বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধঃ দলিলপত্র – ১৫ তম খণ্ড (অনুবাদসহ) – পর্ব – ১

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধঃ দলিলপত্র – ১৫ তম খণ্ড (অনুবাদসহ) – পর্ব – ১

<h1>বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধঃ দলিলপত্র থেকে বলছি</h1><h1>বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধঃ দলিলপত্র থেকে বলছি</h1><strong>(১৫ তম খণ্ড)</strong>
<strong>সাক্ষাৎকার</strong>
<strong> </strong>
<strong><u> </u></strong>
<strong><u> </u></strong>
<strong><u> </u></strong>
<strong><u> </u></strong>
<strong><u> </u></strong>
<strong><u> </u></strong>
<strong><u> </u></strong>
<strong><u> </u></strong>
<strong><u> </u></strong>
<strong><u> </u></strong>
<strong><u> </u></strong>
<strong><u> </u></strong>
<strong><u> </u></strong>
<strong><u> </u></strong>
<strong><u> </u></strong>
<strong><u> </u></strong>
<strong> </strong><h1><u>অ্যাটেনশন! </u></h1><strong><u>পরবর্তী পেজগুলোতে যাওয়ার আগে কিছু কথা জেনে রাখুনঃ</u></strong><ul>  <li>ডকুমেন্টটি যতদূর সম্ভব ইন্টার‌্যাক্টিভ করা চেষ্টা করা হয়েছে। অর্থাৎ এই ডকুমেন্টের ভেতরেই অসংখ্য ইন্টারনাল লিংক দেয়া হয়েছে। আপনি সেখানে ক্লিক করে করে উইকিপিডিয়ার মতো এই ডকুমেন্টের বিভিন্ন স্থানে সহজেই পরিভ্রমণ করতে পারবেন। যেমন প্রতি পৃষ্ঠার নিচে নীল বর্ণে ‘<strong>সূচিপত্র</strong>’ লেখা শব্দটিতে <strong>কি-বোর্ডের </strong><strong>Ctrl চেপে ধরে</strong> ক্লিক করলে আপনি সরাসরি এই ডকুমেন্টের সূচিপত্রে চলে যেতে পারবেন।</li></ul>তারপর ‘<strong>দলিল প্রসঙ্গ</strong>’ শিরোনামে কিছু লেখা আছে। এটি যুদ্ধদলিলের ১৫ তম খণ্ড থেকে সরাসরি লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। এখানে আপনারা জানতে পারবেন যে এই ডকুমেন্টে আসলে কী কী আছে।
তারপর ‘<strong>সূচিপত্র</strong>’। এখান থেকেই মূল দলিল শুরু। সূচিপত্রটি সরাসরি দলিলপত্র থেকে নেয়া হয়েছে। সূচিপত্রে লেখা পেজ নাম্বারগুলো যুদ্ধদলিলের মূল সংকলনটির পেজ নাম্বারগুলোকে রিপ্রেজেন্ট করে।
যুদ্ধদলিলে মোট ১৫ টি খণ্ড আছেঃ
প্রথম খন্ড : পটভূমি (১৯০৫-১৯৫৮)দ্বিতীয় খন্ড : পটভূমি (১৯৫৮-১৯৭১)তৃতীয় খন্ড : মুজিবনগর : প্রশাসনচতুর্থ খন্ড : মুজিবনগর : প্রবাসী বাঙালীদের তৎপরতাপঞ্চম খন্ড : মুজিবনগর : বেতারমাধ্যমষষ্ঠ খন্ড : মুজিবনগর : গণমাধ্যমসপ্তম খন্ড : পাকিস্তানী দলিলপত্র: সরকারী ও বেসরকারীঅষ্টম খন্ড : গণহত্যা, শরনার্থী শিবির ও প্রাসঙ্গিক ঘটনানবম খন্ড : সশস্ত্র সংগ্রাম (১)দশম খন্ড : সশস্ত্র সংগ্রাম (২)একাদশ খন্ড : সশস্ত্র সংগ্রাম (৩)দ্বাদশ খন্ড : বিদেশী প্রতিক্রিয়া : ভারতত্রয়োদশ খন্ড : বিদেশী প্রতিক্রিয়া : জাতিসংঘ ও বিভিন্ন রাষ্ট্রচতুর্দশ খন্ড : বিশ্বজনমতপঞ্চদশ খন্ড : সাক্ষাৎকার
এই ডকুমেন্টে প্রতিটি দলিলের শুরুতে একটা কোড দেয়া আছে।
&lt;খণ্ড নম্বর, দলিল নম্বর, পেজ নম্বর&gt;
অর্থাৎ &lt;১৫,১৮,১৪৩-৯৩&gt; এর অর্থ আলোচ্য দলিলটি মূল সংকলনের ১৫ তম খণ্ডের ১৮ নং দলিল, যা ১৪৩ থেকে ১৯৩ পৃষ্ঠায় মুদ্রিত আছে। দলিল নম্বর বলতে সূচিপত্রে উল্লিখিত নম্বরকে বুঝানো হচ্ছে। উদ্ধৃত দলিলটি ডঃ কামাল হোসেনের একটি সাক্ষাৎকার। বুঝার সুবিধার্থে দলিলটির শুরুর অংশ দেখে নিনঃ
দলিলে বানান সহ বেশ কিছু ভুল আমরা খুঁজে পেয়েছি। সেগুলোকে হলুদ মার্ক করা হয়েছে।
মনে করুন, ২৬ শে মার্চ উপলক্ষে আপনি কোন ম্যাগাজিনে একটি লেখা দিবেন। এই ফাইলে তখন ২৬ শে মার্চ লিখে সার্চ দিলেই ১৫ তম খণ্ডের সেই সংক্রান্ত সকল দলিল পেয়ে যাবেন। ফলে রেফারেন্স নিয়ে লিখতে আপনার খুবই সুবিধা হবে। কারণ আমাদের মূল উদ্দেশ্য একটাই। আমরা যেন সঠিক ইতিহাস চর্চা করে বেড়ে ওঠা একটি প্রজন্ম হয়ে উঠি। এটা আমাদের নিজেদের জন্যেই অত্যন্ত প্রয়োজন। যে জাতি নিজের জন্মের ইতিহাস জানে না, সে জাতির চেয়ে দুর্বল সত্ত্বা পৃথিবীতে আর কিছু নেই।<ul>  <li>মনে করুন, আপনি নিজের এলাকা নিয়ে জানতে চান। তবে নিজের এলাকার নাম লিখে এই ডকুমেন্টে সার্চ করুন। উদাহরণস্বরূপ, আপনি মিরপুর এলাকার হলে Ctrl+F চেপে “মিরপুর” লিখে সার্চ করুন। ১৫ তম খণ্ডের মিরপুর নিয়ে সকল দলিল আপনার সামনে চলে আসবে। দেশকে জানার প্রথম শর্তই হলো নিজের এলাকাকে জানা।</li></ul>অনুবাদকে সবুজ রং দিয়ে মার্ক করা হয়েছে।
মনোযোগ দিয়ে সারসংক্ষেপটি পড়ার জন্য ধন্যবাদ। এবার বিস্তারিত।<h1></h1><h1></h1><h1></h1><h1></h1><h1><u>দলিল প্রসঙ্গঃ </u><u>সাক্ষাৎকার</u></h1><em>(পৃষ্ঠা নাম্বারগুলো মূল দলিলের পৃষ্ঠা নাম্বার অনুযায়ী লিখিত। এর সাথে এই ওয়ার্ড ফাইলের পৃষ্ঠা নাম্বার রিলেটেড নয়)</em>
<em> </em>
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের মুদ্রিত দলিলপত্র-খণ্ডসমূহের সম্পূরক হিসেবে এই খণ্ডটির পরিকল্পনা করা হয়েছে। স্বাধীনতা লাভের প্রায় এক দশক পরে স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস সংকলনের গুরুদায়িত্বে এই প্রকল্পের সামনে একটি প্রধান সমস্যা ছিল পর্যাপ্ত দলিল ও তথ্য হাতে পাওয়া ।এই প্রসঙ্গে ভূমিকায় বিশদভাবে বলা হয়েছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ সম্পর্কিত বিপুল সংখ্যক দলিলপত্র প্রকল্পে সংগৃহীত হয়েছে এবং সেগুলো থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণ প্রথম থেকে চর্তুদশ খণ্ডে মুদ্রিত হয়েছে। তা সত্ত্বেও এমন অনেক বিষয় রয়েছে যেগুলোর কোন লিখিত দলিল নেই । আবার প্রাপ্ত দলিল ও তথ্যাদি কোনো ঘটনাদির ব্যাখ্যা অপর্যাপ্ত রয়ে গেছে যেসব ক্ষেত্রে ঐ সকল ঘটনার সঙ্গে যারা সংশ্লিষ্ট ছিলেন কিংবা যারা সে সম্পর্কে ওয়াকিবহাল তাঁদের মৌখিক বিবরণই সম্যক ধারণা দিতে পারে। এছাড়া নেতৃস্থানীয় ব্যাক্তিত্ব -যারা স্বাধীনতা সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন তাঁদের তৎপরতার নানা কথা একমাত্র সাক্ষাৎকারের মাধ্যমেই পাওয়া সম্ভব। অতএব এই খণ্ডটি স্বাভাবিকভাবেই প্রকল্পের দলিলপত্র খণ্ড সমূহের অন্তর্ভূক্ত হয়।
&nbsp;
প্রকল্প সংগৃহীত সাক্ষাৎকারসমূহ মোটামুটিভাবে দলিলপত্র খন্ডসমূহের তিনটি পর্যায়ে সন্নিবেশিত হয়েছে । জনসাধারণের কাছ থেকে নেয়া গণহত্যা ও নির্যাতনের বিবরণ অষ্টম খন্ডে, সশস্ত্র বাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধাদের সাক্ষাৎকার ‘সশস্ত্র সংগ্রাম ‘ ৯ম ও ১০ম খন্ডে এবং রাজনৈতিক নেতা, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, দূত ও কূটনীতিক, শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক , বিশিষ্ট ব্যাক্তি ও জন প্রতিনিধিদের সাক্ষাৎকার নিয়ে এই খণ্ডটি প্রস্তুত করা হয়েছে ।
&nbsp;
প্রকল্প সাক্ষাৎকার গ্রহণের তালিকায় গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাব্য সকলের নামই ছিল। কিন্তু সাক্ষাৎকার গ্রহণের দীর্ঘ প্রক্রিয়া সাপেক্ষ। প্রকল্পের সীমিত সময়সীমা মধ্যে ও গবেষকদের স্বল্পতা দরুণ অনেকের সাক্ষাৎকার গ্রহণ সম্ভব হয় নি। অন্যদিকে সাক্ষাৎকার দাতাগণের পক্ষ থেকে প্রকল্পের সাফল্য ও নিরপেক্ষতার সম্পর্কে সংশয় ও এক দশক আগের স্বাধীনতাযুদ্ধকালের ঘটনাবলি যথাযথভাবে বলবার বা লিখার জন্য উপযুক্ত সময় ও প্রস্তুতির অভাবে অনেকে সাক্ষাৎকার দিতে সমর্থ হন নি। আবার অনেকে প্রকল্প কর্মীদের আশ্বাস দিয়ে ও অনেকদিন ঘুরিয়ে অবশেষে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছেন। এতদসত্ত্বেও কয়েকজনের কাছ থেকে আমরা অত্যন্ত পরিশ্রমলব্ধ সুদীর্ঘ বিবরণ পেয়েছি এবং সেগুলো এখানে মুদ্রিত হয়েছে ।এগুলোর অধিকাংশ অন্যান্য খণ্ডে মুদ্রিত দলিলপত্র দ্বারা সমর্থিত।
&nbsp;
প্রকল্পের গৃহীত সময়সীমার মধ্যে সাক্ষাৎকারদাতার মূল বক্তব্য আমরা ছাপাবার প্রয়াস পেয়েছি, প্রত্যেকটি বিবরণের শেষে তারিখও মুদ্রিত হয়েছে, সাক্ষাৎকার গ্রহণের সময় বিবরণদাতাকে প্রকল্পের সাধারণ কিংবা বিশেষ প্রশ্নমালা দেয়া হয়েছিল। তিনি কখনো সেটি পুরোপুরিভাবে অনুসরণ করেছেন, কখনো আংশিকভাবে কয়েকটি বিবরণ তাঁরা নিজেরাই লিখে দিয়েছেন কোন প্রশ্নমালা ছাড়া। এই সবগুলোর মধ্যে সামঞ্জস্য রক্ষার জন্য প্রশ্নসমূহ বাদ দিয়ে শুধু বক্তব্য মুদ্রিত করা হয়েছে।
&nbsp;
সাক্ষাৎকার সমূহের ক্রমবিন্যাস বিবরণদাতার নামের আদ্যক্ষর অনুসারে করা হয়েছে। এসবের মধ্যে সংসদ সদস্যদের সাক্ষাৎকারসমূহ বাংলা একাডেমী কর্তৃক স্বাধীনতা লাভের অনতিপরে (১৯৭৩-৭৪) গৃহীত হয়েছিল। তথ্যাদির স্বল্পতা সত্ত্বেও স্থানীয় এলাকার প্রতিনিধিত্বশীল হিসেবে এদের অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে। এগুলি বাছাই করা হয়েছে বিবরণীতে উল্লেখিত তথ্য ও ঘটনাদির গুরুত্বের দিকে লক্ষ্য রেখে।
&nbsp;
উল্লেখ্য যে, সাক্ষাৎকার গ্রহণ ও মুদ্রণের কাজ যুগপতভাবে করতে হয়েছে এবং এ কারণেই অপেক্ষাকৃত পরে গৃহীত একটি সাক্ষাৎকার সবশেষে সন্নিবেশিত হয়েছে আদ্যাক্ষর ক্রম ব্যাতিক্রমে।
এই খন্ডে মুদ্রিত সাক্ষাৎকারসমূহ বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশ আন্দোলনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ও তথ্য উদঘাটিত করবে বলে আমরা আশা করি।
&nbsp;
&nbsp;
&nbsp;
&nbsp;
&nbsp;
&nbsp;<h1>সূচিপত্র</h1>(কি-বোর্ডের Ctrl চেপে ধরে এখানকার যে কোন বিষয়ে উল্লিখিত ব্যক্তির নামের ক্লিক করে আপনারা সরাসরি সেই দলিলে চলে যেতে পারবেন)
<em>(পৃষ্ঠা নাম্বারগুলো মূল দলিলের পৃষ্ঠা নাম্বার অনুযায়ী লিখিত)</em><table width=”527″><tbody><tr><td width=”55″>ক্রম</td><td width=”417″>বিষয়</td><td width=”55″>পৃষ্ঠা</td></tr><tr><td width=”55″>১</td><td width=”417″>আজিজুর রহমান মল্লিক, অধ্যাপক
উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়;
বহির্বিশ্বে বাংলাদেশ আন্দোলনের অন্যতম নেতা</td><td width=”55″>১</td></tr><tr><td width=”55″>২</td><td width=”417″>আফসার আলী আহমেদ
আওয়ামী লীগ দলীয়
জাতীয় পরিষদ সদস্য, রংপুর</td><td width=”55″>১৪</td></tr><tr><td width=”55″>৩</td><td width=”417″><strong>আব্দুর রাজ্জাক মুকুল</strong>
আওয়ামী লীগ দলীয়
জাতীয় সংসদ সদস্য (১৯৭৩)</td><td width=”55″>১৫</td></tr><tr><td width=”55″>৪</td><td width=”417″>আব্দুল করিম খন্দকার
পাকিস্তান সশস্ত্র বাহিনীর জ্যৈষ্ঠতম বাঙ্গালি অফিসার,
বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর ডেপুটি চীফ অব স্টাফ</td><td width=”55″>১৭</td></tr><tr><td width=”55″>৫</td><td width=”417″>আবদুল খালেক
সারদা পুলিশ একাডেমির প্রিন্সিপাল,
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের স্বরাষ্ট্র সচিব ও আইজিপি</td><td width=”55″>২৫</td></tr><tr><td width=”55″>৬</td><td width=”417″>আবদুল বাসিত সিদ্দিকী
আওয়ামী লীগ দলীয়
প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য, টাঙ্গাইল</td><td width=”55″>৩৫</td></tr><tr><td width=”55″>৭</td><td width=”417″>আবদুল মালেক উকিল
আওয়ামী লীগ দলীয় জাতীয় পরিষদ সদস্য, নোয়াখালী;
অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি বিশেষ প্রতিনিধি</td><td width=”55″>৩৬</td></tr><tr><td width=”55″>ক্রম</td><td width=”417″>বিষয়</td><td width=”55″>পৃষ্ঠা</td></tr><tr><td width=”55″>৮</td><td width=”417″>আবু সাঈদ চৌধুরী, বিচারপতি
উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়;
বহির্বিশ্বে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধি এবং
লন্ডনে বাংলাদেশ আন্দোলনের নেতা</td><td width=”55″>৪২</td></tr><tr><td width=”55″>৯</td><td width=”417″>আমিরুল ইসলাম, ব্যারিস্টার
আওয়ামী লীগ দলীয় নেতা,
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রীর অন্যতম উপদেষ্টা</td><td width=”55″>৫১</td></tr><tr><td width=”55″>১০</td><td width=”417″>আসহাবুল হক, মৌলভি
গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা, চট্টগ্রাম</td><td width=”55″>১১০</td></tr><tr><td width=”55″>১১</td><td width=”417″>এ, এম, এ মুহিত
অর্থনৈতিক কাউন্সিলর, পাকিস্তান দূতাবাস, ওয়াশিংটন;
আনুগত্য প্রকাশকারী কূটনীতিক ও
যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশ আন্দোলনের অন্যতম নেতা</td><td width=”55″>১১৩</td></tr><tr><td width=”55″>১২</td><td width=”417″>এম আর সিদ্দিকী
আওয়ামী লীগ দলীয়
জাতীয় পরিষদ সদস্য, চট্টগ্রাম;
প্রশাসনিক পরিষদ প্রধান, ইস্টার্ন জোন;
বাংলাদেশ মিশন প্রধান, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা</td><td width=”55″>১২১</td></tr><tr><td width=”55″>১৩</td><td width=”417″>এম এ হান্নান
আওয়ামী লীগ নেতা, চট্টগ্রাম;
লিয়াজো অফিসার, পূর্বাঞ্চলীয় জোন</td><td width=”55″>১২৭</td></tr><tr><td width=”55″>১৪</td><td width=”417″>ওয়াহিদুল হক
সাংবাদিক</td><td width=”55″>১৩০</td></tr><tr><td width=”55″>১৫</td><td width=”417″>কণিকা বিশ্বাস
আওয়ামী লীগ দলীয়
সংসদ সদস্যা, ফরিদপুর (সংরক্ষিত আসন)</td><td width=”55″>১৩৩</td></tr><tr><td width=”55″>১৬</td><td width=”417″>কাজী জাফর আহমেদ
সভাপতি, বাংলা শ্রমিক ফেডারেশন (ভাসানিপন্থি ন্যাপ নেতা)</td><td width=”55″>১৩৪</td></tr><tr><td width=”55″>ক্রম</td><td width=”417″>বিষয়</td><td width=”55″>পৃষ্ঠা</td></tr><tr><td width=”55″>১৭</td><td width=”417″>কামাল সিদ্দিকী, ডক্টর
মহকুমা প্রশাসক, নড়াইল;
ব্যক্তিগত সচিব, পররাষ্ট্রমন্ত্রী,
গণপ্রজানতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার</td><td width=”55″>১৩৯</td></tr><tr><td width=”55″>১৮</td><td width=”417″>কামাল হোসেন, ডক্টর
আওয়ামী লীগ নেতা</td><td width=”55″>১৪৩</td></tr><tr><td width=”55″>১৯</td><td width=”417″>খন্দকার আসাদুজ্জামান
যুগ্মসচিব, অর্থ, পূর্ব-পাকিস্তান প্রাদেশিক সরকার;
অর্থ সচিব, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার</td><td width=”55″>১৯৩</td></tr><tr><td width=”55″>২০</td><td width=”417″>জয় গোবিন্দ ভৌমিক
জেলা ও দায়রা জজ, ঢাকা;
রিলিফ কমিশনার, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার</td><td width=”55″>১৯৮</td></tr><tr><td width=”55″>২১</td><td width=”417″>দেওয়ান ফরিদ গাজী
আওয়ামী লীগ দলীয় জাতীয় পরিষদ সদস্য;
প্রশাসনিক পরিষদ প্রধান, উত্তর-পূর্ব জোন
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার</td><td width=”55″>২০৪</td></tr><tr><td width=”55″>২২</td><td width=”417″>দেবব্রত দত্ত গুপ্ত
অধ্যাপক, চৌমুহনী কলেজ;
উপ-পরিচালক ও প্রশিক্ষণ সমন্বয়কারী
ইয়ুথ ক্যাম্প ডাইরেক্টরেট, পূর্বাঞ্চলীয় জোন</td><td width=”55″>২০৫</td></tr><tr><td width=”55″>২৩</td><td width=”417″>মণি সিংহ
সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি</td><td width=”55″>২১৩</td></tr><tr><td width=”55″>২৪</td><td width=”417″>মনসুর আলী
আওয়ামী লীগ দলীয়
প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য, খুলনা</td><td width=”55″>২২৩</td></tr><tr><td width=”55″>২৫</td><td width=”417″>মমতাজ বেগম
আওয়ামী লীগ দলীয়
জাতীয় পরিষদ সদস্য (মহিলা আসন), কুমিল্লা</td><td width=”55″>২২৪</td></tr><tr><td width=”55″>ক্রম</td><td width=”417″>বিষয়</td><td width=”55″>পৃষ্ঠা</td></tr><tr><td width=”55″>২৬</td><td width=”417″>মোশাররফ হোসেন
আওয়ামী লীগ দলীয়
প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য, চট্টগ্রাম</td><td width=”55″>২২৫</td></tr><tr><td width=”55″>২৭</td><td width=”417″>মোহাম্মদ আজিজুর রহমান
আওয়ামী লীগ দলীয়
জাতীয় পরিষদ সদস্য, দিনাজপুর</td><td width=”55″>২২৭</td></tr><tr><td width=”55″>২৮</td><td width=”417″>মোহাম্মদ আজিজুর রহমান
আওয়ামী লীগ দলীয়
প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য, সিলেট</td><td width=”55″>২২৯</td></tr><tr><td width=”55″>২৯</td><td width=”417″>মোহাম্মদ আবদুর রব, মেজর জেনারেল (অব:)
আওয়ামী লীগ দলীয়
প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য, সিলেট;
বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর চীফ অব জেনারেল স্টাফ</td><td width=”55″>২৩২</td></tr><tr><td width=”55″>৩০</td><td width=”417″>ইউসুফ আলী, অধ্যাপক
আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা,
মুজিবনগরে মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের পাঠক</td><td width=”55″>২৩২</td></tr><tr><td width=”55″>৩১</td><td width=”417″>মোহাম্মদ বয়তুল্লাহ
আওয়ামী লীগ দলীয় জাতীয় পরিষদ সদস্য, রাজশাহী</td><td width=”55″>২৪৪</td></tr><tr><td width=”55″>৩২</td><td width=”417″>মোহাম্মদ শামসুল হক চৌধুরী
আওয়ামী লীগ দলীয় প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য, রংপুর</td><td width=”55″>২৪৫</td></tr><tr><td width=”55″>৩৩</td><td width=”417″>মোহাম্মদ শামসুল হক, অধ্যাপক
পদার্থবিদ্যা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়</td><td width=”55″>২৪৮</td></tr><tr><td width=”55″>৩৪</td><td width=”417″>মোহাম্মদ হুমায়ূন খালিদ, অধ্যক্ষ
আওয়ামী লীগ দলীয়
জাতীয় পরিষদ সদস্য, টাঙ্গাইল</td><td width=”55″>২৫১</td></tr><tr><td width=”55″>৩৫</td><td width=”417″>মোহাম্মদ রহমতউল্লাহ
দৈনিক ‘জয়বাংলা’ সম্পাদক
নওগাঁ থেকে প্রকাশিত (মার্চ- এপ্রিল’ ৭১)</td><td width=”55″>২৫২</td></tr><tr><td width=”55″>ক্রম</td><td width=”417″>বিষয়</td><td width=”55″>পৃষ্ঠা</td></tr><tr><td width=”55″>৩৬</td><td width=”417″>রেহমান সোবহান, অধ্যাপক
পাকিস্তান আমলে পূর্বাঞ্চলীয় পৃথক অর্থনীতির অন্যতম প্রবক্তা ও
বহির্বিশ্বে বাংলাদেশ আন্দোলনের অন্যতম নেতা</td><td width=”55″>২৬৩</td></tr><tr><td width=”55″>৩৭</td><td width=”417″>শাহ জাহাঙ্গীর কবীর
আওয়ামী লীগ দলীয়
জাতীয় সংসদ সদস্য (১৯৭৩)</td><td width=”55″>২৯৩</td></tr><tr><td width=”55″>৩৮</td><td width=”417″>সাঈদ-উর-রহমান
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র;
যুবশিবির ‘পলিটিক্যাল মটিভেটর’</td><td width=”55″>২৯৪</td></tr><tr><td width=”55″>৩৯</td><td width=”417″>সারওয়ার মুর্শেদ, অধ্যাপক
ইংরেজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়;
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য</td><td width=”55″>২৯৮</td></tr><tr><td width=”55″>৪০</td><td width=”417″>সিরাজুর রহমান
অনুষ্ঠান কর্মকর্তা, বাংলা বিভাগ,
বিবিসি, লন্ডন</td><td width=”55″>৩০২</td></tr><tr><td width=”55″>৪১</td><td width=”417″>সৈয়দ আলী আহসান, অধ্যাপক
সভাপতি, বাংলা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়;
সভাপতি, বাংলাদেশ আর্কাইভস</td><td width=”55″>৩০৫</td></tr><tr><td width=”55″>৪২</td><td width=”417″>অজয় রায়, ডক্টর
রিডার, পদার্থবিদ্যা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়;
বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির সম্পাদক (জুলাই ৭১ হতে)</td><td width=”55″>৩১৩</td></tr><tr><td width=”55″>৪৩</td><td width=”417″>নির্ঘণ্ট</td><td width=”55″>৩৩৭</td></tr></tbody></table>&nbsp;
&nbsp;
&nbsp;
&nbsp;
&nbsp;
<a href=”https://www.facebook.com/ibrahim.razu”>ইব্রাহিম রাজু</a>
&lt;<strong>১৫</strong><strong>,১,১-১৪</strong>&gt;<h1>[অধ্যাপক আজিজুর রহমান মল্লিক]</h1>&nbsp;
১৯৭১ সালের মার্চ মাসে সমগ্র দেশবাসীর মতো চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কর্মচারীরা অসহযোগ আন্দোলনে যোগ হয়। ৭ ই মার্চে প্রদত্ত বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ বেতার মারফত আমাদের শোনার সুযোগ হয় ৮ই মার্চ সকালে। ঐদিনই আমার পরামর্শ অনুসারে শিক্ষকেরা একটি সভায় মিলিত হয়ে স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করবেন বলে অঙ্গীকার করেন। এই সভায় অন্যান্যদের মধ্যে অধ্যাপক সৈয়দ আলী আহসান,সৈয়দ আব্দুল করিম,অধ্যাপক মুহাম্মদ রশিদুল হক ডঃ আনিসুজ্জামান ও জনাব ফজলী হোসেন প্রমুখ বক্তৃতা করেন।
&nbsp;
তখন থেকে ২২শে মার্চ পর্যন্ত স্বাধীনতা -সংগ্রামের জন্য আমরা এক ধরনের প্রস্তুতি নিই। চট্টগ্রাম সেনানিবাসের সন্নিহিত স্থানে অবস্থিত কাউন্সিল অফ সায়েন্টিফিক এন্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ -এর ডক্টর আব্দুল হাইয়ের সংগে অধ্যাপক রশিদুল হক ও অধ্যাপক শামসুল হককে (তখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞানের অধ্যাপক এবং বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য) যোগাযোগ করতে নির্দেশ দেই। কারণ তিনিও আমাদের মতই প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন বলে আমার জানা ছিল। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় ল্যাবরেটরিতে হাতবোমা,গ্রেনেড ইত্যাদি তৈরি করা যায় কিনা সে বিষয়ে পরীক্ষা করতে অধ্যাপক শামসুল হককে গোপনীয় মৌখিক নির্দেশ দেই।  কিছু কিছু ছাত্রকে সামরিক ট্রেনিং দেবার চেষ্টা করা হয় ডঃ হাইয়ের উদ্যোগে। ইউ, ও, টি,সি-র ভারপ্রাপ্ত শিক্ষক ডক্টর এস, এম, আতাহারকে আমি নির্দেশ দেই ইউওটিসি-র রাইফেলগুলো সক্রিয় করার চেষ্টা করতে। চট্টগ্রাম  শহরে আয়োজিত সংস্কৃতিকর্মীদের প্রতিবাদ-সভা ও বিক্ষোভ-মিছিলে অন্যান্য অনেকের মধ্যে অধ্যাপক সৈয়দ আলী আহসান ও  ডঃ আনিসুজ্জামান সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করেন। আরও আগে চট্টগ্রাম শহরে অবস্থিত বাঙালি-অবাঙালি সংঘর্ষে আহতদের জন্য আমার সঙ্গে শিক্ষক-ছাত্ররা  রক্ত দান করেন।
২৩ শে মার্চ সকালে চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র থেকে ঘোষণা করা হয় যে, ঐদিন বিকেলে চট্টগ্রাম শহরে সকল পর্যায়ের শিক্ষক ছাত্র ও জনসাধারণের প্রতিবাদ মিছিল বের হবে এবং তারপরে প্যারেড গ্রাউন্ডে আমার সভাপতিত্বে শিক্ষক-জনতার সভা হবে। যদিও এ সম্পর্কে আমি আগে কিছু জানতাম না, তবু এই মিছিল ও সভায় আমি শিক্ষক ছাত্রসহ যোগ দেই। মিছিল বেশ বড় হয়, সভায় জনসমাবেশও হয় প্রচুর। পলো গ্রাউন্ডের এই জনসভায় তিল ধারণের স্থান ছিল না তাছাড়া মাঠের চারিদিকে বাড়ীর ছাদেও অনেক নারী পুরুষ  জড়ো হয়। এই সভায় আমি জনতার সংগ্রামের সঙ্গে আমরা একাত্মতা ঘোষণা করি।  বাঙালির ন্যায্য অধিকার অর্জন করা পর্যন্ত সংগ্রামের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িত থাকবো সে অঙ্গীকার ও করি। এ সভায় অন্যান্যদের মধ্যে বক্তৃতা করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আব্দুল করিম, অধ্যাপক আর আই চৌধুরী  ও স্থানীয় নেতা মরহুম জহুর আহমদ চৌধুরী। উল্লেখ্য যে এই সভা অনুষ্ঠানের ব্যাপারে যারা উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন তাঁদের মধ্যে ছিলেন আমার প্রাক্তন ছাত্র  এবং তৎকালে চট্টগ্রাম সরকারী কলেজের অধ্যাপক মমতাজউদ্দীন আহমদ।  সভা চলাকালে সংবাদ আসে যে অস্ত্র বোঝাই ‘সোয়াত’ জাহাজ থেকে অস্ত্র নামাতে বাধা দেবার জন্য প্রায় ১০/১৫ হাজার মানুষ  বন্দর এলাকায় বেষ্টনী সৃষ্টি করেছে এবং শহরের বিভিন্ন স্থানে ব্যারিকেড স্থাপন করা হচ্ছে। সভায় উত্তেজনা বাড়ে।  এমতাবস্থায় সভা মুলতবী করে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রত্যাবর্তনের চেষ্টা করি কিন্তু ক্যান্টনমেন্টের কাছে ব্যারিকেড দেখে আবার ফিরে আসি এবং রাঙ্গুনিয়া হয়ে গ্রাম্য পথ ধরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ফিরি অনেক রাতে। অচিরেই যে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর সঙ্গে নিরস্ত্র জনসাধারণের  মুখোমুখি সংঘর্ষ হতে যাচ্ছে, সে সম্পর্কে তখন আর আমার  ও আমার সহকর্মীদের মনে কোন সংশয় থাকে না।
&nbsp;
এই পরিস্থিতিতে প্রতিরোধের একটা পরিকল্পনা গ্রহণ করা আশু প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠে। ২৪ শে মার্চ সকালে UBL (তদকালীন ইউনাইটেড ব্যাংক লিমিটেড-এর আঞ্চলিক ম্যানেজার জনাব কাদের এবং চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার জনাব শামসুল হকের (উভয়েই মুক্তিযুদ্ধের সূচনায় শহীদ হন) সঙ্গে টেলিফোনে আমার কথাবার্তা হয়। সেই আলাপের ভিত্তিতে হাটহাজারী ও রাউজান থানার সঙ্গে আমি টেলিযোগাযোগ স্থাপনের ব্যবস্থা করি এবং শত্রুসৈন্য পথে বেরিয়ে পড়লে স্থানীয়  জনসাধারণের সাহায্যে যাতে তাদের প্রতিরোধ করতে পারি তার জন্যও পরিকল্পনা প্রস্তুত করার  পদক্ষেপ গ্রহণ করি।
&nbsp;
২৫ শে মার্চ সারাদিন খুব  উদ্বেগের মধ্যে কাটে।  শহরের বিভিন্ন স্থানে সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা হচ্ছে,এসব খবর টেলিফোনে পাই।  যেমন, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ জনাব ইউ, এন, সিদ্দীকির বাড়ীতে এসে কিছু লোক তাঁর আগ্নেয়াস্ত্র চাইলে তিনি আমাকে ফোন করেন পরামর্শের জন্য।   আমি তাকে অস্ত্র দিয়ে দিতে বলি। বিরাজমান অস্থিরতা ও উত্তেজনার ঢেউ বিশ্ববিদ্যালয়েও এসে লাগে। বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্টার ও শিক্ষকদের নিয়ে আমার অফিসঘরে  বসে আমরা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করি।
&nbsp;
২৫ শে মার্চ রাত ১০ টার পরে আমার বাসায় টেলিফোন করে ঢাকা থেকে খবর দেন যে,পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর ট্যাংক ঢাকার পথে বেরিয়ে গেছে,সম্ভবত: সান্ধ্য আইন জারি হয়েছে  এবং শেখ মুজিবকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এই খবর পেয়েই আমি শিক্ষকদের কয়েকজনকে আমার অফিসে আসতে বলি। এদের মধ্যে অধ্যাপক সৈয়দ আলী আহসান, ডঃ আর, আই চৌধুরী, অধ্যাপক করিম, অধ্যাপক মুহম্মদ আলী, ডঃ আনিসুজ্জামান, জনাব মাহবুব তালুকদার, ওসমান জামাল ও রেজিস্টার খলিলুর রহমান ছিলেন। আমরা প্রথমে চট্টগ্রাম সাংবাদিকদের কাছে পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজ নিই। তাঁরা কিছুই বলতে পারলেন না। এই সময় আমার আত্মীয়  কুমিল্লার ডি, সি. শামসুল হক খান-এর সঙ্গে ফোনে কথা হয়। তিনি জানান, যে কোন মুহূর্তে তাঁর জীবন  বিপন্ন হতে পারে। কারণ তিনি বঙ্গবন্ধুর ডাকে ক্যান্টনমেন্টে গাড়ীর জ্বালানী সরবরাহ আগেই বন্ধ করে দিয়েছিলেন। আমি তাঁকে অবিলম্বে কুমিল্লা সার্কিট হাউস থেকে সরে গিয়ে গ্রামের দিকে আশ্রয় নিতে বলি। আর পর তাঁর সঙ্গে আমার আর কোন যোগাযোগ হয়নি। তাকে সামরিক বাহিনী ধরে নিয়ে হত্যা করেছিল সে খবর অনেক দিন পরে পাই।
কুমিল্লার যোগাযোগ ছিন্ন হয়ে যাওয়ার পর অনেক চেষ্টায় ঢাকার ‘পূর্বদেশ ‘ও ‘ইত্তেফাক’ অফিসে এবং আমার আত্মীয় ঢাকাস্থ নরউইচ ইউনিয়ন ইনসিওরেন্স – এর তৎকালীন প্রধান কর্মকর্তা জনাব আব্দুল মান্নান খানের সঙ্গে টেলিফোনে  যোগাযোগ করতে সক্ষম হই।  কেউ কেউ সেখান থেকে বললেন যে, একটা কিছু ঘটেছে, কেউ কেউ বলেন কোন মারাত্মক ঘটনার খবর তাঁদের জানা নেই। তবে শহরে কারফিউ ঘোষণা করা হয়েছে এবং ট্যাঙ্ক ও সিপাহীরা রাস্তায় টহল দিচ্ছে।  এ সময় চট্টগ্রামের একজন সাংবাদিক জানান যে, শেখ মুজিব আত্মগোপন করেছেন বলে শোনা যাচ্ছে। আমরা যখন ঢাকায় কথা বলছি,তখন ঢাকার সঙ্গে টেলিফোন সংযোগ হঠাৎ  ছিন্ন হয়ে যায় অনুমান রাত ১১ টার দিকে। আমরা আরো দু-তিন ঘণ্টা বসে থেকে আলাপ-আলোচনা করি এবং সংবাদ সংগ্রহের চেষ্টা করে ব্যর্থ হই। ঢাকাতে সাংঘাতিক কিছু ঘটতে পারে  এই যুক্তির ওপর  আমি বার বার জোর দিই। এর প্রেক্ষিতে আমাদের প্রস্তুতি জোরদার করার সিদ্ধান্ত  নেই এবং সেই রাত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাইস চ্যান্সেলর এর অফিস আমাদের স্থানীয় সংগ্রাম প্রচেষ্টার সদর দপ্তরে পরিণত হয়। নেতৃত্বের দায়িত্ব স্বাভাবিক ভাবেই আমার ওপরে বর্তায়। সারা রাত অফিসে কাটিয়ে ভোর সাড়ে চারটায় বাসায় ফিরে এসে সবেমাত্র গোসল করতে বাথরুমে গিয়েছি তখন চট্টগ্রাম শহর থেকে কোষাধ্যক্ষ সিদ্দিকী সাহেবের ফোন পাই।  তিনি জানেন যে তাঁর বাড়ীতে কয়েকজন তদানীন্তন ই বি আর-এর যুবক অস্ত্রসহ উপস্থিত হয়েছে।  তারা এই বাড়ীতে  ঘাঁটি স্থাপন করবে শত্রু পক্ষের মোকাবেলার জন্য। আমি  ফোনে সেই উত্তেজিত যুবকদের সাথে কথা বলে জানতে পারি যে তারা জীবন নিয়ে ক্যান্টনমেন্ট থেকে অস্ত্রসহ বেরিয়ে এসেছে এবং আরও দল বের হয়ে গেছে। তাদের সঙ্গে অস্ত্র ও গুলিগোলা আছে। তারা সিদ্দিকী সাহেবের বাড়ী থেকে ক্যান্টনমেন্ট -এর সঙ্গে যুক্ত শহরের রাস্তার ওপর নজর রাখবে এবং পাকিস্তানী সৈন্য রাস্তায় বের হলেই তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করবে। এ বাড়ী তাই তাদের দরকার।  আমি সিদ্দিকী সাহেবকে পরিবারের সবাইকে নিয়ে বাড়ী ছেড়ে কাছাকাছি অন্য বাড়ীতে যেতে বলি এবং এদের খাবার দাবারের ব্যবস্থা করতে বলি। তখন শহরে স্থানে স্থানে খণ্ডযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে।  টেলিফোনে গোলাগুলির আওয়াজ পাচ্ছিলাম এবং ছেলেরাও জানাল তাদের দক্ষিণ দিকের একটা বাড়ী থেকে এ বাড়ী লক্ষ্য করে গোলা ছোড়া হচ্ছে এবং বিদ্যুতের তারের খুঁটিতে আঘাত লেগে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়েছে। পরে আমরা জানতে পারি দক্ষিণের ঐ অবাঙালি বাড়িতে আগেই প্রস্তুতি হিসেবে শত্রু সৈন্য মোতায়েন ছিল।
&nbsp;
২৬ শে মার্চ সকালে এ খবর আসার পর আওয়ামী লীগের জনাব এম, আর, সিদ্দিকী ও জনাব এম, এ, হান্নানের সঙ্গে টেলিফোন যোগাযোগ করে ঢাকা ও চট্টগ্রাম এর পরিস্থিতি সম্বন্ধে আরও খবর জানতে পারি। কিছুসংখ্যক সৈন্য নিয়ে ক্যাপ্টেন রফিক সি, আর, বির  টিলায় অবস্থান নিয়েছিলেন। আনিসুজ্জামান এর সঙ্গে তাঁর টেলিফোনে কথা হয় এবং পারস্পরিক এলাকার সংবাদ বিনিময় হয়। চট্টগ্রাম ডাকবাংলোতে অথবা রেলওয়ে রেস্ট হাউসে সংগ্রাম পরিষদের একটি অফিস কাজ করছিল। সেখান থেকে একজন টেলিফোন করে আনিসুজ্জামানকে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করে শোনান এবং তা লিখে নিয়ে সবাইকে জানাতে বলেন। এরপর চট্টগ্রামের বেতার তরঙ্গে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ঘোষণা শুনতে পাই। জনাব এম, এ, হান্নান বঙ্গবন্ধুর ঘোষণা পাঠ করেন এবং পরে সকলকে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে লালদীঘি ময়দানে জমায়েত হতে নির্দেশ দেন। আমি টেলিফোন করে কালুরঘাটে এবং ডাকবাংলোতে বলি যে,এই ঘোষণা অবিলম্বে প্রত্যাহার করা দরকার, কেননা, ওরকম জমায়েতের ওপর বিমান থেকে আক্রমণের সম্ভাবনা আছে। পরে তাঁরা এই সমাবেশ বাতিল করার ঘোষণা দেন। এ ব্যাপারে আমার যে আশঙ্কা ছিল পরবর্তী সময়ে তা সত্যে পরিণত হয়। পাকিস্তানের কয়েকটি জঙ্গি বিমান চট্টগ্রাম  শহর প্রদক্ষিণ করার পর কালুরঘাটে  বোমা বর্ষণ করে।
২৬ শে মার্চ সন্ধ্যায় রাঙ্গামাটি থেকে জিলা প্রশাসক  জনাব হাসান তৌফিক ইমাম টেলিফোনে আমাকে জানান যে, পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং উত্তর চট্টগ্রাম থেকে ইপিআর -এর জওয়ানদের বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় এসে জমায়েত হওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে আমি যেন তাদের দায়িত্ব নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করি। রাতে প্রায় আড়াইশ জওয়ান ক্যাম্পাসে এসে  পৌঁছান।  আমরা তাদের দায়িত্ব গ্রহণ করি। আলাওল হল ও এ, এফ, রহমান হলে থাকবার ও খাওয়ার  ব্যবস্থা করা হয়। তখন থেকে বিভিন্ন কাজের দায়িত্ব আমরা শিক্ষক ও অফিসারদের মধ্যে ভাগ করে দেই। যেমন কেউ খাবারের তত্ত্বাবধান করেন, যানবাহনের দায়িত্ব নেন কেউ, পেট্রোলের জন্য পাম্পে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে স্লিপ দেবার দায়িত্ব দেয়া হয় কাউকে, ছাত্রদের স্বেচ্ছাসেবার নেতৃত্ব নেন কেউ। আমি অফিসে থাকি এবং আমাকে সর্বক্ষণ সহায়তার ভার দেয়া হয় আনিসুজ্জামানকে।
&nbsp;
ই, পি, আর- এর জওয়ানদের প্রতিরোধ কার্যক্রমে  তাৎক্ষনিকভাবে নেতৃত্ব দেবার জন্য পেয়েছিলাম সুবেদার আব্দুল  গণিকে। সেই রাতেই আমার অফিস থেকে সি, এস, আই,আর-এ ড: হাইকে ফোন করে ক্যান্টনমেন্টের যতটুকু খবর আঁচ করা সম্ভব, তা জেনে নিই এবং ই, পি, আর -এর জওয়ানদের দিয়ে ক্যান্টনমেন্টের উত্তর দিক (হাটহাজারী রাস্তার পূর্বদিকের এলাকা) ঘিরে রাখার কৌশল স্থির করা হয়। ক্যান্টনমেন্টের উত্তরাঞ্চলে ছিল পাহাড় ও জংগল এবং সামান্য জনগোষ্ঠীর বাস। বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্যাপগ্রাফিক ম্যাপ ছিল। আমার অফিসে বসে ম্যাপ দেখে ট্রেঞ্চ কাটার জায়গা নির্দিষ্ট হয় এবং ক্যাম্পাসে কনট্রাকটরদের শ্রমিক দিয়ে রাত্রেই পরিখা খনন করা হয়। পরদিন জওয়ানদের নির্দিষ্ট জায়গায় পাঠিয়ে দেয়া হয় এবং তাদের প্রত্যেককে প্যাকেট লাঞ্চ দেয়া হয়। এ ব্যাপারে গ্রাম্য জনসাধারণ আমাদের আবেদনে সাড়া দেন এবং যথেষ্ট সাহায্য করেন। তাঁরা সাধ্যমত চাল-ডাল-তরকারী, আটা, ময়দা, গরু, ছাগল, মুরগী আমাদের কাছে পৌঁছে দেন দান হিসেবে। তবে তাঁদের কাছ থেকে কোন অর্থ আমরা গ্রহণ করিনি। সৈন্যদের পথ দেখানোর কাজেও তাঁরা যথেষ্ট সাহায্য করেন। উল্লেখ্য যে, ই, পি, আর-দের সাহায্যে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের এক মাইল দূরে রেল লাইনের পূর্ব দিকে বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগের জন্য ওয়ারলেস সেট স্থাপন করা হয়েছিল।
&nbsp;
২৭ শে মার্চ বেতারে মেজর জিয়ার প্রথম ঘোষণা প্রচারিত হয়। তা শুনেই আমি হান্নান সাহেবকে টেলিফোনে বলি যে, ঘোষণায় বঙ্গবন্ধুর নাম যোগ করা আবশ্যক। নইলে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির বিষয় বিবেচিত হবে না। মেজর জিয়া পরবর্তী ঘোষণা করেন বঙ্গবন্ধুর নাম করে, তাঁর পক্ষ থেকে।
&nbsp;
২৭শে ও ২৮শে মার্চ ই, পি, আর-এর আরও কিছু জওয়ান এবং চট্টগ্রাম সেনানিবাস থেকে আত্মরক্ষা করে ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের কিছু সৈন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে আসে। সব মিলিয়ে শেষ পর্যন্ত এদের সংখ্যা দাঁড়ায় চারশো’র বেশী। কিন্তু ই, পি, আর ও ই, বি, আর-এর জওয়ানদের একসঙ্গে কাজ করার ক্ষেত্রে অসুবিধা দেখা দেয়। এস, পি শামসুল হক,  মেজর জিয়া ও ক্যাপ্টেন ভূঁইয়ার সঙ্গে আমার টেলিফোনে যোগাযোগ ছিলো। পরস্পরের কাছে পরিচিত হবার জন্য আমরা ভিন্ন কিন্তু নির্দিষ্ট নাম ব্যবহার করতাম। আমাকে দেয়া নাম ছিল ‘ডানিয়েল’। যোগাযোগ করা ক্রমশ: কঠিন হয়ে উঠছিলো, কেননা ক্রমেই তাঁদের অবস্থান এমন জায়গায় হচ্ছিল যেখানে টেলিফোনে কথা বলা যাচ্ছিল না। যাহোক,বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় অবস্থানরত জওয়ানদের যুদ্ধ ব্যাপারে নেতৃত্ব দেবার জন্য আমি সেনাবাহিনীর একজন অফিসার ক্যাপ্টেন রফিক-এর মারফত চেয়ে পাঠাই। তাঁরা পাঠান একজনকে। (পরে দেখি তিনি আমার পূর্ব পরিচিত ও আমার বড় ছেলের বন্ধু)। তাকে নিয়ে একটা ভুল বুঝা-বুঝি হয়। তিনি সরাসরি আমার অফিসে এসে জওয়ানদের দায়িত্ব গ্রহণ না করে, ক্যাম্পাসে আমার সংগৃহীত অস্ত্রশস্ত্র দেখে আরও অস্ত্র সংগ্রহের জন্য বর্ডারে যাবার কথা বলেন এবং এ ব্যাপারে কর্তব্যরত অধ্যাপকের কাছে একটি গাড়ী চান। অধ্যাপক একথা আমাকে ফোনে জানান। ক্যাপ্টেন ভূঁইয়া কিংবা মেজর জিয়া যে তাকে পাঠিয়েছেন তা তিনি জানালেও আমরা সরাসরি কোন খবর কালুরঘাট থেকে পাইনি বলে উক্ত অফিসার সম্বন্ধে আমাদের সন্দেহের উদ্রেক হয়। তখন তাকে আমি আমার অফিসে ডেকে পাঠাই এবং জিজ্ঞাসাবাদ করি। তাতেও সন্দেহ নিরসন না হওয়াতে ই, পি, আর-এর এক নায়েক এবং দুই সিপাহীর সাহায্যে তাকে এবং তার দু’জন সহচর ছাত্রকে নিরস্ত্র করি এবং ভাইস চ্যান্সেলরের ভিজিটরস রুমে পাহারাধীন রাখি। তাঁদের উদ্দেশ্যে আমি বলি যে দেশ এক সংকটময় পরিস্থিতিতে জীবন-মরণ সংগ্রামে লিপ্ত। এ অবস্থায় কারও চালচলনে সন্দেহের উদ্রেক হলে তাকে নজরবন্দী রাখতে হয়। মেজর জিয়ার ক্যাম্প থেকে তাঁদের সম্পর্কে সংবাদ সংগ্রহ করে তারপর সিদ্ধান্ত নেব। ক্যাপ্টেন ভূঁইয়াকে ফোনে যোগাযোগ করি। তিনি বলেন যে, উক্ত অফিসারকে দু’জন ছাত্রসহ পাঠিয়েছি। আমার বক্তব্য, তাই যদি হয়, তবে আমার সঙ্গে দেখা না করে এখানকার দায়িত্ব না নিয়ে চলে যাচ্ছিল কেন। যাহোক,তখন ওই অফিসারকে মুক্ত করে আমি জিয়ার ক্যাম্পে পাঠিয়ে দিই এবং অন্য কোন সিনিয়র অফিসার পাঠাতে অনুরোধ করি। সঙ্গের দুজন ছাত্রকেও তার সঙ্গে পাঠাই কারণ এটা প্রমাণিত হয় যে, তাঁরা প্রতিরোধ সংগ্রামে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে যোগ দিতে মেজর জিয়ার ক্যাম্পে গিয়েছিলো। ক্যাপ্টেন ভূঁইয়ার নির্দেশে অফিসারকে নিয়ে আমাদের এখানে আসে। তাঁরা পরস্পর পরস্পরের সঙ্গে পরিচিত নয়। ছাত্রদের পরিচিতি সম্বন্ধে স্থানীয় নেতাদের কাছ থেকে (জনাব আখতারুজ্জামান তাঁদের মধ্যে একজন) খবর নিয়ে জানতে পারি যে, তাঁদের বক্তব্য সত্য। তখন ওই দুটি ছাত্রকে দিয়ে উক্ত অফিসারকে কালুরঘাট পাঠানো হয় ক্যাপ্টেন রফিকের নিকট। ছাত্র দুটি যখন ফিরে আসছিলো তখন তাঁরা পাকবাহিনীর গুলিতে নিহত হয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, ক্যাম্পাস থেকে সংগ্রাম পরিচালনার সময় আমাদের ছাত্র স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর দুইজন সদস্য আব্দুর রব (তৎকালীন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক) এবং ফরহাদ কাপ্তাই রোডের ওপর এক গেরিলা অপারেশনে মৃত্যুবরণ করে।
&nbsp;
২৯শে মার্চ সেনাবাহিনী ও পুলিশের অফিসারদের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ ছিন্ন হয়ে যায়। মনে হয় তাঁরা অবস্থান পাল্টেছেন, কিন্তু আমাদের খবর দেবার সময় পাননি।
&nbsp;
পক্ষান্তরে আমরা চট্টগ্রাম শহরের পতনের সংবাদ পাই। ইতিমধ্যে শত্রুর গুলিতে পরিখায় অবস্থানরত আমাদের কয়েকজন জওয়ান আহত হয়। এমতাবস্থায় প্রতিরোধ এখান থেকে জোরদার করা সম্ভব নয় বলে জওয়ানদের পক্ষ থেকে আরও উত্তরে চলে যাবার প্রস্তাব আসে। আমরা একমত হই। তাঁরা নাজিরহাটে যাবে সিদ্ধান্ত হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী আমাদের সঙ্গে অবস্থানকারী জওয়ানরা গন্তব্যস্থলের দিকে রওয়ানা হয়ে যান। বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা কেন্দ্রে ডাক্তার আবুল বশর ও ডাক্তার আখতারুজ্জামানের চিকিৎসাধীন কয়েকজন আহত যোদ্ধা ছাড়া তখন আর প্রায় কোন যোদ্ধাই আমাদের হাতে রইলো না। এরপরে শহর থেকে গ্রাম্য পথ ঘুরে যোদ্ধৃবেশে কিছু আওয়ামী লীগ ও নেতা এবং ইউ, ও, টি, সির কিছু প্রশিক্ষণরত ছাত্র ও অফিসার বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় পৌঁছান,কিন্তু ক্যান্টনমেন্ট অবরোধ করে রাখা অসম্ভব দেখে তারাও অন্যত্র চলে যান। এদিকে ক্যাম্পাস থেকে উত্তর চট্টগ্রাম বা রাঙ্গামাটির রাস্তায়ও স্থানীয় জনসাধারণ ব্যারিকেড স্থাপন করতে শুরু করে। এই অবস্থায় আমরা স্থির করি যে ৩০ শে মার্চ ক্যাম্পাস থেকে সকল শিশু, বৃদ্ধ ও নারীকে স্থানান্তরিত করা হবে। কয়েকটি বাসে করে কিছু পরিবার নাজিরহাটে পাঠিয়ে দেয়া হয়, অন্যেরা গিয়ে আশ্রয় নেন কুণ্ডেশ্বরী বালিকা বিদ্যালয়ের হস্টেলে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্মচারীদের বেতন বন্ধ ছিল কারণ হাতে টাকা ছিল না এবং ব্যাংক বন্ধ ছিল। কিছু কর্মচারী ব্যাংকের দরজা ভেঙ্গে টাকা নেয়ার প্রস্তাব করে।  আমি তাদের উদ্দেশ্যে বক্তৃতা দিই এবং ব্যাংক লুট করা চলবে না বলে দিই। আমার বাসায় যে ব্যক্তিগত টাকা ছিল (উল্লেখ্য, আ,আর ব্যক্তিগত গাড়ী বিক্রয়ের দশ হাজার টাকা ব্যাংক বন্ধ থাকায় বাসায় ছিল) সেখান থেকে চার হাজার টাকা নিয়ে এবং অধ্যাপক আর, আই, চৌধুরীর কাছে যে ২/৩ হাজার বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রাবাসের টাকা ছিল তা নিয়ে নিম্ন শ্রেণীর কর্মচারীদের বাড়ী যাবার ভাড়া তাৎক্ষণিকভাবে দিয়ে দিই এবং তাদের যার যার বাড়ীতে চলে যেতে বলে তাদের  কাছ থেকে আমি বিদায় নিই। ৩১ শে মার্চ রাতে ক্যাম্পাস  প্রায় খালি হয়ে যায়। ডাক্তার দু’জনের হাতে চিকিৎসাধীন চার পাঁচজন যোদ্ধাকে  রেখে  ১লা এপ্রিল সন্ধ্যায় আমার পরিবার, রেজিস্টারের পরিবার এবং আনিসুজ্জামানকে (তাঁর পরিবার আগেই কুণ্ডেশ্বরীতে স্থানান্তরিত হয়েছিল) নিয়ে ক্যাম্পাস ত্যাগ করলাম। আমি সপরিবারে রাউজানে আশ্রয় নিলাম।  ক্যাম্পাসে  ভি, সির বাসগৃহ ছেড়ে বেরিয়ে আসার সময় আমার সেক্রেটারি ইনস্যুরেন্স পলিসি, শেয়ার সার্টিফিকেট ইত্যাদির কিছু  কাগজপত্রের ব্যক্তিগত ফাইল আমার পাসপোর্টসহ আমার সামনে এনে হাজির করে সঙ্গে নেবার জন্য। আমি ওই পাসপোর্ট সবার সামনে ছিঁড়ে ফেলেছিলাম কারণ, তখন আমি আর পাকিস্তানী নই, তাই পাকিস্তানী পরিচয়ে কোন পাসপোর্ট সঙ্গে রাখতে চাইনি। অন্যান্য কাগজপত্রের ফাইলটিও ছুড়ে ফেলে দিয়েছিলাম। আমার মনে হচ্ছিল, যতক্ষণ না দেশ স্বাধীন হচ্ছে ততক্ষণ কোন বীমা, কোন শেয়ার  সার্টিফিকেটের দরকার নেই।  পরবর্তীকালে দেশ স্বাধীন হবার পর আমার সেক্রেটারি ঐ ছুড়ে ফেলে দেয়া ফাইলটি আমার ড্রাইভারকে দিয়ে আমাকে ফিরিয়ে দিয়েছিল।
রাউজানে আমি সপ্তাহখানেক ছিলাম। ইতিমধ্যে  সার্বিক পরিস্থিতি আমাদের প্রতিকূলে চলে যায়। সকলেই নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধান করতে থাকে। কুণ্ডেশ্বরীতে যারা আশ্রয় নিয়েছিলেন, তারা ছড়িয়ে- ছিটিয়ে পড়েন। সেখানে আশ্রয় দাতা নূতনচন্দ্র সিংহের পরিবার ও স্থান ত্যাগ করেন। নূতন বাবু শূন্য গৃহে রয়ে যাবার সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। পরে ১৩ ই এপ্রিল হানাদার  বাহিনী তাকে হত্যা করে।
&nbsp;
সম্ভবত: ৮ই এপ্রিল আমি রাউজান থেকে নাজিরহাটে চলে যাই। ওখানে তখন আমাদের সহযোগী জওয়ানরা ছিলেন। সেখানে এক রাত তাদের সঙ্গে থেকে রামগড়ের পথে রওয়ানা হই। সপরিবারে অধ্যাপক সৈয়দ আলী আহসান,  অধ্যাপক রশিদুল হক  ও  ড: মাহমুদ শাহ কোরেশী আমার সঙ্গে আসেন। উল্লেখ্য নাজিরহাট থেকে আমার সঙ্গে যায় মুক্তিযোদ্ধা কয়েকজন, তাদের সঙ্গে কালুরঘাট থেকে সরিয়ে আনা ট্রান্সমিটার সেট ছিল। এদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্র-মুক্তিযোদ্ধাও ছিল।
&nbsp;
১০ ই এপ্রিলে হানাদার  বাহিনী বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা দখল করে। ১১ই থেকে ১৪ ই এপ্রিলের মধ্যে রামগড়ে সপরিবারে এসে পৌঁছান অধ্যাপক শামসুল হক, ডঃ আনিসুজ্জামান, ওসমান জামাল; অন্য শিক্ষকদের  মধ্যে ষরিৎকুমার সাহা,  নূরুল ইসলাম খোন্দকার প্রভৃতি  এবং বেশ কিছু ছাত্র। ছাত্রেরা অনেকেই সাবরুম হয়ে ভারতে প্রবেশ করে এবং এদের মধ্যে কেউ কেউ দু’চার দিনের সামরিক প্রশিক্ষণ নিয়ে দেশে ফিরে এসে শত্রুর মোকাবিলা করে। আমাদের ছাত্র শহীদ ইফতিখার ছিল তেমন একজন।
&nbsp;
রামগড়ে  এসে মেজর জিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক পুনরায় স্থাপিত হয়। সেখান থেকেই তিনি তখন যুদ্ধ পরিচালনা করেছিলেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন মেজর শামসুদ্দীন (ই পি আর), ক্যাপ্টেন রফিক, ক্যাপ্টেন আফতাব (গোলন্দাজ বাহিনী), ক্যাপ্টেন ভূঁইয়া প্রমুখ। রাঙ্গামাটি থেকে হাসান তৌফিক ইমাম ও এস, পি বজলুর রহমান আমাদের আগেই এখানে এসে যোগ দিয়েছিলেন। আওয়ামী লীগের কিছু নেতৃস্থানীয় কর্মী তাদের কাজের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ঢাকা থেকে সাদেক খানও সেখানে এসে পৌঁছান। রামগড়ে মুক্তিযুদ্ধের কাজে এবং আমাদের ব্যক্তিগত প্রয়োজনে সর্বাত্মক সাহায্য করেন সেখানকার চা বাগানের ম্যানেজার জনাব আব্দুল আউয়াল। রামগড় অবস্থানের শেষ দিন ভোরে ক্যাপ্টেন কাদের আমার সঙ্গে দেখা করে তাঁর উপর জিয়া কর্তৃক অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে যান পার্বত্য চট্টগ্রামে। তিনি এই অপারেশন নিহত হন।
&nbsp;
এপ্রিলের মাঝামাঝি রামগড় থেকে আগরতলায় গিয়ে পৌছাই। দেশের মাটি ছাড়ার সময় আমরা যারা চলে যাচ্ছিলাম এবং আমাদের যেসব বন্ধু তখনও দেশে রয়ে গেলেন, সকলেরই চোখ অশ্রুভারাক্রান্ত হয়ে উঠেছিল। আমি আনিসুজ্জামানকে তখন বলেছিলাম, মন খারাপ করো না, এই বছর শেষ হবার আগেই আমরা স্বদেশে ফিরে আসব। আমি জানিনা সেই দুরবস্থার সময়ে এ প্রত্যয় কি করে আমার মনে জন্মেছিল।  তবে মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময়টাতে একথা আমি বহুজনকে বহুবার বলেছিলাম। এমনকি জুন মাসেই সিদ্ধার্থ সঙ্কর রায়কে বড়দিন উপলক্ষে চট্টগ্রামে আসার পর অগ্রিম নিমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম।
&nbsp;
আগরতলায় একটি পরিত্যক্ত বাসগৃহে আমার ও পরিবারের থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল। অদূরে শিক্ষক-প্রশিক্ষণ কলেজের একটি পরিত্যক্ত হোস্টেলে সৈয়দ আলী আহসান, রশিদুল হক ও কোরেশীর স্থান হয়। পরে এই হোষ্টেলেই আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুল হক, আনিসুজ্জামান, ওসমান জামাল, চা বাগানের আব্দুল আউয়াল এবং মেজর শামসুদ্দিন, মেজর শওকত ও মেজর শফিউল্লার পরিবার আশ্রয় লাভ করেন। এক-একটি কক্ষে এক-একটি পরিবার থাকার ব্যবস্থা করা হয়।
&nbsp;
আগরতলায় আমার অনেক আগেই এসে পৌঁছেছিলেন জনাব এম, আর, সিদ্দীকি ও জনাব জহুর আহমদ চৌধুরী। তাঁদের সঙ্গে আলাপ করে কর্মপন্থা স্থির করার চেষ্টা করি। কিন্তু তাৎক্ষণিক কিছু করার ছিল না। তখন আমরা সকলেই স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার প্রতিষ্ঠিত হবার অপেক্ষা করছি। স্রোতের মতো  শরণার্থী আসছে। ঢাকা থেকে ও অনেক বন্ধু,  পরিচিত, স্বজন সেখানে এসে পৌঁছচ্ছেন। এখানে একদিনের দুপুরের খাবার এর কথা আমার মনে পড়ে।  অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে খাবারের আয়োজন ছিল বেশ উন্নতমানের। আমরা খেতে বসেছিলাম। এই কদিন আমাদের সঙ্গে যেসব ছেলে কাজ করছিল তাদের যে দুরবস্থা আমি দেখেছি তা ভেবে আমার বিবেক নাড়া দিল, আমি খেতে পারলাম না। সৈয়দ আলী আহসান ও অন্যান্য সহযোগীদের বলে আমি এলাম এবং একটি সস্তা হোটেলে গিয়ে রুটি ও নিরামিষ খেলাম। প্রতিরোধ যুদ্ধে  পিছু হটলেও সীমান্তের কাছাকাছি তখনও যুদ্ধ চলছে। মেজর খালেদ মোশাররফ এসে ২/৩ রাত আমাকে যুদ্ধ ক্ষেত্রের কাছে নিয়ে যান। অচিরেই তাঁকে সদলে পিছু হটতে হয়। সঙ্গী অফিসারদের নিয়ে মেজর খালেদ মোশাররফ ও মেজর জিয়া আগরতলায় চলে আসেন। কর্নেল ওসমানীর সঙ্গে আমার আগরতলায় পরিচয় হয়। ট্রান্সমিটার সমেত স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রও উঠে আসে আগরতলায়। কিন্তু এর প্রচার শক্তি এত সীমাবদ্ধ ছিল যে, কর্মীদের আপ্রাণ প্রচেষ্টার ফল ঘরে ঘরে পৌঁছতে পারেনি। পরে ড: ত্রিগুনা সেন যখন আগরতলা সফরে আসেন, তখন তাঁকে আমরা অনুরোধ জানিয়েছিলাম আমাদের বেতারের জন্য শক্তিশালী ট্রান্সমিটার সরবরাহ করতে।
&nbsp;
আগরতলায় থাকতে একদিন দৈনিক ‘স্টেটসম্যান’ পত্রিকায় খবর দেখলাম যে, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলরকে পাওয়া যাচ্ছে না। ব্যাপারটা ছিল এই যে, এপ্রিল মে মাসে কাঠমুন্ডু বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক সমাবর্তন উৎসবে আমার প্রধান অতিথি হিসেবে ভাষণ দেবার কথা ছিল। নেপালি কর্তৃপক্ষ তাই পাকিস্তান সরকারকে আমার বিষয়ে লিখেন।  পাকিস্তান সরকার জানান যে,আমাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কাঠমুন্ডুর কর্তৃপক্ষীয় সূত্রে খবরটা ঐভাবে প্রকাশ পায়। পরে পাকিস্তান সরকার অনেক শরণার্থী সম্পর্কে ভারত সরকারকে লিখেছিলেন যে, দুষ্কৃতকারীরা তাদের ধরে ভারতে নিয়ে গেছে, এসব ব্যক্তিদের খুঁজে বের করে পাকিস্তান সরকারের কাছে ফিরিয়ে দেয়া হোক। এই তালিকায় অবশ্য আমার নাম ছিল না।
&nbsp;
মে মাসের প্রথম দিকে জনাব আব্দুল মালেক উকিল কলকাতা থেকে এক সন্ধ্যায় আগরতলায় আমার বাসায় আসেন। তিনি বললেন,প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ আমাকে ডেকে পাঠিয়েছেন,তাঁর সঙ্গে দিল্লী যাবার জন্য।  উকিল সাহেব আমার কলকাতা যাবার বিমানের টিকিটও নিয়ে এসেছিলেন। পারিবারিক ব্যবস্থা সাঙ্গ করে কলকাতায় পৌছতে আমার দুই দিন বিলম্ব হয়। তাজউদ্দিন সাহেব দিল্লী চলে গিয়েছিলেন,আমার আর তখন যাওয়া হল না। এখানে উল্লেখ করতে চাই, মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতে অবস্থানকালে সপরিবারে আমার ব্যয় নির্বাহের  জন্য গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার আমাকে আর্থিক সাহায্য প্রদান করতে প্রস্তুত ছিলেন কিন্তু তা আমি গ্রহণ করিনি। দেশের বাইরে অবস্থানরত আত্মীয়স্বজন,ছাত্র-ছাত্রী ও বন্ধুবান্ধবের নিকট হতে প্রাপ্ত সাহায্যসামগ্রী দিয়েই আমি সংগ্রামের দিনগুলি কাটিয়েছি।
&nbsp;
কলকাতা পৌঁছে বাংলাদেশ মিশন অফিসে আমাকে নেয়া হয়। হোসেন আলী তখন বাংলাদেশ সরকারের আনুগত্য প্রকাশ করে এই মিশনের অস্থায়ী প্রধানের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। তিনি আমাকে বললেন,বিদেশে অবস্থানরত বিচারপতি আবু সায়ীদ চৌধুরীকে টেলিফোনে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে কাজে যোগদানের অনুরোধ জানাতে। কলকাতায় তাঁদের ধারনা ছিল, বিচারপতি চৌধুরী এখনো দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্যে আছেন। টেলিফোন বুক করা হল। কিন্তু লাইন পাওয়া গেল না। শেষে তাঁর কাছে পাঠানোর জন্য আমি ম্যাসেজ রেখে গেলাম যে, আমি এসে গেছি উনি যেন বাংলাদেশের সমর্থনে কাজ করতে নেমে যান।
&nbsp;
কলকাতায় এসে আমার প্রথম কাজ হয় বাংলাদেশ লিবারেশন কাউন্সিল অব ইন্টেলিজেন্টসিয়া  গঠন করা।  দেশের যেসব বুদ্ধিজীবী,শিল্পী ও অন্যান্য সংস্কৃতিকর্মী ততদিনে কলকাতায় শরণার্থী  হয়েছেন, তাঁদের সংগঠিত করে মুক্তি সংগ্রামের পক্ষে কাজ করা ছিল এর উদ্দেশ্য। আমি সভাপতি নির্বাচিত হই, জহির রায়হান নির্বাচিত হন সাধারণ সম্পাদক।  সৈয়দ আলী আহসান, সারওয়ার মুর্শিদ, ব্রজেন দাশ, ফয়েজ আহমদ, কামরুল হাসান প্রমুখ এই কমিটি তে ছিলেন। প্রথম দিকে এই কমিটির কর্মকর্তাদের কয়েকটি সভা অনুষ্ঠিত হয় আমার প্রাক্তন ছাত্রী, সেসময়ে লরেটো কলেজের অধ্যাপিকা ডঃ পি সি ঘোষ এর বাসভবনে। তিনি এবং তাঁর স্বামী কমল ঘোষ ব্যক্তিগতভাবেই কমিটির কর্মকর্তাদের আপ্যায়ন এবং সভার অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচাদির ব্যয়ভার বহন করতেন। এই বুদ্ধিজীবী সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে নেতাজী রিসার্চ ইন্সটিটিউটে বাংলাদেশ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের কাজ শুরু হয়। এখানে আমার দুই মেয়ে এমি ও রানা তথ্য সংগ্রহের ব্যাপারে স্বেচ্ছাসেবিকা হিসেবে কাজ করে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটভূমি, মুক্তিযুদ্ধের গতি, শরণার্থীদের অবস্থা প্রভৃতি বিষয়ে তথ্য সংগৃহীত হয়। অরুপ চৌধুরীর অফিসও এই পরিষদের কাজে এবং পরবর্তীতে স্থাপিত শিক্ষক  সমিতির কাজে ব্যবহার করা হয়। পরে বাংলাদেশের শিল্পীদের দিয়ে বিভিন্ন স্থানে সঙ্গীতানুষ্ঠান ও প্রচারমূলক  বক্তৃতাদানের ব্যবস্থাও হয় পরিষদের উদ্যোগে। এর কাজে কলকাতার মৈত্রেয়ী দেবী, গৌরী আইয়ুব, বিচারপতি মাসুদ এবং অধ্যাপক আব্দুল ওয়াহেদ মাহমুদ খুব সাহায্য করেছিলেন।
&nbsp;
ইতিমধ্যে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক সত্যেন্দ্রনাথ সেনকে সভাপতি করে ও দিলীপ চক্রবর্তীকে সাধারণ সম্পাদক করে গঠিত হয় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ সহায়ক সমিতি। এঁদের উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষভাবে সহায়তা করা এবং বাংলাদেশের শরণার্থী শিক্ষকদের নানাভাবে সাহায্য করা। আমি কলকাতা এলে এঁদের সঙ্গে আমার যোগাযোগ হয়। আলাপক্রমে স্থির হয় যে বাংলাদেশের শিক্ষকদের একটা সংগঠন থাকলে উভয় পক্ষেই কাজের সুবিধা হবে। আমি তখন এই কাজের উদ্যোগ নেই নিই। আনিসুজ্জামানকে আগরতলা থেকে ডেকে পাঠাই এবং কয়েক দিনের প্রস্তুতির পর দ্বারভাঙ্গা  হলে বাংলাদেশের সকল পর্যায়ের শিক্ষকদের এক সভা আহবান করি। কয়েক হাজার শিক্ষক এই এই সভায় যোগদান করেন। সভায় অন্যান্যদের মধ্যে জনাব কামরুজ্জামানও বক্তৃতা দেন। সভার সভাপতিরুপে আমি যে ভাষণ দিয়েছিলাম তা পরে কলকাতা বেতার থেকে প্রচারিত হয়। এই সভায় আমাকে সভাপতি ও আনিসুজ্জামানকে সাধারণ সম্পাদক করে বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি গঠিত হয়। সহ-সভাপতিদের মধ্যে ছিলেন  সৈয়দ আলী আহসান, সারওয়ার মুর্শিদ ও জনাব কামরুজ্জামান (এমপি)।
&nbsp;
‘লিবারেশন কাউন্সিল অব ইন্টেলিজেন্টসিয়া’ গঠন করা নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে একটু ভুল বোঝাবুঝি হয়েছিল। কেউ কেউ সরকারকে এমন ধারণা দিয়েছিলেন যে সরকারী যে উদ্যোগের বাইরে যেভাবে আমরা এই পরিষদ গঠন করেছি তাতে সরকারের সঙ্গে অসহযোগের সম্ভাবনাই বেশী থাকবে। আমাদের মধ্যে আবার কেউ কেউ এমন ধারনা করেছিলেন যে সরকার এক ধরনের দলীয় নিয়ন্ত্রণ আমাদের ওপরে আরোপ করতে যাচ্ছেন। শিক্ষক  সমিতি গঠনের পূর্বমুহূর্তেও আবার এ ধরনের একটা ভাবের সৃষ্টি হয়। ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলাম এমপি ও জনাব কামরুজ্জামান এমপি’র মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন এক সন্ধ্যায় আমাকে ও আনিসুজ্জামানকে  ডেকে পাঠান। তিনি বলেন যে, আনিসুজ্জামান প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয়ে যুক্ত থাকলে তাঁর কাজে সুবিধা হবে অতএব তাঁকে যেন শিক্ষক সমিতিতে বড় দায়িত্ব না দেয়া হয়। আমিরুল ইসলাম ও একই বক্তব্য সমর্থন করেন। কিন্তু আমরা আগে থেকে যেভাবে ভেবে এসেছিলাম তার ফলে এই প্রস্তাবে সম্মত হইনি।  পরবর্তীকালে বাংলাদেশ সরকার পরিকল্পনা সেল গঠন করলে ডঃ মুজাফফর আহমদ, ডঃ সারোয়ার মুর্শিদ, ডঃ মোশাররফ হোসেন ও ডঃ স্বদেশ বসুর সঙ্গে ডঃ আনিসুজ্জামানকে তার সদস্য করা হয় তখন আনিসুজ্জামান শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব ত্যাগ করেন এবং সেই ভার অর্পিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের  ডঃ অজয় রায়ের ওপরে।
&nbsp;
শিক্ষক সমিতির কাজ ছিল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ সহায়ক সমিতির সঙ্গে মিলে বাংলাদেশের শরণার্থী শিক্ষকদের সাহায্য করা, শরণার্থী শিবিরে প্রাথমিক পর্যায়ে বিদ্যালয় চালানো, প্রচার পুস্তিকা প্রণয়ন করা, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে শিক্ষকদের কাছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রতি সমর্থন চেয়ে পত্র লেখা ও পুস্তিকা প্রেরণ করা এবং ভারতের বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযুদ্ধের প্রতি প্রচারাভিযান চালানো।  বহু শিক্ষককে আমরা সহায়ক সমিতির তহবিল থেকে সাহায্য করতে পেরেছিলাম, শরণার্থী শিবিরে কিছু কিছু বিদ্যালয় খুলে বালক-বালিকাদের মধ্যে একটা শৃঙ্খলা রাখার ও শিক্ষকদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা গিয়েছিল। কয়েকটি পুস্তিকা আমরা প্রকাশ করেছিলাম ইংরেজিতে তার মধ্যে  ‘পাকিস্তানবাদ ও বাংলাদেশ’ সম্পর্কে ওসমান জামালের লেখা একটি পুস্তিকা এবং বাংলাদেশ গণহত্যা সম্পর্কে একটি সচিত্র পুস্তিকা উল্লেখযোগ্য। পৃথিবীর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবীণ শিক্ষকদের কাছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে আমরা চিঠি  লিখি এবং আশাব্যঞ্জক ও সমর্থনসূচক উত্তর পাই। অস্ট্রেলিয়া ন্যাশনাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এ এল বাসামকে লেখা আমার চিঠি, তিনি আমার অনুমতি নিয়ে সাইক্লোষ্টাইল করে সে দেশের প্রধান মন্ত্রী ম্যাকলম ফ্রেজারসহ অনেক নেতাকে পাঠান এবং আমাদের অস্থায়ী সরকারকে স্বীকৃতি দিতে অনুরোধ করেন। আমেরিকা ও লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক পরিচিত অধ্যাপকের কাছে লিখা আমার চিঠি মোটামুটি একই ভাবে ব্যবহার করা হয়।
&nbsp;
ভারতে আমরা যে প্রচারাভিযান চালাই, তার প্রথম পর্বের সম্পূর্ণ উদ্যোগ ছিল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ সহায়ক সমিতির। এই সমিতির দিলীপ চক্রবর্তী, সৌরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য, অনিল সরকার (বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের সাহায্য-সহায়তায় অনিলের গভীর আবেগ নিয়ে জড়িয়ে পড়ার একটি উদাহরণ আমি এখানে উল্লেখ করতে চাই। এক পর্যায়ে শরণার্থী শিক্ষকরা যখন আর কোথাও আশ্রয়ের স্থান পাচ্ছেন না, তখন তিনি নিজ বাসগৃহ তাঁদের থাকার জন্য ছেড়ে দিয়ে শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে ওঠেন এবং তাঁর স্ত্রী প্রতিদিন ভোরে ঐ বাড়িতে এসে রান্নাবান্না ও তাঁদের খাওয়ানোর কাজ সেরে রাত ন’টার পর তাঁর পিতার বাসায় ফিরতেন), ডঃ অনিরুদ্ধ রায় ও বিষ্ণুকান্ত* শাস্ত্রীকে নিয়ে আমি ও আনিসুজ্জামান এলাহাবাদ, আলীগড়, লক্ষ্ণৌ, আগ্রা ও দিল্লী সফর করি। এসব শহরের বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গন ছাড়াও আমরা বিভিন্ন জনসভায় বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের ওপর বক্তৃতা দেই। আমাদের সংগে সুবেদ আলী (এম,পি,এ) যোগ দেন। তিনি প্রয়োজনমত উর্দুতে আমার ইংরেজি বক্তৃতার অনুবাদ জনসমাবেশে পেশ করতেন। বিষ্ণুকান্ত বলতেন হিন্দিতে। আনিসও  আমার মতো ইংরেজিতেই  বলতেন। আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে শুধু আমাকে বক্তৃতা করতে দেয়া হয়। সেখানকার পরিবেশ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অনুকূল ছিল না। বক্তৃতা করতে ওঠার আগে সে সম্পর্কে আমি সচেতন ছিলাম। আমার বক্তৃতার পরে শ্রোতাদের অনেকেই কেঁদে ফেলেছিলেন। বক্তৃতা নাকি মর্মস্পর্শী হয়েছিল,  একথা অনেকে বলেছেন।
&nbsp;
দিল্লীতে সাহিত্য একাডেমীর প্রাঙ্গণে অধ্যাপক সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত একটি সভায় ভাষণ দিই এবং বাংলাদেশের সাহিত্য সম্পর্কে আনিসুজ্জামান বক্তৃতা দেন।
&nbsp;
বক্তৃতা দেওয়া ছাড়াও দিল্লীতে আমরা বেশ কয়েকটি ঘরোয়া আলোচনায় যোগ দেই।  কলকাতায় আসার পরে ডক্টর বরুণ দের মাধ্যমে  সিদ্ধার্থ রায়ের সঙ্গে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম সম্পর্কে আলোচনা হয়। আমার মনে হয়েছিল, তিনি তখনও আমাদের সংগ্রামের তীব্রতা অনুভব করতে পারেননি। দিল্লীতে আবার তাঁর সঙ্গে এবং শিক্ষামন্ত্রী ডঃ নূরুল হাসানের সঙ্গে শুধু আমার সাক্ষাৎ হয়। তাছাড়া আমরা অশোক মিত্র ( আই,সি,এস) ,ডঃ আশোক মিত্র  পি, এন, ধর ও পি, এন হাকসারের সঙ্গে আলাপ করি। বাংলাদেশের সকল রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি নিয়ে মুক্তিসংগ্রামের পক্ষে একটি কমিটি গঠন করার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে আমাদের বিবেচনা করা উচিত, একথা হাকসার বেশ জোর দিয়ে বলেছিলেন।  তাঁর কথা পরে আমরা আমাদের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীকে জানিয়েছিলাম।।
&nbsp;
দিল্লীতে আমরা প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সংগে সাক্ষাৎ করি।  তিনি ধৈর্য সহকারে বাংলাদেশ সম্পর্কে আমার বক্তব্য শোনেন এবং ভারতীয় সরকার ও জনগণের সঙ্গে কিভাবে যোগাযোগ রক্ষা করে আমরা মুক্তিসংগ্রামকে এগিয়ে নিতে পারি সে সম্পর্কে তার ব্যক্তিগত মত বিনিময় করেন। পরে মিসেস গান্ধী ও শিক্ষামন্ত্রী ডঃ নূরুল হাসানের সঙ্গে এ ব্যাপারে আমার বিস্তারিত আলাপ-আলোচনা হয়। এরপরে প্রতিমন্ত্রী কে, আর গণেশ আমাদের এক নৈশভোজে আপ্যায়িত করেন। সেখানে ব্রক্ষানন্দ*রেড্ডী ও নন্দিনী শতপথীর মতো রাজনীতিবিদরা ছিলেন, অনেক সাংবাদিকও ছিলেন। প্রধানত: সাংবাদিকরাই মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে বহুবিধ প্রশ্ন করেন, রাজনীতিবিদেরাও কিছু কিছু প্রশ্ন করেছিলেন।আমার উত্তর দেয়া শেষ হলে আমি কিছু প্রশ্ন করার সুযোগ পাই।  আমার প্রশ্ন ছিল ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক নেতাদের উদ্দেশ্যে, তবে আমি তা সাধারণভাবে উত্থাপন করেছিলাম। ঐ আলোচনা থেকে আমি নিশ্চিত হয়েছিলাম যে, মুক্তিযুদ্ধের সাফল্য ছাড়া শরণার্থী সমস্যার সমাধানের যে কোন সম্ভাবনা নেই একথা ভারতীয় নেতারা বোঝেন। তবে তাঁরা আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে ভাবছেন। চীন যে পাকিস্তানের হয়ে যুদ্ধ করবেনা, এ ধারণাও তাঁদের হয়েছে।  মনে হল তবুও তারা ঐ মুহূর্তে ঝুঁকি নিতে চান না এ বিষয়ে।  মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা কি হবে, এ সম্পর্কে তাঁরা খুবই সন্দিহান।  সুতরাং  ভালো করে আটঘাট না বেঁধে  তাঁরা বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিতে কিংবা বাংলাদেশের পক্ষে বড় রকম সংঘর্ষে লিপ্ত হতে চান না।
&nbsp;
সমস্ত পরিস্থিতি সম্বন্ধে আমার এবং আমাদের এসব সাক্ষাৎকারের ফলাফল  ও আমার নিজের ধারণা আমি প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন কে কলকাতায় এসে জানাই। এরপর আমি পাটনা, বোম্বাই, নাসিক, পুনা, কেরালা, জয়পুর, আজমীর ও হায়দারাবাদে জনসভায় বক্তৃতা দিতে যাই। পাটনায় যে বিশাল জনসভায় বক্তৃতা দিতে যাই সে সভায় সভাপতিত্ব করেন জয় প্রকাশ নারায়ণ এবং অন্যান্যর মধ্যে বক্তৃতা দেন বিহার প্রদেশের গভর্নর ডঃ বড়ুয়া।
&nbsp;
বোম্বের বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণেও আমি ছাত্র শিক্ষকদের সমাবেশে বক্তৃতা দিই। ঐ সভায় সভাপতিত্ব করেন বোম্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর। এখানে বাংলাদেশের দুর্গত শরণার্থীদের সাহায্যে আনুমানিক ষাট/সত্তর হাজার টাকার চেক প্রদান করা হয়। এই সাহায্য  এবং একইভাবে ভারতের বিভিন্ন জনসভায় সংগৃহীত অর্থ আমরা দাতাদের পক্ষ থেকে সরাসরি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ সহায়ক সমিতির তহবিলে জমা দেবার ব্যবস্থা করি। কোন অর্থ আমরা নিজ হাতে গ্রহণ করিনি।  বিহারে আমাদের মুক্তিসংগ্রামের পক্ষে জনসমর্থন যোগানোর ব্যাপারে তৎকালীন বিহার সরকারের বিরোধীদলের নেতা কর্পোরী ঠাকুর (পরবর্তীকালে ইনি মূখ্যমন্ত্রী হন) আমাদের সংগে বিশেষভাবে সহযোগিতা করেন। এখানে উল্লেখ্য যে, ভারতের সকল রাজনৈতিক দল বাংলাদেশের ব্যাপারে আমাদের  সঙ্গে ও তাদের সরকারের সংগে সহযোগিতা করেছে। প্রধানমন্ত্রী সবচে’ কট্টর বিরোধী নেতা রাজ নারায়ণও আমাদের সমর্থনে বিশেষ ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন। আমার এলাহাবাদ সফরকালে তিনি তার রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে এক বিরাট জনসমাবেশের আয়োজন করেন এবং সমাবেশের তোরণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের বিরাট এক প্রতিকৃতি স্থাপন করেন। দলের কর্মকর্তা আর কর্মীদের আগ্রহে আমি ঐ সমাবেশে তাদের উদ্দেশ্যে একটি ভাষণ দেই। সে সময় ভারতে বাংলাদেশের সমর্থনে এমন একটি জোয়ার এসেছিল যাতে করে সব জায়গায়, এমনকি দুর্গাপূজা মণ্ডপের প্রবেশদ্বারেও বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি টানানো দেখেছি।
&nbsp;
বোম্বেতে (বর্তমান মুম্বাই)অবস্থান কালে মহারাষ্ট্রের গভর্নর নবাব ইয়ার আলী জংগ এর সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। বাংলাদেশের সমর্থনে আয়োজিত সমাবেশে তিনি উপস্থিত হন এবং আমার বক্তৃতা শোনেন। বিভিন্ন সংগঠনের মাধ্যমে তিনি  বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের জন্য প্রচুর অর্থ, গেরিলাদের জন্য পোশাক পরিচ্ছদ ও অন্যান্য সরঞ্জামাদি সংগ্রহ করে দিয়েছিলেন। বাংলাদেশ মুক্ত হবার পর আমি যখন দিল্লিতে বাংলাদেশের হাইকমিশনার ছিলাম তখন প্রবল বৃষ্টিপাতের মধ্যে একদিন হঠাৎ নবাব ইয়ার আলী জংগ আমার বাসায় এসে উপস্থিত হন এবং বলেন যে,“বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সাহায্যের জন্য আমি যে তহবিল খুলেছিলাম তাতে প্রচুর টাকা জমা হয়েছে। যেহেতু এই টাকা আমাদের জনসাধারণ কর্তৃত্ব বাংলাদেশকে দেয়া তাই এটি আপনাকে নিতে হবে”। মহারাষ্ট্রে তখন দুর্ভিক্ষ চলছিল। সুতরাং এই বিষয়ে আমি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে কথা বলি। মহারাষ্ট্রের গভর্নর আমাকে তহবিলের যে চেক প্রদান করেন তা আমি বঙ্গবন্ধুকে পাঠিয়ে দিয়ে সমপরিমাণ টাকা বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রতীকী সাহায্য হিসেবে মহারাষ্ট্রের জনগণকে দেবার জন্য পরামর্শ দেই। অতঃপর তাই করা হয়।
&nbsp;
শিক্ষক সমিতির পক্ষ থেকে সৈয়দ আলী আহসান কে একবার বাঙ্গালোরে এবং মাজহারুল ইসলাম কে কেরালাতে বক্তৃতা দিতে পাঠানো হয়। সৈয়দ আলী আহসান, মাজহারুল ইসলাম, আনিসুজ্জামান মাঝে মাঝে স্বাধীনবাংলা বেতারকেন্দ্রের অনুষ্ঠানে অংশ নিতেন। আমিও দুবার অংশ নিয়েছিলাম।
&nbsp;
সেপ্টেম্বর মাসের তৃতীয় সপ্তাহে (১৮ থেকে ২০ তারিখ) দিল্লীতে অনুষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ সম্পর্কে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন। “ওয়ার্ল্ড মিট অন বাংলাদেশ” নামে এটি পরিচিত হয়। এর প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন জয়প্রকাশ নারয়ণ। সেখানে ২৪ টি দেশের ১৫০ জন প্রতিনিধি সমবেত হন। বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলের নেতারূপে আমি এই সম্মেলনে যোগ দেই। অন্যান্যদের মধ্যে সৈয়দ আলী আহসান, মওদুদ আহমদ ও আজিজুর রহমান প্রতিনিধি দলের সদস্য ছিলেন। বাংলাদেশ সম্পর্কে একটি আলোকচিত্র প্রদর্শনীও এই উপলক্ষে আয়োজিত হয়। আমি তা উদ্বোধন করি। এই সম্মেলন খুব সফল হয় এবং বিশ্ব জনমত গঠনে আনুকূল্যও সৃষ্টি হয়। এই সম্মেলনের সাফল্যের পিছনে গান্ধী ফাউন্ডেশনের বেশ অবদান আছে। এখানে অমরেশ সেন এর ভূমিকা ও তৎপরতা উল্লেখযোগ্য। এখানে একটা ঘটনার কথা আমার মনে পড়ে। নেপালের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী বি পি কৈরালা, অমরেশ সেন এর বাসায় গোপনে আমার সঙ্গে দেখা করেন এবং আমাদের মুক্তি সংগ্রামে গুর্খাদের স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে অংশগ্রহণের প্রস্তাব দেন। সেসময় তিনি ভারতে আশ্রিত ছিলেন বলে তার এই প্রস্তাব গ্রহণ করা সম্ভব নয়, একথা তাকে জানাই। তবে তার এই আগ্রহের কথা আমি প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ কে জানানোর আশ্বাস দেই। পরবর্তীকালে এই কথা তাজউদ্দীন আহমেদকে জানালে তিনি এই ব্যাপারে আমার সঙ্গে ঐক্যমত প্রকাশ করেন যে, ভারতে আশ্রিত কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সহায়তা নেয়া আমাদের উচিত হবে না।
&nbsp;
দিল্লীর আন্তর্জাতিক সম্মেলন শেষ করেই আমি নিউ ইয়র্ক  এর পথে রওনা হয়ে যাই। বাংলাদেশের জাতিসংঘ  সদর দপ্তরে প্রচারকার্য চালানো ও আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ের জন্য বাংলাদেশ সরকার তখন বিচারপতি আবু সাইদ চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি ১৫ সদস্যের প্রতিনিধি দল প্রেরণ করে। আমি এই দলের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম। শিক্ষকদের মধ্যে রেহমান সোবহানও ছিলেন। রাজনীতিবিদদের মধ্যে আবদুস সামাদ আজাদ, এ আর সিদ্দিকী, ফণি মজুমদার, সিরাজুল হক আর ছিলেন সৈয়দ আবদুস সুলতান, ডাঃ আসহাবুল হক এবং ফকির সাহবুদ্দীনের মত সংসদ সদস্য। এস এ করিম, আবুল ফাতাহ ও এ, এম, এ মুহিতের মতো বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্য ঘোষণাকারী প্রাক্তন পাকিস্তানী কূটনীতিবিদ। আমাদের এই প্রচেষ্টার সাফল্য সম্পর্কে অনেকেই অবহিত আছেন।
&nbsp;
জাতিসংঘের অন্যান্য কয়েকটি রাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতি পর্তুগালের সহানুভূতি ও সমর্থন আদায় ও  আমার কার্যাবলীর অন্তর্ভুক্ত ছিল। একদিন আমি জাতিসংঘ ভবনে পর্তুগীজ দূতের সঙ্গে বাংলাদেশ সম্পর্কে আলাপ করছি,  তাঁকে আমাদের সংগ্রামের পটভূমি বিশদভাবে বুঝাচ্ছি ঠিক সে সময় আমাদের সামনে দিয়ে হলের ভিতরে যাচ্ছেন পাকিস্তানী প্রতিনিধিদলের সদস্য শাহ আজিজুর রহমান, মাহমুদ আলী, রাজিয়া ফয়েজ প্রমুখ। এঁরা যাবার সময় পর্তুগীজ দূত আমাকে আঙ্গুলের ইশারায় বললেন, ঐ দেখুন, আপনাদের প্রতিপক্ষরাও যাচ্ছেন। রাজিয়া ফয়েজ আমার পূর্বপরিচিতা ছিলেন। তিনি আমাকে দেখে আমার কাছে এসে হোটেলে আমার ঠিকানা জানতে চাইলেন এবং রাত দশটার পর আমার সঙ্গে দেখা করবেন, বললেন। নির্ধারিত সময়ে তিনি জনৈক ব্যক্তির সঙ্গে এসে আমার সঙ্গে দেখা করেন। তিনি আমাকে এই বলে বোঝাতে চেষ্টা করেন যে, আপনার মত আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শিক্ষাবিদ যাঁদের সঙ্গে কাজ করছেন তাঁদের নেতা হলেন তাজউদ্দিন প্রমুখ ব্যক্তি। আমি বললাম তাঁরা জনগণের প্রতিনিধি। গণপ্রতিনিধিরা আমার চাইতে বেশী সম্মানের দাবিদার। সব দেশে তাঁরাই সরকার প্রতিষ্ঠা করেন। আমাদের বেলায়ও তাই হয়েছে। দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে আমরা লিপ্ত আছি। কে বেশী সম্মানিত কে কম সম্মানিত এ প্রশ্ন এখানে ওঠে না। তাঁকে আমি বলি, আমার দৃঢ় বিশ্বাস, দেশ স্বাধীন হবে এবং তা আর বেশীদিন বাকী নেই। বাংলাদেশের গেরিলাদের হাতে প্রতিদিন যত পাক সৈন্য মারা যাচ্ছে তাদের সংখ্যা পাকিস্তান সরকার গোপন করতে চাইলেও বিদেশী সাংবাদিকরা তাদের হতাহতের যে সংবাদ দিচ্ছেন তাতে বাংলাদেশের জয়ের সম্ভাবনা সম্পর্কে আমি নিশ্চিত। তখন তিনি ও অধিক হারে পাক সৈন্য ক্ষয়ের কথা স্বীকার করলেন। আমি তাঁকে আবার প্রশ্ন করি, আপনার এই শারীরিক অবস্থায় আপনি কিভাবে এসেছেন ? উল্লেখ্য যে তিনি সন্তানসম্ভবা ছিলেন। তিনি জানান, ইয়াহিয়ার সামরিক সরকারের চাপে আমাকে অনিচ্ছা ও অসুবিধা সত্ত্বেও আসতে হয়েছে। সন্তান ধারণের ৭ মাস অতিবাহনের মেডিক্যাল সার্টিফিকেট  প্রদান করা সত্ত্বেও আমাকে অব্যাহতি দেয়া হয়নি। দেশ স্বাধীন হবার পর অন্যান্যদের সঙ্গে যখন তাঁকেও বাংলাদেশের বিরোধিতা করার কারণে জেলে পাঠানো হয়েছিল তখন তাঁর স্বামী ও তাঁর বোন আমার কাছে আসেন তাঁর মুক্তির ব্যাপারে বলার জন্য। আমি বঙ্গবন্ধুর কাছে তাঁর সম্পর্কে একথার ওপর জোর দিয়ে বলি যে, তিনি ইচ্ছার বিরুদ্ধে নিউইয়র্ক গিয়েছিলেন, অতঃপর অন্যান্যদের সঙ্গে তিনিও জেল থেকে মুক্তি পান।
&nbsp;
জাতিসংঘে দায়িত্বপালনের সঙ্গে সঙ্গে আমি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের আমন্ত্রণে বাংলাদেশ সম্পর্কে শিক্ষক, ছাত্রদের সমাবেশ ও জনসভায় বক্তৃতা করি। প্রসংগতঃ উল্লেখ যে,এ সময়ের ১০ বৎসর পূর্বে আমেরিকার এক বিখ্যাত ও প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছিলাম (পেনসিলভেনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে দক্ষীণ এশীয় ইতিহাস বিভাগের প্রফেসর) এবং তার আগে ও পরে আমেরিকাতে বিভিন্ন সেমিনার ও কনফারেন্সে যোগ দিয়েছিলাম। এর ফলে ঐ দেশের বহু শিক্ষক ও শিক্ষাবিদ আমার পরিচিত ছিলেন। অনেকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব ছিল। তাঁদের মধ্যে কয়েকজন উদ্যোগী হয়ে আমার জন্য এ রকম বিশেষ প্রোগ্রাম এর ব্যবস্থা করেন। এতে বাংলাদেশ সরকারের কোন অর্থ ব্যয় হয়নি।  তবে আই, আর, সি নামক একটি আন্তর্জাতিক সংস্থাও এখানে কিছুটা সহায়কের ভূমিকা পালন করেছিল।
&nbsp;
যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত আমার প্রাক্তন ছাত্র জে, আর খান এ- সময়ে আমার সচিবের কাজ করেন। আমি বক্তৃতা দিই নিউইয়র্ক, কলাম্বিয়া, পেনসিলভানিয়া, স্ট্যানফোর্ড, বার্কলে লংবীচ, শিকাগো, বাফেলা, প্রিন্সটন, মিশিগান, নর্থ  ক্যারোলাইন, হার্ভার্ড, বষ্টন, ইয়েল প্রভৃতি বিশ্ববিদ্যালয়ে। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে মোটামুটিভাবে আমার কর্মসূচি হতো স্থানীয় রেডিও টিভি সাংবাদিকদের কাছে সাক্ষাৎকার প্রদান, মধ্যাহ্নের ফ্যাকাল্টি সদস্যদের সমাবেশে বক্তৃতা দেয়া এবং অপরাহ্নে উন্মুক্ত স্থানে ছাত্র সমাবেশে  বাংলাদেশের ওপর বক্তৃতা দিয়ে সমর্থনের আহবান জানানো। উল্লেখ্য যে, এরূপ অনেক ক্ষেত্রে আমার বক্তৃতার পর শ্রোতারা মার্কিন সরকারের নীতির বিরুদ্ধে বক্তৃতা দিতেন। সেটি আমাদের জন্য একটা অত্যন্ত উৎসাহব্যঞ্জক পরিস্থিতি বলে বিবেচিত হতো। আমার সঙ্গে প্রায়ই থাকতেন ডাঃ আসহাবুল হক। তাছাড়া আমার অনুরোধে ও প্রয়োজনে বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী, সৈয়দ আবদুস সুলতান, ডাঃ আসহাবুল হক, সিরাজুল হক প্রত্যেকে এক একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা করেন। সংসদ সদস্য সিরাজুল হককে আমি পাঠিয়েছিলাম টেক্সাসে। তিনি বক্তৃতা দিয়ে আসার পরপরই সেখানে পাকিস্তানের পক্ষে বক্তৃতা দিতে যান ডক্টর ফাতেমা সাদেক। তারপর সেখানকার বাঙালিরা আমাকে সত্বর টেক্সাসে গিয়ে বাংলাদেশের পক্ষে বক্তৃতা করার জন্য তাগাদা দেন। আমি ছোট্ট একটি প্রাইভেট বিমানে টেক্সাসে যাই এবং এক ছাত্র শিক্ষক সমাবেশে বক্তৃতা দেই। এখানে অনেক পাকিস্তানী ছিলেন যাদের অনেক প্রশ্নের উত্তর তাৎক্ষণিকভাবে দিতে হয়েছে। আমি যখন বাংলাদেশে পাকিস্তানী সামরিক বাহিনীর বর্বরতার নজীরগুলি একের পর এক উল্লেখ করতে থাকি তখনই প্রশ্ন করা বন্ধ হয়ে যায়। এই সভায় ২/৩  জন আমেরিকানও আমাদের সপক্ষে বক্তৃতা দিয়েছিলেন বলে আমার মনে পড়েছে।
ফিলাডেফিয়াতে গভীর ঔৎসুক্য ছিল বাংলাদেশ সম্পর্কে। তার প্রধান কারণ পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক থাকাকালীন আমার যারা ছাত্র বা গুণগ্রাহী ছিলেন তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন বিশ্ববিদ্যালয় বা ঐ এলাকার বিভিন্ন কলেজ শিক্ষক ছিলেন। আমার সময়কার অনেক অধ্যাপকও সেখানে তখন কর্মরত ছিলেন। এসব কারনে বাংলাদেশ লবি ওখানে খুবই শক্তিশালী ছিল। ফলে পাকিস্তানের জন্য মার্কিন সমরাস্ত্রবাহী জাহাজ সেখানে প্রতিবাদকারীরা ঘেরাও করেছিলেন ছোট ছোট স্পীড বোট নিয়ে। এখানে আমার অনেক প্রাক্তন সহকর্মী অধ্যাপকদের সংগে দেখা হয় এবং যোগাযোগ স্থাপিত হয়। যেমন অধ্যাপক নর্মান ব্রাউন,  অধ্যাপক  হোলডেন ফারভার, রিচার্ড ল্যামবার্ট প্রমুখ। হার্ভার্ড ডক্টর কিসিঞ্জারের এক সহকারী আমার বক্তৃতার পর পাকিস্তানের পক্ষ নিয়ে খুব তর্ক করেছিলেন, কিন্তু শ্রোতাদের ওপর কোন প্রভাব বিস্তার করতে পারেননি। মার্কিন জনমত তখন বাংলাদেশের অনুকূলেই ছিল, যদিও মার্কিন সরকারের মনোভাব ছিল এর উল্টো। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার বক্তৃতায় ছাত্র, শিক্ষক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরের লোক উপস্থিত থাকতেন এবং বেতার-টেলিভিশনে তা প্রচারিত হত। তাছাড়া বিভিন্ন শহরে স্থানীয় রেডিও-টেলিভিশন এবং সংবাদপত্রের লোকজন আমার সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন। বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া কয়েকটি কলেজেও আমি বাংলাদেশ ওপর বক্তৃতা দেই।
সময়সংক্ষেপ করার জন্য আমার যাতায়াত ব্যবস্থা হয় প্রধানত: উড়োজাহাজে।  প্রায় বিশ্ববিদ্যালয়েই আমি প্রথমে ফ্যাকাল্টি ক্লাব এবং পরে ছাত্র-ছাত্রীদের সমাবেশে ভাষণ দিই। উড়োজাহাজে ভ্রমণ সূচী এমনভাবে প্রণীত হয় যে,আমি প্রায়  প্রত্যেক দিনই একটা না একটা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে হাজির হতে পেরেছি। এ কর্মসূচী প্রণয়নে জে, আর, খান অত্যন্ত পারদর্শিতার প্রমাণ রেখেছেন।  এসব অনেক প্রোগ্রামে কুষ্টিয়া প্রতিরোধ সংগ্রামের নেতৃত্ব দানকারী ডা: আসহাবুল হক আমার সঙ্গে ছিলেন।
&nbsp;
নিউইয়র্কে অবস্থানকালে কয়েকজন আইনজ্ঞ ও অস্ত্র ব্যবসায়ী গোপনে আমার সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অস্ত্র সরবরাহের প্রস্তাব দেন। প্রস্তাবিত অস্ত্রশস্ত্রের মূল্য পরে পরিশোধ করলেও চলবে বলে তাঁরা আমাকে জানান। তাঁরা আরো প্রস্তাব দেন যে, অনুমতি দেয়া হলে, তাঁরা বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানী কারাগার হতে কমান্ডো অভিযানের মাধ্যমে মুক্ত করার চেষ্টা করবেন। আমার সংশয় ছিল এটি পাকিস্তানি ষড়যন্ত্রের কোন অংশ হতে পারে। যদি তারা তাদের কথায় খাঁটি হয় তাহলেও গোপনভাবে অস্ত্র সরবরাহের সময় অস্ত্র শত্রুর হাতে পড়তে পারে। আর কমান্ডো অভিযানের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুকে মুক্ত করতে গেলে তাঁর জীবনের ওপরে ঝুঁকি আসার আশংকা অধিক। এসব ভেবে আমি তাদের জানালাম এটি আমার এখতিয়ার বহির্ভূত বিষয়। আমি তাঁদের ধন্যবাদ জানিয়ে বললাম দরকার হলে অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকার আপনাদের কাছ থেকে অস্ত্র নেবে। এরপর অল্পকালের মধ্যে দেশ স্বাধীন হয়ে যাওয়ায় এ ব্যাপারে আর অনুসন্ধান করার প্রয়োজন হয়নি।
&nbsp;
যেসব মার্কিন সিনেটর বাংলাদেশের পক্ষে কথা বলতেন, আমি তাঁদের কয়েকজনের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করি। সিনেটর কেনেডির সঙ্গে আমার কলকাতায় সাক্ষাৎ হয়েছিল, তবু আবার তাঁর সঙ্গে দেখা করে তাঁর প্রচেষ্টার জন্য ধন্যবাদ জানাই। সিনেটর স্যক্সবী ও সিনেটর চার্চের সঙ্গেও বাংলাদেশের সর্বশেষ পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করি। স্যাক্সবীর এক ছেলে (স্যাক্সবী জুনিয়র)  আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনের ব্যাপারে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছেন।
&nbsp;
যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় সফররত অবস্থায় আমার সঙ্গে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন স্থপতি ড: ফজলুর রহমান খানেরও শিকাগোতে সাক্ষাৎ হয়। তিনি বাংলাদেশের পক্ষে সেখানে এক বলিষ্ঠ লবির সৃষ্টি করেন। বাংলাদেশ আন্দোলনের  প্রচার কার্যে তার আর্থিক অবদান ও ছিল বিরাট।  আমি এক রাতের জন্য তাঁর অতিথি ছিলাম। শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের আমার এক বন্ধু অধ্যাপক ডিমকও বাংলাদেশ আন্দোলনের পক্ষে সহায়ক শক্তি হিসেবে প্রচুর কাজ করেছিলেন।
&nbsp;
লংবীচে আমার মনে পরে, একটি সমাবেশে ভাষণ দেবার পর বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সেতার বাদক রবি শঙ্কর-এর সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়। তিনি আমাকে তাঁর বাসায় নিয়ে যান এবং যে যন্ত্র সংগীতের মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের জন্য অর্থ সংগ্রহ করছিলেন তার একটি রেকর্ড আমাকে উপহার দেন।
&nbsp;
বস্টন ও হার্ভার্ডে বিমানবন্দরে আমাকে রিসীভ করার জন্য উপস্থিত ছিলেন আমাদের কয়েকজন সিভিল সার্ভিসের সদস্য। তাঁরা আমার সঙ্গে বিভিন্ন জনসভায় উপস্থিত ছিলেন তাঁদের মধ্যে আমার ঘনিষ্ঠ  পরিচিত জনাব খুরশিদ আলম একটি সভায় সভাপতিত্ব করেছিলেন। ডঃ মহিউদ্দীন আলমগীরও যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পক্ষে জনসমর্থনের উদ্দেশ্যে আয়োজিত বিভিন্ন সভা ও অনুষ্ঠানের একজন বিশেষ উদ্যোক্তা ছিলেন। আমার জন্য তার সযত্ন আতিথ্যের কথাও আমার মনে আছে।
&nbsp;
নভেম্বরের শেষের দিকে নিউইয়র্ক থেকে কলকাতায় ফেরার পথে লন্ডনে বাংলাদেশীদের সমাবেশেও আমি বক্তৃতা দেই। সেখানে বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী এবং প্রবাসী বাঙালিদের বিভিন্ন সংগঠন ও সংস্থার  সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ স্থাপিত হয়। সেখানে বাঙালিরা যথেষ্ট মনোবল নিয়ে কাজ করছিলেন।  বস্তুত: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সর্বত্র এবং লন্ডনে বাঙালি সমাজের মধ্যে ঐক্যের যে বোধ, সংগ্রামের যে সংকল্প এবং ত্যাগ স্বীকারের যে মনোভাব আমি লক্ষ্য করি, তাতে মুক্তিযুদ্ধের পরিণাম ও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে বলিষ্ঠ আশার সঞ্চার হয়। লন্ডন ছাড়া ব্রিটেনের লিভারপুল,  অক্সফোর্ড, ক্যামব্রিজ ইত্যাদি স্থানে এবং ইউরোপের বিভিন্ন শহরে গিয়ে আমার বক্তৃতা দেবার কথা ছিল।  কিন্তু এটা আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল যে, আমরা সংগ্রামের শেষ পর্যায়ে পৌঁছে গেছি এবং বাংলাদেশ আন্দোলনকে কেন্দ্র করে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে তাতে পাকিস্তান শীঘ্রই ভারতের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে পড়বে। পাকিস্তানের পক্ষে এর একটি কৌশলগত ধারণা ছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে পাক-ভারত যুদ্ধ হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিপন্ন করতে পারলে বাংলাদেশ প্রশ্ন চাপা পড়ে যাবে। পরবর্তীকালে নিরাপত্তা পরিষদে ভুট্টোর বক্তৃতা (হাজার বছর ধরে ভারতের সঙ্গে যুদ্ধের অঙ্গীকার)  আমার এই ধারনা যে ঠিক ছিল তার প্রমাণ বহন করে। যাহোক, উপমহাদেশে সর্বাত্মক যুদ্ধ  শুরু হয়ে যাবার আসন্ন অবস্থার দরুন আমার উক্ত সফরসূচী বাতিল করে দিল্লী হয়ে আমি কলকাতা ফিরে আসি।
&nbsp;
কলকাতায় ফেরার অল্পকাল  মধ্যেই মুক্তিযুদ্ধের সর্বশেষ পর্যায় শুরু হয়ে যায়। ঐ সংকট মুহূর্তে ইন্দিরা গান্ধী কলকাতার জনসভায় যে বক্তৃতা করেন,তা আমি বেতারে শুনি ঘরে বসে। সত্যি বলতে কি, সে বক্তৃতা শুনে আমি আশাহত হয়েছিলাম। কেননা আমার আশা হয়েছিল যে, ঐ সময় হয়তো বাংলাদেশকে স্বীকৃতিদানের বিষয়ে তিনি কিছু বলবেন। তারপর সেই রাতেই আকস্মিকভাবে  ভারতের ওপর পাকিস্তানী হামলার সংবাদ শোনা গেল। এর পরপরই ভারতীয় সৈন্য মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মিলিত বাহিনীর দ্রুত অগ্রগতি সত্ত্বেও মনে হচ্ছিল আরো তাড়াতাড়ি এরা ঢাকায় এসে পৌঁছাতে পারছে না কেন। তারপর যেদিন পাকিস্তানীদের আত্মসমর্পণের সংবাদ হলো সেদিন দেখলাম বড়দিনের আরো কিছু দেরী আছে। উল্লেখ্য, সিদ্ধার্থ সংকর রায়কে আমি খ্রীষ্টমাসে স্বাধীন বাংলাদেশে আসার অগ্রিম আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম গত জুন মাসে।
&nbsp;
মুক্তিলাভের এই আনন্দ দ্রুত ম্লান হয়ে গেল ঢাকায় বুদ্ধিজীবী হত্যার সংবাদে। আমার কত আপনজনই না দেশদ্রোহীদের ষড়যন্ত্রে অকালে শহীদ হয়েছেন। তবু বারবার নিজেকে বলেছি, এত শহীদ, এত আত্মত্যাগীর মর্যাদা যেন আমরা রক্ষা করতে শিখি স্বাধীন বাংলাদেশে।
&nbsp;
দখলদার বাহিনীর আত্নসমর্পনের পর প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ আমাকে বলেন যে, আপনি বয়োজ্যেষ্ঠ শিক্ষাবিদ, ছাত্র-যুবক, মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে অনেকেই আপনার প্রত্যক্ষ ছাত্র। তারা আপনার কথা শুনবে। বিজয়ের পর প্রত্যেকে যাতে আইন নিজের হাতে তুলে না নেয় এবং সমাজে বিশৃঙ্খলা না ঘটে সেজন্য স্বাধীন বাংলা বেতারে আপনি একটা বক্তৃতা দিন। দালাল, রাজাকার এবং বাংলাদেশের বিরুদ্ধাচরণ যারা করেছে বাংলাদেশ সরকার তাদের শাস্তি প্রদান করবে বিশেষ আদালতে। তাজউদ্দিন সাহেবের এই পরামর্শে উপরোক্ত আহবান জানিয়ে আমি স্বাধীন বাংলা বেতারে বক্তৃতা দেই। এরপর আমি যশোরে বহু আকাঙ্ক্ষিত স্বাধীন ভূখণ্ড পরিদর্শন করি। অবশেষে ‘৭২- এর ৪ ঠা জানুয়ারি আমি সপরিবারে দেশে ফিরে আসি।&nbsp;
–   আজিজুর রহমান মল্লিকএপ্রিল, ১৯৮৪
&nbsp;
&nbsp;
<a href=”https://www.facebook.com/mehjabeen.mostafa?fref=ts”>মেহজাবীন মোস্তফা</a>
&lt;<strong>১৫</strong><strong>,২,১৪</strong>&gt;<h1>[আফসার আলী আহমেদ]</h1>&nbsp;
-মেম্বার অব ন্যাশনাল এসেমব্লি-১২, রংপুর-১২
&nbsp;
অসহযোগ আন্দোলন চলাকালে আমরা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিই। ২৫ শে মার্চের পর আমি ঐক্যবদ্ধভাবে পাক বাহিনীকে প্রতিরোধ করার জন্য নির্দেশ প্রদান করি। আমি নিজ এলাকায় আত্মগোপন করে যুদ্ধ পরিচালনা করি এবং ভারতে যাওয়ার আগে ইপিআর ও পুলিশদের একত্রিত করে যুদ্ধের জন্য সংগঠিত করি। যুদ্ধে বহু পাক-সেনা নিহত হয়।
২৮শে মার্চ আমি ভারতে চলে যাই এবং জলপাইগুড়িতে অবস্থান করতে থাকি। তখন জলপাইগুড়ির ডি.সি. আমাকে অপ্রত্যাশিতভাবে গ্রেফতার করেন। কংগ্রেসের নেতৃবৃন্দ আমাকে মুক্ত করার জন্য অনেক চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। তারপর ২৯ শে মার্চ স্কর্ট করে আমাকে কলকাতা নিয়ে যাওয়া হয়। দিল্লীর সাথে যোগাযোগ করে রাজ্য সরকার গ্রেফতারকৃত অবস্থায়ই আমাকে দিল্লী পাঠান। সেখানে আমাকে মুক্তভাবে রাখা হয়। মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ-এর সাথে দিল্লীতে আমার সাক্ষাৎ হয়। এরপর আমাকে কলকাতা পাঠিয়ে দেয়া হয়। এবং ভারতের দেওয়ানগঞ্জ ক্যাম্পের দায়িত্ব আমার উপর অর্পন করা হয়।
এপ্রিল-মে মাসের দিকে আমি আনসার এবং পুলিশদের আমার এলাকায় অস্ত্রশস্ত্র সংগ্রহ করার নির্দেশ প্রদান করি। ই, পি, আর, আনসার এবং পুলিসদের সংগঠিত করে বাংলাদেশের ভেতরে অপারেশনের জন্য পাঠাই। এরূপ বিভিন্ন অভিযানে তাঁরা কৃতকার্য হন এবং বহু দালাল হত্যা করেন।
&nbsp;
আমাদের এলাকায় দীর্ঘ নয় মাস অনবরত যুদ্ধ চলতে থাকে পাক-সেনাদের সাথে। প্রায় এক লক্ষ টাকা আমার এলাকা থেকে সংগ্রহ করে আমি বাংলাদেশ সরকারের তহবিলে জমা দিই।
আমার এলাকায় আনুমানিক দেড় হাজার লোক পাক সেনাদের দ্বারা নিহত হয়। এই হত্যাযজ্ঞে সৈয়দপুরের বিহারীদের ভূমিকা ছিল অগ্রণী। এই এলাকায় প্রায় এক হাজার নারীকে নির্যাতন করা হয়। উল্লেখ্য যে, এখানে ২২শে মার্চ তারিখে এই অত্যাচারের হাত থেকে স্থানীয় জনগণকে রক্ষা করার জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিলো। পরে বিহারীরা বিশ্বাসঘাতকতা করে বহু লোককে হত্যা করে। সৈয়দপুরে শতকরা ৯৯ ভাগ ঘরবাড়ি ও বিষয়-সম্পত্তি বিনষ্ট ও লুটপাট হয়। উল্লেখ্য যে ব্যাঙ্কের টাকা-পয়সা ও পুড়িয়ে দেয়া এবং লুটপাট করা হয়। সীমান্তে সৈয়দপুরের বিহারীরা ভারতে যাওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে ট্রেনের মধ্যে আটকিয়ে প্রায় চার শত লোককে হত্যা করে। এই ঘটনাটি ঘটে সৈয়দপুর থেকে এক মাইল দূরে। আর একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। ব্রজেন্দ্রলাল ঘোষ নামক এক ব্যক্তি ও তার দুই ছেলেকে আলবদররা হত্যা করে এবং তাঁর দুই মেয়েকেও অপহরণ করে। প্রতিবেশী সালাউদ্দীন নামে এক ব্যক্তি এই ঘটনার প্রতিবাদ করলে তাকে তারা প্রকাশ্য দিবালোকে হত্যা করে। মাহফুজুর রহমান চৌধুরী নামক একজন দুঃসাহসী মুক্তিযোদ্ধাকেও তাঁরা নৃশংসভাবে হত্যা করে।
স্বাক্ষর/-
আফসার আলী আহমেদ
২৬-১০-৭২দ
&nbsp;
&nbsp;
&nbsp;
<a href=”https://www.facebook.com/taeen”>তায়িন উল হক</a>
&lt;<strong>১৫</strong><strong>,৩,১৪-১৭</strong>&gt;<h1>[আব্দুর রাজ্জাক (মুকুল মিয়া)]</h1>১৯৭১ সালের অসযোগ আন্দোলনে সাড়া দিয়ে আন্দোলনে সক্রিয় হই। ১০-১৫ ই মার্চ থেকে বকুল সাহেবের নেতৃত্বে গোপালপুর জেলা স্কুল মাঠে ছাত্রজনতাকে নিয়ে সামরিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র খোলা হয় এবং নিজে প্রায় ২০০ জন ছেলের হাতে বাঁশের লাঠি ও ডামি রাইফেল দিয়ে সামরিক প্রশিক্ষণ দেন।  আমি আরোও ৫/৭ জন ছেলে সহ স্থানীয় পলিটেকনিক ইনিস্টিটিউট এর ওয়ার্কশপ থেকে কাঠের বন্দুক তৈরী করে আমাদের ক্যাম্পে সরবারহ করি। বকুল ও স্থানীয় আওয়ামীলীগ কর্মী ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য জনাব মরহুম বগা মিয়ার (আব্দুর রব) নেতৃত্বে পাবনা শহরে বেশ কয়েকটি জনসভা হয়। হাজার হাজার সরকারি বেসরকারি কর্মচারী ও জনতা উক্ত জনসভায় যোগদান করেন।
&nbsp;
২০শে মার্চ জনাব বকুলের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধাদের চারটি দলে বিভক্ত করা হয় এবং চারজন ছাত্রনেতার উপর চারটা দলের দায়িত্ব দিয়ে তাদেরকে বকুল সাহেবের নির্দেশে শহরের বিভিন্ন রাস্তায় অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে পাঠিয়ে দেয়া হয় যাতে পাকবাহিনী পাবনা শহরে প্রবেশ করতে না পারে।
&nbsp;
একটা দলের ভার শহীদ ছিদ্দিকের উপর অর্পণ করা হয় এবং তার দলকে পাঠানো হয় নগরবাড়ি-পাবনা রোডে। একটি দলের ভার আমি নিজে নিয়ে পাবনা-রাজশাহী রোডে থাকি। একটি দলের ভার ইকবালের উপর দেয়া হয় এবং তার দল পাঠানো হয় শালগাড়িয়া রোডে। আর একটি দলের ভার দেয়া হয় বাবুর উপর এবং তাকে পাঠানো হয় পাকশী-পাবনা রোডে। বকুল সাহেব কিছু যোদ্ধা নিয়ে শহরের কন্ট্রোল রুমে থাকেন।
২৩শে মার্চ আমরা সমগ্র পাবনা শহরে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করি। ঐদিন নকশালদের সাথে আমাদের নুরুল খন্দকারের বাড়িতে সংঘর্ষ হয় এবং নকশালেরা পালিয়ে যায়।
&nbsp;
২৪শে মার্চ পাকবাহিনী নগরবাড়ী হয়ে পাবনা শহরে প্রবেশ করে। তাদের ভারি হাতিয়ারের সামনে টিকতে পারবেনা বলে আমাদের বাহিনী বাঁধা সৃষ্টি করেনি। পাকবাহিনী পাবনা শহরের প্রতিটি অফিস আদালতে বাংলাদেশের পতাকা দেখে শহরে কার্ফু দিয়ে কয়েক রাউন্ড গুলি ছুড়ে এবং রাতের বেলা অনেক মহিলার উপর পাশবিক নির্যাতন চালায়। এদিকে আমরা কয়েকটি দল যোগাযোগ করে একত্রিত হই এবং ডিসি ও এসপি সাহেবের সাথে যোগাযোগ করে পাক সেনাদের আক্রমণ করার জন্য প্রস্তুতি নেই। আমরা শহরের আশেপাশের গ্রামগুলোতে জানিয়ে দেই যে আগামীকাল আমরা পাকবাহিনীকে আক্রমণ করব এবং তারা যেন তাদের যা কিছু আছে তা নিয়ে আমাদের সাথে যোগ দেয়। ঘোষনা দেয়ার সাথে সাথে হাজার হাজার জনতা ঢাল, সড়কী, ফলা, তীর, ধনুক, রামদা বর্ষা ইত্যাদি নিয়ে ঢোল থালা পিটিয়ে “জয় বাংলা” স্লোগান দিতে দিতে চর আশুতোষপুর এ এসে জমায়েত হয়।
&nbsp;
<em>২৪শে মার্চ</em> ভোর চার টার সময় পাকবাহিনী পুলিশ লাইন আক্রমণ করে। পুলিশ বাহিনী পূর্ব হতেই ডিফেন্সে ছিল। পাকনাহিনী আক্রমণ করার সাথে সাথে তুমুল যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়।
&nbsp;
<em>-(আমাদের হিসেবে এটা ২৫ মার্চ ভোর হবে।) </em>
&nbsp;
২৫শে মার্চ সকাল ৭টার সময় আমরা বকুলের নেতৃত্বে হাজার হাজার জনতাকে নিয়ে “জয় বাংলা” স্লোগান দিতে দিতে শহরে ঢুলে পড়ি এবং পাকবাহিনীকে আক্রমণ করি। তুমুল যুদ্ধ চলছে এর মধ্য দিয়ে হাজার হাজার জনতা রুটি, ডাব, ভাত ইত্যাদি দিয়ে আমাদের খাদ্যদ্রব্য যোগান দিচ্ছে। “জয় বাংলা” স্লোগান শোনার সাথে সাথে পাকবাহিনী ৪/৫ টি দলে ভাগ হয়ে যায়। পরে একত্রিত হয়ে সিনেমা হলের নিকতে এসে জমায়েত হয়। এদিকে পুলিশ লাইনে পাক সেনাদের একটি দলের ৮/১০ জন নিহত হয়। “বাণী” সিনেমা হলের কাছে আমরা পাকবাহিনীর সদস্যদের চারিদিক থেকে ঘিরে ফেললে তারা উপায় না দেখে আত্মসমর্পণ করে। সাথে সাথে হাজার হাজার জনতা এসে তাদের পিটিয়ে হত্যা করে।
&nbsp;
পাকসেনাদের ১০/১৫ জনের একটি দল শিল্প এলাকাতে ছিল। তারা উক্ত সংবাদ শোনার সাথে সাথে হাতিয়ার ফেলে রেখে পাবনা থেকে বের হয়ে আরিফপুর গোরস্থানে গিয়ে আশ্রয় নেয়। জনতা এই সংবাদ শোনার সাথে সাথে উক্ত গোরস্থান গিয়ে ঘেরাও করে। আতারপর অনেক খোজাখুজির পর কয়েকটি কবর থেকে ৫/৭ জন পাকসেনাকে টেনে বের করে তাদেরকে লাঠি দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করে। ৪/৫ জন পাকসেনা গোপালপুর মিলের কাছে গিয়ে জনতার হাতে ধরা পড়লে তাদেরকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। অতঃপর পাবনা শহর সম্পূর্ণ মুক্ত হয়ে যায়। এবং আমরা সেখানে আবার বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করি। সেখানকার অফিস আদালত আমাদের নিয়ন্ত্রণে চলতে থাকে।
২৫শে মার্চের পর বাংলাদেশে পাকবাহিনী গণহত্যা শুরু করে। পাবনাতে পাকবাহিনী যাতে প্রবেশ করতে না পারে সেজন্য আমরা রাজশাহী-পাবনা রোড, পাবনা-ঈশ্বরদী রোড, পাকশী-পাবনা রোডে ১৫/২০ জনের এক একটি দল প্রতিরোধ করার জন্য পাঠাই। আর আমরা বকুলের নেতৃত্বে নগরবাড়ী ঘাটে গিয়ে অবস্থান নেই। আমরা সেখানে দেখতে পাই বগুড়া থেকে ক্যাপ্টেন হুদা ৫০/৬০ জনের একটি ইপিআর ও আর্মি বাহিনী নিয়ে নগরবাড়ীতে পৌঁছেছেন। আমরা তাঁর বাহিনীর সাথে যোগ দেই।
&nbsp;
১২ই এপ্রিল পাকবাহিনী বিমান থেকে নগরবাড়ীতে আমাদের উপর বোমা বর্ষণ করে। ঐ দিন ১০টার সময় ২/৩ টি ফেরি ভর্তি পাকসেনা আরিচা থেকে নগরবাড়ী চলে আসে। এসেই তারা শেলিং করে এবং মেশিনগান থেকে আমাদের দিকে এলোপাথারি গোলাবর্ষণ করতে থাকে। ২/৩ ঘন্টা তুমুল যুদ্ধ চলার পর আমরা তাদের ভারী অস্ত্রের সামনে টিকতে না পেরে ক্যাপ্টেন হুদার নির্দেশে দল তুলে নিয়ে পাবনার দিকে চলে যাই।
&nbsp;
পাকবাহিনী নগরবাড়ী প্রবেশ করে। তাদের এক কোম্পানী শাহজাদপুরে চলে আসে আর এক কোম্পানী পাবনার দিকে রওয়ানা হয়ে যায়। পথে কাশিনাথপুরে পাকবাহিনী আমাদের দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত হয়। সেখানে ২/৩ ঘন্টা সংঘর্ষের পর আমরা পাবনা হয়ে মুলাডুলি গিয়ে ডিফেন্স গ্রহণ করি। সেখানে ৩/৪ ঘন্টা যুদ্ধের পর ৬/৭ জন ইপিআর ও ১০/১৫ জন লোক নিহত হয়।
&nbsp;
১৫/১৬ই এপ্রিল আমরা বোনপাড়া যাই। সেখানে পাক সেনাদের সাথে যুদ্ধে আমাদের ৫/৭ জন ইপিআর শহীদ হন। সেখান থেকে আমরা রাজশাহী জেলার সারদাতে পৌঁছি এবং সেখানকার পাকবাহিনীর সাথে যুদ্ধে আমাদের দুই জন মেশিনগান চালক পাকসেনাদের গুলিতে আহত হন। আমি তাদেরকে উদ্ধার করতে গেলে পাকসেনাদের একটি শেলের কণা এসে আমার বুকের বামপাশে লাগলে আমি আহত হই। তারপর তাদেরকে রেখে কোনরকমে আমার বাহিনীর সাথে রাজশাহী জেলার নওগাঁ গিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হই। প্রায় দেড় মাস চিকিৎসার পর সুস্থ হয়ে উঠি। তারপর কলকাতা চলে যাই। সেখানে গিয়ে বকুল সহ পাবনা জেলার অনেক মুক্তিযোদ্ধার সাথে দেখা হয়। তাদের কে নিয়ে বকুলের নেতৃত্বে আমরা প্রথমে শিকারপুর ক্যাম্প করি। সেখানে ১০/১৫ দিন থাকার পর আমরা কেচুয়াডাঙ্গা ক্যাম্প করি।
&nbsp;
সেখানে প্রায় ১৫০ জন ছেলে বকুলের নেতৃত্বে প্রাথমিক সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে। জুন মাসে ৪৪ জন ছেলেকে নিয়ে মুজিব বাহিনীর সামরিক প্রশিক্ষনের জন্য দেরাদুন যাই। দেরাদুনে সাপ-বিচ্ছুর ব্যাপক প্রকোপ ও নানা অসুবিধা সৃষ্টি হওয়ায় আমরা চাকার্তা চলে যাই। সেখানে আমরা মোট ৪৫ দিন বিভিন্ন প্রকার অশ্ত্রশস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করি।
&nbsp;
&nbsp;
আগস্ট মাসে ২/৩ তারিখে আমরা জলপাইগুড়ি চলে আসি। সেখানে ৮/১০ দিন থাকার পর জলঙ্গী বর্ডার দিয়ে বাংলাদেশের ভেতরে প্রবেশ করি এবং পাবনা পাকশী ব্রিজের নিকটে এসে পাকসেনা দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত হলে আমরা ভারতে চলে যাই।
&nbsp;
১৭ই অগাস্ট আমরা কুষ্টিয়ার বর্ডার দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করি এবং সাথিয়া থানার সোনাদহ ব্রীজে রাজাকারদের আক্রমণ করি। এতে ৩ জন রাজাকার নিহত হয় এবং একজন রাজাকারকে জীবিত ধরে নিয়ে আসি। অতঃপর আমরা পাবনা জেলার বোনাইনগর, ফরিদপুর থানায় প্রবেশ করি।
সেপ্টেম্বর মাসে আমরা সাথিয়া থানা ও রাজাকার ঘাঁটি আক্রমণ করি। সেখানে ১২ জন রাজাকার নিহত হয়। ১১ জনকে ধরে নিয়ে আসি এবং অনেক গোলাবারুদ উদ্ধার করি।
&nbsp;
অক্টোবর মাসে পাকসেনারা দিঘলিয়া, রতনপুরে আমাদের ক্যাম্প আক্রমণ করে। ৩/৪ ঘন্টা তুমুল যুদ্ধ চলার পর পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলোতে যে আমাদের আরোও দুটি বাহিনী ছিল তাদেরকে খবর দেয়া হয়। সাথে সাথে তারা এসে তিন দিক থেকে ঘিরে পাকবাহিনী কে আক্রমণ করে। এতে ২৫ জন পাকসেনা নিহত হয়। যুদ্ধ শেষে আমরা ফরিদপুর চলে যাই।
&nbsp;
নভেম্বর মাসে আমরা গাঙ্গাহাটি ব্রিজে রাজাকারদের আক্রমণ করি। সেখানে আমাদের দু’জন যোদ্ধা আহত হয় এবং ছয়জন রাজাকার নিহত হয়। এরপর আমরা বোনাইনগর ফরিদপুর এলাকাতে পোষ্টার লাগিয়ে দেই। তাতে লেখা থাকে, উক্ত মাসের মধ্যে যদি রাজাকার হাতিয়ার নিয়ে আত্মসমর্পণ করে তাহলে তাদেরকে কিছু বলা হবে না। এবং যারা আত্মসমর্পণ করবেন না তাদের ক্ষমা করা হবে না।
&nbsp;
এই সংবাদ রাজাকারদের কানে পৌঁছার সাথে সাথে নভেম্বর মাসের মধ্যে ফরিদপুর থানার সমস্ত রাজাকার হাতিয়ার নিয়ে এসে আত্মসমর্পণ করে। তাদেরকে ক্ষমা করে দেয়া হয়।
&nbsp;
১০/১২ ডিসেম্বর আমরা বাঘাবাড়ি ঘাটে পাকসেনাদের আক্রমণ করি এবং আমাদের বিমান বাহিনী বিমান হতে তাদের উপর বোমা বর্ষণ করে। সেখানে পাকসেনাদের সাথে আমাদের ৪/৫ ঘন্টা যুদ্ধ হয়। এতে আমাদের একজন আহত হয়।
&nbsp;
সন্ধ্যা হয়ে যাওয়ায় আমরা গ্রামে গিয়ে আশ্রয় নেই। পার্শ্ববর্তী আরও মুক্তিযোদ্ধারা এসে দেখে যায়। পরদিন সকালে আমরা পাকসেনাদের আক্রমণ করার জন্য বাঘাবাড়ি ঘাটে যাই। কিন্তু সেখানে কাউকে দেখতে পাইনি। জানা গেল তারা রাতে তাদের গাড়ি ও হাতিয়ারে আগুন লাগিয়ে দিয়ে পাবনার দিকে চলে গেছে। আমরা বাঘাবাড়ি ঘাটে গিয়ে দেখতে পাই ১৫/২০ টি গাড়ি পড়ে আছে এবং অস্ত্রশস্ত্রে আগুন জ্বলছে।
আমরা শাজহাদপুরে ফিরে এসে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করি এবং বেসরকারি শাসন ব্যবস্থা চালু করি।
&nbsp;
স্বাক্ষর/-
মুকুল মিয়া
১৮-১১-৭৩
&nbsp;
&nbsp;
&nbsp;
<a href=”https://www.facebook.com/tajmul42?fref=ts”>তাজমুল আখতার</a>
&lt;<strong>১৫</strong><strong>,৪,১৭-২৪</strong>&gt;<h1>[এ, কে খন্দকার]</h1>&nbsp;
১৯৭০ সালের ডিসেম্বর মাসে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন বিজয়ী আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে জেনারেল ইয়াহিয়া এক পর্যায়ে ভাবী প্রধানমন্ত্রী বলেও অবিহিত করেন। সেই পরিস্থিতিতে ২৩শে মার্চ মহাসমারোহে ‘প্রজাতন্ত্র দিবস’ পালনের কর্মসূচী গৃহীত হয়। তখন আমি ঢাকায় কর্মরত পাকিস্তান সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে কর্মরত বাঙালি অফিসারদের মধ্যে সবচেয়ে সিনিয়র। সুতরাং সম্মিলিত সশস্ত্র বাহিনীর প্যারেড অধিনায়কত্ব করার দায়িত্ব আমার উপর অর্পিত হয়।
&nbsp;
ফেব্রুয়ারী মাসের তৃতীয় সপ্তাহে একদিন জোনাল আর্মী হেডকোয়ার্টারস (বর্তমান এয়ার হেডকোয়ার্টার) থেকে জনৈক কর্নেল আমাকে ফোন করে জানালেন যে, ২৩শে মার্চের পরিকল্পিত প্যারেড বাতিল করা হয়েছে। প্যারেড বাতিলের সিদ্ধান্তের আকস্মিকতায় বিস্মিত হলাম। প্রায় সাথে সাথেই বিগ্রেড হেডকোয়ার্টার অফিস কক্ষে প্রবেশ করে দেখি ডজনখানেক পদস্থ পশ্চিম পাকিস্তানী অফিসার আলোচনারত। আমার আকস্মিক ও অনভিপ্রেত উপস্থিতি তাঁদের মধ্যে একটা অপ্রস্তুত ও কিছুটা বিরুপ ভাবের সঞ্চার করলো। তাঁদের এ মনোভাব বুঝতে আমার অসুবিধা হল না। আমি বিশেষ আর কোন আলোচনা না করে ফিরে এলাম।
&nbsp;
১লা মার্চ। শাহীন স্কুলের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে পূর্ব পাকিস্তানের এয়ার অফিসার কমান্ডিং এয়ার কমডোর মাসুদের সভাপতিত্ব করার কথা। আগে দেখেছি এ ধরনের অনুষ্ঠানে তাঁর উপস্থিতি সবসময় ছিলো সাগ্রহ। কিন্তু সেদিন দেখলাম ব্যাতিক্রম। এয়ার কমোডোর আমাকে বললেন, আমি যেন তাঁর পরিবর্তে অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করি। দুপুর একটায় জেনারেল ইয়াহিয়া পূর্ব ঘোষনা অনুযায়ী ৩রা মার্চে ঢাকায় অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বাতিল ঘোষণা করলেন। বিদ্যুৎ গতিতে ঢাকার চেহারা পাল্টে গেলো। চারিদিকে বিক্ষোভ। শাহীন স্কুল প্রাঙ্গন থেকেই দেখলাম বিক্ষব্ধ জনতার এক বিশাল মিছিল অধিবেশন স্থগিতের প্রতিবাদে শ্লোগান দিতে দিতে মহাখালী থেকে শহরাভিমুখে ধাবমান।
&nbsp;
ঘটনা দুটো উল্লেখ করলাম এজন্য যে এগুলো থেকে আমার দৃঢ়বিশ্বাস জন্মেছে যে, ১লা মার্চে জেনারেল ইয়াহিয়ার পরিষদ অধিবেশন স্থগিত কোন আকস্মিক ও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ঘোষণার প্রস্তুতি আগে থেকেই চলছিল এবং একারনেই এয়ার কমডোর মাসুদ আমাকে পুরস্কার বিতরণী সভার দায়িত্ব দিয়ে নিজে ইয়াহিয়ার ঘোষনা পরবর্তী সম্ভাব্য পরিস্থিতি সম্পর্কিত কাজে ব্যাপৃত ছিলেন।
&nbsp;
ফেব্রুয়ারীর তৃতীয় সপ্তাহ থেকেই লক্ষ্য করলাম যে, পশ্চিম পাকিস্তান বোয়িং ভর্তি সৈন্য ঢাকায় আনা হচ্ছে। তাদের সাথে আর্মীর স্পেশাল কমান্ডো সেনারাও আসছে এবং তাঁদের ব্যাগ ব্যাগেজ নামছে। আমি বুঝতে পারছিলাম যে এটা দেশের দু’অংশের মধ্যে সৈণ্য বদলী ও যাতায়াতের একটা সাধারণ ঘটনা না।
&nbsp;
মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহের পর থেকেই পরিস্কারভাবে অনুভব করলাম যে আমাকে গুরুত্বপূর্ন সিদ্ধান্ত ও অন্যান্য কার্যকলাপ থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হচ্ছে। উপরমহল থেকে এ ধরনের আচরণ অপ্রত্যাশিত হলেও এর কারন আমার নিকট অবোধগম্য ছিল না।
&nbsp;
সারা পূর্ব পাকিস্তান তখন প্রতিবাদমূখর। মানুষ তাঁদের নিজ নিজ পন্থায় এ অন্যায়ের মোকাবেলায় প্রস্তুতি নিচ্ছে। দেখলাম ইকবাল হলের ছাত্ররা কয়েকটি মাত্র ৩০৩ রাইফেল নিয়ে নিজেদের তৈরি করছে শত্রুর মোকাবেলার জন্য। এঘটনায় আমি অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। তাঁদের প্রস্তুতির ধরন দেখে মনে হলো, কত বড় শত্রুর মোকাবেলা তাঁরা করতে যাচ্ছে সে সম্পর্কে একটা পরিষ্কার ধারনা পর্যন্ত তাঁদের নেই। অত্যাধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত একটা নিয়মিত বাহিনীর মোকাবেলায় ৩০৩ রাইফেল নিয়ে বেসামরিক লোকেদের পক্ষে কতটুকু সম্ভব! কিন্তু তবু সেদিন আমি ওদের প্রানের আবেগ আর চিত্তের দৃঢ়তায় মুগ্ধ হয়েছিলাম।
&nbsp;
পূর্ব পাকিস্তানে কর্মরত পাকিস্তান বিমান বাহিনীর টেকনিশিয়ানদের অধিকাংশই ছিলেন বাঙালি। এই অবস্থার সুযোগ নিয়ে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহনের কথা সে সময় আমি ভেবেছি। কিন্তু এ ধরনের পদক্ষেপ নেবার আগে রাজনৈতিক অনুমোদন সমীচীন মনে হওয়ায় আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের একটা কার্যকর যোগাযোগ স্থাপনের চেষ্টা করি। এই সূত্রে দু’জন আওয়ামী লীগ এমপি আমার বাসায় আসেন। আমি তাদেরকে বললাম যে পশ্চিম পাকিস্তানী সৈণ্যদের তৎপরতা ও প্রস্তুতি দেখে আমার ধারনা হচ্ছে, তাঁরা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে না। এ অবস্থায় কি করনীয় জানতে চাইলাম এবং তাঁদের মাধ্যমে সশস্ত্র বাহিনীতে বাঙালিদের ভূমিকা সম্পর্কে পার্টির নেতাদের মনোভাব জানবার ইচ্ছাও তাঁদের নিকট ব্যক্ত করলাম। সে মূহুর্তে তাঁরা আমাকে সুনির্দিষ্ট কিছুই বলতে পারেননি।
&nbsp;
২৫শে মার্চ সন্ধ্যার দিকে এয়ারপোর্টে যাই। দেখলাম অতিগোপনে সতর্ক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় একটি বিমানে মাত্র একজন কিংবা দুজন যাত্রীসহ জেনারেল ইয়াহিয়া করাচীর উদ্দ্যেশ্যে ঢাকা ত্যাগ করলেন। আমি এই সংবাদ টেলিফোনে আওয়ামী লীগ অফিসে জানিয়ে দেই। আমার মনে আছে,এয়ারপোর্ট থেকেই আমি ক্যান্টনমেন্ট এয়ারফোর্সের সব বাঙালি অফিসারদের খবর দেয়ার চেষ্টা করেছি। পরে বাড়ী বাড়ী গিয়ে তাঁদের আবার খবরটা বিস্তারিত দিই। বলেছি, পরিস্থিত গুরুতর, একটা ভয়ংকর কিছু ঘটতে যাচ্ছে। আমি তাঁদের সবাইকে নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নিতে বলি এবং আমার পরিবারকে ক্যান্টনমেন্টে বাহিরে পাঠিয়ে দিই।
&nbsp;
রাত এগারোটার দিকে কানে আসে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর সশস্ত্র আক্রমণের আওয়াজ । পায়ের আওয়াজের পরপরই ট্যাঙ্ক চোলাড় শব্দ । বুঝতে পারলাম যা একদিন আশঙ্কা করেছিলাম তা বাস্তবে পরিণত হতে শুরু করেছে । রাতভর সারা শহরজুরে যে তান্ডব চলছিল, আগুনের আলোতে এবং গুলির আওয়াজে ক্যান্টনমেন্ট থেকেই ঘটনার ভয়াবহতা সম্পর্কে একটা মোটামোটি ধারণা হচ্ছিল । কিন্তু তাণ্ডবের ভয়ঙ্কর রূপটা যে কল্পনার সমস্ত সীমা ছাড়িয়ে গেছে , না দেখা পর্যন্ত সেটা সঠিক বোঝা যায় নি। ২৫ শে মার্চ সন্ধ্যা থেকে মাঝ রাতের ভেতরেই জনসাধারণ জায়গায় জায়গায় ব্যারিকেড সৃষ্টি করে। কিন্তু পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কাছে এসব ব্যারিকেড কোন বাধাই ছিল না।
&nbsp;
২৭শে মার্চ সন্ধ্যায় এয়ারফোর্স মেসে গেলাম। মেসের যে পাশে পুকুরপাড় তা পূর্ব দিক থেকেই নাখালপাড়া এলাকা শুরু।এটা অত্যন্ত গরীব ও নিম্নবিত্তদের এলাকা। কিছুক্ষনের মধ্যেই দেখলাম পাক-বাহিনীর লোকেরা অগ্নিসংযোগকারী যন্ত্র দিয়ে পুরো এলাকাটি ঘিরে ফেলছে এবং তাঁদের সাথে মেশিনধারী সৈন্যরা পজিশন নিয়েছে।
&nbsp;
অল্পক্ষণ পরেই দেখলাম সারা এলাকায় দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে উঠল। আতঙ্কগ্রস্থ অসহায় মানুষ প্রানের ভয়ে আর্তচিৎকার করে বেরিয়ে আসছে বাইরে। সারা শহরে তখন কার্ফু। এরা কার্ফু ভঙ্গ করেছে এই অজুহাতে সঙ্গে সঙ্গে মেশিনধারী সৈন্যরা নির্বিচারে গুলি চালাল।
&nbsp;
পাকিস্তানী কর্তৃপক্ষের মাঝে একটা ধারনা বদ্ধমূল হয়ে গিয়েছিলো যে এই সব গরীব ও নিম্নবিত্ত লোকেরাই আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভিত্তি- সুতরাং এদেরকে সমূলে নিশ্চিহ্ন করে ফেলতে হবে। মেসে জনৈক পাকিস্তানী লেফটেন্যান্ট যিনি আমার পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন এবং জানতেন যে, আমি একজন বাঙালি গ্রুপ ক্যাপ্টেন, আমার সামনে মন্তব্য করলেন, “এটাই জারজদের সাথে সঠিক ব্যবহার”
&nbsp;
এরই মধ্যে মুক্তিবাহিনীতে কিভাবে যোগদান করা যায় সে কথা ভাবতে শুরু করি। কিন্তু কিভাবে যাবো? আমার বাসায় কয়েকজন গার্ড নিয়োগ করা হয়েছিলো নিরাপত্তার জন্য। কিন্তু আসল উদ্দেশ্য ছিল আমার গতিবিধির উপর নজর রাখা।
&nbsp;
কিন্তু তা সত্ত্বেও দেশ ত্যাগের ব্যাপারে আমি অন্যান্য বাঙালি অফিসার, বিশেষ করে বৈমানিকদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করি। তখনকার উইং কমান্ডার বাশারের সাথেও আমি যোগাযোগ স্থাপন করি এবং তাঁর মাধ্যমে অন্য অফিসারদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করি।
&nbsp;
আলাপ-আলোচনার পর আমরা এয়ারফোর্সের কতিপয় অফিসার চুড়ান্ত স্বিদ্ধান্ত নিই যে যেমন করেই হোক পাক বাহিনীর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতেই হবে। আমাদের এই স্বিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য আমরা মাঝে মাঝে বিভিন্ন চাইনিজ রেষ্টুরেন্টে আলোচনায় বসতাম। শেষ পর্যন্ত ঠিক হলো যে একদিন একযোগে সবাই পাক বাহিনী ত্যাগ করবো না। করলে তাতে ধরা পড়লে সবারই একসাথে ধরা পড়ার সম্ভবনা। সিদ্ধান্ত হল ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট নুরুল কাদের প্রথমে সীমান্ত অতিক্রমের বিভিন্ন পথ আগে সরেজমিনে জরিপ করে আসবেন এবং তাঁর রিপোর্ট অনুযায়ী আমরা বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে ভিন্ন ভিন্ন পথে সীমান্ত অতিক্রম করবো । কথামতো নুরুল কাদের খবর নিতে যান। কিন্তু কাজ শেষে ফিরে আসার সময় তিনি পাক বাহিনীর হাতে ধরা পড়েন। পরে অবশ্য নানা অজুহাত দেখিয়ে তিনি মুক্তি পেয়ে আসতে পেরেছিলেন এবং আমাদের সাথে যোগ দিতে সক্ষম হয়েছিলেন।
&nbsp;
অন্যান্য অফিসারদের সাথে মিলে দেশ ত্যাগের এই চুড়ান্ত স্বিদ্ধান্ত নেবার আগে ২৮শে মার্চ আমি এ ব্যাপারে প্রথম পদক্ষেপ নেই। বেড়াতে যাবার কথা বলে স্ত্রী ও ছেলেমেয়েসহ নিজের গাড়ী নিয়ে বেরিয়ে পড়ি। ডেমরা ঘাট পর্যন্ত গিয়ে গাড়িটি চাবিসহ ফেলে রেখে অনির্দিষ্ট নিরাপদ স্থানের উদ্দেশ্যে বের হই। ফ্লাইট লেফট্যান্যান্ট মারগুব পরে (বাংলাদেশ বিমান দুর্ঘটনায় মারা যান) আমাদের সঙ্গে ছিলেন এবং তিনিই পথ দেখিয়ে আমাদের গ্রামের দিকে নিয়ে যাচ্ছিলেন ।
&nbsp;
কিন্তু আমাদের প্রথম প্রচেষ্টাই সফল হয়নি। ভাড়া করা লঞ্চ নিয়ে কিছুদূর যাবার পর নদীতে অল্প পানিতে আটকে পড়ি এবং শেষ পর্যন্ত ভৈরব বাজারের কাছ থেকে ফিরে আসতে বাধ্য হই।
&nbsp;
এপ্রিল মাসের ১০ কি ১১ তারিখে রাজশাহী সীমান্ত অতিক্রমে লক্ষ্যে আমরা কয়েকজন মিলে আবার ঢাকা ত্যাগ করি কিন্তু আরিচা এসে পাক বাহিনীর সমাবেশ দেখে আবার ঢাকা ফিরে আসি।
&nbsp;
সীমান্ত অতিক্রমের পরবর্তী চেষ্টা চালাই ১০ই মে। এবার লক্ষ্য ছিলো কুমিল্লার পথে সীমান্ত অতিক্রম করা। নবীনগর পর্যন্ত গিয়ে পাক বাহিনীর সমাবেশ দেখে ফিরে আসি এবং নরসিংদীর কাছে এক জুট মিলের রেস্ট হাউজে আশ্রয় নেই। মিলের ম্যানেজার ছিলেন ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট রেজা এবং তিনিও আমাদের সাথে সীমান্ত অতিক্রমকারীদের একজন ছিলেন।
&nbsp;
১২ই মে রাতে কুমিল্লার কালির বাজারে জনৈক কৃষকের বাড়ীতে রাত কাটানোর স্মৃতি আমার স্মরণে এখনো অম্লান। কৃষকটির বাড়িতে আমরা বেশ কয়েকটি পরিবার আশ্রয় নিয়েছিলাম। রাত ২/৩ টার দিকে হঠাৎ দরজায় করাঘাত। পাক সেনা হবে ভেবে কেউ কেউ দরজা খুলতে দ্বিধা করছিলেন। বললাম, পাক সেনারা এসে থাকলে দরজা না খুললেও তারা ভেঙ্গে ঢুকবে। যারা দ্বিধা করছিলেন তারাও একমত হলেন যে, দরজা খোলাই সংগত। দরজা খুলে দেখি বাইরে দাঁড়িয়ে গৃহস্বামী স্বয়ং। তিনি আমাদের জন্য কিছু খাবারের ব্যবস্থা করেছেন এবং বিনয় ও আন্তরিকতার সাথে আমাদের খাবারের দাওয়াত দিতে এসেছেন। দরিদ্র কৃষকের বাড়ী। এতো রাতে এতো গুলো লোকের জন্য এত ভাল ভাল খাবারের ব্যবস্থা দেখে আমরা সবাই বিস্মিত। একদিকে আমরা যেমন বিব্রতবোধ করছিলাম অন্যদিকে তেমনি এই গ্রাম্য কৃষকের আন্তরিকতায় অভিভূত হই। পরে জেনেছিলাম যে আমাদের আশ্রয়দানের অপরাধে আমরা চলে যাবার পর পাকসেনারা উক্ত কৃষকের বাড়ী জ্বালিয়ে দেয়।
আমাদের আশ্রয়দাতা উক্ত কৃষক ও স্থানীয় অন্যান্য কতিপয় লোকের সহায়তায় পরদিন আমরা সীমান্ত অতিক্রম করে মতিনগর বিএসঅএফ ক্যাম্পে উপস্থিত হই। এখানে ক্যাপ্টেন আবুর সাথে আমার প্রথম দেখা । তিনি পরে মুক্তি যুদ্ধে শহীদ হন ।
&nbsp;
আমাদের প্রায় সাথে সাথে বিমান বাহিনীর প্রায় তিনশত জুনিয়র টেকনিশিয়ান ভারতে যায়। এখানে বলা অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে, বিমান বাহিনীর যারা সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে গিয়েছিলো তাঁরা স্বেচ্ছায় স্বতঃপ্রনোদিত হয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহনের জন্য তা করেছিলেন। তাঁদের বেশীরভাগের সামনেই দেশে তেমন কোন বিপদ ছিল না। বিমান বাহিনীর যারা ভারতে গিয়েছিলেন একাত্তরে তাঁদের সামনে অন্যান্য পথ খোলা ছিল। তাঁদের ভারতে যাবার উদ্দেশ্য ছিল একটাই, তাহলো দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করা।
&nbsp;
আগরতলা পৌছেই আমি মেজর খালেদ মোশররফ, মেজর শওকত আলী প্রমূখের সঙ্গে যোগাযোগ করি। পরদিন জেনারেল কলকাত সিং এবং আমি মেজর শাফায়েত জামিলসহ কোলকাতায় যাই। ওখানে পৌঁছে আমি কর্নেল ওসমানীর (পরে জেনারেল) সঙ্গে সাক্ষাত করি। কোলকাতায় তাঁর সঙ্গে দুইদিন থাকার পর তিনি আমাকে উর্ধ্বতন ভারতীয় সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাদের সাথে আলাপ আলোচনার জন্য দিল্লি যাওয়ার নির্দেশ দেন। আমি তখন ভারতীয় বিমান বাহিনীর জনৈক পদস্থ কর্মকর্তার সাথে দিল্লি যাই। ইতিমধ্যে আমার সাথে যেসব অফিসার সীমান্ত অতিক্রম করেছিলেন তাঁরাও দিল্লী এসে পৌঁছান।
&nbsp;
দিল্লী থেকে কোলকাতা ফেরার পর কর্নেল ওসমানী আমাকে জানালেন যে, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার আমাকে সরকারের সম্মিলিত সশস্ত্র বাহিনীর ডেপুটি চীফ অব স্টাফ নিযুক্ত করেছেন। সংসদ সদস্য কর্নেল(অবসরপ্রাপ্ত) রবকে রাজনৈতিক কারনে চীফ অব স্টাফ নিয়োগ করা হয়েছে। একজন এমপি হিসেবে কর্নেল রব আগরতলায় মুজিবনগর সরকারের রাজনৈতিক কর্মকান্ড নিয়েই বেশী ব্যস্ত থাকতেন। ফলে যুদ্ধ সংক্রান্ত বিষয়গুলোর বেশীরভাগ দায়িত্ব আমার উপরই ন্যস্ত ছিলো।
&nbsp;
মুক্তিযুদ্ধের সামরিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সমগ্র এলাকাকে বিভিন্ন সেক্টরে ভাগ করে সেক্টর কমান্ডার নির্ধারণ করা হয়। হেড কোয়ার্টারের সাথে যোগাযোগের ব্যাপারে আমাদের নিজস্ব কোণ শক্তিশালী মাধ্যম না থাকায় আমরা ভারতীয় সেক্টরগুলোর সহায়তায় যোগাযোগ রক্ষা করতাম। কমান্ডার ইন চীফ এর তরফ থেকে সেক্টর কমান্ডার দায়িত্ব ভাগ করে দেয়া হয়। পরে বাস্তব অবস্থার প্রেক্ষিতে সেক্টর কমান্ডারই নির্ধারণ করতেন কোন দায়িত্ব তিনি কেমন করে সম্পন্ন করবেন। সমগ্র এলাকাকে বিভিন্ন সেক্টরে ভাগ করার ফলে যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষেত্রে আমরা অধিকতর সমন্বয় সাধনে সক্ষম হই।
&nbsp;
ডেপুটি চীফ অব স্টাফ হিসেবে ট্রেনিং ও অপারেশনের দায়িত্ব ছিল আমার। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য যে সব যুবক সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে প্রবেশ করতো তাঁদের জন্য বর্ডার এলাকাতেই ক্যাম্প খোলা হয়েছিলো। এইসব যুবক্যাম্প থেকে মুক্তিযোদ্ধা রিক্রুট করা হত। এই রিক্রুটমেন্টের ব্যাপারে আওয়ামী লীগ সাংসদদের ভূমিকাই ছিলো অগ্রণী এবং মূলত তারাই নতুন মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়োগ করতেন।
&nbsp;
আমি বিশ্বাস করতাম যে দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণে সকলের সমান অধিকার আছে এবং এ ব্যাপারটিকে সকল প্রকার দলীয় রাজনীতির উর্ধ্বে রাখা প্রয়োজন। এ জন্যই দলমত নির্বিশেষে সকল শ্রেনীর মানুষের মধ্য থেকে আমি মুক্তিযোদ্ধা নিয়োগের চেষ্টা করেছি।
&nbsp;
মুক্তিযোদ্ধা নিয়োগের ব্যাপারে পেশাদারী মনোভাবের প্রয়োজন ছিল। যুবকদের মানসিক ও শারীরিক যোগ্যতা, মনোবল, দৃঢ়তা ইত্যাদি গুণাবলী নিয়োগ লাভের মানদন্ড হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু নিয়োগের ক্ষেত্রে ভিন্নতর নীতি অনুসৃত হওয়ায় কিছু কিছু অনভিপ্রেত ফল পরিলক্ষিত হয়। আমি ছাত্রলীগ, যুবলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন, কমিউনিস্ট পার্টি প্রভৃতি জনমতের সদস্যদের সাথে বহুবার আলোচনায় মিলিত হয়ে মুক্তিযুদ্ধকে সকল প্রকার কোন্দলের উর্ধ্বে রেখে সবাইকে মিলেমিশে একাত্ব হয়ে কাজ করার আহবান জানিয়েছি। রিক্রুটমেন্টের ব্যাপারে আমি কর্নেল ওসমানীর সাথে আলোচনা করতাম এসব বিষয় নিয়ে।
&nbsp;
মুক্তিযুদ্ধ আরম্ভ হওয়ার বেশ কিছুদিন পর ‘মুজিব বাহিনী’’ নামে একটা আলাদা সশস্ত্র গ্রুপ গঠনের কথা আমি জানতে পারি। কর্নেল ওসমানি আলাদা নাম ও বৈশিষ্ট্য নিয়ে এই বাহিনী গঠনের ঘোর বিরোধী ছিলেন। আর আমিও এ ব্যাপারে তাঁর সাথে সম্পূর্ণ একমত ছিলাম। মুক্তিযুদ্ধে সকল শক্তি ও সম্পদ একই লক্ষ্যে এবং একই কমান্ডে সমন্বিত হওয়া উচিৎ এবং এটাই আমরা চেয়েছিলাম। একজন রাজনীতি নিরেপক্ষ ব্যাক্তি হিসেবে আমি অনুভব করতাম যে মুক্তিযুদ্ধ কোন একটা বিশেষ রাজনৈতিক দলের সংগ্রাম নয়- এটা একটা জাতীয় জনযুদ্ধ।
&nbsp;
একাত্তরের আগষ্ট মাসের শেষ দিকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তিনটি ব্যাটালিয়ন গঠন করা হয়- এগুলোকে ‘জেড ফোর্স, এস ফোর্স’ এবং ‘কে ফোর্স’ নামে অভিহিত করা হয়। এগুলো গঠন করার মূখ্য উদ্দেশ্য ছিল যে, ক্রমাগত গেরিলা আক্রমণের ফলে পাক বাহিনী যখন দুর্বল ও হতোদ্যম হয়ে পড়বে তখন এই ব্যাটালিয়নগুলোর দ্বারা চূড়ান্ত আঘাত হেনে বাংলাদেশের একটা উল্ল্যেখযোগ্য পরিমান এলাকা সম্পূর্নরূপে শত্রুমুক্ত করা হবে এবং পরবর্তী পর্যায়ে ঐ এলাকা থেকে রাজনৈতিক কর্মকান্ড ও যুদ্ধ দুই-ই চালিয়ে যাওয়া হবে।
&nbsp;
এই ব্যাটালিয়নগুলো সেনাবাহিনী, বিডিয়ার এবং পুলিশ বাহিনীর যে সব নিয়মিত সৈনিক মুক্তিবাহিনীতে ছিলো তাঁদের ভেতর থেকে গুণাগুণ ও যোগ্যতার ভিত্তিতে বাছাই করা যুবকদের নিয়ে গঠন করা হয়। তিনটি ব্যাটালিয়নে নেয়ার পর নিয়মিত বাহিনীর বাদবাকী সদস্যদের নিয়ে সেক্টর ট্রুপস গঠন করা হয়। ব্যাটালিয়ন ও সেক্টর ট্রুপসের সদস্যরাই সাধারণভাবে ‘ ‘মুক্তিফৌজ’ নামে অভিহিত হত। বাকী সকল নিয়মিত ও অনিয়মিত গেরিলা যোদ্ধাদের ‘মুক্তিযোদ্ধা’ বা ‘ফ্রিডম ফাইটার’ নামে অভিহিত করা হয়।
&nbsp;
ব্যাটালিয়ন ও সেক্টর ট্রুপস গঠন করার ফলে এই বাহিনীর বাইরে একান্তভাবে গেরিলা তৎপরতা চালিয়ে যাবার জন্য যারা রয়ে গেলেন তাদের বেশীরভাগই ছিলেন অপেশাদার, অনভিজ্ঞ ও অতি সামান্য প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। ফলে গেরিলাদের ছোট ছোট গ্রুপগুলিকে সঠিকভাবে নেতৃত্ব প্রদানের অসুবিধা হয়ে পড়ে। এছাড়া ভারতীয় বাহিনী যে পরিমান অস্ত্রশস্ত্র সরবরাহ করতো, প্রয়োজনের তুলনায় তা ছিল একান্তই অপ্রতুল। ফলে সাময়িকভাবে গেরিলা বাহিনীর কার্যকারিতা বেশ কিছুটা হ্রাস পায়।
&nbsp;
গেরিলা যুদ্ধের ব্যাপারে আমাদের সুস্পষ্ট ধারণার অভাব এবং পরে উদ্ভুত এই পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য একটা কার্যকর পরিকল্পনা তৈরি অপরিহার্য হয়ে পড়ে। এ বিষয়ে কর্নেল ওসমানীর অনুমতি নিয়ে আমি যে প্লান তৈরী করি তাতে যুদ্ধ পরিচালনায় একটা দক্ষ কমান্ড গঠন, মুক্তিযোদ্ধা নিয়োগের ক্ষেত্রে সুষ্ঠ নীতি অবলম্বন প্রশিক্ষণ ও পরিবেশের উন্নতি এবং সমন্বয় ও যোগাযোগের ব্যপারে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহনের ব্যপারে সুপারিশ করা হয়েছিল।
&nbsp;
এখানে উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশ সরকারে এক কেবিনেট মিটিং এ জেনারেল অরোরা ও ডিপি ধরসহ বহু শীর্ষস্থানীয় ভারতীয় কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে মুক্তিযোদ্ধাদের অধিকতর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা এবং যুদ্ধোপকরণ সরবরাহের দাবী জানানো হয়। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ সার্বিক সহযোগীতা দানের পূর্বশর্ত হিসেবে মুক্তিযুদ্ধকে জাতীয় চরিত্র আরোপ এবং অর্থনৈতিক দিকগুলো তুলে ধরার পরামর্শ দেন।
&nbsp;
বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিণীর তিনটি ব্যাটালিয়ন গঠন করার কথা আমি আগেই উল্লেখ করেছি। একটা স্বাধীন দেশের পূর্ণাঙ্গ সশস্ত্র বাহিনী গঠনের প্রশ্নটিকে সামনে রেখে আমরা তখন বাংলাদেশের বিমান বাহিনী গড়ে তোলার কথাও চিন্তা করি। বিমান বাহিনীর প্রয়োজনীয়তাও অনুভূত হচ্ছিল। আমি বিমানবাহিনী গঠনের ব্যাপার নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন ও কর্নেল ওসমানীর সাথে আলোচনা করি। এই আলোচনার ফলশ্রুতি হিসেবে পরে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীনের উপস্থিতিতে ভারতীয় প্রতিরক্ষা সচিব মি কে বি লাল এবং বিমান বাহিনীর এয়ার মার্শাল দেওয়ানের সাথে আমার আলোচনা হয়। তাঁরা বললেন যে, আমাদের বৈমানিকদের ভারতীয় স্কোয়াড্রনের সাথেই অপারেট করতে হবে এবং স্বভাবতই ভারতীয় নিয়মকানুন আমাদের ওপর প্রযোজ্য হবে। আমি এই প্রস্তাবে অসম্মতি জ্ঞাপন করে বিকল্প হিসেবে আমাদেরকে বিমান এবং আনুষঙ্গিক সুবিধাদি প্রদানে অনুরোধ জানাই যাতে বাংলাদেশ বিমান বাহিনী, তাঁর নিজস্ব পৃথক সত্ত্বা নিয়ে অপারেট করতে পারে কারন আমাদের প্রশিক্ষনপ্রাপ্ত বৈমানিক ও টেকনিশিয়ানের কোন অভাব ছিল না।
&nbsp;
এর কিছুদিন পর ভারতীয় বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার মার্শাল পি সি লালের সাথে আবার আমার এ ব্যাপারে আলোচনা হয়। এ আলোচনার প্রেক্ষিতে আমরা ভারতীয় বিমান থেকে অটার এয়ারক্রাফট , হেলিকপ্টার এবং ডাকোটা বিমান পাই। এই বিমানগুলো নিয়েই সম্পূর্নভাবে আমাদের নিজস্ব পাইলট ও টেকনিশিয়ানদের নিয়ে ১৯৭১ সালের ২৮শে সেপ্টেম্বর ভারতের নাগাল্যান্ডের ডিমাপুর বিমান ঘাঁটিতে বাংলাদেশ বিমান বাহিনী গঠিত হয়। সে সময় উইং কমান্ডার ৬ নং সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন এবং ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট লিয়াকত ও ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট নুরুল কাদের ৪ এবং ৫ নং সেক্টরে সেনাবাহিনীর সাথে যুদ্ধে অংশ নিচ্ছিলেন। এরা ছাড়া বাকি সকল বৈমানিক বিমান বাহিনীর সাথে যুক্ত থাকে।
&nbsp;
স্কোয়াড্রন লীডার সুলতান মাহমুদ (বর্তমান বিমান বাহিনীর প্রধান) তখন ১ নং সেক্টরের সাথে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। আমি তাঁকে সেখান থেকে ডিমাপুর নিয়ে আসি এবং বিমান বাহিনীর প্রশাসনিক ও ‘অপারেশন’ এর দায়িত্ব তাঁর ওপর দিই।
&nbsp;
-এখানে বর্তমান বলতে ১৯৮৪ সালের কথা বুঝানো হচ্ছে। এ, কে খোন্দকার সে সময়েই সাক্ষাৎকারটা দিয়েছিলেন।
&nbsp;
৬) যেহেতু আমাদের সম্পদ ও জনবল খুবই সীমিত ছিল সেহেতু বিমান যুদ্ধের কৌশল হিসেবে আমরা দুটো পন্থা অবলম্বন । প্রথমত কেবলমাত্র রাতের বেলায় অপারেশন পরিচালন করা এবং দ্বিতীয়ত আমরা যাতে পাকবাহিনীর রাডারে ধরা না পড়ি, সেজন্য খুব নীচু দিয়ে উড্ডয়ন করা।
&nbsp;
নাগাল্যান্ড এক বিস্তীর্ন জংগলাকীর্ণ পার্বত্য এলাকা। সুতরাং লক্ষ্যবস্তু ঠিক করে আমাদের নিয়মিত অনুশীলন করা খুবই অসুবিধাজনক ছিলো। তাই একটা পাহাড়ের উপর সাদা প্যারাসুট ফেলে সেটাকে লক্ষ্যবস্তু ধরে আমরা অনুশীলনের ব্যবস্থা করি যাতে রাতের বেলায়ও দেখা যায়।
&nbsp;
৩রা ডিসেম্বর সর্বাত্বক যুদ্ধ শুরু হলে আমাদের এই ক্ষুদ্র বিমান বাহিনী চট্টগ্রামো গোদানাইলে প্রথম আঘাত হানে এবং পাক বাহিনীর মারাত্বক ক্ষতি সাধনে সক্ষম হয়।
&nbsp;
মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর ডেপুটই চিফ অব স্টাফ হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন দিক প্রত্যক্ষ করার দুর্লভ সৌভাগ্য আমার হয়েছিল । আমরা তরুণেরা প্রায় বিনা অস্ত্রে অথবা অতি সাধারন অস্ত্র নিয়ে কেমন করে অতি আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত একটা বাহিনীর সাথে অসীম সাহস নিয়ে মোকাবেলা করেছিল এবং কেমন করে স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছিল তার বহু ছোট ছোট ঘটনা আজো আমার স্মৃতিতে অম্লান হয়ে আছে এখানে আমি বহু ঘটনা থেকে একটা মাত্র ঘটনার উল্লেখ করছি ।
যুদ্ধ চলাকালে পাক বাহিনীর জন্য প্রয়োজনীয় বস্ত্রসামগ্রী বিশেষ করে অস্ত্রশস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করে দেয়ার লক্ষ্যে আমরা চট্রগ্রাম ও চালনা বন্দরকে অকেজো করে দেয়ার একটা পরিকল্পনা নিই । আমরা সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিলাম যে , যদি নৌ-কমান্ডো পাঠিয়ে পাকিস্তানী বা তাদের মিত্রদের কিছুসংখ্যক জাহাজ ডুবিয়ে দিতে পারি তবে এতে চমৎকার ফল পাওয়া যাবে । ডুবে যাওয়া জাহাজ একদিকে বন্দরের প্রবেশপথকে বন্ধ করে দেবে এবং মানসিক দিক থেকেও অন্য কোন জাহাজ সে পথে যেতে সাহসী হবে না ।
একই লক্ষ্যকে সামনে রেখে জুন মাস থেকে প্রায় ১৫০ জন মুক্তিযোদ্ধাকে মুর্শিদাবাদের পলাশীতে নৌ-কমাণ্ডোর প্রশিক্ষণ দেয়া হয় । এই পরিকল্পনার আওতায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ১৩/১৪ বছর বয়সের একটি কিশোর ডুব-সাঁতার দিয়ে চালনা বন্দরের একটি পাকিস্তানী জাহাজে মাইন ফিট করতে যায় কিন্তু ভ্রান্তিবশত সে একটি চায়নিজ জাহাজের কাছে চলে যায় এবং ওদের হাতে ধরা পড়ে । পরে বহু জিজ্ঞাসাবাদের পর তারা তাকে মুক্তি দেয় । ফিরে এসে অবলীলায় সে তার মৃত্যুর হাত থেকে ফিরে আসার বর্ণ্না দিয়েছিল সবার কাছে । মুক্তিপাগল এই কিশোরের সাহস, দৃঢ়তা ও দেশপ্রেমের দৃষ্টান্ত সেদিন আমরা সবাই বিস্মিত হয়েছিলাম ।এই ঘটনা একটা একক বিচ্ছিন্ন কোন ঘটনা নয়-এ রকম হাজার হাজার নজীর সেদিন আমাদের ছেলেরা স্থাপন করেছে ।
&nbsp;
মে মাসে পরিস্থিতি বিশ্লেষণের পর আমার একটা পরিষ্কার ধারনা হয়েছিলো যে, ডিসেম্বরের শেষ নাগাদ দেশ পুরোপুরি শত্রু মুক্ত হবে। আমার এই ধারনার পেছনে প্রধানতঃ তিনটি কারন ছিল।
&nbsp;
প্রথমতঃ যে বিপুল পরিমান শরনার্থী ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলো তাঁরা অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক দিক থেকে ভারতের পক্ষে একটা বিরাট সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে। সুতরাং যত শীঘ্র এর একটা সমাধানের পথ বের করার জন্য ভারত উদগ্রীব হবে।
&nbsp;
দ্বিতীয়তঃ পাকিস্তানের দুই অংশকে আলাদা করে দেয়ার যে কামনা ভারতের ছিলো তাঁকে সফল করে তোলার এটাই ছিলো সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। সুতরাং ভারত এ সুযোগের পূর্ণ ব্যবহার করবে।
&nbsp;
তৃতীয়তঃ ভারত এটা বুঝতে পেরেছিল যে, বাইরের বিশেষ করে চীনের তরফ থেকে হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায় না। সুতরাং যুদ্ধে যদি ভারতকে নামতেই হয় তাহলে এমন একটা সময় বেছে নিতে হবে যাতে চীনের পক্ষে যুদ্ধে অসম্ভব হয়ে পড়ে। নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত ভারত-চীন এলাকায় প্রচন্ড শীত ও তুষারপাতের ফলে চীনা সৈন্যদের ব্যাপারে চূড়ান্ত ফয়সালা করে নেয়ার ব্যাপারে ভারতের চেষ্টা করাই স্বাভাবিক।
&nbsp;
কেবল ভারতীয় সাহায্যের কথা চিন্তা করেই আমি এ ধারনা পোষন করিনি। ইতিমধ্যে দেশের জনসাধারণের অকুন্ঠ সমর্থন ও সহযোগীতা পেয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল একদিকে যেমন বৃদ্ধি পেয়েছিল তেমনি শত্রুকে চরম আঘাত হানার শক্তিও তাঁদের দিন দিন বৃদ
&nbsp;
অপরদিকে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্রমাগত গেরিলা আক্রমণে এবং দেশের ভেতরে কোটি কোটি বৈরীভাবাপন্ন মানুষের সহযোগিতা ও প্রতিরোধ পাকবাহিনীকে সম্পূর্নরূপে হতোদ্যম ও পরিশ্রান্ত করে তুলেছিল । অবশেষে আমাদের সেই বহু কাঙ্ক্ষিত সময়, শত্রুর পূর্ন আত্নসমর্পণের সময় ঘনিয়ে এল । ১৬ ই ডিসেম্বরের সকাল বেলা । পাক-বাহিনীর আত্নসমর্পণের সিদ্ধান্তের কথা ইতিমধ্যে এসে গেছে । এমন সময় খবর পেলাম বাংলাদেশ সরকারের পূর্ণ কেবিনেটের বসেছে এবং আমাকে ওখানে জরুরী কোন বিষয়ে আলোচনার জন্য খোঁজ করা হচ্ছে । কর্নেল ওসমানী তখন সীমান্তের অগ্রবর্তী এলাকা পরিদর্শনের জন্য সিলেটে ছিলেন । সুতরাং সেই অল্প সময়ে তার সঙ্গে চেষ্টা করেও যোগাযোগ স্থাপন করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি ।
আমাকে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন জানালেন , যে বিকেলে ঢাকায় পাকবাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে আত্নসমর্পণ করবে এবং কর্নেল ওসমানীর অনুপস্থিতিতে বাংলাদেশ মুক্তিবাহিনীর সবচেয়ে সিনিয়র অফিসার হওয়ায় উক্ত অনুষ্ঠানে আমাকে বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধিত্ব করতে হবে । তদনুসারে জেনারেল অরোরার সঙ্গে বিমানে আগরতলা , এবং ওখান থেকে হেলিকাপ্টারে ঢাকা এসে পৌঁছালাম । জেনারেল অরোরা ছিলেন সম্মিলিত বাহিনীর কমাণ্ডার।
আত্নসমর্পণের দলিলে কেবলমাত্র দুই জনের স্বাক্ষর দানের ব্যবস্থা ছিল- একজন পাক বাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় এলাকার প্রধান এবং অন্যজন ভারত ও বাংলাদেশের যৌথ বাহিনীর অধিনায়ক।
অনুষ্ঠানে পাক-বাহিনী প্রধান বিষন্ন, ভগ্নপ্রায় ও অশ্রুসিক্ত জেনারেল নিয়াজীকে দেখলাম। যথাসময়ে উভয় পক্ষের স্বাক্ষর হয়ে গেল । চূড়ান্ত বিজয়ের মাধ্যমে সমাপ্তি ঘটলো বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের।
&nbsp;
আব্দুল করিম খন্দকার (এয়ার ভাইস মার্শাল, অবসরপ্রাপ্ত ) আগষ্ট, ১৯৮৪
&nbsp;
&nbsp;
<a href=”https://www.facebook.com/mehjabeen.mostafa?fref=ts”>মেহজাবিন মোস্তফা </a>ও <a href=”https://www.facebook.com/samiulhasan.pranto?fref=ts”>সামিউল হাসান প্রান্ত</a>
&lt;<strong>১৫,৫</strong><strong>,২৫-৩৫</strong>&gt;<h1>[আবদুল খালেক]</h1>&nbsp;
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড
আবদুল খালেক
ঊনিশশত সত্তুরের মার্চ মাসে আমি সারদা পুলিশ একাডেমির প্রিন্সিপাল ছিলাম। অনেক আগে থেকেই দেশের রাজনৈতিক ঘটনা-প্রবাহের প্রতি আমার বিশেষ আকর্ষণ ছিল। সামাজিক রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক সাংস্কৃতিক দিক থেকে পূর্ববঙ্গ/পূর্ব পাকিস্তানকে কোনঠাসা করে রাখার ঘটনাবলী আমার চেতনায় আঘাত দিয়েছিল। লিয়াকত আলী খান, সরদার আবদুর রব নিশতার প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে পূর্ববঙ্গের প্রতিনিধিত্ব করবেন তা আমি মেনে নিতে পারিনি। রাষ্ট্রভাষা সম্বন্ধে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ও খাজা নাজিম উদ্দিন যে সকল কথা বলেছেন, তাতে উর্দুভাষার প্রতি আমার বিদ্বেষ সৃষ্টি হয়। পঞ্চাশের দশকের গোড়ার দিকে পাকিস্তান পুলিশ সার্ভিসে যোগদান করেও আমার মনোভঙ্গির কোন পরিবর্ত ঘটাইনি, উর্দুভাষা শেখার চেষ্টা করিনি যদিও পুলিশ বিভাগের উর্দুভাষার প্রচলন উর্দুভাষা শেখার চেষ্টা করিনি যদিও পুলিশ বিভাগের উর্দুভাষার প্রচলন ছিল সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য।
&nbsp;
১৯৫৬ সালের সংবিধানের সংখ্যাসাম্য নীতি এবং ১৯৫৮ সালের সামরিকবাদকে আমি মোটেও সমর্থন করিনি। অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে ক্ষমতা দখল করাকে আমি নিছক বর্বরতা বলে গণ্য করেছি। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের এবং ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে যারা অবদান রেখেছেন তাদেরকে আমি আজও শ্রদ্ধা করি, ২১শে ফেব্রুয়ারী-রক্তস্নাত পূর্ববঙ্গে যারা পাকিস্তানের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলেন, তারা আমার পরম শ্রদ্ধাস্পদ।
&nbsp;
১৯৬৯ সালের সামরিক কর্তাদের আদেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হলে পুলিশি তল্রাশি চালানো হয়। উক্ত তল্লাশির বিরোধিতা করে কিছু কথা বলার জন্য সামরিক কর্তৃপক্ষ আমার উপর ক্ষেপে যায়। ঐ বছর ঢাকা বিভাগের ডিআইজি থাকাকালে প্রায় সময় সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে আমার মতবিরোধ ঘটতো। প্রশাসনের সঙ্গে মতবিরোধ অনেক আগেও হয়েছিল। ১৯৫৪ ও ১৯৬৫ সালের নির্বাচনে আমি নিরপেক্ষ থেকে মহাবিপদের সম্মুখীন হয়েছিলাম। সে সময় আমার উপর কড়া নজর রাখা হতো। ১৯৬৯-এরশেষ ভাগে ঢাকার জনসাধারণ মওলানা মওদুদীকে পল্টন ময়দানে বক্তৃতা দিতে দেয়নি। গোলমালের দায়ে ঢাকার পুলিশ সুপার মামুন মাহমুদ (শহীদ) কে ময়মনসিংহে বদলি করা হয় এবং তার পদোন্নতি ছয় মাস পিছিয়ে দেয়া হয়। এই প্রসঙ্গে ঘোরতর আপত্তি জানালে মাস তিনেক পরে আমাকে ঢাকা থেকে সারদায় বদলি করা হয়। কিন্ত ঢাকার ঝামেলা থেকে সরে গিয়ে আমি খুব খুশী হই।
&nbsp;
১৯৭০-এর নির্বাচনের ফলাফল আমি লন্ডনে বসে শুনতে পাই। পাকিস্তান হাইকমিশনের কর্মকর্তারা হতবাক। দু’চার জনের সঙ্গে কথা বলে বুঝতে পারি যে, ফলাফল কার্যকর হতে দেয়া হবে না। দেশে ফিরে মুজিবুর রহমান সাহেবকে এ কথা বলতে তিনি তা হেসে উড়িয়ে দেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সমাজ ১৯৭১-‌এর জানুয়ারী মাস থেকেই পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতার কথা উত্থাপন করতে শুরু করেছিল। ৭ ই মার্চের ঘোষণা ও অসহযোগ আন্দোলনের ফলে আসন্ন সামরিক আঘাতের মোকাবেলা করার কোন রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রস্তুতি আমাদের ছিল কি না জানি না। আওয়ামী লীগ নেতারা ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে সংলাপের রাজনীতিতে উঠেপড়ে লেগেছিল। সামরিক কর্মকর্তারা বহু দেশে সংলাপের নামে রাজনীতিবিদদেরকে বোকা সাজিয়েছে এ খবর হয়ত বা তাদের জানা ছিল না। মার্চের মাঝামাঝি সময়ে সারদা একাডেমিতে কর্মরত ও প্রশিক্ষণরত কয়েকশত পুলিশ খুব অস্থির হয়ে উঠে। দেশে আসন্ন সামরিক পরিস্থিতে তারা জীবন দিবে-এই প্রতিশ্রুতি রেখে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত পুলিশ দল নিজ নিজ কর্মস্থলে চলে যায়। একাডেমির স্টাফকে সে সময় স্থানীয় লোকজনদেরকে গুলিবন্দুক বিষয়ক প্রশিক্ষণের কাজে নিয়োজিত করা হয়। সারদা একাডেমির খবর পেয়ে রাজশাহীতে অনুরূপ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। মামুন মাহমুদ (শহীদ)-এর কথা আগেই বলেছি তিনি তখন ময়মনসিংহ থেকে বদলী হয়ে রাজশাহীর ডিআইজি। পুলিশ সুপার শাহ আবদুল মজিদ (শহীদ) মাত্র মাস দু’এক আগে সারদা থেকে রাজশাহীতে বদলী হন। সারদা ও রাজশাহী পুলিশ লাইনে তখন পরিখা তৈরী করা হয় এবং পুলিশের নেতৃত্বে বিবিধ প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়। রাস্তাঘাট কেটে সামরিক যাতায়াতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়।
&nbsp;
২৩শে মার্চ সারদা একাডেমীতে পাকিস্তানের পতাকা ওঠানো হয় নি। এ খবর পেয়ে রাজশাহী গ্যারিসনের লোকজন এমনকি জেলা প্রশাসনের কেউ কেউ সারদা এসেছিলো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের কর্মসূচির সঙ্গে সংগতি রেখে সারদায় কালো পতাকা ওঠানো হয় এবং পাকিস্তানি পতাকা নিশ্চিহ্ন করা হয়। গ্যারিসনের ধারেকাছেই আমরা এতোকিছু করে যাচ্ছি অথচ তখন আমাদের কোনো ভয়ভীতি ছিল না।
&nbsp;
২৬শে মার্চের সকালে খবর পেলাম যে ইয়াহিয়া খানের সামরিক অভিযানে রাজারবাগ পুলিশলাইন, পিলখানা ইপিআর হেড কোয়ার্টার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা শহরের অনেক অংশ বিধ্বস্ত হয়েছে। হাজার হাজার পুলিশ ও ইপিআর লড়াই করে প্রাণ দিয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু শিক্ষককে হত্যা করা হয়েছে। এসব খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের অস্ত্রাগারের তালা খুলে দেওয়া হয়। সারদা একাডেমীর পুলিশ পরিবারগুলো কোনো দিকে সরে যেতে পারে নি। কেননা স্থানীয় লোকজন কাউকে সেই অঞ্চল ছেড়ে যেতে দিচ্ছিলো না। সামরিক যানবাহন চলাচলের প্রতিবন্ধকতা আগে থেকে তৈরি করা হয়েছিলো। সরকারি আদেশে পদ্মায় নৌকা চলাচল বন্ধ। কাজেই সারদায় বসেই প্রতিরক্ষা/প্রতিরোধের জন্য তৈরি হওয়াই ছিল আমাদের একমাত্র উপায় ও লক্ষ্য।
&nbsp;
৩১ মার্চের শেষ রাতে খবর পেলাম যে একাডেমীর পাশ দিয়ে রাতের অন্ধকারে কিছুসংখ্যক সৈন্য চলাচল করেছে। মিনিটকাল বিলম্ব না করে পরিবারসহ সেই অন্ধকারে আমার নিজস্ব গাড়িতে করে একাডেমীর বাইরে চলে আসি। সঙ্গে ব্যবহারের জন্য কাপড়-চোড় ও টাকা-পয়সা কিছুই নিয়ে আসার সময় পাই নি। একাডেমীতে এই নির্দেশ রেখে আসি যে এবার যেন প্রত্যেকে নিজ নিজ নিরাপত্তার পথ বেছে নিতে বিলম্ব না করে। বেলা ওঠার সঙ্গে সঙ্গে পুটিয়া থানায় এসেও সেনাবাহিনীর গতিবিধির খবর পেলাম। থানার প্রাঙ্গণে আমার গাড়িটি ফেলে টমটম নিয়ে নওগাঁ-র দিকে এগুতে থাকি। আমার স্ত্রী (সেলিনা), মেয়ে (সামিনা) এবং ছেলে (ইনান) আর বাবুর্চি রহিমুদ্দিনকে টমটমে দেখে কে বা কারা গুজব রটিয়ে দেয় যে, সারদার একজন পাঞ্জাবী অফিসার পালিয়ে যাচ্ছে। সন্ধ্যার প্রাক্কালে একটি স্কুলের পাশে উপস্থিত হই এবং স্থানীয় একজন প্রিন্সিপালের বাসায় উঠি। সেখানে হাজার হাজার লোক এসে উপস্থিত। তারা বিশ্বাস করতে চায় না যে আমি বাঙালী। প্রিন্সিপাল আমাদের স্কুলের প্রাঙ্গণে নিয়ে আসেন। এমন সময় পার্লামেন্ট সদস্য সরদার আমজাদ হোসেন সেই পথে যাচ্ছিলেন। আমাদের বিপদের কথা শুনে তিনি লোকজনকে বুঝালেন যে আমি বাঙালী। কিন্তু কিছু সংখ্যক লোক দাবি করে যে, আমাকে বাংলা ভাষায় বক্তৃতা দিয়ে প্রমাণ করতে হবে যে আমি বাঙালী। আমজাদ হোসেনের পরামর্শে অগত্যা বক্তৃতা দিয়ে রেহাই পেলাম। কিন্তু সেখানে রাত কাটাতে সাহস হলো না। অন্ধকারে গরুর গাড়িতে নওগাঁর দিকে এগুতে শুরু করি। রাত এগারোটায় পথিমধ্যে বাগমারা থানাঘরে উঠে দেখি সেখানে কেউ নেই। কিছুক্ষণ পর একজন সিপাহীর দেখা পেলাম। ওসি ও অন্যান্য পুলিশ কোথায় সে জানে না। ওসির পরিবারের কাছে পরিচয় দিয়ে বৈঠকখানায় বসি। গভীর রাতে তিনি আমাদের খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা করেন। সিপাহীটি খবর দিলো যে, ওই জায়গায় আমাদের থাকা নিরাপদ হবে না। সিপাহী বহু কষ্টে একটি গরুর গাড়ির বন্দোবস্ত করে দেন এবং আমরা এ রাতেই নওগাঁর দিকে এগিয়ে চলি। ভোর হতে না হতেই দা,লাঠি,বল্লম ইত্যাদি হাতিয়ার সজ্জিত হাজার হাজার লোকের বেড়াজাল ভেদ করে চলতে হয়। বেলা নয়টার দিকে একটি বাজারে এসে পৌঁছি। সেখানেও আমাকে পাঞ্জাবী বলে সন্দেহ করা হয় এবং আমার বাঙালিত্বের পরিচয় দিতে হয়। পরিবারসহ আমাদের আত্মীয় পুলিশ ইন্সপেক্টর লোদীর বাসায় যাচ্ছিলাম। লোদীকে ডেকে আনার জন্য তিনি লোক পাঠালেন এবং আমাদের জন্য খাবারের বন্দোবস্ত করলেন। ঘণ্টা চারেক পর লোদী সাহেব এসে আমাদের নওগাঁয় নিয়ে গেলেন। কোত্থেকে কীভাবে এখানে এসেছি এ খবর শুনে লোদী পরিবার মর্মাহত। কিন্তু আমরা এতোদিন পর নিরাপত্তাবোধ ফিরে পেলাম।
&nbsp;
এই সময় সান্তাহারে বাঙালি-অবাঙালিদের মধ্যে হিংসাত্মক কার্যকলাপ বন্ধ করার কাজে লোদী ব্যতিব্যস্ত। ম্যাজিস্ট্রেট আজিজুর রহমান ও মেজর নাজমুল হক মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে ব্যস্ত। রাজশাহী জেলার জন্য প্ল্যান বানানো হলো। আমি সারদা অঞ্চলের ভার নেই। সঙ্গে থাকেন সারদা ক্যাডেট কলেজের ক্যাপ্টেন রশীদ এবং অধ্যাপক আজিমদ্দিন। ব্যবস্থা করা হলো যে, পাক-সেনাবাহিনীর আক্রমণে নওগাঁর নিরাপত্তা বিপন্ন হলে ইন্সপেকটর লোদীর পরিবার আমার স্ত্রী, মেয়ে এবং ছেলেকে নিয়ে ধামুরহাট বর্ডার দিয়ে ভারতে আশ্রয় নেবে। ১২ই এপ্রিল আমি সারদায় ফিরে আসি। তখন একাডেমী প্রায় জনশূন্য। ভাইস প্রিন্সিপাল শৈলেন্দ্র কিশোর চৌধুরীর স্ত্রী সন্তানসম্ভবা ছিলেন বলে নিরুপায় হয়ে তারা সারদায় রয়ে গেছেন। পিএসপি ট্রেইনি অফিসারদের মধ্যে মধ্যে বাঙালিরা নিজ নিজ বুদ্ধি খাটিয়ে নিরাপদ স্থানে পৌঁছুবার আশায় বের হয়ে গিয়েছে এবং পশ্চিম পাকিস্তানিদের পদ্মার অপর পাড়ে ভারতে পৌঁছে দেবার ব্যবস্থা করেছে। আরো জানতে পারলাম যে, তারা ভারতীয় বর্ডার নিরাপত্তা বাহিনীর কাছে রিপোর্ট করেছে। জনশূন্য একাডেমীতে থাকার কোনো যৌক্তিকতা নেই দেখে রশীদ ও আমি ঠিক করি যে, ১৪ই এপ্রিল সন্ধ্যায় চারঘাট হয়ে কুষ্টিয়ার পথে ভারতে প্রবেশ করবো। এদিকে ঢাকা থেকে মাঠঘাট জ্বালিয়ে পুড়িয়ে পাক বাহিনী নাটোরে এসে পৌঁছেছে। গুপ্তচরেরা আমাদের অবস্থান ওদের জানিয়ে দেবে এই বিষয়ে আমাদের কোনো সন্দেহ ছিল না। দুটি রাত সারদার বাইরে চারঘাট থানাঘরে কাটাই। থানায় কেউ ছিল না। শুধু আমি এবং সারদার একজন বাঙালি সিপাহী। ১৪ই এপ্রিল বিকাল চারটায়, সঙ্গে কিছু কাপড়চোপড় নিয়ে সারদা থেকে বেরিয়ে পড়ার জন্য তৈরি হচ্ছি ঠিক এমন সময় মেশিনগানের বিকট শব্দ শুনতে পেলাম। মিনিটখানেকের মধ্যে খবর পেলাম যে পাকবাহিনী তিন দিক থেকে একাডেমী ঘেরাও করেছে এবং অফিসার্স মেসে পৌঁছেছে। মুহূর্তকাল বিলম্ব না করে সবকিছু ফেলে পদ্মার দিকে দৌঁড়ে পালাই। পানির ধারে কিছুসংখ্যক স্থানীয় লোক সামরিক বাহিনীর দৃষ্টির আড়ালে লুকিয়ে আছে। নদী পার হবার কোনো যানবাহন অনেকদিন আগে থেকেই সেখানে নেই। সাঁতরিয়ে পার হবার জন্য পানিতে নেমেছি, পিছনে তাকিয়ে দেখতে পাই নিকটবর্তী চরের নালায় একটি ছোট ঘাসের নৌকায় কয়েকজন লোক উঠবার চেষ্টা করছে। কিন্তু ওই সময় নদীতে এগোলেই মাঝি গুলি খেয়ে মরবে এই ভয়ে বুড়ো মাঝি কাউকে নৌকায় উঠতে দিচ্ছে না। ঘাস ভর্তি ছোট নৌকাটিতে বড়জোর দুজন উঠতে পারে। আমি চরে ফিরে আসি এবং নৌকার কাছে গিয়ে মাঝিকে অনুরোধ জানাই আমাকে ঘাসের মধ্যে লুকিয়ে চরের ধার বেয়ে কিছুদূর নিয়ে যাবার জন্য। সৈন্যদের চোখে ধুলি দিয়ে পালাবার আর কোনো বুদ্ধি সেসময় মাথায় আসে নি। আমাকে ঘাসের নিচে লুকিয়ে নৌকাটি ধীর গতিতে নদীর চরের ধার বেয়ে চলেছে তাতে কারো সন্দেহ হয় নি যে নৌকাটিতে আমি পালাচ্ছি। এভাবে একাডেমীর গণ্ডির বাইরে এসে নৌকাটি সরাসরি নদী পার হবার পথে এগিয়ে চলে এবং দ্রুত বেগে অনেক দূরে এসে পৌঁছে। এসময় সামরিক হেলিকপ্টার থেকে আগুন ছেড়ে গ্রামগুলো জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। দিশেহারা হাজার হাজার লোক পালিয়ে পদ্মা নদীর চরে এসেছে কিন্তু নদী পার হতে পারছে না। এদের মধ্যে প্রায় দেড় হাজার লোককে নদীর ধারে গুলি করে হত্যা করা হয়। ঘটনাস্থল থেকে মাত্র চার/পাঁচ শত গজ দূরে উক্ত ঘাসের নৌকা ও আমি। সৈন্যরা ভাবতে পারে নি যে, আমি সেই নৌকায় লুকিয়ে আছি। ঘণ্টাখানেক পর পদ্মার অপর পাড়ে পৌঁছি। সঙ্গে কিছু নেই। ভেজা প্যান্ট ও শার্ট। নওগাঁয় ফেলে আসা পরিবারের কী অবস্থা ভাবতেই পারছিলাম না। হাজারো দুশ্চিন্তায় একেবারে ভেঙে পড়ি। অত্যন্ত দুঃখের সাথে আজো স্মরণ করছি যে, সারদায় গিয়ে আমি একটি ৬০০ পৃষ্ঠাব্যাপী বইয়ের পাণ্ডুলিপি তৈরি করেছিলাম। এই পাণ্ডুলিপি সারদা একাডেমীর স্টেনোগ্রাফার শহীদ মোস্তফার হাতেই তৈরি হয়। আমি যেদিন সারদা ছেড়ে পালিয়ে যাই সেদিনই মোস্তফাকে পাক সৈন্যরা গুলি করে হত্যা করে। আমার বাড়িঘর, পাণ্ডুলিপি সবকিছু লুণ্ঠিত হয়।
&nbsp;
১৪ই এপ্রিল সকালবেলা সারদা একাডেমীর ভাইস প্রিন্সিপাল শৈলেন্দ্র কিশোর চৌধুরীকে পরিবারসহ পদ্মার ওপারে পৌঁছাবার ব্যবস্থা করা হয়। অনেক অনুরোধের পর স্থানীয় লোকজন তার সন্তানসম্ভবা স্ত্রীর প্রতি সদয় হয়ে কোনোক্রমে একটি নৌকা জোগাড় করে দেয়। নদীর ওপারে পৌঁছে চৌধুরী চরেই পরিবারসহ বসে থাকে। তার স্ত্রীকে নিয়ে এগোতে সাহস পায় না। সন্ধ্যার পরক্ষণেই আমরা ভারত সীমান্তে ডাক্তার নরেন্দ্রনাথের বাড়িতে আশ্রয় নেই। সেই বাড়িতে কয়েকশত লোক ইতিমধ্যে আশ্রয় নিয়েছিলো। ডাক্তার আমাদেরকে যথাসম্ভব যত্নসহকারে রাখেন। পরের দিন ব্লক ডেভেলপমেন্ট অফিসার আমাকে বহরমপুর জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে পাঠাবার ব্যবস্থা করেন। আমার পরিবারের পরিস্থিতি সম্বন্ধে তাকে জানাই। তিনি আমার বালুরঘাট যাবার ব্যবস্থা করেন। সেখানে নাটোরের এসডিও কামালউদ্দিনের সাথে দেখা হয়। কয়েকদিন আগে তিনি এখানে পালিয়ে আসেন।
&nbsp;
বহরমপুরে সারদা একাডেমীর পুলিশ ইন্সপেক্টর ক্ষিতিশের সঙ্গে হঠাৎ দেখা হয়। তাকে সঙ্গে করে বালুরঘাট নিয়ে যাই। বহরমপুরে মুর্শিদাবাদের পুলিশ সুপারের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করি। বালুরঘাট বাস টার্মিনালে কংগ্রেস কর্মী উৎপল আমাকে খুঁজে বের করে এবং তাদের বাসায় নিয়ে যায়। জানতে পারলাম বহরমপুরের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আমার খবর বালুরঘাটে পাঠিয়েছেন। উৎপলদের পরিবার দেশ বিভাগের পূর্বে ঢাকা শহরের বাসিন্দা ছিল। উৎপলদের সঙ্গে পরামর্শ করে পর দিন ভোরে ক্ষিতিশ ও আরো কয়েকজনকে ভিন্ন ভিন্ন দলে বিভক্ত করে আমার পরিবারের তল্লাশে সীমান্তের এপারে পাঠানো হয়। প্রত্যেক দলের সঙ্গে আমার হাতে লেখা একটি চিঠি আমার পরিবারের জন্য দিয়ে দেই। নওগাঁয়ে সামরিক বাহিনীর উপস্থিতিতে সেখানকার লোকজন ভারত সীমান্তের দিকে পালিয়ে যায় এবং বিভিন্ন বাড়িতে আশ্রয় নেয় – এ খবর বালুরঘাটে পৌঁছে। বর্ডারের মেইল পাঁচেক ভিতরে ধামুরহাট থানা অঞ্চলে এক হাজীর বাড়িতে অনেক লোকে আশ্রয় নিয়েছিলো। তাদের সঙ্গে লোদী পরিবার ও আমার পরিবার সে বাড়িতে পৌঁছে। কিন্তু তারা নিরুপায়। সীমান্তের অপর পাড়েই বা কোথায় যাবে। এদিকে আমার কোনো খোঁজ-খবর তাদের জানা নেই। ক্ষিতিশ কয়েকটি আশ্রয়স্থল খুঁজে হাজী বাড়িতে গিয়ে তাদের সন্ধান পায়। অতঃপর আমার পরিবার জীবনের চূড়ান্ত অনিশ্চয়তার পথ বেছে নিয়ে ক্ষিতিশদের সঙ্গে উৎপলদের বাড়িতে এসে পৌঁছে। এখানেই আমার পরিবার জীবনের আরেক অধ্যায়ের সূচনা। উৎপলের বাবা-মা-ভাই-বোন সবাই আমাদেরকে আপন বলে গ্রহণ করে। পশ্চিম দিনাজপুরের পুলিশ সুপার ঢাকা জেলার দোহার-নবাবগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা ছিলেন। আমার শ্বশুরালয়ের এলাকায় খ্রিস্টান পরিবারের এই অফিসার ভারতীয় পুলিশ সার্ভিসের সদস্য। তিনি অভাবনীয় সৌজন্য দেখিয়ে আমাদেরকে একটি জীপে কলকাতা পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। এবং পথে আমাদের সকলের খরচ বাবদ একশত টাকা হাতে তুলে দেন।
&nbsp;
১৮ই এপ্রিল সন্ধ্যার প্রাক্কালে কলকাতায় কীড স্ট্রিটের এমপি হোস্টেলে কলকাতার কংগ্রেস দলীয় এমপি জয়নাল আবেদীনের অতিথি হিসেবে আশ্রয় নিই। খাওয়াদাওয়ার খরচ আমাদের নিজেদেরকে বহন করতে হয়েছিলো। আমার বা আমার স্ত্রীর সঙ্গে কোনো টাকাপয়সা ছিল না। সামান্য গহনা ছিল মাত্র। আমাদের ছোট ছেলে ইনান তার জন্মদিনে পাওয়া চারশত টাকা সঙ্গে নিয়েই সারদা থেকে বেরিয়েছিলো। পালাবার দিন রাতে ওই টাকা তার সঙ্গে ছিল। এখন তার টাকা খরচ করতে চায় না। তার হিসাব হলো এতজন লোক মিলে এই টাকা খেয়ে শেষ করার পর আমাদের অবস্থা কী হবে। এমপি হোস্টেলের কোণে পান-বিড়ির দোকানের বেচাকেনা দেখে সে নিজে একটি পান বিড়ির দোকান করতে চায়। তার হিসাব অনুযায়ী দৈনিক ৭/৮ টাকা লাভ হবে এবং তাতে আমাদের খাওয়ার খরচ কোনোক্রমে হয়ে যাবে। ঐ সময় আমাদের পাঁচজনের (বাবুর্চিসহ) জন্য দৈনিক ৫/৬ টাকার বেশি খাওয়া খরচ করতে পারি নি।
&nbsp;
কীড স্ট্রিটে ১৭ই এপ্রিল কুষ্টিয়ার আমবাগানে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সনদ পাঠের কথা শুনতে পাই। সোহরাব হোসেন, মমিনউদ্দিন প্রমুখ কয়েকজন কলকাতার এমপি হোস্টেলেই ছিলেন। কামরুজ্জামানের সঙ্গে দুমিনিটের জন্য দেখা হলো। আমাদের বড় বড় নেতারা কে কোথায় আছেন জানতে চাইলে তিনি কানে কানে বললেন যে, আগামী দিন সে খবর আমাকে দেওয়া হবে। সে মুহূর্তে আমাদের নেতাদের অবস্থান সম্বন্ধে কেউ কিছু বলতে চায় নি।
পরদিন হাইকমিশনে গিয়ে ডেপুটি হাইকমিশনার হোসেন আলী ও পদস্থ অফিসার রফিকুল ইসলাম চৌধুরীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করি। রফিকের ছেলেমেয়ে ও স্ত্রী তখন ঢাকায়। তাদের জন্য দুশ্চিন্তায় এবং কিছু পেশাগত দুর্বিপাকে রফিক দিশেহারা। হাইকমিশনে খন্দকার আসাদুজ্জামান, নূরুল কাদের খান ও আরো কয়েকজনের সঙ্গে দেখা হলো। তাদের কাছে শুনতে পেলাম যে, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমদ, মনসুর আলী, খন্দকার মোশতাক আহমেদ, আবদুল মান্নান ও কর্নেল ওসমানীকে বালিগঞ্জের একটি বাসায় থাকতে দেওয়া হয়েছে। সেখানে কয়েকজন ভারতীয় তাদের দেখাশোনা করছেন। কামরুজ্জামান অন্যত্র থাকেন। তাদের সঙ্গে দেখা করে অনেক কথা জানতে চেয়েছি। সকলের মুখে একই কথা যে, তারা নিজ নিজ সিদ্ধান্তে ভিন্ন ভিন্ন পথে কলকাতায় এসেছেন। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র দেখতে চেয়েছি। কিন্তু কেউ দেখান নি। বালিগঞ্জের সেই বাসস্থানে তাদের আর্থিক অনটন ও দুরবস্থা দেখে খুবই খারাপ লেগেছে। পাশেই মহিষের বাথান, দুর্গন্ধে টিকা যায় না। নিরাপত্তার অভাবে তারা ঘরের বাইরে যাচ্ছেন না। শুধু কামরুজ্জামান ঘুরেফিরে বেড়াচ্ছেন। কলকাতায় লেখাপড়া করেছেন বলে তার জানাশোনা অনেক লোক ছিল। নজরুল ইসলাম ও মনসুর আলীর পরিবারের কোনো খবর নেই। পরিবার উদ্ধারের চিন্তায় তারা দিশেহারা। সারদার ইন্সপেক্টর গাজী গোলাম রহমানকে মনসুর আলীর পরিবার পাবনা জেলার কাজীপুর অঞ্চলে খুঁজে বের করে কলকাতায় আনার জন্য ঠিক করা হলো। পথের খরচ বাবদ একশত টাকা চাওয়া হলো। কিন্তু সে টাকা ১০/১২ দিনেও জোগাড় হয় নি।
&nbsp;
খন্দকার আসাদুজ্জামান, নূরুল কাদের ও আমি একসঙ্গে নেতাদের সঙ্গে দেখা করে প্রবাসী প্রশাসন গড়ে তোলার উপদেশ দেই। আমাদের মতে স্বাধীনতার ঘোষণা করে ঘরে বসে দিশেহারা হয়ে থাকলে চলবে না। আমাদেরকে সংঘবদ্ধ হতে হবে এবং যুদ্ধের জন্য সম্ভাব্য প্রস্তুতি নিতে হবে এবং সে জন্য চাই একটি প্রশাসন যন্ত্র। আমাদের প্রস্তাবে সম্মত হয়ে আমাদেরকেই যথোচিত বিধিব্যবস্থা তৈরি করার ভার দেওয়া হলো। ইতিপূর্বে অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট পদে সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী পদে খন্দকার মোশতাক আহমদ, অর্থমন্ত্রী পদে মনসুর আলী এবং স্বরাষ্ট্র ও রিলিফ মন্ত্রী পদে কামরুজ্জামান অধিষ্ঠিত হন। ১৭ই এপ্রিলের ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে মুজিবনগর সরকার গঠিত হয়। কিন্তু সরকারের কোনো প্রশাসনিক সংগঠন প্রতিষ্ঠিত হয় নি। শুধু কর্নেল ওসমানীকে মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়ক নিযুক্ত করা হয়েছিলো। মুজিব নগর সরকারের খসড়া প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তলার ভার আমাদেরকে দেওয়া হয়। পাবনার ডেপুটি কমিশনার নূরুল কাদের খান এককালে বিমান বাহিনীর অফিসার হিসেবে কাজ করেছেন। তাছাড়া পাবনায় তিনি পাকবাহিনীর মুখোমুখি যুদ্ধ করেছেন। প্রশাসনিক খসড়া তৈরিতে নূরুল কাদেরের অবদান ছিল সবচেয়ে বেশি।
&nbsp;
আসাদুজ্জামান, নূরুল কাদের ও আমি অফিসার ইনচার্জ পদবীতে প্রশাসনের দায়িত্বভার গ্রহণ করি। আমাদের কোনো সেক্রেটারিয়েট বিল্ডিং ছিল না। কয়েকটি চেয়ার-টেবিলেই আমরা সকলে মিলেমিশে বসে কাজ করেছি। আর আমাদের সঙ্গে যারা কাজ করেছেন তারাও একই সঙ্গে বসেছেন। কয়েক মাস পর যখন অন্যান্য অফিসার এসে যোগ দেন তখন আমরা সচিব, উপসচিব ইত্যাদি পদের সৃষ্টি করি। আমি স্বরাষ্ট্র সচিব এবং উপরন্তু আইজি পুলিশের দায়িত্বে ছিলাম। নূরুল কাদের খান পাবনা ট্রেজারির যে কয়েক কোটি টাকা নিয়ে এসেছিলেন সেই টাকাই ছিল মূলত মুজিবনগর সরকারের আর্থিক সম্বল। আগরতলা অঞ্চলেও আমাদের কিছু টাকাপয়সার কড়াক্রান্তি হিসাব-নিকাশ দেওয়া হয়। আসাদুজ্জামান অর্থ সচিব, নূরুল কাদের খান সংস্থাপন সচিবের কাজ করেছেন। মুক্তিযুদ্ধ সংগঠনে নূরুল কাদের খান অভাবনীয় প্রতিভার পরিচয় দেন। সেক্টর, সাব-সেক্টর ইত্যাদি বেসামরিক প্রতিষ্ঠান মুখ্যত তারই ধ্যান-ধারণা। ১৭০০ মেইল বর্ডারে এই সব প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার কাজ কীরূপ কঠিন হতে পারে তা হয়তো অনেকের ধারণায় আসবে না।
&nbsp;
বিভিন্ন সেক্টর থেকে মুক্তিযুদ্ধের অভিযান পরিচালনা করেছেন আমাদের সেক্টর কমান্ডারগণ। তাদের মধ্যে মেজর জিয়াউর রহমান ছিলেন সবচেয়ে সিনিয়র। কমান্ডারদের অধীন অফিসার, জোয়ান, ইপিআর ও পুলিশ বাহিনীর সমস্ত পেশার বাঙালী বীর সন্তানেরা কাজ করেছেন। তাঁরা পাকবাহিনীর ওপর হানা চালিয়েছেন। তাদের অস্ত্র কেড়ে নিয়েছেন। ঘাঁটি থেকে বিতাড়িত করে সেখানে মুক্তিবাহিনীর ঘাঁটি স্থাপন করেছেন। ১৭০০ মাইল স্থল সীমান্তে এই অভিযান একাধারে চালানো হয়। তাতে পাকিস্তানের সামরিক ব্যবস্থাপনা চরম বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়। দেশের অভ্যন্তরে অবস্থানরত লোকদের মধ্যে অগণিত মুক্তিবাহিনী মানুষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রতিরোধ ও আক্রমণে পাকবাহিনী কোথাও দাঁড়াতে পারে নি বলে অস্ত্রশস্ত্র ফেলে পালাতে বাধ্য হয়। পলায়নরত পাকবাহিনীকে ধাওয়া করেছে বাঙালি কৃষক, শ্রমিক, যুবক, ছাত্র, শিক্ষক সবাই মিলে। এই দৃশ্য সবাই দেখেছে। প্রচার মাধ্যমের অভাবে তা অধিকাংশ সময় প্রচার করা সম্ভবপর হয় নি।
&nbsp;
২৫শে মার্চের পর থেকে বাংলাদেশের মানুষ নিরাপত্তা হারিয়ে ফেলে। কিন্তু যাবে কোথায়? যারা সামরিক সরকারের চিহ্নিত শত্রু তাদের বেঁচে থাকার কোনো সম্ভাবনা ছিল না। এই সাধারণ বিষয়টি অনেকে চিন্তা করতে পারেনি। বাংলাদেশের লোকালয়ে আমার পক্ষে পালিয়ে থাকা সম্ভবপর ছিল না সারদার এতো সব কর্মকাণ্ডের পর আমি দেশত্যাগের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিই। ভারতীয় ক্যাম্পে লক্ষ লক্ষ মানুষ হতাশা ও দুর্দশা বোঝা নিয়ে প্রতিদিন এসেছে। তাদের মধ্যে প্রথম দিকে অমুসলমান বাঙালির সংখ্যাই ছিল বেশি। কিন্তু পরবর্তীকালে পরিস্থিতি হয়েছে ভিন্নতর। ক্যাম্পে সকলেই মিলে দিন কাটিয়েছে। ধর্মীয় ভেদাভেদ আমাদের নজরে পড়েনি।
&nbsp;
পাকিস্তানের বর্বর অভিযানের মোকাবেলা করার মতো অস্ত্রবল আমাদের ছিল না। এপ্রিল-মে-জুন মাসগুলোয় আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রতি ভারতীয় মনোভাব আশাব্যঞ্জক ছিল না। প্রত্যক্ষ সংগ্রামের জন্য আমাদেরকে সামরিক সাহায্য দেবে এ কথা আমরা ভাবতে পারি নি। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের মনোভাব যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে – যদিও এটা ছিল স্বাভাবিক কিন্তু আমাদের কাছে সেটা ছিল বেদনাদায়ক ও হতাশাব্যঞ্জক। প্রায় এক কোটি বাঙালি ভারতে যেভাবে আশ্রয় নিয়েছিলো তাতে ভারতবাসীরা শঙ্কিত হয়ে ওঠে। তাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে আমরা উদ্বেগজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিলাম বৈকি।
&nbsp;
ওই দুর্দিনে আমরা ছিলাম নকশালপন্থীদের ভয়ে ভীত। চলাফেরায় বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা ছাড়া উপায় ছিল না। বিশেষ করে আমাদের নেতাদের নিরাপত্তা নিয়ে আমরা খুব বিব্রত ছিলাম। সেজন্য তাঁদের আবাসস্থলে বিশেষ নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়। সিআইটি রোডে একটি তৃতীয় শ্রেণীর হোটেলে এক রুমে আমাদের মন্ত্রী ও অস্থায়ী রাষ্ট্রপতিকে পরিবারসহ বসবাস করতে হয়েছে। এই হোটেলকে নিয়েই আমাদের শত্রুরা অপপ্রচারের ডামাডোল বাজিয়েছিলো। পশ্চিমবঙ্গে আমাদের দু’চারজন আত্মীয়স্বজন ছিলেন। তাঁদের কাছে আশ্রয় চেয়ে হতাশ হয়েছি। তারা বড়জোর একদিন দুদিন থাকতে দেবার পর অন্যত্র চলে যাবার পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁরা মনেপ্রাণে চান নি যে পাকিস্তান দ্বিধা-বিভক্ত হয়ে যাক। হাইকমিশনের পদস্থ কর্মচারী রফিকুল ইসলাম চৌধুরী আমাদেরকে তাঁর বাসায় রাখেন। তাঁর বাসায় আরো তিরিশজন লোক ছিলেন। এতোজনকে প্রায় তিন মাস খাইয়ে-দাইয়ে তিনি ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন। তবু তিনি ও তার স্ত্রী আমাদের বাড়ি ছাড়তে দিবেন না। বহু বুঝিয়ে শেষ পর্যন্ত তাদেরকে রাজি করেছি। অতঃপর গোবরা কবরখানার নিকটবর্তী একটি বাড়িতে বসবাসের ব্যবস্থা করি।
&nbsp;
এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, মেঘালয়, মিজোরাম এবং আসামের কোনো কোনো অঞ্চলে আমাদের লোকজন যখনই প্রবেশ করতে চেষ্টা করেছে তখনই বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে। এমনকি স্থানবিশেষে বন্দী জীবন কাটিয়েছে। তাদেরকে উদ্ধার করার কাজে আমি আপ্রাণ চেষ্টা করেছি। কিছুসংখ্যক লোককে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও উদ্ধার করতে হয়েছে। কংগ্রেসবিরোধী ভারতীয় রাজনৈতিক মহল আমাদের সহায়তায় খুব বেশি আগ্রহ দেখায় নি। পশ্চিমবঙ্গে ১৯৪৭ সালের পর থেকে বহু পূর্ববঙ্গবাসী বসবাস করছে বলে সেখানে স্বভাবত আমরা এককালীন প্রতিবেশীসুলভ ব্যবহার পেয়েছি।
&nbsp;
পাকিস্তান সরকার রাজাকার, আল-বদর ,আল-শামস ইত্যাদি বাহিনীকে অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত করে যে ত্রাসের সৃষ্টি করেছিলো তার কোনো প্রতিরোধ ব্যবস্থা আমরা ভারত থেকে গ্রহণ করতে পারিনি। এই বাহিনীগুলোর সহায়তায় গণহত্যা, নারী নির্যাতন অভিযান চালানো হয়েছে। এই বর্বরতার খবরাখবর আমাদেরকে মরিয়া হয়ে ইতিহাসের সংক্ষিপ্ত সময়ে মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত বিজয় অর্জনে উদ্বুদ্ধ করেছে। আমাদের মতো যারা দেশের বাইরে যেতে পারেননি তারাই সবচেয়ে বেশি ত্রাস ও নিরাপত্তাহীনতার শিকার হয়েছেন – এ কথা অস্বীকার করার জো নেই। যুদ্ধের সেই ভয়াল মাসগুলোয় অহরহ খবর পেয়েছি যে যশোর, নোয়াখালী, পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং আরো কোন কোন অঞ্চলে আমাদের বিপ্লবধর্মী সুযোগ পেলেই মুক্তিযুদ্ধ সমর্থক জোতদার শ্রেনীর মানুষকে হত্যা করেছে । সে সময় খবর পেতাম যে, যেহেতু রাশিয়া জাতিসংঘে আমাদের মুক্তি সংগ্রামকে সমর্থন দিয়েছে সেহেতু রাশিয়াবিরোধী রাজনৈতিক মহল মুক্তি সংগ্রামকে রাশিয়ার চক্রান্ত বলতেও দ্বিধাবোধ করেনি । অভ্যন্তরে সংগ্রামরত মুক্তিযোদ্ধারা মাদের এই অভ্যন্তরিন চক্রকে দাবিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছিলো । নিয়মিত , অনিয়মিত এবং নিয়মবহির্ভূত মুক্তিযোদ্ধারা বাংলার আপামর জনসাধারণকে সংগে নিয়ে পাকিস্তান বাহিনীকে রুখে দিয়েছিলো বলেই ভারতীয় সাহায্য সহানুভূতিকে সম্বল করে আমরা এত অল্প সময়ে এত বড় বিজয় লাভে সমর্থ হয়েছি । কাজেই চিহ্নিত শত্রুদেরকে বাদ দিতে বাকী প্রতিটি বাঙালি ছিল আমাদের মুক্তিযোদ্ধা এবং বিজয় গৌরবের অংশীদার । এত অগণিত মানুষের ‘লিস্ট’ বানাবে আজ কে বা কারা ?
&nbsp;
মুক্তিযুদ্ধের কতক দিক রয়েছে যে সম্বন্ধে কিছু মন্তব্য রাখার লোভ সংবরণ করতে পারছি না । একাত্তরের ৭ই মার্চের ঘোষণায় বাংলাদেশের স্বাধীনতার শর্তসম্পৃক্ত মর্মবানী খুঁজে পেয়েছি কিন্তু ঘোষণাটি স্বাধীনতার ভাষায় লিপিবদ্ধ বলে মেনে নিতে পারিনি । অসহযোগ আন্দোলোন ও আওয়ামি লীগের নির্দেশে প্রশাসনিক পরিস্থিতি যে পর্যায়ে এসেছিল তাতে আমি ভাবতে পারিনি যে সামরিক পরাজয় ছাড়া পাকিস্তান বাংলাদেশ কে স্বাধীন হতে দেবে। বেসামরিক জনগোষ্ঠিকে একটি সুস্পষ্ট আসন্ন সামরিক শক্তির বিরুদ্ধে অস্ত্রশস্ত্রে সংঘবদ্ধ করার কোন রাজনৈতিক কর্মসূচী না থাকায় ২৫শে মার্চের হত্যাকান্ডের পর দিশেহারা ছাত্র, শিক্ষক, কৃষক্‌, শ্রমিক,পুলিশ, ইপিয়ার ও বাঙালি কারো আদেশ ছাড়াই পাকিস্তানের সামরিক শক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল। ২৫শে মার্চের অব্যবহিত পরেই আমাদের প্রতিটা গ্রামগঞ্জের শহরে বন্দরে ‘পশ্চিমা হটাও’ অভি্যান গড়ে উঠে । ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারির পর থেকেই আওয়ামি লীগ কেন্দ্রিয় সরকার মুসলিম লীগের বিরোধিতা করে যে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল আইয়ুব আমলের মাঝামাঝি সময়ে নেতৃত্বের অভাবে তা প্রায় নিষ্প্রাণ হয়ে এসেছিল। ১৯৬৬ সালের ৬ দফা, আগরতলা ষরযন্ত্র মামলা ও ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান শেখ সাহেবকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক শীর্ষমণি হিসেবে চিহ্নিত করে । তার অসাধারণ ত্যাগ,তিতিক্ষা ও জনদরদী মানসিকতার জন্য ১৯৭০ সালের ইলেকশানে আওয়ামি লীগের যে বিজয় সূচিত হয়েছিল তাতে আওয়ামি লীগ ছাড়া অন্য কোন রাজনৈতিক দলের কথা কেউ ভাবতে পারেনি । এ কারণেই স্বাধীনতা যুদ্ধের শীর্ষমণি হিসেবে রাজনৈতিক দিক থেকে আওয়ামি লীগ কেই মেনে নিতে হবে ।
আওয়ামি লীগের নেতৃ স্থানীয় ব্যাক্তিবর্গ এবং আইন পরিষদের নির্বাচিত সদস্যবৃন্দ কোন কেন্দ্রীয় আদেশে দেশ ত্যাগ করেছেন বলে জানা নাই। ২৫শে মার্চের পর তারা যখন কলকাতা বা আগরতলায় সমবেত হন তখন তাদের মধ্যে যে শূন্যতা পরিলক্ষিত হয় তাতে বুঝা গিয়েছে যে কোন পরিকল্পনা মোতাবেক তারা দেশ ত্যাগ করেছেন। কর্নেল ওসমানিও তাই করেছেন। এই পূর্ব পরিকল্পনাহীনতার জন্য আমরাও বুঝতে পারিনি যে, আমাদেরকে কখন কী করতে হবে । এমনকি আগরতলায় যাঁরা পৌঁছেছিলেন তাদের কার্যকলাপের সঙ্গে কলকাতায় অবস্থানরত নেতৃবর্গের কোন সংযোগ ছিল না অনেক দিন । এজন্য ভিনদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে প্রথম দিকে মুক্তিযুদ্ধ সংগঠনের দুটি ধারা সূচিত হয়েছিল । মুজিব নগরে সরকারের প্রশাসন সংগঠিত হওয়ার পর মুক্তিযুদ্ধকে একটি কেন্দ্রিয় প্রশাসনের আওতায় না হয় এবং যথারীতি প্রশাসনিক বিধি নিষেধের অন্তর্ভূক্ত করা হয় । এসকল জটিল কাজ আমরা গুটিকতক কর্মচারীরা সম্পন্ন করেছি , মাহবুব আলম চাষী (মরহুম), হাসান তৌফিক ইমাম, জহুর আহমদ চৌধুরী (মরহুম), মোস্তাফিজুর রহমান সিদ্দিকী প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ আগরতলায় মুক্তিযুদ্ধের প্রশাসনিক কাঠামো বানাবার সূচনা করেন । পরে তারা কলকাতা কেন্দ্রিয় প্রশাসনের অন্তর্ভূক্ত হয়ে পড়েন ।
&nbsp;
মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক নেতৃবিন্দের মধ্যে পাস্পরিক সমঝোতার কিছুটা অভাব ছিল । কিন্তু এই অভাব কে কোনক্রমে ঢেকে রাখার চেষ্টা প্রশাসন থেকে অতি সতর্কতার সাথে করা হয় । আপামর মুক্তিযোদ্ধারা যে অসীম সাহসিকতা, দৃঢ় আত্মপ্রত্যয় ও মনোবল নিয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল তাতে কোন মহলের অন্তর্দ্বন্দ্ব ঠাঁই পায়নি । পার্লামেন্টের প্রায় সকল সদস্য ভারতে আশ্রয় নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন । দেশবাসীর তাঁদের দায় দায়িত্ব পালনে তারা সবসময় সতর্ক ছিলেন । কিন্তু এমন এক অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে মুক্তিযুদ্ধ চালাতে হয়েছিলো যে শুধু তাঁদের প্রজ্ঞার ওপর সব ছেড়ে দেয়ে সম্ভবপর ছিলো না । সে জন্য্য আমাদের সামরিক অফিসারদের প্রজ্ঞাকেই সম্বল করে আমাদের এগুতে হয়েছে । আমাদের প্রধান সেনাপতি কর্নেল ওসমানীর পক্ষে এত বিশাল এবং বিস্তৃত মুক্তিবাহিনীর সব কিছু দেখাশোনা করা সম্ভবপর ছিল না। কাজেই সেক্টর কমান্ডারদেরকে নিজ নিজ পরিকল্পনানুসারে অনেকাংশে যুদ্ধ পরিচালনা করতে হয়েছে । পার্লামেন্টের সদস্যবৃন্দ প্রশাসনে অতি উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন ছিলেন । কিন্তু যুদ্ধ পরিচালনায় তাঁদেরকে অনেক সময় পাশ কাটিয়ে এগুতে হয়েছে । তাতে কেউ কেউ অস্বস্তি বোধ করেছেন। এই পরিস্থিতি এড়াবার জন্য তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধার নিদর্শন হিসেবে আমরা বিভিন্ন অঞ্চলে বেসামরিক কমান্ড কাউন্সিল গঠন করেছিলাম। কার্যতঃ এই সকল কাউন্সিল যুদ্ধ চালানোর কাজে উল্লেখযোগ্য ভাবে জড়িত ছিল না। যুদ্ধ সেক্টর কমান্ডারদের কলাকৌশল ও পরিকল্পনানুসারে পরিচালিত হয়েছে।
&nbsp;
জুলাই মাসের দিকে পার্লামেন্টের সদস্যবৃন্দকে একত্রিত করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় । পারষ্পারক সমালোচনা , অভিযোগ ইত্যাদি যেন দাঁনা বেঁধে উঠতে না পারে সেজন্য রাষ্ট্রপতির কাছে এক প্রস্তাব পেশ করি । তিনি তাতে সম্মতি দেন । কিন্তু কোথায় কিভাবে এই সমাবেশ ঘটানো সম্ভবপর হবে তা ছিলো ভাবনার বিষয় । ভারতীয় সরকারের সহায়তায় ও সৌজন্যে মেঘালয় ও দার্জিলিং-এর মধ্যবর্তী বাগডোগড়া নামক এক নির্জন স্থানে এই সমাবেশের আয়োজন করা হয় । সমাবেশে পার্লামেন্টের সদস্যবৃন্দ ও মন্ত্রী মহোদয়গণ দু’দিন বহু তর্ক-বিতর্কের সম্মুখীন হন। ফলে তাঁদের মধ্যে পারষ্পারিক বোঝাপড়ার পথ সুগম হয় । বাগডোগরা সমাবেশকে মুজিবনগর পার্লামেন্টারী অধিবেশন বলা যেতে পারে । এই সমাবেশের খবর আমরা প্রচার করি নি।
&nbsp;
স্বাধীনতা যুদ্ধের দিনগুলোয় আমরা যখন আমাদের লোকজনদের সাথে কথা বলেছি তখন তাঁদেরকে সমাজতন্ত্রের প্রতিশ্রুতি দিয়েছি। যে অন্যায়, অবিচার ও শোষণকে মুক্তিকামী বাঙালিরা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবর্তীন হয়েছিল তার অবসান ঘটাতে হলে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থাই যে আদর্শস্থানীয় তার ব্যতিক্রমকিছু বলার ছিল না । ধনতন্ত্রের কাঠামো ও ভিতকে দূর্বল করতে হলে জনসাধারণকে সমাজতন্ত্রের পথে এগিয়ে নিতে হবে-এই ছিল আমাদের বাণী । এই দুর্গম পথের পাথেয় যে ত্যাগতিতিক্ষা তার নাম ছিলো স্বাধীনতাযুদ্ধ । ত্রিশ লক্ষ লোকের জীবন দান আর মা-বোনদের ইজ্জত হানি-এই আমাদের ত্যাগ তিতিক্ষা। ফসল হলো বাংলাদেশ।
&nbsp;
বাংলাদেশ স্বাধীন করব এ বিষয়ে আমাদের দৃঢ়প্রত্যয় ছিল। ’৭১-এর নভেম্বর মাসে আমরা ভাবতে শুরু করেছিলাম স্বাধীন বাংলাদেশের প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো বা নীতিমালা এখান এখান থেকেই তৈরী করে নিতে হবে। যুদ্ধোত্তর অর্থনৈতিক ধ্বংসাবশেষের ওপর বিজয়ের গৌরব নিয়ে প্রশাসন চালাতে হলে যে প্রজ্ঞা,ধৈর্য, ও দূরদর্শিতার তা হয়তো রাজনৈতিক মহলে একক ভাবে আশা করা সম্ভবপর হবে না এই ভেবে আমাদের উদ্যোগেই প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক মৌল কাঠামো তৈরী করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। দেশের অভ্যন্তরে অবস্থানরত সরকারী,আধাসরকারী বা সরকার নিয়ন্ত্রিত সংস্থাসমূহ এবং কলকারখানার শ্রমিক কর্মচারীদের ব্যাপারে এটা ধরে নিতে হবে যে তারাও ছিলেন আমাদের মতো মুক্তিযোদ্ধা। এই ছিল আমাদের নীতিগত সিদ্ধান্ত ।
&nbsp;
শুধু ব্যাতিক্রম ছিলো এটুকু যে, যারা প্রত্যক্ষভাবে স্বাধীনতাযুদ্ধের বিরোধিতা দেশবাসির কাছে জঘন্য শত্রুবলে চিহ্নিত হয়েছেন তাদের জন্য একটি স্ক্রীনিং কমিটি গঠন করা হয়। একজন বিচারপতি, বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন উপাচার্য এবং সরকারের একজন সচিবকে নিয়ে এই কমিটি গঠিত হয় । এই কমিটির রায় কে সরকার চুড়ান্ত বলে মেনে নেবে। তারপর আরো কিছুসংখ্যক চিহ্নিত কর্মচারীর কাছ থেকে আনুগত্যের একতা শপথ নেয়া হবে। এর বেশী কিছু নয়। আমাদের মতে এতেই দেশবাসী সন্তুষ্ট থাকবেন এবং প্রচলিত প্রশাসনিক ব্যবস্থা তেমন কোন ওলট পালট হবে না ।
&nbsp;
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সঠিক তথ্য বিবরণীর অভাবে কোন ব্যাবস্থা গ্রহণ করা সুবিবেচিত না হলেও অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের একটা ধারা প্রবাহ আমরা নির্ধারণ করেছিলাম। অবাঙালি মালিকানা শিল্প বা ব্যাবসায় প্রতিষ্ঠান পরিত্যক্ত হয়ে যাবে এই ভেবে পরিত্যক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরকারী নিয়ন্ত্রণে আনার ব্যবস্থা করা হবে। দেশি মালিকানায় শিল্প বা ব্যাবসায় প্রতিষ্ঠান যেগুলো দীর্ঘদিন যাবত বৈষম্যের শিকার হয়েছিল তাদেরকে সকল সুযোগ সুবিধা দিয়ে চাঙ্গা ও তেজী করে তুলতে হবে। এই ছিলো আমাদের অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত। এ ছাড়া বিরাট মুক্তিবাহিনীকে যথাশীঘ্র কি করে কৃষি বা অনযান্য ক্ষেত্রে ফিরিয়ে নেয়া যায় তারও ব্যবস্থা করা হবে । অগণিত ছাত্র শিক্ষক যারা মুক্তিযুদ্ধে জড়িত হয়ে পড়েছে তাদেরকে শান্তিময় জীবনের অভিষ্ঠ মন-মানসিকতায় কিভাবে রূপান্তরিত করা যায় সে দায়িত্ব শিক্ষকদের হাতেই ছেড়ে দেয়া হবে। স্বাধীনতার জন্য ত্যাগ হিসেবে ছাত্র-জীবন থেকে একটি বছর দেবার কথাও চিন্তা করা হয়েছিল যাতে শিক্ষা ব্যবস্থা কোন মহা সংকটের উদ্ভব না ঘটে।
&nbsp;
অর্থনৈতিক পুনর্বাসন এবং সামাজিক শৃঙ্খলার বিধানকল্পে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা আইন সংগত উপায়ে গৃহীত হবে। অর্থনৈতিক, সামাজিক ও প্রশাসনিককোন নতুন সংস্কারে সঙ্গে সঙ্গে হাত দেয়া যাবে না। মুজিব নগর সরকার একটি পরিকল্পনা কমিশন গঠন করেছিল। এই কমিশনে যাঁরা ছিলেন তাঁদের মধ্যে অধ্যাপক মোশারফ হোসেন, অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ চৌধুরী ও তাদের নির্বাচিত আরো কয়েকজন। যতটুকু মনে পড়ে একটা যুদ্ধোত্তর গরীব দেশের জনসাধারণের খাদ্য-গৃহ ও বস্ত্রসংস্থান ছিল এই পরিকল্পনার মৌল বিষয়।
&nbsp;
স্বাধীনতা যুদ্ধের মাসগুলোয় পাকিস্তানী একশত টাকার বিনিময়ে একশত চুয়াল্লিশ ভারতীয় টাকা পাওয়া যায় নি । সমান সমান মূল্যে মুদ্রা বিনিময় হতো । মুজিব নগর সরকারের কর্মকর্তাদের সর্বচ্চ বেতন ছিলো চারশত পাকিস্তানী টাকা। এই টাকা দিয়ে বাড়ী ভাড়া, খাওয়া, অফিসে সাতায়াত,ঔষধ ইত্যাদি বাবদ যাবতীয় খরচ মেটানো হতো। অর্থ ছিল না বলে ব্যায়বহুল নিয়মিত বাহিনী বড় আকারে গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। রিফিউজি ক্যাম্পে খেয়ে দেয়ে অধিকাংশ মুক্তিযোদ্ধা বিভিন্ন সেক্টরে অভিযান চালিয়েছে। কি অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে দিন কাটিয়েছি তা ভাবলে অবাক হতে হয়। ঢাকা থেকে লোক মারফত কিছু টকা পয়সা নেবার ব্যবস্থা শেষ পর্যন্ত করতে হয়েছে । আমার শশুর মরহুম হাফিজুদ্দিন সাহেব এই টাকা দেন। আমার বন্ধু অধ্যাপক মোস্তফা নুরুল ইসলাম বিলেতে ছিলেন তিনিও কিছু পাউন্ড দিয়ে সাহায্য করেন। তাঁদেরকে এই টাকা ফেরত দিতে হয়নি। লক্ষ লক্ষ মানুষ কি অভাবনীয় কষ্টে দিন কাটিয়েছে তা বলে শেষ করা যাবে না।
কামরুজ্জামান স্বরাষ্ট্র ও রিলিফের ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী হিসেবে সীমান্তের একপ্রান্ত থেকে অন্য প্রস্নত ভ্রমণ করেন। অধিকাংশ সময়ে আমি তাঁর সঙ্গে ছিলাম। আমি বিভিন্ন ক্যাম্পে গিয়ে সেক্টর কমান্ডারদের সঙ্গে আলাপ করে তাদের সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেছি। ভারতীয় প্রশাসনের কাছে ক্যাম্পের বিবিধ সমস্যা তুলে ধরেছি। মুক্তিযোদ্ধা বেশে পাকিস্তানি চরদের অনুপ্রবেশ প্রতিহত করার কাজে আমাদের পুলিশ ও অন্যান্য কর্মচারীদের স্থানে স্থানে খবর সংগ্রহ করতে হয়েছে । মুক্তিযুদ্ধের বিশাল আবর্তে আমার কাজের কোন ধরাবাঁধা পরিধি ছিল না বলা চলে। স্থানে স্থানে জোরালো বক্তৃতা দিয়েছি। সমাজতন্ত্রের মর্মবানী ব্যাখ্যা করে মুক্তিবাহিনীকে উদ্বুদ্ধ করার কাজে কামরুজ্জামান ও তাজউদ্দিন ছিলেন সেচ্চার। স্বদেশী গান গেয়ে দেশপ্রেমিক শিল্পীরা স্বাধীনতা যুদ্ধকে দেশ-বিদেশে প্রচার করেছেন। মাত্র কয়েকজন শিল্পী,সাহিত্যিক,সাংবাদিক,বেতারকর্মী যে প্রচারকার্য চালিয়েছেন তা অভাবনীয়। মুকুলের ‘’’ঠেটা মালিক্কা’’’ (গভর্নর ডঃ আব্দুল মোতাল্লিব মালিক) নামক প্রোগ্রাম ও ‘’’চরম পত্র’’’ ছিল সে সময়ের বেতার জগতের অবিস্মরনীয় আলেখ্য। কামরুল হাসান, জহীর রায়হান, হসান ইমাম, আব্দুল জব্বার, মুকুল এবং আরো অনেককে আমি আগে থেকে খুব ভালভাবে জানতাম। তাঁদেরকে অনেক খবর দিয়েছি যা নিজনিজ পদ্ধতিতে তাঁরা ব্যবহার করেছেন। যুদ্ধের বিভিন্ন অঙ্গনের দৈনিক খবর সংগ্রহের ব্যবস্থা আমরা করেছিলাম। আমাদের লোকজন ঢাকা প্রশাসনের সব গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র সেক্রেটারিয়েট থেকে সংগ্রহ করে কলকাতায় আমাদের কাছে পৌঁছে দিত। রিলে সিস্টেমে এইসব খবর পাঠানো হত। সপ্তাহকালের মধ্যে কলকাতা থেকে আমাদের গোয়েন্দারা ঢাকা ও অন্যান্য শহরের অফিসের গোপনীয় কাগজপত্র, পাকিস্তান সরকারের আদেশ নির্দেশ ইত্যাদি সংগ্রহ করে ফিরে আসতো। অফিসের লোকজন গোপনে গুরুত্বপূর্ণ খবর সরবরাহ করে আমাদের সাহায্য করেছে। মুক্তিকামী ছিল বলেই তারা একাজ করেছে। আমাদের গোয়েন্দা বাহিনী বিভিন্ন অঞ্চলে দেশপ্রেমিক মানুষের বাড়িতে লুকিয়ে পালিয়ে রাত কাটিয়েছে। যারা তাদেরকে আশ্রয় দিয়েছিল তারাও পরোক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধ করেছে। আর যারা আমাদের গোয়েন্দাদেরকে খবর দিয়ে সাহায্য করেছিল তাদেরকে কি আমরা প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা বলবো না ? স্টেট ব্যাংকের যেসব সিরিজের নোট খোয়া গিয়েছিল সেসব সিরিজের তালিকাও আমাদের লোকজন সংগ্রহ করেছিল। এই সুদক্ষ গোয়েন্দাদের কাজে প্রধাণতঃ পুলিশ, ছাত্র ও বেসামরিক সরকারী কর্মচারীরা নিয়োজিত ছিল।
&nbsp;
দেশত্যাগী প্রায় সাত হাজার পুলিশ, এবং পাঁচ হাজার ই পি আর স্বাধীনতা যুদ্ধে বিশেষ অবদান রেখেছে। পুলিশদেরকে ১৭০০ মাইল সীমান্তের আশ্রয় ক্যাম্প ও অন্যান্য জায়গা থেকে খুঁজে বের করে সংঘবদ্ধ করার কাজ আমাকে করতে হয়েছে। ই পি আর-এর প্রায় সকলেই নিয়মিত বাহিনীর অন্তর্ভূক্ত ছিল। পুলিশের উল্লেখযোগ্য অংশ প্রত্যক্ষ যুদ্ধে নিয়োজিত ছিল। সীমান্তের সংগে বিশেষ ভাবে পরিচিত ছিল বলে ই পি আর ছিল আমাদের অভিযানের সেরা সৈনিক। ই পি আর ও পুলিশ অকাতারে যুদ্ধক্ষেত্রে জীবন দিয়েছে। প্রায় ষোলশত পুলিশ এবং এক হাজার ই পি আর মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছে। পংঙ্গু হয়েছে অনেকে। পরিবারের ওপর বহু রকম নির্যাতন চালিয়েছে পাকবাহিনী। বাংগালী সৈনিক ও অফিসারদের অনেককেই পাকিস্তানের পশ্চিমাংশে সরিয়ে নেয়া হয়েছিল বলে মুক্তি্যুদ্ধে পেশাগত সৈনিকের সংখ্যা খুব বেশী ছিল না । পশ্চিম পাকিস্তানে যারা আটক ছিলেন বন্দি শিবির থেকে কেউ কেউ পালিয়ে এসে আমাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন।
&nbsp;
স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারতীয় ভূমিকা কারো কার কাছে ছিল বিতর্কিত। নিজস্ব শক্তিতে শুধু ত্যাগ, দঢ়প্রতিজ্ঞা ও মনোবলকে সম্বল করে সুদক্ষ পাকিস্তানী সেনাবাহিনীকে পরাজিত করা সম্ভব হবে কিনা এই প্রশ্নে আমাদের সামরিক মহলে মতভেদ ছিল। কর্নেল ওসমানীর ধ্যান-ধারণার সঙ্গে আমাদের তরুন সামরিক অফিসারদের কিছুটা গরমিল ছিল। বাইরের কারো নেতৃত্বের গুরুভারে মুক্তিবাহিনীর গৌরব ক্ষুণ্ণ হবে এ ধারণা অনস্বীকার্য হলেও আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে দীর্ঘকালীন করার বিপক্ষে প্রশাসনিক মতামত ছিল সুস্পষ্ট। পাক বাহিনীর দীর্ঘকালীন নির্যাতনে দেশবাসী নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে এই ভয়ে যুদ্ধকে দীর্ঘস্থায়ী করার বিপদকে দেখা হয়েছে বাস্তবিকতার দৃষ্টিকোণ থেকে। মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করার সম্ভাব্য ষড়যন্ত্রকে আমরা ভয় করেছি। মুজিব বাহিনীর সৃষ্টিতে মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে বিভেদ দানা গড়ে উঠেছিল প্রায়। ছাত্র নেতারাও ইতিমধ্যে মতবিরোধের শিকার হয়েছিল। তাই সংক্ষিপ্ত তম সময়ের মধ্যে বিজয় অর্জন করতে হবে এই ছিল রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত। এ ব্যাপারে ভারত আমাদেরকে সাহায্য করেছে। মুক্তিবাহিনীকে যথাসম্ভব সঙ্গে নিয়ে চূড়ান্ত অভি্যান চালানো হয়। পশ্চিম রণাঙ্গনের পাক-ভারত যুদ্ধে আমাদের তেমন আকর্ষণ ছিল না । পাকিস্তান পরাজিত হবে এ বিষয়ে কোন সন্দেহ ছিল না। কিন্তু বাংলাদেশের রণাংঙ্গনে কত শীঘ্র পাকিস্তানকে পরাজিত করা যাবে এটাই ছিল আমাদের কাম্য।
&nbsp;
ভারতীয় যুদ্ধবিশারদরা ‘বাইপাস’ সিস্টেম-এ আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি যথাসম্ভব ন্যূন্যতম সীমাবদ্ধ রেখেছিলেন। ‘বাইপাস’ সিস্টেম-এ পাকবাহিনীকে কোন সম্মুখযুদ্ধের সুযোগ দেয়া হয়নি। লক্ষ লক্ষ মুক্তিবাহিনী ভারতীয় নেতৃত্বে পাকবাহিনীকে পাশ কাটিয়ে দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলে। দিশেহারা পাকবাহিনী অস্ত্রশস্ত্র যেখানে-সেখানে ফেলে ঢাকায় এসে আত্মসমর্পনের জন্য ব্যতিব্যস্ত হয়। বাংলাদেশের কোথাও লুকিয়ে জীবন বাঁচাবার পরিস্থিতি তাদের ছিল না । সপ্তম নৌ-বহরের পাঁয়তারা সত্বেও প্রায় এক লক্ষ পাক বাহিনীর এত নির্লজ্জ আত্মসমর্পণ !
&nbsp;
বিজয় যখন দিবালোকের মত স্পষ্ট,তখন আত্মসমর্পণ উৎসবে আমাদের যোগদান সম্পর্কে যে কর্মসূচী গ্রহণ করা হয় তাতে স্থির করা হয়েছিল ১৬ই ডিসেম্বর কর্নেল ওসমানী, রুহুল কুদ্দুস ও আমি হেলিকপ্টারে ভারতীয় কমান্ডারকে নিয়ে ঢাকায় পৌঁছুব। দমদম এয়ারপোর্টে পৌঁছুবার জন্য আমাদের যে সময় দেয়া হয়েছিল তার ঘন্টাখানেক পূর্বে আমাদের প্রশাসনে কি যেন একটা হাস হাস পরিস্থিতির উদ্ভব হয়। আমি তার কিছুই আঁচ করতে পারিনি।
করতে পারিনি। রুহুল কুদ্দুস শুধু জানালেন যে, কর্নেল ওসমানীকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কাজেই ডেপুটি কমান্ডার ইন-চীফ এ.কে. খন্দকারকে খুঁজে বের করা হয়েছে। শুধু তিনি ঢাকায় যাবেন। আমরা দুজন যাবো না। কর্নেল ওসমানীর সঙ্গে কার কী মতভেদ ঘটেছিলো তা আর জানতে পারিনি। ঠিক করা হলো ১৭ই ডিসেম্বর শেখ সাহেবের ছেলে জামালকে ঢাকা রেডিও চালাবার মতো যন্ত্রপাতি দিয়ে পাঠানো হবে। ১৮ তারিখ রুহুল কুদ্দুস, নূরুল কাদের, আসাদুজ্জামান ও আমি ঢাকায় আসবো। পরিবারকে সঙ্গে আনা যাবে না। কাজেই আমার পরিবার ও ছেলেমেয়েকে কলকাতায় রেখে আসি। প্রায় ১২ দিন পর তাদের ঢাকায় নিয়ে আসি। ঢাকার মাটিতে পা দিয়ে সেদিন জীবনের সবকিছু পেলাম। হেলিকপ্টার থেকে নামার আগে শহীদদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করি। এয়ারপোর্টে হাজার হাজার লোকের ভীড়ে কারো সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করি নি। জানি না তারা কী ভেবেছিলো। শুধু হাত উঠিয়ে সালাম জানিয়েছি। আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধব কে কোথায় কীভাবে আছেন – জীবিত কি শহীদ, এ চিন্তায় সে মুহূর্তে এতোই অভিভূত হয়েছিলাম যে, স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে আসার আনন্দে যুগপৎ নেমে আসে অব্যক্ত বিষাদের ছায়া। এই বিষাদ থেকে আজো মুক্ত হতে পারি নি।
&nbsp;
– আব্দুল খালেক,
সেপ্টেম্বর, ১৯৮৪।
&nbsp;
&nbsp;
&nbsp;
<a href=”https://www.facebook.com/alamin.sorkar.7161″><strong>আলামিন সরকার</strong></a>
<strong>&lt;১৫,৬,৩৫&gt;</strong><h1>[আবদুল বাসিত সিদ্দিকী]</h1><em>-পি ই-১৩২, টাঙ্গাইল-৩</em>
২৬শে মার্চ আমরা টাঙ্গাইল সংগ্রাম পরিষদ গঠন করি। পুলিশ এবং আনসারের সহযোগীতায় কিছু অস্ত্র সংগ্রহ করি এবং টাঙ্গাইলে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করি। তারপর টাঙ্গাইল, কালিহাতী, নাটিয়াপাড়াতে অগ্রবর্তী ঘাঁটি স্থাপন করি।
&nbsp;
এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে আমি ও হুমায়ূন খালিদ কালিহাতীতে অবস্থান করি। সেখান থেকে আমরা নাটিয়াপাড়া আক্রান্ত হওয়ার খবর পাই। এই সংবাদ পেয়ে আমরা কালিহাতি থেকে ঘাটাইল চলে যাই এবং সেখানে ক্যাম্প স্থাপন করি। ইপিআর এবং বিডিআর বাহিনী মধুপুরে ঘাঁটি স্থাপন করতে চলে যায়। ঘাটাইল থেকে আমরা ময়মনসিংহ যাই। এখানে সিটি স্কুলে মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্প ছিলো এবং রফিকউদ্দিন ভূঁইয়া সাহেবের বাসায় ছিলো মুক্তিবাহিনীর অফিস। সেখান থেকে ঘাটাইল পাহাড়ি অঞ্চলের ধলাপাড়া গ্রামে চলে যাই। এখান থেকে মধুপুর পতনের সংবাদ জানতে পারি। ধলাপাড়া হাসপাতালে আমরা রিলিফ ক্যাম্প স্থাপন করি। কাদের সিদ্দিকীর সহযোগীতায় সর্বপ্রথম মুক্তিবাহিনী গঠন করি। সখীপুরে মুক্তিবাহিনীর কেন্দ্র স্থাপন করি। চারান, বাসাইল, কাউলাজানি, কাসুটিয়া, বল্লা, দেওপাড়া, ভুঁইয়াপুর, গোপালপুর, বৈলারপুর প্রভৃতি স্থানে আমরা পাক বাহিনীর মোকাবেলা করি।
&nbsp;
অতঃপর আমি, নুরুন্নবী ও নূরুল হক প্রমুখ ভারতে অস্ত্র সংগ্রহের জন্য গমন করি। মেঘালয় থেকে বেশ কিছুসংখ্যক অস্র সংগ্রহ করে আমরা আবার ফিরে আসি। ইতিমধ্যে আমরা টাঙ্গাইলে মুক্তিবাহিনীর বেসামরিক প্রশাসন চালু করি। এর প্রধান কেন্দ্র ছিলো সখীপুর। আমি ছিলাম বিচার বিভাগের প্রধান। কাদের সিদ্দিকী ছিলেন সর্বাধিনায়ক। এসময় ধলাপাড়ায় যে যুদ্ধ হয় তাতে কাদের সিদ্দিকী আহত হয়।
&nbsp;
লাউহাটি, নাগরপুর, বৈখোলা, দেওপাড়া, ধলাপাড়া, মাকরাই প্রভৃতি স্থানে পাক বাহিনীর উপর আক্রমণ চালিয়ে পাক বাহিনীর বিপুল ক্ষতি সাধন করি। এসময় টাঙ্গাইল মূল শহর ও আশেপাশের কতগুলো এলাকা ছাড়া মুক্তিবাহিনীর বেসামরিক প্রশাসন চালু করি। ১১ ই ডিসেম্বর টাঙ্গাইল মূল শহর দখলদার মুক্ত হয়।
&nbsp;
আব্দুল বাসেত সিদ্দিকী
২৫ জুলাই ১৯৭৩ইং
(** পি ই-১৩২ টাঙ্গাইল-৩)”
&nbsp;
&nbsp;
<a href=”https://www.facebook.com/hiddenbirdmm?fref=ts”>মাঈমুনা তাসনিম</a>
&lt;১৫,৭,৩৬-৪২&gt;<h1>[আবদুল মালেক উকিল]</h1>&nbsp;
১৯৭১ সালে আমি নোয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের (লক্ষীপুর ও ফেনী জেলাসহ) সভাপতি ছিলাম। একজন এম.এন.এ. হিসেবে আমিই ’৭১ সালে জেলা সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হই। ইতিপূর্বে আমি ১৯৫৬, ৬২ এবং ৬৫ সালে প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচিত সদস্য, আওয়ামী লীগ পার্লামেন্টারি পার্টি ও সম্মিলিত বিরোধী দলের নেতা হিসেবে কাজ করেছি। নিখিল পাকিস্তান বার কাউন্সিল-এর নির্বাহী কমিটির নির্বাচিত সদস্য হিসেবে ও নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগ কার্যকরী কমিটির পার্লামেন্টারি বোর্ডের সদস্য হিসেবে ১৯৬৬ সালের ৪ঠা ফেব্রুয়ারি লাহোরের গুলবাগে নিখিল পাকিস্তানের বিরোধীদলীয় সম্মেলনের দ্বিতীয় অধিবেশনে আমি সর্বসম্মতিক্রমে সভাপতিত্ব করি এবং ঐ অধিবেশনেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব তাঁর ঐতিহাসিক ছয় দফা প্রস্তাব পেশ করেন।
ঐ অধিবেশনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব, তাজউদ্দিন, অধ্যাপক ইউসুফ আলীসহ আমরা পূর্ব পাকিস্তান থেকে নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের ছয়জন প্রতিনিধি ছিলাম। তার পরের ইতিহাস খুবই করুণ হলেও বাঙালী জাতির মুক্তিসনদ হিসেবে শুধু পূর্ব পাকিস্তানে নয়, পশ্চিম পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশের জি. এম. সৈয়দ হারিনেতা, কাজী ফয়জুল্লাহ, সীমান্ত ও বেলুচিস্তান প্রদেশের আরবাব সেকান্দার হায়াত খান, মানকি শরিফের পীর আতাউল্লাহ খান মঙ্গল, গাউস বক্স বেজেঞ্জো, রেয়াছানী, শেখ মঞ্জুরুল হক, খলিল তিরমিজিসহ সকলেই প্রকাশ্যে ছয় দফা সমর্থন দিয়েছিলেন।
১৯৭১ সালের ১লা মার্চ থেকেই আমরা একই সাথে ঢাকায় দিনের পর দিন আওয়ামী লীগের কার্যকরী কমিটির বৈঠক ও ৬ দফার ভিত্তিতে একটি শাসনতন্ত্র রচনার কার্যে নিয়োজিত ছিলাম।
১৫ই মার্চ ইয়াহিয়া খান পূর্ব পাকিস্তান আসার পূর্ব পর্যন্ত, বিশেষ করে ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের পূর্ব পর্যন্ত আমাদের জরুরি অধিবেশন কখনও কখনও সারা রাত্রী ধরে চলতো। পরবর্তীতে অসহযোগ আন্দোলনের সময় এবং সংলাপের সময় আমরা দৈনন্দিন অগ্রগতি সম্পর্কে আমাদের মতামত ব্যক্ত করতাম। কিন্তু ২৪শে মার্চ বঙ্গবন্ধু হঠাৎ আমাদেরকে অবিলম্বে ঢাকা ত্যাগ করার নির্দেশ দেন এবং তদনুযায়ী আমি ২৪শে মার্চ নোয়াখালীতে (মাইজদি) চলে যাই। স্মরণ করা যেতে পারে, ৭ই মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষদ গঠন করার ও ‘ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ার’ নির্দেশ দিয়েছিলেন। কাজেই আমাদের নিজ নিজ এলাকায় চলে যেতে এবং নির্দেশের গুরুত্ব উপলব্ধি করতে কোনো অসুবিধা হয়নি।
২৫ মার্চ রাত ১১টা আমার মাইজদিস্থ বাসভবনে আমার নিজস্ব টেলিফোনে আমি বঙ্গবন্ধুর সাথে তাঁর ৩২ নম্বর বাড়ির বিখ্যাত ৪২৫১ টেলিফোনে যোগাযোগ করি। একবার ঐ বাড়িতে অবস্থানরত হাজি গোলাম মোর্শেদ (পরবর্তীতে রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী) টেলিফোনে আমার সাথে কথা বলেন এবং তিনি সতর্ক করে দেন যে, “যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে”। বঙ্গবন্ধু শুধু চিৎকার করে বলেছিলেন, “এখনও বসে আছ? সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে”।
২৬শে মার্চ সকালেও আমরা বিভিন্ন সূত্রে স্বাধীনতা ঘোষণার কথা এবং হানাদার বাহিনীর গণহত্যার কথা অবহিত হই। এ সময় নোয়াখালী জেলার ডেপুটি কমিশনার ছিলেন জনাব মনযুর উল করীম (বর্তমানে অতিরিক্ত সচিব)। আমি তাঁর মারফতে জেলা ও দায়রা জজ গাজী শামসুর রহমান (বর্তমানে প্রেস কাউন্সিলের সভাপতি) এবং পুলিশ সুপার শহীদ আব্দুল হাকিম সহ মহকুমা প্রশাসক ও সকল সরকারী কর্মচারী, ম্যাজিস্ট্রেট, ডাক্তার ও ইঞ্জিনিয়ারকে নোয়াখালী সার্কিট হাউসে ২৬ তারিখে ১০টার মধ্যে সমবেত হওয়ার আহ্বান জানাই। আওয়ামী লীগের সমস্ত এমপি এ, এম এন এ ও বিশিষ্ট নাগরিক ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকেও ঐ সমাবেশে উপস্থিত থাকতে অনুরোধ করি। নির্ধারিত সময়ে পূর্বেই সমস্ত সার্কিট হাউস এবং সম্মুখের ময়দান জনসমুদ্রে পরিণত হয়। উক্ত সমাবেশে আমি আনুষ্ঠানিকভাবে সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি হিসেবে হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সর্বাত্মক সংগ্রাম করার জন্য দলমত ধর্ম নির্বিশেষে সকলকে আহ্বান জানাই। উপস্থিত সর্বস্তরের জনগণ এবং জেলা ও দায়রা জজসহ সকল স্তরের কর্মচারী হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে স্বাধীন বাংলার পক্ষে সংগ্রাম করার শপথ গ্রহণ করে। ইতিমধ্যে আকস্মিকভাবে ডেপুটি কমিশনার জনাব মনযুর উল করীম বঙ্গবন্ধু মুজিব কর্তৃক ঘোষিত একটি ইংরেজিতে টাইপ করা স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র আমার হাতে দেন। সেটি ছিলঃ
To the people of Bangladesh and also the world:Pakistan Armed Forces suddenly attacked the EPR Base at Peelkhana and Police Line at Rajarbag at .00 hrs. of 26-3-71, Killing lots of people, Fierce fighting is going on with the EPR and police forces in the streets of Dacca. People are fighting gallantly with the enemy forces for the cause of Freedom of Bangladesh. Every sector of Bangladesh is asked to resist the enemy forces at any cost in every corner of Bangladesh.
May Allah bless you and help you in your struggle for freedom.
Joy BanglaSk. Mujibur Rahman(অনুবাদ)
বাংলাদেশ ও বিশ্ববাসীর প্রতিঃ
&nbsp;
পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনী ২৬-৩-৭১ তারিখ রাত ১২টার সময় হঠাৎ পিলখানার ইপিআর ব্যারাকে এবং রাজারবাগ পুলিশ লাইনে হামলা করেছে, অনেক মানুষ হত্যা করেছে। ইপিআর এবং পুলিশ বাহিনীর সাথে ঢাকার রাস্তায় ভয়াবহ যুদ্ধ চলছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য মানুষ বীরত্বের সাথে শত্রুবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে। বাংলাদেশের প্রতিটি সেক্টরকে যে কোন মূল্যে বাংলাদেশের সকল প্রান্তে শত্রু বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধের আহ্বান জানানো হলো।
&nbsp;
স্বাধীনতা সংগ্রামে আল্লাহ্‌ আপনাদের রহমত করুণ এবং সহায় হোন।
&nbsp;
জয় বাংলা
শেখ মুজিবুর রহমান
&nbsp;
এটি হুবহু বঙ্গবন্ধু ২৫শে মার্চের রাতে ওয়্যারলেস মাধ্যমে ঘোষণা করেছিলেন। কিছুক্ষণ পরেই সমবেত জনতা সর্বোচ্চ কণ্ঠে জয়বাংলা ধ্বনি দিয়ে আকাশ বাতাস মুখরিত করে তোলে এবং আমার নেতৃত্বে একটি বিশাল বিক্ষোভ মিছিল বের করে। মিছিলে সর্বস্তরের জনগণ অংশগ্রহণ করে। ঐ মিছিলের শ্লোগান ছিল ‘ইয়াহিয়ার ঘোষণা মানি না’, ‘বীর বাঙালী অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর’, ইত্যাদি ইত্যাদি। এর মধ্যে সর্বস্তরের নাগরিক ও কর্মচারীগণ শুধু শপথ করেই ক্ষান্ত হননি তারা পাকিস্তানের প্রতি আনুগত্য প্রত্যাহার করে এবং আমার মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে। এমনকি রিজার্ভ পুলিশের ভারপ্রাপ্ত অফিসার মি. খান অস্ত্রাগারের চাবি আমার হাতে অর্পণ করে বলেন যে, আজ থেকে আমরা আপনাদের হুকুমে পরিচালিত হবো এবং বাংলাদেশের প্রতি পূর্ণ অনুগত থাকবো। (From now onwards we are under your command ) ইতিমধ্যে চট্টগ্রাম থেকে আমার নিকট কয়েকটি জরুরি টেলিগ্রাম আসে। জনাব মরহুম জহুর আহমদ চৌধুরী ও জনাব আখতারুজ্জামান চৌধুরী (বর্তমানে জেলা, দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সভাপতি) টেলিফোনে জিজ্ঞাসা করতে থাকেন স্বাধীনতার ঘোষণা সম্পর্কে নিশ্চয়তার জন্য। যেহেতু আমি ই.পি.আর-এর ওয়্যারলেস-এর মাধ্যমে স্বাধীনতা ঘোষণার কপি ছাড়াও বঙ্গবন্ধুর সাথে সরাসরি আলোচনা করেছি এবং যেহেতু সে সময় ঢাকায় বঙ্গবন্ধুর বাড়ির ও অন্যান্য জরুরি টেলিফোন যোগাযোগ চট্টগ্রামের সাথে বিচ্ছিন্ন ছিল, সে জন্য আমাকে টেলিফোনে বারবার নিশ্চয়তা দিতে হয়েছিল। সকল সরকারী ও আধা সরকারী কর্মচারী সেদিনই আমাকে তাদের এক দিনের বেতন দিয়ে যুদ্ধ তহবিলে চাঁদা প্রদান করেন। নোয়াখালী টাউন হলে আমরা কন্ট্রোল রুম স্থাপন করি এবং মাইজদির রৌশন বাণী সিনেমা হলে আমাদের খাদ্য ও সাহায্য সামগ্রী রাখার ব্যবস্থা করি। পুলিশ লাইন ও জেলা স্কুলে তৎক্ষণাৎ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র খোলা হয়।
নোয়াখালীর সর্বস্তরের জনগণ পুলিশ, ই.পি.আর., আনসারসহ ১৯৭১ সালের ২৬ এপ্রিল পর্যন্ত সম্পূর্ণ নোয়াখালী জেলা হানাদারমুক্ত রাখে। এ সময়ে আমরা সামরিক পোশাকে বেলুনিয়া ও নোয়াখালী সীমান্তে অবস্থিত পাক বি.ও.পি. হতে আগত অস্ত্রশস্ত্রসহ হাজার হাজার ই.পি.আর. ও আনসারকে সংগঠিত করি। ৪০/৫০ জন পাকিস্তানি সৈন্যকে বন্দি অবস্থায় রাখি, মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয়স্থল, শিক্ষাকেন্দ্র ও রসদ সরবরাহের ব্যবস্থা করি। বেলুনিয়া বর্ডারে অবস্থিত পাক বি.ও.পি থেকে উদ্ধারকৃত মেশিনগানসহ অনেক অস্ত্রশস্ত্র, গোলাবারুদ আমাদের হস্তগত হয় যা আমরা পরে ২ নম্বর সেক্টরে এবং নোয়াখালী, ফেনী, লক্ষীপুর ও বিশেষ করে শুভপুরের যুদ্ধে কাজে লাগাই।
২রা এপ্রিল চাঁদপুর থেকে মিজান চৌধুরী রায়পুর হয়ে নোয়াখালী আসেন। আমি মিজান চৌধুরী এবং ফেনীর এম.এন.এ. মরহুম খাজা আহমেদ সহ ছোতাখোলা হয়ে ভারতীয় বি.এস.এফ. এর মেজর প্রধান এর সহায়তায় প্রথম সীমান্ত অতিক্রম করি। প্রথমে রামগড় ও পরে উদয়পুর হয়ে আগরতলায় যাই। উল্লেখ্য যে, রামগড়ে আমরা মেজর জিয়া, ক্যাপ্টেন রফিকসহ কয়েকজন সামরিক অফিসার ও তদানীন্তন পার্বত্য চট্টগ্রামের ডি.সি. জনাব তৌফিক ইমামের সঙ্গে আলোচনা করি।
ঐ দিনই সন্ধ্যায় আগরতলা পৌঁছার পরপরই অমৃতবাজার পত্রিকার শ্রী অনিল বিশ্বাসের বাসভবনে বিবিসি ও ভয়েস অভ আমেরিকার প্রতিনিধিসহ অনেক সাংবাদিক আমাদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন এবং আমাদের কথা টেপ করেন। সম্ভবত বাংলাদেশে গণহত্যা ও সর্বাত্মক যুদ্ধ সম্পর্কে এটাই বহির্বিশ্বের প্রথম প্রচারিত বাণী। কারণ আমরা (আমি এবং মিজান চৌধুরী) যে সাক্ষাৎকার প্রদান করি তা শুনেই আমেরিকায় নিযুক্ত তদানীন্তন রাষ্ট্রদূত (মিনিস্টার ও পরে পররাষ্ট্র সচিব) জনাব এনায়েত করিম, তাঁর এক ভাগ্নে ও অন্য একজনকে কলকাতায় কিড স্ট্রিটে সরাসরি আমাদের কাছে পাঠান। তিনি বিশ্বাস করেছিলেন যে অন্তত বাংলাদেশের দুইজন আওয়ামী লীগ নেতা জীবিত আছেন এবং তাদেরকে আগরতলা বা কলকাতায় পাওয়া যাবে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে নোয়াখালী বোধহয় একক ও অনন্যভাবে সরকারী কর্মচারী ও আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে <em>একক নেতৃত্বের</em> মাধ্যমে প্রায় এক মাস যুদ্ধে করে সমগ্র এলাকা হানাদারমুক্ত রেখেছিল। তারপর আমরা নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, বরিশাল ও ফরিদপুরের বেশকিছুসংখ্যক নির্বাচিত এম.পি ও এম.এন.এ. আগরতলায় একত্রিত হই। এ সময় আমাকে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ বিশেষ করে আগরতলার মুখ্যমন্ত্রী ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সাথে যোগাযোগ রক্ষার প্রধান লিয়াজোঁ নির্বাচিত করা হয়। সে সময় কর্নেল ওসমানী, লে. কর্নেল আব্দুর রব এম.এন.এ. সহ কয়েকজন সামরিক অফিসারের সঙ্গে আলাপ আলোচনার পর একটি প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার গঠনের তীব্র প্রয়োজনীয়তা অনুভব করি। আমরা আওয়ামী লীগ ও অন্যান্য রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এ ব্যাপারে একমত হই। ত্রিপুরা তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী শচীন বাবু এবং বিখ্যাত স্বদেশী নেতা কলকাতার ১৪ নং ক্ষুদিরাম বোস লেনের শ্রী পান্নালাল দাসগুপ্ত আমাদের এই কাজে বিশেষ উৎসাহ প্রদান করেন।
অতঃপর ১০ই এপ্রিল জনাব ওসমানীকে প্রধান সেনাপতি এবং মেজর জেনারেল আব্দুর রবকে ডেপুটি করে, বঙ্গবন্ধু মুজিবকে রাষ্ট্রপতি এবং নজরুল ইসলামকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি, জনাব তাজউদ্দীনকে প্রধানমন্ত্রী করে একটি অস্থায়ী মন্ত্রীসভা ও সরকার গঠন করা হয়। অতঃপর শ্রী পান্নালাল দাসগুপ্ত আমাকে ও কয়েকজন এম.এন.এ. ও এম.পি.কে তাঁর কর্মস্থল ও পত্রিকা অফিস কলকাতার ১৪ নং ক্ষুদিরাম বোস লেনে নিয়ে যান। ওখান থেকে আমরা বি.এস.এফ-এর হেড কোয়ার্টার ২/এ, লর্ড সিনহা রোডে গিয়ে জনাব নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন, মনসুর আলীসহ বিপ্লবী সরকারের সব মন্ত্রীর সাক্ষাৎ পাই। পরবর্তীকালে আমরা ‘তালা’য় অবস্থিত আন্দামান ফেরত বিপ্লবী নেতৃবৃন্দ শ্রী অমর গাঙ্গুলী ও মণি গাঙ্গুলীর বাড়িতে অবস্থান করে মুক্তি সংগ্রামের বিভিন্ন বিষয়ে মতামত বিনিময় করি। কিছুদিন পর ওখান থেকে আমরা উত্তর কলকাতায় অবস্থিত ৩০নং মদন মোহন তালা স্ট্রিটে শ্রী শ্যামাপদ সাহা, শ্রী বাদল সেন, শ্রী অমল সেন, প্রমুখ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে পরিচিত হই। পরবর্তীতে তাদের প্রেরণা ও সহায়তায় আমরা শিয়ালদহ, সল্ট লেকসহ বিভিন্ন স্থানে অবস্থিত লক্ষ লক্ষ অসহায় বাস্তুহারাকে দেখাশুনা করি। অতঃপর আমার ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় নড়াইলের তৎকালীন এম.পি.এ. মি. শহীদ ও তদানীন্তন পাকিস্তান ডেপুটি হাইকমিশনার জনাব হোসেন আলীর বিশেষ সহকারী মি. জাকির আহমেদ-এর সহায়তায় আমি হাইকমিশনারকে বাংলাদেশের পক্ষে Defect করার প্রস্তাব করি। তিনি প্রায় সব বাঙালী কর্মচারীসহ Defect করতে রাজি হন। তবে তিনি সমস্ত কর্মচারীর নিরাপত্তা, ভরণ-পোষণ ও অন্যান্য বিষয় আলোচনার জন্য সরাসরি অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করার জন্য একটি প্রস্তাব করেন।
সে মতে আমি তাঁর পক্ষে এই প্রস্তাব নিয়ে ২/এ লর্ড সিনহা রোডে গিয়ে তাঁদের সঙ্গে আলাপ করে একটি তৃতীয় স্থানে বৈঠকের ব্যবস্থা করি। ঐমতে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় এবং যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতা নিয়ে পার্ক সার্কাসের ৯ নং এভিন্যুতে অবস্থিত পাকিস্তানের ডেপুটি হাইকমিশনার অফিস বাংলাদেশ মিশন হিসেবে ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
ইতিমধ্যে ১৭ই এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় দেশি-বিদেশি প্রায় শতাধিক সাংবাদিক ও ফটোগ্রাফারের উপস্থিতিতে বঙ্গবন্ধু মুজিবকে রাষ্ট্রপতি ও তাজউদ্দিনকে প্রধানমন্ত্রী ও অন্যান্য তিনজনকে মন্ত্রী, জনাব ওসমানীকে প্রধান সেনাপতি ও নয়জনকে সেক্টর কমান্ডার করে বিপ্লবী গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার গঠিত হয়। ঐ দিন রাতেই আমরা কলকাতায় ফিরি। তার পূর্ব থেকেই আমাকে কেন্দ্রীয় ত্রাণ ও পুনর্বাসনের এম.এন.এ. ইনচার্জ করে বিধান রায়ের বাড়ি ৪৭ প্রিন্সেপ স্ট্রিটে দফতরের ভার দেয়া হয়। অধ্যাপক ইউসুফ আলীকেও পরে যুক্তভাবে এই পদে একই জায়গায় নিয়োগ করা হয়। পরে পরিচয়পত্র প্রদান, ইত্যাদি ব্যাপারে কাজের চাপ অসম্ভব বেড়ে যাওয়ায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জনাব কামরুজ্জামান তাঁর মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আমাকে যুক্ত করে নেন। সাহায্য ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয়ের আরো দুইটি অতিরিক্ত অফিস নেয়া হয়। একটি ৩/১, কামাক স্ট্রিটে এবং অন্যটি ১নং বালিগঞ্জে। শ্রী জি. এস. ভৌমিক Defected জেলা দায়রা জজকে রিলিফ কমিশনার হিসেবে আমার অধীনে ন্যস্ত করা হয়। জনাব কাওসার আলী সহ অনেকে যুক্তভাবে আমাকে সহায়তা করেন। প্রবাসী মুজিবনগর সরকার ৯ মাস যুদ্ধকালে আর কোনো মন্ত্রী নিয়োগ করেননি। আমাদের এম.এন.এ. ইনচার্জদের মন্ত্রীর স্ট্যাটাস দেয়া হয়। ৩/১, কামাক স্ট্রিটে বিদেশ হতে প্রাপ্ত টাকা, চেক, ইত্যাদি গ্রহণ করা হতো। এখানে জনাব কামরুজ্জামান, ইউসুফ আলী এবং আমি ছাড়া আর কোনো লোকের প্রবেশাধিকার ছিল না।
পরে মাননীয় অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি আমাকে তাঁর ব্যক্তিগত প্রতিনিধি (Personal envoy) হিসেবে মনোনীত করেন এবং জুন মাসে বিভিন্ন রণাঙ্গনে, প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে, ভারতের বিভিন্ন জায়গায় ও নেপালে সংসদীয় দলের নেতা হিসেবে ঘোষণা করেন। পালাটোনায় ক্যাপ্টেন সুজাত আলী, এম.এন.এ. ও ভারতীয় ক্যাপ্টেন ধর আমাকে নিয়ে প্রায় দুই হাজার মুক্তিযোদ্ধার শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন। মেলাঘরে প্রায় চার হাজার মুক্তিযোদ্ধা আমার হাতে শপথ গ্রহণ করে। মেজর খালেদ মোশারফ, ক্যাপ্টেন হুদা, মেজর হায়দার সেখানে উপস্থিত ছিলেন। অনুরূপভাবে আমি রাজনগর, ধর্মনগর, ছোতাখোলা, বিলোনিয়া, বেগুলা, মাঝদিয়া, চরিলাম, সাবরুম, পূর্বাঞ্চলীয় প্রশিক্ষণ ক্যাম্প ও করিমপুর, শিকারপুর, ইছামতি, ভাগীরথীর তীরে অবস্থিত বহু ক্যাম্পে গমন করি এবং বিভিন্ন সেক্টর কমান্ডার ও মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সাহায্য-সহযোগিতা, অস্ত্রশস্ত্র ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী সরবরাহের ব্যবস্থা করি। উল্লেখ্য যে, আমাদের বহু খ্যাতনামা মুক্তিযোদ্ধা দেশের অভ্যন্তরে থেকেই সম্মুখ যুদ্ধ ও গেরিলা যুদ্ধ পরিচালনা করেছিলেন। জনাব রুহুল আমিন ভুঞা, খালেদ মোহাম্মদ আলী এম.এন.এ., মাহমুদুর রহমান, বেলায়েত ও আমার দুই ছেলে গোলাম মহিউদ্দিন ও বাহার উদ্দিনসহ এরা প্রায় ৯ মাস দেশের অভ্যন্তরেই ছিলেন।
১৭ই এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠন করার পরই আমি কিছু নগদ টাকা ও দুই ট্রাক ত্রাণ সামগ্রী যথা রেইন কোট, কিটস, ইত্যাদি নিয়ে আগরতলায় এসে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে বিতরণ করি। জনাব জহুর আহমদ চৌধুরীকে আনুষ্ঠানিকভাবে ১৬৩ জন এম.পি.এ., এম.এন.এ.-এর উপস্থিতিতে আমার সভাপতিত্বে পূর্বাঞ্চলীয় সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। ইতিপূর্বে এ পদ নিয়ে খুব দলাদলি ও দ্বন্দ ছিল। ইতিমধ্যে আমি নিজের কিছু প্রয়োজনীয় সামগ্রী আনয়ন ও পরিবারের স্ত্রী, মাতা, পাঁচ মেয়ে ও দুই ছেলে, সকলের খোঁজ-খবর নেয়া এবং নোয়াখালী জেলার সংগ্রাম পরিষদের সভাপতির দায়দায়িত্ব বুঝিয়ে দেয়ার জন্য ২৪শে এপ্রিল বেলুনিয়া হয়ে নোয়াখালী প্রবেশ করি। মাইজদি গিয়ে দেখি বাসা ফাঁকা, সব মালপত্র আছে কিন্তু বাড়িতে কোনো মানুষ নেই। অনুরূপভাবে জেলা প্রশাসক, জজ, পুলিশ সুপার সকলেই নিজ নিজ বাসস্থান ছেড়ে গ্রামে আশ্রয় নিয়েছেন। কারণ হানাদার বাহিনী লাকসাম হয়ে রেল লাইন ধরে দ্রুত নোয়াখালীর দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। গভীর রাতে আমি জেলা প্রশাসকের সঙ্গে যোগাযোগ করি। পরে শুধু ঘন্টাখানেকের জন্য আমার স্ত্রী ও বড় মেয়ে ও শ্বশুরবাড়ির লোকজনদের সাথে দেখা করি। সঙ্গে সঙ্গেই একটি জিপ ঐ বাড়িতে আসে এবং রিজার্ভ পুলিশের ইন্সপেক্টর মি. খান এসে বলেন, স্যার, এখনই আপনাকে চলে যেতে হবে, কাল আর বর্ডার ক্রস করতে পারবেন না। হানাদার বাহিনী মাইজদি টাউন হতে মাত্র ১০/১৫ মেইল দূরে চৌমুহনীর উত্তরে অবস্থান নিয়েছে। কাজেই ঐ মুহূর্তে হতভম্বের মত আবার নিরুদ্দেশের পথে যাত্রা করলাম। সঙ্গে ছিল আমার ল্যান্ড রোভার জিপ আর ড্রাইভার মাহমুদ, চৌমুহনী বিদ্যামন্দিরের হেডমাস্টার সালাউদ্দিন এবং সোনাইমুড়ির গোলাম মোস্তফা। সামান্য কিছু টাকা নিয়ে আঁকাবাঁকা পথে ২৫শে এপ্রিল বর্ডার ক্রস করে বেলুনিয়া পৌঁছি। আসার সময় স্ত্রীকে বলে আসি, “খোদা হাফেজ, চরাঞ্চলে গিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে চেষ্টা করো।” বর্ডারের কাছে এসে এক নিরাপদ স্থানে জনাব সালাউদ্দিন ও গোলাম মোস্তফাকে নামিয়ে দেই। এস্কর্ট পার্টি হিসেবে মি. খানের জিপ ৩/৪ জন পুলিশ বর্ডার পর্যন্ত আমাদের সঙ্গে ছিল। যুদ্ধের শেষ দিন পর্যন্ত এই বিশ্বস্ত ড্রাইভার মাহমুদ বাবা-মা ছেড়ে আমার সঙ্গে ছিল।
২৬ এপ্রিল তারিখে নোয়াখালীর পতন হয়। সমগ্র শহর হানাদার বাহিনী দখল করে নেয়। আগরতলায় এসে ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী ও বিভিন্ন নেতৃবৃন্দের সঙ্গে এবং অন্যান্যের সঙ্গে বিশেষ করে ২নং সেক্টরের মেজর খালেদ মোশারফ-এর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে অস্ত্র ও বিস্ফোরক প্রেরণের ব্যবস্থা করি।
ইতিমধ্যে মুজিবনগর থেকে জরুরি ভিত্তিতে কলকাতা গমনের জন্য আমার ডাক আসে। আমি পূর্বেই সব কিছু জহুর আহমদ চৌধুরীকে বুঝিয়ে দিয়ে চলে যাই। ৯নং সার্কাস এভিনিউ অর্থাৎ ‘বাংলাদেশ মিশন’-এ দেশি-বিদেশি অনেক ব্যক্তি, বিশেষ করে পিটার হেজেল হার্স্ট, নিউ ইয়র্ক টাইমস এবং ক্রিশ্চিয়ান সায়েন্স মনিটরের প্রতিনিধি হেনরি হাওয়ার্ড গেস মার্ক গায়েন এর সঙ্গে আমি বাংলাদেশের গণহত্যা এবং প্রাসঙ্গিক বিষয়ে আলোচনা করি। এখানে প্রয়াত ড. মুজাফফর আহমদও উপস্থিত ছিলেন। কখনও পররাষ্ট্রমন্ত্রী খন্দকার মোশতাক আহমদও উপস্থিত থাকতেন।
ইতিমধ্যে খবর পেলাম আমার গ্রামের বাড়ি(রাজাপুর), শ্বশুরবাড়ি(আবদুল্লাহপুর) এবং দুই বোনের বাড়ি (যথাক্রমে করিমপুর ও বারইপুর) হানাদাররা আক্রমণ করেছে। আমার মাইজদির পাকা দ্বিতল বাড়ি অগ্নিসংযোগ করে পুড়িয়ে দিয়েছে। আমার শ্বশুরবাড়িতে সৌভাগ্যবশতঃ স্ত্রী ও বড় দুই মেয়ে সেদিন উপস্থিত ছিল না। ঐ দিনই সন্ধ্যায় রাতে তারা অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছিল। ছোট দুই মেয়ে লিলি ও মায়া (১০ বৎসর, ৭ বৎসর)সহ বাড়ির সমস্ত স্ত্রী পুরুষকে বন্দি করে বাহির বাড়িতে উঠিয়ে নেয় এবং সমস্ত পুরুষকে ট্রাকে করে মাইজদি ক্যাম্পে নিয়ে আসে। দীর্ঘ ৪ মাস কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে রেখে তাদের উপর নির্যাতন করে, এবং গায়ের চামড়া পুড়িয়ে দেয়। ৪ জনকে গুলি করে হত্যা করে। পরে অবশ্য তারা বাড়ির সমস্ত মহিলা ও শিশুকে এক বালুচ ক্যাপ্টেনের নির্দেশে ছেড়ে দেয়। ভাগ্যক্রমে আমার বড় ছেলে গোলাম মহিউদ্দিন (লাতু) পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে প্রাণে বেঁচে কচুরীপানার নিচে দিয়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। হানাদাররা দুই বোনের সমস্ত বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়। ছোট বোনটির মৃত্যু এর পূর্বেই হয়েছিল এবং তার স্বামীও জীবিত ছিল না। একমাত্র ভাগ্নে মফিজ তখন সামরিক বিভাগের চাকুরিতে পশ্চিম পাকিস্তানের কোহাটে আটক। ভাগ্নী জামাই মমিনউল্লাহ এবং তার বড় ভাইয়ের কলেজে পড়ুয়া দুই ছেলে নূরউদ্দিন, শাহাবুদ্দিনসহ নয়জনকে লাইনে দাঁড় করিয়ে হানাদার বাহিনী ফায়ারিং স্কোয়াডে গুলি করে হত্যা করে। এই মর্মান্তিক খবর আমাকে জানানো হয়নি। যেমন জহুর আহমদ চৌধুরীর জ্যেষ্ঠ ছেলের মৃত্যু সংবাদও তাঁর নিকট গোপন রাখা হয়েছিল। আ স ম আব্দুর রব ও অন্যান্যের চেষ্টায় আমার স্ত্রী, কন্যা ও মৃত ভগ্নীর ছেলে মনজু এবং আমার ছোট ভাই এনায়েত জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে বেলোনিয়ায় পৌঁছে। এ সময় মুর্শিদাবাদের বিভিন্ন স্থানে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান অধ্যুষিত এলাকায় তীব্রভাবে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা দেখা দেয়। স্মর্তব্য, কলকাতাসহ পশ্চিমবঙ্গ এবং আলীগড়সহ ভারতের উত্তরাঞ্চলের অধিকাংশ মুসলমান যুদ্ধের প্রথম দিকে তীব্রভাবে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতা করে। তাদের ধারণা ছিল পাকিস্তান ভেঙ্গে গেলে তাদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে। তাদের ভ্রমাত্মক ধারণা দূর করার জন্য মুজিবনগর সরকার বিশেষ করে সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও মনসুর আলী আমাকে হিন্দু-মুসলমান সম্প্রীতি রক্ষার জন্য রাষ্ট্রপতির বিশেষ দূত হিসেবে নদীয়া, কৃষ্ণনগর, বহরমপুর সহ বিভিন্ন জায়গায় পাঠান। এ সময় ফরিদপুর থেকে লক্ষাধিক তপশীলী সম্প্রদায়ের লোক উপরিউক্ত এলাকাগুলোতে আশ্রয় নিয়েছিল। যতদূর মনে পড়ে বহরমপুর সীমান্তে একদিনেই প্রায় ১০ হাজার নমশুদ্র ঢাল সড়কি নিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করেছিল। আল্লাহর রহমতে আমি, মরহুম গোলাম কিবরিয়া এম.এন.এ., আজিজুর রহমান আক্কাছ এম.এন.এ. ও অন্যান্য এমপি এবং বহরমপুরের তরুণ আই এ এস অফিসার মি. ডি কে ঘোষ-এর সহযোগিতায় প্রত্যেক মুসলমানের বহিঃ বাড়ির ঘর, স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা সমস্তই বাস্তুহারাদের আশ্রয়ের জন্য ছেড়ে দেয়ার ব্যাপারে সফলকাম হই। এমনকি সরকারী নির্দেশে সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং মারওয়ারীদের বিরাট বিরাট পাটের খালি গুদাম বাস্তুহারাদের জন্য খালি করে দেয়া হয়। মিসেস সুভদ্রা এমপি ও তদানীন্তন কংগ্রেসের মহাসচিব হেনরি অস্টিন সহ আমরা উত্তরাঞ্চলের আলীগড়, মীরাট ও অন্যান্য স্থানের সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী কাজে বিভিন্ন স্থানে জনসভা ও গণসংযোগ করি। এ সময় আমার নেতৃত্বে তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি প্রতিনিধিদলকে নেপালে যাওয়ার জন্য রাষ্ট্রপতি সরকারী নির্দেশ দেন । অপর দুই সদস্য ছিলেন শ্রী সুবোধ মিত্র ও আব্দুল মমিন তালুকদার এম, এন, এ । আমার নেপাল যাওয়ার পূর্বে দিল্লীস্থ পাকিস্তান হাইকমিশন হতে যে দুইজন ডিপ্লোম্যাট কে , এম সাহাবুদ্দিন এবং জনাব আমজাদুল হক ডিফেক্ট করেছিলেন তাঁদের সাথে যোগাযোগ রেখে প্রায় দুসপ্তাহ দিল্লীতে অবস্থান করি। এ সময় আমার আমরা সর্বভারতীয় সংগ্রামী নেতা শ্রী আচার্য কৃপালনি ( যিনি কলকাতার কনভোকেশনে গভর্নরকে গুলি ছুড়ে দণ্ডপ্রাপ্ত হয়ে আন্দামান হতে ফিরেছিলেন ) , শ্রী পান্নাপাল দাসগুপ্ত ও শ্রী অমর সাহার সঙ্গে যোগাযোগ ও আলোচনা করে অনেক তথ্য ও মূল্যবান উপদেশ লাভ করি ।
&nbsp;
এরপর আমরা নেপাল যাই । নেপাল তখন ছিল পাকিস্তানের খুব ঘনিষ্ঠ ও সহযোগী রাষ্ট্র। সৌভাগ্যের বিষয় এই সময় কাঠমুন্ডুতে তিনজন পাকিস্তানী কূটনীতিকের মধ্যে দুইজন বাঙালি । জনাব মোস্তাফিজুর রহমান সি,এস,পি, এবং জনাব মোখলেছউদ্দিন সি,এস,পি ছিলেন । সচিবালয়ের একজন প্রবীন লোক ছিলেন তিনিও ছিলেন ভোলার অধিবাসী । এঈ সফরে আমরা নেপালের সাবেক পররাষ্ট্র মন্ত্রী শ্রী ঋষিকেশ সাহা ও প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শ্রী থাপা ও অন্যান্য বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ , সাংবাদিক , সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবিদের সঙ্গে যোগাযোগ করি । তাঁরা সকলেই “বাংলাদেশ সহায়ক সমিতি” নাম দিয়ে বাস্তুহারাদের সাহায্য এবং স্বাধীনতার সংগ্রামের পক্ষে জোরালো সমর্থন দেন। তাঁরা কয়েকটি ছাত্র-যুবসমাবেশের এবং একটি সাংবাদিক সম্মেলনের আয়োজন করেন। উল্লেখ করা যেতে পারে যে, বর্তমান নেপালের রাজার পিতা শ্রী বীরেন্দ্র তখন জীবিত ছিলেন। বর্তমান রাজার আপন মামা ছিলেন প্রাক্তন পররাষ্ট্র মন্ত্রী ও জাতিসংঘে নেপালের স্থায়ী প্রতিনিধি শ্রী ঋষিকেশ সাহা। তাঁদের মাধ্যমে আমরা রাজদরবারে মুজিবনগর সরকারের ছবি ও কাগজপত্র প্রদান করি।
&nbsp;
নেপাল হতে প্রত্যাবর্তন করে আবার ১ নং বালিগঞ্জে ত্রাণ ও পুনর্বাসনের কাজে যোগদান করি । ১৬ ই ডিসেম্বর পর্যন্ত উক্ত কাজেই নিয়োজিত ছিলাম । ১৬ই ডিসেম্বর এর পরে আমি আগরতলা হয়ে নোয়াখালী চলে যাই । ইতিপূর্বে ৬ই ডিসেম্বর হতেই নোয়াখালী হানাদার মুক্ত হতে থাকে । কাজেই আগরতলা ,উদয়পুর এবং বেলোনিয়ায় অবস্থানরত হাজার হাজার শরণার্থী ও প্রায় অধিকাংশ বাস্তুহারা এবং এম পি এ, এম এন এ ও অন্যান্য প্রায় সব নেতৃবৃন্দ এবং তাদের পরিবার-পরিবর্গ নোয়াখালী প্রত্যাবর্তন করেন । এমনকি আমার দুই ছেলে ও তখন নোয়াখালীতে । কাজেই আমার স্ত্রী ও পাঁচ কন্যা শুধু আমার অপেক্ষায় উদয়পুরে অধীর আগ্রহে এবং উদ্বিগ্ন হয়ে বসেছিল ।
&nbsp;
ইতিপূর্বে পূর্বাঞ্চলের চেয়ারম্যান আমাকে সমগ্র নোয়াখালী (ফেনী ও লক্ষীপুরসহ) জেলার প্রশাসনিক দায়িত্বে নিযুক্ত করেন। বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন এবং আমার মন্ত্রীসভার যোগদানের পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত আমি উক্ত দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলাম।
এখানে অত্যন্ত গর্বের সাথে উল্লেখ করতে পারি যে নোয়াখালী জেলা হানাদারমুক্ত হবার ও আমাদের প্রশাসনিক দায়িত্ব নেয়ার পরে কোনো স্থানে কোনো হত্যাকাণ্ড বা লুটতরাজ অথবা রাহাজানি হয়নি। এমনকি ইতিপূর্বে যুদ্ধ চলাকালীন সময়েও মুক্তিযোদ্ধারা যাদের হত্যা করেছিল তাদেরও কোনো মালামাল বা ঘরবাড়ি লুটপাট করেনি। আমি মুজিব বাহিনী, মুক্তিবাহিনী এবং শ্রমিক সংগঠনের বিভিন্ন বাহিনীকে নোয়াখালী জেলা স্কুল, হরিনারায়ণপুর স্কুল ও অন্যান্য স্থানে অস্ত্রশস্ত্রসহ শান্তিপূর্ণভাবে অবস্থানের নির্দেশ দেই। ফেনী, লক্ষীপুর, রামগতি, কোম্পানীগঞ্জসহ বিভিন্ন ক্যাম্পে ৪/৫ হাজার নগদ টাকা এবং নোয়াখালী সেন্ট্রাল স্টোরে রক্ষিত কাপড়, কম্বল, চাউল-গম-ডাল ইত্যাদি সরবরাহ করি। বিশেষ করে ডেলটা জুট মিলের ও দোস্ত মোহাম্মদ টেক্সটাইল মিলের শ্রমিকদের জন্য বিনামূল্যে চাল সরবরাহ করি। সৌভাগ্যের বিষয় রাজাকার তহবিলে গচ্ছিত প্রায় ৮০ লাখ টাকা জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে এবং ছাত্র শ্রমিক ও বিভিন্ন বাহিনীর নেতৃবৃন্দের তত্ত্বাবধানে বিলি বণ্টন করি। পরে তদানীন্তন কুমিল্লা গ্যারিসনের কমান্ডার মেজর জিয়াকে মাইজদিতে নিয়ে ১০ই জানুয়ারির পূর্বেই মুক্তিযোদ্ধাদের নিকট থেকে অনেক আগ্নেয়াস্ত্র আমাদের নিকট প্রত্যার্পণ করার আহ্বান জানাই এবং জমা নেই।
-আব্দুল মালেক উকিল১ জুলাই, ১৯৮৪।
&nbsp;
&nbsp;
<a href=”https://www.facebook.com/alamin.sorkar.7161″><strong>আলামিন সরকার</strong></a>
<strong>&lt;১৫,৮,৪২-৫১&gt;</strong><h1>[আবু সাঈদ চৌধুরী, বিচারপতি]</h1>&nbsp;
মার্চ মাসের শেষ সপ্তাহে আমি জেনেভায় উপস্থিত ছিলাম। আমি তখন বিশ্ব মানবাধিকার সংস্থার সদস্য। এই সম্মেলন চলাকালে ২৬শে মার্চ, ১৯৭১ সালে বিবিসি’র মাধ্যমে আমি জানতে পারি যে, বাংলাদেশের অবস্থা ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছে। ঢাকায় সাংঘাতিক কিছু হয়েছে কিন্তু বাইরের পৃথিবী থেকে ঢাকা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে বলে সঠিক কিছু জানা যাচ্ছে না। এই খবর শুনে অত্যন্ত মর্মাহত, চিন্তিত এবং ব্যাকুল হয়ে উঠি। অধিবেশন চলা অবস্থায় মানবাধিকার সংস্থারতৎকালীন সভাপতি আঁদ্রে আগিলাকে আমি জানাই যে আমার দেশ সংক্রান্ত গভীর দুঃখজনক সংবাদ আমি জানতে পেরেছি এবং এ সংবাদের পরিপ্রেক্ষিতে আমার পক্ষে অধিবেশনে অংশগ্রহণ আর সম্ভব নয়। আমি মধ্যাহ্নে জেনেভা ত্যাগ করি এবং বিকেলের দিকে লন্ডন এসে পৌঁছি।আমি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের দুজন কর্মকর্তাকে চিনতাম। একজন হচ্ছেন ইয়ান সাদারল্যান্ড, তিনি ছিলেন দঃ এশিয়া বিভাগের প্রধান এবং অপরজন হচ্ছেন এন, জে, ব্যারিংটন। তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী লর্ড হিউমের ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে কর্মরত ছিলেন।পরের দিন যদিও ছুটির দিন ছিলো তবুও আমি উভয়কে তাদের অফিসে আসতে অনুরোধ জানাই। এবং দুজনেই তা রক্ষা করেন। পররাষ্ট্র ভবনে উপস্থিত হলে তারা আমাকে জানান, ঢাকা থেকে এখনো সঠিক কোনো তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। এ সময় আমাকে কফি খেতে অনুরোধ করা হয়। আমরা কফি খাচ্ছি এমন সময় মিঃ সাদারল্যান্ডের একান্ত সচিব খবর দেন যে ঢাকা থেকে একটি টেলেক্স এসেছে। মিঃ সাদারল্যান্ড তথ্য সম্পূর্ণ হলে সেটি নিয়ে আসতে বলেন। সচিব একটি বিশাল টেলেক্স নিয়ে আসেন এবং সাদারল্যান্ড গোটা জিনিসটা পাওয়ার পর আমাকে বলেন জাষ্টিস চৌধুরী, আমি অত্যান্ত দুঃখিত, ঢাকার সংবাদ খুবই খারাপ। বহু ছাত্রকে হত্যা করা হয়েছে এবং আমরা ভীত যে, শিক্ষকরাও এই হত্যাযজ্ঞ থেকে বাদ পড়েনি। নগরে মৃত্যুর সংখ্যা খুবই বেশী।আমি আরো জানতে পারি যে, বৃটিশ ডেপুটি হাইকমিশনার জানিয়েছেন তার পক্ষে আর টেলেক্স করা সম্ভব নয় এবং তিনি বৃটিশ নাগরিকদের ফেরত নেবার অনুরোধ জানিয়েছেন। সেই মুহুর্তে আমার মনে হলো যে, গোটা বাংলাদেশ একটি বধ্যভুমিতে পরিনত হয়েছে। এ অবস্থায় আমার পক্ষে পাকিস্তান সরকারের সাথে কোন রকম সম্পর্ক রাখা অপমানজনক। যারা আমার ছাত্রদের মেরে ফেলেছে আমি কিভাবে তাদের সাথে সম্পর্ক রাখতে পারি। আমার মনে পড়ল জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকান্ডের কথা। আমি তখনই লর্ড হিউমের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করি। কিন্তু সে সময় তিনি স্কটল্যান্ডে তার দেশের বাড়ীতে ছিলেন। আমি অবিলম্বে কমনওয়েলথ সচিবালয়ের সাধারণ সম্পাদক আর্নল্ড স্মিথের সঙ্গে দেখা করি এবং ঢাকায় হত্যা বন্ধ এবং বঙ্গবন্ধুর মুক্তির চেষ্টা করতে বলি। এখানে একজনের নাম বিশেষ করে বলতে হয়, তিনি হচ্ছেন উইলিয়াম পিটার’স। এই ভদ্রলোক একাত্তর সালে কমনওয়েলথ সচিবালয়ে উচ্চপদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। ষাটের দশকে তিনি ঢাকায় যুক্তরাজ্যের হাইকমিশনে ফার্স্ট সেক্রেটারী হিসেবে কাজ করেছিলেন। তিনি আমাদের আশা আকাংখার প্রতি অত্যন্ত সহানুভুতিশীল ছিলেন। এবং তার সাথে আমি সব সময় যোগাযোগ রক্ষা করি।
&nbsp;
জেনেভা থেকে লন্ডনে আসার কয়েক ঘন্টার মধ্যেই সেখানে বসবাসরত বাঙালিদের সাথে আমার দেখা হয় এবং মিঃ সাদারল্যান্ডের সাথে টেলিফোনে কথা বলি। আমি আগেই বলেছি, পরের দিন তার সাথে দেখা করি এবং ঢাকা থেকে পাঠানো টেলেক্স-এ খবর পাই। হাবিবুর রহমান, সুলতান শরিফ এবং অন্য কয়েকজন আমার সাথে যোগাযোগ রক্ষা করেন। মিঃ হাবিবুর রহমান আমাকে পররাষ্ট্র দপ্তরে নিয়ে যান। পররাষ্ট্র দপ্তর থেকে ফিরে এসে আমার স্ত্রীকে আমার সিদ্ধান্তের কথা জানাই। সে অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে আমার এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।ইতিমধ্যে বহু বাঙালি জড় হতে থাকে। সবার নাম মনে রাখা সম্ভব নয়। তবে বিশেষভাবে আমি কয়েকজন ডাক্তারের কথা বলতে চাই যারা স্বাধীনতা আন্দোলনে সক্রিয় ভুমিকা পালন করেছেন। নয় মাস ধরে যে আন্দোলন চলেতাতে কিছু কিছু কর্মীর কাছ থেকে বিভিন্ন অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয় কিন্তু ডাক্তার কর্মীরা কোনোদিন কোনো অসুবিধা করেননি বরং তাদের ত্যাগ কর্মনিষ্ঠা এবং কষ্টসহিষ্ণুতা অন্যদের জন্য আদর্শ হিসেবে প্রজ্বলিত ছিলো। ডাঃ আব্দুল হাকিম, ডাঃ জাফরুল্লাহ চৌধুরী এবং মোশারফ হোসেন জোয়ারদার সারাক্ষন পরিশ্রম করতেন।এখানে বলা প্রয়োজন যে, স্বতঃস্ফূর্তভাবে সমগ্র বৃটেনে বাঙালিদের মধ্যে আন্দোলন গড়ে ওঠে। প্রায় প্রতিটি বাঙালি এই আন্দোলনের সাথে যুক্ত হয় এবং বিভিন্ন এলাকায় কমিটি গঠন করে। কিন্তু একটি সংগঠনের সাথে আরেকটি সংগঠনের যোগাযোগ ছিলো কম যার ফলে নেতৃত্বের প্রশ্নে বিরোধ দেখা দেয়, এবং নিজেদের মধ্যে কলহের সৃষ্টি হয়। প্রত্যেক দলই আমাকে তাদের দলে যোগ দেয়ার জন্য চাপ দেয় কিন্তু আমি একটি কেন্দ্রীয় কমিটি গঠিত না হলে কোনো দলেই যোগ দেব না বলে জানাই।লর্ড হিউমের সাথে এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে সাক্ষাৎকারের ব্যবস্থা করা হয়। এই মধ্যবর্তী সময়ে আমি বিভিন্ন একাডেমিসীয়ান এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় প্রধানের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করতে থাকি। এ ছাড়া বৃটিশ পার্লামেন্টের সদস্যদের সঙ্গেও দেখা করি। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য স্যার এ্যালেন বুলক এবং ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য লর্ড জেমসের সঙ্গে দেখা করি। তারা আমাকে স্যার হিউ স্প্রিংগারের সঙ্গে দেখা করতে বলেন। তিনি ছিলেন কমনওয়েলথ বিশ্ববিদ্যালয় সমিতির সাধারণ সম্পাদক এবং কমনওয়েলথ বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের মুখপাত্র।ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের লর্ড জেমস একটি মধ্যাহ্নভোজের ব্যবস্থা করেন এবং প্রায় বিশজন বিভাগীয় প্রধানকে ঐ ভোজে দাওয়াত করেন। আমি তাদের কাছে বাংলাদেশের অবস্থা বর্ণনা করি এবং তারা গভীর সহানুভুতির সঙ্গে তা শোনেন। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য থাকাকালে লর্ড জেমস ঢাকায় গিয়েছিলেন। তিনি ভবিষ্যতবাণী করেন যে, ছয় মাসের মধ্যে বাংলাদেশ স্বাধীন হবে। পূর্ব পাকিস্তানকে কলোনী হিসেবে ব্যবহার করা আর সম্ভব হবে না। এরপর আমি স্যার হিউ স্প্রিং-এর সাথে দেখা করি। তিনি বলেন, “হত্যাযজ্ঞ বন্ধ করা আমার নৈতিক দ্বায়িত্ব” । তিনি আরো বলেন, তিনি তখনি ইয়াহিয়া খানকে একটি টেলিগ্রাম করবেন বিশ্ববিদ্যালয়ে হত্যাযজ্ঞ বন্ধ করার জন্য।তারপর আমি ঢাকা আন্তর্জাতিক জুরিষ্ট কমিশনের সাধারণ সম্পাদককে টেলিফোন করে সমস্ত ব্যাপার জানাই। তিনি পাকিস্তান সরকারের কাছে একটি তারবার্তা পাঠান। তাতে তিনি হত্যাযজ্ঞ বন্ধ এবং বঙ্গবন্ধুর মুক্তির জন্য অনুরোধ জানান।বাংলাদেশ আন্দোলনে তৎপর বিভিন্ন সংগঠন একত্রীকরণ করার জন্য আমরা সকলেই চেষ্টা করি। এই কাজটি ছিলও অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। রাত দুটা তিনটা পর্যন্ত মিটিং চলতো এবং বাড়ী ফিরে নিজের কাছে শপথ করতাম যে পরদিন আর যাবো না। কে কোন দলের নেতা হবেন তা নিয়ে মতবিরোধ ছিলো। কিন্তু পরদিন আবার ঠিকই যেতাম।
&nbsp;
১০ই এপ্রিল লর্ড হিউমের সাথে আমার সাক্ষাৎ হয়। সাদারল্যান্ড এবং ব্যারিংটন আমাকে তার কাছে নিয়ে যান। লর্ড হিউম আমাকে দেখার সাথে সাথেই বলেন যে তিনি পাকিস্তানের হাই কমিশনারের সঙ্গে কথা বলেছেন। অবস্থা ঠিকই আছে, চিন্তার কোনো কারণ নেই। আমি বলি শুধুমাত্র একজনের কথাতেই প্রমাণ হয় না যে অবস্থা ঠিক আছে। আমি আমার সম্পূর্ণ বক্তব্য পেশ করি এবং শেখ মুজিবুর রহমানের জীবন বাঁচানোর জন্য অনুরোধ জানাই। তিনি বলেন, সুনির্দিষ্ট খবর আছে শেখ মুজিব ভালোই আছেন। এই সাক্ষাৎকারে লর্ড হিউমকে আমি জানাই, আমরা শান্তি এ শৃঙ্খলার সাথে আমাদের আন্দোলন চালিয়ে যাবো। সেদিনই আমি চারটার সময় বিবিসি’তে যাই। মিঃ ট্রার গিল সেখানে আমার একটা একক সাক্ষাৎকার গ্রহন করেন। এই সাক্ষাৎকারে আমি পাকিস্তানের সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করার কথা ঘোষনা করি। বিবিসিতে কর্মরত দুজন বাঙালি সিরাজুর রহমান ও শ্যামল লোধ আমার বিবৃতি নেন এবং প্রচার করেন।আমি বিবিসি’তে বিবৃতি দিয়ে বের হবার সময় পাকিস্তানী হাই কমিশনের মিঃ মহিউদ্দিন আমাকে জিজ্ঞেস করেন যে তিনি কি করবেন। আমি তাকে বলি যথাসময়ে তার সঙ্গে যোগাযোগ করবো। কেননা তখনো মুজিবনগর সরকার গঠিত হয়নি। এ অবস্থায় আমার পক্ষে এক সরকারী কর্মচারীকে সেই মুহুর্তে পদত্যাগ করতে বলা উচিত হত না। পরে অবশ্য আমরা মিঃ মহিউদ্দিনকে পদত্যাগ করতে বলি এবং তিনি তা করেন।আমি যে জায়গায় থাকতাম সেখানে পাকিস্তান হাই কমিশন থেকে বার বার টেলিফোন করে আমাকে হাইকমিশনারের বাড়ীতে নিমন্ত্রণ জানানো হয়। আমি তা প্রত্যাখান করি। অতঃপর আমি বাসা পাল্টাবার সিদ্ধান্ত নেই। কয়েকদিন পরে গোছগাছ করে যখন আমি রওয়ানা হচ্ছি তখনই একটা টেলিফোন আসে। জানতে পারি টেলিফোনটি কলকাতা থেকে করা হয়েছে এবং অপরাপর কথা বলেছেন টাংগাইল থেকে সাংসদ জনাব আব্দুল মান্নান এবং ব্যারিষ্টার আমিরুল ইসলাম। এই টেলিফোন সরকার গঠনের কয়েকদিন আগে আসে। তারা আমাকে জানান যে, তারা আমার সিদ্ধান্তে অত্যন্ত খুশি হয়েছেন এবং তারা চান যে, সরকার গঠনের পর আমি বহির্বিশ্বে বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধিত্ব করি।অস্থায়ী বাসস্থানে যাবার পর স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড থেকে একটি ফোন পাই। কিভাবে তারা আমার নতুন ঠিকানার খবর জানলো ঠিক বুঝতে পারিনি। তারা আমার সঙ্গে দেখা করে জানান যে, পাকিস্তান সরকার আমাকে অপহরণ করার জন্য কিছু পাকিস্তানী লোক নিয়োগ করেছে এবং আমাকে অনুরোধ করেন অত্যন্ত সতর্কভাবে চলাফেরা করতে। তারা আরো জানান সরকারী পর্যায়ে এই সিদ্ধান্ত হয়েছে যে যুক্তরাজ্যে থাকাকালে আমার জন্য ছদ্মবেশী কর্মচারী দ্বারা নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হবে। তারা বিশেষভাবে চলাফেরার ব্যপারে আমাকে সতর্ক করে দেন এবং ভূগর্ভস্থ রেলে ভ্রমন করতে বারণ করেন। কেননা এগুলি বিদ্যুৎচালিত এবং ধাক্কা দিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট করার সম্ভাবনা বেশী, বাসে চলা অধিক নিরাপদ এবং পায়ে হেটে চলা আরো নিরাপদ। কারন এতে স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের পক্ষে চোখ রাখা সহজ। তারা বলেন যে, যদিও সময় আমার উপর তাদের নজর থাকবে তবু যে কোনো বিপদে একটি বিশেষ টেলিফোন নাম্বারে যেন যোগাযোগ করি। সবশেষে তারা বলেন যে, এইসব নিরাপত্তার ব্যবস্থা গ্রহন করা হচ্ছে তা বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সমর্থন হিসেবে নয়। তারা চান যে, যুক্তরাজ্যের মাটিতে এমন কিছু না ঘটুক যাতে যুক্তরাজ্য সরকারের সম্মান ক্ষুন্ন হয়। এই ঘটনার কিছু পরে বৃটেনে বসবাসরত বাঙালিরা কাভেন্ট্রিতে একটি সভার আয়োজন করে। প্রকৃতপক্ষে এই অনুষ্ঠানে যাবার আমার খুব একটা উৎসাহ ছিলো না। কারণ, অন্তর্দ্বন্দ্ব ও কলহ এতো বেশী হত যে আমি খুবই বিমর্ষ বোধ করতাম। এছাড়া আমি অনুভব করেছিলাম যে আমার কোনো আনুষ্ঠানিক ক্ষমতাও ছিলো না। কিন্তু ঠিক সেই মুহুর্তেই জনাব রকিবউদ্দিন আমাকে মুজিবনগর সরকারের নিয়োগপত্রটি দেন এবং আমি কাভেনট্রিতে উপস্থিত হই। সভায় তুমুল হট্টগোল চলছিলো। আমরা বেগম লুলু বিলকিস বানুকে অনুষ্ঠানের সভাপতি করে কাজ শুরু করি। তিনি অত্যন্ত যোগ্যতার সাথে এই সভা পরিচালনা করেন। এই অনুষ্ঠান চলাকালে জনাব রকিব আমার নিয়োগপত্রটি পড়ে শোনান। কিন্তু আঞ্চলিক নেতৃত্ব নিয়ে কোন্দল থাকায় আমি মর্মাহত অবস্থায় হল ত্যাগ করতে উদ্যত হই। এ সময় জনাব মিনহাজ উদ্দিন নামে একজন উঠে দাঁড়িয়ে বলেন যে বহু কলহ হয়েছে, এই কলহে আমাদের অনেক ক্ষতিও হয়েছে। আমরা আর কলহ চাই না। আপনি যাবেন না। এরপর আরো আধঘন্টা ধরে আলাপ আলোচনা হয়। এবং গউস খান প্রস্তাব করেন যে, পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট একটি ষ্টিয়ারিং কমিটি গঠন করা হোক। এর নামকরণ করা হয় ‘ষ্টিয়ারিং কমিটি অব পিপলস রিপাবলিক অব বাংলাদেশ’। আমি সভাপতির পদ গ্রহন করতে দ্বিধাবোধ করি। কারন আমার ভয় ছিলো এই সংগঠন আবার ভেঙ্গে যাবে। দ্বিতীয়তঃ আমি ভাবছিলাম, আমার মূল দ্বায়িত্ব হচ্ছে বিশ্ব জনমত গঠন করা এবং শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্ত করার ব্যাপারে পাকিস্তান সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করা। যাহোক শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হয় যে, ষ্টিয়ারিং কমিটি তার কর্মকান্ড চালাবে আমার উপদেশ মতো।
১১ নম্বর গোরিং ষ্ট্রীটে এই কমিটির জন্য অফিস নেওয়া হয়। অফিস ঘরটি ছিলো জনাব হারুনুর রশীদের। তার পাটের ব্যবসা ছিলো। কমিটির সদস্যদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন শেখ আব্দুল মান্নান, শামসুর রহমান, মিঃ কবীর চৌধুরী। আর মিঃ আজিজুল হক ভুইয়া ছিলেন আহবায়ক। এই সংগঠনের মূল লক্ষ্য নির্ধারিত হয় স্বাধীনতা আন্দোলনের পক্ষে জনমত গঠন করা এবং অস্র সরবরাহ ও সাংগঠনিক কাজের জন্য মূলতঃ বাঙালিদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ। পরে যখন দেখা গেল অস্র সরবরাহে নানা বাঁধা তখন আর অর্থ সংগ্রহের জন্য তেমন প্রচারণা চালানো হয়নি।মুজিবনগর সরকারের পরামর্শ অনুযায়ী অর্থ সংগ্রহের জন্য একটি বোর্ড অব ট্রাষ্টি গঠন করা হয়। এই বোর্ডের সদস্য ছিলেন মিঃ ডোনাল্ড চেসওয়ার্থ, প্রাক্তন মন্ত্রী মিঃ ষ্টোন হাউস এবং আমি। এ কমিটিতে কয়েকজন বাঙালির সদস্য হবার কথা ছিলো। কিন্তু কোন কোন বাঙালি নিয়ে ফান্ড হবে তা ঠিক করতে না পারায় আপাতত এই তিনজনকে নিয়ে বোর্ড গঠিত হয়। পরে আরো নেবার কথা ছিলো। কিন্তু ইতিমধ্যে দেশ স্বাধীন হওয়ায় সংগৃহিত অর্থ বাংলাদেশ সরকারের নিকট হস্তান্তর করা হয় এবং বোর্ডের বিলুপ্তি ঘোষনা করা হয়।পাকিস্তানি দূতাবাস এই অর্থ সংগ্রহ অভিযানের বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রচার চালাতে থাকে এবং বহুলাংশে সফল হয়। কোনো ব্যাংকই একাউন্ট খুলতে দিতে রাজী হচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত হ্যামব্রোজ ব্যাংক রাজী হয় এবং সেখানে একাউন্ট খোলা হয়।কিন্তু পাকিস্তান হাই কমিশন চাপ প্রয়োগ অব্যাহত রাখে যার ফলে হঠাৎ করে একদিন হ্যামব্রোজ ব্যাংক আমাদের জানায় তারা এই একাউন্ট চালাতে দেবে না এবং আমাদের সমুদয় অর্থ উঠিয়ে নিতে হবে। বাংলাদেশ বলে কোনো দেশ নেই। অথচ ফান্ডের নাম বাংলাদেশ ফান্ড। এই ঘটনাটি ঘটে জুন মাসে। তখন আমাদের একাউন্টে এক লক্ষ পাউন্ড সংগৃহিত হয়েছিলো। ব্যাঙ্কের এই সিদ্ধান্তে আমরা অত্যন্ত বিপদগ্রস্ত হই এবং বিচলিত হয়ে পড়ি। কিন্তু আমাদের সাহায্যে এগিয়ে আসেন জন ষ্টোন হাউস(এমপি) এবং তিনি ন্যাশনাল ওয়েষ্ট মিনিষ্টার ব্যাংকে একাউন্ট খোলার ব্যবস্থা করে দেন। প্রসংগত উল্লেখ্য যে, এই ব্যাংক পূর্বে আমাদের একাউন্ট খুলতে দিতে রাজী হয়নি। অর্থ সংগ্রহের ব্যাপারে এমন ব্যবস্থা করা হয় যাতে করে সরাসরি ব্যাংকে টাকা জমা দেওয়া যায়। ইংল্যান্ডের যে কোনো প্রান্ত থেকে যে কোনো ব্যক্তি সরাসরি ব্যাংকে টাকা জমা দিতে পারেন। অর্থ সংগ্রহ এবং আন্দোলন পরিচালনার জন্য নানা প্রান্তে একশটি কমিটি গঠন করা হয়। প্রথম থেকেই আমি রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে যোগাযোগ রক্ষা করতে থাকি এবং কনসারভেটিভ পার্টির প্রফেসর জিনকিন’স এর সাথে যোগাযোগ করি। তিনি একজন প্রাক্তন আই, সি, এসঅফিসার ছিলেন। কনসারভেটিভ পার্টির অফিসে একটি সভার আয়োজন করি এবং তাদের কাছে আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের কারন তুলে ধরি।
লেবার পার্টির সদস্যদের সাথেও আমার যোগাযোগ হয়। তারা আমাদের এই আন্দোলনের প্রতি অত্যন্ত সহানুভুতিশীল ছিলেন। তারা একটি সভার ব্যবস্থা করেন। এ সভা পার্লামেন্ট ভবনেই অনুষ্ঠিত হয়। আমার কাছে মনে হয়েছে এটি ছিলো আমাদের আন্দোলনের প্রতি এক ধরনের শ্রদ্ধা এবং স্বীকৃতির ইঙ্গিত। মে মাসে এই সভা অনুষ্ঠিত হয়।আমার আনুষ্ঠানিক কর্মের অংশ হিসেবে মে মাসে নিউইয়র্ক যাই। ওখানকার বাঙালি কুটনীতিক জনাব মাহমুদ আলীর নেতৃত্বে প্রায় দুশো বাঙালি আমার সাথে বিমানবন্দরে মিলিত হয়। এই দৃশ্য অত্যন্ত আবেগপ্রবণ ছিলো। কারন এতে করে আমাদের আন্দোলনের প্রতি ব্যাপক সমর্থনের লক্ষণ দেখা যায়। যেদিন আমি নিউইয়র্কে পৌঁছি আরো কয়েকজন বাঙালি উচ্চপদস্থ সরকারী কর্মচারী যথা- জনাব এ, এম, এ মুহিত, জনাব খোরশেদ আলম, জনাব হারুন রশীদ এবং আরো অনেকে আমার সাথে দেখা করেন। এবং আমি তাদের সাথে মিলিত হই এবং প্রকৃত অবস্থা তাদের সামনে তুলে ধরি। একটি বিশেষ সাক্ষাৎকারের কথা আমি এখানে উল্লেখ করতে চাই। সৌদি আরবের রাষ্ট্রদূত জনাব বারুদী যিনি খৃষ্টান ছিলেন, রোকেয়া হলের ঘটনা শুনে তিনি এতো বেশী আলোড়িত ছিলেন যে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। তিনি বলেন যে, তিনি সৌদী বাদশাহকে সমস্ত কথা জানাবেন এবং সর্বতোভাবে হত্যাযজ্ঞ বন্ধ করার প্রচেষ্টা চালাবেন।জাতিসংঘের বিভিন্ন কুটনৈতিক সদস্যের সঙ্গেও দেখা করি এবং বক্তব্য রাখি। জাতিসংঘের তৎকালীন অধিবেশনের সভাপতি নরওয়ের প্রতিনিধি ছিলেন। তার সাথেও আমার সাক্ষাৎ হয়। আমরা প্রচারপত্র বিলি করি এবং বিভিন্ন সাংবাদিকদের সাথে মিলিত হই।
&nbsp;
জাতিসংঘের মহাসচিব উথান্টের সাথে দেখা করার চেষ্টা করি। তিনি আমাদের জানান যে তার সাথে সরাসরি দেখা করা আমাদের বিপক্ষে যাবে। কেননা তিনি নীরবে আমাদের জন্য কাজ করে যেতে চান। দেখা না করলে পাকিস্তানে চাপ প্রয়োগের সুযোগ অনেক বেশী থাকবে। তিনি আরো বলেন যে, এ সিদ্ধান্ত আমাদের কল্যাণের জন্য এবং আমাদের বক্তব্য শোনার জন্য তিনি জাতিসংঘের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে পাঠান।আমি যখন ইংল্যান্ডের বাইরে যেতাম তখন শেখ মান্নানকে দ্বায়িত্ব বুঝিয়ে দিতাম। কারন তিনি ইংল্যান্ডে থেকেই অক্লান্ত পরিশ্রম করতেন। তিনি অত্যন্ত যোগ্যতার সঙ্গে তার দ্বায়িত্ব পালন করেছেন। বৃটেনের বিভিন্ন জায়গায় আমরা সভা করি এবং আন্দোলন আরো তীব্র আকার ধারন করে।এরই মাঝে ফ্রান্সের সাথে আমরা যোগাযোগ করি এপ্রিলের শেষের দিকে। আমি সেখান গিয়ে বিভিন্ন স্তরের মানুষের সঙ্গে বাংলাদেশের অবস্থা বর্ণনা করি। সেখানে থাকতে একজনের সাথে আমার গুরত্বপূর্ণ যোগাযোগ হয়, তিনি হচ্ছেন মরিসাসের প্রধানমন্ত্রী জনাব সিউ সাগর রামগোলাম। তাকে আমি বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিতে অনুরোধ জানাই। বিভিন্ন অবস্থার কারনে তার পক্ষে এটা সম্ভব হয়নি কিন্তু অন্য সব ধরনের সাহায়্য তিনি আমাদের করেন। আমি প্যারিসে তার সাথে একদিন আমাদের আন্দোলন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করি। তিনি তার দেশের লন্ডনস্থ দূতাবাসকে আমাদের সব ধরনের সাহায্য করার জন্য নির্দেশ দেন। এ ছাড়া আমরা কিছু বাঙালি ছাত্রকে জনমত গঠনের উদ্দেশ্যে ফ্রান্সে পাঠাই। আন্তর্জাতিক পার্লামেন্টারী ইউনিয়নের সভায়ও আমরা প্রতিনিধি প্রেরণ করি।বৃটেনে অবস্থিত “সোস্যালিষ্ট ইন্টারন্যাশনালের” সাধারণ সম্পাদক হ্যান্স ইয়ানিতশেক আমাদেরকে সর্বতোভাবে সহযোগীতা করেন। তিনি বলেন আমার অফিস তোমাদেরই অফিস, তোমরা এটা সম্পূর্ণভাবে ব্যবহার করতে পারো। এখানে বলা উচিত যে, কিছুদিন আমরা এই প্রস্তাবের সদ্ব্যবহার করি।লন্ডনে জার্মানীর প্রাক্ত চ্যান্সেলর উইলি ব্রান্টের সাথে আমি সাক্ষাৎ করি এবং তাকে জানাই যে স্বাধীনতা ছাড়া আমাদের পক্ষে অন্য কোনো পথ সম্ভব নয়। তিনিও আমাদের সাহায্যর প্রতিশ্রুতি দেন। এখানে বলা যায় যে, যেখানেই গিয়েছি সেখানেই আমরা অত্যন্ত সহানুভুশীল অভ্যর্থনা এবং সাহায্যর আশ্বাস পেয়েছি। এর একটি কারণ হচ্ছে যে, বৃটেনের প্রেস আমাদের খবর এমনভাবে প্রকাশ করে যাচ্ছিল যে, জনমত আমাদের পক্ষেই দাঁড়িয়েছিলো। জুন-জুলাইয়ের দিকে একটি গুঞ্জন ওঠে যে, আমাদের ইসরাইলের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে। আমি অনুসন্ধান করে দেখি যে এ সংবাদ একেবারে ভিত্তিহীন। সংবাদপত্রের মাধ্যমে আমরা এর তীব্র প্রতিবাদ জানাই। জুলাই মাসে বৃটেনে অবস্থিত বাঙালিদের আন্দোলন যথেষ্ট শক্তিশালী এবং জোরদার হয়ে ওঠে। আগষ্ট মাসের প্রথম তারিখে আমরা ট্রাফলগার্ড স্কোয়ারে একটি বিরাট জনসভা করি। এটি ছিল লন্ডনে অনুষ্ঠিত আমার জানামতে সাম্প্রতিক কালের সর্ববৃহৎ জনসমাবেশ। প্রায় চল্লিশ হাজার লোক এই সমাবেশে উপস্থিত হন। এলাকার চারিদিকে সমস্ত বাড়ীঘরের ছাদে লোকজন ভর্তি হয়ে যায়। এই সভাতে বাংলাদেশ দূতাবাসের মহিউদ্দিন বাংলাদেশের প্রতি তার আনুগত্যের কথা ঘোষনা করেন।
&nbsp;
আগষ্ট মাসের শেষের দিকে মুজিবনগর সরকারের সম্মতি নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের মিশন চালু হয়। ২৪ নম্বর প্রেমরিজ গার্ডেনে মিশনের অফিস খোলা হয় এবং এই ভবনটি ব্যবস্থা করেন ডোনাল্ড চেসওয়ার্থ। আগষ্টের শেষে পুরোদমে এই মিশনের কাজ শুরু হয়। এই সময় ডঃ মোশারফ হোসেন জোয়ার্দারের মাধ্যমে প্রখ্যাত ব্যবসায়ী জহরুল ইসলামের সাথে যোগাযোগ হয়। তিনি অসুস্থতার অজুহাত দেখিয়ে পাকিস্তান থেকে পালিয়ে আসেন। তিনি সুবেদ আলী নাম নিয়ে এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। এবং বৃটেনে এই ২৪নং প্রেমরিজ গার্ডেনে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনের সমস্ত খরচ বহন করতেন। মিশন হওয়ার পর আমি এর প্রধান হিসেবে যোগদান করি। বহির্বিশ্বে এটাই বাংলাদেশের প্রথম দূতাবাস।আমার বিদেশ ভ্রমণ সম্বন্ধে কিছু উল্লেখ করা যেতে পারে। আমার দ্বায়িত্ব ছিলো আন্তর্জাতিক জনমত গঠন করা। ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশে আন্দোলন বেশ শক্তিশালী আকার ধারণ করে।নেদারল্যান্ডেও একটি শক্তিশালী সংগঠন ছিলো। এই সংগঠনের নেতৃত্বে ছিলেন জনাব জহির উদ্দিন এবং আমীর আলী। জুন মাসের দিকে ঠিক হয় যে, আমি এ্যামষ্টেডামে যাবো। একদিন পূর্বেই হঠাৎ করে আমার বাসায় এ্যামষ্টেডামের টেলিভিশনের একটি দল উপস্থিত হয় এবং আমার সাক্ষাৎকার গ্রহণ করে। এতে আমাদের আন্দোলন ব্যাপক প্রচার লাভ করে। বলা যেতে পারে অন্য দেশ থেকে এসে সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা আমাদের আন্দোলনকে এক ধরনের স্বীকৃতি প্রদানের শামিল।ডাচ পার্লামেন্ট ভবনে বৈদেশিক বিষয়ক উপ পরিষদে তিন ঘন্টা আলোচনা করি। যাদের সঙ্গে আলোচনা হয় তারা ছিলেন মিঃ টারবিক, জ্যাঁ প্রাংক, মোমেসত্যাগ, স্বাধীকার, ভ্যান উস্তেন। তারা প্রায় সবাই বুঝতে পারেন কেন আমরা স্বাধীনতা দাবী করেছি। তারা মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি গভীর সহানুভুতি প্রকাশ করেন এবং আমাদের বিজয় কামনা করেন। পার্লামেন্টে আমাদের প্রতি সমর্থন প্রকাশ করে প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। আমাদের প্রেস কনফারেন্সটি অত্যন্ত সফল হয়েছিলো। ডাচ সরকার আমাদের পক্ষে একটি বিবৃতি দান করেন এবং সরাসরিভাবে পাকিস্তান সরকারের কাছে প্রতিবাদলিপি পাঠান। ডেনমার্কেও আমাদের সফর অত্যন্ত ফলপ্রসূ হয়েছিল। আগষ্ট মাসের দিকে আমরা সেখানে যাই। ডেনিশ পার্লামেন্টের স্পীকারের সাথে সাক্ষাৎ করি এবং আমাদের বক্তব্য পেশ করি। তিনি আমাদের সব ধরনের সাহায্যের আশ্বাস প্রদান করেন। এখানে এক ভদ্রমহিলার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয়, তার নাম কিনটেন ওয়াট বার্গে। তার গৃহ আমাদের আন্দোলনের কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়। তিনি বাসায় একটি সম্বর্ধনার আয়োজন করেন। সেখানে অনেক বাঙালিও উপস্থিত হন। ওই ভদ্রমহিলাকে কেন্দ্র করে কমিটি গঠন করা হয়। আমরা সেখানেও ব্যাপক প্রচারকার্যে সফল হই। ডাচ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস, এ, ডামের সঙ্গেও দেখা করি। আরেকজন যিনি আমাদের ব্যাপকভাবে সাহায্য করেন তিনি ছিলেন ‘পলিটিকেন’ পত্রিকার সম্পাদক জন ডেনষ্ট্যাম্প। তিনি শুধু আমাদের পক্ষে পত্রিকাতেই লিখেননি, বরং সাথে সাথে তার ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রচারের ব্যবস্থাও করেন। ডেনিশ টিভি সাক্ষাৎকারের সময় আমাদের আন্দোলনের পক্ষে একটি হৃদয়স্পর্শী ঘটনা ঘটে। যিনি আমার সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছিলেন, তিনি সাক্ষাৎকার শুরু হবার পূর্বেই আমাকে জানান যে, তিনি খবর পেয়েছেন একটি ডেনিশ কোম্পানী পাকিস্তান সরকারের কাছে অস্র বিক্রয় করতে যাচ্ছে। তিনি বলেন যে, আমাকে এমনভাবে প্রশ্ন করা হবে যাতে আমি এই বিষয়টি উত্থাপন করতে পারি। সাক্ষাৎকার শুরু হবার সাথে সাথে আমি তথ্যটি জানাতে সক্ষম হই এবং সমস্ত বিষয়টির প্রতিবাদ ও ডেনমার্ক সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করি। তারা আমাকে আশ্বাস দেন যে এই অস্ত্র কিছুতেই পাঠাতে দেয়া হবে না। এই ঘটনাটি থেকে বোঝা যায় যে, আমাদের আন্দোলনের প্রতি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সাধারণ মানুষের কি ধরনের সমর্থন ছিল। এছাড়া আমি বিরোধী দলের নেতা পল হার্টলিংকের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করি।
নরওয়েতে দশ বারো জনের বেশী বাঙালি ছিলো না কিন্তু আন্দোলন ছিলো ব্যাপক। এর কারণ, নরওয়ের সবচেয়ে প্রভাবশালী ছাত্রনেতা মিঃ বুল আমাদের আন্দোলনের পক্ষে ছিলেন। তিনি আমাদের জন্য জনমতের জোয়ার সৃষ্টি করেন। তাদের প্রচেষ্টায় জাতীয় টেলিভিশনে আমার বক্তৃতা প্রচার করা হয়। এক সন্ধ্যায় আমি ছাত্র পরিষদের কার্যকরী কমিটির উদ্দেশে ভাষণ দেই। অসলো বিশ্ববিদ্যালয়েও আমি বহু ছাত্র সমাবেশে একটি ভাষণ দেউ। আমি লক্ষ্য করি নরওয়ের ছাত্ররা আমাদের আন্দোলনকে তাদের নিজেদের আন্দোলন বলে মনে করে। একজন ছাত্র(শিল্পি) ইয়াহিয়া খানের একটি ছবি আঁকেন। তাকে একজন হত্যাকারী হিসেবে চিত্রিত করে। কয়েকজন পাকিস্তানী ছবিটি ছিঁড়ে ফেলে ফলে পাকিস্তানীদের প্রতি তাদের মনোভাব আরো বিরূপ হয়ে ওঠে।অসলোর মেয়র আমাকে অত্যন্ত সম্মানের সাথে অভ্যর্থনা জানান এবং একটি গ্রন্থে আমাকে সরাসরিভাবে বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে উল্লেখ করেন।আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং আইন বিষয়ের প্রধানের সাথে একটি কমিটি গঠনের ব্যাপারে আলোচনা করি।নরওয়ের প্রধান বিচারপতি পিয়ের ওল্ড আমাকে আমন্ত্রণ জানান। সেখানে অন্যান্য বিচারপতিরাও ছিলেন। তিনি আমার পুরানো বন্ধু। এছাড়া আমি রোটারি ক্লাবে বক্তব্য রাখি। সাধারণত এই ফোরামে কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য রাখতে দেয়া হয় না। কিন্তু আমার বেলায় ব্যতিক্রম হয়। আমি সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে আমাদের সমস্ত বক্তব্য পেশ করি এবং উপস্থিত সুধীমন্ডলীর কাছ থেকে প্রচুর সাড়া পাই। সম্ভবতঃ নরওয়ে রোটারি ক্লাবে এই ধরনের ব্যতিক্রমী ঘটনা ঘটেনি।সুইডেনে জনাব রাজ্জাক যিনি পূর্ব পাকিস্তান পররাষ্ট্র বিভাগে কর্মরত ছিলেন আন্দোলন গড়ে তুলতে সক্ষম হন। তিনি আমার সাথে এয়ারপোর্টে দেখা করেন এবং বলেন যে, বিশ্বখ্যাত অর্থনীতিহিদ গুনার মিরডালের সাথে সাক্ষাতের ব্যবস্থা হয়েছে। তার সঙ্গে দেখা করে আমি খুবই আনন্দিত হই। তিনি আমাদের আন্দোলনের প্রতি তার পূর্ণ সমর্থনের কথা জানান। শুধু তাই নয়, তিনি বাংলাদেশ এ্যাকশান কমিটির সুইডেন শাখারও প্রধান হিসেবে কাজ করতে রাজী হন এবং তার অফিস সেই দিন থেকে এ্যাকশান কমিটি অফিসে পরিণত হয়। তার বুকে স্বাধীন বাংলাদেশের ব্যাজ পরিয়ে দেই। এ সময় তার মাধ্যমেই বিভিন্ন পত্রপত্রিকা সম্পাদকদের সাথে আমার যোগাযোগ হয় এবং তারা আমাদের সব ধরনের সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দেন। তৎকালীন ক্ষমতাসীন পার্টির সাধারণ সম্পাদকের সাথেও আমার দেখা হয়। তিনি আমাকে বলেন যে, মৌখিক সমর্থন যথেষ্ট নয়, তারা এর চেয়ে বেশী করতে প্রস্তুত। তিনি বলেন যে, সরাসরিভাবে তারা মুক্তিবাহিনীকে অস্র দিয়ে সাহায্য করবেন। যা হোক যদিও এর পরপরই দেশ স্বাধীন হয়ে যাবার জন্য অস্রের আর প্রয়োজন হয়নি তবুও তাদের সদিচ্ছার তুলনা বিরল।
&nbsp;
আমি যখন হেলসিংকি বিমানবন্দরে অবতরণ করি আমাকে প্রথমে অভ্যর্থনা করেন সেখানকার বৃটিশ কনসাল জেনারেল মিঃ রয় ফক্স। আমি খুবই আশ্চর্য হই এবং তাকে আমার সফরের উদ্দেশ্য জানাই। একজন বিদেশি কুটনীতিক হিসেবে আমার সঙ্গে মেলামেশায় বিপদের সম্ভাবনার কথা তাকে জানাই। ফক্স আমাকে বলেন, আমি তার ব্যক্তিগত বন্ধ এবং বৃটিশ পররাষ্ট্র দপ্তরের কোনো অধিকার নাই তার ব্যক্তিগত বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার। তিনি আমাকে তার বাসায় নিয়ে যান এবং তার অতিথি হবার জন্য আমন্ত্রণ জানান। যা হোক বহু কষ্টে তাকে বুঝিয়ে আমি সন্ধ্যা বেলায় তার বাসা থেকে হোটেলে উঠে আসি। টিভিতে আমার সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হয়। এছাড়া আমি পার্লামেন্ট ভবনে গিয়ে সংসদ সদস্যদের সাথে দেখা করি এবং আমার বক্তব্য প্রচার করি।বিশ্ব শান্তি পরিষদের সদর দফতর এখানে অবস্থিত এবং এর সাধারণ সম্পাদক রুমেশ চন্দ্রের সাথে আমার সাক্ষাৎ হয়। তিনি জানান যে তার সংগঠন বাংলাদেশের পক্ষে সর্বাত্মক কাজ করে যাচ্ছে। এরপর আমি লন্ডনে ফিরে আসি।প্রবাসে আন্দোলনের ঘটনা বর্ননা করতে গিয়ে আমি একটি বিশেষ ঘটনার কথা উল্লেখ্য করতে চাই। সেপ্টেম্বর মাসের কোন একদিন লন্ডনে এ্যানথনি মাসকারেনহাস রচিত “রেইপ অব বাংলাদেশ” বইটির প্রকাশনা উৎসবে আমি উপস্থিত হই। তার পরদিন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর লন্ডনে উপস্থিত হবার কথা। এই সভায় একজন ভারতীয় সাংবাদিক আমাকে জিজ্ঞেস করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আমি সাক্ষাৎ করবো কিনা! আমি তাকে জানাই যে, আমি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎকারের জন্য কোনো সময় চাইনি।(বিচারপতি চৌধুরী তাঁর সাক্ষাৎকারের এই অংশটি নিজেই ইংরেজিতে যেভাবে লিখে দিয়েছেন, ঠিক সেভাবেই মুদ্রিত হলো)
&nbsp;
“The Deputy High Commissioner of India in London rang up in the morning and told me that the Indian Prime Minister Mrs. Indira Gandhi would meet the British Prime Minister Mr. Edward Heath in the afternoon at his official residence at Chequers. She would therefore like to have a meeting with me before that. She wanted to know the attitude of the countries I visited recently. In response to the request, I arrived at Claridges Hotel at 11. A. M. It so happened that the officer of the Scotland Yard who met me at Claridges saw me more than once about my security. I was at once taken by the Dy. High commissioner to the drawing room of Mrs. Gandhi’s suite. Mrs. Gandhi came in a minute’s time. This was first meeting with her (I met her second time at Dhaka after independence). After she exchanged the greetings, she asked me about the reaction in the countries I visited recently about the demand for independence of Bangladesh. To that I told her that I received assurances of support from the people and the Govt. of these countries for our independence movement but to my request for recognition by the governments of those countries the uniform answer was that even the neighboring country of India did not recognize our govt. That would show that even India does not consider that our government was really an effective government. I told her that was a disappointing situation. Then I also said that although we felt very grateful to the people of India for giving shelter to those who had left Bangladesh, we really expected recognition of that government. I said I really did not know if pundit Jawaharlal Nehru could have remained satisfied by giving shelter only to the people who went over to India Mrs. Gandhi said that although she did not give formal recognition she was giving all facilities to the provisional government to function formal announcement would create certain situation. Pakistan would never take it quietly. She said they would attack India. It is true that Pakistan would ultimately be defeated but we have developed infrastructure of industries throughout the country. By initial air bombing they might be able to destroy all our ears of struggle in this field. Therefore although we have decided to help Bangladesh on humanitarian ground, my primary responsibilities is to the people of India as their Prime Minister has also to be borne in mind. I have therefore tried to do both and give recognition to Bangladesh at an appropriate time. I told her of course that we have nothing to offer except friendship on the basis of sovereign equality.Referring to friendship of Bangladesh with India she said that it should be left to the people of Bangladesh to decide after the independence. As far as she was concerned her only expectation was that a democracy would be functioning in a neighboring country.”
(অনুবাদ)
সকালে ইন্ডিয়ান ডেপুটি হাই কমিশনার (লন্ডন) ফোন করে আমার ঘুম ভাঙিয়ে বললেন যে ইন্ডিয়ার প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মিস্টার এডওয়ার্ড হিথের সাথে আজ বিকেলে চেকারসে তার নিজ অফিসে দেখা করবেন। সে কারণে তিনি (ইন্দিরা গান্ধি) আমার সাথে ঐ মিটিঙের পূর্বে দেখা করতে চান। আমি সম্প্রতি যে সকল দেশ ভ্রমণ করেছি সে সকল দেশের মনোভাব তিনি জানতে আগ্রহী। এই অনুরোধের পড়িপ্রেক্ষিতে আমি সকাল ১১টা সময় ক্লারিজেস হোটেলে উপস্থিত হই। স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের যে অফিসার আমার সাথে ক্ল্যারিজেসে দেখা করেছিলেন, তিনি একাধিকবার আমার নিরাপত্তার ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে নিয়েছিলেন। ডেপুটি হাই কমিশনার আমাকে শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর স্যুইটের ড্রইং রুমে নিয়ে যান। কয়েক মিনিট পর শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী এসে উপস্থিত হন। এটা ছিল তাঁর সাথে আমার প্রথম সাক্ষাৎ (স্বাধীনের পর ঢাকাতে উনার সাথে আমার ২য় বার সাক্ষাৎ হয়)। শুভেচ্ছা বিনিময়ের পর তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ব্যাপারে সম্প্রতি আমি যে দেশগুলো ভ্রমণ করেছি সেগুলোর মনোভাব জানতে চাইলেন। এই প্রসঙ্গে আমি তাকে বলেছিলাম, ঐ সকল দেশের মানুষ এবং জনগণের কাছ থেকে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতি সমর্থনের নিশ্চয়তা পেয়েছি। কিন্তু বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার অনুরোধের জবাবে তাঁদের সকলের জবাব ছিল একটাই যে, আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র ইন্ডিয়া এখনো আমাদের সরকারকে স্বীকৃতি দেয় নি। এটা প্রতীয়মান করছে যে এমনকি ইন্ডিয়াও আমাদের সরকারকে কার্যকর হিসেবে গণ্য করছে না। আমি তাকে জানিয়েছিলাম যে সেটা একটা হতাশাজনক পরিস্থিতি তৈরি করেছে। তারপর আমি তাকে বলেছিলাম যদিও বাংলাদেশ ছেড়ে যাওয়া মানুষদের আশ্রয়দানের জন্য ইন্ডিয়ার মানুষের কাছে আমরা কৃতজ্ঞ, তথাপি আমরা সত্যিকার অর্থেই ইন্ডিয়ান সরকারে স্বীকৃতি আশা করেছিলাম। আমি বলেছিলাম, “আমি ঠিক জানি না এমন পরিস্থিতিতে পণ্ডিত জহরলাল নেহরু শুধু বাস্তুহারা মানুষকে আশ্রয় প্রদান করলেই সন্তুষ্ট থাকতে পারতেন কিনা।“ শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী বলেছিলেন যে, যদিও তিনি আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেন নি তথাপি তিনি অস্থায়ী সরকারকে সবরকম সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছেন। আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি কিছু সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে। পাকিস্তান ব্যাপারটাকে শান্তভাবে নেবে না। তিনি বলেন, ওরা ইন্ডিয়াকে আক্রমণ করবে। এটা সত্য যে শেষ পর্যন্ত পাকিস্তান পরাজিত হবে, কিন্তু আমরা দেশ জুড়ে শিল্পানুকূল অবকাঠামো তৈরি করেছি। প্রাথমিক বিমান হামলায় ওরা এই খাতে আমাদের বহু বছরের সাধনা ধ্বংস করে দিতে পারে। যদিও আমরা মানবিক কারণে বাংলাদেশকে সাহায্য করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি, কিন্তু প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমার মূল দায়বদ্ধতা ইন্ডিয়ার মানুষের প্রতি, এই ব্যাপারটাও মাথায় রাখতে হবে। এ কারণে আমি দুটোই একসাথে করার চেষ্টা করছি এবং উপযুক্ত সময়ে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেব।
&nbsp;
আমি উনাকে বলতে ভুলি নাই যে সার্বভৌম সমতার ভিত্তিতে বন্ধুত্ব ছাড়া উনাকে দেওয়ার মত আমাদের আর কিছুই নেই।
&nbsp;
বাংলাদেশ এবং ভারতের বন্ধুত্বের প্রসঙ্গে উনি বলেছিলেন, এটি স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের মানুষের সিদ্ধান্তের উপর ছেড়ে দেওয়া উচিৎ। উনি শুধু আশা করছিলেন যে প্রতিবেশী রাষ্ট্রে গণতন্ত্রের চর্চা হোক।
&nbsp;
এরপর আমি অস্ত্র পাঠানোর জন্য আমাদের অর্থ সংগ্রহের ব্যাপারে কথা উঠাই। আমি বলি যে, আমরা টাকা সংগ্রহ করলেও অস্র কিনতে পারছি না। ভারত যদি কিনে পাঠাবার ব্যবস্থা করতে পারে তবে আমরা টাকাটা তাদের হাতে দিতে পারি। মিসেস গান্ধী তখন আমাকে জিজ্ঞেস করেন, আমরা কত টাকা সংগ্রহ করেছি। আমি উত্তর দেই প্রায় চার লক্ষ পাউন্ড। তিনি বলেন যে, একটি মুক্তিযুদ্ধে যে পরিমান অস্রের দরকার সে পরিমান অস্র এই টাকায় কেনা সম্ভব না। এছাড়া অনির্ধারিতভাবে অস্র পৌঁছালে তা বিরোধী শক্তির হাতেও পড়তে পারে। মুজিবনগর সরকারের সাথে তিনি যোগাযোগ করছেন এবং তাদের মাধ্যমে অস্র বিতরন করছেন। বিচ্ছিন্নভাবে অস্ত্র পৌঁছালে আইনগত সমস্যাও দেখা দিতে পারে। তিনি আমাকে বলেন যে, এই বৈদেশিক মুদ্রা পরবর্তীকালে একটি স্বাধীন দেশের জন্য খুবই প্রয়োজনে আসবে। আমি তাকে জানাই যে, বৃটিশ পররাষ্ট্র দপ্তর আমাকে বলেছে, একজন বিচারক হিসেবে নিশ্চয়ই অস্র পাঠাবার সাথে জড়িত হবো না এই তারা পাকিস্তান সরকারকে দিয়েছেন। এটি এক ধরনের চাপ। অতএব কোনকিছু করতে হলে ভারতীয় দূতাবাসের মাধ্যমেই করতে হবে। আমার এই কথা শুনে মিসেস গান্ধী উঠে পাশের কক্ষে যান এবং পাশের কক্ষ থেকে ভারতীয় হাইকমিশনারকে নিয়ে আসেন। তিনি হাইকমিশনারকে বলেন যে, বিচারপতি চৌধুরী যা পাঠাতে চান, অস্ত্রই হোক বা অন্য কিছু হোক, তিনি যেন তৎক্ষনাৎ ব্যবস্থা করেন। এরপর তিনি বাংলাদেশ আন্দোলনের শুভকামনা করে আমাদের সাক্ষাৎকারের ইতি টানেন।
কয়েকদিন পরেই মুজিবনগর সরকারের তরফ থেকে টেলিগ্রাম আসে যে, আসন্ন জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতা হিসেবে আমাকে নিউইয়র্ক যেতে হবে। ষোলজন সদস্যের একটি দল নির্বাচিত হয়। এরা হলেন
(১) আব্দুস সামাদ আজাদ
(২) ফণিভূষন মজুমদার
(৩) এম, আর সিদ্দিকী
(৪) সৈয়দ আব্দুস সুলতান
(৫) ডঃ মফিজ চৌধুরী
(৬) প্রফেসর মোজাফফর আহমেদ
(৭) ফকির শাহবুদ্দীন
(৮) এ্যাডভোকেট সিরাজুল হক
(৯) ডঃ এ, আর, মল্লিক
(১০) খুররম খান পন্নী
(১১) এস, এ, করিম
(১২) আব্দুল মুহিত
(১৩) রেহমান সোবহান
(১৪) মাহমুদ আলী
(১৫) আবুল ফাতহ।আমরা বেলমন প্লাজা নামে একটি সাধারণ হোটেলে আমাদের অফিস স্থাপন করি এবং বিভিন্ন দেশের সদস্যদের সাথে বাংলাদেশের পক্ষে বক্তব্য প্রচার করতে থাকি। আমার বিশ্বাস প্রায় সবগুলো দেশের সদস্যদের সাথে যোগাযোগ করতে সক্ষম হই। এছাড়া আমরা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের প্রচার কাজ চালাতে থাকি। আমি হারভার্ড, এম, আই, টি, ইয়েল, কলম্বিয়া, নিউইয়র্ক সিটি এবং অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র শিক্ষকদের কাছে বক্তৃতা করি। শত শত শিক্ষক ও ছাত্রদের সমাবেশে বক্তৃতা করি। প্রতিটি শ্রোতা ছিলেন আমাদের পক্ষে। এসময় আমাকে সাহায্য করতেন কাজী রেজাউল হাসান। তিনি ইঞ্জিনিয়ার। তিনি অনেকগুলি ওয়াকিটকি পাঠান মুক্তিযুদ্ধকে সাহায্য করার জন্য। আমরা হারভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অতিথি হিসেবে বোষ্টনে ছিলাম। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের প্রধান ইথিয়েল ডি সোলাপুল একটি ভোজসভার আয়োজন করেন যেখানে প্রায় ২৫ জন অধ্যাপক উপস্থিত ছিলেন। এই অধ্যাপকগণ ছিলেন অত্যন্ত প্রভাবশালী যেহেতু আমেরিকান ষ্টেইট ডিপার্টমেন্টের পরামর্শদাতা হিসেবে সকলেই কার্যরত ছিলেন। তারা নিজেরাও আগ্রহী ছিলেন যেহেতু সরাসরিভাবে বাংলাদেশের অবস্থা জানার এটি একটি সুযোগ ছিল। হারভার্ড ল-স্কুলে আমি একটি বক্তৃতা দেই। আমি বলি যে, বাংলাদেশ স্বাধীন, কেবলমাত্র স্বীকৃতির অপেক্ষায় রয়েছে। এম, আই, টি অডিটোরিয়ামে আমি প্রায় দেড় ঘন্টা বক্তৃতা দেই এবং আমাদের পক্ষে তুমুল জনমতের লক্ষন দেখতে পাই। আমি বারবার বলি যে, আমি ব্যক্তিগতভাবে কোন রাজনৈতিক ব্যক্তি নই। কিন্তু আমার জন্মভূমির উপর যা ঘটেছে তারপর আমার পক্ষে চুপ করে থাকা সম্ভব নয়। একটি আত্মসম্মানবোধ সম্পন্ন জাতি হিসেবে স্বাধীনতা ঘোষনা ছাড়া আমাদের আর কোন উপায় ছিল না। আমার পক্ষে একটি বড় সুবিধা ছিল যে, আমি যখন বাংলাদেশের পক্ষে আমার আনুগত্য প্রকাশ করি তখন আমি ছিলাম একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। অতএব তারা আমাকে সেইভাবে সম্মান দেখায়।নিউইয়র্কে ফিরে এসে আবার লবিং-এ ব্যস্ত হই। এ সময় বাংলাদেশের সীমান্তে পাকিস্তানী বাহিনীর সাথে মিত্র বাহিনীর যুদ্ধ শুরু হয়। পাকিস্তান যুদ্ধ বিরতির জন্য প্রচার চালায়। আমরা বাধা দেই। আমরা বলি একটা নির্যাতিত জাতি যখন জয়লাভ করতে যাচ্ছে তখন বিরতি অসম্ভব। কিন্তু আজ যখন দেশ শত্রুমুক্ত হতে যাচ্ছে তখন যুদ্ধবিরতির প্রশ্ন উঠে কেনো? আমি নিউইয়র্কের জাতিসংঘের দফতরে রয়টার অফিসে বেশীরভাগ সময় থাকতাম। যেহেতু অবস্থা সম্পর্কিত শেষ খবর ওখানেই পাওয়া যেতো। এমন সময় ১৬ই ডিসেম্বর টেলেক্স দেখলাম, খবর এলো যে, নিয়াজী আত্মসমর্পন করেছে। ঢাকা মুক্ত। বাংলাদেশ স্বাধীন। এই খবর সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ল। আমি ধীর চিত্তে, শান্ত মনে এই সংবাদ গ্রহন করলাম এবং পরম করুনাময় আল্লাহর হাজার শুকরিয়া আদায় করলাম।-আবু সাঈদ চৌধুরীফেব্রুয়ারী, ১৯৮৪।
&nbsp;
<a href=”https://www.facebook.com/aminul.hoque.polash?fref=ts”>আমিনুল হক পলাশ</a>
&lt;১৫,৯,৫১-১১০&gt;<h1>[ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলাম]</h1>১৯৭০ সালের ৭ই ডিসেম্বর জাতীয় পরিষদের এবং ১৭ই ডিসেম্বর প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ উভয় পরিষদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। পৃথিবীর ইতিহাসে কোন একটি দলের পক্ষে এত বেশী আসন লাভ করার নজির ইতিপূর্বে আর দেখা যায়নি। নির্বাচনে বাংলার মানুষ আওয়ামলীগের ৬ দফার পক্ষে পূর্ণভাবে তাদের রায় ঘোষণা করেন।
নির্বাচনের পর ‘৭১ সালের ৩রা জানুয়ারী ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে এক বিশাল জনসমুদ্রে বঙ্গবন্ধু ঘোষনা করেন আওয়ামী লীগের কেউ বেঈমানী করলে জ্যান্ত কবর দেবেন। জনসভার প্রারম্ভে বঙ্গবন্ধু নবনির্বাচিত জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যদের শপথ গ্রহন করান। এই ধরনের গণশপথ পৃথিবীর ইতিহাসে ব্যতিক্রমী ঘটনা। এর কিছুদিন পর নির্বাচনপূর্ব প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী শাসনতন্ত্র রচনার জন্য আওয়ামী লীগ সংসদীয় দল একটি সাব কমিটি গঠন করে। দলের নির্দেশ অনুযায়ী সাব কমিটি শাসনতন্ত্র রচনার কাজ শুরু করে। ২৭শে জানুয়ারি পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে আলোচনার উদ্দেশ্যে এক বিরাট প্রতিনিধি দল নিয়ে ঢাকায় আসেন।
<em> </em>
নির্বাচনের পর পর ভুট্টো ৬ দফাভিত্তিক শাসনতন্ত্র রচনার বিরোধিতা শুরু করেন। আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় আসার জন্য আলোচনার দরজা বঙ্গবন্ধু খোলা রাখেন। ভুট্টো ও তার প্রতিনিধিদলের সাথে সর্বপ্রকার যোগাযোগ রক্ষার দায়িত্ব আওয়ামী লীগ সংসদীয় দলের হুইপ হিসেবে বঙ্গবন্ধু আমার ওপর অর্পণ করেন। ভুট্টো ও তার প্রতিনিধি দলকে যথেষ্ট সম্মান ও সৌজন্য দেখানো হয়। ভুট্টো বঙ্গবন্ধু এবং আওয়ামী লীগ নেতাদের সাথে কয়েক দফা বৈঠকে মিলিত হন। আমাদের দলের কয়েকজন নেতা এবং ভুট্টোর প্রতিনিধি সদস্যরা একদিন নৌপথে লঞ্চের মধ্যে এক বৈঠকে মিলিত হন।
ভুট্টোর কয়েকজন বিশিষ্ট সহকারীর সাথে আমার আলোচনা হয়। এদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় সহকারী ব্যারিষ্টার কামাল আফছার আমার সার্কিট হাউজ রোডের বাসভবনে আমার সাথে দেখা করেন। ভুট্টোর দলের নেতাদের সাথে আলোচনার পর একটা জিনিস বুঝতে পারি। তারা ইতোমধ্যেই ধরে নিয়েছে যে, বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে যাবে। ভুট্টো ও তার সহযোগীদের অনমনীয় মনোভাব থেকে এটা সুস্পষ্ট বুঝা গিয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে আলোচনার পূর্বে ও পরে ভুট্টোকে ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেল থেকে আনা নেয়ার দায়িত্ব ছিল আমার ওপর। এক দিন আলোচনার পর ভুট্টোকে নিয়ে গাড়ীতে করে যখন হোটেলে যাচ্ছিলাম, তখন তাকে ভীষণ গম্ভীর দেখি। আমি গাড়ীতেই ভুট্টোকে বলি এমন একটি শাসনতন্ত্র রচনা করা উচিত যাতে বাংলাদেশের এবং পশ্চিম পাকিস্তানের বিভিন্ন ভাষাভাষী সাধারণ মানুশের আশা- আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটবে। আর তা যদি না করা হয় তাহলে সামরিক শাসনের বেড়াজাল থেকে পাকিস্তান কোন দিন মুক্তি পাবে না। আমার কথায় প্রচ্ছন্ন এই ইঙ্গিত ছিল যে, শাসনতন্ত্র রচনায় আমাদের সাথে সহযোগিতা না করলে ভুট্টোর কোন লাভ হবে না। বরং সামরিক জান্তারই বেশী সুবিধা হবে। আমার কথার জবাবে ভুট্টো একটি তাৎপর্যপূর্ন উক্তি করেন। তিনি বলেন, ‘ডোন্ট ফরগেট আমিরুল ইসলাম, দ্যাট আই গট লারজেস্ট নাম্বার অব ভোটস ইন দি ক্যানটনমেন্ট’। এই একটি কথায় বুঝে নিতে আমার জন্য যথেষ্ট ছিল যে, পাকিস্তানের সামরিক জান্তার সাথে ভুট্টোর কী সম্পর্ক রয়েছে। অন্যান্য দিনের মত ভুট্টো সেদিন হোটেলে না গিয়ে তখনকার গভর্নর হাউজে যাবার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। আমি তাকে সেখানে নামিয়ে দেয়ার সময় দেখলাম, সিঁড়ির নীচে গভর্নরের এ ডি সি ভুট্টোর জন্য অপেক্ষা করছেন। তিনি ভুট্টোকে বলেন জেনারেল আকবর ফোনে তার জন্য অপেক্ষা করছেন।
আমার মনে হয় এ দুটো ঘটনা আলোচনার ভবিষ্যৎকে সন্দিহান করে তোলে। ফিরে এসে আমি বঙ্গবন্ধুকে এই ঘটনা জানাই। ৩১শে জানুয়ারি ভুট্টো সদলবলে ঢাকা ত্যাগ করেন। যাবার কালে ভুট্টো বলে যান আলাপ আলোচনার মাধ্যমে শাসনতন্ত্র তৈরী করা হবে। কিন্তু করাচী ফিরে ভুট্টোর সুর বদলে যায়। তিনি বলতে থাকেন সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে শাসনতন্ত্র চাপিয়ে দেয়ার এখতিয়ার আওয়ামী লীগের নেই। আসন্ন গনপরিষদের অধিবেশনে তিনি যোগ দেবেন না এবং পশ্চিম পাকিস্তান থেকে অন্য কাউকে যোগ দিতে দেবেন না। পশ্চিম পাকিস্তানে গিয়ে তিনি জেনারেলদের সাথে বৈঠকে মিলিত হন। বিভিন্ন ঘটনাবলী থেকে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, পাকিস্তান সামরিক জান্তার জেনারেলদের ক্ষমতা হস্তান্তরের কোন সদিচ্ছা নেই। কেন না তারা বুঝতে পারে জনগণের প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হলে সামরিক জান্তার স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হবে। আর এই প্রাসাদ ষড়যন্ত্রে জেনারেলদের সাথে গোপনে ভুট্টোও হাত মিলান।
ফেব্রুয়ারী মাসে আমাদের দ্বিতীয় দফা ও শেষ প্রচেষ্টা ছিল পাকিস্তানের জন্য একটি শাসনতন্ত্র রচনা। পহেলা মার্চ সকালে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠকে শাসনতন্ত্র রচনাকারী কমিটির পক্ষ থেকে খসড়া শাসনতন্ত্র পেশ করা হয়। এই বৈঠকে পাঞ্জাবের মালিক সরফরাজসহ পশ্চিম পাকিস্তানের কয়কজন নেতা উপস্থিত ছিলেন। আমাদের প্রণীত খসড়া শাসনতন্ত্র কেন্দ্রীয় কমিটির অনুমোদন লাভ করে। এই ব্যাপারে পরিবর্তন ও পরিবর্ধনের দায়িত্ব বঙ্গবন্ধু সংসদীয় দলের উপর ন্যস্ত করেন।
সকালের বৈঠকের পর হোটেল পূর্বানীতে বিকেলের বৈঠকের স্থান ধার্য করা হয়। ইতিমধ্যে বাংলাদেশ সময় বেলা ১ টা ৫ মিনিটে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান পাকিস্তান বেতারে এক বিবৃতিতে ৩রা মার্চ অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেন। বাংলার মানুষকে বিক্ষুব্ধ করার জন্য এই একটি ঘোষণাই যথেষ্ট ছিল। ঢাকা শহরের সকল শ্রেনীর মানুষ এই ঘোষণার প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে আসে। জনতার জোয়ারে ভেসে যায় ঢাকার প্রতিতি অলিগলি রাজপথ। মিছিলকারী জনতার হাতে ছিল বিভিন্ন ধরনের লাঠি ও লোহার রড। জনতার মুখে একটি শ্লোগানই শোনা যায় ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধর, বাংলাদেশকে স্বাধীন কর’। ‘৬দফা, না এক দফা, এক দফা এক দফা’। সারা শহর থেকে খন্ড খন্ড মিছিল পল্টন ময়দানে এসে জমায়েত হয়। পল্টনের সভায় বক্তৃতা করেন তোফায়েল আহমেদ, নুরে আলম সিদ্দিকী, আ,স,ম আবদুর রব, শাজাহান সিরাজ, আবদুল কুদ্দুস মাখন, আবদুল মান্নান প্রমুখ। এই সভায় ডঃ কামাল হোসেন ও আমি উপস্থিত ছিলাম। জনতা সেই মুহূর্তে বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতি কামনা করছিল। আওয়ামী লীগ সংসদীয় দলের বৈঠক উপলক্ষে বঙ্গবন্ধু ও সংসদ সদস্যরা হোটেল পূর্বাণীতে উপস্থিত হয়েছেন।
বেলা সাড়ে চারটায় হোটেলে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সাংবাদিক সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু অহিংস ও অসহযোগ আন্দোলনের কথা ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, আমরা যে কোন পরিস্থিতির মোকাবেলা করতে প্রস্তুত। অধিবেশন স্থগিত ঘোষণার প্রতিবাদে ২রা মার্চ ঢাকায় এবং ৩রা মার্চ সারাদেশে পূর্ণ দিসব হরতাল পালনের আহবান জানান। তিনি বলেন, আগামী ৭ই মার্চ রেসকোর্সের ময়দানে এক জনসভায় তিনি ভবিষ্যত কর্মসূচী ঘোষণা করবেন। শেখ সাহেব সাংবাদিক সম্মেলনে বক্তৃতাকালে হোটেল প্রাঙ্গনে হাজার হাজার লোক উপস্থিত ছিলেন। আওয়ামী লীগ সংসদীয় দলের পক্ষ থেকে ভবিষ্যৎ কর্মসূচী গ্রহনের জন্য বঙ্গবন্ধুকে সর্বময় ক্ষমতা দেয়া হয়। তাঁর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে গণ্য হবে।
২রা মার্চ থেকে সারাদেশে অসহযোগ আন্দোলনের শুরু হয়। নীতি নির্ধারনী বিষয়াদি ঠিক করার জন্য প্রতিদিন এই বৈঠক বসে। বঙ্গবন্ধু, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, এম, মনসুর আলী, খন্দকার মোশতাক আহমেদ, তাজউদ্দিন আহমদ এবং এ,এইচ এম কামরুজ্জামানকে নিয়ে দলীয় হাইকমান্ড গঠন করা হয়। তাজউদ্দিন আহমদকে কর্মসূচী বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেয়া হয়। তাঁকে সাহায্য করার জন্য ডঃ কামাল হোসেন এবং আমাকে বলা হয়। কেন্দ্রীয় সংগ্রাম কমিটির পক্ষ থেকে সংগ্রাম কমিটির গঠনের জন্য সকল জেলা, মহকুমা ও থাকাকে নির্দেশ দেয়া হুয়। আমার দায়িত্ব ছিল প্রতিদিন সন্ধ্যায় সকল জেলার সংগ্রাম পরিষদের সাথে যোগাযোগ করে তাদের বক্তব্য লিপিবদ্ধ করা। তাছাড়া ঢাকা শহরের বিভিন্ন সরকারী, বেসরকারী সংস্থার সাথে যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার দায়িত্বও আমার ওপর ছিল। ব্যাংক কর্মচারী, ডাক, তার, টেলিফোন বিভাগের কর্মচারীদের সাথে আমরা যোগাযোগ করি। তাজউদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে ডঃ কামাল হোসেন ও আমি প্রতিদিন সন্ধ্যায় বৈঠকে বসে আন্দোলনের কর্মসূচী তৈরী করি। এসব বৈঠক কখনও বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে আবার কখনও ডঃ কামালের চেম্বারে অনুষ্ঠিত হত। অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মোকাবেলার তীক্ষ্ণ মেধাশক্তি ছিল তাজউদ্দিন আহমদের। মাঝে মাঝে ব্যাংকের পদস্থ কর্মকর্তা বৈঠকে উপস্থিত থাকতেন। টেলিফোন বিভাগের একজন বড় অফিসার নুরুল হক সাহেব তখন খুবই সহযোগিতা করেন। তাঁকে পাক বাহিনী ২৫শে মার্চের রাতে হত্যা করে।
পশ্চিম পাকিস্তানে সকল প্রকার টেলেক্স, তার বন্ধ করে দেয়া হয়। শুধুমাত্র বিদেশী সাংবাদিকদের জন্য নির্দিষ্ট কথায় টেলেক্স সুবিধা দেয়া হয়। প্রতিদিন সন্ধ্যার পর আমরা তিন জন উদ্ভূত অবস্থার প্রেক্ষিতে একটা খসড়া তৈরী করে রাত আটটার দিকে বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা করতাম। কোন বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হলে বঙ্গবন্ধু তার সমাধান করে দিতেন। এরপর সংবাদপত্রে যা দেয়ার তা দিয়ে দেয়া হত। নতুন কোন সিদ্ধান্ত থাকলে জেলা সংগ্রাম কমিটিকে জানিয়ে দেয়া হতো। সে সময় চট্টগ্রাম এবং খুলনা আন্দোলনের জন্য ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। চট্টগ্রাম থেকে আওয়ামী লীগ নেতা জহুর আহমেদ চৌধুরী, এম আর সিদ্দিকী, এম,এ, হান্নান, আবদুল হান্নান প্রমুখ এবং খুলনা থেকে শেখ আবদুল আজিজ আমাদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করতেন। ঢাকা শহরের আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীকে সর্বদা সতর্ক রাখা হয়। তাছাড়া জনগনের সুবিধার্থে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে কন্ট্রোল রুম স্থাপন করা হয়।
বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে লাইব্রেরী কক্ষটিকে অফিস হিসেবে ব্যবহার করা হয়। সকাল থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু এখানে থাকতেন। তাজউদ্দিন আহমদ এবং ডঃ কামাল হোসেন নীতি নির্ধারণী হাইকমান্ডের বৈঠকে প্রায়ই ব্যস্ত থাকতেন বলে অফিসের দায়িত্ব বেশীরভাগ সময় আমাকে পালন করতে হত। প্রতিদিন বিভিন্ন ধরনের লোক নানা সমস্যা নিয়ে ছুটে আসতেন। সারা দিন ধরে বাজত টেলিফোন। এগুলির সঠিক সমাধানের দায়িত্ব ছিল কন্ট্রোল রুমের। বাসভবনের নীচের কক্ষটিতে টেলিফোন ও কাগজপত্র নিয়ে আমরা কাজ করতাম। হাইকমান্ডের অধিকাংশ বৈঠক হত বঙ্গবন্ধুর কক্ষে। বাড়ির প্রাঙ্গণে সর্বদাই থাকত অগণিত উৎফুল্ল জনতা ও সাংবাদিকদের ভিড়।
৩রা মার্চ ছাত্রলীগ আয়োজিত পল্টনে বিরাট জনসভায় বঙ্গবন্ধু বক্তৃতা করেন। বঙ্গবন্ধু তাঁর বক্তৃতায় দেশের মুক্তি না হওয়া পর্যন্ত খাজনা ট্যাক্স বন্ধ রাখার আহবান জানান। বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতিতে ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ করা হয়। ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি’ কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই সঙ্গীতকে বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত ঘোষণা করায় হয়। তাছাড়া সেদিনের সভা মঞ্চে বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকাও দেখা যায়।
৬ই মার্চ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান পুনরায় ২৫ শে মার্চ জাতীয় পরিষদের আহবান করেন। বাংলার মাঠে ঘাটে, হাটে বাজারে সর্বত্র আন্দোলন দানা বেঁধে উঠে। এদিকে বিভিন্ন স্থানে সামরিক জান্তার গুলীতে বেশ কিছু লোক হতাহত হয়।
বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ নিয়ে জল্পনা-কল্পনা চলতে থাকে। বঙ্গন্ধু ১লা মার্চ নিজেই বলেছেন ৭ই মার্চে রেসকোর্সের জনসভায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচী ঘোষণা করবেন। বিভিন্ন দেশ থেকে থেকে বহু সাংবাদিক বাংলাদেশে আসেন। ধানমন্ডির ৩২নম্বর সড়কে বঙ্গবন্ধুর ৬৭৭ নম্বর বাড়ী সংগ্রামের সূতিকাগারে পরিণত হয়। সকালে বিকালে দেশী বিদেশী সাংবাদিক এই বাড়ীতে এসে ভীড় জমান। তারা সুযোগ পেলেই বঙ্গবন্ধুর নিকট থেকে বিভিন্নভাবে আন্দোলন ও ভবিষ্যৎ কর্মসূচী জানতে চান।
আর পাক বাহিনীও সুযোগের প্রতীক্ষায় থাকে। শোনা যায়, রেসকোর্সের জনসভাকে লক্ষ্য করে ঢাকা সেনানিবাসে কামান বসানো হয়। শেখ মুজিব যদি স্বাধীনতা ঘোষণা করেন তাহলে জনসভায় গোলা বর্ষণ করা হবে।
ইতিমধ্যে লক্ষ্য করলাম বঙ্গবন্ধু অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী হয়ে উঠেছেন। সারা দেশের মানুষের প্রাণঢালা ভালবাসা ও সমর্থন তাঁকে দৃঢ় আত্মপ্রত্যয়ী করে তুলেছে। তখন তাঁর প্রতিটি কথাই ছিল বাঙ্গালির মনের কথা।
বঙ্গবন্ধুর মনের কথা তাজউদ্দিন আহমদের জানা ছিল। বঙ্গবন্ধুর ইঙ্গিতই তাঁর জন্য যথেষ্ট ছিল। বিভিন্ন সাংবাদিক সম্মেলনে বঙ্গবন্ধুর বক্তব্যের খসড়া আমরা রচনা করে দিতাম। নেতার নির্দেশ অনুযায়ী তা করা হতো। তাজউদ্দিন আহমদ মুষ্টিবদ্ধ হাত মুখে রেখে কান পেতে কথা শুনতেন। একজন নিখুঁত শিল্পীর মত আমাদের রচিত খসড়াগুলো তিনি শুনতেন। এরপর তিনি বক্তব্যের খসড়া বঙ্গবন্ধুর কাছে নিয়ে যেতেন। আমাদের রচিত খসড়া বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই বঙ্গবন্ধুর পছন্দ হতো। কোন কোন সময় তিনি কিছু পরিবর্তন করতেন।
৭ই মার্চের বক্তৃতা সম্পর্কে আওয়ামী লীগের বৈঠকে দীর্ঘ আলোচনা হয়। আলোচনার পর বক্তব্যের ব্যাপারে সর্বময় ক্ষমতা দেয়া হয়। বঙ্গবন্ধু আমাদেরকে খসড়া বক্তব্য লিখার নির্দেশ দেন। ৭ই মার্চ অপরাহ্নে বঙ্গবন্ধুর পায়ের কাছে বসে রেসকোর্সের ময়দানে মন্ত্রমুগ্ধের মত তাঁর বক্তব্য শুনছিলাম। তিনি সেদিন তাঁর বক্তব্যের মাধ্যমে বাঙ্গালি জাতির পথ নির্দেশ করেন। তিনি বাঙালি জাতির দীর্ঘদীনের ক্ষোভ, নির্যাতন ও নিষ্পেষণের কথা উল্লেখ করেন, বাঙালি জাতিকে মরণপন যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে আহ্বান জানান। সঙ্গে সঙ্গে তিনি জাতিকে স্বাধীনতা ও মুক্তির বাণী শোনান। বক্তৃতা একদিকে ছিল যেমন আবেগময়ী, অপরদিকে ছিল নির্ভুল যুক্তি ও গভীর আত্মপ্রত্যয়ী।
প্রকৃতপক্ষে পহেলা মার্চ থেকে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে বাংলাদেশ পরিচালিত হয়। বক্তৃতার পর বঙ্গবন্ধু বলেন আমি স্বাধীনতা ঘোষণা করে আমার দায়িত্ব পালন করেছি। এখন দেশবাসীর দায়িত্ব হল হানাদার বাহিনীকে দেশ থেকে বিতাড়িত করা। বাংলার মুক্তিপাগল মানুষ সে দায়িত্ব পালন করেছে একাত্তরের ১৬ই ডিসেম্বর।
কেউ কেউ বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের বক্তৃতাকে আব্রাহাম লিংকনের গেটিসবার্গ বক্তৃতার সাথে তুলনা করেন। বঙ্গবন্ধু জীবনে ৭ই মার্চের আগে ও পরে অসংখ্য বক্তৃতা করে গেছেন। ৭ই মার্চের বক্তৃতার সাথে তাঁর অন্য কোন বক্তৃতার তুলনা হয় কি? মুক্তিযুদ্ধকালে ৭ই মার্চের বক্তৃতায় উদ্বুদ্ধ হয়ে মুক্তিযোদ্ধারা মরণপণ সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। তাই আমি মনে করি, ৭ই মার্চের বক্তৃতা এক অনন্য বক্তৃতা, যারা সাথে পৃথিবীর অন্য কোন বক্তৃতারই তুলনা চলে না। তাই বাঙ্গালি জাতি যতদিন বিশ্বের বুকে বেঁচে থাকবে ততদিনই এই বক্তৃতার দ্বারা আলোড়িত হবে। বাঙালি জাতির জীবনে এই বক্তৃতা অক্ষয় ও অম্লান হয়ে থাকবে।
৭ই মার্চের বক্তৃতায় বঙ্গবন্ধু আন্দোলনের নয়া কর্মসূচী ঘোষণা করেন। দেশের সর্বত্র শহরে বন্দরে নগরে গ্রামে গঞ্জে হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে জনসভা, বিক্ষোভ মিছিল ও শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হতে থাকে। ১৫ই মার্চ আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে দলের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দিন আহমদ ৩৫টি নির্দেশ জারি করেন। এই নির্দেশের মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের সর্বময় দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৭ই মার্চ ছিল বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন। এদিন সকালে বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগের এক বৈঠক ডাকেন। বৈঠকে বঙ্গবন্ধু উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মতামত ব্যক্ত করার জন্য সকলের প্রতি আহ্বান জানান। বৈঠকে উপস্থিত দুই-একজন ছাড়া সকলেই এই অভিমত ব্যক্ত করেন যে পাক সশস্ত্র বাহিনীর মোকাবেলা সশস্ত্রভাবেই করতে হবে। এই বৈঠকে অন্য একটি বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। সেটা হল এই পরিস্থিতিতে আমরা বিদেশের কাছ থেকে কি রকম সাড়া বা সাহায্য পেতে পারি।
আমি এই বৈঠকে আমার-বক্তব্য তুলে ধরি। চার্চিলের ‘উই আর এলোন অন দি ব্রিজ’ এই উদ্ধৃতি দিয়েই বক্তৃতা শুরু করি। বাংলাদেশের আন্দোলন সম্পর্কে বিদেশের সাথে আমাদের যোগাযোগ ছিল না। সত্তরের ১২ই নভেম্বর ঘূর্ণিঝড়ের পর বাংলাদেশের মানুষের প্রতি বিশ্ববাসীর সমর্থন বাড়তে থাকে। এরপর জাতীয় সাধারণ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয় সারা বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এরপর ঐতিহাসিক আন্দোলনের খবর বহির্বিশ্বের পত্র-পত্রিকায় ব্যাপকভাবে প্রকাশিত হয়। কিন্তু বিদেশের কোন সরকারের কূটনৈতিক বা উচ্চপর্যায়ের লবির সাথে আমাদের কোন যোগাযোগ ছিল না। তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের কূটনৈতিক তৎপরতা ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সে তুলনায় আমাদের বলতে গেলে কোন যোগাযোগই ছিল না।
আমার বক্তৃতার পর তাজউদ্দিন আহমদ বক্তৃতা করেন। তিনি আমার বক্তব্য সমর্থন করে কর্তব্য সম্পর্কে ইঙ্গিত দেন। তিনি বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব ও জনগনের ঐক্যের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। তাজউদ্দিন আহমদ বলেন যুদ্ধে পাকিস্তানের সাথে মোকাবেলা আমাদের সম্ভব নয়। তাই সংগ্রামকে গণভিত্তিক সশস্ত্র সংগ্রামে পরিণত করতে হবে। সভাপতির ভাষণে বঙ্গবন্ধু সশস্ত্র যুদ্ধের মোকাবেলায় সকলকে প্রস্তুত থাকার ইঙ্গিত দেন।
এদিন ঢাকায় প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ও তার সহকর্মীদের সাথে বঙ্গবন্ধু ও তাঁর সহকর্মীদের আলোচনা অব্যাহত থাকে। ২৩শে মার্চ পাকিস্তান দিবসে স্বাধীন বাংলা ছাত্র পরিষদের আহ্বানে প্রতিরোধ দিবস পালন করা হয়। ঐ দিন বঙ্গবন্ধুর বাসভবনসহ বাংলাদেশের সর্বত্র স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়।
ঐদিন সন্ধ্যায় বঙ্গবন্ধুর পক্ষ থেকে প্রেসিডেন্টের কাছে শাসনতন্ত্রের একটি খসড়া পেশ করা হয়। এই খসড়াটির মূল অংশগুলো মেনে নেয়া হবে প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে এ ধরনের একটা ধারণা দেয়া হয়। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাবার কথা পরবর্তী বৈঠকে। ২৪শে মার্চ প্রেসিডেন্টের পক্ষ নীরব থাকে এবং সামরিক বাহিনী দেশের বিভিন্ন জায়গায় নির্যাতন শুরু করে। ইতিমধ্যে আমরা খবর পেয়ে গেছি যে প্রত্যহ বিমানে করে পাকিস্তান থেকে সৈন্য আনা হচ্ছে।
চট্টগ্রাম থেকে আমরা খবর পেলাম পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ‘সোয়াত’ জাহাজে করে অস্ত্র এসেছে। বঙ্গবন্ধু হাজী গোলাম মোর্শেদের মাধ্যমে চট্টগ্রামে মেজর জিয়ার কাছে একটি নির্দেশ প্রেরণ করেন। খবরটি ছিল সোয়াত জাহাজ থেকে যেন অস্ত্র নামাতে না দেয়া হয়। এ ব্যাপারে মেজর জিয়া কোন সক্রিয়া ভূমিকা পালন না করায় পরবর্তীকালে তার সঙ্গে আর যোগাযোগ করা হয় নি।
&nbsp;
২৩শে মার্চ সকালে ঢাকা থেকে সকল জেলা সদরে আওয়ামী লীগ সংগ্রাম কমিটির কাছে একটি নির্দেশ প্রেরণ করা হয়। নির্দেশে বলা হয়<strong>, </strong>যেকোন সময় পাক বাহিনী আমাদের ওপর হামলা চালাতে পারে। পাল্টা আঘাত হানার জন্য সকলকে প্রস্তুত থাকতে হবে। বাংলাদেশের পতাকা ইতিমধ্যেই দেশের সর্বত্র তৈরী হয়ে গেছে।
<strong> </strong>
২৪শে মার্চ বিকেল থেকেই বঙ্গবন্ধু সকলকে ঢাকা ছেড়ে যাবার নির্দেশ দেন। বঙ্গবন্ধু তাঁর পেছনের ঘরে প্রায় প্রত্যেকের সাথে এক মিনিট করে কথা বলেন। অনেক সময় ভিড়ের মধ্যে বাথরুমেও কারো কারো সাথে তিনি কথা বলেন।
&nbsp;
২৫শে মার্চ তারিখেও এ ধরনের শলাপরামর্শ চলে। বঙ্গবন্ধু একে একে সকলকে বিদায় দিচ্ছেন। বিকেল থেকেই যেন ৩২ নম্বরের বাড়ীতে থমথমে ভাব বিরাজ করতে থাকে। বিকেল প্রায় ৪ টায় আমার বন্ধু তৎকালীন ইউনাইটেড ব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট জনাব রিজভী বঙ্গবন্ধুর বাসায় এসে আমাকে জিজ্ঞাসা করেন কথা বলার সময় আছে কিনা। সময় থাকলে তার সাথে চা খেতে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানান। রিজভীর বাসা বঙ্গবন্ধুর বাড়ী থেকে ২০০ গজ দূরে। আমি রিজভীর সাথে তার বাসায় গেলাম। রিজভী আমাকে বলেন<strong>, </strong>অস্বাভাবিক একটা কিছু ঘটতে যাচ্ছে। এদেশ বসবাসের কোন যোগ্য থাকবে না। তিনি এখনই স্ত্রী-পুত্র নিয়ে সেনানিবাসে তার ভগ্নিপতির বাসায় চলে যাচ্ছেন। রিজভী তার পাঠান দারোয়ানের সাথে আমার পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলেন<strong>, </strong>আমি কোন সময় গেলে যেন আমাকে থাকার আশ্রয় দেয়া হয়। তিনি বলেন<strong>, </strong>ইচ্ছা করলে আমি তার বাড়ী ব্যবহার করতে পারি। পেছনের একটি দরজা দেখিয়ে বলেন<strong>, </strong>বিপদের সময় পলায়নের রাস্তা রয়েছে। পরে জেনেছিলাম শহিদুল্লাহ কায়সার কিছুদিন আগে এই বাড়ীতে ছিলেন।
<strong> </strong>
বঙ্গবন্ধুর বাসায় ফিরে এসে তাড়াতাড়ি হাতের কাজগুলো শেষ করি। রিজভীর কাছে শোনা বক্তব্য এক ফাঁকে বঙ্গবন্ধুকে জানাই। বঙ্গবন্ধু শুনে গম্ভীর হয়ে যান। এর ক<strong>'</strong>দিন পূর্বে এরকম পরিস্থিতিতে আত্মগোপনের কথা নিয়ে আমরা বঙ্গবন্ধুর সাথে আলোচনা করি। আমরা বঙ্গবন্ধুকে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আত্মগোপনের জন্য চাপ দেই। তিনি আত্মগোপনের কথা দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেন। তাজউদ্দিন আহমদ বলেন<strong>, </strong>আত্মগোপনের জন্য তিনি পূর্ব থেকেই বঙ্গবন্ধুকে বলে আসছেন। তিনি কিছুতেই রাজী হচ্ছেন না।
&nbsp;
বঙ্গবন্ধু একদিন তাঁর বেডরুমে হাইকম্যান্ডের বৈঠকের সময় তাজউদ্দিন আহমদ ও আমাকে ডাকেন। আমি আমার সহ-হুইপ আবদুল মান্নানকে নিয়ে সেখানে যাই। বৈঠকে আত্মগোপনের জন্য আমরা সকলে মিলে বঙ্গবন্ধুকে চাপ দেই। তিনি প্রশ্ন করেন আমাকে নিয়ে তোরা কোথায় রাখবি<strong>? </strong>বাংলাদেশে আত্মগোপন সম্ভব না। আমার হয়তো মৃত্যু হবে<strong>, </strong>কিন্তু বাংলাদেশ স্বাধীন হবেই।
&nbsp;
২৫শে মার্চ বিকেলে আমার আবার ইচ্ছা হলো আত্মগোপন করার জন্য বঙ্গবন্ধুকে অনুরোধ জানাই। মনে মনে ঠিক করলাম<strong>, </strong>তাজউদ্দিন আহমদ ও ডঃ কামাল হোসেন আসলে সকলে মিলে বঙ্গবন্ধুকে পুনরায় শেষ অনুরোধ জানাবো। তাঁরা দু<strong>'</strong>জন অন্য কাজে বাইরে ছিলেন। আমি জাতির উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধুর শেষ বক্তব্যের খসড়া তৈরী করতে ব্যস্ত। আমার খসড়া প্রস্তুত হলো। বঙ্গবন্ধু একটু দেখে ঠিক করে দেন। রাত সাড়ে আটটার দিকে বঙ্গবন্ধু সাংবাদিকদের সামনে পরবর্তী কর্মসূচী ঘোষণা করেন।
&nbsp;
আমি বঙ্গবন্ধুর বাসা থেকে বেরিয়ে পাশে বদরুন্নেছা আহমদের বাসায় খোঁজ নিতে যাই। নুরুদ্দিন ভাই বলেন<strong>, </strong>সেনানিবাস থেকে শিগগিরই ট্যাংক বেরিয়ে আসবে। কিছুক্ষণের মধ্যেই হয়তো জনতার ওপর আক্রমণ শুরু হবে। আমি বঙ্গবন্ধুর বাড়ীতে ফিরে এসে দেখি তিনি ওপরে চলে গেছেন। বঙ্গবন্ধুর বাসা থেকে আবার বেরিয়ে আসি। আমি এখনো আশায় করছি তাজউদ্দিন আহমদ ও কামাল হোসেনকে নিয়ে বঙ্গবন্ধুর সাথে শেষ আলোচনা করবো। তাজউদ্দিন ভাইয়ের বাড়ীতে গিয়ে দেখি নূরজাহান মোর্শেদ এম<strong>,</strong>পি বসে আছেন। বাড়ীর ভেতরে তাজউদ্দীন ভাই জোরে জোরে ভাবীর সাথে কথা বলছেন। কথা বুঝলাম তাজউদ্দিন ভাইয়ের মন খারাপ। কি করবো বুঝে উঠতে পারছিলাম না। কিছু না বলেই বাড়ি ত্যাগ করি। উদ্দেশ্য কামাল হোসেনের সাথে দেখা করা। গাড়ীতে নূরজাহান মোর্শেদকে নিয়ে নিলাম। তাকে নামিয়ে আমার বাসায় আসার পথে দেখি পাক সৈন্যরা বেতার ভবন দখল করে নিয়েছে।
<strong> </strong>
সার্কিট হাউজ রোডের ৪ নম্বর বাড়ীতে আমি থাকি। কামাল হোসেন থাকেন ৩নম্বর বাড়ীতে। আমার বাড়ীতে যাওয়ার পূর্বে কামাল হোসেনের বাড়ীতে যাই। তিনি বাড়ীর বাইরে দাঁড়িয়ে আহমেদুল কবীর ও তাঁর স্ত্রীকে বিদায় দিচ্ছেন। বিদায়ের সময় লম্বা না করার জন্য আমি তাঁদের তাড়া দিলাম। তাঁদের বিদায় দিয়ে ডঃ কামাল কি করা যা বলে আমাকে জিজ্ঞেস করেন। বললাম পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী আপনি প্রস্তুত হোন। আমি বাসায় লীলাকে বলে আসি।
&nbsp;
১ লা মার্চ থেকে বাড়ীতে দুপুরে খাওয়ার সময় আসি। স্ত্রী ও পুত্র-কন্যার সাথে এক প্রকার কথাবার্তা হয় না বললেই চলে। আমার শ্বশুর আওয়ামী লীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা খান সাহেব এম<strong>, </strong>ওসমান আলী ১৯শে মার্চ ইন্তেকাল করেন। স্ত্রী তখনো শোক কাটিয়ে উঠতে পারেনি। পিতৃহারা স্ত্রীকে সান্তনা দেয়ার সময়ও আমার হয়ে ওঠে নি।
&nbsp;
ঘরে প্রবেশ করে লীলাকে বললাম<strong>, </strong>আমাকে এখন চলে যেতে হবে। সে শুধু জানতে চাইলো আমার কাছে টাকা আছে কিনা। পকেটে ২/১০ টাকা থাকতে পারে। আমার পরনে পাজামা<strong>, </strong>গায়ে পাঞ্জাবী<strong>, </strong>আর পায়ে সেন্ডেল। <strong>'</strong>ভালো থাক<strong>’ </strong>এ কথা বলেই স্ত্রীর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে এলাম। পূর্বের মত দেয়াল টপকিয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে কামাল হোসেনের বাসায় আসি। তিনি প্রস্তুত ছিলেন।
&nbsp;
পথে দেখি শাহবাগের মোড়ে জনতা গাছ কেটে ব্যারিকেড সৃষ্টি করেছে। এই পথে বঙ্গবন্ধুর বাড়ীতে যাওয়ার রাস্তা বন্ধ। বহু কষ্টে কর্মীদের সহযোগিতায় রাস্তার ব্যারিকেড সরিয়ে বঙ্গবন্ধুর বাসায় পৌছি। বঙ্গবন্ধু যে আত্মগোপন করতে নারাজ গাড়ীতে ডঃ কামালকে সে কথা জানাই। ৩২ নম্বরের বাড়ীতে প্রবেশ করে দেখি বঙ্গবন্ধু নীচের তলায় খাবার শেষ করেছেন। দৃশ্যটি দেখে আমার <strong>'</strong>লাস্ট সাপারের<strong>’ </strong>কথা মনে পড়লো। বঙ্গবন্ধুর পরনে লুঙ্গি ও গায়ে গেঞ্জী ছিল। আমাদের দু<strong>'</strong>জনকে দেখে তিনি দরজায় আসেন। আমরা সংক্ষেপে শহরের অবস্থা জানিয়ে বঙ্গবন্ধুকে আমাদের সাথে চলে যাবার জন্য পুনরায় অনুরোধ জানাই। বঙ্গবন্ধু তাঁর পূর্ব সিদ্ধান্তে অটল। তিনি বললেন<strong>, </strong>তোমরা প্রতিজ্ঞা পাঠ করেছ<strong>, </strong>আমি যা নির্দেশ করবো তাই শুনবে। তারপর তিনি আমাদের দু<strong>'</strong>জনের পিঠে দু<strong>'</strong>হাত রেখে বলেন<strong>, ‘</strong>কামাল<strong>, </strong>আমিরুল আমি কোনদিন তোমাদেরকে কোন আদেশ করিনি। আমি তোমাদের আজ আদেশ করছি<strong>, </strong>এই মুহূর্তে তোমরা আমার বাড়ী ছেড়ে চলে যাও। আর তোমাদের দায়িত্ব তোমরা পালন করবে<strong>'</strong>। আর শহরের অবস্থার কথা শুনে তিনি বলেন<strong>, </strong>আমি বাড়ী ছেড়ে চলে গেলে হানাদাররা আমার জন্য ঢাকা শহরের সকল লোককে হত্যা করবে। আমার জন্য আমার জনগণের জীবন যাক এটা আমি চাই না।
<strong> </strong>
বঙ্গবন্ধুর বাড়ী থেকে মোহাম্মদ মুসার বাড়ীতে যাই। আমার গাড়ী সেই বাড়ীতে রেখে মুসার গাড়ীতে উঠি। মুসার ড্রাইভার গাড়ী চালায়। আমরা তাজউদ্দিন আহমদের বাড়ীতে গিয়ে উপস্থিত হই। তাজউদ্দিন ভাইকে সর্বশেষ পরিস্থিতি অবহিত করি। তাঁকে জানাই<strong>, </strong>বঙ্গবন্ধু সকলকে আত্মগোপনের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি ইতস্তত করেন।
<strong> </strong>
এ সময়ে বি ডি আর এর একজন হাবিলদার এসে আমাদের বলে গেলেন<strong>, </strong>বি ডি আর এর সকল বাঙ্গালি সদস্যরা বেরিয়ে পড়েছে। আজ রাতে তারা পাক বাহিনীর হামলার আশংকা করছে। তাজউদ্দিন ভাইকে তাড়াতাড়ি তৈরী হতে বললাম। তিনি ভেতরে গেলেন। সময় গড়িয়ে যাচ্ছে। ডঃ কামালকে খুবই চিন্তিত দেখাচ্ছিল। ডঃ কামাল গাড়ীযোগে অন্যত্র যেতে চাইলেন। আমি বললাম<strong>, </strong>এটা ঠিক হবে না। তাজউদ্দিন আহমদের কিছুটা দেরী হলো। তিনি বেরিয়ে আসলেন। তাঁর পরনে লুঙ্গি ও গায়ে পাঞ্জাবী। কাঁধে একটি ব্যাগ ঝোলানো রয়েছে। আর তাঁর ঘাড়ে একটি রাইফেল। তাঁর এই বেশ দেখে আমি বললাম<strong>, </strong>শিকারে যাচ্ছেন নাকি<strong>?</strong>
&nbsp;
তাজউদ্দিন ভাই গত কিছুদিন যাবৎ আমাদের অস্ত্র প্রশিক্ষণ গ্রহণের কথা বলছিলেন। তিনি ইতিমধ্যে রাইফেল ট্রেনিং নিয়ে নিয়েছেন। আরহাম সিদ্দিকী তাঁকে এই রাইফেল যোগাড় করে দেন। কিন্তু এই রাইফেল পরবর্তীকালে আমাদের জন্য সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। রাইফেল বেশী দূর নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়
নি।
সময় দ্রুত গড়িয়ে যাচ্ছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই হয়তো এই এলাকায় পাক সৈন্য এসে যাবে। পুরাতন ঢাকার একটা বাড়ীতে সকলের একত্র হবার কথা ছিল। কিন্তু বঙ্গবন্ধু তাঁর বাসভবন থেকে বাইরে আসতে রাজী না হওয়ায় সেই সিদ্ধান্ত বাতিল হয়ে যায়। বঙ্গবন্ধুর বাড়ী ছেড়ে যাবার সিদ্ধান্তে নেতাদের মন ভেঙ্গে যায়। তাজউদ্দিন আহমদ ভগ্নমনোরথ অবস্থায় বাড়ীতে বসে ছিলেন। তিনি নিজেকে এক রকম ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দিয়েছিলেন। আঘাত হানার পূর্বেই আমাদের নেতা বঙ্গবন্ধুকে রক্ষার চেষ্টা করি। এরপর ভাবলাম<strong>, </strong>১লা মার্চ থেকে তাজউদ্দিন আহমদ<strong>, </strong>ডঃ কামাল হোসেন ও আমি একত্রে কাজ করেছি। এই ৩ জনকে যেকোন মূল্যে একত্রে থাকতে হবে। ১৫ নম্বর সড়কের কাছাকাছি এলে ডঃ কামাল গাড়ী থামাতে বলেন। তিনি বলেন<strong>, </strong>সকলে এক বাড়ীতে না থেকে আমি এখানে আমার এক আত্মীয়ের বাড়ীতে থেকে যাই।
&nbsp;
আমার চরম অনিচ্ছা সত্ত্বেও বাধা দিতে পারলাম না। তবে মনে মনে খুবই বিরক্ত হলাম। কামাল হোসেন আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। কিন্তু তার একক সিদ্ধান্ত নেয়ার ধরনটা মেনে নিতে পারলাম না। তবুও কামাল হোসেন গাড়ী থেকে নেমে গেলেন। কথা রইলো পরদিন সুযোগ পেলেই তিনি মুসা সাহেবের বাড়ীতে যাবেন। আমরাও সেখানে যাব<strong>, </strong>না হয় যোগাযোগ করে সিদ্ধান্ত নেব। কিন্তু এটা আর হয়ে ওঠেনি। ডঃ কামাল মুসা সাহেবের বাড়ী যেতে পারেন নি<strong>, </strong>আর আমরাও পারি নি ডঃ কামালের সাথে যোগাযোগ করতে। পরবর্তীকালে তিনি পাক বাহিনীর হাতে ধরা পড়েন। নির্যাতিত হন পাকিস্তানী কারাগারে। আর আমরা বঞ্চিত হই তার সুযোগ্য নেতৃত্ব থেকে। ডঃ কামালের সেদিনের একক সিদ্ধান্ত আজও আমাকে পীড়া দেয়। যদ্দিন তিনি পাকিস্তানী কারাগার থেকে ফিরে না এসেছেন<strong>, </strong>তদ্দিন নিজেকে খুবই অপরাধী মনে হয়েছে। কেন সেদিন জোরে বাধা দিতে পারিনি।
<strong> </strong>
ইতিমধ্যে ধানমন্ডির বিদ্যুৎ চলে গেলো। রাস্তা জনমানব শুন্য। আমাদের স্বেচ্ছাসেবকদের দুই একটা গাড়ী মাঝে মধ্যে বিদ্যুৎ চমকানোর মত দেখা যায়। কালবিলম্ব না করে লালমাটিয়ায় রেলওয়ের এককালের চীফ ইঞ্জিনিয়ার গফুর সাহেবের বাড়ীর কাছে গিয়ে দু<strong>'</strong>জন নেমে গেলাম। ড্রাইভার গাড়ী নিয়ে মুসা সাহেবের বাড়ী চলে গেলো।
<strong> </strong>
গফুর সাহেব আমাদের জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। আমরা তাকে পূর্বে কোন খবর দেইনি। তবুও তিনি আমাদের স্বাভাবিক ভাবে গ্রহণ করলেন। আমরা বাড়ীতে ঢুকার ৫/৭ মিনিটের মধ্যেই এক প্রচণ্ড শব্দে সমস্ত ঢাকা শহর কেঁপে উঠলো। পরে জেনেছি এটা ছিল আঘাত শুরু করার সংকেত।
&nbsp;
শুরু হলো চারদিক থেকে ব্রাশ ফায়ার। অবস্থা জানতে আমি ও তাজউদ্দিন ভাই বাড়ীর ছাদে যাই। পাক বাহিনীর ব্যপক হামলার মাঝে আমাদের ছেলেদের ৩০৩ রাইফেলের বিচ্ছিন্ন শব্দ। <strong>'</strong>জয় বাংলা<strong>’ </strong>ধ্বনি শুনতে পাই। পাশাপাশি মোহাম্মদপুরের কয়েকটি বাড়ি থেকে <strong>'</strong>পাকিস্তান জিন্দাবাদ<strong>’ </strong>ধ্বনি শোনা গেলো। আমরা মোহাম্মদপুরের কাছাকাছি ছিলাম। তবে একদিক থেকে আমাদের বাড়ী নিরাপদ মনে হলো। কেননা অবাঙালি অধ্যুষিত মোহাম্মদপুর এলাকায় পাক বাহিনী কোন হামলা করবে না। আক্রমণের ব্যাপকতা ও আকস্মিকতায় আমরা একেবারে <strong>'</strong>থ<strong>’ </strong>হয়ে গেছি।
&nbsp;
আমাদের ওপর হামলা হবে একথা জানতাম। সেটা হবে রাজনীতিবিদ<strong>, </strong>ছাত্র ও কর্মীদের ওপর। কিন্তু আধুনিক সমর সজ্জিত পাক বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির উপর ঝাঁপিয়ে পড়বে<strong>,</strong> তা ভাবতে পারি নি। পৃথিবীর ইতিহাসে এ ধরনের নজির আর কোথাও দেখিনি। গফুর সাহেবের বাড়ীর অসম্পূর্ণ ছাদের ইট-সুরকির ওপর বসে আমরা দু<strong>'</strong>জন পাক সৈন্যদের হামলার মুখে ভয়ার্ত মানুষের আর্তচিৎকার শুনছি। এক সময় তীব্র নীলাভ এক উজ্জ্বল আলোতে ঢাকা শহর আলোকিত হয়ে উঠল। বিভিন্ন স্থানে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। আগুনের কালো ধোঁয়ায় ঢাকার আকাশ ক্রমশঃই কালো হয়ে উঠছে।
&nbsp;
মধ্যরাতের দিকে ব্রাশ ফায়ার ও বিকট শব্দ শুনে তাজউদ্দিন বলে ওঠেন<strong>, </strong>এবার দস্যুরা ৩২ নম্বর বঙ্গবন্ধুর বাড়ীতে হামলা করছে। এ সময় তিনি কেঁদে উঠলেন। বঙ্গবন্ধু কি তাঁর বাসা থেকে বেরিয়েছিলেন<strong>? </strong>বঙ্গবন্ধু যখন কোন অবস্থাতেই বাসা থেকে বেরিয়ে যেতে অসম্মত হন<strong>, </strong>তখন আমাদের সর্বশেষ অনুরোধ ছিল<strong>, </strong>তাঁর বাড়ীর পেছনে জাপানীদের অফিসে যেন তিনি চলে যান। এ সময় বঙ্গবন্ধুর কথা<strong>, </strong>তাঁর পরিবার পরিজনের কথা<strong>, </strong>দলের বিভিন্ন নেতাদের কথা বার বার মনে হতে লাগলো।
&nbsp;
এক সময় আমরা দুইজন ছাদ থেকে নেমে এলাম। নীচে এসে অনেকক্ষণ বসে রইলাম। শুধু ভাবছি আর ভাবছি। এমনিভাবে রাত ভোর হতে চলল। চারদিক থেকে গুলির শব্দ আসছে। শরীর ও মন অবসন্ন হয়ে উঠছে।
&nbsp;
সকালে আমি বাথরুমে গেলাম। আয়নায় নিজের চেহারা দেখলাম। মনে হলো এক রাতে একটা শতাব্দী পার হয়ে গেছে।
<strong> </strong>
পাশে পড়ে ছিল গফুর সাহেবের ব্লেড। ১৯৬১ সালে লণ্ডনে ব্যারিস্টারি পড়ার সময় সযত্নে রক্ষিত ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি কেটে নিলাম। বাথরুম থেকে বেরিয়ে আসার পর তাজউদ্দিন ভাই অবাক বিস্ময়ে আমার দিকে তাকালেন। বুঝলাম<strong>, </strong>দাড়ি কাটা কাজ দেবে। ২৬ শে মার্চ সকালে দু<strong>'</strong>জন বসে গত রাত থেকে ঘটনাগুলো বুঝবার চেষ্টা করলাম। নিজেদের কর্তব্য স্থির করতে দেরী করিনি। এই অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে প্রথম কাজ হলো এই বাড়ী ত্যাগ করা। বাড়ীর সামনে দিয়ে পাক বাহিনীর টহলদার জীপ আসা-যাওয়া করছে। রুমাল বেঁধে কিছু লোক জীপে করে পাক সেনাদের সাথে ঘুরছে। তারা বাঙালি নেতা-কর্মীদের বাড়ীঘর<strong>, </strong>অবস্থান পাক বাহিনীকে দেখিয়ে দেয়ার কাজে সহায়তা করছে আন্দাজ করলাম।
&nbsp;
স্থানীয় সংগ্রাম কমিটির একটি চালাঘরে কয়েকজন কর্মী আত্মগোপন করে রয়েছে। তাদের কাছে একটা রেডিও ছিল। ওরা রেডিওর খবরাখবর শুনছে।
<strong> </strong>
২৬শে মার্চ সন্ধ্যায় প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া বক্তৃতা দেন। আমরা দেয়ালে কান পেতে বেতারে ইয়াহিয়ার বক্তৃতা শুনি। পাক প্রেসিডেন্ট বক্তৃতায় আওয়ামী লীগ ও বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে বিষোদ্গার করেন। জনগনের শতকরা ৯৭ ভাগ ভোট লাভকারী আওয়ামী লীগকে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান বেআইনী ঘোষণা করেন। ইয়াহিয়ার গলা থেকে সুতীব্র ক্রোধ বেরিয়ে আসে। ইয়াহিয়ার বক্তৃতা ও গত কয়েক ঘন্টার নৃশংস হত্যাকাণ্ড আমরা মিলিয়ে দেখার চেষ্টা করি।
<strong> </strong>
দু<strong>’</strong>জনে ঠিক করলাম<strong>, </strong>পাক বাহিনীর এই বর্বরোচিত হামলার খবর যে কোন ভাবে বিশ্ববাসীকে জানাতে হবে। ২৫ শে মার্চে ঢাকার গণহত্যার খবর ভারত কিংবা বিশ্বের কোন বেতারে প্রচারিত হয় নি। তবে ২৬ শে মার্চ রাতে অস্ট্রেলিয়া বেতার ঢাকার গণহত্যর খবর প্রচার করে।
<strong> </strong>
পাক বাহিনী আমাদের বাড়ী সার্চ করতে পারে এই আশংকায় আমরা কিছুটা চিন্তিত হয়ে পড়ি। প্রথম সমস্যা তাজউদ্দিন আহমদের রাইফেল। যদ্দিন আমরা এই বাড়ীতে ছিলাম<strong>, </strong>এর সমাধান করতে পারি নি। দ্বিতীয় সমস্যা<strong>, </strong>আমরা তিনজন পুরুষ মানুষ ছাড়া এ বাড়ীতে কোন মেয়ে মানুষ নেই। মেয়ে লোক না থাকাতে আমাদের অবস্থান নিয়ে প্রশ্নের সৃষ্টি হতে পারে।
<strong> </strong>
এই অবস্থায় তাজউদ্দিন ভাই এর নাম মহম্মদ আলী আর আমার নাম রহমত আলী ঠিক করে নেই। সার্চ হলে বলা হবে মহম্মদ আলী চাঁদপুরে গফুর সাহেবের ঠিকাদারীর কাজ তদারকি করেন। আর আমার বাড়ী পাবনা<strong>, </strong>আমি গৃহস্বামীর ভাই এর ছেলে। ঢাকায় বেড়াতে এসেছি।
&nbsp;
২৬শে মার্চ সারাদিন গফুর সাহেবের বাড়ীতে আটক থাকি। বাইরএ কার্ফু। চারদিকে মিলিটারী জীপ টহল দিচ্ছে। ফিজিক্যাল এডুকেশন কলেজের উপর সেনাবাহিনীর ক্যাম্প করেছে। উপরে সার্চ লাইটের মতো কি যেন একটা বসানো হয়েছে। এটা দেখে মনে হয় একটা যুদ্ধের ছাউনী। কলেজের ছাদের ওপরে মেশিনগান তাক করে ওরা কন্ট্রোল রুম থেকে সকল এলাকা পাহারা দিচ্ছে। আমরা যে বাড়ীতে আছি সে বাড়ী থেকে সব দেখা যাচ্ছে। আমরা আশংকা করছি যে কোন মুহূর্তে বাড়ী বাড়ী তল্লাশী শুরু হতে পারে।
&nbsp;
পরদিন ঘুম থেকে উঠে লক্ষ্য করলাম<strong>, </strong>কার্ফু ও গোলাগুলির মধ্যেও সাধারণ মানুষের গতি অব্যাহত রয়েছে। সামনে রাজপথ নিয়ে লোকজনের চলাচল নেই। কিন্তু ভেতরের রাস্তা দিয়ে সাধারণ মানুষ চলাচল করছে। ছোট ছোট ছাপড়া দোকানগুলো ঝাপ উঠিয়ে সওদা বিক্রয় করছে। কাজের মেয়েরা কলসী দিয়ে পানি নিচ্ছে। মনে মনে ঠিক করলাম<strong>, </strong>সাধারণ মানুষের মধ্যে মিশে গেলে আমার চলাচলেও কোন অসুবিধা হবে না।
<strong> </strong>
আমি একাই বাড়ী থেকে বেরিয়ে পড়ি। যে কোনভাবে সাত মসজিদ রোড পার হতে হবে। আমার অবস্থান থেকে সাত মসজিদ রোড বেশ দূরে। আমার খুবই পরিচিত কুষ্টিয়ার আতাউল হক সপরিবারে সাত মসজিদ রোডের কাছাকাছি থাকেন। গলি দিয়ে পার হচ্ছি। পথে একজন মৌলানাকে পেলাম। এমনিতেই তার সাথে কথা বলি। তিনি লালমাটিয়ার পুরাতন অধিবাসী। মৌলানা সাহেব আতাউল হককে চিনেন। তার সাহায্যে আতাউল হকের বাড়ীতে পৌছি। মৌলানাকে বললাম<strong>, </strong>আমি হক সাহেবের আত্মীয়<strong>, </strong>পাবনা থেকে এসেছি। ওরা আমাকে দেখে প্রথমে চিনতে পারে নি। পরে জড়িয়ে ধরে বাড়ীর ভেতর নিয়ে গেল।
<strong> </strong>
মৌলানাকে ঐ বাড়ীতে আমার আত্মীয় মহম্মদ আলী আছেন<strong>, </strong>তাকে নিয়ে আসার জন্য বললাম। কিছুক্ষণ পর মহম্মদ আলী এসে হাজির হলেন।
<strong> </strong>
হক সাহেবের বাড়ীতে আমাদের নাশতা তৈরী করতে ওরা ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এরই মধ্যে আমি আবার বেরিয়ে পড়েছি। বিভিন্ন বাড়ীর পেছনের অলিগলি দিয়ে পথ চলছি। আমার আশংকা হচ্ছিল এই বাড়ী থেকে বেরোতে না পারলে আটকে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কোন কোন স্থানে হামাগুড়ি দিয়ে সাত মসদিজ রোডে পৌছার চেষ্টা করছি। হঠাৎ করে একটি মিলিটারী জীপ এই রাস্তায় ঢুকে পড়ে। রাস্তায় ঢুকেই ওরা এলোপাথাড়ি গুলি ছুড়ে। আমি একটি বাড়ির পাশে নিজেকে লুকিয়ে রাখি। জীপটি ফিরে যেতেই আমি আতাউল হকের বাড়ীতে ফিরে আসি। কিছুক্ষণ পর এ ধরনের গোলাগুলি চরম আকার ধারণ করে। কোথাও আগুন জ্বলছে। ভয়ার্ত মানুষের আর্তচীৎকারে পরিবেশ ভয়াবহ হয়ে ওঠে।
<strong> </strong>
আতাউল হকের ঘরের বেড়া ও চাল টিন দিয়ে তৈরী। টিনের বেড়া ফুটো করে গুলী যে কোন একজনের গায়ে লাগতে পারে। গৃহকর্ত্রী বলেন<strong>, </strong>পাশের পাকা বাড়ীতে চাকর ছাড়া অন্য কোন লোকজন নেই। আমরা ইচ্ছা করলে দেয়াল টপকে সেখানে যেতে পারি। তার কথায় আমি পাশের পাকা বাড়ীতে যাই। তাজউদ্দিন ভাই ঐ বাড়ীতে গেলেন না।
<strong> </strong>
এলোপাথাড়ি গুলি প্রায় আধা ঘন্টা ধরে চলে। পরে শুনেছি<strong>, </strong>এটা ছিল প্রথম পর্যায়ের অপারেশন। পাক বাহিনীর উদ্দেশ্য ছিল পরিবেশকে আতংকিত করে ঢাকাবাসীকে গ্রামের দিকে ঠেলে দেয়া। বস্তি এলাকা পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। নীড়হারা বস্তির হাজার হাজার মানুষ বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় নিয়েছে। ছিন্নমূল মানুষগুলো সামান্য আসবাবপত্র ও ছোটছোট ছেলেমেয়েদের কোলে দিয়ে এসেছে এখানে। কার্ফু জারী থাকা অবস্থায়ও এলোপাথাড়ি গুলি চলে। এমন সময় একটি মাইকে কেউ বলে গেল<strong>, </strong>কিছুক্ষণের জন্য কার্ফু তুলে নেয়া হয়েছে।
<strong> </strong>
সে সময় একজন ছাত্র এ বাড়ীতে আসে। সে আমাদেরকে চিনতে পারে। তার মুখে শহরের টুকরো টুকরো খবর পেলাম। আমাদের প্রধান জিজ্ঞাসা ছিল ৩২ নম্বরে কি হয়েছে<strong>? </strong>ছাত্রটি সঠিক কিছু বলতে পারলো না। তবে বঙ্গবন্ধুর ব্যাপারে দু<strong>'</strong>ধরনের খবর শুনেছে। কেউ বলেছে বঙ্গবন্ধু সরে গেছেন। আবার কেউ বলেছে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
<strong> </strong>
বাইরে কার্ফু না থাকায় আমরা বাড়ী ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেই। আমাদের দুজনের হাতে ১টি করে বাজারের থলি। যেন আমরা বাজার করতে যাচ্ছি। তাজউদ্দিন ভাই এর পরনে লুঙ্গি ও পাঞ্জাবী<strong>, </strong>মাথায় সাদা টুপি। বাজারের থলির নীচে তার নিজের ব্যাগ রাখা হয়েছে।
<strong> </strong>
আমরা সাত মসজিদ রোডে পৌছি। আর একটু এগিয়ে ডান দিকে মোড় নিলে ১৯ নম্বর রাস্তা। সেটা পার হলেই রায়ের বাজার। এমন সময় আমাদের পেছনে একটি মিলিটারী জীপ এলো। জীপটি চলে যেতেই আমরা আবার রাস্তায় চলে আসি। ডানে মোড় নিলে লালমাটিয়ার সীমানা পেরিয়ে ১৯ নম্বর সড়ক। ডানে মোড় নেব এ সময় তাজউদ্দিন ভাই থমকে দাঁড়ান। আর একটু এগুলেই ডান পাশে তার বাড়ি। তিনি তার বাড়ী যেতে চাইলেন। আমি জোর আপত্তি জানাই। যুক্তি দিলাম<strong>, </strong>আপনার বাড়ী নিশ্চই আক্রান্ত হয়েছিল। হায়েনার দল এখনো বাড়ীর আশেপাশে আড়ি পেতে বসে থাকতে পারে। তাজউদ্দিন ভাই-এর মনে পড়লো তার ঔষধগুলোর কথা। সেগুলো বাড়ীতে রয়ে গেছে। বাড়ীতে আর যাওয়া হলো না।
<strong> </strong>
ডান দিকে মোড় নিয়ে আমরা রায়ের বাজারে পৌছি। এখানে আওয়ামী লীগ কর্মীদের একটি শক্ত ঘাঁটি তখনো রয়েছে। নির্ভীক কর্মীরা সংগ্রাম কমিটির অফিস পাহারা দিচ্ছে। এদের সাহস দেখে একদিকে যেমন বিস্মিত হলাম<strong>, </strong>অপরদিকে আমার হাসিও পেল। কেননা প্রবল প্রতিদ্বন্দী সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে এ ধরনের মোকাবেলা সাহসের দিক দিয়ে অপ্রতিদ্বন্দী হলেও কৌশলের দিক দিয়ে একেবারেই সমর্থনযোগ্য নয়।
<strong> </strong>
পাক বাহিনীর হামলা তখনো আসে নি। এলাকাবাসীর মনের ভয়ের লেশমাত্র নেই। সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক ও অন্যান্য নেতাকর্মীদের সাথে আমাদের কথা হলো। তারা আমাদের কাছে এই মুহুর্তের করণীয় জানতে চাইল। আমরা সংক্ষেপে তাদের কয়েকটি নির্দেশ দেই।
<strong> </strong>
রায়ের বাজার থেকে দুজন লোককে দু’দিকে পাঠালাম। একজন গেল ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর খোঁজখবর জানতে<strong>, </strong>আর অপরজনকে পাঠালাম মুসা সাহেবের বাসায় ডঃ কামাল এসেছেন কিনা তা জানার জন্য। ৩২ নম্বরের খোঁজ নিয়ে আমাদের প্রেরিত লোক ফিরে এসে জানায় বঙ্গবন্ধুর বাড়ীর সামনে পুলিশ নিহত হয়ে পড়ে রয়েছে। বাড়ীতে কোন লোকজন নেই। পরস্পর জানতে পেরেছে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে নিয়ে গেছে। আর মুসা সাহেবের বাড়ীতে খোঁজ নিয়ে জানা গেল<strong>, </strong>ডঃ কামাল হোসেন সেখানে পৌছুতে সমর্থ হন নি।
<strong> </strong>
সংগ্রাম কমিটির এই অফিসে চারদিক থেকে বিচ্ছিন্নভাবে খবর আসছে। মানুষের মুখে মুখে খবর প্রচার হয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন সূত্রে জানা গেল শেখ ফজলুল হক মনি<strong>, </strong>সিরাজুল আলম খান<strong>, </strong>আবদুল রাজ্জাক<strong>, </strong>তোফায়েল আহমদ প্রমূখ নদী পার হয়ে জিনজিরার দিকে চলে গেছেন। শেখ কামাল ও শেখ জামাল বাসা থেকে পালিয়ে গেছে। সৈয়দ নজরুল ইসলাম<strong>, </strong>মনসুর আলী<strong>, </strong>কামরুজ্জামান প্রমুখ নেতৃবৃন্দের কোন খোঁজ-খবর জানতে পারলাম না।
<strong> </strong>
কিছুক্ষণের মধ্যে আমরা এ স্থান ত্যাগ করব। সেখানে জমায়েত নেতাকর্মীদের বললাম<strong>, </strong>সংগ্রামকে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ মোতাবেক গ্রামে গঞ্জে ছড়িয়ে দিতে হবে। আমরা বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ মোতাবেক বেরিয়েছি। তারা সময়ে সময়ে নির্দেশ পাবে।
<strong> </strong>
ইতিমধ্যে আমরা অনেক ভেবেছি। পাক বাহিনীর নগ্ন হামলার জবাব দিতে হবে। বাংলার দামাল যুবকদের পুনর্গঠিত করতে হবে। ২৭শে মার্চ রায়ের বাজারের কর্মীদের কাছ থেকে আমরা বিদায় নিলাম। এই বিদায় ছিল মর্মস্পর্শী। তাজউদ্দিন ভাইকে আমি বলি<strong>, </strong>এখন পথই আমাদের ঠিকানা<strong>, </strong>পথই আমাদের সঠিক পথে পৌঁছে দেবে। বিদায়ের সময় রায়ের বাজারের একজন কর্মী জিজ্ঞাসা করেন আমাদের পরিবারের জন্য কিছু বলার আছে কিনা। আমরা দু<strong>'</strong>জনে দু<strong>'</strong>টুকরো কাগজ নিয়ে কিছু লিখে তাদের হাতে দিলাম। কর্মীরা পৌঁছে দেয়ার দায়িত্ব নিলেন। তাজউদ্দিন ভাইয়েরটা পৌঁছুল<strong>, </strong>আমারটা কর্মীরা পৌঁছাতে পারেনি। শুনেছি আমার বাড়ীওয়ালী কাউকে বাড়িতে ঢুকতে দেননি। আমার খোঁজে কেউ আসলে তাকে ভয় দেখাতেন।
<strong> </strong>
পরবর্তীকালে দু<strong>'</strong>জনে আলাপ করে দেখেছি স্ত্রীর কাছে আমাদের দু<strong>'</strong>জনের লেখার মাঝে আশ্চর্য রকমের মিল ছিল। আমাদের বক্তব্যের সারমর্ম ছিল আমরা এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে পা বাড়িয়েছি। কবে এর শেষ হবে জানি না। আট কোটি মানুষের সাথে মিশে যাও। যদি বেঁচে থাকি<strong>, </strong>তাহলে দেখা হবে।
<strong> </strong>
আমরা আবার যাত্রা করি। তাজউদ্দিন আহমদের পায়ে কাপড়ের জুতা। হাঁটতে তার কষ্ট হচ্ছে। হাঁটতে হাঁটতে তার পায়ে ফোসকা পড়ে যায়। জুতা খুলে তিনি হাঁটতে থাকেন।
<strong> </strong>
আমরা রায়ের বাজার থেকে নদী পার হয়ে নবাবগঞ্জ থানায় যাব। অগণিত লোক পার হয়ে যাচ্ছে। পার হয়ে হেঁটে চলেছি। ঢাকা থেকে ভাগ্যাহত মানুষ যাচ্ছে। চারদিকে শুধু মানুষ আর মানুষ রয়েছে। পাক বাহিনীর বর্বর অত্যাচারে লোকজন ঢাকা ছেড়ে চলে যাচ্ছে। মানুষের মিছিলে সর্বশ্রেণির মানুষ রয়েছে। এই মিছিলে আমরা মিশে গেছি। কেউ জানে না আমরা কারা। শুধু জানি আমিও ওদের একজন। চলতে চলতে এক সময় হয়তো এক বৃদ্ধার মাথার পুঁটলিও নিজের হাতে নিয়েছি। কখনো বা কোন ছোট শিশুকে কোলে করে পার করে দিয়েছি।
<strong> </strong>
আমাদের গতি দ্রুত। ক্ষুধা তৃষ্ণায় কাতর হাজার হাজার মানুষ উত্তপ্ত বালির ওপর দিয়ে চলেছে। রাস্তার দু<strong>'</strong>পাশে গ্রামের মানুষ মিছিলের মানুষকে উদার হস্তে খাওয়াচ্ছে<strong>,</strong> আশ্রয় দিচ্ছে। ডেকে ডেকে মানুষকে খাওয়াচ্ছে। আতিথেয়তার প্রতিযোগিতা ছিল প্রতিটি গৃহে। সেদিন বাঙ্গালির জন্য বাঙ্গালিদের দরদ দেখেছিলাম<strong>, </strong>এতে আমি নিশ্চিন্ত হই যে বাংলার স্বাধীনতা কেউ ঠেকাতে পারবে না।
<strong> </strong>
চলার পথে একজন সিপাই যুবকের সাথে কথা হলো। তার পরনে লুঙ্গি। ২৫শে মার্চ রাতে সে রাজারবাগ পুলিশ লাইনে ছিল। সে রাতে কিভাবে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচলো<strong>, </strong>কিভাবে তার সঙ্গী সাথীরা পাক বাহিনীর বর্বরতার শিকার হলো<strong>, </strong>এই ভয়াবহ কাহিনী তার মুখ থেকে শুনলাম। অন্য একজন সিপাই। সে মিটফোর্ড হাসপাতালে একজন রাজবন্দীর পাহারায় ছিল। অতি কষ্টে সে জীবন নিয়ে চলে এসেছে।
<strong> </strong>
কাফেলাতে শুধু জীবন্ত মানুষ নয়<strong>, </strong>এখানে রয়েছে লাশ। কয়েক দিনের পুরনো লাশও রয়েছে। প্রিয়জনের মৃতদেহ ওরা ঢাকা থেকে গ্রামের বাড়ীতে নিয়ে যাচ্ছে। পথে পথে অনেক জানাজা হতে দেখলাম। ঢাকাতে যারা শহীদ হয়েছে তাদের লাশ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে।
<strong> </strong>
পথিমধ্যে তাজউদ্দিন ভাইকে অনেকে চিনে ফেলে। একজন আওয়ামী লীগ কর্মী আমাদের আপত্তি সত্ত্বেও এক প্রকার জোর করে তার বাড়ী নিয়ে গেলেন। তার জোর দাবী কিছু মুখে দিয়ে যেতে হবে।
<strong> </strong>
আমরা ক্ষুধা তৃষ্ণা এক প্রকার ভুলে গেছি। চা ও বিস্কুট খেলাম। কিছু বিস্কুট পকেটে নিয়ে আবার পথ চলা শুরু করি।
<strong> </strong>
যাবার আগে কর্মীদের উদ্দেশ্যে বলে গেলাম<strong>, </strong>সংগ্রাম কমিটির আওতায় সব কিছু পরিচালনা করতে হবে। শত্রুদের ওপর কড়া নজর রাখতে হবে। শত্রুদের খবর পেলে আত্মরক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে।
<strong> </strong>
পথ চলতে চলতে এক সময় বেলা পড়ে গেল। সামনে নদী। এই নদী পার হলে নবাবগঞ্জ থানা পার হয়ে আমরা দোহার থানায় যাব। খেয়া নৌকায় লোকজনকে পার করে দেয়া হচ্ছে। তবুও নদীর দু<strong>'</strong>ধারেই মানুষের ভিড়। তবে মানুষকে পার করে কেউ কোন পয়সা নিচ্ছে না। আশেপাশের মানুষ নিজেদের নৌকা দিয়ে ভাগ্যাহত জনতাকে পার করে দিচ্ছে। আমরাও অন্যান্য যাত্রীর সাথে একটি নৌকায় পার হই। নৌকাওয়ালা পয়সা নিতে রাজী হলো না।
<strong> </strong>
ওপারে নেমেই দেখি একজন যুবক দাঁড়িয়ে। আমাদেরকে জড়িয়ে ধরল। সে যেন আনন্দে আত্মহারা। যুবক মোটর সাইকেল নিয়ে এসেছে। সে বলল<strong>, </strong>আপনাদের নেয়ার জন্যই আমরা এখানে অপেক্ষা করছি।
<strong> </strong>
মোটর সাইকেলে দুইজনের বেশী ওঠা যায় না। প্রথমে তাজউদ্দিন ভাইকে নিয়ে গেল তার গ্রামে। আমি হাটতে থাকি। পরে আমাকেও নিয়ে গেল। সে গাঁয়ে আওয়ামী লীগের এক বিশিষ্ট নেতার বাড়ীতে আমাদের থাকার ব্যবস্থা হলো। স্বাভাবিকভাবেই আমরা ক্ষুৎপিপাসায় কাতর। বাড়ীর সামনে পানি ভরা পুকুর। সন্ধ্যা হওয়া সত্ত্বেও দু<strong>'</strong>জনে গোছল করি। এরপর বৈঠকে বসি। ইতিমধ্যে এই বাড়ীতে অনেক লোক জমা হয়ে গেছে। স্থানীয় নেতা-কর্মীদের সাথে বিস্তারিত আলোচনা শেষে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেয়া হলো।
<strong> </strong>
আহার শেষে দু<strong>'</strong>জনে এক চৌকিতেই ঘুমাতে যাই। পরদিন ভোরে আমাদের যাওয়ার জন্য ২টি মোটর সাইকেলের ব্যবস্থা করা হয়। আমাদের অবস্থান থেকে পদ্মার দূরত্ব ৫০ মাইল। মোটর সাইকেলযোগে রওনা হয়ে রোদ উঠতে না উঠতে আমরা সুবেদ আলী এমপি<strong>'</strong>র বাড়ীতে পৌছি। সুবেদ আলী টিপু ব্যারিষ্টারী পড়তে বিলেত গিয়েছিলেন। বিলেতে থাকাকালে তার সাথে আমার পরিচয়। তিনি একজন উৎসাহী দলীয় সদস্য।
<strong> </strong>
এই বাড়ীতে আমরা আবার বৈঠকে বসি। সেখানে কৃষক নেতা জিতেন বাবুর সাথে দেখা হলো। তিনি ন্যাপ এর সদস্য। ঘন্টাখানেক পরে আমরা আবার যাত্রা করি। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা অপর একজন এমপি এ আশরাফ চৌধুরীর বাড়ীতে পৌঁছে যাই। গৃহস্বামী মাত্র ১ ঘন্টা আগে বাড়ী পৌঁছেছেন। তিনি ২৫শে মার্চের কালরাতে ঢাকায় ছিলেন। বিরাট দ্বিতল বাড়ী। পানি এনে স্নানের ব্যবস্থা করা হয়। এখানে কিছু খেয়ে আবার পথ চলা শুরু করি। পথ দেখাবার জন্য স্কুলের একজন বাঙালি দফতরী আমাদের সাথে রয়েছেন। পদ্মার তীরে পৌছতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। প্রমত্ত পদ্মার বুকে তখন প্রচণ্ড ঢেউ। কয়েকটি নৌকা তীরে বাঁধা রয়েছে। বহু অনুরোধ সত্ত্বেও কোন নৌকা আমাদের ওপারে নিয়ে যেতে সাহস পেল না। অগত্যা তীর থেকে আমরা আগারগাঁও নামক একটি গ্রামে ফিরে এলাম। আমাদের দলীয় একজন কর্মী-বন্ধুর বাড়িতে রাত্রি যাপন করি।
<strong> </strong>
বাড়ীর লোকেরা তাঁতের কাজ করে খায়। স্নান করে খেতে যাব<strong>, </strong>হঠাৎ স্বাধীন বাংলা বেতারের অনুষ্ঠান কানে ভেসে আসলো। ঘোষক বেতারে বলছেন<strong>, </strong>বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন। অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে হাজির হতে বেতারে নির্দেশ দেয়া হলো। প্রথমে এদের নাম-ধাম কিছুই বুঝা গেল না। ঠাওর করে উঠতে পারলাম না<strong>, </strong>কারা কোত্থেকে এই বেতার চালাচ্ছে। পরে বেতারে মেজর জিয়ার কন্ঠ শোনা গেল। তিনি বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহবান জানান।
<strong> </strong>
মেজর জিয়ার আহবান বেসামরিক<strong>, </strong>সামরিক তথা বাংলার সর্বশ্রেণীর মানুষকে সংগ্রামে উজ্জীবিত করে। পরদিন এই বেতার থেকে টিক্কা খানের আহত হবার কথা শুনি। তাছাড়া মুক্তিযোদ্ধাদের বিজয়ের অনেক খবর প্রচার করা হয়।
<strong> </strong>
আমরা দু<strong>'</strong>জন গভীরভাবে উপলব্ধি করলাম যে অবিলম্বে একটি সরকার গঠন করা প্রয়োজন। পরদিন ভোরবেলা আবার রওনা হই। পদ্মা তখন শান্ত। মাঝ নদীতে চর পড়েছে। আমাদের তাই দুই অংশে পার হতে হবে। আমাদের সাথে আশরাফ আলী চৌধুরীর স্কুলের পিওন রয়েছে।
<strong> </strong>
পদ্মার ঘাটে ছোট বড় অনেক নৌকা। অনেক নৌকা খুলনা বরিশালে ধান কাটতে যাচ্ছে। আমরা ভাবছি এবারে ফসল কেটে সব নৌকা কি ঘরে ফিরতে সমর্থ হবে<strong>? </strong>এমনিভাবে ভাবতে ভাবতেই নদী পার হওয়ার জন্য নৌকায় উঠছি। সাধারণ মানুষের সাথে কথা বলছি। সকলের মনেই ভীতির ভাব। এমন সময় আইডব্লিউটিএ<strong>'</strong>র একটি মোটর যান দেখা গেল শব্দ করে আমাদের দিকে আসছে। কেউ কেউ এটাকে পাক সামরিক বাহিনীর মোটর যাব ভেবে আশংকা প্রকাশ করে। আমি বললাম<strong>, </strong>এত তাড়াতাড়ি ওরা ঢাকা ছেড়ে আসতে পারে না। মোটর যানটি কাছে আসার পর দেখা গেল এতে কিছু সাধারণ যাত্রী রয়েছে। পরে শুনেছি<strong>, </strong>পাক বাহিনী যাতে ব্যবহার না করতে পারে এ জন্য শ্রমিকরা এই বোটগুলোকে নিয়ে এসেছিল।
<strong> </strong>
আমরা নদীর ওপারের খবর জানি না। সেখানে একটি বাজার দেখা যাচ্ছে। একটি নৌকা করে আমরা নদীর ওপারে যাই। আর নদীর এপার থেকেই পথ দেখাতে আসা স্কুলের পিওনকে বিদায় করে দেই।
<strong> </strong>
বাজারের পাশেই একটা মাঠ। মাঠে কেউ লাঙ্গল চালাচ্ছে কেউ বা অন্যান্য কাজ করছে। চারদিকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক মনে হলো। এই অবস্থায় আমরা বাজারে গিয়ে পৌছি। বাজারে গিয়েই সেখানকার সংগ্রাম পরিষদের কর্মীদের সাথে দেখা হলো।
<strong> </strong>
আমরা এখান থেকে ফরিদপুর যাব। সেখান থেকে পায়ে হেঁটে ছাড়া অন্য কোন পথে যাওয়ার সুযোগ নেই। এমনকি পায়ে হাঁটা পথও ভাল নয়। খাল<strong>, </strong>বিল<strong>, </strong>নালা পেরিয়ে যেতে হবে। তবে ঘোড়ায় চড়ে যাওয়া যায়। অগত্যা আমরা দুটি ঘোড়াই ভাড়া নেই। এই বাজার থেকে ৭ মাইল দূরে ফরিদপুর শহর। ঘোড়ায় চড়ে শহরের এক প্রান্তে নামি। সেখান থেকে রিক্সাযোগে আওয়ামী লীগ নেতা ও এমপি ইমামউদ্দিনের বাড়িতে উপস্থিত হই। বাড়ীতে পা দিয়েই বুঝলাম লোকজন বেশ শংকিত। গত রাতে শহর থেকে লোকজন গ্রামে চলে গেছে। ঢাকা থেকে লোকজন এসে সেখানকার ভয়াবহ পরিস্থিতির কথা বর্ণনা দিয়েছে। ঢাকার মর্মান্তিক হত্যাযজ্ঞের কথা শুনেই লোকজন রাতের বেলা শহর থেকে চলে যায়।
<strong> </strong>
ইমামউদ্দিনের স্ত্রী খুবই সাহসী মহিলা। বাড়ীতে তিনি একা। ইমামউদ্দিন বাড়ীতে নেই<strong>, </strong>তিনি সংগ্রাম পরিষদের নেতা-কর্মীদের নিয়ে আশেপাশের পুলিশ ও বি ডি আর-এর সাথে যোগাযোগ রক্ষা করছেন। স্ত্রীর কাছ থেকে খবর পেয়ে ইমাম সাহেব বাড়ী আসেন। তাড়াতাড়ি ডালভাত রান্না হলো। শহরের লোক আশংকা করছে এখানে যশোরের পাক সৈন্যরা যে কোন সময় হামলা করতে পারে।
<strong> </strong>
আমরা সবে মাত্র খেতে বসেছি। এমন সময় খবর এলো পাক সৈন্য এদিকে আসছে। কোন দিক দিয়ে আসছে সে সময় তা বুঝা গেল না। চারদিক লোকজন ছুটোছুটি করছে প্রাণ ভয়ে। মনে মনে ঠিক করলাম এখান থেকে মাগুরার পথে রওনা হবো। সেখান থেকে যশোর সেনানিবাস ও আশেপাশের খবর পাওয়া যাবে।
<strong> </strong>
স্থানীয় নেতাকর্মীদের সাথে আলোচনা শেষে আমরা ফরিদপুর ত্যাগ করি। রাস্তার বিভিন্ন অংশ কেটে দেয়া হয়েছে পাক সৈন্যরা গতি রোধ করার জন্য। একটা রিক্সাযোগে আমরা কামারখালীর পথে চলেছি। কোথাও কোথাও নিজেরা রিক্সা পার করেছি। এমন সময় ফরিদপুরের দিকে একটি জীপ আসতে দেখি। জীপটি কার তা দেখার জন্য আমরা রাস্তার আড়ালে চলে যাই। কিছুক্ষণ পর বুঝলাম জীপটিকে অসামরিক লোক রয়েছে। জীপে চালকের সাদা পোশাক পরিহিত একজন ভদ্রলোক বসা। রাস্তায় এসে জীপটি থামাবার ইঙ্গিত দেই। পরিচয় নিয়ে জানলাম তিনি রাজবাড়ীর মহকুমা প্রশাসক। নাম শাহ ফরিদ। তার কাছে টুকরো টুকরো খবর পেলাম।
<strong> </strong>
শাহ ফরিদ মেহেরপুর গিয়েছিলেন। সেখান থেকে তিনি চুয়াডাঙ্গার সাথে যোগাযোগ করেছেন। তিনি জানান<strong>, </strong>মেহেরপুরের মহকুমা প্রশাসক তওফিক ইলাহী চুয়াডাঙ্গার পুলিশ ও বি ডি আর এর সাথে যোগাযোগ করে পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন। ঝিনাইদহ<strong>, </strong>যশোর<strong>, </strong>রাজবাড়ী ও কুষ্টিয়ার জনগণ পাক সৈন্যের বিরুদ্ধে অবরোধ সৃষ্টি করছে। সেখানে চলছে যুদ্ধের প্রস্তুতি। এসব খবর শুনে আমরা দু<strong>'</strong>জন আশান্বিত হই।
&nbsp;
শাহ ফরিদ আমাকে চিনল কিনা বুঝলাম না। ঢাকার পরিস্থিতি তাকে জানাই। আমি বললাম<strong>, </strong>আমরা আওয়ামী লীগ হাই কমান্ডের পক্ষ থেকে এই এলাকার পরিস্থিতি সরেজমিনে দেখতে এসেছি। পরে শাহ ফরিদ পাক বাহিনীর হাতে ধরা পড়েন।
&nbsp;
রাজবাড়ী ও ফরিদপুরের পুলিশ ও বিডিআরদের কুষ্টিয়ার মুক্তিসংগ্রামীদের সাথে মিলিত হবার কথা ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা আর হয়ে ওঠে নি। আরো কিছুক্ষণ এগিয়ে রিক্সা ছেড়ে দেই। স্থানীয় একটি বাসে অন্যান্য কয়েকজন যাত্রীর সাথে আমরাও উঠি। কিছুদূর যেয়ে বাসটি আর যেতে পারলো না। এখন আমার সাথে অনেক যাত্রী। কামারখালী পৌঁছতে সন্ধ্যা হয়ে গেলো।
&nbsp;
সামনে নদী পার হতে হবে। একটি মাত্র খেয়া নৌকা। যাত্রী বেশি। নদীর স্রোত অত্যন্ত প্রবল। নৌকা প্রায় ডুবে যাওয়ার অবস্থা। অনেক কষ্টে নদী পার হলাম। আকাশে চাঁদ ঝলমল করছে। হাঁটতে আমাদের বেশ সুবিধা হলো। এখান থেকে মাগুরা ৮ মাইল। আমাদের সাথে আরো অনেকে রয়েছে। তারা ঢাকা থেকে এসেছে। এদের মধ্যে কিছু ছাত্র-যুবকও রয়েছে। আমরা এদের মধ্যে অচেনা রয়ে গেছি<strong>, </strong>যেমনি ছিলাম সারা পথে। ঘনিষ্ঠ কর্মী ছাড়া কারো কাছে নিজেদের পরিচয় দেই নি।
<strong> </strong>
সন্ধ্যাবেলা কামারখালী ঘাটে রেডিও শুনি। রেডিওর কাছে বহু লোক ভিড় করে। বেতারে টুকরো টুকরো খবর প্রচার হয়। <strong>'</strong>মুক্তিবাহিনীর গুলিতে টিক্কা খান আহত<strong>,’ </strong>পাক বাহিনী পালিয়ে যাচ্ছে ইত্যাদি। বেতারে সকলকে সতর্ক থাকার আহবান জানানো হয়।
&nbsp;
মাগুরা খালের ওপর কাঠের পুলটি পুড়তে দেখলাম। শত্রুদের গতিরোধ করার জন্য নিজেরাই পুল পোড়াচ্ছে। টর্চের আলোতে ওপারে সঙ্গীন দেখা গেল। বললাম<strong>, </strong>আমরা বন্ধু। পার হবার জন্য একটি মাত্র ছোট নৌকা ছিল। দুই জনের বেশী নৌকায় ওঠা যায় না। আমরা দুইজন সকলের শেষে পার হই।
&nbsp;
ওপারে গেলে সকলের দেহই তল্লাশি করা হলো। আমার পর তাজউদ্দিন ভাই-এর পালা। মুখের দিকে তাকিয়েই তাকে জড়িয়ে ধরলো। নেতাকে চিনতে পেরেছে। তাজউদ্দিন ভাইও তাকে জড়িয়ে ধরেন।
&nbsp;
রাত তখন অনেক। একটি রিক্সাওয়ালাকে বাড়ী থেকে ডেকে আনা হলো। আমরা দু<strong>'</strong>জনে রিক্সায় আর সে হেঁটে চলে। অনেক রাতে আমরা আওয়ামী লীগ নেতা সোহরাব হোসেনের বাড়ি পৌছি। সোহরাব ভাই-এর স্ত্রী রাতের বেলা আমাদের জন্য রান্না করেন। খেতে খেতে ভোর হয়ে গেল।
&nbsp;
সোহরাব হোসেন এখান থেকে সংগ্রাম পরিচালনা করছেন। মাগুরার মহকুমা প্রশাসক কামাল সিদ্দিকী মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে সক্রিয়ভাবে কাজ করছেন। স্থানীয় কর্মীরা তার ভূয়সী প্রশংসা করলেন।
&nbsp;
সিদ্দিকী আমার পূর্ব পরিচিত। বিশ্ববিদ্যালয় সমাবর্তন অনুষ্ঠানে অন্যান্য কয়েকজনের সাথে সিদ্দিকীকেও বহিষ্কার করা হয়েছিল। আমি তার পক্ষে কৌসুলি ছিলাম। পরবর্তীকালে স্বাধীনতা সংগ্রাম চলাকালেও সিদ্দিকী উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেন।
&nbsp;
আমরা দু<strong>'</strong>জন ও সোহরাব ভাই জীপযোগে জেলা বোর্ডের রাস্তা দিয়ে ঝিনাইদহ পৌছি। সেখানে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল আজিজের বাসায় উঠি। আমরা সেখানে পৌঁছে এসডিপিও মাহবুবউদ্দিনকে খবর পাঠাই। মুক্তিযুদ্ধকালে মাহবুবের ভূমিকা ছিল স্বর্ণোজ্জ্বল। পরে তিনি ঢাকার পুলিশ সুপার হন।
&nbsp;
মাহবুব ঝিনাইদহে কন্ট্রোল রুম স্থাপন করেছে। আমাদের দেখে খুবই উৎফুল্ল হলো। এই কন্ট্রোল রুম থেকে কুষ্টিয়া<strong>, </strong>চুয়াডাঙ্গা ও মাগুরার সাথে যোগাযোগ রক্ষা করা হচ্ছে। যশোর সেনানিবাসের চারদিক জনগণ ও মুক্তিযোদ্ধারা অবরোধ করে রেখেছে। হাজার হাজার লোক বজ্রকন্ঠে শ্লোগান দিচ্ছে সেনানিবাস পুড়িয়ে দেবার জন্য। জনতার হাতে বন্দুক<strong>, </strong>রাইফেল<strong>, </strong>বল্লম<strong>, </strong>বর্শা<strong>, </strong>দা<strong>, </strong>কুড়ালসহ স্থানীয় অস্ত্রশস্ত্র। কুষ্টিয়াতে তিন শতাধিক পাক সেনা মুক্তিবাহিনী দ্বারা অবরুদ্ধ।
&nbsp;
কুষ্টিয়া ঝিনাইদহ থেকে ২৮ মাইল দূরে। চুয়াডাঙ্গায় মেজর ওসমান মুক্তিবাহিনীর নেতৃত্বে রয়েছেন। মেহেরপুরের মহকুমা প্রশাসক মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে যোগ দিয়েছেন। চুয়াডাঙ্গার অবাঙালি মহকুমা প্রশাসককে হত্যা করা হয়েছে। কুষ্টিয়ার অবরোধ জোরদার করার পরিকল্পনা নেয়া হয়। বিভিন্ন জরুরি নির্দেশ দিয়ে আমরা দুইজন ও মাহবুব চুয়াডাঙ্গা চলে যাই। সেখানে পৌঁছে তওফিক এলাহী ও মেজর ওসমানের সাথে ব্যাপক আলোচনা হয়। চুয়াডাঙ্গার সকল আওয়ামী লীগ কর্মীকে সর্বশেষ পরিস্থিতি অবহিত করি। ইতিমধ্যে আমরা চুয়াডাঙ্গা থেকে একটি বিডিআর বাহিনী কুষ্টিয়া প্রেরণ করি।
&nbsp;
কুষ্টিয়াতে পাক সেনা ও মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে তুমুল যুদ্ধ হয়। গ্রাম থেকে অগণিত লোক শহরে আসে। হাজার হাজার মানুষের শ্লোগানে শহর কেঁপে ওঠে। মানুষের হাতে বিভিন্ন শ্রেণীর সাধারণ অস্ত্র। পুলিশের সকল রাইফেল মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে। অবাঙালি এডিসি সার্কিট হাউজে পাক সেনাদের সাথে অবরুদ্ধ। এডিসি নিহত হয়েছে মুক্তিযোদ্ধাদের গুলিতে। তিনি একজন পাক জেনারেলের আত্মীয়।
&nbsp;
কুষ্টিয়ার সর্বশ্রেণীর লোক যুদ্ধে অংশ নেয়। এমনকি মেয়েরা পর্যন্ত। সাধারণ মানুষ মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ভাত<strong>, </strong>ডিম<strong>, </strong>রুটি<strong>, </strong>পিঠা<strong>, </strong>মিষ্টি ইত্যাদি পাঠায়। আমাদের অগণিত সৈনিকদের রসদের কোন অভাব হয় নি। ঝিনাইদহ থেকে খবর পাই<strong>, </strong>কিছুসংখ্যক পাক সৈন্য ভয়ে পালিয়ে গেছে ।
&nbsp;
সারাগঞ্জ ব্রিজ আমার বাড়ির পাশে। যশোর-কুষ্টিয়ার মধ্যে সংযোগকারী রাস্তার ওপর এই ব্রীজ দিয়েই যশোর থেকে পাক বাহিনী কুষ্টিয়া আসতে পারে। স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা ব্রীজের পাশে মাটি কেটে এর উপর চট বিছিয়ে দেয়। চটের মধ্যে আলকাতরা দিয়ে রাস্তার পিচের মত কালো করা হয়। কুষ্টিয়া থেকে পাক সেনাদের একটি পলাতক জীপ সেই খাদে পড়ে যায়। গ্রামের লোক ওদের পিটিয়ে মারে। এমনিভাবে কুষ্টিয়ার গ্রামের মানুষ পালিয়ে যাওয়া পাক সেনাদের পিটিয়ে মারে।
<strong> </strong>
চুয়াডাঙ্গা থেকে খবর পাই<strong>, </strong>কুষ্টিয়াতে আমরা জয়ী হয়েছি। ওরা অস্ত্রশস্ত্র ফেলে পলায়নোন্মুখ। এদের একজনও যশোর সেনানিবাসে ফিরে যেতে পারেনি। দুপুরে চুয়াডাঙ্গা থেকে কুষ্টিয়ার বীর জনতার প্রতি একটি অভিনন্দন বাণী পাঠাই। আমার এই বিবৃতি ভারতে কয়েকটি কাগজে প্রকাশিত হয়।
&nbsp;
চুয়াডাঙ্গা গিয়ে তিন ভাগে বৈঠক করি। একটি রাজনৈতিক<strong>, </strong>একটি সামরিক ও অপর বৈঠকটি করি তওফিক ও মাহবুবকে নিয়ে। তওফিক একাধারে চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুরের মহকুমা প্রশাসক। সেখানে বসে পাবনার খবর পাই। সেখানে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে জেলা প্রশাসক নুরুল কাদের যোগ দিয়েছেন। মাগুরা<strong>, </strong>ঝিনাইদহ<strong>, </strong>ফরিদপুরে আমাদের অবস্থা ভাল। যশোর সেনানিবাস বীর জনতার দ্বারা তখনো অবরুদ্ধ।
&nbsp;
ঢাকার অবস্থা আমরা স্বচক্ষে দেখেছি। চট্টগ্রামের খবর বিপ্লবী বেতারযোগে পেয়েছি। অবস্থাদৃষ্টে মনে হলো<strong>, </strong>সারা বাংলায় গণযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে এই যুদ্ধ চলছে। বাংলার সেনাবাহিনী<strong>, </strong>বিডিআর<strong>, </strong>পুলিশসহ সর্বশ্রেণীর লোক সংগ্রামে অংশ নিয়েছে। বীর জনতার মনোবল থেকে আমরা বিশেষভাবে আশান্বিত। বিভিন্ন স্থানে খণ্ড যুদ্ধে আমরা জয়ী হলেও বিশাল পাক বাহিনীর সাথে লড়াই করার মত অস্ত্রসম্ভার এই মুহূর্তে আমাদের নেই। তবে পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে জনতার শক্তি দানা বেঁধে উঠেছে<strong>, </strong>একে সুসংহত করতে হবে। জনযুদ্ধের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে যোদ্ধাদের হাতে প্রয়োজনীয় অস্ত্র তুলে দিতে হবে। শত্রুর কাছ থেকে কেড়ে নেয়ার কৌশল আমাদের যোদ্ধাদের শিখাতে হবে।
&nbsp;
চুয়াডাঙ্গায় তৌফিক<strong>, </strong>মাহবুব ও মেজর ওসমানের সাথে আবার বৈঠক করি। ডাঃ আসহাবুল হক আমাদের সাথে সর্বদা যোগাযোগ রক্ষা করছেন। অস্ত্রের জন্য ভারতে যে আমাদের নেতা-কর্মী ও মুক্তিযোদ্ধারা আমাদের ওপর চাপ দিয়ে যাচ্ছেন।
&nbsp;
বেলা ৩টার দিকে আমি ও তাজউদ্দিন ভাই সীমান্তের পথে রওনা হই। তওফিক ও মাহবুব আমাদের সাথে ছিল। পলায়নী মনোবৃত্তি নিয়ে সীমান্ত পার হবো না বলে আমরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। স্বাধীন সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে যোগ্য মর্যাদা নিয়েই আমরা ভারতে যাব। স্বাধীন দেশের প্রতিনিধি হিসেবে আমাদের গ্রহণ করলেই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সাথে আমাদের আলোচনা সম্ভব।
&nbsp;
সীমান্ত থেকে কিছু দূরে একটি জঙ্গলের মাঝে ছোট্ট খালের ওপর একটি বৃটিশ যুগের তৈরী কালভার্ট। কালভার্টের ওপর তাজউদ্দিন ভাই ও আমি বসে আছি। আমাদের প্রতিনিধি হিসেবে তওফিক ও মাহবুবকে ওপারে পাঠাই।
&nbsp;
তাজউদ্দিন ভাইকে বিষণ্ন মনে হলো। তার বিষণ্নতার কারণ জিজ্ঞাসা করি। তিনি বলেন<strong>, </strong>ছোটবেলার একটা কথা তার মনে পড়ছে। তিনি বলতে থাকেন ছোটবেলা হিন্দু সহপাঠীরা বলতেন<strong>, </strong>তোদের পাকিস্তান টিকবে না। আমি পাল্টা জোর দিয়ে বলতাম অবশ্যই টিকবে। ছোটবেলার সহপাঠীদের কথা তার মনে পড়ছে। সূর্য ডুবু ডুবু করছে বাংলাদেশের আকাশে আবার কখন নতুন সূর্যের উদয় হবে<strong>, </strong>তা ভাবতে আমরা দু<strong>'</strong>জনেই কালভার্টের ওপর শরীর এলিয়ে দেই।
তওফিক এলাহী ও মাহবুব চলে যাওয়ার পর অনেক্ষণ কেটে গেল। ওরা ভারতীয় সীমান্ত ফাঁড়িতে গেছে। জঙ্গলের ভেতর বেশ অন্ধকার নেমে এসেছে। জনবসতি নেই বললেই চলে।
&nbsp;
চারদিকে আগাছায় ভরে গেছে। আরো কিছুক্ষণ পর অন্ধকারে মানুষের পায়ের শব্দ শুনতে পেলাম। তাজউদ্দিন ভাইকে ডেকে একটু দূরে গিয়ে দাঁড়াই। শব্দ ক্রমশঃ আমাদের দিকেই আসছে। আগন্তুকরা কাছে এসেই অস্ত্র উঁচু করে সামরিক কায়দায় আমাদের অভিবাদন জানান। অফিসারটি জানান<strong>, </strong>আমাদেরকে তিনি যথোপযুক্ত সম্মান দিয়ে ছাউনিতে নিয়ে যেতে এসেছেন।
&nbsp;
আগন্তুক অফিসারের সাথে আমরা ছাউনিতে চলে যাই। ছাউনিতে গিয়ে জানতে পারি যে<strong>,</strong> আমাদের আগমনের খবর ইতিমধ্যে কোলকাতায় পৌঁছে গেছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই বিএসএফ-এর আঞ্চলিক প্রধান গোলক মজুমদার ছাউনীতে এসে পৌঁছলেন। আমরা আমাদের সংগ্রামে ভারতে সর্বাত্মক সাহায্যের আবেদন জানাই।
&nbsp;
মজুমদার বলেন<strong>, </strong>আপনাদের আবেদনের জবাব শুধুমাত্র প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীই বলতে পারেন। তিনি জানান<strong>, </strong>আমাদেরকে প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করার ব্যবস্থা তিনি করে দেবেন। তার সাথে কোলকাতা যাওয়ার জন্য আমাদের অনুরোধ করেন। তিনি বলেন যে<strong>, </strong>তার পক্ষে ছোট ছোট অস্ত্রশস্ত্র দেয়া সম্ভব। তবে দিল্লীর সাথে আলোচনা ছাড়া কিছু করা সম্ভব না। তওফিক এলাহী ও মাহবুবকে বিদায় দিয়ে মজুমদারের জীপে করে আমি ও তাজউদ্দিন ভাই কোলকাতা যাত্রা করি।
&nbsp;
মজুমদার নিজে গাড়ি চালিয়ে আমাদের বিমানবন্দরে নিয়ে আসেন। তিনি জানান<strong>, </strong>আমাদের সাথে আলোচনার উদ্দেশ্যে এই ফ্লাইটে দিল্লী থেকে একজন কর্মকর্তা আসবেন। তার এ কথা শুনে আমরা কিছুটা আশ্চর্য হই। রাতেই তার সাথে যোগাযোগ করেন। জীপ থেকে নামিয়ে আমাদের অপেক্ষাকৃত বড় কালো রঙ এর একটি গাড়ীতে তোলা হলো। বিমান থেকে ছ<strong>'</strong>ফুটেরও বেশি লম্বা একজন লোক নেমে সোজা আমাদের গাড়ীতে উঠলেন। মজুমদার তার সাথে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিলেন। তিনি হলেন বিএসএফ এর প্রধান রুস্তমজী।
রুস্তমজী এক সময় ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী নেহেরুর নিরাপত্তা প্রধান ছিলেন। নেহেরু পরিবারের সাথে তার ঘনিষ্ঠতা রয়েছে। তিনি প্রধানমন্ত্রীর খুবই আস্থাভাজন।
&nbsp;
এদিকে আমার কাপড় চোপড়ের অবস্থা একেবারেই শোচনীয়। গাড়ীতেই শুরু হয় আলোচনা। রুস্তমজীর প্রথম প্রশ্ন ছিল বঙ্গবন্ধু কোথায়<strong>? </strong>মজুমদারের প্রথম প্রশ্নও ছিল এটাই। এর পরেও আরো অনেকের সাথে দেখা হয়েছে সকলেরই প্রথম প্রশ্ন ছিল বঙ্গবন্ধু কেমন আছে<strong>? </strong>এই প্রশ্নের উত্তরের জন্য আমরা তৈরী ছিলাম। দলীয় নেতৃবৃন্দ<strong>, </strong>মুক্তিযোদ্ধাসহ সকলের সাথে বঙ্গবন্ধুর অবস্থানের ব্যাপারে আমরা একই উত্তর দিয়েছি। আমরা যা বলতে চেয়েছি তা হলো বঙ্গবন্ধু মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। আমরা তার কাছ থেকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ পাচ্ছি। তিনি জানেন<strong>, </strong>আমরা কোথায় আছি। তিনি আমাদের দায়িত্ব ভাগ করে দিয়েছেন। সময় হলে বা প্রয়োজন দেখা দিলে তিনি উপযুক্ত স্থানে আমাদের সাথে দেখা করবেন।
&nbsp;
একটি সুন্দর বাড়ীতে (আসাম হাউজ) আমাদের থাকার ব্যবস্থা করা হলো। একটি ঘরে আমি আর তাজউদ্দিন ভাই<strong>, </strong>অন্য ঘরে রুস্তমজী। আমরা খুবই ক্লান্ত। স্নান করা প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের সাথে অতিরিক্ত কোন কাপড় নেই। রুস্তমজী আমার পরিধেয় বস্ত্রের অভাবের কথা জেনে তার ইস্ত্রি করা পায়জামা ও কোর্তা দিলেন। ছ<strong>'</strong>ফুট লম্বা মানুষের কোর্তা সামাল দেয়া আমার পক্ষে কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়।
&nbsp;
তখন প্রায় মধ্যরাত। স্নানের কাজ সেরে নিলাম। এত রাতে খাবার পাওয়া কষ্টকর<strong>,</strong> তবুও গোলক মজুমদার আমাদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করেন। খাওয়ার পর টেবিলের ওপর রাখা একটি মানচিত্রের দিকে আমরা চোখ রাখি। কোনদিন যুদ্ধ করি নি বা এর কথা ভাবি নি। অথচ আজ যুদ্ধের পরিকল্পনায় অংশ নিতে হচ্ছে। রুস্তমজী রণকৌশলী। আমাদের মূল উদ্দেশ্য তাকে জানালাম। আজ রাতেই আমাদের অনেকগুলো সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
<strong> </strong>
আমাদের প্রথম কাজ হলো দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে থাকা রাজনৈতিক নেতাদের একত্রিত করে তাদের নিরাপদ স্থানে নিয়ে আসা। আর দ্বিতীয় কাজ হলো<strong>, </strong>মুক্তিযুদ্ধকে সংঘবদ্ধ ও সুসংহত করা। বিএসএফ-এর বিভিন্ন প্রধানদের এই গভীর রাতে ডাকা হয়। তার যোগাযোগ প্রধানের সাথে এই রাতেই যোগাযোগ করা হলো। আওয়ামী লীগের এমএলএ<strong>,</strong> এমপিসহ নেতাদের একটি তালিকা তৈরি করে এতে তাদের সম্ভাব্য অবস্থানের কথা উল্লেখ করা হয়। এসব নেতার সাথে যোগাযোগের জন্যে এই তালিকা বিভিন্ন সীমান্ত ফাঁড়িতে প্রেরণ করা হয়। আমরা বিশেষ ক<strong>'</strong>জন দলীয় নেতার কথা জানালাম যাদের সাথে আমাদের সহসাই যোগাযোগ প্রয়োজন। যশোর সেনানিবাস অবরুদ্ধ<strong>, </strong>কুষ্টিয়াতে আমরা জয়লাভ করেছি এবং চুয়াডাঙ্গাতেও আমাদের শক্ত ঘাঁটি হয়ে উঠেছে। রাজনৈতিক ও সামাজিক দিক থেকে অতি দ্রুত আমাদের সুসংবদ্ধ হয়ে উঠতে হবে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আমাদের এই খবর পৌঁছে দেয়া প্রয়োজন। বিএসএফ এর মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধাসহ নেতৃবৃন্দের কাছে নির্দেশ পৌঁছে দেয়া শুরু করি।
<strong> </strong>
যুদ্ধরত মুক্তিযোদ্ধাদের যথাসম্ভব সাহয্য দিতে বিএসএফ রাজী হলো। পরামর্শ করতে রাত প্রায় শেষ হয়ে গেল। ভোরের দিকে কিছুক্ষণের জন্য আমরা বিছানায় যাই। ঘুম থেকে উঠে বাথরুমে গিয়ে রেডিওর শব্দ শুনি। বিএসএফ-এর চট্টোপাধ্যায় এই রেডিও দিয়েছিলেন। রেডিওতে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে পাক হানাদার বাহিনীর নির্মম অত্যাচারের কাহিনী শুনি। আমাদের মা-বোনদের ওপর বর্বর অত্যাচারের কথা শুনে মনের অজ্ঞাতেই বাঁধ ভাঙা জোয়ারের মত দু-চোখ বেয়ে অশ্রু নেমে এলো।
<strong> </strong>
বিএসএফ আমাদের আতিথেয়তার ভার নেয়। চট্টোপাধ্যায়ের সাথে পরিচয় হয়ে গেছে। ৯ মাস আমাদের সাথে বিশ্বস্ত বন্ধু হিসেবে কাজ করেছেন। আমাদের সিদ্ধান্তগুলো কার্যকরী করার দায়িত্ব ছিল তার ওপর। একজন বিদেশী রাষ্ট্রের কর্মচারী হয়ে এমন নিষ্ঠার সাথে কাজ করেও কোন দিন কোন কৃতিত্বের দাবী করেন নি। মিঃ চট্টোপাধ্যায় আমার জন্য একটি প্যান্ট ও একটি শার্ট যোগাড় করলেন।
<strong> </strong>
আমাদের দ্বিতীয় অধিবেশন শুরু হলো। যেসব স্থানে আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের প্রধান কেন্দ্র গড়ে উঠেছে সেগুলো নিয়ে আলোচনা হয়। কিছুক্ষণ পর চুয়াডাঙ্গার সাথে যোগাযোগ হলো। চুয়াডাঙ্গাকে আমরা বিপ্লবী সরকারের রাজধানী করার পরিকল্পনা মনে মনে ঠিক করেছি। পরদিন দেখি<strong>, </strong>সংবাদপত্রে এই খবর প্রকাশিত হয়েছে। এই খবর ফাঁস না করার জন্য ডাঃ আসহাবুল হককে আমি অনুরোধ করেছিলাম। কিন্তু পরে বুঝলাম<strong>, </strong>আনন্দের আতিশয্যে বিদেশী সাংবাদিকদের কাছ তিনি তা বলে দিয়েছেন। ডাঃ আসহাবুল হক<strong>, </strong>মেজর ওসমান ও তওফিক ইলাহীর সাথে আমাদের ফোনে যোগাযোগ হলো। মেজর ওসমানকে বললাম তার সাথে সহসাই আমাদের দেখা হবে। তিনি বেশ প্রয়োজনীয় অস্ত্র ও গোলাবারুদের একটি তালিকা তৈরী করে রাখেন।
<strong> </strong>
সেদিন ছিল কোলকাতা <strong>'</strong>বন্ ধ<strong>’</strong>। বাংলাদেশের আন্দোলনের সমর্থনে এই ‘বন্ ধ<strong>’</strong> ডাকা হয়। কোলকাতার জনজীবন একেবারে স্তব্ধ। গাড়ী ঘোড়া সবকিছু বন্ধ। কোলকাতার ভাইরা সেদিন আমাদের আন্দোলনের সমর্থনে এগিয়ে আসেন। কোলকাতাস্থ পাক সরকারের কার্যালয়ের চারদিকে হাজার হাজার জনতা বিক্ষোভ প্রকাশ করেন।
<strong> </strong>
আমাদের জন্য একটা বাড়ী দরকার। রুস্তমজী বাড়ির সন্ধানে আমাদের নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। পাকিস্তান কনস্যুলেট এর কাছে আমাদের জন্য একটি বাড়ি নির্বাচিত হলো।
&nbsp;
ঘরে ফিরেই তাজউদ্দিন ভাই ও আমাই তিনটা খসড়া পরিকল্পনায় হাত দেই। এগুলো হলো দলের সাংগঠনিক<strong>, </strong>সরকার গঠন ও সামরিক পরিকল্পনার কাজ। যা মাথায় এসেছে<strong>, </strong>তাই লিখেছি। সাথে সাথে ছক কেটে তীর চিহ্ন দিয়ে সাংগঠনিক কাঠামো তৈরি করেছি। এরপর মুক্তিযুদ্ধের জন্য সারাদেশকে কয়টি ভাগে ভাগ করা হয়।
&nbsp;
পরদিন আমাদের দিল্লী যাওয়ার কথা। বিএসএফ ও অন্যরা খুবই সাবধানতা অবলম্বন করছে আমাদের অবস্থান গোপন রাখার জন্য। পরদিন সকালে সীমান্তের দিকে যাই। খবর অনুযায়ী মেজর ওসমান অস্ত্রশস্ত্রের একটা তালিকা তৈরি করে নিয়ে আসেন। মেজর ওসমানকে কিছু অস্ত্র দেয়া হলো। এর মধ্য এলএমজিও ছিল। ইতিমধ্যে খবর এলো পাক সৈন্যরা যশোর সেনানিবাস থেকে বের হবার চেষ্টা করছে। তাকে এক্ষুনিই যেতে হবে। মেজর ওসমান সদ্য পাওয়া এলএমজি কাঁধে নিয়ে দ্রুত রওনা হলেন।
&nbsp;
চুয়াডাঙ্গা<strong>, </strong>কুষ্টিয়া<strong>, </strong>যশোর অঞ্চলে স্বাধীনতা যুদ্ধে মেজর ওসমানের সাথে তার স্ত্রীও সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহন করেন। এই তেজস্বী মহিলা অশেষ ত্যাগ স্বীকার করেছেন। সাহসী এই বীরের স্ত্রী বেগম ওসমান মুক্তিযোদ্ধাদের প্রেরণার উৎস হয়ে ওঠেন। একদিকে তিনি স্বামীকে যুদ্ধের মুখে ঠেলে দিতেন<strong>, </strong>অপরদিকে বিডিআর জোয়ান ও মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রাণিত করতেন। নিজের হাতে রান্না করে তিনি যুদ্ধ শিবিরে পাঠিয়ে দিতেন।
&nbsp;
১৯৭১ সালের ৬ই ডিসেম্বর সেনা বাহিনীর সদস্যদের গুলিতে ওসমান নিহত হন।
&nbsp;
১৯৭১ সালের ১লা এপ্রিল। আজ আমরা দিল্লী যাচ্ছি। গোলক মজুমদার আমাদের সাথে আছেন। সরজিৎ চট্টোপাধ্যায় বিমানবন্দরে আমাদের সাথে দেখা করার কথা রয়েছে। একটি নির্দিষ্ট কক্ষে আমাদের বসার ব্যবস্থা করা হয়। সাংবাদিক ও অন্যান্য যাত্রীর দৃষ্টি এড়িয়ে আমাদের যেতে হবে। ইতিমধ্যে চট্টোপাধ্যায় আমাদের দুজনের জন্য একটি স্যুটকেস ও একটি ব্যাগ নিয়ে এসেছেন। হাত ব্যাগে কাগজপত্র<strong>, </strong>কলম<strong>, </strong>পেন্সিল ইত্যাদি রয়েছে। স্যুটকেসে আমাদের পরিধেয় কাপড়<strong>, </strong>তোয়ালে ও সাবান। রাত ১০ টার দিকে জীপে করে একটি মিলিটারী মালবাহী বিমানের কাছে আমাদের নিয়ে আসা হল। মই দিয়ে আমরা বিমানের ককপিটে উঠি। পাইলট ও তার সহকারীদের ছাড়া নিমানে বসার জন্য কোন আসন নেই। শুধুমাত্র কেনভাসের বেল্ট দিয়ে আমাদের চারজনের বসার ব্যবস্থা করা হল। বিমানের পিছন দিক উন্মুক্ত। এদিয়ে অনায়াসে মাল উঠা-নামা করা যায়। তখনও এতে মাল ভর্তি ছিল। এই মালবাহী সামরিক বিমানে নেয়ার উদ্দেশ্য ছিল ভারতের সকল এজেন্সী থেকে আমাদের যাত্রা গোপন রাখা।
&nbsp;
এটা ছিল একটা পুরনো রাশিয়ান বিমান। এর শব্দ ছিল বিকট। বিমানের যাত্রা শুরু হল। সমস্ত ককপিট কাঁপছে। তাজউদ্দিন ভাই বেশ কিছুক্ষণ চেষ্টা করেও ওভাবে বসে থাকতে পারলেন না। দিল্লী পৌছতে রাত শেষ হয়ে যাবে। কিছুক্ষণ পর একটা কেনভাস বিছিয়ে আমি ও তাজউদ্দিন ভাই মেঝেতে শুয়ে পড়ি। গরমে আমরা ঘামছিলাম। বিমানের কাঁপনের সাথে আমাদের শরীরও কাঁপছিল। এমনি করে আধা ঘুমে আধা জেগে ভোরের দিকে আমরা দিল্লী পৌছি। সেখানে মিলিটারী বিমান বন্দরে আমাদের জন্য একটি গাড়ি প্রস্তুত ছিল। একজন কর্মকর্তা আমাদের নিয়ে গেলেন। চট্টপাধ্যায় আমাদের সাথে ছিলেন। মজুমদার গেলেন তাঁর মেয়ের বাসায়। প্রতিরক্ষা কলোনীর একটি বাড়িতে আমাদের রাখা হলো। পরে জেনেছি বাড়িটি ছিল বিএসএফ-এর একটি অতিথিশালা। এ বাড়ীতে অন্য আর কেউ নেই। আমি ও তাজউদ্দিন ভাই এক ঘরে<strong>,</strong> চট্টপাধ্যায় অন্য ঘরে। আমাদের দুটি বিছানা রয়েছে। ঢাকা থেকে বেরোবার পর থেকে দু<strong>'</strong>জন একত্রেই থাকছি। এতে সুবিধা অনেক। রাতে ঘুম না আসা পর্যন্ত সব কিছু পর্যালোচনা করার সুযোগ পাই। গোলক মজুমদার ও রুস্তমজী ভারতের প্রধানমন্ত্রী মিসেস ইন্দিরা গান্ধীর সাথে আমাদের একটি বৈঠকের ব্যবস্থা করার কাজে লিপ্ত রয়েছেন। আমাদের কিন্তু বিলম্ব সইছে না। ইতিমধ্যেই দিল্লীর বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা প্রশ্ন তুলছে যে মোহম্মদ আলী প্রকৃতই তাজউদ্দিন আহমেদ এবং রহমত আলী ব্যারিষ্টার আমিরুল ইসলাম কিনা।
<strong> </strong>
ভারতের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্হার আচরণে কখনো অবাক হয়েছি আবার কখনো ভীত হয়েছি। তবে <strong>'</strong>র<strong>'</strong> <strong>RAW</strong> নামক একটি গোয়েন্দা সংস্থা মুক্তিযুদ্ধের সময় নিজেদের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টায় খুবই ব্যস্ত ছিল। এই সংস্থাটির কার্যকলাপে কখনই সন্তুষ্ট হতে পারি নি। কয়েকটি গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন আমাদের সাথে আলাপ করে। তারা নিশ্চিত হতে চায় আসলেই আমরা আওয়ামী লীগের লোক কিনা। তাদের আলোচনার পর সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার মিঃ কউলের কিছুটা বিশ্বাস জন্মে যে সত্যিই আমরা আওয়ামী লীগের লোক।
<strong> </strong>
মেজর ওসমানের অস্ত্রের তালিকাটা তখনো আমার পকেটে। কথায় কথায় মিঃ মীরন আমাদের জানান যে<strong>, </strong>আলোচনার মাধ্যমে অস্ত্র পেতে আমাদের বিলম্ব হবে। মিঃ মীরনের কাছে আমরা জানতে পারি<strong>, </strong>লণ্ডনে মিনহাজ উদ্দিনের সাথে তাদের কথা হয়েছে। আমাদের কোন খবর থাকলে তিনি তা পৌঁছে দিতে পারেন।
&nbsp;
মিনহাজ আমার পূর্ব পরিচিত। আমি তাকে চিঠি লিখি। আমি চিঠিতে অস্ত্রের একটা তালিকা পাঠাই। তাকে জানাই<strong>, </strong>লণ্ডনস্থ বাঙালিরা ইচ্ছা করলে আমাদের জন্য অস্ত্রের ব্যবস্থা করতে পারে। তখনো বুঝে উঠতে পারি নি অস্ত্র কেনা বা তা সরবরাহ করা তত সহজ নয়।
&nbsp;
ইতিমধ্যে আমরা খবর পেলাম<strong>, </strong>রেহমান সোবহান ও ডঃ আনিসুর রহমান দিল্লীতে পৌঁছেছেন। তাছাড়া এম<strong>,</strong> আর সিদ্দিকী<strong>, </strong>সিরাজুল হক বাচ্চু মিয়া ও যুবনেতা আব্দুর রউফ তখন দিল্লীতে ছিলেন। তাদের সকলের সাথে আলাদা আলাদাভাবে আমাদের বৈঠক হয়। এম আর সিদ্দিকীর কাছে চট্টগ্রাম<strong>, </strong>কুমিল্লা ও নোয়াখালী অঞ্চলের মোটামুটি কিছু খবর পাই। তাঁর কাছে চট্টগ্রামের কালুর ঘাট বেতার থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠের কাহিনীও শুনি। তিনি জানান<strong>, </strong>মেজর জিয়া একটা জীপে করে পালিয়ে যাচ্ছিলেন। চট্টগ্রামের আওয়ামীলীগের নেতারা এক প্রকার জোর করে জিয়াকে দিয়ে স্বাধীনতা ঘোষণা পাঠ করান। তিনি আরো জানান চট্টগ্রাম থেকে তারা একটি ট্রান্সমিটার আগরতলাতে নিয়ে এসেছেন<strong>, </strong>এবং তা দিয়ে প্রচার কাজ চালানো হচ্ছে। ত্রিপুরা রাজ্য সরকার ও জনগণ তাদেরকে সর্বপ্রকার সাহায্য করেছেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন। একটি সরকার গঠন করার জন্য তিনি আমাদের অনুরোধ জানান। কর্মীদের প্রতি শুভেচ্ছা নিয়ে তিনি আগরতলা চলে যান। তবে তাকে সরকার গঠন করার ইঙ্গিত দিয়ে দিলাম। আবদুর রউফকে নির্দেশসহ রংপুর পাঠিয়ে দেই।
<strong> </strong>
এ সময় ময়মনসিংহ থেকে রফিকউদ্দিন ভূঁইয়া ও সৈয়দ আবদুস সুলতানের চিঠি পেলাম। সৈয়দ সুলতান বাংলাদেশের পক্ষে জাতিসংঘে যাবার ইচ্ছা প্রকাশ করেন।
&nbsp;
এমনিভাবে দিল্লী আসার পর ২ দিন কেটে গেল। ইতিমধ্যে রুস্তমজী ও গোলক মজুমদার প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সাথে দেখা করেছেন। আমরা তাদের দু<strong>'</strong>জনকে এ কথা বুঝাতে সক্ষম হই যে<strong>, </strong>বাঙালি হলেও আমাদের জাতীয়তাবোধ ও জাতীয় সত্ত্বা বাংলাদেশের ভূ-খন্ডের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। আমরা আমাদের ৫৪ হাজার বর্গমাইল ভূ-খন্ডের সার্বভৌমত্বে বিশ্বাস করি।
<strong> </strong>
৪ঠা এপ্রিল তাজউদ্দিন ভাই ইন্দিরা গান্ধীর সাথে সাক্ষাৎ করেন। সাক্ষাৎকালে তাদের কোন সহযোগী ছিল না। বৈঠকে উপস্থিত না থাকলেও পূর্বাপর আলোচনার বিষয় আমার জানা ছিল। সাক্ষাতে যাওয়ার পূর্বে তাজউদ্দিন ভাই আমার সাথে কয়েক ঘন্টা ধরে সম্ভাব্য আলোচনা সূচী নিয়ে আলোচনা করে যান।
&nbsp;
মিসেস গান্ধীর সাথে সাক্ষাতের পর তাজউদ্দিন ভাই আমাকে সব কিছু জানান। মিসেস গান্ধী বারান্দায় পায়চারী করছিলেন। তাজউদ্দিন ভাই-এর গাড়ী পৌঁছে যাওয়ার পর তাকে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী স্টাডি রুমে নিয়ে যান। স্বাগত সম্ভাষণ জানিয়ে মিসেস ইন্দিরা গান্ধী প্রথম প্রশ্ন করেন। <strong>'</strong>হাউ ইজ শেখ মুজিব<strong>, </strong>ইজ হি অল রাইট<strong>?’ </strong>এই প্রশ্ন সম্পর্কে আমরা নিশ্চিত ছিলাম। কেননা এই প্রশ্নের সম্মুখীন আমাদেরকে আরো অনেকবার হতে হয়েছে। মিসেস গান্ধীর প্রশ্নের জবাবে তাজউদ্দিন ভাই বলেন<strong>, ‘</strong>বঙ্গবন্ধু আমাদেরকে দায়িত্ব দিয়ে পাঠিয়েছেন। তিনি তাঁর স্থান থেকে আমাদের নির্দেশ দিয়ে যাচ্ছেন। আমাদের বিশ্বাস<strong>, </strong>তিনি আমাদের নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন। ২৫শে মার্চের পর তাঁর সাথে আমাদের আর যোগাযোগ হয় নি। সাক্ষাতে তাজউদ্দিন ভাই আরো বলেন<strong>,</strong> বাংলাদেশে স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়েছে। যে কোন মূল্যে এই স্বাধীনতা আমাদের অর্জন করতে হবে। তাজউদ্দিন ভাই বললেন<strong>,</strong> পাকিস্তান আমাদের আন্তর্জাতিকীকরণের চেষ্টা চালাতে পারে। যে কোন মূল্যে পাকিস্তানের এই প্রচেষ্টা বন্ধ করতে হবে। তাজউদ্দিন ভাই বলেন<strong>, </strong>আমাদের অস্ত্র ও মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ প্রয়োজন হবে। প্রয়োজন হবে বাংলাদেশ থেকে আগত শরণার্থীদের জন্য আশ্রয় ও খাদ্য। মাতৃভূমির স্বাধীনতা যুদ্ধে তাজউদ্দিন ভাই ভারত সরকারের সার্বিক সহযোগিতা কামনা করেন। বাংলাদেশের নেতা জানান<strong>, </strong>আমাদের পররাষ্ট্রনীতি হবে জোট নিরপেক্ষ। সকলের প্রতি বন্ধুত্ব<strong>, </strong>কারো প্রতি শত্রুতা নয়। বাংলার মানুষের সংগ্রাম মানবতার পক্ষে ও হিংস্র ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে। সকল গণতন্ত্রকামী মানুষ ও সরকারের সহায়তা আমরা চাই।
<strong> </strong>
আমরা একটি সরকার গঠনের প্রয়োজনীয়তা বিশেষভাবে উপলব্ধি করি। কেননা ভারত সরকারের সাথে একটি সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে আমাদের কথা বলা উচিৎ। এদিকে সরকার গঠনের জন্য বিভিন্ন ফ্রন্ট থেকে চাপ আসা অব্যাহত রয়েছে। সরকার গঠন করার ব্যাপারে তাজউদ্দিন ভাইকে খুবই চিন্তিত মনে হয়। অস্ফুটস্বরে তিনি বলে ফেলেন বঙ্গবন্ধু আমাকে কী বিপদে ফেলে গেলেন। আমি বিরক্তির সাথে জানতে চাইলাম সরকার গঠনের ব্যাপারে তাজউদ্দিন ভাই দ্বিধাগ্রস্থ কেন<strong>? </strong>জবাবে তাজউদ্দিন ভাই বলেন<strong>, </strong>আপনি আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীন রাজনীতি জানেন না। সরকার গঠন করার প্রয়োজনীয়তার কথা বুঝি। জাতির বৃহত্তর স্বার্থেই তা প্রয়োজন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু ও অন্যান্য নেতাদের অনুপস্থিতিতে সরকার গঠন করে নাজুক পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হবে।
<strong> </strong>
আমার সরল মনের কাছে দেশের এমন ভয়াবহ একটি পরিস্থিতিতে সরকার গঠনের প্রয়োজনীয়তা রাজনৈতিক চেতনার দিক দিয়ে প্রথম ও প্রধান কর্তব্য বলে মনে হয়।
&nbsp;
তাজউদ্দিন ভাই আমাকে জিজ্ঞেস করেন কাকে নিয়ে সরকার গঠন করা হবে<strong>? </strong>আমি স্বাভাবিক উত্তর দিলাম। বঙ্গবন্ধু সরকার গঠন করে রেখে গেছেন। আমি বললাম<strong>, </strong>যে ৫ জন নিয়ে বঙ্গবন্ধু হাই কমাণ্ড গঠন করেছিলেন<strong>, </strong>এই ৫ জনকে নিয়েই সরকার গঠন করা হবে। দলীয় প্রধান বঙ্গবন্ধু<strong>, </strong>সাধারণ সম্পাদক ও তিনজন সহ-সভাপতি নিয়ে এই হাই কমাণ্ড পূর্বেই গঠিত হয়েছিল। তাজউদ্দিন ভাই পুনরায় প্রশ্ন করেন<strong>, </strong>প্রধানমন্ত্রী কে হবেন<strong>? </strong>দ্বিধা না করে এবারও জবাব দিলাম<strong>, </strong>২৫শে মার্চের পর থেকে আজ পর্যন্ত যিনি প্রধান দায়িত্ব পালন করে আসছেন তিনিই স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ের দায়িত্ব পালন করবেন।
তাজউদ্দিন ভাই অনেকক্ষন ভাবলেন। আমার প্রস্তাবের যৌক্তিকতা কোনভাবেই তিনি নাকচ করতে পারলেন না। তিনি এত বেশি কেন ভাবছিলেন তার উত্তর জানতে আমার অনেক সময় লেগেছিল।
&nbsp;
তাজউদ্দিন ভাই নিষ্ঠাবান ও সংগ্রামী পুরুষ। দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে দল ও দেশের স্বার্থে কাজ করতেন। নিজে বেশিরভাগ কাজ করেও তিনি কৃতিত্বের দাবি করতেন না। সকল কৃতিত্ব বঙ্গবন্ধুকে দিয়ে তিনি নিজেকে সর্বদাই দূরে রাখার চেষ্টা করেছেন। তাই আমি যখন বিপ্লবী সরকারের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেয়ার জন্য তাঁর নাম প্রস্তাব করি<strong>,</strong> তখন এই প্রস্তাব মেনে নিতে তাঁর খুবই কষ্ট হচ্ছিল। এই দায়িত্বের গুরুভার সম্পর্কেও তিনি সচেতন ছিলেন। এই অবস্থায় তিনি আবার আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের কথা স্মরণ করেন। তাঁরা কে কোথায় কী অবস্থায় আছেন<strong>, </strong>এ নিয়ে তিনি বিশেষভাবে চিন্তা করছেন। পত্রিকাতে ইতিমধ্যে অনেকের মৃত্যু সংবাদ পরিবেশিত হয়েছে। অবশ্য পত্রিকাতে নিহতের তালিকায় তাজউদ্দিন ভাই এবং আমার নামও রয়েছে।
<strong> </strong>
নিহতের তালিকায় আমাদের দু<strong>'</strong>জনের নাম দেখে ভেবেছিলাম<strong>, </strong>আমাদের নেতারাও হয়তো জীবিত রয়েছেন। আমাদের আর একটি চিন্তা হলো বঙ্গবন্ধুকে সরকারের প্রধান করা হলে আমাদের আন্দোলনের ব্যাপারে কি প্রতিক্রিয়া হবে। অথবা তাঁর জীবনের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার কারণ দেখা দিবে কিনা। এ নিয়ে দু<strong>'</strong>জনে অনেক রাত পর্যন্ত আলোচনা করি। পক্ষে বিপক্ষে যুক্তি দেই আবার খণ্ডন করি। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিলাম<strong>, </strong>ফলাফল যাই হোক<strong>, </strong>বঙ্গবন্ধুকে সরকারের রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করতে হবে।
&nbsp;
তাজউদ্দিন ভাই বলেন<strong>, </strong>আমি দীর্ঘদিন ধরে বঙ্গবন্ধুর সহকর্মী হিসেবে তাঁর সাথে কাজ করেছি। তবে এই ব্যাপারে আমি স্থির নিশ্চিত যে<strong>, </strong>কোন প্রকার ভয় ভীতি বা চাপের মাধ্যমে পাক সরকার বঙ্গবন্ধুকে দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে কোন বিবৃতি দিতে সমর্থ হবে না।
<strong> </strong>
আমরা যেহেতু একটি যুদ্ধে লিপ্ত ছিলাম এবং বঙ্গবন্ধু তখন শত্রুর কারাগারে বন্দী কাজেই সে সময় আমাদের সব কিছুই ভাবতে হয়েছিল। তাছাড়া ভাবাভাবির বেশি সময়ও ছিল না। কেননা আমাদের ত্বরিৎ সিদ্ধান্ত নেয়া প্রয়োজন। একটা সরকার গঠন করা ছাড়া কাজে এগুনো যাচ্ছে না। মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সিপাহশালার শত্রুর হাতে বন্দী। আবার তাঁকে বাদ দিয়ে যে মুক্তিযুদ্ধের কথা কল্পনাও করা যায় না।
&nbsp;
তারপর কথা উঠলো দেশের নাম কী হবে। আমি বললাম<strong>, ‘</strong>গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ<strong>'</strong> তাজউদ্দিন ভাই এর পছন্দ হলো। নামটি ঠিক করার সময় আমাদের মাথায় গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের কথা মনে হচ্ছিল। এ সময় সরকারী কাগজপত্র ব্যবহারের জন্য একটি মনোগ্রাম ঠিক করা দরকার। মনোগ্রাম আমাদেরই ঠিক করতে হবে। বর্তমানে বাংলাদেশের যে মনোগ্রাম সরকারী কাগজপত্রে ব্যবহৃত হচ্ছে<strong>, </strong>তা আমার হাতে আঁকা। চারপাশে গোলাকৃতি লাল-এর মাঝে সোনালী রং- এর মানচিত্র। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এটি তাঁর প্রথম সরকারী অনুমোদন।
<strong> </strong>
এই দিন সন্ধ্যার পর রেহমান সোবহান ও ডঃ আনিসুর রহমান আমাদের সাথে দেখা করতে এলেন। রেহমান সোবহান এর আগে একবার দেখা করে গেছেন। এ সময় আনিসুর রহমান স্বচক্ষে দেখা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাক বাহিনীর নারকীয় হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা দেন। তিনি নিজের বাসার গেটে তালা ঝুলিয়ে অন্যদিক দিয়ে বাসায় ঢুকে স্ত্রী ও ছেলেমেয়ে নিয়ে বাসার মেঝেতে শুয়ে রাত কাটান এবং জানালা দিয়ে সেই নারকীয় হত্যাকাণ্ড দেখেন। পাক দস্যুরা তার বাসার গেটে দরজা দেখে চলে যায়। সারাদিন আমি তাজউদ্দিন ভাই-এর বক্তৃতা তৈরী করেছি। রেহমান সোবহান বক্তৃতার খসড়া রচনায় আমাকে সহায়তা করেন। সেদিনই তার কাছে জানতে পারি যে<strong>, </strong>ডঃ কামাল হোসেন গ্রেফতার হয়েছেন। রেহমান সোবহান জানান<strong>, </strong>তিনি যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত সৃষ্টি করবেন। তার ইংরেজী খসড়ার একটা অংশ আমার খুব ভাল লেগেছিল। সেটা ছিল <strong>'</strong>পাকিস্তান ইজ ডেড এণ্ড বারিড আন্ডার মাউন্টেন অব কর্পসেস<strong>'</strong> বাংলায় এর অনুবাদ করি পর্বত ‘প্রমাণ লাশের নিচে পাকিস্তানের কবর রচিত হয়েছে’। শেষ অনুচ্ছেদ আমি লিখি<strong>,</strong> <strong>'</strong>আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধা<strong>, </strong>ছেলেদের রক্ত ও ঘামে মিশে জন্ম নিচ্ছে নতুন বাংলাদেশ।<strong>’ </strong>এক সময় চোখের জলে বক্তৃতার খসড়ার এক অংশ ভিজে গেল। চোখ মুছে আবার লিখতে শুরু করি। লেখা শেষ হলে সমস্ত বক্তৃতাটা তাজউদ্দিন ভাইকে শোনাই।
<strong> </strong>
রাজনৈতিক খসড়া প্রণয়নে তাজউদ্দিন ভাই খুবই দক্ষ। কোন একটি খসড়া করার পর তিনি মনোযোগ দিয়ে শুনতেন<strong>, </strong>মাথা নাড়তেন<strong>, </strong>কোন স্থানে থেমে নিজের বক্তব্য স্পষ্ট করে বলতেন। প্রয়োজনবোধে পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করতেন। এমনিভাবে চূড়ান্ত বক্তব্য তৈরী হতো। আমাদের দু<strong>'</strong>জনের মন ও চিন্তা যেন একইভাবে কাজ করছিল।
<strong> </strong>
আমার হাতের লেখা খুব ভাল নয়। তাজউদ্দিন ভাই-এর বক্তৃতা টেপ করতে হবে। আমি একটি টেপ রেকর্ডারের ব্যবস্থা করি। তিনি সমস্ত বক্তৃতা নিজের হাতে লিখে নিলেন। চট্টপাধ্যায় তার নিজের হাতে আরো একটি কপি করে নেন। তখন তিনজনের হাতে বক্তৃতার তিনটি কপি হয়ে গেল। পরদিন তাজউদ্দিন ভাই দ্বিতীয়বারের মত ইন্দিরা গান্ধীর সাথে দেখা করেন। ইন্দিরা গান্ধী জানান<strong>, </strong>বঙ্গবন্ধুকে বন্দী করে পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। অবশ্য এই খবর পাকিস্তান সরকার তখনো সরকারীভাবে প্রকাশ করে নি।
<strong> </strong>
ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সাথে তাজউদ্দিন ভাই বিভিন্ন বিষয়ে মতবিনিময় করেন। সিদ্ধান্ত হয় মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার ভারতের মাটিতে অবস্থান করতে পারবে। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ<strong>, </strong>তাঁদের জন্য অস্ত্র সংগ্রহ এবং শরণার্থীদের আশ্রয় ও খাবারের ব্যবস্থা করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের খবরা খবর প্রচারের জন্য একটি বেতার ষ্টেশন স্থাপনের বিষয়েও আলোচনা হয়।
<strong> </strong>
এদিকে আমাদের নেতারা যে কোথায় আছেন সে খবর আমরা এখনো জানি না। তাঁদের খোঁজ খবর নেয়ার জন্য একটি ছোট বিমানের ব্যবস্থা করা হলো। স্বাধীনতা যুদ্ধে সহায়তা করার জন্য ভারত সরকার একজন অবসরপ্রাপ্ত জেনারেলকে আমাদের সাথে দেন। ঐ জেনারেলের নাম নগেন্দ্র সিং। তাঁর বয়স ৬০ এর উর্ধ্বে। তিনি সামরিক ব্যাপারে আমাদের পরামর্শ দেবেন। জেনারেল সিং মনে-প্রাণে একজন খাঁটি সৈনিক। ব্যক্তিগত জীবনে খুবই ধর্মপ্রাণ। এছাড়া মানবিক গুণাবলী সম্পন্ন মানুষ। আমাদের সংগ্রামের প্রতি তিনি আন্তরিকভাবে শ্রদ্ধাশীল। দিল্লীতে বসেই তাজউদ্দিন ভাইয়ের বক্তৃতা টেপ করা হয়। বক্তৃতার পূর্বে আমার কণ্ঠ থেকে ঘোষণা প্রচারিত হয় এখন তাজউদ্দিন আহমদ জাতির উদ্দেশ্যে বক্তৃতা দেবেন। এরপর তাজউদ্দিন ভাই বক্তৃতা শুরু করেন।
<strong> </strong>
আমরা বিমানে করে আবার কলকাতায় ফিরে এলাম। এখানে এসে জানলাম মনসুর ভাই ও কামরুজ্জামান (হেনা ভাই) এসেছেন। তাঁদের কথা শুনে কিছুটা স্বস্তি পেলাম। খবর নিয়ে জানলাম কলকাতায় গাজা পার্কের কাছে একটা বাড়িতে কামরুজ্জামান ভাই থাকেন। শেখ ফজলুল হক মনি ঐ বাড়িতে আছেন। পরে আব্দুর রাজ্জাক<strong>, </strong>তোফায়েল আহমদ ও সিরাজুল ইসলাম খান এই বাড়িতে ঘাঁটি গড়েন।
<strong> </strong>
আমি ও তাজউদ্দিন ভাই কামরুজ্জামান ভাইয়ের কাছে দেখা করতে গেলাম। আমরা তাঁর কাছে এ পর্যন্ত ঘটনাবলী ব্যক্ত করি। কামরুজ্জামান ভাইয়ের মনে একটা জিনিস ঢুকানো হয়েছে যে আমরা তাড়াহুড়া করে দিল্লী গিয়ে ইন্দিরা গান্ধীর সাথে দেখা করেছি। নেতাদের জন্য অপেক্ষা করা উচিত ছিল।
<strong> </strong>
শেখ মনি আমাকে অন্য একটি ঘরে ডেকে নিয়ে গেলেন। তিনি আমাকে এটা বুঝালেন যে ইন্দিরা গান্ধীর সাথে আমাদের বিলম্বে সাক্ষাৎ হওয়ার কারণ হলো তাঁরা এখান থেকে ক্লিয়ারেন্স দেন নি। তিনি বুঝাতে চাইলেন তাঁরা একটি শক্তিশালী গ্রুপ এবং তাঁদের সাথে ইন্দিরা গান্ধীর পূর্ব থেকেই যোগাযোগ রয়েছে।
<strong> </strong>
আমাদের সরকার গঠনের ব্যাপারে সন্তুষ্ট নন এমন অনেক এমপিএ<strong>, </strong>এমএনএ ও আওয়ামী লীগ নেতা কলকাতায় এসেছেন। প্রিন্সেস স্ট্রীটের এমএলএ হোষ্টেলে ওরা উঠেছেন।
<strong> </strong>
একটা জিনিস বুঝতে পারলাম আমাদের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ শুরু হয়ে গেছে। শহরের বিভিন্ন স্থানে ভিন্ন ভিন্ন গ্রুপে আলাপ-আলোচনা চলছে। ইতিমধ্যে কামরুজ্জামান ভাইকে নিয়ে কতিপয় এমপি ও নেতা প্রিন্সেস স্ট্রীটে একটি বৈঠক করেছেন। আর এতে ভালভাবে সুর মিলিয়েছেন মিজানুর রহমান চৌধুরী। তাজউদ্দিন ভাই আমাকে ডেকে বললেন<strong>, </strong>আপনাকে আগেই বলেছিলাম এই দল দিয়ে কি স্বাধীনতা যুদ্ধ হবে<strong>?</strong>
<strong> </strong>
আমরা বিএসএফ এর লর্ড সিনহা রোডের একটি অফিসে অবস্থান করছি। ভারত সরকার আমাদের নিরাপত্তার জন্য বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন। আমরা ভারতে মাটিতে<strong>, </strong>ইন্দিরা গান্ধীর সরকার এই কথা প্রকাশ করতে রাজী নয়।
<strong> </strong>
আমাদের নেতাদের বিভিন্নমুখী বৈঠকে তাজউদ্দিন ভাই ও আমি বিশেষভাবে বিব্রতবোধ করছি। কামরুজ্জামান ভাই খুবই সুবিবেচক মানুষ। তিনি ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্ত নেয়ার কথা বললেন। রাতের বেলা লর্ড সিনহা রোডে আমাদের বৈঠক বসল। উপস্থিত বিশিষ্ট নেতৃবৃন্দের মধ্যে ছিলেন কামরুজ্জামান<strong>, </strong>মিজান চৌধুরী<strong>, </strong>শেখ মনি<strong>, </strong>তোফায়েল আহমদ ও আরও অনেকে। শেখ মনি তাঁর বক্তৃতায় বলেন<strong>, </strong>স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়েছে<strong>, </strong>বঙ্গবন্ধু শত্রুশিবিরে বন্দী<strong>, </strong>বাংলার যুবকরা বুকের তাজা রক্ত দিচ্ছে<strong>, </strong>এখন কোন মন্ত্রীসভা গঠন করা চলবে না।
<strong> </strong>
মন্ত্রী-মন্ত্রী খেলা এখন সাজে না। এখন যুদ্ধের সময়। সকলকে রণক্ষেত্রে যেতে হবে। রণক্ষেত্রে গড়ে উঠবে আসল নেতৃত্ব। এই যুদ্ধ পরিচালনার জন্য একটি বিপ্লবী কাউন্সিল গঠন করতে হবে।
<strong> </strong>
তাজউদ্দিন ভাই ও আমি ছাড়া বৈঠকে উপস্থিত প্রায় সকলে শেখ মনির বক্তব্য সমর্থন করেন। তাজউদ্দিন ভাই যেহেতু নিজে প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন<strong>, </strong>তাঁর পক্ষে পাল্টা জবাব দেয়া সম্ভব নয়। তাই শেষ পর্যন্ত আমাকেই উঠে দাঁড়াতে হলো। উপস্থিত প্রায় সকলেরই ধারণা ছিল আমি ও তাজউদ্দিন ভাই আগেভাবে দিল্লী গিয়েছি ক্ষমতা কুক্ষীগত করার জন্য।
<strong> </strong>
আমি আমাদের দিল্লী যাওয়ার সমর্থনে ও শেখ মনির বক্তব্যের বিপক্ষে কয়েকটি যুক্তি পেশ করি। আমার প্রথম যুক্তি ছিল<strong>, </strong>দিল্লী যাত্রার পূর্বে আমাদের জানা ছিল না কারা বেঁচে আছেন এবং কাকে কোথায় পাওয়া যাবে। দ্বিতীয় যুক্তি হলো<strong>, </strong>ইন্দিরা গান্ধীর সাথে তাজউদ্দিন ভাই দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে কথা বলেছেন। দলের সভাপতি বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে কথা বলার এখতিয়ার তাজউদ্দিন ভাইয়ের রয়েছে। তাছাড়া ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সাথে প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে মাত্র। ভবিষ্যতে আরও আলোচনা হবে। তখন দলের অন্যান্য নেতৃবৃন্দ অংশগ্রহণ করতে সমর্থ হবেন। তৃতীয়ত আমরা বঙ্গবন্ধু নিয়োজিত হাই কম্যাণ্ড নিয়ে অস্থায়ী সরকারের মন্ত্রীসভা গঠনের পরিকল্পনা করেছি মাত্র।
<strong> </strong>
আমি আরও বললাম<strong>, </strong>বাংলাদেশ বার ভুঁইয়ার দেশ। বারটি বিপ্লবী কাউন্সিল গড়ে ওঠা বিচিত্র কিছু নয়। আমাদের অবশ্যই আইনগত সরকার দরকার। কেননা<strong>, </strong>আইনগত সরকার ছাড়া কোন বিদেশী রাষ্ট্র আমাদের সাহায্য করবে না। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে একটি নির্বাচিত সরকারের নেতৃত্ব দেয়ার সুযোগ খুব কমই হয়েছে। স্বাধীকার প্রতিষ্ঠার অধিকার একটি আন্তর্জাতিক নীতি। যে কোন জনগোষ্ঠীর তাদের নির্বাচিত সরকার দ্বারা শাসিত হওয়ার অধিকার রয়েছে। পাকিস্তান হানাদার বাহিনী বাংলার মানুষের সে গণতান্ত্রিক অধিকারের অবমাননা করেছে। তাই আমাদের সরকার প্রতিষ্ঠার অধিকার হরণই হচ্ছে জনগণের অধিকার হরণ।
&nbsp;
শেখ মনির বক্তব্য খণ্ডন করার জন্য দু<strong>'</strong>টি যুক্তি দিলাম। শেখ মনির প্রস্তাবিত বিপ্লবী কাউন্সিল যদি বিভিন্ন মতাবলম্বীরা দুইটি<strong>, </strong>পাঁচটি বা সাতটি গঠন করে তাহলে জনগণ ও মুক্তিযোদ্ধারা কোনটির আদেশ মেনে চলবে না। কোন কাউন্সিলের সাথে বিদেশের সরকার সহযোগিতা করবে। এই ক্ষেত্রে একাধিক কাউন্সিল গঠনের সম্ভাবনাই নয় কি<strong>?</strong>
&nbsp;
সরকার প্রতিষ্ঠার অধিকারই হচ্ছে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। আজকে সেই অধিকার প্রতিষ্ঠা না করে অন্য কোন বিপ্লবী কাউন্সিল গঠন করা হলে জনগণের মৌলিক অধিকারকে অবমাননা করা হবে। সেটা নিশ্চয়ই আমাদের উদ্দেশ্য নয়। আমার বক্তব্যের পর মিজান চৌধুরী ও শেখ মনি ছাড়া উপস্থিত প্রায় সকলে তাঁদের পূর্বের মনোভাব পরিবর্তন করেন।
&nbsp;
কামরুজ্জামান ভাই আমাকে ডেকে জিজ্ঞাসা করেন<strong>, </strong>শেখ মনির কথানুযায়ী বিপ্লবী পরিষদ গঠন করা যায় কিনা। আমি তাঁকে বললাম<strong>, </strong>তা করা হলে যুদ্ধ বিপন্ন হবে। তিনি আমার কথার আর কোন প্রতিবাদ করলেন না। আমি তাঁকে বলি তার সাথে দেখা করে আমি বিস্তারিত সব বলবো।
&nbsp;
সভার শেষ পর্যায়ে তাজউদ্দিন ভাই বক্তৃতা দেন। উপস্থিত সকলে সরকার গঠন করার ব্যাপারে তাঁর বক্তব্য মেনে নিলেন।
&nbsp;
১০ই এপ্রিল বিভিন্ন অঞ্চল সফরের জন্য আমাদের বের হবার কথা। একটি ছোট্ট বিমানের ব্যবস্থা করা হলো। বিমানটি খুব নিচু দিয়ে উড়তে পারেন। বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা আমাদের দলীয় নেতৃবৃন্দের সাথে যোগাযোগ করাই এই সফরের উদ্দেশ্য। মনসুর ভাই<strong>, </strong>কামরুজ্জামান ভাই ও তোফায়েল আহমেদ একই বিমানে আমাদের সাথে যাবেন।
&nbsp;
পরদিন খুব ভোরে গাজা পার্কের বাড়ীতে কামরুজ্জামান ভাই-এর সাথে দেখা করে তাঁকে বিস্তারিত সব কিছু অবহিত করি।
&nbsp;
তাঁর সাথে বলতে গেলে আমার আত্মিক যোগাযোগ ছিল। তিনি প্রাণখোলা সহজ-সরল মানুষ। দু<strong>'</strong>জনে একান্তে প্রায় আধ ঘন্টা আলোচনা করি। আলোচনার মাধ্যমে তাঁর মনের জমাট মান অভিমান দূরীভূত হয়ে গেল। বিপ্লবী পরিষদ গঠনের জন্য যুবকদের প্রস্তাব যে অযৌক্তিক ও অবাস্তব এবং এটা যে যুদ্ধের সহায়ক হবে না তাও তিনি মেনে নিলেন।
&nbsp;
তাজউদ্দিন ভাই-এর অস্থায়ী সরকারের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার ব্যাপারে তাঁর আর কোন আপত্তি রইলো না। আমাদের সাথে বিমানে আগরতলা যাওয়ার জন্য কামরুজ্জামান ভাইকে বললাম। তিনি বলেন<strong>, </strong>যাওয়ার ব্যাপারে তাঁর কোন আপত্তি ছিল না। তিনি খবর পেয়েছেন<strong>, </strong>তাঁর পরিবার পরিজন কোলকাতার পথে দেশ ত্যাগ করেছেন। এই পরিস্থিতিতে তাঁর এখানে থাকা প্রয়োজন। আমি খুশি মনে বিদায় নেই।
&nbsp;
১০ই এপ্রিল। বিমানে আমাদের আগরতলা রওনা হওয়ার কথা। তাজউদ্দিন ভাই<strong>, </strong>মনসুর ভাই<strong>, </strong>শেখ মনি<strong>, </strong>তোফায়েল আহমেদ ও আমি লর্ড সিনহা রোড থেকে সোজা বিমানবন্দরে যাই। অন্যানের মধ্যে মিঃ নগেন্দ্র সিং আমাদের সঙ্গী হলেন। বিমানটি খুবই ছোট। এতে বসার মত ৫/৬ টি আসন ছিল।
&nbsp;
খুব নিচু দিয়ে বিমান উড়ে যাচ্ছে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় তৈরি অব্যবহৃত বিমানবন্দর বমলার কয়েকটিতে আমরা নামি। এগুলো বাংলাদেশ সীমান্তের খুব কাছাকাছি।
&nbsp;
ছোট ছোট বন্দরগুলো বাংলাদেশ সীমান্তের খুব কাছাকাছি। একটি বিমান বন্দরে আমরা দুপুরের খাবার খাই। বিএসএফ-এর মাধ্যমে খবর দেয়া হলো কোন আওয়ামী লীগ নেতার খোঁজ পেলে পরবর্তী কোন বিমানবন্দরে তৈরি রাখতে।
&nbsp;
উত্তর বঙ্গ তথা রাজশাহী<strong>, </strong>বগুড়া<strong>, </strong>পাবনা অঞ্চলের কোন নেতা খুঁজে পাওয়া গেল না। এদের বেশীর ভাগ কোলকাতা এসে গেছেন। কিছুক্ষণ পর আমরা বাগডোগরা বিমান বন্দরে নামি। সেখান থেকে জীপে করে শিলিগুড়ি যাই। শহর থেকে অনেক ভেতরে সীমান্তের খুব কাছাকাছি একটি বাংলোতে উঠলাম। গোলক মজুমদার এখানে আমাদের অভ্যর্থনা জানান। পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচী অনুযায়ী এখানের কোন একটি জঙ্গল থেকে গোপন বেতার কেন্দ্রের মাধ্যমে তাজউদ্দিন ভাই-এর বক্তৃতা প্রচারিত হবে। এ সময় তোফায়েল আহমেদ কিছুটা অসুস্থ হয়ে পড়েন। শেখ মনি বলেন<strong>, </strong>তোফায়েল আহমদের কলকাতা যাওয়া দরকার। শেখ মনি কিছু নির্দেশসহ তোফায়েল আহমদকে কলকাতা পাঠিয়ে দিলেন।
&nbsp;
মনসুর ভাই-এর জ্বর এসে গেছে। তিনি শুয়ে আছেন। আমি তাঁর পাশে বসে আছি। তাঁর সাথে আমার সম্পর্ক খুবই ঘনিষ্ঠ। প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী পদ নিয়ে তাঁর সাথে আলাপ করলাম। তিনি মত দিলেন তাজউদ্দিন ভাই প্রধানমন্ত্রী হলে তিনি কোন আপত্তি করবেন না। এরপর মনসুর ভাই বা কামরুজ্জামান ভাই প্রধানমন্ত্রী পদের ব্যাপারে আর কোন প্রশ্ন তোলেন নি।
&nbsp;
পাঁচজন নেতার মধ্যে তিনজনের সাথে আলাপের পর আমার খুব বিশ্বাস হয়েছিল যে<strong>,</strong> সৈয়দ নজরুল ইসলাম তাজউদ্দিন ভাই-এর প্রধানমন্ত্রীত্বে কোন আপত্তি করবেন না। তাছাড়া তাঁকে উপরাষ্ট্রপতি করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে তিনি অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন। এখন বাকি রইলো খন্দকার মোশতাক আহমদ। শুধু তিনি আপত্তি করতে পারেন।
<strong> </strong>
তবুও চারজন এক থাকলে মোশতাক ভাইকেও রাজী করানো যাবে। এখন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাজউদ্দিন ভাই-এর প্রথম বক্তৃতা প্রচার করার পালা। তাজউদ্দিন ভাই প্রচারের জন্য চোখে অনুমতি দিলেন। প্রধানমন্ত্রীর রেকর্ড করা বক্তৃতার ক্যাসেট গোলক মজুমদারের কাছে দেয়া হলো।
&nbsp;
শেখ মনি তাজউদ্দিন ভাই-এর সাথে একান্তে আলাপ করতে চাইলেন। আমি বাইরের ঘরে বিএসএফ-এর আঞ্চলিক কর্মকর্তার সাথে দিনাজপুর ও রংপুর অঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধের অবস্থা ও শত্রুদের তৎপরতা নিয়ে আলোচনা করলাম।
&nbsp;
শেখ মনির সাথে কথাবার্তা শেষে তাজউদ্দিন ভাই আমাকে ডাকেন। তিনি জানান<strong>, </strong>শেখ মনি এখন সরকার গঠনের ব্যাপারে রাজী নন। আগরতলা গিয়ে দলীয় এমপি<strong>, </strong>এমএনএ ও নেতা-কর্মীদের সাথে বৈঠক শেষে শেখ মনি সরকার গঠনের প্রস্তাব করেছেন। আর এটা করা না হলে বিরুপ প্রতিক্রিয়া হবে বলে তিনি জানিয়েছেন।
&nbsp;
আমি সরকার গঠনের পক্ষে পুনরায় যুক্তি দিলাম। আমি বললাম<strong>, </strong>সরকার গঠন করতে বিলম্ব হলে সংকট আরো বৃদ্ধি পাবে এবং এতে ক্ষতির সম্ভাবনাই বেশি। তাছাড়া সরকার গঠনের পরিকল্পনা তো নতুন কিছু নয়। মনসুর ভাই ও কামরুজ্জামান ভাই তাজউদ্দিন ভাইকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মেনে নিয়েছেন। সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও খন্দকার মোশতাক আহমদের তখনো দেখা নেই। তাঁরা কে কোথায়<strong>, </strong>কি অবস্থায় আছেন<strong>, </strong>সে খবর এখনো আসে নি। ইতোমধ্যে বন্ধুরাষ্ট্রের সাথে আমাদের কিছুটা রাজনৈতিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছে<strong>, </strong>সরকার গঠনে বিলম্ব হলে তাও নস্যাৎ হবার সম্ভাবনা রয়েছে। সরকার গঠন করার ব্যাপারে ভারত সরকারকে আমরা আশ্বাস দিয়েছি। তাতে বিলম্ব হলে আমাদের নেতৃত্ব সম্পর্কেও তারা সন্দেহ পোষণ করবেন। আমাদের মধ্যে যে কোন্দল রয়েছে কোন অবস্থাতেই তা বাইরে প্রকাশ হতে দেয়া উচিত নয়। ভারত সরকারও জানেন<strong>, </strong>আমাদের বক্তৃতা শিলিগুড়ির এই জঙ্গল থেকে আজ প্রচারিত হবে। আমার এসব কথা শেখ মনি মানতে রাজী নন। বেশি করে বুঝাতে চাইলে শেখ মনি জানান<strong>, </strong>তারা বঙ্গবন্ধু থেকে ক্ষমতাপ্রাপ্ত। অতএব তাদের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে কারো প্রশ্ন তোলা উচিত নয়। এ সময় তাজউদ্দিন ভাই আমাকে বলেন<strong>, </strong>আমি যেন গোলক মজুমদারকে জানিয়ে দেই যে প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতা আজ প্রচার করা সম্ভব হবে না। এ ব্যাপারে পরবর্তী সিদ্ধান্ত তাঁকে যথাসময়ে জানানো হবে।
&nbsp;
গোলক মজুমদারকে ফোন করে জানাই যে আজ বক্তৃতা প্রচার করা হবে না। এ কথা শুনে তিনি যেন আকাশ থেকে পড়লেন। তিনি পাল্টা প্রশ্ন করেন<strong>, </strong>বিলম্ব করা কি ঠিক হবে<strong>? </strong>তিনি বলেন<strong>, </strong>যে মুহূর্তে সব কিছু ঠিক ঠাক সে মুহুর্তে তা স্থগিত রাখলে সব মহলে প্রশ্ন দেখা দেবে। তা আমরা ভেবে দেখছি কিনা। ইতিমধ্যে রেকর্ড করা ক্যাসেট নির্ধারিত স্থানে (জঙ্গলে) পৌঁছে গেছে।
&nbsp;
আমি গোলক মজুমদারকে বললাম ক্যাসেট যদি পাঠিয়ে থাকেন<strong>, </strong>প্রচার করে দিন। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এই একটি মাত্র সিদ্ধান্ত এককভাবে নিয়েছিলাম। এই দিন ছিল দশই এপ্রিল। রেডিও অন করে রেখে খেতে বসেছি। খাওয়ার টেবিলে তাজউদ্দিন ভাই ও শেখ মনি আছেন। রাত তখন সাড়ে ন<strong>'</strong>টা। সেই আকাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত আসলো। প্রথমে আমার কন্ঠ ভেসে আসলো। ঘোষণায় আমি বলেছিলাম<strong>, </strong>বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী জনাব তাজউদ্দিন আহমদ বক্তৃতা দেবেন। প্রধানমন্ত্রী বক্তৃতা প্রচারিত হলো। সারা বিশ্বব্যাপী শুনলো স্বাধীন বাংলা সরকারের প্রধানমন্ত্রীর বেতার বক্তৃতা। আমাদের সংগ্রামের কথা দেশে বিদেশে ছড়িয়ে পড়লো।
&nbsp;
বক্তৃতা প্রচারিত হলো। আমাদের তিনজনের কারো মুখে কোন কথা নেই। আমি শুধু বললাম<strong>, </strong>গোলক মজুমদার শেষ পর্যন্ত বক্তৃতা প্রচার বন্ধ করতে পারেন নি। মনসুর ভাই রুটি খেয়ে আগেই ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। তিনি বক্তৃতা শুনতে পান নি।
<strong> </strong>
পরে একক সিদ্ধান্তে বক্তৃতা প্রচারের জন্য তাজউদ্দিন ভাই-এর কাছে ক্ষমা ও শাস্তি প্রার্থনা করি। তিনি বলেছিলেন যে<strong>, </strong>সে সময় আমার সিদ্ধান্তই সঠিক ছিল। সেদিন বক্তৃতা প্রচার না করলে গোলমাল আরো বৃদ্ধি পেত বৈকি।
&nbsp;
শেখ মনি তাজউদ্দিন ভাইকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন<strong>, </strong>তাঁকে প্রধানমন্ত্রী করার ব্যাপারে তিনি আগরতলা গিয়ে সকল প্রকার উদ্যোগ গ্রহণ করবেন। কিন্তু আগরতলা গিয়ে শেখ মনি ভারত সীমান্তের কাছাকাছি কসবাতে সংসদ সদস্য মমতাজ বেগমের বাড়িতে চলে যান।
&nbsp;
তাজউদ্দিন ভাই-এর বক্তৃতা প্রচারের পর অনেক রাতে কর্নেল (অবঃ) নুরুজ্জামান (সেক্টর কমান্ডার) ও আবদুর রউফ (রংপুর) আসেন। গভীর রাত পর্যন্ত তাঁদের সাথে আলোচনা করি। উত্তর বঙ্গে কয়েকটা সেক্টর রয়েছে। একটি সেক্টরের দায়িত্ব রয়েছেন কর্নেল জামান। তারা জানান<strong>, </strong>গেরিলা কায়দায় আকস্মিক হামলায় শত্রুদের পর্যুদস্ত করা হচ্ছে।
&nbsp;
আমি অবাঙালিদের ওপর হামলা না করার পরামর্শ দিলাম। অবাঙালি বিহারীদের ওপর জনগণ ক্ষুব্ধ। রংপুর ও সৈয়দপুরে বেশ কিছু বিহারী রয়েছে। অবশ্য ইতিমধ্যে কোন কোন স্থানে এদের ওপর বিচ্ছিন্ন হামলা হয়ে গেছে। আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব হামলা বন্ধ করার চেষ্টা করছেন। সরকার গঠনে তারা আনন্দ প্রকাশ করলেন।
&nbsp;
পরদিন ১১ই এপ্রিল সকালে নাশতা করে আমরা বিমানে উঠি। আগের রাতে প্রধানমন্ত্রীর বিতর্কের অবসান হওয়ায় মনসুর ভাই যেন বেশ খুশী।
&nbsp;
খুব নিচু দিয়ে আমাদের ছোট বিমান উড়ছে। দু<strong>'</strong>দেশের নেতাদের খোঁজখবর নিচ্ছি। সৈয়দ নজরুল ইসলামকে বিশেষভাবে খোঁজ করার জন্য ময়মনসিংহ সীমান্তে আমরা খবর দিয়ে রেখেছিলাম। সৈয়দ নজরুলকে পাওয়া যেতে পারে এমন একটি স্থানে গিয়ে প্রথমে শুনলাম<strong>,</strong> নেতৃত্বস্থানীয় কাউকে পাওয়া যায় নি। পরে বিএসএফ-এর স্থানীয় অফিসার জানান<strong>, </strong>ঢালু পাহাড়ের নীচে সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও আবদুল মান্নান রয়েছেন। এ কথা শুনে আমরা <strong>'</strong>ইউরেকা<strong>’ </strong>বলে আনন্দে লাফিয়ে উঠি।
&nbsp;
মাত্র আড়াই ঘন্টা পরে তাঁরা দু<strong>'</strong>জন আসলেন। নজরুল ভাই জীপ থেকে প্রথমে নামেন। আমার সহকারী হুইপ আবদুল মান্নানকে দেখে প্রথমে চিনতে পারিনি। পরে জানালাম ২৫শে মার্চের পর থেকে মান্নান সাহেব খুব কষ্টে দিনকাল কাটিয়েছেন। পাক বাহিনীর ভয়ে দু<strong>'</strong>দিন পায়খানায় পালিয়ে ছিলেন। টাঙ্গাইল থেকে সড়ক পথে হেঁটে ময়মনসিংহ এসেছেন। তিনি একেবারে জীর্ণশীর্ণ হয়ে গেছেন।
&nbsp;
সৈয়দ নজরুল ইসলাম তাঁর গ্রামের বাড়িতে ছিলেন। আমাদের খবর পেয়ে নজরুল ভাই ও তাঁর ভাই যথেষ্ট উৎসাহিত হন। নজরুল ভাইকে তাজউদ্দিন ভাই ডেকে নিয়ে একান্তে কথা বলেন। গত কয়েক দিনের ঘটনাবলী তাঁকে অবহিত করা হয়। আমরা বাইরে বসে আছি। সৈয়দ নজরুল ইসলাম<strong>, </strong>তাজউদ্দিন ভাইকে বিমানে মোবারকবাদ জানান। এই দৃশ্য দেখে আমরা সকলেই উৎফুল্ল হই। আমরা আবার বিমানে উঠি। আমাদের পরবর্তী গন্তব্যস্থল আগরতলা। আমরা বিমানে আসন গ্রহন করি। সামনের আসনে সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও মনসুর ভাই। নজরুল ভাই বিমানে বসে ঢাকা থেকে পলায়নের কাহিনী বর্ণনা করেন। তিনি ডঃ আলীম চৌধুরীর ছোট ভাই-এর বাসায় থাকতেন। তিনি ছিলেন নজরুল ভাই-এর আত্মীয়। সেই বাসা থেকে পরচুলা ও মেয়েদের কাপড় পরিধান করে গোপনে ঢাকা ত্যাগ করেন। মনসুর ভাই এ কথা নিয়ে এমনভাবে ঠাট্টা করলেন যে বিমানে কেউ না হেসে থাকতে পারলেন না। আমাদের আগরতলা পৌঁছতে সন্ধ্যা হয়ে গেল।
&nbsp;
ইতিমধ্যে আগরতলায় অনেক নেতা এসে পৌঁছেছেন। কর্নেল ওসমানীর সাথে দেখা হলো। তাঁর চেহারায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। দৃষ্টি আকর্ষণ করার মত গোঁফ তিনি কেটে ফেলেছেন। প্রথমে চিনতেই পারছিলাম না। আমার নিজেরও দাড়ি কেটে ফেলেছি। দু<strong>'</strong>জনেই দু<strong>'</strong>জনকে ডেকে হাসি ঠাট্টা করলাম।
&nbsp;
আগের রাতে খন্দকার মোশতাক এসেছেন। ডঃ টি হোসেন ঢাকা থেকে তাকে নিয়ে এসেছেন। এম আর সিদ্দিকী কয়েক দিন পূর্বে আগরতলা এসেছেন। চট্টগ্রাম থেকে জহুর আহমদ চৌধুরী এবং সিলেট থেকে আবদুস সামাদও এসে গেছেন। তাছাড়া তাহেরউদ্দিন ঠাকুর ও মাহবুব আলী চাষী ছিলেন।
&nbsp;
আগরতলা সার্কিট হাউজ পুরোটা আমাদের দখলে। ওসমানী ও নগেন্দ্র সিং ভিন্ন একটি ঘরে অবস্থান করছেন।
<strong> </strong>
ওসমানী যুদ্ধের পরিকল্পনা এবং অস্ত্রশস্ত্রের তালিকা তৈরী করে ফেলেন। আধুনিক সমরসজ্জায় সজ্জিত পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীকে সম্মুখ যুদ্ধে আমাদের পক্ষে মোকাবেলা করা সম্ভব না। ওসমানীকে সশস্ত্র বাহিনী প্রধানের দায়িত্বভার গ্রহণের আমন্ত্রণ জানানো হলো। তিনি এর পূর্বশর্ত হিসেবে যুদ্ধের সাজসরঞ্জামের কথা উল্লেখ করেন।
<strong> </strong>
রাতে খাবারের পর নেতৃবৃন্দ বৈঠকে বসেন। খন্দকার খুবই মনঃক্ষুণ্ণ। নাটকীয়ভাবে তিনি বললেন<strong>, </strong>আমরা যেন তাকে মক্কায় পাঠিয়ে দেই। আর মৃত্যুকালে তার লাশ যেন বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়া হয়। আমি ডঃ টি হোসেনের মাধ্যমে মোশতাক সাহেবের মনোভাব জানতে চাইলাম। মোশতাক ও টি হোসেন-এর মধ্যে অন্তরঙ্গ সম্পর্ক রয়েছে। দু<strong>'</strong>জনেই এক জেলার লোক। পারিবারিক পর্যায়েও তাদের সম্পর্ক খুবই মধুর। তিনিই তাকে নিয়ে এসেছেন আগরতলায়।
&nbsp;
টি হোসেনের সাথে আলাপ করে জানলাম<strong>, </strong>মোশতাক সাহেব প্রধানমন্ত্রী পদের প্রত্যাশী। সিনিয়র হিসেবে এই পদ তারই প্রাপ্য বলে তিনি জানিয়েছেন। সারা রাত পরামর্শ হলো।
&nbsp;
অনিদ্রা ও দীর্ঘ আলোচনায় আমি খুবই ক্লান্তি অনুভব করি। এক পর্যায়ে আমি ঘুমিয়ে পড়ি।
&nbsp;
শেষ পর্যন্ত খন্দকার মোশতাক মন্ত্রী সভায় থাকতে রাজী হলেন<strong>, </strong>তবে একটা শর্ত হলো<strong>, </strong>তাকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দিতে হবে। তাজউদ্দিন ভাই আমাকে একথা জানান। সবাই এতে রাজি হলেন। কেননা<strong>, </strong>একটা সমঝোতার জন্য এই ব্যবস্থা একেবারে মন্দ নয়। অবশেষে খন্দকার মোশতাকের মন্ত্রিসভায় যোগদানের বিষয়টি সুরাহা হলো। একজন হেসে খবর দিলেন<strong>,</strong> তিনি যোগদানে রাজি হয়েছেন। উপস্থিত সকলে এক বাক্যে আলহামদুলিল্লাহ পড়লেন। সকলে জহুর ভাইকে মোনাজাত করতে অনুরোধ করলেন। তিনি কয়েকদিন পূর্বে পবিত্র হজ্বব্রত পালন করে এসেছেন। তাঁর মাথায় তখনো মক্কা শরীফের টুপি। তিনি আধ ঘন্টা ধরে আবেগপ্রবণভাবে মোনাজাত পরিচালনা করেন। তাঁর মোনাজাতে বঙ্গবন্ধুর কথা<strong>, </strong>পাক দস্যুদের অত্যাচার<strong>,</strong> স্বজন হারানো<strong>, </strong>দেশবাসীসহ শরণার্থীদের কথা এলো। সে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। অনেকের চোখে পানি এসে গেল। এই মোনাজাতের মাধ্যমে আমরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞা নিলাম।
<strong> </strong>
স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস আগরতলায় অনুষ্ঠিত বৈঠককে আওয়ামী লীগ সংসদীয় দলের প্রথম বৈঠক বলা যেতে পারে। তাজউদ্দিন ভাই ও আমার প্রচেষ্টায় যেসব পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিল বৈঠকে সবগুলোকে অনুমোদন দেয়া হয়।
<strong> </strong>
এদিকে ওসমানী ও নগেন্দ্র সিং-এর বৈঠকে যুদ্ধের বিভিন্ন প্রস্তুতি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করা হয়। বৈঠকে এক পর্যায়ে আমি অংশ নেই। এর পূর্বে যুদ্ধ পরিকল্পনা নিয়ে দিল্লী কলকাতাসহ দেশের বাইরে ভেতরে সীমাবদ্ধ আলোচনা হয়েছে। সব ক<strong>'</strong>টিতে আমি গভীরভাবে জড়িত ছিলাম। যুদ্ধের ব্যাপ্তি<strong>, </strong>প্রকৃতি<strong>, </strong>সামরিক<strong>, </strong>রাজনৈতিক ও সামাজিক দিকগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বুঝবার চেষ্টা করি।
<strong> </strong>
১৩ই এপ্রিল ছোট বিমানে কলকাতা ফিরে গেলাম। মন্ত্রিসভার সদস্য ছাড়াও আবদুস সামাদ আজাদ ও কর্নেল ওসমানী কলকাতা আসেন। অন্যান্যরা কলকাতায় রয়ে গেলেন। বাংলাদেশ থেকে ভারতে পৌঁছার ব্যাপারে আমরা ২টি প্রবেশ পথ ঠিক করি। এর একটি হচ্ছে আগরতলা। এই পথে ঢাকা<strong>, </strong>চট্টগ্রাম<strong>, </strong>কুমিল্লা<strong>, </strong>নোয়াখালী ও সিলেটের লোকজন প্রবেশ করবে। অন্যান্য জেলার লোকজনের জন্য প্রবেশ পথ করা হয় কলকাতা। পরে অবশ্য সিলেটের জন্য ডাউকি<strong>,</strong> ময়মনসিংহের জন্য তোরা পাহাড়<strong>, </strong>রংপুরের জন্য ভুরুঙ্গামারী<strong>, </strong>দিনাজপুরের জন্য শিলিগুড়ি<strong>, </strong>বরিশালের জন্য টাকি-এ রকম বেশ কয়েকটি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পথ ঠিক করা হয়।
<strong> </strong>
মন্ত্রিসভার আনুষ্ঠানিক শপথের জন্য ১৪ই এপ্রিল দিনটি নির্ধারণ করা হয়েছিল। শপথের স্থানের জন্য আমরা চুয়াডাঙ্গার কথা চিন্তা করি। কিন্তু ১৩ই এপ্রিল পাক হানাদার বাহিনী চুয়াডাঙ্গা দখল করে নেয়। পাক দস্যুরা সেখানে বিমান থেকে বোমাবর্ষণ করে। আমরা চুয়াডাঙ্গা রাজধানী করার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম শেষ পর্যন্ত তা আর গোপন থাকে নি। চুয়াডাঙ্গার কথা বাদ দিয়ে আমাদের নতুন স্থানের কথা চিন্তা করতে হলো।
<strong> </strong>
এই নিয়ে গোলক মজুমদারের সাথে আমাদের বিস্তারিত আলোচনা হয়। এ ব্যাপারে সবাই একমত হন যে যেখানেই আমরা অনুষ্ঠান করি না কেন<strong>, </strong>পাক বাহিনীর বিমান হামলার বিরুদ্ধে সতর্ক থাকতে হবে।
<strong> </strong>
শেষ পর্যন্ত মানচিত্র দেখে কুষ্টিয়া জেলার মেহেরপুর মহকুমার বৈদ্যনাথ তলাকে মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণের উপযুক্ত স্থান হিসেবে নির্ধারন করা হয়। মন্ত্রিসভার শপথের জন্য নির্বাচিত স্থানের নাম আমি<strong>, </strong>তাজউদ্দিন ভাই<strong>, </strong>গোলক মজুমদার এবং বিএসএফ-এর চট্টপাধ্যায় জানতাম। ইতিমধ্যে দ্রুত কতগুলো কাজ করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিল।
<strong> </strong>
অনুষ্ঠানের কর্মসূচী নির্ধারন ছাড়াও প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতার খসড়া রচনা করতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে বিশ্বের কাছে নবজাত বাংলাদেশকে স্বীকৃতির আবেদনও বাংলা ভাষায় করা হয়েছিল। ইংরেজী কপি বিদেশী সাংবাদিকদের কাছে দেয়া হয়। সবচেয়ে বড় কাজ হলো স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র রচনা করা।
<strong> </strong>
আমি আর তাজউদ্দিন ভাই যে ঘরে থাকতাম<strong>, </strong>সে ঘরের একটি ছোট্ট স্থানে টেবিল ল্যাম্পের আলোতে লেখার কাজ করি। আমার কাছে কোন বই নেই<strong>, </strong>নেই অন্য দেশের স্বাধীনতার ঘোষণার কোন কপি।
<strong> </strong>
আমেরিকার ইন্ডিপেনডেন্স বিল অনেকদিন আগে পড়েছিলাম। সেই অরিজিনাল দলিল চোখের সামনে ভাসছে। আর সেই বড় বড় হাতের স্বাক্ষরগুলো। কিন্তু ভাষা বা ফর্ম কিছুই মনে নেই। তবে বেশি কিছু মনে করার চেষ্টা করলাম না। শুধু মনে করলাম<strong>, </strong>কি কি প্রেক্ষিতে আমাদের স্বাধীনতার অধিকার রয়েছে। এমনি চিন্তা করে ঘোষণাপত্রের একটা খসড়া তৈরি করলাম। স্বাধীনতার ঘোষণায় অস্থায়ী প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা নির্ধারণ করে দেয়া হলো।
<strong> </strong>
স্বাধীনতা ঘোষণাপত্রের খসড়া রচনার পর তাজউদ্দিন ভাইকে দেখালাম। তিনি পছন্দ করলেন। আমি বললাম<strong>, </strong>আমরা সকলে এখন যুদ্ধে অবতীর্ণ। এই দলিলের খসড়াটি কোন একজন বিজ্ঞ আইনজীবীকে দেখাতে পারলে ভাল হতো। তিনি বললেন এই মুহূর্তে কাকে আর পাবেন<strong>, </strong>যদি সম্ভব হয় কাউকে দেখিয়ে নিন।
<strong> </strong>
ইতিমধ্যে কলকাতা হাইকোর্টের আইনজীবীরা আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের স্বপক্ষে সমর্থন দিয়েছেন। এদের মধ্যে সুব্রত রায় চৌধুরীর নাম আমি শুনেছি। রায় চৌধুরীর আন্তর্জাতিক খ্যাতি রয়েছে। আমি তার লেখা কিছু নিবন্ধ পড়েছি বলে মনে হলো। বিএসএফ-এর মাধ্যমে রায় চৌধুরীর সাথে দেখা করতে চাই। তিনি রাজি হলেন। বালিগঞ্জে তার বাসা। আমার পরিচয়<strong>, ‘</strong>রহমত আলী<strong>’ </strong>নামে। সুব্রত রায় চৌধুরীর বাসায় পৌঁছে তাকে আমার প্রণীত ঘোষণাপত্রের খসড়াটি দেখালাম। খসড়াটি দেখে তিনি আনন্দে লাফিয়ে ওঠেন। এই খসড়া আমি করেছি কিনা জিজ্ঞাসা করলেন। আমি হ্যাঁ সূচক জবাব দেই। তিনি বলেন<strong>, </strong>একটা কমা বা সেমিকোলন বদলাবার প্রয়োজন নেই।
<strong> </strong>
তিনি বলেন<strong>, </strong>বাংলাদেশের স্বাধীকার প্রতিষ্ঠার যে আইনানুগ অধিকার<strong>, </strong>তা মানবাধিকারের একটা অংশ। এই কথা স্বাধীনতার সনদে ফুটে উঠেছে। তিনি জানান<strong>, </strong>তিনি এর ওপর একটা বই লিখবেন। এই ঘোষণাপত্রের একটা কপি তাকে দেয়ার জন্য তিনি অনুরোধ করলেন। এরপর আইন ব্যবসা প্রায় বন্ধ করে দিয়ে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের ওপর বই লেখা শুরু করেন। তার রচিত বইটির নাম হচ্ছে <strong>'</strong>জেনেসিস অব বাংলাদেশ<strong>’- </strong>আন্তর্জাতিকভাবে অধ্যয়নের জন্য ইউরোপ ও আমেরিকার বহুবিধ বিদ্যালয়ে এখন তা পড়ানো হচ্ছে।
<strong> </strong>
এটা ছিল সুব্রত চৌধুরীর সাথে আমার প্রথম পরিচয়। এরপর থেকে যুদ্ধ সমাপ্ত পর্যন্ত তিনি আমাকে বড় ভাই-এর মত সময়ে অসময়ে সাহায্য সহযোগিতা করেছেন। আমার জন্য তার দুয়ার সর্বদাই ছিল খোলা।
<strong> </strong>
এদিকে শপথ অনুষ্ঠানের খুঁটিনাটি তৈরি করা হচ্ছে। জানা গেল প্রধান সেনাপতি ওসমানির সামরিক পোষাক নেই। কিন্তু শপথ অনুষ্ঠানের জন্য তার সামরিক পোষাক প্রয়োজন। বিএসএফকে ওসমানীর জন্য এক সেট সামরিক পোষাক দিতে বললাম। তাদের স্টকে ওসমানীর গায়ের কোন পোষাক পাওয়া গেল না। সেই রাতে কাপড় কিনে<strong>,</strong> দর্জি ডেকে তাঁর জন্য পোষাক তৈরি করা হলো।
<strong> </strong>
শপথ অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের হাজির করার ভার আমার ও আবদুল মান্নানের ওপর। ১৬ই এপ্রিল আমরা দু<strong>'</strong>জনে কলকাতা প্রেসক্লাবে যাই। এই প্রথম বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে দু<strong>'</strong>জন প্রতিনিধি বিদেশী সাংবাদিকদের সাথে মিলিত হই। সমস্ত প্রেসক্লাব লোকে লোকারণ্য। তিল ধারণের ঠাই নেই। সার্চ লাইটের মত অসংখ্য চোখ আমাদের দিকে নিবদ্ধ। ক্লাবের সেক্রেটারী উপস্থিত সাংবাদিকদের সাথে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিলেন। তাদেরকে প্রথম অনুরোধ জানাই আমাদের উপস্থিতির কথা গোপন রাখতে হবে। এরপর বললাম<strong>, </strong>আমরা বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে একটি বার্তা নিয়ে এসেছি।
<strong> </strong>
সমবেত সাংবাদিকদের পরদিন ১৭ই এপ্রিল কাক ডাকা ভোরে প্রেসক্লাবে হাজির হতে অনুরোধ জানাই। বললাম<strong>, </strong>তখন তাদেরকে আমাদের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদের একটি বিশেষ বার্তা দেয়া হবে। তাদের কেউ কেউ আরো প্রশ্ন করতে চাইলেন। আমরা কোন উত্তর দিতে অপারগতা প্রকাশ করি। এতে তারা কেউ কেউ হতাশও হন। সাংবাদিকদের নির্দিষ্ট স্থানে যাওয়ার জন্য আমাদের গাড়ি তৈরি থাকবে বলেও জানালাম।
<strong> </strong>
আওয়ামী লীগের এমপি<strong>, </strong>এমএনএ এবং নেতাদের খবর পাঠিয়ে দেই রাত বারোটার মধ্যে লর্ড সিনহা রোডে সমবেত হওয়ার জন্য।
<strong> </strong>
বিএসএফ-এর চট্টপাধ্যায়কে বলি আমাদের জন্য ১০০টি গাড়ির ব্যবস্থা করতে। এর ৫০টা থাকবে প্রেসক্লাবের সাংবাদিকদের বহন করার জন্য। অবশিষ্ট ৫০টার মাধ্যমে আওয়ামী লীগ নেতাদের বাংলাদেশ সীমান্তে পৌঁছানো হবে।
<strong> </strong>
রাত ১২টা থেকে নেতাদের আমি গাড়িতে তুলে দেই। বলে দেয়া হলো<strong>, </strong>কোথায় যাচ্ছেন জিজ্ঞাসা করতে পারবেন না। সকাল বেলা আমরা একত্র হবো। গাড়ীর চালক নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে দেবেন। সাইক্লোস্টাইল করা স্বাধীনতা সনদের কপিগুলো গুছিয়ে নিলাম। হাতে লেখা কিছু সংশোধনী রয়েছে। কয়েকজনকে এগুলো সংশোধন করার জন্য দেই।
<strong> </strong>
১৭ই এপ্রিল জাতীয় ইতিহাসের একটি স্মরণীয় দিন। স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণের দিন। সারা রাত ঘুম হয়নি। ভোরের দিকে সৈয়দ নজরুল ইসলাম<strong>, </strong>তাজউদ্দিন আহমদ<strong>, </strong>খন্দকার মোশতাক আহমদ<strong>, </strong>এম মনসুর আলী<strong>, </strong>এএইচএম কামরুজ্জামান এবং ওসমানী একটি গাড়িতে রওয়ানা হয়ে যান।
<strong> </strong>
আমি ও আব্দুল মান্নান ভোরের দিকে পূর্ব কর্মসূচী অনুযায়ী কলকাতা প্রেসক্লাবে যাই। ভোরেও ক্লাবে লোক ধরে নি। ক্লাবের বাইরেও অনেক লোক দাঁড়িয়ে ছিল।
<strong> </strong>
আমি সাংবাদিকদের লক্ষ্য করে বিনীতভাবে বললাম<strong>, </strong>আমি বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে আপনাদের জন্য একটা বার্তা নিয়ে এসেছি। তাদের জানালাম স্বাধীন বাংলার মাটিতে বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ গ্রহণ করবেন। আপনারা সেই অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত। কেউ জানতে চাইলেন কিভাবে যাবেন<strong>, </strong>কোথায় যাবেন। আমি পুনরায় বলি<strong>, </strong>আমি আপনাদের সাথে রয়েছি<strong>, </strong>পথ দেখিয়ে দেব। আমাদের গাড়ীগুলো তখন প্রেসক্লাবের সামনে। উৎসাহিত সাংবাদিকরা গাড়ীতে ওঠেন। তাদের অনেকের কাঁধে ক্যামেরা। ৫০/৬০ টা গাড়ীযোগে রওয়ানা হলাম গন্তব্যস্থানের দিকে। আমি ও আব্দুল মান্নান দু<strong>'</strong>জন দুই গাড়ীতে। আমার গাড়ীতে কয়েকজন বিদেশী সাংবাদিক ছিলেন। পথে তাদের সাথে অনেক কথা হলো।
<strong> </strong>
শপথ অনুষ্ঠানের নির্ধারিত স্থান আম্রকাননে পৌছতে ১১ টা বেজে গেল। অনুষ্ঠানের আয়োজন প্রায় শেষ। মাহবুব ও তওফিক এলাহী অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামকে গার্ড অব অনার প্রদান করেন। আগেই ঠিক করা হয়েছিল যে চিফ হুইপ অধ্যাপক ইউসুফ আলী অনুষ্ঠানে স্বাধীনতার সনদ পাঠ করবেন।
<strong> </strong>
এদিকে পাক হানাদার বাহিনীর চাপের মুখে আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের পিছু হঠতে হয়েছে। সম্মুখ সমরে হানাদের বাহিনীর মোকাবিলা করা আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষে সম্ভব নয়। নির্দেশ সত্ত্বেও দেশ মাতৃকার মুক্তি পাগল যোদ্ধারা বাংকার ছেড়ে আসতে রাজি হচ্ছিল না। মাহবুব ও তওফিক তাদের সৈন্যসহ পাক হানাদার বাহিনীর দ্বারা ঘেরাও হয়ে পড়েছিলেন। তারা সুকৌশলে পিছু হটে আসেন। মনোবল ঠিক রেখে পশ্চাদপসরণ করা একটা কঠিন কাজ। ক্লান্ত শ্রান্ত মুক্তিযোদ্ধারা বাংকার থেকে উঠে আসে। ওদের চোখে মুখে বিশ্বাসের দীপ্তি বিদ্যমান ছিল।
<strong> </strong>
কোরান তেলাওয়াতের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরু হলো। একটি ছোট্ট মঞ্চে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি<strong>, </strong>প্রধানমন্ত্রী<strong>, </strong>মন্ত্রিসভার সদস্যবর্গ<strong>, </strong>ওসমানী<strong>, </strong>আবদুল মান্নান ও আমি। আবদুল মান্নান অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন। ইউসুফ আলী স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন। সৈয়দ নজরুল ইসলাম শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন। অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী ভাষণ দেন। একজন সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ এই স্থানের নাম মুজিবনগর করেন। ১৬ই ডিসেম্বর পাক হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণ পর্যন্ত মুজিবনগর ছিল অস্থায়ী সরকারের রাজধানী।
<strong> </strong>
সাংবাদিক সম্মেলনে প্রধান প্রশ্ন ছিল সরকারের প্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কোথায়<strong>? </strong>জবাবে নজরুল ইসলাম বলেন<strong>, </strong>আমরা বঙ্গবন্ধুর নির্দেশেই মন্ত্রিসভা গঠন করেছি। তাঁর সাথে আমাদের চিন্তার (বিস্তর) যোগাযোগ রয়েছে। আমরা জানতাম বঙ্গবন্ধু শত্রুশিবিরে বন্দী। কিন্তু আমরা তা বলতে চাই নি। পাক বাহিনী বলুক এটাই আমরা চাচ্ছিলাম। কারণ আমরা যদি বলি বঙ্গবন্ধু পাক শিবিরে<strong>, </strong>আর তারা যদি অস্বীকার করে তাহলে সমূহ বিপদের আশংকা রয়েছে। আর আমরা যদি বলি তিনি দেশের ভেতরে যুদ্ধের নেতৃত্ব দিচ্ছেন তখন হানাদাররা বলে বসবে তিনি বন্দী।
<strong> </strong>
আম বাগানের অনুষ্ঠানে ভর দুপুরে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী ছাড়াও পার্শ্ববর্তী এলাকার হাজার হাজার লোক জমায়েত হয়। হাজারো কন্ঠে তখন উচ্চারিত হচ্ছিল জয় বাংলা<strong>, </strong>জয় বঙ্গবন্ধু<strong>, </strong>বীর বাঙালি অস্ত্র ধর<strong>, </strong>বাংলাদেশ স্বাধীন কর<strong>,</strong> ইত্যাদি শ্লোগান।
<strong> </strong>
আমার কাজ ছিল দ্রুত অনুষ্ঠান শেষ করে সাংবাদিকদের ফেরত পাঠানো। দুপুরের মধ্য অনুষ্ঠান শেষ হয়ে গেলো। সাংবাদিকদের গাড়ীযোগে ফেরত পাঠানো হল। মন্ত্রিসভার সদস্যরা ফিরেন সন্ধ্যায়। অনুষ্ঠানের পর কলকাতা গিয়ে সাংবাদিকরা বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে সংবাদ পরিবেশন করেন।
<strong> </strong>
কলকাতার বাসায় ফিরে তাজউদ্দিন ভাইকে জিজ্ঞাসা করি কলকাতায় পাকিস্তান মিশনের হোসেন আলীকে আমাদের পক্ষে আনা যায় কিন। ফরিদপুরের আত্মীয় শহিদুল ইসলামের মাধ্যমে হোসেন আলীর সাথে যোগাযোগ করা হল। হোসেন আলী প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ করতে রাজী হলেন।
<strong> </strong>
গঙ্গার ধারে একটি হোটেলে দু<strong>'</strong>জনের সাক্ষাৎ হল। হোসেন আলী আমাদের পক্ষে আসতে রাজী হলেন।
<strong> </strong>
ইতিমধ্যে বিশ্বে যোগাযোগ বৃদ্ধির জন্য লণ্ডনে ফোন করি। লণ্ডনের গেনজেজ হোটেলের মালিক তসদ্দুক আহমদ আমার পুরাতন বন্ধু। এক কালে তিনি প্রগতিশীল রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন। তার সাথে যোগাযোগ করে বিচারপতি আবু সাইদ চৌধুরীর ফোন নম্বর পেলাম। বিচারপতি চৌধুরী যুদ্ধ শুরু হওয়ার পূর্ব থেকেই লণ্ডনে ছিলেন। তিনি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য।
<strong> </strong>
বিচারপতি চৌধুরীর মাধ্যমে লণ্ডনের তৎকালীন কাউন্টি কাউন্সিলের সদস্য এলভারস্যান<strong>, </strong>শ্রমিক নেতা ডোনাল্ড চেসয়ার্থ-এর সাথে যোগাযোগ করি। ডোনাল্ড আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। লণ্ডনে ব্যারিষ্টারী পড়ার সময় তার সাথে আমার পরিচয়। পরিচয় সূত্রেই বন্ধুত্ব। ডোনাল্ড ও অন্যান্যদের আমাদের মুক্তিযুদ্ধে সাহায্য সহযোগিতা করার আবেদন জানাই।
<strong> </strong>
লণ্ডনে আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনে ডোনাল্ডের যথেষ্ট সাহায্য সহযোগিতা পেয়েছিলাম। তার সাথে টেলিফোনে কথা হল। তিনি মুক্তিযুদ্ধের ব্যাপারে সার্বিক সাহায্যের আশ্বাস দিলেন। সে সময় রকিব সাহেব সিলেট থেকে কলকাতা আসেন। তিনি লণ্ডনে যাবেন। তার কাছে আবু সাঈদ চৌধুরীকে একটা চিঠি দিলাম। চিঠিতে স্বাধীনতা আন্দোলনের পক্ষে মত গড়ে তোলার জন্য বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে তাকে আহবান জানাই। চৌধুরীর সাথে আমার ফোনেও যোগাযোগ হল।
<strong> </strong>
১৮/১৯ তারিখের দিকে ওয়াশিংটন থেকে হারুনুর রশীদ এলেন। তিনি বিশ্ব ব্যাংকে চাকুরী করেন। তার কাছে বিদেশে অবস্থানরত বাঙালিদের মনোভাব জানতে পারলাম। ওয়াশিংটনে এ এম মুহিত ও অন্যান্যদের সহযোগিতায় তারা একটি গ্রুপ গঠন করেছেন। তিনি তাদের পক্ষে তাদের সাহায্যের আশ্বাস দিলেন। দিল্লী থেকে কলকাতা ফিরে আমরা খবর পেয়েছিলাম প্রফেসর নুরুল ইসলাম কোলকাতায় আছেন।
<strong> </strong>
মন্ত্রিসভা শপথ গ্রহনের পরদিন (১৮ই এপ্রিল) স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে আরো একটি স্মরণীয় দিন। এই দিন সকালবেলা কলকাতা পাক মিশনের হোসেন আলীসহ প্রায় সকল কর্মকর্তা বাংলাদেশের পক্ষে আনুগত্য প্রকাশ করেন। সার্কাস এভিনিউতে অবস্থিত পাক দূতাবাসে এত দিন ধরে যেখানে পাকিস্তানের পতাকা উড়তো<strong>, </strong>সেখানে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উড়ানো হল। এই ঘটনায় দেশে বিদেশে এক ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। দূতাবাসে সেদিন জনতার ঢল নামে। বিভিন্ন সংগঠন মিছিল করে সার্কাস এভিনিউতে এসে হোসেন আলীকে স্বাগত সম্ভাষন জানায়। ফুলের মালায় মিশনের প্রাঙ্গন ভরে যায়।
<strong> </strong>
বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী আমাকে প্রেরণ করেন হোসেন আলীকে অভিনন্দন জানাতে। হোসেন আলীর স্ত্রী<strong>, </strong>দুই কন্যা এবং এক ছেলের সাথে পরিচয় হল। তারা সকলেই স্বাধীনতা যুদ্ধে শরিক হলেন। হোসেন আলীর স্ত্রী খুবই সাহসী মহিলা। এ ব্যাপারে স্বামীকে তিনি প্রচণ্ড সাহস যুগিয়েছেন।
<strong> </strong>
বিদেশী বেতারের সাথে বাংলাদেশের পাক দস্যুদের অত্যাচারের করুণ কাহিনী তিনি বর্ণনা করেন। কান্নাজড়িত তার এই বক্তব্য কলকাতা বেতারে প্রচারিত হয়। এই মহিলার হৃদয়স্পর্শী বক্তব্য যারা শুনেছেন তারাই মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে সহানুভূতি প্রকাশ করেছেন।
<strong> </strong>
১৮ই এপ্রিলের পূর্ব রাতে বেগম হোসেন আলী ও তার একমাত্র মেয়ে মিলে স্বাধীণ বাংলার পতাকা তৈরি করেন। আমি থাকতে থাকতে বহু লোক এলো হোসেন আলীকে অভিনন্দন জানাতে। বেশীক্ষণ সেখানে আমি অবস্থান করি নি। বহু গণ্যমান্য লোককেও আসতে দেখলাম।
<strong> </strong>
বাংলাদেশের বহু লোক পাক বাহিনীর অত্যাচারে কলকাতায় শরণার্থী হয়েছে। তাদের জন্য সাহায্য প্রয়োজন। ১৯শে এপ্রিল থেকে মিশনে কাপড়<strong>, </strong>অর্থ ইত্যাদি সাহায্য আসতে থাকে। হোসেন আলী আগেই পাক মিশনের অর্থ ব্যাংক থেকে তুলে রেখেছিলেন। এই অর্থ দিয়ে মিশন পরিচালনা করা হবে।
<strong> </strong>
পাক মিশনের একজন মাত্র কর্মচারী বাংলাদেশের পক্ষে আনুগত্য প্রকাশ করেননি। তিনি তার বাসায় রয়ে গেলেন। মিশনে আসেন না। এই ভদ্রলোকের সাথে কথা বলতে তার বাসায় গেলাম। তিনি আমার পূর্ব পরিচিত। ১৯৬৪ সাল<strong>, </strong>তখন মোনায়েম খানের রাজত্ব। এই ভদ্রলোক সে সময় পাবনার পুলিশ সুপার ছিলেন। তার নাম আর আই চৌধুরী। সরকার বিরোধী এক মিছিল করায় পাবনায় সে সময় বহু লোককে গ্রেফতার করা হয়। আমাদের দলের নেতা মনসুর আলী তখন জেলে। আমি ও নাইমুদ্দিন পাবনা গিয়ে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের সাথে দেখা করি এবং পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে পত্রিকায় একটা রিপোর্ট প্রকাশ করি। জেলে আমাদের নেতাদের সাথে দেখা করার পর আদালতে তাদের জামিনের আবেদন করি।
<strong> </strong>
পুলিশ সুপার আর আই চৌধুরীর প্রচণ্ড দাপটের কথা তখন আমার মনে পড়ছিল। তবে <strong>'</strong>৬৪ সালের চেহারার সাথে আজকের চেহারার কোন মিল নেই। তার স্ত্রী তখনো বাংলাদেশের অভ্যন্তরে। কিছুদিন পর তার স্ত্রীর কলকাতা আসার পর আর আই চৌধুরী বাংলাদেশের পক্ষে আনুগত্য প্রকাশ করেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় মেজর ডালিম তার মেয়ের সাথে বিয়ের প্রস্তাব দেয়। মেয়ের পিতা রাজী হননি। পরে ছেলে মেয়ে নিজেদের উদ্যোগে বিয়ে করে। তাজউদ্দিন ভাই তাদের মিলিয়ে দেন।
<strong> </strong>
ক্রমশঃ আমাদের লোকজন বৃদ্ধি পাচ্ছে। স্থান সংকুলান হচ্ছে না। বিএসএফ বালিগঞ্জে একটি বাড়ী ভাড়া করে। আমরা সেই বাড়ীতে উঠি। তাজউদ্দিন ভাই ও আমি একটি ঘরে। অন্য একটি ঘরে সৈয়দ নজরুল ও মনসুর ভাই এবং পৃথক একটি ঘরে খন্দকার মোশতাককে। কামরুজ্জামান ভাই থাকতেন তার এক বন্ধুর বাড়ীতে।
<strong> </strong>
১৯শে এপ্রিল বাংলাদেশ মিশনের একটি ভবনে তিন তলায় আমি অফিস করছি। আমার প্রথম কাজ হচ্ছে বাংলাদেশের স্বীকৃতির জন্য বিদেশী রাষ্ট্রপ্রধানদের কাছে আবেদন করা। কয়েকজন টাইপিস্ট আমার সাথে রাত দিন কাজ করছে। প্রধানমন্ত্রীর ১০ই এপ্রিল ও ১৭ই এপ্রিলের বক্তৃতা বিভিন্ন স্থানে প্রেরণ করতে হবে। স্বীকৃতির আবেদনপত্রসহ বক্তৃতার বহু কপি তৈরী করা হলো। স্বীকৃতির আবেদনে দস্তখত নিয়ে একটুর ঘাপলার সৃষ্টি হল। পররাষ্ট্রমন্ত্রী খন্দকার মোশতাক এগুলোতে নানা অজুহাতে সই দিতে দেরী করলেন। এদিকে আমি অস্থির হয়ে গেছি। কয়েকদিন গড়িমসি করে পরে তিনি সই করেন।
<strong> </strong>
স্বীকৃতির এই আবেদনপত্রগুলো কিছু ডাকযোগে আবার কিছু লোক মারফত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রেরণ করা হয়। আবদুস সামাদ আজাদ কিছু চিঠিসহ বিদেশের পথে রওয়ানা হয়ে গেলেন। আমাদের এই স্বীকৃতির আবেদনের খবর বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।
<strong> </strong>
মোশতাক সাহেবের পরিবার আনার জন্য ডঃ টি হোসেন আগরতলা থেকে আবার ঢাকা ফিরে গেছেন। আমার পরিবারের খবর সম্ভব হলে নেয়ার জন্য ডঃ টি হোসেনকে অনুরোধ করেছি। কিন্ত তিনি ঢাকায় সন্ধান করেও আমার পরিবারের কোন খোঁজ পাননি। তার আগেই আমার পরিবারকে ঢাকা ছাড়তে হয়েছে। ডঃ হোসেন আমার প্রতিবেশী ডঃ নাইমুর রহমানের বাসায় আমার পরিবারের খোঁজ করেছিলেন। তারা ভাল আছেন বলে তিনি শুনেছেন। কিন্তু কোথায় তারা ছিলেন এই খবর পাই আরো পরে। কিছুদিন পর ডঃ টি হোসেন কলকাতা ফিরে আসেন।
<strong> </strong>
ইতিমধ্যে মন্ত্রিসভায় কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। আমি সন্ধ্যায় মিশন থেকে বাসায় ফিরে জানলাম<strong>, </strong>আমাকে প্রধানমন্ত্রীর <strong>'</strong>প্রিন্সিপাল এইড<strong>'</strong> করা হয়েছে। আমার সহকারী হুইপ আবদুল মান্নানকে প্রচারের দায়িত্ব দেয়া হয়।
<strong> </strong>
আমি প্রধানমন্ত্রীর কাছে জানতে চাইলাম<strong>, </strong>আমাকে কেন এই পদে নিয়োগ করা হলো। তিনি বলেন<strong>, </strong>এটা মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত এবং আমারও ইচ্ছা। পুনরায় জিজ্ঞাসা করি<strong>, </strong>আমার করণীয় কি হবে<strong>? </strong>তাজউদ্দিন ভাই জানান<strong>,</strong> “প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমি যা কিছু করবো তার সবকিছুই আপনার কাজের অংশ হবে।”
<strong> </strong>
এ সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে কিছু বেসামরিক অফিসার এসে গেছেন। পাবনার জেলা প্রশাসক নুরুল কাদের<strong>, </strong>রাজশাহীর জেলা প্রশাসক হান্নানসহ আরো অনেকে। এদের কাজ দেয়া হলো। রাজশাহীর জেলা প্রশাসক কয়েকদিন কাজ করে ফিরে চলে যান।
<strong> </strong>
সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশ থেকে শত শত লোক প্রতিদিন আসছে। এদের মধ্যে সরকারী কর্মচারী<strong>, </strong>ডাক্তার<strong>, </strong>প্রকৌশলী<strong>, </strong>ব্যবসায়ী<strong>, </strong>উকিল<strong>, </strong>ছাত্র-যুবক<strong>, </strong>রাজনৈতিক নেতা-কর্মী বিভিন্ন স্তরের লোক রয়েছে। সকলেই চলে আসে বাংলাদেশ মিশনে। এদের পেশা উল্লেখ করে নাম ঠিকানা রেকর্ড হতে লাগলো। পেশা জানার উদ্দেশ্য হল প্রয়োজনে কাজে লাগানো। মিলিটারী<strong>, </strong>পুলিশ<strong>, </strong>বিডিআর<strong>, </strong>মুক্তিযোদ্ধা ও আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী হলে আমার কাছে পাঠিয়ে দেয়ার কথা ছিল। এখান থেকে আমি তাদের প্রয়োজনীয় কাজে লাগাবার চেষ্টা করতাম।
<strong> </strong>
এ সময়টা আমাদের জন্য চরম সংকটের সময় ছিল। পাক হানাদার বাহিনী প্রচণ্ড হামলা করে আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের সীমান্তের দিকে ঠেলে দিয়েছে। প্রায় সকল ফ্রন্ট থেকে মুক্তিযোদ্ধারা পশ্চাদপসরণ করছে। এ সময়ে তাদের মনোবল ঠিক রেখে যুদ্ধ পরিচালনা ছিল খুব কঠিন কাজ।
<strong> </strong>
বনগাঁ সীমান্তে একটা তাঁবুতে মেজর ওসমান<strong>, </strong>তওফিক এলাহী ও মাহবুব তাদের দল বল নিয়ে অবস্থান করছেন। তখনো তারা ভারতে ভেতরে প্রবেশ করেন নি। কাষ্টম চেক পোষ্টের ওপারে তাদের ছাউনী।
<strong> </strong>
সারাদিন অফিসে খুবই ব্যস্ত থাকতাম। কিন্তু শত ব্যস্ততার মধ্যেও সীমান্তে যোদ্ধাদের খোঁজ খবর প্রতি সন্ধ্যায় নিতে চেষ্টা করতাম। এ সময় আমার জুনিয়র পার্টনার ব্যারিষ্টার মওদুদ আহমদ কলকাতা পৌঁছেন। সহযোগিতা করার জন্য তাকে আমার সাথেই রাখলাম। আমার অফিসের পাশে একটা ঘরে তার বসার ব্যবস্থা হলো। প্রথম দিকে তিনি বিদেশী প্রেসের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করতেন। এ কাজ তিনি খুবই দক্ষতার সাথে করেন। পরে তাকে বহিঃপ্রচারের দায়িত্ব দেয়া হয়।
<strong> </strong>
এরপর বাংলাদেশ সরকার ডাকঘর স্থাপন করেন। মওদুদ আহমদ পোষ্ট মাষ্টার জেনারেল হন। বিমান মল্লিকের নকশা করা স্ট্যাম্প বাজারে ছাড়া হলো। স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মারক হিসেবে এই স্ট্যাম্প ছাড়া হয়।
<strong> </strong>
দৈনিক প্রচুর লোক আসতো। এসেই জিজ্ঞাসা করতো থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা কোথায়<strong>?</strong> সোজা জবাব দিতাম<strong>, ‘</strong>এই প্রশ্নের জবাব কেউ দিতে পারবে না। আপনাকে ম্যানেজ করে নিতে হবে। অর্থাৎ আপনি আমাদের ম্যানেজ কমিটির সদস্য হলেন। যেখানে রাত হবে<strong>, </strong>সেখানেই ঘুমাবার চেষ্টা করবেন। কেউ খেতে বললে কোন আপত্তি করবেন না।<strong>'</strong>
<strong> </strong>
কলকাতায় অনেকের বন্ধু বান্ধব রয়েছে। অনেকে আবার বাংলাদেশে থেকে গেছেন। কিছু কিছু বাংলাদেশী সেই সূত্রে আশ্রয় লাভ করেছেন। মৈত্রেয়ী দেবীর বাড়িতে থাকতেন কেউ কেউ। পরে মৈত্রেয়ী দেবীর বাড়ীর পাশে একটি স্কুলে ক্যাম্প তৈরী করা হয়। এমনিভাবে কলকাতা শহরে বিভিন্নভাবে থাকার ব্যবস্থা হয়ে যায়। আগরতলাতেও এমনি ধরনের ব্যবস্থা হয়ে যায়। আসাম ও মেঘালয়ের জীবন ছিল আরো শক্ত। শেষোক্ত দু’টি রাজ্যের মানুষ তত প্রাণখোলা ছিল না।
<strong> </strong>
এ সময় বৃটেনের শ্রমিক দলীয় সংসদ সদস্য ডগলাস ম্যান কলকাতা আসেন। আমার বন্ধু ডোনাল্ডের চেষ্টায় তিনি আমাদের অবস্থা স্বচক্ষে দেখার জন্য আসেন। ডোনাল্ড আমাকে ফোন করে বলেন<strong>, </strong>ডগলাস ম্যান-এর সাথে যেন বাংলাদেশ সরকারের কারো সাক্ষাতের ব্যবস্থা করে দেই। ডগলাস ম্যান বৃটিশ হাই কমিশনারের বাড়ীতে উঠেছেন। সেখানে গিয়ে তার সাথে দেখা করি। মিঃ ম্যান ও আমি বাংলাদেশের ভেতরে যাব। সেখানে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিনের সাথে তার দেখা হবে।
<strong> </strong>
তাজউদ্দিন ভাই ভোরে চলে গেছেন। বাংলাদেশের মাটিতে প্রথম সাক্ষাতের প্রয়োজন। তাই এই ব্যবস্থা করা হয়েছে। কাষ্টম চেক পোষ্টের কাছে প্রধানমন্ত্রীর থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সেখানে বাংলাদেশের পতাকা উড়ছে। আমি ডগলাস ম্যানকে নিয়ে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ করি। সেখানে মেজর ওসমানকে পাওয়া গেল। বৃটিশ এমপিকে নিয়ে আমরা মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে গেলাম। এই বিদেশীকে দেখে মুক্তিযোদ্ধারা খুবই খুশী হলো। তারা ডগলাস ম্যান-এর কাছে মুক্তিযুদ্ধ<strong>, </strong>পাক সেনা হানাদার বাহিনীর নির্মম অত্যাচার<strong>, </strong>মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধ ইত্যাদি বর্ণনা করেন। আমরা তাকে অনুরোধ করি তিনি যেন আমাদের দূত হয়ে সারা বিশ্বে আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের কথা জানিয়ে দেন। কিছুক্ষণ পর মিঃ ম্যান আমার হাত ধরে বলেন<strong>, </strong>আমাকে একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গ্রহণ করো। তিনি আমাদের সর্বতোভাবে সাহায্য সহযোগিতা করার আশ্বাস দেন। মানবিক গুণে গুণান্বিত খাঁটি পুরুষ ডগলাস তার কথা রেখেছিলেন।
<strong> </strong>
ডগলাস ম্যান-এর এই সফর এবং প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ-এর সাক্ষাৎ-এর খবর ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়। এতে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে সাড়া জাগে। ডগলাস ম্যান ফিরে গিয়ে খবরের কাগজ<strong>, </strong>বৃটিশ পার্লামেন্ট<strong>, </strong>শ্রমিক দলের বৈঠকসহ বিভিন্ন কমিটিতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে রিপোর্ট দেন।
<strong> </strong>
ডগলাস ম্যানকে বিদায় করে দিয়ে কলকাতা ফেরার পথে তাজউদ্দিন ভাই ও আমি যশোর অঞ্চল থেকে আগত আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের সাথে বৈঠক করি। তারা খুব কষ্টে দিনাতিপাত করছে। সেখানেও শরণার্থী সংখ্যা বেড়েই চলেছে। পথে আসতে আসতে প্রধানমন্ত্রীর সাথে শরণার্থীসহ বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আলোচনা করি।
বাংলাদেশ থেকে খবর আসছে যে<strong>, </strong>সেখানে সর্বত্র হানাদার বাহিনীর আক্রমনের প্রচণ্ডতা বৃদ্ধি পেয়ছে। তারা গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিচ্ছে। হানাদার বাহিনীর অত্যাচার যত বৃদ্ধি পাচ্ছে শরণার্থীদের সংখ্যাও সেই হারে বেড়ে চলেছে। ২৫শে মার্চের পর ঢাকা থেকে যে হারে মানুষ গ্রামে চলে গিয়েছিল আজো সেই হারে বাংলাদেশ থেকে মানুষ সীমান্ত পার হয়ে আসছে।
<strong> </strong>
কলকাতা ফিরে আইনজীবী সুব্রত রায় চৌধুরীর সাথে শরণার্থী নিয়ে আলোচনা করি। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় সহায়ক সমিতির কর্মকর্তাদের সাথে আমার যোগাযোগ করিয়ে দেন। সমিতির সম্পাদক দিলীপ চক্রবর্তীর সাথে আমার প্রথম পরিচয় হয়। তিনি বলেন<strong>,</strong> পরদিন তিনি সীমান্তের দিকে যাবেন। কৃষ্ণনগর ও নদীয়া জেলা সীমান্তে। আমি গেলে তিনি নিয়ে যেতে পারেন। আমি রাজী হলাম। কথা হলো<strong>,</strong> তিনি আমাকে বাংলাদেশ মিশন থেকে তুলে নেবেন।
<strong> </strong>
সীমান্তে যাওয়ার জন্য আমি হাতের কাজ গুছিয়ে নেই। আমার সেখানে যাওয়া বিশেষভাবে প্রয়োজন। কারণ<strong>, </strong>সীমান্তের এই অঞ্চলে নিজের জেলা কুষ্টিয়ার অনেকের সাথে সাক্ষাৎ হবে। কৃষ্ণনগরে গিয়ে দেখি<strong>, </strong>স্থানীয় সমাজকর্মীরা এক বাড়ীতে অফিস করেছে। সেদিন সেখানে শরণার্থী সমস্যার সমাধান ও মুক্তিযুদ্ধকে সাহায্য করার উদ্দেশ্যে সর্বদলীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বৈঠক আহবান করা হয়েছে। প্রফেসর দিলীপ চক্রবর্তী বৈঠকে আমাকে পরিচয় করিয়ে দেন। আমাকে পেয়ে তারা খুশী হন।
<strong> </strong>
আমি সমাবেশে আমাদের সংগ্রাম<strong>, </strong>যুদ্ধ পরিস্থিতি ও ভবিষ্যৎ কর্মসূচী নিয়ে আলোচনা করি। বর্তমান পরিস্থিতিতে পশ্চিম বঙ্গের সচেতন অধিবাসীদের কাছ থেকে কি আশা করি তাও জানালাম। ছোটবেলায় দাদুর মুখে শোনা কৃষ্ণনগর<strong>, ‘</strong>পুতুল খেলার কৃষ্ণনগর<strong>’ </strong>আজ স্বচক্ষে দেখলাম। বাংলাদেশের ভিটে মাটি হারা মানুষ আসছে। কিন্তু এপারের জনগণ আঁতকে ওঠে নি। ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সুদৃঢ় বলেই এপারের মানুষ ওপারের ভাগ্যহত মানুষদের আশ্রয় দিচ্ছে। বৈঠক থেকে বেরিয়ে আসলে চুয়াডাঙ্গার সকল কর্মী ভাইয়েরা আমার সাথে কোলাকুলি করেন। এদের মধ্যে মিছকিন মিয়া<strong>, </strong>ফকীল মোহাম্মদ<strong>, </strong>ডাঃ নজির আহমদসহ আরো অনেকে ছিলেন। তাদের মুখে অনেক কথা শুনলাম। আমি তাদেরকে বললাম<strong>, </strong>এদেশে আমরা যেন বাস্তুহারা হয়ে না যাই। এই যুদ্ধে সকলকে অংশ নিতে হবে। যিনি অস্ত্র হাতে নিতে পারবেন<strong>, </strong>তিনি প্রশিক্ষণ নেবেন। আর যিনি তা পারবেন না<strong>, </strong>তাকে সহকারী হিসেবে যুদ্ধের সামগ্রী বহন করতে হবে। সকলকে একত্র থাকতে হবে। যা পাই তা ভাগ করে খেতে হবে। আমি তখন কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় দায়িত্ব ছাড়াও জেলার প্রতি বিশেষ দায়িত্ব রয়েছে।
এর পর আমি কয়েকদিন ধরে কুষ্টিয়া জেলার দলীয় কর্মীদের খুজে বের করি। চুয়াডাঙ্গা আওয়ামী লীগের তৎকালীন প্রচার সম্পাদক (বর্তমানে জাসদ নেতা) মীর্জা সুলতান রাজা আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। কুষ্টিয়া আওয়ামী লীগ সংগঠনের সাংগঠনিক ব্যাপারে তিনি আমাকে সক্রিয়া সহায়তা করেছেন। সমাজতান্ত্রিক ও বিপ্লবী কর্মী গড়ে তোলার ব্যাপারে তার প্রচেষ্টা ছিল প্রশংসনীয়। তাকে খুজে বের করি। মীর্জা সুলতান<strong>, </strong>আবুল হাশেম<strong>, </strong>ডাঃ নাজিরসহ আরো অনেকে মিলে একটি বাড়ীতে একটি ক্যাম্প গড়ে তুলেছেন। বিভিন্নভাবে তাঁবু<strong>, </strong>খাবার ও রান্নার জিনিসপত্র যোগাড় করা হলো। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় সহায়ক সমিতি বিশেষ করে দিলীপ চক্রবর্তী এ ব্যাপারে বিশেষ সহযোগিতা করেন।
<strong> </strong>
এমনিভাবে বয়রা<strong>,</strong> মামাভাগ্নে<strong>,</strong> কৃষ্ণনগর<strong>, </strong>শিকারপুরসহ বিভিন্ন অঞ্চলে আমাদের দলীয় কর্মীদের উদ্যোগে ছোট ছোট ক্যাম্প গড়ে ওঠে। এগুলোর মধ্যে শিকারপুরের অবস্থা অতি করুণ। কুষ্টিয়া সদর<strong>,</strong> কুমারখালী<strong>, </strong>রাজাবাড়ী ইত্যাদি অঞ্চলের লোকজন এখানে জমা হয়েছে। একটি ছোট গুদাম ঘর স্থানীয় লোকেরা ছেড়ে দিয়েছে। সেখানে সকল রাজনৈতিক কর্মী স্থান নিয়েছেন। কুষ্টিয়ার আব্দুল হামিদ<strong>, </strong>আজিজ মিয়া<strong>, </strong>আবুল কালাম<strong>, </strong>জলিল সবাই এখানে স্থান নিয়েছেন। এক হাঁটু পানি দিয়ে এই গুদাম ঘরে যেতে হয়। কোন রকমে ছাউনি দিয়ে রান্নার ব্যবস্থা করা হয়েছে। মাটিতে বিছানা পেতে থাকতে দেয়া হয়েছে। এত কষ্টের মধ্যে থেকেও এদের মনোবল ও উদ্দীপনা কমে নি। কিভাবে দেশ স্বাধীন হবে<strong>, </strong>এই যেন তাদের সবসময়ের চিন্তা। মেহেরপুরের এমপিএ মহিউদ্দিন<strong>, </strong>এমপিএ নুরুল হক<strong>, </strong>জলিল এদেরকেও খুঁজে পেলাম। তারা একটি পাটের গুদামে আশ্রয় নিয়েছে।
<strong> </strong>
আমাদের সকলের চিন্তায় এক অদ্ভুত মিল রয়েছে। আওয়ামী লীগ কর্মীরা যে এক পরিবারভুক্ত তা বিপদের দিনে বুঝা যায়। কেউ কাউকে ছেড়ে যাবে না। যা পাবে<strong>, </strong>তা সকলে মিলে ভাগ করে খাবে এমনি মনোভাব গড়ে উঠেছে। সীমান্তের বিভিন্ন এলাকা ঘুরতে ঘুরতে অনেক রাত হয়ে যেতো। কোন কোন দিন রাত ১২ টার দিলে কলকাতা ফিরতাম। দিনের বেলা অফিসে আর রাতের বেলা সীমান্তে এই ছিল নিত্যদিনের কাজ। প্রধানমন্ত্রীকে প্রায়ই মনঃক্ষুণ্ণ মনে হতো। নকশালীদের তখন চরম দাপট। কৃষ্ণনগর<strong>, </strong>রানাঘাট অঞ্চলে তাদের তৎপরতা চলছে। তেমনি কলকাতায়ও। ২/১ ঘন্টা ঘুমিয়ে<strong>, </strong>উঠে পড়তাম। সকালে নাশতার টেবিলেও তাজউদ্দিন ভাই-এর সাথে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হতো। ১২/১ টার মধ্যে মিশনে গিয়ে কাজ শেষ করতাম। এরপর হোসেন আলীর সাথে দুপুরের খাবার সেরে নিতাম। হোসেন আলীর স্ত্রী ডালভাত পাক করতেন। বিদেশ থেকে পাওয়া চিঠিপত্রের সংক্ষিপ্ত সার ও প্রেস ক্লিপস প্রধানমন্ত্রীকে দিতাম। দুপুরের খাওয়া শেষ করে সীমান্তের দিকে রওয়ানা হতাম।
<strong> </strong>
ইতিমধ্যে শরণার্থী সমস্যা ব্যাপক আকার ধারণ করলো। সীমান্তের কাছাকাছি ভারতের কয়েকটি রাজ্যের স্কুল কলেজগুলো বন্ধ করে দিতে হলো। বাংলাদেশ থেকে আগত শরণার্থীরা এগুলোতে আশ্রয় নিয়েছে। স্থানীয় উদ্যোগে শরণার্থীদের সাহায্য করা হচ্ছে। কিন্তু সমস্যা এতো ব্যাপক যে কেন্দ্রীয় উদ্যোগ ছাড়া এর সমাধান সম্ভব ছিল না। ভারত সরকার চাল<strong>, </strong>ডাল ইত্যাদির ব্যবস্থা করলেন কিন্তু রান্নার হাঁড়ি<strong>, </strong>পাতিল<strong>, </strong>বাসন কোসনের অভাব রয়েছে। পায়খানা প্রস্রাব করার স্থানেরও অভাব। পানির ব্যবস্থা নিতান্ততই অপ্রতুল। এই অবস্থার জন্য আশ্রয়দাতা ও আশ্রিত কেউ প্রস্তুত ছিলেন না। স্থানীয় জনগণের সহযোগিতায় বিভিন্ন শিবিরে আমাদের স্বেচ্ছাসেবকরা এসব সমস্যার আশু সমাধানের চেষ্টা করছে। কোন কোন শিবিরে কলেরা<strong>, </strong>রক্ত আমাশয় ইত্যাদি রোগ দেখা দিয়েছে। শিশু মৃত্যুর হার ক্রমেই বেড়ে চলেছে। দীর্ঘ সীমান্ত পথ পাড়ি দিয়ে শিবিরে এসে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েছে। অনাহার ও রোগের বেশী শিকার হচ্ছে শিশু ও বৃদ্ধরা। এমনও ঘটনা ঘটেছে যে মা মৃত শিশুকে সৎকার না করে পথিমধ্যে ফেলে এসেছে। অনাহার ক্লিষ্ট মানুষের আহার<strong>, </strong>বিশ্রাম প্রয়োজন। শরণার্থী শিবিরের করুণ অবস্থার দেখে চোখের জল বাধ মানে না। কিন্তু দুরবস্থার মধ্যে থেকেও মানুষের মনোবল কমে নি। কলকাতার বন্ধুদের আমাদের এই দুরবস্থার কথা জানাই। বিভিন্ন ত্রাণ সমিতি সাহায্যের হাত প্রসারিত করে এগিয়ে আসে।
<strong> </strong>
মৈত্রেয়ী দেবী সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা কমিটির আহ্বায়িকা। তিনি ছোট এক ত্রাণ তহবিল গঠন করেছেন। রবি ঠাকুরের স্নেহধন্যা মৈত্রেয়ী দেবী বাংলার মানুষের দুঃখের দিনে এগিয়ে এলেন। তাকে নিয়ে আমি বিভিন্ন শিবিরে গিয়েছি। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা<strong>, </strong>বিশেষ করে শরণার্থী ও স্থানীয় জনগণের মধ্যে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে হবে।
<strong> </strong>
একটি লিফলেট ছাপা হলো। লিফলেটে শরণার্থী শিবিরে থাকার নিয়ম কানুন<strong>, </strong>সতর্কতামূলক ব্যবস্থা ইত্যাদি লিখা ছিল। এটা শরণার্থীদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। প্রথম দিকে বিভিন্ন ত্রাণ সংস্থার সাহায্যে শিবিরগুলো পরিচালিত হয়। পরে অবশ্য এগুলোর ভরণ-পোষণের দায়িত্বভার কেন্দ্রীয় সরকার গ্রহন করে। চব্বিশ পরগণা অঞ্চলে বরিশাল ও স্থানীয় সমাজ কল্যাণ সংস্থাগুলোর সহায়তায় শরণার্থী শিবিরগুলো পরিচালিত হতে থাকে।
<strong> </strong>
বিভিন্ন সেক্টরে সামরিক বাহিনীর পদস্থ কর্মকর্তাদের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণের কাজ চলছে। আগরতলাতে খালেদ মোশারফ ও শফিউল্লাহ নিজ নিজ ছাউনীতে নিয়মিত বাহিনীর সাথে অনিয়মিত মুক্তিবাহিনী গড়ে তুলেছেন। নতুন নতুন যোদ্ধা তৈরী হচ্ছে। পাক বাহিনীর সাথে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র লড়াইয়ে নবাগতরা অংশগ্রহণ করে।
<strong> </strong>
আমাদের সাথে ভারত সরকারের কথা হয়েছিল তারা ১ লাখ গেরিলাকে প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র দেবে। এছাড়া একটি বেতার ষ্টেশন চালুর ব্যাপারেও ভারত সরকার প্রতিশ্রুতি দেন। এদিকে ভারত সরকারের বিভিন্ন এজেন্সীর লোক আমাদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করছে। কখনো পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়<strong>, </strong>কখনো সামরিক লিয়াজো আমাদের কাছে আসছে। এসব বিষয়ে সমন্বয় সাধনের জন্য বাংলাদেশ মন্ত্রিসভা মিসেস ইন্দিরা গান্ধীর সাথে সাক্ষাতের সিদ্ধান্ত নেয়।
<strong> </strong>
মিসেস গান্ধীর সাথে দেখা করার জন্য সকল মন্ত্রী দিল্লী যান। দেখা করে তারা কলকাতা ফিরে আসেন। এ সময় ওসমানী রাজনৈতিক সচেতন ছেলেদের প্রশিক্ষণ দেয়ার প্রস্তাব করেন। রাজ্জাক<strong>, </strong>তোফায়েল প্রস্তাব নিয়ে আসেন তাদের দায়িত্ব দিলে তারা ভাল ছেলে রিক্রুট করে দিতে পারে। ওসমানী তাদের প্রস্তাবে উৎসাহ প্রকাশ করেন। তিনি আমার পাশের ঘরে থাকতেন। বালিগঞ্জে তার অফিস ছিল। তার অফিস তখনো ভালোভাবে গড়ে ওঠে নি। তিনি আমাকে একটা অথোরাইজেশন লেটার লিখে দেয়ার অনুরোধ করেন। আমি তা লিখে টাইপ করে দিয়ে দিলাম। ওসমানী তার পক্ষে রাজ্জাক<strong>, </strong>তোফায়েলকে রিক্রুট করার অধিকার দিয়ে দিলেন। এই চিঠির সুযোগ গ্রহণ করেই শেখ ফজলুল হক মনি<strong>, </strong>সিরাজুল আলম খান<strong>, </strong>আবদুর রাজ্জাক<strong>, </strong>তোফায়েল আহমেদ<strong>, </strong>আ<strong>, </strong>স<strong>, </strong>ম<strong>, </strong>আবদুর রব <strong>'</strong>মুজিব বাহিনী<strong>’ </strong>নামে আলাদা বাহিনী গড়ে তোলেন।
<strong> </strong>
ভারতের ২টি স্থানে মুজিব বাহিনীর সদস্যদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। জেনারেল ওভান এই প্রশিক্ষণের দায়িত্বে ছিলেন। আজ পর্যন্ত আমি বুঝে উঠতে পারছি না মুজিব বাহিনী নামে এই আলাদা বাহিনীর কোন প্রয়োজন ছিল কি না। তবে যদ্দুর জেনেছি ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা “র”-এর সাথে শেখ মনির লবি ছিল। তাকে বুঝানো হয় যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে বর্তমান আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব সে সময় নেতৃত্ব দিতে অসমর্থ হবে। অথবা এই নেতৃত্ব কোন প্রকার আপোষ করতে পারে। তাকে আরো বুঝানো হয়<strong>, </strong>যে যুব শক্তি স্বাধীনতার উন্মেষ ঘটিয়েছে<strong>, </strong>তারাই কেবলমাত্র সঠিক নেতৃত্ব দিতে সক্ষম হবে। প্রয়োজনে এই নেতৃত্ব আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের বিকল্প হিসেবে কাজ করতে পারবে। তাছাড়া বাংলাদেশ স্বাধীন হলে নব্যশক্তি চীন বা নকশাল পন্থীদের স্বাধীন ও সার্বভৌম সরকার প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতা করবে। পরে আরো জেনেছি<strong>, </strong>ভারত সরকার এই সিদ্ধান্ত নেয় যার অর্থ হলোঃ “এক বাক্সে সকল ডিম না রাখা”।
&nbsp;
বিএসএফ-এর রুস্তমজী মুজিব বাহিনী গঠনের তীব্র প্রতিবাদ করেন। কিন্তু তার প্রতিবাদ শেষ পর্যন্ত গ্রাহ্য করা হয়নি। সবচেয়ে আশ্চর্য ব্যাপার হলো<strong>, </strong>ভারত সরকার মুজিব বাহিনী গঠন সংক্রান্ত এই সিদ্ধান্ত মুজিব নগর সরকারের কাছে গোপন রাখে। তবে মুজিব বাহিনী গঠনের বিষয়টি আমাদের কাছে আর গোপন থাকেনি। তাজউদ্দিন ভাই-সহ আমাদের অনেককে এই সিদ্ধান্ত পীড়া দেয়। জাতি যখন সম্পূর্ণভাবে একটি নেতৃত্বের পেছনে ঐক্যবদ্ধ ও আস্থাবান তখন যুব শক্তিকে রাজনৈতিক নেতৃত্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করা বা বিভেদ সৃষ্টির প্রচেষ্টা মুক্তিযুদ্ধের যেমন সহায়ক হয় নি<strong>, </strong>তেমনি পরে দেশ পুনর্গঠনের কাজেও অন্তরায় হিসেবে কাজ করেছে।
<strong> </strong>
আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে এর চেয়ে বড় বিপর্যয় (সেট ব্যাক) আর কিছু হতে পারে না। আমাদের এমপি<strong>, </strong>এম এন এ ও নেতাদের মনোনীত ছেলেদের মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। ওসমানীর প্রত্যাশিত <strong>'</strong>সোনার ছেলে<strong>’ </strong>পাওয়া গেল না। মুজিব বাহিনীর নেতৃবৃন্দ তাকে এই সুযোগ দেয় নি। ওসমানীর প্রাথমিক ধারণা ছিল তারা হয়তো তাদের দায়িত্ব পালন করেন নি। কিন্তু পরে তিনি জানেন<strong>, </strong>এই দায়িত্বের ভার নিয়ে তারা অন্য দায়িত্ব পালনে ব্যস্ত ছিলেন।
<strong> </strong>
স্বাধীন বাংলা বেতার প্রতিষ্ঠার জন্যে সবাই তাগিদ দিচ্ছে। এটা আমাদের পরিকল্পনার শুরুতেই প্রধান কর্মসূচী ছিল। আমার জানামতে আমাদের নিজস্ব বেতার ষ্টেশন স্থাপনের ব্যাপারে ভারতে প্রধানমন্ত্রী খুব একটা আগ্রহী ছিলেন না। এ ব্যাপারে একটা নির্দেশ আসার কথা ছিল। কিন্তু কোন কারণে এতে জটিলতা দেখা দেয়। ভারতীয় আমলাতন্ত্রের জট খুলতে আমাদের বেশ বেগ পেতে হয়।
&nbsp;
ইতিমধ্যে ভারতীয় বৈদেশিক অফিসের মিঃ রয়<strong>, </strong>মিঃ নাথ<strong>, </strong>কংগ্রেসের বহু নেতা উপনেতা আমাদের সাথে যোগাযোগ করেন। ত্রিগুণা সেনের সাথে বাংলাদেশ মিশনে পরিচয় হয়। তিনিও সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দেন। সর্বোদয় নেতা জয়প্রকাশ নারায়ণও আমাদের সংগ্রামের প্রতি সহানুভূতি জানান।
&nbsp;
কিছুদিনের মধ্যে ব্যবস্থা এমন হলো যে আমাদের কর্মসূচী রেকর্ড করে তা স্বাধীন বাংলা বেতার থেকে প্রচার করতে পারবো। আমরা বালিগঞ্জের যে বাড়ীতে থাকতাম সেখানে একটা ঘরে রেকর্ড করা শুরু হয়। একটা টেপ রেকর্ডার-এর ব্যবস্থা করে তা করা হয়। কিছুদিন পর থিয়েটার রোডের একটি বাড়ীতে রেকর্ডের কাজ করা হয়। বেতার কেন্দ্রও ঐ বাড়ীতে চলে যায়। আবদুল মান্নান বেতার পরিচালনার দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। এ সময় বৃটেন থেকে ডোনাল্ড চেসওয়ার্থ আসেন। তার সাথে আসেন “ওয়ার অন ওয়ান্ট”- এর পক্ষ থেকে একটি ছোট্ট প্রতিনিধি দল। সাথে ছিলেন ফাদার হার্ডেলসন ও মাইকের বার্নস এমপি। তিনি আসার আগেই আমাকে খবর দেয়া হয়। প্রতিনিধিদল সরেজমিনে শরণার্থীদের ক্যাম্প ঘুরে ঘুরে দেখেন।
&nbsp;
আমি তাদের থাকার জন্য সুব্রত রায় চৌধুরীর বাড়ীর তিন তলায় ব্যবস্থা করি। কিন্তু তারা সেখানে উঠেন নি<strong>; </strong>তারা উঠেন গ্র্যাণ্ড হোটেলে। সেখানে উঠেই টেলিফোনে যোগাযোগ করেন। ফাদার হার্ডেলসন ছিলেন কলকাতায় নিযুক্ত বৃটিশ ডেপুটি হাইকমিশনার। এই প্রতিনিধিদলের সাথে বিস্তারিত আলোচনা হয়। তারা জানতে চান কিভাবে আমাদের সাহায্য করবেন। আমি প্রস্তাব করি<strong>,</strong> “ওয়ার অন ওয়ান্ট” নিজেরা প্রত্যেক ক্যাম্পে সাহায্য করতে পারবে না। কারণ<strong>, </strong>সমস্যা অতি ব্যাপক। তাই তারা যদি বাংলাদেশী কোন সাহায্য প্রতিষ্ঠান বা বাংলাদেশ সরকারকে সাহায্য করেন<strong>,</strong> তাহলে আমরা তা ক্যাম্পে পৌছাতে পারবো।
&nbsp;
ডোনাল্ড পূর্ব থেকেই আমাদের সাহায্যের ব্যাপারে উৎসাহী। তিনি অন্যান্য ট্রাষ্টিদের সাথে আলোচনা করে যথাসাধ্য সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি আমার কাছে পরিকল্পনা ও বাজেট চান। আমি তা দিই। আমাদের প্রধানমন্ত্রীর সাথেও এ নিয়ে আলোচনা হয়। শরণার্থী শিবিরের সাধারণ মানুষকে সাহায্য করা ছাড়াও রাজনৈতিক ও সমাজকর্মী যারা কোন কাজ করতে পারছেন না<strong>, </strong>তাদের কাজে লাগাবার ব্যবস্থা করতে হবে।
&nbsp;
আমি বাংলাদেশ ভলান্টিয়ার সার্ভিস নামে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা ও এর একটা বাজেট পেশ করি। প্রধানমন্ত্রী এই সংগঠনের প্রয়োজনীয়তার কথা স্বীকার করেন। তিনি এই সংগঠন করার অনুমতি দেন।
&nbsp;
বরিশাল থেকে নূরুল ইসলাম মনজুর ও মহিউদ্দিন এম পি অস্ত্রের জন্য আসেন। সে জেলায় তখন প্রচণ্ড প্রতিরোধ যুদ্ধ চলছে। বরিশাল শহর ও তার আশপাশ মুক্তিযোদ্ধাদের দখলে। তারা জানান<strong>, </strong>অস্ত্র পেলে সেখানে তারা পাক বাহিনীর মোকাবিলা করতে সক্ষম হবেন। আমি বুঝলাম<strong>, </strong>বরিশালে যে শক্তি আছে<strong>, </strong>তাদের এদিকে নিয়ে এসে নতুন সাংগঠনিক রূপরেখায় গড়ে তোলা প্রয়োজন। কিন্তু তারা তাদের সংকল্পে অটল। তাদের দু<strong>'</strong>জনেরই বিশ্বাস অস্ত্র পেলে তারা বরিশাল মুক্ত করতে পারবেন। মেজর জলিল এই সেক্টরের কমান্ডার। বরিশালে তিনি বীরের মত যুদ্ধ করেছেন। শেষ পর্যন্ত তাদের অনুরোধ রক্ষার্থে দু<strong>’ </strong>নৌকা অস্ত্র ও গোলাবারুদ পাঠাবার ব্যবস্থা করা হয়।
<strong> </strong>
দুর্ভাগ্যবশত পাক চরেরা আগে ভাগে এই খবর পেয়ে যায়। পশ্চিম বাংলার মুসলমানরা সাধারণতঃ আমাদের আন্দোলন সহানুভূতির চোখে দেখতো না। এদের কেউ কেউ হানাদারদের মদদ দিত। নৌকা ভর্তি অস্ত্র নিয়ে যাওয়ার সময় চব্বিশ পরগনার কোন এক স্থানে পাক বাহিনী এই ছোট্ট নৌকাকে এমবুশ করে। পাক বাহিনীর হামলার হাত থেকে মনজুর রক্ষা পেলেও মহিউদ্দিন ও অপর একজন শত্রুর হাতে বন্দী হন। তাদের অকথ্য নির্যাতন করা হয়। কিছুদিন পর মেজর জলিল ও নূরুল ইসলাম মনজুর দলবল নিয়ে টাকিতে এসে ক্যাম্প স্থাপন করেন।
<strong> </strong>
টাকি থেকে নৌপথে খুলনা সাতক্ষীরা ইত্যাদি প্রত্যন্ত অঞ্চলে আমরা যেতাম। মুক্তিযুদ্ধের খবরাখবর ও সংগঠনের অবস্থা এমনিভাবে জানা সম্ভব হতো। হাজার হাজার শরণার্থী এই অঞ্চলে বসবাস করছে। এরা খুলনা<strong>, </strong>বরিশাল<strong>, </strong>পটুয়াখালীর শরণার্থী। এরা নৌকায় সংসার সাজিয়ে নিয়েছে। দেশ থেকে চাল<strong>, </strong>ডাল<strong>, </strong>হাঁড়ি পাতিল সব এনেছে। হাজার হাজার নৌকায় এভাবে লোকজন বসবাস করেছে। ছিন্নমূল মানুষ ভিটেমাটি ছেড়ে কিভাবে ঢেউ-এর সাথে লড়াই করছে<strong>, </strong>তা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। দুঃখী মানুষের এই দুঃসাহসী মনোবল দেখে আমার মন গর্বে ভরে উঠেছে। চব্বিশ পরগনার কয়েকটি অঞ্চলে প্রধানমন্ত্রীসহ আমি বহুবার গিয়েছি।
&nbsp;
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে বেশ কিছু বিদেশী সাংবাদিক অনন্য ভূমিকা পালন করেছেন। এরা বাংলার মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্ব গাঁথা বিশ্বের জনগণের সামনে তুলে ধরেছেন। এসব বরেণ্য সাংবাদিকদের মধ্যে পিটার হেজেল হার্ষ্ট<strong>, </strong>নিউইয়র্ক টাইমস-এর সিডনী সেন বার্গ<strong>, </strong>লা মদের একজন সাংবাদিক ও লণ্ডনের গ্রনেডা টেলিভিশনের প্রতিনিধি শিলার নাম উল্লেখযোগ্য।
&nbsp;
শিলা খুব সাহসী মহিলা ছিলেন। তিনি বিভিন্ন রণাঙ্গনে মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধের চিত্র সারা পৃথিবীতে প্রচার করে বুঝিয়ে দিয়েছেন বাংলার মুক্তিযুদ্ধ কাল্পনিক কিছু নয়। এক সময় শীলাকে আমি খালেদ মোশারফের যুদ্ধ ক্যাম্পে পাঠাই। খালেদ পূর্বাঞ্চলে এক দুঃসাহসী প্রতিরোধ বাহিনী গড়ে তুলেছে। খালেদ আমার পুরাতন বন্ধু। আমরা দু<strong>'</strong>জনেই ঢাকা কলেজের ছাত্র। আমি তখন ছাত্র রাজনীতি করি। সামরিক বাহিনীতে যাওয়ার পরেও তার সাথে আমার দুই-একবার দেখা হয়েছে। খালেদের দুঃসাহসিক বীরত্ব আমাকে মুগ্ধ করেছে। খালেদ ছাড়াও মুক্তিযুদ্ধে শফিউল্লাহ<strong>, </strong>এম<strong>, </strong>এ<strong>, </strong>জলিল<strong>, </strong>রফিকুল ইসলাম<strong>, </strong>ওসমান চৌধুরী<strong>,</strong> নূরুজ্জামান<strong>, </strong>নজমুল হুদা<strong>, </strong>তওফিক<strong>, </strong>মাহবুবসহ আরো অনেকের ভূমিকা ছিল অনন্য।
&nbsp;
শিলা খালেদের সাথে যুদ্ধক্ষেত্রে প্রায় এক সপ্তাহ বাংকারে বসে ছবি তুলেছেন। তিনি ফিরে এসে আমাকে বলেন<strong>, </strong>আমি যা দেখেছি<strong>, </strong>এতে জোর দিয়ে বলতে পারি<strong>, </strong>বাংলাদেশ স্বাধীন হবেই। পৃথিবীর কোন শক্তি এই অদম্য স্পৃহা দমাতে পারবে না। শিলা খালেদের বীরত্বের ভূয়সী প্রশংসা করেন। এমনিভাবে টেলিভিশন ক্রুসহ বিদেশী প্রতিনিধি নিয়ে বহুবার রণাঙ্গনে গেছি। একদিন বয়রার কাছে একটি ক্যাম্পে যাই। ক্যাপ্টেন নজমুল হুদা ঐ ক্যাম্পের ইনচার্জ ছিলেন।
&nbsp;
একটি পানি ভেঙ্গে শিবিরে যেতে হয়। কয়েকদিন পূর্ব থেকেই বৃষ্টি হচ্ছিলো। ক্যাম্পে পৌঁছে দেখি কোথাও কোন শুকনো জায়গা অবশিষ্ট নেই। ছেলেদের গায়ের কাপড় ভিজে গেছে। আমরা সবাই শীতে থর থর করে কাঁপছি। বিকেল ৩/৪টা বেজে গেল<strong>, </strong>তবুও তাদের খাওয়া হয়নি। ভেজা কাঠে রান্না করতে হলো। তবুও হুদা কোন অভিযোগ করলেন না। ফেরার সময় হুদা শুধু বললেন<strong>, </strong>কিছু মশারী দিতে পারলে ভাল হয়। মশার খুবই উৎপাত। পরদিন দিলিপ চক্রবর্তীর কাছে মশারী চাইলাম। তিনি কয়েক<strong>'</strong>শ মশারীর ব্যবস্থা করে দিলেন। দুই দিন পর এই মশারী সহ ক্যাম্পে যাই। সেদিন লুঙ্গি ছিল। তাই ক্যাম্পে পৌছাতে কোন অসুবিধা হলো না। হুদার সাথে অনেক আলোচনা হলো। মুকিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ<strong>,</strong> প্রশিক্ষণের পর দেশে পাঠানো এবং দেশে এদের পরিচালনার ব্যাপারে নেতৃত্বের অভাব ইত্যাদি বিশয় নিয়ে আলোচনা করলাম। আমি এসব বিষয় নিয়ে পরে প্রধানমন্ত্রীর সাথে আলোচনা করি। প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার আবেদন জানাই।
<strong> </strong>
বাংলাদেশ থেকে কলকাতায় বহু অধ্যাপক<strong>, </strong>শিক্ষক এসেছেন। এদের মধ্যে ডঃ সারওয়ার মোর্শেদ<strong>, </strong>বেগম নূরজাহান মোর্শেদ<strong>, </strong>ডঃ এ আর মল্লিক<strong>, </strong>ডঃ আনিসুজ্জামান<strong>, </strong>ডঃ মোশাররফ হোসেন<strong>, </strong>ডঃ স্বদেশ বোস-এর সাথে কথা হল। আমরা কিছু কাজ তাদের কারো কারো মধ্যে ভাগ করে দিলাম। এখন থেকে প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতা বিবৃতি তৈরী করার দায়িত্ব ডঃ সারওয়ার মোর্শেদ ও ডঃ আনিসুজ্জামানকে দিলাম। তারা খসড়া তৈরী করতেন। আমি প্রধানমন্ত্রীর সাথে এগুলোর চূড়ান্ত রুপ দিতাম। ডঃ মল্লিককে বাংলাদেশ থেকে আগত শিক্ষকদের সংগঠিত করার দায়িত্ব দেয়া হলো। তার প্রচেষ্টায় সেখানে শিক্ষক সমিতি গড়ে ওঠে।
&nbsp;
(স্কুল) শিক্ষক সমিতির সভাপতি কামরুজ্জামান এই শিক্ষক সমিতির ওয়ার্কিং প্রেসিডেন্ট হিসেবে কাজ করেন। বন্ধু মঈদুল হাসানও কলকাতা আসলেন। তাকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সাথে কয়েক দফা বৈঠক হলো। তিনি দিল্লী চলে গেলেন। সেখানে নেপথ্যে থেকে তিনি আমাদের লবি সৃষ্টি করেন।
<strong> </strong>
এদিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খন্দকার মোশতাক কোন কাজেই হাত দিচ্ছেন না। মাহবুব আলম চাষী ও তাহের উদ্দিন ঠাকুরকে আগরতলা থেকে কলকাতা আসার জন্য মোশতাক চাপ দিচ্ছেন। মোশতাক-এর দাবী অনুযায়ী তাদের দু<strong>'</strong>জনকে কলকাতা আনা হলো। চাষীকে মোশতাক আহমদ পররাষ্ট্র সচিব এর পদের নিয়োগ করেন। আমি বুঝলাম আমার মাধ্যমে বিদেশের সাথে বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যে যোগাযোগ হচ্ছিল তাতে মোশতাক খুশী হতে পারেন নি। চাষী কাজ শুরু করেছেন। মোশতাক এরপর দাবী করলেন<strong>,</strong> বাংলাদেশ মিশনে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ছাড়া অন্য কোন বিভাগ থাকতে পারবে না। এতদিন আমি বাংলাদেশ মিশনে কাজ করেছি। মোশতাকের এই নতুন দাবীর অর্থ বুঝতেও আমার অসুবিধা হলো না। অর্থাৎ আমাকে সার্কাস এভিনিউস্থ পররাষ্ট্র মিশন থেকে তাড়াতে হবে।
<strong> </strong>
থিয়েটার রোডে প্রধানমন্ত্রীর অফিসে আমার বসার ব্যবস্থা হলো। আমার পরিবার না আসা পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী ও আমি একটি ঘরের দুইটি চৌকিতে থাকতাম। থিয়েটার রোডের বাড়ীটি বেশ বড়। সৈয়দ নজরুল ইসলামের পরিবার না আসা পর্যন্ত তিনিও এখানে থাকতেন। এরপর সৈয়দ নজরুল ইসলাম<strong>, </strong>মনসুর আলী<strong>, </strong>খন্দকার মোশতাক ও কামরুজ্জামান পৃথক পৃথক ফ্ল্যাটে ওঠেন। কিন্তু পরিবার আসার পরেও প্রধানমন্ত্রী থিয়েটার রোড ত্যাগ করেন নি। তাজউদ্দিন ভাই প্রতিজ্ঞা করেছিলেন<strong>, </strong>যতদিন দেশ স্বাধীন না হবে<strong>, </strong>ততদিন তিনি পারিবারিক জীবনযাপন করবেন না। তিনি বলতেন<strong>, </strong>যুদ্ধরত অবস্থায় যোদ্ধারা যদি পরিবার বিহীন অবস্থায় থাকতে পারে<strong>, </strong>আমি সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তা করতে পারবো না কেন<strong>? </strong>তিনি তার প্রতিজ্ঞা রক্ষা করেছিলেন।
<strong> </strong>
আমার পরিবার আসতে অনেক দেরী হয়ে যায়। ঢাকা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর আমার ছোট্ট পরিবার ৩ ভাগে বিভক্ত ছিল। আমি প্রধানমন্ত্রীর সাথে<strong>, </strong>ছেলে প্যাবলু স্ত্রীর সাথে<strong>, </strong>আর মেয়ে শম্পা তার নানীর সাথে গিয়েছিল নারায়ণগঞ্জে। ২৫শে মার্চের পর পাক বাহিনী নারায়ণগঞ্জ আমার শ্বশুরের বাড়ী এবং স্ত্রীর ভাই মুস্তফা সারোয়ারের বাড়ীতে আগুন দেয়। মেয়েটি তার নানীর সাথে মানুষের মিছিলে শামিল হয়। এরপর বহু কষ্টে শ্বশুরের পৈতৃক বাড়ী দাউদকান্দির জামালকান্দিতে উপস্থিত হয়।
<strong> </strong>
আমার স্ত্রী লীলা আমার কোন খোঁজ খবর পাননি। বাড়ীওয়ালী বেগম হাবিবউদ্দিন ওপর তলায় থাকতেন। আমাদের সাথে তার খুবই সদ্ভাব ছিল। আমি তাকে খালাম্মা ডাকতাম। তিনিও পুত্রবৎ স্নেহ করতেন। কিন্তু ২৫শে মার্চের পর আমার স্ত্রীকে ৪ বছরের ছেলেসহ বাড়ী ছাড়তে বাধ্য করেন। স্ত্রী পাশের বাড়ীর নাইমুর রহমানের সাথে আমার খোঁজে মুসা সাহেবের বাড়ীতে যান। আমি মুসা সাহেবের বাড়ীর ছাদের যে ঘরে থাকতাম<strong>, </strong>সেখানের একটি চৌকিতে একটি রক্তাক্ত চাদর ছিল। আমার স্ত্রী এই চাদর দেখে ফেলেন। ২৫শে মার্চে রাতে সে চৌকিতে একজন গাড়ী চালক ঘুমিয়েছিলেন। হানাদারদের গুলিতে সে নিহত হয়। এরপর লীলা আমার খোঁজে শ্বশুরবাড়ী নারায়ণগঞ্জে রওয়ানা হন। কিন্তু তিনি সেখানে যেতে পারেন নি। ফতুল্লায় পাকবাহিনী ব্যারিকেড সৃষ্টি করে রাখে। ফিরে এসে তিনি দু<strong>'</strong>একজন আত্মীয় স্বজনের বাসায়ও যান। কিন্তু অনেকেই সেদিন তাকে ভাল চোখে দেখেন নি। তবে কোন এক সাহসী সহৃদয় আত্মীয়ের বাড়ীতে আমার স্ত্রী প্রায় দু<strong>'</strong>সপ্তাহ অবস্থান করেন। সেখান থেকে ডঃ নাইমুর রহমানের স্ত্রীর সহযোগিতায় গাড়ীযোগে তিনি নারায়ণগঞ্জ যান। কিন্তু সেখানে গিয়ে শ্বশুরবাড়ীর কাউকে না পেয়ে নৌকাযোগে জামালকান্দি চলে যান। তখনো আমার মেয়ে সেখানে পৌছে নি। নদীর প্রায় কাছাকাছি আমার শ্বশুরের গ্রামের বাড়ী। মিলিটারী হামলার আশংকায় আমার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে গ্রামান্তরে দৌড়াতে হয়েছে। তা<strong>'</strong>ছাড়া তিনি তখনো জানতে পারেননি আমি কোথায়<strong>,</strong> কী অবস্থায় রয়েছি। আওয়ামী লীগের একজন নেতৃস্থানীয় কর্মী রহমত আলীর কাছে খবর পেলাম আমার স্ত্রী জামালকান্দিতে রয়েছেন। রহমত আলীর কাছে তাজউদ্দিন ভাই-এর পরিবারের খবর পাওয়া গেল। রহমত আলী জানান<strong>, </strong>তিনি প্রধানমন্ত্রীর পরিবারকে নিয়ে আসবেন। আমি রহমত আলীর কাছে চিঠি দিলাম। রহমত আলী প্রথমে বেগম তাজউদ্দিন ও জুন মাসের শেষ দিকে আমার পরিবারের লোকজনকে কলকাতায় নিয়ে আসেন।
মে-জুন মাসের দিকে আগরতলা গিয়েছিলাম। সেখানে আমার স্ত্রীর বড় ভাই আওয়ামী লীগ নেতা এ কে এম শামজ্জোহা তার পরিবার পরিজন নিয়ে আসেন। তাঁদের কাছে আমার পরিবারের খোজ খবর পাই। আমার পরিবার যখন কলকাতায় পৌঁছেন<strong>, </strong>আমি তখন উপস্থিত থাকতে পারি নি। বিএসএফ-এর মিঃ চট্টপাধ্যায় একটি কার্গো বিমানে করে তাদেরকে আগরতলা থেকে কলকাতা নিয়ে যান। বিএসএফ-এর ভাড়া করা বাড়ী কোহিনূর ম্যানসনে তাদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়। এসময় আমি খুব ব্যস্ত। আমাদের অভ্যন্তরীন রাজনীতির একটি প্রচণ্ড সংকট মোকাবেলা করতে হচ্ছিলো।
<strong> </strong>
প্রথম থেকে মন্ত্রিসভার প্রতি আমাদের যুব সমাজের একটা অংশের বিরূপ মনোভাব ছিল। তারা মুজিব নগর সরকারের নেতৃত্ব মেনে নিতে অনীহা প্রকাশ করেছিলেন। যুবকদের এই অংশের কাজ ছিল বিভিন্নভাবে সরকারকে অপদস্থ ও হয়রানি করা। তারা ভারতে প্রধানমন্ত্রী মিসেস ইন্দিরা গান্ধীর কাছে পর্যন্ত মুজিব নগর সরকারের নেতৃত্ব সম্পর্কে কুৎসা ও ভুল তথ্য পরিবেশন করে। অপপ্রচারের অংশ হিসেবে তারা প্রচার করে যে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদের প্রতি অধিকাংশেরই সমর্থন নেই।
<strong> </strong>
এই অবস্থায় আওয়ামী লীগের নির্বাচিত সদস্য ও নেতাদের একটি বৈঠক অনুষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করি। কারণ এমন একটি বৈঠকই প্রমাণ করতে পারে যে তাজউদ্দিন সরকারের প্রতি সংশ্লিষ্ট সকলের শুধু সমর্থনই নেই<strong>, </strong>এ পর্যন্ত তার সকল কার্যক্রমের প্রতিও তাদের অনুমোদন রয়েছে।
&nbsp;
এই উদ্দেশ্যে শিলিগুড়ির জঙ্গলে বৈঠকের আয়োজন করা হয়। নদীর পাশে পাহাড়িয়া এলাকার এই জঙ্গলে বৈঠকের জন্য অনেকগুলো তাঁবু টানানো হয়। নির্বাচিত সদস্য ও দলীয় নেতাদেরকে বৈঠকে একত্রিত করার ব্যাপারে বিএসএফ-এর চট্টপাধ্যায়ের বিরাট অবদান রয়েছে।
&nbsp;
বৈঠকে খোলাখুলিভাবে সরকারের কার্যক্রম ও ভবিষ্যৎ কর্মসূচী নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বৈঠকে মুজিবনগর সরকারের প্রতি আস্থা ও সমর্থন প্রকাশ করা হয়। এতদিন যারা তাজউদ্দিন সরকারের অপপ্রচার করেছিল<strong>, </strong>বৈঠকের ফলে তাদের মুখে ছাই কালি পড়ে। শিলিগুড়ির বৈঠকের পর কলকাতা বিমান বন্দরে জানলাম<strong>, </strong>আমার পরিবারবর্গ এসেছে।
&nbsp;
কোহিনূর ম্যানসনের ফ্ল্যাটে স্ত্রী<strong>, </strong>মেয়ে ও পুত্রের সাথে মিলিত হলাম দীর্ঘ দিন পর। ফ্ল্যাটে কোন আসবাবপত্র নেই। মেঝেতে বিছানা পাতা রয়েছে। একই ফ্ল্যাটে আমরা ছাড়াও শামসুজ্জোহা ও মুস্তফা সরওয়ারের পরিবারবর্গ রয়েছে। জায়গার তুলনায় আমরা লোক ছিলাম বেশী।
&nbsp;
এ সময় হানাদার বাহিনীর সমর্থকরা আমার গ্রামের বাড়ী জ্বালিয়ে দিলে তারা গৃহহারা হন। অসুবিধা হলে দেশ ছাড়ার জন্যে আমি আব্বাকে ইতিপূর্বে খবর দিয়েছিলাম। তিনি বলেছিলেন<strong>, </strong>দেশের মাটিতে থেকেই আমাদের জন্য তিনি দোয়া করছেন। জীবনের অধিকাংশ সময় চাকরি সূত্রে তিনি কলকাতায় কাটিয়েছেন। তার কলকাতা আসার কোন ইচ্ছা ছিল না। বাড়ীঘর জ্বালিয়ে দেয়ার পরে আত্মীয়স্বজনরা এক প্রকার জোর করে আব্বাকে কলকাতা পাঠিয়ে দেন।
&nbsp;
হানাদাররা আমার বাড়ীর সকল সম্পত্তি লুট করে নিয়ে যায়। তাদের গুলিতে আমার চাচী আহত হন। বাড়ীর মেয়েরা অন্যত্র আত্মীয়দের বাড়ীতে আশ্রয় নেয়। আব্বাসহ যুবক ও অন্যান্য পুরুষ মানুষ কলকাতা চলে আসেন। ২৫শে মার্চের রাত থেকেই এ পর্যন্ত তাজউদ্দিন ভাই ও আমি একত্রে থেকেছি। পরিবার আসার পর তার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হলাম। তাকে ছেড়ে আসতে আমার খুব কষ্ট হচ্ছিল। তাছাড়া রাতের বেলায় এই বিচ্ছিন্নতায় কাজেরও বিরাট ক্ষতি হলো। কেননা<strong>, </strong>এতদিন দিনের শেষে রাতের বেলা বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের পথ খুঁজে বের করতাম। আমার স্ত্রী অন্তঃসত্ত্বা। তাছাড়া সকল প্রতিকূলতার ভেতর সংগ্রাম করে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে জীবন যাপন করে খুবই দুর্বল ও অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। স্ত্রীর এই শারীরিক অসুস্থতার সময় আমার কাছে থাকা খুবই প্রয়োজন। অসুস্থ স্ত্রীকে ডঃ অমীয় ঘোষের কাছে নিয়ে গেলাম। ইতিমধ্যে তার সাথে আমার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক হয়ে গেছে। প্রথম থেকেই তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামের পক্ষে কাজ করে আসছেন। আমার স্ত্রীর অবস্থা দেখে ডাক্তার চিন্তিত হয়ে পড়েন। কারণ অপুষ্টি ও অনিয়মের কারণে গর্ভজাত সন্তান বিপদমুক্তভাবে প্রসব নাও হতে পারে। অন্যান্য সংসদ সদস্যদের হারে মাসিক যে টাকা পেতাম<strong>, </strong>তা দিয়ে কোন রকমে বাজার খরচ চলতো।
&nbsp;
আমার জন্য একটি সরকারী জীপ বরাদ্দ ছিল। এর জন্য প্রয়োজনীয় পেট্রোল দিতেন বলাইদা। বলাইদা ছিলেন একজন নামকরা সলিসিটর। তার এক মক্কেলের এক্সপেন্স একাউন্টে একটি নির্দিষ্ট পেট্রোল পাম্প থেকে স্লীপ দিয়ে গাড়ীর জন্যে পেট্রোল নিতাম। ৯ মাস যুদ্ধের সময় এই দানের পেট্রোল ছিল চলাফেরার একমাত্র সহায়।
&nbsp;
ইতিমধ্যে বাংলাদেশ ভলান্টিয়ার সার্ভিস (বি ভি এস) গঠন করা হয়েছে। এই সংস্থা গঠনের উদ্দেশ্য<strong>, </strong>কার্যকরী কমিটি<strong>, </strong>উপদেষ্টা ঠিক করা হয়েছে। আমি নিজে বিভিএস-এর চেয়ারম্যান। আমাদের স্কুলের প্রধান শিক্ষক করিমুদ্দিন আহমদ উপদেষ্টা এবং শাহীন স্কুলের অধ্যক্ষ মামুনুর রশীদ নির্বাহী পরিচালক।
&nbsp;
<strong>'</strong>ওয়ার অন ওয়ান্ট<strong>’ </strong>আমাদের প্রাথমিক কাজের জন্য টাকা দেয়। প্রত্যেক শরণার্থী শিবিরে স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ করা হয়। <strong>'</strong>ওয়ার অন ওয়ান্ট<strong>’ </strong>বিভিএসকে একটি জীপও দেয়। সদর স্ট্রীটে গাজা সংলগ্ন বাড়ীতে মিশনের বদান্যতায় বিভিএস-এর অফিসের জন্য দুইটা ঘর পাওয়া গেল।
&nbsp;
কৃষ্ণনগরে সেচ্ছাসেবকদের একটি সম্মেলন হয় জুলাই-এর কোন এক সময়ে। শরণার্থী শিবিরে করণীয় কার্যক্রমের বিশদ বিবরণসহ পুস্তিকা ছাপানো হয়। সকাল বেলা সম্মেলনে যাত্রার পূর্বে দেখলাম<strong>, </strong>আমার স্ত্রী প্রসব বেদনায় কাতর। বেগম শামসুজ্জোহার সাহায্যে পাশের ক্লিনিকে তাকে নেয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এই অবস্থায়ও আমার স্ত্রী অত্যন্ত সাহসের সাথে আমাকে সম্মেলনে যেতে বললেন।
<strong> </strong>
এমনি এক অবস্থায় আমাকে সাহস দিয়ে সম্মেলনে প্রেরণের কথা কোনদিন ভূলে যাওয়া সম্ভব নয়। সম্মেলনে ডঃ মোশাররফ হোসেন<strong>, </strong>শিল্পী কামরুল হাসান<strong>, </strong>মামুনুর রশীদ প্রমুখ আমার সাথী হলেন। আমার বন্ধু ও রাজনৈতিক সাথী কুষ্টিয়ার কুমারখালি কলেজের অধ্যক্ষ দেওয়ান আহমদকে কৃষ্ণনগরে এই সম্মেলনের প্রস্তুতির ভার দিয়েছিলেন।
&nbsp;
বিভিন্ন শরণার্থী শিবির থেকে স্বেচ্ছাসেবক আসেন। এদের সকলেই রাজনৈতিক ও সমাজকর্মী। তবে তাদের যুদ্ধের যাওয়ার বয়স নেই। আর্তমানবতার সেবা করাই সম্মেলনে আগত সকলের উদ্দেশ্য। ডঃ মোশাররফ হোসেন সম্মেলনে বক্তৃতা ছাড়াও কিছু ছাপানো পুস্তিকা বিতরণ করা হয়। এসব পুস্তিকায় বিভিএস-এর কর্মসূচী<strong>, </strong>শরণার্থী শিবিরে করণীয় কর্তব্য<strong>, </strong>স্বাধীনতা সংগ্রামে এই বিপুল জনগোষ্ঠীকে কিভাবে কাজে লাগানো যায় এবং স্বাধীনতার পর দেশ গঠনে এদের ভূমিকা লিপিবদ্ধ করা ছিল। সম্মেলনে অন্যান্যদের মধ্যে ডঃ স্বদেশ বোস এবং শিল্পী কামরুল হাসানও বক্তব্য রাখেন।
<strong> </strong>
কৃষ্ণনগর থেকে ফেরার পথে জানলাম<strong>, </strong>কুষ্টিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলের কর্মীরা এখানে আশেপাশে রয়েছে। খবর পেলাম<strong>, </strong>কুষ্টিয়ার খোকসা থানার ৭টি গ্রাম পাক বাহিনী জ্বালিয়ে ছারখার করে দিয়েছে। একতারপুর গ্রামের কাপালিকরাও গ্রাম ছেড়ে এখানে এসেছেন। এসব গ্রামের আবাল বৃদ্ধ-বনিতা আমাকে তাদের অত্যন্ত আপনজন জানতেন। কলকাতায় ফিরে প্রথমেই ক্লিনিকে যাই। বুকের ভেতর ছিল চাপা উত্তেজনা। ক্লিনিকে গিয়ে জানলাম আমার পুত্র সন্তান হয়েছে। মা ও সন্তান সুস্থ আছে বলেও জানলাম। আমরা শখ করে সন্তানের নাম রাখি জয়<strong>; </strong>কিন্তু আমাদের ভাগ্য সুপ্রসন্ন ছিল না। জন্মের পর জয় আমাশয় রোগে আক্রান্ত হয় এবং এক সপ্তাহের মধ্যেই জয় আমাদের ছেড়ে চলে যায়। অর্থাভাবে জয়-এর চিকিৎসা করাও সম্ভব হয় নি। ক্লিনিকে মৃত্যপথযাত্রী জয়কে নেয়া হয়। সেলাইন-এর বিল আমরা পরিশোধ করতে পারবো কি না<strong>, </strong>এই নিয়ে ক্লিনিকে কর্তৃপক্ষ চিন্তিত ছিল। কিন্তু সেলাইন দেয়ার আর প্রয়োজন হয় নি। তার আগেই জয় চলে যায়।
<strong> </strong>
পুত্রশোকের অভিজ্ঞতা যেন কোন পিতা মাতার না হয়। আমি জয়কে নিজে হাতে মাটিতে নামিয়ে দেয়ার সময় আল্লাহর কাছে এই প্রার্থনা করি আল্লাহ আমার জয়-এর পরিবর্তে স্বাধীনতা দিও। এই শোক সামলে নিতে আমার প্রায় সপ্তাহখানেক সময় লাগে। কিন্তু আমার স্ত্রীর সেই স্মৃতি আজো মুছে যায় নি। তা ছাড়া কোন মায়ের পক্ষে তা সম্ভবও নয়। ডঃ স্বদেশ বোস পরে বলেছিলেন<strong>, </strong>সন্তান পেটে থাকা অবস্থায় পথে পথে ঘুরে এবং খাদ্য ও বিশ্রামের অভাবে মা ও সন্তানের অপুষ্টি হয়। এই সন্তান বেচে থাকলেও সংশয় মুক্ত ছিল না। স্ত্রীকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছি প্রতিদিন শরণার্থী শিবিরে বহু শিশু চিকিৎসার অভাবে মারা যাচ্ছে। এরপর থেকে স্ত্রীও আমার সাথে সীমান্ত শিবির দেখতে যেতেন। এমনিভাবে স্ত্রী আমার কাজের সহযোগী হয়ে ওঠেন। আমরা এ সময়ে বিভিন্ন শিবিরে অর্থকরী কাজে মেয়েদের প্রশিক্ষণ দেয়ার কর্মসূচী গ্রহন করি। তাছাড়া প্রতি ক্যাম্পে শিশু কিশোরদের জন্য কয়েকটি নির্ধারিত কর্মসূচী ছিল। প্রতি ক্যাম্পে ভোর বেলা পতাকা উত্তোলন<strong>,</strong> মুক্তিযুদ্ধের গান<strong>, </strong>পিটি<strong>,</strong> শরীরচর্চা ও খেলাধুলা এই কর্মসূচীর অন্তর্ভুক্ত ছিল। এগুলো ক্যাম্পে ক্যাম্পে প্রাণের স্পন্দন সৃষ্টি করে। ক্যাম্পগুলোতে ময়লা নিষ্কাশন ও স্বাস্থের পরিবেশ সৃষ্টির জন্য ড্রেন কাটা<strong>, </strong>নালা সাফ<strong>, </strong>আবর্জনা পরিষ্কার ও ব্লিচিং পাউডার ছিটানোর ব্যবস্থা করা হয়। আমাশয় রোগে বিভিন্ন শিবিরে বহু লোক মারা যায়। তন্মধ্যে শিশু মৃত্যুর হারই বেশী। ডাক্তার ও ওষুধের প্রচণ্ড অভাব। প্রত্যেক ক্যাম্পে মেডিক্যাল সেন্টার খোলার সঙ্গতি আমাদের নেই।
এসময় আমি হোমিওপ্যাথিক ডাক্তারদের খুঁজে বের করে প্রত্যেক ক্যাম্পে নিয়োগ করি। তাদের ওষুধের বাক্স দেয়া হল। এতে বেশ কাজ হলো। সীমান্তের নিকটে আমরা হাসপাতাল ক্যাম্প গড়ে তুলি। একজন কর্মঠ ডাক্তার এবং তাকে সাহায্যকারী কয়েকজন নার্স পেলেই হাসপাতাল শুরু করা যায়। কোন ছোট গুদাম জাতীয় স্থান নামমাত্র অর্থে ভাড়া নিয়ে সেখানে ছোট ছোট চৌকি ফেলে ১০/১২ বেডের হাসপাতাল তৈরী করা হতো। বিভিন্ন সংস্থার সাহায্য সহযোগিতায় হাসপাতাল পরিচালনা করা হয়।
&nbsp;
এসব হাসপাতাল আমাদের খুবই উপকারে আসে। এতদিন পাক বাহিনীর সাথে যুদ্ধে আহত যেসব মুক্তিযোদ্ধা সামান্য চিকিৎসার অভাবে মারা যেত<strong>, </strong>হাসপাতালগুলো চালু হওয়ার পর তারা চিকিৎসা পেতে থাকে। ডাক্তারী পড়া ছাত্ররা এসব হাসপাতালে চমৎকার সাফল্য দেখিয়েছেন। বাংলাদেশ সরকার এমপিদের প্রতি মাসে ২০০ টাকা মাসহারা দিত। কিন্তু রাজনৈতিক নেতা ও কর্মীদের এ ধরনের কোন আর্থিক সুবিধা ছিল না। বিভিএস ( বাংলাদেশ ভলান্টিয়ার সার্ভিস)-এর পক্ষ থেকে এসব রাজনৈতিক ও সমাজকর্মীদের মাসিক ৫০ টাকা মাসহারা দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়। দুঃসময়ে এ টাকা তাদের খুবই কাজে আসে।
&nbsp;
প্রধানমন্ত্রী আমাকে দু<strong>'</strong>বার দিল্লী পাঠান। প্রথমবার দিল্লী যাওয়ার উদ্দেশ্য ছিল সেখানকার বিভিন্ন এজেন্সীর লোকদের সাথে সাক্ষাৎ করা। সেখানে বিভিন্ন পত্রিকার সম্পাদক ও সাংবাদিকদের সাথে আমার দেখায় হয়। এদের কাছে বিভিন্ন ধরনের খবর পাওয়া গেল। বিশিষ্ট সাংবাদিক কুলদীপ নায়ার-এর সাথেও আলোচনা করি। তাছাড়া দিল্লীতে অবস্থিত বিদেশী মিশনের কর্মকর্তাদের সাথেও পৃথক পৃথক বৈঠকে মিলিত হই।
&nbsp;
এদের সাথে সাক্ষাতের সময় শুনতাম বেশী<strong>, </strong>বলতাম কম। দেশ-বিদেশে আমাদের সংগ্রামের প্রতিক্রিয়াসহ পরাশক্তিসমূহের মনোভাবও জানার সুযোগ হয়। ভারত সরকার সম্পর্কেও অনেক খবর জানা সম্ভব হলো। হিন্দুস্তান টাইমস-এর সম্পাদক উইলিয়াম ভারগিস ও তার মত আরো অনেকে বুঝাতে চান<strong>,</strong> ভারতের সকলে যে বাংলাদেশের পক্ষে আছে বা থাকবে এ ধারণা করার কোন কারণ নেই। তারা বলেন<strong>, </strong>আজো অনেকে ভাবেন যে ঐক্যবদ্ধ পাকিস্তানই ভারতের জন্য মঙ্গল হবে। কারণ পাকিস্তানকে এতদিনে চেনা-জানা হয়ে গেছে। কিন্তু বাংলাদেশ একটা অনিশ্চিত ব্যাপার। কারো কারো ধারণা<strong>, </strong>বাংলাদেশকে নিয়ে ভারত যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে ভারতের অগ্রগতি ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন ব্যহত হবে।
<strong> </strong>
এ সময় দিল্লীতে শেখ আবদুল্লার সাথেও আমার দেখা হয়। একটি বাড়ীতে আধা নজরবন্দী অবস্থায় তিনি থাকতেন। তার চলাফেরার উপর বিভিন্ন সংস্থার কড়া নজর ছিল। তার মেয়ের বিয়ের ব্যাপারে তখন তিনি ব্যস্ত ছিলেন। তবুও পুরো একটা দিন তিনি আমার জন্য ব্যয় করেন।
&nbsp;
বহুদিন পূর্ব থেকেই তার নাম শুনেছি। কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়নি। আমার চোখে তিনি বীর। ভারতের উত্থান পতনের ইতিহাসে তিনি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তিনি স্পষ্টবাদী। তিনি তার মনোভাব গোপন করলেন না। তিনি বললেন<strong>, </strong>তিনি পাকিস্তান চান নি। কিন্তু বাঙালিরা চেয়েছিল। তারা আবার আজকে বাংলাদেশ চায়। আগামীতে তারা আবার কি চাইবে<strong>, </strong>তার কোন নিশ্চয়তা আছে কি<strong>? </strong>শেখ আব্দুল্লাহর কথাগুলো তখন আমার খুব ভালো লাগে নি। কিন্তু তার কথার ভেতরে যে ইঙ্গিত ছিল<strong>, </strong>পরে তার মর্ম বেশী করে উপলব্ধি করেছি।
<strong> </strong>
আমি শেখকে বুঝাবার চেষ্টা করি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাঙালি আজ সম্পূর্ণভাবে ঐক্যবদ্ধ। আমাদের সংগ্রাম ৮ কোটি বাঙালির অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের কথা বলতেই তিনি আবার ক্ষুদ্ধ কন্ঠে বলেন, তোমরা জিন্নাহর পিছনেও ছিলে। নাচাটাই তোমাদের স্বভাব। আজ তোমরা বঙ্গবন্ধুর পেছনে আছো। আবার কালকে তাঁর বিরোধিতা করতেও তোমাদের সময় লাগবে না। কাজেই তোমাদের প্রতি অন্ততঃ আমার কোন সমর্থন নেই।
&nbsp;
সে সময় পাকিস্তানের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করছে এমন কিছু ব্যক্তির সাথেও আমি সাক্ষাত করি। তখন বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ভারতীয় সংসদে একটি প্রতিনিধি দলও প্রেরণ করা হয়। মিঃ ফনীভূষণ মজুমদারের নেতৃত্বাধীন এই প্রতিনিধিদলের অন্যান্য সদস্য ছিলেন মিসেস নূরজাহান মোর্শেদ এবং শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন।
&nbsp;
আমি দিল্লী আসার আগেই বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল ভারতীয় সংসদে বক্তৃতা করেন। আমি দিল্লী এসেছি জেনে তারা আমার সাথেও যোগাযোগ করেন। বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল আহূত সাংবাদিক সম্মেলনে থাকার জন্য আমাকে অনুরোধ করা হলো। সম্মেলনে পেশ করার জন্য বক্তব্য তৈরী করে নিয়ে গেলাম। ফনীদা জানতেন বিদেশী প্রেসের সাথে আমি যোগাযোগ রক্ষা করছি। দিল্লী প্রেসক্লাবে তিনি আমাকে সামনে ঠেলে দিলেন। সংক্ষিপ্ত বক্তৃতা দিলাম। সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে প্রশ্ন আহবান করি। শাহ মোয়াজ্জেম আমার নাম বলে পরিচয় করিয়ে দিলেন। কিন্তু তখনো আমি ছদ্মনাম ‘রহমত আলী’ হিসেবে পরিচিত। ভারতীয় পত্রপত্রিকায় আমার বক্তব্য প্রচারিত হলো। পরিবার পরিজনের সাথে তখনো আমার দেখা হয় নি।
&nbsp;
সাংবাদিকদের প্রশ্নের মূল বক্তব্য ছিল পাক হানাদার বাহিনীর মোকাবেলায় অনভিজ্ঞ গেরিলা মুক্তিযোদ্ধারা কিভাবে সফল হবেন এবং যুদ্ধের প্রকৃত অবস্থাই বা কী? উত্তরে বললাম, দেশ মাতৃকার জন্য রক্তদানে প্রস্তুত মুক্তিযোদ্ধারা ভাড়াটে পাক হানাদার বাহিনীকে পরাভূত করবেই। আমাদের ধারণা ছিল বর্ষাকালে পাক বাহিনীর অগ্রযাত্রা ব্যাহত হবে। প্লাবন ও বন্যায় অনভ্যস্ত পশ্চিমা বাহিনী এ সময় মূলতঃ শহরে আটকে থাকবে। আমাদের যুদ্ধ পরিকল্পনাও তেমনি ছিল। সাংবাদিক সম্মেলনে এরূপ ইঙ্গিত দেই। কিন্তু বাস্তবে ঘটনা অন্যরূপ। পাক হানাদার বাহিনী গান বোটের সাহায্যে প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রবেশ করে মুক্তিবাহিনীর উপর ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে।
&nbsp;
দিল্লী থাকাকালে অন্য একটি কাজ করি। সিপিআই-এর একজন এমপি’র মাধ্যমে দিল্লীস্থ সোভিয়েত দূতাবাসের সাথে যোগাযোগ হয়। সংসদীয় দলের ৩ জন প্রতিনিধিসহ আমরা ৪ জন সোভিয়েত দূতাবাসে যাই।
&nbsp;
এটি পাক দূতাবাসের সামনে অবস্থিত ছিল। রাষ্ট্রদূতের পরবর্তী কর্মকর্তা আমাদের সাথে দেখা করেন। অত্যন্ত ধৈর্য্যের সাথে তিনি আমাদের বক্তব্য শোনেন। তিনি বলেন দূতাবাসের পক্ষ থেকে আমাদের বক্তব্য তিনি মস্কোতে পাঠাবেন। এর বেশী কিছু তিনি করতে পারবেন না বলে জানান। স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রথম পর্যায়ে সোভিয়েত নেতৃবৃন্দ আমাদের সাথে ঘনিষ্ট যোগাযোগে আগ্রহী ছিলেন না। আব্দুস সামাদ আজাদ বাংলাদেশের পক্ষ থেকে শান্তি সম্মেলনে মস্কো যান। তখনো তিনি সোভিয়েতের কোন নেতৃস্থানীয় ব্যাক্তির সাক্ষাৎ লাভে সমর্থ হন নি।
&nbsp;
শান্তি সম্মেলনের সময় খাবার টেবিলে বিভিন্ন প্রতিনিধিদের পতাকা থাকতো। আব্দুস সামাদ আজাদ সেখানে বাংলাদেশের পতাকা রাখার দাবী জানালে স্বাগতিক দেশ অসম্মতি প্রকাশ করে। এমনকি বাংলাদেশ প্রতিনিধি ব্যক্তিগতভাবে একটি পতাকা রাখতে চাইলে মস্কোর তা পছন্দ হয় নি। এরপর আব্দুস সামাদ আজাদ নিজের ঘরে খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা করেন।
&nbsp;
তাজউদ্দিন ভাই সাংবাদিক মঈদুল হাসানের মাধ্যমে মস্কোর সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেন। আমাদের সংগ্রামের প্রতি সরাসরি সমর্থন করতে মস্কোর যে অসুবিধা ছিল, সেটা আমরা বুঝতাম। তবে আমাদের সংগ্রামের প্রতি যে মস্কোর সমর্থন রয়েছে, সেটা বঙ্গবন্ধুর গ্রেফতারের পর পাক সরকারের কাছে প্রেরিত প্রেসিডেন্টর চিঠিতে তার আভাস পাওয়া গেছে। ২৫ শে মার্চ পাক হানাদার বাহিনীর হামলার প্রতিবাদ করে পদগোর্ণি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের কাছে চিঠি দিয়েছিলেন। বিশ্ব রাজনীতিতে ভারসাম্য রক্ষা করার জন্যই সে সময়ে মস্কোর পক্ষে আমাদের সংগ্রামের প্রতি সরাসরি সমর্থন দেয়া সম্ভব হয় নি।
&nbsp;
তবে একটি ঘটনার প্রেক্ষিতে সোভিয়েত ইউনিয়ন বাংলাদেশের সংগ্রামের প্রতি সমর্থন দেয়ার জন্যে ভারতের সাথে খোলাখুলি আলোচনা শুরু করে। আমাদের সংগ্রাম চলার সময় মিঃ হেনরি কিসিঞ্জার গোপনে চীন সফর করেন। আর চীন-মার্কিন সম্পর্কের উন্নতির ব্যাপারে পাকিস্তান দূতিয়ালী করে। এই ঘটনা ভারত সোভিয়েত মৈত্রী চুক্তি স্বাক্ষরের প্রেক্ষিত রচনা করে। আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অবস্থা ও বৃহৎ শক্তির ভারসাম্যের আলোকে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের অবস্থান সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীর ভবিষ্যৎবাণী কার্যে পরিণত হয়েছিল।
&nbsp;
এসব আলোচনাকালে আমরা দু’জনেই মোটামুটি একইরকম মতামত পেশ করতাম। কিসিঞ্জার চীন সফরের খবরের প্রতি আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই সফর আমাদের সংগ্রামে প্রভাব বিস্তার করবে। পরে এটা সত্যে প্রমাণিত হয়। মস্কো উপলব্ধি করে যে, যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও পাকিস্তান এই অঞ্চলে রাশিয়াবিরোধী জোট গঠনে ব্যস্ত রয়েছে। পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষা করতে চীন-মার্কিন তখন বিশেষভাবে ব্যস্ত।
&nbsp;
চীন-মার্কিন সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হওয়ার পর রুশ-ভারত সম্পর্ক স্বাভাবিকভাবেই ঘনিষ্ঠতর হয়। এখন রাশিয়ার পক্ষ থেকে ভারতের একটি আশ্বাস প্রয়োজন। সেই আশ্বাসটি হলো, কোন কারণে চীন ভারতে হামলা করলে রাশিয়া যেন পাল্টা চাপ সৃষ্টির ব্যবস্থা করে, যাতে চীন নির্বিঘ্নে ভারতে ঢুকে পড়তে না পারে।
&nbsp;
হিমালয়ের তুষার ও সোভিয়েতের বন্ধুত্ব এই দু’টি ছিল চীনের বিরুদ্ধে ভারতের রক্ষা কবচ। তাই সময় ও সুযোগে আন্তর্জাতিক পরিবেশ সৃষ্টির জন্যে ভারত তখন অপেক্ষা করছিল, সে সময় বাংলাদেশের বীর সন্তানেরা গভীর আত্মপ্রত্যয় নিয়ে পাক বাহিনীর মোকাবিলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছিল।
&nbsp;
দিল্লীতে আমি ভারতের বৈদেশিক দফতরে টি এন কাউলের সাথে যোগাযোগ করি। তিনি আমাদেরকে বিদেশে প্রচার কাজের ওপর জোর দেয়ার কথা বলেন। তিনি বিদেশের বিভিন্ন রাজধানী, সেখানকার সরকার, সংবাদপত্র ও জনমত সম্পর্কে আমাদের একটি ধারণা দেন। আমি এসব দিল্লী সফরের রিপোর্ট হিসেবে একটা নকশার মত প্রধানমন্ত্রীর কাছে পেশ করি।
&nbsp;
আমাদের মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে বিশ্বের সরকারগুলো কে কি ভাবছে, তা বুঝতে আমাদের কোন অসুবিধা হয় নি। এ ব্যাপারে তাজউদ্দিন ভাই-এর একটি মোটামুটি হিসেব ছিল। তিনি জোর দিয়েই বলতেন যে আগামী শীতেই একটা ফয়সালা হয়ে যাবে। কেননা এছাড়া আর কোন গত্যন্তর ছিল না।
&nbsp;
মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ গ্রহনের জন্যে প্রতিদিন সীমান্ত পার হয়ে শত শত তরুণ যুবক আসছে। তাদের মুখে এক কথা-ট্রেনিং চাই, অস্ত্র চাই। মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ গ্রহনে ইচ্ছুক যুবক ছাড়াও প্রতিদিন বহু লোক আমার অফিসে সাক্ষাৎ করতে আসতেন তাদের প্রত্যেকের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে।
&nbsp;
বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলার আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী ও সংসদ সদস্যরা প্রধানমন্ত্রীর অফিসে ভিড় করা শুরু করলেন। তাদের সবার বক্তব্য, স্ব স্ব স্থানের ছেলেদের ট্রেনিং-এর ব্যবস্থা করতে হবে। আমরা বুঝতে পারলাম, যে সংখ্যায় মুক্তযোদ্ধা ট্রেনিং-এর ব্যবস্থা আমরা করেছি, এর চেয়ে বহু বেশি সংখ্যায় যুবকরা আসছে প্রশিক্ষণের জন্যে। এ সময় আমরা ‘ইয়ুথ ক্যাম্প’ খোলার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। এই ক্যাম্পগুলো এমপি ও আওয়ামী লীগ নেতারা পরিচালনা করেন।
&nbsp;
এর পরের ধাপ ছিল অভ্যর্থনা শিবির। অভ্যর্থনা শিবিরের কাজ ভারতীয়রা ও আমরা যৌথভাবে পরিচালনা করতাম। মুক্তিযোদ্ধাদের অভ্যর্থনা ক্যাম্প থেকে ছয় সপ্তাহের ট্রেনিং-এ পাঠানো হতো।
&nbsp;
প্রথমে আমাদের ২৫ হাজার গেরিলাকে প্রশিক্ষণ দেয়ার সিদ্ধান্ত ছিল। পরে এই সংখ্যাকে এক লক্ষে উন্নীত করা হয়। এর মধ্যে ট্রেনিং শেষ করে ৯০ হাজার স্বদেশে আসতে সক্ষম হয়। তাছাড়াও ছিল নিয়মিত বাহিনী। সেনাবাহিনী, নৌ বাহিনী, বিমান বাহিনী ও বিডিআর-এর সৈনিকদের দ্বারা এই বাহিনী গঠন করা হয়। পুলিশের সংখ্যাও ছিল পর্যাপ্ত।
&nbsp;
সীমান্তে ছাউনী তৈরী করে নিয়মিত বাহিনী অবস্থান করতো। সেখান থেকেই তারা পাক বাহিনীর ওপর হামলা করেছে। তাছাড়া ছিল সহায়তাকারী একটি গোষ্ঠী। একটু বয়ষ্ক, যাদের পক্ষে মুক্তিযোদ্ধা হওয়া সম্ভব ছিল না, তারা ‘ইয়ুথ ক্যাম্প’ ও ‘অভ্যর্থনা ক্যম্পে’ নিয়মিত বাহিনীর সাথে সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করতো।
&nbsp;
ইয়ুথ ক্যাম্প করতে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা পাওয়া গেল। বাংলার হাজার হাজার দামাল ছেলের দ্বারা ক্যাম্পগুলো ছিল পরিপূর্ণ। তাদের শুধু একটাই কথা-ট্রেনিং চাই, অস্ত্র চাই। খান সেনাদের যে কোন মূল্যে খতম করতে হবে।
&nbsp;
এসময় আমি নিয়মিত ইয়ুথ ক্যাম্পে যেতাম। প্রিনসেপ স্ট্রীটে ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি অফিস খোলা হল। এই মন্ত্রণালয় ইয়ুথ ক্যাম্প পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে। কাজের মাধ্যমে ত্রাণমন্ত্রী এ এইচ এম কামরুজ্জামানের সাথে আমার সম্পর্ক আরো গভীর হয়ে ওঠে। সপ্তাহে কয়েকবার আমাদের বৈঠক হতো। এতে কাজের সমন্বয় বৃদ্ধি পায়। কামরুজ্জামান (হেনা ভাই) ও আমি সড়কপথে বাংলাদেশের পুরো সীমান্ত দেখার জন্য ২৫ দিনের এক কর্মসূচী গ্রহণ করি। স্বরাষ্ট্র সচিব আব্দুল খালেক আমাদের সাথে ছিলেন। ২৫শে মার্চ রাতে খালেক রাজশাহীতে ছিলেন, পরে সীমান্ত পার হয়ে আসেন। আব্দুল খালেক পুলিশ বাহিনীর লোকদের সংঘবদ্ধ করেছেন। তিনি অত্যন্ত অমায়িক লোক। তাঁর উদ্যম ও কর্মোৎসাহ আমাকে মুগ্ধ করেছে। তিনি ছিলেন একটি ব্যতিক্রমধর্মী চরিত্রের অধিকারী। আমরা রওয়ানা হই কলকাতা থেকে। মুর্শিদাবাদ, পশ্চিম দিনাজপুরের শিলিগুড়ি পার হয়ে মেঘালয়ের তোরা পাহাড় অঞ্চলের পাদদেশে আমরা ক্যাম্প স্থাপন করি। ফিরে আসার সময় পথে পথে সকল ক্যাম্প পরিদর্শন করি।
&nbsp;
আমাদের খাওয়া ও থাকার ব্যবস্থা হতো ইয়ুথ ক্যাম্পে। ইয়ুথ ক্যাম্প ছাড়াও পথিমধ্যে নিয়মিত যোদ্ধাদের ক্যাম্পগুলোতে গেছি। আমাদের এই সফরের উদ্দেশ্য ছিল সৈনিক ও মুক্তিযোদ্ধাদের সরেজমিনে দেখা এবং স্থানীয় ও ভারতীয় প্রশাসন যন্ত্রের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করা। তোরাতে মেঘালয়ের মূখ্যমন্ত্রীর সাথে দেখা হলো।
&nbsp;
মূখ্যমন্ত্রীর বাসভবনে আমাদের সাদর অভ্যর্থনা জানান হয়। মেঘালয়ের জনগনের অধিকাংশ খৃস্টান। তারা ইংরেজী শিক্ষায় শিক্ষিত। মিশনারীদের পুরাতন প্রভাব বিদ্যমান। এখানে পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরার মতো সহায়তায় এত ব্যাপক নয়। আমাদের লোকদের অবস্থা খুবই শোচনীয়।
&nbsp;
মেঘালয় সরকারের সাথে সরাসরি আলোচনা হলো। হেনা ভাই-এর সাথে মূখ্যমন্ত্রীর ছাত্রজীবনের সম্পর্ক ছিল। আলোচনায় এ সম্পর্ক আরো গভীর হলো।
&nbsp;
এখানেই মেজর জিয়াউর রহমানের সাথে আমার প্রথম পরিচয় হয়। খবর পেয়ে তিনি ডাকবাংলোতে আমাদের সাথে দেখা করতে আসেন।
&nbsp;
মুক্তিযোদ্ধাদের ভেতর থেকে প্রতিশ্রুতিপূর্ণ অফিসারের একটা গ্রুপ তৈরীর ভার ছিল জিয়ার ওপরে। কয়েকদিন পূর্বে জিয়া সৃষ্ট আমাদের শিক্ষানবিশ গ্রুপটিকে পাক বাহিনী ধ্বংস করে দিয়েছে। এর কারণ অনুসন্ধান করাও আমার দায়িত্বের অন্তর্ভূক্ত ছিল। আমরা ঘটনাস্থলে গেলাম। সেই পরিত্যক্ত ক্যাম্প সার্ভে করি। সবকিছু শুনে মনে হলো শত্রুর মুখে শিক্ষানবিশ অফিসাররা নিতান্তই নিরাপত্তাহীন ছিল। এত বড় আঘাতের রেশ তখনো কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয় নি। মেঘালয়ের কাজ শেষে আমরা শিলং-এর পথে রওয়ানা হই। পাহাড়ি পথ বেয়ে আমাদের গাড়ি চলতে থাকে। পাহাড়ি অঞ্চলে রাতের বেলা শীত বাড়ে।
&nbsp;
জঙ্গলে ক্যাম্প স্থাপন করে মুক্তিযোদ্ধারা বিভিন্ন ক্যাম্পে শত্রুহানার পরিকল্পনায় ব্যস্ত। রাতের বেলায় এমন একটি ক্যাম্পে গিয়ে আমরা উপস্থিত হই। পরিত্যক্ত বাড়িতে ক্যাম্প করা হয়েছে। চালা দেয়া ঘর এবং কয়েকটি তাঁবু রয়েছে। ছেলেরা তখন আগুন পোহাচ্ছিল। শীতের মধ্যে তাদের প্রয়োজনীয় কাপড় নেই। পাহাড়ী জঙ্গলে খাওয়া দাওয়ার এমনিতেই অসুবিধা। যোগাযোগের অবস্থাও ভালো নয়। এই অবস্থায় মুক্তিযোদ্ধাদের মুখে অম্লান হাসি। তাদের সাথে অনেকক্ষণ খোলাখুলি কথা হয়। কারো কারো প্রশ্ন, স্বাধীনতার পর দেশকে কিভাবে পূনর্গঠিত করতে হবে। অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য কী ব্যবস্থা নেয়া হবে ইত্যাদি। তাদের প্রয়োজনীয়তার কথা জিজ্ঞাসা করি। তারা জানান, তাদের প্রয়োজন শুধু অস্ত্রের। তাদের অভাবের তালিকায় শীতবস্ত্র, জুতা, কম্বল ও খাবারসহ অনেক কিছু ছিল। কিন্তু তারা এসবের কিছুই উল্লেখ করেন নি। তাদের সর্বপ্রথম ও সর্বশেষ দাবী হলো অস্ত্র চাই। শত্রুকে হত্যা করে দেশকে মুক্ত করতে হবে।
&nbsp;
সারারাত গাড়ী চালিয়ে আমরা পথ অতিক্রম করে পরদিন সিলেট সীমান্তে আসি। পথে পথে বহু শিবির আমরা পরিদর্শন করেছি। সিলেটের কিছু অঞ্চল মুক্তিযোদ্ধাদের দখলে রয়েছে। হেনা ভাইয়ের খুব ইচ্ছা বাংলার মাটিতে রাত কাটাবেন। বর্ষার পানিতে সিলেটের হাওড় তখনো পরিপূর্ণ। আমাদের আসার খবর চারদিকের গ্রামে ছড়িয়ে গেছে। ছোট ছোট নৌকায় আমাদের দলীয় নেতা-কর্মীরা দেখা করতে এলেন। নেতৃবৃন্দ ও স্থানীয় বিএসএফ কর্মকর্তার সাথে আলোচনা শেষে শিলং-এর পথে যাত্রা করি।
&nbsp;
এখানে মুক্তাঞ্চলে বহু শরণার্থী শিবির রয়েছে। রয়েছে মুক্তিযোদ্ধা শিবির। এখান থেকে গিয়ে তারা হানাদারদের ওপর হামলা চালাচ্ছে। স্বাধীন বাংলার পতাকা উড়ছে। একটি গ্রামে পৌঁছলাম। সেখানে বিরাট জনতার সমাগম হয়। স্থানীয় নেতৃবৃন্দ ও আমরা বক্তৃতা করি। স্বাধীন বাংলার মাটিতে প্রকাশ্যে জনসভা করতে পেরে অফুরন্ত আনন্দ পেলাম। জনসভা শেষে রাতেই শিলং পৌছার কথা রয়েছে। এই অঞ্চলে সিলেটের একজন এম.পি আব্দুল হক অত্যন্ত দক্ষতার সাথে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেছিলেন। স্বাধীনতার পর তিনি এক সড়ক দূর্ঘটনায় নিহত হন।
&nbsp;
সেখান থেকে আমরা শিলং ডাকবাংলাতেই যাই। সিলেটের একজন এম.পি এই অঞ্চলে প্রধান সমন্বয়কারী ছিলেন। এই এম.পি’র নাম ব্যারিষ্টার মোনতাকিম চৌধুরী পরে তাকে জাপানে রাষ্ট্রদূত নিয়োগ করা হয়। এখানে স্থানীয় নেতৃবৃন্দের সাথে কয়েকটি বৈঠক করি। পরদিন আমরা সিলেট ও আসামের সীমান্তে অবস্থিত ‘বালাট’-এর পথে রওয়ানা হই। কিছুদিন পূর্বে বালাটের কাছে পাকবাহিনীর সাথে সংঘর্ষে আমাদের কয়েকজন বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হয়েছে। সীমান্তের ওপারে বাংলাদেশের মাটিতে এই বীরদের কবর দেয়া হয়েছে। বালাটেও স্থানীয় নেতাদের সাথে আমাদের কয়েক দফা বৈঠক হয়।
&nbsp;
আমাদের ফেরত যাত্রা শুরু হল। শিলং-এ পৌছে দিনের কর্মব্যস্ততা শেষ করে পশ্চিম বাংলার একজন প্রখ্যাত সাংবাদিকের বাসায় যাই। তার কাছ থেকে স্থানীয় রাজনীতি, আসাম ও মেঘালয় সরকারের মনোভাব সম্পর্কে অবহিত হই। এর পূর্বে আমি কয়েকবার গৌহাটি, আগরতলা ঘুরে গেছি। আসাম সরকার মুক্তিযুদ্ধের ব্যাপারে খুব বেশী উৎসাহী ছিলেন না। শরনার্থী শিবিরগুলোতে খুবই কড়াকড়ি। তাই তাদের জীবন এখানে খুব সুখকর ছিল না।
&nbsp;
এর আগে ডোনাল্ড চেসওয়ার্থকে নিয়ে আমি আগরতলা গেছি। তাকে নিয়ে আমি সাবরুমে গেছি, এখানে ওপারে বাংলাদেশ সীমান্তে একটি রেষ্ট হাউজ রয়েছে। সেখানে হানাদার বাহিনী ক্যাম্প তৈরী করেছে। পাক হানাদার বাহিনী এখানে নারী নির্যাতন করেছে। দস্যুরা নারীদের উলঙ্গ করে পর্যন্ত রাখে। ওপারের লোকের মুখে এসব নির্যাতনের কথা আমরা শুনি। সাবরুমের ডাকবাংলোতে বিশ্রামের সময় ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম আসামী মাহফুজুল বারীর সাথে আমাদের দেখা হয়। বারী একজন সাধারণ শরনার্থীর মতো ডোনাল্ডের কাছে বাংলাদেশে পাক বাহিনীর নির্মম অত্যাচারের কাহিনী বর্ণনা করেন। ডোনাল্ড এসব কথা বৃটিশ সংসদে বলবেন বলে আমাদের জানান। এবং তিনি পরে তা করেছিলেন।
&nbsp;
হ্যনসার্ড-এর রিপোর্টে বাংলাদেশের করুণ এই আলেখ্য প্রকাশিত হয়। আমি জন স্টোন হাউজ, ডগলাস ম্যান, পিটার বার্নস এমপিসহ অনেক সাংবাদিককে নিয়ে বাংলাদেশের মুক্তাঞ্চলে পৌছি। এমন একটি দল নিয়ে পাটগ্রামের মুক্তাঞ্চলে যাই। যুদ্ধ চলার সময়ও আমি বহুবার পাটগ্রামে গেছি। পাটগ্রামে একবার আমরা একটি ডাকঘর উদ্বোধন করি। এ সময় প্রখ্যাত ডিজাইনার বিমান বোস অংকিত স্বাধীনতা যুদ্ধের কোমেমোরেটিভ স্ট্যাম্প লণ্ডন ও কলকাতায় বিক্রি করা হয়।
&nbsp;
পাটগ্রামে ডাকঘর উদ্বোধন করার সময় টেলিভিশনসহ বেদেশী সাংবাদিক উপস্থিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ এবং মোস্তফা সারওয়ার অনুষ্ঠানে যোগদান করেন। পাটগ্রাম থেকে আমরা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে যাই। মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে আমরা ১ রাত ১ দিন কাটাই। সামরিক ছাউনীতে আমাদের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা হয়।
&nbsp;
আমরা দিনাজপুরের পঁচাগড় পর্যন্ত মুক্তাঞ্চলে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের খোঁজ খবর নিই। আমাদের উপস্থিতিতে মুক্তিযোদ্ধাদের কামান বিপুল উৎসাহে গর্জে ওঠে। আমাদের মুক্তিবাহিনীর হাতে তখন কামান এসে গেছে। এই কামানের গোলায় দূরের পাকিস্তানি বাংকারগুলো ভেঙ্গে পড়েছে। দূরবীন দিয়ে পলায়নপর পাক বাহিনী দেখে উল্লাসিত হই।
&nbsp;
দিনাজপুর জেলার এই অঞ্চলের একটি গ্রামের সমস্ত অধিবাসী মুক্তিবাহিনীর জন্যে গ্রামটি ছেড়ে দিয়ে অন্যত্র চলে গেছে। গ্রামটির নাম মনে নেই। গ্রামের বেশিরভাগ বাড়ি-ঘরে টিনের বা খড়ের চালা। ঘরের ভিটিগুলো বেশ উঁচু। ঘরের ভিতরে বাংকার তৈরী করা হয়েছে। মেঝেতে গর্ত করে মাটির ভেতরে কামান বসানো হয়েছে। এ সময়ে বঙ্গবন্ধুর সেই উদাত্ত আহ্বান ‘ঘরে ঘরে দুর্গ ঘড়ে তোল’ এ কথা মনে হত। গোরস্থানে কবরের ভেতরেও অনেক স্থানে বাংকার হয়েছে। গ্রামবাসীরা মুক্তিযোদ্ধাদের খাদ্য সরবরাহ করেছে। ছোট ছোট রাখাল ছেলেরা দূরে গরু চরাতে গিয়ে পত্র বাহকের কাজ করেছে ও দূরে শত্রুদের অবস্থান জানাচ্ছে। এই প্রসঙ্গে ভিয়েতনাম যুদ্ধের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। ভিয়েতনামের জনগন পরম পরাক্রমশালী মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে বীরের মতো লড়াই করেছে। প্রতিদিন বাংলাদেশের মাটিতে একাধিক বীরত্ব গাঁথা জন্ম নিচ্ছে। এই বীরত্ব গাঁথার সবগুলো হয়ত কোন দিনই লেখকের কলামে, কবির কবিতায় বা শিল্পীর কণ্ঠে শোনা যাবে না। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস হয়তো কোন দিনই লেখা হবে না। তবে ৯ মাস ব্যাপী মুক্তিযুদ্ধের সময় বিভিন্ন রণাঙ্গনে মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্ব ও সাহস দেখে মন ভরে উঠতো। প্রথম প্রথম বেশ ভয় করতাম। পরে আস্তে আস্তে অভ্যস্ত হয়ে যাই। একদিন ভারতীয় একজন জেনারেলের কথা শুনে আমার ভয় অনেকটা কমে গেল। তিনি বলেন, ‘যে গুলিতে তুমি মারা যাবে, সে গুলির আওয়াজ তোমার কানে আসবে না। আর যে গুলির শব্দ তুমি শুনছ, তা তোমার গায়ে লাগবে না।’ এরপর বলতে গেলে গুলির শব্দে আর ভয় পাই নি।
&nbsp;
ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রী ও আমি যুদ্ধের নিয়ম কানুন কিছুটা রপ্ত করে ফেলেছি। তাছারা কোন ক্যাম্পে গেলে আমাদের জন্য যথেষ্ট নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হতো। আর বিশেষ কথা হলো আমাদের তখন মরার ভয় ছিল না, ভয় ছিল শত্রুর হাতে যেন না পড়ি। শত্রুর হাতে না পড়ার জন্য সতর্কতা অবলম্বন করতে হতো। কারন, যুদ্ধাবস্থায় বন্দিত্ব মৃত্যুর চেয়ে খারাপ হতে পারে। সে সময় পঁচাগড়ের একটা সেতু মুক্তিযোদ্ধারা উড়িয়ে দেয়। সেতুর স্থান থেকে ঢাকার মেইল স্টোন দেখা যায়। ভাবতাম, এই পথে কখন ঢাকা যাব। বাংলাদেশের এই অঞ্চলের মুক্তাঞ্চলগুলো ছিল আমাদের আগামি দিনের মাইল পোস্ট।
&nbsp;
প্রধানমন্ত্রী ও আমি পাটগ্রাম সফর করে শিলিগুড়িতে ফিরে আসি। শিলিগুড়ির মিলিটারী হাসপাতালে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের দেখতে গেলাম। আহতদের মুখে মুক্তিযুদ্ধে তাদের বীরত্বের কাহিনী শুনলাম। তাদের চোখে মুখে দেশে ফেরার স্বপ্ন। শিলিগুড়ির এক কাকর বিছানো পথ দিয়ে আমরা পাটগ্রাম যেতাম। পাটগ্রামের পরিত্যক্ত রেল স্টেশনে বসে বাংলাদেশ যুদ্ধে সহায়তাকারী বন্ধু ডোনাল্ড ও স্টোনহাউস কে বাংলাদেশে প্রবেশের ভিসা প্রদান করি। শিলিগুড়িতে বাংলাদেশ সরকারের বেসামরিক কর্মচারীদের একটি প্রশাসন কাঠামো ছিল। গণসংযোগের জন্য আমি একবার শিলিগুড়ি বারে যাই।
&nbsp;
প্রধানমন্ত্রীর সাথেও একবার শিলিগুড়ি যাই। সারদিন কর্মসূচি ছিল। এবার চিত্তদের বাসায় যেতে পারি নি। সন্ধাবেলায় শিলিগুড়ির ভারতীয় সামরিক বাহিনীর মিলিটারি ক্লাবে আমাদের নিমন্ত্রণ ছিলো। এই অঞ্চলে ভারতীয় সামরিক বাহিনীর প্রধান, তার সঙ্গী সাথী কর্মকর্তারা সকলে উপস্থিত। তাদের ব্যবহার খুবই ভাল। তাদের আলোচনায় একতি বিষয় বিশেষ ভাবে পরিষ্ফুট হয়ে উঠে। তা হলো ভারতীয় গণতন্ত্রের প্রতি তাদের অগাধ শ্রদ্ধা। গনপ্রতিনিধিদের প্রতি তাদের শ্রদ্ধাভাব দেখে আমার খুব ভাল লাগলো। বুঝলাম সে দেশে কেন গণতন্ত্র টিকে আছে।
&nbsp;
পরদিন সকালে আমরা আমাদের মুক্তিবাহিনী প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে পরিদর্শনে গেলাম। এগুলো ভারতীয় বাহিনীর সরাসরি তত্বাবধানে। আমরা ক্যাম্পে পৌঁছে দেখি শিক্ষানবিশ মুক্তিযোদ্ধারা টার্গেট শুটিং-এ ব্যস্ত। মুক্তিযোদ্ধারা প্রশিক্ষণ শেষে লাইন করে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী কে অভিনন্দন জানায়। জয় বাংলা শ্লোগানে পাহাড়ি এলাকায় অবস্থিত ক্যাম্প কেঁপে ওঠে। আমাদের সবার কন্ঠে ভেসে আসল ‘আমাদের সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি’।
&nbsp;
ক্যাম্পের সীমার শেষ প্রান্তে এসে ছেলেরা আমদের বিদায় দিয়ে গেল। এখান থেকে আমরা রংপুরের ভূরুঙ্গামারীর দিকে রওয়ানা হই। আমাদের সাথে ভারতীয় একজন বিখ্যাত আলোকচিত্র শিল্পী রয়েছে। তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের ছবি তুলেছেন। পেছনে একটি জীপে সেই ক্যামেরা ম্যান। আমাদের সাথে অন্যান্যদের মধ্যে রয়েছেন সংস্থাপন সচিব নূ