বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধঃ দলিলপত্র – ১৪ তম খণ্ড (অনুবাদসহ)

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধঃ দলিলপত্র – ১৪ তম খণ্ড (অনুবাদসহ)

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ চতুর্দশ খণ্ড

বিশ্ব জনমত

 

 

 

 

 

 

 

 

অ্যাটেনশন!

পরবর্তী পেজগুলোতে যাওয়ার আগে কিছু কথা জেনে রাখুনঃ

 

  • ডকুমেন্টটি যতদূর সম্ভব ইন্টার‍্যাক্টিভ করা চেষ্টা করা হয়েছে। অর্থাৎ এই ডকুমেন্টের ভেতরেই অসংখ্য ইন্টারনাল লিংক দেয়া হয়েছে। আপনি সেখানে ক্লিক করে করে উইকিপিডিয়ার মতো এই ডকুমেন্টের বিভিন্ন স্থানে সহজেই পরিভ্রমণ করতে পারবেন। যেমন প্রতি পৃষ্ঠার নিচে নীল বর্ণে ‘সূচিপত্র’ লেখা শব্দটিতে কি-বোর্ডের Ctrl চেপে ধরে ক্লিক করলে আপনি সরাসরি এই ডকুমেন্টের সূচিপত্রে চলে যেতে পারবেন।

 

 

  • তারপর দলিল প্রসঙ্গ শিরোনামে কিছু লেখা আছে। এটি যুদ্ধদলিলের চতুর্দশ খণ্ড থেকে সরাসরি লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। এখানে আপনারা জানতে পারবেন যে এই ডকুমেন্টে আসলে কী কী আছে।

 

 

  • তারপর ‘সূচিপত্র’ এখান থেকেই মূল দলিল শুরু। সূচিপত্রটি সরাসরি দলিলপত্র থেকে নেয়া হয়েছে। সূচিপত্রে লেখা পেজ নাম্বারগুলো যুদ্ধদলিলের মূল সংকলনটির পেজ নাম্বারগুলোকে রিপ্রেজেন্ট করে।

 

 

 

 

 

  • যুদ্ধদলিলে মোট ১৫ টি খণ্ড আছেঃ

 

প্রথম খন্ড : পটভূমি (১৯০৫-১৯৫৮)
দ্বিতীয় খন্ড : পটভূমি (১৯৫৮-১৯৭১)
তৃতীয় খন্ড : মুজিবনগরঃ প্রশাসন
চতুর্থ খন্ড : মুজিবনগরঃ প্রবাসী বাঙালীদের তৎপরতা
পঞ্চম খন্ড : মুজিবনগরঃ বেতারমাধ্যম
ষষ্ঠ খন্ড : মুজিবনগরঃ গণমাধ্যম
সপ্তম খন্ড : পাকিস্তানী দলিলপত্র: সরকারী ও বেসরকারী
অষ্টম খন্ড : গণহত্যা, শরনার্থী শিবির ও প্রাসঙ্গিক ঘটনা
নবম খন্ড : সশস্ত্র সংগ্রাম (১)
দশম খন্ড : সশস্ত্র সংগ্রাম (২)
একাদশ খন্ড : সশস্ত্র সংগ্রাম (৩)
দ্বাদশ খন্ড : বিদেশী প্রতিক্রিয়াঃ ভারত
ত্রয়োদশ খণ্ড : বিদেশী প্রতিক্রিয়াঃ জাতিসংঘ ও বিভিন্ন রাষ্ট্র
চতুর্দশ খন্ড : বিশ্বজনমত
পঞ্চদশ খন্ড : সাক্ষাৎকার

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

  • এই ডকুমেন্টে প্রতিটি দলিলের শুরুতে একটা কোড দেয়া আছে।

<খণ্ড নম্বর, দলিল নম্বর, পেজ নম্বর>; অর্থাৎ <১৪, ২, ৪-৭> এর অর্থ আলোচ্য দলিলটি মূল সংকলনের ১৪ তম খণ্ডের ২ নং দলিল (দলিল নাম্বার সূচিপত্রের সাথে লিঙ্কড), যা ৪-৭ নং পৃষ্ঠায় মুদ্রিত আছে। দলিল নম্বর বলতে সূচিপত্রে উল্লিখিত নম্বরকে বুঝানো হচ্ছে। উদ্ধৃত ‘২’ নাম্বার দলিলটিতে ‘অবস্থা সৈনিকদের নিয়ন্ত্রণে’ রয়েছে। বুঝার সুবিধার্থে দলিলটির শুরুর অংশ দেখে নিনঃ

 

 

  • দলিলে যেসব বানান ভুল আমরা খুঁজে পেয়েছি, সেগুলোকে হলুদ মার্ক করা হয়েছে।

 

 

  • মনে করুন, আপনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রএর ভুমিকা নিয়ে কিছু একটা লিখতে চাইছেন। এই ফাইলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র” কিংবা “আমেরিকা” লিখে সার্চ দিলেই ১৪তম খণ্ডের সেই সংক্রান্ত সকল দলিল পেয়ে যাবেন। ফলে রেফারেন্স নিয়ে লিখতে আপনার খুবই সুবিধা হবে। কারণ আমাদের মূল উদ্দেশ্য একটাই। আমরা যেন সঠিক ইতিহাস চর্চা করে বেড়ে ওঠা একটি প্রজন্ম হয়ে উঠি। এটা আমাদের নিজেদের জন্যেই অত্যন্ত প্রয়োজন। যে জাতি নিজের জন্মের ইতিহাস জানে না, সে জাতির চেয়ে দুর্বল সত্ত্বা পৃথিবীতে আর কিছু নেই।

 

 

  • অনুবাদ করা অংশে আলাদা করে অনুবাদ লিখে দেয়া আছে।

 

  • আমাদের এই ১২তম খণ্ডে যারা কাজ করেছেন তারা এক একজন এক এক ধরনের অপারেটিং সিস্টেম বা একই অপারেটিং সিস্টেম/সফটওয়ারের বিভিন্ন ভার্শনে কাজ করেছেন। যার কারনে ভিতরের টেক্সট মাঝে মাঝে “ওলটপালট” দেখা যেতে পারে। সেরকম কিছু হলে দয়া করে বিচলিত হবেন না। যে অংশটুকু “ওলটপালট” দেখাচ্ছে সে অংশটুকু কপি বা কাট করে নিয়ে “নোটপ্যাডে” পেস্ট করুন। দেখবেন ঠিক হয়ে গেছে। এরপর সেটাকে চাইলে কপি করে ওয়ার্ড ফাইলটিতে পেস্ট করে রাখতে পারেন।

 

 

মনোযোগ দিয়ে সারসংক্ষেপটি পড়ার জন্য ধন্যবাদ। এবার বিস্তারিত।


 

দলিল প্রসঙ্গঃ

বিশ্ব জনমত

(পৃষ্ঠা নাম্বারগুলো মূল দলিলের পৃষ্ঠা নাম্বার অনুসারে সরাসরি লিখিত। এর সাথে এই ওয়ার্ড ফাইলের পৃষ্ঠা নাম্বার রিলেটেড নয়)

 

চতুর্দশ খণ্ডের বিষয়বস্তু হচ্ছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের ঘটনাবলি বিভিন্ন দেশের পত্র পত্রিকা এবং বেতার প্রচারে ব্যাপকভাবে স্থান পায়। বস্তুতপক্ষে প্রায় প্রতিদিনের খবরের কাগজে বাংলাদেশের বিভিন্ন ঘটনার রিপোর্ট বা সম্পাদকীয় মুদ্রিত হয়। এখানে উল্যেখ্য যে, প্রায় সব প্রকাশনাই ছিল বাংলাদেশে আন্দোলনের পক্ষে অথবা সেই সময় এই দেশের মানুষের অবর্ননীয় দুঃখ কষ্টের ওপর রচিত নিবন্ধ।

 

এই খণ্ড নির্মানে প্রকল্প দলিলপত্রের ভিত্তিতে কয়েকটি দেশ ভিত্তিক বিভাজন করেছেন। সমগ্র গ্রন্থ ৫ টি অধ্যায়ে বিভক্ত করা হয়েছে। প্রথম অধ্যায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, পৃষ্ঠা ১-৩১৪, দ্বিতীয় অধ্যায়, যুক্তরাজ্য, পৃষ্ঠা ৩১৭-৪৬১ তৃতীয় অধ্যায়, বিবিসি, পৃষ্ঠা ৪৬৫- ৫৫৮; চতুর্থ অধ্যায়, বিশ্ব রাষ্ট্র সমূহ, পৃষ্ঠা ৫৬১-৬৬৫; পঞ্চমত অধ্যায়, ভারত, পৃষ্ঠা; ৬৬৯-৯৮০।

 

গণমাধ্যমের ক্ষেত্রে কেবলমাত্র বিবিসি থেকে প্রচারিত সংবাদ ও প্রতিবেদন সমূহ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর কারণ হচ্ছে অন্যান্য বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত সংবাদ ও নিবন্ধ সমূহ চেষ্টা সত্ত্বেও সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। বিবিসি এ ব্যাপারে সহযোগিতা দেখায়। এছাড়া এই বেতার কেন্দ্রের খবর সমূহ ছিল পশ্চিমি বেতারকেন্দ্রগুলি কর্তৃক প্রচারিত তথ্যসমূহের প্রতিনিধিমূলক।

 

মার্কিন পত্র পত্রিকা থেকে নির্বাচন কালে যতদূর সম্ভব বিভিন্ন সংবাদের গুরুত্ব এবং প্রতিনিধিত্বমূলক চরিত্র উপস্থিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। নিউয়র্ক টাইমস, ওয়াশিংটন পোস্ট, বাল্টীমোর সান, টাইম ও নিউজ উইক ম্যাগাজিন, ওয়ালস্ট্রিট জার্নাল ইত্যাদিতে প্রকাশিত খবরাদিতে প্রাধান্য পেয়েছে। কেননা এই পত্রিকাগুলো হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের জনমত গঠনে সবচেয়ে শক্তিশালী এবং এগুলো ৭১ সালে বাংলাদেশের পক্ষে প্রচার কার্যে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। তুলনামূলকভাবে স্বল্প পরিচিত কিছু পত্র পত্রিকার সংবাদ নিবন্ধও সংযোজিত হয়েছে। যেসব প্রতিবেদন সেসময় বাংলাদেশের মানুষের কাছে জনপ্রিয় হয়েছিল তার বেশ কয়েকটি এই খণ্ডে ছাপানো হয়েছে।

 

যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত বিভিন্ন পত্র পত্রিকার ক্ষেত্রেও উপরোক্ত নীতিমালা মেনে চলা হয়েছে। তৎকালীন যুক্তরাজ্যের গণমাধ্যম বাংলাদেশের আন্দোলনকে ব্যাপকভাবে বিশ্ববাসীর কাছে উপস্থাপিত করে। বিবিসি থেকে প্রচারিত অনুষ্ঠানসমূহের মধ্যে একটি ছিল সাপ্তাহিক সংবাদ পরিক্রমা। এই অনুষ্ঠানে যুক্তরাজ্যে প্রকাশিত প্রভাবশালী পত্রিকা সমূহের সংবাদ ও প্রতিবেদন এবং তাঁদের ওপর মন্তব্য প্রচার করা হত। অতএব, এই দুই অধ্যায় একে অন্যের পরিপূরক হিসেবে এই গ্রন্থে স্থান পেয়েছে।

 

চতুর্থ অধ্যায় বিন্যাসকালে যতদূর সম্ভব চেষ্টা করা হয়েছে বিশ্বজনমতের একটি প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র তুলে ধরার। এই উদ্যেশ্যে যেসব পত্র পত্রিকা প্রকল্পের সংগ্রহে ছিল সেগুলো থেকে যতদূর সম্ভব একটি বিস্তৃত রূপ উপস্থিত করা হয়েছে। কিছু কিছু দেশের অনুপস্থিতির কারণ হচ্ছে আমাদের সংগ্রহের অভাব।

 

১৯৭১ সালে ভারতের সমস্ত পত্র পত্রিকায় বাংলাদেশ সংক্রান্ত সংবাদই সবচেয়ে বেশী প্রাধান্য পায়। যেহেতু ভারতের পররাষ্ট্র এবং আভ্যন্তরীণ প্রধান বিষয় ছিল বাংলাদেশ সমস্যা সেহেতু ভারতীয় খবর এবং বাংলাদেশ সংক্রান্ত খবরের মধ্যে এমন কোন পার্থক্য ছিলোনা। পঞ্চম খণ্ডের এ অধ্যায় সম্পাদনা করতে গিয়ে দলিলের ব্যাপকতাই ছিল আমাদের সামনে এক প্রধান সমস্যা। এই সমস্যা উত্তরণে প্রকল্প যথাসম্ভব চেষ্টা করেছে সেই সব সংবাদ নিবন্ধকে স্থান দিতে যেগুলি সরাসরি বাংলাদেশের অবস্থান এবং আন্দোলন সম্পর্কিত। একই সাথে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে ভারতীয় নীতি সংক্রান্ত দলিলসমূহও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বিভিন্ন দল ও গোষ্ঠীর ভূমিকাও বাদ যায়নি। অর্থাৎ সরকারী কর্মকাণ্ডের বাইরে যেসব তৎপরতা ছিল সেদিকেও নজর দেয়া হয়েছে।

 

কেবলমাত্র একটি খণ্ডে সমগ্র বিশ্বজনমতের প্রতিচ্ছবি পাঠকের সামনে উপস্থিত করা দুঃসাধ্য ব্যাপার। প্রকল্প চেষ্টা করেছে তার একটি প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র তুলে ধরতে। এর মধ্যে কিছু পরিচিত প্রতিবেদন হয়ত বাদ পরতে পারে তবে প্রকল্পের মূল উদ্যেশ্য ছিল ১৯৭১ সালে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আন্দোলনের প্রতি সমর্থন এবং সহানুভূতির একটি নির্বাচিত দলিল- সমগ্র নির্মান করা।

 

পাঠকের কাছে কিছু কিছু সংবাদ এবং প্রতিবেদন হয়ত পরস্পর বিরোধী মনে হতে পারে। এটাই স্বাভাবিক, কারণ, ঘটনাসমুহ বিভিন্ন সাংবাদিক অবলোকন করেছেন তাঁদের নিজস্ব প্রেক্ষিত থেকে। তাছাড়া তথ্যেরও কিছু কিছু গরমিল থাকা অস্বাভাবিক নয়। কারণ সে সময় কোন কেন্দ্রীয় তথ্য সরবরাহের ব্যাবস্থা ছিলোনা। এমনকি বলা যেতে পারে যে সে অবস্থায় নির্ভুল সংবাদ সংগ্রহ করা ছিল প্রায় অসম্ভব। সংগৃহীত তথ্য এবং অনুমানের ওপর ভিত্তি করেই এইসব রিপোর্ট রচিত হত। আশা করা যায় এই ধারাটি পাঠক উপলব্ধি করবেন এবং ৭১ এর বাংলাদেশের ঘটনাবলির একটি সামগ্রিক চিত্র এই খণ্ডের মাধ্যমে উপস্থাপিত হবে।

 

 

 

সূচীপত্র

 

প্রথম অধ্যায়; পত্র-পত্রিকাঃ যুক্তরাষ্ট্র
ক্রমিক শিরোনাম পৃষ্ঠা নাম্বার কম্পাইলার/অনুবাদক
ঢাকায় বিদ্রোহ দমনে কামান ব্যবহার ১-৩ Razibul Bari Palash
অবস্থা সৈন্যদের নিয়ন্ত্রণে ৪ -৭ Nishat Oni
সেনাবাহিনী কর্তৃক বিদেশি সাংবাদিক বহিষ্কার Razibul Bari Palash
ট্যাঙ্কের বিরুদ্ধে লাঠি ৯-১০ Farjana Akter Munia
ইয়াহিয়ার পূর্ব পাকিস্তান আক্রমণ পূর্ব পরিকল্পিত ১১ -১৭
Saikat Joydhar
বিক্ষুব্ধ পাকিস্তান ১৮
ঐন্দ্রিলা অনু
পাকিস্তানের মর্মান্তিক ঘটনা ১৯ Farjana Akter Munia
ট্যাঙ্ক দ্বারা শহর ধ্বংস ২০
Fazla Rabbi Shetu
পূর্ব পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ সংঘাত ২১ Nobel Himura
১০ পাকিস্তানের নামে (সম্পাদকীয়) ২২ Nobel Himura
১১ দ্বন্দ্বের মূলে ২৩ Razibul Bari Palash
১২ পাকিস্তানের ভয়ংকর খেলা ২৫-২৬ Nobel Himura
১৩ পাকিসানিরা বাঙ্গালীদের নিশ্চিনহ করছে ২৭-২৮ Nobel Himura
১৪ পাকিস্তানে গৃহ যুদ্ধ ২৯–৩৪ Tanuja Barua
১৫ পাকিস্তান   – পতনের পদধ্বনি ৩৫-৩৭ Raisa Sabila
১৬ বাঙলায় রক্ত বন্যা ৩৮ Razibul Bari Palash
১৭ দেশত্যাগীদের মতে ভয়ঙ্কর যুদ্ধ চলছে ৩৯–৪১ ঐন্দ্রিলা অনু
১৮ আমরা সবাই বাঙ্গালী ৪২ Razibul Bari Palash
১৯ প্রথম রাউন্ডে পশ্চিম পাকিস্তানের বিজয় ৪৪-৪৫ ঐন্দ্রিলা অনু
২০ পাকিস্তান – একটি আদর্শের মৃত্যু ৪৬-৪৯ Raisa Sabila
২১ হত্যাযজ্ঞের মধ্যে বাঙ্গালীদের মন্ত্রীসভা গঠন ৫০–৫২ Raisa Sabila
২২ পাকিস্তানে বিদ্রোহীরা স্বীকৃতি চায় ৫৩ Razibul Bari Palash
২৩ বাঙ্গালী যোদ্ধাদের সঙ্গে ৫৪-৫৬ হাসান মাহবুব
২৪ গুলি না রুটি ৫৭ Razibul Bari Palash
২৫ অর্থনৈতিক দুর্যোগ ৫৮-৫৯ Razibul Bari Palash
২৬ পুর্ব পাকিস্তানের হত্যালীলা (সম্পাদকীয়) ৬০ Saniyat Islam
২৭ বাঙ্গালী সৈনিকের ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা ৬১–৬৩ Anjamul Hoque Ananda
২৮ পাকিস্তানের অস্ত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি ৬৪-৬৫ Saniyat Islam
২৯ এই যুদ্ধে নারকীয় অবস্থা কেবল এক পক্ষেরই ৬৬-৬৭ Tirtha Taposh
৩০ কুষ্টিয়ার যুদ্ধ ৬৮–৬৯ Ashraful Mahbub
৩১ একটি মূমুর্ষ আদর্শ ৭০–৭৩ Shuvadittya Saha
৩২ সীমান্তের দিকে চাপ ৭৪-৭৫ Nishat Oni
৩৩ শকুন আর বুনো কুকুর ৭৬-৭৮ তানভীর আহমেদ নোভেল
৩৪ পাকিস্তান – একটি ভগ্নপ্রায় স্বপ্ন ৭৯ Prodip Mitra
৩৫ পূর্ব পাকিস্তান দুর্যোগোত্তর যন্ত্রণা ৮০–৮১ Prodip Mitra
৩৬ মৃতের শহর ঢাকা ৮২-৮৩ Prodip Mitra
৩৭ পাশবিক হত্যা ( সম্পাদকীয়) ৮৪ Prodip Mitra
৩৮ ঘৃণ্য হত্যাকাণ্ড ৮৫–৮৬ Ashik Uz Zaman
৩৯ একজন মেজরের বিদ্রোহ ৮৭ Razibul Bari Palash
৪০ যুদ্ধ না অপমান ৮৯-৯০ Razibul Bari Palash
৪১ নির্যাতিত বাঙ্গালী (সম্পাদকীয়) ৯১ Razibul Bari Palash
৪২ পাকিস্তানের কথা ৯২ Ashik Uz Zaman
৪৩ বিকল্প চিন্তা ৯৩–৯৪ Ashik Uz Zaman
৪৪ পূর্ব পাকিস্তানের গণহত্যা ৯৫-৯৭ Ashik Uz Zaman
৪৫ পাকিস্তান – বিনষ্ট ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার প্রয়াস ৯৮-৯৯ Razibul Bari Palash
৪৬ পাকিস্তানের সাহায্য বন্ধের জন্য সিনেটরদের বিবৃতি ১০০–১০১ Ashik Uz Zaman
৪৭ অনিশ্চিত আশ্রয় ১০২-১০৩ Ashik Uz Zaman
৪৮ পূর্ব পাকিস্তানের হত্যাযজ্ঞ (সম্পাদকীয়) ১০৪ Ashik Uz Zaman
৪৯ ভয়ঙ্কর দুর্যোগ ১০৫ Razibul Bari Palash
৫০ ঘৃণ্য হত্যাকাণ্ড ১০৬-১০৭ Ashik Uz Zaman
৫১ বাঙ্গালী শরনার্থী – দুঃখের শেষ নেই ১০৮–১১০ Shihab Sharar Mukit
৫২ নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও পাকিস্তানে মার্কিন অস্ত্র প্রেরণ ১১১-১১৪ Ashik Uz Zaman
৫৩ অস্ত্র যখন ধর্মতাত্তিক সমস্যা ১১৫–১১৬ Ashik Uz Zaman
৫৪ পাকিস্তানী সৈন্যদের গ্রাম আক্রমণ ১১৭ Razibul Bari Palash
৫৫ টিক্কাখানের পৈশাচিক রক্তস্নান ১১৯–২২১ Ashik Uz Zaman
৫৬ মার্কিন সরকার পাকিস্তানে সাহায্যদান অব্যহত রাখবে ১২২-১২৩ Zulkar Nain
৫৭ পাকিস্তানকে সাহায্য দেয়া কেন? ১২৪–১২৫ Zulkar Nain
৫৮ বাঙ্গালী নিধনে সাহায্য ১২৬ Zulkar Nain
৫৯ পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনীতি বিপুলভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ১২৭-১২৯ Zulkar Nain
৬০ একটি বিদেশি সৈন্যবাহিনী কর্তৃক আরোপ ১৩০-১৩২ Zulkar Nain
৬১ দক্ষিণ এশিয়া – দুর্যোগের পদধ্বনি ১৩৩-১৩৪ Zulkar Nain
৬২ পাকিস্তানের জন্য মার্কিন অস্ত্র – একটি গ্লানির ইতিহাস ১৩৫-১৩৬ Razibul Bari Palash
৬৩ পাকিস্তান ১৩৭-১৩৮ নীতেশ বড়ুয়া
৬৪ ভারত ১৩৯–১৪০ নীতেশ বড়ুয়া
৬৫ পশ্চিম পাকিস্তানীদের বাঙ্গালী দমন অব্যাহত ১৪১-১৪৫ Ashik Uz Zaman
৬৬ পাকিস্তানের নিন্দা ১৪৬ Razibul Bari Palash
৬৭ পাকিস্তানের উদ্যেশ্যে প্রেরিত অস্ত্র ভর্তি জাহাজ প্রতিরোধের কয়েকটি সংবাদ ১৪৭-১৫৪
Lenin Ghazi
৬৮ বাঙ্গালীরা রুখে দাঁড়িয়েছে ১৫৫-১৫৬ নীতেশ বড়ুয়া
৬৯ একটি বিভক্ত দেশ ১৫৭–১৬২ নীতেশ বড়ুয়া & Raisa Sabila
৭০ পাকিস্তানের অপর একটি প্রস্তাব ১৬৩–১৬৪
Masroor Ahmed Makib
৭১ যন্ত্রণা এবং বিপদ ( সম্পাদকীয়) ১৬৫-১৬৭ Zulkar Nain
৭২ মার্কিন  যুক্তরাষ্ট্রের দায়িত্ব ১৬৮–১৬৯ Zulkar Nain
৭৩ ভিয়েতনাম যুদ্ধের মত ১৭০-১৭১ Zulkar Nain
৭৪ জাতিসঙ্ঘের সাহায্য দল ১৭২-১৭৩ হোসাইন মুহাম্মদ মুরাদ
৭৫ একটি জাতীকে হত্যা করা হচ্ছে ১৭৪–১৮১
Lima Chowdhury
৭৬ সোনার বাঙলা ধ্বংস অভিযান ১৮২–১৯১
Raisa Sabila
৭৭ পূর্ব পাকিস্তানের বিপর্যস্ত মানুষ ১৯২ Razibul Bari Palash
৭৮ কূটনীতিকদের পাকিস্তানী পক্ষ ত্যাগ ১৯৪-১৯৫ Nishat Oni
৭৯ ভারতের সাথে চুক্তি সোভিয়েতের যুদ্ধ এড়াবার চেষ্টা ১৯৬–১৯৮ Raisa Sabila
৮০ সিদ্ধান্তের সময় ১৯৯ হাসান মাহবুব
৮১ বাঙলায় কি ‘চরম; সিদ্ধান্ত নেয়া হচ্ছে? ২০০–২০১ Fariha Binte Mahmud
৮২ আমরা সাহায্য করতে পারি তবে অস্ত্র দিয়ে নয় ২০২-২০৩ Fariha Binte Mahmud
৮৩ মার্কিন বিমানে বাঙলায় সৈন্য পাঠানো হচ্ছে ২০৪-২০৫ Razibul Bari Palash
৮৪ ঘনিস্ট বন্ধু ২০৬ Shakeel Syed Badruddoza
৮৫ শরনার্থিরা বলেন সৈন্যরা হত্যাকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে ২০৯–২১০ Shakeel Syed Badruddoza
৮৬ পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ সমস্যা ২১১ হাসান মাহবুব
৮৭ পাকিস্তান ভারত যুদ্ধ ২১২-২১৩ Nijhum Chowdhury
৮৮ নীরব দর্শকের ভূমিকা ২১৪ হাসান মাহবুব
৮৯ তারা কি থাকবে না ফিরে যাবে ২১৫-২১৬ Nusrat Jahan Ima
৯০ পাকিস্তান ভারতের উপর যুদ্ধের ছায়া ২১৭-২১৮ Razibul Bari Palash
৯১ পূর্ব পাকিস্তানের বীভৎস অবস্থা সব আশা ধ্বংস করেছে ২১৯–২২৩ Tanuja Barua
৯২ সিনেট কর্তৃক পাকিস্তানে সাহায্য বন্ধের প্রস্তাব ২২৪–২২৫ Zulkar Nain
৯৩ পাকিস্তানের অবস্থা সংকটজনক ২২৬–২২৭ Zulkar Nain
৯৪ বাংলাদেশের জন্য যুদ্ধ ২২৮-২২৯ Zulkar Nain
৯৫ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তান ও ভারতকে সংযত হতে বলেছে ২৩০–২৩১ Partha Sumit Bhattacharjee
৯৬ এশিয়ার নাজুক পরিস্থিতি ২৩২ Zulkar Nain
৯৭ সাহায্য কমিয়ে দেয়া একটি নিষ্ঠুর সিদ্ধান্ত ২৩৩ Zulkar Nain
৯৮ পাকিস্তান ভারতের সৈন্য মুখোমুখি ২৩৪–২৩৫ Zulkar Nain
৯৯ গণহত্যা বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত ভারত সৈন্য পিছু হটাবে না ২৩৬-২৩৭ Zulkar Nain
১০০ শান্তির প্রতি হুমকি ২৩৮ Razibul Bari Palash
১০১ সৈন্য প্রত্যাহার করলেই সমস্যার সমাধান হবে না ২৩৯ ঐন্দ্রিলা অনু
১০২ দক্ষিণ এশিয়ার বিপর্যয় এড়ানোর পন্থা ২৪০–২৪২ Aabir M. Ahmed
১০৩ যুদ্ধের সম্ভবনা ২৪৩ Razibul Bari Palash
১০৪ বাংলাদেশের যুদ্ধে পাকিস্তানের ক্ষয়ক্ষতি ২৪৪ Razibul Bari Palash
১০৫ শান্তির প্রতি নতুন হুমকি ২৪৫-২৪৬ Iffat E Faria
১০৬ যুদ্ধের আলামত ২৪৭-২৪৮ Aabir M. Ahmed
১০৭ বাঙলার যুদ্ধ ২৪৯-২৫০ Razibul Bari Palash
১০৮ বিদেশি সাহায্যের নতুন দিক ২৫১-২৫২ Razibul Bari Palash
১০৯ পূর্ব পাকিস্তানে উপ নির্বাচন ২৫৩-২৫৪ Razibul Bari Palash
১১০ যুদ্ধ অত্যাসন্ন ২৫৫–২৫৮ Sajib Barman
১১১ সন্ত্রাস পূর্ব পাকিস্তানের একমাত্র পরিস্থিতি ২৫৯ Razibul Bari Palash
১১২ পরাজয়োন্মুখ যুদ্ধ ২৬০–২৬৪ Ayon Muktadir
১১৩ পাক সেনার আক্রমণের পড় একটি শহর ২৬৫ Razibul Bari Palash
১১৪ যুদ্ধ না শান্তি ২৬৬ Razibul Bari Palash
১১৫ উপমাহাদেশের জন্য সাহায্য অপ্রতুল ২৬৭ Razibul Bari Palash
১১৬ মধ্যস্থতার সময় এখনো আছে ২৬৮ Razibul Bari Palash
১১৭ দক্ষিণ এশিয়া ২৬৯ Razibul Bari Palash
১১৮ ভারত কখন আক্রমণ করবে ২৭০–২৭১ Razibul Bari Palash
১১৯ পূর্ব পাকিস্তান – পুনর্দখলকৃত উপনিবেশ ২৭২ Razibul Bari Palash
১২০ নিরাপত্তা পরিষদের উচিৎ মূল সমস্যার দিকে তাকান ২৭৩

Mitu Mrinmoye

 

১২১ মূল সমস্যার সমাধানকরন ২৭৪ Razibul Bari Palash
১২২ পাকিস্তানের হঠকারিতা ২৭৫ Razibul Bari Palash
১২৩ বাঙলায় যুদ্ধ ২৭৬-২৮৫ Tanuja Barua
১২৪ মুক্ত যশোরে বাঙ্গালী ২৮৬ Mitu Mrinmoye
১২৫ হর্ষোতফুল্ল বাঙ্গালীরা ভারতীয় সৈন্যদের স্বাগত জানাচ্ছে ২৮৭ Shuvaditto
১২৬ উচ্ছ্বসিত বাঙ্গালীদের স্বাধীনতা উদযাপন ২৮৮-২৮৯ Orgho Zaber
১২৭ নিক্সন এবং দক্ষিণ এশিয়া ২৯০-২৯১ Shuvaditto
১২৮ পশ্চিম বঙ্গের চিঠি ২৯২–২৯৯ Hasan Tareq Imam
১২৯ হর্ষধনির মধ্য দিয়ে বাঙ্গালীদের ঢাকা প্রবেশ ৩০০–৩০২ Anjamul Hoque Ananda
১৩০ বিজয়োল্লাস ৩০৩ হাসান মাহবুব
১৩১ যুদ্ধের গর্ভ থেকে একটি জাতির জন্ম ৩০৪–৩১৬ Razibul Bari Palash
দ্বিতীয় অধ্যায়; পত্র-পত্রিকাঃ যুক্তরাজ্য
১৩২ ট্যাঙ্কের দ্বারা বিদ্রোহ দমন ৩১৭-৩২৩ Hasan Tareq Imam
১৩৩ পাকিস্তানের হত্যাকাণ্ড ৩২৪ হাসান মাহবুব
১৩৪ বাঙলার দুর্যোগ ৩২৫ Razibul Bari Palash
১৩৫ বাঙলার জন্য কাঁদো ৩২৬-৩২৮ Masroor Ahmed Makib
১৩৬ পূর্ব পাকিস্তানে হত্যা লীলা ৩২৯-৩৩০ Nobel Himura
১৩৭ অস্ত্রের মুখে একতা ৩৩১-৩৩৩ Nishat Oni
১৩৮ পাকিস্তানের রক্তাক্ত পথ ৩৩৪ Nobel Himura
১৩৯ একটি সাহায্যের আবেদন ৩৩৫-৩৩৭ Ashik Uz Zaman
140 বইতে নাই
১৪১ ক্ষমতার সীমানা ৩৩৮-৩৪০ Raisa Sabila
১৪২ পরিকল্পিত হত্যা ৩৪১-৩৪৪ Lima Chowdhury
১৪৩ হাজারো সন্ত্রস্ত মানুষ এখনো ঢাকা থেকে পালাচ্ছে ৩৪৫-৩৪৬ Lima Chowdhury
১৪৪ বাগাড়ম্বর ও বাস্তব ৩৪৭–৩৪৮ Lima Chowdhury
১৪৫ বাংলাদেশের রক্ত ৩৪৯-৩৫০ Saniyat Islam
১৪৬ হত্যা ও প্রতিরোধের যুদ্ধ একই সাথে চলছে ৩৫১-৩৫৪ Lima Chowdhury
১৪৭ শেখ মুজিবের দল সামরিক প্রতিরোধের জন্য প্রস্তুত ছিলোনা ৩৫৫-৩৫৭ Ayon Muktadir
১৪৮ বাংলাদেশের স্বপ্ন মিলিয়ে যাচ্ছে ৩৫৮-৩৬৪ Razibul Bari Palash
১৪৯ পাকিস্তান – কথা বলার সময় এসেছে ৩৬৫-৩৬৬ Razibul Bari Palash
১৫০ বিশ্বের সাম্প্রতিকতম শরনার্থী ৩৬৭ Saiful Arefin Borshon
১৫১ স্তব্ধ বিবেক ৩৬৮-৩৬৯ Raisa Sabila
১৫২ অবিশ্বাস্য দুর্ভোগ ৩৭০-৩৭২ Saiful Arefin Borshon
১৫৩ বাঙলার পিরিত জনগণ ৩৭৩ Saiful Arefin Borshon
১৫৪ কলেরা নিয়ন্ত্রণের বাইরে ৩৭৪ Razibul Bari Palash
১৫৫ গণহত্যা ৩৭৬–৩৯৫ Zulkar Nain
১৫৬ যুদ্ধ এবং শরনার্থী পরিস্থিতি ৩৯৬-৩৯৮ Ashraful Mahbub
১৫৭ ধর্মান্ধ ও পাষণ্ডদের রাজত্ব ৩৯৯-৪০৫ Hasan Tareq Imam
158 বইতে নাই
১৫৯ বাঙ্গালীদের দেশত্যাগ এখনো চলছে ৪০৬-৪০৭ Razibul Bari Palash
১৬০ বাঙলায় পাকিস্তানীদের দিন শেষ হয়ে আসছে ৪০৮-৪০৯ Razibul Bari Palash
১৬১ বাংলাদেশের অবস্থা ভালো নয় ৪১০ Razibul Bari Palash
১৬২ পূর্ব পাকিস্তানে দূর্ভিক্ষ অনিবার্য ৪১১-৪১২ Razibul Bari Palash
১৬৩ বাংলাদেশ কে স্বাধীন করতেই হবে ৪১৩-৪১৫ Ashik Uz Zaman
১৬৪ আরও শরনার্থী আসতে পারে ৪১৬ Razibul Bari Palash
১৬৫ পাকিস্তানীদের প্রতিশোধমূলক হত্যা ৪১৭ Razibul Bari Palash
১৬৬ নিরস্ত্র বাঙ্গালীদের অপর অত্যাচার অব্যাহত ৪১৮-৪১৯ Razibul Bari Palash
১৬৭ গেরিলারা ১২ মাস ব্যাপী যুদ্ধেও লক্ষ্য স্থির করেছে ৪২০-৪২১ Ashik Uz Zaman
১৬৮ গেরিলা বাহিনী রাস্তায় রাস্তায় যুদ্ধ শুরু করেছে ৪২২ Razibul Bari Palash
১৬৯ যে যুদ্ধ বিশ্বের প্রতি হুমকি স্বরূপ ৪২৩–৪২৪ Ashik Uz Zaman
১৭০ অবরুদ্ধ ঢাকা ৪২৫–৪২৬ Ashik Uz Zaman
১৭১ জীবিত এবং মুক্ত ৪২৭-৪২৯ Ashik Uz Zaman
১৭২ বাংলাদেশ মুক্ত ৪৩০ Razibul Bari Palash
১৭৩ স্বাধীন বাঙলা ৪৩২ Ashik Uz Zaman
১৭৪ পাকিস্তানীদের প্রতিরোধ ব্যাবস্থা যথেষ্ট নয় ৪৩৩-৪৩৪ Ashik Uz Zaman
১৭৫ ঢাকার উপর ছত্রী সেনা ৪৩৫ Razibul Bari Palash
১৭৬ পশ্চাদগামী পাকিস্তানীদের প্রতিশোধ ৪৩৬ Razibul Bari Palash
১৭৭ ঢাকা ডায়রি ৪৩৮–৪৪০ Abdulla Al Asif
১৭৮ সাত কোটি মানুষের যুদ্ধ ৪৪১-৪৪৮

Abdulla Al Asif &

Razibul Bari Palash

১৭৯ গেরিলারা এখন ঢাকার ভিতরে ৪৪৯ Razibul Bari Palash
১৮০-a ঢাকা ধ্বংসের মুখোমুখি ৪৫০-৪৫১ Tashrik Mohammad Sikder
১৮১-a স্বাধীন বাংলাদেশের সরকার কর্তৃক যশোরে ক্ষমতা গ্রহণ ৪৫২-৪৫৩ Razibul Bari Palash
১৮২-a বাংলাদেশে পাকিস্তানীদের পরাজয় অবধারিত ৪৫৪ Razibul Bari Palash
১৮৩-a

১। নিয়াজির প্রসস্ততি

২। ইয়াহিয়ার সৈন্য বাহিনীর লজ্জা

৪৫৫-৪৫৭ Razibul Bari Palash
১৮৪-a ঢাকায় সমাপ্তি ৪৫৮ Razibul Bari Palash
১৮৫-a বর্তমান বাংলাদেশ ৪৫৯ Razibul Bari Palash
১৮৬-a বাংলাদেশের বিরাট বিজয় ৪৬০ Razibul Bari Palash
তৃতীয় অধ্যায় –বিবিসি, লন্ডন
১৮৭-a স্বাধীনতা যুদ্ধকালে বাংলাদেশের ঘটনাবলির উপর বি বি সি প্রচারিত সংবাদ ৪৬৫ -৪৮৬ Razibul Bari Palash
১৮৮-a বিবিসি ‘এশিয়া বিষয়ক আলোচনা’য় বাংলাদেশ প্রসঙ্গ ৪৮৭-৫২৬ Razibul Bari Palash
১৮৯-a বাংলাদেশ সম্পর্কে বিবিসি প্রচারিত অনুষ্ঠানমালা – ‘ সাম্প্রতিক ঘটনাবলি’ ৫২৭-৫৩৪ Raisa Sabila
১৮০-b বাংলাদেশের ঘটনাবলির উপর প্রেরিত প্রতিবেদন ৫৩৫-৫৪৮ Ashik Uz Zaman
১৮১-b বাংলাদেশের আন্দোলন সম্পর্কিত বিবিধ প্রতিবেদন ৫৪৯-৫৬০
Shakeel Syed Badruddoza
চতুর্থ অধ্যায়; পত্র-পত্রিকাঃ বিশ্বরাষ্ট্রসমূহ
১৮২-b বিশৃঙ্খলার আবর্তে ৫৬১ Razibul Bari Palash
১৮৩-b দুর্যোগের আবর্তে পাকিস্তান ৫৬২ Razibul Bari Palash
১৮৪-b পূর্ব পাকিস্তান ৫৬৩ Razibul Bari Palash
১৮৫-b বাংলাদেশের জনগণের বিরুদ্ধে পাক বর্বর অভিযানের উপর দুটি সোভিয়েত পত্রিকার মন্তব্য ৫৬৪ Razibul Bari Palash
১৮৬-b পাকবাহিনীর হত্যা যজ্ঞের উপর চিলি, তুরস্ক ও অস্ট্রীয় পত্রিকার মন্তব্য ৫৬৫ Razibul Bari Palash
১৮৭-b পরিকল্পিত হত্যা ৫৬৬ Razibul Bari Palash
১৮৮-b বাঙলায় গণহত্যা ৫৬৭ Razibul Bari Palash
১৮৯-b বাংলাদেশের যন্ত্রণা ৫৬৮-৫৬৯ Rajvi Bd
১৯০ বীরোচিত সংগ্রাম ৫৭০ Rajvi Bd
১৯১ এই গণহত্যা বন্ধ কর ৫৭১ Razibul Bari Palash
১৯২ শরনার্থী সমস্যার সমাধান ৫৭২ Razibul Bari Palash
১৯৩ লাখো গৃহহীন মানুষ ৫৭৩ Razibul Bari Palash
১৯৪ ভয়ংকর অভিজ্ঞতার বর্ননা ৫৭৪ Razibul Bari Palash
১৯৫ বিশ্ব কিছুই করছেনা ৫৭৫ Razibul Bari Palash
১৯৬ সাহায্য ৫৭৬ Razibul Bari Palash
১৯৭ জাতিসঙ্ঘের প্রতি চ্যালেঞ্জ ৫৭৭ Razibul Bari Palash
১৯৮ একটি মানবিক দৃষ্টিকোণ ৫৭৮ Razibul Bari Palash
১৯৯ বাঙলায় পীড়ন ও প্রতিক্রিয়া ৫৭৯-৫৮০ Sajib Barman
২০০ পূর্ব পাকিস্তানে হত্যা ৫৮১ Razibul Bari Palash
২০১ পূর্ব বাঙলায় শরনার্থী ৫৮২ Razibul Bari Palash
২০২ একটি বিশ্ব সমস্যা ৫৮৩ Razibul Bari Palash
২০৩ অবর্ণনীয় পরিস্থিতি ৫৮৪ Razibul Bari Palash
২০৪ মানবতার ধ্বংসলীলা ৫৮৫ Razibul Bari Palash
২০৫ পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ ৫৮৬ Razibul Bari Palash
২০৬ বাঙলায় বিপর্যয় ৫৮৭-৫৮৮ Razibul Bari Palash
২০৭ শরনার্থীদের ব্যাপারে আশংকা ৫৮৯ Razibul Bari Palash
২০৮ বাঙলায় ভয়াভহ অবস্থা ৫৯০ Razibul Bari Palash
২০৯ হিংসাত্মক তৎপরতা বন্ধ করতে হবে ৫৯১ Razibul Bari Palash
২১০ পাকিস্তানের আকাশে বিপর্যয়ের ছায়া ৫৯২-৫৯৪
Nobel Himura
২১১ বেয়নেটের সাহায্যে স্বাভাবিক অবস্থা ৫৯৫ Razibul Bari Palash
২১২ সাহায্যের জন্য আর্তনাদ ৫৯৬-৫৯৭ Razibul Bari Palash
২১৩ ভারতীয় অর্থনিতির জন্য একটি বড় বোঝা ৫৯৮ Razibul Bari Palash
২১৪ কায়হান পত্রিকার কয়েকটি প্রতিবেদন ৫৯৯-৬১৮ Razibul Bari Palash
২১৫ অকল্পনীয় বিপর্যয় ৬১৯ Razibul Bari Palash
২১৬ শরনার্থীদের নিয়ে ভারতের সমস্যা ৬২০ Razibul Bari Palash
২১৭ পূর্ব বাঙলার অধিবাসীদের সাহায্য করুন ৬২৩ Razibul Bari Palash
২১৮ পাকিস্তানে যা করনীয় ৬২৪ Razibul Bari Palash
২১৯ ব্যাপক ব্যাবধান ও তীব্র ঘৃণা ৬২৫-৬২৭ Ashik Uz Zaman
২২০ ইয়াহিয়ার উভয় সংকট ৬২৮ Razibul Bari Palash
২২১ বাঙলার আগুন ৬২৯-৬৩০ Raisa Sabila
২২২ বিশ্ব শরনার্থীদের কথা ভুলে গেছে ৬৩১-৬৩৩ Masroor Ahmed Makib
২২৩ বাঙ্গালীদের পরিকল্পনা ৬৩৪-৬৩৫ Razibul Bari Palash
২২৪ অবস্থার উন্নতি হচ্ছেনা ৬৩৬ Razibul Bari Palash
২২৫ পূর্ব বাঙলা শরনার্থী – একটি বিশ্ব সমস্যা ৬৩৭ Razibul Bari Palash
২২৬ শরনার্থীদের ফিরে আসার আবেদন ৬৩৮ Razibul Bari Palash
২২৭ ইয়াহিয়া খানের নতুন রাজনীতি ৬৩৯-৬৪০ Razibul Bari Palash
২২৮ জরুরী সমস্যা ৬৪১ Razibul Bari Palash
২২৯ পাকিস্তান শাসক গোষ্ঠী কোন ঠাসা ৬৪২ Razibul Bari Palash
২৩০ স্বেচ্ছাচারিতার শিকার ৬৪৩ Razibul Bari Palash
২৩১ পরাশক্তি সমূহের দায়িত্ব ৬৪৪ Razibul Bari Palash
২৩২ এশিয়া বিস্ফোরন্মুখ ৬৪৫ Razibul Bari Palash
২৩৩ পূর্ব বাঙলা – সামরিক সমাধানের ব্যার্থতা ৪৪৬ Razibul Bari Palash
২৩৪ ইন্ডিয়া পাকিস্তান যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত ৬৪৭-৬৪৮ Zulkar Nain
২৩৫ উপমহাদেশের বর্তমান অবস্থা ৬৪৯ Razibul Bari Palash
২৩৬ রাজাকারদের নিষ্ঠুরতা ৬৫০ Razibul Bari Palash
২৩৭ পাকিস্তানের কার্যাবলি ভীতিপ্রসূত ৬৫১ Razibul Bari Palash
২৩৮ আঘোষিত যুদ্ধ ৬৫২-৬৫৩ Razibul Bari Palash
২৩৯ ইয়াহিয়ার বোধোদয় ঘটাতে হবে ৬৫৪ Razibul Bari Palash
২৪০ তৃতীয় বিশ্বের জন্য শিক্ষা ৬৫৫ Razibul Bari Palash
২৪১ পাকিস্তান ভারত সঙ্ঘর্ষ ৬৫৬ Razibul Bari Palash
২৪২ যে যুদ্ধ কেউ থামাল না ৬৫৭ Razibul Bari Palash
২৪৩ পাকিস্তান দায়ী ৬৫৮ Razibul Bari Palash
২৪৪ একটি রাজনৈতিক সমাধান সম্ভব ছিল ৬৫৯ Razibul Bari Palash
২৪৫ অবিশ্বাস্য ৬৬০ Razibul Bari Palash
২৪৬ বাংলাদেশের মানুষের ইচ্ছার প্রতি শ্রদ্ধা দেখাতে হবে ৬৬১ Razibul Bari Palash
২৪৭ ইয়াহিয়া খান দায়ী ৬৬২ Razibul Bari Palash
২৪৮ যুদ্ধ কেন হল ৬৬৩ Razibul Bari Palash
২৪৯ দায়ী কে ৬৬৪ Razibul Bari Palash
২৫০ একটি নতুন জাতির জন্ম ৬৬৫-৬৬৮ Razibul Bari Palash
পঞ্চম অধ্যায়ঃ পত্র-পত্রিকাঃ ভারত
২৫১ এক লক্ষ লোক নিহত ? ৬৬৯–৬৭৩ Md Masud Hossain
২৫৩ কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি বাংলাদেশ কে স্বীকৃতি ডানের আহবান ৬৭৪ Razibul Bari Palash
২৫৪ সম্পাদকীয় – বাংলাদেশের জন্য আমরা কী করতে পারি ? ৬৭৬-৬৭৭ Kamol Roy
২৫৫ বাংলাদেশে সার্বভৌম সরকার ৬৭৮ Razibul Bari Palash
২৫৬ সম্পাদকীয় – আবেদন গণহত্যা বন্ধ হবে না ৬৭৯-৬৮০

Kamol Roy

 

২৫৭ প্রাক্তন পাক কূটনীতিকরা বলেন – আমরা বাংলাদেশের অনুগত ৬৮১ Kamol Roy
২৫৮ ভারত নীরব দর্শক নয় ৬৮২ Nahid Sajibe
২৫৯ মুক্তিযোদ্ধারা রাজশাহী পুনর্দখল করেছে ৬৮৩ Razibul Bari Palash
২৬০ বুদ্ধিজীবী নিধন ৬৮৪-৬৮৫ Razibul Bari Palash
২৬১ যুদ্ধের ঘনঘটা (সম্পাদকীয়) ৬৮৬–৬৮৭ Razibul Bari Palash
২৬২ ক্ষমাহীন অপরাধ (সম্পাদকীয়) ৬৮৮–৬৯০ Razibul Bari Palash
২৬৩ বাংলাদেশের গণহত্যার ব্যাপক নিন্দা ৬৯১ Razibul Bari Palash
২৬৪ রাজশাহী যুদ্ধের প্রত্যক্ষ বর্ননা ৬৯২-৬৯৪ Zulkar Nain
২৬৫ মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে ৩ হাজার সৈন্য নিহত ৬৯৫ Razibul Bari Palash
২৬৬ স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ – নতুন রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ৬৯৬ Kamol Roy
২৬৭ বাংলাদেশ মিশনের যাত্রা ৬৯৭ Razibul Bari Palash
২৬৮ চীনা প্রতিক্রিয়া ভারতের জন্য হুমকি ৬৯৮-৬৯৯ Razibul Bari Palash
২৬৯ কুমিল্লায় মুক্তিফৌজের উপর প্রচণ্ড আক্রমণ ৭০০-৭০১ Razibul Bari Palash
২৭০ তাজউদ্দীন কর্তৃক মুক্ত এলাকা গঠন ও কমান্ডার নিয়োগ ৭০২-৭০৩ Razibul Bari Palash
২৭১ সাপ্তাহিক ফ্রন্টিয়ার পত্রিকার একটি সম্পাদকীয় নিবন্ধ ৭০৪-৭০৫ Mashroor Makib
২৭২ স্বাদিন সংগ্রামী বাংলাদেশের পাশে পশ্চিম বাঙলা ৭০৬–৭০৮ Kamol Roy
২৭৩ বাংলাদেশ মিশন স্বীকৃতির জন্য প্রচেষ্টা চালাবে ৭০৯-৭১০ Razibul Bari Palash
২৭৪ পাকিস্তানের ভরাডুবি (সম্পাদকীয়) ৭১১-৭১২ Kamol Roy
২৭৫ পূর্ব বাংলার ঘটনাবলীর গতি প্রকৃতি ৭১৩–৭১৬ Ashik Uz Zaman
২৭৬ বাংলাদেশ প্রশ্নে জাতিসঙ্ঘের প্রতারণা ৭১৭-৭১৮ Razibul Bari Palash
২৭৭ কলিকাতা ও ঢাকায় ডেপুটি হাই কমিশন বন্ধ হচ্ছে ৭১৯-৭২০ Kamol Roy
২৭৮ ঢাকায় ভারতীয় দূতাবাসের কর্মচারিরা অন্তরীন ৭২১ Razibul Bari Palash
২৭৯ যুক্তরাষ্ট্রে বাঙ্গালী কূটনীতিকদের বদলি করা হচ্ছে ৭২২ Razibul Bari Palash
২৮০a সীমান্তের ওপারের জনগণ সক্রিয় ৭২৩–৭২৬ Nishat Oni
২৮০b রেলওয়ে শ্রমিক ইউনিয়নের বাংলাদেশ কে স্বীকৃতি দানের আবেদন ৭২৭ Razibul Bari Palash
২৮১ ইয়াহিয়ার বায়না- বাংলাদেশ মিশনের সঙ্গে গোপন বৈঠক চাই ৭২৮-৭২৯ Kamol Roy
২৮২ এখনই ভারতের স্বীকৃতি বাংলাদেশের স্বার্থের অনুকূল হবেনা ৭৩০-৭৩১ Aparajita Neel
২৮৩ পূর্ব বাঙলার ঘটনা প্রবাহের উপর ফ্রন্টিয়ার পত্রিকার একটি সমীক্ষা ৭৩২–৭৩৪ Razibul Bari Palash
২৮৪ চট্টগ্রামে পাক বর্বরতা ৭৩৫ Razibul Bari Palash
২৮৫ দূতাবাস কর্মচারি বিনময়ে সুইস মধ্যস্ততায় পাক ভারত সম্মতি ৭৩৬-৭৩৭ Razibul Bari Palash
২৮৬ শরনার্থী শিবিরে শ্রীমতী গান্ধি ৭৩৮–৭৩৯ Kamol Roy
২৮৭ দূতাবাস কর্মচারি বিনিময়ে সুইস প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত ৭৪০-৭৪১ Razibul Bari Palash
২৮৮ ইয়াহিয়ার সীমাহীন বর্বরতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধের আবেদন ৭৪২-৭৪৩ Kamol Roy
২৮৯ স্বীকৃতির সময় এখনো আসেনি – প্রধানমন্ত্রী ৭৪৪–৭৪৭
Pallab Das
২৯০ শরনার্থীদের ৬ মাসে সাহায্য দিতে লাগবে ২০০ কোটি টাকা ৭৪৮ Kamol Roy
২৯১ সীমান্ত দেখতে প্রতিরক্ষা মন্ত্রী উদবাস্তমন্ত্রি আসছেন ৭৪৯ Razibul Bari Palash
২৯২ ক্ষমতার ভারসাম্য ৭৫০-৭৫১ Razibul Bari Palash
২৯৩ করিমগঞ্জ সীমান্তে পাকিস্তানী সৈন্য সমাবেশ ৭৫২ Razibul Bari Palash
২৯৪ জঙ্গি শাহির হাতে অন্তত ১০ লাখ নিহত ৭৫৩ Razibul Bari Palash
২৯৫ একটি নির্ভিক কণ্ঠ ৭৫৪-৭৫৫ Aparajita Neel
২৯৬ ১১ জুন দেশের শ্রমিক শ্রেণি ‘বাংলাদেশ দিবস’ পালন করবে ৭৫৬ Aadrita Mahzabeen
২৯৭ নির্যাতনের চিত্র ৭৫৭ Razibul Bari Palash
২৯৮ মেঘালয় সীমান্তে বাঙ্গালী নিধন ৭৫৮-৭৬০ Razibul Bari Palash
২৯৯ শরনার্থী শিবিরে বাঙ্গালী নিধন ৭৬১ Razibul Bari Palash
৩০০ বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দানের প্রশ্নে ভারত সরকারের দ্বিধা কাটেনি ৭৬২–৭৬৩ সমীরণ
৩০১ অবিলম্বে বাংলাদেশ সরকার কে স্বীকৃতির দাবিতে পৌরসভার প্রস্তাব ৭৬৪ Kamol Roy
৩০২ পাকিস্তানে গোপন তথ্য পাচার রাজ্যসভায় সরকারী বিবৃতির দাবি ৭৬৫ Kamol Roy
৩০৩ বাংলাদেশে হস্তক্ষেপ ও সুদৃঢ় নীতির দাবি ৭৬৬-৭৭০ Kamol Roy
৩০৪ বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে ভারতের ভূমিকা ৭৭১-৭৭৩ Kamol Roy
৩০৫ লোকসভায় কমিউনিস্ট সদস্যদের পাক ডেপুটি হাই কমিশনার সম্পর্কে ভারতের আচরণের নিন্দা ৭৭৪-৭৭৫ Kamol Roy
৩০৬ বাংলাদেশে পাক ফৌজি বর্বরতা অবিশ্বাস্য কিন্তু সন্দেহাতীত ৭৭৬ Kamol Roy
৩০৭ ভাসানী রাজনৈতিক সমাধানের সম্ভবনা নাকচ করেছেন ৭৭৭ Razibul Bari Palash
৩০৮ বাংলাদেশ প্রশ্নে বিশ্বের হস্তক্ষেপ চাই ৭৭৯–৭৮১ MD Ahsan Ullah
৩০৯ আশা ও বিভ্রান্তির মাঝখানে ৭৮২-৭৮৪ Ayon Muktadir
৩১০ পাকিস্তানের সঙ্গে সমঝোতার কোন অবকাশ নাই – তাজউদ্দীন ৭৮৫-৭৮৬ Razibul Bari Palash
৩১১ স্টেটসম্যান পত্রিকার একটি সম্পাদকীয় ৭৮৭-৭৮৮ Razibul Bari Palash
৩১২ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ভি সি কর্তৃক যুব শিবির উদ্বোধন ৭৮৯ Razibul Bari Palash
৩১৩ স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিন ৭৯০- ৭৯১ Kamol Roy
৩১৪ মেহেদি মাসুদের অপর বিধি নিষেধ আরোপ – ভারত সরকারের কড়া ব্যাবস্থা ৭৯২ Kamol Roy
৩১৫ বার্মিংহামে পাক ক্রিকেট দলের বিরুদ্ধে বৃহত্তম বিক্ষোভ সমাবেশ ৭৯৩ Kamol Roy
৩১৬ দায়িত্ব পালনে মন্ত্রী শ্বরই কেন্দ্রের গড়িমসি ৭৯৪-৭৯৫ Kamol Roy
৩১৭ বাংলাদেশের ব্যাপারে শুধু বিশ্ব বিবেক নয় দেশের বিবেক ও জাগাতে হবে ৭৯৬-৭৯৮ Kamol Roy
৩১৮ সোয়েলের কাছে বাংলাদেশের স্বীকৃতি প্রশ্নটি ভাবাবেগজাত – সংখ্যালঘুদের জাতীয় কনভেনশনে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ ৭৯৯ Kamol Roy
৩১৯ রাজনৈতিক সমাধানের জন্য বাংলাদেশ সরকারের অস্থায়ী রাস্ট্রপ্রিধানের চারদফা পূর্ব শর্ত ৮০০-৮০১ Kamol Roy
৩২০ অনাহারে পথশ্রমে অবসন্ন মৃতপ্রায় শরনার্থী দল ৮০২-৮০৩ Kamol Roy
৩২১ চিকিৎসা সামগ্রী প্রেরণের জন্য জরুরী বিমান ৮০৪-৮০৫ Razibul Bari Palash
৩২২ আই পি আই বৈঠকে বাংলাদেশ প্রশ্ন উঠতে পারে ৮০৬ Razibul Bari Palash
৩২৩ বাংলাদেশের রাজনৈতিক সমাধান ৮০৭–৮০৮ Kamol Roy
৩২৪ কলকাতার দূতাবাস গুলিতে বদলি ও নিতুন নিয়োগের হিড়িক , কারণ রাজনৈতিক ? ৮০৯-৮১০ Kamol Roy
৩২৫ সাহায্য দাতাদের প্রতি বাংলাদেশের আবেদন ৮১১ Razibul Bari Palash
৩২৬ ভারত ডুবতে বসেছে ৮১২-৮১৪ Kamol Roy
৩২৭ শরনার্থীদের চিকিৎসায় সরকারী ও বেসরকারি সংস্থার সমন্বয় দরকার ৮১৫ Aparajita Neel
৩২৮ বাংলাদেশ মুক্তি আন্দোলনকে সমর্থন করুন। ভারতীয় মুসলমান ভাইদের প্রতি বাংলাদেশ সংসদীয় প্রতিনিধিদের আবেদন ৮১৬ Razibul Bari Palash
৩২৯ ভারত সরকারের অনুরোধে বাংলাদেশের সরনার্থীদের জন্য সোভিয়েত বিমানের আগমন ৮১৭ Razibul Bari Palash
৩৩০ ইসলামি দেশ বিপন্ন বলে বাংলাদেশ জাতি হত্যা চাপা দেয়া যাবেনা ৮১৮ Razibul Bari Palash
৩৩১ হিন্দুস্তান স্ট্যান্ডার্ড পত্রিকার একটি সম্পাদকীয় ৮১৯ Razibul Bari Palash
৩৩২ ১৯ জুন ‘বাংলাদেশ দিবস’ পালন করুন ৮২০ Razibul Bari Palash
৩৩৩ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে বনগাঁও সুবৃহৎ সমাবেশ ৮২১ Razibul Bari Palash
৩৩৪ মুক্তির দূত মুক্তি ফৌজ ৮২২ Razibul Bari Palash
৩৩৫ বাংলাদেশ শরনার্থীদের জন্য ‘মাস্টার প্ল্যা’ চাই ৮২৩ -৮২৫ মোঃ কাওছার আহমদ
৩৩৬ ফুলবাড়িয়ে সীমান্তে পাক বাহিনীর গোলাবর্ষণ ৮২৬-৮২৭ Raisa Sabila
৩৩৭ মার্কিন ইস্টরে বাংলাদেশ অস্ত্র ঝরানো চলবে না ৮২৮ Bashneen Faham
৩৩৮ মার্কিন সাম্রাজ্য বাদের অপকৌশল ও বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম ৮২৯ Bashneen Faham
৩৩৯ মার্কিন সরকার কে সাফ জবাব দেবার সাহস ভারত সরকারের নেই ৮৩০-৮৩১ Bashneen Faham
৩৪০ বিক্ষুব্ধ ভারতের দাবি । মার্কিন অস্ত্র বোঝাই পাক জাহাজ যেন আর না এগোয় ৮৩২-৮৩৩ Bashneen Faham
৩৪১ ধরা পড়েছে মার্কিন ফাঁকই (সম্পাদকীয়) ৮৩৪-৮৩৫ Bashneen Faham
৩৪২ কোন সমাধান না হলে ভারত যে কোন ব্যাবস্তা গ্রহণ করতে বাধ্য। উর্দু পত্রিকার সম্পাদকদের সভায় বাংলাদেশ প্রসঙ্গে অভিমত ৮৩৬ Bashneen Faham
৩৪৩ একটি রাজনৈতিক সমাধান (সম্পাদকীয়) ৮৩৭ Razibul Bari Palash
৩৪৪ মুক্তি যোদ্ধাদের আক্রমণে নিহত সাড়ে তিন হাজার পাক অফিসারদের মৃতদেহ করাচীতে কবরস্থ ৮৩৮-৮৩৯ Bashneen Faham
৩৪৫ পাকিস্তানকে অস্ত্র না দেওয়া ৮৪০-৮৪১ Aparajita Neel
৩৪৬ পাকিস্তানী প্রচারণার বিরুদ্ধে হুশিয়ারি ৮৪২ Razibul Bari Palash
৩৪৭ মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অস্ত্র দাবি ৮৪৩-৮৪৪ Razibul Bari Palash
৩৪৮ ব্রিটিশ সংসদীয় দলের বিবৃতি প্রচার করা যাবেনা । পাক জঙ্গি সরকারের ফরমান ৮৪৫ Bashneen Faham
৩৪৯ পাকিস্তানের মিথ্যা কূটনৈতিক প্রচার ৮৪৬ Bashneen Faham
৩৫০ পাকিস্তানে মার্কিন অস্ত্র সাহায্য বন্ধের জন্য ভারতের দাবি ৮৪৭ Razibul Bari Palash
৩৫১ বাংলাদেশের হৃদয় হতে ৮৪৯-৮৫০ Bashneen Faham
৩৫২ মার্কিন কনস্যুলেট ভবনের সামনে বিক্ষোভ ৮৫১ Razibul Bari Palash
৩৫৩ কূটনৈতিক বিনিময়ের প্রস্তুতি ৮৫২ Razibul Bari Palash
৩৫৪ মুক্তি সংগ্রাম কমিটি গঠিত ৮৫৩-৮৫৪ Razibul Bari Palash
৩৫৫ পূর্বাঞ্চলে পাক বাহিনীর আত্ম রক্ষামূলক তৎপরতা ৮৫৫–৮৫৬ Maruf Kabir
৩৫৬ পাকিস্তানে ফিরে যেতে বাংলাদেশ মিশন কর্মচারিদের অস্বীকৃতি প্রকাশ ৮৫৭-৮৫৯ Maruf Kabir
৩৫৭ পাক বাহিনীর দলিলে লুট ও ধর্ষনের প্রমাণ ৮৬০-৮৬১ Razibul Bari Palash
৩৫৮ পাকিস্তানে অস্ত্র সরবরাহের প্রতিবাদে ছাত্রদের দ্বারা মার্কিন পতাকার অসন্মান ৮৬২
Nobel Himura
৩৫৯ পূর্ববাঙলার বিপন্ন বৌদ্ধেরা অনন্দবাজার পত্রিকা (সম্পাদকীয়) ৮৬৩ Bashneen Faham
৩৬০ মুজিবের নয় , ইয়াহিয়ার বিচার চাই (সম্পাদকীয়) ৮৬৪-৮৬৫ Bashneen Faham
৩৬১ বাংলাদেশ ও জাতিসঙ্ঘ (সম্পাদকীয়) ৮৬৬-৮৬৭
Razibul Bari Palash
৩৬২ কলকাতায় বাংলাদেশের প্রথম ফুটবল খেলা ৮৬৮ Bashneen Faham
৩৬৩ মুজিবের বিচার শুরু – রাষ্ট্রপুঞ্জের প্রতি ভারতের আবেদন ৮৬৯-৮৭২ Ashik Uz Zaman
৩৬৪ বাংলাদেশ সমস্যার রাজনৈতিক সমাধানে গুরুত্ব আরোপ – ভারত – সোভিয়েত যুক্ত বিবৃতি ৮৭৩-৮৭৪ Bashneen Faham
৩৬৫ পাক বাহিনীর কৌশলগত পশ্চাৎপসরন ৮৭৫-৮৭৬ Razibul Bari Palash
৩৬৬ বিদেশি সত্যাগ্রহী দল বাংলাদেশে প্রবেশ করছেন ৮৭৭ Bashneen Faham
৩৬৭ চুক্তির পর ৮৭৮-৮৭৯ Ashik Uz Zaman
৩৬৮ ইউরোপে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ৮৮০-৮৮২ Nusrat Jahan Ima
৩৬৯ বাংলাদেশের সরকারের ‘ওয়ার কাউন্সিল’ গঠিত ৮৮৩-৮৮৪ Ashik Uz Zaman
৩৭০ বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বিবৃতি ৮৮৫ Ashik Uz Zaman
৩৭১ আজ বাংলাদেশের উপর আন্তর্জাতিক সম্মেলনের উদ্বোধন ৮৮৬-৮৮৭ Razibul Bari Palash
৩৭২ ২৪ জাতি সম্মেলনের আহবান – মুজিব কে বিনা শর্তে মুক্তি দিন ৮৮৮-৮৯১ Ashik Uz Zaman
৩৭৩ বাংলাদেশ এখন একটি আন্তর্জাতিক প্রশ্ন ৮৯২-৮৯৪ Aabir M. Ahmed
৩৭৪ শরণ সিং কর্তৃক বাংলাদেশ সমস্যার রজনৈতিক সমাধান দাবি ৮৯৫-৮৯৭ Ashik Uz Zaman
৩৭৫ বাংলাদেশ প্রশেন সোভিয়েত মনোভাবে মুজিব নগরেও আশার সঞ্চার ৮৯৮ Ashik Uz Zaman
৩৭৬ ভারত – রুশ চুক্তির প্রতি আকুন্ঠ সমর্থন – চ্যাবনের প্রস্তাবে সভায় ঐক্যমত্য ৮৯৯-৯০০ Bashneen Faham
৩৭৭ ইয়াহিয়ার শিখণ্ডীরা পূর্ব বাঙলার নির্বাচন সম্পর্কে নিশ্চিত নয় ৯০১ Razibul Bari Palash
৩৭৮ রাশিয়া – আলজিরিয়া ও বাংলাদেশ (সম্পাদকীয়) ৯০৩-৯০৪
Bashneen Faham
৩৭৯ স্বীকৃতির দাবিতে চাই ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন (সম্পাদকীয়) ৯০৫-৯০৬
Bashneen Faham

 

৩৮০ পুর্ব পাকিস্তানে উপ নির্বাচন (সম্পাদকীয়) ৯০৭ Hasan Mahmud
৩৮১ পাক হাই কমিশনের অধিকাংশ বাঙ্গালী কর্মচারির পলায়ন ৯০৮-৯০৯
Hasan Mahmud
৩৮২ পূর্ব বাঙলার শিশুদের বিক্ষোভ প্রদর্শন ৯১০ Hasan Mahmud
৩৮৩ নিক্সনের সঙ্গে প্রধান মন্ত্রীর নাজুক আলোচনা শুরু ৯১২-৯১৩ Hasan Mahmud
৩৮৪ পশ্চিম পাকিস্তানী বুদ্ধিজীবীগণ কর্তৃক মুজিবের মুক্তি দাবি ৯১৪ Hasan Mahmud
৩৮৫ দিলির ছাত্রদের সমাবেশ , আলির মুক্তি দাবি ৯১৫-৯১৬ Hasan Mahmud
৩৮৬ সামরিক সরবরাহের অসুবিধায় পাক বাহিনী ক্ষতির সম্মুখীন ৯১৭-৯১৮ Ashik Uz Zaman
৩৮৭ পাক বাহিনীর গুলির আওয়াজ স্তব্ধ করতে সেনাবাহিনীর হিলই, বালির ঘাঁট সীমান্ত অতিক্রম ৯১৯ Ark Prince
৩৮৮ পাকিস্তান যুদ্ধ পরিস্থিতি ঘনীভূত করেছে ৯২২-৯২৩
Ark Prince
৩৮৯ পাকিস্তান ভারতের উপর পুর্নাংগ যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছে – প্রধানমন্ত্রী ৯২৪
Abdul Malek
৩৯০ পাক ভারত বাংলাদেশ যুদ্ধে খবর ৯২৮-৯৩০ Fakhruzzaman Sayam
৩৯১ পুর্ব বঙ্গে পাক বাহিনীকে আত্ম সমর্পনে বাধ্য করা আমার লক্ষ্য – লে জে আরোরা ৯৩১-৯৩২ Fakhruzzaman Sayam
৩৯২ নিরাপত্তা পরিষদে সোভিয়েত ভেটো – বাংলাদেশ সমস্যার রাজনৈতিক সমাধান দাবি ৯৩৩-৯৩৪ Fakhruzzaman Sayam
৩৯৩ পাক – ভারত- বাংলাদেশ যুদ্ধের খবর ৯৩৫-৯৩৭ Fakhruzzaman Sayam
৩৯৪ পাক – ভারত- বাংলাদেশ যুদ্ধের খবর ৯৩৮-৯৪১ Fakhruzzaman Sayam
৩৯৫ বাংলাদেশ স্বীকৃতি পেল – ‘জয় বাঙলা’ ধ্বনির মধ্যে লোকসভায় ঘোষণা ৯৪২ Aparajita Neel
৩৯৬ স্বাগত বাংলাদেশ – বাংলাদেশের স্বীকৃতির উপর একটি সম্পাদকীয় ৯৪৩-৯৪৪ Aparajita Neel
৩৯৭ পাক – ভারত- বাংলাদেশ যুদ্ধের খবর ৯৪৫-৯৪৮ Biplob Momin Jhinuk TIpu
৩৯৮ পাক – ভারত- বাংলাদেশ যুদ্ধের খবর ৯৪৯-৯৫০ Fakhruzzaman Sayam
৩৯৯ পাক – ভারত- বাংলাদেশ যুদ্ধের খবর ৯৫১-৯৫৩ Fakhruzzaman Sayam
৪০০ মুক্তি সংগ্রাম ঢাকার দ্বারপ্রান্তে ৯৫৪–৯৫৫ Fakhruzzaman Sayam
৪০১ পাক – ভারত- বাংলাদেশ যুদ্ধের খবর ৯৫৬-৯৫৭ Fakhruzzaman Sayam
৪০২ পালাতে দেব না – হুশিয়ার মানেকশা ৯৫৮-৯৫৯ Fakhruzzaman Sayam
৪০৩ পাক – ভারত- বাংলাদেশ যুদ্ধের খবর ৯৬০-৯৬২ Ashik Uz Zaman
৪০৪ পাক – ভারত- বাংলাদেশ যুদ্ধের খবর ৯৬৩-৯৬৪ Ashik Uz Zaman
৪০৫ সপ্তম নৌ বহর সিঙ্গাপুরের পথে ৯৬৫-৯৬৬ Razibul Bari Palash
৪০৬ ঢাকা দখলের লড়াই ৯৬৭–৯৭১ Ashik Uz Zaman
৪০৭ রাশিয়ার তৃতীয় ভেটো ৯৭২ Razibul Bari Palash
৪০৮ বঙ্গোপসাগরে সপ্তম নৌ বহর পৌঁছেছে, কুড়িটি রুশ রণ তরী ও আসছে ৯৭৩-৯৭৪ Razibul Bari Palash
৪০৯ আত্ম সমর্পনের জন্য নিয়াজিকে কয়েক ঘণ্টা সময় দেয়া হয়েছে ৯৭৫-৯৭৬ Goutam Chandra Sarker
৪১০ ঢাকার ভিতরে ভারতীয় কামান ৯৭৭-৯৭৮ Razibul Bari Palash
৪১১ পাকিস্তান হাড় মানল ৯৭৯ Aparajita Neel
৪১২ নিয়াজির নিশর্ত আত্ম সমর্পন ৯৮০ Aparajita Neel

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
১। ঢাকায় বিদ্রোহ দমনে কামান ব্যাবহার নিউইয়র্ক টাইমস ২৮ মার্চ ১৯৭১

 

Razibul Bari Palash

<১৪, , >

 

নিউইয়র্ক টাইমস- ২৮ মার্চ ১৯৭১

ঢাকায় বিদ্রোহ দমনে কামান ব্যাবহার

ঢাকায় বেসামরিক লোকের উপর গুলি

– সিডনি এইচ শ্যানবার্গ

 

জনাব শ্যানবার্গ ছিলেন সেই ৩৫ জন বিদেশী সাংবাদিকদের একজন যাকে পূর্ব পাকিস্তান থেকে শনিবার সকালে বহিষ্কার করা হয়। তিনি এই তারবার্তা ভারতের বোম্বে থেকে পাঠিয়েছেন।

 

পাকিস্তান আর্মি পূর্ব পাকিস্তানের নিরস্ত্র বেসামরিক নাগরিকদের উপর আর্টিলারি এবং ভারী মেশিনগান ব্যাবহার করে ৭৫ মিলিয়ন মানুষের স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন ধ্বংস করার চেষ্টা করছে।

 

হামলা কোন সতর্কবাণী ছাড়াই বৃহস্পতিবার গভীর রাতে শুরু হয়। পশ্চিম পাকিস্তানী সৈন্যরা, যাদের সেনাবাহিনীতে প্রাধান্য ছিল, প্রাদেশিক রাজধানী ঢাকার রাস্তায় নামে। স্বাধীনতা আন্দোলনের আস্তানাগুলো – যেমন বিশ্ববিদ্যালয় ধ্বংস করা ছিল তাদের উদ্যেশ্য।

 

কতজন বেসামরিক লোক নিহত বা আহত হয়েছে তা জানার কোন উপায়ও ছিল না। অন্যান্য এলাকায় কি ঘটছে সেটা জানারও উপায় ছিলোনা। যদিও ঢাকা আক্রমণের আগের কিছু সঙ্ঘর্ষের খবর আমরা জানি।

উত্তর ঢাকায় অবস্থিত হোটেল থেকে অনেক অঞ্চলের বিশাল আগুন দেখা যাচ্ছিল। এর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা এবং পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলসের ব্যারাক দেখা যাচ্ছিল। পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলস একটি আধা-সামরিক বাহিনী যেখানে পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদের আধিক্য ছিল।

 

সকালে যখন ৩৫ জন সাংবাদিককে ঢাকা থেকে বের করে দেয়া হচ্ছিল তখনো অনেক জায়গায় আগুন জ্বলছিল এবং গুলির শব্দ আসছিল।

 

“হে ঈশ্বর, দে ঈশ্বর বলে একজন পাকিস্তানি ছাত্র চিৎকার করছিল – সে হোটেলের জানালা দিয়ে দৃশ্য দেখছিল আর অশ্রুসজল চোখে বলছিল, ‘ওরা তাদের মেরে ফেলছে, তাদের জবাই করছে।’

 

 

 

ঘরে আগুন

 

সামরিক ট্রাকের সুরক্ষিত বহরে এয়ারপোর্টে যেতে যেতে সাংবাদিকরা দেখতে পাচ্ছিল রাস্তার দুই পাশের দরিদ্র বাঙালিদের খড়ের ছাদে সৈন্যরা আগুন দিচ্ছিল কারণ তারা ছিল স্বাধীনতাকামী।

 

যখন বৃহস্পতিবার রাতে সামরিক একশন শুরু হল তখন সৈন্যরা বিজয় স্লোগান দিচ্ছিল। তারা স্বয়ংক্রিয় রাইফেল, মেশিনগান ও গুলি ছুড়ে ঢাকার বহু অংশে আগুন দেয়।

 

যখন বিদেশী সাংবাদিকদরা পরিস্থিতি দেখার জন্য হোটেলের বাইরে যেতে চেয়েছে তখন সেনাবাহিনীর প্রহরীরা তাদের যেতে দেয়নি এবং বলেছে বের হলে তাদের গুলি করা হবে।

 

রাত ১টা ২৫ মিনিটে হোটেলের ফোন লাইন বিকল হয়ে যায়। হোটেলের বাইরের মিলিটারি গার্ড এটা বন্ধ করে দেয়। একই সময়ে টেলিগ্রাফ অফিসের আলো নিভে যায়।

বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় এবং অন্যান্য এলাকায় ভারী স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের শব্দ শোনা যায়।

 

 

 

বাজারে হামলা

 

রাত ২ টা ১৫ মিনিটে একটি মাউন্টেড মেশিন গান সহ একটি জীপ্ হোটেলের সামনে দিয়ে ময়মনসিংহ রোডের দিকে যায় এবং পাশে একটি বাজারের সামনে থামে। বন্দুক দ্বিতীয় তলায় জানালার দিকে তাক করা ছিল। প্রায় এক ডজন সেনা রকেট পিস সহ তাদের সাথে যোগ দেয়।

 

দ্বিতীয় তলা থেকে হঠাৎ শব্দ আসে “বাঙালিরা ঐক্যবদ্ধ!” এবং সৈন্যরা তখন মেশিনগান দিয়ে নির্বিচারে ভবনের দিকে এলোমেলো গুলি চালায়। সৈন্যরা তখন একটি সরু গলি দিয়ে বাজারের মধ্যে প্রবেশ করে গুলি চালায় এবং সরু গলি গাড়ি দিয়ে ব্লক করে। সৈন্যদের ফ্ল্যাশলাইটের আলোয় সাংবাদিকরা ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের ১০ তলা থেকে এসব অবিশ্বাস্য ঘটনা দেখছিল।

 

সৈন্যরা গুলি শুরুর সাথে সাথে ২০০ গজ দূর থেকে প্রায় ১৫-২০ জন্য বাঙ্গালী যুবক রাস্তা দিয়ে তাদের দিকে আসতে থাকে – তারা চিৎকার করে সৈন্যদের দিকে আসছি

কিন্তু মনে হল তাদের হাতে কোন অস্ত্রই নেই।

 

জীপের উপর মেশিনগান থেকে তাদের দিকে প্রায় গুলিবর্ষণ শুরু হল এবং স্বয়ংক্রিয় রাইফেল দিয়ে সৈন্যরাও গুলি শুরু করল। যুবকের দল রাস্তার দুই পাশে ঢুকে পড়ল। তাদের কেউ আহত বা নিহত হয়েছে কিনা সেটা বলা অসম্ভব ছিল।

 

সৈন্যরা তখন তাদের মনোযোগ সরু গলির দিকে দিল। এরপর তারা একটি খুচরা যন্ত্রাংশের গ্যারেজে আগুন দিল এবং তারপর তাদের মূল টার্গেট – বিশেষ করে অফিস ও প্রেস, ইংরেজি দৈনিক – ইত্যাদি যারা মূলত শেখ মুজিবের সমর্থক ছিল সেগুলো ধ্বংস করতে শুরু করল।

 

উর্দুতে তারা চিৎকার করে বলছিল যেন তারা ঘর থেকে বাইরে এসে আত্মসমর্পন করে – অন্যথায় তাদের গুলি করা হবে। কিন্তু কোন শব্দ আসল না এবং কেউ বেরিয়ে আসল না। সৈন্যরা তখন ভেতরে একটি রকেট নিক্ষেপ করল এবং গুলি শুরু করল। তারপর তারা বিল্ডিংএ আগুন দিল এবং প্রেস ও অন্যান্য যন্ত্র ধ্বংস করল।

 

আরও এগিয়ে তারা সব দোকানপাট ও কুঁড়েঘরগুলোতে আগুন দিল এবং শীঘ্রই আগুণের শিখা দোতলার উপরে উঠে গেল।

 

৪ টার পর পর চিৎকার কিছুটা কম্বল, কিন্তু মাঝে মাঝে কামানের গুলি শোনা যেতে লাগল। দূর থেকে ট্রেচার বুলেট হোটেলের দিয়ে ছুটে আসল।

 

৪ টা ৪৫ মিনিটে আরেকটি বড় আগুন ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস সদর দপ্তরে দেখা গেল।

 

৫ টা ৪৫ মিনিটে ভোরের অস্পষ্ট আলোয় দেখা গেল ছয়টি চীনের তৈরি টি-৫১ হালকা ট্যাংকে চড়ে সেনারা শহরের প্রধান রাস্তায় টহল দিচ্ছে।

 

সবিরাম অগ্নিসংযোগ এবং অনিয়মিত কামানের গোলা বিস্ফোরণ গতকাল থেকে আজ সাংবাদিকদের বহিষ্কার করার সময় পর্যন্ত অব্যাহত আছে।

 

গতকাল সকাল থেকে হেলিকপ্টার পরিদর্শন করছে এবং রেকি করছে। গত নভেম্বরের ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের সময় ত্রাণ কাজের জন্য সৌদি আরব পাকিস্তানকে ৪ টি হেলিকপ্টার দিয়েছিল। জানা যায় সেগুলো এই কাজে ব্যাবহ্রিত হচ্ছে।

 

 

পশ্চিম পাকিস্তানে ইয়াহিয়া

 

সকাল ৭ টায় সেনাবাহিনীর দখল করা ঢাকা রেডিওতে ঘোষণা করা হয় যে প্রেসিডেন্ট আগা মুহাম্মদ ইয়াহিয়া খান পশ্চিম পাকিস্তানে ফিরে এসেছেন এবং আজ রাত ৮ টার দিকে জাতির উদ্যেশ্যে ভাষণ দেবেন।

 

সকাল ৮ টার পর একটি কালো Chevrশেভ্রতlet 1959 জীপ এক ট্রাক সশস্ত্র সৈন্য পাহারায় হোটেলের সামনে থামে। এই বহর জুলফিকার আলী ভুট্টো ও তার দলকে এয়ারপোর্টে নিয়ে যেতে এসেছে। তারা পশ্চিম পাকিস্তান ফিরবে।

 

জনাব ভুট্টো পশ্চিম পাকিস্তানের প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা যিনি পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের জন্য শেখ মুজিবের দাবীর বিরোধিতা করেন।

 

 

তার বিরোধীদল পশ্চিম পাকিস্তানের সেনাবাহিনী সমর্থিত এবং তার পশ্চিম পাকিস্তানের ব্যবসাও সেনা সমর্থিত। জনাব ভুট্টো অবগত আছেন যে বাঙালিরা তাদের বর্তমান সমস্যার জন্য তাকে দোষ দেয়। তথাপি তাকে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র সহ বেসামরিক ও সেনাবাহিনীর দেহরক্ষী গার্ড দিচ্ছে। তিনি ভীত হয়ে সব সাংবাদিকদের প্রশ্নের একই জবাব দিচ্ছেন, বলছেন “আমি কোন মন্তব্য করতে রাজি নই।’

 

সকাল ১০ টায় রেডিও নতুন সামরিক আদেশ ঘোষণা করে।

 

হোটেলে সাংবাদিকরা কোন তথ্য জিজ্ঞেস করলে প্রত্যেকবার তাদের প্রত্যাখাত করা হয়। সকল কূটনৈতিক মিশন প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। এক পর্যায়ে একজন ক্যাপ্টেন সাংবাদিকদের একটি গ্রুপ যখন তার সাথে কথা বলতে সামনের দরজা দিয়ে আসছিল, তিনি ক্রুদ্ধ হয়ে গেলেন। তিনি তাঁদের ভবনে প্রবেশ করতে বললেন এবং দেশে ফিরে যেতে বললেন। তিনি চিৎকার করে বললেন, “আমি তোমাদের হ্যান্ডেল করতে পারি, আমি যদি আমার নিজের লোকদের হত্যা করতে পারি তাহলে তোমাদেরও পারি।’

 

 

ক্রাইসিস নিয়ন্ত্র

 

এর অল্প কিছুক্ষণ পরে, সামরিক সরকার হোটেলে খবর পাঠালেন যে বিদেশী সাংবাদিকদের সন্ধ্যা সোয়া ৬ টার মধ্যে হোটেল ছেড়ে যেতে প্রস্তুত হতে হবে। সাংবাদিকরা তাদের জিনিসপত্র গোছাতে গোছাতে এবং বিল পরিশোধ করতে করতে রাত ৮ টা ২০ মিনিট বেজে গেল। তখন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার ভাষণ শেষ হবার পরপর সৈন্য ভর্তি ৫ টি ট্রাক সামনে- পেছনে পাহারা দিয়ে সাংবাদিকদের এয়ারপোর্ট নিয়ে গেল।

 

ছাড়ার আগে আগে, ইনচার্জ লে কর্নেলকে একজন সংবাদকর্মী জিজ্ঞেস করলেন কেন বিদেশী সাংবাদিকদের বের করে দেয়া হচ্ছে? তিনি বলেন, “আমরা তোমাদের ছেড়ে যেতে বলছি কারণ এখানে থাকাটা তোমাদের জন্য খুবই বিপজ্জনক হবে।” “খুবই রক্তাক্ত পরিবেশ সৃষ্টি হবে।” হোটেলের সকল কর্মচারী ও অন্যান্য বিদেশীরা বিশ্বাস করত যে, সাংবাদিকরা চলে যাবার পর হত্যাকাণ্ড শুরু হবে।

 

“এটা আর হোটেল থাকছে না – এটা হতে যাচ্ছে একটি রক্তাক্ত হাসপাতাল।’ – একজন হোটেল কর্মি জানালেন।

 

বিমানবন্দরে অবস্থানকালে যেখা যাচ্ছিল যে দূরে অগ্নিসংযোগ চলছে। সাংবাদিকদের এর জিনিসপত্র কঠোরভাবে চেক করা হয় এবং কিছু ভিডিও ফিল্ম, বিশেষ করে ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশন এর ফিল্ম বাজেয়াপ্ত করা হয়।

 

 

 

 

         শিরোনাম    সূত্র তারিখ
২। অবস্থা সৈন্যদের নিয়ন্ত্রণে বাল্টিমোর সান ২৮ মার্চ, ১৯৭১

 

Nishat Oni

<১৪, , >

 

দি বাল্টিমোর সান-মার্চ ২৮, ১৯৭১

অবস্থা সৈন্যদের নিয়ন্ত্রণে

জন ই. উড্রাফ

 

দুইদিনের গোলাগুলি ও জ্বালাও পোড়ানোর পরে, ঢাকাকে একটি বারুদ আর অগ্নিশিখার শহরে পরিনত করে পূর্ব পাকিস্তানি সেনারা সহসাই পশ্চিম পাকিস্তানিদের গ্রেফতার করে স্বাধীনতার দিকে এগিয়ে যায় ।

 

এর মধ্যে রাষ্ট্রপতি এ ম ইয়াহিয়া খান ঘোষণা দেন গত রাতে তার সতর্কতা শেষ হয়েছে, দুই বছর ব্যাপী গণতন্ত্রের উপর চালানো পরীক্ষা, পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানীর দখল নিতে সেনাবাহিনীর এরই মধ্যে গোলাগুলি, সকল অভিমুখে আগুন ছড়ান, এবং শেখ মুজিবর রহমানের জন্য জনগনের সমর্থন, পূর্ব পাকিস্তানের সাড়ে সাত কোটি জনতার নির্বাচিত নেতা এখন জেলে।

 

স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের সব হামলার মধ্যে খুব কমই শোনা যেত যা পরিষ্কারভাবে জানান দিত যে কেউ একজন সেনাবাহিনীর গুলি থেকে বেঁচে ফিরছে।

 

অল্প কিছু ঘটনার সাক্ষী সাংবাদিকদের মতে, সৈনিকরা কোন পূর্ব সতর্কতা না জানিয়ে শুন্য হাতের নাগরিকদের উপর ভারী অস্ত্র নিয়ে হামলা চালাত। মৃত্যু বা কি ঘটল তা নিশ্চিত হওয়া যেত না।

 

কথাবার্তার ভাঙ্গনের চেয়েও জরুরী প্রথম যে চিহ্নটি পাওয়া গেল তা আসলো একটি রিপোর্টের মাধ্যমে যা প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ঢাকায় ভারী পাঁচিলে ঘেরা রাষ্ট্রপতি ভবনে বিকাল ৫টা ৪৫ মিনিটে রেখে যায়। গেটে দুই ঘণ্টা ব্যাপী অনুসন্ধানের পরে জানা গেল, সেনা বিচ্যুতির দায়িত্বে সেখানে থাকা বেসামরিক রক্ষীর জবাবে, “ এই প্রশ্ন করার জন্য এটা খুব খারাপ সময় ( রাষ্ট্রপতির খোঁজ জানা)”

 

রাত ১১ টার দিকে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে সৈন্যরা সাংবাদিকদের ধরতে লাগল এবং তাদের গুলির ভয় দেখিয়ে ভিতরে যাবার আদেশ দিল। শহরের বিভিন্ন জায়গায় স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র দিয়ে আবার গোলাগুলি শুরু হল। কাল রাত ১২ টা ২০ মিনিটে শেখ মুজিবের ঘরে করা টেলিফোনের উত্তরে একটি শান্ত কণ্ঠ বলল শেখ বিছানায়।

 

আজ সকালে করাচি রেডিও শেখ মুজিবরের খোঁজ সম্পর্কে প্রথম নির্দিষ্ট করে বলল, দাবি করা হচ্ছে প্রায় এক ঘণ্টা আগে শেখ মুজিব ও তার পাঁচ জন লেফটেন্যান্ট সহ গ্রেফতার হয়েছে সেই ফোন কলের ১০ মিনিট পরে। কল করার দশ মিনিট পরে হোটেলের সেই টেলিফোন ডেড হয়।

 

এদিকে হোটেলে সৈন্যরা আসে পাশে ওড়া বাংলাদেশের সবুজ, লাল ও সোনালি পতাকা ছিড়ে ফেলে এবং তা পুড়িয়ে দেয়।

 

শুক্রবার রাত ১ টার দিকে প্রথম কামানের শব্দ শোনা যায় যা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন ক্যাম্পের দিকে এগোচ্ছিল যেখানে বাঙ্গালী ছাত্র নেতারা দীর্ঘ সময় ধরে সক্রিয় ছিল।

প্রায় ২৫ থেকে ৩০ সৈন্য বোঝাই ট্রাক হোটেলের পাশ দিয়ে দেড় মাইল দূরে ক্যাম্পাসের দিকে এগোচ্ছিল। কিছুক্ষন পরেই ক্যাম্পাসের দিক থেকে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের গুলির শব্দ শোনা গেল।

 

রাত ২ টা থেকে ২.৩০ এর দিকে আরো কয়েকটা কামান বসানো হল, দুটি বড় দালান জ্বালিয়ে দেয়া হল, রাত বিপুল আলোকছটায় ছেয়ে গেল। বাঙ্গালী সাংবাদিকরা হোটেলের ১০ম তলার জানালা দিয়ে দেখে সেটাকে ইকবাল ও মহসিন হল চিহ্নিত করল যা ছিল আওয়ামী লীগ ছাত্রদের কর্ম ঘাঁটি।

 

রাত প্রায় ২ টা ১৫ তে সেনারা হোটেল ছেড়ে রাস্তার ওধারে একটি সরু গলিতে নিঃস্ব প্রায় কিন্তু জনপ্রিয় একটি ইংরেজি সংবাদপত্রের অফিসের দিকে এগোচ্ছিল। লোকজন স্পষ্টভাষায় এবং প্রায় দায়িত্বহীন ভাবে সরকারকে গালাগাল শুরু করে।

 

গলির মধ্যে একটি ধ্বংস হওয়া গ্যারেজ থেকে দুটি ধ্বংসপ্রাপ্ত গাড়ি উদ্ধার করা হয় যা আগে থেকেই উপস্থিতমতো একটি ব্যারিকেডের মধ্যে টেনে নেয়া হয়েছিল, এবং সৈন্যরা চলে যাওয়ার আগে তা বিনাশ করার জন্য শত গুলি চালায়। এক পর্যায়ে গ্যারাজের দ্বিতীয় তলা থেকে চিৎকার শোনা যায় “বাঙ্গালী এক হও’”, জবাবে সৈন্যরা রাইফেল ও মেশিনগানের শত শত গুলি ছোড়ে।

 

এই পর্যায়ে প্রায় ১৫ জন ছাত্র খালি হাতে হোটেলের পাশে বীথিকায় নেমে আসে এবং ক্ষোভের সাথে চিৎকার করতে থাকে।

 

সৈন্যরা জীপ ঘোরায় এবং যুবকদের দিকে মেশিনগান তাক করে গুলি শুরু করে, সৈন্য ভর্তি জীপ পিছে রেখে ছাত্ররা ভয়ে পালিয়ে যায়।

 

এরপর সেনারা যেখান থেকে একতার শ্লোগান আসছিলো সেই গ্যারাজে ফিরে যায়। তারা দরজা ভেঙ্গে কয়েকজনকে ভিতরে ঢোকায়। এর কিছুক্ষনের মধ্যেই দরজার কাছে অল্প আগুন জ্বলতে দেখা যায়। সেটা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং গ্যারাজের সর্বত্র ছড়িয়ে যায়।

সেনারা গুলি করতে করতে গলি দিয়ে পালিয়ে সংবাদপত্রের অফিসের দিকে যায়।

 

যখন তারা ভিতরে পৌঁছায়, তারা চিৎকার করে সাবধান করে কিন্তু তারা পশ্চিম পাকিস্তানের ভাষা উর্দুতে বলছিল, যা পূর্ব পাকিস্তানে খুব বেশি বোধগম্য ছিলনা। কেউ গেলনা, সেনারা ভবনের মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ করল এবং এর মধ্যে শত স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র ও মেশিনগান ছেড়ে দিল।

 

দরজা ভেঙ্গে তারা কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে পাশের রুমে প্রবেশ করলো। হোটেলে ফেরার সময় সেনারা চিৎকার করে বলছিল “নারায়ে তাকবির” একটি মুসলিম শ্লোগান যার অর্থ “সৃষ্টিকর্তার জয়” যা পাকিস্তানি আচরণের সাথে সম্পৃক্ত।

 

তারা আরো চিৎকার করে উর্দুতে বলল “আমরা যুদ্ধ জয় করেছি”। রাত প্রায় চারটার দিকে তাদের দুইজন ভিতরে আসলো এক জগ চা নিতে।

 

এর মধ্যে সব দিক দিয়ে প্রায় হাফ ডজন আগুন ঝলসে উঠলো, এবং প্রায় ৪.১৫ এর দিকে পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলসের ক্যান্টনমেন্ট থেকে সবচেয়ে বড় আগুন জ্বলে উঠলো। ঘণ্টা ব্যাপি এই আগুন জ্বলে আর প্রথম আধা ঘণ্টা ধরে গোলাবারুদের ফুলকি উড়তে দেখা যায়। দুই একরেরও বেশি জায়গা জুড়ে এর আলো ছড়িয়ে পড়ে। আগুনের শিখা ও ধোঁয়ায় আকাশ বাতাস ছেয়ে যায়।

 

রাত প্রায় ৫.২০ মিনিটে ছয়টি চাইনিজ টি-৫৪ ট্যাঙ্ক গর্জন করে হোটেলে আসে এবং প্রায় ২০ মিনিট সেখানে অবস্থান করে। এগুলোর মধ্যে একটার কামান সরাসরি হোটেলের কর্নার বরাবর সর্বক্ষণ তাক করানো ছিল। এরপর শীঘ্রই একটি বড় ট্রাক আসে যেটার বডিতে কয়েক ফুট গভীর আমেরিকার তৈরি কারবাইন্স ও কম্যুনিস্ট- ব্লক একে- মডেলের স্বয়ংক্রিয় রাইফেলস বসানো ছিল।

 

১৯৫৫ সাল থেকে শুরু হওয়া আমেরিকার সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে পাকিস্তানিদের সমর্থনের নজির ছিল এইসব পুরনো ধরণের ভারী অস্ত্র, যার জোরাল পরামর্শ ছিল কিছু অল্পসংখ্যক ইউনিট যাতে বাঙ্গালি নিয়োগ ছিল তা থেকে তাদের নিরস্ত্র বা অব্যহতি দেয়া।

 

সারাদিন ব্যাপি বিক্ষিপ্ত হামলা চলে এবং সকাল বেলা পাড়া প্রতিবেশী সব দিক দিয়ে লাউডস্পীকার সহ ট্রাক চলে। দখলদারিরা ছাদে চড়ে বাংলাদেশের পতাকা নামিয়ে সংঘর্ষে মৃতদের উদ্দেশ্যে কালো পতাকা উত্তোলিত করে।

 

ব্যাপক হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে ঢাকা রেডিও তে প্রথম সম্প্রচার হয় গতকাল সকালের মধ্যভাগে, বাহুল্য বর্জিত ঘোষণায় বলা হয় পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত কারফিউ চলবে। পরে একজন কর্মকর্তা বলল শহরে লাউডস্পীকার ব্যবহার করা হয়েছে লোকজনকে ঘরে থাকতে সতর্ক করার জন্য। আগের রাতে হোটেলের কাছে হামলার ব্যাপারে কোন সতর্কতা জারি করা হয়নি।

 

সকাল ৮.৩০ দিকে জনাব ভুট্টো তার দলবল সহ ভারি সেনা পাহারায় হোটেল ত্যাগ করে আর পাঞ্জাবি বেসমরিকরা কম্যুনিস্ট-ব্লক রাইফেলস বহন করে নিয়ে যায়। জনাব ভুট্টো ধূসর রঙের স্যুট পরা ছিল এবং কঠিন মুখভঙ্গি করে দুইবার বলল, “আমার কিছু বলার নেই”।

 

সকালে একজন লেফটেন্যান্ট কর্নেল হোটেলে এসেছিল, বিকেল ও সন্ধ্যার মধ্যে সে নিজেকে হোটেল এলাকা সহ প্রায় দুই স্কয়ার মাইল এলাকার কমান্ডার হিসেবে শনাক্ত করল। দুপুরের পরে পুলে সাঁতার কাটার সময় সে হোটেল ব্যবস্থাপনাকে বলল বিদেশিদের থাকার অনুমতি দেয়া হল।

 

৬ টার দিকে হোটেলে সাংবাদিকদের ফোন আসতে লাগলো যে মার্শাল ল প্রশাসক লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা খান তাদের চলে যাবার পরামর্শ দিচ্ছে। সেনাবাহিনী সরকারি জনসংযোগ বিভাগের মেজর সিদ্দিক সালিক, ফোন কলের ধরনের নির্দেশনার ব্যাপারে অনুসন্ধানকারী এক সাংবাদিককে বলে, “কিছু উপদেশ বাধ্যতামূলক।”

 

কেন তাদের হোটেল ছাড়তে হবে এই প্রশ্ন বারবার করা হলে লেফটেন্যান্ট কর্নেল বলে, “আমরা চাই আপনারা ছেড়ে যান কারন এটা আপনাদের জন্য অনেক বিপদজনক হবে। এখানে অনেক রক্তপাত হবে”।

 

রাত ৮ টার মধ্যে হোটেলে অবস্থানকারী ত্রিশের অধিক সাংবাদিকদের চারটি সেনা ট্রাকে ওঠানো হয় কিন্তু তাদের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার বক্তব্য শোনানোর জন্য অপেক্ষা করানো হয় যেখানে সে ঘোষণা করেছিল, আওয়ামী লীগের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে শেখ মুজিবকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।

 

জেনারেল ইয়াহিয়া পূর্ব পাকিস্তানে পশ্চিম পাকিস্তানি সেনাদের প্রশংসা করল এবং বলল, “আমি তাদের নিয়ে গর্বিত”।

 

এরপর ট্রাক গুলো রাইফেল বহনকারী সৈন্য ভর্তি ট্রাকের পিছে এয়ারপোর্টের দিকে এগিয়ে চলল, পিছনে সব গাছ কাদামাটির নল, আবর্জনার স্তুপ, জ্বালিয়ে দেয়া বিভিন্ন সরু গলি যেখানে প্রায় সব দেয়ালে দেয়ালে শেখ মুজিবের ছবি ছিল, সব গুঁড়িয়ে দিয়ে এগিয়ে চলল আর পিছে তিনটি ট্রাক ভর্তি সশস্ত্র সেনারা জ্বলতে থাকা একটি গ্রাম বসে দেখছিল।

 

 

 

 

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
সেনাবাহিনী কর্তৃক বিদেশী সাংবাদিক বহিষ্কার নিউইয়র্ক টাইমস ২৮ মার্চ, ১৯৭১

 

 

Razibul Bari Palash

<১৪, , >

 

নিউ ইয়র্ক টাইমস, রবিবার, মার্চ ২৮, ১৯৭১

সেনাবাহিনী পাকিস্তান থেকে ৩৫ জন বিদেশী সাংবাদিক বহিষ্কার করেছে

  • গ্রেস লিস্টেন্সেন

 

সামরিক কর্তৃপক্ষ গতকাল পূর্ব পাকিস্তান ৪৮ ঘন্টার বেশী সময়ের জন্য এসেছে এমন ৩৫ জন সাংবাদিককে ঢাকার একটি হোটেল থেকে বহিষ্কার করেছে।

 

পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সৈন্যরা উত্তর ঢাকার ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে অবস্থানরত কিছু বিদেশী সাংবাদিককে হোটেল থেকে বের হলে গুলি করার হুমকি দিয়েছে। এই সেনারা পূর্ব পাকিস্তানের বেসামরিক বিদ্রোহীদের উপর গুলিবর্ষন করছিল।

 

করাচিতে প্লেনে করে তাদের পাঠানোর আগে সেখানকার সাংবাদিক – যাদের মধ্যে নিউ ইয়র্ক টাইমস সংবাদদাতা সিডনি এইচ Schönberg ছিলেন – তাদের অনুসন্ধান করা হয়েছে এবং তাদের কাছে পাওয়া নোট, চলচ্চিত্র ও ফাইল বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।

তাদের মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, ব্রিটেন, কানাডা, ফ্রান্স, জাপান এবং রাশিয়ার সংবাদপত্র ও অন্যান্য মিডিয়ার প্রতিনিধি ছিল।

 

ঢাকায় থাকাকালীন সময়ে সাংবাদিকদের কোনো ফাইলিং বা কূটনৈতিক মিশনের সঙ্গে যোগাযোগ করা থেকে বিরত রাখা হয়েছিল।

 

জনাব শ্যানবার্গ রিপোর্ট করেন যে, যখন হোটেল এলাকার ইনচার্জ লে কর্নেলকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল কেন বিদেশী সংবাদদের চলে যেতে বলা হচ্ছে – তখন তিনি বললেন “আমরা ব্যাখ্যা দিতে বাধ্য না, এটা আমাদের দেশ।”

 

তিনি মুখ ফিরিয়ে নিলেন, এবং অবজ্ঞাভরে স্মিত হাসি দিয়ে বললেন,: “আমরা আপনাদের চলে যেতে বলছি কারণ এটা আপনাদের জন্য নিরাপদ জায়গা নয়, খুবই রক্তাক্ত হতে পারে সেটা।”

 

এ এম রোজেন্থাল, টাইমসের ব্যাবস্থাপনা সম্পাদক, পাকিস্তানি সরকারকে একটি টেলিগ্রামে বিক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

 


 

টেলিগ্রামে বলেনঃ

 

“নিউ ইয়র্ক টাইমস এর সংবাদদাতা সিডনি শ্যানবার্গ সহ আরও ৩০ জন বিদেশী সংবাদদাতাকে অন্যায্য এবং অভূতপূর্বভাবে ঢাকা থেকে বহিষ্কার করায় হতবাক হয়েছি। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতার সব মূলনীতির পরিপন্থী হওয়া সত্ত্বেও জনাব Schanberg এবং অন্যদের ঢাকায় ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকলে এবং যদি তারা তাদের সাংবাদিকতার দায়িত্ব পালন করতে বাইরে যায় তাহলে তাদের গুলি করা হবে বলে হুমকি দেয়া হয়েছে।

 

“পরবর্তীকালে তাদের কাগজপত্র ও ফিল্ম বাজেয়াপ্ত করে তাদের দেশ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এটা কি বিশ্বাস করতে পারি যে শুধুমাত্র সামরিক কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এই ত্রুটি হয়েছে? আশা করছি যে আপনার সরকার অবিলম্বে এই অবস্থা দূর করবে।’

 

 

 

 

 

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ

৪। ট্যাঙ্ক এর বিরুদ্ধে লাঠি

 

নিউইয়র্ক টাইমস ২৮শে মার্চ, ১৯৭১

 

Farjana Akter Munia

<১৪, , ১০>

 

নিউইয়র্ক টাইমস, রবিবার, ২৮শে মার্চ, ১৯৭১

পূর্ব পাকিস্তানে ট্যাংক প্রতিরোধে লাঠি এবং বর্শা

ট্যাঙ্ক এর বিরুদ্ধে লাঠি

  • লিখেছেন সিডনি এইচ. শ্যানবার্গ

 

নিউইউর্ক টাইমস স্পেশাল

 

নয়া দিল্লী, ২৮শে মার্চ – পূর্ব পাকিস্তান এর জনগন লাঠি, বর্শা আর ঘরে তৈরি রাইফেল নিয়ে বিমান, বোমা, ট্যাংক এবং ভারি কামান দিয়ে সজ্জিত পশ্চিম পাকিস্তানি মিলিটারির বিরুদ্ধে গড়ে তুলছে এক প্রতিরোধমূলক আন্দোলন ।

 

প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের জন্য যে অহিংস আন্দোলন এর শুরু হয়েছিল সেটাই এই প্রতিরোধ এ রুপ নিয়েছে যখন তিন রাত আগে বেসামরিক নাগরিকদের উপর সরকারি বাহিনী আকস্মিক হামলা চালায়।

 

গত ডিসেম্বরে নির্বাচনে জয়ী হওয়ার ফলে পূর্ব পাকিস্তানিরা সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজনৈতিক ক্ষমতা দাবি করার চেষ্টা করে এবং তা প্রতিরোধ করতে এগিয়ে আসে সেনাবাহিনী। এই মাসের শুরুর দিকে মেজর. সিদ্দিক সালিক যিনি পূর্ব পাকিস্তানের সামরিক আইন প্রশাসনের জন্য জনসংযোগ কর্মকর্তা, বিদেশি সাংবাদিকদের কাছে অবাধ্য বেসামরিক নাগরিকদের সাথে আচরনের ব্যাপারে সেনাবাহিনীর ভুমিকা সম্পর্কে বলছিলেন।

 

“তারপর আপনি সেনাবাহিনী কে ডেকে পাঠান”, বলছিলেন লম্বা পশ্চিম পাকিস্তানি অফিসারটি, “এটি একটি শেষ পন্থা, আর সেনাবাহিনী হত্যা করার জন্যই গুলি করবে”

 

তার এই মন্তব্য ছিল ভবিষ্যদ্বাণীপূর্ণ। দুই সপ্তাহ পরে, গত বৃহস্পতিবার রাত থেকে, পাকিস্তানি সেনাবাহিনী স্পষ্টতই যে কেউ রাস্তায় একটু নড়াচরা করেছিল অথবা কোন জানালা থেকে চিৎকার করে অবাধ্যতা প্রকাশ করছিল তাদের কে সরাসরি হত্যা করা শুর করে। স্বশাসনের জন্য বাংগালি আন্দোলনকে পিশে ফেলতে পূর্ব পাকিস্তানের বেসামরিক নাগরিকদের বিরুদ্ধে সৈন্যরা কামান, মেশিন গান, রিকয়েললেস রাইফেল ও রকেট ব্যবহার করেছিল।

এটা নিশ্চিত যে, হাজার হাজার বাঙালি হত্যা করা হবে, কিন্তু স্বশাসনের আন্দোলন এবং তাদের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান এর প্রতি তারা এত নিবেদিত প্রাণ যে ১০০০ মাইল দূরের এক অঞ্চল থেকে আসা কার্যত একটি বিদেশি সেনাবাহিনী কিভাবে অনির্দিষ্টকালের জন্য ‘পূর্ব পাকিস্তান নিয়ন্ত্রণ করবে তাই এখন প্রশ্নবিদ্ধ।

 

এই সেনাবাহিনী এসেছে পশ্চিম থেকে, যেখানে বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের আধিক্য, মাথাপিছু আয় বেশী, জিনিষপত্রের দাম কম। ৭৫ মিলিয়ন পূর্ব পাকিস্তানীদের চেয়ে ৫৫ মিলিয়ন পশ্চিম পাকিস্তানীদের জন্য সেখানে সব কিছুই তুলনামূলক ভাবে ভাল।

 

পুর্ব পাকিস্তানীরা যে নামে পরিচিত অর্থাৎ অনেক বাঙালি গত কয়েক সপ্তাহে শহর থেকে পালিয়ে দেশের মধ্যে গ্রামের বাড়িতে পালিয়ে গেছেন।

 

এই প্রতিবেদক সহ বিদেশী সাংবাদিকদের, শনিবার পূর্ব পাকিস্তান থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তাদের শরীর এবং মালপত্র ভালভাবে সার্চ করে ফিল্ম এবং নোটবুক জব্দ করা হয়েছে।

 

 

 

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
ইয়াহিয়ার পূর্ব পাকিস্তান আক্রমণ পূর্ব-পরিকল্পিত বাল্টিমোর সান ৩০ মার্চ, ১৯৭১

 

Saikat Joydhar

<১৪, , ১১১৭>

 

দ্য বাল্টিমোর সান, মঙ্গলবার, ৩০ মার্চ, ১৯৭১

ইয়াহিয়া পূর্ব পাকিস্তান আক্রমণের পরিকল্পনা করেছিলেন

একটি পরিভাষা তার মুজিবকে ফাঁদে ফেলার প্রয়াসকে লুকাতে পারে না

-জন ই. উডরাফ, সান স্টাফ করেস্পন্ডেন্ট

 

নয়া দিল্লি, ২৯ মার্চঃ প্রেসিডেন্ট এ, এম ইয়াহিয়া খানের পশ্চিম পাকিস্তানী সামরিক শাসকগোষ্ঠী পূর্ব পাকিস্তানের উপর তাদের সতর্ক ও সমন্বিত অতর্কিত আক্রমণের একটি আইনী পারিভাষিক ব্যাখ্যা প্রদান করছে।

 

প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া এবং প্রধান প্রধান পশ্চিম পাকিস্তানী রাজনীতিকগণ আকস্মিকভাবে দুই সপ্তাহ ধরে চলা রাজনৈতিক সংলাপ বাতিল করা এবং তার পরপরই পূর্ব বাংলার অসহযোগ আন্দোলনের উপর কঠোর সামরিক দমনপ্রক্রিয়ার একই ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন।

 

প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া জাতির উদ্দেশ্যে তার রেডিওবার্তায় যে কারনটি উল্লেখ করেছেন, তা হল পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি নেতা শেখ মুজিবুর রহমান প্রস্তাবিত ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির সাক্ষাতের পূর্বেই ঘোষণার মাধ্যমে নির্বাচিত বেসামরিক প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবি জানিয়েছিলেন।

 

একই ব্যাখ্যা

 

সংলাপে অংশগ্রহণকারী পশ্চিম পাকিস্তানভিত্তিক পাকিস্তান পিপলস পার্টির একজন সদস্য ওমর কসৌরি কড়া নিরাপত্তার মধ্যে শুক্রবার সকালে পিপলস পার্টি প্রধান জুলফিকার আলী ভুট্টোর সাথে ঢাকা কন্টিনেন্টাল হোটেল ত্যাগের সময় সাংবাদিকদের সাথে কথোপকথনে ঠিক একই ব্যাখ্যা প্রদান করেন।

 

জেনারেল ইয়াহিয়া শুক্রবার রাতে জাতির উদ্দেশ্যে বলেন, “এ ধরনের ঘোষণা যে কাগজে লেখা হত, সেই কাগজের সমান মূল্যও তা বহন করত না। এবং তিনি (শেখ মুজিব) এই অব্যাহতি (impunity) ব্যবহার করে যা ইচ্ছা তাই করতে পারতেন”।

 

ডিসেম্বরের নির্বাচন ও ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি, যাদের কিনা সামরিক বাহিনী কখনও সাক্ষাতের অনুমতি দেয় নি, তাদের একমাত্র অথোরিটি ‘লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক অর্ডার’ নামক দীর্ঘতর শিরোনামযুক্ত রাষ্ট্রপতির ঘোষণা থেকে উক্ত ঘোষণা কতটুকু ভিন্ন হবে, তা তিনি উল্লেখ করেন নি।

তার পরিবর্তে তিনি বলেছেন, সংরক্ষিত থাকা সত্ত্বেও তিনি সাময়িকভাবে পরিকল্পনাটি মেনে নিয়েছেন, কিন্তু এই শর্তে যে পশ্চিম পাকিস্তানী রাজনীতিকরা এমন একটি পরিকল্পনার প্রতি তাদের ‘দ্ব্যর্থহীন সম্মতি’ প্রদান করবে, যা কিনা শেখ মুজিবের বাঙালি সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে কার্যতঃ দেশের চালকের আসনে বসাবে।

 

“ইয়াহিয়া এর আগে কিছু বিস্ময়কর রাজনৈতিক সরলতা প্রদর্শন করেছেন”, ঢাকার সকল বিদেশি সাংবাদিকদের দেশের বাইরে পাঠানোর উদ্দেশ্যে বিমানবন্দরে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতকৃত সামরিক বাহিনীর ট্রাকের রেডিওতে শুক্রবারের সম্প্রচার শুনে এমনই মন্তব্য করেছেন পাকিস্তানের অন্যতম অভিজ্ঞ এক বিদেশি সংবাদদাতা।

 

“কিন্তু পরিস্থিতি এত সরল নয়, পরিস্থিতি অনেক জটিল। এতে এটাই প্রমাণিত হবে যে আলোচনার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল ইচ্ছাকৃত বিলম্ব করা, আর এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে তারা পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আরও সৈন্য নিয়ে এসেছিল”।

 

 

প্রতারণার পুনঃপরিকল্পনা

 

আলোচনা যে সময়ক্ষেপনের পন্থা ছিল, এই মন্তব্যই তার প্রথম অর্থবহ ইংগিত ছিল না। একজন ঘনিষ্ট সম্পর্কযুক্ত ভ্রমণকারী ধ্বংসযজ্ঞের এক সপ্তাহ পূর্বে করাচি থেকে ঢাকা পৌছে সাংবাদিকদের বিস্মিত করেছেন এই বলে যে অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য দুই জেনারেল তাকে বলেছেন সামরিক বাহিনীর পরিকল্পনা ছিল বাঙালি নেতৃবৃন্দকে বিশ্বাস করানো যে আলোচনা সফল হতে পারে এবং তারপর পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই কঠোর ব্যবস্থা নেয়া।

 

কেউই তখন এ বিষয়ে কিছু লেখেন নি, কেননা এই খবরকে সমর্থন করার মত সমানভাবে নির্ভরযোগ্য অন্য কোন সূত্র ছিল না। এবং সত্যিকার অর্থে কেউই এমন ধারণা পোষণ করতে চান নি যে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া নির্বাচিত বেসামরিক প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা তুলে দেয়ার পরিকল্পনার পিছনে দুটি বছর নিজের জনপ্রিয়তা বাজি রাখার পর এমন কোন পদক্ষেপের অনুমোদন দেবেন।

 

যদিও এখনও সামরিক জান্তার অভিপ্রায় সম্পর্কে কোন ইস্পাতকঠিন নিশ্চয়তা প্রদান করা সম্ভব নয়, তবুও বৃহস্পতিবারের ঘটনাপ্রবাহের প্রত্যক্ষদর্শী কেউই দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে পারবে না যে এটি পূর্ব পরিকল্পিত ছিল না।

 

যতক্ষনে অত্র অঞ্চলে সামরিক এবং বেসামরিক জনগণের মধ্যে সংঘর্ষের প্রতিবাদস্বরূপ শনিবার হরতালের আহ্বানসম্বলিত শেখ মুজিবের বিবৃতি বৃহস্পতিবার রাতে সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে, ততক্ষনে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া তার নজিরবিহীন নিরাপত্তার বলয়ে ঘেরা বাড়ি ত্যাগ করেছেন। তার এবং ভুট্টোর উপদেষ্টামন্ডলীর সর্বশেষ মিটিং শেষ হওয়া থেকে একজন বাঙালি সাংবাদিক কর্তৃক প্রেসিডেন্টের গৃহত্যাগ অবলোকনের মাঝে তেমন কোন সময়ের পার্থক্য ছিল না।

ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের এগারো তলা, যাকে কিনা হাফ ডজন সয়ংক্রিয় আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে মিঃ ভুট্টো একটি দুর্গে পরিণত করেছেন, সেখানে সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে লিফটের মাধ্যমে মিনিটে দুইজন করে সৈন্য ওঠানামা শুরু হয়।

 

এধরণের কর্মকান্ড প্রায় এক ঘন্টা ধরে চলতে থাকে। এরপর একটি বড় সৈন্যদল কালো রঙের পুরাতন কার্ডবোর্ডের একটি স্যুটকেস নিয়ে নেমে আসে। স্যুটকেসটি পরে প্রায় বিশ জনের এক প্লাটুন সৈন্যের হাতে হস্তান্তর করা হয়, যারা সেটিকে রাষ্ট্রপতির ভবণে নিয়ে যায়। সেখানে তখনও কিছু গার্ড ডিউটিরত ছিল। সেই কালো স্যুটকেসে কি ছিল, তা কখনও জানা যায় নি।

 

 

একটি অশুভ সময়

 

রাষ্ট্রপতির মুখপাত্র, যিনি সর্বদা সাংবাদিকদের অভ্যর্থনা জানানোর জন্য উপস্থিত থাকতেন, তার অবস্থান জানতে চাইলে গার্ড বলেন, “তিনি কোথাও গিয়েছেন এবং কখন ফিরে আসবেন, তা আমার জানা নেই। দয়া করে আপনারা আপাতত চলে যান এবং কাল সকাল দশটায় আসুন”।

 

এদিকে রাষ্ট্রপতির ভবন থেকে মাত্র দুই ব্লক দূরত্বে অবস্থিত হোটেলের নিরাপত্তাকর্মী পূর্বের অন্য যেকোন রাতের তুলনায় সংখ্যায় দ্বিগুণ মনে হচ্ছিল। রবিবার থেকে মিঃ ভুট্টোর নিরাপত্তায় নিয়োজিত পরিচিত কোন মুখকেই ঐ রাতে ডিউটিতে দেখা গেল না।

 

পরিচিত নিরাপত্তাকর্মীরা ছিল ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস-এর একটি কন্টিনজেন্ট, একটি বাঙালি অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বাহিনী। যদিও তারা সেনাবাহিনীর অধীনস্ত ছিল, তবুও ধারনা করা হত তারা আওয়ামী লীগের প্রতি অনুগত। নতুন বাহিনীর পোশাকে কোন ইউনিট বা পরিচয় বহনকারি ব্যাজ ছিল না, শুধু পদমর্যাদা, পরিচয় এবং যুদ্ধকালীন অর্জিত রিবন ছিল। তারা পাঞ্জাবীদের মত লম্বা ছিল, বাঙালিদের মত খাঁটো ছিল না।

 

 

অপরিচিত মুখ

 

হোটেলের সামনে এক ক্যাপ্টেন বললেন, “আমাকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে যেন রাত ১১টার পর কেউ হোটেল ত্যাগ করার চেষ্টা করলে তাকে গুলি করা হয়। দয়া করে ভিতরে যান। আমি আপনাদের কোন ক্ষতি করতে চাই না”।

 

‘দয়া করে বাইরে যাবেন না’ লেখা একটি নোটিশ লবিতে টানানো ছিল। কিছুক্ষন ক্যাপ্টেনকে বোঝানোর চেষ্টা করার পর কেউ আর বাইরে গেল না।

 

 

 

শুরু হল গোলাগুলি

 

কয়েক মিনিটের মধ্যে সয়ংক্রিয় আগ্নেয়াস্ত্রের বিক্ষিপ্ত গোলাগুলির শব্দ সমস্ত শহর জুড়ে শোনা যেতে লাগল। একটার দিকে ভারী মেশিনগান এবং কামানের শব্দ শোনা গেল, বিক্ষিপ্ত অগ্নিকান্ড দৃশ্যমান হল। গোলাগুলি ও ধ্বংসযজ্ঞের প্রথম রাত শুরু হল।

 

ঐ রাতের ঘটনাপ্রবাহকে শুধুমাত্র একটি উপায়েই ব্যাখ্যা করা সম্ভব- একটি অহিংস ও অসহযোগ আন্দোলনকে ধ্বংস করার জন্য নিরস্ত্র জনসাধারনের উপর একটি আনন্দচিত্তে সমন্বিত ও পূর্ব পরিকল্পিত আক্রমণ।

 

আক্রমণ চালানো হয়েছে কোন প্রকার সম্প্রচারিত বা প্রকাশিত সতর্কবাণী ছাড়াই, যদিও অফিসাররা দাবি করেছেন তারা লাউডস্পিকার ব্যবহার করে বেসামরিক জনগণকে রাজপথ ত্যাগ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন।

 

কারফিউ ঘোষণা করে প্রথম রেডিওবার্তা প্রচার করা হয়েছিল মধ্যবেলায়, বিক্ষোপ করতে করতে এগিয়ে আসা পনের জন নিরস্ত্র যুবকের উপর কোন সতর্কবাণী ছাড়াই সৈন্যবাহিনী কর্তৃক একটি জীপের সঙ্গে লাগোয়া মেশিনগান থেকে গোলাবর্ষণের ঘটনা বিদেশি সাংবাদিকদের অবলোকনের প্রায় আট ঘন্টা পর।

 

 

দশ ঘন্টা পর

 

কারফিউ ঘোষণার দশ ঘন্টা পর প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া আলোচনা ভেঙে যাওয়ার আইনগত ব্যাখ্যা দিয়ে এবং যে ব্যক্তিটির সঙ্গে আলোচনা চলছিল, পূর্ব পাকিস্তানকে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পৃথক করার মত ‘রাষ্ট্রদ্রোহিতা’র অপবাদ দিয়ে সেই শেখ মুজিবের সমালোচনা করে রেডিওতে ভাষণ দেন।

 

শেখ মুজিবের দাবিদাওয়া সম্পর্কে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার বক্তব্য এমন বিশ্বাসযোগ্যতা প্রদান করে যে এই আওয়ামী লীগ নেতা স্বায়ত্তশাসনের শর্তসমূহকে এমন পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন, যা কার্যত স্বাধীনতার সমপর্যায়ের হত।

 

ছাত্র-জাতীয়তাবাদ ও অন্যান্য মৌলিক রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে শেখ মুজিবের উপর যে চাপ ছিল, তাতে তাঁর পক্ষে ইয়াহিয়া যা যা বলেছেন সেগুলো দাবি করা সম্ভব। যদিও প্রেসিডেন্ট খুব সাবধানে এই বিষয়টিকে আলোচনা ভঙ্গের কারন হিসেবে তালিকাবদ্ধ করা থেকে বিরত থেকেছেন।

 

সবসময় চরমপন্থা নয়

 

শেষের দিকে তাঁর (বঙ্গবন্ধুর) দাবিদাওয়া যতটা অসংযত ছিল বলে প্রেসিডেন্ট দাবি করেন, সবসময় তা তেমনটি ছিল না।

পাঁচ বছর ধরে আওয়ামী লীগ একটিমাত্র কার্যক্রমকেই প্রধান করে দেখে এসেছে, আর তা হল এমন একটি সংবিধান প্রণয়ন, যা কিনা পূর্ব পাকিস্তানকে তার বৈদেশিক সাহায্য, বৈদেশিক বাণিজ্য এবং করের উপর নিয়ন্ত্রন প্রদান করে। সেই কার্যক্রম এবং সেই সাথে দেশের ক্রমাগত সামরিক স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ফলস্বরূপ শেখ মুজিবের ছয় বার জেল খাটার রোমান্টিকতায় পূর্ণ গল্প পূর্ব বাংলায় আওয়ামী লীগকে প্রচন্ড জনপ্রিয়তা এনে দিয়েছিল।

 

দাবিটি করা হয়েছিল দুই যুগের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে, যেখানে পঞ্চান্ন মিলিয়ন পশ্চিম পাকিস্তানী তাদের নিয়ন্ত্রিত সামরিক বাহিনী ব্যবহার করে পঁচাত্তর মিলিয়ন বাঙালিকে শোষণ করেছে।

 

অধিকাংশ কর, অধিকাংশ আয়কৃত বৈদেশিক মুদ্রা এবং অধিকাংশ জনগণ ছিল পূর্ব পাকিস্তানের।

 

অধিকাংশ কর, অধিকাংশ বৈদেশিক মুদ্রা এবং অধিকাংশ বৈদেশিক সাহায্য যেত পশ্চিম পাকিস্তানে।

 

যে সামরিক বাহিনী এখন বাঙালিদের বশে আনার চেষ্টা করে যাচ্ছে, দেশের মোট বাজেটের শতকরা ষাট ভাগ তারা ভোগ করে, যার প্রধান উৎস বাঙালিদের করের টাকা। বিষয়টি উল্লেখ করতে বাঙালিরা কখনও ভোলে না।

 

আর একটি বিষয়, যা বাঙালিরা সবসময় উল্লেখ করে, শতকরা দশ ভাগেরও কম সৈনিক এবং তার চেয়েও কম অফিসার বাঙালি।

 

কিন্তু অর্থনৈতিক বৈষম্যই পাকিস্তানের দুই অংশের ভিতর একমাত্র বৈষম্য নয়। পশ্চিমাংশ মূলত নিয়ন্ত্রন করে লম্বাকৃতির পাঞ্জাবীরা, যারা কিনা ঐ অঞ্চলে আরও অনেক জাতি ও ভাষাভাষীর সাথে বসবাস করে। অপরদিকে পূর্বাংশে জাতি ও ভাষার দিক থেকে বাঙালিরাই মূলত বসবাস করে।

 

এই দুই জাতিগত গোষ্ঠী শুধু ভাষার দিক থেকেই আলাদা নয়। খাদ্য, পোশাক, এমনকি যে ধর্মের দোহাই দিয়ে ভারতীয় বৃটিশ সাম্রাজ্য থেকে স্বাধীনতা লাভ করেছিল পাকিস্তান, সেই ধর্মচর্চায়ও রয়েছে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য।

 

 

দাম্ভিকতাই যার পরিচয়

 

একজন পাঞ্জাবী সেনাকে চেনা যায় খাট, ময়লা, স্বল্পঋজু বাঙালিদের মধ্য দিয়ে হাটার সময় তার দাম্ভিকতা পূর্ণ হাতের দোল দেখে।

 

এসকল পার্থক্য সত্ত্বেও, পশ্চিমের জাতিগত বৈষম্যের তুলনায় বাঙালিদের জাতিগত ঐক্য সত্ত্বেও সেনাবাহিনী এমন ধারনা মাথায় নিয়ে নির্বাচিত বেসামরিক শাসনের দিকে তাদের সাবধানী পদক্ষেপ শুরু করেছে যেন জোটবদ্ধ পশ্চিমা নির্বাচকমন্ডলী বহুবিধ দলে বিভক্ত ও জর্জরিত পূর্বের উপর প্রভাব বিস্তার করতে পারবে।

 

“আমরা বিশ্বাস করেছিলাম অ্যাসেম্বলিতে যতই আঞ্চলিক পার্থক্য থাকুক না কেন, পশ্চিমের পুরাতনপন্থি রাজনীতিকরা সহজেই বহুধাবিভক্ত পূর্বের বিপক্ষে জয়লাভ করবে”, দুই সপ্তাহ আগে এমনটাই বলেছেন একজন গুরুত্বপূর্ণ পশ্চিমা রাজনীতিক।

 

“কিন্তু বাস্তবে ভুট্টো হঠাৎ করেই একটি সমাজতান্ত্রিক আবেদন নিয়ে এসে আমাদের সবাইকে পরাস্ত করলেন। এবং মুজিব ঐ অভিশপ্ত ঘুর্ণিঝড়ে ভর করে সম্পূর্ণ পূর্ব পাকিস্তান জিতে নিলেন”।

 

নির্বাচন যখন নিকটবর্তী, ইসলামাবাদ সরকারের কোন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিই গত শরতে নির্বাচনের ঠিক পূর্বমুহূর্তে হয়ে যাওয়া ঘুর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে বেঁচে যাওয়া মানুষদের ব্যাপারে কোন প্রকার উদ্বেগ প্রকাশ করেন নি, যে জলোচ্ছ্বাসে লাখ লাখ বাঙালি প্রাণ হারিয়েছিল।

যেখানে অন্যান্য দেশ বন্যার মত সাহায্য নিয়ে এসেছে, যেখানে পশ্চিম পাকিস্তান তাদের হেলিকপ্টারগুলো ভারতের সাথে যুদ্ধের ভয়ে রেখে দিয়েছে। সরকার থেকে বলা হয়েছে, যে অঞ্চলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বাৎসরিক চক্রের একটি অনুমিত ঘটনা, রাজনৈতিক সন্ধিক্ষন এমন এক পর্যায়ে ছিল যে সে অঞ্চলে অন্য একটি আরও ভয়াবহ দুর্যোগ ঘটে যেতে পারত।

 

“মুজিব যদিও শক্তিশালী ছিলেন, কিন্তু এই প্রাকৃতিক দুর্যোগটি তাকে অপ্রতিরোধ্য করেছে”, বলছিলেন এক আমেরিকান বিশ্লেষক, “এটাই ঘটনার মোড় ঘুড়িয়ে দিয়েছে”।

 

সব স্পষ্ট হয়ে যায়

 

যখন একদিকে শেখ মুজিব অ্যাসেম্বলিতে নিরঙ্কুশ সসংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেন, অন্য দিকে ভুট্টো পশ্চিমের সিটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেন, তখন ভুলের ব্যাপ্তি স্পষ্ট হয়ে উঠল।

 

এটা ছিল একটি বোধগম্য ভুলঃ পাকিস্তানে এর আগে সত্যিকার অর্থে কোন অবাধ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় নি যার উপর ভিত্তি করে ধারনা করা সম্ভব।

 

কিন্তু এটি পশ্চিম পাকিস্তানকে একটি অসম্ভব বিপজ্জনক অবস্থায় ফেলে দেয়। কেননা পশ্চিম পাকিস্তানের অর্থনীতি মূলত নির্ভরশীল ছিল পূর্ব পাকিস্তান থেকে নানা উপায়ে লভ্যাংশ আত্মসাৎ করার ক্ষমতার উপর, এবং আওয়ামী লীগের কার্যক্রম তা চিরতরে বন্ধ করে দেবে।

 

শেখকে দোষারোপ করা হল

 

শেখ মুজিব যদি বৈদেশিক সাহায্য এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের উপর স্থানীয় নিয়ন্ত্রনের ব্যাপারে আওয়ামী লীগের অনড় অবস্থান থেকে সরে না আসেন, তাহলে অ্যাসেম্বলি বয়কট করে হরতাল ডাকার হুমকি দিয়েছেন মিঃ ভুট্টো। কিন্তু আওয়ামী লীগ নেতা শপথ নিয়েছেন তাঁর সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে ব্যবহার করে উক্ত কার্যক্রম বলবত করার, যা তাকে নির্বাচিত হতে সাহায্য করেছে।

 

নিশ্চিত ব্যর্থতার মুখোমুখি হয়ে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ৩ মার্চ পূর্ব-নির্ধারিত অ্যাসেম্বলির অধিবেশন মুলতবি করেন এবং এই মুলতবির ফলশ্রুতিতে সৃষ্ট অস্থিতিশীলতার জন্য ৬ মার্চ রেডিওতে শেখ মুজিবকে দোষারোপ করেন।

 

পূর্ব বাংলায় এই অভিযোগের পক্ষে কোন প্রমাণ ছিল না। অবশ্য প্রেসিডেন্ট, যিনি কিনা এর মাত্র নয় দিন পরই পূর্ব পাকিস্তানে আসেন, তার পক্ষে হয়ত এটা জানার কোন উপায় ছিল না।

 

আসলে যা হয়েছিল, তা হল, পুলিশ অধিকাংশ স্থানে দাঙ্গাবাজদের হাতে রাস্তা ছেড়ে দিয়েছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগের সেচ্ছাসেবকগণ বহুল প্রচারিত শেখ মুজিবের অহিংস আন্দোলনের সাহায্যে মাত্র দুই দিনে শুধুমাত্র বাঁশের লাঠি হাতে দাঙ্গাবাজদের নিয়ন্ত্রনে নিয়ে এসেছিল।

 

স্থবিরতা

 

৯ মার্চের মধ্যে দুই দিন আগে বিশাল এক জনসমাবেশে শেখ মুজিবের দেয়া অসহযোগ আন্দোলনের ডাক সরকার ও সরকারের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানকে স্থবির করে দিয়েছিল এবং বহু বছর পর প্রথমবারের মত পশ্চিম পাকিস্তান পূর্ব পাকিস্তানকে শাসন করার ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত হল।

 

পর্যায়ক্রমে আওয়ামী লীগের উচ্চমহল যেসব অফিস ও প্রতিষ্ঠানকে পর্যাপ্ত পরিমানে নিয়ন্ত্রন করতে পারবে বলে মনে করল, শেখ মুজিব সেগুলো খুলে দেয়া শুরু করলেন।

অনেক প্রতিষ্ঠানের উপর আওয়ামী লীগের নিয়ন্ত্রন ছিল সন্তোসজনক। কিন্তু এমন কিছু প্রতিষ্ঠান ছিল, যেগুলো খুলে দেয়ার ব্যাপারে আওয়ামী লীগ কখনোই পুরোপুরি নিশ্চিত ছিল না। স্কুল এবং আদালত ছিল তাদের মধ্যে অন্যতম।

 

অন্যান্য মূলত বেসামরিক কিছু সেবা, যেমন অভিবাসন ও কাস্টমস, এগুলো কখনোই হুমকির মুখে ছিল না। আর চেকপয়েন্টগুলোতে আর্মির সশস্ত্র নিয়ন্ত্রন সম্পর্কে আওয়ামীলীগ কখনোই প্রশ্ন তোলে নি।

 

কিন্তু কিছু ঘনিষ্ট সম্পর্কযুক্ত সেবা, যেমন সড়ক ও রেলপথ এবং চট্টগ্রামের জাহাজের কুলিদের উপর আওয়ামী লীগের নিয়ন্ত্রন এই কাস্টমস ও অভিবাসন চেকপয়েন্টের উপর সরকারের নিয়ন্ত্রনকে অর্থহীন করে তুলেছিল।

 

এমনকি এক সপ্তাহ পরে আওয়ামী লীগ বেশকিছু কর আদায়ও শুরু করেছিল, যদিও আয়করকে কখনোই আর চালু করা হয় নি।

 

পশ্চিম পাকিস্তানে মিঃ ভুট্টোর সাথে লম্বা সময় অতিবাহিত করার পর যতদিনে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া শেখ মুজিবের সাথে আলোচনার জন্য ঢাকায় আসেন, ততদিনে সরকারের নিয়ন্ত্রন এতটাই ভেঙে পরেছে যে, নতুন সামরিক গভর্নর তাকে শপথ পড়ানোর জন্যও কাউকে খুঁজে পান নি।

 

নতুন গভর্নর লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা খানকে বাঙালিরা মনে করত শক্ত মনের বাজপাখি। ষাটের দশকে পশ্চিম পাকিস্তানের বেলুচিস্তানের নাগরিকদের একটি বিদ্রোহ দমনে টিক্কা খানের ভূমিকার জন্য বাঙালিরা তাকে ডাকত ‘বেলুচিস্তানের কসাই’ নামে।

 

বাঙালিদের গুপ্ত রেডিও এখন প্রতিদিনই উৎসাহের সাথে একটি খবর প্রচার করছে যে একটি দাঙ্গাবাজ দল কোন উপায়ে জেনারেল টিক্কা খানের বাড়িতে গিয়ে তাকে হত্যা করেছে। কিন্তু কোন ব্যাখ্যা ছাড়া কাউকে তার স্থলাভিষিক্ত না করা পর্যন্ত এই রিপোর্টের সত্যতা সম্পর্কে জানার উপায় নেই।

 

জেনারেল টিক্কার পূর্ববর্তী গভর্নর, যিনি কিনা বাঙালিদের কাছে পরিচিত ছিলেন এমন একজন হিসেবে, যিনি তাদের আন্দোলনের অর্থ উপলব্ধি করতে পারেন, কোন প্রকাশ্য ব্যাখ্যা ছাড়াই তিনি ঢাকা ছেড়ে পশ্চিম পাকিস্তানে চলে গেছেন। তাকে যেসব বাঙালি চিনত, তারা বলেন, ১ মার্চ অ্যাসেম্বলি স্থগিত করার পরপরই কঠোর সামরিক পদক্ষেপের প্রস্তুতি গ্রহন করার জন্য তাকে আদেশ করা হলে তিনি পদত্যাগ করেন। একটি স্বাভাবিক বদলি প্রক্রিয়ায় যেমনটি করা হয়, তেমনভাবে তার কোন সহকারীকেই বদলি করা হয় নি।

প্রেসিডেন্ট ১৫ মার্চ ঢাকা পৌছালে তার অভ্যর্থনাও সন্তোসজনক ছিল না। উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদের স্বাভাবিক প্রতিনিধিদল বিমানবন্দরে তাকে অভ্যর্থনা জানাতে যেতে ব্যর্থ হল।

 

 

শেখ মুজিবের চেয়েও দ্রুততর

 

কিন্তু আন্দোলন এমন এক শক্তির সঞ্চার করেছে, যা শেখ মুজিবের চেয়েও দ্রুতগতিতে ধাবমান। একটি সত্যিকারের বাঙালি জাতীয়তাবাদ, যা পূর্ব পাকিস্তানের অন্য কোন আন্দোলন থেকে তৈরি হয় নি।

 

বাঙালিরা পশ্চিম পাকিস্তানী ‘বিদেশি’ সৈন্যদের হত্যা করার কথা বলছে। এমনকি ঢাকার রাস্তায় পাকিস্তানের পতাকা এবং ‘পাকিস্তানের জনক’ মোহম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি পুড়িয়েছে।

পাকিস্তান দিবসে তারা সর্বত্র একটি নতুন জাতিরাষ্ট্র ‘বাংলাদেশ’ এর নতুন পতাকা উত্তোলন করেছে এবং চীনা দূতাবাস থেকে পাকিস্তানের পতাকা ছিঁড়ে নামিয়ে ফেলেছে।

 

তারপরও শান্তি সম্ভব

 

তবুও অধিকাংশ বাঙালি এ ব্যাপারে একমত হয়েছেন যে শেখ মুজিব চাইলে আন্দোলনকে তাঁর দাবিকৃত বৃহদাকার স্বায়ত্তশাসনের পথে ফিরিয়ে আনতে পারতেন এবং পাকিস্তানকে দুটি আলাদা রাষ্ট্রে চুড়ান্ত বিভক্তির হাত থেকে রক্ষা করতে পারতেন, যদি তিনি পশ্চিমাদের তাঁর দাবি মেনে নিতে রাজি করাতে পারতেন।

তিনি পারতেন কিনা, রাজনৈতিক সমস্যাগুলোর কোন মিমাংসা করা যেত কিনা, এসব কিছুই কেতাবি প্রশ্নে পরিণত হয়েছে তখনই, যখন সামরিক বাহিনী ও মিঃ ভুট্টো সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে বাস্তব রাজনৈতিক সমস্যাগুলোর চেয়ে ক্ষমতা হস্তান্তরের পদ্ধতিই অধিক গুরুত্বপূর্ণ।

 

সামরিক বাহিনীই অবশেষে কতটি পাকিস্তান হবে, সেইই প্রশ্নের শেষ উত্তর দিয়ে দিল।

গত কয়েকদিনের গণহত্যার পর একটি সত্যিকারের একীভূত পাকিস্তানের আর কোন আশাই রইল না।

 

কারন চলমান যুদ্ধের দুটি মাত্র পরিণতি হতে পারে। একটি হল পঁচাত্তর মিলিয়ন বাঙালির একটি স্বাধীন দেশ, অন্যটি একটি সম্পূর্ণরূপে দলিত ও অন্ধকারাচ্ছন্ন উপনিবেশ, যা শুধুমাত্র মানচিত্রেই পূর্ব পাকিস্তান নামে পরিচিতি পাবে।

 

——–

 

 

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ

বিক্ষুদ্ধ পাকিস্তান

 

বাল্টীমোর সান ৩০ মার্চ, ১৯৭১

 

ঐন্দ্রিলা অনু

<১৪, , ১৮>

 

বাল্টীমোর, মঙ্গলবার, ৩০ মার্চ, ১৯৭১

বিক্ষুদ্ধ পাকিস্তান

 

 

যদিও রেডিও পাকিস্তান সরকারী কিছুই নয়, তবে তারা দাবী করে পূর্ব পাকিস্তান আগের মত স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে ফিরে যাচ্ছে । মূলত ঢাকা থেকে বিদেশী রিপোর্টারদের নির্বাসনের পর বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে জানার জন্য বিশ্বাসযোগ্য কোন সূত্র ছিলনা । সরকারী চ্যানেলগুলোকে যা বলতে বলা হয় তারা তাই বলে । একটি বিদ্রোহী রেডিও ঢাকা, চট্টগ্রাম এবং অন্যান্য জায়গার যুদ্ধের বর্ণনা দেয় কিন্তু এই উৎসের কর্তৃপক্ষও প্রতিষ্ঠিত নয় ।

 

একটা বিষয় পরিস্কার যে, বিতাড়িত হওয়ার আগে বিদেশী রিপোর্টারদের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত পর্যবেক্ষন আর সরকারী পর্যবেক্ষণ এর সাথে অনেক পার্থক্য পাওয়া যায় । সেনাবাহিনী, যারা পশ্চিম পাকিস্তানের সেনাবাহিনী ছিল তারা বিদ্রোহ দমনের কোন চেষ্টা করেনি । তারা পূর্বনির্ধারিতভাবে মেরে চলছে সব উস্কানি ছাড়িয়ে ।

 

দি সান এর একজন বিতাড়িত রিপোর্টার জন ই. উডরাফ নয়াদিল্লী থেকে পুরনো গুজব সম্পর্কে লিখছেন, তিনি সেই সময় সন্দেহ প্রকাশ করেন যে, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ঢাকার আলোচনাকে ইচ্ছাকৃতভাবে দীর্ঘ করছে, পশ্চিম বাংলাকে একটা অনিবার্য সমঝোতার মাধ্যমে শান্ত করার জন্য এবং তারপর কোন পূর্বাভাস ছাড়াই আক্রমণ করবে ।

 

সত্যি বা মিথ্যা যাই হোক, সরকারের কৌতূহলী ব্যাখ্যার কারনে সেই লিখাটা বিশ্বাস করা হয় যেখানে বলা হয় সঙ্কট চরমে পৌঁছেছিল তাই কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হয়, আইনি পরিভাষায় – বাংলার নেতা শেখ মুজিবুর রহমান জাতীয় পরিষদের নির্ধারিত সভার পূর্বেই চেয়েছিলেন বেসামরিক জনগনের উপর ক্ষমতার দলবদল আনতে । জুলফিকার আলি ভুট্টোর পাকিস্তান পিপলস পার্টিও একই কথা বলেছিল এবং একটি প্রকল্প প্রস্তাব করেছিল এবং পরবর্তিতে পরোক্ষ সম্মতি দিয়েছিল ।

 

যদি সরকার স্বাভাবিকভাবে নির্মম সামরিক নির্যাতন চালাতে থাকে, তাহলে অচিরেই পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করা হতে পারে । এমনকি এটা সন্দেহ করা যায় এবং নিশ্চিতভাবেই ধরে নেয়া যায় যে, এখন দুই পাকিস্তানের মধ্যকার বিভাজন সংস্কারের উর্ধ্বে এবং পশ্চিম বাঙালিরা এই বিদেশী শাসকদের শাসন চিরকাল মেনে নিবে না যাদের চেহারা, স্বভাব, ভাষা সবকিছুই তাদের থেকে আলাদা ।

 

 

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
পাকিস্তানের মর্মান্তিক ঘটনা ওয়াশিংটন পোস্ট ৩০ মার্চ ১৯৭১

 

Farjana Akter Munia

<14, 7, 19>

 

দ্যা ওয়াশিংটন পোস্ট, মার্চ ৩০, ১৯৭১

পাকিস্তানের মর্মান্তিক ঘটনা

 

পাকিস্তানের পূর্ববিভাগ, অনেক বেশি জনবহুল, গত ডিসেম্বরে জাতীয় নির্বাচিনে জয়ী এবং জাতীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার জন্য শান্তিপূর্ণভাবে চলতে শুরু করেছে। পশ্চিমাঞ্চল, যেটি আধিপত্যপ্রাপ্ত এবং ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ভারতে মোসলেম পাকিস্তান তৈরি হওয়ার পর পূর্বের শোষণকারী, সঠিকভাবে হুমকি বুঝতে পেরেছে এবং আত্মসমর্পণ শক্তি স্থগিত রেখেছেন। একটি পাকিস্তান কমিউনিজমের মধ্যে পূর্ব স্বায়ত্তশাসন অনুমোদন করার জন্য একটি সাংবিধানিক সূত্র প্রণয়ন করা যেতে পারে কিনা তা আলোচনার শুরু হয়েছিল। এটি স্পষ্ট নয় যে পূর্বের ক্ষমতাসীনরা আলোচনা ব্যর্থ হওয়ায় ভয় পেয়েছে কিনা অথবা পদানুবর্তিতায়, যে কোনো মূল্যে, বিনা নোটিশে, সশস্ত্র বিদ্রোহ ছাড়াই গত শুক্রবার তারা গত শুক্রবার তারা পূর্ব পাকিস্তানে ব্যাপকভাবে নিরস্ত্র বা অচল হয়ে পড়েছে এমন নাগরিকদের বিরুদ্ধে মেশিনগান বন্দুক, অগ্নিনির্বাপক বন্দুক ও ট্যাঙ্কের গুলিবর্ষণ শুরু করে। স্পষ্টতই হাজার হাজার নিহত হয়েছিল, সংখ্যাটি কেবল অনুমান করা যেতে পারে কারণ সরকার একযোগে সেন্সরশিপ প্রয়োগ করেছে এবং সমস্ত বিদেশী সংবাদদাতাকে বহিষ্কার করেছে, নোট এবং চলচ্চিত্রগুলি জব্দ করছে। পশ্চিম পাকিস্তানি সরকার পূর্বের ঢাকা নিয়ন্ত্রণের দাবি করে, সন্দেহ নেই যে এটি একটি সামরিক নিয়ন্ত্রিত উচ্চ চালিত বন্দুকের ফায়ারিং পরিসীমার মধ্যে অঞ্চল। তবে পূর্ব পাকিস্তানে ৭৫ মিলিয়ন লোকের মধ্যে রাজনৈতিক আনুগত্যের কোনও অর্থপূর্ণ পরিমাপ দাবি করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।পূর্বে, ঢাকাতে একটি মধ্যপন্থী মতামত পাকিস্তান ফেডারেশনের আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের প্রতি আকৃষ্ট ছিল। এখন মনে হচ্ছে মধ্যপন্থী নির্মূল হয়ে গেছে এবং “বাংলাদেশ” – শব্দটির অর্থ বাংলা জাতি, এর পূর্ণ স্বাধীনতার দাবির পিছনে রাজনৈতিক মনোভাব ছড়িয়ে পড়েছে। ইতোমধ্যে হাজার হাজার মাইল এলাকা ভারতীয় অঞ্চল বেঙ্গল থেকে আলাদা হয়ে গেছে, একটি স্বতন্ত্র সংস্কৃতি এবং জাতি, পশ্চিমের পাঞ্জাবিরা রক্তের সাথে দূরতিক্রম্য ব্যবধান খনন করেছে। এ পর্যায়ে বাঙ্গালী প্রতিরোধের ফর্মটি কোনও নির্দিষ্টতার সাথে পূর্বাভাস দিতে পারে না। বহিরাগতদের জন্য, পাকিস্তানে প্রদর্শনী মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের অপরিহার্যতা সম্পর্কে আরও প্রমাণ দেয় যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে আর্মির নেতৃত্বে পরিচালিত করেছিল এবং অনেক বছর ধরে পাকিস্তানকে সাহায্য করেছিল।

 

স্পষ্টভাবে যেমন একটি দেশের জন্য প্রকৃত মিথ্যা হুমকির মধ্যে ছিল; তার জনগণের প্রাচীন আতঙ্কের মধ্যে এবং আধুনিকায়নের উপায়ে। আমেরিকার অস্ত্রগুলি আবার একটি প্রাপক সরকার দ্বারা ব্যবহৃত হয় যা তার নিজের নাগরিকদের দাবি করে।এটি শোচনীয়। কিন্তু আসল ট্র্যাজেডি পাকিস্তানের জয়।

 

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
ট্যাঙ্ক দ্বারা শহর ধ্বংস নিউ ইয়র্ক পোস্ট,

৩০ মার্চ, ১৯৭১

 

 

Fazla Rabbi Shetu

<১৪,৮,১৮>

নিউ ইয়র্ক পোস্ট, মঙ্গলবার, ৩০ মার্চ, ১৯৭১

যেভাবে সেনা ট্যাংক একটি শহর ধ্বংস করল

-মাইকেল লরেন্ট

 

যখন পাকিস্তানি সেনারা বাঙ্গালি স্বাধীনতা আন্দোলনের উপর চড়াও হল, তখন সহযোগী ফটো সাংবাদিক মাইকেল লরেন্ট পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকায় ছিলেন। সংবাদকর্মীরা তাদের হোটেলে আবদ্ধ ছিলেন। কিন্তু শেষ অবধি সপ্তাহান্তে অন্যান্য সংবাদকর্মীদের সাথে স্থানান্তরিত হবার আগেই লরেন্ট নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গ করে শহরের ধ্বংসপপ্রাপ্ত এলাকাগুলো পরিদর্শন করেন।

ঢাকা, পূর্ব পাকিস্তান (এপি)- কোন সতর্কতা ছাড়াই বৃহস্পতিবার রাতে পাকিস্তানি সেনারা বাঙ্গালি স্বাধীনতা আন্দোলনের উপর আক্রমণ করে মানুষকে চমকে দেয়।

সেনাবাহিনীর আমেরিকান এম ২৪ ট্যাংক, কামান এবং পদাতিক সৈন্যদল পূর্ব পাকিস্তনের প্রাদেশিক রাজধানী এবং সর্ববৃহৎ শহরের বড় অংশ ধ্বংস করে ফেলে।

মূল লক্ষ্য ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জনবহুল পুরান ঢাকা যেখানে শেখ মুজিবুর রহমান ও তার আওয়ামী লীগ শক্তিশালী এবং শহরের অদূরে ১৫ লক্ষ জনবসতির শিল্প এলাকা।

সম্ভবত শুধু প্রাদেশিক রাজধানীতে ৭০০০ মানুষ নিহত হয়।

এখনো উত্তপ্ত যুদ্ধ এলাকায় শনিবার এবং গতকাল ঘোরার সময় একজন ছাত্রাবাসের বিছানায় কিছু ছাত্রের জ্বলন্ত দেহ দেখতে পান। ট্যাংকগুলি ছাত্রাবাসে সরাসরি আঘাত করেছিল। জগন্নাথ কলেজে একটি গণ কবর দ্রুত ভরাট করা হয়: ইকবাল হলে ২০০ ছাত্র নিহত হবার খবর পাওয়া যায়। তখনো ২০ এর মত লাশ মাটিতে আর ছাত্রবাসে ছিল।

সৈন্যদল অনবরত মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বাজুকা নিক্ষেপ করলেও, হতাহতের খবর জানা যায় নি। হাজার হাজার মানুষ শুধু যা নিতে পারত তা নিয়ে শহর ছেড়ে পালাচ্ছিল। কেউ কেউ মাল গাড়ীতে খাবার ও কাপড় নিয়ে যাচ্ছিল। খুব কম মানুষই সামরিক শাষকের আদেশ সত্ত্বেও সরকারী চাকুরীতে ফিরে এসেছিল।

 

 

 

 

শিরোনামঃ সূত্রঃ তারিখঃ

পূর্ব পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ সংঘাত

 

ক্রিশ্চিয়ান সায়েন্স মনিটর

 

.

৩০ মার্চ, ১৯৭১

 

 

অনুবাদঃ মোঃ রাশেদ হাসান

Nobel Himura

< ১৪,০৯,২১>

.

ক্রিশ্চিয়ান সায়েন্স মনি, মার্চ ৩০, ১৯৭১

পূর্ব পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ সংঘাত

 

এটা খুবই দূর্ভাগ্যজনক, পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান পূর্ব পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী নামিয়েছেন। বিশেষ ভাবে তখন, যখন গত ডিসেম্বরের নির্বাচনে তাঁরা (পূর্ব-পাকিস্তান) সংখ্যা গরিষ্ঠতা অর্জন করেছে।

 

যদিও পাকিস্তান নামে মাত্র গণতান্ত্রিক। সরকার পরিচালনায় সবসময় সামরিক বাহিনীর শক্ত প্রভাব ছিল।

 

দুঃখজনক ভাবে পূর্ব পাকিস্তানের নিরস্ত্র সাধারণ মানুষদের ব্যাপক হতা হতের খবর পাওয়া যাচ্ছে। যে ঝড়ের সূচনা প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া করেছেন তা হয়ত গেরিলা যুদ্ধের রূপে হাজার গুণে ধংসাত্মক হয়ে ফিরে আসবে। পূর্ব পাকিস্তানীরা তাঁদের নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে যুদ্ধ করছেন, তাঁদের বিপরীতে পশ্চিম পাকিস্তানের আছে সোভিয়েত ট্যাংক এবং আমেরিকান যুদ্ধবিমান; এই অবস্থা অম্লমধুর স্মৃতিতে আমেরিকান বিপ্লবের সময়ের মিনিটম্যানদের (Minutemen) কথা মনে করিয়ে দেয়।

 

যদিও পশ্চিমারা অস্ত্রের দিক থেকে এগিয়ে আছে তবুও পূর্ব পাকিস্তানীরা তাঁদের নদী-পাহাড়-মাটি-সমুদ্রের জ্ঞান কাজে লাগাতে পারে যেখানে পশ্চিমা সমরাস্ত্র সহজে কার্যকারিতা পাবেনা।

 

এক হাজার মাইল দূরত্ব থেকে যুদ্ধ পরিচালনার লজিস্টিক এবং ভৌগলিক সমস্যা সমূহ পাকিস্তানের গৃহযুদ্ধকে নাইজেরিয়ার থেকে আলাদা করেছে। কিন্তু মানবিক সাহায্য কার্যক্রম নাইজেরিয়ার মত একই রকম বাঁধার সম্মুখীন হতেপারে যেখানে সাহায্য গুলো বিশিরভাগ সময় শত্রুর খোরাকে পরিণত হয়েছিল।

 

 

 

 

 

শিরোনামঃ সূত্রঃ তারিখঃ
১০। পাকিস্তানের নামে (সম্পাদকীয়)

নিউইয়র্ক টাইমস

 

৩১ মার্চ, ১৯৭১

 

 

Nobel Himura

অনুবাদঃ মোঃ রাশেদ হাসান

<১৪,১০,২২>

 

 

নিউইয়র্ক টাইমস, মার্চ ৩১, ১৯৭১

সম্পাদকীয়

ইন দ্যা নেম ওফ পাকিস্তান

 

ইয়াহিয়া খানের সামরিক সরকারের মিলিটারি ফোর্স যারা কিনা ‘সৃষ্টিকর্তার নামে এবং একটি ঐক্যবদ্ধ পাকিস্তানের নামের’ দোহায় দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে তারা পূর্ব পাকিস্তানীদের উপর নির্মন ক্র্যাকডাউনের মাধ্যমে উপরুক্ত এই দুটি বিষয়কে অসম্মান করেছে।

 

পাকিস্তানী ক্রাকডাউনের সময় সেখানে উপস্থিত কূটনীতিক এবং সংবাদকর্মিদের রিপোর্টে দৃশ্যত নিরস্ত্র মানুষের উপর মিলিটারির এমন ভয়াবহ আক্রমণের ফলে কোন ঐক্যের ছবি পাওয়া যায়নি এবং এই ঘটনার কোন যৌক্তিক অর্থ বা ভবিষ্যৎ থাকতে পারেনা। পশ্চিমা বাহিনীর তাদের ‘মুসলমান ভাইদের’ প্রতি এই নির্মমতা- পূর্বের যারা দাবী করেন যে পশ্চিম এবং পূর্বের মাঝের ভিন্নতা সমাধের অযোগ্য, তাদের সেই দাবীকেই সত্য প্রমাণ করে।

 

যদিও এটা একটা অভ্যন্তরীণ কোন্দল তবুও এটা আন্তর্জাতিক অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে পারে- বিষেশ ভাবে যদি দির্ঘমেয়াদে গেরীলা যুদ্ধ চলতে থাকে। এই অবস্থায় আন্তর্জাতিক কমিউনিটি একটাই কাজ করতে পারে আর তা হল, ইয়াহিয়া খানকে ডেকে মানবতা এবং শুভ বুদ্ধির দোহায় দিয়ে এই রক্তপাত বন্ধ করে শেখ মুজিবুর রহমানকে তাঁর জনগণের নির্বাচিত নেতা হিসেবে প্রাপ্ত ন্যায্য ভূমিকা ফিরিয়ে দিতে।

 

আমেরিকা, পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর অস্ত্র এবং প্রশিক্ষণের ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। তাদের এখন বিশেষ দায়িত্ব হবে ইয়াহিয়া সরকারের প্রতি যেকোন রকমের সামরিক সাহায্য বন্ধ করা। অর্থনৈতিক সাহায্য শুধু এই শর্তে চলমান রাখা যেতে পারে যে এর বেশীরভাগ অংশ পূর্বপাকিস্তানের দুঃখজনক ক্ষত উপশমে ব্যাবহার হবে।

 

পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসছে, রেডিও পাকিস্তানের এমন দাবির ব্যাপারে আমাদের মনে রাখতে হবে এটি (রেডিও পাকিস্তানের ) একটি সরকারী মুখপাত্র ছাড়া আর কিছু নয়। সত্যি বলতে বিদেশী সংবাদকর্মিদের ঢাকা থেকে বিতাড়নের পর বর্তমান পরিস্থিতি জানার জন্য সেখানে এখন আর কোন বিশ্বাসযোগ্য সূত্র নেই। সরকারী মাধ্যম গুলো সেটাই বলছে যা তাদের বলতে বলা হচ্ছে। বিদ্রোহী একটি রেডিও ঢাকা-চট্টগ্রাম এবং অন্যান্য স্থানে যুদ্ধ চলছে বলে খবর প্রচার করছে কিন্তু এই সূত্রের দায়িত্বশীলতা এখনও প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়নি। ভারত হতে প্রাপ্ত বেশীরভাগ তথ্যই গুজবের মত।

 

তবে এখন একটা বিষয় পরিষ্কার- বিতাড়িত হবার আগে গত সপ্তাহের বিভিন্ন কার্যক্রম সম্পর্কে বিদেশী রিপোর্টারদের অব্জারভেশন থেকে যে চিত্র পাওয়া যায় তার সাথে সরকার প্রচারিত চিত্র একেবারেই মিলেনা। সেনাবাহিনী যাদের পশ্চিম পাকিস্তানী সেনাবাহিনী বলা চলে, এরা কোন বিদ্রোহ প্রতিহত করতে কাজ করেনি। এরা পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে সকল সমস্যা সমাধান করতে আক্রমণ চালিয়েছে।

 

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
১১। দ্বন্দ্বের মূলে ওয়াশিংটন পোস্ট ৪ এপ্রিল ১৯৭১

 

Razibul Bari Palash

<১৪,১১,২৩-২৪>

 

ওয়াশিংটন পোস্ট, ৪ এপ্রিল ১৯৭১

দ্বন্দ্বের মূলে

সেলিগ এস হ্যারিসন

 

গত সপ্তাহে রাজধানী ঢাকার রাজনৈতিক ডেডলক হবার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ এবং বাঙালিদের বিরুদ্ধে জেনারেল ইয়াহিয়া খান এর সামরিক প্রতিশোধের উন্মত্ততা বাংলাদেশের ৭৩ মিলিয়ন মানুষের স্বায়ত্তশাসনের সংগ্রাম যেন চাকার মধ্যে আরেকটি চাকার কাহিনী।

 

জেনারেল ইয়াহিয়া এবং পশ্চিম পাকিস্তানের প্রভাবশালী নেতারা পূর্ব পাকিস্তানে সস্বায়ত্তশাসনের ফলে কেন্দ্রে ক্ষমতায়নের ভারসাম্যের প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন আছেন। কারণ মূলত পশ্চিমের সামরিক শাসকরাই কেন্দ্রীয় সরকারে আছেন।

 

পশ্চিম পাকিস্তানে আভ্যন্তরীণ বিভাজন রয়েছে। সেখানে একদিকে প্রভাবশালী পাঞ্জাব সিন্ধ প্রদেশ আছে যারা শিল্প, সামরিক ও জমিদারি প্রধান অঞ্চল এবং অন্যদিকে আছে উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত ও বেলুচিস্তানের সংখ্যালঘু প্রদেশ।

 

জেনারেল ইয়াহিয়া বাঙালিদের মুক্তি আন্দোলন এড়ানোর জন্য দৃঢ়সংকল্পবদ্ধ ছিলেন কারণ তা না হলে ৬০ মিলিয়ন মানুষের শক্তিশালী পশ্চিম প্রদেশের সাথে স্বৈরশাসনের তুলনামূলক পরিমাপের প্রয়োজন হবে।

 

উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় দেশ, খাইবার পাসের কারণে বিখ্যাত। এখানে মানুষ পুশতু ভাষায় কথা বলে। তারা দির্ঘদিন ধরে তাদের স্বায়ত্তশাসন অথবা স্বতন্ত্র “পুশতুনস্তান” এর মাধ্যমে স্বশাসন চায়।

 

প্রতিবেশী জনবহুল বালুচিস্তান দ্রুত বেড়ে উঠেছে – সম্প্রতি সময়ে অনেকদিন মরুভূমি হয়ে পরে থাকার পর সেখানে প্রাকৃতিক গ্যাসের খনি পাওয়া যাওয়ায় তারা নিজেদের ব্যাপারে সজাগ।

 

বালুচ উপজাতীয় নেতারা বেলুচিস্তানের শিল্পায়ন জন্য গ্যাস চাইছেন যা প্রতিবেশী পাঞ্জাব থেকে চ্যানেলের মাধ্যমে দেয়া যেতে পারে।

 

জেনারেল ইয়াহিয়া, শেখ মুজিবুর রহমান ও পশ্চিমাঞ্চলীয় সংখ্যালঘু প্রদেশের মধ্যে জটিল ত্রিমাত্রিক বিরোধিতার মধ্যে গত সপ্তাহটি ছিল সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুলফিকার ভুট্টো, পশ্চিম পাকিস্তানের পিপলস পার্টির নেতা, তিনি ন্যাশনাল এসেম্বলিতে পশ্চিম অঞ্চলের দলগুলোর মধ্যে একক বৃহত্তম গোষ্ঠীর প্রতিনিধি হিসবে আবির্ভূত হন।

 

জনাব ভুট্টো জেনারেল ইয়াহিয়াকে একটি একক, একীভূত পশ্চিম পাকিস্তানের সম্পূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর করতে চেয়েছিলেন, যেহেতু চারটি আলাদা প্রদেশে স্থানান্তরিত হলে তিনি পাঞ্জাব ও সিন্ধু অঞ্চলের স্থানীয় নেতা হিসেবে পরিগণিত হবেন।

 

পশ্চিমবঙ্গের সংখ্যালঘু প্রদেশ পাঞ্জাব ও সিন্ধু – অনেক দিন ধরে বাঙালির দিকে তাকিয়ে ছিল – তাদের আন্দোলনে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছিল। তারা চেয়েছিল মুজিবের যেন পূর্বাঞ্চলে আওয়ামীলীগের নেতৃত্বে স্বায়ত্তশাসনের পাশাপশি পশ্চিমাঞ্চলের চারটি পৃথক প্রাদেশিক পরিষদের নেতাদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের বিষয়ে জোর দাবি জানান।

 

 

তারপর চেয়েছিল তিনি যেন তার জাতীয় পরিষদে ৩১৩ টির মধ্যে পাওয়া ১৬৭ টি আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীত্ব গ্রহণ করেন এবং একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় সরকার গঠন করেন। ট্রেড ইউনিয়ন এবং সিভিল লিবার্টী, প্রেস লিবার্টী এবং শ্রম অধিকারের জন্য পশ্চিমের সংস্কারবাদীদের মনোভাবও সেটাই ছিল।

 

 

বিভিন্ন কারণে জেনারেল ইয়াহিয়াও চেয়েছিলেন যেন মুজিবুর রহমানকে তার অধীনে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন যেখানে শক্তিশালী কেন্দ্রীয় সরকার হবে যা সেনাবাহিনী দ্বারা প্রভাবিত।

 

কিন্তু বাংলাদেশের একটি শক্তিশালী বিচ্ছিন্নতাবাদী দ্বারা মুজিবুর রহমানকে টেনে ধরা হল – রাওয়ালপিন্ডিতে অফিস গ্রহণের মাধ্যমে সেটি ভার্চুয়াল রাজনৈতিক আত্মহত্যার সামিল হত।

 

তা না করে মুজিব জোর দিলেন যে ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি প্রাথমিকভাবে দুটি অংশ হবে – পূর্বের জন্য একটি এবং পশ্চিমের জন্য একটি, – পূর্ববাংলার গোষ্ঠী জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে বাঙালি পরিচয়ের পরিবেশিত হবে।

 

পশ্চিমা সংখ্যালঘু প্রদেশগুলি যেমন জেনারেল ইয়াহিয়া হিসাবে বিরোধিতা করেছিল, তেমনি ভয় ছিল যে, ভুট্টো তাদের সংখ্যা বাড়িয়ে তুলবে এবং তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য তাদের পৃথক প্রাদেশিক অবস্থান প্রত্যাখ্যান করবে।

 

পাশাপাশি আরেকটি ইস্যু হল দুই উইংয়ের জন্য পৃথক অধিবেশনের ব্যাপারটি। জেনারেল ইয়াহিয়ার জন্য এটা ভাববার বিষয় ছিল যে অ্যাসেম্বলির সেশনের উদ্বোধনের পূর্বে তিনি প্রাদেশিক শাসকদের ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য জোরালোভাবে ব্যাবস্থা গ্রহণ করবেন কিনা।

 

শুক্রবার তার সম্প্রচারে জেনারেল ইয়াহিয়া যুক্তি দেন যদি এসেম্বলিকে একই সাথে নতুন অথরিটি বেইজের সেশন না বলা হয় তাহলে মুজিবুরের সামরিক আইন বন্ধ করতে হবে এই মর্মে যে দাবি ছিল তা কাগজে লেখা ছিল না।

 

জেনারেল ইয়াহিয়া বিবৃতিতে বলেন যে মুজিবুর মঙ্গলবার রাতে এসেম্বলি ইস্যু নিয়ে আলোচনার প্রাক্বালে তার চূড়ান্ত অবস্থান অস্বীকার করেন। এভাবেই তিনি তার বাঙ্গালী নেতাদের “অস্থির এবং স্বেচ্ছাচারী’ কথা বলাকে সম্পূর্ণ নিন্দা করেছে। জেনারেল ইয়াহিয়া ঘোষণা করেন, “আমি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছতে চাই যে, যে মানুষ ও দল পাকিস্তানকে বিভক্ত করতে চায় তারা পাকিস্তানের শত্রু।’’

 

কিন্তু বৃহস্পতিবার রাতে মুজিবুরের ঘনিস্টজন বলেন যে আলোচনায় প্রতিষ্ঠিত হল নিয়মানুযায়ী, জেনারেল ইয়াহিয়া ও শেখের মধ্যে ক্ষমতার হস্তান্তর করার প্রক্রিয়াসহ অমীমাংসিত সমস্যা নিয়ে একটি চূড়ান্ত “আলোচনা” হবে।

 

পশ্চিম পাকিস্তান সূত্রে জানা যায় যে জেনারেল ইয়াহিয়া ঢাকায় মুজিবুরের সাথে প্রাথমিক আলোচনার পর একটি সমঝোতার ব্যাপারে স্বল্প আশাবাদী ছিলেন কিন্তু সামরিক প্রস্তুতির জন্য সময় ক্ষেপণের জন্য তিনি আলোচনা করার প্রয়াস চালিয়ে যান।

 

এই সূত্রে জানা যায় যে জেনারেল ইয়াহিয়া মুজিবুর অনুভূতি ও আত্মবিশ্বাসের দৃঢ়তা এবং তার স্বতন্ত্র মনোভাবের দ্বারা ক্রমশ ক্রুদ্ধ হয়েছিলেন। তাই জেনারেল ইয়াহিয়াই শেষ পর্যন্ত এগিয়ে আসলেন।

 

মুজিবুর এসেম্বলিতে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রধান বিষয়টি মেনে নেওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিলেন যদি জেনারেল ইয়াহিয়া প্রকাশ্যে পূর্ব এবং পশ্চিমাঞ্চলে অবিলম্বে সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য একটি রেজুলেশনের আগাম ঘোষণা দিতেন।

 

তিনি ভীত ছিলেন যে এসেম্বলিতে হয়ত অফিসিয়ালি একটি যুদ্ধক্ষেত্র হবে এবং ক্ষমতার স্থানান্তর করার জন্য কোন ফর্মুলা বের হবে না।

 

 

 

 

 

 

 

শিরোনামঃ সূত্রঃ তারিখঃ

১২। পাকিস্তানের ভয়ঙ্কর খেলা

 

নিউয়র্ক টাইমস

 

৪ এপ্রিল, ১৯৭১

 

 

 

Nobel Himura

অনুবাদঃ মোঃ রাশেদ হাসান

<১৪,১২, ২৫-২৬>

 

নিউ ইয়র্ক টাইমস, রবিবার, এপ্রিল ৪, ১৯৭১

পাকিস্তানঃ ‘সবই খেলার অংশ’- ভয়ঙ্কর এবং প্রাণঘাতী খেলা

 

নয়া দিল্লি- পাকিস্তানী আর্মির পূর্ব পাকিস্তানিদের স্বাধীনতা সংগ্রাম দমনের জন্য আগ্রাসী ভূমিকার বিষয়ে- পাকিস্তান হতে এক্সপেল্ডকৃত বিদেশী সাংবাদিকদের প্রতি একজন পাকিস্তানী বিমানবালা এই বলে লেকচার দেন যে ‘এর সবকিছুই প্রয়োজনীয়, অবশ্যই প্রয়োজনীয়’। ‘এমনটা যদি তোমাদের দেশে হত তাহলে তোমরাও এমন করতে। এভাবেই খেলতে হয়।‘

 

খেলা? একজন বিদেশী সাংবাদিকের কাছে এটা অবিশ্বাস্য দেখাচ্ছিল। ট্যাংক আর্টিলারি এবং ভারী মেশিনগান নিয়ে দৃশ্যত নিরস্ত্র সাধারণ মানুষের উপর হামলা করা হয়। সেই সব মানুষের উপর হামলা করা হয় যারাকিনা বস্তুত অহিংস আন্দোলন করছিল যেমন অসহযোগ আন্দোলন এবং হর্তাল। আর এসব তারা গত নির্বাচনে বিজয়ের বাধ্যমে প্রাপ্ত রাজনৈতিক সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রতিষ্ঠার জন্য করছিল। এবং এ সপ্তাহে নির্বিচার হত্যাকাণ্ডের আরও যথেষ্ট রিপোর্ট বেরিয়ে এসেছে যা সকল সন্দেহ দূর করে দিয়েছে এমনকি তা অনেক ভারতীয় এবং পশ্চিমা কূটনীতিকের মাথা ব্যাথার কারণে পরিণত হয়েছে। তারা ধারণা করছেন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের সায়ত্ব শাসনের ভাবনা দমনে পাক আর্মিকে নুন্যতম পিছপা হবার নির্দেশ দেওয়া ছিলনা।

 

আক্রমণ শুরু করা হয়েছিল ২৫ মার্চ রাত থেকে, এর আগে ১০ দিন ব্যাপি সংলাপে পাকিস্তান আর্মি এবং ক্ষমতাসীন পশ্চিম পাকিস্তানী নেতারা পূর্ব পাকিস্তানের নেতাদের মিথ্যা আশা এবং আশ্বাসের মাঝে রেখেছিল যে তাদের বৃহত্বর সায়ত্বশাসনের দাবী পূরণ হবে।

 

এখন এটা পরিষ্কার বুঝা যাচ্ছে পশ্চিম পাকিস্তানীরা কখনই সংলাপের সাফল্য চায়নি, তারা এই বিষয়টি দিয়ে শুধু সময় ক্ষেপণ করছিল যেন পশ্চিম পাকিস্তান থেকে এই সময়ের মাঝে আক্রমণ সংগঠনের জন্য যথেষ্ঠ পরিমাণে সৈন্য নিয়ে আসা যায়। কিন্তু যখন সংলাপ চলছিল তখন সাংবাদিক থেকে শুরু করে কূটনীতিক সহ সকল পর্যবেক্ষকরা এমন কুৎসিত ধারণা সত্য হতেপারে বলে মনে করেননি। এমন ঘটার সকল পূর্বাভাস আগে থেকেই ছিল- সৈন্যরা আকশ এবং পানি পথে আসছিল, একজন সদয় আইন প্রশাসককে বরখাস্ত করা হয় এবং আর্মর স্বভাব বহির্ভূত নীরবতা পালন করছিল যখন পূর্বপাকিস্তানিরা সেনাশাসন প্রত্যাক্ষান করে তাঁদের নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে মেনে চলছিল।

 

সংবাদ কর্মিরা এসবকিছুই রিপোর্ট করছিলেন কিন্তু যখন সংলাপের কক্ষ থেকে ‘কিছু উন্নতি হয়েছে’ এমন কথা বেরিয়ে আসছিল তারা তখন সেটাই মুখ্য ধরে নিচ্ছিলেন কারণ এমনটাই হওয়া উচিৎ ছিল। তারা ভুল ছিলেন। আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের বদলে সামরিক দমন মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে।

 

কিন্তু দমনের পথে নামার সময় খুব সম্ভব পশ্চিম পাকিস্তানের মৃত নেতারা আর্মির সক্ষমতা এবং সাড়ে সাত কোটি বাঙালির অনুভূতির গভীরতা দুটোই পরিপাম করতে ভুল করেছিলেন।

 

তারা ধারণা করেছিল কিছু গোলাগুলি করলেই মানুষ ভয় পেয়ে যাবে, এমনটাই বলেন সীমান্তের ওপারে ভারতের কলকাতার পুলিশ কমিশনার, রণজিৎ গুপ্ত। পশ্চিম পাকিস্তানীরা পূর্ব-পাকিস্তানিদের সম্পর্কে কতটা কম জানে তা এই বোকার মত চিন্তা থেকেই ধারণা করা যায়।

 

মানুষ গোলাগুলিতে আতঙ্কিত হয়ে বশ্যতা স্বীকার করার বদলে এখন মনেহচ্ছে- যদি পাক আর্মি বড় শহর এবং গুরুত্বপূর্ন শহর গুলোর নিয়ন্ত্রণ কখনও নেয়ও তবুও তারা অনুন্নত নদীমাতৃক গ্রাম এলাকায় ব্যাপক গেরিলা প্রতিরোধের সম্মুখীন হবে। এমন প্রতিরোধ যুদ্ধ পশ্চিম পাকিস্তানী সৈন্যদের চলাচল এবং রসদের যোগান বাঁধাগ্রস্ত করে পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা সংগ্রামকে সফল করতে পারে।

 

ভারতে, পূর্ব পাকিস্তানের লক্ষ্যের ব্যাপারে সহমর্মি অনেকেই পশ্চিম পাকিস্তানের এই মিলিটারি আগ্রাসনকে হিটলারের আগ্রাসনের সাথে তুলনা করেছেন। ‘পাক আর্মির অমানবিক অত্যাচার’ এমন হেডলাইন ছিল কলকাতার একটি পত্রিকার। আরেকটি পত্রিকা লিখেছে ‘কশাইখানা’ সাথে যোগ করেছেঃ দখলদার পাকিস্তানী আর্মি বাংলাদেশে যে গণহত্যা এবং ধ্বংসযজ্ঞ শুরু করেছে তা নাজি বাহিনীর অন্ধকারতম আতঙ্কের অধ্যায়কেও হার মানাবে। ভারতীয় সংসদ একে নিরস্ত্র মানুষের নির্বিচার হত্যা বলে অভিহিত করেছে যা গণহত্যার সমান।

 

 

সরকার সমূহ নীরব

 

বিশ্বের অন্যান্য সরকার সমূহের অধিকাংশ নীরব রয়েছে। ‘তোমার সরকার এই ভয়াবহতা কেন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছেনা?’ কলাতায় একজন কর্মকর্তা প্রশ্নকরেন একজন আমেরিকানক। ‘এটা কোন জলোচ্ছ্বাস নয় এটা কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়- এখানে মানুষ মানুষকে জবায় করছে।‘

 

বাঙালিরা, এইনামেই পূর্ব পাকিস্তানের মানুষদের ডাকা হয়, এখন একটা কোঠিন প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে যা নিপীড়নের অভিযোগ জানানো এবং নিপীড়নের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর মাঝামাঝি। হয়ত এই প্রান্ত তাঁরা ২৫মার্চ আক্রমণের রাতেই পার করে ফেলেছে। অথবা হয়ত তা মার্চের ১ তারিখেই পার করা হয়েছে যখন ইয়াহিয়া খান প্রধান সামরিক আইন কর্মকর্তা জাতীয় অধিবেশনের একটা সেশন বাতিল করে দেন যা পরের দুই দিনের মধ্যে শুরু হয়ে একটি নতুন সংবিধান প্রণয়নের মাধ্যদিয়ে গণতান্ত্রিক সরকার ব্যাবস্থায় ফেরার কথা ছিল। ঐ অধিবেশনের জন্য গত ডিসেম্বরে নির্বাচন হয়- সে নির্বাচনে শেখ মুজিব এবং তার আওয়ামীলীগ পার্টি ডোমিনেট করে। আওয়ামীলীগ বিশাল আকারে প্রাদেশিক সায়ত্ব শাসনের দাবী করে এবং কেন্দ্রীয় সরকারকে সামরিক, বৈদেশিক বাণিজ্য এবং বৈদেশিক সাহায্যের দায়িত্ব ছেড়ে দিতে চায়।

 

এ সকল শর্ত পশ্চিম পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠি, আর্মি এবং বড় ব্যাবসায়ী ও রাজনৈতিকদের ঘৃণার বিষয় হয়েছিল। এই সমস্যার উপর রাজনৈতিক সংলাপের সময়, প্রথমে তারা স্বাভাবিক ভাবে আলোচনা শুরু করে এবং পরে নিয়ে আসে জুলফিকার আলি ভুট্টকে, সে ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের প্রভাবশালী নেতা। যখন সে অভিযোগ করে যে আওয়ামীলীগ অনেক বেশী সায়ত্ব শাসন চাচ্ছে যা প্রায় সার্বভৌম ক্ষমতার সীমানায় পড়ে তখন আলোচনা স্তব্ধ হয়ে যায়। এরপর হঠাৎ করেই আর্মি আক্রমণে চলে আসে।

 

আক্রমণের পরদিন সকালে, মি. ভূট্টো এবং তার সফর সঙ্গীরা কোঠর মিলিটারি পাহারার মাঝে পশ্চিম পাকিস্তানের নিরাপদ সীমানায় উড়ে যান যেখানে এই রাজনৈতিক নেতা দরাজ গলায় ঘোষণা করেন- ‘সৃষ্টিকর্তার কৃপায় পাকিস্তান বেঁচে গেছে’।

 

কিন্তু ঐক্যবদ্ধ মুসলিম দেশ হিসেবে টিকে থাকার জন্য শুধু ব্যাক্তিগত ধর্মীয় বুলির থেকেও বেশী কিছু প্রয়োজন হবে। ধর্ম একটা সামাজিক বন্ধনের মত ছিল যা দুই প্রদেশকে এক করে রেখেছিল কিন্তু তা কখনই যথেষ্ট ছিলনা।

 

হয়ত অনেক সময় প্রয়োজন হবে, কিন্তু যারা বর্তমান বাঙালি জাতীয়তাবাদের জোয়ার এবং আর্মি আক্রমণের বীভৎসতা দেখেছে তাঁদের এ বিষয়ে সন্দেহ আছে। এদিকে শেখ মুজিব তাঁর বর্তমানে প্রতিহিংসার মুখে পড়া বাড়ির সামনে জড় হওয়া অনুসারীদের সাথে আগে এই বলে শ্লোগান দিতে পছন্দ করতেন- ‘সংগ্রাম সংগ্রাম। চলবেই চলবেই’। ‘দ্যা ফাইট উইল গো অন। দ্যা ফাইট উইল গো অন’।

 

-সিডনী এইচ শেনবার্গ।

 

 

 

 

 

 

 

শিরোনামঃ সূত্রঃ তারিখঃ
১৩। পাকিস্তানীরা বাঙালিদের নিশ্চিহ্ন করছে

বাল্টিমোর সান

 

৪ এপ্রিল, ১৯৭১

 

 

 

Nobel Himura

অনুবাদঃ মোঃ রাশেদ হাসান

<১৪,১৩, ২৭-২৮>

 

দ্যা সান, বাল্টিমোর। রবিবার, এপ্রিল ৪, ১৯৭১

পাকিস্তানীরা বাঙালিদের নিশ্চিহ্ন করছে

লিখেছেন জন ই. উড্রফ

 

মাত্র ৪ মাস আগে পশ্চিম পাকিস্তান আর্মি বলেছিল তারা সাইক্লোনের আঘাত হতে বেঁচে যাওয়া মানুষদের সাহায্যের জন্য সৈন্য এবং হেলিকপ্টার পাঠাতে পারবেনা, যেখানে এই সাইক্লোনে গংগিও অববাহিকার লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল। আর্মি বলেছিল, যদি সৈন্য এবং হেলিকপ্টার সরানো হয় তাহলে ভারত পশ্চিম পাকিস্তানে আক্রমণ করে বসতে পারে। যে সময় পাক আর্মি এই স্টেটমেন্ট ইস্যু করে, সে সময় ভারত ঘুর্ণিঝড় আক্রান্তদের জন্য রিলিফ এবং সাহায্যের পরিমাণ বাড়ানোর ইস্যু নিয়ে ব্যাস্ত ছিল।

 

আর আজ, সেই একই পশ্চিম পাকিস্তানের আর্মিকে দেখে বোঝা যাচ্ছে গত নির্বাচনের ফলাফল গুলি করে দমন করার জন্য তাদের শেষ সৈন্যটিকেও সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্ব পাকিস্তানে পাঠিয়ে দিতে তারা সার্বিক ভাবে প্রস্তুত।

 

পাঞ্জাবীদের দ্বারা ডমিনেটেড আর্মি যে কোন পর্যায় পর্যন্ত নামতে প্রস্তুত এতে কোন সন্দেহ নেই।

 

গত সপ্তাহের বৃহস্পতি এবং শুক্রবারের বীভৎস চিত্র থেকে একটাই কথা বলাযায় যে এখানে অস্ত্রের বিজয় হয়েছে সেই সকল মানুষের উপরে যারা অহিংস ভাবে ভোটের মাধ্যমে তাদের নির্বাচিত লোকেদের ক্ষমতায় দেখতে চেয়েছিল।

 

সাংবাদিকেরা ধ্বংস যজ্ঞের এলাকা পরিদর্শন করেছে

 

গত সপ্তাহে যে সকল সংবাদমাধ্যম প্রতিনিধি অভিজাত ঢাকা ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে গৃহবন্দী হয়ে অবস্থান করছিলেন তারা বাহীরে ঘটে চলা ধ্বংস যজ্ঞের কিছু খণ্ড চিত্র দেখেছেন। যেমন কিছু আর্মিরা সিভিলিয়ান ঘরবাড়িতে গুলি করছে, ডজন খানেক নিরস্ত্র যুবকের উপর মেশিনগান চালানো হচ্ছে, সিভিলিয়ান ব্যাবসা প্রতিষ্ঠানে আর্মি আগুণ দিচ্ছে।

 

কিন্তু দুজন ইউরোপিয়ান সাংবাদিক আর্মির চোখ ফাঁকি দিয়ে আরও কিছুদিনের জন্য ঢাকায় থেকেযান, তাঁরা ধ্বংস এবং হত্যা যজ্ঞের প্রমাণ খুঁজে খুঁজে মুছে ফেলার আগেই পরিদর্শন করেনেন।

তাদের দেওয়া তথ্য- এরআগে যারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন ক্যাম্পাস থেকে আসা কামানের গোলা এবং টানা ম্যাশিনগানের শব্দ শুনে যা কিছু খারাপ অনুমান করছিলেন, তার সবটাই সত্য বলে নিশ্চিত করে। সেখানে দুইটি বিল্ডিঙে জ্বলতে থাকা আগুণ অনেকক্ষণ ধরে রাতের আকাশ আলো করে রেখেছিল।

 

বস্তিবাসীদের হত্যা করা হয়েছে

 

ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেআসা দুজন সাংবাদিক দাবী করেন শত শত ছাত্র তাদের বিছানায় পুড়ে মরেছে এবং আরও শত শত ছাত্রকে গণকবরে পোড়ানো হয়েছে। তাঁরা পূর্বের নির্ভরযোগ্য ডিপ্লোম্যাটিক রিপোর্ট গুলোও সত্য বলে নিশ্চিত করেছেন- যেখানে বলাহয় বাঁশের তৈরি দির্ঘ বস্তিগুলো অবরুদ্ধ করে আগুণ লাগিয়ে দেওয়াহয় এবং কোন বস্তিবাসি পালাতে চেষ্টা করলে তাদের গুলি করে মারাহয়।

 

পশ্চিম পাকিস্তান এবং পূর্ব বাংলার মাঝে বা পাক আর্মির মাঝে একমাত্রে বন্ধন ছিল মুসলিম ধর্ম বিশ্বাস, যার কারণে ভারত ভাগের সময় এই বিভক্ত রাষ্ট্রের জন্মহয় হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গার বীরুধে স্বর্গ রাষ্ট্র হিসেবে।

 

এমনকি আজও আর্মি তার ক্ষমতা বহাল এবং প্রয়োগ করছে ‘ইসলামিক স্টেট অফ পাকিস্তানের নামে’। যদিও জীবিত অথবা মৃত মানুষ পোড়ানো মুহাম্মদের (সঃ) বিশ্বাসের পরিপন্থী ও নিষিদ্ধ । পশ্চিম পাকিস্তানী মুসলমানদের এটা একটা প্রিয় অপরাধ যা তারা হিন্দুদের উপরেও করে থাকে।

 

স্বদেশের মুসলমানদের উপর ইসলামী রাষ্ট্রের নামে এমন আক্রমণ জাস্টিফাই করা হচ্ছে- এমনকি অন্যান্য ইসলামিক রাষ্ট্রের চোখেও, যাদের কাছে ইতোমধ্যেই পাকিস্তান সাহায্যের আবেদন জানিয়েছে শুধু মাত্র সামরিক বীজয়ের পরে। এবং যেকোন সামরিক বীজয় রক্তক্ষয় কমানোর বদলে বাড়িয়ে দিবে কারণ বহু দশকের সংগ্রামের পর আজ বাঙালিরা একজন মানুষের নেতৃত্বে একতাবদ্ধ হয়েছে।

 

এসব থেকে ধারণা পাওয়া যায় পশ্চিম পাকিস্তানীরা পুড়িয়ে এবং গুলিকরে বাঙালিদের দমনের জন্য কতটা ঠাণ্ডা মাথায় হিসাব মিকাশ করেছে। যে রাতে ব্যাপক গণহত্যা শুরু হয় সে রাতে, হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে বসে কিছু পশ্চিম পাকিস্তানী রাজনৈতিক নেতা ব্যাক্তিগতভাবে এসকল প্রস্তাবনা দিয়েছেন।

 

 

 

 

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
১৪। পাকিস্তানে গৃহযুদ্ধ নিউইয়র্ক নিউজ ৫ এপ্রিল,১৯৭১

 

Tanuja Barua

<14, 14, 29-34>

 

নিউজউইক , এপ্রিল ৫, ১৯৭১

গৃহযুদ্ধে নিজেকে নিক্ষেপ করলো পাকিস্তান

 

“মুজিব এবং তাঁর দল/পার্টি পাকিস্তানের শত্রু। এই অপরাধ ক্ষমার অযোগ্য । কিছু ক্ষমতালোভী এবং দেশদ্রোহী মানুষকে আমরা কখনোই এই দেশ ধ্বংস করতে দেবো না। দেবো না বারো কোটি জনগণের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে”।

  • রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খান

 

তোমাদের যা কিছু আছে তা নিয়েই ঘরের বাইরে বেড়িয়ে এসো। শত্রুপক্ষের শেষ সৈন্যটি নির্মুল হয়ে পিছু না হটা পর্যন্ত যেকোন মূল্যেই লড়াই চালিয়ে যাও এবং এই দেশকে বাঁচাও পশ্চিম পাকিস্তানি নিষ্ঠুর স্বৈরশাসকের হাত থেকে।

  • শেখ মুজিবুর রহমান

শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত এটা মনে হচ্ছিলো যে পাকিস্তানের ভাগ্য নির্ধারক দুইজন দাম্ভিক ব্যাক্তি মুখোমুখি সংঘর্ষ এড়িয়ে যাবে । পূর্ব –পাকিস্তান রাজধানী ঢাকা থেকে প্রকাশিত একটি রিপোর্টে বলা হয়েছে রাষ্ট্রপতি মোহহাম্মদ ইয়াহিয়া খান এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী পূর্ব-পাকিস্তানের নেতা মুজিব বিষয়টি নিয়ে সমঝোতা করবেন। কিন্তু অনেকটা আকস্মিকভাবেই বদলে গেলো পাকিস্তানের জটিল রাজনৈতিক ধাঁধাঁর পটভূমি। পূর্ব-পাকিস্তানে অবস্থিত রংপুর এবং চট্টগ্রাম শহরে সামরিক বাহিনী আন্দোলনরত বাঙালীদের উপর মেশিনগান দিয়ে নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করে। ইয়াহিয়া তার সৈন্যদের আন্দোলন বানচাল করে সরকারের পূর্ণ কর্তৃত্ব স্থাপনের নির্দেশ দেন। এদিকে মুজিব পূর্ব-পাকিস্তানকে ‘স্বাধীন , স্বার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ’ হিসেবে ঘোষণা দেন। এবং এর মাধ্যমেই পাকিস্তান নিজেকে নিক্ষেপ করলো গৃহযুদ্ধে।

২৪ বছরব্যাপি পাকিস্তানের পূর্ব এবং পশ্চিম অংশের মধ্যে গড়ে ওঠা এই ভঙ্গুর সম্পর্ক আচমকা ভেঙ্গে পড়লো। কারণ পাকিস্তান সরকার , পূর্ব- পাকিস্তানের অভ্যন্তরীন এবং বাহ্যিক যোগাযোগব্যবস্থায় তাৎক্ষণিকভাবে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিলো এবং প্রাথমিক রিপোর্ট / প্রতিবেদনে কি ছিল তাও কুয়াশাচ্ছন্ন। এরপরেও প্রতিবেশী দেশ ভারত হতে এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের খন্ডচিত্র উঠে আসছে ভিন্ন ভিন্ন প্রতিবেদনে যেখানে দেখা গেছে সুসংগঠিত সামরিক বাহিনীর সাথে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে লিপ্ত বিদ্রোহীদের যুদ্ধাস্ত্রের ঘাটতি থাকার স্বত্বেও আবেগ এবং দেশীয় অস্ত্র হাতেই তারা লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু অত্যন্ত নিরাশার সাথে বলতে হচ্ছে যে, পূর্ব-পাকিস্তানের গেরিলা যোদ্ধারা নির্বিচারে নিহত হচ্ছে যুদ্ধক্ষেত্রে। কিন্তু এই সপ্তাহান্তে যদিও অনুমান করা হচ্ছে যে মূলত দুর্ধর্ষ পাঞ্জাবী সৈন্যের সমন্বয়ে গঠিত সামরিক বাহিনী তাদের প্রতিপক্ষ বাঙালিদের দ্বারা ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির স্বীকার হয়েছে। খুব কম লোকই মনে করে যে যে পাকিস্তানের দুই বিচ্ছিন্ন অংশকে পুনরায় কার্যকরিভাবে একীভূতকরণ সম্ভব হবে।

 

পাকিস্তানের এই পরিস্থিতি অপ্রত্যাশিত ছিল কারণ তখন মুজিব এবং ইয়াহিয়া একটি সমঝোতার মধ্যবর্তী অবস্থায় ছিলেন। রংপুর এবং চট্টগ্রামের গণহত্যা / ধ্বংসযজ্ঞের খবরে/রিপোর্ট সম্পর্কে অবগত হয়েই ক্ষুব্ধ মুজিব সামরিক বাহীনিকে অভিযুক্ত করেন। এর প্রেক্ষিতে ইয়াহিয়া দ্রুত আলোচনার সমাপ্তি ঘোষণা করে গোপনে পশ্চিম- পাকিস্তানের উদ্দেশ্যে ঢাকা ত্যাগ করেন। নিজের এলাকা পশ্চিমে ফিরেই তিনি জাতীয় বেতারের মাধ্যমে মুজিবের দল আওয়ামীলীগকে নিষিদ্ধ করার ঘোষণা প্রদান করেন, যা ছিল পূর্ব-পাকিস্তানের সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক সংগঠন। তিনি শেখ মুজিবের অসহযোগ আন্দোলনকে “দেশদ্রোহী/বিশ্বাসঘাতকের কাজ” বলে ঘোষণা দিলেন।

 

ইয়াহিয়ার ঢাকা ত্যাগের অল্প সময়ের মধ্যে ল্যাফটেনেন্ট জেনারেল টিক্কা খান পূর্ব-পাকিস্তানের প্রশাসনের উপর কঠোর নিষেধাজ্ঞাওসহ মার্শাল ল জারি করেন। সকল বিদেশী প্রতিনিধিকে হোটেলের মধ্যেই আটকে রাখা হয় এবং পরবর্তিতে সামরিক বাহিনী তাদের গুরুত্বপূর্ন তথ্য –উপাত্ত এবং স্থির-চিত্রসমূহকে ছিনিয়ে নেয় এবং সকল প্রতিবেদককে নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়। বিদেশী সেসব প্রতিনিধিদের মধ্যে ছিলেন নিউজউইক এর প্রতিবেদক লরেন জারকিন্স , যিনি এই রিপোর্ট/প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন।

 

ঢাকা মডার্ন ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের জানালা থেকে আমরা দেখতে পেলাম সৈন্যভর্তি একটা জীপ একটি বিপনী কেন্দ্রে প্রবেশ করছে এবং ভীড়ের মধ্যে ভারী আগ্নেয়াস্ত্র যোগে প্রকাশ্যে গুলি চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। যখন গোলাগুলি চলছিলো তখন তার ২০০ গজের মধ্যেই হঠাৎ করে ১৫ জন বাঙালী তরুণ সৈন্যদের উদ্দেশ্যে চিৎকার করতে করতে আবির্ভুত হলো। তরুণদের দেখে মনে হলো তারা খালি হাতেই এসেছে। কিন্তু সৈন্যরা তাদেরকে লক্ষ্য করেই মেশিনগান চালনা করলো। এরপর সৈন্যরা রওনা হলো পাশের গলিতে অবস্থিত মুজিবের পক্ষে অবস্থান নেওয়া গণমুখী সংবাদপত্রের অফিসের দিকে যারা খুব কঠোরভাবে সমালোচনা করেছিল সেনাবাহিনীর কর্মকাণ্ডের। সৈন্যদল অধিকাংশ বাঙালিরা যে ভাষা বুঝেনা সেই উর্দু ভাষায় চিৎকার করে সতর্ক করে বলছিলো যাতে তারা আত্মসমর্পন করে নাহয় তাদের উপর গুলি চালানো হবে। কেউ বেড়িয়ে এলো না। তারা সম্পূর্ন ভবন বিস্ফোরণ এবং অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে ধ্বংস করে দিল। এবং এই ধংসযজ্ঞের পরে তারা “পাকিস্তান জিন্দাবাদ” বলে উল্লাস করতে করতে বেড়িয়ে আসলো।

 

এই সপ্তাহের শেষের দিকে, ১০৫ মিলিমিটার কামানের সহায়তায় সমস্ত শহরে গোলাগুলি চলছিল এবং হাউইটজারের গোলাবর্ষণের মুহুর্মুহু শব্দ শোনা যাচ্ছিল যেগুলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস অভিমুখে নিক্ষিপ্ত হচ্ছিল। এক সকালে আমার ঘুম ভেঙে গেলো বিমানবন্দর এলাকায় রাস্তার উদ্দ্যশে রওনা হওয়া ছয়টি টি-৫৪ চাইনিজ হালকা ট্যাংকের গর্জন শুনে। ধূসর ধোঁয়ার কুণ্ডলী মেঘলা করে রেখেছিল আকাশ। এবং প্রায় সাথে সাথেই পুরান ঢাকার দিকে অগ্নিসংযোগ এবং বিস্ফোরণের দৃশ্য দেখা গেল। পুরান ঢাকা এলাকাটিতে দেখা খুবই সরু কিছু গলি , একমুখী খোলা সড়ক এবং যেখানে অধিকাংশ মানুষ বাস করে এক কামরার বদ্ধ পরিবেশে।

 

ঢাকায় পশ্চিম পাকিস্তানি বাহিনীদের দেখেই অনুমিত হয় যে উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে তারা উৎফুল্ল । সামান্য শব্দেই তারা স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র ব্যবহার করে গুলি চালাচ্ছে। যখন ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে অবস্থানরত কিছু প্রতিবেদক/ রিপোর্টার্রত/সাংবাদিকগণ শহরের পরিস্থিতি জানতে হোটেলের বাইরে বের হবার চেষ্টা করায় , হোটেলের সামনে প্রহরারত সেনাবাহিনীর একজন ক্যাপ্টেন আমাদের গুলি করার হুমকি দেয়। সে আমাদের হোটেলের ভেতর প্রবেশ করতে নির্দেশ দিলো। সে ক্রোধের সাথে চিৎকার করে বলছিলো – “যদি আমি আমার নিজের লোককে হত্যা করতে পারি, তোমাদেরকেও হত্যা করতে পারবো”।

 

এই ভয়ংকর পরিস্থিতিতে সামরিক বাহিনী আন্দোলনরত সকল সরকারী কর্মাচারীদের কাজে যোগ দেয়ার নির্দেশ দেয় নতুবা তাদেরকে সামরিক আইনে বিচারের মুখোমুখি হতে হবে এবং এর সাথে তারা ২৪ ঘন্টা কার্ফিউ জারি করে। এমতাবস্থায় ট্রাকভর্তি সৈন্যদল ঢাকা শহরে প্রবেশ করে এবং যেসব বাড়িতে বাংলাদেশের লাল-সবুজ-হলুদ পতাকা উড়ছে , প্রত্যেকটি বাড়ির সম্মুখে গাড়ি থামায় তারা। এবং প্রতিটি বাড়ির বাসিন্দাদের পতাকা নামানোর নির্দেশ দেয় হানাদার বাহিনী। হোটেলের আশেপাশের এলাকার তিন তলা একটি ভবনের ছাদে একজন শাড়ি পরিহিতা মহিলার ধীরে ধীরে ছাদে উঠে সৈন্যদের মেশিনগানের মুখে নিতান্ত অনিচ্ছাসত্ত্বে পতাকা নামিয়ে নিতে বাধ্য হয়।

 

জেনকিন্স সহ অন্যান্য বিদেশী সাংবাদিক এবং প্রতিবেদকদের পূর্ব-পাকিস্তান থেকে জোর করে বের করে দেওয়া হলো। সমগ্র বিশ্ব তখন বেতার থেকে সম্প্রচারিত কিছু প্রশ্নবিদ্ধ সংবাদ/তধ্যের উপর নির্ভর করে থাকতে হয়েছে। করাচীর প্রধান বেতারকেন্দ্র থেকে ঘোষণা করা হলো যে , সৈন্যবাহিনী মুজিবকে গ্রেফতার করেছে। কিন্তু ঢাকা্র একটি গোপন বেতারকেন্দ্র থেকে সম্প্রচারিত একটি গোপন সংবাদে বলা হয়েছে যে মুজিব তাঁর গোপন কার্যালয়ে নিরাপদে আছেন। সেই বিদ্রোহী সংবাদঘোষক বলেন যে, “মুজিবের নেতৃত্বেই বাংলাদেশের জনগণ প্রয়োজনে আরো রক্ত দেবে …”।

 

যদি পাকিস্তানকে বৈষম্য এবং সহিংসতার মাধ্যমে বিভাজিত করা হয় তবে বলা যায় শতাব্দীর চারভাগের এক ভাগ সময়ের মধ্যেই সে আবার পূর্বাবস্থায় ফিরে গেল। ১৯৪৭ সালে এই পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের আত্মপ্রকাশ ঘটে বিভাজন এবং দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে। মূলত পাকিস্তান গঠিত/ সৃষ্টি হয়েছিল ব্রিটিশ ভারতের মুসলমান অধ্যুষিত এলাকা নিয়ে , যার স্বপ্নদ্রষ্টা ছিলেন মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এবং তার লক্ষ্য ছিল দক্ষিণ এশিয়া মুসলমানদের জন্য আলাদা ইসলামিক রাষ্ট্র গঠন করা। হিন্দু ও মুসলমানের দীর্ঘ ছয়মাসের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ফলস্বরূপ ভারত হতে বিচ্ছিন্ন হয় পাকিস্তান এবং প্রায় পাঁচ লক্ষ মানুষ প্রাণ হারায়। এবং সৃষ্টি হয় পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের , যার দুটো প্রদেশের মাঝে ছিল ১১০০ মাইলের একটি দীর্ঘ ভারতীয় এলাকা।

 

ভৌগলিক বৈচিত্র্য এক্ষেত্রে যথেষ্ট সমস্যাপূর্ণ ছিল। কিন্তু অবস্থা আরও জটিল হয় এই কারণে যে দুই অংশের মধ্যে একমাত্র মিল ছিল ইসলামের প্রতি আনুগত্য। পশ্চিম পাকিস্তান মরুভুমি এবং পর্বতময় শুস্ক আবহাওয়ার অঞ্চল অপরদিকে পূর্বাংশ আর্দ্র বনানী এবং পাললিক সমভূমির অধিকতর জনসংখ্যা নিয়ে গঠিত। পশ্চিম পাকিস্তানের পাঞ্জাবি জনগোষ্ঠী এবং পূর্ব -পাকিস্তানের বাঙালিদের মধ্যে জাতিগত ব্যক্তিত্বে পার্থক্য অনেক বেশী ছিল। গর্বিত পাঞ্জাবীরা বাঙ্গালীদের দেখতো হীন দৃষ্টিভঙ্গিতে এবং বছরের পর বছর তারা শোষণ করেছে তাদেরই পূর্বাংশের জনসাধারণকে।

 

 

প্রশ্নাতীতভাবে পরাজয়

 

পরিহাসের সাথে বলতে হয় যে ইয়াহিয়া খান হলেন পরথম পশ্চিম পাকিস্তানি যিনি জনসমক্ষে স্বীকার করেছেন যে, দুই পাকিস্তান একত্রিত হবার পর পূর্ব-পাকিস্তান রাজনৈতিক ক্ষমতা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে কখনোই সমতা পায়নি। এই বিষয়গুলোকে সংশোধনের লক্ষ্যে ইয়াহিয়া এক ব্যক্তি , এক ভোট এই মর্মে কঠোর পরিচালনায় পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচন ঘোষণা দেন । কিন্তু গত ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনের ফলাফল খুবই চমকপ্রদ ছিল। পূর্ব-পাকিস্তানে , মুজিবের আওয়ামীলীগ ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। এবং যেহেতু জনসংখ্যার দিকে পূর্ব – অংশ অনেক এগিয়ে, মুজিবের নেতৃত্বে জাতীয় পরিষদে তারা সবচেয়ে বেশী আসন বরাদ্দ পায় এবং দৃশ্যত সংসদেও লাভ করে সর্বোচ্চ আসন।

 

নির্বাচনী প্রচারণার সময় পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতার বন্টন এবং দুটো প্রদেশের স্বায়ত্বশাসন নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে মুজিব ছয়-দফা কর্মসূচীর ঘোষণা দেন। পশ্চিম পাকিস্তানে সর্বোচ্চ ভোটপ্রাপ্ত বর্ষীয়ান বাম-ঘেঁষা রাজনীতিবিদ, প্রাক্তন- পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো যে এমন কিছু কখনোই মেনে নেবেন না এটা মোটেও আশ্চর্যজনক ছিল না। যখন ভূট্টোর সমর্থকরা জাতীয় পরিষদের নতুন সভায় যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানালো, তখন ইয়াহিয়া উদ্বোধনি অধিবেশন পিছিয়ে দিতে বাধ্য হলেন। এর ফলে মুজিব অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিতে বাধ্য হলেন যার ফলে পূর্ব-পাকিস্তানে কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণ কার্যত অবলুপ্ত হয় এবং মুজিবই শাসকে পরিণত হন। শেষ পর্যন্ত ইয়াহিয়ার কাছে অবশেষে বাঙালির দাবী মঞ্জুর করা নতুবা ক্ষমতার বলে তা আন্দোলন প্রতিহত করা ছাড়া আর কোন উপায় ছিল না।

 

ইয়াহিয়া মুজিবকে একজন আইন ভঙ্গকারী বলে অভিযুক্ত করেন এবং সেই সাথে তিনি সকল আলোচনার পথ রুদ্ধ করে দিলেন। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য সামরিক শক্তিকে বেছে নেন। পূর্ব-পাকিস্তানে কেন্দ্রীয় বাহিনীর সম্মলিত শক্তি (যার সৈন্য সংখ্যা ২০ হাজার থেকে ৭০ হাজারের মধ্যে ছিল বলে অনুমান করা হয়) প্রশিক্ষণ এবং অস্ত্রসস্ত্রে শত্রুপক্ষের থেকে অনেকটাই উন্নত ছিল, তারপরেও পশ্চিমারা বেশকিছু গুরুতর সমস্যার সম্মুখীন হয়। পশ্চিম পাকিস্তান এবং পূর্ব-পাকিস্তানে স্থলপথে সরাসরি কোন যোগাযোগব্যবস্থা ছিলনা , উপরন্তু ভারতীয় আকাশপথের উপর দিয়ে যাবতীয় বিমান চলাচল নিষিদ্ধ থাকায় যৌথ বাহিনীর কমান্ডারদের নিজেদের সৈন্য , বেশ দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে শ্রীলঙ্কা হয়ে ভারতের দক্ষিণাংশ দিয়ে পার করতে হচ্ছিলো। যুক্তরাষ্ট্রের একজন বিশ্লেষক জানালেন “পাকিস্তানী সামরিক বাহিনী স্বল্প মেয়াদে হয়তো বাংলার ভূখণ্ড ছিন্নভিন্ন করে দিতে পারবে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তাকে ভয়াবহ কৌশলগত সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে”।

 

গেরিলা যোদ্ধাদের অভয়ারণ্য

 

কেন্দ্রীয় বাহিনীর শক্তির বিপরীতে বাঙালি বাহিনী ছিল মাত্র ১৫০০০ হাজার গেরিলা যোদ্ধার সমন্বয়ে গঠিত। যাদের বেশীরভাগই ছিল বেসামরিক যোদ্ধা এবং তাদের হাতে ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্যবহৃত বেশ পুরানো কিছু অস্ত্র। কিন্তু যদিও শহরে বাঙালিদের তুলনায় কেন্দ্রীয় বাহিনী শক্তিমত্তায় অনেক এগিয়ে ছিল, সামরিক পর্যবেক্ষকদের মতে গ্রামে বাস করতো পাকিস্তানের প্রায় ৯০ শতাংশ জনগোষ্ঠি এবং এইসব প্রত্যন্ত এলাকা ছিল গেরিলা যোদ্ধাদের স্বর্গরাজ্য। জলমগ্ন ধানের বিস্তৃত মাঠ , চা-বাগান , পাটক্ষেত এবং ঘন কলার বাগান , প্রতিপক্ষকে গোপনে লুকিয়ে থেকে অতর্কিত হামলা করার মতো উপযুক্ত একটি দেশ যা দক্ষিণ ভিয়েতনামি মেকং উপত্যকার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। অধিকাংশ প্রবাসী সামরিক যুদ্ধ বিশ্লেষকদের মতে পূর্বাংশের এইসব সুবিধা পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর জন্য একটি দুঃসহ পরিস্থিতির সৃষ্টি করবে।

 

এতদসত্বেও ইয়াহিয়া যদি এই নৃশংস গণহত্যা চালিয়ে যেতেন তবে সাময়িক ভাবে হলেও আন্দোলনকে দমন করতে সক্ষম হতেন। যদি মুজিবকে গ্রেফতার করার সংবাদ যদি সত্য হয় তাহলে বাংলাদেশের জন্য হবে এটি একটি সাংঘাতিক আঘাত হিসেবে পরিগণিত হবে। কেন্দ্রীয়বাহিনীর দমন-পীড়ন যতোই কঠিন হোক না কেন, বাঙালিরা অসহযোগ আন্দোলন বা ভিয়েত কং কৌশলের গেরিলা আক্রমণের মাধ্যমে যেকোন মূল্যেই পশ্চিমাদের আক্রমণকে প্রতিহত করতে থাকবে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে ইয়াহিয়া নিজের দেশেই ঔপনেবিশিক শাসক হওয়ার কদর্য ইচ্ছা নিয়ে এগোতে চাইছেন। গত সপ্তাহে যৌথ বাহিনী যখন ঢাকায় ট্যাংক এবং স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র সহযোগে আক্রমণ করে বসলো , তখনি মনে হয়েছে পাকিস্তানের এই দুই ভিন্ন প্রদেশের সম্প্রীতিতে বসবাস করার সকল সম্ভাবনাকেই ধ্বংস করে দিলো।

 

 

ভিন্ন মতাদর্শঃ বাঙালির জটিল মনস্তত্ব

 

বাঙালিদের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে যারা অবগত আছেন , তারা অবশ্যই ধারণা করতে পারেন এটিই অবশ্যম্ভাবী যে একদিন তারা নিজেদের জন্য একটি আলাদা স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্টা করতে চেষ্টা করবে। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য কর্তৃক উপমহাদেশের বিভাজিত দুটো রাষ্ট্র ভারত এবং পাকিস্তানের অংশ হবার স্বত্বেও , প্রায় ১২ কোটি বাঙালি ( পূর্ব পাকিস্তানে বসবাসরত সাত কোটি এবং বাকী অংশ ছিল ভারতের পূর্ব-বাংলায়) এবং তারা নিজেদের প্রতিবেশী থেকে ভিন্ন জাতিস্বত্বা বলে মনে করে । আবেগপ্রবণ এবং সদালাপী, বাদামী চামড়ার বাঙালি,তাদের মতোই হিন্দু এবং মুসলমান ধর্ম বিশ্বাসী এবং স্বদেশী ভারত এবং পাকিস্তান থেকে আলাদা জাতি হিসেবে নিজেদের মধ্যেই সপ্রতিভ। পাশ্চাত্যের একজন বিশেষজ্ঞের মতে “ তারা নিজেদের প্রথমেই ভাবে বাঙালি, দ্বিতীয়তে হিন্দু বা মুসলমান এবং সর্বশেষে পাকিস্তানি বা ভারতীয়”।

 

সংস্কৃতিগত ,জাতিগত, ভাষাগত এবং আত্মিক দিক থেকে, বাঙালি জাতি পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে ভিন্ন। বাংলার পন্ডিতদের মতে এর কারণস্বরূপ বলা যায় যে , খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীর প্রাচীন রাজ্য বংগ থেকে উদ্ভব হয়েছে বাংলা নামটি। এই বাংলায় এশিয়ার অন্যতম প্রাচীন সাহিত্যের ধারা প্রবাহিত হচ্ছে , যার আছে হাজার বছরের ইন্দো-আর্য ভাষা এবং সুপ্রাচীন ইতিহাস। সুদীর্ঘ গৌরবময় সাহিত্যের ঐতিহ্য , পণ্ডিত ব্যক্তিবর্গের আবাসভূমি যার আছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো বিস্ববিজয়ী আধুনিক সাহিত্যিক । একজন সুরকার এবং গীতিকার হবার পাশাপাশি , রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একাধারে ছিলেন একজন বাঙালী কবি, ঔপন্যাসিক এবং নাট্যকার । ১৯১৩ সালে তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরষ্কার লাভ করেন।

 

আলোচন/ বৈঠক

 

যেখানে লেখার ভাষায় আছে ঐতিহ্য, অপরদিকে কথ্য ভাষা বোঝা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে । কলকাতা এবং ঢাকার ক্যাফেগুলোতে , বাঙ্গালিরা ব্যস্ত অন্তহীন আলোচনায় এবং আকাশ-কুসুম জ্ঞানগর্ভ আলোচনা এবং রাজনৈতিক পরিকল্পনা নিয়ে। ভারতীয় একটি প্রবাদে বলা হয় যে “ প্রতিটি বাঙালি কমিটিতে চারজন সদস্য অবশ্যই থাকবেঃ একজন মুখোপাধ্যায় , একজন বন্দ্যোপাধ্যায়, একজন চট্টোপাধ্যায় ( সবগুলোই বাঙালি নাম ) এবং একজন সিং”। শিখদের নাম হয় সিং দিয়ে। শিখরা বাঙালিদের মতো নয় , তারা পরিচিত তাদের কাজের জন্য। এবং এটিই প্রচলিত যে ঐ একজন শিখই মূল কাজটি করবে।

 

একটি জাতি , যারা ঊনবিংশ শতকে ব্রিটিশ/ইংরেজদের শাসনসহ , শত শত আক্রমণ , যুদ্ধের শিকার হয়েছে , সে বাঙালি জাতি দীর্ঘ পরিক্রমায় শিখে নিয়েছে টিকে থাকার শিল্প। অহংকারী পাঞ্জাবির মত না হয়ে বাঙালিরা নমনীয় হতে পারে। সে ধুতি পরিধান করবে, সুভাষিত বক্তব্যে কথা বলবে , অস্ত্র বলতে আছে কেবল ছাতা , বাঙালিকে একজন দক্ষ এবং বিশ্বস্ত কেরানী হিসেবেই ভাবা হয়। যুদ্ধ করা সামরিক বাহিনীর কাজ , বাঙালির নয়।

 

বাংগালিদের সম্পর্কে গতানুগতিক যে ধারণা প্রচলিত সুযোগ পেলে তারা তাদের সাথী/ সহযাত্রীদের ডিঙিয়ে যেতে বেশ পারদর্শী। একজন ব্যবসায়ী বলতেই পারেন যে “ খেয়াল রেখো । সে কিন্তু বাঙালি”। তার মানে এই যে সে কেবলই ধুর্ত নয় বরং সে কূটবুদ্ধি্তে পরিপূর্ণ।

 

সুচতুর এবং শান্ত হিসেবে বাঙালির পরিচয় থাকার স্বত্বেও তাদেরকে একাধিকবার উপস্থাপন করা হয়েছে কূটবুদ্ধি এবং ধ্বংসাত্মক মানসিকতার মানুষ হিসেবে। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সর্বপ্রথম বাংলার আন্দোলনকারীরাই সবচেয়ে নিবেদিতপ্রাণ হয়ে দূর্ধর্ষ লড়াই করেছে । এবং বাংলা অঞ্চল বিভক্ত হবার পর থেকেই ভারত এবং পাকিস্তান দুটো দেশের বাংলা অঞ্চলেই নিয়মিতভাবে রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং নতুন বিপ্লবের সূচনা হয়েছে। একজন আমেরিকান পণ্ডিতের মতে “ তাদের শান্ত মনে হলেও , তারা সহিংস হয়ে উঠতে জানে, কিন্তু তা সাধারণত ভুল পথে। তিনি আরো যোগ করেন যে- “ বাঙ্গালি মানসের একটি দিক আছে যা গোলমালকে কেন্দ্র করেই বিকশিত হয়।”

 

 

কবি বা রাজনীতি

 

গত সপ্তাহে শেখ মুজিবুর রহমান যখন বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন , তার সমালোচকেরা বলতে শুরু করলেন , মুজিব তাঁর চরমপন্থি সমর্থকদের চাপে এই ঘোষণা দিয়েছেন, স্রোতে ডুবে যাওয়ার বদলে স্রোতের টানে চলার কৌশল নিয়েছেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে মুজিবের উত্থান হয়েছে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাঙালি জাতির একজন নেতা হিসেবে । জাতীয়তাবাদের জন্য বাঙালিরা যৌক্তিকভাবে লড়াই করে যাচ্ছিলো দীর্ঘদিন ধরে। যদিও বা মনে হতে পারে মুজিব স্রোতের টানে চলছেন, কিন্তু আদতে তার উত্থান কাকতালীয় নয়। ৫১ বছর আগে ঢাকার নিকটবর্তী একটি গ্রামে একজন স্বচ্ছল জমির মালিকের ঘরে জন্ম নেওয়া মুজিব বিরাট কোন শিক্ষাগত অর্জন ছাড়াই প্রাথমিক লেখাপড়া শেষ করেন। সময়ের সাথে সাথে তিনি একজন জনপ্রিয় ছাত্রে পরিণত হলেন । মানুষের সাথে কথা বলতে পছন্দ করতেন। চলনে বলনে খেলাধুলায় তিনি সময়ের সাথে হয়ে উঠলেন অসামান্য। কলকাতার ইসলামিক কলেজে যখন তিনি লিবারেল আর্টস ডিগ্রীর জন্য পড়াশুনা করতে গেলেন তখন সেখানকার মুসলিম লীগের কিছু জ্যেষ্ঠ নেতাকর্মীর নজ্রে আসেন। তাঁর রাজনৈতিক গুরু ছিলেন তখন এইচ এস সোহরাওয়ার্দী, যিনি ব্রিটিশরাজের অধীনে বাংলার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, পরবর্তীতে, তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এক বছর দায়িত্ব পালন করেন. মুজিব আইন বিষয়েও পড়াশুনা করেন । কিন্তু সোহরাওয়ার্দী, যিনি ছিলেন মধ্যপন্থী, মুজিব তার পদাঙ্ক অনুসরণ না করে সরাসরি পদক্ষেপের দিকে ঝুঁকে পড়েন । চল্লিশ দশকের শেষ দিকে তাঁরা দুজনেই অনুধাবন করলেন যে, নব গঠিত পাকিস্তানের অন্যতম প্রধান বাংলা প্রদেশকে নানা সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। ১৯৪৯ সালে সোহরাওয়ার্দী সুসংগঠিত “বাংলার বাঙালিদের জন্য” আওয়ামী লীগ নামের নতুন রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করেন। মুজিব রাজপথে নেমে গেলেন এবং তাকে দুইবার গ্রেফতার করে কারাগারে প্রেরণ করা হলো অবৈধ হরতাল এবং তার সাথে সংশ্লিষ্ট থাকার অপরাধে।

জেল হতে বের হয়েই মুজিব হয়ে গেলেন আওয়ামী লীগে সোহরাওয়ার্দীর ডান-হাত। কিন্তু অন্যান্য দলের সাথে জোট গঠন করে তার নেতৃত্ব দেবার সম্ভাবনাকে ধ্বংস করে দেয়া হলো। ১৯৫৬ সালে মুজিব সাফল্যের সাথে নব গঠিত পূর্ব-পাকিস্তানে আওয়ামী লীগকে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন। সাত মাস কৃতিত্বের সাথে তিনি শিল্প ও বানিজ্য মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৩ সালে সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুর পর মুজিব অনেকটা বিনা বাঁধায় তাঁর কিছু পুরানো আদর্শিক রীতিনীতিতে পরিবর্তন আনতে সক্ষম হন । তিনি আওয়ামী লীগকে পুনরুজ্জীবিত করেন। রাজনীতিতে যুক্ত করেন “স্বতস্ফুর্ততার” শৈলী এবং দাবী করেন আভ্যন্তরীন নিজস্ব শাসন ব্যবস্থার । পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীন করার ষড়যন্ত্রের অভিযোগে. ১৯৬৬ সালে আইয়ুব খান সরকার তাকে পুনরায় গ্রেফতার করে । পূর্ব-পাকিস্তানে তখন বিদ্রোহের আগুন জ্বলে উঠালো । ফলস্রুতিতে আইয়ুব খান পদত্যাগ করে মুজিবকে মুক্তি দিতে বাধ্য হলো। জনগণের চোখে মুজিব জাতির নায়ক হিসেবে আবির্ভূত হলেন ।

 

একজন গড়পড়তা বাঙালির তুলনায় লম্বা ( তাঁর উচ্চতা ৫ ফুট ১১ ইঞ্চি) , চুলে রুপালো আভা , পুরু গোঁফ এবং কালো চোখের অধিকারী মুজিব খুব সহজেই লাখো মানুষের র‍্যালিকে আকর্ষণ করতে পারেন। তাঁর উদ্দীপ্ত ভাষণের মাধ্যমে জনগণকে আপ্লুত করার অসীম ক্ষমতা ছিল তাঁর । একজন কূটনৈতিকের মতে –“ তুমি তাঁর সাথে একাকী আলাদাভাবে কথা বললেও তাই হবে এবং তিনি এমনভাবে কথা বলেন মনে হবে তিনি ৬০ হাজার মানুষের সামনে বক্তব্য দিচ্ছেন’। একাধারে উর্দু , বাংলা এবং ইংরেজী – পাকিস্তানের এই তিন ভাষায় তিনি সমান পারদর্শী। মুজিবের মাঝে চিন্তাবিদ হবার ভান নেই তিনি প্রকৌশলী নন বরং তিনি রাজনীতির কবি। কিন্তু সচরাচর বাঙালিরা কৌশলী নয়, বরং কিছুটা চিন্তক, এবং সেজন্যই হয়তো তাঁর রাজনৈতিক কৌশলই দরকার ছিল সকল অঞ্চলের ভিন্ন মতাদর্শ এবং নানা শ্রেণীর মানুষকে একত্রীকরণের জন্য।

 

নিউজ উইক পত্রিকার লরেন জেনকিন্সকে এক মাস আগে এক গোপন সাক্ষাৎকারে মুজিব জানান যে “দেশটিকে এই অবস্থা থেকে বাঁচানোর কোন আশার দেখা মিলছে না। যে দেশটিকে আমরা চিনতাম সেটি এক অর্থে ধ্বংস হয়েই গেছে”। কিন্তু তিনি রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খানের পিছিয়ে যাবার জন্য অপেক্ষা করছিলেন । তিনি বলেন “ আমরা সংখ্যায় গরিষ্ঠ, আমরা বিচ্ছিন্ন হতে পারবো না । কিন্তু তারা পশ্চিমারা সংখ্যায় কম , তাই তাদের উপর নির্ভর করছে তারা একত্রে থাকতে চান কিনা”।

 

দুই সপ্তাহ পরে এই আশংকা আরো ঘনীভূত হলো। শত শত বাঙালী জড়ো হলো মুজিবের ঢাকাস্থ বাড়ির হলঘরে। পাইপে ধোঁয়া উঠিয়ে ( “একমাত্র বিদেশি জিনিস যা আমি ব্যবহার করি”), তিনি হাসিমুখে সবার সাথে কথা বললেন। এই উৎসাহী জনসমাবেশে বক্তব্যকালে পশ্চিমা সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেনঃ “ভোর পাঁচটা থেকে আমাকে এর মধ্যেই থাকতে হয়। কোন ম্যাশিনগানের কি সাধ্য আছে এই অদম্য শক্তিকে রোহিত করার”? কিছুদিন পর কেউ একজন চেষ্টা করছিলো।

 

 

 

 

 

 

 

শিরোনামঃ সুত্রঃ তাংঃ

পাকিস্তানঃ পতনের পদধ্বনি

 

টাইম ম্যাগাজিন

 

৫ই এপ্রিল, ১৯৭১

 

 

Raisa Sabila

<১৪, ১৫, ৩৫৩৭>

 

টাইম ম্যাগাজিন, এপ্রিল ৫, ১৯৭১

পাকিস্তানঃ পতনের পদধ্বনি

 

বঙ্গপোসাগরে সৃষ্ট ভয়াবহ এক জলোচ্ছাসের পরে, গত সপ্তাহে পূর্ব পাকিস্তানের সর্বত্র গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। ধুলোমাখা জনাকীর্ণ শহরগুলোতে দাঙ্গা দমন করার জন্য সেনা বাহিনী সাধারন মানুষের উপর গুলি চালিয়েছে। হাজার হাজার মানুষ হতাহত হচ্ছে। যদিও এ গননা এখনও নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছেনা, কেননা প্রিথিবীর সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ এ এলাকায় (প্রতি বর্গমাইলে ১৪০০ জন) এমুহূর্তে চলছে চরম বিদ্রোহ আর কড়া প্রহরা। যদিও প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান এই অঞ্চলের জনগনের এরুপ ব্যাপক হারে হতাহতের স্বীকৃতি দিতে প্রস্তুত আছেন, তবে মনে হচ্ছে এর চুড়ান্ত ফলাফল দাঁড়াবে, পূর্ব পাকিস্তানের সাথে সম্পর্কের স্থায়ী ভাঙ্গন আর বাংলাদেশ নামে নতুন একটি জাতির বেদনাদায়ক জন্ম।

 

১৯৪৭ সালের দেশবিভাগের মাধ্যমে পাকিস্তান নামের দেশটিকে একটি মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে গঠন করা হলেও, জাতিগত ও সাংস্কৃতিক পার্থক্য সবসময়ই দেশটির অভ্যন্তরে একটি অস্ফুট সঙ্ঘাতময় পরিস্থিতি তৈরি করে রাখছিল। দুইটি মুসলিমপ্রধান এলাকা, যা পূর্বে ভারতের অংশ ছিল, একত্রিত হয়ে একটি দেশ গঠন করে। দেশটির দুই অংশের মাঝখানে প্রায় ১০০০ মাইল জুড়ে ভারত সীমান্ত দিয়ে বিচ্ছিন্ন। ফলে, গত সপ্তাহে প্রায় ৮০ হাজার পশ্চিম পাকিস্তানি সেনা যখন পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে মাঠে নামে, তাদের সরবরাহ ঘাটি ছিল সেখান থেকে ১০০০ মাইল দূরে অবস্থিত। বেশির ভাগ খাবার এবং গোলা বারুদই প্রায় ৩০০০ মাইল লম্বা ভারত সীমান্ত উপকুল দিয়ে এপর্যন্ত বয়ে নিয়ে আসা হয়েছে। আয়তনে লম্বা, নির্ভয় পাঞ্জাবি জওয়ানদের চারপাশ ঘিরে এখন রয়েছে প্রায় ৭৮০ লক্ষ শত্রুভাবাপন্ন বাঙ্গালী। এই গৃহযুদ্ধ নিঃসন্দেহে দীর্ঘ সময় ধরে চলবে এবং প্রচুর রক্তপাত ঘটাবে। বাঙ্গালীরা সামান্য কিছু লুটের অস্ত্র, বল্লম আর বেশিরভাগ বাশের লাঠি হাতে কোনমতে গেরিলা যুদ্ধের ট্রেনিং নেয়। কিন্তু এই প্রতিরোধের আন্দোলন একবার সঙ্ঘটিত হয়ে গেলে, ধীরে ধীরে পশ্চিম পাকিস্তানিদেরকে হঠিয়ে দিতে পারে। একদিক থেকে দেখতে গেলে, এই আন্দোলন ১৯৬৭-৭০ সালে ঘটে যাওয়া নাইজেরিয়ান গ্রিহযুদ্ধের কথা মনে করিয়ে দেয়, যখন তাদের ফেডারাল শাসকরা জাতীয় সঙহতির নামে স্বায়ত্বশাসনের দাবি বাতিল করে দেয় এবং বায়ফ্রার বদলে আত্মনিয়ন্ত্রনের পন্থা বেছে নিয়েছিল।

 

 

প্রথম আঘাত

 

গত সপ্তাহ পর্যন্ত মনে হয়েছিল, পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতারা তাদের মতানৈক্য দূর করার প্রক্রিয়াটি প্রায় শেষ করে এনেছে। তারপর খুব অল্প সময়ের মধ্যে দেশে তিনটি ঘটনা ঘটে যার ফলে পুরো জাতি এখন সহিংসতার কবলে। চট্টগ্রামে পশ্চিম পাকিস্তানি সেনারা একটি রসদ সরবরাহের জাহাজ খালি করার সময় জনতা তাদের ঘেরাও করে ফেলে। প্রথম কোন পক্ষ থেকে গুলি ছোড়া হয়েছিল, তা এখনও সঠিকভাবে না জানা গেলেও, এটা জানা যায় যে সেনাদের গুলিতে ৩৫ জন বাঙালি মারা যায়। এর প্রতিবাদে তাদের রাজনৈতিক নেতা শেখ মুজিবর রহমান অসহোযোগ আন্দোলন ঘোষণা করেন। অতঃপর ইয়াহিয়া খান তাকে দুর্বৃত্ত হিসেবে এবং তার রাজনৈতিক দল আওয়ামিলীগকে দেশের শত্রু হিসেবে ঘোষণা করেন এবং সেনাবাহিনীকে তাদের ‘দায়িত্ব” পালন করার নির্দেশ দেন।

 

শহরতলীর ঘাটি থেকে ট্যাংক এবং বেয়নেটওয়ালা বন্দুক কাধে সৈন্যভর্তি ট্রাক ঝংকার তুলে একের পর এক বের হয়ে আসে ঢাকার রাস্তায়। চিৎকার করে তারা বলতে থাকে, “নারায়ে তাকবির, পাকিস্তান জিন্দাবাদ”। টাইমস এর সংবাদদাতা ড্যান কগিন, যাকে বাকি সাংবাদিকদের মতই ঢাকা থেকে বহিষ্কৃত করা হয়, বলেন- আক্রমনের অনেক আগেই ঢাকার অন্তত হাফ ডজন এলাকায় বিক্ষিপ্তভাবে ক্ষুদ্র কামানসহ ট্যাঙ্ক, আর্টিলারি, রকেট ব্লাস্ট জমা করা হয়। শহরের অন্ধকার চিরে চক্রাকারে ঘুরছিল ট্রেসার লাইট। স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের সাথে সাথে গ্রেনেড বিস্ফোরণের শব্দও পাওয়া যাচ্ছিল। মাথার উপরের আকাশ ভারি হয়েছিল সারি সারি কালো ধোয়ার স্তম্ভে। রাতের বেলা হঠাত হঠাত শোনা যাচ্ছিল ‘জয় বাংলা’ ধ্বনি আর তারপরি সেই চিৎকার ঢেকে যাচ্ছিল মেশিনগানের গুলির আঘাতে।

 

সেনাবাহিনী ঢাকাতে ২৪ ঘন্টার কঠোর কারফিউ আরোপ করে। ঘোষণা দেয়া হয় কারফিউ অবমাননাকারিদের দেখা মাত্র গুলি করা হবে। কিন্তু, অল্প কিছুক্ষন পরেই, চট্টগ্রামের কোন এক এলাকা থেকে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র চালু করা হয়। এই গোপন বেতারকেন্দ্র থেকেই বলা হয় যে, মুজিব স্বাধীন বাংলাদেশের ঘোষণা দিয়েছেন এবং দেশের সর্বস্তরের জনগণকে যুদ্ধে যোগ দিয়ে দেশকে শত্রুমুক্ত করার আহবান জানিয়েছেন। যদিও, এই বেপরোয়া ঘোষণার মধ্যে কোন সামরিক দিকনির্দেশনা ছিল না। একি দিনে, রাত প্রায় দেড়টার দিকে সেনাবাহিনী শেখ মুজিবকে তার নিজ বাড়ি থেকে গ্রেফতার করে। একি সময়, পশ্চিম পাকিস্তানেও এই প্রলম্বিত সামরিক শাসনের প্রতিবাদে কিছু বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

 

দেশে প্রথমবারের মত পরীক্ষামুলকভাবে সত্যিকারের গনতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া থেকেই মুলত পাকিস্তানের এই ভাঙ্গনের উৎপত্তি। তার পূর্বে পাকিস্তানের শাসন মুলত মনোনীত নির্বাচকমণ্ডলীদের দ্বারাই পরিচালিত হত। ১৯৬৯ সালের গনআন্দোলনের পর দেশে সামরিক আইন জারি করা হয়।

বিগত বছরগুলোতে পাকিস্তানে শুধু ভৌগলিক পার্থক্যই ছিলনা। প্রায় ৫৮০ লক্ষ পশ্চিম পাকিস্তানি আধিবাসিরা দেহবৈশিষ্ট্য আর মন-মানসিকতায়ও বাঙ্গালীদের থেকে যথেষ্ট আলাদা। ধারনা করা হয় যে, তুরকি থেকে যেসকল ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষ এই ভুখন্ড দখল করেছিল, তাদেরই উত্তরসুরি এই দীরঘাঙ্গী, গৌর বর্ণের পশ্চিম পাকিস্তানিরা। আকারে অপেক্ষাকৃত খর্বকায়, শ্যামল বর্ণের পূর্ব পাকিস্তানিরা এই দক্ষিন ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়া অঞ্চলের অধিবাসীদেরই বংশধর। সরকার ও প্রশাসন খাতে পশ্চিমাদের একচেটিয়া অধিকার আর জাতীয় বানিজ্যিক খাতে সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রনে আরো বেশি বিভেদের সৃষ্টি করে। বহু বছর ধরে, পাকিস্তানের মোট আয়কৃত বৈদেশিক মুদ্রার বেশিরভাগ অংশ পূর্ব পাকিস্তানে উৎপাদিত পাট রপ্তানি থেকে আসলেও এ অঞ্চলের তেমন উন্নয়ন কার্যক্রম চালানো হয়নি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, রাস্তাঘাট, নতুন কলকারখানা বা আধুনিক সরকারি দালান বেশিরভাগই স্থাপিত হয়েছে পশ্চিম পাকিস্তানে।

 

দেশে বেসামরিক শাসন ফিরিয়ে আনা ও ক্ষমতা থেকে পদত্যাগ করার উদ্যোগ নিয়েই ইয়াহিয়া গত ডিসেম্বরে নির্বাচন দিয়েছিলেন, যেন একটি জাতীয় পরিষদ গঠন করে দেশে নতুন সংবিধান প্রনয়ন করা যায়। এ নির্বাচনে, বাঙ্গালীদের ভোটে পূর্ব পাকিস্তানের ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭তেই শেখ মুজিবের আওয়ামীলীগ বিজয়ী হয়। জাতীয় পরিষদের মোট ৩১৩টি আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসন পেয়ে তারা নির্বাচনেও বিজয়ী দল হিসেবে ঘোষিত হয়। মুজিবের দল দাবী করে যে, কেন্দ্রীয় সরকারকে ফলতঃ ভেঙ্গে দেশটির দুই প্রদেশে দুইটি আলাদা প্রাদেশিক সরকার গঠিত হবে। নিজ নিজ অঞ্চলের রাজস্ব আয়, বানিজ্য ও বৈদেশিক সহায়তার নিয়ন্ত্রন প্রাদেশিক সরকারের হাতে থাকবে। প্রতিরক্ষা ও কুটনৈতিক সিদ্ধান্তগুলোও প্রাদেশিক সরকার নির্ধারণ করবে। দেশকে অক্ষুন্ন রাখতে অবিচল ইয়াহিয়া, মুজিবের এই স্বায়ত্বশাসনের দাবী প্রত্যাখ্যান করেন। জাতীয় পরিষদ গঠনের কার্যাবলী পিছিয়ে দিয়ে তিনি ঢাকার উদ্দ্যেশ্যে যাত্রা করলেন। মুজিবের সাথে একটি সমঝোতার চুক্তিতে আসার লক্ষ্যে তিনি টানা ১১ দিন বৈঠক করেন। ইয়াহিয়া দাবী করেন যে, যাই হোক না কেন, মুজিবকে পশ্চিম পাকিস্তানের অধিকাংশ আসনে বিজয়ী পার্টির নেতা ও প্রাক্তন পররাষ্ট্র মন্ত্রী জুলফিকার আলি ভুট্টুর সাথেও সমঝোতায় আসতে হবে। ভুট্টো পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্ব দাবী করলেও মুজিব তার বক্তব্যেই অনড় থাকেন যে নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী হয়েছে তার দল। সুতরাং ভুট্টোকে ছাড়াই সরকার গঠন করা তার ন্যায্য অধিকার।

 

সর্বাপেক্ষা দরিদ্র জাতি

 

পূর্ব পাকিস্তান থেকে যদি অবশেষে বাংলাদেশ নামে বিশ্বের দরবারে স্বীকৃত হয় তবে বিশ্বের অষ্টম বৃহত্তম জনসংখ্যা আর সর্বনিম্ন মাথাপিছু আয়ের (বাৎসরিক ৫০ ডলার) অধিকারী রাষ্ট্র হবে বাংলাদেশ। নিঃসন্দেহে এটিই হবে সর্বাপেক্ষা দরিদ্র রাষ্ট্র। বর্তমানে পাকিস্তানের এই দুই অঙ্গরাজ্য সংযুক্ত থাকায় যুক্তরাষ্ট্র কেবল ১৫০ মিলিয়ন ডলার অর্থ সহায়তা প্রদান করছে। পূর্ব পাকিস্তান পৃথক রাষ্ট্রে পরিণত হলে, দুইটি আলাদা রাষ্ট্রে আর্থিক সহায়তা প্রদান করতে হবে। ফলে, যুক্তরাষ্ট্রকেও তার আর্থিক সহায়তার পরিমাণ আরো ১৫০ মিলিয়ন ডলার বৃদ্ধি করতে হবে। পূর্ব পাকিস্তানের শিল্পখাতের সংখ্যা হাতে গোনা কয়েকটি মাত্র। পাটের চাহিদাও বিশ্ব বাজারে ক্রমহ্রাসমান। পশ্চিম পাকিস্তানও আয়তনে আরো ক্ষুদ্র ও আর্থিকভাবে দরিদ্র হয়ে পড়বে। যদিও সেখানে প্রাথমিকভাবে পোশাকশিল্পের একটি সম্ভাবনাময় খাত তৈরির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

 

এই দুর্ভাগ্যজনক বিচ্ছেদ থেকে যদি কেউ লাভবান হয়, তবে সেটি হবে ভারত। কেননা, দেশটিকে এখন অপেক্ষাকৃত দুর্বল প্রতিপক্ষের সম্মুখীন হতে হবে। মুজিব ইতিমধ্যে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে তিনি দিল্লী এবং সীমান্তের ওপারের হিন্দু বাঙ্গালীদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করবেন। কাশ্মীরকে কেন্দ্র করে পশ্চিম পাকিস্তানের ভারতের প্রতি যে বৈরী মনোভাব , শেখ মুজিব তা ধারন করেন না। পূর্ব পাকিস্তান থেকে আয়কৃত বৈদেশিক মুদ্রা ছাড়া, অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র অর্থনৈতিক ভিত নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের পক্ষে একটি শক্তিশালী সেনাবাহিনী পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়বে। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী অত্যন্ত শক্তিশালি হওয়ার কারনে এতদিন পর্যন্ত ভারত তাদের প্রতিবেশীকে সঙ্ঘাতের সময় সমুচিত জবাব দিতে পারেনি। অবশ্য, ভারত নিজেও তাদের আদিবাসী বিচ্ছিন্নতাবাদি দলগুলোকে ছেড়ে কথা বলেনা, অনেক ভারতীয়র স্মৃতিতে নেতা নেহরু আজো বারবার ফিরে আসেন দুঃস্বপ্ন হয়ে। রাজনৈতিকভাবে একসময় যারা ঐক্যভুত ছিল, একসময় তারাই ব্যবধান আর শত্রুতার ফলে একে অপরের সাথে লিপ্ত হল রক্তাক্ত সঙ্ঘাতে, আর সেই পরিবর্তন বদলে দিল গোটা উপমহাদেশটাকেই।

 

 

হাত তোল, যোগ দাও আমার সাথে

 

গত সপ্তাহে শেখ মুজিবর (মুজিব) রহমানকে গ্রেফতার করে পশ্চিম পাকিস্তানি সেনারা তাকে এমন এক রেকর্ড করার সুযোগ করে দিয়েছেন, যা পৃথিবীর কোন মানুষ কোনদিন ভাংতে চাইবে না। ৯ বছর ৮ মাস সময় জেলে কাটিয়েছেন মুজিব, পাকিস্তানের অন্য যেকোন প্রসিদ্ধ রাজনৈতিক নেতাদের কারাবাসের তুলনায় অনেক বেশি।

 

পশ্চিম পাকিস্তানিরা শেখ মুজিবের প্রতি এত বিদ্বেষ পোষণ করার মুল কারন, প্রায় ২৩ বছরেরও বেশি সময় ধরে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য তিনি পূর্বদেশ (আঞ্চলিক স্বায়ত্বশাসন) প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন। গত ডিসেম্বর নির্বাচনী প্রচারনায়, এই পূর্বদেশই ছিল মুজিবের প্রচারনার মুল বিষয়। নির্বাচন শুরু হওয়ার ঠিক পূর্বেই তিনি জলোচ্ছাসে ক্ষতিগ্রস্ত উপকূলীয় এলাকা পরিদর্শনে যান। সেখানে যেয়ে তিনি বক্তৃতায় বলেন- “ যদি নির্বাচনে আমরা হেরে যাই, তবে এই লক্ষ মানুষের কাছে আমাদের দায় থেকে যাবে। জলোচ্ছাসের আঘাতে নিহত এই মানুষগুলোর জীবন বিসর্জন বৃথা যাবেনা। এই লক্ষ মানুষের সর্বচ্চো আত্মত্যাগ আরো লক্ষ বাঙ্গালীর স্বাধীনতার অধিকার আদায়ের দাবিতে শক্তি যোগাবে”।

 

বাঙ্গালীদের তুলনায় লম্বা (৬ ফুট), গাঁট্টাগোট্টা শরীর, মাথাভর্তি পাকা চুলের মুজিবকে সবসময় দেখা যায় ঢিলেঢালা পাঞ্জাবির সাথে একটি কালো হাতকাটা কোর্ট পরিহিত অবস্থায়। একজন গম্ভীর মানুষ, বাঙ্গালীদের তিনি নিজের সন্তানের মতই ধমকান। ৫১ বছর আগে, পূর্ববাংলার টুঙ্গিপাড়ার এক মধ্যবিত্ত গৃহস্থ পরিবারে তার জন্ম (গৃহস্থের পদমর্যাদার কারনেই শেখ পদবী দেয়া হয়)। মুজিব কলকাতা ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ে কলা বিষয়ে অধ্যয়ন করেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে পড়াশোনা করেন। ধানমন্ডির অভিজাত এলাকায় অবস্থিত তার দোতলা বাড়িটি বেশ অনাড়ম্বর হলেও ছিমছাম। এবাড়িতেই স্ত্রী ফজিলাতুন্নেসা, তিন ছেলে ও দুই মেয়ে নিয়ে তার বসবাস। মাত্র সামান্য কিছুদিন বীমাকর্মকর্তা হিসেবে চাকরি করলেও, তার জীবনের বেশির ভাগ সময় তিনি রাজনিতীকেই উৎসর্গ করেছেন। প্রথমে তিনি ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে সম্পৃক্ত ছিলেন। ১৯৪৭ এর দেশবিভাগের পর তিনি পূর্ব পাকিস্তানের উপর চালানো পশ্চিম পাকিস্তানিদের প্রতিটি শোষণের প্রতিবাদ করেছেন প্রচন্ড কড়া ভাষায়। তিনি তার সমরথকদের উদ্দেশ্যে বলেন- “ভাইয়েরা আমার, তোমরা কি জানো করাচি শহরের প্রতিটি রাস্তা সোনা দিয়ে মোড়া? তোমরা কি সেই লুট হয়ে যাওয়া সোনা ফিরিয়ে আনতে চাওনা? তবে হাত তোল, হাত তোল, যোগ দাও আমার সাথে। পাকিস্তানের জনক মোহাম্মদ আলি জিন্নাহর উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণার প্রতিবাদে গড়ে ওঠা ছাত্রআন্দোলনে যোগ দিয়ে প্রথমবারের মত তিনি গ্রেফতার হন ১৯৪৮ সালে।

 

এখনও পর্যন্ত, অনেকক্ষেত্রেই, তিনি রাজনৈতিকভাবে মধ্যপন্থী হিসেবে রয়ে গেছেন। তিনি একজন সামাজিক গণতন্ত্রবাদী, যিনি বড় বড় শিল্পকারখানা, ব্যাংক এবং বীমা প্রতিষ্ঠান ইত্যাদির রাষ্ট্রায়ত্তকরনে বিশ্বাসী করেন। এমনকি বৈদেশিক মুদ্রার নীতিতেও তিনি মধ্যপন্থাই অবলম্বন করেন। যেখানে পশ্চিম পাকিস্তানের জুলফিকার আলী ভুট্টো গণচীন ও সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে আন্তরিক সম্পর্ক বজায় রাখেন এবং কঠোরভাবে ভারত-বিরোধিতা করেন, সেখানে মুজিব ভারতের সাথে বানিজ্যে আগ্রহী এবং কিছুটা পশ্চিমা ধ্যানধারনার বাহক হিসেবেই পরিচিত।

 

 

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
বাংলায় রক্তবন্যা নিউইয়র্ক টাইমস ৭ এপ্রিল ১৯৭১

 

 

Razibul Bari Palash

<১৪, ১৬, ৩৮>

 

নিউ ইয়র্ক টাইমস. ৭ এপ্রিল, ১৯৭১

বাংলায় রক্তগঙ্গা

 

 

পাকিস্তানের সাম্প্রতিক ঘটনা উপর ওয়াশিংটনের নীরবতা ক্রমাগত স্পষ্ট হচ্ছে। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বেসামরিক নাগরিকদের নির্বিচারে হত্যা করছে এবং পূর্ববাংলার বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতৃত্ব কে দমন করছে।

 

পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র গতকাল স্বীকার করে যে, “যদি আমেরিকান অস্ত্র এই পরিস্থিতিতে ব্যবহার করা হয় তবে আমরা উদ্বিগ্ন হব।” কিন্তু তিনি জোর দেন যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এখানকার পরিস্থিতি সম্পর্কে সরাসরি জ্ঞান নেই। এটা একটা কুতর্ক। শুধু গত মাসে তারা তাদের বার্ষিক পররাষ্ট্রনীতির রিপোর্টে বলেন তারা পাকিস্তানে অতিরিক্ত অস্ত্র সরঞ্জাম বিক্রি করতে রাজি হয়েছে শুধুমাত্র “তাদের সুসজ্জিত সেনাবাহিনীর জন্য।”

 

যে কোনো ভিত্তিতেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলায় রক্তগঙ্গার বিরুদ্ধে কথা বলবে যেমনটা সোভিয়েত ইউনিয়ন ইতিমধ্যে বলেছে। পাকিস্তানের প্রধান অস্ত্র সরবরাহকারী হিসেবে ওয়াশিংটনের উচিৎ বর্তমানে ব্যাবহ্রিত কৌশলকে অসমর্থন ঘোষণা করা এবং একথা স্পষ্ট করা যে যতক্ষণ পুর্ব পাকিস্তানের নিপীড়ন বন্ধ না হবে ততক্ষণ কোন অতিরিক্ত অস্ত্র বা খুচরা যন্ত্রাংশ পাকিস্তানে পাঠানো হবে না। তাদের ডবল বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

 

অ্যামেরিকার উচিৎ এখানকার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বন্ধ করার জন্য যা কিছু করা সম্ভব সেটা করা। তা না হলে ভারতীয় উপমহাদেশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে এবং তার ভয়াবহ প্রভাব আন্তর্জাতিকভাবেও পড়বে।

 

 

 

 

 

৩৯

 

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
১৭। দেশত্যাগীদের মতে ভয়ঙ্কর যুদ্ধ চলছে নিউইয়র্ক টাইমস ৭ এপ্রিল, ১৯৭১

 

ঐন্দ্রিলা অনু

<১৪, ১৭, ৩৯৪১>

 

নিউইয়র্ক টাইমস, ৭ এপ্রিল, ১৯৭১

দেশত্যাগীদের মতে ভয়ঙ্কর যুদ্ধ চলছে

  • সিডনী এইচ শ্যানবার্গ

 

 

একশোরও বেশি বিদেশি উদ্বাস্তু আজকে চট্টগ্রাম থেকে ৩৪ ঘন্টার সমুদ্রযাত্রা করে কলকাতা পৌঁছেছে, সেইসাথে পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান এই বন্দর থেকে পাকিস্তানি আর্মির স্বাধীনতা আন্দোলন দমন করার ব্যাপারে সর্বশেষ প্রত্যক্ষদর্শীর রিপোর্ট সংগ্রহ করা গেছে।

 

ডাচ ছাত্র জন মার্টিনুসেন বলেছে, “এটা একটা অবৈধ হত্যাকান্ড”।

 

আমেরিকার নিউইয়র্কের নিউ রোচেলের বাসিন্দা নিল ওটুল বলেন, “আমরা আর্মিদেরকে সাধারণ জনগণের উপর গুলি চালাতে দেখেছি। আমি বেশি কিছু বলতে চাইনা কারন তাহলে হয়তো আমাদের সংগঠন প্রতিহিংসার শিকার হতে পারে”। তার সংগঠনের নাম প্রকাশ না করতে অনুরোধ করেছেন তিনি।

 

যুদ্ধের কারনে চট্টগ্রাম বন্দরে আটকে থাকা একটি ব্রিটিশ জাহাজ আজ বিকেলে কলকাতা বন্দরে ১১৯ জন বিদেশি নিয়ে পৌঁছেছে, যেখানে প্রায় ১৭ টি ভিন্ন দেশের মানুষ ছিল। সবচেয়ে বেশি সংখ্যক ছিল ৩৭ জন আমেরিকান এবন ৩৩ জন ব্রিটিশ।

 

ক্ল্যান ম্যাক নায়ার জাহাজটি থেকে যখন তারা নেমে আসে তখন তাদের সাথে দেখা করতে আসে

তাদের দেশের কূটনৈতিক কর্মকর্তারা এবং কিছু ভারতীয় ও বিদেশি সাংবাদিক।

 

যদিও কিছু উদ্বাস্তু কথা বলতে নারাজ ছিল তবে বাকিরা পূর্ব পাকিস্তানের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর চট্টগ্রামের এক ভয়ানক চেহারা তুলে ধরে। এখন পর্যন্ত খুব কমই জানা গেছে যে কিভাবে ৪ লক্ষ জনগণের সেই শহরে যুদ্ধ চলছে।

 

বিদেশিরা বলে যে, যুদ্ধ শুরুর কিছুদিন পর পাকিস্তানি সৈন্যরা পূর্ব পাকিস্তানের সকল প্রতিরোধ শক্তি শহর থেকে বের করে দেয়।

 

কিন্তু তারা এও বলেছে যে, আর্মির ক্ষমতা শহরের বাইরে কর্ণফুলী নদীর তীরে ৫ মাইল পর্যন্ত সীমাবদ্ধ।

নদীর দক্ষিণে সব ধরণের ক্ষমতা স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশ নেয়া মুক্তিবাহিনীর হাতে যা সাধারণ জনগণ, পূর্ব পাকিস্তান পুলিশ, ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস এবং ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট নিয়ে গঠিত।

বিদেশিরা বলে যে, গতকাল সকালে যখন তারা কলকাতার উদ্দেশ্যে আসছিল তখনও তারা শহরের আশেপাশে গোলাগুলির আওয়াজ শুনেছে। তারা বলে যে, শহরের বেশিরভাগ বাসিন্দাই শহর ছেড়ে গ্রামাঞ্চলের দিকে পালিয়ে গেছে।

 

আর্মীরা বস্তি পুড়িয়ে দিয়েছে

 

বিদেশিরা বলে, ২৬ মার্চ শুক্রবার ভোরের দিকে সহসা যখন শহরে যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছিল, তখন আর্মিরা স্বাধীনতাকামী হতদরিদ্রদের বস্তিগুলো পুড়িয়ে দেয়। তারা বলে যে, গতকাল সকালে যখন তাদেরকে মিলিটারি পাহারায় বন্দরে নিয়ে আসা হচ্ছিল, তখনও তারা ওইসব এলাকায় বাঁশের কুঁড়েঘরগুলো থেকে আগুন জ্বলতে দেখেছে।

 

পাকিস্তান সরকারের পক্ষে কথা বলা, পাকিস্তান রেডিও দাবী করে যে, পূর্ব পাকিস্তান শান্ত আছে এবং জীবনযাত্রা স্বাভাবিক পর্যায়ে আছে।

 

ডেনমার্কের আরহুস ইউনিভার্সিটিতে মাস্টার্সে অধ্যয়নরত মিঃ মার্টিনুসেন তার স্ত্রী কারেনকে সহ পাকিস্তানের রাজনীতি নিয়ে পড়াশুনা করতে ৭ মাস আগে চট্টগ্রাম এসেছিলেন। তিনি বলেন যে, “কোনকিছুই ঠিক নেই এবং কোনকিছুই আর আগের মতো ফিরে আসেনি। তারা পরিকল্পিতভাবে দরিদ্রদের এলাকাগুলো পুড়িয়ে দিয়েছে কারন তারা হয়তো ভেবেছে তাদেরকে একসাথে সবাইকে খুঁজে বের করা কঠিন হবে। তাদেরকে এই হত্যাযজ্ঞ ও ধ্বংসযজ্ঞ উপভোগ করতে দেখা গেছে”।

 

২৩ বছর বয়সী এই শিক্ষার্থী জানায়, “অনেক বাঙালিকে হত্যা করা হয়েছে। মাত্র ৪ দিন আগেই নদীতে প্রায় ৪০০ মৃতদেহ ভাসতে দেখা গেছে”।

 

মিঃ মার্টিনুসেন যিনি বাংলার রাস্তায়, দোকানে অসংখ্য মানুষকে গুলি করে হত্যা করতে দেখেছেন তিনি পূর্ব পাকিস্তানের বিজয়ের ব্যাপারে ভবিষ্যৎবাণী করেন, যারা অনেকদিন ধরে পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে আসছিল।

 

স্বাধীনতা আন্দোলন

 

পাতলা গড়নের এই ছাত্রটি বলে, “অসংখ্য বাঙালি তাদের বাংলাদেশ চায় এবং আমি নিশ্চিত যে তারা এটা পাবেই”।

 

বাঙালি জাতির জন্য বাংলাদেশ হল বাঙলা। এটা তাদের পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা আন্দোলনের নাম।

 

২৬ বছর বয়সী মিঃ ওটুল এর মুখেও একই কথা শোনা যায়। তিনি বলেন, “চট্টগ্রাম এখন পাকিস্তান আর্মির দখলে। এটা এখন বর্বর নরপশু ও সন্ত্রাসীদের দখলে। আর্মিদের সংখ্যা আরও বেড়েই চলেছে। তারা সাধারণ জনগণের উপর গুলি চালাচ্ছে। আমরা অনেক মৃতদেহ দেখেছি। আমরা লাশের গন্ধ পেয়েছি। তারা সবাইকে অনেক হয়রানি ও মারধর করছিল। বহিরাগতরা নির্বিচারে লুটপাট করছিল এবং আগুন জ্বালিয়ে দিচ্ছিল।

 

প্রতিশোধের রিপোর্ট

 

“বহিরাগত” বলতে কি বুঝিয়েছেন সেটা খুলে বলেননি মিঃ ওটুল কিন্তু নিঃসন্দেহে তিনি পূর্ব পাকিস্তানের অবস্থানরত পশ্চিম পাকিস্তানিদেরকেই বুঝিয়েছেন।

 

অন্যান্য শরণার্থীরা জানিয়েছে যে, কিছু কিছু বাঙালি অবাঙালি ব্যবসায়ীদেরকে হত্যা করে প্রতিশোধ

নিয়েছে।

 

বিদেশিরা জানিয়েছে যে, চট্টগ্রামে সন্ধ্যা ৭ টা থেকে ভোর ৫ টা পর্যন্ত কার্ফিউ জারি হয়েছে, ৩ দিনের জন্য বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে তবে শহরের কিছু এলাকায় পুনরায় সংযোগ দেয়া হয়েছে এবং বন্দরে কোন বাঙালি কর্মচারি না থাকায় সেটি আপাতত বন্ধ আছে।

 

দুর্বিষহ যুদ্ধের কারনে কিছু উদ্বাস্তু তাদের বাড়িঘর ছেড়ে মূল যুদ্ধক্ষেত্র থেকে দূরে হোটেল আগ্রাবাদে আশ্রয় নিয়েছে।

 

তারা জানিয়েছে যে, তারা বাইরে থাকা অবস্থায় সৈন্যরা তাদের বাড়িতে হানা দিয়েছিল।

আমেরিকার নিউইয়র্কের মন্ট্রোসের ইঞ্জিনিয়ার এডওয়ার্ড জে. ম্যাকমানুস ব্যঙ্গ করে বলেন, পাকিস্তানি সেনারা খুবই ভদ্র। তারা আমার সব হুইস্কি শেষ করে ফেলেছে, কিন্তু আমার গ্লাসগুলো তারা ফেরত দিয়েছে, বেশ ভদ্র”।

 

 

 

 

 

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
১৮। আমরা সবাই বাঙ্গালী দি নিউইয়র্ক টাইমস ১১ এপ্রিল ১৮৭১

 

Razibul Bari Palash

<১৪, ১৮, ৪২৪৩>

 

নিউ ইয়র্ক টাইমস, রবিবার, ১১ এপ্রিল ১৯৭১

আমরা সকলে বাঙালি

 

এজেন্স ফ্রান্স- একজন প্রেসে সংবাদদাতা যিনি গত সপ্তাহে পূর্ব পাকিস্তানে গিয়েছিলেন তিনি নিম্নলিখিত লেখাটা লিখেছিলেন।

 

কলকাতার বর্ডার পেরুলেই “বাংলাদেশ” । “বাঙ্গালী জাতী’’ – পূর্ব পাকিস্তান হিসাবে পরিচিত । সেখানে প্রবেশ করলে দেখবেন হয় পুরনো দিনের কোন চিত্রায়িত দৃশ্য দেখছেন। বিপ্লবীদের হাতে প্রাচীন অস্ত্র, এবং গ্যারান্ড রাইফেল, শরণার্থী বোঝাই ট্রলি, পথের পাশে পড়ে থাকা লাশ – যেন স্পেনীয় গৃহযুদ্ধ বা চীনা বিপ্লব।

 

এক ডজন “মুক্তিযোদ্ধা” এবং দুই বা তিনটি রাইফেল নিয়ে একটি “লিবারেশন আর্মি” লরি যশোরের পথে যাচ্ছে – ভারতীয় সীমান্ত থেকে ৩০ মাইল দূরে, রক্তাক্ত যুদ্ধে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী থেকে ফিরে আসছে তারা। যশোর প্রবেশ করার আগে আপনি বিভিন্ন গ্রাম দেখবেন ভাঙ্গাচোরা। লাশের ধ্বংসাবশেষ। যশোরের এইসব ধ্বংসাবশেষ দেখলে বুঝবেন পশ্চিম পাকিস্তানী বিমান বাহিনী কোন সতর্কতা অবলম্বন করেনি আক্রমণের সময়।

 

মাত্র কয়েক মাস পূর্বেই, পূর্ব পাকিস্তানে জনগণ “নোংরা ও উদ্ধত হিন্দু” সাংবাদিকদের কাছে যেতে অসন্তোষ প্রকাশ করতো। এখন তারা বলছে, “হিন্দু, মোসলেম, কোনো বিষয় না। আমরা সব বাঙালি।” শত্রু এখন ‘পাঞ্জাবি’, পশ্চিম পাকিস্তানীদের ডাকার জন্য সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত নাম।

 

গ্রাম গ্রামে স্লোগান চলছে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উধৃতি, প্রাক পার্টিশন ভারতের মহান কবি , মাওসেতুঙ এর বানি ‘ ‘’ জনতার সংগ্রাম দীর্ঘজীবী হউক।’’ “রাজনৈতিক ক্ষমতা বন্দুকের নল থেকে বেড়িয়ে আসে.” মাওবাদীরা পূর্ব পাকিস্তানে তিন সংগঠিত গ্রুপ এর একটি। তারা এখনও শেখ মুজিবের দুই প্রভাবশালী গ্রুপ-আওয়ামী লীগ ও বাঙালি সেনাবাহিনীর ২৫০০০ লোকের থেকে অনেক ক্ষুদ্র । কিন্তু তাদের শক্তি বাড়ছে। শেখ মুজিব, যিনি অতিশয় জনপ্রিয় (এবং সহিংসতার বিরুদ্ধে তাঁর বিরোধিতার জন্য পরিচিত) হয় মৃত বা জেলে আছেন ।

 

 

কিভাবে এটা শুরু হল?

 

কেউই ভাবেনি যে এমন অবস্থা হবে। গরিব জনগোষ্ঠীকে অন্য রা এভাবে হত্যা করবে যাদের সাথে ২০ বছর ধরে অবস্থান এবং একই ধর্ম ও জাতীয়তার লোক। চুয়াডাঙ্গা, ভারত সীমান্ত থেকে ২০ মাইল দূরে – সেটাকে “বাংলাদেশের অস্থায়ী রাজধানী করা হয়েছে। মেজর. এম এ ওসমানীকে দক্ষিণ-পশ্চিম সাব সেক্টর এর কমান্ডার একথা আমাদের জানান।

 

২৪ মার্চ রাতে যখন ‘পাঞ্জাবি’ সেনাবাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ে মেজর ওসমান তখন তার পাঞ্জাবি কমান্ডিং অফিসার মেজর আতিকের সাথে আলোচনা করছিলেন। “তিনি অত্যন্ত ভদ্র ছিলেন এবং আমাকে আমার জীপ্, আমার বন্দুক এবং আমার ড্রাইভারের রাখতে দিলেন। ‘’ পরের দিন শেখ মুজিব বাঙালির কাছে মুক্তির ড্যাক দিলেন এবং আতিক শাহ কে গ্রেফতার করা হল এবং হত্যা করা হল।

 

কি হবে এই দুঃখজনক নতুন শত্রুতা করে? অদূরদর্শী স্বায়ত্তশাসনের পরিণতি কি? পাকিস্তান এর থেকে কি সুবিধা অর্জন করবে? ডঃ হক, মেজর ওসমানের রাজনৈতিক ডেপুটি, একটি সবুজ সমভ্রেরো ছিল, সাথে ২ টি ৪৫ ক্যালিবার বন্দুক এবং প্রায় বিপ্লবী নেতার নিখুঁত ক্যারিক্যাচার, শ্মশ্রুধারী এই মানুষটি বললেন উত্তর “খুব সহজ”।

 

তিনি বলেন, এদেশে ৭২ মিলিয়ন মানুষ। এত মানুষের ভেতরেরও এখানে পাকিস্তানী পকেট আছে। যেহেতু এখানে অনুর্ধ ১০০০০০ পাকসেনা আছে জিততে হলে প্রত্যক্টা সৈন্যকে ১০০০ বাঙ্গালী মারতে হবে। যা একেবারেই অসম্ভব। অতএব জয় সুনিশ্চিত।

 

– জিন ভিনসেন্ট

 

 

 

 

 

 

 

শিরনাম সূত্র তারিখ
১৯। প্রথম রাউন্ডে পাকিস্তানের বিজয় টাইম ১২ এপ্রিল, ১৯৭১

 

ঐন্দ্রিলা অনু

<১৪, ১৯, ৪৪-৪৫>

 

টাইম ম্যাগাজিন, ১২ এপ্রিল, ১৯৭১

প্রথম রাউন্ডে পাকিস্তানের বিজয়

 

গত সপ্তাহে পূর্ব পাকিস্তানে একজন বিদেশি কূটনীতিক বলেছে, “কোন সন্দেহ নেই যে এটা একটা হত্যাকান্ড” । আরেকজন পশ্চিম পাকিস্তানি কর্মকর্তা বলেছেন, “এটাকে যথার্থই রক্তগঙ্গা বলা যায়। পাকিস্তানি সেনারা একদম নির্দয়ের মত আচরণ করছে” ।

 

পাকিস্তানের বেসামরিক যুদ্ধের প্রথম রাউন্ড গত সপ্তাহে শেষ হয়েছে এবং এতে জয়ী ছিল পশ্চিম পাকিস্তান, যাদের ৮০ হাজার পাঞ্জাব সৈন্য আছে যারা বিদ্রোহী পূর্ব পাকিস্তানে দায়িত্বরত আছে । পূর্ব পাকিস্তান থেকে কূটনীতিক, উদ্বাস্তু ও গুপ্তচরদের মাধ্যমে আসা খবরগুলো অনেক ভিন্নভাবে প্রচার হচ্ছে । প্রায় ৩ লাখেরও বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়েছে তবে পাকিস্তান সরকারের মতে এ সংখ্যা মাত্র ১০ থেকে ১৫ হাজারের মত এবং সেই হাজার হাজার বিধ্বস্ত মানুষেরা ছাড়া কেউ এটা নিশ্চিতভাবে বলতে পারবে না ।

 

গণকবর

 

 

 

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ

২০। পাকিস্তানঃ একটি আদর্শের মৃত্যু

 

নিউ ইয়র্ক উইক ১২ এপ্রিল, ১৯৭১

 

Raisa Sabila

<১৪, ২০, ৪৬৪৯>

 

পাকিস্তানঃ একটি আদর্শের মৃত্যু

সুত্রঃ নিউ ইয়র্ক উইক

তাঃ ১২ এপ্রিল, ১৯৭১

নিউজ উইক

 

তাদের অবাধ্যতা ছিল দীর্ঘ সময়ের, অস্ত্র ছিল সামান্যই, যেন একদল ক্রিশকায় অদক্ষ কৃষকের দলে যাদের মুল অস্ত্র বলতে কোদাল, গাইতি আর বাশের লাঠি। কিন্তু তারা দাবী করেছে যে পূর্ব পাকিস্তানের একটি শহর যশোরের দুই মাইল উত্তর-পশ্চিমাংশে অবস্থিত ক্যান্টনমেন্টে ১০০০ এরো বেশি পাকিস্তানি সেনাদের ঘেরাও করেছে। এখন তারা শপথ করেছে যে পাকিস্তান থেকে আগত এই পাঞ্জাবি সৈন্যরা অনাহারে মৃত্যুবরণ করার আগে তারা এই অবরোধ তুলে নেবেনা। একজন বিদ্রোহী প্রচন্ড উৎসাহ নিয়ে নিউস উইক প্রতিনিধি টনি ক্লিফটনকে বলেন- “আমরা সৈন্যদের ঘেরাও করে রেখেছি, এবং তারা খাবার সংগ্রহ করার জন্য বের হতে পারবে না। এই হতভাগারা অনাহারে আছে এবং অবশ্যই এভাবে তারা মারা যাবে, তাদের মরতেই হবে।”

এই ক্রোধ আর ঘৃণায় জর্জরিত পূর্ব পাকিস্তানের রুপ আমাদের সামনে আসে গত সপ্তাহে যখন ক্লিফটন ভারতীয় সীমান্ত পার হয়ে একদিনের জন্য ওপারে যান এবং সীমান্তের নিকটবর্তী কিছু গ্রাম ঘুরে আসেন। তা নাহলে, পাকিস্তানের এই গৃহযুদ্ধর সকল খবর প্রকাশনা্র উপর কঠিন নিষেধাজ্ঞা আরোপিত আছে, গোটা পূর্ব পাকিস্তান বিষয়ক সংবাদ প্রকাশনাই কঠিন প্রহরাধীন, সকল বিদেশী সাংবাদিকদের সেখানে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তার উপর বিভ্রান্তিমুলক বা অনিশ্চিত সুত্র থেকে আসা গুজবে প্রতিবেশী দেশ ভারত ও ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠছে, ফলে সেখান থেকেও যোগাযোগ রক্ষা করা কঠিন করে তুলেছে।

 

সকল দিক থেকেই বিদেশী রাষ্ট্রসমুহগুলো এধরনের সমস্যার সম্মুখিন হচ্ছে পূর্ব পাকিস্তানের উপর নিরভরযোগ্য সংবাদ যোগার করার ক্ষেত্রে। ওয়াশিংটন থেকে সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি জানান যে তার রিফিউজি সাবকমিটির প্রাপ্ত রিপোরটে নির্বিচারে হত্যা, রাজনৈতিক নেতাদের হত্যা, হাজার হাজার ছাত্র ও সাধারন মানুষের কষ্ট ও প্রতি ঘন্টায় মৃতের সংখ্যা কেবল বেড়ে যাওয়ার তথ্য আছে। যদিও, কেনেডি তাদের খবরের উৎস নিশ্চিত করেননি। স্টেট ডিপার্টমেন্ট এর মুখপাত্র রবার্ট জে ম্যাকক্লস্কি একথা অস্বীকার করছেন যে নিক্সন প্রশাসন ঢাকার রিপোর্ট চেপে যাচ্ছে এবং ঘোষণা দিয়েছেন যে এরকম পরিস্থিতিতে ঘটনাসমুহ ও তাদের ফলাফল এর নিশ্চয়তা নিরুপন করা অসম্ভব। তার উপর সপ্তাহান্তে, যুক্তরাষ্ট্রীয় সকল কুটনৈতিক কর্মকর্তাদের পূর্ব পাকিস্তান থেকে সরিয়ে আনতে যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকার পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্সের নিচ্ছে।

 

 

 

প্রতিবাদঃ

 

যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তান এর বিষয়ে কোন ভ্রুক্ষেপ করছেনা, অথচ এমন নির্লিপ্ততা ভারতের নেই। তাদের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী পূর্ব বাংলার উপর আর্মিদের এরুপ অত্যাচারকে “গনহত্যার পর্যায়ের নিয়মতান্ত্রিক ধ্বংসলীলা” বলে নিন্দা জানিয়েছেন। দিনের পর দিন একেকটি উত্তেজনাপূর্ণ শিরোনামে পূর্ণ ভারতের সংবাদপত্রগুলো, তাদের প্রথম পাতার মুল সংবাদের বিষয়বস্তু এখন ভয়ংকর যুদ্ধ আর সেনাবাহিনীর রক্তপাত আর অরাজকতার খবর। আবার এদিকে ইসলামাবাদ প্রশাসন ভারত সরকার ও তার সংবাদপত্রগুলোকে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন সংবাদ ছড়ানোর অভিযোগে অভিযুক্ত করছে। গত সপ্তাহে দুই দেশের কর্মকর্তাগণ পাল্টাপাল্টি প্রতিবাদ জানানোতে মনে হচ্ছে এই দুই দেশের মধ্যকার বৈরিতা আবারো নতুন করে সঞ্চালিত হবে।

 

যদি ভারতের প্রতিবেদন অনুযায়ী পূর্ব পাকিস্তানে ৭,০০,০০০ লক্ষ মানুষ আক্রান্ত হবার খবর অত্যুক্তি মনে হয় তবে পশ্চিম পাকিস্তানের এই দাবী যেখানে বলা হয়েছে পূর্ব পাকিস্তানের সর্বত্র সবকিছু ভালভাবে চলছে ও শান্তি বিরাজ করছে, সেটিও একিরকম্ভাবে অসম্ভব। যেসব টুক্রো খবর আমাদের কাছে এসে পৌছেছে তাতে মনে হচ্ছে মুল শহরগুলোতে সেনাবাহিনীর আধিপত্যই প্রকট হলেও গ্রামাঞ্চলগুলো তা একিরকম নয়। সেনাদল ক্যান্টন্মেন্ট থেকে হামলা চালাতে পারে, এবং তারা সেটি করেও যেহেতু তাদের প্রচুর মজুদ অস্ত্র রয়েছে। ক্লিফটনের প্রতিবেদন অনুযায়ী- তবুও তারা তাদের সেনানিবাসের বেশি দূরে যায়না বা বাইরে বেশি সময় কাটায়না, এবং অবশ্যই অন্ধকার হবার পূর্বে ফিরে যায়, নতুবা গুপ্ত হামলার স্বীকার হওয়ার ভয় খুব বেশি। তাদের উদ্দেশ্য থাকে ঝটিকা হামলা চালিয়ে লোকজনদের আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করানো, যদিও তারা এই অবস্থানে কতদিন থাকতে পারবে, তা নিশ্চিত নয়। কারন শীঘ্রই বর্ষাকাল শুরু হবে আর রাস্তাঘাটে চলাচল করা অসম্ভব হয়ে পরবে।

 

ধ্যানমগ্ন

 

পূর্ব পাকিস্তানের এই গনবিরোধের হাওয়া ১০০০ মাইল দূরে ভারত সীমান্তের ওপারে অবস্থিত পশ্চিম পাকিস্তানে খুব সামান্যই লেগেছে বলে মনে হয়। নিউস উইক পত্রিকার মিলান জে কুবিক এর মত অনুযায়ী সেখানকার মানুষের জীবনযাত্রা খুবি স্বাভাবিকভাবে চলছে। কিন্তু একি সাথে কুবিক এর মনে হয়েছে বুদ্ধিজিবী ও রাজনিতিবিদগন ২৩ বছর আগে স্থাপিত এই রাষট্রের ভিত্তির পতন আসন্ন দেখে চিন্তিত হয়ে পড়েছেন। লাহোরের একজন কুটনৈতিক দুঃখের সাথে বলেন- “ আমরা যখন এই দেশটি গড়ে তুলেছিলাম, তখন ভারত উপমহাদেশ ছেড়ে আসার ক্ষেত্রে একমাত্র বিষয় ছিল এমন একটি দেশ গড়ে তোলা যেখানে সকল মুসলিম একসাথে স্বাধীনভাবে ও সমান অধিকার নিয়ে বেচে থাকবে। এখন সেই আদর্শের মৃত্যু ঘটেছে এবং যে পাকিস্তানের বীজ আমরা বপন করেছিলাম তাও ধুলিস্যাত হয়ে গেছে’।

 

একটি জাতির জেগে ওঠা

 

গত মাসের শেষ দিকে, যখন পশ্চিম পাকিস্তানে গন্ডগোল প্রচন্ড পরিমানে বেড়ে যায়, নিউস উইকের সাংবাদিক লরেন জেঙ্কিন্স বাঙ্গালীদের স্বাধীনতার এ সংগ্রামের খবর সংগ্রহ করতে সেখানে যান। সেখানে গ্রিহ যুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছিল, এবং পাকিস্তানি আর্মি পুরা এলাকাতেই কঠোর প্রহরা মোতায়েন করেছিল। জেঙ্কিন্সসহ সকল বিদেশী সাংবাদিকদেরই তখন সেখান থেকে বের করে দেয়া হয়। গত সপ্তাহে বৈরুতে ফেরত যাওয়ার পূর্বে জেঙ্কিন্স তার ব্যক্তিগত প্রতিবেদনে পূর্ব পাকিস্তানের করুন পরিনতির কথা এভাবে ব্যক্ত করেনঃ

 

‘তপ্ত সুরযের নিচে তিনি দাঁড়িয়ে ছিলেন, তার কপাল এবং মসৃণভাবে আচড়ানো চুলের গোড়া থেকে ফোটায় ফোটায় ঘাম ঝরে পরছিল, তার চোখ অনিদ্রায় লাল, কিন্তু তার চেহারা গর্ব এবং আশায় উজ্জল। মাত্র কিছুখন আগেই ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্রদের একটি মিছিল ধানমন্ডিতে অবস্থিত তার বাসভবনের সবুজ লোহার গেট দিয়ে ঘুরে তার বাগানে এসে দাড়িয়েছিল, এবং তার সমর্থনে আবেগমন্ডিত কণ্ঠে স্লোগান দিচ্ছিল “জয় বাংলা” বলে। এই ৫১ বছর বয়সী বর্ষীয়ান নেতা পূর্ব পাকিস্তানের সাড়ে সাত কোটি মানুষের নেতা। তার উদ্দিপনা এখন আকাশচুম্বী, মুজিব (যেভাবে স্থানীয়রা তাকে সম্বোধন করেন) আমাদের বিদেশী সাংবাদিক দলের দিকে এগিয়ে এলেন এবং তার বাগানে দাড়িয়েই উত্তেজিত স্বরে কথা বললেনঃ “ আমার জনগন ঐক্যবদ্ধ হয়েছে, তাদের থামানো যাবেনা। তোমাদের কি মনে হয় মেশিন গানের গুলিতে আমার লোকেরা তাদের মনোবল আর উৎসাহ হারাবে?

 

এই কথাগুলো উচ্চারন করার ঠিক ৩৬ ঘন্টা পর পাকিস্তানি আর্মি, বিশেষ করে পাঞ্জাবি আরমিরা এর নিষ্ঠুর প্রত্যুত্তর দিতে বাঙ্গালীদের উপর ঝাপিয়ে পরে, প্রচন্ড রক্তপাত এবং বিপুল অস্ত্র নিয়ে তারা নিরস্ত্র বাঙ্গালীর উপর ঝাপিয়ে পরে প্রথম বারের মতন জিতে যায়। এবং সেই সাথে মুজিবের ভাগ্য (তাকে নিয়ে নানারকম খবর আসছে, কেউ বলছেন তিনি আর্মিদের হাতে বন্দী আবার কেউ বলছেন তিনি আত্মগোপন করে আছেন) এবং সংক্ষেপে পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতার সংগ্রামের ভবিষ্যতকেও এক নিমিষে ধংশ করে দেয়। কিন্তু সেই অভিজ্ঞতা যেন বাংগালীর ঐক্যকে আরো মজবুতভাবে ঝালাই করে দিয়েছে এবং সেই সাথে সেনাদের জোরদখল নেয়ার পর একটি তিক্ত অসন্তুষ্ট মনোভাব বাঙ্গালীদের মধ্যে বেরেই যাচ্ছে। গত মাসে মুজিবের ভক্তরা বাংলাদেশ নিজেদের নাম পূর্ব পাকিস্তানি থেকে পরিবর্তন করে ‘বাঙালি’তে রুপান্তরিত করে, যার ফলে একদল পাঞ্জাবিদের হাতে ২৩ বছর ধরে শোষিত, অত্যাচারিত, বঞ্চিত, অপমানিত এই মানুষগুলো এক দারুন স্প্রিহায় জেগে উঠেছে।

 

একদিক থেকে দেখতে গেলে এই জাগরনের কৃতিত্ব কিছুটা ইয়াহিয়া খানের উপরেও বর্তায়, যিনি গত মাসে নিরধারিত নির্বাচন পরবরতী জাতীয় পরিশদের অধিবেশন রুখে দিয়ে এই ক্রোধের মুখোমুখি হলেন, সেই নির্বাচন যেখানে আওয়ামী লীগ বিপুল ভোটে জয়লাভ করেছে। পাঞ্জাবিদের প্রতিনিধি হয়ে ইয়াহিয়া যখন পূর্ব পাকিস্তানের এই স্বাধীনতার স্বপ্ন নস্যাত করতে উদ্যত হলেন, বাঙালি তকনি ফুসে উঠল, পুলিশের সাথে তাদের ঘন ঘন সংঘর্ষ বাধতে লাগ্ল, সর্বত্র একটি স্বাধীন রাষট্রের দাবী। এক রাতের মধ্যে পাক্সিতানের সবুজ সাদা পতাকা যেন ঢাকা থেকে অদ্রিশ্য হয়ে গেল আর সেখানে উঠল বাংলাদেশের পতাকা, গারো সবুজ রঙের জমিনের মাঝে একটি লাল ব্রিত্ত আর তার মাঝে পূর্ব পাকিস্তানের ম্যাপ এই পতাকার নকশা করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা।

 

সমঝোতা

 

পূর্ব পাকিস্তানের এই অনানুষ্ঠানিক সরকারের মুল কেন্দ্র মুজিবের বাড়িতেই, যেখানে এই নেতা পাইপ মুখে সকল দর্শনার্থীদের সঙ্গে তার অনাড়ম্বর বৈঠকখানায় দেখা করেন। অদ্ভুত বিষয় হল এই স্বাধীনতার ঘোর যখন ছড়িয়ে পরল গোটা বাংলাদেশে, তখন মুজিব উদ্যোগ নিলেন এ স্পৃহাকে নিয়ন্ত্রন করার। মুজিব এ বিষয়ে ওয়াকিবহাল ছিলেন যে কোন একতরফা স্বাধীনতার ঘোষণা করলেই সেনাবাহিনীর রোষ নেমে আসবে সাধারনের উপর। মুজিব চেয়েছিলেন এমন একটি সমঝোতায় আসতে যেখানে বাঙ্গালী তার আকাংখিত স্বায়ত্বশাসন অর্জন করবে, কিন্তু আর্মিদের কথা অনুসারে পাকিস্তানের অখন্ডতাও বিনষ্ট হবে না। যার ফলে, কিছু মানুষ প্রকাশ্যেই মত দিয়েছেন যে, পাকিস্তানের এই দুই দুরতম ও আলাদা দুইটি অঙ্গরাজ্যকে একত্রিত রাখার জন্য মুজিবই এখন শেষ আশা। কিন্তু, শেষপর্যন্ত পশ্চিম পাকিস্তানিদের উন্নাসিক আচরনে মুজিবের সকল চেষ্টাই ব্যর্থ হয়েছে, বিশেষ করে পাঞ্জাবি এবং পাঠানদের জন্য যাদের সংখ্যা সেনাবাহিনীতে অনেক বেশি এবং যাদের দেশপ্রেমের আবেগের কাছে বাংগালিরা অবজ্ঞার পাত্র হয়েই এসেছে। পশ্চিম পাকিস্তানিদের মতে মুজিব ও আওয়ামীলীগ দল প্রকাশ্যে রাজদ্রোহ করেছে, যদিও মুজিব হচ্ছেন দেশের সবেচেয়ে বেশি আসনে জেতা রাজনৈতিক দলটির নেতা। এই পশ্চিমাদের কাছে মুখ্য বিষয় ছিল পাকিস্তানের একতা ও অখন্ডতাকে ধরে রাখা। অবশ্যই এ বিষয়ে বিতর্ক আছে, তবে একতা অবশ্যই দেশের অর্থনৈতিক, কুটনৈতিক ও সেনাকল্যানে ভুমিকা রাখে। কিন্তু, এই ১০০০ মাইল দূরে অবস্থাঙ্কারী পাকিস্তানের দুই অঙ্গরাজ্যের মধ্যকার শত্রুতা এখন এমনি চরম আকারে পৌছে গেছে যে এখন একতা কেবলই অবাস্তব মনে হয়।

 

ত্রাশের রাজত্ব

 

আর্মিরা অতর্কিতেই আক্রমন চালায় বাঙ্গালীদের উপর। ট্রাকে ট্রাকে সৈন্য ঢাকার এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে পাড়ি দেয় রাতের অন্ধকারে, সর্বশক্তিতে তারা ঝাপিয়ে পরে বাঙ্গালীদের উপরে। ঘরে ঘরে মেশিন গানের গুলি ছোড়া হয়, কমান্ডারদের নির্দেশে ট্যাঙ্ক গোলাবর্ষণ করতে করতে রাস্তাগুলোতে টহল দিতে থাকে। পুরো ব্যাপারটাই ছিল একটি ভয়ানক ত্রাশ ও প্রতিহিংশার আক্রমন। এভাবে নিরস্ত্র মানুষের উপর এত গোলা বর্ষণ করার মত কোন কারন থাকার প্রশ্নই আসেনা। পৃথিবীর সবচাইতে দারিদ্র্যপিরীত এলাকার ভাঙ্গাচোরা বাড়ি ঘর এভাবে নিরদয় ভাবে পুড়িয়ে দেয়ার কোন কারন থাকতে পারে না।

 

এবং আমরা পাকিস্তানিদের অভিযুক্ত করা যায়, এমন অনেক কিছু দেখে ফেলেছিলাম। “তোমাদেরকে আধ ঘন্টার মধ্যে সব গুছিয়ে হোটেল ত্যাগ করতে হবে” এ নির্দেশটি আমাদের দেন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর জন সংযোগ বিষয়ক কর্মকর্তা, যেখানে ঢাকায় উপস্থিত সকল বিদেশী সাংবাদিক উপস্থিত ছিলেন। আমি তাদের প্রশ্ন করেছিলাম- “ আমাদের কি বের করে দেয়া হয়েছে’। তিনি আমাদের বলেন- “ আমি ঠিক এধরনের কোন শব্দ ব্যবহার করতে চাচ্ছিনা, কিন্তু আপনাদের চলে যেতে হবে’।

 

দুই ঘন্টা পরে আমাদেরকে চারটি আর্মিদের ট্রাকে ওঠানো হোলো এবং কড়া পাহাড়ায় ঢাকা বিমানবন্দরে নিয়ে যাওয়া হল। সেখানে আমাদের তল্লাশি চালানো হয় এবং আমাদের বেশিরভাগ লেখা ও ছবি জব্দ করা হয়। পাকিস্তানি একটি বেসামরিক জেটলাইনারে করে আমাদের পশ্চিম পাকিস্তানের কড়াচি উড়িয়ে আনা হয় এবং সেখানে আরো এক দফা আমাদের তল্লাসি করা হয়। আমার কাছে থাকা রেডিও, ক্যামেরার দুই রোল ফিল্ম যা আমার রেডিওর কম্পারট্মেন্টে লুকানো ছিল, তা আমার কাছ থেকে নিয়ে নেয়া হয়। তারপর আমাকে আরেকটি কক্ষে নিয়ে জামা নগ্ন করে তল্লাসি চালানো হয় এবং আমার অন্তর্বাসের মধ্যে লুকিয়ে রাখা আরেকটি ফিল্ম ও জব্দ করা হয়। একজন পুলিশ অফিসার হাসতে হাসতে আমাকে বললেন, ‘শুধু স্মৃতিটুকুই নিয়ে যেতে পারবে’।

 

 

 

একতা

 

তা আমার আছে, আমার এখনও মনে আছে সেই সব মানুষদের যাদের আমি দেখেছিলাম। নারী, পুরুষ, শিশু সবাই মিলে গাছের ডাল বা দালানের ইট খুলে ব্যারিকেড দিচ্ছে যেন আর্মিরা প্রবেশ না করতে পারে, যেসকল অন্ধকারাচ্ছন্ন ঘরের দিকে গুলি ছোড়া হচ্ছিল, সেগুলো থেকেই আবার ভেসে আসছিল, বীর বাঙ্গালী এক হবার স্লোগান। অবশ্য এই সেনা হামলারও আগে আমি একটি গ্রামে গিয়েছিলাম যেখানে এখন ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান আর্মির মাধ্যমে একদল বেসামরিক স্বেচ্ছাসেবী গেরিলা প্রশিক্ষন নিচ্ছিলেন। আমরা রাস্তাগুলোকে কেটে ফেলব, ফেরি চলাচল বন্ধ করে দিব এবং ব্রিজ উপড়ে ফেলবো, একজন বিদ্রোহী আমাকে সেখানে বলেছিলেন। এবং আমরা আমাদের শত্রুর মোকাবেলা করতে বন্দুক এর যোগান পাব। তার ভবিষ্যৎবানি হয়ত না ফলতে পারে, কিন্তু এই গেরিলা যুদ্ধ যদি গোটা পাকিস্তানে ছড়িয়ে পড়ে তবে বাংলাদেশের জন্য তা হবে অত্যন্ত দীর্ঘ ও রক্তস্নাত। মুজিবের যাই হোক না কেন, এমন একটি সঙ্ঘাত দিয়েই এ বিতর্কের অবসান হবে যে মেশিনগানের গুলিতে মানুষের চেতনা হত্যা করা যায় কি না।

 

 

 

 

 

শিরোনাম সুত্রঃ তারিখ

২১। হত্যাযজ্ঞের মধ্যে বাঙ্গালীদের মন্ত্রীসভা গঠন

 

নিউ ইয়র্ক টাইমস

 

১৪ এপ্রিল, ১৯৭১

 

 

Raisa Sabila

<১৪, ২১, ৫০৫২>

 

নিউ ইয়র্ক টাইমস, এপ্রিল ১৪, ১৯৭১

হত্যাযজ্ঞের মধ্যে বাঙ্গালীদের মন্ত্রীসভা গঠন

 

নিম্নলিখিত সংবাদটি আমাদের নিউ দিল্লীতে অবস্থানকারী সংবাদ দাতা প্রেরন করেছেন। যার পূর্বে তিনি ভারত এবং পূর্ব পাকিস্তানের সীমান্ত এলাকা এবং পাকিস্তানের অভ্যন্তরে একটি চার দিনের সফর সম্পন্ন করেন।

 

সিডনি এইচ শ্যানবারগ

নিউ ইয়র্ক টাইমস বিশেষ প্রকাশনা

 

১৩ এপ্রিল, আগরতলা, ভারত- খবর অনুযায়ী, পূর্ব পাকিস্তানে গনহারে হত্যাকান্ড চলছে এবং পূর্ব পাকিস্তানের বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতাদের বেশিরভাগকেই হত্যা করা হলেও, এই আন্দোলনের উচ্চ পর্যায়ের অনেক সদস্যই এখনও বেচে আছেন এবং তারা একটি মন্ত্রীসভা গঠন করেছেন। এই মন্ত্রীসভায় অন্তর্ভুক্ত সদস্যদের মধ্যে তাজউদ্দিন আহমেদকে, শেখ মুজিবর রহমানের অবর্তমানে ভারপ্রাপ্ত দলনেতা হিসেবে অভিষিক্ত করা হয়। শেখ মুজিবর রহমান, যার নেতৃত্বে আওয়ামীলীগ স্বাধীনতার আন্দোলন করেছিল এবং যার ফলস্বরূপ আজ পশ্চিম পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তাদের উপর হামলা করেছে।

 

সংবাদদাতার পরিদর্শিত একটি সীমান্ত এলাকায়, যা পূর্ব পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত, কমপক্ষে ৬ জন বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা মিলিত হয়ে মন্ত্রীসভা গঠন করে মিঃ আহমেদকে দেশটির প্রধানমন্ত্রী এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর দায়িত্ব প্রদান করেন, যেই দেশের নাম তারা দিয়েছেন বাংলাদেশ, বা বাঙ্গালীর দেশ। তারা শেখ মুজিবকে তাদের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ঘোষণা করেন, যদিও এই বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতাগন গোপনে স্বীকার করেন যে তিনি পশ্চিম পাকিস্তানে কারারুদ্ধ অবস্থায় আছেন।

 

যখন কেন্দ্রীয় সরকার, যা মুলত পশ্চিম পাকিস্তানীরাই নিয়ন্ত্রন করেন, ক্রমাগত বলছেন যে পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতি এখন শান্ত আছে এবং ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে, তখনই এমন একটি সম্পূর্ণ ব্যাতিক্রমধর্মী দৃশ্যের অবতারনা হল।

 

প্রতিদিনই যুদ্ধ সঙ্ঘটিত হবার খবর

 

বিভিন্ন আস্থাভাজন খবরসুত্র জানিয়েছে যে রোজই পূর্ব পাকিস্তানে সংঘর্ষ সঙ্ঘটিত হচ্ছে। দলে দলে পূর্ব পাকিস্তানিরা শহর থেকে পালিয়ে হয় শরণার্থী হচ্ছেন আর নয়তো বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সেনাদলে যোগ দিচ্ছেন। আর হাজার হাজার শরণার্থী, বাক্স-পেটরা বা বস্তায় তাদের যতসামান্য জিনিসপত্র নিয়ে অস্থায়ী নিরাপদ আস্রয়ের খোজে সীমানা পেরিয়ে ভারতে প্রবেশ করছেন।

 

সংবাদদাতা পাকিস্তানী সৈন্যদের মুক্তিবাহিনীকে ধরিয়ে দেয়া বা তাদের আস্তানার খোজ দেয়াতে অস্বীকৃতি জানানোর অপরাধে গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিতে দেখেছে। আগুনে পোড়া খর আর বাশের তৈরি কুড়েঘরের ধোয়ায় কুমিল্লা শহরতলীর আকাশ ভারী হয়ে উঠছিল, আর নিচে কুকুর বা শেয়ালের টেনে নিয়ে যাওয়া গ্রামবাসীদের ক্ষতবিক্ষত মৃতদেহের উপরে চক্কর দিচ্ছিল শকুন।

 

সাড়ে সাত কোটি পূর্ব পাকিস্তানীদের মধ্যে ঠিক কতজনকে পাকিস্তানি সেনারা হত্যা করেছে তা জানার কোন উপায় নেই, কিন্তু বিভিন্ন নিরভরযোগ্য সুত্রের খবর অনুযায়ী তা কমপক্ষে দশ হাজার, কোন কোন প্রতিবেদন সংখ্যাটি এর চেয়েও বেশি বলে জানিয়েছে।

কেন্দ্রীয় সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে সকল বিদেশী সাংবাদিকদের পূর্ব পাকিস্তানে প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছে। পাকিস্তানিরা সেনাদের বার বার আক্রমনস্বত্বেও সবাধিনতাবাদীদের দখলে থাকা কিছু গ্রামীন এলাকায় তথ্য অনুসন্ধান করে জানা যায় যে, পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনী পূর্ব পাকিস্তানের সকল নেতা ও তরুণদের হত্যা করেছে এবং তাদের স্বাধীনতার আন্দোলনকে সম্পূর্ণভাবে মাটিতে মিশিয়ে দিতে এ অঞ্চলের অর্থনীতির ভিত ধংশ করে দিয়েছে।

 

সম্পূর্ণ পশ্চিম পাকিস্তানীদের নিয়ে গঠিত এই সেনাবাহিনী নির্বিচারে হত্যা করছে ছাত্র, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক, প্রকৌশলী, চিকিৎসক বা নেতৃত্ব দিতে সক্ষম এমন যেকাউকেই, তার এই জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে সম্পৃক্ততা থাকুক বা না থাকুক।

 

২৫শে মার্চে শুরু হওয়া এই সেনা আক্রমনের পূর্বে যেসব পূর্ব পাকিস্তানি আর্মি অফিসার ও সিপাহিরা পালিয়ে যেতে পারেনি বা গেরিলা বাহিনীতে যোগদান করেনি, কেন্দ্রীয় সরকারের লেলিয়ে দেয়া বাহিনী হয় তাদের হামলা করে হত্যা করেছে আর নয়ত মৃত্যুদণ্ডে দন্ডিত করেছে। বেশিরভাগ অফিসারদের পরিবারের সদস্যদেরও হত্যা করা হয়, তাদের মধ্যে সামান্য কয়েকজনই পালাতে পেরেছেন।

 

আকাশ বা নৌপথে খাদ্য মজুদ, চা কারখানা, পাটকল বা প্রাকৃতিক গ্যাস খনিগুলোতে গোলাবর্ষণ করার সুযোগ পেয়ে আর্মিরা পূর্ব পাকিস্তানের গোটা অর্থনৈতিক ভিতকে মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়েছে। সেদেশের উত্তর-পশ্চিম এলাকায় অবস্থিত একটি চা বাগানের ম্যানেজার ভারতে পালিয়ে এসেছেন। জাতিতে স্কটিশ এই ব্যক্তি মন্তব্য করেন, “এই দেশ অন্তত ২৫ বছর পিছিয়ে গেছে। মুক্তিবাহিনীর সদস্যরা পাকিস্তানি সেনাদের ঠেকাতে রেললাইন বা রাস্তাগুলো উড়িয়ে দিচ্ছে। যদি একসময় তারা স্বাধীন হয়ও, তাদেরকে একদম গোড়া থেকে শুরু করতে হবে সবকিছু”। মন্তব্যকারী এই ভদ্রলোক এবং তার সাথে পালিয়ে আসা আরো দুইজন এস্টেট ম্যানেজার তাদের পরিচয় গোপন রাখতে অনুরোধ জানিয়েছেন এই আশংকায় যে এর ফলে পূর্ব পাকিস্তানের অবস্থানকারী ব্রিটিশ পরিবারগুলোর উপর অভিযান চালানো হতে পারে।

 

 

 

 

শুন্যট্রাকের উপর হামলা

 

তিনজন শরণার্থী জানান যে পাকিস্তানি রেডিওগুলোতে ভারত থেকে আসা গোলাবারুদ ও অস্ত্রসংবলিত নয়টি ট্রাক পাকিস্তানি বিমান বাহিনী ধ্বংস করার যে খবর প্রচারিত হয়েছে, সেই ট্রাকগুলোতে আসলে কোন অস্ত্র ছিলনা। মুলত সেগুলো ছিল পরিতক্ত্য এবং শুন্য ট্রাক। একটি চাবাগানের গোলাঘরে সেগুলো ফেলে রাখা হয়েছিল।

 

নিরভরযোগ্য সুত্রে পাওয়া খবরে জানা যায়, রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম বা কুমিল্লা শহরগুলোতে মোট জনসংখ্যার কেবল ২০ থেকে ২৫ শতাংশই এখনও সেখানে অবস্থান করছে, ছোট শহরগুলো থেকেই মানুষ পালিয়েছে সবচাইতে বেশি। ঢাকার জনসংখ্যা ছিল প্রায় ১৫ লক্ষের মতন, চট্টগ্রামে ৪ থেকে ৫ লক্ষ মানুষ ছিল আর কুমিল্লার জনসংখ্যা ছিল প্রায় এক লক্ষের মত।

 

আর্টিলারি ফায়ারের গর্জনে দেশটির পূর্বাঞ্চল কেপে উঠছে রোজই, আর তা অনুভূতও হচ্ছে সর্বত্রই। প্রতিটি গেরিলা আক্রমন, কিংবা সংখ্যায় ও অস্ত্রবলে অত্যন্ত দুর্বল মুক্তিবাহিনির হাতে কোন ধরনের হয়রানীর সম্মুখীন হলেই পাকিস্তানি আর্মিরা সেখানকার সাধারন জনগণের উপর হামলা চালিয়ে প্রতিশোধ নিচ্ছে।

 

বাঙ্গালীদের নিঃশেষ করে দেয়ার আগেই কুমিল্লার ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট থেকে পালিয়ে আসা এক তরুন বাঙ্গালী লেফটেন্যান্ট বলেন, “এরা সব কাপুরুষের দলে, আমরা তাদের গুলি করার জন্য বুক পেতে দিয়েছি, সেনাবাহিনির ইউনিফরম পরে আছি, আর তারা হামলা করে নিরস্ত্র সাধারন মানুষের উপর”। মুক্তিবাহিনীর ভিতরে দক্ষ প্রশিক্ষনদাতা অফিসার, অস্ত্র, গোলাবারুদ, যানবাহন ও সাধারন রসদসামগ্রীর প্রচন্ড সংকট চলছে। কিছু সেনার পায়ে জুতো পর্যন্ত নেই। তাদের অস্ত্রসামগ্রীর মধ্যে সবচেয়ে ভারী অস্ত্রি তিন ইঞ্চি মরটার, যদিও তারা কিছু শক্তিশালী বন্দুক কব্জা করতে পেরেছে। অন্যদিকে পাকিস্তানি সেনারা ব্যবহার করছে জেট-ফাইটার বম্বার প্লেন, ভারী আর্টিলারি এবং গানবোট যার সিংহভাগেরি যোগানদাতা যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়ন আর গনচীন।

এদিকে পাকিস্তানের অভিযোগ অনুযায়ী ভারত থেকে পূর্ব পাকিস্তানে কোন অস্ত্রসস্ত্র বা সৈন্যদল পাঠানোর মত কার্যক্রম সংবাদদাতার গোচরে আসেনি। পূর্ব পাকিস্তানের কোন ভারতীয় সেনা পাঠানো হয়নি।

 

এই বিপর্যয় ঘটার আগেই পূর্ব পাকিস্তানে প্রায় ২৫,০০০ সৈন্য আনা হয়েছিল।, এ দুটি অঙ্গরাজ্যর মধ্যে প্রায় ১০০০ মাইলের ভারত ভূখণ্ড তাদের বিচ্ছিন্ন করে রাখে, ফলে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে প্রচুর সৈন্য সেসময় নিয়ে পূর্ব পাকিস্তানে আনা হয়।

 

কেউ কেউ ধারনা করছেন যে এ মুহূর্তে পূর্ব পাকিস্তানের প্রায় ৬০,০০০ থেকে ৮০,০০০ সৈন্য অবস্থান করছে, যাদের বেশিরভাগই হয় পাঞ্জাবি আর নাহয় পাঠান। এই দুই জাতির বেশিরভাগই মুসলিম হলেও পাঞ্জাবিরা সবসময়ই বাঙ্গালীদের হেয় প্রতিপন্ন করে এসেছে। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র কোন শক্ত অবস্থান নেয়নি, তা জানতে পেরে বাঙ্গালীরা ক্ষুব্ধ, বেশিরভাগ স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতাই পশ্চিমা ভাবধারায় বিশ্বাসী এবং তারা ওয়াশিংটনের সমর্থন পাবে বলে ধারনা করেছিল। তারা আরো ক্ষুব্ধ এই কারনে যে আমেরিকার পাঠানো অস্ত্রই তাদের উপর চালানো হচ্ছে।

আমরা সাহায্য আসা করেছিলাম

‘তুমি কি জানো, তারা আমাদের হত্যা করতে তোমাদের প্লেন, তোমাদের রকেট আর ট্যাঙ্ক ব্যবহার করছে’?- উত্তেজিত কন্ঠে এবং সরু চোখে তাকিয়ে একজন বাঙালি যোদ্ধা এ প্রশ্নটি আমাদের সংবাদদাতাকে করছিলেন। ‘আমরা তাদের কাছে সাহায্য আসা করেছিলাম, এমন আচরন নয়’। বাকিরাও এমন মন্তব্যই করেছিলেন।

 

পাকিস্তানিরা চৈনিক অস্ত্র ব্যবহার করাতে বাঙ্গালীরা অবাক হয়নি, কেননা তারা এটাই ধরে নিয়েছিলেন যে পিকিং পাকিস্তান সরকারের পাশে থাকবে। কোন কোন বাঙালি অফিসার এও দাবী করেন যে এই সেনা হামলার পরিকল্পনাতে চীন ও সম্পৃক্ত ছিল। পিকিং এর সম্পূর্ণ সমর্থন ছাড়া পাকিস্তানিরা কখনই এধরনের অভিযানে নামার সাহস করতো না।

 

এমনকি এই সঙ্ঘাতের পূর্বেও বাঙ্গালিরা তাদের স্বাধীনতা আন্দোলনে কোন সমর্থন পায়নি পশ্চিমা বিশ্ব থেকে এবং এটিও তাদের বেশ হতবাক করেছে। এখন তাদের মোহভঙ্গ হয়েছে।

 

“এখানে গনহত্যা চলছে, কিন্তু সবাই শুধু তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে” একজন বাঙালি ছাত্র মন্তব্যটি করেন। কেউ কথা বলছেনা, পৃথিবীর কোথাও কি বিবেক নেই?

 

এই তিক্ত মনোভাবের মধ্যে ভারত অন্তর্ভুক্ত নয়। তারা পাকিস্তানের এই সেনা হামলার প্রতিবাদ করেছে এবং অন্যান্য সরকারকেও একি কাজ করতে আহবান জানাচ্ছে। ভারতের জনগন এবং কর্তৃপক্ষ শরণার্থী ও অন্যদের খেয়াল রাখছে, কিন্তু সংবাদ দাতা কোন ধরনের অস্ত্র সাহায্য দিতে দেখেনি। যদিও এ অভিযোগ পাকিস্তান বারবারই করে এসেছে এবং দিল্লী তা বার বার অস্বীকার করে এসেছে।

 

 

 

 

 

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
২২। পাকিস্তানে বিদ্রোহীরা স্বীকৃতি চায় ডেট্রয়েট ফ্রি প্রেস ১৪ এপ্রিল, ১৯৭১

 

 

Razibul Bari Palash

<১৪, ২২, ৫৩>

 

ডেট্রয়েট ফ্রি প্রেস, ১৪ এপ্রিল, ১৯৭১

পাকিস্তানী বিদ্রোহীরা স্বীকৃতি চায়

 

 

নয়াদিল্লী- (ইউপিআই) – বাংলাদেশের বিচ্ছিন্নতাবাদী সরকার মঙ্গলবার পূর্ব পাকিস্তানের সার্বভৌমত্ব ঘোষণা করেছেন এবং “সব গণতান্ত্রিক দেশকে’ স্বীকৃতি দেবার জন্য ও পশ্চিম পাকিস্তানের বিরুদ্ধে গৃহযুদ্ধে সহায়তা করার জন্য আবেদন করেছে।

 

এই ঘোষণা ফ্রি বাংলা রেডিওতে সম্প্রচারিত হয় এবং বলা হয় বাংলাদেশ (বাঙ্গালী জাতির) সরকারের রাজধানী হবে চুয়াডাঙ্গা, এটি ভারতের সীমান্ত থেকে ১০ মাইল দূরের একটি ছোট শহর।

 

পশ্চিম পাকিস্তানী সৈন্যরা প্রধান প্রধান শহর দখল করছিল কারণ তারা বিদ্রোহ দমন করার জন্য অব্যাহত অভিযান চালাচ্ছিল।

 

কমিউনিস্ট চীনের প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাই এর একটি নোট যা প্রেসিডেন্ট আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খানের নেতৃত্বের পাকিস্তান সরকারের প্রতি পিকিং এর সমর্থন প্রকাশ করে সেটি মঙ্গলবার করাচি ও নয়া দিল্লিতে সাড়া জাগিয়েছে।

 

করাচিতে ইয়াহিয়ার সামরিক সরকারের একটি সূত্র জানায়, চৌ এর বার্তা পূর্ব পাকিস্তানের গৃহযুদ্ধ থেকে দুরে থাকার জন্য ভারতের প্রতি একটি সরাসরি সতর্কবার্তা। যা সঙ্ঘটিত হচ্ছে ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্ত দিয়ে এবং এটি পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ১০০০ মাইল দুরে অবস্থিত।

 

ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বলেন, চৌ এর নোট ভারত সরকারের আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত বিদ্রোহীদের সঙ্গে সংহতিপ্রকাশের অবস্থানের উপর কোন প্রভাব ফেলবে না।

 

ভারত বাংলাদেশের বিচ্ছিন্নতাবাদী সরকারকে স্বীকৃতি দেবে কিনা জানতে চাইলে, মিসেস গান্ধী বলেন, “বিষয়টি বিবেচনাধিন।”

 

 

 

 

 

শিরনাম সূত্র তারিখ
২৩। বাঙালি যোদ্ধাদের সাথে নিউইয়র্ক টাইমস ১৪ই এপ্রিল ১৯৭১

 

হাসান মাহবুব

<১৪, ২৩, ৫৪৫৬>

 

দ্যা নিউইয়র্ক টাইমস, ১৪ই এপ্রিল ১৯৭১

বাঙালি যোদ্ধাদের সাথে

 

যখন কেন্দ্রীয় সরকার, যা পশ্চিম পাকিস্তানের কর্তৃত্বে রয়েছে, ধারাবাহিক ভাবে প্রচার করে যাচ্ছে- পশ্চিম পাকিস্তানের পরিস্থিতি শান্ত এবং অবস্থা স্বাভাবিকের দিকে ফিরে যাচ্ছে, তখন সরেজমিনে গিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র দেখা গিয়েছে।

 

বিশ্বস্ত সূত্রের বরাতে প্রতিদিনই পাওয়া যাচ্ছিলো প্রতিটি সেক্টরে লড়াইয়ের খবর। দলে দলে স্বাধীনতাকামী পূর্ব পাকিস্তানীরা শহর ছেড়ে পালাচ্ছিল হয় শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিতে অথবা মুক্তিবাহিনীর দলে যোগ দিতে, হাজারো শরণার্থী তাঁদের যৎসামান্য সম্বল নিয়ে যাচ্ছিল কাঠের বাক্সে এবং ট্রাংকে করে।। ইন্ডিয়া নামক দেশটি তখন তাদের কাছে এক টুকরো স্বর্গ।

পাকিস্তানী সৈন্যরা তখন তাণ্ডব চালিয়ে যাচ্ছে সবুজ বাংলার বুকে। মুক্তিযোদ্ধাদের ঠেকাতে এবং লুকানোর ব্যাবস্থা বন্ধে জ্বালিয়ে দিচ্ছে ঘরের পর ঘর, গ্রামের পর গ্রাম। শুকনো তালপাতা, ঘাস আর খড় থেকে মৃত্যুগন্ধী ধোঁয়ার আস্ফালন। আকাশ থেকে শকুনেরা নেমে এসেছে। এপ্রিলের এই সময়টায় সবচেয়ে উপদ্রুত অঞ্চল ছিলো কুমিল্লা। পাকিস্তানী হায়েনাদের সাথে সঙ্গত করেছে শেয়াল-কুকুরেরা। জীর্ণ কৃষকের রুগ্ন শরীরের উচ্ছিষ্ট দিয়ে চলছে মহাভোজ, দু তরফ থেকেই।

 

সাড়ে সাত কোটি বাঙালির ঠিক কতজন শহীদ হয়েছে তার পুঙখানুপুঙ্খ তথ্য দেয়া অসম্ভব, তবে নির্ভরযোগ্য সামরিক সূত্র গুলি মোটামুটি একমত যে সংখ্যাটা ২০ হাজার থেকে ১ লক্ষ হবে। কিছু কিছু রিপোর্ট আরো বেশি সংখ্যার কথা বলে।

 

পূর্ব পাকিস্তানের চলমান ঘটনা অনুসন্ধান করতে বিদেশী সাংবাদিকদের অফিশিয়ালি বাধা দিয়ে যাচ্ছিলো পাকিস্তানী কেন্দ্রীয় সরকার। তবে মুক্তিবাহিনী নিয়ন্ত্রিত প্রত্যন্ত এলালাকা গুলো (যা কিনা প্রায় সময় পাক আর্মির আক্রমণের স্বীকার হত) থেকে প্রাপ্ত প্রমাণ মতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী পূর্ব পাকিস্তানের নেতাদের এবং রাজনৈতিক নেতাদের মেরে ফেলেছে এবং এই প্রদেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি চূর্ণ করে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে মুক্তিসংগ্রামকে ধ্বংস করার জন্য।

 

সরাসরি জাতীয়তাবাদী সংগ্রামে যুক্ত থাকুক আর না থাকুক- সামরিক নির্দেশে, পাকিস্তানি আর্মি যার পুরোটাই এখন পশ্চিম পাকিস্তানি অফিসার এবং সৈন্য দ্বারা পূর্ণ- ছাত্র, বুদ্ধিজিবি, প্রফেসর, ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার, এবং অন্যান্য নেতৃত্য দেওয়ার যোগ্যতা সম্পন্ন ব্যাক্তিদের হত্যা করেছে।

 

২৫শে মার্চের আর্মি অভিযান শুরু হবার পর থেকে, সামরিক আক্রমণ এবং মৃত্যু দন্ড এই দুইয়ের মাধ্যমেই কেন্দ্রীয় সরকারের বাহিনী পূর্ব পাকিস্তানের আর্মি অফিসার এবং সৈন্যদের মেরে ফেলেছিল যারা কিনা পালিয়ে গেরিলা বাহিনীতে যোগ দিতে ব্যার্থ হয়েছিল। বেশিরভাগ অফিসারের পরিবারের সকলকে মেরে ফেলা হয়েছে, তাঁদের মাঝে অল্প কিছু মানুষ পালাতে সক্ষম হয়েছেন।

 

পদাতিক বাহিনীর পাশাপাশি বিমান বাহিনী এবং নৌবাহিনীও ছিলো সমান সক্রিয়। খাদ্যের গুদাম, চায়ের কারখানা, পাটকল, প্রাকৃতিক গ্যাস ক্ষেত্র; বেছে বেছে পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক ভিত্তি গুলোকে তারা গুড়িয়ে দিয়েছে।

 

“এই যুদ্ধ দেশটাকে ইতিমধ্যে ২৫ বছর পিছিয়ে দিয়েছে”- একজন স্কটিশ চা বাগানের ব্যবস্থাপক এমনটাই বলেছিলেন। যে কিনা দেশের উত্তর-পূর্ব দিকে তার আবাদি এলাকা থেকে ভারতে পালিয়ে এসেছিলেন। মুক্তিবাহিনী পাকিস্তানি বাহিনীকে ঠেকাতে রাস্তাঘাট, রেললাইন এবং ব্রিজ উড়িয়ে দিচ্ছিল, তাতে করে যদি মুক্তিবাহিনী জয় লাভ করেও, তাঁদের শুরু করতে হবে একদম প্রথম থেকেই” তার বচনে ছিলো এমনই কঠিন বাস্তব নৈরাশ্য।

 

পূর্ব পাকিস্তানে তখনও অবস্থানরত তাদের পরিবারের লোকেদের উপর হামলা হতে পারে এমন আশঙ্কায় এই স্কটিশ ভদ্রলোক, এবং তার সাথে পালিয়ে আসা আরও দুজন চা-বাগান ব্যাবস্থাপক তাদের নাম প্রকাশ করতে নিষেধ করেন।

 

এই তিনজন ব্যাক্ত করেন যে, ভারত থেকে অস্ত্র এবং গোলাবারুদ নিয়ে ৯টি ট্রাকের কনভয় পূর্ব পাকিস্তানে প্রবেশ করা এবং পরে পাকিস্তানি বিমান হামলায় তা ধ্বংস হবার যে খবর পাকিস্তান রেডিও প্রচার করছে তা প্রকৃত পক্ষে ছিল একটি চা বাগানের আঙিনায় দাড় করানো ৯টি খালি ট্রাকের সমন্বয়।

 

বিশ্বস্ত সূত্র নিশ্চিত করে যে আনুমানিক শতকরা ২০ থেকে ২৫ ভাগ মানুষ রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম এবং কুমিল্লা ছেড়ে চলে গেছেন। এমন কি উপশহর বা মফস্বল গুলিও ফাঁকা হয়ে গেছে। এ সময় ঢাকার জনসংখ্যা দাঁড়িয়েছে পনের লক্ষ, চট্টগ্রামের আনুমানিক ৪ থেকে ৫ লক্ষ, এবং কুমিল্লার ১ লক্ষ।

 

পূর্ব পাকিস্তানের পূর্ব অংশে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর ভারি আর্টিলারির প্রচণ্ড আঘাতের তীব্র শব্দ প্রতিদিনই, নিয়মিত ভাবে, প্রতিটি সেক্টরে শোনা যাচ্ছে। সংখ্যায় এবং অস্ত্রে পিছিয়ে থাকা মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিটি গেরিলা আঘাত বা লাঞ্ছনার পর পাকিস্তানি আর্মি তাদের অক্ষম ক্ষোভ সাধারণ মানুষের উপর অত্যাচার করে মেটাচ্ছিল।

 

‘কাপুরুষের দল!’ এমনটাই সম্বধন করেন একজন তরুণ বাঙ্গালী লেফটেন্যান্ট। তিনি তখন পালিয়ে এসেছিলেন কুমিল্লা ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট থেকে যখন পাকিস্তানি আর্মি তাঁর ব্যাটেলিয়নকে নিশ্চিহ্ন করার উদ্যোগ নিয়েছিল। তিনি বলেন-‘আমরা ওদের (পাক আর্মি) আমাদেরকে গুলি করার সুযোগ দিয়েছিলাম। আমরা ইউনিফর্মে ছিলাম। কিন্তু ওরা আমাদের না মেরে সাধারণ মানুষের উপর গুলি চালালো।‘

 

মুক্তিবাহিনীর যোদ্ধাদের কাছে অস্ত্র ছিলো না, গোলা-বারুদ ছিলো না, ছিলো না যান-বহন এবং দক্ষ ও প্রশিক্ষিত নের্তৃত্ব। তাদের অনেকেই চলতেন খালি পায়ে!

তাদের কাছে ভারী অস্ত্র বলতে ছিলো তিন ইঞ্চি মর্টার, এবং কিছু ছিনিয়ে নেওয়া ভারী বন্দুক। অপরদিকে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর কাছে ছিলো অত্যাধুনিক জেট-ফাইটার বম্বার, গানবোট এবং আরো ভারী গোলাবারুদ। এগুলোর যোগানদাতা ছিলো আমেরিকা, সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং চিন।

পাকিস্তান দাবী করছিল যে ভারতের সরকার থেকে নিযুক্ত সৈন্যবাহিনী এসে পাকিস্তানে যুদ্ধ করে যাচ্ছে। তবে এই প্রতিবেদক তেমন কিছুই কখনও প্রত্যক্ষ করেন নি।

 

কিছু পুরোনো এনফিল্ড এবং গ্রান্ড রাইফেল এবং কিছু মেড ইন চিনা রাইফেল এবং ম্যাশিনগান কব্জা করে অথবা অপ্রতুল উৎস থেকে সংগ্রহ করেই লড়ে যাচ্ছিলো মুক্তিযোদ্ধারা।

 

পাকিস্তান আর্মির ৩ লক্ষ সৈন্যের মাত্র ১০ভাগ ছিল বাঙ্গালী। তাঁদের প্রায় সকলেই যারা প্রথম দিকের হত্যাযজ্ঞ থেকে পালাতে পেরেছিলেন মুক্তিবাহিনীতে এসে যোগ দেন এবং তাঁরাই মুক্তিবাহিনীর একমাত্র প্রশিক্ষিত অংশ।

 

এ পর্যন্ত হাতে পাওয়া সংখ্যা গুলো নির্দেশ করে যে এই বাহিনীর (মুক্তিবাহিনী) কেন্দ্রে রয়েছেন ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ৩ হাজার জন সদস্য যারা পূর্বে ছিলেন নিয়মিত বাহিনী রূপে। ৯ হাজার জনের মত ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস সদস্য, যারা পূর্বে একটি প্যারা মিলিটারি বাহিনী হিসেবে ছিলেন এবং মূলত ভারত-পাকিস্তান সীমান্ত পাহারা দিতেন।

 

মুক্তিবাহিনীর বাকি ফোর্স সংগঠিত করা হয়েছিল পুলিশ, সামান্য ট্রেনিং পাওয়া লোকাল মিলিশিয়া এবং একদম নতুন সদস্য দ্বারা।

 

রাজনৈতিক সংকট ঘনীভূত হবার পূর্বে, ইস্ট পাকিস্তান আর্মির পূর্ব পাকিস্তানে ২৫ হাজার সৈন্য ছিল। বিপুল সংখ্যক নতুন সৈন্য পশ্চিম পাকিস্তান থেকে উড়িয়ে আনা হয়, যা ছিল (পশ্চিম পাকিস্তান) পূর্ব পাকিস্তান থেকে হাজার মাইলের ভারতীয় এলাকা দারা বিভক্ত।

 

কিছু অনুমান থেকে ধারণা করা হয় পূর্ব পাকিস্তানে পশ্চিম পাকিস্তানি সৈন্য সংখ্যাটি ছিল প্রায় ৬০ থেকে ৮০ হাজার এর মত যাদের বেশির ভাগ ছিল পাঞ্জাবী এবং পাঠান। পাঞ্জাবীরা বিশেষত ঐতিহ্যগত ভাবে বাঙ্গালীদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করত যদিও তারা উভয়েই মুসলমান ছিল।

 

যদিও একজন গেরিলা যোদ্ধার কাছে গড়পড়তা ৩০ থেকে ৪০ রাউন্ড আমুনিশন থাকত, তবুও তাঁরা ছিলেন দৃঢ় প্রতিজ্ঞ, বেশীরভাগ সময় এর কারণ ছিল পাকিস্তানি আর্মি দ্বারা পরিবারের কোন সদস্য নিহত হওয়া বা কখনও একদম সবাইকে হারানো।

 

‘ওরা আমাকে এতিম করেছে,’ একজন মুক্তিযোদ্ধা একথা বলেন।

 

যার চোখগুলো ছিল তাঁর অন্যান্য কমরেডদের মতই অপলক এবং স্থির। দেখে মনে হচ্ছিল যা হচ্ছে তাঁরা ঠিক বিশ্বাস করতে পারছেন না। ‘আমার জীবনের এখন আর কোন প্রয়োজন নেই’।

এর দু দিন আগেই কুমিল্লার প্রান্তদেশে, ইন্ডিয়া সীমান্তের এক মাইলেরও কম দূরত্বে জ্বলছিলো গ্রামাঞ্চল। বিমান ঘাঁটির পাঁচ মাইল ব্যাসার্ধের মধ্যে সবগুলো গ্রাম জ্বালিয়ে দেবার পরিকল্পনা ছিলো তাদের। এ চিত্র শুধু কুমিল্লায় না, ছিলো দেশের সবখানেই।

পাকিস্তানি সৈন্যদের জব্দ করতে, ৩২ বছর বয়সী গেরিলা কমান্ডার মেজর খালেদ মোশাররফ এই এলাকায় দশ সদস্যের একটি দল পাঠান। এই সংবাদদাতা তাঁদের সাথে যুক্ত হন, তাঁদের তিন জন সদস্যের পায়ে কোন জুতো ছিলো না।

 

ধান ক্ষেতের সুবিধা নিয়ে দলটি পাকিস্তানি সৈন্যদের ২০০ গজের ভিতর পৌছে যান, যারা (পাকিস্তানি সৈন্য) তালপাতার ঘরে ফসফরাস গ্রেনেড ছুড়ে মারছিল। বাঙালীরা, যাদের কাছে ছিল কিছু চাইনিজ অটোম্যাটিক অস্ত্র, গুলি করে দিল। সাথে সাথেই পাকিস্তানি সন্যরা পালটা গুলি করা শুরু করল। প্রায় ২০ মিনিট ধরে নিরবচ্ছিন্ন গুলি বিনিময়ের পর বাঙালীরা পিছু হটে একটা বাধের আড়ালে নিরাপদে অবস্থান নিল।

 

গেরিলা দলগুলোর মধ্যে সমন্বয় ছিলো দুর্বল এবং কখনও কখনও বলতে গেলে ছিলোই না। বাঙালীরা এখন নিষ্ঠার সাথে গেরিলা কার্যপদ্ধতি রপ্ত করছে যখন পাকিস্তানি আর্মি বেশীরভাগ বড় শহর, ক্যান্টনমেন্ট এবং বিমান বন্দরের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে।

 

শক্তি বৃদ্ধির সাথে সাথে সৈন্যরা (পাকিস্তানি) গ্রামের দিকে আক্রমণ পরিচালিত করছে এবং নিজেদের নিয়ন্ত্রিত শহর গুলোর মাঝে যাত্রিক যোগাযোগের চেষ্টা চালাচ্ছে। কিছু যোগাযোগের চেষ্টা সফল হয়েছে কিন্তু সবগুলো নয়, কারণ গেরিলারা প্রায় নিয়মিত ভাবে রাস্তা, পানির লাইন এবং রেল লাইন কেটে দিতে সামর্থ হচ্ছে।

 

-সিডনি এইচ শ্যানবার্গ

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
২৪। গুলি না রুটি নিউইয়র্ক টাইমস ১৫ এপ্রিল ১৯৭১

 

Aparajita Neel

<১৪, ২৪, ৫৭>

 

নিউইয়র্ক টাইমস, ১৫ এপ্রিল ১৯৭১

গুলি না রুটি

 

ওয়াশিংটন সর্বদা প্রকাশ করে যে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে তারা যুক্ত নয় – কিন্তু সেটি এই সপ্তাহে প্রকাশ পেয়ে গেছে যখন স্টেট ডিপার্টমেন্ট স্বীকার করেছে যে প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ সত্ত্বেও, যুক্তরাষ্ট্র দমনমূলকনীতিতে বিশ্বাসী পাকিস্তানি সরকারকে গোলাবারুদ এবং অন্যান্য “নন-লেথাল” সামরিক সরঞ্জাম বিক্রি করছে। যতদিন এই বিক্রয় চলবে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইসলামাবাদের সামরিক শাসনের পাশে ও চীনের পাশে অবস্থান করবে এবং কার্যত তা পাকিস্তানের দ্বারা বাঙালি সংখ্যাগরিষ্ঠের ক্রমবর্ধমান বঞ্চনার জন্য এবং সম্প্রতি ন্যাশনাল এসেম্বলির জন্য নির্বাচিত পার্টির দমনের কাজকে প্ররোচনা দেবে।

 

তিন সপ্তাহ ধরে যখন রাষ্ট্রপতি ইয়াহিয়া নিরস্ত্র বাঙালিদের উপর তার সেনাবাহিনীকে লেলিয়ে দিয়েছেন তখন স্টেট ডিপার্ট্মেন্ট বলেছে যে তারা জানেননা যে কখন পাকিস্তানে সর্বশেষ অস্ত্র চালান গিয়েছে – অথবা কোন চালান পথে আছে বা পাঠানোর জন্য প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। এমনকি যদি এই আমলাতান্ত্রিক কথা অবিশ্বাস্যভাবে সত্য হয়, তবে প্রশাসন পাকিস্তানকে অস্ত্র সরবরাহের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করার কারণে সেই ব্যর্থতার দায় এরাতে পারেনা।

 

বাঙালিদের উপর সর্বাত্মক নিপীড়নে ওয়াশিংটন পাকিস্তানকে গম দেয়া নিষিদ্ধ করেছে। তারা বলেছে যে, পূর্ব পাকিস্তানের বন্দরে ইতোমধ্যে যে চালান গিয়েছে সেগুলো নামানোর যায়গা না থাকায় নতুন করে পাঠানো বন্ধ করা হল। এটা সাময়িকভাবে সত্য হতে পারে, তবে একথা নিশ্চিত যে পূর্ব পাকিস্তানে খাদ্য ত্রাণের প্রয়োজনীয়তা আগামী মাসগুলিতে ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাবে। পশ্চিমা শাসিত অযোগ্য ও উদাসীন পাকিস্তানী সরকারের সামরিক কর্মযজ্ঞ বন্ধ করার দিকে মনোনিবেশ করা উচিত। কি ধরনের নিরেপেক্ষ রাজনৈতিক পরিস্থিতির অধীনে মানবিক ত্রাণ বন্ধ করাকে ন্যায্য দাবি করা যেতে পারে?

 

 

 

 

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
২৫। অর্থণৈতিক দুর্যোগ নিউইয়র্ক টাইমস ১৫ এপ্রিল ১৯৭১

 

Razibul Bari Palash

<১৪, ২৫, ৫৮৫৯>

 

নিউইয়র্ক টাইমস, ১৫ এপ্রিল ১৯৭১

অর্থণৈতিক দুর্যোগ

 

পূর্ব পাকিস্তানের অনেক অঞ্চলে কৃষকরা তাদের ধানের বীজ বপন করছে না কারণ পাকিস্তানি আর্মি এবং বাংলার স্বাধীনতা বাহিনীর কারণে তারা সামনে আসতে ভয় পায়।

 

ভারতবর্ষের ১০০০ কিলোমিটার জুড়ে পশ্চিম পাকিস্তানে ‘টেক্সটাইল মিলস’ সস্তা তুলো পণ্য চালু করছে যার একমাত্র বাজার হল পূর্ব পাকিস্তান। তবে সেগুলো সেখানে বিক্রি করা যাচ্ছে না যতক্ষণ পাকিস্তানি বাহিনী স্বাধীনতা আন্দোলনকে নির্মূল করে এবং যুদ্ধ শেষ না করে।

 

গত তিন সপ্তাহের যুদ্ধ প্রচুর জীবন নষ্ট হবার পাশাপাশি দেশের উভয় অঞ্চলের অর্থনীতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে।

 

যদিও এই সংবাদদাতা পূর্ব পাকিস্তানে প্রকার ক্ষুধা দেখেন না, তবে গ্রামাঞ্চলে খাদ্য শস্য কম এবং কিছু এলাকায় দুর্ভিক্ষের সম্ভাবনা আছে বলে মনে হয়।

 

এমনকি স্বাভাবিক সময়ে পূর্ব পাকিস্তানকে একটি ক্ষুধার্ত এলাকা বলা হতে পারে, কারণ এখানে বার্ষিক খাদ্যশস্যের ঘাটতি ২৫ মিলিয়ন টন।

 

পূর্ব পাকিস্তানে বিদেশী সাংবাদিকদের প্রবেশের উপর পাকিস্তানি সরকার নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। পূর্ব বঙ্গের বঙ্গোপসাগরের বন্যাকবলিত ঘনবসতিপূর্ন কিছু বদ্বীপের কোন খবরই পাওয়া যায় না। গত বছরের নভেম্বরে একটি ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানায় কয়েক লাখেরও বেশি মানুষ মারা যায়। এতে সেখানকার সকল ফসল ধ্বংস হয়।

 

ত্রাণ সরবরাহের সময় থেকে প্রায় দুই মিলিয়ন মানুষ বেঁচে আছে। মার্চ মাসের প্রথম দিকে রাজনৈতিক সংকট শুরু হয় এবং সেনা বাহিনী সাধারণ মানুষের উপর আক্রমণ চালায় যার ফলে ঘূর্ণিঝড় ক্ষতিগ্রস্থ এলাকায় খাদ্য সরবরাহ হ্রাস পায়।

 

বিদেশী কূটনীতিক এবং অন্যেরা চিন্তিত আছেন যে সেখানে খাদ্য সমস্যা কয়েক সপ্তাহের মধ্যে মারাত্মক আকার ধারণ করবে – বর্ষা আসার সাথে সাথে- কারণ এই সময়ে দক্ষিণের কিছু এলাকায় প্রায় যোগাযোগবিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। প্রায় পাঁচ মাসের জন্য এই অবস্থা বলবত থাকে।

 

এ ছাড়াও এটি অনুমান করা হয় যে প্রায় ১০০০০০ ঘূর্ণিঝড় বেঁচে থাকা মানুষ এখনো ঘর বা আশ্রয়হীন। বর্ষাকালে তারা নিকৃষ্ট অবস্থার মুখোমুখি হবে।

 

যুদ্ধের কারণে অর্থনৈতিক সংকট বাড়বে। পাকিস্তান সশস্ত্র বাহিনী – যা সম্পূর্ণরূপে পশ্চিম পাকিস্তানি সৈন্যদের দ্বারা গঠিত- তারা খাদ্য, , চা বাগান এবং পাটকলগুলি ধ্বংস করছে। যারা প্রতিরোধ করছে আতার গেরিলা কৌশল অবলম্বন করছে। তারা রেল লাইনগুলি উধাও করে দিচ্ছে, সেতু উড়িয়ে দিচ্ছে এবং সেনাবাহিনীর আক্রমণকে সীমাবদ্ধ করার জন্য তাদের রসদ আসার পথগুলো নষ্ট করে দিচ্ছে।

 

চা আবাসন ও পাটকলের ম্যানেজার, বেশিরভাগই বিদেশী – তারা তাদের চাষ ছেড়ে দিচ্ছে , দায়িত্ব দিয়ে যাচ্ছে বাঙ্গালী সহকর্মীদের হাতে।

 

হাজার হাজার চা শ্রমিককে দেবার মত টাকা নেই। উত্তরপূর্বের সিলেট জেলার প্রায় সব কাজই বন্ধ করে দিয়েছে। চা শ্রমিকরা সব হিন্দু এবং ম্যানেজারদের মতে যারা ইতোমধ্যে ভারতে পালিয়ে যাচ্ছে যেটি একটি হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা।

 

 

পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ব্যাংক ও দোকানগুলি লুটপাট করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

তাদের মূল লক্ষ্য সাধারণ মানুষ – বললেন পূর্ব অঞ্চলের বেইজে প্রতিরক্ষা বাহিনীর কমান্ডার কর্নেল এম এ জি ওসমানি। তিনি বলেন,”তারা জনগণকে সন্ত্রাসের ভয় দেখাচ্ছেন ও খুধার্ত রাখার চেষ্টা করছে।”

 

এখানে লবণ, দারুচিনি, রান্নার জন্য সরিষা তেল, ল্যাম্পের জন্য কেরোসিন এবং মেশিনগুলির জন্য জ্বালানি যেমন- গ্রামের ময়দা মিল চালানোর জন্য – ইত্যাদির সংকট রয়েছে।

 

চাল এবং মাছ বাঙালিদের প্রধানতম খাবার। পুর্ব পাকিস্তানের ৭৫ মিলিয়ন মানুষ। কিন্তু চালের পরিমাণ কমে যাওয়ায় তারা কাঁঠালের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। কাঁঠাল, যা একটি সবজি হিসাবে রান্না করা যায় পেকে যাবার আগে এবং পেকে গেলে ফল হিসেবে খাওয়া যায়। পূর্ব পাকিস্তানে সর্বত্র এটি প্রচুর পরিমাণে ফলে। কিন্তু এটি সবসময় বাঙালির খাদ্য তালিকায় সামান্য অংশ জুড়ে ছিল।

 

সেনাবাহিনীর সামরিক সরবরাহ ব্যতীত পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান বন্দর চট্টগ্রামের মধ্য দিয়ে কিছু আসছে না।বাঙালিদের এখন তাদের নিজেদের এলাকায় যা পাওয়া যাবে তাই দিয়ে চলতে হবে। শত শত বছর, বন্যা, ঝড় ও গভীরতম দারিদ্রতার পর থেকে তাদের বেঁচে থাকার লড়াই চলছে।

 

যদিও যুদ্ধ পশ্চিম পাকিস্তানকে শারীরিকভাবে স্পর্শ করেনি তবে পূর্বের কারণে এর অর্থনৈতিক মন্দার হতে পারে।

 

পূর্ব থেকে উৎপন্ন হওয়া পাট দেশের বৃহত্তম একক রপ্তানি পণ্য এবং বিদেশী মুদ্রা উপার্জনকারী পণ্য। বেশিরভাগ বৈদেশিক আয়ের টাকা পশ্চিমবঙ্গে সেনাবাহিনীর জন্য এবং বড় শিল্প ও জনসাধারণের কাজের জন্য ব্যয় করা হয়।

 

পূর্ব পাকিস্তানে এই ধরনের শোষণ, যা ১৯৪৭ সালে ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে দেশটির দুই অংশের আলাদা হবার সময় থেকেই চলছিল। এর ফলেই এখন পূর্ব অঞ্চল তাদের আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের জন্য দাবি করেছে এবং অবশেষে যা স্বাধীনতার আন্দোলনে রূপ নিয়েছে।

পূর্বের পাট কল বন্ধ হয়ে গেলে, পশ্চিম পাকিস্তানের অর্থনীতি ঝুঁকিতে পড়বে।

 

পূর্ব পাকিস্তান সবসময় পশ্চিম পাকিস্তানে উৎপাদিত পণ্যের বাজার হিসেবে ব্যাবহ্রিত হয়েছে। বিশেষ করে পোশাকের জন্য তুলার উপকরণ। এবং এই বাণিজ্য এখন বন্ধ হয়ে গেছে।

 

তুলা হল এমন সস্তা মানের বিশ্বের কোন স্থানে যার আর কোনও বাজার নেই; এটা পূর্ব পাকিস্তানে একটি সরকার নির্ধারিত মূল্যে বিক্রি হত। এটা করা হত পশ্চিমের টেক্সটাইল শিল্পকে টিকিয়ে রাখার জন্য।

 

পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সমস্ত সংবাদ প্রতিবেদনগুলির উপর সেন্সরশিপ প্রয়োগের কারণে সেখানে অর্থনীতিতে কি কি সমস্যা হচ্ছে তা তুলে ধরা মুশকিল হচ্ছে।

 

পূর্ব পাকিস্তানে স্বাধীনতা বাহিনীর বিরুদ্ধে পাকিস্তানের সরকার কতদিন যুদ্ধ করে টিকে থাকবে তা অনিশ্চিত।

 

  • সিডনী এইচ শ্যানবার্গ

 

 

 

 

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ

২৬। পূর্ব পাকিস্তানের হত্যাযজ্ঞ

 

দা ইভনিং স্টার এপ্রিল ১৭, ১৯৭১
Saniyat Islam

<১৪, ২৬, ৬০>

 

দা ইভনিং স্টার , এপ্রিল ১৭, ১৯৭১

সম্পাদকীয়

পূর্ব পাকিস্তানের হত্যাযজ্ঞ

 

সব সূত্র যাচাই করে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া গেছে যে পূর্বপাকিস্তানের সর্বস্তরে এখন যা চলছে তাকে হত্যাযজ্ঞ হিসেবেই অবিহিত করতে হবে। সর্বস্তরে চলছে চিহ্নিত বাঙালি পুরোনো এবং নতুন নেতাদের হত্যাসহ স্বাধীনতাকামি বাঙালিদের দমিয়ে রাখার প্রচেষ্টা।এর ফলে সাময়িকভাবে কার্যকরীভাবে স্বাধীনতার দাবি একটু থিতু হয়ে এসেছে।

 

মুক্ত বাংলার স্বাধীনতার ডাক দেয়া রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলার আসামী হিসেবে গ্রেপ্তার হয়েছেন এবং পশ্চিম পাকিস্তানে বিচারের অপেক্ষায় কারা -অন্তরীণ রয়েছেন। আধুনিক এবং সুসজ্জিত ৮০,০০০ সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বিপ্লবী বাংলার অস্ত্রস্বল্প, খাদ্যস্বল্প সেনাবাহিনীর গেরিলা আক্রমণ সুবিধা করতে পারছেনা বরং এরকম খবর আসছে যে পশ্চিম পাকিস্তানী সেনাবাহিনী হাজার হাজার সাধারণ মানুষকে হত্যা করেছে এবং কিছু সূত্র বলছে এই সংখ্যা লক্ষ ছাড়িয়ে গেছে। নিউইয়র্ক টাইমসের এক রিপোর্টার যিনি ভারত থেকে পূর্ব পাকিস্তানে গেছেন বলছেন যে সেনাবাহিনী করাচি থেকে নির্বাহী আজ্ঞামতে প্রকৌশলী, চিকিত্সক, অধ্যাপক এবং ছাত্রদের চিহ্নিত করে হত্যা করেছে এবং করে চলেছে এবং এর মূল হীনলক্ষ্য ভবিষ্যত বাংলাদেশকে নেতৃত্বশূন্য করে ফেলা । শুধু এটাই নয় সেনাবাহিনী ভবিষ্যত অর্থনীতিকে বিনষ্ট করবার পরিকল্পনায় খাদ্য গুদাম, প্রাকৃতিক গ্যাস ক্ষেত্র এবং পাটের কারখানাগুলোকে ধ্বংস করে দিচ্ছে।

 

এধরনের সেনা অভিযানের খবরে যদিও অত্যুক্তি থাকে এবং ধরেও নেয়া হয় যে পূর্ব পাকিস্তানের বিপ্লবী সেনারা পরাজিত হবে কিন্তু যেসব খবর আসছে সেগুলো হৃদয়বিদারক এবং নৃশংস। যারা এই ঘটনার প্রতক্ষদর্শী নন তারাও এসব রিপোর্টে আন্দোলিত না হয়ে পারছেন না। এই পরাজয় পূর্ব পাকিস্তানের সর্বসাধারণের জন্য আরো বড় আঘাত হয়ে আসবে কেননা খুব নিকট অতীতেই তারা ভয়াবহ বন্যা, রোগ আর দুর্ভিক্ষের সাথে লড়াই করেছে। জয়ের ফলে পশ্চিম পাকিস্তান এই রক্তাক্ত বিচ্ছিন্নতাবাদ দমন অভিযানে সম্ভাব্য সাফল্য দাবি করবে এবং পাঞ্জাবি আর পাঠানদের সাথে বাঙালিদের যে দীর্ঘস্থায়ী শত্রুতা তা আবার সামনে চলে আসবে।

 

আমেরিকার সরকার এই উদ্ভুত পরিস্থিতিতে কোনো প্রতক্ষ পদক্ষেপ নিচ্ছে না, অথচ তাদের এ ব্যাপারে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে পাকিস্তানকে এই হত্যাযজ্ঞ, যেখানে এটাকে এখন গণহত্যা বলে অবিহিত করা যায়, বন্ধে সরাসরি হস্তক্ষেপ করা উচিত। শুধু তাই নয়, যুদ্ধ বন্ধ হলে যারা এই নৃশংস হত্যাযজ্ঞে বেঁচে যাবে তখন তাদের বৃহদাসরে খাদ্য সরবরাহ, চিকিত্সা এবং পুনর্বাসন নিয়েও তাদের প্রস্তুত থাকা উচিত।

শিরোনাম সূত্র তারিখ
২৭। শিরোনামঃ বাঙালী সৈনিকের ভয়ংকর অভিজ্ঞতা সূত্রঃ নিউইয়র্ক টাইমস ১৭ এপ্রিল, ১৯৭১

 

Anjamul Hoque Ananda

<১৪, ২৭, ৬১৬৩>

 

নিউইয়র্ক টাইমস, ১৭ই এপ্রিল, শনিবার

আটকে পড়া বাঙালী কর্মকর্তার ভয়ংকর অভিজ্ঞতা

সিডনী এইচ শ্যানবার্গ

নিউইয়র্ক টাইমস এর বিশেষ প্রতিবেদক।

 

আগরতলা, ভারত, এপ্রিল ১৩ – দবির মনে করতে থাকেন, ২৫ মার্চ রাতে তিনি এবং ৫৩ডি ফিল্ড আর্টিলারি রেজিমেন্ট এর দুইজন পূর্ব পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তা যখন বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলেন, তখন তাদের কমান্ডারকে তার কার্যালয়ে ডেকে আনা পাকিস্তানি সেনাদের উদ্দেশ্যে বলতে শুনলেনঃ

 

“তোমরা সবাই এখনই শহরে যাও, এবং সকালের মধ্যে আমি পুরো কুমিল্লা লাশে ঢাকা পড়া দেখতে চাই। যদি কোন কর্মকর্তা তা করতে ইতস্ততঃ বোধ করে, তাহলে সে আমার কাছে কোন ধরনের অনুকম্পা পাবে না।”

 

দবির বলতে থাকেন, পরবর্তিতে, ৩০শে মার্চ বিকেলে, অন্য দুইজন বাঙালী কর্মকর্তাসহ পাঁচদিন গৃহবন্দী থাকার পর পশ্চিম পাকিস্তানিরা তাঁদের হত্যা করার জন্য তাঁদের ঘরে একজন সেনা কর্মকর্তাকে পাঠায়- কিন্তু দবির মৃত্যুর অভিনয় করে আহত অবস্থায় পালিয়ে বাঁচতে সক্ষম হন।

 

তিনি এখন বাঙালী জনগণের দেওয়া পূর্ব পাকিস্তানের নতুন নাম বাংলাদেশ, তথা বাঙালী জাতির স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধরত সৈন্যবাহিনীতে যোগ দিয়েছেন।

 

তাদের সহকর্মীদের হত্যা

 

বস্তুতঃ দবির এর অভিজ্ঞতা ব্যতিক্রম কিছু ছিল না। পশ্চিমা উদ্বাস্তু, বাঙালী সৈনিক এবং শরণার্থীদের ভাষ্যমতে, সশস্ত্র বাহিনীগুলোতে আধিপত্যি বিস্তার করে রাখা পশ্চিম পাকিস্তানি সেনারা সমগ্র পূর্ব পাকিস্তান জুড়েই তাদের পূর্ব পাকিস্তানি সহকর্মীদের হত্যা করছে যাতে করে অল্প সংখ্যক সেনা কর্মকর্তাও স্বাধীনতা যুদ্ধের পক্ষে না থাকতে পারে। বিভিন্ন সূত্র হতে পাওয়া প্রতিবেদন মতে, অনেক বাঙালী কর্মকর্তাদের পরিবারকেও একসাথে জড়ো করে হত্যা করা হয়েছে।

 

এভাবে আইন এবং শপথ ভেঙ্গে সেনা-কর্মকর্তাদের নিজেদের সহযোদ্ধাদের হত্যা করা যাদের সাথে কাঁধ মিলিয়ে তারা যুদ্ধ করেছেন, এই যুদ্ধের আরো অনেক ঘটনার মধ্যে একটি বাস্তবতাকে খুব পরিষ্কারভাবে সামনে তুলে আনে, তা হল ৭.৫ কোটি বাঙালীর প্রতি পাঞ্জাবী এবং পাঠান পশ্চিম পাকিস্তানিদের জাতিগত তীব্র ঘৃণার গভীরতা।

 

যে রাতে সেনাবাহিনী স্বাধীনতা সংগ্রামকে দমন করার চেষ্টা শুরু করেছিল সে রাত থেকেই বাঙালী সৈনিকদের হত্যা করা শুরু হয়।

 

২০ বছর বয়সী, অবিবাহিত, মোটামুটি সুঠাম দেহের অধিকারী সেকেন্ড লেফটেনেন্ট দবির পূর্ব পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলের এক শিবিরে বসে সেই রাত এবং পরবর্তি দিনগুলোতে তার ঘটনাগুলো এই প্রতিবেদককে বলছিলেন।

 

দবির তাঁর আসল নাম নয়; তিনি একটি ছদ্মনাম ব্যবহার করতে চেয়েছেন তাঁর পরিবার- বাবা-মা, এক ভাই, তিন বোনে- এদের মধ্যে কেউ একজন বেঁচে থাকার সম্ভাবনার কথা ভেবে।

 

কার্যালয়ের দায়িত্ব অর্পণ

 

কোমল, প্রায় আবেগহীন কন্ঠে তিনি বলতে লাগলেনঃ

 

পশ্চিম পাকিস্তানি সেনারা অস্ত্র সংগ্রহ করতে কমান্ডারের কার্যালয় থেকে অস্ত্রাগারের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে যাওয়ার পরেই তিনজন নিরস্ত্র বাঙালী কর্মকর্তাকে ভেতরে ডাকা হল এবং বলা হল তাঁদের কার্যালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, যদিও তাঁরা অবস্থাদৃষ্টেই বুঝতে পেরেছিলেন তাঁদের গৃহবন্দী করা হচ্ছে।

 

যে রাতে তাঁদের কমান্ডারের পাশের কক্ষে রাখা হয়েছিল সে রাতে দবির ঘুমাতে পারেন নি। রাত ১টার দিকে উঠোনের কোথাও সাত বা আটটি গুলি হয়েছিল।

 

পরের তিন দিন দবির এবং অন্য দুইজন, উভয়েই ক্যাপ্টেন, যখন প্রহরীদের প্রহরায় টেলিফোন এবং কাগজপত্রের জবাব দিচ্ছিলেন তখন তারা দূরে ম্যাশিন-গান, ছোটখাট আগ্নেয়াস্ত্র এবং গোলার আওয়াজ শুনেছেন।

 

একটি জানালা দিয়ে তাঁরা কিছু পাকিস্তানি সৈন্যকে দেখলেন রেজিমেন্টের ৬০ জন বাঙালী সেনাকে হাত উপরে তুলে একটি দালানের পেছনে নিয়ে যেতে। তারপর তিনজন আগ্নেয়াস্ত্রের অবিরাম হুংকার শুনলেন এবং বুঝলেন বাঙালীদের হত্যা করা হয়েছে।

 

মার্চের ২৯ তারিখে সকল ছলচাতুরির অবসান ঘটিয়ে এই তিন কর্মকর্তাকে একসাথে একটি কক্ষে বন্দী করে ফেলা হল। ভীতির মধ্য দিয়েই তাঁরা রাত কাটালেন।

 

৩০ তারিখ বিকেলে একজন পশ্চিম পাকিস্তানি কর্মকর্তা দরজার সামনে এলো এবং বন্দুকের বাঁট দিয়ে দরজার কাঁচ ভেঙ্গে ফেলল।

 

একজন বাঙালী ক্যাপ্টেন হাঁটু গেড়ে বসে প্রাণভিক্ষা চাইলেন। জবাব ছিল এক পশলা গুলি। দ্বিতীয় পশলা গুলি চালানো হল দ্বিতীয় ক্যাপ্টেনের দিকে।

 

দবির দরজার পাশের দেয়ালের সাথে ঘেঁষে দাঁড়ালেন। পশ্চিম পাকিস্তানি দরজার তালা খোলার চেষ্টা করল এবং গালি দিয়ে চাবি আনতে চলে গেল।

দবির নিজের খাটিয়ার নিচে গিয়ে ঢুকলেন এবং হাত দিয়ে মাথা ঢেকে রাখলেন। লোকটি ফিরে এল। “আমি জোরে চিৎকার করেছিলাম”, বললেন দবির। “সে গুলি করল। আমি টের পেলাম আমার গায়ে গুলি লেগেছে। আমি এমনভাবে শব্দ করলাম যেন আমি মারা যাচ্ছিলাম। আমি মারা গেছি ভেবে সে গুলি বন্ধ করল এবং চলে গেল।”

 

লাঠি এবং ধারালো অস্ত্র দিয়ে খোঁচানো

 

একটি গুলি গিয়ে লেগেছিল দবির এর ডান কব্জিতে, অন্য একটি তার চোয়াল ছুঁইয়ে গিয়েছিল এবং তৃতীয়টি তার পেছন দিকে তাঁর জামা ছিঁড়ে গিয়েছিল। তিনি তাঁর কবজি থেকে রক্ত নিয়ে তাঁর মুখে মেখে দিলেন এবং নিঃশ্বাস বন্ধ করে রাখলেন যখন অন্যান্য কর্মকর্তারা তাঁরা মারা গিয়েছেন কিনা তা নিশ্চিত করতে ফেরত এসেছিল।

 

পশ্চিম পাকিস্তানিরা যতক্ষণ পর্যন্ত তৃপ্ত হচ্ছিল না ততক্ষণ পর্যন্ত লাশগুলিকে লাঠি এবং ধারালো অস্ত্র দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে দেখছিল। পরের আড়াই ঘন্টা ধরে একের পর এক সৈন্য এই প্রদর্শনী দেখতে কক্ষটিতে আসছিল। এক পাঞ্জাবী সার্জেন্ট দুই ক্যাপ্টেন এর মৃতদেহে লাথি মারছিল। প্রত্যেক বারই দবির প্রাণপণে নিশ্বাঃস আটকে রেখেছিলেন।

 

“সময় গড়ালো”, দবির বলতে থাকলেন, “রক্ত শুকিয়ে গিয়েছিল আমার ক্ষতের উপর মাছি এসে জড়ো হচ্ছিল। গন্ধটা খুব বাজে ছিল।”

 

সাত ঘন্টা পর দবির জানালা দিয়ে বের হলেন এবং চার ফুট নিচে মাটিতে গিয়ে পড়লেন। একজন পাহারাদার তাঁর শব্দ শুনে ফেলল এবং গুলি করা শুরু করল, কিন্তু অন্ধকার থাকার কারণে তার গুলিগুলো উল্টোপাল্টা ভাবে চলে গেল। প্রাঙ্গণে থাকা অন্যান্য সৈন্যরাও গুলি করা শুরু করল, কিন্তু দবির সর্বশেষ প্রহরী কুঠুরীটি পার হয়ে, একটি ধানক্ষেত হামাগুড়ি দিয়ে এবং একটি ছোট নদী পার হয়ে পালাতে সক্ষম হলেন। পরের দিন একজন গ্রাম্য চিকিৎসক তাঁর কব্জি থেকে গুলিটি বের করে ব্যান্ডেজ করে দিলেন।

 

দবিরকে দেখতে এখনো কিশোর মনে হয়- ওজনে মাত্র ১২০ পাউন্ড- কিন্তু তাঁর আচার ব্যবহার এ ব্যাপারে কোন দ্বিধা রাখে না যে পশ্চিমা পাকিস্তানের কাবুলে অবস্থিত মিলিটারি একাডেমি থেকে শ্রেণীতে ৪র্থ হয়ে স্নাতক করার মাত্র ৩ মাসের মধ্যেই তিনি এখন পুরোপুরি বড় হয়ে গেছেন।

 

পশ্চিম পাকিস্তানিদের প্রতি তাঁর ঘৃণা অন্ত্যন্ত তীব্র কিন্তু নিয়ন্ত্রিত। “কোন কারণ ছাড়াই তারা আমাদের হত্যা করেছে”, তিনি বলেন, “তারা আমাদের বাধ্য করেছে তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে”।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

     শিরোনাম সূত্র তারিখ
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই তৈরী হয়েছে পাকিস্তানে

নিউয়র্ক টাইমস

 

১৮ই এপ্রিল, ১৯৭১

 

 

Saniyat Islam

<১৪, ২৮, ৬৪৬৫>

 

নিউয়র্ক টাইমস, ১৮ই এপ্রিল, ১৯৭১

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই তৈরী হয়েছে পাকিস্তানে ব্যবহৃত অস্ত্র

  • চেস্টার বোলস

 

এসেক্স , কন. – পূর্ব পাকিস্তানে এখন যে ভয়ঙ্কর সংগ্রাম চলছে তার এবং আরো অস্ত্রাভিযানের যে মহড়া চলছে ‘বন্ধুত্বপূর্ণ সরকারের’ প্রশ্নবোধক মোড়কে কিন্তু এই প্রশ্ন একেবারেই তোলা হচ্ছে না যে এই অস্ত্র কার বিরুদ্ধে ব্যবহার হবে বা কি জন্য ব্যবহার হবে?

 

১৯৫৪ এবং ১৯৬৫ সালের মধ্যে পাকিস্তান (পশ্চিম পাকিস্তান) সরকারের জন্য যে বিলিয়ন ডলারের সামরিক সরঞ্জাম প্রোগ্রাম ছিল সেটি ১৯৬৫ সালে পাকিস্তানকে ভারত আক্রমণে ইন্ধন জুগিয়েছিল। এখন (কিছু সোভিয়েত ও চীনা যুদ্ধসরঞ্জাম) এটি পশ্চিম পাকিস্তান সরকার দ্বারা ব্যবহার করা হচ্ছে তাদের পূর্বপাকিস্তানি স্বদেশবাসীর বিরুদ্ধে যারা কিছুদিন আগেই বৃহত্তর স্বায়ত্তশাসনের জন্য ব্যাপকভাবে ভোট দিয়েছেন।

 

এটা সমগ্র বিশ্বের কাছে একটি অশুভ প্রদর্শনী কারণ আমাদের সরকারের পক্ষ থেকে কোন দায়িত্বশীলতার কোন ইঙ্গিত নেই যে এই অস্ত্র কিভাবে বা কার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে এটি সমগ্র পরিস্থিতি ধাঁমাচাপা দেয়ার সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালিয়েছে।

 

এমনকি যখন আন্তর্জাতিক রেডক্রসকে পূর্ব পাকিস্তানে প্রবেশ করতে দিতে অস্বীকার করে, যখন সব বিদেশী সংবাদদাতারা তাত্ক্ষণিকভাবে দেশ থেকে বের করে দেয়া হয়, এবং যখন ঢাকায় আমাদের কনস্যুলেট জেনারেলের মাধ্যমে তাত্ক্ষণিক রিপোর্টগুলিতে বর্ণিত হয়েছে পূর্ব পাকিস্তানের বেসামরিক নাগরিকদের উপর পশ্চিম পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ব্যাপক সামরিক অভিযানের বিস্তারিত বিবরণ, আমাদের সরকার বলছে এটা কি ঘটছে তা জানত না তাই তাই মন্তব্য করার মতো কোন অবস্থানে তারা নেই।

 

এটি কেবল তখনই প্রকাশ্যে আসতে শুরু করে যখন পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থারত ৫০০ এর মতো আমেরিকান শরণার্থী আমাদের সরকারকে চাপ দিতে শুরু করে পশ্চিম পাকিস্তানের এই বর্বরতায় নিঃশ্চুপ থাকার জন্য।

 

আমার মতে মার্কিন সরকারের অনতিবিলম্বে দুটি কাজ করতে হবে। প্রথমত, মার্কিন সরকারের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সরঞ্জামের অপব্যবহারের বিরুদ্ধে পশ্চিম পাকিস্তানের সরকারকে শক্তিশালী প্রতিবাদ করতে হবে এবং চিকিত্সা এবং খাদ্য ছাড়া সব ধরণের সহায়তা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের একটি বৈঠকে ডেকে আলোচনা করা যাতে কিভাবে এশিয়ার শান্তি বজায় রাখা যায় এবং যথাযথ পদক্ষেপগুলি বিবেচনা করা যেখানে এর মধ্যে সংঘাত স্পষ্ট হয়ে গেছে। মার্কিন সরকারের মুখপাত্র ইতিমধ্যেই প্রথমটি উপেক্ষা করেছেন এবং দ্বিতীয় প্রত্যাখ্যান করেছেন এই মর্মে যে পূর্ব পাকিস্তানে যা হচ্ছে এটা পাকিস্তানের একটি “অভ্যন্তরীণ ব্যাপার” যার মধ্যে হস্তক্ষেপ করার অধিকার আমাদের নেই। কিন্তু একই প্রশ্ন কি করা যায়না কঙ্গোতে মার্কিন হস্তক্ষেপ সম্পর্কে? কিংবা দক্ষিণ আফ্রিকা সম্পর্কে ? দক্ষিণ রোডেশিয়া, কিংবা সাইপ্রাস প্রসংগে ?

 

যখন এই ধরনের ব্যাপক মাত্রায় শান্তি হুমকির সম্মুখীন হয় তখন জাতিসংঘের উচিত যেকোনো মূল্যে, নিয়ন্ত্রণ হাতছাড়া হয়ে যাবার পূর্বেই, একটা সমাধান খুঁজে বের করা। এই দায়িত্ব আরো বেশি হয়ে যায় যখন দেখা যায় যে এই ‘আভ্যন্তরীন ব্যাপার ‘ আসলে পার্শ্ববর্তী দেশের ১০০০ মাইল দূরত্বে থাকা একটি ভিন্ন ও গভীর অন্ত:র্নির্মিত সাংস্কৃতিক দ্বন্দে থাকা এবং ভিন্ন অর্থনৈতিক স্বার্থের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণকে পদদলিত করে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য একটি সুশৃঙ্খল আধুনিক অস্ত্রসজ্জিত সংখ্যালঘুদের প্রচেষ্টা দেখা যায়।

 

যদি আমরা এই যুদ্ধ বন্ধ করার জন্য বিশ্ব মতামতের নেতৃত্ব গ্রহণ করি, তাহলে সোভিয়েত ইউনিয়ন, যা আপাতঃ দৃষ্টিতে পাকিস্তানকে একটি হালকা দোষী সাব্যস্ততার প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে বসে আছে, অবশ্যই আমাদের অবস্থান সমর্থন করবে। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিশেষ করে চীনের কাছ থেকে যারা ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সমস্যা নিয়ে উদ্বিগ্ন হলেও পরিস্থিতিতে তারা পশ্চিম পাকিস্তানের ডানপন্থী সামরিক একনায়কত্বের সাথে সহমর্মী ।

 

পূর্ব পাকিস্তানের উত্থানের স্মারক হিসেবে এসেছিলো ডিসেম্বর মাস, যা দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতির নতুন আশা জুগিয়েছিল।পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত প্রথম স্বাধীন নির্বাচনে ফল হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমান ও তার আওয়ামী লীগের একচ্ছত্র জয়লাভের মাধ্যমে শুধু যে একটি গণতান্ত্রিক শোকের গঠনের সুযোগ সৃষ্টি হলো শুধু তাই নয়, ভারতের সাথে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের মাদ্ধমে দুই দেশের মধ্যে দ্বন্দ্ব লাঘবের সুযোগও সৃষ্টি হয়েছিল।

 

দুই মাস পর, ভারতের নির্বাচনে সুবিশাল জয়ে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মিসেস গান্ধীর নির্বাচিত হওয়ায় ভারতীয় জনসাধারণের দারিদ্র্য হ্রাসের জন্য এবং তার প্রতিবেশীদের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক উন্নত করার পথ সুগম হয়।

 

দুঃখজনকভাবে, পশ্চিম পাকিস্তান সরকারের এই পদক্ষেপের ফলে নিকট ভবিষ্যতে একটি রাজনৈতিকভাবে স্থিতিশীল, একিভূত পাকিস্তান রাষ্ট্রের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের আশা ধূলিস্যাত হয়ে গেছে। যদিও তাদের সামরিক শক্তি প্রশ্নাতীত, অবশ্যম্ভাবীভাবেই পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থানরত পশ্চিম পাকিস্তানি বাহিনী শেষ পর্যন্ত প্রত্যাহার হবে, কারণ আসন্ন বর্ষার মৌসুমে গ্রামাঞ্চলে খাদ্য এবং সামরিক সরবরাহ করা হবে অত্যন্ত কঠিন, ফলে আমরা একটি স্বাধীন পূর্বপাকিস্তানের সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছি।

 

কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘ যদি একটি বিকল্প পথ দেখতে না পারে এবং বর্তমান সংগ্রামকে এর অনিবার্য রক্তাক্ত চূড়ান্ত পরিনিতিতে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়, তবে পূর্ব পাকিস্তান হয়ে উঠবে রাজনৈতিকভাবে বিভ্ৰান্ত ৭০ মিলিয়ন মানুষের একটি জনপদ যারা মনে করবে তাদের সমর্থন পাওয়ার একমাত্র আশা হচ্ছে ভারত সরকার। এটা হবার সম্ভাবনা খুব বেশি একারণে যে অনেক পর্যবেক্ষক বিশ্বাস করছেন, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য গভীরভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতা শেখ মুজিবুর রহমান ইতিমধ্যেই মারা গেছেন।

 

যেহেতু এই বিপদ একটি ক্রমবর্ধমান সমস্যা হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে, মিসেস গান্ধীর সরকারকে ভারতীয় জনসাধারণের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের কর্মসূচি থেকে সরে এসে

 

ভারতের উত্তর এবং পূর্ব সীমান্ত সুরক্ষিত করার জন্য রাজনৈতিক ও সামরিক সমস্যাগুলোতে মনোনিবেশ করতে হচ্ছে।

 

 

 

 

 

***চেস্টার বোলস, ভারতের রাষ্ট্রদূত (১৯৬৩১৯৬৯), উপমহাদেশে মাত্রই দশ সপ্তাহ অবস্থান শেষে ফিরে এসেছেন তিনি এবং লিখেছেন একটি নতুন বই, “প্রমিসেস টু কিপ”    

 

 

 

 

 

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
২৯। এই যুদ্ধে নারকীয় অবস্থা কেবল এক পক্ষেরই নিউ ইয়র্ক টাইমস …. এপ্রিল, ১৯৭১

 

Tirtha Taposh

<১৪, ২৯, ৬৬৬৭>

 

নিউ ইয়র্ক টাইমস

এই যুদ্ধে নারকীয় অবস্থা কেবল এক পক্ষেরই­­

 

আগরতলা, পূর্ব পাকিস্তান – লোকে বলে, যুদ্ধ নরকের সমান। কিন্তু, সেটা উভয় পক্ষের জন্যই।

 

পাকিস্তানী সৈন্য ও প্রায় নিরস্ত্র পূর্ব পাকিস্তানী যোদ্ধাদের মাঝের মাত্র তিন সপ্তাহের পুরোনো এই যুদ্ধের এক মাত্র নরক ছিল পূর্ব পাকিস্তানের ১০ হাজার সাধারন মানুষের জীবন, যেটি পাকিস্তানী সেনারা সন্ত্রাস ও সীমাহীন নিপিড়নে মাধ্যমে ধ্বংস করেছিল এবং সাথে গুড়িয়ে দিতে চেয়েছিল বাঙ্গালীদের স্বাধিনতার স্বপ্ন।

 

বেশির ভাগ বড় শহর নিজেদের আয়ত্তে এসে যাওয়ায়, পাকিস্তানী আর্মি- যার সিংহভাগই পশ্চিম পাকিস্তানী সেনা দিয়ে গড়া, তাদের অনেকের ভিতরেই পূর্ব পাকিস্তানিদের প্রতি জাতিগত ঘৃণা ধারণ করে আছে। এই সেনাবাহিনী এখন আক্রমণ চালাতে শুরু করছে গ্রামের দিকে। অল্প কিছু দিনের মধ্যেই শুরু হবে প্রবল বর্ষা। এই ঘোর বর্ষায় নিয়মিত আর্মি চলাচল খুবই কঠিন, তার আগেই তারা চায় তাদের আয়ত্বের সীমানা আরো কিছুদূর এগিয়ে নিতে।

 

“তারা এই হাটু-পানিতে ভুল করবে ও মারা যাবে’’, বললেন এক বাঙ্গালী অফিসার। “ গ্রামের নৌকা ব্যবহার করে আমরা তাদের জীবন অসহ্য বানিয়ে দিব।’’

 

এক অন্ধকারাচ্ছন্ন সময়ের পথে এই যুদ্ধ এগুচ্ছে।

 

বেশির ভাগ কূটনীতিক ও বিদেশী পর্যবেক্ষকরা ভাবছেন এই যুদ্ধের ফলাফল হিসেবে বাঙ্গালীরা তাদের থেকে হাজারের বেশী মাইল দূরের পশ্চিম পাকিস্তানীদের জীবন দূর্বিষহ বানিয়ে তুলবে।

 

যদি না বিদেশী বানিজ্যিক সাহায্যের কমতি না ঘটে তবে যে শোষনের প্রতিবাদে এই স্বাধীনতা যুদ্ধের শুরু; সেই যুদ্ধে, পশ্চিম পাকিস্তানের কবল হতে নিজের দেশকে উদ্ধার করতে বছরের পর বছর পার হয়ে যাবে এই সাড়ে সাত কোটি বাঙ্গালীর, এটুকু স্বীকার করতেও বাধ্য হচ্ছেন পর্যবেক্ষকরা।

 

প্রতেক মূদ্রার যেমন দুটো পিঠ থাকে; তেমনি থাকে প্রত্যেক গল্পের, প্রত্যেক তর্কের, প্রতি সংঘর্ষের! কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানে যা কিছু ঘটছে তা দেখার পর, পাকিস্তানী আর্মির এইসকল কার্যক্রমের ন্যাযতা দাবি করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্পষ্ট সব তথ্যপ্রমাণ থেকে দেখা যাচ্ছে সেনাবাহিনীকে পাঠানোই হয়েছে পূর্ব পাকিস্তানের সকল নেতা ও রাজনৈতিক মাথাদের মেরে ফেলা ও দেশ অর্থনৈতিক ভাবে ধ্বংস করে দেওয়ার জন্য।

 

“তারা চায় আমাদের এত নিচে টেনে আনতে যেন আমরা ঘাস খেয়ে বেঁচে থাকতে বাধ্য হই’’, বলছেন এক বাঙ্গালী যোদ্ধা। “তাদের বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়াবার মত যেন কেউই না থাকে, তারা সেটা নিশ্চিত করতে চায়’’।

 

বাঙ্গালী ছাত্র, বুদ্ধিজীবী, অধ্যাপক, সেনা কর্মকর্তা, প্রকৌশলী, ডাক্তার, কিংবা যে কোন ব্যক্তি, যাদের মধ্যে নেতৃত্ব দেবার মত এতটুকুও ক্ষমতা আছে, পাকিস্তানী সেনারা তাদেরকে হত্যা করছে

 

ট্যাঙ্ক, জেট যুদ্ধ বিমান, ভারী কামান, গানবোট যার বেশির ভাগই যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়ন, কম্যুনিস্ট চায়না থেকে পাওয়া, তাই দিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানীরা নির্বিচারে বাঙ্গালীদের খুন করে চলেছে একের পর এক হামলায় ধ্বংস করছে খাদ্য গুদাম, চা-বাগান, পাট কারখানা, প্রাকৃতিক গ্যাস ক্ষেত্রকে, যাতে করে পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক অবকাঠামোকে একেবারে মাটিতে মিশিয়ে দেয়া জয়ায়।

 

অফিসিয়াল রেডিও দিয়ে পাকিস্তান সরকার বারবার দুষছে তাদের পুরোনো শত্রু ভারতকে। তাদের অভিযোগ ভারত যুদ্ধের সব ক্ষেত্রেই সর্বাত্মক ভাবে সাহায্য করছে মুক্তিযোদ্ধাদের; অস্ত্র সরবরাহ, পাকিস্তানী নৌবহরকে আক্রমণ, অস্থায়ী চোরাগোপ্তা এমবুশ, লুকোনো রেডিও স্টেশন প্রতিস্থাপন থেকে শুরু করে তাদের এই গণহত্যার ব্যপারে অনাহূত, অতিরঞ্জিত বার্তা প্রকাশে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমকে অনুপ্রাণিত করা পর্যন্ত সকল ব্যপারেই।

 

যদিও ভারত সরকার এসকল অভিযোগই বারবার প্রত্যাখান করেছে, তবুও বাংলাদেশের নিজস্ব কোনো সংবাদমাধ্যম না থাকায়, তারাই বিশ্ব সংবাদের কাছে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।

 

ভারত হয়তোবা মুক্তিযুদ্ধে গোলা-বারুদ পাঠাচ্ছে, তবে এখন পর্যন্ত এমন কোন কিছুই প্রমান করার মত তথ্য পাওয়া যায় নি।

 

“কিছু বিচ্ছিন্নতাবাদীর” কাজ বলে এই মুক্তিযুদ্ধকে অভিহিত করে প্রতিদিন খবর জানাচ্ছে রেডিও পাকিস্তান ও নিয়ন্ত্রিত পশ্চিম পাকিস্তানের সংবাদ মাধ্যম। “পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসছে”, পাটের পুনরায় রপ্তানিও চালু হয়েছে এমন সংবাদও দিচ্ছে। যার সবটাই এক ঢাহা নোংরা জালিয়াতি ছাড়া কিছু নয়।

 

সিডনি এইচ. শ্যানবার্গ

 

 

 

 

 

 

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
৩০। কুষ্টিয়ার যুদ্ধ টাইম এপ্রিল ১৯, ১৯৭১

 

Ashraful Mahbub

<১৪, ৩০, ৬৮-৬৯>

 

টাইম ম্যাগাজিন, এপ্রিল ১৯, ১৯৭১

কুষ্টিয়ার যুদ্ধ

 

গত সপ্তাহে পূর্ব পাকিস্তানে দুর্বার প্রচণ্ড লড়াইয়ে বাঙ্গালী শহরের অধিবাসি ও কৃষকরা ৮০,০০০ পশ্চিম পাকিস্তানী সৈন্যদের “হানাদার বাহিনী” কে প্রতিরোধ করেছে। সংবাদে জানা যায় যে, প্রচন্ডভাবে সশস্ত্র পশ্চিম পাকিস্তানী সেনাদের হাতে কমপক্ষে ২০০,০০০ বেসামরিক নিহত হয়েছে। কিন্তু সৈন্যরাও রাগাম্বিত কৃষকদের হাতে গুরুতরভাবে হতাহত হয়েছে। এই সৈন্যবাহিনী রাজধানী ঢাকা, গুরুত্বপূর্ণ চট্টগ্রাম ও খুলনা বন্দর এবং অন্যান্য কয়েকটি শহর নিয়ন্ত্রন করছে। কিন্তু প্রাপ্ত খবর অনুয়ায়ী বাংলাদেশ মুক্তি ফৌজ (বেঙ্গল স্টেট লিবারেশন ফোর্সেস) নামক একটি দুর্বার প্রতিরোধ বাহিনী অনেক নগর ও শহর সহ পূর্ব পাকিস্তানের অন্তত এক-তৃতীয়াংশের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। পশ্চিম পাকিস্তানের কর্তৃপক্ষ পূর্ব পাকিস্তান থেকে সব বিদেশী সাংবাদিকদের বহিষ্কার করে বহির্বিশ্ব থেকে যুদ্ধের প্রকৃত তথ্য আড়াল করতে প্রায় পুরোপুরি সফল হয়েছে। কিন্তু গত সপ্তাহে টাইম প্রতিবেদক ড্যান কগিংস ভারত থেকে সীমান্ত পার হয়ে পূর্ব পাকিস্তান যেতে সক্ষম হন, যেখানে তিনি কুষ্টিয়া শহর (লোকসংখ্যাঃ ৩৫,০০০) এর যুদ্ধক্ষেত্র পরিদর্শন করেন। শহরের লোকজন এবং বন্দী পশ্চিম পাকিস্তানী সেনাদের সাথে ব্যাপক সাক্ষাৎকারের পর, কগিংস গৃহযুদ্ধের প্রথম পক্ষকাল সময় এ কুষ্টিয়ায় সংঘটিত বর্বরতা এবং সাহসিকতার একটি প্রতিচ্ছবি তৈরি করতে পেরেছিলেন।

 

তার রিপোর্ট

 

কুষ্টিয়া, বিস্তৃত গঙ্গা কাছাকাছি চাল-উৎপাদনকারী জেলার একটি শান্ত শহর, ২৫ মার্চ রাতে একটি বিশ্রামহীন ঘুমে কাটল।সতর্কবাণী ছাড়াই, কুষ্টিয়া থানার বাইরে ১৩ টি জীপ আর ট্রাক থেমে যায়।সময় ছিল রাত ১০:৩০ যখন যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে। ৬০ মাইল দক্ষিণে অবস্থিত যশোর সেনানিবাসের বেস থেকে ২৭ বেলুচ রেজিমেন্টের ডেল্টা কোম্পানি এসে পৌঁছায়। কোম্পানির ১৪৭ সদস্য কোনো প্রকার প্রতিরোধ ছাড়াই ৫০০ বাঙালি পুলিশকে দ্রুত নিরস্ত্র করে ফেলে এবং তারপর চারটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট এর দখল নেয়েঃ জেলা পুলিশ প্রধান কার্যালয়, সরকারি অফিস ভবন, ভি এইচ এফ বেতার ট্রান্সমিটার এবং ছেলেদের জিলা স্কুল। সকাল ৫:৩০ এর আগে ঘুমন্ত শহরের অধিবাসিগণ অধিকাংশই বুঝতে পারেনি কি ঘটেছিল, যখন সৈন্যদের জীপ ক্ষিপ্ত গতিতে খালি রাস্তায় দিয়ে যাচ্ছিল আর ঘোষনা করছিল যে কারফিউ ৩০ মিনিট পর থেকে শুরু হবে।

 

কারফিউ বলবৎকালীন সময় কুষ্টিয়া ৪৮ ঘন্টার জন্য শান্ত ছিল, যদিও সাতজন-বেশিরভাগই কৃষক যারা শহরে এসেছিল, কি ঘটেছিল ঐ বিষয়ে অজ্ঞাত ছিল, রাস্তায় দেখামাত্র গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। কারফিউ ২৮ মার্চ সকালে প্রত্যাহার করা হয় এবং শহরের লোকজন দ্রুততার সাথে প্রতিরোধ করার জন্য সংগঠিত হতে শুরু করেছে ।

সেই রাতে, সৈন্যদের সামনে ৫৩ জন পূর্ব পাকিস্তানী পুলিশ কিছু করতে অক্ষম ছিল। তারপর, তারা সব ৩০৩ এনফিল্ড রাইফেল ও গোলাবারুদ যা বহন করতে পারে তা নিয়ে নিকটবর্তী গ্রামে চলে যায়। পুলিশরা ১০০ জন কলেজ ছাত্র যারা ইতিমধ্যে “বাংলাদেশের” জন্য কাজ করছিলেন ঐ বাহিনীর সঙ্গে যোগ দেন। ছাত্ররা স্থানীয় কৃষকদের গেরিলা যুদ্ধের মূলকৌশল শিখাচ্ছিল যাদের হাতে অস্ত্র বলতে শুধুমাত্র হাতুড়ি, খামার সরঞ্জাম ও বাঁশের লাঠি ছিল। দুই দিনের মধ্যে, পুলিশ ও শিক্ষার্থীরা কয়েক হাজার স্বেচ্ছাসেবক ও ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের যোদ্ধাদের সংগঠিত করেছিল এবং কুষ্টিয়ায় পাঁচ সেনা অবস্থানের উপর যুগপত হামলার জন্য পরিকল্পনা করছিল।

 

৩১ মার্চ ভোর ৪.৩০ টার সময়, প্রায় ৫০০০ কৃষক ও পুলিশ নিয়ে একটি গঠিত বাহিনী কুষ্টিয়া মুক্ত করার অভিযান শুরু করে। শহরের অধিবাসিগণ হাজার হাজার জনগণ “জয়বাংলা” (বাংলার জয় হোক) বলে রাস্তায় চিৎকার করছিল। দৃশ্যত সৈন্যরা অগ্নিশর্মা হাজার হাজার বাঙালিদের আক্রমনের ভয়ে চিন্তায় ব্যাকুল ছিল। মোহাম্মদ আইয়ুব নায়েক সুবেদার (সিনিয়র সার্জেন্ট) কে আটকের পরে, দুঃখ করে বললেন “আমরা খুবই আশ্চর্য হয়েছি”। “আমরা ভেবেছিলাম বাঙালি সৈন্যরা আকারে আমাদের মতই এক কোম্পানির মত হবে। আমরা জানতাম না যে সবাই আমাদের বিরুদ্ধে ছিল”।

 

তাক্ষনিক মৃত্যু

 

কুষ্টিয়ায় বাঙ্গালী যোদ্ধারা কোন আত্মঘাতী, জনস্রোতের আক্রমন করেনি, যা তারা কিছু জায়গায় করছিল।কিন্তু রাইফেলের শত শত অবিচলিত অনবরত গোলাবর্ষনে ডেল্টা কোম্পানির সৈন্যদের ওপর এক নিষ্করুণ প্রভাব ফেলেছিল।দুপুরে, সরকারি ভবন এবং জেলা সদর এর পতন ঘটে।পরের দিন ভোর হওয়ার অল্পক্ষণ আগেই, প্রায় ৭৫ জন সৈন্য তাদের জীপ ও ট্রাকের জন্য রাস্তা তৈরি এবং দূর পর্যন্ত প্রবল গোলাবর্ষন করতে থাকে। দুটি জিপ জনতার আক্রমন এর মুখে অবরুদ্ধ হয়ে পরে। ঘটনাস্থলেই পূর্ব পাকিস্তানিরা ডজন খানেক সৈন্যকে টেনে বের করে আনে এবং তাদের জবাই করে।

 

অন্যান্য গাড়িগুলো কালো টন শহরের বাইরে রাস্তাজুরে ফেলে রাখা গাছের ব্যারিকেড এবং খনন করে রাখা ৪ ফুটের পরিখাতে আটকা পরেছিল।সৈন্যরা কৃষকদের দ্বারা পরাজিত ও কুপিয়ে হত্যা করার আগে প্রায় ৫০ জন বাঙালিকে গুলি করে। কয়েকজন সৈন্য পালিয়ে গেলেও পরে বন্দী করে হত্যা করা হয়।

 

পরের দিন ভোর হওয়ার আগেই ,কুষ্টিয়ায় ১৩ জন সৈন্য রেডিও ভবন ছেড়ে পালায় এবং ১৪ মাইল পায়ে হেটে পাড়ি দেবার পর দুজন বাঙালি যোদ্ধা তাদের আটক করে নিয়ে যায় এবং তাদেরকে কুষ্টিয়া জেলা কারাগারে ফেরত আনা হয়। জানা মতে তারা ডেল্টা কোম্পানির ১৪৭ জনের মধ্যে বেঁচে যাওয়া ১৩ জন। নিহত পশ্চিম পাকিস্তানীদের মধ্যে নাসিম ওয়াকার ছিল, ২৯ বছর বয়সী একজন পাঞ্জাবি যাকে গত জানুয়ারিতে কুষ্টিয়ার সহকারী উপ-কমিশনার হিসেবে নিযুক্ত করা হয়েছিল। যখন একটি উত্তেজিত জনতার স্রোত তার লাশ পায়, তারা এটিকে শহরের রাস্তায় আধ মাইল মত এটি টেনে-হিচঁরে নিয়ে যায়।

 


 

স্বল্পমাত্রার প্রতিরোধের চেষ্টা

 

পরদিন পাকিস্তান সেনাবাহিনী কুষ্টিয়ায় পাল্টা আক্রমণ করার জন্য যশোর থেকে অন্য পদাতিক কোম্পানি প্রেরণ করে। ঐ নতুন কোম্পানি কুষ্টিয়া থেকে অর্ধেক দূরত্বে বিশাখালি গ্রামে বাংলাদেশী বাহিনীর পাতা ফাঁদ এ আটকা পড়ে। সেনা বহরের নয়টি গাড়ির দুইটি জিপ বাঁশ ও লতাপাতায় আবৃত একটি গভীর গর্তে ঢুকে আটকে যায়। তিয়াত্তর জন সৈন্য ঘটনাস্থলেই নিহত হয় এবং অন্যদের তাড়া করে হত্যা করা হয়।

 

গত সপ্তাহ জুরে, বাংলাদেশের সবুজ, লাল ও সোনালি পতাকা কুষ্টিয়ায় ছাদে, ট্রাকে এবং এমনকি রিকশায় ও উড়ছিল। এই অঞ্চলে স্থানীয় দলীয় নেতার অধীনে বাঙালি প্রশাসন চলমান ছিল, ডঃ আসহাবুল হক (৫০) একজন খ্যাতিমান চিকিৎসক যিনি ওয়েবলি-স্কট রিভলবার এবং স্প্যানিশ স্বয়ংক্রিয় গ্রেনেড প্যাকেট করেন। এই সপ্তাহের শেষে, কুষ্টিয়া থেকে কয়েক মাইল দূরে দুইটি সেনা ব্যাটালিয়ন একটি ফাঁড়ি গড়েছে। তারা খবর পেয়েছে, যদিও দুর্বার প্রতিরোধের বিরুদ্ধে সামান্য অগ্রগতিই করতে পেরেছে। এমনকি যদি সৈন্যরা কুষ্টিয়ায় পৌঁছাতে পারেও, শহরের মানুষেরা আবারও যুদ্ধ করতে অনেক বেশী প্রস্তুত ছিল।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
৩১। একটি মুমুর্ষ আদর্শ ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল

২১ এপ্রিল , ১৯৭১

 

 

Shuvadittya Saha

<১৪, ৩১, ৭০-৭৩>

 

ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল, এপ্রিল ২১, ১৯৭১

একটি উজ্জ্বল সম্ভাবনা

 

পূর্ব পাকিস্তানিদের আমৃত্যু যুদ্ধের অঙ্গীকার

কিন্তু ওরা কি পারবে ?

তাদের বিপ্লবকে সামনে এগিয়ে নেবার মতো অস্ত্রের এবং নেতৃত্বের অভাব

অন্য কোন দেশ থেকে কোন সাহায্য নেই

অনেক বেশি প্যাট্রিক হেনরি?

 

পিটার আর. কান

(ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের স্টাফ রিপোর্টার)

 

মেহেরপুর, পূর্ব পাকিস্তান – মানুষ গরুর গাড়িতে , রিকশায় , বাইসাইকেলে, কেউ কেউ ট্রাকে, কিন্তু বেশিরভাগ লোক এবং মুক্তিযোদ্ধা বাংলাদেশ থেকে পায়ে হেঁটে ভারতের সীমান্তের দিকে ছুটছে। মেহেরপুর থেকে আধা মাইল পিছনে পশ্চিম পাকিস্তানি সেনা ক্যাম্প থেকে মর্টার এবং ক্ষুদ্র অস্ত্রের গুলি ধেয়ে আসছে।

 

“পাঞ্জাবিরা (পশ্চিম পাকিস্তানি) মেহেরপুরে কামান এর গোলা এবং বোমা ফেলছে” একদল বাঙালি চিৎকার করে ভারত সংলগ্ন সীমান্তে একটা ট্রাক লক্ষ্য করে বললো, যেটা গ্রাম থেকে শুধু শেষ অস্ত্রধারী লোকদের নিয়ে সীমান্ত পারি দিচ্ছিল। ভারত সীমান্তের চার মাইল এর মতো পথ – খাঁখাঁ প্রায় জনমানবশূন্য গ্রাম।   মেহেরপুরের অপেক্ষাকৃত ধনী ব্যক্তিগণ একদিন আগেই শহর ছেড়ে চলে গেছে। আজকে যারা যাচ্ছে, তাদের মধ্যে আছে খালি পায়ে শরণার্থী , ছয় বাচ্চা নিয়ে মলিন পোশাকে মহিলা , মাথায় মালসামান নিয়ে বোচকা বোঝাই করা লোকজন , বিছানা ভেঙে টেনে নিয়ে যাচ্ছে এমন দুইজন লোক, একজন অন্ধ লোক, যে কিনা তার অন্ধের যষ্ঠি গরু নিয়ে হেটে যাচ্ছে।

 

একটি দুর্বল যুদ্ধ চালনা

 

ভারতীয় সীমান্তে একটি মিলিটারি ক্যাম্পের আশেপাশে শ’খানেক বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্য মলিন মুখে ব্যাজ নামিয়ে বসে আছেন। ভারতীয় সীমানার ভিতরে আরো এক ডজন সেনাবাহিনীর জীপ আর একটা রিকোয়েলাস রাইফেল দেখা যাচ্ছে, সম্ভবত সেটাই বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একমাত্র রিকোয়েলাস রাইফেল। পিছনের দিকে কয়েক মাইল দূরেই ভারতের সীমান্তবর্তী শহরে জটলা করে বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ চলমান রাজনৈতিক অবস্থা নিয়ে এবং শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত লড়াই করে যাবার কথা আলোচনা করছে ।

পাকিস্তানে গৃহযুদ্ধ শুরু হবার পর থেকে নি:সন্দেহে প্রচুর বাঙালি মারা গেছে। কিন্তু নানাবিধ কারনে সেভাবে যুদ্ধ এখনো দেখা যায়নি। সেকারনে মনে হচ্ছে আমরা বাংলাদেশে সম্ভবত ইতিহাসের একটি দুর্বলতম এবং সময়ের হিসেবে স্বল্পতম বিপ্লব দেখতে যাচ্ছি। এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে ৫০০০০ এরও কম সেনা নিয়ে এবং সীমিত আগ্নেয়াস্ত্র, যুদ্ধ বিমান ব্যবহার করে সেনাবাহিনী ৭৫ মিলিয়ন বাঙালিকে দমন করতে সক্ষম হয়েছে।

 

স্বাধীনতার সুদীর্ঘ পথ

 

বলছি না যে, বাংলাদেশ হবার কারণগুলো এখন আর আবেদন নেই। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তান যদি কোনদিন স্বাধীন হয়, সেটা কখনো গত চার সপ্তাহে যেই ধরনের “স্বতঃস্ফূর্ত বিপ্লব” দেখলাম, তার মাধ্যমে অন্তত সম্ভব না। স্বাধীনতা হয়তো আসবে, তবে কয়েক সপ্তাহে না, কয়েক বছরে, আরো কঠিন লড়াই এবং অল্প কাব্যের মাধ্যমে, প্রচলিত যুদ্ধের পরিবর্তে গেরিলা যুদ্ধের মাধ্যমে এবং সম্ভবত আদর্শবাদের বুলি না কুপচিয়ে সশস্ত্র বামপন্থী গেরিলাদের মাধ্যমে ।

 

অনেকখানি আবার নির্ভর করবে ভারতের উপরে, তারা কতটুকু অস্ত্র এবং সীমান্তে সহযোগিতা দিবে দীর্ঘায়িত এই স্বাধীনতা যুদ্ধ চালিয়ে যেতে। কিন্তু যাই হোক না কেন, পশ্চিম পাকিস্তান কঠিন সমস্যায় পড়বে। সামনে বর্ষার মৌসুম শুরু হবে, এই অবস্থায় তারা দখলকৃত সুদীর্ঘ গ্রাম বাংলায় কিভাবে তাদের সৈন্য মোতায়েন করবে। তাদের পুনরায় দখলকৃত কলোনিতে তারা প্রশাসনই বা কিভাবে চালাবে। পূর্ব পাকিস্তানের ভেঙে পড়া অর্থনীতিকে বা কিভাবে জোড়া লাগানো হবে আর কিভাবেই বা পূর্ব পাকিস্তানকে সীমিত পশ্চিম পাকিস্তানি সম্পদ এর আবর্জনার স্তূপ হবে থেকে বাঁচানো যাবে। বাঙালি প্রতিরোধ এর প্রতি ভারতের সমর্থনকেই বা কিভাবে মোকাবেলা করা হবে যাতে এই প্রতিরোধ লড়াইয়ে তাদের সমর্থন আরো না বাড়ে।

 

পাকিস্তানের সমস্যা আরো অনেকগুন বেড়ে যাবে যদি পশ্চিম পাকিস্তানের জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এর মধ্যেও অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ে , অথবা এই দুর্দিনে পশ্চিম পাকিস্তান এর অন্যান্য প্রতিদ্বন্দ্বী জেনারেল বা রাজনীতিবিদরা ঐক্যবদ্ধ না থাকে।

 

একটি সোজাসাপ্টা সংগ্রাম

 

সংগ্রামের তীব্রতা এবং সংগ্রামের নৈতিক কারনের প্রশ্নে কিছু সংশয় থাকলেও মূল সমস্যার জায়গাগুলো মোটামোটি সোজাসাপ্টা। ১৯৪৭ সালে যখন ইংল্যান্ড তাদের ভারতীয় সাম্রাজ্যকে স্বাধীনতা প্রদান করে, জাতিগতভাবে অথবা ভৌগলিক ভাবে ভাগ না হয়ে ভারতীয় উপমহাদেশ ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ হয়। মুসলিম পাকিস্তানের দুই ভাগ হিন্দু ভারতের দুই পাশে ১২০০ মাইল দূরে অবস্থিত ছিল। পাকিস্তানে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামরিক দিক থেকে পাঞ্জাবিদের একছত্র আধিপত্য ছিল, এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালিরা শোষণের স্বীকার বলে ভাবতে শুরু করল ।

 

গত ডিসেম্বরে যে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তাতে পূর্ব পাকিস্তানিরা শেখ মুজিবর রহমানের জাতীয়তাবাদী আওয়ামীলীগকে অভূতপূর্ব ভাবে ভোট দিয়ে বিজয়ী করে। আ :লীগ এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে, যার অর্থ দাঁড়ায় গণতন্ত্রের নিয়ম অনুসারে পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করার কথা। পশ্চিমাঘেঁষা এবং মধ্যপন্থী সমাজতন্ত্রী বলে পরিচিত শেখ মুজিবর রহমান পররাষ্ট্র আর প্রতিরক্ষা বাদে অন্য সব বিষয়ে পূর্ব বাংলার স্বায়ত্বশাসন এর দাবি করেছেন। অর্থনৈতিক এবং অন্যান্য নানা কারনে পশ্চিম পাকিস্তানী রাজনীতিবিদ এবং জেনারেলরা এই প্রস্তাবের কঠোর বিরোধিতা করছেন।

 

আলোচনার নাম করে সময় ক্ষেপন করে পূর্ব পাকিস্তানে বিপুল পরিমানে পশ্চিম পাকিস্তানী সেনা এবং ভারী অস্ত্র নিয়ে আসা হয়েছে। ২৫মার্চ রাতে এই সেনারা ক্ষিপ্রতা এবং নৃশংসতার সাথে পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকায় আঘাত হেনেছে এবং জঘন্য বর্বর ভাবে বাঙালি আন্দোলনকারীদেরকে দমন করেছে । পাকিস্তান মিলিটারি ঢাকা এবং বন্দর নগরী চিটাগাং এর দখল নেয়, এবং যুদ্ধের সূত্রপাত ঘটে।

 

অন্যান্য শহর গুলোতে বাঙালিরা প্রতিরোধ গড়ে তুলে এবং সেগুলো স্বাধীন আছে বলে প্রচার করছে। এই বিপ্লবটা খনিকটা গল্পের বই এর মতো, যেখানে হাজার হাজার প্যাট্রিক হেনরি জ্বালাময়ী বক্তিতা দিচ্ছে অস্ত্র ধারণ করে দেশ স্বাধীন করে ফেলতে এবং হাজার হাজার বেটসি রোজেরা লাল , সবুজ এবং হালকা সোনালী রঙের বাংলাদেশের পতাকা বানাচ্ছে। বেসামরিক প্রশাসন , ইপিআর (বাঙালি রেজিমেন্ট , যা আসলে পাকিস্তান আর্মির একটা অংশ ছিল ) এবং সর্বস্তরের সাধারণ বাঙালিরা মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা কুঁড়েঘর থেকে অফিস আদালত, গরুর গাড়ি থেকে আধুনিক জীপ্ সর্বত্র পতপত করে উড়ছে। বিপ্লবের স্লোগান “জয় বাংলা” অবুঝ শিশু থেকে রাজনীতিবিদ পর্যন্ত সবার মুখে মুখে ঘুরে ফিরছে।

 

 

অস্ত্রবিহীন একটি সেনাবাহিনী

 

বাঙালিদের কিছু জিনিস ছিল না বা তারা কিছু কাজ করার চেষ্টা করেনি যা তারা করতে পারত। ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস এর আধা সামরিক বাহিনীর সদস্যরা ছাড়া মুক্তিবাহিনীর অন্য কারো অস্ত্র বা প্রশিক্ষণ দুটোরই মারাত্বক অভাব ছিল। এমনকি ইপিআর এর কাছেও খুব হালকা এবং পুরানো যুগের অস্ত্র ছিল। এই অস্ত্রের স্বল্পতা হয়তো দেশে বানানো সম্ভব এমন অস্ত্র, যেমন দেশে তৈরী মলোটভ ককটেল বা সাধারণ মাইন দিয়ে কিছুটা দূর করা যেত, কিন্তু বাঙালিরা এক্ষেত্রে খুব সামান্য কাজ করেছে।

 

বাঙালিরা বিস্ময়করভাবে যুদ্ধের জন্য একেবারে অপ্রস্তুত ছিল, অথচ যুদ্ধ যে কোন সময় শুরু হতে পারে, এমন আশঙ্কা অনেক বাঙালিই এমনকি কয়েক বছর ধরে করে আসছে। বাংলাদেশের দুর্ভাগ্য যে, তাদের কোন ধরনের যোগাযোগ ব্যবস্থা বা লিয়াজো বা বোঝাপড়া ছিল না, যেকারনে গ্রামের পর গ্রাম, জেলার পর জেলা তাদেরকে ভুগতে হচ্ছে । নেতৃত্ব সাধারণভাবে আওয়ামীলীগ নেতাদের হাতে এবং কিছু ক্ষেত্রে সরকারি চাকুরী করা লোকের হাতে ছিল।

 

তাদের শহরে বসে থাকার একটা প্রবণতা দেখা যায়, যেখানে বসে তারা প্রথমে তাদের লোকদের নিয়ে উদ্দীপক কথা বার্তা বলে, এবং পরে হাহুতাশ করে কেন তাদের যুদ্ধ বিমান, আর্টিলারি , গোলাবারুদ ইত্যাদি নেই এসব বলে। শেখ মুজিবর রহমান, যিনি কিনা এখন পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি বলে ধারণা করা হচ্ছে, তিনি একজন টিপিক্যাল বাঙালি।   তার একজন কট্টর সমালোচক, যিনি নিজেও একজন বাঙালি, শেখ মুজিবের সম্পর্কে বলেছেন “একজন অসম্ভব লোক ! যখনই তাকে কোন প্রশ্ন করা হোক না কেন, তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এর একটা উক্তি দিয়ে তার জবাব শুরু করবেন। ” ঠাকুর হলো বাঙালিদের সর্বোৎকৃষ্ঠ লেখক।

 

পশ্চিম পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বেকুবের মতো ভেবেছিল ৭৫মিলিয়ন শত্রুভাবাপন্ন লোক ৫৫০০০ বর্গ মেইল এলাকায় ছড়িয়ে আছে (বাংলাদেশের আয়তন কমবেশি আরাকান এর মতো।) তাই তারা প্রথম ২ সপ্তাহ শহর এলাকাতে মিলিটারি ক্যান্টনমেন্ট এর আশেপাশে তাদের অভিযান চালায়। কিন্তু যখন তারা বিমান বাহিনীর সাহায্য নিয়ে দেশের অভ্যন্তরে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করলো, তারা খুব অল্পই প্রতিরোধ পেয়েছিল।

 

একটি চ্যালেঞ্জহীন সেনাভিযান

 

গত সপ্তাহের শেষের দিক থেকে বাংলাদেশের বাহিনী শহর খালি করে চলে যাচ্ছে আর পাকিস্তানি মিলিটারি রাস্তায় নামছে প্রায় কোন রকম প্রতিরোধ ছাড়াই। আমাদের কাছে কিছু প্রতিবেদন আছে যে, বাংলাদেশী নেতারা এবং যোদ্ধারা গ্রামের দিকে সরে যাচ্ছে গেরিলা যুদ্ধের প্রস্তুতি নেবার জন্য। কিন্তু মেহেরপুর বা এরকম কিছু জায়গা, যেখান থেকে ভারতের পশ্চিম বাংলার সরাসরি সীমান্ত আছে, সেখানে লোকজন সোজাসোজি ভারতে চলে যাচ্ছে।

 

এখনকার একজন স্কুল এর প্রিন্সিপাল যিনি গত সপ্তাহেই সাংবাদিকদের বাংলাদেশের অস্থায়ী রাজধানীতে (মেহেরপুর) স্বাগত জানিয়েছিলেন, তিনি এখন ভারতের একটি সীমান্তবর্তী শহর গেড়েতে একটি অতিথিশালায় যেয়ে উঠেছেন। তিনি বললেন “আমাদের ৭৫ মিলিয়ন লোক শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত লড়াই করে যাবে। ”

 

আর একজন শরণার্থীর সাথে কথা হলো। তাকে বেশ নৈরাশ্যবাদী শোনালেও তিনি সত্যি কথাটাই বলার চেষ্টা করেছেন : ” রক্ত পিপাসু পাঞ্জাবীরা আমাদেরকে শাসন করবে, তা যে কোন মূল্যের বিনিময়েই হোক না কেন। তারা আমাদের হাজার হাজার মানুষ মেরে ফেলছে। আমরা কিই বা করতে পারি ? আমাদের হাতে তেমন কোন অস্ত্র নেই। ইন্ডিয়ানরা আমাদেরকে কিছু ব্রিটিশ আমলের বন্দুক দিয়েছে। কিন্তু পাঞ্জাবীরা কিন্তু কোন অকেজো বন্দুক নিয়ে বসে নেই। গতকালকেই আমরা আমাদের জমিতে কৃষিকাজ নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম কিন্তু আজকে আমাদের গেরিলা হবা ছাড়া কোন উপায় নেই । কিন্তু কিভাবে সেটা হবে ? অনেকে বলছেন, বর্ষাকাল শুরু হলে আমাদের সুবিধা হবে। কিন্তু কিভাবে আমরা সেটার সদ্ব্যবহার করব ? আমাদের কাছে পেন্সিল কাটার ছুরি আর নৌকা চালানোর বৈঠা, বর্ষা এসব আছে। সেগুলো নিয়ে আমরা নৌকা ভাষায় চলব আর ওদের কাছে আছে যুদ্ধ বিমান, কামান, আর্টিলারি, ট্যাংক। আমরা কি করে পেরে উঠব ওদের সাথে ?”

 

পূর্ব পাকিস্তানের দর্শনা শহর সীমান্ত থেকে ৩ মাইল দূরে অবস্থিত । বেশ কিছু বাংলাদেশী সমর্থক একটি পরিত্যক্ত পুলিশ ফাঁড়িতে উদ্বিগ্ন হয়ে বসে পরস্পরের চোখ চাওয়া চাওয়ি করছে। পাঞ্জাবিদের হাতে এখন থেকে ১০ মাইল দূরে অবস্থিত জেলা শহর চুয়াডাঙ্গার পতন ঘটেছে, এরকম একটি অসমর্থিত খবর নিয়ে তারা আলাপ করছে। ” ২টি পাকিস্তানী যুদ্ধ বিমান চুয়াডাঙ্গার উপরে বোমা বর্ষণ করেছে। একাধিক বাঙালি মারা গেছে। পাঞ্জাবিরা শহর থেকে মাত্র ৩ মাইল দূরে আছে। তাদের প্রতিরোধ করার জন্য কোন বাংলাদেশী মুক্তি বাহিনী শহরে নেই। সবাই শহর ছেড়ে চলে গেছে। ”

 

আমরা মারা যাব

একজন রাজনীতিবিদ বক্তিতা দিচ্ছে যে বাংলাদেশের সমর্থনে বহি:বিশ্বের কেউ এগিয়ে আসছে না, যেটা আসলেই সত্যি কথা । কিছু লোক তার কথা শুনছে। আর একজন স্থানীয় নেতা জিজ্ঞেস করছে, পাকিস্তানী বাহিনীর মোকাবেলায় বাংলাদেশী মুক্তি বাহিনীর প্ল্যান কি ? কেউ একজন বললো “আমরা সবাই মারা পড়ব”.. অন্য একজন হতাশভাবে মাথা নেড়ে সায় দিল। কিন্তু পরের দিন পাকিস্তানী বাহিনী কোন প্রতিরোধ ছাড়াই চুয়াডাঙ্গা শহরে প্রবেশ করল।

 

একটা হতাশা বাংলাদেশের মানুষকে গ্রাস করছিল যে বাইরের বিশ্বের কেউ পাকিস্তানকে থামাতে এগিয়ে আসছে না। বাংলাদেশিদের আশা করাটা হয়তো খুবই স্বাভাবিক, কিন্তু এমনকি চরম বাস্তববাদী কোন মানুষও বাংলাদেশের ব্যাপারে বিশ্বের অন্যান্য দেশের ভূমিকায় হতাশ হতো। বাঙালিরা, যারা কিনা পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ এবং আক্রান্ত হয়ে বাধ্য হয়ে এখন স্বাধীনতার জন্য লড়াই করছে, তাদের সাহায্যে পৃথিবীর কোন শক্তিশালী দেশ এগিয়ে আসছে না।

 

রাশিয়া পশ্চিম পাকিস্তানকে হত্যাযজ্ঞ বন্ধ করতে আহবান জানিয়ে বাংলাদেশকে শুধু হালকা মৌখিক সমর্থন দিয়েছে। অন্য দিকে কমিউনিস্ট চীন যাদের কিনা নিজেদের সংগ্রামের ইতিহাস আছে, তারা পশ্চিম পাকিস্তানকে পুরো সমর্থন দিয়ে বসে আছে।

 

শুধুমাত্র ভারত, যে কিনা পাকিস্তানের প্রতিবেশী এবং শত্রু, সে বাংলাদেশ কে দৃঢ়ভাবে মৌখিক সমর্থন দিয়েছে। ভারত অঘোষিতভাবে পূর্ব পাকিস্তানের সীমানার মধ্যে প্রবেশ করে এখানকার লোকদের এবং মুক্তিবাহিনীকে যথা সম্ভব সাহায্য দেওয়া এবং অন্ততপক্ষে আপাদত শরণার্থী নেবার নীতি গ্রহণ করেছে। কিন্তু এমনকি ভারতও সরাসরিভাবে কূটনৈতিকভাবে বাংলাদেশকে স্বীকার করা অথবা সংগঠিত মিলিটারি সাহায্য দেবার মতো কোন কিছু করছে না।

 

বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ার ভয়

 

এখন পর্যন্ত ভারত এবং পাকিস্তান উভয়ই পরস্পর এর বিরুদ্ধে বিভিন্ন তিক্ত অভিযোগ এবং পাল্টা অভিযোগ করলেও, মনে হচ্ছে উভয় দেশই উদ্বিগ্ন যেন দুই দেশের মধ্যে সর্বাত্বক যুদ্ধ শুরু না হয়ে যায়। কিন্তু যদি সামান্যও ধৈর্যচ্যুতি ঘটে, যে কোন সময় পূর্ব পাকিস্তানের গোলযোগ সারা উপমহাদেশে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

 

গত শনিবারে ভারতীয় সীমানার থেকে মাত্র কয়েক গজের মধ্যে অবস্থিত মুজিবনগরের আম্রকাননে বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার শপথ নেয়। এই অনুষ্ঠানে বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে গণমাধ্যমে উপস্থাপন করা হয় এবং বক্তারা দেশপ্রেম মূলক বক্তব্য দেন।

 

কিন্তু বাংলাদেশের গরিমা খুব দ্রুত মলিন হতে সময় লাগল না । অনুষ্ঠানের পরদিনই এক ডজনের মতো লোক বাদে ওই গ্রামকে সম্পূর্ণ ধুলায় মিশিয়ে দেওয়া হলো। অনুষ্ঠানের মঞ্চ এর একটা স্ট্যান্ড আম্রকাননে ঠিকই দাঁড়িয়ে রইল কিন্তু কিছু হাঁস আর রাজঁহাস ছাড়া কাউকেই তার আশেপাশে দেখা গেল না।

 

ভারতের সীমান্তের অভ্যন্তরে সেই গরিমার কিছু লেস খুঁজে পাওয়া গেল। একজন বাংলাদেশী কর্মকর্তা আগের দিনের স্মৃতিচারণ করলেন, “সেটা একটা অসাধারন দিন ছিল। ” তিনি বললেন, “সাতজন মন্ত্রী , ২৭ জন বিশিষ্ঠ ব্যক্তি। কি অসাধারন বক্তিতা। একটি স্মরণীয় অনুষ্ঠান ”

শিরোনাম সূত্র তারিখ
৩২। সীমান্তের দিকে চাপ টাইম ২৬ এপ্রিল, ১৯৭১

 

Nishat Oni

<১৪, ৩২, ৭৪৭৫>

 

                  টাইম ম্যাগাজিন, এপ্রিল ২৬, ১৯৭১

সীমান্তের দিকে চাপ

গত সপ্তাহে রেডিও পাকিস্তান ঘোষণা করেছে পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকা আর যশোর শহরের মধ্যে আভ্যন্তরীণ বিমান ফ্লাইট চালু হয়েছে, যা বিদ্রোহীদের একটি শক্ত ঘাঁটি । ব্রডকাস্ট নোট করতে ব্যর্থ হয় যে পি আই এ প্রপজেট শুধুমাত্র সেনাদের বহন করছিল এবং যশোর বিমান বন্দরে এয়ার ফোর্স SABRE জেট দ্বারা তারা পাহারায় ছিল ।

 

এটা সত্যি যে, পাকিস্তানের অসভ্য গৃহযুদ্ধে সেনাবাহিনী আক্রমণাত্মক ভাবেই গ্রহণ করেছে । যতক্ষণ না পর্যন্ত অতিরিক্ত জনবল ও সরবরাহ না পৌঁছায়, সৈন্যরা নিজেদের অধ্যুষিত এলাকায় থাকা বেছে নেয়। গত সপ্তাহে তারা ভারতীয় সীমান্তে চাপ দেয়, সময়ের মধ্যে রাস্তার উপরে শক্ত আস্তরণ রক্ষা করার জন্য । মে মাসের শেষের দিকে সাধারণত বর্ষা আরম্ভ হয় । যদি তা রক্ষা করা যায় তাহলে তারা যে কোন মাপের অস্ত্র এবং অন্যান্য উপকরণ আমদানি অবরুদ্ধ করতে পারবে বাংলাদেশী প্রতিরক্ষা যোদ্ধাদের জন্য।

 

নকশাল সহানুভূতি

 

অপারেশনের ভারী খরচ সত্ত্বেও ( প্রতিদিন প্রায় ১.৩ মিলিয়ন ) এবং বিশ্বব্যাপী সমালোচনার দরুন, পাকিস্তান সরকারের রাষ্ট্রপতি আগা মোহাম্মাদ ইয়াহিয়া খান একটি নিষ্পত্তিমূলক বিজয় ঘোষণা দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় । আমেরিকা সহ অন্যান্য পশ্চিমা দেশ নিরপেক্ষতা বজায় রাখছে । ওয়াশিংটন ঘোষণা করেছে, মার্চের ২৫ তারিখ থেকে শুরু হওয়া পাকিস্তানকে কোন অস্ত্র সাহায্য করা হয়নি। অপরদিকে সাম্যবাদী চীন পাকিস্তানকে জোরালো সমর্থন করে যাচ্ছে, যেখানে পাকিস্তানের ঐতিহ্যবাহী বিপক্ষ ভারত, বিদ্রোহীদের প্রতি সহানুভূতিশীল।

পূর্ব বাঙ্গালী বিদ্রোহীদের নিকটাত্মীয় পশ্চিম বাঙ্গালী অনেকেই গভীরভাবে জড়িত ছিল । কিন্তু পশ্চিম বাঙ্গালীরা পূর্ব বাংলার দীর্ঘায়িত যুদ্ধে তাদেরও দাম দিতে হতে পারে ভেবে ভয় পাচ্ছিলো। এতদিন পশ্চিম বাংলা সীমান্ত পার হয়ে আসা আশ্রয়প্রার্থীদের একটা ধীর অবিচল প্রবাহ গ্রহণ করে আসছিল। এই ধারা এখন বৃদ্ধি পেয়েছে যা স্টেটের অর্থনীতিতে অতিরিক্ত বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পশ্চিম বাঙ্গালীদের মধ্যে অতি উৎসাহী কিছু শহুরে সন্ত্রাসী আছে যারা মাওবাদী নকশাল। এদের মধ্যে কেউ কেউ সীমান্ত পার হয়ে ঘরোয়া বন্দুক ও বোমা নিয়ে বিদ্রোহীদের সাহায্য করছে।

 

 

কঠোর শব্দ

 

সরকারীভাবে ভারত শান্ত থাকার চেষ্টা করছে। প্রধানমন্ত্রী ইন্দ্রিরা গান্ধী আগেই ঘোষণা দিয়েছিলেন, পূর্ব পাকিস্তানে ভারত কখনই ‘নীরব দর্শক’ হয়ে থাকবে না। কিন্তু গত সপ্তাহে যখন তাকে জিজ্ঞেস করা হল এটাকে কি রাজকীয় যুদ্ধ বলা হবে কিনা, জবাবে তিনি কঠোরভাবে বলেন, ‘কঠোর শব্দের ব্যবহারে কোন লাভ নেই’।

 

পূর্ব পাকিস্তানের ক্যাম্প থেকে রিপোর্ট করা হয় যে ধ্বংসলীলা চলছেই, মৃতের সংখ্যা দুইলক্ষ বা তারও অধিক। চিটাগাং বন্দরে শতাধিক লাশ নদীতে ফেলা হয়েছে স্রোতে ভেসে যাওয়ার জন্য। কৃষক ভুমিদস্যুদের কমে যাচ্ছে বলে কিছু পর্যবেক্ষক পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষিত নেতাদের বিরুদ্ধে ভার্চুয়াল প্রতিবেদন করেছে। এমনকি পূর্ব পাকিস্তানী ব্যবসায়ীদের মালিকানাধীন আধুনিক পাটকল ও ধ্বংস হয়েছে।

 

অস্থায়ী সরকার

 

বাঙ্গালীদের দিকেও কিছু বর্বরতা ছিল। ১৯৪৭ সালের দেশভাগে ব্রিটিশ ভারত ভাগ হয়ে যে ভারত ও পাকিস্তান হয়েছিল তাদের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানে বসতি স্থাপন করা অ-বাঙ্গালী মুসলিমদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহীরা পুরাতন শোধ পরিশোধে তৎপর হয়। দিনাজপুর শহরে এই গ্রুপের সকল পুরুষদের মেরে ফেলা হয় এবং মহিলাদের আন্তঃক্যাম্পে স্থানান্তর করা হয়। বিদ্রোহীদের রাজনৈতিক নেতা শেখ মুজিবর (মুজিব) রহমানের ক্রমাগত অনুপস্থিতিতে, যিনি পশ্চিম পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি ছিলেন, বিদ্রোহীরা গত সপ্তাহে একটি অস্থায়ী সরকার গঠনের ঘোষণা দেয় । তারা শেখ মুজিবর রহমানকে রাষ্ট্রপতি রেখে, পূর্ব পাকিস্তানে তাদের সহকর্মী তাজউদ্দীন আহমেদকে প্রধানমন্ত্রী বানায়। বিদ্রোহীরা অস্থায়ী সরকারের রাজধানী হিসেবে মেহেরপুরকে ঠিক করে যা ভারত সীমান্ত থেকে মোটামুটি চার মাইল দুরত্ত্বে অবস্থিত।

 

বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পেট্রোল ও জ্বালানীর অভাবে পড়ে এবং একটি সুসংগঠিত সেনাবাহিনীর জন্য প্রয়োজনীয় যোগাযোগ সামগ্রীর অভাবে পড়ে। তারা সম্পূর্ণ স্কেল প্রবৃত্তি এড়িয়ে চলা শুরু করে যাতে অবশ্যম্ভাবী ক্ষয়ক্ষতিতে টিকে থাকা যায়। তাছাড়া কিছু পর্যবেক্ষকের বিশ্বাস, ততদিনে গেরিলা যুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছে যার শহরের অংশ সেনাবাহিনী এবং গ্রামাঞ্চলের অংশ বিদ্রোহীরা নিয়ন্ত্রণ করছে। সরকারের পূর্ব পাকিস্তানে বজায়ে রাখা আপাত সংকল্পের পরেও, পরিস্থিতির নিছক মানবীয় গানিতিক হিসাবে বাঙ্গালীদের জয়ের সম্ভাবনা বা কম করে হলেও আঞ্চলিক সায়ত্ত্বশাসন জিততে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইতিমধ্যেই পশ্চিম পাকিস্তানী সেনাদের মধ্যে বিপরীতে বাঙ্গালী সেনাদের সংখ্যা ছাড়িয়ে গেছে ১০০০ থেকে ১ জনে।

 

 

 

 


 

শিরনাম
সূত্র
তারিখ
৩৩। শকুন ও বুনো কুকুর
নিউ ইয়র্ক টাইমস
২৬ এপ্রিল, ১৯৭১
তানভীর আহমেদ নোভেল

<১৪, ৩৩, ৭৬৭৮>

 

নিউ ইয়র্ক টাইমস, ২৬ এপ্রিল, ১৯৭১

শকুন ও বুনো কুকুর

 

প্রেসিডেন্ট মোহাম্মাদ ইয়াহিয়া খানের পাকিস্তানি সেনাবাহিনী প্রায় দু’সপ্তাহের বেশি সময় ধরে প্রতীক্ষার এর কৌতূহলী খেলায় রত ছিলো। তারা দৃঢ়ভাবে তাদের দ্বিখণ্ডিত দেশের বিদ্রোহী পূর্বভাগের শক্তিশালী ক্যান্টনমেন্ট গুলোতে অবস্থান করেছে এবং তারা বিচ্ছিন্নতাবাদীদের গড়ে তোলা ‘মুক্তিবাহিনী’ কে অবজ্ঞা করেছে। কিন্তু গত সপ্তাহে হঠাৎ তাদের ঘুম ভাঙে। ঘুম থেকে লাফিয়ে উঠেই পাঞ্জাবী সৈন্যদল একসাথে কঠোর পদক্ষেপে এগিয়ে যেতে থাকে এবং অবরুদ্ধ পূর্ব পাকিস্তানের সমস্তটা জুড়ে এক ডজনেরও বেশি বিধ্বংসী আক্রমণ চালায়। আর যখন তাদের এই প্রবল ঝটিকা আক্রমণ গুলো শেষ হয় তখন এটা পরিষ্কার বুঝা যায় যে এক মাসেরও কম বয়সী বাংলাদেশ প্রজাতন্ত্র (বাঙালী জাতি) এ আঘাতে অচেতন হয়ে পড়েছে।

 

এ গৃহযুদ্ধে ইতিমধ্যে বর্বরতা লক্ষণীয়, পাকসেনাদের বজ্রাঘাতগুলো শুধুমাত্রই পশুত্বের চিহ্ন। বন্দরনগরী চট্টগ্রামে পাকিস্তানি সৈন্যরা বাঙালী কয়েদিদেরকে ট্রাকের সামনে তুলে তাদের স্বাধীনতার স্লোগান ”জয় বাংলা” বলতে বাধ্য করছে। যখন বাঙ্গালি তাদের লুকোনো গোপন জায়গা থেকে বের হয়ে এসেছে, তখন পাকিস্তানি সেনারা তাদের সয়ংক্রিয় অস্ত্র দ্বারা সরাসরি তাদের গুলি করছে। . পূর্ব সীমান্তের শহর সিলেট ও কুমিল্লাতে পশ্চিম পাকিস্তানি সৈন্যরা জাতীয়তাবাদী নেতা শেখ মুজিবর রহমানের সমর্থকদের ও বহু কৃষক কে নির্মম ভাবে হত্যা করে তাদের মৃতদেহ ফেলে যায় যেগুলি পরে বুড়ো শকুন ও শিকারী কুকুর ছিন্নভিন্ন করে।

 

পশ্চিম পাকিস্তানিদের উগ্রতম সামরিক অভিযান গুলো দেখলেই বোঝা যায় যে, সাধারণ সামরিক যুদ্ধ হতেও তাদের উদ্দেশ্য অনেক বেশি ভয়ংকর, লোকালয়ের পর লোকালোয়। আসলে পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনিতিকে তারা ধ্বংস করে দিতে চেয়েছে যাতে স্বাধীনতা সংগ্রাম কে পিষে ফেলা যায়। ইসলামাবাদের হাই কমান্ডের নির্দেশেই পাক সেনারা কৌশলে ছাত্র, প্রকৌশলী, ডাক্তার সহ এমন যে কোনো কেউ যার নেতৃত্ব দেবার সম্ভাবনা রয়েছে তাদের হত্যা করছে ; তারা স্বাধীনতাবাদী হোক আর না-ই-হোক। একজন বাঙালী সৈন্যের মতে, ”ওরা আমাদের আবার সেই আঠারো শতকে ঠেলে দিতে চাইছে, যেনো আবার দুর্ভিক্ষ হয়, আর আমরা বাঁচার তাগিদে ঘাস খেতে বাধ্য হই। তারা এটাই নিশ্চিত হতে চায় যে, তাদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে কেউ কখনো রুখে দাঁড়াতে পারবে না”। .

 

সব বিধ্বংসী আক্রমণের বিরুদ্ধে বাঙালীরা তেমন প্রতিরোধ করতে পারেনি। মুজিবের আওয়ামীলীগ সহকর্মীরা বাংলাদেশের যুদ্ধকালীন মন্ত্রী সভা গঠন করেছে ও ঘোষনা করেছে, ‘ বাংলার আকাশে যতক্ষন সূর্য থাকবে ততক্ষণ যুদ্ধ চলবে।’ বিদ্রোহীরা আশা করেছে, আসছে বর্ষার শুরুতেই পশ্চিম পাকিস্তানিদের যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিন্ন হবে। বাঙালিদের পক্ষের একজন বিশ্লেষক বলেন, ‘ সরবরাহ পথ হল ইয়াহিয়া খানের একিলিস হিল। আমাদের হিসাব মতে পাকসেনারা বর্ষায় কোনো সাপ্লাই পাবে না। কমান্ডাররা এতে সন্তুষ্ট থাকবে না। .

 

বন্দী

 

পশ্চিমা নেতারা খুশি হোক কিংবা বেজার, পর্যবেক্ষকদের মতে তাদের আত্মবিশ্বাসের ভালো কারণ রয়েছে। পশ্চিমারা মুজিবকে বন্দী করতে বলেছে এবং দেশদ্রোহের অভিযোগে আদালতে তার বিচার হতে যাচ্ছে। অপরদিকে এই শক্তিশালী ৫১ বছর বয়সী নেতা যিনি সংগ্রামের প্রতীক তিনি বন্দি থাকায় নতুন সরকারের কার্যক্রম একটু ধোঁয়াশার মধ্যে আছে। আর রণক্ষেত্রে ২৫০০০ এর বেশি সাথীকে হারিয়ে বাঙালীরা টলটলায়মান অবস্থায় রয়েছে।

 

তারচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে বাঙালীদের যুদ্ধ বিন্যাস পদ্ধতি সরাসরি প্রশ্নবিদ্ধ। গত সপ্তাহে মিলান জে. কিউবিক পূর্ব পাকিস্তান ঘুরে এক তারবার্তায় জানান, ‘আমি বর্ধমানে শরণার্থীদের ধারাবাহিক স্রোত দেখলাম, যারা মাথায় করে বড় বড় পুটুলি এবং ছোট ছোট ঝাঁকে ঝাঁকে হাড় জিড়জিড়ে ছাগল ও বাছুর চড়িয়ে এগুচ্ছেন’। ‘কিন্তু আমি মাত্র একটাই টয়োটা জিপ দেখলাম যা ‘মুক্তিফৌজ’ বা বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী সৈন্যদের। গাড়িটির নিরস্ত্র ড্রাইভার যার বাড়ি ঝিকরগাছা -রাস্তার উপরে থাকা শত্রুদের নিয়ে সে একটা পরিকল্পনা করল, কিন্তু সে কিংবা তার সাথের অন্য দুজনের কিভাবে তাঁদের মোকাবিল করবে তা নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিল। ‘আমরা কি দিয়ে লড়াই করবো? আমাদের কিছু নাই।

 

প্রতিবেশী

 

গা ছাড়া মনোভাব মনোভাব এবং একই সাথে কেন্দ্রীয় নেতাদের কার্যকরী ভূমিকার অনুপস্থিতির প্রভাব বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জন্য খুব ভালো হবে না। কিন্তু একটা বড় প্রশ্নচিহ্ন রয়ে যায় : শক্তিশালী প্রতিবেশী চীন ও ভারতের প্রতিক্রিয়া। পশ্চিমাদের অভিযোগ মতে দুষ্টু প্রতিদ্বন্দ্বী ভারত দ্বন্দ্বের প্রায় শুরু হতেই পূর্ব পাকিস্তানিদের বিপক্ষে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছে। গত সপ্তাহে ইসলামাবাদ জানায় তারা ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর দু’টো কোম্পানীকে পুর্ব অঞ্চল থেকে হটিয়ে দিয়েছে।

 

পূর্ব প্রদেশের পক্ষে কাজের অভিযোগ ভারত সরাসরি অস্বীকার করে। তবে বেশিরভাগ পর্যবেক্ষকই তাদেরকে সমর্থন করেছেন। তার উপর দেখা গেছে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান তার দেশে ঐক্যবদ্ধ রাখার চেষ্টা করছেন – যদিও অনেকের তা নিয়ে সন্দেহ আছে ।কারণ তারা পুর্ব অঞ্চলের পুরো মাত্রায় হত্যাযজ্ঞের খবর জানেন। তবে এটাও সত্য যে নয়া দিল্লি বাংলাদেশের বিদ্রোহীদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ন সম্পর্ক গড়েছে ইসলামাবাদকে চড় দেবার জন্য। সমস্ত সপ্তাহ ধরে ভারতীয় পত্রিকাগুলি পাকিস্তানের ব্যাপক নৃশংসতার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছে। এবং ভারতীয় মন্ত্রীসভায় বাংলাদেশের স্বীকৃতির ব্যাপারে জনগণের মাঝে প্রচারণা চালিয়েছেন এবং গোপন আলোচনা করেছেন।

 

চৌএর টেলিগ্রাফ

 

পিকিং পশ্চিম পাকিস্তানীদের পক্ষে আশাতীত সমর্থন দিয়েছে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর গত মাসেই তারা পরিষ্কার বিবৃতি দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী চৌ-এন-লাই ইয়াহিয়া কে একটি টেলিগ্রামে বলেন ‘ভারতীয় সম্প্রসারণবাদীদের’ ধ্বংস করতে এবং তাদের দেশের সার্বভৌমত্ব এবং জাতীয় স্বাধীনতা রক্ষার সংগ্রামে চাইনিজরা পাকিস্তানিদের সাহায্যের জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ’। গত সপ্তাহে সমগ্র এশিয়ায় গুজব ছড়িয়েছিলো যে, পশ্চিম পাকিস্তানিরা বেইজিংয়ের সাথে আলোচনা করেই মিলিটারি ক্র্যাক ডাউন করেছিল। বাকি সব অশুভ লক্ষণ ও ষড়যন্ত্র মুকাবিলা দেখে উপমহাদেশীয় বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন যে, এসব বাগাড়ম্বর পূর্ণ উক্তি ধাপে ধাপে বাস্তব কাজে রূপ নেবে, যদিও তা নিকট ভবিষ্যতে অন্তত নয়। চিন-ইসলামাবাদ মিত্রতা ভারতের কাছে অনেকটা ধরেই নেয়া। অন্যদিকে ভারতীয়রা বর্তমানে তাঁদের নিজেদের অভ্যন্তরীণ সমস্যায় আচ্ছন্ন। তবুও ইয়াহিয়া খানের মনোভাব ও ভারতের আবেগপূর্ণ প্রতিক্রিয়া রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের নিয়ামক হতে পারে। একজন বিশেষজ্ঞ বলেন যদি যুদ্ধ ও রক্তক্ষয় চলতে থাকে তাহলে সামান্য একটি স্ফুলিঙ্গ সমস্ত এলাকায় আগুণ ধরিয়ে দিতে পারে – এবং সমস্ত পাকিস্তান, ভারত এমনকি চীন ও তাতে ধ্বংস হতে পারে।

 

 

 

 

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
৩৪। পাকিস্তান – একটি ভগ্নপ্রায় স্বপ্ন সেন্ট লুই পোস্ট ডিসপ্যাচ ২৯ এপ্রিল , ১৯৭১

 

Prodip Mitra

<১৪, ৩৪, ৭৯৮২>

 

সেন্ট লুই পোস্ট ডিসপ্যাচ  – ২৯ এপ্রিল, ১৯৭১

পাকিস্তান একটি ভগ্নপ্রায় স্বপ্ন

পাকিস্থানের ভবিষ্যৎ এখন অস্পষ্ট হলেও, পুরোন সমাজব্যবস্থা দৃশ্যত অবসান হয়েছে। ভারতীয় উপমহাদেশের প্রধান তিন নেতার অন্যতম, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, যার উদ্ভব ১৯৪০ এর দশকের মাঝামাঝি ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসনের অবসানের সময় ঘটে, তার স্বপ্ন পাকিস্তানের পূর্ব ও পশ্চিম ভাগের মধ্যে চলমান গৃহযুদ্ধে শেষ হয়ে যাচ্ছে। এই ঘটনা কেন  আরো আগেই হয়নি, সেটাই বিস্ময়ের কথা। হিন্দু-মুসলমান বিরোধের সূত্র ধরে একথা বলা কঠিন এ নেহেরু ও গান্ধী তাদের অবস্থানে সঠিক ছিলেন, তবে একথাও সত্য যে ইন্ডিয়া গত এক প্রজন্ম সময় ধরে শান্তিপূর্ণ অবস্থায় আছে; তাদের রাষ্ট্রব্যবস্থা পরিণত এবং তা তাদের দেশের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরাগান্ধীর উপর বিস্ময়কর আস্থা হতে প্রমাণিত হয়। এবং অপরপক্ষে পাকিস্তান তাদের ইতিহাসে সামরিক একনায়কতন্ত্রেই ঘুরপাক খাচ্ছে। তাদের সরকার ট্যাংক ও সামরিক বিমান পাঠিয়ে ভিনয়মতাবলম্বী জনতাকে আক্রমণ করতে পারত।

 

সৌভাগ্যক্রমে ভারত এখনো প্রতিবেশী দেশের বিবাদে জড়ানোর ইচ্ছা দেখায়নি, যদিও স্বাভাবিকভাবেই ইন্দিরা গান্ধী পূর্বপাকিস্তানের পক্ষ সমর্থনের  কথা বলেন। আসলে সামরিকতন্ত্রী পশ্চিমপাকিস্তানই গত কুড়ি বছর ধরে ভারতের সাথে বিভেদে জড়িয়েছিল।

 

 

 

 

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
৩৫। পূর্বপাকিস্থান দুর্যোগোত্তর যন্ত্রনা ইভনিং ষ্টার ২৯ এপ্রিল ১৯৭১

 

Prodip Mitra

<১৪, ৩৫, ৮০৮১>

 

ইভনিং ষ্টার, মঙ্গলবার, ২৯ এপ্রিল ১৯৭১

সাইক্লোনের পর পূর্বপাকিস্থানে নিদারূণ যন্ত্রণা

হেনরি এস. ব্র্যাড শিয়ার (ইভনিং ষ্টার স্টাফ )

 

হংকং – “এই সাইক্লোনের ধ্বংসযজ্ঞ এখনো শেষ হয়নি” গত ৪ঠা মার্চে জুলফিকার আলী ভুট্টোর  এক সাক্ষাৎকারে করা এমন মন্তব্যে দেখা যায় যে পশ্চিম পাকিস্থানের সামরিক-আমলাতান্ত্রিক-জমিদার-অভিজাত শ্রেণী পূর্বপাকিস্থানে নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে রক্তপাত ঘটাতেও ইচ্ছুক। এর তিন সপ্তাহ পর গত বৃহস্পতিবার রক্তবন্যা শুরু হয়। পাকিস্তানের দুই অসম খণ্ডের মাঝে এই গৃহযুদ্ধ দীর্ঘ এবং রক্তাক্ষ হতে পারে, যদিও সরকারি সূত্রে বলা হয়েছে যে লড়াই বস্তুত শেষ. এই ঝড়ে ধারণা করা হয় প্রায় ৪,০০,০০০ থেকে ৫,০০,০০০ মানুষ নিহত হয়েছেন। সঠিক সংখ্যা হয়তো কেউ কোনোদিন জানাতে পারবেন না, না পারবে কেউ কোনোদিন জানতে যে ঠিক কত মানুষ এই গ্রহযুদ্ধে মারা গেছেন।  পাকিস্থানী সরকার সব তথ্য গোপন করার চেষ্টা করছে। নির্বাচনের ফলাফল বের হবার পর থেকেই ভুট্টো পূর্বপাকিস্থানকে তাদের আশানুরূপ একটি সংবিধান থেকে বঞ্চিত করার চেষ্টা করছেন। ভুট্টো, একজন সামন্ততান্ত্রিক জমিদার এবং সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী যিনি একটি সফল কিন্তু সুবিধাবাদী ক্যারিয়ারের অধিকারী, পশ্চিম পাকিস্তানে গরিবদের  সমাজতান্ত্রিক সুবিধা দেবার কথা বলে নির্বাচনে জিতেছেন।  (শেখ মুজিবর) রহমানের বিরুদ্ধে তার ধ্বংসাত্মক রণকৌশল বরং গরিবদের চেয়ে পশ্চিমা অভিজাতন্ত্রের স্বার্থ জন্যই বেশি রক্ষা করছে।  তার বয়কট করার হুমকির ফলেই পাকিস্তানের জাতীয় সংসদ অধিবেশন পিছিয়ে যায়।  প্রত্যাহত রহমান সাধারণ ধর্মঘট ডাকেন যা একসময় বেড়ে আওয়ামীলীগের হাতে পুর্বপাকিস্থানে সব বেসামরিক ক্ষমতা ন্যাস্ত করে।  সাধারণ ধর্মঘটের সময় থেকে, বিভিন্য তথ্যসূত্র হতে জানা যায় যে পশ্চিমপাকিস্তান থেকে পূর্বে ক্রমাগত সৈন্য উড়িয়ে নেয়া হয়েছে। সরকারের হাতেই জাতীয় বিমান সংস্থা ও ঢাকায় বিমানবন্দরের নিয়ন্ত্রণ ছিল। এইসব রিপোর্ট সত্য প্রতিপন্য হয়।  অসমর্থিত সূত্রে জানা যায় যে জাহাজে করেও পূর্বে সৈন্য আনা হয়েছে।  নৌবন্দরগুলোয় সরকারের নিয়ন্ত্রণ কম , কারণ সেসব আওয়ামীলীগ সমর্থকদের দখলে এবং তারা সেনা সরঞ্জাম খালাস হতে দিচ্ছিলেন না।  রহমান সেনাবাহিনীকে খাদ্য ও সরঞ্জাম হতে  বিচ্ছিন্য করে রেখেছিলেন।  অনুমান করা যায় যে সংকট শুরুর সময় পূর্ব পাকিস্তানে, যেখানে ৭৫ মিলিয়ন মানুষের বাস,  ২৬,০০০ সৈন্য ছিল।  সংঘাত শুরুর সময় সেই সৈন্য সংখ্যা ৩০,০০০ বা তার ও বেশি হয়।  গত বুধবারে দেখা যায় যে সৈন্য সঞ্চলন শুরু হয়েছে। চিটাগাং বন্দরে  একটি গোলাবারুদ বোঝাই জাহাজ কয়েকসপ্তাহ ধরে বসে আছে কারণ খালাসীরা মালামাল খালাসে বাধা দিচ্ছে।  বুধবার হতে সেনাবাহিনী নিজেই তা খালাস করার চেষ্টা চালায়। অসমর্থিত সূত্রে জানা যায় সাধারণ মানুষ সেনাচলাচলের বিরুদ্ধে রাস্তায় প্রতিরোধ গড়ে তুলছেন এবং শহরে ১৪টি ট্যাংক আনা  হয়েছে। পূর্বপাকিস্তানের নানাস্থানে সেনাবাহিনী ও সাধারণ জনগণের মধ্যে সংঘর্ষের খবর পাওয়া যায়।  এখনপর্যন্ত  ৫০ জন নিহত হবার কথা শোনা যায়।

শিরোনাম সূত্র তারিখ
৩৬। মৃতের শহর ঢাকা টাইম মে ৩, ১৯৭১

Prodip Mitra

<১৪, ৩৬, ৮২৮৩>

 

টাইম, ৩ মে ১৯৭১

মৃতের শহর ঢাকা

 

ঢাকা ও অন্যান্য পূর্বপাকিস্থানি শহরে ট্যাংকবাহিনী আক্রমণ চালানোর কয়েক ঘন্টার ভেতরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী পূর্বপাকিস্তান থেকে সকল বিদেশী সাংবাদিক বহিস্কার করে সেখানে চলমান  গৃহযুদ্ধ ধামাচাপা দিতে দৃশ্যত সফল হয়।  টাইম পত্রিকার সাংবাদিক ড্যান কগিন ও সেই সময় পূর্বপাকিস্তান থেকে বহিস্কৃত হন, তবে তিনিই প্রথম আমেরিকান সাংবাদিক যিনি সম্প্রতি ভারত থেকে হোন্ডা, ট্রাক, বাস , এবং সাইকেলে করে আবার যুদ্ধ শুরু হবার পর আবার পূর্বপাকিস্তানে প্রবেশ করেছেন। তিনি জানান,

 

ঢাকা সবসময়ই মোটামুটি নিরস একটি শহর ছিল।  হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল এবং এক ডজন চাইনিজ রেস্তোরার বাইরে শহরের  ১৫ লক্ষ বাসিন্দার ভেতর  স্বচ্ছল মানুষদের জন্য অবকাশের তেমন সুজোগ কখনোই ছিল না।  তবে বর্তমানে, নানাভাবেই এই শহর মৃতের শহরে পরিণত হয়েছে। সেনাবাহিনীর ট্যাংক ও সংক্রিয়অস্ত্র বহর নিয়ে নিরস্ত্র মানুষের উপর  চালানো বর্বর আক্রমণের এক মাস পর, ঢাকা শহর এখনো স্তম্ভিত, এর বাকি অধিবাসীগণ সেনাবাহিনীর বজ্রকঠিন নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আতঙ্কের ভেতর শহরে আছেন। মৃতের সঠিক সংখ্যা কোনোদিনও জানা সম্ভব হবে না, তবে সম্ভবত শুধু ঢাকা শহরেই প্রায় ১০০০০ নিহত হয়েছেন এবং শহরের প্রায় অর্ধেক মানুষ পার্শবর্তী গ্রাম গুলোতে  আশ্রয় নিয়েছেন।  জনপথ ও ফেরিঘাটের উপর থেকে সেনা অবরোধ তুলে নেবার সাথে সাথেই শহর থেকে জনস্রোত বাইরে বইছে।  শহরে যারা আছেন, তারা শুধু খাদ্যবস্তু আহরণের তাগিদেই বাড়ি হতে বের হচ্ছেন।  সেনাবাহিনী অনেক জায়গায় কালের গুদামে আগুন দিয়ে দেয়ায় কালের দাম ৫০% বেড়ে গিয়েছে। শহরে ১৪টি ও মোট ১৮টি বাজার ধ্বংস হয়ে গেছে। সব ব্যস্ত রাস্তা জনমানবহীন, এবং  স্থানীয় সরকার অচল হয়ে আছে।

 

জারজদের মার! – সব ছাদেই পাকিস্তানের সবুজ-সাদা পতাকা নীরবে নিশ্চল হয়ে ঝুলছে। একজন বাঙালি মন্তব্য করেন,   “আমরা সবাই জানি যে পাকিস্তান শেষ” , “কিন্তু পতাকা ঝুলিয়ে রেখেছি সৈন্যদের এড়ানোর আশায়।” পাকিস্তানের জনক জিন্নাহ ও সমসাময়িক প্রেসিডেন্ট আঘা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খানের ছবি প্রকাশ্যে ঝুলিয়ে কেউ কেউ আরেকটু রক্ষা পাবার আশা করছেন। তবে সত্য এই যে পূর্বপাকিস্তানের মানুষ সেনাদখলদারিত্বকে নিজেদের স্বাধীনতার পথে শুধুমাত্র একটি বাধা মনে করছেন, আত্মসমর্পন হিসেবে নয়।  “আমরা ক্ষমা করবোনা, ভুলেও যাবো না” , একজন বাঙালি বলেন। আমি সাংবাদিক জানতে পারার পর অনেক মানুষ নিজেরাই আমাকে গণ কবর, একটি সিড়িঘর যেখানে দুইজন প্রফেসর নিহত হন, ও যেখানে যেখানে অন্যান্য পাশবিকতা ঘটেছে, সেসব জায়গা দেখতে নিয়ে যান।  সবচেয়ে পাশবিক আঘাত হানা হয় পুরান ঢাকায়, সেখানে অনেক অংশই পুড়িয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়া হয়।  সেনাবাহিনি শহরের কিছু অংশের চারদিকে পেট্রল ঢেলে, আগুন দিয়ে, ও আগুনথেকে পালানো মানুষদের পিষে ফেলে ধংসযজ্ঞ চালায়। “ওরা বের হয়ে আসছে”, “জারজদের  মার!” , এমন ডাক এক সৈন্যের গলায় এক পশ্চিমা সেসময় শুনতে পান। এক ব্যবসায়ী সেই আগুনে দৃশ্যত সামান্য কয়জনই পুরান ঢাকার সেকশন-২৫ ব্লকের ধংসযজ্ঞ হতে রক্ষা পেয়েছিলেন। যারা আগুনের হাত থেকে বেঁচেছিলেন, তারা সোজা বন্দুকের গুলির সামনে পড়েন। বেঁচে থাকা মানুষদের আরো আতংকিত করতে সৈন্যরা মৃতদেহ তিন দিন ধরে অপসারণে বাধা দেন, যদিও মুসলমান রীতি হচ্ছে মারা যাবার সাথে সাথেই বা অন্তত ২৪ ঘন্টার মধ্যেই তা কবর দিয়ে ফেলা।

 

পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী : পাশবিকতার কাহিনী অপরিসীম। এক তরুণ যার বাসাযা তল্লাসী হচ্ছিল, সৈন্যদের অনুরোধ করেন তারা যেন তার ১৭ বছর বয়স্ক বোন কে ছেড়ে দেয় ; সৈন্যরা মেয়েটিকে বেয়োনেট খুঁচিয়ে মারে ও ছেলেটিকে তা দেখতে বাধ্য করে। সৈন্যরা কর্নেল আব্দুল হাই, যিনি  ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের একজন বাঙালি ডাক্তার, তাকে বাসায় শেষবারের মতো ফোন করার সুজোগ দেয়।  তার এক ঘন্টা পর তার লাশ তার বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়।  এক বৃদ্ধ, যিনি শুক্রবারে নামাজ পড়তে যাওয়াকে কারফিউ এর চেয়ে বেশি দরকারি মনে করেছিলেন, তাকে মসজিদের পথে গুলিকরে মারা হয়।  আক্রমণ শুরুর দিনেই, রাত প্রায় ১:৩০টার দিকে দুই গাড়ি বোঝাই সৈন্য বাঙালি জাতির স্বাধীনতা আন্দোলনের মূল নেতা, শেখ মুজিবর রহমানের বাসায় পৌঁছে।  সৈন্যরা যখন তার বাড়ির দিলে লক্ষ করে গুলি ছুড়তে শুরু করে, তিনি তখন আত্মরক্ষার জন্য খাটের নিচে শুয়ে পড়েন। গুলি চালানোর এক বিরতির সময় তিনি দুই হাত তুলে বাড়ির নিচ তলায় চলে আসেন, এবং চিৎকার করে সৈন্যদের জানান, “গুলি করার দরকার নাই, আমি এখানে, আমাকে নিয়ে যাও।  “

————

 

 

 

 

 

 

 

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
৩৭। পাশবিক হত্যা   (সম্পাদকীয়) নিউ ইয়র্ক টাইমস ৬ মে,, ১৯৭১

 

Prodip Mitra

<১৪, ৩৭, ৮৪>

নিউ ইয়র্ক টাইমস , ৬ মে,, ১৯৭১

পাশবিক হত্যা   (সম্পাদকীয়)

 

গত কয়েক বছর ধরেই ওয়াসিংটন (আমেরিকার রাজধানী) পাকিস্তান সরকারকে তাদের জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার নাম ভারী অস্ত্র, ট্যাংক, ও সামরিক বিমান সরবরাহ করে আসছে। দুঃখজনক হলেও সেই চুক্তিতে করাচির (পাকিস্তানের রাজধানী) তার নিজের দেশের জনতার নিরাপত্তা রাখা নিয়ে কিছু উল্লেখ ছিল না।  অতঃপর (আমেরিকার) স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয় অবশেষে মানতে বাধ্য হয় যে সেসব আগ্নেয়াস্ত্র ও প্রতিরোধ ব্যবস্থা অবাধে গত মার্চ মাস হতে পাকিস্তানে সাধারণ মানুষের উপর প্রয়োগ করা হচ্ছে।  ওয়াসিংটন আরো স্বীকার করতে বাধ্য হয় যে তারা সম্প্রতিক বছরগুলোতে পাকিস্তানকে গোলাবারুদ ও সামরিক যন্ত্রাংশ সরবরাহ করছে। এই পটভূমিকায়, ওয়াশিংটন করাচিকে বেসরকারি পর্যায়ে সংবরণের  জন্য যেসব আবেদন করেছে, তা আদৌ কার্যকর হয়নি।

 

 

 

 

 

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
ঘৃণ্য হত্যাকাণ্ড নিউইয়র্ক টাইম্‌স ১০ই মে, ১৯৭১

 

 

Ashik Uz Zaman

<১৪, ৩৮, ৮৫-৮৬>

 

দি নিউইয়র্ক টাইম্‌স, ১০ই মে, ১৯৭১

ঘৃণ্য হত্যাকাণ্ড

ম্যালকম ডাব্লিউ. ব্রাউন কর্তৃক

রাজশাহী, পাকিস্তান, ১০ই মে

 

পদস্থ সরকারী কর্মচারীদের সাহচর্যে যে ছয়জন সংবাদকর্মীকে পাকিস্তানের সরকার পূর্ব পাকিস্তানে প্রবেশের অনুমতি দিয়েছে তাদের একজন কর্তৃক

 

বাঙালী বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বিরুদ্ধে পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর পরিচালিত নিষ্পেষণ শক্তি আপাতদৃষ্টিতে পূর্ব পাকিস্তানের সকল গুরুতর সশস্ত্র বিদ্রোহ চূর্ণ করতে সক্ষম হয়েছে।

 

এই শহরটি, যার জনসংখ্যা ১,০০,০০০ ছিল, যেটি ঘোলা পানির, ধীরে বয়ে চলা গঙ্গা নদীর পূর্ব পাড়ে অবস্থিত, যার অপর পাড়ের ৩,০০০ গজের মধ্যে ভারত । এই শহরটির মতো সীমান্তবর্তী শহরগুলো আপাত-নিষিদ্ধ বিচ্ছিন্নতাবাদী আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক শক্ত ঘাঁটি ছিল, যারা গত ৭ই ডিসেম্বরের জাতীয় সংসদীয় নির্বাচনে ব্যাপক ব্যবধানে জয়লাভ করে।

 

জাতীয় সেনাবাহিনী, যা মূলত পশ্চিম পাকিস্তানের পাঞ্জাবীদের নিয়ে গঠিত; ২৫শে মার্চ পুরো পূর্ব পাকিস্তান জুড়ে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের উপর আঘাত হানে, এবং মাঝ-এপ্রিলের মধ্যে, আপাতদৃষ্টিতে, সেনাবাহিনীর সামরিক অভিযান কার্যত সম্পন্ন হয়ে গেছে।

 

সীমান্তবর্তী এলাকার সর্বশেষ বিদ্রোহগুলো অত্যন্ত দ্রুততার সাথে দমন করা হয়, এবং যদিও সেনাবাহিনীর টহল দলগুলো এখনো মাঝেমাঝে আক্রান্ত হয়, তবুও এই দ্বিধাবিভক্ত দেশটির পূর্ব অংশটি এখন শক্ত হাতে নিয়ন্ত্রিত বলে প্রতীয়মান হয়।

 

সংশ্লিষ্ট সকলের জন্যই এটি বেদনাদায়ক। সাংবাদিকেরা মাটির সাথে মিশে যাওয়া বা লুঠ হওয়া হাজার হাজার দালান দেখেছেন। শহরগুলোতে, শত শত বুলেটে ঝাঁঝরা হওয়া দেয়াল দেখলে বোঝা যায় ফায়ারিং স্কোয়াড কোথায় তাদের কাজ সেরেছে। লাশগুলো পাড়ার কুয়ায় ফেলা হয়েছে, এবং সার্বজনীন জনমানবশূন্যতা ঘটনাবলীর হিংস্রতার সাক্ষ্য দেয়।

 

ঠিক কিভাবে এসব ঘটেছে তা আপাতদৃষ্টিতে বোঝা যাচ্ছেনা, কেননা প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য তাদের দৃষ্টিভঙ্গির উপর নির্ভর করে একবারেই পরস্পরবিরোধী।

 

সামরিক বাহিনী এবং সারা দেশ জুড়ে তাদের প্রতিষ্ঠিত বেসামরিক “শান্তি কমিটি”-এর সদস্যরা বলছে বেশিরভাগ ধ্বংসযজ্ঞ এবং গণহত্যা ঘটিয়েছে বিদ্রোহীরা, এবং সীমান্তে অনুপ্রবেশকারী ভারতীয় সৈন্যরা।

 

কিন্তু রাস্তাঘাটে বাঙালীরা প্রায়শই সাংবাদিকদের কাছে এসে ফিসফিসয়ে কিছু কথা বলেই দ্রুত চোখের আড়ালে চলে যায় সদা-উপস্থিত শান্তি কমিটির সদস্যরা দেখার আগেই।

 

শান্তি কমিটির বেশিরভাগ সদস্য, সেনাবাহিনী যাদেরকে বেসামরিক প্রশাসনের কিছু দায়িত্ব দিয়েছে, হচ্ছে বিহারি মুসলিম, যারা ১৯৪৭ সালে ভারত থেকে পাকিস্তানে চলে আসে যখন ব্রিটিশ ভারতকে ভেঙে এইদুটি রাষ্ট্র তৈরি করা হয়।

 

পূর্ব পাকিস্তানের বেশিরভাগ ব্যবসা এবং বাণিজ্য এই বিহারীদের হাতে, যারা স্থানীয় বাঙালীদের মাঝে সংখ্যালঘু। স্থানীয় বাঙালীরা বেশিরভাগই মুসলিম, তবে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক হিন্দু সংখ্যালঘু সম্প্রদায় রয়েছে।

 

অপেক্ষাকৃত সমৃদ্ধিশালী বিহারীদের প্রতি অনেকটা দারিদ্র্যপীড়িত বাঙালীদের, অসন্তোষ, সাম্প্রতিক যুদ্ধে বাঙালীদের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের পিছনে একটি কারণ হিসেবে কাজ করেছিল। ধারণা করা হচ্ছে, শত শত সাক্ষাৎকার নেয়ার পর, কিছু কিছু এলাকায় বাঙালীরা বিহারীদের গণহারে হত্যা করেছে এবং তাদের বাড়িঘর লুঠ করেছে এবং পুড়িয়ে দিয়েছে। বাঙালীরা যারা জাতীয় সেনাবাহিনীতে ছিল তারা বিদ্রোহ করেছে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সাথে যোগ দেয়ার জন্য। মূলত পাঞ্জাবী অধ্যুষিত পশ্চিম পাকিস্তানের সেনাবাহিনী যখন জোরপূর্বক পূর্বের অঙ্গরাজ্যে প্রবেশ করে, বিহারীদের মধ্যে তাদের মিত্ররা তৈরি ছিলই, যাদের বেশিরভাগই প্রতিশোধ নেয়ার সুযোগ খুঁজছিল।

 

এর পরবর্তীতে চালানো গণহত্যার ভয়াবহতা বেশিরভাগ প্রত্যক্ষদর্শীকেই অসুস্থ করে তুলেছে। এই সংঘাতের ফলশ্রুতিতে, এই শহরের মতো শহরগুলো থেকে বেশিরভাগ বাঙালী এবং সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রায় সবাই, পালিয়ে গেছে। এখানে যে দালানগুলো নিয়ে শহরের প্রধান বাজার এলাকা গঠিত সেগুলো ধ্বংস হয়ে গেছে, আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় ১৪ই এপ্রিল যখন সেনাবাহিনী এই শহর দখল করে নেয় তখন মর্টারের গোলার আঘাতে এগুলো ধ্বংস হয়েছে।

 

সুন্দর কারুকার্য করা কাঠের ব্যালকনিসহ কিছু পাঁচ-তলা দালান এখনো দাঁড়িয়ে আছে এই এলাকায়,

তবে ওগুলোর মধ্যে কিছু দালানের উপরদিকের তলাগুলো গোলাবর্ষণে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে।

 

শহরের বেশিরভাগ এলাকায়, অবশ্য, গোলাবর্ষণ হয়নি, এবং সাইকেল রিক্সা এবং হকাররা আবারো রাস্তায় চলাচল শুরু করেছে। শহরে আবারো পানি, বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু হয়েছে, এমনকি একটি অভিযোগ দপ্তরও আছে।

 

 

 

 

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
৩৯। একজন মেজরের বিদ্রোহ নিউজ উইক ১০ মে ১৯৭১

 

Razibul Bari Palash

<১৪, ৩৯, ৮৭>

 

নিউজউইক, মে ১০, ১৯৭১

মেজর হকের বিদ্রোহ

-মিলান জে কিউবিক

 

প্রথম দিন একটি ছোট খামারবাড়ি , পূর্ব পাকিস্তান সীমান্ত থেকে ২ মাইল ভিতরে , বাড়ির পিছনের দিকের উঠোনের মধ্যে মেজর হকের সাথে সাক্ষাৎ হয়। তিনি কেডস এবং একটি কৃষকদের লুঙ্গি (একটি স্কার্ট এর উপর একটি দীর্ঘ সাদা শার্ট) পরিহিত ছিলেন। সামনের অনিবার্য সামরিক বিপর্যয় থাকা সত্ত্বেও তিনি নিরুদ্বিগ্ন। এক সপ্তাহের কম সময়ে আমি কর্দমাক্ত ট্র্যাক দিয়ে নডিং করে বাংলাদেশে আসি। ‘পাকিস্তান সেনাবাহিনী পালাতে পালাতে এখানে এসে পৌঁছাবে এবং পদদলিত হবে। তাদের আসতে দিন। যুদ্ধের প্রথম অংশ শেষ হবে তখন এবং তারপর ফেজ দুই আরম্ভ হবে। ‘

 

এলাকায় হকের একটি আহত উইলিস জীপের মাধ্যমে আমরা যতখানি এলাকা দেখেছি ইতিমধ্যে সেগুলো মুক্ত। নারী ও শিশুদের অধিকাংশই ভারতে শরণার্থী শিবিরে চলে যায়। আর দেশের বাকি অঞ্চলে মাসব্যাপী তেল, জ্বালানি তেল ও শিল্পজাত পণ্যের সংকট ছিল। “আমার কাছে টাইফয়েড এবং কালাজ্বর এর কোন ওষুধ নাই। ‘ এক ফার্মাসিস্ট আমাকে বলছিলেন। “আর কিছুক্ষণের মধ্যেই এস্পিরিন শেষ হয়ে যাবে। ‘

 

তবুও এই সব যন্ত্রণার পরেও গ্রামবাসী এখনো বাংলার স্বাধীনতা সমর্থন করে। উদাহরণস্বরূপ, শাহাপারে কয়েকশ কৃষক প্রচুর উদ্দীপনার সাথে হকের আবেদনে সাড়া দেয়। তিনি বলেছেন আগামী মাসে ধান কেটে আনতে। ‘ আপনারা সব যদি ভারতে পালিয়ে যান তাহলে বাংলাদেশ একটি ভয়ানক দুর্ভিক্ষে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ফসল কাতাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিস আপনাদের যুদ্ধ করার পরিবর্তে। তারা সাদাসিধা বাংলা পতাকা উড়িয়ে একত্রে উচ্চারণ করল “জয়বাংলা জয়বাংলা!”

 

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, হক ও তার প্রধান নিয়োগকারী, ২৪ বছর বয়সী শাহ আবদুল খালেকের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধের জন্য বাংলাদেশের স্বেচ্ছাসেবকদের বাছাই করতে কোন কষ্ট হলনা। আমার স্কুল গাইবান্ধার এক গ্রামে। আমার দেশ আর বিপদে পড়েছে। আমার দায়িত্ব যুদ্ধ; পালান নয়। মাদিলে একটি পিতার দুই ছেলে ১৭ ০ ২৩ বছর বয়সী যুদ্ধে অংশ নেবে। আমি গর্বিত । ভেড়ার মত জবাই হয়ে মরার চেয়ে হাতে রাইফেল নিয়ে মরা অনেক সন্মাঞ্জনক।

 

এত উৎসাহের পরেও বাঙালি এখনও বাঁধার মুখোমুখি হচ্ছেন। অস্ত্র বলতে তাদের কাছে ৩০০০ প্রাচীন এনফিল্ড রাইফেল এবং প্রায় ১০০ ছোট মর্টার । তার উপরে, বাঙালিদের গুরুতর নেতৃত্বের সমস্যা আছে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ছাড়া ভারতীয় সীমান্ত থেকে মাত্র এক মাইল দূরে বাংলাদেশের ছয় সদস্যের সরকার এখনো তেমন জোরালো ভাবে প্রকাশিত হতে পারেনি। হক নিজে আমাকে বলেছিলেন , “আমাকে দ্রুত ভারত যেতে হবে, কিন্তু আমি পারব না। সবচেয়ে কাছে অবস্থিত বাঙালি অফিসার ২০ মাইল দূরে এবং এই মানুষগুলো আমার মত আশা হৃদয়ে ধারণ করে।

 

বাঙ্গালীদের কিছু সুবিধাও আছে। নিউ দিল্লি ইতিপূর্বেই “মুক্তি বাহিনী”র জন্য স্বর্গ করে দিয়েছেন বিভিন্ন গেরিলা ট্রেনিং ক্যাম্প এবং কিছু ট্রাক ও সরঞ্জাম ও আশ্রয়স্থল প্রদান করে। অনেক কূটনীতিক, পরন্তু, অদূর ভবিষ্যতে বিদ্রোহীদের কাছে অস্ত্র চালান করার আশা প্রকাশ করেন ভারত সরকারের কাছে। বাঙালিদের সবচেয়ে বড় সুবিধা হল ৭০০০০ সদস্যের ফেডারেল দখলদার বাহিনী কখনো স্থায়ীভাবে ৭৫ মিলিয়নেরও বেশি মানুষকে নিশ্চিনহ করে দিতে পারবেনা। “যদি আপনি এখন থেকে চার মাস পড়ে আসেন তাহলে কিছু কাজ দেখাতে পারবো – হক আমাকে জানান – আমি চলে যাচ্ছিলাম। এবং তিনি সেটাই করবেন।

 

 

 

 

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
৪০। যুদ্ধ না অপমান টাইম ১০ মে ১৯৭১

 

Razibul Bari Palash

<১৪, ৪০, ৮৯-৯০>

টাইম ম্যাগাজিন; মে ১০, ১৯৭১

যুদ্ধ না অপমান

 

 

পূর্ব পাকিস্তানে রক্তাক্ত গৃহযুদ্ধ ও খাদ্যাভাব থাকলেও অন্য অংশে আছে আরেক সমস্যা। সেনা সমর্থিত প্রেসিডেন্ট আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খানের সরকার পূর্ব পাকিস্তান ভেঙ্গে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সম্পূর্ন বিরোধী। কিন্তু তা করতে গিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের সম্পদ ক্ষয় এবং অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে। এটা শাসকদের গলার মধ্যে আটকে আছে – একথা এক আমেরিকান কূটনীতিক ইসলামাবাদে বলেন। তিনি আরও বলেন তাদের হয় এটা গিলে ফেলতে হবে না হয় উগড়ে ফেলতে হবে।

 

গত সপ্তাহে পূর্ব পাকিস্তানে সম্মুখ যুদ্ধ থেমে গেছে। তা সত্ত্বেও, পশ্চিম পাকিস্তান সুদুর ভবিষ্যতে পূর্ব পাকিস্তানে প্রচুর সেনা সমাবেশ চালিয়ে যেতে হবে। তাছাড়া, ভারতের জন্য তার প্রতিরক্ষাকে দুই অতিরিক্ত ভাগে ভাগ করতে হচ্ছে।

 

পুরনো ঘৃণা

 

এদিকে, পশ্চিম পাকিস্তানে শিল্প মাত্র এক তৃতীয়াংশ হয়ে গেছে। কারণ জনবহুল পূর্ব পাকিস্তানে অর্থনৈতিক মন্দা । পশ্চিম পাকিস্তান, পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক পতন দ্বারা প্রভাবিত। স্বাভাবিক সময়ে পূর্ব পাকিস্তানের পাট শিল্প থেকে পুরো দেশের বৈদেশিক মুদ্রার অর্ধেক আয় হয়। এখন এটা অলস পড়ে আছে। তাছাড়া অন্যান্য শিল্প পরিবহন সুবিধা প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। পশ্চিম পাকিস্তানের সাহায্য দরকার পূর্ব পাকিস্তানকে আবার গড়ে তোলার জন্য। কিন্তু তা কঠিন হবে। “আমরা অর্থনৈতিক ধ্বংসের কিনারে’ পশ্চিম পাকিস্তানের নিউ টাইমসের একটি সম্পাদকীয় গত সপ্তাহে এমনটাই লিখেছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিঃশেষ হয়ে গেছে কিছুদিন আগে। এবং মে এবং জুন মাসে ইউ এস ও ইউরোপিয়ান ক্রেডিটরদের ঋণের নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ করতে অসমর্থ হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৮০ মিলিয়ন ডলার ঋণ সহ বৈদেশিক সাহায্য বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এবং এগারো জাতি যারা পাকিস্তান অর্থনৈতিক উন্নয়নের সবচেয়ে সমর্থনকারী তারাও ইয়াহিয়ার বর্তমান সঙ্কট শেষ না হওয়া পর্যন্ত আগ্রহ দেখাচ্ছেনা।

 

এসব চাপের কারণে ও পূর্ব পাকিস্তানের দুরবস্থার জন্য পশ্চিম পাকিস্তানের ভারতের উপর পুরনো আবার উদ্দীপ্ত হয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকার পুর্ব পাকিস্তানে সেনাবাহিনির নৃশংস আক্রমনের (দমনমূলক অভিযানের) উপর আসা বিদেশি সংবাদমাধ্যমের খবরাখবর থেকে পশ্চিম পাকিস্তানীদেরকে সম্পুর্ন বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে। পশ্চিম পাকিস্তান এটিকে ভারতীয় চক্রান্ত বলে চালানোর চেষ্টা করছেন। ভারত আপাতত নিরপেক্ষ আছে – কিন্তু এতে বাঙ্গালী বিদ্রোহীদের অনেক সুবিধা হয়েছে।

 

 

 

বর্ডার শুটিং

 

পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে কূটনৈতিক হুমকি ধারাবাহিকভাবে চলছে। কলকাতায় পাকিস্তানের প্রধান কূটনীতিক বাংলাদেশের দিকে ডিফেক্টেড হবার কারণে ইসলামাবাদ

 

একজন প্রতিনিধি পাঠায় যিনি কোন ভাবেই সুযোগ কড়তে পাড়েন নাই। ফলে পাকিস্তান, অফিস বন্ধ করে দাবি করেন যে ভারত ঢাকায় তার মিশন বন্ধ করেছে।

 

এটা কূটনৈতিক ধস্তাধস্তি আরো বিপজ্জনক। তবে, পরিস্থিতি ইস্ট ‘পাকিস্তান ও ভারতের সীমান্ত বরাবর উন্নয়নশীল ছিল। পশ্চিম পাকিস্তানে সেনা বিদ্রোহীদের এবং ভারতের সরবরাহের সম্ভাব্য উৎস খুঁজে পেতে চেষ্টা করেছেন এবং বাঁধা দেবার চেষ্টা করছেন। গত সপ্তাহে উভয় পক্ষের অভিযোগ যে তাদের উপর সৈন্যরা আক্রমণ করেছে। এই পরিস্থিতি বিদেশী কূটনীতিকদের শঙ্কায় ফেলেছে। তারা ভাবছেন যে আরেকটি ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের শুরু হতে পারে। কোন দেশই যুদ্ধ করতে চায় না, এবং কারো সেই সামর্থ্য ও নাই। কিন্তু এটা ১৯৬৫ সালের ১৭ দিনের যুদ্ধের মতই পরিবেশ। “সেনাবাহিনীর সিদ্ধান্তের জন্য তাদের ভারত অথবা পূর্ব পাকিস্তানে নাকাল হবার সম্ভবনা আছে” এক কূটনীতিক একথা বলেন। পূর্ব পাকিস্তানের ঘটনা একটি ধারাবাহিক যুদ্ধবিগ্রহের পথ উন্মুক্ত করে।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
৪১। নির্যাতিত বাঙ্গালী (সম্পাদকীয়)

ওয়াশিংটন পোস্ট

(বাংলাদেশ ডকুমেন্টস)

১২ মে ১৯৭১

 

Razibul Bari Palash

<১৪, ৪১, ৯১>

 

ওয়াশিংটন পোস্ট , ১২ মে ১৯৭১

সম্পাদকীয়

নির্যাতিত বাঙ্গালী

 

পাকিস্তান পূর্ব অংশের সাথে যাচ্ছেতাই আচরণ করছে। তারা রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসনের জন্য আন্দোলন করছে। কিন্তু সেটাকে সেনাবাহিনী দিয়ে নির্মমভাবে দলিয়ে দেবার চেষ্টা চলছে। ইয়াহিয়া খানের মিলিটারি সরকার এখনো আন্তর্জাতিক ত্রাণ ভুক্তভোগী বাঙ্গালীদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেনা। তারা তাদের ভারতে পালিয়ে যাতে বাধ্য করছে।

 

 

 

 

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ

৪২। পাকিস্তানের কথা

 

বালটিমোর মে ১৪, ১৯৭১

 

 

Ashik Uz Zaman

<১৪, ৪২, ৯২>

 

দি বালটিমোর সান। মে ১৪, ১৯৭১

সম্পাদকীয়

পাকিস্তানের কথা

 

মার্চ মাসে পাকিস্তানে ঘটে যাওয়া শোকাবহ ঘটনার ব্যাপ্তি, যখন দেশটির দুইটি অংশকে পাশবিকভাবে ছিড়ে দু’টুকরো করে ফেলা হয়, একটু একটু করে জানা যাচ্ছে, পূর্ব পাকিস্তানে প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে অনুসন্ধানে নিয়োজিত ছয়জন বিদেশী সাংবাদিকের একটি দলের পাঠানো এ যাবতকালে প্রাপ্ত প্রকৃত তথ্য থেকে। এখন পর্যন্ত এই পর্যবেক্ষকরা সতর্ক নিরীক্ষণের মধ্যে সাবধানে লেখালেখি করেছেন, কিন্তু তাদের মধ্যে একজন, এসোসিয়েটেড প্রেস –এর মোস্ট রোসেনব্লুম, এর বিকল্প হিসেবে দেশত্যাগ করেন এবং ব্যাংকক থেকে তাঁর বার্তাগুলো পাঠান। তাঁর প্রতিবেদন এমন এক ঘৃণা ও বিভীষিকার কথা জানায়, যা কিনা এক গৃহযুদ্ধের অবিশ্বাস্য গণহত্যা, ধ্বংসের কিনারায় পৌঁছে যাওয়া জাতীয় অর্থনীতির এবং রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার।

 

মৃতের সংখ্যা, মিঃ রোসেনব্লুমের আনুমানিক হিসাবে, পাঁচ লক্ষ হতে পারে। যে ধ্বংসলীলা চালানো হয়েছে, তিনি জানান, তা অবিশ্বাস ধরণের। লাখ লাখ মানুষ ক্ষুধাপীড়িত, দুর্ভিক্ষ থেকে এবং ত্রাণ বিতরণ বন্ধ হয়ে যাওয়াতে, এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে। পরিস্থিতি এর চেয়ে খারাপ আর হতে পারেনা।

 

মিঃ রোসেনব্লুম এবং অন্যান্য সুত্রমতে এটা পরিষ্কার যে অজ্ঞাতসংখ্যক হত্যাকাণ্ড সঙ্ঘটিত হয়েছে পূর্ব বাঙালীদের দ্বারা, সেখানে বসবাসরত পশ্চিম পাকিস্তানী এবং অন্যান্য অবাঙালীদের প্রতি ঘৃণা এবং প্রতিশোধপরায়নতার প্রেক্ষিতে। কিন্তু এটাও পরিষ্কার যে জাতিটিকে পাশবিকভাবে ছিড়ে দু’টুকরো করার কৃতিত্ব প্রথমতঃ পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীকেই দিতে হবে এবং তাদেরকে যারা আদেশ-নির্দেশ দিয়েছে তাদেরকেও।

 

এক ভাষ্যমতে সামরিক বাহিনীর অভিযানে ঢাকায়, যা কিনা পূর্ব বাংলার রাজধানী, মৃতের সংখ্যা ১৫০ এর মতো হবে যা অবশ্যই এক দানবীয় মিথ্যাচার, এবং সামরিক বাহিনী সেদিন ভোরে পূর্ব পরিকল্পিত এক সশস্ত্র বিদ্রোহ দমনের জন্য এই হামলা চালিয়েছে এমন কোনো প্রমাণও পরিবেশন করা হয়নি সামরিক বাহিনী এই অভিযান শুরু করার পরে।

 

প্রকৃত ঘটনা এখনো তাই মনে হচ্ছে, যা প্রথমেই ধারণা করা হয়েছিল, যে পাকিস্তানের সরকার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী পূর্ব বাংলার আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় বসতে না দেয়ার ব্যাপারে বদ্ধপরিকর ছিল, এবং এই দৃঢ়সংকল্প থেকেই মার্চের এই সুপরিকল্পিত গণহত্যার জন্ম হয়

যদিও এর পূর্ণ পরিণতি এখনো জানতে বাকি, তবুও এটুকু এখনই স্পষ্ট যে পাকিস্তানের স্রষ্টাদের পরিকল্পিত পাকিস্তান আর নেই, এক নড়বড়ে অর্থনৈতিক কাঠামোকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে আসা হয়েছে যা থেকে পরিত্রাণের আর কোন পথ প্রায় নেই, বিদ্বেষপূর্ণ এক প্রজন্মের সৃষ্টি নিশ্চিত করা হয়েছে এবং রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে এমন সব নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে যার উদ্দেশ্যের সাথে পাকিস্তানের জাতীয় সমৃদ্ধির সামান্যই সংযোগ রয়েছে

 

 

 

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ

বিকল্প চিন্তা

 

নিউজউইক মে ১৯, ১৯৭১

 

Ashik Uz Zaman

<১৪, ৪৩, ৯৩৯৪>

 

বিকল্প চিন্তা

নিউজউইক, মে ১৯, ১৯৭১

 

সাত সপ্তাহ আগে যখন পূর্ব পাকিস্তানে যুদ্ধ শুরু হয়, তখন দ্বিধাবিভক্ত জাতির পশ্চিম ভাগের বেশির ভাগ মানুষ তাদের সরকারের বিছিন্নতাবিরোধী কঠোর মনোভাবকে সমর্থন করেছিল। কিন্তু রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ চলতে থাকলে, পশ্চিম পাকিস্তানের আরও বেশি মানুষ বিকল্প চিন্তা করা শুরু করে। করাচী থেকে গত সপ্তাহে, নিউজউইকের মিলান জে. কুবিচ তারবার্তার মাধ্যমে এই সংবাদ প্রেরণ করেছেনঃ

 

যুদ্ধের শুরুতে, কঠিনভাবে নিয়ন্ত্রিত করাচীর সংবাদমাধ্যম এই বিদ্রোহ এবং জাতির উপর এর প্রভাবকে অতিরঞ্জিত সরকারী মতামতের পর্দার আড়ালে ঢেকে দিতে পেরেছিল। এই ধুম্রজাল এতই কার্যকর ছিল যে মাঝে মাঝে এটা তাদেরকেও হতভম্ব করে দিত যারা এটা ছড়িয়েছে। এখন, সরকার এই পর্দার এক পাশ তুলেছে, এবং এর নিচে তারা দেখতে পাচ্ছে যে পশ্চিম পাকিস্তানিরা দ্বিধা ও বিষণ্ণতায় ভুগছে।

 

তাদের বিহ্বলতা আরো প্ররোচনা পায় যখন গত সপ্তাহে ঘোষণা আসে যে প্রেসিডেন্ট মোহাম্মেদ ইয়াহিয়া খানের সামরিক জান্তা পাকিস্তানের ৪০০ কোটি মার্কিন ডলারের বৈদেশিক ঋণ শোধ করার জন্য আরও ছয় মাসের সময় চাইছে, এবং জ্বালানী তেলের মূল্য ৮ থেকে ১০ শতাংশ বৃদ্ধি করা হবে। সরকারী হুকুমে ৪৬ ধরনের পণ্য আমদানি নিষিদ্ধকরণ এবং অন্যান্য পণ্যের উপর দিগুন-ত্রিগুন আমদানি শুল্ক আরোপের পরপরই এই ঘোষণা আসায়, মনে হচ্ছে এটা ভবিষ্যৎ ক্রমাগত মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাস। এবং এই সম্ভাবনা, পক্ষান্তরে, অনেক পাকিস্তানি অর্থনীতিবিদের সেই আশঙ্কাই প্রমান করে যে যুদ্ধের ময়দানে সরকারের জয় হলেও, পূর্ব পাকিস্তানে যে তিক্ত সংগ্রাম চলছে তা জাতীয় অর্থনীতির ব্যাপক ক্ষতিসাধন করছে।

 

এই উপসংহারে আসার পক্ষে যুক্তি খুঁজে পাওয়া খুব কঠিন নয়। একদিকে, পশ্চিম পাকিস্তানের পণ্য উৎপাদনকারী শিল্পগুলো বড় একটি আঘাত পেয়েছে দেশের পূর্ব অংশে তাদের পণ্যের বাজার বন্ধ হয়ে যাওয়াতে, যেখানে তারা তাদের উৎপাদিত পণ্যের একতৃতীয়াংশ বিক্রি করতো। অন্যদিকে, অসংখ্য বাঙালি শরণার্থী পূর্ব পাকিস্তান থেকে ভারতে চলে যাওয়াতে আসন্ন চা-পাতা উত্তোলন হুমকির মুখে পরেছে, যা বিকল্প হিসেবে চা পাতা আমদানির সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিচ্ছে। সবচেয়ে ক্ষতিকর, অবশ্য, পূর্ব পাকিস্তানের পাট রপ্তানি ব্যাহত হওয়া, যা কিনা জাতির জন্য বৈদেশিক মুদ্রার সবচেয়ে বড় উৎস; মাত্র গত সপ্তাহে রপ্তানি পুনরায় শুরু হয়েছে। সব মিলিয়ে, এই যুদ্ধের প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে প্রতিদিন ২০ লাখ মার্কিন ডলার যা কিনা এক বিশাল বোঝা এই জাতির জন্য যার বৈদেশিক মুদ্রার মজুত এই সংকটের শুরুতে ছিল মাত্র ৮ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলার।

আরও বলতে গেলে, অদূর ভবিষ্যতে পরিস্থিতির লক্ষণীয় মাত্রায় উন্নতি হবার সম্ভাবনও খুবই ক্ষীণ। যদিও কতিপয় সরকারী কর্মকর্তা বলতে চান যে আস্তে আস্তে পূর্ব পাকিস্তানের জীবনযাত্রা “স্বাভাবিক” হয়ে আসছে, অন্যরা স্বীকার করেন যে সশস্ত্র বিদ্রোহের মাত্রা ক্রমশঃ বাড়ছে। রয়েছে ব্যাপক হারে কর ফাঁকির খবর (যা কিনা পুরো জাতির কর আদায়ের ৪০ শতাংশ)। এবং রাজনৈতিকভাবে পরিস্থিতি শান্ত করার সরকারী চেষ্টাও একইভাবে বিফল হচ্ছে। তাই, গেরিলা যোদ্ধাদের জন্য সাধারন ক্ষমা এবং সরকারি কর্মচারীরা যার যার চাকরিতে ফিরে এলে তাদের বকেয়া বেতন পরিশোধের ঘোষণা থাকলেও, শুধুমাত্র গুটিকয়েক পূর্ব পাকিস্তানিই এই প্রস্তাব গ্রহণ করেছে। বাস্তবে, পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে নির্বাচিত ১৬৭ জন সংসদ সদস্যর মধ্যে মাত্র দুই জনই তাদের অঞ্চলের স্বাধীনতার ঘোষণাকে অস্বীকার করেছে।

 

অবধারিতভাবে, ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সংকট এবং পূর্ব পাকিস্তানের চলমান প্রতিরোধ পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলেও নাড়া দিয়েছে। কিছুদিন আগেই উত্তর-পশ্চিমের সীমান্ত প্রদেশ সিন্ধ-এ বেশকিছু নাগরিককে গ্রেফতার করা হয় প্রাদেশিক বিভাজনের পক্ষে আন্দোলন করার অপরাধে। এবং জুলফিকার আলি ভুট্টো, পশ্চিম পাকিস্তানের উচ্চাকাঙ্ক্ষী নেতা যে কিনা তার অনুসারীদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে অচিরেই পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক শাসনের অবসান হবে, নিন্দিত হয়েছে সামরিক শাসন এখনো বলবত থাকায়। কিন্তু সর্বোপরি মাথার উপর মূল্যস্ফীতির শঙ্কা এবং পূর্ব পাকিস্তানে দীর্ঘমেয়াদি গেরিলা যুদ্ধের সম্ভাবনা ইয়াহিয়া খানের জন্যেও হুমকিস্বরূপ। কেননা গত সপ্তাহে করাচীর একজন শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক নেতা আমাকে বলেছেনঃ “অতীতের অন্য সরকারগুলো এর চেয়ে অনেক অল্পতেই ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে। আমি বলবো ইয়াহিয়ার হাতে আর ছয় মাস সময় আছে সবকিছু ঠিকঠাক করার জন্য। এরপর, সামরিক বাহিনী ধরে নেবে যে তাদের প্রেসিডেন্ট যে কাজ পারবেনা সেটাতেই হাত দিয়েছে, এবং তারা হয়তো একজন নতুন নেতা খোঁজা শুরু করবে।” যদি সঠিক হয়, তাহলে এই ধারণা থেকে বলা যায় যে ইয়াহিয়ার হাতে সামান্য হলেও সময় আছে। কিন্তু পরিস্কার বোঝা যাচ্ছে যে, সময় খুব দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে।

 

 

 

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
৪৪। পূর্ব পাকিস্তানে গণহত্যা স্যাটারডে রিভিউ মে ২২, ১৯৭১

 

Ashik Uz Zaman

<১৪, ৪৪, ৯৫৯৭>

 

দা স্যাটারডে রিভিউ, মে ২২, ১৯৭১

পূর্ব পাকিস্তানে গণহত্যা

 

মানুষের সকল অধিকারের মাঝে সবচেয়ে মৌলিক যে অধিকার, একজন মানুষের বিপদের সময় সাহায্যের জন্যে অন্য একজন মানুষের এগিয়ে আসার অধিকারকে এখন এমন এক মাত্রার আনুষ্ঠানিক ঔদ্ধত্যের মাধ্যমে অস্বীকার করা হচ্ছে যা কিনা সাম্প্রতিক ইতিহাসে বিরল এক দৃষ্টান্ত।

 

পূর্ব পাকিস্তানের যে মানুষগুলো গত বছরের বন্যার কারণে এখনো গৃহহীন এবং ক্ষুধাপীড়িত, তারাই এখন আবার মনুষ্যসৃষ্ট এক দুর্যোগের শিকার। তাদের দেশ পরিণত হয়েছে এক অনুমোদিত বধ্যভুমিতে। বহির্বিশ্বের সাথে যোগাযোগ আজ প্রায় শুন্যের কোঠায়। যারা জরুরী চিকিৎসা বা অন্যান্য সাহায্যে এগিয়ে আসতে চেয়েছিল তাদেরকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে।

 

বর্তমান সময়ের এই অবস্থার শেকড় রয়েছে ১৯৪৭ সালে ভারতীয় উপমহাদেশকে দ্বি-জাতিতত্বের ভিত্তিতে ভেঙে দুটি পৃথক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্তের মধ্যে। ইংরেজদের কাছ থেকে স্বাধীনতা আদায়ের সংগ্রাম ছিল জটিল এবং হিন্দু ও মুসলিম জোটের পৃথক অস্তিত্বের কারণে সংকটময়। ইংরেজরা এমনি এক দ্বিধাবিভক্ত উপমহাদেশের ধারনা প্রতিপালন করেছে যে ভারত হবে হিন্দু অধ্যুষিত এবং পাকিস্তান হবে মুসলিম অধ্যুষিত। দীর্ঘদিন ধরে গান্ধী এবং নেহরু এইধরণের দেশবিভাগের বিরোধিতা করে এসেছেন এই বিশ্বাস থেকে যে দুই ধর্মের মানুষগুলোকে একটি বিশাল জাতিতে একীভূত করা অপরিহার্য। গান্ধী এবং নেহরু অবশ্য তাদের দেশবিভাগ সংক্রান্ত এই আপত্তি উঠিয়ে নেন, যখন তারা নিশ্চিত বুঝতে পারেন যে নাহলে জাতীয় স্বাধীনতাই অনির্দিষ্টকালের জন্যে বিলম্বিত হবে।

 

দেশবিভাগের নকশাতে মূলত দুটি রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয়তা ছিল। বাস্তবে, উদ্ভব হয় তিনটি রাষ্ট্রের। কেননা পাকিস্তানকে তার নিজের মাঝেই দুইভাগে বিভক্ত করা হয়, পূর্বে ও পশ্চিমে। পশ্চিম অংশটি ছিল ভৌগলিকভাবে আকারে বড় এবং সেখানেই রাজধানী স্থাপিত হয়। পূর্বের অংশটি ছিল জনবহুল এবং প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ। একই দেশের দুই অংশের মাঝে রয়ে যায় হাজার মাইলের ব্যবধান।

 

ভৌগলিক এই বৈসাদৃশ্য বুঝতে হলে, শুধু কল্পনা করতে হবে যদি মেইন এবং জর্জিয়া অঙ্গরাজ্য সিদ্ধান্ত নেয় যে তারা পৃথক একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করবে তাহলে কি ঘটতো। জর্জিয়া নামের এক রাষ্ট্র তৈরি হতো, যার দুই অংশের মধ্যিখানে বাস্তবে পুরো যুক্তরাষ্ট্র অবস্থিত। আমরা আরো ধরে নিই যে এই নতুন রাষ্ট্রের রাজধানী হতো অগাস্টা, উত্তর জর্জিয়াতে। পক্ষান্তরে বেশিরভাগ মানুষ এবং প্রাকৃতিক সম্পদ রয়ে গেছে দক্ষিন জর্জিয়াতে। ফলাফলে সৃষ্টি হতো এক প্রশাসনিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলার। পাকিস্তানে যা ঘটেছে তা এই বর্ণনার সাথে মোটামুটিভাবে মিলে যায়। পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে পাঞ্জাবি (পশ্চিমের) এবং বাঙালি (পূর্বের) সমাজের মধ্যকার সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক প্রবল ব্যবধান।

শুরুর দিকে কিছুটা সময়ের জন্য পূর্ব এবং পশ্চিম পাকিস্তানের মানুষেরা নতুন জাতীয়তাবাদের আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক প্রফুল্লতায় একীভূত ছিল। কিন্তু মৌলিক সমস্যাগুলো আরো প্রকট হতে লাগলো যখন পূর্ব পাকিস্তান উপলব্ধি করতে শুরু করলো যে তারা আসলে পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণের জাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছে যা কিনা ইংরেজ ঔপনিবেশিকতারই নামান্তর। তারা দাবি করেছিল যে সরকারের নীতিনির্ধারণী উচ্চপদে তাদের জনসংখ্যার আনুপাতিক হারে প্রতিনিধিত্ব নেই। তাদের অভিযোগ ছিল যে শিল্প-উৎপাদনের ক্ষেত্রে তাদের শ্রম ও সম্পদের ভূমিকা থাকা সত্ত্বেও লভ্যাংশের ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত করে তাদেরকে অর্থনৈতিকভাবে শোষণ করা হচ্ছে। তারা পূর্ব এবং পশ্চিমের মধ্যকার মজুরি ও জীবনযাত্রার মানের সুতীক্ষ্ণ বৈষম্যকে তুলে ধরেছিল।

 

এই বিদ্রোহের উদ্গিরন অবধারিত ছিল। পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে শুরু হওয়া রাজনৈতিক আন্দোলনের পিছনের প্রকৃত খুঁটিনাটি এখানে তুলে ধরার কোন মানে নেই। এখানে এইটুকুই বলা যথেষ্ট যে ইসলামাবাদের কেন্দ্রীয় সরকার শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত স্বায়ত্তশাসনের প্রস্তাব পূর্ব পাকিস্তানের সংসদে উপস্থাপনে নারাজ ছিল। যদিও সাধারণ নির্বাচনে বিপুল ভোটে স্বায়ত্তশাসনের পক্ষেই রায় এসেছিল। ইসলামাবাদের কেন্দ্রীয় সরকার জনতার এই রায়কে সম্মান দিতে শুধু ব্যর্থই হয়নি, বরং সামরিক বাহিনীকে লেলিয়ে দেয় এর বাস্তবায়নকে বানচাল করতে। ২৬ শে মার্চে শুরু হয় আনুষ্ঠানিক হত্যাযজ্ঞ।

 

(১) ২৬ শে মার্চ ভোরে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র ও গ্রেনেড সজ্জিত সৈনিকরা সাঁজোয়া যান (ট্যাঙ্ক) নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ঘেরাও করে। ইকবাল হল এবং তার ডরমেটরিতে অবস্থানরত সকল ছাত্রকে হত্যা করা হয়। ট্যাঙ্কের গোলায় ধসিয়ে দেয়া হয় পুরো ভবনটি।

 

(২) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলে অবস্থানরত একশত তিন জন হিন্দু ছাত্রকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ছয়জন হিন্দু ছাত্রকে অস্ত্রের মুখে বাধ্য করা হয় তাদের কবর খুঁড়তে এবং তারপর তাদেরকেও গুলি করে হত্যা করা হয়।

 

(৩) দর্শন বিভাগের প্রধান বরেণ্য অধ্যাপক জি. সি. দেবকে তার বাসা থেকে বের করে পার্শ্ববর্তী মাঠে নিয়ে যাওয়া হয় এবং গুলি করা হয়।

 

(৪) একই বিভাগের অন্য শিক্ষক যাদেরকে হত্যা বা গুরুতরভাবে জখম করা হয় তাদের নামঃ মনিরুজ্জামান, গুহঠাকুরতা, মুনিম, নাকী, হুদা, ইন্নাস আলি।

 

(৫) সৈনিকেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৪ নং দালানের ‘ডি’ ফ্ল্যাটে জোর করে ঢুকে অধ্যাপক মনিরুজ্জামান, তার ছেলে, তার ভাই (যিনি পূর্ব পাকিস্তান হাইকোর্টে চাকরী করতেন) ও তার ভাইপোকে আটক করে এবং তাদেরকে দলবেঁধে দোতলার বারান্দায় নামিয়ে আনে, যেখানে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের গুলিতে তাদের হত্যা করা হয়।

 

(৬) পুরানঢাকার সদরঘাট টার্মিনালের ছাদে একটি স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র (মেশিনগান) স্থাপন করা হয়। মার্চের ২৮ তারিখে, এই অস্ত্রের আওতার মধ্যে থাকা সকল বেসামরিক নাগরিকদের গুলি করা হয়। এই হত্যাযজ্ঞের পর, মৃতদেহগুলোকে টেনেহিঁচড়ে কতগুলো বাসে তোলা হয়। কিছু মৃতদেহ পুড়িয়ে ফেলা হয়। কিছু মৃতদেহ টার্মিনালের পাশের বুড়িগঙ্গা নদীতে ফেলে দেয়া হয়।

(৭) ২৮ শে মার্চ সকালে, শাঁখারী বাজার, পুরানঢাকার একটি হিন্দু অধ্যুষিত শিল্প-এলাকা, এর দুপাশে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র (মেশিনগান) বসানো হয়। সৈনিকেরা আচমকা গুলিবর্ষণ শুরু করে ভিতরে আটকে পড়া বেসামরিক নাগরিকদের ওপর। মৃতদেহগুলো ছড়িয়েছিটিয়ে পড়ে থাকে রাস্তার ওপর।

 

(৮) ২৮ শে মার্চ সন্ধ্যায়, সৈন্যরা রমনা কালীবাড়ি, পুরানঢাকার এক প্রাচীন হিন্দু বসতি, তে ঢুকে পড়ে, সবাইকে (আনুমানিক ২০০ জনকে) হত্যা করে। পরেরদিন ২৯ শে মার্চে, একশোর মতো মৃতদেহ পাওয়া যায় ঐ এলাকায়।

 

(৯) বেসামরিক নাগরিকদের ঢাকা থেকে পালানোর সকল পথ অস্ত্রের মুখে বন্ধ হয়ে যায়।

 

(১০) ২রা এপ্রিল সকালে, চল্লিশজন সৈনিক বাড্ডা নামক গ্রামে ঢুকে সব (আনুমানিক ৬০০ জন) পুরুষদেরকে একত্রিত করে এবং অস্ত্রের মুখে দলবেঁধে গুলশান পার্কে নিয়ে আসে, সেখানে তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। ঐ দল থেকে দশ জনকে নিয়ে যাওয়া হয়, তাদের ভাগ্যে কি ঘটেছে তা আজো অজ্ঞাত।

 

এখানে বর্ণিত এই সত্যিকার ঘটনাগুলো যুবকবয়সী এবং শিক্ষিতদের উপর চালানো ব্যাপক গণহত্যার এক অতিক্ষুদ্র অংশ মাত্র। এক্ষেত্রে নিহত বা আহতদের সঠিক সংখ্যা অনুমানের চেষ্টা নিছক বাতুলতা। প্রত্যেক শহর এবং গ্রামেরই রয়েছে এমন ভয়ঙ্কর ইতিকথা। এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যে ইসলামাবাদ সরকার মাত্র গত সপ্তাহ পর্যন্ত, শক্তিপ্রয়োগের মাধ্যমে সাংবাদিকদেরকে এর বাইরে রেখেছে।

 

যুক্তরাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্র বিভাগের কাছে শুধু উপরে বর্ণিত ঘটনাগুলেো ছাড়াও আরও অসংখ্য ঘটনার প্রামাণ্য বিবরণ রয়েছে। ঢাকাস্থ আমেরিকান রাষ্ট্রদূত এবং এপিপি-এর সাথে সম্পৃক্ত আমেরিকান চিকিৎসকরা এই বিস্তারিত বিবরণগুলো ওয়াশিংটনে প্রেরন করেন। কোন অজানা কারণবশত, স্বরাষ্ট্র বিভাগ তাদের কাছে থাকা কোন বিবরণই প্রকাশ করেনি।

 

পাকিস্তানে পাঠানো আমেরিকান বন্দুক গোলাবারুদ ও অন্যান্য অস্ত্রই ব্যবহার করা হয়েছে বাঙালীদের উপর আক্রমণের সময়। একই ভাবে সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং গণপ্রজাতন্ত্রী চীন থেকে পাঠানো অস্ত্রও ব্যবহৃত হয়েছে।

 

বর্তমান পরিস্থিতিতে জাতিসংঘ কোন সহায়ক হতে পারেনি। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার দাবী করছে যে এটা তাদের আভ্যন্তরীণ বিষয়, যা কিনা জাতিসংঘের এখতিয়ারের বাইরে।

 

এথেকে হয়ত বুঝতে সুবিধা হতে পারে যে জাতিসংঘ এখনো পর্যন্ত আপাতদৃষ্টিতে প্রমানযোগ্য এই গণহত্যার বিরুদ্ধে কোন কার্যকর ভূমিকা নেয়নি কেন কিন্তু এর কোন ব্যাখ্যা নেই যে কেন বিবেকবান মানুষেরা জাতিসংঘে দাঁড়িয়ে আকাশ বিদীর্ণ করে এই ঘৃণিত অপরাধের প্রতিবাদ করছেনা।

 

উপদ্রুত এলাকায় খাদ্য, ঔষধ, এবং চিকিৎসক প্রেরণের সকল প্রচেষ্টা ইসলামাবাদের কেন্দ্রীয় সরকার বানচাল করতে সক্ষম হয়েছে। এটা বোঝা খুবই দুষ্কর যে এই ধরনের একটি সিদ্ধান্তকে কিভাবে টিকে থাকতে দেয়া যায়। বাঙালীরা হয়ত তাদের রাজনৈতিক স্বাতন্ত্র্য জাতিসংঘের মানবাধিকার ঘোষণার অধীনে কোনদিনই পাবেনা।

 

যুক্তরাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্র বিভাগ তাদের জাতীয় স্বার্থে অত্যন্ত জোরের সাথে এবং সাফল্যের সাথে কথা বলতে কখনই দ্বিধাবোধ করেনি। প্রত্যেক আমেরিকান নাগরিক এই প্রত্যাশা করতেই পারে যে যেখানে মানবাধিকারের প্রশ্ন জড়িত সেখানে যুক্তরাষ্ট্র অত্যন্ত জোরের সাথে কথা বলবে। যুক্তরাষ্ট্র যদি পাকিস্তানে অস্ত্র পাঠানোর নৈতিক উপায় বের করতে পেরে থাকে তাহলে সেখানে খাদ্য ও জরুরী চিকিৎসা সাহায্য প্রেরণের ব্যপারেও নৈতিক উপায় বের করতে পারবে।

 

প্রেসিডেন্ট বলেছেন যে ভিয়েতনাম হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে পৌরুষের এক পরীক্ষা। এই প্রস্তাবনাটি দ্ব্যর্থক। তবে এটুকু নিশ্চিত বলা যায় যে পাকিস্তানে যে ঘটনাগুলো ঘটছে তা যুক্তরাষ্ট্রের সহানুভূতিশীল বিবেকের কাছে এক বিশেষ পরীক্ষাসরূপ।

 

 

 

 

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
৪৫। পাকিস্তানঃ বিনষ্ট ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার প্রয়াস টাইম ২৪ মে ১৯৭১

 

Razibul Bari Palash

<১৪,৪৫,৯৮-৯৯>

 

টাইম, ২৪ মে ১৯৭১

পাকিস্তান

বিনষ্ট ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার প্রয়াস

 

 

“আমাদের কালিমালিপ্ত করা হয়েছে,” পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনীর গোয়েন্দা প্রধান ঘোষণা করেন। মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আকবর খান। জেনারেলের কাছে করাচিতে দেড় ডজন বিদেশী সাংবাদিক পূর্ব পাকিস্তানে সাত সপ্তাহ ধরে বাঙালি বিদ্রোহ দমন করার প্রচেষ্টায় সেনা নিষ্ঠুরতার ব্যাপক রিপোর্ট উল্লেখ করে জানতে চাওয়া হলে তিনি একথা বলেন। “বানানো সংবাদ বিদেশী সংবাদ এবং রেডিও প্রচার করছে,” সরকার ধারাবাহিকভাবে আসল ঘটনার বিবরণ দিয়েছে এবং চারদিনের দ্রুত হেলিকপ্টার সফরে “সঠিক” গল্প জানানো হবে – বলে তিনি জানান।

 

শান্তি কমিটিঃ পশ্চিম পাকিস্তান সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। দমন অভিযানে মার্চ থেকে অন্তত ২০০০০০ মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে – তাদের সব বাঙালি। উপরন্তু, আরও ১৫০০০০০ জন বাঙালি ভারতে পালিয়ে যান এবং যারা এখনো আছেন তারা দুর্ভিক্ষ অভাবের মধ্যে ছেবে আছেন যা নিয়ে সরকার পক্ষের কোন উদ্বেগ আছে বলে মনে হচ্ছে না। পূর্ব পাকিস্তান ট্রাজেডি জেনারেল টিক্কা (যার মানে “লাল গরম”) খানের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছে। সেনাবাহিনী বলছে তারা পূর্ব পাকিস্তানকে রক্ষা করছে ধ্বংসের হাত থেকে। তারা আরও বলেন বিদ্রোহীরা আসলে ভারতের সঙ্গে অনেক বৃহৎ ষড়যন্ত্রেে নেমেছে। নাৎসি স্টর্ম ট্রুপারদের মত এটা একটা রণকৌশল। পশ্চিম পাকিস্তানী বাহিনী রক্তগঙ্গা প্রতিরোধ করতে বাধ্য হচ্ছে মাত্র।

 

সাংবাদিক দের সফর সাবধানে দেখাশোনা করা হয় যাতে সরকারের অভাবনীয় কাহিনী অন্তত বিশ্বাসযোগ্য বানানো হয়। ছয়জন সংবাদমাধ্যমকর্মীর সাথে পাহারা দেয়ার জন্যে যে কয়জন সেনা পাঠানো হয়েছিল, তারা টিক্কা খানের ট্যাংক আর যুদ্ধবিমানের হামলায় পোড়া ও ধ্বংসপ্রাপ্ত বাঙ্গালীদের বাড়িঘর ও অন্যান্য ধ্বংসচিত্র না দেখানোর জন্য চেষ্টার কোন কমতি রাখেনি। পাকিস্তানীরা নৃশংসতার দৃষ্টান্ত ঢেকে রাখার সুযোগ পায়নি। নাটোরে, এটি ঢাকার উত্তর-পশ্চিম দিকের একটি শহর, সাংবাদিকদের শান্তি কমিটির লোকেরা অভ্যর্থনা জানায়। এই দল আর্মিদের তৈরি। কমিটির লোক নিকটবর্তী গ্রামে ণয়ে যান যেখানে, ৭০০ থেকে ১৩০০ লোককে বাঙ্গালীরা জবাই করেছিল। সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল একটি কুয়া যেটি মানুষের কঙ্কাল এবং পচা মাংস দিয়ে ভর্তি । এক শান্তি কমিটির লোক বলেছিলেন: “তোমরা যেমন নৃশংসতার কখনো দেখনি!”

 

সেনাবাহিনী সাংবাদিকদের তাদের নিজেদের ইচ্ছামত চারপাশে ঘুরে দেখতে দিতে চাচ্ছিলনা। টাইম পত্রিকার প্রতিবেদক লুই Kraar গত সপ্তাহে রিপোর্ট করেন , “আমি নাটোরের রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলাম। একজন দাড়িওয়ালা শান্তি কমিটির লোক কেউ যখন আমার সাথে কথা বলতে আসছিল তাকেই বাঁধা দিচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত আমি সেই লোকের থেকে বিচ্ছিন্ন হলাম এবং সেখানকার হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায় গেলাম। জায়গাটা সম্পূর্ন ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। এক গাদা ধ্বংসস্তুপ ও ছাই পড়ে আছে। হাঁটতে হাঁটতে এক তরুণ আমার কাছে এসে বলল সে একজন ছাত্র। সে বলল ‘আমরা আর্মির ভয়ে আতংকিত থাকি। আপনি আসার আগ পর্যন্ত তারা মানুষকে মারছিল।’

 

পারফেক্ট অর্ডারঃ দেখতে পেলেন হত্যার ধরণ সর্বত্র একই রকম। সরকারি বাহিনী নিজেদের ইচ্ছামত যা খুশি করেছে। বাঙ্গালী অধিবাসিরা মোট হত্যা – প্রায় ২০০০০ এর হয়ত ১০% অবাঙালির উপর প্রতিশোধ নিতে পেরেছে। এবং তারপর সেনাবাহিনী এসে সবকিছু শেষ করে দিয়ে গেছে। ঢাকার উত্তরে ময়মনসিংহে, পাকিস্তানি জেট বিমান দ্বারা এবং দুই টি আমেরিকান এম 34 ট্যাঙ্ক দ্বারা পাঁচ ঘন্টা গোলাবর্ষণ ও শেলিং করা হয়েছে। ময়মনসিংহ এখন শুধু ধ্বংসাবশেষ রয়েছে এবং তার প্রাক গৃহযুদ্ধ জনসংখ্যার প্রায় ৯০% লোক পালিয়ে গেছেন বা হত্যা করা হয়েছে। টিক্কা খান যথার্থ বলেছেন , “আমরা নিখুঁত আইন-শৃঙ্খলা চাই”।

 

 

 

 

 

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
৪৬। পাকিস্তানের সাহায্য বন্ধের জন্য সিনেটরদের বিবৃতি বালটিমোর সান

জুন ৯, ১৯৭১

 

 

Ashik Uz Zaman

<১৪, ৪৬, ১০০১০১>

 

দি সান বালটিমোর, জুন ৯, ১৯৭১

দুইজন সিনেটর পাকিস্তানে সাহায্য বন্ধের আবেদন জানান

অ্যাডাম ক্লাইমার

দি সানএর ওয়াশিংটন দপ্তর থেকে

 

ওয়াশিংটন, জুন ৮ – যতক্ষণ পর্যন্ত না পাকিস্তানের সরকার তাদের নীতি পরিবর্তন করছে যাতে করে উদ্বাস্তুরা তাদের দেশে ফিরে যেতে পারে ততক্ষণ পর্যন্ত সেখানে সবধরনের সাহায্য বন্ধ করে রাখা উচিত। সিনেটরদ্বয় উইলিয়াম বি. স্যাক্সবি (রিপাবলিকান, ওহাইও অঙ্গরাজ্য) এবং ফ্রাংক চার্চ (ডেমোক্র্যাট, আইডাহো অঙ্গরাজ্য) আজ এই জোরালো আবেদন জানান।

 

তাঁরা ঘোষণা করেন যে তাঁরা আগামি সপ্তাহে বৈদেশিক সাহায্য আইনের খসড়া সংশোধনের দাবী সিনেটে উত্থাপন করবেন পাকিস্তানে যেকোন সামরিক অথবা অর্থনৈতিক সাহায্য বন্ধ রাখতে যতক্ষণ পর্যন্ত না ভারতে অবস্থানরত ৫০,০০,০০০ উদ্বাস্তু তাদের দেশে ফিরে যাচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক ত্রাণকাজ শুরু হচ্ছে।

 

সিনেটর চার্চ যুক্তি তুলে ধরেন যে এই সংশোধনটি একটি “গৃহযুদ্ধ”-এর এক পক্ষ – পাকিস্তানের সরকার – এর প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন পরিহার করার জন্যে অতিব জরুরী। তিনি বলেন এটি একটি “নিরপেক্ষ” দাবী এবং পাকিস্তানের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে অনধিকারচর্চা এর উদ্দেশ্য নয়। তবে প্রশ্নের সম্মুখীন হলে তিনি স্বীকার করেন যে এই সংশোধন চাওয়া হচ্ছে পাকিস্তানের সরকার যাতে পূর্ব পাকিস্তানের নাগরিকদের প্রতি তাদের নীতি পরিবর্তন করতে বাধ্য হয় – যথেষ্ট উদার ধরণের নীতি পরিবর্তন প্রয়োজন যাতে করে উদ্বাস্তুরা তাদের দেশে ফিরে যাওয়াকে নিরাপদ মনে করে।

 

যুক্তরাষ্ট্র ১ কোটি ৫০ লক্ষ মার্কিন ডলারের সংস্থান করবে

 

ইতিমধ্যে, চার্লস ব্রেই, মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র, ঘোষণা দেন যে যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে আরো ১ কোটি ৫০ লক্ষ মার্কিন ডলারের সাহায্য সংস্থান করবে যাতে করে তারা পাকিস্তানী উদ্বাস্তুদের সাহায্য করতে পারে। এটি পূর্বে ঘোষিত দুই কোটি ৫০ লক্ষ মার্কিন ডলারের সাথে যোগ হবে।

 

এই সংস্থানের, এক কোটি মার্কিন ডলার যাবে খাদ্য সরবরাহে, এবং বাকি অংশ যাবে চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং অন্যান্য প্রয়োজনে, মার্কিন পররাষ্ট্র সচিবের উদ্বাস্তু বিষয়ক বিশেষ সহকারী, ফ্রান্সিস এল. কেলোগ, ঘোষণা করেন।

 

মিঃ কেলোগ জানান সীমান্ত পার হয়ে প্রতিদিন ৫০,০০০ থেকে ১,০০,০০০ জন শরণার্থী ভারতে আসছেই, এবং যুক্তরাষ্ট্র এদের মধ্যে থেকে ১২,৫০,০০০ জনের খাদ্যের সংস্থানে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, তিনি বলেন ভারত সরকারের আনুমানিক হিসাবে শরণার্থীদের বর্তমান সংখ্যা ৪৭ লাখ হবে।

 

তিনি আরো জানান সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র চলতি সপ্তাহের শেষ নাগাদ ১০,০০,০০০ টি কলেরা-নীরোধি টিকা পাঠাবে।

 

সামরিক বাহিনীর বিশেষ প্রতিনিধিদলের আগমন

 

এদিকে নয়াদিল্লীতে, বিমান বাহিনীর একটি সি-১৩০ পরিবহন বিমানে করে ২৭-সদস্য বিশিষ্ট মার্কিন সামরিক বাহিনীর একটি বিশেষ প্রতিনিধিদল এসে পৌঁছেছেন। তাঁরা ত্রিপুরা রাজ্যের বিমান ঘাঁটিগুলো পরিদর্শন করবেন, যেগুলো কিনা পূর্ব পাকিস্তানের পূর্বে অবস্থিত, সম্ভাব্যতা যাচাই করার জন্যে যে আকাশপথে শরণার্থীদেরকে (যাদের সংখ্যা বর্তমানে ৫,০০,০০০ যেখানে ত্রিপুরা রাজ্যের জনসংখ্যাই হচ্ছে পনের লক্ষ) ভারতেরই অপেক্ষাকৃত লঘুবসতিপূর্ণ এলাকায় সরিয়ে নেয়া যায় কিনা। তাঁরা জানান, যদি তা সম্ভব মনে হয় তাহলে আরো তিনটি সি-১৩০ পরিবহন বিমান সেখানে পাঠানো হবে।

 

এই সিনেটরদ্বয় তাদের এই সংশোধনী প্রস্তাবটি আগামী সপ্তাহে পেশ করবেন যখন সিনেট-এর বৈদেশিক সম্পর্ক বিষয়ক কমিটি এই বৈদেশিক সাহায্য আইনের খসড়াটি নিয়ে আলোচনায় বসবে। উক্ত কমিটি এর আগে একটি প্রস্তাব অনুমোদন করেছে – যেটি এখনো সিনেট-এ উত্থাপিত হয়নি – যা কিনা পাকিস্তানে আরো সামরিক সাহায্য প্রেরনে বাধা দেবে। এই দক্ষিন এশীয় দেশটি মুলতঃ মার্কিন সামরিক সরঞ্জামে সজ্জিত, কিন্তু ১৯৬৫-এর পাক-ভারত যুদ্ধের পর থেকে সেখানে শুধুমাত্র খুচরা যন্ত্রাংশ এবং গোলাবারুদই পাঠানো হয়েছে।

 

সিনেটর চার্চ অনুমান করেন বর্তমানে মুলতবী হয়ে থাকা অর্থনৈতিক সাহায্যের পরিমান হবে ৮ কোটি মার্কিন ডলার। তিনি বলেন যে তিনি জানেন না কি পরিমান সামরিক সাহায্য প্রদানের সম্ভাবনা রয়েছে। গত অক্টোবর মাসে হওয়া বিমান এবং সৈন্যবাহী সাঁজোয়া যান-এর বিক্রয় প্রক্রিয়া এখনো সম্পন্ন হয়নি।

 

উভয় সিনেটর অভিযোগ করেন যে পাকিস্তানের সরকারকে সাহায্য প্রদান করাতে মার্কিন সরকারকে পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালীদের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দেয়া হচ্ছে। সিনেটর স্যাক্সবি অভিযোগ করেন যে সামরিক বাহিনী শেখ মুজিবর রহমান এবং তাঁর মধ্যপন্থী, মুলতঃ পশ্চিম-ঘেঁষা দল আওয়ামী লীগ কে “নিষ্পিষ্ট করেছে”, যারা কিনা কিছুদিন আগেই জাতীয় নির্বাচনে জয়লাভ করেছে।

 

সিনেটর স্যাক্সবি ডাঃ জন ই. রোড-কেও উপস্থাপন করেন, যিনি একজন চিকিৎসক হিসেবে ‘আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা’-এর সাথে পূর্ব পাকিস্তানে ছিলেন। ডাঃ রোড যুক্তি তুলে ধরেন যে ত্রাণকাজ একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার মাধ্যমেই হতে হবে কেননা গত ডিসেম্বরের ঘূর্ণিঝড় এবং বন্যার সময় পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী দেখিয়ে দিয়েছে যে তারা সুষ্ঠুভাবে ত্রাণকাজ পরিচালনায় অক্ষম।

 

তিনি বলেন মার্কিন সাহায্য – যা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই মুলতবি হয়ে আছে – এটাই বোঝায় যে “যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে এক পক্ষকে সাহায্য করছে”। তিনি আরো বলেন “গণহত্যা যে চালানো হয়েছে তা নথিভুক্ত আছে”।

 

 

 

 

 

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
৪৭। অনিশ্চিত আশ্রয় নিউজউইক ১৪ই জুন, ১৯৭১

 

 

Ashik Uz Zaman

<১৪, ৪৭, ১০২-১০৩>

 

নিউজউইক, ১৪ই জুন, ১৯৭১

অনিশ্চিত আশ্রয়

 

লাখে লাখে, বাঙালী শরণার্থীরা স্রোতের মতো পূর্ব পাকিস্তান থেকে সীমান্ত পার হয়ে ভারতে যাচ্ছে। তাদের অঞ্চলকে স্বাধীন ঘোষণা করার চেষ্টার ফলশ্রুতিতে শুরু হওয়া পাশবিক দমননীতি থেকে পালিয়ে, ব্যাধি এবং অপরিচ্ছন্নতার মাঝে তারা এক অনিশ্চিত আশ্রয় খুঁজে পেয়েছে। গতসপ্তাহে, নিউজউইকের টনি ক্লিফটন কয়েকটি শরণার্থী শিবির পরিদর্শন করেন এবং এই প্রতিবেদনটি পেশ করেনঃ

 

ইতিমধ্যেই, ভারতের অঙ্গরাজ্য পশ্চিমবঙ্গের আকাশ ভারী এবং ধূসর হয়ে উঠে আসন্ন বর্ষাকালের পূর্বাভাস দিচ্ছে, যা কিনা যে কোনো সময়ে ফেটে পরতে পারে। সবসময়ই ধ্বংসাত্মক, এবছরের বর্ষা অবধারিত ভাবেই অতিরিক্ত প্রলয় ঘটাবে, বহুগুনে বাড়িয়ে দেবে প্রায় ৪০ লক্ষ পাকিস্তানীর আতঙ্ক এবং দুর্দশা যারা এখন গাদাগাদি করে আশ্রয় নিয়েছে জরাজীর্ণ শরণার্থী শিবিরগুলোতে তাদের প্রাক্তন স্বদেশের সীমান্তের ঠিক এপারেই। ভারতীয় সরকারী কর্মচারীরা অত্যাশ্চর্যভাবে শরণার্থীদের জন্য খাদ্য এবং বাসস্থানের ব্যবস্থা করে আসছে, কিন্তু তাদের সব প্রচেষ্টা ধুয়েমুছে যাবে যদি এমনকি বর্ষার “স্বাভাবিক” বৃষ্টিও হয়। আর যদি ভারী বর্ষণ হয়, তাহলে আসন্ন বন্যা এমন এক বিপর্যয় ঘটাতে পারে যার তুলনা করা যেতে পারে সেই প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ের সাথে যেটি মাত্র গত বছরই পূর্ব পাকিস্তানে ৫ লক্ষ মানুষকে হত্যা করেছে।

 

বর্ষার বৃষ্টি, অবশ্য, শরণার্থীদের দুর্দশা   শুধু কিছুটা বাড়িয়ে দেবে মাত্র যারা, বিগত সামান্য কয়েক সপ্তাহে, তাদের সম্পূর্ণ জীবনধারাকে ভেঙে পরতে দেখেছে। তারা যেন এক করুণ দৃশ্য পথে হাঁটছে দলভ্রষ্ট হয়ে, কাপড়ের পুঁটলি আঁকড়ে ধরে এবং মাঝেমধ্যে একটা কালো ছাতা প্রখর সূর্যের তাপ থেকে রক্ষা পেতে। আছে হাজার হাজার ছোট্ট শিশু এবং অসমঞ্জস্যসংখ্যক তরুণী, যারা লুটেরা পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর বিশেষ লক্ষ্যবস্তু। দল বেঁধে লোকেরা গাছের নিচে বসে আছে অভাগার মতো তাদের দীর্ঘ পদযাত্রা এবং খাদ্যের অভাবে অবসন্ন হয়ে। “এখানকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে”, জানালেন কে. কে. নস্কর, যিনি কোলকাতা থেকে প্রায় ৬০ মাইল দুরের বনগাঁ নামক এলাকার সরকারী প্রশাসক। “ আর ১ জনকেও থাকার জায়গা বা খাবার দেবার ক্ষমতা আমার নেই, আর ওরা আসছে প্রতিদিন ১,০০,০০০ জন করে। আমি এইটুকুই করতে পারি যে ওদেরকে সামান্য কিছু খাবার দিয়ে এবং অন্য কোথাও পাঠিয়ে দিতে”।

 

 

দুর্গন্ধঃ ঘিঞ্জি শিবিরগুলোর ভেতরে, দৃশ্য একইরকম বিষণ্ণ। অসংখ্য শরণার্থী – যাদের অনেকের পায়েই ফোস্কা পড়েছে, পা ফুলে গেছে, আমাশয় এবং অন্যান্য পৈটিক অসুখে আক্রান্ত – কে প্রায়শই শুধুমাত্র বাঁশের খুঁটি এবং তেরপলের ছাদের তৈরি দায়সারা আশ্রয়ের নিচে গাদাগাদি করে রাখা হচ্ছে। এই আশ্রয়গুলোর কোনো দেয়াল নেই, নেই কোনো বিছানা এবং আলোর ব্যবস্থা। যত্রতত্র আবর্জনা ফেলার কারণে এবং পুরো শিবিরের পয়ঃনিস্কাশন ব্যবস্থা খোলা হওয়ার কারণে, দুর্গন্ধ প্রায়শই অসহ্য হয়ে ওঠে, এবং মহামারী দেখা দেয়ার সম্ভাবনাও ব্যাপক। হয়তো এই অন্ধকার ছবিতে একমাত্র আলোর ছটা এই যে শরণার্থীরা তুলনামুলকভাবে ভালো খাবার পাচ্ছে – অন্তত ভারত এবং পাকিস্তানের দীর্ঘস্থায়ী অপুষ্টির মাত্রার তুলনায়।

 

তাদের বর্তমান অস্তিত্বের অপরিচ্ছন্নতা সত্ত্বেও, বাঙালীরা সহ্য করে যাচ্ছে নুন্যতম অভিযোগ নিয়ে। কিন্তু তারা একইসাথে হতবুদ্ধি এবং অপমানিত বোধ করছে যে উৎপীড়ন এবং আতঙ্ক তাদের ভোগ করতে হয়েছে দীর্ঘদিনের শত্রুর হাতে, পাকিস্তানের শাসক পাঞ্জাবীরা। আমি এক বৃদ্ধার সাথে কথা বলেছি, রসিমন বিবি নামক এক বিধবা যিনি আমাকে বলেন, “আমি এখানে এসেছি কারণ ওরা আমার ছেলেকে মেরে ফেলেছে। ও তখন বীজের দোকান থেকে বাড়ি ফিরে আসছিলো যখন পাঞ্জাবীরা ওর কাছে আসে এবং ওকে গুলি করে হত্যা করে। আমি জানিনা কেন। সে তার জীবনে কখন কোনো খারাপ কাজ করেনি।” আরেকজন শরণার্থী আমাকে তার দুই ছেলেকে দেখান, যাদের বয়স ৬ এবং ৭, তাদের উভয়ের শরীরেই পাঞ্জাবী সৈন্যদের শারীরিক নির্যাতনের থেঁতলানো দাগ এখনো আছে। কয়েকজন শরণার্থী বলেন পাঞ্জাবীরা বাচ্চাদের অপহরণ করা শুরু করে এবং মুক্তিপণ আদায়ের জন্য আটকে রাখে। মেথোডিষ্ট মিশনারি জন হেসটিংস যোগ করেন, “আমি একজনের সাথে কথা বলেছি যে তার বাচ্চার মুক্তিপণের জন্য যতটুকু সম্ভব টাকা জোগাড় করে, কিন্তু ২০০ টাকা প্রায় ২৬ মার্কিন ডলার কম হয়। তখন সে বলে, বাকি টাকা উশুল করার জন্য আমাকে পেটাও। এবং তারা তখন তাকে পেটায়, তার একটা চোখ উপড়ে নেয় এবং তারপর তার বাচ্চাকে ফিরিয়ে দেয়”।

 

ব্যাধি. এমনকি যখন তারা পালিয়ে ভারতে চলে আসে, তখনও শরণার্থীরা নানাবিধ বিপদের সম্মুখীন হচ্ছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে কলেরা। যখন প্রথম দলগুলো, সীমান্ত পার হয়ে আসে, চিকিৎসকেরা তাদেরকে কলেরার প্রতিষেধক দেন, কিন্তু এখন বাঙালীরা এমন সংখ্যায় ঝাঁকে ঝাঁকে ভারতে আসছে যে তাদের সবাইকে প্রতিষেধক দেয়া সম্ভব নয়। “সিরিঞ্জ ব্যবহার করতে এতো বেশি সময় লাগে”, একজন চিকিৎসক বলেন, “আর আমাদের কাছে প্রতিষেধক টীকা দেয়ার যন্ত্র কেনার মতো টাকাও নেই”। ইতিমধ্যেই কলেরার প্রকোপ মহামারীর আকার ধারন করতে যাচ্ছে। গতসপ্তাহে, প্রায় ২,০০০ শরণার্থী মারা গেছে, এবং সমানসংখ্যক মৃতপ্রায় হয়ে হাসপাতালে বা রাস্তার পাশে পড়ে আছে। ভবিষ্যতের চেহারা আরো অন্ধকারাচ্ছন্ন, কেনোনা বর্ষা মৌসুমের বন্যা অবধারিতভাবেই এই পানিবাহিত রোগটি ছড়াতে সাহায্য করবে।

 

সকল ভোগান্তি সত্ত্বেও, শরণার্থীরাই শুধু খারাপ সময়ের সম্মুখীন হচ্ছে না। পাকিস্তানীদের সমাগমের প্রাচুর্যের ফলশ্রুতিতে, পশ্চিমবঙ্গের সব্জি এবং ভোজ্য তেলের দাম আকাশে উঠে গেছে। একইসাথে, স্থানীয় অধিবাসীরা দেখতে পাচ্ছে যে তাদের মজুরী প্রচলিত দরের চেয়ে কমে যাচ্ছে কেননা শরণার্থীরা কম মজুরীতে কাজ করতে রাজি হচ্ছে। “শরণার্থীরা সরকারের কাছ থেকে বিনামূল্যে খাবার পাচ্ছে তাই তারা যাদেরকে খাবার কিনতে হয় তাদের চেয়ে কম মজুরীতে কাজ করতে পারে”, মিঃ নস্কর ব্যাখ্যা করেন। “একজন ক্ষেতমজুরের দৈনিক মজুরী কমে অর্ধেক হয়ে গেছে”। অবধারিতভাবে, এই ধরণের পরিস্থিতি ক্রোধের জন্ম দেয়। “এখানকার মানুষেরা শরণার্থীদের প্রতি সহানুভূতিশীল,” মিঃ নস্কর বলেন, “কিন্তু তাদের সহানুভূতি শুকিয়ে যেতে শুরু করেছে। দুই মাসের মধ্যে, পাকিস্তানীদের প্রতি অসন্তোষ ছাড়া আর কিছুই থাকবে না”।

শরণার্থীদের সমস্যা ইতোমধ্যে ভারতের রুগ্ন বাজেটের উপরও প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করেছে। সরকার আগামী তিন মাসে শরণার্থীদের দেখভাল করার খরচ ধরে রেখেছে নুন্যতম ৩ কোটি মার্কিন ডলার, এবং এটা অনেক বেড়ে যেতে পারে। আজ পর্যন্ত, অন্যান্য দেশের কাছ থেকে ভারত যে আর্থিক সাহায্য পেয়েছে তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অল্প। যদিও যুক্তরাষ্ট্র শরণার্থীদের সাহায্যে ১ কোটি ৪০ লক্ষ মার্কিন ডলার দেয়ার পরিকল্পনা করছে যা তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, অন্যান্য দেশগুলো এখন উদাসীন রয়েছে এব্যাপারে। “একটি বিশাল বিপর্যয় এড়াতে হলে প্রচুর পরিমানে বৈদেশিক সাহায্য প্রয়োজন হবে”, মিঃ হেসটিংস সাবধান করেন, “তারপরেও কেউই নাড়াচাড়া করছে বলে মনে হচ্ছেনা”। পশ্চিম জার্মানি ১,৪০,০০০ মার্কিন ডলার দিয়েছে এবং এথেকে বলতে ইচ্ছে করবে, “অসংখ্য ধন্যবাদ। তোমরা মাত্র আধাবেলা চালিয়ে নেয়ার মতো খাবার কিনে এনেছো”। কর্নেল পি. এন. লুথরা, যিনি শরণার্থী কার্যক্রমের দায়িত্বে রয়েছেন, একইভাবে অবসাদগ্রস্তঃ “আমরা কোনোভাবে চালিয়ে নিচ্ছিলাম, কিন্তু পরিস্থিতি আরো অনেক খারাপের দিকে যাচ্ছে। আমরা আগামী দশ দিনের জন্য পরিকল্পনা করি এবং তিন দিন পর দেখতে পাই যে আমাদের আবার পরিকল্পনা করতে হচ্ছে কেননা শরণার্থীদের সংখ্যা হঠাৎ করে দ্বিগুণ হয়ে গেছে। আমরা আমাদের সাধ্যমতো করছি, আমাদের একার পক্ষে এটা করে যাওয়া সম্ভব নয়”।

 

 

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ

৪৮। পূর্ব-পাকিস্তানে হত্যাযজ্ঞ

 

ওয়াশিংটন ডেইলি নিউজ

জুন ১৫, ১৯৭১

 

 

 

Ashik Uz Zaman

<১৪, ৪৮, ১০৪>

 

দি ওয়াশিংটন ডেইলি নিউজ. জুন ১৫, ১৯৭১

সম্পাদকীয়

পূর্বপাকিস্তানে হত্যাযজ্ঞ

 

প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ, যার একটার চেয়ে অন্যটা আরো ভয়ঙ্কর, যা পূর্ব পাকিস্তান থেকে প্রতিদিনই বের হয়ে আসছে, এবং পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর বাঙালী জনতার উপর চালানো হত্যাযজ্ঞের খবর ফাঁস করে দিচ্ছে।

 

স্বাভাবিকভাবেই, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সামরিক জান্তা অস্বীকার করে আসছে যে তারা বেঁছে বেঁছে গণহত্যা চালাচ্ছে। কিন্তু একের পর এক তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে যে তারা ঠাণ্ডামাথায় হত্যা করছে সংখ্যালঘু হিন্দু, বাঙালী বিচ্ছিন্নতাবাদী, বুদ্ধিজীবী, চিকিৎসক, শিক্ষক, ছাত্র – মোটকথা যারাই একটি স্বতন্ত্র পূর্ব পাকিস্তানকে নেতৃত্ব দিতে পারবে।

 

সবচেয়ে বড় প্রমাণ এই যে ৫০ লাখ পূর্ব পাকিস্তানী তাদের বাড়িঘর ছেড়ে আসার মতো ভয়াবহ সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং পায়ে হেঁটে সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে পালিয়ে এসেছে। এই ক্ষুধাপীড়িত, কলেরা-আক্রান্ত জনগোষ্ঠীর সাথে প্রতিদিন আরো ১,০০,০০০ করে আতঙ্কিত শরণার্থী যোগ হচ্ছে।

 

যদি পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতি এখন “স্বাভাবিক” হয়ে থাকে, যেমনটা ইয়াহিয়া খানের অধস্তন অত্যাচারী শাসক দাবী করছে, তাহলে কেন নতুন নতুন শরণার্থীরা ভারতকে প্লাবিত করছে এবং আগে যারা এসেছে তারা কেন বাড়ি ফিরে যেতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে?

 

অন্যান্য দেশের পাশাপাশি, যুক্তরাষ্ট্রও শরণার্থীদের জন্য ঔষধ এবং প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী পাঠাচ্ছে। এটাই ন্যায্য, যেহেতু ভারতের নিজেরই অনেক বড় বড় সমস্যা আছে এবং নিজের নাগরিকদের প্রতি ইয়াহিয়া খানের নিষ্ঠুরতার মাশুল তাদের দেয়ার কথা নয়।

 

আমাদের সরকার পূর্ব পাকিস্তানের ভেতরে জাতিসঙ্ঘ পরিচালিত একটি ত্রাণ কার্যক্রম পাঠানোরও চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সেনাবাহিনীর কঠোর ব্যবস্থার কারণে ধানের চাষ ব্যাহত হয়েছে, এবং লাখ লাখ বাঙালী অনাহারে পড়বে যদি বাইরে থেকে খাদ্য সরবরাহ করা না হয়। জাতিসঙ্ঘেরই এটা করতে হবে, কেননা কেউই বিশ্বাস করেনা যে পশিম পাকিস্তানীরা বাঙালীদেরকে খাদ্য সরবরাহ করবে, যেখানে তারা ওদেরকে ঔপনিবেশিক প্রজা মনে করে।

 

সবচেয়ে জরুরী হচ্ছে যে যুক্তরাষ্ট্র ইয়াহিয়া খানের জান্তা সরকারকে পূর্ব পাকিস্তানের সাথে “একটি শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক সহাবস্থান”-এ আসতে আকুল আবেদন জানিয়ে আসছে। এর মাধ্যমে ওয়াশিংটন বলতে চাইছে যে পূর্ব পাকিস্তানীদেরকে স্বায়ত্তশাসন দিতে – যার জন্য পূর্ব পাকিস্তানের বেশিরভাগ মানুষ ভোট দিয়েছে।

 

এটা কি ওয়াশিংটনের জড়িত হওয়ার মত কোনো বিষয়? আমরা তাই মনে করি। এই দেশটি বিগত দুই দশক ধরে কোটি কোটি ডলারের অর্থনৈতিক এবং সামরিক সাহায্য পাকিস্তানে পাঠিয়েছে। (বেশিরভাগ অর্থনৈতিক সাহায্য পশ্চিম পাকিস্তান নিজের কাছেই রেখে দিয়েছে এবং সামরিক সাহায্য ব্যবহার করা হয়েছে বাঙালীদের নিষ্পেষিত করতে।)

 

দেউলিয়া হয়ে যাওয়া ঠেকাতে পাকিস্তানের এখন প্রতি বছর ৪৫ কোটি মার্কিন ডলার করে প্রয়োজন হবে, এবং যুক্তরাষ্ট্র একটি আন্তর্জাতিক সঙ্ঘের প্রধান যাদেরকে অনুরোধ করা হয়েছে এই অর্থের সংস্থান করতে।

 

ওয়াশিংটনের কি এই রকম সাহায্য চালিয়ে যাওয়া উচিত? আমরা বলি না – যতক্ষণ পর্যন্ত না ইয়াহিয়া খান তার সামরিক খুনিদের প্রত্যাহার করে নিচ্ছে এবং পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধিকারের দাবী মেনে নিচ্ছে। নইলে, তার জান্তাকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে, আমরাও বাঙালী জনতার উপর চালানো গণহত্যা এবং দাসত্বের নৈতিক অংশীদার হয়ে যাব।

 

এই পদক্ষেপ, আমরা স্বীকার করি, আমাদের পররাষ্ট্রনীতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে কিন্তু কোনো গণহত্যার পক্ষে মৌনসম্মতি দেয়ার চেয়ে এই মূল্য কিছুই নয়।

 

 

 

 

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
৪৯। ভয়ংকর দুর্যোগ নিউইয়র্ক টাইমস ১৬ জুন ১৯৭১

 

Razibul Bari Palash

<১৪, ৪৯, ১০৫>

 

নিউইয়র্ক টাইমস, ১৬ জুন ১৯৭১

ভয়ংকর দুর্যোগ

প্যারিস থেকে সি এল লুসবার্গার

 

ভয়ংকর হত্যাকাণ্ডের জন্য হিরোশিমা আর নাগাসাকির কথা আমরা ভুলিনি। সংখ্যার দিকে প্রায় সমানুপাতিক হ্যাম্বার্গ আর ড্রেসডেনের কথা আরও সহজে ভুলে যাচ্ছি। সেগুলোকে গতানুগতিক ধরেছি আমরা।

 

তারই পরিপ্রেক্ষিতে পূর্ব পাকিস্তানের দুর্যোগ দেখা যেতে পারে। এখানকার দুর্যোগ মানুষের সহানুভূতি মাপক যন্ত্রে পরিমাপযোগ্য নয়। ঠিক কত জন প্রতিদিন নিহত-আহত হচ্ছে, নিখোঁজ হচ্ছে, গৃহহীন হচ্ছে তা কারো পক্ষে গণনা করা সম্ভব নয়।

 

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
৫০। ঘৃন্য হত্যাকাণ্ড নিউইয়র্ক টাইমস ২১ জুন ১৯৭১

 

Ashik Uz Zaman

<১৪, ৫০, ১০৬১০৭>

 

নিউজউইক, ২১শে জুন, ১৯৭১

বসবাসের জন্য শ্রেয়তর স্থান

 

ভারতে পূর্ব পাকিস্তান থেকে স্রোতের মতো শরণার্থীদের আগমন স্তিমিত হয়ে আসতে শুরু করেছে গত সপ্তাহ থেকে, কিন্তু তাদের সাথে করে নিয়ে আসা কলেরা মহামারীর বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ চলছিলো তা এখনো চলছে। ৫,০০০-এর ও বেশি শরণার্থী ইতোমধ্যেই কলেরায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে; মহামারীর সর্বোচ্চ পর্যায়ে, কবরখোদকরা এতই ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলো যে তারা আর কাজ করতে পারছিলো না, এবং ঐতিহ্যবাহী হিন্দু ধর্মের প্রথানুযায়ী শবদেহ দাহ করার জন্য প্রয়োজনীয় কাঠের সরবরাহ পুরোপুরি শেষ হয়ে গিয়েছিল। যদিও ভাড়া করা বিমানে করে প্রতিদিনই খাদ্য, চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং ঔষধ আসছে, তারপরও ভারত এখন পর্যন্ত প্রায় ৫০ লক্ষ শরণার্থীর পরিচর্যা করার জন্য যে ২০ কোটি মার্কিন ডলারের বৈদেশিক সাহায্য প্রয়োজন তার দশ ভাগের এক ভাগ হয়তো পেয়েছে। “যে পরিস্থিতিকে পাকিস্তানের আভ্যন্তরীণ বিষয় বলে দাবী করা হয়েছিল”, ভারতের প্রধানমন্ত্রী, ইন্দিরা গান্ধী নয়াদিল্লীতে গত সপ্তাহে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন সংসদকে বলেন, “তা এখন ভারতের আভ্যন্তরীণ সমস্যা হয়ে উঠেছে”।

 

সবধরণের হতাশাব্যাঞ্জক পরিসংখ্যান সত্ত্বেও, যেভাবেই হোক, ভারতের চিকিৎসা সেবা বিভাগ চমৎকারভাবে কাজ করে যাচ্ছে। “আমি এটা বলতে পারি না যে মহামারী কমে যাচ্ছে”, বলেন মিঃ আর. এন. গুপ্তা, প্রধান সমাজকল্যাণ কর্মকর্তা নদীয়ায় অবস্থিত কৃষ্ণনগর হাসপাতালের, যেটি সবচে বেশি উপদ্রুত এলাকাগুলোর একটি। “আমরা এখনো প্রতিদিন প্রায় ৫০ থেকে ১০০ জন রোগী পাচ্ছি। পার্থক্য হচ্ছে, এই সপ্তাহে আমরা প্রায় সব রোগীকে হাসপাতালে চিকিৎসা দিতে পেরেছি। গত সপ্তাহে, রোগীর সংখ্যা এতো বেশি ছিল যে অনেক মানুষ আমাদের কাছে এসে পৌঁছানোর আগে পথেই মারা গেছে”।

 

কিন্তু যদিও নদীয়ার রাস্তাঘাট এখন প্রায় কলেরা রোগীশুন্য, হাসপাতাল গুলোতে এখনো অনেক অসহায়, আক্রান্ত রোগী রয়েছে। একটি চিকিৎসা কেন্দ্র, ক্যাথোলিক সেবাদানকারীদের দ্বারা পরিচালিত, সিস্টারস অফ মেরী। ইমাকুলেট, যেটিকে কিছুদিন আগে তৈরি করা হয়েছিলো প্রসূতি হাসপাতাল হিসেবে; উদ্ভোদনের দুই সপ্তাহ আগেই এটিকে চালু করা হয় কলেরা রোগীদের জন্য এবং এখন পর্যন্ত কোনো প্রসূতি এখানে ভর্তি হননি। দালানটির সবখানে সারি সারি বিছানায় ছোট্ট শিশুরা শুয়ে আছে এবং মাথার উপর ঝোলানো বোতল থেকে সঞ্জীবনী দ্রবণ তাদের ক্ষীণ শরীরে প্রবেশ করছে। “এর ফলাফল খুবই লক্ষণীয়”, নিউজউইকের টনি ক্লিফটন গত সপ্তাহে তারবার্তায় জানান। “আক্ষরিক অর্থে জীবন, তাদের শরীরে পুনরায় প্রবেশ করিয়ে দেয়া হচ্ছে, এবং আপনি চাক্ষুষ করবেন যে বোতল যতই খালি হতে থাকে ততই তারা ধীরে ধীরে শক্তি ফিরে পেতে থাকে”। কিছু রোগী সব চিকিৎসার বাইরে চলে যায়। কিন্তু সর্বক্ষণ কাজে নিয়োজিত থেকে, হাসপাতালের দুইজন চিকিৎসক এবং আটজন সেবিকা মিলে এখন পর্যন্ত কলেরা রোগে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হওয়া প্রথম ৪২৫ জনের মধ্যে আঠারো জন বাদে সবাইকে বাঁচাতে সক্ষম হয়েছেন।

“আমরা আমাদের এ্যাম্বুলেন্সগুলোকে বাইরে পাঠাই রাস্তা থেকে রোগীদেরকে তুলে আনতে”, ব্যাখ্যা করেন সিস্টার ইমাকুলেট, হৃষ্টপুষ্ট, ত্রিশোর্ধ চিকিৎসক যিনি এই হাসপাতালটি পরিচালনা করেন। “এদের কেউ কেউ কাদা এবং বৃষ্টিতে পড়ে ছিল এবং সম্পূর্ণরূপে বিধ্বস্ত অবস্থায়। তারপরেও যদি না তারা আক্ষরিক অর্থে মৃত্যুমুখে পতিত হয় তাহলে ওদের বেশীরভাগকেই আমরা সুস্থ করে তুলতে পারি। এই মেয়েটিকে” শান্তভাবে ঘুমিয়ে থাকা এক কিশোরীকে দেখিয়ে তিনি যোগ করেন, “যখন নিয়ে আসা হয় তখন তার নাড়ীর স্পন্দন ছিল না এবং শ্বাস-প্রশ্বাস চলছিল না। আমরা ওকে স্যালাইন দিই, এবং এখন সে সুস্থ আছে। এদের কারো কারো জন্য এক গ্যালন তরল প্রয়োজন হয় সুস্থ হয়ে উঠতে, কিন্তু সঠিক যত্ন নিলে, এরা দুই বা তিন দিনের মধ্যে হাসপাতাল ছেড়ে যেতে পারে”। এই চিকিৎসায় কাজ হয় শুধুমাত্র চিকিৎসক এবং সেবিকাদের নিঃস্বার্থ সেবার কারণে। “আমরা সবসময় ওদের সাথে আছি”, সিস্টার ইমাকুলেট বলেন, “এবং আমরা তাদের প্রত্যেকের পেছনে অনেক টাকা ব্যয় করি – মাথাপিছু প্রায় ৬০ টাকা (৭ মার্কিন ডলার)করে।”

 

এই হাসপাতালটি একটু আলাদা, কেননা এটা নতুন এবং ব্যক্তিগত তহবিল দ্বারা পরিচালিত; নদীয়ায় খুব অল্পকয়েকটি হাসপাতালই আছে যারা প্রতিটি রোগীর জন্যে ৬০ টাকা পর্যন্ত খরচ করার সামর্থ্য রাখে। কৃষ্ণনগর হাসপাতালটি বরং অনেকটা সাধারণ মানের। এমনিতে ২৫ শয্যাবিশিষ্ট হলেও, এই মুহূর্তে এখানে ৪০০-রও বেশি রোগী আছে, যাদের অনেকেই দালানের পাশে তৈরি করা কমলা রঙের তাবুর নিচে আশ্রয় নিয়েছে তাদের পরিবারের সদস্যদের সাথে। বিছানার চাদরের সরবরাহ অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে, এবং বেশীরভাগ তোষকই দূষিত হয়ে গেছে শারীরিক বর্জ্যে। রোগীরা দাগে ভরা পাতলা জালিকাপড়ে ঢাকা ৬ ফুট দীর্ঘ এবং ৩ ফুট প্রস্থের টিনের ট্রে-র উপর শুয়ে থাকে। চারিদিকে শুধু মাছি, এবং শব্দ আর দুর্গন্ধ মাত্রাধিক। শুন্য-দৃষ্টি চিকিৎসক এবং সেবিকাদের কাজের ভার এতই বেশি যে তাদের একজন গত সপ্তাহে ক্লান্তিতে ভেঙে পড়ে এবং মারা যায়। এখন পর্যন্ত এতো অপরিচ্ছন্নতা সত্ত্বেও, হাসপাতালটি অত্যন্ত আশ্চর্যজনকভাবে কার্যকর রয়েছে, এবং মাত্র ৮ শতাংশের মতো রোগী মারা গেছে।

 

 

টাইফয়েডঃ পাকিস্তানের গৃহযুদ্ধের শরণার্থীরা ভারতীয় আশ্রয় শিবিরে এসেও অনেক বিপর্যয়ের সম্মুখীন। “আমরা এখন যে ভয় পাচ্ছি সেটি হচ্ছে টাইফয়েডের মহামারী”, বলেন কৃষ্ণনগর হাসপাতালের মিঃ গুপ্তা। “এখানে প্রায় পাঁচ লক্ষ মানুষ শিবিরগুলোতে এবং এখানে আসার রাস্তার পাশে বসবাস করছে। এদের অনেকেই দূষিত পানি পান করছে, এবং ওদের অনেকেই এখানে আসার অত্যন্ত কষ্টকর যাত্রার ধকলে দুর্বল। এটা টাইফয়েডের জন্য আদর্শ পরিবেশ”।

 

হয়তো ভারতের এই চলমান দুর্দশার কথা চিন্তা করেই, পাকিস্তানের সরকার শরণার্থীদের তাদের ঘরে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে তাদেরকে সাধারণ ক্ষমার প্রস্তাব এবং খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা সেবা এবং তাদের আগের বসতবাড়ি পর্যন্ত পরিবহনসহ পৌঁছে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে। গত সপ্তাহের এক আনুমানিক হিসাব অনুযায়ী, কয়েক হাজার বাঙালী ইতোমধ্যেই সীমান্ত পার হয়ে পাকিস্তানে ফিরে গেছে এই প্রস্তাব গ্রহন করার জন্য। কিন্তু এখন পর্যন্ত, ৫ লাখ গৃহহীন মানুষের বেশীরভাগ মনে করছে বলে মনে হয় যে, এতো সমস্যা থাকার পরেও, এই মুহূর্তে ভারত বসবাসের জন্য শ্রেয়তর স্থান।

 

 

 

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
৫১। বাঙ্গালি শরণার্থীঃ দুঃখের শেষ নেই টাইম ২১ জুন, ১৯৭১

 

Shihab Sharar Mukit

<১৪, ৫১, ১০৮-১১০>

 

টাইম ম্যাগাজিন। ২১ জুন, ১৯৭১

বাঙ্গালি শরণার্থীঃ দুঃখের শেষ নেই

 

একটি ঘুর্ণিঝড়ে প্রায় ৫ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। একটি গৃহযুদ্ধ কেড়ে নিয়েছে প্রায় আরও ২ লাখের বেশি। দেশ ছেড়ে যাওয়া মানুষের সংখ্যা ৫ হাজার ছাড়িয়েছে এবং আরও বাড়ছে। কলেরা ঠিক মত শুরু হবার আগেই কেড়ে নিয়েছে প্রায় ৫ হাজার জীবন। মোসাইকের দিনগুলিতে প্লেগের আক্রমণের মত কিছু না ঘটলে এই ঘটনা বাইবেলে উল্লেখিত কষ্টের কাহিনির সাথে অনেকটাই মিলে যায়। এটা একরকম নিশ্চিতভাবেই বলা যায় পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের বিপর্যয়ের তালিকা আস্তে আস্তে আরও বড় হবে। গত সপ্তাহে নতুন করে প্রতিদিন প্রায় ১ লাখের মত উদ্বাস্তু ভারতে প্রবেশ করছে এবং তাদের মুখে মুখে মুসলিম অধ্যুষিত পাকিস্তানে হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতি সাম্প্রদায়িক সহিংসতার খবর ছড়িয়ে পরছে। এছাড়াও ভারতের পাঁচটি প্রদেশের সীমান্তে ক্রমবর্ধমান শরণার্থীর চাপে শরণার্থী শিবিরগুলোতে দুর্গন্ধ এবং দুর্ভিক্ষ ও অন্যান্য মহামারীর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

 

শরণার্থীদের ভারতের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু হয় মার্চে যখন পশ্চিম পাকিস্তানিরা পূর্ব পাকিস্তানিদের স্বাধীনতার স্বপ্নকে ধ্বংস করে দেবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। যখনই পাকিস্তানি দুঃসাহসী পাঠান ও পাঞ্জাবি বাহিনীর সাথে বাঙ্গালি মুক্তিবাহিনীর যুদ্ধ শুরু হয় তখনই প্রায় ১৫ লাখ পূর্ব পাকিস্তানি- হিন্দু মুসলিম নির্বিশেষে দেশ ছেড়ে ভারতের পশ্চিম বঙ্গ, ত্রিপুরা, আসাম, মেঘালয় ও বিহার প্রদেশে আশ্রয় নেয়। পালিয়ে যাওয়া মানুষের বেশিই হিন্দু এবং তারা অত্যাচার, ধর্ষণ ও বেপরোয়া হত্যাকাণ্ডের কাহিনী বর্ননা করছে। নতুন শরণার্থীদের মতে পাকিস্তান সরকার সদ্য অবৈধ ঘোষিত হওয়া শেখ মুজিবুর রহমানের আওয়ামী লীগের সমর্থক হিসেবে পাকিস্তানের ১ কোটি হিন্দুদের (মোট জনসংখ্যা ৭.৮ কোটি) দোষারোপ করছে। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত পশ্চিম পাকিস্তানের রাজধানী করাচিতে গৃহবন্দি থাকা মুজিবকে সত্যিকার অর্থেই হিন্দুরা অন্ধসমর্থন দেয়। যা মুসলিমরাও দেয়, যার ফলেই গত ডিসেম্বরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ১৬৯ আসনের ১৬৭ টি তে জয়লাভ করেছিল। কিন্তু হিন্দুরা সংখ্যালঘু হওয়ায় আক্রমনের তুলনামূলক সহজতর লক্ষ্যে পরিণত হয়েছে।

 

আঘাতে আঘাতে জর্জরিত করে মেরে ফেলা হচ্ছে

 

একজন হিন্দু ঠিকাদার বর্ণনা করেছেন কিভাবে একটি চা বাগানে এসে জিজ্ঞেস করেছে নির্বাচনে কাদের ভোট দিয়েছিল। আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়েছে কথা স্বীকার করায় তারা প্রায় ২০০ জনকে গুলি করেছে। ভারতের আগরতলায় এক হাসপাতালের ডাক্তার খুব বাজে ভাবে দগ্ধ রোগীদের সংখ্যা প্রকাশ করেছেন। ডাক্তার জানান, শরণার্থীদের জোরপূর্বক একটি কুঁড়েঘরে ঢুকানো হয় এবং সেনাবাহিনী সেই কুঁড়েঘরে আগুন লাগিয়ে দেয়। এছাড়াও হাসপাতালটিতে ৩৭০ জন গুলিবিদ্ধ পুরুষ, নারী ও শিশুকে সেবা দিয়ছে যাদের মধ্যে ১৭ জন মারা গিয়েছেন।

পশ্চিম বঙ্গ-পূর্ব পাকিস্তান সীমান্তের পেট্রাপোলের শরণার্থীশিবিরে এক ষোড়শী বলছিল কিভাবে সে ও তার বাবা-মা ঘুমিয়ে ছিল, “তখনই আমরা বাইরে পায়ের শব্দ পেলাম। দরজা একরকম ভেঙে ফেলেই আমাদের ঘরের ভিতরে কয়েকজন ঢুকে পরে। তারা আমাদের গোলায় বেয়নেট তাক করে রাখে এবং আমার চোখের সামনেই আমার মা-বাবাকে রাইফেলের বাট দিয়ে পিটিয়ে নেরে ফেলে। আমাকে মেঝেতে ফেলে দেয় এবং তাদের মধ্যে তিনজন আমাকে ধর্ষণ করে।”

 

ত্রিপুরা ক্যাম্পে থাকা আরেক বালিকা বলছিল কিভাবে সে পালিয়ে আসার আগে ১৩ জন পশ্চিম পাকিস্তানি সৈন্য দ্বারা পাশবিক অত্যাচারের স্বীকার হয়েছিল। পলায়নকৃত পরিবারের মেয়েদের তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে এবং তাদের পরিবার মুক্তিপণ দিতে না পারলে সৈন্যদের কাছে পতিতা হিসেবে বিক্রি করে দেয়া হচ্ছে।

 

সীমান্ত ঘুরে যাওয়া এক কর্মকর্তার দেয়া তথ্য মতে পাকবাহিনী ও তাদের হিন্দুবিরোধী সমর্থকগোষ্ঠী পূর্বপাকিস্তান ছাড়ার আগে জনপ্রতি ১৪০ ডলার করে দাবি করছে। নিজের স্ত্রীর মুক্তিপণ হিসেবে দাবীকৃত অর্থের মাত্র ২৫ ডলার কম থাকায় একজন দাবি করেন ‘বাকি টাকা আমাকে মেরে উসুল করে নিন’। মারতে মারতে একটা চোখ উপড়ে ফেলার পরেই তারা সেই লোক ও তার স্ত্রীকে যেতে দেয়।

 

যারা পালিয়ে গিয়েছে তারা গয়ার ‘ডিজাস্টার অব ওয়ার’ এর উদাহরণ হতে পারে। যাদের ভাগ্য ভাল ছিল তারা আগেই পরিপূর্ণ তাবু গুলোতে আশ্রয় নিয়েছে যেগুলো আগে থেকেই কস্টিক সোডা ও মানুষের মলমূত্রের গন্ধ এবং গোড়ালি সমান গত বর্ষার ময়লা পানিতে ভর্তি। ভারী বৃষ্টির হাত থেকে রক্ষা পেতে বেশিরভাগই গাছ বা ঝোপের আড়ালে আশয় নেয়। অনেকে কোনমতে বন্ধ হয়ে যাওয়া স্কুলগুলোর বারান্দায় একটু জায়গা খুঁজে নেয়। অন্যরা যারা কলকাতার কাছাকাছি আছে তারা বড় ড্রেনের পাইপের ভিতরেই ঠাই নিয়েছে। তাদের চতুর্দিকেই এখন দুষিত পানি, রোগবালাই আর মৃত্যু।

 

প্রতীকী শবদাহ

 

দুষিত খাবার পানি, পরিচ্ছন্নতার অভাব ও লাখ লাখ শরণার্থীদের সবাইকে কর্তৃপক্ষ টীকা দিতে না পারায় কলেরা ছড়িয়ে পরছে, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে। কলেরা ভারত ও পাকিস্তানে খুবই পরিচিত একটি ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ যা মারাত্মক বমি ও ডায়রিয়া ঘটায় যার ফলে দেহে পানিশূন্যতা হয় ফলাফল প্রাণহানি। আক্রান্তদের ইনজেকশনের মাধ্যমে বা পানীয় হিসেবে প্রচুর পরিমানে লবণের দ্রবন, স্যালাইন ও গ্লুকোজ খাওয়ানো গেলে বাঁচানো সম্ভব। কিন্তু সেখানের মেডিকেল টিমের সামর্থ্যের তুলনায় শরণার্থীদের ঢল এত বেশি যে সবাইকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

 

শরণার্থীরা যেসব রাস্তা দিয়ে চলাচল করে সেগুলো শুধু ফেলে দেয়া কাপড় আর গৃহস্থালি পণ্যেই পূর্ণ না, এসবের সাথে যোগ হয়েছে কলেরায় মারা যাওয়া মানুষের লাশ যেগুলো তাদের পরিবার কলেরায় আক্রান্ত হবার ভয়ে সৎকার না করেই ফেলে গেছে। যদিও হিন্দুরা শবদাহ করে থাকে, কিন্তু বেশিরভাগ লাশের উপরেই মাত্র ২/৩ টা কাঠি জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছিল এবং বাকিটা রেখে দেয়া হয়েছে অপেক্ষায় থাকা শকুন কিংবা বন্য কুকুরে তুলে নিয়ে যাওয়ার জন্য। যদিও কোন লাশ দাফন করা হয়, সেই লাশ মাংসাশী প্রাণীরা তুলে বের করে আনে। শরণার্থীরা যাতে লাশ নদীতে না ফেলে সে ব্যাপারে স্থানীয় পুলিশ সতর্ক রয়েছে। জনাকীর্ণ হাসপাতালগুলোতে অসুস্থ ও মৃতপ্রায় রোগীদের একসাথে জড়ো করে রাখা হয়েছে এবং হাসপাতালের কাজের চাপে জর্জরিত স্টাফরা সময় বের করে মৃতদেহ সরিয়ে নেবার আগ পর্যন্ত মৃতদের জীবিতদের সাথে রাখা হয়।

পশ্চিমবঙ্গের একটি জনবহুল স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ৪৫ বছরের এক চাষি দেখছিলেন তার সদ্য জন্ম নেয়া বাচ্চা কিভাবে তার কলেরায় আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া মায়ের বুক থেকে দুধ খাবার চেষ্টা করছিল। “আমার বউ মরে গেছে” খুব ক্ষীণ স্বরে লোকটা বলছিল “আমার বাচ্চারা মরে গেছে। আর কি হতে পারে?” রোগবাহী শরণার্থীরা যেভাবে ভারতের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে যাচ্ছে তাতে করে কয়েক লাখ ভারতীয় এই মহামারী রোগে যেকোনো সময় আক্রান্ত হতে পারে। একারণে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ পূর্ব পাকিস্তানিদের কলকাতায় প্রবেশে বাঁধা দিচ্ছে যেখানে আগে থেকেই লাখ লাখ মানুষ নোংরা পরিবেশে বাস করে এবং মহামারী কলেরা সেখানে একটি বার্ষিক অনুষ্ঠানের মত।

 

অসম বিনিময়

 

যদিও ভারত সাময়িক সময়ের জন্য শরণার্থীদের রাখতে আপত্তি করেনি এবং তাদের সাধ্যমত সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে তাদের সাহায্য করার জন্য কিন্তু ইন্দিরা গান্ধীর সরকার এই দরিদ্র মানুষের এই ক্রমবর্ধমান ঢলকে শুধুই অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দুর্যোগ হিসেবেই দেখছে। শরণার্থী সমস্যাটা ভারতকে আগস্ট ১৯৪৭ এ উপমহাদেশ ভাগ হয়ে ভারত ও পাকিস্তান হবার পর থেকেই পীড়া দিয়ে যাচ্ছে।

 

উত্তর ভারতে বিনিময়টা প্রায় সামঞ্জস্যপূর্ণ, ৬০ লাখ মুসলিম পাকিস্তানে চলে যাচ্ছে এবং প্রায় ৬৫ লাখ হিন্দু শিখ ভারতে প্রবেশ করছে। দেশ ভাগের পর থেকে পূর্ব পাকিস্তানের প্রায় ৪৩ লাখ হিন্দু ভারতে পালিয়ে গেছে, বেশিরভাগই পশ্চিমবঙ্গে। মুসলিমদের সেরকম কোন যাত্রা লক্ষ্য করা যায়নি। এই অসামঞ্জস্যের ফলে সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমস্যাগুলোকে চাঙ্গা করে তোলে যার ফলে পশ্চিমবঙ্গ ও তার রাজধানী কলকাতা মানবিক বিপর্যয়ের এক আস্তানায় পরিণত হয়।

 

শরণার্থীদের খাবার ও আবাসের ব্যবস্থা করতে প্রতিদিন প্রায় ১.৩৩ মিলিয়ন ডলার ব্যয় হচ্ছে যা শ্রীমতী গান্ধীর সরকার বহন করতে পারবে না যদি এটি গত মার্চে ‘গরীবী হটাও’ প্রচারণায় করা প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে চেষ্টা করে। শরণার্থীদের রোজকার খাবারের চাহিদা বর্তমান খাদ্য মজুদে ঘাটতি সৃষ্টি করছে এবং স্বয়ং ভারতীয়দের এক দুর্ভিক্ষের হুমকির মুখে ফেলে দিচ্ছে। শরণার্থীরা ভারতীয়দের কাজও কেড়ে নিচ্ছে; স্থানীয় শ্রমিকদের যে মজুরীতে ভাড়া নেয়া হত তার এক চতুর্থাংশে বিনিময়ে শরণার্থী চাষিদের কাজে নেয়া হচ্ছে।

 

জায়গার অভাব

 

এসব সমস্যার মুখোমুখি হয়ে ভারত সরকার শরণার্থীদের ‘উদ্বাস্তু’ বা ‘পলায়নকারী’ হিসেবে আখ্যায়িত করছে এবং আশা করছে’নিজেরাই গরীব রাষ্ট্র হওয়ায়’ তারা একসময় তাদের নিজেদের দেশে ফিরে যাবে। পূর্ব ভারতের এক শরণার্থী শিবিরে শ্রীমতী গান্ধী বলেন, “আমরা চাইলেও আপনাদের সারাজীবন এখানে রাখতে পারব না।” পূর্ব পাকিস্তানের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও সম্ভাব্য গেরিলা যুদ্ধের মুখে তাদের নিজ দেশে ফিরে যাওয়া নিকট ভবিষ্যতে সম্ভব না। তাছাড়াও যুদ্ধ ও দেশ ত্যাগের কারণে পূর্ব পাকিস্তানে বর্ষা মৌসুমের আগে শস্য রোপণের হার খুবই কম। দুর্ভিক্ষ আঘাত হানার সম্ভাবনা প্রায় নিশ্চিত। এবং যখন এটা হবে তখন আরও লাখ লাখ মানুষ তাদের তল্পিতল্পা গুটিয়ে পাশের দেশে আশ্রয় খুঁজতে যাবে যেখানে আগে থেকেই থাকার জন্য জায়গার খুব অভাব।

 

 

 

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
৫২। নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও পাকিস্তানে মার্কিন অস্ত্র প্রেরণ নিউইয়র্ক টাইমস

জুন ২২, ১৯৭১

 

 

Ashik Uz Zaman

<১৪, ৫২, ১১১১১৩>

 

দি নিউইয়র্ক টাইমস, জুন ২২, ১৯৭১.

নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও পাকিস্তানে মার্কিন অস্ত্র প্রেরণ

ট্যাড সুলচ

নিউইয়র্ক টাইমসের বিশেষ প্রতিনিধি

 

ওয়াশিংটন, জুন ২১ – পাকিস্তানের পতাকাবাহী একটি মালবাহী জাহাজ মার্কিন সমরাস্ত্র নিয়ে আজ নিউইয়র্ক থেকে করাচির উদ্দেশ্যে যাত্রার প্রস্তুতি নিচ্ছিলো, আপাতদৃষ্টিতে এ ধরণের সরবরাহের উপর এই সরকারের আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত নিষেধাজ্ঞাকে উপেক্ষা করেই।

 

পররাষ্ট্র মন্ত্রলায়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা, অনুসন্ধানের প্রতিক্রিয়ায়, স্বীকার করেন যে অন্তত আরো একটি জাহাজ বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র থেকে পাকিস্তানের পথে রয়েছে যা তাদের বর্ণনা অনুযায়ী “বৈদেশিক সামরিক বিক্রয়”-এর পণ্য বহন করছে।

 

এই পণ্যগুলো, তারা জানান, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্বৃত্ত সরবরাহ থেকে এসেছে এবং পাকিস্তানে এধরণের সমরাস্ত্র প্রেরণে তিন মাস আগের আরোপিত নিষেধাজ্ঞা কিভাবে কার্যকর করা হবে তা নিয়ে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যকার বিভ্রান্তির ফলশ্রুতিতে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে।

 

“এখানে স্পষ্টতই অসাবধানবশতঃ কোনো ধরণের বিচ্যুতি ঘটেছে,” এক কর্মকর্তা বলেন।

অগাস্ট মাসে করাচিতে

 

পদ্মা, যে জাহাজটি নিউইয়র্ক থেকে যাত্রার প্রস্তুতি নিচ্ছিলো, সেটি আটটি যুদ্ধবিমান, প্যারাসুট এবং হাজার হাজার পাউন্ড ওজনের খুচরা যন্ত্রাংশ এবং যুদ্ধবিমান এবং সামরিক যানবাহনের আনুষঙ্গিক উপকরণ নিয়ে অগাস্ট মাসের মাঝামাঝি সময়ে করাচীতে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।

 

সুন্দরবন, পাকিস্তানে নিবন্ধিত আরেকটি জাহাজ, মে মাসের ৮ তারিখে নিউইয়র্ক থেকে যাত্রা শুরু করে পাকিস্তানের জন্য অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম নিয়ে, যার মধ্যে সৈন্যবাহী সাঁজোয়া যানের যন্ত্রাংশ রয়েছে, জাহাজের মালামালের তালিকা এবং সাথে পাঠানো পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেয়া রপ্তানি অনুমোদন অনুযায়ী। এই বুধবার জাহাজটির করাচী পৌঁছানোর কথা রয়েছে।

 

এই সমস্ত সরঞ্জাম বৈদেশিক সামরিক বিক্রয় আইনের ধারা মোতাবেক যুক্তরাষ্ট্রের বিমান বাহিনী পাকিস্তানের কাছে বিক্রি করেছে।

 

পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর, মূলত পশ্চিম পাকিস্তানী সৈন্যদেরকে গত ২৫শে মার্চ পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধিকার আন্দোলনকে দমন করার নির্দেশ দেয়ার পর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঘোষণা দেয় যে পাকিস্তানের কাছে সকল প্রকার সামরিক সরঞ্জাম বিক্রয় স্থগিত করা হলো এবং এই কার্যক্রম, যেটি ১৯৬৭ সালে শুরু করা হয় সেটি এখন “পুনঃবিবেচনা” করা হচ্ছে।

 

আজ, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা, পদ্মা এবং সুন্দরবনের যাত্রা প্রসঙ্গে জানতে চাওয়া হলে, বলেন যে এটি এখনো এই সরকারের আনুষ্ঠানিক নীতিতে রয়েছে যে পাকিস্তানের জন্য সবধরণের সামরিক সরঞ্জাম বিক্রয় নিষিদ্ধ।

 

এই কর্মকর্তারা ব্যাখ্যা করেন যে মার্চ মাসে পূর্ব পাকিস্তানে শুরু হওয়া স্বাধীনতা আন্দোলনের নিষ্ঠুর দমন শুরু হবার পরপরই এই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আনুমানিক হিসাব অনুযায়ী এর পরবর্তী সংঘর্ষে অন্ততঃ ২,০০,০০০ পূর্ব পাকিস্তানী নাগরিক নিহত হয়েছে এবং প্রায় ষাট লক্ষ শরণার্থী ভারতে পালিয়ে গিয়েছে।

 

আজকের সাক্ষাৎকারে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা বলেন যে ২৫শে মার্চের পর পাকিস্তানের জন্য কোনো সামরিক সরঞ্জাম পাঠানোর ব্যাপারে তারা অবগত নন।

 

তারা স্বীকার করেন যে এরকম কিছু পাঠানো হলে তা ঘোষিত নীতির পরিপন্থী হবে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলেন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় তাদের জানিয়েছে যে ২৫শে মার্চের পর বৈদেশিক বিক্রয় কার্যক্রমের আওতায় কোনো ধরণের সামরিক সরঞ্জাম “পাকিস্তানের সরকার বা পাকিস্তান সরকারের কোনো প্রতিনিধি”-এর কাছে হস্তান্তর করা হয়নি।

কোনো ব্যাখ্যা দেয়া হয়নি

 

তারা বলেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাথে আজকের আলোচনায় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এই নীতি মেনে চলার ব্যাপারে “পুনঃনিশ্চয়তা” দিয়েছে। তারা অবশ্য ব্যাখ্যা দিতে পারেননি কিভাবে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এই বিবৃতির সাথে প্রকৃত ঘটনাকে খাপ খাওয়ানো যায়, এখানকার পাকিস্তান দূতাবাসে পেশ করা বহন পত্র অনুযায়ী, সুন্দরবন জাহাজে যে সরঞ্জামগুলো তোলা হয় সেগুলো ২৩শে এপ্রিল এবং পদ্মা জাহাজে যে সরঞ্জামগুলো তোলা হয় সেগুলো ২১শে মে তে নিউইয়র্ক বন্দরে গ্রহন করা হয়।

 

রপ্তানিকারকেরা পাকিস্তান দূতাবাসের প্রতিরক্ষা ক্রয় বিভাগের লেফটেন্যান্ট কর্নেল এম. আম্রাম রাজাকে ২১শে মে একটি চিঠি পাঠান যার মধ্যে এই দুটি জাহাজের জন্য বন্দর রশিদ সংক্রান্ত বিষয় ছিল।

 

এই সরবরাহগুলো সম্বন্ধে গত শনিবার এবং আজকে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে জানতে চাওয়া হলে, তারা সবধরণের অনুসন্ধানের জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে যেতে বলে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে কর্মকর্তারা আনুষ্ঠানিক নিষেধাজ্ঞার আলোকে এই সরবরাহগুলো কিভাবে হচ্ছে তার ব্যাখ্যা দিতে অপারগ।

 

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে জানায় ২৫শে মার্চের পর পাকিস্তানের কাছে কোনো কিছু বিক্রয় বা সরবরাহের অনুমোদন দেয়া হয়নি এবং যে সরঞ্জামগুলো এই দুটি জাহাজে তোলা হয়েছে সেগুলো আনুষ্ঠানিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের আগে কেনা হয়েছে।

 

কিন্তু বন্দরে পাঠানো এবং প্রকৃত সরবরাহগুলি ২৫শে মার্চের পরে কেনো করা হলো এব্যাপারে তারা কোনো মন্তব্য করেননি।

 

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এখনো পর্যন্ত ১৭ই জুনে পাঠানো একটি চিঠির জবাব দেয়নি যেটি সিনেটর চার্চ, আইডাহো অঙ্গরাজ্যের ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব উইলিয়াম পি. রজারস কে লেখেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমতিক্রমে “বিশেষ কিছু সামরিক সরঞ্জাম” পাকিস্তানে প্রেরণের ব্যাপারে তথ্য জানানোর অনুরোধ জানিয়ে।

 

সিনেটর চার্চ, যিনি সিনেটের বৈদেশিক সম্পর্ক বিষয়ক কমিটির একজন সদস্য, মিঃ রজারসকে জানান যে তিনি উপলব্ধি করেছেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই সরঞ্জামগুলোর জন্য অনুমতিপত্র নম্বর. ১৯২৪২ প্রদান করেছে।

 

সুন্দরবন জাহাজে বহনকৃত মালামালের বহন পত্র নিরীক্ষণে জানা যায় এই অনুমতিপত্রের অন্তর্গত একটি সামগ্রীর বর্ণনা আছে এভাবে “২৩টি স্কিড, যন্ত্রাংশ”, ওজন ১১,৮৯৫ পাউন্ড। এই সামগ্রীগুলোর আর কোনো বর্ণনা ছিল না।

 

কিন্তু পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রদানকৃত আরেকটি অনুমতিপত্র অনুযায়ী সুন্দরবন জাহাজের মালামালের বর্ণনা আছে এভাবে “সামরিক যানবাহনের জন্য যন্ত্রাংশ এবং আনুষঙ্গিক সরঞ্জাম”। সুন্দরবন জাহাজে মোট ২১ ধরণের সামগ্রী বহন করা হচ্ছে, বন্দরে সরবরাহ করার তালিকা অনুযায়ী, যেগুলো কাগজপত্রে বর্ণনা দেয়া হয়েছে শুধুমাত্র শক্ত কাগজের বা কাঠের বাক্স ভর্তি “গাড়ির যন্ত্রাংশ এবং আনুষঙ্গিক সরঞ্জাম”, “স্কিড এবং যন্ত্রাংশ”, “বাক্স” এবং “যন্ত্রাংশ”।

তালিকায় রয়েছে বিমান এবং প্যারাসুট

 

পদ্মা জাহাজের জন্য বন্দরে সরবরাহ করার তালিকাতে দুইটি অংশে লেখা আছে “চারটি বিমান” প্রতিটিতে, ১১৩টি প্যারাসুট এবং যন্ত্রাংশ, এবং গাড়ির যন্ত্রাংশ, আনুষঙ্গিক সরঞ্জাম, স্কিড

এবং “কাঠের বাক্স”।

 

একটি সামগ্রীর বর্ণনা আছে এভাবে “বাক্স বাণ্ডিল এবং যন্ত্রাংশ” যার ওজন লেখা আছে ১৪.১৩৩ পাউন্ড।

 

পাকিস্তানে সামরিক সরঞ্জাম বিক্রির কার্যক্রম, যেটি শুরু হয়েছিল ১৯৬৭ সালে, চলছিলো প্রতি বছরে প্রায় ১ কোটি মার্কিন ডলার করে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র, রবার্ট জে. মেক্লস্কির ভাষ্যমতে। ঐ বছর যুক্তরাষ্ট্র ভারত এবং পাকিস্তান উভয় দেশের কাছেই “অ-প্রাণঘাতী” সরঞ্জাম বিক্রি করতে রাজি হয়, ১৯৬৫ সালের ইন্দো-পাকিস্তান যুদ্ধের পর সামরিক সরবরাহের উপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা কিছুটা শিথিল করার মাধ্যমে।

 

১৯৭০ সালের অক্টোবর মাসে, ব্যতিক্রম হিসেবে, এই সরকার রাজি হয় পাকিস্তানের কাছে অনুল্লেখিত সংখ্যক এফ-১০৪ জঙ্গিবিমান, বি-৫৭ বোমারু বিমান, এবং সৈন্যবাহী সাঁজোয়া যান বিক্রি করতে। তবে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আজ নিশ্চিত করেছে যে এই “ব্যতিক্রমী” সরঞ্জামগুলোর কোনোটিই সরবরাহ করা হয়নি।

 

কিন্তু এখানকার নির্ভরযোগ্য সূত্র মতে, যারা পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক, ১৯৬৭ সাল এবং ৩০শে এপ্রিল, ১৯৭০ সালের মধ্যে শুধুমাত্র বিমান বাহিনীর কাছ থেকে পাকিস্তানে সামরিক সরঞ্জামের প্রবাহ ৪,৭৯,৪৪,৭৮১ মার্কিন ডলার হয়েছে।

 

ডেনভারে অবস্থিত বিমান বাহিনীর রাজস্ব ও হিসাবরক্ষণ সদরদপ্তর থেকে ওয়াশিংটনে অবস্থিত পাকিস্তান দূতাবাসের প্রতিরক্ষা ক্রয় বিভাগের কাছে ২৮শে মে একটি চিঠি পাঠানো হয় যাতে রয়েছে “একটি প্রতিবেদন … যেখানে রয়েছে চলতি সকল বৈদেশিক সামরিক বিক্রয়ের তালিকা, প্রতিটির মূল্য, সংগৃহীত অর্থ, সরবরাহকৃত এবং যা কিছু সরবরাহ করা বাকি রয়েছে”।

এই চিঠিটি – ইলেইন বি. লোভেনথাল কর্তৃক স্বাক্ষরিত, ডেনভারে অবস্থিত সদরদপ্তরের বৈদেশিক সামরিক বিক্রয় শাখার প্রধান হিসাবাধ্যক্ষ – যিনি “যুক্তরাষ্ট্রের বিমান বাহিনীর সামরিক বিক্রয়ের লেনদেন এবং সরবরাহের বিস্তারিত তালিকা তৈরি”-এর প্রধান ছিলেন।

 

এই “প্রতিবেদন”-এ উল্লেখ আছে যে পাকিস্তানের সামরিক ক্রয়ের পূর্বের হিসাব ২,৫৬,৭৯,৬৫৪.১০ মার্কিন ডলার, সরবরাহ করা হয়নি এমন সামগ্রীর মোট মূল্য ২,১৭,৩০,৭৪০.০৭ মার্কিন ডলার এবং “এখন পর্যন্ত গৃহীত নগদ অর্থ”-এর পরিমাণ ২,৪৩,৪২,৭৮২.৩৭ মার্কিন ডলার।

 

এই প্রতিবেদনটি ঠিক কোন সময়সীমার হিসাবকে অন্তর্ভুক্ত করেছে তা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা সঠিকভাবে বলতে পারেননি।

 

তবে বিমান বাহিনীর প্রতিবেদনটিতে আরো বলা আছে, যে পাকিস্তান সরকারকে ১৯৭১ সালের ৩১শে মে বা তার আগেই মোট ৩৩,৭৬,২৫৩.৫১ মার্কিন ডলার পাঠাতে হবে আরো “মোট নগদ অর্থের প্রয়োজন” মেটাতে।

 

এই রিপোর্টের একটি টীকায় দেখানো আছে যে পাকিস্তানের কাছ থেকে “১৯৭১ সালের মে মাসে” ৫৪,০৪,১১৬.৪৯ মার্কিন ডলারের একটি চেক পাওয়া গেছে।

 

এখানকার নির্ভরযোগ্য সূত্র আরো জানিয়েছে যে “সমূহ সম্ভাবনা” আছে সেনাবাহিনী এবং নৌবাহিনীও পাকিস্তানের কাছে আরো সমরাস্ত্র বিক্রি করেছে।

 

ইস্ট ওয়েস্ট শিপিং এজেন্সীর মুখপাত্র, যারা কিনা পদ্মা এবং সুন্দরবন জাহাজ দুটির নিউইয়র্কের প্রতিনিধি, ইংগিত দেন যে পদ্মা জাহাজটি তার সাম্প্রতিক আরো কিছু যাত্রায় পাকিস্তানের জন্যে সামরিক সরঞ্জাম বহন করেছে, সর্বশেষ যেটি মার্চের ২২ তারিখে করাচীতে পৌঁছে দিয়েছে। পূর্ব পাকিস্তানে সৈনিকদের অভিযান চালানোর তিনদিন আগে।

 

পদ্মা জাহাজটি যে যাত্রার জন্য এখন প্রস্তুতি নিচ্ছে সেটি ২৫শে মার্চের পরে নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর সামরিক সরঞ্জাম বহন করে করাচীতে নিয়ে যাওয়ার প্রথম সমুদ্রযাত্রা। সুন্দরবন জাহাজটির বর্তমান সমুদ্রযাত্রাটিও নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর প্রথম যাত্রা। কিন্তু নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে যে পাকিস্তানের জন্য সামরিক সরঞ্জামাদি নিয়ে অন্য আরো জাহাজ ২৫শে মার্চের পরেও পূর্ব এবং পশ্চিম উপকূলের বন্দরগুলো থেকে যাত্রা করে থাকতে পারে।

 

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
৫৩। অস্ত্র যখন ধর্মতাত্ত্বিক সমস্যা নিউইয়র্ক টাইমস ২৭শে জুন, ১৯৭১

 

Ashik Uz Zaman

<১৪, ৫৩, ১১৫-১১৬>

 

দি নিউইয়র্ক টাইমস, রবিবার, ২৭শে জুন, ১৯৭১

যুক্তরাষ্ট্র এবং পাকিস্তান

অস্ত্র যখন ধর্মতাত্ত্বিক সমস্যা

 

ওয়াশিংটন – নিক্সন প্রশাসন গতসপ্তাহের পত্রিকা পড়ে জানতে পেরেছে যে তারা মার্কিন সামরিক সরঞ্জাম পাকিস্তানে পাঠানোর উপর নিজেরাই যে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল তা উপেক্ষা করছে দেশটির পূর্ব অংশে গৃহযুদ্ধ শুরু হবার পর থেকেই।

 

দেরিতে জানতে পারা যে ২৫শে মার্চে এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবার পরেও সামরিক সরঞ্জাম বোঝাই অন্তত তিনটি মালবাহী জাহাজ নিউইয়র্ক বন্দর থেকে করাচীর পথে ছেড়ে গেছে, এবং ঐ দিনের পর আরো নতুন রপ্তানি আদেশ যে বেআইনি ভাবে দেয়া হচ্ছে, এতে প্রশাসন প্রকাশ্যে বিব্রতকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হচ্ছে। এর সাথে আছে সংসদীয় অসন্তোষ এবং ভারতের সাথে রাজনৈতিক টানাপোড়েন।

 

এই ঘটনাটি পূর্ব পাকিস্তানের কার্যত বিস্ফোরক পরিস্থিতির প্রতি ওয়াশিংটনের দ্যর্থক মনোভাবকে আরো স্পষ্ট করে দেখিয়ে দিতে কাজ করেছে, যেখানে বাঙালী স্বাধীনতা আন্দোলনের উপর পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর চালানো দমন-পীড়নে এখন পর্যন্ত প্রায় ২,০০,০০০ বাঙালী নিহত হয়েছে বলে জানা গেছে এবং ষাট লক্ষ শরণার্থীকে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে যেতে বাধ্য করেছে।

কয়েকজন পর্যবেক্ষক বিশ্বাস করেন যে প্রশাসনের তরফ থেকে ইচ্ছাকৃত ছলচাতুরী ছিল। মোটামুটি সবাই এটা মেনে নিয়েছিল যে যারা প্রশাসনের উপরের দিকে নীতিনির্ধারণ করেন এবং যারা কার্যত সেই নীতির প্রতিফলন ঘটান তাদের মধ্যকার আভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যাহত হওয়ায় অস্ত্রের এই চালানগুলো সঙ্ঘটিত হয়েছে, যেটাকে একজন উদ্বেজিত আমলা গত সপ্তাহে বর্ণনা করেন, “হস্তীসম বৃহৎ প্রশাসনের মূল্য” হিসেবে।

 

অস্ত্রের এই চালানগুলোকে ঘিরে এই আমলাতান্ত্রিক বিভ্রান্তি সবদিক থেকেই পর্বতপ্রমাণ। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেই বেশ কয়েকজন সিনেটরকে আশ্বস্ত করেছিল (লিখিতভাবে) যে পাকিস্তানের জন্য কোনো অস্ত্রের চালান পাঠানোর কথা নেই, হতবাক হয়ে যায় যখন তারা দুটো (আরো পরে তৃতীয়) মালবাহী জাহাজ ছেড়ে যাওয়ার কথা জানতে পারে এবং ছুটে যায় প্রতিরক্ষা মন্ত্রনালয়ের কাছে এর ব্যাখ্যা চাইতে।

 

পেন্টাগন তাদের কম্পিউটার ঘাঁটে এবং তথ্য পরিবেশন করে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে চমকে দিয়ে, যে ২৫শে মার্চে অস্ত্রের চালানের উপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা মাত্র ৬ই এপ্রিলে এসে কার্যকর হয়েছে। এরপর, প্রশাসন থেকে ব্যাখ্যা দেয়া হয় যে ২৫শে মার্চের আগে পাকিস্তানী সরকারী কর্মকর্তাদের হাতে যেসব সামরিক সরঞ্জাম হস্তান্তর করা হয়েছে সেগুলো পাঠিয়ে দেয়া যেতেই পারে। কেন পাঠিয়ে দেয়া যায় সেটা আর বলা হয়নি।

 

প্রকৃত সত্য নিরূপণ করতে দ্রুত একটি উচ্চ-পদস্থ বিশেষ টাস্ক ফোর্স গঠন করা হয়, কিন্তু পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানার আগেই চার দিন অতিবাহিত হয়ে যায় যে পাড়িল্লা, পাকিস্তানের মালবাহী জাহাজ যেটি গত সপ্তাহান্তে নিউইয়র্ক বন্দরে মালামাল তুলছিলো, সেটি বন্দর ছেড়ে গেছে (১) ১ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলার সমমূল্যের গোলাবারুদ, (২) সামরিক বিমান, সাঁজোয়া যান এবং জীপগাড়ির খুচরা যন্ত্রাংশ এবং (৩) বিমানবিধ্বংসী গোলন্দাজদের প্রশিক্ষণের জন্য বেতার-নিয়ন্ত্রিত চালক বিহীন ছোট বিমান নিয়ে।

 

তিন দিন ধরে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এবং সাংবাদিকরা গোলাবারুদগুলো “প্রাণঘাতী” নয় সরকারের এরূপ দাবির বিষয়ে বিতর্কে লিপ্ত হন। এর সুত্রপাত হয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পূর্ববর্তী এক স্বীকারোক্তি থেকে যে পাকিস্তানের কাছে যে সামরিক সরঞ্জাম বিক্রয় করা হয়, যা কিনা “অ-প্রাণঘাতী” দ্রব্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ, তার মধ্যে গোলাবারুদও আছে।

 

তৃতীয় দিনের মাথায়, এক সাংবাদিক প্রশ্ন করেনঃ “কখন গোলাবারুদ প্রাণঘাতী হয়?”। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র উত্তর দেনঃ “এটি একটি ধর্মতাত্ত্বিক প্রশ্ন”।

 

অস্পষ্ট থেকে যায় পূর্ব পাকিস্তানের সংকটের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের নীতির মূলকথা এই স্বীকৃত পটভূমির বিপরীতে যে এখানে অত্যন্ত বাস্তব আশঙ্কা রয়েছে ভারত এবং পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়ে যাবার যদি না পূর্ববাসীদের স্বায়ত্তশাসনের আকাঙ্ক্ষার জন্য দ্রুত একটি রাজনৈতিক সমাধান পাওয়া যায়।

 

এই আশঙ্কা উদ্ভূত হচ্ছে ভারতের সম্পদের উপর শরণার্থীদের সংখ্যা যে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করেছে, ভারতের স্থানীয় অধিবাসী এবং শরণার্থীদের মধ্যেকার ক্রমবর্ধমান বিরোধ এবং পূর্ব পাকিস্তানের “মুক্তিযোদ্ধা”-দের রাজনৈতিক মৌলিকিকরণ বিষয়ক ভারতের ভয় থেকে। এই সবগুলো উপাদানকেই নয়াদিল্লী দেখছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের রাজনৈতিক স্থিরতা এবং এই উপমহাদেশের শান্তির প্রতি সরাসরি হুমকি স্বরূপ।

 

ভারতীয় নীতি, যুক্তরাজ্য এবং কানাডার শক্ত সমর্থনসহ, হচ্ছে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের উপর যথেষ্ট পরিমানে আন্তর্জাতিক চাপ প্রয়োগের ব্যবস্থা করা যাতে সে পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের দাবী মেনে নিতে বাধ্য হয়। ভারতের যুক্তি হচ্ছে শরণার্থীদের পূর্ব পাকিস্তানে ফিরে যাওয়ার পরিবেশ সৃষ্টি করার জন্য এটা করা জরুরী। চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে পাকিস্তানকে সব ধরণের বৈদেশিক সাহায্য থেকে বঞ্চিত করার দাবী তাদের।

 

এই বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মনোভাব অস্পষ্ট। প্রশাসনের সহজাত প্রবৃত্তি, বিশেষ করে পেন্টাগনের, হচ্ছে ভারত এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যকার সুসম্পর্কের ক্ষতিপূরণ হিসেবে যে কোন মূল্যে পাকিস্তানের সাথে গ্রহণযোগ্য মাত্রায় ভালো সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। এই মনোভাব এখনো বজায় আছে যদিও গত কয়েক বছরে পাকিস্তান আরো কাছ ঘেঁষা হয়েছে সমাজতন্ত্রী চীনের।

 

যদিও এই মাসের শুরুতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পাকিস্তানকে প্রকাশ্যে পূর্ববাসীদের সাথে “রাজনৈতিক আপোসরফা” করার উপায় খুঁজতে বলেছে – দুই মাস ধরে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ চলার পর এই প্রথমবার এটা করলেও – তারা অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের যুক্তি প্রত্যাখ্যান করেছে।

 

তবে, গত সপ্তাহে বিশ্ব ব্যাংকের একটি বিশেষ প্রতিনিধিদল পরামর্শ দেয়, পাকিস্তানের পরিস্থিতি পর্যালোচনার পর, যে ১১০টি নতুন তহবিল পাকিস্তানের জন্য আন্তর্জাতিক সাহায্য সঙ্ঘের মাধ্যমে দেয়া হবে যতক্ষণ না ইসলামাবাদ সরকার পূর্ব পাকিস্তানের সাথে “রাজনৈতিক আপোসরফা” করে।

 

–      ট্যাড সুলচ

 

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
৫৪। পাকিস্তানী সৈন্যদের গ্রাম আক্রমণ শিকাগো সান টাইমস ২৮ জুন ১৯৭১

 

Razibul Bari Palash

<১৪, ৫৪, ১১৭-১১৮>

 

শিকাগো সান টাইমস

সোমবার. জুন ২৮, ১৯৭১

পাকিস্তানী সৈন্যদের গ্রাম আক্রমণ – প্রচুর লোক নিহত

 

বলিয়াদি , পূর্ব পাকিস্তান (এপি) – পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একটি দল রবিবার সন্ধ্যার আগে জলমগ্ন গ্রামের হিন্দু এলাকার বাসিন্দাদের হত্যা করে, ঘরবাড়ি লুণ্ঠন করে এবং বাজার জ্বালিয়ে দেয়।

 

২০ মিনিট পরে ২৪ জন পশ্চিম পাকিস্তানী সৈন্য ও ডজন খানেক সম্মুখ সেনা চলে যায়। তাদের সদর দপ্তর আমাদের পশ্চিমে । তাদের কমান্ডার যিনি নিজে তার নাম বলেন মেজর ওমর তিনি সাংবাদিকদের জানান এটি ছিল আমাদের ‘’রুটিন টহল।’’

 

আরেকজন মেজর যিনি নাম বলতে চাননি – তিনি একটি নীল টুপিবিশেষ পড়া ছিলেন এবং নগ্নপদে ছিলেন। তার লোকদের কাছে স্বয়ংক্রিয় রাইফেল ও ছাতা ছিল বৃষ্টি থেকে রক্ষার জন্য।

 

একটি পরিদর্শনে দেখা যায় তারা তিনটি লাশ ফেলে যায় এবং গ্রামের কিছু বাড়ি এখনো জ্বলছিল।

 

কিছু বয়সী নারী ও শিশু মৃত্যু শোকে বলছিল “তারা সবকিছু নিয়ে গেছে”।

 

একজন মুসলিম বাসিন্দা জানান এখানে প্রায় ১০০ পরিবার ছিল যারা পাটক্ষেত দিয়ে পালিয়ে চলে গেছে।

 

একজন সাদা দাড়ি ওয়ালা মানুষের লাশ একটি পাতির উপর শোয়ানো আছে এবং সেটা দোচালা ঘরের নিচে রাখা ছিল। তার পিঠে গুলি লেগেছিল।

 

গ্রামবাসীরা জানান, ৫ ঘণ্টার যুদ্ধের এই ৩ লাশের পাশাপাশি আরও ৫/৬ জন মারা গেছেন।

 

আক্রমণ হচ্ছিল ঢাকার উত্তরে প্রায় ১ ঘণ্টার রাস্তা পেরিয়ে যেখানে চার ব্রিটিশ সাংসদদের পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতি তদন্ত করতে এসেছিলেন – তারা শেষ দিনে ঘুমিয়ে কাটিয়েছেন। এছাড়া একই সময়ে আরও জাহাজ এসেছে, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে গোলাবারুদ এবং স্পেয়ার্স বহন করে। এটি পশ্চিম পাকিস্তানের করাচির দিকে যাচ্ছিল।

 

ঘেরাও করা শহরটি বিচারপতি বি কে সিদ্দিকীর বাড়ি, যিনি বাংলার প্রধান বিচারপতি যিনি মার্চ এর শুরু থেকে আইনি কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন এবং তিনি প্রদেশের নতুন সামরিক গভর্নর হিসেবে লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা খানকে শপথ করানো থেকে বিরত থাকেন।

 

মুসলমান গ্রামবাসী ও অনেক ছাত্র যারা ২৫ মার্চ থেকে ঢাকা থেকে পালিয়ে গেছে তারা জানায় শুক্রবার থেকে আর্মি পেট্রোল ঢাকার আশেপাশে ৬ কিলোমিটারের মধ্যে প্রচুর পরিমাণে টহল দিচ্ছে – অনেক সময় তারা নৌকায় করে আসছে।

 

ওইসব গ্রামের দিকে তাকালে সকাল থেকে গুলির শব্দ ও ধোঁয়া দেখা যাচ্ছে।

 

 

গ্রামবাসীরা বিশ্বাস করে টাঙ্গাইলের ২৪ মাইল উত্তরএ ব্রহ্মপুত্র নদের উপর বিচ্ছিন্নতাবাদীদের কার্যকলাপ এর রিপোর্ট পেয়ে পাকসেনারা এগুলো শুরু করেছে।

 

 

 

 

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
৫৫। টিক্কা খানের পৈশাচিক রক্তস্নান নিউজউইক ২৮শে জুন, ১৯৭১

 

 

Ashik Uz Zaman

<১৪, ৫৫, ১১৯-১২১>

 

নিউজউইক, ২৮শে জুন, ১৯৭১

টিক্কা খানের পৈশাচিক রক্তস্নান

 

গত মার্চ মাসে পাকিস্তানে গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই, প্রেসিডেন্ট মোহাম্মাদ ইয়াহিয়া খান আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন বাঙালির স্বাধীনতার যুদ্ধকে দমাতে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী যে নৃশংস আচরণ করছে তার খবর যেন বহির্বিশ্বের কাছে কিছুতেই পৌঁছতে না পারে। বেশীরভাগ বিদেশী সাংবাদিকদের পূর্ব পাকিস্তানে যেতে দেয়া হয়নি, এবং কেবলমাত্র যেসব পশ্চিম পাকিস্তানী সাংবাদিকদের কাছ থেকে “অনুকূল প্রতিবেদন” পাওয়ার আশা আছে শুধুমাত্র তাদেরকে আমন্ত্রন জানানো হয় পূর্ব পাকিস্তানে যেতে এবং তাদের দেশবাসীকে এই বিদ্রোহ সম্বন্ধে জানাতে। অন্তত একটি ক্ষেত্রে, অবশ্য, এই নীতি বিপর্যয় ঘটায়। অ্যান্থনি ম্যাস্কারেনাস, করাচীর একজন সাংবাদিক যিনি লন্ডনের সানডে টাইমসের জন্যও লেখেন, ঘটনাবলী প্রত্যক্ষ করে এতটাই আতঙ্কিত হয়ে পরেন যে তিনি এবং তার পরিবার পালিয়ে লন্ডন চলে আসেন পুরো প্রতিবেদন প্রকাশ করার জন্য। গত সপ্তাহে, টাইম্‌স পত্রিকায়, ম্যাস্কারেনাস লেখেন যে ঢাকার পাকিস্তানী সামরিক এবং বেসামরিক কতৃপক্ষ তাকে বারবার বলেছে যে সরকার চায় “পূর্ব পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিনতাবাদের সমস্ত হুমকি চিরতরে নিশ্চিহ্ন করতে, এর জন্য যদি ২০ লক্ষ মানুষকে হত্যা করতে হয় তবুও”। এবং ম্যাস্কারেনাস উপসংহার টানেন যে রাষ্ট্রীয় সেনাবাহিনী “ঠিক তাই করছে পৈশাচিক পুঙ্খানুপুঙ্খতার সাথে”।

 

পাকিস্তানী সেনাবাহিনী যে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের রক্তে স্নান করছে তা দৃঢ়তার সাথে ঘোষণা করেছেন সাংবাদিক এবং অন্যান্য যারা ৬০ লক্ষ আতঙ্কিত শরণার্থীর যুদ্ধ চাক্ষুষ করেছেন প্রতিবেশী ভারতে। নিউজউইকের টনি ক্লিফটন সম্প্রতি ভারতের শরণার্থী-ভারাক্রান্ত সীমান্ত এলাকা পরিদর্শন করেন এবং নিম্নোক্ত প্রতিবেদনটি তারবার্তার মাধ্যমে পাঠানঃ

 

যে কেউ পাকিস্তানের সাথে ভারতের সীমান্তবর্তী শরণার্থী শিবির এবং হাসপাতালগুলো পরিদর্শন করলে বিশ্বাস করতে শুরু করবে যে পাঞ্জাবী সেনাবাহিনী যেকোন ধরণের নিষ্ঠুরতায় সক্ষম, আমি শিশুদের দেখেছি যাদেরকে গুলি করা হয়েছে, আমি পুরুষদের দেখেছি চাবকিয়ে যাদের পিঠের চামড়া তুলে ফেলা হয়েছে। আমি দেখেছি মানুষদের যারা আক্ষরিক অর্থে আতঙ্কে বাকশক্তি হারিয়েছে চোখের সামনে নিজের সন্তানকে খুন হতে দেখে অথবা নিজের কন্যাকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যেতে দেখে যৌন দাসী হিসেবে। আমার কোনই সন্দেহ নেই যে পূর্ব পাকিস্তানে শত শত “মেই লাই” এবং “লিডিস”-এর মতো ঘটনা ঘটেছে এবং আমি মনে করি, আরো ঘটবে।

 

অন্য কিছুর চেয়েও আমার ব্যক্তিগত অনুভুতি হচ্ছে বিস্ময়ের। আমি এতবেশি লাশ দেখেছি যে আর কোন কিছুই আমাকে এরচেয়ে বেশি আতঙ্কিত করতে পারবে না। কিন্তু বারবার আমি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ভাবি, নিজেকে জিজ্ঞেস করি কিভাবে কোনো মানুষ নিজেকে দিয়ে এরকম উন্মত্ত খুনোখুনি করতে পারে।

 

গণহত্যা

 

লাল এবং সবুজ ফুলের ছাপা গোলাপি রঙের ছেঁড়া জামা পড়া একটি লাজুক ছোট্ট মেয়ের কাহিনীটি এক বিশেষ আতঙ্কের। তার দ্বারা কারো কোন বিপদ হওয়ার কথা নয়। তবুও আমার, তার সাথে দেখা হয় কৃষ্ণনগরের এক হাসপাতালে, অন্যান্য রোগীদের পিছনে দাঁড়িয়ে আছে ঘাবড়ানো চেহারা নিয়ে, তার হাত দিয়ে ঘাড়ের দগদগে ক্ষত ঢেকে যেখানে একজন পাকিস্তানে সৈন্য বেয়োনেট দিয়ে তার গলা কেটে দিয়েছে। “আমি ইসমত আরা, মরহুম ইসহাক আলির মেয়ে” আমাকে তার আনুষ্ঠানিক পরিচয় জানায় সে। “আমার বাবা কুষ্টিয়ার একজন ব্যবসায়ী ছিলেন। আনুমানিক দুই মাস আগে তিনি আমাদের বাড়ি থেকে বের হন এবং উনার দোকানে যান এবং এরপর উনাকে আমি আর দেখিনি। ঐ একই রাতে, আমি বিছানায় যাবার পর, আমি ধমক এবং চিৎকার শুনতে পাই, এবং আমি যখন দেখতে যাই যে কি হচ্ছে, ঐখানে পাঞ্জাবী সেনারা ছিলো”।

 

“আমার চার বোন মরে পড়েছিল মেঝেতে, এবং আমি দেখি যে ওরা আমার মাকে মেরে ফেলেছে। আমি যখন ওখানে যাই ওরা আমার ভাইকে গুলি করে – সে বিজ্ঞানে স্নাতক ছিল। তখন এক সৈন্য আমাকে দেখে ফেলে এবং আমাকে ছুরি দিয়ে আঘাত করে। আমি মেঝেতে পড়ে যাই এবং মৃতের ভান করে থাকি। সৈন্যরা যখন চলে যায় আমি পালিয়ে আসি, এবং একজন আমাকে তার সাইকেলে তুলে নেয় এবং আমাকে এখানে নিয়ে আসা হয়”।

 

হঠাৎ করে, যেন সে আর তার অগ্নিপরীক্ষার অভিজ্ঞতার কথা আর ভাবতে পারছিল না, মেয়েটি ঘর ছেড়ে বের হয়ে যায়। হাসপাতালের চিকিৎসক আমাকে ব্যাখ্যা দিচ্ছিলেন যে যখন মেয়েটিকে হাসপাতালে আনা হয় তখন সে নিজের রক্তেই গোসল হয়ে ছিল, যখন সে অন্য রোগীদের ভিড় ঠেলে এগিয়ে আসে এবং সরাসরি আমার সামনে এসে দাড়ায়। “আমি এখন কি করবো?” সে জানতে চায়। “একসময় আমার পাঁচ বোন এবং এক ভাই এবং বাবা এবং মা ছিল। এখন আমার কেউ নেই। আমি এতিম। আমি কোথায় যেতে পারি? আমার কি হবে এখন?”।

ঘটনার শিকার

 

“তোমার কিছু হবে না” আমি বলি, বোকার মতো। “এখানে তুমি নিরাপদ”। কিন্তু ওর এবং ওর মতো হাজার হাজার বালক এবং বালিকা এবং পুরুষ এবং নারীর ভাগ্যে কি আছে যারা তাদের প্রজ্জলিত গ্রাম থেকে পালিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছে যে আগুনের শিখায় প্রতি রাতে পূর্ব পাকিস্তানের আকাশ আমি আলোকিত হয়ে উঠতে দেখি? ত্রিপুরার রাজধানী, আগরতলার হাসপাতাল, সীমান্ত থেকে মাত্র আধা মাইল দূরে, এবং সেটি ইতোমধ্যেই উপচে পড়ছে হানাদার পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর শিকার দিয়ে। এখানে ৪ বছর বয়সী এক বালক আছে যে পেটের ভেতর বুলেট নিয়েও বেঁচে গেছে এবং এক নারী আছেন যিনি আনমনে বর্ণনা করেন কিভাবে সৈন্যরা তার চোখের সামনে তার দুই বাচ্চাকে হত্যা করে, এবং এরপর তাকে গুলি করে যখন সে তার সবচেয়ে ছোট শিশুটিকে কোলে নিয়ে ছিলো। “গুলিগুলো বাচ্চার পেছন দিয়ে ঢোকে এবং এরপর তাঁর বাম বাহু ভেদ করে যায়”, ডাঃ আর. দত্ত, হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক, ব্যাখ্যা করেন “কিন্তু পরে তাঁর জ্ঞ্যান ফিরে আসে এবং তিনি