বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধঃ দলিলপত্র – ১০ তম খণ্ড (অনুবাদসহ)

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধঃ দলিলপত্র – ১০ তম খণ্ড (অনুবাদসহ)

 

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ

দলিলপত্রঃ দশম খন্ড

                            সশস্ত্র সংগ্রাম ()

 

 

 

 

অ্যাটেনশন!

পরবর্তী পেজগুলোতে যাওয়ার আগে কিছু কথা জেনে রাখুনঃ

 

  • ডকুমেন্টটি যতদূর সম্ভব ইন্টার‍্যাক্টিভ করা চেষ্টা করা হয়েছে। অর্থাৎ এই ডকুমেন্টের ভেতরেই অসংখ্য ইন্টারনাল লিংক দেয়া হয়েছে। আপনি সেখানে ক্লিক করে করে উইকিপিডিয়ার মতো এই ডকুমেন্টের বিভিন্ন স্থানে সহজেই পরিভ্রমণ করতে পারবেন। যেমন প্রতি পৃষ্ঠার নিচে নীল বর্ণে‘সূচিপত্র লেখা শব্দটিতে কি-বোর্ডের Ctrl চেপে ধরে ক্লিক করলে আপনি সরাসরি এই ডকুমেন্টের ‘সূচিপত্রে’ চলে যেতে পারবেন।

 

 

  • তারপর দলিল প্রসঙ্গ শিরোনামে কিছু লেখা আছে। এটি যুদ্ধদলিলের ১০ম খণ্ড থেকে সরাসরি লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। এখানে আপনারা জানতে পারবেন যে এই ডকুমেন্টে আসলে কী কী আছে।

 

 

  • তারপর ‘সূচিপত্র’ এখান থেকেই মূল দলিল শুরু। সূচিপত্রটি সরাসরি দলিলপত্র থেকে নেয়া হয়েছে। সূচিপত্রে লেখা পেজ নাম্বারগুলো যুদ্ধদলিলের মূল সংকলনটির পেজ নাম্বারগুলোকে রিপ্রেজেন্ট করে।

 

  • যুদ্ধদলিলে মোট ১৫ টি খণ্ড আছেঃ

প্রথম খন্ড      : পটভূমি (১৯০৫-১৯৫৮)

দ্বিতীয় খন্ড         : পটভূমি (১৯৫৮-১৯৭১)

তৃতীয় খন্ড          : মুজিবনগরঃ প্রশাসন

চতুর্থ খন্ড           : মুজিবনগরঃ প্রবাসী বাঙালীদের তৎপরতা

পঞ্চম খন্ড           : মুজিবনগরঃ বেতারমাধ্যম

ষষ্ঠ খন্ড : মুজিবনগরঃ গণমাধ্যম

সপ্তম খন্ড           : পাকিস্তানী দলিলপত্র: সরকারী ও বেসরকারী

অষ্টম খন্ড           : গণহত্যা, শরনার্থী শিবির ও প্রাসঙ্গিক ঘটনা

নবম খন্ড           : সশস্ত্র সংগ্রাম (১)

দশম খন্ড            : সশস্ত্র সংগ্রাম (২)

একাদশ খন্ড        : সশস্ত্র সংগ্রাম (৩)

দ্বাদশ খন্ড           : বিদেশী প্রতিক্রিয়াঃ ভারত

ত্রয়োদশ খন্ড        : বিদেশী প্রতিক্রিয়াঃ জাতিসংঘ ও বিভিন্ন রাষ্ট্র

চতুর্দশ খন্ড          : বিশ্বজনমত

পঞ্চদশ খন্ড         : সাক্ষাৎকার

 

 

  • এই ডকুমেন্টে প্রতিটি দলিলের শুরুতে একটা কোড দেয়া আছে।

<খণ্ড নম্বর, দলিল নম্বর, পেজ নম্বর>

অর্থাৎ <১০,৩,১৪৫-৭৩> এর অর্থ আলোচ্য দলিলটি মূল সংকলনের ১০ম খণ্ডের ৩ নং দলিল, যা ৭৩ থেকে ১৪৫ নং পৃষ্ঠায় মুদ্রিত আছে। দলিল নম্বর বলতে সূচিপত্রে উল্লিখিত নম্বরকে বুঝানো হচ্ছে। উদ্ধৃত ‘৩’ নাম্বার দলিলটি ‘২ নং সেক্টর ও ‘কে’ ফোর্সের যুদ্ধ বিবরণ’ অংশে রক্ষিত ‘ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ’-এর একটি সাক্ষাৎকার মুদ্রিত আছে। বুঝার সুবিধার্থে দলিলটির শুরুর অংশ দেখে নিনঃ

 

  • আবার কোন কোন দলিলের সাথে উপ-দলিল ও থাকে। যেমন, <১০, ১৮.২, ৪২২-৪২৭> এর অর্থ হচ্ছে ১০ম খণ্ডের ১৮ নাম্বার দলিলের ২ নাম্বার উপদলিল যা ৪২২ থেকে ৪২৭ নং পৃষ্ঠায় মুদ্রিত আছে।

 

 

  • দলিলে যেসব বানান ভুল আমরা খুঁজে পেয়েছি, সেগুলোকে হলুদ মার্ক করা হয়েছে।

 

  • মনে করুন, আপনি ১ নম্বর সেক্টর নিয়ে কিছু একটা লিখতে চাইছেন। এই ফাইলে ‘১ নম্বর সেক্টর’ লিখে সার্চ দিলেই ১০ম খণ্ডের সেই সংক্রান্ত সকল দলিল পেয়ে যাবেন। ফলে রেফারেন্স নিয়ে লিখতে আপনার খুবই সুবিধা হবে। কারণ আমাদের মূল উদ্দেশ্য একটাই। আমরা যেন সঠিক ইতিহাস চর্চা করে বেড়ে ওঠা একটি প্রজন্ম হয়ে উঠি। এটা আমাদের নিজেদের জন্যেই অত্যন্ত প্রয়োজন। যে জাতি নিজের জন্মের ইতিহাস জানে না, সে জাতির চেয়ে দুর্বল সত্ত্বা পৃথিবীতে আর কিছু নেই।

 

  • মনে করুন, আপনি নিজের এলাকা নিয়ে জানতে চান। তবে নিজের এলাকার নাম লিখে এই ডকুমেন্টে সার্চ করুন। উদাহরণস্বরূপ, আপনি কুমিল্লা শহরের সংঘটিত যুদ্ধ সম্পর্কে জানতে চাইলে Ctrl+F চেপে ‘কুমিল্লা’ লিখে সার্চ করুন। ১০ম খণ্ডে রক্ষিত ‘কুমিল্লা’ নিয়ে সকল দলিল আপনার সামনে চলে আসবে। দেশকে জানার প্রথম শর্তই হলো নিজের এলাকাকে জানা।

 

 

 

মনোযোগ দিয়ে সারসংক্ষেপটি পড়ার জন্য ধন্যবাদ। এবার বিস্তারিত।

 

 

 

দলিল প্রসঙ্গঃ সশস্ত্র সংগ্রাম ()

(পৃষ্ঠা নাম্বারগুলো মূল দলিলের পৃষ্ঠা নাম্বার অনুসারে সরাসরি লিখিত। এর সাথে এই ওয়ার্ড ফাইলের পৃষ্ঠা নাম্বার রিলেটেড নয়)

 

বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সশস্ত্র পর্যায়ের যাবতীয় কর্মকাণ্ডের দলিলসমুহ তিন খন্ডে বিভাজন করা হয়েছে।

 

বর্তমান সশস্ত্র সংগ্রাম (২) প্রস্তুত করা হয়েছে মুজিবনগর সরকার গঠনোত্তর কালে বাংলাদেশের বিভিন্ন সেক্টরের যুদ্ধ তৎপরতাকে কেন্দ্র করে। সাধারনভাবে জুন-জুলাই থেকে মধ্য ডিসেম্বরে হানাদার বাহিনীর চুড়ান্ত আত্মসমর্পণ পর্যন্ত সেক্টরে সেক্টরে সংগঠিত যুদ্ধের ধারা প্রতিরোধমূলক ছিল না।, তা ছিল কেন্দ্রীয় কমান্ডের অধীন, সংগঠিতো আক্রমণমুখী। মুজিবনগরে অনুষ্টিত সেক্টর কমান্ডারদের সম্মেলনে (পৃঃ ১-৬,২০২-০৪) গৃহীত কার্যক্রমের পর বাংলাদেশের সশস্ত্র স্বাধীনতা যুদ্ধ ক্রমশঃ এ রূপ গ্রহন করে। উল্লেখিত সময়ের যুদ্ধের বৈশিষ্ট্যের জন্যই সশস্ত্র সংগ্রাম (২)-এর এই পরিকল্পনা।

 

সশস্ত্র যুদ্ধেও বিবরণ সংগ্রহ ও সন্নিবেশিত করা ছিল অত্যান্ত দুরূহ কাজ। যুদ্ধকালে সেক্টরসমূহের দৈনন্দিন ঘটনাবলীর ধারাবাহিক বিবরণ অনেক ক্ষেত্রে রক্ষিত হতে পারে নি। এ কারনে, যুদ্ধে যারা প্রত্যক্ষভাবে জড়িত মুখ্যতঃ তাদের সাক্ষাৎকার, লিখিত প্রতিবেদন ও গ্রন্থ প্রভৃতিকে এখানে প্রাথমিক দলিল হিসাবে গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়া, পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত বিবরণও কিছু এসেছে।

 

সাক্ষাৎকারগুলির বেশীরভাগ বাংলা একাডেমীর অঙ্গীভূত জাতীয় স্বাধীনতার ইতিহাস পরিষদ (জুলাই, ৭২-ডিসেম্বর, ৭৩)-এর উদ্যোগে গৃহীত। ২ ও ৩ নং সেক্টর কমান্ডারদ্বয়-ব্রিগ্রেডিয়ার খালেদ মোশাররফ (পৃঃ ৭৩) ও মেজর জেনারেল কে, এম শফিউল্লাহ (পৃঃ ২০০)-এর সাক্ষাতকারসহ কয়েকটি বাংলা একাডেমীর গবেষক জনাব সুকুমার বিশ্বাস ব্যাক্তিগতভাবে গ্রহণ করেছিলেন। এগুলি এখানে সেক্টর অনুসারে বিন্যস্ত করে হয়েছে।

 

প্রথমে সেক্টর কমান্ডারদের সাক্ষাৎকার বা তাঁদের রচিত বিবরনসমুহের মাধ্যমে সেক্টরের ঘটনাবলী উন্মোচনের চেষ্টা করে হয়েছে, পরে পৃথক শিরনামে সাব-সেক্টর কমান্ডারবৃন্দ এবং অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধাদের বক্তব্য সন্নিবেশ গোটা সেক্টরের ঘটনার ব্যাপকতা তুলে ধরা হয়েছে। এছাড়া, স্বাধীনতাযুদ্ধের সংগঠক, অনিয়মিত গণবাহিনীর সদস্য বা ফ্রিডম ফাইটারদের (গেরিলা যোদ্ধা) সাক্ষাৎকার ও তাঁদের সম্বন্ধে প্রদত্ত বিবরণ এবং পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত বিবরণের সাহায্যেও রণাঙ্গনের ঘটনাপ্রবাহকে যথাসম্ভব আরও স্পষ্ট করে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। এখানে ৭নং সেক্টর অধিনায়ক লেঃ কর্নেল (অবঃ) কাজী নুরুজ্জামানের সাক্ষাৎকার বা তাঁর নিজস্ব কোনো প্রতিবেদন দেওয়া সম্ভব হয়নি- সাক্ষাৎকার প্রদানে তিনি অক্ষমতা জ্ঞাপন করেছেন। যুদ্ধে তাঁর ভূমিকা সম্বন্ধে সাব-সেক্টর প্রধানদের প্রদত্ত বর্ণনায় (পৃঃ ৩৩৫-৩৬৭) জানা যাবে। অপরদিকে, বি-ডি-এফ-বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর সংগঠিত তিন ব্রিগেড ফোর্স-এর অন্যতম জেড ফোর্সে (পৃঃ ৪৭৬-৫০৯) এর মুল কমান্ডার জিয়াউর রহমান (পরবর্তীতে লেঃ জেনারেল ও রাষ্ট্রপতি)- এর সাক্ষাতকারও সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি তাঁর অকালমৃত্যুর কারনে। এই ফোর্স কোন নির্দিষ্ট সেক্টরের অন্তর্গত না থাকাতে এ বিষয়ে আলাদা শিরোনামে (পৃঃ ৪৭৬) বিবৃত হয়েছে। এবং এ ব্যাপারে ঐ ব্রিগেডের সামরিক অফিসারদের প্রদত্ত বিবরণসমূহের ব্যাপক সাহায্য নেওয়া হয়েছে। অন্য দুটি ব্রিগেড ফোর্স- ‘কে’ ফোর্স (পৃঃ ৭৩) এবং ‘এস’ ফোর্স (পৃঃ ২০০)- এর যুদ্ধ তৎপরতা ও গঠন সংক্রান্ত তথ্যাদি এসেছে এদের মূল কমান্ডারদ্বয়ের নিজস্ব বর্ণনায়।

 

বাংলাদেশের সশস্ত্র সংগ্রাম কেবল স্থলযুদ্ধেই সীমিত ছিল না, তা নৌ এবং বিমানযুদ্ধেও সম্প্রসারিত হয়েছিল। বাংলাদেশ নৌবাহিনীর গঠন ও তাঁর অপারেশনসমুহের বিবরণ মিলবে সাক্ষাৎকার ভিত্তিক তথ্যরাজিতে (পৃঃ ৫১০-৫২১) এবং মুক্তাঞ্চল থেকে প্রকাশিত পত্রিকার খবরে (পৃঃ ৫২১-৫২২)। অনুরূপ, বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর গঠন ও তার যুদ্ধ তৎপরতার সাক্ষ্য পাওয়া যাবে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী (বি-ডি-এফ)- এর তৎকালীন বার ডেপুটি চীফ অব স্টাফ এয়ার ভাইস মার্শাল এ, কে, খন্দকার (পৃঃ ৫২৩) এবং ক্যাপ্টেন আব্দুস সাত্তার (পৃঃ ৫৬৮)- এর ভাষ্য। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে মেডিক্যাল কোর ও সিগন্যাল কোরও গঠন করা হয়েছিল। সীমিত আকারে হলেও এরা পৃথক সত্তা নিয়ে কর্মতৎপর। এদের তৎপরতা সম্বন্ধেও কিছু তথ্য সন্নিবিশিত হয়েছে যথাক্রমে ৫২৬ ও ৫২৮ পৃষ্ঠায়।

 

প্রত্যেক সেক্টরে মুক্তিবাহিনীর চুড়ান্ত পর্বের লড়াই সম্পর্কে একটি প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে গোটা রণাঙ্গনের পরিস্থিতি তুলে ধরার জন্য (পৃঃ ৫২৯-৫৩৭) এবং এর পরই পাক-ভারত যুদ্ধের বিস্তৃত প্রেক্ষাপটে পূর্বাঞ্চলজুড়ে ভারতীয় মিত্র বাহিনীর যুদ্ধ তৎপরতার বিবরণ (ভারতীয় সূত্র থেকে আহরিত) সংযোজিত হয়েছে। ভারতীয় বাহিনী ও বাংলাদেশ বাহিনী মিলে গড়ে উঠেছিল এই কমান্ড। এদের যৌথ কার্যক্রম, হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে পরিচালিত এদের দ্রুত যৌথ সামরিক অভিযানগুলি এবং সে সবের সাফল্যজনক চূড়ান্ত পরিসমাপ্তি সম্বন্ধে সম্যক ধারণা পাওয়া যাবে এই বিবরণে।

 

সশস্ত্র সংগ্রামের পর্যায়ে বি-ডি-এফ-এর গঠন ছিল চূড়ান্ত নির্ধারক ঘটনা। সামগ্রিক যুদ্ধ স্ট্র্যাটেজি প্রণয়ন, রণক্ষেত্রকে বিভিন্ন সুবিধাজনক সেক্টরে বিভাজন, এবং এগুলিতে সৈনাধ্যক্ষ নিয়োগ, ব্রিগেড ফোর্স গঠন, নতুন সামরিক অফিসার ট্রেনিং ও তাঁদের নিয়োগ, নৌ ও বিমান বাহিনী গঠন, গণবাহিনী (ফ্রিডম ফাইটার) গঠন ও প্রশিক্ষণ প্রভৃতি যাবতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল বি-ডি-এফ-এর নিয়ন্ত্রনাধীন। এ সম্বন্ধে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক জেনারেল আতাউল গণি ওসমানীর একটি পূর্ণাংগ সাক্ষাৎকার সংযোজিত হয়েছে এ খন্ডের পরিশিষ্টে (পৃঃ ৫৫৯)। স্বাধীনতার পরপরই গৃহীত ও তাঁরই সংশোধিত এ সাক্ষাৎকারটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সামগ্রিক প্রেক্ষিত উন্মোচনে প্রভুত সাহায্য করবে।

 

গণবাহিনী বলে পরিচিত গেরিলা মুক্তিযোদ্ধাদের ভুমিকা ছিল স্বাধীনতা যুদ্ধে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এ বাহিনী গড়ে ঊঠেছিল হাজার হাজার তরুণ ছাত্র-যুবক নিয়ে। সেক্টর-সাব-সেক্টরের আওতায় এরা প্রচণ্ডভাবে সক্রিয় ছিল দেশের অভ্যন্তরে অবিরাম আঘাত হানার মাধ্যমে হানাদার বাহিনীকে প্রতিনিয়ত পর্যুদস্ত করার কাজে। তথ্যের স্বল্পতার দরুন এদের অপূর্ব সাহসিকতাপূর্ণ বিচিত্র ও বিশাল কর্মকাণ্ডের সামান্য অংশই বর্তমান খন্ডে প্রতিফলিত হয়েছে।

 

সাক্ষাৎকারগুলিতে বর্ণিত ঘটনাবলীর ধারাবাহিকতা ও কালানুক্রমিকতার ওপর সতর্ক দৃষ্টি রাখা হয়েছে, সম্পাদনায় অনেক ক্ষেত্রে বিশ্লেষণাত্মক বর্ণনা ও পুনারাবৃত্তি পরিহার করে শুধু ঘটনা পরিস্থিতিকে রাখা হয়েছে, এবং মুদ্রণ প্রমাদ এড়ানোর যথাসাধ্য প্রয়াস নেওয়া হয়েছে। তবু অনিচ্ছাকৃত দু একটি ত্রুটি রয়ে গেছে। তন্মোধ্যে উল্লেখযোগ্য, ১ নং সেক্টরের যুদ্ধ বর্ণনাকারীদের মধ্যে শামসুল ইসলাম-এর (পৃঃ ৬২) নাম অমুদ্রিত থেকে গেছে।

 

জাতীয় স্বাধীনতার সশস্ত্র লড়াইয়ের ক্ষেত্রে সাধারনতঃ যেমনটি হয়ে থাকে, বলতে গেলে, বাংলাদেশের গোটা ভূখন্ডই ছিল রণক্ষেত্রবিশেষ। বহু প্রথাগত সম্মুখ-যুদ্ধে ও সংঘর্ষে, বিস্তর অ্যামবুশে, গেরিলা, পদাতিক, নৌ কমান্ডো ও বৈমানিকদের বীরত্বপূর্ণ দুঃসাহসিক অভিযানে এবং তাঁদের বিপুল আত্মোৎসর্গে পরিপূর্ণ ছিল এ রণক্ষত্র। এর প্রতিটি ঘটনার তথ্যোদ্ধার সুদীর্ঘকালীন প্রয়াসসাপেক্ষ। এখানে প্রকল্পের নির্দিষ্ট-কাল পরিসরে যে পরিমাণ তথ্য সংগ্রহ করা গেছে, তারই ভিত্তিতে গ্রন্থের সীমিত আয়তনের দিকে লক্ষ্য রেখে স্বাধীনতা যুদ্ধের সশস্ত্র পর্বের ঘটনাকে সেক্টরে সেক্টরে বিন্যস্ত করে একটি প্রতিনিধিত্বশীল চিত্র উপস্থাপন করা হয়েছে।

 

 

 

 

 

সূচীপত্র

ক্রমিক শিরোনাম

পেজ নাম্বার

(মূল

দলিল)

পি ডি এফ পেজ

কম্পাইলার/

ট্রান্সলেটর

কোড

প্রতিবেদনঃ মেজর (অবঃ)রফিক-উল ইসলাম

–    বিলম্বিত কনফারেন্স

–    যুদ্ধের পরিবর্তিত গতি

–    অপারেশন জ্যাকপট

–    কোণঠাসা

–    গেরিলা যোদ্ধা

–    যুদ্ধের মুখোমুখি

–    হতবুদ্ধি ইয়াহিয়া

–    অঘোষিত যুদ্ধ শুরু

–    যুদ্ধ পরিকল্পনা

–    স্বাধীনতার চূড়ান্ত লড়াই

–    পরিশেষ

১-৪২ ৬৮৯২

মিনহাজ উদ্দিন

 

<১০, ১.১, ১-৪২>
১ নং সেক্টরের কতিপয় গেরিলা অপারেশন ৪৩-৫৮ ৬৯৩৪ ডাঃ মোঃ রাজিবুল বারী(পলাশ) <১০, ১.২ ৪৩-৫৮>
প্রতিবেদনঃ শামসুল ইসলাম ৫৯-৬১ ৬৯৫০

নওশাবা তাবাসুম

 

<১০, ২.১, ৫৯-৬১>
সাক্ষাৎকারঃ মেজর মাহফুজুর রহমান ৬২-৬৮ ৬৯৫৩ ডাঃ মোঃ রাজিবুল বারী(পলাশ) <১০, ২.২, ৬২-৬৮>
সাক্ষাৎকারঃ নায়েক সুবেদার মনিরুজ্জামান ৬৯-৭২ ৬৯৬০

নীলাঞ্জনা অদিতি

 

<১০, ২.৩, ৬৯-৭২>
সাক্ষাৎকারঃ ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ ৭৩-১৪৫ ৬৯৬৪

রানা আমজাদ

ডাঃ মোঃ রাজিবুল বারী(পলাশ)

ফকরুজ্জামান সায়েম

মোঃ কাওছার আহমদ

নীলাঞ্জনা অদিতি

<১০, ৩, ৭৩-১৪৫>
সাক্ষাৎকারঃ মেজর আইনুদ্দিন ১৪৬-১৪৮ ৭০৩৭ আতিকুল ইসলাম ইমন <১০, ৪.১, ১৪৬-১৪৮>

Daturmura Theatre

–    ৯ম বেঙ্গল রেজিমেন্টের কুমিল্লা শহর দখল

১৪৮-১৫২ ৭০৩৯ ডাঃ মোঃ রাজিবুল বারী(পলাশ) <১০, ৪.২, ১৪৮-১৫২>
সাক্ষাৎকারঃ মেজর গফফার ১৫৩-১৭০ ৭০৪৪ আতিকুল ইসলাম ইমন <১০, ৪.৩, ১৫৩-১৭০>
সাক্ষাৎকারঃ মেজর ইমামুজ্জামান ১৭০-১৭১ ৭০৬১ আতিকুল ইসলাম ইমন <১০, ৪.৪, ১৭০-১৭১>
সাক্ষাৎকারঃ লেঃ কর্নেল মোস্তফা কামাল ১৭১-১৭৩ ৭০৬২ আতিকুল ইসলাম ইমন <১০, ৪.৫, ১৭১-১৭৩>
সাক্ষাৎকারঃ মেজর শহীদুল ইসলাম ১৭৩-১৭৫ ৭০৬৪ আতিকুল ইসলাম ইমন <১০, ৪.৬, ১৭৩-১৭৫>
সাক্ষাৎকারঃ ক্যাপ্টেন হুমায়ুন কবির ১৭৫-১৭৮ ৭০৬৬ আতিকুল ইসলাম ইমন <১০, ৪.৭, ১৭৫-১৭৮>
সাক্ষাৎকারঃ মেজর জাফর ইমাম ১৭৮-১৮৪ ৭০৬৯ আতিকুল ইসলাম ইমন <১০, ৪.৮, ১৭৮-১৮৪>
সাক্ষাৎকারঃ সুবেদার মেজর লুৎফর রহমান ১৮৪-১৯০ ৭০৭৫ আতিকুল ইসলাম ইমন <১০, ৪.৯, ১৮৪-১৯০>
সাক্ষাৎকারঃ সুবেদার আবদুল ওয়াহাব ১৯০-১৯৩ ৭০৮১ নীলাঞ্জনা অদিতি <১০, ৪.১০, <১৯০-১৯৩>
সাক্ষাৎকারঃ সুবেদার গোলাম আম্বিয়া ১৯৩-১৯৪ ৭০৮৪ নীলাঞ্জনা অদিতি <১০, ৪.১১, ১৯৩-১৯৪>
সাক্ষাৎকারঃ মেজর দিদার আতাউর হোসেন ১৯৪-১৯৮ ৭০৮৫ নীলাঞ্জনা অদিতি <১০, ৪.১২, ১৯৪-১৯৮>

সাক্ষাৎকারঃ মেজর জেনারেল এ কে এম শফিউল্লাহ

–    রায়পুরার নিকটবর্তী বেলাবো অপারেশন

–    কটিয়াদি অ্যামবুশ

–    মুকুন্দপুর অ্যামবুশ

–    কালেঙ্গা জঙ্গলে অ্যামবুশ

–    মনোহরদী অবরোধ

১৯৯-২১৬ ৭০৯০

শোয়েব কামাল

 

 

 

 

 

<১০, ৫, ১৯৯-২১৬>
সাক্ষাৎকারঃ ব্রিগেডিয়ার এম এ মতিন ২১৭-২১৯ ৭১০৮ রানা আমজাদ <১০, ৬.১, ২১৭-২১৯>
সাক্ষাৎকারঃ লেঃ কর্নেল গোলাম হেলাল মুর্শেদ খান ২১৯-২২২ ৭১১০ রানা আমজাদ <১০, ৬.২, ২১৯-২২২>
সাক্ষাৎকারঃ সিপাই আফতাব হোসেন ২২২ ৭১১৩ রানা আমজাদ <১০, ৬.৩, ২২২>
সাক্ষাৎকারঃ মেজর দোস্ত মোহাম্মদ শিকদার ২২৩-২২৪ ৭১১৪ রানা আমজাদ

<১০, ৬.৪, ২২৩-২২৪>

 

সাক্ষাৎকারঃ মেজর শামসুল হুদা বাচ্চু ২২৪-২২৫ ৭১১৫ রানা আমজাদ <১০, ৬.৫, ২২৪-২২৫>

প্রতিবেদনঃ মেজর এস এ ভুঁইয়া

–     একটি এ্যামবুশ ও সুবেদার চান মিয়ার বীরত্ব

–     আর একটি রেইড

–     ধর্ম ঘরে সুবেদার তৈয়বের কৃতিত্ব

–     বীর মুজাহিদ দুলা

–     চূড়ান্ত লড়াই ও আখাউড়ার যুদ্ধ

–     আশুগঞ্জের লড়াই এবং ঢাকার পথে ‘এস’ ফোর্স

২২৫-২৩৪ ৭১১৬ রানা আমজাদ <১০, ৬.৬, ২২৫-২৩৪>
সাক্ষাৎকারঃ ব্রিগেডিয়ার চিত্তরঞ্জন দত্ত ২৩৫-২৪৪ ৭১২৬ শাহরিয়ার ফারুক <১০, ৭, ২৩৫-২৪৪>

সাক্ষাৎকারঃ লেঃ কর্নেল মোঃ মোহাম্মদ আব্দুর রব

–     সুত্রাকান্দির যুদ্ধ

–     লতি টিলার অপারেশন

–     সবুজপুর (লাটু) রেলওয়ে স্টেশন অপারেশন

–     আটগ্রাম অপারেশন

২৪৫-২৫৭ ৭১৩৬ শুভাদিত্য সাহা <১০, ৮.১, ২৪৫-২৫৭>
যুদ্ধের ডায়েরী ২৫৮-২৭৭ ৭১৪৯ অয়ন মুক্তাদির <১০, ৮.২, ২৫৮-২৭৭>
সাক্ষাৎকারঃ মেজর ওয়াকিউজ্জামান ২৭৮-২৮২ ৭১৬৯ নীলাঞ্জনা অদিতি

<১০, ৮.৩, ২৭৮-২৮২>

 

সাক্ষাৎকারঃ লেঃ জেনারেল (অবঃ) মীর শওকত আলী ২৮৩-২৮৭

৭১৭৪

 

মুক্ত বিহঙ্গ

 

<১০, ৯, ২৮৩-২৮৭>
১০
সাক্ষাৎকারঃ মেজর তাহের উদ্দিন আখঞ্জি ২৮৮-২৯০ ৭১৭৯ নওশাবা তাবাসুম <১০, ১০.১, ২৮৮-২৯০>
সাক্ষাৎকারঃ মেজর এস এম খালেদ ২৯০-২৯২ ৭১৮১ নওশাবা তাবাসুম <১০, ১০.২, ২৯০-২৯২>
সাক্ষাৎকারঃ মোঃ রফিকুল আলম ২৯২-২৯৪ ৭১৮৩ নওশাবা তাবাসুম <১০, ১০.৩, ২৯২-২৯৪>
একটি অপারেশনের রিপোর্ট ২৯৪-২৯৬ ৭১৮৫ মাসরুর মাকিব <১০, ১০.৪, ২৯৪-২৯৬>
সাক্ষাৎকারঃ নাজমুল আহসান মহীউদ্দিন আলমগীর ২৯৬-২৯৭ ৭১৮৭ নওশাবা তাবাসুম <১০, ১০.৫, ২৯৬-২৯৭>

১১

 

 

সাক্ষাৎকারঃ এয়ার ভাইস মার্শাল এম. কে. বাশার ২৯৮-৩০২ ৭১৮৯ নওশাবা তাবাসুম <১০, ১১, ২৯৮-৩০২>
১২
সাক্ষাৎকারঃ লেঃ কর্নেল দেলোয়ার হোসেন ৭১৯৪

নীলাঞ্জনা অদিতি

 

<১০, ১২.১, ৩০৩-৩০৯>
সাক্ষাৎকারঃ মেজর সুলতান শাহরিয়ার রশীদ ৭২০১ নীলাঞ্জনা অদিতি <১০, ১২.২, ৩১০-৩১৩>
সাক্ষাৎকারঃ সৈয়দ মনসুর আলী ৭২০৪ নীলাঞ্জনা অদিতি <১০, ১২.৩, ৩১৩-৩১৪>
সাক্ষাৎকারঃ সুবেদার মেজর মোঃ কাজিমমউদ্দিন ৭২০৫ নীলাঞ্জনা অদিতি <১০, ১২.৪, ৩১৪-৩১৮
সাক্ষাৎকারঃ মোঃ নুরুজ্জামান ৭২০৯ নীলাঞ্জনা অদিতি <১০, ১২.৫, ৩১৮-৩২১>
সাক্ষাৎকারঃ লেঃ কর্নেল মতিউর রহমান ৭২১২ নীলাঞ্জনা অদিতি <১০, ১২.৬, ৩২১-৩২৬>
সাক্ষাৎকারঃ মেজর মোঃ আবদুস সালাম ৭২১৭ নীলাঞ্জনা অদিতি <১০, ১২.৭, ৩২৬-৩২৮>

মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি (প্রতিবেদন)

–     রায়গঞ্জ দখলের লড়াই

–     বড়খাতা ব্রীজঃ ব্রীজ অন রিভার তিস্তা

–     চার রাত্রির কাহিনী

৭২১৯ নীলাঞ্জনা অদিতি <১০, ১২.৮, ৩২৮-৩৩৩>
১৩
যুদ্ধের ঘটনাপঞ্জীঃ ব্রিগেডিয়ার গিয়াসউদ্দিন চৌধুরী ৩৩৪-৩৪২ ৭২২৫ মুক্তাদির অয়ন <১০, ১৩.১, ৩৩৪-৩৪২>

Reorganisition of Troops at Rajshahi

–     অপারেশন “কাবযাকারা

৩৪২-৩৪৭ ৭২৩৩ ডাঃ মোঃ রাজিবুল বারী(পলাশ) <১০, ১৩.২, ৩৪২-৩৪৭>
সাক্ষাৎকারঃ মেজর (অবঃ) রফিকুল ইসলাম ৩৪৭-৩৫০ ৭২৩৮

নীলাঞ্জনা অদিতি

 

<১০, ১৩.৩, ৩৪৭-৩৫০>
১৪
প্রতিবেদনঃ ডাঃ মাহবুবুল আলম ৩৫১-৩৫৪ ৭২৪২ মুক্ত বিহঙ্গ <১০, ১৪.১, ৩৫১-৩৫৪>
সাক্ষাৎকারঃ নায়েক মোহাম্মাদ আমিনউল্লাহ ৩৫৪-৩৫৫ ৭২৪৫ মুক্ত বিহঙ্গ <১০, ১৪.২, ৩৫৪-৩৫৫>
সাক্ষাৎকারঃ হাবিলদার মোঃ ফসিহউদ্দিন আহমদ ৩৫৫-৩৫৬ ৭২৪৬ মুক্ত বিহঙ্গ <১০, ১৪.৩, ৩৫৫-৩৫৬>
মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি (প্রতিবেদন) ৩৫৬-৩৫৭ ৭২৪৭ মুক্ত বিহঙ্গ <১০, ১৪.৪, ৩৫৬-৩৫৭>
৭নং সেক্টরের মুক্তিবাহিনীর তৎপরতা ৩৫৭-৩৬৪ ৭২৪৮ মুক্ত বিহঙ্গ <১০, ১৪.৫, ৩৫৭-৩৬৪>
Operation Avoya Bridge: বদিউজ্জামান ৩৬৪-৩৬৬ ৭২৫৫

অপরাজিতা নীল

 

<১০, ১৪.৬, ৩৬৪-৩৬৬>
১৫
সাক্ষাৎকারঃ লেঃ কর্নেল এম. এ. ওসমান চৌধুরী ৩৬৭-৩৬৯ ৭২৫৮ মিনহাজ উদ্দিন <১০, ১৫.১, ৩৬৭-৩৬৯>
সাক্ষাৎকারঃ লেঃ কর্নেল এম. এ. মঞ্জুর ৩৬৯-৩৭১ ৭২৫৮ মিনহাজ উদ্দিন <১০, ১৫.২, ৩৬৯-৩৭১>
১৬
সাক্ষাৎকারঃ লেঃ কর্নেল মোস্তাফিজুর রহমান ৩৭২-৩৭৪ ৭২৬৩ মিনহাজ উদ্দিন <১০, ১৬.১, ৩৭২-৩৭৪>

সাক্ষাৎকারঃ তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী

–     বেনাপোল পতাকা

৩৭৪-৩৭৬ ৭২৬৫ মিনহাজ উদ্দিন <১০, ১৬.২, ৩৭৪-৩৭৬>
সাক্ষাৎকারঃ মেজর আবদুল হালিম ৩৭৬-৩৭৭ ৭২৬৭ মিনহাজ উদ্দিন <১০,১৬.৩, ৩৭৬-৩৭৭>
সাক্ষাৎকারঃ মেজর অলীক কুমার গুপ্ত ৩৭৭-৩৭৯ ৭২৬৮ মিনহাজ উদ্দিন <১০, ১৬.৪, ৩৭৭-৩৭৯>
সাক্ষাৎকারঃ সুবেদার মেজর তবারকউল্লাহ ৩৭৯ ৭২৭০ মিনহাজ উদ্দিন <১০, ১৬.৫, ৩৭৯>
সাক্ষাৎকারঃ নায়েক সুবেদার আবদুল মতিন পাটোয়ারী ৩৭৯-৩৮০ ৭২৭০ মিনহাজ উদ্দিন <১০, ১৬.৬, ৩৭৯-৩৮০>
সাক্ষাৎকারঃ ক্যাপ্টেন আবদুল গনি ৩৮১ ৭২৭২ মিনহাজ উদ্দিন <১০, ১৬.৭, ৩৮১>
১৭

প্রতিবেদনঃ মেজর (অবঃ) এম. এ. জলিল

–     বরিশালের রণাঙ্গন

–     গুপ্ত পথে যাত্রা

–     সুন্দরবনে প্রেতাত্মা

–     সর্বাধিনায়কের দরবার

–     মৃত্যুঞ্জয়ী কাফেলা

–     গেরিলা অভিযান

–     বিজয় অভিযান

৩৮২-৪২১ ৭২৭৩

দীপংকর ঘোষ দ্বীপ

হুসাইন মুহাম্মাদ ইশতিয়াক

আল্লামা বোরহান উদ্দিন শামীম

<১০, ১৭, ৩৮২-৪২১>

 

১৮
সাক্ষাৎকারঃ মেজর মেহেদী আলী ইমাম ৪২২-৪২৭ ৭৩১৩ আতিকুল ইসলাম ইমন <১০, ১৮.১, ৪২২-৪২৭>
সাক্ষাৎকারঃ লেঃ শামসুল আরেফিন ৪২৭-৪২৯ ৭৩১৮ আতিকুল ইসলাম ইমন <১০, ১৮.২, ৪২৭-৪২৯>
সাক্ষাৎকারঃ মোঃ নূরুল হুদা ৪২৯-৪৩৫ ৭৩২০ আতিকুল ইসলাম ইমন <১০, ১৮.৩, ৪২৯-৪৩৫>
সাক্ষাৎকারঃ শামসুল আলম তালুকদার ৪৩৫-৪৪১ ৭৩২৬ আতিকুল ইসলাম ইমন <১০, ১৮.৪, ৪৩৫-৪৪১>
সাক্ষাৎকারঃ ডাঃ মোহাম্মদ শাহজাহান ৪৪১-৪৪২ ৭৩৩২ আতিকুল ইসলাম ইমন <১০, ১৮.৫, ৪৪১-৪৪২>
সাক্ষাৎকারঃ রাজিনা আনসারী ৪৪২ ৭৩৩৩ আতিকুল ইসলাম ইমন ১০, ১৮.৬, ৪৪২>
সাক্ষাৎকারঃ স. ম. বাবর আলী ৪৪৩ ৭৩৩৪ আতিকুল ইসলাম ইমন ১০, ১৮.৬, ৪৪৩>
সাক্ষাৎকারঃ ক্যাপ্টেন (অবঃ) নূরুল হুদা ৪৪৪ ৭৩৩৫ আতিকুল ইসলাম ইমন <১০, ১৮.৭, ৪৪৪>
১৯
সাক্ষাৎকারঃ লেঃ কর্নেল (অবঃ) আবু তাহের ৪৪৮-৪৫১

৭৩৩৯

 

অপরাজিতা নীল <১০, ১৯.১, ৪৪৮-৪৫১>

কয়েকটি অপারেশনের বর্ণনা

–    চিলমারীঃ যুদ্ধের ইতিহাসে একটি বিস্ময়

–    মুক্তিযোদ্ধাদের অবদান ও কামালপুর অভিযান

৪৫১-৪৫৯ ৭৩৪২ মুক্ত বিহঙ্গ <১০, ১৯.২, ৪৫১-৪৫৯>

২০

 

 

 

 

 

 

সাক্ষাৎকারঃ মেজর আবদুল আজিজ

–    ১১ নং সেক্টরের যুদ্ধ বিবরণ

–    কামালপুরের অবরোধ

৪৬০-৪৬৩

৭৩৫১

 

শাহরিয়ার ফারুক

 

<১০, ২০.১, ৪৬০-৪৬৩>

সাক্ষাৎকারঃ সুবেদার মেজর জিয়াউল হক

–    গেরিলা অপারেশন

৪৬৩-৪৬৫ ৭৩৫৪

শাহরিয়ার ফারুক

 

<১০, ২০.২, ৪৬৩-৪৬৫>
সাক্ষাৎকারঃ সুবেদার মোসলেহউদ্দিন আহমদ ৪৬৫-৪৬৬ ৭৩৫৬

শাহরিয়ার ফারুক

 

<১০, ২০.৩, ৪৬৫-৪৬৬>
সাক্ষাৎকারঃ মিজানুর রহমান খান ৪৬৬-৪৬৭ ৭৩৫৭

শাহরিয়ার ফারুক

 

<১০, ২০.৪, ৪৬৬-৪৬৭>
সাক্ষাৎকারঃ লেঃ কর্নেল এম. এ. মান্নান ৪৬৭-১৭২ ৭৩৫৮

শাহরিয়ার ফারুক

 

<১০, ২০.৫, ৪৬৭-৪৭২>
১১নং সেক্টরের আরও যুদ্ধ বিবরণ ৪৭২-৪৭৫ ৭৩৬৩

শাহরিয়ার ফারুক

 

<১০, ২০.৬, ৪৭২-৪৭৫>
২১
সাক্ষাৎকারঃ মেজর অলি আহমদ ৪৭৬-৪৭৭ ৭৩৬৭ অপরাজিতা নীল <১০, ২১.১, ৪৭৬-৪৭৭ >

সাক্ষাৎকারঃ মেজর আমিন আহমদ চৌধুরী

–    ‘জেড’ ফোর্সের অপারেশনসমূহঃ ১ম ইষ্ট বেঙ্গলের কামালপুর যুদ্ধ

৪৭৭-৪৮৮ ৭৩৬৮

অপরাজিতা নীল

 

<১০, ২১.২, ৪৭৭-৪৮৮>
সাক্ষাৎকারঃ ক্যাপ্টেন মাহবুবুর রহমান ৪৮৯-৪৯১ ৭৩৮০

মাসরুর আহমেদ

 

<১০, ২১.৩, ৪৮৯-৪৯১>
সাক্ষাৎকারঃ ক্যাপ্টেন আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী ৪৯১-৪৯৫ ৭৩৮২ অভিজিত ঘোষ <১০, ২১.৪, ৪৯১-৪৯৫>
সাক্ষাৎকারঃ মেজর বজলুল গনি পাটোয়ারী ৪৯৫-৪৯৬ ৭৩৮৬ দীপংকর ঘোষ দ্বীপ <১০, ২১.৫, ৪৯৫-৪৯৬>
সাক্ষাৎকারঃ মেজর মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন ৪৯৬-৪৯৮ ৭৩৮৭ দীপংকর ঘোষ দ্বীপ <১০, ২১.৬, ৪৯৬-৪৯৮>

সাক্ষাৎকারঃ ক্যাপ্টেন হাফিজউদ্দিন আহমদ

–    কোদালকাটির যুদ্ধ

৪৯৮- ৫০৪ ৭৩৮৯ রানা আমজাদ <১০, ২১.৭, ৪৯৮-৫০৪>
সাক্ষাৎকারঃ মেজর আবদুল হালিম ৫০৪ ৭৩৯৫ দীপংকর ঘোষ দ্বীপ <১০, ২১.৮, ৫০৪>
সাক্ষাৎকারঃ মেজর সৈয়দ মুনিবুর রহমান ৫০৫-৫০৮ ৭৩৯৬ দীপংকর ঘোষ দ্বীপ <১০, ২১.৯, ৫০৫-৫০৮>
ইস্ট বেঙ্গলের গর্বঃ চিলমারী যুদ্ধ (প্রতিবেদন) ৫০৮-৫০৯ ৭৩৯৯ ফয় সাল <১০, ২১.১০, ৫০৮-৫০৯>
২২
সাক্ষাৎকারঃ মোঃ রহমতউল্লাহ ৫১০-৫১৪ ৭৪০১

মাসরুর আহমেদ

 

<১০, ২২.১, ৫১০-৫১৪>
সাক্ষাৎকারঃ বদিউল আলম ৫১৪-৫২০ ৭৪০৫ মোঃ কাওছার আহমদ <১০, ২২.২, ৫১৪-৫২০>
On the Water fronts-Spectacular Achievements ৫২১ ৭৪১২ তূর্য রহমান <১০, ২২.৩, ৫২১>
Marine Commandos’ Vital Blow ৫২১-৫২২ ৭৪১২ তূর্য রহমান <১০, ২২.৪, ৫২১-৫২২>
২৩
সাক্ষাৎকারঃ এয়ার ভাইস মার্শাল আবদুল করিম খোন্দকার ৫২৩-৫২৫

৭৪১৪

 

অপরাজিতা নীল <১০, ২৩, ৫২৩-৫২৫>
২৪
সাক্ষাৎকারঃ কর্নেল মোহাম্মদ শামসুল হক ৫২৬-৫২৭ ৭৪১৭ অপরাজিতা নীল <১০, ২৪, ৫২৬-৫২৭>
২৫

সাক্ষাৎকারঃ মেজর এম. এইচ. বাহার

 

৫২৮ ৭৪১৯ অপরাজিতা নীল <১০, ২৫, ৫২৮>
২৬
প্রতিবেদনঃ মেজর (অবঃ) রফিকুল ইসলাম ৫২৯-৫৩৭ ৭৪২০ অপরাজিতা নীল <১০, ২৬, ৫২৯-৫৩৭>
২৭
মিত্র বাহিনীর তৎপরতা ও অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্য (প্রতিবেদন) ৫৩৮-৫৫৮ ৭৪২৯ মিনহাজ উদ্দিন <১০, ২৭, ৫৩৮-৫৫৮>
২৮
জেনারেল এম এ জি ওসমানীর বিশেষ সাক্ষাৎকার ৫৫৯-৫৬৭ ৭৪৫০ অপরাজিতা নীল <১০, ২৮, ৫৫৯-৫৬৭>
২৯
প্রতিবেদনঃ ক্যাপ্টেন আবদুস সাত্তার ৫৬৮-৫৭০ ৭৪৫৯ ডাঃ মোঃ রাজিবুল বারী(পলাশ) <১০, ২৯, ৫৬৮-৫৭০>

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
১। ১ নম্বর সেক্টরে সংগঠিত যুদ্ধ ‘লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে’- মেজর(অব) রফিক- উল- ইসলাম বীরউত্তম, ঢাকা, ১৯৮১ ——–১৯৭১

 

মিনহাজ উদ্দিন

<১০, ১.১, ১-৪২>

 

প্রতিবেদনঃ মেজর (অবঃ) রফিক-উল ইসলাম

 

বিলম্বিত কনফারেন্স

 

১০ জুলাই আমি আগরতলা থেকে ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সের একখানি বিমানে কলকাতার উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। পথে গোহাটিতে আধঘণ্টার জন্য থেমে রাতে সাড়ে আটটার দিকে কলকাতার আকাশে পৌছে গেলাম।নীচে তখন মুষল ধারার বৃষ্টির সাথে বেগে বাতাস বইছিল।এহেন দুর্যোগে কয়েকবার চেষ্টা করার পর আমাদের বিমান রানওয়ে স্পর্শ করল। ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে আমাদের চার ঘণ্টার কষ্টকর যাত্রা শেষ হলো। রাত তখন ৯ টা।

 

অচেনা কলকাতায় আমি সম্পূর্ণ অপরিচিত আগন্তক।বিমানবন্দরের ভবনে কিছুক্ষণ পায়চারী করার পর একটি ট্যাক্সি ভাড়া করলাম। শিখ ড্রাইভারকে বললাম বাংলাদেশ আর্মি হেডকোয়াটারে নিয়ে যেতে।কিন্ত রাতে আর্মি হেডকোয়াটার খুঁজে পেলাম না। তখন ড্রাইভারকে একটি মাঝারি হোটেলে নিয়ে যেতে বললাম।

 

বহুদিনের পরিচর্যার অভাবে আমার চুল দাঁড়ি সমানে বেড়ে উঠেছিল। পায়ে ক্যাম্বিশের জুতো জোড়া ছেঁড়াও ময়লা। গায়ে বেঢপ ধরণের জামাটিও বেশ বড়,পরনে টাউজার এবং হাতে কিছু সরকারী কাগজপত্র ভর্তি একটি থলে এই ছিল আমার সেদিনের সর্বাঙ্গীণ চেহারা। শিখ ড্রাইভার নিশ্চয় আমার সাথে রসিকতা করে থাকবে। সে আমাকে একটি ব্যয়বহুল হোটেলে পৌছে দিল। হোটেলে ঢুকতেই অনুভব করলাম রিসেপশন রুমটি শীততাপ নিয়ন্ত্রিত।আমি যেন হঠাৎ করে দারুণ একটা আঘাত পেলাম। মনের অজান্তেই হাত বাড়িয়ে আমার থলেটি স্পর্শ করলাম। সেখানে উপস্থিত সুন্দর বেশভূষার সজ্জিত পুরুষও মহিলার অবাক দৃষ্টির মুখে আমি বেশ অপ্রস্তুত হয়ে গেলাম। মুহূর্তের হতভম্ব ভাব কাটিয়ে রিসেপশনিস্টকে জিজ্ঞেস করলাম,’’ একটা রুম পাওয়া যাবে কি?’’ ভদ্রলোক আড়চোখে আমার পা থেকে মাথা পর্যন্ত একটু জরিপ করে নিলেন। আমার জুতো,ট্টাউজার, শার্ট, থলে, দাঁড়ি কোনকিছুই তার দৃষ্টি এড়ালো না। তারপর কিছুটা কৌতুহলের হাসি ফুটিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,’’আপনি কি…?’’ ‘’হ্যাঁ আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি।‘’ সাথে সাথে জবাব দিলাম।

 

পরদিন সকালে হোটেল ত্যাগ করলাম। কিন্ত একরাতের ভাড়া হিসেবে পকেটে যা ছিল তার অর্ধেকটা বেরিয়ে গেছে।বাংলাদেশ বাহিনীর হেডকোয়াটার যাওয়ার সারাটা পথে আমি শুধু সেই শিখ ড্রাইভারকে অভিসম্পাত করছিলাম।

 

১১থেকে ১৭ জুলাই পর্যন্ত সম্মেলন অনুষ্ঠিত হল।সম্মেলনের আলোচনা সকালে শুরু হয়ে শেষ হতো রাতে। সেখানে সকল সেক্টর কমান্ডারাই উপস্থিত ছিলেন। সম্মেলনে আমরা নানা ধরণের সমস্যা এবং ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা সম্পর্কে আলোচনা করি। উলেখ্য যে, তখন পর্যন্ত আমাদের চিন্তার কিংবা কাজের কোন সমন্বয় ছিল না।

 

কলকাতা ৮ নম্বর থিয়েটার রোদের ভবনটিতে আমরা মিলিত হয়েছিলাম। এটা ছিল বি এস এফ এর অফিস। যুদ্ধের সময় বাংলাদেশ সরকারকে এটি ব্যাবহার করতে দেয়া হয়েছিল।

 

একাত্তরের মার্চে রফিক-উল-ইসলাম সাবেক ই পি আর সেক্টর হেডকোয়ার্টার, চট্টগ্রাম ক্যাপ্টেন পদে সেক্টর এডজুডেন্টের দায়িত্ব পালন করছিলেন।

 

আমাদের প্রথম অধিবেশনে সভাপতি ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ। বাংলাদেশ বাহিনীর চীফ ইন কম্যান্ডার কর্নেল(অব) এম, এ, জি ওসমানী প্রথম দিনের অধিবেশনে যোগ দিতে পারেননি।

১২ই জুলাই দ্বিতীয় দিনের অধিবেশনে ছিলেনঃ

 

১। প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ

২। কর্নেল(অব) এম, এ, জি ওসমানী

৩। লেঃ এম, এ, রব

৪। গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ,কে খন্দকার

৫। মেজর(অব) নুরুজ্জামান

৬। মেজর সি আর দত্ত

৭। মেজর জিয়াউর রহমান

৮। মেজর কে, এম শফিউল্লাহ

৯। মেজর খালেদ মোশাররফ

১০। মেজর মীর শওকত আলী

১১। উইং কমান্ডার এম, কে বাশার

১২। মেজর ওসমান চৌধুরি

১৩। মেজর রফিক- উল- ইসলাম

১৪। মেজর নাজমুল হক

১৫। মেজর এম, এ,জলিল

১৬। মেজর এ, আর চৌধুরি

 

দশদিন ব্যাপী সম্মেলনে যুদ্ধের বিভিন্ন দিক, বিভিন্ন সমস্যা এবং ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করি। ওই বৈঠকে লেঃ এম, এ, রব চীফ অব –স্টাফ এবং গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ, কে খন্দকার ডেপুটি- চীফ- অব স্টাফ নিযুক্ত হন।

 

সম্মেলনে গুরুত্বপূর্ণ যেসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল তা হচ্ছেঃ

 

১। বিভিন্ন সেক্টরের সীমানা নির্ধারণ

 

২। নিম্নলিখিতভাবে গেরিলা যুদ্ধের আয়োজনঃ

(ক)নির্ধারিত এলাকায় নির্দিষ্ট দায়িত্ব দিয়ে পাঁচ অথবা দশজন নিয়ে গঠিত ট্রেনিং প্রাপ্ত গেরিলা দলকে বাংলাদেশে পাঠানো হবে।

(খ)গেরিলাদের শ্রেণীবিভক্তিঃ

 

একশন গ্রুপঃ এই গ্রুপের সদস্যরা শত্রুর বিরুদ্ধে সরাসরি গেরিলা হামলা পরিচালনা করবে। তারা শতকরা ৫0 থেকে ১০০ ভাগ হাতিয়ার বহন করবে।

 

 

গোয়েন্দা সেনাঃ এই গ্রুপের গেরিলারা সাধারণত সংঘর্ষে জড়িত হবেনা। এরা শত্রুপক্ষের খবরাখবর সংগ্রহ করবে। এদের সাধারণতঃ৩০ ভাগের বেশি অস্ত্র থাকবেনা।

 

গেরিলা ঘাঁটিঃ প্রতিটি ঘাঁটিতে গেরিলাদের থাকা খাওয়ার জন্য কয়েকটি নিরাপদ গৃহের ব্যাবস্থা থাকবে যেখান থেকে যথা যথ খবর প্রাপ্তির পরই তারা নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌছাতে পারে। প্রত্যেক ঘাঁটিতে একটি করে মেডিক্যাল গ্রুপ থাকবে যারা প্রয়োজনে গেরিলাদের চিকিৎসা করবে। প্রত্যেক ঘাঁটিতে একজন রাজনৈতিক নেতার দায়িত্ব থাকবে। এদের দায়িত্ব ছিল বিভিন্ন কর্মপদ্ধতির মাধ্যমে পাকিস্তানীদের মানসিকভাবে দুর্বল করে দেওয়া এবং একই সঙ্গে বাঙ্গালীরা যাতে সাহসও শক্তি হারিয়ে না ফেলে সেদিকে লক্ষ্য রাখা। শত্রুর বিরুদ্ধে বড় আক্রমণ পরিচালনার উদ্দেশ্যে আর বেশী সংখ্যকগেরিলা কিংবা নিয়মিত বাহিনীর সৈনিকদের স্থান সংকুলানের জন্য প্রতিটি ঘাঁটিকে তৈরি রাখাও এদের দায়িত্ব ছিল।

 

৩। নিয়মিত বাহিনীর সদস্যদের অবিলম্বে ব্যাটালিয়ান ফোর্সএবং সেন্টার ট্রুপস এর ভিত্তিতে সংগঠিত করতে হবে।

 

৪। শত্রুর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে নিম্নলিখিত পদ্ধতিতে যুদ্ধ পরিচালনার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়ঃ

(ক) প্রতিটি সুবিধাজনক স্থানে শত্রুর বিরুদ্ধে রেইড এবং অ্যামবুশের মাধ্যমে আঘাত হানার জন্য বিপুল সংখ্যক গেরিলাকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে।

(খ) শিল্প প্রতিষ্ঠান চালু রাখতে দেওয়া যাবেনা। বিদ্যুতের খুঁটি, সাবষ্টেশন প্রভৃতি উড়িয়ে দিয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ অচল করার মাধ্যমে একাজ করতে হবে।

(গ) পাকিস্তানীদেরকে কোন কাঁচামাল কিংবা উৎপাদিত পণ্য রফতানি করতে দেওয়া হবেনা। যেসব জিনিস গুদামে থাকবে সেগুলো ধ্বংস করে দিতে হবে।

(ঘ) শত্রু পক্ষের সৈন্যও সামরিক সরঞ্জাম আনা- নেওয়ার জন্য ব্যবহারযোগ্য রেলপথ, নৌপথ পরিকল্পিতভাবে ধংস করে দিতে হবে।

(ঙ)রণকৌশলগত পরিকল্পনা এমনভাবে প্রণয়ন করতে হবে যাতে শত্রুরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়তে বাধ্য হয়্।

(চ) শত্রুদের ছত্রভঙ্গ করার পর তাদের বিচ্ছিন্ন বাহিনীগুলোর উপর গেরিলারা মরনপ্রান আঘাত হানবে।

বিভিন্ন সেক্টরএবং ফোস পুনর্গঠনের কাজে ইপিআর ভূমিকা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ন। যুদ্ধের               প্রাথমিক পর্যায়ে ইপির বাহিনীর কাছ থেকেই বাংলাদেশ সরকার প্রায় সমুদয় অস্ত্র ও গোলাবারুদের ব্যবস্থা করেছিল। শুধু তাই নয় প্রথম থেকেই বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে তারাই প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল।ইপিআর এর অয়ারলেস সেট এবং যানবাহন ব্যাপকভাবে কাজে লেগেছিল। মুক্তিযুদ্ধে ইপিআর এর সিগন্যাল এবং ড্রাইভাররা সেদিন খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভুমিয়া রাখে। সেই দুর্দিনে স্বাধীনতার জন্য নিবেদিত প্রাণ ড্রাইভাররা শত্রুপক্ষের তুমুল গোলাবৃষ্টির মধ্যে আমাদের সৈন্য ও রসদ বহন করে দৃঢ় মনোবল ও সাহসিকতার অত্যুজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

 

আমাদের এই সম্মেলনে বাংলাদেশকে১১টি সেক্টরে বিভক্ত করা হয়।

 

১ নম্বর সেক্টরঃ চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং নোয়াখালীর জেলার অংশবিশেষ নিয়ে(মুহুরি নদীর পূর্ব এলাকা) এই সেক্টর গঠিত হয় । সমস্ত সেক্টরটি আবার পাঁচটি সাব-সেক্টরে বিভক্ত করা হয়।আমি এই সেক্টরের কমান্ডার নিযুক্ত হই।এই সেক্টরের মোট সৈন্য সংখ্যা ছিল ২১শ’। এর মধ্যে ১৫শ’ ইপিআর, ২শ’ পুলিশ ৩শ’ সামরিক বাহিনী এবং নৌও বিমানবাহিনীর সদস্য সংখ্যা ছিল প্রায় একশ। এখানে গেরিলাদের সংখ্যা ছিল প্রায়২০হাজার। যার মধ্যে৮ হাজারকে একশন গ্রুপ হিসেবে গড়ে তোলা হয়। এদের মধ্যে শতকরা৩৫ ভাগকে অস্ত্রও গোলাগুলি দেওয়া হয়েছিল।

 

২ নম্বর সেক্টরঃ কুমিল্লাও ফরিদপুর জেলা এবং নোয়াখালীও ঢাকার অংশবিশেষ নিয়ে এই সেক্টর গঠিত হয়। সেক্টর কমান্ডার নিযুক্ত হন খালেদ মোশাররফ। সেক্টরটি ৬ টি সাব সেক্টরে বিভক্ত ছিল।সেক্টরটি৬টি সাব-সেক্টরে বিভক্ত ছিল। সমগ্র সেক্টরে নিয়মিত বাহিনীর সদস্য ছিল প্রায় ৪ হাজারএবং গেরিলা ছিল প্রায়৩০ হাজার।

 

৩ নম্বর সেক্টরঃ মেজর কে এম শফিউল্লাহর মৌলভীবাজার মহকুমা, ব্রাক্ষণবাড়িয়া মহকুমা, নারায়ণগঞ্জ মহকুমা এবং কেরানীগঞ্জের অংশবিশেষ নিয়ে এই সেক্টর গঠিত হয়। ১০ টি সাব-সেক্টরে বিভক্ত এই সেক্টরে গেরিলা বাহিনীর সদস্য সংখ্যা ছিল প্রায়১০হাজার। এস-ফোর্স গঠনের পর মেজর শফিউল্লাহকে তার কমান্ডার নিযুক্ত করা হয়। মেজর নুরুজ্জামানকে৩ নম্বর সেক্টরের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

 

৪ নম্বর সেক্টরঃ উত্তরে সিলেট সদর এবং দক্ষিণে হবিগঞ্জ থানার মধ্যবর্তী সমস্ত অঞ্চল নিয়ে গঠিত এই সেক্টরের কমান্ডার নিযুক্ত হন মেজর চিত্তরঞ্জন দত্ত। সেক্টরটি ৬ টি সাব-সেক্টরে বিভক্ত ছিল। সেক্টরের সৈন্য সংখ্যা ছিল প্রায় ২ হাজার এবং গেরিলা ছিল প্রায়৮ হাজার। সেক্টর হেডকোয়াটার ছিল করিমগঞ্জে। পরে তা নাসিমপুরে স্থানান্তর করা হয়।

 

৫ নম্বর সেক্টরঃ সিলেট জেলার উত্তরাঞ্চল নিয়ে গঠিত এই সেক্টরের কমান্ডার নিযুক্ত হন মেজর মীর শওকত আলী। সেক্টরে নিয়মিত বাহিনীর সংখ্যা প্রায় ৮০০ এবং গেরিলা প্রায় ৭ হাজার। সেক্টরটি ৬ টি সাব-সেক্টরে বিভক্ত ছিল।

 

৬ নম্বর সেক্টরঃ এই সেক্টর রংপুরও দিনাজপুর জেলা নিয়ে গঠিত। উইং কমান্ডার এম, কে বাশার ছিলেন সেক্টর কমান্ডার। সাব-সেক্টর সংখ্যা ছিল ৫টি। সৈন্য সংখ্যা ছিল প্রায় ১২শ এবং গেরিলা ছিল ৬ হাজার। সেক্টর হেডকোয়াটার ছিল রংপুর জেলার পাট গ্রামের নিকট বুড়িমারীতে।

 

৭ নম্বর সেক্টরঃ রাজশাহী,পাবনা,বগুড়া এবং দিনাজপুর জেলার অংশবিশেষ নিয়ে গঠিত। সেক্টর কমান্ডার নিযুক্ত হন মেজর নাজমুল হক। যুদ্ধকালে এক মটর দুর্ঘটনায় তিনি মারা গেলে সেক্টর কমান্ডার হিসেবে মেজর কিউ এন জামান দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সাব-সেক্টরের সংখ্যা ছিল৮ টি।সৈন্য সংখ্যা ছিল প্রায়২ হাজার এবং গেরিলার সংখ্যা ছিল প্রায়২ হাজার।

 

৮ নম্বর সেক্টরঃ ১৫ জুলাই পর্যন্ত এই সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন মেজর এম,এ ওসমান চৌধুরী। এসময় মেজর এম, এ মঞ্জুর পাকিস্তান থেকে পালিয়ে আসেন এবং তাকে ৮ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার নিযুক্ত করা হয়। এর আওতায় ছিল কুষ্টিয়া, যশোর, খুলনা, বরিশাল পটুয়াখালী জেলা। পরে বরিশালও পটুয়াখালীকে এই সেক্টর থেকে বাদ দেওয়া হয়। সেক্টরে সৈন্য সংখ্যা ছিল ২ হাজার। গেরিলা ৭ হাজার। সাব-সেক্টরের সংখ্যা ছিল ৭টি। সেক্টর হেডকোয়াটার ছিল বেনাপোলে।

 

৯ নম্বর সেক্টরঃ বরিশাল, পটুয়াখালী, এবং খুলনাওফরিদপুর জেলার অংশবিশেষ নিয়ে গঠিত হয়। সেক্টর কমান্ডার নিযুক্ত হন মেজর এম,এ, জলিল। সাব-সেক্টরের সংখ্যা ছিল৮ টি। গেরিলা ছিল প্রায়১৫ হাজার। নিয়মিত সৈন্য ছিল এক ব্যাটালিয়নের মত।

 

১০ নম্বর সেক্টরঃ এই সেক্টরের কোন আঞ্চলিক সীমানা ছিলনা। শুধু নৌ-বাহিনীর কমান্ডোদের নিয়ে গঠিত এই সেক্টরের সদস্যদের শত্রুপক্ষের নৌযান ধ্বংস করার জন্য বিভিন্ন সেক্টরে পাঠানো হতো। প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন সংখ্যক কমান্ডো এক-একটি গ্রুপ গঠিত হতো। যে সেক্টরের এলাকায় কমান্ডো অভিযান পরিচালিত হতো সেই এলাকার সেক্টর কমান্ডারের অধীনে থেকে কমান্ডোরা কাজ করত। নৌ- অভিযান শেষ হওয়ার পর কমান্ডোরা তাদের মুল সেক্টর অর্থাৎ ১০ নম্বর সেক্টরে ফিরে আসতো।

 

১১ নম্বর সেক্টরঃ এই সেক্টরটি ছিল মেজর তাহেরের কমান্ডে। ১৫ নভেম্বর এক অভিযানে তিনি আহত হলে স্কোয়াড্রন লিডার হামিদুল্লাহকে এই সেক্টরের কমান্ডার করা হয়। এখানে সাব-সেক্টর ছিল৮ টি এবং গেরিলাদের সংখ্যা ছিল প্রায় ২০ হাজার।

 

এই সম্মেলনে সেক্টর সমূহ সম্পর্কে সিদ্ধান্তের পর সৈনিকদেরও নিম্নলিখিত গ্রুপে পুনর্গঠন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হল।

 

নিয়মিত আর্মি ব্যাটালিয়নঃ তখনকার স্বল্প সংখ্যক ব্যাটালিয়নগুলো নিয়ে বাংলাদেশ বাহিনী গঠিত হয়। এইসব ব্যাটালিয়নের জনশক্তি ছিল খুবই কম। প্রত্যেক সেক্টর থেকে লোক সংগ্রহ করে শক্তি বৃদ্ধির চেষ্টা চলে। তারপর এগুলোকে ব্রিগ্রেডগ্রুপে ভাগ করা হয়। কে-ফোর্স , এস- ফোর্স এবং জেড-ফোর্স নামে এগুলো পরিচালিত হয়। এসব বাহিনীর অধিকাংশ লোকই ছিল ইপিআর এর।

 

সেক্টর ট্রুপসঃ উপরোক্ত ব্যাটালিয়নগুলোতে যেসব ইপিআর,পুলিশ এবং সামরিক বাহিনীর লোকদের অন্তর্ভুক্ত করা যায়নি তাদেরকে যার যার সেক্টরে যুদ্ধ করার জন্য ইউনিটও সাব-ইউনিটে ভাগ করা হয়। নিয়মিত বাহিনীগুলোর চেয়ে সেক্টর ট্রুপের অস্ত্রবল ছিল কিছুটা কম।ওপরের প্রথমও দ্বিতীয় গ্রুপ, মুক্তিফৌজ, এম এফ মুক্তিবাহিনী অথবা নিয়মিত বাহিনী হিসেবে পরিচিত। এদেরকে সেনাবাহিনীর বিধিবিধানও নিয়ম-কানুন মেনে চলতে হয়। এদেরকে জীবন-ধারণের ভাতা হিসেবে একটি যুক্তিসংগত অর্থের অংক দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয় কিন্ত তারা কোন বেতন গ্রহণ করেননি।সরকারীভাবে তাদের নাম রাখা হয় ‘নিয়মিত বাহিনী’।

 

অনিয়মিত বাহিনী অথবা ফ্রিডম ফাইটার্স(এফ এফ)ঃ গেরিলা পদ্ধতিতে শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য জেসব লোককে ট্রেনিং দেওয়া হতো তারা ছিল ফ্রিডম ফাইটার্স। এর সরকারী নাম ছিল অনিয়মিত অথবা গণবাহিনী। এরা সেনাবাহিনীর নিয়ম-কানুন অনুসারে চলতে বাধ্য ছিলো না। অনেকক্ষেত্রে নিয়ম-শৃঙ্খলার অভাব ছিলো এই গ্রুপের বৈশিষ্ট।তবে, আমরা নিশ্চিত ছিলাম যে, সুদীর্ঘ এবং কঠোর সংগ্রামী জীবনযাপনের মধ্য দিয়ে তারা আপনা থেকেই সুশৃঙ্খল হয়ে উঠবে।সাধারণতঃ এদেরকে বলা হত ‘গেরিলা’। মুক্তিফৌজ এবং ফ্রিডম ফাইটারদেরও সাধারণভাবে এফ-এফ অথবা ফ্রিডম ফাইটার্স বলা হতো এবং এই নামে সকল যোদ্ধাই সুপরিচিত ছিল।

 

অনিয়মিতবাহিনীর লোকেরা কোন বেতন কিংবা জীবনধারণ ভাতা পেতো না। ট্রেনিংয়ের পর বাংলাদেশের ভেতরে পাঠানোর খরচ হিসেবে রাহা খরচ হিসেবে কিছু অর্থ দেওয়া হতো।একে বলা হতো ‘ইনডাকশন মানি’ বা নিযুক্তি ভাতা।

 

আমাদের নিয়মিত(এম এফ) এবং অনিয়মিত(এফ এফ) বাহিনীর সাংগঠনিক কাঠামো এবং সদস্য সংখ্যা হিসেব করে তাদের জন্য কাপড় চোপড়, রেশন,অস্ত্র, গোলাগুলি অয়ারলেসসেট, টেলিফোন সেট কম্পাস, বাইনোকুলার ইত্যাদি প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের তালিকা তৈরি করে পুরো সেক্টরের অত্যাবশ্যকীয় জিনিসপত্রের সাকুল্য তালিকা সরকারের কাছে পেশ করতে হতো।আমাদের সরকার আবার ভারত সরকারের কাছ থেকে জিনিসগুলো সংগ্রহ করতেন। অস্ত্রশস্ত্র সংগ্রহের ব্যাপারে আমাদের অভিজ্ঞতার কথা আগেও বলেছি। নিঃসন্দেহে এই সমস্যার জন্য আমরা প্রথম দিকে মার খেয়েছিলাম। সেক্টরগুলোতে ব্যবহৃত অশ্ত্র-শস্ত্রের তেমন কোন সামঞ্জস্য ছিলো না। কিছু ছিল চীনের তৈরি,কিছু ব্রিটিশ আবার কিছু আমেরিকান। এগুলোর গোলাগুলির নিয়ে আমাদের নিদারুণ সংকটে পড়তে হতো। শেষপর্যন্ত আমাদের শুধু একধরণের( সম্ভবত ভারতীয়) অস্ত্র দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।

 

যানবাহনের সমস্যার তো কোন অন্তই ছিলো না। খুচরো যন্ত্রপাতির অভাবে গাড়িগুলি প্রায়ই অচল থাকতো। এরপর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যেভাবে হোক যতদূর সম্ভব বেশী গাড়ি চালু রাখতে হবে। ভারত সরকারের সাথে উচ্চপর্যায়ের আলোচনার পর ভারতীয় সেনাবাহিনীর ই-এম-ই(ইলেকট্রিক্যাল মেকানিক্যাল এন্ড ইকুইপমেন্ট) বিভাগকে এই কাজের ভার দেওয়া হয়।

 

চিকিৎসার সুযোগ- সুবিধার অভাব ছিল প্রকট। ভারতের হাসপাতালগুলো আহত শরণার্থীতে ভরে গিয়েছিল। এদের বেশিরভাগই ছিল বুলেট কিংবা বেয়োনেটের আঘাতে আহত। আমরা বাঙ্গালী সৈনিকদের জন্য কয়েকটি অস্থায়ী ফিল্ড হাসপাতাল গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেই। পরে সবচাইতে সবচাইতে বড় হাসপাতালটি স্থাপিত হয়েছিল ২ নম্বর সেক্টরে। যুদ্ধের সময় খুব কম সংখ্যক চিকিৎসকই ভারত গিয়েছিলেন। এই ঘাটতি পূরণের জন্য ৪র্থ বর্ষের মেডিক্যাল ছাত্রদের পর্যন্ত কাজে নিয়োগ করা হয়। তারা চিকিৎসা ক্যাম্প এবং সাব- সেক্টরের দায়িত্বও গ্রহণ করে। ভারতের সামরিক হাসপাতালগুলোতে আমাদের আহত সৈনিকদের চিকিৎসা করার জন্যও ভারতীয় সেনাবাহিনীর সঙ্গেও একটি ব্যবস্থা করা হয়েছিলো।

 

এরকম আরো অনেক সমস্যার কথা এবং সেগুলো সমাধানের উপায় নিয়ে আমাদের সাথে আলোচনা করা হয়। সেক্টরগুলোতে কতগুলো অত্তযাবশ্যকীয় দ্রব্য এবং যন্ত্রপাতি একেবারেই ছিলো না। এ ব্যাপারে আমাদের চাহিদা পুরণ করা হবে বলেও প্রতিশ্রুতি পেয়েছিলাম। কিন্ত যুদ্ধকালে কোনকিছুই আমরা পর্যাপ্ত পরিমাণে পাই নাই। হয়ত এর যুক্তিসঙ্গত কোন কারণও থাকতে পারে। বর্ষার সময়ে আমাদের অধিকাংশ সৈনিকদের জন্য জরুরী ভিত্তিতে আচ্ছাদন নির্মাণের কথা ছিল কিন্ত কোনসময়েই এই আচ্ছাদনের উদ্দেশ্য সাধিত হয়নি। তাঁবুর সরঞ্জামও চাহিদা অনুযায়ী পাইনি। শীতে কম্বলের সংখ্যা ছিল অল্প , গরম কাপড় তারও কম। আমাদের সৈনিকরা অধিকাংশ যুদ্ধই করেছে খালি পায়ে। জঙ্গলে চলাচলের বুটও ছিল মাত্র কয়েক জোড়া। আমরা বিপুল সংখ্যক প্লাস্টিকের স্যান্ডেল পেয়েছিলাম। ওগুলো ছিল বাথরুমের জন্য উপজুক্ত, যুদ্ধক্ষেত্রের জন্য নয়।

 

প্রতিটি সেক্টরে সামরিক অভিযানের ক্ষমতা এবং কি পরিমাণ সৈন্য আমাদের আছে সেসব নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা করেছিলাম। কমান্ডো ধরণের হামলার জন্য তখনো আমরা সৈন্যদের পুরা পুনর্গঠন করতে কিংবা ট্রেনিং দিতে পারিনি। তাই বাংলাদেশের খুব ভেতরে প্রবেশ করার পরিকল্পনা আমরা কিছুদিনের জন্য বাদ দিয়ে তখনকার মত সমগ্র সীমান্ত এলাকা বরাবর শত্রুর উপর আঘাত হানার প্রস্তুতি নেই। গেরিলা তৎপরতা উপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়াহয়। এই উদ্দেশ্যে বিপুল সংখ্যক লোককে গেরিলা যুদ্ধের ট্রেনিং দেওয়া হয়। স্থানীয়ভাবে আমরা স্বল্পসংখ্যক র ফ্রিডম ফাইটারকে ট্রেনিং দেওয়ার ব্যাপক পরিকল্পনা হাতে নেয়। আমরা আশা করেছিলা এর দ্বারা কয়েকমাসের মধ্যে আমরা পর্যাপ্ত পরিমাণ গেরিলা গড়ে তুলতে পারব এবং এদেরকে দিয়ে পাকবাহিনীকে ব্যতিব্যস্ত রাখা যাবে। ইত্যবসরে সরাসরি অভিযান পরিচালনার জন্য নিয়মিতসৈন্যদের প্রশিক্ষণও পুনর্গঠন পূর্ণোদ্যমে চলবে। ফ্রিডম ফাইটারদের উপর যোগাযোগ ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রভৃতি ধ্বংসের দায়িত্ব থাকবে। প্রয়োজনে তারা শত্রুদল্কে অ্যামবুশ করবে এবং সশস্ত্র ঘাঁটি, জ্বালানিও অস্ত্র মজুতের স্থান কিংবা সরবরাহ স্থানের উপর হামলা চালাবে। এরপর নিয়মিতবাহিনীর সর্বাত্মকঅভিযানে শত্রুপক্ষকে সহজে কাবু করা যাবে।

 

এইভাবে আমরা চূড়ান্ত রণকৌশল নির্ধারণ করি।কিন্ত প্রশ্ন দাঁড়ায় কে কখন সেই সর্বাত্মক অভিযান চালাবে।

 

তখনকার মতো যুদ্ধের জন্য সর্বাধিক সংখ্যক লোককে ট্রেনিং দেওয়ার ব্যাপারেই আমরা বেশী আগ্রহী ছিলাম। ট্রেনিং সপ্তাহের তা মেয়াদ ছিল দুই থেকে তিন সপ্তাহের। এসময়ের মধ্যে তারা রাইফেল, লাইট মেশিনগান, হ্যান্ড গ্রেনেড, বিস্ফোরক প্রভৃতি কিভাবে ব্যবহার করতে হয় তা শিখতো। এছাড়া অ্যামবুশের কায়দা- কানুন এবং রণাঙ্গনের কৌশল কিছু শেখানো হতো। আমাদের সব প্রচেষ্টার লক্ষ্য ছিল গুণগত নয়, পরিমাণগত দিক দিয়ে কি করে আরও বেশি লোক গড়ে তোলা যায়।প্রয়োজনীয় সকল প্রকার দ্রব্য-সামগ্রীও ট্রেনিংের জন্য আমাদেরকে পুরোপুরি ভারতীয় সেনাবাহিনীর উপর নির্ভর করতে হতো।এ ব্যাপারে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য ভারতীয় সরকার তাঁদের কয়েকজন সিনিয়র সামরিক কর্মকর্তাকে নিয়োগ করেন। ব্রিগ্রেডিয়ার রাঙ্কের এইসব অফিসার ভারতীয়বাহিনীর ইস্টার্ন কমান্ডের সামরিক এবং প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে থেকে কাজ করতেন। তাদের নিযুক্তি ছিল ভারতীয় সেক্টর কমান্ডার হিসেবে। ভারতের একজন সেক্টর কমান্ডার দুই অথবা তিনটি সেক্টরের দায়িত্বে ছিলেন। প্রধানতঃ ভারতীয় বাহিনীর সেক্টর কমান্ডারদের মাধ্যমে বাংলাদেশ বাহিনীর হেডকোয়াটার এবং ইস্টার্ন কমান্ডের সাথে আমাদের যোগাযোগ রাখতে হতো। যুদ্ধের যাবতীয় আমাদের হেড কোয়াটার এবং ভারতীয় ইস্টার্ন কমান্ড যৌথভাবে প্রণয়ন করতেন।এই সকল নীতি কার্যকর করার দায়িত্ব দেওয়া হতো ভারতীয় এবং বাংলাদেশ সেক্টর কমান্ডারদের হাতে। অনেকসময় পরস্পর বিরোধী একাধিক নির্দেশনা আসতো। তখন আরা পড়তাম বিপাকে, কাজে বিঘ্ন সৃষ্টি হতো।

 

১৫ই জুলাই আমরা অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং প্রধানমন্ত্রী জনাব তাজউদ্দীন আহমদের সাথে বৈঠকে মিলিত হই। এ অনুষ্ঠানে কোন মতবিনিময় কিংবা বিভিন্ন সেক্টরের পরিস্থিতি সম্পর্কে কোন আলোচনা হয়নি। সে রাতে সেটি ছিল শপথ গ্রহণের অনুষ্ঠান।আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আনুগত্য স্বীকার করে শপথ গ্রহণ করি।

 

কলকাতা ত্যাগের পূর্বেই জানতে পারলাম পাকিস্তান থেকে কয়েকজন সামরিক অফিসার পালিয়ে আসতে পেরেছিলেন। এইসব সামরিক অফিসারদের কাছে জানা গেলো যে, অন্যান্য বাঙ্গালী অফিসাররাও আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে যোগদানের উদ্দেশ্যে পালানোর চেষ্টা করছেন। কিন্ত পালানোর এই চেষ্টা অর্থাৎ পাকিস্তানের সীমান্ত পার হয়ে ভারতে আসা এবংযুদ্ধে যোগ দেওয়া খুবই বিপজ্জনক ছিল বিশেষ করে পাকিস্তানে যারা পরিবার- পরিজন নিয়ে বসবাস করছিলেন তাদের জন্য ত বটেই। পাকিস্তান থেকে আমাদের অফিসাররা চলে আসছিলেন এই খবরে আমরা খুবই খুশি হয়েছিলাম। আবার অন্য কিছু ঘটনা আমাদের ভাবিয়ে তুলেছিল। আমাদের যুব শিবির থেকে অসময় কিছু লোক পালিয়ে যায়। হয়তো যুবশিবিরের কষ্ট সহ্য না করতে পেরে কিংবা ব্যক্তিগত ও পারিবারিক কাজে হতাশাগ্রস্ত হয়ে তারা একাজ করেছিলেন। তবে এদের সংখ্যা ছিল নগণ্য। এই ঘটনা তেমন উল্লেখযোগ্য সমস্যারও সৃষ্টি করেনি।

 

যুবশিবিরের কিছু লোকের মধ্যে হতাশা ছিল একথা সত্য। জুলাইয়ের শেষদিকে মেজর খালেদ মোশাররফ এবং আমি আগরতলার কাছে এই ধরণের একটি শিবির দেখতে যাই। সেখানে তিন হাজারের বেশী যুবক দু’ মাসের বেশী সময় ধরে ট্রেনিংএর জন্য অপেক্ষা করছিলো। স্বাস্থ্যরক্ষার ব্যবস্থা ছিল খুবই দুঃখজনক। খাদ্যও পানি সরবরাহের ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। অন্যান্য যুবশিবিরেরও একই হাল। লক্ষ্যহীন সুদীর্ঘ অপেক্ষার পর একটি লোকের পক্ষে হতাশ হয়ে পড়া খুবই স্বাভাবিক। যুবশিবিরে সংখ্যা পরেরদিকে দ্বিগুণ হওয়া সত্ত্বেও এতো বিপুলসংখ্যক যুবকের জন্য সকল ব্যবস্থা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা দুরূহ হয়ে পড়েছিল।

 

আরেকটি বিষয় উল্লেখ না করে পারছিনা শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় গ্রহণকারী খুব কম লোকের মধ্যেই ট্রেনিং গ্রহণের কিংবা শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধে যাওয়ায় আগ্রহ দেখা যেতো। যুদ্ধকালে এক লাখেরও বেশী মুক্তিযোদ্ধা ট্রেনিং নেয়। কিন্ত এরমধ্যে শতকরা একভাগও শরণার্থী শিবিরের লোক ছিলোনা। এর কারণ সম্ভবতঃ যুবশিবিরগুলোতে যারা এসেছিলো তাদের পরিবার-পরিজন বাংলাদেশে ফেলে এসেছিলো তাই ট্রেনিং এর পরই এরা বাংলাদেশে ফিরে যাবার জন্য ছিল উদগ্রীব । তদের স্বদেশ ত্যাগের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল সামরিক ট্রেনিং গ্রহণ করা।অন্যদিকে বাড়ি থেকে পালিয়ে যারা যুবশিবিরে আশ্রয় নিয়েছিলো তারা পরিবার-পরিজন সহই সেখানে থাকতো। জীবন বাঁচানোর জন্য অন্ততঃ দু’বেলা দু’মুঠো আহার জুটবে এই নিশ্চয়তাও শিবিরে তাদের ছিল। বাংলাদেশে তাদের জন্য দুশ্চিন্তা করার খুব বেশী কেউ ছিলোনা। শিবিরে তাদের জীবনের ভয়ও কম ছিল। এসব কারনেই অন্ততঃ সেই মুহূর্তে দেশে ফেরার তেমন আগ্রহ তাদের ছিলনা।তাদের নিরাপদ স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের ব্যবস্থা কারা করছে ,কিভাবে করছে এই নিয়ে তাদের তেমন মাথাব্যথা ছিলোনা। মনে মনে তারা চাইত কষ্টের কাজটুকু অন্যে করুক, তারা একদিন ধীরেসুস্থে ফিরতে পারলেই হলো। শরণার্থী শিবিরের বাসিন্দাদের মধ্যে এবং নিছক ভয়ে যারা দেশত্যাগ করেছিলো তাদের মধ্যে এই মনোবৃত্তি লক্ষ্য করা গেছে। যুদ্ধে তাদের বিশেষ কোন আবদার ছিলোনা , থাকলে তা ছিল পরিস্থিতিসাপেক্ষ, স্বেচ্ছাপ্রণোদিত নয়। এদিকে শত ভয়ভীতি এবং দারুণ বিপদের মাঝেও যে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙ্গালী দেশে থেকে গিয়েছিলো, স্বাধীনতার জন্যই তাদেরকেই দিতে হয়েছে সবচাইতে বেশীমূল্য।


 

যুদ্ধের পরিবর্তিত গতি

 

জুন মাসের শেষদিকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হয়। এইসময় প্রচলিত যুদ্ধপদ্ধতি এবং গেরিলা পদ্ধতিতে যুদ্ধ করার জন্য বাংলাদেশবাহিনীকে পুনর্গঠিত হয়।বস্তুতঃ জুনের চতুর্থ সপ্তাহ থেকে পুনর্গঠন প্রক্রিয়া শুরু হলেওবিভিন্ন সেক্টরের ততপরতার মধ্যে সমন্বয় সাধনের উদ্দেশ্যে জুলাই মাসে আমরা এক সম্মেলনে মিলিত হয়েছিলাম।এই সম্মেলনের কথা আগেই বলেছি। ১৫ই মে পর্যন্ত আর যা কিছু সাহায্য পেয়েছিলাম তার ব্যবস্থা করেছিলো ভারতীয় বিএসএফ। যাহোক, সময়ের বিবর্তনে এবং পশ্চিম পাকিস্তানের দু’টি নতুন ডিভিশনকে বাংলাদেশে এনে মোতায়েন করার পর যুদ্ধ পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন ঘটে। এই কারণে সবকিছুতে ভিন্নতর সমন্বয়, প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি এবং ব্যাপক সাহায্যের প্রয়োজন দেখা দেয়।কিন্ত প্রয়োজন মেটানোর সামর্থ্য বিএসএফ এর ছিলোনা। তাই ১৯৭১ এর১৬ই মে ভারতীয় সেনাবাহিনী বিএসএফ এর কাছ থেকে বাংলাদেশ এই অস্বাভাবিক ঘটনাবলী মোকাবেলার দায়িত্ব গ্রহণ করে।

 

লক্ষ্য করার বিষয় যে, বিভিন্ন পাকিস্তানী ডিভিশনে আক্রমণকারী দলগুলো ২৫শে মার্চ রাতে আকস্মিক আক্রমণের পর ৭২ ঘণ্টার মধ্যেই বিভিন্নস্থানে অবস্থান গ্রহণের জন্য কাজ সম্পন্ন করে। চলাচলের কাজ বিমানযোগে করা হয়। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যকার দূরত্ব বিবেচনা করে(১২০০মাইল ভারতীয় এলাকা)এবং ভারতের উপর দিয়ে সকল প্রকার পাকিস্তানী বিমান চলাচল বন্ধ থাকায় পাকিস্তানের পুরো দুটো আর্মি ডিভিশনকে পূর্বাঞ্চলে স্থানান্তর করতে অন্ততঃ একমাসের কম সময় লাগার কথা নয়। সেই হিসেবে দ্যাখা যায় একমাস আগে অর্থাৎ ৭১এর ২৮ শে ফেব্রুয়ারির মধ্যে যাত্রা প্রস্তুতি শুরু না করলে দুই ডিভিশন পাকসেনা বাংলাদেশে আসতে পারতো না। বাংলাদেশে গণহত্যার উদ্দেশ্য নিয়েই এইসব আর্মি ডিভিশন এখানে এনে মোতায়েন করার ষড়যন্ত্র হয়েছিলো। সবকিছুর তোড়জোড় শুরু হয়েছিল২৮ ফেব্রুয়ারির আগে। তাহলে দেখা যায়, ভুট্টো ১৬ই ফেব্রুয়ারি যে হুমকি দিয়েছিলেন তার সাথে এই ষড়যন্ত্রের নিশ্চয়ই একটা যোগসাজশ ছিল। ভুট্টো বলেছিলেন,” কেউ পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ঢাকা যেতে চাইলে তাকে নিজ দায়িত্বেই যেতে হবে, তা তিনি খাকী পোশাকে অথবা সাদাকালো যে পোশাকেই যাননা কেন।‘’ রাওয়ালপিন্ডির আর্মি হেড কোয়াটারে ২২শে ফেব্রুয়ারি যে উচ্চ পর্যায়ের সম্মেলন হয়, সম্ভবত সেখানেই ষড়যন্ত্রের সূত্রপাত ঘটে।

৯ম ডিভিশনের ৩১৩ বিগ্রেডকে বিমানযোগে সিলেট পাঠানো হয়।১১৭ বিগ্রেড যায় কুমিল্লায়। ১৪ ডিভিশনের অধীনে কুমিল্লায় যে ৫৩ বিগ্রেড অবস্থান করছিলো ইতিমধ্যেই তাকে চট্টগ্রাম যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। ৯ম ডিভিশনের বাংলাদেশে আসার পরই মেঘনার পূর্বদিকে সমগ্র এলাকা অর্থাৎ সিলেট, কুমিল্লা, নোয়াখালী, চট্টগ্রামও পার্বত্য চট্টগ্রামের সামগ্রিক দায়িত্ব তাদের উপর ন্যস্ত করা হয়। এই পরিকল্পনা অনুসারে ৫৩ বিগ্রেড চট্টগ্রাম, ১১৭বিগ্রেড কুমিল্লায় এবং ৩১৩ বিগ্রেড সিলেটে অবস্থানগ্রহন করে। আগে থেকেই পূর্বাঞ্চলে মোতায়েন১৪ ডিভিশনের পর ঢাকা, ময়মনসিংহ, ফরিদপুর, যশোর, খুলনা প্রভৃতি জেলার দায়িত্ব ছিল। ৫৩ বিগ্রেডকে৯ম ডিভিশনের অধীনে এবং ৯মডিভিশনের২৭ বিগ্রেডকে ১৪শ ডিভিশনের অধীনে ন্যস্ত করা হয়। ১৪শ ডিভিশনের ৫৭ বিগ্রেড ঢাকায় অবস্থান করছিল। এই ডিভিশনের অপর বিগ্রেডটি ছিল উত্তরবঙ্গে।

পশ্চিম পাকিস্তানের কোয়েটা থেকে ১৬শ ডিভিশন চলে আসার পর উত্তরবঙ্গের দায়িত্ব এই ডিভিশন গ্রহণ করে। জেনারেল টিক্কা খান পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর হওয়া ছাড়াও এই সকল বাহিনীর সার্বিক কমান্ডের দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। ১১ এপ্রিল লেঃ জেনারেল এ, এ, একে নিয়াজি ইস্টার্ন কমান্ডের কমান্ডার নিযুক্ত হওয়ার পর জেনারেল টিক্কা খান তার এই বাড়তি দায়িত্ব ছেড়ে দেন। এরপর তিনি শুধু গভর্নর এবং সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে কাজ করেন। পাকিস্তানীদের উল্লেখিত সেনাবাহিনী ছাড়াও পরে আর দুটি ডিভিশন গড়ে তোলা হয়। এই দুটি পাক ডিভিশনের জন্য বাংলাদেশবাহিনী এমনকি ভারতীয়বাহিনীতেও পুনর্গঠনের প্রয়োজন দেখা দেয়।বাংলাদেশ বাহিনী পুনর্গঠনের সাথে সাথে সকল সেক্টরে পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযানও অব্যাহত থাকে। আমাদের আক্রমণাত্মক তৎপরতা অক্ষুণ্ণ রাখা এবং লড়াইয়ের উদ্যমকে সমুন্নত রাখাই ছিল এর উদ্দেশ্য।

 

অপারেশন জ্যাকপট

 

ভারতীয় সেনাবাহিনী ১৬ই মে বিএসএফ এর নিকট থেকে বাংলাদেশে পূর্ণ সামরিক তৎপরতা চালাবার দায়িত্ব গ্রহণ করে। এক সপ্তাহ পরে ২৩শে মে ভাগীরথী নদীর তীরে একটি গোপন ট্রেনিং ক্যাম্প চালু করা হয়। এই ক্যাম্পের অবস্থান ছিল পলাশী স্মৃতিসৌধের পাশে। এর সাংকেতিক নাম দেওয়া হল ক্যাম্প ‘ সি২পি’।ক্যাম্পের জন্য লোক সংগ্রহের উদ্দেশ্যে ভারতীয় নৌবাহিনীর অফিসাররা বিভিন্ন যুবশিবির সফরে বেরিয়ে পড়েন। আমার ক্যাম্পে আগত নৌবাহিনীর অফিসার বললেন,’’ আমি কয়েকজন নিপুণ সাঁতারু বাছাই করতে চাই, তাদেরকে তরুণ এবন ভাল স্বাস্থ্যের অধিকারী হতে হবে। জুন মাসের মধ্যে ১৫০ জন স্বেচ্ছাসেবকের প্রথম দলটি বাছাই করে ‘ সি২পি’ ক্যাম্পে পাঠানো হয়। আগস্টের মধ্যে এরা কঠোর এবং শ্রমসাধ্য ট্রেনিং সম্পন্ন করে। পুরো ব্যাপারটাই ছিল ভারতীয় নৌবাহিনীর দায়িত্বে।

 

বাংলাদেশে নৌপথে সৈন্য এবং অন্যান্য সমর সরঞ্জাম পরিবহনের ব্যবস্থা বানচাল করার উদ্দেশ্যে জাহাজ এবং নৌযান ধ্বংস করাই ছিল এই উদ্যোগের লক্ষ্য অল্প খরচে দ্রুত লক্ষ্য অর্জনে পর্যাপ্ত সংখ্যক স্বেচ্ছাসেবক দরকার ছিল যাদেরকে সাঁতারের এবং লিমপেট মাইনসহ বিভিন্ন প্রকার বিস্ফোরক দ্রব্য ব্যবহারের ট্রেনিং দেওয়া যেতে পারে।এ কাজের জন্য উচ্চ ট্রেনিংপ্রাপ্ত লোকদের নিয়ে একটা বিশেষ কর্মসূচী গ্রহণ করা হয় এ বিশয়ে বিস্তারিত কর্মসূচী প্রণীত হয় নৌবাহিনীর হেডকোয়াটারে। পরিকল্পনা অনুসারে চট্টগ্রামও মংলার সমুদ্রবন্দর, চাঁদপুর, দাউদকান্দি, নারায়ণগঞ্জ, আশুগঞ্জ নগরবাড়ি, খুলনা, বরিশাল গোয়ালন্দ, ফুলছড়িঘাট এবং আরিচা ঘাটের নদীবন্দরগুলোর উপর সরাসরি আক্রমণ চালানোর সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।অভিযানের সাংকেতিক নাম দেওয়া হয়’ অপারেশন জ্যাকপট’। অপারেশন কার্যকরী করার চূড়ান্ত দায়িত্ব দেওয়া হয় সংশিষ্ট সেক্টর কমান্ডারদের উপর।

 

২৮শে জুলাই আমি ডেল্টা সেক্টরের কমান্ডিং অফিসার ভারতীয় সেনাবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার সাবেগ সিং এর সাথে বসে চূড়ান্ত পরিকল্পনা তৈরি করেছিলাম। চার ঘণ্টারও বেশী সময় আমরা বিস্তারিত আলোচনা করি এবং চট্টগ্রাম নদীবন্দর ও কর্ণফুলী নদীর ম্যাপও চার্ট পর্যালোচনা করি।চন্দ্রতিথি আবহাওয়ার অবস্থা, জোয়ার ভাটার সময়, বাতাসের গতিপ্রকৃতি, স্রোতের গতি এবং আরও অসংখ্য তথ্য আমাদের আলোচনায় প্রাধান্য লাভ করে। মে মাস থেকেই বন্দরের তৎপরতা সম্পর্কে খোঁজখবর নিচ্ছিলাম। আমরা ইতিমধ্যেই বাংলাদেশের বন্দর এলাকা সম্পর্কে একটা পরিষ্কার চিত্রও পেয়ে যাই। অপারেশনে আমাদের নৌ-মুক্তিযোদ্ধার কোথায় কি ধরনের সমস্যা মোকাবিলা করতে পারে তাও আমরা বিশদভাবে আলোচনা করি। বন্দরের জন্য পাকবাহিনী কি ধরণের রক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে এবং সন্ত্রাসীরা কোথায় কিভাবে পাহারার ব্যাবস্থা করেছে এসব বিষয়ে আলোচনা হয়। সে সময়ে রাতের বেলায় নদীমুখে সকল প্রকার নৌ চলাচল নিষিদ্ধ ছিল। প্রধান কয়েকটি গানবোট নিয়মিত টহলকার্যে নিযুক্ত ছিল। আমাদের পরিকল্পনা গোপন রাখতে পারলে এসব বাধা তেমন কোনই সমস্যা নয়। ঠিক হল পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস অর্থাৎ ১৪ই আগস্টে ৬০ জন ট্রেনিংপ্রাপ্ত তরুণ চট্টগ্রাম বন্দরে পাঠানো হল। রাতে তারা সাঁতার কেটে কর্ণফুলী পাড়ি দিয়ে যতবেশী সংখ্যক জাহাজে গিয়ে লিমপেট মাইন লাগিয়ে দেবে।তারপর তারা ভাটার টানে দুরে সরে যাবে।

 

১০ আগস্ট ‘অপারেশন জ্যাকপট’ শুরু হয়। চট্টগ্রাম বন্দরের জন্য বাছাইকৃত ৬০ জন তরুণকে তিন ভাগে ভাগ করি। ১ এবং২ নম্বর গ্রুপ স্থলপথে মিরেশ্বরাই এবং চট্টগ্রাম শহর হয়ে কর্ণফুলী পূর্বপাড় চরলাক্ষার সর্বশেষ ঘাঁটিতে গিয়ে পৌঁছাবে। ৩নম্বর গ্রুপ চারলাক্ষার উপনীত হবে নৌকাযোগে। তিনটি গ্রুপেরই সার্বিক কমান্ডে থাকবেন একজন কমান্ডার। তাদের সকলের কাছে থাকবে লিমপেট মাইন, একজোড়া ফিন( সাঁতারের সময় পায়ে লাগানোর জন্য) এবং শুকনো খাবার। প্রতি তিনজনের কাছে একটি করে স্টেনগান থাকবে। সার্বিক দায়িত্বে নিযুক্ত গ্রুপ কমান্ডারকে দেওয়া হয় হালকা অথচ শক্তিশালী একটি ট্টানজিস্টর সেট। তার জন্য সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য হচ্ছে, অল ইন্ডিয়া রেডিওর কলকাতা কেন্দ্রের প্রতিটি সঙ্গীতানুষ্ঠান তাকে শুনতে হতো খুব মন দিয়ে। এতে ব্যর্থ হলে সমস্ত পরিকল্পনা ভেস্তে যাবে।

 

৯ আগস্টে হরিণা ক্যাম্পে তাদের চূড়ান্ত নির্দেশ দেই।পথপ্রদর্শক এবং কুলীসহ তাদের সকলকে বলে দেওয়া হয় এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় কিভাবে অগ্রসর হতে হয়, পথে কোথায় কোথায় থামবে ইত্যাদি। প্রতিটি এলাকায় আমাদের বিশ্বস্ত গেরিলা বেস কমান্ডারের ঠিকানা দিয়ে দেওয়া হয় এরা তরুণদের খাদ্যও আশ্রয় দেবে এবং চরলাক্ষা যাওয়ার পথে ব্যবস্থা করবে। ১৩ই আগস্ট১নম্বরও২ নম্বর গ্রুপ চারলাক্ষার পূর্ববর্তী ঘাঁটিতে পৌঁছে যায়। জায়গাটি চট্টগ্রামের কাছেই। পথে অবশিষ্ট অংশটুকু এদের জন্য খুবই মারাত্মক কারণ তাদেরকে শহরের ভেতর দিয়ে নৌকা দিয়ে নদী পার হতে হবে। তারপরই তাদের শেষঘাঁটি চরলাক্ষা।

 

এদিকে গুজব ছড়িয়ে পড়ল যে, ১৪ই আগস্ট পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবসে পাকিস্তান দখলদারবাহিনীর উপর মুক্তিবাহিনী সাংঘাতিক আক্রমণ চালাবে। একারণে শত্রুরা ছিল পুরো সতর্ক অবস্থায়। সারারাত ধরে কারফিউ চলতো। লোকজনকে তল্লাশির জন্য পথে মোড়ে মোড়ে বসানো হয়েছিলো অসংখ্য চেকপোস্ট। মেশিনগান ফিট করা আর্মি জীপগুলো সারা শহর টহল দিয়ে বেড়াচ্ছিল। নতুন করে আবার বাড়ি বাড়ি তল্লাশি শুরু হয়। বিভিন্ন এলাকা ঘেরাও দিয়েও অভিযান চালানো হয়।পথচারী সবাইকে কঠিন তল্লাশি শুরু হয়।এতসব তল্লাশি ফাঁকি দিয়ে শহরের মাঝখান দিয়ে পার হতে হবে ১নম্বরও ২নম্বর গ্রুপকে তারপর আছে নদী পার হওয়ার সময় তল্লাশির ঝামেলা। সেটি পার হলে আশা আছে সময়মত এই দুই গ্রুপ চরলাক্ষায় পৌঁছে যাবে। কিন্ত কনকারণে যদি দলের একজনও ধরা পড়ে তাহলে সমস্ত অভিযান বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা। তাই হামলাকারী দলের নেতাও আমাদের মত চিন্তিত ছিল।

 

আরও একটি কারণে এই দলের নেতা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। নৌকায় করে ৩নম্বর গ্রুপটি ১৩নপম্বর ঘাঁটিতে পৌঁছার কথা ছিল, তারা সে ঘাঁটিতে পৌঁছতে সক্ষম হয়নি। এদিকে১৩ আগস্ট কলকাতা রেডিওর সঙ্গীতানুষ্ঠান শোনার ট্টানজিস্টর খুলতেই তার কানে ভেসে এলো পুরনো দিনের বাংলা গান’’ আমার পুতুল আজকে প্রথম যাবে শ্বশুর বাড়ী’’। এগানের ভেতর দিয়ে সে এবং তার দল প্রথম সংকেত লাভ করে। কমান্ডার জানে,আগামী২৪ ঘণ্টার আরেকটি গান সে শুনতে পাবে। ওটি শোনার পর সে ট্টানজিস্টর ফেলে দিতে পারবে। ‘ অপারেশন জ্যাকপট সফল না হওয়া পর্যন্ত তাদের আর কোন গান শোনার জন্য উদগ্রীব হয়ে রেডিও শুনতে হবেনা।

 

নগরীতে মোতায়েন আমদের লোকেরা চমৎকারভাবে দায়িত্ব পালন করছিলো। তারা মিশনের নৌ-মুক্তিযোদ্ধাদের নিরাপদে একেবারে চরলাক্ষায় পৌঁছানোর ব্যাবস্থা করে দেয় । রাস্তায় একটি এ্যাম্বুলেন্স এবং বিদ্যুৎ বিভাগের একটি পিকআপ দেখতে পেলেও পাকিস্তানী সৈন্যদের মনে তেমন প্রশ্ন জাগেনি। শুধু তাই নয়, পাকবাহিনীর নাকের ডগা দিয়ে গেঁয়ো পোশাকপরা একদল লোক ফলমূল, মাছ, চাউল এবং লবণের ঝুড়ি নিয়ে ফেরী নৌকায় উঠলো এবং চালক যখন নিশ্চিত মনে নৌকার মুখ ঘুরিয়ে কর্ণফুলীতে পাড়ি জমালো তখনও পাকিস্তানীরা কিছুই বুঝতে পারেনি। সবাই ভেবেছিলো বাজার সেরে বাড়ি ফিরছে। এইসব হাঁটুরে সওদার জন্যই আগেই তাদেরকে টাকাপয়সা দেওয়া হয়েছিলো । প্রতিটি ঝুড়ির একেবারে তলায় চটের থলেতে ছিল লিমপেট মাইন, ফিনা ইত্যাদি। আবার কোনটায় ছিল স্টেনগান।

 

১৪ই আগস্ট রেডিওতে দ্বিতীয় বাংলা গানটি শোনা গেলোঃ’’ আমি তোমায় যত শুনিয়েছিলাম তার বদলে চাইনি কোন দান।‘’ আসলে এটা ছিল সাংকেতিক সংকেত। যার ফলে সেই রাতেই নৌ-মুক্তিযোদ্ধাদের পাকিস্তানী জাহাজসমূহে আঘাত করার কথা।

 

কিন্ত দুর্ভাগ্য এই দলের অভিযান একদিন পিছিয়ে গেলো।৩ নম্বর গ্রুপ ছাড়া সকলেই রাতের মধ্যে চরলাক্ষায় পৌঁছে গিয়েছিলো। ৩ নম্বর গ্রুপের যোদ্ধারা প্রায় ৮০ মাইল হেঁটে আসার পর ১৪ই আগস্ট একদিন তাদের বিশ্রাম দরকার।দিনের আলোতে কিছুটা রেকিও করা দরকার। লক্ষ্যবস্তগুলো প্রতিটি সদস্যের দেখা উচিত। যেখান দিয়ে তারা পানিতে নামবে এবং কাজ শেষ করে যেখানে তাদের উঠতে হবে সেসব জায়গাও আগে থেকে তাদের দেখে রাখতে হবে। তাই একেবারে তাড়াতাড়ি করলেও পরবর্তী রাতের আগে আর কিছু হচ্ছেনা।

 

১৪ই আগস্ট এখানে কিছু না ঘটলেও শত্রপক্ষের জন্য সময়টি খুব স্বস্তির ছিলোনা। সারারাত্রি সমগ্র সীমান্ত এলাকা এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন অংশে আমাদের যোদ্ধারা অসংখ্য আক্রমণ চালায়। আমাদের হতাশাগ্রস্তও জনগণও চাইছিলেন ১৪ই আগস্ট তাদের ছেলেরা কিছু একটা করুক। এমন কিছু করুক যাতে পাকিস্তানীদের উচিত শিক্ষা হতে পারে।

 

১৫ই আগস্ট চরলাক্ষায় আমাদের৪০ জন তরুণ যাদের অধিকাংশেরই বয়স বিশের কোটা পার হয়নি- তাড়াতাড়ি রাতের খাবার খেয়ে নিয়ে স্বল্পক্ষণের একটি ঘুম দেয়।

 

রাত ১টা। বন্দরনগরী পুরো নিদ্রামগ্ন। শান্ত নদীতে স্রোতের কুলুকুলু ধ্বনি। নিঃশব্দে ওরা নদীরপাড়ের দিকে দ্রুত এগিয়ে যায়।অপর পাড়ের জেটিগুলো তখন বিদ্যুৎ আলোয় ঝলমল করছিল। সার্চলাইট ফেলে নদীর ওপর লক্ষ্য রাখছিল   সান্ত্রীরা। ওরা ক্লান্ত। হয়ত ঘুমেঘুমে ঢুলুঢুলু।

 

১৪ই আগস্ট এবং তার পূর্ববর্তী কয়েকদিন পাকিস্তানীদের উপর বেশ বড়রকমের ধকল গেছে। এরাতে তাদের সকলেই যেন একটু নিশ্চিন্ত। পাকা প্লাটফরমের উপর লম্বা ক্রেনের ছায়াগুলো যেন ভৌতিক মনে হয়। তবে সান্ত্রীরা এই ছায়া চেনে। নদীর দিক থেকে তাদের ভয়ের কোন আশংকা নেই।কোন নৌকা কিংবা সাম্পান জাহাজের দিকে অগ্রসর করতে চাইলেই দেখা যাবে। সেক্ষেত্রে দূরপাল্লার কয়েকটি অস্ত্রের রাউন্ডই যথেষ্ট। কিন্ত তেমন কখনই ঘটেনি।

 

এমভি আল- আববাস এসেছে৯ই আগস্ট।১২নম্বর জেটিতে নোঙ্গর করা এই জাহাজ ১০,৪১০ টন সামরিক সরঞ্জাম নিয়ে এসেছে।

 

একখানি বার্জে (ওরিয়েন্ট বার্জ নম্বর৬) ২৭৬ টন অস্ত্রশস্ত্রও গোলাবারুদ বোঝাই করে করে মৎস্য বন্দরের জেটির সামনে রাখা আছে। এটাকে ট্রেনে ঢাকা নিয়ে যাওয়া হবে।

 

এমভি হরমুজ ১৪ই আগস্ট চট্টগ্রাম পৌঁছেছে। সঙ্গে নিয়ে এসেছে৯,৯১০ টন সমরসম্ভার।১৩ নম্বর জেটিতে জাহাজটি ভেড়ানো।

 

আরও কয়েকখানি জাহাজও বার্জ এদিকওদিক রয়েছে। নেভাল জেটিতে ছিল দুটি গানবোট এবং একখানি বার্জ। সন্ধার পরি গানবোট দুটি অজ্ঞাতস্থানের উদ্দেশ্য রওনা হয়ে যায়। আমাদের ছেলেদের কপাল খারাপ। এমন সুন্দর দুটি শিকার হাতছাড়া হল। রাত সোয়া আটটা। আল-আববাসও হরমুজের মাস্টার এবং ক্রুরা গভীর নিদ্রায় অচেতন। মিলিটারি এবং সান্ত্রীরা আধো ঘুম আধো জাগরণে ঢুলছে। রাত দুইটা বাজলে তাদের ডিউটি শেষ। আর মাত্র ৪৫ মিনিট বাকী। তারপর অন্যরা আসবে।

 

মাথাটা পানির উপর রেখে আমাদের ছেলেরা যার যার লক্ষ্যবস্তর কাছে পৌঁছে গেছে। কালবিলম্ব না করে তারা জাহাজগুলোর গায়ে লিমপেট মাইন লাগিয়ে দিয়ে আবার তেমনি নিঃশব্দে নদীর ভাটিতে ভেসে যায়। আর দক্ষিণে সরে গিয়ে তারা পূর্বতীরে উঠে পড়ে। রাত পোহাতে তখনওঅনেক বাকি।নিরাপদ দূরত্বে সরে যাওয়ার পর্যাপ্ত সময় তারা পেয়ে যায়।সকাল নাগাদ তারা পটিয়া এবং সেখানে সারাদিন বিশ্রাম নিয়ে১নম্বর সেক্টর হেডকোয়াটার হরিণার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হবে।

 

রাত১টা ৪০মিনিট। হঠাৎ কান ফাটানো আওয়াজে বন্দরনগরী চট্টগ্রাম কেঁপে উঠে। লোকজন শয্যা থেকে লাফিয়ে নেমে পড়ে। শিশুরা ভয়ে কান্না করছে। কিন্ত কি ঘটছে তা কেউ বলতে পারেনা।

 

রাত১টা৪৫ মিনিট। আরেকটি প্রচণ্ড বিস্ফোরণ। তারপর তৃতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম । একটির পর একটি বিস্ফোরণে চট্টগ্রাম তখন থরথর করে কাঁপছে। আতংক ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র।সান্ত্রীরা দিকবিদিক জ্ঞান হারিয়ে পাগলের মতো ইতস্তত বিক্ষিপ্ত গুলি ছুঁড়তে শুরু করে।৬ নম্বর ওরিয়েন্ট বার্জ দেখতে না দেখতে তলিয়ে গেলো।আল-আববাস এবং হরমুজও দ্রুত ডুবতে থাকে। জাহাজের খোলে প্রচণ্ড বেগে তখন পানি ঢুকছে। আশেপাশের বার্জগুলোও তখন ক্ষতিগ্রস্ত। বিস্ফোরণে জাহাজের ক্রুদেরও অনেকে হতাহত হয় কিন্ত ভয়ে কেউ সাহায্যের জন্য ওদিকে অগ্রসর হচ্ছেনা, পাছে আবার বিস্ফোরণ শুরু হয়ে যায়।

 

সূর্যোদয়ের সাথে সাথে সিনিয়র অফিসাররা বন্দরে গিয়ে উপস্থিত হন। সমগ্র এলাকায় সান্ধ্য আইন জারি করা হল। মুক্তিবাহিনীর খোঁজে হেলিকপ্টারগুলো আকাশে উড়ে গেছে। পাকিস্তানীরা তাদের জিঘাংসা মেটাতে নদীর পূর্বপাড়ের জনপদগুলোর উপর নির্বিচারে কামানের গোলাবর্ষণ করতে থাকে। নদীর পাড়ের গ্রামগুলোতে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়। সন্দেহের বশবর্তী নিরাপদ গ্রামবাসী এবং জেলেদের ধরে এনে মুক্তিবাহিনীর খবর বের করার চেষ্টা করা হয়। শেষে কিছু না পেয়ে তাদের নদীর পাড়ে গুলি করে হত্যা করা হয়। নিরস্ত্র গ্রামবাসী আর জেলেদের লাশগুলো স্রোতের টানে ভেসে চলে সমদ্রের দিকে।

 

পটিয়াতে আমাদের যোদ্ধারা তখন বিশ্রাম নিচ্ছিল। তারা একটি অতিবিপদজনকও জটিল মিশন সফল করেছে। তাদের এই সফল অভিযান স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে একটি বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।

 

ভোর তখন পাঁচটা। ঢাকাস্থ ইস্টার্ন কমান্ড হেডকোয়াটারের অপারেশন রুমের কর্তব্যরত স্টাফ অফিসার ঘটনার বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ না করেই সত্ত্বর ঘটনা সম্পর্কে কোর কমান্ডারকে অবহিত করার সিদ্ধান্ত নেন। গেরিলাদের চাঁদপুর এবং মংলা বন্দরের হামলার খবরও কুমিল্লাও যশোর সেনানিবাস থেকে তড়িৎ গতিতে হেড কোয়াটারে পাঠানো হয়। এই সকল আক্রমণে একদিকে শত্রুর যেমন বিপুল পরিমাণ সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতি হয়, অপরদিকে পাকিস্তানীদের মিথ্যা দম্ভ আর অহমিক হয় ধূলিসাৎ। অপারেশন জ্যাকপট সফল হয় পুরোপুরিভাবে।

 

এই দিনের ঘটনা সম্পর্কে ১৬ই আগস্ট পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর তদন্ত রিপোর্টে লেখা হয়েছিলোঃ

 

‘’পরিস্থিতি পর্যালোচনার প্রেক্ষাপটে জাহাজের কোন ব্যক্তিকেই দায়ী করা চলেনা। কারণ পূর্ব থেকে কিছুই টের পাওয়া যায়নি এবং গেরিলারা যে এমন ধরণের অভিযান চালাতে পারে তা আগে থেকে কেউ কল্পনাও করতে পারেনি। অবশ্য নদীর দিকটা ভাল করে দেখাশোনা করার জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। দিন রাত্রির কোন সময়েই নৌকা ইত্যাদি আর জাহাজগুলোকে ঘেঁষতে দেওয়া হচ্ছেনা।‘’(পাক সেনাবাহিনীর তদন্ত কমিশনের রিপোর্ট থেকে উদ্ধৃত)

 

সামুদ্রিকও নদীবন্দরগুলোর উপর এই চমকপ্রদ হামলা পাকিস্তানীদের হতচকিত করে দিয়েছিলো। এমন দুঃসাহসিক অভিযান চালাতে পারে এটা ছিল পাকিস্তানীদের চিন্তারও বাইরে। এই হামলার আগ পর্যন্ত আমাদের যুদ্ধ –পদ্ধতি সম্পর্কে পাকিস্তানীরা মোটামুটি পরিচিত হয়ে উঠেছিলো। সারা দেশজুড়ে এ সময়ে মুক্তিযোদ্ধারা ছোট ছোট হামলা চালায়। কিন্ত জুন-জুলাই মাসের এই ছোট ছোট হামলাগুলি ছিল কম তাৎপর্যপূর্ণ।হ্যান্ডগ্রেনেড নিক্ষেপ , শত্রুর গাড়ি ধ্বংস , রাজাকার, দালাল,শান্তিবাহিনী বা আলবদর, আলশামস এর লোকজন হত্যার মধ্যে এসময়ের ঘটনাবলী সীমাবদ্ধ ছিল। কোন গুরুত্বপূর্ণ লক্ষবস্তর উপর তখনও হামলা চালানো হয়নি শত্রপক্ষের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও ছিল তখন পর্যন্ত অক্ষত। এমনকি নেতৃস্থানীয় বাঙ্গালী দালালরা পর্যন্ত বেশ আয়েশের সাথে তাদের দৈনন্দিন কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছিলো। মাঝে-মধ্যে এদের মধ্যে কয়েকটি পরিকল্পনাহীন হামলা হলেও তা ব্যর্থ হয়ে গেছে।মাঝখান থেকে গেরিলারা ধরা পড়ে পাকিস্তানীদের হাতে প্রাণ দিয়েছে।

রণকৌশলের দিক থেকে শত্রপক্ষের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রসমূহ বিভিন্ন হেডকোয়াটার,অফিসার মেস, অস্ত্রও রসদ গুদাম, বিদ্যুৎ ও জালানি কেন্দ্র, বন্দর, রেলওয়ে এসবের উপর আগস্ট পর্যন্ত কোন সুপরিকল্পিত হামলা হয়নি। ফলে, আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে বাংলাদেশ প্রশ্ন প্রায় মৃতপ্রায় হয়ে পড়ে। মুক্তিযোদ্ধাদের এবং দেশের মানুষের মনোবল কিছুটা যেন ভেঙ্গে পড়ে।

 

অন্যদিকে পাকবাহিনীর অবস্থা তখন বেশ সুবিধাজনক। যুদ্ধের প্রথমদিকে আমাদের নিয়মিতবাহিনী তাদের বেশকিছু ক্ষতি করেছিলো। শত্রুপক্ষের হতাহতের সংখ্যাও ছিল প্রচুর। বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া খবরে মোটামুটি জানা যায় যে, পাঁচ থেকে ছয় হাজার শত্রুসৈন্য নিহত এবং তখন আট থেকে দশ হাজার আহত হয়েছিলো। আহতদের মধ্যে এক- তৃতীয়াংশ পুনরায় যুদ্ধ করার অনুপযুক্ত হয়েছিলো।

 

সামরিকভাবে গেরিলা তৎপরতা সন্তোষজনক না হলেও আমরা ভবিষ্যতের জন্য অবশ্যই আশাবাদী ছিলাম। মুক্তিযোদ্ধারা সম্পূর্ণ প্রচলিত পদ্ধতিতে ট্রেনিং পেতো এবং ট্রেনিং শেষ করেই বাংলাদেশের অভ্যন্তরে তাদেরকে গেরিলা পদ্ধতিতে যুদ্ধ করতে হতো।তাছাড়া মুক্তিযোদ্ধাদের প্রায় সবারই বয়স কম, আবেগ বেশী। কেউ কেউ আবার অতিরিক্ত উচ্চাভিলাষী। এরা প্রত্যেকেই গ্রুপলিডার কিংবা ঐ ধরণের কিছু একটা হতে চাইতো। এটা বুঝতে চাইত না সবাই লিডার হলে অনুসারী কোথা থেকে আসবে। অবশ্য যুদ্ধ সম্পর্কে আমাদের সকলের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত এর চাইতে বেশি কিছু আমাদের আশা করার ছিল না।

 

এমনি যখন আমাদের অবস্থা যে সময়ে অপারেশন জ্যাকপট এর সাফল্য প্রমাণ করেছিলো যে, যথাযথ শিক্ষা এবং নেতৃত্ব দিতে পারলে আমাদের ছেলেরাও অবিশ্বাস্য কাজ করতে পারে। তাদের মধ্যে আন্তরিকতার কোন অভাব ছিলোনা।তারা বুদ্ধিমান, কোন পরিস্থিতিতে কি করতে হবে দ্রুত তা বুঝে নিতেও সক্ষম। তাদের মানসিক উৎকর্ষ ছিল নিঃসন্দেহে নিরক্ষর পাকিস্তানী সৈন্যদের চাইতে উত্তম। শিক্ষিত এক বিরাট গেরিলাবাহিনী আমরা পেয়ে ছিলাম, এটা আমাদের সৌভাগ্য।

 

সেপ্টেম্বর থেকে প্রতিমাসে ২০ হাজার গেরিলাকে ট্রেনিং প্রদান করে তাদেরকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এই হিসেবে ৭১ এর ডিসেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশে গেরিলার সংখ্যা আনুমান করা হয় এক লাখের উপরে। এদের মধ্যে শতকরা৩০ ভাগ যথাযথভাবে কাজ করলেওপাকবাহিনীর পরিকল্পনায় একটা ভাঙ্গন ধরানো সম্ভব। এই পরিস্থিতিতে গেরিলাদের নিয়েই ব্যস্ত থাকতে হবে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীকে। আর চূড়ান্ত আঘাত আনার সেটাই সুবর্ণ সুযোগ। একদিকে যেমন চলছিল এসব পরিকল্পনা, অন্যদিকে সময়ের সাথে সাথে ভারতও পাকিস্তান ক্রমান্বয়ে এগিয়ে আসছিল একটা অবশ্যম্ভাবী যুদ্ধের দিকে।

 

 

কোণঠাসা

 

সেপ্টেম্বর থেকে ভারতে ব্যাপক যুদ্ধ প্রস্তুতি শুরু হয়। ডিভিশনাল এবং কোর হেডকোয়াটারগুলো অগ্রবর্তী স্থানসমূহে অবস্থান গ্রহণ করতে থাকে।সরবরাহ ব্যবস্থাও রণ প্রস্তুতিতে ব্যাপক চাঞ্চল্য লক্ষ্য করা যায়। ভারতীয় সেনাবাহিনী সম্ভাব্য- সংঘর্ষস্থল অভিমুখী সড়ক নির্মাণ,সেতুগুলোর রক্ষণাবেক্ষণও মেরামতের কাজ পূর্ণ উদ্যমে শুরু করে। কতগুলো ইউনিট সীমান্তবর্তী ঘাঁটিসমূহে অবস্থান নেয়। ভূপ্রকৃতি এবং সম্ভাব্য রণাঙ্গনের অবস্থা বিশ্লেষণ সহ ব্যাপক পর্যবেক্ষণ তৎপরতা চলতে থাকে।

 

এদিকে আমরা প্রতিদিন ট্রেনিংপ্রাপ্ত শত শত মুক্তিযোদ্ধাকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে পাঠাচ্ছিলাম বটে, কিন্ত তেমন কোন উল্লেখযোগ্য ফল পাচ্ছিলাম না।সকল স্তরে নেতৃত্বদানের অভাবই ছিল আমাদের প্রধান অন্তরায়। কোন স্থানেই আমাদের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ স্থাপিত হচ্ছিল না এবং গেরিলা তৎপরতা আশানুরূপ জোরদার করার ক্ষেত্রেও পেছনে পড়ে যাচ্ছিলাম। এ সময়ে বাংলাদেশের নেতৃত্বেও শূন্যতা পূরণের জন্য, বিশেষ করে গেরিলা ঘাঁটিগুলোর জন্যকিছুসংখ্যক এম- সি- এ(গণপরিষদ সদস্য) কে ট্রেনিং দেওয়ার একটি উদ্যোগ নেওয়া হয়। উপস্থিত এম-সি-এ দের যারা উৎসাহী এবং শারীরিক সমর্থ তাদেরকে গেরিলা যুদ্ধের কায়দা কানুন বিশেষতঃ গেরিলাদের নিয়ন্ত্রণও নেতৃত্বে দানের বিষয়ে ট্রেনিং প্রদানই এই প্রচেষ্টার লক্ষ্য। কথা ছিল ট্রেনিং এর পর তারা বাংলাদেশে যার যার এলাকায় গিয়ে গেরিলা তৎপরতা পরিচালনা করবেন। আমার সেক্টরে এম-সি-এ জনাব মোশারফ হোসেন এবং আর কয়েকজন রাজনৈতিক নেতা এব্যাপারে উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ গ্রহণ করেন। গেরিলাদের নেতৃত্বদানের জন্য তাঁদেরকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে পাঠানো হয়েছিলো। অন্যান্য সেক্টরের কয়েকজন এম-সি-এ কে পাঠানো হয়। কিন্ত সারাদেশে একাজের জন্য প্রেরিত এম-সি-এদের সংখ্যা ছিল নিতান্তই নগণ্য। অল্প কয়েকজন এম-সি-এ ট্রেনিং করেছিলেন, যুদ্ধ করতে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছিলেন তস্র চাইতেও কম। ফলে,পরিকল্পনাটি তেমন কোন কাজে আসেনি।

 

সমগ্র উপমহাদেশ জুড়ে একদিকে যখন ব্যাপকতর যুদ্ধ আসন্ন হয়ে আসছিল তখন অন্যদিকে সামরিক আরও জোরদার করার জন্য আমাদের অর্থাৎ সেক্টর কমান্ডারদের উপর চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছিলো। বলা হচ্ছিলো শত্রুকে ছত্রভঙ্গ করেও দুর্বল করে রাখতে হবে। তাহলে সহজে চূড়ান্ত অভিযান চালিয়ে তাদের পরাভূত করা সম্ভব হবে এবং এই লক্ষ্য অর্জন করতে হবে যথাসম্ভব স্বল্প সময়ের মধ্যে, সম্ভব হলে নভেম্বরের মধ্যেই।

 

অথচ অস্ত্রশস্ত্রও অন্যান্য দিক দিয়ে আমাদের যা সামর্থ্য তাতে করে এই সীমিত সময়ের মধ্যে আরদ্ধ দায়িত্ব পালন করা আমাদের পক্ষে অসম্ভব। আমার ১ নম্বর সেক্টরের আওতায় ছিল মহুয়া নদীর সমগ্র পূর্বাঞ্চল অর্থাৎ পুরো চট্টগ্রাম, ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলা। এখানে শত্রুপক্ষের শক্তি ছিল দুই বিগ্রেডের বেশী। এছাড়া পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আগত আরও দুটি সামরিক ব্যাটালিয়ন এই অঞ্চলে শত্রুপক্ষের শক্তি বৃদ্ধি করছিলো। আমাদের পক্ষে ছিল ইপিআর, পুলিশ এবং সেনাবাহিনীর লোক নিয়ে তিনটি ব্যাটালিয়ন।সমগ্র সেক্টরে অফিসার পেয়েছিলাম সেনাবাহিনীর চারজন এবং বিমানবাহিনীর দুইজন। পাক সেনাবাহিনীর পক্ষে এখানে অফিসারের সংখ্যা ছিল অন্যূন ১৫০। ১ নম্বর সেক্টরে সাব সেক্টর করেছিলাম পাঁচটি। এর প্রতিটি কমান্ডে ছিল একজন অফিসার কিংবা একজন জেসিও। কমান্ডো সংক্রান্ত জটিল সমস্যাবলীর ব্যাপারে এঁদের অভিজ্ঞতা ছিল নিতান্তই সামান্য। আর আমার এলাকায় সক্রিয় যুদ্ধ চলছিলো অর্ধ শতাধিক মাইলেরও অধিক সীমান্ত এলাকাজুড়ে।

 

সেক্টর হেডকোয়াটারেই সমস্যার চাপ ছিল সবচাইতে বেশী। একজন মাত্র স্টাফ অফিসারকে সকল প্রশাসনিক এবং সরবরাহ ব্যবস্থা দেখতে হতো। কাজের মেয়াদ ছিল দিনরাত ২৪ ঘণ্টা এবং সপ্তাহে সাতদিন। কাজের অসহ্য চাপে স্টাফ অফিসার শেষ পর্যন্ত অসুস্থ হয়ে পড়ে। কিন্ত হাসপাতালে কয়েকদিন থাকার পর তাকে আবার কাজ শুরু করতে হয়। এই অবস্থায় কোন বিকল্প খুঁজে পাচ্ছিলাম না।

 

আমাদের সরবরাহ ঘাঁটি ছিল আগরতলায়।তিন হাজার লোকের জন্য রেশন, জ্বালানী তাঁবুও অন্যান্য সরঞ্জাম,কাপড়চোপড়, অস্ত্রশস্ত্র, ঔষধপত্র সবকিছু সেখান থেকে নিয়ে আসতে হতো। সেই একই গাড়িতে করে দুর্গম পার্বত্য অঞ্চল পাড়ি দিয়ে এগুলো আবার বিভিন্ন সাব- সেক্টরে পৌঁছানো হতো। বৃষ্টি- বাদলের দিনে সরবরাহ ব্যবস্থা চালু রাখতে আমাদের জীবন ওষ্ঠাগত হয়ে উঠছিল। কোন কোন সময় গাড়ি রাস্তার বাইরে গড়িয়ে পড়লে কিংবা হাঁটু সমান কাদায় চাকা বসে গেলে সেই গাড়ি না তোলা পর্যন্ত কিংবা রসদপত্র মাথায় করে গন্তব্যস্থলে না পৌঁছান পর্যন্ত সেখানে একজন অফিসারকে অপেক্ষা করতে হতো।

 

গেরিলা বাহিনীর প্রশাসনিক এবং অভিযান নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত দায়িত্ব ছিল আরও কষ্টকর। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে নিযুক্ত লাভের আশায় শত শত গেরিলা আমার হেড কোয়াটারে আসতো। তাদেকে এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন গ্রুপে ভাগ করতে হতো, তারপর আসতো দায়িত্ব সম্পর্কে তাদেরও ব্রিফিং এর পালা। প্রতিটি গ্রুপকে ব্রিফিং করতে কম করে হলেও এক ঘণ্টা সময় লাগতো। বিশেষ কাজের জন্য ব্রিফিং এ সময় লাগতো আরও বেশী।প্রত্যেক গ্রুপকেই অস্ত্রশস্ত্র, গোলাবারুদ ও রাহা খরচ দিতে হতো। ছেলেদের নিরাপদে ভেতরে পাঠানোর জন্য শত্রুবাহিনীর তৎপরতা ও চলাচল সংক্রান্ত সর্বশেষ খবর সংগ্রহ করতে হতো। টহলদাতা শত্রুসেনারা এক জায়গায় থাকতো না বলে সর্বশেষ খবরেও পরিবর্তন ঘটতো। এদের কাছে গাইড থাকতো। তারা নিরাপদ রাস্তা ধরে নিকটবর্তী ঘাঁটিতে(সাধারনতঃ সীমারেখা থেকে ৮-১০ মাইলের মধ্যে) গেরিলাদের পৌঁছে দিতো। নতুন আগন্তকদের সম্পর্কে আগেই ঘাঁটিতে খবর দেওয়া থাকতো। সেখানে তাদের খাদ্যও আশ্রয়ের ব্যবস্থা হতো। একই পদ্ধতিতে সেখান থেকে তাদের রওয়ানা হতে হতো পরবর্তী ঘাঁটিতে। তাদেরকে অতি সাবধানে আক্রমণস্থলের কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্য যানবাহনের দরকার হতো। প্রত্যেক গ্রুপ সদস্যের নাম-ঠিকানা, তাদের পরিকল্পিত পথ, ঘাঁটি, অস্ত্র-শস্ত্র, গোলাবারুদের হিসাব, কাপড়চোপড়, রেশন, পথ খরচের টাকা পয়সা সবকিছুর বিস্তারিত রেকর্ড রাখতে হতো। দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করার পর প্রতিটি গ্রুপের সাথে আমাদের যোগাযোগ রাখতে হতো। তাদের উপর নিয়ন্ত্রণ রক্ষা করা এবং নির্ধারিত দায়িত্ব পালন নিশ্চিত করার ব্যাপারেও আমাদের তৎপর থাকতে হয়। গ্রুপ গুলো নিরাপদ গন্তব্যস্থলে পৌঁছে যাওয়ার পর আমাদের তারা সে খবর জানিয়ে দিতো। তারা কোন অভিযান চালালে কিংবা শত্রুপক্ষের কোন তথ্য সংগ্রহ করতে পারলে তাও আমাদের জানাতে হতো। আমাদের সেক্টরের ভিন্ন জায়গায় তিনটি গোপন অয়ারলেস সেট চালু ছিল। এগুলোর মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে আমরা নিয়মিত খবর সংগ্রহ করতাম। এছাড়া খবর সংগ্রহ করে এক বিরাট নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিলাম। বিভিন্ন দলের কাছে খবর নিয়ে এরা সেক্টর হেড কোয়াটারে পৌঁছে দিতো। ফেরার পথে আবার তারা বিভিন্ন দলের গাইড হিসেবে কাজ করতো।এইভাবে তাদের আবর্তনমূলক কাজ চলতো দিনের পর দিন। চতুর্দিকে সবসময় সবকিছু চালু রাখাই ছিল আমাদের প্রধান দায়িত্ব।এর যেকোন একটা থামলেই বিপদের সম্ভবনা।

 

স্বাধীনতা যুদ্ধের সাথে জড়িত সকল শ্রেণীর লোকেরই তখন সঙ্গীন অবস্থা।মন্ত্রীসভার সদস্যবৃন্দ, আর্মি হেডকোয়াটার নেতৃবৃন্দ কিংবা ফ্রন্ট লাইনে সংগ্রামরত যোদ্ধা সকলেরই অবস্থা অভিন্ন। যুদ্ধরত সৈনিকও গেরিলাদের উপর নির্দেশ আসতে থাকে যুদ্ধ আরো জোরদার করার।মুক্তিযোদ্ধারা শত্রুকে অনবরত আঘাত হেনে চলেছিল। তাদের হাতে বিপুল সংখ্যক শত্রু নিহত কিংবা আহতও হয়েছে। নিজেরাও হতাহত হয়েছে। কিন্ত কোনদিন এর স্বীকৃতি অথবা প্রশংসা তারা খুব বিশেষ পায়নি। একারণে স্বভাবতই তারা ছিল ক্ষুব্ধ।

 

পার্বত্য চট্টগ্রামের একেবারে উত্তরপ্রান্তে ডেমাগিরিতে কয়েক শত ছেলে ট্রেনিং নেওয়ার জন্য মাসের পর মাস অপেক্ষা করছে। তাদের মধ্যে কয়েকজন জ্বরেও রক্ত আমাশয়ে মারাও গেছে। অন্যদেরকে দিনের পর দিন সপ্তাহের পর সপ্তাহ অনাহারে কাটাতে হয়েছে। শত মাইল দুর্গম এবং পার্বত্য অঞ্চলও নিবিড় বনানী পার হয়ে মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেওয়ার উদ্দেশ্যে তারা এসেছিলো। কিন্ত কেউ তাদের সম্পর্কে সামান্যতম আগ্রহ প্রকাশ করেনি। তারা যে মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে বাড়ি ছেড়েছিল তার স্বীকৃতিও কারো কাছ থেকে তারা পায়নি।

 

যুদ্ধে নিয়োজিত গেরিলাদের শতকরা পঞ্চাশ জনের জন্য ভারত অস্ত্রও গোলাবারুদ সরবরাহ করেছিলো(পরে অবশ্য শতকরা৯০ জনকে অস্ত্র সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়।) বাকী ছেলেদের খালি হাতে যুদ্ধে পাঠানো কিংবা অপেক্ষা করতে বলা ছাড়া আমাদের কোন গত্যন্তর ছিলোনা। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর হেডকোয়াটারের নির্দেশ ছিল অস্ত্র ছাড়া কাউকে যাতে গেরিলা যুদ্ধে পাঠানো না হয়। আমাদের সবচাইতে সহজ উপায় ছিল দুই গ্রুপের অস্ত্র দিয়ে তিন গ্রুপকে পাঠানো। ফলে প্রতিটি গ্রুপে শতকরা ৩০ থেকে ৪০ ভাগ ছেলেকে সরবরাহের অপ্রতুলতার জন্য বসিয়ে রাখতে হতো। এদের জন্য আবার রেশন পেতাম না, ফলে সমস্যা আরো মারাত্মক আকার ধারণ করতো। আমরা স্থানীয়ভাবে এর কিছুটা সমাধান বের করেছিলাম। সকল অফিসার, জেসিও এবং অন্যান্য রাঙ্কের সৈনিকরা মিলে একটা মাসিক চাঁদার ব্যবস্থা করেছিলাম। এর মাধ্যমে যা আয় হতো তা দিয়ে বাড়তি আহার যোগানোর চেষ্টা চলতো। এই ব্যবস্থা ছিল অনিয়মিত এবং পরিস্থিতির চাপে পড়েই আমাদের এটা করতে হয়েছিলো। অথচ এর জন্যও আমাদের ভুল বোঝা হতো, আমরা হতাম সমালোচনার পাত্র। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা আমাদের সম্পর্কে গোপনে চিঠিতে লিখতেন,’’ বাংলাদেশের সেক্টর কমান্ডাররা পুরো নিয়ম নেনে চলছেন না’’। এবিষয়ে ভারতীয় অফিসারদের এই মতামত সম্ভবত অনেকাংশে সঠিক ছিল। তাদের উপর ভারতীয় আর্মি হেড কোয়াটারের সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকতো, গেরিলাদের ট্রেনিং শেষ হওয়ার তিন চার দিনের মধ্যে সকলকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে তা সে সবাইকে অস্ত্র সরবরাহ করে কিংবা মাত্র কিছু অস্ত্র সরবরাহ করেই হোক। কিন্ত আমাদের উপর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর হেডকোয়াটারের নির্দেশ ছিল সবাইকে অস্ত্র সজ্জিত না করে কোন গ্রুপকেই যেন বাংলাদেশের অভ্যন্তরে যুদ্ধে পাঠানো না হয়।

 

বাংলাদেশ আর্মি হেডকোয়াটার এবং ভারতীয় আর্মি হেডকোয়াটারের মধ্যে সমন্বয় তখনও পুরো গড়ে উঠেনি বলেই হয়ত আমাদের জন্য সমস্যার সৃষ্টি হয়েছিলো।

 

গেরিলা যোদ্ধা

 

আগস্ট মাস থেকেই কাপ্তাই পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং চট্টগ্রাম বন্দরের নিকটবর্তী বাংলাদেশের একমাত্র তৈল শোধনাগারটি অচল করার জন্য চাপ দিচ্ছিলাম। কিন্ত এই গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র দুটি ধ্বংস হলে পাকিস্তানীদের চাইতে আমাদের ক্ষতি বেশি হবে বলে মনে করে আমি দুটি প্রস্তাবই প্রত্যাখ্যান করি। বিদ্যুৎ ব্যবস্থা এবং জ্বালানির অভাব দেখা দিলে শত্রুদের যান চলাচল সীমিত হয়ে পড়বে এবং এতে করে তাদের তৎপরতাও হ্রাস পাবে। কিন্ত আমার মনে হচ্ছিলো কেন্দ্র দুটি ধ্বংস না করেও অন্যভাবে আমাদের লক্ষ্য হাসিল করা সম্ভব।

 

আমরা ভাবনাকে সামনে রেখে একটি নতুন পরিকল্পনা প্রণয়ন করে ভারতীয় সেনাবাহিনীর বিগ্রেডিয়ার সাবেক সিং এর সঙ্গে কথা বলি। তিনি ভারত সরকারের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের ১,২,৩ নম্বর সেক্টরের কার্যক্রমও চাহিদা সংক্রান্ত বিষয়ে সমন্বয়কারীর দায়িত্বে ছিলেন। আমাদের পরিকল্পনা ছিলঃ

 

১। মদনঘাটে বিদ্যুৎবিভাগের সাব- স্টেশন ধ্বংস করা।

২। কাপ্তাই এবং চট্টগ্রামের মধ্যে যতগুলি সম্ভব বৈদ্যুতিক পাইলন ধ্বংস করতে হবে।

 

আমার বিশ্বাস ছিল দুটি কাজ করতে পারলেই শত্রুপক্ষের বিদ্যুৎ সরবরাহ বিশেষ করে চট্টগ্রাম বন্দরের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হবে এবং এতে করে ওদের বাণিজ্য অন্যান্য জাহাজ নোঙ্গরে অচলাবস্থা সৃষ্টি হবে।

 

যথারীতি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত গৃহীত হলে একাজের জন্য আমি আমার সাথে কার্যরত বিমানবাহির নির্ভীক অফিসার ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট সুলতানকে মনোনীত করলাম। সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে আমি তাকে পরিকল্পনাটি বুঝিয়ে দিলাম এবং রেইডিং বাহিনীর সদস্যদের বেছে নিতে বললাম। এরপর সবাই মিলে আমরা কয়েকটি মহড়া দিলাম। রেইডিং পার্টির সদস্যদের কি কাজে পাঠানো হতো তা আগে থেকে বলা হতোনা। একেবারে সর্বশেষ ঘাঁটিতে পোঁছানোর পর যখন লক্ষ্যবস্তর উপর আঘাত হান্তে যাবে ঠিক তখনই তাদেরকে বলা হবে, তার আগে নয়। সুলতান তার দলের লোক এবং প্রয়োজনীয় অস্ত্রশস্ত্র বেছে নিলো। বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ধ্বংস করা ছাড়াও সুলতানের উপর ঐ এলাকার গেরিলা তৎপরতা হ্রাস পাওয়ার কারণ নির্ণয়ের দায়িত্ব দেওয়া হল।

 

১১ই সেপ্টেম্বর সুলতানের সঙ্গে কয়েকজন বিশেষ ট্রেনিংপ্রাপ্ত এবং কিছু সংখ্যক নিয়মিত সদস্যকে হরিণা থেকে এ অভিযানে পাঠানো হল।

 

৩রা অক্টোবর তার পার্টি দুঃসাহসিক অভিযান চালিয়ে শহর থেকে মাইল খানেক দূরেই মদনাঘাটের ট্রান্সফরমার ধ্বংস করে দিলো। বহুসংখ্যক বৈদ্যুতিক পাইলনও উড়িয়ে দেওয়া হয়। এতে কাপ্তাই থেকে সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে পড়ে। বিশেষভাবে সুরক্ষিত মদনাঘাট বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির চারদিকে ছিল ইটের দেওয়াল আর দুর্ভেদ্য কাটাতারের বেড়া। এখানে মোতায়েন থাকতো ১০জন নিয়মিত সৈন্য এবং২০ জন আধাসামরিক বাহিনীর সদস্যের একটি প্লাটুন। তারা সবসময় চারদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখছিল। তার মধ্যে থেকে সুলতান তাঁর দল নিয়ে শত্রুর উপর সফলতার সাথে এই আক্রমণ সম্পন্ন করে। আগস্ট মাসের মাঝামাঝিতে বন্দরের জাহাজ ধ্বংসের পর আবার দুঃসাহসী হামলায় শত্রুরা দিশেহারা হয়ে পড়ে। তারা বুঝতে পারলো যে গেরিলারা ক্রমান্বয়ে অধিক শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।

 

অভিযান শেষ করে ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট সুলতান ঐ এলাকার অধিকাংশ গেরিলা গ্রুপের সাথে যোগাযোগ করে তাদের অসুবিধা এবং সমস্যাবলী নিয়েও আলোচনা হয়। ১১ই অক্টোবর সুলতান হরিণায় এসে বিস্তারিত রিপোর্ট পেশ করেন।

 

গেরিলারা গ্রামাঞ্চলে বেশ কার্যকর অবস্থান গড়ে তুলেছিল। বস্তুতঃ সারা দেশটাই তখন পুরো গেরিলাঘাঁটিতে পরিণত হয়েছিলো।ফলে যখন তখন যেকোনো দিকে সৈন্যরা অভিযান চালাতে পারতো। রাতগুলো ছিল একান্তভাবেই তাদের। ফলে পাকিস্তানী সৈন্যরা পারতপক্ষে রাতের বেলা বাইরে বের হতো না।

 

আমাদের পক্ষে জনগণের সমর্থন ছিল ব্যাপক। গেরিলাদের সাহায্যে আসতে পারলে লোকজন সম্মানিত এবং গর্ব অনুভব করতো। গেরিলাদের খাদ্য ও আশ্রয় দেওয়ার অপরাধে পাকিস্তানীরা বহু লোককে হত্যা করেছে, তাদের বাড়ি ঘর জ্বালিয়ে, সহায়- সম্পত্তি লুট করে সেই লুটের মালের বখরা পুরষ্কার হিসেবে রাজাকারও দালালদের দেওয়া হয়েছে। এতদশত্বেও জনগণের হৃদয় আবেগ এবং উচ্ছ্বাসে উদ্বেলিত হয়ে উঠেছে, যখন দেখেছে অল্প বয়সী তরুণেরা ভারী অস্ত্র- গোলাবারুদের ভারে নুজ্জ হয়েও দৃঢ় প্রত্যয়ে লম্বা লম্বা পা ফেলে শত্রু হননের দিকে এগিয়ে চলেছে। বাংলার জনগণ মুক্তিযোদ্ধাদের স্বাগত জানানোর জন্য সাগ্রহে প্রতীক্ষা করেছে দিনের পর দিন। দেশের ভেতরে অবস্থানকারী লোকজন যদি সেদিন এই ত্যাগ স্বীকার না করতো তাহলে অঙ্কুরেই আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের স্বাভাবিক মৃত্যু ঘটতো।

 

যুদ্ধের মুখোমুখি

আমরা সিদ্ধান্ত নেই, রণকৌশলের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ এলাকা এবং যেসব সীমান্ত ফাঁড়িতে শত্রুর পাহারা একটু কম, সেগুলো দখলের মাধ্যমেই আমাদের অভিযান শুরু হবে। প্রতিটি অভিযান শুরুর পূর্বেই ভারতীয় গোলন্দাজ বাহিনী আমাদের সহয়তা করবে। সীমান্তবর্তী এলাকা এবং সীমান্ত ফাঁড়ি দখল পরিকল্পনার পেছনে কতগুলো গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল, সেগুলো হচ্ছেঃ

(ক) এইসব সীমান্ত ফাঁড়ি বা সীমান্ত এলাকা দখলের যুদ্ধে আমাদের বাহিনীর দক্ষতাও দুর্বলতা আমরা নিরূপণ করতে পারবে।

(খ) সকলকে বলে দেওয়া হবে এই লক্ষ্য অর্জনে আমরা বদ্ধপরিকর। এবং আমাদের এই অভিযান অব্যাহত থাকবে।এতে করে শত্রুরা গেরিলা বিরোধী তৎপরতা কমিয়ে আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থায় আরো বেশী শক্তি নিয়োগ করবে। শত্রুদের এভাবে সীমান্ত এলাকায় ব্যস্ত রাখতে পারলে দেশের অভ্যন্তরভাগে শত্রুর সংখ্যা কমে যাবে, ফলে গেরিলাদের কাজ আরও সহজ হবে।

(গ) এধরণের সংঘর্ষের মাধ্যমেই শত্রুর প্রস্তুতি এবং তার প্রতিরোধ ক্ষমতার মাত্রাও আমরা পরিমাপ করতে পারবো।

 

সীমান্তরেখা বরাবর আমাদের তৎপরতা বৃদ্ধির সাথে সাথে পাকিস্তানীরা ঠিকই অভ্যন্তর ভাগের শক্তি কমিয়ে সীমান্তে এনে সৈন্য জড় করতে থাকে। এতে বিভিন্ন স্থানের পরিস্থিতি গেরিলাদের অনুকূল হয়ে উঠে।অবশ্য,এই সঙ্গে কিছু অসুবিধাও দেখা দেয়। সীমান্ত এলাকায় শত্রুর শক্তি বৃদ্ধি পাওয়ায় নতুন ট্রেনিংপ্রাপ্ত গেরিলাদের সেই পথ দিয়ে দেশের ভেতরে পাঠানো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যায়। ভেতরে প্রবেশের প্রায় সকল পথই শত্রুসৈন্যরা বন্ধ করে দেয়।

২২শে সেপ্টেম্বর চম্পকনগর সীমান্ত ফাঁড়ি এবং প্রধান সড়কের উপর গুরুত্বপূর্ণ বল্লভপুর এলাকা দখল করার জন্য আমরা প্রচেষ্টা চালাই। আক্রমণের আগে ভারতীয় গোলন্দাজ বাহিনী লক্ষ্যস্থলের উপর গোলাবর্ষণের মাধ্যমে শত্রুর সুদৃঢ় অবস্থানগুলো ধ্বংস করার চেষ্টা করে।

 

কিন্ত দীর্ঘ ছয় ঘণ্টার যুদ্ধের পর আমরা পশ্চাদপসরনে বাধ্য হই। কামানের গোলায় শত্রুর তেমন ক্ষতি হয়নি। পাকিস্তানী বাংকারগুলো ছিল খুব মজবুত। প্রতিটি প্রতিরক্ষা বাংকারেই শত্রুরা ভূগর্ভে কয়েকদিন থাকার মতো রসদপত্র মজুত রেখেছিলো। ঘাঁটিগুলোর মধ্যে ট্রেঞ্চপথে যোগাযোগ ছিল। তাছাড়া আমরা যা অনুমান করছিলাম তার চাইতেও বেশী ছিল তাদের স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের সম্ভার।

 

চম্পকনগর সীমান্ত ফাঁড়ি আক্রমণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিলো ক্যাপ্টেন মাহফুজকে। ফাঁড়ির ডান পাশ দিয়ে নিজেদের আড়াল করে আমি ওদের অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দেই। কিন্ত লক্ষ্যস্থলের চারপাশে কয়েকশ গজ এলাকা গা ঢাকা দেওয়ার মতো তেমন কোন ফসলের ক্ষেত, উঁচু ভূমি অথবা বন-জঙ্গল ছিলোনা। পার্শ্ববর্তী একটি পাহাড় থেকে আমি যুদ্ধ পরিচালনা করছিলাম। ফাঁড়িটি থেকে এর দূরত্ব ছিল আটশ গজের মতো। সেখান আমি থেকে লক্ষস্থলের অনেক কিছুই দেখতে পারছিলাম। অয়ারলেসে মাহফুজ আমার সাথে যোগাযোগ রাখছিল। আমাদের বাহিনী কভার দেওয়ার জন্য কামানসহ ভারতীয় গোলন্দাজবাহিনীর একজন পর্যবেক্ষকও আমার সাথে ছিলেন। আগেই উল্লেখ করেছি, আমাদের সৈন্যদের অগ্রসর হওয়ার আগে কামান থেকে গোলাবর্ষণ করা হয়।কামানের গোলাবর্ষণ শেষ হলে আমাদের বাহিনী চূড়ান্ত আঘাত হানার জন্য দ্রুত অগ্রসর হতে থাকে। এসময় শত্রুরাও প্রচণ্ড বেগে গুলিবর্ষণ শুরু করে।ফাঁড়ির ডান এবং বাম পার্শ্ব থেকেই একটি করে মেশিনগান আমাদের কোম্পানীকে যথেষ্ট বিপাকে ফেলে দেয়।দুর্ভাগ্যক্রমে মাহফুজের একমাত্র অয়ারলেস সেটটিও বিকল হয়ে পড়ে। একটির বেশী দেবার মত মজুত কোন সেট আমাদের ছিলোনা। অয়ারলেস সেট নষ্ট হতেই মাহফুজ তার প্লাটুনের সাথে যোগাযোগ হারিয়ে ফেলে এবং আমারওমাহফুজের মধ্যকার সংযোগও বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।কিছুক্ষণ পরেই শুভপুর সেতুর দিক থেকে পাকিস্তানীদের কামানের গোলা আমাদের উপর এসে পড়তে থাকে।এদিকে কবেরহাট এলাকা থেকে আরও শত্রুসৈন্য দ্রুত চম্পকনগরে এসে পৌঁছায়।

 

কামানের গোলা, বিশেষ করে এয়ারবাস্ট শেল বিস্ফোরণের ফলে আমাদের কোম্পানীর পক্ষে আর অগ্রসর হওয়া সম্ভব হচ্ছিলনা। পাকিস্তানী মেশিনগানগুলোর অবস্থান জানার জন্য আমি মাহফুজের সাথে যোগাযোগ করার অনেক চেষ্টা করি।অবস্থান জানতে পারলে ভারতীয় কামান থেকে মেশিনগানের উপর গোলাবর্ষণ করা যেতো।আমাদের অবস্থান থেকে আমি কিংবা গোলন্দাজ পর্যবেক্ষক কেউই মেশিনগানগুলো দেখতে পাচ্ছিলাম না। যোগাযোগ ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়ায় আমাদের সকল পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়।

এই পরিস্থিতিতে কোম্পানীকে আরও এগিয়ে যেতে আত্মহত্যারই শামিল ছিল।

 

বল্লভপুর এলাকাতেও আমাদের কোম্পানী কমান্ডারকে শুরুতেই থমকে পড়তে হয়। তার দুটি প্লাটুন লক্ষ্যস্থলের দিকে অগ্রসর হচ্ছিলো, কিন্ত প্লাটুন কমান্ডারদের সাথে যোগাযোগ করার জন্য তার হাতে কোন অয়ারলেস সেট ছিলোনা। প্লাটুন দুটির সন্ধান লাভের জন্য তখন সে বার্তাবাহক পাঠায়। তাদের খুজে পাওয়া গিয়েছিলো বটে, কিন্ত তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। দিনের আলো ফুটতেই পাকিস্তানীরা আমাদের দেখে ফেলে এবং তাদের কামানগুলো সক্রিয় হয়ে উঠে।

 

এই দুটি আক্রমনেই একমাত্র যোগাযোগ ব্যবস্থা অভাবে সফল হতে পারিনি।কোম্পানী কমান্ডারদের সাথে যোগাযোগ রক্ষার জন্য আমার কাছে অয়ারলেস সেট ছিল অপ্রতুল আর প্লাটুন কমান্ডারদের সাথে যোগাযোগ রক্ষার জন্য কোম্পানী কমান্ডারদের কোন অয়ারলেস সেট ছিলোনা।নিজের প্লাটুনগুলোর সাথে সুষ্ঠু ব্যবস্থা না থাকলে কোন কোম্পানী কমান্ডারের পক্ষে রাত্রে এধরণের আক্রমণ চালানো বেশ অসুবিধাজনক হয়ে পড়ে।

সাময়িকভাবে আমরা ব্যর্থ হলেও এ দুটো প্রচেষ্টার ফলে আমরা বুঝতে পারি আমাদের সেনারা যুদ্ধের জন্য উল্লেখযোগ্য দক্ষতা অর্জন করতে পেরেছে। যথাযথভাবে পরিকল্পনা নেয়া হলে এবং যোগাযোগের সরঞ্জামও ভারী অস্ত্র শস্ত্রের সাহায্য পাওয়া গেলো, আমাদের বিশ্বাস ,নিশ্চয়ই আমরা জয়ী হতে পারবো।

 

যুদ্ধের তখন ছয় মাস চলছে। এসময়ে গুরুত্বপূর্ণ কতগুলো ঘটনা ঘটে। এগুলো পরোক্ষভাবে আমাদের স্বাধীনটা যুদ্ধের ওপর প্রভাব নতুন বিস্তার করে।ঘটনাগুলির একটি হচ্ছে ভারতও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি সাক্ষর। চুক্তি অনুযায়ী দুদেশ কোন সংকটও বহিঃশত্রুর আক্রমণের মুখে পরস্পরের সাহায্যে এগিয়ে আসবে বলে অঙ্গীকার করে। চুক্তি সাক্ষরের পর আমাদের সাহায্য করার ব্যাপারে ভারত আরও বলিষ্ঠ ভুমিকা গ্রহণ করে। ভারতের সরকার এবং জনগণ বুঝতে পারে বাংলাদেশ প্রশ্নে তারা যে পদক্ষেপ সে ব্যাপারে এখন তারা একা নয়। অচিরেই এই প্রতিরক্ষা চুক্তির প্রভাবে ভারতে এবং বাংলাদেশে বিশেষ করে মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে সুস্পষ্ট হয়ে উঠে। ভারত এতদিন পর্যন্ত খুব সন্তর্পণে এবং সাবধানে এগিয়ে চলছিলো। চুক্তির পর আমাদেরকে সর্বাত্মক সাহায্যের ব্যাপারে তার সমস্ত দ্বিধাদ্বন্ধ কেটে যায়।

 

এদিকে দুপক্ষের যুদ্ধের পরিকল্পনা আরও ব্যাপকতর হয়ে উঠে। গেরিলাদের মধ্যে যেন নতুন করে প্রাণের সঞ্চার হয়। প্রতিদিনই সড়কও রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার কাজ চলতে থাকে। প্রকাশ্য দিনের বেলাতেও হামলাও অ্যামবুশ শুরু হয়ে যায়। ভারতীয়ও পাকিস্তানীদের উভয় পক্ষের কামানের গর্জনে সীমান্ত এলাকা হয়ে উঠে চরম উত্তেজনাময়।

 

এদিকে ২৮শে সেপ্টেম্বর ভারতের ন্যাগাল্যান্ডে বাংলাদেশী পাইলটরা ট্রেনিং শুরু করে। গোড়াপত্তন হয় বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর। প্রায়ই একই সময় পাকিস্তানী নৌবাহিনী থেকে পালিয়ে আসা ৪৫ জন নৌসেনা নিয়ে বাংলাদেশ নৌবাহিনীরও গোড়াপত্তন হয়। সেপ্টেম্বরে আমরা দুটি নৌযানও সংগ্রহ করি। এম-ভি পলাশ এবং এম-পি পদ্মা নামের জাহাজ দুটি ছিল কলকাতা পোর্ট কমিশনারের। প্রায়৩৮ লাখ টাকা খরচ করে এগুলো যুদ্ধের উপযোগী করে তোলা হয়। প্রতিটি নৌযানে দুটি করে ৪০ মিলিমিটার কামান( এল-৬০) বসানো হয়।

 

অক্টোবরের মধ্যে দুটি জাহাজই অভিযান শুরু করার জন্য প্রস্তুত হয়ে উঠে। ‘’অপারেশন হট প্যান্টস’’ সাংকেতিক নামে শুরু হয় অভিযান, যার লক্ষ্য ছিল খুলনাও মংলা এলাকায় শত্রুপক্ষের নৌযানের উপর আঘাত হানা এবং পসুর নদীর মোহনায় মাইন স্থাপন করা।

 

 

হতবুদ্ধি ইয়াহিয়া

 

 

অক্টোবর থেকে গেরিলাদের তৎপরতা সম্পর্কে উৎসাহব্যঞ্জক খবর পেতে থাকি। তবে বাংলাদেশের বিভিন্ন বন্দর দিয়ে পণ্যসামগ্রী বাইরে প্রেরণ এবং বাইরে থেকে সামরিক সরঞ্জাম ও অন্যান্য জিনিস নিয়ে আসা অব্যাহত গতিতেই চলতে থাকে।বাইরের যেসব মালামাল আসতো সেগুলো আবার যথারীতি দেশের ভেতর বিভিন্ন গন্তব্যস্থলে পৌঁছে যাচ্ছিলো। নৌবাহিনীর ডুবুরীদের সাফল্যজনক তৎপরতা সত্ত্বেও নৌ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার ব্যাপারে আমরা বিশেষ সফলতা লাভ করতে পারিনি। বিষয়টি বিশ্লেষণ করে দেখা যায় বেশ কতগুলো কারণে দেখা যায় পাকিস্তান সরকার তার নৌযোগাযোগ মোটামুটি সুষ্ঠুভাবে চালু রাখতে সমর্থ হয়েছিলো।

 

(ক) বিদেশী শিপিং কোম্পানীগুলিকে পাকিস্তান সরকার যেকোনো সম্ভাব্য দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে আকর্ষণীয় ক্ষতিপূরণ দানের প্রস্তাব করেছিলো।

(খ) অভ্যন্তরীণ নদীপথগুলোকে মোটামুটি ব্যাপকভাবে সশস্ত্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা সহ নৌযানগুলোর চলাচলের ব্যবস্থা করা হয়েছিলো।

(গ) উপকূল এলাকা এবং সামুদ্রিক বন্দরগুলোতে গানবোটের তৎপরতা বৃদ্ধি করা হয়।

(ঘ) শত্রুরা নৌ কমান্ডোদের কার্যপদ্ধতি জেনে যাওয়ায় তারা পর্যাপ্ত রক্ষাব্যবস্থা গ্রহণ করে।

 

পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে আমরা বেশি করে নৌকমান্ডো নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেই। আমরা আরও যেসব ব্যবস্থা গ্রহণ করি সেগুলো ছিলঃ

 

(ক) আই ডব্লিও টি এ জাহাজগুলোতে ক্রু হিসেবে নৌকমান্ডো নিয়োগ করা।

(খ) নদীর তীর এবং সাগরের উপকূল থেকে সুবিধাজনক দূরপাল্লার হাতিয়ারের সাহায্যে নৌযানগুলোর উপর সরাসরি আক্রমণ চালানো এবং

(গ) এতদঞ্চলের আবহাওয়াগত কারণে সকাল সন্ধায় সৃষ্ট মৌসুমি কুয়াশার সুযোগ নিয়ে লিমপেট মাইন দ্বারা পাকিস্তানী জাহাজগুলোকে ধ্বংস করা।

 

১২ই অক্টোবর ইয়াহিয়া খান জাতির উদ্দেশ্যে এক বেতার ভাষণ দেন। তিনি তার ভাষায় ‘ জাতীয় জীবনের এই ভয়াবহ মুহূর্তে আল্লাহও ইসলামের নামে সকলকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে তার পিছনে ঐক্যবদ্ধ হতে বললেন। বিরস, গম্ভীর, মাদালস কণ্ঠে তিনি বললেনঃ-

 

(ক) পাকিস্তানের সমগ্র সীমান্ত বরাবর ভারত ব্যাপক সৈন্য সমাবেশ করেছে।

(খ) ট্যাংক, গোলন্দাজ ইউনিট এবং বিমানবাহিনীকে পাক সীমান্তের কাছে এনে জড়ো করা হয়েছে(তার জিজ্ঞাসা ‘এসবের অর্থ কি?’) এবং

(গ) চট্টগ্রামও মংলা বন্দরে নৌবাহিনীর ডুবুরীদের হামলা হয়েছে। সড়ক, রেলপথও সেতু ধ্বংস করা হচ্ছে এবং বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হচ্ছে।

 

ইয়াহিয়ার এই বিশেষ বক্তৃতায় বিশেষ কয়েকটি দিক লক্ষণীয়। সবকিছুর জন্য তিনি ভারতকেই দোষারোপ করেছেন এবং সচেতনভাবে মুক্তিবাহিনীর কথা এড়িয়ে গেছেন।

 

এতে পরিষ্কার হয়ে উঠে যে, তিনি যুদ্ধ করার একটি অজুহাত খুঁজছেন। এক বদ্ধ উন্মাদ যে মুক্তিবাহিনীর আঘাতে ক্ষত বিক্ষত, ক্রোধোন্মত্ত তার কথায় সেটাই প্রমাণিত হল। ততদিনে তাকে আমরা আরও নির্মম আঘাত হানার প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছি।

 

জুলাই মাস থেকে চট্টগ্রাম বন্দর এলাকার তেল ।সংরক্ষণাগারে একটা আক্রমণ চালানোর জন্য আমরা পরিকল্পনা করছিলাম। একাজের জন্য বিশেষভাবে বাছাই করা ছেলেকে আলাদাভাবে ট্রেনিং দেওয়া হয়। কিন্ত উপরোক্ত হাতিয়ার না পাওয়ায় অক্টোবরের মাঝামাঝি পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করতে হয়। পাকিস্তান বিমানের জন্য উচ্চদাহ্য শক্তি সম্পন্ন জ্বালানি ভর্তি ট্যাংকগুলো ছিল প্রধান আকর্ষণ। ১৬ই অক্টোবর ট্রেনিংপ্রাপ্ত গণপরিষদ সদস্য মোশারফ হোসেনের নেতৃত্বে বিশেষ দলকে উক্ত তেল সংরক্ষণাগারে আক্রমণের জন্য পাঠানো হয়। আক্রমণের আগের রাতে শত্রুরা কিভাবে যেন শহরে গেরিলা দলের উপস্থিতি টের পেয়ে যায়।চট্টগ্রামে তারা যেখানে উঠেছিলো পাকিস্তানীরা সে এলাকা ঘিরে ফেলে। সৌভাগ্যক্রমে একটি ড্রেনের ভেতর দিয়ে আমাদের পুরো দলটি আত্মরক্ষা করতে সমর্থ হয়। কিন্ত তাদের অস্ত্রশস্ত্র খোয়া যায়। ফলে পরিকল্পনা অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত হয়ে যায়।

 

ওদিকে ইয়াহিয়া খান ভারত আক্রমণের একটি যথাযথ অজুহাত খুঁজছিলেন।তিনি ভেবেছিলেন ভারতের সঙ্গে যুদ্ধ বাঁধিয়ে একটি মারাত্মক আন্তর্জাতিক সংকট সৃষ্টি করে বাংলাদেশের সমস্যা থেকে বিশ্ববাসীর দৃষ্টি অন্যদিকে ফেরানো যাবে। তার সমর অধিনায়করাও সে ধরনের একটি যুদ্ধের ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছিলেন। অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে সৈয়দপুরে এক জনসমাবেশে পাকিস্তানী ইস্টার্ন কমান্ডের কমান্ডার লেঃ জেনারেল নিয়াজী ঘোষণা করলেন, উভয় ফ্রন্টের পরবর্তী যুদ্ধ ভারতের মাটিতে হবে।নিয়াজীর মুখ থেকে কথাটা বোধহয় বেফাঁস বেরিয়ে পড়েছিলো- কারণ ইয়াহিয়া খান তখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে যুদ্ধের কথা বলেননি। কিন্ত না বললে কি হবে ২০ এবং ২২শে অক্টোবর পাকিস্তানীরা সীমান্ত থেকে ভারতের অভ্যন্তরে কমলপুর গ্রামের উপর গোলাবর্ষণ করলো। যুদ্ধের জন্য পাকিস্তানী উস্কানিমূলক তৎপরতায় বহুসংখ্যক বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং আহত হল। একদিন পর ২৩ অক্টোবর পাকবাহিনী পশ্চিম ফ্রন্টের সম্ভাব্য রণাঙ্গনগুলোতে সৈন্য সমাবেশ শুরু করে।

 

 

 

অঘোষিত যুদ্ধ শুরু

 

নভেম্বর নাগাদ ভারতের তিনটি কোরের অধীনে সাতটি পদাতিক ডিভিশন যুদ্ধের জন্য সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণ করে। কুম্ভীগ্রামের ঘাঁটি পুনরায় চালু করা হয় এবং নৌবাহিনীর ইস্টার্ন ফ্লীটকে সক্রিয় করা হয়। যেকোনো আক্রমণ প্রতিরোধের জন্য তাদের ব্যাপক পরিকল্পনা তখন চূড়ান্ত।

 

ভারতীয় সেনাবাহিনী পূর্ব ফ্রন্টে পাকিস্তানের সকল দুষ্কর্মের উপযুক্ত জবাব দেওয়ার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত ছিল। এসময়ই ভারতীয় সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় বেলুনিয়া পুনর্দখল করার জন্য পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়। একই সঙ্গে অন্যান্য সেক্টরেও অনুরূপ পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। বেলুনিয়া ৫ই নভেম্বর আক্রমণের(ডি-ডে) নির্ধারিত হয়।

 

কিন্ত ৪ঠা নভেম্বর এক মর্মান্তিক ঘটনায় আমরা সকলেই বিচলিত হয়ে পড়ি। আমার অন্যতম সাব-সেক্টর কমান্ডার ক্যাপ্টেন শামসুল হুদা সেদিন রাত সাড়ে৮টায় মারা যান। বেলুনিয়া অভিযানে তিনটি কোম্পানীকে তার নেতৃত্বে রাখার পরিকল্পনা ছিল। অকুতোভয় যোদ্ধা হিসেবে সৈন্যরা তাকে ভালোবাসতো, প্রশংসা করতো। আমি নিজেও দেখেছি কি নির্ভীকভাবে রণাঙ্গনের অগ্রবর্তী এলাকায় তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন।এরুপ একজন অফিসারকে দেখলাম তাঁর ক্যাম্পের মধ্যে পড়ে আছেন, প্রাণহীন নিস্পন্দ। জায়গাটি রক্তে ভেসে গেছে, মাথার খুলী ছিন্নভিন্ন বিক্ষিপ্তভাবে চারদিকে ছড়ানো।কয়েক মিনিট আগেও তিনি তাঁর সৈন্যদের সাথে কথা বলেছেন, পরের দিনের অভিযান সম্পর্কে কয়েকটি চূড়ান্ত নির্দেশ দিয়েছেন। যতদূর জানা যায়,বাড়ি থেকে তাঁর খুব খারাপ খবর এসেছিলো। বিগত কয়েকমাস ধরে আমরা অনিশ্চয়তার মধ্যে যুদ্ধ করছিলাম।অনিশ্চয়তাও হতাশায় মনোবল ঠিক রাখা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছিলো কিছু লোকের পক্ষে। আমার সেক্টরে বাড়িঘর নিয়ে কিংবা পারিবারিক কোন বিষয় নিয়ে আলোচনা নিষিদ্ধ করে দিয়েছিলাম। খুবই নিষ্ঠুর আদেশ সন্দেহ নেই, কিন্ত সৈনিকগণের উপর খারাপ আবেগ সৃষ্টি করতে পারে এমন ধরণের কথাবার্তা থেকে বিরত রাখার জন্যই এটা করতে হয়েছিলো। আমাদের দুর্ভাগ্য৪ঠা নভেম্বর রাত সাড়ে৮ টায় ক্যাপ্টেন শামসুল হুদাকে তার বিছানায় বসে কি যেন চিন্তা করতে দেখা যায়।সীমাহীন এক অবসাদ তাকে পেয়ে বসেছিল।একসময় আপনার অজান্তেই তিনি স্টেনগান হাতে তুলে নিয়ে নলটি নিজের চিবুকে ঠেকান।তারপর যন্ত্রচালিতের মত ট্রিগার চালান।

 

বেলুনিয়া অভিযান নিয়ে আমি তখন ভারতীয় বিগ্রেড কমান্ডারের সাথে আলোচনা করছিলাম।খবর পেয়ে প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারিনি।কিন্ত কঠিন বাস্তবতাকে একসময় স্বীকার করে নিতেই হল।আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হয় যে পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামীকালই অভিযান শুরু হবে।পুরো একটা জাতির ঘোর দুর্দিনে ব্যক্তিজীবনের ট্রাজেডিগুলো আমরা শুধু মনে মনে রাখতে পেরেছি, আর কিছু করতে পারিনি সেদিন।

 

নিয়মিত পদাতিক বাহিনী এবং মিলিশিয়া নিয়ে বেলুনিয়ায় পাকিস্তানের শক্তি ছিল দুই ব্যাটালিয়নের মত।ব্যাটালিয়ন ছিল উত্তর অংশ এবং বাকি অংশ ছিল দক্ষিণভাগে।শক্তিশালী ব্যাংকার তৈরি করে এবং বেশ বিস্তৃত এলাকাজুড়ে মাইন পেতে তারা অবস্থান গ্রহণ করেছিলো। এসমস্ত অবস্থান সম্পর্কে সন্ধান না নিয়ে আক্রমণ চালালে অহেতুক লোকক্ষয় হতে পারে। কোনভাবে উত্তর অংশের শত্রুদলকে বাকী অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে বিচ্ছিন্ন অংশের সাহায্য সহযোগিতা বন্ধ করতে পারলে পাকিস্তানীরা আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হবে। আত্মসমর্পণ না করলেও কয়েকদিনের মধ্যে তাদের নির্মূল করা সম্ভব হবে। আমরা তাই সিদ্ধান্ত নেই উত্তরের এবং দক্ষিণের মাঝামাঝি কোন স্থানে অতি সন্তর্পণে রাত্রির অন্ধকারে নিঃশব্দে অবস্থান গ্রহণ করবো। ট্রেঞ্চ এবং ব্যাংকার গড়ে তুলবো রাতারাতি। এবং পরদিন সূর্যের আলো ছড়িয়ে পড়লেই পাকিস্তানীরা দেখতে পাবে তাদের উত্তরের অংশ দক্ষিণের বাহিনী থেকে হয়ে পড়েছে বিচ্ছিন্ন। মাঝখানে বসে আছে তাদের যমদূত মুক্তিসেনারা।

 

নভেম্বর ৪ তারিখ। অন্ধকার এবং শীতের রাত।কনকনে ঠাণ্ডা বাতাস বইছে। ক্যাম্প ছেড়ে বেলনিয়া অভিযানে এগিয়ে চলে মুক্তিসেনাদের দল।সৈন্যদের দীর্ঘসারি যাত্রা শুরু করতেই বৃষ্টি শুরু হয়ে যায়।বৃষ্টির সাথে বাতাসের বেগও বেড়ে যায়। হাড়কাঁপানো শিতে আমাদের ঠোঁট কাঁপছিলো। আমরা পশ্চিমদিকে এগিয়ে চলি। প্রাকৃতিক দুর্যোগ কষ্ট হলেও বস্তুত আমাদের সুবিধাও ছিল যথেষ্ট। আবহাওয়া খারাপ দেখে সে রাতে শত্রুদের টহলদাররা আর বাইরে বেরোয়নি।তারা ধারণাও করতে পারেনি এই রাতটিকেই আমরা বেছে নেবো।দমকা বাতাসের গর্জনে আমাদের চলাফেরা এবং ট্রেঞ্চ খোঁড়ার আওয়াজ তলিয়ে যাচ্ছিলো। ভোর হতে না হতেই আমাদের সবগুলো কোম্পানী যার যার জায়গায় পৌঁছে প্রতিরক্ষামূলক ট্রেঞ্চে অবস্থান গ্রহণ করে। আমরা তখন শীতে প্রায় জমে যাচ্ছিলাম। কিন্ত একটু পরেই বৃষ্টি থেমে গিয়েই পরিষ্কার সূর্যালোক চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।

 

দেরি না করে আমরা শরণার্থী শিবির এবং গ্রাম থেকে লোক নিয়ে সাজ সরঞ্জাম বহনের ব্যবস্থা করি। যানবাহন চলাচলের জন্য পাহাড় এবং ধানক্ষেতের ভেতর দিয়ে চার মাইল দীর্ঘ রাস্তার ব্যবস্থা আমাদের করতে হয়।হাজার হাজার লোক স্বতঃস্ফূর্তভাবে দিন রাত কাজ করে চলে। তিনদিনের মাথায় রাস্তাটি যানবাহন চলাচলের উপযোগী হয়ে উঠে। আমাদের সাহায্য করার জন্য বেসামরিক লোকদের মধ্যে অভূতপূর্ব সাড়া লক্ষ্য করি। ফলে আমাদের মনোবল বেড়ে যায় বহুগুণ।

 

একজন অধ্যাপক ব্যাংকারের জন্য সি, আই সিটের বোঝা মাথায় বহন করে চার মাইল পথ অতিক্রম করে টিনগুলো যথাস্থানে নামিয়েই আবার তিনি পেছন দিকে দৌড়ে গেছেন আরেকটা বোঝা আনতে। ছয় বছরের একটি ছেলেকে দিয়ে কোন কাজ করানো হবেনা বলাতে সে সেদিন কেঁদে ফেলেছিল।

 

আমাদের অবস্থান গ্রহণ করায় শত্রুদের মধ্যে তেমন কোন ত্বরিত প্রতিক্রিয়া দেখতে পেলাম না। তার হয়ত ভেবেএটাওমুক্তিফৌজের অ্যামবুশ ধরণের কিছু একটা হবে তারা মুক্তিবাহিনীকে হঠিয়ে দেওয়ার জন্য একটা কোম্পানী পাঠায়। কিছুক্ষণের সংঘর্ষে ২৯ জন শত্রুসেনা নিহত হয় এবং অন্যরা উপায়ান্তর না দেখে পালিয়ে যায়। এমনকি তারা লাশগুলোও নিতে পারেনি ৭ই নভেম্বর ২টি সাবর জেট সারাদিন আমাদের অবস্থানের উপর স্টাপিং করে। এতে আমাদের টিন বহনকারী একজন বেসামরিক লোক নিহত হয়। আশ্চর্যের ব্যাপার শত্রুরা তেমন ব্যাপক আক্রমণ করতে আসছিলনা। তাছাড়া, উত্তর অংশে পাকিস্তানীদের আমরা যেভাবে ঘিরে ফেলেছিলাম সেখান থেকে তাদের মুক্ত করারও তেমন কোন চেষ্টাও করছিলোনা আমরা স্পষ্ট বুঝতে পারলাম পাকিস্তানীরা এতদিনের আক্রমণাত্মক ব্যবস্থার পরিবর্তে এখন আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থা নিয়েছে। এসময়ে বেলুনিয়ায় পাকিস্তানীদের একটি অয়ারলেস বার্তা ইন্টারসেপ্ট করি। সেটা ছিল,’’ বেলুনিয়া থেকে নিজেরাই পালাবার ব্যবস্থা কর।‘’

 

কয়েকজন শত্রুসেনা আমাদের ব্যূহ ভেদ করে পালানোরও চেষ্টা করেছিল কিন্ত তারা আমাদের গুলিতে নিহত হয়। ১১ই নভেম্বরের মধ্যে আমরা অবশিষ্ট শত্রুসেনাকে ধ্বংস করে ফেলি। বেশকিছু পাকিস্তানী আমাদের হাতে বন্দী হয়।

 

যুদ্ধবন্দীদের কাছ থেকে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর দুর্ভাগ্যের কথা জানতে পারি। সর্বত্রই শত্রুসৈন্যদের একটা সাধারণ অভিযোগ ছিল যে, অফিসাররা তাদের সাথে ফ্রন্টলাইনে থাকতো না। শুধু গোলাগুলি ছাড়া অন্যসব কিছুরই অভিযোগ ছিল।তাদের তিক্ত অভিযোগঃ “মনকি খাদ্যের জন্যও আমাদের ব্যবস্থা করতে বলা হতো।” প্রতিটি সেক্টরে যুদ্ধবন্দীর কাছে এবং মৃত সৈনিকদের পকেটে অনেক চিঠি পাওয়া গেছে। এগুলো পশ্চিম পাকিস্তানে তাদের বাবা, মা, আত্মীয়স্বজনদের কাছে লেখা। এসব চিঠিতে তাদের করুণ অবস্থা এবং প্রতিটি স্তরে শৃঙ্খলার কাঠামো ভেঙ্গে পড়ার এক করুণ চিত্র পাওয়া যায়। এই ছিল তাদের সাফল্য- মাসে পর মাস দস্যুবৃত্তি,পাশবিক অত্যাচার এবং যাবতীয় জঘন্য অপরাধের উপযুক্ত পুরষ্কার। একজন সিপাই তার বাবাকে লিখেছেঃগতমাসে এগারোশত টাকা পাঠিয়েছি, বোধহয় পেয়েছেন। দুদিন যাবৎ এক অজ্ঞাতস্থান অভিমুখে আমরা চলেছি। গতকাল মুক্তিবাহিনীর হামলার মুখে পড়েছিলাম।এতে আমাদের প্লাটুনের দুজন মারা গেছে। এর আগে খালের পানিতে পড়েও একজন মারা যায়। এখানে ভীষণ বৃষ্টি হয়। যেদিকে তাকাই সেদিকেই শুধু বড় বড় নদী আর পুকুর।

 

লোকজন ভয়ে আমাদের কাছে ঘেঁষতে চাননা। গ্রাম থেকে আমরা খাবার সংগ্রহ করি, কিন্ত এর জন্য কোন দাম দেইনা। আমাদের অফিসাররাও কোন দাম দেয়না। আমরা এখন একটি গ্রামে বিশ্রাম নিচ্ছি। কালসকালেই আবার রওনা হতে হবে। রাতে চলাফেরা করতে পারিনা। এখানে অনেক মুক্তিফৌজ। আমি পশ্চিম পাকিস্তানে বদলী হওয়ার জন্য দরখাস্ত করেছি। আমার জন্য দোয়া করবেন।‘’

 

পরেরদিন ভোরই মুক্তিবাহিনী এই প্লাটুনটি অ্যামবুশ করে। ফলে দলের আরও দশজন সৈন্য মারা যায়।নিহত একজনের পকেটেই চিঠিটি পাওয়া গিয়েছিলো।

 

আমরা বেলুনিয়া অভিযানের আয়োজন করেছিলাম ৪ঠা নভেম্বর। অর্থাৎ এই তারিখ থেকেই সীমিত এবং স্থানীয় পর্যায়ে হলেও ভারতীয়রা সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেয়। আর ৫ই নভেম্বর শুরু হয়ে যায় ভারত এবং পাকিস্তানের মধ্যকার অঘোষিত যুদ্ধ।

 

 

যুদ্ধ পরিকল্পনা

 

নভেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহের মধ্যেই আমরা বেলুনিয়া থেকে শত্রু বিতাড়িত করি। পাকিস্তান রেডিও অবশ্য তখনও বেলুনিয়া তাদের দখলে আছে বলে সমানে প্রচার করে চলেছিল। পাকিস্তান কতৃপক্ষ একদিকে মিথ্যা প্রচার অভিযান চালিয়ে যাচ্ছিলো অপরদিকে ঢাকা- চট্টগ্রাম রোডের গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ কেন্দ্র ফেণী থেকে ক্রমান্বয়ে তাদের সৈন্য সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলো।

 

২১ নভেম্বর ঢাকা থেকে এপি প্রতিনিধি এক বার্তায় বলেন, পাকবাহিনী এবং মুক্তিফৌজের মধ্যে মরনপ্রান লড়াই শুরু হয়েছে।এই লড়াইয়ে পাকিস্তানীদের যে শক্তিক্ষয় হচ্ছে তাতে ভারতের সাথে সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে তারা যে কি করবে বোঝা যাচ্ছেনা। ঢাকা- চট্টগ্রাম এবং অন্যান্য শহরে গেরিলাদের হামলায় পর্যুদস্ত পাকিস্তানীরা দিশেহারা। এসময়ে মুক্তিফৌজ অন্তত সাতটি থানার উপর আক্রমণ চালিয়ে থানাগুলোকে মুক্ত করেছে।দেশের অধিকাংশ স্থানে মুক্তিবাহিনী বিদ্যুৎ সরবরাহ চরমভাবে ব্যাহত করেছে। বন্দরে কাজকর্ম বন্ধ। শিল্প-কারখানার শ্রমিকেরা যে যার বাড়ির পথ ধরেছে। বিস্তীর্ণ পল্লী অঞ্চল তখন মুক্তিফৌজের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে। সেখানে তারা নিজেদের শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছে। রাজাকার এবং দালালদের বিচার শুরু হয়ে গেছে। মুক্তিফৌজের দ্রুত শক্তিবৃদ্ধি অভিযানের তীব্রতায় ইয়াহিয়া খান এবং নিয়াজি বেসামাল। বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পাকিস্তানীরা বিতাড়িত হচ্ছিল, প্রতিমুহূর্তে লোকক্ষয়ের সংখ্যা বাড়ছিলো।কিন্ত এখানেই শেষ নয়, পূর্ব পাকিস্তান শিগগিরই হাতছাড়া হয়ে যাবে, এই আশংকায় তারা ভীতও সন্ত্রস্ত হয়ে উঠে।আর এই আশংকা সত্য হলে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর উৎকৃষ্ট কয়েকটি ডিভিশন তাদের হারাতে হবে দীর্ঘদিনের জন্য।

 

ইতিমধ্যেই পাকিস্তান কয়েকবারই পশ্চিম ফ্রন্টে ভারতের আকাশসীমা লংঘন করে।পূর্ব ফ্রন্টে নিয়াজি দুঃসাহসিক একটা কিছু করে তার সৈন্যদের মনোবল বৃদ্ধির চেষ্টা করেন। পাকিস্তানী সৈন্যরা ২১ই নভেম্বর পশ্চিমবঙ্গের রানাঘাটের নিকটবর্তী ভারতীয় বয়রা গ্রামে হত্যা চালায়। ট্যাংক,কামান, জঙ্গিবাহিনী তাদের সহযোগিতা করেছিল।এতে কয়েকজন ভারতীয় সৈন্য নিহত। তবে বেশী মারা যায় বেসামরিক ব্যক্তিরাই বিপুল সংখ্যক লোক আহতও হয়। ভারতের মাটিতেই যুদ্ধ হবে নিয়াজি বোধহয় তার এই দম্ভের যথার্থতা প্রমাণ করার চেষ্টা করেছিলেন। ভারতীয় এলাকায় অনুপ্রবেশের অনুমতিও তিনি নিশ্চয়ই ইয়াহিয়ার কাছ থেকে পেয়েছিলেন। এর খেসারতও তাকে হাতে হাতে পেতে হয়।ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রচণ্ড পাল্টা আক্রমণে তারা শুধু পেছনেই হটে আসেনা, ১৩টি শেফি ট্যাংক এবং৩টি সাবর জেটকে এই সীমিত যুদ্ধে হারিয়ে ফিরে আসতে হয় নিজ এলাকায়। দুজন পাকিস্তানী পাইলট বন্দী হয় ভারতের হাতে।

 

এসব উস্কানিতেও মিসেস গান্ধী ছিলেন স্থির।পাকিস্তানের কামানের গোলায় ভারতের বেসামরিক লোক হতাহত হচ্ছিলো। বিষয়সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতি ছিল প্রচুর।তা সত্ত্বেও ভারত সরকার সর্বাত্মক ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় ভারতের বিভিন্ন রাজনৈতিক মহল তিব্র ক্ষোভ প্রকাশ করতে থাকে। মিসেস গান্ধী অবশ্য আশা করেছিলেন যে, শেষ পর্যন্ত কয়েকটি বৃহৎ শক্তির সুমতি হবে। তারা ইচ্ছা করলে ইয়াহিয়াকে দিয়ে বাংলাদেশের গণহত্যা বন্ধ করিয়ে সমস্যার একটি রাজনৈতিক সমাধান করাতে পারবেন।

 

২১ই নভেম্বর পাকিস্তান সমূহ বিপদ টের পেয়ে জাতিসংঘে এক নালিশ দায়ের করে বসে। তার বক্তব্য, ভারতীয় সেনাবাহিনী ১২টি ডিভিশন পূর্ব পাকিস্তানের চারটি সেক্টর আক্রমণ শুরু করেছে। একইদিন ইয়াহিয়া সারা পাকিস্তানে জরুরী অবস্থা জারি করেন।এর চারদিন পর অর্থাৎ ২৫নভেম্বর পাকিস্তান সফররত উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন চীনা প্রতিনিধি দলের ভোজসভায় ইয়াহিয়া বক্তৃতাচ্ছলে জানিয়ে দেন যে, হয়ত দিন দশেকের মধ্যে আমাকে আর এখানে নাও পাওয়া যেতে পারে কারণ সম্ভবত আমাকে যুদ্ধে যেতে হবে।

 

২৭ নভেম্বর পাকিস্তানী গোলন্দাজ বাহিনী পশ্চিম দিনাজপুরের ভারতীয় শহর বালুরঘাটের প্রচণ্ড হামলা চালায়। কামানের গোলার ছত্রছায়ায় এক বিগ্রেড পাকসেনা হিলিতে ভারতীয় অবস্থানের উপর আক্রমণ করে। পদাতিক বাহিনীর সঙ্গে ট্যাংক বহরও ছিল। প্রথম দফায় পাকিস্তানীদের৮০ জন্য সৈন্য ও চারটি ট্যাংক ধ্বংস হয় এবং তাদের আক্রমণ প্রতিহত হয়। পরেরদিন দ্বিতীয় দফা হামলার সময় তিনটি পাকিস্তানী ট্যাংক আটক করা হয় এবং তাদের বহু সংখ্যক সৈন্য প্রাণ হারায়। ভারতীয় পক্ষের ক্ষয়ক্ষতিও ছিল ব্যাপক।এবার ভারতীয়রা প্রতিশোধ নিতে এগিয়ে আসে বিপুল শক্তিতে।তারা আন্তর্জাতিক সীমারেখা পার হয়ে বাংলাদেশের ভেতর কয়েক মাইল ঢুকে পড়ে। ভারত সরকার আগেই তার সৈন্যদের সীমান্ত এলাকায় সীমিত আকারে অভিযান পরিচালনার আদেশ দিয়ে রেখেছিলেন। নির্দেশ ছিল, সীমান্তের ওপার থেকে ভারতের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার হুমকি দেখা দিলে সৈন্যরা তা নির্মূল করার জন্য বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে পারবে। ভারত তখন শুধু তার সীমান্ত রক্ষাই নয়, প্রয়োজন দেখা দিলে সমুচিত প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য প্রস্তত।

 

পরিস্থিতি বিস্ফোরণোম্মুখ হয়ে উঠলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন প্রস্তাব দেন যে, ভারতও পাকিস্তান দুই পক্ষকেই সীমান্ত এলাকা থেকে সৈন্য সরিয়ে দিতে হবে। ইয়াহিয়া খান বাহ্যত প্রস্তাবে সম্মতি জানান।অপরপক্ষে ভারত এই শর্তে সম্মত হয় যে, বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তানকে তার সৈন্যদের সরিয়ে দিতে হবে। সকল সমসসার মূল কারণ হচ্ছে বাংলাদেশে পাকিস্তানী সৈন্যবাহিনীর কার্যকলাপ এবং এদেরকে সরিয়ে না নিলে এই অঞ্চলে শান্তি আসবেনা। এইসব প্রস্তাব যখন আদান-প্রদান হচ্ছিল পাকিস্তান তখন পশ্চিম ফ্রন্টে রাতের অন্ধকারে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটিস্থানে সৈন্যসমাবেশ করে। এ ঘটনা ১লা ও ২রা ডিসেম্বর।২রা ডিসেম্বরেই পাকিস্তান সংঘর্ষের বিস্তৃতি ঘটানোর অসৎ উদ্দেশ্যে মরিয়া হয়ে আগরতলার ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় গোলাবর্ষণ করে। এদিন নয়াদিল্লী কংগ্রেস কর্মী সম্মেলনে বক্তৃতাকালে মিসেস গান্ধী স্পষ্ট কণ্ঠে ঘোষণা করেন, তথাকথিত বৃহৎ শক্তি যেভাবে চাইবে সেইভাবে কাজ করার দিনশেষ হয়ে গেছে। ভারতের স্বার্থ যাতে রক্ষিত হয় সেইদিকে দৃষ্টি রেখে আজ আমাদের কাজ করতে হবে।

 

অক্টোবর মাসেই জম্বুকাশ্মীরের পুঞ্চ সেক্টরে পাকিস্তানীদের প্রথম যুদ্ধপ্রস্তুতি লক্ষ্য করা গিয়েছিলো। পশ্চিম পাকিস্তানের সমর প্রস্তুতি এবং তৎসঙ্গে বাংলাদেশের অবস্থার ক্রম অবনতি এবং কোটি কোটি বাঙ্গালীর দুর্দশার প্রতি বৃহৎ শক্তিগুলোর উদাসীনতা লক্ষ্য করে ভারত সরকার তখনই তাদের সশস্ত্র বাহিনীকে সম্ভাব্য আপৎকালে জন্য পুরোপুরি হুঁশিয়ার থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। পাকিস্তান এর আগে তিনবার ভারয়ত আক্রমণ করেছে সেকথা ইন্দিরা গান্ধী ভুলে যাননি।

 

ভারতের সাথে সম্ভাব্য যুদ্ধে পাকিস্তান পশ্চিম ফ্রন্টে প্রথমে অভিযানেই রাজনৈতিক এবং রণকৌশলের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ যতদূর সম্ভব বেশী এলাকা দখল করে নেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলো।পাকিস্তানের মূল পরিকল্পনায় ছিল, একটি সাঁজোয়া ডিভিশন এবং দুইটি পদাতিক ডিভিশন এগিয়ে নিয়ে ভারতের উপর হামলা চালাবে।দরকার হলে আক্রমণকারী ডিভিশনগুলোর শক্তি বৃদ্ধির জন্য আরও পদাতিকও সাঁজোয়া বাহিনীর সৈন্য পাঠানো হবে। পশ্চিম পাকিস্তানে অবস্থিত বাকী অংশের পাকসেনাবাহিনীর দায়িত্ব ছিল সমস্ত ভারতীয় বাহিনীকে স্থানীয়ভাবে প্রতিরক্ষামূলক যুদ্ধে ব্যস্ত রাখা।ভারতীয় সেনাবাহিনীকে বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যে অনেকগুলো প্রলুব্ধ হামলার পরিকল্পনা করা হয়। পাকিস্তানীরা আশা করেছিল এইসব প্রলুব্ধ হামলায় বিভ্রান্ত হয়ে ভারত তার সেনাবাহিনীকে বিশেষ করে সেনাবাহিনীর শক্তিশালী রিজার্ভ বাহিনীকে মূল রণাঙ্গন থেকে অন্যক্ষেত্রে নিয়জিত করে ফেলবে। ফলে, পাকিস্তানের মূল আক্রমণকারী বাহিনীর পক্ষে অতি সহজে এবং স্বল্প প্রচেষ্টায় গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে যুদ্ধ পরিচালনা এবং জয়লাভ করা সম্ভব হবে।

 

এই লক্ষ্য সামনে রেখে পাকিস্তান তার ১২ পদাতিক ডিভিশনের উপর পুঞ্চ এলাকা দখল করার দায়িত্ব অর্পণ করে। পাকিস্তান আশা করেছিলো, পুঞ্চ এলাকায় হামলা চালালে জম্বুও কাশ্মীরে অবস্থিত ভারতীয় বাহিনী এ এলাকাতে তীব্র যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে পড়বে ফলে তার আর চেনাব নদীর দক্ষিণে সুযোগ পাবেনা। সেই ফাঁকে পাকিস্তান চেনাব নদীর দক্ষিণে মূল হামলা চালিয়ে সফল হবে।এখানে উল্লেখযোগ্য, পাকিস্তানের এই ডিভিশনটি কাশ্মীরেই অবস্থান করছিল এবং অধিকাংশ কাশ্মীরেই লোক।

 

পাকিস্তান আরো পরিকল্পনা করছিলো যে, রাভি নদী বরাবর সুদৃঢ় প্রতিরক্ষাব্যূহ গঠন করে তারা নওশের রাজৈরি এলাকা দখল করে ফেলবে। একাজের দায়িত্ব দেওয়া হল গুজরাটে অবস্থিত২৩ পদাতিক ডিভিশনকে।

 

১নম্বর করের উপর দায়িত্ব দেওয়া হল সাকারগড় এলাকায় ভারতকে যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলার। প্রলুব্ধকারী হামলা চালিয়ে ভারতীয় বাহিনীকে ঐ এলাক্য যুদ্ধে নামাবার পরিকল্পনা করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল আসল আক্রমণকারী এলাকা সম্পর্কে যেন ভারত কিছুই বুঝে উঠতে না পারে।

 

লাহোর এবং কাসুর সোলেমনকি এলাকায় ৪নম্বর কোরকে ইরাবতী এবং গ্র্যান্ড ট্যাংক রোডের মধ্যবর্তী চানগানওয়ালা নালা পর্যন্ত সমস্ত অঞ্চল রক্ষা করার দায়িত্ব দেয়া হয়। রহিম ইয়ার খান এবং করাচী সহ কচ্ছের রানের মধ্যবর্তী এলাকা রক্ষার দায়িত্ব দেয়া হয় ১৮ পদাতিক ডিভিশনের উপর।

 

ইয়াহিয়া খান চেয়েছিলেন, উল্লেখযোগ্য পরিমাণে গুরুত্বপূর্ণ ভারতীয় ভূখণ্ড বিশেষ করে জম্বু কাশ্মীর সেক্টরের বেশকিছু এলাকা প্রথমেই দখল করে ফেলতে। যুদ্ধে পূর্বাঞ্চলের কোন জায়গা খোয়া গেলে ভবিষ্যতে তা উদ্ধারের জন্য পশ্চিমাঞ্চলের এই দখলকৃত জায়গার বিনিময়েও দর কষাকষি করতে পারবেন, এই ছিল তার আশা।

 

লক্ষ্য অর্জনের জন্য পশ্চিমাঞ্চলে তাকে প্রথমেই আক্রমণাত্মক ভুমিকা নিতে হবে এবং পূর্বাঞ্চলে জেনারেল নিয়াজিকে রাখা হবে আত্মরক্ষামূলক ভূমিকা ।

 

পাকিস্তান সেনাবাহিনী তার ইস্টার্ন কমান্ড অর্থাৎ বাংলাদেশের জন্য সীমিত সংখ্যক আক্রমণাত্মক অভিযান সহ প্রধানত আত্মরক্ষামূলক তৎপরতার ভিত্তিতে একটি পৃথক পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলো। গুটিকয়েক আক্রমণাত্মক অভিযানের ব্যবস্থা করা হয়েছিলো শুধু যুদ্ধটাকে ভারতের মাটিতে গড়িয়ে দেয়ার উদ্দেশ্যে।

 

বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতিও অন্যান্য সুযোগসুবিধা সীমান্ত রেখার যত কাছে অবস্থান দেয়া যায় ততদুর পর্যন্ত এলাকা নিয়ে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়।

 

ভারত থেকে বাংলাদেশে আসার যতগুলো পথ রয়েছে সেই সবগুলো পথেই এই ধরনের সুদৃঢ় প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়। গুরুত্বপূর্ণ শহর এবং যোগাযোগ কেন্দ্র যেমন-চট্টগ্রাম, ফেনী, লাকসাম, চাঁদপুর, কুমিল্লা, আখাউড়া, দাউদকান্দি, ভৈরব, ঢাকা, খুলনা, যশোর, ঝিনাইদহ, এবং বগুড়ার চারপাশে চূড়ান্ত প্রতিরক্ষাব্যূহ গড়ে তোলার ব্যবস্থা করা হয়। যেকোনো মূল্যে ঢাকাকে রক্ষা করাই ছিল পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য।

 

এই ধরণের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সাথে পাল্টা আঘাত(কাউন্টার অ্যাটাক) হানার জন্যেও প্রস্তুতি নেওয়া হয়। পাকিস্তান ইস্টার্ন কমান্ডের বিস্তারিত এই রণপরিকল্পনা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর চীফ অব স্টাফ আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে বাংলাদেশ সফরকালে অনুমোদন করেছিলেন। পরিকল্পনা প্রধান লক্ষ্য ছিল মুক্তিযোদ্ধারা যাতে কোন শহর দখল না করে সেখানে সরকার প্রতিষ্ঠা করতে না পারে। কারণ এটা করতে পারলে তারা বিভিন্ন দেশের স্বীকৃতি আদায়ের চেষ্টা করবে। পাকিস্তানীরা অগ্রবর্তী প্রতিরক্ষা ঘাঁটিগুলোতে তিন-চার সপ্তাহ চলার মত গোলাগুলি, রসদপত্র রাখার এবং পশ্চাৎপদবর্তী প্রতিরক্ষা অবস্থানসমূহে পর্যাপ্ত পরিমাণে রসদ রাখার ব্যবস্থাও করে। অগ্রবর্তী ঘাঁটি রক্ষা করা দুষ্কর হয়ে পরলে সেখান থেকে যোগাযোগ কেন্দ্র কিংবা গুরুত্বপূর্ণ শহরে পশ্চাৎপসরন করে সেসব স্থান রক্ষা করার জন্য লড়াই করে যাওয়ার পরিকল্পনা করা হয়।

 

কয়েকমাস ধরে পাকসেনা বাহিনী এসব প্রতিরক্ষাবাহিনীর ঘাঁটির সকল ব্যবস্থা নিয়ে বেশ তৎপর ছিল ।তারা হাজার হাজার কংক্রিটের বাংকার এবং পিলবক্স নির্মাণ করে। ট্যাংক চলাচল ঠেকানোর জন্য সম্ভাব্য পথগুলোতে গভীর নালা কেটে রাখে।

 

এব্যাপারে পাকিস্তানীদের অর্থের কোন অভাব ছিল না। শরণার্থী সাহায্যও পুনর্বাসন কর্মসূচীর নাম করে ইয়াহিয়া খান বেশ মোটা অংকের অর্থ জোগাড় করেছিলেন।আসলে ভারত থেকে তখনও কোন শরণার্থী ফিরে আসেনি। অল্পসংখ্যক যারা এসেছিলো তারাও সেনাবাহিনীর তথাকথিত অভ্যর্থনা কেন্দ্রে ফিরে আসেনি। তারা জেপথে ভারত গিয়েছিলো সেই গোপন পথেই ফিরে এসেছে। মাঝ থেকে শরণার্থীদের জন্য পাওয়া পুরো টাকাটাই প্রতিরক্ষা বাজেটের অংশ হিসেবে নিয়াজীর হাতে তুলে দেওয়া হয়। বেলুনিয়ার একটিমাত্র ট্যাংক বিরোধী নালা তৈরি করতে পাকিস্তানীরা প্রায় ২০ লক্ষ টাকা খরচ করে।

 

অপরপক্ষে ভারতীয় সেনাবাহিনী পশ্চিম ফ্রন্টে আক্রমণাত্মক প্রতিরক্ষা এবং পূর্ব ফ্রন্টে ঝটিকা আক্রমণ চালিয়ে বাংলাদেশ মুক্ত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করে।অবশ্য পশ্চিম ফ্রন্টে ভারতীয় সেনাবাহিনী অনুকূল পরিস্থিতির সুযোগে কোন কোন সেক্টরে আক্রমণ চালিয়ে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে যতদূর সম্ভব অগ্রসর হওয়ার পরিকল্পনাও গ্রহণ করে।

 

ভারতীয় সেনাবাহিনীর সামরিক উদ্দেশ্যও লক্ষ্য নিম্নরূপঃ

 

(১) যথাসম্ভব স্বল্প সময়ের মধ্যে(সর্বাধিক তিন সপ্তাহের মধ্যে) মুক্তিফৌজের সহায়তায় বাংলাদেশ স্বাধীন করা।

(২) চীন দেশের দিক থেকে সম্ভাব্য হামলার বিরুদ্ধে ভারতের উত্তর সীমান্ত রক্ষা।

(৩) আক্রমণাত্মক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে সংহতি রক্ষা করা

(৪) নাগাল্যান্ড, মনিপুর , মিজোরাম এলাকায় বিদ্রোহাত্নক তৎপরতা দমন করা

 

এই কাজ গুলো মোটেই সহজসাধ্য ছিল না।বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতি দ্রুত সৈন্য চলাচলের জন্য অনুপযুক্ত। পুরো দেশ জুরে রয়েছে নদীনালা, খালবিল। এগুলোর জন্য যেকোনো বাহিনীর অভিযান ব্যাহত হতে বাধ্য।

 

এইসব প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধক অবস্থানের মূল্যায়ন করে বাংলাদেশকে পৃথক চারটি সেক্টরে ভাগ করা হয়। এইসব সেক্টরে ভারতও পাকিস্তানের অবস্থান ছিল নিম্নরূপঃ

 

১। উত্তরপশ্চিম সেক্টরঃ যমুনার পশ্চিমও পদ্মার উত্তর অঞ্চল এই এলাকার অন্তর্ভুক্ত। সেক্টরের আওতাধীন জেলাগুলো ছিল রংপুর, দিনাজপুর, বগুড়া, রাজশাহী এবং পাবনা। সেক্টরের হেডকোয়াটার স্থাপন করেছিলো নাটোরে। এই সেক্তরে সর্বত্র এবং বিশেষ করে ঠাকুরগাঁ, দিনাজপুর, হিলিও রংপুরে দুর্ভেদ্য প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছিলো।

 

পাকিস্তানের ১৬ ডিভিশনের মোকাবেলায় ভারত তার ৩৩ কোরের(লে. জেনারেল থাপা) অধীনে দুটি মাউন্টেন ডিভিশনকে নিয়োজিত করে। এই ডিভিশনগুলোর সহায়ক হিসেবে নিয়োজিত ছিল ডিভিশনাল গোলন্দাজ বাহিনী, একটি মাঝারি ট্যাংক রেজিমেন্ট এবং হালকা উভয়চর ট্যাংকের(পি টি ৭৬) আর এক্তি রেজিমেন্ট। ভারতীয় ডিভিশনালগুলো ছিল উত্তরে কুচবিহার জেলায়৬ মাউন্টেন ডিভিশন, বালুরঘাট এলাকায় ২০ মাউন্টেন ডিভিশন এবং শিলিগুড়ি এলাকায় ৭১ বিগ্রেড। বাংলাদেশে অভিজানের দায়িত্ব পালন ছাড়াও ৩৩ কোরকে সিকিমও ভুটানের মধ্য দিয়ে সম্ভাব্য চীনা আগ্রাসন প্রতিহত করার দায়িত্ব ছিল।

 

২। পশ্চিম সেক্টরঃ পদ্মার দক্ষিণ এবং পশ্চিম এলাকা নিয়ে গঠিত এই সেক্টরের জেলাগুলো হচ্ছে কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, যশোর, খুলনা, বরিশাল এবং পটুয়াখালী। এই সেক্টরের মেজর জেনারেল এম, এইচ আনসারীর নেতৃত্বে পাকিস্তানের ৯ পদাতিক ডিভিশন মোতায়েন করা হয়। এই সেক্টরের হেডকোয়াটার ছিল যশোরে।

পাকিস্তানী ৯পদাতিক বাহিনীর মোকাবেলায় ভারতীয় পক্ষে ছিল জেনারেল রায়’নার কমান্ডে নবগঠিত ২কোর। এই কোরের আওতায় দুটি ডিভিশন ছিল মেজর জেনারেল দলবির সিং এর নেতৃত্বে ৯ পদাতিক ডিভিশন এবং মেজর জেনারেল মহিন্দর সিংবারার নেতৃত্বে ৪ মাউন্টেন ডিভিশন। জেনারেল রায়’নার সহয়তায় আরও ছিল দুটি ট্যাংক রেজিমেন্ট এবং ডিভিশনের সহায়ক গোলন্দাজ বাহিনী।

 

৩। উত্তর সেক্টরঃ এই সেক্টর গঠিত হয়েছিলো ময়মনসিংহ, ঢাকা জেলার কিছু অংশ নিয়ে পাকিস্তানীদের পক্ষে এই সেক্টরের দায়িত্ব ছিল বিগ্রেডিয়ার এ কাদেরের নেতৃত্বে ৯৩ বিগ্রেড এবং এর আওতায় ৩১বালুচও ৩৩ পাঞ্জাব রেজিমেন্ট,আধা সামরিক বাহিনী(নবগঠিত ইপিসিএপি এর দুটি উইং)কয়েকটি মুজাহিদ ইউনিট এবং একটি মর্টার ইউনিট। এই এলাকার উত্তরাংশ   পাকিস্তানীদের প্রধান শক্তি ছিল লে. কর্নেল সুলতান মাহমুদের নেতৃত্বে ৩১ বালুচ রেজিমেন্ট। এদেরকে ময়মনসিংহের উত্তরাঞ্চলে মোতায়েন করা হয়েছিলো। উল্লেখ্য যে, সুলতান মাহমুদই ছিল সবচেয়ে বেশী বাঙ্গালী হত্যার হোতা।কমলপুর- খকশীগঞ্জ- জামালপুর এবং হাতিবান্ধা শেরপুর, জামালপুর বরাবর যে এলাকা যে এলাকা রয়েছে তার প্রতিরক্ষার দায়িত্ব ছিল এই রেজিমেন্টের উপর।এছাড়া দালু- হালুয়াঘাট- ময়মনসিংহ বরাবর এলাকার দায়িত্ব এরা পালন করতো।

 

এই সেক্টরের বিপরীতে ভারতের মেঘালয় এলাকায় ছিল ১০১ কমুনিকেশন জোন। এই জোনের আওতাধীন ভারতীয় সৈন্যরা আসাম, ত্রিপুরা, মেঘালয়, অরুণাচল, নাগাল্যান্ড ,মিজোরাম এলাকায় দায়িত্ব পালনরত সৈন্যদের চলাচল ও রক্ষণাবেক্ষণ সংক্রান্ত সকল প্রকার সহযোগিতা প্রদান করতো। এই এলাকায় ভারতীয়দের যোগাযোগ ব্যবস্থা তেমন উন্নত না থাকায় বিরাট বাহিনীর পক্ষে এখানে দীর্ঘস্থায়ী তৎপরতা চালানো সম্ভব ছিল না। তাই এই সেক্টরে ভারতীয় সৈন্য ছিল সীমিত। এলাকাটির প্রতিরক্ষার দায়িত্বে ছিলেন ভারতীয় মেজর জেনারেল গুরুবক্স সিং। তার অধীনে ছিল বিগ্রেডিয়ার হরদেব সিংক্লেয়ারের নেতৃত্বে ৯৫ মাউন্টেন বিগ্রেড গ্রুপ এবং ২৩ পদাতিক ডিভিশন থেকে আনীত একটি পদাতিক ব্যাটালিয়ন। এখানে ভারতীয় বাহিনীকে সহযোগিতা করেছে কাদের সিদ্দিকির নেতৃত্বে টাঙ্গাইল এলাকার সক্রিয় মুক্তিযোদ্ধারা।

 

৪।ইস্টার্ন সেক্টরঃ মেঘনার পূর্ব পাশের এলাকা নিয়ে গঠিত এই সেক্টরের জেলাগুলো হচ্ছে সিলেট, কুমিল্লা, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম। পাকিস্তান এই সেক্টরে তাদের ১৪ ডিভিশন এবং অস্থায়ী ৩৯ ডিভিশন মোতায়েন করেছিলো। মেজর জেনারেল আবদুল মজিদের নেতৃত্বে ১৪ ডিভিশনের সৈন্যরা কুমিল্লা পর্যন্ত এলাকার দায়িত্বে ছিল। ২০২ বিগ্রেড সিলেট,২৭ বিগ্রেড ব্রাহ্মণবাড়িয়াও আখাউড়া, ১১৭ বিগ্রেড কুমিল্লা,৩১৩ বিগ্রেড ব্রাহ্মণবাড়িয়া উত্তরাঞ্চলও মৌলভীবাজার এলাকার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিল। ৫৩ পদাতিক বিগ্রেড ছিল লাকসামও ফেনীর দায়িত্বে।

 

চট্টগ্রামও কক্সবাজার এলাকার দায়িত্বে ছিল ৩৯ পদাতিক ডিভিশন। কমান্ডার ছিলেন মেজর জেনারেল রহিম খান।

 

ভারতের পক্ষে এই সেক্টরের দায়িত্বে ছিল লে. জেনারেল সগত সিং এর নেতৃত্বাধীন ৪র্থ কোর। তার অধীনে ছিল মেজর জেনারেল কৃষ্ণরাও এর অধীনে ৮ম মাউন্টেন ডিভিশন, মেজর জেনারেল গজভালেস এর ৫৭ মাউন্টেন ডিভিশন এবং মেজর জেনারেল আর, ডি, হিরার অধীনে ২৩ মাউন্টেন ডিভিশন। বাংলাদেশের ৮টি ব্যাটালিয়ন এবং আমাদের ১ থেকে৫ নম্বর সেক্টরের সকল ট্রুপসকে সগত সিং এর অধীনে ন্যাস্ত করা হয়েছিলো। অভিযান সংক্রান্ত দায়িত্ব ছাড়াও ৪র্থ কোরের উপর আগরতলা শহর, বিমান ঘাঁটিএবং ঐ এলাকার বিমান বাহিনীর সকল প্রতিষ্ঠান রক্ষার ভার ছিল।

 

প্রাথমিক অবস্থায় বাংলাদেশ পাকিস্তানী ডিভিশনের ১৪ টি ডিভিশনের কেবল ৪টি পদাতিক ডিভিশন ছিল। ২৮ মার্চের মধ্যে ৯ এবং ১৬ ডিভিশন দুটি এখানে চলে আসে।এরপর বাংলাদেশে আরও তারা দুটি ডিভিশন গড়ে তোলে। এই দুটি ছিল ৩৬ এবং ৩৯অস্থায়ী ডিভিশন। ১৯৭১ এর অক্টোবরের মধ্যে পাকিস্তান এখানকার তার সবগুলো ডিভিশন পুনর্গঠনের কাজ সম্পন্ন করে। ডিভিশনগুলোর সাথে অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে ছিল গোলন্দাজও ভারী মর্টার বহরও ট্যাংক বহর। আমেরিকান শেফি ট্যাংক ছিল ৬০ টি। বিমানবাহিনীতে ছিল ২০খানি এফ-৮৬ সাবর জেট এবং নৌবাহিনীতে ছিল অজ্ঞাত সংখ্যক গানবোট এবং অন্যান্য উপকূলীয় নৌযান।

 

এর মোকাবিলায় ভারত তার ৭ পদাতিক ডিভিশনকে এই এলাকায় যুদ্ধ করার জন্য নিয়োজিত করে। পশ্চিম পাকিস্তানের ফ্রন্টে আক্রমণাত্মক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং চীন সীমান্তে সম্ভাব্য হামলা মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় সৈন্য নিয়োজিত করার পর বাংলাদেশে যুদ্ধ চালনার জন্য ভারতের হাতে এই ৭টি পদাতিক ডিভিশন ছাড়া আর কোন নিয়মিত ফোর্স ছিল না। এইগুলোর মধ্যে ৬টি ছিল পূর্ণাঙ্গ ডিভিশন এবং ২ টি স্বতন্ত্র পদাতিক বিগ্রেড। ডিভিশনগুলোকে যুদ্ধে পূর্ণ সহায়তার জন্য ছিল হালকা এবং মাঝারি পাল্লার গোলন্দাজ বহর, পিটি-৭৬ ধরণের উভচর ট্যাংকের দুটি রেজিমেন্ট এবং টি- ৫৪ ধরণের একটি ট্যাংক রেজিমেন্ট। এছাড়া ৩টি সতন্ত্র ট্যাংক স্কোয়াড্রন এবং দ্রুত চলাচলে সক্ষম( মেকানাইজড) ব্যাটালিয়নকে যুদ্ধের জন্য নিয়োজিত করা হয়।

 

ভারতীয় বিমানবাহিনীর ৭টি জঙ্গি বোমারু বিমানের স্কোয়াড্রন এই এলাকার জন্যে নিয়োজিত করা হয় । এছাড়া ছিল সৈন্য পরিবহনের জন্য কিছু সংখ্যক হেলিকপ্টার।বিমানবাহিনী জাহাজ আই, এন এস ভীক্রান্ত সহ ইস্টার্ন ফ্লীট ছিল এই অঞ্চলের সমুদ্রে প্রায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি। বাংলাদেশের উপকূলের অদূরবর্তী সমগ্র সাগর এলাকা অবরোধের দায়িত্ব ছিল এই ইস্টার্ন ফ্লীটের উপর ন্যাস্ত। যুদ্ধ যদি শুরু হয় তাহলে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সমুদ্রপথে সৈন্য কিংবা সরঞ্জাম নিয়ে আসা নিয়াজির পক্ষে কিছুতেই সম্ভব হবেনা।

 

এটা সাধারণ মাপকাঠি হিসাবে মোটামুটি প্রতিষ্ঠিত যেকোনো আক্রমণ পরিচালনা করে সফলতা অর্জন করতে হলে প্রতিটি আত্মরক্ষাকারী সৈনিকের বিরুদ্ধে তিনজন আক্রমণকারী নিয়োগ করতে হবে। পূর্বাঞ্চলে ভারত কিন্ত সে অনুপাতে পাকিস্তানের চাইতে শক্তিশালী ছিল না। অনুপাত যেখানে ৩:১হওয়া দরকার ছিল সেখানে ভারতও পাকিস্তানের অনুপাত ছিল ২:১। কিন্ত ইস্টার্ন লে. জেনারেল অরোরা যে ৭টি ডিভিশন পেয়েছিলেন তার চাইতে আর বেশী সৈনিক পাওয়ার আর কোন আশাই তিনি করতে পারতেন না এবং এই বাহিনী দিয়েই তাকে আরাধ্য কাজ সমাধা করতে হবে। এটা তিনি বুঝতে পেরেছিলেন।

 

তবে জেনারেল অরোরার আস্থা ছিল জয়ী তিনি হবেনই। বাংলাদেশের সমগ্র বাহিনী তার সহযোগিতায় প্রস্তুত ছিল। এর মধ্যে নিয়মিত বিগ্রেডগুলো ছিল কে ফোর্স, এস ফোর্স, জেড ফোর্স। ৯ সেক্টরের ২০ হাজার বাঙ্গালী সেক্টর ট্রপস অস্ত্র হাতে প্রস্তুত। এক লাখ গেরিলা সর্বত্র শত্রুকে তখন সর্বত্র তাড়িয়ে নিয়ে ফিরছিল।সর্বশেষ এবং সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষ ভারত- বাংলাদেশ যৌথবাহিনীকে সর্বাত্মক সাহায্য প্রদানের জন্য তৈরি হয়েছিলো। ইয়াহিয়া কিংবা নিয়াজির জন্য তাদের অন্তরে করুণার অবশিষ্ট লেশমাত্র ছিল না। যুদ্ধ শুরু হয়ার অনেক আগেই এই ঘৃণা পাকিস্তানের পরাজয় একরূপে নিশ্চিত করে রেখেছিল।

 

জনসমর্থনের উপর ভিত্তি করেই প্রধানত ভারতের বিজয় নিরূপণ করা হয়েছিলো। জনসাধারণের একটি বিশাল অংশ ততদিনে রাইফেল, এল এমজি স্টেনগান ইত্যাদি চালানো কিংবা গ্রেনেড নিক্ষেপের কায়দা কানুন শিখে ফেলেছিল। শত্রুপক্ষের খবরাখবর সংগ্রহ করা এবং প্রায় সকল ধরণের অস্ত্রের পরিচিতি সম্পর্কে তারা মোটামুটি অভিজ্ঞ হয়ে উঠেছিলো। কোন অস্ত্রটি কোন দেশের তৈরি তাও অনেকে বলতে পারতো। আমার ২ নম্বর সেক্টরের আট বছরের একটি ছেলে প্রায় প্রতিটি টহলদের পার্টির সাথেই স্কাউট হিসেবে কাজ করতো। দিনের বেলায় সে একাই চলে যেত শত্রুর সবকিছু দেখে আসার জন্য। ফিল্ড ম্যাপের উপর আঙুল দিয়ে সে আমাদের বুঝাতঃ এই হচ্ছে বল্লভপুর গ্রাম স্যার। এখানে আছে বড় একটা পুকুর। মেশিনগানটি বসানো আছে এখানে। এখানে মাইন লাগানো আছে। কিন্ত গরু বাছুর এখান দিয়ে হেঁটে যেতে দেখেছি কিছুই হয়নি। তাই নিশ্চয় ওটা ভুয়া মাইনক্ষেত্র। এই যে এখানে একটা স্কুল বিল্ডিং, সেখানে অফিসাররা থাকে। এইভাবে যুদ্ধের এলাকার সবকিছু সে আমাদের বুঝিয়ে দিতো।

 

বিভিন্ন অঞ্চলের ভূপ্রকৃতির বৈশিষ্ট বিবেচনা করে জেনারেল অরোরা তার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছিলেন। প্রধান লক্ষ্য ছিল যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব ঢাকা মুক্ত করা। শত্রুর শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ঘাঁটিগুলো এড়িয়ে এবং যোগাযোগও সরবরাহ লাইন দখল করে দ্রুত গতিতে ঢাকা দখল করাই ছিল মূল পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য।

 

ঢাকা একবার মুক্ত হয়ে গেলেই শত্রুর বিচ্ছিন্ন অবস্থানগুলো আপনা আপনি আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হবে। তাহলে অত্যন্ত ধীরে সুস্থে এইসব এড়িয়ে যাওয়া অবস্থানগুলো ধ্বংস করা যাবে।

 

প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধকতাসমূহ যুদ্ধের লক্ষ্য নির্ধারণ করে। চূড়ান্ত বিজয় লাভ করতে হলে এটা অপরিহার্য হয়ে পড়ে যে, ঢাকাকে আসল লক্ষ্যবস্ত হিসাবে যুদ্ধ চালাতে হবে এবং অন্যান্য লক্ষ্যবস্ত নির্ধারণ করতে হবে প্রাকৃতিক সেক্টর হিসেবে আলাদাভাবে।

 

উত্তর- পশ্চিম সেক্টরে বগুড়া ছিল প্রধান যোগাযোগ কেন্দ্র। সিধান্ত নেয়া হয় যে, এই সেক্টরের সকল জায়গায় শত্রু সৈন্যদের উপর আক্রমণ চালিয়ে তাদেরকে শেষ করতে হবে তবে প্রধান অভিযান ঘোড়াঘাট ও গোবিন্দগঞ্জ হয়ে বগুড়া মুক্ত করার লক্ষ্যেই পরিচালিত হবে।

 

পশ্চিম সেক্টরে যশোর ছিল প্রধান যোগাযোগ কেন্দ্র। ঝিনাইদহ- মাগুরা- ফরিদপুর হয়ে ঢাকার সাথে এর সংযোগ। তাই ঝিনাইদহ এবং মাগুরা দখল করতে পারে যশোরে পাকিস্তানীরা বিপদে পড়বে এবং মিত্রবাহিনীর পক্ষে দ্রুত ঢাকা অভিমুখে যুদ্ধাভিযান চালানো সম্ভব হবে।তাই মূল হামলা ঝিনাইদহ- মাগুরা দখলের উদ্দেশ্যে পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। তবে শত্রুকে বিভ্রান্ত করার জন্যে যশোরের দিকে একটি আক্রমণ চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

 

উত্তর সেক্টরের মিত্র বাহিনীর একটি বিগ্রেডকে জামালপুর- টাঙ্গাইল সড়ক ঢাকার অভিমুখে অগ্রসর হওয়ার দায়িত্ব দেয়া হয়।

 

পূর্ব সেক্টরে লক্ষ্য রাখতে হবে, ঢাকা যেন চট্টগ্রাম কিংবা কুমিল্লা থেকে কোন সাহায্য পেতে না পারে। মেঘনা নদী বরাবর তিনটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান অর্থাৎ চাঁদপুর, দাউদকান্দি এবং আশুগঞ্জ দখল করতে পারলেই এই উদ্দেশ্য হাসিল করা সম্ভব। প্রথম অবস্থায় কুমিল্লা, গ্যারিসন এড়িয়ে গেলেও চলবে।

 

ঢাকা মুক্ত করার লক্ষ্যে দাউদকান্দি থেকে ভৈরব পর্যন্ত মেঘনা নদীর উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা এবং জামালপুর- টাঙ্গাইল অক্ষ বরাবর অগ্রসররত দলটির সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে রাজধানীর অভিমুখে যুদ্ধাভিযান পরিকল্পনার অপরিহার্য অঙ্গ হয়ে পড়ে।

 

পশ্চিম সেক্টরে অগ্রসরমান কলামের জন্য গোয়ালন্দঘাট দিয়ে পদ্মা পার হওয়ার ব্যবস্থা থাকবে। বিশাল এই নদীটি পার হওয়ার ব্যবস্থা আগে থাকতেই করে রাখতে হবে।

 

চট্টগ্রাম অভিমুখে অগ্রসর হওয়ার সময় আমার সঙ্গে নিজস্ব এক বিগ্রেড সেক্টর ট্রুপস ছাড়াও ভারতীয় দুটি বাহিনীর ব্যাটালিয়ন এবং বেঙ্গল রেজিমেন্টের একটি ব্যাটালিয়ন ছিল। এই সব সেনা নিয়ে গঠিত হয় বিচিত্র একবাহিনী যার নাম দেয়া হয় ‘কিলোফোর্স’’ আমাদের পথ ছিল সবচাইতে দীর্ঘতম অথচ যানবাহনের সংখ্যা ছিল সবচাইতে কম। ফিল্ড আর্টিলারী আমাদের সহায়তায় ছিল বটে, তবে কোন ট্যাংক কিংবা অন্য কোন প্রকার সাহায্যকারী ইউনিট ছিল না। এই সেক্টরে আমি ইতিমধ্যেই শত্রুর পশ্চাৎভাগে দুটি নিয়মিত কোম্পানী পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। আমার একটি কোম্পানী মীরেশ্বরাই এলাকা এবং ফটিকছড়ি এলাকায় নিরাপদে ঘাঁটি স্থাপন করে বসেছিল। সমগ্র বেলুনিয়া অঞ্চল কয়েকদিন আগে থেকেই শত্রুমুক্ত হয়েছিলো। ফেনী মুক্ত করার জন্য আমাদের প্রস্তুতি চূড়ান্ত। ১৯৭১ এর ২রা ডিসেম্বরের কথা বলছি। পরেরদিন মিসেস গান্ধী এক জনসভায় বক্তৃতা দিবেন। আমরা অনেকেই আশা করছিলাম এই সভায় হয়তো তিনি বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়ার কথা ঘোষণা করবেন।

                                            


স্বাধীনতার চূড়ান্ত লড়াই

 

বেলুনিয়ায় আমার অগ্রবর্তী কমান্ড পোস্টের দিকে জিপ চালিয়ে এগিয়ে যাই। ধুলায় আচ্ছন্ন পথ। দুই পাশে সোনালী ফসলের মাঠ। ধান কাটা মৌসুম এসে গেছে।

 

অন্যান্য দিনের মতই সূর্য ডুবে গেল। তারপর সমস্ত এলাকা পূর্ণ চাঁদের আলোয় ভরে উঠে।পথের পাশে একটি টহলদার দলকে ব্রিফিং দেয়া হচ্ছিলো।অল্প দুরেই আমাদের মেশিনগানের আওয়াজ শোনা যায়। ফাঁকে ফাঁকে পাকিস্তানী মেশিনগান,….. কখনও বা আর্টিলারী শেল শুরু হয়। সবকিছুই নিত্তনৈমিত্তিক ঘটনা….. বাংলাদেশের হয়ত সব ফ্রন্টেই তা ঘটেছিলো প্রতিদিন।

 

মিসেস ইন্দিরা গান্ধী সেদিন কলকাতার এক বিশাল জনসভায় ভাষণ দিলেন। তাঁর নয়াদিল্লী ফিরে যাবার কোন তাড়াহুড়োই ছিল না।

 

জেনারেল অরোরার ইস্টার্ন কমান্ড হেড কোয়াটারে আর একটা কর্মব্যস্ত দিনের অবসান ঘটলো। যেহেতু প্রধানমন্ত্রী রাজধানীর বাইরে তাই ইস্টার্ন কমান্ডের কেউ কোন গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ বা সিদ্ধান্ত পাওয়ার আশা করছিলো না। ওদিকে ইয়াহিয়া খান তখন ইসলামাবাদে।দশদিনের মধ্যে তিনি যুদ্ধ করার যে পূর্বাভাস দিয়েছিলেন তা শেষ হতে আরও দুইদিন বাকী।

 

ভারতের সমস্ত অগ্রবর্তী বিমান ঘাঁটিসমূহের যুদ্ধের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছিলো। তবে বিমানঘাঁটিগুলোতে যুদ্ধের সবগুলো বিমান তখন পর্যন্ত পৌঁছেনি। ভারতীয় নৌবাহিনীর ইস্টার্ন ফ্লীট এবং ওয়েস্টার্ন ফ্লীট তখন পর্যন্ত শান্তিকালীন ঘাঁটিতে অবস্থান করছিলো।

 

পাকিস্তানের বহুল প্রচারিত সাবমেরিন ৩১১ ফুট দীর্ঘ পি-এন-এস গাজী এগিয়ে চলল ভারতের নৌঘাঁটি বিশাখাপত্তমের দিকে। উদ্দেশ্য ছিল ভারতের বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ‘ভীক্রান্ত’ কে টর্পেডো মেরে ডুবিয়ে দেয়া। ৩রা ডিসেম্বর। শুক্রবার।ভারতীয় সময় বিকাল ৫ টা ৪৭ মিনিটে পাকিস্তানী বিমানবাহিনী অতর্কিতে ভারতের ৭টি ঘাঁটিতে একযোগে হামলা চালায়। রাত সাড়ে আটটায় জম্বু এবং কাশ্মীরে দক্ষিণ-পশ্চিম ছাম্ব এবং পুঞ্চ সেক্টরে ব্যাপক আক্রমণ অভিযান শুরু করে।

 

এই ধরণের পরিস্থিতির জন্য ভারত পুরো প্রস্তুত ছিল। মিসেস গান্ধী দ্রুত রাজধানীতে প্রত্যাবর্তন করলেন এবং ঐ রাতে ১২টা ৩০ মিনিট জাতির উদ্দেশ্য প্রদত্ত ভাষণে সকলকে চরম ত্যাগ স্বীকারের জন্য তৈরি হওয়ার আহবান জানালেন। ততক্ষণে জেনারেল অরোরাও আক্রমণের নির্দেশ পেয়ে যান। ভারতীয় নৌবাহিনী ইতিমধ্যেই সফল অভিযান শুরু করে দিয়েছিলো। বিশাখাপত্তম উপকূলের মাত্র কয়েক মাইল দূরে ভারতীয় ডেস্টায়ার ‘আই এন এস রাজপুত’ পাকিস্তানী সাবমেরিন গাজীর সন্ধান পেয়ে যায়। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই ‘রাজপুতের ডেপথ চার্জে পাকিস্তানের সাবমেরিন গাজী টুকরো টুকরো হয়ে সাগর গর্ভে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। একই সঙ্গে অন্যদিকে ভারতীয় সেনাবাহিনী এবং মুক্তিবাহিনী যৌথভাবে বাংলাদেশ সীমারেখায় অতিক্রম করে বাংলাদেশে প্রবেশ করলো। ইস্টার্ন ফ্লীটও দ্রুত লক্ষ্যস্থল অভিমুখে অগ্রসর হল। ভারতীয় বিমানবাহিনী কিছুক্ষণ আগে থেকেই পশ্চিম পাকিস্তানের প্রায় সবগুলো বিমান ঘাঁটি এবং রাডার কেন্দ্রের উপর আঘাত হেনে চলছিলো। রাত ৩টায় ভারতীয় বিমানগুলো ঢাকা ও কুর্মিটোলা বিমান ঘাঁটিগুলোর প্রথম হামলা শুরু করে। ইতিহাসের আর একটি মহান স্বাধীনতার চূড়ান্ত সংগ্রামের সুচনা হল।

 

যুদ্ধের প্রথমদিনে সকল রণাঙ্গনে পাকিস্তানীরা মরণপণ শক্তিতে আক্রমণ প্রতিরোধ করার চেষ্টা করলো। বেলা ১০টার মধ্যে ভীক্রান্ত তার নির্দিষ্ট গন্তব্যস্থলে পৌঁছে যায়। কিছুক্ষণের মধ্যে ৬টি ‘সী হক’ বিমান চট্টগ্রাম এবং কক্সবাজারের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যস্থলগুলোতে আঘাত হানার জন্য ডেক উড়ে গেলো।

 

পূর্ব সেক্টর অর্থাৎ মেঘনা নদীর পূর্ব দিকের অঞ্চলে পাকিস্তানী সৈন্যদের ধ্বংস করার দায়িত্ব ভারতীয় ৪র্থ কোরের উপর ন্যস্ত ছিল।এই সেক্টরে প্রধান সড়কপথে রণকৌশলগত প্রতিবন্ধকতা ছিল দুটি স্থানে ব্রাহ্মণবাড়িয়া এবং লাকসামে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া দহল করতে পারলে পূর্ব সেক্টরের সকল পাকিস্তানী সৈন্য বিশেষকরে সিলেটও মৌলভীবাজারের সৈন্যরা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে বাধ্য। একই সঙ্গে লাকসাম আমাদের দখলে এলে কুমিল্লা গ্যারিসন থেকে চট্টগ্রামও ঢাকা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। চাঁদপুরও ফেনী দখলের দায়িত্ব ছিল ৪র্থ কোরের উপর। যুদ্ধ শেষ হওয়ার ১০দিনের মধ্যেই এই স্থান দখল করার পরিকল্পনা নেয়া হয়। একই সঙ্গে উত্তরে শমসেরনগর বিমানঘাঁটি, মৌলভীবাজার এবং সিলেটও মুক্ত করার দায়িত্ব এই কোরের উপর ছিল। ৪র্থ কোরের প্রাথমিক পরিকল্পনায় ঢাকা মুক্ত করার পরিকল্পনা ছিল না। সে অনুসারে কোর কমান্ডার সগত সিং ৮ মাউন্টেন ডিভিশনকে শমসেরনগর বিমানঘাঁটি, মৌলভীবাজার এবং সিলেট শহর মুক্ত করার নির্দেশ দেন। করিমগঞ্জের নিকট সীমান্ত অতিক্রম করে ৮ম মাউন্টেন ডিভিশনের কলাম সিলেটের দিকে এবং অন্য একটি মৌলভীবাজারের দিকে অগ্রসর হয়। শমসেরনগর বিমানঘাঁটি মুক্ত হয় প্রথম দিনেই। পাকিস্তানীরা অবস্থা বেগতিক দেখে এই অঞ্চলের অধিকাংশ সীমান্ত ফাঁড়ি থেকে পশ্চাদপসরন করতে থাকে।

 

এই কোরের ৫৭তম ডিভিশনকে আগরতলার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পর আখাউড়া মুক্ত করে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পথে অগ্রসর হওয়ার পথে নির্দেশ দেয়া হয়। কুমিল্লা এবং ময়নামতি মুক্ত করার কাজে নিযুক্ত ২৩ মাউন্টেন ডিভিশনকে সাহায্য করাও ৫৭ ডিভিশনের দায়িত্ব ছিল। তারপর মেঘনা নদীর তীরে গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ কেন্দ্র চাঁদপুর এবং দাউদকান্দি মুক্ত করার লক্ষ্যে যুদ্ধভিযান চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশও এই ডিভিশনকে দেয়া হয়।

 

এই সেক্টরে দক্ষিণে ফেনী শহর থেকে পাকিস্তানীরা সন্তর্পণে পালিয়ে যায়। সাথে সাথে আমার বাহিনী শহরটিতে প্রবেশ করে। ফেনী আমাদের হাতে চলে আসায় চট্টগ্রাম পাকিস্তানীদের সাথে দেশের অন্যান্য স্থানের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এসময় কুমিল্লাও লাকসাম এলাকায় প্রচণ্ড যুদ্ধ শুরু হয়।

 

আমার সেক্টরে ফেনী এবং বেলুনিয়া এলাকা সম্পূর্ণ শত্রু মুক্ত হওয়ার পর পাকিস্তানীরা ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি স্বীকার করে লাকসামের দিকে পশ্চাদপসরন করে। এটাই হচ্ছে একমাত্র এলাকা( অর্থাৎ চট্টগ্রাম সেক্টর) যেখানে ভারতীয় সেনাবাহিনীর কোন নিয়মিত পুরো বিগ্রেড নিয়োজিত হয়নি। এখানে অভিযান চলেছে আমার তিন ব্যাটালিয়ন সেক্টর ট্রপস ( যার মধ্যে থেকে ২ কোম্পানী ইতিপূর্বেই চট্টগ্রামের অভ্যন্তরে প্রেরণ করা হয়েছিলো) এবং ভারতীয় সেনাবাহিনীর দুটি ব্যাটালিয়নের শক্তির উপর নির্ভর করে।

 

বেলুনিয়াও ফেনীতে আমাদের হাতে চরম মার খাওয়ার পর ৫৩ বিগ্রেডসহ ১৫ বালুচ রেজিমেন্ট ৬ডিসেম্বর লাকসামের দিকে পলায়ন করেছিলো। ৬ডিসেম্বর আমরা ফেনী মুক্ত করে চট্টগ্রামের পথে অগ্রসর হই। সামনে আমাদের ৬৫ মাইল পথ। শুভপুরের কয়েক মাইল দক্ষিণে ধুমঘাট রেল সেতুটি দখল এবং রক্ষা করার জন্য আমি সাথে সাথেই দুই প্লাটুনকে পাঠিয়ে দেই ধুমঘাটের দিকে। চট্টগ্রামের পথে অগ্রসররমান আমাদের মূলবাহিনীতে ছিল আমার সেক্টরের তিনটি নিয়মিত বাহিনী এবং বাংলাদেশের একটি কামান বহর নাম ছিল মুজিব ব্যাটারী।(শেখ মুজিবর রহমানের নাম অনুসারে)।ভারতীয় বাহিনীতে ছিল ২য় রাজপুত ব্যাটালিয়ন, বি এস এফের গোলন্দাজ রেজিমেন্ট। এই সেক্টরে বাংলাদেশ বাহিনীর কমান্ডার হিসাবে আমি এবং ভারতীয় বাহিনীর কমান্ডার বিগ্রেডিয়ার আনন্দ সরুপ ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্য করে চলছিলাম। আগেই বলা হয়েছে আমাদের যৌথ বাহিনীর নাম’কিলো ফোর্স’ ।

 

ফেনী থেকে রওনা হওয়ার পথে পাকিস্তানের ৩৯ অস্থায়ী ডিভিশনের সৈন্যদের মোকাবিলা হবে বলে আমরা জানতাম। পাকিস্তানী এই ডিভিশনের সাথে কামানও সাঁজোয়া বহর ছিল। আমার কিংবা ভারতীয় বাহিনীর সাথে ট্যাংক বিধ্বংসী অস্ত্র ছিল না।এই কারণে ভারতীয় সেনাবাহিনী একটু সতর্কটার সাথে অগ্রসর হচ্ছিলো। একই সঙ্গে একটি বাংলাদেশ ব্যাটালিয়নকে চট্টগ্রাম পাহাড়ের মধ্য দিয়ে পাঠানো হয় হাটহাজারী এবং চট্টগ্রাম ক্যান্টমেন্টের মাঝামাঝি জায়গায় অবস্থান গ্রহণ করার জন্য। এই জায়গাটি বন্দর নগরী চট্টগ্রামের কয়েক মাইল উত্তরে। আর আমরা মূল বাহিনী মহাসড়ক পথে চট্টগ্রামের পশ্চিম দিক দিয়ে এগিয়ে চললাম।

 

চট্টগ্রাম অগ্রাভিযান আমরা ছাগলনাইয়া মুক্ত করার পর ৭ নভেম্বর ফেনী নদীর উপর স্মরণীয় শুভপুর সেতুর কাছে পৌঁছো। চট্টগ্রামের পথে আমাদের সামনে হচ্ছে এটিই হচ্ছে সর্বশেষ বাধা।অবশ্য এরপরও কয়েকটি ছোটখাটো সেতু রয়েছে। শুভপুর সেতুর কাছে গিয়ে দেখি পাকিস্তানীরা সুদীর্ঘ সেতুর দুটি স্পান সম্পূর্ণ ধ্বংস করে গেছে। আমরা আরো খবর পাই যে তারা ৮ মাইল দূরে মিরেশ্বরাই গিয়ে প্রতিরক্ষা ব্যূহ গড়ে তুলেছে।

 

তৎক্ষণাৎ ভারতীয় ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের সদস্যদের ডাকা হয়। তারা যৌথবাহিনী যানবাহনও ভারী অস্ত্রশস্ত্র পার করার জন্য ফেনী নদীতে একটি প্লাটুন ব্রিজ তৈরি করার কাজে লেগে যায়। কিন্ত নতুন সেতুর জন্য আমরা অপেক্ষা না করে আমার সৈন্যদলের একটি অংশ নিয়ে আমি ৮ ডিসেম্বর বিকেলে নৌকাযোগে নদী পার হয়ে সামনের দিকে অগ্রসর হই। স্বল্পতম সময়ে কবেরহাটে আমরা সেক্টর হেডকোয়াটার স্থাপন করে আমরা জোরারগঞ্জ পর্যন্ত এলাকা শত্রুমুক্ত করি। ভারতের বিগ্রেড কমান্ডারও কবেরহাট পৌঁছে যান। আমার এলাকায় যুদ্ধের জন্য রসদ সংগ্রহই ছিল বড় সমস্যা। আমাদের খাদ্যদ্রব্য এবং অন্যান্য জিনিসপত্রের জন্য পুরোপুরি ভারতীয় সৈন্যবাহিনীর উপর নির্ভর করতে হচ্ছিলো। এগুলোর জন্য ভারতীয় সেনাবাহিনীকে আবার তাদের পেছনের ঘাঁটির উপর নির্ভর করতে হতো।এই ঘাঁটি ছিল শুভপুর থেকে প্রায়৫০ মাইল দূরে। এই পথটুকুর অধিকাংশ ছিল আবার ভীষণ খারাপ। তাই আমাদের রসদ সরবরাহ ব্যবস্থায় মারাত্মক সংকটের সৃষ্টি হয়েছিলো। হয়ত এই কারণেই আমার সঙ্গের ভারতীয় ব্যাটালিয়নগুলো সাবধানে এগুতে চাইছিলো। ভারতীয় কমান্ডার যুদ্ধের সরঞ্জাম এবং রসদের সরবরাহ সম্পর্কে নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত বেশিদূর অগ্রসর হতে চাইছিলো না। এদিকে শত্রুরা শুভপুর সেতু ধ্বংস করে আমাদের আরও সংকটে ফেলে দিয়েছিলো। এই প্রতিকূলতা অবস্থা সত্ত্বেও আমরা বেশীক্ষণ অপেক্ষা করতে পারছিলাম না। জাতিসংঘে আমাদের জন্য ক্ষতিকারক কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণের এবং পাকিস্তানের অনুকূলে মার্কিন ৭ম নৌবহরের সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার পূর্বেই যত তাড়াতাড়ি পারা যায় আমাদের চট্টগ্রাম পৌঁছতে হবে।

 

ইতিপূর্বেই আমি মিরেরশ্বরাইয়ের নিকট গেরিলা তৎপরতায় লিপ্ত আমার নিয়মিত কোম্পানী এবং মিরেশ্বরাইও সীতাকুণ্ড এলাকার সকল গেরিলা গ্রুপকে নির্দেশ দিয়ে রেখেছিলাম যে, তারা যেন শত্রুর উপর প্রচণ্ড আক্রমণ শুরু করে। ৯ই ডিসেম্বর দিবাগত রাতে প্রতিটি গেরিলা দল মহাসড়ক অভিমুখে অগ্রসর হতে থাকে। গ্রাম গ্রামান্তর থেকে তাঁরা গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে সড়কের দিকে আসছিলো এবং এতে করে ২০ মাইল দীর্ঘ এবং১০ মাইল প্রস্থ জুড়ে এলাকায় এমন ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিলো যে, মনে হচ্ছিলো মুক্তিবাহিনীর পুরো একটি কোরই বোধহয় আক্রমণ চালিয়েছে। সেই রাতেই পাকিস্তানীরা পশ্চাদপসারণের আদেশের জন্য অপেক্ষা না করেই পেছনের দিকে পালিয়ে যায়।

 

এদিকে আমরা যখন একটি জাতি হিসেবে আমাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য লড়াই করছিলাম আন্তর্জাতিক কূটনীতির ক্ষেত্রে তখন চলছিল আরেক খেলা কিছু আমাদের সমর্থনে আবার কিছু ছিল আমাদের বিরুদ্ধে। ৫ই ডিসেম্বর নিরাপত্তা পরিষদে পাকিস্তানের পক্ষে অবিলম্বে যে যুদ্ধবিরতির জন্য যে প্রস্তাব পেশ করা হয়েছিলো, সোভিয়েত ইউনিয়ন তাতে ভেটো দেয়। পাকিস্তান যখন হেরে যাচ্ছিলো সেই মুহূর্তে যুদ্ধবিরতি মানা হলে ইসলামাবাদেরই তাতে সুবিধা হতো, আর আমরা যেটুকু অর্জন করেছিলাম তাও হারাতাম।

 

এরপরের দিন অর্থাৎ ৬ই ডিসেম্বর ভারতের প্রধানমন্ত্রী মিসেস গান্ধী গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দানের ঘোষণা করলে তা মুক্তিযোদ্ধাদের এবং বাংলাদেশের জনগণের মনোবল বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়। পাকিস্তানের বন্দীশালায় আটক শেখ মুজিবর রহমানের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে সেদিন মিসেস গান্ধী বলেছিলেন, এই নবজাত রাষ্ট্রের যিনি জনক বর্তমান মুহূর্তে আমাদের সমস্ত চিন্তা তাঁকেই কেন্দ্র করে।

 

৮ই ডিসেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে সৈন্য প্রত্যাহারের একটি প্রস্তাব সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে পাশ হয়েছিল। প্রস্তাবটির উদ্যোক্তা ছিল মার্কিন সরকার। বৃহৎ শক্তিবর্গের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন পাকিস্তানকে ভরাডুবির হাত থেকে বাঁচানোর জন্য যুদ্ধবিরতির পক্ষে ভোট দিয়েছিলো। প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট পড়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের। ব্রিটেন, ফ্রান্স এবং অন্য ৮টি দেশ ভোটদানে বিরত থাকে।

 

সাধারণ পরিষদে মার্কিন প্রস্তাব গ্রহণের বিষয়টি আমাদের কাছে তেমন বিস্ময়কর কিছু ছিল না। এতে এমন কিছু ঘটেনি যা আমাদের লক্ষ্যচ্যুত করতে পারে। ভারত, পাকিস্তান কিংবা এই মহতী জাতি সংস্থার অন্যান্য সদস্য হয়ত এই প্রস্তাব মানতে বাধ্য। কিন্ত আমরা তখনও জাতিসংঘের সদস্য নই। বরং আমাদের এই লক্ষ্য ছিল অত্যন্ত পবিত্র আর সেই লক্ষ্য অর্জনের পথে প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে আমরা পৌঁছে গিয়েছিলাম।এমনকি এসময় যদি ৭ম নৌবহর পাকিস্তানের সহায়তার জন্য যেকোনোভাবে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তো তবুও আমরা এই মুক্তির সংগ্রাম চালিয়ে যেতাম। ৭ম নৌবহরের যুদ্ধে যোগদানের ফলে হয়তো বাংলার আরও অসংখ্য মানুষ প্রাণ হারাতো। কিন্ত মৃত্যু আর ধ্বংসযজ্ঞ এ দুটোর কোনটিই তখন এদেশের মানুষের অজানা কিছু নয়। পাকিস্তানের জন্যে এই যুদ্ধ ছিল নিছক জয় এবং পরাজয়ের। কিন্ত আমাদের জন্যে এই যুদ্ধ ছিল জাতি হিসেবে বেঁচে থাকার মরনপ্রান সংগ্রাম, অন্যথায় সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবার। এযুদ্ধ আমাদের দেবে গৌরবময় জীবনের সন্ধান নতুবা মৃত্যু।

 

 

ভারতের চীফ অব আর্মি স্টাফ জেনারেল এসএইসএফ মানকেশ যুদ্ধের এক নতুন কৌশল অবলম্বন করলেন ৮ই ডিসেম্বর থেকে। যৌথবাহিনীর সাফল্যে সন্তুষ্ট হয়ে তিনি এক সময়োচিত মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ( সাইকোলজিক্যাল ওয়ার) শুরু করেন। তাঁর ভাষণ পর্যায়ক্রমে বেতারে প্রচারিত হতে থাকে। অন্যদিকে এই ভাষণ প্রচারপত্রের মাধ্যমে বিমানের সহয়তায় পাকিস্তানী অবস্থানসমূহের উপর বিলি করা হয়। বাংলাদেশে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর অফিসারও জওয়ানদের মানকেশ তার বার্তায় সরাসরি বলেন, অস্ত্র সংবরণ করো, নইলে মৃত্যু অবধারিত। যৌথবাহিনী তোমাদের চারদিক থেকে ঘিরে ফেলেছে। তোমাদের বিমানবাহিনী সম্পূর্ণ ধ্বংস ও নিয়ে আর কোন সাহায্য পাবেনা। বন্দরগুলোও এখন অবরুদ্ধ, তাই বাইরে থেকে কোন সাহায্য পাওয়ার আশা বৃথা।মুক্তিবাহিনী এবং জনগণ প্রতিশোধ নিতে উদ্যত। তোমাদের ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে গেছে।সেই সাথে তিনি তাদের এই আশ্বাসও দেন সময় থাকতে অস্ত্র সংবরণ করলে তোমাদের সৈনিকদের যোগ্য মর্যাদা দেয়া হবে।

 

মুক্তিযোদ্ধা এবং ভারতীয় সেনাবাহিনী দীর্ঘদিন একসাথে কাজ করে আসছিলো।১০ই ডিসেম্বর ভারতীয় সেনাবাহিনীর সিনিয়র কমান্ডারের অধীনে ভারত এবং বাংলাদেশ বাহিনীর যৌথ কমান্ড গড়ে তোলা হয়।

 

এই দিনই(১০ই ডিসেম্বর) ঢাকা রেডিওর ট্রান্সমিটারের উপর সরাসরি এক বিমান হামলায় বেতার প্রচার বন্ধ হয়ে যায়।ভীক্রান্তের বিমানবহর তখন চট্টগ্রাম পোর্ট বিমানবন্দরও সামরিক দিক দিয়ে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অন্যান্য কেন্দ্রের উপর সমানে আক্রমণ যাচ্ছিলো।

 

মার্কিন ৭ম নৌবহরের টাস্কফোর্স ইতিমধ্যেই মালাক্কা প্রণালী অতিক্রম করে দ্রুত বঙ্গোপসাগরের দিকে অগ্রসর হচ্ছিলো। মার্কিনী এই বহরে ছিল পারমাণবিক শক্তি চালিত বিশাল বিমানবাহী জাহাজ’ এন্টারপ্রইজ’ এবং আরও ৬টি যুদ্ধজাহাজ। এব্যাপারে মার্কিন সরকারের অজুহাত ছিল বাংলাদেশে মার্কিন নাগরিকদের সরিয়ে নেয়ার জন্যই ৭ম নৌবহরকে এই অঞ্চলে আনা হচ্ছে। এই যুক্তি মার্কিন জনসাধারণের কাছেও গ্রহণযোগ্য ছিল না, কারণ আমাদের যৌথ কমান্ড ১১ই ডিসেম্বর থেকে বিমান হামলা সাময়িকভাবে স্থগিত রেখে ঢাকা বিমানবন্দর মেরামতের সুযোগ করে দেয়। যাতে আন্তর্জাতিক পথের বিমানগুলোতে বিদেশী নাগরিকরা ঢাকা ত্যাগ করতে পারেন। কিন্ত মার্কিন নাগরিকদের মধ্যে এসময়ে ঢাকা ত্যাগের তেমন কোন লক্ষণ দেখা যায়নি।

 

ততক্ষণে যুদ্ধ সম্পর্কে সবাই স্পষ্ট ধারণা করতে পারছিলো। যৌথবাহিনীর সাফল্যের সাথে মেঘনা নদীর অপারে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণের পর সামরিক বিশেষজ্ঞরা অভিমত প্রকাশ করেছিলেন সাত থেকে দশ দিনের মধ্যে ঢাকার পতন ঘটবে। নিয়াজি অবশ্য তখনো নিরাপদে ঢাকায় বসে হুংকার দিচ্ছিলেন প্রতি ইঞ্চি জায়গার জন্য একটি প্রাণ বেঁচে থাকা পর্যন্ত আমরা যুদ্ধ চালিয়ে যাব।রাও ফরমান আলী কিন্ত ঠিকই বুঝেছিলেন খেলা শেষ। বাংলাদেশে পাকিস্তানীরা যে জঘন্য অপরাধ করেছিলো অপারেশন জেনোসাইডের অন্যতম স্থপতি ফরমান আলী সে বিষয়ে পুরো সচেতন হয়ে পড়ছিলেন। পরাজয় তখন অবশ্যম্ভাবী। মুক্তিবাহিনীর হাত থেকে রক্ষা পাবার উদ্দেশ্যে ১১ই ডিসেম্বর যুদ্ধবিরতির জন্য জাতিসংঘ সদর দপ্তরে এক আবেদন জানান। ফরমান আলী এখানকার পাকিস্তানী সকল পাকিস্তানীকে অপসারণের ব্যবস্থা করারও অনুরোধ জানান। সঙ্গে সঙ্গে ইয়াহিয়া খান জাতিসংঘকে জানিয়ে দেন ফরমান আলীর প্রস্তাব অনুমোদিত।ইয়াহিয়ার তখনো আশা যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন তাকে উদ্ধারের জন্য এগিয়ে আসবে। নিয়াজীকে তিনি আরেকটু অপেক্ষা করার নির্দেশ দেন।

 

চীন বোধহয় একা অজুহাতের জন্যই অপেক্ষা করছিলো। আর ৪ঠা ডিসেম্বর মার্কিন ৭ম নৌবহর বঙ্গোপসাগরে প্রবেশ করে।

 

চট্টগ্রাম সেক্টরে আমাদের সকল সৈন্য ৯ই ডিসেম্বর বিকালের মধ্যে শুভপুর সেতু বরাবর ফেনী নদী পার হয়ে যায়। সামনে শত্রুরা কোথায় কি অবস্থায় আছে পর্যবেক্ষণের জন্য আমরা যথারীতি টহল দল আগেই পাঠিয়ে দিয়েছিলাম।পাকিস্তানীরা মিরেশ্বরাই ছেড়ে যাচ্ছে বলে একজন গেরিলা বেস কমান্ডার আমাকে খবর দেয়। মিরেরশ্বরাই থেকে১৫ মাইল দূরে গিয়ে সীতাকুণ্ডুতে তারা নাকি নতুনভাবে অবস্থান গ্রহন করে।আমি সাথে সাথে মিরেরশ্বরাই দখল করার জন্য একটি ব্যাটালিয়ন পাঠিয়ে দেই। তখনো আমাদের কোন যানবাহন ফেনী নদী পার হতে পারেনি।ব্যাটালিয়নের সৈন্যদের তাই পায়ে হেঁটেই অগ্রসর হতে হচ্ছিলো। ভারী অস্ত্রশস্ত্রও মালামাল নেওয়ার জন্য কয়েকটি রিকশাও গরুর গাড়ি জোগাড় করা হয়।

 

বিকালে আমি পরিষদ সদস্য মোশারফ হোসেনকে নিয়ে একখানি রিকশায় মিরেরশ্বরাইয়ের দিকে যাত্রা শুরু করি। আমাদের ব্যাটালিয়নও তখন একই দিকে মার্চ করে যাচ্ছিলো। পথে তাদের পেছনে ফেলে আমরা এগিয়ে যাই। অবশ্য এইভাবে একা সামনে এগিয়ে যাওয়া ছিল খুবই ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। পাকিস্তানীরা ঠিক কোথাও রয়েছে কিনা তখনো আমরা তা জানতাম না। তারা সকলে মিরেরশ্বরাই ত্যাগ করেছিলো কিনা তাও জানা ছিল না। তারা সকলে মিরেরশ্বরাই ত্যাগ করেছে কিনা তারও নিশ্চয়তা ছিল না। তবু আমি মিরেরশ্বরাই ঝুঁকি নিয়ে পৌঁছে দেখি একটু আগে শত্রুসেনারা সে স্থান ছেড়ে চলে গেছে। স্থানীয় কয়েকজন কর্মকর্তা মিরেরশ্বরাই হাইস্কুল ভবনে আমার সাথে একত্র হলেন। পাকিস্তানীরা আবার রাতে ফিরে আসতে পারে বলে তার আশংকা করছিলেন। আমাদের তখন অত্যন্ত দ্রুত চট্টগ্রাম দখল করা দরকার। তাই মিরেরশ্বরাইতে আমরা দ্রুত প্রতিরক্ষা অবস্থান গড়ে তুললাম। এপ্রিলও মে মাসে এই অঞ্চলেই আমরা যুদ্ধ করেছিলাম। তাই পুরো এলাকাটি আমার এবং আমার অধিকাংশ সৈন্যেও ছিল সুপরিচিত। মিরেরশ্বরাইতে আমরা বেসামরিক প্রশাসন চালু করি। কবেরহাটে অবস্থানরত ভারতীয় বিগ্রেডিয়ার আনন্দ সরুপকে আমরা নতুন অবস্থানের কথা জানিয়ে তাকে সত্বর এখানে চলে আসার অনুরোধ জানাই।চট্টগ্রামের পথে শত্রুসেনার সঠিক অবস্থান জানার জন্য একটি টহলদার দল পাঠিয়ে দেই মিরেরশ্বরাই থেকে সীতাকুণ্ডের দিকে। ভোরেই আবার যাত্রা শুরু করতে হবে। তাই মিরেরশ্বরাই হাইস্কুলে সে রাতটা কাটালাম।

 

পরেরদিন স্বল্পদৈর্ঘ্য সংঘর্ষের পরই সীতাকুণ্ডে শত্রুদের প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ে।সীতাকুণ্ড অতিক্রম করার পর ১৩ই ডিসেম্বর কুমিরায় পৌঁছে আমরা পাকিস্তানীদের শক্তিশালী ঘাঁটির সম্মুখীন হই। ভূমি বৈশিষ্ট্যের কারণে এই জায়গাটি শত্রুদের যথেষ্ট অনুকূলে ছিল। পশ্চিমে সাগর এবং পূর্বে উঁচু পাহাড়ের মধ্যবর্তী সরু এলাকা জুড়ে পাকিস্তানীদের সুদৃঢ় অবস্থান নিয়ে বসেছিল। সড়কের একস্থানে গভীর খালের উপর সেতুটি তারা ধ্বংস করে দিয়েছিলো। রাস্তার উপর প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা ছাড়াও পার্শ্ববর্তী উঁচু পাহাড়ে যক্ষ্মা হাসপাতালের কাছে ছিল তাদের মূল প্রতিরক্ষাঘাঁটি। পরবর্তী চব্বিশ ঘণ্টা উভয়পক্ষে তুমুল সংঘর্ষ হয়। আমাদের কয়েকজন সংঘর্ষে হতাহত হলেও পরদিন সকালের মধ্যে আমরা পূর্বদিকে অগ্রসর হতে সক্ষম হই। বেসামরিক জনগণ শত্রুসেনাদের অবস্থান সম্পর্কে আমাদের খবরাখবর দিচ্ছিলো।সংবাদ অনুযায়ী সঠিক লক্ষ্যস্থলের কামান দেগে ওদের ঘায়েল করেছিলাম। ১৪ই ডিসেম্বর ভোর রাত ৩তার মধ্যে আমরা কুমিরা পুরোপুরি শত্রুমুক্ত করে ফেলি।চট্টগ্রাম এখন মাত্র ১২ মাইল দূরে। কুমিরা মুক্ত হওয়ার মাত্র ৩ঘণ্টার মধ্যে আমাদের যানবাহন এবং কামানগুলো ভাঙ্গা সেতু এড়িয়ে খাল পার হতে শুরু করে। কয়েক হাজার নারী, পুরুষ, শিশু ভাঙ্গা সেতুর কাছে জমায়েত হয়ে আমাদের সাহায্য করছিলো। একদল খালের পাড় কেটে ডাইবারসন রোডের ব্যবস্থা করেছিলো। অন্যদল আবার গাছ, পাথর, মাটি যা পাচ্ছিলো তাই দিয়ে খাল ভরে ফেলার চেষ্টা করছিলো। আমি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এই দৃশ্য দেখছিলাম। এই সময় এক বৃদ্ধা আমার কাঁধে হাত রেখে বললেন, বাবা চিন্তা করোনা। এই কাজ আমরাই পারবো। দ্যাকো তোমাদের মালপত্র আর গাড়িঘোড়া কিভাবে পার করার বন্দোবস্ত করছি। দরকার হলে আমরা সবাই খালে শুয়ে পড়বো। আর তার উপর দিয়ে তমাদের গাড়ি পার করার ব্যবস্থা করবো। দেরি করোনা বাবা। প্রত্যেক মুহূর্তে তারা আমাদের লোক মারছে। বৃদ্ধা একটু থামলেন। তার দুই চোখ পানিতে ভরে গেছে। বৃদ্ধা বললেন, তোমরা জানোনা, কিছুদিন আগে ঈদের সময় চাটগাঁয়ে একটি লোকাল ট্রেন থামিয়ে তারা সকল বাঙ্গালী যাত্রীকে খুন করেছে।প্রায় একহাজার হবে।দা, চুরি এসব দিয়ে মেরেছে। আমার মেয়ে আর নাতিনাতনিও ছিল। আর বলতে পারবোনা। তোমরা এগিয়ে যাও, তাড়াতাড়ি এগিয়ে যাও। তিনি আমাকে প্রায় ঠেলে দিয়ে আবার কাজে ফিরে গেলেন।আমিও পাকিস্তানীদের এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের কথা শুনেছিলাম। তবে, চট্টগ্রামের যে সর্বশেষ খবর আমি পেয়েছিলাম তা ছিল আরও ভয়াবহ। পাকিস্তানী সামরিক জান্তা এবং অবাঙালিরা সম্মিলিতভাবে পরিকল্পনা করছিলো চট্টগ্রাম শহরে কয়েক হাজার বাঙ্গালিকে নির্বিচারে হত্যা করতে। এটা ছিল তাদের শেষ মরণকামড়।

 

ততোক্ষণে বঙ্গোপসাগরে ৭ম নৌবহরের অনুপ্রবেশে পরিস্থিতি বেশ জটিল হয়ে উঠেছিলো। চট্টগ্রামের কোন সমুদ্র উপকূলে টাস্কফোর্সের মার্কিন বাহিনী অবতরণ করতে পারে বলে আশংকা করা হচ্ছিলো। তাই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমরা চট্টগ্রাম মুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেই। সেই উদ্দেশ্যে ভারতের ২৩ ডিভিশনের ৮৩ বিগ্রেড লাকসাম থেকে দ্রুত যাত্রা শুরু করে এবং কুমিরার কাছে আমাদের সাথে যোগ দেয়। অন্যদিকে ভারতের বিমানবাহিনী ও ইস্টার্ন ফ্লীট পাকিস্তানী অবস্থানগুলোর উপর অবিরত গোলাবর্ষণ করে চলছিলো। এখানকার পাকাবাহিনীকে ধ্বংস করা এবং পোর্ট অচল করে দেওয়ার জন্যই এই আক্রমণ চলছিলো। বোমার আঘাতে জ্বালানি তেলের ট্যাংকগুলো কয়েকদিন ধরে জ্বলছিল। ক্ষতিগ্রস্ত এবং নিমজ্জিত জাহাজের সংখ্যাও ছিল প্রচুর।ডুবন্ত চ্যানেল প্রায় পুরোপুরি বন্ধ। পোর্টের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ছিল ব্যাপক। ৫০০ এবং১০০ পাউন্ড বোমার গর্তগুলো ভরাট এবং ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কার করতে পরে সময় লেগেছিল এক বছরেরও বেশী।

 

মুক্তিযোদ্ধারা খবর নিয়ে এলো যে, কিছু পাকিস্তানী অফিসার ও সৈন্য কক্সবাজার হয়ে পালাবার স্থলপথে পালাবার চেষ্টা করছে। কেউ কেউ আবার জাহাজে করে কেটে পড়ার চেষ্টা করছে। কয়েকটি পাকিস্তানী জাহাজকে বিদেশী জাহাজের মত রং লাগিয়ে এবং বিদেশী পতাকা উড়িয়ে ছদ্মবেশে পালানোর জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এই খবর ভারতের ইস্টার্ন ফ্লীটকে পাঠালে ইস্টার্ন ফ্লীট সতর্ক হয়ে যায়। ছদ্মবেশে পালানোর চেষ্টা করতে গিয়ে বেশ কয়েকটি পাকিস্তানী জাহাজ ভীক্রান্ত এর গোলায় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

 

বার্মা দিয়ে পাকিস্তানীদের পালাবার চেষ্টা বন্ধ করার জন্য এসময়ে কক্সবাজারে একটি অভিযানের পরিকল্পনা নেয়া হয়। এই উদ্দেশ্যে রোম ফোর্স নামে এক নতুন বাহিনীর সৃষ্টি হয়। এই বাহিনীতে ছিল ভারতের১/২ গুর্খা রাইফেলস এবং ১১বিহার রেজিমেন্টের দুটি কোম্পানী। মর্টার সজ্জিত এই বাহিনী ভারতের একখানি সওদাগরী জাহাজে ১৪ই ডিসেম্বর কক্সবাজার উপকূলে গিয়ে পৌঁছে। সেখানে মুক্তিবাহিনীর সদস্যদের সহায়তায় রোম ফোর্স তীরে অবতরণ করে। কিন্ত ঐ এলাকায় কোন পাকিস্তানীকে অবশ্য তারা পায়নি।

 

১৫ই ডিসেম্বর গভীর রাতে পাকিস্তান চীফ অফ আর্মি স্টাফ থেকে নিয়াজী শেষ নির্দেশ লাভ করেন। ভারতীয় সেনাবাহিনীর চীফ অব স্টাফ আত্মসমর্পণের যে শর্ত দিয়েছেন তা যুদ্ধবিরতির জন্য গ্রহণ করা যেতে পারে বলে এতে নিয়াজীকে পরামর্শ দেয়া হয়। এই রাতেই দুটার মধ্যে বাংলাদেশের যেসব স্থানে পাকিস্তানী সেনাদল অবস্থান করছিলো নিয়াজী তাদেকে ওয়্যারলেস যুদ্ধবিরতি পালন এবং যৌথবাহিনীর নিকট আত্মসমর্পণ করার নির্দেশ জারি করেন।

 

রাত শেষ হয়ে আসে। ১৬ই ডিসেম্বর শেষরাতের দিকে ভারতীয় ৯৫ মাউন্টেন বিগ্রেডে নিয়োজিত বিগ্রেডিয়ার ক্রেয়ার নিয়াজীর হেডকোয়াটারের একটি ম্যাসেজ ইন্টারসেপট করেন। এই বার্তায় ভোর ৫টা থেকে নিয়াজী তার সকল সেনাদলকে যুদ্ধবিরতি পালন করতে বলেছিলেন। ক্লেয়ার সাথে সাথে এই অয়ারলেস বার্তার কথা জেনারেল নাগরাকে জানিয়ে দেন পরিস্থিতি পর্যালোচনার পর বিগ্রেড কমান্ডার এবং ডিভিশনাল কমান্ডার মিরপুর ব্রিজের কাছে দ্বিতীয় ছত্রী ব্যাটালিয়ন যেখানে অবস্থান করছিলো সেখানে পৌঁছান। সেখানে অবস্থানরত মুক্তিবাহিনী এবং ভারতীয় প্যারা ব্যাটালিয়ন বাহিনীর থেকে তারা জানতে পারলেন যে, ভোর ৫টার পর ব্রিজের কাছে আর গোলাগুলি হয়নি। এরপর জেনারেল নাগরা তাঁর একজন এডিসি এবং ভারতীয় ছত্রী ব্যাটালিয়নএরন একজন অফিসারকে শ্বেত পতাকাবাহী জিপে করে ব্রিজের অপর পাড়ে পাঠিয়ে দেন। তখন বেলা ৯টা। জীপের আরোহীরা জেনারেল নিয়াজীর উদ্দেশ্যে লেখা জেনারেল নাগরার একটি বার্তা বহন করছিলেন। রণক্ষেত্রের করোতার পরিবর্তে বার্তাটিতে নাটকীয়তাই ছিল একটু বেশি। জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজী এবং জেনারেল নাগরা দুজন ছিলে ব্যক্তিগত জীবনে পরিচিত সম্ভবত তাই বার্তাটিতে ছিল নরমের সুর। প্রিয় আবদুল্লাহ আমি এসে পড়েছি। তোমার সব বাহাদুরি আর খেলা শেষ। আমার কাছে এখন আত্মসমর্পণ করবে, এই আমার উপদেশ। পাকিস্তানের জন্য সত্যই তখন সকল খেলা শেষ।নিজ বাহিনীর প্রতি যুদ্ধবিরতি এবং আত্মসমর্পণ করার যে নির্দেশ নিয়াজী জারি করেছিলেন, ১৬ই ডিসেম্বর সকালেই তা ভারত সরকারকে জানিয়ে দেয়ার জন্য ঢাকাস্থ মার্কিন সামরিক এটচিকে অনুরোধ করেন। তার অনুরোধ যথারীতি ভারতে মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে ভারত সরকারকে জানানো হয়।

 

চট্টগ্রাম এলাকায় আমরা তখন কুমিরার দক্ষিণে আরও কয়েকস্থানে শত্রুমুক্ত করে ফেলেছি। আমাদের যাত্রা বিলম্বিত করার উদ্দেশ্যে এসব জায়গায় কিছু কিছু পাকিস্তানী সৈন্য অবস্থান করছিলো। পথের সকল বাধা পরাভূত করে ১৬ই ডিসেম্বরের মধ্যে আমরা ভাটিয়ারীর শক্তিশালী ঘাঁটির সম্মুখীন হই। এখান থেকে ফৌজদারহাট এলাকা পর্যন্ত পাকিস্তানীরা দুর্ভেদ্য প্রতিরক্ষামূলক ঘাঁটি গড়ে তুলেছিল। এখানে তাদের অধিকাংশ সৈন্য এবং সমরাস্ত্র এনে মোতায়েন করছিলো।আমাদের লক্ষ্য ছিল কিভাবে এই কমপ্লেক্স আমরা ধ্বংস করতে পারি। যুদ্ধ করতে করতে ওরা যদি চট্টগ্রাম শহরে মধ্য দিয়ে গিয়ে অবস্থান করতে পারে তাহলে আমরা পড়বো বিপদে। বাড়িঘর অধ্যুষিত এলাকায় যুদ্ধ গেলে প্রতিটি বাড়িই আত্মরক্ষাকারীর আড়াল হিসেবে কাজে লাগাতে পারবে। সেই পরিস্থিতিতে শহরের মধ্যে পা বাড়ানো আমাদের জন্য দুরুহ হয়ে পড়বে।

 

তাই ফৌজদারহাট এবং চট্টগ্রামের মাঝখানে শত্রুদের অবরোধ করার সিদ্ধান্ত নেই।উদ্দেশ্য ছিল ভাটিয়ারী এবং ফৌজদারহাটে অবস্থান গ্রহণকারী সৈন্যরা যেন পেছনে গিয়ে শহরে প্রবেশ করতে না পারে। পরিকল্পনা অনুযায়ী শত্রু বাহিনীর পেছনে আমাদের সৈন্যরা তাদের পশ্চাদপসরনের পথ রুদ্ধ করে রাখবে এবং সামনে থেকে আমাদের অবশিষ্ট অংশ আক্রমণ চালাবে। অভিযানের এই পদ্ধতি কতটা ‘’ঘাড়ে ধরে মুখে আঘাত করার মত’’ বলা যেতে পারে। সেই অনুসারে ভারতের ৮৩ বিগ্রেডের দুটি ব্যাটালিয়ন ২রাজপুত এবং ৩ ডোগরাকে পেছনের পথ বন্ধ করে দেয়ার জন্য পাঠানো হয়। ভারতের তৃতীয় আরেকটি ব্যাটালিয়ন সম্মুখ সমরে আমাদের মুক্তিযোদ্ধা ব্যাটালিয়নের সাথে যোগ দেয়।পূর্বোক্ত ব্যাটালিয়ন দুটি রাতের আঁধারে সড়ক থেকে প্রায় ১৫ মাইল পূর্ব দিক দিয়ে পাহাড়ী রাস্তা ধরে ফৌজদারহাটের কিছুটা দক্ষিণে গিয়ে আবার সড়কে উঠবে এবং সেখানে রাস্তা বন্ধ করে অবস্থান গ্রহণ করবে এই ছিল তাদের প্রতি নির্দেশ।পাহাড়ের মধ্য দিয়ে অগ্রসরমান এই দলের মালামাল বহনের জন্য প্রায় ১২০০ বেসামরিক লোক জোগাড় করা হয়। প্রয়োজনীয় সব জিনিসই এই বাহিনীর সাথে থাকবে যাতে তারা অন্তত ৪দিন চলতে পারে। খাদ্যদ্রব্য, গোলাবারুদ, ট্যাংক বিধ্বংসী কামান, মর্টার, মাটি খননের সরঞ্জাম, রান্নার উনুন এবং অন্যান্য তৈজসপত্র এ দুটি ব্যাটালিয়নের জন্য যাকিছু প্রয়োজন সবই বহন করতে হবে। এছাড়া বেসামরিক লোক যারা যাবে তাদের খাদ্য এবং কিছু জ্বালানি কাঠও সঙ্গে থাকবে।

 

১৫ই ডিসেম্বর সন্ধ্যার কিছু আগেই ব্যাটালিয়ন দুটি পাহাড়ের ভেতর দিয়ে যাত্রা শুরু করে। স্থানীয় কিছু কিছু লোক আগে চলে যেতে থাকে গাইড হিসেবে। এই অভিযানের সাফল্যের উপরই চট্টগ্রামে আমাদের চূড়ান্ত লড়াইয়ের ফলাফল নির্ভর করছে।

 

ইতিমধ্যে আমার নির্দেশে মিরেরশ্বরাই এবংসীতাকুণ্ড এলাকায় প্রায় ২০০০ সৈন্য একত্র হয়ে কয়েকটি নির্ধারিত স্থানে অবস্থান গ্রহণ করে।যথাসময়ে তারাও লড়াইয়ে যোগ দেবে। শহর এলাকা সম্পর্কে ভালোভাবে জানে বলে রাস্তায় যুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে তারা খুব কাজে লাগবে।তাদেরকে একত্রিত করে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত রাখলাম।

 

ভাটিয়ারীতে ১৫ই ডিসেম্বর সন্ধ্যায় আমরা পাকিস্তানীদের প্রথম রক্ষাব্যূহের উপর আক্রমণ চালাই। দুটি কোম্পানীর এই আক্রমণ ওরা প্রতিহত করে দেয়, আমাদের পক্ষে হতাহত হয় ২ জন। ১৬ই ডিসেম্বর অগ্রবর্তী দলটি শত্রুর পেছনে ব্যারিকেড সৃষ্টি করার পরই আমাদের আসল আক্রমণ শুরু হবে। তাই আমরা পরেরদিন হামলা চালাবার জন্য ব্যাপক প্রস্তুতি শুরু করি।

ঢাকার অদূরে ভারতীয় জেঃ নাগরা যে দুজন অফিসার জেঃ নিয়াজীর কাছে পাঠিয়েছিলেন তার ২ ঘণ্টার পর ১১টার দিকে ফিরে আসে। তাদের জীপের পেছনে একখানি গাড়িতে করে আসেন পাকিস্তানের ৩৬ ডিভিশনের জেনারেল মোহাম্মদ জামসেদ। জেনারেল নিয়াজীর সরকারী প্রতিনিধি হিসেবে তিনি যৌথবাহিনীর কাছে আত্মসিয়মর্পণের প্রস্তাব নিয়ে আসেন।এরপর নাগরা এবং আরও কয়েকজন অফিসারকে জামসেদের হেডকোয়াটারে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখান থেকেতারা নিয়াজীর অফিসে যাওয়ার প্রাক্কালে কলকাতাস্থ ইস্টার্ন কমান্ডের হেডকোয়াটার এবং ৪র্থ কোরের হেডকোয়াটারের সর্বশেষ পরিস্থিতি সম্পর্কে যথারীতি খবর পাঠিয়ে দেন।এর আগে সকাল সাড়ে সাতটার দিকে নিয়াজী অয়ারলেসযোগে মানেকেশকে আত্মসমর্পণের মেয়াদ আরও ৬ঘণ্টা বাড়িয়ে দেয়ার অনুরোধ করেছিলেন। একই সঙ্গে তিনি আরো অনুরোধ করেন যে, আত্মসমর্পণের শর্তাবলী নির্ধারণ করার জন্য তিনি যেন একজন ভারতীয় সিনিয়র সামরিক অফিসারকে ঢাকা পাঠিয়ে দেন।

 

এতসব ঘটনা সম্পর্কে আমরা কিছুই জানতাম না। আমরা ভাটিয়ারীতে তখন যুদ্ধে লিপ্ত। আমদের অগ্রবর্তী দল সাফল্যের সঙ্গে পাহাড়ী পথ ধরে এগিয়ে যাচ্ছিলো। কথা ছিল ১৬ই ডিসেম্বর কোন একসময়ে তারা শত্রুর পেছনের দিকে রাস্তা বন্ধ করে অয়ারলেসযোগে সে খবর আমাদেরকে জানিয়ে দেবে। আমরা সবাই তাদের খবর শোনার জন্য রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করছিলাম।

 

নাগরার কাছ থেকে নিয়াজীর আত্মসমর্পণের কথা জানতে পেরে জেনারেল অরোরা তার চীফ অব স্টাফ মেজর জেনারেল জ্যাকবলকে বিমানযোগে ঢাকা পাঠিয়ে দেন। ততক্ষণ মিরপুর যৌথবাহিনী ব্রিজ পার হয়ে ঢাকায় প্রবেশ করতে শুরু করে। এসময়ে নগরীর রাস্তাঘাট ছিল জনমানবশূন্য।

 

মুক্তিবাহিনী এবং ভারতীয় সৈন্যদের রাজধানীতে প্রবেশের খবর দাবানলের মতো চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে। উল্লাসের জোয়ারে ঢাকার লক্ষ লক্ষ লোক নেমে আসে রাস্তায়। জনমানবহীন নিঃশব্দ নগরী মুহূর্তে ভরে উঠে মানুষের বিজয় উল্লাসে। ওরা এসেছে এই বাণী উচ্চারিত হতে থাকে মানুষের মুখে মুখে। আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে ধ্বনি উঠে জয় বাংলা। সে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। যৌথবাহিনীর জন্য মানুষ এগিয়ে আসে ফুলের ডালি হৃদয়ের গভীর আর ভালবাসা নিয়ে।

 

ঢাকায় সেদিন একদিকে চলছিল মানুষের বিজয় মিছিল। তারই পাশাপাশি ছিল পরাজিত পাকিস্তানীদের পলায়নের হাস্যকর দৃশ্য।কিন্ত মানুষ যে কত জিঘাংসা পরায়ণ হতে পারে পাকিস্তানীরা তার এক নতুন নজীর সৃষ্টি করেছিলো। পালিয়ে জাবার সেই মুহূর্তেও পাকিস্তানীরা বিভিন্ন নিরীহ মানুষের উপর এলোপাতাডি গুলি চালায়। ফলে বহু নিরীহ বাঙ্গালী হতাহত হন।

 

আত্মসমর্পণের একটা খসড়া দলিলসহ জেনারেল জ্যাকব বেলা ১টায় জেনারেল অরোরার হেডকোয়াটার থেকে ঢাকা এসে অবতরণ করলেন। বেলা ২টা ৫০ মিনিটে জেনারেল অরোরা তার সৈনিক জীবনের সবচাইতে আকাঙ্ক্ষিত বার্তা পেয়ে গেলেন। জীবনের খুব কম সংখ্যক সেনানায়কই এমন বার্তা পেয়েছেন। বার্তাটি ছিল, নিয়াজীতার সেনাবাহিনীর সকলকে নিয়ে আত্মসমর্পণে রাজী হয়েছেন এবং আত্মসমর্পণ দলিলেও স্বাক্ষর করেছেন।পশ্চিম সেক্টরে পাকিস্তানী ৯ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল আনসারীর আত্মসমর্পণ পর্ব ততক্ষণে সাঙ্গ হয়েছে। বিকাল ৩টার মধ্যে মুক্তিবাহিনীর শত শত তরুণ এবং ভারতীয় সেনাবাহিনীর একটি বিগ্রেড বিজয়ীর বেশে রাজধানী ঢাকায় প্রবেশ করে। আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানের জন্য জেনারেল অরোরা তার বিমানও নৌবাহিনীর চীফ অব স্টাফকে নিয়ে একটু পরেই ঢাকায় অবতরণ করলেন।

 

আমার বিশ্বস্ত জেসিও সুবেদার আজিজ এবং ১৫ বছরের এক কিশোর মুক্তিযোদ্ধা এতসব ঘটনার কিছুই অবহিত ছিল না।পাকিস্তানীদের একটি খালের অপর পাড়ে হঠিয়ে পুনরায় আক্রমণ পরিচালনার জন্য অবস্থান গ্রহণ করছিলো। অল্প বয়স্ক ছেলেটি কাছেরই এক গ্রামের। তাঁর গ্রাম আগেই শত্রুমুক্ত হয়েছে। মা-বাবার সাথে দেখা করার জন্য ১৫ই ডিসেম্বর তাকে ১২ ঘণ্টার জন্য ছুটি দিয়েছিলাম। কিন্ত সে প্রত্যয়দৃপ্ত কণ্ঠে জবাব দিয়েছিলো, না স্যার। চট্টগ্রাম মুক্ত করার পরই আমি বাড়ি ফিরবো। কয়েকদিন বা আর লাগবে। আত্মসমর্পণের জন্য জেনারেল নিয়াজীর নির্দেশ তখনো তার সকল সেনাদলের কাছে পৌঁছেনি। আমরা জানতাম না যে, বেলা ৪টা৩১মিনিটে ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান)আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠান সমাপ্ত হচ্ছে।

 

চট্টগ্রাম শহর থেকে মাত্র ৬মাইল দূরে মহাসড়কের উপর ভাটিয়ারী দখলের জন্য আমরা তখন লড়াই করছি। আক্রমণ চালাচ্ছে মুক্তিবাহিনীর একটি কোম্পানী। ঘড়িতে তখন বেলা ৪টা ৩০মিনিট। ঢাকা এবং অন্যান্য জায়গায় অস্ত্রের গর্জন থেমে গেছে। নিয়াজী এবং অরোরা হয়তো কলম হাতে নিয়ে আত্মসমর্পণের চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করছেন। নিয়তির নির্মম পরিহাস। ঠিক সেই মুহূর্তে ঢাকা থেকে ১৬০ মাইল দূরে পাকিস্তানীদের একটি কামানের গোলা আমার অধীনস্থ মুক্তিযোদ্ধা এই কোম্পানীর মাঝখানে এসে পড়লো। সুবেদার আজিজ এবং ১৫ বছরের সেই ছেলেটি দুজনে গোলার আঘাতে আহত হলো। আস্তে আস্তে পশ্চিম আকাশে সূর্য ডুবে গেলো, সেই সাথে বাতাসে মিলিয়ে গেলো তাদের শেষ নিঃশ্বাস। তখন সন্ধ্যার অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে ধীরে, ধীরে। একজন পাকিস্তানী মেজর ভাটিয়ারীর ভাঙ্গা ব্রিজের মুখে এসে দাঁড়ালো। হাতে তার সাদা পতাকা। তারা নিয়াজীর নির্দেশ পেয়ে গেছে, এখন আত্মসমর্পণ করতে চায়।

 

 

 

পরিশেষ

 

রণাঙ্গনে এবার নেমে আসে প্রশান্ত নীরবতা।

 

রাইফেল, মেশিনগান, মর্টার,কামানের গোলাগুলির শব্দ থেমে যায়।থেমে যায় আহতের কান্না,মুমূর্ষের করুণ আর্তনাদ।নতুন এক রাত্রির প্রহর আসে কোন এক হারানো অতীতের স্বপ্ন নিয়ে। এমনি সুন্দরের স্বপ্নে আহবান কাল ধরে মানুষের সংগ্রাম চলেছে।

 

ভাটিয়ারীতে মহাসড়কের উপর সেতুটি পাকিস্তানীরা ধ্বংস করে দিয়েছিলো। হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধা আর স্বেচ্ছাসেবক ১৬ই ডিসেম্বর সারারাত ধরে কাজ করলো ভাটিয়ারীর খালের মধ্যদিয়ে একটা বিকল্প রাস্তা তৈরি করতে। রাতেই আমরা সমস্ত সৈন্য এবং গেরিলাদের চট্টগ্রাম শহরে এবং চট্টগ্রামও পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্যান্য এলাকা নিয়ন্ত্রণ ভার গ্রহণ করার দায়িত্ব বুঝিয়ে দেই। ফেনীর অংশবিশেষ সহ শুভপুর পর্যন্ত এলাকার নিয়ন্ত্রণভার আমরা আগেই নিয়েছিলাম। আমার সম্পূর্ণ বাহিনীকে পরদিন খুব সকাল বেলায়ই চট্টগ্রাম শহরে প্রবেশ করে গুরুত্বপূর্ণ স্থানসমূহের নিয়ন্ত্রণভার গ্রহণের নির্দেশ দিলাম। একটি ব্যাটালিয়নকে অবশ্য রাতেই খাল পার হয়ে শহরের অভিমুখে যতদূর সম্ভব এগিয়ে অবস্থান গ্রহণ করতে পাঠিয়ে দেই।

 

শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত সার্কিট হাউসকে আমরা হেডকোয়াটার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। পাকিস্তানী সৈন্যদের নির্দেশ দেয়া হলো পোর্ট এলাকায় নৌবাহিনীর হেডকোয়াটার এবং চট্টগ্রাম ক্যান্টমেন্টে আত্মসমর্পণের জন্য জমায়েত হতে। পাকিস্তানী বন্দীদের দায়িত্ব ভারতীয় সেনাবাহিনীর ন্যস্ত হয়। চট্টগ্রামে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর ১৬১ জন অফিসার, ৩০৫ জন জেসিও এবং নৌও বিমানবাহিনীর সমপর্যায়ের লোক এবন তিন বাহিনীর ৮৬১৮ জন্য সৈন্য আত্মসমর্পণ করে।

 

১৭ই ডিসেম্বর ভোর পর্যন্ত বিকল্প রাস্তার কাজ সম্পন্ন হলো না। ফলে তখন পর্যন্ত সে স্থান দিয়ে গাড়ী পার করাও সম্ভব ছিল না। আমি পুলের এপারে গাড়ী থেকে নেমে পড়লাম একটি ছোট প্যাকেট হাতে নিয়ে। তারপর একটি লাঠিতে ভর দিয়ে খাল পার হয়ে ওপারে গিয়ে উঠলাম। দুদিন আগে কুমিরার যুদ্ধে আহত হওয়ায় আমাকে লাঠিতে ভর দিয়ে বেশ খুঁড়িয়ে চলতে হচ্ছিলো।

 

পাকিস্তানীদের আত্মসমর্পণের ব্যাপারে লোকজন তখনও পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পারেনি। তা সত্ত্বেও কিছু লোক আমাদের এগিয়ে নেয়ার জন্য ভাটিয়ারীর ভাঙ্গা সেতু পর্যন্ত এগিয়ে এসেছিলো। আমি আমার এক বন্ধুর গাড়ীতে উঠে বসলাম। গাড়ী সোজা ছুটে চলল সোজা সার্কিট হাউসের দিকে।

 

অগণিত নারীপুরুষ রাস্তায় বেরিয়ে পড়েছে। পথের দুই দাঁড়িয়ে তারা হাত তুলে যৌথবাহিনীর সৈন্য এবং মুক্তিযোদ্ধাদের অভিনন্দন জানাচ্ছিল।জয় বাংলা ধ্বনিতে আকাশ বাতাস মুখরিত হয়ে উঠে। কেউ কেউ বোধহয় তখনও পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারেননি সত্যিই যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে। ভয়ে ভয়ে বাড়ির ভেতর থেকে উঁকি দিয়ে তারা সেই অবিশ্বাস্য দৃশ্য দেখছিল। পাকিস্তানিদের তখন অস্ত্র সংবরণের পালা। বাস ও ট্রাকে করে তারা দ্রুত ছুটে পালাচ্ছিল নৌবাহিনীর হেড কোয়াটার এবং ক্যান্টমেন্টের দিকে।

 

সার্কিট হাউসে তখন বহু লোক জমা হয়ে গেছে। জনতার ভিড় ঠেলে আমি এগিয়ে যাই। যুদ্ধের এই কয়মাসে আবার দাঁড়ি বেশ বড় হয়ে যাওয়ায় অনেক বন্ধু এবং পরিচিত জনি আমাকে চিনতে পারলো না।

 

এমনি এক সুন্দর মুহূর্তের জন্য সযত্নে এই প্যাকেটটি সাথে রেখেছি দীর্ঘ নয়মাস। এবার ওটাকে খুলে ফেললাম। সুন্দর করে ভাঁজ করা বাংলাদেশের পতাকাটি একটি কিশোর ছেলের হাতে দিয়ে তাকে পাঠিয়ে দিলাম সার্কিট হাউসের ছাদে। সেখানে তখনও পাকিস্তানী পতাকা উড়ছিলো। ছেলেটি পাকিস্তানের পতাকা নামিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দেয় নিচে। সেখানে ওড়ানো হয় স্বাধীন বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতার প্রতীক জাতীয় পতাকা।সে সময় হাজার হাজার মানুষ দৌড়ে আসছে সার্কিট হাউসের দিকে। সমস্ত এলাকা ভরে গেছে মানুষের ভিড়ে।পতাকা উত্তোলনের সময় মুহূর্তের জন্য নিস্তব্ধ হয় উত্তাল জনসমুদ্র সেই অবিস্মরণীয় সেই ঐতিহাসিক ঘটনা প্রত্যক্ষ করার জন্য। তারপর বাতাসে দোলা লাগে, উড়তে থাকে নতুন পতাকা। নিস্তব্ধ জনতা উদ্বেলিত হয়ে উঠে। আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে সেই জন সমুদ্রে উঠে জয়ধ্বনি জয় বাংলা।

 

পাকিস্তানীদের হাতে বন্দী ধ্বংসের পথযাত্রী একটা জাতি পেয়ে গেলো স্বাধীনতা। দুঃস্বপ্নের রাতের শেষে সেই পতাকার রক্তিম সূর্য বাংলার মানুষের জন্য নিয়ে এলো নতুন আশার বাণী। সমস্ত পৃথিবীতে সে বিজয়ের বার্তা পৌঁছে দিতে যেন মানুষ একযোগে মুহুর্মুহু ধ্বনি দিতে থাকে জয় বাংলা। খুলে গেলো সমস্ত আবদ্ধ দুয়ার। বাঁধভাঙ্গা স্রোতের মতো বেরিয়ে আসে সকল মানুষ। দীর্ঘদিনের দুঃসহ যন্ত্রণা শেষে তারা উপভোগ করতে চাইলো উষ্ণ সূর্যালোক, মুক্ত বাতাস, সুন্দর সম্ভবনাময় নতুন স্বাধীনতা। ভয়াবহ গণহত্যার মধ্য দিয়ে তারা বেঁচে থেকে স্বাধীনতার আনন্দ উপভোগ করতে পারছে একথা কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছিলো না। তবুও সেই সব মানুষ বেঁচে আছে। মেঘমুক্ত নীল আকাশের নিচে সোনালী সূর্যের আলোকে মানুষ চেয়ে থাকে নতুন পতাকার দিকে। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের পতাকাকে অভিবাদন জানিয়ে আমি নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইলাম কিছুক্ষণের জন্য, অবাক বিস্ময়ে। ভুলে গেলাম আমার চারপাশের উত্তাল জনসমদ্রের কথা।তখন ৯টা ১৫ মিনিট, ১৭ই ডিসেম্বর ১৯৭১ সাল।

 

কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রায় প্রতিটি ঘরে বিভিন্ন আকারের নতুন জাতীয় পতাকা শোভা পেতে লাগলো। শুধু ঘরের ছাদই নয়, গাছপালা, লাইটপোস্ট, দোকানপাট যেখানেই সম্ভব সেখানে মানুষ উড়ালো নতুন পতাকা। উৎসবের সাড়া পড়ে গেলো সমস্ত শহরে। যুদ্ধের নয়মাস এমনি একটা সুন্দর মুহূর্তের জন্যপ্রতিটি বাঙ্গালীর ঘরে লুকিয়ে রাখা হয়েছিলো বাংলাদেশের পতাকা। ধরা পড়ে অনেকে আবার পাকিস্তানীদের হাতে নির্মমভাবে নিহত হয়েছে।

 

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর পৃথিবীর সবচাইতে বেদনাময় ঘটনার পরিসমাপ্তি ঘটে হয়তো সাময়িকভাবে। এই নিষ্ঠুর ঘটনা ছিল অবিশ্বাস্য, আর তাই হয়তো এখানে কান্নার ভাষা হারিয়ে গিয়েছিলো। বিকৃত বিকারগ্রস্ত, রক্তলিপ্সু পাকিস্তানীরা নিরীহ নারীপুরুষ এবং শিশুহত্যার নৃশংসতায় হিটলারের নাৎসী বাহিনীকেও হার মানিয়েছে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে জার্মানির পক্ষ অবলম্বনকারী দুটি সরকার ছাড়া আর সমস্ত পৃথিবীর সরকার একযোগে রুখে দাঁড়িয়েছিলো হিটলারের গণহত্যার বিরুদ্ধে। অথচ, বাংলাদেশে পাকিস্তানীরা যখন গণহত্যা চালালো তখন এইসব সরকারের কয়েকটি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে না গিয়ে বরং ইয়াহিয়াকে গণহত্যায় সহায়তা করলো। একটা কঠিন সত্য পৃথিবীর মানুষের কাছে সুস্পষ্ট হয়ে উঠলো যে, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর ক্রমান্বয়ে বিশ্ব নেতৃবৃন্দের অনেকেরই নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটেছে। তাদের মুখে মানবতার বুলি আসলে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

 

বিজয়ের মধ্য দিয়ে নয় মাসের দুঃস্বপ্নের অবসান ঘটলো। বাংলার মানুষ আবার তাঁর ভাগ্য নিয়ন্ত্রনের অধিকার অর্জন করলো। পথে-প্রান্তরে পর্বতাঞ্চলে নদনদী খালে বিলে বাংলার প্রতিটি অঞ্চলে বাঙ্গালী আবার নির্ভয়ে ঘুরে বেড়াতে পারবে। ছায়ার মতো অনুসারী মৃত্যুর ভয়ে আর ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে থাকতে হবেনা আর। রাতের অন্ধকারে প্রতিটি অচেনা শব্দ মৃত্যুর অশুভ পদধ্বনি আসবে না। চারদিকে আনন্দ আর উল্লাসের ঢেউ। ২৫ মার্চের সে ভয়াবহ রাতের পর এই প্রথম মহিলারা নির্ভয়ে বেরুতে পারলো। ঘরের বাইরে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা দলবেঁধে ছুটে চলেছে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে।মার্চ করে চলেছে মুক্তিবাহিনী। পথের দুই পাশের উচ্ছ্বসিত জনতা তাদের জানাচ্ছে প্রাণঢালা অভিনন্দন।সুখী মানুষের আনন্দ কোলাহলের এক অভূতপূর্ব সমাবেশ।মুক্তিযোদ্ধাদের ফুলের মালা পরিয়ে দিচ্ছে কেউ কেউ। অনেকে গাইছে গান।নির্মল হাসিতে যেন সমস্ত মানুষের রূপ উদ্ভাসিত। কারো চোখে ছিল সুখের অশ্রুজল। একজন আনন্দের আতিশয্যে বাঁধ ভাঙ্গা চোখের জল সামলাতে গিয়ে শাড়ীর আঁচল কামড়ে রেখেছেন দৃঢ়ভাবে। কাছে কোথাও মাইকে বাজছিল অতিপ্রিয় সেই গান ‘’ মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি।‘’ এমনি অনেক ফুলের মতো জীবনকে হয়তো আমরা যুদ্ধ করে বাঁচাতে পেরেছি। আবার অনেককেই বাঁচাতে পারিনি। আমার মনে হলো সেইসব শহীদের কথা, যারা নিজদেশে বন্দীর মতো জীবনযাপন করছিলো। পাকিস্তানীরা এদেশকে পরিণত করেছিলো বন্দীশালায়। যেখানে তারা মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেছিল সাড়ে সাত কোটি মানুষকে। সেই বন্দীশালায় পাকিস্তানীদের হাতে নির্মমভাবে নিহত অসংখ্য মানুষের ত্যাগ আর গভীর জীবনবেদনা ছিল এত মহান যে শ্রদ্ধায় নত হয়ে আমি অনুচ্চ স্বরে বললামঃ

 

‘’…… এবং শান্তি আর যুদ্ধ নয়-

তোমাদের বিদেহী আত্মার জন্য

চাই শুধু শান্তি যুদ্ধ নয়।

এই বন্দীশালা, এখানেই ছিল

তোমাদের তীর্থের জীবন।‘’

 

ইতিহাসে এই মর্মান্তিক নাটকের যবনিকাপাত সে কি বিজয়ের আনন্দে উদ্ভাসিত নাকি শোকের বেদনায় আপ্লুত? অথবা সেখানে ঘটেছে বিজয় আর বেদনার অপূর্ব সংমিশ্রণ? এই নির্মমও অচিন্তনীয় গণহত্যাকে কি পৃথিবীর মানুষ পৃথিবীর ইতিহাস বদলের অমোঘ বিধান বলেই সমস্ত দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে পারবে?

 

সার্কিট হাউসের সামনে সবুজলনে দাঁড়িয়ে আমি ভাবছিলাম সেই বিষাদময় সমস্ত ঘটনার কথা। যুদ্ধের নয়মাসের শহীদের কথা আবার মনে পড়লো। পাকিস্তানীরা এদের হত্যা করলো গ্রামে গঞ্জে, নগরে-বন্দরে, শহরে- মসজিদ –মন্দিরে।অনেকেই ধরে নিয়েছিলো আরো নিষ্ঠুরভাবে অশেষ যন্ত্রণা দিয়ে হত্যা করার জন্য। বাংলার এই অসহায় মানুষগুলো আর কোনদিনই ফিরে আসবেনা। কিন্ত পাকিস্তানীরা যখনই এদেরকে বেঁধে নিয়ে যেতো হত্যা করার উদ্দেশ্যে সেই মুহূর্তে এইসব অসহায় মানুষ কি ভাবতো কে জানে? তাঁদের আপনজনই বা কি গভীর মর্মবেদনায় ভেঙ্গে পড়তো চিরবিদায়ের সেই মুহূর্তে? এইসব মানুষকে যখন পাকিস্তানীরা লাইনে দাঁড়িয়ে হত্যা করতো, রাস্তায় টেনে নিয়ে যেতো জীপের নিচে বেঁধে বেয়োনেট আর রাইফেলের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত করে ফেলতো তখন মৃত্যুপথ যাত্রী সেই সব মানুষ কি ভাবতো আমরা কোনদিন তা জানবো না। নিষ্পাপ শিশু, অবলা নারী অসহায় বৃদ্ধ কেউই সেদিন রক্ষা পায়নি পাকিস্তানীদের হাত থেকে।

 

সেই সব প্রাণের বিনিময়ে আজ আমরা স্বাধীন। আমার চিন্তায় বাধা পড়লো। একজন বৃদ্ধ এগিয়ে এলেন আমার দিকে। যুদ্ধে তাঁর ছেলে হারিয়ে গেছে চিরদিনের জন্য। মুখে তার হাসি নেই, নেই অশ্রুজল। তিনি শান্ত, অতিশান্ত। আমাকে জড়িয়ে ধরে তিনি গভীর প্রশান্তিতে চোখ বুজে রইলেন কিছুক্ষণ।

মানব হৃদয়ের সেই অব্যক্ত বেদনা কেউ কোন দিন বুঝতে পারবে না।

 

*একাত্তরের মার্চে রফিক-উল-ইসলাম সাবেক ইপিআর সেক্টর হেডকোয়ার্টার, চট্টগ্রামে ক্যাপ্টেন পদে সেক্টর এডজুট্যেন্টের দায়িত্বপালন করছিলেন।

 


 

ডাঃ মোঃ রাজিবুল বারী (পলাশ)

<১০, ১.২ ৪৩-৫৮>

অনুবাদ

১ নম্বর সেক্টরের কতিপয় গেরিলা অপারেশন

 

সবগুলো সেক্টরে সঙ্ঘটিত অসংখ্য রেইড, অ্যামবুশ আর আক্রমণের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি এখানে উল্লেখ করা হয়েছে। এই ঘটনাসমূহে যুদ্ধের প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে একটি ধারণা পাওয়া যায় এবং অনভিজ্ঞ মুক্তিযোদ্ধারা কিভাবে ধীরে ধীরে সারা দেশে ক্রমাগত পাকিস্তানিদের সাথে লড়াই করে দক্ষ ও অভিজ্ঞ সামরিক শক্তিতে পরিণত হল সেটাও জানা যাবে।

 

১নং সেক্টরঃ মে মাসের প্রথম সপ্তাহে কয়েকটি ছোট গেরিলা দল গঠন করা হয়। এখানে ৩ থেকে ৫ জন ছাত্র ছিল। এরা হ্যান্ড গ্রেনেড এবং হাল্কা অস্ত্রে ট্রেনিং প্রাপ্ত ছিল। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল পাকিস্তানি সেনা আর রাজাকারদের হত্যা করা। বাইশনাপুর এলাকায় ৪ জুন বিকেলে ১ নং সেক্টরের প্রথম ট্রেনিংপ্রাপ্ত গেরিলা পাঠানো হয়। জুন মাসের ১০ তারিখে একটি পেট্রল বাহিনী রামগড়-কারেরহাট রাস্তার নিকটে হাইকুতে এম্বুশ পাতে। পারস্পরিক যুদ্ধে ৪ জন পাকসেনা নিহত হয়। কোন ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই আমাদের সৈন্যরা ফিরে আসে।

 

উল্লেখ্য কারেরহাট থেকে রামগড় পর্যন্ত ১৫ কিলোমিটার রাস্তার এলাকাটি পাহাড়ি ও জঙ্গলে পরিপূর্ণ ছিল। লোকজনের বসবাস তেমন ছিলোনা। গেরিলাদের লুকিয়ে থাকার জন্য এটা ছিল মোক্ষম এলাকা। এই রাস্তায় অনেকগুলো আক্রমণ সঙ্ঘটিত হয়েছে। কারেরহাট, হাইকু আর রামগড়ে পাকিস্তানিদের শক্ত ঘাটি ছিল। এরা ৫০ মাইল দূরে চট্টগ্রাম পর্যন্ত তাদের দখল বজায় রেখেছিল। যুদ্ধের পুরোটা সময়ে এই ৩ টি সেন্টার নিজেরা সমন্বয় করে চলত। সবসময় যথেষ্ট পাহারা ছিল এখানে। পর্যাপ্ত অস্ত্র, এম্যুনিশন, জালানি, রেশন, সৈন্য সরবরাহ এবং আহতদের নেবার জন্য এটি ব্যাবহ্রিত হত। তাই শেষের দিকে এখানে পাকিস্তানিরা কিছু রিজার্ভ সৈন্য, এম্যুনিশন এবং রেশনের ব্যাবস্থা করে রাখে। যুদ্ধ পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে থাকায় এবং হতাহতের সংখ্যা বাড়তে থাকায় এই রাস্তাটি খুবই ব্যাস্ত হয়ে পড়ে।

 

জুনের দিকে আমাদের নিয়মিত বাহিনী ও গেরিলারা আরও দক্ষতার সাথে পাকিস্তানি সৈন্যদের সাথে মোকাবিলা করা শুরু করে।

 

১ নম্বর সেক্টরের ৪০০ মাইলের মধ্যে সম্মুখভাগে ছিল ৫০ মাইলের মতন। গেরিলা অপারেশন ঠিক মত চালানোর জন্য এটাকে ৫ ভাগে বিভক্ত করা হয়। প্রতিটি সাব-সেক্টরেই যুদ্ধকালীন সময়ে প্রচুর আক্রমণ সঙ্ঘটিত হয়েছে। পাশাপাশি সুদক্ষ গেরিলা বাহিনী সর্বদাই আক্রমণ ও এম্বুশের মাধ্যমে পাকিস্তানি সৈন্যদের ব্যাতিব্যাস্ত রেখেছে।

 

জুনের ২১ তারিখ ১০ জন গেরিলা রাতের অন্ধকারে শ্রীনগর এলাকায় পাকবাহিনীর উপর আক্রমণ চালায়। প্রথমে পুরো এলাকাটি রেকু করা হয় এবং আটোমেটিক ও সেমিঅটোমেটিক অস্ত্রের অবস্থান নির্নয় করা হয়। ৭৫ মি মি রকেট লাঞ্চার দিয়ে গেরিলারা খুব সহজেই শত্রুদের নিষ্ক্রিয় করে। এর পর তারা গ্রেনেড দিয়ে কয়েকটি বাঙ্কার এবং ২ টি যানবাহন ধ্বংস করে। পাকিস্তানিরা এলোমেলো গুলি চালাতে থাকে গেরিলাদের ভড়কে দেবার উদ্যেশ্যে। ১ ঘণ্টার মত যুদ্ধ চলে। এতে ২টি যানবাহন ধ্বংস হয় এবং ৫ জন পাকসেনা গুরুতর আহত হয়।

 

জুনের ২৩ তারিখ হাইকুর কাছে আরেকটি এম্বুশ করা হয়। রামগড়ের দিকে যাত্রাপথে একটি রেশনবাহী কনভয় এম্বুশে আক্রান্ত হয়। রাস্তার পাশে উঁচু স্থানে ঘন জঙ্গলে গেরিলারা অবস্থান নেয়। রকেট লাঞ্চার ও এল এম জি দিয়ে কনভয়টি আক্রমণ করা হয়। একটি মাইক্রবাস ধ্বংস হয়। ১ জন অফিসার ও ৩ জন পাকিস্তানি সৈন্য নিহত হয়, ২ জন গুরুতর জখম হয়। পাকিস্তানিরা এখানে এম্বুশ আক্রন্ত হবার ব্যাপারে আগে থেকে সতর্ক ছিল। ফলে তারা রাস্তার উল্টো পাশে জঙ্গলে গা ঢাকা দেয়। ইতোমধ্যে পার্শ্ববর্তী হাইকু থেকে আরও সৈন্য চলে আসে এবং যুদ্ধে অংশ নেয়। কিন্তু ততোক্ষণে আমাদের এম্বুশ পার্টি জঙ্গলের ভিতর দিয়ে ঘাঁটিতে ফিরে যায়।

 

জুলাইয়ের ১ তারিখ ক্যাপ্টেন সামসুল হুদার নেতৃত্বে আমি এক প্লাটুন সৈন্য দেবীপুর ঘাঁটি আক্রমণের জন্য পাঠাই। সেটি সফল হয়েছিল। আমাদের সৈন্যরা এক বাঙ্কার থেকে পণ্য বাঙ্কারে যাচ্ছিল – আর তার ভেতরে হ্যান্ড গ্রেনেড মেরে ভেতরে থাকা সৈন্য ও সাবমেশিনগান উড়িয়ে দিচ্ছিল। মিশন শেষ করে গেরিলারা ঘাঁটিতে ফিরে আসে। আমাদের সিপাহি ফজলুর রহমান, হাবিলদার আবুল হোসেন এবং তোহা মিয়া সাহসিকতার সাথে লড়াই করেন এবং শহিদ হন। ৬ জন পাকসেনা নিহত ও ১২ জন আহত হয়।

জুলাইয়ের ৩ তারিখ দুপুরে রামগড়-কারেরহাট রোডে চিকনছাড়া পয়েন্টে পাকসেনাবাহি একটি মাইক্রোবাস আমাদের এম্বুশের শিকার হয়। এতে ক্যাপ্টেন ও ৪ জন পাকসেনা নিহত হয়। এই পথে আমরা অসংখ্য অপারেশন চালাই এবং বেশ কয়েকজন পাকসেনা নিহত হয়। ফলে তারা এই পথে তাদের চলাচল বন্ধ করে দ্যায়, দিনের বেলাও কমিয়ে দ্যায়।

 

জুলাইয়ের ১১ তারিখ গেরিলারা মিরসরাইয়ে হানাপনি ব্রিজটি উড়িয়ে দ্যায়। জুলাই ১৫ তারিখ সুবেদার রহম আলি সহ ২০ জনের মত বেগম বাজার ও রামগড়ের মাঝামাঝি এম্বুশ পাতেন। রেশন ও গোলাবারুদ বাহী একটি কনভয় এর শিকার হয়। গুলি শুরু হওয়া মাত্র পাকসেনারা বিচলিত হয়ে যায় এবং দৌড়ে পালায়। ৬ জন পাকসেনা নিহত হয় এবং বেশ কিছু আহত হয়।

 

বিওপি এবং শত্রু কবলিত অপারেশনগুলো প্রায় একই রকম। আমাদের বাহিনী আগে রেকু করে পাকিস্তানিদের এলএমজি ও মেশিনগানের অবস্থানগুলো চিহ্নিত করত। এরপর ১০ থেকে ১৫ জনের কয়েকটি দল আলাদা আলাদাভাবে সেগুলোতে আক্রমণ করত। কিছু গেরিলারাও প্রস্তুত থাকত নতুন শত্রুসমাবেশ ঠেকাতে। এছাড়া যুদ্ধ শেষে আমাদের সৈন্যদের নিরাপদে ফিরে যেতেও গেরিলারা সাহায্য করত। বাকি গেরিলারা বাঙ্কার ধ্বংস করার জন্য আক্রমণ চালাত। সময় ও সুযোগ হলে তারা আরও বাঙ্ককার ও গুরুত্তপূর্ণ পয়েন্টে আক্রমণ করত, কার্বাইন ফায়ার ও হ্যান্ড গ্রেনেড ও ব্যাবহার করত। উদ্দেশ্য ছিল পাকসেনাদের অস্থির করে তোলা এবং নিজেদের ক্ষতি না করে শত্রুদের যতোখানি ক্ষয়ক্ষতি করা যায়। দীর্ঘক্ষন ধরে লড়াই চালানোর মত সময় আমরা নিতাম না এবং আমাদের এত গোলাবারুদ ও ছিলোনা। তাই আমরা ক্রমাগত সম্মুখ ও অ্যামবুশ আক্রমণ চালিয়ে পাকসেনাদের ব্যাতিব্যাস্ত ও ছত্রভঙ্গ করে দিতাম। এতে পাকসেনাদের মনোবল পুরো ধ্বংস হয়ে যেত এবং বাংলাদেশে যুদ্ধের বুহুরুপের আকস্মিকতায় ভবিষ্যতের যে কোন আক্রমণে তারা আগেই ভিত হয়ে পড়ত।

 

জুলাই ১৬ তারিখ গুথুমা বিওপি তে আক্রমণ চালানো হয়। ৩ জন পাকসেনা গুরুতর আহত হয়। গেরিলারা নিরাপদে ফিরে আসে।

 

জুলাই ১৯ তারিখ আমরা কারিয়াবাজারে পাকসেনাদের আক্রমণ করি। আমাদের কাছে তথ্য আসে যে পাঞ্জাব রেজিমেন্টের একজন পাকিস্তানি মেজরের নেতৃত্বে একটি দল ভারতে যাবার পথে প্রায় ২০০ বাঙ্গালীকে বন্দী করে। এদের ভিতরে অনেক মহিলাকে তারা নির্যাতন করে। তাই বন্দীদেরকে মুক্ত করার উদ্দ্যেশে আমরা আক্রমণের প্ল্যান করি। রাত ১টা ৩০ মিনিটের দিকে ৪৫জনের একটি গ্রুপ ২ইঞ্চি মর্টার, রকেট লাঞ্চার, এলএমজি এবং রাইফেল নিয়ে কারিয়াবাজার হাই স্কুলে অবস্থিত মেজর ও পাঞ্জাব বাহিনীর উপর আক্রমণ করে। পার্শ্ববর্তী কয়েকটি দোকান ও ঘরে বন্দীদের রাখা ছিল। আক্রমণের শুরুতেই আমাদের বাহিনী এলএমজি দিয়ে পাকসেনাদের স্কুল ঘরের ভেতরেই থাকতে বাধ্য করে। অন্যদিকে গেরিলারা চিৎকার করে বন্দীদের পালিয়ে যেতে বলে এবং নিরাপদে পালিয়ে যেতে সাহায্য করে। অন্ধকারের সহায়তায় ১৫০ জন বন্দী পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। এরপর ভারি মর্টার এবং রকেট লাঞ্চারের আক্রমণ চলে প্রায় ৩০ মিনিট। ১৮ জন পাকসেনা নিহত হয়। আমাদের দিকে কোন ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।

 

জুলাই ২৩ তারিখে মুক্তিযোদ্ধারা বরতারিকা এবং মিরসরাইয়ের মাঝখানে রেলপথে মাইন সেট করে। একটি ট্রেন যাবার সময় সেটি বিস্ফোরিত হয়। একটি ইঞ্জিন ও কেবিন বিধ্বস্ত হয় এবং কিছু সময়ের জন্য রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়।

 

হাইকুতে পাকিস্তানী অবস্থানের উপর আরেকটি আক্রমণ সঙ্ঘটিত হয়। জায়গাটা মিলিটারি যানবাহনের জন্য পার্কিং হিসাবে ব্যাবহার হচ্ছিল। জুলাই ২৭ তারিখে সন্ধ্যা ৪টার দিকে আমরা মর্টার ও রকেট লাঞ্চার দিয়ে আক্রমণ চালাই। পাকসেনারা এতে খুবই অবাক হয়। ১৫ মিনিটের আক্রমণে পার্কিং এলাকা পুরোপুরি ধ্বংস হয়। ৪ জন পাকসেনা নিহত হয় এবং অসংখ্য সেনা আহত হয়। অনেকগুলো গাড়িতে আগুণ লেগে যায় এবং অনেক রাত পর্যন্ত সেগুলো জ্বলতে থাকে।

 

আগস্টের ৩ তারিখ গ্রুপ ক্যাপ্টেন খোন্দকার এবং কর্নেল রব এইচকিউ বাংলাদেশ ফোর্স ১ নম্বর সেক্টরে আসেন। তারা গেরিলাদের সাথে সমন্বয় এবং পাকসেনাদের বিরুদ্ধে অপারেশনের ব্যাপারে আলোচনা করেন। জুলাই ১০ তারিখে কলিকাতায় সেক্টর কমান্ডারদের মিটিংএর সিদ্ধান্ত মোতাবেক এই কো-অর্ডিনেশন সম্পন্ন করা হয়।

 

মিটিং এর সিদ্ধান্ত মোতাবেক পাকসেনাদের গেরিলা আক্রমণের পরিকল্পনা করা হয়। হাজার হাজার সমর্থ লোকজন স্বেচ্ছায় মুক্তিযুদ্ধে যোগ দ্যায়। বর্ডার এলাকা দিয়ে নতুন নতুন অনেক ট্রেনিং সেন্টার গড়ে ওঠে। নিয়মিত বিরতিতে আমরা শত শত ট্রেনিংপ্রাপ্ত ছেলেদের পাচ্ছিলাম। ট্রেনিং প্রাপ্ত ছেলেরা সব সময় সম্মুখযুদ্ধে যেতে চাইত। পাকসেনাদের ক্রমাগত পরাজয়ে গেরিলা এবং স্থানীয় জনগণের মনোবল অনেক বৃদ্ধি পেল। তারা দুঃসাহসী ও ভয়ানক আক্রমণে গেরিলাদের সাহায্য করত। বেশী ঝুকিপূর্ন অপারেশনের দায়িত্ব পেলে তারা গর্ববোধ করত।

 

আগস্ট ৯ তারিখে আমাদের সৈন্যরা আন্দারমানিক বিওপি তে আক্রমণ চালায়। প্রায় ১ ঘণ্টা ধরে এই আক্রমণ চলে। নায়েক হারিছ মিয়া নেতৃত্ব নিয়ে অসীম সাহসের সাথে আক্রমণ চালান। কার্বাইন থেকে গুলি করতে করতে আর গ্রেনেড নিক্ষেপ করতে করতে তিনি এক বাঙ্কার থেকে অন্য বাঙ্কারে ছুটে যাচ্ছিলেন আর একাই পাকিস্তানীদের যথেষ্ট ক্ষতিসাধন করছিলেন। পাকিস্তানীরা কোন প্রতিরোধ করতে পারছিলনা এবং যুদ্ধে শেষে আমাদের সৈন্যরা তাদের প্রচুর হতাহত করে নিরাপদে ফিরে আসে।

 

জরাল্গঞ্জের নিকট পাতাকোর্টের কাছে আগস্টের ১০ তারিখ পাকসেনাদের একটি কোম্পানি আর রাজাকার মিলে একটি অ্যামবুশ পাতে। মহিউদ্দিনের নেতৃত্বে ২০ জন গেরিলাদের একটি দল এদের সাথে যুদ্ধে একজন পাকসেনা নিহত, ২জন আহত ও ৩ জন রাজাকারকে আহত করে। পড়ে গেরিলারা নিরাপদে পালিয়ে যায়।

 

১৪ই আগস্ট ছিল পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস এবং এই দিনে আমরা বৃহৎ কিছু আক্রমণ ও এম্বুশের পরিকল্পনা করি। পাকিস্তানী হাই কমান্ডের পক্ষ থেকে তাদের সৈন্যদের সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে বলা হয়। আমরাও তাদের প্রস্তুতির কোথা জানতাম এবং সেভাবেই প্রস্তুতি নেই। তাদের স্বাধীনতা দিবসে ১ নং সেক্টরে পরিকল্পিতভাবে আমরা ১০টি আক্রমণ চালাই। ছাগলনাইয়া থেকে রামগড় পর্যন্ত এই আক্রমণ চলে। তাছাড়া অনেক অ্যামবুশ ও ছোট ছোট আক্রমণও চলে।

 

সবচেয়ে গুরুত্তপূর্ণ আক্রমণ হয় সুভাপুরের কাছে শ্রীনগরে। আগে থেকে এলাকাটি রেকু করা হয়। কমান্ড পোস্ট, এল এম গই ও মেশিনগান পোস্ট, রেশন ও অস্ত্রগুদামের অবস্থান সঠিকভাবে নির্নয় করা হয়। আমাদের বাহিনী ধীরে ধীরে ওদের কাছে পৌঁছে রকেট লাঞ্চার দিয়ে পোস্টগুলোকে ধ্বংস করে। তাই এই আক্রমণ বেশিক্ষণ ধরে চলেনি এবং কাজ শেষে গেরিলারা রাতের অন্ধকারে নিরাপদে ফিরে আসে। এক প্লাটুন সৈন্য দিয়ে অপারেশনটি চালানো হয় এবং ২ জন পাকসেনা নিহত ও ৪ জন আহত হয়। আমাদের সৈন্যরা কেউ আহত হয়নি।

২৫শে আগস্ট পূর্ব ওয়ালিনগরের কাছে আম্লিঘাটে আরেকটি আক্রমণ সঙ্ঘটিত হয়। পাকসেনাদের ৩ জন আহত হয়। আমাদের একজন সৈন্য সামান্য আহত হয়। কিন্তু তারা নিরাপদে ঘাঁটিতে ফিরে আসে।

 

২৮শে আগস্টে নিজামের নেতৃত্বে এফ এফ ১৫ গ্রুপ মিরসরাইয়ের কাছে একটি রেলওয়ে ট্র্যাকে মাইন সেট করে। সকাল ৮টা ২৫ মিনিটে একটি পাকসেনা ও রাজাকারবাহী ট্রেন সেখান দিয়ে যাবার সময় বিস্ফোরণ ঘটে। এতে প্রায় ৩৫ জন পাকসেনা আহত হয়।

 

সেপ্টেম্বরের ৫ তারিখে চট্টগ্রামের একটি রাজাকার ক্যাম্পে আক্রমণ করে ৬ জন রাজাকার নিহত ও অনেক আহত করা হয়।

 

১২ই সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক বর্ডারের কাছে সমরখন্দ এলাকায় একটি অ্যামবুশ করা হয়। ১৯ রাজপুত ব্যাটালিয়নের (ইন্ডিয়া) একটি অংশ আমাদের সাথে অংশগ্রহণ করে। একটি পাকিস্তানী পেট্রোল দলের ৫ জন আহত হয় এবং বাকিরা যুদ্ধ না করে পালিয়ে যায়।

 

সেপ্টেম্বরের ১৪ তারিখে ইন্ডিয়ান আর্মি কমান্ডার লে জেন জগজিৎ সিং এর সাথে খুব গুরুত্তপূর্ণ একটি মিটিং হয়। একসাথে গারিলা ও নিয়মিত সৈন্যবাহিনী নিয়ে যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত হয়। সংক্ষেপে পরিকল্পনাগুলো নিম্নরূপ –

 

১। যেগুলোতে পাকসেনা কম আছে সেগুলো আগে দখল করা

২। প্রতিশোধমূলক আক্রমণ চালানো এবং তাদের ক্ষয়ক্ষতি করার চেষ্টা করা

৩। পাকসেনাদের যোগাযোগ ব্যাবস্থা ধ্বংস করা

৪। গেরিলা কার্যক্রম বাড়ানো

 

আমরা বুঝতে পারি, ভারতীয় কমান্ডারের এই সিধান্ত আসলে ভারতীয় সরকারেরই সিদ্ধান্ত। এতে আরও প্রমাণ হল যে ভারতীয় সেনাবাহিনী পাকবাহিনীর যে কোন আক্রমণের জন্য প্রস্তুত আছে। এতে আমরা খুব অনুপ্রাণিত হলাম এবং আমাদের মনে হল আমাদের মুক্তিযুদ্ধে তারা আরও গভীরভাবে যুক্ত হতে যাচ্ছে।

 

সেপ্টেম্বরের ১৫ ও ১৬ তারিখে আমরা স্থানীয় ভারতীয় কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার সেহবাগ সিং এর সাথে বিস্তারিত আলোচনায় বসি। খালেদ মোশাররফ ও শফিউল্লাহ – ও সেখানে ছিলেন।

 

সেপ্টেম্বরের ১৫ তারিখ পরশুরামের কাছে আমজাদহাট এলাকায় আমাদের ১০ জন সৈন্য অ্যামবুশ করে। সেখানে পাকসেনাদের সাথে প্রায় ২ ঘণ্টা ধরে লড়াই চলে। নায়েক নাদিরুজ্জামান খুব সাহসিকতার সাথে যুদ্ধ করেন এবং নিরাপদে অ্যামবুশ বাহিনীকে সরে যেতে সহায়তা করেন। পাকসেনাদের ৮ জন আহত হয়। আমাদের ১ জন ও আহত হয়।

 

সেপ্টেম্বরের ১৮ তারিখ শ্রীনগর এলাকায় ১৯ রাজ আরআইএফ এর কর্নেল শর্মার সাথে আমাদের প্রথম মিটিং হয়। বর্ডারের কাছে ভারতীয় সৈন্যদের সহায়তায় পাকসেনাদের ছোট কয়েকটি অবস্থান আমরা একসাথে মুক্ত করি। একসাথে কাজ করা খুব প্রয়োজন ছিল যাতে করে পাকসেনারা বর্ডার ক্রস করে পুনরায় আক্রমণ না চালাতে পারে। যদিও আক্রমণ বাংলাদেশ সৈন্যরাই করবে। তবে খুব জরুরি মুহুর্তে তারা আমাদের ফায়ার সাপোর্ট দেবে।

 

রাতে আমাদের সৈন্যরা গঊরঙ্গপাড়ায় অ্যামবুশ পাতে। ১৫ জনের বেশী পাকসেনা তাতে আহত হয়।

১৯শে সেপ্টেম্বর কর্নেল শর্মা এবং আমি পাকিসেনাদের অবস্থানগুলো সম্পুর্ণ রেকু করি। ভারতীয় আর্টিলারি কমান্ডারও আমাদের প্ল্যানে ছিলেন। মেইন হেডকোয়ার্টার ও সাব-সেক্টর থেকে আমরা আমাদের সৈন্য জোগাড় করি। যে মুহূর্তে আমরা অপারেশনের প্ল্যান করছিলাম অন্যন্য এলাকায় এবং বাংলাদেশের ভেতরে আরও গেরিলা অপারেশন চলছিল।

 

সেপ্টেম্বরের ২০ তারিখ সুবেদার রহম আলি চম্পানগর বিওপিতে পাকসেনাদের উপর আক্রমণ চালান। সংক্ষিপ্ত আক্রমণের পর পাকসেনাদের ৩ জন আহত হয়।

 

পরের দিন ২১ শে সেপ্টেম্বর গুথুমা বিওপি তে অ্যামবুশ আক্রমণে আমরা ৩ পাকসেনাকে আহত করি এবং আমাদেরও ১ জন আহত হয়। খাজুরিয়াতে আরেকটি অ্যামবুশ আক্রমণে ১ জন পাকসেনা ও ১ জন রাজাকার নিহত হয়।

 

২২শে সেপ্টেম্বর ১ প্লাটুন সৈন্য জয়চাদপুরে এম্বুশ করে। পাকসেনাদের একটি কোম্পানি এতে আক্রান্ত হয়। আমাদের ক্ষুদ্র অ্যামবুশ পার্টির জন্য এটা একটু বড় হয়ে যায়। আমাদের সৈনিক রুহুল আমি আহত হয় এবং আমরা ২টি রাইফেল, ১ টি মর্টার ও ১টি স্পেয়ার ব্যারেল এলএমজি হারাই। পাকিস্তানীদের কোন ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। একই দিন সন্ধ্যায় শ্রীনগর এলাকায় ভারতীয় সেনাবাহিনী ও পাকসেনাদের মাঝে গুলিবিনময় হয়।

 

২৩শে সেপ্টেম্বরে ১০ম নৌ কমান্ডার ছোট ছোট নৌকা নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের অফ পোর্টে শত্রুজাহাজে মাইন সেট করতে যান। লম্বা দূরত্ব এবং বিক্ষিপ্ত সমুদ্র থাকার কারণে তারা সফল হতে পারেননি এবং অপারেশন বাতিল করতে বাধ্য হন। ফেরার পথে একজন কমান্ডো , মোহাম্মাদ হসেইন, ডুবে মারা যান। চট্টগ্রামের পতেঙ্গা উপকুলে পাকসেনাদের কোস্টাল নেভি আক্রমণের জন্য ৩ জন কমান্ডোর সমন্বয়ে একটি দলকে পাঠানো হয়। পাকসেনারা সম্পূর্ণ সজাগ ছিল এবং আমাদের ২ জন কমান্ডো ধরা পড়ে যায়।

 

২৩শে সেপ্টেম্বর ভোর ৩-৩০ মিনিটে এক কোম্পানি সৈন্য বল্লভপুরে পাকসেনাদের আক্রমণ করে। ক্যাপ্টেন মাহফুজের নেতৃত্বে আরেকটি দল চাম্পাকনগরে পাকসেনাদের উপর আক্রমণ করে। আক্রমণের প্রথমে আর্টিলারি বাহিনী ১০ মিনিট গুলি চালায়। পাকসেনাদের শক্তিশালী ডিফেন্স প্রস্তুত ছিল এবং বাঙ্কারগুলোও প্রস্তুত ছিল। তাই আর্টিলারি বাহিনী ব্যার্থ হয়। এরমধ্যে পাকসেনারা আরও সৈন্য সমাবেশ করে ভারি আর্টিলারি দিয়ে কারেরহাটে আমাদের অবস্থানগুলোর উপর আক্রমণ চালায়। কয়েকবার চেষ্টা করে না পেরে শেষ পর্যন্ত আমরা আক্রমণ বন্ধ করি। আমাদের ১ জন নিহত ও ২ জন আহত হয়। একজন ভারতীয় সেনা আহত হয় পাকসেনাদের ক্রমাগত বোমাবর্ষনের কারণে। আমাদের আক্রমণ ব্যার্থ হয়ে যায়।

 

সেদিন সন্ধ্যায় পশ্চিম দেভপুরে একটি এম্বুশে ২ জন পাকসেনা নিহত হয়।

 

সেপ্টেম্বর ২৫ তারিখে সকাল ৭টায় ঘথুমায় আমাদের ১৫ জন গেরিলার এম্বুশে ৩ জন পাকসেনা আহত হয়। ঐ রাতে চম্পকনগর বিওপি তে আরেকটি আক্রমণে ৫ জন পাকসেনা আহত হয়। রকেট লাঞ্চার ব্যবহৃত হয় এবং অনেক বাঙ্কার ধ্বংস করা হয়।

 

২৬শে সেপ্টেম্বর গুথুমা বিওপি তে আক্রমণ করা হয়। আমাদের সৈনিক নায়েক হারিস মিয়া হামাগুড়ি গিয়ে কয়েক গজ দূরের একটি বাঙ্কারে গ্রেনেড ঢুকিয়ে দ্যায়। অন্যরাও কয়েক দিক দিয়ে আক্রমণ চালায় এবং পড়ে রাতের অন্ধকারে নিরাপদে সরে আসে। ২ জন পাকসেনা আহত হয়।

 

২৬শে সেপ্টেম্বর সকাল ১০-৩০ মিনিটে দেভপুরে আরেকটি এম্বুশে ৬ জন পাকসেনা আহত হয়। একজন সাধারণ জনগণ আহত হয় এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষনের ফলে।

 

ফেনি নদীতে আন্দারমানিক বিওপি ছিল পাকসেনাদের শক্তিশালী অবস্থান। প্রতি সন্ধ্যায় সকালে সৈন্যরা ফল-ইন এবং সকালে রোল-কল করা হয়। এই খবরে আমাদের একটি এম্বুশ পার্টি বিওপি তে এম্বুশ পাতে। রোল-কল শেষের সাথে সাথে এলএমজি ও রাইফেল দিয়ে আক্রমণ শুরু হয়। এই সময়ে পাকসেনারা তাদের ট্রেঞ্চ ও বাঙ্কারে লুকানোর চেষ্টা করে। ১ জন জেসিও সহ মোট ১৫ জন আহত হয়। সর্বমোট ২ প্লাটুন পাকসেনাকে রোলকলের জন্য একত্রিত করা হয়।

 

২৯ শে সেপ্টেম্বর ভোর ৫টায় পূর্বমধুপুরে গেরিলাদের একটি দল অ্যামবুশ পাতে। ৩ টি রসদপূর্ণ পাকসেনাদের বাহন অ্যামবুশে আক্রান্ত হয়। কিন্তু পাকসেনাদের কেউ এতে আহত হয়নি।

 

সেদিন রাত ১১-৩০টায় বল্লভপুড় ও ছাগলনাইয়া তে আক্রমণ চালানো হয়। বল্লভপুরে পাকিস্তানীদের হতাহতের ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ভারতীয় আর্টিলারি বাহিনীর সহায়তায় ছাগলনাইয়াতে আক্রমণ চালানো হয়। এতে ৫ জন পাকসেনা নিহত ও ৭ জন আহত হয়। একজন পাক অব্জার্ভার আমাদের দিকে আর্টিলারি ফায়ার চালানোর জন্য গাছের উপরে অবস্থান নেয়। কিন্তু আমাদের বাহিনী তাকে সনাক্ত করে এবং গুলি করে নিষ্ক্রিয় করে।

 

পরের দিন সকাল ৪টায় চম্পকনগরের একটি কাল্ভার্ট উড়িয়ে দেয়া হয়। এতে পাকসেনাদের রেশন ও রসদ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়।

 

১লা অক্টোবর নিজামের নেতৃত্বে ১৬ জন গেরিলাদের একটি দল মিরসরাইয়ে দুর্গাপুর হাই স্কুলের একটি ক্যাম্পে আক্রমণ চালায়। ক্যাম্পটি মূলত রাজাকারদের ছিল এবং নানা রকম নৃশংসতা ও নির্যাতনের জন্য এটি খুব ভয়ংকর হিসাবে পরিচিত ছিল। কয়েকদিন পর্যবেক্ষনের পর গেরিলারা রাতে ক্যাম্পটি আক্রমণ করে প্রায় ১ ঘণ্টা যুদ্ধ চলে। ২০ জন রাজাকার নিহত হয় এবং ৭টি রাইফেল জব্দ করা হয়। কয়েকজন রাজাকার প্রথম দিকে প্রতিরোধের চেষ্টা করে কিন্তু অনেকেই রাতের অন্ধকারে পালিয়ে যায়। এই যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধা ফরিদ নিহত হয় কিন্তু মৃত্যুর পূর্বে সে বলে যায় যে সে নিজে ১০ জনকে মেরেছে।

এর আগে সকাল ১০-৩০ মিনিটে গুথুমার কাছে আরেকটি গেরিলা দল শত্রুচলাচলের পথে অ্যামবুশ পাতে। একজন পাকসেনা নিহত হয় এবং বাকিরা লাশ ফেলে রেখেই পালিয়ে যায়। প্রকাশ্য দিবালোকে এমন সফলতায় আমরা উদ্দীপ্ত হই এবং গেরিলাদের সক্ষমতা সম্পর্কে আমাদের আরও আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়। আমরা আরও বড় অপারেশনে গেরিলাদের যুক্ত করার ব্যাপারে তাদের উপর নির্ভর করা শুরু করি।

 

পরের দিন চম্পকনগর বিওপি তে রাতে আক্রমণ করা হয়। এতে ২ জন পাকসেনা নিহত হয়। আমাদের একজন সৈন্য গুলিবিদ্ধ হয়ে মারাত্মক আহত হয়।

 

অক্টোবরের ৩ তারিখে খুব সকালে বেলনিয়ার আমজাদনগরে এম্বুশ করা হয়। শত্রুপক্ষের একটি দল খুব সম্ভবত খাদ্য আনার জন্য কোম্পানি হেডকোয়ার্টারের দিকে যাচ্ছিল। সকাল ৫টায় এম্বুশ করা হয়। এই আক্রমণে পাকসেনাদের ২ জন গুরুতর আহত হয় এবং নাকিরা তাদের বহন করে নিয়ে যায়। পরে জানা যায় যে ঐ দুজন পাকসেনা পরে নিহত হয়।

 

সেই রাতে কারেরহাটে করালিয়া টিলার নিকটে আরেকটি এম্বুশ পাতা হয়। পেট্রোল ডিউটি করার সময় ২ জন পাকসেনা ও ৩ জন রাজাকার নিহত হয়। আমাদের বাহিনীর পরে নিরাপদে ফিরে আসে।

 

বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন সময়ে এম্বুশ আক্রমণ চলছিল। আমরা ছোট আকারে কয়েকটি পাক ক্যাম্পে আক্রমণ চালানোর পরিকল্পনা করছিলাম যাতে সেগুলো আমরা দখল করে পরে মিলিটারি আক্রমণ চালাতে পারি। আমার সেক্টরে পরশুরামের অবস্থানটিকে প্রথম টার্গেট হিসাবে ধরা হয়। ৩রা অক্টোবর সকাল থেকে আমরা রেকু করা শুরু করি। অক্টোবরের শুরু থেকে আক্রমণ ও অ্যামবুশের সংখ্যা, তীব্রতা এবং দুর্ধর্ষতা বাড়ার সাথে সাথে পাকসেনাদের জোর ও মনোবল কমতে থাকে। রেকু করার সময় একজন ভারতীয় অফিসার ও আমি পাকসেনাদের মেশিনগান ও মর্টাররের আক্রমণের শিকার হই। এলোমেলো গুলিতে একজন সাধারণ জনগণ ও আহত হয়। অক্টোবর এর শুরু থেকে এই ধরনের ঘটনা বাড়তে থাকে।

 

৪ঠা অক্টোবর থেকে আরও কয়েকটি অবস্থান রেকু করা শুরু হয়। একই সাথে আমরা আমাদের বাহিনীর শক্তি পরিমাপ করি।

 

নিয়মিত সৈন্যরা যুদ্ধের শুরুতে সামনে থাকত। তাই তারা তেমন বিশ্রাম নেবার সময় পেতনা। এভাবে সব সময় ব্যাস্ত থাকার জন্য তাদের সক্ষমতা কমতে থাকে। তাই তাদের পর্যাপ্ত বিশ্রাম, রিগ্রুপিং দরকার ছিল। কিন্তু নিয়মিত সৈন্য সংখ্যা কম হবার কারণে আমরা তাদের পর্যাপ্ত বিশ্রাম দিতে পারছিলাম না। বরং এদের দিয়েই সকল মিলিটারি কার্যক্রম চালাচ্ছিলাম।

 

গেরিলারাও অনেক চাপের সম্মুখীন হয়। তাদের মোটামুটি ট্রেনিং ছিল। এই দুর্বলতা আমরা তাদেরকে মানসিক ভাবে উৎসাহ দিয়ে এবং স্বাধীনতার কথা বলে পূরণ করার চেষ্টা করতাম। তারপরও আমরা লক্ষ্য করলাম কিছু নির্দিস্ট ভীতি তাদের ক্ষমতাকে দূর্বল করছে। এই ভয় তাদের নিজেদের নিরাপত্তাহীনতার জন্য নয়। তারা ভয় করত পাকসেনারা সাধারণ জনগণের উপর যে আক্রমণ চালাত সেটা নিয়ে। গেরিলা অপারেশন চালানোর পর চারপাশের সাধারণ জনগণের উপর তারা নির্যাতন করত। সেইজন্য যেখানে পার্শ্ববর্তী সাধারণ জনগণের বসবাস ছিল সেখানে গেরিলা অপারেশন চালাতে তাদের একটু অনিচ্ছা কাজ করত।

 

এই দুর্বলতার কারণে সেই এলাকার রাজাকাররা আরও সুবিধা পেয়ে যেত এবং নানা রকম অত্যাচার চালাতো। এর পরও আমরা নিতমিত ও গেরিলা অপারেশন চালিয়ে গেছি।

 

৪ঠা অক্টোবর সকাল ১০টায় গুথুমা বিওপি এর কাছে ২ জন পাকসেনা নিহত হয়। পরের দিন একজন সিনিয়র ভারতীয় অফিসার আমাদের হেড কোয়ার্টারে আসেন ভবিষ্যতের অপারেশনের সমন্বয়ের ব্যাপারে। ঐ দিন সকাল ১১টায় পূর্ব দেবপুর বিওপি তে অ্যামবুশে ২ জন পাকসেনা নিহত হয়। আমাদের একজন সৈন্য সামান্য আহত হয়।

 

৬ই অক্টোবর শ্রীনগরে নিয়োজিত ব্রিগেডিয়ার সেহবাগ সিং এবং আরও কয়েজন ভারতীয় সেনা অফিসার জায়গাটি রেকু করেন। ওইদিন দুপুর ২-৪৫ মিনিটে গেরিলারা ছাগলনাইয়া ও মুহুরিগঞ্জের মাঝে একটি ব্রিজ উড়িয়ে দ্যায়।

 

একই সময়ে করিমগঞ্জ বাজার হাই স্কুলে পাকসেনাদের একটি অবস্থানে আক্রমণ করে। এতে ৩ জন পাকসেনা, ৫ জন রাজাকার এবং ১ জন সাধারণ জনগণ নিহত হয়।

 

ওইদিন বিকাল ৩ টায় আমি মেলাঘরে ২নং সেক্টরের হেডকোয়ার্টারে সমন্বয় মিটিং এ যাই। সেখানে সেক্টর কমান্ডার খালেদ মোশাররাফ ছিলেন। সেখানে জানতে পারি ছাগলনাইয়াতে পাকসেনারা বিপুল পরিমাণে সমবেত হয়েছে।

 

সাথে সাথে আমরা আর্টিলাড়ি বাহিনী দিয়ে আক্রমণ শুরু করি। পরে প্রচুর হতাহতের খবর পাই।

৭ অক্টোবর দিনের বেলা ২ নং সেক্টরে বেলোনিয়াতে একটি অ্যামবুশ করা হয়। ক্ষণস্থায়ী এই যুদ্ধে ২ জন পাকসেনা ও ৩ জন রাজাকার নিহত হয়।

 

এর একটু পূর্বে সারবন এলাকাতে পাকসেনারা সনি সমাবেশ করে এবং কিছু মর্টার আনে। এতে আমাদের কিছু রিফুজি ক্যাম্প ও হাসপাতাল মর্টারের সীমানার ভেতর এসে যায়।

 

অক্টোবর ৬ তারিখে কয়েকটি আক্রমণ ও অ্যামবুশ চালানো হয়। চট্টগ্রাম শহর থেকে কয়েক মাইল দূরে হালদা নদীর উপরে মধুনা ঘাটে একটি বিদ্যুৎ সাব-স্টেশন ছিল। মেইন ক্যাম্প থেকে প্রায় ৭০ মাইল দূরে গিয়ে আমাদের একটি দল ২টি ট্রান্সফর্মার ধ্বংস করে। সিপাহি মান্নান আসল শেল টি নিক্ষেপ করেন যাতে ট্রান্সফর্মার ধ্বংস হয়। কিন্তু পরে তিনি গুলিবিদ্ধ হন। পরে অবশ্য সে সুস্থ হয়ে যায়।

 

সকাল ৮টার সময় ছাগলনাইয়া বিওপি তে আরেকটি আক্রমণ সঙ্ঘটিত হয়। রাতে আমাদের একটি বাহিনী শত্রু অবস্থানের খুব কাছে গিয়ে শুয়ে থেকে অপেক্ষা করে। সেসময় খুব বেখেয়ালে পাকসেনারা বাঙ্কার রেডি করছিল। সেসময় আমাদের দল আক্রমণ চালায় এবং ৩ জন পাকসেনা নিহত হয়। আমাদের একজন আহত হয়েছিল।

 

সন্ধ্যা ৬টার দিকে হামাগুড়ি দিয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম সড়কে পার্ক করে রাখা দুইটি যানের দিকে এগিয়ে যায়। সেখানে কিছু সৈন্য গোলাবারুদ নামাচ্ছিল। গেরিলারা হ্যান্ড গ্রেনেড ছুড়ে রাতের অন্ধকারে পালিয়ে যায়। একজন পাকসেনা ভীষণ জখম হয় এবং গাড়িগুলো খারাপভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

 

অক্টোবর ৭ তারিখে গেরিলারা ছাগলনাইয়া – বেলোনিয়া সড়কের একটি সেতু উড়িয়ে দ্যায়। এটা করা হয়েছিলো পাকসেনাদের বেলোনিয়াতে আলাদা করে দেবার জন্য। সেতুটি হাল্কা অস্ত্র, এলএমজি ও মেশিনগান সমৃদ্ধ পাকসেনারা পাহারায় রেখেছিল। কিন্তু প্রচুর গোলাগুলির পর গেরিলারা সফল হয়। ওইদিন গেরিলারা রাধানগর তহসিল অফিস গুড়িয়ে দ্যায় এবং মকামিয়াতে পাকসেনাদের আক্রমণ করে। ২ জন পাকসেনা সেখানে নিহত হয়।

 

অক্টোবর ৮তারিখে সকাল ৮-৩০টায় পূর্ব দেবপুরে একটি অ্যামবুশ করা হয়। একটি পাক পেট্রোল কাছাকাছি আসতেই আক্রমণের শিকার হয়। ৩ জন পাকসেনা নিহত ও ১ জন আহত হয়। গেরিলারা কোন ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই ফিরে আসে।

 

৮ অক্টোবর সন্ধ্যায় ঘুতুমায় পাকসেনাদের অবস্থানের পাশে একটি দল অপেক্ষা করতে থাকে। সেই সময়টা ছিল পাকসেনাদের সান্ধ্যকালিন রোল-কলের। রোল-কল শেষ হবার সাথে সাথে এলএমজি ও ২ইঞ্চি মর্টার দিয়ে আমাদের বাহিনী তাদের উপর আক্রমণ করে। ১০ জন পাকসেনা আহত হয়। গেরিলারা রাতের অন্ধকারে নিরাপদে ফিরে আসে।

 

অক্টোবর ৯ তারিখে সন্ধ্যা ৭-৩০ মিনিটে ঘুতুমা বিওপি তে একটি আক্রমণ করা হয়। একজন মিলিশিয়া নিহত ও ১ জন পাকসেনা আহত হয়।

 

সেই রাতে সামনের আরও কিছু এলাকা আমি রেকু করি। হেডকোয়ার্টারে ১৯ রাজ আরআইএফ এর কর্নেল শার্মার সাথে দেখা হয়। আমরা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করি। সেই দিন পর্যন্ত ভারতীয় সেনাবাহিনীর লক্ষ্য ছিল কোনভাবেই পাকসেনারা যাতে মুক্তিযোদ্ধা খোঁজার নাম করে আন্তর্জাতিক বর্ডার পার হতে না পারে। পাশাপাশি তারা আমাদের সীমিত আকারে নানারকম আক্রমণ ও অ্যামবুশে সাহায্য করার জন্য প্রস্তুত ছিল। আলোচনার শেষ দিকে ক্যাপ্টেন মাহবুব আমাদের একটি সুখবর দেবার জন্য রুমে প্রবেশ করলেন। প্রায় ১০ দিন আগে আমরা ধুমঘাট ও মুহুরিগঞ্জের মাঝে একটি রেলওয়ে ব্রিজ উড়িয়ে দেবার জন্য কিছু গেরিলা পাঠাই। ব্রিজটি সব সময় পাহারায় থাকত। তাই কাজটি কঠিন ছিল। ইচ্ছা করেই আমরা ঐ এলাকায় এই কয়দিন কোন আক্রমণ চালাইনি যাতে করে পাহারাদাররা অসতর্ক হয়ে থাকে। অনেকগুলো গেরিলাকে পার্শবর্তী গ্রামে অবস্থান করে পাকসেনাদের গতিপথ লক্ষ্য করতে বলা হয়েছিল এবং আক্রমণের সঠিক সময় বের করতে বলা হয়েছিল। তাছাড়া আক্রমণকারী বাহিনীর জন্য নিরাপদ বেইস, টার্গেট পর্যন্ত পৌঁছাতে সহায়তা করা এবং আক্রমণ শেষে নিরাপদে ঘাঁটিতে ফিরে আসার দায়িত্বও তাদের ছিল। সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে রেইডিং পার্টি ও ডিমলিশন এক্সপার্ট দের সেখানে পাঠানো হয়। সাব-সেক্টর হেডকোয়ার্টারের কাছে একটি ব্রিজে তারা রিহার্সাল করে। টার্গেট থেকে ১ মাইল দূরে ২টি পরিত্যাক্ত খামার বাড়িতে তারা অবস্থান নেয়। এরপর মূল গেরিলা গ্রুপটি ভেতরে যায় এবং টার্গেটে পৌঁছে। সেখানে কয়েকদিন ধরে তারা রেকু করে – সেন্ট্রি কখন কি করে, ডিউটির সময়, ডিউটি পরিবর্তনের সময় ইত্যাদি। শেষে ৬ অক্টোবর রাতে আক্রমণ শুরু হয়। ব্রিজটি অংশিকভাবে ধ্বংস হয়েছিল – তবে ঢাকা- চট্টগ্রাম রেল যোগাযোগ পুরপুরি বন্ধ হয়ে যায়।

 

সে সময়ে গুজব ওঠে রাজনীতিবিদের একটি অংশ যারা রাজাকার ছিল তারা শান্তিপূর্ণ অবস্থানের আগ্রহী। এতে আমাদের সৈন্য, গেরিলা ও সাধারণ জনগণ খুব চমকিত হল। রাজাকারদের যোগ্য শাস্তি দরকার ছিল। পাকিস্তানীরা সংলাপের পথ বন্ধ রেখেছিল। বাহিনীকে আক্রমণ তীব্রতর করে বিজয় ছিনিয়ে আনতে নির্দেশ দেয়া হয়।

 

অক্টোবর ১০ তারিখে গেরিলারা বড়বাজারে একটি পাক অবস্থানের উপর আক্রমণ চালায় এবং ৬ জন আহত হয়।

 

অক্টোবর ১২ তারিখে পরশুরাম এলাকায় পাক অবস্থানে আক্রমণ করা হয়। ২ জন পাহারাদার নিহত হয় এবং ১৫ মিনিট যুদ্ধের পড় গেরিলারা ফিরে আসে।

 

৯-৩০ মিনিটে ঢাকা-চট্টগ্রাম রোডে গেরিলারা অ্যামবুশ পাতে। এতে ২ জন পাকসেনা নিহত ও ১ জন আহত হয়।

 

ঐ রাতে পাকিস্তানী প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান পাকিস্তানী রেডিওতে ঘোষণা করেন যে পাকিস্তানের সমস্ত বর্ডারে ইন্ডিয়ান আর্মি ঘিরে রেখেছে এবং কমান্ডো অপারেশন চালিয়ে সড়ক ও রেলওয়ে ব্রিজ ধ্বংস এবং বিদ্যুৎ লাইন ধ্বংস করছে। এই বক্তব্য থেকে আমরা বুঝতে পারি যে তিনি আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের গেরিলা কার্যক্রমকে উল্ল্যেখযোগ্যভাবে লক্ষ্য করছেন এবং এইসকল ঘটনা তাঁর অহং এ লাগে। পাশাপাশি তাঁর স্বপ্ন ধ্বংসের পথে কাজ করে।

 

১৪ অক্টোবর পূর্বঅংশের সেক্টর কমান্ডাররা আগরতলা যান তৎকালীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ও ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতিকে রিসিভ করতে। তারা ভারতীয় সেনাবাহিনীর একটি বিশেষ বিমানে পৌঁছেন। আমরা সংক্ষেপে আমাদের অস্ত্র ও গোলাবারুদ স্বল্পতা সম্পর্কে আলোচনা করি। পাকিস্তানীপন্থীদের সাথে শান্তিপূর্ণ অবস্থানের গুজবটিও আলোচনায় আসে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী সেটা নাকচ করে দিয়ে আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল বজায় রাখতে বলেন। কোন প্রকার সাময়িক স্বাধীনতা প্রস্তাব ও গ্রহণ করা হবেনা বলে তিনি আমাদের নিশ্চিত করেন।

 

অক্টোবর ১৫ তারিখে আমাদের বাহিনী বল্লভপুর, দারগাহাট ও ছয়ঘরিয়া তে আক্রমণ চালায়। এতে ৬ জন পাকসেনা ও অনেক রাজাকার এবং মিলিশিয়া নিহত হয় এবং ৮ জন আহত হয়।

 

অক্টোবর ১৬ তারিখে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন সাহেব শ্রীনগর এলাকা পরিদর্শন করেন। এটি পাকসেনাদের অবস্থান থেকে মাত্র ১ মাইলের দূরত্বে এবং তাদের মর্টার রেঞ্জের ভিতরেই ছিল। সেদিন রাজনৈতিক নেতা মোশাররফ হোসেন এমসিএ এর নেতৃত্বে একটি বিশেষ কমান্ডো গ্রুপ চালু করা হয় বাংলাদেশের ভেতরে। তাদের কাজটি হল চট্টগ্রামের নৌঘাঁটিতে অবস্থিত ফুয়েল ডাম্প ধ্বংস করা।

 

১৭ অক্টোবর সকালে জগন্নাথ সোনাপুর গ্রামের কাছে গেরিলারা এম্বুশ করে। সেখানে ২ইঞ্চি মর্টার ও এলএমগজি ছিল। ২ জন পাকসেনা ও ৩ জন মিলিশিয়া নিহত হয়। বেলনিয়া দেবপুর বিওপি তে আরেকটি এম্বুশ করা হয়। সেখানে ৩ জন পাকসেনা নিহত হয়। আমাদের দিকে সিপাহি আমজাদ আলি (বিডিআর ১১ উইং) মারাত্মকভাবে জখম হন।

 

১৭ অক্টোবর সকাল ৫-৩০ মিনিটে আমাদের গেরিলারা পূর্ব দেবপুর এলাকায় এম্বুশ করে। আধা ঘণ্টা ধরে যুদ্ধ চলে এবং ৩ জন পাকসেনা নিহত হয়। ওইদিন আমি ভারতীয় সেনাবাহিনীর অফিসার লে কর্নেল বিশ্রার সাথে আলোচনা করে পাক সেনাদের বিরুদ্ধে নিয়মিত যুদ্ধের পরিকল্পনা করি। সেনামোতায়েন, বিন্যাস, আক্রমণ ও গুলির নিয়ম – প্রতিটি ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও ভারতীয় সেনাবাহিনীর ভেতর সমন্বয়ের আরও দরকার ছিল। এই সমন্বয়ের অভাবে ভারতীয় আর্টিলারি ভুলক্রমে আমাদের অবস্থানের উপর আক্রমণ করে বসে এবং ছাগলনাইয়াতে আমাদের ৪ জন সৈন্য আহত হয়।

 

১৮ অক্টোবর প্রথম প্রহরে আমরা গুথুমা বিওপি তে আক্রমণ করি। প্রথমে ৩ইঞ্চি মর্টার থেকে ৫০ রাউন্ড গুলি করা হয়। পাকিস্তানীরা তখন তাদের আর্টিলারি দিয়ে আমাদের উপর আক্রমণ শুরু করে। আধা ঘণ্টা ধরে যুদ্ধ চলে এবং ১০ জন পাকসেনা নিহত হয়। আমাদের ২ জন জখম হয়। সিপাহি লতিফ গুরুতর আহত হন এবং বেলোনিয়া হাসপাতালে পাঠালে পরে তিনি শহিদ হন।

 

ওইদিন সকালে মাতুয়া গ্রামে অন্য এক আক্রমণে ৩ জন পাকসেনা নিহত হয়।

 

২১শে অক্টোবর সকালে আমজাদনগরে ১০-৩০ মিনিটে অ্যামবুশ করা হয়। ১ জন পাকসেনা নিহয় ও ৩ জন মিলিশিয়া আহত হয়। এলপাতাড়ি গুলিতে একজন স্থানীয় সাধারণ লোক নিহত হন। ওইদিন ৫টি রিকশায় এক গ্রুপ পাকসেনা এবং মিলিশিয়া চাদগাজি যাচ্ছিল। ১২-৩০ মিনিটে সেখানকার গেরিলারা তাদের আক্রমণ করে। ৩ জন পাকসেনা নিহত হয়। একজন রিকশা চালকও নিহত হয়।

রামগড়ের কাছে বারো পানুয়া তে অন্য একটি এম্বুশে ৫ জন পাকসেনা নিহত হয়।

 

এবং মিরধরবাজারে ২ প্লাটুন সৈন্য অ্যামবুশ করে থাকে পাকিস্তানী একটি পেট্রলের অপেক্ষায়। কাট-অফ পার্টি হিসাবে দক্ষিণ যোধপুরে একটি গেরিলা বাহিনীও পাঠানো হয়। পাকিস্তানী বাহিনী এম্বুশের কাছে আসলে তীব্র গুলির শিকার হয়। যুদ্ধ চলতেই থাকে এবং ছাগলনাইয়া থেকে যোধপুর পর্যন্ত পাকসেনারা সমবেত হতে থাকে। এই দুইটি এম্বুশে আমাদের বাহিনী ২ ইঞ্চি মর্টার, এলএমজি ও রাইফেল ব্যাবহার করে। পরে জানা যায় ১০ জন পাকসেনা নিহত হয়েছে এবং ১৫ জন আহত হয়।

 

২২ শে অক্টোবর বড়পানুয়াতে আরেকটি এম্বুস করা হয়। ৩ জন পাকসেনা জখম হয় এবং গেরিলারা ১টি এলএমজি , কিছু ৩০৩ রাইফেল এবং গোলাবারুদ উদ্ধার করে। ওইদিন কিছু ভারতীয় মিডিয়াম গান বর্ডারের দিকে অগ্রসর হয়। ভারতীয় হেডকোয়ার্টারও সামনে আগানো হয়। পুরো বর্ডার জুড়ে প্রচুর রসদ ও যন্ত্রপাতি জড়ো করা হয়।

 

২৭শে অক্টোবর গুথুমাতে একটি অ্যামবুশে ১ জন পাকসেনা জখম হয়। ঐ রাতে লে রকিবের নেতৃত্বে একটি কোম্পানি বাংলাদেশের ভেতরে পাঠানো হয় – মিরসরাই ও চট্টগ্রামের মাঝখানে গেরিলা অপারেশন চালানোর জন্য। চট্টগ্রামের একজন এম পি ডা মান্নান এই গ্রুপের সাথে যান।

 

২৮শে অক্টোবর একটি দল দেবপুর বিওপি তে অ্যামবুশ করে। সকাল ৮তার দিকে পাকসেনারা কিছু রেশন ও গোলাবারুদ একটি গরুর গাড়ি থেকে নামাচ্ছিল। সেই সময়ে আমাদের গেরিলারা আক্রমণ করলে ২ জন পাকসেনা ও ২ জন রাজাকার নিহত হয়।

 

অক্টোবরের শেষ দিনগুলো আমাদের এবং ভারতীয় সৈন্যদের জন্য খুবই ভোগান্তির ছিল। আমরা পাকসেনাদের অবস্থানের উপর অনেক অপারেশনের প্ল্যান করি। ছোট ছোট গুলিবিনিময় প্রায়শই হচ্ছিল। এলোমেলো আর্টিলারি ফায়ারের জন্য সাধারণ লোকজন জখম হচ্ছিল। পাকিস্তানীরা সাধারণ জনগণের উপর বিনা কারণে ক্রমাগত গোলাবর্ষণ করছিল।

 

সকল ভারতীয় সেনা তাদের যুদ্ধের অবস্থান নিচ্ছিল।

 

শান্তির বাজারে ৮৩ ব্রিগেড হেডকোয়ার্টারে ১লা নভেম্বর একটি খুব গুরুত্তপূর্ণ কনফারেন্স হয়। এই প্রথম বারের মর্ম ভারতীয় সৈন্যদের বাংলাদেশের সীমানার ভেতর ঢুকতে দেয়ার অনুমতি দেয়া হয়, রক্ষণভাগ দখল এবং বাংলাদেশ ফোর্সের অন্যন্য দায়িত্ব ও কাজ নেবার অনুমতি দেয়া হয়। ভারতের ৮ বিহার রেজিমেন্ট ও ২ রাজপুত ব্যাটালিয়ন স্থায়ী ঘাটি তৈরি করে বেলনিয়াতে। এখান থেকে আমাদের সৈন্যদের পরিচালনা করা এবং গুরুত্তপূর্ণ অবস্থান দখল করে পাকিস্তানীদের বেলনিয়া ও পরশুরাম এলাকায় পৃথক করার প্ল্যান করা হয়। ৫/৬ তারিখ রাত আক্রমণের জন্য নির্ধারন করা হয়। সেই পর্যন্ত আমরা এখানে সেখানে ছোট ছোট অপারেশন চালিয়ে যাচ্ছিলাম যাতে পাকিস্তানীরা বড় কোন অপারেশন সম্পর্কে ধারণা করতে না পারে।

 

৩রা নভেম্বর গেরিলাদের একটি গ্রুপ রানিরহাট রাংমতি রোডে একটি ব্রিজ ধ্বংস করার চেষ্টা করে। হঠাত সেখানে পাকিস্তানী পেট্রোল, মিলিশিয়া ও রাজাকাররা এসে পড়ে। পরিমল সরকার নামে একজন গেরিলা ধরা পড়ে এবং পার্শবর্তী পাকিস্তানী ক্যাম্পে তাকে নেয়া হয়। বাকি গেরিলারা সাথে সাথে ক্যাম্পে আক্রমণ চালায় এবং পরিমলকে মুক্ত করে। ৪ জন পাকসেনা সেখানে নিহত হয়। একজন গেরিলা আহত হয়।

 

নভেম্বর ৫ তারিখ রাত ৮-৩০ টায় পাকিস্তানীদের বেলনিয়াতে কাটঅফ করার অপারেশন শুরু হয়। অন্য কোথাও এই অপারেশনের কথা বিস্তারিত লেখা আছে।

 

৬ নভেম্বর সকালে গেরিলারা অন্ধ্রমানিক বিওপি তে আক্রমণ করে। এতে তারা ২ইঞ্চি মর্টার ও ৭৩ মি মি রকেট ব্যাবহার করে। ৩ জন পাকসেনা জখম হয়।

 

৬ নভেম্বর দুর্গাপুর মির সরাই পুলিশ স্টেশনের কাছে গেরিলারা পাকিস্তানী পেট্রলের সাথে সম্মুখ যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। ১৫ মিনিট ধরে যুদ্ধ চলে। ১ জন পাকসেনা নিহত ও ২ জন আহত হয়। আমাদের অংশে মজাম্মেল হক গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন। আমাদের গ্রুপ তাকে ফিরিয়ে নিয়ে আসে এবং গোপনে তাঁর মেডিকেল চিকিৎসা চলে।

 

৭ নভেম্বর পাকসেনারা ২ প্লাটুন সৈন্য নিয়ে আমাদের আক্রমণ করে বেলনিয়াতে। হাবিলদার আলি হোসেন ও তাঁর দল আক্রমণের জবাব দেন। তারা একটি বড় পুকুরের পাশে অবস্থান নেন। তাদের অবস্থান শক্তিশালী ছিল এবং পুরো অংশ অস্ত্রসজ্জিত ছিল। পাকসেনাদের সফল আক্রমণ ফিরিয়ে দেয়া হয়।

 

বেলনিয়াতে আরেকটি কাউন্টার আক্রমণে আমাদের ৩ জন সৈন্য ও প্লাটুন কমান্ডার নিহত হন এবং বাকি সৈন্যরা সরে যেতে চেষ্টা করে। এই সময়ে ইপিআর সুবেদার গনি সামনে এগিয়ে আসেন। গনি সাহসী আক্রমণ শুরু করেন। ফলে অবস্থানটি আমরা পুনর্দখল করি এবং অবস্থা আমাদের আয়ত্তে আসে।

 

৮ নভেম্বর গেরিলারা রামগড়-কারেরহাট রোডে অ্যামবুশ পাতে। উঁচু জায়গায় থাকার কারণে অ্যামবুশ পার্টি এলএমজি, কার্বাইন ও হ্যান্ড গ্রেনেড ছুড়ে আক্রমণ করে। ৪ জন পাকসেনা নিহত ও ২ জন আহত হয়।

 

নভেম্বর ১২ তারিখে এক প্লাটুন সৈন্য চম্পকনগর এলাকার বিশ্বনাথে অ্যামবুশ করে। সকাল ১০টায় ২টি সেকশনের পেট্রল আক্রমণের শিকার হয়। ৭ জন পাকসেনা নিহত ও ১ জন আহত হয়। বাকিরা পালিয়ে যায়। একজন আহত মিলিশিয়া আমাদের হাতে বন্দী হয়। পথিমধ্যে সে মারা যায় এবং আমরা তাকে পথেই কবর দেই।

 

১৬ই নভেম্বর পূর্ব দেল্পুর বিওপি তে আক্রমণ করা হয়। প্রায় ১ ঘণ্টা ধরে এটা চলে। সেই সময়ে সেখানে মূলত মিলিশিয়ারা ছিল। ৩ জন পাকসেনা নিহত হয়। ৭ জন রাজাকার আমাদের বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পন করে। প্রচুর পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ আমাদের দখলে আসে।

 

১৭ই নভেম্বর মউনিদ্দিনের নেতৃত্বে গ্রুপ ১৯ মিরসরাইয়ে পাকসেনাদের উপর এম্বুস করে। ৩ জন হখম হয়। আমাদের একজন গেরিলা সামান্য আহত হয়।

 

১৮ই নভেম্বর কর্নফুলি টি এস্টেট এ আক্রমণ চালানো হয়। ৬ জন পাকসেনা আহত হয়। ওইদিন ফটিক’ছড়িতে একটি অপারেশনে ২ জন পাকসেনা নিহত হয়। আমাদের বাহিনী ৬০টি রাইফেল, ১টি এল এম জি , ২টি স্টেনগান এবং প্রচুর গোলাবারুদ পায়। ১১ জন পাকিস্তানী পুলিশ বন্দী করা হয়।

 

২০ নভেম্বর ১৮১ ব্রিগেড হেডকোয়ার্টারে সম্মিলিত সামরিক আক্রমণের সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু সেই সময়ে সৈন্যসংখ্যা, যানবাহন, মজুদ এবং অন্যান্য সরঞ্জাম উভয় পক্ষেই প্রচুর পরিমাণে ছিল। মনে হচ্ছিল আমাদের চূড়ান্ত যুদ্ধের প্রস্তুতি প্রায় শেষ। কয়েকটি অবস্থান পরিদর্শনের পড় আমি হেডকোয়ার্টারে ফিরে আসি। বাহিনী সে সময়ে তাদের নামাজ পরছিল। এদের অনেকেই গত ৮ মাসে তাদের পরিবারের কোন খবর জানেনা। আল্লাহর কাছে সেজদা করার সময় তারা বাচ্চাদের মত কান্নাকাটি করছিল। আমি নামাজে যোগ দেই, শান্ত থাকার চেষ্টা করি এবং নামাজ শেষে সবার সাথে হাসিমুখে মোলাকাত করি। কিন্তু এই হাসি আমার মন থেকে আসছিলনা। অনেকেই আমাকে জড়িয়ে ধরে হু হু করে কেঁদে উঠল।

 

২১শে নভেম্বর বেলনিয়ার উত্তর ভাগ মুক্ত হল এবং বেলনিয়ার বাকি অংশ মুক্ত করার কাজ দ্রুত শুরু করলাম। ইতোমধ্যে পাকিস্তানীরা ফেনি এলাকায় বিশাল সংখ্যক সৈন্য সমাবেশ করছিল।

 

২২শে নভেম্বর তবলছড়িতে পাকসেনাদের ক্যাম্পে আক্রমণ করে ২ জন পাকসেনা আহত, ১৩ জন রাজাকার তাদের রাইফেল ও গোলাবারুদ সহ আমাদের বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পন করে। ওইদিন আমাদের ২ টি কোম্পানি বেলনিয়ার ভেতরে যুদ্ধ করছিল। সেখানে ৬ ও ১৪ কুমায়ুন ব্যাটালিয়ন নিযুক্ত ছিল। তারা ১০ জন পাকসেনাকে বন্দী করে। সেখানে আরও ২২ জন যখম হয় এবং তাদের বন্দী করা হয়। আমাদের ২ জন গেরিলা আহত হয় এবং ১ জন জেসিও এর পা মাইনে উড়ে যায়।

 

২৩শে নভেম্বর চম্পকনগর বিওপি তে অ্যামবুশ করা হয়। এতে ২ জন পাকসেনা জখম হয়। আমি জোনাল কাউন্সিলের (বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতাদের সমন্বয়ে গঠিত একটি কমিটি যারা ঐ এলাকার মিলিটারিদের সিভিল ব্যাপারে সহায়তা করে) সাথে মিটিং করি। এটি শান্তিবাজারে ছিল এবং তাদের সাথে

মুক্ত এলাকার ব্যাপারে আলোচনা করি। কে ফোর্সের কমান্ডারদের নিয়ে মিটিং হয় সেখানে ভারত ও বাংলাদেশের ১ নং সেক্টরের কমান্ডাররা ছিলেন। ভারতীয় ব্রিগেডের কমান্ডার হাই কমান্ড থেকে নির্দেশপ্রাপ্ত হয়ে ছিলেন। এবং এই সিদ্ধান্ত হয় যে খুব জরুরি মুহূর্তে ভারতীয় অফিসাররা আমাদের সৈন্যদের নেতৃত্ব দিতে পারবে। যদিও যে পরিমাণ অফিসার দরকার ছিল আমাদের তাঁর ৫% ও ছিল না। যদিও আমরা সেই সাহায্য চাইনি এবং আমাদের অফিসার ও জেসিও দিয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিলাম।

নভেম্বর ২৪ তারিখ আমরা ফুলগাজি ও চাঁদগাঁজি মুক্ত করি। পরের দিন আমি বেলনিয়ার মুক্ত অঞ্চল ভিজিট করি। সেদিন মির’সরাইয়ে আমাদের গেরিলারা রাজাকারদের একটি ক্যাম্পে আক্রমণ করে। ৩ জন রাজাকার নিহত হয় এবং কয়েকটি রাইফেল ও গোলাবারুদ দখল করে।

 

২৬ শে নভেম্বর আমাদের বাহিনী বেলনিয়ার আরও এলাকা মুক্ত করে। আমাদের সফলতার খবর ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে বিশাল পরিমাণ রাজাকার আমাদের কাছে আত্মসমর্পন করা শুরু করে।

 

২৭শে নভেম্বর প্রায় ৩০ জন রাজাকার ছাগলনাইয়াতে তাদের অস্ত্র ও গোলাবারুদ সহ আত্মসমর্পন করে। সেদিন আমরা বেলনিয়া-ফেনি রোডে মুনসীরহাটে মুক্ত এলাকা ভিজিট করি। মুক্ত এলাকার জনগণও তাদের বাড়িতে ফিরে আসতে শুরু করে।

 

২৮শে নভেম্বর মিরসরাইয়ে হাদির ফকির হাটে আমাদের গেরিলারা আক্রমণ করে। ৪ জন পাকসেনা জখম হয়। কিছুক্ষণ পরে আরও পাকসেনারা বাজারে জড়ো হতে থাকে। তারা পুরো বাজার আগুণ জ্বালিয়ে দ্যায় এবং সাধারণ মানুষকে হত্যা করতে থাকে। এরপর গেরিলারা আত্মঘাতী বোমাহামলা শুরু করে। গারিলা শাহ্‌ আলম তাঁর কার্বাইন নিয়ে জীবনে ঝুঁকি নিয়ে পাকিস্তানিদের উপর আক্রমণ চালাতে থাকে। সে ধরা পড়ার আগে ৮ জন পাকসেনাকে হত্যা করে। পাকসেনারা তাকে নির্যাতন করে এবং সেখানেই মেরে ফেলে। গেরিলারা পরে তাঁর মৃতদেহ উদ্ধার করে এবং যথাযথ ভাবে সৎকার করে।

 

৩০শে নভেম্বর গেরিলারা নালুয়া চা বাগানে পাকসেনাদের উপর আক্রমণ করে। ৫ জন পাকসেনা জখম হয়। ১টি এলএমজি ও ২টি রাইফেল জব্দ করে।

 

নভেম্বরের শেষ দিকে এটা সবার কাছে স্পষ্ট হয়ে যায় যে যেকোনো সময় যুদ্ধ শুরু হবে। এটাও শোনা যায় যে ইয়াহিয়া খান ইউএন এর কাছে একটি বৃহৎ যুদ্ধের ইস্যু তৈরি করতে চাচ্ছিলেন এবং তাৎক্ষনিক যুদ্ধ বিরতি সহ বর্ডার এলাকায় ইউএন অব্জার্ভার দেবার আবদন করতে চাচ্ছিলেন। ইউএন অব্জার্ভার দেয়া হলে আমাদের সৈন্য ও গোলাবারুদের নিয়মিত সরবরাহ ব্যাহত হবে।

 

ইতোমধ্যে ভারতীয় সেনাদের সম্পূর্ণ প্রস্তুতি ছিল। গত মাসে আমাদের গেরিলা বাহিনীদের সংখ্যাও সর্বোচ্চ হয়ে গেছে এবং তারা বাংলাদেশ ও ভারতীয় মিলিটারি অপারেশনের সাথে একত্রে যুদ্ধ করার জন্য যোগ্য ছিল। বাংলাদেশের ভেতরে যেসব গেরিলা বাহিনী অপারেশন চালাচ্ছিল তাদেরকে শত্রু লাইনের পেছনে কাজ চালিয়ে যেতে বলা হল। এতে করে পাকিস্তানীদের মধ্যে যোগাযোগ বন্ধ করা যাবে এবং আরও বড় ক্ষয়ক্ষতি করা সম্ভব হবে। আমাদের আক্রমণের এলাকায় পাকিস্তানীরা সময় মত কোথাও নতুন কোন সরবরাহ করতে পারছিলনা।

 

৪ ঠা ডিসেম্বর গেরিলারা জানতে পারল যে কাটিরকাট বাজারে পাকিস্তানীরা মুক্তিযোদ্ধা সন্দেহে সাধারণ মানুষকে এরেস্ট করছে। তারা বাড়ি ঘর জ্বালিয়ে দেয়া শুরু করে এবং ৩০ জনকে এরেস্ট করে বাজারের কাছে গুলি করার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। এই তথ্যের উপর ভিত্তি করে গেরিলারা কারিরহাট দখল করে। ৬ জন পাকসেনা নিহত হয়। বাকিরা পার্শবর্তী ক্যাম্পে পালিয়ে যায়। গেরিলারা বন্দীদের মুক্ত করে।

 

৩ ডিসেম্বর যুদ্ধ শুরু হলে গেরিলারা তাদের আক্রমণের তীব্রতা অনেক গুন বাড়িয়ে দ্যায় এবং আরও বেশী সংখ্যক আক্রমণ ও অ্যামবুশ চালাতে থাকে।

 

৯ ডিসেম্বর নাজিরহাঁট এলাকায় গেরিলা কোম্পানি পাকসেনাদের আক্রমণ করে। লে শওকতের নেতৃত্বের এই কোম্পানি ২০ জন শত্রুসৈন্য নিহত করে এবং তাদের মারাত্মক ক্ষয়ক্ষতি সাধন করে। কিছু পাকিস্তানী মৃত্যুবরন করে আর বাকিরা চট্টগ্রামের দিকে পালিয়ে যায়। আমাদের ৫ জন নিহত ও ৩ জন আহত হয়।

 

স্বাক্ষর ………

২০ শে মার্চ, ১৯৮৩

 

*[মেজর (অবঃ) রফিক উল ইসলাম, বীর উত্তম এর ২০ মার্চ ১৯৮৩ তারিখে গৃহীত সাক্ষাতকার থেকে ]

 

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
২। ১ নং সেক্টরে সংঘটিত যুদ্ধের আরোও বিবরণ বাংলা একাডেমীর দলিলপত্র

——–১৯৭১

 

 

 

নওশাবা তাবাসুম

<১০, ., ৫৯৬১>

 

প্রতিবেদনঃ শামসুল ইসলাম

বাংলা একাডেমীর দলিলপত্র

 

১। জুন মাস:

(ক) তহশীল অফিস-

(১) ফেনী শহর

(২) খিতাবচর

(৩) পটিয়া

(৪) কানুনগোপাড়া

(৫) মৌলভীবাজার

(৬) আনোয়ার থানার দুইটি তহশীল অফিস।

 

(খ) গ্রেনেড চার্জ-

(১) নিউমার্কেট ৩ জন

(২) রেয়াজউদ্দিন বাজার ৫ জন

(৩) রেয়াজউদ্দীন বাজার ৩ জন

(৪) পাচঁলাইশ থানা ৩ জন

(৫) মিউনিসিপ্যালিটি, আলী মোল্লা চৌঃ আহত হয়।

(৬) রেয়াজউদ্দিন বাজার ৪ জন আহত।

 

২। জুলাই মাসঃ

(ক) তহশীল অফিস-

(খ) গ্রেনেড চার্জ-

১) নিউমার্কেট ৫ জন

(২) সদরঘাট ৭ জন নিহিত ১১ জন আহত

৩) কক্সবাজার ২ জন

(৪) আমিন মার্কেট ১ জন

(৫) রেয়াজুদ্দিন বাজার ২ জন আহত

(৬) রেয়াজুদ্দিন বাজার কেউ মারা যায়নি

(৭) চুনার গুদামের মোড় ১ জন।

(৮) জুবলী রোড ৩ জন

(৯) খাতুনগঞ্জ ৩ জন।

 

(গ) দালাল অপারেশন-

(১) পোপদিয়ার চেয়ারম্যান কাসেম-(এই অপরেশনে বোয়ালখারীর আবুল হাসান সাহায্য করিয়াছে)

(২) রাউজানের ফয়েজ আহমেদ ৮ জন ডাকাত মুহজুল্লাহ ও তৎপুত্র

(৩) চেয়ারম্যান দেলোয়ার সওদাগর বাড়ী জ্বালিয়ে দেওয়া হয়, গাড়ীটিও,

(৪) চরকানাই-এর নাজির আহমদ

(৫) বোয়ালখালীতে দুইজন রাজাকার হত্যা।

 

৩। আগস্ট মাস:

(ক) গ্রেনেড চার্জ-

(১) রেয়াজুদ্দীন বাজার ২ জন

(২) নিউমার্কেট ২ জন

(৩) কোর্ট বিল্ডিং-বিস্ফোরণ হয় নাই

(৪) কলিজিয়েট স্কুল ২ জন

(৫) সিটি কলেজ ১ জন

(৬) চাইনিজ-ডেন্টিস্ট-কেউ মারা যায়নি।

 

(খ) দালাল অপারেশন-

(১) বধুপুরায় ৩ জন

(২) মালিয়ারায় ৭ জন

(৩) জিরিতে ৩ জন

(৪) সারেন্ডার রাইফেলসহ ৪ জন

(৫) বোয়ালখালীতে ১ জন

(৬) রাউজানে ১ জন

(৭) রাংগুনিয়ায় ৩ জন।

(গ) রাজাকার অপারেশন-

(১) জিরি মাদ্রাসায় ২১ জন রাজাকার নিহত, ১৬ টি রাইফেল

(২) বোয়ালখালীতে ১ জন রাজাকার

(৩) রাইজানে ৮ জন রাজাকার

(৪) ….২ জন রাজাকার, ২ জন পুলিশ ও চেয়ারম্যান নিহত।

 

(ঘ) অন্যান্য

(১) ১৩২০০০ ভোল্টের দুটো পাওয়ার পাইলন কলকারখানার মেইন ইলেক্ট্রিক সাপ্লাই লাইন ধংস- ২৮ দিন সমস্ত কলকারখানা বন্ধ থাকে,

(২) কৈয়াগ্রাম ১ টি পুল বিনিষ্ট,

(৩) রেলের বিট উপড়ে ফেলার ট্রেন লাইনচ্যুত (দোহাজারী লাইন)।

 

৪। সেপ্টেম্বর মাস:

(ক) রাজাকার অপারেশন:

(১) কালারপুল থানা-২ জন রাজাকার, ৬ টি রাইফেল ও এমুনিশন

(২) লাখাড়া-তিনজন রাজার দুইটি রাইফেল

(৩) ধলঘাট ৭ জন মুজাহিদ

(৫) ধলঘাট-৭ জন মুজাহিদসহ মোট ২১ জন

(৬) জৈষ্টপুরা-১ জন রাজাকার

(৭) মিলিটারি পুলে ১ জন পাঞ্জাবী।

 

(খ) গ্রেনেড চার্জ-

(১) রেয়াজুদ্দিন বাজার-২ জন

(২) ষ্টেশন রোড-কেউ মারা যায়নি

(৩) লালদিঘীরপাড়-জামাতের মিছিলে ৭/৮ জন নিহিত।

 

(গ) দালাল অপারেশন-

(১) কোরাইল ডাংগায় এক জন

(২) লারোয়াতলীতে ১ জন

(৩) বোরলায় ১ জন

(৪) ধলঘাটে ১ জন

 

(ঘ) অন্যান্য

(১) ১টি পুল ধংস

(২) লাখাড়ায় signal wireless station সম্পূর্ণ ধংস করে দেওয়া হয়

(৩) কোরাইল ডেংা পাহাড়ে কাঠ কাটা নিষিদ্ধ করা হয়

(৪) ফসফরাস দিয়ে পেট্রোল পাম্প ধংস করে দেওয়া হয়।

 

৫। অক্টোবর মাস:

(ক) রাজাকার অপারেশন-

(১) কদুরখিল গ্রামের সকল রাজাকারদের বাড়ীঘর পুড়িয়ে দেওয়া হয়।

(২) পরদিন কদুরখিল গ্রামে ৫২ জন রাজাকার ও…… বন্দি

(৩) ধলঘাট রেলওয়ে স্টেশনে ট্রেন আক্রমণ- ২১ জন পুলিশ ও রাজাকার ধৃত

(৪) পশ্চিম পটিয়ায় ২ জন রাজাকার ও ৬টি ষ্টেনগান উদ্ধার

(৫) রাউজানে তিনজন রাজাকার

(৬) শিলচলে সাতজন পাঞ্জাবী সাহায্যকারী

(৭) বান্দরবন রাস্তায় চারজন পাঞ্জাবী

(৮) দুইজন মুজাহিদ।

 

(খ) দালাল অপারেশন-

(১) পশ্চিম পটিয়ায় ১ জন

(২) রাউজানে ৫ জন

(৩) রাংগুনিয়ায় ৩ জন।

 

(গ) অন্যান্য-

(১) একটি ট্রেন বিস্ফোরক দিয়ে সম্পূর্ণ উড়িয়ে দেওয়া

(২) তিনটি কাঠের চালি……. দিয়ে উড়িয়ে দেওয়া হয়

(৩) কাঠ ব্যাবসায় ও চালনায় সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষনা করা হয়।

 

৬। নভেম্বর মাস:

(ক) রাজাকার-পাঞ্জাবী অপারেশন-

(১) টাউনে গ্রেনেড চার্জ করে তিনজন রাজাকার হত্যা

(২) পারুয়ায় গ্রেনেড চার্জ করে তিনজন মিজো ও একজন পাঞ্জাবী

(৩) মগদাইরে গ্রেনেড চার্জ করে একজন রাজাকার

(৪) ফজলপুরে গ্রেনেড চার্জ করে তিনজন রাজাকার

(৫) ধলঘাটে ট্রেন আক্রমণ করে…… জন মুজাহিদ

(৬) ধলঘাটে এম্বুশ- ৯ জন পাঞ্জাবী ও তিনজন মিলিশিয়া।

 

(খ) দালাল অপারেশন

(১) রাউজান ১ জন

(২) রাউজান ৪ জন

 

(গ) অন্যান্য-

(১) ট্রেন ইঞ্জিন লাইনচ্যুত করে দেওয়া হয়

(২) ২টি পুল নষ্ট করে দেওয়া হয়

(৩) ৪৪০০০ ভোল্টের ছোট ইলেকট্রিক লাইনটি নষ্ট করে দেওয়া হয়

(৪)১ টি কাঠের চালি ডুবিয়ে দেওয়া হয়

(৫) ১৩২০০০ ভোল্টের মেইন সাপ্লাই লাইনটিও নষ্ট করে দেওয়া হয়-মিল কারখানা আবার বন্ধ করে দেওয়া হয় (১৩ দিনের জন্য)।

 

 

 


 

ডাঃ মোঃ রাজিবুল বারী (পলাশ)

<১০, ., ৬২৬৮>

অনুবাদ

 

১নং সেক্টরের যুদ্ধ বর্ননা

(সাক্ষাৎকারঃ মেজর মাহফুজুর রহমান, বীর বিক্রম, ২৫ আগস্ট, ১৯৭৩)

 

৩ মে ১৯৭১ এ, হরিনা নামক স্থানে আমাদের জন্য একটি নতুন ক্যাম্প নির্বাচন করা হয়,যেটি ছিল ছিল সাবরুম থেকে ৫ মাইল দূরে। মেজর জিয়াউর রহমান (বর্তমানে বিগ্রেডিয়ার), মেজর শওকত আলী (বর্তমানে কর্নেল), মেজর (অবসরপ্রাপ্ত) রফিক, ক্যাপ্টেন (বর্তমানে মেজর) খালেক,ক্যাপ্টেন (বর্তমানে মেজর) অলি, ক্যাপ্টেন(বর্তমানে মেজর) এনামুল হক, আমি, জনাব ইসহাক (এডমিনস্ট্রেশান অফিসার), জনাব মুরে (এমটিও),অসংখ্য এমসিএ সেখানে ছিল। পরবর্তীতে আরও অসংখ্য অফিসার,যেমন- স্কোয়াড্রন লিডার(বর্তমানে কর্নেল) শামসুল হক,মেজর(বর্তমানে লেফট্যানেন্ট কর্নেল) খুরশিদ, ফ্লাইট লেফট্যানেন্ট(বর্তমানে স্কোয়াড্রন লিডার সুলতান, ক্যাপ্টেন(বর্তমানে মেজর) মতিউর রহমান,ক্যাপ্টেন শামস (গত), ফ্লাইট লেফট্যানেন্ট আবদুর রউফ, ফ্লাইং অফিসার শওকত সহ আরো অনেকে। এই স্থানটি হয়ে উঠে ১ নং সেক্টর হেডকোয়ার্টার এবং এর নেতৃত্বে ছিলেন মেজর(বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত) রফিকুল ইসলাম।

 

এলাকাটি চিনতে ও এর সাথে লাগোয়া সীমানা পর্যবেক্ষনে এবং লোক নিয়োগে কিছুদিন সময় লাগে। কয়েকজন বিশ্বস্ত কর্মকর্তা আমাদের সেক্টরের হেডকোয়ার্টারে আসেন এবং আমাদের কিছু মাইন,এক্সপ্লোসিভস ইত্যাদি দেখান। ১০ মে মেজর (বর্তমানে বিগ্রেডিয়ার) জিয়াউর রহমান আমাকে আলীনগর বিএসএফ ঘাটিতে নিয়ে যান এবং সেখানে ক্যাপ্টেন পিকে ঘোষ (আলী) এর সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। যিনি ছিলেন ওই ঘাটির কমান্ডার এবং আমাদের সৈন্যদের সাথে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে অনেক অপারেশনের সাথে ছিলেন। আমাকে সেখানে নিয়ে যাওয়া হয় একটি বিশেষ উদ্দেশ্যে। পরদিন সকালে আমি তার সাথে শুভপুর ব্রিজে যাই এবং দেখতে পাই আমাদের সৈন্যরা তাদের শেষ চেষ্টা দিয়ে এটি দখলে রাখছে। আমি আমার কাজ পেয়ে যাই,যার কারনে আমার এখানে আসা। এবং সেটি হল যেকোন মূল্যে মুহুরিক রেল ব্রিজটি উড়িয়ে দিতে হবে। ১১ এপ্রিল রাত ১২ টার দিকে দুইজন পিএলেস সুবেদার সাবেদ আলী ও সুবেদার জালাল আহমেদের অধীনে ব্রিজের দিকে রওনা হই। আমার দলের সাহসী ইঞ্জিনিয়ার এনসিও জুলফিকার আলী ছিল আমার ডিমোলিটার। আমাদের অনুগত কিছু বাহিনী এর আগেও ব্রিজটি ধ্বংস করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু দিনের বেলায় এটি সর্বক্ষন পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও রাতের বেলায় রাজাকার ও তাদের সহযোগী বাহিনীর পাহাড়ায় থাকে। ফলে সবগুলো প্রয়াসই ব্যার্থ হয়েছিল। যাই হোক, পথিমধ্যে আমি কয়েকজন নিশস্ত্র সেন্ট্রি পাই যাদেরকে গ্রেফতার করে সাথে নিয়ে চলি আমাদের এক্সপ্লোসিভ বক্স গুলো বহন করার জন্য। ভোর প্রায় চারটার দিকে,যখন চাদের আলো প্রায় শেষ হয়ে আসছিল আমরা অনেক বাঁধা পেরিয়ে ব্রিজের কাছে চলে আসতে সক্ষম হই। প্রায় ১০-১৫ জন সাধারন নাগরিককে হাঁটাচলা ও গল্পগুজব করতে দেখতে পাই। পাকিস্তানি সেনা আছে কিনা তা বোঝার জন্য কয়েক মিনিট পর্যবেক্ষন করি। তারপর আর সময়ক্ষেপন না করে সরাসরি আমার কাজে নেমে পড়ি। কিন্ত প্রায় দশ মিনিটের মাথায় প্রায় ২০০ থেকে ৩০০ জন স্থানীয় লোক ব্রিজের পাশে জড়ো হয় এবং চিৎকার করে আমাদের ব্রিজ উড়িয়ে দিতে বাঁধা দেয়। এমনকি তাদের মধ্যে অনেকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে খবর দেয়ার ভয় দেখায়। এই চিৎকার গন্ডগোলের মাঝেও প্রায় ২০-২৫ মিনিট লেগে যায় ব্রিজের দুই পাশে এক্সপ্লোসিভগুলো ফিট করতে। তারপর আমি আমার প্লাটুনকে নিরাপদ দূরত্বে সরে যেতে বলি এবং স্থানীয়দের এই মুহূর্তে স্থান ত্যাগ করতে বলি। কিন্ত বারবার সতর্ক করা সত্ত্বেও তারা আমার কথার কোন গুরুত্বই দেয় না। তারপর আমি সেফটি ফিউজ ফায়ার টি চালু করে দেড় মিনিট পর্যন্ত দৌড়ে দূরে চলে আসি। কানফাটা শব্দে ব্রিজের একপাশ ধসে পড়ে। পরবর্তীতে আমি আমার প্লাটুনের সাথে যোগ দেই এবং ক্যাম্প ত্যাগ করি। এই সকালেই শুভপুর ব্রিজে আক্রমন হয় এবং সেটি দখল করা হয়।

 

জুনে মেজর (বর্তমানে বিগ্রেডিয়ার) জিয়াউর রহমান বেঙ্গল রেজিমেন্ট ৮ E এর মূলভাগ এবং সেইসাথে সেক্টর ১ এর আরো কিছু বিচ্ছিন্ন ফোর্স মিলিয়ে তুরাতে একটি পরিপূর্ন নূতন ব্যাটেলিয়ন প্রস্তুত করেন। ক্যাপ্টেন খালেক, ক্যাপ্টেন সাদেক, ক্যাপ্টেন অলি, ক্যাপ্টেন এজাজ ছিলেন এই ফোর্সের সাথে। আমাকে ১ নাম্বার সেক্টর সাথে সাবরুমে ৩ নাম্বার সাবসেক্টর এর কমান্ডার করা হয়। ১ নাম্বার সাবসেক্টর টি ছিল বিলোনিয়ায় ক্যাপ্টেন শামস (গত) এর অধীনে। দুই নাম্বার সাবসেক্টর টি ছিল ক্যাপ্টেন (বর্তমানে মেজর) মতিউর রহমান এর অধীনে যা অবস্থিত ছিল শোভাপুরের নিকট শ্রী-নগরে। তিন নাম্বারটি ছিল আমার অধীনে এবং এর অবস্থান ছিল রামগড়ের ঠিক বিপরীতে। চার নাম্বার সাবসেক্ট্ররটি ছিল ইপিআর সুবেদার খায়রুজ্জামানের অধীনে এবং যায়গাটির নাম ছিল তবলছড়ি, কাসালং এর উত্তরে। মেজর (বর্তমানে কর্নেল) শওকত সিলেটে পাচ নাম্বার সেক্টরের কমান্ড গ্রহন করেন। ক্যাপ্টেন (বর্তমানে মেজর) এবং এডজুডেন্ট ফ্লাইট ল্যাফটেনেন্ট (বর্তমানে স্কোয়াড্রন লিডার) সুলতান আহমেদ ছিলেন ইনডাকটিং অফিসার।

 

আমি আমার সাব সেক্টরের অধীনে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন যায়গায় অপারেশান পরিচালনা করছিলাম যেমন রামগড়,চিকনাছড়া,হাইকু, নারায়নহাট,কারিরহাট,শুভপুর, জোরারগঞ্জ,মাস্তান নগর এবং মীরসরাই এর অধিকাংশ যায়গা যা ছিল বর্ডার এর ২০ মাইলের মধ্যে। গত ২-৩ মাসে আমার সাব সেক্টরের সেনারা কয়েকটি সফল অভিযানের মাধ্যমে শত্রুদের মাঝে ত্রাসের সৃষ্টি করে। গত তিন মাসে বিভিন্ন অপারেশনে হতাহতের সংখ্যা ছিল ৩০০ এর বেশী। আমার সেক্টর কমান্ডার মেজর রফিক এবং পুরো সেক্টরের দোয়া আমাদের উপর ছিল কারন আমরা পরিপূর্ন সন্তুষ্টি সহকারে অপারেশন গুলো সম্পন্ন করতে পেরেছিলাম। বিগ্রেডিয়ার আনন্দ স্বরুপ পরবর্তীতে ১ নাম্বার সেক্টরের দায়িত্ব গ্রহন করেন এবং ২৮ আগস্ট ১৯৭১ সালে প্রথমবারের জন্য আমার সাবসেক্টর টি পরিদর্শন করেন এবং আমাদের অনুপ্রেরণা যোগান।

 

পরবর্তীতে আমাকে শ্রীনগরে ২ নাম্বার সাব সেক্টরের দায়িত্ব গ্রহন করতে বলা হয় যা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ন একটি স্থান। একাত্তরের ১৫ সেপ্টেম্বর,আমি আমার কিছু সাহসী পুরানো যোদ্ধা বন্ধু যেমন ক্যাপ্টেন পিকে ঘোষ,লেফট্যানেন্ট কর্নেল হিম্মত সিং সিও ৪ গার্ডস,ক্যাপ্টেন বাজওয়া একমাত্র আর্টিলারি অফিসারদের সাথে মিলিত হই। তারা সকলেই আমাকে সেখানে পেয়ে আনন্দিত ছিলেন। জনাব খায়রুদ্দিন এমসিএ-ইয়ুথ ক্যাম্প কমান্ডার এবং আফসারুদ্দিন ব্যারিস্টার, আরেকজন ক্যাম্প কমান্ডার (ব্ল্যাক শার্ট) আমার সাথে ক্যাম্পে দেখা করেন এবং আমার সাহায্য ও সহযোগিতা কামনা করেন। পরবর্তীতে আমরা ৪ টি দলের একটি অপারেশান চালনা করি পাকিস্তানি একটি ক্যাম্পে, চম্পকনগরে। যেখানে লেফন্যানেন্ট কর্নেল হিম্মত সিং নিজে আমার সাথে ছিলেন।

 

১৯ সেপ্টেমবর ১৯৭১ এ চারজন গার্ড স্থানান্তরিত করা হয় ১৪ রাজ রিফ, লেফট্যানেন্ট কর্নেল ওম প্রকাশ শর্মা বল্লভপুর ও চম্পকনগরে অপারেশানের জন্য একটি প্ল্যান তৈরী করেন। রাতের বেলার এই আক্রমনের জন্য দিনের বেলা রিহার্সেল করা হয়। ২১ সেপ্টেম্বর ভোর ৩ টা ত্রিশ মিনিটে দুইটি গ্রুপে ভাগ হয়ে সৈন্য রওনা হয়। যার একটি ছিল লেফট্যানেন্ট আবদুল হামিদের নেতৃত্বে বল্লভপুরে এবং আরেকটি ছিল আমার অধীনে চম্পকনগরে। আমরা একই সময়ে আক্রমন শুরু করি। আমাদের শেলিং আক্রমন ছিল ভয়াবহ যদিও তারাও খুব সহজ ছিল না। যদিও আমরা দ্রুত টার্গেট নিয়ন্ত্রনে আনতে পারি নি। আমাদের সকল শেল ই টার্গেটের আশেপাশে পড়ছিল এবং তারা প্রাণভয়ে পালাতে শুরু করে। আমরা তাদের বন্দি করতে ব্যর্থ হই। আমার একজন সিপাহী আহত হয় এবং রাজ গ্রুপের দুইজন সিপাহি আহত হয়।

 

৫ অক্টোবরে জনাব সামাদ,বাঙ্গলাদেশের এক্টিং ডিফেন্স সেক্রেটারি,জেনারেল সরকার, এবং বিগ্রেডিয়ার শাহ আমার ক্যাম্প পরিদর্শন করেন এবং চলমান অবস্থার পরিপূর্ন একটি রিপোর্ট দেখতে চান। গত কয়েক দিনে অসংখ্য ব্রীজ, বিদ্যুতের পাইলন ধ্বংস করা হয়। অসংখ্য সফল এমবুশ,রেইড, এসাল্ট চালনা করা হয়। এবং পরবর্তীতে আরো সহযোগী কিছু সংগঠন বল্লভপুর,মধুগ্রাম,শ্রী নগর এবং ছাগলনাইয়ার সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে দূরে সরে আসতে শুরু করে।

 

আমার একটি প্লাটুন পুলিশের সুবেদার রাফিকুল ইসলামের নেতৃত্বে ছিল। তাকে কিছুদিন আগে আমি এফ এফ এর কিছু দল সহ বাংলাদেশের ভিতরে মিরেরসরাইতে পাঠাই। সেখানে সে ২ সপ্তাহ ছিল। প্রচুর সফল অপারেশন করে। এবং একদা এক পাকিস্তানী মেজরের কাটা মাথা নিয়ে হাজির হয়। ঐ অপারেশনগুলোতে আমাদের একজন সাহসী শিক্ষানবিশ এফ এফ নিহত হয়। নায়েক জুলফিকারের বাম কাঁধ উড়ে যায়। বেঙ্গল ৮ ই এর সিপাহি নুরুল আলমের পেট ও থাই এর পিছনের দিকটা উড়ে গেলেও অনেক কষ্টে সে নিরাপদে ফিরে আসে।

 

১৫ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ, ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছোট ভাই, কিছু ভিআইপি, জেনারেল নরেন্দর সিং, মেজর (বর্তমানে লে কর্নেল) নুরুল ইসলাম এবং আরও ৪০ জন অফিসার আমার ক্যাম্পে আসেন এবং আমার সৈন্যদের বাহবা দেন।

 

উত্তরে নালুয়া বিওপি পর্যন্ত আমার প্রতিরক্ষ বাড়াই। সেখানে চাঁদগাজির বেলনিয়া ও আলমিহাঁট পর্যন্ত অপারেশনের দায়িত্বে ছিলেন সাহসী ইপিআর এর জে সি ও সুবেদার লনই মিয়া। দক্ষিণে কারেরহাঁট – শোভাপুর পর্যন্ত আরেকজন সাহসীর দায়িত্বে ছিল। তিনি হলেন ই পি আর এর জেসি ও এন/সুবেদার রহমত আলি। আরও কিছু সাহসী জে সি ও ইপি আর এর এক্টিং সুব মেজর ফখরুদ্দিন, ৮ ই বেঙ্গলের সুবেদার সাবেদ আলি, ই পি আর এর সুবেদার আব্দুল গনি যারা কয়েক মাস ধরে প্রচুর সফল অপারেশন চালিয়েছেন এবং সুনাম কুড়িয়েছেন।

 

২১ শে অক্টোবর আমার তিন প্লাটুন বাংলাদেশের ভিতরে ধুঁকে পরে তিনটি ভিন্ন জায়গায় যথাক্রমে ফটিকছড়ি, নাজির হাঁট ও মীর সরাই এ স্বাধীন হবার শেষ দিন পর্যন্ত অপারেশন চালায়। একটি ছিল সুবেদার সাবেদ আলি -লে শওকতের অধীন। দ্বিতীয় টি এনআই সুবেদার রহমান এ ইউ লে ফারুক আহমেদের সাথে, আর তৃতীয়টি সুবেদার রফিকুল ইসলাম লে রকিবের সাথে।

 

২৪শে অক্টোবর আমার এলাকায় একটি সম্মেলন হয়। ব্রিগেডিয়ার সান্ধু কমান্ডার ৮৩ বিডীই, লে কর্নেল বিশলা সি ও ৮ বিহার, লে কর্নেল ভিড়ক কমান্ডার আর্টিলারি, মেজর বাজওয়া সমরগঞ্জের বিওপি কমান্ডার এবং আমি সেখানে ছিলাম। এর পড় আমরা সবাই বেলনিয়া বিওপি পর্যন্ত রেকু করি। কিছুদিনের ভেতর আমি আমার সাব সেক্টরের বাহিনীর তিন চতুর্থাংশ নিয়ে বেলনিয়ার কাছে চলে যাই। ৩০ অক্টোবর শান্তিরহাট এ ৮৩ বিডিই হেডকোয়ার্টারে সেক্টর কমান্ডার মেজর রফিকের সাথে মিটিং করি। পরবর্তি অপারেশনের জন্য বাহিনীকে সতর্কতা আদেশ প্রদান করি। গুথুমা ও মোতাই বিওপি তে রেকু করি। ১ নভেম্বর ৩য় কনফারেন্সে অংশ নেই। লে জেনারেল সাগাত সিং ও মেজর জেনারেল হিরা সেখানে ছিলেন – তাদের সাথে বেলনিয়াতে প্রবেশের নিয়মিত আলোচনা করি।

 

বেলনিয়ার ৪ মাইল দক্ষিণে পরশুরামের নিকট রাস্তা ব্লক করার দায়িত্ব আমরা ৮৩ বিডিই এর কাছে থেকে পাই। এর উদ্যেশ্য ছিল আমাদের দক্ষিণ থেকে আক্রমণ ঠেকানো। মহুরি নদী বেলনিয়ার ভিতর সোজাসুজি উত্তর দক্ষিণ বরাবর গিয়ে এটিকে পূর্ব ও পশ্চিম দুই সেক্টরে বিভক্ত করেছে। পূর্ব দিকের ১ নং সেক্টরের কমান্ডার আমাকে বানানো হল। আর পশ্চিমের দায়িত্ব দেয়া হল ক্যাপ্টেন (বর্তমানে মেজর) জাফর ইমামকে। ক্যাপ্টেন জাফর ইমামের সাথে ক্যাপ্টেন হেলাল মুশেদের নেতৃত্বে ১০ ই বেঙ্গল ও ২ ই বেঙ্গলের একটি দল মোতায়েন ছিল। আমার ৪ টি দল ছিল। বেশিরভাগ ইপিআর এর ছেলেরা। লে মন্সুরুল আমিনের নেতৃত্বে ২টি দল ও আমার সাথে ২ টি। লে মন্সুরের ৬ পিআই কমান্ডার ছিল ই পি আর এর সুবেদার আজিজ, ই বেঙ্গলের হাবিলদার (বর্তমানে এন/সুবেদার) ইমাম, পুলিশের হাবিলদার (বর্তমানে এন/সুবেদার) এরশাদ। আমার সাথে ৬ জন ছিল। সুবেদার লনি মিয়া ই পি আর থেকে, এক্টিং সুবেদার মেজর ফখরুদ্দিন ই পি আর থেকে, সুবেদার আব্দুল গনি ই পি আর থেকে, হাবিলদার শহীদ ই পি আর থেকে, এন/সুবেদার নুরুজ্জামান ই পি আর এর এবং এন/সুবেদার দিন মোহাম্মাদ ই পি আর থেকে। লে মন্সুরের সাথে ৩’’ মর্টার ছিল ই পি আরের এন/সুবেদার মানিকের কাছে। আমার কাছে ৩’’ মর্টার টি ই বেঙ্গলে এন/সুবেদার সাইদ আহমেদের কাছে ছিল। আমার সেক্টরে ২ টি রাজপুট যুক্ত ছিল এবং ক্যাপ্টেন জাফরের সেক্টরে ছিল দগড়া।

 

৩/৪ নভেম্বর রাতে আমরা বেলনিয়াতে রেকু করি। ৬টি রোড ব্লক পজিশন ছিল আমার অধীনে আর ৬ টি ছিল ক্যাপ্টেন শামসের অধীনে। আশ্চর্যের বিষয় ছিল বর্ডারের ৫ মাইলের ভিতর রেকু করলেও আমাদের উপর কোন আক্রমণ আসল না। ১ নং সেক্টরের উপ অধিনায়ক ক্যাপ্টেন শামস এই দিন সন্ধ্যায় মৃত্যুবরণ করেন। সেক্টর কমান্ডার মেজর রফিক ও বেলনিয়ার মেজর প্রধান তাকে দেখতে আসেন। বেলনিয়ার বাংলাদেশের অংশে তাকে দাফন করা হয়। লে মন্সুর এই সেক্টরের উপ অধিনায়ক নির্বাচিত হন।

 

৫ নভেম্বর ৫টা ৩০ মিনিটে আমরা বেলনিয়াতে প্রবেশ করি। আমাদের রোড ব্লকের শেষ পয়েন্ট ছিল সালিয়া দীঘি, পরশুরাম পি এস এর ২ মাইল দক্ষিণে, বর্ডারের ৫ মাইল ভিতরে বেলনিয়া ছাগল নাইয়া মেইন রোডের পাশে। ২ রাজপুতের একটি প্লাটুন ও আর্টিলারি ও পি আমার সাথে ছিল। তখন ছিল গভীর রাত এবং মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছিল যখন আমরা সেখানে প্রবেশ শুরু করি। রাস্তা পিচ্ছিল ছিল, অন্ধকারে একে ওপরকে হারিয়ে ফেলছিলাম, অনেকে ঠাণ্ডায় কাপাকাপি করছিলাম। রাত ১২ টার সময় আমরা গন্তব্যে পৌছালাম। তখন প্রচণ্ড ঝড় হচ্ছিল। আমরা অবস্থা নিতে শুরু করি এবং এখানে সেখানে গর্ত করতে থাকি। ঝরের কারণে আমাদের এফ এফ রা তাদের জি সি আই শিট আমাদের পচনে আনতে পারছিলনা। আসে পাশে যা কিছু ছিল তাই দিয়ে আমরা মোটামুটি একটা ডিফেন্স বানালাম।

 

পরের দিন ৬ নভেম্বর ৫ টা ৩০ মিনিটে গুথুমা বিও পি তে একটি পেট্রোল সম্ভবত রেকু করে ফিরছিল। তখন তারা সুবেদার লনি মিয়া পি আই এর আক্রমণে পড়ে শেষ হয়। ১০ টার দিকে শত্রুরা আমাদের ব্যাপারে জানতে পারে এবং চারদিক থেকে আক্রমণ শুরু করে। ঝরের ভিতর সারা দিন তারা আমাদের পরাস্ত করতে চেষ্টা করেও ব্যার্থ হয়। রাতে আমার লেফট ফরওয়ার্ড পি আই হাবিলদার শহীদ শত্রুদের দ্বারা আক্রান্ত হয়। কিন্তু শত্রুরা হতাহত হয় এবং তাদের লাশগুলো এলোমেলো ভাবে পড়ে ছিল।

 

৭ নভেম্বর ৪টা ৪৫ মিনিটে ১১ পাঞ্জাবের একটি দল আমার বামের হাবিলদার শহীদের অংশে আবার আক্রমণ করে। আক্রমণ করতে করতে তারা দলের মূল ঘাঁটি সালিয়া দীঘির কাছে পৌঁছে যায়। আমি বুঝিনি কি হয়েছে। আমি দেখছিলাম আমাদের ও শত্রুবাহিনী আমাদের দিকে দৌড়ে আসছে। শেষ পর্যন্ত শত্রুবাহিনী আমাদের ঘাঁটি পর্যন্ত আস্তে না পারলেও সালিয়া দীঘির পাশে আমাদের ঘাঁটি থিক ১০০ গজ দূরে আমাদের অবস্থানটি দখল করে নেয়। ৫ জন সেনা, ২ জন এফ এফ, পি আই কমান্ডার হাবিলদার শহীদ ধৃত হন এবং তাদের হত্যা করা হয়। ২ দিন ধরে ৭ টি লাশ সেখানে পড়ে ছিল। হাবিলদার শহীদ কে ফেনী জেলে নিয়ে যাওয়া হয় এবং তাকে সেখানে গুলি করে হত্যা করা হয়। জেলে তার একজন ভাতিজা ছিল – সৌভাগ্যক্রমে স্বাধীনতার দিনটি পর্যন্ত সে জীবিত ছিল।

 

২ দিন ধরে আমি শত্রুদের থেকে আমার অবস্থান টি পুনরুদ্ধার করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু পারা যাচ্ছিলনা। গত ২ দিন ধরে শত্রুরা আমাদের উপর অনেক আক্রমণ চালিয়েছে। সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল ৮ নভেম্বর সন্ধ্যায়। পরশুরাম ও বেলনিয়া আমাদের অপারেশনে আসল। এই মুহূর্তে আমরা ছিলাম পিছনে – শুরু দক্ষিণে শত্রুরা আমাদের সামনে ছিল।

 

৯ নভেম্বর এক্টিং সুবেদার মেজর ফখরুদ্দিন ও ২ রাজপুটের লে কুমুদের প্লাটুন দক্ষিণ বেড়াবাড়িয়া গ্রামে আমাদের পুরনো অবস্থান যেটি হাবিলদার শহীদের অধীনে ছিল সেটই পুনরুদ্ধার হয়। শত্রুরা তাদের বা আমাদের মৃতদেহ কনটিকেই মাটিচাপা দেয়নি। আমরা ১৫ টি পচা লাশ সেখানে পেয়েছিলাম যেগুলোকে মশা, মাছি আর পোকা ধরে গেছিল। তাই একটি লাশ ও আমরা সনাক্ত করতে পারিনি। একটি লাশের পকেটে পবিত্র কুরান ছিল আর একটি কাগজে লেখা ছিল ‘২৪৮৪৫৪৭ সেপাই মুশ্তাক আহমেদ’। পালাবার সময়ে শত্রুপক্ষ প্রচুর অস্ত্র ও গোলাবারুদ রেখে যায়। একটি ঝুরিতে লেখা ছিল ১১ পাঞ্জাব।

 

৯ নভেম্বর বিকেল সাড়ে ৩টায় ৩টি শত্রু বিমান আমাদের অবস্থানের ওপর নাপাম বোমা বর্ষন করে। আমার একজন সেপাহি আহত হয়েছে। আর মেজর শহীদের দলের একজন আহত হয় এবং ঘটনাস্থলেই মারা যায়। ১০ নভেম্বর শত্রু পক্ষ চাতালিয়া ও কাপ্তান বাজার থেকে আক্রমণ চালায়। কিন্তু আমাদের অবস্থান থেকে আমাদের সরাতে ব্যার্থ হয়। আজ বিকেল সাড়ে ৩ টায় ৪টি বিমান দিয়ে আবারো আক্রমণ করে। সন্ধ্যায় চাতালিয়ায় ডান দিক থেকে একটি ব্যাটালিয়ন আক্রমণ করে। তাছাড়া সামনে সাতকুচিয়া আর বামে গুথুমা থেকেও আক্রমণ করে কিন্তু ব্যার্থ হয়। সর্বশক্তিমান আল্লাহ আমাদের সাথে ছিলেন। শত্রুদের প্রচুর ক্ষয় ক্ষতি হয় এবং তারা ২/৩ মাইল পিছু হটে। পরেরদিন সকালে PAF CESNA আমাদের উপর দিয়ে ঘোরা শুরু করল এবং গোলা নিক্ষেপ শুকু করে। ১২ নভেম্বর শত্রু সেনারা গুথুমা ত্যাগ করে। ২ রাজপুট এর লে কর্নেল দত্ত ও সেক্টর কমান্ডার মেজর রফিক আমাদের সাথে দেখা করলেন এবং বাহবা দিলেন। সালিয়া দীঘি থেকে আমি আমার বাহিনী নিয়ে এসে ১ মাইল দূরে আরও ভালো অবস্থান নিয়ে নিলাম।

 

বেলনিয়া হেডকোয়ার্টারে সকল অপি কমান্ডারদের নিয়ে একটি কনফারেন্সের আয়োজন করা হল। ক্যাপ্টেন (বর্তমানে মেজর) জাফর ইমাম সেখানে ছিলেন। সফল যুক্ত অপারেশনের জন্য আমরা একে ওপরকে জড়িয়ে ধরলাম। মেজর জেনারেল হিরা আমাদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিলেন এবং আমাদের বাহবা দিলেন। আমাদেরকে আমাদের বর্তমান লাইন বেলনিয়া- ছাগল নাইয়া থেকে আরও এগিয়ে যাবার আদেশ দেয়া হল। আমরা আরও ২ মাইল এগিয়ে গেলাম। মোতাইখালের কাছে। আমাদের ডানে কেত্রাঙ্গা তে আর বামে বাঘমারা আর সামনে কাপ্তান বাজারে শত্রুদের শক্ত ঘাঁটি ছিল।

 

১৯ নভেম্বর বিডি ইহেড কোয়ার্টারে আরেকটি মিটিং করি। এখন আমরা একটি নতুন ১৮১ বিডিই এর অধীনে আসলাম সেটাতে দায়িত্বে ছিলেন ব্রিগেডিয়ার আনন্দ সরূপ। লে কর্নেল হাসাবনিসের দায়িত্বে একটি নতুন ব্যাটালিয়ন ৬ জাত আমার বাহিনীতে যুক্ত হয়। আমার বাহিনী ও ৬ জাত নিয়ে বেলনিয়ার ৯ মাইল দূরে আমরা আমাদের ২ য় রোড ব্লক শুরু করি খেজুরিয়া বিওপি এর ভিতরে মহাম্মাদপুরের দক্ষিণে। শত্রুরা আমাদের বিপক্ষে ফিল্ড আর্টিলারি ব্যাবহার করছিল। জগতপুর গ্রামে শত্রু অবস্থানে আক্রমণ করি। ১০ রাজাকার ও ১৫ বালুশ আমাদের কাছে আত্তসমর্পন করে। সেই অপারেশনে ৬ যাতের একজন নায়েক নিহত হয়। চিতলিয়া, কাপ্তান বাজার, মহাম্মাদপুর, খেজুরিয়ার বেশীর ভাগ অপারেশনে আমরা সবাইকে আত্তসমর্পনে বাধ্য করি। Allied PT. 76 amphibious tks were used in our support on 24th November. আমজাদঘাঁট ও চাঁদগাজি বাজারে শত্রুপক্ষ শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তোলে। আমরা আমাদের গতি ধরে রাখি। ২৫ নভেম্বর পর্যন্ত। এটি মৃধার বাজার পর্যন্ত। ছাগল নাইয়াতে আব্দুল কাদের মজুমদার নামে একজন খুব ভালো বেসামরিক ব্যাক্তি আমাদের যথেষ্ট সাহায্য করেন। তিনি আমাদের সাথে যুদ্ধেও অংশ গ্রহণ করেন। গঙ্গাধড়বাজার, রেজুমিয়া ও ফেনী থেকে শত্রুরা পালিয়ে যেতে শুরু করে।

 

২৮ নভেম্বর শান্তির বাজার ১৮১ বিডিই হেড কোয়ার্টারে ব্রিগেডিয়ার আনন্দ সরূপের সাথে আরেকটি মিটিং করি। সেখানে সিও৬ যাত, সি ও ১৪ কুমাওন, সি ও ৩২ মোহর এবং আমাদের পরবর্তি কাজ বুঝিয়ে দেয়া হয়। এবারে আমাকে একটু বড় ও ঝুঁকি পূর্ন এলাকার দায়িত্ব দেয়া হল। আমার একটি প্লাটুন ছিল সুবেদার লনি মিয়াঁর নেতৃত্বে। তাদেরকে মাতুয়া গ্রামে অবস্থান নিতে বলা হল। এটি ছিল দখিন যশপুরে অবস্থিত শত্রুদের হেডকোয়ার্টারের নাকের ডগায়। তাই আমাদের এই প্লাটুনটিকে শত্রুরা সহজেই আক্রমণ শুরু করে। শত্রুরা একটি স্টিম রোলার এনে আমাদের ঐ এলাকার এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে যেতে থাকে।

 

কিন্তু আমরা সেটিকে ট্যাঙ্ক ভাবতে থাকি। কিন্তু স্থানীয়দের কাছে জানতে পারি এটি একটি রোড রোলার মাত্র। অনেকবার অনুরোধ করার পড় ব্রিগেডিয়ার আনন্দ সরুম আমাকে কিছু ফোর্স দিলেন। মেজর গুরুং এর বাহিনী থেকে গুরখা পি আই এর ৩২ মাহার আমাদের দেয়া হয়। সাথে সাথে সেটাকে আমি সুবেদার লনি মিয়াঁর পি আই এ যুক্ত করি। মাইন, পেট্রোল ও গোলাগুলির কারণে আমি প্রতিটি অবস্থানেই দেখতে যাই। তবে ঐ সময়ে মুভ করা কঠিন ছিল। কারণ সর্বত্রই শত্রু পক্ষের মাইন পোঁতা ছিল। এগুলোর সব গুলোকে নিষ্ক্রিয় করা সম্ভব ছিলোনা। ৩২ মাহারের এক নায়েক ৫৭ আর সি এল আনার সময় মাইনে পারা দেয় এবং তার ডান পায়ের কনুই থেকে হাঁটু পর্যন্ত উড়ে যায়। আমি আমার আর এম ও চট্টগ্রাম মেডিকেলের ৫ ম বর্ষের ছাত্র ডা শফিকুর রহমান ভুঁইয়া কে নিয়ে সেখানে যাই এবং প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে তাকে এ ডি এস মৃধার বাজারে পাঠানো হয়। এর কিছুক্ষণ পরই সুবেদার ফখরুদ্দিনের পি আই মাইনে আঘাত পান। ড্রেসিং করার মত একটি টুকরাও আমাদের কাছে ছিলোনা। একটি কম্বল দিয়ে ক্ষতটা পেঁচিয়ে তাকে ম্রিধার বাজারে পাঠানো হয়।

 

৩ ডিসেম্বর লে কর্নেল হর গোবিন্দ সিং ৩২ মোহরের সি ও তার ও জি পি আমার সাথে হেড কোয়ার্টারে দেখা করতে আসেন। তিনি শত্রুদের অবস্থানের একটি সম্পূর্ন ধারনা চাচ্ছিলেন। সেই রাতে তার গুর্খা পি আই যেটা আমার বাহিনীর সুবেদার পি ায় ফ্রন্টের সাথে যুক্ত ছিল তাদের অন্য একটি অপারেশনে যেতে বলা হয়। ফেরার সময় অকস্মাৎ একটি গুলিতে একজন ঘটনাস্থলেই নিহত হন। ছিরিঙ্গা দীঘিতে আমার বাহিনী ও মিত্র বাহিনীর মেজর গুরুং এর ৩২ মাহারের কিছু অংশ দিনব্যাপী আক্রমণ করে। ৫ ডিসেম্বর শত্রুরা প্রচুর মাইন রেখে পালিয়ে যায়। জায়গাটি সম্পূর্ন ক্লিয়ার করতে গেলে কয়েকজন বেসামরিক গাইড গুরুতর আহত হন।

 

সুবেদার মেজর মহিউদ্দিন নামে আমার একজন পিআই কমান্ড তার ডান পায়ে হাঁটুর নিচে গুলি খান। তাকে এ ডি এস মৃধাবাজারে পাঠানো হয়। এবং তার এম জি কমান্ডার এন/সুবেদার সফিউল্লাহ তার দায়িত্ব পান। ইতিমধ্যে আমাকে মুহুরি নদীর কাচজে রেজু মিয়া ব্রিজের নিকট পানুয়া (উত্তর) কাশীপুর ও নিজপানুয়া তে যেতে বলা হয়।

 

এখানে আমাকে বলা হয় আমার ডানে ৪ ই বেঙ্গল ফেনী থেকে চট্টগ্রামের দিকে আসছে আর ডানে বর্ডারের পাশ দিয়ে ৩২ মাহার আছে। আমরা ১৮১ বিডিইএর সাথে চট্টগ্রামের দিকে যাচ্ছিলাম। এখন আমি আমার পুরনো জায়গায় আসলাম যেখানে আমি আগে বহু অপারেশন চালিয়েছি। ৬ ডিসেম্বর আমি আমার দল নিয়ে করিয়া বাজারে পৌঁছালাম। সেখানে ৪ ই বেঙ্গলের লে মুমতাজের সাথে দেখা হয় যার দল ধুম ঘাটের দিকে যাচ্ছিল। এখানে এতদিন পড় নিয়মিত ই বেঙ্গল ট্রুপ্স দেখে আমি খুশি হলাম।

 

প্রথন বারের মত ১ নং সেক্টরের হেড কোয়ার্টার বাংলাদেশের ভেতরে পরশুরামে স্থাপিত হল। ঢাক – চট্টগ্রাম রোডের লম্বা যাত্রা পথে সেক্টর কমান্ডার মেজর এনামুল হোক চৌধুরীর সাথে দেখা হয়। তিনি ৩২ মাহারের সাথে যাচ্ছিলেন। দেখা হল গঙ্গাধর বাজারের কাছে। পথে সর্বাপুর ও অন্যন্য গুরুত্তপূর্ন ব্রিজ উড়িয়ে দেয়া হয়। নৌকায় জুরিন্দা দিয়ে ফেনী নদী পাড় হই। ৮ ডিসেম্বর মধ্য রাতে কারেরহাট পৌছাই।

 

৯ ডিসেম্বর সকালে আমাকে বলা হয় ৩২ মহার এর একটি দল মেজর ভাস্করের সাথে মেইন রোডে যেতে। ক্যাপ্টেন আলি নামে একজন আর্টিলাড়ি ও পি আমাদের সাঁথে ছিল। শত্রুরা ফেরার পথে আমাদের উপর বোমা বর্ষন করতে থাকে। যরাগঞ্জে পৌছাই ও আমার বাহিনী নিয়োগ করি। সেক্টর কমান্ডার মেজর রফিক ও যরাগঞ্জে এম সি এ মীর মশাররফ হোসেন এখানে আমাদের সাথে যোগ দেন এবং আমাদের উৎসাহিত করেন। এহন ৩ টি দল তিন দিক দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। আমি আমার বাহিনী নিয়ে সীতাকুণ্ডের দিকে, মেজর গুরুংফ তার দল নিয়ে ঢাকা ট্রাঙ্ক রোড অক্ষে আর মেজর ভাস্কর রোডের ডান পাশ দিয়ে গ্রামের ভিতর দিয়ে।

 

সারা রাত হেঁটে ৩ টা ৪৫ মিনিটে আমি আমার বাহিনী নিয়ে বারাইয়াধালা র‍্যালি স্টেশনে পৌছাই। এখানে আমি আমার পুরনো বাহিনীকে খুঁজে পাই যারা লে রকিব, ফারুক ও শওকাতের সাথে অনেক আগেই বাংলাদেশে প্রবেশ করেছিল। সেটা ছিল অক্টোবরে। লে রকিব মীরের সরাইয়ে, লে ফারুক সীতাকুণ্ডে আর লে শাওকাত হাঁটহাজারিতে কাজ চালাচ্ছিলেন। আমি আমার পুরনো সাব সেক্টরের সবার সাথে দেখা হওয়ায় খুব অনন্দিত হলাম। লে শাওকাতের নাজিরহাটে কয়েকজন নিহত হওয়া ছাড়া বাকি সবাই অক্ষত আছে জেনে ভালো লাগলো।

 

সীতাকুণ্ডের প্রচুর শত্রু সৈন্য সমাবেশ হতে থাকল। এবার ব্রিগেডিয়ার আনাদ সরুম ৩২ মাহর কে একটি নতুন কাজ দিলেন। সীতাকুণ্ডের পিছন নিয়ে বাহিনী নিয়ে আমাকে যেতে বলা হল। মীর প্রকাশের অধীনে ৩১ যাতের একটি দলকে ভোর ৪ টার সময় রোড ব্লক করতে বলা হল – যাতে শত্রুরা পালিয়ে যেতে না পারে। লে কর্নেল হর গোবিন্দ সিং এর সাথে ৩২ মাহালের একটি দল ও মেজর গুরুং এর সাথে অন্য একটি দল সীতাকুণ্ড র‍্যালি স্টেশনে আক্রমণ করে। আক্রমণ রাতে করা হয়। এসময়ে অনেক সৈন্য অবস্থান ত্যাগ করেছিল। কিছু সৈন্য যারা আমাদের দিক দিয়ে পালানর চেষ্টা করছিল তাদেরকে আমরা আক্রমণ করি। কেউ নিহত হল, কেউ আত্ম সমর্পন করল। এখানে আমি লে মন্সুর ও লে ফারুক এর সাথে আবার দেখা হয়। তাদের সাথে আমি ৩ অক্ষে এগোতে থাকি। লে মন্সুর র‍্যালি লাইন, আমি ঢাকা ট্রাঙ্ক রোড ও লে ফারুক ডানে উপকূলীয় এলাকা দিয়ে এগোতে থাকি।

 

১৫ ডিসেম্বর আমরা কুমিরাতে পৌছাই এবং আমাদের সব সৈন্য সেখানে মোতায়েন করি। শত্রুরা আমাদের অবস্থানের উপর শেল নিক্ষেপ করছিল। দুর্ভাগ্যক্রমে একটি শেল ক্যাপ্টেন আলির কাছে পরে। তিনি আমাদের আর্টিরালি ও পি – কিছুদিন ধরে আমাদের সাথে অপারেশন চালাচ্ছিলেন। তিনি ঘটনাস্থলেই মারা যান। আমার প্রথম এলাইড আর্টিলারি ও পি হল ক্যাপ্টেন দারকুন্দে – বেলনিয়াতে। ক্যাপ্টেন আলি ছিলেন আমাদের ২ য় আর্টিলারি যে আমার সাথে থাকত, ঘুমাত, খেত, অপারেশন করত এবং আমাদের মাটিতেই নিহত হল।

 

১৬ ডিসেম্বর ৭১, ৮ বিহারের লে কর্নেল বিশলা – যিনি ছিলেন আমার নিকটের সাব সেক্টর প্রতিবেশী – আমাকে অনুরধ করলেন তাকে সাহায্য করার জন্য এইবার চট্টগ্রাম শহর আক্রমণের ব্যাপারে। তার এলাকা ছিল ফয়েজ লেক – যেটা ছিল বিহারিদের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা যেখানে শত শত নিরীহ বাঙ্গালীকে জবাই করে মারা হয়েছে। ৩২ মাহারের সি ও আমাকে ছেড়ে যেতে চাইছিলেন না আর আমি আমার বাহিনীর সাথে মিশে গিয়েছিলাম। আমার সেক্টর কমান্ডারের অনুমতি ছাড়া আমি কাউকে সহায়তা করতে পারিনা। শত্রুরা তখনো এলোমেলো শেল নিক্ষেপ করে যাচ্ছিল। সর্বশেষ ভিক্টিম ছিলেন লে মন্সুরের বাহিনীর সুবেদার মাহফুজ ই পি আর। শেল পড়ার সাথে সাথে ঘটনাস্থলেই সে নিহত হয়। জেনারেল নিয়াজি তার বাহিনী নিয়ে আত্তসমর্পন করেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হল।

 

এসডি / (মাহফুজুর রহমান)

৮ ই বেঙ্গল

২৫ আগস্ট, ১৯৭৩

 

 


 

নীলাঞ্জনা অদিতি

<১০, ., ৬৯৭২>

 

সাক্ষাৎকারঃ নায়েক সুবেদার মনিরুজ্জামান

(২৪ আগস্ট ১৯৭৩)

 

৮ ই মে, সীমান্ত পার হয়ে ভারতে আশ্রয় নেই। হরিণাতে ২৪ ঘন্টা অবস্থানের পর মেজর জিয়াউর রহমানের আদেশে শুভপুর অঞ্চলে বল্লভপুর এলাকায় আসি। শুভপুর – বল্লভপুরে পাকসেনাদের সাথে ২২ দিন যুদ্ধ চলে। এখানে মেজর জিয়াউর রহমান ও ক্যাপ্টেন ঘোষ (BSF) যুদ্ধ পরিচালনা করেছিলেন।

 

সংবাদদাতার মাধ্যমে জানতে পারলাম যে, পাকিস্তানী সৈন্যরা আমাদের উপর আক্রমণ চালাবে। যুদ্ধের শেষদিন রাতে তিনটা থেকে আমাদের মর্টার মেশিনগান দিয়ে নির্দিষ্ট স্থানে ফায়ার শুরু করতে বাধ্য হই। ভোর ৫ টা থেকে ৮ টা পর্যন্ত আমাদের অন্যান্য ফোর্স শুভপুর হতে আমলীঘাট পর্যন্ত Defence Position ছাড়তে বাধ্য হয়। পাকিস্তানীদের Artillery 105mm এর গোলা মধুগ্রাম – আমলীঘাটে বৃষ্টির মত পরতে থাকে। আমাদের গোলাবারুদ শেষ করে আমরা সকাল ৯ টায় ভারতের আমলীঘাট এলাকাতে একত্রিত হই। ভারতীয় সেনাবাহিনীর একজন অফিসার ব্রিগেডিয়ার পান্ডের অধীনে আমাদের এক conference হয়। মেজর জিয়াউর রহমান ক্যাপ্টেন অলি ও অন্যান্য EPR বেঙ্গল রেজিমেন্টের JCO NCO এই conference এ উপস্থিত ছিলেন।

 

ব্রিগেডিয়ার পান্ডে বললেন যে, “আমার ৩০ বছরের চাকরী জীবনে অনেক বড় বড় যুদ্ধ দেখেছি কিন্তু শুভপুরের যুদ্ধের মত কোথাও দেখিনি। মুক্তিফৌজদের চিন্তার কোন কারণ নেই। এ হল যুদ্ধের প্রথম অধ্যায়। দ্বিতীয় ও তৃতীয় এখনো বাকী আছে। যুদ্ধের দ্বিতীয় অধ্যায় আপনাদেরকে সম্পন্ন করতে হব। তৃতীয় অধ্যায়ে আপনারা অন্যের সাহায্য পেতে পারেন। বাংলাদেশের হিরো বানেগা ত মুক্তিফৌজ বানেগা। আওর কিছিকা হক নেহি হে। খোদা হাফেজ জয় বাংলা।

 

মেজর জিয়াউর রহমান আমাদের স্বান্তনা দেয়ার জন্য সন্ধ্যা পর্যন্ত আমাদের সাথে ছিলেন। সন্ধ্যাবেলায় আমাদেরকে ঘন জঙ্গলের মধ্যে ক্যাম্প করার নির্দেশ দিয়ে তিনি চলে যান। ক্যাপ্টেন অলি আমাদের সাথে থেকে যান। এখানে কয়েকদিন অবস্থানের পর ছাগলনাইয়া থানার অন্তর্বর্তী চাঁদগাছী সাবসেক্টর গঠন করা হয়। এক কোম্পানি সৈন্য এবং Mortar Platoon নিয়ে জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে ১/ ২ তারিখে আমরা চাঁদ্গাছিতে Defence তৈরী করি। সেখান থেকে Commando Operation শুরু হয়ে যায়। ক্যাপ্টেন অলি Sub Sector Commander Second in Command ক্যাপ্টেন শহীদ শামসুল হূদা যুদ্ধ পরিচালনা করেছিলেন যিনি মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে সদয় ব্যবহার করতেন। তিনি অত্যন্ত দয়ালু ছিলেন। যে কোন Operation কে জয়যুক্ত করতে তিনি নিজের সৈন্যদের উদবুদ্ধ করতেন এবং আপ্রাণ পরিশ্রম করতেন।

 

চাঁদগাজি ডিফেন্সে থাকাকালীন পাকিস্তানী সৈন্যদের এক ব্যাটেলিয়ান আমাদের উপর আক্রমণ করে (জুন মাসের ১৫ তারিখ)। সেই আক্রমণের দাঁতভাঙ্গা জবাব দেয়া হয়। পাকিস্তানী সৈন্যরা পিছু হটে যায়। সেইদিন আমাদের একটা Artillery Battery ছিল। ১৬ ই জুন পাকিস্তানী সৈন্যরা আবার এক ব্রিগেড সৈন্য নিয়ে আমাদের উপর আক্রমণ চালায়। কিন্তু পাকিস্তানীরা ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাদের অনেক লোক হতাহত হয়। পরাজয়ের গ্লাণি নিয়ে তারা পিছু হটতে বাধ্য হয়। চাঁদ্গাছি দীঘিতে আমাদের Defence ছিল। দ্বিতীয় আক্রমণের দিন ভারতীয় সেনাবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার সাবেক সিং উপস্থিত থেকে Command করেছিলেন।

 

১৬/১৭ জুন পাকিস্তানী সৈন্যরা সকাল ৮ টা থেকে তৃতীয়বার আক্রমণ শুরু করে। তৃতীয়বার আক্রমণে আমাদের Defence এর অবস্থানগুলোতে তারা fire করে। পাঁচ টার সময় তারা আমাদের Defence এর উপর রেকী আরম্ভ করে। তাদের একটা Commando Battalion হেলিকপ্টারযোগে আমাদের Defence এর তাদের সুবিধাজনক জায়গায় অবতরন করতে শুরু কর। তারা দালালদের মাধ্যমে propaganda করেছিল যে তাদের এক ব্যাটেলিয়ন commando তারা অবতরণ করাচ্ছে মুক্তিফৌজকে ধ্বংস করার জন্। রাত বারো টার সময় ক্যাপ্টেন শামসুল হূদার নির্দেশ অনুযায়ী Special Messenger আমাকে একটি চিঠি দেন। তাতে লেখাছিল এক ঘন্টার মধ্যে position ছেড়ে কৃষ্ণনগর বাজারে report করতে। সমস্ত গোলাবারুদ শেষ করে কৃষ্ণনগরে যাবার জন্য এই message পেয়ে messenger কে আমি গ্রেফতার করি এবং বললাম যে আমি নিজে শামসুল হূদার কাছে যাব এবং message clarify না করা পর্যন্ত তুমি এই জায়গা থেকে কোথাও যেতে পারবে না। আমি নিজে শামসুল হূদার সাথে সাক্ষাত করি। তিনি আমাকে বললেন “ এটা একটা আশ্চর্য ঘটনা।Defence ছাড়ার কথা আমি বলিনাই ব্রিগেডিয়ার সাবেক সিং বলেছেন।

 

আমার সন্দেহ হয়েছিল এটা পাকিস্তানি কোন গুপ্তচরের কাজ। ক্যাপ্টেন শামসুল হূদা টেলিফোনযোগে ব্রিগেডিয়ার সাবেক সিং কে বললেন যে আমাদের সৈন্যরা ডিফেন্স ছেড়ে যেতে রাজী নয়। এমতাবস্থায় আমি কি করব? ব্রিগেডিয়ার বললেন সবার কাছে আমার অনুরোধ জানিয়ে দেন তারা যেন অতি সত্বর নির্দিষ্ট স্থানে একত্রিত হয়ে যায় আমি সকালে তাদের সাথে সাক্ষাৎ করব। এই আদেশ অনুযায়ী মুক্তিযোদ্ধারা কৃষ্ণনগরে পৌঁছে।

 

ক্রিষনুগরে মেজর জিয়াউর রহমান উপস্থিত ছিলেন। তিনি একজন JCO কে জিজ্ঞেস করলেন Mortar Platoon? সে এখনো আসে নাই? সে বলল, এখনো আসে নাই। ঐ লোকটাকে জিয়াউর রহমান অত্যন্ত দুঃখের সাথে জিজ্ঞেস করলেন Mortar Platoon কে ছেড়ে তোমরা কেন এসেছ ? পরে আমি সেখানে পৌছলাম। জিয়াউর রহমান আমাকে জিজ্ঞেস করলেন মুনীর defence ছাড়তে কে বলেছে? আমি বললাম জানিনা স্যার। ক্যাপ্টেন হূদা মেজর জিয়াউর রহমান কে বললেন স্যার ভারতীয় সেনাবাহিনীর কমান্ডার আদেশে defence ছাড়তে হয়েছে। আপনি ব্রিগেডিয়ার সাবেক সিং এর সাথে এ ব্যপারে আলাপ করুন।

 

১৮ ই জুন ব্রিগেডিয়ারের একজন সহকর্মী অফিসার কৃষ্ণনগরে আসেন এবং বলেন যে, ব্রিগেডিয়ার সাহেব বিকেলে আসবেন। আপ্নারা কোন চিন্তা করবেন না। সমস্ত সৈন্য নিয়ে আমরা পংবাড়ি চলে গেলাম। সেখানে কিছুক্ষন অবস্থাণের পর ব্রিগেডিয়ার সাবেক সিং, মেজর জিয়াউর রহমান ক্যাপ্টেন রফিক। ক্যাপ্টেন অলি, ক্যাপ্টেন হূদা ক্যাপ্টেন হামিদ পংবাড়িতে আসেন। ব্রিগেডিয়ার সাবেক সিং প্রায় এক ঘন্টা সেখানে সবার উদ্দেশ্যে বক্তৃতা দেন। তিনি মর্টার কমান্ডোকে ডেকে পাঠান। ক্যাপ্টেন হামিদ আমাকে দেখিয়ে দেন। ব্রিগেডিয়ার আমাকে উদ্দেশ্য করে বলেন আব বহুত নারাজ হো গেয়া কিউ লরাই খতম নেহি হে বহুত লরাই কারনা হে। হাম পাকিস্তানী কা হাত মে ঘেরা জাওয়ান কো মারনে নেহি দেঙ্গা। তিনি আমাদের কে নানা উপদেশ দেন এবং ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নির্ধারণে বাঙ্গালী অফিসারদের সাথে আলাপ আলোচনা করেন। সেখানে আমাদের সাধারন চা ও জলখাবার তিনি অত্যন্ত আনন্দের সাথে গ্রহণ করেন। তিনি একজন বিখ্যাত ও বিচক্ষণ সাহসী বুদ্ধিমান ও প্রকৃত কমান্ডার হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন।

 

পংবাড়িতে আমরা বিশ্রাম নিচ্ছিলাম। পংবাড়ি থেকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে গেরিলা কায়দায় অপারেশন চলতে থাকে। ছাগলনাইয়া থানা এলাকায় জুন মাসের শেষ ভাগে রিস্টমুখ / রিকশামুখ ক্যাম্প তৈরী করা হয়। এখানে অবস্থানকালিন গেরিলা যুদ্ধ চলতে থাকে। ১৪ আগস্ট ভোরবেলায় তিনটার সময় আমরা ক্যাপ্টেন হূদার আদেশে একটি কমান্ডো অপারেশন এর ব্যবস্থা গ্রহন করি। আমার মর্টার প্লাটুন চাঁদ্গাজিতে পাকিস্তানী সৈন্যদের ঘাঁটি আক্রমণের পরিকল্পনা নেয়। ভোর ৭ টা ৪০ মিনিটে আমার পায়ে একটা গুলি লাগে। তার ফলে আমার দ্বিতীয় ব্যক্তিকে দায়িত্ব দিয়ে আমি চিকিৎসা গ্রহণ করতে চলে যাই। সেইদিন পাক বাহিনীর মারাত্মক ক্ষয়ক্ষতি হয়। এই যুদ্ধের খবর বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছিল।

 

২৬ আগস্ট পাকিস্তানীরা ছাগলনাইয়া থানার আমজাদহাটে প্রতিরক্ষাব্যুহ তৈরী করে। মুক্তিযোদ্ধারা মর্টার প্লাটুনের সাহায্যে তাদের উপর গোলাবর্ষণ করে। পাকিস্তানিদের বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হয়। তারা মুহূরী নদী পার হয়ে খাদ্যদ্রব্য অস্ত্র শস্ত্র ফেলে পিছু হটতে থাকে। গুতুমা, পরশুরাম ছাগলনাইয়া অঞ্চলে এইভাবে যুদ্ধ চলতে থাকে। আমরা বিলেনিয়া এলাকাতে নোনাছড়ি ক্যাম্প স্থাপন করি। অক্টোবর মাসের ২০ তারিখ ১ নম্বর সেক্টর কমান্ডার মেজর রফিক সাহেবের আদেশে আমাকে Artillery OP ভারতীয় সেনাবাহিনীর ৫৭ মাউন্টেন রেজিমেন্টে রিপোর্ট করতে হয়। সেখানে তিনদিন তাদের কমান্ড প্রসিডিউর শিক্ষা নিতে হয়। ২৪ অক্টোবর আমাকে অবজারভার ডিউটিতে পাঠানো হয়। সেটা হল কবেরহাটে পাক বাহিনীর সৈন্য অবস্থান, তার উপরে আর্টিলারির ফায়ার করানো – রাত দুইটার সময় নয়াটিলা অঞ্চল এলাকা থেকে ভোর ছটা থেকে আর্টিলারির ফায়ার করানো হয়। পাকিস্তানীদের অবস্থানগুলোর ওপর প্রথম মিডিয়াম রেজিমেন্টের ফায়ার আরম্ভ হয়। তখন আর্টিলারি কমান্ডিং অফিসার বলেছেন – “ আজ পাকিস্তানী কো মন ইয়াদ আয়েগা”।

 

আমার দায়িত্ব শেষ করে ২৪ ঘন্টা পরে আর্টিলারি কমান্ডারের কাছে পৌঁছি। কমান্ডিং অফিসার, ব্রিগেড কমান্ডার মেজর জেনারেল সেক্টর কমান্ডার সবাই আমার জন্য অপেক্ষা করছিল। আমার সাথে সাক্ষাৎ হলে তারা আমাকে জিজ্ঞেস করেন এই কাজ সমাধা করতে আমার অসুবিধার কথা। পথে আমার অসুবিধার কথা তাদের বর্ণনা করলাম। সবকিছু বর্ণনা করা এখানে সম্ভব নয়।

 

ব্যাটারী কমান্ডার মেজর ওয়াতর সিং ক্যাপ্টেন বি কে ফালিয়া মেজর চৌধুরী তাঁদের সাথে অবস্থান করতে থাকি। তাঁরা আমাকে সর্বত ভাবে সাহায্য সহযোগীতা করেছেন। ১০ ই নভেম্বরে মুন্সিরহাট ফুলগাজি এই সমস্ত এলাকার যুদ্ধে পরশুরাম থানার অন্তর্গত অঞ্চলে মুক্তিযোদ্ধা ও ভারতীয় বাহিনীর প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছিল। কিন্তু পাক বাহিনী কোথা থেকে আক্রমণ চালাচ্ছে তার কোন সঠিক হদিস পাওয়া যাচ্ছিল না। তাদের অবস্থান সম্পর্কে জানতে চেষ্টা করলে একমাত্র OP ছাড়া কোন উপায় নেই। কমান্ডিং অফিসার সিদ্ধান্ত নিলেন পাক বাহিনীর অনুসন্ধান নিতে হবে। তিনি আমার কাছে জিজ্ঞেস করলেন মনির সাব কেয়া হোগা। আমি বললাম, আপনি আমাকে একটা ওয়ারলেস নিয়ে আবার আদেশ দেন আমি যাব। তিনি বললেন আপনার জীবনের ঝুঁকি কে নেবে ? আমি নিজেই ঝুঁকি নিয়ে যাব বলে বললাম। তিনি আমাকে বলেন নিজের ঝুঁকির কথা কাগজে লিখে দেয়ার জন্য। তিনি আমাকে একা যেতে দিলেন না। তারপর আমরা OP group চলে গেলাম সিদ্ধিনগর। একটা বৃক্ষের উপর রাত ১২ টা থেকে ভোর ৬ টা পর্যন্ত পাকিস্তানীদের অবস্থান জানার জন্য বসে থাকি। কিন্তু কোন সন্ধান না পেয়ে শেষ পর্যন্ত সেখান থেকে চলে গেলাম খেদাবাড়ি সৌভাগ্যবশত সেখান থেকে একটা উঁচু বৃক্ষ দেখতে পাই।

 

১৬ নভেম্বর আমরা artillery target record করছিলাম। দেখতে পেলাম ফেনী হতে একটা ট্রেন পরশুরামের দিকে যাচ্ছে। ট্রেন টা দেখে আমাদের অনেক সাহায্য হয়েছে। গাড়ি উত্তরদিকে যাচ্ছে। আমাদের কাজ অব্যাহত থাকে। Gun Ranging অবস্থায়। বোমা রেলওয়ে লাইনের ওপর পরে। রেল লাইনের একটা fish plate নষ্ট হয়ে যায়। ট্রেনটা যখন ফেরত আসে তখন ওখানে এসে তিনটা বগি পরে যায়। ওটা দেখে আমরা আশ্চর্য হয়ে যাই। পুরানো মুন্সিরহাটে পাকিস্তানীদের Artillery gun position এ মিত্রবাহিনীর গোলার আঘাতে gun position ও চালক উভয়েই ধ্বংস হয়।

 

১৭ ই নভেম্বর ভোর থেকে পাকিস্তানীরা মুন্সিরহাট ফুলগাজি পরশুরাম অঞ্চল ছেড়ে ফেনীর দিকে চলে যেতে বাধ্য হয়। ১৮ ই নভেম্বর ফুলগাজী মুক্তিযোদ্ধাদের দখলে আসে। পাক বাহিনী ফেনী অঞ্চল থেকে long range কামানের সাহায্যে আত্মরক্ষা fire করে। এদিকে পরশুরাম অঞ্চলে পাক বাহিনীর ৬০/১০০ সৈন্য কয়েকজন অফিসার সহ মুক্তিযোদ্ধা ও মিত্রবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে। পাকিস্তানী সৈন্যগন ফেনী থেকে আর্টিলারি আক্রমন অব্যাহত রাখে। ১ লা ডিসেম্বর পর্যন্ত এভাবে যুদ্ধ চলতে থাকে।

 

আমি ২৭ শে নভেম্বর নিজের সেক্টরে ফেরত আসি। বর্তমানে নিজের মর্টার প্লাটুনের দায়িত্ব গ্রহন করি। মুন্সিরহাতের দক্ষিনে পাঠাননগরে অবস্থান করি। আমরা চট্টগ্রামের দিকে অগ্রসর হতে থাকি। ৩১ নম্বর জাঠ রেজিমেন্ট করেরহাট থেকে চট্টগ্রামের দিকে অগ্রসর হতে থাকে।

 

আমরা জোরারগঞ্জ মীরসরাই সীতাকুন্ড বারবকুন্ড কুমীরা ছোট কুমীরাতে ১৪ ই ডিসেম্বর রাতে ১২ ঘন্টা অবস্থান করি। ১৫ তারিখ ভোর ৩ টা থেকে অগ্রগতি শুরু হয়। সকাল ৭ টার সময় কুমীরা পৌঁছি। এখানে পাকিস্তানিদের সাথে তুমুল যুদ্ধ হয়। ৫৬ টা আর্টিলারি গান এর সাহায্যে আমাদের অগ্রগতি অব্যাহত থাকে। বেলা ৮ টার সময় কুমিরা টিবি হাসপাতাল পর্যন্ত পৌছলে পাকবাহিনী আত্মরক্ষা ফায়ার আরম্ভ করে যার ফলে মিত্রবাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর অনেকে হতাহত হয়।

 

১৫ ই ডিসেম্বর বারটার সময় পাক বাহিনী আমাদের ওপর পালটা আক্রমনের প্রস্তুতি নেয়। রেকি গ্রুপ ধরা পরে। জাঠ রেজিনেন্টের মর্টারের ফায়ার। শেষবারের মত জয়ানরা ইচ্ছামত ফায়ার করে জয়যুক্ত হন। পাক বাহিনীর ঘাঁটিগুলোর ক্ষতিসাধন হয়। মেজর এডজ্যুটান্ট ৩১ জাঠ রেজিমেন্ট সংবাদ পাঠালেন মুক্তিবাহিনীকে মোবারকবাদ জানালেন।

 

১৬ ই ডিসেম্বর শুক্রবার পাক সেনারা আত্মসমর্পণ করে চট্টগ্রাম কুমীর সীতাকুন্ডে। চট্টগ্রামে মুক্তিবাহিনী উল্লাসে ফেটে পরে।

 

স্বাক্ষরঃ (এন এম মুনীরুজ্জামান)

২৪ – ৮ – ৭৩

 

 

 

 

 

 

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
৩। ২ নম্বর সেক্টর ও ‘কে’ ফোর্সের যুদ্ধের বিবরণ। সাক্ষাৎকারঃ ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ* ১৯৭৪-১৯৭৫

………………

১৯৭১

 

রানা আমজাদ <৭৩-৮৩>

ডাঃ মোঃ রাজিবুল বারী (পলাশ) <৮৪-১০৩>

ফকরুজ্জামান সায়েম < ১০৪- ১১৬>

মোঃ কাওছার আহমদ <১১৭-১১৯>

ডাঃ মোঃ রাজিবুল বারী (পলাশ) <১২০-১৩৬>

নীলাঞ্জনা অদিতি <১৩৬-১৪৫>

 

 

সাক্ষাৎকারঃ ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ

 

সামগ্রিকভাবে যুদ্ধ পরিচালনার জন্য আমি আমার যুদ্ধের এলাকাকে কয়েকটি সাব-সেক্টর-এ বিভক্ত করে নেই। আমার সাব-সেক্টরগুলি নিম্নলিখিত জায়গায় তাদের অবস্থান গড়ে তুলি।

 

(ক) গঙ্গাসাগর, আখাউড়া এবং কসবা সাব-সেক্টরঃ এর উপ-অধিনায়ক ছিলেন ক্যাপ্টেন আইনউদ্দিন। তার সঙ্গেছিল লেঃ ফারুক, ক্যাপ্টেন মাহবুব এবং সেকেন্ড লেঃ হুমায়ূন কবির। এখানে ৪র্থ বেঙ্গলের ডেল্টা কোম্পানী এবং ই, পি, আর-এর দুটি কোম্পানী ছিল। এদের সঙ্গে মর্টারের একটা দল ছিল। এই সাব সেক্টর কসবা, আখাউড়া, সাইদাবাদ, মুরাদনগর, নবীনগর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া পর্যন্ত তাদের অপারেশন চালাত।

 

(খ) দ্বিতীয় সাব-সেক্টর ছিল মন্দভাগেঃ এর উপ-অধিনায়ক ছিলেন ক্যাপ্টেন গাফফার (বর্তমানে মেজর)। তার অধীনে চার্লি কোম্পানী এবং একটা মর্টারের দল ছিল। এ দলটি মন্দভাগ রেলওয়ে স্টেশন হতে কুটি পর্যন্ত তাদের অপারেশন চালাতো।

 

(গ) তৃতীয় সাব-সেক্টরে ছিল শালদা নদীঃ এর উপ-অধিনায়ক ছিলেন মেজর আবদুস সালেক চৌধুরী (মরহুম)। এর অধীনে এ কোম্পানী এবং ই,পি,আর-এর একটা কোম্পানী ছিল। এ দলটি শালদা নদী, নয়নপুর এবং বুড়িচং এলাকা পর্যন্ত তাদের অপারেশন চালাত।

 

(ঘ) চতুর্থ সাব-সেক্টর ছিল মতিনগরেঃ কমান্ডে ছিল লেঃ দিদারুল আলম। হেডকোয়ার্টার কোম্পানীর কিছুসংখ্যক সৈন্য এবং ই,পি,আর-এর একটা কোম্পানী গোমতীর উত্তর বাঁধ থেকে কোম্পানীগঞ্জ পর্যন্ত এই সাব-সেক্টরে অভিযান চালাতো।

 

(ঙ) গোমতীর দক্ষিণে ছিল নির্ভয়পুর সাব-সেক্টরঃ এর উপ-অধিনায়ক ছিলেন ক্যাপ্টেন আকবর এবং লেঃ মাহবুব। এ দলটির অপারেশন কুমিল্লা থেকে চাঁদপুর এবং লাকসাম পর্যন্ত ছিল।

 

(চ) রাজনগর সাব-সেক্টর ছিল সর্বদক্ষিণেঃ এ সাব-সেক্টরের উপ-অধিনায়ক ছিলেন ক্যাপ্টেন জাফর ইমাম, ক্যাপ্টেন শহীদ এবং লেঃ ইমামুজ্জামান। এই সাব-সেক্টর বেলুনিয়া, লাকসামের দক্ষিণ এলাকা এবং নোয়াখালীতে অপারেশন চালাতো। এই সাব-সেক্টরে ৪র্থ বেঙ্গল এর ‘বি’ কোম্পানী, ই, পি, আর-এর ১টি কোম্পানী ও গণবাহিনীর লোক নিয়ে তৈরি এক সদ্যগঠিত কোম্পানী। জুলাই মাসে পাকিস্তানী সেনারা কসবা এবং মন্দভাগের পুনঃদখলের প্রস্তুতি নেয় এবং কুটিতে ৩১তম বেলুচ রেজিমেন্টের বাহিনী এবং গোলন্দাজ বাহিনী সমাবেশ করে। ক্যাপ্টেন গাফফারের অধীনে মন্দভাগ সাব-সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধারা শত্রুসেনাদের মোকাবেলার জন্য তৈরি ছিল। জুলাই মাসের ১৯ তারিখে শত্রুসেনারা একটা কোম্পানী নিয়ে শালদা নদীতে নৌকাযোগে অগ্রসর হয়। সুবেদার ওহাবের নেতৃত্বে মন্দভাগ সাব-সেক্টরের একটা প্লাটুন মন্দভাগ বাজারের নিকট শত্রুদের এই অগ্রবর্তী দলটির উপর প্রচণ্ড আঘাত হানে। এ সংঘর্ষে শত্রুসেনারা সম্পূর্ণ হতবুদ্ধি হয়ে যায়। শালদা নদীর তীর থেকে সুবেদার ওহাবের প্লাটুন্টি শত্রুসেনার উপর অতর্কিত আক্রমণ চালায়। এই আক্রমণে অন্ততঃপক্ষে ৬০/৭০ জন লোক হতাহত হয় এবং অনেকেই নদীতে ঝাঁপ দিয়ে প্রাণ হারায়। এই আক্রমণে ৪র্থ বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈন্যরা ৩১তম বেলুচ রেজিমেন্টের অধিনায়ক কর্নেল কাইয়ূম, ৫৩ তম গোলন্দাজ বাহিনীর কুখ্যাত অফিসার ক্যাপ্টেন বোখারী, আরো তিন-চারজন অফিসার এবং ৮/১০ জন জুনিয়র অফিসার প্রাণ হারায়। ক্যাপ্টেন বোখারী ২৫ মার্চের পর থেকে কুমিল্লা শহরে অনেক হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী ছিল। তার মৃত্যুতে কুমিল্লাবাসীরা অত্যন্ত আনন্দিত হয়। শত্রুসেনারা শালদা নদীতে এই বিরাট পর্যুদস্তের পর তাদের বাহিনীকে পিছু হটিয়ে কুটিতে নিয়ে যায়। এবং আমি আমার ঘাঁটি মন্দভাগ ও শালদা নদীতে আরো শক্ত করে তুলি।

 

পাকিস্তানের ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলওয়ে লাইন সম্পর্কে জেনারেল টিক্কা খাঁ দম্ভ করে ঘোষণা করেছিল যে ওটা জুলাই মাসের মধ্যে খুলবে। তাঁর সেই আশা চিরতরে ধূলিসাৎ হয়ে যায়। পাকিস্তান আমলে এই রেললাইনে ট্রেন চলেনি। ইতিমধ্যে জুলাই মাসে আমি খবর পাই যে, পাকবাহিনী বেলুনিয়াতে ঢোকার চেষ্টা করছে। আমি ক্যাপ্টেন জাফর ইমাম কে নির্দেশ দেই যেন তাদেরকে ঢুকতে বাধা দেওয়া হয়। এ সময় ক্যাপ্টেন জাফর ইমাম ছাগলনাইয়াতে পাকবাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত ছিল। পাকবাহিনী ছাগলনাইয়ার উপরে ফেনীর দিক থেকে চট্টগ্রাম সড়কের উপর আক্রমণ চালায়। এ আক্রমণে তাদের ২০/২৫ জন লোক হতাহত হয়। শত্রুসেনারা পিছু হটে যায়। কিন্তু তাঁর কয়েকদিন পরে পাকসেনারা ছাগলনাইয়ার দক্ষিণ থেকে ফেনী-চট্টগ্রাম পুরনো রাস্তায় অগ্রসর হয়। এবং ক্যাপ্টেন জাফর ইমামের সৈনিকদের উপর অতর্কিত আক্রমণ চালায়। আমাদের কিছুসংখ্যক হতাহত হওয়ায় এবং শত্রুদের গোলার মুখে টিকতে না পেরে ক্যাপ্টেন জাফর ইমাম আমার কাছে পরবর্তী কর্মপন্থার নির্দেশ চেয়ে পাঠান। আমি ক্যাপ্টেন জাফর ইমামকে বলি ছাগলনাইয়া থেকে তাঁর সৈন্যদের সরিয়ে বেলুনিয়ার সাব-সেক্টর রাজনগরে আনার জন্য। আমাদের এই মুভে বেলুনিয়াতে অবস্থিত শত্রুসেনারা ঘিরে যাওয়ার আতঙ্কে বেলুনিয়া থেকে ফেনীতে পশ্চাদপসরণ করে এবং ফেনীতে তাদের প্রধান ঘাঁটি গড়ে তোলে। বেলুনিয়া শত্রুমুক্ত হওয়ায় আমি আমি বেলুনিয়াকে শত্রুকবল থেকে মুক্ত রাখার দৃঢ়মনস্থ করি। ক্যাপ্টেন জাফর ইমামকে বান্দুয়াতে (ফেনী থেকে ২ মাইল উত্তরে) এবং ইমামুজ্জামানকে তাদের নিজ নিজ কোম্পানী নিয়ে প্রতিরক্ষাব্যূহ তৈরি করার নির্দেশ দেই। বান্দুয়াতে সম্মুখবর্তী অবস্থান গড়ার পথ মুন্সিরহাটে ক্যাপ্টেন জাফর ইমামের অধীনে আমার সেনাদল বেশ মজবুত প্রতিরক্ষাব্যূহ গড়ে তোলে। বেলুনিয়া একটি ১৭ মাইল লম্বা এবং ১৬ মাইল চওড়া বাঙ্কার। এই বেলুনিয়াতে আমরা যে প্রতিরক্ষা ঘাঁটি গড়ে তুলি সে প্রতিরক্ষাব্যূহকে ধ্বংস করার জন্য পাকসেনারা এর পর থেকে যথেষ্ট চেষ্টা চালিয়ে যায়। পরবর্তীকালে অনেক যুদ্ধে তাদের বিপুল ক্ষয়ক্ষতি এবং সৈন্য হতাহত হয়। বেলুনিয়া সেক্টর পাকসেনাদের জন্য ভয়ংকর বিভীষিকা রূপ ধারন করে। এর সঙ্গে সঙ্গে এই স্থানের জনসাধারণও যথেষ্ট ক্ষয়ক্ষতি ও কষ্ট স্বীকার করে। এখানকার জনসাধারণের কষ্টকে ভাষায় বর্ণনা করা যায় না। পাকবাহিনীর গোলার আঘাতে প্রতিটি বাড়ি প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় ও অনেক নিরীহ লোক মারা যায়। কিন্তু স্থানীয় জনসাধারণ কোনদিনও তাদের মনোবল হারায়নি। যুদ্ধ যতদিন চলে ততদিনই তারা মুক্তি বাহিনীর অসামরিক ব্যবস্থাপনায় হাসিমুখে সাহায্য করে। অনেকক্ষেত্রে তারা সেনাবাহিনীর সাথে সাথে রক্ষাবুহ্য শক্তিশালী করার জন্য পরিখা খননে ও অন্যান্য কাজে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সাহায্য করে। মে মাসে আমাদের মুন্সিরহাট ডিফেন্স এবং বান্দুয়ার অবস্থানটি বেশ শক্তিশালী হয়ে উঠে। এ জায়গাটি আমরা এজন্যে প্রতিরক্ষা ঘাঁটির জন্য মনোনিত করেছিলাম। জায়গাটার সামনে কতগুলো প্রাকৃতিক বাধাবিঘ্ন ছিল যেগুলি শত্রুসেনার অগ্রসরের পথে বিরাট বাধাস্বরূপ। এতে শত্রুসেনাদের নাজেহাল করার যথেষ্ট সুযোগ ছিল। আমাদের অবস্থানটি মুহুরী নদীর পাশ ঘেঁষে পশ্চিম দিক থেকে ছিলোনিয়া নদীকে ছাড়িয়ে পশ্চিম সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। ব্যূহটি কমপক্ষে ৪ মাইল চওড়া ছিল। আমরা এই অবস্থানটি এইভাবে পরিকল্পনা করেছিলাম যে, শত্রুসেনাদের বাধ্য হয়ে আমাদের ঘাঁটি আক্রমণ করার সময় প্রতিরক্ষার শুধু সামনে ছাড়া আর কোন উপায়ে আসার রাস্তা ছিলনা। এ পরিকল্পনা অনুযায়ী শত্রুসেনাদের আসার মনোনীত জায়গাগুলোতে এলে সবচেয়ে বেশি ধ্বংস করা যায়। পরবর্তীকালে আমাদের এ পরিকল্পনা ঠিকই কাজে লেগেছিল। যেসব জায়গা দিয়েই শত্রুরা আসার চেষ্টা করেছে যথেষ্ট হতাহত হয়েছে। এই সেক্টরে প্রথমে আমাদের সৈন্যসঙ্খ্যা ছিল দূ’কোম্পানী(৩০০ জনের মত) এবং কিছুসংখ্যক গণবাহিনী। শত্রুওসংখ্যা আমাদের চেয়ে সব সময় বেশীছিল এবং এছাড়া শত্রুদের ছিল শক্তিশালী অস্ত্র, গোলাবারুদ, বিমান বাহিনী ও ট্যাংক। আমাদের মুন্সিরহাটে প্রধান ঘাঁটি সম্বন্ধে শত্রুদের ধোঁকা দেওয়ার জন্য বন্দুয়া রেলওয়ে স্টেশনের কাছে ছিলোনিয়া নদীর উপর একটি অগ্রুবর্তী ঘাঁটি স্থাপনের নির্দেশ দেই। এটা ছিল ডিলেয়িং পজিশন। এ পজিশনের সামনে রাস্তা ও রেলের সেতুগুলি ধ্বংস করে দেয়া হয় যাতে শত্রুদের অগ্রসরে আরো বাধার সৃষ্টি হয়। শত্রুসেনার সম্ভবত অগ্রসরের রাস্তার পশ্চিম এবং পূর্ব পার্শ্বে রাস্তার দিকে মুখ করে আমরা বেশ কতগুল উঁচু জায়গায় এবং পুকুরের উঁচু বাঁধে শক্ত এবং মজবুত বাঙ্কার তোইরি করি এবং তাতে হালকা মেশিনগান এবং মেশিনগান লাগিয়ে দেই। এ ছিল একরকমের ফাঁদ যাতে একবার অবস্থানের ভিতরে অগ্রসর হলে দু’পাশের গুলিতে শত্রুসেনারা ফিরে যেতে না পারে। এসব বাঙ্কার এমনভাবে লুকানো ছিল যে সম্মুখ থেকে বোঝার কোন উপায় ছিল না।

 

৭ই জুনের সকাল। আমরা জানতে পারলাম শত্রুসেনারা ফেনী থেকে বেলুনিয়ার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। ১০টার দিকে বন্দুয়ার আশে পাশে শত্রুসেনারা এসে জমা হতে লাগলো এবং প্রথম্বারের মত আমাদের পজিশনের উপর গোলাগুলি চালাতে লাগলো। আমার নির্দেশ ছিল যে শত্রুদের এই গোলাগুলির কোন জবাব যেন না দেয়া হয়। শত্রুসেনারা বন্দুয়া সেতুর উপর একটা বাঁশের পুল নির্মাণ করে যেমনি পার হওয়ার চেষ্টা করছিল, ঠিক সে সময় আমাদের অগ্রবর্তী ডিলেয়িং পজিশনের বীর সৈনিকরা তাদের উপর গুলি চালায়। এতে প্রথম সারিতে যে সব শত্রুসেনা সেতু অতিক্রম করার চেষ্টা করে তারা সবাই গুলি খেয়ে পানিতে পড়ে যায়। এ পর্যায়ে শত্রুসেনাদের অন্তত ৪০/৫০ জন লোক হতাহত হয়। এরপর শত্রুসেনারা পিছে হতে যায়। কিছুক্ষণ পর আবার প্রবল গোলন্দাজ বাহিনীর সহায়তায় তীব্র আক্রমণ চালায়। আমাদের ডিলেয়িং পজিশনের সৈনিকরা শত্রুদের আরো বহুসংখ্যক লোক হতাহত করে বীরত্বের সাথে আক্রমণ প্রতিহত করতে থাকে কিন্তু আক্রমণ যখন আরও তীব্ররূপ ধারণ করে ডিলেয়িং পজিশন কে তারা পরিত্যাগ করে প্রধান ঘাঁটি মুন্সিরহাটে পিছু হটে আসে। শত্রুরা কিছুটা সফলতা লাভ করায় আরো প্রবল বেগে সামনের দিকে অগ্রসর হতে থাকে এবং ছিলোনিয়া নদী পর্যন্ত অগ্রসর হয়। এখানে এসে তারা নদী পার হওয়ার সকল প্রস্তুতি নেয়। আমাদের প্রধান ঘাঁটি থেকে ৮০০ গজ সামনে আনন্দপুর নামক গ্রামে শত্রুসেনারা তাদের সমাবেশ ঘটাতে থাকে। নদী পার হয়ে আমাদের আক্রমণ করার জন্য শত্রুরা সকল প্রস্তুতি নিতে থাকে। নদী পার হবার পূর্ব মুহূর্তে কামানের সাহায্যে আমাদের ঘাঁটির উপর তারা প্রবল আক্রমণ আরম্ভ করে। তারা বৃষ্টির মতো গোলা আমাদের অবস্থানের উপর ছুড়ছিল। এ আকস্মিক আক্রমণ চালানোর উদ্দেশ্য আমরা ভালভাবেই বুঝতে পারছিলাম। এই সুযোগে পাকসেনারা নদী পার হবার জন্য নৌকা এবং বাঁশের পুলের সাহায্যে এগিয়ে আসতে থাকে। যদিও আমরা শত্রুদের কামানের গোলায় যথেষ্ট বিপর্যস্ত ছিলাম তবুও মানসিক দিক দিয়ে আমাদের সৈন্যদের মনোবল ছিল বিপুল। ওদের বেশ সংখ্যক সৈন্য নদী পার হয়ে আমাদের অবস্থানের ২০০/৩০০ গজ ভিতরে চলে আসে এবং কিছুসগখ্যক তখনও নদী পার হচ্ছিল। ঠিক সেই সময়ে আমাদের মর্টার এবং মেশিনগান গর্জে উঠে। আমাদের এ অকস্মাত পাল্টা উত্তরে শত্রুসেনারা অনেক হতাহত হতে থাকে। তবুও তারা বাধা বিপত্তি ডিঙ্গিয়ে প্রবল বেগে অগ্রসর হতে থাকে। আর আমাদের সৈনিকরাও তাদের ব্যাপক ক্ষয় ক্ষতি করতে থাকে। তবুও টাটা নিঃসহায় অবস্থাতে ও দক্ষতার সাথে অগ্রসর হতে থাকে। কিন্তু আল্লাহ হয়তো অদের সহায় ছিলেন না। এ স্ময়ে তারা আমাদের সামনের মাইন ফিল্ডের মুখে এসে পড়ল। তাদের পায়ের চাপে একটার পর একটা মাইন ফাটতে আরম্ভ করলো। আমাদের চোখের সামনে অনেক শত্রুসেনা তুলোর মত উড়ে যেতে লাগলো। আমাদের গোপনে অবস্থিত পাশের মেশিনগাঙ্গুলির বৃষ্টির মতো গুলি ও মাইনের আঘাত তাদের মধ্যে একটা ভয়াভহ বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করে। শধু কয়েকজন শত্রু এসব বাধাবিপত্তির মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়ে আমাদের কয়েকটি অগ্রবর্তী বাঙ্কারের সামনে পর্যন্ত পৌছায়, কিন্তু আমাদের সৈনিকরা গ্রেনেড হাঁতে তাদের জন্য প্রস্তুত ছিল এবগ তারা সেখানেই আমাদের গ্রেনেডের মুখে ধ্বংস হয়। এই বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়ে শত্রুসেনারা আর সামনে এগোতে সাহস পায়নি। যারা পিছনে ছিল তারাও এই সংকট জনক অবস্থা এবং ভয়াবহতা বুঝতে পেরে পিছন দিকে পলায়ন করতে শুরু করে। শত্রুসেনাদের পালাতে দেখে আমাদের সৈনিকরাও উল্লাসে চেঁচিয়ে উঠে এবং আরো প্রবল গতিতে তাদের গুলি করে মারতে থাকে। আমাদের মর্টারও পসগচাদপসরণরত শত্রুদের উপর অনবরত আক্রমণ চালিয়ে তাদের হতাহত করতে থাকে। আমাদের আক্রমণ থেকে রক্ষা পেয়ে ওদের খুব কম সৈন্য ছিলোনিয়া নদীর অপর পারে পিছু হটে যেতে সক্ষম হয়। এ সময় আমাদের উপর শত্রুসেনারা অনবরত কামানের গোলা চালিয়ে যাচ্ছিল যাতে তাদের বিপর্যস্ত ও পর্যুদস্ত যে সমস্ত অবশিষ্ট সৈনিক ছিল তারা নিরাপদে আরো পশ্চাৎঘাঁটি আনন্দপুর পর্যন্ত পৌঁছতে পারে। এর কিছু পরে দুটোর সময় তাদের গোলন্দাজ বাহিনীর গোলাগুলি বন্ধ হয়ে যায়। সমস্ত যুদ্ধক্ষেত্রে নীরবতা নেমে আসে। আমরা কিছুক্ষণ আবার তাদের পুনঃআক্রমনের জন্য অপেক্ষা করতে থাকি কিন্তু পরে জানতে পাই যে তাদের অবস্থা সত্যি বিপর্যস্ত এবং তাদের মনোবল একেবারেই ভেঙ্গে গেছে। পুনঃআক্রমণের শক্তি আর তাদের নেই। সমস্ত যুদ্ধক্ষেত্রে তাদের অন্ততঃপক্ষে ৩০০ জনের মৃতদেহ পাওয়া যায় এবং ছিলোনিয়া নদীতে কত ভেসে গেছে সেটারও হিসাব আমরা পাই না। পরে জানতে পারি যে পাকিস্তানীরা একটা ব্যাটালিয়নের চেয়েও বেশি সৈন্যদল নিয়ে এ আক্রমণ চালিয়েছিল এবং ব্যাটালিয়নের ৬০ ভাগের মত লোক নিহত বা আহত হয়েছে। এদের অনেকের কবর এখনও ফেনীতে আছে।

 

এর পর থেকে শত্রুসেনারা আনন্দপুরে স্থায়ী ঘাঁটি করার জন্য বাঙ্কার খোঁড়ার কাজ শুরু করে দিল। আস্তে আস্তে ওদের সৈন্যসংখ্যাও অনেক বেড়ে যেতে লাগল। আমরা খবর পেলাম ওরা প্রচুর অস্ত্র এবং নতুন সৈন্য চট্টগ্রাম এবং ঢাকা থেকে এনে সমাবেশ করছে। সঙ্গে সঙ্গে প্রচুর কামান ও ট্যাঙ্ক তারা নিয়ে এসেছে। ৭ই জুনের বেলুনিয়া যুদ্ধের পর তাদের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এবং হতাহতের সংখ্যা দেখে পাকিস্তানীরা বুঝতে পেরেছিল যে আমি এই জায়গাতে তাদের সঙ্গে আবার সম্মুখ সমরে যুদ্ধের জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এবং সে জন্য আমার পরিকল্পনা অনুযায়ী তাদেরকে আমি ফাঁদে ফেলার জন্য তৈরি ছিলাম। পাকসেনারা আমার পরিকল্পনা অনুযায়ী অগ্রসর হয়ে সে ফাঁদে পা দিয়ে যথেষ্ঠ ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিল। সেই কারণে ভবিষ্যতে যাই করুক খুব সতর্কতার সাথে কাজ করার প্রস্ততি নিতে থাকে। বেলুনিয়ার বিপর্যয় পাকিস্তানী সেনাদের সবাইকে বিচলিত করে তোলে। তারা এই সিদ্ধান্ত নেয়, যে কোন উপায়ে বেলুনিয়াকে পুর্নদখল করতেই হবে। তাই তাদের সৈন্য সমাবেশ চলতে থাকে। জেনারেল আব্দুল হামিদ খান, চীফ অফ স্টাফ স্বয়ং জুলাই মাসে ফেনীতে আসেন বেলুনিয়া যুদ্ধের প্রস্তুতি এবং পরিচালনার জন্য। আমি আমার প্রতিরক্ষার অবস্থান আরও শক্তিশালী করার চেষ্টা করি। মন্দভাগ থেকে ক্যাপ্টেন গাফফারকে চতুর্থ বেঙ্গল রেজিমেন্ট-এর ‘সি’ কোম্পানী নিয়ে এবং আরো কিছু মর্টার নিয়ে বেলুনিয়া সেক্টরে গিয়ে প্রতিরক্ষাব্যূহ আরো শক্তিশালী করে তোলার নির্দেশ দেই। যেহেতু আমার কাছে আর কোন সৈন্য ছিল না, তাই আমি এ তিনটি কোম্পানী দিয়ে জাফর ইমামকে শত্রুদের সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য তৈরী থাকার নির্দেশ দেই। শত্রুরা আমাদের প্রতিরক্ষা থেকে মাত্র ৮০০ গজ দূরে গতিয়ানালার অপর পারে তাদের প্রস্তুতি চালিয়ে যাচ্ছিল। উভয়পক্ষে অনবরত গোলাগুলি বিনিময় হত, আর তাছাড়া শত্রুদের গোলন্দাজ বাহিনী আমাদের ঘাঁটির উপর অবিরাম শেলিং চালিয়ে যেত। আমাদের সৈনিকদের বাঙ্কার ছেড়ে বাইরে চলাফেরার উপায় ছিল না। কিন্তু শত্রুর এই গোলাগুলির এবং আর্টিলারী ফায়ারিং-এর মধ্যেও আমাদের বীর বঙ্গশার্দুলরা তাদের মনোবল হারায়নি এবং এতে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল। তারা এ গোলাগুলিকে যুদ্ধক্ষেত্রে বাজনার মত মনে করত। মাঝে মাঝে আমাদের সৈনিকরা পরিত্যক্ত গ্রামের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়ে শত্রুদের অনেক হতাহতও এবং অনেক সময় ১০৬ মিলিমিটার ট্যাঙ্কবিধ্বংসী-কামানের সাহায্যে তাদের বাঙ্কার উড়িয়ে দিয়ে আসত। এসব আকস্মিক আক্রমণাত্নক কার্যে শত্রুরা যথেষ্ট ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ত এবং তাদের যথেষ্ট হতাহত হত। তারপরই তারা শুরু করত গোলন্দাজ বাহিনীর সাহায্যে অবিরাম বৃষ্টির মত গোলাগুলি। এভাবে জুলাই মাসের ১৭ তারিখ পর্যন্ত চলল। পাকিস্তানীদের যুদ্ধের প্রস্তুতি দেখে ঐ এলাকার জনমনে যথেষ্ট ত্রাসের সৃষ্টি হয়। প্রথমবারের আক্রমণে যদিও জনসাধারনের বেশী ক্ষতি হয়নি, সেহেতু সেবার শত্রুসেনারা ছিল আমাদের হাতে পর্যুদস্ত। যুদ্ধের বিভীষিকা তারা প্রত্যক্ষভাবে সেবার দেখেছিল, কিন্তু এবারের পাকবাহিনীর প্রস্তুতির খবরে সত্যি তারা চিন্তিত হয়ে পড়েছিল। এ সময় ছিল ভরা বর্ষা। সব জায়গাতে ছিল পানি। পানি ভেঙ্গে ছেলেমেয়ে নিয়ে শত্রুদের অকস্মাৎ আক্রমণের মুখে নিরাপদ জায়গায় সরে যাওয়া অসম্ভব হতে পারে। এ জন্য আমরা স্থানীয় লোকদের নির্দেশ দেই যাতে তারা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে আগেই দূরে সরে যায় বা সরে যেতে পারে। কেউবা সেচ্ছায় আর কেউবা নিরুপায় হয়ে বিপদের ঝুঁকি নিয়ে স্ব স্ব স্থানে রয়ে যায়। আমাদের সৈনিকরা প্রতিরক্ষাব্যূহের উন্নতি চালিয়ে যেতে থাকে। যে সব জায়গাতে শত্রুদের আমাদের অবস্থানের ভিতরে অগ্রসর হওয়ার সম্ভাবনা ছিল আমরা সেসব জায়গাতে মাইন লাগাতে থাকি। ১৭ জুলাই রাত ৮টায় আমাদের উপর শত্রুরা অকস্মাৎ আক্রমণ শুরু করে দেয়। প্রায় আধাঘন্টা পর তিনটা হেলিকপ্টার আমাদের অবস্থানের পাশ দিয়ে পিছনের দিক চলে যায়। চারিদিকে অন্ধকার ছিল এবং সঙ্গে সঙ্গে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছিল। হেলিকপ্টারগুলো অবস্থানের পিছনে অবতরণ করার সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের সৈনিকরা বুঝতে পেরেছিল যে শত্রুসেনারা প্রতিরক্ষা ব্যূহের পিছনে ছত্রীবাহিনী নামিয়েছে। আমাদের অগ্রবর্তী অবস্থানগুলো থেকেও খবর আসতে লাগল যে শত্রুরা মুহুরি ও ছিলোনিয়া নদীর পাড় দিয়ে এগিয়ে আসছে। ওদের সঙ্গে ট্যাঙ্কও আছে। অবস্থানের সামনে বিপুল সৈন্য নিয়ে শত্রুর আক্রমণের প্রতিরক্ষা আর পিছনে তাদের ছত্রীবাহিনী আমাদের সৈনিকদের পিছন থেকে ঘিরে ফেলার জন্যও প্রস্তুত। এরকম একটা সংকটময় অবস্থাতেও ক্যাপ্টেন জাফর ইমাম এবং ক্যাপ্টেন গাফফার এবং লেঃ ইমামুজ্জামান ও ক্যাপ্টেন শহীদের নেতৃত্বে সামান্য শক্তি নিয়েও যুদ্ধের জন্য আমাদের সৈনিকদের মনোবল ছিল অটুট। আমার সব অফিসার ঐ চরম মূহুর্তে তাদের সাহস এবং দৃঢ়প্রত্যয়ের পরিচয় দিয়েছিল। রাত তখন সাড়ে ৯টা। বৃষ্টি বেশ একটু জোরালো হয়ে উঠেছে। শত্রুরা তাদের অগ্রসর অব্যাহত রেখেছে। এ সময়ে ক্যাপ্টেন গাফফারের অবস্থানের পিছন থেকে শত্রুরা হামলা চালায়। ক্যাপ্টেন গাফফার এবং তার সৈনিকরা বীরত্বের সাথে শত্রুসেনাদের হামলা মোকাবেলা করে। প্রায় ১ ঘন্টা যুদ্ধের পর শত্রুসেনারা বেশ কিছু হতাহত সৈনিক ফেলে ক্যাপ্টেন গাফফারের অবস্থান থেকে বিতাড়িত হয়ে যায়। এ সময় ক্যাপ্টেন জাফর ইমামের কোম্পানীর সামনেও শত্রুরা আক্রমণ চালায়। শত্রুদের ট্যাঙ্কগুলিও আস্তে আস্তে যুদ্ধক্ষেত্রের দিকে এগিয়ে আসছিল। শত্রুদের কামানের গুলি সমস্ত অবস্থানের উপর এসে পড়ছিল। লেঃ ইমামুজ্জামান,যাঁর কোম্পানী সবচেয়ে বামে ছিল, সেখানেও শত্রুরা আস্তে আস্তে চাপ দিতে থাকে। ক্যাপ্টেন জাফর ইমাম আমাকে এ পরিস্থিতির কথা জানায়। আমি বুঝতে পারলাম যে শত্রুসেনারা ডানে, বামে হেলিকপ্টারের সাহায্যে আমার প্রতিরক্ষাব্যূহের পিছনে পজিশন নিয়েছে এবং আস্তে আস্তে আমার সমস্ত ট্রুপসদের ঘিরে ফেলার মতলব এঁটেছে। শত্রুর চাপ আস্তে আস্তে বেড়েই চলছিল। উভয়পক্ষেরই হতাহত ক্রমেই বেড়ে চললো। তাদের অনেকেই আমাদের মাইন ফিল্ডের ভিতরে পড়ে গিয়ে প্রাণ হারাচ্ছিল, কিন্তু তবুও তারা অগ্রসর হচ্ছিল। ইতিমধ্যে আমার ৫ জন লোক নিহত ও ৩৫ জন লোক আহত হয়। এই অন্ধকারে সমস্ত অবস্থান জুড়ে চলছিল সম্মুখসমরে হাতাহাতি যুদ্ধ। যদিও শত্রুদের ক্ষয়ক্ষতির সংখ্যা আমাদের চেয়ে অনেক বেশী হচ্ছিল, তবুও আমার পক্ষে ৩০/৪০ জন- হতাহতের পরিমাণ খুবই মারাত্নক ছিল। তাছাড়া আমার সৈন্যসংখ্যা ছিল অনেক কম আর অস্ত্রশস্ত্রেও ছিলাম আমি তাদের চেয়ে অনেক দূর্বল। আমি বুঝতে পারলাম সকাল পর্যন্ত তারা যদি আমাকে এভাবে ঘিরে রাখতে পারে, তাহলে তাদের বিপুল শক্তিতে দিনের আলোতে এবং ট্যাংক ও কামানের গোলায় আমার সৈন্যদের সম্পূর্নরূপে ধ্বংস করে দেবে।

 

রাতের অন্ধকারে তাদের ট্যাঙ্ক এবং কামানের গোলা আমাদের উপর কার্যকরী হয়নি। কিন্তু দিনের আলোতে এসব অস্ত্র আমার অবস্থানের জন্য মারাত্নক হয়ে দাঁড়াবে। আমি ক্যাপ্টেন জাফর ইমামকে বর্তমান অবস্থান থেকে ডাইনে বা বামে সরে গিয়ে শত্রুদের এড়িয়ে পিছনে এসে চিতুলিয়াতে নতুন প্রতিরক্ষাব্যূহ তৈরী করার নির্দেশ দেই। এ নির্দেশ অনুযায়ী রাত ১টায় ক্যাপ্টেন জাফর ইমাম, ক্যাপ্টেন শহীদ এবং ক্যাপ্টেন গাফফার তাদের স্ব স্ব দল নিয়ে শত্রুদের এড়িয়ে চিতুলিয়াতে নতুন প্রতিরক্ষা অবস্থানে পৌঁছে। পৌছার সঙ্গে সঙ্গে নতুন অবস্থানের জন্য তৈরী শুরু হয়ে যায়। তখন সকাল ৯টা কি ১০টা। আমি নিজেই যথেষ্ট উদ্বিগ্ন ছিলাম লেঃ ইমামুজ্জামান এবং তার দলটি না পৌঁছানোর জন্য। যখন প্রতিরক্ষা ব্যূহ তৈরী চলছিল আমি তিন-চারজন সিপাই সঙ্গে নিয়ে আগে অগ্রসর হয়ে যাই- শত্রুদের সম্বন্ধে জানবার জন্য। চেতুলিয়া থেকে বেশ কিছু দূর আগে মুন্সিরহাটের নিকট যেয়ে দেখতে পাই যে শত্রুরা সকাল পর্যন্ত মুন্সিরহাটে রেলওয়ে স্টেশন পর্যন্ত দখল করে নিয়েছে এবং এর আগে আর অগ্রসর হওয়ার সাহস করেনি। তারা ভাবছিল যে আমাদের পিছনের পজিশনগুলো হয়ত এখনও আছে। আমরা যে রাত্রে এসব ঘাঁটি ত্যাগ করে চেতুলিয়াতে নতুন ব্যূহ রচনা করেছি এ সম্বন্ধে তারা সকাল ১০টা পর্যন্ত জানতে পারেনি এবং তারা খুব সতর্কতার সাথে অগ্রসর হচ্ছিল। আমি প্রায় ১টা পর্যন্ত আমার রেকি বা অনুসন্ধান শেষ করে চেতুলিয়াতে ফেরত আসি, ঠিক এই মুহূর্তে শত্রুদের আরো তিন চারখানা হেলিকপ্টার আসে এবং আমাদের অবস্থানের ৭০০/৮০০ গজ ডানে রেলওয়ে লাইনের উঁচু বাঁধের পিছনে অবতরণ করে। এছাড়া আরো দুটি হেলিকপ্টার আসে যেগুলি আমাদের বামে আধা মাইল দূরে একটা পুকুরের বাঁধের পিছনে অবতরন করে এবং সঙ্গে সঙ্গে সেদিক থেকে ভয়ংকর গোলাগুলির আওয়াজ শুনতে পাই। আমি বুঝতে পারলাম শত্রুরা আমার ট্রুপসদের চতুর্দিক থেকে ঘিরে ফেলেছে এবং আমাদের প্রতিরক্ষা অবস্থান তখনও কিছুই তৈরী হয়নি। এ সময় ছিল আমার পক্ষে চরম মুহূর্ত। বাম থেকে গোলাগুলির আওয়াজ আরো প্রচন্ড হচ্ছিল। আমি তৎক্ষনাৎ সিদ্ধান্ত নেই এবং ক্যাপ্টেন জাফর, ক্যাপ্টেন গাফফারকে নির্দেশ দেই এখনই এই মুহূর্তে তাদের নিজ নিজ কোম্পানী নিয়ে বর্তমান অবস্থান পরিত্যাগ করার জন্য। আমি এবং আমার সমস্ত সৈন্যকে অবস্থানটি পরিত্যাগ করার আধা ঘন্টার মধ্যে শত্রুরা সেদিন আক্রমণ চালায়।

 

এবারও শত্রুসেনারা আমাকে এবং আমার সেনাদলকে সামান্য মুহূর্তের জন্য ধরার সুবর্ণ সুযোগ আবার হারিয়ে ফেলে। হয়তবা এ ছিল পরম করুণাময় আল্লাহর আশীর্বাদ। আমি পরে জানতে পারি আমার অবস্থানের বাম থেকে যে গোলাগুলির আওয়াজ শুনতে পেয়েছিলাম তা ছিল লেঃ ইমামুজ্জামানের সৈনিকদের সঙ্গে পাকসেনাদের সংঘর্ষ। পাকসেনারা হেলিকপ্টারযোগে বামে অবতরণ করেছিল সে সময় লেঃ ইমামুজ্জামানের সৈন্যদলের সামনে পড়ে যায়। এতে তাদের যথেষ্ঠ ক্ষয়ক্ষতি হয়। লেঃ ইমামুজ্জামান শত্রুদের প্রচন্ড আঘাত হেনে পরে বাম দিক দিয়ে পিছনে হটে আসে এবং আমার সঙ্গে মিলিত হয়। যদিও আমাকে অবস্থান পরিত্যাগ করতে হয়েছিল এবং পাকবাহিনী বেলুনিয়া পুনঃদখল করে নেয় তবুও শত্রুদের যা হতাহত হয় তা ছিল অপূরনীয়। আমাদের পশ্চাদপসরন একটা রণকৌশল ছিল। সৈন্য, অস্ত্র, গোলাবারুদ সবকিছুই ছিল নগণ্য। সে তুলনায় শত্রুদের শক্তি ছিল বিরাট। আমার তখনকার যুদ্ধের নীতি এবং কৌশলই ছিল শত্রুদেরকে অকস্মাৎ আঘাত হানা বা তাদেরকে প্রলোভন দেখিয়ে আমার মনোনীত জায়গা অগ্রসর হতে দেওয়া এবং তাদেরকে পর্যুদস্ত এবং ধ্বংস করা-শত্রুদের এভাবে ব্যতিব্যস্ত রেখে আস্তে আস্তে নিজের শক্তি আরো গড়ে তোলা এবং সংগঠনকে শক্তিশালী করা। অংকুরেই ধ্বংস হয়ে যাওয়াটা আমার উদ্দেশ্য ছিল না। এ পরিপ্রেক্ষিতে সব সংঘর্ষেই আমি পাক সেনাবাহিনী কে আঘাত হানতাম অতর্কিতে। আবার যখন যথেষ্ঠ ক্ষতিসাধন হত তখন অকস্মাৎভাবেই সংঘর্ষ এড়িয়ে অন্য জায়গায় চলে যেতাম। এতে শত্রুরা আরো মরিয়া হয়ে উঠত এবং পাগলের মত আমার নতুন অবস্থানে এসে আঘাত হানত। বারবারই এ রণকৌশল পুনরাবৃত্তি হত। যে সময় বেলুনিয়ার সম্মুখসমর চলছিল, ঠিক সে সময় আমি শত্রুর পিছনের এলাকায় আঘাত হানার জন্য তৈরী হচ্ছিলাম। আমার হেডকোয়ার্টারস-এ অন্ততঃপক্ষে চারহাজার গেরিলা সে সময় প্রশিক্ষণরত ছিল। এদেরকে আমি বিভিন্ন দলে বিভক্ত করে বিশেষ বিশেষ ধরনের গেরিলা যুদ্ধের পদ্ধতিতে শিক্ষা দিচ্ছিলাম। একটি দলকে শিক্ষা দিচ্ছিলাম ডিমোলিসন (বিস্ফোরক) ব্যবহার- যাদের প্রথম উদ্দেশ্য ছিল দেশের অভ্যন্তরে যত রাস্তা ও রেলওয়ে সেতু আছে সেগুলি ধ্বংস করে দেওয়া- যাতে শত্রুরা অনায়াসে যাতায়াত করতে না পারে এবং বিভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্রে পাক সেনাদল তাদের রেশন ঠিকমত পোঁছাতে না পারে। এ ছাড়া এ দলটির আরো কাজ ছিল শিল্পক্ষেত্রে-কিছু মনোনীত শিল্পকে সাময়িকভাবে অকজো করে দেওয়া। বিশেষ করে ঐ সব শিল্প, যাদের তৈরী মাল পাকবাহিনী বিদেশে রপ্তানী করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে সক্ষম হবে। এসব শিল্প অকেজো করার সময় আমাকে অনেক সতর্কতার সাথে পরিকল্পণা করতে হয়েছে, যেহেতু সব শিল্পই আমাদের দেশের সম্পদ এবং এগুলি সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিলে পরবর্তীকালে স্বাধীনতার পর আমাদের নিজেদেরই আবার সংকটের সম্মুখীন হতে হবে, সে কারণে প্রতিটা টার্গেট সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর পরিকল্পণাগুলিকে যথেষ্ঠ বিবেচনার সাথে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করতে হত এবং তারপরই সিদ্ধান্ত গ্রহন করতাম। শিল্পগুলিকে ধ্বংস না করে এগুলিকে সাময়িক অকেজো করার এক অভিনব পদ্ধতি আমি খুঁজে পাই। আমার সেক্টর-এর বেশীরভাগ শিল্প ঢাকার চারপাশে- ঘোড়াশাল এবং নরসিংদীতে অবস্থিত ছিল। আমি জানতে পেরেছি যে, এসব শিল্পের জন্য বৈদ্যুতিক শক্তি সাধারণত সাজিবাজার পাওয়ার হাউস ও কাপ্তাই থেকে পাওয়ার লাইনের মাধ্যমে আসে। আমি আমার গেরিলাদের প্রথম টার্গেট দেই ওই সব পাওয়ার লাইন উড়িয়ে দেওয়ার জন্য। প্রতি সপ্তাহে ২০টি টিম বিভিন্ন এলাকায় পাওয়ার লাইন ধ্বংস করতে থাকে। এর ফলে প্রায় ৭৫ শতাংশ বিদ্যুৎ সরবরাহ শিল্প এলাকাগুলোতে বন্ধ হয়ে যায়। পাকবাহিনী নিরুপায় হয়ে প্রত্যক পাইলনের নীচে এন্টি-পার্সোনাল মাইন পুঁতে রাখত যাতে আমার লোকজন পাইলনের কাছে আসতে না পারে। তারা সিদ্ধিরগঞ্জ পাওয়ার হাউস থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে শুরু করে। আমি যখন এ খবর জানতে পারি, তখন সিদ্ধিরগঞ্জের সরবরাহ কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ যাতে না যেতে পারে তার পরিকল্পনা করতে থাকি। আমার হেডকোয়ার্টাস থেকে তিনটি দলকে ঢাকার বিদ্যুৎ সরবরাহ পদ্ধতি সম্বন্ধে সমস্ত তথ্য আনার জন্য প্রেরন করি। এক সপ্তাহের মধ্যে তারা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে অনুসন্ধান চালিয়ে যায় এবং আমাকে সমস্ত খবর পৌঁছায়। তারা আরো জানায়, পাকবাহিনীর একটি শক্তিশালী দল ট্যাঙ্কসহ সিদ্ধিরগঞ্জ বিদ্যুৎ সরবরাহ কেন্দ্রে আস্তানা গড়েছে। চতুর্দিকে বাঙ্কার প্রস্তত করে সে জায়গাটি পাহারা দিচ্ছে। সে কেন্দ্রটিকে অকেজো করতে হলে একটা বিরাট যুদ্ধের পর সেটিকে দখল করতে হবে। শত্রুঘাঁটি যেরূপ শক্তিশালী ছিল তাতে সফল হাওয়া সম্ভব হতেও পারে , নাও হতে পারে। আর তাছাড়া আমি প্রকৃতপক্ষে কেন্দ্রটি সম্পূর্ণরূপে উড়িয়ে দেওয়ার পক্ষেপাতী ছিলাম না। আমি এসব ভেবে অন্য পন্থা অবলম্বন করার জন্য চিন্তা করতে থাকি। এই সময়ে ওয়াপদার একজন ইঞ্জিনিয়ার আমার কেন্দ্র আসেন। তাঁর সঙ্গে এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা হয়। আমার যে অনুসন্ধান দলটি খবরাখবর এনেছিল, তারা আসার সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ কেন্দ্রের একটা নীলনকশা ওয়াপদার প্রধান দপ্তর থেকে চুরি করে এনেছিল। আমি ইঞ্জিনিয়ার জনাব ভূইয়াকে এ নীলনকশা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহের একটা সম্পূর্ণ মডেল আমার হেডকোয়ার্টারে-এ তৈরীর নির্দেশ দেই। ইঞ্জিনিয়ার জনাব ভূঁইয়া আমার নির্দেশ অনুযায়ী ঢাকা, টঙ্গি, ঘোড়াশাল, নারায়নগঞ্জের বিদ্যুৎ সরবরাহ লাইনের একটা পূর্ণাঙ্গ মডেল তৈরী করেন। সে মডেলের উপর ইঞ্জিনিয়ার সাহেবের সাথে আলোচনাকালে আমি বুঝতে পারি যে, ঢাকাতে মোট ন’টি জায়গাতে (পোস্তাগোলা, ডেমরা, হাটখোলা, জংসন, খিলগাঁও, মতিঝিল, ধানমণ্ডি, শাহবাগ, কমলাপুর, উলন) গ্রীড সাবস্টেশন আছে এবং এই সাবস্টেশনগুলি যদি আমরা ধ্বংস করে দিতে পারি তবে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাবে। এও বুঝতে পারি যে, বিদ্যুৎ সরবরাহ সিদ্ধিরগঞ্জ থেকে মোটামুটি তিনটি লাইনে আসে এবং যদি সবগুলো সাবস্টেশন একসঙ্গে উড়িয়ে না দেয়া যায়, তাহলে বিদ্যুৎ সরবরাহ অন্য পথ দিয়ে চলবে। ঢাকার এবং শিল্প এলাকার বিদ্যুৎ সরবরাহ অকেজো করে দেওয়ার জন্য আমি জুলাই মাস থেকে ১৬টি টিম ট্রেইন করতে থাকি। এসব টিমে ৮ থেকে ১০ জন গেরিলাকে এভাবে ট্রেনিং দেই যাতে তারা সাবস্টেশন গুলির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি খুব কম সময়ের মধ্যে চিনে নিতে পারে এবং সেগুলো অনায়াসে ধ্বংস বা অকেজো করে দিতে পারে। ট্রেনিং-এর ব্যবস্থা এমনভাবে করা হয় যাতে তারা এ কাজে সম্পূর্ন পারদর্শিতা অর্জন করে। দু’মাস ট্রেনিং-এর পর এসব টিমগুলোকে আমার হেডকোয়ার্টারে মডেলের উপর একটা পূর্ণাঙ্গ রিহার্সালের বন্দোবস্ত করি যাতে প্রত্যেকটা টিমের প্রতিটি ব্যক্তির তার কার্য সম্বন্ধে কোন সন্দেহ না থাকে। নিজ নিজ কার্য যাতে তৎপরতার সাথে করতে পারে সে জন্য এ ব্যবস্থা করা হয়। এ টিমগুলি কে আমি কসবার উত্তরে আমাদের যে গোপন প্রবেশপথ ছিল, সে পথে ঢাকাতে প্রেরন করি। টিমগুলি নবীনগর এবং রূপগঞ্জ হয়ে নদীপথে ঢাকার উপকন্ঠে পোঁছে এরা প্রথম তাদের রেকি (সন্ধানী) সম্পন্ন করে। অনুসন্ধানের পর জানতে পারে যে কতগুলো সাবস্টেশনে পাকিস্তানীরা ছোট ছোট আর্মি পাহারা দলের বন্দোবস্ত করেছে। আবার কোন কোনটিতে পশ্চিম পাকিস্তানী পুলিশ কিম্বা রাজাকার দ্বারা পাহারার বন্দোবস্ত করেছে। দলগুলি তাদের সমস্ত সরঞ্জাম এবং অস্ত্র ঢাকাতে বিভিন্ন জায়গাতে লুকিয়ে রেখে বর্তমান অবস্থান সম্বন্ধে আমাকে খবর পাঠায় এবং নির্দেশের অপেক্ষায় থাকে। আমি বুঝতে পারলাম যদিও কোন কোন জায়গায় ছোট ছোট পাহারার বন্দোবস্ত করা হয়েছে তবুও এগুলি ধ্বংস করার সুযোগ এখনই। এরপর পাহারা আরও সুদৃঢ় হওয়ার আশঙ্কা আছে। সে জন্য আর কালবিলম্ব না করে সবগুলো পাওয়ার সাবস্টেশন একযোগে অতিসত্বর ধ্বংস করার বা অকেজো করার নির্দেশ পাঠাই। আমার নির্দেশ পাওয়ার পর সব টিমই নিজ নিজ কমান্ডারদের নেতৃত্বে একযোগে জুন মাসের ২৭ তারিখের রাতে অকস্মাৎ তাদের আক্রমন চালায়। তারা এইসব আক্রমণে ধানমণ্ডি, শাহবাগ, পোস্তাগোলা, উলন, মতিঝিল, ডেমরা প্রভৃতি সাবস্টেশনগুলি ধ্বংস বা সাময়িক অকেজো করে দিতে সক্ষম হয়েছিল। আক্রমণের সময় আমার লোকদের সঙ্গে অনেক জায়গায় পাকসেনাদের সংঘর্ষ হয়- বিশেষ করে ধানমণ্ডি সাবস্টশনে। এই দলটির নেতৃত্ব দিচ্ছিল রুমি। সে একাই স্টেনগান হাতে পাকসেনাদের উপর হামলা চালায় এবং সকলকে গুলি করে মেরে ফেলে। তার অসীম সাহসিকতার ফলে অন্যান্য লোকরাও উজ্জীবিত হয়ে ওঠে এবং পাকসেনাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং সাবস্টেশনটি ধ্বংস করে দেয়। এরূপ সংঘর্ষ শাহবাগ ও ডেমরাতে ঘটে। বাকি জায়গাগুলোয় আমার লোকেরা এমন অকস্মাৎভাবে সাবস্টেশনগুলির ভিতরে ঢুকে পড়ে যে পাকসেনারা বা পাকিস্তানী পুলিশেরা কিছু বোঝার আগেই তাদের হাতে বন্দী বা নিহত হয়। এ অপারেশন-এ অন্তত ৭৫ শতাংশ সফলতা লাভ করি। ঢাকার বিদ্যুৎ সরবরাহ ২৪ ঘন্টার জন্য সম্পূর্ণ অচল হয়ে যায়। যদিও পাকিস্তানীরা বিমানযোগে সাবস্টেশনের যন্ত্রপাতি পশ্চিম পাকিস্তান থেকে নিয়ে আসে এবং কিছুটা সরবরাহ পুনরুদ্ধার করে-তবুও শিল্প এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ চিরতরে কমে যায়। এতে পাটকলগুলি চালাবার প্রচেষ্টা অনেকাংশে কমে যায়।

 

এ সময়ে আমি আরো জানতে পারি যে, প্রিন্স সদরুদ্দিন জাতিসংঘের পক্ষ থেকে ঢাকায় আসছেন সরেজমিনে অবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য। জেনারেল টিক্কা খান সে সময়ের প্রস্ততি নিচ্ছিল প্রিন্স সদরুদ্দিনকে বাংলাদেশের সবকিছু স্বাভাবিক অবস্থা দেখাবার জন্য। আমি তার এই প্রচেষ্টা বানচাল করার জন্য আরো পাঁচটি দল তৈরী করি। তাদের কাজ ছিল ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় গ্রেনেড বিষ্ফোরণ ঘটানো এবং অবস্থা যে স্বাভাবিক নয় সে সম্বন্ধে প্রিন্স সদরুদ্দিনকে বুঝিয়ে দেওয়া। পরিকল্পনা অনুযায়ী দলগুলি ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় বিষ্ফোরণ ঘটায়-প্রিন্স সদরুদ্দিনের অবস্থানকালে। সবচয়ে বড় বিষ্ফোরণ ঘটায় মতিঝিলে। আলম এবং সাদেক এ দুজন গেরিলা ১টা গাড়ীর ভিতরে ৬০ পাউন্ড বিষ্ফোরক রেখে মতিঝিল হাবিব ব্যাঙ্ক বিল্ডিং-এর সামনে বিলম্বিত ফিউজের মাধ্যমে ভয়ংকর বিস্ফোরণ ঘটায়। এ বিস্ফোরণের ফলে হাবিব ব্যাঙ্কের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। এই ঘটনায় সমস্ত ঢাকা শহরে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ে। জনসাধারন সঙ্গে সঙ্গে সব কাজ কর্ম বন্ধ করে দেয়। সেদিন রাতেই প্রিন্স সদরুদ্দিন যখন হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে বিশ্রাম করছিলেন এ দলটি হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের বারান্দায় আরেকটা বিস্ফোরক ভর্তি গাড়ী বিস্ফোরণ ঘটায়। চতুর্দিকে এসব বিস্ফোরণে জাতিসংঘে মহামান্য পর্যবেক্ষক বেশ ভাল করে বুঝতে পেরেছিলেন যে টিক্কা খান যাকে স্বাভাবিকভাবে দেখানোর চেষ্টা করেছে, তা স্বাভাবিক নয়। ঢাকার অপারেশন যখন চলছিল তখন আমি আমার বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেনাদের এবং প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত গেরিলাদের মিলিত দল বিভিন্ন থানায় পাঠাচ্ছিলাম থানাগুলি দখল করে নেওয়ার জন্য। এই দিনগুলি ছিলো বিশেষ অসুবিধার-কারণ আমার ট্রেনিংপ্রাপ্ত ছেলেরাও সেনারা সবাই ছিল যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত। কিন্তু ছিল না শুধু অস্ত্র আর গোলাবারুদ। অনেক চেষ্টা করেও গোলাবারুদ আর অস্ত্রের কোন ব্যবস্থা করতে পারছিলাম না।

 

আমাদের বন্ধুরা সবসময় আশ্বাস দিত ‘এই অস্ত্র এসে পড়ছে’। কোন সময় বলত ট্রেনে মালভর্তি হয়ে গেছে, বন্যার জন্য আসতে পারছে না, কেননা রেললাইন বন্ধ। আবার কোন সময় বলত ফ্যাক্টরিতে তৈরী হচ্ছে। এমনও সময় গেছে যে অনেক গুরুত্বপূর্ণ অপারেশন পরিকল্পনা তৈরীর পর আমাদের সে পরিকল্পনা পরিত্যাগ করতে হতো অস্ত্রের অভাবে। নিজেদের কাছে যে সব অস্ত্র ছিল সেসবেরও গোলাবারুদ অত্যন্ত রেশনিং-এর পরেও প্রায় শেষ হওয়ার পথে ছিল। এ সময় সমস্ত মুক্তিবাহিনীতে হতাশার ভাব পরিলক্ষিত হয়। অনেক সময় বহু অনুরোধের পর হয়ত ৩০৩ রাইফেলের ৫ রাউন্ড করে গুলির সাহায্য পেতাম। এ ধরনের যুদ্ধের জন্য যা ছিল অতি নগণ্য। এসব অসুবিধা এবং সংকটের মধ্যেও আমরা ভেঙ্গে পড়িনি। আমি আমার সেনাদলকে নির্দেশ দেই, যে উপায়ে হোক আর যেখানেই হোক পাক বাহিনীকে এ্যামবুশ করে যা অতর্কিতে আক্রমন করে তাদের অস্ত্রশস্ত্র গোলাবারুদ ছিনিয়ে নিয়ে নিজেদেরকে সজ্জিত করে তুলতে হবে। এ যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হবে। সকলকে আত্ননির্ভরশীলতা এবং আত্নবিশ্বাস আরো বাড়াতে হবে। আমার এ নির্দেশ বেশ কাজে লাগে।সকলেই আবার পূর্ণ উদ্দ্যমে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে থাকে।

 

জুলাই মাসে টিক্কা খান আবার মন্দভাগ এবং শালদা নদী পুনর্দখল করার প্রচেষ্টা চালায়। পাকিস্তানীরা বেলুচ কুট্টি নামক জায়গায় সৈন্য সমাবেশ করে। আমাকে এ খবর আমাদের লোকেরা পৌঁছায়। আমি ক্যাপ্টেন গাফফারকে মন্দভাগের অবস্থান আরো এগিয়ে বাজারের নিকট অবস্থান শক্তিশালী করার নির্দেশ দেই। শত্রুসেনারা সকালে বেলুচ রেজিমেন্টের দুটি কোম্পানীকে সামনে রেখে অগ্রসর হয়। সকাল সাড়ে দশটায় শত্রুসেনারা অবস্থানের অগ্রবর্তী স্থান পর্যন্ত অগ্রসর হয় এবং আমাদের মাইনফিল্ডের ভিতর আটকা পড়ে যায়। তবুও তারা অগ্রসর হতে থাকে। তারা যখন আমাদের থেকে ৫০ গজের মধ্যে এসে পড়ে, ক্যাপ্টেন গাফফারের সেনাদল তাদের উপর অকস্মাৎ গুলিবর্ষণ শুরু করে। শত্রুরা আমাদের অবস্থান এত সামনে আছে তা জানত না। চতুর্দিকের গুলিতে তাদের দুটি কোম্পানী সম্পূর্ণ ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় এবং শত্রুসেনারা চারিদিকে ছুটাছুটি করতে থাকে। এতে তাদের নিহতের সংখ্যা আরো বেড়ে যায়। ৩১ বেলুচ কিছুক্ষন পর তাদর আক্রমন পরিত্যাগ করে। কিন্তু এক ঘন্টা পরে পাক সেনারা শলদা নদীর দক্ষিন তীরের সাথে আমাদের অবস্থানের ডান পাশ দিয়ে পিছনে আসার চেষ্টা করে। তারা যে এরূপ একটা কিছু করতে পারে ক্যাপ্টেন গাফফার তা পূর্বেই অনুমান করেছিল। এ জন্য ক্যাপ্টেন গফফার তৈরীও ছিল। সুবেদার ওহাবের অধীন একটি কোম্পানীকে সে আগে থেকেই শালদা নদীর দক্ষিণ তীরে এ্যামবুশ পজিশনটির ফাঁদে পড়ে যায়। নিরুপায় হয়ে তারা অবস্থানটির উপর প্রবল আক্রমণ চালায় কিন্তু আমাদের গুলির মুখে এ আক্রমণ ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। আর উপায় না দেখে পরবর্তী আক্রমণ স্থগিত রেখে পাকসেনারা পিছু হটে যায়। ক্যাপ্টেন গাফফারের সেনাদল ও সুবেদার ওহাবের সেনাদল পশ্চাৎগামী শত্রুদের পিছনে ধাওয়া করে। এ সময় চতুর্দিক ধানক্ষেতে এবং অন্য জায়গায় বেশ পানি ছিল। শত্রুরা এসব পানি ভেঙ্গে পশ্চাদপসরণ করার সময় অনেক আহত ও নিহত হয়। যুদ্ধের শেষে সমস্ত যুদ্ধক্ষেত্রে খুঁজে আমরা অন্তত ১২০টা মৃতদেহ খুঁজে পাই এবং আরো অনেক মৃতদেহ যেগুলি পানিতে ছিল, খুঁজে পাওয়া যায় না। এ যুদ্ধের ফলাফল আমার পক্ষে অনেক লাভজনক ছিল। আমরা ৮টা মেশিনগান, ১৮টা হালকা মেশিনগান প্রায় দেড়শ (১৫০) রাইফেল, ২ টা রকেট লাঞ্চার, ২ টা মর্টার ও অজস্র গোলাবারুদ হস্তগত করি। আরো অনেক অস্ত্রশস্ত্র যেগুলি পানিতে ছিল সেগুলি খুঁজে পাওয়া যায়নি। মৃতদেহগুলির মধ্যে ১ জন ক্যাপ্টেন, ১জন লেফটেন্যান্ট এবং আরো কয়েকজন জুনিয়ার কমিশন্ড অফিসার কে সনাক্ত করা হয়। শত্রুরা এই সময় বৃষ্টি এবং বন্যার জন্য আমাদের হাতে বেশ নাজেহাল হচ্ছিল এবং তাদেরকে বাধ্য হয়ে গতিবিধি শুধু রাস্তায় সীমিত রাখতে হচ্ছিল। কিন্তু আমরা শত্রুদের এ দুর্বলতা সম্পুর্ণভাবে কাজে লাগাতে পারছিলাম না যেহেতু তখন আমরা অস্ত্রশস্ত্রের দিকে দুর্বল ছিলাম-যদিও ইতিমধ্যেআমাদের বেশ সংখ্যক লোক ট্রেনিং পেয়ে প্রস্তুত ছিল। অস্ত্রের অভাবে এসব ট্রেনিং প্রাপ্ত লোকদের আমরা ভেতরে পাঠাতে পারছিলাম না। শত্রুরা আমাদের দুর্বলতা বুঝতে পেরে তাদের গতিবিধি আরো বাড়াবার জন্য জলযানের যোগাড় করতে লাগল- বাংলাদেশের যত লঞ্চ, স্টিমার, স্পীডবোট ছিল, সেগুলি দখল করে মেশিনগান ফিট করে এগুলিকে গানবোট হিসাবে ব্যবহার করতে লাগল।

 

আমাদের কাছে খবর আসে যে, শত্রুরা ‘পাক বে’ কোম্পানীকে তিনশত ফাইবার গ্লাস স্পীডবোট তৈরীর নির্দেশ দিয়েছে। নারায়নগঞ্জের ‘পাক বে’ ডকইয়ার্ডে এসব স্পীডবোট তৈরীর কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে। এই ‘বে’ কোম্পানীর একজন অফিসারের ভাই আমার মুক্তিবাহিনীতে ছিল। সে এসে খবর দেয় যে এই স্পীডবোটে লাগাবার জন্য তিনশ ইঞ্জিন সদ্য আনা হয়েছে এবং সেগুলি ‘পাক বে’র গুদামে মওজুত রাখা আছে। আমি তৎক্ষণাৎ সেই ছেলেটিকে আরো দশজন গেরিলা মনোয়ন করার নির্দেশ দিই এবং এই সিদ্ধান্তে পৌঁছি যে, ফাইবার গ্লাস স্পীডবোট প্রস্তুত হয়ে গেলে শত্রুদের গতিবিধি অনেক গুণে বেড়ে যাবে, এই বর্ষার মওসুমে শত্রুসেনারা বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে পৌঁছাতে পারবে। তখন আমাদের মুক্তিবাহিনীর পক্ষে সুদূর গ্রামের গোপন অবস্থানগুলি অত্যন্ত বিপজ্জনক হয়ে পড়বে। সে জন্য এই মেশিনগুলিকে এখনই ধ্বংস করে দিতে হবে। নির্দেশমত মনোনীত দলটিকে প্রশিক্ষণের পর নারায়ণগঞ্জ পাঠিয়ে দিই। নারায়ণগঞ্জ এসে তারা প্রথম ‘পাক বে’র গুদামটি রেকি (অনুসন্ধান) করে এবং জানতে পারে যে, দু’জন পুলিশ এবং দু’জন চৌকিদার যে গুদামটিতে মেশিনগান রাখা আছে সেখানে পাহাড়া দিচ্ছে। সেদিন সন্ধ্যায় আমার দলটি অতর্কিত পুলিশদের নিরস্ত্র করে ফেলে এবং পুলিশ ও চৌকিদারদের একটি কামড়ায় বন্ধ করে গুদামের তালা ভেঙ্গে গুদামে প্রবেশ করে। গুদামের ভিতরে ডিজেল এবং পেট্রোল ছিল। সেগুলি সব মেসিনের উপর ঢেলে দেয় এবং যে সব ফাইবার গ্লাস নৌকা প্রস্তুত ছিল তাতেও ঢেলে দেয়। এরপর অগ্নিসংযোগ করে বেড়িয়ে আসে। কয়েক সেকেণ্ডের ভিতর সমস্ত মেশিনে এবং ফাইবার গ্লাস নৌকাগুলিতে আগুন লেগে যায় এবং বিষ্ফোরণ ঘটে। এই বিষ্ফোরণে শত্রুদের সমস্ত মেশিন এবং ৩০০ নৌকা ধ্বংস হয়ে যায়।

 

এ অপারেশনের ফলে পাক বাহিনী তাদের গতিবিধি অনেকাংশ সীমিত করতে বাধ্য হয়। অপরদিকে এই অপারেশনের মুক্তিবাহিনীর পক্ষে সুদূঢ় গ্রামাঞ্চলে তাদের গোপন স্থান বিপদমুক্ত রাখা সম্ভব হয় এবং তারা সুযোগের সদ্ব্যবহার করে পাকসেনাদের উপর আক্রমন চালাতে থাকে।

 

 

২রা জুলাই সকাল সাড়ে ৫টায় সময় একটা দল মোঃ হুমায়ুন কবিরের নেতৃত্বে শত্রুদের লাটুমুড়া অবস্থানের উপর অতর্কিতে আক্রমণ চালায় এ আক্রমণে মার্টারের সাহায্যও নেইয়া হয়। আক্রমণে ফলে ১২ জন পাকসেনা নিহত অ ৪ জন আহত হয়।

 

কুমিল্লাতে আমাদের এ্যাকশন তীব্রতর হওয়ার জন্য পাকসেনারা কুমিল্লার উত্তরে গোমতী বাঁধের উপর তাদের অবস্থান তৈরী করে এবং এরপরে তারা তাদের কর্তৃত্ব আরও উত্তরে বাড়ানোর জন্য টহল দিতে শুরু করে। পাকসেনারা যাতে শহরের বাইরে কর্তৃত্ব পুনঃস্থাপন করতে না পারে সেজন্য আমি ‘বি’ কৌম্পানীর দু’টি প্লাটুনসহ কোটেশ্বর নামক স্থানে শক্তিশালি ঘাঁটি গড়ে তুলতে নির্দেশ দেই। পাকসেনারা ২/৩ দিন এই এলাকায় সম্মুখবর্তী জায়গায় তাদের টহল বজায় রাখে। এরপর ৪ ঠা জুলাই পাকসেনাদের একটি ভারী দল সকাল ৪ টার সময় আমাদের অবস্থানের আধামাইল পশ্চিম কোটেশ্বর গ্রামের ভিতর পর্যন্ত অগ্রসর হয়। সকাল ৪ টা ১৫ মিনিটে তারা আরো অগ্রসর হয়ে আমাদের ২০০/৩০০ গজের মধ্যে পৌঁছে। এ সময় আমাদের সৈন্যরা তাদের উপর গুলি চালায়। পাকসেনারা ২/৩ ঘন্টা প্রবল চাপ চালিয়ে যায় অগ্রসর হবার জন্য কিন্তু আমাদের গুলির মুখে বারবারই পিছু হটে যেতে বাধ্য হয়। এরপর তারা ৫০০/৬০০ গজ পিছু হটে গিয়ে আমাদের বামে ‘সারিপুরের’দিক থেকে আবার অগ্রসর হবার চেষ্টা করে। এবারও পাকসেনারা আমাদের গোলাগুলির সামনে টিকতে না পেরে সম্পূর্ণ পর্যুদস্ত হয়ে পিছু হটে যেতে বাধ্য হয়। এ সংঘর্ষে পাকসেনাদের কমপক্ষে ৩০জন হতাহত হয়। আমাদের ১ জন প্রাণ হারায়।

 

হোমনা থানা পাকসেনাদের জন্য সামরিক দিক দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থান ছিল। ঢাকাতে যেসব গেরিলাকে পাঠাতাম অপারেশনের জন্য, তারাও এই হোমনা দিয়ে যাতায়াত করত। সে জন্য পাকসেনারা লঞ্চে করে সব সময় দাউদকান্দি থেকে হোমনা টহল দিয়ে আসত। আর হোমনায় দালাল পুলিশেরা পাকসেনাদের মুক্তিবাহিনী সম্পর্কে খবরাখবর দিতো। এ পুলিশ স্টশনটি আমার আমার জন্য বিরাট বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সে জন্য এই থানাটি দখল করে নেয়ার জন্য আমি হাবিলদার গিয়াসকে নির্দেশ দেই। হাবিলদার গিয়াস তার সেনাদল ও স্থানীয় গেরিলাদের নিয়ে থানাটি আক্রমণ করার প্রস্তুতি নেয়। তারা খবর নিয়ে জানতে চায় যে, থানাতে বাঙালী দালাল পুলিশ ছাড়া পশ্চিম পাকিস্তানী পুলিশও যথেষ্ঠ আছে। থানা রক্ষার্থে পুলিশ থানার চতুর্দিকে বাঙ্কার তৈরী করেছে এবং কয়েকয়েকটা হালকা মেশিনগানও তাদের কাছে আছে। সম্পূর্ণ খবরাখবর নিয়ে হাবিলদার গিয়াস থানা আক্রমণের একটা পরিকল্পনা নেয়। ১লা জুলাই রাত ১১টার সময় হাবিলদার গিয়াস তার গনবাহিনী ও নিয়মিত বাহিনীকে নিয়ে থানাটি অতর্কিতে আক্রমণ করে। এ আক্রমণে পশ্চিম পাকিস্তানী পুলিশরা হালকা মেশিনগানের সাহায্য বাধা দেয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যে আক্রমণের মুখে তারা সবাই নিহত হয়। হাবিলদার গিয়াস থানাটি দখল করে নেয়। এর ফলে থানার সমস্ত অস্ত্রশস্ত্র তার হস্তগত হয় এবং আমাদের ঢাকা যাবার রাস্তাও শত্রুমুক্ত হয়।

 

আমাদের একটি প্লাটুন মিয়াবাজার থেকে ফুলতুলীতে টহল দিতে যায়। রাত ৩টার সময় তারা দেখতে পায় পাকসেনাদের ১টি জীপ এবং ২টি ট্রাক কুমিল্লা থেকে দক্ষিণের দিকে টহল দিতে যাচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে আমাদের প্লাটুনটি কুমিল্লা চট্টগ্রাম রাস্তার উপর এ্যামুশ-এর জায়গায়অ তারা ১টি মেসিনগান রাস্তার দুদিঙ্ক থেকে লাগিয়ে পাকসেনাদের জন্য অপেক্ষা করে। রাত সারে ৪টায় পাকসেনাদের গাড়ীগুলি মিয়াবাজার অবস্থানে ফেরত আসে। আসার পথে গাড়ীগুলি আমাদের এ্যামুশ-এ পড়ে যায়। এ্যামবুশ পার্টি খুব নিকটবর্তী স্থান থেকে মেশিনগান এবং হালকা মেশিনগানের গুলি চালিয়ে গাড়ীগুলি ক্ষতিগ্রস্ত করে দেয়। পাকসেনারা গাড়ী থেকে লাফিয়ে নীচে নামার চেষ্টা করে কিন্তু এতেও তাদের অনেক লোক মেশিনগানের গুলিতে হতাহত হয়। পাকসেনাদের কমপক্ষে ৩ জন অফিসার সহ ২১ জন নিহত ১৫ জন আহত হয়। পরে খবর পাওয়া যায় যে নিহতের মধ্যে ১ জন লেঃ কর্ণেলও ছিলেন। এ এ্যামবুস সময় পাকসেনারা কুমিল্লা বিমানবন্দর তাদের সাথীদের সাহার্য্যেথে কামানের সাহায্যে আমাদের এ্যামবুশ অবস্থানের উপর প্রচন্ড গোলা ছুঁড়তে থাকে। গোলার মুখে বেশীক্ষন টিকতে না পেরে আমাদের এ্যামবুশ পার্টি স্থানটি পরিত্যাগ করে পিছু হটে আসে।

 

জুলাই মাসের ১ লা তারিখে পাকসেনারা আবার তাদের শালদা নদী ও কসবা অবস্থানের ভিতরে যোগাযোগের স্থাপনের চেষ্টা চালায়। সকাল ১০টার সময় শালদা নদী থেকে পাকসেনারাদের একটি দল কসবার দিকে অগ্রসর হয়। এই দলটি কিছুদূর অগ্রসর হবার পর মন্দভাগের নিকট গফফারের ৪র্থ বেঙ্গলের ‘সি’ কোম্পানী, পাকসেনারা যখন তাদের অবস্থানের সামনে দিয়ে কসবার দিকে অগ্রসর হচ্ছিল, ঠিক সে সময় তাদের উপর অতর্কিত হমলা চালায়। পাকসেনারা আর অগ্রসর হতে পারে না এবং ছত্রভঙ্গে তাদের মৃতদেহগুলি ফেলেই শালদা নদীর অবস্থানে পালিয়ে যায়। পালানোর পথে আমাদের মর্টারের গোলাও তাদের যথেষ্ঠ ক্ষতিসাধন করে। এ সংঘর্ষে পাকসেনাদের ৮ জন আহত ও ৩ জন নিহত হয়।

 

পাকসেনারা জুলাই মাসের ৩ তারিখে ফেনী থেকে দুটি কোম্পানী নিয়ে বেলুনিয়ার দিকে অগ্রসর হয়। রাস্তায় তারা ‘শালদা বাজার’ নামক স্থানে সাময়িক অবস্থান নেয়। এই সংবাদ পেয়ে ক্যাপ্টেন জাফর ইমামের ১টি প্লাটুন ৩ মর্টারসহ দুপর দুটার সময় শত্রুদের এই দলটির উপর অতর্কিত আক্রমণ চালায়। পাকসেনারা এই আক্রমণের জন্য প্রস্তুত ছিল না। তাদের মনোবল বেলুনিয়াতে আগে থেকেই যথেষ্ট কমে গিয়েছিল। এ ছাড়া সে সময়ে বৃষ্টি হচ্ছিল। বৃষ্টির মধ্যে সাময়িকভাবে বানানো ট্রেঞ্চগুলোতে থাকাও বেশ অসুবিধাজনক হয়ে পড়েছিল। অতর্কিত আক্রমণের ফলে মেশিনগান ও মর্টারের গোলাগুলিতে তদের অসংখ্য লোক হতাহত হয়। পরে জানা যায় যে, তদের অত্যন্তপক্ষে ৩০ জন লোক নিহত ও ২০ জন লোক আহত হয়েছে। পাকসেনারা এরপর শালদা বাজারের পার্শ্ববর্তী সাহেবনগর ও অন্যান্য গ্রামগুলি থেকে স্থানীয় লোকদের অন্য স্থানে চলে যেতে বলে। মতলববাজার এলাকাতে মুক্তিবাহিনীর একটি প্লাটুনকে লেঃ মাহবুব পাঠিয়ে দেয়। এই প্লাটুনটি মতলব এলাকায় গিয়ে তাদের ঘাঁটি স্থাপন করে। সেখানে তারা জানতে পারে মতলব থানাতে পাকিস্থানী পুলিশ এবং রেঞ্জার মোতায়েন করা হয়েছে। এ পুলিশের অত্যাচারে স্থানীয় লোকরা অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। পাকিস্থানী পুলিশরা স্থানীয় দালালদের সহয়তায় শাসনকার্য আয়ত্তাধীন আনার চেষ্টা করেছে। আমাদের দলটি মুক্তিযোদ্ধা জাহাঙ্গীরের নেতৃত্বে এই থানাকে আক্রমণ করার সিদ্ধান্ত নেয়। তারা থানার সম্বন্ধে সকল খবর যোগাড় করে। জুলাই মাসের ২ তারিখের রাতে গেরিলা দলটি থানার উপর আক্রমণ করে। পাকিস্থানী পুলিশ ও রেঞ্জাররা এই আক্রমণকে প্রতিহত করার চেষ্টা করে কিন্তু তীব্র আক্রমণের মুখে ৫ জন পুলিশ নিহত এবং ৭ জন আহত হয়। ঠিক এই সময়ে গেরিলাদের নিকট যে হালকা মেশিনগানটি ছিল সেটা খারাপ হয়ে যায়। নিরুপায় হয়ে গেরিলা আক্রমণ পরিত্যাগ করতে বাধ্য হয়। গেরিলাদেরও ১ জন নিহত হয়। কিন্তু এই আক্রমণের পর থেকে পাকিস্থানী পুলিশরা আর থানার বাইরে আসার সাহস পায়নি। সমস্ত মতলব থানা এলাকা মুক্তিবাহিনী আয়ত্তাধীন এসে যায়।

 

শালদা নদীতে আমাদের কার্যকলাপ সব সময় চালানো হচ্ছিল। মেজর সালেকের এক পেট্রল পার্টি খবর আনে যে রেলওয়ে সড়কের পূর্ব দিক দিয়ে একটি ছোট রাস্তা পাকসেনারা তদের শালদা নদী ও নয়ানপুর অবস্থানের মধ্যে যোগাযোগ করার জন্য ব্যবহার করে। মেজর সালেক ৫ জনের একটি ডিমোলিশন পার্টি পাঠিয়ে সেই রাস্তার উপর মাইন পুঁতে দেয়। ৯ই জুলাই সকাল সাড়ে ৫টার সময় পাকিস্থানীদের একটি প্লাটুন শালদা নদী থেকে নয়ানপুর যাবার পথে এইসব এন্টি-পার্সোনাল মাইনের উপর পড়ে যায়। মাইন বিষ্ফোরণে ১০ জন পাকসেনা নিহত এবং আরো অনেকে আহত হয়। পাকসেনারা বিপর্যস্ত হয়ে শালদা নদীতে ফিরে আসে।

 

৬ই জুলাই পাকসেনারা প্রায় ১টি ব্যাটালিয়ন নিয়ে মন্দভাগ বাজার পর্যন্ত অগ্রসর হয়। সেখান থেকে তারা সামনে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করে। আমাদের ‘এ’ কোম্পানি এবং ‘সি’ কোম্পানি মেজর সালেক এবং ক্যাপ্টেন গাফফারের নেতৃত্বে পাকসেনাদের শালদা নদী এঙ্কলেভ এর ভিতর অগ্রসর হটে প্রচণ্ড বাঁধা দেয়। পাকসেনারা তাদের ফিল্ড আর্টিলারি মন্দভাগ বাজার পর্যন্ত নিয়ে আসে এবং কামানের সাহায্যে আমাদের অবস্থানের উপর এবং পার্শবর্তী গ্রামগুলোতে তীব্র গোলাবর্ষণ করতে থাকে। এই গোলাবর্ষণে আমাদের ১১ জন আহত হয় এবং অন্তত ৩২ জন বেসামরিক ব্যাক্তি হতাহত হয়। পাকসেনারা তাদের আক্রমণ চালিয়ে যেতে থাকে এবং শালদা নদী এঙ্কলেভ দখল করার চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকে। আমাদের মুক্তিসেনারাও তাদের এ আক্রমণে তীব্র বাঁধা দিতে থাকে। যদিও আমাদের মর্টারের গোলা তাদের কামানের অবস্থান পর্যন্ত পৌছতে পারেনি তবুও মর্টারের গোলা এবং মেশিনগুলোতে তাদের আক্রমণ প্রতিহত হয়ে যায়। তারা পিছু হটে মন্দভাগ বাজারে অবস্থান নিতে বাধ্য হয়। মেজর সালেক পাকসেনাদের শালদা নদীর অবস্থানের বিরুদ্ধে তার কার্যকলাপ আরও তীব্রতর করার জন্য ৯ই জুলাই পাক অবস্থানের উপর ঘোরাফিরা করছিল, ঠিক সে সময় আমাদের কামানগুলি এবং মর্টার পাকসেনাদের অবস্থানের উপর প্রচণ্ড গোলাবর্ষণ করতে থাকে। এই গোলাবর্ষণ প্রায় আধ ঘণ্টা ধরে চলে। এই অকস্মাৎ প্রচণ্ড মর্টার এবং কামানের গোলাবর্ষণে শত্রুরা হতভম্ভ হয়ে পড়ে। এতে তাদের অনেক হতাহত হয়। পরে জানতে পারা যায় যে এই গোলাগুলিতে ১৯ জন পাকসেনা নিহত এবং ১১ জন আহত হয়। একটি মেশিনগান বাঙ্কার সহ তিনটি বাঙ্কার ধ্বংস হয়। কামানের গোলার আঘাতে তাদের একটি এম্যুনিশন ডাম্প বিস্ফোরিত হয়ে ধ্বংস হয়ে যায়। এর পড় দিন একটি স্পিড বোট পাকসেনাদের নিয়ে শালদা নদী হয়ে পশ্চিম দিকে যাচ্ছিল। আমাদের পেট্রোল পার্টটি, যেটি আগে থেকেই শালদা নদীর পিছনে অবস্থান নিয়েছিল, তারা পাকবাহিনীর স্পীড বোট এম্বুশ করে। এম্বুশের সময় আমাদের গুলির আঘাতে স্পিড বোট ডুবে যায়। ১২ জন পাকসেনা গুলিতে না হয় পানিতে ডুবে মারা যায়। মরিতদের মধ্যে ১ জন মেজর ও ১ জন ক্যমাটেন ছিল এবং তাদের মদমর্যাদার ব্যাজ এম্বুশ পার্টি নিয়ে আসে। এম্বুশ পার্টি পানি থেকে একটি মেশিনগান, একটি ওয়ারলেস সেট এবং একটি ম্যাপ (যাতে শত্রুর অবস্থাগুলি চিনহিত ছিল) উদ্ধার করতে সমর্থ হয়। এর পরই পাকসেনাদের কামানের গোলা আমাদের দলের উপর পড়তে থাকে। আমাদের দল তখন বাধ্য হয়ে এম্বুশ স্থান পরিত্যাগ করে।

 

১০ই জুলাই পাকসেনারা একটি কোম্পানি নিয়ে বিকেল ৪তার সময় পাল্টা আক্রমণ শুরু করে। পাকসেনারা শালদা নদীর উঁচু স্থান সাগরতলা স্থানটি দখল করার জন্য অগ্রসর হয়। তাদের সঙ্গে তাদের গোলন্দাজ বাহিনীও সহায়তা করে। কিন্তু সাগরতলা উঁচু অবস্থানের উপর আমাদের যে প্লাটুন টি ছিল সেটি এবং রেললাইনের পশ্চিমে আমাদের আরেকটা প্লাটুন তাদেরকে প্রচণ্ডভাবে বাঁধা দ্যায়। তাদের প্রায় ৩০/৪০ জন হতাহত হয়। এরপর তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে শালদা নদীতে নিজ অবস্থানে পালিয়ে যায়।

 

পাকিস্তানীদের একটি দল নবীনগরে তাদের ঘাঁটি স্থাপন করে। পাকসেনাদের নবীনগরে অবস্থানের পড় আমাদের নরসিংদী, ভৈরববাজার এবং কালীগঞ্জে যাতায়াতের রাস্তায় বাঁধার সৃষ্টি হয়। পাকসেনারা কয়েকজন স্থানীয় দালালের সহায়তায় মুক্তিবাহিনীর জন্য সমস্ত এলাকায় ত্রাসের সৃষ্টি করে। ক্যাপ্টেন আইনুদ্দিন এই এলাকাকে পুনরায় বিপদমুক্ত করার জন্য ১৬ জনের একটি দলকে হাবিলদার আওয়ালের নেতৃত্বে নবীনগর পাঠায়। হাবিলদার আওয়াল কষবার উত্তর দিয়ে অনুপ্রবেশ করে নবীনগরের ৩ মাইল পশ্চিমে তার গোপন ঘাঁটি স্থাপন করে। এরপর স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তায় পাকসেনাদের অবস্থান সম্পর্কে সম্পূর্ণ খবর যোগাড় করে। এর পর ৮ই জুলাই সকাল ৬টায় পাকসেনাদের নবীনগরের অবস্থানটির উপর অতর্কিত আক্রমণ করে। এ অতর্কিত আক্রমণের জন্য পাকসেনারা মোটেই প্রস্তুত ছিলোনা। তারা হকচকিয়ে যায় এবং আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের দলটি পাকসেনাদের ৭জন ও ৫জন দালালকে নিহত করতে সক্ষম হয়। সঙ্ঘর্ষে আমাদের ১ জন আহত হয়। আমি এসময় ঢাকাতে আরও কয়েকটি গেরিলা পার্টি পাঠাই। এই দলগুলি আগের প্রেরিত দলগুলির সাথে যোগ দ্যায় এবং ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ ও পার্শবর্তী এলাকায় তাদের গেরিলা কার্যকলাপ চালিয়ে যায়। একটি দল জুলাই মাসের প্রথমেই পাকসেনাদের ছোট একটি এম্যুনিশন পয়েন্ট আক্রমণ করে আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত করে। এর ফলে পাকবাহিনী সমস্ত ঢাকাতে সান্ধ্য আইন জারি করে এবং ঢাকা শহরে প্রহরার ব্যাবস্থা করে। ঐ দিনই দুজন গেরিলা নিউমার্কেটের নিকট পাকসেনাদের একটি জিপের ভিতর গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। ফলে ১জন অফিসার ও ৩ জন পাকসেনা নিহত হয়। ৫ই জুলাই নারায়ণগঞ্জে ২ জন আর একটি দল গুলশান সিনেমা হলের পর্দার ভিতর ১টি গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। ফলে পর্দাটি সম্পুর্ন পুড়ে যায় এবং নিকতবর্তী ৫জন দালালও আহত হয়। সমস্ত নারায়ণগঞ্জে এবং ঢাকায় আতঙ্কের সৃষ্টি হয়। ৪ঠা জুলাই দুপুর ১২টার সময় ৫জন গেরিলার একটি দল পাগলাটে বিদ্যুৎ সরবরাহ পাইল উড়িয়ে দ্যায়। ১০ জনের গেরিলার একটি দল নিউমার্কেটের নিকট পশ্চিম পাকিস্তানী পুলিশ এবং পাকসেনাদের একটি মিলিত দলের উপর গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। ফলে ৮ জন পশ্চিম পাকিস্তানী পুলিশ ও ৪ জন পাকসেনা নিহত হয়।

 

এদিকে ১১ই জুলাই সকাল ৮টা থেকে অকস্মাৎ পাকসেনারা ভারি কামান এবং মর্টারের সাহায্যে আমাদের শালদা নদী অবস্থানের উপর প্রচণ্ড গোলাগুলি চালাতে থাকে। এই গোলাগুলির ফলে আমাদের শালদা নদী অবস্থানে বেশ ক্ষয়ক্ষতি হয়। পাকসেনাদের গোলাগুলি সমস্ত দিন ধরে চলতে থাকে। মর্টার স্প্লিন্টারের আঘাতে ৪র্থ বেঙ্গলের হাবিলদার তাজুল মিয়া এবং সিপাই আব্দুর রাজ্জাক মারাত্মকভাবে আহত হয়। এছাড়াও দুজন বেসামরিক লোক নিহত ও ৮জন বেসামরিক লোক আহত হয়। কিন্তু বিকেলের দিকে গোলাগুলি বন্ধ হয়ে যায় এবং আক্রমণও হয়নি।

 

৯ই জুলাই পাকসেনারা আমাদের কোটেশ্বর অবস্থানের উপর সকাল ৬টায় আবার তাদের আক্রমণ শুরু করে। আমাদের কোটেশ্বর অবস্থানের সৈন্যরা মর্টার এবং কামানের সহায়তায় পাকসেনাদের এই আক্রমণের মোকাবিলা করে। পাকসেনারা প্রথমে দুটি কোম্পানি নিয়ে আক্রমণ চালায়। পরে আরও দুটি কোম্পানিকে শক্তি বৃদ্ধির জন্য নিয়ে আসে। ৩/৪ ঘণ্টা যুদ্ধের পড় আমাদের কামানের গোলায় এবং মেশিনগানের গুলিতে পাকিস্তানীদের আক্রমণ ব্যাহত হয়। এ যুদ্ধে পাকসেনাদের অন্তত ২৪/২৫ জন নিহত হয়। তারা আক্রমণ বন্ধ করে পিছু হটে যায়।

 

আমাদের Petrol পার্টি ৯ই জুলাই পাকসেনাদের কোম্পানি হেডকোয়ার্টার রেকি করে এবং অবস্থান সম্পর্কে জানতে পারে। আমাদের কামানগুলি এই কোম্পানি হেডকোয়ার্টারের উপর প্রচণ্ড গোলা নিক্ষেপ করতে থাকে। ফলে দুজন পাকসেনা নিহত এবং ৬জন আহত হয়। এর মধ্যে একজন অফিসার ও তার Signaller ছিল। স্থানীয় লোকেরা অফিসারটিকে কাঁধে ব্যাজ দেখে সনাক্ত করতে পেরেছিল। শত্রুদের মনোবল ভেঙ্গে গিয়েছিল।

 

১০ই জুলাই রাতে ক্যাপ্টেন গাফফার ৪র্থ বেঙ্গলের ‘সি’ কোম্পানি থেকে দুটি সেকশন সালদা নদীর পশ্চিমে কামালপুর এবং মাইঝখাইরের ভিতর এম্বুশ অবস্থানের ভিতর এসে পড়ে – ঠিক সে সময় পাকসেনাদের সম্মুখবর্তী অংশের উপর আমাদের সৈন্যরা গুলি চালাতে শুরু করে। অতর্কিত আক্রমণে পাকসেনারা হতভম্ভ হয়ে যায় এবং কিছু বোঝার আগেই তাদের অনেক লোক হতাহত হয়। ছত্রভঙ্গ হয়ে তারা পেছনের দিকে পালাতে শুরু করে। এঅবস্থাতেও তাদের অনেক হতাহত হয়। সঙ্ঘর্ষে পাকসেনাদের একজন মেজর, দুজন ক্যাপ্টেন ও ৮জন সিপাই নিহত হয়। আমাদের Ambush পার্টি ১টি MIGA মেশিনগান এবং Am-PRC-10 Wireless Set হস্তগত হয়।

 

হোমনাতে হাবিলদার গিয়াসের অধীনে যে মুক্তিবাহিনীর দলটি হোমনা থানায় আক্রমণ চালিয়ে অস্ত্রশস্ত্র দখল করে নেয়, সেই দলটি এ এলাকাতেই তাদের ঘাঁটি গড়ে তোলে। এ দলটির কার্যকলাপে পাকবাহিনী নিকটবর্তী সমস্ত থানাগুলিকে আরও শক্তিশালী গড়ে তোলে। পাকসেনারা রাস্তার প্রত্যেকটি সেতুর উপর তাদের কড়া পাহারার ব্যাবস্থা করে। প্রতিটি হাঁট বাজার এলাকাতেও তারা ক্যাম্প তৈরি করে। এছাড়া নিকটবর্তী সমস্ত এলাকার চেয়ারম্যান ও মেম্বারদের ডেকে ‘শান্তি কমিটি’ গড়ার কড়া নির্দেশ দ্যায়। প্রতিটি এলাকার চেয়ারম্যানকে স্থানীয় লোক নিয়োগ করে পাকসেনাদের অধীনে সামরিক প্রশিক্ষণ নিতে বাধ্য করে এবং তাদের কাজ করতে বাধ্য করে। কন স্থানীয় লোক যদি তাদের নির্দেশমোট কাজ করতে অস্বীকার করত, পাকসেনারা তাদের পিতামাতা বাড়িঘরের ক্ষতি করে বা ভয় দেখিয়ে তাদের নির্দেশমত কাজ করাতে বাধ্য করত। পাকসেনারা স্থানীয় দালালদের সহযোগিতায় হাবিলদার গিয়াসের দলটির সঠিক সন্ধান পায় এবং তাদের অবস্থিতি সম্বন্ধে পাকবাহিনীর মন্তব্য আমরা নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানতে পাই। তাদে ধারণা ছিল যে হোমনা এবং দাউদকান্দি এলাকাতে কমপক্ষে আমাদের ৬ হাজারেরও বেশী লোক কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। এজন্য পাকসেনারা কখনো রাতে তাদের ক্যাম্পগুলির বাইরে আসতে সাহস পেতনা। এছাড়া কোন সময়েই দলে ভারি না হলে ক্যাম্পের বাইরে টহলে বের হতোনা। পাকসেনাদের ভীতসন্ত্রস্ত মানসিক অবস্থার জন্য আমাদের দলটির নির্বিঘ্নে কাজ চালিয়ে যেতে সুবিধা হয়। সপ্তাহে একদিন কি দুদিন লঞ্চের সাহায্যে পাকসেনাদের এসব ক্যাম্পে রসদ যোগানো হত। এ সংবাদ আমাদের দলটি জানতে পারে। ৬ই জুলাই দাউদকান্দি থানার অন্তর্গত মাসিমপুর বাজারের অর্ধমাইল পশ্চিমে জয়পুর গ্রামে শাখানদীর পাড়ে হাবিলদার গিয়াস তার দলটি নিয়ে পাকসেনাদের জন্য একটি এম্বুশ পাতে। সকাল ১০টার সময় পাকসেনাদের দুটি লঞ্চ দাউদকান্দির দিক থেকে গোমতী হয়ে এই শাখানদীতে আসে। লঞ্চগুলি এম্বুশের সামনে পড়তেই আমাদের দলটি অতর্কিতে গোলাগুলি ছুড়তে থাকে। পাকসেনারা নদীর ভিতর থেকে অ্যামবুশ দলটির উপর হামলা না করতে পারায় এবং তীরে অবস্থিত এম্বুশ পার্টির তীব্র গোলাগুলিতে লঞ্চগুলির যথেষ্ট ক্ষয়ক্ষতি হওয়ায় অনেক পাকসেনা হতাহত হয়। উপায়ান্তর না দেখে লঞ্চগুলি পিছু হটে যায় এবং দাউদকান্দির দিকে পালিয়ে যায়। পড়ে বিভিন্ন সূত্রে আমরা খবর পেয়েছি যে অন্তত ২০/২৫ জন পাকসেনা আহত বা নিহত হয়েছে। লঞ্চগুলি অ্যামবুশের ভিতর পড়ে যাওয়া সত্ত্বেও সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দেয়া সম্বভ হয়নি, কারণ এম্বুশ পার্টির নিকট রাইফেল এবং হাল্কা মেশিনগান ছাড়া বড় অস্ত্র, যেমন রকেট কিংবা কামান ছিলোনা, তবুও এ এম্বুশের ফলাফল ছিল আমাদের বিশাল সাফল্য। ফলে পাকসেনারা এ এলাকায় চলাফেরা কমিয়ে দ্যায়। এতে আমাদের কর্তৃত্ব ও স্থানীয় লোকের মনোবল আরও বেড়ে যায়। এর পড় হোমনা ও দাউদকান্দি থানার জনসাধারণ সতস্ফুর্তভাবে আমাদের সাহায্যে এগিয়ে আসে।

 

৪র্থ বেঙ্গলের ‘বি’কোম্পানির একটি প্লাটুন চৌদ্দগ্রাম এলাকায় পাকসেনাদের বিরুদ্ধে তাদের আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছিল। পাকসেনারা কুমিল্লা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক খোলার জন্য তাদের প্রচেষ্টা দিন দিন বাড়িয়ে যাচ্ছিল। যাসব সড়ক সেতু আমরা ধ্বংস করে দিয়েছিলাম সেগুলি পুননির্মান করার চেষ্টা করছিল। ৯ই জুলাই সকাল ৮টায় আমাদের প্লাটুনটি চৌদ্দগ্রামের উতরে স্রকের উপর বালুজুরি ভাঙ্গাল্পুরের নিকট অ্যামবুশ পাতে। ১১টার সময় পাকসেনারা একটি সিআর বি ট্রাকে করে এবং দুটি জিপে রাস্তা দিয়ে আসে এবং ভাঙ্গালপুড়ের নিকট থামে। পুলটি মেরামত করার কাজের প্রস্তুতি চলতে থাকে। ঠিক সে সময়ে আমাদের এম্বুশ পার্টি তাদের উপর গোলাগুলি চালাতে থাকে। এর ফলে পাকসেনাদের মধ্যে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। অ্যামবুশ পার্টির গুলিতে তাদের অনেক হতাহত হয়। পাকসেনারা পুলের নিকট থেকে পিছু হটে অবস্থান নেয় এবং পড়ে চৌদ্দগ্রাম থেকে আরও পাকসেনা এসে তাদের সাথে যহ দ্যায়। এরপর পাকসেনারা আমাদের এম্বুশ অবস্থানের উপর আক্রমণের প্রস্তুতি নেয়। আমাদের দলটিও একটু পিছু হটে উঁচু জায়গায় আরও শক্ত অবস্থান গড়ে তোলে। পাকসেনারা ৩টার সময় মর্টার, কামান, মেশিন গানের সহায়তায় আমাদের অবস্থানের উপর আক্রমণ করে। আমাদের গুলিতে পাকসেনারা পর্যদুস্ত হয়ে ৩/৪ ঘণ্টা যুদ্ধের পড় বিকেল ৫টায় আক্রমণ পরিত্যাগ করে পিছু হটে যায়। যুদ্ধে পাকসেনাদের ৩০ জন নিহত ও ৬ জন আহত হয়। যুদ্ধক্ষেত্রের চারিদিক মৃতদেহগুলি বিচ্ছিন্ন অবস্থায় ফেলে রেখে তারা পালিয়ে যায়। পাকসেনারা পিছু হটার পর আমাদের দলটি অনেক অস্ত্রশস্ত্র দখল করে নেয় এবং শত্রুদের ক্ষতিগ্রস্ত ট্রাকটিও নিয়ে আসার চেষ্টা করা হয় কিন্তু ট্রাকটির এত বেশী ক্ষতি হয়েছিল যে এটা আনা সম্ভব হয়নি এবং টট্রাকটি সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দেয়া হয়। পাকসেনাদের যে দুজন দালাল যুদ্ধের সময় পথ দেখিয়ে নিয়ে এসেছিল তারাও গুলিবিদ্ধ হয়। পাকসেনারা পিছু হটে যাবার পথ আমাদের দলটি তাদের ২/৩টি পেট্রল ও পর্যবেক্ষন ঘাঁটিতে অবস্থিত পাকসেনাদের তাড়িয়ে দেয়। বিকেল সাড়ে ৪টার সময় পাকসেনাদের একটি জঙ্গি বিমান যুদ্ধক্ষেত্র পর্যবেক্ষন করে এবং আমাদের দলটিকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করে। কিন্তু আমাদের দলটি সেখান থেকে একটু দূরে সরে যাওয়াতে জঙ্গি বিমানটি কিছুক্ষণ ঘোরাফেরা করে চলে যায়। এ সঙ্ঘর্ষের পর ১০ই জুলাই সন্ধ্যায় একটি এম্বুশ পার্টি উক্ত অবস্থানের ১ মাইল দক্ষিণে লেঃ ইমামুজ্জামানের নেতৃত্বে আবার এম্বুশ পাতে। আমাদের ধারনা ছিল যে, পাকসেনারা আবার উক্ত সেতুর নিকট আসবে। ১০ই জুলাই সারাদিন পাকসেনাদের জন্য তারা অপেক্ষা করে থাকে কিন্তু আমাদের ধারনা মত সেদিন না এসে ১১ই জুলাই ১১টার সময় পাকসেনাদের একটা কোম্পানি দুটি গাড়ী সহ আস্তে আস্তে ভাঙ্গা সেতুর দিকে মিয়াবাজারের দিকে অগ্রসর হয়। পাকসেনারা যখন এম্বুশ অবস্থানের ভিতর পৌঁছে ঠিক সেই সময় এম্বুশ পার্টি তাদের উপর প্রচণ্ড গোলাগুলি চালাতে থাকে। এতে শত্রুদের বেশ হতাহত হয়। তারা পিছু হটে গিয়ে পাল্টা আক্রমণ চালায় এবং উভয়পক্ষে যুদ্ধ সারাদিন ধরে চলতে থাকে। এ যুদ্ধে পাকসেনাদের ১০/১৫ জন আহত হয়। বিকেল ৩টায় পাকসেনারা যুদ্ধক্ষেত্র পরিত্যাগ করে আবার পিছু হটে যায়। আমাদের দলটি রাত ২টা পর্যন্ত পুনরায় আক্রমনের অপেক্ষায় থাকে। এরপর বালুজুরির ভগ্নাবশেষ সেতুটি সম্পূর্ণরূপে বিধ্বস্ত হলে লেঃ ইমামুজ্জামান তার দলটি নিয়ে ঘাঁটিতে চলে আসে। আসার পথে চৌদ্দগ্রাম লাকসাম রোডের উপর বাংগোডার পশ্চিমে এবং চৌদ্দগ্রামের উত্তরে আরেকটা ভাঙ্গা ব্রিজের নিকট এন্টি ট্যাঙ্ক এবং এন্টি পার্সোনাল মাইন পেতে রাখে। মাইন পাতার সময় আমাদের কমান্ডো প্লাটুনের দুজন লোক দুর্ঘটনায় সামান্য আহত হয়।

 

এ সময় পাকিস্তানীরা ফেনী দিয়ে চট্টগ্রাম রেল লাইন পুনরুদ্ধার করার চেষ্টা করে। আমরা রাজনগর সাবসেক্টর থেকে ক্যাপ্টেন জাফর ইমাম একটি প্লাটুন ও ইঞ্জিনিয়ার এর একটি দলকে এক্সপ্লোসিভ সহ মিয়াবাজারের দক্ষিণে পাঠিয়ে দেয়। এ দলটি সরিসদি রেলওয়ে ব্রিজ সম্বন্ধে খবরাখবর নেয় এবং গোমতীর নিকট সরিসদি রেলওয়ে ব্রিজটি আক্রমণ করার জন্য বেছে নেয়। কিছু সংখ্যক স্থানীয় দালাল পাকবাহিনীর অস্ত্র দিয়ে এই ব্রিজটি পাহার দিত। ১৩ই জুলাই রাত ১১টার সময় দলটি সরিসদি ব্রিজটি আক্রমণ করে। পাহারারত সশস্ত্র দালালদের কিছু নহত এবং বাকিদের তারিয়ে দিয়ে তারা ডিমলিশন লাগিয়ে ব্রিজটিকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়। এর ফলে পাকিস্তানীরা শুধু ফেনী এবং গুণবতীর মধ্যে ট্রেন মাঝে মাঝে চলাচল চালু রাখত। অবশ্য এর আগে ট্রেন চলাচল করতে পারত না। এ দলটি পাকিস্তানীদের নয়াপুর বি ও পি অবস্থানের উপর ৩ মর্টারের সাহায্যে আক্রমণ চালায়। এর ফলে দুজন পাকসেনা নিহত ও ৭ জন আহত হয়।

 

১৩ই জুলাই রাত ১০টায় পাকসেনাদের দত্তসার দীঘি এবং আমতলা অবস্থানগুলির ওপর ক্যাপ্টেন জাফর ইমামের নেতৃত্বে দুটি দল আক্রমণ চালায়। এ আক্রমণের পাকসেনাদের ১৫ জন আহত ও কিছু নহত হয়। শালদা নদীতে পাকসেনারা আবার নতুন করে তাদের শক্তি বৃদ্ধি করতে থাকে। ১১ই জুলাই পাকসেনারা আমাদের শালদা নদী অবস্থানের দিকে মারমুখী পেট্রলিং চালাতে থাকে। আমাদের সৈন্যরাও মেজর সালেকের নেতৃত্বে তাদের অবস্থানের সাহসের সঙ্গে পাকসেনাদের উপর লক্ষ রাখে। ১২ই জুলাই রাত ৮টায় পাকসেনারা প্রচণ্ডভাবে আমাদের সালদা নদী অবস্থানের উপর আক্রমণ চালায়। আমাদের ৪র্থ বেঙ্গলের এ কোম্পানি মেজর সালেকের নেতৃত্বে এ আক্রমণ মোকাবিলা করে। আমাদের সৈন্যদের গুলির আঘাতে পাকসেনাদের প্রচুর হতাহত হয়। তারা পর্যদুস্ত হয়ে আক্রমণ পরিত্যাগ করে রাত ১১টায় পিছু হটে যেতে বাধ্য হয়। সমস্ত রাত উভয় পক্ষে গোলাগুলি চলতে থাকে। ভোর ৫টায় পাকসেনারা একটি ব্যাটালিয়ন নিয়ে আবার সালদা নদীর দক্ষিণে গরঙ্গলা অবস্থানের উপর নতুনভাবে আক্রমণ শুরু করে। সেই সঙ্গে তারা আমাদের আশাবাড়ি অবস্থানেও হামলা চালায়। এই দুই আক্রমণ ও আমাদের মেশিনগানের গুলি ও মর্টারের গোলার সামনে তারা পর্যুদস্ত হয়। পাকসেনাদের অসংখ্য হতাহত হয়। দিনের আলোতে আমাদের সৈন্যরা বাঙ্কার থেকে অগ্রসরমান শত্রুদের হতাহত করে। পাকসেনারা তাদের আক্রমণ ভঙ্গ করে দিতে বাধ্য হয় এবং পিছু হটে যায়। আমাদের সৈন্যরা পলায়নপর শত্রুদের তাড়া করে। যুদ্ধের সময় আমাদের মর্টারের গোলাতে পাকসেনাদের চাপাইতে অবস্থিত একটি এম্যুনিশন এবং রেশন স্টোরে বিস্ফোরণ ঘটে, ফলে ২১ জন আহত ও কিছু সংখ্যক নিহত হয়। ঐ দিনই লেঃ হুমায়ুন কবিরের একটি দল পাকসেনাদের লাটুমুড়াতে যে অবস্থান ছিল তাঁর পিছনে অবস্থান চালায় এবং বেশ কয়েকজন আহত ও নিহত করে। পাকসেনাদের গসাইলস্থ বি ও পি র একটি টহলদার ক্যাপ্টেন গাফফারের একটি দল সন্ধ্যা ৬টায় মন্দভাগ বাজারের শত্রু অবস্থানের উপর এবং নক্তের বাজার শত্রু অবস্থানের উপর মর্টারের সাহায্যে অতর্কিত আক্রমণ চালায়। এ আক্রমণে পাকসেনাদের ১২ জন নিহত হয় এবং বেশ কয়েকটি বাঙ্কারও ধ্বংস হয়। পাকিস্তানীরা আমাদের মন্দভাগ অবস্থানের উপর কামানের সাহায্যে পাল্টা আক্রমণ চালায়। এতে আমাদের ১ জন নায়েক এবং ৩ জন সিপাই আহত হয়।

 

আমাদের স্পেশাল কমান্ডোরা জুলাই মাস্যা ৯,১০,১১ তারিখ ঢাকা শহরে তাদের কার্যকলাপ আরও তীব্র করে। গেরিলা কমান্ডার হাবিবুল আলম এবং কাজির নেতৃত্বে একটি ইম্প্রুভাইজড টাইম বোমা ফার্মগেঁটের নিকট পাঞ্জাবিদের ‘মাহরুফ রেস্টুরেন্টে’ স্থাপন করা হয়। এই রেস্টুরেন্টে পাকসেনারা এবং দালালরা সবসময় আসতো। নির্ধারিত সময় অনুযায়ী বোমাটি বিস্ফোরিত হয় এবং এতে ১৬ জন পাকসেনা কয়েকজন দালাল সহ হতাহত হয়। এর মধ্যে ৮ জন মারা যায় এবং ১২ জন আহত হয়। হলিক্রস কলেজ ভবনেও কিছু ক্ষতি হয়।

 

৪ জনের আরেকটি গেরিলা দল ডি আই টি ভবনের নিকট প্রহরা রত ২ জন পাকসেনাকে নিহত করে। এই পার্টি এর পড় সিদ্দিক বাজারের নিকট ১টি টহলদার পাকসেনাদলকে এম্বুশ করে এবং ২/৩ জন পাকসেনা এতে নিহত হয়। মুসলিম কমার্শিয়াল ব্যাংক , স্টেট ব্যাংক, নাজ সিনেমা হল, ওয়াপদা ভবন ইত্যাদি স্থানে গ্রেনেড বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। এসব ঘটনার ফলে সমস্ত ঢাকায় আতংকের সৃষ্টি হয়। পাকসেনারা ব্যাতিব্যাস্ত ও সন্ত্রস্ত হয়ে ওঠে। ঢাকার স্বাভাবিক অবস্থাও সম্পুর্ন নষ্ট হয়ে যায় এবং এলাকাবাসীদের মনোবল আরও বেড়ে যায়।

 

জুন মাসে আমি যখন পাকসেনাবাহিনীর সঙ্গে সব ফ্রন্ট যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিলাম সে সময় আমি বুঝতে পারলাম যদিও আমাদের যোদ্ধাদের আঘাতে পাকসেনাদের প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছিল এবং যতই আমাদের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলছিল তবুও আমাদের চেয়ে তাদের শলি অনেক বেশী ছিল। বিশেষ করে যেখানে পাকসেনারা শক্তিশালী ঘাঁটি গড়ে বাঙ্কারে অবস্থান নেয় সেখান থেকে তাদেরকে বিতাড়িত করা আমাদের পক্ষে বিশেষ করে সব সময় সম্ভব হতনা। আমি সবসময়ে সংগঠিত গোলন্দাজ বাহিনীর অভাব আনুভব করতাম। বাংলাদেশে অবস্থিত পাকসেনাদের বেশ কয়েকটি গোলন্দাজ রেজিমেন্ট ছিল। এসব রেজিমেন্টে যেসব বাঙলাই নিযুক্ত ছিল ২৫শে মার্চের পড় অনেককে পাকসেনারা হত্যা ও বন্দি করে। আবার অনেকে পালিয়ে প্রাণ বাঁচায় এবং পরে সেসব গোলন্দাজ বাহিনীর সৈন্যরা আমাদের সেক্টরে যোগ দেয়। তাদের আমি বিভিন্ন বেঙ্গল রেজিমেন্টের সঙ্গে যুদ্ধে নিয়োগ করি। যুদ্ধে এসব সৈন্যরা যথেষ্ট সাহসেরও পরিচয় দিয়েছে। এসব সৈন্যদের নিয়ে আমি একটি গোলন্দাজ বাহিনী গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেই। এই পরিপ্রেক্ষিতে গোলন্দাজ বাহিনীর সব সৈন্যকে কনাবনে একত্রিত করা হয়। একটি নতুন রেজিমেন্ট গড়ে তোলার জন্য যথেষ্ট কষ্টের সম্মুখীন হটে হয় এবং সেই কষ্ট নতুন রেজিমেন্টটিকেও বহন করতে হয়। এদের কোন থাকার জায়গা ছিল না , খাওয়া এবং রানার কোন ব্যাবস্থাও ছিলোনা। রেজিমেন্টের জন্য বিভিন্ন রকমের প্রকৌশলী লোকের দরকার হয়, কিন্তু সব রকমের সৈন্য আমাদের ছিলোনা। তাছাড়া সবচেয়ে বড় জিনিস কামান এবং অন্যান্য সরঞ্জামাদি যা একটি গোলন্দাজ বাহিনীর জন্য নিতান্ত প্রয়োজন ছিল। আমি পার্শবর্তী বন্ধুরাষ্ট্র ভারতের মিলিটারি অধিনায়কদের সঙ্গে গোলন্দাজ বাহিনীর প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র এবং অস্ত্রের জন্য অনুরোধ জানাই। অনেক ছোটাছুটির পর তারা কয়েকটি ৩.৭ ইঞ্চি ছোট কামান আমাদের দেয়। এই কামানগুলি দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময়কার ছিল এবং সম্ভবত সেকেলে হিসাবে পরিত্যাক্ত ছিল কিন্তু তবুও এগুলি পাবার পড় আমার গোলন্দাজ বাহিনীর লোকদের মধ্যে একটি নতুন সাড়া জাগে। তারা তৎক্ষণাৎ এই কামানগুলি প্রশিক্ষণ নিতে শুরু করে দেয়। প্রকৌশলী লোকের অভাব থাকায় বেঙ্গল রেজিমেন্ট এবং গণবাহিনী থেকে লোক ভর্তি করে তাদের ট্রেনিং দেয়া হয়। এসময় ক্যাপ্টেন পান্না পাকিস্তান থেকে কোন রকমে সীমান্ত অতিক্রম করে পালিয়ে এসে আমাদের সঙ্গে যোগ দেয়। তিনি গোলন্দাজ বাহিনীর লোক ছিলেন। ক্যাপ্টেন পান্না রাত দিন খেতে আমাদের এই গোলন্দাজ বাহিনীকে ট্রেনিং করিয়ে শত বাঁধা বিপত্তি ডিঙ্গিয়ে মোটামুটি যুদ্ধের জন্য উপযোগী করে তোলেন। এভাবে বাংলাদেশের প্রথম গলন্দাজ বাহিনীর জন্ম হয়। জন্মের পর থেকে ফার্স্ট ফিল্ড রেজিমেন্ট বিভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্রে জুলাই মাস থেকে আমরা কয়েকটি সাবসেক্টরে কমান্ডার অপারেশনকে ফলপ্রসূ করে তোলে। বিশেষ করে সালদা নদী, কোনাবনে প্রথম এই রেজিমেন্ট এর সহায়তার জন্যই পাকবাহিনীর বারবার আক্রমণ ক্যাপ্টেন গাফফার এবং মেজর সালেক প্রতিহত এবং পর্যুদস্ত করতে সক্ষম হয়। ক্যাপ্টেন পাশার নেতৃত্বে আমাদের সদ্য ট্রেনিংপ্রাপ্ত গোলন্দাজ বাহিনীর সৈন্যরা অনেকসময় এমন ভাবে পাকসেনাদের উপর আক্রমণ চালিয়েছে যে গোলন্দাজ বাহিনীর ইতিহাসে তা বিরল। পাকসেনাদের নিকট ছিল অত্যাধুনিক কামান, আর সেসব কামানের গোলা নিক্ষেপের ক্ষমতা ছিল বেশী। সব সময় পাকসেনাদের চেষ্টা ছিল তাদের কামানের গোলাতে আমাদের এই ছোট পুরাতন কামানগুলিকে বিনষ্ট করে দেয়া। সেজন্য দিনরাত আমাদের প্রথম ফিল্ড রেজিমেন্ট কোন জায়গাতেই বেশিক্ষণ এক স্থানে থাকতে পারতোনা। সঙ্গে সঙ্গে পাকিস্তানীদের অর্ধেক গোলা তাদের উপর পড়ে। তাছাড়া আমাদের পুরাতন কামানগুলির গোলা ক্ষেপণের দূরত্ব ছিল পাকিস্তানীদের অর্ধেকের কম। সে কারণে অধিকাংশ সময় আমাদের প্রথম ফিল্ড রেজিমেন্ট এর লোকেরা তাদের কামানগুলি মাথায় করে নিকটে বা পশ্চাতে দুর্গম রাস্তায় নিয়ে যেত এবং শত্রুদের উপর আক্রমণ করত। এসব আক্রমণের ফলে পাকসেনারা ব্যাতিব্যাস্ত হয়ে পড়ত। ফার্স্ট ফিল্ড রেজিমেন্ট এর কৌশল কতকটা কমান্ডো ধরণের। পরবর্তী পর্যায়ে প্রথম ফিল্ড রেজিমেন্ট আমাদের মুক্তিবাহিনী যখন ডিসেম্বর মাসে ফেনী, নোয়াখালী এবং চট্টগ্রামের দিকে অগ্রসর হয়, তখন কে ফোর্সের ৪র্থ বেঙ্গল, ১০ ম বেঙ্গল এবং ৯ম বেঙ্গলকে পাক বাহিনীদের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ সাহায্য করে। গোলন্দাজ বাহিনীর জন্য হবে এটা গৌরবের দৃষ্টান্ত।

 

জুলাই মাসের ১২ তারিখে লেঃ হুমায়ুন কবির সি এন্ড বি রাস্তার উপর একটি প্লাটুনের পেট্রল পাঠায়। এই পেট্রোলটি শত্রুর গতিবিধি সম্বন্ধে খবরাখবর নেবার জন্য কুটি পর্যন্ত অগ্রসর হয়। দুপুর দুটার সময় এই পেট্রোল পার্টি যখন কুটির নিকট দিয়ে টহল দিচ্ছিল তখন তারা দেখতে পায় অনেক গাড়িতে কুমিল্লা থেকে পাকিস্তানীরা সৈন্য সমাবেশ করছে। কুটিতে গাড়ী থেকে নেমে ওদের একটি ব্যাটালিয়নের মত দল মন্দভাগ বাজারের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। আমাদের পেট্রোলটি বুঝতে পারে যে, এই পাকসেনারা নয়নপুর, মন্দভাগ বাজারের দলটি বাজারের দিকে এসে অবস্থান নেয় এবং দোকানের ভিতর বাঙ্কার তৈরি করতে থাকে। এছাড়া তাদের অবস্থানের চতুর্দিকে পাট এবং ধান কেটে পরিষ্কার করে ফেলে যাতে তাদের গুলি সামনে আমাদের অবস্থানে এসে পড়ে। এসব সংবাদ পেট্রোল হেডকোয়ার্টারে পৌঁছে। সংবাদ পাবার পর আমি পাকসেনাদের ঘাঁটিগুলি শক্তিশালী হয়ে ওঠার আগেই তাদের উপর আঘাত হানার সিদ্ধান্ত নেই। ক্যাপ্টেন গাফফারকে ৪র্থ বেঙ্গলের সি কোম্পানি দিয়ে ফার্স্ট ফিল্ড রেজিমেন্টের কামানগুলি মন্দভাগ বাজারের নিকট পর্যন্ত অগ্রসর হয়। সন্ধ্যা হবার আগেই ছোট ছোট কয়েকটি দল পাঠিয়ে বাজারটি এবং শত্রু অবস্থানটি সম্পূর্ণ খবরাখবর নেয়। সন্ধ্যায় ক্যাপ্টেন গাফফার তাঁর কোম্পানি এবং ফার্স্ট ফিল্ড রেজিমেন্টের সহায়তায় মন্দভাগ বাজারের শত্রু অবস্থানের উপর অতর্কিতে আক্রমণ চালায়। আমাদের কামানগুলি গোপন পথে নৌকাযোগে বাজারের পার্শবর্তী গ্রামে অবস্থান নেয়। ক্যাপ্টেন গাফফারের আক্রমণের ঠিক পূর্ব মূহুর্তে কামাগুলি থেকে অতি নিকতবর্তী শত্রু অবস্থানের বাঙ্কারগুলি এবং বাজারের ঘরগুলিকে প্রচণ্ড গোলাবর্ষণ করতে থাকে, ফলে অনেক বাঙ্কার এবং ঘর ধ্বংস হয়ে যায় এবং বাজারে অবস্থিত পাকসেনারা আহত ও নিহত হয়। এত নিকট থেকে অতর্কিত কামানের গোলার আক্রমণ পাকসেনারা আশা করতে পারেনি। কিছুক্ষণের মধ্যেই পাকসেনাদের অন্তত ৬০/৭০ জন হতাহত হয়। পাকসেনাদের আর্তনাদ এবং চিৎকার আমাদের লোকরাও শুনতে পায়। কিছুক্ষণের মধ্যে তাদের প্রতিরোধশক্তি ক্ষীণ হয়ে আসে এবং তারা অবস্থান ছেড়ে পালিয়ে যায়। দুঘণ্টা যুদ্ধের পর মন্দভাগ বাজার এবং অনেক অস্ত্রশস্ত্র ক্যাপ্টেন গাফফারের দখলে আসে। এর পরদিন আমাদের একটি পার্টি শালদা নদীতে এম্বুশ পাতে। পাকসেনাদের একটি স্পিডবোট দুপর ১টায় এম্বুশ পড়ে যায়। এম্বুশ পার্টির গুলিতে স্পিডবোটটি ধ্বংস হয়ে যায় এবং ২০ জন পাকসেনা হতাহত হয়। কেউ কেউ নদীতে পড়ে ভেসে যায়। এম্বুশ পার্টিটি পরে নিরাপদে মন্দভাগ অবস্থানে আসে। আমাদের হেডকোয়ার্টারে খবর পাই যে , দাউদকান্দিতে পাকসেনারা ফেরিঘাটের নিকটে ঘাঁটি স্থাপন করেছে। এখানে প্রায় দুকোম্পানির মত পাকসেনা বাঙ্কার নির্মান করে ঘাঁটিটি বেশ শক্তিশালী করে তোলে। এখানে পাকসেনারা ঢাকা-কুমিল্লাগামী প্রতিটি গাড়ি দাঁড় করিয়ে অনুসন্ধান চালায়। তাছাড়া নিকটবর্তী একটা স্পিডবোটে টহল দেয়। আমরা একটি প্লাটুন দাউদকান্দিতে পাঠিয়ে দেই। এদের সঙ্গে আরেকটি দল পাঠানো হয় সৈয়দনগর ওয়ারলেস স্টেশন এবং ইলিয়টগঞ্জ রাস্তার সেতু ধ্বংস করার জন্য। আমাদের দলগুলি দাউদকান্দিতে যেয়ে গৌরীপুর নামক স্থানে তাদের ঘাঁটি তৈরি করে। এরপর শত্রুদের গতিবিধি সম্বন্ধে খবর নেয়। ১৩ই জুলাই সন্ধ্যা ৮টার সময় প্লাটুনটি দাউদকান্দির উত্তরে গোমতী নদীতে পাকসেনাদের একটি টহলদারি স্পিডবোটকে এম্বুশ করে। এই এম্বুশে একজন লেফটেন্যান্ট এবং ২০ জন পাকসেনা নিহত হয়। অফিসারটির র‍্যাঙ্কের ব্যাজ এবং অন্যান্য অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে আসা হয়। এরপর এই দলটি পরদিন রাতে সৈয়দনগর ওয়ারলেস স্টেশন ধ্বংস করে দেয়। দলে ওপর অংশ ইলিয়টগঞ্জ নতুন সেতুটি ডেমলিশন লাগিয়ে দুটি স্প্যান উড়িয়ে দেয়। তাদের কাজ সম্পূর্ণ করে দলগুলো নিরাপদে হেডকয়ার্টারে ফেরত আসে।

 

কুমিল্লা-চাঁদপুর রাস্তায় হাজীগঞ্জের নিকট রামচন্দ্রপুরের ব্রিজ উড়িয়ে দেয়ার পর পাকসেনাদের যোগাযোগ ব্যাবস্থার বেশ অসুবিধা হয়। পাকসেনারা ঐ জায়গাতে ফেরীর বন্দোবস্ত করে। এই ফেরী যোগাযোগ বিনষ্ট করার জন্য লেঃ মাহবুব একটি কোম্পানি রামচন্দ্রপুরে পাঠায়। ৬ই জুলাই ভোরে এই দলটি রামচন্দ্রপুর ফেরিঘাটের নিকট এসে এম্বুশ পাতে। ঐ দিনই সকাল ৭টার সময় পাকসেনাদের একটি দল রামচন্দ্রপুর ফেরিঘাটে আসে। তাদের জিনিসপত্র তখন ফেরিঘাটে উঠছিল ঠিক সেই সময় এম্বুশ পার্টি তাদের উপর গুলি চালায়। এতে পাকসেনাদের ৪জন নিহত হয়। উভয়পক্ষে প্রায় ঘণ্টা খানেক গোলাগুলি চলে। গোলাগুলির সংবাদ পেয়ে চাঁদপুর থেকে পাকসেনাদের প্রায় দুই কোম্পানি সৈন্য সাহায্যের জন্য আসে। পাকসেনারা ফেরিঘাটের কিছু দূরে এসে গাড়ী থেকে নামে এবং এম্বুশ অবস্থানে অগ্রসর হবার জন্য প্রস্তুত হয়। ঠিক সেই সময়ে আমাদের অন্য এম্বুশ পার্টিটি তাদের উপর অতর্কিত আক্রমণ চালায়। এই আক্রমণে পাকসেনারা সম্পূর্ণ ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় এবং তাদের ৩১ জন নিহত এবং ৫৪ জন আহত হয়। আমাদের এন সি ও এবং একজন সিপাই গুরুতর আহত হয়। এরপর আমাদের দলটি এম্বুশ অবস্থান পরিত্যাগ করে। আসার পথে ৮ই জুলাই মুদ্দাফরগঞ্জ সড়কসেতুটি উড়িয়ে দিয়ে আসে। এর পর পাকসেনারা সেতুটির নিকতবর্তী কয়েকটি গ্রামে মর্টারের সাহায্যে গোলাগুলি করে। সে সময়ে পাকসেনাদের অভ্যর্থনার জন্য অনেক স্থানীয় দালাল শান্তি কমিটি সভার আয়োজক এবং মিছিল করে পাকসেনাদের অভ্যর্থনার জন্য এগিয়ে যায়। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত এই মিছিলের উপর গুলি চালিয়ে অনেককে তাদের হত্যা করে।

 

আমাদের চাঁদপুর কোম্পানি যোগাযোগ ব্যাবস্থা বিচ্ছিন্ন করার কার্যকলাপ আরও বৃদ্ধি করে। স্থানীয় লোকদের সহায়তায় হাজীগঞ্জ এবং লাকসাম, চাঁদপুর ও কুমিল্লার সি এন্ড বি রাস্তা ও রেলওয়ে সড়কের ২০০ গজ কেটে ধ্বংস করে দেয়া হয়। এ সময়ে পাকিস্তানীরা পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ইঞ্জিনিয়ার, ইঞ্জিন ড্রাইভার এবং শ্রমিক এনে রাস্তা মেরামত করার চেষ্টা চালায়। আমাদের গেরিলারা এইসব পাকিস্তানী রেলওয়ে কর্মচারিদের মেরে সেখান থেকে তাড়িয়ে দেয়। এর ফলে রেল এবং সড়ক যোগাযোগ সম্পুর্ন বন্ধ হয়ে যায়। নিরুপায় হয়ে ২৬শে জুলাই পাকবাহিনী একটি কোম্পানিকে চাঁদপুর থেকে এই এলাকায় পাঠায়। পাকসেনাদের এই কোম্পানিটি রেলওয়ে লাইনের সঙ্গে সঙ্গে লাকসামের দিকে অগ্রসর হয়। ঠাকুর বাজারের নিকট আমাদের একটি এম্বুশ পার্টি আগে থেকেই অবস্থান নিয়েছিল। দুপুর ২টার সময় পাকসেনাদের এই কোম্পানিটি যখন এম্বুশ অবস্থানের মাঝে আসে তখন আমাদের দলটি তাদের উপর আক্রমণ চালায়। ফলে পাকসেনাদের একজন জে সি ও সহ ২২জন পাকসেনা আহত হয়। পাকসেনারা ছত্রভঙ্গ হয়ে চাঁদপুর পলায়ন করে। এর পরদিন গেরিলারা মধু রেলওয়ে স্টেশনের নিকট রেলওয়ে এবং সড়ক সেতু ধ্বংস করে দেয় এবং যে পাকিস্তানী ইঞ্জিনিয়ার পরিদর্ষনের জন্য আসে তাকেও আহত করে।

 

আমাদের ঢাকার গেরিলা দল তাদের কার্যকলাপ চালিয়ে যাচ্ছিল। ব্রিটিশ সরকারের একটি পার্লামেন্টারি দল বাংলাদেশের সে সময়ের পরিস্থিতি সারেজমিনে জানার জন্য ঢাকায় আসে। এই দলটি ঢাকা ইন্টার কন্টিনেন্টাল হোটেলে অবস্থান করছিল। ২৪শে জুন সকাল সাড়ে ৭টায় হোটেলের ভিতরে লবিতে বসে বিমান বন্দরে যাবার অপেক্ষা করছিল। ঠিক সে সময়ে আমাদের ৩ জন গেরিলা হোটেলের সামনে বারান্দায় দুটি গ্রেনেড বিস্ফোরণ ঘটায় এবং পরিষদীয় দলটিকে ঢাকার পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করায়। এর কদিন পর আমাদের গেরিলারা জানতে পারে যে নারিন্দায় গউরিমা মন্দিরে পাকিস্তানীদের অনেক দালাল সমবেত হয়ে আলোচনার আয়োজন করছে। দালালরা যখন আলোচনায় ব্যাস্ত ঠিক সেই সময়ে আমাদের গেরিলারা আলোচনায় একটি বিস্ফোরণ ঘটায়। এতে প্রায় ২০/২৫ জন পাক দালাল হতাহত হয়। ঢাকার গেরিলা দল টি এন্ড টি বিভাগের একজন পাকিস্তানী উর্ধতন কর্মচারির গাড়ীতে এম-১৪ মাইন দিয়ে বুবিট্র্যাপ লাগিয়ে রাখে। ফলে পাকিস্তানী অফিসারটি গাড়ীসুদ্ধ শেষ হয়ে যায়। পাকিস্তানী অফিসাররা মাঝে মাঝে ধানমন্ডির সাংহাই চাইনিজ রেস্টুরেন্টে সান্ধ্যভোজে আসত। এই সংবাদ পাবার পর আমাদের একটি গেরিলা দল ৮ই জুলাই রাত ৯টায় পাকিস্তানী অফিসাররা সেখানে আসলে তাদের উপর গ্রেনেড ছোঁড়ে। ফলে ২/৩ জন পাকিস্তানী অফিসার নিহত হয়। পাকিস্তানী পুলিশরা এ সময়ে রাতে ট্যাক্সিতে বা জিপে ঢাকার বিভিন্ন রাস্তায় পেট্রলিং করত। এসব টহলদার পাকিস্তানী পুলিশদের এম্বুশ করার জন্য ঢাকার গেরিলা দল একটি পরিকল্পনা নেয়। তাদের গতিবিধি সম্বন্ধে সম্পূর্ণ খবরাখবর নেয়া হয়। ১০ই জুলাই একটি পাকিস্তানী টহলদার পুলিশ পার্টি ধানমণ্ডির রাস্তা নং ২ এর দিকে যাচ্ছিল। গেরিলাদের একটি পার্টি তাদের পিছি নেয়। পুলিশের পেট্রোলটি ২ নং রাস্তার মোড়ে যখন তেদের গতি কমিয়ে দেয় ঠিক সে সময়ে গেরিলারা তাদের গাড়ীতে একটি গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। সঙ্গে সঙ্গে গাড়িটি ধ্বংস হয়ে যায়। এতে একজন অফিসার সহ ৫ জন পাকিস্তানী পুলিশ নিহত হয়। আমাদের গেরিলা দলটি নিরাপদে সে স্থানটি পরিত্যাগ করে। এর কদিন পর আমাদের আরেকটি গেরিলা দল নিউ বেইলি রোডে পাকবাহিনীর একটি জিপের ওপর এক্রমন চালায়। এই আক্রমণে ৩/৪ জন পাকসেনা নিহত হয় এবং জিপটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

 

নারায়ণগঞ্জে অবস্থিত আমাদের গেরিলা দলটি পোস্ট অফিসের ভিতর বিস্ফোরণ ঘটায় এবং মণ্ডলপাড়া ও চৌধুরীবাড়ী ইলেকট্রিক সাবস্টেশনটি ১২ই জুলাই রাত সাড়ে ১০টার সময় ধ্বংস হয়। এছাড়া সিদ্ধির নগর ও আশুগঞ্জের সাথে একটি বৈদ্যুতিক পাইলন উড়িয়ে দেয়। সিদ্ধিরগঞ্জ এবং নরসিংদীর মাঝে দুটি বৈদ্যুতিক পাইলন ধ্বংস করে দেয়। এর ফলে কাঞ্চন এবং কালীগঞ্জের বেশ কয়েকটি শিল্প কারখানা বিদ্যুতের ওভাবে বন্ধ হয়ে যায়। এর কিছুদিন পর ফতুল্লা এবং ঢাকার মাঝে পাগলা রেলওয়ে সেতুটি উড়িয়ে দেয়। ফলে নারায়ণগঞ্জ এবং ঢাকার মাঝে ট্রেন যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। এসময়ে আমার হেডকোয়ার্টারে খবর আসে যে পাক সরকার পাক বাহিনীর তত্ত্বাবধানে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা নেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই পরীক্ষাকে বানচাল করে দেয়ার জন্য আমরাও একটা পরিকল্পনা নেই। এই পরিকল্পনা অনুযায়ী আমার হেডকোয়ার্টার থেকে ঢাকার গেরিলা দলগুলিকে নির্দেশ পাঠিয়ে দেয়া হয়। এই নির্দেশ অনুযায়ী পরীক্ষার দিন সিদ্ধেশ্বরী স্কুল এবং আরও অন্যান্য স্কুলে পরীক্ষার ঠিক পূর্ব মুহূর্তে বিস্ফোরণ ঘটান হয়। ফলে খুব কম সংখ্যক ছেলেমেয়ে পরীক্ষা দেয়ার জন্য পরীক্ষা হলে আসে। ১৫ই জুলাই রাতে এই গেরিলা দল বকশীবাজারে অবস্থিত বোর্ড অফিস আক্রমন করে। ডিমলিশন দিয়ে বোর্ড অফিসের কিছু অংশ উড়িয়ে দেয়া হয়। তর ফলে বোর্ডের বেশ কিছু দলিল এবং কাগজপত্র ধ্বংস হয়ে যায়। এর ফলে এই পরীক্ষা প্রহসনে পরিণত হয় এবং অনেক ছাত্র ছাত্রী ইচ্ছাকৃতভাবেই পরীক্ষা বর্জন করে।

 

হাবিলদার গিয়াসের নেতৃত্বে আমাদের মুরাদনগরের দলটি ১৬ঈ জুলাই রাত ১টার সময় ইলিয়টগঞ্জের দেড় মাইল পশ্চিমে পুঁতিয়া গ্রামের সামনে কুমিল্লা-দাউদকান্দি সড়কের উপর কয়েকটি এন্টি ট্যাঙ্ক মাইন পুঁতে রাখে। পরদিন সকালে পাকবাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীনে একটি অয়াপদা ট্রাক মাইনের উপর বিস্ফোরিত হয়। ফলে ট্রাকটি ধ্বংস হয়ে যায়। ট্রাকে অবস্থানরত একজন পাকসেনা , দুজন রাজাকার ও ড্রাইভার সহ সবাই নিহত হয়। ফলে ৫জন পাকসেনা, ১ জন মেজর ও ৬জন রাজাকার নিহত হয়। এই সংবাদ পেয়ে কুমিল্লা থেকে পাকসেনারা ৩০টি গাড়িতে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়। পাকসেনাদের গাড়িগুলি ঘটনাস্থল থেকে অনেক দূরে এসে দাড়ায়।

 

সামনের গাড়ী থেকে বেশ কিছু সংখ্যক পাকসেনা নেমে আস্তে আস্তে ঘটনাস্থলের দিকে অগ্রসর হয়। তারা রাস্তার পাশ দিয়ে অগ্রসর হচ্ছিল। অগ্রসর হবার সময় আমাদের পুঁতে রাখা এন্টি পার্সোনাল মাইনের বিস্ফোরণে তাদের ৬/৭ জন বিস্ফোরিত হয় এবং আরও অনেক আহত হয়। এরপর পাকসেনারা আর সম্মুখে অগ্রসর হয়নি। সমস্ত দিন পাকসেনারা মাইন ডিটেক্টরের সাহায্যে ঘটনাস্থলের চতুর্দিকে তন্ন তন্ন করে তল্লাশি চালায়। সমস্ত বেসামরিক যাতায়াতও বন্ধ হয়ে যায়। এরপর পাকসেনারা পার্শবর্তী গ্রাম গুলিতে মুক্তি বাহিনীর সন্ধানে তল্লাশি শুরু করে। হাবিলদার গিয়াসের দলের একজন নায়েক মস্তফা কামাল স্থানীয় লোকদের সাথে মিশে পাকসেনাদের দুরবস্থা দেখে। দাউদকান্দি থেকে পশ্চিম নারায়ণগঞ্জে এবং দাউদকান্দি সড়কের উপর বাউসিয়ায় একটি গুরুত্তপূর্ণ সেতু ছিল। এই সেতুটি সম্পূর্ন কংক্রিটের তৈরি। এবং বেশ মজবুত। এই সেতুটি ধ্বংস করার জন্য জুলাই মাসের প্রথমে আমি মোঃ রফিক নামে বিশেষ ট্রেনিং প্রাপ্ত গেরিলাকে মনোনীত করি। তার সঙ্গে আরেকটি গেরিলাকে দিয়ে এই সেতু রেকি করার জন্য পাঠাই। মোঃ রফিক সেতুটি পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে রেকি করে এবং একটি নকশা বানিয়ে নিয়ে আসে। এরপর অধ্যাপক মুনির চৌধুরীর ছেলে ভাষণের নেতৃত্বে ১০ জনের একটি ডিমোলিশন পার্টিকে রফিকে সঙ্গে নিয়ে বাউসিয়া সেতুটি ধ্বংস করার জন্য পাঠিয়ে দেই। এই দলটি প্রথম মুরাদনগরে গিয়ে তাদের স্থায়ী ঘাঁটি করে। এর পর তারা গোমতী নদী পাড় হয়ে বাউসিয়াতে পৌঁছে। সেখানে একদিন থাকার পর স্থানীয় গেরিলাদের সাহায্য নিয়ে ১২ই জুলাই রাতে বাউসিয়া সেতুতে ডিমলিশন লাগায়। কিন্তু ডেমলিশন বিস্ফোরণের সময় ইগ্নিশন ঠিকমত কাজ করেনা। ইত্যবসরে স্থানীয় ডালা চেয়ারম্যান এবং রাজাকার পাকবাহিনীদের খবর দেয়। পাকবাহিনী এবং রাজাকার অকস্মাৎ ভাষণের ডিমলিশন পার্টির উপর আক্রমণ চালায়। আক্রমণে ভাষণের দলের ৩ জন গেরিলা গুরুতরভাবে আহত হয়। এই ৩ জনের মধ্যে একজন স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রাজ্জাক কোরাইশই ও ছিল। গেরিলা দলটি ইগ্নিশন কাজ না করার দরুন সেতু উড়িয়ে দিতে ব্যার্থ হয়ে পাকবাহিনীর আক্রমণের চাপে অবস্থান পরিত্যাগ করতে বাধ্য হয়। এর ফলে আমাদের যথেষ্ট ক্ষতি হয়। যদিও আহত গেরিলাদের সঙ্গে আনতে সক্ষম হয় কিন্তু যেসব বিস্ফোরক সেতুটিতে লাগানো হয়েছিল সেগুলি উঠিয়ে আনা তাদের পক্ষে সম্ভব হয় না। এবং তারা ২৬০ পাউন্ড আই এন টি সেখানেই ফেলে রেখে হেড কোয়ার্টারে ফেরত আসে। এত বিরাট পরিমাণ আই এন টির শত্রুর হাতে পড়া ও নষ্ট হয়ে যাওয়া আমাদের পক্ষে একটা বিরাট ক্ষতির কারণ। ঐ সময়ে বিস্ফোরক দ্রব্যাদি আমাদের খুব কম ছিল। অনেক চেষ্টার পর হয়তো কিছু কিছু আমরা যোগাড় করতে সক্ষম হতাম। ধাকা-কুমিল্লা রাস্তা বন্ধ কোরে দেয়া আমার লক্ষ ছিল। সেই লক্ষ এইভাবে ব্যার্থতায় পর্যবসিত হওয়ায় আমি যথেষ্ট চিন্তিত হয়ে পড়ি। এবং পড় পরই আবার বিস্ফোরক জোগাড়ের চিন্তায় থাকি। ২/৩ সপ্তাহ পরে অনেক কষ্টে আবার কিছু পরিমাণ আই এন টি সংগ্রহ করতে সক্ষম হই। আই এন টি জোগাড়ের পড় আমি মোঃ রফিকে ডেকে পাঠাই। শেষ পর্যন্ত আমরা বাউসিয়ার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করতে সমর্থ হয়েছিলাম। লাটুমুরাতে লেঃ হুমায়ুনের নেতৃত্বে যে কোম্পানি অবস্থান নিয়েছিল সেই অবস্থানের উপর পাক বাহিনী তাদের চাপ অব্যাহত রাখে। লাটুমুরার অবস্থান থেকে আমাদের বিতাড়িত করার চেষ্টা করে। লেঃ হুমায়ুনের কোম্পানিটি পাক বাহিনীর প্রচণ্ড চাপের মুখেও তাদের অবস্থানটি সাহসের সঙ্গে ধরে রাখে। মুক্তিযোদ্ধারা এই অবস্থান থেকে প্রায়ই পাকসেনাদের উপর অতর্কিত আক্রমণ চালাতে থাকে। ১৭ই জুলাই বিকেল ৪টায় আমাদের ও-পি দেখতে পায় যে লাটমুড়া থেকে একটি শত্রুদল চন্দ্রপুর শত্রুঅবস্থানের দিকে এগিয়ে আসছে। লেঃ হুমায়ুন কবির তৎক্ষণাৎ একটি প্লাটুন চন্দ্রপুরের রাস্তায় পাকসেনাদের এম্বুশ করার জন্য পাঠিয়ে দেয়। প্লাটুনটি চন্দ্রপুর থেকে একটু দূরে অবস্থান নিয়ে পাকসেনাদের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। পাকসেনারা যখনি সেই অবস্থানে পৌঁছে ঠিক তখনি তাদের উপর অতর্কিত আক্রমণ চালানো হয়। ফলে ৪জন পাকসেনা নিহত এবং আহত হয়। পাকসেনারা এম্বুশ থেকে বাঁচার জন্য লাটুমুড়ায় পলায়ন করে।

 

২০শে জুলাই সকাল ৯টার সময় একটি প্লাটুন পাকসেনাদের ইয়াকুবপুর , চন্দ্রপুর এবং বাগানবাড়ি অবস্থানের উপর অতর্কিত আক্রমণ করার জন্য পাঠানো হয়। এই প্লাটুনটি গোপন পথে গ্রামের ভিতর দিতে পাকসেনাদের অবস্থানের অতি নিকটে যেতে সমর্থ হয়। রেকি করার পড় তারা দেখতে পায় যে, পাকসেনাদের কিছু লোক বিভিন্ন বাঙ্কারের উপর বসে চা পান করছে, এবং তাদের প্রহরার ব্যাবস্থা শিথিল। এছাড়াও আরও ৩/৪ টি দল বাঙ্কারের উপর দাঁড়িয়ে ছিল। তাদের একজন ও-পি গাছের উপর বসা ছিল। আমাদের প্লাটুনটি জঙ্গলের ভিতর দিয়ে অগ্রসর হয়ে তাদের বাঙ্কারগুলির উপর আক্রমণ চালায়। গোলগুলিতে যেসব পাকসেনা বাঙ্কারের উপর বসে চা পানে ব্যাস্ত ছিল এবং দাঁড়িয়েছিল তারা সঙ্গে সঙ্গে আহত ও নিহত হল। নিকতবর্তী একটি ঘর থেকে কিছু পাকসেনা বেরিয়ে আসে এবং বাঙ্কারের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করে তারাও আহত ও নিহত হয়। এরপর পাকসেনাদের প্রতি এক্রমন করারা আগেই আমাদের প্লাটুনটি অবস্থান ত্যাগ করে নিজেদের এলাকায় নিরাপদে ফিরে আসে। এই সঙ্ঘর্ষের ফলে ১৩ জন পাকসেনা নিহত ও ১০ জন আহত হয়। আমাদের একজন গুরুতর ভাবে আহত হয়।

 

শালদা নদীতে পাকসেনাদের বিরুদ্ধে ৪র্থ বেঙ্গলের এ কোম্পানি এবং সি কোম্পানি তাদের তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। পাকসেনারা শালদা নদী রেলওয়ে স্টেশন থেকে নারায়নপুরের দিকে অগ্রসর হবার চেষ্টা করছিল। ১৭ই জুলাই তাদের একটি দল রেলওয়ে স্টেশনের প্রায় এক হাজার গজ দক্ষিণে মনোরা রেলওয়ে ব্রিজ পর্যন্ত অগ্রসর হয়। ব্রিজের কাছে এসে পাকসেনাদের দলটি ব্রিজের চতুর্দিকে বাঙ্কার তৈরির প্রস্তুতি নেয়। বেলা সাড়ে ১২টার সময় এ কোম্পানির একটি প্লাটুন মর্টার সহ পাকসেনাদের এই দলটির উপর অতর্কিত আক্রমণ চালায়। এ আক্রমণের ফলে পাকসেনারা সম্পূর্ণ ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় এবং তাদের বেশকিছু লোক আহত ও নিহত হয়। পাকসেনারা উপায়ান্তর না দেখে আবার শালদা নদীতে পিছু হটে যায়। পরদিন সকাল ৯টার সময় শালদা নদী থেকে পাকসেনারা আবার মনোরা ব্রিজের দিকে অগ্রসর হয়। সকাল ৯টায় আমাদের সৈনিকরা আবার তাদের বাঁধা দেয়। এবং পাকসেনাদের উপর মর্টার এবং কামানের গোলা নিক্ষেপ করে। ফলে পাকসেনাদের ৪জন লোক নিহত এবং ১০ জন আহত হয়। পাকসেনারা আর অগ্রসর না হয়ে পিছু হটে মনোরা ব্রিজের উত্তরে অবস্থা নেয়। ১৯শে জুলাই পাকসেনারা ব্রিজের দক্ষিণে আবার অবস্থান নেয় বাঙ্কার খোঁড়ার চেষ্টা করে। এবারো পাকিস্তানীরা আমাদের মর্টার , কামান এবং মেশিনগানের গোলাগুলিতে অনেক হতাহত হয়ে পিছু হটতে বাধ্য হয়। পরে স্থানীয় লোকের কাছে জানা যায় যে, পাকসেনারা আহত ও নিহত সঙ্গীদের নৌকায় করে পিছনে নিয়ে যায়। এদের সঠিক সংখ্যা সম্বন্ধে তাৎক্ষনিকভাবে সংবাদ জানা না গেলেও পরে যানা যায় ৮ জন নিহত এবং ১৪ জন আহত হয়। ২১শে সন্ধ্যায় ৪র্থ বেঙ্গলের এ কোম্পানির একটা প্লাটুন শালদা নদীর অবস্থানের ভিতর অতর্কিত আক্রমণ চালায়। আক্রমণের ফলে ৮জন পাকসেনা নিহত ও ৭ জন আহত হয়। দেড় ঘণ্টা যুদ্ধের পর আমাদের দলটি শত্রু অবস্থান পরিত্যাগ করে নিরাপদে ঘাঁটিতে ফিরে আসে। এই আক্রমণের সাথে আমাদের ফার্স্ট ফিল্ড রেজিমেন্ট পাকসেনাদের উপর আক্রমণ চালিয়ে বহু পাকসেনাকে হতাহত করে। জুলাই মাসে কুমিল্লায় পাকসেনারা স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য যথেষ্ট চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল এবং কিছুটা সফলও হয়েছিল। এ সময় কুমিল্লা শহরের ভিবিন্ন স্থানে পাকসেনারা তাদের ক্যাম্প গড়ে তুলেছিল। এসব ক্যাম্প থেকে তাড়া ঘন ঘন টহল চালাত। কুমিল্লায় পাকসেনাদের এই তৎপরতা খর্ব করার জন্য আমাদের গেরিলাদের ২০ জনের একটি দল একটি ৩ ইঞ্চি মর্টারসহ কুমিল্লার উত্তরে অনুপ্রবেশ করে। ২০শে জুলাই সকাল সাড়ে ১০টার সময় গেরিলাদের এই দলটি কুমিল্লা শহরে পাকসেনাদের বিভিন্ন অবস্থানের উপর মর্টারের সাহায্যে গোলা নিক্ষেপ করে। একটি গোলা আজাদ স্কুলে, একটি গোলা সাধনা ঔষধালয়ের নিকটে, একটি গোলা গোয়ালপত্রীতে, একটি গোলা কালীবাড়ির নিকটে এবং একটি গোলা এস ডি ওর অফিসের নিকটে বিস্ফোরিত হয়। গোলাগুলি বিস্ফোরণের ফলে পাকসেনাদের মনোবল ভেঙ্গে যায় এবং ভিতসন্ত্রত হয়ে কুমিল্লা সেনানিবাসের দিকে ছোটাছুটি করতে থাকে। বিশেষ করে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সদ্য আগত সেনারা মনোবল হারিয়ে ফেলে। অনেক পাকসেনা স্থানীয় লোকদের সেনানিবাসের রাস্তা জানতে চায়। আবার অনেকে ভয়ে ব্রিজের তলায় লুকিয়ে পরে। আবার কুমিল্লাতে যখন গেরিলারা তাদের তৎপরতা চালাচ্ছিল ঠিক সে সময়ে গেরিলাদের আর একটি দল চাঁদপুরেও তাদের তৎপরতা বাড়িয়ে দেয়। ১৭ই জুলাই রাত ১০টায় বাবুর হাটের পূর্বে কুমিল্লা-চাঁদপুর রাস্তায় আশিকাটি গ্রামের নিকট পাকসেনাদের একটি কনভয় যখন যাচ্ছিল তখন আমাদের গেরিলারা গাড়ীতে গ্রেনেড নিক্ষেপ করল। ফলে ৮ জন পাকসেনা নিহত ও আরও অনেকে আহত হয়। ১০শে জুলাই দুপুর ১টার সময় বাবুরহাটে পাকসেনাদের একটি গাড়ীর উপর গেরিলারা গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। এর ফলে ৫ জন পাকসেনা নিহত ও ৭ জন আহত হয়।

 

১১ই জুলাই বিকেল সাড়ে ৬টায় ২ জন গেরিলা চাঁদপুর পাওয়ার স্টেশনের সামনে পাহারারত ২জন পাকসেনা ও ২ জন পাকিস্তানী পুলিশের উপর গ্রেনেড নিক্ষেপ করে তাদের হত্যা করে।

 

চাঁদপুরে শান্তি কমিটির দালালদের একটি আলোচনা সভায় গ্রেনেড নিক্ষেপ করার পর ৭ জন দালাল আহত হয়। এ ছাড়াও ইলিয়টগঞ্জে পাকসেনাদের স্থানীয় এক দালালের লঞ্চে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়া হয়। এ সমস্ত কার্যকলাপের ফলে স্থানীয় লোকদের মনোবল আরও বেড়ে যায়। তাদের মুক্তিবাহিনীর উপর আস্থা আবার ফিরে আসে।

 

কসবার উত্তরে কাশিমনগর রেলওয়ে সেতুর নিকট পাকিস্তানীদের ডুটি প্লাটুন অবস্থা নিয়ে সেতুটি প্রহরার কাজে নিযুক্ত ছিল। এই সেতুটিকে ধ্বংস করার জন্য আমি ক্যাপ্টেন আইনউদ্দিনকে নির্দেশ দেই। নির্দেশ পেয়ে ক্যাপ্টেন আইনউদ্দিন সেতুটি রেকি করার জন্য ডিমলিশন এক্সপার্ট সহ একটি রেকি পাঠায়। এই রেকি পার্টি শত্রুঅবস্থান সম্বন্ধে এবং সেতুটি সম্বন্ধে বিস্তারিত খবর দিয়ে আসে। এরপর ১৮ই জুলাই রাত ২টায় একটি রেইডিং প্লাটুন ক্যাপ্টেন আইনউদ্দিনের নেতৃত্বে কাশিমপুর সেতুর উদ্যেশ্যে রওনা দেয়। রাত ৮টার সময় সেতুটির নিকতবর্তী পাক অবস্থানের উপর প্লাটুনটি আক্রমণ চালায়। আক্রমণের ফলে ১৭ জন পাকসেনা নিহত হয় এবং যারা বেঁচে ছিল তাড়া অবস্থান ত্যাগ করে খাইরাতুল্লাতে পালিয়ে যায়। আমাদের রেইডিং পার্টি সেতুটিকে বিস্ফোরণ লাগিয়ে ধ্বংস করে দেয়। মুক্তিযোদ্ধারা পাকসেনাদের অবস্থান থেকে অনেক অস্ত্র উদ্ধার করে। আমি যখন কুমিল্লা ও নোয়াখালী এলাকায় যুদ্ধে ব্যাস্ত ছিলাম, সে সময় শত্রুদের খবরাখবর নেবার জন্য একটি ৬ ইন্টিলিজেন্স নেট স্থাপন করি। এদের দায়িত্ব ছিল শত্রুদের সম্বন্ধে বিস্তারিত খবর আমাদের নিকট প্রেরণ করে। বিশেষ করে এইসব ইন্টিলিজেন্স এ এমন কতগুলো লোক কাজ করত যাদের সম্বন্ধে কিছু কোথা বলার দরকার। যেমন লাটু মিয়া। সে কুমিল্লা সেনানিবাস হাসপাতালে মালীর কাজ করত। সে আমাদের খবর পাঠায় সেনানিবাসে পাকসেনাদের ডুটি ব্রিগেড আছে এবং সেখানে একটি ডিপ হেডকোয়ার্টার স্থাপন করা হয়েছে। এ ছাড়া ৫০০-৬০০ রাজাকার এবং রেঞ্জার মোতায়েন করা হয়েছে। সে আরও খবর পাঠায় কুমিল্লা সেনানিবাসের প্রতিরক্ষা ব্যাবস্থা খুবই উত্তম এবং মজবুত করা হয়েছে এবং এই প্রতিরক্ষাবুহ্য বাইরে উত্তরে গোরা কবরস্থান পর্যন্ত তৈরি করা হয়েছে।

 

কুমিল্লা বিমানবন্দরেও একটি ব্যাটালিয়ন শক্তিশালী প্রতিরক্ষা অবস্থান তৈরি করা হয়েছে।

 

কুমিল্লা এবং নোয়াখালী এলাকায় পাকসেনাদের শক্তি এক ডিভিশনেরও বেশী। কিন্তু পাকসেনাদের এত শক্তি থাকা সত্ত্বেও তাদের মনোবল বেশ কমে গেছে। সাধারণ সিপাইরা এই যুদ্ধের নইরাশ্যজনক ফলাফল সম্বন্ধে মন্তব্য করত। তাদেরকে জোর করে যুদ্ধে ব্যাবহার করা হচ্ছে। সে জন্য তাড়া যথেষ্ট অসন্তোষ প্রকাশ করত। তাদের মধ্যে পলায়নপর মনোভাব খুবই প্রবল। তাড়া যুদ্ধ এলাকা ছেড়ে নিরাপদ স্থানে পালিয়ে যেতে ইচ্ছুক। আমাদেরকে আরও খবর পাঠায় যে, পাকসেনাদের হতাহতের সংখ্যা খুবই বেশী। শুধু সেনানিবাস হাসপাতালেই প্রায় ৫০০-৬০০ জন আহত সৈনিক চিকিৎসাধীন আছে। হাসপাতালে স্থানের অভাবে তাঁবুর ভিতরে অনেক আহত সৈনিককে রাখা হয়েছে এবং গুরুতর আহত সৈনিকদের পশ্চিম পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। আহতের সংখ্যা এত বেশী হওয়ার জন্য সাধারণ মনোবল ভেঙ্গে পড়েছিল। কুমিল্লা শহরে আমাদের এবং পাকিস্তানীদের তৎপরতার ফলে লোকজন শহর ছেড়ে গ্রামের দিকে পালিয়ে যাচ্ছে। প্রত্যেক শহরবাসী পরিচয়পত্র ছাড়া শহরে বেড় হটে পারছেনা। কুমিল্লার উত্তরে পাকসেনারা আমাদের কোটেশ্বর অবস্থান পুনর্দখলের জন্য চেষ্টা চালায়। ২৪শে জুলাই পাকসেনাদের একটি কোম্পানিগঞ্জ পার হয়ে কোটেশ্বরের দিকে অগ্রসর হটে থাকে। সকাল ১০টায় পাকসেনাদের কোম্পানিটি যখন আমাদের অগ্রসর অবস্থানের সামনে পৌঁছে যায়, তখন আমাদের মুক্তিবাহিনী সৈনিকরা তাদের উপর মর্টার এবং হাল্কা মেশিনগানের সাহায্যে তাদের অগ্রসরে বাঁধা দেয়। আমাদের গোলাগুলিতে পাকসেনারা প্রচুর ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবুও পাকসেনারা তাদের আক্রমণের চাপ অব্যাহত রাখে। আমাদের মুক্তিযোদ্ধারাও সাহসের সাথে তাদের আক্রমণ পরিত্যাগ করে ২ ঘণ্টা পরে পিছু হটতে বাধ্য হয়। এই সঙ্ঘর্ষের ফলে পাকসেনাদের ১৫জন হতাহত হয়। পাকসেনারা সমস্ত দিন আমাদের অবস্থানের উপর কামানের গোলা নিক্ষেপ করে।

 

ঐ দিনই কোটেশ্বর এবং কসবা অবস্থান থেকে দুই দল গেরিলা বুড়িচং থানার নিকট একটি সড়কসেতু, তিনটি বিদ্যুৎ পাইলন এবং কসবা এবং কসবার নিকট একটি রেলসেতু উড়িয়ে দেয়া হয়। বেলুনিয়াতে আমাদের সৈন্যরা যখন পাকিস্তানীদের সঙ্গে সম্মুখ সমরে লিপ্ত এবং পাকিস্তানীরা ফেনীর দিক থেকে বেলুনিয়া ব্রিজে প্রবেশ করার চেষ্টা করছিল ঠিক সেই সময়ে পাকসেনারাও আমাদের পেছনে ধ্বংসাত্মক চেষ্টা চালায়। তারা কিছু সংখ্যক দালালকে এই কাজে নিয়োগ করে। এইসব দালালকে মাইনসহ আমাদের অবস্থানের পিছনে পাঠায়। দালালরা আমাদের লাইনের পিছনে রাস্তায় ৬টা এন্টিপার্সোনাল এবং ৯টা এন্টিট্যাঙ্ক মাইন লাগায়। কিন্তু স্থানীয় জনসাধারণের সতর্কতার জন্যই এন্টিট্যাঙ্ক মাইনগুলিতে আমাদের কোন ক্ষতি হয়নি। মাইন পোঁতার খবরটি একজন স্থানীয় লোক আমাদের বেলুনিয়া হেডকোয়ার্টারে পাঠায়। খবর পাওয়ামাত্র হেডকোয়ার্টার থেকে আমাদের ডিমলিশন বিশেষজ্ঞ দল গাইডের সঙ্গে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে তৎক্ষণাৎ মাইনগুলি নিষ্ক্রিয় করে দেয়। আমরা স্থানীয় লোকদের পাকিস্তানী ধ্বংসাত্মক তৎপরতা সম্বন্ধে সজাগ থাকতে বলি। এরপর যখনি পাকিস্তানী দালালরা এরকম ধ্বংসাত্মক কাজের জন্য আমাদের অবস্থানের পিছনে আসার চেষ্টা করেছে স্থানীয় জনগণ তাদের প্রচেষ্টাকে ব্যার্থ করে দিয়েছে। জুলাই মাসের শেষের দিকে লেঃ মাহবুব মিয়াবাজার, চাঁদপুর, হাজীগঞ্জ ইত্যাদি এলাকাতে পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে তৎপরতা জোরদার করে। পাকসেনারা মিয়াবাজারে যে ক্যাম্প করেছিল সেখান থেকে কুমিল্লা-চট্টগ্রাম রাস্তা আবার খোলার চেষ্টা করে। লেঃ মাহবুব মিয়াবাজার শত্রুক্যাম্পটি রেইড করার জন্য পাঠিয়ে দেয়। এই দলটি সন্ধ্যায় মিয়াবাজারের নিকট পৌঁছে যায়। সেখান থেকে তাদের একটি ছোট রেকি দল পাকসেনাদের অবস্থান সম্পর্কে পুঙ্খানুপুঙ্খ খবর সংগ্রহ করে। রাত ১২টায় কমান্ডো দলটি গোপন পথে অগ্রসর হয়ে শত্রু অবস্থানের উপর অতর্কিত হামলা চালায়। এই অতর্কিত হামলার জন্য পাকিস্তানীরা মোটেই প্রস্তুত ছিলোনা। তারা দিগ্বিদিকজ্ঞ্যানশুন্য হয়ে যায়। আমাদের কমান্ডো দলটি এই অবস্থার সুযোগ নিয়ে পাকসেনাদের বেশ কয়েকটি বাঙ্কার গ্রেনেড ছুড়ে উড়িয়ে দেয়। পাকসেনারা আক্রান্ত হয়ে ছোটাছুটি করতে থাকে এবং আমাদের সৈনিকদের গুলিতে প্রায় ২০ জন নিহত এবং ১০ জন আহত হয়। এক ঘণ্টা যুদ্ধ চলার পর আমাদের কমান্ডো দলটি পাকসেনাদের প্রচুর ক্ষতিসাধন করে। শত্রুসেনাদের অবস্থান পরিত্যাগ করে মুক্তিযোদ্ধারা নিরাপদে চলে আসে। চাঁদপুরে পাকিস্তানীরা তাদের ঘাঁটি আরও শক্তিশালী করে তোলে। চাঁদপুরের এই ঘাঁটি থেকে তারা জায়গায় গাড়ীতে পেট্রলিং করত। এইসব পেট্রলিং এর জন্য ২-৩ টি ৩ টনের ট্রাক কনভয় এর আকারে ব্যাবহার করত। এইসব পেট্রলিং ভোরে, দুপুরে, সন্ধ্যায় এবং রাত ১২টার পর পাকসেনারা চালাত। এবং প্রত্যেক গাড়ির ব্যাবধান ৫০ থেকে ১০০ গজের মধ্যে। এই সংবাদ স্থানীয় গেরিলারা লেঃ মাহবুবের কাছে পৌঁছে দেয়। খবর পেয়ে লেঃ মাহবুব দুটি প্লাটুন ২০শে জুলাই চাঁদপুরের পূর্বে পাঠিয়ে দেয়। প্লাটুন দুটি চাঁদপুর থানার আশিকাটির নিকট এম্বুশ পাতে। পরদিন ভোর ৫টায় চাঁদপুর থেকে একটি পেট্রোল কনভয় আশিকাটির দিকে অগ্রসর হয়। কনভয়টি যখন এম্বুশ অবস্থানের মাঝে পৌঁছে যায় ঠিক তখনি আমাদের অ্যামবুশ পার্টি মেশিনগান এবং হাল্কা মেশিনগানের সাহায্যে গুলি চালায়। এর ফলে কনভয় এর প্রথম তিনটি জিপ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে রাস্তা থেকে পড়ে যায় এবং অবশিষ্ট গাড়ীগুলিরও যথেষ্ট ক্ষতিসাধন হয়। পাকসেনারা গাড়ি থেকে নেমে পাল্টা আক্রমণের চেষ্টা করে। কিন্তু আমাদের এম্বুশ পার্টির গুলিতে তাদের অন্তত ১০ জন নিহত এবং ২৫ জন আহত হয়। পাকসেনারা গুলির মুখে টিকতে না পেরে পালিয়ে যায়। ঐ দিন আশিকাটির ৩ মাইল পশ্চিমে সন্ধ্যায় আমাদের আর একটি এম্বুশ পার্টি পাকসেনাদের আর একটি কনভয়কে অ্যামবুশ করে। ফলে পাকসেনাদের ৩ জন নিহত এবং ৫ জন আহত ও একটি ট্রাক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রচুর অস্ত্র ও গোলাবারুদ আমাদের এম্বুশ পার্টির হস্তগত হয়। এছাড়া একটি মটর সাইকেলও দখলে নেয়। এম্বুশের খবর পেয়ে পাকসেনারা তাদের হাজীগঞ্জ ক্যাম্প থেকে আমটি শক্তিশালী কোম্পানি আমাদের এম্বুশ পার্টিকে আক্রমণ করার জন্য পাঠিয়ে দেয়। এই কোম্পানিটি ১ ঘণ্টা পর ঘটনাস্থলে আসে। ততক্ষণে আমাদের এম্বুশ পার্টি সংঘর্ষ শেষে মোটামুটি প্রস্তুত হয়েই অপেক্ষা করছিল। পাকসেনারা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হবার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের এম্বুশ পার্টি আবার তাদের উপর অতর্কিত হামলা চালায়। এর ফলে পাকসেনাদের ১২ জন নিহত ও ১০ জন আহত হয়। এরপর আমাদের দলটি অবস্থান পরিত্যাগ করে নিরাপদে নিজ ঘাঁটিতে ফিরে আসে। পাকসেনাদের একটি শক্তিশালী দল হাজীগঞ্জের নিকট নরসিংপুরে তাদের ঘাঁটি স্থাপন করে। এই ঘাঁটি থেকে পাকসেনারা ঐ এলাকার চতুর্দিকে ত্রাসের সৃষ্টি করে। এই ঘাঁটিকে আক্রমণ করার জন্য লেঃ মাহবুব নিয়মিত ও গণবাহিনীর একটি সম্মিলিত কোম্পানি পাঠিয়ে দেয়। এই কোম্পানিটি ১৭ই জুলাই তারিখ হাজীগঞ্জের দক্ষিণে তাদের অস্থায়ী গোপন অবস্থান তৈরি করে। এরপর পেট্রোল পাঠিয়ে পাকসেনাদের অবস্থান সম্বন্ধে তথ্য যোগাড় করে। ১৭ই জুলাই সন্ধ্যায় আমাদের কোম্পানিটি অতর্কিত পাকসেনাদের ঘাঁটির উপর আক্রমণ করে। আক্রমণের ফলে পাকসেনাদের ১৩জন নিহত ও অনেক আহত হয়। এরপর আমাদের কোম্পানিটি অতর্কিত পাকসেনাদের ঘাঁটির উপর আক্রমণ করে। আক্রমণের ফলে পাকসেনাদের ১৩ জন নিহত ও অনেক আহত হয়। এরপর আমাদের কোম্পানিটি নিরাপদে নিজ অবস্থানে ফিরে আসে।

 

ফরিদপুরে আমাদের গেরিলা দল তাদের কার্যকলাপ জুন মাস্যা চালিয়ে যাচ্ছিল। তাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল যে, তারা যেন বেসামরিক সাধন শাসন ব্যাবস্থা কে সম্পুর্ন অচল করে দেয়। এই প্ররিপ্রেক্ষিতে ১২জিন গেরিলারা চিকা নিদই এবং মুন্সেফ অফিস ধ্বংস করে সমস্ত অফিসিয়াল কাগজপত্র জ্বালিয়ে দেয়। ১৮ই জুলাই একটি দল গসাইরহাট থার দামুদিয়া পুলিশ ফাঁড়ির উপর আক্রমণ চালিয়ে ফাঁড়ি ধ্বংস করে দেয়। ফাঁড়ি থেকে ৫টি রাইফেল, প্রচুর গুলি এবং একটি ওয়ারলেস সেট দখল করে নেয়। গেরিলা দল দামুদিয়া তহশিল অফিস ও সার্কেল অফিস জ্বালিয়ে দেয়। এই ঘটনার দুদিন পর আরও একটি গেরিলা দল দামুদিয়া তহশিল অফিস ও সার্কেল অফিস জ্বালিয়ে দেয়। এই ঘটনার দুদিন পর আরও একটি গেরিলা দল ভেদরগঞ্জ থানা আক্রমণ করে দুজন পশ্চিম পাকিস্তানী পুলিশকে আহত করে এবং একটি ওয়ারলেস সেট হস্তগত করে। সঙ্গে সঙ্গে তহশিল অফিস ও পালং থানার আঙ্গালিয়া বাজারে জুট গোডাউন আগুন লাগিয়ে ২৫ হাজার মণ পাট জালিয়ে দেয়া হয়। গেরিলারা আঙ্গালিয়া তহশিল অফিসও জ্বালিয়ে দেয়। এসব কার্যকলাপের ফলে মাদারীপুরের শাসনব্যাবস্থা অচল হয়ে যায়।

 

শালদা নদীতে এবং মন্দভাগে ক্যাপ্টেন গাফফার এবং মেজর সালেক পাকবাহিনীকে বার বার আঘাত করতে থাকে। আমাদের রেকি পার্টি খবর নিয়ে আসে যে, ২৪ শে জুলাই বিকেল ৩টার সময় পাকসেনারা নওগাঁও স্কুলে স্থানীয় দালালদের নিয়ে একটি আলোচনা সভার আয়োজন করেছে। এই সংবাদ পেয়ে ক্যাপ্টেন গাফফার একটি প্লাটুন মর্টার সহ নওগাঁর নিকট পাঠিয়ে দেয়। বিকেল ৫টায় পাকসেনাদের ৫০-৬০ জন লোক ও স্থানীয় দালালরা স্কুল প্রাণগণে সমবেত হয়ে তাদের আলোচনা সভা শুরু করে। সভা শুরু হওয়ার কিছুক্ষণ পরই আমাদের প্লাটুনটি মর্তারের সাহায্যে পাকসেনাদের এই সমাবেশের উপর অতর্কিত আক্রমণ চালায়। ফলে আলোচনা সভা বেঙে যায় এবং পাকসেনারা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। পাকসেনাদের ৩০জন লোক ৭ জন দালালসহ নিহত হয়। আমাদের প্লাটুনটি নিরাপদে ফিরে আসে। পাকসেনারা শালদা নদীর দক্ষিণে মনোরা ভাঙ্গা রেলওয়ে সেতুটি মেরামত করার জন্য আবার চেষ্টা চালায়। ২৬শে জুলাই সকাল ১০টায় পাকসেনাদের একটি শক্তিশালী দল তাদের শালদা নদী অবস্থান থেকে মনোরা সেতুর নিকট সমবেত হয়। এরপর সেতুর চতুর্দিকে তারা বাঙ্কার তৈরির প্রস্তুতি নেয়। সংবাদ পেয়ে মেজর সালেক মর্টারসহ একটি প্লাটুন পাকসেনাদের মনোরা সেতু থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার জন্যে পাঠিয়ে দেয়। বিকেল ৪টায় আমদের দলটি আগরতলার নিকট অবস্থান নেয় এবং পাকসেনাদের উপর মর্টার এবং মেশিনগানের সাহায্যে অতর্কিত আক্রমণ চালায়। আমাদের গোলাগুলিতে পাকসেনারা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পরে এবং তাদের অনেক হতাহত হয়। মনোরা সেতু থেকে তারা পালিয়ে যায়। পরে বিশ্বস্ত সূত্রে আমরা জানতে পারলাম যে পাকসেনাদের কমপক্ষে ৪ জন নিহত এবং অনেক আহত হয়।

 

২৬শে জুলাই ক্যাপ্টেন আইনউদ্দিন একটা এম্বুশ পার্টি নওগাঁ এবং আক্সিনার মাঝামাঝি রাস্তায় এম্বুশ পাতে। পাকসেনাদের একটি দল নওগাঁর পথে সেই এম্বুশে পরে যায়। ফলে ৭ জন পাকসেনা নিহত ও ৪ জন আহত হয়। আমাদের একজন গুরুতরভাবে আহত হয়। প্লাটুনটি ফেরার পথে কল্যাণসাগরে আবার একটি এম্বুশ পেতে বসে থাকে। পাকসেনাদের একটি কোম্পানি সাইদাবাদ থেকে কসবার পথে সেই এম্বুশে পড়ে যায়। ফলে ২১ জন পাকসেনা ও ১ জন দালাল নিহত হয় এবং ৯ জন আহত হয়। পাক পেট্রোল পার্টির একটি ট্রাক ও ধ্বংস হয়। ঐ দিন ক্যাপ্টেন আইনউদ্দিনের একটি কমান্ডো দল বগাবাড়িতে একটি রেলওয়ে ব্রিজ ও ২-৩ টি টেলিফোন পাইলন উড়িয়ে দেয়। আমরা যেসব গেরিলাদের ঢাকা এবং কুমিল্লার পশ্চিম ও ভৈরব বাজার এলাকায় পাঠাতাম, তারা কসবার উত্তর দিকে ছাতুরা ও নবীনগর হয়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় কার্যকলাপ সম্বন্ধে খবরাখবর নেয়ার জন্য পাকসেনারা দালালদের নিযুক্ত করে এবং আমাদের অনুপ্রবেশের রাস্তাকে বন্ধ করার জন্য রাজাকারদের রাস্তায় এবং নদীপথে পাহারায় মোতায়েন করে। এই সব দালাল এবং রাজাকাররা আমার অপারেশনের জন্য অসুবিধার সৃষ্টি করে। দালালদের ধরার জন্য এবং রাজাকারদের সমুচিত শিক্ষা দেয়ার জন্য ক্যাপ্টেন আইনউদ্দিন ও লেঃ হারুন কে আমি নির্দেশ দেই। নির্দেশ অনুযায়ী ক্যাপ্টেন আইনউদ্দিন এবং লেঃ হারুন বিভিন্ন স্থানে তাদের লোকজনকে দালালদের বিরুদ্ধে সতর্ক করে দেয় এবং এম্বুশ পেতে রাখে। ২৫শে জুলাই সন্ধ্যায় নরসিংহের নিকট লেঃ হারুনের লোক পাকসেনাদের ৬ জন দালালকে এম্বুশ করে বন্দি করে। এদের নিকট ১৪ পাউন্ড বিস্ফোরক, ৩টি গ্রেনেড পাওয়া যায়। এর পরদিন আরও ৭ জন দালাল আমাদের এম্বুশে ধরা পরে এবং তাদের কাছ থেকে দুটি রাইফেল, ৪টি হ্যান্ড গ্রেনেড, ১টি ওয়ারলেস সেট এবং ১২০ রাউন্ড গুলি পাওয়া যায়। এর পর থেকে আমাদের এলাকাতে আর সাহস পায়নি। বন্দি দালালদের কাছ থেকে যানা যায় যে তাদেরকে পাকিস্তানী অফিসাররা প্রশিক্ষণ দিয়েছে এবং সঙ্গে করে এনে মুক্তিবাহিনীর অবস্থানের নিকট ছেড়ে দেয়। তাদের উপর নির্দেশ ছিল মুক্তিবাহিনীর বিরুদ্ধে ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ চালিয়ে যাওয়ার জন্য অন্যথায় তাদের পরিবার বর্গের উপর কঠোর ব্যাবস্থা গ্রহণ করা হবে। এরপর রাজাকারদের শায়েস্তা করার জন্য ক্যাপ্টেন আইনউদ্দিন একটি কোম্পানি পাঠিয়ে দেয়। এই কমান্ডো কোম্পানিটি ছাতুরার নিকট রাজাকার ক্যাম্পের উপর ২৫শে জুলাই অতর্কিতে হামলা চালায়। হামলার ফলে ১৬ জন রাজাকার নিহত এবং ৫ জন আহত হয়। ঐ এলাকার রাজাকাররা ভিত হয়ে সম্পূর্ণভাবে আমাদের নিকট আত্মসমর্পণ করে। তারা পরদিন তাদের নেতাকে আমাদের ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেয় এবং মুক্তিবাহিনীর সাথে সহায়তা করার অঙ্গীকার দেয়। এছাড়া অনেক রাজাকার মুক্তিবাহিনীর পক্ষে যুদ্ধ করার ইচ্ছা প্রকাশ করে। এর পর থেকে যুদ্ধ শেষ হওয়া পর্যন্ত এই এলাকার রাজাকারদের সক্রিয় সহায়তা মুক্তিবাহিনী সব সময় পেয়েছে। অনেক সময় রাজাকাররাই আমাদের গেরিলাদেরকে নিরাপদ রাস্তায় তাদের গন্তব্যস্থলে পৌঁছেছে। সি এন্ড বি রাস্তায় যে সেতুর নিচ দিয়ে আমাদের গেরিলারা নৌকায় যাতায়াত করত রাজাকাররা সেই সেতুর উপর পাকসেনাদের গতিবিধি সম্পর্কে সংকেত দিত। কোন সময় যদি পাকসেনারা ঐ জায়গায় টহলে আসতো তবে আগে থেকে হারিকেনের লাল আলো বা টর্চের সাহায্যে সংকেত দিয়ে আমাদের জানাত। আর ফলে এই রাস্তাটি আমাদের জন্য সম্পুর্ণ নিরাপদ হয়ে যায়।

 

মেজর সালেক একটি ডিমলিশন পার্টি ও একটি কমান্ডো প্লাটুনকে ২৮শে জুলাই রাত ২টার সময় হরিমঙ্গলে পাঠিয়ে দেয়। এই দলটি হরিমঙ্গলের নিকটে রেলওয়ে সেতুটির রেকি করে এবং সকাল সাড়ে ৬টা পর্যন্ত ডিমলিশন বানিয়ে সেতুটিকে উড়িয়ে দেয়। বিস্ফোরণের ফলে সেতুটির মাঝখানে ৪০ ফুটের একটি গ্যাপ সৃষ্টি হয়। এছাড়া সেতুটি দখন পাশে ২৭০ ফুট রেলওয়ে লাইন বারুদ লাগিয়ে নষ্ট করে দেয়া হয়। এর পরদিন এই ডিমলিশন পার্টি বিজন্মা রেলওয়ে সেতুটি বারুদ লাগিয়ে উড়িয়ে দেয়। ২৮শে জুলাই সকাল ৮তায় পাকসেনাদের একটি শক্তিশালী দল বিজন্মা ব্রিজের নিকট পরিদর্শনে আসে। ঠিক সেই সময় আমাদের কামান তাদের উপর গোলাগুলি করে। ফলে পাকসেনাদের ৩ জন নিহত ও ৭ জন আহত হয়। পাকসেনারা সেই অবস্থান পরিত্যাগ করে কায়েক গ্রামের দিকে পলায়ন করে। এরপর পহেলা আগস্ট পাকসেনাদের একটি শক্তিশালী কোম্পানি হরিমঙ্গল সেতুর নিকট অগ্রসর হয় এবং সেখানে তাদের ঘাঁটি গড়ার চেষ্টা করে। এবারো আমাদের সৈন্যরা তাদের অগ্রসরে বাঁধা দেয়। আমাদের সৈন্যদের গোলাগুলিতে পাকসেনাদের ৩০ জন হতাহত হয়। ফলে পাকসেনারা পিছু হটতে বাধ্য হয়।

 

কসবার টি আলির বাড়িতে পাকসেনাদের যে অবস্থান ছিল, সে অবস্থা থেকে পাকসেনারা চাল পর্যন্ত প্রায়ই যাতায়াত করত। এই সংবাদ লাটুমুরার নিকট লেঃ হুমায়ুন কবির সংগ্রহ করে। সে আরও জানতে পারে যে কাচা রাস্তায় পাকসেনাদের কমপক্ষে একটি কোম্পানি যাতায়াত করে। পাকসেনাদের এই দলকে আক্রমণ করার জন্য লেঃ কবির একটি প্লাটুন পাঠিয়ে দেয়। এই প্লাটুনটি এই প্লাটুনটি কল্যাণসাগরের নিকট ২৩শে জুলাই ভোর সোয়া ৪টায় এম্বুশ পড়ে যায়। আমাদের যোদ্ধাদের অতর্কিত গুলির আঘাতে পাকসেনাদের ২০জন নিহত ও ৮ জন আহত হয়। ১ জন স্থানীয় দালাল, যে পাকসেনাদের পথনির্দেশক ছিল, সেও মারা যায়। ২-৩ ঘণ্টা যুদ্ধের পড় পাকসেনারা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় এবং আমাদের লোকেরা অবস্থান তুলে নিজ ঘাঁটিতে ফেরত আসে।

 

কসবার উত্তরে পাকসেনাদের গোসাই স্থানে একটি শক্ত ঘাঁটি ছিল। এই ঘাঁটিতে অন্তত ৪০-৫০ জন পাকসেনা অবস্থান করছিল। আমাদের যেসব গেরিলা ঢাকার পথে যাতায়াত করত, এই অবস্থান থাকাতে তাদের যাতায়াতের গোপন পথে বিপজ্জনক হয়ে যায়। এই ঘাঁটিটি ধ্বংস করে দিয়ে যাতায়াতের গোপন পথে নিরাপদ করার জন্য আইনউদ্দিন ৪র্থ বেঙ্গলের ডি কোম্পানিকে পাঠায়। ডি কোম্পানি ৩১শে জুলাই রাত ১০টার সময় দক্ষিণ থেকে অগ্রসর হয়ে গোসাই স্থান অবস্থানের নিকট পৌঁছে। এই অবস্থানটি রেকি পূর্বেই করা ছিল। পাকসেনাদের অবস্থানটির দক্ষিণ হতে ডি কোম্পানি অতর্কিত আক্রমণ চালায়। আক্রমণের ফলে পাকসেনারা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে যায়। আক্রমণ ২-৩ ঘণ্টা চলে। ডি কোম্পানির সৈন্যরা বেশ কয়েকটি বাঙ্কার ধ্বংস করে দেয় এবং অন্তত ২০ জন পাকসেনাকে হতাহত করে। আক্রমণের প্রবল চাপে টিকতে না পেরে পাকসেনারা গোসাই স্থান পরিত্যাগ করে পিছনে পলায়ন করে।

 

শালদা নদীতে আমাদের সঙ্গে পাকসেনাদের সঙ্ঘর্ষ পুরো জুলাই মাস চলতে থাকে। ক্যাপ্টেন গাফফারের নেতৃত্বে শালদা নদীর শত্রু অবস্থানটির উত্তর দিকে ৪র্থ বেঙ্গলের সি কোম্পানি মোটামুটি ঘিরে ফেলেছিল। এদিকে দক্ষিণ দিকে আগরতলা ও কাঁটামোড়ায় মেজর সালেক ৪র্থ বেঙ্গলের এ কোম্পানি দিয়ে পাকসেনাদের শালদা নদী অবস্থানের উপর চাপ দিয়ে যাচ্ছিল। পাকসেনাদের পিছন থেকে সরবরাহের রাস্তা একমাত্র নদী ছাড়া সবই প্রায় বন্ধ হয়ে গেছিলো। নদীপথেই লুকিয়ে মাঝে মাঝে পাকসেনাদের অবস্থানে রসদপত্র সরবরাহ করা হত। এই সরবরাহ পথে পাকসেনাদের এম্বুশ পেতে বসে থাকে। রাত ১টার সময় ৭-৮ টি নৌকায় প্রায় ১৫০ জন সৈন্য ও অন্যন্য সরবরাহ সহ পাকসেনারা তাদের শালদা নদী অবস্থানের দিকে অগ্রসর হয়। নৌকাগুলি যখন এম্বুশ অবস্থানের ভিতরে আসে আমাদের প্লাটুনটি মেশিনগানের সাহায্যে গুলি চালাতে থাকে। সঙ্গে সঙ্গে নৌকা ডুবে যায়। পাকসেনারাও পিছন হতে পাল্টা গোলাগুলি শুরু করে। সঙ্ঘর্ষ প্রায় অর্ধঘণ্টা স্থায়ী থাকে। এরপর পাকসেনাদের পিছনের নৌকাগুলি ফেরত চলে যায়। এই সঙ্ঘর্ষে পাকসেনাদের প্রায় ৬০-৭০ জন হতাহত হয় , ৪-৫ টি নৌকা ডুবে যায় এবং অনেক রসদ নষ্ট হয়। নৌকার আরোহী পাকসেনারা ডুবে যায়। পাকসেনাদের গুলিতে আমাদের ৪ জন নিহত ও একজন আহত হয়।

 

কুমিল্লার উত্তরে কালামছড়ি চা বাগানের নিকট পাকসেনাদের একটি ঘাঁটি ছিল। এখানে মাসাধিককাল ধরে পাকসেনা ও মুক্তি বাহিনীর মধ্যে সঙ্ঘর্ষ চলে আসছিল। মুক্তিবাহিনীর আক্রমণে অতিস্ট হয়ে পাকসেনারা কালামছড়ি চা বাগানে বাঙ্কার তৈরি করে। ২রা আগস্ট রাত ১২টার সময় লেঃ হারুনের নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনীর একটি ক্ষুদ্র দল শত্রুঅবস্থানের উপর হামলা চালায়। পাকসেনাদের এক কোম্পানি সৈন্য কামান এবং মর্টারের সহায়তায় শক্তিশালী অবস্থান গড়ে তুলেছিল। ২রা আগস্ট মুক্তিবাহিনীর অমর সাহসী ক্ষুদ্র দলটি হ্যান্ড গ্রেনেড ও ৩০৩ রাইফেলের সাহায্যে আক্রমণ চালায়। গ্রেনেড বিস্ফোরণ ঘটিয়ে শত্রুদের ১০টি বাঙ্কার ধ্বংস করে দেয়। পাকসেনারা ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে ৫০ জন নিহত সঙ্গীকে ফেলে পিছনে গ্রামের দিকে পালিয়ে যায়। সেখানেও গ্রামের লোক দ্বারা আক্রান্ত হয়ে অনেক পাকসেনা নিহত হয়। দুজন পাকসেনা আমাদের হাটে বন্দি হয়। এম জি আই এ ও মেশিনগান সহ অনেক অস্ত্রশস্ত্র এবং ২০-২৫ হাজার গুলি আমাদের হস্তগত হয়। এছাড়া অনেক খাদ্যসামগ্রী ও কাপড় আমাদের হস্তগত হয়। আমাদের পক্ষে দুজন মুক্তিসেনা নিহত হয়। জুলাই মাসে নোয়াখালীতে অপারেশনের জন্য ১৪ জন গণবাহিনীর গেরিলা গোপন পথে চৌদ্দগ্রামে আলোকরা বাজার হয়ে দক্ষিণ দিকে যাচ্ছিল। রাত ১টার সময় বাজারের নিকটে শত্রুদের একটি দল অতর্কিতে গেরিলাদের উপর আক্রমণ চালায়। আমাদের গেরিলারা সাহসের সঙ্গে আক্রমণের মোকাবিলা করে, কিন্তু শত্রুদের আক্রমণের মুখে টিকতে না পেরে ছত্রভঙ্গ হয়ে পিছু হটতে বাধ্য হয়। সঙ্ঘর্ষে আমাদের একজন গেরিলা নিহত ও কয়েকজন আহত হয়। এবং বেশ কিছু অস্ত্রশস্ত্র ফেলে তারা পালিয়ে আসে। হাবিলদার গিয়াসের নেতৃত্বে যে দলটি হোমনা থানায় অবস্থান করছিল সেই দলটি ২৮শে জুলাই রাতে হোমনা থানার সাঘুটিয়া (হোমনা, বাঞ্ছারামপুর, রামচন্দ্রপুরের সঙ্গমস্থল) লঞ্চঘাটে পাকবাহিনীর টহলদার একটি লঞ্চের উপর এম্বুশ ফাঁদে আটকা পড়ে। পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী সুবেদার গিয়াসের দল আকস্মিকভাবে শত্রুদের উপর হামলা চালায়। ঘটনার আকস্মিকতায় প্রায় ২০-২৫ মিনিট পর্যন্ত পাকসেনারা কোন জবাব দেয়না। দুর্ভাগ্যবশত রকেট লাঞ্চার কাজ না করায় সুবেদার গিয়াসের দল লঞ্চটাকে ডুবাতে সক্ষম হয়নি। ১ ঘণ্টা ধরে উভয় পক্ষে প্রচণ্ড সংঘর্ষ চলে। পাকসেনারা বিক্ষিপ্তভাবে মর্টারের গোলা ছুড়তে থাকে। সুবেদার গিয়াসের দলের এতে কোন ক্ষতি হয়নি। ১ঘন্টা সঙ্ঘর্ষের পর পাকসেনাদের লঞ্চটি পালিয়ে যায়। আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা তাদের পিছে ধাওয়া করে। পাকসেনাদের হতাহতের সংবাদ সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানা না গেলেও প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণে প্রকাশ ক্ষতবিক্ষত লঞ্চটি দেড় ঘণ্টা হোমনা থানার ঘাটে নোঙ্গর করে থাকে। সেখানে বেশ কিছু আহতকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয় এবং অবশেষ অনেক মৃতদেহ সহ লঞ্চটি ঢাকা অভিমুখে যাত্রা করে। জুলাই মাসে পাকসেনারা চট্টগ্রাম-কুমিল্লা রোড খুলতে চেষ্টা করে। এই সময় মাঝে মাঝে পাকসেনাদের শক্তিশালী দল এই রাস্তায় টহল দেয়ার জন্য আসত। চৌদ্দগ্রামের উত্তরে ও দক্ষিণে ইমামুজ্জামান এইসব পাকসেনাদের টহলদারি দলগুলোকে তাড়িয়ে দিত।

 

৩০ শে জুলাই সকাল ৭টায় ইমামুজ্জামানের একটা প্লাটুন চৌদ্দগ্রামের ৪ মাইল দক্ষিণে নানকরা নামক স্থানে এম্বুশ পাতে। এম্বুশ পার্টি সারাদিন অপেক্ষা করার পড় জানতে পারে যে জগন্নাথ দীঘির নিকট একটি জিপ টহলে বেরবার জন্য তৈরি হচ্ছে। এই জিপকে এম্বুশ করার জন্য অ্যামবুশ পার্টি তখনি তৈরি হয়ে যায়। সন্ধ্যাসাড়ে ৬টার সময় পাকবাহিনীর এই জীপটি চৌদ্দগ্রামের ডিকে অগ্রসর হয় এবং মুক্তিযোদ্ধাদের এম্বুশ অবস্থানে পৌঁছে। পৌছার সঙ্গে সঙ্গে অ্যামবুশ পার্টি জিপটির উপর মেশিনগান এবং হাল্কা মেশিনগান থেকে গুলি চালায়। গুলিতে ড্রাইভার আহত হয়। ৬ জন পাকসেনা জিপ থেকে লাফিয়ে নিচে নামে, কিন্তু তারাও আমাদের এম্বুশ পার্টি গুলিতে নিহত হয়। পরে এম্বুশ পার্টি একটি মৃত পাক সেনার পকেটে একটি চিঠি পায়। তা থেকে জানা যায় এই পাকসেনারা ২৯ তম বেলুচ রেজিমেন্টের সি কোম্পানির লোক। নিহত পাকসেনাদের নিকট হতে রাইফেল এবং যথেষ্ট গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়। একজন আহত পাকসেনা আমাদের হাটে বন্দি হয়। এই অ্যামবুশের পর পাকসেনারা কুমিল্লা থেকে আরও সৈন্য চৌদ্দগ্রামে নিয়ে আসে এবং সারারাত ধরে আমাদের অবস্থানের উপর মর্টার এবং কামানের গোলা নিক্ষেপ করে। আমাদের লোকেরাও শত্রু অবস্থানের উপর মর্টারের গোলা নিক্ষেপ করে। পরদিন ৩১শে জুলাই সকালে পাকিস্তানীদের একটি কোম্পানি চৌদ্দগ্রাম থেকে ও আর একটি কোম্পানি জগন্নাথ দীঘি থেকে ট্রাঙ্ক রোড হয়ে আমাদের অবস্থানের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। পাকসেনারা যখন আমাদের অবস্থানের ২০০ গজের মধ্যে পৌঁছে তখনি আমাদের এম্বুশ অবস্থান থেকে তাদের উপর অতর্কিত গুলি চালানো হয়। গুলির আঘাতে ২০ জন পাকসেনা রাস্তার উত্তরে এবং ৬ জন দক্ষিণে আহত ও নিহত হয়। পাকসেনারা কামানের গোলার সহায়তায় পিছনে সরে যেতে থাকে। এই সময়েও আমাদের গুলির আঘাতে আরও কিছু সৈন্য হতাহত হয়। এরপর আমাদের এম্বুশ পার্টি সেই অবস্থান পরিত্যাগ করে হরিশ্বরদার হাটের নিকট নতুন অবস্থান নেয়। এর দুদিন পড় দোসরা আগস্ট সকাল ৭তায় পাকসেনাদের একটি ব্যাটালিয়ন উত্তর, দক্ষিণ, পশ্চিম হতে হরিশ্বরদার হাটের দিকে অগ্রসর হয়। এই সময়ে আমাদের অবস্থানে লেঃ ইমামুজ্জামান আরও দুটি প্লাটুন পাঠিয়ে অবস্থানটি শক্তিশালী করে। পাকসেনারা হরিশ্বরদার হাটের নিকট অবস্থিত ৩টি ভাঙ্গা সে পর্যন্ত অগ্রসর হয় এবং সেখানে পিছন থেকে গোলাগুলি চালায়। আমাদের কোম্পানিটিও সাহসের সঙ্গে পাকসেনাদের আক্রমণকে প্রতহত করতে থাকে। সমস্ত দিনের যুদ্ধে পাকসেনাদের ২৫ জন হতাহত হয়। পাকসেনারা দোসরা আগস্ট রাতে প্রধান সড়কের উপর তাদের প্রতিরক্ষাবুহ্য তৈরি করে। এর পরদিন তাড়া ৩রা আগস্ট সমস্ত দিন ধরে পাকসেনাদের সাথে সঙ্ঘর্ষ চলে। ঐ দিন সন্ধ্যায় আমাদের কোম্পানিটি অবস্থা পরিত্যাগ করে তাদের ঘাঁটিতে ফিরে আসে।

 

পাকসেনাদের একটি শক্তিশালী দল নয়ানপুর রেলওয়ে স্টেশন এলাকায় সুদৃঢ় ঘাঁটি করে অবস্থান করছিল। অনেক সময় এই অবস্থানের সঙ্গে অতীতে আমাদের যথেষ্ট সঙ্ঘর্ষ হয়। পাকসেনারা এই ঘাঁটিতে আরও বাড়িয়ে শালদা নদীর অবস্থান পর্যন্ত যোগাযোগ স্থাপন করার চেষ্টা করছিল। মেজর সালেক পাকসেনাদের নয়ানপুর ঘাঁটি আক্রমণ করার সিদ্ধান্ত নেয়। এই ঘাঁটিতে পাকসেনাদের অন্তত এক কোম্পানির বেশী সৈন্য ছিল। পাকসেনারা স্টেশন ও নিকটবর্তী রেলওয়ে গুদাম এলাকায় তাদের সুদৃঢ় বাঙ্কার তৈরি করে। মেজর সালেক ভদের এই অবস্থানটি সম্বন্ধে বিস্তারিত খবরাখবর সংগ্রহ করে। এর পড় ৪র্থ বেঙ্গলের এ কোম্পানি এবং কিছু সংখ্যক গণবাহিনী নিয়ে রাত সাড়ে ১২টার সময় পাকসেনাদের অবস্থানের নিকট জমায়েত হতে থাকে। পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী রাত আড়াইটার সময় স্টেশনের ২০০ গজ উত্তরে রেললাইন পর্যন্ত প্রথম পর্যায়ে দখল করে নিতে সক্ষম হয়। এই সময়ে পাকসেনাদের গোলাগুলি ভীষণ তীব্র হতে শুরু করে এবং আমাদের সেনাদের আক্রমণ কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়ে। মেজর সালেক অন্য প্লাটুন অর্থাৎ যারা স্টেশনের দিকে ছিল তাদের আক্রমণ আরও তীব্র করার নির্দেশ দেয়। এই প্লাটুনটি পাকসেনাদের প্রবল গুলিবৃষ্টির মধ্যে রেললাইনের পাশ দিয়ে আস্তে আস্তে অগ্রসর হতে থাকে। এত প্লাটুনের লোকেরা রেলস্টেশনের ২৫ গজের মধ্যে পৌঁছাতে সক্ষম হয়। এবং পাকসেনাদের প্রায় ৬-৭টি বাঙ্কার উড়িয়ে দেয়। এই সময়ে স্টেশনের নিকটস্থ গুদাম এলাকা থেকে আমাদের লোকদের উপর তীব্র আক্রমণ শুরু হয়। অতর্কিত এই আক্রমণে আমাদের অনেক লোক হতাহত হয়। অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। মেজর সালেকের পক্ষে আক্রমণ চালিয়ে যাওয়া আর সম্ভব হয় না। নিরুপায় হয়ে মেজর সালেক তার আহত ও নিহত সৈনিকদের নিয়ে পশ্চাতে হতে আস্তে বাধ্য হয়। এই যুদ্ধে আমাদের যথেষ্ট ক্ষয়ক্ষতি হয়। এ কোম্পানির ৭ জন নিহত ও ৯ জন আহত হয়। এই যুদ্ধে সৈনিকদের মনোবল কিছুটা করে যায়। পাকসেনার তাদের অবস্থান অক্ষত রাখতে সক্ষম হয়। আমার সেক্টরে এটাই ছিল প্রথম এবং সবচেয়ে মারাত্মক বিপর্যয় যাতে এতজন এক সাথে নিহত ও আহত হল।

 

ঢাকা এবং ঢাকার চারপাশে গেরিলারা তাদের কার্যকলাপ চালিয়ে যাচ্ছিল। ২৫শে জুলাই সকাল ৬টা পূবাইলের নিকট কালসজা স্থানে রেলওয়ে লাইনের ওপর বৈদ্যুতিক বিস্ফোরণ ঘটিয়ে একটি ট্রেন উড়িয়ে দেয়া হয়। ইঞ্জিন্সহ তিনটি রেলওয়ে বগি লাইনচ্যুত হয় এবং ইঞ্জিনে আগুন লেগে বিধ্বস্ত হয়। ট্রেনের আরোহী ৩০-৩৫ জন পশ্চিম পাকিস্তানী পুলিশ সেই সাথে নিহত হয়। বগিগুলি লাইনচ্যুত হয়ে পানিতে পড়ে যায়। গেরিলাদের আরেকটি দল ৪ঠা আগস্ট আড়াইহাজার থানার নিকট পাঞ্চকাপি সড়কসেতু এবং দরগাও সড়কসেতু উড়িয়ে দেয়। এর ফলে নরসিংদী – ডেমরার মধ্যে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এদিকে ২৭শে জুলাই ৪ জনের একটি গেরিলা দল মতিঝিলের (পীরজঙ্গি মজার) নিকট বিদ্যুৎ সরবরাহ সাবস্টেশনের উপর আক্রমণ চালায়। পশ্চিম পাকিস্তানী পুলিশ এই সাবস্টেশনটিকে পাহার দিচ্ছিল। গেরিলারা দুজন পশ্চিম পাকিস্তানী পুলিশকে নিহত এবং বাকিদের নিরস্ত্র করে। তাড়া তালা ভেঙ্গে সাবস্টেশনে প্রবেশ করে ও সাব স্টেশনটি এক্সপ্লোসিভ লাগিয়ে ধ্বংস করে দেয়। ফলে মতিঝিল, কমলাপুর স্টেশন, শাহজাহানপুর , গোপীবাগে বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। গেরিলা দলটি এরপর ফেরার পথে শাহজাহানপুরে রাজাকারদের দ্বারা আক্রান্ত হয়; কিন্তু সাহসের সঙ্গে পাল্টা আক্রমণ চালিয়ে ৮-১০ জন রাজাকারকে নিহত করে নিরাপদে নিজ ঘাঁটিতে ফিরে আসে। জুলাই মাসে শেষ সপ্তাহে আরে একটি গেরিলাদল সিদ্ধিরগঞ্জ এবং খিলগাঁও ও কমলাপুরের মাঝে বেশ কয়েকটি বিদ্যুৎ সরবরাহ লাইনের পাইলন উড়িয়ে দেয়। ফলে টঙ্গি, কালীগঞ্জ প্রভৃতি শিল্প এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। ১৫ ই জুলাই পাগলা এলাকার গেরিলা দল ফতুল্লা এবং ঢাকার মাঝে একটি রেলওয়ে সেতু এক্সপ্লোসিভ লাগিয়ে উড়িয়ে দেয়। ফলে ঢাকা- নারায়ণগঞ্জ রেল যোগাযোগ সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। ফার্মগেটের নিকট পাকিস্তানীদের একটি চেকপোস্ট আক্রমণ করার সিদ্ধান্ত নেয়। কয়েকদিন গাড়িতে রেকি করার পড় তারা দেখতে পায় যে, পাহারারত মিলিটারি পুলিশ সব সময় মোটেই সতর্ক থাকে না। একদিন সন্ধ্যায় আলম, কাজি, গাজি এবং স্বপন নামের চার জন ঢাকার গেরিলা একটি গাড়ীতে ফার্মগেটে আসে। মিলিটারি চেক পোস্টের নিকটে পৌছার সময় তাদেরকে পাকসেনারা আস্তে নির্দেশ দেয়। তারা তাদের গাড়ীটি নির্দেশ অনুযায়ী দ্বিতীয় রাজধানীর দিকে মুখ করে রাস্তার পাশে দাড় করায়। চারজন পাকসেনা গাড়ীর দিকে চল্লাশির জন্য অগ্রসর হয়। সঙ্গে সঙ্গে গাড়ী থেকে গেরিলারা তিনটি চায়নিজ স্টেনগান থেকে গুলি চালাতে থাকে। পাকসেনাদের অন্যান্য লোকও গাড়ীর দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করে। গেরিলা দল তাদের লক্ষ্য করে গ্রেনেড ছোড়ে এবং তীব্র গতিতে গাড়ী চালিয়ে অবস্থান ত্যাগ করে। এ সঙ্ঘর্ষের ফলে পাকসেনাদের ৫ জন মিলিটারি পুলিশ আহত ও ৪ জন নিহত হয়। সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত ফার্মগেট এবং কাওরান বাজার এলাকায় আতংকের সৃষ্টি হয়। ২রা আগস্ট ঢাকার গেরিলাদের আরেকটি দল ‘গ্যানিস’ এবং ‘ভোগ’ নামক দুটি বড় দোকানে গ্রেনেড ছুড়ে দোকান দুটির ক্ষতিসাধন করে।

 

লেঃ ইমামুজ্জামানের রেকি পার্টি সংবাদ নিয়ে আসে যে, পাকসেনাদের দুটি জিপকে রেশন এবং গোলাবারুদ সরবরাহের জন্য বালিয়াজুরি ভাঙ্গা ব্রিজের নিকট শত্রু অবস্থানের নিকট যেতে দেখা গেছে। লেঃ ইমামিজ্জামান তৎক্ষণাৎ একটি প্লাটুন জিপ দুটিকে এম্বুশ করার জন্য হরিসর্দার বালিয়াজুরি ব্রিজের নিকট পাঠিয়ে দেয়। লেঃ ইমামুজ্জামান প্লাটুনটি সঙ্গে সঙ্গে অবস্থান নিয়ে জিপের উপর রাইফেলের সাহায্যে গুলি চালাতে থাকে। সঙ্গে সঙ্গে পাকসেনাদের দুজন নিহত হয়। একটি জিপ মৃত সঙ্গীদের নিয়ে দ্রুত ঘুরে পালিয়ে যায়। অন্য জিপটির উপর প্লাটুনটি গুলি চালাতে থাকে। পাকসেনাদের রাস্তার পশ্চিম পাশে অবস্থান নিয়ে আমাদের প্লাটুনটির উপর গুলি চালাতে থাকে। তাদের গুলি ফুরিয়ে এলে তারা গাড়ি থেকে গুলি নেবার চেষ্টা করে – কিন্তু তাদের সে চেষ্টা ব্যার্থ হয়। এ আক্রমণে তাদের ৬ জন মারা যায়। পরে পাকসেনারা আমাদের এম্বুশ অবস্থানের উপর প্রচণ্ড গোলা ছুড়তে থাকে। বাধ্য হিতে আমাদের প্লাটুনটি অবস্থান পরিত্যাগ করে। শত্রুদের গাড়িটি বিধ্বস্ত হয়ে যায়। এরপর পাকসেনাদের একটি শক্তিশালী দল দুপুর দেড়টার দিকে আমাদের অবস্থানের দিকে অগ্রসর হয়। প্রচণ্ড সঙ্ঘর্ষে ১০ জন পাকসেনা নিহত এবং আরও কয়েকজন আহত হয়। পাকসেনারা বাধ্য হয়ে তাদের আক্রমণ পরিত্যাগ করে ফেরত চলে যায়।

 

মেজর সালেক ১০ই আগস্ট একটি প্লাটুন নিয়ে শালদা নদীর পশ্চিমে ব্রাহ্মণবাড়িয়া কুমিল্লা সি এন্ড বি রাস্তার নিকট শিলদাই গ্রামে তার গোপন ঘাঁটি স্থাপন করে। পরদিন স্থানীয় লোকের নিকট খবর পায় যে সি এন্ড বি রাস্তার উপর দিয়ে প্রতিদিন কুমিল্লা থেকে উজানিরশার পাক অবস্থানে ৩-৪ টি জিপ যাতায়াত করে। এই সংবাদ পেয়ে মেজর সালেক পাকসেনাদের জন্য সিএন্ড বি রাস্তায় একটা এম্বুশ পাতে। সমস্ত দিন ও রাত অপেক্ষা করার পরেও পাকসেনারা সেদিন আর আসেনি। বোঝা গেল যে হয়তো বা তাদের কোন ডালা বা রাজাকার আগে থেকেই এম্বুশ সম্পর্কে সতর্ক করে দিয়েছিল। অনেক অপেক্ষা করার পর রাস্তায় মাইন লাগিয়ে মেজর সালেকের দলটি তার ঘাঁটিতে রওনা হয়। পথে রসুল্গ্রামের নিকট একটি রাজাকার ক্যাম্পে আক্রমণ চালায়। আক্রমণের সময় ক্যাম্প ভবনের ভিতর বেশ কয়েকটি গ্রেনেড নিক্ষেপ করা হয়। এই আক্রমণের ফলে ২০ জন রাজাকার নিহত ও ৩০ জন বন্দি হয়। এরপর দলটি নিজেদের অবস্থানে নিরাপদে ফিরে আসে।

 

শালদা নদী , মন্দভাগ এবং এর চতুর্দিকে আমাদের সৈন্যরা পাকসেনাদের উপর প্রায়ই আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছিল। পাকসেনাদের হতাহতের সংখ্যাও দিন দিন আরও বেড়ে যাচ্ছিল। আমাদের আক্রমণের ফলাফল সম্বন্ধে দুটি সঠিক বিবরণ গ্রামবাসী মারফত জানতে পাই। শালদা নদীর শত্রু অবস্থানের উপর আমরা গোলন্দাজ বাহিনীর সহায়তায় গোলার আক্রমণ চালানোর ফলে আগস্টের দ্বিতীয় সপ্তাহে শত্রুপক্ষের অন্তত ৬০ জন নিহত হয়। বাধ্য হয়ে শত্রুরা স্টেশন ছেড়ে নয়ানপুর গ্রাম, শালদা নদী গোডাউন ইত্যাদি এলাকায় অবস্থান তৈরি করে। মন্দভাগেও শত্রু অবস্থানের ওপর আমাদের গোলার আক্রমণের ফলে পাকসেনাদের প্রায় ১৫০ জন হতাহত হয়। পাকসেনাদের একটি ১২০ এম এম মর্টারের মারাত্মক ক্ষতিসাধন করা হয়। সন্ত্রস্ত পাকসেনারা বাধ্য হয়ে তাদের কামানের অবস্থানের পিছু হটিয়ে ব্রাহ্মণপাড়া নিয়ে যায়। আমাদের এম্বুশের ফলে শালদা নদুর রাস্তা পরিত্যাগ করা নাগাইশ হয়ে ব্রাহ্মণপাড়া থেকে একটি নতুন রাস্তা খোলার চেষ্টা করে। ১১ই আগস্ট পাকসেনাদের একটি কোম্পানি এই নতুন রাস্তায় আসে। আসার পথে নাগাইশ গ্রাম থেকে একজন স্থানীয় লোককে পথপ্রদর্শক হিসাবে নিয়ে আসে। এই লোকটি পরে আমাদের জানায় যে পাকসেনাদের মনোবল একেবারেই ভেঙ্গে গেছে। নৌকাতে আসার সময় অনেক সৈন্যই সামনে অগ্রসরে অনিচ্ছা প্রকাশ করে। তাদের কমান্ডোরা অনেক ভাবে তাদের উৎসাহিত করার চেষ্টা চালায়। এছাড়াও তেদের অনেককে চিন্তিত ও বিমর্ষ দেখাচ্ছিল। তারা তাদের পুরনো দাম্ভিক স্বভাব অনেকটা পরিত্যাগ করেছে। পাকসেনারা গ্রামবাসীদের সাথে মিশবার চেষ্টাও করছিল। শত্রুদের এই নতুন রাস্তার খবর পেয়ে মেজর সালেক একটি প্লাটুন পাঠিয়ে দেয়। প্লাটুনটি নাগাইশ গ্রামে পাকসেনাদের দুটি রসদ বোঝাই নৌকা ব্রাহ্মণপাড়া থেকে নয়ানপুরের দিকে যাচ্ছিল। আমাদের প্লাটুনটি তাদের উপর অতর্কিত আক্রমণ করে এবং ১১ জন পাকসেনাকে নিহত করে নৌকাটি ডুবিয়ে দেয়।

 

কিছুক্ষণ পর পাকসেনাদের আরও ৩টি নৌকা শালদা নদী থেকে ব্রাহ্মণপাড়ার দিকে যাচ্ছিল। এই নৌকাগুলিকেও আমাদের এম্বুশ পার্টি শশিদল গ্রামের নিকট এম্বুশ করে এবং এতে ১০ জন পাকসেনা নিহত হয়। পরদিন পাকসেনাদের দুটি শক্তিশালী প্লাটুন আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের দমনে নাগাইশের দিকে অগ্রসর হয়। আমাদের প্লাটুনটি সংবাদ পেয়ে সুবেদার নজরুল ও নায়েব সুবেদার মনিরের নেতৃত্বে পাকসেনাদের এই দলটিকে নাগাইশ পৌছার আগেই অতর্কিত আক্রমণ করে ২৫ জন পাকসেনাকে নিহত করে। পাকসেনারা পিছু হতে যায়। ১৭ই আগস্ট ব্রাহ্মণপাড়া এই নদীপথ খোলার জন্য পাকসেনাদের একটি বিরাট দল নদীর পাড় দিয়ে অগ্রসর হয়। এবং সঙ্গে সৈন্য বোঝাই ৩টি নৌকাও অগ্রসর হয়। পাকসেনাদের এই দলটিকে আমাদের সৈন্যরা আবার এম্বুশ করে। অ্যামবুশের ফলে নৌকার আরোহী ১৮ জন পাকসেনা নিহত হয়। পাকসেনাদের যে দলটি পাড় দিয়ে আসছিল তাদের প্রবল চাপে বাধ্য হয়ে আমাদের সৈন্যরা পিছু হটে আসে। পাকসেনারা দুই তিনবার এম্বুশে পড়ার পরেও শালদা নদীর নাগাইশ-ব্রাহ্মণপাড়া যোগাযোগ খোলার চেষ্টা চালিয়ে থাকে। এই খাল ছাড়া পিছন থেকে শালদা নদীতে সরবরাহের আর কোন রাস্তা ছিল না।

 

১৯শে আগস্ট দুপুর ১২টার সময় পাকসেনাদের তিনটি নৌকা শালদা নদী থেকে ব্রাহ্মণপাড়ার দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। এই নৌকাগুলি যখন ছোট নাগাইশের নিকট পৌঁছে তখন আমাদের সৈন্যরা নৌকাগুলির উপর আক্রমণ চালায়। পাকসেনারা পালটা গুলি চালিয়ে আমাদের আক্রমণ প্রতিহত করার চেষ্টা করে , কিন্তু আমাদের সৈন্যদের তীব্র আক্রমণের মুখে তাদের দুটি নৌকা ডুবে যায় এবং ২০ জন নিহত হয়। পিছনের নৌকাটি দ্রুত পিছনের ফিরে পাড়ে পৌঁছায়। পাকসেনারা নৌকা থেকে নেমেই আমাদের সৈন্যদের ওপর আক্রমণের চেষ্টা করে। প্রায় চার ঘণ্টা উভয় পক্ষে গোলাগুলি চলার পড় পাকসেনারা পিছু হটে যায়। ঐ দিনই বেলা ১টার সময় আমাদের কামানের গোলায় শালদা নদী গুদামে অবস্থিত পাকসেনাদের একটি বাঙ্কার ধ্বংস হয়। ফলে ৮জন পাকসেনা ঘটনাস্থলেই নিহত হয়।

 

মন্দভাগেও ৪র্থ বেঙ্গলের সি কোম্পানি অতর্কিত আক্রমণ চালিয়ে পাকসেনাদের চারটি বাঙ্কার ধ্বংস করে দেয়। ফলে ১১ জন নিহত ও তিনজন আহত হয়। লেঃ ইমামুজ্জামান পাকবাহিনীর হরিসর্দার হাটের অবস্থানের উপর তার চাপ রেখে যাচ্ছিল। এই চাপের ফলে পাকসেনাদের মনোবল দ্রুত ভেঙ্গে পড়েছিল। এই অবস্থানটিতে বরাবর অতর্কিত আক্রমণ এবং এম্বুশ চালানোর ফলে পাকসেনারা আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের ভয়ে সব সময় সজাগ থাকত।

 

শত্রুদের এই অবস্থানটি মুক্ত করার জন্য একটি পরিকল্পনা নেওয়া হয়। ভিতসন্ত্রস্ত পাকসেনাদের মনোবল সম্পূর্ণ ভেঙ্গে দেয়ার জন্য অবস্থানটির নিকতবর্তী এলাকায় গুজব ছড়িয়ে দেয়া হয় যে, পাকসেনাদের এই অবস্থানটির ওপর মুক্তিবাহিনীর আক্রমণ অবশ্যাম্ভাবি। ৪র্থ বেঙ্গল রেজিমেন্ট আক্রমণ করার জন্য অতিসত্বর হরিসর্দার হাটের দিকে উত্তর থেকে অগ্রসর হচ্ছে এবং তাদের সঙ্গে বন্ধুরাষ্ট্রের দেয়া অনেক কামানও আছে। এছাড়াও অনেক মুক্তিযোদ্ধা এ আক্রমণের জন্য একত্রিত হচ্ছে। এই ধরণের গুজব প্রায় ই পাকসেনাদের আমানগোন্ডা অবস্থানের এলাকায় প্রচার করা হচ্ছিল। এর ফলে পাকসেনাদের মনোবলে আরও ভাঙ্গন ধরে। ১৪ই আগস্ট আরও গুজব ছড়িয়ে দেয়া হয় যে, পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবসেই এই আক্রমণ চালানো হবে। ১৪ই আগস্ট রাত ১০তার সময় লেঃ ইমামুজ্জামান কয়েকজন সিপাই আমানগোণ্ডার নিকটে গিয়ে লাইন পিস্তল এবং ২ ইঞ্চি মর্টারের সাহায্যে ইল্যুমিনেটিং প্যারাস্যুট বোমা ছোড়া হয় এবং কয়েক রাউন্ড গুলি চালানো হয়। এর পরদিন আমানগোন্ডা অবস্থানের নিকট পৌঁছে দেখা গেল যে, পাকসেনারা সমস্ত প্রতিরক্ষা অবস্থান ছেড়ে রাতে ভয়ে পালিয়ে গেছে এবং এলাকাবাসী পাকসেনাদের পরিত্যাক্ত জিনিসপত্র সংগ্রহ করছে।

 

এ ছাড়াও পরে আমরা আরো অনেক সূত্রে জানতে পারি যে, মুক্তিবাহিনীর সম্ভাব্য আক্রমণ সম্বন্ধে পাকিস্তানীরা এত বেশী সন্দিহান এবং চিন্তিত হয়ে পড়েছিল যে, ১৩ই আগস্ট ঢাকা থেকে এক ব্যাটালিয়ন সৈন্য এবং চারটি লাইট ট্যাংক কুমিল্লাতে আনা হয়। এই ব্যাটালিয়নটি বানাসিয়া থেকে গাজীপুর পর্যন্ত রেললাইনের পাশে প্রতিরক্ষা অবস্থান তৈরি করে, দুটি ট্যাংক কুমিল্লা বিমানবন্দরের নিকট মোতায়েন করে এবং বাকিগুলি কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে রাখা হয়। কুমিল্লার সামরিক প্রশাসক ব্রিগেডিয়ার মাসুদ ঘোষণা করেন যে, যদি কোন বাঙ্গালী সামরিক কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করে যে, মুক্তিবাহিনী তার বাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে তবে তাকে সম্পূর্ণ ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে। এইভাবে পাকবাহিনী তাদের দোষ মুক্তিবাহিনীর উপর চাপাবার প্রচেষ্টা চালায় এবং এইসব অভিযোগকে তাদের কাজে ব্যবহার করার চেষ্টা করে।

 

পাকসেনারা হোমনা থানায় একবার আক্রান্ত হবার পর এই থানাটিতে আবার পশ্চিম পাকিস্তানী পুলিশ এবং কিছুসংখ্যক পাকসেনা মোতায়েন করে শক্তিশালী করে তোলে। থানাটিতে পাকসেনাদের অবস্থান শক্তিশালী হবার পর হোমনা এলাকায় মুক্তিবাহিনীর পক্ষে তাদের কার্যকলাপ চালিয়ে যাওয়াতে বাধার সৃষ্টি হয়। এই এলাকা আবার মুক্ত করার জন্য হাবিলদার গিয়াস থানাটিকে আক্রমণ করার সিদ্ধান্ত নেয়। প্রথমে থানাটির প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সম্বন্ধে সম্পূর্ণ খবর সংগ্রহ করে। স্থানীয় গেরিলাদেরকেও তার প্লাটুনের সঙ্গে একত্রিত করে। ১৫ই আগস্ট রাত ১২টার সময় আমাদের সম্মিলিত দলটি হোমনা থানার উপর অতর্কিত আক্রমণ করে। কিন্তু ২ ঘণ্টা তুমুল যুদ্ধের পর তারা আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। যুদ্ধে তাদের ১০ জন নিহত ও ১৪ জন বন্দী হয়।

 

আমাদের দলটির দুজন আহত হয়। থানাতে ২৪টি রাইফেল, দুটি বন্দুক, ১৬টি বেয়োনেট, একটি ওয়্যারলেস সেট, দুটি টেলিফোন সেট, ১০টি গ্রেনেড ও দেড় হাজার গুলি আমাদের হস্তগত হয়। বন্দীদের থানা হেডকোয়ার্টারে পাঠিয়ে দেয়া হয়। হোমনা থানার বিস্তৃত এলাকা আমাদের নিয়ন্ত্রনে আসে। এর দুদিন পর হোমনা পতনের খবর পেয়ে পাকসেনাদের ৩টি দল মুরাদনগর থেকে হোমনার দিকে নৌকায় অগ্রসর হয়। মুরাদনগরে অবস্থিত আমাদের গেরিলারা এই সংবাদ পেয়ে যায়। স্থানীয় গেরিলা কমান্ডার মুসলেউদ্দিনের নেতৃত্বে দুপুর ২টার সময় নদীর পাড়ে অগ্রসরমান পাকসেনাদের জন্য এমবুশ পাতে।

 

মুরাদনগর থেকে ৮ মাইল দূরে সন্ধ্যা ৬টার সময় পাকসেনাদের নৌকাগুলি এমবুশে পড়ে যায়। আমাদের গেরিলাদের গুলিতে দুটি নৌকা ডুবে যায়। গোলাগুলিতে ১ জন ক্যাপ্টেনসহ ২৯ জন পাকসেনা এবং পাঁচজন রাজাকার নিহত হয়। আমাদের গেরিলারা ৩টি এমজি-৪২ এবং দুটি বেল্ট বক্স (৫০০ গুলিসহ), ৫০০ চাইনিজ রাইফেলের গুলি এবং ১টি ৩০৩-রাইফেল হস্তগত করে। অবশিষ্ট অস্ত্রশস্ত্র পানিতে ডুবে যাওয়ায় উদ্ধার করা সম্ভব হয় নি। কুমিল্লা থেকে তিন মাইল উত্তর-পূর্বে কংসতলাতে পাকসেনারা আগস্ট মাসে তাদের একটি ঘাঁটি স্থাপন করে। এই ঘাঁটিতে পাকসেনাদের অন্তত এক কোম্পানী শক্তি ছিল। পাকসেনাদের এই ঘাঁটির সংবাদ ক্যাপ্টেন মাহবুবের নিকট পৌঁছে। তিনি একটি পেট্রোল পার্টি পাঠিয়ে এই ঘাঁটি সম্বন্ধে বিস্তারিত খবর সংগ্রহ করেন। ১৬ই আগস্ট সন্ধ্যা ৭টায় ক্যাপ্টেন মাহবুবের নেতৃত্বে দুই প্লাটুন শত্রুঘাঁটির দিকে অগ্রসর হয়। রাত ২টায় ক্যাপ্টেন মাহবুবের দলটি পাকসেনাদের ঘাঁটির উপর অতর্কিতে আক্রমণ চালায়। মুক্তিবাহিনীর সৈনিকেরা পাকঘাঁটির ভিতরে অনুপ্রবেশ করে পাকসেনাদের হতচকিত করে দেয়। তুমুল সংঘর্ষে কিংকর্তব্যবিমূঢ় পাকসেনাদের প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হয়। পাকসেনারা পর্যুদস্ত হয়ে তাদের ঘাঁটি ছেঁড়ে পালিয়ে যায়। আমাদের দলটি পলায়মান পাকসেনাদের খায়েশ বাজার এবং লক্ষ্মীপুর ঘাঁটি থেকেও হটতে বাধ্য করে। সমস্ত রাতের সংঘর্ষে পাকসেনাদের একজন অফিসারসহ ৩০ জন হতাহত হয়। এরপর আমাদের দলটি নিরাপদে তাদের কেন্দ্রে ফিরে আসে।

 

এর তিনদিন পর কুমিল্লার ১ মাইল উত্তরে আমাদের আরও একটি দল পাকসেনাদের জন্য একটি এমবুশ প