বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধঃ দলিলপত্র – ১২ তম খণ্ড (অনুবাদসহ)

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধঃ দলিলপত্র – ১২ তম খণ্ড (অনুবাদসহ)

 

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র: দ্বাদশ খণ্ড

             বিদেশী প্রতিক্রিয়াঃ ভারত

 

 

 

 

অ্যাটেনশন!

পরবর্তী পেজগুলোতে যাওয়ার আগে কিছু কথা জেনে রাখুনঃ

 

  • ডকুমেন্টটি যতদূর সম্ভব ইন্টার‍্যাক্টিভ করা চেষ্টা করা হয়েছে। অর্থাৎ এই ডকুমেন্টের ভেতরেই অসংখ্য ইন্টারনাল লিংক দেয়া হয়েছে। আপনি সেখানে ক্লিক করে করে উইকিপিডিয়ার মতো এই ডকুমেন্টের বিভিন্ন স্থানে সহজেই পরিভ্রমণ করতে পারবেন। যেমন প্রতি পৃষ্ঠার নিচে নীল বর্ণে ‘সূচিপত্র’ লেখা শব্দটিতে কিবোর্ডের Ctrl চেপে ধরে ক্লিক করলে আপনি সরাসরি এই ডকুমেন্টের সূচিপত্রে চলে যেতে পারবেন।

 

 

  • তারপর দলিল প্রসঙ্গ শিরোনামে কিছু লেখা আছে। এটি যুদ্ধদলিলের ১২তম খণ্ড থেকে সরাসরি লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। এখানে আপনারা জানতে পারবেন যে এই ডকুমেন্টে আসলে কী কী আছে।

 

 

  • তারপর ‘সূচিপত্র’ এখান থেকেই মূল দলিল শুরু। সূচিপত্রটি সরাসরি দলিলপত্র থেকে নেয়া হয়েছে। সূচিপত্রে লেখা পেজ নাম্বারগুলো যুদ্ধদলিলের মূল সংকলনটির পেজ নাম্বারগুলোকে রিপ্রেজেন্ট করে।

 

 

  • বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধঃ দলিলপত্র মোট ১৫ টি খণ্ড আছেঃ

 

প্রথম খণ্ড : পটভূমি (১৯০৫-১৯৫৮)
দ্বিতীয় খণ্ড : পটভূমি (১৯৫৮-১৯৭১)
তৃতীয় খণ্ড : মুজিবনগরঃ প্রশাসন
চতুর্থ খণ্ড : মুজিবনগরঃ প্রবাসী বাঙালীদের তৎপরতা
পঞ্চম খণ্ড : মুজিবনগরঃ বেতারমাধ্যম
ষষ্ঠ খণ্ড : মুজিবনগরঃ গণমাধ্যম
সপ্তম খণ্ড : পাকিস্তানী দলিলপত্র: সরকারী ও বেসরকারী
অষ্টম খণ্ড : গণহত্যা, শরনার্থী শিবির ও প্রাসঙ্গিক ঘটনা
নবম খণ্ড : সশস্ত্র সংগ্রাম (১)
দশম খণ্ড : সশস্ত্র সংগ্রাম (২)
একাদশ খণ্ড : সশস্ত্র সংগ্রাম (৩)
দ্বাদশ খণ্ড : বিদেশী প্রতিক্রিয়াঃ ভারত
ত্রয়োদশ খণ্ড : বিদেশী প্রতিক্রিয়াঃ জাতিসংঘ ও বিভিন্ন রাষ্ট্র
চতুর্দশ খণ্ড : বিশ্বজনমত
পঞ্চদশ খণ্ড : সাক্ষাৎকার

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

  • এই ডকুমেন্টে প্রতিটি দলিলের শুরুতে একটা কোড দেয়া আছে।

<খণ্ড নম্বর, দলিল নম্বর, পেজ নম্বর>; অর্থাৎ <১২, ১১, ১৩-১৮> এর অর্থ আলোচ্য দলিলটি মূল সংকলনের ১২ তম খণ্ডের ১১ নং দলিল (দলিল নাম্বার সূচিপত্রের সাথে লিঙ্কড), যা ১৩ থেকে ১৮ নং পৃষ্ঠায় মুদ্রিত আছে। দলিল নম্বর বলতে সূচিপত্রে উল্লিখিত নম্বরকে বুঝানো হচ্ছে। উদ্ধৃত ‘১১’ নাম্বার দলিলটিতে ‘জাতিসংঘের সোশ্যাল কমিটি অব দি ইকোনমিক এন্ড সোশ্যাল কাউন্সিল এ ভারতের স্থায়ী প্রতিনিধি সমর সেনের ভাষণ’ রয়েছে। বুঝার সুবিধার্থে দলিলটির শুরুর অংশ দেখে নিনঃ

 

 

 

  • দলিলে যেসব বানান ভুল আমরা খুঁজে পেয়েছি, সেগুলোকে হলুদ মার্ক করা হয়েছে।

 

 

  • মনে করুন, আপনি ইন্দিরা গান্ধীর বক্তব্য নিয়ে কিছু একটা লিখতে চাইছেন। এই ফাইলে ইন্দিরা গান্ধীর বক্তব্য লিখে সার্চ দিলেই ১২তম খণ্ডের সেই সংক্রান্ত সকল দলিল পেয়ে যাবেন। ফলে রেফারেন্স নিয়ে লিখতে আপনার খুবই সুবিধা হবে। কারণ আমাদের মূল উদ্দেশ্য একটাই। আমরা যেন সঠিক ইতিহাস চর্চা করে বেড়ে ওঠা একটি প্রজন্ম হয়ে উঠি। এটা আমাদের নিজেদের জন্যেই অত্যন্ত প্রয়োজন। যে জাতি নিজের জন্মের ইতিহাস জানে না, সে জাতির চেয়ে দুর্বল সত্ত্বা পৃথিবীতে আর কিছু নেই।

 

  • মনে করুন, আপনি কোন এলাকা নিয়ে জানতে চান। তবে ঐ এলাকার নাম লিখে এই ডকুমেন্টে সার্চ করুন। উদাহরণস্বরূপ, আপনি ঢাকা শহরের সংঘটিত যুদ্ধ সম্পর্কে জানতে চাইলে Ctrl+F চেপে ‘ঢাকা’ লিখে সার্চ করুন। ১২তম খণ্ডে রক্ষিত ‘ঢাকা’ নিয়ে সকল দলিল আপনার সামনে চলে আসবে। দেশকে জানার প্রথম শর্তই হলো নিজের এলাকাকে জানা।

 

  • অনুবাদ করা অংশে আলাদা করে অনুবাদ লিখে দেয়া আছে।

 

  • আমাদের এই ১২তম খণ্ডে যারা কাজ করেছেন তারা এক একজন এক এক ধরনের অপারেটিং সিস্টেম বা একই অপারেটিং সিস্টেম/সফটওয়ারের বিভিন্ন ভার্শনে কাজ করেছেন। যার কারণে ভিতরের টেক্সট মাঝে মাঝে এলোমেলো দেখা যেতে পারে। সেরকম কিছু হলে দয়া করে বিচলিত হবেন না। যে অংশটুকু এলোমেলো দেখাচ্ছে সে অংশটুকু কপি বা কাট করে নিয়ে “নোটপ্যাডে” পেস্ট করুন। দেখবেন ঠিক হয়ে গেছে। এরপর সেটাকে চাইলে কপি করে ওয়ার্ড ফাইলটিতে পেস্ট করে রাখতে পারেন।

 

 

মনোযোগ দিয়ে সারসংক্ষেপটি পড়ার জন্য ধন্যবাদ। এবার বিস্তারিত।

 

 

দলিল প্রসঙ্গঃ

বিদেশী প্রতিক্রিয়াভারত

(পৃষ্ঠা নাম্বারগুলো মূল দলিলের পৃষ্ঠা নাম্বার অনুসারে সরাসরি লিখিত। এর সাথে এই ওয়ার্ড ফাইলের পৃষ্ঠা নাম্বার রিলেটেড নয়)

 

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন ভারতের সরকারী ও বেসরকারি প্রতিক্রিয়া এবং ভূমিকা সম্পর্কিত দলিলপত্র বর্তমান খণ্ডে সন্নিবেশিত হয়েছে। ‘বাংলাদেশ প্রশ্নে ভারতের সরকারী প্রতিক্রিয়া’, ‘বাংলাদেশ প্রশ্নে ভারতের বিভিন্ন রাজ্য সরকার ও বিধানসভা সমূহ’, ‘বাংলাদেশ প্রশ্নে ভারতের বেসরকারি প্রতিক্রিয়া’, ‘ভারতীয় রাজ্যসভায় বাংলাদেশ প্রসঙ্গ’ এবং ‘ভারতীয় লোকসভায় বাংলাদেশ প্রসঙ্গ’- এই ৫ টি শিরোনামে দলিলসমূহকে বিন্যাস করা হয়েছে।

 

বাংলাদেশে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর হত্যাযজ্ঞ শুরু হবার পর দিন ২৬ মার্চ ভারতের লোকসভায় প্রসঙ্গটি আলোচিত হয়। ৩১ মার্চ ভারতের রাজ্য ও লোকসভার যৌথ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী উত্থাপিত এক প্রস্তাব গ্রহণের মধ্য দিয়ে পাকিস্তান সরকারের তীব্র নিন্দা এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন করা হয়। ২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পন পর্যন্ত ৯ মাসের বিভিন্ন সময়ে দেশে ও বিদেশের প্রধানমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রীসহ সরকারী নেত্রীবৃন্দের উল্লেখযোগ্য বক্তৃতা, বিবৃতি ও সাক্ষাৎকারসমূহ এই খণ্ডে সন্নিবেশিত হয়েছে। যুদ্ধ চলাকালীন বিভিন্ন সময়ে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বিদেশ সফরকালে এবং সোভিয়েত ইউনিয়নসহ কয়েকটি দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীবর্গের ভারত সফরকালে প্রকাশিত যুক্ত ইশতেহার ও বিবৃতিসমূহ বর্তমান খণ্ডে সংকলিত হয়েছে। ১৬ থেকে ২০ অক্টোবর পর্যন্ত যুগোস্লাভিয়ার প্রেসিডেন্ট মার্শাল টিটোর ভারত সফর ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ (পৃষ্ঠাঃ ১০০- ১০৩)। ২৩ অক্টোবর থেকে নভেম্বর পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও ফ্রান্সসহ পাশ্চাত্যের কয়েকটি দেশে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সফরকালে প্রকাশিত যুক্ত ইশতেহার, বিবৃতি, সাক্ষাৎকার ও বিভিন্ন সমাবেশে তাঁর ভাষণসমূহও এখানে উদ্ধৃত হয়েছে। পরিস্থিতির ব্যাখ্যা করে ১৫ নভেম্বর ভারতের প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে লিখিত চিঠিটি এই খণ্ডে মুদ্রিত হয়েছে।

 

সরকারিভাবে ১৯৭১-এর ৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়া হলেও স্বীকৃতির দাবী উত্থাপিত ও আলোচিত হয়ে আসছিল প্রথম দিক থেকেই। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় স্বীকৃতির সর্বসম্মত প্রস্তাব গৃহীত হয় ৮ মে (পৃষ্ঠা ২৩০ থেকে ২৮১)। রাজ্যসভায় দাবীটি উত্থাপিত হয় ৫ মে (পৃষ্ঠা ৫৩৩ থেকে ৫৩৭)। এছাড়া শরনার্থী সমস্যা, পাকিস্তানকে দেয়া মার্কিন অস্ত্র, চীনের সমর্থন, সীমান্ত পরিস্থিতি এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্যসহ বাংলাদেশ সংক্রান্ত সকল প্রশ্নেই রাজ্যসভা ও লোকসভার কার্যবিবরণী এই খণ্ডে সন্নিবেশিত হয়েছে।

 

সরকার এবং পার্লামেন্টের বাইরে বাংলাদেশের সমর্থনে গড়ে ওঠা সকল শ্রেণীর জনগণের আন্দোলন ও তৎপরতার চিত্র মিলবে গ্রন্থের বিভিন্ন দলিলপত্র ও সংবাদপত্রের প্রতিবেদন থেকে। ‘সংগ্রামী স্বাধীন বাংলাদেশ সহায়ক সমিতি’, ‘কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ সহায়ক সমিতি’, ‘বাংলাদেশ সহায়ক শিল্পী সাহিত্যিক বুদ্ধিজীবী সমিতি’, ‘ইয়োথ ফর বাংলাদেশ’সহ বিভিন্ন সংস্থার তৎপরতা সম্পর্কিত দলিলপত্র এই খণ্ডে মুদ্রিত হয়েছে। এই সময়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল ১৮ সেপ্টেম্বর থেকে দিল্লীতে অনুষ্ঠিত ৩ দিনব্যাপী বাংলাদেশ প্রশ্নে আন্তর্জাতিক সম্মেলন (পৃষ্ঠা ৪৬৫-৪৭৯) এই সম্মেলনে বাংলাদেশের সমর্থনে সশস্ত্র বিশ্ববাহিনী গঠনের প্রস্তাব গৃহীত হয়েছিল (পৃষ্ঠা ৪৬৯-৭০)। এছাড়া ক্ষমতাসীন ও বিরোধী প্রতিটি রাজনৈতিক দল, শ্রমিক ও ছাত্র সংগঠনেরই বাংলাদেশ প্রশ্নে প্রস্তাব, বিবৃতি ও তৎপরতা সংক্রান্ত তথ্যসমূহ এ খণ্ডে সন্নিবেশিত হয়েছে। ভারতীয় সংবাদপত্রসমূহের ভূমিকারও উল্লেখ রয়েছে এই গ্রন্থে।

 

এই খণ্ডের দলিলপত্রসমূহের সূত্র হিসেবে ভারত সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ ডকুমেন্টস’ ১ম ও ২য় খণ্ড, ভারতের তথ্য ও বেতার মন্ত্রণালয় প্রকাশিত ‘ইয়ার্স অব এন্ডেভার’, লোকসভা ও রাজ্যসভার কার্যবিবরণী, পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার কার্যবিবরণী, বিভিন্ন সংগঠনের মূল দলিল, পুস্তিকা ও প্রচারপত্র এবং বিশেষতঃ ভারতের বিভিন্ন সংবাদপত্রের প্রতিবেদনসমূহ ব্যবহৃত হয়েছে। রাজ্য ও লোকসভায় সদস্যপদের ভাষণে ইংরেজি ছাড়া ব্যবহৃত হিন্দিসহ অন্যান্য ভাষা অনুবাদ করে বাংলায় মুদ্রণ করা হয়েছে। কতিপয় স্থলে কার্যবিবরণী কম গুরুত্বপূর্ণ ও অসংশ্লিষ্ট অংশ বাদ দেয়া বা সম্পাদনা করা হয়েছে।

 

 

 

 

 

সূচিপত্র

 

ক্রমিক বিষয় পৃষ্ঠা কম্পাইলার / ট্রান্সলেটর
বাংলাদেশের ওপর পাকিস্তানী সৈন্যের আক্রমণের উদ্যেগ প্রকাশ করে ভারতের লোকসভার প্রস্তাব 1
Razibul Bari Palash
পাকিস্তানের নৃশংসতার প্রশ্নে রাষ্ট্রসংঘের নির্লিপ্তির সমালোচনা করে প্রেরিত ভারতের লিপি
Aparajita Neel
ইয়াহিয়ার প্রতি চিনের প্রকাশ্য সমর্থন ভারতকে নিরস্ত্র করবেনা – প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা
Razibul Bari Palash
সীমান্তে হামলার ব্যাপারে পাকিস্তানের প্রতি ভারতের হুশিয়ারি Aparajita Neel
পাকিস্তানের অপপ্রচারের বিরুদ্ধে ভারতের প্রতিবাদ ৫-৬ Aparajita Neel
পাকিস্তানের আক্রমণ বরদাস্ত করা হবেনা – প্রতিরক্ষামন্ত্রীর ঘোষণা Aparajita Neel
ভারতের মাটিতে গোলা নিক্ষেপের জন্য পাকিস্তানের প্রতি ভারতের সতর্কবানি Aparajita Neel
সীমা ছাড়ালে গুরুতর পরিণতি হবে – পাকিস্তানকে ভারতের হুশিয়ারি Aparajita Neel
পাকিস্তানের ঘটনা প্রবাহ শেষ পর্যন্ত ভারতের উপর চাপ সৃষ্টি করবে – প্রধানমন্ত্রীর সতর্কবানি ১০ Razibul Bari Palash
১০ এখনই ভারতের স্বীকৃতি বাংলাদেশের সার্থের অনুকূল হবেনা – বিরোধী নেত্রীবৃন্দের সাথে আলোচনাকালে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য ১১-১২ রায়হান হোসেন রানা
১১ জাতিসঙ্ঘের সোশ্যাল কমিটি অব দি ইকোনমিক এন্ড সোশ্যাল কাউন্সিল এ ভারতের স্থায়ী প্রতিনিধি সমর সেনের ভাষণ ১৩-১৮ Razibul Bari Palash
১২ বাংলাদেশের আন্দোলনকে সমর্থনের জন্য বিশ্ব শান্তি কংগ্রেসের প্রতিনিধিদের প্রতি প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধির আহবান ১৯ Aparajita Neel
১৩ বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম সফল হবে – প্রধানমন্ত্রীর আশা প্রকাশ ২০ Razibul Bari Palash
১৪ যথাসময়ে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়া হবে – প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক শরনার্থি সমস্যার ওপর গুরুত্ব আরোপ ২১-২৪ Razibul Bari Palash
১৫ যেকোনো পরিণতির জন্য ভারত প্রস্তুত – পাকিস্তানের প্রতি প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধির সতর্কবানি ২৫ Razibul Bari Palash
১৬ শরনার্থিদের প্রত্যাবর্তনের জন্য বিশ্বকে নিশ্চয়তা দিতে হবে – প্রতিরক্ষামন্ত্রীর মন্তব্য ২৬ Razibul Bari Palash
১৭ বাংলাদেশের জনগণকে ভারত সাহায্য দিয়ে যাবে – প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা ২৮ Aparajita Neel
১৮ পাকিস্তানের ওপর প্রভাব খাটানর আহবান জানিয়ে প্রেসিডেন্ট সাদাতের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর চিঠি ২৯ Razibul Bari Palash
১৯ বাংলাদেশ পরিস্থিতির মোকাবেলা করা হবে – কোলকাতায় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধির হুশিয়ারি ৩০-৩১ Aparajita Neel
২০ বাংলাদেশের রাজনৈতিক সমাধান প্রয়োজন – ওয়াশিংটনের ন্যাশনাল প্রেস ক্লাবে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সরদার শরণ সিং এর ভাষণ ৩২-৪১ Razibul Bari Palash
২১ সম্পাদকদের সাথে বৈঠককালে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধির ঘোষণা ৪৪ Razibul Bari Palash
২২ বাংলাদেশ প্রশ্নে ভারতের ভূমিকা বিশ্বে প্রশংসিত হচ্ছে – প্রধানমন্ত্রীর সাথে আলোচনাকালে শিল্প মন্ত্রীর অভিজ্ঞতার বর্ননা ৪৫-৪৬ Razibul Bari Palash
২৩ বাংলাদেশের প্রশ্নে যে কোন শীর্ষ সম্মেলনের আগে অবশ্যই হত্যাকাণ্ড এবং নির্যাতন বন্ধ করতে হবে বলে শ্রীনগরে সাংবাদিক সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা ৪৭-৪৮ Razibul Bari Palash
২৪ পাকিস্তান যুদ্ধ চাপানোর চেষ্টা করছে – প্রতিরক্ষামন্ত্রীর মন্তব্য ৪৯ Aparajita Neel
২৫ পাকিস্তানকে সাহায্য বন্ধের প্রশ্নটি কয়েকটি দেশ বিবেচনা করছে বলে লন্ডনে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বিবৃতি ৫০-৫১ Abu Jafar Apu
২৬ জার্মান গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রে ভারত সরকারের বিশেষ প্রতিনিধি ড করন সিং এর সফর শেষে প্রকাশিত ইন্দো জি ডি আর যুক্ত বিবৃতি ৫২-৫৩ Razibul Bari Palash
২৭ বাংলাদেশের জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য সমাধানই সংকট নিরসনের একমাত্র পথ – পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বিবৃতি ৫৪-৫৫ Razibul Bari Palash
২৮ বাংলাদেশ প্রশ্নে কোন হঠকারী নীতি নয় – প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা ৫৬ Aparajita Neel
২৯ জাতিসঙ্ঘের ইকোনমিক এন্ড সোশ্যাল কাউন্সিলে ভারতীয় পর্যবেক্ষক প্রতিনিধিদলের নেতা এন কৃষ্ণের ভাষণ ৫৭ Razibul Bari Palash
৩০ প্রতিরক্ষা বাহিনীকে প্রস্তুত থাকতে হবে – প্রতিরক্ষামন্ত্রীর বক্তৃতা ৫৮ Razibul Bari Palash
৩১ জাতিসঙ্ঘের মহাসচিবের সহকারীকে প্রদত্ত ভারতের জবাব ৫৯-৬২ Razibul Bari Palash
৩২ ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে স্বাক্ষরিত ২০ বছর মেয়াদি শান্তি বন্ধুত্ব ও সহযোগিতা চুক্তির বিস্তারিত বিবরণ ৬৩-৬৫ Razibul Bari Palash
৩৩ নয়াদিল্লীর ইন্ডিয়া গেঁটে অনুষ্ঠিত জনসভায় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধির ভাষণ ৬৬-৬৮ Razibul Bari Palash
৩৪ শেখ মুজিবের বিচারের ব্যাপারে পাকিস্তানের ওপর প্রভাব খাটানোর আবেদন জানিয়ে রাষ্ট্রপ্রধানদের কাছে প্রেরিত প্রধানমন্ত্রীর বার্তা ৬৯ Razibul Bari Palash
৩৫ শেখ মুজিবের বিচার হবে – ঘোষণায় উদ্বেক প্রকাশ করে জাতিসঙ্ঘের মহাসচিবের প্রতি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বার্তা ৭০ Razibul Bari Palash
৩৬ ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফর শেষে প্রকাশিত ভারত ইন্দোনেশিয়া যুক্ত ইশতেহার ৭১-৭৩ Razibul Bari Palash
৩৭ বিশ্ব শান্তি পরিষদের মহাসচিবের সাথে প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাতকার ৭৪-৭৬ Razibul Bari Palash
৩৮ নেপালে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফর শেষে প্রকাশিত ইন্দোনেপাল যুক্ত ইশতেহার ৭৭ Razibul Bari Palash
৩৯ বাংলাদেশ প্রশ্নে নিরপেক্ষ দেশগুলির প্রতি ভূমিকা গ্রহণের আহবান – রাষ্ট্রসংঘে পররাষ্ট্র সচিবের বিবৃতি ৭৮-৮০ Aparajita Neel
৪০ পাকিস্তানের যুদ্ধের হুমকির পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর বিবৃতি ৮১ Razibul Bari Palash
৪১ মস্কো বিশ্ব বিদ্যালয়ে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধির ভাষণের সারাংশ ৮২ Razibul Bari Palash
৪২ বাংলাদেশ প্রশ্নে পাকিস্তানের সাথে কোন আলোচনা হবেনা – জাতিসঙ্ঘে ভারতের স্থায়ী প্রতিনিধির ঘোষণা ৮৩ Razibul Bari Palash
৪৩ সিমলায়অনুষ্ঠিতসর্বভারতকংগ্রেসকমিটিরঅধিবেশনেপররাষ্ট্রমন্ত্রীরভাষণ ৮৪-৯১ Razibul Bari Palash
৪৪ পাকিস্তান যুদ্ধ বাধালে ভারতের সৈন্যরা দখল করা পাকিস্তানী এলাকা ছাড়বে না – প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা ৯২-৯৩ Aparajita Neel
৪৫ নিউইয়র্ক টাইমস এর প্রতিনিধি সিডনি এইচ শ্যানবার্গের সাথে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধির সাক্ষাতকার ৯৪-৯৬ Razibul Bari Palash
৪৬ সীমান্তের পরিস্থিতি মারাত্মক, ভারত তথাপি যুদ্ধ এড়াতে চায় – সাংবাদিক সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ ৯৭ – ৯৯ Razibul Bari Palash
৪৭ প্রেসিডেন্ট টিটোর ভারত সফর শেষে প্রকাশিত ভারত- যুগোস্লাভ যুক্ত ইশতেহার ১০০ – ১০৩ Razibul Bari Palash
৪৮ পাল্টা আঘাত হানতে ২ মিনিটের বেশী লাগবেনা – প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও রাষ্ট্রমন্ত্রীর ঘোষণা ১০৪ Aparajita Neel
৪৯ প্ররোচনার মুখে ভারতের সংযমকে দুর্বলতা মনে করলে পাকিস্তান মারাত্মক পরিণতির মুখে পড়বে – রাষ্ট্রপতির সতর্কবানি ১০৫ Aparajita Neel
৫০ কয়েকটি রাষ্ট্র সফরে যাওয়ার প্রাক্বালে দেশবাসীর উদ্যেশ্যে প্রধানমন্ত্রীর বেতার ভাষণ ১০৬ Razibul Bari Palash
৫১ জাতিসঙ্ঘ দিবসে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তৃতা ১০৭ Razibul Bari Palash
৫২ ব্রাসেলসে রয়্যাল ইন্সটিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল এফেয়ার্স এ প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধির ভাষণ ১০৮ Razibul Bari Palash
৫৩ যুদ্ধের হুমকি থাকলে সীমান্তে সৈন্যও থাকবে – প্রতিরক্ষামন্ত্রীর ঘোষণা ১০৯ Aparajita Neel
৫৪ পশ্চিম জার্মান টেলিভিশনে প্রচারিত প্রতিরক্ষামন্ত্রী জগজিবন রামের সাক্ষাতকার ১১০ – ১১১ Razibul Bari Palash
৫৫ অস্ট্রীয় বেতারে প্রচারিত প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাতকার ১১২ – ১১৩ Razibul Bari Palash
৫৬ ভিয়েনায় রাষ্ট্রীয় ভোজসভায় প্রদত্ত প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের সারাংশ ১১৪ Razibul Bari Palash
৫৭ ভিয়েনায় অস্ট্রিয়ান সোসাইটি ফর ফরেন পলিসি এন্ড ইন্টারন্যাশনাল রিলেশন্স এ প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতার সারাংশ ১১৫ Razibul Bari Palash
৫৮ যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়া হলে অবস্থার মোকাবিলায় ভারত প্রস্তুত – অর্থমন্ত্রি চ্যাবনের মন্তব্য ১১৭ – ১১৮ Aparajita Neel
৫৯ লন্ডনস্থ ইন্ডিয়া লীগ এ প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের সারাংশ ১১৯ Razibul Bari Palash
৬০ বিবিসিতে প্রচারিত মার্ক টালির সাথে প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাতকার ১২৪ – ১৩৩ Razibul Bari Palash
৬১ ওয়াশিংটন এ প্রেসিডেন্ট নিক্সন প্রদত্ত ভোজসভায় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধির ভাষণ ১৩৪ – ১৩৭
Zulkar Nain &
Ibrahim Razu
৬২ ওয়াশিংটনে ন্যাশনাল প্রেসক্লাবে প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতা ও প্রশ্নোত্তর ১৩৮-১৪৭ Razibul Bari Palash
৬৩ যুক্তরাষ্ট্রের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রদত্ত প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধির বক্তৃতা ১৪৮- ১৫১
Zulkar Nain

৬৪

 

যুক্তরাষ্ট্রের এন বি সি টেলিভিশনের মিট দ্যা প্রেস অনুষ্ঠানে প্রচারিত প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধির সাক্ষাতকার ১৫২-১৫৮ Shuvadittya Saha
৬৫ প্যারিসে রাষ্ট্রীয় ভোজ সভায় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধির ভাষণ ১৫৯-১৬০
Nusrat Jahan Ima

৬৬

 

বিশ্ব এখন বাংলাদেশ সংকট সম্পর্কে আগের চাইতে বেশী সচেতন – বিদেশ সফর শেষে ডিলিটে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর মন্তব্য ১৬১- ১৬২
Zulkar Nain
৬৭ নিউজ উইকের সাথে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সাক্ষাতকার ১৬৩-১৬৪ Nusrat Jahan Ima
৬৮ বনন্থ বিথোভেন হলে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর ভাষণ ১৬৫-১৭২ Nusrat Jahan Ima
৬৯ আত্মরক্ষার প্রয়োজনে ভারতীয় সেনাবাহিনী সীমান্ত অতিক্রম করবে – সরকারী মুখপাত্রের ঘোষণা ১৭৩-১৭৪
Vincent Biswas
৭০ মুজিবকে মুক্তি দিয়ে রাজনৈতিক সমাধানের পথে আসার জন্যে ইয়াহিয়ার প্রতি প্রধানমন্ত্রীর আহবান ১৭৫ Aparajita Neel
৭১ আমরা আমাদের জাতীয় সার্থে যা ভালো তাই করব – দিল্লীতে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর ঘোষণা ১৭৬- ১৭৭
Fakhruzzaman Sayam
৭২ কোলকাতার জনসভায় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর বক্তৃতা ১৭৮-১৮১
Farjana Akter Munia
৭৩ যুদ্ধ চলাকালে ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীসমূহের উদ্যেশ্যে আকাশবাণী বেতারে প্রচারিত প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর বানী ১৮২ Aparajita Neel
৭৪ দিল্লী বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর ভাষণ ১৮৩ – ১৯৬ Razibul Bari Palash
৭৫ নিউইয়র্ক টাইমস এর সাথে পররাষ্ট্রমন্ত্রী শরণ সিংহের সাক্ষাতকার ১৯৭ – ১৯৮ Fakhruzzaman Sayam
৭৬ যুক্তরাষ্ট্রের এন বি সি টেলিভিশনের সাথে পররাষ্ট্রমন্ত্রী শরণ সিং এর সাক্ষাতকার ১৯৯ Fakhruzzaman Sayam
৭৭ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নিক্সনের প্রতি প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর চিঠি ২০০ -২০২ Raisa Sabila
৭৮ যুক্তরাষ্ট্রের সিবিএস টেলিভিশনের সাথে পররাষ্ট্রমন্ত্রী শরণ সিং এর সাক্ষাতকার ২০৩ – ২০৫ Raisa Sabila
৭৯ জাতিসঙ্ঘে পররাষ্ট্রমন্ত্রী শরণ সিং এর সাংবাদিক সম্মেলন ২০৬ – ২১০

Rajib Chowdhury

&

Bijoya Chowdhury

৮০

 

লেট পাকিস্তান স্পিক ফর হারসেলফ ২২১-২১৮

Rajib Chowdhury

Bijoya Chowdhury

২১৯- ২২২
Niaz Mehedi
৮১ বাংলাদেশের প্রশ্নে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যসভা ও বিধান সভা প্রতিক্রিয়া ২২৩
Aadrita Mahzabeen
৮২ বাংলাদেশকে আশু স্বীকৃতি দানের জন্য পশ্চিম বঙ্গ মন্ত্রীসভার সদস্যের আহবান ২২৪- ২২৫ Shuvadittya Saha
৮৩ কলকাতায় বুদ্ধিজীবী সমাবেশে বাংলাদেশের সমর্থনে পশ্চিমবঙ্গের ৫ জন মন্ত্রী ২২৬
Aadrita Mahzabeen
৮৪ বাংলাদেশের সরনার্থিদের সাহায্যে সকল রাজ্যকে এগিয়ে আসার জন্য পশ্চিমবঙ্গ সরকারের আহবান ২২৭-২২৮ Prodip Mitra
৮৫ শরনার্থি আশ্রয়ের প্রশ্নে পশ্চিমবঙ্গ বিধান সভায় রাজ্যপালের ভাষণ ২২৯
Aparajita Neel
৮৬ বাংলাদেশকে অস্ত্রসহ সকল প্রকার সাহায্য দানের দাবির প্রশ্নে পশ্চিমবঙ্গ সরকার ও বিরোধী নেতাদের ঐক্যমত্য ২৩০ Masroor Ahmed Makib
৮৭

পশ্চিমবঙ্গ বিধান সভায় সর্বসম্মত প্রস্তাব – ‘বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিন’

 

২৩১-২৪১
Shahriar Faruk
২৪২ – ২৫১
তাজমুল আখতার
২৫২- ২৫৮
মোঃ কাওছার আহমদ
২৫৯- ২৬১
তানভীর আহমেদ নোভেল
২৬২-২৭১
Rashed Islam
২৭২-২৮২
Minhaz Uddin
৮৮ বুদ্ধিজীবীদের উদ্যোগে সংগ্রামী স্বাধীন বাংলাদেশ সহায়ক সমিতি গঠিত ২৮৩ দীপংকর ঘোষ দ্বীপ
৮৯ পূর্বাঞ্চলের ৫ জন মুখ্যমন্ত্রীর আহবান – শরনার্থি প্রশ্নকে জাতীয় সমস্যা হিসেবে গণ্য করা হোক ২৮৪ – ২৮৫ দীপংকর ঘোষ দ্বীপ
৯০ শরনার্থি সমস্যা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সাথে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর আলোচনা ২৮৬ দীপংকর ঘোষ দ্বীপ
৯১ শরনার্থিদের পশ্চিমবঙ্গের বাইরে পাঠানোর জন্য কেন্দ্রের প্রতি মন্ত্রীসভার দাবি ২৮৭ – ২৮৮ দীপংকর ঘোষ দ্বীপ
৯২ সীমান্ত পরিস্থিতি এবং অসামরিক প্রতিরক্ষা ব্যাবস্থার প্রশ্নে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকের ওপর প্রতিবেদন ২৮৯

দীপংকর ঘোষ দ্বীপ

 

৯৩ শরনার্থির সাথে পাকিস্তানী দুষ্কৃতিকারীরা ভারতে অনুপ্রবেশ করেছে বলে আসামের অর্থমন্ত্রির উক্তি ২৯০ Prodip Mitra
৯৪ শরনার্থীদের ভেতরে বাংলাদেশ বিরোধীদের তৎপরতা চলছে বলে আসামের মন্ত্রীর বিবৃতি ২৯১ Prodip Mitra
৯৫ উড়িষ্যার বাংলাদেশের শরনার্থিদের আশ্রয়দান প্রসঙ্গে রাজনৈতিক নেত্রীবৃন্দের সাথে মুখ্যমন্ত্রীর আলোচনা ২৯২ Prodip Mitra
৯৬ উড়িষ্যার বাংলাদেশের শরনার্থিদের আশ্রয়দান প্রসঙ্গে রাজ্য সরকারের অভিমত ২৯৩ Prodip Mitra
৯৭ পাকিস্তানের দুষ্কৃতিকারীরা আসামে ধ্বংসাত্মক তৎপরতা চালাচ্ছে বলে প্রধানমন্ত্রীর কাছে মুখ্যমন্ত্রীর রিপোর্ট ২৯৪-২৯৫ Prodip Mitra
৯৮ বাংলাদেশে পাক সেনাদের হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে পশ্চিমবঙ্গে সভা ও মিছিল ২৯৬ Vincent Biswas
৯৯ বাংলাদেশে গণহত্যার প্রতিবাদে পশ্চিমবঙ্গের লেখক ও বুদ্ধিজীবীদের বিবৃতি ২৯৭ Vincent Biswas
১০০ বাংলাদেশের ঘটনাবলিতে ভারতের বিভিন্ন মহলের প্রতিক্রিয়া ২৯৮- ৩০০ নীলাঞ্জনা অদিতি
১০১ বাংলাদেশে হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে কোলকাতায় নাগরিক সমাবেশ ৩০১ নীলাঞ্জনা অদিতি
১০২ কোলকাতায় মার্ক্সবাদি কমিউনিস্ট পার্টির জনসমাবেশে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদানের দাবি ৩০২ – ৩০৩ নীলাঞ্জনা অদিতি
১০৩ সারা বিশ্বের প্রতি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানোর আহবান জানিয়ে গৃহীত শাসক কংগ্রেস নির্বাহি পরিষদের প্রস্তাব ৩০৪ – ৩০৫
Niaz Mehedi
১০৪ বাংলাদেশে গণহত্যার প্রতিবাদে কলকাতায় ডাক্তারদের মিছিল ৩০৬ দীপংকর ঘোষ দ্বীপ
১০৫ বাংলাদেশের সমর্থনে সারা পশ্চিম বঙ্গে হরতাল পালিত ৩০৭-৩০৯ দীপংকর ঘোষ দ্বীপ
১০৬ স্বীকৃতি দানের আহবান জানিয়ে প্রকাশিত সম্পাদকীয় – অবিলম্বে স্বীকৃতি দিন ৩১০-৩১১ দীপংকর ঘোষ দ্বীপ
১০৭ পশ্চিম বঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বে বাংলাদেশের সাহায্যে মুক্তি সংগ্রাম সহায়ক সমিতি গঠিত ৩১২-৩১৩ দীপংকর ঘোষ দ্বীপ
১০৮ সাহায্যের আহবান জানিয়ে শিল্পী সাহিত্যিক বুদ্ধিজীবী সমিতির বিবৃতি ৩১৪-৩১৫ দীপংকর ঘোষ দ্বীপ
১০৯ বাংলাদেশে গণহত্যার পড়োটোবাডে কোলকাতায় অধ্যাপকদের বিক্ষোভ মিছিল ৩১৬ দীপংকর ঘোষ দ্বীপ
১১০ কোলকাতায় ছাত্র যুবকদের বিক্ষোভ মিছিল ৩১৭ দীপংকর ঘোষ দ্বীপ
১১১ বাংলাদেশের স্বীকৃতির প্রশ্ন – ভারত সরকারের এত দ্বিধা, এত ভয় কেন? বিবেকানন্দ মুখোপাধ্যায় লিখিত নিবন্ধ ৩১৮-৩২০ দীপংকর ঘোষ দ্বীপ
১১২ বাংলাদেশের সমর্থনে ডিলিটে সর্বভারতীয় সাহায্য সংস্থা গঠিত ৩২১ – ৩২২

Jayanta Sen Abir

 

১১৩ রাষ্ট্রসংঘ থেকে পাকিস্তানকে বহিষ্কারের দাবি জানিয়ে বাংলাদেশ সহায়ক শিল্পী সাহিত্যিক বুদ্ধিজীবী সমিতির প্রস্তাব ৩২৩ – ৩২৪ Jayanta Sen Abir
১১৪ পাকিস্তানী নৃশংসতার বিরুদ্ধে কোলকাতার শিখ সম্প্রদায়ের প্রতিবাদ ৩২৫ Saiful Arefin Borshon
১১৫ বাংলাদেশ তহবিলে সাহায্য দানের জন্য ক্ষুদ্র শিল্প সমিতির আহবান ৩২৬ Saiful Arefin Borshon
১১৬ মসজিদের উপর বোমাবর্ষনের প্রতিবাদে পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম সম্প্রদায় ৩২৭ Saiful Arefin Borshon
১১৭ শরনার্থিদের সাহায্যের জন্য বুদ্ধিজীবীদের আবেদন ৩২৮ Ashik Uz Zaman
১১৮ বাংলাদেশকে স্বীকৃতির জন্য ভারতের মুসলিম বুদ্ধিজীবীদের আহবান ৩২৯ -৩৩০ Ashik Uz Zaman
১১৯ বোম্বেতে বাংলাদেশ সহায়ক সমিতি গঠিত ৩৩১ Fakhruzzaman Sayam
১২০ ইয়াহিয়া খানের বর্বরতার বিরুদ্ধে ভারতের মুসলিম নেতাদের বিবৃতি ৩৩২ Fakhruzzaman Sayam
১২১ গান্ধি শান্তি ফাউন্ডেশন কর্তৃক বাংলাদেশের সমর্থনে রাষ্ট্রসংঘ ও বিভিন্ন দেশে প্রতিনিধিদল পাঠানোর সিদ্ধান্ত ৩৩৩ Fakhruzzaman Sayam
১২২ পাকসেনাদের নৃশংসতার বিরুদ্ধে কোলকাতার মুসলমান সমাজের প্রস্তাব ৩৩৪ Saiful Arefin Borshon
১২৩ বাংলাদেশের প্রশ্নে আচার্য বিনোবার সাক্ষাতকার – ডেমোক্র্যাসি এন্ড মিলিটারিজম আর ইনকম্পিটিবল

৩৩৫ –

৩৩৭

Ashik Uz Zaman
১২৪ সকল দেশের প্রতি ভারত- বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ সোসাইটির আহবান ৩৩৮-৩৩৯ Saiful Arefin Borshon
১২৫ বাংলাদেশ জাতীয় সমন্বয় কমিটির সমাবেশে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দানের দাবি ৩৪০ Sharfuddin Bulbul
১২৬ বাংলাদেশে দুর্দশাগ্রস্ত মানুষের সাহায্যে এগিয়ে আসার জন্য ভারতের ৪৪ জন অধ্যাপক, লেখক ও বুদ্ধিজীবীর আবেদন ৩৪২ – ৩৪৪ Rafiqul Islam Shawon
১২৭ রাষ্ট্রসংঘ মহাসচিবের প্রতি পশ্চিমবঙ্গের বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের আবেদন ৩৪৫ – ৩৪৬
Russell Rahman
১২৮ বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রশ্ন ‘বাংলাদেশ’ প্রব্লেমস অব রিকগনিশন – বি এল শর্মার পর্যালোচনা ৩৪৭ – ৩৪৯ Masroor Ahmed Makib
১২৯ বিরোধী নেতাদের সাথে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক – বাংলাদেশকে আশু স্বীকৃতি দানের সম্ভবনা নেই ৩৫০ – ৩৫১ Masroor Ahmed Makib
১৩০ বাংলাদেশ দি ট্রুথ ৩৫২ – ৩৬৬ Razibul Bari Palash
১৩১ ঈদ ই মিলাদুন্নবির সমাবেশে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দানের দাবি ৩৬৭ Sharfuddin Bulbul
১৩২ বাংলাদেশ স্বীকৃতির প্রশ্নে আনন্দবাজার পত্রিকার সম্পাদকীয় ৩৬৯ Sharfuddin Bulbul
১৩৩ গান্ধি শান্তি ফাউন্ডেশনের সভায় বাংলাদেশ প্রশ্নে জয় প্রকাশ নারায়ণের ভাষণ ৩৭১- ৩৭২ Masroor Ahmed Makib
১৩৪ বাংলাদেশকে স্বীকৃতির প্রশ্নে ভারতের বিশিষ্ট আইনজ্ঞ ও শিক্ষাবিদের অভিমত অবিলম্বে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়া উচিৎ ৩৭৩

Sharfuddin Bulbul

 

১৩৫ কায়রোতে সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবীদের সমাবেশে জয়প্রকাশ নারায়ণ – দেরী হলে পূর্ব বঙ্গ ভিয়েতনাম হবে ৩৭৪

Sharfuddin Bulbul

 

১৩৬ কোলকাতায় আর্চ বিশপের বিবৃতি – শরনার্থিদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের ব্যাবস্থা করতে হবে ৩৭৫ – ৩৭৬ Rafiqul Islam Shawon
১৩৭ অবিলম্বে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিতে হবে – অধ্যাপক সমর গুহ এমপি র নিবন্ধ ৩৭৭ -৩৮১ Vincent Biswas
১৩৮ বাংলাদেশে অত্যাচার বন্ধ করার জন্য বিশ্ব শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের দাবি ৩৮২ Vincent Biswas
১৩৯ বাংলাদেশকে সহায়তার উদ্যেশ্যে সারা ভারত ট্রেড ইউনিয়ন সংস্থা গঠিত ৩৮৩
Zulkar Nain
১৪০ গেট ওয়ার্ল্ড ইনভল্ভড ইন বাংলাদেশ – ভারতের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী দিনেশ শিং এর নিবন্ধ ৩৮৪ – ৩৮৬ Raisa Sabila
১৪১ জয়প্রকাশ নারায়ণ কর্তৃক বাংলাদেশ প্রশ্নে লন্ডনে বিশ্ব সফরের অভিজ্ঞতা বর্ননা ৩৮৭ – ৩৮৮

Sharfuddin Bulbul

 

১৪২ স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিন – একটি সম্পাদকীয় ৩৮৯ – ৩৯০ Sharfuddin Bulbul
১৪৩ লন্ডনে জয়প্রকাশ নারায়ণ – বাংলাদেশ প্রশ্নে বিষকে সক্রিয় হবার আহবান ৩৯১ Sharfuddin Bulbul
১৪৪ ইয়োথ ফর বাংলাদেশ – এর একটি আবেদন

৩৯২-

৩৯৪

Hasan Tareq Imam
১৪৫ গারো পাহারের কেন্দ্রীয় ত্রাণ সংস্থা কর্তৃক প্রধানমন্ত্রীর কাছে পেশক্রিত স্মারকলিপি ৩৯৫ – ৩৯৬ Hasan Tareq Imam
১৪৬ বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দানের জন্য মি এম সি চাগলার দাবি ৩৯৭ – ৩৯৮ Rafiqul Islam Shawon
১৪৭ শরনার্থিদের দায়িত্ব সকল রাজ্যকেই নিতে হবে বলে কমিউনিস্ট নেতা রাজ্যেশ্বর রাওয়ের মন্তব্য ৩৯৯ Rafiqul Islam Shawon
১৪৮ সারভেন্টস অব ইন্ডিয়া সোসাইটির সভাপতি কর্তৃক রাষ্ট্রসংঘের ভূমিকার সমালোচনা ৪০০ – ৪০১ Rafiqul Islam Shawon
১৪৯ বাংলাদেশ প্রশ্নে পাশ্চাত্যের প্রতি জয়প্রকাশ নারায়ণের আহবান ৪০২ – ৪০৩ Rafiqul Islam Shawon
১৫০ বাংলাদেশকে স্বীকৃতির প্রশ্নে কেন্দ্রীয় সরকারের বিলম্বের সমালোচনা ৪০৪ – ৪০৫ Masroor Ahmed Makib
১৫১ মার্ক্সবাদি কমিউনিস্ট পার্টির অধিবেশনে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদানে কেন্দ্রের বিলম্বের সমালোচনা ৪০৬
Farjana Akter Munia
১৫২ পাকিস্তানের মার্কিন অস্ত্রের বিরুদ্ধে কোলকাতার ইয়থ ফর বাংলাদেশ এর উদ্যোগে বিক্ষোভ মিছিল ৪০৭
তানভীর আহমেদ নোভেল
১৫৩ বাংলাদেশের ওপর দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার নিরাপত্তার প্রশ্ন নির্ভর করছে বলে সিঙ্গাপুরে জয় প্রকাশ ৪০৮-৪০৯ Razibul Bari Palash
১৫৪ ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির প্রস্তাব – বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র ও সামরিক শিক্ষাসহ সর্বপ্রকার সাহায্য দিতে হবে ৪১০
Russell Rahman

 

১৫৫ বাংলাদেশের অনুকূলে জনমত সৃষ্টির উদ্যেশ্যে বিদেশ সফর শেষে সংবাদপত্রে প্রদত্ত জয়প্রকাশ নারায়ণের অভিজ্ঞতা ও বলিষ্ঠ বিবৃতি ৪১২ – ৪১৪ Pallab Das
১৫৬ বাংলাদেশ সম্পর্কে ভারতের সোশ্যালিস্ট ওয়ার্কার্স পার্টির বক্তব্য ৪১৫ -৪১৮
Fakhruzzaman Sayam
১৫৭ বাংলাদেশের সংগ্রামকে সহায়তা করার জন্য সর্ব আসাম বাংলাদেশ সহায়ক সমিতির আহবান ৪১৯ -৪২১
দীপংকর ঘোষ দ্বীপ
১৫৮ ইয়াহিয়ার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য প্রধানমন্ত্রীর প্রতি জয়প্রকাশ নারায়ণের আহবান ৪২২ – ৪২৩ Pallab Das
১৫৯ জনসঙ্ঘের সভাপতি বাজপায়ি কর্তৃক অবিলম্বে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদানের দাবি ৪২৪ Saiful Arefin Borshon
১৬০ বাংলাদেশের স্বীকৃতির প্রশ্নে সবাই একমন, তবু সরকার নীরব কেন? মি সমর গুহ এম পির প্রবন্ধ ৪২৫- ৪২৬
Russell Rahman

 

১৬১ বিহার রাজ্যে বাংলাদেশ সম্মেলন সমিতির জয়প্রকাশ নারায়ণর দাবি – অবিলম্বে বাংলাদেশ সরকারকে স্বীকৃতি দেয়া হোক ৪২৭-৪২৯
Russell Rahman

 

১৬২ সেন্ট্রাল একশন কমিটি অব বাংলাদেশ এর বিবৃতি এবং খসড়া প্রস্তাব ৪৩০-৪৩৪
নীতেশ বড়ুয়া
১৬৩ বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দানের দাবিতে সারা পশ্চিম বঙ্গে সফল ছাত্র ধর্মঘট পালিত ৪৩৫
Russell Rahman
১৬৪ সাবেক সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল কাউল কর্তৃক বাংলাদেশ প্রশ্নে সরকারী নীতির সমালোচনা ৪৩৬-৪৩৭ Raisa Sabila
১৬৫ শেখ মুজিবের মুক্তির দাবিতে কোলকাতায় বিরাট সমাবেশ ৪৩৮- ৪৩৯
Russell Rahman
১৬৬ মুজিবকে রক্ষার জন্য বিশ্বের প্রতি ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির আহবান ৪৪০ নীতেশ বড়ুয়া
১৬৭ মালাদ নাগরিক বাংলাদেশ সহায়ক সমিতির সাধারণ সম্পাদকের রিপোর্ট ৪৪১ – ৪৪৩ নীতেশ বড়ুয়া
১৬৮ ব্লিডিং বাংলাদেশ – কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ সহায়ক সমিতি কর্তৃক প্রকাশিত চিত্র সংকলনে সমিতির সভাপতির বক্তব্য ৪৪৪ নীতেশ বড়ুয়া
১৬৯ মার্ক্সবাদী কমিউনিস্ট পার্টির প্রস্তাব – বাংলাদেশের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে চীনের ভূমিকার সমালোচনা ৪৪৫ Aparajita Neel
১৭০ বাংলাদেশের সমর্থনে পশ্চিমবঙ্গের জমিয়তে উলামার বক্তব্য ৪৪৬ Aparajita Neel
১৭১ এন এপিল টু জেসিস টু মুভ দ্যা পিপল অব দেয়ার ওয়ার্ল্ড-ইন্ডিয়ান জুনিয়র চেম্বারের পুস্তিকা ৪৪৮ – ৪৫৪ নীতেশ বড়ুয়া
১৭২ বাংলাদেশ টাইম এন্ড লজিক রানিং আউট ক্র্যাকশন কমিটি বাংলাদেশের পুস্তিকা ৪৫৫ – ৪৬০ নীতেশ বড়ুয়া
১৭৩ মুজিব নিহত হলে ভারত দায়ী হবে – মিঃ রাজনারায়ণের মন্তব্য ৪৬১ নীতেশ বড়ুয়া
১৭৪ নজরুলের পুত্র কর্তৃক কবিকে দেয়া পাকিস্তান সরকারের ভাতা প্রত্যাখ্যান ৪৬২ নীতেশ বড়ুয়া
১৭৫ গান্ধী শান্তি ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের জন্য স্বাধীনতা অভিযাত্রার আয়োজন করবে ৪৬৩ নীতেশ বড়ুয়া
১৭৬ বিশ্বশান্তি আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ কর্তৃক অবিলম্বে বাংলাদেশ সমস্যার সমাধান দাবি ৩৬৪ Aparajita Neel
১৭৭ দিল্লীর আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অবিলম্বে মুজিবকে মুক্ত করার দাবি ৪৬৫ – ৪৬৮

Jayanta Sen Abir

 

১৭৮ দিল্লীর আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বাংলাদেশের মুক্তির জন্য সশস্ত্র বিশবাহিনি গঠনের আহবান ৪৬৯ Aparajita Neel
১৭৯ দিল্লী সম্মেলনে বাংলাদেশের মানুষের দুর্দশা লাঘবের জন্য রাষ্ট্র সঙ্ঘের প্রচারণার আহবান ৪৭১
Nusrat Jahan Ima
১৮০ দিল্লীর আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বাংলাদেশের স্বীকৃতির প্রশ্ন ৪৭২ – ৪৭৪ Pallab Das
১৮১ বিশ্বের প্রতি বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদানের জন্য দিল্লী আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আহবান ৪৭৫ – ৪৭৬ Ashik Uz Zaman
১৮২ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ফ্রেন্ডস অব বাংলাদেশ সংস্থা গঠনের সিদ্ধান্ত ৪৭৭ Ashik Uz Zaman
১৮৩ দিল্লী আন্তর্জাতিক সম্মেলনে প্রতিনিধিদল কর্তৃক বাংলাদেশে প্রবেশের সিদ্ধান্ত বাতিল ৪৭৮ – ৪৭৯ Ashik Uz Zaman
১৮৪ বাংলাদেশ সরকারের ওপর ভারত সরকারের প্রভাবের প্রশ্নে স্বতন্ত্র পার্টির বক্তব্য ৪৮০ Aparajita Neel
১৮৫ বাংলাদেশ প্রশ্নে কেন্দ্রীয় সরকারের ভূমিকা নমনীয় বলে জাতিসঙ্ঘের কেন্দ্রীয় কমিটির অভিযোগ ৪৮১ – ৪৮২ Saiful Arefin Borshon
১৮৬ পাকিস্তানের যুদ্ধ প্রস্তুতির মোকাবিলার প্রশ্নে আসাম প্রাদেশিক কংগ্রেস (বার্ষিক) কমিটির প্রস্তাব ৪৮৩ – ৪৮৪ Saiful Arefin Borshon
১৮৭ পাকিস্তানের হুমকি মোকাবিলার ব্যাপারে সরকারের সাথে তিনটি বিরোধী দলের সহযোগিতা ৪৮৫ – ৪৮৬ Saiful Arefin Borshon
১৮৮ বাংলাদেশের প্রশ্নে জয়প্রকাশ নারায়ণের বিবৃতি সমূহের সংকলন ৪৮৭ – ৪৯২ Rafiqul Islam Shawon
১৮৯ এ ক্রাই ফর হেল্প – মহারাষ্ট্র বাংলাদেশ এইড কমিটি আয়োজিত শরনার্থিদের সাহায্যে সাংক্রিতিক অনুষ্ঠান উপলক্ষে প্রকাশিত স্মরণিকা (রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর বানি) ৪৯৩ -৪৯৪
Sajib Barman

 

১৯০ বাংলাদেশ ও ভারতের ভবিষ্যৎ জয় প্রকাশ নারায়ণ লিখিত নিবন্ধ ৪৯৫-৫০০
রানা আমজাদ
১৯১ কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ সহায়ক সমিতির রিপোর্ট (১৯৭১ সনের এপ্রিল থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত) ৫০১-৫০৬ মোহিব নীরব
৫০৬ – ৫২৬ Raisa Sabila
১৯২ রাজ্যসভায় বিতর্ককালে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর মধ্যবর্তি ভাষণ ৫২৭-৫২৮
Shuvadittya Saha
১৯৩ বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ঘটনাবলির পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক উত্থাপিত প্রস্তাব ৫২৯-৫৩০ Shuvadittya Saha
১৯৪ বাংলাদেশ থেকে বিপুল সংখ্যক শরনার্থির আগমনের ফলে সৃষ্ট পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে শ্রম ও পুনর্বাসন মন্ত্রীর বিবৃতি ৫৩১ – ৫৩২
Sajib Barman

 

১৯৫ বাংলাদেশকে স্বীকৃতির দাবির প্রশ্নে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর জবাব ৫৩৩-৫৩৭ Nishat Oni
১৯৬ ভারতে পাকিস্তানের বিপ্লবী তারিক আলির গোপন উপস্থিতি এবং কোলকাতায় তার বক্তৃতার ওপর আলোচনা ৫৩৮ -৫৪০ নীতেশ বড়ুয়া

১৯৭

 

বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে পাকিস্তানে অস্ত্র সরবরাহ থেকে বিরত থাকার ভারতীয় আহবান ব্রিটেনে কর্তৃক প্রত্যাখ্যানের ওপর পররাষ্ট্রমন্ত্রী শরণ সিং এর বিবৃতি ৫৪১ – ৫৫৬ Razibul Bari Palash
১৯৮ বাংলাদেশ থেকে লক্ষ লক্ষ শরনার্থির আগমনের উপর আলোচনার জবাবে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর বিবৃতি ৫৫৭ – ৫৬০
Sajib Barman

 

১৯৯ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক পাকিস্তানকে সাম্প্রতিক অস্ত্র সরবরাহের রিপোর্টের ওপর আলোচনা ৫৬১-৫৯০ Razibul Bari Palash
২০০ মস্কো, বোন, প্যারিস, অটোয়া, নিউইয়র্ক, ওয়াশিংটন ও লন্ডন সফর শেষে প্রত্যাগত পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বিবৃতি ৫৯১ – ৫৯২
নীতেশ বড়ুয়া

 

২০১

 

সাম্প্রতিক পরিস্থিতির উপর প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর বিবৃতি ৫৯৩-৫৯৬ Nishat Oni

২০২

 

পাকিস্তানে মার্কিন অস্ত্রের অবিরাম সরবরাহ ও তার ফলশ্রুতির ওপর আলোচনা ৫৯৭ – ৬১৮
Hasan Tareq Imam

 

২০৩ পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট কর্তৃক ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার হুমকির পরিপ্রেক্ষিতে আলোচনা ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বিবৃতি ৬১৯ – ৬৩৮ Razibul Bari Palash
২০৪ স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ স্বীকৃতি প্রদানের দাবি জানিয়ে উত্থাপিত প্রস্তাব ও তার ওপর আলোচনা ৬৩৯ – ৬৮৯

Razibul Bari Palash

&

Aparajita Neel

২০৫ ইয়াহিয়া খান কর্তৃক শেখ মুজিবুর রহমানের বিচার ও প্রাণদণ্ড হুমকির পরিপ্রেক্ষিতে আলোচনা ও প্রধানমন্ত্রীর বিবৃতি ৬৯০-৭০৭ Raisa Sabila
২০৬ পূর্ব সীমান্তে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী কর্তৃক অবিরাম শত্রুতামূলক কার্যকলাপের ফলে সৃষ্ট মারাত্মক পরিস্থিতির উপর আলোচনা ৭০৮-৭১৬ Raisa Sabila
২০৭ বাংলাদেশ প্রশ্নে জাতিসঙ্ঘের তৃতীয় কমিটিতে চীন কর্তৃক পাকিস্তানের পক্ষে ভূমিকা গ্রহণের পরিপ্রেক্ষিতে আলোচনা ৭১৭ – ৭২৭ Raisa Sabila
২০৮ সাম্প্রতিক বিদেশ সফরের ওপর আলোচনাকালে প্রধানমন্ত্রীর বিবৃতি ৭২৮-৭৩১ Raisa Sabila

২০৯

 

পাকিস্তান কর্তৃক যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়ার পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর বিবৃতি ৭৩২ – ৭৪৯
Biddut Dey &
Nusrat Jahan Ima
২১০ বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান করে প্রদত্ত প্রধানমন্ত্রীর বিবৃতি ৭৫০-৭৬০
Ayon Muktadir
২১১ যুদ্ধের সর্বশেষ পরিস্থিতির উপর প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর বিবৃতি ৭৬১-৭৬৩
Sajib Barman
২১২ বাংলাদেশে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর হত্যাযজ্ঞ সম্পর্কে আলোচনা ৭৬৫ – ৭৬৮
Ayon Muktadir
২১৩ বাংলাদেশের ঘটনাবলি সম্পর্কে ভারতের পররাষ্ট্রনীতির বিবৃতি ও বিবৃতির ওপর সদস্যদের আলোচনা ৭৬৯ – ৭৮৬
Razibul Bari Palash

 

২১৪ বাংলাদেশ সম্পর্কে প্রস্তাব গ্রহণ প্রসঙ্গে আলোচনা ৭৮৭ – ৭৮৯
Sajib Barman
২১৫ বাংলাদেশ ঘটনাবলির ওপর প্রধানমন্ত্রীর উত্থাপিত প্রস্তাব ৭৯০ -৭৯২
Masroor Ahmed Makib

২১৬

 

সীমান্তে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর আক্রমণাত্মক তৎপরতা সম্পর্কে বিতর্ক ৭৯৩ – ৮০৪

Zulkar Nain

&

Tashrik Sikder:

২১৭ বাংলাদেশ থেকে আগত শরনার্থিদের সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীর বিবৃতি ৮০৫-৮০৭ Rafiqul Islam Shawon
২১৮ বাংলাদেশ থেকে আগত শরনার্থিদের সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীর বিবৃতি ৮০৮ -৮১১ হোসাইন মুহাম্মদ মুরাদ
২১৯ বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দান প্রসঙ্গে বিরোধী সদস্যদের প্রস্তাব বিতর্ক ৮১২- ৮২৬
Hasan Tareq Imam

 

২২০ পাকিস্তানের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র প্রেরণ সম্পর্কে পররাষ্ট্র বিবৃতির উপর বিতর্ক ৮২৭- ৮৩৪
Hasan Tareq Imam

 

২২১ কয়েকটি দেশে সফর প্রসঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বিবৃতি ও তার ওপর আলোচনা ৮৩৫- ৮৪০ Raisa Sabila
২২২ বাংলাদেশ কে স্বীকৃতি দানের জন্য উত্থাপিত প্রস্তাবের ওপর আলোচনা ৮৪১-৮৬৯ Razibul Bari Palash
২২৩ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক পাকিস্তানকে অস্ত্র সরবরাহের সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে আলোচনা ৮৭০ -৮৭৫ Razibul Bari Palash
২২৪ পাকিস্তানের সামরিক জান্তা কর্তৃক শেখ মুজিবর রহমানকে হত্যার হুমকি প্রসঙ্গে আলোচনা ৮৭৬- ৮৮৮ Hasan Tareq Imam
২২৫ ভারতের সীমান্ত পাকিস্তানের সৈন্য সমাবেশ সম্পর্কে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর বিবৃতি ও আলোচনা ৮৮৯- ৮৯৭ Hasan Tareq Imam
২২৬ পাশ্চাত্যের কয়েকটি দেশ সফর শেষে প্রধানমন্ত্রীর বিবৃতি ৮৯৮-৯০০ Fahmida Bristy
২২৭ পাক ভারত সীমান্ত পরিস্থিতি ও তিনটি অনুপ্রবেশকারী পাকিস্তানী স্যাবর জেট বিমান সম্পর্কে আলোচনা ৯০১-৯০৩ Fahmida Bristy
২২৮ পাকিস্তানে জরুরী অবস্থা ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রীর বিবৃতি ৯০৪ – ৯০৫ Fahmida Bristy
২২৯ পাকিস্তান কর্তৃক ভারতের উপর আক্রমণের পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রীর বিবৃতি ও তার ওপর আলোচনা ৯০৬ – ৯২০ Tanvir Tanz Hedayet
২৩০ পাকিস্তানের আক্রমণের পর যুদ্ধ পরিস্থিতি সম্পর্কে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর বিবৃতি ৯২১ – ৯২২
Fahmida Bristy
২৩১ বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান করে প্রধানমন্ত্রীর বিবৃতি ও তার ওপর আলোচনা ৯২৩- ৯৪০ Tanvir Tanz Hedayet
২৩২ পাকিস্তানের আক্রমণের পর সর্বশেষ পরিস্থিতি সম্পর্কে প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর বিবৃতি ৯৪১ -৯৪২ Raisa Sabila
২৩৩ ভারত মহাসাগরের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সপ্তম নৌবহরের তৎপরতা সম্পর্কে আলোচনা ৯৪৩ -৯৫০ Razibul Bari Palash

 

 

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
১। বাংলাদেশের ওপর পাকিস্তানী সৈন্যের আক্রমণে উদ্বেগ প্রকাশ করে ভারতের লোকসভার প্রস্তাব বাংলাদেশ ডকুমেন্টস – ১ম খণ্ড (পররাষ্ট্র দপ্তর প্রকাশিত) ৩১ মার্চ, ১৯৭১

 

Razibul Bari Palash

<১২, , >

 

পার্লামেন্টে ৩১ মার্চ ১৯৭১ ভারতের প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবিত রেজোল্যুশন থেকে

 

“পূর্ববঙ্গে সৃষ্ট সাম্প্রতিক অবস্থায় এই হাউজ গভীর ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করছে। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পাঠানো সশস্ত্র বাহিনীর ব্যাপক হামলায় পূর্ব বাংলার সমগ্র জনগণের উপর দুর্যোগ নেমে এসেছে। তাদের ইচ্ছা ও দাবির বিরুদ্ধে সেখানে চলছে নানারকম কর্মকান্ড।

ডিসেম্বর ১৯৭০ সালে পাকিস্তানের নির্বাচনের মাধ্যমে মানুষ তাদের ইচ্ছা প্রকাশ করলেও সেটাকে সম্মান দেখানোর পরিবর্তে পাকিস্তান সরকার জনগণের ম্যান্ডেট এর সাথে বিদ্রুপ করছেন।

 

পাকিস্তান সরকার আইনত নির্বাচিত প্রতিনিধিদের অস্বীকার করেছে। শুধুমাত্র তাই নয় তারা বিনা কারণে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বাতিল করেছে। এতে ঐ প্রতিনিধিদরা তাদের ন্যায়সঙ্গত এবং সার্বভৌম ভূমিকা রাখা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। পূর্ববাংলার জনগণের উপর চলছে শক্তির নগ্ন ব্যবহার। বেয়নেটের খোঁচায়, মেশিনগান, ট্যাংক, কামান ও বিমান দিয়ে তাদের দমন করা হচ্ছে।

 

ভারতের সরকার ও জনগণ সবসময় পাকিস্তানের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ স্বাভাবিক এবং ভ্রাতৃসুলভ সম্পর্ক বজায় রাখতে চেয়েছে। ভারত উপ-মহাদেশের মানুষ শতাব্দীকালব্যাপী ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের পুরনো বন্ধনে আবদ্ধ। এই হাউস আমাদের সীমান্তের কাছে ঘটতে থাকা কর্মকান্ড নিয়ে উদাসীন থাকতে পারেনা। আমাদের দেশের সমস্ত এলাকা জুড়ে সকল মানুষ সেখানকার নিরস্ত্র ও নিরীহ জনগণের ওপর নজিরবিহীন নৃশংসতার বিরুদ্ধে নিন্দা জ্ঞ্যাপন করছে।

 

এই হাউস পূর্ববাংলার জনগণের গণতান্ত্রিক জীবনসংগ্রামের সাথে গভীর মমত্ব ও সংহতি প্রকাশ করছে।

শান্তি প্রতিষ্ঠার শাশ্বত অভিপ্রায়ে ভারত মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা ও প্রতিরক্ষায় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। এই হাউজ অনতিবিলম্বে শক্তি প্রয়োগ করে অসহায় মানুষের উপর নিপীড়ন বন্ধের দাবি জানাচ্ছে। এই হাউজ পৃথিবীর সব দেশ ও তাঁর জনগণের কাছে এমন একটি গঠনমূলক পদক্ষেপ নেয়ার ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষন করছে যাতে তারা পাকিস্তান সরকারকে গণহত্যা বন্ধ করার ব্যাপারটি বোঝাতে সক্ষম হন।

 

এই হাউস গভীরভাবে বিশ্বাস করে পূর্ব বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষের গণঅভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক বিজয় হবে। হাউস তাদের আশ্বাস দিচ্ছে যে তাদের সংগ্রাম ও উতসর্গের পথে ভারতের জনগণের সহানুভূতি ও সমর্থন পাবেন।

 

  • বাংলাদেশের ঘটনাবলী সম্পর্কে ভারতের প্রথম প্রতিক্রিয়া ২৭ মার্চের লোকসভা ও রাজ্যসভার কার্যবিবরণীতে দ্রষ্টব্য।

 

 

 

 

 

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
২। পাকিস্তানের নৃশংসতার প্রশ্নে রাষ্ট্রসংঘের নির্লিপ্তির সমালোচনা করে প্রেরিত ভারতের লিপি দৈনিক ‘যুগান্তর’ ২ এপ্রিল, ১৯৭১

 

Aparajita Neel

<১২, , >

রাষ্ট্রসংঘে ভারতের লিপি

পাকিস্তানের ব্যাপারে নিশ্চেষ্টতা অমার্জনীয়

 

রাষ্ট্রসংঘ, ১লা এপ্রিল (পি টি আই)- পশ্চিম পকিস্তানী সৈন্যরা বাংলাদেশের মানুষের উপর যে হারে নির্যাতন শুরু করেছে, তা বর্তমানে এমন এক স্তরে এসে পৌঁছেছে যে, তা পাকিস্তানের অভ্যন্তরীন ব্যাপার মনে করে নিশ্চেষ্ট থাকার আর সময় নেই। আত্তর্জাতিক মানবগোষ্ঠী কর্তৃক একটি উপযুক্ত ব্যবস্থা অবলম্বন করা অত্যাবশ্যক হয়ে উঠেছে – ভারত গতকাল রাষ্ট্রসংঘকে এই কথাটি স্মরণ করিয়ে দিয়েছে।

 

রাষ্ট্রসংঘের সেক্রেটারী জেনারেল উ থান্টের কাছে ভারতের এই অভিমত একটি পত্রাকারে পেশ করা হয়। রাষ্ট্রসংঘ ভারতের স্থায়ী প্রতিনিধি শ্রী সমর সেন পত্রটি পেশ করেন এবং পত্রটি তার অনুরোধে রাষ্ট্রসংঘ সদস্যদের নিকট প্রচার করা হয়। পরে রাষ্ট্রসংঘের একটি ইস্তেহার হিশেবে তা প্রকাশ করা হয়।

 

এই পত্রে শ্রী সমর সেন বলেছেনঃ মানব দুর্গতি এই মুহুর্তে এই নিষ্ক্রিয়তা ও নিরবতাকে দুর্গত জনসাধারণ বহির্বিশ্বের উদাসীনতা বলে ভাববে।

 

শ্রী সেন সতর্ক করে দেন যে, পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনীকে সংযত না করলে এবং আন্তর্জাতিক অভিমত বাংলাদেশের জনসাধারণের প্রতি সহানুভূতি ও সমর্থনসূচক না হলে এই উপ-মহাদেশে উত্তেজনা ক্রমশই বৃদ্ধি পাবে।

 

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
৩। ইয়াহিয়ার প্রতি চীনের প্রকাশ্য সমর্থন ভারতকে নিরস্ত্র করবে না – প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা দৈনিক অমৃতবাজার ১৪ এপ্রিল ১৯৭১

 

Razibul Bari Palash

<১২, , >

 

ইয়াহিয়ার প্রতি চীনের প্রকাশ্য সমর্থন আমাদেরকে নিরস্ত্র করবে না প্রধানমন্ত্রী

(আমাদের লক্ষ্ণৌ অফিস থেকে)

 

লক্ষ্ণৌ, এপ্রিল ১৩, প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী সতর্ক করেন যে ভারত বাংলাদেশের ঘটনাবলির জন্য নীরব দর্শকের ভূমিকায় থাকবেনা। এবং ঘোষণা করেন যে, বাংলাদেশের বিপক্ষে পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক শাসকদের সাথে চীন এর “খোলামেলা সমর্থন” আমাদের অবস্থানের উপর কোন প্রভাব ফেলবে না।

 

এক সংবাদ সম্মেলনে বক্তৃতাকালে মিসেস গান্ধী বলেন, “আমরা স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারি এবং আমাদের মনোভাব অন্যদের কর্মের উপর নির্ভর করে না”।

 

বাংলাদেশের নতুন গঠিত সরকারকে স্বীকৃতি দেয়া হবে কিনা জানতে চাওয়া হলে মিসেস গান্ধী বলেন এ ব্যাপারটি বিবেচনাধীন। অপর এক প্রশ্নে ছিল, বাংলাদেশের যুদ্ধ পশ্চিম পাকিস্তানের ‘ইম্পেরিয়াল ওয়ার’ কিনা? জবাবে মিসেস গান্ধী বলেন শুধু শক্ত কথায় কোন লাভ হবেনা।

 

মিসেস গান্ধী মনে করেন পূর্ববাংলার অবস্থা তাঁর দেশের অন্যান্য অংশেও প্রভাব ফেলে। পূর্ববাংলা ও ভারতের মধ্যে বসবাসকারী মানুষের রক্তের সম্পর্ক ছিল এবং ভারতীয়দেরও পূর্ববাংলার জনগণের প্রতি সহানুভূতি আছে – এটাই স্বাভাবিক।

 

পাকিস্তানে নির্বাচনী ফলাফল সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে মিসেস গান্ধী বলেন, আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে উভয় দেশ লাভবান হবে এবং সম্পর্কের উন্নতি হবে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে যা ঘটছে তাতে এখন সবকিছু বদলে গেছে এবং এটিকে উভয় দেশের জন্য দুর্ভাগ্য হিসেবে বর্ণনা করা যেতে পারে।

 

সিলন ও অন্যান্য প্রতিবেশী দেশগুলোর সুস্পষ্ট রেফারেন্স দিয়ে মিসেস গান্ধী বলেন সেখানে যা ঘটেছিল এই দেশের ক্ষেত্রেও তার পরোক্ষ প্রভাব পড়বে।

 

যেগুলো তিনি আগে বলেছেন সেই সব প্রশ্নের নতুন কোন জবাব তিনি দিতে অসম্মতি জ্ঞ্যাপন করেন। তিনি জানান এসব ব্যপারে নতুন কিছু যোগ করার নেই।

 

পরে কংগ্রেস আইনপ্রণেতাদের সাথে একটি সাক্ষাৎকারে মিসেস গান্ধী বলেন, যদিও অন্যান্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা উচিত নয় কিন্তু সেটাকে পুরোপুরি পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ক হিসাবে বর্ণনা করা যায়না।

 

মধ্যমেয়াদী জরিপে পর তার প্রথম সফরে মিসেস গান্ধী কে তার আসনের মানুষ একটি আড়ম্বর সংবর্ধনা দেয়।

জেলার অর্থনৈতিক সমস্যার উপর এক সেমিনারে বক্তৃতাকালে এবং একটি বাস টার্মিনাল স্টেশন উদ্বোধনের সময় প্রধানমন্ত্রী স্থানীয় নাগরিকদের সাথে বৈঠক করেন।

 

ইউ পি মুখ্যমন্ত্রী, জনাব কমলাপতি ত্রিপাঠি এবং তার মন্ত্রিসভার সহকর্মীদের সাথে মিসেস গান্ধী লক্ষ্ণৌ থেকে হেলিকপ্টারে করে এখানে আসেন। সংসদবিষয়ক মন্ত্রী, জনাব ওম মেহতা এবং জনাব উমা শংকর দীক্ষিত তার সঙ্গে এসেছিলেন।

 

 

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
৪। সীমান্তে হামলার ব্যাপারে পাকিস্তানের প্রতি ভারতের হুশিয়ারি দৈনিক আনন্দবাজার ১৬ এপ্রিল ১৯৭১

 

Aparajita Neel

<১২, , >

আর যেন গোলাগুলি না পড়েঃ পিণ্ডিকে দিল্লীর হুশিয়ারি

 

সীমান্তে হামলাবাজি বন্ধ কর। আর যেন গোলাগুলি না পড়ে। দিল্লী পিণ্ডিকে কড়া ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে।

 

সীমান্তের ওপারে যখন কামানের নলে আগুন, এপারেও তখন কথার আগুন ছুটছে। ভারতের সাফ সাফ বয়ান একটা কূটনৈতিক লড়াইয়ের সূচনা বলা যেতে পারে। আমাদের গ্রামের ওপর পাক বাহিনী গোলা নিক্ষেপ করেছিল, তারই বিরুদ্ধে এই নোট, তীব্র প্রতিবাদ। অদিকে পিণ্ডি ভারতীয় এলাকা থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া তিনজন সিপাহিকে ফেরত দেবার দাবী সরাসরি খারিজ করে দিয়েছে।

 

নয়াদিল্লী থেকে আমাদের বিশেষ সংবাদদাতা জানাচ্ছেন ত্রিপুরা পূর্ববঙ্গ সীমান্তে ভারতীয় এলাকার মধ্যে পাক সশস্ত্র বাহিনী বিনা প্ররোচনায় গুলি বর্ষনের বিরুদ্ধে ভারত অদ্য (বৃহস্পতিবার) পাক হাই কমিশনের কাছে কড়া প্রতিবাদলিপি পাঠিয়েছে।

 

প্রতিবাদলিপিতে বলা হয়েছে, ত্রিপুরা সীমান্তের কাছে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর সমাবেশ ঘটেছে এবং বিপজ্জনক অবস্থার সৃষ্টি করেছে।

 

বহির্বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে ঐ লিপিটি পাঠানো হয়েছে। লিপিতে বলা হয়েছে এই ধরণের আক্রমণাত্মক কাজকর্ম বন্ধের জন্য অবিলম্বে পাক সশস্ত্র বাহিনীকে যথোপযুক্ত নির্দেশ দেওয়া উচিৎ। পাক বাহিনী এ রকম করে গেলে যে কোন রকম পরিণাম বা পরিণতির জন্য পাক সরকারকে দায়ী কড়া হবে।

 

আগে প্রতিবাদলিপিতে বলা হয়েছে যে, দিনাজপুর অঞ্চলে মোতায়েন পাকবাহিনী ভারতীয় এলাকায় বিশেষ করে সামজিয়া গ্রামে হাল্কা মেশিন গান ও মাঝারি মেশিন গান থেকে গোলা বর্ষন করেছে। তাছাড়া, ৭ এপ্রিল থেকে ত্রিপুরার বিপরীত দিকে বিবিবাজারে (কুমিল্লায়) পাকসেনাদের সমাবেশ হচ্ছে এবং বিনা প্ররোচনায় পাক বাহিনীর গোলাবর্ষনে ভারতীয় নাগরিকরা আহত হয়েছেন।

 

পি টি আই জানাচ্ছেনঃ পাকিস্তান বেতারে বলা হয়েছে যে, কদিন আগে অপহৃত ভারতীয় সীমান্ত নিরাপত্তা বাহিনীর তিনজন সিপাহিকে ফেরত দেবার জন্য ভারতের দাবীটি পাকিস্তান অগ্রাহ্য করেছে।

 

১১ এপ্রিলে ভারতের নোটে বলা হয়েছে, গত ৯ এপ্রিল ওইসব সিপাই ২৪ পরগনা-যশোহর সীমান্তে কর্তব্যরত ছিলেন, ভারতীয় এলাকার মধ্য থেকে তাদের অপহরণ কড়া হয়। পাক বেতারে বলা হয়েছে, ভারতের দাবী ভিত্তিহীন। সিপাইদের পুর্ববঙ্গের এলাকায় আটক কড়া হয়।

 

পূর্ব পাকিস্তান নয়

(বিশেষ সংবাদদাতা)

 

নয়াদিল্লী, ১৫ এপ্রিল – ভারত সরকারের কাছে পূর্ব পাকিস্তান বলে আর কোন কথা নেই। এর স্থান নিয়েছে ‘পূর্ববঙ্গ’।

 

আজ এই প্রথম বহির্বিষয়ক মন্ত্রক পাকিস্তানী হাইকমিশনকে দেওয়া তাদের সরকারী নোটে সর্বত্র ‘পূর্ববঙ্গ’ কথাটি ব্যাবহার করেন। ভারতীয় এলাকার মধ্যে সশস্ত্র বাহিনীর গুলিবর্ষনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে ঐ নোট দেওয়া হয়েছে।

 

 

 

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
৫। পাকিস্তানের অপপ্রচারের বিরুদ্ধে ভারতের প্রতিবাদ দৈনিক যুগান্তর ১৭ এপ্রিল ১৯৭১

 

Aparajita Neel

<১২, , >

 

ভারতের বিরুদ্ধে অপপ্রাচার চালিয়ে গণহত্যার বর্বরতা ঢাকা যাবেনা

পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রতিবাদ

(দিল্লী অফিস থেকে)

 

১৬ এপ্রিল – বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামে ভারত কোন না কোনোভাবে জড়িত আছে বলে পাকিস্তানী জঙ্গীশাহি ভারতের বিরুদ্ধে যে মিথ্যা প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে ভারত আজ তাঁর তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে। ভারত সরকারের এই প্রতিবাদ একটি বিবৃতির আকারে আজ পররাষ্ট্র দপ্তরের জনৈক মুখপাত্র বিশ্বের সাংবাদিকদের কাছে পেশ করেন।

 

উক্ত মুখপাত্র প্রসঙ্গত বলেন যে, ভারতের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ ও প্রচার চালিয়ে পাক জঙ্গীশাহি বাংলাদেশে যে বর্বর ও অমানুষিক গণহত্যা চালিয়ে যাচ্ছে তা কিছুতেই ঢাকতে পারবে না।

 

কেউ কেউ এই প্রতিবেদক কে বাংলাদেশ সরকারকে স্বীকৃতি দেওয়ার পূর্ব সূচনা বলে মনে করছেন। একজন বিদেশী সাংবাদিক এ সম্পর্কে প্রশ্ন করলে সরকারী মুখপাত্রটি এর সরাসরি কোন উত্তর না দিয়ে বলেন, যখন যে অবস্থা দেখা যাবে তখন তাঁর সেইভাবে মোকাবিলা হবে। এই হল ভারত সরকারের নীতি।

 

পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্রটি আরও বলেন যে, পাক জঙ্গীশাহী বাংলাদেশে যে মধ্যযুগীয় পৈশাচিক হত্যালীলা চালাচ্ছে তা থেকে বিশ্ববাসীর দৃষ্টি ঘুরিয়ে দেবার জন্যই ভারতের বিরুদ্ধে তারা মিথ্যা প্রচারে নেমেছে। কিন্তু বিশ্বের নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষকদের অনেকেই পাক বর্বরতা স্বচক্ষে দেখেছেন। কাজেই পাকিস্তান যতই চেষ্টা করুক তাঁর পক্ষে এই নিদারুণ নির্মম সত্য চাপা দেওয়া সম্ভব হবেনা। তিনি জোরের সঙ্গে বলেন যে, ভারতের বিরুদ্ধে দেশ বিদেশে যতই অপপ্রচার ও বিষোদগার করা হোক না কেন ইসলামাবাদের জঙ্গী শাসক চক্র কিছুতেই এই অকাট্য ও প্রত্যক্ষ সত্য চাপা দিতে পারবেনা যে, পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণ ও নিপীড়নের নাগপাশ ছিন্ন করার জন্য বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়ছেন।

 

স্বীকৃতি দানের প্রশ্নে

পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্রের এই বিবৃতিতে কেউ কেউ বাংলাদেশের সরকারকে স্বীকৃতি দানের পূর্ব সূচনা বলে মনে করছেন। জনৈক বিদেশী সাংবাদিক এ সম্বন্ধে প্রশ্ন করলে সরকারী মুখপাত্রটি তাঁর সরাসরি উত্তর না দিয়ে কেবল বলেন, সরকার অবস্থা বুঝে ব্যাবস্থা নেবেন। তাঁর এই মন্তব্য থেকে এই কথাই মনে হয় যে, বাংলাদেশ সরকার হয়ত এখন সরকারিভাবে স্বীকৃতির জন্য অনুরোধ জানান নি। অথবা এমনও হতে পারে যে, ভারত সরকার এখনো এ ব্যাপারে কোন সিদ্ধান্ত নেননি।

 

বাংলাদেশ সরকারের দুজন দূত ইউরোপে রওনা হয়ে গেছেন বলে ভারত সরকার কোন খবর রাখেন কি – জনৈক সাংবাদিকের এই প্রশ্নের উত্তরে মুখপাত্রটি বলেন, ‘কাগজে পড়েছি’। সরকারী মুখপাত্রের এই ধরণের কাটা কাটা উক্তি থেকে মনে হয় সরকার ভবিষ্যতের কথা ভেবেই এখন সতর্কতা অবলম্বন করে চলছেন।

 

সম্প্রতি পাকিস্তানী বাহিনী ভারত সীমান্ত এলাকা থেকে কয়েকজন সীমান্ত রক্ষী ও অসামরিক নাগরিকদের ধরে নিয়ে গেছে। ভারতীয় এলাকা থেকে সীমান্ত রক্ষী ও নাগরিকদের জোর করে ধরে নিয়ে যাওয়ার পেছনে পাকিস্তানের একটা গুঢ চক্রান্ত থাকাও বিচিত্র নয়। হয়ত পাকিস্তান পরে এটাই প্রমাণ করতে চাইবে যে ভারত সরকার এদের মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে সামিল হয়ে পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য বাংলাদেশে পাঠিয়েছিল। কিন্তু ভারত অংকুরেই পাকিস্তানের এই দুরভিসন্ধি ফাঁস করে দিতে চান এবং সেই জন্যই এই প্রতিবাদ। পাকিস্তানের অপপ্রচার ক্রমশ এমন একটা স্তরে পৌঁছেছে যে, এর প্রতিবাদ না করলে তা যে অংশত সত্য এ কথাই মনে হবে। তাই বাংলাদেশ সম্পর্কে ভারত সরকারের প্রকৃত নীতি কি তা সকলকে জানানোর জন্যই ভারত পাক অপপ্রচারের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে।

 

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
৬। পাকিস্তানের আক্রমণ বরদাস্ত করা হবেনাঃ প্রতিরক্ষামন্ত্রীর ঘোষণা দৈনিক যুগান্তর ২৫ এপ্রিল, ১৯৭১

 

Aparajita Neel

<১২, , >

পাক হামলা বরদাস্ত কড়া হবেনা

-প্রতিরক্ষামন্ত্রী

 

শিবপুরি (মধ্যপ্রদেশ), ২৪ এপ্রিল (পি টি আই) – কেন্দ্রীয় প্রতিরক্ষামন্ত্রী শ্রী জগজীবন রাও আজকে এই সতর্বানি উচ্চারণ করেছেন যে, ভারতীয় এলাকায় পাকিস্তানের কোন সামরিক অভিযানই বরদাস্ত করবেনা।

 

পশ্চিমবঙ্গে বনগাঁর অনতিদূরে সীমান্তে পাকিস্তানী গোলাবর্ষনের সংবাদ পেয়েই ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী এই হুশিয়ারি দিয়েছেন। তিনি এখানে একটি ভাষণ দিচ্ছিলেন।

 

প্রসঙ্গত শ্রী জগজীবন বলেন, ভারতকে সর্বক্ষন সজাগ সতর্ক এবং ভারতের মাটিতে যে কোন আক্রমণ প্রতিহত করবার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।

 

ভারত-তিব্বত সীমান্ত বাহিনীর শিক্ষার্থী সদস্যেদের উদ্যেশে ভাষণ দিয়ে গিয়ে প্রতিরক্ষামন্ত্রী কথাগুলি বলেন।

 

 

 

 

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
৭। ভারতের মাটিতে গোলা নিক্ষেপের জন্য পাকিস্তানের প্রতি ভারতের সতর্কবানি সৈনিক আনন্দবাজার ২৫ এপ্রিল, ১৯৭১

 

Aparajita Neel

<১২, , >

ভারতের মাটিতে গোলা ফেলা বন্ধ করো নতুবা

পরিণামের জন্য দায়ী হবেঃ পাকিস্তানের প্রতি সতর্কবানি

 

ভারতীয় সীমান্ত বনগাঁর কাছে শনিবার সকালে পাকিস্তানী গোলা এসে পড়েছে। তাছাড়া এক কোম্পানি পাক ফৌজ নিষিদ্ধ সীমার ৫ কিলোমিটার ভিতরে এসে, পেটরাপোলে রেল লাইনের কাছে অবস্থান নিয়ে, শনিবার বিকালে চারটে থেকে এক ঘণ্টা ধরে ভারতীয় গ্রামগুলির উপর গুলি চালায়। পরে তারা বেনাপোলে হটে যায়। নয়াদিল্লী থেকে এর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। দাবী করা হয়েছে যে, পাকিস্তানকে কথা দিতে হবে যে, এ ধরনের ব্যাপার আর ঘটবে না, আর না হলে সম্ভাব্য পরিণাম যা ঘটবে তাঁর জন্য পাকিস্তান দায়ী হবে।

 

সকালে পাকফৌজ ভারতীয় সীমান্তের (বনগাঁ) ওপারে মুক্তিফৌজের শিবির লক্ষ্য করে মর্টার চালায়। তারই কয়েকটি গোলা ভারতীয় এলাকায় এসে পড়েছিল। দ্বিতীয় ঘটনাটি আরও গুরুতর।

 

বহির্বিষয়ক মন্ত্রক পাক হাইকমিশনকে ঐ ঘটনাগুলির প্রতিবাদে যে নোট পাঠিয়েছেন তা রীতিমত কড়া ধাঁচের। এছাড়া অন্য একটি নোটে পাকিস্তানকে জানানো হয়েছে যে, ভারতের সীমান্ত রক্ষীবাহিনীর লোকেরা কখনোই পাকিস্তানে প্রবেশ করেননি। এ বিষয়ে পাকিস্তানের ১৪ এপ্রিল তারিখের অভিযোগ একেবারেই ভিত্তিহীন। অর্থাৎ আজ ভারত পাকিস্তানকে দুইটি নোট পাঠিয়েছে।

 

ভারত আরও বলেছে যে, অপহৃত তিনজন সীমান্তরক্ষীকে ফেরত দিতে হবে এবং অপহরণকারীদের যারা পাকফৌজের লোক তাদের উপযুক্ত শাস্তি দিতে হবে।

 

ভারত আরও জানিয়েছে যে, ১২ এপ্রিল রাত এগারটায় পাকফৌজ সোনামুড়ার কাছে ত্রিপুরার উপমন্ত্রী শ্রী মনসুর আলীর বাড়ির উপর গুলি চালিয়েছিল এবং ১৪/১৫ এপ্রিল রাত্রে ঐ অঞ্চলে কর্তব্যরত নায়ক মনিকুমারকে গুলি চালিয়ে হত্যা কয়েছিল। ১৭ এপ্রিল ঐ অঞ্চলে আরও কয়েকজন ভারতীয় নাগরিকের আবাসের উপর পাকিস্তানীরা গুলি চালিয়েছিল। ভারত এইসব ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়েছে এবং বলেছে যে সে পাকিস্তানের কাছে এজন্য ক্ষতিপূরণ দাবী করতে পারে। এ ধরণের ব্যাপার বন্ধ না হলে যা পরিণাম ঘটবে পাকিস্তান সে জন্য এককভাবে ও সম্পূর্ণভাবে দায়ী হবে।

 

– পি টি আই ও ইউ এন আই

 

 

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
৮। সীমা ছাড়ালে গুরুতর পরিণতি হবেঃ পাকিস্তানকে ভারতের হুশিয়ারি দৈনিক আনন্দবাজার ২৯ এপ্রিল, ১৯৭১

 

Aparajita Neel

<১২, , >

পাকিস্তানকে ভারতের হুশিয়ারিসীমা ছাড়ালে পরিণতি গুরুতরঃ

নিহতদের জন্য ক্ষতিপূরণ দিন

(বিশেষ সংবাদদাতা)

 

নয়াদিল্লী, ২৮ এপ্রিল – গত ২৬শে এপ্রিলের পর থেকে ভারতীয় সীমান্তের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের বুকে ঢুকে পাকিস্তানী সেনারা যে আক্রমণ চালিয়েছে, ভারত আজ তাঁর বিরুদ্ধে কড়া ভাষায় পাকিস্তানের কাছে প্রতিবাদ জানিয়েছে। আক্রমণের চারটি ঘটনায় গতকাল এবং তাঁর আগের দিন তেত্রিশ জন ভারতীয় নাগরিক পাকফৌজের হাতে প্রাণ হারিয়েছেন। অন্ততঃ আটজন আহত হয়েছে, দুজন নিখোঁজ।

 

আমলাতান্ত্রিক পদ্ধতি অনুযায়ী ভারত তিনটি নোটে পাকিস্তানের কাছে আজ ক্ষতিপূরণ চেয়েছে এবং হুশিয়ার করে দিয়েছে যে, ভবিষ্যতে ১৯৬০ সালের ভূমি নীতি লঙ্ঘনের এরূপ ঘটনা ঘটলে গুরুতর পরিণতির সম্মুখীন হতে হবে। এইসব নোট পররাষ্ট্র দফতর আজ পাকিস্তান হাই কমিশন অফিসে পাঠিয়ে দিয়েছেন।

 

ইতিমধ্যে জানা যায় যে, বাংলাদেশে পাক ফৌজের ইউনিটগুলি পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা ও আসাম সীমান্তে পৌঁছে সীমান্তের ঘাঁটিগুলিতে ছড়িয়ে পড়তে চেষ্টা করেছে। মনে হয়, সেনাবাহিনীর নির্দেশ অনুযায়ী হত্যায় সুখী পাকফৌজ এ জন্যই সীমান্তের এপারে গুলি চালিয়ে যাচ্ছে।

 

১৯৬০ সালে ভারত ও পাকিস্তান উভয়ের সীমান্ত থেকে সেনাবাহিনীকে অন্তত এক হাজার গজ দুরে রাখার জন্য ভূমিনিতি তৈরি করেন। পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলস এবং ভারতীয় সীমান্তরক্ষীকারী বাহিনীর জন্য এই নীতি তৈরি হয়। এখন পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলস বলে কিছু নেই। কাজেই ভারত যে এখনো পাকিস্তানের সঙ্গে আইনের কচকচিতে ব্যাস্ত এটা খুবই মজার ব্যাপার।

 

সরকারী মহল বলেন, ভারতীয় সেনাবাহিনীকে সীমান্ত থেকে এখনো অন্তত এক হাজার গজ দুরে রাখা হচ্ছে। সীমান্ত রক্ষী বাহিনীই সীমান্তের ভার আপাতত বইতে পারবে মনে করেই এই ব্যাবস্থা।

 

ভারতের নোটে যে সমস্ত ঘটনার প্রতি পাকিস্তানের দৃষ্টি আকর্ষন কড়া হয়েছে এবং প্রতিবাদ জানানো হয়েছে তা হলঃ

 

২৬ এপ্রিলঃ পাকিস্তানী সৈন্য জলপাইগুড়ির কাছে ভারতীয় সীমান্তের বনাপারা পর্যন্ত চলে আসে এবং ভারতীয় এলাকার মধ্যে গুলি চালিয়ে দুজন ভারতীয় গ্রামবাসীকে নিহত করে।

 

২৭ এপ্রিলঃ বয়রা এলাকায় (বনগাঁর উত্তরে) পাকফৌজ ভারতের লাখিমপুর গ্রাম পর্যন্ত চলে আসে এবং গুলি চালিয়ে পাঁচজনকে নিহত করে। নিহতদের একজন নাবালিকা। তিনজন আহত হয়।

 

২৭ এপ্রিলঃ বনগাঁর কাছে ভারতীয় এলাকায় ঢুকে পাক সৈন্য সীমান্তরক্ষী দলের উপর গুলি চালায়।

 

২৭ এপ্রিলঃ পাকসেনা ধরলা নদী পেরিয়ে ভারতীয় ছিটমহল বাঁশপাচিরে বেলা দুটো নাগাদ প্রবেশ করে। বেপরোয়া গুলি চালিয়ে হানাদাররা অন্তত পঁচিশ জনকে হতাহত করে।

 

২৬ এপ্রিলঃ কাছার সীমান্তে প্রহরারত সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর উপর পাক সৈন্য হামলা করে। একজন কনস্টেবল নিহত হন। পাঁচ জন আহতদের মধ্যে একজন ইন্সপেক্টর, দুজন কনস্টেবল নিখোঁজ।

 

পাক সৈন্যরা দুটি ওয়ারলেস সেট, একটি রাইফেল এবং দুটি হাল্কা মেশিনগান ছিনিয়ে নেয়।

 

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
৯। পাকিস্তানের ঘটনাপ্রবাহ শেষ পর্যন্ত ভারতের উপর চাপ সৃষ্টি করবে – প্রধানমন্ত্রীর সতর্কবানি দৈনিক স্টেটসম্যান ৭ মে ১৯৭১

 

Razibul Bari Palash

<১২, , ১০>

 

পাকিস্তানের ঘটনাপ্রবাহ শেষ পর্যন্ত ভারতের উপর চাপ সৃষ্টি করবে শ্রীমতী গান্ধী

(আমাদের বিশেষ প্রতিনিধি)

 

 

নয়াদিল্লি, ৬ মে – মিসেস. গান্ধী বলেছেন, পূর্ব পাকিস্তানে যাই ঘটুক না কেন ভারত চোখ বন্ধ করে থাকতে পারেনা। কারণ সেটা এই দেশ ও দেশের অর্থনীতির ওপর প্রভাব ফেলতে বাধ্য।

 

প্রধানমন্ত্রী জেলা কংগ্রেস কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এর একটি সম্মেলন উদ্বোধনকালে পূর্ব পাকিস্তান থেকে ভারতে শরনার্থিদের ঢালাও প্রবেশ সম্পর্কে উল্লেখ করে বলেন, প্রায় ২ মিলিয়ন লোক পূর্ব পাকিস্তান থেকে তার দেশে প্রবেশ করেছে।

 

যখন লড়াই থামবে তখন তাড়া ফিরে যাবে। ইতোমধ্যে তিনি আশা প্রকাশ করেন যে সারা দেশের মানুষ তাদের সাহায্য করবে। আমরা শুধুমাত্র বর্তমানে তাদের দেখাশোনাই করবোনা বরং যুদ্ধ শেষে তারা যাতে তাদের বাড়িতে ফিরে যেতে পারে সেদিকেও খেয়াল রাখব। মিসেস গান্ধী বলেন, জনাব এমসি শীতলভাদের নেতৃত্বে শরনার্থিদের সাহায্য করার জন্য ইতিমধ্যে একটি কেন্দ্রীয় সহায়তা কমিটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

 

মিসেস গান্ধী বলেন যে “সীমান্ত জুড়ে ঘটিত ঘটনার ফলস্বরূপ একটি নতুন বোঝা তার দেশের উপর এসেছ”। পূর্ব পাকিস্তানের এসব ঘটনায় শুধু পশ্চিমবঙ্গের উপর নয় বরং পুরো দেশের উপর নিশ্চিতভাবে প্রচণ্ড প্রভাব ফেলবে।

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
১০। এখনই ভারতের স্বীকৃতি বাংলাদেশের
স্বার্থের অনুকূল হবে না-বিরোধী নেতৃবৃন্দের           সাথে আলোচনাকালে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য
দৈনিক ‘আনন্দবাজার’ ০৮ মে, ১৯৭১

 

রায়হান হোসেন রানা

<১২, ১০, ১১১২>

 

এখনই ভারতের স্বীকৃতি বাংলাদেশের স্বার্থের অনুকূল হবে না
তবে মুক্তি আন্দোলনকে পূর্ণ সমর্থন দেওয়া হবে

শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী

(বিশেষ সংবাদদাতা)

নয়াদিল্লী, ৭মে- আজ সকালে বিরোধী নেতাদের সঙ্গে বাংলাদেশ নিয়ে আলোচনার জন্য প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী বৈঠকে বসেছিলেন। প্রায় সকলেই বাংলাদেশ সরকারকে অবিলম্বে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানান। (ব্যতিক্রমঃ বিকানীরের মহারাজা ডঃ করণ সিং এবং মুসলিম লীগ নেতা মহম্মদ ইসমাইল। দুজনের বক্তব্যে অবশ্য কিছু পার্থক্য ছিল।) সকলের কথা শোনার পর প্রধানমন্ত্রী যা বলেন তাঁর মর্ম এইরকমঃ বাংলাদেশের মুক্তি আন্দোলনের প্রতি ভারত পূর্ণ সমর্থন জানাবে কিন্তু বাংলাদেশকে এখনই কূটনৈতিক স্বীকৃতি দেওয়া এই দেশেরই স্বার্থের পরিপন্থী হবে। সারা বিশ্বে বাংলাদেশের জনগণের প্রতি প্রচুর সহানুভুতি থাকলেও স্বীকৃতির ব্যাপারে ভাবনা চিন্তা চলছে। তবে তাজউদ্দিন সরকারকে স্বীকৃতি দেওয়া হবে না এমন কথা তিনি বলেননি বা সরকার এ ব্যাপারে ঠিক কি করবেন তার কোন আভাস দেননি। শুধু স্পষ্টভাবে তিনি বলেন যে, কোন অবস্থাতেই ভারত ভীত নয়।

 

ভারতের স্বীকৃতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী

 

ইন্দিরাজী বলেন যে, পাকিস্তান ভারতের বিরুদ্ধে নানা উসকানিমূলক কাজ করছে। ভারতকে নানা ভাবে বাংলাদেশের ব্যাপারে জড়াতে চাইছে। যাই হোক, ভারত যা ঠিক মনে করবে তা করতে ভীত নয়।

 

দুই ব্যাতিক্রম । অবিলম্বে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দানের দাবির বিরোধীতা করেন বিকানীরের মহারাজা ডঃ করণ সিং। তিনি লোকসভায় কয়েকটি ছোট গোষ্ঠী ও কয়েকজন নির্দল সদস্যের নেতা। সেই গোষ্ঠী ও ব্যাক্তিরা অবশ্য আগেই বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়ার দাবী জানিয়েছেন।

ডঃ কিরণ সিং এর বক্তব্যঃ বাংলাদেশের মুক্তি আন্দোলন আসলে বাঙালীদের বিদ্রোহী ভারতের এ ধরনের ব্যাপার ঘটলে সরকার কি করতেন? কাশ্মীরের কথাও ভাবা দরকার ।

 

ইন্দিরাজ তাঁকে বলেনঃ কাশ্মীরে যারা হাঙ্গামা বাধাতে চায় তারা জনসাধারন থেকে বিচ্ছিন্ন। পক্ষান্তরে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামীদের পিছনে বিপুল গরিষ্ট সমর্থন রয়েছে। বাংলাদেশে গরিষ্ট অভিমত পাকিস্তান দাবিয়ে রাখতে চাইছে।

 

মুসলিম লীগ নেতা মহম্মদ ইসমাইল যা বলেন তার মর্মঃ এমন কিছু করা ঠিক হবে না যাতে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ে বা কোন সঙ্কট সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিলে ওই ধরনের সঙ্কট দেখা দিতে পারে। তবে সরকার এ ব্যাপারে যে কোন ব্যবস্থাই নিন না কেন তার প্রতি তাঁহাদের দলের সমর্থন থাকবে।

 

ইন্দিরাজ বলেন যে, বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে কিছু লোক সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি করতে চাইছে। সকলকে এ বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।

 

স্বীকৃতির স্বপক্ষে জোর দাবিঃ অধিকাংশ বিরোধী নেতা বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দানের জন্য জোর দাবি জানান। পরিস্থিতি সম্পর্কে ইন্দিরাজীর বিশ্লেষণ তাঁরা মেনে নেননি। তাঁরা বলেন যে, বাংলাদেশ একটি বাস্তব সত্য। স্বীকৃতি দিয়ে সরকার শুধু সেই সত্যটিকেই মেনে নেবেন আর তাতে সেইখানকার আন্দোলন জোরদার হবে। ভারত এ বিষয়ে জোর করলে ভারতেরই ক্ষতি হতে পারে।

 

এই দাবি জানান – সি পিএম, সি পি আই, ডি এম কে, আদি কংগ্রেস, পি এস পি, এম এস পি, ফঃ বঃ আর এস পি। শ্রী ইন্দ্রজিৎ গুপ্ত (সি পি আই) তাঁর দলের পশ্চিমবঙ্গ কমিটির পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীকে একটি স্মারকলিপি দেন। শ্রী এ কে গোপালান ( সি পি এম ) বলেন যে, পাকিস্তানকে ভয় না করে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধাদের সকল রকমের সাহায্য দেওয়া হোক। শ্রী কে মনোহরণ (ডি এম কে) শ্রী শ্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী (জঃ সঃ) শ্রী চিত্ত বসু (ফঃ বঃ), শ্রী ত্রিদিব চৌধুরী (আর এস পি) শ্রী এন জি গোরে (পি এস পি) ও শ্রী এস এন মিশ্র (আদি কং) একই দাবি তোলেন।

 

ত্রাণকার্য সম্পর্কে একটি আলাদা বৈঠক বসবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন যে পাকিস্তানী ফৌজের অত্যাচার থেকে বাঁচবার জন্য এ পর্যন্ত প্রায় পনের লক্ষ লোক ভারতে এসেছেন। আরও আসবেন। এ জন্য ত্রাণকার্য সম্পর্কে কি করা যায় সে বিষয়ে আলোচনার জন্য তিনি (প্রধানমন্ত্রী) বিরোধী নেতাদের সঙ্গে পৃথক একটি বৈঠকে বসবেন। (অর্থমন্ত্রী শ্রী চ্যবন নাকি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে এ জন্য মোট ষাট কোটি টাকা দরকার)। তবে ওই বৈঠকে কবে বসবে তা ঠিক হয়নি। ভারত চায় যে, এই ত্রাণকার্য আন্তর্জাতিক রুপ নিক।

 

ইন্দিরাজী আরও বলেন যে, বাংলাদেশে আগে দুই ডিভিশন পাক ফৌজ ছিল। এখন আছে চার ডিভিশন। শহরগুলি অধিকাংশ পাক ফৌজের দখলে আছে। গ্রামাঞ্চলের বহু এলাকাই এখনও মুক্তিফৌজের নিয়ন্ত্রণে। গেরিলা তৎপরতা চালিয়ে তাঁরা পাক ফৌজের তৎপরতা সাফল্যের সঙ্গে মোকাবিলা করছেন।

 

কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার বৈঠক

নয়াদিল্লী, ৭ মে-প্রকাশ বাংলাদেশ সম্পর্কে আলোচনার জন্য কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভা আজ এক বৈঠকে মিলিত হন। এই বৈঠকে পূর্বনির্ধারিত ছিল না।

বিরোধী দলনেতাদের সঙ্গে আলোচনার পরেই প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি গান্ধী স্বল্প সময়ের নোটিশে তার সহকর্মীদের ঐ বৈঠকে আহবান করেন।

এক ঘন্টাব্যাপী বৈঠকে শ্রীমতি গান্ধী বিরোধী নেতাদের সঙ্গে তাঁর আলোচনার বিষয়ে সহকর্মীদের অবহিত করেন।

-পি টি আই

 

 

 

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
১১। জাতিসঙ্ঘের ‘সোশ্যাল কমিটি অব দি ইকনমিক এন্ড সোশ্যাল কাউন্সিল’ এ ভারতের স্থায়ী প্রতিনিধি সমর সেনের ভাষণ ভারত সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ১২ মে ১৯৭১

 

 

Razibul Bari Palash

<১২, ১১, ১৩১৮>

 

মানবাধিকার কমিশনের প্রতিবেদনের এজেন্ডা আইটেম () এর উপরে জাতিসংঘের অর্থনৈতিক সামাজিক পরিষদের সামাজিক কমিটিতে ভারতের স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত এস সেন এর স্টেটমেন্ট, ১২ মে ১৯৭১

 

জনাব চেয়ারম্যান,

 

আমার প্রতিনিধিদল এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উপর আলোচনায় অংশ নেয়ার জন্য এই অনুষ্ঠানকে যথাযথ মনে করে। কমিশনের বর্তমান রিপোর্টে এটি স্পষ্ট যে মানবাধিকার রক্ষা এখনো একটি গুরুত্তপূর্ন সমস্যা। প্রকৃতপক্ষে, সাধারণ পরিষদের ২৫ তম অধিবেশনে গৃহীত স্মারক ঘোষণাপত্রের রিপোর্টের অনুচ্ছেদ ৮-এ প্রকাশিত একটি অনুচ্ছেদে বাস্তবায়নের ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। প্রসঙ্গিক বাক্যটিতে লেখা আছে – “যদিও কিছু অগ্রগতি অর্জন করা সম্ভব হয়েছে, তথাপি এখনও বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে একাধিক ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে মানবাধিকারের গুরুতর লঙ্ঘন সংঘটিত হচ্ছে। আমরা নিজেদেরকে মানুষের অধিকার রক্ষার মৌলিক স্বাধীনতাসমূহ লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে ক্রমাগত এবং নির্ধারিত সংগ্রামের অঙ্গীকার করি। এই লঙ্ঘনের মৌলিক কারণগুলো দূর করতে হবে। মানুষের মর্যাদার জন্য জাতিসংঘ কর্তৃক প্রদত্ত চার্টার ব্যবহারের মাধ্যমে জাতি, বর্ণ, লিঙ্গ, ভাষা বা ধর্ম নির্বিশেষে সার্বজনিন শ্রদ্ধাবোধ তরান্বিত করতে হবে। ”

 

চার্টার এর ১(৩), ৫৫ (গ) এবং ৫৬ আর্টিকেলে, মানবাধিকার নিশ্চিত করার জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তার কথা বলা আছে। ১৯৬৮ সাল, যেটাকে আন্তর্জাতিকভাবে মানবাধিকার বছর হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে, সেদিন ‘Human Rights-A Compilation of International Instruments of the United Nations” নামে একটি পুস্তিকা প্রকাশিত হয়। এই পুস্তিকার শেষ পৃষ্ঠায় মানবাধিকার মোকাবেলার যন্ত্র হিসাবে ৩৪ টি বিষয়ের একটি তালিকা দেওয়া হয়। এছাড়া এই তালিকা থেকে, গত তিন বছরে বিভিন্ন অন্যান্য নথি, ঘোষণা এবং রেজুলেশন গৃহীত হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, সামাজিক অগ্রগতি ও উন্নয়ন ঘোষণাপত্র ১৯৬৯ এর কথা উল্লেখ করা উচিত। ২৫ তম অধিবেশন ঘোষণাপত্র আমি ইতিমধ্যে উল্লেখ করেছি, যেখানে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের ব্যাপারে আন্তর্জাতিক আইন ও এর মূলনীতি ঘোষণা সহ ইউনাইটেড নেশনস চার্টার অনুযায়ী সহযোগিতার কথা উল্লেখ আছে – এগুলো সবই মাত্র ছয় মাস গৃহীত হয়। উপরন্তু, তেহরান মানবাধিকার ঘোষণাও অপ্রাসঙ্গিক। ১৯৪৯ সালের যুদ্ধকালীন সময়ে বেসামরিক ব্যক্তিদের সুরক্ষা সংক্রান্ত জেনেভা কনভেনশনটিও তাই। উপরন্তু, সাধারণ পরিষদে গত বছর চারটি রেজুলেশন ২৬৭৪, ২৬৭৫, ২৬৭৬ ও ২৬৭৭ গৃহীত হয়, যেগুলোর সবই আর্মস কনফ্লিক্টে সৃষ্ট মানবাধিকার প্রশ্ন সংক্রান্ত। ভারত শুরু থেকেই মানবাধিকার কমিশনের সদস্য। এবং জাতিসংঘসহ সব বড় মাপের ফোরামে ছোট বড় সব রকমের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ব্যাপারে তার অবস্থান জনিয়ে এসেছে। আমি যতোগুলো ঘোষণার কথা বলেছি এগুলো সবই যেখানেই মানবাধিকার লঙ্ঘন হয় সেটা নিয়েই আলোচনা করে থাকে। তেহরান ঘোষণা, মে ১৯৬৮ সালে সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। এর ৫ম অনুচ্ছেদে আছে- “জাতিসংঘের প্রাথমিক লক্ষ্য সর্বোচ্চ স্বাধীনতা ও মর্যাদার মাধ্যমে প্রত্যেকটি মানুষের মানবাধিকার সংরক্ষণ। এই উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য, সকল দেশের আইন প্রতিটি ব্যক্তিকে জাতি, ভাষা, ধর্ম বা রাজনৈতিক বিশ্বাস – নির্বিশেষে মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও তথ্য অধিকার এবং পাশাপাশি ধর্ম পালনের অধিকার দান করা উচিত, এবং তার দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং সামাজিক জীবনে অংশগ্রহণের অধিকার থাকা উচিৎ। ”

 

যতক্ষণ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বিভিন্ন দেশে আইনের লঙ্ঘন পর্যবেক্ষন না করে এবং তার প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা না নেয় ততক্ষণ আমরা মানবাধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতা রক্ষা প্রশ্নে যাই বলি না কেন সেটা বিদ্রুপ মাত্র। এটা বারবার অনেকভাবেই জাতিসংঘের বিভিন্ন ফোরামে প্রকাশ করা হয়েছে এবং আমি কৃতজ্ঞ বিশেষ করে পাকিস্তানের বিশিষ্ট প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত আগা শাহীর কাছে কারণ তিনি আফ্রিকা এবং ফিলিস্তিনে মানবাধিকার লঙ্ঘনের উপর মে ২০, ১৯৭০ তারিখে অনুষ্ঠিত সামাজিক কমিটির সভায় বলেন –

 

“অন্যান্য কোন পরিস্থিতি যেখানে মানবাধিকারের ব্যাপক লঙ্ঘন হবে সেগুলো পরীক্ষা ও তদন্ত করা হবে এবং মানবাধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতা বিষয়ে জাতিসংঘের সনদ বাধ্যতামূলক ভাবে মানতে হবে যাতে এটি বিদ্রুপ ও একাডেমিক বিতর্কে সীমাবদ্ধ না হয়ে যায়। ”

 

এটা প্রসঙ্গে উদাহরণস্বরূপ ভারত সরকার গভীর ক্ষোভের সাথে মানবাধিকার লংঘনের একটি বর্তমান অবস্থা গোচরে আনতে চায় যেখানে লক্ষ লক্ষ মানুষের মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে। এটি জানানোর পাশাপাশি আমার দেশে যে লক্ষাধিক শরণার্থী আসছে সেই অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে মানবিক ত্রাণ ব্যবস্থার জন্য আবেদন করছি। সমস্যা যে আকার ধারণ করেছে তাতে এটি এখন একটি আন্তর্জাতিক উদ্বেগের বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

 

এই মর্মান্তিক মানবিক সমস্যা বোঝার জন্য তার কারণগুলো ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন। এর ফলে বিশ্ব সম্প্রদায়ের পক্ষে এটির গুরুত্ব ও ধারাবাহিকতা অনুধাবন করা সহজ হবে এবং তার ফলে সেটা কমাতে জরুরী ব্যবস্থা গ্রহণ করে লাখ লাখ মানুষের দুর্ভোগ কমানোর ব্যাপারে আগানো যাবে।

 

I

 

পাকিস্তান সরকার মানবাধিকার কনভেনশনের বিভিন্ন ঘোষণা, রেজুলেশন ও কনভেনশন গ্রহণ ও সমর্থণ করে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে তারা পূর্ববঙ্গে মিলিটারি একশনে এই আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা ব্যাপকভাবে লঙ্ঘন করেছে। এটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে গভীর উদ্বেগের বিষয়। আমি সেখানে যেসকল অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটছে সেগুলো এত বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করার প্রয়োজন মনে করছিনা। এগুলো সবারই জানা। এতে তাদের মধ্যে হতাশা সঞ্চিত হচ্ছে। বছরের পর বছর তারা যে অসাম্যের স্বীকার হচ্ছে তার ফলে এমন মর্মান্তিক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। ফলে অনেক ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ জন্ম নিচ্ছে। এমন প্রচুর ঘটনা আমি লক্ষ্য করেছি। এই বছর মার্চের শেষের দিকেও আমাদের প্রত্যাশা ছিল যে এই মনুষ্যসৃষ্ট অসুবিধা দূর করার জন্যে পূর্ব বাংলার মানুষের দাবী মেনে নেয়া হবে। কিন্তু করা হয়েছে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার বিপরীত। একটি সামরিক অভিযান পূর্ববাংলায় রাজনৈতিক চেতনা ও কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। ২৬ মার্চ পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি যেসব কথা বলেন তার মধ্যে বলেন –

 

“আমি সারা দেশে সব রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আওয়ামী লীগ একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে নিষিদ্ধ করা হল। আমিও একটা সম্পূর্ণ প্রেস সেন্সরশিপ আরোপ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সামরিক আইন প্রবিধান খুব শীঘ্রই এই সিদ্ধান্ত অনুসারে জারি করা হবে। ”

 

এ প্রসঙ্গে আমি মানবাধিকার ঘোষণাপত্র, সম্পূর্ণরূপে পাকিস্তানের কাছে গ্রহণযোগ্য একটি নথির মূল বিধান কমিটির দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। এই ঘোষণাপত্রের অনুচ্ছেদ ৩: “জীবন, স্বাধীনতা এবং ব্যক্তি নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার আছে”। পূর্ববাংলায় গৃহীত ব্যবস্থা এই অধিকার থেকে বঞ্চিত করে। অনুচ্ছেদ ৫: “কোন মানুষের বিরুদ্ধে অবমাননাকর আচরণ অথবা শাস্তি, নির্যাতন করা বা নিষ্ঠুর আচরণ করা যাবে না”। যা আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমে দেখা গেছে তাতে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ হয় যে, এই অধিকার ক্ষুণ্ণ হয়েছে। আর্টিকেল ৭, ৮, ৯, ১২, ১৩, ১৭, ১৮, ১৯, ২০ ও ২১ এর বিধান একভাবে অবমাননা করা হয়েছে। জনাব চেয়ারম্যান, আমি দেখাতে পারি মানবাধিকার সংক্রান্ত যেকোন নথিতেই পাকিস্তানের সমর্থন আছে এবং এটাও নিঃসন্দেহে দেখানো যায় যে পাকিস্তান প্রায় সব বিধান ভঙ্গ করেছে।

 

পূর্ববাংলার জনগণের সাথে পশ্চিম পাকিস্তানের জাতিগত, ভাষাগত এবং সাংস্কৃতিক পার্থক্য আছে। তথাপি পশ্চিম পাকিস্তানী সেনাবাহিনী কর্তৃক সম্পত্তি ধ্বংস করে কনভেনশনের ২ নং ধারা লংঘন করা হয়েছে যেটা সাধারণ পরিষদ কর্তৃক স্বাক্ষরিত এবং যার অনুসমর্থন প্রস্তাব হয়েছিল ৯ ডিসেম্বর, ১৯৪৮ সালে [রেজোলিউশন ২৬০-এ- (iii)]। পাকিস্তান নিজেও এই কনভেনশন এর বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। একইভাবে সামরিক আইন ঘোষণা, কঠোর নিয়মকানুন পূর্ব বাংলায় কঠোরভাবে চালানো হচ্ছে। তাদের আইন মেনে না চললে মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত দেয়া হতে পারে। যে স্বাধীনতাকে জাতিসঙ্ঘে মৌলিক বিবেচনা করা হয়েছে সেটাও দমন করা হচ্ছে।

 

১২ আগস্ট, ১৯৪৯ জেনেভা কনভেনশনের আর্টিকেল ৩ এ সাধারণ জনগণের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। বিশেষভাবে নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির জীবন, অঙ্গহানি ও নির্যাতনের সহিংসতা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এছাড়া বিশেষ অমানবিক ও অবমাননাকর আচরণ নিষিদ্ধ। পূর্ববর্তী রায় নিয়মিতভাবে গঠিত সাধারণ আদালত দ্বারা না হলে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর অবৈধ হবে সেকথাও বলা আছে। সকল কনভেনশনের বিধান লঙ্ঘিত হয়েছে। আর আশ্চর্যের ব্যাপার, পাকিস্তান সরকার ইন্টারন্যাশনাল কমিশন অব জুরিস্টস দ্বারা তৈরি আপীল কে সামান্যতম ভ্রুক্ষেপ করার চিন্তা-ভাবনাও দেখায়নি। আমি তাদের টেলিগ্রাম পড়ছি। ২ এপ্রিল ১৯৭১ –

 

“ইন্টারন্যাশনাল কমিশন অব জুরিস্টস গভীরভাবে পূর্ব পাকিস্তানে বিয়োগান্তক ঘটনা সম্পর্কে উদ্বিগ্ন। মৃত্যুর পরিমাণ কমাতে সর্বোচ্চ ব্যাবস্থা গ্রহণ করুন এবং রাজনৈতিক বন্দীদের সংযম ও শ্রদ্ধার সাথে মোকাবেলা করুন”।

 

 

এপ্রিল ১৫ তারিখের টেলিগ্রাম:

 

‘আমাদের ২ এপ্রিল-এর টেলিগ্রাম এর প্রেক্ষিতে, ইন্টারন্যাশনাল কমিশন অব জুরিস্টস বিশেষ সামরিক ট্রাইবুনাল করে আওয়ামী লীগ নেতাদের বিচার করার চেষ্টায় উদ্বিগ্ন। আইন অনুযায়ী স্বাভাবিক বেসামরিক আদালতের কার্যধারা মোতাবেক আগালে তা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা বলে আন্তর্জাতির বিশ্ব কর্তৃক সন্তোষজনক হবে।

 

ইন্টারন্যাশনাল কমিশন অব জুরিস্টস সবসময় রাজনৈতিক অপরাধের জন্য অভিযুক্ত রাজনৈতিক বিরোধীদের বিচারের জন্য বিশেষ ট্রাইবুনাল প্রতিষ্ঠার অনুমোদন দেয়না। কারণ বিশেষ ট্রাইবুনাল যা আইনে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বিচারকদের দ্বারা যথাযথভাবে আদালত গঠন হয়না এবং এখানে আইনি প্রয়োগে স্বাধীনতা ও সম্মানের অভাব থাকে। শেখ মুজিবুর রহমান বা অন্য আওয়ামী লীগ নেতারা যদি পাকিস্তানের আইনের অধীনে কোনো অপরাধ করে থাকেন, সেখানে দরকার হলে তাদের বেসামরিক আদালতে আনা যেতে পারে।

 

এই পরিস্থিতি বিবেচনা করে আমরা আন্তর্জাতিক মতামত ইতিমধ্যে দিয়েছি। এবং ইতোমধ্যে কমিটি এই ব্যাপারে শোকাহত। যেহেতু জাতিসঙ্ঘ অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের মানবাধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তাই তাদের এ বিষয়ে সুস্পষ্ট ব্যাবস্থা গ্রহণ জরুরী। বড় মাপের গণহত্যা, নারী ও শিশু, নৃশংসতা, এবং ব্যাপক স্কেলে সংঘটিত অত্যাচার এবং সম্পত্তি ধ্বংস পূর্ববাংলার নিরস্ত্র বেসামরিক জনগণের উপর নেমে আসা হত্যাকাণ্ড প্রভৃতির বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক বিবেক প্রজ্বালিত করা আবশ্যক ও বিশ্বের এই অংশে সভ্য সমাজ পুনঃস্থাপন করার জন্য আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টা আবশ্যক।

II

 

কিন্তু সেখানে মানবাধিকারের আরও ঘটনা ঘটছে যা বর্তমান কমিটির নজরে আনা উচিত। পূর্ববাংলায় নেয়া সামরিক কর্মের ফলস্বরূপ, ভারতে শরণার্থীর সংখ্যা ইতিমধ্যে অতিক্রম করেছে ১.৮ মিলিয়ন। সুনির্দিষ্ট হিসাবে সীমান্তের কাছাকাছি ভারতীয় কর্তৃপক্ষ ৩ মে দিল্লি থেকে উলি্ল্লখিত ছিল ১, ৪৮১, ১০১ জন। এই চিত্র যথেষ্ট বৃদ্ধি পেয়েছে। ৩ মে, ১৪১, ৫৮৮ জন উদ্বাস্তু আসাম ও মেঘালয় (ভারতীয় একটি পূর্ব রাজ্য) প্রবেশ করে; যখন ৩৯৩, ৮৩ জন ক্যাম্পের বাইরে, ১, ২০০, ৯৬২ জন শরণার্থী পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশ করেছে এই ১০২, ২০৫ জন ক্যাম্পে, এগুলোর ৫৩২, ৬৭৫ জন ক্যাম্পে, ৬৬৮, ২৮৭ জন ক্যাম্পের বাইরে হয়; ১৩৬, ৫৩২ জন উদ্বাস্তু ত্রিপুরা প্রবেশ করে; ৩৫, ০০০ জন বাইরে। এগুলোর ১০১, ৫৩২ জন ক্যাম্পে, ২, ০১৯ জন শরণার্থী বিহার প্রবেশ করেছে। এভাবে ক্যাম্পে শরণার্থী মোট সংখ্যা ৭৩৮, ৪৩১ জন এবং বাইরে  ৭৪২, ৬৭০ জন। ৩ মে আমরা ১৫৬ টি ক্যাম্প স্থাপন করেছি এবং মহাসচিব ও যেমন ইউএনএইচসিআর, ইউনিসেফ, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে অন্যান্য ইউ এন সংস্থা জ্ঞ্যাত আছে। এ ছাড়াও, ক্যাথলিক রিলিফ অর্গানাইজেশন, কারিতাস ব্যবস্থা গ্রহণ করছে।

 

আমি আনন্দের সাথে বলতে চাই যে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক ভাবে শরণার্থীদের সাহায্য করার জন্য ব্যাবস্থা নেয়া হচ্ছে। উদ্বাস্তু অনেক নারী ও শিশুদের কঠিন চাপের মুখে এবং সবচেয়ে কঠিন অবস্থার মধ্যে তাদের বাড়িঘর ও গ্রাম ছেড়ে চলে যেতে হয়েছে। এই বৃহৎ অন্তঃপ্রবাহ দৈনিক বাড়তে থাকে যেমন আমি ইতিমধ্যে উল্লেখ করেছি। পূর্ববাংলায় পাকিস্তানের নৃশংসতার ফলে এত বিপুল সংখ্যক লোক তাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে ভারতে চলে আসছে। সামান্য খাদ্য এবং ব্যক্তিগত জিনিসপত্র সঙ্গে কষ্টসহকারে নিয়ে বিপজ্জনক যাত্রায় তারা আসছে। পূর্ববঙ্গে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসা পর্যন্ত, মানবিক ভিত্তিতে, এই ক্ষুধার্ত মানুষকে আশ্রয় দেওয়ার ও যারা রোগ এবং অনাহারে ভুগছে তাদের মানবিক কারণে আমরা সাহায্য করছি। পাকিস্তান সরকারের কর্তব্য তাদের নিপীড়ন বন্ধ করা এবং স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনা যাতে উদ্বাস্তুরা নিরাপদে ফিরে যেতে পারে। যতক্ষণ পর্যন্ত পাকিস্তান পূর্ব বাংলায় নিরাপদ পরিবেশ সৃষ্টি করবে ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা শরনার্থিদের আমরা সানন্দে সাহায্য করব। অন্যান্য সরকার এবং সেইসাথে আন্তর্জাতিক সংস্থা এগিয়ে আসতে হবে। এটি অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের উদ্বেগের বিষয় এবং আমরা আশা করি যে কাউন্সিল এই সমস্যা উপলব্ধি করবে এবং এই আপীল অনুমোদন করবে।

 

III

পূর্ববঙ্গে পাকিস্তান সরকার কর্তৃক গৃহীত আরেকটি পদক্ষেপের ফল সেখানে অর্থনৈতিক জীবনের ভাঙ্গন শুরু করেছে। মার্চ থেকে শুরু করে সব বিদেশী সংবাদ প্রতিনিধিদের বহিষ্কার করা হয়েছে এবং নির্ধারিত ৫ বা ৬ জন কে প্রহরায় পূর্ববাংলার যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। সেসব ভ্রমণের বিস্তারিত অনেক মাস বহিঃবিশ্ব জানতে পারবেনা। সহিংসতার প্রাদুর্ভাবে পরিবহন ও বন্টন ব্যবস্থা এবং অন্যান্য অপরিহার্য পরিষেবার সম্পূর্ণ ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। যেহেতু পূর্ববঙ্গ তার বৃহৎ জনসংখ্যার জন্য প্রচুত খাদ্যশস্য আমদানির উপর নির্ভর করে তার উপরে কয়েকমাস আগে একটি সর্বনাশা ঘূর্ণিঝড় প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি করে যায়। তার উপর যেহেতু সামরিক প্রভাব জারি হয়েছে তাই এবার আবাদ মৌসুমও প্রভাবিত হবে। এই অবস্থার অধীনে দুর্ভিক্ষ হবার সম্ভাবনা প্রকট এবং সাধারণত মহামারি ও রোগ আরও বৃদ্ধি পাবে। ফলে পূর্ববাংলা থেকে ভারতে পালিয়ে আসবে আরও উদ্বাস্তু। এভাবে লাখ লাখ শরণার্থী ভারতে ঢালাও প্রবেশের ফলে এই অঞ্চল একটি অস্থিতিশীলতার দিকে ধাবিত হতে পারে। তাই ভারতে পূর্ববঙ্গ থেকে উদ্বাস্তুদের অন্তঃপ্রবাহ বন্ধ করা জরুরী। এটি একটি আন্তর্জাতিক উদ্বেগের বিষয় হওয়া উচিত। এটি সম্ভব একমাত্র যদি এই কাউন্সিল নিশ্চিত করতে পারে যে পাকিস্তান আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংগঠনগুলোকে সেদেশে ঢুকে অভাবগ্রস্ত বাঙ্গালীদের সাহায্য করার অনুমতি দেয়।

 

আন্তর্জাতিক ত্রাণ অপারেশন সঙ্ঘটিত হলে বর্তমান সৃষ্ট সঙ্কটের অপসারণ করতে সক্ষম হবে।

 

এটা হতাশাজনক যে এই পরিস্থিতিতে পাকিস্তান সরকার আন্তর্জাতিক রেড ক্রস দলের করাচিতে গিয়ে পূর্ববঙ্গে কার্যধারা চালানোর অনুমতি পায়নি। এপ্রিল ১ তারিখে ইউ বলেন যে তিনি পূর্ব পাকিস্তানের সাম্প্রতিক মানুষের দুর্ভোগ ও ক্ষতি সম্পর্কে উদ্বিগ্ন এবং বলেন যদি পাকিস্তান সরকারের সেক্রেটারি জেনারেল এর কাছে মানবিক প্রচেষ্টার সাহায্য চান তবে তার ক্ষমতার সবকিছুই খুশি মনে করবেন। উত্তরে পাকিস্তানীরা ছোট্ট করে শুধু বলেছেন – এখনো নয়। এই প্রসঙ্গে আমরা আজ সকালে নিউ ইয়র্ক টাইমস সম্পাদকীয়র মন্তব্যটি উল্লেখ করতে চাই। বিশ্বের অন্যান্য অনেক সরকার এবং আন্তর্জাতিক সংস্থা গুলো পূর্ব পাকিস্তানের শোচনীয় পরিস্থিতি অনুধাবন করে সাহায্য করার জন্য উৎসুক আছে কিন্তু পাকিস্তান সরকার বরাবরের মত বলেছে তাদের দেশে যথেষ্ট খাদ্য মজুদ আছে। মাত্র কয়েক মাস আগে, একটি ভয়াবহ সাইক্লোন পূর্ব বাংলার কিছু অংশ বিধ্বস্ত করে দিয়েছে। সে সময়ে, অনেক কমিটি ও জাতিসংঘের অন্যান্য ফোরামে রেজুলেশন পাশ হয় প্রাকৃতিক দুর্যোগের রিলিফ এর জন্য ও অনেক পদক্ষেপ গৃহীত হয়। পাকিস্তান নিজেও সাহায্যের জন্য ব্যাপকভাবে আপীল করে বিশাবাসীর কাছে। আমার দেশ ও তাতে সাড়া দেয়। কিন্তু অবাক করে দিয়ে এখন তারা বলছে পাকিস্তানে যথেষ্ট খাবার আছে।

 

এই অবস্থায় প্রথম অপরিহার্য পদক্ষেপ হল পাকিস্তানকে জিজ্ঞাসা করতে হবে যে অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদকে অবিলম্বে ত্রাণ কাজের সম্মতি দিবে কিনা যাতে জাতিসংঘের পৃষ্ঠপোষকতায় সুশৃঙ্খলভাবে ও সমন্বিত সাহায্য কর্মসূচি জন্য পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা যেতে পারে। যেহেতু সেক্রেটারি জেনারেল, ইতিমধ্যে সব মানবিক সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার কথা বলেছেন তাই এটা এখন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বশীল আচরণ হবে আন্তর্জাতিক ত্রাণ প্রচেষ্টার ব্যাপারে।

 

আমরা আশা করি এবং বিশ্বাস করি যে পূর্ব বাংলার জনগণের মৌলিক চাহিদা ও সেবা মেটানোর জন্য যথাযথ ব্যাবস্থা নেয়া হবে এবং তাদের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটাতে সহায়তা করা হবে। তারা যথেষ্ট ভুগেছে। এবং তারা অবশ্যই মনে রাখবে কে তাদের মনে রেখেছে আর কে ছিল নীরব দর্শকের ভূমিকায়।

 

 

 

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
১২। বাংলাদেশের আন্দোলনকে সমর্থনের জন্য বিশ্বশান্তি কংগ্রেসের প্রতিনিধিদের প্রতি প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর আহবান দৈনিক আনন্দবাজার ৫ মে ১৯৭১

 

Aparajita Neel

<১২, ১২, ১৯>

পুর্ববঙ্গের স্বাধীনতা আন্দোলন সমর্থন করুনঃ

বিশ্বশান্তি কংগ্রেসে ইন্দিরাজীর বার্তা

 

বুদাপেস্ট, ১৩ মে – আজ এখানে বিশ্বশান্তি কংগ্রেসের দিনব্যাপী অধিবেশন শুরু হয়েছে। অধিবেশনে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সমর্থন জানানোর জন্য ভারতের বক্তব্য অন্যান্য দেশের প্রতিনিধিরা মনোযোগ দিয়ে শোনেন। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকেও একজন প্রতিনিধি সম্মেলনে যোগ দিয়েছেন।

 

৮০ টি দেশের প্রায় ৭০০ প্রতিনিধির সামনে প্রকাশ্য অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর বার্তাটি পড়ে শোনানো হয়। তাতে শ্রীমতী গান্ধী বলেছেন, ভারতের অবস্থায় পূর্ববঙ্গের ঘটনাবলিতে উদাসীন থাকা কঠিন।

 

প্রধানমন্ত্রী ঐ বার্তায় বলেছেন, প্রায় ২০ লক্ষ উদ্বাস্তু ভারতে চলে এসেছেন – ফলে আমাদের উপর প্রচণ্ড চাপ পড়েছে। এই উদ্বাস্তুরা যাতে নিরাপদে মর্যাদার সঙ্গে দেশে ফিরে যেতে পারেন – তেমন অবস্থা সৃষ্টি করার জন্য পাকিস্তানকে অবশ্যই বাধ্য করতে হবে।

 

শ্রীমতী গান্ধী বলেছেন, আশা করি, বিশ্বের শান্তিপ্রিয় মানব সমাজ মানবিক অধিকার রক্ষার জন্য উঠে দাঁড়াবেন। পুর্ববঙ্গের জনসাধারণের ন্যায্য দাবী, তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই তাদের দেশ শাসন করবেন। বিশ্বের মানুষ আশা করি, এই দাবী সমর্থন করবেন, এবং তাদের ঐ অধিকার পুনরুদ্ধারের জন্য সচেষ্ট হবেন। এই গুরুত্বের পরিস্থিতি এবং লক্ষ লক্ষ নির্দোষ মানুষের অবর্ননীয় দুর্দশায় আমার মন ভারাক্রান্ত।

 

ভারতীয় প্রতিনিধি দলের সদস্য শ্রী অমৃত নাহাত বার্তাটি পড়ে শোনান। তাঁকে প্রবল হর্ষধনী জানিয়ে সদস্যরা অভিনন্দন জানান।

 

ভারতীয় প্রতিনিধি দলের নেতা শ্রীকৃষ্ণ মেনন বলেন, পূর্ববঙ্গে গৃহযুদ্ধ নয় – গুলি চালিয়ে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন দমন হচ্ছে। তিনি হিটলারি অত্যাচারের সঙ্গে পূর্ববঙ্গের ঘটনার তুলনা করেন।

 

শ্রী মেনন আরও বলেন, পূর্ববঙ্গ বিশ্বের অষ্ট জাতীয় এলাকা এবং হাঙ্গেরির চেয়ে তাঁর জনসংখ্যা ১০ গুণেরও বেশী।

 

– পি টি আই

 

 

 

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
১৩। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম সফল হবে – প্রধানমন্ত্রীর আশা প্রকাশ দৈনিক স্টেটসম্যান ১৬ মে ১৯৭১

 

Razibul Bari Palash

<১২, ১৩, ২০>

 

বাংলাদেশর সংগ্রাম বৃথা যাবে না প্রধানমন্ত্রী

 

আগরতলা, ১৫ মে: প্রধানমন্ত্রী মিসেস ইন্দিরা গান্ধী, আজ আশা প্রকাশ করেন যে বাংলাদেশের জনগণের সংগ্রাম বৃথা যাবেনা। তারা শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতা এবং তার থেকে গণতান্ত্রিক সরকার অর্জন করবেন।

 

মিসেস গান্ধী, এখান থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে মোহনপুরে একটি বিশাল সমাবেশে ভাষণ দিচ্ছিলেন। তিনি বলেন, ভারত পূর্ববাংলায় একটি গণতান্ত্রিক সরকার গঠিত হলে তাকে স্বাগত জানাবে এবং তার সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখবে।

 

ভারতের মত পূর্ব বাংলায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সেখানে মানুষ তাদের নিজস্ব সরকার গঠন করতে পারেনাই যা তাদের দেশ থেকে দারিদ্র্য দূর করতে সাহায্য করবে।

 

সম্পদের সীমাবদ্ধতা

 

প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, ভারত এবং পূর্ব বাংলার মানুষ গণতান্ত্রিক পথ অনুসরণ করবে এবং তারা নিজেরাই তাদের নিজ নিজ জাতির স্বার্থে সাম্প্রদায়িকতার বিষকে আশ্রয় দেবেনা।

 

মিসেস গান্ধী বলেন; ‘ আমাদের ভাই ও বোন যারা ভারতে এসেছে তাদের সাহায্য করতে আমাদের যথাসাধ্য চেষ্টা করতে হবে। কিন্তু আমাদের সম্পদ সীমিত “।

 

প্রধানমন্ত্রী বলেন, এটি শুধু পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার ছিল, কিন্তু এখন এটি ভারতের জন্য সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

শরনার্থিদের সাহায্য করার অবর্ননীয় সমস্যা উল্লেখ করে তিনি বলেন, শরণার্থীদের প্রবল অনুপ্রেবেশ দেশের অর্থনীতির উপর একটি ভয়ানক বোঝা হবে। কিন্তু এটি ভারতের কোন নির্দিষ্ট রাজ্যের উদ্বেগ না – এটি পুরো দেশের জন্যই চিন্তার বিষয়। তাই কেন্দ্র সরকার এই দায়িত্ব বহন করবে।

 

তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, এই মানুষগুলো তাড়াতাড়ি তাদের দেশের শান্তি পুনরুদ্ধার করতে পারবে এবং তাদের নিজস্ব সরকার গঠন করে তাদের মাতৃভূমিতে ফিরে যেতে সক্ষম হবে।

 

ত্রিপুরায় মিসেস গান্ধী নরসিংগড়, মোহনবাড়ি এবং সিমনাতে শরনার্থি ক্যাম্পের ব্যক্তিদের খাদ্য ও জীবনযাপনের সম্পর্কে খোঁজ-খবর নেন।

 

এর আগে আসামের শিলচর-এর কাছাকাছি উধারবন্দের একটি শরণার্থী শিবিরে মিসেস গান্ধী বলেন, বাংলাদেশের এবং ভারতের জনগণ এই দুর্ভোগ লাঘবের জন্য একত্রে যথাসাধ্য সবকিছু করবে।

 

মিসেস গান্ধী শরনার্থিদের দুঃখের কাহিনী মনোযোগ দিয়ে শোনেন।

 

উধারবন্দ শরণার্থী শিবিরে প্রায় ২৫০০০ শরনার্থি আছে।

 

মিসেস গান্ধী দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, পাকিস্তান ভারতে সাম্প্রদায়িক উগ্রতা উসকে দেয়ার প্রয়াস নিচ্ছে। এজন্য মানুষকে সতর্ক থাকতে অনুরোধ করেন।

 

 

 

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
১৪। ‘যথাসময়ে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়া হবে’ প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক শরনার্থি সমস্যার উপর গুরুত্ব আরোপ দৈনিক স্টেটসম্যান ১৭ মে ১৯৭১

 

 

Razibul Bari Palash

<১২, ১৪, ২১২৪>

 

ভুল সময়ে কোন স্বীকৃতি নয়:

প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক শরনার্থি সমস্যার উপর গুরুত্ব আরোপ

(আমাদের বিশেষ প্রতিনিধির মাধ্যমে)

 

 

প্রধানমন্ত্রী মিসেস ইন্দিরা গান্ধী, রোববার দমদম বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত মতবিনিময় সভায় স্পষ্টভাবে বলেন যে, বাংলাদেশ সরকারকে স্বীকৃতি দেওয়ার মত বহুল আলোচিত বিষয়টি এই মুহুর্তে কেন্দ্রীয় সরকার সবচেয়ে জরুরি বিষয় হিসাবে দেখছে না।

 

তিনি বলেন, প্রধান বিবেচনার ব্যাপার হল কেন্দ্রীয় সরকার কর্তৃক উক্ত স্বীকৃতি বাংলাদেশের মানুষকে এই মুহূর্তে কোন সাহায্য করবে কিনা। “আমি মনে করি এটা তাদের কোন সাহায্য করবে না এবং ভুল সময়ে স্বীকৃতি দেওয়া উচিত নয়, ” বলেন তিনি।

 

যখন একজন রিপোর্টার জিজ্ঞাসা করল আপনি কি অন্য কোন দেশের স্বীকৃতির জন্য অপেক্ষা করছেন কিনা তক্ষণ তিনি দৃশ্যত বিরক্ত হয়ে পরলেন। তিনি বলেন, এ ধরনের প্রশ্ন আগে বেশ কয়েকবার করা হয়েছে। তিনি সব সময়ই বলেছেন যে ভারতের একটি স্বাধীন নীতি আছে এবং বিভিন্ন ইস্যুতে সে তার অবস্থান প্রণয়নে অন্যদের উপর নির্ভর করে না।

 

“আমরা স্বাধীন দেশ নিজেদের স্বাধীন নীতি দিয়ে চলি। খুব শক্তিশালী চোখ দিয়ে স্বাধীন সূর্যের নিচে নানা বিষয় নিয়েই আমরা বাস করি এবং অন্যরা কে কি বলল বা করল তার উপর আমরা নির্ভরশিল না। ”

 

দুই শরণার্থী শিবির এবং বনগাঁর একটি হাসপাতালে সফর করার পর একটি বিমান বাহিনীর হেলিকপ্টারে করে বিমানবন্দরে পৌঁছলে প্রধানমন্ত্রী মুখ্যমন্ত্রী এবং পশ্চিমবঙ্গের উপ-মুখ্যমন্ত্রী, জনাব অজয় ​​মুখার্জির সঙ্গে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন। শ্রীযুক্ত বিজয়গুপ্তের সিং নাহার, শ্রীযুক্ত সিদ্ধার্থ শংকর রায়, ইউনিয়ন শিক্ষা মন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন। বৈঠকটি আধা ঘন্টা স্থায়ী হয়।

 

মিসেস গান্ধী আসাম থেকে হলদিবাড়ি ভ্রমন করে সকালে দমদম বিমানবন্দরে পৌঁছান ২টা ১৫ মিনিটে। তাঁর সাথে জনাব রায় ও মিস পদমজা নাইডু, যিনি বাংলাদেশ সহায়ক সমিতির প্রধান – এরা উপস্থিত ছিলেন। দমদম থেকে প্রধানমন্ত্রী ও তার দল হেলিকপ্টারযোগে বনগাঁও যান। আরেকটি হেলিকপ্টার পশ্চিমবঙ্গ মন্ত্রীদের নিয়ে যায়। তারা একটু পরে সাড়ে পাঁচটায় দমদম আসেন।

 

প্রধানমন্ত্রী একটি নীল শাড়ি এবং একটি ফুলস্লিভ ব্লাউজ পড়া ছিলেন এবং তাকে ক্লান্ত লাগছিল। নতুন এয়ারপোর্ট এর লাউঞ্জে প্রথম তলায় এসে তিনি তার পরিচারকের কাছে নিচের তলায় দ্রুত একটি কনফারেন্স কল করেন – সাথে ছিলেন জনাব অজয় ​​মুখোপাধ্যায় ও জনাব নাহার।

 

প্রেস সাংবাদিকদের দোতলায় লাউঞ্জে অপেক্ষা করতে বলা হয়েছে। কিছু সময় পর, মিস পদমজা নাইডু কনফারেন্সে আসেন ও ত্রাণ সমস্যা নিয়ে আলোচনা করেন।

 

জনাব অজয় ​​মুখোপাধ্যায় ও জনাব নাহার এর সঙ্গে বৈঠক চলাকালে জনাব সিদ্ধার্থ রায় এর পশ্চিমবঙ্গ সংক্রান্ত বর্তমান সমস্যা ও আলোচনায় আসে। পরে যোগাযোগ করা হলে জনাব নাহার বলেন, কিছু গুরুতর সমস্যা নিয়ে আলোচনা হয়েছে কিন্তু তিনি সেগুলো এখনই প্রকাশ করতে চাচ্ছেন না।

 

বিশাল সমস্যা

 

শরণার্থী সমস্যা প্রসঙ্গে তিনি সাংবাদিকদের বলেন: “এটি একটি বিশাল সমস্যা এবং এটা নিয়ে কঠিন মোকাবেলা করতে হবে। আমাদের দ্রব্যমূল্য অপর্যাপ্ত এবং পরিস্থিতি মেটানোতেও ঘাটতি আছে; তবে সরকার ভালভাবে কাজ করছে। ”

 

তিনি বলেন যে সেখানে অনেকে আছেন যারা এখনো আশ্রয় পান নাই – যাদের ব্যাপারে তিনি সজাগ আছেন। তিনি বলেন জিনিসপত্র পৌঁছাতে একটু সময় লাগবে। যখন জিজ্ঞাসা করা হল কোনো সাহায্য বিদেশ থেকে আশা করছেন কিনা; তিনি জানান যে কেউ এটা আশা করতে পারে। কিন্তু এখন পর্যন্ত তেমন কিছুই অন্যান্য দেশ থেকে আসেনি। তিনি আরো বলেন, তিনি মনে করছেন যে, বাইরে থেকে যদি সহায়তা আসে তবে, কি এসেছে ও কার কাছ থেকে এসছে সেটা ভারত জানাবে।

 

প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শরনার্থীদের যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ছেড়ে যেতেই হবে, কিন্তু “কিভাবে শীঘ্রই সেটা সম্ভব হবে, আমি জানি না। ” তিনি মনে করেন যে, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো একটি অবস্থার সৃষ্টি করতে পারে তাদের ফিরে যাওয়ার জন্য।

 

পাকিস্তান সরকার দাবি করে বাংলাদেশের উদ্বিগ্ন অবস্থা কেটে স্বাভাবিক হয়েছে – এই কথার উপর মন্তব্য করতে গিয়ে মিসেস গান্ধী বলেন, জনগণকে অন্য কোথাও সরিয়ে দিয়ে খুব সহজেই উদ্বিগ্ন অবস্থা স্বাভাবিক করা যেতে পারে তবে আমার মতে এটি কোন স্বাভাবিক পন্থা নয়।

 

কেন্দ্রীয় সরকার সীমান্ত এলাকা থেকে শরনার্থীদের হস্তান্তর করার জন্য প্রস্তাব বিবেচনা করছে। ত্রিপুরার মত ছোট্ট একটি রাজ্যে এই অবস্থা একটি বড় সমস্যার সৃষ্টি করছে। তিনি বলেন, দেশের অন্যান্য অংশে এদের আশ্রয় দেবার ব্যবস্থা বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে তিনি নিশ্চিত না সেটা সম্ভব হবে কিনা।

 

বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র সহায়তার জন্য অনেক রাজনৈতিক দলগুলোর যে প্রস্তাব সে ব্যাপারে মন্তব্য করতে বলা হলে, মিসেস গান্ধী বলেন, “এ ব্যাপারে কোন মন্তব্য বা প্রতিক্রিয়া নেই”।

 

ঢাকা থেকে ভারতের কূটনীতিকদের ফিরিয়ে দেবার ব্যাপারে পরামর্শ চাইলে তিনি বলেন যে বিষয়টি একদম থমকে আছে; কারণ পাকিস্তান সরকার কোনো প্রস্তাব গ্রাহ্য করছেন না।

 

মিসেস গান্ধী বলেন সংবাদপত্রগুলোকে সংবাদ ও মতামত প্রকাশে খুব সতর্ক হতে হবে। এটা মনে রাখতে হবে যে শত্রুদের এজেন্টরা খুব সজাগ। খেয়াল রাখতে হবে শরনার্থী ইস্যুটি যেন একটি জাতীয় সমস্যা হিসাবে প্রকাশিত হয় – কোন সাম্প্রদায়িক ইস্যুতে নয়।

 

তিনি বলেন, ভারত সীমান্ত বরাবর পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ফায়ারিং করছে। এই ক্ষেত্রে কিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। “সবসময় ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব নাও হতে পারে’- প্রধানমন্ত্রী বলেন।

 

বনগাঁ

 

আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক বলেন – এর আগে আজ বিকেলে বনগাঁতে বাংলাদেশের শরণার্থীদের উদ্যেশ্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এটি একটি দু:খের বিষয় যে পূর্ববঙ্গে স্বাধীনতাযুদ্ধকে এখন একটি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বলে রং দেবার চেষ্টা করা হচ্ছে। এ ধরনের প্রচেষ্টা শুধুমাত্র সে দেশের দুর্বলতার কারণ হবে।

 

বিকেলে মিসেস গান্ধী পেট্রাপোল ও ইটখোলাতে দুটি শরণার্থী ত্রাণকেন্দ্র পরিদর্শন করেন। তিনি বনগাঁর মহকুমা হাসপাতাল পরিদর্শন করেন এবং যারা পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে গুলিতে আহত হয়েছে তাদের সঙ্গে কথা বলেন।

 

তিনি উদ্বাস্তুদের বলেন যে ‘পূর্ববঙ্গের মুক্তিযুদ্ধ সকল দমন ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। মনে রাখবেন, আপনাদের যুদ্ধ আমাদের যুদ্ধ। ’’

 

অবিচার ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার সময় বাংলাদেশের জনগণ ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। “আমরা জানি যে আমাদের সব সাহায্য সত্ত্বেও, আপনারা এখানে সমস্যার মুখোমুখি হতে পারেন কারণ আমরা ধনী দেশ না। ’’

 

মিসেস গান্ধী আশা করেন যে শরণার্থীদের দীর্ঘদিন ভুগতে হবে না এবং তারা খুব শীঘ্রই দেশে ফিরতে সক্ষম হবেন। তিনি বলেন, ভারত একটি গণতান্ত্রিক দেশ। এখানে হিন্দু, মুসলমান, খ্রিস্টান ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের মধ্যে কোন দ্বন্দ্ব নেই। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, পূর্ব বাংলার জনগণ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার জন্য এবং যৌথভাবে মুক্তির জন্য যুদ্ধে লড়াই করবে।

 

পেট্রাপোল ক্যাম্পে যেখানে চার হাজারের অধিক শরণার্থী বসবাস করছে সেখানে মিসেস গান্ধী একটি ছোট মেয়েকে খাবার খেতে দিচ্ছিলেন। মেয়েটি বলে, সে তার অনেক আত্মীয় হারিয়েছে। ১০ বছর বয়সী একটি ছেলে তার কাঁধে তার ছোট বোনকে বহন করে নিয়ে আসার বর্ননা দিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে। তিনি একজন নারীর সাথেও কথা বলেন যার স্বামী পাকিস্তানি সেনাদের গুলিতে নিহত হয়েছে।

 

ভরত সেবাশ্রম এর একজন মুখপাত্র বলেন পেট্রাপোল ক্যাম্পের জনসংখ্যার প্রায় ৪০% মুসলমান। আট বছরের নীচের ছেলেমেয়ের সংখ্যা ২২০০।

 

কলকাতা বিমান বন্দরে অবতরণের পর অবিলম্বে বাংলাদেশের স্বীকৃতির দাবিতে গণতান্ত্রিক ছাত্র সংগঠন এবং গণতান্ত্রিক যুব সংস্থার সমর্থকরা একটি বিক্ষোভের আয়োজন করে। বিক্ষোভকারীরা বাংলাদেশের প্রতি কেন্দ্রীয় সরকারের মনোভাবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে।

 

জনাব জে.সি. দে, ইন্ডিয়ান রেড ক্রস সোসাইটির পশ্চিমবঙ্গ শাখার সভাপতি, প্রধানমন্ত্রী, এবং ইন্ডিয়ান রেড ক্রস সোসাইটির চেয়ারম্যান মিস পদমজা নাইডুকে পেট্রাপোল রাজ্য ইউনিটে তাদের কার্যকলাপ ব্যাখ্যা করে।

 

হলদিবাড়ি

 

হলদিবাড়িতে আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক বলেন – ভারতীয় সীমানার মধ্যে পাকিস্তানের বারবার অনুপ্রবেশের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন সীমান্তের কাছে বসবাসকারী মানুষেরা “কিছু ঝুঁকির সম্মুখীন হবে”। তিনি বলেন, সীমান্তের নিকতবর্তী এলাকায় যারা শেখ মুজিবকে গত নির্বাচনে ভোট দিয়েছে তাদের ভারতে বহিষ্কার করে পূর্ববাংলার জনসংখ্যা হ্রাস করাই এর উদ্দ্যেশ্য।

 

এস ইউ সি এর স্থানীয় ইউনিট এবং ফরওয়ার্ড ব্লক ও আরও একটি প্রতিষ্ঠান মিসেস গান্ধীর কাছে বাংলাদেশকে অবিলম্বে স্বীকৃতির দাবিতে স্মারকলিপি পেশ করে।

 

এস ইউ সি সমর্থকরাও হেলিপ্যাডে এবং গণপূর্ত বিভাগের বাংলো যেখানে তিনি দলের প্রতিনিধিদের সাথে সাক্ষাৎ করেছেন তার সামনে বিক্ষোভ করে।

 

ইউ এন আই যোগ করে – মিসেস গান্ধী পশ্চিমবঙ্গের দুই মন্ত্রীকে নয়া দিল্লিতে ত্রাণ ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছেণ। তিনি রাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রী, জনাব জয়নাল আবেদিন ও গণপূর্ত মন্ত্রী, জনাব সন্তোষ রায় কে ধন্যবাদ জানান। তারা বৃহস্পতিবার নয়া দিল্লির উদ্যেশ্যে রওনা হবেন বলে আশা করা যায়।

 

 

 

 

 

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
১৫। যে কোন পরিস্থিতির জন্য ভারত প্রস্তুত – পাকিস্তানের প্রতি প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সতর্কবানী দৈনিক স্টেটসম্যান ১৯ মে ১৯৭১

 

Razibul Bari Palash

<১২, ১৫, ২৫>

 

ভারত কোনো পরিণামের জন্য প্রস্তুত

পাকিস্তানকে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সতর্কবানী

বড় শক্তিগুলো শরনার্থী সমস্যা নিয়ে কথা বলেছে

 

রানিখেত, ১৮ মে, প্রধানমন্ত্রী মিসেস ইন্দিরা গান্ধী, আজ পাকিস্তানকে সতর্ক করেন যে ভারত তার উপর হুমকির বিষয়ে অনড়। “যদি আমাদের উপর কোন বিশেষ চাপ দেয়া হয়, তাহলে আমরা প্রয়োজনে যুদ্ধ করার জন্য প্রস্তুত” – UNI রিপোর্ট।

 

প্রধানমন্ত্রী জনসভায় বক্তৃতাকালে ‘পূর্ববাংলায় সবকিছু স্বাভাবিক আছে’ – পাকিস্তানের এই দাবীকে চ্যালেঞ্জ করে বলেন যদি এটা সত্যি হয় তবে অতি সত্বর পাকিস্তানের উচিৎ শরনার্থিদের ফিরিয়ে নেয়া।

 

ভারতীয় সীমান্তে উদ্বাস্তুরা ভারত-এর জন্য একটি বড় সমস্যা তৈরি করেছে। এটি গুরুতরভাবে দেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবন প্রভাবিত করবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

 

মিসেস গান্ধী গণতান্ত্রিক জাতির কাছে পাকিস্তানকে পূর্ববাংলায় তার সামরিক নৃশংসতা থামাতে বলতে অনুরোধ করেন। তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বুঝাতে চেষ্টা করেন যে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ সমস্যা ধীরে ধীরে ভারত-এর জন্য একটি বড় সমস্যা হয়ে উঠছে। তবে তিনি বলেছেন “শরনার্থীদের বোঝা আমাদের উপর অনেক বড় চাপ ফেলছে, কিন্তু কিভাবে আমরা অসহায় শরণার্থীদের উপেক্ষা করতে পারি? ”

 

সেখানে কার্যত উদ্বাস্তুদের থাকার কোন ব্যাবস্থাই ছিলনা। পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরা ও মেঘালয় সীমান্ত এলাকায় সকল হাসপাতাল, স্কুল এবং অন্যান্য সরকারী ভবন উদ্বাস্তুদের আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়। যাইহোক, ভারতীয়রা উদ্বাস্তুদের সাহায্যরে জন্য সর্বোত্তম চেষ্টা করবে। তিনি বিস্ময় প্রকাশ করেন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর দ্বারা ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ধনী দেশগুলোর কাছ থেকে সাহায্য আসছিলনা।

 

পিটিআই: ভারত পশ্চিমাদের জানায় যে পূর্ববঙ্গে সৃষ্ট পরিস্থিতি ভারতের জন্য সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিকর ছিল। সীমান্তের ভারতীয় অংশে জমা হওয়া শরনার্থিরা সেখানে বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে।

 

তিনি তাদের বলেছিলেন যে, পাকিস্তান ভারতের জন্য একটি কঠিন পরিস্থিতি তৈরি করেছে। কোন দেশই এই রকম আচরণ করার অধিকার রাখেনা। যদি অতি সত্বর এই পরিস্থিতির উন্নতি না হয় তাহলে ভারত সুনির্দিষ্ট ব্যাবস্থা গ্রহণ করবে।

 

 

 

 

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
১৬। শরনার্থিদের প্রত্যাবর্তনের জন্য বিশ্বকে নিশ্চয়তা দিতে হবে – প্রতিরক্ষামন্ত্রীর মন্তব্য দৈনিক হিন্দুস্তান স্ট্যান্ডার্ড ২১ মে ১৯৭১

 

Razibul Bari Palash

<১২, ১৬, ২৬২৭>

সব শরণার্থীদের ফিরে যাওয়া নিশ্চিত করতে হবে: রাম

(স্টাফ রিপোর্টার)

 

 

আসাম ও পশ্চিমবঙ্গের বাংলাদেশ শরণার্থী শিবিরগুলোতে সফর শেষে কেন্দ্রীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রী, জনাব জগজীবন রাম, রোববার বিকেলে বনগাঁর কাছে পেট্রাপোল এ সাংবাদিকদের বলেন বিশ্ববাসীকে “নজিরবিহীনভাবে’’ বাংলাদেশ থেকে ভারতে শরনার্থি প্রবেশের ব্যাপারে কি ব্যাবস্থা নেয়া যায় সেটা বের করে এই সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে।

 

তিনি বাংলাদেশের জনগণের প্রতি পাকিস্তান সরকারের কাজকে “বর্বরোচিত” হিসাবে মন্তব্য করে বলেন এটি “সমগ্র মানব ইতিহাসে একটি বড় কলঙ্কজনক ঘটনা”।

 

মন্ত্রী বলেন, ‘আমরা ইতিমধ্যে পূর্ববাংলায় অমানবিক কর্মকান্ড থামানোর জন্য পাকিস্তান সরকারের প্রতি অনুরোধ করার ব্যাপারে বিশ্ববাসীর শরণাপন্ন হয়েছি।

 

এরপরও তিনি আরো বলেন, যদি পাকিস্তান “তার বর্বর নীতি চালিয়ে যায় যার দরুন লক্ষ লক্ষ নারী, পুরুষ ও শিশুরা নিরাপত্তার জন্য ভারতের ঢুকতে থাকে তাহলে বিশ্ববাসীকে এই সমস্যার সমাধান করতে অন্যান্য পদক্ষেপ নিতে হবে।

 

দিল্লি যাওয়ার আগে প্রতিরক্ষা মন্ত্রী দমদম বিমানবন্দরে বলেন সরকার শরনার্থিদের ঠেকানোর জন্য সকল ব্যাবস্থা নিয়েছে। তিনি একজন সাংবাদিকএর সাথে একমত প্রকাশ করে বলেন যে অনুপ্রবেশকারী দের জন্য এই দেশে একটি সামাজিক সমস্যা তৈরি হবে এবং একটি অর্থনৈতিক বোঝা সৃষ্টি হবে।

 

উদ্বাস্তু দের অন্য কোথাও পাঠিয়ে দেয়া সম্পর্কে জানতে চাইলে, জনাব রাম বলেন, তিনি এর আগে কেন্দ্রীয় পুনর্বাসন মন্ত্রী, জনাব খাদিখার এবং মুখ্যমন্ত্রী জনাব অজয় মুখার্জির সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছেন। কিন্তু “খুব শীঘ্রই” ফলাফল নাও পাওয়া যেতে পারে।

 

হাজার হাজার শরনার্থিদের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে প্রতিরক্ষা মন্ত্রী বলেন, ভারত পাকিস্তানকে বার বার বলেছে সেখানে সহনীয় পরিস্থিতি সৃষ্টি করার জন্য যাতে তাদের জনগণ ফেরত যেতে পারে।

 

জনাব রাম বলেন, “আমি আমার নিজের চোখ দিয়ে আপনাদের দুঃখজনক অবস্থা দেখতে এসেছি এবং এই কষ্ট প্রশমিত করার জন্য নতুন করে ভালো কিছু করা যায় কিনা দেখছি। ” প্রায় ৩ টার দিকে জনাব রাম হেলিকপ্টার করে দমদম বিমানবন্দর আসেন। তার ১৫ মিনিট পর একটি আই এ এফ থেকে দিল্লীর উদ্যেশ্যে রওনা করেন।

 

দুপুরে রাজভবন, কলকাতা, এক সংবাদ সম্মেলনে প্রতিরক্ষা মন্ত্রী, বলেন বাংলাদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ শরনার্থিদের প্রবেশ “আমাদের উপর একটি বড় বোঝা”। তিনি বলেন, তাদের সংখ্যা আমাদের আয়োজনের চেয়ে অনেক বেশী। অনেকে খোলা আকাশের নিচে বাস করছেন।

 

পাকিস্তানি সেনারা রোববার জনাব জগজিবন রাম, পেট্রাপোল এ আগমনের পূর্বে ভারতের ভিতরে শেলিং করে।

 

আজ সকালে একটি ৮১ মিঃ মিঃ মর্টার শেল ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী ঘাঁটির পাসে পরে। সেখানে কেউ হতাহত হয়নি। শেলটি যশোর রোডের ডান দিকে পরে। বিএসএফ সেখানে তাদের অবস্থান নেয়। কিন্তু গুলি করেনি।

 

বৃহস্পতিবার তিন জন বিএসএফ সদস্য পাকিস্তানি গোলাবর্ষণের কারণে আহত হয়। তারা হাসপাতালে রয়েছেন।

 

শনিবার রাতে পাকিস্তানি সেনারা সাদিপুর গ্রামে ভারতীয় সীমান্তের কাছাকাছি আগুন ধরিয়ে দেয়। কিছু বাসিন্দা যারা সেখান থেকে ভারতে পালিয়ে যায়নি তাদের হত্যা করা হয়।

 

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
১৭। বাংলাদেশের জনগণকে ভারত সাহায্য দিয়ে যাবে – প্রধানমন্ত্রীর ঘোষনা দৈনিক কালান্তর ২৩ মে ১৯৭১

 

Aparajita Neel

<১২, ১৭, ২৮>

বাংলাদেশের জনগণকে ভারত সাহায্য দিয়ে যাবে

– ইন্দিরা গান্ধী

 

নয়াদিল্লী, ২২ মে (ইউ এন আই) – বাংলাদেশ থেকে বিপুল সংখ্যক শরনার্থী আমাদের আভ্যন্তরীণ সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে, কারণ ইতিমধ্যেই ভারতের সীমান্ত রাজ্যগুলিতে প্রায় ৩০ লক ২০ হাজার শরনার্থি এসেছেন। এই সমস্যা সংকটজনক হয়ে উঠতে পারে। শরনার্থী সমস্যাকে সমস্ত দেশগুলিরই নিজেদের সমস্যা হিসেবে গণ্য কড়া উচিৎ বলে তিনি উল্লেখ করেন।

 

ইন্দিরা কংগ্রেস সংসদীয় দলের সাধারণ সভায় প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ দিচ্ছিলেন।

 

শ্রীমতী গান্ধী আরও বলেন, যা ছিল পাকিস্তানের আভ্যন্তরীণ সমস্যা তা আজ আমাদের আভ্যন্তরীণ সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে, কারণ ইতিমধ্যেই ভারতের সীমান্ত রাজ্যগুলিতে প্রায় ৩০ লক্ষ ২০ হাজার শরনার্থী এসেছেন। এই সমস্যা সংকটজনক হয়ে উঠতে পারে। শরনার্থী সমস্যাকে সমস্ত দেশগুলিরই নিজেদের সমস্যা হিসেবে গণ্য কড়া উচিৎ বলে তিনি উল্লেখ করেন।

 

শ্রীমতী গান্ধী বলেন যে সমস্ত রাজ্য শরনার্থিদের আশ্রয় দিয়েছে তাদের একার পক্ষে এই ভার গ্রহণ কড়া সম্ভব নয়। দেশের মানুষ, ও বিশ্ব রাজনৈতিক, অর্থণৈতিক ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এই সমস্যা মোকাবিলা করতে হবে।

 

তিনি বলেন, শরনার্থিরা যাতে তাদের ঘরে পুনরায় ফিরে যেতে পারেন পাকিস্তানকে সেই অবস্থা সৃষ্টির জন্য পৃথিবীর অন্যান্য রাষ্ট্রের নজর দেয়া উচিৎ।

 

শরনার্থী শিবিরগুলি পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা বর্ননা করে তিনি বলেন যে, পূর্ব বাংলায় মানবিক অধিকারকে অবদমন করা হচ্ছে।

 

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
১৮। পাকিস্তানের ওপর প্রভাব খাটানর আহবান জানিয়ে প্রেসিডেন্ট সাদাটের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর চিঠি দৈনিক ‘হিন্দুস্তান স্টান্ডার্ড’ ২৪ মে ১৯৭১

 

Razibul Bari Palash

<১২, ১৮, ২৯>

 

ইয়াহিয়াকে ফেরাতে সাদাতের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান

 

কায়রো, ২৩ মে -ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইউ ও এ আর (UOAR) এর সভাপতি জনাব সাদাতকে একটি ব্যাক্তিগত ম্যাসেজ পাঠিয়েছেন যা প্রাথমিকভাবে পূর্ববাংলা ও ভারতীয় উপমহাদেশের অবস্থার একটি প্রতিবিম্ব তুলে ধরেছে। পিটিআই।

 

মিসেস গান্ধীর বার্তা বিষয়বস্তু জানা যায়নি কিন্তু এটা ধারনা করা হয় যে, প্রধানমন্ত্রী জনাব সাদাতের কাছে আপীল করেন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান কে পূর্ববাংলায় রক্তপাত বন্ধ এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য বলার ব্যাপারে।

 

ধারণা করা হয় যে মিসেস গান্ধী গত সপ্তাহে পশ্চিম এশিয়ায় সমস্যার একটি শান্তিপূর্ণ নিষ্পত্তির জন্য মিশরের সাম্প্রতিক ইতিহাসে সবচেয়ে খারাপ রাজনৈতিক সংকটের মধ্যে দিয়ে বাহিত জনাব সাদাতের প্রতি ভারতের সমর্থন নবায়ন ও প্রসারিত করার সুযোগে এই প্রস্তাব দিতে পারেন।

 

মিসেস গান্ধীর চিঠি UAR এর ডেপুটি প্রিমিয়ার ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী, জনাব রিয়াদ, ভারতীয় রাষ্ট্রদূত জনাব আমি জে বাহাদুর সিং, গতকাল বিকালে হস্তান্তর করেন।

 

রাষ্ট্রদূত ৪০ মিনিটের বৈঠকে পূর্ববাংলার বিশেষ করে সেখান থেকে ভারতে উদ্বাস্তুদের প্রবেশ ও তার গুরুতর প্রভাব সম্পর্কে বলেন।

 

জনাব রিয়াদ পূর্ববাংলার অবস্থার ব্যাপারে UAR এর মনোভাব কি ছিল তা প্রকাশ করেন নি। তবে বোঝা যাচ্ছে যে ভারতের কথা বিশেষ বিবেচনায় নেয়া হয়েছে।

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
১৯। বাংলাদেশ পরিস্থিতির মোকাবিলা করা হবেঃ কোলকাতায় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর হুশিয়ারি দৈনিক কালান্তর ৬ জুন ১৯৭১

 

Aparajita Neel

<১২, ১৯, ৩০৩১>

বাংলাদেশের ঘটনার গুরুতর পরিণতি হটে পারেঃ

প্রধানমন্ত্রীর হুশিয়ারিযথাসময়ে ব্যাবস্থা নেওয়া হবে

(স্টাফ রীপোর্টার)

 

কোলকাতা, ৫ জুন – প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী আজ এখানে বলেন, পূর্ব বাংলা থেকে লক্ষ লক্ষ শরনার্থী আগমনের ফলে অতি গুরুতর পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে। এবং এর পরিণতি দেশের পক্ষে গুরুতর হতে পারে। কিন্তু আমরা যেন তাতে শঙ্কিত না হই। আমাদের সুস্থিরভাবে এই পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হবে যাতে ঠিক সময়ে ঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারি।

 

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের শরনার্থিরা যাতে স্বদেশে ফিরে যেতে পারেন, তাঁর জন্য প্রয়োজনীয় অবস্থার সৃষ্টি হওয়া প্রয়োজন।

 

আজ রাজভবনে মুখ্যমন্ত্রী ও উপ-মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে আলাদাভাবে এবং তাঁর পড়ে সামরিক অফিসার সহ বিভিন্ন অফিসার ও রাজ্যের মন্ত্রীসভার সঙ্গে বাংলাদেশের শরনার্থি সমস্যা নিয়ে আলোচনার পর সাংবাদিকদের কাছে তিনি উপরোক্ত মন্তব্য করেন।

 

তিনি বলেন, বাংলাদেশের ব্যাপারে ‘সমস্যার বিরাটত্ব অনুযায়ী আন্তর্জাতিক সমর্থন মেলেনি। ’

 

তিনি জানান, পশ্চিমবঙ্গের শরনার্থি সমস্যা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশের শরনার্থিদের রাজ্যের বাইরে কেন্দ্রীয় সরকারের যে জমি আছে, সেই সব জমিতে শিবির করে নিয়ে যাবার অবস্থা হচ্ছে কিন্তু সমস্ত ব্যাবস্থাই হচ্ছে অস্থায়ী ভিত্তিতে কারণ শরনার্থিদের দেশে ফিরে যেতে হবে এবং তাদের স্বদেশে ফিরে যাবার অনুকূল অবস্থার সৃষ্টি করতে হবে।

 

পুর্বাহ্নে প্রধানমন্ত্রীর তরফ থেকে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র দফতরের প্রতিমন্ত্রী শ্রী কে সি পন্থ জানান, রাজ্যের মন্ত্রীসভার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠককালে মুখ্যমন্ত্রী ও উপ-মুখ্যমন্ত্রী মন্ত্রীসভার পক্ষ থেকে লক্ষ লক্ষ শরনার্থির অব্যাহত আগমনের ফলে রাজ্যের প্রশাসনের উপরে যে গুরুতর চাপ পড়েছে তা বিস্তারিতভাবে জানিয়ে যেসব ব্যাবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করেন তাঁর মধ্যে ছিল,

 

ক) ভারত সরকার কর্তৃক শরনার্থিদের অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে যাবার ব্যাবস্থা করা

খ) শরনার্থিদের ক্যাম্পের মধ্যে রেখে যাতে তাদের রক্ষণাবেক্ষণ করা যায় তাঁর উপযুক্ত ব্যাবস্থা করা।

কারণ শরনার্থিরা এই দেশের অধিবাসীদের সঙ্গে মিলে মিশে গেলে অসুবিধার সৃষ্টি হবে।

 

তারা এই দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন যে, কিছু কিছু লোক শরনার্থিদের এখানে জমি ও লোকদের বাড়ি দখল করতে প্ররোচিত করছে। এর ফলে অনাবশ্যক একটা আইনশৃঙ্খলা সমস্যার উদ্ভব হবে এবং তা শরনার্থিদের স্বার্থানুগত হবেনা।

 

এই বৈঠকে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি রোধ করার জন্য প্রয়োজনীয় সব রকমের ব্যাবস্থা নেবার প্রয়োজনীয়তাও বিশেষভাবে আলোচিত হয়।

 

প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি গান্ধী মন্ত্রীসভাকে জানান যে, ভারত পাকিস্তানের বিচ্ছিন্নতায় উৎসাহী নয়। বাংলাদেশ যে অশান্ত, তা পাকিস্তানেরই সৃষ্টি। কিন্তু ওইসব ঘটনা সম্পর্কে আমরা উদাসীন থাকতে পারিনা। কারণ আমরা ভারতের শান্তি ও স্থায়িত্বে আগ্রহী। ভারতের শান্তি ও স্থায়িত্বকে বিঘ্নিত করে এমন যে কোন ঘটনাই আমাদের স্বার্থের সাথে জড়িত। বস্তুত আমরা মনে করি, ভারতে শান্তি ও স্থায়িত্ব পাকিস্তানের উপরেও একটা নিয়ামক প্রভাব বিস্তার করবে।

 

প্রধানমন্ত্রী কার্যকরিভাবে আইন- শৃঙ্খলা পরিস্থিতির মোকাবেলা করার উপরেও জোর দেন।

 

পশ্চিমবঙ্গের সমস্যা সম্পর্কে কেন্দ্র যে সর্বদা রাজ্য সরকারের সঙ্গে ঘনিস্ট যোগাযোগ রক্ষা করে চলছে, তা জানিয়ে শ্রী পন্থ বলেন যে, শরনার্থিদের কত দ্রুত ও কি পরিমাণে এই রাজ্য থেকে অপসারণ করা যায় সে বিষয়ে নির্দিস্ট পরিকল্পনা করার জন্য আগামী সোমবার পশ্চিমবঙ্গের দুজন অফিসার দিল্লী যাচ্ছেন। শরনার্থিদের শিবিরের প্রশাসন চালাবার ব্যাপারে রাজ্য সরকারকে যতটা সম্ভব দায়িত্বমুক্ত করার জন্যও কেন্দ্র চেষ্টা করবে।

 

তিনি আরও জানান, ভারতের বিভিন্ন মন্ত্রী বিদেশী রাষ্ট্রগুলোকে বাংলাদেশ থেকে উদ্ভূত সমস্যা ব্যাখ্যা করতে এবং এই সমস্যা সমাধানে কতটা তারা সাহায্য করতে পারে তা জানাবার জন্য সফরে যাচ্ছেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছাড়াও শিক্ষামন্ত্রী সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায় চারটি রাষ্ট্র সফর করবেন।

 

মন্ত্রীসভার সঙ্গে আগে প্রধানমন্ত্রী সেনাবাহিনীর ইস্টার্ণ কমান্ড – এর জি ও সি লেঃ জেঃ জগসিত সিং আরোরা, পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের ইন্সপেক্টর জেনারেল শ্রী প্রসাদ বসু, কোলকাতার পুলিশ কমিশনার শ্রী রঞ্জিত চ্যাটার্জির সঙ্গে আলোচনা করেন। ‘

 

দুর্যোগপূর্ন আবহাওয়ার দরুন প্রধানমন্ত্রীর দিল্লী প্রত্যাবর্তন আজকের মত স্থগিত রাখছেন। আগামীকাল তিনি ফিরে যাবেন।

 

 

 

 

 

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
২০। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সমাধান প্রয়োজন – ওয়াশিংটনের ন্যাশনাল প্রেসক্লাবে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সরদার শরণ সিং এর ভাষণ ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রকাশিত পুস্তিকা ১৭ জুন, ১৯৭১

 

Razibul Bari Palash

<১২, ২০, ৩২৪৩>

 

বাংলাদেশে রাজনৈতিক সমাধান দরকার

জাতীয় প্রেস ক্লাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী সরদার শরণ সিং এর বক্তৃতা

ওয়াশিংটন, জুন ১৭, ১৯৭১

 

আমাকে আমন্ত্রণের জন্য আমি জাতীয় প্রেসক্লাবকে ধন্যবাদ জানাই। এর একটি বিশেষ কারণ আছে। আমি আপনাদের নেতাদের সাথে একটি সমস্যার শান্তিপূর্ন অস্থায়ী সমাধানের জন্য এখানে এসেছি। সমস্যাটি প্রেসে ইতোমধ্যে বিষদভাবে রিপোর্ট করা হয়েছে। তাই আমি আমেরিকান প্রেসের প্রতিনিধিদের মাঝে কথা বলার সুযোগ পেয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। নিশ্চই আমেরিকান প্রেস জনমত গঠনে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে।

 

পূর্ববাংলার ট্রাজেডি আজ ভারতের জন্য বড় সমস্যা। এশিয়ার জুড়েও এটা এখন গুরুত্তপূর্ন। আমাদের অঞ্চলে এটা শান্তি এবং উন্নতির পথে চরম হুমকি।

 

পূর্ববাংলার অবস্থা আপনারা ভালো জানেন। কিন্তু আমাদের জন্য এবং আমাদের পুরো অঞ্চলের জন্য এটি কত বড় সমস্যা সেই ব্যাপারে আমি আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। আমাদেরকে মনে রাখতে হবে যে আজ যদি নিজেদের অসহায়ত্বের কারনে অথবা যারা এই ঘৃন্য কাজগুলো করছে তাদের উপর কোন বিশেষ দুর্বলতার কারনে, আমরা এই ঘটনাকে অবহেলা করি অথবা এই ঘটনাগুলোকে আরো বাড়তে দেই, তাহলে পুরো পৃথিবীকে এক সময় এর ফলাফল ভোগ করতে হবে।

 

পূর্ববাংলার অস্থিরতার জন্য যে উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তা আমাদের সামনে হাজির হয়েছে তা শুধু ভারতের একার নয়। আপনাদেরও। পূর্ববাংলার ঘটনাবলির ধরণ ও মাত্রা এমন যে সেটি পাকিস্তানের সীমানা অতিক্রম করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে উদ্বেগের বিষয় হতে বাধ্য।

 

 

গণতন্ত্র নিষ্পেষিত

 

আমাদের দুই দেশের গণতান্ত্রিক নীতি ও মূল্যবোধের প্রতি একটি সাধারণ অঙ্গীকার আছে। এই একই মূল্যবোধ ও নীতিগুলোকে পূর্ববাঙলায় নৃশংসভাবে দমন করা হচ্ছে।

 

পূর্ববাংলায় সেনাবাহিনী গণতান্ত্রিক নীতির দমনে নিয়জিত থাকায় এটি সেখানে একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনে রূপ নিচ্ছে। গত ডিসেম্বর সেখানে নির্বাচন হয়েছে একটি এসেম্বলি করে পাকিস্তানে সংবিধান প্রণয়ন করার জন্য। বৃহত্তর পাকিস্তানের জাতীয় নির্বাচনে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামীলীগ নিরংকুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে এবং প্রাদেশিক শাসনকর্মে তাদের প্রাধান্য দাবি করে। এটা মনে রাখতে হবে যে আওয়ামী লীগের ৬ দফা দাবীগুলো বিচ্ছিন্নতাবাদী কিংবা স্বাধীনতার দাবি ছিল না, স্বাধীনতার দাবি ওঠার পেছনে ছিল উত্তাল মার্চ মাসের ঘটনা গুলো এবং ২৫শে মার্চের গণহত্যার শুরুর মাধ্যমে এই দাবি জোরালো হয়। এই ঘটনার পেছনে দায়ী পশ্চিম পাকিস্তানের একটি সংখ্যালঘু গোষ্ঠী যাদের হাতে ছিলো বিদেশী অর্থ ও অস্ত্র যেগুলোর মাধ্যমে জনতার রায়কে তারা পরিবর্তন এবং ধুলিস্যাৎ করতে চেয়েছিল।

 

সেনাসন্ত্রাসের এই রাজত্বের ফলে ৬ মিলিয়ন মানুষ পূর্ববাংলা থেকে তাদের বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়েছে এবং ভারতে শরণার্থী হিসেবে অবস্থান নিয়েছে। এবং এটি চলমান আছে। প্রতিটি দিন প্রায় ১ লাখ মানুষ আমাদের দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করছে – পূর্ববাংলার সীমান্ত জুড়ে পাকিস্তান আর্মিরা তাদের তারিয়ে দিচ্ছে। সহজ করে বললে প্রতি সেকেন্ডে ১ জন শরনার্থি আমাদের দেশে প্রবেশ করছে।

 

আমরা এই উদ্বাস্তুদের সামর্থ্য অনুযায়ী ত্রাণ দিচ্ছি। আমাদের পূর্ব বাংলার রাজ্যের শিশুদের স্কুলগুলো শরণার্থীদের আশ্রয় প্রদান করার জন্য বন্ধ হয়ে গেছে। আমাদের স্বাস্থ্য সেবা সীমিত এবং সেখানে পরিবহন ও তাঁবু, খাদ্য ও ওষুধ এবং অন্যান্য সম্পদ সংকট আছে। ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে প্রত্যেক স্থানীয় বাসিন্দাদের বাড়িতে ১ জন পূর্ববাংলা থেকে আসা শরণার্থী অবস্থান নিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ, আগে থেকেই অনেক জনবহুল, তার উপর শরনার্থিদের ব্যাপক অণুপ্রবেশে অনেক বড় সমস্যা তৈরি হয়েছে।

 

খাদ্য, আশ্রয় ও ওষুধ প্রদান অগ্রাধিকারে রাখা আবশ্যক। ত্রাণ খরচ মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে। আমরা বর্তমান বছরের জন্য আমাদের বাজেটে ৮০ মিলিয়ন ডলারের একটি টোকেন বরাদ্ধ রেখেছি, এবং এর জন্য আরও ৩০ মিলিয়ন অতিরিক্ত করের বোঝা অর্পিত করা হয়েছে যা আমাদের জনগণকে এই বছর বহন করতে হবে।

 

আমাদের সম্পদ সীমাবদ্ধতা আছে তবে যথাসাধ্য চেষ্টা করছি শরণার্থীদের দেখাশোনার ব্যাপারে। পাশাপাশি আমরা বিদেশি সরকারগুলোর থেকে ও নানারকম স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও সংস্থা থেকে এবং ব্যক্তিগতভাবে নাগরিকদের থেকে সাহায্য প্রার্থনা করেছি ও পাবো আশা করছি। যদি এই অবদান খুব বড় নাও হয় তবুও এর পেছনের আবেগকে আমাদের সরকার ও জনগণকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে এটাই সার্থকতা।

 

যাইহোক, এটি অনেক বড় কাজ। এমনিতেই ভারতে দারিদ্র্য ও বেকারত্ব নিয়ে ভুগছে। অতএব, আশা করি যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, উদার মানবিক প্রবৃত্তি নিয়ে এগিয়ে আসবে এবং পাশাপাশি বিশ্বের অন্যান্য সমৃদ্ধ দেশও এগিয়ে আসবে।

 

 

 

সামরিক অ্যাকশন এখনই বন্ধ করতে হবে

 

কিন্তু ত্রাণ শুধুমাত্র সাময়িক উপশমকারী; সমস্যার সমাধান নয়। তাই এই পরিস্থিতির মূলে ব্যবস্থা গ্রহণ সবচেয়ে গুরত্বপূর্ণ। তাই পাকিস্তান থেকে আরও উদ্বাস্তু অন্তঃপ্রবাহ অবিলম্বে থামাতে হবে। এবং সেটার জন্য পূর্ববাংলায় সামরিক কর্মকান্ড অবিলম্বে বন্ধ করা দরকার। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিৎ পাকিস্তান সরকারকে এই ব্যাপারে চাপ দেয়া।

 

পাশাপাশি, যারা তাদের বাড়িঘর ছাড়তে বাধ্য হয়েছে তাদের পূর্ব বাংলায় নিরাপদে ফেরত পাঠানোর জন্য অবস্থা তৈরি করতে হবে। পাকিস্তান সরকারকে এই শরণার্থীদের পুনর্বাসনের জন্য সঠিক দায়িত্ব গ্রহণ করতে হবে। এই সময়ের মধ্যে পূর্ব বাংলায় তাদের সম্পদ সংরক্ষণ করতে হবে এবং তাদের প্রত্যাবর্তন আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধানে করা উচিৎ।

 

নিজ নিজ গৃহে প্রত্যাবর্তন এবং উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনে সময় লাগবে এবং ত্রাণ ব্যবস্থা প্রয়োজন হবে। তাই সেখানে প্রয়োজনে ক্যাম্প সেট আপ করতে হবে। আমাদের মত পূর্ব পাকিস্তানে অস্থায়ী ত্রাণ শিবিরে স্থাপন করা উচিত।

 

পাকিস্তান সরকার পূর্ব বাংলার শিবির বা অভ্যর্থনা কেন্দ্র স্থাপন করেছেন বলে দাবি করে, কিন্তু শরণার্থীরা সেখানে ফিরে যাচ্ছেনা। কারণ তারা দৃশ্যত পাকিস্তান সরকারের ক্ষমার ঘোষণা বিশ্বাস করে না। অতএব তদের ব্যক্তি ও সম্পত্তির নিরাপত্তা বিধান নিশ্চিত ও বিশ্বাসযোগ্য করার জন্য সকল ব্যাবস্থা নিতে হবে।

 

আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধান

 

 

পাকিস্তান আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধানে উদ্বাস্তুদের জন্য অস্থায়ী ক্যাম্প বসাতে পারে।

 

মৌলিক সমস্যা হচ্ছে একটা রাজনৈতিক বিষয় এবং এটির রাজনৈতিক সমাধান দরকার। ভালো একটি সমাধান ছাড়া, শরনার্থিরা ফিরে আসার আস্থা ও নিরাপত্তার পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করবেনা। এর জন্য দুটি অপরিহার্য শর্ত আছে –

 

প্রথমত, প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক সমাধান জরুরি ভিত্তিতে করা আবশ্যক, এবং দ্বিতীয়ত, সমাধান কার্যকর হতে হবে এবং পূর্ববঙ্গ ও তাদের নির্বাচিত নেতাদের ও জনগণের ইচ্ছার সঙ্গে সঙ্গতি রেখেই তা করতে হবে।

 

পূর্ববাংলার জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গৃহীত যেকোন ব্যাবস্থা গ্রহণের চেষ্টা পরিস্থিতি তো ঠিক করবেই না বরং দূরত্ব আরও বাড়বে এবং এর ক্ষতিকর প্রভাব পুরো পূর্ববাংলায় পরিলক্ষিত হবে।

 

 

মুজিবের জন্য উদ্বেগ

 

আমরা মুজিবের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা এবং সুস্থতা নিয়ে চিন্তিত। তিনি খুব উচ্চ মর্যাদা এবং বিরল মানবিক গুণাবলির একজন মানুষ যিনি পূর্ব বাংলার সমগ্র জনগণের প্রাণপ্রিয় নেতা। আমরা আশা করি যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় শেখ মুজিবকে মুক্তি দিতে পাকিস্তানের শাসকদের উপর সকল প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবেন এবং পূর্ব বাংলার মানুষের আশা, আকাঙ্ক্ষা ও উজ্জীবনের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করবেন যা প্রতিফলিত হয়েছিল গত ডিসেম্বরের শেষের দিকে। শুধু কারারুদ্ধ করে এটিকে নির্বাপিত করা যাবে না।

 

আমরা সামগ্রিকভাবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, এবং বিশেষ করে যেসব দেশের সাথে পাকিস্তানের সম্পর্ক ভালো তাদের অনুরোধ করছি একটি রাজনৈতিক সমাধানের জন্য পাকিস্তান সরকারকে প্রভাবিত করতে।

 

পাকিস্তানে সামরিক সাহায্যের অনুদান বিষয়ে আমাদের অবস্থা স্পষ্ট। অবস্থা এখন এমন হয়েছে যে অর্থনৈতিক অনুদান বর্তমানে পাকিস্তানের জনগণকে দমন করার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে। সুতরাং এ বিষয়টি পাকিস্তানের জনগণের জন্য উদ্বেগের। এটি যত দ্রুত সম্ভব শেষ করতে হবে। তাই আমরা যতদিন না একটি রাজনৈতিক সমাধান আসে ততদিন পাকিস্তানে তাদের মিলিটারি ও অর্থনৈতিক সাহায্য বন্ধ করার ব্যাপারে সকল দেশের প্রতি আহবান করছি।

 

 

ভারতকে হুমকি

 

আমি আশা করি যে এই দেশের মানুষ বুঝতে পারবে কেন আমরা পূর্ববাংলার পরিস্থিতির উপর আমাদের উদ্বেগ প্রকাশ করছি। মার্চ ২৫ থেকে পূর্ববাংলায় যে হত্যাকাণ্ড হচ্ছে তার ফলাফল আমাদেরকেও প্রভাবিত করছে। অবস্থা এখন এমন হয়েছে যে পাকিস্তানের সামরিক সরকারের কার্যক্রম আমাদের সমাজ ও আমাদের রাষ্ট্রের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবেশকে প্রভাবিত করছে। এর ফলে আমাদের এলাকায় সংঘাতময় পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে যার পরিণতি চিন্তার বাইরে।

 

আমরা ধৈর্য, ​​সহিষ্ণুতা ও সংযমের সাথে আচরণ করছি। কিন্তু যদি আমাদের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক অবস্থা হুমকির সম্মুখীন হয় তবে আমরা বসে থাকব না।

 

আমাদের স্বাধীনতার পর থেকে ২৩ বছর ধরে, আমরা আমাদের গণতন্ত্র, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থানের জন্য লড়াই করছি। আমরা আমাদের দেশ থেকে দারিদ্র্য ও ক্ষুধা এবং রোগ নির্মূল করতে সফল হইনি। কিন্তু আমাদের জনগণের জীবনযাপন গত আড়াই দশকের তুলনায় কিছুটা উন্নত হয়েছে। আমরা আমাদের খাদ্য উৎপাদন দ্বিগুণ করেছি। শিক্ষা, চিকিৎসা ও কাজের সুযোগের প্রাপ্যতা বিস্তৃত হয়েছে। আমাদের রপ্তানির বার্ষিক বৃদ্ধির হার গত বছরে ৭ শতাংশ মাত্রা স্পর্শ করে এবং আমাদের প্রবৃদ্ধির হার বার্ষিক শতকরা ৫ এ উন্নীত হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আমাদের প্রচেষ্টাকে সাহায্য করেছে এবং আমি নিশ্চিত এই সাফল্যের তারাও অংশীদার।

 

 

পাকিস্তানের তৈরী সংকট

 

ফেব্রুয়ারিতে সাধারন নির্বাচনের পর, আমাদের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ও আমাদের দল, ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস, আমাদের প্রোগ্রামের জন্য জনগণের বিপুল সমর্থন পেয়েছে। আমরা আমাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থার উপর একটি শক্তিশালী হুমকির আভাস পাচ্ছি। আর, তারপর এখন আসল পাকিস্তানের তৈরি সমস্যা যা আমাদের ফসলের উপর হুমকি এবং আমাদের শান্তি ও আমাদের সন্তানদের জন্য অগ্রগতির প্রত্যাশা হুমকির সম্মুখীন করে তুলেছে।

 

যেকোনো দায়িত্বশীল সরকারের জন্য এটি একটি অসহনীয় অবস্থা। তাই আমাদের উদ্বেগ অতি দ্রুত পূর্ব পাকিস্তানে একটি রাজনৈতিক সমাধান তৈরি করা যা বাঙালি এবং তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে গ্রহণযোগ্য। যাতে শান্তি ফিরে আসতে পারে এবং উদ্বাস্তুদের যারা আমাদের দেশে এসেছে তাদের বাড়িতে ফিরে যেতে পারে।

 

আমরা একটি মারাত্মক পরিস্থিতির সম্মুখীন। কিন্তু আমরা বিশ্বাস করি যে বিশ্ব সম্প্রদায় সম্মিলিতভাবে এর একটি সন্তোষজনক সমাধান বের করবেন এবং ভারতের স্থিতিশীলতার জন্য এবং এই অঞ্চলের শান্তির জন্য হুমকি দূর করবেন।

 

এই আশায় আমি ওয়াশিংটনে সফরে এসেছি এবং আমি বুঝেছি যে ওয়াশিংটন আমাদের আশঙ্কা অনুধাবন করেছেন এবং আমরা তাদের সাহায্য সহানুভূতি পাব।

 

[উপরের বক্তৃতা প্রতিনিধি কর্ণীলিয়াস ই গালাঘার এর অনুরোধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেশনাল রেকর্ডে সংরক্ষণ করা হয়েছে]

 

 

বক্তৃতার পরে প্রশ্নোত্তর পর্ব

 

প্রশ্নঃ আপনি গত রাতে বলেছেন যে আপনারা ৬ মিলিয়ন শরনার্থিকে ৬ মাস দেখভাল করবেন। যদি পাকিস্তান এই শরনার্থিদের নিতে অস্বীকৃতি জানায় তাহলে আপনারা কী করবেন?

 

পররাষ্ট্রমন্ত্রীঃ প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। যদি সেখানে ৬ মিলিয়নের বেশী হয় তখন কী ঘটবে? সেটাই আমাদের উদ্বিগ্ন হবার কারণ। আমাদের প্রথম দাবি, আর যাই হোক না কেন, উদ্বাস্তুদের এই অনুপ্রবেশ বন্ধ করতে হবে। আর এর জন্যে কোন বড় ধরণের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন দরকার পড়েনা। তাহলে এখন সেখানে প্রশাসনিক ও সামরিক যন্ত্রপাতি পরিচালনা করছেন তারা যদি কৌশলে জনগণকে পুশ করে, যদি অস্ত্র থামিয়ে জনগণের আস্থা আনতে পারেন, যে কোন মূল্যে অনুপ্রবেশ ঠেকানোর চেষ্টা করেন, তবেই তা বন্ধ হওয়া সম্ভব। পরিস্থিতি এতোই ভয়াবহ যে, আমি আমার বক্তৃতায় বলেছিলাম – এই অবস্থা চলতে থাকলে, আমরা অসহায়ভাবে বসে থাকতে পারব না। তাছাড়া এটি আমাদের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার পথে ক্রমবর্ধমান হুমকিস্বরূপ এবং শুধুমাত্র তাই নয় এটি আমাদের পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ঠেলে দেবে।

 

 

 

প্রশ্নঃ কেন আপনি পূর্ব পাকিস্তানকে পূর্ব বাংলা বলছেন? এটি কি পূর্ব ও পশ্চিম বাংলার একীভুতকরণের ইঙ্গিত দেয়?

পররাষ্ট্রমন্ত্রীঃ আমি এটাকে পূর্ববাংলা বলি কারণ মূলত এটা পূর্ববাংলাই ছিল। বাংলার দুটি অংশ পূর্ব ও পশ্চিম। তাছাড়া এটি বলার আরেকটি কারণ হল আমরা পূর্ব বাংলার ৭৫ মিলিয়ন মানুষের আদর্শে একাত্মতা প্রকাশ করি। তারা মিলিটারি প্রভাব ও শোষণ থেকে মুক্তির জন্য লড়াই করে যাচ্ছে। এবং এগুলো মূলত পরিচালিত হয় পাশ্চিম পাকিস্তানীদের ও তাদের সংবিধান দ্বারা।

 

এটি বলার মানে এই নয় যে ভবিষ্যতে আমরা আমাদের পশ্চিমবাংলার সাথে পূর্ববাংলাকে একীভূত করতে চাই – যদি পূর্ববাংলা স্বাধীনও হয় তবুও এই একীভূতকরণ সম্ভব না। পশ্চিমবঙ্গ ভারতের একটি অংশ। ভারতের সংবিধানে পরিচালিত। কাজেই এখানকার জনগণের দুশ্চিন্তার কিছু নেই। পূর্ব বাংলার ভাগ্যে যাই ঘটুক না কেন- হয় তারা ৬ দফা আদায় করে সফল হোক অথবা তারা মিলিটারিদের বিরুদ্ধে সম্পূর্ন জয়লাভ করে স্বাধীন হিসাবে আত্মপ্রকাশ করুক – তাতে পশ্চিমবঙ্গের জনগণের দুশ্চিন্তা করার কিছু নেই।

 

 

প্রশ্নঃ প্রেসিডেন্ট নিক্সন এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে পূর্ববঙ্গে গণহত্যার নিন্দা করেননি। তিনি কি তার সাথে আপনার ব্যক্তিগত আলোচনায় এটা করেছেন?

পররাষ্ট্রমন্ত্রীঃ আমি নিশ্চিত এইসব উদ্বেলিত শ্রোতা আমাকে প্রেসিডেন্ট নিক্সনের পক্ষ হয়ে তার বক্তব্য আমি বলে দেই সেটা পছন্দ করবেন না। আপনি হয়ত জানতে চেয়েছেন রাষ্ট্রপতি নিক্সনের মনে কি আছে। তাই এটা বলা আমার পক্ষে কঠিন যে তিনি কী ভাবছেন বা ভাবছেন না। আমার কাজ হল আমার দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরা। সেটা যেভাবেই হোক আমাকে আমার কথা প্রেসিডেন্ট নিক্সন এবং সরকারের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের কাছে তুলে ধরতে হবে এবং তারপরে তারা ভেবে দেখবেন তাদের মনোভাব তারা জনসম্মুখে প্রকাশ করবেন কি করবেন না। আমি এটা নিয়ে তাদের সঙ্গে কোনো বিতর্ক করতে চাই না।

 

 

প্রশ্নঃ কূটনৈতিক প্রতিবাদ ছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পশ্চিম পাকিস্তান সরকারের উপর বাঙালিদের উপর অমানবিক অত্যাচার বন্ধের জন্য আর কী পদক্ষেপ নিতে পারে বলে আপনি মনে করেন?

পররাষ্ট্রমন্ত্রীঃ আমার মনে কোন সন্দেহ নেই যে আপনার প্রশ্নে উল্লেখিত কূটনৈতিক প্রতিবাদ ছাড়াও শুধু যদি আমেরিকান সরকার ও জনগনের অসন্তুষ্টির ব্যাপারটা সঠিক ভাবে প্রকাশিত হয়, তাহলে সেটাই সামরিক শাসকদের উপর একটা বড় প্রতিক্রিয়া ফেলবে, এমনকি তা পশ্চিম পাকিস্তানের জনগনের উপরও ফেলবে, যারা সংবাদপত্র মাধ্যমের উপর নানা ধরনের কঠোর বিধিনিষেধ আরোপের কারনে আসলে কি হচ্ছে পুর্ব পাকিস্তানে সেটা জানে না। এবং এই অসন্তুষ্টির ব্যপারে একটি কঠোর ও পরিষ্কার ঘোষণা শুধু ভুক্তভোগীদের প্রয়োজনীয় ও প্র্যাপ্য সান্ত্বনা দিতেই অনেক সাহায্য করবে না, বরং চলমান সামরিক অভিযানের মাধ্যমে যারা এই ঘৃণ্য অপরাধগুলো করছে গনতন্ত্রের ও মুক্ত ঐতিহ্যের বিরুদ্ধে, তাদের উপরেও চাপ সৃষ্টি করবে।

 

 

প্রশ্নঃ আপনি বলেছেন ‘ভারত চুপ করে বসে থাকবেনা’ – এর দ্বারা আপনি কি ভারত পাকিস্তান যুদ্ধের ইঙ্গিত দিচ্ছেন?

পররাষ্ট্রমন্ত্রীঃ যুদ্ধ ছাড়াও আমাদের উদ্যেশ্য বাস্তবায়নের জন্য আমাদের আরও অনেক পথ আছে। তবে আমরা আশা করি সেসকল পদ্ধতি আমাদের নেয়ার দরকার পরবেনা। এবং এটাও আশা করি যে আপনারা সেসব সম্পর্কে আমাকে এখন কিছু বলতে বাধ্য করবেন না।

 

বর্তমানে আমরা জনমত গঠনের কাজে নিযুক্ত আছি- সরকারী ও বেসরকারি লেভেলে। আমরা মৌলিক সমস্যা গুলোর প্রতি মনোযোগ আকর্ষনের চেষ্টা করছি। আমরা অল্প চেষ্টাতেই এখন এই বিষয়টি যাচাই করতে পারছি। আমাদের দৃঢ় আশা ও বিশ্বাস যে এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ করার একমাত্র পথ হল আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় গুলোকে সরকারী – বেসরকারি উভয় পর্যায়ে এগিয়ে আসতে হবে। এই অবস্থায় যদি দেশগুলো নিশ্চুপ থাকে তাহলে মিলিটারি একশন আরও ভয়ানক রূপ ধারণ করবে। এবং এর ফলাফলও খুব তীব্র হবে।

 

 

প্রশ্নঃ জনাব মন্ত্রী, আপনি কি মনে করেন যে, পশ্চিমা দেশগুলোর পররাষ্ট্র অফিস থেকে পূর্ব পাকিস্তানের গণহত্যার সম্পর্কে সামান্যই বলার ছিল?

পররাষ্ট্রমন্ত্রীঃ আমি তাদের পক্ষ থেকে কথা বলতে পারি। কিন্তু কঠিন বাস্তবতা এই যে তারা স্বল্পভাষী। কিন্তু এখন তাদের বিবেকে নাড়া দেবার সময় এসেছে। সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুযায়ী তাদের বাইরে কথা বলা উচিত। এবং মূল বিষয়ের আশেপাশে না গিয়ে গভীরে গিয়ে মোকাবিলা করা উচিৎ।

 

 

প্রশ্নঃ হিন্দু শরণার্থীদের কি পূর্ব বাংলায় আসতে বলা হবে? আর আপনি একটি একীভূত পূর্ববাংলা বলতে কি বুঝিয়েছেন? এটি কি ভারত ও পাকিস্তান থেকে আলাদা কিছু?

পররাষ্ট্রমন্ত্রীঃ প্রথম প্রশ্নের উত্তরে বলা যায় একজন হিন্দু উদ্বাস্তু বা একজন মুসলিম শরণার্থী যেই হোক না কেন তাকে দেশে ফিরে যেতে হবে। আপনার সাথে আমি আরেকটি তথ্য যোগ করে বলতে চাই এই দুইটি ধর্মের লোক ছাড়াও খ্রিস্টান ও বৌদ্ধ ধর্মের শরনার্থিরাও সেখানে আছে। পাকসেনারা সকল সম্প্রদায়ের লোকদের উপরই অত্যাচার চালিয়েছে।

 

ফিরে যেতে বললেই শরনার্থিরা ফিরে যাবেনা। তারা যখন মনে করবে যে পরিস্থিতি যাবার মত হয়েছে কেবলমাত্র তখনি তারা ফিরে যেতে চাইবে। তাই জনে জনে জিজ্ঞেস করে এটা সম্পন্ন করা যাবেনা। বরং পূর্ব বাংলার মানুষের চাহিদাকে সন্মান করে কাম্য রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি হলে তারা যেতে উদ্বুদ্ধ হতে পারে। তারা তাদের মতামত গত নির্বাচনে দিয়েছে যেখানে আওয়ামীলীগ ১৬৯ টি আসনের ১৬৭ টি পেয়েছে। আমি মনে করি পৃথিবীর যেকোন মানদণ্ডে যেকোন স্থানের তুলনায় এটি একটি রেকর্ড, একটি বিশাল সফলতা।

 

তাই জনগণের আস্থা আসে এমন সরকারকে সেখানে প্রতিস্থাপন করতে হবে। এতে করে শরনার্থিদের ফিরে যাওয়ার পরিবেশ তৈরি হবে।

 

দ্বিতীয় প্রশ্নের জবাব আমি ইতিমধ্যে দিয়েছি। পশ্চিমবঙ্গ, ভারত উপমহাদেশের একটি বিশেষ সম্প্রদায়, তাদের সমৃদ্ধ ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে দেশের উন্নয়ন প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। ভারতীয়দের জনজীবনে এটির বিশেষ দখল ও প্রভাব রয়েছে। পুর্ব বাংলায় যা কিছু হচ্ছে তাতে আমরা মনে করি এর প্রভাবে ঐ অঞ্চলের মানুষের সামনে এগিয়ে যাবার স্বপ্ন বহুগুণে পিছিয়ে যাবে এবং এর প্রভাব আমাদের অংশেও পড়বে।

 

 

প্রশ্নঃ মান্যবর, আপনি কি একটি রেডিও রিপোর্টের উপর মন্তব্য করবেন দয়া করে? সেখানে বলা ছিল আপনার সরকার পাকিস্তানি শরনার্থিদের জন্য আমেরিকান এয়ারলিফট এর প্রচারে প্রেসকে বাঁধা দিচ্ছে – অন্যদিকে একই ধরণের সোভিয়েত এয়ারলিফটকে কভারেজ এর অনুমতি দিয়েছে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রীঃ আমরা সম্পূর্ণরূপে এই দুই সুপার পাওয়ারের মধ্যে নিরপেক্ষ অবস্থানে আছি। আর আমি কোনো প্রান্তিকে সি -১৩০ প্লেন এর সাথে এ এম ১২ বা এ এম -১৪ প্লেন এর প্রতি বৈষম্য করছি এমন ধরনের অনুভূতি দুর করতে চাই। আমি নিজে আমেরিকান প্লেন সজ্জার একটি পূর্ণ রিপোর্ট দেখেছি। আমি নিশ্চিত যে, ভারতের প্রেস স্বাধীন – এমন একটি ভাবমূর্তি সেখানে রয়েছে। এগুলোর বেশিরভাগ কোন দাতব্য প্রতিষ্ঠান নয়। তবু তারা কখনো নালিশ করেনি যে সেখানে কোন অনিয়ম হয়েছে।

 

 

প্রশ্নঃ আপনি কি মনে করেন যে পাকিস্তান সরকার দ্বিপক্ষীয় ভিত্তিতে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করবে?

পররাষ্ট্রমন্ত্রীঃ এ ব্যাপারে আমি সন্দিহান। এগুলো সত্যি অসহায় লোকদের হাতে পৌঁছাবে কিনা সেব্যাপারেও আমি নিশ্চিত নই। এই বিষয়টি আমি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাথে এবং ইউ এন সার্কেলে আলোচনা করেছি। এই কারণেই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই ব্যাপারটি তদারকি করার জন্য জোর দিচ্ছে।

 

অভিজ্ঞতার কোন বিকল্প নেই। এটা সবার জানা যে কয়েক মাস আগে সাইক্লোনে যে ত্রাণ ক্ষতিগ্রস্থদের জন্য পাকিস্তান সরকারকে দেওয়া হয়েছিল তার একটি অংশ এখনো অব্যবহৃত রয়ে গেছে। তাছাড়া ত্রাণ কাজের জন্য সেই সময় যে স্পিড বোট দেয়া হয়েছিল সেগুলো পাকিস্তান সামরিক কর্তৃপক্ষ মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে ব্যাবহার করছেন।

 

 

প্রশ্নঃ জনাব মন্ত্রী, আপনি কি মনে করেন যে দুই পাকিস্তান একটি সরকারের অধীনে চলতে পারে?

পররাষ্ট্রমন্ত্রীঃ আমি ভবিষ্যতে কি হবে তার উপর মন্তব্য করতে চাই না। আমি বর্তমান সমস্যা নিয়ে আমাদের অবস্থান স্পষ্ট করতে চাই। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ এবং পূর্ববাংলার জনগণের মধ্যে চলমান ব্যাপারটিতে আমরা আমাদের অবস্থা তুলে ধরছি মাত্র। এব্যাপারে পূর্ববাংলার জনগণ তাদের ভবিষ্যতে নির্ধারন করবে। এবং আমরা খুশি হব যদি সেখানকার নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের প্রশাসনে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়। তাছাড়া এই ব্যাপারে আমরা এখনো নির্দিস্ট কোন অবস্থান নেইনি।

 

 

প্রশ্নঃ আগের একটি প্রশ্নের জের ধরে জানতে চাই ভারত কি পূর্ব বাংলাকে তাদের একটি রাজ্য বানাতে চায়? আপনি বলেছেন পশ্চিম বাংলা দুই বাংলাকে একীভূতকরণে ভারত সরকারের প্রচেষ্টায় বাঁধা দেবেনা। এব্যাপারে এমনি মূল প্রশ্নের উত্তরটি দেবেন কি?

পররাষ্ট্রমন্ত্রীঃ আপনি প্রশ্নটি আবার করুন।

 

 

প্রশ্নঃ আগের একটি প্রশ্নের উত্তরের ব্যাপারে বিস্তারিত জানতে চাই – সেটা হল – ভারত কি পূর্ববাংলাকে তাদের সাথে একীভূত করে নেবে কিনা? এই ব্যাপারে আপনি কি আর কিছু বলবেন দয়া করে?

পররাষ্ট্রমন্ত্রীঃ পূর্ববাংলার মুক্তিযোদ্ধারা তাদের স্বাধীনতার জন্য যেভাবে লড়াই করছে তাতে আমি কখনোই মনে করিনা যে তারা আবার ভারতের অংশ হয়ে অর্থাৎ অন্য একটি দেশের কাছে পরাধীন হয়ে থাকবে। তাদের স্বাধীনতার আখাঙ্খা এর থেকে অনেক শক্তিশালী।

 

এই অভিব্যাক্তির ব্যাবহার বোঝায় না যে পশ্চিমবংগ (যা ভারতীয় রাষ্ট্রসঙ্ঘের একটি সদস্য)স্বাধীন হয়ে গেলেও পূর্ববঙ্গের সাথে যোগ দেবার কোন ঝুকি আছে। তারা আমাদের দেশ, তথা মহান ভারতবর্ষের মত দেশে, যেখানে তারা রাজনৈতিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা রেখেছে, সেখানে সমঅংশদারিত্ব হবার মূল্য বোঝে, এবং সেকারনেই আমার মনে হয়, পশ্চিমবঙ্গ, যা ভারতের একটি অংগ, তার জনগন কখনো ভারত হতে বের হয়ে যেতে চাইবেন, তা সে পূর্ব পাকিস্তানের ভাগ্য যাই হোক না কেন, সেটা আওয়ামীলীগের বর্নিত ৬ দফা অনুসারে অর্থনৈতিক স্বায়ত্ব শাসনই অর্জন করুক বা সামরিক জান্তা কতৃক জনগনের আশা আকাঙ্ক্ষা ক্রমাগতভাবে ভাবে চাপা দেয়া রাষ্ট্রতে পরিনত হোক।

 

 

প্রশ্নঃ আপনি কি সঠিক কোন সংখ্যা বলতে পারবেন যে ঠিক কতদিনের জন্য আন্তর্জাতিক মানবিক সাহায্য দরকার বলে ভারতীয়রা বিশ্বাস করে?

পররাষ্ট্রমন্ত্রীঃ এ প্রসঙ্গে আমি একটি বা দুইটি কথা বলতে চাই। প্রথমত, সবচেয়ে দরকারি যে কথাটা সবার আগে বলতে চাই তা হল যেসকল পূর্ব পাকিস্তানী নাগরিক আমাদের ভিতরে প্রবেশ করেছে তাদের দায়-দায়িত্ব স্পষ্টত পাকিস্তান সরকারের উপর বর্তায়। দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়েরও দায়িত্ব রয়েছে যার অংশ হিসেবে ভারত তার অংশটুকু দেখবে।

 

এবং যদি এই উদ্বাস্তুদের জন্য আন্তর্জাতিক ভাবে কোন ত্রাণ পাওয়া যায় সেটা ভারত নিজেদের ধরে নেবেনা। এটা পাকিস্তানকে দেয়া হয়েছে বলে ধরা হবে। কারণ এই ত্রাণের ফলে পাকিস্তান সরকারের উপর যে দায়িত্ব ও চাপ বর্তায় তা কিছুটা কমবে বলে ধরা যায়।

 

হিসেব করলে দেখা যায় যা এখন পর্যন্ত পাওয়া গেছে তা মূল চাহিদার থেকে খুবই সামান্য। তার চেয়ে গুরুত্তপূর্ন বিষয় হল আমাদের অঞ্চলে সামাজিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে। এই অবস্থা দীর্ঘায়িত হলে তা অদূর ভবিষ্যতে যে সমস্যার সৃষ্টি করবে তা শুধুমাত্র টাকা দিয়ে সমাধান করা বা মেটানো যাবেনা। এই বিষয়টা অবশ্যই আমাদের খেয়াল রাখতে হবে।

 

এই কারণেই আমরা বরাবরের মতো একটি স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ আশা করছি পূর্ব পাকিস্তানে। কারণ মূল কারণের সমাধান না করে শুধু উদ্ভূত সমস্যার সমাধান করলেই বিষয়টা মিটে যাবেনা।

 

আমরা খেয়াল করেছি এখন পর্যন্ত অনেক উদার দাতারাও যে সাহায্য করেছেন তা মূল চাহিদার তুলমায় একেবারেই নগণ্য। এটা দিয়ে খুব সামান্য সংখ্যক উদ্বাস্তুকে সাহায্য করা যাবে। তবুও আমরা তাদের শ্রদ্ধা করছি – টাকার পরিমাণ যাই হোক – তাদের মনোভাবের জন্য।

 

 

প্রশ্নঃ চীন এর বিশ্বাসযোগ্যতা এবং বিশ্বের তার প্রভাব বিবেচনা করে সে যেভাবে পাকিস্তান সরকারের কাজকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে এর প্রভাবে আপনার মূল্যায়ন কী?

পররাষ্ট্রমন্ত্রীঃ নিশ্চয় যেকোনো কেউ যখন পাকিস্তানের সামরিক শাসকদের সমর্থন করে – তা বিশ্বের যে অংশ থেকেই হোক, এতে তারা স্তুতি লাভ করবে, একগুঁয়েমিতে আরও উৎসাহিত হবে এবং গণপ্রজাতন্ত্রী চিন সরকারের কাছ থেকে এই সমর্থন স্পষ্টভাবে সমগ্র পরিস্থিতির উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

 

 

প্রশ্নঃ জনাব মন্ত্রী, উদ্বাস্তু এবং অন্যদের মধ্যে কলেরা পরিস্থিতি কি?

পররাষ্ট্রমন্ত্রীঃ সেখানে কলেরার ঘটনা ঘটছে। এবং আমি মনে করি যে, এটি থামানোর জন্য বড় কিছু পদক্ষেপ গৃহীত হয়েছে যাতে কলেরা ছড়িয়ে পড়ার সম্ভবনা কিছুটা কমে এসেছে। আমাদের সুবিশাল দেশ। আমাদের বিশাল সংখ্যক জনগণের স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করতে হয়। স্বাস্থ্য বিভাগ কলেরা নিয়ন্ত্রণে ভালো ব্যাবস্থা নিয়েছে ও তারা সফল হয়েছে। আমরা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অত্যধিক কলেরা ছড়িয়ে পড়ার বিষয়ে উদ্বিগ্ন প্রকাশ করতে বলছিনা। আমরা মনে করি কলেরা সমস্যাকে বড় করে দেখিয়ে তারা মূল ঘটনা আড়াল করার চেষ্টা করছেন। তাই আমরা এই মহামারির কথা চিন্তা না করে বরং মূল সমস্যায় মনঃসংযোগ করতে বলি।

 

 

প্রশ্নঃ কমিউনিস্ট চীন কি ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে কোনো ভবিষ্যৎ বিবাদের ব্যাপারে ভারতকে কোনো সতর্কতা জারি করেছে?

পররাষ্ট্রমন্ত্রীঃ একটি শব্দে বলা যায় ‘না’।

 

 

প্রশ্নঃ শরণার্থীদের ত্রাণ কার্যের জন্য ভারতের কি তার বাজেট সংকুচিত করার সম্ভবনা আছে?

পররাষ্ট্রমন্ত্রীঃ আমার মনে হয় এটা বেশ স্পষ্ট যে উদ্বাস্তুদের সমগ্র ব্যয় আমাদের জন্য লাভজনক কিছু নয়। এবং, এটা মেটানোর জন্য আমাদের কিছু উন্নয়ন খাতের বাজেট কর্তন করতে হবে। ফলে আমাদের দেশের উন্নয়ন ব্যাঘাত ঘটবে যেটা আমাদের জন্য উদ্বেগের বিষয়।

 

 

প্রশ্নঃ জনাব মন্ত্রী, কিভাবে এই অবস্থায় ইন্দো-আমেরিকান সম্পর্ক উন্নয়ন করা যায়?

পররাষ্ট্রমন্ত্রীঃ এটার উত্তর দেয়া কঠিন। তবে এটা বলতে পারি আপনারা সবাই যদি আমাকে সমর্থন দেন তাহলে তার প্রভাব খুব বড় হবে। (হাসতে হাসতে বলেন)।

 

 

প্রশ্নঃ আপনার দেশের কত শতাংশ লোক প্রতি রাতে ক্ষুধার্ত অবস্থায় বিছানায় যায়? আপনার দেশে আপনার মানুষের খাদ্যের মধ্যে প্রয়োজনীয় প্রোটিন প্রদান এর জন্য মাছের ব্যাবস্থা আছে কি? আপনি কি জনসংখ্যা বিস্ফোরণকে একটি বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করতে চান? পাশাপাশি, ভারতে জন্মনিয়ন্ত্রণ এর অগ্রগতি সম্পর্কে কিছু কি বলতে পারেন?

পররাষ্ট্রমন্ত্রীঃ বেশ কিছু প্রশ্ন একসাথে সমন্বিত করা হয়েছে। সম্ভবত এই ব্যাপারে যদি বিস্তারিত বলতে যাই তাহলে আমাদের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও উন্নয়ন এর একটি পূর্ণ অবস্থা অনুধাবন করা সম্ভবপর হবে।

 

কিন্তু, আমি যত সংক্ষেপে পারি বলার চেষ্টা করছি। প্রথম প্রশ্ন ছিল কর জন লোক রাতে না খেয়ে ঘুমাতে যায়? আমার একটাই উত্তর – যেহেতু গত বছর আমাদের খাদ্য উৎপাদন ১ মিলিয়ন টন পাইল ফলক অতিক্রম করেছে। কেন্দ্রিয়ভাবে আমাদের অবস্থান ভালো। আমরা আমাদের খাদ্য আমদানি অনেকটা কমিয়ে আনতে সক্ষম হতে পেরেছি। তবে আমরা কিছু পরিমাণ আমদানি করছি রিজার্ভ ঠিক রাখার জন্য।

 

দ্বিতীয় প্রশ্নটি ছিল আমিষের যোগানদাতা হিসাবে মাছের ভূমিকা নিয়ে। এটাই কি আসলে বুঝিয়েছেন?

 

 

প্রশ্নঃ হ্যাঁ, স্যার. আপনার দেশের মৎস্য সম্পদ কি আপনার মানুষের খাদ্যের মধ্যে প্রয়োজনীয় প্রোটিন প্রদান করছে?

পররাষ্ট্রমন্ত্রীঃ আমাদের চাহিদা মাফিক যথেষ্ট মাছ উৎপাদন হয়না তবে আমরা আরও বাড়াতে চাই। এবং আমরা মাছ আহরণের জন্য আরও জোরালো ব্যাবস্থা গ্রহণ করছি।

 

আমাদের মাছ খাওয়াতে কোন সমস্যা নেই। আপনারা যদি মাছ পরিবেশন করেন এবং দেখেন যে ইন্ডিয়ানরা কাঁটাচামচ দিয়ে মাছকে কেমন করে বাগে আনছে, তাহলেই এর উত্তর পেয়ে যাবেন।

 

পরের প্রশ্ন?

 

 

প্রশ্নঃ আপনি কি মনে করেন জনসংখ্যা বিস্ফোরণ আজ বিশ্বের একটি বড় সমস্যা?

পররাষ্ট্রমন্ত্রীঃ হ্যা। এবং পাশাপাশি একটি কথা আমি বলতে চাই জনসংখ্যা সমস্যা যেমন পুরো বিশ্বকে ভাবাচ্ছে – এটাকে যেমন ভাগ করে নেয়া যাচ্ছেনা – সবাই মিলেই সমাধান করতে হচ্ছে তেমনি শান্তিকেও ভাগ করে দেয়া যাবেনা – সবাই মিলেই শান্তির জন্য এগিয়ে আসতে হবে। একারণেই সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে শান্তি প্রতিষ্ঠায়। যার যার পক্ষে যতটুকু করা সম্ভব তা করতে হবে। তা না হলে তুলনামূলক গরীব দেশে যদি জনসংখ্যা বাড়ে এক সময় সেটা যেসব দেশে উন্নত জীবন যাপন বজায় রয়েছে সেখানেও একসময় প্রভাব ফেলতে শুরু করবে।

 

আর, আমরা আমাদের পক্ষে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ সম্পূর্ণরূপে নিয়েছি। এবং আমি এই চিন্তাটা আপনাদের সাথে শেয়ার করতে চাই যে ভারতের এই ব্যাপারে কোন বাঁধা নেই। এটা নির্ভর করে আমরা কি কার্যকর পদ্ধতিতে আমাদের জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি এগিয়ে নিতে সক্ষম হব তার উপর।

 

 

প্রশ্নঃ আপনি রাজনৈতিক সমস্যার কথা বলছিলেন। ইউ এস সরকার তো ত্রাণ, অর্থ ও অন্যান্য সাহায্যের কথা বলেছে। তাহলে এগুলো কি বধিরের প্রলাপ মাত্র?

পররাষ্ট্রমন্ত্রীঃ যদি এটাই চুক্তি হত তাহলে কিছুই শোনা যেত না। এবং আলোচনা বন্ধ হতে হলে দুজনকেই বধির হতে হয়। আমি মনে করিনা যে উভয় আচরণ অসঙ্গত। আমেরিকা সরকার তাদের যে ত্রাণের কথা উল্লেখ করেছেন তার জন্য আমি তাদের স্বাগত জানাই।

আমরা কিন্তু শুধুমাত্র উপসর্গ নয় মূল সমস্যা মোকাবিলার তাগিদ দিয়েছি। আমি যদি বলি আমি যা বলেছি সব বধিরের সামনে বলা হয়েছে তাহলে এটা ভুল বলা হবে।

 

 

চেয়ারঃ মহামান্য, চূড়ান্ত প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করার আগে, আমি আপনার আগমন উপলক্ষে একটি স্মৃতিরক্ষা সনদ উপহার দিতে চাই।

পররাষ্ট্রমন্ত্রীঃ আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

 

 

চেয়ারঃ পাশাপাশি জাতীয় প্রেস ক্লাবের অফিসিয়াল নেকটাই দিতে চাই। তবে দুঃখিত যে এটা কিন্তু আপনাকে ওয়েস্টার্ণ পোশাকের সাথে পড়তে হবে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রীঃ আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

 

 

প্রশ্নঃ শেষ প্রশ্ন, স্যার, এটা সত্য যে আপনি একবার একটি অ্যালার্মঘড়ি রাষ্ট্রদূত কেন কেটিং (Ken Keating) কে দিয়েছিলেন।

পররাষ্ট্রমন্ত্রীঃ একটি অ্যালার্ম ঘড়ি.

 

চেয়ারঃ আমি এর গুরুত্ব জানিনা।

পররাষ্ট্রমন্ত্রীঃ খুব আরামপ্রদ একটি বিষয় উত্থাপিত হয়েছে। প্রথমে আমি আপনাকে ধন্যবাদ দেই, মিস্টার প্রেসিডেন্ট। আপনার ভাবুকতা ও প্রশ্ন স্ক্রীনিং করে যতটা সম্ভব উপস্থাপনযোগ্য এবং রুচিকর আকারে উপস্থাপন করার চেষ্টার জন্য। এবং আমি আপনার চিন্তা এবং বিবেচনার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।

 

দ্বিতীয়ত, আমি এই স্যুভেনিরকে অনেক মূল্যায়ন করি যা আমার জন্য তুলে ধরা হয়েছে। এটি সর্বদা আমাকে একটি খুব আরামপ্রদ ও স্মরণীয় অনুষ্ঠানের কথা মনে করিয়ে দেবে যে আমি এমন একটি মুক্ত আলোচনায় অংশ নিয়েছিলাম এবং আমি প্রেসকে একটিভ দেখতে চাই। কিছুক্ষণের জন্য আমি এই বিষয়টা মিস করছিলাম কারণ আমি এই মুহূর্তে প্রায় ১০ দিন ধরে আমার পার্লামেন্ট ও প্রেস থেকে দূরে আছি। দেশে গিয়ে এই অতিথিপরায়ণতার কথা খুব মনে পড়বে। দেশকে ও দেশের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরতে অসাধারণ এই সুযোগটি আমার কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

 

শেষ প্রশ্ন ছিল রাষ্ট্রদূত কেটিং কে একটি অ্যালার্ম ঘড়ি দেয়া সম্পর্কে। আমি বলতে চাই যে, জনাব রাষ্ট্রদূত সিনেটর কেটিং আমাদের কূটনৈতিক কোরের মধ্যে সবচেয়ে পছন্দ এবং সম্মানিত রাষ্ট্রদূতদ। আমি স্বীকার করি যে তিনি আমাদের দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নের, তাদেরকে শক্তিশালী করার জন্য চমৎকার কাজ করেছেন। এবং যেখানে ফলপ্রসূ সহযোগিতা এবং একত্রীকরণ করার চেষ্টা করেছেন। আমি আপনাকে আশ্বস্ত করতে চাই যে, মানুষ হিসেবে আমরা যুক্তিসঙ্গতভাবে বিনীত হতে চাই, এবং আমরা এলার্ম ঘড়ির মত হাস্যকর কিছু উপহার দিয়ে কাউকে বিব্রত করতে চাইনা।

 

আর, জনাব কেটিং খুব সতর্কবান মানুষ। তার জাগার জন্য এলার্ম ঘড়ির প্রয়োজন হয় না। তিনি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কদাচিৎ ঘুমান। তাই ঘড়ির এলার্ম দিয়ে তাকে উঠিয়ে দেবার প্রয়োজন নেই। সকল গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তিনি সদা জাগ্রত।

 

আর, হতে পারে, আমি তার জন্য কিছু ঘুমের বড়ি কিনতে পারি। কিন্তু আমি বলতে চাই যে জনাব কেটিং আমেরিকার ঐতিহ্যবাহী জীবন যাপনে অভ্যস্ত। এবং, আমি খুবই আনন্দিত যে তিনি চমৎকার কাজ করছেন।

 

কিন্তু, তারপরেও কাঠামোবদ্ধ প্রশ্নের ফাঁকে এমন একটি ছেলেমানুষি প্রশ্নের সুযোগ রাখা যেতেই পারে।

 

ধন্যবাদ।

 

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, নয়াদিল্লী।

 

 

 

 

 

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
২১। সম্পাদকদের সাথে বৈঠক কালে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর ঘোষনা – শরনার্থিদের নিরাপত্তার সাথে দেশে ফেরত পাঠাতে আমি প্রতিজ্ঞ দৈনিক স্টেটসম্যান ১৮ জুন ১৯৭১

 

Razibul Bari Palash

<১২, ২১, ৪৪>

 

 

শ্রীমতী. গান্ধী বলেন

“আমি তাদের ফেরত পাঠাতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ”

 

নয়া দিল্লি. ১৭ জুন, মিসেস ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসার সাথে সাথে শরণার্থীদের ফেরত পাঠাতে ভারতের সংকল্পের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। UNI এর রিপোর্ট। “আমি শুধু তাদের ফেরত পাঠাতে যাচ্ছি’ – অর্থনৈতিক সম্পাদকদের এক সভায় তিনি একথা বলেন।

 

ঘণ্টাব্যাপী বৈঠকে মিসেস গান্ধী প্রধানত পূর্ববঙ্গের উদ্বাস্তুদের অন্তঃপ্রবাহ ভারতের উপর “বোঝা” হয়ে উঠেছে বলে উল্লেখ করেন। এত অল্প সময়ে এই ধরনের বিশাল বোঝা বহন করা যে কোন দেশের জন্যই কঠিন।

.

মিসেস গান্ধী স্বীকার করেন ভারতের এই শরণার্থীদের জন্য একটি বড় অংকের অর্থ খরচ করতে হবে। এগুলো পরিকল্পনা কমিশন ও অন্যান্য বিভাগের দ্বারা করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে সহায়তা পাওয়ার উপরও এটা নির্ভর করে। এ পর্যন্ত ভারত মাত্র ৩৬ মিলিয়ন ডলার গ্রহণ করেছে।

 

মিসেস গান্ধীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল যে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তিনি আর্থিক দৈন্যতার কারণে পরিকল্পিত ৬০ কোটি রুপি বাজেট ঘাটতির জন্য এবং আন্তর্জাতিক মহলের অংশিদারিত্ত বাবদ উদ্বাস্তুদের জন্য কোন সহায়তা চাইবেন কিনা?

 

মিসেস গান্ধী বলেন, “আমি ব্যক্তিগতভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এটা শুরু করেছি। একটি প্রোগ্রাম কাজ করছে। ”

 

তিনি এই ব্যাপারে ভারতের প্রেসের ভূমিকায় জোর দেন।

 

 

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ প্রতি ভারতের মনোভাবে কোনো পার্থক্য আসবেনা। শুরু থেকে ভারত একটি রাজনৈতিক নিষ্পত্তির দাবি জানিয়ে আসছে। “আমি নিশ্চিত যদি সব বিশ্বশক্তিগুলোর প্রয়োজনীয় চাপ আগে থেকে দেয় তবে এটা(বন্দোবস্ত) সম্ভব হতে পারে। কিন্তু মনে হয় সে আশা সুদূর পরাহত।

 

মিসেস গান্ধী বলেন যতটুকু জানা যায় একটি রাজনৈতিক নিষ্পত্তি শেখ মুজিবুর রহমান ও তার আওয়ামী লীগের সদস্য যারা সাম্প্রতিক নির্বাচনে জয়ী হয়েছিল তারা চায়। “তারা তাদের সিদ্ধান্ত নিতে চেয়েছিল”, বলেন তিনি।

 

 

 

 

 

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
২২। বাংলাদেশ প্রশ্নে ভারতের ভূমিকা বিশ্বে প্রশংসিত হচ্ছে – প্রধানমন্ত্রীর সাথে আলোচনাকালে শিল্পমন্ত্রীর অভিজ্ঞতার বর্ননা দৈনিক স্টেটসম্যান ১৮ জুন ১৯৭১

 

Razibul Bari Palash

<১২, ২২, ৪৫৪৬>

 

বাংলাদেশ প্রশ্নে ভারতের ভূমিকা বিশ্বে প্রশংসিত হচ্ছে

প্রধানমন্ত্রীকে মঈনুল হক চৌধুরী

(আমাদের বিশেষ প্রতিনিধি)

 

নয়াদিল্লি, ১৭ জুন; জনাব মইনুল হক চৌধুরী, শিল্প উন্নয়ন মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত বাংলাদেশের ব্যাপারে দেশের অবস্থান ব্যাখ্যা করার জন্য কিছু ইউরোপীয় দেশ সফর শেষ করে গত রাতে ফিরে আসেন। তাঁর অস্ট্রিয়া, হাঙ্গেরি, সুইডেন, হল্যান্ড এবং ইতালি সফরের ফলাফল তাকে জানান।

 

জনাব চৌধুরী এই সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাকে এসব দেশের মতামত জানান। ছয় মিলিয়ন শরনার্থির জন্য সৃষ্ট গুরুতর সমস্যার ব্যাপারে তাদের সাথে আলোচনা করা হয়েছে।

 

তিনি আশ্বাস পেয়েছিলেন যে তাদের মিত্রদের সাথে পরামর্শক্রমে বাংলাদেশ ইস্যুর রাজনৈতিক সমাধান আনা সম্ভব হবে।

 

এসব দেশে তার সফরে জনাব চৌধুরী বিভিন্ন দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রী ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাদের সাথে আলোচনা করেন। তিনি তাদের সঙ্গে শরনার্থিদের পরবেশের ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি দেশেগুলকে মনে করিয়ে দেন যে শরনার্থিদের ব্যাপারে আন্তর্জাতিক বিশ্ব সম্প্রদায়ের দায়িত্ব আছে।

 

মিস্টার চৌধুরী এসব দেশে বলেন যে পাকিস্তান ভারতের খরচে তার জনসংখ্যার খরচ থেকে পরিত্রাণ পেতে চেষ্টা করছে। এই আগ্রাসন একটি গুরুতর অপরাধ। নিজেদের জনসংখ্যা কমানোই একটি উদ্যেশ্য ছিল। সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্ব বাঙালি বুদ্ধিজীবি, রাজনীতিবিদ ও হিন্দু সংখ্যালঘুদের তারা হত্যা করছে।

তিনি বলেন বর্তমান সরকার পাকিস্তানকে বাংলাদেশে তাদের সামরিক কর্ম বন্ধ এবং রাজনৈতিক সমাধান চাওয়ার কথা বলেছে। তিনি বলেন বন্দুকের মুখে কিছু আদায় করা যায়না। দেশ গুলোকে বোঝানো হয়, যে গণহত্যা একটি আন্তর্জাতিক সমস্যা; অতএব এটা সবার জন্যই উদ্বেগের বিষয়।

 

তিনি এসকল দেশকে অনুরোধ করেন যাতে তারা পূর্ববাংলায় একটি রাজনৈতিক সমাধান চাইতে এবং ছয় মিলিয়ন উদ্বাস্তুকে “সম্মান ও শান্তিতে বাড়ীতে ফিরে যেতে” যাবার পরিবেশ তৈরি করতে পাকিস্তানকে বাধ্য করে। সেখানে সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। প্রতিরক্ষার জন্য পাওয়া অস্ত্র দিয়ে পাকিস্তান নির্দোষ এবং নিরস্ত্র নাগরিকদের হত্যা করছে। আন্তর্জাতিক দাতাসংস্থা ও দাতাদেশগুলোর পাকিস্তানকে দেওয়া সমস্ত মানবিক সাহায্য তত্বাবধান করা উচিত ও সেইসব ত্রাণ মানুষের কাছে পৌঁছানর বিষয় তাদের তত্ত্বাবধান করা উচিৎ। উল্যেখ্য, পূর্ববঙ্গে মর্মান্তিক ঘূর্ণিঝড় এর পরে এইড হিসাবে দেওয়া স্পিডবোট এখন সেখানে মানুষ হত্যা করার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে।

 

 

 

 

 

 

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
২৩। বাংলাদেশের প্রশ্নে যে কোন শীর্ষ সম্মেলনের আগে অবশ্যই হত্যাকাণ্ড এবং নির্যাতন বন্ধ করতে হবে বলে শ্রীনগর সাংবাদিক সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা দৈনিক স্টেটসম্যান ২১ জুন, ১৯৭১

 

Razibul Bari Palash

<১২, ২৩, ৪৭৪৮>

 

পূর্ব বাংলার সম্মেলনে ভারতের শর্ত

হত্যাকাণ্ড অবশ্যই বন্ধ করতে হবেপ্রধানমন্ত্রী

 

শ্রীনগর, জুন ২০, মিসেস ইন্দিরা গান্ধী বলেন যেকোন সম্মেলনের আগে পূর্ববাংলায় গণহত্যা বন্ধ করতে হবে। – ইউ এন আই, পি টি আই।

 

কাশ্মীর ভ্যালিতে ২ দিনের ভিজিট শেষ করে ৩০ মিনিটের মত স্থায়ী একটি সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন যদি অন্য দেশের ডাকা কোন সম্মেলনে ভারতকে ডাকা হয় সেক্ষেত্রে এই শর্ত তাদের আগে মানতে হবে।

 

পূর্ববাংলায় ঘটিত সন্ত্রাসী কার্য কলাপের ফলশ্রুতিতে সেখান থেকে প্রচুর শরণার্থীর অনুপ্রেবেশ এর ক্রমাগত বৃদ্ধি পাওয়ায় তিনি বলেন তাদেরকে চিরদিন এভাবে ভারতে রেখে দেয়া যাবেনা।

 

বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া ঘটনাসমূহ উল্লেখ করে তিনি বলেন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে জানানো হয়েছে যে সেখানকার পরিস্থিতি বিপদসংকুল ও উদ্বেগজনক।

 

বাংলাদেশকে স্বীকৃতি সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন – ‘এখনই নয়। ’ তিনি বলেন একটি অংশের জনমত এর পক্ষে থাকলেও এই ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে হবে সরকারীভাবে। কাজেই দেশের জন্য যা ভালো হবে এটা বিবেচনা করে সরকার তার মতামত জানাবে।

 

তিনি বলেন, বাংলাদেশে যা ঘটছে ভারত তার নজর রাখছে। এই মূহুর্তে এই সমস্যার কোন সমাধান তার কাছে নেই। তিনি বলেন, ‘আমি শুধু জানি তারা শরনার্থীদের এখানে থাকতে দিচ্ছে – অন্যদিকে আমরা চাচ্ছি সেখানে গণহত্যা বন্ধ করতে।

 

ভারতের পরিকল্পনা কি জানতে চাওয়া হলে হালকা চালে তিনি বলেন, ভারতের আবেদনে সাড়া দিতে যদি পাকিস্তান ব্যার্থ হয় তাহলে আমরা আগে পরিস্থিতি দেখব তারপরে প্রেসকে জানাব।

 

সম্প্রতি কাশ্মীর সহ কিছু বর্ডার এলাকায় যে পরিস্থিতি তাতে কি আপনি মনে করেন নিকট ভবিষ্যতে পাকিস্তান আক্রমণ করতে পারে?

 

মিসেস গান্ধী – ‘সন্দেহ আছে’

 

সর্বদয়া নেতা জয়প্রকাশ নারায়ণ সম্প্রতি একটি মন্তব্যে বলেন যে ভারত অযথা চীন ভীতির কারণে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে তুলনামূলক ধীরে আগাচ্ছে – এই ব্যাপারে মিসেস গান্ধীর মতামত জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন ‘আমরা কাউকেই ভয় পাইনা, বিশেষ করে চীনকে। ’

 

গণভোট ফ্রন্ট

 

সম্প্রতি গণভোট ফ্রন্ট একজনের ট্রাইব্যুনাল করে বিচারে সাম্প্রদায়িক পক্ষপাত দেখিয়েছিলেন যার পরিপ্রেক্ষিতে সরকার তাদের নিষিদ্ধ করার বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করার সম্ভবনা আছে কিনা জানতে চাওয়া হলে মিসেস গান্ধী বলেন এই প্রশ্নটি ওঠেনি কারণ সরকার ঐ ফ্রন্টের ব্যাপারে যে বিষয়টি তুলেছিল তা সমর্থন করে এবং নিষেধাজ্ঞা বলবত আছে।

 

একজন রিপোর্টার প্রশ্ন করেন তাহলে একই রকম অপরাধে অন্য একটি দলকে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হচ্ছেনা কেন? বিশেষ করে মিরাজ মওলানা ফারুকের নেতৃত্বে প্রো-পাকিস্তানী আওয়ামী একশন পার্টির যে অপসারণ দাবী প্রচার হয়েছে।

 

তিনি বলেন, তিনি এই বিষয়ে তেমন জানেন না। তবে তিনি বলেন কার নামে কে কি বলেছে তার চেয়ে আসলে কি ঘটেছে বা কি করেছে সেটাই মূল বিষয় হওয়া উচিৎ।

 

প্রধানমন্ত্রী বলেন কাশ্মীরের একটি স্থানীয় প্রেস বাংলাদেশ নিয়ে ‘মিথ্যা প্রচারণা’ করেছে। সেখানে বাংলাদেশ ও কাশ্মীরের তুলনামূলক অবস্থান তুলে ধরে মুখ্যমন্ত্রী জনাব জি এম সাদিক এর সঙ্গে জেনারেল ইয়াহিয়া খানকে ব্র্যাকেটবন্দি করে সমালোচনামূলক সংবাদ প্রকাশ করা হয়েছে।

 

তিনি বলেন: এভাবে তুলনা করাটা খুব অযৌক্তিক। হয় সেখানে খুব বড় সমস্যা আছে অথবা এটা ইচ্ছাকৃত ভাবে করা হয়েছে অথবা দুইটাই।

 

 

গুরেজ ও টাংদারে তাঁর সফর সম্বন্ধে বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, কাশ্মির অনেক উন্নত ছিল। কিন্তু প্রগতির গতি এখনো পরিকল্পিত অর্থনীতির পূর্ণ সুবিধা লাভ করতে পারেনি। সেখানে অনেক প্রকল্প চলছে যা শিক্ষিত যুবকদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেবে।

 

মিসেস গান্ধী বলেন, কাশ্মিরকে পাকিস্তানের সঙ্গে তুলনা করা যায়না। কারণ এটি অনেক অর্থনৈতিক অগ্রগতি অর্জন করেছে। অন্যদিকে পাকিস্তানের জনগণ টিকে আছে মিথ্যা অপপ্রচারের উপর এবং তাদের স্বাধীনতাকে অস্বীকার করা হচ্ছে।

 

সরকার সেখানে “নকশাল ভীতি” নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়েছে কিনা জানতে চাওয়া হলে, মিসেস গান্ধী উত্তর দিয়েছিলেন: “পুরোপুরি না; সমস্যা এখনও বিদ্যমান”

 

সরকারের যে “গরিবি হটাও” পরিকল্পনা ছিল সে ব্যাপারে মিসেস গান্ধী জানান সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে এবং হাতে এখনও কিছু পদক্ষেপ আছে। যেহেতু ব্যাংক জাতীয়করণ হচ্ছে তাই এই ব্যাপারে ব্যাবস্থা নেয়াও শুরু হয়েছে।

 

 

 

 

 

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
২৪। পাকিস্তান যুদ্ধ চাপানোর চেষ্টা করছেঃ প্রতিরক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য দৈনিক যুগান্তর ২১ জুন, ১৯৭১

 

Aparajita Neel

<১২, ২৪, ৪৯>

পাক জঙ্গীশাহী যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়ার অবস্থা সৃষ্টি করছে

প্রতিরক্ষামন্ত্রী

 

জলন্ধর, ২০ জুন – প্রতিরক্ষামন্ত্রী শ্রী জগজীবন রাম আজ সেনাবাহিনীর অফিসার ও জওয়ানদের বলেছেন, পাকিস্তানী জঙ্গিশাহির বেপরোয়া কাজের ফলে যে পরিস্থিতির উদ্ভব হোক তাঁর মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।

 

শ্রী জগজীবন রাম এখানে সেনাদের কাছে বলেন যে, পাকিস্তান পূর্বাঞ্চলে ভারতের সীমান্ত লঙ্ঘন করছে। ‘আমরা শান্তিকামী, যুদ্ধ চাই না। কিন্তু আমাদের ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়ার মত পরিস্থিতিই পাকিস্তান সৃষ্টি করছে। ‘

 

তিনি বলেন, বাংলাদেশ থেকে ব্যাপক হারে শরনার্থি ভারত আসায় বহু সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। শরনার্থিদের দেখাশোনার দায়িত্ব ছাড়াও পশ্চিমবঙ্গে সামাজিক সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। বাংলাদেশের লোকদের ভারত আসতে বাধ্য করে পাকিস্তান ‘দুরভিসন্ধিমূলক আগ্রাসন’ ঘটিয়ে যাচ্ছে। এর পরিণাম ভয়াবহ হতে বাধ্য।

 

প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেন, ভারতীয় সৈন্যরা যে কোন আগ্রাসন মোকাবিলায় পূর্বাপেক্ষা ভালোভাবে প্রস্তুত। শিল্পেও উন্নতি ঘটছে। অস্ত্র কারখানাগুলিতে প্রয়োজনীয় সব জিনিসই তৈরি হচ্ছে।

 

তিনি বলেন, সৈন্যরা যে কঠিন পরিস্থিতিতে কাজ করছেন এবং বসবাস করছেন সরকার তা জানেন। তাদের বেতন বাড়াতে এবং তাদের জন্য আরও বাড়িঘর নির্মান করতে সরকার সচেষ্ট। তবে প্রয়োজন অনুযায়ী সম্পদ দেশের নেই, একথাও মনে রাখতে হবে।

 

তিনি একদিনের সফরে এখানে আসেন, এখানকার হাসপাতালটিও পরিদর্শন করেন।

  • পি টি আই ও ইউ এন আই

 

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
২৫। পাকিস্তানকে সাহায্য বন্ধের প্রশ্নটি কয়েকটি দেশ বিবেচনা করছে বলে লন্ডনে পরিরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিবৃতি দৈনিক আনন্দবাজার ২৩ জুন, ১৯৭১
Abu Jafar Apu

<১২, ২৫, ৫০>

 

পাকিস্তানকে সাহায্য বন্ধ সম্পর্কে বিশ্ব রাষ্ট্রগুলি বিবেচনা করছে শরণ সিং

 

লন্ডন, ২২শে জুন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শ্রী শরণ সিং গতকাল সন্ধায় এখানে বলেন যে, গত এক পক্ষকাল হতে যে কয়েকটি দেশ তিনি সফর করেছেন সেই কয়েকটি দেশের সরকার পাকিস্তানকে সাহায্যদান বন্ধ করার কথা বিবেচনা করছেন।

 

শ্রী সিং বিশ্বের যে ছয়টি রাষ্ট্র সফর করে এসেছেন সেই কয়টি রাষ্ট্র বর্তমান পরিস্থিতিতে পাকিস্তানকে সাহায্যদান বন্ধের কথা সম্মত হয়েছে কিনা, সাংবাদিক সম্মেলনে এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন যে, ঘরোয়া ভাবে তাকে যে বলা হয়েছে যেসব কথা তিনি প্রকাশ করতে পারেন না, তবে তিনি একথা বলতে পারেন যে, দুটি কারনে কয়েকটি রাষ্ট্র পাকিস্তানকে সাহায্যদান বন্ধের কথা বিবেচনা করছে।

 

প্রথমত: পাকিস্তান নিজের দোষে অর্থনৈতিক সংকট করেছে এই অবস্থায় সাহায্যদান সেখানে অকার্যকর হয়ে পড়েছে। দ্বিতীয়ত: এই রাষ্ট্রগুলো মনে করে যে বর্তমানে করলে সংখ্যালঘু প্রশাসন সেই সাহায্য সংখ্যাগুরুকে দমনের কাজে লাগাবে।

 

এর আগে সফরের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করে শ্রী শরণ সিং বলেন যে, বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতির মূল কারন এবং সমস্যাগুলি কি তা সংশ্লিষ্ট সরকার রাষ্ট্রসংঘ সংস্থা এবং বেসরকারী নেতৃবৃন্দ ও সংবাদপত্র সহ এইসব রাষ্ট্রের জনগনকে অবহিত করার উদ্দেশ্যেই তিনি এই সফর করেছেন।

শ্রী শরং সিং বলেন যে, এই সমস্যার মূল কারন হচ্ছে যে, প্রাপ্তবয়স্কের ভোটাধিকারের ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত গনতান্ত্রিক নির্বাচনের ট্যারিফ পদ্ধতিতে এবং অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্রের দ্বারা দমন নীতি চালিয়ে বাতিল করে দিতে চাওয়া হয়েছে। এর ফলে ব্যাপক গনহত্যা হয়েছে এবং লক্ষ লক্ষ মুসলমান, হিন্দু খ্রিষ্টান ও বৌদ্ধ নিজেদের ঘরবাড়ী ছেড়ে ভারতীয় এলাকায় চলে এসেছে। শ্রী সিং বলেন যে, তাঁদের কাছে নিশ্চিত প্রমান আছে যে, কোন কোন এলাকায় পরিকল্পিতভাবে হত্যা চালিয়ে সেই এলাকায় অধীবাসিদের উৎখাত করা হয়েছে।

 

শ্রী সিং বলেন যে, প্রশ্ন হচ্ছে যে, এই পরিস্থিতি সম্পর্কে বিশ্বরাষ্ট্রগুলির কি মনোভাব হওয়া উচিত? ৬০ লক্ষ লোক শুনতে খুব বেশী নয়, কিন্তু যেখানে এই ৬০ লক্ষ লোক আসে সেখানকার অবস্থা সাংঘাতিক হয়ে দাঁড়ায়। যে দেশের জনসংখ্যা এমনিতেই বেশী এবং সেখানে রাজনৈতিক অস্থিরতা রেয়েছে সেখানে উদ্বাস্তুদের এই রকম ব্যাপক আগমন হলে যে সমস্যার উদ্ভব হয়, অর্থের ভিত্তিতে তার সমাধান সম্ভও নয়। শ্রী সিং বলেন যে, পরিস্থিতি ক্রমেই আরো সংকটজনক হয়ে উঠছে উন্নতির কোন আভাস নেই। বিশ্বের রাষ্ট্রগুলির প্রধান মনোভাব এই হওয়া উচিত যাতে পাকিস্তানে বর্তমান বিপরীত অবস্থা সৃষ্টি হয়, উদ্বাস্তু আগমন বন্ধ হয় এবং এখানকার অবস্থার এমন পরিবর্তন হয় যাতে উদ্বাস্তুদের জীবন ও সম্পত্তির নিরাপত্তা সম্পর্কে আস্থা ফিরে আসে। বিশ্বের রাষ্ট্রগুলির যাতে এই বিষয়ে দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়, সেই উদ্দেশ্যেই তিনি এই সফরে বেরিয়েছেন।

 

শ্রী সিং বলেন যে, কেউ যদি এই সমস্যার প্রতি গভীরভাবে দৃষ্টি দেন তাহলে তিনি বুঝতে পারবেন যে, বর্তমান পরিস্থিতির উপর জেনারেল ইয়াহিয়া খানের কোন নিয়ন্ত্রন ক্ষমতা নেই। উদ্বাস্তুদের বাংলাদেশে ফিরে যাওয়ার আহবান জানিয়ে ইয়াহিয়া খান ২২শে মে যে বিবৃতি দিয়েছিলেন তারপরও ২০ লক্ষ উদ্বাস্তু ভারতে এসেছে। এ থেকে বোঝা যায় যে, যে পরিস্থিতিতে উদ্বাস্তুরা বাড়ীঘর ছেড়ে ভারতে এসেছে, সেই পরিস্থিতি এখনও বর্তমান – সেখানে এখনও আস্থার সংকট রয়েছে।

 

সুতরাং বর্তমান অবস্থায় বাংলাদেশে যাদের হাতে আইন ও শৃঙ্খলার ভার রয়েছে তাঁরা যদি জনগনের বিশ্বাস ও আস্থা অর্জন করতে পারেন তাহলেই উদ্বাস্তুদের আবার স্বদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

 

শ্রী সিং বলেন যে, শেখ মুজিবুর রহমান এবং তাঁর আওয়ামী লীগ দলের শুধু পূর্ববঙ্গেই নয়, সমগ্র পাকিস্তানেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। সুতরাং তাদের সঙ্গেই একটা রাজনৈতিক মীমাংসায় আসতে হবে, যাতে জনগনের প্রতিনিধিরা সরকার গঠন করতে পারেন। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষকে বাংলাদেশ অধিবাসীদের সঙ্গে একটা মিমাংসায় পৌঁছতে হবে। বাংলাদেশের পক্ষে একমাত্র নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই কথা বলতে পারেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশ্ব রাষ্ট্রগুলির কর্তব্য হচ্ছে পাকিস্তানের উপর সম্ভাব্য সর্বপ্রকার চাপ সৃষ্টি করা। এবং পাকিস্তান সরকারকে সুস্পষ্টভাবে বলা যে বাংলাদেশে অত্যাচার চালানোর অর্থই জনগনের অধিকারের উপর অত্যাচার এবং এই অত্যাচার বন্ধ করতে হবে।

 

শ্রী সিং বলেন যে, পাকিস্তানকে সর্বপ্রকার সরকারী এবং বেসরকারী সাহায্যদান বন্ধ করতে হবে, কেননা এই সাহায্য পেলে পাকিস্তান অত্যাচার চালিয়ে যেতে উৎসাহিত হবে এবং এই মর্মম্ভদ অবস্থা দীর্ঘায়িত হবে। পাকিস্তান যাতে রাজনৈতিক মীমাংসায় বাধ্য হয় সেজন্য চাপ সৃষ্টি করতে হবে।

 

– পি টি আই

 

 

 

 

 

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
২৬। জার্মান গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রে ভারত সরকারের বিশেষ প্রতিনিধি ডঃ করন সিংয়ের সফর শেষে প্রকাশিত ইন্দো জি ডি আর যুক্ত বিবৃতি ভারত সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ২৪ জুন, ১৯৭১

 

Razibul Bari Palash

<১২, ২৬, ৫২৫৩>

 

জার্মান গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রে ভারত সরকারের বিশেষ প্রতিনিধি ডঃ করন সিংয়ের সফর শেষে প্রকাশিত ইন্দোজি ডি আর যৌথবিবৃতি, ২৪ জুন ১৯৭১

 

২২ থেকে ২৪ জুন, ১৯৭১ ডঃ করণ সিং, পর্যটন ও বেসামরিক বিমান চলাচল মন্ত্রী, পূর্ব পাকিস্তানে বিয়োগান্তক ঘটনা থেকে উদ্ভূত পরিস্থিতি থেকে শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য জিডিআর সরকারের সাথে আলোচনা করতে জার্মান ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক ভিজিট করেন।

 

জিডিআর থাকাকালিন, মন্ত্রী ডঃ করণ সিং কে জিডিআর এর মন্ত্রী পরিষদ এর চেয়ারম্যান উইলি স্টপ ও পররাষ্ট্র মন্ত্রী অটো উইনজার সাদরে গ্রহণ করেন।

 

এছাড়াও তিনি পরিবহন মন্ত্রী, অটো আর্ন্ডট এর সঙ্গে বৈঠক করেন।

 

ভারতের প্রধানমন্ত্রী মিসেস গান্ধীর পক্ষ থেকে মন্ত্রী ডা করণ সিং পূর্ব পাকিস্তানের সাম্প্রতিক গুরুতর সমস্যা নিয়ে ভারতের মনোভাবের কথা মন্ত্রী পরিষদের চেয়ারম্যান ও ডেনমার্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রীকে অবহিত করেন।

 

ভারতীয় মন্ত্রী জার্মানির রাজনৈতিক অবস্থান ও সেইসাথে মানবিক সহায়তা প্রদানের প্রশংসা করেন। এতে উদ্বাস্তুদের সমস্যার সঙ্গে সহানুভূতি ও সংহতি প্রকাশ হয় বলে তিনি উল্লেখ করেন যা ছিল পাকিস্তানী মিলিটারি একশনের ফল। ২১ মে, ১৯৭১ সালে প্রধানমন্ত্রী উইলি স্টপ এর ইন্দিরা গান্ধিকে লেখা চিঠির কথা মনে করিয়ে দিয়ে মন্ত্রী পুনর্ব্যক্ত করেন জিডিআর ভারত যে ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করছে সেটিকে আগের মত আমলে নেবে এবং জরুরীভাবে যে আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি হতে যাচ্ছে তা শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক সমাধানের ব্যাপারে সমর্থন বলবত রাখবে।

 

ভারতীয় মন্ত্রী সমস্যা কতটা জরুরী ও তাতপর্যবহ তা ব্যাখ্যা করেন। পূর্ববঙ্গ থেকে প্রতিনিয়ত লাখ লাখ শরণার্থী দেশে আসা অব্যাহত রেখেছেন এবং তাদের সংখ্যা প্রায় ৮ মিলিয়নে এসে দাঁড়িয়েছে। এতে করে ঐ এলাকার শান্তিরক্ষা ও ভারসাম্য রক্ষা করা কষ্টকর হয়ে পড়ছে এবং এর ফলে তা ভারত-এর জন্য গুরুতর সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে।

 

উভয় পক্ষ সমস্যার নানা দিক নিয়ে আলোচনা করেন এবং তারা একমত হন যে উদ্ভূত পরিস্থিতির বাস্তবমুখী ও সঠিক সমাধান করার একমাত্র পথে হচ্ছে শরনার্থিদের ফিরে যাবার জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করা। তার একমাত্র পথ হচ্ছে পূর্বপাকিস্তানের জনগণ ও নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সাথে আলোচনা করে তাদের মত অনুযায়ী ব্যাবস্থা গ্রহণ।

 

ভরত মনে করে শরণার্থীদের অনুপ্রবেশ একটি আন্তর্জাতিক সমস্যা। জি ডি আর মন্ত্রীদের কাউন্সিলের সভাপতি ভারতের অবস্থানকে সমর্থন জানান। তিনি জার্মান ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিকের পক্ষ থেকে তার অবস্থান প্রকাশ করেন এবং ঘোষণা দেন যে পূর্ব পাকিস্তান থেকে ভারতে পালিয়ে আশা শরনার্থিদের সাহায্যে বাবদ তারা ৬ মিলিয়ন মার্ক বা ১ কোটি রুপি দেবেন।

 

আন্তর্জাতিক শান্তি ও প্রবৃদ্ধি বজায় রাখার স্বার্থে উভয়ে পরস্পর যোগাযোগ রাখার ব্যাপারে একমত হন।

 

উভয়ে আঞ্চলিক সমস্যা নিয়ে আলোচনা করেন এবং জি ডি আর এর সাথে ভবিষ্যৎ সুসম্পর্ক ও বোঝাপোড়া বজায় রাখার ব্যাপারে আলোচনা করেন।

 

উভয় পক্ষ মনে করেন যে ডঃ করণ সিং এর ভিজিটের ফলে দুই দেশের বন্ধুত্তপূর্ন সম্পর্ক ও সহযোগিতা আরও ফলপ্রসূ হবে।

 

ভারতীয় মন্ত্রী অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সামাজিক কল্যাণের ক্ষেত্রে জার্মান ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক এর সাফল্যের প্রশংসা করেন। এবং জি ডি আর এর পররাষ্ট্র মন্ত্রীর কাছ থেকে ইউরোপের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অবস্থা নিয়েও আলোচনা করেন। তাছাড়া তিনি তার আগমন উপলক্ষয়ে তাকে দেয়া উষ্ণ অভ্যর্থনা ও আতিথেয়তার জন্য সার্বিকভাবে ধন্যবাদ জ্ঞ্যাপন করেন।

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
২৭। বাংলাদেশের জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য সমাধানই সংকট নিরসনের একমাত্র পথ – পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বিবৃতি দৈনিক হিন্দুস্তান স্ট্যান্ডার্ড ২৬ জুন, ১৯৭১

 

 

Razibul Bari Palash

<১২, ২৭, ৫৪৫৫>

 

বাঙ্গালীর কাছে গ্রহণযোগ্য সমাধানই সংকট নিরসনের পথ বলে মনে করে বিশ্বশক্তিগুলো সিং

(বিশেষ প্রতিবেদক)

 

নয়াদিল্লি, জুন-২৫, মন্ত্রী জনাব শরণ সিং, আজ সংসদে বলেন যে সম্প্রতি তিনি কয়েকটি দেশ পরিদর্শন করেন এবং তারা মনে করে পূর্ববাংলার জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য এমন কোন পদক্ষেপ নিলেই কেবল মাত্র উদ্ভূত পরিস্থিতি সমাধান করা সম্ভব।

 

আরও কিছু বিষয় চুক্তিতে উঠে আসে। (১) বাংলাদেশে সব রকম সামরিক কর্ম অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে, (২) বাংলাদেশ থেকে উদ্বাস্তু প্রবাহ অবিলম্বে অবশ্যই বন্ধ করতে হবে (৩) শান্তি ও নিরাপত্তার মধ্যে তাদের বাড়িতে ফিরে আসার অবস্থার সৃষ্টি করা আবশ্যক। এতে করে শরণার্থীরা বাংলাদেশে তাদের নিজ নিজ বাড়িতে নিরাপদে যেতে পারবে। (৪) বর্তমান পরিস্থিতি ভয়াবহ, এবং তা এ অঞ্চলে শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য ঝুকিপূর্ন।

 

যারা তার বিদেশে সফরের ব্যাপারে সংসদের উভয় কক্ষের একটি বিবৃতি দেন। তিনি বলেন বিশ্বনেতারা এটা একমত হয়েছিলেন যে পূর্ববাংলা থেকে এই দেশের অভ্যন্তরে ছয় মিলিয়ন উদ্বাস্তুর এই বিশাল অন্তঃপ্রবাহ দ্বারা ভারত সরকারের জন্য অসহনীয় পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই ব্যাপারে অর্থ ও অন্যান্য সহায়তা দিতে সম্মত হয়েছে।

 

তিনি দেখেছেন যতগুলো দেশে ভ্রমণ করেছেন সেখানকার সবাই উদ্বাস্তুদের এই বৃহৎ অন্তঃপ্রবাহ দেখাশোনার ব্যাপারে ভারত সরকার ও ভারতের জনগণের দ্বারা প্রদর্শিত সেবা অত্যন্ত প্রশংসা কুড়িয়েছে। এহেন পরিস্থিতি যা মানব ইতিহাসে নজিরবিহীন হিসাবে স্বীকৃত ছিল। মনুষ্যসৃষ্ট এই দুর্যোগে এই দেশে আসা পূর্ববাংলার জনগণের জন্য এখানকার পরিস্থিতিও গুরুতর আকার ধারণ করেছে। এটি আমাদের উপর একটি বিশাল বোঝা। এর ফলে এই অঞ্চলের শান্তি এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছেনা – সেটি তাদের অবগত করা হয়েছে।

 

মন্ত্রী এটা স্পষ্ট করেন যে, পূর্ববাংলা থেকে উদ্বাস্তু দের দেয়া সাহায্য মূলত পাকিস্তানকে সাহায্য করা। কারণ তারা সেই দেশের নাগরিক। যদিও তারা তাদের নিজেদের সরকার কর্তৃক এই পরিণতি ভোগ করছে।

 

মন্ত্রি বলেন, আমি এও বলেছিলাম যে, বাংলাদেশের নির্যাতিত জনগনকে আন্তর্জাতিক নজরদারির মাধ্যমে দেয়া মানবিক সহায়তা ছাড়া অন্য যে কোন ধরনের অর্থনৈতিক সহায়তা দিলে সেটা কেবল সেদেশের সংখ্যালঘু সামরিক জান্তা, যারা সংখ্যাগুরু জনগোষ্ঠীর উপর অত্যাচার চালাচ্ছে, তাদেরকে ক্ষমতায় থাকতে সহায়তা করবে, এবং এটা হবে তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে একটি দুর্ভাগ্যজনক হস্তক্ষেপ।

 

আমি উল্লেখ করি যে বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক সংস্থার জরিপে যে দেখা গেছে সেখানে মিলিটারি জান্তারা কি বীভৎসতা চালাচ্ছে। ফলে এখানে যে কোন ধরণের আর্থিক সহায়তা পরিস্থিতির সমাধানের প্রতিকূলে যাবে।

 

আমি আরো বলেছিলাম, মানবিক বিবেচনায় বাংলাদেশের নির্যাতিত জনগণের স্বার্থে দেয়া আর্থিক সহায়তা ব্যাতীত অন্য যেকোন অর্থনৈতিক লেনদেন কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠ নিপীড়নে নিয়োজিত সামরিক জান্তাকেই প্রভাবিত করবে এবং এটি তাদের আভ্যন্তরীন বিষয়ে একটি দুর্ভাগ্যজনক হস্তক্ষেপ হিসেবেই গণ্য হবে।

 

৬ জুন থেকে ২২ জুনের মধ্যে, জনাব সিং মস্কো, বন, প্যারিস অটোয়া, নিউ ইয়র্ক, ওয়াশিংটন এবং লন্ডন সফর করেন। এসব রাজধানীতে প্রতিটি সরকার প্রধান ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করেন। U.N. মহাসচিব এবং তার সহকর্মীরা আলোচনায় ছিল। তিনি সরকারের অন্যান্য নেতৃবৃন্দ, সম্পাদক, সমাজকর্মী ও নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।

 

মন্ত্রী বলেন, এই আলোচনায় পূর্ববাংলা থেকে ছয় মিলিয়ন উদ্বাস্তু আসায় আমাদের অঞ্চলে সৃষ্ট অব্যাহত সঙ্কটের ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষন ও জোর দেয়া হয়। পূর্ব পাকিস্তানে পাকসেনা কর্তৃক সংগঠিত ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের জন্য উদ্বাস্তুদের এই অনুপ্রবেশ হচ্ছে।

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
২৮। বাংলাদেশ প্রশ্নে কোন হঠকারী নীতি নয় – প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা দৈনিক কালান্তর ৩০ জুন, ১৯৭১

 

Aparajita Neel

<১২, ২৮, ৫৬>

 

বাংলাদেশের ব্যাপারে সরকার হঠকারী নীতি নেবেনা

শ্রীমতী গান্ধী

 

নয়াদিল্লী, ২৯ জুন (ইউ এন আই) – বাংলাদেশের ব্যাপারে সরকার কোন হঠকারী নীতি নেবেনা। আজ কংগ্রেস পার্লামেন্টারি পার্টির এক সভায় ভাষণদানকালে প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী এই কথা বলেন। তিনি আরও বলেন, এই রকম একটি সূক্ষ্ণ সমস্যায় কোন সরকারই অগ্র পশ্চাৎ বিবেচনা না করে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারেনা।

 

বাংলাদেশ প্রসঙ্গে ভারতের কূটনৈতিক তৎপরতার নৈরাশ্যজনক ছবি উপস্থিত করায় শ্রীমতী গান্ধী দুঃখ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশে পাকবাহিনীর নরহত্যা অথবা এর ফলে ভারতের নিরাপত্তা ও অর্থনিতিতে প্রশ্নটা বিশ্বের রাজধানীগুলিতে বোঝানো হয়নি বললে সদস্যরা ভুল করবেন।

 

প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী গান্ধী বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, সদস্যরা তাদের নির্বাচনি কেন্দ্রে ফিরে কেন বাংলাদেশের সমর্থনে জনমত সংগঠিত করছে না। ত্রাণের কাজে জনসাধারণের সহযোগিতা আদায়ে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

 

ইতিপূর্বে শ্রী নাগী রেড্ডী বলেন, ভারতের বিরুদ্ধে বৃহৎ শক্তিগুলি চক্রান্ত করছে। শারনার্থিদের সংখ্যা এক কোটিতে পৌঁছাতে পারে। ভারতের উচিৎ কঠোর পন্থা অবলম্বন করা।

 

পশ্চিম পাকিস্তানী সৈন্যদের পূর্ব বাংলা থেকে সাময়িকভাবে হটিয়ে দিতে হবে, এই কথা বলেন শ্রী মহাজন।

 

অন্যদিকে শ্রী প্রবোধ চন্ত্র পুরোকায়েত অভিযোগ করেন চীন আতংকের জন্য ভারত সরকার সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারছেনা।

 

তিনি বলেন, প্রতিনিধি পাঠিয়ে বিদেশী রাষ্ট্রকে প্রভাবান্বিত করা যাবেনা কারণ তারা নিজেদের স্বার্থ অনুযায়ী নীতি নির্ধারন করে থাকে। তিনি মন্তব্য করেন, আমরা যুদ্ধ সম্পর্কে কথাবার্তা নাও বললে পারি কিন্তু আমাদের যুদ্ধ ভীতি থাকলে চলবে না।

 

 

 

 

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
২৯। জাতিসঙ্ঘের ইকনমিক এন্ড সোশাল কাউন্সিলে ভারতীয় পর্যবেক্ষকদলের নেতা এন কৃষ্ণের ভাষণ ভারত সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ৯ জুলাই, ১৯৭১

 

Razibul Bari Palash

<১২, ২৯, ৫৭>

 

জুলাই, ১৯৭১ তারিখে রাষ্ট্রদূত এন কৃষ্ণান, অর্থনৈতিক সামাজিক পরিষদের ৫১ তম অধিবেশনে ভারতীয় অবজারভার ডেলিগেশনের নেতা হিসেবে বিবৃতির চুম্বক অংশ

 

গত কয়েক বছর ধরে ভারতে আশাপ্রদ প্রবৃদ্ধি থেকে বোঝা যাচ্ছে এটি একটি টেকসই ও সারগর্ভ অগ্রগতির দিকে যাচ্ছে। এবছর ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর আমাদের সরকার আমাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমস্যার মোকাবেলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। কিন্তু পূর্ব বাংলার ঘটনার ফলে সেখান থেকে উদ্বাস্তুদের একটি বৃহৎ অন্তঃপ্রবাহ আমাদের উন্নয়নের ছন্দকে বড় সমস্যায় ফেলেছে। ইতিমধ্যে জুন শেষে তার সংখ্যা ৬.৩ মিলিয়ন এ পৌঁছেছে। এটা স্পষ্ট যে, খাদ্য, আশ্রয় ও তাদের ওষুধ প্রদানের কাজটি অবশ্যই অগ্রাধিকার পাবে। এমনকি এই উদ্দেশ্যে বর্তমান বছরের জন্য আমাদের বাজেটে এই খাতে ৮০ মিলিয়ন রুপি বরাদ্দ রাখা হয়েছে এবং যার জন্য আমাদের জনগণের ওপর ৩০ শতাংশ অতিরিক্ত করের বোঝা চাপানো হয়েছে। আমরা আমাদের বোঝা মোকাবিলার জন্য জাতিসংঘ ও বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি সহানুভূতিশীল হবার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। যাইহোক, এখনও উদ্বাস্তুদের ক্রমবর্ধমান সংখ্যার সাথে মিলিয়ে ত্রাণ চাহিদা দিতে হবে। কিন্তু এটি শুধুমাত্র একটি অস্থায়ী সমাধান হতে পারে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় অনুধাবন করেছে এর থেকে নিষ্কৃতি পেতে হলে আগে অনুপ্রবেশ ঠেকাতে হবে। তেমন পরিবেশ সৃষ্টি হলে ও তারা তাদের নিরাপত্তার আশ্বাস পেলে তাদের মাতৃভূমিতে প্রত্যাবর্তন করার আশা সৃষ্টি হবে এবং ফিরে যাওয়া ত্বরান্বিত হবে।

 

আমাদের প্রতিনিধিদল কৃতজ্ঞ যে যুগোস্লাভিয়া ও নিউ জিল্যান্ড পরিষদের চলতি অধিবেশনে এটা নিয়ে আলোচনা করার প্রস্তুতি শুরু করেছে। তাছাড়া সোভিয়েত ইউনিয়ন, ইউ.কে. হাঙ্গেরি, নরওয়ে এবং অন্যদের প্রতিনিধিরাও তাদের বিবৃতি প্রকাশ করার সময় এই বিষয়টি আলোচনায় এনেছিলেন। আমরা তাদের সবার কাছে কৃতজ্ঞ। আমরা আগ্রহের সঙ্গে অপেক্ষা করছি উদ্বাস্তুদের জন্য ইউ এন হাইকমিশনার আগামী সপ্তাহে পরিষদে বিবৃতি দেবেন। আমরা নিশ্চিত যে, আলোচনার ফলে উদ্বাস্তুদের ত্রাণ চাহিদা পূরণ এবং তাদের দ্রুত এবং স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসনএর ব্যাপারে আরো মনোযোগ বৃদ্ধি পাবে। আমরা আশা করি ECOSOC সমস্যা বিবেচনা করে তার সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করবেন এবং একটি টেকসই ও স্থায়ী সমাধান দেবেন।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
৩০। প্রতিরক্ষা বাহিনীকে প্রস্তুত থাকতে হবে – প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর বক্তৃতা দৈনিক হিন্দুস্তান স্ট্যান্ডার্ড ২০ জুলাই, ১৯৭১

 

 

Razibul Bari Palash

<১২, ৩০, ৫৮>

 

পিণ্ডির কুচক্রী আক্রমণহতে পারে জে রাম

টাইমস অফ ইন্ডিয়াসংবাদ সেবা

 

বোম্বে, জুলাই ১৯- প্রতিরক্ষা মন্ত্রী, জনাব জে রাম বলেছেন যে পাকিস্তান বাংলাদেশে ‘কুচক্রী আগ্রাসন” চালাচ্ছে এবং সেখান থেকে লাখ লাখ মানুষ তাড়িয়ে দিচ্ছে।

 

তিনি আইএনএস “ভিক্রান্ত” বোর্ডে কর্মকর্তা ও পশ্চিমা নৌ কমান্ডের নাবিকদের সামনে ভাষণ দিচ্ছিলেন।

 

পিটিআই যোগ করে: বাংলাদেশের মধ্যেকার ঘটনার জন্য ভারতের নিজস্ব নিরাপত্তা প্রস্তুতি জরুরী। অবশ্যই, পাকিস্তান ও চীন থেকে নিরাপত্তা হুমকি আসতে পারে। মন্ত্রী বলেন, জনগণ সশস্ত্র বাহিনীর ক্ষমতার উপর পূর্ণ আস্থা রাখে। দেশের দীর্ঘ তটরেখা নৌবাহিনীর হাতে নিরাপদ।

 

জনাব জগজীবন রাম বলেন ভারত বাংলাদেশের থেকে আসা মুক্তিযোদ্ধাদের দেখাশোনা করছে। কিন্তু তারা ফিরে যাবে বাংলাদেশকে মুক্ত করতে, মুজিবুর রহমানের গণতান্ত্রিক বাংলাদেশকে মুক্ত করতে। তিনি আত্মবিশ্বাসী যে মুক্তি বাহিনী চূড়ান্তভাবে বাংলাদেশকে মুক্ত করতে সক্ষম হবে।

 

জনাব রাম বলেন আমাদের সীমান্তরক্ষী বাহিনী পূর্বাঞ্চলে পাকিস্তানের অনুপ্রবেশের ব্যাপারে সজাগ আছে।

 

মন্ত্রী কে ভাইস অ্যাডমিরাল এস এন কোহলি FOC-ইন-সি, ওয়েস্টার্ন কমান্ড স্বাগত জানান।

 

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
৩১। জাতিসঙ্ঘের মহাসচিবের সহকারীকে প্রদত্ত ভারতের জবাব ভারত সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ২ আগস্ট, ১৯৭১

 

Razibul Bari Palash

<১২, ৩১, ৫৯৬২>

অনুবাদ

 

জাতিসঙ্ঘের মহাসচিবের সহকারীকে প্রদত্ত ভারতের জবাব

আগস্ট, ১৯৭১

 

১। ভারত সরকার জাতিসঙ্ঘ মহাসচিবের দৃষ্টিগোচর করে যে পূর্ব পাকিস্তান থেকে ভারতে শরণার্থীদের আগমন তাদের জন্য পরম উদ্বেগের ব্যাপার। পাশাপাশি পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক নৃশংসতা দ্রুত বন্ধ করা জরুরী। দৈনিক ৪০০০০ থেকে ৫০০০০ উদ্বাস্তু ভারতে প্রবেশ করছে। নৃশংসতা চলতে থাকলে এদের দেশ ছেড়ে ফিরে যাবার সম্ভবনাও কম। ভারত সরকার ইতোমধ্যে উদ্বাস্তু ফেরত পাঠানোর জন্য পদক্ষেপ নিয়েছে – এর সংখ্যা এখন চার মিলিয়ন হয়ে গেছে। গত ২৫ মে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান বিবৃতি দিয়েছেন যে তিনি পাকিস্তানি নাগরিকদের নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার অনুমতি দেবেন।

 

২। ভারতে সাত লক্ষেরও বেশি উদ্বাস্তু আছে। দৈনিক দেশত্যাগ এখনও অব্যাহত আছে। এর মূল কারণ পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতি। বিশৃঙ্খলা ও সামরিক দমন এবং পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ হত্যা অপ্রতিহতভাবে অব্যাহত আছে। আন্তর্জাতিক প্রেসে তা স্পষ্ট। এই বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক রিপোর্ট ও স্বাধীন বিদেশী পর্যবেক্ষকরা ভারতে তাদের ক্যাম্পে সফর এবং উদ্বাস্তুদের থেকে দুঃখের কাহিনী শুনে নিজেরাই বিবৃতি দিয়েছেন।

 

 

৩। উদ্বাস্তুদের সংখ্যা এখনও প্রতিদিন বাড়ছে। লক্ষ লক্ষ লোকদের দেখাশোনা করা ভারত সরকারের উপর বোঝা। এটা সবাই লক্ষ্য করেছেন। তাছাড়া পাকিস্তান পর পর দুটি বিপর্যয় সামলাতে পারছেনা- একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ অন্যটি মানুষসৃষ্ট। ফলে পাকিস্তানের ক্রমবর্ধমান আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ও প্রশাসনিক ব্যার্থতা প্রকট হচ্ছে। রাজনৈতিক পরিস্থিতির উত্তরণেও এটা বাঁধা হয়ে আছে। পূর্ব পাকিস্তানে একটি উন্নত রাজনৈতিক পরিবেশ সৃষ্টি হলে ভারত থেকে শরণার্থীদের ফেরত পাঠানোর বিষয়ে চিন্তা করা সম্ভব। দেশের অখন্ডতা রক্ষা ও স্বনিয়ন্ত্রণের মূলনীতির মধ্যে যে সঙ্ঘর্ষ তা বিশেষ ভাবে প্রতিভাত হচ্ছে পুর্ব পাকিস্তানে, যেখানে সংখ্যাগুরু জনগোষ্ঠী নিপীড়িত হচ্ছে একটি সংখ্যালঘু সামরিক শাসনের হাতে, যারা গত বছরের ডিসেম্বরে তাদেরই নিজেদের দেয়া নির্বাচনের ফলাফল অস্বীকার করছে, এবং সাড়ে সাত কোটি মানুষের উপর নির্বিকার হত্যাকাণ্ড, গনহত্যা ও সাংস্কৃতিক দমন চালাচ্ছে।

 

৪। প্রিন্স সদরুদ্দিন ভারতের প্রধান মন্ত্রিকে কিছুদিন আগে বলেন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নানা ভাষার, নানা পেশার কর্মীদের আনলে শরনার্থিদের ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হবে। ইউএনএইচসিআর ১৬ জুলাই জেনেভায় অনুষ্ঠিত ECOSOC সভায় সীমান্তে উদ্বাস্তুদের জন্য কোন পরামর্শ দেয় নাই। বর্ডারের উভয় পাশে হাই কমিশনারদের প্রতিনিধি দেয়া হলে শরনার্থিদের ফিরে যাওয়া তরান্বিত হবে কিনা সে ব্যাপারে তিনি কিছুই বলেন নাই।

 

৫। এই পরিস্থিতিতে ভারত সরকার সীমান্তের ভারতীয় অংশে কিছু লোককে পোস্টিং দেবার উদ্যেশ্য বুঝতে পারছেনা। আমরা মনে করি এতে করে উদ্বাস্তুরা বাড়ী ফিরে যাবেনা। তাছাড়া তারা পাকিস্তানের সামরিক কর্তৃপক্ষ দ্বারা নির্বিচারে গণহত্যার মুখোমুখি হবে। পাশবিক বল প্রয়োগের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানের ৭৫ মিলিয়ন মানুষ এখন নির্যাতিত। এতে সেখানে বিরাজমান রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও প্রশাসনিক বাস্তবতার প্রকাশ হয়। পাক সরকার উদ্বাস্তুদের ফিরে যাবার পরিবেশ সৃষ্টি করেনি। বরং এটাকে অসম্ভব কঠিন করে দিয়েছে। তারা ইচ্ছা করে ভারতে অনুপ্রবেশ ঘটাচ্ছে।

 

৬। উদ্বাস্তুদের প্রবেশে বাঁধা দেবার কোন ইচ্ছা ভারতের নেই। আমরা তাদের দ্রুত নিরাপদে ফিরে যাওয়া নিয়ে শঙ্কিত। এই প্রেক্ষাপটে, UNHCR এর সেক্রেটারি জেনারেল ৩০শে জুন বিবৃতি দেন ভারতের অভিযোগ উদ্বাস্তুদের প্রত্যাবর্তন বাধা গ্রস্ত হচ্ছে। প্রিন্স সদরুদ্দিন বলেন হোস্ট সরকারের বিপক্ষে কোনো প্রমাণ নেই যে তারা শরণার্থীদের বাধা দিচ্ছেন। আবার প্যারিসে এক প্রশ্নের জবাবে ১০ জুলাই প্রিন্স বলেন, এটা বলা ঠিক হবেনা যে ভারত তাদের প্রবেশে বাঁধা দিচ্ছে। ১৯ জুলাই, কাঠমান্ডুতে ব্রিটিশ সংগঠন “ওয়ার্ণ ওয়ান্ট” পাকিস্তানের বিবৃতিকে “আবর্জনা” বলে আখ্যায়িত করেছে। কারণ পাকিস্তান বলেছে ভারত উদ্বাস্তুদের রেখে দিচ্ছে ইচ্ছা করে এবং তাদের ফিরতে দিচ্ছেনা। কলকাতায় ২২ জুলাই, জনাব ম্যানফ্রেড ক্রস, একজন অস্ট্রেলিয়ান এমপি, পাকিস্তানের কথাকে “অসম্ভব” বলে উড়িয়ে দেন। যুক্তরাষ্ট্রের হাউজের প্রতিনিধি মাননীয় কর্ণেলিয়াস ই গ্যালাঘের ১০ জুলাই বলেন পাকিস্তানের সৃষ্ট সংকট ভারত সরকার অত্যন্ত দক্ষতার সাথে সামলাচ্ছেন। তারা অবিশ্বাস্য সংযম দেখিয়ে যাচ্ছেন। তারা উদ্বাস্তুদের সাহায্য ও সমবেদনা দেখাচ্ছেন। সত্যি করেই বলা যায় এই সরকার নৈতিক ও মানবিক আচরণ করছেন। যেদিন প্রথম উদ্বাস্তু বর্ডার অতিক্রম করেছে সেদিন থেকেই প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সরকার সুনাম অর্জন করে চলেছেন। উদ্বাস্তুদের অনুপ্রবেশের সংখ্যা দেখলেই বোঝা যায় পাকিস্তান সরকার নির্বাচনে জয়ী না হতে পেরে তাদের উপর কি পরিমাণ পেষন ও নৃশংস নীতি অবলম্বন করছেন। আমি উদ্বাস্তুদের সাক্ষাৎকার নিয়ে দেখেছি। আমি এখন বিশ্বাস করি খুব হিসাব করে বুদ্ধিবৃত্তিক মানুষদের – অধ্যাপক, ছাত্র, এবং সেনাবাহিনী কর্তৃক ডিস্টিংশনপ্রাপ্ত দের হত্যা করে নিশ্চিনহ করে দেয়া হচ্ছে। আমার এই মতামত গণহত্যার পক্ষে রায় দেয়। এছাড়া আরও যত রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে যার কোথাও বলা নেই যে এটি ছাড়া শরনার্থিদের অনুগমনের অন্য কোন কারণ আছে।

 

৭. এই পটভূমিতে ভারত সরকার একটি “উভয় পক্ষের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনারের সীমিত উপস্থাপনা” এর প্রস্তাব আনার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে যেখানে তারা বলবে যে তারা শরনার্থিদের ফিরে যেতে বাঁধা দিচ্ছেনা। তাদের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো গুরুতর প্রভাবিত হলেও শুধুমাত্র মানবিকতার ভিত্তিতে ভারত প্রবেশের অনুমতি দিয়ে যাচ্ছে। ভারত সরকার উদ্বিগ্ন যে তারা সহসা দেশে ফিরে যেতে পারবে কিনা। জাতিসংঘ বা ইউএনএইচসিআর প্রতিনিধিদের উপস্থিতি এই ব্যাপারে সাহায্য করতে পারবে না। অপরপক্ষে, এটা মূল সমস্যাকে চাপা দিয়ে দেবে – যেটি হচ্ছিল মূলত সামরিক নৃশংসতার ধারাবাহিকতা থেকে। বিশ্বের মনোযোগ অন্যদিকে প্রবাহিত হলে শরণার্থীদের আরও অন্তঃপ্রবাহ বজায় থাকবে। এবং রাজনৈতিক নিষ্পত্তির অভাবে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য নেতৃত্বের শাসন প্রতিস্থাপন বিলম্বিত হবে।

 

৮. ইউএনএইচসিআর এর দিল্লিতে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের একটি মোটামুটি শক্তিশালী দল রয়েছে এবং তাদের জন্যে শরণার্থী শিবিরে দেখার জন্য সুবিধা দেওয়া হয়েছে। বস্তুত জনাব টমাস জেইমসন, ইউএনএইচসিআর এর পরিচালক, ভারতে ইউএনএইচসিআর কার্যালয়ের প্রধান প্রতিনিধি। তিনি সম্প্রতি শরণার্থী শিবিরে সফর করে এসেছেন। সব শরণার্থী শিবিরে প্রবেশ অনুমতি প্রদান করা হয় এবং সীমান্ত এলাকায় এইসব ক্যাম্পে যানবাহন সুবিধা দেওয়া হয়। এছাড়াও ১০০০ বিদেশী পর্যবেক্ষক শরণার্থী শিবির পরিদর্শন করেন এবং তাদের অধিকাংশ প্রকাশ্যে বলেছেন যে উদ্বাস্তুরা বাংলাদেশের সামরিক অপারেশন এর কারণে ভারতে আশ্রয় নিচ্ছে এবং যদি উপযুক্ত অবস্থার সৃষ্টি করা হয় তাহলে তারা নিরাপদ ফিরে যাওয়া নিশ্চিত করবে। পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান নেতা শেখ মুজিবুর রহমান এবং তার নির্বাচিত সহকর্মীরা এই ব্যাপারে একটি রাজনৈতিক বক্তব্য রেখেছেন। সরকারী সাহায্য প্রতিষ্ঠানগুলো পরিশেষে জানায় আন্তর্জাতিক সংস্থাদের এগিয়ে আসা উচিৎ। এসে তার উদ্বাস্তুদের পরিস্থিতি দেখুন। তাদের রিলিফ প্রোগ্রাম, মানবিক সহায়তা এবং কিছু লোকবল নিয়োগ করুন। মানুষের এই হতাশাজনক দুর্ভোগ আর ভোগান্তিতে সবাই এগিয়ে আসুন এই আশা ব্যাক্ত করা হয়।

 

৯. ভারত সরকারের কোনো প্রস্তাব নেই যা মৌলিক সমস্যা থেকে মনোযোগ অন্যদিকে ধাবিত করে। কারণ এতে শরণার্থীদের পরিণতিও অপরবর্তিত থাকবে। তারা জাতিসংঘের যে কোনো কর্ম বা পদক্ষেপ সমর্থন করবে। পর্যাপ্ত আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধানে শরণার্থীদের ভূমি, ঘরবাড়ী এবং সম্পত্তির নিশ্চয়তা নিশ্চিত করে পূর্ব পাকিস্তানে তাদের ফেরত পাঠানো হবে। এমন অবস্থা সেখানে তৈরি করা হবে যে তা আন্তর্জাতিক সংস্থার অধীনে থাকবে এবং উদ্বাস্তুরা নিরাপদে ফিরে আসতে পারে এবং পুনরায় কোন প্রতিহিংসামূলক হুমকি বা নিপীড়নের স্বীকার না হয় সেই ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে। ভারত সরকার ২৭ জুলাই প্রকাশিত নিউইয়র্ক টাইমস এর রিপোর্ট এবং ফোটোগ্রাফিতে জাতিসঙ্ঘ মহাসচিবের দৃষ্টি আকর্ষণ করান। এই অবস্থায় ভারতীয় সীমান্তে কাউকে পোস্টিং দেয়া হলে তাতে পরিস্থিতির কোন উন্নতি হবেনা। ভারত সরকার এটাকে সমর্থন করতে পারেন না কারণ এটা তাদের তারা মনে করে এটা অবাস্তব ও বিপদজনক হবে। তাই তারা এই প্রস্তাব কোন ভাবেই মেনে নেবেন না।

 

১০. পূর্ববাংলার মূল সমস্যা সেখানে বহুদূর থেকে আসা একটি সেনা বাহিনী নিষ্ঠুরভাবে তাদের নিয়ন্ত্রণ করছে। যদি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় পূর্ববঙ্গে উদ্বাস্তুদের ফেরতের ব্যাপারে পদক্ষেপ নেয়ার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সজাগ হয় তাহলে সেখানে ইতিমধ্যে নির্বাচিত নেতাদের কাছে গ্রহণযোগ্য একটি রাজনৈতিক নিষ্পত্তির মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানের ভিতরে স্বাভাবিক অবস্থার পুনরুদ্ধার সম্ভব।

 

 

 

 

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
৩২। ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে স্বাক্ষরিত ২০ বছর মেয়াদি শান্তি বন্ধুত্ব ও সহযোগিতা চুক্তির বিস্তারিত বিবরণ ভারত সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণাল­য় ৯ আগস্ট, ১৯৭১

 

 

Razibul Bari Palash

<১২, ৩২, ৬৩৬৫>

অনুবাদ

 

 

শান্তি, বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার ভিত্তিতে ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষর, আগস্ট ৯

 

 

আন্তরিক বন্ধুত্বের তাগিদে বিদ্যমান সম্পর্ক সুদৃঢ় করার অভিলাষ।

 

একথা বিশ্বাস করা যে বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার উন্নয়নের ফলে উভয়ের মৌলিক জাতীয় স্বার্থ ও সেইসাথে এশিয়া ও বিশ্ব শান্তির স্বার্থ পূরণে ভূমিকা রাখবে।

 

সর্বজনীন শান্তি ও নিরাপত্তা উন্নীত করনের জন্য এবং আন্তর্জাতিক উত্তেজনা ও উপনিবেশবাদের অবশিষ্টাংশ চূড়ান্ত বর্জন করার প্রচেষ্টা করতে হবে।

 

শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক বিষয়ে একত্রে থাকতে হবে।

 

দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে যে বর্তমান বিশ্বের আন্তর্জাতিক সমস্যা শুধুমাত্র দ্বন্দ্ব দ্বারা সমাধান করা যাবেনা।

 

জাতিসংঘের উদ্দেশ্য ও চার্টার মূলনীতি মেনে চলতে সংকল্প পুনর্ব্যক্ত করা হয়।

 

একদিকে ভারতের প্রজাতন্ত্র এবং অন্য দিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন এই চুক্তির ব্যাপারে একমত হন এবং এটি সম্পন্ন করতে নিম্নলিখিত রাষ্ট্রদূতরা নিয়োগপ্রাপ্ত হন।

 

ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের পক্ষে:

সরদার শরণ সিং, পররাষ্ট্রমন্ত্রী

 

 

সোভিয়েত ইউনিয়নের পক্ষ থেকে:

জনাব এ গ্রমিকো, পররাষ্ট্র মন্ত্রী, তাদের প্রতিটি সম্ভবনা আলোচনা করেন যা সঠিকভাবে ক্রমান্বয়ে নিম্নে লিপিবদ্ধ হল।

 

ধারা ১: চুক্তিবদ্ধ শপথে ঘোষণা করা হয় যে উভয় দেশের শান্তি ও বন্ধুত্ব দেশের এবং দেশের জনগণের মধ্যে প্রাধান্য পাইবে। উভয় দেশ স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও অপরপক্ষের অখণ্ডতার প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করবে এবং অন্যান্য অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা থেকে বিরত থাকবে। দেশ দুটির আন্তরিক বন্ধুত্ব বজায় থাকবে এবং তারা ভালো

 

প্রতিবেশীসুলভ মন নিয়ে কাজ করবে এবং ব্যাপক সহযোগিতার পূর্বোক্ত নীতির ভিত্তিতে ও সেইসাথে সমতা ও পারস্পরিক সুবিধার জন্য বিদ্যমান সম্পর্ক সংহত করা চালিয়ে যাবে।

 

ধারা ২: প্রত্যেক সম্ভাব্য উপায়ে শান্তি এবং তাদের জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য উচ্চ চুক্তিবদ্ধ দল সংরক্ষণ এবং এশিয়া ও বিশ্বের সর্বত্র শান্তি জোরদার করার জন্য কাজ করা। অস্ত্র, জাতি এবং সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ অর্জন করার জন্য একসাথে কাজ করা যা এশিয়া সহ সারা বিশ্বে অবস্থান দৃঢ় করবে।

 

ধারা ৩: সাম্য ও আদর্শের প্রতি আনুগত্য পূর্বক ঔপনিবেশিকতা ও বর্ণবাদ সম্পূর্ণ বর্জনের জন্য সংগ্রাম করতে তারা সংকল্পবদ্ধ হন।

 

উচ্চ চুক্তিবদ্ধ দল এই লক্ষ্য অর্জন করার জন্য অন্য দেশকে সহায়তা করতে পারে যাতে যাতে এবং উপনিবেশবাদ ও জাতিগত আধিপত্যের বিরুদ্ধে তাদের সংগ্রামে জাতির আকাঙ্খার সমর্থন করার অন্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতা করবে।

 

ধারা ৪: ভারত সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েতের শান্তিকামী নীতিকে সন্মান করে। এতে সকল দেশের প্রতি বন্ধুত্ব ও সহযোগিতাপূর্ন সম্পর্ক সৃষ্টি হয়।

 

সোভিয়েত ইউনিয়ন ভারতীয়দের উদারনীতিকে সম্মান করে এবং মনে করে যে এই নীতি বিশ্বশান্তি ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিরাপত্তা রক্ষণাবেক্ষণ এবং বিশ্বের উত্তেজনা কমাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করবে।

 

ধারা ৫: সর্বজনীন শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতার ব্যাপারে তারা আগ্রহ প্রকাশ করেন। চুক্তি স্বাক্ষরকারী দেশগুলো এই চুক্তিবদ্ধ হয় যে আন্তর্জাতিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট সমস্যায় একে অপরের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখবে এবং তাদের নেতৃস্থানীয় রাষ্ট্রনায়কদের মধ্যে মতবিনিময়, মিটিং, সরকারি প্রতিনিধি এবং দুই সরকারের বিশেষ দূতদের ভিজিট এবং কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে যোগাযোগ রক্ষা করবে।

 

ধারা ৬: তাদের মধ্যে অর্থনৈতিক, বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার তাত্পর্যপূর্ণ সংযুক্ত এবং প্রসারিত করবে। ব্যাপক সহযোগিতার পাশাপাশি প্রসারিত তাদের মধ্যে বাণিজ্য, পরিবহন ও যোগাযোগ অব্যাহত থাকবে। এসকল চুক্তি হবে ডিসেম্বর-২৬, ১৯৭০ এর ইন্দো-সোভিয়েত ট্রেড এগ্রিমেন্ট এর ভিত্তিতে।

 

ধারা ৭: বিজ্ঞান, শিল্প, সাহিত্য, শিক্ষা, জনস্বাস্থ্য, প্রেস, রেডিও টেলিভিশন, সিনেমা, পর্যটন ও ক্রীড়া ক্ষেত্রে সম্পর্ক আরও উন্নত করা হবে।

 

ধারা ৮: চুক্তি ঘোষণা করে যে একপক্ষ অন্য পক্ষের বিরুদ্ধে পরিচালিত কোন সামরিক জোটে অংশগ্রহণ করতে পারবে না।

 

একে অন্যের বিরুদ্ধে আগ্রাসন থেকে বিরত থাকবে এবং অন্যদের সেনাবাহিনীর ক্ষতিসাধন হয় বা সম্পদ নষ্ট হয় এমন কোন আগ্রাসন অন্যের ভূখণ্ডে চালানো যাবেনা।

 

ধারা ৯: তৃতীয় পক্ষের কেউ যদি অন্যের ক্ষতিসাধনের জন্য কোন চুক্তি করতে চায় তাহলে তা থেকে বিরত থাকতে হবে। এমন অবস্থায় অবিলম্বে এই দুই দেশ হুমকি অপসারণ করার জন্য পারস্পরিক আলোচনা শুরু করিবে এবং শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য উপযুক্ত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

 

ধারা ১০: তারা শপথ ঘোষণা করে যে একে অন্যের গোপন এক বা একাধিক তথ্য প্রকাশ থেকে বিরত থাকবে বা কোন চুক্তি যা বর্তমান চুক্তিবিরোধী হয় সেগুলো বর্জন করবে। তারা আরও ঘোষণা করে যে কোন বাধ্যবাধকতা ছাড়াই তারা একে অপরের সামরিক ক্ষতির কারণ হতে পারে এমন কিছুতে জড়াবেনা।

 

ধারা ১১: এই চুক্তি বিশ বছরের জন্য গৃহীত হল এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে আরও ৫ বছর চলতে থাকবে যদি এর মাঝে কোন উচ্চ পর্যায়ের পরিবর্তনের প্রয়োজন না হয়। চুক্তি স্বাক্ষরের এক মাসের মধ্যে মস্কো থেকে এটি সঞ্চালিত হবে ও বলবত্ থাকবে।

 

ধারা ১২: চুক্তিতে কোন বোঝার ভুল থাকলে উভয় টিম শান্তিপূর্ন আলোচনা করে তা স্পষ্ট করবে এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সমঝোতার মনোভাব নিয়ে শান্তিপূর্ণ উপায়ে দ্বিপক্ষীয়ভাবে তা করা হবে।

 

রাষ্ট্রদূতরা হিন্দি, রাশিয়ান এবং ইংরেজিতে উপস্থিত চুক্তি স্বাক্ষর করেছে এবং সব গুলো সমানভাবে অর্থপূর্ন করা হয়েছে এবং তাদের সিল- স্বাক্ষর নেয়া হয়েছে।

 

নয়া দিল্লিতে ৯ অগাস্ট, ১৯৭১ এটি সম্পন্ন হয়।

 

ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের পক্ষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী শরণ সিং স্বাক্ষর করেন।

 

সোভিয়েত ইউনিয়নের পক্ষ থেকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ গ্রমিকো সই করেন।

 

 

 

 

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
৩৩। নয়াদিল্লীর ইন্ডিয়া গেঁটে অনুষ্ঠিত জনসভায় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধির ভাষণ ভারতের তথ্য ও বেতার মন্ত্রণালয় প্রকাশিত দি ইয়ার্স অফ এন্ডিভার ৯ আগস্ট, ১৯৭১

 

Razibul Bari Palash

<১২, ৩৩, ৬৬৬৮>

অনুবাদ

 

সংকটের মুখোমুখি

 

সংসদ ১৯ মার্চ শুরু হয় এবং ২৫ ও ২৬ মার্চ বাংলাদেশে এমন কিছু ঘটনা ঘটে যা বিশ্বকে মর্মাহত করেছে। বাংলাদেশের জনগণ একই উদ্দেশ্য নিয়ে লড়ছে যার জন্য আপনি এবং আমি আমাদের দেশে একটা দীর্ঘ সংগ্রামের সময় অতিবাহিত করেছি।

 

বাংলাদেশের ঘটনা সঙ্কট সৃষ্টি করছে। ৭৩ লাখ মানুষ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গণহত্যার কারণে ভারতে আশ্রয় নিয়েছে। আমরা তাদের আমন্ত্রণ জানাইনি। কীভাবে আমরা তা করতে পারি? আমাদের নিজের দেশে অনেক কিছুর ঘাটতি আছে। সুতরাং, কিভাবে আমরা তাদের আসতে বলি? আমাদের নিজের জনগণের দুর্ভোগ বৃদ্ধি পেয়েছে এতে। এটা আমাদের কোনো দোষ না যে তারা এসেছেন। তারা তাদের দেশ ছেড়ে বিপদ পরে তাদের দুঃখ কষ্ট থেকে অব্যাহতি পাবার আশায় এখানে এসেছেন। এমনকি যাঁরা রাজনীতির সঙ্গে কোনোভাবে জড়িত ছিলোনা তাদেরকেও হত্যা করা হয়েছে। তাদের ঘর অগ্নিসংযোগ এবং নৃশংসতার সব প্রক্রিয়া তাদের উপর চালানো হয়েছিল।

 

আপনাদের মধ্যে কেউ যদি শরনার্থিশিবিরে যান তাহলে তাদের দুর্দশার চিত্র দেখতে পাবেন। যে যাবে সে বলবে না যে ভারত সরকার শরনার্থিদের ফেরত পাঠাতে চায়। কোন মানুষই, তার কোলে একটা বাচ্চা নিয়ে সমস্ত দিন ও রাত্রি কাদা ও পানিতে দাঁড়িয়ে থাকতে পারেনা। কারণ দাঁড়িয়ে থাকবার জন্য কোন শুকনো জায়গা নেই। যদি থাকত তাহলে তারা স্বদেশই থাকতেন যদি সেখানে একটি বিশ্রামের জায়গা খুঁজে পান। কিন্তু, না। তাদের নিজের মাটিতেই তাদের উপর বর্বর শত্রুরা নৃশংসতা চালিয়েছে। আমরা আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি এই লক্ষাধিক লোককে ত্রাণ দিতে। আমরা তাদের বলেছি, আমরা তাদের শুধুমাত্র স্বল্প সময়ের জন্য রাখতে পারি। কোন দেশ অন্য কোন দেশ থেকে আসা এত মানুষের ভার বইতে সামর্থ নয়। আমাদের পক্ষেও সম্ভব না। আমরা বিশ্ববাসীকে এটা জানিয়েছি।

 

 

আপনারা জানেন যে আমরা যা বলি তা করি। কিন্তু কেউ কেউ মনে করেন যে, স্লোগান দিলেই যথেষ্ট। যারা সবসময় সত্যাগ্রহের বিপক্ষে ছিল তারাই বাংলাদেশ ইস্যুতে সত্যাগ্রহের সাথে যোগ দিয়েছেন। বর্তমানে সত্যাগ্রহের কোণ মানে নেই। সত্যাগ্রহের মূল্য ছিল স্বাধীনতা সংগ্রামের সময়। যখন সত্যাগ্রহ জানত না যে তাদের ৭ বছর বা ১০ বছর কারাগার যাপন করতে হবে। সেটি ছিল সত্যাগ্রহের দিন। কিন্তু এখন উপহাস করা হচ্ছে। সত্যাগ্রহের লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দান। আমরা কখনোই বলিনি যে আমরা বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেবনা। সরকার সাবধানে সব দিক বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেবে। এবং তখন সেটি আমাদের জনগণ দ্বারা সমর্থিত হবে। কিন্তু আমাদের ভাবতে হবে এটা আমাদের ও বাংলাদেশের উপর কোন প্রভাব ফেলবে কিনা।

 

আপনাদেরকে সত্যি বলছি, সরকার তার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করবে। সরকার সব সময় এমন পদক্ষেপ গ্রহণ করবে যা আমাদের জনগণের এবং বাংলাদেশর জন্য মঙ্গলজনক হবে।

 

আপত্তি আসতে পারে কেন আমি অন্য দেশের মানুষের কথা উল্লেখ করছি? কিন্তু সচেতন ভাবে খেয়াল করলে দেখবেন কিভাবে সেখানকার ঘটনা আমাদের ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করছে এবং ভবিষ্যতেও করবে।

 

এমনকি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় এবং বিশ্বের সবচেয়ে ধনী দেশ আজ উদ্বাস্তুদের এই বিশাল অন্তঃপ্রবাহ বরণ করে নিবে না এবং তাদের সাহায্য দিতে প্রস্তুত হতে পারবেনা। আমরা বিশ্বের দরিদ্রতম দেশগুলির মধ্যে অন্যতম। আমাদের পক্ষে এই বোঝা গ্রহণ করা খুব অস্বস্তিকর। একমাত্র পথ ছিল যে বর্ডারে ঢুকতে চাওয়ার সময় গুলি করার ভয় দেখানো। এছাড়া এত বিপুল সংখ্যক লোকের অন্তঃপ্রবাহ বন্ধ করার কোণ পথ ছিলোনা। এই সমস্যার আরেকটি দিক রয়েছে। আমরা জানি যে এই লোকগুলোকে ঢুকতে দেয়া না হলে তাদের দেশে তাদের হত্যা করে ফেলা হবে- এটা জেনেও কি আমরা না ঢুকতে দিতে পারি? আমরা নিশ্চই তাদের সাথে এমনটা করতে পারিনা। আমাদের ঐতিহ্য হল ভারত সবসময় আর্তপীড়িতদের পাশে থেকেছে তাতে আমাদের যত সমস্যাই হোক। আমরা যতোটুকু সম্ভব তাদের সাহায্য করছি এমনকি আমাদের জনগণও এইসব লোকদের জীবন বাঁচানোর জন্য ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত আছে। কিন্তু এই মুহূর্তে আমরা তাদের জন্য যথেষ্ট করতে পারছিনা।

 

আমরা অবশ্যই বাইরে থেকে সাহায্য চাই এবং আমরা কিছু পাচ্ছি। কিন্তু আমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বুঝতে হবে যার উপর আমি জোর দিচ্ছি এবং আমাদের জনগণকে বলছি। আমাদের নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে এবং অন্যদের উপর নয়। যত কষ্টই হোক আমরা নিজেরা এই ব্যয় বহন করব এমনকি যদি কেউই আমাদের সাহায্য করতে না আসে। প্রশ্ন হল আমাদের বন্ধু আছে কিনা বা আমাদের সাহায্য করার মত কেউ আছে কিনা। আমাদের সাহায্য করার জন্য যদি কেউ আসে তাহলে আমরা কৃতজ্ঞ হব। কিন্তু আমরা অন্যদের উপর নির্ভর করতে পারি না।

 

আমি আমাদের বোঝা ঠিক কত বড় হবে সেই ব্যাপারে আমরা সজাগ আছি। আগেই বলেছি, এমনকি সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে ধনী দেশ এই ভারী বোঝায় বিচলিত হবে। আমরা ঠাট্টার স্বীকার হব কিন্তু আমরা মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছি কারণ আমরা জানি য়ে আমরা আমাদের ঐতিহ্য, আত্মসম্মান এবং ভাল প্রতিবেশীর প্রতি আদর্শ আচরণ করছি।

 

সামনের পথ অনেক কঠিন এবং সমস্যাপূর্ন। এটা অনেক বছর ধরেই এমন ভাবে চলছে। এবং এটি আরও বাড়তে পারে। কিন্তু আমি জানি, বড় অসুবিধায় আমাদের সাহস ও শক্তিও বড় হতে হবে। আমরা বিশ্বকে দেখাতে পারবে যে, দারিদ্র্য, অর্থনৈতিক পশ্চাদপদতা এবং নিরক্ষরতা থাকা সত্ত্বেও আমাদের শক্তি আছে। অনেকে আমাদেরকে হুমকি দিয়েছে, অনেকে তাদের তরবারি উঁচিয়ে আছে। কিন্তু সেটা আমাদের পথ নয়। আমরা আমাদের করুন অবস্থা দেখিয়ে এইসব লোকদের গৌরবান্বিত বোধ করাতে চাইনা। আমরা জানি, যারা এই ধরনের হুমকি দিতে পারে তাদের বাস্তবে কোণ শক্তি নেই। তারা নিজেদের রক্ষা করার জন্য অজুহাত খুঁজে পেতে চেষ্টা করে। এই অবস্থা ভিন্ন কিছু জাতি ও আমাদের নিজেদের দেশের কিছু মানুষের সাথেও হয়েছে। বাংলাদেশের মানুষের ভয়ানক দুঃখভোগ চলছে। যদিও এই দেশে বাংলাদেশ ইস্যুতে অনেকে রাজনৈতিক ফায়দা করতে চেষ্টা করছেন। বিরোধী দলের নেতা বলেছেন, আমি যদি আজ বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিতে প্রয়োজন না মনে করি তার মানে এই না যে এই ইস্যুতে মতের ঐক্য ছিল না। আমি বলছিনা যে সেখানে দ্বিমত হতে পারে না। আমি শুধুমাত্র বলতে চাই এই মুহুর্তে সরকারকে কঠোর ও বাস্তব সম্মত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এখন ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে বিতর্ক করে সরকারকে দুর্বল করে দেয়া ঠিক হবেনা। তাতে বিশ্ব শুধু অবাক হবে। আমাদের মিটিং এর অন্যতম উদ্যেশ্য ছিল এটা দেখানো যে ছোট ছোট রাজনৈতিক ইস্যু এই মুহুর্তে ভারতের কাছে কোন বিষয় না। ভারত ঐক্যবদ্ধ আছে এবং আমরা শক্তিশালী। আমাদের সরকার ও মানুষ কষ্ট করার জন্য প্রস্তুত আছে এবং আমাদের তার জন্য কঠিন ব্যাকিং আছে। তারা জানে যে তারা যদি সাহসের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে তার প্রভাব শুধুমাত্র আমাদের প্রতিবেশীদের রাষ্ট্রই নয় বরং সমগ্র বিশ্বে ছাপিয়ে যাবে। আমাদের শক্তি প্রয়োগ করে আমরা বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে সাহস ও অনুপ্রাণিত করতে পারব। সবচেয়ে বড় ব্যাপার হল আমরা তাদের বুঝাতে পারি যে আমরা কোন পরিস্থিতিতেই দুর্বল না। এবং কোনো চাপ বা হুমকি আমাদের মনোভাব পরিবর্তন করতে বাধ্য করতে পারবেনা। আমাদের লক্ষ্য বাংলাদেশের মানুষকে সাহায্য করা। পাশাপশি আমরা আমাদের নিজেদের জনগণকেও সাহায্য করব। আমাদের সারা দেশকে শক্তিশালী করতে হবে এবং এরপর আমরা আমাদের কার্যপ্রণালী অনুযায়ী এগিয়ে যেতে থাকব।

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
৩৪। শেখ মুজিবের বিচারের ব্যাপারে পাকিস্তানের ওপর প্রভাব খাটানোর আবেদন জানিয়ে রাষ্ট্রপ্রধানদের কাছে প্রেরিত প্রধানমন্ত্রীর বার্তা ভারত সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ১০ আগস্ট, ১৯৭১

 

Razibul Bari Palash

<১২, ৩৪, ৬৯>

অনুবাদ

 

রাষ্ট্রপ্রধানদের কাছে প্রেরিত প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর বার্তা

১০ অগাস্ট, ১৯৭১

 

 

প্রধানমন্ত্রী, মিসেস ইন্দিরা গান্ধী, ১০ আগস্ট, ১৯৭১ সালে সরকার প্রধানদের কাছে নিম্নলিখিত বার্তা প্রেরণ করেন –

 

সরকার ও ভারত সেইসাথে আমাদের প্রেস ও সংসদ ব্যাপকভাবে বিচলিত কারণ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান বিবৃতি দেন যে, তারা কোন বিদেশী আইনি সহায়তা ছাড়া শেখ মুজিবুর রহমানের গোপন সামরিক বিচার শুরু করতে যাচ্ছে। আমরা বলতে চাই যে এই তথাকথিত বিচার শুধুমাত্র শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করার উদ্যেশ্যে ব্যবহার করা হবে। পূর্ব বাংলার পরিস্থিতি তীব্রতর করা হবে এবং এ কারণে আমাদের জনগণের শক্তিশালী অনুভূতি এবং সব রাজনৈতিক দলের মধ্যে একটি মারাত্মক পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে। এটি আমাদের জন্য একটি গভীর উদ্বেগের বিষয়। আমরা আপনাদের কাছে আবেদন করছি একটি বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এ অঞ্চলের শান্তি ও স্থিতিশীলতার বৃহত্তর স্বার্থে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে আপনাদের প্রভাব অনুযায়ী ব্যাবস্থা নিবেন।

 

 

 

 

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
৩৫। শেখ মুজিবের বিচার হবে – ঘোষণায় উদ্বেক প্রকাশ করে জাতিসঙ্ঘের মহাসচিবের প্রতি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বার্তা ভারত সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ১০ আগস্ট, ১৯৭১

 

Razibul Bari Palash

<১২, ৩৫, ৭০>

অনুবাদ

 

জাতিসঙ্ঘের মহাসচিবের প্রতি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বার্তা

আগস্ট ১০, ১৯৭১

 

পররাষ্ট্রমন্ত্রী জনাব শরণ সিং, জাতিসংঘ মহাসচিব, উ থান্টকে, নিম্নলিখিত বার্তা পাঠিয়েছেন ১০ আগস্ট, ১৯৭১:

 

আমরা মর্মাহত এবং ক্ষোভ প্রকাশ করছি এই জন্যে যে রাওয়ালপিন্ডি ঘোষণা দিয়েছে আগামীকাল থেকে তারা শেখ মুজিবুর রহমানের বিচার আরম্ভ করতে যাচ্ছে। এই ঘোষণায় বিভিন্ন শ্রেণীগত বিবৃতি দিয়ে বলা হয়েছে যে সম্প্রতি তিনি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন এবং রাষ্ট্রদ্রোহমূলক কাজকর্মে লিপ্ত থাকার জন্যে শেখ মুজিবকে দোষী করা হচ্ছে। শেখ মুজিবুর রহমান তার জনগণের কাছে একজন অসামান্য নেতা, অনেক প্রিয় এবং অনেক সম্মানিত। ১৯৭০ সালের ডিসেম্বর মাসের নির্বাচনে তাঁর যে বিজয় হয়েছে সম্ভবত এত অতুলনীয় নির্বাচন বিশ্বের কোথাও কোনো অনুরূপ নির্বাচনে দেখা যায়নি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আমাদের জনগণ, প্রেস সংসদ এবং সরকার লক্ষ্য করেছে যে পূর্ববঙ্গে পাকিস্তান সরকারের সৃষ্ট পরিস্থিতির জন্য আমাদের উপর তার প্রভাব পড়া শুরু হয়েছে। যদি পাকিস্তান সরকার শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনের উপর কোন ধরণের চরম সিদ্ধান্ত নেয় তাহলে আমাদের উপর তার প্রভাব আরও দশ গুন বৃদ্ধি পাবে। তাই আমরা আপনাদের কাছে এই ব্যাপারে দ্রুত পদক্ষেপ নেবার জন্য অনুরোধ করছি যাতে পাকিস্তান সরকার এমন কোন হটকারি সিদ্ধান্ত না নেয় যা তাদের সমস্যা আরও বাড়িয়ে দেবে এবং তাদের সাথে আমাদেরও। মুজিবের ব্যাপারে এই মুহুর্তে গৃহীত যেকোন অন্যায় পদক্ষেপ এর পরিণতি হবে খুব ভয়ানক ও বিপজ্জনক।

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
৩৬। ইন্দোনেশিয়ায় পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফর শেষে প্রকাশিত ভারত ইন্দোনেশিয়া যুক্ত ইশতেহার ভারত সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ১৫ আগস্ট, ১৯৭১

 

Razibul Bari Palash

<১২, ৩৬, ৭১৭৪>

অনুবাদ

 

ইন্দোনেশিয়ায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী সরদার শরণ সিং এর সফর শেষে প্রকাশিত ভারত ইন্দোনেশিয়া যুক্ত ইশতেহার, আগস্ট ১৫, ১৯৭১

 

ইন্দোনেশিয়া প্রজাতন্ত্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রী মান্যবর আদম মালিকের আমন্ত্রণে মান্যবর সরদার শরণ সিং, ভারত প্রজাতন্ত্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রী, ১২ থেকে ১৫ ই আগষ্ট, ১৯৭১ ইন্দোনেশিয়া সফর করেন। সাথে সঙ্গী ছিল মেনন, ভারত সরকারের সেক্রেটারি, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, জনাব আর ডি সাথী, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম-সচিব এবং জনাব ই গনসালভেস, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া বিভাগের যুগ্ম সচিব।

 

সফরকালে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মহামান্য রাষ্ট্রপতি মোঃ সুহার্তো সাদরে তাদের গ্রহণ করেন। আলোচনার সময় তার সঙ্গে মহামান্য জেনারেল উ এইচ নসুশন, প্রোভিশনাল পিপলস কনসালটেটিভ পরিষদের চেয়ারম্যান, মান্যবর আদম মালিক, পররাষ্ট্র মন্ত্রী ও মান্যবর ডঃ শরীফ তৈয়ব, জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ছিলেন। এই আলোচনায় ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তার প্রতিনিধিদলের সদস্যদের এবং মান্যবর এনবি এর সহায়তা নেন।

 

ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে জনাব আর বি আই এন ডিজাজডিনিগ্রাত, পররাষ্ট্র বিভাগের রাজনৈতিক বিষয়ক মহা-পরিচালক, জনাব ইসমাইল তাজিব, পররাষ্ট্র দপ্তরের এক্সটার্নাল অর্থনৈতিক বিষয়ক মহাপরিচালক, জনাব হার তাসিং, পররাষ্ট্র দপ্তরের নিরাপত্তা ও কমিউনিকেশন বিভাগের ডিরেক্টর জেনারেল, জনাব এবি লুবিস, পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের পরিচালক, এবং জনাব নুরমাথিয়াস, পররাষ্ট্র বিভাগের এশীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় বিষয়ক পরিচালক মহোদয় গ্রহণ করেন।

 

দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের মধ্যে আন্তরিকতা ও সমঝোতার পরিবেশে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয় এবং সাধারণ স্বার্থ এবং আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি সহ বিভিন্ন সাম্প্রতিক উন্নয়ন সম্পর্কিত বিষয় তাদের আলোচনায় উঠে আসে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, ভারত মহাসাগর, নিরপেক্ষ জাতিদের মধ্যে সহযোগিতা, শান্তির সাম্প্রতিক চুক্তি, বন্ধুত্ব ও কো-অপারেশন, সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়।

 

নিজস্ব অঞ্চলের সমস্যা নিয়ে আলোচনা, উভয় পক্ষের জোটনিরপেক্ষ নীতি, তাদের বিশ্বাস, সর্বজনীন শান্তি ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিরাপত্তা রক্ষণাবেক্ষণ ইত্যাদি অনেক বিষয় গুরুত্বের সাথে আলোচনায় আসে। বিশেষ করে এশিয়ায় বিরাজমান বর্তমান অবস্থা আলোচনা করে প্রতিটি দেশের মানুষ বাইরের হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত হয়ে তাদের ভাগ্য নির্ধারণ করা উচিত বলে একমত প্রকাশ করা হয়। সম্মেলনের ঘোষণাপত্রে এই অঞ্চলের সার্বভৌমত্ব এবং সব প্রান্তিককৃত দেশগুলির স্বাধীনতা সংহত করার প্রয়োজন স্বীকার করা হয়। তারা এশিয়ায় সাম্প্রতিক উন্নয়নের জন্য এবং শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য একটি পরিবেশ তৈরি করার প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করেন। এবং এর ফলে তাদের বন্ধন শক্তিশালী হবে হবে আশা প্রকাশ করেন। এছাড়া অন্য দেশগুলোও লুসাকা সম্মেলনে তাদের এইসব পলিসি নিয়ে এগিয়ে যাবে বলে আশা প্রকাশ করা হয় যে।

 

দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রী পূর্ব পাকিস্তান থেকে ভারতে উদ্বাস্তু প্রবেশ ও এর জন্য উদ্ভূত সমস্যা নিয়ে আলোচনা করেন এবং উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তারা এদের ফিরে যাবার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টির জন্য কাজ করার প্রয়োজনের উপর একমত হন।

 

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ ঘটনায় তার উদ্বেগ জানান এবং বলেন যে ইন্দোনেশিয়া সরকারের কোন প্রচেষ্টা আবশ্যক হলে তারা সেটা করবেন যা হবে শান্তিপূর্ণ ও স্থিতিশীল অবস্থা অর্জনের লক্ষ্যে।

 

তারা ইতিমধ্যে পূর্ববর্তী সভায় এ অভিমত ব্যক্ত করেন যে ইন্দো-চীন সমস্যা একটি শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা যেতে পারে।

 

দুই দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও উন্নত ও বিস্তৃত করার ব্যাপারে তারা চুক্তিবদ্ধ হন।

 

দুই মন্ত্রীদের ১৯৫৫ সালের সাংস্কৃতিক এবং শিক্ষাগত চুক্তির কাঠামো অনুযায়ী তারা গত দুই বছর সময় সম্পর্কের অগ্রগতি নিয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন। তারা দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা পর্যালোচনা করেন এবং পারস্পরিক লাভজনক পরিধি বিস্তৃত করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে সম্মত হন – বিশেষ করে শিক্ষা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে।

 

দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের দু’দেশের নেতৃবৃন্দের মধ্যে ক্রমবর্ধমান দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও গভীর ও শক্তিশালী করার কথা ব্যাক্ত করেন। এ প্রসঙ্গে তারা দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সহযোগিতার কথা পর্যালোচনা করেন। দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রী অর্থনৈতিক ও কারিগরি সহযোগিতার ক্ষেত্র চিহ্নিত করণ, বাণিজ্য ও যৌথ শিল্প উদ্যোগ উন্নয়নের প্রচারের জন্য একসাথে কাজ করার প্রত্যয় ব্যাক্ত করেন।

 

দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রী আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সহযোগিতার লক্ষ্য অর্জনের জন্য বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ জোরদার করার প্রয়োজনীয়তা পুনরায় আলোচনায় আনেন। এ প্রসঙ্গে তারা এশীয় মন্ত্রী কাউন্সিল ECAFE এর উদ্যোগের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞ্যাপন করেন।

 

পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা আন্তর্জাতিক ফোরামে অর্থনৈতিক ও সামাজিক কর্মকান্ডের সকল ক্ষেত্রে সহযোগিতা জোরদার করার জন্য নীতিগত সিদ্ধান্ত নেন এবং বাণিজ্য ও উন্নয়নের জন্য প্রথম ও দ্বিতীয় ইউনাইটেড ন্যাশনস কনফারেন্স এর আলজিয়ার্স সনদের বিধানাবলীর ভিত্তিতে প্রয়োজনীয়ভাবে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেন।

 

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইন্দোনেশিয়া সফরের সময় তাকে ও তার দলকে উষ্ণ স্বাগত ও আন্তরিক আতিথেয়তার জন্য ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি ইন্দোনেশিয়া পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে ভারত সফরের আমন্ত্রণ করেন।

 

 

 

 

 

 

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
৩৭। বিশ্ব শান্তি পরিষদের মহাসচিবের সাথে প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাতকার ভারত সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ৩০ অগাস্ট, ১৯৭১

 

Razibul Bari Palash

<১২, ৩৭, ৭৪৭৬>

অনুবাদ

 

বিশ্ব শান্তি পরিষদের মহাসচিবের সাথে প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাতকার

আগস্ট ৩০, ১৯৭১

 

প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে বিশ্ব শান্তি পরিষদ মহাসচিব রমেশ চন্দ্রের সাক্ষাতকারঃ

 

প্রশ্নঃ ম্যাডাম, ইন্দো-সোভিয়েত চুক্তি ভারতের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের দ্বারা প্রশংসিত হয়েছে। এর কারণ কি হতে পারে?

উত্তরঃ ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে বন্ধুত্ব অনেক বছর ধরে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে, আমরা উভয়ে শান্তির জন্য কাজ করেছি এবং বর্ণবাদ এবং উপনিবেশবাদের বিরোধিতা করেছি। সোভিয়েত ইউনিয়নের ভারী শিল্পের মাধ্যমে আত্মনির্ভরশীলতা অর্জনের জন্য আমাদের প্রোগ্রাম সাহায্য করেছে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক অভাবনীয় দ্রুততার সাথে পরিবর্তন, প্রসারণ ও একটি নতুন যুগে প্রবেশ করেছে। পুরনো ক্ষুদ্রতা কাটিয়ে নতুন নতুন চুক্তিতে আবদ্ধ হচ্ছে নানা দেশ। এটি একটি সাধারণ প্রবণতা। কিন্তু কিছু সুবিধাবাদী দেশ এসব পরিবর্তনের সুবিধা গ্রহণ করে ফায়দা লুটার চেষ্টা করছে।

আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি, বর্তমান চুক্তিতে এই ধরনের হঠকারিরা নিরুৎসাহিত হবে। আমাদের জনগন সোভিয়েত ইউনিয়নকে বন্ধু হিসেবে দেখবে। এজন্যই চুক্তি আমাদের দেশে এই ধরনের ব্যাপক প্রশংসা লাভ করেছে।

প্রশ্নঃ এতে এই এলাকার শান্তির পরিস্থিতি – বিশেষ করে বাংলাদেশের জনগণের মুক্তি সংগ্রামে কোন প্রভাব হবে কি?

উত্তরঃ আপনার প্রশ্নের দ্বিতীয় অংশ দিয়ে শুরু করছি। বাংলাদেশের সংগ্রামের মূল ব্যাপার হচ্ছে এর একপাশে ৭৫ মিলিয়ন মানুষ এবং অন্য দিকে ইসলামাবাদের, প্রতিহিংসাপরায়ণ নিষ্ঠুর ও স্বৈরাচারী সামরিক শাসক – এই দুইয়ের মধ্যে সংঘাত। বাংলাদেশের মানুষ তাদের ন্যায্য দাবি আদায়ের জন্য লড়াইয়ে ঐক্যবদ্ধ। কিন্তু আমরা জানি যে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে পশ্চিম পাকিস্তানের জনগণের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। তাছাড়া বালুচিস্তান, এন.ডাব্লিউ.এফ.পি অথবা সিন্ধু ও পাঞ্জাব কে বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত প্রদেশের মত দেখা হচ্ছে।

আমাদের জনগণ, সংসদ ও সরকার এবং বাঙলা দেশের জনগণের প্রতি পূর্ণ সহানুভূতি ও সমর্থন দেখাচ্ছে। আমরা পশ্চিম পাকিস্তানের জনগণের সঙ্গে কোন ঝগড়া করছিনা। অর্থাৎ সমস্যাটি ইন্দো-পাকিস্তান সম্পর্কিত নয়।

ইসলামাবাদে সামরিক শাসকেরা নিজেদের লোকদের থেকে তাদের বিচ্ছিন্ন রেখেছে এবং তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে। পাকিস্তানের জনগণের দৃষ্টি অন্যদিকে সরিয়ে দিতে তারা এই সমস্যাকে একটি ইন্দো-পাকিস্তান সমস্যায় রুপ দিতে চেষ্টা করছে। বিশ্বের বাকি দেশের কাছেও এমনটি করার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। যুদ্ধের হুমকি থেকে বেপরোয়া পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। তাই আমরা কি করে এটাকে গুরুত্ব না দিয়ে থাকি? যাইহোক, আমরা মনে করি যে চুক্তি গৃহীত হয়েছে তাতে ইসলামাবাদ কোন হঠকারি সিদ্ধান্ত নিতে গেলে একটু হলেও চিন্তা করবে।

কিন্তু শান্তি মানে নিছক যুদ্ধ অনুপস্থিতি নয়। নিপীড়ন ও অবিচারের মুখে শান্তি বজায় থাকতে পারেনা। তাই জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণের উপর ভিত্তি করে শান্তি স্থাপনের ব্যাবস্থা করা উচিত।

 

প্রশ্নঃ আপনি ন্যায়ত বলেছেন যে চুক্তি করা মানেই জোটনিরপেক্ষ অবস্থান থেকে সরে যাওয়া নয়। কিন্তু এতে করে সমস্ত বিশ্বে জোটনিরপেক্ষ শক্তিগুলো এক হবার সুযোগ সৃষ্টি তরান্বিত হবে কি?

উত্তরঃ পাওয়ার ব্লকের অবস্থায় আমরা বিভিন্ন সরকারের বন্ধুত্ব চেয়েছি। শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের জন্য যুদ্ধ থেকে বিরত থাকা প্রয়োজন। এর জন্য মৌলিক নীতিমালা হয়েছে। একই সঙ্গে আমরা উপনিবেশবাদ এবং বর্ণবৈষম্যবাদের বিরোধিতা করেছি। এশিয়া ও আফ্রিকার অনেক জাতি অনুরূপ নীতি অবলম্বন করেছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন আমাদের নীতিকে সম্মান ও সমর্থন করেছে। চুক্তিটি নিজ প্রয়োজনেই অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল।

জোটনিরপেক্ষ শব্দটিকে অপব্যাখ্যা করা হয়েছে। এজন্য এ ধরনের সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছে। এই চুক্তি আমাদের নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে সরায়নি বলে আমরা মনে করি।

 

জোটনিরপেক্ষ দেশগুলোর জাতীয় স্বার্থ হচ্ছে সামরিক হঠকারিতার হুমকি থেকে দেশকে সুরক্ষিত করা। সিকিউরিটি এমনভাবে তৈরি করতে হবে যাতে করে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করা যায়। ইন্দো-সোভিয়েত চুক্তির ফলে সৃষ্ট বন্ধুত্ব, শান্তি ও সহযোগিতার মূল অর্জন এটি।

 

প্রশ্নঃ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও পশ্চিম এশিয়ায় শান্তি স্থাপনের জন্য আপনার অনুমান কি?

উত্তরঃ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার শান্তি নির্ভর করে ভিয়েতনাম, লাওস ও কম্বোডিয়ার সমস্যার সমাধান উপর। এই তিনটি এখন পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত। তবে, দক্ষিণ ভিয়েতনাম কিছুটা এগিয়েছে। এটি স্বীকৃত যে সামরিক সমাধান কোন সঠিক সমাধান না। সম্প্রতি দক্ষিণ ভিয়েতনামের অস্থায়ী বিপ্লবী সরকার নির্দিষ্ট প্রস্তাব দিয়েছে। এর মধ্যে আছে বিদেশী সৈন্য প্রত্যাহার, বিশেষভাবে আমেরিকান বাহিনী। আমার কোনো সন্দেহ নেই যে, এই প্রত্যাহার একটি নির্দিষ্ট নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে করা হবে। তারপর দক্ষিণ ভিয়েতনাম বাইরের সামরিক বা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ছাড়া তাদের ভবিষ্যতের কর্ম্পন্থা ঠিক করতে পারবে। আজ না হোক কাল, ভিয়েতনাম সমস্যা এই পদ্ধতিতেই সমাধান হবে।

বর্তমানে পশ্চিম এশিয়ায় একটু স্থিরতা আসছে। তবে সম্ভাব্য পরিস্থিতি বিপজ্জনক। সমাধান খুঁজে বের করতে যত বিলম্ব হবে পরিস্থিতি ততই আরো কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। জাতিসঙ্ঘের কাছে এর একটি সমাধান চাওয়া হয়েছে।

১৯৬৭ সালের নিরাপত্তা পরিষদে প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত একটি ধারাবাহিক প্রস্তাব দিয়েছেন। আমরা মনে করি সেগুলো বিবেচনায় আনা উচিৎ।

 

প্রশ্নঃ চুক্তিটি ছিল উপনিবেশবাদ, বর্ণবাদ এবং নিরস্ত্রীকরণ এর উপরে। তাহলে কিভাবে আপনি মনে করেন এটা অ্যান্টি-উপনিবেশবাদ ও বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলনের উপর অবদান রাখবে? এবং নিরস্ত্রীকরণ কে অগ্রগতির দিকে নিবে? ‘

উত্তরঃ চুক্তিতে উভয় সরকারের উপনিবেশবাদ এবং সব ধরনের বর্ণবৈষম্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালিয়ে যেতে ইচ্ছা পুনর্ব্যক্ত হয়েছে। একইভাবে, আমরা নিরস্ত্রীকরণের জন্য কাজ অব্যাহত রাখব। দু’দেশ শান্তি ও ন্যায়বিচারের জন্য সংকল্পবদ্ধ।

 

 

 

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
৩৮। নেপালে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফর শেষে প্রকাশিত ইন্দোনেপাল যুক্ত ইশতেহার ভারত সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ৫ সেপ্টেম্বর, ১৯৭১

 

Razibul Bari Palash

<১২, ৩৮, ৭৭৭৮>

অনুবাদ

 

নেপালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী সরদার শরণ শিং এর সফর শেষে প্রকাশিত ইন্দোনেপাল যুক্ত ইশতেহার, ৫ সেপ্টেম্বর, ১৯৭১

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সরদার শরণ সিং, ৩ থেকে ৫ সেপ্টেম্বর, ১৯৭১ নেপালে শুভেচ্ছা সফর করে গেলেন। নেপালের মহামান্য রাষ্ট্রপতির আমন্ত্রণে। শ্রী পি এন, মেনন, সচিব, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, শ্রী টমাস আব্রাহাম, যুগ্ম-সচিব, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও শ্রী এস ভেংকাটরমণ, আন্ডার সেক্রেটারি, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়. তার সাথে ছিলেন।

 

সফরকালে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মহামান্য নেপাল রাজার সাথে বৈঠক করেন। তিনি মাননীয় আর টি শ্রী কীর্তী নিধি বিস্তা, নেপাল সরকারের প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং এছাড়াও মাননীয় শ্রী গ্যানেন্দ্র বাহাদুর কারকি, শিক্ষা মন্ত্রী, ভূমি সংস্কার, খাদ্য, কৃষি ও বন মন্ত্রী এদের সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন।

 

কাঠমান্ডুতে ভারতের রাষ্ট্রদূত মান্যবর শ্রী এল পি সিং নয়া দিল্লির নেপালের রাষ্ট্রদূত মান্যবর সরদার ভীম বাহাদুর পান্ডে, শ্রী বি আর ভাণ্ডারী, নেপাল সরকারের পররাষ্ট্র সচিব, এবং শ্রী পি এন মেনন, ভারত সরকারের সচিব, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, এই বৈঠকে সহায়তা করেন।

 

প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী গভীর ভাবে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভারত ও নেপালের মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করেন। তারা তাদের পারস্পরিক সম্মান, এবং আগ্রহ, একে অপরের সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা ও অখণ্ডতা, এবং অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতি পুনর্ব্যক্ত করেন। তারা দু’দেশের বিভিন্ন বিষয়ে জনগণের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে গড়ার উপর জোর দেন এবং তাদের পারস্পরিক সুবিধার জন্য তাদের শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

 

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মহামান্য রাজার বিজ্ঞ পরিচালনায় নেপালের বহুতরফা অগ্রগতির প্রশংসা করেন।

 

মহামান্য নেপালের প্রধানমন্ত্রী নেপালে ভারত সরকার কর্তৃক প্রদত্ত সহায়তার জন্য মহামান্য সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং আশা প্রকাশ করেন যে এই সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী নেপালের প্রধানমন্ত্রীকে আশ্বাস দেন যে, ভারত সরকার দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার ক্ষেত্র বিস্তীর্ণ করবে এবং তাদের এই প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।

 

দুই মন্ত্রী ট্রেড অ্যান্ড ট্রানজিট এর সদ্য সমাপ্ত চুক্তি নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন এবং আশা প্রকাশ করেন যে এতে নেপালে দ্রুত শিল্পায়ন ও বাণিজ্য বহুমুখীকরণ নীতি বাস্তবায়ন হবে।

 

নেপালের প্রধানমন্ত্রী ও ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রী আন্তর্জাতিক ইস্যুতে সর্বজনীন শান্তি ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিরাপত্তা এবং বিশ্বের উত্তেজনা কমানোতে একত্রে কাজ করার ইচ্ছা ব্যাক্ত করেন। এর একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হিসেবে জোটনিরপেক্ষ নীতির প্রতি আনুগত্য পুনর্ব্যক্ত করেন।

 

নেপালের প্রধানমন্ত্রী পূর্ব পাকিস্তান থেকে লাখ লাখ শরণার্থী আসায় ভারতে সৃষ্ট সামাজিক ও অর্থনৈতিক কুপ্রভাব দৃষ্টিগোচর করেন। দুই মন্ত্রী তাদের উদ্বাস্তুদের তাদের বাড়িতে ফেরত পাঠানোর জন্য অবস্থার সৃষ্টির জন্য জরুরী প্রয়োজনের উপর একমত প্রকাশ করেন।

 

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে ও তার দলকে কাঠমন্ডুতে দেয়া আতিথেয়তা এবং সৌজন্যতার জন্য ধন্যবাদ জ্ঞ্যাপন করেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী, শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর পক্ষ থেকে নেপালের প্রধানমন্ত্রীকে সুবিধাজনক সময়ে ভারতে আসার আমন্ত্রণ জানান – যা সাদরে গৃহীত হয়।

 

 

 

 

 

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
৩৯। বাংলাদেশ প্রশ্নে নিরপেক্ষ দেশগুলির প্রতি ভূমিকা গ্রহণে আহবানঃ রাষ্ট্রসংঘে পররাষ্ট্র সচিবের বিবৃতি দৈনিক আনন্দবাজার ১৮ সেপ্টেম্বর, ১৯৭১

 

Aparajita Neel

<১২, ৩৯, ৭৯৮০>

 

বাংলাদেশের ব্যাপারে নিরপেক্ষ দেশগুলিকে সোচ্চার হতে হবেঃ

রাষ্ট্রপুঞ্জে শ্রী টি এন কল

 

রাষ্ট্রপুঞ্জ, ১৭ সেপ্টেম্বর – ভারতের পররাষ্ট্র সচিব শ্রী টি এন কল রাষ্ট্রপুঞ্জে নিরপেক্ষ গোষ্ঠীকে সুস্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন যে, বাংলাদেশে শোচনীয় মানবিক বিপর্যয় সম্পর্কে যদি এই গোষ্ঠী সুস্পষ্ট মতামত জানাতে না পারেন তাহলে ঐ সব নিরপেক্ষ দেশের মন্ত্রী সম্মেলনে ভারত যোগদান করতে পারে নাও করতে পারে। আগামী সপ্তাহে নিরপেক্ষ রাস্ট্রগোষ্ঠীর মন্ত্রী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে।

 

গতকালের সভায় এক জোরালো বক্তৃতায় শ্রী কল বলেন, নিরপেক্ষ দেশগুলি যদি বাস্তব অবস্থাকে উপেক্ষা করে এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক সমাধানের জন্য প্রস্তাব দেবার সাহস দেখাতে না পারে তাহলে সারা বিশ্বের কাছে তারা নিন্দিত হবে ও নিরপেক্ষতার মৌল ধারনাই নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।

 

আজ রাত্রে নিরপেক্ষ দেশগুলির দ্বিতীয় অধিবেশন বসলে বাংলাদেশের ব্যাপারে ভারতের কঠোর মনোভাব জানাবার জন্য পররাষ্ট্র সচিব এই আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন।

 

নিরপেক্ষ গোষ্ঠীর প্রস্তাবিত যুক্ত ইশতেহারে বাংলাদের সমস্যার ‘রাজনৈতিক মীমাংসার’ কথা বাদ দেওয়া উচিৎ বলে মরক্কোর প্রতিনিধি প্রস্তাব করেন। তারপরই শ্রী কল বক্তৃতা প্রসঙ্গে ঐ কথা বলেন। অবশ্য মরক্কোর ঐ প্রতিনিধি বাংলাদেশ থেকে আগত শরনার্থিদের দেখাশোনা করার ব্যাপারে ভারত যে বিপুল দায় নিয়েছে তাঁর জন্য সহানুভূতি জানান।

 

নাইজেরিয়া মরক্কোর এই বক্তব্য সমর্থন করে।

 

আলজিরিয় প্রতিনিধি ভারতের প্রতি তাঁর দেশের সৌহার্দ প্রকাশ করেন এবং শরনার্থি সমস্যার কথা উল্লেখ করেন। এশিয়ার দুটি বিরাট দেশ পারস্পরিক সংঘর্ষে লিপ্ত হবে সেজন্য তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন এবং বলেন যে, এর মীমাংসার জন্য নিরপেক্ষ দেশগুলিকে এগিয়ে আসতে হবে।

 

রাষ্ট্রপুঞ্জে পাকিস্তানের স্থায়ী প্রতিনিধি শ্রী আগা শাহী এর আগে ভারত ছাড়া অন্যান্য সব নিরপেক্ষ দেশগুলির কাছে এক পত্রে বলেছেন যে, খসড়া ইশতেহারে বাংলাদেশ সমস্যার রাজনৈতিক সমাধানের কথা যেন না থাকে। কেননা, তাঁর মতে, এটা পাকিস্তানের আভ্যন্তরীণ ব্যাপার।

 

নিরপেক্ষ দেশগুলির আলোচনা চক্রে বাংলাদেশের বিষয়ে আলোচনার চেষ্টা হওয়ায় রাষ্ট্রপুঞ্জে পাকিস্তানের প্রাক্তন সহকারী প্রতিনিধি এবং বর্তমানে বাংলাদেশের প্রতিনিধি শ্রী এস এ করিম স্বাগত জানান। শ্রী করিম তাঁর পত্রে বলেছেন, পশ্চিম পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের জনগণ মুক্তিসংগ্রামে লিপ্ত হয়েছে। পর্তুগালের বিরুদ্ধে এঙ্গোলা ও মোজাম্বিকের জনগণের সংগ্রাম থেকে এ সংগ্রাম পৃথক নয়। পাকিস্তানের মত তারাও আঞ্চলিক সংহতীর নামে ঔপনিবেশিক শাসন বজায় রাখার চেষ্টা করছে।

 

শ্রী কলের সোজা ভাষায় বক্তৃতার পড় সভাপতি ও জাম্বিয়ার স্থায়ী প্রতিনিধি শ্রী ভারনন জনসন সোয়াঙ্গা যুক্ত ইশতেহারে বাংলাদেশ সংক্রান্ত অনুচ্ছেদে ঐক্যমত্য স্থাপনে তাঁর প্রভাব বিস্তার করেন।

 

বাংলাদেশ সমস্যা পাকিস্তানের আভ্যন্তরীণ ব্যাপার শ্রী কল এটা মানতে নারাজ। তিনি বলেন, এটা আভ্যন্তরীণ সমস্যা নয়, আন্তর্জাতিক সমস্যা। তিনি বলেন, সেক্রেটারি উ থান্ট গত ১৪ সেপ্টেম্বর তাঁর সাংবাদিক বৈঠকে বলেছিলেন যে, বাংলাদেশের মৌল সমস্যাই হল রাজনৈতিক।

 

শ্রী কল বলেন, নিরপেক্ষ গোষ্ঠীর একই নীতি ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলের জন্য ভিন্ন ভিন্নভাবে প্রয়োগ করা উচিৎ নয়। তিনি বলেন, ভারত দক্ষিণ আফ্রিকার জাতীয় মুক্তি আন্দোলন এবং প্যালেস্টেনিয়ান শরনার্থিদের নিজেদের দেশে প্রত্যাবর্তনের অধিকার সমর্থন করে এসেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সেই একই নীতি প্রযোজ্য হওয়া উচিৎ। অথচ এই বাংলাদেশের ঘটনা ইতিহাসে অভূতপূর্ব। ৯ মাসে ৯০ লক্ষ শরনার্থির আগমন ইতিহাসে কোন সময়ে ঘটেছে কিনা সন্দেহ।

 

বক্তৃতার উপসঙ্ঘারে শ্রী কল বলেন, ১০ ডিভিশন পাক সামরিক বাহিনী বাংলাদেশর সাড়ে সাত কোটি লোককে কখনোই চেপে রাখতে পারবেনা।

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
৪০। পাকিস্তানের যুদ্ধের হুমকির পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর বিবৃতি দৈনিক টাইমস অব ইন্ডিয়া ১৯ সেপ্টেম্বর, ১৯৭১

 

Razibul Bari Palash

<১২, ৪০, ৮১>

অনুবাদ

 

জে. রামের ভাষ্যইয়াহিয়াকে নতিস্বীকারে বাধ্য করা হবে

নয়াদিল্লি, ১৮ সেপ্টেম্বর:

 

 

প্রতিরক্ষা মন্ত্রী, জনাব জগজীবন রাম, আজ বাংলাদেশ সমস্যায় ভারতের ‘রাজনৈতিক সমাধান’ এর ব্যাপারে ধারণা দেন। তিনি বলেন সেখানকার নির্বাচিত প্রতিনিধিদের স্বীকার করে নেয়া হবে অন্যতম উপায়।

 

এই নির্বাচিত প্রতিনিধিরা বলেন সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দেয়া ছাড়া কোন কিছুইতেই তারা সন্তস্ট হবেন না। জনাব জগজীবন রাম আজ “ভারতের প্রতিরক্ষা প্রস্তুতির” উপর আলোচনা করতে গিয়ে এক সভায় একথা জানান।

 

মুক্তিবাহিনী বিপুল ভাবে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কৌশল এবং মনোবল ধ্বংস করছে। এবং পাশাপাশি আন্তর্জাতিকভাবে পাকিস্তানের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে একটি নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হচ্ছে। হতে পারে যে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান এই চাহিদা স্বীকার করতে বাধ্য হবেন।

 

প্রতিরক্ষা মন্ত্রী বলেন ভারতের বিপক্ষে ‘’যুদ্ধ” এর হুমকি যদি পুনরাবৃত্তি হয় এবং মুক্তিযোদ্ধারা বাংলাদেশের বিভিন্ন অংশ যেভাবে মুক্ত করছে তাতে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের ক্রমবর্ধমান শক্তির ব্যাপারে সচেতন হচ্ছেন বলে আমরা মনে করি।

 

তিনি বলেন এই হুমকি একজন “চরম পরিশ্রান্ত জেনারেল” উচ্চারণ করতে পারেন যিনি তার দেশের মানুষের কাছ থেকে এবং এমনকি সেনাবাহিনীর বিদ্রোহের মুখোমুখি হয়েছিলেন।

 

তিনি বলেন একমাত্র ‘নৈরাশ্যের রাজা’ই মনে করতে পারেন যে যুদ্ধে ভারত সেনাবাহিনী পরাস্ত হবে। অন্যদিকে “সেনাবাহিনী, নৌ ও বিমান বাহিনীতে আমার ছেলেরা আদেশের জন্য প্রস্তুত”, যোগ করেন তিনি।

 

প্রতিরক্ষা মন্ত্রী বলেন যদি হামলা চালায়. “আমি শুধু আমার সীমানা রক্ষা করা করবো না বরং তার সীমানার গভীরে তাকে প্রথিত করব। ’’

 

জনাব জগজীবন রাম বলেন ইন্দো- পাকিস্তান বিরোধের ক্ষেত্রে জাতিসংঘের বাহিনী হস্তক্ষেপ করবে না বলে তিনি মত পোষণ করেন। তিনি বলেন যারা উদ্বাস্তু- অন্তঃপ্রবাহের ব্যাপারে প্রশ্ন তুলেন তাদের প্রজ্ঞার গভীরতা তার কাছে প্রশ্নবিদ্ধ।

 

 

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
৪১। মস্কো বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধির ভাষণের সারাংশ ভারত সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ২৯ সেপ্টেম্বের, ১৯৭১

 

Razibul Bari Palash

<১২, ৪১, ৮২>

অনুবাদ

 

মস্কো বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধির ভাষণের সারাংশ

২৯ সেপ্টেম্বর, ১৯৭১

 

ভারতীয় জনগণের প্রচেষ্টা প্রায়ই নস্যাৎ হয়ে গেছে বিভিন্ন বহির্মুখী চাপে। এই বছরের শুরুর দিকে আমাদের সাধারণ নির্বাচনে ভারতের জনগণ আমাদের দেশ এগিয়ে নিয়ে যাবার ম্যান্ডেট দিয়েছে। আমরা অর্থনৈতিক অবস্থা উন্নয়নে জোর দিয়েছি। ঠিক এমনই এক সময়ে আমাদের সীমানা জুড়ে একটি নতুন ধরনের অনুপ্রবেশ শুরু হল। এরা কোন সশস্ত্র লোক নয়। পূর্ব পাকিস্তান থেকে আসা অসহায় সন্ত্রাস জর্জরিত নারী, পুরুষ ও শিশুদের একটি সুবিশাল অন্তঃপ্রবাহ হতে থাকল। এদের অনেকে আহত, অসুস্থ এবং সবাই ক্ষুধার্ত। গত ছয় মাসের মধ্যে ৯ মিলিয়ন মানুষ এসেছে এবং আসছে প্রতিনিয়ত। ইতিহাসের পাতায় এর চেয়ে বড় কোন মাইগ্রেশন আর কি হয়েছে?

 

যখন লাখ লাখ মানুষ অন্য দেশের সীমানায় পুশ করা হয়, সেই দেশের মানুষের স্বাভাবিক জীবন, ভবিষ্যতের পরিকল্পনা, নিরাপত্তা ও শান্তি হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়ে। আমরা সর্বশ্রেষ্ঠ সহনশীলতায় দেখাচ্ছি। কিন্তু দরকার হলে সঙ্কটের মূল কারণ দূর করার জন্য অবিলম্বে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সাথে নিয়ে গ্রহণযোগ্য একটি রাজনৈতিক সমাধান এর জন্য ব্যাবস্থা গ্রহণ করতে হবে। দুর্ভাগ্যবশত, এমন কোন চেষ্টা করা হচ্ছেনা। এটা বিশ্ববাসীর দায়িত্ব যে আর দেরী না করে নিরাপত্তা এবং মর্যাদার সাথে উদ্বাস্তুদের তাদের বাড়িতে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া সক্রিয় করতে সচেষ্ট হয়ে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টিতে সাহায্য করা —-

 

 

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
৪২। বাংলাদেশ প্রশ্নে পাকিস্তানের সাথে কোন আলোচনা হবেনা – জাতিসঙ্ঘে ভারতের স্থায়ী প্রতিনিধির ঘোষণা দৈনিক স্টেটসম্যান ৭ অক্টোবর, ১৯৭১

 

Razibul Bari Palash

<১২, ৪২, ৮৩>

অনুবাদ

 

 

বাংলাদেশ প্রশ্নে পাকিস্তানের সাথে কোন আলোচনা নয় জাতিসঙ্ঘে ভারতের স্থায়ী প্রতিনিধির ঘোষণা

 

ইউ.এন.এইচ.কিউ ৬ অক্টোবর – বাংলাদেশের সমস্যা শুধুমাত্র পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয় – এই কথায় ভারত সকল দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা দৃঢ় ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে।

– ভাষ্য পিটিআই।

 

জাতিসঙ্ঘে ভারতের স্থায়ী প্রতিনিধি, জনাব সমর সেন সাধারণ পরিষদে স্পষ্ট ভাবে গতকাল একটি সমুচিত জবাব দেন। তার আগে পাকিস্তানি প্রতিনিধিদলের নেতা জনাব মাহমুদ আলী তার বক্তব্যে এমন অভিযোগ করায় তার উত্তরে তিনি একথা বলেন।

 

জনাব সেন বলেন, ‘বাংলাদেশের সমস্যা পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে। ’ তিনি ঘোষণা করেন, ‘আমরা এর ভিতরে আসতে চাইনা। ’

 

“আমরা এটার ভেতরে ঢুকতে পারিনা এবং আমাদের আসা উচিত নয়। যারা মনে করে যে এক্ষেত্রে ভারতীয় সহযোগিতার প্রয়োজন তাদের উপলব্ধি করা উচিত যে, প্রতিবেশীর সঙ্গে সহযোগিতা সবসময় স্বাগত জানানো হয়। পাকিস্তান যে গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে, যেখানে মানবাধিকার বিলুপ্তির পথে, সেই কাজ করতে ভারত অংশীদারিত্ব করতে পারেনা। পাকিস্তান কাশ্মীর সম্পর্কে এবং সেখানকার নৃশংসতার ব্যাপারে কখনো কথা বলতে আসেনি।

 

ভারত পররাষ্ট্রমন্ত্রী জনাব শরণ সিং উপস্থিত ছিলেন, কিন্তু জনাব সেন ভারতের পক্ষ থেকে বিবৃতি দেন।

 

জনাব সেন জনাব আলী কর্তৃক প্রণীত অভিযোগ অস্বীকার ও ভিত্তিহীন বলে আখ্যা দেন। জনাব আলি প্রথমে একটি সংবাদ সম্মেলনে এবং পরে সাধারণ পরিষদে বলেন যে ভারত ২৯ সেপ্টেম্বর আগরতলায় সীমান্ত জুড়ে ১০০০ শেল নিক্ষেপ করেছে। নয়া দিল্লির একটি টেলিগ্রাম তিনি পাঠ করেন, যাতে বলা আছে শেলিং আসলে পশ্চিম পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনী ভারতীয় ভূখণ্ডের উপরে করেছে এবং গত কয়েক সপ্তাহ ধরে বিপুল মানুষ হত্যা করছে।

 

ভারত ৪০০ টি অভিযোগ করেছিল, টেলিগ্রামে উল্লেখিত।

 

জনাব সেন বলেন জনাব আলীর অভিযোগে প্রমাণিত হয় যে পাকিস্তান আগ্রাসী প্রয়াস চালাচ্ছে।

 

তার বক্তব্যে পাকিস্তানের প্রতিনিধি কাশ্মীরের সাথে বাংলাদেশের পরিস্থিতি সমার্থক বোঝাতে চেয়েছিলেন। তিনি অভিযোগ করে বলেন, প্রায় ১ মিলিয়ন উদ্বাস্তু ভারত থেকে কাশ্মীর পালিয়ে গেছে এবং তারা অভিযোগ করে যে ভারত তাদের ফিরিয়ে নেয়ার পরিবেশ তৈরি করছেনা।

 

 

 

 

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
৪৩। সিমলায় অনুষ্ঠিত সর্বভারত কংগ্রেস কমিটির অধিবেশনে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষণ ভারত সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ৮ অক্টোবর ১৯৭১

 

Razibul Bari Palash

<১২, ৪৩, ৮৪৯১>

অনুবাদ

 

সিমলা সর্বভারতীয় কংগ্রেস কমিটির অধিবেশনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী সরদার শরণ সিং এর ভাষণ, অক্টোবর , ১৯৭১

 

আমি, এ.আই.সি.সি সদস্যদের প্রতি অত্যন্ত কৃতজ্ঞ যারা সর্বসম্মতিক্রমে এবং সর্বান্তকরণে ইন্দো-ইউ.এস.এস.আর চুক্তি অনুমোদন করেছেন। এটি একটি রাজনৈতিক কাঠামো, তাই, পৃথক সাধারণ অনুমোদন এবং পূর্ণ এনডোর্সমেন্টের এর পাশাপাশি আমাদের জন্য পরিষ্কারভাবে এই নথির বিষয়বস্তু এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ধারনা সম্পর্কে স্পট হওয়া জরুরী। আমি এই চুক্তিটিকে চারটি গুরুত্বপূর্ণ দিক এবং উপাদানের সমন্বয়ে বিবেচনা করতে চাই। প্রথমত, এটা দুই দেশের মধ্যে চলমান চুক্তি উপনিবেশবাদ বর্জন এবং বর্ণবাদী শাসকদের অবদমনের জন্য কাজ করবে। এটি একটি খুব গুরুত্বপূর্ণ যৌথ ঘোষণাপত্র। একথা অনস্বীকার্য যে এখনো বিশ্বের বড় অংশ ঔপনিবেশিক আধিপত্য ও বর্ণবাদী শাসকদের অধীনে আছে। পর্তুগিজ ঔপনিবেশিক শাসন এখনও ঔপনিবেশিক আধিপত্য ও বর্ণবাদী শাসকদের অধীনে চলমান। বর্ণবাদী শাসকরা এখনও দক্ষিণ আফ্রিকার বিভিন্ন অংশ গিনি, নামিবিয়া এবং রোডেশিয়ায় তাদের প্রভাব চালাচ্ছে এবং জাতিসংঘের গৃহীত রেজল্যুশনে তা অন্তর্ভুক্ত। এটা সবসময় আমাদের অর্গানাইজেশনের লক্ষ্য ছিল যে উপনিবেশবাদ বর্জন করতে হবে এবং বর্ণবাদী শাসকদের হটানোর জন্য কংগ্রেস কাজ করছে। এই দৃষ্টিভঙ্গি শুধু আমরা ধারণ করিনা বরং স্বাধীনতার পর এটা আমাদের লক্ষ্যে পরিণত হয়েছে। কংগ্রেস সংগঠন সবসময় উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে একটি খুব শক্তিশালী কন্ঠ উত্থাপন করেছে এবং বাস্তবিকই জাতির পিতা মহাত্মা জি, দক্ষিণ আফ্রিকাতেই নিজেই তার প্রথম রাজনৈতিক কার্যকলাপ শুরু করেছিলেন। এটা পরিতাপের বিষয় এবং দুর্ভাগ্যের ব্যাপার যে দক্ষিণ আফ্রিকা এখনও বর্ণবাদী শাসনামলে নিমজ্জমান ও জাতিবিদ্বেষ অনুশীলন চলছেই। চুক্তিতে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও ভারতের মধ্যকার চুক্তিতে যে উপনিবেশবাদ ও বর্ণবাদের অবশিষ্টাংশ শেষ করার গুরুত্বপূর্ণ নিবন্ধ অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল যা মনে করিয়ে দেয়া হয়।

 

 

চুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল জোটনিরপেক্ষ নীতি যা ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে স্বীকৃতি পেয়েছে। এটা অবাক ব্যাপার যে কিছু মানুষ, প্রাথমিক পর্যায়ে এটাকে সমালোচনা করেছেন এই বলে যে এই চুক্তি ভারতের জোটনিরপেক্ষ নীতির সাথে সাঙ্ঘর্ষিক। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে এই মন্তব্য কোন জোটনিরপেক্ষ দেশ থেকে আসেনি। বরং এমন কেউ মন্তব্য করেছে যারা নিজেরাই জোট নিরপেক্ষ নয় এবং যেখানে সামরিক শাসন ব্যাবস্থা পরিচালিত। ভারতের সাথে সোভিয়েত ইউনিয়নের চুক্তি স্বাক্ষরে একে অপরের সাথে কো-অপারেশন ও ভালোবাসা বৃদ্ধি পাবে। অথচ এতে এমন কিছু দেশ কষ্ট পেয়েছে যারা সামরিক চুক্তি এবং প্রতিরক্ষা চুক্তির সদস্য। প্রকৃত পক্ষে এই চুক্তি প্রমাণ করে যে ভারতের কর্মকান্ডে সোভিয়েত ইউনিয়নের শ্রদ্ধা রয়েছে।

 

শুধু তাই নয়, আমি মনে করি, এটা প্রথমবারের মত একটি আনুষ্ঠানিক নথি যেখানে সোভিয়েত ইউনিয়ন শান্তির জন্য একটি প্রধান ফ্যাক্টর হিসেবে জোটনিরপেক্ষতাকে সমর্থন দেয়। এটি মূলত সারা বিশ্বে উত্তেজনা কমানোর জন্য ছিল। সুতরাং, শুধুমাত্র ভারতের নীতি সম্পূর্ণরূপে সংরক্ষণ করা হয়েছে তা নয় বরং আন্তর্জাতিক বিষয়াবলির প্রেক্ষাপটে জোটনিরপেক্ষ ধারণার বৈধতা চতুর্থ ধারায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

 

আমিও সর্বশেষে মস্কোতে আমাদের প্রধানমন্ত্রীর সফর শেষে যে চুক্তি করা হয় সেই ব্যাপারে হাউসের মনোযোগ আকর্ষন করছি। সেখানেও ভারতের জোটনিরপেক্ষ নীতির ধারণা বিশেষভাবে যৌথ ইশতেহারে উল্লেখ করা হয়েছিল।

 

চুক্তির তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিধান হল বৈজ্ঞানিক ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা। দুটি দেশ, প্রযুক্তি ক্ষেত্রে এবং পারস্পরিক সুবিধার জন্য বিভিন্ন ক্ষেত্রে সম্পর্কযুক্ত থাকে। ফলে এই চুক্তি অনুযায়ী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা পাওয়া যাবে। সর্বশেষ অত্যাধুনিক প্রযুক্তি অগ্রিম ভিত্তিতে, ইলেকট্রনিক্স ক্ষেত্রে অগ্রগতি ও অন্যান্য অত্যাধুনিক ক্ষেত্র যাতে সোভিয়েত ইউনিয়ন নিঃসন্দেহে অসাধারণ উন্নতি করেছে, ভারত এই চুক্তি অনুযায়ী সম্পূর্ণরূপে কোনো বিশেষ পরিস্থিতির জরুরী প্রয়োজনে উপকৃত হবে বলে আশা করা যায়। ভারতের সুবিধা হল যে আমরা আমাদের অর্থনীতিকে, শিল্পকে এগিয়ে নিতে পারি। ইউএসএসআর এর প্রযুক্তি যা আমাদের কাছে আসবে তা দিয়ে আমরা আমাদের বৈজ্ঞানিক জ্ঞান ও জ্ঞান বিস্তারের জন্য জন্য সম্পূর্ণ সুবিধা নিতে পারব।

 

চতুর্থ গুরুত্বপূর্ণ বিধান যা সম্পর্কে বেশ স্বাভাবিকভাবেই আলোচনা হবে কারণ এটি খুব জনপ্রিয় একটি চুক্তি। বিস্তৃতভাবে এটি নিরাপত্তা দৃষ্টিভঙ্গি উপর বর্ণনা করা যেতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ এই চুক্তিতে ৩ টি ক্লজ আছে যাতে দু’দেশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে যদি অন্য পক্ষ সামরিক সংঘাতে জড়িত হয় তাহলে সেও জড়িত হবে। এই চুক্তি প্রচলিত সামরিক চুক্তি বা পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির থেকে আলাদা। সেখানে অন্যান্য দেশ জড়িত হলে দেশ এক সশস্ত্র সংঘর্ষে জড়িয়ে যেতে পারে। এই চুক্তিতে এ ধরনের কোন বিধান নেই। সেখানে অবশ্য অনাক্রমণ হিসাবে বর্ণনা করা যেতে পারে। এ সম্পর্কে স্পষ্ট বিধান আছে। অর্থাৎ দুই দেশের কেউ যদি অন্য দেশের সাথে কোনো সশস্ত্র সংঘাতে লিপ্ত হয় তাহলে এদের কেউ ঐ দেশকে কোনো ধরনের কোনো সাহায্যের দেব না। তাহলে যদি আমরা কোন দেশের সাথে সংঘাতে লিপ্ত হই তাহলে পূর্বচুক্তি থাকার কারণে সেই দেশকে আমাদের সাথে চুক্তিবদ্ধ কোন দেশ কোন প্রকার সহায়তা দিতে পারবেনা।

 

একথা অনসীকার্য যে আমরা ধারাবাহিকভাবে আমাদের শক্তি বাড়ানোর চেষ্টা করব। আমি আশ্বস্ত করতে চাই যে এই চুক্তির ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিক সম্পূর্ণরূপে বিবেচনায় নিয়ে এই চুক্তি সুরক্ষিত হয়। এই চুক্তি অনুযায়ী সোভিয়েত ইউনিয়ন এখন পাকিস্তানকে কোনো ধরনের সামরিক সরবরাহ করতে পারবেনা। আবার, চৌহান জিভারি স্বচ্ছভাবে ব্যাখ্যা করেন যে, এই চুক্তি খুব গুরুত্বপূর্ণ যা আমাদের নিরাপত্তার জন্য অত্যাবশ্যক। কিন্তু চুক্তির কারণ যুদ্ধ এবং সংঘর্ষ নয়। কিন্তু যুদ্ধ এড়াতে এবং শান্তির বাহিনীকে অধিকতর শক্তিশালী করতে এটি দরকার। সংক্ষেপে, এই চুক্তির ফলে যখন দেশ যেকোন কারণে আক্রান্ত হয় বা একটি আক্রমণের হুমকির সম্মুখীন হয়, তখন দুই দেশ হুমকি এড়ানোর জন্য একে অপরের জন্য “কার্যকর পদক্ষেপ” গ্রহণ করবে। এর ফলে আক্রমণের হুমকির এড়ানো সহজ হবে। এটা খুবই মজার যে অনেকে আমাদের মনে করিয়ে দেন “কে এবং কোথায় তোমার বন্ধু? ’’ তারা আসলে আমাদের চুক্তির ছিদ্র খুঁজছেন। আমি মনে করিয়ে দিতে চাই এই চুক্তি হবার পরে বিরোধী দলের অবস্থান সম্পর্কে – যারা ঐতিহ্যগতভাবে কংগ্রেস এর বিরোধিতা করে। এমনকি তারাও এই চুক্তির পরে প্রথম প্রতিক্রিয়া হিসাবে, তেমন কিছু জোরালভাবে বলেননি। কারণ জানত যে, এই চুক্তি পক্ষে দেশের অনুভূতি এতটাই শক্তিশালী যে, তারা সম্পূর্ণভাবে এর পক্ষে ছিলেন। তারা চুক্তি সমর্থন করেছে তবে তাদের মূল অবস্থান পরিবর্তন করেনি এবং শুধু ফরম্যাট পরিবর্তন করেছে। তবে দেশ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রভাব লক্ষ্য করা গেছে – এতে কোন সন্দেহ নেই। যে কেউ স্বীকার করতে বাধ্য হবে যে এর ফলে আমাদের স্বাধীনতা ও জোটনিরপেক্ষতা সুরক্ষিত থাকবে এবং একই সময়ে এটা আমাদের পারস্পরিক সহযোগিতায় গঠনমূলক ভূমিকা রাখবে। নিরাপত্তা কোণ থেকে এই চুক্তি বিবেচনা করলে দেখা যায় এটি আমাদের সার্বভৌমত্ব ও দুই দেশের নিরাপত্তা রক্ষা করার জন্য দরকারি একটি পদক্ষেপ।

 

 

 

 

 

সাম্প্রতিক বাংলাদেশ?

 

বস্তুত আমি এই বিষয়ে আসছি। এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি সম্পর্কে কথা বলতে গেলে আমাকে আগে চুক্তি সম্পর্কে বলা উচিৎ ছিল। সেটা বলা শেষ করে আমি এখন রাষ্ট্রপতির অনুমতি নিয়ে আমার সম্প্রতি বিভিন্ন রাজধানীতে এবং জাতিসংঘে সাম্প্রতিক সফর সম্পর্কে কিছু বলতে চাই। আমি আন্তর্জাতিক বিশ্বকে বাংলাদেশ সম্পর্কে আমার মূল্যায়ন দেব। আপনারা সন্দেহাতীতভাবে অবগত আছেন যে, প্রাথমিক পর্যায়ে বাংলাদেশের প্রশ্নটি মূলত একটি অভ্যন্তরীণ প্রশ্ন এবং পাকিস্তানের আভ্যন্তরীণ ব্যাপার ছিল। কিন্তু সামরিক কর্তৃপক্ষের গণহত্যা, নিপীড়ন এবং নিরস্ত্র বেসামরিক নাগরিক ও বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক দলের বিরুদ্ধে শোষণ চলছিল। মানবাধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতা অবদমনের ফলে এমন নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টি হয় যে জোরপূর্বক প্রচুর দেশান্তর ঘটতে থাকে। পরিস্থিতি স্পষ্টত আন্তর্জাতিক উদ্বেগের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। আমার সহকর্মী ও অনেকে নিজে থেকে ভিজিট করে পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করেছেন – বিভিন্ন রাজধানীতে বিবৃতি, যৌথ বিবৃতি, কখনো কখনো সরকারি বিবৃতি দিয়েছেন। এই সমস্যা সমাধান এখন মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে অপরিহার্য। অতি সত্ত্বর উদ্বাস্তুদের ফিরে যাবার জন্য একটি নির্ভরযোগ্য পরিবেশ সৃষ্টি করা অবশ্যম্ভাবী।

 

এখন যদি আমরা সাবধানে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বিতর্ক পরীক্ষা করি তাহলে দেখা যায় যে চারটি বড় ক্ষমতাধর দেশে- যারা নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের ভেটো দেয়ার ক্ষমতা রাখে, তাদের মুখপাত্রদের, তাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বক্তব্যে বোঝা যায় তারা পরিস্থিতি বুঝতে পেরেছেন। এই পরিস্থিতির ফলে অসহায় মানুষ বাধ্য হয়ে দেশত্যাগ করছে ও ভারতীয় ভূখন্ডে জড়ো হচ্ছে যা ভারতের জন্য একটি বোঝা। এর ফলে এই এলাকায় অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি হচ্ছে। একটি গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক সমাধান পারে উদ্বাস্তুদের ফিরে যাবার অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করতে। জনগণের প্রতিনিধিদের কাছে গ্রহণযোগ্য একটি সমাধান বাংলাদেশের মানুষের কাছেও গ্রহণযোগ্য হবে এবং সন্দেহাতীতভাবে বাংলাদেশের মানুষ তাদের উপর নির্ভর করে এবং শেখ মুজিবুর রহমান এবং আওয়ামী লীগের ওপর তাদের নির্ভরতা আছে যেটি তারা অভূতপূর্ব নির্বাচনী বিজয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন যেখানে জাতীয় পরিষদে ১৬৯ টি আসনের মধ্যে ১৬৭ টি আসন পেয়ে দলটি জয়ী হয়েছে। এই ছিল পরিস্থিতি এবং নিরাপত্তা পরিষদ-এর চার স্থায়ী সদস্য সোভিয়েত ইউনিয়ন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স এবং সেইসাথে বৃটেন এগুলো বিস্তৃতভাবে গ্রহণ করে এবং নিরাপত্তা পরিষদে তাদের বিবৃতি তাদের প্রতিনিধিদের দ্বারা প্রণীত হয়েছে। বিভিন্ন দেশের, বিশেষ করে যেখানে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান কাজ করছে, এবং সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা প্রকাশ্যে এই পরিস্থিতিতে ভারতের পদক্ষেপের প্রশংসা করেছে।

 

সমগ্র বিশ্বে, আমরা শুধু ইতিবাচক বিষয়গুলো বলব, নেতিবাচক বিষয়গুলো নয়। এই সম্পর্কে সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। আমাদের ভুলে গেলে চলবেনা যে সার্বভৌম দেশ, যারা জাতিসংঘের সদস্য, তাদের একটি মোটামুটি বড় সংখ্যা আছে যাদের তাদের দেশে ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করে সামরিক শাসক – যার মধ্যে পাকিস্তানও আছে। ঔপনিবেশিক যুগ-পরবর্তী সময়ের জন্য এটি একটি দু: খজনক অভিজ্ঞতা। বিপুল সংখ্যক দেশ স্বাধীন হয়েছে। এদের মধ্যে কিছু সংখ্যক দেশে গণতন্ত্র চর্চা, গণতান্ত্রিক কাঠামোর, গণতান্ত্রিক মতাদর্শ, গণতান্ত্রিক সংবিধান এগুলো সৃষ্টি হয়। কিন্তু এটি নিষ্ঠুর বাস্তবতা যে কোথাও কোথাও গণতন্ত্র শিকড় গাঁড়তে অক্ষম ছিল। প্রেসিডেন্সিয়াল বা পার্লামেন্টারি যে ধরণের হোক না কেন তা টেকেনি। শোনা যায় যে ইয়াহিয়া খান নির্বাচন দিতে ব্যার্থ হয়েছিলেন। এমনকি তারা নির্বাচন করার কথা বলে এখন পিছুটান দিচ্ছেন। এখন অবস্থা এমন যে তিনি চাইলেও এর থেকে এড়িয়ে চলতে পারবেন না। এতকিছুর কারণে আমাদের গণতান্ত্রিক আদর্শ, আমাদের আনুগত্য, আমাদের প্রেম যখন বাধাগ্রস্ত হবে তখন স্বাভাবিকভাবেই আমরা তা মেনে নেবনা। কারণ আমাদের দেশে আমরা গণতন্ত্রের শিকড় প্রতিষ্ঠায় সফল হয়েছি। অন্য কিছু দেশ যাদের অভিজ্ঞতা আমাদের মত না তারা অনেকে আমাদের মত প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে না- কারণ আমাদের মত তারা বিষয়গুলো অনুধাবন করলে এইসব ইস্যুতে স্বাভাবিক ভাবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়াত।

 

জাতিসংঘে উপরোক্ত আলোচনার পরে আমি একটি ইতিবাচক এবং একটি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করতে চাই। ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি হল এইসকল ইস্যুতে ইতোমধ্যে যেসব দেশের প্রতিনিধিরা আমাদের সমর্থন দিয়েছেন তারা পাকিস্তানের সামরিক শাসকদের মনোভাব পরিবর্তন সম্পর্কে একই ধারনা পোষণ করেন এবং এর ফলে ভবিষ্যতে তাদের কাছ থেকে তাদের প্রভাবকে কাজে লাগানো যেতে পারে। এবং আমি বলতে চাই যে, পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু যারা পাকিস্তানের সাহায্যকারী তারা প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ও তার সামরিক জেনারেলদের পরিস্থিতি মোকাবেলা করার পদ্ধতি জেনে ও এই সামরিক পদ্ধতির ব্যর্থতা সম্পর্কে আন্দাজ করতে পেরেছে এবং তারাও মনে করে সামরিক পদ্ধতি পরিত্যক্ত করা উচিৎ। এবং তারা মনে করে রাজনৈতিক ভাবেই এর সমাধান করতে হবে। আমরা জানতে পেরেছি যে যারা পাকিস্তানের বন্ধু তারাও এখন পাকিস্তানকে বোঝানো শুরু করেছে যে সামরিক কর্মকান্ড বন্ধ করতে হবে এবং সমস্যা সমাধানের জন্য রাজনৈতিক পথ অবলম্বন করতে।

 

আমাদের নিজেদের দেশে কিছু সমালোচক আমাদের নীতির ছিদ্রানুসন্ধান করার চেষ্টা করেছে। আমরা যখন বলি যে সেখানে একটি রাজনৈতিক সমঝোতা হতে হবে, তখন তারা বলে কেন আমরা বাংলাদেশ সম্পর্কে আপোস করছি? আমি এই দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে কিছু বলতে চাই। আমাদের অবস্থান স্পষ্ট। আমরা বলি যে বাংলাদেশের জনগণ দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে যা গ্রহণযোগ্য তা আমাদের কাছেও গ্রহণযোগ্য হবে। এটা স্বাধীনতার ভিত্তিতে হবে নাকি বৃহত্তর একটি উপনিবেশ হবে সেটা নির্বাচিত প্রতিনিধিরা সিদ্ধান্ত নেবেন। একমাত্র এই পদক্ষেপের পরেই সেখানে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসতে পারে। যা শরণার্থীদের ফেরত যেতে সহজতর করবে।

আমি এই পর্যায়ে বলতে যে এটি সর্বজন গৃহীত হয়েছে এবং এটা সবাই উপলব্ধি করেছে যে ভারত শরণার্থীদের বাংলাদেশে পাঠানোর জন্য কাজ করে যাচ্ছে এবং তাড়া তাদের রেখে দিতে চায়না। ঐতিহাসিক কারণে এবং বিভিন্ন সমস্যা থাকা সত্ত্বেও মানবিক কারণে আমরা উদ্বাস্তুদের প্রতি সমবেদনা মনোভাব গ্রহণ করি। নিজেদেরকে লক্ষ লক্ষ শরণার্থীদের দেখাশোনার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। এখন স্বাধীনতার ২০ বছর পর একজন পাকিস্তানে অবস্থানরত মানুষ হয় একজন পাকিস্তানি নাগরিক, অথবা বাংলাদেশের নাগরিক অথবা একটি পশ্চিম পাকিস্তানের নাগরিক এবং যখন কোন বিদেশি নাগরিক ভারতে আসে আমরা তাকে দেখাশোনা করব এটাই স্বাভাবিক। ভৌগলিক কারণে আমাদেরকেই আগে এগিয়ে আসতে হবে। প্রাথমিক দায়িত্ব আমাদের উপর বর্তালেও আন্তর্জাতিক আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়েরও দায়িত্ব রয়েছে। আমরা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সাহায্য দিতে বলি তাতে আমাদের উপর সামান্য ভরও যদি কমে। আমাদের মনে রাখতে হবে যে, কোনো দেশ যারা আমাদের এই উদ্বাস্তুদের দেখাশোনা করার জন্য এইড দিতে পারে। মনে রাখতে হবে এটি পাকিস্তান বা বাংলাদেশের জনগণের জন্য সাহায্য। ভারতের কোন সহায়তা নয়। আমরা বলেছি যেকোন পরিমাণ সাহায্য সাদরে গৃহীত হবে যা আমাদের বোঝা লাঘব করবে। ৯ মিলিয়ন লোক সেখানে যে আর্থ-সামাজিক সমস্যা তৈরি করেছে তা পরিমাপ যোগ্য নয়। এটাকে ডলার, পাউন্ড, ডাচমার্ক বা ইয়েন দিয়ে মাপা যায়না। এতে বস্তুত আমাদের পুরো দেশ ভুক্তভোগী।

 

আমি বলতে চাই আমাদের এই গভীর সমস্যায় সমগ্র প্রশাসন ও কেন্দ্রীয় সরকার সাধ্যমত পদক্ষেপ নিয়েছে। উদ্বাস্তুদের দেখাশোনা যতটুকু সম্ভব চালিয়ে যাবার পাশাপাশি আমাদের উন্নয়নের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। ভারতের ৫৫ কোটি মানুষ যে ভোগান্তি আর ক্ষতির স্বীকার হচ্ছে তা কোন পরিসংখ্যান, হিসাব, অর্থমূল্য দিয়ে বিচার করা যায়না। উদ্বাস্তুদের জন্য আমরা অসংখ্য স্কুল বন্ধ করে দিয়েছি। অসংখ্য হাসপাতালে চিকিৎসকরা শুধু তাদের চিকতসা দেবার জন্য নিয়জিত আছেন। এমনকি মেডিকেলের ছাত্ররা তাদের পড়াশোনার ব্যাঘাত ঘটিয়ে সেখানে উদ্বাস্তুদের জন্য কাজ করছে। কত শত শিক্ষার্থি আর স্বেচ্ছাসেবক উদ্বাস্তুদের জন্য কাজ করে যাচ্ছে তার সীমা নেই। যদি এদের জন্য যত অর্থ দরকার তার সবটা পাওয়া যেত হয়ত ভারত নিশ্চিন্ত থাকতে পারত। এই একটি খুব বিপজ্জনক দিক যে সাধারণভাবে যদি আপনি অন্যান্য দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলেন, তারা আপনাকে বলবে এটি বেশ বড় বোঝা, তারা অনেকটা সহানুভূতিশীল হবে, আমরা জানি। কিন্তু এটা করা আমাদের উদ্যেশ্য না। হয়তো আমরা আমাদের এই বোঝা শেয়ার করার আবেদন জানাব কিন্তু আমাদের মূল দাবী বাংলাদেশের অবস্থার পরিবর্তনের জন্য পদক্ষেপ নেয়া যাতে বর্তমান পরিস্থিতি থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া যায় এবং এর ফলে উদ্বাস্তুরা তাদের দেশে ফিরে যেতে সচেষ্ট হবে। এটি সমাধানের একমাত্র পথ হচ্ছে বাংলাদেশে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মেনে নেয়া। পুরো দেশের জন্য এটি সবচেয়ে জরুরী এই মুহুর্তে। আমি মনে করি এর গুরুত্ব ইতোমধ্যে বিশ্বের অন্যান্য দেশের সরকারগুলো অনুধাবন করেছেন। আমরা বোঝাতে পেরেছি যে আমাদের ধৈর্যের সীমা আছে। এবং আমাদের অধ্যবসায় ও সংযম এর সময় পেরিয়ে গেলে আমাদের জন্য তা আরও বিপদ জনক হবে। এই অবস্থার উন্নতিকল্পে বিশ্বকে এখনই এগিয়ে আসতে হবে। আমাদের মৌলিক ঐক্য ও আমাদের জাতি ও আমাদের মানুষের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার মানসিকতাই এই মুহূর্তে আমাদের মূল শক্তি।

 

চীন গণপ্রজাতন্ত্রী সম্পর্কে, লক্ষ্য করে থাকবেন যে পিকিং থেকে কিসিঞ্জার তার দ্বিতীয় সফর শেষে দেখা গেল আমেরিকা তাদের নীতি পরিবর্তন করেছে। তাদের চেষ্টা ছিল চিনকে জাতিসংঘের বাইরে রাখা। যখন যুক্তরাষ্ট্র তাদের নীতি অবলম্বনকারী কিছু দেশেকে একীভূত করতে চাইছে ঠিক সেই মুহুর্তে তারা ওইসব দেশের ব্যাপারে তাদের কূটনীতি পরবর্তন করে ফেলেছে। তবে কূটনীতি হঠাত করে পাল্টে ফেলা যায়না। তাই তাদেরকে খুব রহস্যজনক পদ্ধতি অবলম্বন করতে হচ্ছে। হঠাৎ করে দেখা যাচ্ছে যে আমেরিকা চিনকে জাতীয় পরিষদের সদস্য করতে ব্যাস্ত হয়ে পড়েছে ও পদক্ষেপ নিচ্ছে – শুধু তাই নয় নিরাপত্তা পরিষদেও চিনকে প্রবেশ করানোর জন্য কাজ করছে যেখানে ভেটো ক্ষমতা পর্যন্ত রয়েছে। অন্যদিকে তাইওয়ানকেও তারা প্রতিনিধিত্ব করছে। ঐতিহাসিকভাবে আমেরিকা তার সমর্থকদের এতদিন বুঝিয়ে এসেছে যে তাইওয়ান সরকার শুধু ফরমোজা ও তাইওয়ানের নয় বরং এটি সমস্ত চিনের। কিন্তু হঠাত করে এখন তারা তাদের অবস্থান থেকে সরে এসেছেন। ভারত যতদূর জানে, চীনের সাথে আমাদের সম্পর্কে যত সমস্যা থাকুক না কেন, সেটি খুব স্পষ্ট এবং এই পরিবর্তিত অবস্থায় আমাদের মনোভাব একটি কমাও পরিবর্তন করার প্রয়োজন আমরা মনে করিনা। আমরা বিশ্বাস করি চিন এক এবং চীন একটি গণপ্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্র এবং একটি সরকার সেখানে বলবত আছে। এবং জাতিসংঘে তার ন্যায়সঙ্গত জায়গা তার পুনরুদ্ধার করা উচিত। তবে এই সেশনে তারা ফরমজাকে নিজেদের হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারবে কিনা সে ব্যাপারে আমি সন্দিহান। আমি মনে করি সে তার অবস্থান পুনঃপ্রতিষ্ঠার ব্যাপারে প্রচুর সমর্থন পাবে। আমরা বিশ্বাস করি অস্থিতিশীল বিশ্বের লাঘব কমাতে চীন তার সাধ্যমত দায়িত্ব পালন করবে এবং জাতিসঙ্ঘে তাদের অবস্থান তুলে ধরবেন। এর জন্য আন্তর্জাতিক বিশ্ব দীর্ঘদিন আগ্রহী – যার জন্য আমরাও অপেক্ষা করছি।

 

আমাদের ধারনা যে চীনকে এত সময় বাইরে রাখায় কিছু জটিলতা ও অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে। এটা স্বাভাবিক হতে কিছুটা সময় লাগবে – যদিও চীন জাতিসঙ্ঘের সাথে যুক্ত হয়। আন্তর্জাতিক কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের মুখোমুখি আমরা অবস্থান করছি।

 

আরও স্পষ্টভাবে বলতে গেলে, আমি কয়েক মিনিট ইউরোপের সর্বশেষ উন্নয়ন সম্পর্কে বলব। কোনো সন্দেহ নেই যে, ইউরোপে স্পষ্টভাবে উত্তেজনা কিছুটা প্রশমিত হয়েছে। এই প্রাথমিকভাবে সম্ভব হয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানির চ্যান্সেলর জনাব উইলি ব্রান্ডিট এঁর সাহসের কারণে। তার ইচ্ছাতেই সোভিয়েত নীতির পরিবর্তন করা হয়েছে এবং অবশ্যই সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে একটি খুব ভাল ফল পেয়েছে। এবং জার্মানি ও ইউএসএসআর এর মধ্যে মস্কো চুক্তি ইউরোপীয় উত্তেজনার শিথিলকরণে একটি নতুন দ্বার খুলেছে। উভয় পক্ষ মনে করেন এতে নতুন উন্নয়নশীল অবস্থা সৃষ্টি হবে। সর্বশেষ বার্লিনে চার ক্ষমতা চুক্তি, একটি আশা সৃষ্টি করেছে যে ইউরোপের উত্তেজনা শিথিলকরণ হচ্ছে। এতে করে শান্তি তরান্বিত হবে বলে আমরা মনে করছি। এর ফলে বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে বৈরিতার অবসান ও উত্তেজনার শিথিলকরণ হবে। একটি নতুন যুগের সূচনা হচ্ছে বলেই আমরা মনে করছি। সশস্ত্র সংঘাত থেকে মুক্ত হয়ে কিছু উন্নয়নশীল দেশ উন্নত দেশগুলোর কাছ থেকে সাহায্য নিয়ে তাদের অর্থনীতি বিকশিত করার জন্য সুযোগ পাবে।

 

এই হল আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি। ভিয়েতনাম ও মধ্যপ্রাচ্যের অবস্থা সম্পর্কে আমার কাছে নতুন কোন তথ্য নেই। পশ্চিম এশিয়া এবং পূর্ব এশিয়ায় এখনও যুদ্ধ পরিস্থিতি বিরাজ করছে – জানিনা এখান থেকে শান্তির পথে কবে আমাদের উত্তরণ হবে – যদিও আমরা তার জন্য প্রাণপণে চেষ্টা করে যাচ্ছি।

 

 

 

 

 

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
৪৪। পাকিস্তান যুদ্ধ বাধালে ভারতের সৈন্যরা দখল করা পাকিস্তানী এলাকা ছাড়বে না – প্রতিরক্ষা মন্ত্রী দৈনিক যুগান্তর ১৮ অক্টোবর ১৯৭১

 

Aparajita Neel

<১২, ৪৪, ৯২৯৩>

পাকিস্তান যুদ্ধ বাধালে ভারতের সৈন্যরা দখল করা পাক অঞ্চল ছাড়বেনা

  • জগজীবন

 

জলন্ধর, ১৭ অক্টোবর (পি টি আই ও ইউ এন আই) – প্রতিরক্ষা মন্ত্রী শ্রী জগজীবন রাম আজ পাকিস্তানকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন যে, ভারতের উপর যদি যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়া হয় তাহলে যা ঘটুক না কেন, ভারতীয় সৈন্যবাহিনী পাকিস্তানের যে অঞ্চল দখল করবে সেখান থেকে তারা সরে আসবে না। আমরা সেখান থেকে সৈন্যবাহিনী অপসারণ করব না।

 

শিয়ালকোট ও লাহোর থেকে জনসাধারণ অন্যত্র চলে যাচ্ছে এই মর্মে সংবাদপত্রে প্রকাশিত সংবাদের উল্লেখ করে প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেন, পাকিস্তানী সামরিক জান্তা আমাদের উপর যদি যুদ্ধ চাপিয়ে দেয় তাহলে আমাদের সেনাবাহিনী এগিয়ে গিয়ে এই সব শহর দখল করবে এবং পাকিস্তানের দখলীকৃত অঞ্চল থেকে এবার আমরা সরে আসবও না, তাতে যাই ঘটুক না কেন।

 

প্রতিরক্ষামন্ত্রী আরও বলেন যে, বাংলাদেশ প্রসঙ্গে অমীমাংসিত থাকা পর্যন্ত সীমান্ত থেকে ভারত তাঁর সেনাবাহিনী প্রত্যাহার করবে না।

 

এখান থেকে ২০ কিলোমিটার দুরে কর্পুর তলায় এক জনসভায় ভাষণ প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী এ ব্যাপারে যেকন আন্তর্জাতিক চাপ প্রতিরোধে ভারতের দৃঢ় সংকল্প ঘোষনা করেন।

 

শ্রী রাম বলেন যে, ভারতের আঞ্চলিক অখণ্ডতার বিরুদ্ধে পাকিস্তানের যে কোন দুরভিসন্ধির উপযুক্ত জবাব দেওয়ার জন্য বর্তমান প্রস্তুতি অব্যাহত থাকবে। তিনি বলেন, পাক প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের যুদ্ধ হুমকির পরিপ্রেক্ষিতে এই প্রস্তুতি প্রয়োজন। ইয়াহিয়া খান বলেছেন যে, বাংলাদেশ মুক্তিবাহিনী কোন অঞ্চল দখল করলে, পাকিস্তান ভারতের উপর তাঁর প্রতিশোধ গ্রহণ করবে।

শ্রী রাম বলেন, সময় যত অতিবাহিত হবে, মুক্তিবাহিনী ততই অগ্রগতি হবে এ বিষয়ে আমার কোন সন্দেহ নেই এবং অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন দেশে পরিণত হবে।

 

নাশকতামূলক কাজের জন্য ভারত পুর্ব বঙ্গে অনুপ্রবেশকারীদের পাঠিয়েছে বলে পাকিস্তান যে অভিযোগ করেছে তিনি তাঁকে ভিত্তিহীন ও খেলো বলে বর্ননা করেন।

 

শ্রীরাম বলেন যে, পাকিস্তান নিজের অপকর্মের জন্য ভারতকে দোষারোপ করতে যাচ্ছে। জনসভায় প্রতিরক্ষামন্ত্রীকে পাঞ্জাবের বীরত্ব ও সাহসিকতার প্রতীক একখানি তরবারি উপহার দেয়া হয়। শ্রী রাম উপহার গ্রহণ করে, পাকিস্তান যদি ভারত আক্রমণের সাহস করে থাকে তাহলে পাকিস্তানকে পরাভূত করার আশ্বাস দিয়ে বলেন যে, তিনি চিরদিন গান্ধীজীর আদর্শে বিশ্বাসী কিন্তু দেশের অখণ্ডতার সঙ্গে কোন প্রকার আপোষ হতে পারেনা।

 

তিনি বলেন, শরনার্থিরা একদিন তাদের নিজ গৃহে ফিরে যাবে, কিন্তু ইয়াহিয়া খানের পাকিস্তানে নয়, মুজিবের বাংলাদেশে।

 

শ্রী জগজিবন রাম বলেন যে, পাকিস্তানের প্রায় অর্ধাংশের বিলুপ্তি হয়েছে এবং ভারতের যুদ্ধ করতে নাও হতে পারে। ইয়াহিয়া খান এখন বুঝতে পারছেন যে, বাংলাদেশে মুক্তিবাহিনীর শক্তি বাড়ছে এবং বিশ্বের জনমত ক্রমশ পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যাচ্ছে। বাংলাদেশকে মুক্ত করার জন্য মুক্তিবাহিনী শুধু এক ঘা দেওয়া প্রয়োজন।

 

শ্রী রাম বলেন যে, সীমান্তের নিকটবর্তী গ্রামবাসীদের তিনি অন্যত্র সরে যেতে বলবেন না কারণ তিনি জানেন যে, তাদের মনোবল অটুট আছে এবং সাহসের সঙ্গেই তারা যে কোন বিপদের সম্মুখীন হতে পারবেন।

শ্রী বিদ্যাচরন শুক্লের ভাষণ

রায়পুর, ১৭ অক্টোবর (পি টি আই) – প্রতিরক্ষা উৎপাদন দফতরের মন্ত্রী শ্রী বিদ্যাচরন শুক্ল গত রাত্রে এখানে এক সাংবাদিক বৈঠকে বলেন যে, সীমান্ত এলাকায় পাকিস্তানী সৈন্য সমাবেশের সংবাদ সম্পর্কে ভারত সম্পূর্ন অবগত।

 

তিনি বলেন, পাক সৈন্য অথবা যে কোন শত্রপক্ষ আক্রমণের মোকাবিলার জন্য আমরা সম্পূর্ন প্রস্তুত এবং আমরা আমাদের শত্রুপক্ষকে আমাদের প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি জানিয়ে দিতে চাই।

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
৪৫। নিউইয়র্ক টাইমস এর প্রতিনিধি সিডনি এইচ শ্যানবার্গের সাথে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধির সাক্ষাতকার দৈনিক নিউইয়র্ক টাইমস ১৯ অক্টোবর ১৯৭১

 

Razibul Bari Palash

<১২, ৪৫, ৯৪৯৬>

অনুবাদ

 

সিডনি এইচ শ্যানবার্গের সাথে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধির সাক্ষাতকার

 

 

১৯ অক্টোবর, ১৯৭১ নিউ ইয়র্ক টাইমস, এর সংবাদদাতা সিডনি এইচ শ্যানবার্গ ও প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর একটি সাক্ষাত্কার প্রকাশিত করে।

 

প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ঘোষণা করেছেন যে, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সীমান্তে সামরিক পরিস্থিতি খুব খারাপ।

 

১ ঘন্টা দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমরা অবশ্যই যুদ্ধবিগ্রহ শুরু করতে চাইনা। কিন্তু আমরা আমাদের স্বার্থ রক্ষা করব এবং আমাদের নিরাপত্তা রক্ষা করব’।

 

“দুর্ভাগ্যবশত” তিনি আরো বলেন, “পাকিস্তান ঘৃণা এবং হতাশার রেকর্ড করেছে। সামরিক শাসক তার নিজের জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছে এবং জানিনা এর পরে তারা কি করবে। ”

 

প্রধানমন্ত্রীকে সচিবালয়ে তার কার্যালয়ে সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হয়। তাকে পূর্ব পাকিস্তানে বাংলা বিদ্রোহীদের ভারত সামরিক সহায়তা প্রদান করছে বলে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বিরক্ত হন।

 

কিন্তু তিনি সুনিশ্চিতভাবে অস্বীকার করেন নি যে ভারত তাদের সাহায্য করছেনা। তিনি বলেন, “সম্ভবত আপনি জানেন, তাদের নিজেদের অনেক সাহায্যকারী আছে, বেশিরভাগ, সব বিশ্বজুড়ে। এছাড়াও, অনেক পথ তাদের জন্য খোলা আছে।

 

সাক্ষাত্কারে মিসেস গান্ধী বলেন, তাদের অস্ত্র থাক বা না থাক তাদের সংগ্রাম কেউ বন্ধ করতে পারবেনা।

 

তিনি বিশেষত সপ্তাহে আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খানের দেয়া বক্তব্যকে উল্লেখ করেন, যে বক্তৃতায় তিনি ভারতকে “উন্মাদের মত যুদ্ধপ্রস্তুতি” নেবার দায়ে অভিযুক্ত করেন এবং এই হুমকি মোকাবেলায় তার দেশের ১২০ কোটি মুজাহিদ বা ইসলাম প্রচারকদের, যাদের “হৃদয় মহানবী (স) এর প্রতি ভালবাসায় পূর্ণ” আহবান জানান।

 

তিপ্পান্ন বছর বয়সী প্রধানমন্ত্রী দৃঢ়ভাবে বলেন ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে এই সময়ে কোনো শান্তি আলোচনা হবে না। আগে পাকিস্তানকে তার নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করে একটি আপস বন্দোবস্ত করে পূর্ব পাকিস্তান সংকটের সমাধান করতে হবে।

 

প্রায় সাত মাস ধরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে যে বাঙালি বিচ্ছিন্নতাবাদ আন্দোলন চলছে তা দমন করার চেষ্টা করছে। এই দল গত ডিসেম্বরে সাধারণ নির্বাচনের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেও সামরিক শাসকদের দ্বারা নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছিল ২৫ মার্চ।

 

সামরিক দমনে পূর্ব পাকিস্তান থেকে ভারতে লাখ লাখ শরণার্থী পালিয়ে আসছে।

 

মিসেস গান্ধীকে জিজ্ঞেস করা হয় যদি শরণার্থীদের কারণে ভারতের অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপ ব্রেকিং পয়েন্টে চলে আসে তাহলে ভারত অন্তঃপ্রবাহ বন্ধে পাকিস্তানের বিপক্ষে সামরিক পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হবে কিনা।

 

“আসলে আমি বলব, আমরা ইতিমধ্যে সেই পয়েন্টে এসে পৌঁছেছি”, তিনি বললেন। “কিন্তু এর মানে এই নয় যে, আমরা এর কারণে ফাটল সৃষ্টি করতে যাচ্ছি”।

 

“আমরা অবশ্যই একটি দ্রুত সমাধান চাই, কিন্তু আমরা বড় কোন সমস্যার সৃষ্টি করতে চাই না”। “যেহেতু আপনারা জানেন, আমরা অত্যন্ত সংযত হয়ে আছি। আমি এই ব্যাপারে গভীর চিন্তা করছি। আপনারা একটি দেশের নাম বলুন যারা এতোটা সংযম ও ধৈর্য দেখাতে পারে। ’’

 

গত কয়েক সপ্তাহে, উভয় দেশ তাদের পূর্ব ও পশ্চিম সীমান্তে তাদের সৈন্য সংখ্যা বাড়িয়েছে। উভয় দেশের প্রেসে অনেক লেখা হয়েছে। ১৯৬৫ সালে কাশ্মীর নিয়ে যুদ্ধ হয়।

 

তা সত্ত্বেও, মিসেস গান্ধী বলেন তার পরিকল্পনায় এখনো তিনি কোন পরিবর্তণ আনেননি যদিও পরিস্থিতি খুব ভয়াবহ। তার পরবর্তি ৩ সপ্তাহ বিদেশ সফর করার কথা আছে যা আগামী রবিবার থেকে শুরু হবে। তিনি লন্ডন এবং ওয়াশিংটন সহ ছয় টি পশ্চিমা রাজধানীতে যাবেন যার পরে তার পরিকল্পনা নির্দেশিত করবেন।

 

প্রধানমন্ত্রী বললেন যে আমেরিকার অবস্থান দেখে বোঝা যাচ্ছে তারা দুরদর্শী চিন্তা করছেন না পূর্ব পাকিস্তানের ব্যাপারে।

 

“বাংলাদেশে পাকিস্তানি সামরিক শাসন কোন ভাবেই পাকিস্তান শক্তিশালীকরণ করছেনা – বলেন তিনি।

 

মিসেস গান্ধী নিক্সন প্রশাসন থেকে কিছু অস্ত্র চালান পাকিস্তানে আসছে বলে উল্লেখ করেন। তারা পাকিস্তান সরকারকে নিয়ে সমালোচনায় আগ্রহী নন।

 

তবে আমাদের সাথে আমেরিকা এবং তার জনগণের সাথে বন্ধুত্ব বজায় আছে। তিনি বলেন, “কিন্তু যতদূর ভারতীয় জনগণ বুঝতে পারে যে তারা মূলত ভারত ও পাকিস্তানকে ব্যালেন্স করে চলছেন। ’’

 

পাকিস্তানে আমেরিকান অস্ত্র সম্পর্কে তিনি বলেন, “আমি জানি না তারা আসলে কি চাচ্ছেন, কিন্তু অতীতে তারা বড় পরিমাণে সরবরাহ করেছেন। তারা শুধু ভারতের বিরুদ্ধে এগুলো ব্যাবহার করছে।

 

“এই ব্যাপারে”, তিনি বলেন, “আমরা অবশ্যই সোভিয়েত ইউনিয়ন এর কাছ থেকে অনেক বেশি বুঝতে পারছি। ’

 

মিসেস গান্ধী বলেন “মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন সম্পর্ক আমাদের কাছে খুবই অদ্ভুত মনে হয়। আমরা সোভিয়েত ইউনিয়নকে আমেরিকার চেয়ে বেশী সমর্থন করি না, বরং আমরা উভয় কে সমানভাবে সমর্থন করি।

 

মূল বিষয় হল সোভিয়েত ইউনিয়ন আমাদের কিছু মৌলিক বিষয়ে আমাদের সমর্থন করে যার জন্য আমরা লড়াই করেছি। এবং এই সব নিয়ে আমরা জাতিসংঘেও তাদের সঙ্গে ছিলাম সন্দেহ নেই। একটু আগে, আপনি আমেরিকান সাহায্যের সম্পর্কে বললেন। আমরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে খুব কৃতজ্ঞ এবং তারা নানাভাবে আমাদের সাহায্য করেছেন। কিন্তু একটা সময় ছিল যখন আমরা রাষ্ট্র খাতের বিকাশ চেয়েছিলাম কিন্তু তখন তারা রাষ্ট্র খাতের সাহায্য করেনি যেটা কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়ন করেছিল”।

 

আমরা অবশ্যই ব্যক্তি হিসাবে আমেরিকানদের সঙ্গে ভাল সম্পর্ক রাখছি। ধরেন যদি আমরা রাশিয়ান বা অন্য কেউ হতাম তাহলে কি হত? ভাষাগত বিষয় অবশ্যই একটা ফ্যাক্টর। কিন্তু আমি ব্যক্তিগতভাবে আমি অ্যামেরিকার প্রযুক্তিগত ও বৈজ্ঞানিক অগ্রগতিকে পছন্দ করি।

 

 

 

 

 

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
৪৬। সীমান্তের পরিস্থিতি মারাত্মক, ভারত তথাপি যুদ্ধ এড়াতে চায় – সাংবাদিক সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ দৈনিক স্টেটসম্যান ২০ অক্টোবর ১৯৭১

 

Razibul Bari Palash

<১২, ৪৬, ৯৭৯৯>

অনুবাদ

 

সীমান্ত পরিস্থিতি ভয়াবহশ্রীযুক্তা গান্ধী

কিন্তু ভারত পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধ এড়াতে চায়

এর আগে চীনের সঙ্গে রাষ্ট্রদূতদের সাক্ষাতকার বিবেচিত হয়নি

(আমাদের রাজনৈতিক প্রতিবেদক থেকে প্রাপ্ত সংবাদ)

 

 

নয়া দিল্লি, ১৯ অক্টোবরঃ ভারত-পাকিস্তান সীমান্ত পরিস্থিতি বর্ননা করতে গিয়ে মিসেস ইন্দিরা গান্ধী আজ ঘোষণা করেন যে, ভারত সশস্ত্র সংঘাত এড়াতে সবকিছুই করতে পারে। তিনি যোগ করেন, “কিন্তু যে হাত মুঠো করে রেখেছে তার সাথে করমর্দন করা যায় না।

 

তবে, কেউ যুদ্ধের বিষয়ে ভবিষ্যতবাণী করতে পারে না। পাকিস্তান বাহিনী সব সীমান্তে ভীড় করেছে। ভারতও প্রয়োজনীয় আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।

 

প্রধানমন্ত্রী আজ সকালে একটি প্রেস কনফারেন্স বলেন যে পাকিস্তানের ভয়প্রদর্শন সত্ত্বেও ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তার আসন্ন সফর যাচ্ছেন। সরকার এই পরিস্থিতিতে জরুরী অবস্থা ঘোষণা করবেন কিনা।

 

আত্মবিশ্বাসে ভরপুর, প্রধানমন্ত্রী স্বচ্ছন্দে এবং খোশমেজাজে জবাব দেন যে বাংলাদেশ প্রশ্নে ভারতের সঙ্গে আলোচনায় পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতির যে প্রস্তাব, সেটা তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন। ভারত শুধুমাত্র একটি ব্যাপারে জড়িত আছে আর তা হল বাংলাদেশের জনসংখ্যার ১৩% এখন ভারতীয় ভূখণ্ডে অবস্থান করছে। এবং এটা হচ্ছে তাদের গণহত্যার কারণে।

তিনি এটা স্পষ্ট বলেন যে ভারত পাকিস্তানের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে চেয়েছিল। বাংলাদেশ ভারত-পাকিস্তান ইস্যু ছিল। বাংলাদেশ মূলত পাকিস্তানের সামরিক শাসন এবং বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে একটি ব্যাপার ছিল। যত দ্রুত শরণার্থীরা তাদের মাতৃভূমিতে ফিরে যেতে পারবে ততই তা ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্ভাব্য অগ্নিদাহ দূর করবে।

 

মিসেস গান্ধী বলেন মার্কিন বা সোভিয়েত ইউনিয়ন কেউ বলেনি কীভাবে বর্তমান পরিস্থিতি থেকে মুক্ত হওয়া যায়। সবাই শুধু ভারতের কথা প্রশংসা করেছে। আর অন্যরা অস্ত্র নিয়ে বসে আছে।

 

মিসেস গান্ধী জানান যে সমস্যা পাকিস্তানের সরকার ও বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে ছিল। তাই তিনি এসব নিয়ে মন্তব্য করতে চাননি। সামরিক শাসকদের অধীনে একটি স্বাধীন নির্বাচন হয়েছিল – নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সুযোগ দেয়া হলে হয়ত অবস্থা এমন হতনা। এই প্রতিনিধিরা নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে নির্বাচিত হয়, “যে নির্বাচনের উপেক্ষা করা যায়না”।

 

পাকিস্তানি সামরিক জান্তার প্রথম কাজ হল একটি রাজনৈতিক নিষ্পত্তির দিকে যাওয়া। বাংলাদেশে নৃশংসতার বন্ধ করা এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে গ্রহণযোগ্য অবস্থার সৃষ্টি করা।

 

মিসেস গান্ধী বলেন জাতিসংঘ পর্যবেক্ষক পাঠাবে বলেছে। এই ব্যাপারে ভারতের অবস্থান সম্পর্কে বিভ্রান্তির কোন সুযোগ নাই। ভারত উদ্বাস্তু বিষয়ক হাই কমিশনের সদস্যদের জন্য এমনকি সংসদ সদস্য ও সাংবাদিকদের জন্য সব শরণার্থী শিবির দেখার সুযোগ করে দিয়েছেন। এটা ইউ এন এর দায়িত্ব যে তারা উদ্বাস্তু শিবির ঘুরে দেখবে যে বাংলাদেশে কি ঘটছিল এবং শরণার্থীদের ফেরত পাঠানোর ব্যাপারে পদক্ষেপ নেবে। এটা করার পর জাতিসঙ্ঘ আমাদের এপ্রোচ করতে পারে। এই মুহুর্তে ভারত এটার দেখাশোনা করছে। বাংলাদেশ সমস্যার সমাধানের ব্যাপারে ভারত যা করছে তা সহজেই নষ্ট করা যাবেনা। পাশাপাশি, পাকিস্তানী শাসকরা যদি বাংলাদেশে একটি পাপেট সরকার বানীয়ে রাখে তাতেও সমস্যা দূরীভূত হবেনা।

 

মিসেস গান্ধী ভারত-চীন সম্পর্কে অনেক প্রশ্নের উত্তর দেন কিন্তু নতুন কোণ তথ্য দেন নি। ভারতের প্রতি চীনা মনোভাব ধীরে ধীরে পরিবর্তন হচ্ছে। ইন্দো-সোভিয়েত চুক্তিতে জনাব চৌ এন লাই এর প্রতিক্রিয়া উল্লেখযোগ্য। জনাব চৌ এর কাছ থেকে কোণ চিঠি এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। চীন কেন রাষ্ট্রদূত বিনিময় করবেনা তাঁর আসলে কোণ যুক্তিযুক্ত কারণ নেই। মিসেস গান্ধী বলেন, তিব্বত বর্ডারে চিনা সৈন্য আছে। তিনি মনে করেন না যে তার পরিমাণ খুব বেশী। মার্শাল টিটোর সঙ্গে তার আলোচনার ইঙ্গিত করে যে, চীন সম্পর্কে ভারত ও যুগোস্লাভিয়ার মনোভাব বিস্তৃতভাবে একই রকম।

 

ইন্দো-সোভিয়েত চুক্তির এক প্রশ্নের একটি উত্তপ্ত জবাবে ইন্দিরা গান্ধীর বলেন কোন বিদেশী রাষ্ট্র জাতীয় স্বার্থে ভারতের পারমাণবিক অস্ত্র মজুদ করন থামাতে পারবেনা। এই ব্যাপারে জনসাধারণের মনে কোন সন্দেহ নেই। এটা শুধুমাত্র কৌতূহলী কিছু সংবাদপত্র ও রাজনৈতিক দলগুলোর ছড়ান গুজব। এতে সরকারের স্ট্যান্ড কোনো পার্থক্য হবে না। চুক্তিটি ভারতের অবস্থান শক্তিশালী করেছে এবং ইন্দো-সোভিয়েত মৈত্রী আরও শক্তিশালী হবে।

 

মিসেস গান্ধী স্বীকার করেন যে শরণার্থী অন্তঃপ্রবাহ দেশের অর্থনীতির উপর একটি তীব্র চাপ সৃষ্টি করেছে। তাই, সরকার মনে করে তা ছিল চতুর্থ পরিকল্পনা। অর্থমন্ত্রী ইতিমধ্যে অতিরিক্ত সম্পদ তোলার সম্ভাবনা পরীক্ষা করার জন্য মুখ্যমন্ত্রীদের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন। দামের প্রশ্ন চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে সম্পর্কিত। তাই সরকার রাজস্ব ও অন্যান্য নীতিসমূহ ঠিক করছেন মূল্যের উপর যাতে প্রভাব কম হয়।

 

প্রেস সবচেয়ে বড় যে ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি করেছিলে সেটা হল যে তারা বলেছিল আমি শরনার্থিদের ফিরে যাবার জন্য ৬ মাস সমসয় বেঁধে দিয়েছি। আমি আসলে পার্লামেন্ট বলেছিলাম আপনারা আমাকে হিসাব করে জানান ৬ মাসে কত আর্থিক বোঝা সৃষ্টি হবে এমন একটা ধারণা দিতে। কারণ পরিস্থিতি মূল্যায়ন করার জন্য আমার এই ধারণা নেয়া দরকার ছিল। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে কি ঘটেছিল সেটা বোঝাও আমাদের দরকার। তাছাড়া অসাধারণ এই অর্থনৈতিক বোঝা থেকে, আরও কি কি সামাজিক ও রাজনৈতিক উত্তেজনার সম্ভাবনা হতে পারে তাও আমাদের ধারণা নেয়া দরকার ছিল। সেখানকার শান্তি, নিরাপত্তা ও পূর্ব অঞ্চলের স্থিতিশীলতার সমস্যা আমাদের ভাবতে হবে।

 

শরণার্থীদের জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তা ও সরকারি অগ্রাধিকার এর মধ্যে পার্থক্য করা অর্থহীন। ভারত আর্থিক সহায়তা চায় ঠিক কিন্তু উদ্বাস্তুদের এখানে থাকার ব্যাপারে তাদের কোণ প্রশ্ন আপাতত নেই। তারা একটি অস্থায়ী ভিত্তিতে এখানে আছে এবং যত তাড়াতাড়ি পরিস্থিতি ভালো হবে তারা ফিরে যাবে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে তারা সফল হবেই। ইতিহাস দেখিয়েছে যে, এই ধরনের সংগ্রামে বাধা আসে কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা জিতে। উপরন্তু, বাংলাদেশের সমগ্র মানুষ মুক্তিবাহিনীতে সমর্থিত। এমনকি দেশের বাইরে অবস্থিত বাংলাদেশি নাগরিকরাও সাহায্য করছিল।

 

ইউ.এন.আই এবং পিটিআই যোগ করে পশ্চিম এশিয়া ও ইন্দো-চীন এর পরিস্থিতি পরিবর্তন হচ্ছে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে একই রয়ে গেছে। যদিও সেখানে অনেক পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে বৈরিতার অবসান করার জন্য। তবে এশিয়ায় দ্বন্দ্ব চলছেই।

 

টানা অট্রহাসি শোনা গেল যখন প্রেস কনফারেন্সে মিসেস গান্ধী বললেন যা বের করা সাংবাদিকদের দায়িত্ব, তা ফাস করে দিয়ে তিনি তাদের ভাত মারতে চান না, অতঃপর মন্ত্রী সভার পূন বিন্যাস এর খবরটিকে তিনি গুজব হিসেবে বর্ননা করলেন।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
৪৭। প্রেসিডেন্ট টিটোর ভারত সফর শেষে প্রকাশিত ভারত- যুগোস্লাভ যুক্ত ইশতেহার ভারত সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ২০ অক্টোবর ১৯৭১

 

Razibul Bari Palash

<১২, ৪৭, ১০০১০৩>

অনুবাদ

 

প্রেসিডেন্ট টিটোর ভারত সফর শেষে প্রকাশিত ভারতযুগোস্লাভ যুক্ত ইশতেহার

২০ অক্টোবর, ১৯৭১

 

ভারতের রাষ্ট্রপতি শ্রী ভি ভি গিরির বন্ধুত্বপূর্ণ আমন্ত্রণে, ১৬ অক্টোবর থেকে ২০ অক্টোবর ১৯৭১ যুগোস্লাভিয়ার প্রেসিডেন্ট মার্শাল জসিপ ব্রজ টিটো রাষ্ট্রীয় সফরে ভারতে আসেন। ভারত-যুগোস্লাভ এর অব্যাহত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং শান্তি, স্বাধীনতা, স্বাধীনতা ও আন্তর্জাতিক সহায়তা বৃদ্ধির জন্য এই সফর খুব গুরুত্ববহ।

 

যুগোস্লাভিয়া সমাজতান্ত্রিক ফেডারেল প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্ট, ভারতের রাষ্ট্রপতি ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী গুরুত্বপূর্ণ বর্তমান আন্তর্জাতিক বিষয় এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের উপর আলোচনা করেন।

 

 

যুগোস্লাভ দিকে আলোচনায় অংশগ্রহণকারী ছিলেন:

 

জনাব রাটো ডুগ্নোজিজ, যুগোস্লাভিয়া সমাজতান্ত্রিক ফেডারেল প্রজাতন্ত্র প্রেসিডেন্সি সদস্য;

 

জনাব ইলিয়া রায়াচিচ, ভয়ভোডিনা স্বায়ত্তশাসিত প্রদেশ পরিষদের চেয়ারম্যান, ও যুগোস্লাভিয়া সমাজতান্ত্রিক ফেডারেল প্রজাতন্ত্র প্রেসিডেন্সি সদস্য; জনাব আন্তন ভ্রাতুসা, যুগোস্লাভিয়া সমাজতান্ত্রিক ফেডারেল প্রজাতন্ত্র ফেডারেল নির্বাহী পরিষদের সদস্য;

 

জনাব মার্কো ভ্রুনচে, প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপতি মন্ত্রিপরিষদ ভারপ্রাপ্ত প্রধান;

 

জনাব মিলোস মেলোভস্কি, প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপতি মন্ত্রিসভায় পররাষ্ট্র কাউন্সেলর;

 

জনাব এডুয়ার্ড কিউন, পররাষ্ট্র ফেডারেল সচিবালয়ের এশিয়া বিভাগের প্রধান; এবং

 

জনাব আনডেল্কো ব্লাজেভিচ, দূতাবাসের নয়া দিল্লি যুগোস্লাভিয়া সমাজতান্ত্রিক ফেডারেল প্রজাতন্ত্র এর চার্জ দ্যা এফেয়ার্স.

 

 

ভারতীয় দিকে ছিল:

 

সরদার শরণ সিং, এক্সটার্নাল অ্যাফেয়ার মন্ত্রী;

 

ডঃ করণ সিং, বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রী; শ্রী সুরেন্দ্র পাল সিং, পররাষ্ট্র উপমন্ত্রী;

 

শ্রী টি এন কাউল, পররাষ্ট্র সচিব; শ্রী এস কে বন্দ্যোপাধ্যায়, সচিব (পূর্ব); শ্রী পি এন মেনন, সম্পাদক (পশ্চিম); শ্রী এইচ লাল, সচিব, বৈদেশিক বানিজ্য মন্ত্রী; শ্রী আর জয়পাল, ভারত যুগোস্লাভিয়া থেকে রাষ্ট্রদূত; শ্রী কে পি মেনন, যুগ্ম-সচিব, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়; শ্রী আর ডি সাথী থেকে, যুগ্ম-সচিব, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়; শ্রী উ পি ভেঙ্কাটেশরন, যুগ্ম-সচিব, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

 

উভয় পক্ষই আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন, বিশ্ব শান্তি, জাতীয় স্বাধীনতা এবং স্বাধীনতার জন্য সংগ্রামে তাদের প্রচেষ্টা সহ কিছু বিষয়ে একমত প্রকাশ করেন।

 

আইডেন্টিটি বা মতামতের ঘনিষ্ঠতা দু ‘দেশের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। পারস্পরিক আস্থা ও সমঝোতার মনোভাব নিয়ে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।

 

উভয় পক্ষই দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা আরও জোরদার করবে এবং বছরের পর বছর ধরে সংহত সম্পর্কের সাথে তারা এঁকে ওপরের কাছে সুপরিচিত। তারা স্বীকার করেন একটি দীর্ঘমেয়াদী ভিত্তিতে এটি আরও সম্প্রসারণ করা এবং সর্বক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতার জন্য তাগিদ দেন। তারা নিয়মিত দ্বিপাক্ষিক আলোচনা চর্চা চালানোর সিদ্ধান্ত নেন।

 

দুই পক্ষের যৌথ কমিটির মাধ্যমে দুই দেশের অর্থনৈতিক উনয়নের প্রয়োজনীয়তা আলোচনা করেন এবং অন্যান্য সংস্থা উভয় দেশে বা তৃতীয় দেশের মধ্যে যৌথ প্রকল্প নিয়েও আলোচনা করেন। একটি পারস্পরিক সুবিধাজনক ভিত্তিতে বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত দক্ষতার শেয়ারিং নিয়েও আলোচনা হয়।

 

পূর্ববাংলায় সাম্প্রতিক ঘটনার ফলে সৃষ্ট মারাত্মক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করা হয়। এর ফলে ভারতের সৃষ্ট গুরুতর সামাজিক ও রাজনৈতিক উত্তেজনা ও অর্থনীতির উপর চাপ যুগোস্লাভিয়ার কাছে অনুভূত হয়েছে। শরনার্থিদের প্রবেশ – যার সংখ্যা প্রতিদিন হাজার হাজার বাড়ছে – এটি নিয়ে যুগোস্লাভ গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে। উভয় পক্ষ একমত হয় যে এই সমস্যা শুধুমাত্র নির্বাচিত প্রতিনিধিদের – যারা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়েছিল – তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য একটি রাজনৈতিক সমাধান দ্বারা সমাধান করা যেতে পারে। পূর্ববাংলায় অবস্থা স্বাভাবিক হলে শরণার্থীরা জাতী-ধর্ম নির্বিশেষে নিরাপত্তা ও সম্মানজনকভাবে তাদের মাতৃভূমিতে ফিরে যেতে সক্ষম হবে।

 

উভয় পক্ষই অধিকার এবং পূর্ববাংলার জনগণের বৈধ স্বার্থ অনুযায়ী এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য কাজ করার সিদ্ধান্ত নেয়। জনগণের সিদ্ধান্তকে এড়িয়ে গেলে সমস্যা আরও তীব্রতর হবে বলে তারা একমত হন।

 

উভয় পক্ষ একমত হয়েছে যে এই অস্থিরতা ও উত্তেজনার একটি সমাধান তাড়াতাড়ি না বের করলে অবস্থার গুরুতর অবনতি হতে পারে।

 

যুগোস্লাভ শেখ মুজিবুর রহমানের ভাগ্যের ব্যাপারে শঙ্কিত কারণ তাঁর সাথে যা কিছু অন্যায় করা হচ্ছে তার পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে বলে তারা মনে করেন।

 

প্রেসিডেন্ট টিটো, দৃঢ় ভাবে বিশ্বাস করেন যে শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক সমাধান এর স্বার্থে এবং শান্তি ও উপ-মহাদেশের স্থিতিশীলতার স্বার্থে শেখ মুজিবুর রহমানের ব্যাপারে কোণ হঠকারী সিদ্ধান্ত নেয়া ভালো হবেনা। তিনি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জনাব ইয়াহিয়া খান এর প্রতি এই আবেদন করে যান ১৪ আগস্ট, ১৯৭১। ভারতের প্রধানমন্ত্রী পূর্ববাংলার নির্বাচিত নেতা, শেখ মুজিবুর রহমানকে নিশর্তে মুক্তিদানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। একটি শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য এটি অপরিহার্য।

 

ভারতের প্রধানমন্ত্রী বলেন ভারত সরকার চায় যে শরণার্থীরা তাদের মাতৃভূমিতে অবিলম্বে ফিরে যাক এবং এর জন্য যেসব ব্যাবস্থা করা দরকার তা করা উচিৎ। যুগোস্লাভ এর সঙ্গে একমত হয়। উভয় পক্ষ আরও একমত হয়েছে যে এই লক্ষ লক্ষ শরণার্থীদের সাহায্য করা সমগ্র বিশ্ব সম্প্রদায়ের উপর পরে।

 

দুই পক্ষই লক্ষ্য করে যে ইউরোপ যদিও এখনও বিভক্ত এবং তবুও শেষ যুদ্ধের বোঝা তাদের টানতে হচ্ছে। তবুও তাদের অবস্থার উন্নতি অনেক হয়েছে। সমতার ভিত্তিতে ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে নিরাপত্তা এবং শান্তি ও গঠনমূলক সহযোগিতার জোরদারের একটি পরিবেশ তৈরি হয়েছে।

 

উভয় পক্ষই মনে করে যে, তাদের মধ্যকার জোট নিরপেক্ষ নীতি তাদের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করে। যুগোস্লাভিয়া ও ভারতের নীতি বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে নিরপেক্ষ দেশগুলোর আন্তর্জাতিক কার্যক্রমে সহায়ক।

 

উভয় পক্ষই অশান্তিকর আন্তর্জাতিক আর্থিক সংকট ও অর্থনৈতিক অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে আলোচনা করেন। তারা উল্লেখ করেন যে, উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের মধ্যে দূরত্ব কমানোর জন্য কোন ব্যাবস্থা গৃহীত হয়নি। এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রভাবিত বৈষম্যমূলক ব্যবস্থার কারণে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

 

তারা পুনর্ব্যক্ত করে উন্নয়নশীল দেশগুলো যাদের অধিকাংশ বর্তমান বিশ্বের অর্থনৈতিক সংকটের দ্বারা প্রভাবিত তাদের আরও জোরাল পদক্ষেপ সম্মিলিতভাবে নিয়ে পরিস্থিতির উন্নতি করতে হবে।

 

উভয় পক্ষই একমত যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে আন্ত-আঞ্চলিক, আঞ্চলিক ও উপ-আঞ্চলিক পর্যায়ে একসাথে কাজ করতে ইচ্ছুক। এই প্রসঙ্গে তারা তারা ব্যাংককে অনুষ্ঠিত এশিয়ান ফরেন ট্রেড মন্ত্রীবর্গের এবং গ্রুপ ৭৭ এর মিনিস্টিরিয়াল কনফারেন্স এর প্রতি গুরুত্বারোপ করেন।

 

তারা একমত হন যে U.N.C.T.A.D. -III তে গৃহীত পদক্ষেপ ও জাতিসঙ্ঘের দ্বিতীয় দশ বছর মেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনার গৃহীত পদক্ষেপগুলির বাস্তবায়নের ব্যাপারে উন্নয়নশীল দেশগুলোর একটি ঐক্যমত্য নিশ্চিত করতে হবে।

 

 

উভয় পক্ষই আন্তর্জাতিকভাবে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণে সাধারণ ও সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ এর প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

 

দুই পক্ষ জাতিসংঘের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করেন এবং জাতিসংঘের সব সদস্যের বিধানাবলী পালন প্রয়োজনীয়তার গুরুত্বের সাথে নেন। তারা সদস্যপদের সার্বজনীনতা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার ব্যাপারে একমত হন। তারা জাতিসঙ্ঘে ভুটান, বাহরাইন ও কাতারের যোগদানে স্বাগত জানান। তারা জাতিসংঘে চীনের বৈধ অধিকার অবিলম্বে পুনবিবেচনার উপর বিশেষ গুরুত্ব দেন। তারা মনে করে ইউ.এন এর বাইরে অন্যান্য দেশেরও ইউ.এন. এবং তার সংস্থার কার্যক্রমে অংশ নেয়া উচিৎ।

 

উভয় পক্ষই জাতীয় মুক্তি আন্দোলন এবং ঔপনিবেশিক আধিপত্য এর বিরুদ্ধে সংগ্রামের জন্য তাদের সমর্থন ঘোষণা করেন এবং ঔপনিবেশিক দেশকে স্বাধীনতা প্রদানের ব্যাপারে জাতিসঙ্ঘের ঘোষণা অনুযায়ী উপনিবেশবাদ সম্পূর্ণ বর্জনের দাবি করেন। তারা মানবাধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতা বিরোধী হিসেবে বর্ণবাদী নীতি ও চর্চার নিন্দা জ্ঞ্যাপন করেন।

 

দুই পক্ষের ইন্দো-চীন বিষয়ে বিদেশী হস্তক্ষেপের ধারাবাহিকতা ধরে তাদের উদ্বেগ প্রকাশ করেন। শান্তি ও নিরাপত্তার স্বার্থে বাইরে থেকে কোনো হস্তক্ষেপ ছাড়াই ইন্দো-চীন থেকে সব বিদেশি সেনা দ্রুত প্রত্যাহারের দাবী পেশ করেন। এ প্রসঙ্গে লক্ষনীয় যে দক্ষিণ ভিয়েতনামের অস্থায়ী বিপ্লবী সরকারের সাত দফা প্রস্তাব একটি শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক সমাধানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি গঠন করে। তারা আশা করেন ভিয়েতনাম, লাওস ও কম্বোডিয়ার প্রশ্নে একটি শান্তিপূর্ণ সমাধান জেনেভা চুক্তিতে থাকবে।

 

দুই পক্ষই পশ্চিম এশিয়ায় উত্তেজনাকর পরিস্থিতি এবং সংকট সমাধানের জন্য তাদের গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তারা একমত যে ২২ নভেম্বর, ১৯৬৭ -এর নিরাপত্তা পরিষদের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ একটি শান্তিপূর্ণ চুক্তি আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য দেয়া হয়েছিল। তারা ইস্রায়েল ও ফিলিস্তিনের জনগণের ন্যায়সঙ্গত অধিকারের প্রতি সম্মানসহ রেজোলিউশন তৈরি ও তার প্রয়োগের জন্য আবেদন করেন। তারা দীর্ঘস্থায়ী, স্থিতিশীল এবং স্থায়ী শান্তি অর্জনের প্রয়োজনীয়তার কথা পুনর্ব্যক্ত করেন।

 

যুগোস্লাভিয়ার রাষ্ট্রপতি ভারতের প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতিকে আমন্ত্রণ জানান। তার আমন্ত্রণ অত্যন্ত আনন্দের সাথে গৃহীত হয়।

 

 

 

 

 

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
৪৮। পাল্টা আঘাত হানতে দুই মিনিটের বেশী সময় লাগবে না – প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও রাষ্ট্রমন্ত্রীর ঘোষণা দৈনিক আনন্দবাজার ২২ অক্টোবর ১৯৭১

 

Aparajita Neel

<১২, ৪৮, ১০৪>

 

আমরা প্রস্তুত, পাল্টা আঘাত হানতে দুই মিনিটের বেশী সময় লাগবে না

 

নয়াদিল্লী ২১ অক্টোবর – ভারতের সমর প্রস্তুতি পুরদমে চলছে এবং সামরিক বাহিনী সম্পূর্ন সজাগ। আমরা আক্রান্ত হলে পাকিস্তানকে পাল্টা আঘাত হানতে দুই মিনিটের বেশী সময় লাগবে না। প্রতিরক্ষা উৎপাদন দফতরের রাষ্ট্রমন্ত্রী শ্রী বিদ্যাচরন শুক্লা আজ এখানে এই কথা বলেন। এ খবর ইউ এন আই এর।

 

প্রতিরক্ষা মন্ত্রী শ্রী জগজিবন রামও দৃঢ় কণ্ঠে আজ ঘোষণা করেন যতক্ষণ পাকিস্তানের দিক থেকে যুদ্ধের হুমকি থাকবে ভারত ও পাক সীমান্ত থেকে সৈন্য সরাবে না। আমাদের বিশেষ সংবাদদাতার এই খবরে আরও বলা হয়েছে, শ্রী রাম তাঁর মন্ত্রকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংসদীয় পরামর্শদাতা কমিটির সভায় আজ বলেন যে, ভারতের জাতীয় স্বার্থ রক্ষার ব্যাপারে ভারতের সমর প্রস্তুতির কোন রকম শিথিলতা হবে না।

 

পাকিস্তানের যুদ্ধের হুমকিতে সদস্যরা উদ্বেগ প্রকাশ করেন। কিন্তু প্রতিরক্ষামন্ত্রী আশ্বাস দিয়ে বলেন যে, পাক আক্রমণ মোকাবিলার জন্য ইতিমধ্যেই যথোপযুক্ত প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। ভারত বিন্দুমাত্র ভিত নয়। ভারত আক্রমণের মত নির্বুদ্ধিতা করলে পাকিস্তান সমুচিত জবাব পাবে।

 

তবে তিনি মন্তব্য করেন, পরিস্থিতি গুরুতর। পাকিস্তানের সেনা সমাবেশের জন্য পশ্চিম সীমান্তে ভারতকেই সৈন্য মোতায়েন করতে হয়েছে।

 

প্রতিরক্ষা উৎপাদন দফতরের মন্ত্রী শ্রী শুক্লা এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে দেশের প্রতিরক্ষা প্রস্তুতির এক হিসাব দেন। তিনি বলেন, ১৯৬৫ সালে পাক আক্রমণের পর সমরাস্ত্র উৎপাদনের ব্যাপারে ভারতের সর্বাত্তক অগ্রগতি ঘটেছে। আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর হাতে এখন আধুনিক ও অতি আধুনি সমরাস্ত্র বৈজয়ন্ত, ট্যাঙ্ক, যুদ্ধ জাহাজ, মিগ প্রভৃতি।

 

দেশের অস্ত্র কারখানাগুলোই প্রতিরক্ষা চাহিদার বড় অংশ মেটাচ্ছে।

 

 

 

 

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
৪৯। প্ররোচনার মুখে ভারতের সংযমকে মনে করলে পাকিস্তান মারাত্মক পরিণতির মুখে পড়বে – রাষ্ট্রপতির সতর্কবানি দৈনিক যুগান্তর ২৩ অক্টোবর ১৯৭১

 

Aparajita Neel

<১২, ৪৯, ১০৫>

পাকিস্তানকে রাষ্ট্রপতির হুশিয়ারি

নয়াদিল্লী, ২২ অক্টোবর (পি টি আই) – রাষ্ট্রপতি শ্রী ভিভি গিরি আজ পাকিস্তানকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, গুরুতর ও ক্রমবর্ধমান প্ররোচনা সত্ত্বেও ভারত যে সংযম ও ধৈর্যের পরিচয় দিচ্ছে তাঁকে যেন দুর্বলতার চিনহ বলে কেউ ভিল না করেন।

তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে ঘোষণা করেন আমরা আমাদের সার্বভৌমত্ত ও আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষার জন্য সম্পূর্ন্রূপে প্রস্তুত।

 

আজ সকালে ইরাকের রাষ্ট্রদূত মিঃ আবদুল্লা সালেমুস আলসামারায়ে রাষ্ট্রপতি ভবনে তার পরিচয়পত্র পেশ করছিলেন তখন রাষ্ট্রপতি তার ভাষণে বলেন যে, পশ্চিম পাকিস্তানী সৈন্যদের অত্যাচারের ফলে পুর্ববঙ্গ থেকে ৯৫ লাখের ও বেশী শরনার্থি ভারতে আশ্রয় নেওয়ায় ভারতের সামনে বিরাট সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। এই শরনার্থি আগমন বন্ধ করতে হবে। এবং এরা যাতে নিরাপদে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করতে পারেন তার জন্য পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। রাষ্ট্রপতি বলেন যে, এ ধরণের গুরুত্ততপূর্ন বিষয়ে বন্ধু দেশগুলো নীরব থাকলে শান্তি আসতে পারে না।

 

রাষ্ট্রপতি বলেন, সমস্যাটি ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে নয়, এটা হল পুর্ব বঙ্গবাসী এবং পাক জঙ্গিশাহির পরিচালিত নির্বাচনে, জনগণের আশা আকাঙ্ক্ষা পদদলিত হওয়ায় এর উদ্ভব। পূর্ব পাকিস্তান থেকে ব্যাপকভাবে শরনার্থি আগমনের কথা উল্লেখ করে ইরাকি রাষ্ট্রদূত বলেন, ইরাক বাংলাদেশের শরনার্থি সমস্যার মানবিক দিক এবং রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থণৈতিক ক্ষেত্রে ভারতের অসুবিধা সম্পর্কে সম্পূর্ন ওয়াকিবহাল।

 

তিনি বলেন, উন্নতিশীল দেশগুলোর ঔপনিবেশিক ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলি থাবা বিস্তারে উদ্যত। তাদের এই অপপ্রয়াস ব্যার্থ করে দিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে মধুর প্রতিবেশী সুলভ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা হোক, গণতন্ত্রী ইরাক সরকার তা আশা করেন।

শিরোনাম সূত্র তারিখ
৫০। কয়েকটি রাষ্ট্র সফরে যাওয়ার প্রাক্বালে দেশবাসীর উদ্যেশ্যে প্রধানমন্ত্রীর বেতার ভাষণ ভারত সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ২৩ অক্টোবর ১৯৭১

 

Razibul Bari Palash

<১২, ৫০, ১০৬>

অনুবাদ

 

জাতির উদ্যেশ্যে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সম্প্রচারিত ভাষণ

২৩ অক্টোবর ১৯৭১

 

কাল সকালে, আমি কিছু দেশে সফরে যাচ্ছি। আমি বলতে চাই যে, আমি যত দুরেই যাই আমি আপনাদের সাথই থাকব। এইরকম একটি মুহূর্তে আমি বসে থাকতে পারিনা। আমাদের দেশ বিপদের সম্মুখীন। তা সত্ত্বেও, অনেক চিন্তার পর, আমি যাবার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। অন্যান্য দেশের নেতাদের সঙ্গে দেখা করার জন্য ও মতামত বিনিময়ের জন্য দীর্ঘদিনের আমন্ত্রণ ছিল। আমি তাদেরকে আমাদের বর্তমন পরিস্থিতির বাস্তবতা সম্পর্কে বলতে চাই।

 

আমাদের জাতীয় স্বার্থ রক্ষার ব্যাপারে আমরা যখন কোন সমস্যায় পড়ি তার সমাধান আসলে আমাদের হাতেই থাকে। কিন্তু এখন পরিস্থিতি এমন যে আমরা এটাকে এভাবে চলতে দিতে পারিনা। শুধু রাগ বা তাড়াহুড়া করে আমরা অবস্থান নষ্ট করতে চাইনা। শুধুমাত্র আমাদের প্রতিরক্ষা বাহিনীর উপর নির্ভর করে বসে থাকলেই চল্বেনা। এই মুহুর্তে আমাদের সব মানুষের সতর্কতা প্রয়োজন। গত কয়েক মাসে, সাহস, মর্যাদা ও সংযম দিয়ে আমরা এই চ্যালেঞ্জ প্রতক্ষ্য ও মোকাবেলা করেছি। আমি নিশ্চিত যে ভবিষ্যতে আপনারা যে কোন বিপদ একই ভাবে মোকাবিলা করবেন। আমাদের ঐক্য ও শৃঙ্খলা প্রয়োজন। আমি আন্তরিকভাবে আশা করি যে আমাদের সকল রাজনৈতিক দলগুলো আমাদের সাথে দাঁড়াবেন।

 

দেশের প্রত্যেকটি জনগণ তাদের বাড়িতে কষ্ট করছেন। জাতির সম্পদ রক্ষা করা এবং আরো সম্পদ বাড়াতে আমাদের সব রকমের চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। কৃষি ও শিল্পে আমাদের উৎপাদন বাড়াতে হবে। কৃষক ও শ্রমিক, ব্যবস্থাপক ও কারখানার মালিক সবাই একটি অতিরিক্ত জাতীয় দায়িত্ব হিসেবে তদের সর্ব শক্তি দিয়ে এটা করার চেষ্টা করবেন।

 

যে কোন সংকটে, মজুদ দেশ-বিরোধী অপরাধ। ব্যাবসায়িদের একটি বিশেষ দায়িত্ব এই সময়ে লাভের আশায় দাম বৃদ্ধি না করা। আমাদের আরও কাজ করতে হবে এবং সঞ্চয় করতে হবে। গুজব ছড়ানো্‌, সাম্প্রদায়িকতা উস্কানি ইত্যাদি আমদেরকে প্রতিহত করতে হবে।

 

বাংলাদেশ থেকে উদ্বাস্তুর অন্তঃপ্রবাহ আমাদের জন্য একটি বোঝা। তবুও আমরা আমাদের সীমান্তে সঙ্কটের পরেও তাদের দেখাশোনা করছি – এই মুহুর্তে তারা ভূমিহীন এবং বেকার। আমরা পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি। ভারতীয় জনগণের অসুবিধা সাময়িক এবং একটি ভাল এবং শক্তিশালী দেশ গড়ে তোলার ব্যাপারে আমাদের আরও আন্তরিক হতে হবে।

 

আমার সংহতি এবং ভারতীয় জনগণের প্রতি দায়িত্বানুভূতির কারণে আমাকে এই সফরে যেতে হবে। দল ও ধর্মগত সব পার্থক্য মুছে যাক। আসুন আমরা ঐক্যবদ্ধ হই এবং একসাথে দাঁড়াই। আসুন আমরা একসাথে কাজ করি। আমাদের জাতির অখণ্ডতা ও স্বাধীনতা ধরে রাখতে একসাথে কাজ করি।

 

জয় হিন্দ

 

 

 

 

 

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
৫১। জাতিসঙ্ঘ দিবসে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তৃতা ভারত সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ২৪ অক্টোবর ১৯৭১

 

Razibul Bari Palash

<১২, ৫১, ১০৭>

অনুবাদ

 

নয়া দিল্লীতে জাতিসঙ্ঘ দিবসে পররাষ্ট্রমন্ত্রী সরদার শরণ সিংয়ের বক্তৃতা

২৪ অক্টোবর, ১৯৭১

 

 

নিম্নে ভাষণের উপর একটি রিপোর্ট দেয়া হল:

 

জনাব শরণ সিং বলেন এটা অপরিহার্য যে পূর্ব বাংলার জনগণের দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সাথে একটি গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক সমাধানের মাধ্যমে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে হবে। শুধুমাত্র তখনই উদ্বাস্তুরা দেশে ফিরে যেতে শুরু করবে।

 

“আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এই সমস্যার গুরুত্ব উপলব্ধি করতে হবে। এবং একটি সম্মিলিত পদ্ধতিতে কাজ করে এটি সমাধান করা তাদের দায়িত্ব।

 

জনাব শরণ সিং বলেন পাকিস্তান অযথা আক্রমনাত্মক ভাবে ভারতীয় সীমান্তে বাহিনী জড়ো করছে এবং মূল ঘটনা অন্যদিকে প্রবাহিত করার চেষ্টা করছে।

 

“তবে পূর্ববাংলায় মূল সমস্যা রাজনৈতিক। মন্ত্রী উল্লেখ করেন।

 

ভারত, বাংলাদেশের শরণার্থীদের উপর আস্থা রাখে। পূর্ব বাংলায় নিরাপত্তা এবং শান্তি পুনরুদ্ধার হলে তারা তাদের নিজের মাতৃভূমিতে ফিরে যেতে পারে।

 

পররাষ্ট্র মন্ত্রী দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, যখন সামগ্রিকভাবে মানবজাতির উপর পূর্ববাংলায় পাকিস্তানি সামরিক শাসকরা গণহত্যা ও নিপীড়ন চালাচ্ছিল তখন সরকার ধীরে চলছিল।

 

জনাব শরণ সিং বলেন শুধুমাত্র একটি সমাধান যা হল পূর্ব বাংলার জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে গ্রহণযোগ্য পরিস্থিতি তৈরি করা – এটি করা গেলেই শরণার্থীদের ফেরত পাঠানোর জন্য পরিবেশ তৈরি হবে।

 

তিনি বলেন ভারতীয় সীমান্ত জুড়ে পাকিস্তান তাদের সৈন্য জড়ো করে পূর্ববাংলায় তাদের কলঙ্কজনক রেকর্ড ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করছে।

 

জনাব শরণ সিং, যারা বিদেশী নীতি সংক্রান্ত বিষয়ে ইউ.এন. এর সদস্যপদ আছেন তাদের এই পরিস্থিতিতে অবদান রাখা উচিৎ।

 

জনাব শরণ সিং বলেন, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ইউ.এন. এর অর্জন অসাধারণ। কিন্তু রাজনৈতিক ক্ষেত্রে আমি তেমনটি বলতে পারছিনা।

 

পররাষ্ট্রমন্ত্রী উল্লেখ করেন এখনো অনেক বড় বড় সমস্যা সমাধান এর জন্য প্রতীক্ষিত। উদাহরণ হিসেবে তিনি অনেক আফ্রিকান দেশে চলমান সংখ্যালঘু সরকার কে ক্রমাগত অস্বীকার করার কথা তুলে আনেন।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
৫২। ব্রাসেলসে রয়্যাল ইন্সটিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল এফেয়ার্স এ প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধির ভাষণ ভারত সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ২৫ অক্টোবর ১৯৭১

 

Razibul Bari Palash

<১২, ৫২, ১০৮>

অনুবাদ

 

 

রয়্যাল ইন্সটিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল এফেয়ার্স এ প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধির ভাষণের চুম্বক অংশ, ২৫ অক্টোবর ১৯৭১

 

একটি নতুন সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে যার বিশালতা ছড়িয়ে পড়ছে এবং আমাদের সমস্যার সম্মুখীন করে ফেলেছে। প্রায় বেলজিয়ামের জনসংখ্যার সমান ৯ মিলিয়ন মানুষ পূর্ব বাংলায় পাকিস্তানের সামরিক শাসকদের দ্বারা নির্যাতিত। এবং তাদেরকে আমাদের সীমানার ভিতরে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। এটি আমাদের স্বাভাবিক জীবন এবং আমাদের ভবিষ্যতের পরিকল্পনায় আঘাত হানবে। বিশ্ববাসীর কি এই আগ্রাসনের ব্যাপারে সচেতন হওয়া উচিত নয়? প্রচলিত অর্থে এটি গৃহযুদ্ধ নয়। এটা বেসামরিক নাগরিকদের গণহত্যার বিশাল যজ্ঞ কারণ তারা গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। আমরা যথেষ্ট ধৈর্য্য ধরে আছি কিন্তু জানি যে এটা আমাদের নিরাপত্তা ও স্ট্যাবিলিটির জন্য হুমকি স্বরূপ। এই সমস্যার মূল কারণ অবশ্যই সমাধান করতে হবে। এর একটি রাজনৈতিক সমাধান বেড় করা আবশ্যক, এবং বাংলাদেশের জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে তা গ্রহণযোগ্য হতে হবে। যারা শরণার্থীদের অন্তঃপ্রবাহ থামাতে এবং যারা ইতিমধ্যে ঢুকে পড়েছে তাদের ফেরত পাঠাতে চান তাদের অতি সত্বর সমাধানের দিকে এগিয়ে আসা উচিৎ।

 

 

 

 

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
৫৩। যুদ্ধের হুমকি থাকলে সীমান্তে সৈন্যও থাকবেঃ প্রতিরক্ষামন্ত্রীর ঘোষণা দৈনিক আনন্দবাজার ২৬ অক্টোবর ১৯৭১

 

Aparajita Neel

<১২, ৫৩, ১০৯>

 

যুদ্ধের হুমকি থাকলে সীমান্তে সৈন্যও থাকবেঃ প্রতিরক্ষামন্ত্রী

(বিশেষ সংবাদদাতা)

 

নয়াদিল্লী, ২৫ অক্টোবর – ভারতের প্রতি পাকিস্তানের যুদ্ধের হুমকি যতদিন বজায় থাকবে ততদিন সীমান্তে ভারতীয় সেনাদের মোতায়েন রাখা হবে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী শ্রী জগজীবন রাম ভারতের এই দৃঢ় সংকল্পের কথা আজ আবার ঘোষণা করেন।

 

এখানে ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজে বক্তৃতা প্রসঙ্গে শ্রীরাম বলেন, ভারত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে এমন কোন ব্যাবস্থা নেবে না যাকে আক্রমণাত্মক কাজ বলা যাতে পারে। কিন্তু ভারতের বিরুদ্ধে যে কোন আক্রমণ পূর্ন শক্তি নিয়ে প্রতিহত করা হবে।

 

প্রতিরক্ষামন্ত্রী ঘোষণা করেন যে আমাদের দেশ আক্রান্ত হলে আমরা শুধুমাত্র সীমান্ত রক্ষার ব্যাবস্থা করেই তুষ্ট হব না। শত্রুকে আমরা তাদের একালাতেই হটিয়ে নিয়ে যাব। আমাদের দেশে নয়, লড়াই যাতে শত্রুভুমিতেই হয় আমরা সেই ব্যাবস্থাও করব।

 

তিনি আরও বলেন, সৈন্য প্রত্যাহারের জন্য আন্তর্জাতিক চাপ দেয়া হলে ভারত দাবী জানাবে যে এক কোটি শরনার্থির বাংলাদেশে ফিরে যাওয়ার দায়িত্ব ওইসব রাষ্ট্র নিক। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশ থেকে ভারতে শরনার্থি আগমন অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে এবং ভারত থেকে শরনার্থিদের বাংলাদেশে ফেরার কাজও শুরু করতে হবে। শুধুমাত্র সেই অবস্থায় সৈন্য প্রত্যাহারের কথা ভারত বিবেচনা করবে।

 

শ্রীরাম বলেন পাকিস্তানী ক্যান্টনমেন্ট গুলো সীমান্তের এত কাছে যে, পাকিস্তান সৈন্য প্রত্যাহার করে নিলেও অল্প সময়ের মধ্যেই তাদের আবার সীমান্তে ফিরিয়ে নিয়ে আসতে পারে। কিন্তু ভারতের ক্যান্টনমেন্টগুলি অধিকাংশই সীমান্তের ছয়শ থেকে নয়শ মাইল দুরে। কাজেই ভারতীয় সেনাদের সীমান্তে নিয়ে আসতে অনেক বেশী সময় প্রয়োজন।

 

তিনি বলেন। ভারত সব সময়ই পাকিস্তানের সঙ্গে বন্ধুত্তপূর্ন সম্পর্ক রাখতে চেয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে তাদের কাছ থেকে উল্লেখযোগ্য সাড়া পাওয়া যায়নি।

 

প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ব্যাপারে ভারতের যে উদ্বেগ রয়েছে, সেটা প্রতিবেশী রাষ্ট্রের পক্ষে স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের অর্থণৈতিক ও সামাজিক স্থায়িত্ব ক্ষুণ্ণ করার কুমতলবে পাক শাসকরা পুর্ব বাংলার বিপুলসংখ্যক নাগরিককে ভারতে পালিয়ে আসতে বাধ্য করেছে।

 

 

 

 

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
৫৪। পশ্চিম জার্মান টেলিভিশনে প্রচারিত প্রতিরক্ষামন্ত্রী জগজিবন রামের সাক্ষাতকার দৈনিক স্টেটসম্যান ২৭ অক্টোবর ১৯৭১

 

Razibul Bari Palash

<১২, ৫৪, ১১০১১১>

অনুবাদ

 

পশ্চিম জার্মান টেলিভিশনে প্রচারিত প্রতিরক্ষামন্ত্রী জগজীবন রামের সাক্ষাতকার

২৬ অক্টোবর, ১৯৭১

 

 

সাক্ষাত্কারের উপর একটি রিপোর্ট:

 

প্রশ্নঃ প্রধানমন্ত্রীর অনুপস্থিতিতে ভারত যুদ্ধের কত কাছে?

উত্তরঃ আমাদের উদ্দেশ্য সবসময় শান্তিপূর্ণ ছিল। আমরা যুদ্ধ চাই না। এ কারণে প্রধানমন্ত্রী বিদেশে ব্যস্ত সময় কাটানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। যদি যুদ্ধ আসে তাহলে তার দায় সম্পূর্ণরূপে পাকিস্তানের উপর হবে।

 

 

প্রশ্নঃ সম্প্রতি আপনি বলেছেন: যদি যুদ্ধ হয়, এটা পাকিস্তানের মাটিতে হবে, এবং যাই হোক আমরা লাহোরে সোজা চলে যাব এবং সেখানে যা হবার হবে – আপনি কি মনে করেন যে, এই মন্তব্য দিয়ে, আপনার প্রধানমন্ত্রী আত্মরক্ষামূলক ভঙ্গি বুঝিয়েছেন?

উত্তরঃ ঠিক সেরকম নয়। আমরা সবসময় আত্মরক্ষামূলক। কিন্তু আত্মরক্ষামূলক মানে এই নয় যে, যদি আমাদের দেশ আক্রমণ করা হয়, আমরা শুধুমাত্র সীমান্তে বা আমার মাটিতে বসে থাকব। এর মানে হল যে আমরা হানাদারদের ঠেলে নিয়ে যাব তাদের দেশে। এবং আত্মসমর্পণ করতে তাদের বাধ্য করা হবে। এটার মানে আগ্রাসন নয়।

 

আমি সবসময় বলে যে আমরা যুদ্ধ চাই না। যদি আমরা আক্রান্ত হই অবশ্যই আমরা আমাদের দেশ রক্ষার জন্য লড়াই করব। কিন্তু প্রতিরক্ষা শুধু সীমান্তে যুদ্ধ বা তার সীমানায় ঠেলাঠেলি নয়।

 

 

প্রশ্নঃ বর্তমানে সীমান্তে সৈন্য অবস্থানকে কিভাবে দেখেন?

উত্তরঃ আপনারা পুরো বিতর্কের উৎপত্তি জানেন। আমি জানি না কিভাবে কি ঘটবে না ঘটবে তাঁর জন্য আমরা দায়ী হতে পারি? এটা পূর্ববাংলার সঙ্কট। আমাদের নাক গলানোর কিছু নাই। যদি জেনারেল ইয়াহিয়া খান দুষ্ট চক্রান্ত করে ভারতে প্রায় সাড়ে নয় মিলিয়ন লোক পাঠিয়ে ভারতের অর্থনীতি এবং সামাজিক উত্তেজনা তৈরি না করত তাহলে আমরা এতোটা জড়িত হতাম না।

 

তাছাড়া, তিনি ঘোষণা দেন যে তিনি আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবেন যদি বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধারা পূর্ববাংলার কিছু এলাকা মুক্ত করে ফেলে।

 

এখন যদি মুক্তিযোদ্ধারা নির্দিষ্ট এলাকা মুক্ত করে ফেলে তাঁর জন্য আমরা কেন শাস্তি পাবো? এবং তার ঘোষণা ফলোআপ করার জন্য তিনি সীমান্ত এলাকায় সেনানিবাস থেকে তার সৈন্য পাঠিয়েছেন। এখন, যে কোন দেশের যে কোন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী, এই অবস্থায় তাঁর দেশ এবং সীমানার নিরাপত্তা রক্ষা করার জন্য অবশ্যই ব্যবস্থা নিবে।

 

 

প্রশ্নঃ কীভাবে আপনি পাকিস্তানীদের সাথে আপনার কমান্ডের অধীনে সেনাবাহিনীর শক্তির তুলনা করবেন?

উত্তরঃ ভারতের যুদ্ধ শক্তি পাকিস্তানের চেয়ে অনেক অনেক গুন বেশী।

 

 

প্রশ্নঃ যুদ্ধ লাগলে কতদিন স্থায়ী হবে বলে আপনি মনে করেন?

উত্তরঃ এসব বিষয়ে বলা খুব কঠিন। বর্তমান যুগে কোনো নিষ্পত্তিমূলক যুদ্ধ খুঁজে পাওয়া মুশকিল। যুদ্ধ চলতে থাকে এবং বিশ্বের ক্ষমতাধররা এসে যুদ্ধবিরতির জন্য চেষ্টা করে।

 

 

প্রশ্নঃ কীভাবে আপনি সীমান্ত পরিস্থিতি মূল্যায়ন করবেন?

উত্তরঃ দুই দেশের সেনারা সীমান্তের উভয় পাশে জমা হচ্ছে। একথাও ঠিক যে, সীমান্ত পরিস্থিতি ভয়াবহ, এবং আমি বলতে পারি পাকিস্তানি সেনাদের ব্যাপক কার্যক্রমের জন্য আমরা আমাদের সৈন্য রাখতে বাধ্য হয়েছি। যখন সৈন্যরা সীমানা জুড়ে একে অপরের মুখোমুখি হয়, তখন অবস্থা গুরুতর হয়।

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
৫৫। অস্ট্রীয় বেতারে প্রচারিত প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাতকার ভারত সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ২৭ অক্টোবর ১৯৭১

 

Razibul Bari Palash

<১২, ৫৫, ১১২১১৩>

অনুবাদ

 

অস্ট্রিয়ান রেডিওতে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সাক্ষাত্কার

২৭ অক্টোবর ১৯৭১

 

 

প্রশ্নঃ অস্ট্রিয়া এবং বিশ্ব সফরে আপনার প্রত্যাশা কি?

উত্তরঃ শুধু বোঝাপোড়া ও বন্ধুত্বের প্রত্যাশা।

 

প্রশ্নঃ ভারত ও পাকিস্তান যুদ্ধের দোরগোঁড়ায়। ভিজিট অসফল হলে কি করবেন?

উত্তরঃ আচ্ছা, আমি আগেই বলেছি যে আমি শুধু ইউরোপীয় পরিস্থিতি বুঝতে এসেছি। পাশাপাশি নেতাদেরকে আমি ভারত ও এশিয়ার পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারনা দিতে এসেছি। সুতরাং, সাফল্য বা ব্যর্থতার কোন প্রশ্নই ওঠে না। আমি শুধু এটুকু বলতে চাই যে আমি কোন লক্ষ্য নিয়ে আসিনি।

 

প্রশ্নঃ আপনার মতে কীভাবে একটি সশস্ত্র সংঘাতের পথ পরিহার করা যায়?

উত্তরঃ পূর্ববাংলার পরিস্থিতি রাজনৈতিকভাবে নিষ্পত্তি করতে হবে – যা সেখানকার মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য এবং পূর্ববাংলার নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে গ্রহণযোগ্য।

 

প্রশ্নঃ শরণার্থীদের প্রত্যাবাসন করাতে ভারত ও পাকিস্তানের মাটিতে স্টেশন করার জন্য ইউ.এন. এর প্রস্তাব পাকিস্তান গ্রহন করলেও ভারত কেন করেনি?

উত্তরঃ প্রথমত, আমরা জাতিসংঘের হাই কমিশনারের কাছ থেকে ১০ জন পেয়েছি যারা ইতিমধ্যে ভারতে শরনার্থি ক্যাম্প ও সীমান্ত পরিদর্শন করেছেন। দ্বিতীয়ত, যদি ভারতে আসেন তাহলে তাদের কাজ কি হবে? তাদের আগে আরও শরনার্থি অনুপ্রবেশ বন্ধ করার ব্যাবস্থা নেয়া উচিৎ যা প্রতিদিন ৩০ থেকে ৪২ হাজার। তাদের কাছে জানা যাচ্ছে হাজারো ভোগান্তির নির্মম ঘটনা। তাই কেউ এই বিষয়ে আগ্রহ দেখালে তার প্রথম কাজ হওয়া উচিৎ ভারতে উদ্বাস্তুর আরও অন্তঃপ্রবাহ প্রতিরোধ করা। তারপরই শুধুমাত্র পরবর্তী ধাপ বিবেচনা করতে পারেন।

 

প্রশ্নঃ দ্য ব্রিটিশ সানডে পত্রিকা “অবজার্ভার” আপনাকে ধারালো নখের সঙ্গে একটি ঘুঘু ডেকেছেন। পূর্ব পাকিস্তানের অবস্থার অবনতি হলে আর কি ঘটবে? সেখানে কি দুর্ভিক্ষ হবে? কী হবে আর কী অবস্থা হবেনা সেটা বড় নয় – এ অবস্থা ভারতের জন্য অসহনীয় হবে।

উত্তরঃ পরিস্থিতি খুব ভয়াবহ। কারণ আমরা মনে করি যে এটি আমাদের স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি। আমরা সমস্যার সমাধান হিসেবে যুদ্ধ বিশ্বাস করি না। আমরা দ্বন্দ্ব প্রতিরোধ করার জন্য যতদূর সম্ভব সবকিছু করব। কিন্তু আমাদের জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তা রক্ষা করার ক্ষেত্রে কোন ছাড় দেয়া হবেনা।

 

প্রশ্নঃ এর প্রায় তিন মাস আগে একটি চুক্তি হয় ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়ন-এর মধ্যে। এবং এই চুক্তিতে অবিলম্বে ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য আক্রমণ বা আক্রমণের হুমকি নিয়ে আলোচনা ও চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর মানে কি এই যে, ভারতের নিরপেক্ষতার ঐতিহ্যগত নীতি এখন বিলুপ্ত হয়েছে?

উত্তরঃ আমাদের অস্ট্রিয়ার মত নিরপেক্ষ নীতি ছিলনা। আমরা জোটনিরপেক্ষ, অর্থাৎ একটি নীতি অব্যাহত আছে। আমরা বিশ্বাস করি যে আমাদের বিষয়ে আমাদের সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতা আমাদের আছে। আমরা আন্তর্জাতিক বিষয়ক ব্যাপারে যথার্থতা বিচার করে এবং দেশের স্বার্থ ও বিশ্ব শান্তি বিবেচনা করে এগিয়ে যাব। আমি মনে করি না সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে এই চুক্তির ফলে আমাদের স্বাধীনতার উপর কোন প্রভাব পড়বে।

 

 

 

 

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
৫৬। ভিয়েনায় রাষ্ট্রীয় ভোজসভায় প্রদত্ত প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের সারাংশ ভারত সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ২৭ অক্টোবর ১৯৭১

 

Razibul Bari Palash

<১২, ৫৬, ১১৪>

অনুবাদ

 

ভিয়েনায় রাষ্ট্রীয় ভোজসভায় প্রদত্ত প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ

২৭ অক্টোবর ১৯৭১

 

 

কিছু বিশেষ অংশ নিম্নে বর্নিত হল –

 

ভারতের যাত্রা সহজ না, কিন্তু কঠিন ধাপ বেয়ে বেয়েই আমরা এগিয়ে গিয়েছি। আজ আমাদের অন্যান্য সমস্যা আমাদের সীমান্তের ঘটনার কাছে ম্লান হয়ে গেছে। অস্ট্রিয়ার উদ্বাস্তুদের সঙ্গে ডিল করার অভিজ্ঞতা আছে। সুতরাং, আপনারা বুঝবেন যে অস্ট্রিয়ার নিজস্ব জনসংখ্যার সমান আকারের শরনার্থি প্রবেশ করলে কি কি সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে। কিন্তু উদ্বাস্তুদের সমস্যা একটি আনুষঙ্গিক সমস্যা মাত্র। কারণ খুঁজলেই জানা যাবে কেন এত মানুষ তাদের বাড়ি ছেড়ে ছাউনিতে আশ্রয় নিচ্ছে। তাঁদের অনেকেই, ভারী বর্ষণের সময় গাছের নীচে বসে থাকতে বাধ্য হয়। ভারতীয় ঐতিহ্য অনুযায়ী তাদের থাকার যথাসাধ্য ব্যাবস্থা করা হয়েছে। যাইহোক, আমরা এটিকে স্থায়ী হিসেবে মেনে নিতে পারিনা।

 

এই মুহূর্তে, আমাদের প্রধান চিন্তার বিষয় হল আমাদের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা; শরনার্থি নয়। ভারতের জনগণ অস্ট্রিয়া থেকে যে সহানুভূতি এবং সমর্থন পেয়েছে তাঁর জন্য কৃতজ্ঞ। আমাদের আন্তরিক ইচ্ছা যে অস্ট্রো-ভারতীয় সম্পর্ক বছরের পর বছর ধরে বজায় থাকবে। আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি বা অভ্যন্তরীণ বিষয়ে সমস্যা হতে পারে। আমাদের নিজস্ব অভিজ্ঞতা হল যখনই আমরা একটি সমস্যা সমাধান করতে যাই তখন আরও ১০ টা এসে হাজির হয়। কিন্তু আমরা মনে করি এটা জীবনের অংশ এবং আমরা মনে করি যে প্রতিটি সমস্যা আমরা নিজেরাই মুখোমুখি হয়ে সমাধান করতে পারব।

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
৫৭। ভিয়েনায় অস্ট্রিয়ান সোসাইটি ফর ফরেন পলিসি এন্ড ইন্টারন্যাশনাল রিলেশন্স এ প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতার সারাংশ ভারত সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ২৮ অক্টোবর ১৯৭১

 

Razibul Bari Palash

<১২, ৫৭, ১১৫১১৬>

অনুবাদ

 

 

ভিয়েনায় অস্ট্রিয়ান সোসাইটি ফর ফরেন পলিসি এন্ড ইন্টারন্যাশনাল রিলেশন্স এ প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতার সারাংশ, ২৮ অক্টোবর, ১৯৭১

 

আপনারা জানেন গত সাত মাস ধরে আমাদের সীমানায় গুরুতর অবস্থা চলছে। সম্ভবত আপনারা জানেন যে পাকিস্তানের দুই অংশ ভারতীয় অঞ্চলের হাজার হাজার মাইল দ্বারা ভাগ করা। পরিস্থিতি সৃষ্টি হবার কারণ পূর্ব বাংলার জনগণের বৈধ অধিকারকে সময় মত মূল্য না দেয়া। যখন নির্বাচন সংঘটিত হয় শেখ মুজিবুর রহমান আওয়ামী পার্টির নেতা ছিলেন। তখন একটি ছয় দফা কর্মসূচি ছিল। এতে তারা পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসন চেয়েছিল, স্বাধীনতা নয়। তারা ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত রাখতে চেয়েছিল। কারণ পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনীতি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যেহেতু এই বাণিজ্য বন্ধ ছিল তাই তারা চেয়েছিল ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য।

 

এই দফা প্রকাশ্য ছিল এবং এই দফার ভিত্তিতে নির্বাচন হয়। কেউ বলতে পারবেনা যে এখানে কিছু গোপন করা হয়েছিল। কিন্তু যখন শেখ মুজিবুর রহমান সংখ্যাগরিষ্ঠভাবে জয়ী হন তখন শোষক সরকার এটাকে ভালভাবে নেয় নি।

 

আরও একটি জিনিস আমি বলতে চাই। এই সংখ্যালঘুর প্রশ্ন না। সম্পূর্ন পাকিস্তানকে এক ধরলে পূর্ববাংলার জনগণ সংখ্যাগরিষ্ঠ। কিন্তু সরকার স্বাভাবিক গণতন্ত্রের পরিবর্তে আলোচনার নামে আরও সৈন্য আনে এবং সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে যা বিশ্ববাসী দেখছে। পূর্ববাংলার জনগণ তাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নিচ্ছে। তাদের সমগ্র জনসংখ্যার প্রায় ১৩ শতাংশ ঘর ছেড়ে চলে যাচ্ছে। শরণার্থী ও নিহতদের মধ্যে হিন্দু, মুসলমান, খ্রিস্টান ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী লোক আছে। শুরুতে বিশেষ বিশেষ লোকদের – যেমন পণ্ডিত লেখক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক হত্যা করা হয়। ২৫ মার্চ রাতে বৃহস্পতিবার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি বিশেষ আক্রমণ করা হয় এবং ৩০০ জনেরও বেশি লোক-ছাত্র, অনুষদ সদস্য এবং অন্যান্য দের নিহত করা হয়েছিল।

 

শত শত বছর ধরে ভারত উদ্বাস্তুদের আশ্রয় দিয়েছে – কিন্তু এবার তাঁর সংখ্যা ও প্রবেশের হার অনেক বেশী। তাই সমস্যার আকার এবং চরিত্র ভিন্ন। আমাদের দেশে সৃষ্ট উত্তেজনা – রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক – সব দিক থেকে সৃষ্টি হয়েছে। এটি আমাদের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্যও হুমকি স্বরূপ।

 

আমাদের উন্নতিতে আমাদের জনগণের অধৈর্য শাণিত হয়েছে। এটা সত্য নয় যে গরীবরা আরও গরীব হয়েছে – তাদেরও কিছুটা উন্নতি হয়েছে। কিন্তু এটা সত্য যে তারা তাদের দারিদ্র্যকে অনেক সূক্ষ্মভাবে দেখে। তাই তারা আর অপেক্ষা করতে প্রস্তুত নয়। আমরা সমাজতন্ত্রের পথে চলে যাব কারণ আমার মনে হয় অর্থনৈতিক বৈষম্য থাকলে সত্যিকারের গণতন্ত্র হতে পারে না। এমনকি সংবিধান সমান অধিকারের কথা বললেও জনগণ এর থেকে লাভবান হতে পারবে না। তাই ভারত যদি তার স্থায়িত্ব বজায় রাখতে না পারে তাহলে এটা পূর্ব এশিয়ার জন্য এমনকি বিশ্বের শান্তির জন্যও হুমকি। অনেক দেশের সরকার এবং সংসদীয় নেতাদের বিষয়টি বোঝানো হয়েছে কিন্তু অনেকে অভিনয় করছেন, বলা যায় কিছুটা অন্তর্দৃষ্টির অভাব।

 

আমি অস্ট্রিয়াতে যে বোঝাপড়া ও সমবেদনা পেয়েছি তার জন্য কৃতজ্ঞ। অনেক সাধারণ মানুষ, একজন মহিলা যিনি শাকসবজি বিক্রি করেন, অনেক শিশু, এরকম বিভিন্ন গ্রুপ, আমার কাছে এসেছেন তাদের সহানুভূতি প্রকাশ করার জন্য এবং এমনকি ছোট ছোট অনুদান দিতেও। আমি এই সহানুভূতির জন্য কৃতজ্ঞ এবং যে সব মানুষ এই কঠিন সময়ে বন্ধুত্বের হাত প্রসারিত করেছেন তাদের অনেক ধন্যবাদ জানাচ্ছি। এটাই বিশ্বের শান্তির ভিত্তি: যখন অন্যরা সমস্যায় পরে আমরা আমাদের নিজস্ব ক্ষমতা অনুযায়ী সাহায্য করার চেষ্টা করি।

 

 

 

 

 

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
৫৮। যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়া হলে অবস্থার মোকাবিলায় ভারত প্রস্তুত – অর্থমন্ত্রি চ্যাবনের মন্তব্য দৈনিক আনন্দবাজার ২৮ অক্টোবর ১৯৭১

 

Aparajita Neel

<১২, ৫৮, ১১৭>

 

উদ্বাস্তুরা ফিরে যাবার সঙ্গে সঙ্গে নতুন করগুলি প্রত্যাহার করে নেয়া হবে

চ্যাবন

(দিল্লী অফিস থেকে)

 

২৮ অক্টোবর- কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রি শ্রী ওয়াই বি চ্যাবন আজ এখানে প্রেস ক্লাব অফ ইন্ডিয়ায় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় সুস্পষ্টভাবে জানান যে, নতুন যেসব কর ধার্য করা হয়েছে তা সম্পূর্ণ সাময়িক, পূর্ব বাংলার উসবাস্তুরা স্বদেশে ফিরে যাবার সঙ্গে সঙ্গেই তা প্রত্যাহার করে নেয়া হবে। তিনি বলেন, সত্যি কথা বলতে কি, এই নতুন কর ধার্যের উদ্যেশ্য কেবল অতিরিক্ত অর্থ সংগ্রহ করাই নয়, দেশবাসীকে সংকট সম্পর্কে অবহিত করাও।

 

শ্রী চ্যাবন বলেন, সরকারের বাজেটের হিসাব অনুযায়ী উদ্বাস্তুদের ডিসেম্বর মাসের মধ্যেই স্বদেশে ফিরে যাবার কথা। সেই সময় পর্যন্ত তাদের ভরন-পোষণের জন্য মোট ৪৫০ কোটি টাকার দরকার। যদিও ভারত একটা আন্তর্জাতিক ট্রাস্ট হিসেবে উদ্বাস্তুদের ভরন পোষণের দায়িত্ব নিয়েছে, বাইরে থেকে যে সব সাহায্য আসছে তা অত্যন্ত কম। এমনকি প্রতিশ্রুত ১২৫ কোটি টাকার মধ্যে মাত্র ৩০ কোটি টাকার মত সরকারের হাতে এসেছে।

 

শ্রী চ্যাবন স্বীকার করেন যে, পূর্ব বাংলা থেকে বিরাট সংখ্যক উদ্বাস্তু আগমনের ফলে ভারতের অর্থনিতির উপর প্রচণ্ড চাপ পড়েছে এবং তার অর্থণৈতিক চিত্র কিছুটা বিকৃত হতে চলেছে। দৃষ্টান্ত স্বরূপ এই সমস্যার ফলে মুদ্রাস্ফীতি প্রবণতা দেখা দিয়েছে এবং তা দ্রব্যমূল্যের উপর প্রতিফলিত হয়েছে।

 

উদ্বাস্তুরা ডিসেম্বর মাসের মধ্যে ফিরে যাবে বলে কেন তিনি মন্তব্য করেছেন শ্রী চ্যাবন তা স্পষ্ট করে কিছু বলেন নি। এবং যদি ঐ সময়ের মধ্যে উদ্বাস্তুরা ফিরে যেতে না পারে তাহলে সরকার কি করবেন তাও তিনি বিশদভাবে প্রকাশ করতে অস্বীকার করেন। তার মতে, পরিস্থিতি ক্রমশ দানা বাধছে। তবু তিনি সংকট নিরসনে ভারতের তড়িঘড়ি কোন ব্যাবস্থা গ্রহণের সম্ভবনা বাতিল করে দেন।

 

তিনি বলেন আমরা যুদ্ধ চাইনা। তিনি আরও বলেন, সশস্ত্র সংঘর্ষ এড়াতে ভারত কোন চেষ্টাই বাদ রাখবেনা। তবে আমাদের উপর যদি যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়া হয় তা আমরা সেই জরুরী অবস্থা মোকাবিলা করার জন্য প্রস্তুত। সঙ্গে সঙ্গে তিনি একথাও স্মরণ করিয়ে দেন যে, যুদ্ধ যদি বাঁধে তাহলে আমাদের অর্থনীতির উপর আরও চাপ পড়বে।

 

জাতীয় অর্থনিতির চিত্রণে শ্রী চ্যাবন বলেন, উদ্বাস্তু আগমনের ফলে আমদের অর্থনিতির উপর প্রচণ্ড চাপরা সত্ত্বেও সরকার সামাজিক ও বৈষয়িক উভয় প্রকার উন্নয়নমূলক পরিকল্পনায় অগ্রসর হতে কৃতসংকল্প। এই সব ক্ষেত্রে কোন রকম ছাটাই হবেনা। শিল্পক্ষেত্রে অচলাবস্থা দেখা দেওয়ায় অর্থমন্ত্রি কিছুটা অসন্তোষ প্রকাশ করেন। শিল্পোৎপাদন বৃদ্ধি মোটেই সন্তোষজনক নয়। সরকার ইতিমধ্যেই এই সমস্যা বিচার করে দেখেছেন। শিল্প ক্ষেত্রে বর্তমান আচলাবস্থার কারণ নির্নয়ের উদ্যেশে পরিকল্পনা কমিশন সারাদেশে একটা অনুসন্ধান শুরু করেছেন। কারণ নির্নিত হবার পর অবস্থার উন্নতির জন্য সংশোধনী ব্যাবস্থা গ্রহণ করা হবে।

 

শ্রী চ্যাবন নিশ্চিত, এই ব্যাবস্থা যদি সফল করা যায় তাহলে বর্তমান যে মূল্যরেখা উর্ধগতি হয়েছে সরকার তাঁকে ঘরে রাখতে সমর্থ হবেন। কারণ প্রাকৃতিক বিপর্যয় সত্ত্বেও কৃষি উৎপাদনের সামগ্রিক চিত্র ভালোই রয়েছে। তবে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে সরকারের হিসাব কিছু বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। দৃষ্টান্তস্বরূপ, বন্যা ও খরা ত্রাণে বাজেটে মাত্র ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছিল। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকার এ পর্যন্ত বিভিন্ন রাজ্যকে মোট প্রায় ১৫০ কোটি টাকা দিয়েছেন। এর ফলেও আমাদের অর্থনিতির উপর কিছুটা বাড়তি চাপ পড়েছে।

 

যাই হোক, ভালোভাবে অর্থ সংগ্রহ করে এবং ব্যয় হ্রাস করে বিশেষ করে পরিকল্পনা বহির্ভুত বিষয়ে – সরকার পরিস্থিতি সামলে নেবেন বলে আশা করছেন। এ কাজে রাজ্য সরকারগুলির সাড়াও উতসাহব্যাঞ্জক।

 

আবার সরকার আবশ্যিক দ্রব্যগুলির বিলি বণ্টনের মূল ব্যাবস্থাগুলি ঠিক করে রাখবেন যাতে প্রয়োজন হলে কোন কোন ক্ষেত্রে কন্ট্রোল প্রবর্তন করা যায়। তবে এই মুহুর্তে সরকার কন্ট্রোলের কথা ভাবছেন না।

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
৫৯। লন্ডনস্থ ইন্ডিয়া লীগ এ প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের সারাংশ ভারত সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ৩১ অক্টোবর ১৯৭১

 

Razibul Bari Palash

<১২, ৫৯, ১১৯১২৩>

অনুবাদ

 

লন্ডনস্থ ইন্ডিয়া লীগ এ প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের সারাংশঃ

লন্ডন, ৩১ অক্টোবর ১৯৭১

 

বন্তব্যের চুম্বক অংশ নিম্নরূপঃ

 

আপনারা সবাই জানেন যে নির্বাচনের আগে, দলীয় বিভক্তির আগে, ভারতে মারাত্মক খারাপ একটি খরা হয়েছে। বিদেশী সংবাদপত্র ছাপিয়েছিল “ভারত কি টিকবে? ভারতের গণতন্ত্র কি টিকবে? ’’ আমরা মারাত্মক ভুল বোঝাবুঝি এবং সমালোচনার স্বীকার হই। যখন আমরা স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করি – প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছিল: ‘আমরা কি অহিংসা দিয়ে স্বাধীনতা জয় করতে পারি? ” তখন প্রশ্ন তোলা হয়েছিল “এত নিরক্ষরতা নিয়ে এমন একটি বিশাল দেশ গণতান্ত্রিক হতে পারে? ” আমরা পাঁচটি নির্বাচনে প্রমাণ করে দিয়েছি যে গণতন্ত্র কাজ করতে পারে এবং গণতন্ত্র ভারতে গভীর শিকড় দিয়ে বিস্তৃত। গণতন্ত্র একটি শিক্ষামূলক প্রক্রিয়া। কারণ প্রতি নির্বাচনে ভারতীয় জনগণ পরিপক্বতা লাভ করে। আমি বলতে পারব না যে সবাই বিজ্ঞতার সাথে ভোট দেয়। কিন্তু যদিও সেখানে মানুষ অপপ্রচারে বিভ্রান্ত করে তাদের ঐ সংখ্যাটা তেমন বড় হয়না।

 

এই ছিল ভারত পরিস্থিতি যখন আমরা আমাদের নতুন সংসদ গঠন করি। আমরা উচ্চ আশা নিয়ে এসেছি; ভারতের সমগ্র জনগণের আশা নিয়ে। আমরা কিছু প্রোগ্রাম হাতে নেই। কিন্তু এক সপ্তাহ পরে একটি খুব বড় বোঝা আমাদের উপর আসে। এবং এটি আমাদের সীমানা জুড়ে স্থান নেয়। এতে আমাদের জীবনযাপন বিঘ্নিত হচ্ছে। কিন্তু এটা তার চেয়েও আসলে বড় কিছু। আমি দেখেছি ইংল্যান্ড এবং অন্যান্য দেশে যেখানে আমি পরিদর্শন করেছি; সেখানে এই সীমান্ত পরিস্থিতি সমস্যা নেই বল্লেই চলে। আমি বলতে চাই ৯০০০০০০ সংখ্যাটা মোটেই ছোট নয়। এবং অবশ্যই একসাথে এই অতিরিক্ত মানুষের দেখাশোনা করা সহজ কাজ নয়। কিন্তু বাংলাদেশের সমস্যা নিছক ভারতের উদ্বাস্তু সমস্যা নয়। এটা একটি গভীর সমস্যা এবং নানাভাবে আমাদের প্রভাবিত করে। শরণার্থীদের সমস্যা আমাদের জন্য বড় সমস্যা, কারণ তারা একটি বিশাল অর্থনৈতিক বোঝা। তারা সামাজিক সমস্যা, রাজনৈতিক সমস্যা সৃষ্টি করেছে ও সর্বোপরি নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা ও ভারতের অখণ্ডতা প্রশ্নে আমরা জর্জরিত। আমাদের দেশের বাইরে যা ঘটছে সেটা নিয়েও আমরা সমানভাবে উদ্বিগ্ন। বিশ্ব দেখতে পাচ্ছে কিরমকম নৃশংসতা ও বর্বরতা চলছে যা আমরা শুনেছি শরণার্থীদের কাছ থেকেও – যা রোজ রোজ বাড়ছে নতুন মাত্রায়।

 

যখন আমি ভারত লীগের জন্য কাজ করছিলাম আমাদের প্রধান চিন্তার বিষয় হল ভারত-এর স্বাধীনতা। কিন্তু তখন ইউরোপে কি ঘটছে সে সম্পর্কে কম উদ্বিগ্ন ছিলাম। কারণ তখন স্পেনীয় গৃহযুদ্ধ ছিল বেশী গুরুত্তপূর্ণ। সে সময় ফ্যাসিবাদ এবং নাত্সিবাদ ইউরোপে শক্তি লাভ করছিল। ভারত লীগ তখন এই সব আন্দোলন সম্পর্কে সজাগ ছিল। আমরা মনে করি মানবতা যেখানে নিষ্পেষিত সেখানেই মানব জাতির পরাজয়।

 

আজ বাংলাদেশের সমস্যা একই। প্রতিটি মানুষ যারা স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে, যারা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে, মৌলিক মানবাধিকারে বিশ্বাস করে – তাদের এটি অনুধাবন করা উচিৎ। অবশ্য যেখানে মানবাধিকার নেই সেখানে কোন গণতন্ত্র হতে পারে না। আমি, অথবা ভারত সরকার, অথবা ভারতের মানুষ, কখনোই পাকিস্তান বা পাকিস্তানের জনগণের বিরুদ্ধে নই। আমরা সবসময় তাদের ভাল চাই কারণ আমরা বিশ্বাস করি এটা আমাদের স্বার্থ যে আমাদের প্রতিবেশী দেশে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও অগ্রগতি বজায় থাকুক। আমরা জানি যে, ঠিক যেমন আমাদের প্রধান সমস্যা দারিদ্র্য ও বৈষম্য তেমনি এটি পাকিস্তানেরও সমস্যা। আমরা গভীরভাবে সেখানে মানুষের মঙ্গলের বিষয়ে উদ্বিগ্ন। কিন্তু আমরা যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা, সমৃদ্ধি ও অগ্রগতির কথা বলি তা শুধুমাত্র আসতে পারে সেখানকার মানুষের চাওয়ার মূল্যায়ন করা হলে। যেখানে আমাদের মানুষ অবহেলিত ও অনগ্রসর সেখানেই আমাদের কাজ করতে হবে। আমরা জানি যে, এটা যাদুর মত মুহুর্তেই সমাধান করা যাবেনা। তবে এই অনুযায়ী আমাদের কাজ করতে হবে। কিন্তু এর জন্য আমাদের প্রতিটি এলাকায় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে এবং জনগণের ন্যায়সঙ্গত ক্ষোভ দূর করতে হবে। মানুষকে নিজেদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পরিবেশ দিতে হবে এবং তাদের উন্নয়ন কর্মসূচিকে এগিয়ে দিতে হবে। এটাই গণতন্ত্র। এর জন্য মানুষ আমাদের ভোট দেয়। কিন্তু তাদের সব প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করা উচিত যাতে গণতন্ত্র কাজ করে এবং মানুষের জন্য উন্নত জীবন এনে দিতে পারে।

 

আমাদের নির্বাচনের আগে সমগ্র পাকিস্তানে নির্বাচন ছিল। সেখানে কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আমাদের কোনো চুক্তি ছিল না। কিন্তু আমরা অনেক মানুষের কাছ থেকে শুনেছি আওয়ামী লীগের নির্বাচনে জয়লাভ করার সম্ভবনা ছিল। আমরা দেখতে পেলাম একটি অসাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে তারা জয়ী হয়। এত বড় জয় হবে তা আমাদের ধারণার বাইরে ছিল। আমার মনে হয় সমস্ত বিশ্বে কোন গণতান্ত্রিক নির্বাচনে এটিই সর্বচ্চ জয়। যখন আমাদের দেশে নির্বাচন হয় স্বয়ংক্রিয় ভাবে যে দল জিতে তার নেতা প্রধানমন্ত্রী হন। কিন্তু সীমান্ত জুড়ে ভিন্ন ঘটনা চলছিল। এটি একটি অত্যন্ত দুঃখজনক এবং ভয়ানক দিকে মোড় নেয়। আমাকে বলা হয়েছে যে, ২৪ মার্চ বাংলাদেশের নেতাদের সাথে যে কথা হয়েছিল তার বাইরেও কিছু একটা হতে যাচ্ছে। পরে দেখা গেল এটি ছিল মূলত সমুদ্র পথে সৈন্য আনার জন্য কালক্ষেপণ। তারা মূলত ২৫ মার্চের জঘন্যতার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল। গণহত্যার শুরু হয় বুদ্ধিজীবীদের দিয়ে। প্রথম হামলা ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং একটি বৃহৎ সংখ্যা, আমি বিশ্বাস করি প্রথম দিনে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার ছাত্র, অধ্যাপকদের সহ ৩০০ জনেরও বেশি লোক হত্যা করা হয়।

 

এরপরে ভারতে বন্যার পানির মত মানুষ আসতে শুরু করল – পরিমাণ এত বেশী ছিল যে সমস্ত বিশ্ব এর আগে এমনটি পরখ করেনি। ভারত উদ্বাস্তুদের আশ্রয়স্থল হিসাবে ব্যাবহ্রিত হয়। এটা আমাদের জন্য একটা নতুন ঘটনা নয়। নতুন জীবন খুঁজে পেতে যারা আমাদের দেশে এসেছে তাদের সাহায্য করার জন্য আমাদের দরজা ঐতিহ্যগতভাবে খোলা রয়েছে প্রায় শত বছর ধরে এটা আমাদের রীতি। কিন্তু যদি কয়েক সপ্তাহের মধ্যে লক্ষ লক্ষ লোক আসে তখন ভারতের মতো একটি বিশাল দেশও তা পরিচালনা করতে পারবেনা। আমাদের জায়গা, টাকা বা উপকরণ কোনটাই নেই। তাই আমরা বাইরে থেকে আসা সাহায্যকে স্বাগত জানাই। কিন্তু, আমি আগেই বলেছি, সাহায্য করতে গিয়ে বিশ্ব যেন ভুলে না যায় যে কেবল মাত্র উদ্বাস্তুদের সাহায্য করাই মূল সমস্যার সমাধান নয়। উদ্বাস্তুদের সাহায্য মানে ভারতকে সাহায্য করা নয়। আবার এটি বাংলাদেশের জন্যও সাহায্য নয়। কারণ আমরা শরণার্থীদের ফেরত পাঠাতে চাই, এবং আমরা সম্পূর্ণরূপে সচেতন যে তারা এই মুহুর্তে সম্ভবত ফিরে যেতে পারবেনা। আরো শরণার্থী আসা বন্ধ করতে হবে। তাদের পরিমাণ এখন ৯০০০০০০ এর অধিক এবং প্রতিটি দিন আরও ৩০ থেকে ৪০০০০ নতুন উদ্বাস্তু আসছে। বেশিরভাগ তথ্য আমরা তাদের কাছ থেকেই পাই।

 

তাই আমাদের এমন অবস্থা সৃষ্টি করতে হবে যাতে আরও মানুষ নিজেদের বাস্তুভিটা ছেড়ে যেতে বা চায়। এরপর দ্বিতীয় ধাপে আমরা যারা ইতিমধ্যে এসে পড়েছে তাদের যেতে বলতে পারি। প্রশ্ন হল এই মুহুর্তে এটা সম্ভব কিনা – উত্তর হল অবশ্যই না। আমাদের বলা হল জাতিসংঘ থেকে পর্যবেক্ষক গ্রহণ করা। কিন্তু এতে খুব বেশি পার্থক্য হবেনা। সম্ভবত আপনারা জানেন ইতোমধ্যে এখানে তাদের ১০ জন আছে। জাতিসংঘের হাই কমিশন থেকে আসা দশ জন পর্যবেক্ষক আমাদের আছে এবং তারা সেখানে শুরু থেকে আছে। আমাদের লুকানোর কিছু নেই। সীমান্ত, সেইসাথে ক্যাম্পে সব বিদেশী সংবাদদাতারা আছেন। তাদের জন্য সেগুলো সব সময় খোলা থাকে। আপনারা যারা ইংল্যান্ডে বসবাস করছেন তারা ব্রিটিশ সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবর দেখেছেন। এবং সম্ভবত আপনারা জানেন যে অনুরূপ রিপোর্ট আমেরিকান পত্রিকায় প্রকাশিত হচ্ছে। ইউরোপের অনেক দেশ এবং বিশ্বের অন্যান্য অংশেও এসব খবর যাচ্ছে। সুতরাং সেখানে যে সংস্করণটি বেরিয়ে আসছে সেটি ভারতীয় সংস্করণ নয়। এটা প্রত্যক্ষদর্শী যারা নিজেরা এই ঘটনা দেখেছ তাদের সংস্করণ। বস্তুত, আমাদের অধিকাংশ তথ্যও এই সব মানুষের কাছ থেকে পাচ্ছি। প্রকৃতপক্ষে সেখানকার উদ্বাস্তু এবং সেইসব মানুষ ছাড়া আমাদের নিজস্ব তথ্য সংগ্রহ করার আর কেউ নেই।

 

এটা আমাদের জন্য খুবই মারাত্মক সমস্যা। এটা নিছক ভারত-এশিয়ার উদ্বেগ নয় বরং এটি পুরো বিশ্বের উদ্বেগ। সবাই আজ আমাদের বলার জন্য ব্যস্ত যে আমাদের সংযম প্রদর্শন করতে হবে। আমি মনে করি না যেকোনো ব্যক্তি বা কোনো সরকার আমাদের চেয়ে বৃহত্তর সংযম দেখাতে পারবে। তাছাড়া আমাদের উস্কানী ও দেয়া হচ্ছে এবং আমাদের নিরাপত্তা হুমকির মুখে এবং আমাদের তা দূর করতে হবে। কিন্তু সংযম আমাদের কি দিচ্ছে? এতে কোন সমাধান তো হচ্ছেনা। বরং আমাদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, প্রশাসনিক অবস্থা দিনে দিনে খারাপ হচ্ছে।

 

লোকজন আমাকে জিজ্ঞাসা করে কতদিন ভারত এভাবে চালাতে পারবে? আসলে সেই তারিখ আগেই গত হয়ে গেছে। আমি মনে করি যে, আমি একটি আগ্নেয়গিরির উপরে বসে আছি এবং আমি সত্যিই জানিনা কখন এটি বিস্ফোরণ হতে যাচ্ছে। তাই আমরা কিভাবে সংযত থাকব সেটি এখন প্রশ্ন নয়। বরং সীমান্তজুড়ে কি ঘটবে সেটাই এখন প্রশ্ন হওয়া উচিৎ। আমরা মনে করি এই যে একটি উপায় খুঁজে পাওয়ার ব্যাপারে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্ব আছে। একথাও ঠিক যে, সবচেয়ে ভালো উপায় হলো, মানবিক পথ, রাজনৈতিক সমঝোতা এবং রাজনৈতিক নিষ্পত্তির চেষ্টা এবং এটা হতে পারে শুধুমাত্র বাংলাদেশের জনগণের নির্বাচিত নেতাদের সাথে গ্রহণযোগ্য পদক্ষেপেরে মাধ্যমে।

 

এটা আমার কাছে খুব অদ্ভুত মনে হয় এমন পরিস্থিতিতে হঠাৎ কিছু নির্বাচিত ব্যক্তিকে নিখোঁজ করে দিলেই নাকি পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যাবে যেখানে তাদের অস্তিত্ব বিশ্বজুড়ে। আপনি হঠাৎ যদি বলেন যে আপনি নতুন নির্বাচন দেবেন এবং তাতেই সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে – কিন্তু আসলে তা হবেনা। নির্বাচন যখন হয়েছিল তখন তা অবৈধ হিসেবে গণ্য করা হয়নি। এবং নির্বাচন একই সরকারি কর্তৃপক্ষের অধীনে হয়েছে। তারা একটি ছয় দফা কর্মসূচি দিয়েছে যা উভয় পাকিস্তান এর লোকদের দ্বারা সমর্থিত ছিল। কেউ তাতে আপত্তি করেনি। কিন্তু তারা আপত্তি উত্থাপন করেছে যে তারা ৬ দফা মানেনা।

 

আজ ভারত খুবই গুরুতর পরিস্থিতির মুখোমুখি। সত্যি বলতে, আমি জানিনা এটা কিভাবে মোকাবেলা করব। আমি শুধুমাত্র দেখতে পাচ্ছি যে দিন দিন পরিস্থিতি খারাপ হচ্ছে। সঙ্কট আরও তীব্র হয়ে উঠছে। ভারত একটি দেশ যা সবসময় যুদ্ধের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে গেছে। আমরা সব সময় বিশ্বাস করি সমস্যা ও বিরোধ আপস এবং আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা যেতে পারে। কিন্তু জাতীয় স্বার্থের বিবেচনায় আমি আমাদের জনগণের স্বার্থ, তাদের নিরাপত্তা এবং তাদের স্থায়িত্ব বিঘ্নিত হতে দিতে পারিনা। আমি ভারতে আমার জনগণকে বলতে চাই এই অবস্থায় আমাদের এক থাকতে হবে এবং ঠাণ্ডা মাথায় পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে। যাই ঘটুক না কেন, আমরা না শুধুমাত্র অদূর ভবিষ্যত না দূরবর্তী ভবিষ্যতের কথাও মাথায় রাখব। আমাদের নিরাপদ ভবিষ্যতের জন্য স্বাধীনতার আগে এবং স্বাধীনতার পর যা ভেবেছি সেভাবে কাজ করে যেতে হবে।

 

আমি শুধু বলতে চাই যে এই দূরত্বে বসে মানুষ শুধুমাত্র আমাদের ভুল, অভাব, দুর্বলতা আর কলহ দেখতে পায়। কিন্তু বাস্তবে এই সব জিনিস বিদ্যমান নয়। আপনারা যদি মনে করেন এটি সমগ্র ভারতের চিত্র তাহলে ভুল হবে। আমরা ষোলটির বেশী ভাষায় কথা বলা দেশ। কিন্তু সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। এবং ঐ সব ভাষার প্রত্যেকটিতে ইউরোপের যে কোনো দেশের জনসংখ্যার চেয়ে বেশী লোক কথা বলে। আমরা হস্তক্ষেপ করতে চাই না, আমরা অভিন্নতা চাই না। কিন্তু সত্য যে তার পরেও বিভাজন-প্রক্রিয়া, আন্দোলন ক্রমাগত স্থান দখল করে আছে। তবুও ভারতীয় ঐক্যের সুদৃঢ় ভিত্তি আছে। ভারতীয়দের আছে শক্তিশালী আত্মবিশ্বাস। বলা হয়েছিল আমরা কিছু করতে পারিনা এবং আমরা দেখিয়েছি যে, আমরা করতে পারি। আমি আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম সম্পর্কে, গণতন্ত্র সম্পর্কে কথা বলেছি। ইন্ডিয়ার উইকলি পত্রিকা বলেছিল ভারত কোনোদিন তার ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাবারের ব্যাবস্থা করতে পারবে না। অথচ এই বছর, ১৯৭১ সালে আমরা সম্পূর্ণরূপে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হই। যদিও আমরা শুধুমাত্র গম ও চালের দিকে মনোযোগ দিয়েছি। আমাদের এখনো অনেক গবেষণা করতে হবে। অন্যান্য ক্ষেত্র সব ধরণের উৎপাদন বাড়াতে হবে। আমাদের বলা হয়েছিল যে আমাদের পরিকল্পনা কাজ করবে না। পরিকল্পনার অবশ্যই উত্থান পতন আছে কিন্তু আমরা এটিকে নির্দিস্ট দিকে ধাবিত করেছি। এটা সত্য যে আমরা মারাত্মক সমস্যার সম্মুখীন। কিন্তু মনে করি না যে আমরা হতাশ। মনে হয় না যে আমরা নিরুৎসাহিত। আমাদের সাহস পরিপূর্ন, আত্মবিশ্বাস পূর্ণ এবং আমরা জানি যে আমরা ধৈর্য ধরে অবশ্যই ভারী বোঝা বহন করতে পারব। আমরা সাহায্যের হাতকে স্বাগত জানাই এবং আপনাদের সমর্থন চাই। তবে আমরা কারো সাহায্য বা সহানুভূতি উপর পুপোপুরি নির্ভরশীল নই।

 

আরেকটি প্রশ্ন হল কেন আমরা আমেরিকানদের বাদ দিয়ে রাশিয়ার কাছে গেছি। সত্যি বলতে আমরা আসলে কারো কাছে যাইনি। আমাদের সাহায্য যদি কেউ করতে চায়, আমরা না বলতে পারিনা। আমাদের জাতীয় স্বার্থের জন্য ভালো হবে এমন যে কোন কিছু আমরা সাদরে গ্রহণ করতে রাজি আছি।

অর্থনৈতিক উন্নতি ও প্রবৃদ্ধির জন্য দারিদ্র্য ও বৈষম্য কমিয়ে আনা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু, আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। তা হল আমাদের স্বাধীনতা। আমরা শুধুমাত্র সেই সাহায্য গ্রহণ করছি যা আমাদের স্বাধীনতার উপর কোন প্রভাব ফেলবে না। আমরা সবসময় বন্ধু দেশের সঙ্গে বিশ্বাস স্থাপন করেছি এবং আমরা এটি অব্যাহত রাখব কিন্তু আমি আগেই বলেছি, আমাদের জাতীয় স্বার্থে অনেক কিছু বিবেচনায় আনা লাগতেS পারে – এবং আমরা সবসময় তার জন্য জোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাব।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
৬০। বিবিসিতে প্রচারিত মার্ক টালির সাথে প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাতকার দি ইয়ার্স এন্ডেভার ১৬ নভেম্বর ১৯৭১

 

Razibul Bari Palash

<১২, ৬০, ১২৪১৩৩>

অনুবাদ

 

একটি গুরুতর অবস্থা

 

প্রশ্ন: প্রধানমন্ত্রী, শরণার্থীদের সংকটে আপনি বলেছেন অন্যান্য দেশগুলোর উচিৎ পাকিস্তানের ওপর চাপ দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতি দূরীভূত করতে সাহায্য করা যাতে শরণার্থীরা ফিরে যেতে পারে। আপনি কি ধরনের চাপ দেবার কথা বোঝাচ্ছেন?

প্রধানমন্ত্রী: পাকিস্তান অন্যান্য দেশ থেকে সামরিক ও অর্থনৈতিক সাহায্য পাচ্ছে। এটা থেকে বোঝা যায় যে তারা কোন সাহায্য পূর্ব বাংলায় করবেনা। এটা বেশী দিন চলতে দেয়া যায়না।

 

প্রশ্ন: কিন্তু আপনি কি মনে করেন এই মুহুর্তে অন্য দেশ এমন কিছু করতে পারে?

প্রধানমন্ত্রী: বেশ উন্মুক্তভাবে বললে; আমি সত্যিই নির্দিস্ট কিছু দেখতে পারছি না। তবে আমি নিশ্চিত কিছু মানুষ আশাবাদী হয়ে জন্ম নেয়। তাই আমি মনে করি সবচেয়ে জটিল সমস্যা ও সমাধান করা যায় যদি কেউ খুঁজে পেতে ইচ্ছুক হয়।

 

প্রশ্ন: এটা জিজ্ঞাসা করতে সম্ভবত একটু বিব্রত লাগছে। আপনি কি এ ব্যাপারে আমেরিকান সরকারের মনোভাব সম্পর্কে বিশেষভাবে চিন্তিত?

প্রধানমন্ত্রী: আমি আমেরিকান সরকারকে বিছিন্ন করব না কারণ আমি মনে করি যে অনেক সরকার এই বিষয়ে বিব্রত বোধ করছে। উদ্বাস্তুদের সংখ্যা বেশী হবার কারণে এবং আমাদের অর্থনৈতিক ক্ষমতা কম হবার কারণে আমাদের ব্যাপারে ইতিবাচক অবস্থান নিতে সমস্যা হয়। জনগণের দৃষ্টিও উদ্বাস্তু ইস্যুর কারণে বিভক্ত আছে। আমরা তাদের সহানুভূতি চাই। এটা খুবই দু: খজনক হবে যদি সব মনোযোগ উদ্বাস্তু দের উপর গিয়ে পরে – সমস্যার মূল কারণ এড়িয়ে।

 

প্রশ্ন: এর কি কোনো প্রতিকার নেই?

প্রধানমন্ত্রী: পূর্ব বাংলার সমস্যার সমাধান করলেই এটা ঠিক হয়ে যাবে।

 

প্রশ্ন: কিন্তু আপনি আরও নির্দিষ্টভাবে বলবেন কি যে কিভাবে সমস্যার সমাধান হবে?

প্রধানমন্ত্রী: প্রথমে আমার মনে হয় পূর্ব বাংলার জনগণ এবং তাদের নির্বাচিত নেতারা কি চান সেটা দেখা উচিৎ।

 

প্রশ্ন: তাদের পূর্ণ অধিকার বলতে আপনি কি বুঝাতে চান? স্বায়ত্তশাসন নাকি স্বাধীনতা?

প্রধানমন্ত্রী: এই মুহূর্তে উভয় পক্ষে তিক্ততা এবং ঘৃণা রয়েছে। পূর্ব বাংলার মানুষ কে হত্যা করা হয়েছে। ২৫ মার্চ রাতে সেখানে বিশ্ববিদ্যালয় এর ছাত্র এবং অনুষদ সদস্যদের অনেককে হত্যা করা হয়েছে সম্পূর্ণ বিনা উস্কানিতে। এমনকি এখনো নিহত হচ্ছে বুদ্ধিজীবি, অল্পবয়সী ছেলেমেয়ে এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোক।

 

প্রশ্ন: আমার মনে হয় ভারত যেভাবে উদ্বাস্তু দেখাশোনা করছে তা সার্বজনীন প্রশংসা লাভ করেছে। তারপরেও কিছু লোক কেন ভারত শরণার্থী শিবিরে একটি বৃহৎ জাতিসংঘের দলের উপস্থিতির অনুমতি দেবনা সেটা বলছে – যে সুপারিশ পাকিস্তান করেছিল – এই প্রশ্নের যথাযথ জবাব কি?

প্রধানমন্ত্রী: U.N. পর্যবেক্ষকদের ইতিমধ্যে দশ জন সেখানে আছে। সেটি সবার জন্য উন্মুক্ত। সংবাদপত্রের ওপর কোন সেন্সরশীপ নেই। যারা ক্যাম্প পরিদর্শন করবেন তাদের ওপর কোন নিষেধাজ্ঞা নেই। এবং আমাদের নিজেদের ও অন্যান্য দেশ থেকে যারা আছেন কারো উপরে নিষেধাজ্ঞা নেই। তাহলে U.N. পর্যবেক্ষক দলের উদ্দেশ্য কী হবে? যদি একশ U.N. পর্যবেক্ষক আসে এটা কোন ব্যাপার না। কিন্তু আসলে তাদের কোন কাজ থাকবেনা।

 

প্রশ্ন: পূর্ব পাকিস্তানে গেরিলাদের কারণে সেখানে অস্থিরতা আছে। ভারত তাদের ব্যাপকভাবে আশ্রয় দিচ্ছে বলে রিপোর্ট আছে। আপনি কী মনে করেন এই আশ্রয় ও সহায়তা প্রত্যাহার করলে পূর্ব পাকিস্তানের অবস্থা কিছুটা শান্ত হবে?

প্রধানমন্ত্রী: অবশ্যই না। এর বিপরীতে আমার মনে হয় এটা খুব খারাপ হবে। আপনারা জানেন আমাদের সীমান্তে যে মানুষ আসছে বা যাচ্ছে তা বন্ধ করতে পারবেন না। এমনকি একটি ব্রিটিশ দল আমাদের এখান থেকে না জানিয়ে ভারত ত্যাগ করে সেখানে গেছে এবং ফিরে এসেছে। আপনারা জানেন পূর্ব বাংলার সুবিশাল জনসংখ্যার অনেকে ইংল্যান্ড, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য বিভিন্ন দেশে বসবাস করছে যারা এই আন্দোলনকে সমর্থন করে। উপরন্তু গেরিলা কার্যক্রম সমস্ত পূর্ব বাংলায় হচ্ছে – শুধু বর্ডারে নয়। এবং তাদের আধাসামরিক বাহিনী আছে যারা আগে-ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস, ইস্ট বেঙ্গল রাইফেলস এ ছিল যাদের কিছু অস্ত্রও ছিল।

 

প্রশ্ন: প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়ে একটি প্ল্যাটফর্ম হিসাবে আপনি বলেছেন “গরিবি হটাও ‘ অর্থাৎ দারিদ্র্য নির্মূল কর। এখন পরিষ্কারভাবে দেখা যাচ্ছে শরণার্থীদের বোঝা আসায় ভারতীয় অর্থনীতি খুব নির্মম পরিস্থিতিতে আছে। এই মুহুর্তে ভারতীয় অর্থনীতির অবস্থা কি?

প্রধানমন্ত্রী: অর্থনীতি যেমন স্বাস্থ্যবান হবার কথা তেমন নয়। সমস্যা আরো তীব্রতর হচ্ছে, যদি কেউ মনে করে আমাদের পতন হচ্ছে তাহলে তাদের বলছি, ভারতীয় জনগণ তাদের অভিজ্ঞতার মাধ্যমে শিখছে। তাদের বিরাট বোঝা বহন করার ধৈর্য আছে। আমার মনে হয় কষ্ট সহ্য করার ধারণক্ষমতাও অসীম।

 

প্রশ্ন: ভারতের পররাষ্ট্রনীতি সংক্ষেপে জানা যাবে? সোভিয়েত – ভারত শান্তি চুক্তি নিয়ে কিছু মানুষ চিন্তিত কারণ ভারত সবসময় জোট নিরপেক্ষ দেশ হিসেবে পরিচিত ছিল। চুক্তিটি ভারতের এতদিনের কর্মকান্ডের সাথে সামঞ্জশ্যপূর্ন নয়।

প্রধানমন্ত্রী: কিন্তু এমনটা তারাই ভাবছেন যারা নিজেরাও জোট নিরপেক্ষতার বিপক্ষে। এই চুক্তি কোন ভাবেই জোট নিরপেক্ষতাকে বাধাগ্রস্ত করেনা। আমরা আমাদের নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার এবং আমাদের নিজস্ব পদক্ষেপ নেয়ার স্বাধীনতা রাখি।

 

প্রশ্ন: ভারত বলে যে তারা চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করতে চায়। রাশিয়ার সাথে চুক্তির ফলে সেই সম্ভবনা তো আর থাকছে না।

প্রধানমন্ত্রী: কেন নয়? সম্ভবত আপনারা দেখেছেন জনাব চৌ এন লাই কি বলেছেন। তিনি বলেন, এতে কোন সমস্যা হবেনা।

 

প্রশ্ন: আপনি কি পাকিস্তান – চীন সম্পর্কে চিন্তিত নন?

প্রধানমন্ত্রী: না।

 

প্রশ্ন: জাতিসংঘের সম্পর্কে কি অবস্থান? ভারত সবসময় জাতিসংঘে চীন এর এন্ট্রিকে সমর্থিত করেছে। আপনি কি মনে করেন যে এখন যেহেতু চীন অন্তর্ভুক্ত তাই জাতিসংঘের দক্ষতা বাড়বে না কমবে?

প্রধানমন্ত্রী: আমি মনে করি এটি উত্তর দেবার মত কোন প্রশ্ন না। আমি সত্যিই জানি না এটা কিভাবে কাজ করতে যাচ্ছে। কেবল ভবিষ্যতই বলতে পারে। কোন কারণ নেই কম দক্ষ হবার। আপনি বলতে পারেন এটা অন্য দিক মোড় নিতে পারে।

 

প্রশ্ন: এখন কি আমরা সাহায্য ও বাণিজ্য চালু করতে পারব? প্রেসিডেন্ট নিক্সনের ডলার রক্ষা করার জন্য একটি প্যাকেজ ঘোষণা করেছিলেন সিনেটের এইড বিলে। আপনি কি মনে করেন এতে করে বাণিজ্য যুদ্ধ হতে পারে?

প্রধানমন্ত্রী: স্বাভাবিকভাবেই এটা আমাদের অর্থনীতিকে প্রভাবিত করবে। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত আমেরিকানদের। আমাদের শুধু তারা যা করবে তার সাথে মিলিয়ে ব্যাবস্থা নিতে হবে।

 

প্রশ্ন: আমি জানি যে ভারত আই এম এফ এর সম্প্রতি যে নীতি ঘোষণা করেছে তার বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিয়েছে কারণ সেখানে অনুন্নত দেশের দিকে নজর দেয়া হয়নি। আপনি কি মনে করেন ওইসব দেশকে এর আওতায় আনা সম্ভব?

প্রধানমন্ত্রী: আমার স্বার্থ শুধুমাত্র এই সব অনুন্নত দেশের ব্যাপারে। কারণ ধনী ও দরিদ্র দেশগুলোর মধ্যে বিভাজন বেশী হলে তা শুধুমাত্র বিশ্বের অস্থিরতা বাড়াবে। এবং আমি মনে করি এই ভাসমান মুদ্রা খুব সহায়ক হবে না। আমরা আরো স্থিতিশীল অবস্থা চাই।

 

প্রশ্ন: সর্বশেষে আমি শুধু জানতে চাই ভারত ও পাকিস্তানের পরিস্থিতি সম্পর্কে আপনার সর্বশেষ দৃষ্টিভঙ্গি কি?

প্রধানমন্ত্রী: আমি মনে করি যে প্রধান সমস্যা সীমান্ত নয়। আমি মনে করি মানুষ মৌলিক বিষয়টি জানতে চায়। আপনি যদি আসল সমস্যার মূল দিকটা না সমাধান করে কাজ করেন তাহলে এক সময় মূল সমস্যাটা আরও প্রকট আকার ধারণ করবে।

 

প্রশ্ন: কিন্তু আপনি কতদিন এই অবস্থা আরও গুরুতর হয়ে যুদ্ধের দিকে চলে যেতে পারে বলে মনে করেন?

প্রধানমন্ত্রী: এটা এখন আরও গুরুতর হয়ে যাচ্ছে।

 

প্রশ্ন: ভারতের মধ্যে প্রচুর শরনার্থি প্রবেশ করছে যা বিশ্বের মনোযোগ আকর্ষন করেছে। ভারত এই অবস্থায় কেমন বোধ করছে?

প্রধানমন্ত্রী: আমাদের কিছু করার নেই। পরিস্থিতি ক্রমশ অবনতি হচ্ছে। এটি ভারতের অর্থনীতি, স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা ও দেশের অখণ্ডতার উপর হুমকি।

 

প্রশ্ন: কিন্তু পশ্চিম ইউরোপ থেকে সফর করে আপনি কি মনে করেন যে এই সব দেশ ভারত-এর জন্য তাদের যে সহমর্মিতা প্রকাশ করেছে, তা থেকে তারা কিছু বাস্তব পদক্ষেপও নেবে?

 

প্রধানমন্ত্রী: যদিও এখানে মানুষ উদ্বিগ্ন, কিন্তু ইউরোপ সবসময়, ইউরোপীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্বের দিকে তাকায়। অন্য দিকে এশিয়া ও আফ্রিকার সব অন্যান্য দেশ তাদের নিজস্ব সমস্যার কারণে অন্যদের নিয়ে চিন্তার সময় পায়না। ইউরোপীয় অনেক দেশ উপমহাদেশে ‘ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করে। তাই আমি মনে করি এই প্রশ্ন তাদেরকে করুন – কারণ তারাই বলতে পারবেন ভারত দুর্বল, নাকি অস্থিতিশীল; ভারত এশিয়ার শান্তির জন্য কোনো দরকারী কিছু করতে পারবে কিনা।

 

প্রশ্ন: আপনি কি বলবেন যে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আপনার বৈঠক সফল হয়নি যেহেতু আপনি মনে করেন আপনি বোঝাতে ব্যার্থ হয়েছেন?

প্রধানমন্ত্রী: না, আমি হতাশ নই। প্রথমত, আমি কখনো বিশেষ কিছু আশা করিনা। এখন প্রশ্ন হল তারা অনুধাবন করেছেন কিনা অথবা তারা গভীরভাবে এটা সম্পর্কে কিছু করতে চান কিনা।

 

প্রশ্ন: কাশ্মীরের সমস্যার মত দীর্ঘ ইতিহাস দেখে, মানুষ কি একরকম বিশ্বাস করবে যে এটাও দীর্ঘদিন ধরে চলতে পারে?

প্রধানমন্ত্রী: কোন মানুষ? আপনারা দেখছেন অন্য সব কিছুই আগের মত আছে – ভারত ছাড়া। অন্য দেশ কি ভাবছে তাঁর উপর আমরা নির্ভরশিল না। আমরা জানি আমাদের কি লাগবে এনং আমরা সেই অনুযায়ী কাজ করব। আমরা যে কোন দেশ থেকে সাহায্যকে স্বাগত জানাই। কিন্তু যদি তা না আসে তবু ভালো।

 

প্রশ্ন: পাকিস্তানের সঙ্গে সীমান্তে সামরিক পরিস্থিতি কেমন আপনি কি বলতে পারবেন? কারণ এটা নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হচ্ছে। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান গত সপ্তাহে সাঁজোয়া বাহিনী এবং সেনা বাহিনীকে অবস্থান নিতে আহবান জানিয়েছেন যা ইঙ্গিত করে যে যুদ্ধাবস্থা আসছে।

প্রধানমন্ত্রী: আমরা যুদ্ধাবস্থার মধ্যে আছি। যেহেতু সেনারা নিজেদের অবস্থান সম্পর্কে জানে, তাই উভয় সীমান্তে তারা প্রস্তুত আছে। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান এর সেনা মোতায়েনের আগে চিন্তা করা উচিৎ। আমাদের সেনা শুধুমাত্র তখনই সরানো হয় যখন আমরা মনে করি যে আমাদের নিরাপত্তা মারাত্মক হুমকির মুখে। আমার কোনো সন্দেহ নেই আমরা এখনো প্রস্তুত না। আমি আপনাদের স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে এর আগে আমরা দুইবার পাকিস্তান দ্বারা আক্রান্ত হয়েছি।

 

প্রশ্ন: কিন্তু গত সপ্তাহে জানা যায় কিছু ব্যাটেলিয়ন সেখানে কর্মযজ্ঞ করেছে আর কিছু বিমান সেখানে নিযুক্ত ছিল। প্রায় পাঁচশত হতাহত হয়েছে। এটাই কি সীমান্তের চিত্র?

প্রধানমন্ত্রী: আমার এতে সন্দেহ আছে। সীমান্ত জুড়ে সেখানকার কিছু নেতা বিশ্ব ফোরামে কিছু কথা বলে যাচ্ছেন যা আসলে সত্য নয়। এমন কথা এর আগেও শুনেছি অনেক।

 

প্রশ্ন: কিন্তু সেখানে কিছু কামানের গোলা ব্যাবহ্রিত হয়েছে। পূর্ব দিকে কি নেই?

প্রধানমন্ত্রী: হ্যাঁ, কিছু গোলাবর্ষণ হয়েছে।

 

প্রশ্ন: তারা কি এখনো চালিয়ে যাচ্ছে?

প্রধানমন্ত্রী: আমি তাই মনে করি।

 

প্রশ্ন: সীমান্তে উত্তেজনা আপনি কিভাবে দেখছেন তাহলে?

প্রধানমন্ত্রী: হ্যাঁ, এটা খুবই উত্তেজনাকর।

 

প্রশ্ন: যুদ্ধের পরিবেশ কি থেমে যাচ্ছে নাকি আরও ঘনীভূত হচ্ছে?

প্রধানমন্ত্রী: যুদ্ধ একটি মন্দ জিনিস। ভারত সবসময় যুদ্ধের বিরুদ্ধে ছিল। কিন্তু কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। আজ আমরা মনে করি যে, ভারতীয় জনগণের স্বার্থ যেমন বিবেচ্য তেমনি এশিয়ায় শান্তি তথা বিশ্বের শান্তি, স্থিতিশীলতা, অখণ্ডতাও বিবেচ্য। এটাই মূল বিষয়।

 

প্রশ্ন: হ্যাঁ, আমি সত্যি বলতে চাচ্ছি যে ভারত যুদ্ধের দিকেই যাচ্ছে হয়তো। যদিও আপনি বলেছেন এটা এড়িয়ে যাবার ব্যাপারে আপনি খুব মনযোগী। তবুও বলব পরিস্থিতি যদি যুদ্ধের অবশ্যম্ভাবিকতার দিকে যায় তাহলে আপনি কি থামাতে পারবেন?

প্রধানমন্ত্রী: আমরা এটা থামিয়েছি। তাহলে যদি শান্ত না থাকতাম এবং সংযত না হতাম তাহলে খারাপ দিকেই যেত যুদ্ধ পরিস্থিতি। আমি বা আমার সরকারের কেউ কি যুদ্ধের পক্ষে একটি শব্দও উচ্চারণ করেছে? কিন্তু আপনারা যদি অন্য পক্ষের কিছু বক্তব্য শোনেন তাহলে দেখবেন তারা পাবলিকলি কিভাবে ইঙ্গিত দিয়ে কথা বলেছেন।

 

প্রশ্ন: আপনি কি মনে করেন পাকিস্তান আক্রমণ করতে পারে?

প্রধানমন্ত্রী: নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছেনা। এটি নির্ভর করবে আগ্রাসন এর উপর। ১৯৬৫ সালে হাজার হাজার অনুপ্রবেশকারীদের পাঠানো হয় কিন্তু তারা তা স্বীকার করেনি। কিন্তু পরে জানা গেল যে সেটি আগ্রাসন ছিল এবং উদ্যেশ্য ছিল সেনাবাহিনীর জন্য পথ পরিষ্কার করা।

 

প্রশ্ন: আপনি কি বিশ্বাস করেন উদ্বাস্তুদের ঢোকার ব্যাপারে কঠোর হলে অবস্থা কিছুটা ভালো হবে? হয় কূটনৈতিক অথবা সামরিক? এখন কি পরিস্থিতি অনুকূলে আছে?

প্রধানমন্ত্রী: আমি জানি না পরিস্থিতি এর অনুকূলে আছে কিনা। কিছু কাজ সম্পন্ন করা বাকি আছে। আমরা পাকিস্তান সমস্যার সাথে নিজেদের ভারাক্রান্ত করতে চাচ্ছিনা। তাদের সমস্যা খুব বড়। নির্বাচনে প্রচুর লোক তাদের বিপক্ষে ভোট দিয়েছে। বর্তমান সরকারের তত্ত্বাবধানেই অনুষ্ঠিত হয়েছিল ভোট। তাই জুলুম, হত্যা বা সীমান্ত জুড়ে পুশ করা শুরু করে তারা। তাই কেন আমরা অন্য দেশের সমস্যা আমাদের মাথায় নেব? এর কি কোন যুক্তি আছে?

 

প্রশ্ন: কিন্তু আপনি কতটা দৃঢ় প্রত্যয়ী? আপনি যা বলেছেন তা কতটা বিশ্বাসযোগ্য?

প্রধানমন্ত্রী: আমি কোন কিছু বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ করতে আগ্রহী নই। আমি আমার দেশের জনগণের ভবিষ্যত এবং বর্তমান নিয়ে চিন্তিত। তারা আমাকে বিশ্বাস করে এবং আমি তাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারিনা।

 

প্রশ্ন: আপনি প্রথম পদক্ষেপ বলেছেন উদ্বাস্তুদের প্রবেশ থামাতে হবে কিন্তু কিভাবে?

প্রধানমন্ত্রী: গণহত্যা, ধর্ষণ, গ্রাম পোড়ানো থামাতে হবে।

প্রশ্ন: আপনি অবস্থার উন্নতির জন্য প্রথম পদক্ষেপের কথা বলেছেন। বলেছেন উদ্বাস্তুদের দেশত্যাগ বন্ধ করতে হবে। কিন্তু ভারত যে গেরিলাদের সাহায্য করছে যারা পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সাথে লড়াই করছে। আপনি কি মনে করেন না যে গেরিলাদের সাহায্য করা বন্ধ করলে পরিস্থিতি একটু স্বাভাবিক হবে?

প্রধানমন্ত্রী: তার মানে কি বলতে চাচ্ছেন আমরা হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে যাওয়ার ইন্ধন দিচ্ছি? প্রথম কী ঘটেছিল? ব্রিটিশ সংবাদপত্র, ফরাসি, আমেরিকার পত্রিকাসমূহ, কানাডিয়ান সংবাদপত্র, আরব সংবাদপত্রের সংবাদদাতাদের হিসাব অনুযায়ী কত জন মানুষ নিহত হয়েছে তার আগে? গেরিলাযুদ্ধ শুরু হবার অনেক আগে থেকেই গণহত্যা চলছিল।

 

প্রশ্ন: কিন্তু আমি আসলে পরিস্থিতি থামানোর ব্যাপারে বলছিলাম।

প্রধানমন্ত্রী: এখন প্রশ্নটা কি তাহলে? প্রশ্নের অর্থ কি আমরা ইন্ধন দিচ্ছি? আমরা যদি গণহত্যা সমর্থন করতাম তাহলে এটা কি থামানো যাবে? আপনি কি মনে করেন মানুষের সামনে তাঁর পরিবারের মহিলাদের ধর্ষন করবে আর তারা বসে বসে দেখবে? অবশ্যই না – আমরা এই পরিস্থিতি থামাতে চাই। সেখানে যা হচ্ছে তা সবচেয়ে খারাপ ধরনের যুদ্ধ, সবচেয়ে খারাপ ধরনের নৃশংসতা।

 

প্রশ্ন: কিন্তু গেরিলাদের না থামিয়ে কিভাবে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে থামানো যায়? তারা তো তাদের দেশের শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য তেমনটা করতে বাধ্য থাকবে। তাই প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে কি করতে পারেন আপনি?

প্রধানমন্ত্রী: হিটলার যখন তাণ্ডব চালাচ্ছিলেন তখন আপনারা কেন বলেননি। আসুন চুপ থাকি – শান্তি কামনা করি জার্মানির। ইহুদীরা মরুক, বেলজিয়াম মরুক, ফ্রান্স মরুক। আপনি কি বলবেন তখন সব নিশ্চুপ ছিল?

 

প্রশ্ন: কিন্তু কিভাবে তাহলে এই প্রথম ধাপ নিয়ন্ত্রণ করার প্রস্তাব করেন …?

প্রধানমন্ত্রী: আমরা বিশ্ব সম্প্রদায়কে সজাগ করছি। তারা সংবাদপত্র থেকে জানতে পারছে কি হচ্ছে। লোকজন তথ্য দিচ্ছে। আমরাও আমাদের বেশীর ভাগ খবর নিচ্ছি ব্রিটিশ, অ্যামেরিকানসহ বিদেশী পত্রিকাগুলো থেকেই।

 

 

প্রশ্ন: তাহলে কি আপনি সমস্যা নিষ্পত্তির জন্য বিস্তৃত রূপরেখা দিতে পারবেন?

প্রধানমন্ত্রী: আমরা বাংলাদেশের জনগণের নিষ্পত্তির সিদ্ধান্ত নিতে পারিনা। এটা শুধুমাত্র তারা নিজেরা নিতে পারেন। কিন্তু আমি কেবল বলতে পারি যেহেতু ইতিমধ্যে একটি গণতান্ত্রিক ও মুক্ত নির্বাচন হয়েছে। এই অবস্থায় আরেকটি নির্বাচন করা প্রহসনমূলক।

 

প্রশ্ন: কিন্তু আপনি বলেছেন যে উদ্বাস্তুদের প্রত্যাবর্তন ঠেকাতে বাংলাদেশের পরিস্থিতি ঠিক করার দরকার – তাতে যদি পূর্ন স্বাধীনতা এই মুহুর্তে অর্জিত না হয় তবুও। স্বায়ত্তশাসন কি পূর্ণ স্বাধীনতার চেয়ে কম নয়?

প্রধানমন্ত্রী: এটা সম্পূর্ন তাদের উপর নির্ভর করে। এটা আমরা দেখাতে চাইনি। এটা তাদের দেখানোর বিষয়। আমরা কোন বিশেষ খেলার কথা বলছিনা যে তারা একটি পদক্ষেপ নিলে তারপরে আমরা নেব। আমরা লাখ লাখ মানুষের জীবন সম্পর্কে কথা বলেছি।

 

প্রশ্ন: আপনার সাম্প্রতিক বক্তৃতায় আপনি বলেছেন যে আপনি একটি আগ্নেয়গিরির উপর বসা, আমি মনে করি আপনি একটি খাঁচার ভিতরে বসা যেটি সব সমস্যা থেকে দূরে। আপনি বলেছেন পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্য স্থিতিশীলতা আনতে হবে – কিন্তু সেটা কিভাবে সম্ভব?

তাদের একত্রিত করবেন কিভাবে?

প্রধানমন্ত্রী: আমরা জানি না তারা কিভাবে একত্রিত হবে। এটা আমাদের উদ্বেগের বিষয়। যদিও বিষয়টি পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক শাসক এবং পূর্ববাংলার নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মধ্যে। পাকিস্তানের সেনা আমাদের পূর্ব সীমান্তেও জড়ো হচ্ছে। তাই একটি খাঁচার ভিতরে বসে থাকার অবস্থা আমাদের নেই। এর মানে এই নয় যে আমরা কিছু জানিনা। আমরা সজাগ আছি। তবে আমরা জানিনা পূর্ববাংলার জনগণ কী করবে। তাদের সিদ্ধান্ত তারাই শুধু নিতে পারে।

 

প্রশ্ন: কিন্তু আপনি যখন পুর্ব পাকিস্তান মুক্তকারিদের সাহায্য করছেন তখন তো আপনি হাত গুটিয়ে বসে থাকতে পারেন না। আপনি জড়িত আছেন এবং আপনাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতির আলোচনার প্রস্তাব দিলেও আপনি তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। এটি কি আপনার অবস্থানের সাথে একটি স্ববিরোধিতা নয়?

প্রধানমন্ত্রী: একদম না। আপনি কি চান যেসব মানুষ ভারতে প্রবেশ করছে আমি তাদের হত্যা করি? ঠেকাতে হলে রাস্তা একটাই তাহলে তাদের খুন করতে হবে। এছাড়া আসলে আর কোন পথ নেই।

 

 

প্রশ্ন: না, অবশ্যই না। আমি তা সুপারিশ করি না।

প্রধানমন্ত্রী: কিন্তু তেমনটাই মনে হয় —

 

প্রশ্ন: কিন্তু আমি ভাবছি আপনি কেন আলোচনার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন? এটা কি গুরুত্বপূর্ণ নয় – অন্তত বড় কোন ঝামেলা হবার আগে?

প্রধানমন্ত্রী: কার সাথে কিসের কথা? এখন পর্যন্ত, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান সবাইকে বলছেন যে বাংলাদেশের পরিস্থিতি একেবারে স্বাভাবিক। এখন, হয় সে জানে না কী ঘটছে বা তিনি ইচ্ছাকৃত ভাবে মিথ্যা বলছেন। যেটাই হোক, সেক্ষেত্রে আলাপের ভিত্তি কি?

 

প্রশ্ন: আপনি কি মনে করেন ভারত উপ-মহাদেশের দুই দেশের বিভাজনের ফলে এটা ব্যর্থ হয়েছে?

প্রধানমন্ত্রী: আমরা খুব পরিষ্কারভাবে বলেছি ভারতীয় জনগণ পুরো জিনিসটার বিরুদ্ধে ছিল। কিন্তু আমি ও আমাদের নেতারা মনে করেছি এই ভাবে শান্তি আনতে হবে। এটা ভারতকে এগিয়ে নেবার এবং ভারতের দরিদ্র মানুষের জন্য একটি ভাল জীবন গড়ে তুলতে সহায়ক হবে। তারা এটা গ্রহণ করেছিল এবং আমরা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ছিলাম না। পাকিস্তানের জনগণের প্রতি আমার বন্ধু সুলভ মনোভাব আছে। তারা একটি সামরিক শাসন চালাচ্ছে যা তাদের জনগণের জন্য কল্যাণকর না।

 

প্রশ্ন: পূর্ববাংলায় যা হচ্ছে তা কি ভারতকে বিপদের সংকেত দেয় না?

প্রধানমন্ত্রী: তেমনটা নয়।

 

প্রশ্ন: এতে কি ভারতের মধ্যে বিচ্ছিন্নতাবাদী প্রবণতাও বাড়তে পারে?

প্রধানমন্ত্রী: না না। কারণ আমরা আমাদের মানুষের সাথে মোকাবেলা করতে পারি এবং আমরা দেখি যখন তাদের বৈধ ক্ষোভ তারা প্রকাশ করে আমরা তা সমাধান করি।

 

প্রশ্ন: আপনি কি দেখছেন যে উপমহাদেশে ক্ষমতার অপব্যাবহার ও রাজ্যের ভাষাগত পার্থক্যের কারণে যে পরিবেশ সৃষ্টি হচ্ছে তা কি আপনি ঠেকাতে পারবেন?

প্রধানমন্ত্রী: হ্যা মানুষ বোঝা খুব কঠিন। আমাদের ১৬ টি ভাষার লোকদের মাঝে; ২০ টিও হতে পারে – কোন বৈরিতা তৈরি করার পরিকল্পনা আমাদের নেই। আমরা মনে করি আমরা এক। আমাদের মাঝে কোন দ্বন্দ্ব থাকলেও জরুরী অবস্থায় আমরা এক থাকতে পারি। আমাদের সীমানা জুড়ে যা হচ্ছে অথবা তিন বছর যে খরা হয়েছিল তখন আমরা এক ছিলাম।

 

প্রশ্ন: আপনি ঠিক বলেছেন। এক সপ্তাহ আগে প্রচুর উদ্বাস্তু আপনার উপর এসে পড়ল – তখন কেবল আপনি জগণের ম্যান্ডেট পেয়েছিলেন। ভারতের আমূল পরিবর্তন এবং সংস্কারের উপর প্রতিশ্রুতিশীল হয়ে আপনি জয়ী হয়েছেন। কিন্তু এখন শরণার্থী সমস্যার কারণে আপনি বিপদগ্রস্ত। নির্বাচনী অঙ্গীকার এর ব্যাপারে এই মুহুর্তে আপনার অবস্থান কি?

প্রধানমন্ত্রী: শুনতে অবাক লাগতে পারে ভারতীয় মানুষের সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতা ও পরিপক্বতা পশ্চিমাদের চেয়ে বেশী। তাদের ক্ষোভ আছে, দাবি আছে। কিন্তু অসুবিধার সময়ে আমরা একসঙ্গে দাঁড়াতে পারি। আমাদের কষ্ট সহ্য করার অসীম ক্ষমতা আছে। যদি আমাদের তা করা লাগে আমরা করব।

 

প্রশ্ন: আমি বলতে চাচ্ছি আপনি কি মনে করেন আপনি আপনার কথা যদি পূরণ করতে না পারেন তাহলে গণতন্ত্র নিজেই ভূলুণ্ঠিত হবে?

প্রধানমন্ত্রী: না। ভারতে এমনটি হবেনা। গণতন্ত্র পৃথিবীর সব দেশ থেকে চলে যেতে পারে – কিন্তু ভারত থেকে নয়। শুধুমাত্র বিদেশীরাই ভাবে যে গণতন্ত্র হুমকির মুখে। আমি কখনই এক মুহুর্তের জন্যও তা বিশ্বাস করি না।

 

প্রশ্ন: কিন্তু আপনি নিজে কেমন বোধ করেন যখন আপনি দেখেন যে ভারতে যে পরিবর্তনের ভিত্তিতে নির্বাচিত হয়েছে এটা এখন বিপন্ন হতে চলেছে?

প্রধানমন্ত্রী: হ্যাঁ, এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে আমরা আমাদের দারিদ্র্য হ্রাস করেছি। আমাদের বিভিন্ন সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবিচার ও বৈষম্য আছে এখনো। কিন্তু কিছু ব্যাপার তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ – বিশেষ করে যেখানে দেশের স্বাধীনতা জড়িত। আমি মনে করি রাজনৈতিক দলগুলোও – হোক ডানে/বামে বা কেন্দ্রে – তারাও আমাদের নিরাপত্তা ইস্যুতে আমাদের সাথে থাকবে।

 

প্রশ্ন: অত্যন্ত সংক্ষিপ্তভাবে, প্রধানমন্ত্রী, পরিশেষে, আপনাকে এই দেশের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্মূল্যায়ন করার জন্য বলা হয়েছে। আমাদের ভাগ্য আসলে দুই বা তিন শত বছর পরে নির্ধারিত হবে। তবু সেই সময়টাকে আপনি কেমন দেখতে চান?

প্রধানমন্ত্রী: প্রথমত অতীতকে ভুলতে হবে। আগের সমপর্ক কেমন ছিল বিশেষ করে সেগুলো। স্বাধীনতার সাথে সাথে সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় হয়েছে। এমন সময় ছিল যখন আমাদের তেমন বন্ধুত্বপূর্ন সমপর্ক ছিল না। কিন্তু আমি মনে করি আমরা এখন একটি নতুন ভিত্তিতে বন্ধুত্ব করতে পারি। আরও প্রাসঙ্গিকতার সাথে, উভয় দেশের বিভিন্ন সমস্যায় সাহায্য করতে পারি। পারস্পরিক সুবিধার অবস্থান তৈরি করতে পারি।

 

 

 

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
৬১। ওয়াশিংটনে প্রেসিডেন্ট নিক্সন প্রদত্ত ভোজসভায় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর ভাষণ ভারত সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ৪ নভেম্বর ১৯৭১

 

Zulkar Nain &

Ibrahim Razu

<১২ ৬১, ১৩৪-১৩৭>

 

ভারত সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ৪ঠা নভেম্বর, ১৯৭১

ওয়াশিংটনে প্রেসিডেন্ট নিক্সন প্রদত্ত ভোজসভায় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর ভাষণ

 

আজ আমরা এই বাড়িতে অবস্থান করছি এটা যেমন সত্য। তেমনি বাস্তবিক অর্থেই এই কক্ষ এমন অনেক ইতিহাসের সাক্ষী। অনেক বিখ্যাত মানুষ এখানে ছিলেন, যাদের আদর্শ এবং কর্ম দ্বারা প্রভাবিত ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রের সীমানা অতিক্রম করেছে।

 

আমার মনে পড়ে, প্রথম যখন আমার বাবা জেফারসন এবং লিংকনের কর্মচঞ্চল এলাকার সাথে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন, বাচ্চা মেয়ে হিসাবে আমি কতটা শিহরিত হয়েছিলাম। সেই দিনগুলোর পরে বিশ্বে অনেক কিছু ঘটেছে। অনেক উত্থান-পতন হয়েছে। কিন্তু কিছু চিন্তা চেতনা আর আদর্শ মানুষকে একত্র করেছিল। যদিও অনেক ভুখন্ড আর মহাসাগর আমাদের পৃথক করে রেখেছে, আমি মনে করি আপনাদের দেশ ও আমার দেশের মধ্যে অনেক পার্থক্য থাকলেও দুই দেশের মানুষের মধ্যে অনেক মিলও আছে, আমাদের উভয়েরই জাতিগত উপাদানে গঠিত বৃহৎ সমাজ আছে যারা আমাদের ধর্মীয় মুল্যবোধ নিয়ে গর্বিত, এবং চাপিয়ে দেওয়া বিভিন্ন বিষয়ে ক্ষুব্ধ। আমাদের জনগন বন্ধুত্বপূর্ণ এবং উদার, একে অপরকে জানতে চায়, তাড়াতাড়ি তাদের অনুভূতি প্রকাশ করে এবং একই সাথে ক্ষমা প্রদর্শন এর জন্যও তারা সদাপ্রস্তুত।

 

স্বাভাবিকভাবেই, সেখানে বৈশিষ্ট্য ও মূল্যায়নের অনেক পার্থক্য আছে। এবং যেহেতু আমাদের জনগণ এবং আমাদের আইনসভা টিকে আছে স্পষ্টবাদিতার জন্য, তাই সেখানে বিশ্রী অকপটতার অনেক মুহূর্ত আছে। কিন্তু এটাও মনে রাখবেন যে উভয় সমাজে আমাদের সবচেয়ে স্পষ্টভাষী সমালোচকগুলো আমরাই।

 

আমি মনে করি একটি সচল গণতন্ত্র এই ধরনের দুর্বলতাকে সবলে পরিণত করে। গত মার্চে আমাদের পঞ্চম সাধারণ নির্বাচনে, মি. প্রেসিডেন্ট যেখানে আপনি অত্যন্ত উদারভাবে উল্লেখ করেছিলেন যে, আমাদের জনগণ গণতান্ত্রিক উপায়ে জাতীয় সমস্যার সমাধান করতে পেরেছে। তারা জাতিকে দারিদ্রের বিরুদ্ধে দীর্ঘ সংগ্রাম করার জন্য নতুন আত্মবিশ্বাস ও তরুণ উদ্দীপনার একটি পরিষ্কার ও সুসঙ্গত নির্দেশনা দিয়েছিল।

১৯৬০ সালের উন্মাদনা যেটি আমাদের প্রবৃদ্ধিকে দুর্বল করে দিয়েছিল সেটা কাটিয়ে উঠেছি। আপনাদের মূলধন ও খাদ্যের দীর্ঘমেয়াদি সাহায্যের কারণে আমাদের পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়িত হয়েছিল। বিদেশী সাহায্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটা সরাসরি অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখে এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোতে উন্নত দেশগুলোর, বিশেষভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের, অবদান তুলে ধরে। কিন্তু আমাদের জনগনের একান্ত প্রচেষ্টা আর ত্যাগের মাধ্যমে আমরা অভূতপূর্ব এবং দ্রুত সফলতা অর্জন করেছি।

 

আজ আমরা খাদ্য-শস্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। বৈদেশিক ঋণ আমাদের সম্পদের সামান্য কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ একটা অংশ। সবকিছু এত সহজে অর্জিত হয়নি। এবং যদিও এই সময়গুলোতে আমরা অনেক হাসিখুশি ছিলাম, মি. প্রেসিডেন্ট আপনি জানেন, ভারতের জন্য তা কতটা কঠিন ছিল।

 

খরার সময়ে অনেকেই মনে করেছিল আমরা হয়তো আর বাঁচবো না। কিন্তু ঐ গুরুত্বপূর্ণ সময়টাতে আমরা কৃষিক্ষেত্রে নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করেছিলাম যেটি আজ আমাদের স্বয়ংসম্পূর্ণ করে তুলেছে।

 

আপনি আমাদের নির্বাচনের কথা বলেছিলেন। তারা খুব সহজে জয়ী হয়নি। আমি তখনই মিসেস নিক্সনকে বলছিলাম যে সব কিছু নিষ্পত্তি করার জন্য আমাদের হাতে সময় খুব কম কারণ আমরা নির্দিষ্ট সময়ের ১ বছর ৩ মাস আগেই নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম কারণ জনগন প্রায়ই বলতো “আপনারা সংখ্যালঘু সরকার। আপনাদের এটা করার অধিকার নাই, ওটা করার অধিকার নাই”, এসবে আমরা বিরক্ত হয়ে গেছিলাম। আমরা বলেছিলাম, “ঠিক আছে, তাহলে নির্বাচন করি”। তেতাল্লিশ দিনে আমি ৩৬০০০ মাইল পথ ঘুরেছিলাম। আমি ৩৭৫টা সভায় অংশ নিয়েছিলাম যার মধ্যে কোথাও ১ লাখের বেশী, কোথাও ২ বা ২.৫ লাখ মানুষ হয়েছিল। এটা ছিল একজন মানুষের প্রচেষ্টা, কিন্তু স্বাভাবিকভাবেই এটা করতে লক্ষ মানুষের দরকার ছিল। আমরা কেন নির্বাচনে জিতেছিলাম তার বড় কারণ আমাদের প্রচেষ্টা না, বরং আমরা জনগণ তথা গরিব মানুষ, ছোট ব্যবসায়ী, গরীব কৃষক, যারা দারিদ্রতার নিম্নসীমায় বাস করে, এবং সর্বোপরী যুবক শ্রেণীর মানুষদেরকে আমরা বুঝাতে সক্ষম হয়েছিলাম যে আমরা তাদের জন্য যতটুকু করেছি অন্যরা সেটুকু করেনি।

তাই প্রচারনা শুধু দলীয় না জনগণের প্রচারণায় রূপ নিয়েছিল। আমি জানিনা যুক্তরাষ্ট্রে কি হয়, কিন্তু আমাদের দেশের নেতা-কর্মীরা প্রার্থীর ব্যাপারে সমানভাবে উৎসাহী ছিল না। (প্রেসিডেন্ট নিক্সন – আমাদের ক্ষেত্রেও একই) কিছু জায়গায় স্বাভাবিকভাবেই আমরা ভেবেছিলাম আমাদের সবচেয়ে ভালো প্রার্থীকে পেয়েছি। আবার কিছু জায়গায়তে আমরা বিভিন্ন কারনে তা হয়নি। আবার এমন অনেক জায়গা ছিল যেখানে আমরা ভেবেছিলাম আমাদের প্রার্থী জিতবে না, কারণ যারা (মাঠ পর্যায়ের দলীয় নেতা-কর্মী) আমাদের প্রার্থীকে জিততে সাহায্য করবে তারা প্রার্থীকে কোন ধরনের সহযোগীতাই করে নি। কিন্তু আবার এমন অনেক জায়গায় জনগন এভাবে বলেছে যে – প্রার্থী যেই হোক, সে যদি মিসেস গান্ধীর অধীনে প্রার্থী হয় আমরা তাকে নির্বাচনে জিতাব, সেখানে দলীয় লোক কি বলল বা অন্য কেউ কি বলল তা মুখ্য ছিল না। এভাবেই আমরা এই নির্বাচনে জয়ী হয়েছিলাম।

 

আমাদের নতুন সংসদে সপ্তাহে মাত্র একবার দেখা হয়েছিল, এবং অন্যান্য সকল রাজনীতিবিদদের মত তখনো আমরা একে অন্যকে পিঠ চাপড়ে অভিনন্দন জানাতেই ব্যস্ত ছিলাম, তখন হটাৎ করেই সমগ্র বিশ্বে পরিবর্তন ঘটে গেল। যেটাকে আমরা সূর্যের আলো ভেবে সামনে এগিয়ে যেতে এবং বাকি সমস্যাগুলো সমাধানের কথা ভেবেছিলাম সেটা অন্ধকারের কালো ছায়ায় ঢেকে গেল। এবং কোন সতর্কবার্তা ছাড়াই আমাদের সীমান্ত জুড়ে গুরুত্বর সঙ্কট সৃষ্টি হয় এবং প্রায় আমাদের গ্রাস করে ফেলে, আমাদের কষ্টার্জিত স্থিতিশীলতাকে হুমকির মধ্যে ঠেলে দিল।

যা ঘটেছিল, তা সমসাময়িক ইতিহাসের একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ, আমার এটা নিয়ে ভাবা ঠিক না, কিন্তু আমি কি সেই সমস্যার সত্যিকারের গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারি? আপনারা কি ভাবতে পারেন মিশিগানের সমস্ত জনগন হঠাৎ করে নিউ-ইয়র্কে জড়ো হলো? কল্পনা করুন তখন নিউ-ইয়র্ক প্রশাসনিক অবস্থা, স্বাস্থ্য সেবা এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা, খাদ্য এবং আর্থিক অবস্থা কেমন হবে? এবং এটা সমৃদ্ধিশালী অবস্থায় ছিলনা, বরং দেশটি ইতিমধ্যে দারিদ্র্য এবং জনসংখ্যা সমস্যার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতেছিল।

আমরা আমাদের উন্মুক্ত সমাজের ঐতিহ্যের মূল্য দিয়েছি। নিশ্চিতভাবেই যুক্তরাষ্ট্রের জনগন এটা বুঝবে। আপনার সমাজ কি এমন লোক দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়নি যারা সামাজিক এবং অর্থনৈতিক অবিচার থেকে দূরে থেকেছেন? আপনাদের দরজা কি তাদের জন্য সবসময় উন্মুক্ত ছিল না?

 

প্রত্যেক জাতিকে তার নিজের ক্রুশ বহন করতে হবে। আমাদের জনগণ দৃষ্টান্তমূলক একতা, আত্ননীর্ভরশীলতা, এবং সংযমের সাথে এই চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। কিন্তু কাছের এবং দূরের প্রতিবেশী এবং অন্য যারা গণতন্ত্রকে গুরুত্ব দেয় এবং গণতান্ত্রিক নীতি মেনে চলে, আমরা তাদের বোঝার এবং আমি আরো বললে – আমরা তাদের থেকে বড় ধরনের সাহায্য কামনা করি।

 

আমাদের কোন বন্ধু চাইবেনা, এবং বিশেষ করে যারা আমাদের আদর্শের কেউ না, যে আমরা আমাদের দীর্ঘদিনের গণতান্ত্রিক নীতি পরিহার করি। যদি আজ আমরা ভয়াবহ আর্থিক মন্দায় পড়ি এবং আমাদের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা হুমকির সম্মুখীন হয়, তার জন্য দায়ী থাকবে আমাদের গণতান্ত্রিক নীতি এবং ভৌগোলিক নৈকট্য যেটা আমাদেরকে মধ্যযুগীয় বর্বরতার শিকার হয়ে লক্ষ লক্ষ অসহায় শরনার্থীতে পরিণত করেছে।

পরিস্থিতি আমাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিণতির কথা ভাবার সুযোগ দেয়নি। আমাদের প্রশাসন ইতিমধ্যে বিশাল জনসাধারনের চাহিদা মেটানো নিয়ে চাপে আছে, তার মধ্যে অতিরিক্ত আশ্রয়হীন নয় মিলিয়ন মানুষের দেখাশোনার ঝামেলায় আছে যারা সবাই অন্যদেশী। খরার জন্যে রাখা মজুদ খাদ্য ব্যবহার করা হচ্ছে। উন্নয়নমূলক কাজের জন্য বরাদ্ধকৃত সীমিত সম্পদের পরিমান ক্রমশই হ্রাস পাচ্ছে।

অপপ্রচার নিয়ে ভাবার থেকে এই অনুষ্ঠান অনেক গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের জনগন বুঝতে পারছে না যে, কিভাবে আমরা ক্ষতির শিকার হলাম, আমরা যারা সব ধকল বহন করেছি এবং বীরত্বপূর্ন সহিষ্ণুতার সাথে নিজেদের সামলাচ্ছি, আমদের কেন যারা এই দুর্দশার জন্য দায়ী তাদের সমান গণ্য করা হচ্ছে।

 

এর পরিনাম কতদুর পৌছাবে সেটা এখনো বলা যাচ্ছেনা। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত এই সমস্যার মূলোৎপাটনের চেষ্টা করা। ভারত এব্যাপারে যর্থাথ উদার প্রতিক্রিয়া দেখাবে।

 

তন্মধ্যে, আমার দেশের জনগনের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার দায়িত্ব বা কর্তব্য আমি এড়িয়ে যেতে পারি না।

 

মি. প্রেসিডেন্ট, আমরা আমাদের স্বাধীনতা এবং গণতন্ত্রের উপর বিশ্বাস রেখে আপনার সাথে আছি। আমার দেশের আকার, এবং জটিল পরিস্থিতি আমাদের অনেক হতাশাজনক ভবিষ্যদ্বাণীর মুখোমুখি করেছে। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মত ভারতের অনেক সহনশীল যা সমাজ, বিভিন্ন সঙ্কট থেকে বের হওয়ার সমাধান এবং শক্তির নতুন উৎস ভেদে ব্যাতিক্রম নয়।

 

মি. প্রেসিডেন্ট, সুচিন্তাভাবনার জন্য সারা বিশ্বেই আপনার তারিফ রয়েছে যার জন্যে আপনি সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। আমি নিশ্চিত যে, এত সুন্দর লাবন্যময়ী এবং মনোমুগ্ধকর ফার্স্ট লেডি আপনার শক্তির উৎস।

 

আজ সকালে, আপনি যখন ঝলমলে রোদের কথা বলেছিলেন, এবং বাস্তবিক অর্থেই দিনটি ছিল অসাধারন। আমি জানিনা এরজন্য আপনি নাকি আমি দায়ী কারণ ভারতে মানুষের ইচ্ছানুযায়ী আবহাওয়া আনার জন্য আমার বেশ সুনাম আছে। স্বাভাবিকভাবেই এটা বৃষ্টি, মোটেই ঝলমলে রৌদ্র না, কারণ আমাদের ফসলের জন্য বৃষ্টি দরকার এবং এমনকি খরার মৌসুমে প্রচন্ড খরার সময়ে, আমি যখন কোথাও যেতাম, সেখানে বৃষ্টি হত, যদিও পার্থক্য তৈরি করার জন্য সেটা নগন্য কিন্তু দুই বা তিন ফোঁটা হত শুধু বলার জন্য যে, “বেশ, আমি সেখানে ছিলাম”।
সম্ভবত, ঝলমলে রৌদ্রজ্জল দিনে আমার কিছু করার ছিল।

 

কিন্তু ঐ সূর্যকিরণ যখন স্বাভাবিকভাবেই আপনার অতি চমৎকার বাগান ও বাড়ির সৌন্দর্য্য বাড়ায় এবং যেটা আমরা এখান থেকে দেখতে পারছি, আপনি তখন অন্য একটি গাঢ় সূর্যকিরণের উল্লেখ করেন, যেটি আপনি মনে করেন আমাদের বন্ধুত্বকে ব্যাপক অর্থবহ এবং উদ্দেশ্যমন্ডিত করবে।

 

সুতরাং, যখন আপনি সূর্যকিরণের কথা উল্লেখ করলেন, তখন কিছু একটা আমার মনের মাঝে একটা ঘন্টা বাজল, কিন্তু আমি তাৎক্ষনিকভাবে বিশ্ব নিয়ে ভাবিনি। সেসব বিষয় আমার পরবর্তীতে মনে এসেছিল। আমাদের একটি বেদ গ্রন্থে যা বিশ্বের বিদ্যমান প্রাচীন সাহিত্য, সেখানে একটা উদ্ধৃতি খুঁজে পেলাম – সূর্যোদয়ের সাথে যেমন পদ্ম তার দ্যুতি পায়, তেমনিভাবে বন্ধুদের চিন্তা ভাবনা সুপ্রসন্ন হয় এবং সমৃদ্ধি বয়ে আনে।

 

সুতরাং আমরা আশা করি এই কক্ষে বন্ধুদের মাঝে হওয়া আলোচনা সমৃদ্ধি বয়ে আনবে। অবশ্যই ইতিমধ্যে আপনার দেশ উন্নতির শিখরে পৌঁছে গেছে, কিন্তু আমরা আশা করি আপনি অন্যদেরও সাহায্য করবেন যারা এখনো সেখানে পৌঁছায় নি, এবং আপনারা আরো উন্নতির চরম শিখরে পৌছান। গ্রহণযোগ্যতা মানুষকে সমৃদ্ধি উপভোগ করতে সাহায্য করে। আপনার সমৃদ্ধ হওয়ার উপাদান আছে। আমরা অনেক দেশ দেখেছি যাদের অনেক কিছু আছে, কিন্তু কোন কারণে জনগন তা উপভোগ করছে না। তারা কিছু একটা খুঁজছে কিন্তু তারা জানে না তারা কি খুঁজছে।

 

আমি আন্তরিকভাবে এই ইচ্ছা আপনাদের সাথে ভাগাভাগি করছি, শুধু ব্যক্তিগতভাবে নয় বরং ভারত সরকার এবং ভারতের সমগ্র জনগনের পক্ষ থেকে বলছি যারা যুক্তরাষ্ট্রের জনগনের প্রতি শ্রদ্ধাভাজন এবং বন্ধু সুলভ।

 

আমি বলেছিলাম, স্বাধীনতার সংগ্রামকালে যুক্তরাষ্ট্রের আহবানে এবং পরবর্তীতে আপনাদের বিজ্ঞানীদের এবং আরো যারা বিশ্বের জ্ঞান-বিজ্ঞানকে এগিয়ে নেয়ার কর্মকান্ডে আমাদের জনগন কতটা উৎসাহ পেয়েছিল।

ভারতে, যদিও আমাদের অনেকেই আগামী দিন নিয়ে ভাবে, কিন্তু যখন আমরা কিছু বলতে চাই, আমরা নিজের অজান্তেই অতীতে খুজতে থাকি। অনেক কথা আছে যেগুলো হাজার বছর পূর্বে লেখা হলেও সেটা আজো খুব ভালোভাবে লেখা যেতে পারে। আমাদের সংক্ষিপ্ত ইতিহাসে এমন কিছু অংশ (আমি নিশ্চিত আপনাদের আমেরিকাতেও তেমন আছে) এবং কিছু মহান আদর্শ আছে, যত উন্নতিই হোক আর মানবজাতি যত অগ্রসরই হোক আমরা সেগুলো টিকিয়ে রাখতে চাই।

 

তাই কিছু বিষয় থাকা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ন কিন্তু এর থেকে আরো গুরুত্বপূর্ন হলো কিভাবে তা উপভোগ করবেন এবং তাদের মধ্য দিয়ে কিভাবে আনন্দকে অন্যদের সাথে ভাগাভাগি করবেন।

 

আমি আপনাকে আবারো একবার ধন্যবাদ দিতে চাই আমাকে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য যার জন্য আমার এখানে আশা সম্ভব হয়েছে এবং আপনার সাথে অনেক গুরুত্বপূর্ণ এবং আনন্দদায়ক কথা বলার সুযোগ করে দেয়ার জন্য মি প্রেসিডেন্ট, এবং আশা করি আগামীকাল এই প্রসংসনীয় সমাবেশের সুন্দর মনোমুগদ্ধকর পরিবেশে উপস্থিত থেকে আরো অনেক বিশিষ্ট মানুষের সাথে গুরুত্বপূর্ণ সময় কাটাবো।

 

আমি কি আপনাদের সবাইকে, যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি এবং বিভিন্ন সময়ের ফার্স্ট লেডি এবং আগামী দিনের মহান ব্যক্তিবর্গদের সুস্বাস্থ্য কামনা করে এবং আমাদের দুই দেশের মধ্যকার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক উপলক্ষ্যে ভোজসভার আয়োজনে অংশ নেওয়ার জন্য বলতে পারি?

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
৬২। ওয়াশিংটনে ন্যাশনাল প্রেসক্লাবে প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতা ও প্রশ্নোত্তর ভারত সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ৫ নভেম্বর ১৯৭১

 

Razibul Bari Palash

<১২, ৬২, ১৩৮১৪৭ >

 

ওয়াশিংটনে ন্যাশনাল প্রেসক্লাবে প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতা

৫ নভেম্বর, ১৯৭১

 

আমি এখানে আবার আসতে পেরে অত্যন্ত আনন্দিত। আপনাদের অনেকের সাথে আমার আগে পরিচয় হয়েছে ভারতে বা বাইরে। আপনারা আমার কিছু বর্ণনা দিচ্ছিলেন। কিন্তু সম্ভবত যারা রাজনীতি করেন তাদের জীবনের দুটি দিন কখনো একরকম হয়না। অনেক সময় অনেক দরকারি অথবা বাধ্যবাধকতাও মেনে চলতে হয়। অনেক কিছু ইচ্ছার বিরুদ্ধেও করে যেতে হয়।

 

যখন আমি মানুষের সাথে থাকি সেটাই আমার আনন্দ। বিশেষ করে যখন আমি বিশেষ কোন মানুষদের সাথে থাকি যেমন আজকের এই হলরুমের আপনারা।

 

আমাদের সময় সীমিত, তাই আমি দীর্ঘ বক্তৃতা করতে যাচ্ছি না। আমি শুধু কয়েকটি পয়েন্ট বলব যা আপনাদের প্রশ্নগুলোর উত্তর পাইয়ে দিতে সহায়ক হবে। অবশ্যই, কোন বিশেষ বিষয়ে আগ্রহী হলে প্রশ্ন করবেন।

 

আমি এখানে পাঁচ বছর আগে এসেছিলাম এবং আমি আপনাদের বলেছিলাম ভারতে কি কি কাজ করার চেষ্টা করছি। সে সময় শুধু ভারতেই, বিশ্বের সব অংশে অনেক কিছু ঘটছিল। কিন্তু স্বাভাবিকভাবেই, এখন আমি আমার নিজের দেশে নিয়ে বেশি উদ্বিগ্ন।

 

১৯৬৬ সালে আমার দেশ নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছিল। সেটা করেছিল বিশ্বের প্রেস, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রেস – আমাদের ঐক্য, গণতন্ত্র এবং এমনকি আমাদের বেঁচে থাকার ক্ষমতা সম্পর্কে। সেসব পেরিয়ে এখানে আমি আবার এসেছি। তবে আমরা অনেক অন্ধকার এবং অসুবিধা পার করেছি যা অত্যন্ত কঠোর পরিশ্রমী মানুষের জন্যও কষ্টকর। আমরা এখন গম, ধান ও অন্যান্য শস্যতে স্বয়ংসম্পূর্ণ, যা আমাদের জনগণের প্রধানতম খাদ্য। সেচ সুবিধা ও সারের প্রতুলতায় অন্যান্য পণ্য উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমাদের পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচির কিছু প্রভাব ছিল। গত মার্চ মাস পর্যন্ত আমাদের জনসংখ্যা চৌদ্দ মিলিয়ন।

 

আমাদের রাজনৈতিক দলের ক্ষমতা পরিবর্তন শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে। এটি আমাদের জাতীয় জীবনে বৃহত্তর সঙ্গতি ও দিকনির্দেশনা দিয়েছে। আমাদের জনগণের আত্মবিশ্বাস আমাদের সাধারণ নির্বাচনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ষাট শতাংশ মানুষ ভোট দিয়েছে। শুধু শহরে নয়; প্রত্যন্ত অঞ্চলে ও পাহাড়ি এলাকাতেও। জনগণ আমাকে এবং আমার দলকে সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়েছে। কিন্তু নির্বাচনের বিশেষ দিক ছিল মানুষের উদ্যম; বিশেষ করে তরুণদের ভেতরে – যার জন্য তারা নিজেরাই স্বপ্রণোদিত হয়ে নির্বাচন প্রচারণা চালিয়েছিল।

 

নির্বাচন আমাদের মানুষের মনে নতুন আশার সঞ্চার করেছে এবং আমাদের নতুন শক্তিতে বলিয়ান করেছে এবং জীবন বোধ তৈরি করেছে। কিন্তু আজ আমাদের চিন্তাধারা বাংলাদেশ সঙ্কট নিয়ে বিষণ্ণ। সেখানেও নির্বাচন হয়েছিল। এমনকি সামরিক সরকারের অধীনে পূর্ববাংলার জনগণ মহা উচ্ছ্বাসে আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়েছে তাদের গণতান্ত্রিক অধিকারের জন্য। ভোটে তারা তাদের রায় ও আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছিল। সামরিক সরকার আলোচনার নামে সময় ক্ষেপণ করছিল। মূলত সেই সময়ে তারা প্রচুর সৈন্য নিয়ে আসছিল। এর পর যখনি আওয়ামীলীগ একটি পরিণতির দিকে যাচ্ছিল তখনি নেমে আসল ন্যাকারজনক সন্ত্রাস – ইতিহাসে যার তুলনা বিরল।

 

আমি মাঝে মাঝে আত্মরক্ষার্থে প্রেসের সমালোচনা করতে দ্বিধা করিনি। কিন্তু আজ এই অনুষ্ঠানে আমি বিশ্বের অনেক দেশের প্রেস সংবাদদাতাদের ধন্যবাদ দেই বিশ্বের বিবেককে জাগিয়ে তুলতে চেষ্টা করার জন্য। তারা পূর্ববাংলার ভয়ানক বিয়োগান্ত ঘটনাগুলো প্রকাশ করার মত সাহস ও অধ্যবসায় দেখিয়েছেন। তাদের রিপোর্ট ছিল সৎ এবং স্পষ্ট। কিন্তু ফোটোগ্রাফ দিয়ে তারা সেসব দুঃখ, দুর্দশা পৌঁছে দিতে পারেননি।

 

সেখানে যা হচ্ছে সেটি কোন গৃহযুদ্ধ নয়। এটা গণতান্ত্রিকভাবে ভোট দেবার অপরাধে বেসামরিক নাগরিকদের গণহত্যা। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার খুব ন্যাকারজনক পদ্ধতি এটি। এবং ইচ্ছাকৃতভাবে দেশের অসহায় মানুষকে অস্ত্র হিসাবে ব্যাবহার করে প্রতিবেশী দেশকে বিব্রত করার কৌশল। শরণার্থীদের সংখ্যা ইউরোপের কিছু দেশের জনসংখ্যার চেয়ে বেশী – যেমন অস্ট্রিয়া, বেলজিয়াম – যেখানে কিছুদিন আগে আমি গিয়েছিলেম।

 

আমরা মনে করি এটি একটি নতুন ধরণের আগ্রাসন। এটা অবশ্যই আমাদের উপর একটি বড় অর্থনৈতিক বোঝা। এর ফলে আমাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক উত্তেজনা সৃষ্টি হচ্ছে। এটা একটি দেশের আভ্যন্তরীণ বিষয় নয়। কারণ পূর্ব পাকিস্তানে যে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সমস্যা হচ্ছে তাতে অন্য দেশও ভুক্তভোগী হবে – আর তা হল ভারত। এটি কোন আন্তর্জাতিক বিরোধ না। একটি ইন্দো-পাকিস্তান বিরোধও নয়।

 

আমাদের বলা হয়েছে যে সৈন্য মুকাবিলা শান্তির জন্য হুমকি। সমগ্র জনগণের হত্যা করা হলে সেটা কি শান্তির জন্য হুমকি নয়? বিশ্ব কখন উদ্বিগ্ন হবে? দুই দেশের সমস্ত মানুষ যদি যুদ্ধের কারণে মৃত্যুবরণ করে, হাজার হাজার শত শত জবাই করা হয় ও জনগণের বিরুদ্ধে সামরিক শাসন যুদ্ধ ঘোষণা করে তাদের দেশ থেকে বহিস্কৃত করে তখনো কি তারা উদ্বিগ্ন হবেনা?

 

আমরা আগ্রাসনের এই অবাক করা অবস্থা মোকাবেলা করতে পারছিনা। আমাদের নতুন ভাবে জবাব দিতে হবে। তাই আমরা বিশ্ব নেতাদের সংকটের প্রকৃতি এবং মীমাংসা সম্পর্কে ধারনা দিতে ও নিতে এসেছি। আমি বেশ কয়েক মাস আগে সরকার প্রধানদের কাছে চিঠি লিখেছি এবং তাদের সাথে দেখা করতে আমার সহকর্মীরা প্রস্তুত আছে। আমরা তাদের অবহিত করি যে পাকিস্তানের সামরিক শাসকরা পূর্ব বাংলায় শেখ মুজিবুর রহমান ও তার নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতা না করে জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে নানারকম তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে।

 

বিশ্ব নেতারা এটা বুঝতে পারলে এই দুর্বিপাক এবং অনেক লক্ষ লক্ষ লোকের মাইগ্রেশন এড়ানো যেত। দিন চলে যাচ্ছে। কিন্তু এখনও সময় আছে বিশ্বনেতার পরিস্থিতির বাস্তবতা উপলব্ধি করার।

 

আমি বিভিন্ন সফরে অনেক রাজধানী পরিদর্শন করেছি। আমি জানতে চেয়েছি সমাধান কি হওয়া উচিৎ। জানতে চেয়েছি কীভাবে পূর্ব বাংলার জনগণ একটি দীর্ঘস্থায়ী সমাধান পেতে পারে?

 

আমি বিশ্বের নেতাদের বলেছি পূর্ব বাংলার জনগণের স্বার্থ বিরোধী কোন মতামত যেন তারা না দেন। একটি জাতির ভাগ্য তাদের অজান্তেই অন্যদের দ্বারা নির্ধারন করা ঠিক নয়। এশিয়ার জনগণের চাহিদা অনুযায়ী তাদের নিজস্ব পছন্দ অনুসারে টেকসই গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরি করা উচিৎ। গণতন্ত্র যদি আপনাদের জন্য ভালো হয় তাহলে ভারতের জন্যও ভালো। এবং এটা পূর্ববাংলার জনগণের জন্যও ভালো হবে।

 

গণতন্ত্র অবদমনের চেষ্টাই পাকিস্তানে সব ঝামেলার মূল কারণ। বিশ্বের দেশগুলির চিন্তা করা করা উচিত তারা কি চান? এক ব্যক্তি ও তার মেশিন এর পক্ষে কাজ করা নাকি একটি পুরো জাতির স্বার্থ – কোনটি তাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ?

 

আমাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছে ভারত কি উদ্যোগ নেবে। আমি মনে করি সবচেয়ে বড় কাজ হল ধইর্য ধরে থাকা। আমরা দেখতে চাই না যে এটি একটি ইন্দো- পাকিস্তান ইস্যু হয়ে যায়। দুই দেশের মধ্যে কোন সরাসরি আলোচনা এই পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করবে। সমাধান আরো কঠিন হবে। পাকিস্তান এমন একটি পরিস্থিতি বানানোর চেষ্টা করছে যাতে তারা বলতে পারে যে তাঁরা প্রতিবেশী দেশ দ্বারা আক্রান্ত। আমি বলেছি, হুমকি পাকিস্তান থেকে এসেছে- আমাদের দিক থেকে নয়। যখন তারা দেখছে তাদের প্ল্যান অনুযায়ী কাজ হচ্ছেনা তখন তারা আমাদের পশ্চিম প্রান্তে সৈন্য জড়ো করতে থাকে।

 

পাকিস্তান জাতিসংঘ থেকে পর্যবেক্ষক ভারতে পাঠাবার প্রস্তাব করেছে। প্রাথমিক ভাবে তাকালে এটিকে ভালো একটি কাজ বলে মনে হয়। কিন্তু এটি আসলে মূল সমস্যা থেকে বিশ্ববাসীর মনোযোগ অন্য দিকে ধাবিত করার কৌশল। আমরা আক্রান্ত হতে রাজি না। পূর্ববাংলার জনগণের জন্য কথা বলার কোন অধিকার আমাদের নেই – যার জন্য আমরা তাদের সাথে কোন আলোচনায় যেতে পারছিনা। শুধু শেখ মুজিব ও তার নির্বাচিত প্রতিনিধিদের এই অধিকার আছে।

 

আমি কিছু নির্দিষ্ট পয়েন্ট উল্লেখ করেছি যেগুলো ভেবেছিলাম আপনাদের আগ্রহ সৃষ্টি করবে। এখন আমাকে প্রশ্নের জন্য সময় দেয়া উচিৎ। তবে একটি কথা বলি আপনাদের – ক্লাবের প্রেসিডেন্ট সাহেব বলেছেন আমি সাহায্যের জন্য এখানে এসেছি – কিন্তু আমি কোন সাহায্যের জন্য আসিনি। এমনকি যে কয়টি দেশ আমি ভিজিট করেছি তার কারো কাছে আমি সাহায্য চাইনা। আমি আর আমার প্রতিবেশী দেশের অবস্থা জানানো আমার দায়িত্ব – যাতে দেশগুলোর নেতারা পরিস্থিতি বুঝতে পারেন। তারা তাদের সিদ্ধান নেবেন। আমার কাছ থেকে শোনার পরে আমি জানতে চাই তারা এটা নিয়ে কি ভাবছেন বা কি ম