বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধঃ দলিলপত্র – ১৫ তম খণ্ড (অনুবাদসহ) – পর্ব – ২

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধঃ দলিলপত্র – ১৫ তম খণ্ড (অনুবাদসহ) – পর্ব – ২

  
 
<a href=”https://www.facebook.com/profile.php?id=100005843262936&amp;fref=ts”>হৃতহৃ ইসলাম</a>
&lt;১৫,২২,২০৫-১৩&gt;<h1>[দেবব্রত দত্ত গুপ্ত]</h1>&nbsp;
১৯৭১ সনের ২৩শে মার্চ পর্যন্ত আমি নোয়াখালীর চৌমুহনী কলেজে অধ্যাপনা করেছি। ২৩শে মার্চ সন্ধ্যায় আমি তৎকালীন কিছু স্বাধীনতা সংগ্রাম ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের কাছ হতে জরুরী নির্দেশ পেয়ে কুমিল্লা শহরে চলে আসি এবং ২৫শে মার্চ স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু হওয়ার অব্যাহতির পরেই , শহর ছেড়ে কুমিল্লার মুরাদনগর থানার চুড়লিয়া গ্রামে চলে যাই। গ্রামে স্বাধীনতার স্বপক্ষে জনমত গঠন ও অন্যান্য প্রাসঙ্গিক কাজ শেষ করে ১৫ই এপ্রিল’৭১ কুমিল্লার গ্রামাঞ্চলের বেশ কিছুসংখ্যক যুবক ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দসহ বুড়িচং থানার নাইঘর নয়নপুর হয়ে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের বক্সনগরে গিয়ে পৌঁছি। তারপর বক্সনগর হতে সোনামুড়া হয়ে ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানী আগরতলাতে যাই এবং সেখানে যুদ্ধকালীন বাংলাদেশ মিশন ও প্রশাসনিক দপ্তরের সাথে যোগাযোগ করি। সে সময় বাংলাদেশ সরকারের পূর্বাঞ্চলীয় বেসামরিক প্রশাসনিক দপ্তর ছিল আগরতলা কৃষ্ণনগর এলাকায় কয়েকটি বাড়িতে। অবশ্য রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের একতি উল্লেখযোগ্য অংশ তখন আগরতলা শহরের ‘কুঞ্জবন’ এলাকায় এবং ছাত্র নেতৃবৃন্দের অধিকাংশই অবস্থান করতেন আগরতলার গোলবাজারের ‘শ্রীধর ভিলায়’।
&nbsp;
যেহেতু আমি অধ্যাপনা জীবনে বাংলাদেশের ভাষা-সংস্কৃতি, জাতীয়তাবাদ ও স্বাধীনতা আন্দোলনের সাথে বিভিন্নভাবে জড়িত ছিলাম সুতরাং তৎকালীন স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহনকারী রাজনৈতিক ও অন্যান্য পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ আমাকে ডঃ হাবিবুর রহমানসহ পূর্বাঞ্চলের যুব প্রশিক্ষণ, সমন্বয় সাধন এবং পরিচালনার দায়িত্বের সাথে জড়িত থাকতে অনুরোধ করেন। আমিও এই ধরণের একটি পবিত্র সুযোগের সন্ধানেই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলাম। সুতরাং সুযোগ যখন এল, তখন এক মুহূর্তও বিলম্ব না করে সানন্দে কাজে ঝাঁপিয়ে পড়লুম। সময়টা ছিল তখন ১৫ই মে, ১৯৭১ ইং।
&nbsp;
১৯৭১ সনের মার্চ মাসে, দেশের ভিতরে স্বাধীনতা সংগ্রাম তীব্র হওয়ার সাথে সাথে বাংলাদেশের ছাত্র, শিক্ষক, যুবক, কৃষক, রাজনৈতিক নেতা ও কর্মীসহ সমাজের বিভিন্ন স্তরের আবাল বৃদ্ধ বনিতা নির্বিশেষে, হাজার হাজার মানুষ স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করার উদ্দেশ্যে এবং বেঁচে থাকার তাগিদে, সীমান্ত অতিক্রম করে দেশের বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চল দিয়ে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে প্রবেশ করতে আরম্ভ করে। বাংলাদেশের মানচিত্রের দিকে তাকালে এটা অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে অনুধাবন করা যায় যে, ভৌগলিক দিক দিয়ে ত্রিপুরা রাজ্য ও বাংলাদেশের সীমান্তের অবস্থান অত্যন্ত সন্নিকটবর্তী এবং সহজগম্য। ফলে মুক্তিযোদ্ধা ও শরণার্থীগণ তুলনামূলকভাবে অন্যান্য অঞ্চল হতে এই অঞ্চল দিয়ে অতি সহজেই স্বাধীনতার জন্য বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী বিভিন্ন বনাঞ্চলে এবং গ্রামে, আশ্রয় নিতে আরম্ভ করে। প্রসঙ্গক্রমে এখানে উল্লেখযোগ্য যে, ত্রিপুরা রাজ্যের ভৌগলিক অবস্থান, রাস্তা-ঘাটের দুর্গমতা এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক সুযোগ-সুবিধা মুক্তিযোদ্ধা এবং শরণার্থীদেরকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় এই অঞ্চলে আগমন করতে উৎসাহিত করেছিল। তাই যুদ্ধ আরম্ভ হবার অব্যবহিত পরে অর্থাৎ ১৯৭১ সনের এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময় হতেই পূর্বাঞ্চলীয় বাংলাদেশ সরকার এবং তৎকালীন লিবারেশন কাউন্সিল ভারত সরকারের প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের সাথে আলাপ-আলোচনা করে শরণার্থীদের জন্য আশ্রয় শিবির স্থাপন করার সাথে সাথে বাংলাদেশ ভেতর হতে আগত বিভিন্ন পর্যায়ের অস্ত্র প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এই সময় মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে ইচ্ছুক যুবকদের জন্য ৩ ধরণের প্রশিক্ষণ ক্যাম্প ত্রিপুরা রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে স্থাপন করা হয়েছিল। প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোর নাম নিম্নে উল্লেখ করা হলঃ
&nbsp;
১. অভ্যর্থনা কেন্দ্র ( Reception Camp)
&nbsp;
২. যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ( Youth Training Camp)
&nbsp;
৩. সামরিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ( Army Training Camp)
&nbsp;
মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণে ইচ্ছুক এবং প্রশিক্ষণার্থী বিভিন্ন শ্রেনীর যুবকদের মধ্যে যে সব যুবক সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণের যোগ্যতা অর্জন করে নি বা সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে ইচ্ছুকও নয়, সে সব যুবককে উপযুক্ত ও প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দিয়ে , যুদ্ধ চলাকালে এবং পরবর্তীকালে যুদ্ধ ধ্বংসপ্রাপ্ত দেশ গড়ার সৈনিকরূপে ‘ ভিত্তি ফৌজ’ হিসেবে গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে একটি স্কীম প্রণয়নের দায়িত্ব তৎকালীন গণপ্রজাতন্তী বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে নিম্নে উল্লেখিত ব্যক্তিদের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছিলঃ
&nbsp;
জনাব ড. হাবিবুর রহমান ওরফে ড. আবু ইউসুফ (যুদ্ধের সময় ডঃ হাবিবুর রহমান, যুদ্ধের সময় ডঃ আবু ইউসুফ, এই ছদ্মনাম ব্যবহার করতেন), জনাব মাহবুব আলম, জনাব তাহের উদ্দিন ঠাকুর, অধ্যাপক দেবব্রত দত্ত গুপ্ত।
&nbsp;
উপরোক্ত এই কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে কাজ করেছেন ড. হাবিবুর রহমান। ড. রহমান স্বাধীনতা পূর্ববর্তীকালে তিতাস গ্যাসের জেনারেল ম্যানেজার ছিলেন। পরবর্তীকালে তিনি বাংলাদেশ সরকারের গ্যাস, ওয়েল ও মিনারেল রিসোর্সের ১৯৭৫ সব পর্যন্ত চেয়ারম্যান এবং সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। জনাব মাহবুব আলম যুদ্ধের সময় পররাষ্ট্র সচিব এবং পরবর্তীকালে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ সচিব, স্বনির্ভর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। জনাব ঠাকুর যুদ্ধের সময় এম, এন, এ এবং পররাষ্ট্র দপ্তরের একজন পরিচালক ছিলেন। দেশ স্বাধীন হবার পর তিনি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও বেতার দপ্তরের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে কাজ করেছেন।
&nbsp;
যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোকে পরিচালনার জন্য গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ( মুজিব নগর ) একটি ‘ইয়থ ট্রেনিং কন্টোল বোর্ড’ গঠন করেছিলেন। অধ্যাপক ইউসুফ আলী এই বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এই বোর্ডের তত্ত্বাবধানে মুজিবনগর, পূর্বাঞ্চল (ত্রিপুরা রাজ্যকেন্দ্রিক) ও পশ্চিমাঞ্চলের ( পশ্চিম বঙ্গকেন্দ্রিক ) এই দুইটিই ইয়থ ক্যাম্প ডাইরেকটরেট গঠন করা হয়েছিল। তবে, এই সময়ের মধ্যে পশ্চিমাঞ্চলের যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলো বিভিন্ন কারণে তেমন ‘শক্ত’ এবং ‘মজবুত’ হয়ে গড়ে উঠতে পারে নি। পশ্চিম অঞ্চলের যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্রসমূহের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন জনাব আহমদ রেজা।
&nbsp;
ইয়থ ট্রেনিং ক্যাম্পগুলোর দৈনন্দিন কাজ সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য নিম্নে উল্লেখিত পদগুলো সৃষ্টি করা হয়েছিলঃ
&nbsp;
ক্যাম্প প্রধান (১)
উপ-ক্যাম্প প্রধান (১);
ক্যাম্প তত্ত্বাবধায়ক (২);
ছাত্র প্রতিনিধি (২);
স্বাস্থ্য অফিসার(২);
পলিটেকিলে মটিভেটর (৪);
ফিজিকেল ইনস্ট্রাকটর (৪)।
তাছাড়া প্রাথমিক পর্যায়ে ইয়থ ক্যাম্প ডাইরেকটরেট যে সব ব্যক্তিকে নিয়ে গঠন করা হয়েছিল, তাঁদের নামও এখানে উল্লেখ করা হলঃ
&nbsp;
সর্বজনাব মাহবুব আলম , প্রকল্প সমন্বয়কারী; ড. হাবিবুর রহমান, পরিচালক (প্রশিক্ষণ); অধ্যাপক নুরুল ইসলাম চৌধুরী, এম,এন,এ; জনাব মুজাফফর আহমদ, এম,পি,এ; জনাব খালেদ মুহম্মদ আলী, এম,এন,এ; জনাব বজলুর রহমান, রাজনৈতিক নেতা; অধ্যাপক দেবব্রত দত্ত গুপ্ত, উপ-পরিচালক এবং প্রশিক্ষণ সমন্বয়কারী; জনাব মোশারফ হোসেন, হিসাব রক্ষণ অফিসার।
&nbsp;
প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখযোগ্য যে, উপরোক্ত কার্যকরম, পরিচালনা ব্যবস্থা ও আনুষঙ্গিক নীতি-পদ্ধতির মধ্যে পরবর্তীকালে কিছুটা কিছুটা পরিবর্তন এবং পরিবর্ধন করা হয়েছিল। কিন্তু সে সব পরিবর্তন তেমন উল্লেখযোগ্য নয় বলে এখানে উল্লেখ করা হল না।
&nbsp;
১। <a href=”https://www.facebook.com/hashtag/%E0%A6%85%E0%A6%AD%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%A5%E0%A6%A8%E0%A6%BE_%E0%A6%95%E0%A7%87%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A6%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%83″>অভ্যর্থনা কেন্দ্রঃ</a> <u>(</u><u>Reception Centre)</u>
স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার জন্যে বিভিন্ন নদী, নালা, খাল-বিলসহ দুর্গম রাস্তা-ঘাট পায়ে হেঁটে ও নৌকাযোগে অতিক্রম করে ক্লান্ত, শ্রান্ত ও অবসন্ন অবস্থায় যখন হাজার হাজার যুবক ত্রিপুরা রাজ্যে প্রবেশ করত, তখন এই সমস্ত রিসিপশন ক্যাম্পের মধ্যে যুবকদেরকে ৭ দিনের জন্য ধরে রাখার ব্যবস্থা করা হত। এই সময় যুবকেরা বিশ্রাম, খাওয়া, সাধারণ পোশাক, চিকিৎসা ও নিরাপত্তার সুযোগ লাভ করত। এইসব ক্যাম্পের পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ ও অন্যান্য ব্যবস্থাপনার সার্বিক দায়-দায়িত্ব সাধারণত বাংলাদেশ ও ভারত সরকারের প্রতিনিধিদের ওপরই ন্যস্ত ছিল। তবে, অধিকাংশ দেশেই বাংলাদেশের পক্ষ হতে একজন এম,পি-এ/এম,এন,এ-কে, ক্যাম্প প্রধান/উপ-প্রধান হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হত।
২। <a href=”https://www.facebook.com/hashtag/%E0%A6%AF%E0%A7%81%E0%A6%AC_%E0%A6%AA%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%B6%E0%A6%BF%E0%A6%95%E0%A7%8D%E0%A6%B7%E0%A6%A3_%E0%A6%95%E0%A7%87%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A6%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%83″>যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্রঃ</a><u> (Youth Training Camp):</u>
অভ্যর্থনা কেন্দ্রগুলোতে ৭ দিনের বিশ্রাম, খাওয়া ও চিকিৎসার পর একটি সুনির্দিষ্ট প্রোফরমার মাধ্যমে স্বাধীনতা সংগ্রামে যোগদানে ইচ্ছুক যুবকদেরকে ৪৫ দিনের প্রশিক্ষণের জন্য বাছাই করে, যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোতে সাধারণত তিন ধরনের প্রশিক্ষণ দেয়া হতো। এই প্রশিক্ষণ কোর্সগুলো নিম্নরূপ ছিলঃ
ক। <a href=”https://www.facebook.com/hashtag/%E0%A6%AA%E0%A6%B2%E0%A6%BF%E0%A6%9F%E0%A6%BF%E0%A6%95%E0%A7%87%E0%A6%B2_%E0%A6%AE%E0%A6%9F%E0%A6%BF%E0%A6%AD%E0%A7%87%E0%A6%B6%E0%A6%A8%E0%A6%83″>পলিটিকেল মটিভেশনঃ</a><u> (Political Motivation):</u>
এই ধরনের প্রশিক্ষণের মূল উদ্দেশ্য ছিল, যুদ্ধে অংশগ্রহণের ইচ্ছুক যুবকদেরকে রাজনৈতিকভাবে সচেতন করে তোলা এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদ, বাঙালি সংস্কৃতি ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা ইত্যাদি সম্পর্কে উদ্বুদ্ধ করা।
খ। <a href=”https://www.facebook.com/hashtag/%E0%A6%89%E0%A7%8E%E0%A6%AA%E0%A6%BE%E0%A6%A6%E0%A6%A8_%E0%A6%93_%E0%A6%89%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A8%E0%A7%9F%E0%A6%A8%E0%A6%AE%E0%A7%82%E0%A6%B2%E0%A6%95_%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A6%9C%E0%A7%87%E0%A6%B0_%E0%A6%AA%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%B6%E0%A6%BF%E0%A6%95%E0%A7%8D%E0%A6%B7%E0%A6%A3%E0%A6%83″>উৎপাদন ও উন্নয়নমূলক কাজের প্রশিক্ষণঃ</a><u> (Base work Training):</u>
এই প্রশিক্ষণের মূল উদ্দেশ্য ছিল, স্থানীয় সম্পদ, শক্তি ও সঙ্গগঠনের মাধ্যমে বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতি ও সমাজ ব্যবস্থাপনাসহ উৎপাদন এবং উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডে দেশের যুবশক্তি কি ভূমিকা পালন করতে পারে, সে সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দান করা। তাছাড়া, এই স্বাধীনতা সংগ্রাম যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে যাতে বাঙালী একটি জাতি হিসেবে টিকে থাকার জন্যে নিজস্ব সম্পদ , শক্তি, যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, নেতৃত্ব, কর্মপ্রচেষ্টা, ও কঠোর শ্রমের দ্বারা আপাতত শহুরে অর্থনীতি বাদ দিয়ে ( যেহেতু শহরগুলো শ্ত্রুদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছিল ) নিজেরাই নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে স্বাবলম্বী হয়ে বেঁচে থাকার দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রামে উপযুক্ত করে নিজেদেরকে গড়ে তুলতে সক্ষম হয়, সে সম্পর্কে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেয়াও এই ব্যবস্থার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল।
গ। <a href=”https://www.facebook.com/hashtag/%E0%A6%B9%E0%A6%BE%E0%A6%B2%E0%A6%95%E0%A6%BE_%E0%A6%85%E0%A6%B8%E0%A7%8D%E0%A6%A4%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A7%87%E0%A6%B0_%E0%A6%AA%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%B6%E0%A6%BF%E0%A6%95%E0%A7%8D%E0%A6%B7%E0%A6%A3%E0%A6%83″>হালকা অস্ত্রের প্রশিক্ষণঃ</a><u> </u><u>(</u><u>Light Arms training):</u>
এই প্রশিক্ষণের মূল উদ্দেশ্য ছিল, এই প্রশিক্ষণার্থী যুবকদেরকে পি,টি, করানো, ‘গ্রেনেড’ নিক্ষেপ, দেশের ভিতরে শত্রুদের যাতায়াতে বিঘ্ন সৃষ্টি করার জন্য বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ‘মাইন’ পোঁতা, মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী ‘গেরিলা’সহ বিভিন্ন পর্যায়ের সংগ্রামী যুবক, সৈনিক, পুলিশ, আনসার ও অন্যান্য পর্যায়ের লোকদের সাথে গোপন এবং প্রয়োজনীয় যোগাযোগসহ তত্ত্ব এবং তথ্য সরবরাহের কাজে ( রেকি এবং ওপি করা) সহযোগিতা করা ইত্যাদি।
প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখযোগ্য যে, আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম ছিল একটা জনযুদ্ধ। সুতরাং এই জনযুদ্ধের প্রধান শক্তির উৎস ছিল দেশের আপামর সাধারণ মানুষ। যেহেতু আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রাথমিক পর্যায়ে আমরা বিভিন্ন কারণে গেরিলা পদ্ধতির যুদ্ধকেই বেছে নিয়েছিলাম সুতরাং এই যুদ্ধে দেশের জনগণের সক্তিয় সহযোগিতা ছাড়া জয়লাভ করা কোন অবস্থাতেই সম্ভবপর ছিল না। কারণ জনতা হলো ‘পানি’ এবং গেরিলারা হলো ‘মাছ’। সুতরাং পানি দূষিত হলে যেমন মাছ বেঁচে থাকতে পারে না, তেমনি জনতার সহযোগিতা না পেলেও ‘গেরিলা’ পদ্ধতির জনযুদ্ধ কোন অবস্থাতেই সাফল্যমণ্ডিত হয় না। আমাদের পরম সৌভাগ্য এই যে, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে দেশের সাধারণ মানুষ, যে কোন মূল্যের বিনিময়ে নিজেদের গেরিলারূপী দামাল ছেলেদেরকে আশ্রয়, প্রশ্রয়, খাদ্য ও বিভিন্নমুখী সহযোগিতা প্রদান করতে কখনো কুণ্ঠাবোধ করেনি। সুতরাং দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সবচেয়ে বড় শক্তি ও সম্পদ ছিল এই দেশের সাধারণ মানুষ।
&nbsp;
<u>ভিত্তি ফৌজ </u><u>( </u><u>V.F</u><u> ) </u><u>এবং যুব প্রশিক্ষণ </u>
<u> </u>
দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সময়, দেশের ভিতর হতে লক্ষ লক্ষ ছাত্র যুবক ও কৃষকেরা যখন প্রয়োজনীয় অস্ত্র প্রশিক্ষণ গ্রহণ এবং দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণ করার জন্য সীমান্ত অতিক্রম করে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ শিবিরগুলোওতে উপস্থিত হচ্ছিল, তখন বিভিন্ন যুক্তিসঙ্গত কারণেই শিবিরে অবস্থানকারী সব শ্রেনীর লোকদেরকে অস্ত্র প্রশিক্ষণ দেয়া সম্ভবপর ছিল না। তাছাড়া বিদেশে থেকে যেমন এক বিপুলসংখ্যক অস্ত্র প্রার্থীর জন্য তাদের ইচ্ছানুযায়ী প্রয়োজনীয় অস্ত্র সংগ্রহ করা দুঃসাধ্য ছিল, তেমনি Arms without command and control-অত্যন্ত বিপজ্জনক পরিস্থিতি এবং ঘটনার সৃষ্টি করতে পারে, এইসব ধারণায় ভাবান্বিত হয়ে সবাইকে অস্ত্র প্রশিক্ষণ না দেবারও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছিল।
যেহেতু আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম প্রাথমিক পর্যায়ে গেরিলা পদ্ধতির ছিল সুতরাং কোন অবস্থাতেই <em>গতানুগতিক আর্মির</em> সাথে সরাসরি মোকাবেলা করা যুদ্ধ-বিজ্ঞান সম্মত হতো না। দ্বিতীয়ত, একটি যুবককে হালকা (লাইট) এবং মাঝারি ধরনের অস্ত্র পরিচালনায় প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ করতে হলেও কমপক্ষে ৬ মাস সময়ের প্রয়োজন। কিন্তু তৎকালীন পরিবেশ এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী, সব যুবককে অস্ত্র প্রশিক্ষণের জন্য এর সময় দেয়া আমাদের পক্ষে কোনো অবস্থাতেই সম্ভবপর ছিল না। তাছাড়া এখানে উল্লেখিত এইসব সমস্যা ব্যতীত তৎকালে অন্যান্য বহুবিধ রাজনৈতিক,প্রশাসনিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও আদর্শগত সমস্যা এবং কারণ ছিল, যার জন্য প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোতে অবস্থানকারী সব মানুষকে ‘অস্ত্র’ প্রশিক্ষণে প্রশিক্ষিত করা তৎকালীন নেতৃবৃন্দ এবং কর্মকর্তাগণ প্রয়োজন মনে করেননি। সুতরাং ‘অভ্যর্থনা শিবির’ হতে যে সমস্ত যুবককে ৪৫ দিনের প্রশিক্ষণের জন্য যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে রিক্রুট করা হত, সে সব যুবকের মাঝ থেকে একমাত্র তাদেকেরি ‘সামরিক’ প্রশিক্ষণের জন্য ভারতের বিভিন্ন সামরিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে প্রেরণ করা হতো যাদের শিক্ষাসহ শারীরিক, মানসিক ও প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক যোগ্যতা ছিল। এই পদ্ধতি ও ব্যবস্থার ফলে যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোর যে হাজার হাজার যুবকজের সরাসরি সামরিক প্রশিক্ষণ দেয়া সম্ভব হতো না, সে সব যুবকদের ওপরে উল্লেখিত প্রক্রিয়ায় প্রশিক্ষণ দিয়ে ‘ভিত্তি ফৌজ’ ( সামরিক ও অর্থনৈতিক ) হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করা হত। এখানে ‘ভিত্তি’ বলতে মাটিকে এবং ফৌজ বলতে সামজিক চেতনা সম্পন্ন এবং তৎকালে ভিত্তি ফৌজকে দেশের ভিতরে ও বাহিরে স্বচ্ছন্দে চলাফেরা করার জন্য যে আইডেন্টিটি কার্ডের নমুনা নিম্নে উল্লেখ করা হল।
&nbsp;
<strong>বিপদের আশংকায় নষ্ট কর</strong>
<strong>বাংলাদেশ ভিত্তি</strong><strong>-</strong><strong>ফৌজ বাহিনীর নির্দেশ পত্র</strong>
<strong>এতদ্বারা জানান যাইতেছে যে</strong><strong>, </strong><strong>নাম</strong><strong>…………….. </strong><strong>বয়স</strong><strong>………….. </strong><strong>পিতা </strong><strong>……………… </strong><strong>গ্রাম </strong><strong>……………….. </strong><strong>থানা</strong><strong>…………… </strong><strong>জিলা</strong><strong>…………….. </strong><strong>কে বাংলাদেশ ভিত্তি</strong><strong>-</strong><strong>ফৌজ বাহিনীর </strong><strong>…………… </strong><strong>নং স্বেচ্ছাসেবক কর্মী হিসেবে গ্রহুণ করা হইল।</strong>
<strong>বঙ্গবন্ধু </strong><strong>শে</strong><strong>খ মুজিবুর রহমানের অপর নির্দেশ অনুসারে বাংলাদেশের গ্রামে গ্রামে স্বাবলম্বী</strong><strong>- </strong><strong>কর্মশৃংখলার ভিত্তিতে এবং পঞ্চায়েতী শাসনের মাধ্যমে মুক্তিকামী জীবন যাপন </strong><strong>(</strong><strong>ও</strong><strong>) </strong><strong>সমাজ শৃঙ্খলার দূর্গ গঠনের প্রশিক্ষণ নির্দ্দেশ এই কর্মীকে দেওয়া হইল। </strong>
<strong> </strong>
<strong>মোহর                                                                                                 বাংলাদেশ মুক্তি পরিষদের পক্ষ হইতে </strong>
<strong>স্বা</strong><strong>ক্ষর</strong><strong>………………………….</strong>
<strong>তারিখ</strong><strong>…………………………</strong>
<strong> </strong>
<strong>যুব অভ্যর্থনা ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোর নাম ও স্থান</strong><table><tbody><tr><td width=”239″>প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোর নাম</td><td width=”239″>স্থান</td></tr><tr><td width=”239″>১। ইছামতি ওয়াই/টি</td><td width=”239″>দূর্গা চৌধুরী পাড়া অঞ্চল</td></tr><tr><td width=”239″>২। একীনপুর ওয়াই/টি</td><td width=”239″>ঐ</td></tr><tr><td width=”239″>৩। বিলুনিয়া ওয়াই/টি</td><td width=”239″>বিলুনিয়া মহকুমা</td></tr><tr><td width=”239″>৪। সাবরুম ওয়াই/টি</td><td width=”239″>সাবরুম</td></tr><tr><td width=”239″>৫। সোনার বাংলা ওয়াই/টি</td><td width=”239″>হাঁপানিয়া</td></tr><tr><td width=”239″>৬। মড়াটিলা ওয়াই/টি</td><td width=”239″>ঐ</td></tr><tr><td width=”239″>৭। মাছিমা ওয়াই/টি</td><td width=”239″>সোনামুড়া মহকুমা</td></tr><tr><td width=”239″>৮। বঙ্গবন্ধু ওয়াই/টি</td><td width=”239″>হাঁপানিয়া</td></tr><tr><td width=”239″>৯। কাঁঠালিয়া ওয়াই/টি</td><td width=”239″>সোনামুড়া মহকুমা</td></tr><tr><td width=”239″>১০। বঙ্গশার্দ্দুল ওয়াই/টি</td><td width=”239″>হাঁপানিয়া</td></tr><tr><td width=”239″>১১। কৈশাশহর ওয়াই/টি</td><td width=”239″>কৈলাশপুর মহকুমা</td></tr><tr><td width=”239″>১২। রাজনগর ওয়াই/টি</td><td width=”239″>উদয়পুর মহকুমা</td></tr><tr><td width=”239″>১৩। যমুনা ওয়াই/টি</td><td width=”239″>হাঁপানিয়া</td></tr><tr><td width=”239″>১৪। বড়মুড়া ওয়াই/টি</td><td width=”239″>সোনামুড়া মহকুমা</td></tr><tr><td width=”239″>১৫। হাতীমাড়া ওয়াই/টি</td><td width=”239″>ঐ</td></tr><tr><td width=”239″>১৬। গোমতী ওয়াই/টি</td><td width=”239″>দুর্গা চৌধুরী পাড়া</td></tr><tr><td width=”239″>১৭। পালাটোনা ওয়াই/টি</td><td width=”239″>উদয়পুর মহকুমা</td></tr><tr><td width=”239″>১৮. শ্রীনগর ওয়াই/টি</td><td width=”239″>বেলুনিয়া মহকুমা</td></tr><tr><td width=”239″>১৯। শীল ছড়া ওয়াই/টি</td><td width=”239″>সাররুম মহকুমা</td></tr><tr><td width=”239″>২০। সোনাক্ষিরা ওয়াই/টি</td><td width=”239″>করীমগঞ্জ মহকুমা</td></tr><tr><td width=”239″>২১। *হারিমা ওয়াই/টি</td><td width=”239″>বেলুনিয়া মহকুমা</td></tr><tr><td width=”239″>২২। বক্সনগর ওয়াই/টি</td><td width=”239″>সোনামুড়া মহকুমা</td></tr><tr><td width=”239″>২৩। তিতাস ওয়াই/টি</td><td width=”239″>হাঁপানিয়া</td></tr><tr><td width=”239″>২৪।* বিজনা ওয়াই/টি</td><td width=”239″>ঐ</td></tr><tr><td width=”239″>২৫। ব্রক্ষপুত্র ওয়াই/টি</td><td width=”239″>ঐ</td></tr><tr><td width=”239″>২৬। গোমতী ওয়াই/টি</td><td width=”239″>ঐ</td></tr><tr><td width=”239″>২৭। *চড়াই লাল ওয়াই/টি</td><td width=”239″>উদয়পুর মহকুমা</td></tr><tr><td width=”239″>২৮। *গকুল নগর ওয়াই/টি</td><td width=”239″>সদর মহকুমা</td></tr><tr><td width=”239″>২৯। ১ নং মিলিটারি হোল্ডিং ক্যাম্প</td><td width=”239″>দুর্গা চৌধুরী পাড়া</td></tr><tr><td width=”239″>৩০। ২ নং মিলিটারি হোল্ডিং ক্যাম্প</td><td width=”239″>ঐ</td></tr><tr><td width=”239″>৩১। ৩ নং মিলিটারি হোল্ডিং ক্যাম্প</td><td width=”239″>ঐ</td></tr></tbody></table>&nbsp;
<strong>* </strong><strong>তারকা চিহ্নিত ক্যাম্পগুলোকে ২ ভাগে ভাগ করে</strong><strong>, </strong><strong>এক একটি ভাগের নামকরণ বিভিন্ন নদীর নামে করা হয়েছিল। </strong>
&nbsp;
<strong><u>যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোর সাথে সরাসরি জড়িত এম</u></strong><strong><u>,</u></strong><strong><u>পি</u></strong>
<strong><u>ও এম</u></strong><strong><u>, </u></strong><strong><u>এস</u></strong><strong><u>* , </u></strong><strong><u>এদের নাম</u></strong><table><tbody><tr><td width=”136″><strong><u> </u></strong>
<strong><u>ক্রমিক ক্যাম্পের নাম</u></strong></td><td width=”140″><strong> </strong>
<strong><u>স্থানের নাম</u></strong></td><td width=”203″><strong><u> </u></strong>
<strong><u>দায়িত্বপ্রাপ্ত এম পি এ এবং</u></strong> <strong><u>এম এন এ </u></strong><strong><u>–</u></strong><strong><u>দের </u></strong> <strong><u>নাম</u></strong></td></tr><tr><td width=”136″><strong>১</strong><strong>। </strong><strong>গোমতী</strong><strong>-</strong><strong>২ </strong></td><td width=”140″><strong>দূর্গা চৌধুরী পাড়া </strong></td><td width=”203″><strong>জনাব আমীর হোসেন</strong><strong>, </strong><strong>এম পি এ</strong></td></tr><tr><td width=”136″><strong>২</strong><strong>। </strong><strong>বিজনা</strong></td><td width=”140″><strong>ঐ</strong></td><td width=”203″><strong>জনাব সৈয়দ এমদাদুল বারী</strong><strong>, </strong><strong>এম পি এ </strong></td></tr><tr><td width=”136″><strong>৩</strong><strong>। </strong><strong>ইছামতি</strong></td><td width=”140″><strong>ঐ</strong></td><td width=”203″><strong>জনাব জামাল উদ্দিন আহমদ</strong><strong>, </strong><strong>এম পি এ </strong></td></tr><tr><td width=”136″><strong>৪</strong><strong>। </strong><strong>ব্রক্ষ্মপুত্র</strong></td><td width=”140″><strong>হাঁপানিয়া</strong></td><td width=”203″><strong>জনাব আফতাব উদ্দিন ভূঁইয়া </strong><strong>, </strong><strong>এম পি এ </strong></td></tr><tr><td width=”136″><strong>৫</strong><strong>। </strong><strong>তিতাস</strong></td><td width=”140″><strong>ঐ</strong></td><td width=”203″><strong>জনাব কাজী আকবর উদ্দিন</strong><strong>, </strong><strong>এম পি এ </strong></td></tr><tr><td width=”136″><strong>৬</strong><strong>। </strong><strong>গোমতী</strong><strong>-</strong><strong>১ </strong></td><td width=”140″><strong>ঐ</strong></td><td width=”203″><strong>জনাব আলী আজম</strong><strong>, </strong><strong>এম পি এ </strong></td></tr><tr><td width=”136″><strong>৭</strong><strong>। </strong><strong>মুনা </strong></td><td width=”140″><strong>ঐ </strong></td><td width=”203″><strong>জনাব সফীউদ্দিন </strong><strong>, </strong><strong>এম পি এ </strong></td></tr><tr><td width=”136″><strong>৮</strong><strong>। </strong><strong>সোনার বাংলা </strong></td><td width=”140″><strong>ঐ</strong></td><td width=”203″><strong>জনাব শামসুল হুদা</strong><strong>, </strong><strong>এম পি এ </strong></td></tr><tr><td width=”136″><strong>৯</strong><strong>। </strong><strong>বঙ্গ সারদুল</strong></td><td width=”140″><strong>ঐ </strong></td><td width=”203″><strong>জনাব দেওয়ান আবুল আব্বাস </strong><strong>, </strong><strong>এম </strong><strong>এন</strong><strong> এ</strong></td></tr><tr><td width=”136″><strong>১০</strong><strong>। </strong><strong>এম এ আজিজ</strong><strong>* </strong></td><td width=”140″><strong>হরি</strong><strong>ণা</strong></td><td width=”203″><strong>জনাব মির্জা আবুল মনসুর</strong><strong>, </strong><strong>এম পি এ </strong></td></tr><tr><td width=”136″><strong>১১</strong><strong>। </strong><strong>হরিনা ওয়াই</strong><strong>/</strong><strong>সি</strong></td><td width=”140″><strong>ঐ</strong></td><td width=”203″><strong>জনাব এম এ হান্নান</strong><strong>, </strong><strong>সাধারণ সম্পাদক চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামীলীগ </strong></td></tr><tr><td width=”136″><strong>১২</strong><strong>। </strong><strong>পালাটোনা</strong></td><td width=”140″><strong>উদয়পুর</strong></td><td width=”203″><strong>ক্যাপ্টেন মুহম্মদ সুজাত আলী</strong><strong>, </strong><strong>এম এন এ</strong></td></tr><tr><td width=”136″><strong>১৩</strong><strong>। </strong><strong>রাজনগর</strong></td><td width=”140″><strong>রাজনগর</strong></td><td width=”203″><strong>অধ্যাপক এ হানিফ</strong><strong>, </strong><strong>এম এন এ </strong></td></tr><tr><td width=”136″><strong>১৪</strong><strong>। </strong><strong>বড়মুড়া</strong></td><td width=”140″><strong>কাঁঠালিয়া</strong></td><td width=”203″><strong>জনাব জালাল উদ্দিন আহমদ</strong><strong>, </strong><strong>এম </strong><strong>পি</strong><strong> এ</strong></td></tr><tr><td width=”136″><strong>১৫</strong><strong>। </strong><strong>চড়ইলাম</strong><strong>-</strong><strong>১ </strong></td><td width=”140″><strong>চড়ইলাম</strong></td><td width=”203″><strong>জনাব সাখাওয়াত উল্লাহ</strong><strong>, </strong><strong>এম পি এ</strong></td></tr><tr><td width=”136″><strong>১৬</strong><strong>।</strong> <strong>চড়ইলাম</strong><strong>-</strong><strong>২</strong></td><td width=”140″><strong>ঐ</strong></td><td width=”203″><strong>জনাব ওয়ালি উল্লাহ নওজোয়ান</strong><strong>, </strong><strong>এম এন এ</strong></td></tr><tr><td width=”136″><strong>১৭</strong><strong>। </strong><strong>পদ্মা</strong></td><td width=”140″><strong>গকুল নগর</strong></td><td width=”203″><strong>জনাব এস হক</strong><strong>, </strong><strong>এম পি এ </strong></td></tr><tr><td width=”136″><strong>১৮</strong><strong>। </strong><strong>কৈলাশহর</strong></td><td width=”140″><strong>কৈলাশহর</strong></td><td width=”203″><strong>জনাব তৈবুর রহীম</strong><strong>, </strong><strong>এম পি এ</strong></td></tr><tr><td width=”136″><strong>১৯</strong><strong>। </strong><strong>আশারাম্বাড়ি</strong></td><td width=”140″><strong>খোয়াই </strong></td><td width=”203″><strong>জনাব মোস্তাফা শহিদ</strong><strong>, </strong><strong>এম পি এ</strong></td></tr><tr><td width=”136″><strong>২০</strong><strong>। </strong><strong>ধর্মনগর</strong></td><td width=”140″><strong>ধর্মনগর</strong></td><td width=”203″><strong>জনাব তাইমুজ আলী</strong><strong>, </strong><strong>এম পি এ</strong></td></tr><tr><td width=”136″><strong>২১</strong><strong>। </strong><strong>এম এ আজিজ ওয়াই</strong><strong>/</strong><strong>সি</strong><strong>-</strong><strong>২</strong></td><td width=”140″><strong>হরিণা</strong></td><td width=”203″><strong>জনাব মোশাররফ হোসেন</strong><strong>, </strong><strong>এম পি এ এ </strong></td></tr><tr><td width=”136″><strong>২২</strong><strong>। </strong><strong>চোতাখোলা </strong></td><td width=”140″><strong>বিলোনিয়া</strong></td><td width=”203″><strong>জনাব</strong><strong> এ বি এম তালেব আলী এম</strong><strong>, </strong><strong>পি</strong><strong>,</strong><strong>এ</strong>
<strong> </strong></td></tr><tr><td width=”136″><strong>২৩</strong><strong>। </strong><strong>মিলিটারী হোল্ড</strong><strong>িং</strong><strong> ক্যাম্প</strong></td><td width=”140″><strong>ডি সি পাড়া</strong></td><td width=”203″><strong>জনাব সিরাজুল ইসলাম</strong><strong>, </strong><strong>এম</strong><strong>, </strong><strong>পি</strong><strong>, </strong><strong>এ</strong>
<strong>জনাব রফিক উল্লাহ</strong><strong>, </strong><strong>এম পি এ</strong></td></tr><tr><td width=”136″><strong>২৪</strong><strong>। </strong><strong>কাঁঠালিয়া</strong></td><td width=”140″><strong>কাঁঠালিয়া</strong></td><td width=”203″><strong>জনাব আলহাজ আলী আকবর</strong><strong>, </strong><strong>এম পি এ </strong></td></tr><tr><td width=”136″><strong>২৫</strong><strong>। </strong><strong>একীনপুর</strong></td><td width=”140″><strong>একীনপুর</strong></td><td width=”203″><strong>জনাব মোঃ আঃ সোবহান</strong><strong>, </strong><strong>এম পি এ</strong></td></tr><tr><td width=”136″><strong>২৬</strong><strong>। </strong><strong>পালাটোনা</strong><strong>-</strong><strong>২</strong></td><td width=”140″><strong>উদয়পুর</strong></td><td width=”203″><strong>জনাব আবদুল্লা আল হারুন</strong><strong>, </strong><strong>এম পি এ</strong></td></tr><tr><td width=”136″><strong>২৭</strong><strong>। </strong><strong>মনু</strong></td><td width=”140″><strong>খোয়াই</strong></td><td width=”203″><strong>জনাব মোঃ ইলিয়াস</strong><strong>, </strong><strong>এম পি এ</strong></td></tr><tr><td width=”136″><strong>২৮</strong><strong>। </strong><strong>বাগাফা</strong></td><td width=”140″><strong>বিলোনিয়া</strong></td><td width=”203″><strong>জনাব আবু নাসের চৌধুরী</strong><strong>, </strong><strong>এম পি এ </strong></td></tr></tbody></table><strong> </strong>
<strong>* </strong><strong>তারকা চিহ্নিত ক্যাম্পগুলোকে ২ ভাগে ভাগ করে</strong><strong>, </strong><strong>এক একটি ভাগের নামকরণ বিভিন্ন নদীর নামে করা হয়েছিল। </strong>
<strong> </strong>
<strong><u>প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোতে ব্যবহৃত </u></strong><strong><u>‘</u></strong><strong><u>ছদ্ম নামে</u></strong><strong><u>’</u></strong><strong><u>র তালিকাঃ</u></strong>
স্বাধীনতা যুদ্ধাকালে, বিশেষত অক্টোবর মাসের মাঝামাঝি সময়ে, এই যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোর মধ্যে কয়েকটির নাম, অবস্থান, কর্মতৎপরতা এবং আনুষঙ্গিক ঘটনাবলীর খবরাখবর কিছুটা শত্রুপক্ষের গোচরীভূত হয়ে পড়ে। ফলে কিছু সংখ্যক যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্রকে ‘ছদ্মনাম’ ধারণ করতে হয়। নিম্নে যে সব যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোকে ‘ছদ্মনাম’ ধারণ করতে হয়েছিল, সেগুলোর নাম উল্লেখ করা হলঃ
&nbsp;<table><tbody><tr><td width=”91″>ক্রমিক</td><td width=”149″>পুরাতন নাম</td><td width=”120″>স্থান</td><td width=”120″>নতুন নাম</td></tr><tr><td width=”91″>১।</td><td width=”149″>পদ্মা</td><td width=”120″>চড়ইলাম</td><td width=”120″>ক্রিকেট</td></tr><tr><td width=”91″>২।</td><td width=”149″>মেঘনা</td><td width=”120″>ঐ</td><td width=”120″>গলফ</td></tr><tr><td width=”91″>৩।</td><td width=”149″>গঙ্গা</td><td width=”120″>গকুল নগর</td><td width=”120″>টেনিস</td></tr><tr><td width=”91″>৪।</td><td width=”149″>যমুনা</td><td width=”120″>ঐ</td><td width=”120″>হকি</td></tr><tr><td width=”91″>৫।</td><td width=”149″>মুহুড়ী</td><td width=”120″>হরিণা</td><td width=”120″>ফুটবল</td></tr><tr><td width=”91″>৬।</td><td width=”149″>তিস্তা</td><td width=”120″>বিজনা</td><td width=”120″>পলো</td></tr><tr><td width=”91″>৭।</td><td width=”149″>কল্যাণপুর</td><td width=”120″>খোয়াই</td><td width=”120″>সুইমিং</td></tr></tbody></table>*বিশেষ প্রয়োজনে ক্যাম্পগুলোর ‘ছদ্ম নাম’ বাংলাদেশের বিভিন্ন নদনদীর নামানুসারে রাখা হয়েছিল।
*মরহুম জনাব এম, এ আজিজ চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগের একজন জনপ্রিয় নেতা ছিলেন। সুতরাং যুদ্ধের সময় তাঁর নাম অনুসারে দু’টি যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের নামকরণ করা হয়েছিল।
&nbsp;
<u>যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোর সাথে ভারতীয় সেনাবাহিনীর যেসব</u>
<u>কর্মকর্তা সরাসরিভাবে জড়িত ছিলেন তাঁদের নামঃ</u>
&nbsp;
ব্রিগেডিয়ার মাস্টার-সার্বিক তত্ত্বাবধান এবং সহযোগিতা; ব্রিগেডিয়ার সাবেক সিং- সার্বিক তত্ত্বাবধান এবং সহযোগিতা; মেজর সুব্রামননিয়াম- সহকারী পরিচালক, সেন্ট্রাল রিলিফ; ক্যাপ্টেন বিভুরঞ্জন চ্যাটার্জী- চড়াইলাম যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র; মেজর মিত্র- তত্ত্বাবধায়ক; ক্যাপ্টেন ডি পি ধর- কল্যাণপুর যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র; ক্যাপ্টেন আর পি সিং – গকুল নগর যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র; ক্যাপ্টেন এস কে শর্মা- চড়ইলাম যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র; ক্যাপ্টেন ডি এস মঈনী- বাগাফা যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র; ক্যাপ্টেন জি এস রাওয়াত – গকুল নগর যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র; ক্যাপ্টেন নাগ- চোতাখোলা যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র।
&nbsp;
<strong><u>যুব</u></strong> <strong><u>প্রশিক্ষণ</u></strong> <strong><u>কেন্দ্রের</u></strong> <strong><u>সাথে</u></strong> <strong><u>জড়িত</u></strong> <strong><u>ভারত</u></strong> <strong><u>সরকারের</u></strong>
<strong><u>বেসামরিক</u></strong> <strong><u>প্রতিনিধিদের</u></strong> <strong><u>নামঃ</u></strong>
&nbsp;
ড. শ্রী ত্রিগুনা সেন, শিক্ষামন্ত্রী (ভারত); শ্রী সচীন্দ্রলাল সিং, মুখ্যমন্ত্রী (ত্রিপুরা রাজ্য); শ্রী কে পি দত্ত, পরিচালক, শিক্ষা দপ্তর, (ত্রিপুরা রাজ্য); শ্রী মনুভাই বিমানী, বাংলাদেশ এসিস্টেন্স কমিটি (ভারত)।
&nbsp;
প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোতে একসাথে সাধারণত পাঁচশত থেকে আড়াই হাজার পর্যন্ত যুবককে প্রশিক্ষণ দেবার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এই সময় বিভিন্ন অসুবিধা থাকা সত্ত্বেও সর্বমোট প্রায় এক লক্ষ যুবককে প্রাথমিক ভাবে প্রশিক্ষণ দেবার জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছিল। কিন্তু এদের মধ্যে মাত্র পঞ্চাশ হাজার যুবকদেওরকে প্রয়োজনীয় সময়। অর্থ, সম্পদ ও উপকরণের অভাবে প্রশিক্ষণ দেয়া সম্ভব হয় নি।
&nbsp;
<strong><u>যুব</u></strong> <strong><u>প্রশিক্ষণ</u></strong> <strong><u>কেন্দ্রের</u></strong> <strong><u>সাথে</u></strong> <strong><u>জড়িত</u></strong> <strong><u>বাংলাদেশের</u></strong> <strong><u>সামরিক</u></strong>
<strong><u>কর্মকর্তাদের</u></strong> <strong><u>নামঃ</u></strong>
&nbsp;
ক্যাপ্টেন রফিকুল ইসলাম ইসলাম – ১নং সেক্টর; ক্যাপ্টেন জাফর ইমাম- ১নং সেক্টর; মেজর আবদুল মতিন- ১নং সেক্টর; মেজর খালেদ মোশাররফ- ২নং সেক্টর; মেজর সফিউল্লাহ- ৩নং সেক্টর; ক্যাপ্টেন নুরুজ্জামান-৩নং সেক্টর; মেজর সি আর দত্ত-৪ নং সেক্টর।
&nbsp;
<strong><u>প্রশিক্ষণ</u></strong> <strong><u>কেন্দ্রগুলোর</u></strong> <strong><u>সাথে</u></strong> <strong><u>জড়িত</u></strong> <strong><u>ছাত্র</u></strong> <strong><u>ও</u></strong> <strong><u>যুব</u></strong> <strong><u>নেতৃবৃন্দঃ</u></strong><strong><u>*</u></strong>
&nbsp;
জনাব আ স ম আবদুর রব, প্রাক্তন সহ –সভাপতি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, কেন্দ্রীয় ছাত্র ইউনিয়ন, জনাব শেখ ফজলিল হক মনি, তৎকালীন যুব নেতা; জনাব আবদুল কুদ্দুস মাখন, প্রাক্তন যুব ও ছাত্র নেতা; জনাব নূরে আলম সিদ্দিকী, প্রাক্তন যুব ও ছাত্র নেতা; জনাব সৈয়দ রোজউর রহমান, ছাত্র নেতা, কুমিল্লা, জনাব মাইনুল হুদা, ছাত্র নেতা, কুমিল্লা, শহীদ স্বপন কুমার চৌধুরী, যুব ও ছাত্র নেতা; জনাব মোস্তাফিজুর রহমান, ছাত্র নেতা, নোয়াখালী।
&nbsp;
*এখানে উল্লিখিত বাংলাদেশী সামরিক কর্মকর্তাগণ ব্যতীত আরও যে সব সামরিক অফিসার যুব-প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোর সাথে জড়িত ছিলেন, তাঁদের নামের তালিকা বিবরণ দাতাদের কাছে না থাকার দরুণ এখানে উল্লেখ করতে পারেন নি বলে তিনি দুঃখ প্রকাশ করেছেন।
&nbsp;
<u>যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোর সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে</u>
<u>জড়িত বাংলাদেশের ব্যক্তিবর্গের নামঃ</u>
&nbsp;
জনাব জহুর আহমদ চৌধুরী, এম এন এ ( চট্টগ্রাম), অধ্যাপক নুরুল ইসলাম, এম এন এ (চট্টগ্রাম), অধ্যাপক ইউসুফ আলী, এম এন এ (দিনাজপুর), প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোর পরিচালক মণ্ডলীর সভাপতি; অধ্যাপক খোরশেদ আলম, এম এন এস (কুমিল্লা), অধ্যক্ষ আবুল কালাম মজুমদার, এম এন এ (কুমিল্লা); জনাব এহমদ আলী, এম এন এ (নোয়াখালী), জনাব নুরুল হক, এম এন এ (নোয়াখালী) জনাব খালেদ মোহাম্মদ আলী, এম এন এ ( নোয়াখলী), জনাব লুৎফুন হাই সাচ্চু, এম এন এ ( ব্রাক্ষ্ণণবাড়ীয়া), জনাব আলী আজম, এম এন এ ( ব্রাক্ষণবাড়ীয়া), জনাব মুহাম্মদ রাজা মিয়া, এম পি এ ( কুমিল্লা), জনাম মোঃ আবদুল আউয়াল, এম এন এ (কুমিল্লা) , জনাব হাজী আবুল হাসেম এম পি এ (কুমিল্লা), জনাব আবদুর রউফ, রাজনৈতিক নেতা (কুমিল্লা), জনাব মুহাম্মদ আফজাল খান, রাজনৈতিক নেতা,(কুমিল্লা),জনাব কাজী জহিরুল কাইয়ুম, এম এন এ (কুমিল্লা), ফ্লাইট লেফটেনান্ট এ বি সিদ্দিকী, এম পি এ (কুমিল্লা), জনাব খাজা আহমদ, এম এন এস (নোয়াখালী), জনাব আবদুল মালেক উকিল, এম এন এ (নোয়াখালী), জনাব আবদুল করিম বেপারী (মুন্সিগঞ্জ), এডভোকেট হামিদুর রহমান, রাজনৈতিক নেতা (ব্রাহ্মণবাড়ীয়া); কর্ণেল আবদুর রব, জনাব এইচ টি ইমাম, প্রাক্তন জেলা প্রশাসক, রাঙ্গামাটি, জনাব রকিব উদ্দীন আহমদ, প্রাক্তন এস ডি ও (ব্রাহ্মণবাড়ীয়া), জনাব এম আর সিদ্দিকী, এম এন এ (চট্টগ্রাম); জনাব সাইদুর রহমান, সমাজকর্মী,(কুমিল্লা), জনাব আবু মিয়া, সমাজকর্মী, নেপোরমা, কুমিল্লা, শ্রী রাখাল ভট্টাচার্য, সরকারী কর্মচারী, বাংলাদেশ সরকার, ডা. আবদুছ ছাত্তার এম পি এ, জনাব জাবেল আলী মোক্তার (চাঁদপুর), জনাব মকবুল আহমদ এডভোকেট (চাঁদপুর); জনাব মীর হোসেন চৌধুরী (কুমিল্লা); জনাব আমীর হোসেন এম পি এ (কুমিল্লা), জনাব বিসমিল্লাহ মিয়া, এম পি এ (নোয়াখালী), জনাব শহীদ উদ্দিন ইস্কান্দার এম পি এ (নোয়াখালী), জনাব জালাল আহামদ, এম পি এ (কুমিল্লা), অধ্যাপক মুহাম্মদ খালেদ, এম পি এ (চট্টগ্রাম), ক্যাপ্টেন আবুল কাসেম, এম পি এ (চট্টগ্রাম), জনাব মীর্জা আবুল মনসুর, এম পি এ (চট্টগ্রাম) , জনাব আবদুর রশিদ ইঞ্জিনিয়ার এ পি এ; ড. এ কে হাসান, আঞ্চলিক প্রশাসক, মুজিব নগর, জনাব মোশারফ হোসেন চৌধুরী, উপ-পরিচালক (একাউন্টস); জনাব গোলাম রফিক, (শিল্পী), জনাব শহীদ কাদরী, প্রোগ্রাম অফিসার, যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, জনাব আলোয়ার হোসেন স্তাফ অফিসার, যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, জনাব মুকতুল হোসেন, পিয়ন, যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, জনাব শাহাব উদ্দিন, ড্রাইভার, যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, জনাব আজিত কুমার নন্দি, হিসাব রক্ষক, যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, জনাব সঞ্জীব কুমার রায়, স্টেনোগ্রাফার, যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, জনাব গাজী গোলাম মোস্তাফা, রাজনৈতিক নেতা, শ্রী সুখলাল সাহা ( পলিটিক্যাল মটিভেটর) , জনাব আজিজুল হক, সমাজ কর্মী (কসবা), জনাব অহীদ মিয়া, ড্রাইভার, অধ্যাপক আবু আহমদ (ব্রাহ্মণবাড়ীয়া), জনাব কুতুবুর রহমান, ছাত্র নেতা।
&nbsp;
আমাদের দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ বিভিন্ন কারণে সম্পূর্ণভাবে নিজেদের মাটিতে থেকে আরম্ভ করা সমাপ্ত করা সম্ভব হয়নি। স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় আমাদের যুদ্ধের প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহেরও অত্যন্ত অভাব ছিল। এতদসত্ত্বেও বীর বাঙালীরা এবং তাঁদের অকুতোভয় সন্তানেরা বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে সামান্য কয়েকদিনের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে দেশের আপামর জনসাধারণের সক্রিয় সহযোগিতা ও প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় যেভাবে রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম করেছে তা নিঃসন্দেহে পৃথিবীর ইতিহাসে এক অনন্য সাধারণ ঘটনা। সুতরাং বাঙালি জাতির ত্যাগ, তিতিক্ষা ও শ্রমের তাৎপর্যকে বেঁচে থাকা দেশের অবশিষ্ট মানুষগুলো গভীরভাবে উপলদ্ধি করুক, ইহাই বোধ হয় শহীদানের আত্মার একমাত্র আকুতি।
&nbsp;
-দেবব্রত দত্ত গুপ্ত
অক্টোবর,১৯৮২
&nbsp;
<a href=”https://www.facebook.com/ibrahim.razu”>ইব্রাহিম রাজু</a> এবং <a href=”https://www.facebook.com/alimul.faisal?fref=ts”>আলিমুল ফয়সাল</a>
&lt;১৫,২৩,২১৩-২২২&gt;<h1>[মণি সিংহ]</h1>নির্বাচন অনুষ্ঠানের পর থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত আমি কারাগার বন্দী ছিলাম। দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থেকে কাজ করার পর ১৯৬৭ সালে আমি গ্রেপ্তার হই এবং ১৯৬৯ সালের মহান গণঅভ্যুত্থানের সময় জনগণ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, আমার এবং রাজবন্দীদের মুক্তির দাবি দেশের আনাচে-কানাচে ধ্বনিত করে তোলে, সেই পটভূমিতে ফেব্রুয়ারী মাসে আমরা মুক্তি পাই।
&nbsp;
কিন্তু সামরিক শাসন জারি ও ইয়াহিয়া খান ক্ষমতায় আসার পর ১৯৬৯ সালের জুলাই মাসে আমাকে আবার গ্রেপ্তার করা হয়। ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চের পর বন্দীরা রাজশাহী জেল ভেঙ্গে আমাকে বের করে নেয়ার আগ পর্যন্ত আমি আটক ছিলাম। কাজেই উল্লিখিত সময়ে আমি ব্যক্তিগতভাবে পার্টি ও জনগনের রাজনৈতিক সংগ্রামে সরাসরি যোগ দিতে পারিনি। তবে আমাদের পার্টির তখনকার ভূমিকা আমার জানা আছে, সেটা সংক্ষেপে বলছি।
&nbsp;
১৯৭০ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনের ফলাফলের বিশ্লেষণ ও পরিস্থিতির মূল্যায়ন আমাদের পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির পক্ষ থেকে বের করা হয়। আমরা নির্বাচনের ফলাফলকে পূর্ব বাংলার জনগণের ঐক্যবদ্ধ অভ্যুত্থান এবং একটি আকাঙ্খার বহিঃপ্রকাশরুপে দেখি। আমাদের বিশ্লেষণে বলা হয়েছিল যে নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ৬-দফার পক্ষে রায়ের মধ্য দিয়ে বাঙালী জাতীয়তাবাদী চেতনা আরও বিকাশ লাভ করেছে এবং বাঙালি জাতির আত্ননিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠানকে নায্য মনে করে এবং প্রকৃতপক্ষে আমাদের পার্টিই প্রথম বাংলাদেশের জনগণের পূর্ণ আত্ননিয়ন্ত্রণের দাবি ধ্বনিত করে।
&nbsp;
নির্বাচনের ফলাফল মূল্যায়ন করে আমরা আরও দেখছিলাম যে আওয়ামীলীগ কেবল “পূর্ব পাকিস্তানের ” জনগণেরই সর্বাত্নক সমর্থন পায় নি, তৎকালীন পাকিস্তানের জাতীয় সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে গোটা পাকিস্তানের সরকার গঠনের অধিকারও লাভ করেছে। কিন্তু আমরা মূল্যায়নে বলেছিলাম যে পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী ও প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিগুলি এবং এই শাসকদের মদদকারী সাম্রাজ্যবাদ কিছুতেই নির্বাচনের ফলাফল মেনে নেবে না এবং তা বানচাল করার জন্য ষড়যন্ত্র করবে। বিশেষত ৬-দফার সঙ্গে ছাত্র সমাজের ১১-দফাও তখন জনগণের মধ্যে জনপ্রিয় ছিল এবং বিজয়ী দলের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১১-দফাকে সমর্থন দিয়েছিলেন। ১১-দফায় সাম্রাজ্যবাদ ও একচেটিয়া পূঁজির স্বার্থের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলা হয়েছিল, ফলে তাঁর ঐ নির্বাচনের দাবি কিছুতেই মানতে পারে না। এ-কারনে পাকিস্তানে আওয়ামী লীগের সরকার গঠন ছিল অনিশ্চিত এবং এমতাবস্থায় বাংলাদেশ স্বাধীনতা সংগ্রামের দিকেই অগ্রসর হবে এবং সে সংগ্রামের জন্য জনগণকে প্রস্তুত করা দরকার।
&nbsp;
১৯৭০ সালের নির্বাচন সম্পর্কে আমাদের পার্টর এই বিশ্লেষণ পরবর্তী ঘটনাবলী সঠিক বলেই প্রমাণিত হয়। ‘৭১ সালের ফেব্রুয়ারী মাস নাগাদ নির্বাচনের ফলাফল বানচালের জন্য পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী এবং ভুট্টো প্রমুখের ষড়যন্ত্র পরিষ্কার হয়ে উঠে এবং জাতীয় সংসদের যে অধিবেশন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের ঘোষনা অনুযায়ী ৩রা মার্চ হওয়ার কথা ছিল তা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। ঐ সময় ২৫ শে ফেব্রুয়ারী আমাদের পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি এক প্রস্তাবে রাজনৈতিক দাবী হিসেবে ঘোষনা মোতাবেক জাতীয় সংসদের অধিবেশন, সেখানে জাতিসমূহের আত্ননিয়ন্ত্রণের অধিকারের স্বীকৃতিসম্বলিত শাসনতন্ত্র প্রনয়ন এবং প্রেসিডেন্ট কর্তৃক ঐ শাসনতন্ত্র অনুমোদন ও ক্ষমতা হস্তান্তর করার দাবী উত্থাপন করে। সে সঙ্গে ঐ প্রস্তাবে বলা হয় যে, নির্বাচনের রায়কে কার্যকরী করতে না দেয়া হলে বাংলাদেশের জনগনের আন্দোলন একটি পৃথক রাষ্ট্র গঠনের দিকে যেতে পারে। এ পরিস্থিতিতে আমাদের কর্তব্য হবে বাঙালিদের জাতীয় আত্মনিয়ন্ত্রনের নীটি অনুসারে ঐ সংগ্রামে শরিক থাকা এবং ঐ নিতি অনুসারে সমস্ত গনতান্ত্রিক এবং প্রগতিশীল শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করে এই সংগ্রামকে সঠিক পথে চালিত করতে চেষ্টা করা।
&nbsp;
১লা মার্চ ইয়াহিয়া খান কর্তৃক জাতীয় সংসদের অধিবেশন হবে না – এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে আমরা শাসকগোষ্ঠীর ষড়যন্ত্র কার্যকর হতে দেখলাম। ঐ দিন জনগন স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাস্তায় নেমে স্বাধীনতার আওয়াজ তুলল। পরিস্থিতি সম্পর্কে আমাদের মূল্যায়ন ছিল যে পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী বাঙালী জাতির এই অভ্যুত্থান দমন করার জন্য সর্বাত্নক শক্তি প্রয়োগ করবে এবং স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র সংগ্রামের প্রয়োজন হবে। সে জন্য জনগণকে প্রস্তুত করা দরকার।
&nbsp;
আমাদের পার্টি বেআইনী এবং আত্নগোপনে ছিল। ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক প্রভৃতি গণসংগঠনের মাধ্যমে এবং অন্যান্য গনতান্ত্রিক শক্তির সঙ্গে আমাদের যতটুকু যোগাযোগ এবং সম্পর্ক ছিল তা কাজে লাগিয়ে আমরা আমাদের মূল্যায়নের ভিত্তিতে প্রচারকার্য চালিয়েছি। পার্টির নামোল্লেখ না করে আমরা ‘ একতা ‘ নামে যে সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশের সুযোগ গ্রহণ করেছিলাম তার মাধ্যমেও আমরা দেশপ্রেমিক শক্তি ও জনগণকে প্রস্তুত করার জন্য প্রচার চালিয়েছি। প্রকৃতপক্ষে উল্লিখিত সময়ের মধ্যে আমরা সম্ভাব্য স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য সাধ্যমতো আমাদের পার্টি ও জনগণকে প্রস্তুত করে তুলেছিলাম।
&nbsp;
১লা মার্চের পর ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধু রেসকোর্স এর জনসমাবেশ থেকে “এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতা ও মুক্তির সংগ্রাম ” বলে ঘোষণা দিয়ে যে অসহযোগ আন্দোলনের সূচনা করেন, আমরা তার পুরোপুরি সমর্থক ছিলাম। ইয়াহিয়া খান যখন ঢাকায় বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলোচনায় বসেন, তখন আলোচনার বিরোধীতা করাকে আমরা যুক্তিসংগত মনে করি নি, কিন্তু আমাদের পার্টির মূল্যায়ন ছিল যে ঐ আলোচনায় কোন অপসরফা হবে না কেননা জনগণ স্বাধীনতার আকাঙ্খা ব্যক্ত করেছে এবং পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী এবং সাম্রাজ্যবাদীরা এটা মেনে নিতে পারে না। আমাদের পার্টি তখন জনগণের সচেতনতা জাগরূক রাখার জন্য এবং আসন্ন যেকোন ধরনের সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার জন্য জনগণকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করতে ঢাকাসহ সম্ভব মতো দেশের সব জায়গায় স্বেছাসেবক বাহিনী গঠন, তাদের কুচকাওয়াজ ও ট্রেনিং ইত্যাদির ব্যবস্থা করি। তখন ছাত্রসমাজের শক্তিশালী প্রগতিশীল সংগঠন ” পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন “-এ আমাদের পার্টির প্রভাব থাকায় তাদের মাধ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ’ইউ ও টি সি’র- সহায়তায় তরুণ-তরুণীদের রাইফেল ট্রেনিং এবং কুচকাওয়াজের আয়োজন করা হয়েছিল। ডেমরা এলাকার কিছুসংখ্যক শ্রমিককেও আমরা স্বেচ্ছাসেবক করে এ-ধরনের ট্রেনিং-এ যুক্ত করেছিলাম। এ-সব কার্যক্রমের উদ্দেশ্য ছিল জনগণকে দেখিয়ে উদ্ধুদ্ধ ও তাদের মনোবল বৃদ্ধি করা এবং সশস্ত্র সংগ্রাম সম্পর্কে মানসিকভাবে সচেতন ও প্রস্তুত করে তোলা। এক কথায় ঐ সময়টাতে আমাদের পার্টির ভূমিকা ছিল অবশ্যম্ভাবী স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য সাধ্যমতো সকল দেশপ্রেমিক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ, জনগণকে সচেতন ও প্রস্তুত করে তোলা। এক কথায়, ঐ সময়টাতে আমাদের পার্টির ভূমিকা ছিল অবশ্যম্ভাবী স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য সাধ্যমতো সকল দেশপ্রেমিক শিক্তিকে ঐক্যবদ্ধ, জনগণকে সচেতন ও প্রস্তুত করে তোলা।
&nbsp;
আমাদের পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি ২৫শে মার্চের আগেই বুঝতে পেরেছিল যে অবস্থা ক্রমেই সশস্ত্র সংগ্রামের দিকে অগ্রসর হয়ে যাচ্ছে। উল্লেখ করা যায় যে, ৯ই মার্চ ঢাকায় উপস্থিত কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যদের এক বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সশস্ত্র সংগ্রামের যথাসম্ভব প্রস্তুতির জন্য একটি সার্কুলার প্রচার করা হয়েছিল। তবে তখনকার পরিস্থিতিতে কোনো কোনো জেলায় সার্কুলারটি বিলম্বে পৌঁছে এবং পার্টির তখনকার শক্তিসামর্থ্য সশস্ত্র সংগ্রামের ব্যাপক প্রস্তুতির উপযুক্ত ও ছিল না। সে পরিস্থিতিতে ২৫ শে মার্চ জনগণের বিরুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর সশস্ত্র আক্রমণ শুরু হয়।
&nbsp;
সামগ্রিক অবস্থা সম্পর্কে আমাদের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ছিল এই যে, জনগণ জাতীয় আত্মনিয়ন্ত্রণের আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছে এবং বিশেষত সমগ্র পাকিস্তানে আওয়ামী লীগের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন, পশ্চিম-পাকিস্তানে ভুট্টোর দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন এবং বাঙালিদের জাতীয় অধিকারের দাবির সঙ্গে ১১-দফায় সাম্রাজ্যবাদ-সামন্তবাদ-একচেটিয়া পুঁজিবিরোধী আকাঙ্ক্ষা ব্যক্তি হওয়ায় পাকিস্তানে একটা সরকার গঠন এবং বাঙালিদের দ্বারা শাসিত হওয়ার অবস্থা পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ও সাম্রাজ্যবাদ কিছুতেই মেনে নেবে না। কাজেই বাঙালিদের স্বাধীনতা সংগ্রাম অনিবার্য এবং তা সশস্ত্র সংগ্রামের পথে যাবে। সে জন্য জনগণকে ঐক্যবদ্ধ ও প্রস্তুত করাই মুখ্য কাজ এবং তা খুব দ্রুত করতে হবে।
&nbsp;
সামগ্রিক অবস্থা মূল্যায়নের আরও একটা দিক আমাদের পার্টির ছিল। তা হচ্ছেঃ আমরা সচেতন ছিলাম যে আমাদের জাতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের কতগুলি দুর্বলতা থাকবে। মধ্যস্তরের জনগণের যে দল আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ঐ স্বাধীনতা সংগ্রামের সূচনা হয়েছিল তাঁদের মধ্যে আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্যবাদের চরিত্র ও তার বিরুদ্ধে আপোসহীন সংগ্রামের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে চেতনার ঘাটতি ছিল এবং শ্রমিক-কৃষক মেহনতী মানুষের সংগঠন শক্তি ছিল দুর্বল। বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে আওয়ামী লীগের সমর্থনে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল আমরা অনিবার্য ঘটনা-ধারায় পিছনে না থেকে সর্বশক্তি দিয়ে সংগ্রামে অংশগ্রহণের মাধ্যমে সংগ্রামের গতিধারায় অন্যান্য দেশপ্রেমিক শক্তি ও জনগণের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তাদের সচেতন হয়ে উঠার প্রক্রিয়ায় ঐ দুর্বলতাগুলো কাটানো প্রয়োজন বলেই তখন সিদ্ধান্ত করেছিলাম। তাছাড়া স্বাধীনতা সংগ্রামে জয়লাভের জন্য জাতীয় ঐক্য এবং জাতীয় মুক্তির সমর্থক আন্তর্জাতিক শক্তিসমূহের সমর্থন সংগঠিত করার প্রয়োজনীয়তাও আমরা উপলব্ধি করেছিলাম। উল্লেখ্য যে, ২৫ শে মার্চের আগেই ঢাকায় উপস্থিত কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব সিদ্ধান্ত নিয়ে বিভিন্ন দেশে পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে পত্র পাঠায়।
&nbsp;
স্বেচ্ছাসেবকদের সংগঠিত করাও প্রচার চালানোর মাধ্যমে প্রতিরোধের শক্তিগুলোকে প্রস্তুত করার চেষ্টার কথা আগেই বলেছি। ২৫ শে মার্চ পাকবাহিনীর সশস্ত্র আক্রমন শুরু হলে আমাদের পার্টির ছাত্র-যুবক-শ্রমিক-স্বেচ্ছাসেবকরা যেখানে যতটুকু সম্ভব হয়েছে আওয়ামী লীগ ও ন্যাপ প্রভৃতি দেশপ্রেমিক শক্তির সঙ্গে মিলিতভাবে প্রতিরোধরত বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও ইপিআর বাহিনীর সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে।
&nbsp;
এপ্রিলের মাঝামাঝি নাগাদ এই প্রাথমিক প্রতিরোধ ভেঙ্গে পড়লে প্রথমে শহর থেকে গ্রামে এবং পরে বাধ্য হয়ে আমাদের কর্মীরা ভারতে চলে যায়। তাঁরা আমাদের পার্টি ও গণসংগঠনের সমর্থক ও ইচ্ছুক তরুণদেরও সংগঠিত করে মুক্তিবাহিনীর ট্রেনিং -এর জন্য ভারত যেতে থাকেন। অনেক বিপন্ন পরিবারও ভারতে গিয়ে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়।
&nbsp;
সীমান্ত অতিক্রম করার প্রাক্কালে আমি রাজশাহী জেলে বন্দী ছিলাম। বাইরে সমগ্র জাতি যে মুক্তির জন্য উদ্বেল হয়ে উঠেছে তা বুঝতে পারলাম। বুঝতে পারতাম সামনে অপেক্ষা করছে এক নিদারুণ রক্তাক্ত সংগ্রাম। রাজশাহী শহরেই ইপিআর এর ক্যাম্প ছিল। পাকবাহিনীর ক্যাম্প ও ছিল। ২৫ শে মার্চ পাক বাহিনী ইপিআর ক্যাম্প আক্রমণ করে। ই পি আর প্রতিরোধ করে। আমি গোলাগুলির আওয়াজ শুনি এবং কিছু কিছু গোলাগুলি জেলখানার কাছে এসে পড়তে থাকে। ফলে বন্দীদের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়। গোলাগুলির মাঝে পড়ে বন্দী অবস্থায় মৃত্যু ঘটতে পারে। অন্য সকল এসে আমাকে বলে যে আপনি ডি আই জি -কে বলুন জেলের গেয় খুলে সকলকে মুক্তি দিতে। ডি আই জি বললাম, কিন্তু তিনি রাজি হন না। তখন বন্দীরা সিদ্ধান্ত নেয় জেল ভেঙ্গে বের হবে। বাইরে জনতাও জেল ভাঙ্গা সমর্থন করে। বন্দী ও জনতা মিলে জেলের ময়লা ফেলার দরজা ভেঙ্গে ফেলে। আমরা বের হয়ে আসি। আমার সঙ্গে আরও কয়েকজন রাজনৈতিক বন্দী ছিলেন। জনতাই আমাদের পদ্মা নদীর ধারে নিয়ে গিয়ে নৌকায় উঠিয়ে দেয় এবং বলে যে, শহরে থাকা আপনাদের জন্য নিরাপদ নয়, আপনারা নদীর ওপারে চলে যান। নৌকাযোগে নদী পার হয়ে বুঝতে পারি যে, আমরা ভারতের মাটিতে পা দিয়েছি। কারন পদ্মার ওপারেই ভারত।
&nbsp;
এই সময়ে জেলের ভেতরের বিচিত্র কোনো অভিজ্ঞতা নেই। কিন্তু মার্চ মাসের একটি অসাধারন ঘটনা ছিল। ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধু রেসকোর্সে ‘স্বাধীনতার সংগ্রাম’ বলে ডাক দেয়ার পরে ঐ ভাষণ ও ঘোষণার জন্য আমি বঙ্গবন্ধুকে অভিনন্দন ও সমর্থন জানিয়ে রাজশাহী জেল থেকে একটি টেলিগ্রাম করতে চাই। জেল কর্তৃপক্ষ বলেন যে, “আপনি তো টেলিগ্রাম করতে পারবেন না, কারন আপনি ডেটিনিউ। আপনার টেলিগ্রাম পাঠাতে পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের অনুমোদন লাগবে। ” আমি বললাম, ” তবে অনুমোদন নিয়ে আসুন।” তাঁরা বলল যে, ” এখন অনুমোদন আনা যাবে না, কারন পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চ অফিসে কেউ কাজ করছে না, তারা অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দিয়েছে। ” পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগও অসহযোগ আন্দোলনে শরীক হয়েছে এমন অভিজ্ঞতা আমার রাজনৈতিক জীবনে ইতিপূর্বে আর ছিল না। তখন জেলের ভেতর থেকে আমি বুঝতে পারি যে সমগ্র জাতি স্বাধীনতার জন্য কতখানি ঐক্যবদ্ধ হয়েছে।
&nbsp;
প্রতিরোধ শুরু হওয়ার আগে থেকেই বিভিন্ন গণতান্ত্রিক দলের সঙ্গে আমাদের আত্নগোপনরত পার্টির সম্পর্ক ছিল। বিশেষত ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (মোজাফফর) আমাদের পার্টির ঐতিহ্যগত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। ন্যাপের অসাম্প্রদায়িক, সাম্রাজ্যবাদী বিরোধী এবং সমাজতন্ত্রের সমর্থক ভূমিকার জন্য আমাদের পার্টির সঙ্গে তাদের রাজনৈতিক ও নীতিগত মিল ছিল বেশী। অসহযোগ আন্দোলন, প্রতিরোধ ও মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন পর্যায়ে এই দুই পার্টি ঘনিষ্ঠ সহযোগীতায় কাজ করেছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় ন্যাপের (এবং ছাত্র ইউনিয়নের) সঙ্গে মিলিতভাবে আমাদের পার্টি গেরিলা বাহিনী গড়ে তোলে। অনেক স্থানে একত্রে ক্যাম্প করা হয়।
&nbsp;
আওয়ামী লীগের সঙ্গে ১৯৬০-৬১ সাল অর্থাৎ আইয়ূব-বিরোধী আন্দোলনের সূচনা থেকেই আমাদের পার্টির সহযোগীতামূলক সম্পর্ক ছিল। আমাদের পার্টি আত্মগোপনে থাকতে বাধ্য হলেও ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের পূর্ব সময়টাতে আওমী লীগের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে রাজনৈতিক বিষয়ে আমাদের মতবিনিময় ও পরামর্শ হয়েছে। ১৯৭০-এর নির্বাচনের ফলাফল পাকিস্তানী শাসকরা যে মেনে নেবে না এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম অনিবার্য এবং তা সশস্ত্র সংগ্রাম হতে পারে এ বিষয়ে বঙ্গবন্ধু এবং আমাদের পার্টি ঐক্যমত্যে পৌঁছেছিল। বঙ্গবন্ধু আমাদের বলেছিলেন যে সশস্ত্র প্রতিরোধ এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থনের জন্য যোগাযোগের ক্ষেত্রে কমিউনিস্ট পার্টির সহযোগীতা তাঁর জন্য মূল্যবান হবে, কেননা আওয়ামী লীগের এক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা ও যোগাযোগের অভাব রয়েছে।
&nbsp;
বঙ্গবন্ধু আজ বেঁচে নেই। তিনি ঘাতকদের হাতে প্রাণ হারিয়েছেন। তাঁর স্মৃতিতে স্মরণ করে আমি বলতে চাই যে কমিউনিস্ট পার্টি সম্পর্কে তিনি যে মূল্যায়ন ও প্রত্যাশা করেছিলেন মুক্তিযুদ্ধে আমরা তা পূরণ করতে পেরেছি।
&nbsp;
১৯৭১ সালের এপ্রিলে আওয়ামী লীগ প্রথম স্বাধীন বাংলাদেশের সরকার গঠন এবং গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ ঘোষনা করার পরই দেশের ভেতর আমাদের পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি ও সম্পাদকমন্ডলীর উপস্থিত সদস্যরা এক বৈঠকে বসে সিদ্ধান্ত নিয়ে স্বাগত জানায় এবং প্রথম স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে সহযোগীতার কথা ঘোষনা করে। আমাদের পার্টির ঐ প্রথম প্রকাশ্য বিবৃতি বিদেশে সংবাদপত্র ও বেতারে প্রচারিত হয়েছিল। এর ফলে স্বাধীনতা সংগ্রামে পার্টির ভূমিকা দেশ-বিদেশে জনগণ জানতে পারে। আমাদের পার্টির বহু সদস্য সমর্থক বাংলাদেশ সরকারের অধীনে মুক্তিবাহিনীর ট্রেনিং গঠন করে। তবে এক্ষেত্রে সরকার ও আওয়ামী লীগের সঙ্গে আমাদের পার্টির কিছু কিছু দ্বিমত ও সমস্যার সৃষ্টি হয়েছিল ।
&nbsp;
অন্যান্য দলের মধ্যে কাজী জাফর আহমদ ও রাশেদ খান মেননদের দলের সঙ্গেও আমাদের দেখা সাক্ষাৎ হয়। এরা মাওবাদী নীতি অনুসরন করলেও ২৫ মার্চের পর সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে যায়। এরা স্বাধীনতার প্রতি সমর্থন দিলেও আওয়ামী লীগের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি, স্বাধীনতার শক্তিগুলোর ঐক্য এবং স্বাধীনতার আন্তর্জাতিক শত্রু-মিত্র সম্পর্কে এঁদের নীতির সঙ্গে আমাদের প্রভুত পার্থক্য ছিল। মুক্তিযুদ্ধকালে এঁরাসহ কিছু মাওবাদী শক্তি আওয়ামীলীগ কে বাদ দিয়ে একটি ‘বামপন্থী ফ্রন্ট’ গঠনের যে প্রস্তাব দিয়েছিল তাকে আমরা বিভেদাত্নক ও স্বাধীনতা সংগ্রামকে দুর্বল করার প্রয়াসী বলে ভ্রান্ত মনে করে প্রত্যাখান করি এবং আওয়ামী লীগসহ জাতীয় ঐক্য গঠনের নীতি অনুসরণ করি। স্বাধীনতার বিরোধীতাকারী দলগুলোকে আমরা শত্রু বলে চিহ্নিত করি।
&nbsp;
২৫ মার্চের পড়ে জেল ভেঙে মুক্ত হওয়ার পর কয়েকজন সহকর্মীসহ আমার নিরাপত্তা ও মুক্তিযুদ্ধের প্রয়োজন উপলব্ধি করে জনতাই আমাদের ঠেলে নিয়ে পদ্মা পার করিয়ে দেয় একথা আগেই বলেছি। কাজেই দেশের ভিতরে আমাদের পার্টির সংগঠিত হওয়ার ব্যাপারে আমি ব্যক্তিগতভাবে জড়িত থাকতে পারি নি।
&nbsp;
আমাদের পার্টির অন্য নেতারা ২৫ মার্চের পর সঙ্গে সঙ্গেই দেশত্যাগ করেন নি। তাঁরা পরিস্থিতি অনুযায়ী ভেতর থেকে প্রতিরোধ সংগঠিত করার কাজ শুরু করেন। অচিরেই ঢাকায় থাকা অসম্ভব এবং সকলের থাকা অপ্রয়োজনীয় মনে হলে আমাদের পার্টির নেতৃবৃন্দ তৎকালীন কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারন সম্পাদক আবদুস সালাম, খোকা রায়, মোহাম্মদ ফরহাদ, জ্ঞান চক্রবর্তী সাইফউদ্দিন মানিক, মনজুরুল আহসান খান প্রমুখ ঢাকা জেলার বেলাতো থানার রায়পুরায় ঘাঁটি করে অবস্থা করেন। কিছু কমরেডকে অধিকৃত রাজধানীতে রেখে যাওয়া হয়। রায়পুরা এলাকা পাকবাহিনীর পদানত হলে আমাদের নেতৃবৃন্দ ভৈরবের দিকে আশুগঞ্জ সরে গিয়ে অবস্থান নেন। নেতৃবৃন্দ দেশ থেকে পার্টির বিভিন্ন পর্যায়ে সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ পুনঃস্থাপন এবং পুনর্গঠিত হয়ে সশস্ত্র প্রতিরোধ ভূমিকা পালনের চেষ্টা চালাচ্ছিলেন। আশুগঞ্জে বেঙ্গল রেজিমেন্টের প্রতিরোধ ভেঙ্গে পড়লে এপ্রিলের তৃতীয় সপ্তাহে নেতৃবৃন্দের থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ে এবং প্রকৃতপক্ষে এলাকার জনগণ তাঁদেরকে ক্রমে সীমান্তের দিকে নিয়ে যায়। সীমান্ত অতিক্রম করার আগেই কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব বিভিন্ন জেলা সংগঠনের জন্য নির্দেশ দিয়ে ক্যাডার পাঠাতে সক্ষম হন।
&nbsp;
পাকবাহিনীর আক্রমন, নির্বিচার গনহত্যা, অগ্নিসংযোগ, লুটতরাজ প্রভৃতির মুখে সীমান্ত এলাকার হাজার হাজার মানুষ ভারতে চলে যায়। আমাদের পার্টির বহু কর্মী সমর্থক ভারতে চলে যেতে বাধ্য হয়। অন্যান্য দলের কর্মীরাও চলে যায়। আমাদের হিসেব অনুযায়ী আমাদের পার্টির নেতা, সমর্থক, কর্মীগন ও তাদের পরিবারবর্গ মিলিয়ে ৬ হাজার নরনারী ভারতের পশ্চিমবংগ, মেঘালয় ও ত্রিপুরা এই তিনটি রাজ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল। এই সময়ে গোটা পার্টি সাময়িকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। বিভিন্ন জেলায় দেশের মাঝে আমাদের কিছু কমরেড থেকে গিয়েছিলেন। প্রবাসে সকলের জন্যে আশ্রয়, খাদ্য প্রভৃতির ব্যবস্থা করা, ভেতরে বাহিরে সকল পার্টির সাথে পুনরায় সংযোগ স্থাপন করা, সংগঠন গুছিয়া নেয়া, এবং সর্বোপরি কালবিলম্ব না করে গেরিলা বাহিনী গড়ে তোলা সহ অত্যন্ত দুরুহ কাজ পার্টির সামনে ছিল। আমরা নেতা-কর্মীদের সবকিছু হাসিমুখের সাথে সহ্য করা, অসম সাহসিক প্রয়াস এবং ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি সহ অন্যান্য দেশপ্রেমিক শক্তির সাহায্যের ফলে অতি অল্প সময়ে আমরা কাজগুলো গুছিয়ে তুলি। এ পর্যায়ে আমাদের সংগঠিত হওয়ার ধারাগুলো ছিল নিম্নরূপঃ
&nbsp;
ক) কমিউনিস্ট পার্টি, ন্যাপ ও ছাত্র ইউনিয়নের যৌথ ক্যাম্প স্থাপন, ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি ও অন্যান্য দেশপ্রেমিকের সহায়তায় ভারতের তিনটি রাজ্যে তাদের আহার-বাসস্থানের ব্যবস্থা।
&nbsp;
খ) দু ধরনের ক্যাম্প ছিল- পার্টির বয়স্ক সদস্যদের পরিবারবর্গের আশ্রয়ের জন্যে এবং তরুনদের যাদের লড়াইয়ের উপযুক্ত মনে করা হবে ও ট্রেনিং দিয়ে পাঠানো হবে।
&nbsp;
(গ) ক্রমশ স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের সহায়তা গ্রহন এবং আমাদের ক্যাম্পে সংগঠিত তরুনদের সরকারের মুক্তিবাহিনীর ট্রেনিং এ প্রেরণ।
&nbsp;
(ঘ) আমাদের পার্টি, ন্যাপ, ও ছাত্র ইউনিয়নের মিলিত একটি নিজস্ব গেরিলা বাহিনী গঠন। এতে প্রথমে ট্রেনিং প্রদানে প্রভূত ‘টেকনিক্যাল’ সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। পরে ভারত সরকারের অনুমতি নিয়ে তা গঠন সম্ভব হয়।
&nbsp;
(ঙ) আগরতলায় এবং মুক্তিযুদ্ধের শেষদিকে কলকাতায় কেন্দ্রীয় কমিটির কার্যালয় গঠন করে কাজ করা।
&nbsp;
(চ) আমাদের নিজস্ব গেরিলা বাহিনীকে বাংলাদেশ সরকারের সাথে যোগাযোগ রেখে দেশের ভেতরে যুদ্ধে পাঠানো।
&nbsp;
(ছ) দেশের ভেতরে কমরেডদের সাথে যোগাযোগ স্থাপন ও গেরিলাদের সহায়তা প্রদান।
&nbsp;
(জ) আমাদের ক্যাম্পে মুক্তিযোদ্ধাদের রাজনৈতিক শিক্ষার ব্যবস্থা।
&nbsp;
(ঝ) কেন্দ্রীয় কমিটী কতৃক ‘মুক্তিযুদ্ধ’ নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশ করে তা সকল ক্যাম্পে, শরনার্থী ও মুক্তিযোদ্ধাদের মাঝে ও দেশের ভেতর প্রচারের ব্যবস্থা করা।
&nbsp;
আমাদের পার্টি, ন্যাপ ও ছাত্র ইউনিয়নের গেরিলা বাহিনীতে ৫ হাজার তরুনকে ট্রেনিং দিয়ে পাঠানো হয়। এছাড়া আমাদের প্রচেষ্টায় আমরা আরো ১২ হাজার তরুনকে সংগ্রহ করে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের মুক্তিবাহিনীতে পাঠাই। অর্থাৎ আমরা মোট ১৭ হাজার তরুন মুক্তিযোদ্ধাকে যুদ্ধের জন্যে সংগঠিত করি। তবে যুদ্ধের পরে এদের অনেকেই লেখাপড়া, চাকরি, কৃষিকাজ ও ব্যবসা প্রভৃতি নিজ নিজ পেশায় ফিরে যায় এবং রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত ছিল না।
&nbsp;
ভারতে যাওয়ার পরই ১৯৭১ সালের মে মাসে কেন্দ্রীয় কমিটি মিলিত হয়ে প্রথমে স্বাধীনতা সংগ্রামের মৌলিক চরিত্র, সংগ্রামের শক্তি, ও শত্রু-মিত্র সম্পর্কে একটি দলিল গ্রহন করেছিল। ঐ দলিলে পাকিস্তানের ঐপনিবেশিক শাসন-শোষনের স্বরুপ নির্দেশ করে আমাদের সশস্ত্র সংগ্রামকে জাতীয় স্বাধীনতা ও মুক্তির সংগ্রাম বলে মূল্যায়ন করা হয়েছিল। বলা হয়েছিল যে স্বাধীনতার জন্যে জনগনের দৃঢ় একতা এবং মুক্তিবাহিনীর বীরত্ব ও ত্যাগ আমাদের প্রধান শক্তি। এবং প্রতিবেশী ভারত, সোভিয়েত ইউনিয়নসহ সমাজতান্ত্রিক শিবির, বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলন ও স্বাধীনতা, গনতন্ত্র ও প্রগতিকামী শক্তি আমাদের বন্ধু ও অন্যদিকে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ, মাওবাদী চীন ও দুনিয়ার অন্যান্য প্রতিক্রিয়াশীলেরা পাকিস্তানের সমর্থক ও আমাদের স্বাধীনতার শত্রু বলে মূল্যায়ন করেছিল। এই মূল্যায়ন সঠিক বলেই প্রমানিত হয়েছে।
&nbsp;
মে মাসের পরেও মাঝে মাঝে কেন্দ্রীয় কমিটির সভা করা সম্ভব হয়েছে। যদিও আমাদের কমরেডরা ভারতের তিনটি রাজ্যে ও দেশের মাঝে ছড়িয়ে থাকায় তা কষ্টসাধ্য ছিল। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, মেঘালয় তিনটি রাজ্যেই সীমান্তবর্তী শহরে আমাদের পার্টি, ন্যাপ ও ছাত্র ইউনিয়নের যৌথ ক্যাম্প ছিল। দু ধরনের ক্যাম্প ছিল। পার্টির বয়স্ক সসস্যদের পরিবারবর্গসহ এবং যুদ্ধে পাঠানোর জন্যে তরুনদের ‘ইয়ুথ ক্লাব’।
&nbsp;
দেশ থেকে যাওয়ার সময়ে আমাদের কমরেডদের সাথে যে সামান্য অর্থসম্পদ ছিল,তাই ছিল আমাদের প্রাথমিক সহায়। পরে ভারতীয় নাগরিকদের দ্বারা গঠিত সহায়ক কমিটি থেকে আমরা অর্থ ও অন্যান্য সাহায্য পেয়েছিলাম। আমাদের প্রতিষ্ঠিত কিছু ক্যাম্প আমরা বাংলাদেশ সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় মিলিয়ে দিয়েছিলাম। পরে অল্প সংখ্যক ক্যাম্পই আমাদের নিয়ন্ত্রনে ছিল।
&nbsp;
এছাড়া ইংল্যান্ড ও আমেরিকায় প্রবাসী আমাদের পার্টির সমর্থকেরা অর্থ সাহায্য সংগ্রহ করে পাঠাতেন। বাংলাদেশে পাক বাহিনীর নৃসংসতা ও বাংগালীদের সাহসিক যুদ্ধের খবর বিভিন্ন দেশের সংবাদপত্রে ছাপা হওয়ার পর সারা দুনিয়াময় আলোড়নের সৃষ্টি হয়েছিল। এ পটভূমিতে মুক্তিযুদ্ধের শেষের মাসগুলোতে দুনিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে সাহায্য সংগ্রহের কাজটা আমাদের কমরেডরা সমন্বিত করে পাঠাতেন।
&nbsp;
আমাদের ক্যাম্পে সংগঠিত তরুনদের অধিকাংশকেই যেহেতু মুক্তিবাহিনীতে পাঠিয়ে দেয়া হত, তাই খরচের বোঝা আমাদের বহন করতে হয়নি। আর আমাদের নিজস্ব গেরিলা বাহিনীর ছেলেরা দেশের ভেতরে এসে জনগনের সহায়তায় আহার বাসস্থানের ব্যবস্থা করত।
&nbsp;
আওয়ামীলীগের সাথে আমাদের কিছু সম্পর্কের কথা আগেই বলেছি। সবিচেয়ে বড় ঐকমত্য ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রশ্নে, সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে তা অর্জনের প্রশ্নে আমরা একমত ছিলাম।
&nbsp;
আমরা আওয়ামী লীগ সহ স্বাধীনতার পক্ষের সকল শক্তির বৃহত্তম ঐক্য গড়ে তুলতে সচেষ্ট ছিলাম। এই প্রচেষ্টা তেমন সফল হয় নি। শেষের দিকে বাংলাদেশ সরকারের ‘পরামর্শদাতা কমিটি’ গঠিত হয় এবং তাতে আমাদের পার্টির প্রতিনিধি হিশেবে আমি ছিলাম। সশস্ত্র সংগ্রামের অগ্রগতির পর্যায়ে আমাদের উভয় দলের দৃষ্টিভংগিগত কিছু পার্থক্য ছিল। আমরা মুক্ত এলাকা গড়ে তুলে সেখানে প্রগতিশীল অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক নীতি গ্রহন ও কার্যকরের মাধ্যমে ভবিষ্যত বাংলাদেশের মডেল জনগনের সামনে তুলে ধরার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করতাম ও ঐ রকম রণকৌশলের কথা বলতাম। আমরা স্বাধীনতা সংগ্রামকে কেবল সাধারন জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতাম না। মেহনতি মানুষ শোষণ ও নির্যাতনমুক্ত সুখী জীবন গড়ার আকাং্খা থেকে স্বাধীনতা চাইত। আমরা স্বাধীনতা সংগ্রামের মধ্য দিয়ে শ্রমিক কৃষক মেহনতি মানুষের দৃঢ় ও শক্তিশালী রুপে সংগঠিত হওয়ার লক্ষ সামনে রেখেছিলাম। মুক্তাঞ্চল গড়ে তুলে প্রগতিশীল অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিতে পারলে সারা দেশের মেহনতি মানুষ আরও উতসাহ ও অনুপ্রেরণা নিয়ে এগিয়ে আসত। আমরা জাতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামে নিজস্ব শক্তির উপর নির্ভর করার উপর জোর দিতাম। এই সকল বিষয়ে আওয়ামীলীগের স্পষ্ট ধারণা ছিল না।
&nbsp;
আওয়ামীলীগের একাংশের তরুনদের দ্বারা ‘মুজিব বাহিনী’ নামে পৃথক একটি বাহিনী হবার পর তাদের সংগে এবং বিশেষ করে আমাদের সমর্থক গেরিলাদের দেশের ভেতরে প্রেরণের প্রশ্নে সরকারের সংগে আমাদের কিছু অসুবিধা দেখা দিত। এসব সমস্যা সমাধানের জন্যে পরে একটি কোওর্ডিনেশন কমিটি গঠিত হয়েছিল।
&nbsp;
তবে সার্বিকভাবে আওয়ামীলীগের সাথে আমাদের সুসম্পর্ক বজায় ছিল। কমিউনিস্টরা সবসময় তাদের আন্তর্জাতিক কর্তব্য হিশেবেই যে কোন জাতির ন্যায্য সংগ্রাম- জাতীয় স্বাধীনতা ও মুক্তির সংগ্রামকে সমর্থন করে। এই নীতি থেকে বস্তুত আমাদের প্রচেষ্টা ছাড়াই আমাদের মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকেই ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি আমাদের সমর্থনে এগিয়ে আসে এবং বাংলাদেশের পক্ষে ভারতে জনমত গঠনে প্রভূত সহায়তা করে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম, বিশেষত পাক বাহিনীর নিষ্ঠুর নির্যাতন ও গনহত্যা এবং প্রায় এককোটি ছিন্নমূল নারী ও শিশুর ভারতে আশ্রয় গ্রহন ইত্যাদি ভারতের জনগনের মাঝে বাংলাদেশের পক্ষে গভীর আবেগ সৃষ্টি করেছিল। তারা, বিশেষত সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোতে বাংলাদেশের শরনার্থী ও উদ্বাস্তুদের আশ্রয় দিতে যে অসুবিধার সম্মূখীন হয়েছিলেন তা হাসিমুখে আওহ্য করেছিলেন। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি এই জনমতকে আরও বিস্তৃত ও সংহত করার জন্যে অবদান রেখেছে। ভারতের বিরোধী দক্ষিনপন্থী রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে বাংলাদেশ এর স্বাধীনতার প্রশ্নে কিছু কিছু বিভ্রান্তি ও বিরুদ্ধ মত ছিল। কোন কোন প্রশ্নে কংগ্রেস এরও দোদুল্যমানতা ছিল। এক্ষেত্রে ভারতের অভ্যন্তরে একটি রাজনৈতিক লড়াই ছিল। এই লড়াইয়ে বাংলাদেশ এর পক্ষে সিপিআই এর ভূমিকা দ্বারা আমাদের সংগ্রাম লাভবান হয়েছে।
&nbsp;
আগেই বলেছি ২৫শে আগেই আমরা ভ্রাতৃপ্রতিম পার্টিগুলোর কাছে আমাদের সম্ভাব্য স্বাধীনতা সংগ্রামের সহায়তায় জন্যে পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে চিঠি পাঠাই। এরপর ভারতে যাবার পর মে মাসে আমাদের পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির কয়েকজন নেতৃস্থানীয় সদস্য ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সাথে বৈঠকে বসে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম সম্পর্কে বিস্তৃত আলোচনা করেছিলেন। সেপ্টেম্বর মাসে ভারতের কোচিনে অনুষ্ঠিত ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির কংগ্রেসে আমাদের পার্টির একটি প্রতিনিধিদল পাঠানো হয়েছিল এবং সেখানে স্বাধীনতা সংগ্রাম সম্পর্কে বিস্তৃত জানানোর সুযোগ গ্রহন করা হয়েছিল। তবে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি আগে থেকেই আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের পক্ষে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে প্রচারের উদ্যোগ নিয়েছিল।
&nbsp;
সকলেই জানেন যে রণক্ষেত্র থেকে জাতিসংঘে নিরাপত্তা পরিষদের টেবিল পর্যন্ত প্রতিবেশী ভারত ব্যাতীত সোভিয়েত ইউনিয়নসহ বিশ্ব সমাজতান্ত্রিক শিবির এবং আন্তর্জাতিক প্রগতি ও শান্তির শক্তিসমূহের সক্রিয় সমর্থন বাংলাদেশ এর স্বাধীনতা যুদ্ধে বিজয়্ব্র একটি অন্যতম প্রধান উপাদান। আমাদের পার্টিই এপ্রিল মাসে উদ্যোগি হয়ে বিশ্ব শান্তি পরিষদের সাধারন সম্পাদক রমেশ চন্দ্রেএও সাথে যোগাযোগ করে তার সহায়তায় তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল বিদেশ পাঠায়। এই দলের সদস্য ছিলেন আওয়ামীলীগের আবদুস সামাদ আজাদ, ন্যাপের দেওয়ান মাহবুব আলী (ফেরার পথে দিল্লীতে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন), এবং কমিউনিস্ট পার্টির ডা: সারোয়ার আলী। এই শান্তি প্রতিনিধিদল ইউরোপের বিভিন্ন রাজধানী সফর করে প্রগতিশীল শক্তিসমূহের কাছে ইয়াহিয়া বাহিনীর ভয়াবহ গনহত্যা এবং আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের বিষয় তুলে ধরেন। তখন পর্যন্ত কোলকাতা ছাড়া বিদেশের কোথাও বাংলাদেশ সরকারের মিশন গঠিত হয় নি।
উল্লেখ করা প্রয়োজন যে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের শুরুতে বিদেশে এমনকি প্রগতিশীল মহলেও নানারকম প্রশ্ন বিদ্যমান ছিল। বিদেশে পাকিস্তানীদের মিথ্যা প্রচার খন্ডন করার বিশেষ প্রয়োজন ছিল। ১৯৭০ এর নির্বাচনে জনগনের রায়ের প্রকৃত তাৎপর্য এবং আমাদের সংগ্রাম যে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী তরপরতা’ নয় ও জনগনের ব্যপক সমর্থনপুষ্ট ন্যায্য সংগ্রাম এই কথাও বিদেশে প্রচাররের প্রয়োজন ছিল। অন্য দেশের মুসলমানদের মধ্যে বাংলাদেশ এর স্বাধীনতা সংগ্রামকে “মুসলিম দেশ পাকিস্তান ভাংগার জন্যে অন্য দেশের ষড়যন্ত্র” বলেও বিভ্রান্তি ছিল। আমরা চিঠিপত্র ও প্রচারপত্রের মাধ্যমে এইসব ভ্রান্তি মোচনের চেষ্টা করেছি। সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু হবার কিছুকাল আগে থেকেই আমরা নিশ্চিত ছিলাম যে, আন্তর্জাতিক প্রগতিশীল শক্তিসমূহ, বিশেষত সোভিয়েত ইউনিয়ন ও সমাজতান্ত্রিক শিবিরের সমর্থন ও সাহায্য ব্যাতীত মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও চীনের মাওবাদী নেতৃত্ব এর সমর্থনপুষ্ট বর্বর ইয়াহিয়া চক্রকে পরাভূত করা ও স্বাধীনতা সংগ্রামে জয়লাভ করা সম্ভব হবে না। তাই আমাদের পার্টি স্বাধীনতা সংগ্রামে সমর্থন ও সাহায্যের আবেদন জানিয়ে দুনিয়ার ভ্রাতৃপ্রতিম কমিউনিস্ট পার্টির কাছে বিশদ চিঠি পাঠানোর এবং আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের পক্ষে দুনিয়ার সকল প্রগতিশীল জনমত সমবেত করার জন্যে ও অন্য সকল সম্ভাব্য পন্থার জন্যে চেষ্টা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এই সিদ্ধান্ত মতে প্রথমে পাক বাহিনীর গনহত্যা শুরু হবার আগে ১৪ই মার্চ এবং সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু হবার পরে মে মাসে কেন্দ্রীয় কমিটির পক্ষ হতে সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টি সহ দুনিয়ার প্রায় সকল কমিউনিস্ট পার্টির নিকট চিঠি পাঠানো হয়েছিল। আমাদের পার্টির সে চিঠি হতেই বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলন ও দুনিয়ার বিভিন্ন কমিউনিস্ট পার্টি এবং তাদের মাধ্যমে জাতিসমূহের স্বাধীনতা ও মুক্তি সমর্থনকারী শান্তি ও প্রগতির শক্তিসমূহ এবং গনতান্ত্রিক জনগন আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম সম্পর্কে সঠিক ধারনা পেয়েছিল। এটি বিশ্ব জনমত গড়ে ওঠায় ও আমাদের স্বাধীনতার পক্ষে বিশ্বের গনমাধ্যপমে প্রচারে সহায়ক হয়েছিল।
&nbsp;
কোচিনে অনুষ্ঠিত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির যে কংগ্রেসের কথা আগে বলেছি সেখানে আমাদের পার্টির কেন্দ্রীয় প্রতিনিধিদল ২২টি ভ্রাতৃপ্রতিম কমিউনিস্ট পার্টির সাথে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম সম্পর্কে আলোচনা করেছিলেন। তাছাড়া শান্তি আন্দোলন ও অন্যান্য প্রগতিশীল আন্দোলন এর সাথে যোগাযোগ করে তাদের সমর্থন পাবার চেষ্টা আমাদের পার্টি করেছে।আমরা বলতে পারি যে, আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম এর পক্ষে দুনিয়ার সমাজতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল শক্তিসমূহকে সমবেত করার ক্ষেত্রে আমাদের পার্টি যথোচিত উদ্যোগ গ্রহন করেছিল, এবং এই গুরুত্বপূর্ণ কাজে যথাসাধ্য অবদান রেখেছে। বিশ্ব জনমত গঠনের ক্ষেত্রে এবং তার কার্যকর ভূমিকা সুসংহত করতে আমাদের পার্টির অবদানই সবচেয়ে বেশি।
&nbsp;
স্বাধীনতা যুদ্ধে শত্রুর বিরুদ্ধে জয়লাভের জন্যে একটি অপরিহার্য শর্ত ছিল সমগ্র জাতির একতা এবং আরো সুনির্দিষ্টভাবে স্বাধীনতার সকল শক্তি বিশেষত আওয়ামীলীগ, ন্যাপ ও কমিউনিস্ট পার্টির ঐক্যবদ্ধ কর্মতৎপরতার প্রয়োজন ছিল। আমাদের পার্টি স্পষ্টভাবে এইসব রাজনৈতিক দল সমবায়ে জাতীয় মুক্তিফ্রন্ট গঠনের আওয়াজ তুলেছিল এবং সে ফ্রন্ট গঠনে অবিরাম প্রচেষ্টা নিয়েছিল। বিশ্ব জনমত ও ভারতের জনমত ও বাংলাদেশের নিকট এরুপ জাতীয় ঐক্যের বহিঃপ্রকাশ দেখতে চাচ্ছিল। আওয়ামীলীগ এ ধরনের জাতীয় ঐক্য গঠনের গুরুত্ব বিলম্বে উপলব্ধি করে। পাশাপাশি কয়েকটি মাওবাদী উপদল আওয়ামীলীগকে বাদ দিয়ে তথাকথিত ‘বামপন্থী ফ্রন্ট’ এর নামে বিভেদাত্মক আওয়াজ তুলেছিল। এই দুই মনোভাবের বিরুদ্ধেই আমাদের পার্টির ঐক্যের নীতি তথা জাতীয় মুক্তিফ্রন্ট গঠনের নীতি স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রথমদিকে কার্যকর হয় নি। যুদ্ধ শুরু হবার কিছুকাল পরে আওয়ামীলীগ,ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি, বাংলাদেশ কংগ্রেস এর প্রতিনিধি ও ব্যাক্তিগতভাবে মাওলানা ভাসানীকে নিয়ে তদানীন্তন স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের একটি ‘পরামর্শদাতা’ কমিটি গঠিত হয়েছিল। সেই কমিড়িতে আমাদের পার্টির প্রতিনিধি ছিলাম আমি।
&nbsp;
এই পরামর্শদাতা কমিটি গঠনের গুরুত্ব ছিল এই যে স্বাধীনতা সংগ্রামে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ এবং কমিউনিস্ট পার্টি সহ দেশপ্রেমিক শক্তি যে একতাবদ্ধ সেটা প্রত্যক্ষভাবে দুনিয়ার সামনে প্রকাশ করা গিয়েছিল। বিভিন্ন দলের সমন্বয় নিয়ে ঐ কমিটি দেশের ভেতরে জনগন ও মুক্তিযোদ্ধাদের মনে নতুন উতসাহ উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছিল। আমাদের পার্টি ‘ পরামর্শদাতা কমিটি’ গঠনকে স্বাগত জানিয়েছিল। তবে ঐ কমিটি তেমন কার্যকর ভূমিকা নিতে পারে নি এবং ঐ ঐক্যের উচ্চতর কোন বিকাশও ঘটেনি। এ বিষয়ে প্রধানত গুরুত্ব উপলব্ধি তে আওয়ামীলীগ এর দুর্বলতা ও অনুতসাহ ছিল।
&nbsp;
কমিউনিস্ট পার্টি, ন্যাপ ও ছাত্র ইউনিয়নের সম্মিলিত একটি পৃথক গেরিলা বাহিনী গড়ে উঠেছিল। এই বাহিনী গঠন, ব্যবস্থাপনা, ভারত সরকারের সাথে এই বিষয়ে যোগাযোগ প্রভৃতির সামগ্রিক দায়িত্ব ছিল আমাদের পার্টির বর্তমান সাধারন সম্পাদক মোহাম্মদ ফরহাদ এর উপর। আমাদের গেরিলা টিম সকল জেলায় পাঠানো হয়েছিল। ঢাকার খোদ রাজধানী, রায়পুরা, কুমিল্লা নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, রংপুর সহ উত্তরবঙ্গ এর কতেকটি স্থানে আমাদের গেরিলা টিম একশন করেছে এবং আমাদের কমরেডরা প্রাণ দিয়েছেন। যারা ভারতে যাননি, সেই কমরেডরা দেশের ভেতরে থেকে যুদ্ধের সংগঠন গড়ে তুলেছিলেন এবং এরাই ভারত থেকে আগত গেরিলাদের একশনে সাহায্য করেছিলেন। এখন বয়সের কারনে কোন সময়ে কোথায় কোথায় আমাদের টিম কিরুপ একশন বা লড়াই করেছিল তা স্মৃতি থেকে আমার পক্ষে বিশদ বলা সম্ভব নয়। আমরা নিজেরা এবং বাংলাদেশ সরকার ও মুক্তিবাহিনীর সহায়তায় সাধ্যমত সারাদেশে যুদ্ধরত ছিলাম। যুদ্ধ ছাড়া সংবাদ বহন, রেকি করা প্রভৃতি যুদ্ধের সহায়ক ঝুকিপূর্ণ কাজ আমাদের কমরেডরা করেছেন। কেবল নিচুপর্যায়ে নয়, উচু পর্যায়েও যুদ্ধের সংগঠনে আমাদের ভূমিকা ছিল। ছোটখাটো গেরিলা একশন ছাড়া আমাদের গেরিলারা চট্টগ্রাম বন্দরে পাকিস্তানী জাহাজ ডুবিয়েছিল। কুমিল্লা জেলার চৌদ্দগ্রাম এলাকায় ঢাকা- চট্টগ্রাম সড়কে বেতিয়ারা নামক স্থানে আমাদের কমরেড আজাদ, মুনির প্রমুখ আমাদের গেরিলা বাহিনীর ৯ জন সদস্য পাকবাহিনীর সাথে লড়াইয়ে নভেম্বর মাসের ১১ তারিখে নিহত হন।
&nbsp;
মুক্তিযুদ্ধকালে আমাদের পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য শহীদুল্লাহ কায়সার ঢাকায় আলবদর বাহিনীর হাতে নিহত হন।
&nbsp;
-মনি সিংহ
(বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি
মার্চ, ১৯’৮৪
&nbsp;
<a href=”https://www.facebook.com/mohammadkausar.ahmed”>রিফাত আহমেদ</a>
&lt;১৫,২৪,২২৩&gt;<h1>[মনসুর আলী]</h1>&nbsp;
অসহযোগ আন্দোলন এর র্পূবেই আমরা খুলনাতে একটা আন্দোলন গড়ে তুলি এবং ৩রা মার্চ সভা শেষ করে একটা মিছিল বের করি। এ মিছিলে পাকবাহিনী গুলি চালায় এবং গুলিতে আজিজুল হক,খালেদসহ আরো কয়েকজন নিহত হয়। গুলির প্রতিবাদে ৫ই মার্চ মিছিল বের করি। পাকবাহিনী এ মিছিলেও গুলি চালায়। দুজন নিহত এবং বেশ কয়েকজন আহত হয়। ৭ই মার্চ তারিখে বঙ্গবন্ধুর ভাষণের পর আমরা অসহযোগ আন্দোলন শুরি করি। প্রত্যহ সকাল ১০টায় খুলনা পার্কে আমরা জমায়েত হতাম এবং বৃহত্তর আন্দোলনের জন্য প্রস্তুতি নিতাম। ১৪ই মার্চ তেরখাদায় একটি সভা করি এবং এখানে একটি হাসপাতাল স্থাপন করি। তাছাড়া এখানে গেরিলা ট্রেনিং এর ব্যবস্থা করি। খুলনার অন্যান্য থানায়ও ট্রেনিং এর ব্যবস্থা করা হয়। থানার পুলিশরা ট্রেনিং প্রদান করতো, এভাবে প্রায় ১০,০০০ মুক্তিযোদ্ধা প্রস্তুত করা হয়।
&nbsp;
২৬শে মার্চ থেকে ট্রেনিং প্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে রূপসাঘাট, সেনের বাজার যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি করা হয়। এখানে পাক সৈন্যদের সাথে গুলি বিনিময় হয়। ১লা এপ্রিল আমি তেরখাদায় চলে আসি। এ সময় আমরা খুলনার সাথে যশোরের যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করে দেই এবং লঞ্চ যোগাযোগ বন্ধকরি। ৬ই এপ্রিল সমস্ত ট্রেনিং ক্যাম্পের দায়িত্ব থানার ওসি সাহেবের কাছে প্রদান করে আমি ভারতের উদ্দেশ্য রওনা দেই। ৭ই এপ্রিল কলকাতায় অবস্থান করি এবং সেখানে আওয়ামীলীগ নেতাদের সাথে যোগাযোগ করি। ১৭ই এপ্রিল মুজিবনগরে শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে যোগদান করি। ২৪শে এপ্রিল বাংলাদেশ সরকারের নির্দেশক্রমে নিজ এলাকায় ফিরে আসি। এ সময় পাক বাহিনী আমার মৃত্যুদন্ড ঘোষণা করে। ১৩ই মে প্রথমে পাকসেনারা তেরখাদা আক্রমণ করে। ৪ঠা আগস্ট তেরখাদায় রাজাকার, পাঞ্জাবী পুলিশ ও পাক সেনাদের সঙ্গে মুক্তিফৌজের যুদ্ধ হয়। প্রায় ৫৭ জন লোককে পাকবাহিনী হত্যা করে। তবে ছাগলদা, ছাছিয়াদহ, চরকুরিয়া, চুকখোলা প্রভূতি ইউনিয়ন সমূহ যুদ্ধের সময় নিরাপদ ছিল।
&nbsp;
৯ই আগস্ট আমি শেষবারের মত ভারত চলে যাই। টেট্যা যুব ক্যাম্পের ২০০ জন যুবকে গেরিলা ট্রেনিং এর জন্য চাকুলিয়া প্রেরণ করি। এ সময় তেরখাদা থানার ভিতরে পতলাতে একটি নতুন থানা স্থাপন এবং নিরঞ্জন সেন নামক একজনকে ওসি নিয়োগ করি এবং একটি স্টিমার নিমজ্জিত করা হয়। ডাকবাংলোতে শান্তি কমটির মিটিং চলাকালে গ্রেনেড চার্জ করা হয়। পাওয়ার হাউজেও আমরা একটি অভিযান চালাই এবং পাকসেনাদের একটি লঞ্চ ডুবিয়ে দেই। এ সমস্ত যুদ্ধ ছাড়াও ৭টি গেরিলাযুদ্ধ সংঘটিত হয়। এসব যুদ্ধে পাঞ্জাবি ক্যাপ্টেন সেলিমসহ ৫৫ জন পাকসেনা এবং প্রায় ১০০ রাজাকার ও আলবদর মারা যায়। ইদ্রিস ও কালু নামে দুজন মুক্তিযোদ্ধা এবং রতন, খোকন, মোহাম্মদ ও খোকাসহ আরো ৭ জন মুক্তিযোদ্ধা আহত হয়।
&nbsp;
পাকবাহিনী আমার এলাকায় ব্যাপক ক্ষতি সাধন করে। ছাচিয়াদহ বাজারে ১৩২টি তেরখাদায় ২০০টি সহ সম্পূর্ণ এলাকায় ৩০০০ বাড়িঘর তারা লুট করে এবং পুড়িয়ে দেয়। প্রায় ১৫০ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হয়। এদের মধ্য তেরখাদা কলেজের ছাত্রলীগ সভাপতি সরফরাজের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি গোয়েন্দা হিসেবে কাজ করতেন। ১৪ই আগস্ট পাকবাহিনী তাকে ধরে নিয়ে যায়।শোনা যায়, প্রথমে তাকে পাকিস্তান জিন্দাবাদ বলতে বলে। এতে তিনি রাজী না হওয়ায় তার বাম হাতে গুলি করা হয়।এতেও তিনি পাকিস্তান জিন্দাবাদ বলতে রাজী না হওয়ায় তার অন্য হাতে গুলি করা হয়। সবশেষে তাকে একেবারে হত্যা করা হয়।
&nbsp;
আমার এলাকার বোরহান উদ্দিন, ফহম উদ্দিন, আব্দুল ওহাব, শামসুল হক শেখ সেকান্দার আলী, নূরুল হক, আবু তালেব, প্রফুল্ল কুমার প্রমুখ নেতারা স্বাধীনতা যুদ্ধে বিশেষভাবে কাজ করেন।
&nbsp;
-(ড:মনসুর আলী) সাবেক এম,পি,এ
খুলনা, ২৬ অক্টোবর, ১৯৭২
&nbsp;
&nbsp;
<a href=”https://www.facebook.com/mohammadkausar.ahmed”>রিফাত আহমেদ</a> এবং <a href=”https://www.facebook.com/Farhan.Tanvir.Chowdhury”>অনয়</a><h1>[মমতাজ বেগম]</h1>&nbsp;
২৫ শে মার্চের রাত্রে আমি ঢাকার দীননাথ সেন রোডে ছিলাম। এখানে থেকে ১লা এপ্রিল কুমিল্লায় যাত্রা করি। কয়েকদিন আমি কসবায় অবস্থান করি। এখানে অবস্থানকালে জনসাধারণকে স্বাধীনতা পক্ষে উৎসাহিত করি এবং আনসার ও স্থানীয় ছাত্রলীগ কর্মীদের সাথে নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে চেষ্টা করি।
&nbsp;
ইতিমধ্যে মেজর বাহার কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট হতে পালিয়ে প্রাক্তন সৈনিক, ইপিআর ও আনসার বাহিনীর সদস্যদের একত্রিত করে বাংলাদেশের জন্য একটি সৈন্যদল গঠন করার চেষ্টা করেন। এ সময় আমাদের কিছু সদস্য ভারত সরকারের সাথে যোগাযোগ করে। বাংলাদেশকে শত্রুর কবল থেকে মুক্ত করার জন্য একটি সরকার গঠন করার প্রয়োজন পড়ে। ১০ এপ্রিল যখন সরকার গঠন করা হয় তখন সেখানে মহিলা সদস্যদের মধ্যে শুধু আমিই উপস্থিত ছিলাম। পরে সেই সরকার মুজিবনগর ( কুষ্টিয়ার আম্রকাননে) শপথ গ্রহণ করে।
&nbsp;
১২ই এপ্রিল ক্যাপ্টেন ভূঁইয়া আমার সাথে যোগাযোগ করেন। তাঁর নেতৃত্ব আমার ছোট ভাই আজিজ, ফজলু, কদ্দুস, কসবা ছাত্রলীগের সভাপতি কাইউম, দোদুল ও আরো কিছু সংখ্যক ছেলে ইলিয়টগঞ্জ পুল ও কোম্পানিগঞ্জ পুল ধ্বংস করার পরিকল্পনা নেয়। উক্ত দলটি ইলিয়টগঞ্জ ধ্বংস করতে সক্ষম হয় কিন্ত কোম্পানীগঞ্জ পুল ধ্বংস করা যায় নি।
&nbsp;
১৩ই এপ্রিল মেজর খালেদ মোশারফ আমার সাথে যোগাযোগ করেন। পরের দিন অতর্কিত পাকবাহিনী কসবা এসে পড়লে আমরা আগরতলার দেবীপুরে চলে যাই।
&nbsp;
আগরতলায় পূর্বের মতোই বাংলাদেশ সেনাবাহিনী গঠন করার কাজে সহায়তা করি। এপ্রিল মাসের শেষের দিকে দেবীপুরে (আগরতলা) অবস্থানরত ক্যাপ্টেন গাফফার ও তার বাহিনীর সহযোগিতায় শালদানদীর খাদ্য মুক্তিবাহিনী ও মুজিব বাহিনীর যোদ্ধাদের সামরিক শিক্ষার জন্য এবং শিক্ষাপ্রাপ্তদের দেশের অভ্যন্তরে কুমিল্লায় খাদ্য আশ্রয় ও চিকিৎসার যথাসম্ভব ব্যবস্থা করে দিতেও সচেষ্ট ছিলাম। আমরা মহিলাদেরকেও মুক্তি সংগ্রামে অংশগ্রহণ করার জন্য উদ্ভৃত করি। তাই ‘মহিলা আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী’ নামে একটা সংগঠন প্রতিষ্ঠা করা হয়। জাহানারা হক এই সংগঠনের সভানেত্রী ও ফরিদা মহিউদ্দিন সেক্রেটারি মনোনীত হন। এখানে মেয়েদের নার্সিং শেখার ব্যবস্থা করা হয়। আমরা বিভিন্ন ক্যাম্পে ত্রাণ কার্যও পরিচালনা করি।
&nbsp;
চৌদ্দগ্রাম থানা, কোতোয়ালির বৃহৎ অংশ, বুড়িচং, মুরাদনগরের অংশ বিশেষ, কসবা, আখাউড়া কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট মুক্তিবাহিনীর লক্ষ্যস্থল ও পাকবাহিনীর দুর্ভেদ্য দুর্গ ছিল। সে সময় ঘরবাড়ি, মানুষ, রাস্তাঘাট ও যানবাহন ব্যাপক ক্ষতিসাধিত হয়। কসবা, আখাউড়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, লালমাই ও লাকসামে বেশ কয়েকটি গণকবর রচিত হয়।
&nbsp;
প্রতিরোধ যুদ্ধের মধ্যে কুমিল্লা পুলিশ লাইনের পুলিশ বাহিনীর কথা উল্লেখ করা যায়। রামমালার আনসার বাহিনী ও প্রতিরোধ যুদ্ধে অবর্তীণ হয় ২৫শে মার্চ মধ্যরাতে। লালমাই স্টেশনের সন্নিকটে কিছু সংখ্যক ইপিআর ও বেঙ্গল রেজিমেন্টের কিছু লোক প্রায় ৫ দিন পর্যন্ত প্রতিরোধ যুদ্ধ করে। লাকসাম, চৌদ্দগ্রাম, বুড়িচং, কসবা ও আখাউড়া সর্বাধিক নারী নির্যাতন হয়। আমার কসবাস্থ বাসস্থান বোমাবর্ষণ ও অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে পাক সামরিক জান্তা বিনষ্ট করে।
&nbsp;
যুদ্ধকালীন একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হচ্ছে, এপ্রিল মাসের প্রথম দিকে বন্ধু রাষ্ট্র ভারতে যাওয়ার সময় কর্ণেল এম এ জি ওসমানী আমাদের কসবাস্থ বাসভবনে দুদিন অবস্থান করেন। প্রথম দিকে অবশ্য তাকে আমরা চিনতে পারি নি। কেননা তিনি পরিচয় গোপন রেখেছিলেন এবং তার সু-পরিচিত গোঁফ ছিল না। পরে তাকে চিনতে পারি এবং ভারত যাওয়ার ব্যাপারে সহায়তা করি। পথে এক জায়গায় তাঁকে পাঞ্জাবী মনে করে কয়েকজন মারতে উদ্যত হয়েছিল। কিন্ত আমার এক আত্নীয় সনাক্তকরণের ফলে তাকে রক্ষা করা সম্ভব হয়।
-মমতাজ বেগম
গণপরিষদ সদস্য
( সাবেক এম, এন, এ; মহিলা আসন-৬)
৩০ জুন, ১৯৭৩
&nbsp;
<a href=”https://www.facebook.com/alamin.sorkar.7161″><strong>আলামিন সরকার</strong></a>
&lt;১৫,২৬,২২৫-২৭&gt;<h1>[মোশাররফ হোসেন]</h1>অসহযোগ আন্দোলনের শুরুতেই আমি নানাবিধ অস্ত্রশস্ত্র ও এক্সপ্লোসিভ যোগাড় করতে থাকি। ২৪শে মার্চ কর্ণফুলী নদীতে অবস্থানরত ‘সোয়াত’ জাহাজ হতে শেল নিক্ষেপ করা হয়। ক্যান্টনমেন্ট হতে বাঙালি সৈন্যর একটি দল ক্যাপ্টেন রফিকের অধীনে কুমিরার দিকে যাত্রা করে। ২৫শে মার্চ রাত্রিতে চট্রগ্রাম ক্যান্টনমেন্টে গোলাগুলি বিনিময় হয়।
ইতিমধ্যে আমি ও আমার সঙ্গীরা শুভপুর ব্রিজটির আংশিক ক্ষতিসাধন করি। অন্যদিকে চট্রগ্রামের দিকে আসার সময় লোকদিগকে রাস্তায় গাছপালা, ইটপাটকেল ইত্যাদি দিয়ে নানাভাবে প্রতিরোধ সৃষ্টির জন্য পরামর্শ দেই। ২৬ তারিখ চট্রগ্রামের দিকে অগ্রসরমান পাক সেনাদের সঙ্গে কুমিরার ক্যাপ্টেন রফিকের দলের এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ সংঘটিত হয়। ঐ যুদ্ধে একজন ক্যাপ্টেন সহ অনেক পাকিস্তানী সৈন্য মারা যায়। পরে মেজর জিয়াউর রহমানের অধীনে আরেক দল বাঙালি সৈন্য কালুরঘাটের দিকে যাত্রা করে।
এদিকে সমস্ত চট্রগ্রাম আমাদের অধীনে চলে আসে। এম, এ হান্নান সাহেব সহ আমি অনতিবিলম্বে কালূরঘাটস্থ চট্রগ্রাম বেতার কেন্দ্রে উপস্থিত হই। এবং আমরা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠা করি। হান্নান সাহেবই স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের প্রথম বক্তা এবং তিনি বেলা দেড় ঘটিকার সময় বঙ্গবন্ধুর পক্ষে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।
২৬ তারিখ রাত্রে ‘সোয়াত’ জাহাজ হতে চট্রগ্রাম শহরে অবিরাম গুলিবর্ষণ হয়। আমরা চট্রগ্রাম শহরে ক্যান্টনমেন্টের ঘেরাওকৃত বাঙালি সৈন্যদের সাহায্য করার প্রচেষ্টা চালাই। তখন সমস্ত যুদ্ধব্যবস্থা মেজর জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বাধীন চলতে থাকে। ২৯ শে মার্চ তিনি শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘Head of State’ <em>(রাষ্ট্রপ্রধান)</em> এবং নিজেকে ‘Supreme Commandar of the Bengali Armed forces’ <em>(বাঙালি সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক) </em> ঘোষনা করে যুদ্ধ পরিচালনা করতে লাগলেন। কিন্তু এপ্রিল মাসের তৃতীয় দিনের মধ্যে চট্রগ্রাম শহরের কিছু কিছু অংশ ব্যতিত সবটুকুই পাক সেনাদের অধীনে চলে যায়। আমরা তখন কালুরঘাট ছেড়ে রামগড়ে চলে যাই। আমাদের অবস্থান আরো দৃঢ় করার জন্য এখানে একটি কন্ট্রোল রুম স্থাপন করা হয়। চট্রগ্রাম শহর দখল করেই পাক সেনারা চট্রগ্রামের আশেপাশে ছড়িয়ে পড়ে। ৭ই এপ্রিল কালুরঘাটের পতন হয়।
ঢাকা-চট্রগ্রাম রোডে তখন ক্যাপ্টেন শমসের মবিনের নেতৃত্বাধীন যুদ্ধ চলছিলো। অন্যদিকে পার্বত্য চট্রগ্রামে বাঙালি ও পাক সেনাদের মধ্যে যুদ্ধ চলতে থাকে। সীতাকুন্ডে পাক বাহিনীর সঙ্গে একটি যুদ্ধ হওয়ার পর ক্যাপ্টেন মবিনের সৈন্য বাহিনী চিনকি আস্তানায় চলে যায়। বাঙালি সৈন্যবাহিনী এরপর মিরেশ্বরাই ব্রিজের ক্ষতিসাধনের জন্য এখানে সমবেত হয়। এপ্রিলের প্রথম দিকে আমাদের সৈন্যবাহিনী এক সপ্তাহ যাবৎ পাক হানাদারদের মোকাবেলা করেছিলো। ১৭ তারিখে ব্রিজ হতে দুরে বাঙালি ও পাক বাহিনীর মধ্যে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয়। দুটি কনভয় সহ প্রায় ৪০০ জন পাক সৈন্য ধ্বংস হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত বাঙালি সৈন্যরা বেলা দুটার মধ্যে পিছু হটতে বাধ্য হয়। একজন বাঙালি সুবেদার মৃত্যুবরণ করেন এবং দুজন সেপাই আহত হন।
ঐদিন রাত্রেই আমরা মীরেশ্বরাই থেকে সামান্য উত্তরে মোস্তান নগরে ওৎ পেতে থাকি। ১৮ তারিখে পাক সেনাদের সাথে একটি খন্ডযুদ্ধ হয়। এতে প্রায় ৩০/৪০ জনের মতো পাক সৈন্য নিহত হয়। ১৮ তারিখ সন্ধ্যায় ঐ স্থান ছেড়ে বাঙালি সৈন্যরা করেরহাট চলে আসে এবং হিংগুলি ব্রিজটির ক্ষতিসাধন করে। মোস্তান নগর যুদ্ধের পর পাক সেনারা আর বেশী অগ্রসর হতে পারেনি। তারপর আমাদের সৈন্যরা রামগড় রাস্তার ওপর তুলাতুলি ব্রিজটি উড়িয়ে দেয়। এদিকে শুভপুর, তুলাতুলি, খাগড়াছড়ি ও ফটিকছড়ি প্রভৃতি স্থানে যুদ্ধ চলছিল এবং ক্রমান্বয়ে পাক সেনারা রামগড় ঘিরে ফেলে। আমরা সীমান্ত পেরিয়ে সাবরুমে চলে যাই। পরে হরিণাতে গিয়ে একটি Army Camp <em>(আর্মি ক্যাম্প) </em> ও ‘Youth Camp’ <em>(যুব ক্যাম্প) </em> গঠন করি। উক্ত ক্যাম্পে যুবকদের সামরিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা ছিল। প্রশিক্ষণ নেয়ার পর তারা বিভিন্ন গেরিলা দলে বিভক্ত হয়ে অপারেশনে চলে যায়।
অন্যদিকে সেপ্টেম্বর মাসে বিহারের চাকুরিয়া ট্রেনিং সেন্টারেও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। অক্টোবরের ১৫ তারিখ হতে নভেম্বরের ২০ তারিখ পর্যন্ত মীরেশ্বরাই, সীতাকুন্ড, চট্রগ্রাম শহর পর্যন্ত স্পেশাল কমান্ডো গ্রুপ নিয়ে অপারেশনে লিপ্ত ছিলাম। বাকী সময়টুকু হরিণা সেক্টর নং ১, হেডকোয়ার্টারে ছিলাম।
মীরেশ্বরাই থানার করেরহাট ও হিংগুল ইউনিয়ন সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ হয়। এখানে পাক সেনাদের হেডকোয়ার্টার ছিলো। ঐ স্থানগুলি সীমান্তের কাছেই ছিলো। প্রতিরোধ যুদ্ধের কেন্দ্র হিসেবে এখানে বহু হত্যাকান্ড ও ধ্বংসযজ্ঞ সংঘটিত হয়। মীরেশ্বরাই থানার Wireless Station <em>(ওয়্যারলেস স্টেশন)</em> এর পাশে সবচেয়ে বেশী হত্যাকান্ড সংঘটিত হয়। বিভিন্ন স্থান থেকে ধৃত লোকদিগকে এখানে আনা হতো এবং বিভিন্ন পৈশাচিক কায়দায় হত্যা করা হতো। এখানে আজহারুস সোবাহান নামে এক ব্যক্তি জবাই করতো এবং প্রতি জবাইতে পাঁচটি করে সিকে পয়সা পেতো। এখানে আনুমানিক ৫০০ জনকে হত্যা করা হয়। ওসমানপুর ইউনিয়নে একসাথে ৫ জন লোককে গুলি করে হত্যা করা হয়। হিংগুলি ইউনিয়নেও একসাথে ১০ জনকে হত্যা করা হয়।
মাতবর হাটে আমাদের প্রতিরক্ষা যুদ্ধের হেডকোয়ার্টার ছিলো। ইছাখালী ইউনিয়ন, কাঁটাছোড়া, ওসমানপুর, মিঠানালা ও মগাদিয়া প্রভৃতি ইউনিয়নে আমাদের অবস্থান দৃঢ় ছিলো। এসমস্ত স্থান হতে আমরা গেরিলা যুদ্ধ চালাতাম।
<u>মিয়াজান</u> <u>ঘাটের</u> <u>যুদ্ধ</u><u>(</u><u>জুন</u><u>/</u><u>জুলাই</u><u>)</u><strong><u>
</u></strong>
ওসমানপুর ইউনিয়নে মিয়াজান ঘাটে ১৮ ঘন্টা ধরে এক যুদ্ধ হয়। ঐ যুদ্ধে পাকিস্তানের একজন মেজর ও তিনজন সেপাই প্রাণ হারায়। মাত্র ১৫০ জন সৈন্য নিয়ে শেষ অবধি তারা পিছু হটতে বাধ্য হয়।
<u>দারোগার হাট</u> <u>বাজারের</u> <u>যুদ্ধ</u><u>(</u><u>এপ্রিল</u><u>/</u><u>মে</u><u>)</u>
কাঁটাচড়া ইউনিয়নের দারোসা বাজার হতে কিছু দুরে মাইন ফাটিয়ে মুক্তিবাহিনী পাক বাহিনীর একটি গাড়ী উড়িয়ে দেয়। মাইন ফাটলে প্রায় ৬ জন পাক বাহিনীর লোক মারা যায়। এরপর এখানে প্রায় ৬ ঘন্টা ধরে যুদ্ধ হয়। পরে ওরা পিছু হটতে শুরু করে এবং পলায়ন করার সময় কয়েকজন লোককে হত্যা করে। তাদের মধ্যে হাজী দুলাল মিয়া অন্যতম।
মিঠানালা কমিউনিটি সেন্টার, দূর্গাপুর হাইস্কুল ও আবু তোরাব হাইস্কুলে অবস্থানরত রাজাকার ও পাক বাহিনীর সৈন্যদিগকে পুনঃ পুনঃ আক্রমণ চালিয়ে উৎখাত করা হয়। এসমস্ত অভিযানে আমাদের মুক্তিবাহিনীর লোকও মারা যায়। দূর্গাপুর হাইস্কুল অভিযানে ফরিদ আহমেদ নামে একজন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। পাক সেনাদের বাংকারে গ্রেনেড ছোড়ার সময় হঠাৎ প্রতিপক্ষের একটি বুলেট তার বুকে বিদ্ধ হয়।
<u>হাদি</u> <u>ফকিরের</u> <u>হাটের</u> <u>যুদ্ধ</u><u>(</u><u>নভেম্বর</u><u>)</u>
শাহ আলমের অধীনে এক প্লাটুন মুক্তিবাহিনী একটি রাজাকার দলকে আক্রমণ করলে এ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। প্রচন্ড আক্রমণে ৭ জন রাজাকার মারা যায়। পরে রাজাকারদের সাহায্যার্থে পাক বাহিনী চলে আসে। পাক সৈন্য আসলে ওদের শক্তি বৃদ্ধি পায়। এবং মুক্তিবাহিনীর দল ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। শাহ আলম এক ধান ক্ষেতে আত্মগোপন করে গুলিবর্ষণ করতে থাকে। কিন্তু পাক বাহিনী শেষ অবধি তাকে ধরে ফেলে হত্যা করে। এ যুদ্ধে পাকিস্তানের কয়েকজন সৈন্য আহত হয়।
<u>বাংলা</u> <u>বাজারের</u><u>(</u><u>আগের</u> <u>পাকিস্তান</u> <u>বাজার</u><u>) </u><u>যুদ্ধ</u><u>(</u><u>মে</u><u>/</u><u>জুন</u><u>)</u>
জনাব মুস্তাফিজুর রহমানের নেতৃত্বে এক প্লাটুন মুক্তিযোদ্ধা বাংলা বাজারের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। মুক্তিযোদ্ধারা পাক বাহিনীর দলটিকে অতর্কিত হামলা করে এবং ১০ জনকে হত্যা করে। যুদ্ধ চলাকালে মুস্তাফিজুর রহমান বুলেটবিদ্ধ হন।
<u>তেতুইয়া</u><u>, </u><u>তেমোহনী</u> <u>ও</u> <u>আবুর</u> <u>হাটের</u> <u>যুদ্ধ</u><u>(</u><u>অক্টোবর</u><u>)</u>
পাক বাহিনী উপরোক্ত মুক্তিবাহিনীর গেরিলা সেন্টার আক্রমণ করে। এ যুদ্ধ প্রায় দই দিন স্থায়ী হয়। মুক্তিবাহিনীর প্রধান যুদ্ধকেন্দ্র মাতার হাট পর্যন্ত আক্রান্ত হয়। প্রধান গেরিলা সেন্টার ছেড়ে মুক্তিযোদ্ধাদের বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত পিছু হটে যেতে হয়েছিলো। পরে প্রবল আক্রমণের মুখে পাকিস্তানী বাহিনী মাতার হাট ছেড়ে আসতে বাধ্য হয়। যুদ্ধে উভয় পক্ষের কিছু লোক আহত ও নিহত হয়।
আবুর হাটে একজন সাধারণ পানের দোকানী দেশ স্বাধীন করার অদম্য এক নজির স্থাপন করেছেন। পাক বাহিনী বাংলাদেশে হানা দেয়ার পাক বাহিনী বাংলাদেশে হানা দেয়ার প্রথম দিকে আবুর হাটের দিকে আসতে শুরু করলে লোকজন নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে আরম্ভ করে। কিন্তু উক্ত দোকানদার তফাজ্জল হোসেন পাক সেনাদের সম্মুখে গিয়ে কয়েকটি গ্রেনেড ছুড়ে মারে। গ্রেনেড লক্ষ্যবস্তুতে না পড়াতে কয়েকজন পাক সৈন্য আহত হয়।
২৬ শে মার্চ পাক বাহিনী যখন চট্রগ্রামের দিকে আসছিলো তখনা তারা রাস্তার দুপাশের বাড়ীঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়। বড় তাকিয়া বাজারে উপস্থিত হয়ে পাক বাহিনী লুট ও অগ্নসংযোগ করে। এ সময় এক সাহসী যুবক দা ও লাঠি নিয়ে একজন পাকসেনাকে আক্রমণ করে। তারপর পাকসেনারা তাকে ধরে ফেলে এবং হত্যা করে।
চট্রগ্রামের দিকে অগ্রসরমান পাক বাহিনী সীতাকুন্ডে পৌঁছেই লোহাগড়া গ্রামে ঢুকে পড়ে। ১০/১২ জন পাক সৈন্য একটা মেয়েকে ধরে আনে এবং একটা পুকুর পাড়ে এনে উপর্যুপুরি ধর্ষণ করে। মেয়েটি কয়েকদিন মাত্র জীবিত ছিলো, তারপর সে মারা যায়।-মোশাররফ হোসেনগণপরিষদ সদস্য
(সাবেক এমপিএ চট্রগ্রাম)১২ জুন, ১৯৭৩
&nbsp;
&nbsp;
<a href=”https://www.facebook.com/ibrahim.razu”>ইব্রাহিম রাজু</a>
&lt;১৫,২৭,২২৭-২৯&gt;<h1>[মোহাম্মদ আজিজুর রহমান]</h1>২৪ শে মার্চ আমি ঠাকুরগাঁও ও দিনাজপুরের ইপিআর বাহিনীর কয়েকজন সুবেদার ও হাবিলদারের সঙ্গে গোপনে আলাপ করি এবং তাদের উপদেশ দেই পাক অফিসাররা তাদের অস্ত্র জমা দিতে তারা যেনো অস্ত্রগার দখল করে নেন। এতে তারা রাজী হন।
&nbsp;
দিনাজপুর ইপিআর বাহিনীর একজন সুবেদার যুদ্ধ ঘোষণার পূর্বেই অস্ত্রাগার লুন্ঠন এবং পাক সৈন্যদের হত্যার জন্য আমার এবং জেলা আওয়ামিলীগ সেক্রেটারি অধ্যাপক ইউসুফ আলীর কাছে অনুমতি চান। কিন্তু আমরা তার এ প্রস্তাবে রাজী হই নি।
&nbsp;
২৫ শে মার্চ রাত প্রায় ১১ টা পর্যন্ত স্থানীয় আওয়ামিলীগ নেতৃবর্গ এবং অবাঙালি বিহারীদের মধ্যে মিটিং হয়। এই মিটিং-এ বিহারীরা শান্তি রক্ষার প্রতিশ্রুতি দেয় এবং বিহারী বাঙালি ভাই ভাই প্রভৃতি শ্লোগান দেয়।
&nbsp;
২৫ শে মার্চের মধ্যরাতেই আমরা গুলির শব্দ শুনতে পাই। চারিদিক থেকে ‘জয় বাংলা’ র প্রভৃতির শ্লোগান ও কানে ভেসে আসে। ভোর পর্যন্ত এই রকম ধ্বনি শুনতে পাই ।
&nbsp;
২৬ শে মার্চ সকালে ফজরের নামাজান্তে আমার বাসার সামনে একটি হালকা কামান বসানো দেখতে পাই। পাঞ্জাবী সামরিক কর্মকর্তা আমাদের ডেকে নিয়ে যান এবং তাদের কথামতো কাজ করতে চাপ দেন। তারা আমাদের স্পষ্ট জানিয়ে দেন তাদের কথা না শুনলে যে কোন দণ্ড তারা দিতে পারেন। এখান থেকে বাসায় না গিয়ে আওয়ামি লীগের এক নেতার বাসায় চলে যাই। ইতিমধ্যে শহরে কারফিউ জারি হয়ে গেছে ।
&nbsp;
২৭ শে মার্চ সকালে দু’ঘন্টার জন্য কারফিউ তুলে নেয়া হয়। এ সুযোগে আমি বেরিয়ে পড়ি এবং ইপিআর বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করি। সিদ্ধান্ত মোতাবেক স্থির হয় দিনাজপুর ইপিআর ৮ম বাহিনীর বাঙালিদের দায়িত্বে থাকবেন ক্যাপ্টেন নজরুল হক এবং ৯ম বাহিনীর দায়িত্বে থাকবেন সুবেদার মেজর আব্দুর রউফ। আর আমি বেসামরিক বিষয়ক উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করবো। ঐ দিন পাক বাহিনী আমাকে অনেক খোঁজাখুঁজি করে। আমি কাঞ্চন নদী পেরিয়ে গ্রামে এক আত্নীয়ের বাড়ীতে আশ্রয় নেই।
&nbsp;
২৮ শে মার্চ এখানে থেকে ঠাকুরগাঁয়ের ইপিআর বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য রওয়ানা হই।
&nbsp;
২৯শে মার্চ ঠাকুরগাঁ পৌঁছি। সেখানেও গোলাগুলির শব্দ শুনতে পাই। এখানে সুবেদার মেজর কাজিমউদ্দিন এবং ঠাকুরগাঁ আওয়ামিলীগ নেতাদের সঙ্গে একত্রে কাজ চালিয়ে যাই। সুগার মিলের জীপ নিয়ে দিনাজপুর ৯নং ইপিআর বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য ২৯ তারিখেই রওয়ানা হই।
&nbsp;
৩০শে মার্চ দিনাজপুরের কাঞ্চন নদীর ঘাটে মুক্তি বাহিনীর ঘাঁটিতে পৌঁছে। ঐ দিনই দিনাজপুর ইপিআর ঘাঁটির সব অস্ত্র আমরা লাভ করি। এসব অস্ত্রপাতি স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা, ছাত্র এবং মুজাহিদদের সহায়তায় কাঞ্চন নদীর পশ্চিমে এক গ্রামে রেখে দিই। এখানে রফিক সাহেব, ফয়েজ সাহেব, নাজিম ভুঁইয়া, জজ, আব্দুল হান্নান চৌধুরী এবং ক্যাপ্টেন নজরুল হকের সঙ্গে দেখা হয়। ভারতীয় বন্ধুগণ এখানে আমাদের রসদ সরবরাহ করতো।
&nbsp;
৩১ শে মার্চ ঠাকুরগাঁ ঘাঁটি আমাদের দখলে আসে। রাত দশটায় আমরা অস্ত্রগারের অস্ত্র নিজেদের অধিকারে আনি। ঠাকুরগাঁ আওয়ামি লীগের সহসভাপতি আবুবকর খানও এই সময় আমাদের সঙ্গে ছিলেন। যুদ্ধের শেষের দিকে তিনি শহীদ হন। ঐ রাতেই ঠাকুরগাঁ থেকে একটু দূরে আমাদের ঘাঁটি ও ট্রেঞ্চ বসাই।এ সময় স্থানীয় গ্রামবাসী আমাদের সর্বাত্নক সহায়তা করে। তারা মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে কাজ করে। এ সময় ভারতীয় সীমান্ত থেকে কিছু অস্ত্র এবং ওয়ারলেস সংগ্রহ করি। আমি ঠাকুরগাঁ ও পঞ্চগড় এলাকার দায়িত্ব পালন করি। রেল লাইন অচল করে দেই এবং প্রাক্তন উইং কমান্ডার জনাব মির্জার সঙ্গে পরামর্শ করে শিবগঞ্জ বিমান ঘাঁটি নষ্ট করে দেই। ক্যাপ্টেন নজরুলের দেয়া অস্ত্রসহ আমরা এলাকাব্যাপী মুক্তিযোদ্ধা সংগ্রহ ও সংগঠনে তৎপর হই।
&nbsp;
২রা এপ্রিল সীমান্ত পার হয়ে অস্ত্রের জন্য ভারতে যাই। সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য সুবেদার কাজিম উদ্দিনকে পাঠিয়ে আমি ঐ তারিখে গভীর রাতে আবার দেশে ফিরে আসি।
&nbsp;
৩রা এপ্রিল দিনাজপুরে আমাদের যুদ্ধঘাঁটি পরিদর্শন করি। ঐদিনই দিনাজপুরের ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ক্যাপ্টেন আশরাফকে ঠাকুরগাঁয়ে ডেকে পাঠাই এবং মিটিং করে সৈয়দপুর ঘাঁটি আক্রমনের পরিকল্পনা নিই। ৫ই এপ্রিল আমি সেতাবগঞ্জ ও পীরগঞ্জ ঘাঁটি অভিমুখে রওনা হই। ৬ই এপ্রিল রাতে ভারতে যাই এবং কংগ্রেস নেতা বাবু আর দত্ত এম এন এ – এর সঙ্গে আলাপ করি। অধ্যাপক ইউসুফ আলী, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, কামারুজ্জামান, মিজানুর রহমান, মনসুর আলী প্রমুখ নেতৃবর্গের সঙ্গেও সেখানে সাক্ষাৎ হয়।
১৩ ই এপ্রিল দিনাজপুরের রায়গঞ্জে ফিরি এবং দিনাজপুর শহর উপকণ্ঠে প্রবেশের চেষ্টা করি। কিন্তু সে সময় পাক বাহিনী দিনাজপুরে প্রবেশ করে প্রবল গুলিবর্ষন করে। রাত্রে ক্যাপ্টেন নজরুল হক, সুবেদার মেজর রউফ, ওসমান গণী সাহেবের সঙ্গে ভারত সীমান্তে সাক্ষাৎ হয়। এ সময় রাধিকাপুর স্টেশনে ভারতগামী হাজার হাজার শরণার্থী দেখতে পাই। এখান থেকে বি এস এফ ক্যাম্পে চলে যাই এবং সেখানে অবস্থান করি।
&nbsp;
১৯ শে এপ্রিল মুক্তিবাহিনীসহ পাকবাহিনীর ঘাঁটি আক্রমন করি। যুদ্ধে আমরা জয়ী হই এবং প্রচুর খাদ্যদ্রব্য সংগ্রহ করি। শরণার্থী ক্যাম্পের যুবকদের নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং স্থাপন করি। আমার সঙ্গে এ সময় দিনাজপুরের জজ, ডাঃ নইম উদ্দিন, ছাত্রনেতা আজিজুল ইসলামও ছিলেন। মুজিবনগর সরকার এবং ভারতীয় বাহিনী আমাদের এ ব্যাপারে সহায়তা করেন। এ সময় বাংলাদেশ সীমান্তে এমএনএ, এমপিএ-এর দের এক সম্মেলন হয়। আমাকে মুক্তিবাহিনীর ৬নং সেক্টরের বেসামরিক উপদেষ্টার দায়িত্ব প্রদান করা হয়।
&nbsp;
অক্টোবর মাস পর্যন্ত আমি এ দায়িত্ব পালন করি। জলপাইগুড়ির রাজগঞ্জ যুবশিবির, ইসলামপুর, গংগারামপুর, হামজাপুর, বালুঘাট প্রভৃতি যুবশিবির পরিদর্শন করে যুবকদের অনুপ্রাণিত করি এবং উৎসাহ দেই। ভারতীয় মিত্রবাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করি। যুবশিবিরে যুবকদের গেরিলা ট্রেনিং দিয়ে তাদের বাছাই করে যুদ্ধের জন্য বাংলাদেশে প্রেরণের ব্যাবস্থা করি। শরণার্থী শিবির পরিদর্শন করে তাদের অবস্থা ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছে পেশ করি। পশ্চিম বাংলার প্রধানমন্ত্রী বাবু সিদ্ধার্থ শংকর রায়ের সাথে এ ব্যাপারে যোগাযোগ করি।
&nbsp;
৫ই ডিসেম্বর আমি ভারত থেকে মিত্রবাহিনীর সঙ্গে ঠাকুরগাঁও-এ প্রবেশ করি। এখানে বেশ কয়েকদিন ব্যস্ততার মধ্যে কাটে। ইতিমধ্যে ১৬ই ডিসেম্বর আমরা দিনাজপুরে স্বাধীনতা উৎসব পালন করি।
&nbsp;
১৯৭১ সালের যুদ্ধের নয় মাস আমাদের দিনাজপুর জেলায় পাক বাহিনী অসংখ্য নারী নির্যাতন, ধ্বংসযজ্ঞ ও গণহত্যা চালায়। ১৩ই এপ্রিল পাক বাহিনী দিনাজপুর শহর পুনর্দখলকালে অমানুষিক অত্যাচার চালায়। দিনাজপুর শহরের টেলিফোন ভবনে অনেক লোককে হত্যা করা হয়। পীরগঞ্জে ডাঃসুজাউদ্দিন, আওয়ামি লীগের প্রেসিডেন্ট আবদুর রহমান ও একজন অধ্যাপককে পাক সেনারা নির্মমভাবে হত্যা করে। সেতাবগঞ্জের আওয়ামী লীগ নেতা ডাঃ তমিজউদ্দিন চৌধুরী, মুনিরউদ্দিন, দিনাজপুর ডিগ্রি কলেজের অধ্যাপক শাহ সুলেমান তৈয়ব পাক সেনাদের গুলিতে শহীদ হন। ঠাকুরগাঁও খানকা শরিফের পীরসাহেবের কনিষ্ঠ পুত্রকেও তারা হত্যা করে। ঠাকুরগাঁও সুগার মিলে আওয়ামীলীগের সহ-সভাপতি আবু বকর খানকে দালালদের সহায়তায় নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। পাক সেনারা তেঁতুলিয়া ও বালিয়াডাংগীতেও অকথ্য অত্যাচার ও হত্যাকান্ড চালায়।
&nbsp;
-মোহাম্মদ আজিজুর রহমান
গণপরিষদ সদস্য (সাবেক এম, এন, এ)
দিনাজপুর
২৭ অক্টোবর, ১৯৭২
&nbsp;
<a href=”https://www.facebook.com/alimul.faisal?fref=ts”>আলিমুল ফয়সাল</a>
&lt;১৫,২৮,২২৯-৩২&gt;<h1>[মোহাম্মদ আজিজুর রহমান]</h1>স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই আমরা সিলেটে গণআন্দোলন গড়ে তুলি। মূলতঃ ১৯৭১ সালের মার্চ মাস থেকে আমরা বহুমূখী কর্মসূচী ও আন্দোলনের মাধ্যমে পাক স্বৈরাচার সরকারের বিরোধিতা করি এবং বৃহৎ সংগ্রামের প্রস্তুতি নিতে থাকি।
২রা মার্চ পথসভা ও মশাল মিছিল, ৩রা মার্চ হরতাল, ৪ঠা মার্চ মশাল মিছিল, ৫ই ও ৬ই মার্চ হরতাল, ১০ই মার্চ গণসমাবেশ ও মিছিল বের করি।
১১ই মার্চ আমাকে আহবায়ক করে মৌলভীবাজার মহকুমাতে সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়।
১২ই মার্চ থেকে ২৫শে মার্চ পর্যন্ত আন্দোলন, জনসভা, মিছিল ও কর্মীসভা আরো প্রবলভাবে চলতে থাকে।
২৫শে মার্চ বিকেল ৩ টায় শ্রীমঙ্গল থানার ভৈরববাজার স্কুল মাঠে শ্রমিক সমাবেশে আমি ভাষন দেই এবং স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রস্তুতি নেয়ার জন্যে শ্রমিকদের প্রতি আহবান জানাই। প্রায় ২ হাজার শ্রমিক লাঠি, তীর-ধনুক সহ উক্ত জনসভায় উপস্থিত ছিল এবং তারা সবাই লাঠি উচু করে শত্রুদের প্রতিরোধের শপথ নেয়। সভাশেষে শ্রমিক নেতৃবৃন্দের সাথে দেশের সার্বিকি পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়, এবং যে কোন পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্যে প্রস্তুত থাকার সিদ্ধাবত নেয়া হয়। এরপর রাত ১১ টায় আমি মৌলভীবাজার নিজ বাড়িতে চলে যাই।
২৬শে মার্চ ভোর ৪টায় তদকালীন অবাংগালী এসডিও এবং এসপিডিও আমার বাড়িতে আসেন এবং থানায় নিয়ে যান। থানা থেকে আমাকে ব্যোমকেশ ঘোষ বাবুর বাড়িতে নিয়ে যায় এবং তাকে সংগে করে আমাদের ট্যুরিস্ট রেস্ট হাউজে বন্দী করে রাখে। এখানে অবাংগালী ও খানসেনারা আমাদের ওপর বিভিন্ন প্রকার অত্যাচার চালায়। ২৭শে মার্চ আমাকে ছেড়ে দিলে আমি বাসায় চলে আসি। ঐ দিন বিকেলে কার্ফু ভংগ করে হাজার হাজার জনতা মৌলভীবাজারের দিকে আসতে থাকে। পাক বাহিনী জনতাকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। কার্ফু ভংগের মিছিলে রোদন মিয়া, ছওমন ঠাকুর, তারা মিয়া ও অজ্ঞাতনামা ৫ জন শ্রমিক শহীদ হন এবং বহু লককে গ্রেফতার করা হয়। ২৭ তারিখ রাতেই পাক ক্যাপ্টেন আবার আমাকে গ্রেফতার করে রেস্ট হাউজে নিয়ে যায় এবং লাঠি ও রাইফেলের বাট দিয়ে বেদম প্রহার করে। বহু নিরীহ বাঙালিকে কার্ফু ভঙ্গের দায়ে গ্রেফতার করে পাক সেনারা অমানুষিক নির্যাতন করে। রাতে পাক বাহিনীর অত্যাচারের শিকার বাঙালিদের চিৎকার শুনতে পেয়েছি। সৈন্যরা রাত ১১ টায় ব্যোমক্যাশ বাবু, গিয়াসনগর চা বাগানের ম্যানেজার এবং আমাকে সিলেট সার্কিট হাউজে বন্দী করে রাখে।
২৮শে মার্চ সকালে কর্ণেল সরফরাজ আমাকে ইন্টারোগেশন করেন। আওয়ামী লীগের কর্মীদের কে কোথায় আছেন, স্বাধীনতা সংগ্রামে আমার সমর্থন আছে কিনা এসব প্রশ্ন করে। আমি কর্ণেলের কোন প্রশ্নের উত্তর না দেয়ায় আমাকে ভেতরের এক কক্ষে নিয়ে গিয়ে ৩ জন খান সেনা একযোগে ভীষন প্রহার করেন। তাদের প্রহারে আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। জ্ঞান ফিরে আসলে আমাকে আমার কর্ণেলের সামনে হাজির করা হয় এবং স্বাধীনতার বিরুদ্ধে বক্তব্য দেয়ার জন্যে চাপ দেয়, আমি তার প্রস্তাবে রাজী না হওয়ায় আমাকে থানায় পাঠিয়ে দেয়া হয়। ২৯শে মার্চ বেলা ১টায় আমাকে সিলেট সেন্ট্রাল জেলে পাঠানো হয়। ৫ই এপ্রিল জেলের ভেতরে থেকেই সিলেট শহরের চারিদিকে গুলির শব্দ শুনতে পাই এবং দুপুরের পর কম করে হলেও তিনবার সিলেট শহরের উপর বিমানহামলে চলে। ব্রাশের শেলের কয়েক টুকরা আমাদের কক্ষে এসে পড়ে। ৬ই এপ্রিল জেলের পূর্ব-উত্তত দিক থেকে মুক্তিযোদ্ধা ও দক্ষিন-পশ্চিম দিক থেকে পাকবাহিনীর মাঝে তুমুল লড়াই চলে। ঐদিন প্রায় ৮বার পাক বিমান মুক্তিফৌজের ওপর হামলা করে। ঐদিন জেলের সাধারন কর্মীরা বিমান হামলার ভয়ে বাইরে রাখার দাবীতে সোচ্চার হয়ে ওঠে। কতৃপক্ষের সাথে কাটাকাটি হলে গুলি ছোড়া হয়। আমাদের জেলের দিকে প্রায় ৫০ রাউন্ড গুলি ছোড়া হয়। সারারাত ধরে গোলাগুলি চলতে থাকে। আমরা সৌভাগ্যক্রমে সেদিন রক্ষা পাই।
৭ই এপ্রিল খবর পাই মুক্তিবাহিনী শহরের বেশ কিছু অংশ মুক্ত করে নিয়েছে। ২টার সময় দুজন মুক্তিযোদ্ধা আমাদের সাথে সাক্ষাত করে এবং ৫টায় সিলেটের সিরাজ সাহেব আমদের মুক্ত করে নিয়ে আসেন। সন্ধ্যা ৬টায় মানিক চৌধুরী, এম এন এ কর্ণেল রেজা, ও মেজর দত্তের সাথে মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্প পরিদর্শন করি।
৮ থেকে ১০ই এপ্রিল ডাক্তারের পরামর্শে বিশ্রামে থাকার পর আমি মৌলভীবাজার আওয়ামীলীগ নেতাদের সংগে এক সভায় মিলিত হই।
১২ই এপ্রিল নিম্নোক্ত ব্যাক্তিদের নিয়ে সিলেট জেলা প্রশাসনিক কাউন্সিল গঠন করা হয়।
১. দেওয়ান ফরিদ গাজী, এম এন এ জেলা প্রশাসক২. মোঃ ইলিয়াস, এম এন এ মৌলভীবাজার মহকুমা প্রশাসক৩. মোস্তফা আলী, এম এন এ হবিগঞ্জ মহকুমা প্রশাসক৪. মাসুদ চৌধুরী, এম এন এ সিলেট সদর মহকুমা প্রশাসক৫. জনাব আবদুল হক, এম এন এ সুনামগঞ্জ মহকুমা প্রশাসক
উল্ল্যেখ্য যে, মুজিবনগরে অস্থায়ী সরকার গঠনে প্রতিনিধিত্ব করার জন্যে সিলেট থেকে কর্ণেল রব ও মানিক চৌধুরীকে ভারতে প্রেরণ করা হয়।
১২ই এপ্রিল থেকে ২৬শে এপ্রিল পর্যন্ত সিলেট জেলার বিভিন্ন অঞ্চলে যুদ্ধ চলতে থাকে। এইসব যুদ্ধে প্রধান ঘাটি স্থাপিত হয়। এই ঘাটির দায়িত্বে ছিলেন কর্ণেল রব, কর্ণেল রেজা, মেজর সি আর দত্ত। সিলেট জেলার সংগ্রামকে ত্বরান্বিত করতে তারা এ ঘাটি থেকে সেনা পরিচালনা করতেন। শেরপুর মুক্তিবাহিনীর ঘাটির দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন বেঙ্গল রেজিমেন্টের ক্যাপ্টেন আজিজ। ২৫শে এপ্রিল রাতে ক্যাপ্টেন আজিজ আহত হলে তাকে কালীঘাট হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়। ঐদিনই শেরপুর সেক্টরের পতন ঘটে।
২৬শে এপ্রিল রাতে প্রধান সেনাপতি আতাউল গণি ওসমানী এবং ইলিয়াস সাহেবের ওপর মৌলভীবাজার সোনালী ব্যাকংকের সমস্ত টাকা নিয়ে যাবার দায়িত্ব দেন। ভারতীয় ডেমোলিশন পার্টির এক্সপ্লোসিভ দিয়ে ব্যাংকের স্ট্রং রুমের দরজা খুলতে গেলে সমস্ত রুম বিধ্বস্ত হয়। ব্যাংক থেকে ২ কোটি ৫ লাখ ৩ হাজার টাকা পাওয়া যায়। এখান থেকে প্রায় ২ কোটি টাকা আগরতলা ৯১ নং বিএসএফ হেডকোয়ার্টারে বাংলাদেশের প্রতিনিধি এম আর সিদ্দিকী ও কর্ণেল রবের মাধ্যমে মুজিবনগর সরকারের কাছে জমা দেয়া হয়। এ অভিযানে ইলিয়াস সাহেব ছাড়াও মানিক চৌধুরী ও মেজর জামান অংশগ্রহন করেন।
২৮শে এপ্রিল মৌলভীবাজার শহর পাকবাহিনীর কবলে চলে যায়।
২৯শে এপ্রিল আমরা শ্রীমঙ্গল হতে কয়েক হাজার ব্যারেল পেট্রল, ৩০লাখ সিগারেট, কয়েক হাজার মন চাউল, ২৫০টি ট্রাক্টর, ৩০০টি ট্রাক, ২০০ জীপ ও মটরকার বন্ধুরাষ্ট্র ভারতে নিয়ে যেতে সক্ষম হই।
আমি ভারতের কৈলাশ্বরে অবস্থানকালে ক্যাম্পে পৌছিয়ে দেয়া ও মুক্তিফৌজে ভর্তি করার ব্যাবস্থা করি। মুক্তিযোদ্ধাদের উৎসাহ যোগানোর জন্যে কৈলাশ্বর মুক্তিফৌজ হতে ৩৫ জন মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে আমি, মোজাফফর সাহেব ও সুবেদার চৌধুরী মাঝে মাঝে পাক বাহিনীর ক্যাম্প গুলোতে আক্রমন করতাম। কইলাশ্বরে ভগবাননগরে যুব ক্যাম্প আমি স্থাপন করি এবং মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং এর ব্যবস্থা করি।
সেপ্টেম্বর মাসে চাতলাপুর হতে মুক্তিফৌজের ক্যাম্প টিলাবাজারে স্থাপিত হয়। তখন আমাদের ৪ নং সেক্টরে দায়িত্বে ছিলেন কর্ণেল সি আর দত্ত এবং উক্ত সেক্টরের রাজনৈতিক লিয়াজো ছিলেন দেওয়ান ফরিদ গাজী। আমাকে কইলাশ্বর ও ধরমনগরের রাজনৈতিক লিয়াজো অফিসার নিয়োগ করা হয়। ইতিমধ্যে চীফ অব স্টাফ কর্ণেল রবকে চেয়ারম্যান এবং ডক্টর হাসানকে প্রশাসনিক ফইসার নিয়োগ করে হবিগঞ্জ জেনারেল কাউন্সিল গঠন করা হয়। সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদ বিহারের চাকুলিয়া ক্যাম্পে ২২ জন যুবককে আমার নেতৃতবে ট্রেনিং করার জন্যে পাঠানো হয়, আমি তাদেরকে ট্রেনিং শেষে কলকাতা হয়ে কইলাশ্বর পাঠিয়ে দেই। এ সময় আমি, মোজাফফর আহমেদ, মেজর জেনারেল কে বি কেশব রাও- এর সাথে বিভিন্ন যুদ্ধ পরিকল্পনা নিয়ে বেশ কয়েকবার আলোচনা করি। আমি প্রত্যক্ষভাবে মেরলীচড়া পাক ক্যাম্প, আলীনগর পাক ক্যাম্প, চাতলাপুর বিওপি ইত্যাদি ক্যাম্পে বিভিন্ন সময় আক্রমন করি।
২রা ডিসেম্বর মিত্রবাহিনী ও মুক্তিবাহিনী যৌথভাবে সমরেশনগরে আক্রমন করে। ভীশন যুদ্ধ হয় এবং এ যুদ্ধে মেজর গুরুমসহ বেশকয়েকজন মৈত্রীসৈন্য ও মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন।
৩রা ডিসেম্বর সকালে তৈয়াবুর রহীম এম্পি সহ আমি চাতলাপুর বিওপি ও সমরেশনগর স্কুলে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করি। এ সময় ভারতের মুক্তিছড়া থেকে মেজর আনোয়ারুজ্জামানের নেতৃত্বে ৩টি বেঙ্গল রেজিমেন্টের কোম্পানী কমলাগঞ্জের থানা হেডকোয়ার্টারে পাঠানো হয়। তাদের আমি ২০ জন গাইড সংগ্রহ করে দেই।
৪ঠা ডিসেম্বর বিকেলে সিএনসি স্পেশাল ব্যাচ ও মুক্তিযোদ্ধা সহ কড়াইয়াহাড়ি মুক্তিযোদ্ধার প্রধান ক্যাম্পে এসে যোগ দেই।
৫ই ডিসেম্বর মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে সৈয়দ মহসীন আলীর নেতৃত্বে এক কোম্পানী মুক্তিবাহিনী এসে যোগ দেয় এবং মুন্সিবাজার (কমলাগঞ্জ) পাক বাহিনীর ক্যাম্পে হানা দেয়। যুদ্ধে পাক বাহিনীর পতন ঘটে এবং পাক বাহিনী পিছু হঠতে বাধ্য হয়।
৬ই ডিসেম্বর রাজনগরের তেরকপাশা স্কুলে এক সমাবেশে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করি। ৭ই ডিসেম্বর মুক্তিফৌজের কোম্পানীকে রাজনগর থানার বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হয়।
৯ই ডিসেম্বর মৌলভীবাজার আসি। ঐদিন মৌলভীবাজারে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করা হয়। তৈয়াবুর রহীমকে মৌলভীবাজারের প্রশাসনিক দায়িত্ব দেয়া হয়।
২০শে ডিসেম্বর মৌলভীবাজার সরকারী বিদ্যালয়ে মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্পে এক দুঃখজনকি ঘটনা ঘটে। একটি মাইন বিস্ফোরনের ফলে ক্যাম্পের কমান্ডার সহ ২৩ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। সৌভাগ্যক্রমে আমি বেচে যাই।মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে কুলাউড়া থানার শরীফপুর ইউনিয়নের ১০হাজার লোকের বসতিপূর্ণ অঞ্চল মুক্ত ছিল এবং এ অঞ্চলে বাংলাদেশের নিজস্ব প্রশাসন চালানো হয়েছিল। প্রশাসনিক দায়িত্বে ছিলেন তুয়াবুর রহীম এমপি সাহেব। মুক্তিবাহিনী সবসময় এ অঞ্চলে অবস্থান করত এবং পাক বাহিনী কখনও এ অঞ্চল অধিকার করতে পারে নি।
বর্বর পাকবাহিনী যুদ্ধকালে সিলেটে অনেক নির্যাতন চালিয়েছে। শুধুমাত্র মৌলভীবাজারে স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে ৪০০ নিরীহ মানুষকে পাক-বাহিনী হত্যা করে। ৪-৫ হাজার বাড়ীঘর জ্বালিয়ে দেয়। যুদ্ধচলাকালে আমরা হারিয়েছি মুকিত, সহীদ, রানু, সুদর্শন, নরেশ, অরুন, খোকা, কাজলসহ নাম না জানা আরো অনেক বীর মুক্তিযোদ্ধাকে।
-মোহাম্মদ আজিজুর রহমান
গণপরিষদ সদস্য, (সাবেক এম, পি, এ) সিলেট
২২ অক্টোবর, ১৯৭৩
&nbsp;
&nbsp;
<a href=”https://www.facebook.com/sanjana.shaibal”>সানজানা এস পায়েল</a>
&lt;১৫,২৯,২৩২&gt;<h1>[মোহাম্মদ আবদুর রব, মেজর জেনারেল অবসরপ্রাপ্ত]</h1>স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হলে আমি এতে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহন করি। ১০ই এপ্রিল ভারতে যাই এবং আগরতলা অবস্থান করি। ইস্টার্ন জোনের এক থেকে চারটি সেক্টরের দায়িত্ব আমাকে দেয়া হয়। এখানে মুক্তিবাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেয়ার ব্যবস্থা করি। ভারতে জেনারেল মানেক শা, জেনারেল অরোরা, জেনারেল গিল, জেনারেল সরকার, জেনারেল কালকাট প্রমুখ অফিসারদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করি। ৭ই মে তারিখে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাত করি। প্রধানমন্ত্রী আমাদের সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দেন। আমি মুক্তিবাহিনী ইপিআর-দের নিয়ে সিলেটের বিভিন্ন অঞ্চলে অপারেশন চালাই। হবিগঞ্জ থেকে শুরু করে শ্রীমঙ্গল, মৌলভীবাজার, শমসের নগর, শেরপুর, সিলেট প্রভৃতি স্থানে প্রতিরধ ব্যবস্থা গড়ে তুলি। পাক বাহিনীর সঙ্গে আমাদের সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষে আমাদের দু’জন সৈন্য শহীদ হয়। অন্যদিকে পাক বাহিনীর ১৫/২০ জন সৈন্য মারা যায়।
&nbsp;
পাক বর্বর বাহিনী মাখালকান্দি, জিলুয়া, কাটাখালী, আরিয়ামুগুর, বদরপুর, রাজেন্দ্রপুর, রুমিয়া প্রভৃতি গ্রাম আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়। তারা মাখালকান্দি গ্রামটি প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়। পাক বাহিনী আমার এলাকায় প্রায় ৫০০ জন লোককে হত্যা করে। শুধুমাত্র মাখালকান্দিতেই ৩০০ জনকে হত্যা করা হয়। প্রায় ১০/১৫ জন নারীকে পাক বর্বররা ধর্ষণ করে। তাছাড়া পাক বাহিনী ক্যাম্পে নিয়ে গিয়েও অনেক লোকের উপর পাশবিক অত্যাচার চালায়।“
-আবদুর রব, মেজর জেনারেল (অবঃ)গণপরিষদ সদস্য, (সাবেক এম,পি,এ),
সিলেট ৩১ অক্টোবর, ১৯৭২।
&nbsp;
&nbsp;
<a href=”https://www.facebook.com/alamin.sorkar.7161″><strong>আলামিন সরকার</strong></a>
&lt;১৫,৩০,২৩২-৪৪&gt;<h1>[অধ্যাপক ইউসুফ আলী, অধ্যাপক]</h1>&nbsp;
১৯৬৫ সালের ৬ই সেপ্টেম্বর। বঙ্গবন্ধু এভিনিউ (তদানীন্তন জিন্নাহ এভিনিউ) -এর আলফা ইনস্যুরেন্স অফিসের দোতলায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের খাস কামরায় বসে আছি। আরো আছেন রাজশাহীর জনাব কামারুজ্জামান এম, এন, এ সাহেব এবং বেশ কয়েকজন আওয়ামী লীগ কর্মী। মধ্যমণি বঙ্গবন্ধু নিজে। আলোচ্য বিষয় দলীয় রাজনীতি থেকে শুরু করে দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থা। হালকা পরিবেশ। বেলা তখন প্রায় ১০টা। টেলিফোন বেজে উঠলে শেখ সাহেব ধরলেন। তার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখি অত্যন্ত উত্তেজিতভাবে আলাপ করছেন। প্রায় ২/৩ মিনিট পরে ফোন ছেড়ে দিয়ে বললেন, এপিপি থেকে ফোন এসেছিলো। ভারত পাকিস্তান আক্রমণ করেছে। ভারতীয় সেনা লাহোর শহরের উপকণ্ঠে শালিমার বাগান পর্যন্ত এসেছে এবং এর সঙ্গে অন্যান্য ফ্রন্টেরও কিছু কিছু প্রাথমিক খবর। তিনি বললেন, পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে সব রকমের যোগাযোগ বন্ধ। কিছুক্ষণ কি যেন ভাবলেন তারপরেই বলে উঠলেন ‘দেশটাকে বাঁচানো যায়’। একটা বড় সুযোগ এসে গেছে। ‘আমরা যদি স্বাধীনতা ঘোষনা করে দেই’ বলে তিনি কিছুক্ষন থামলেন। যাহোক, তিনি খুবই উত্তেজিত অথচ পরিবেশটা এই আলোচনার উপযুক্ত নয়। হেনা ভাই (কামারুজ্জামান) আমার চোখের দিকে তাকালেন। ইতিমধ্যে শেখ সাহেব বাথরুমে গেছেন। তিনি বললেন যে, নেতা খুবই উত্তেজিত, কথাবার্তা অসংলগ্ন হচ্ছে। তাকে এখান থেকে সরাতে হবে। শেখ সাহেব ফিরে আসার সঙ্গে সঙ্গে হেনা ভাই এবং আমি উঠে দাড়িয়ে তাকে প্রায় একরকম জোর করে নিচে নিয়ে এলাম। টিপ টিপ বৃষ্টি পড়ছে। তার জিপে ৩২ নম্বর রোডের বাড়ীতে এসেই তাজউদ্দিন সাহেবকে ফোনে ডেকে পাঠালেন। তিনি এলেন। আমরা মোট চারজন। তাকে আমরা তিনজনই বুঝাতে চেষ্টা করলাম আপনার কথা আমরা বুঝতে পেরেছি কিন্তু এরকম একটা কাজ করতে যাওয়ার আগে অনেকগুলো দিক খুবই গুরত্ব সহকারে চিন্তা করতে হবে। তবে মনে হয় এখন তার উপযুক্ত সময় নয়। দেশবাসী এটার জন্য প্রস্তুত নয়। এটাই বঙ্গবন্ধুর নিকট প্রকাশ্যে স্বাধীনতার কথা আমি প্রথম শুনতে পাই।
১৯৬৬ সাল। পাক-ভারত যুদ্ধের পরবর্তী অবস্থা। ভারতের উপর দিয়ে পাকিস্তানের দুই অংশের চলাচল বন্ধ। শ্রীলংকা ঘুরে বিমান ঢাকা-করাচী সংযোগ রক্ষা করছে। ২রা এপ্রিল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নেতৃত্বে আমরা মোট ৬ জন যাচ্ছি লাহোরে একটি জাতীয় সম্মেলনে যোগদান করতে। তাসখন্দ ঘোষণার পর পশ্চিম পাকিস্তানের বিরোধীদলীয় নেতারা ডেকেছেন এই সম্মেলন। আলোচ্য বিষয় তাসখন্দ ঘোষণা জাতীয় স্বার্থকে মারাত্মকভাবে জলাঞ্জলি দিয়েছে। আমাদের জোয়ানরা যুদ্ধক্ষেত্রে যে জয়লাভ করেছিলো আইউব খাঁ আলোচনার টেবিলে তা লাল বাহাদুর শাস্রীকে দিয়ে দিয়েছেন। যাহোক আমরা শ্রীলংকা ঘুরে সকালের দিকে করাচী গিয়ে পৌঁছলাম। বিমান বন্দরে হাজার হাজার বাঙালি বঙ্গবন্ধু ও এবং তার দলকে অভ্যর্থনা জানালো। দলের মধ্যে (১) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব, (২) তাজউদ্দিন আহমেদ, (৩) আব্দুল মালেক উকিল, (৪) আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ নূরুল ইসলাম চৌধুরী, (৫) এবিএম নূরুল ইসলাম এমএনএ এবং (৬) আমি নিজে। সব বাঙালির একটাই প্রশ্ন ‘মুজিব ভাই’, আমাদের বাঙালীদের কি হবে’। তিনি সবাইকে দুশ্চিন্তা করতে নিষেধ করে বললেন, “দেখ বাঙালি জাতির দাবি তো ন্যায্য দাবী। আমরা পথ খুঁজে পাবই”।
আমরা গিয়ে উঠলাম মরহুম হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর কন্যা আখতার সোলায়মান বেবীর বাসা বিখ্যাত ” লাখাম হাউসে”। সেখানেও সারাদিন বহু লোকের আনাগোনা। বাঙালী-অবাঙালী নির্বিশেষে। সবারই একই প্রশ্ন এই সংকট উত্তরণের পথ কি? এর মধ্যে দুপুরের আহারের পর শেখ সাহেব আমাদের কয়েকজনকে নিয়ে দরজা বন্ধ করে বসলেন এবং বললেন আমাদের নিজেদের মধ্যে কিছু জরুরী আলোচনা আছে। তারপর তিনি সঙ্গে নিয়ে আসা ‘৬ দফার’ কাগজপত্র ব্যাগ থেকে বের করলেন। আমরা পড়লাম। তিনি আমাদের বিশদ বুঝানোর চেষ্টা করলেন। দীর্ঘ আলোচনার পর আমি বললাম, ‘আপনি আমাদের নেতা, বহু দিক বিবেচনা করার পর আপনি এই ৬ দফা প্রনয়ণ করেছেন এবং দেশবাসীর সামনে তা দিতে যাচ্ছেন। মনে হয় পশ্চিম পাকিস্তান বিশেষ করে পাঞ্জাব এই ৬ দফা মানবে না”। আমি এর কারণ বিশ্লেষণ করে বলার চেষ্টা করলাম, “এই ৬ দফা যদি অমননীয় হয় তাহলে এটা সরাসরি এক দফার দিকেই চলে যাবে, আমরা কী এর জন্য তৈরী হয়েছি”? প্রায় সবাই একই মত প্রকাশ করলাম। তাজউদ্দিন ভাই মুচকি মুচকি হাসছিলেন। জানি না নেতার সঙ্গে পূর্বে তার এ সম্পর্কে আলোচনা হয়েছে কি-না। বঙ্গবন্ধু অনেক দিক দিয়ে বিষয়টির উপর আলোকপাত করে বললেন, ” আজ হোক কাল হোক পূর্ব পাকিস্তানকে একদিন আলাদা হতেই হবে। এরকম কৃত্রিম ভৌগোলিক অবস্থান, আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ভিন্ন অবস্থা নিয়ে দুটো অংশ কতকাল দাড়িয়ে থাকবে। এটা সত্য কথা যে, আমরা দেশবাসীকে এখনো তৈরী করার কাজে হাত দেইনি। তবে বাঙালীরা অত্যন্ত রাজনীতি সচেতন। সংগঠনের মাধ্যমে তা করা যাবে। এরপর লাহোরের সম্মেলন সম্পর্কে আলোচনা হলো এবং আমরা কোন লাইন গ্রহণ করবো তাও তিনি জানিয়ে দিলেন।
এর পরের কথা- পরদিন আমরা লাহোরে গেলাম সরাসরি সম্মেলনস্থলে চৌধুরী মোহাম্মদ আলীর বাসভবনের সামনের বিরাট লনে এই সম্মেলনের আয়োজন। নেতাকে আন্তরিকতার সঙ্গে অভ্যর্থনা করা হলো। আমরা বসলাম। সম্মেলন তখনো শুরু হয়নি। সময় সকাল ৯টা ৩০মিনিট। সাবজেক্ট কমিটির সভা শুরু হবে। বঙ্গবন্ধু মালেক ভাইকে পাঠালেন সাবজেক্ট কমিটির সভায়। তিনি সেখানে বক্তব্য রাখলেন- এটা যেহেতু জাতীয় সম্মেলন সেহেতু জাতীয় সমস্যাগুলি আলোচনার মাধ্যমেই এখানে প্রতিফলিত হবে। তাসখন্দ ঘোষনা ছাড়াও পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, বন্যা, অর্থনৈতিক শোষণ, চাকুরীক্ষেত্রে চরম বৈষম্য, মারাত্মক বেকার সমস্যাগুলি আমাদের জাতীয় সমস্যা এবং এগুলো এই সম্মেলনে আলোচিত হবে। তাছাড়া পশ্চিম পাকিস্তানের বেলুচিস্তান, সিন্ধু এবং সীমান্ত প্রবেশেরও অনেক সমস্যা আছে। সেগুলোও কেনো এখানে আলোচনা করা যাবে না!
কিন্তু চৌধুরী মোহাম্মদ আলীর যুক্তি হলো- এতগুলো সমস্যা আলোচনা করতে গেলে মূল আলোচ্য বিষয়(তাসখন্দ ঘোষণা) গুরুত্বহীন হয়ে পড়বে। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের কোনো সমস্যারই আলোচনা হবে না।
এই কথার পর আওয়ামী লীগের অনমনীয় মনোভাবের ফলে সাবজেক্ট কমিটিতে হৈচৈ শুরু হয়ে যায়। এমতাবস্থায় আওয়ামী লীগের পক্ষে ওয়াক আউট করা ছাড়া গত্যন্তর ছিলো না। সম্মেলন ত্যাগের প্রাক্কালে বঙ্গবন্ধুর ৬ দফার কাগজপত্র আমাদের হাতে দিলেন বিলি করার জন্য। বিখ্যাত ৬ দফা এভাবেই লাহোরে প্রথম জনগণের হাতে গিয়ে পৌঁছলো। সম্মেলনস্থলের অনতিদূরে মালিক গোলাম জিলানী সাহেবের বাসায় আমাদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছিলো। আমরা সম্মেলন থেকে বেরিয়ে আসার পর প্রায় ৩/৪ শত পশ্চিম পাকিস্তানী, অবশ্য অধিকাংশই আমাদের আওয়ামী লীগ কর্মী আমাদের ধাওয়া করে। আমরা দ্রুত জিলানী সাহেবের বাসায় পৌঁছলাম। মালিক জিলানী এবং আজম খান এই দুজন শেখ সাহেবের দুই পাশে দেহরক্ষীর কাজ করেছিলেন।
জিলানী সাহেবের বাসায় পৌঁছার পর আর এক দৃশ্য। আসোলে আমরা সকাল থেকে কেউই চা নাস্তা করিনি। অনেক সকালে উঠে করাচী বন্দরে ছুটতে হয়েছিলো লাহোরগামী বিমান ধরার জন্য। আমরা পাশের ঘরে চা খাচ্ছি তখন ভীষণ গোলমালের শব্দ কানে আসে। ব্যাপার কি? জিলানী সাহেব এসে বললেন ৩/৪ শত লোক এসেছে বঙ্গবন্ধুর কাছে। তাদের প্রশ্ন আপনি এত বড় একটা সম্মেলন কেনো বানচাল করে দিলেন এবং এর দ্বারা আপনি বিরোধী দলগুলির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে সম্মেলন নষ্ট করে পরোক্ষভাবে কেনো আয়ুব খানকেই সাহায্য করলেন। তারা খুবই উত্তেজিত, বিক্ষুদ্ধ এবং বিশৃঙ্খল ছিলো। পরে অবশ্য তিনি সবার বক্তব্য শোনার পর তার বক্তব্য দিলেন। এক ঘন্টাব্যাপী এই বক্তব্যে পূর্ব পাকিস্তানে এবং সিন্ধু, বেলুচিস্তান এবং সীমান্ত প্রদেশে নিপীড়িত বঞ্চিত দরিদ্র জনগণের যে করুণ এবং মর্মান্তিক কাহিনী ব্যক্ত করলেন তা শুনে অনেকেই কেঁদে ফেললেন। বিশেষ করে বেলুচিস্তান এবংসীমান্তের কিছু নেতা বঙ্গবন্ধুকে জড়িয়ে ধরে বললেন, তুমি ঠিকই বলেছো। তুমি শুধু পূর্ব পাকিস্তানের নেতা নও, আমাদেরও নেতা। আমাদের কথা কেউই তো সাহসের সাথে এমন করে কোনদিন বলেনি। তারপরও তিনি ৬ দফার উপর সাংবাদিক সম্মেলন করেছিলেন। অবশ্য পশ্চিম পাকিস্তানের পত্রিকাগুলিতে ৬ দফা নিয়ে ঝড় উঠতে শুরু করলো।
১৯৬৬ সালের জাতীয় সম্মেলনের শীতকালীন অধিবেশন বসেছে ঢাকায়। আমার একটা প্রস্তাব(Resolution) গৃহিত হলো আলোচনার জন্য। বিষয়বস্তু ‘পূর্ব পাকিস্তানের জন্য পৃথক আমদানী নীতি'(Separate Import policy for East Pakistan)। আমি পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের কৃষি, শিল্প বাণিজ্যের উপর তুলনামূলক আলোচনা করে দেখানোর চেষ্টা করলাম যে, দুই অঞ্চলের অবস্থা বিশেষ করে বললাম দুই রোগীর জন্য একই প্রেসক্রিপশন চলতে পারে না। এর উপর আলোচনার ঝড় উঠলো। আর তার চেয়েও বেশী ঝড় উঠলো পশ্চিম পাকিস্তানের সংবাদপত্রগুলোতে। Pakistan Times তো সম্পাদকীয়তে বলেই ফেললো, অধ্যাপক ইউসুফ আলী আওয়ামী লীগের লোক। আওয়ামী লীগ ৬ দফার মাধ্যমে দেশকে দ্বিখন্ডিত করতে চায় এবং এই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই আমি এই প্রস্তাব উত্থাপন করেছি। প্রস্তাবটি ভোটে হেরে গেলেও আমরা পূর্ব পাকিস্তানের করুণ অবস্থা তুলে ধরার চেষ্টায় মোটামুটি সফল হয়েছি। এমনকি পশ্চিম পাকিস্তানের নেতা গাউস বক্স বেজেঞ্জা, খায়ের বক্স মারী, আতাউল্লাহ খান মেঙ্গল সহ বেশ কয়েকজন পশ্চিম পাকিস্তানী এমএনএ এই কথা স্পষ্ট করে আমার কাছে বলেছেন যে, ইনসাফ কায়েম করতে না পারলে চিরদিনের জন্য একটা জাতিকে এভাবে রাখা সম্ভব নয়।
এরপর আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামী হিসেবে শেখ মুজিব যখন ঢাকা সেনানিবাসে আটক তখন আমরা কয়েকজন প্রত্যেকদিন তার সাথে দেখা করতে যেতাম। অফিসার্স মেসে দেখা সাক্ষাৎ ও কথাবার্তা হতো। কর্নেল এ,বি নাসেরের উপরে দ্বায়িত্ব ছিলো আমাদের মেহমানদারীর। সেখানে প্রায় দিনই নাসেরও আলোচনায় অংশগ্রহণ করতো। শেখ সাহেব বলতেন, নাসের! দেখো, মামলায় আমার কি হবে জানি না কিন্তু একটা কথা তোমাকে বলছি। দেশের দুই অংশের সম্পর্কটাকে তোমরা এত বেশী নাজুক করে তুলেছো যে যত বেশী টানবে তত শীঘ্র ছিড়ে যাবে।
১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনের পর ১৯৭১ সালের গোড়ার দিকে আওয়ামী লীগ পার্লামেন্টারী পার্টির নির্বাচনে আমি পার্টির চীফ হুইপ হই। অন্য দুইজন ছিলেন জনাব আব্দুল মান্নান এবং ব্যারিষ্টার আমিরুল ইসলাম। ৩রা মার্চ থেকে পরিষদের অধিবেশন শুরু হবে। স্বভাবতই চীফ হুইপ হিসেবে পরিষদ ভবনে সংসদ সদস্যগণের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থাপনার ব্যাপারে আমি খুবই ব্যস্ত। ইতিমধ্যে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে কিছু সংসদ সদস্য ঢাকায় পৌঁছে গেছে। ফেব্রুয়ারী মাসের শেষের দিকে নেতা আমাকে তার ৩২ নম্বর রোডের বাড়ীতে ডেকে পাঠালেন। ঐ বাড়ীতে সব সময় লোকজনের অসম্ভব ভীড়। আমি আসার পরেই গাজী গোলাম মোস্তফা আমাকে বঙ্গবন্ধুর লাইব্রেরী রুমে পৌঁছে দিলেন। সেখানে দরজা বন্ধ রেখে বঙ্গবন্ধ আরেকজনের সাথে নিচুস্বরে আলাপ করছিলেন। আমি ঢুকতেই তিনি গাজী সাহেবকে দরজা বন্ধ করে দিয়ে চলে যেতে বললেন। তার সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললেন, ইনি হলেন আলী সাহেব। কোলকাতায় আমাদের ডেপুটি হাইকমিশনার। তাদের মধ্যে যা আলোচনা হবার তা পূর্বেই হয়ে গিয়েছিলো। তিনি সালাম জানিয়ে চলে গেলে নেতা আমাকে বললেন, বিভিন্ন মহলের সাথে আলাপ আলোচনা করে মনটা খারাপ হয়ে যাচ্ছে। মনে হয় ওরা সবকিছু সহজভাবে এগিয়ে যেতে দিবে না। হয়তো একটা চরম পরিণতির দিকেই আমরা অনিবার্যভাবে এগিয়ে যাচ্ছি। সেই জন্যই আমি হোসেন আলী সাহেবকে ডেকে পাঠিয়েছি। যদি সেরকম একটা অবস্থার উদ্ভব হয় তার চিন্তা ভাবনা এবং ব্যবস্থা তো আগে থেকে কিছু করে রাখতে হবে। তারপর তিনি আমাকে অন্যান্য প্রস্তুতি কতদূর কি হলো জানতে চাইলে আমি তাকে গৃহিত ব্যবস্থাদি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল করলাম।
২৪শে মার্চ সকাল ৬টা। বাসার টেলিফোন বেজে উঠলো। দিনাজপুর সদর এসডিও আবদুল লতিফ সাহেব অত্যন্ত উত্তেজিত কণ্ঠে জানালেন সৈয়দপুরে দাঙ্গা শুরু হয়ে গেছে। বাঙালিদের মেরে শেষ করে দিচ্ছে।
এর কয়েকদিন আগে থেকেই গোটা দেশে একটা থমথমে ভাব। একদিকে আইন অমান্য আন্দোলন অন্যদিকে আলোচনা চলছিল বঙ্গবন্ধু ও ইয়াহিয়া খানের মধ্যে। উত্তেজিত ফেটে পড়ছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে হঠাৎ সৈয়দপুরে বাঙালি বিহারীদের মধ্যে দাঙ্গা হাঙ্গামা শুরু হলে তা আমাদের ইস্পিত লক্ষ্যকে আরো দূরে ঠেলে দিবে। আমি ফোন করলাম জিলা আনসার কমান্ডার শরীফুল ইসলাম সাহেবকে। তাকে বললাম রাইফেল ক্লাবে কি কি অস্র এবং গুলি আছে তা খুব তাড়াতাড়ি বের করে আনুন। বেশ কয়েকটি রাইফেল এবং কয়েক কার্টন গুলি নিয়ে এসডিও সাহেবের জীপে এগিয়ে চললাম সৈয়দপুরের দিকে। সৈয়দপুরের কাছাকাছি যাওয়ার পর স্থানীয় জনগণ আমাদের জানালো যে আসলে বাঙালি বিহারী দাঙ্গা নয়। সেনানিবাসের মিলিটারীরা সাদা পোশাকে বাঙালিদের নির্বিচারে হত্যা করেছে এবং ইতিমধ্যে তারা আওয়ামী লীগের ভাইস প্রেসিডেন্ট মাহতাব বেগ, তার পুত্র এবং আরো অনেক লোককে গুলি করে হত্যা করেছে। বুঝলাম উচ্চতর মহলে যতই আলোচনা চলুক আসোলে মিলিটারীরা দেশে একটি বিশৃঙ্খলা ও জঙ্গী পরিবেশ সৃষ্টি করতে চায় বা দেশকে আর্মি এ্যাকশনের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
দিনাজপুরে ফিরেই টেলিফোনে শেখ সাহেবের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম। তাকে ব্যাপারটা জানালে তিনি বললেন ওরা ইচ্ছাকৃতভাবে এসব করছে আলোচনা পন্ড করার জন্য। যাহোক তোমরা চেষ্টা করো যাতে সৈয়দপুরের অবস্থা দিনাজপুরে সংক্রমিত না হয়। আমি প্রতিদিনই ঢাকায় তার সাথে যোগাযোগ করে জানবার চেষ্টা করতাম আলোচনার অগ্রগতি এবং ঢাকার অবস্থা। সেদিন জানতে চাইলে তার মনের হতাশা কিছুতেই চাপা থাকলো না।
২৪ এবং ২৫শে মার্চ সারাদিন আমরা কয়েকজন মিলে দিনাজপুর শহরের বিহারী এলাকাগুলো ঘুরে ঘুরে তাদের বুঝাতে চেষ্টা করলাম যেনো বাঙালি-বিহারী সম্প্রীতি কিছুতেই ক্ষুন্ন না হয়। ২৫শে মার্চ বিকেলে ইপিআর সেক্টর কমান্ডার তারেক রসুল কোরেশীর সাথে ফোনে আলাপ করলাম। তিনি বললেন, আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করছি অবস্থা শান্ত এবং নিয়ন্ত্রণ রাখার জন্য।
২৫শে মার্চ সন্ধ্যার পর আমি বাসা থেকে বেরোচ্ছি আওয়ামী লীগ অফিসে যাওয়ার জন্য। হঠাৎ বাইরের ঘরে ফোন বেজে উঠলো। ফোন ধরতেই বঙ্গবন্ধুর সেই ভারী গলা। তিনি দিনাজপুরের অবস্থা জানতে চাইলে সংক্ষেপে জানিয়ে বললাম ঢাকার কি অবস্থা। তিনি বললেন, মাথা ঠান্ডা রেখে কাজ করো। আরেকবার ঢাকার কথা জানতে চাইলে তিনি আবার বললেন ‘সতর্কতার সাথে সিদ্ধান্ত নিয়ে এগিয়ে যাবে’। এটা বলেই ফোন ছেড়ে দিলেন। অন্যান্য দিন অন্তত দ’এক কথায় ঢাকার অবস্থা তিনি জানাতেন কিন্তু আজ কেনো জানি কিছুই বললেন না ভেবে মনটা আশংকায় দুলে উঠলো। এরপর আওয়ামী লীগ অফিসে কয়েকজন বসে আছি। অনিশ্চিত ও থমথমে অবস্থা। একটু আগেই নিউ টাউন থেকে ফিরেছি। সেখানকার অবাঙালী নেতাদের খুব উদ্ধত মনে হলো অথচ ইতিপূর্বে কতই না বিনয়ের সাথে আমার সঙ্গে বরাবর ভালো ব্যবহার করেছে। যাহোক, রাত তখন ঠিক ১২টা ৩ মিনিট। হঠাৎ গুলির শব্দ। কখনো মনে হয় নিউ টাউন জিলা স্কুলের দিকে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই গুলির শব্দ আরো প্রবল হলো। আওয়ামী লীগ অফিসে থাকাটা আমরা নিরাপদ মনে করলাম না। সবাই আপন আপন বাড়ীর দিকে দ্রুত রওয়ানা হলাম। বাসায় এসে মোটর সাইকেলটা রেখে টেলিফোনের কাছে এলাম। ভাবলাম এসপি’র কাছ থেকে জানার চেষ্টা করি প্রকৃত ব্যাপারটা কি। ফোন তুলেই দেখি লাইন কেটে দেয়া হয়েছে। হতভম্ব হয়ে গেলাম। আস্তে আস্তে থানার দিকে পায়ে হেটে এগিয়ে গেলাম। অতিরিক্ত এসপি,কে পেলাম। তিনিও বিশেষ কিছু বলতে পারলেন না। শুধু এইটুকু বললেন, মিলিটারীরা ট্রাকে করে বেরিয়ে এলোপাতাড়ি গুলি করে বেড়াচ্ছে। এমনকি জিলা স্কুলের কাছে রাত্রিকালীন পাহারারত পুলিশের গাড়ীর দিকেও লক্ষ্য করে গুলি ছুড়েছে। পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি!! আরো ধাঁধায় পড়ে গেলাম।
বড় অস্বস্তির মধ্যে ঘুমহীন রাত কেটে গেলো। ভোর রাতে আজানের পরপরই মাইকে প্রচার শুনলাম বেলা ১১টা থেকে কারফিউ। দিনটা ছিলো শুক্রবার।
সকাল সাড়ে সাতটার সময় বারান্দায় বসে আছি। এমন সময় ডিসির একজন পিয়ন সালাম জানিয়ে আমার হাতে একটা স্লিপ দিলো। তাতে ডিসি (ফয়েজউদ্দিন সাহেব) লিখেছেন আমার বাসায় আমার সঙ্গে চা খেলে আমি খুব খুশি হবো। আমি ৮টার দিকে বাসা থেকে বেরিয়ে গেলাম। ইতিপূর্বে ভোর বেলায় আমার মা বলেন যে, তিনি রাতে খুবই খারাপ স্বপ্ন দেখেছেন। রাস্তায় রাস্তায় কুকুর মানুষের লাশ ছিড়ে খাচ্ছে। সুতরাং সবাইকে নিয়ে তখুনি গ্রামের বাড়ি চলে যেতে চান। কিন্তু এই অবস্থায় আমি কি করে যাই। তাই আমি, আমার স্ত্রী ও কনিষ্ঠ মেয়েটি বাদে বাসার সকলেই গ্রামের বাড়িতে চলে গেলো।
বাসা থেকে বেরিয়ে থানার কাছে গিয়ে ওসিকে বললাম ডিসি’র বাংলোয় যেতে হবে কিন্তু যানবাহন তো নেই। এমনিতেই শুক্রবার দোকান-পাট বন্ধ, তার উপর কারফিউ ঘোষণা। এমন সময় অতিরিক্ত এসপি গাড়ী নিয়ে থানায় ঢুকলেন। তিনি বললেন, আমার মনটা কিন্তু সায় দিচ্ছে না যে আপনি ডিসি’র বাংলোয় যান। কারণ পাশেই সার্কিট হাউস। মিলিটারীদের অস্থায়ী হেড অফিস। দেখাই যাক না কি হয় এই মনে করে তার গাড়িতে আমাকে পৌঁছে দেয়া হয়। ডিসি’র বাংলোর গেট বন্ধ, পাশের সার্কিট হাউজের গেট খোলা। গাড়ি থেকে নামার সঙ্গে সঙ্গেই গেটের পাহারাদার সৈনিক এমন অভদ্র এবং কর্কশভাবে আমাদের অভ্যর্থনা করে ভিতরে নিয়ে গেলো যাতে আমার মনটাই খারাপ হয়ে গেলো। গাড়ি বারান্দায় বেশ কয়েকজন মিলিটারী অফিসার। এক পাশে ডিসি। তিনি এগিয়ে এসে আমার সাথে হাত মিলিয়ে শান্ত স্বরে বললেন আপনি কেনো এলেন? বলেই মুখ ফিরিয়ে আরেকদিকে চলে গেলেন। আশ্চর্য ব্যাপার! পরে অবশ্য ডিসি আমাকে বলেছিলেন যে অস্ত্রের মুখে তিনি স্লিপটা লিখে আমার কাছে পাঠিয়েছিলেন। একটু পরে আরো ২/১ জন আওয়ামী লীগ নেতা আসলো। লেঃ কঃ তারেক রসুল আমাদের নিয়ে বসলেন। তাকে সাহায্য করলেন মেজর তারিক আমিন। কোরেশী আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ঢাকায় আপনাদের শেখ সাহেব প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আলাপে রয়েছেন। আলাপের ফলাফল যাই হোক না কেনো, ইতিমধ্যে দেশের বৃহত্তম স্বার্থেই সামরিক আইন জারী করা হয়েছে। আমি আপনাকে বলছি, আপনার লোকজনকে জানিয়ে দিন, তারা যেন আমাদের সাথে সহযোগীতা করেন। বলেই তিনি অন্যান্যদের চলে যেতে বললেন কিন্তু আমাকে থাকতে বললেন। মিলিটারী অফিসাররা সবাই উঠে চলে গেলে আমি একাই চুপচাপ বসে আছি। পরিস্থিতিটা ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না। আমাকে থাকতে বললেন কি আরো কিছু আলাপ করার জন্য নাকি চা খাওয়ানোর জন্য। এই মেজর আর কর্নেল যে কতদিন আমার বাসায় চা খেয়েছে, কত সহজ ব্যবহার করেছে অথচ আজকের ব্যবহারের সঙ্গে তার কত প্রভেদ। আজকে মনে হচ্ছে তারা যেন চিনেই না।
যাক, তখন প্রায় সাড়ে দশটা বাজে। ১১টা থেকে কারফিউ। কারো কোনো পাত্তাই নেই। ভাবছি উঠে চলেই যাব কিনা। একবার উঠেই দাড়ালাম অমনি দরজায় স্টেনগান হাতে দাঁড়িয়ে থাকা সৈনিকটি ভাঙা গলায় হুকুম করলো “বয়ঠো”। কি মুশকিল! তার মিনিট পাঁচেক পরে কোরেশী এসে বললো, “আপনি বাসায় চলে যান। বাসাতেই থাকবেন”। তাকে বললাম ১১টা বাজতে মাত্র কয়েক মিনিট বাকী, রিকশা পাবার কোনো আশা নেই। দয়া করে তোমার গাড়িতে করে আমাকে বাসায় পৌঁছে দিলে বলতেই সরি বলে মুখ ফিরিয়ে চলে গেলো। ব্যবহার দেখে তো আমার অবাক হবার পালা। আমি দ্রুত বেরিয়ে হেটে বাসার দিকে রওয়ানা হলাম। পরে ক্যাপ্টেন নজরুলের কাছে সমস্ত ব্যাপারটা শুনেছি। নজরুল বাঙালী। তিনি পাশের ঘরেই অসুস্থ বলে মুখে কাপড় ঢেকে শুয়ে ছিলেন। ঘটনাটি ছিলো আমাকে নিয়ে কি করা হবে। ৪/৫ জন মিলিটারী অফিসার কিছুতেই একমত হতে পারছিলো না। মেজর জিলান নামে একজনের মত ছিলো ঝামেলা করে লাভ নেই। এখন রেখে দিয়ে রাতে শেষ করে দেয়া হোক। কর্নেল তারেক রসুল কোরেশীর মত ছিলো সৈয়দপুরের সেনানিবাসে পাঠিয়ে দেয়া হোক। যা করার সেখানেই আজকে রাতের মধ্যে করা যাবে। অথচ ইনিই আমার বাসায় চা খেয়েছিলেন সবচেয়ে বেশী! শুধু মেজর তারিক আমিনের মত হলো আমরা তার সম্পর্কে যখন কোনো সুনির্দিষ্ট নির্দেশ পাই নি, তাই এখন অন্য কিছু না করে বাসায় অন্তরীণ করে রাখা হোক (অথচ কয়েকদিন আগে ছাত্রদের একটা মিছিলের ব্যাপারে তার সঙ্গে আমার প্রচন্ড বাদানুবাদ হয়েছিলো)। লেঃ দুররানী নামে একজন অফিসার তাকে সমর্থন করে এবং এই দুররানীকেই দ্বায়িত্ব দেয়া হয় আমাকে পাহারা দেয়ার জন্য।
বাসায় আছি। কারফিউ। টেলিফোন লাইন বিচ্ছিন্ন। সামনে দিয়ে কয়েক মিনিট পরপর মিলিটারী টহল। একটা অসহ্য অবস্থা। এর মধ্যেও যতটুকু সম্ভব আওয়ামী লীগ সহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতৃবন্দের সঙ্গে যোগাযোগের প্রচেষ্টা চালাতে লাগলাম। আমি বিশেষ করে মরিয়া হয়ে চেষ্টা করলাম ইপিআর’এর সুবেদার মেজর রউফের সঙ্গে যোগাযোগ করতে। কারণ বেশ কয়েক মাস বিশেষ করে নির্বাচনের পর থেকেই তার সঙ্গে আমার বহু গোপন বৈঠক হয়েছে। ইপিআর-এ যদিও কিছু বাঙালি অফিসার ছিলো কিন্তু কেন যেন আমি তাদেরকে ঠিক বিশ্বাস করতে পারিনি। সেই কারণে সুবেদার মেজর রউফ এবং তার মাধ্যমে দিনাজপুর ও রংপুর একই সেক্টরের অধীনে ছিলো এবং দিনাজপুর ছিলো সেক্টর হেড কোয়ার্টার। এই অবস্থাতেই বাসার পেছনের দিক দিয়ে বেরিয়ে অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়ে মাড়োয়ারী পট্টিতে এক বাসায় তার সাথে আমার সংক্ষিপ্ত আলাপ হলো। আমি শুধু জানতে চাইলাম আমাদের পূর্বপরিকল্পনা ঠিক আছে কিনা এবং সেই মোতাবেক কাজ করতে কোনো বিশেষ অসুবিধা আছে কিনা। তিনি জানালেন সব ঠিক আছে। তখন সময় ২৬শে মার্চ রাত ৯টা। সিদ্ধান্ত হলো ২৮শে মার্চ দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে আমরা আমাদের কাজ শুরু করবো। ইতিমধ্যে আমার করণীয় সম্পর্কেও তিনি আমাকে স্মরণ করিয়ে দিলেন। আমার কাজ ছিলো দিনাজপুর জিলার পশ্চিম সীমান্তের ইপিআর ফাঁড়ি থেকে বাঙালি ইপিআর-দের উপরোক্ত সময়ের পূর্বেই এক জায়গায় জমায়েত করা। বাসায় ফিরেই আমার স্ত্রীকে বললাম আমাদের দু’জনের একসঙ্গে পালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয় অথচ আমাকে যথাশীঘ্র সম্ভব বাইরে চলে যেতে হবে।
&nbsp;
সকাল হলো। বাইরের রাস্তায় মিলিটারী টহল। আমি বেলা ৯টার দিকে আমার স্ত্রী এবং ছোট বাচ্চাকে আল্লাহর হাতে সঁপে দিয়ে বাসার পিছনের প্রাচীর টপকে রাস্তায় একটা রিকশা নিলাম। রিকশা দ্রুত চালাতে বললাম। প্রথমে যেতে বললাম মুন্সিপাড়া। এই চরম দুর্দিনে জগলু এবং আব্দুর রহীম সাহেবের খোজ নেয়া প্রয়োজন। হঠাৎ রিকশাওয়ালা আমাকে উর্দুতে বললো প্রফেসার সাহেব, আপনি যত শীঘ্র পারেন টাউন ছেড়ে চলে যান। আমি জানি আপনার খুবই বিপদ। এতক্ষণ এদিকে খেয়ালই ছিলো না যে রিকশাওয়ালা অবাঙালি অথচ সে-ই আমার প্রাণ বাঁচানোর জন্য সরে যেতে বলছে। যাহোক, জগলু এবং রহীম সাহেব নেই। তারা শহর ছেড়ে চলে যেতে পেরেছেন। তারপর শাহ মাহতাবের বাসায় যাই। তাকে আরেক বাসা থেকে খুজে নিয়ে রিকশাওয়ালাকে বললাম কাঞ্চন ঘাটের দিকে যেতে। সে বললো কাঞ্চন কলোনী এবং কাঞ্চন ঘাটে মিলিটারী পাহারা দিচ্ছে। তখন সে এক বাঁধের কাছে আমাদের ছেড়ে দিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে অতিক্রম করে নদী পাড় হতে বললো। আমি রিকশাওয়ালার দিকে তাকালাম। সে বললো আল্লাহ আপনার হেফাজত করুন।
বাঁধ পার হতেই দেখি নদীর পশ্চিম পাড়ে ২/৩ হাজার লোক লাঠিসোটা বল্লম ইত্যাদি নিয়ে জড় হয়েছে। ওরা আমার গ্রামের ও তার আশে পাশের লোক। ওরা শুনেছে আমাকে গৃহবন্দী করে রেখেছে। আমাকে আমাকে মুক্ত করে নিয়ে যাবার জন্যই ওরা সমবেত হচ্ছে। তাও আবার লাঠি-বল্লম নিয়ে মিলিটারীর মোকাবেলা। মনে মনে হাসলাম। আমাকে দেখেই ওরা আনন্দে উত্তেজনায় যেনো পাগল হয়ে গেলো। কিন্তু এই আনন্দ বেশিক্ষন সইল না। হঠাৎ কয়েক রাউন্ড গুলির শব্দ। সঙ্গে সঙ্গে ৫/৬ জন মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। তিনজন সঙ্গে সঙ্গেই মারা গেল। আর দুইজন গুরুতর আহত। বেশ দূরে একখানা জীপ থেকে নেমে আমাকে লক্ষ্য করেই গুলি। আমি প্রাণে বেঁচে গেলাম কিন্তু আমারই জন্য কয়েকটা অমূল্য প্রাণ চলে গেল।
এদিকে আমি চলে যাওয়ার আধ ঘন্টার মধ্যেই টের পেয়ে যায় যে আমি যেভাবেই হোক বাসার বাইরে চলে গেছি। তখনই তারা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে আমার খোজে। বিশেষ করেআমার গ্রামের বাড়ি যাবার রাস্তায় কাঞ্চন ঘাটের কাছে যখন আমার সন্ধান পেল তখন আমি কয়েক হাজার লোক দ্বারা পরিবেষ্টিত। ব্যাপারটা আঁচ করতে জীপ থেকে নেমে কয়েক রাউন্ড গুলি করেই তারা চলে যায়। নদী পার হতে সব কাপড় ভিজে গিয়েছিল। ভেজা কাপড়েই কয়েক মাইল হেঁটে গ্রামের বাড়িতে পৌঁছি। পৌঁছেই প্রথম কাজ হলো কয়েকজন লোককে মোটরসাইকেলে বিভিন্ন দিকে প্রেরণ করা। সেতাবগঞ্জের রউফ চৌধুরীকে লিখলাম তুমি সেতাবগঞ্জ সুগার মিলের সব ক’টা ট্রাক বিভিন্ন ইপিআর শিবিরে পাঠিয়ে দাও। তাদেরকে নিয়ে রাতের মধ্যে আমার গ্রামের কাছে সমবেত হও। রাত ২/৩ টার মধ্যেই ২/৩ খানা ট্রাক ভর্তি ইপিআর দেওয়াদিঘী হাটখোলায় হাজির। তাদের খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা করে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেয়া হলো। তারা সকালের পূর্বেই কাঞ্চন ব্রীজের পশ্চিম পার্শ্বে গ্রামের আড়ালে পজিশন নিলো।
&nbsp;
২৮শে মার্চ রবিবার। সেই বিশেষ মুহুর্তটি উপস্থিত হলো যার জন্য কয়েক মাস কত গোপন আলোচনা, শলাপরামর্শ উত্তেজনা। বেলা তিনটা বাজার পূর্বে প্রথমেই ৬ পাউন্ডার এর গুলির শব্দে আকাশ কাঁপিয়ে ঝড় সৃষ্টি হলো যেন। আসোলে অপারেশন শুরু হয়েছে বেলা ২টা থেকেই। কুঠিবাড়ি সেক্টর হেডকোয়ার্টারে যত অবাঙালি ইপিআর জওয়ান এবং অফিসার ছিল তাদেরকে বেয়নেট দিয়ে শেষ করতে হয়েছে। কারণ গুলির শব্দ হলেই কয়েক শত গজ দূরে অবস্থান গ্রহণকারী মিলিটারীদের কাছে খবর পৌঁছে যেত। ইপিআর-দের টার্গেট ছিলো সার্কিট হাউজের পাশের ময়দান এবং এবং বড় ময়দানের মাঝখানে অবস্থিত অফিসার্স ক্লাব। এগুলোতেই মিলিটারীরা অবস্থান নিয়েছিলো। কিন্তু বিপদ হলো সেখান থেকে গুলি কুঠিবাড়িতে আসছিলো আরো দুটি স্থান থেকে। উপরোক্ত স্থান ছাড়াও রাজবাড়ীর কাঁটাপাড়া এবং সুইহারী ডিগ্রী কলেজের ছাদের উপরেও যে মিলিটারীরা পজিশন নিয়েছিলো সেটা ইপিআর-রা জানতে পারেনি। তিন দিকের গুলির আক্রমণে তারা অনেকটা হতভম্ব হয়ে গেলো। তখন তারা নতুন একটা কৌশল গ্রহণ করলো। কুঠিবাড়ির পশ্চিম পাশের প্রাচীর ভেঙ্গে তারানদীর বালুর উপরঅবস্থান নিয়ে সেখান থেকে গোলাবর্ষণ শুরু করলো। এটা মিলিটারীরা টের পেলো না। এসময়ে কাঞ্চন ঘাট, বাইশাপাড়া, কাঞ্চন রেলওয়ে ব্রীজের পশ্চিম পার্শ্বে উঁচু লাইনের দু’পার্শ্বের নিচু জায়গায় হাজার হাজার উল্লসিত মানুষের ঢল। তাদের মাথার উপর দিয়ে গোলাগুলি ছুটছে অথচ তার মধ্যেই নিজেদের জীবনকে তুচ্ছ করে নদী পার হয়ে ছুটে যাচ্ছে কুঠিবাড়ির ভিতর। সেখান থেকে অস্রশস্র গোলাগুলির ভারী বাক্সগুলি কয়েকজনে মিলে অনায়াসে নদী পার করে পশ্চিম পাড়ে এনে জমা করেছে। সেখানে গোলাগুলিতে ক’জন লোক নিহত হয়। এ যেন জীবনকে বাজী রেখে মহাল্লোসে মেতে উঠার তীব্র প্রতিযোগীতা। সেখান থেকে রাতের মধ্যে খোশালডাঙ্গা হাটে সব অশ্রশস্র ও মালপত্র এনে জড়ো করা হলো।
এর মধ্যেও শহরের কয়েকটি লক্ষ্যে বিশেষ করে উপশহরে(নিউ টাউনে) গোলা নিক্ষেপ চলতেই থাকে। কারণ মিলিটারী ও অবাঙালি ইপিআর’রা পিছিয়ে এখানেই আশ্রয় গ্রহণ করেছিলো। সারা রাত ব্যাপী গোলাগুলি চলে।পরের দিনই দুটো ঘটনা ঘটলো। দিনাজপুর শহরের অমিয় কুটিরে সিকিউরিটি সহ মেজর রাজা থাকতো সপরিবারে। তার স্ত্রী কুষ্টিয়ার রাজনৈতিক নেতা জনাব সাদ আহমদ সাহেবের বোন। মেজর রাজা যখন ওয়্যারলেস সেটের সামনে বসে করাচী এবং অন্যান্য স্থানে খবর পাঠানোর চেষ্টা করছিলো ঠিক সেই সময়েই ইপিআর’রা তাকে ধরে নিয়ে আসে এবং দিনাজপুর হেমায়েত আলী হলের সামনে গুলি করে হত্যা করে।মেজর তারিক আমিন সকাল বেলা ডিসি’র বাংলোয় এসে তার কাছে দেখা করে প্রাণ ভিক্ষা চায় এবং আশ্রয় চায়। অবশ্য ডিসি’র পক্ষে সেই পরিস্থিতিতে তা করা সম্ভব ছিলো না। তার একদিন পরেই শহরের উপকণ্ঠে কসবা এলাকায় নদীর তীরে তাকে সপরিবারে প্রাণ দিতে হয়। লেঃ কর্নেল তারেক রসুল কোরেশী জনৈক স্থানীয় চেয়ারম্যানের(পরবর্তীতে রাজাকার হিসেবে তাকে কারাগারে দীর্ঘদিন থাকতে হয়েছিলো) সহায়তায় মোহনপুর ব্রীজ পার হয়ে আমবাড়ী দিয়ে রাতের অন্ধকারে পার্বতীপুর পৌঁছে প্রাণ বাঁচাতে সমর্থ হয়। তারপর কয়েকদিনের জন্য কাঞ্চন ঘাট থেকে ২ মাইল পশ্চিমে ভবানীপুরে আফতাবউদ্দিন সরকার সাহেবের বাড়িতে সাময়িকভাবে জিলা সদর স্থানান্তরিত হয় এবং জিলা কর্মকর্তাগণ সেখান থেকেই সেই অস্বাভাবিক অবস্থায় যতটা সম্ভব সরকারী কাজকর্ম নির্দেশনামা জারী করতে থাকেন।
&nbsp;
৩১ তারিখে দিনাজপুর ইনস্টিটিউট প্রাঙ্গণে সর্বদলীয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানেই পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা হয় এবং সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।(ক) অধ্যাপক মোঃ ইউসুফ আলী।(খ) গোলাম রহমান।(গ) এএমআই জেড ইউসুফ এবং(ঘ) গুরুদাস তালুকদার- এই ক’জনের নামে একটি প্রচারপত্র ছাপিয়ে বিলি করতে হবে।
প্রচারপত্র অবিলম্বে স্বাধীন বাংলাদেশের সরকার গঠনের দাবি করা হবে এবং জনগণকে সশস্র যুদ্ধের জন্য আহবান জানানো হবে। এই প্রচারপত্র ১লা এপ্রিল তারিখে প্রকাশিত হয় এবং এই সপ্তাহেই কোলকাতা থেকে প্রচারিত দৈনিক ‘কালান্তর’ পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় প্রকাশিত হয়।এই সভায় সর্ব সম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে অবিলম্বে কয়েকটি কাজ করতে হবে। সেগুলি হচ্ছে, ভারতে গিয়ে ভারত সরকার এবং আন্তর্জাতিক বিশ্বের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করে বাংলাদেশের অবস্থানকে তুলে ধরা। বাংলাদেশের অন্যান্য নেতার সঙ্গে সম্ভব হলে যোগাযোগ স্থাপন করা এবং আমাদের ইপিআর, পুলিশ, আনসারসহ যুদ্ধরত জনগণের জন্য প্রয়োজনীয় অস্রশস্র সংগ্রহের চেষ্টা করা। এই সিদ্ধান্ত অনুসারে আমি ২রা এপ্রিল সীমান্ত অতিক্রম করি। এর পূর্বে দিনাজপুরের ডেপুটি কমিশনার আমার কাছে কিছু নির্দেশ চাইলে আমি তাকে নিন্মলিখিত নির্দেশাবলী দেই।কোনো অবস্থাতেই কোন ব্যাংকের স্ট্রং রুম থেকে যাতে নগদ অর্থ এবং সোনা রুপা গয়না লুটতরাজ না হয়; প্রয়োজন না হলে কোনো ব্যক্তিকে হত্যা না করা; দেশের ভিতরে সীমান্তের কাছাকাছি খাদ্যশস্য মজুদ করা যাতে যুদ্ধরত লোকদের খোরাকীর কোনো অসুবিধা না হয়। অতঃপর আমি ভারতের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হই।
সীমান্তের ওপারেই অবস্থিত রাধিকাপুর ষ্টেশনে আমাকে অভ্যর্থনা জানান পশ্চিম দিনাজপুর জিলার রায়গঞ্জ মহকুমার পুলিশ অফিসার। সেখান থেকে আমাকে নিয়ে যাওয়া হলো জিলা সদর বালুর ঘাটে। সেখানে এসপির অফিসে দীর্ঘক্ষণ সার্বিক পরিস্থিতি, মুক্তিযুদ্ধ ও জনগণের সঙ্গে পাক সৈন্যদের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষের কৌশলগত দিক এবং বাংলাদেশ থেকে আসা উদ্বাস্তুদের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আলোচনা চলে। অতঃপর এসপি মিঃ হ্যারিস জেমস পশ্চিম বঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শ্রী অজয় মুখার্জী মহাশয়ের একটি বার্তা আমাকে দেন। ঐ বার্তায় মুখ্যমন্ত্রী আমাকে অবিলম্বে কলকাতায় পৌঁছে তার সাথে দেখা করার জন্য অনুরোধ করেছেন। আমি পরদিন স্থানীয় কংগ্রেস এমএলএ’র সঙ্গে কলকাতায় পৌঁছে সরাসরি কংগ্রেস অফিসে যাই। সেখানে আমাকে অভ্যর্থনা জানান শ্রী অরুণ মৈত্র(পরবর্তীতে পশ্চিম বাংলা কংগ্রসেস প্রেসিডেন্ট)। অন্যান্য কংগ্রেস নেতৃবৃন্দের সাথে পরিচয় এবং কিছু আলাপ আলোচনার পর আমাকে নিয়ে যাওয়া হয় ৩৪ ইন্ডিয়ান মিরর স্ট্রীটে “বাংলাদেশ মুক্তি সংগ্রাম সহায়ক সমিতির” অফিস কক্ষে। সেখানে মুখ্যমন্ত্রী শ্রী অজয় মুখার্জী পূর্ব থেকেই উপস্থিত ছিলেন। উষ্ণ আন্তরিকতা নিয়ে তিনি আমার সঙ্গে আলাপ করলেন। তারা তাদের প্রধান সমস্যার কথা বললেন। বাংলাদেশের কোনো সংবাদই তারা ভালভাবে পাচ্ছেন না। বিক্ষিপ্তভাবে প্রাপ্ত কিছু সংবাদের উপর ভিত্তি করে তারা পূর্ণাঙ্গ কর্মসূচী গ্রহণ করতে পারছেন না।
&nbsp;
সেই অবস্থায় এই অসুবিধা খুবই স্বাভাবিক কারণ আমাদের পক্ষেও পুরোপুরি বলা সম্ভব ছিলো না বাংলাদেশের কোথায় কী ঘটছে। সব রকমের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। বিশেষ করে সেই দিনগুলিতে আমি ছিলাম দেশের দূরতম এক সীমান্ত জিলা দিনাজপুরে। আকাশবাণী, বিবিসি, ভয়েস অব এমেরিকার দেয়া সংবাদের উপর নির্ভর করা ছাড়া আর বিশেষ কিছুই আমাদের জানার ছিলো না। তবু এর মধ্যে এই সহায়ক সমিতি একটি অফিস করেছেন এবং কিছু চাঁদা আদায় করে বালুঘাট বেনাপোল সীমান্ত বরাবর উদ্বাস্তু এবং মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে সাহায্য পৌঁছাচ্ছেন। এই সহায়ক সমিতি সর্বদলীয় ভিত্তিতে গঠিত হয়েছিলো। অর্থাৎ প্রায় সব রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে এটি গঠিত হয়েছিলো এবং ১৯৭১ সালের শেষ পর্যন্ত এই সমিতি আমাদের প্রচুর সাহায্য সহযোগীতা দান করেছিলো। প্রথম দিনই অর্থাৎ ৪ঠা এপ্রিল তারিখে মুখ্যমন্ত্রী আমার কাছে তার অসন্তোষ প্রকাশ করলেন এই বলে যে, দু তিন দিন আগে বাংলাদেশের দুইজন নেতা তার সঙ্গে দেখা করে দিল্লী চলে গেছেন। তারা তাদের আসোল পরিচয় না দিয়ে দুটি ছদ্মনাম, মাহমুদ আলী ও রহমত আলী বলে চলে গেছেন। মুখ্যমন্ত্রীর ধারণা উপরোক্ত দ’জন নেতা প্রকৃত পরিচয় গোপন করেছেন। পরে জানতে পারি তারা ছিলেন জনাব তাজউদ্দিন আহমেদ এবং ব্যারিষ্টার আমিরুল ইসলাম। শ্রী অজয় বাবু ছাড়াও এই সমিতিতে ছিলেন প্রাদেশিক মন্ত্রী সন্তোষ রায়, ডাঃ জয়নাল আবেদীন, শ্রী কাশীকান্ত মৈত্র, কংগ্রেসের অরুণ মৈত্র, গোপালপুর কমিউনিষ্ট পার্টির স্বাধীন গৃহ এবং শ্রী বিজয় সিংহ নাহার প্রমূখ নেতৃবৃন্দ।
আমার থাকার জায়গা তাঁরা করে দিলেন কীড স্ট্রীটের এমএলএ ভবনে। তারপর চেষ্টা চললো নেতৃবৃন্দের সাথে সংযোগ স্থাপনের। প্রথম দেখা হলো জনাব কামারুজ্জামান সাহেবের সাথে বালিগঞ্জ এলাকার রাজেন্দ্র রোডের নর্দার্ন পার্কের একটি বাড়িতে। পরবর্তীতে জানা গেলো বাংলাদেশ থেকে আগত উচ্চ পর্যায়ের নেতৃবৃন্দের জন্য এই বাসাটি সংরক্ষিত ছিলো। বাসাটির তিন তলায় উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন বেতার যন্ত্র ছাড়া যোগাযোগ স্থাপনের অন্যান্য উপকরণ দ্বারাও এটি সজ্জিত ছিলো। এর পরে তাজউদ্দিন সাহেব ফিরে এলেন দিল্লী থেকে। পরপরই এলেন ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং খন্দকার মোশতাক আহমেদ সাহেব। প্রথম দিকে নেতৃবৃন্দের জন্য বাসস্থান নির্দিষ্ট ছিলো ১০, লর্ড সিনহা রোডে।
ইতিমধ্যে আওয়ামী লীগের অনেক নেতা, এমএনএ, এমপিএ কোলকাতায় পৌঁছে গেছেন। ১০ই এপ্রিল তারিখে ১০নং লর্ড সিনহা রোডেই নেতৃবৃন্দ এবং অনেক এমপিএ, এমএনএ’দের মধ্যে বিস্তারিত আলোচনার পর সরকার ও মন্ত্রীসভার কাঠামো এবং সদস্যগণের নাম ঠিক করা হয়। পরবর্তী ১৭ই এপ্রিল তারিখে এই সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকতার রূপ গ্রহণ করে। সেখানেই স্বাধীনতার সনদ ঘোষণার পর আমি মন্ত্রীসভার সদস্যগণকে শপথ পাঠ করাই। শতাধিক দেশী বিদেশী সংবাদ সংস্থার বেতার টেলিভিষন সাংবাদিকের উপস্থিতিতে একটি স্বাধীন জাতি ও রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের প্রথম আইনানুগ আত্মপ্রকাশ ঘটে এবং সরকারের মাধ্যমেই সারা বিশ্বের জনগণের নিকট আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে সাহায্য সহানুভুতি ও সক্রিয় সমর্থন কামনা করা হয়।
&nbsp;
এরপরে নেতৃবৃন্দের জন্য বাসস্থান নির্দিষ্ট করা হয় ৫৭/৮ বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডে। যুদ্ধ শেষ হওয়া পর্যন্ত তারা সপরিবারে থাকেন সিআইটি রোডে আশু বাবুর বাড়িতে। অবশ্য মন্ত্রী সাহেবরা বরাবর থিয়েটার রোডের অফিসে বসতেন। কোলকাতা মিশন বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আনুগত্য ঘোষণার পর সেখানে খন্দকার মোশতাক সাহেবের পররাষ্ট্র বিষয়ক অফিস বসে। আর বিদেশ থেকে প্রাপ্ত সাহায্যের হিসাব সংরক্ষণের জন্য প্রতিদিন ২ ঘন্টা করে আমাকে সেখানে বসতে হত। বিদেশী চাঁদা ও সাহায্যের সমন্বয় করতেন মিশন প্রধান জনাব হোসেন আলী। হোসেন আলী সাহেব ও তার স্ত্রী এই মিশন থেকে মুক্তিযুদ্ধের জন্য অত্যন্ত গুরত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করেছিলেন।কোলকাতায় ফিরে একটি নতুন দুশ্চিন্তা আমার মনকে আচ্ছন্ন করলো। চিন্তা করলাম মুজিবনগরে স্বাধীনতার ইস্তেহার পাঠের সংবাদ শুধু বাংলাদেশ বা পাকিস্তানে নয়, সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। সংবাদটি পাক সেনারা কিভাবে গ্রহণ করবে? আমি জানি না এই মূহুর্তে আমার পরিবারের লোকজন কে কোথায়! গ্রামের বাড়ী থেকে আসার সময় শুধু মা এবং স্ত্রীকে বলে এসেছিলাম “যাচ্ছি” । কোথায় যাচ্ছি, কখন ফিরবো, আদৌ ফিরতে পারবো কিনা সে মূহুর্তে এই চিন্তার করার অবকাশ একেবারেই ছিল না। শরীরের কোনো স্থান কেটে যাবার সঙ্গে সঙ্গে বেদনা বোধ হয় না, হয় পরে। ঠিক তেমনই, সেই সময় এই চিন্তা আমাকে ভীত ও আতংকিত করে তুললো। কামরুজ্জামান সাহেবের সঙ্গে আলোচনা করলাম। তারও একই অবস্থা। আনন্দবাজার পত্রিকার মালিক অশোক বাবু তার গাড়ী এবং কিছু পথখরচ আমার হাতে দিলেন। আমি এবং হেনা ভাই (কামরুজ্জামান সাহেব) রওয়ানা হলাম আপন আপন পরিবারের সন্ধানে ২০শে এপ্রিল ১৯৭১ তারিখে। রাতে এসে পৌঁছলাম কৃষ্ণনগর ডাক বাংলোয়। সেখানে শুরু হল ঝড় বৃষ্টি। মনে ভীষণ অনিশ্চয়তা ও উত্তেজনা। বাইরে দুর্যোগের রাত। সেখানেই মধ্যরাতে আমাদের কাছে এসে পরিচয় দিয়ে দেখা করলেন চুয়াডাংগার আওয়ামী লীগ নেতা এবং একজন দুর্ধর্ষ মুক্তিযোদ্ধা ডাঃ আসহাবুল হক। তার সাথে প্রায় সারারাত ব্যাপী আলোচনা হলো পশ্চিম সেক্টরের যুদ্ধের কথা। বিভিন্ন কলাকৌশল সম্পর্কে তাকে নির্দেশ দিয়ে আমরা পরদিন সকালে রওয়ানা হলাম। মুর্শিদাবাদ জিলার ‘ভাবতা’ নামক স্থানে হেনা ভাইয়ের পরিবারের সবারই খোজ পাওয়া গেলো। তিনি অনেকটা নিশ্চিন্ত হন। কিন্তু আমার অবস্থা!! পরদিন বিভিন্ন উদ্বাস্তু শিবির আমরা পরিদ্শন করলাম। পরিদর্শন মানে উদ্বাস্তুদের দুঃখ এবং সর্বনাশের করুণ কাহিনী শোনা। পরদিন পশ্চিম দিনাজপুরের কালিয়াগঞ্জে এসে আমরা রাধিকাপুর ও ডালিমগাঁও উদ্বাস্তু শিবিরে যাই। দিনাজপুর, বগুড়া, পাবনার অনেক নেতার সাথে দেখা হলো সেখানে। স্থির হলো ১লা মে তারিখে বেলা ১০ টায় রাধিকাপুর প্লাটফর্মে আমরা সকলে মিলে সভা করে পরিস্থিতি বিশ্লেষণ এবং পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবো। ইতিমধ্যে খোজ পেয়ে গেলাম আমার পরিবারের। রায়গঞ্জ শহরে এক বারান্দায় পেলাম আমার স্ত্রী এবং মেয়েদের। ছেলে দুজন সেখানে ছিলো না। তারা সীমান্তের এলাকায় মুক্তিযোদ্ধা শিবিরে অন্যান্যদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলো। এরা কি করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে কয়দিনে কত দুঃখ দুর্গতির মধ্যে দিয়ে সীমান্ত অতিক্রম করেছে তার কাহিনী শুনলাম। তবে অনেক পরিবারের বুকফাটা কাহিনীর তুলনায় এ আর কতটুকু!
&nbsp;
পরদিন ১লা মে তারিখে গেলাম রাধিকাপুরে সভা করতে। গিয়েই শুনলাম এক শিবিরে এক বৃদ্ধা মরণাপন্ন। মৃত্যুর পূর্বে আমাকে একটু দেখতে চায়। এদিকে সভার সময় হয়ে গেছে। তবুও গেলাম মৃত্যুপথযাত্রীকে শেষবারের মত দেখতে। ঠিক বেলা ১০টায় যখন সভা অনুষ্ঠানের কথা ছিলো তখন আমি শিবিরে। ১০টা ১৫ মিনিটের সময় সীমান্ত থেকে পাক সৈন্যরা শেলিং শুরু করলো। টার্গেট আমাদের সভাস্থল। তারা বোধহয় পূর্বাহ্ণেই খবর পেয়ে গিয়েছিল। রাধিকাপুর ষ্টেশন ঘরের প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হল এবং কয়েকজন লোকও মারা গেলো। সেখানে ঐ সভার নেতৃবৃন্দ পরিস্থিতি নিয়ে, উদ্বাস্তুদের সমস্যা নিয়ে আলোচনা করলেন। মুক্তিযোদ্ধাদের বিষয়টিই বিশেষ গুরুত্বলাভ করলো। অনেক সশস্র মুক্তিযোদ্ধা সেই সভায় উপসথিত ছিলেন তাদের জন্য ক্যাম্পের ব্যবস্থা, খাওয়া দাওয়া, অস্র ইত্যাদি বিষয়ে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
দুই তিন দিন পর ফিরে গেলাম কোলকাতায়। সেখানে একটা যোগাযোগের অফিসের প্রয়োজনীয়তা তীব্রভাবে অনুভুত হচ্ছিলো। মুক্তিসংগ্রাম সহায়ক সমিতির প্রচেষ্টায় ৩/১ ক্যামাক স্ট্রীটে অফিস ঘর পাওয়া গেলে। আমি সেই অফিসের দ্বায়িত্ব নিলাম। আমাকে বিশেষভাবে সাহায্য করলেন ব্যারিষ্টার বাদল রশিদ। মুজিবনগর সরকারের পক্ষে এটাই সর্বপ্রথম সংযোগ রক্ষাকারী অফিস। ক্যামাক স্ট্রীটে স্থান সংকুলান না হওয়ায় ৪৫ প্রিন্সেস স্ট্রীটে অফিস স্থানান্তর করা হয়। আমাকে তখন দ্বায়িত্ব দেয়া হয়েছে। মুজিবনগর সরকারের ত্রাণ এবং পুনর্বাসন মন্ত্রী ছিলেন জনাব কামরুজ্জামান সাহেব। আমি অনারারী মহাসচিব। আমাদের সহায়তা করার জন্য এই অফিসেই বসতেন সর্বজনাব আব্দুল মালেক উকিল, মোঃ সোহরাব হোসেন, আব্দুর রব সেরনিয়াবাত, ব্যারিষ্টার বাদল রশিদ ও শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন প্রমুখ নেতৃবৃন্দ।
এই মন্ত্রনালয়ের অধীনে যুব অভ্যর্থনা শিবির স্থাপন করা হলো। এগুলির কাজ ছিলো সীমান্ত অতিক্রম করে আসা যুবকদের জন্য আহার বাসস্থানের ব্যবস্থা করা, ক্লাস নেয়া, শরীরকে সুস্থ রাখার জন্য পিটিসহ অন্যান্য শারীরিক কসরত ও হালকা অস্র পরিচালনা শিক্ষা দেওয়া। ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রীকে এই দায়িত্ব পালনের জন্য মোটিভেটর নিয়োগ, তাবু বিছানা বালিশ, কাপর চোপর, রান্নার যাবতীয় সরঞ্জাম ও নিয়মিত রেশন সরবরাহ করতে হয়েছে। শিবির পরিচালকও আমরা নিয়োগ করতাম। মহাসচিব হিসেবে আমাকে এই শিবিরগুলিতে অর্থসহ যাবতীয় সরবরাহ প্রথমে সরাসরি এবং জোনাল কাউন্সিলের মাধ্যমে করতে হতো।
&nbsp;
এছাড়াও আমাদের দায়িত্ব ছিলো সীমান্ত বরাবর উদ্বাস্তু শিবিরগুলির বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে ভারত সরকার সহ বিভিন্ন বিদেশী রাষ্ট্র এবং সাহায্যদাতা সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করা। উদ্বাস্তুদের কার্ড ও অন্যান্য বস্তু সরবরাহের দায়িত্ব আমাদেরই পালন করতে হতো। মূল কথা, যেহেতু এই সময় শিক্ষক, বুদ্ধিজীবি, শিল্পি, সরকারী কর্মচারীসহ বিভিন্ন স্তরের উদ্বাস্তুদের রিলিফের প্রয়োজন ছিলো সুতরাং স্বাভাবিকভাবেই এই অফিসকে সবদিকেই দৃষ্টি রাখতে হতো।
যুব অভ্যর্থনা শিবির ছাড়াও তৎকালীন সশস্র বাহিনী, ইপিআর, আনসার মুজাহিদ যারা প্রথম থেকে সরাসরি যুদ্ধে জড়িত ছিলেন(কারণ তারা ছিলেন শিক্ষাপ্রাপ্ত তাই প্রশিক্ষণের প্রয়োজন ছিলো না) তাদের শিবিরগুলির দায়িত্বও আমাদের মন্ত্রীকে নিতে হয়েছে। তাদের কাপর চোপর, খাওয়া দাওয়াসহ যাবতীয় সরবরাহ আমাদেরকেই করতে হয়েছে। এরপর এসেছে যুব শিবির প্রকল্পটির ধারণা। এর মূল উদ্ভাবক ভারতের তৎকালীন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ডঃ ত্রিগুনা চরণ সেন। স্থির হলো যুব অভ্যর্থনা শিবির থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের বাছাই করে এই যুব শিবিরে আনতে হবে। সেখানে উচ্চতর মোটিভেশন সহ মাঝারি ধরনের অস্র পরিচালনা প্রশিক্ষণ দিতে হবে। সেখান থেকে সরাসরি তাদেরকে অস্র দিয়ে গেরিলা হিসেবে দেশের ভিতরে প্রেরণ করা হবে কিংবা কেউ যদি আরো উচ্চতর ভারী অস্রের প্রশিক্ষণ নিতে চায় তাদের জন্য ভারতের বিভিন্ন স্থানে প্রশিক্ষণ শিবির নামে আরো কয়েকটি শিবির স্থাপন করা হবে। এসব যুব শিবির সরাসরি আমাদের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও এগুলোতে প্রশিক্ষণের দায়িত্ব গ্রহণ করে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন ও মেজর পর্যায়ের অফিসারবৃন্দ। এগুলির পরিচালনা ও নিয়োগের জন্য গঠন করা হয় ‘Board of control youth camps’। আমাকে এর চেয়ারম্যান নিযুক্ত করা হয়। সদস্য ছিলেনঃ(১) ডঃ মফিজ চৌধুরী।(২) ক্যাপ্টেন করীম।(৩) শ্রী গৌর চন্দ্র বালা।সচিব ছিলেন তৎকালীন সিএসপি জনাব নুরুল কাদের খান। ডিজি ছিলেন উইং কমান্ডার এসআর মির্জা। ডিরেক্টর ছিলেন আহমেদ রেজা। এর অফিস ছিলো ৮নং থিয়েটার রোড, মুজিবনগর কেন্দ্রীয় অফিস ভবনে।
কামরুজ্জামান সাহেব এবং আমি প্রায়ই এই যুব অভ্যর্থনা শিবির এবং যুব শিবিরগুলি পরিদর্শন করতাম। আমাদের সার্বক্ষণিকভাবে একটি হেলিকপ্টার নির্দিষ্ট করা ছিলো। চব্বিশ পরগণা জিলার হাসনাবাদ টাকী থেকে শুরু করে পূর্বাঞ্চলের আগরতলা সাবরুম পর্যন্ত সীমান্ত বরাবর দীর্ঘ এলাকাব্যাপী এই সমস্ত শিবির স্থাপিত ছিলো। সুতরাং এগুলির পরিদর্শন কাজ খুব সহজসাধ্য ছিলো না। যুব শিবির কিংবা ত্রাণ ও পুনর্বাসনের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ করা হতো মুজিবনগর সরকারের বাজেট থেকে। এই হিসাব সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় স্টাফ ছিলো, সময় সময় এই হিসাব অডিট করা হতো। যুদ্ধ পরবর্তীকালে এই অডিটের হিসাব বাংলাদেশ সরকারের নিকট দাখিল করা হয় এবং ব্যাংকে রক্ষিত টাকা বাংলাদেশ সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ে প্রত্যর্পণ করা হয়।
&nbsp;
৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১স্মৃতিতে বড় উজ্জল হয়ে আছে দিনটি। ৩রা ডিসেম্বর ভারত পাকিস্তান সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে। নয় মাসের স্বাধীনতার যুদ্ধ শেষ পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে। প্রিন্সেস স্ট্রীটের অফিসে বসে আছি। হঠাৎ খবর এলো ভারত সরকার গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারকে স্বীকৃতি দিয়েছে। চারিদিকেই আনন্দ উৎসব শুরু হয়ে গেলো। অতি আনন্দে সবার চোখই অশ্রুসজল। দীর্ঘ নয় মাসের কত মৃত্যু কত রক্ত কত বেদনা ও অশ্রুঘন কাহিনীর সকরুণ স্মৃতি। এই স্বীকৃতি আমাদের জন্য একটা পরিচয়। জাতি হিসেবে গৌরবময় পরিচয় এনে দিয়েছে। একটা নতুন রাষ্ট্র, একটা নতুন জাতির জন্ম পৃথিবীর বুকে স্বীকৃত হলো।
খুব সম্ভব এদিনেই ফোন পেলাম। অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম সাহেবের কণ্ঠস্বর। আমার প্রতি নির্দেশ- শরণার্থী প্রত্যাবর্তন বিষয়ে বাংলাদেশ সরকার এবং ভারত সরকারের মধ্যে এক্ষুনি উচ্চ পর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক আলোচনা হবে। আমাকে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিতে হবে। নির্দিষ্ট সময়ে বালিগঞ্জ বিএসএফ হেডকোয়ার্টারে পৌঁছলাম। আমার গাড়ি পৌঁছার সঙ্গে সঙ্গেই বিএসএফ এর এক কর্নেল এসে গাড়ির দরজা খুলে ধরলে আমি নামার সঙ্গে সঙ্গেই স্যালুট করলো। আশেপাশে দাড়ানো আরো কয়েকজন অফিসার একইভাবে স্যালুট করলো। সভা ঘরের দরজায় আমাকে অভ্যর্থনা জানালেন লেঃ জেঃ জগজিৎ সিং অরোরা এবং কেন্দ্রীয় জয়েন্ট সেক্রেটারী শ্রী এ কে রায়। কথাগুলো বলার উদ্দেশ্য হলো, এর আগেও অনেকবার এই অফিসে এসেছি। এদের সাথে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়েছে কিন্তু আগের তুলনায় আজকের ব্যবহারে বিশেষ পার্থক্য স্পষ্ট চোখে পড়ে। এর কারণ, আজ স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের পক্ষে সরকারী এবং আনুষ্ঠানিকভাবে এই অফিসে আমার আগমন। আলোচনার টেবিলে বসলাম। দুপাশের দুই সরকারের প্রতিনিধিবৃন্দ। আমার সামনে বাংলাদেশের পতাকা টেবিলের স্ট্যান্ড দাঁড় করানো। বিপরীতে ভারতের পতাকা। আলোচনার বিষয় ভারতে আগত বাংলাদেশের শরণার্থীদের দেশে প্রত্যাবর্তন। প্রথমে আমি ভারত কতৃক বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদানের জন্য এবং এই সভার আয়োজনের জন্য ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলাম। ভারতের পক্ষে আলোচনার সূত্রপাত করেন শ্রী এ কে রায়। তিনি বলেন, বাংলাদেশে শরণার্থী কিভাবে ফিরে যাবে তার একটা ফর্মূলা উদ্ভাবন করা প্রয়োজন। আলোচনা অগ্রসর হবার পূর্বেই আমি বললাম এটা তো সম্পূর্ণ আপনাদের ব্যাপার। কারণ প্রধানমন্ত্রী মিসেস ইন্দিরা গান্ধী অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথেই বলেছেন মর্যাদার সঙ্গেই আমি বাংলাদেশের শরণার্থীদের দেশে ফিরত পাঠাবো। সুতরাং ফর্মূলা উদ্ভাবন করে নতুন সিদ্ধান্তের প্রয়োজন নেই। আমার এই কথায় হঠাৎ ভারত পক্ষ নীরব হয়ে গেলো। প্রধানমন্ত্রী সাথে এ ব্যাপারে আলোচনা করে তার নির্দেশ লাভের জন্য শ্রী রায় কিছুক্ষণের জন্য সভার কাজ বন্ধ রাখলেন। কয়েক মিনিটের মধ্যে তিনি সভায় এসে বললেন প্রধানমন্ত্রী শরণার্থী প্রত্যাবর্তন সম্পর্কে তার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন। তারপর আনুসংগিক সংক্ষিপ্ত আলোচনা হলো। বিভিন্ন স্থান থেকে সুবিধামত শরণার্থীর বাস, ট্রেন এবং অন্যান্য যানবাহনে দেশে ফিরবেন। ফেরার সময় হাঁড়ি পাতিল চাল ইত্যাদি এবং কিছু নগদ টাকা প্রত্যেককে দেয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
এক কোটি বাংলাদেশী শরণার্থীকে সসম্মানে দেশে ফিরত পাঠানোর প্রতিশ্রুতি রক্ষার জন্য বহু টাকা ব্যয় এবং এত বড় আয়োজনের ব্যবস্থা খুব সহজ কাজ ছিলো না। মিসেস গান্ধীর প্রতি গভীর শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে গেলো। আরেকবার সবাইকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে অফিসে ফিরে এলাম।
&nbsp;
১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের আনন্দ এবং বহু আকাঙ্খিত স্বাধীন বাংলাদেশের মাটির অভূতপূর্ব অনুভুতি তখনো সদ্য সজীব। এ অবস্থায় একটা প্রলয়ংকারী ও মর্মন্তুদ ঘটনা ঘটে যা দিনাজপুরবাসী কোনদিন বিস্মৃত হবে না। দিনাজপুরের মহারাজাদের তৈরী স্কুল। নাম মহারাজা গিরিজানাথ হাই স্কুল। বিস্তীর্ণ এলাকা। সামনে বিরাট খেলার মাঠ। বিরাট স্কুল ঘর মজবুত এবং দেখার মতো। ১৯৪২ সালে অবিভক্ত ভারতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে কোলকাতা রিপন কলেজের একটি শাখা দিনাজপুরে খোলা হয় এবং এই মহারাজা স্কুলেই সকালের শিফটে সেই কলেজ চলতো। পাক বাহিনী আত্মসমর্পণের পর ৭নং সেক্টরের সব মুক্তিযোদ্ধা দিনাজপুর শহরে প্রবেশ করলে তাদের জন্য কয়েকটি শিবিরের ব্যবস্থা করা হয়। এর মধ্যে দিনাজপুর স্টেডিয়াম ও মহারাজা স্কুল ছিলো বড় শিবির। মহারাজা স্কুলের সামনের মাঠে আন্ডার গ্রাউন্ড ঘর তৈরি করে উদ্ধারকৃত সমস্ত অস্র রাখার ব্যবস্থা করা হয়। প্রায় প্রতিদিন ট্রাকে করে বিভিন্ন স্থান থেকে বিভিন্ন প্রকারের অস্র উদ্ধার করে এখানে এনে জমা করা হতো। সেদিন ৬ জানুয়ারী। হিলি সীমান্ত থেকে দুই ট্রাক অস্রশস্র(বিভিন্ন প্রকার তাজা বোমাসহ) নিয়ে এসে সেগুলো ট্রাক থেকে নামিয়ে মাটির নিচের ঘরে রাখার কাজ শুরু হয়। সময় সন্ধা ৬টা ৩০মিনিট। হয়তো অন্যমনস্কতার কারণে তাজা বোমা কারো হাত থেকে পড়ে গিয়ে বিস্ফোরিত হয়। এই বিস্ফোরণ এতই প্রচন্ড এবং ভয়াবহ হয় যে সম্পূর্ণ স্কুল ধ্বংস হয়ে যায়। স্কুলের সামনের মাঠটি একটি বিরাট পুকুরে পরিণত হয়। শুধু দিনাজপুর নয়, এই শহর থেকে ১৯ মাইল দূরে পার্বতীপুর শহরের কিছু বাড়ী ঘরের জানালার কাচও ভেঙ্গে যায়। ৪৫০ জনের মত মুক্তিযোদ্ধা সেখানে থাকতেন। দুর্ঘটনার পর আহতদের আর্তনাদে এক করুণ এবং মর্মান্তিক দৃশ্যের অবতারণা ঘটে। আহতদের বিভিন্ন হাসপাতালে ও ডাক্তারদের কাছে পাঠানো ও নিহতদের লাশ উদ্ধার কার্যে শহরের হাজার হাজার মানুষ সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে। তবে পুরো মৃতদেহ পাওয়া যায়নি বলা চলে। প্রায় সকলেরই দেহ ছিন্নভিন্ন অবস্থায় পাওয়া যায়। লাশের অঙ্গ প্রতঙ্গ এক জায়গায় জমা করে মোটামুটি হিসেবে ১৬০ জনের মতো নিহত মুক্তিযোদ্ধার লাশ সংগ্রহ করে শহরের তিন মাইল উত্তরে সুবিখ্যাত চেহেল গাজী মাজারের একপাশে দাফন করা হয়। ঘটনার ৬/৭ মাস পরে ধ্বংসস্তুপ পরিস্কার করার সময় আরো প্রায় ৪০টি মাথার খুলি পাওয়া যায়। নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধে যারা বীরের মতো জয়লাভ করে স্বাধীনতার রক্তসূর্যকে ছিনিয়ে আনলো তাদেরকে সামান্য একটা দুর্ঘটনার শিকার হয়ে এরূপ মর্মান্তিক মৃত্যুবরণ করতে হলো! বীরদের এই সকরুণ পরিণতি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক সকরুণ মর্মন্তুদ অধ্যায় সৃষ্টি করে রাখবে।
&nbsp;
-মোহাম্মদ ইউসুফ আলী
নভেম্বর, ১৯৮৪
&nbsp;
&nbsp;
<a href=”https://www.facebook.com/hmishtiaq?fref=ts”>হুসাইন মোহাম্মদ ইশতিয়াক</a>
&lt;১৫,৩১,২৪৪-৪৬&gt;
<em>স্বাধীনতার পর প্রথম যেই কাজটা দরকার</em><em>, </em><em>তা হলো সংবিধান প্রণয়ন। এর জন্য যেই কমিটি গঠন করা হয়</em><em>, </em><em>তাকে গণপরিষদ বলে। আমাদের স্বাধীনতার পর</em><em>, </em><em>মাত্র ৮ মাসে যেই চমৎকার সংবিধান তৈরি করা হয়েছিল</em><em>, </em><em>সেই গঠনতন্ত্র কমিটিতে অর্থাৎ গণপরিষদের একজন সদস্য ছিলেন মোহাম্মদ বয়তুল্লাহ।</em><h1>[মোহাম্মদ বয়তুল্লাহ]</h1>নওগাঁ ৭ উইং ই,পি,আর হেডকোয়ার্টারে ২৫শে মার্চের পূর্ব হতে ক্যাপ্টেন ও মেজর পর্যায়ের পাঞ্জাবী অফিসারবৃন্দের উপস্থিতির কারনে সংগ্রামের শুরুতে কিছুটা অসুবিধার সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু মার্চের শেষ ভাগে মেজর নাজমুল হক ও ক্যাপ্টেন গিয়াসউদ্দিন বদলী হয়ে নওগাঁ আসেন এবং তাঁরা উভয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহন করেন। তাঁরা প্রথমেই উপরোক্ত পাঞ্জাবী মেজর, ক্যাপ্টেন ও তৎকালীন নওগাঁর পাঞ্জাবী এস,ডি,ও-কে গ্রেফতার করেন। এ সময় আমি নওগাঁ সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি ছিলাম। আমার সক্রিয় সহযোগিতায় কয়েকদিনের মধ্যেই নওগাঁর বিভিন্ন ই,পি,আর ক্যাম্পের পাঞ্জাবী ও পাঠান সিপাহীদের গ্রেফতার করা সম্ভব হয়। এবং এর ফলে সমগ্র নওগাঁ শত্রুমুক্ত হয়।
আমার নেতৃত্বে এবং মেজর নাজমুল হক ও ক্যাপ্টেন গিয়াসউদ্দিনের পুর্ণ সহযোগিতায় বহুসংখ্যক যুবকদের সামরিক শিক্ষা দানের জন্য নওগাঁ কে,ডি স্কুল ও ডিগ্রি কলেজ প্রশিক্ষন কেন্দ্র স্থাপন করা হয়। ঐ সময় বগুড়ায় পাক-বাহিনীর গুরুত্বপুর্ণ অর্থসম্ভার (Arms Ammunition dump) ছিল। রংপুর দিনাজপুর থেকে পাক বাহিনী উক্ত অস্ত্রশস্ত্র দখল করার জন্য বগুড়ার দিকে অগ্রসর হতে থাকলে ক্যাপ্টেন গিয়াসউদ্দিনের নেতৃত্বে কিছুসংখ্যক ই,পি,আর ও কিছুসংখ্যক নতুন শিক্ষাপ্রাপ্ত যুবককে নিয়ে বগুড়ার উত্তর ধারে খান সেনাদের অগ্রগতি রোধ করা হয়। তার কিছুসংখ্যক সৈন্য মারা গেলে তারা পশ্চাদপসরণ করে। এই যুদ্ধে নওগাঁর ১৪ বছর বয়স্ক বাবলু নামক এক তরুন যোদ্ধা প্রথম শহীদ হন। ক্যাপ্টেন গিয়াসের নেতৃত্বে ঐ সময় বগুড়া থেকে বেশ কিছু অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছিল। ইতিমধ্যে ট্রেনিংপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে। এইসব তরুন মুক্তিযোদ্ধা ও ই,পি,আর জোয়ানদের নিয়ে ক্যাপ্টেন গিয়াসউদ্দিনের নেতৃত্বে পাঞ্জাবীদের তৎকালীন শক্ত কেন্দ্র (Strong hold) রাজশাহী সেক্টর আক্রমন করা হয় এবং বহু পাঞ্জাবী সৈন্য খতম করা হয়। রাজশাহীর যুদ্ধ পরিচালনায় অস্ত্ররসদ সরবরাহ এবং সামগ্রিক যুদ্ধ পরিকল্পনা শহীদ মেজর নাজমুল হক-এর নেতৃত্বে নওগাঁ হতে পরিচালিত হয়। এই পর্যায়ে সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি হিসেবে আমি সামগ্রিক সহযোগিতা প্রদান করি।
এই সময়ে আর্টিলারীর অভাবে সংগ্রাম ব্যাহত হতে থাকলে এবং পাক-বাহিনীর আরিচা-নগরবাড়ী হয়ে রাজশাহীর দিকে অগ্রসর হতে পারে এই আশংকায় উন্নত ধরনের অস্ত্রপ্রাপ্তির আশায় আমি প্রথমে একাকী মালহদ শহরে ভারতীয় সামরিক ও বেসামরিক অফিসারদের সঙ্গে সাক্ষাৎ-এর জন্য যাই। সেখানে নবাবগঞ্জের এম,সি,এ ডাক্তার মঈনউদ্দিন ওরফে মন্টু ডাক্তার সাহেবের সাথে দেখা হয়। সামরিক ও বেসামরিক অফিসারদের সাথে আলোচনার পর ঠিক হয় যে সামরিক কর্তৃপক্ষের নিকট অস্ত্র সরবরাহ করতে তাদের আপত্তি নেই। কিন্তু তৎপুর্বে মুক্তিবাহিনীর পক্ষে সামরিক কর্তৃপক্ষের সাথে তাদের আলোচনা প্রয়োজন। এমতাবস্থায় আমি নওগাঁ ফিরি এবং মেজর নাজমুল হককে সাথে নিয়ে পুনরায় মালদহ যাই। এ সময়ে ভারতীয় অস্ত্রশস্ত্রের সাহায্যে ক্যাপ্টেন গিয়াস রাজশাহী সেনানিবাস দখলের প্রায় কাছাকাছি অবস্থায় পৌঁছেছিলেন। অস্ত্র সাহায্য প্রাপ্তির আশ্বাস নিয়ে আমি ও নাজমুল হক নওগাঁ ফিরে আসি। কিন্তু ২/১ দিনের মধ্যে পাক সৈন্য ভারী কামান ও অন্যান্য অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র সজ্জিত হয়ে নগরবাড়ী অতিক্রম করে পাবনা দখল করার পর ট্রেনযোগে নওগাঁ অভিমুখে অগ্রসর হতে থাকলে আমরা আত্মরক্ষার্থে ১৭ই এপ্রিল তারিখে মেজর নাজমুল হকের সাথে পরামর্শ করে বালুর ঘাট হয়ে পশ্চিমবঙ্গে আশ্রয় গ্রহণ করি।
উল্লেখ্য যে, এই এলাকার সমস্ত সংগ্রামের অধিনায়ক মেজর নাজমুল হক শিলিগুরি থেকে তরঙ্গপুর ফেরার পথে আকস্মিকভাবে স্বহস্তচালিত জীপ দুর্ঘটনায় শহীদ হন।
এরপর আমি পশ্চিম দিনাজপুরের রায়গঞ্জের মুক্তিফৌজের সামরিক শিক্ষা শিবিরে, রাজশাহী, রংপুর, দিনাজপুর ও বগুরায় শিক্ষানবিশ যুবকদের রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও দেশপ্রেমে উদ্ধুদ্ধ করার জন্য দীর্ঘদিন অবস্থান করি এবং ট্রেনিং ক্যাম্প হতে সামরিক শিক্ষাপ্রাপ্ত প্রথম ও দ্বিতীয় ব্যাচের মুক্তি সেনাদের নিয়ে ‘শোবরা অপারেশন’ শিবিরে অবস্থান করি। এবং তাদের সঙ্গে থেকে তাদেরকে সঙ্গে থেকে তাদেরকে সংগ্রামে উদ্ধুদ্ধ করতে পারি পরবর্তীকালে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক বিভিন্ন এলাকা সেক্টরে বিভক্ত করলে আমি তরঙ্গপুর ‘শোবরা অপারেশন’ ক্যাম্পের জন্য সিভিল লিয়াজোঁ অফিসার নিযুক্ত হয়ে কাজ চালিয়ে যেতে থাকি।
যে সমস্ত এলাকায় খান সেনাদের গেরিলা যুদ্ধে ঘায়েল করা হয় তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য বান্ধাইখড়া। সেপ্টেম্বর-অক্টোবরের দিকে এখানে ৫টি বিরাট নৌকাভর্তি প্রায় ৭০/৮০ জন খান সেনাকে তাদের অফিসারসহ ব্রাশ ফায়ারে খতম করা হয়। সাহাগোলা ব্রীজ ধ্বংস করে দেয়া হয়। এবং সৈন্য বোঝাই একটি রেলগাড়ি বিধ্বস্ত করে দেওয়া হয়। এখানে প্রায় শতাধিক খান সেনা নিহত হয়। নগা-মহাদেবপুর হাই রোডের মধ্যে হাপানিয়া গ্রামে মাইন বিস্ফোরণের দ্বারা একটি সৈন্য বোঝাই ট্রাক বিধ্বস্ত করা হয়। এতে ৮/৯ জন পাক সেনা মারা যায়। হাপানিয়ার দক্ষিনে আরেকটি বিস্ফোরণে দু’জন অফিসারসহ ৫/৬ জন পাক সৈন্য নিহত হয়।
-মোহাম্মদ বয়তুল্লাহগণপরিষদ সদস্য (সাবেক এম, এন, এ)রাজশাহী ২২ অক্টোবর, ১৯৭২
<strong> </strong>
&nbsp;
<a href=”https://www.facebook.com/alamin.sorkar.7161″><strong>আলামিন সরকার</strong></a>
&lt;১৫,৩২,২৪৫-৪৮&gt;<h1>[মোহাম্মদ শামসুল হক চৌধুরী]</h1>&nbsp;
২৩ মার্চ ভুরুঙ্গামারী উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে কুড়িগ্রাম মহকুমা ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দ, আওয়ামী লীগ, স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী, পুলিশ, আনসার মুজাহিদ, সাবেক ইপিআর, আওয়ামী লীগ কর্মী, নেতা এবং সর্বস্তরের জনগণের এক বিরাট সমাবেশে আমি সভাপতিত্ব করি। এই সমাবেশে ইয়াহিয়ার ঘৃণ্য চক্রান্ত নস্যাৎ করে সশস্র সংগ্রামের মাধ্যমে পাকিস্তানী সৈন্যদের কবল থেকে মাতৃভুমিকে মুক্ত করার জন্য শপথ গ্রহণ করা হয়। ঐ সমাবেশেই স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়। ভূরুঙ্গামারীর ইতিহাসে এটিই ছিলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন।
২৫ মার্চের কাল রাত্রিতে বাংলাদেশে ব্যাপক গণহত্যা শুরু হলে ২৬ মার্চে আমরা জরুরী ভিত্তিতে স্থানীয় নেতাদের নিয়েএক গোপন বৈঠকে থানা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করি এবং সমস্ত ইউনিয়নে সংগ্রাম পরিষদ গঠন করার জন্য জরুরী নির্দেশ প্রদান করি। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ মোতাবেক সর্বস্তরের জনগণকে সংঘবদ্ধ করার জন্যও আমরা কর্মসূচী গ্রহণ করি।
ইতিমধ্যে ভূরুঙ্গামারী থানার সীমান্তবর্তী ফাঁড়িগুলোর সাবেক অবাঙালি ইপিআর’রা সাবেক বাঙালি ইপিআর’দের উপর আক্রমণের প্রস্তুতি নেয়। ইপিআর আনিস মোল্লা এবং রওশন-উল-বারীর নেতৃত্বে ইপিআরের সদস্যবৃন্দ আমাদের সহযোগীতা কামনা করলে স্থানীয় কর্মী ও নেতৃবৃন্দসহ আমার ভূরুঙ্গামারীর বাসস্থানে এক জরুরী বৈঠকে অবাঙালি ইপিআরদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে বাঙালি ইপিআরদের সক্রিয় সাহায্যের পরিকল্পনা করা হয়।
২৮ মার্চ অবাঙালি ইপিআরদের বিরুদ্ধে আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। পরদিন ২৯ মার্চ বাঙালি ইপিআর এবং সম্মিলিত ছাত্র জনতার সঙ্গে প্রত্যক্ষ সংঘর্ষে জয়মনিরহাট ক্যাম্পের একজন অবাঙালি সুবেদার, একজন ড্রাইভার এবং একজন ওয়্যারলেস অপারেটর নিহত হয়। উক্ত জয়মনিরহাট ক্যাম্পে অবাঙালি ইপিআরদের সঙ্গে সহযোগীতাকারী জয়মনিরহাটের একজন অবাঙালি চক্ষু চিকিৎসক জনগণের হাতে নিহত হয়।
&nbsp;
অত্র থানার অন্যান্য সীমান্ত ফাঁড়ি যেমন- কেদার, সোনাহাট, ধলডাঙ্গা প্রভৃতি স্থানে বাঙালি ইপিআরদের সঙ্গে সংঘর্ষে কয়েকজন অবাঙালি নিহত হয়। অবাঙালি ইপিআরদের কবল থেকে জয়মনিরহাট ক্যাম্প উদ্ধার করার সঙ্গে সমস্ত অস্রাদি আওয়ামী লীগের তত্ত্বাবধানে রাখা হয় এবং নাগেশ্বরী ও ভূরুঙ্গামারী থানার সমস্ত বাঙালি ইপিআরগণকে তাদের অস্ত্রসমেত উক্ত ক্যাম্পে জরুরী ভিত্তিতে সংঘবদ্ধ করা হয়।
অতঃপর সাবেক বাঙালি ইপিআরগণের সঙ্গে আনসার, মুজাহিদ এবং আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী জয়মনির হাটে যোগ দেয়। ছাত্র ও যুব সম্প্রদায়ও এখানে যোগ দেয়। এদের সকলকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে নিয়ে আমরা হানাদার বাহিনী প্রতিরোধের ব্যবস্থা করি।
জয়মনিরহাটে সংঘবদ্ধ এই দলকে বিভিন্ন ক্যাম্পে এবং পুলিশ ফাঁড়ি থেকে প্রাপ্ত সামান্য অস্র দিয়েই রংপুর সামরিক গ্যারিসন থেকে হানাদার বাহিনী যাতে অত্র অঞ্চলে প্রবেশ করতে না পারে সেজন্য তিস্তাপুল প্রতিরোধ কেন্দ্রে পাঠানো হয়। এই সংঘবদ্ধ মুক্তিযোদ্ধাদের খাওয়াসহ যাবতীয় আর্থিক দায়িত্ব আমি স্থানীয় কর্মী ও নেতৃবৃন্দের সহযোগীতায় পালন করেছি। অতঃপর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রয়োজনীয় অস্র যোগান দেয়াই ছিলো বড় সমস্যা।
২৯ মার্চ আমি ব্যক্তিগত উদ্যোগে স্থানীয় নেতৃবৃন্দকে নিয়ে বন্ধুরাষ্ট্র ভারতের আসাম ও পশ্চিমবঙ্গ সীমান্তে সোনাহাট এবং সাহেবগঞ্জ সীমান্ত ঘাটির সেনাধ্যক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করি। আমাদের অনুরোধে উক্ত সেনাধ্যক্ষ প্রাথমিক বেসরকারী সাহায্য হিসেবে ১ এপ্রিল মধ্যরাতে ২টি হালকা মেশিনগান, কিছুসংখ্যক রাইফেল এবং প্রচুর হাতবোমা প্রদান করেন। এসব অস্র তিস্তা প্রতিরোধ কেন্দ্রে সরাসরি পাঠানো হয়। পরবর্তীকালে আমি সোনাহাট এবং সাহেবগঞ্জের ভারতীয় সীমান্ত ঘাঁটি থেকে সামরিক সাহায্য নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে পাঠিয়েছি।
৫ ই এপ্রিল ভুরুঙ্গামারী কলেজে আমরা প্রথম মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য প্রশিক্ষণ কেন্দ্র খুলি। যুবক এবং ছাত্ররা এখানে প্রশিক্ষণ নিতে থাকে। শীঘ্রই বাংলাদেশের অধিকৃত অঞ্চল থেকে বহু ছাত্র-যুবক এখানে আসতে থাকলে এই প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটি সম্প্রসারণ করা হয়। সমগ্র রংপুর জেলার বিভিন্ন সীমান্ত ফাঁড়ি থেকে বাঙালি ইপিআরবৃন্দকে আমরা ভূরুঙ্গামারী থানায় সংঘবদ্ধ করতে সমর্থ হই। বিভিন্ন সীমান্ত ফাঁড়ি থেকে আগত ইপিআরদের মধ্যে দুই কোম্পানী ইপিআরকে তিস্তা প্রতিরোধ কেন্দ্রে পাঠিয়ে দেই। এক কোম্পানী ইপিআরকে ভূরুঙ্গামারীতে সংরক্ষিত রাখা হয়।
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের মুক্তিযোদ্ধাদের প্রথম ও প্রধান নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র হিসেবে ভূরুঙ্গামারী প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হানাদার কবলিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত অসংখ্য অসংখ্য গেরিলা যোদ্ধা তৈরি করেছে। প্রাথমিক পর্যায়ে প্রাথমিক ট্রেনিং দিয়েই গেরিলাদের সরাসরি প্রতিরোধ ঘাঁটিতে পাঠানো হয়েছে। পরবর্তীকালে এখান থেকে মুক্তিযোদ্ধাদেরকে উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য ভারতে পাঠানো হয়েছে। সংগ্রাম পরিষদের মাধ্যমে অত্র থানার বিভিন্ন ইউনিয়নের জনগণ মুক্তিযোদ্ধাদেরকে আর্থিক সাহায্য করেছেন। এছাড়া ভারতীয় জনগণ ভূরুঙ্গামারী থানার প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোতে চাল গম আলু কেরোসিন পেট্রোল সিগারেট বিস্কুট ঔষধপত্র প্রভৃতি সামগ্রী দিয়ে সাহায্য করেছেন।
৮ ই এপ্রিল ভারতে আশ্রিত আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের এক জরুরী গোপন নির্দেশ পাই। উক্ত নির্দেশে উত্তরাঞ্চলের সাবেক গণপরিষদ সদস্যবৃন্দকে অবিলম্বে ভারতের এক অজ্ঞাত স্থানে সম্মিলিত হয়ে স্থানীয় ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করতে বলা হয়।
সে মোতাবেক ৯ এপ্রিল আমি অত্র অঞ্চলের অপরাপর গণপরিষদ সদস্যদের নিয়ে ভারতের আসাম প্রদেশের গোয়ালপাড়া জেলার সোনাহাট সীমান্ত ঘাঁটিতে উপস্থিত হই। অতঃপর সামরিক কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণে আমাদেরকে আসাম প্রদেশের গোয়ালপাড়া জেলার রূপসা বিমান বন্দরে নিয়ে আসা হয়। এখানেই আওয়ামী লীগের অন্যতম প্রধান সৈয়দ নজরুল ইসলাম সহ বহু নেতার সাথে আমরা প্রথম মিলিত হই। কিছুক্ষণের মধ্যে তাজউদ্দিন আহমেদ, কুষ্টিয়ার ব্যারিষ্টার আমিরুল ইসলাম, শেখ ফজলুল হক মনি, ভারতের ইস্টার্ন কমান্ডের প্রধান জগজিৎ সিং অরোরা, আসাম ৮২তম সীমান্তরক্ষী ব্যাটালিয়নের সেনাধ্যক্ষ, কর্নেল আর দাস রূপসা বিমান বন্দরে অবতরণ করেন এবং আমাদের সঙ্গে জরুরী বৈঠকে মিলিত হন। এই বৈঠকে উত্তরাঞ্চলের ভারতীয় সামরিক সাহায্য, মুক্তিবাহিনীর তত্ত্বাবধান ও তাদের সার্বিক দায়িত্ব আমার উপর অর্পণ করা হয়। এই সময় জনাব মিজানুর রহমান চৌধুরী, জনাব মতিউর রহমান সহ সাবেক বাংলাদেশ বাহিনী প্রধান ওসমানী মুক্তাঞ্চল সফর করে আমাকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেন। এভাবে ঊর্ধ্বতন নেতৃবৃন্দ ও স্থানীয় জনগণের সাহায্য সহযোগীতা এবং ভারতীয় জনগণ ও সামরিক কর্তৃপক্ষের সাহায্যে আমরা ২৬ মে পর্যন্ত কুড়িগ্রাম শহরের উত্তরে ধরলা নদীর উত্তর তীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থা অটল রাখতে সক্ষম হই।
২৬ মে রাতে পাক বাহিনীর ভারী অস্ত্রের মুখে আমাদের পাটেশ্বরী প্রতিরোধ ঘাঁটি ভেঙ্গে গেলে আমরা ভারতে আশ্রয় গ্রহন করি।
&nbsp;
ভারতে প্রবেশের পরপরই মুক্তিযোদ্ধাদের সংঘবদ্ধ করা হয়। ভারতের পশ্চিম বাংলা সীমান্তের সাহেবগঞ্জ ও আসামের সোনাহাটে ভারতীয় সামরিক বাহিনীর অনুমোদনে মুক্তিযোদ্ধাদের গেরিলা ঘাঁটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এখান থেকেই মুক্তিযোদ্ধারা অধিকৃত ভূরুঙ্গামারী এবং নাগেশ্বরী থানার বিভিন্ন স্থানে হানাদারদের প্রতি আঘাত হানতে থাকে। বাংলাদেশ সরকারের পরিকল্পনা মোতাবেক অধিকৃত অঞ্চল থেকে মুক্তিযোদ্ধা সংগ্রহ করার জন্য পশ্চিম বাংলা সীমান্তে যুব শিবির খোলার খোলার দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহন করা হয়। প্রাথমিক অবস্থায় এই যুব শিবিরগুলো স্থানীয় ভারতীয় জনগণের আর্থিক সাহায্যপুষ্ট ছিলো। পরবর্তীকালে বাংলাদেশ সরকার যুব শিবিরগুলোর আর্থিক দায়িত্ব গ্রহন করে। যুব শিবিরে ভারতীয় সেনাবাহিনীর সহায়তায় মুক্তিযোদ্ধাদের প্রাথমিক ট্রেনিং-এর পর তাদের উচ্চতর ট্রেনিং-এর জন্য ভারতের অভ্যন্তরে পাঠানো হতো।
দুধকুমার নদীর পূর্ব তীরস্থ নাগেশ্বরী এবং ভূরুঙ্গামারী থানার এক বিস্তীর্ণ অঞ্চল হানাদার কবল মুক্ত ছিলো। এই সমস্ত অঞ্চলের জনগণের সাহায্যের জন্য আমরা বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে সাধ্যমত চেষ্টা চালিয়েছি। মুক্তাঞ্চলের জনগণের নিরাপত্তার জন্য নাগেশ্বরী থানার সুবলপাড় বন্দরে এবং মাদারগঞ্জে মুক্তিযোদ্ধাদের ছোট ছোট ঘাঁটি স্থাপন করা হয়েছিলো। পশ্চিম বাংলার কুচবিহার জেলা শহর উত্তরাঞ্চলের সাবেক গণপরিষদ সদস্যবৃন্দের প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ সরকারের Northern zone অফিস হবার পরপরই মুক্তাঞ্চলে চিকিৎসা ও ঔষধপত্রের তীব্র অভাব জরুরী ভিত্তিতে মিটানো হয়। মুক্তাঞ্চলে সোনাহাটে প্রধান মেডিকেল কেন্দ্র স্থাপন করে সেখান থেকে বিভিন্ন অঞ্চলে উক্ত মেডিকেল কেন্দ্র খোলা হয়। বাংলাদেশ সরকারের কুচবিহারস্থ Northern zone medical centre থেকে মুক্তাঞ্চলে ঔষধপত্র সরবরাহ করার ব্যবস্থা আমরা করেছি। আসাম প্রদেশে ৮২তম ব্যাটালিয়ন হেডকোয়ার্টারে যোগাযোগ করে সেখান থেকে ঔষধপত্র লাভ করেছি এবং উক্ত অঞ্চলের জনগণকে বিনামূল্যে বিতরণ করেছি। মুক্তাঞ্চলে খাদ্য সংকট দেখা দিলে আমি তা অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারকে অবহিত করি এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগে Northern zone-এর সাবেক চেয়ারম্যান, সাবেক গণপরিষদ সদস্য জনাব মতিউর রহমানকে মুক্তাঞ্চল পরিদর্শন করতে আহবান জানাই। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে তিনি ৭১ সালের নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে সোনাহাটে এক বিরাট গণসমাবেশে ১০ হাজার টাকা প্রদান করেন। স্থানীয় কর্মীদের সহায়তায় উক্ত টাকা বিতরণ করা হয়। প্রসঙ্গতঃ উল্লেখযোগ্য, বাংলাদেশ সরকারের Northern zone-এর প্রচার বিভাগের বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব আমার উপর অর্পণ করা হয়েছিলো। মুক্তাঞ্চলের জাতীয় ঐক্য অক্ষুন্ন রাখার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা আমরা সাধ্যমতো চালিয়েছিলাম।
বাংলাদেশের সাবেক ইপিআর বাহিনীর ক্যাপ্টেন নওয়াজেদের অধীনস্থ সাহেবগঞ্জ ঘাঁটির গেরিলা যোদ্ধা এবং ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর আসাম সীমান্তের সোনাহাট ঘাঁটির গেরিলা মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে ভারতীয় সনাবাহিনীর সৈন্যদের এক যৌথ অভিযানের পর ১৭ নভেম্বর ভূরুঙ্গামারী মুক্ত হয়। এর পরই অত্র থানার আন্ধারীঝাড় বাজার থেকে পাক বাহিনী তাদের গোলন্দাজ বাহিনী সরিয়ে পিছু হটে গেলে ভূরুঙ্গামারী থানা শত্রুমুক্ত হয়। এই এলাকা মুক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভারতে আশ্রিত জনগণ বিধ্বস্ত ভূরুঙ্গামারীতে দলে দলে প্রবেশ করতে থাকে। মাতৃভুমিতে পা দিয়েই জনগণের আনন্দ উল্লাস আমাদেরকে অভিভূত করে। ডিসেম্বরে সারা বাংলাদেশের মুক্তির সাথে সাথে জনগণ এক অভূতপূর্ব আনন্দে উল্লসিত হয়েছে। দীর্ঘ পঁচিশ বছরের স্বাধিকার আন্দোলন থেকে সশস্র সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়কে জনগণ বাঙালি জাতির এক ঐতিহাসিক বিজয় বলে মনে করেছে।
– শামসুল হক চৌধুরী
গণপরিষদ সদস্য, (সাবেক এম, পি, এ)
রংপুর-১২
১৭ ই মে, ১৯৭৩
&nbsp;
<a href=”https://www.facebook.com/alamin.sorkar.7161″><strong>আলামিন সরকার</strong></a>
&lt;১৫,৩২,২৪৮-৫১&gt;<h1>[অধ্যাপক মোহাম্মদ শামসুল হক]</h1>&nbsp;
স্বাধীনতা যুদ্ধ আরম্ভ হবার প্রাক্কালে আমি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক ছিলাম। সত্তরের নির্বাচনের ফলাফল অনুযায়ী ক্ষমতা হস্তান্তরের ব্যাপারে পাক-সামরিক জান্তার ক্রিয়াকলাপ অনেকের মতো আমার মনেও সন্দেহ জাগিয়ে তোলে। জাতীয় পরিষদের প্রথম অধিবেশনের তারিখ পরিবর্তন করা হয় এবং ঢাকার বৈঠকে যোগদানের ব্যাপারে ভুট্টোর অনীহা প্রকাশের ফলে বৈঠক অনিশ্চিত হয়ে পড়লে সারা দেশ ক্ষোভে উত্তেজনায় ফেটে পড়ে। এই পটভূমিতে ১৬ মার্চ থেকে ২৩ মার্চ পর্যন্ত ইয়াহিয়া-ভুট্টো ও সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন লাভকারী আওয়ামী লীগ নেতাদের মধ্যে যে আলোচনা চলে স্বভাবতই তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিয়ে তা আমরা অনুসরণ করছিলাম। আমার ধারণা ছিল এই চরম সংকট ও অচলাবস্থা নিরসনে তাঁরা হয়তো একটা সমঝোতায় উপনীত হবেন।
অন্যদিক সারাদেশে প্রতিদিনই ইয়াহিয়ার সামরিক তৎপরতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সভা ডাকা হচ্ছিলো। ২৩ মার্চ বিকেলে চট্রগ্রাম শহরে ছাত্র শিক্ষক জনতার একটি প্রতিবাদ মিছিল বের হয় ও প্যারেড গ্রাউন্ডে গিয়ে মিলিত হয়। এই জনসভায় আমরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছাত্র-শিক্ষক অনেকে গিয়েছিলাম। সভা চলাকালে খবর পেলাম, চট্রগ্রাম বন্দরে বাঙালি শ্রমীকরা জাহাজ থেকে অস্ত্র নামাতে অস্বীকার করায় পাক বাহিনীর জোয়ানরা গোলাবর্ষণ করেছে। এরপর সভা মূলতবী হয়ে যায়। চট্রগ্রাম শহর থেকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ফিরে আসার সময় এক অভুতপূর্ব স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিরোধ প্রত্যক্ষ করি। তরুণ ও যুবকরা সেচ্ছাসেবকের প্রতীক নিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ব্যারিকেড সৃষ্টি করেছে। দেখে মনে হলো তারা পাক সামরিক অভিযান বাঁধা দিতে অকুতোভয়। ক্যাম্পাসের দিকে এগুতে পারিনি। গ্রামের ভিতর দিয়ে পায়ে হেটে পথ খুঁজে নিয়ে আমাদের ক্যাম্পাসে পৌঁছতে অনেক রাত হয়েছিলো।
&nbsp;
দেশের এই ক্রান্তিকালে যে কোন মুহূর্তে নতুন কোন ঐতিহাসিক অধ্যায়ের উন্মোচন হতে পারে এরূপ একটা অবস্থায় গভীর ঔৎসুক্য নিয়ে প্রতিদিন বেতারে খবর শুনতাম। ২৬ মার্চ সকালে রেডিও খুলতেই হঠাৎ অস্বাভাবিক অবস্থা মনে হলো। ভারী কণ্ঠ যা কোনো বাঙালির মনে হয়নি। ঘোষণা শুনতে পেলাম। ঢকাতে কারফিউ জারি হয়েছে, পরবর্তী ঘোষণার জন্য অপেক্ষা করুন। সেই মুহুর্তে ঢাকায় কি ঘটেছে তা জানা যায়নি। তবে সাংঘাতিক কিছু একটা হয়েছে তা আঁচ করা যাচ্ছিলো।
দ্বিপ্রহরের পর থেকে আকাশবাণীর খবরে ঢকার কিছু কিছু সংবাদ পেলাম। ইপিআর ও পুলিশ ক্যাম্প আক্রমণ করেছে পাক সেনারা, নিরীহ জনসাধারণের উপরও তারা ভারী অস্ত্র-শস্ত্র নিয়ে চড়াও হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের অনেক পরিচিতজনের নিহত হবার কথাও শুনলাম। ঠিক সেই মুহুর্তে চট্রগ্রামে আমরা কি করবো তা স্থির করতে পারি নি।
২৬ মার্চ রাত বারোটার দিকে উপাচার্য ডঃ আজিজুর রহমান মল্লিক আমাকে ডেকে পাঠান এবং বলেন আরো যাকে পান সঙ্গে নিয়ে আসবেন। গিয়ে দেখি অনেক ইপিআর(তদানীন্তন ইষ্ট পাকিস্তান রাইফেল)-এর লোকজন রামগড় ও সন্নিহিত সীমান্ত এলাকায় তাদের স্থান ছেড়ে ক্যাম্পাসে এসে জড় হয়েছে। এদের খাওয়ার ব্যবস্থা করাই ছিলো সেই মুহুর্তের সবচেয়ে জরুরী কাজ। আমাকে সেই দায়িত্ব দেয়া হলো। অন্যান্য কর্মীদের সঙ্গে নিয়ে গেলাম। চাল ডাল তরকারী ইত্যাদি সংগ্রহ করে তাদের খাওয়ার আয়োজন করা হলো। এ অবস্থায় তারা কি করবে এ নিয়ে আমাদের আলোচনা হয়। চট্রগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট আক্রমণ যায় কিনা এবং কি উপায়ে তা করা যাবে এ ব্যাপারে অনেক কথাবার্তা হলো। উল্লেখ্য যে, এদের মধ্যে অফিসারের সংখ্যা ছিলো কম।
ডঃ মল্লিক বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার উদ্ভুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। অবস্থা মোকাবেলার জন্য তার গোপন নির্দেশে আমরা মলোটভ ককটেল জাতীয় কিছু বোমা তৈরী করার উদ্যোগ নিয়েছিলাম। এ ব্যাপারে তিনি আমাকে সাহায্য করার জন্য সিএসআইআর-এর ডঃ আবদুর হাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। রসায়ন বিভাগের ডঃ মেসবাহউদ্দিন ও পদার্থ বিঞ্জান বিভাগের এখলাস উদ্দিনের সহায়তায় চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ল্যাবরেটরীতে আমরা এ ধরনের কিছু হাতবোমা তাৎক্ষণিকভাবে বানাতে সক্ষম হই এবং সেগুলো পরীক্ষামূলক ব্যবহার করি।
২৭ তারিখ কালুরঘাট স্বাধীনবাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র হতে মেজর জিয়া কর্তৃক স্বাধীনতার ঘোষণা শোনা যায়। ঐ ঘোষণার প্রথমে তিনি নিজেকে প্রেসিডেন্ট বলে উল্লেখ করেছিলেন পরে তা সংশোধন করে শেখ মুজিবের পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা সম্প্রচার করেন। তার নেতৃত্বে ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের জোয়ানরা কালুরঘাটে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে বলেও আমরা খবর পাই। ডঃ মল্লিক কালুরঘাট স্টেশনের সাথে যোগাযোগ স্থাপনের ব্যবস্থা করেন।
এই বেতার ঘোষণার পর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অবস্থান করা আমাদের কারো পক্ষে আর নিরাপদ ছিলো না। মল্লিক সাহেব ক্যাম্পাসে অবস্থানরত মহিলা ও শিশুদের আগে সরাবার ব্যবস্থা করেন। ৩০ মার্চ সকালের দিকে অন্যান্যদের সঙ্গে আমার পরিবার কুন্ডেশ্বরী বালিকা বিদ্যালয় হোস্টেলে আশ্রয় নেয়। অপরাহ্নে আমরাও মিলিত হই তাদের সঙ্গে। নিরাপত্তার আশংকা আমাদের তাড়িয়ে নিয়ে চলছিলো সর্বত্র। ফজলুল কাদের চৌধুরীর লোকেরা সেখানে আমাদের ভয়ভীতি প্রদর্শন করতে শুরু করে। আমরা সত্ত্বর সে স্থান ত্যাগ করে নাজিরহাটে চলে যাই। এখানে মল্লিক সাহেব, ডঃ আনিসুজ্জামান, সৈয়দ আলী আহসান এবং আরো অনেক শিক্ষক অবস্থান করছিলেন। ডঃ মল্লিক চট্রগ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা হান্নান সাহেব ও অন্যান্য রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করছিলেন। তারা সীমান্ত অতিক্রম করার নির্দেশ দেন। সকলে চলে যাবার পর আমরা আরো প্রায় এক সপ্তাহ সেখানে কাটাই। এ সময় মুক্তিবাহিনীর তৎপরতা শুরু হয়ে যায়। বিভিন্ন স্থানে সেতু উড়িয়ে তারা যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করতে থাকে। এ অবস্থায় আমরা কয়েকটি পরিবার নৌকায় করে রামগড় টি এস্টেটে চলে যাই। সেখানে এক রাত কাটানোর পরই হানাদার বাহিনীর অভিযানের সংবাদ ও গোলাগুলির শব্দ শুনতে পাই। অতি সত্ত্বর আমরা নদী পার হয়ে ভারতের সাবরুমে একটি প্রাইমারী স্কুলে এসে পৌঁছি। এখানে সপ্তাহখানেক অবস্থান করি। স্কুলের একেকটি কামরায় প্রায় ১০টি করে পরিবারকে এই ক’দিন কোনমতে থাকতে হয়েছিলো।
এরপর আগরতলায় এসে ডঃ মল্লিক ও বাংলাদেশ থেকে আগত অনেকের সঙ্গে দেখা হয়। এখানে বেশ কিছুদিন অবস্থান করি। একটি টেকনিক্যাল স্কুলের পরিত্যক্ত হোস্টেলে সপরিবারে আশ্রিত হই। মে মাসের প্রথম দিকে ডঃ মল্লিক কোলকাতায় যান। সৈয়দ আলী আহসানও তার পরপরই চলে যান।
আগরতলায় শরণার্থীদের জন্য ক্যাম্প খোলা হয়েছিলো। এসব ক্যাম্পে বাংলাদেশ থেকে আগত যুবক ও ছেলেদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছিলো। আমি এসব ক্যাম্পে যাতায়াত করেছি এবং মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে তাদেরকে উদ্বুদ্ধ করার জন্য প্রচেষ্টা চালিয়েছি। এখানে মেজর জিয়া, ক্যাপ্টেন আকবর হোসেন, মেজর মীর শওকত আলী প্রমুখ মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সামরিক ব্যক্তিবর্গের সঙ্গেও মাঝে মাঝে আমার দেখা সাক্ষাৎ হতো। মেজর নুরুজ্জামান আমাদের খাওয়া দাওয়ার ব্যাপারে সহায়তা করেছিলেন।
ইতিপূর্বে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষভাবে সহায়তা করা এবং শরণার্থী শিক্ষকদের নানাভাবে সহায়তা করার উদ্যেশ্য নিয়ে ‘কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ সহায়ক সমিতি’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান সংগঠিত হয়েছিলো। এই প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ থেকে আগত শিক্ষকদের ঠিকানা ও বিবরণ চেয়ে পাঠানো হয়েছিলো যাতে তারা ভারতে কোথাও কোনোভাবে আশ্রয় নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করতে পারেন। তাদের এই আহবান অনুযায়ী আমি আমার বায়োডাটা পাঠিয়েছিলাম। কিছুদিন পর কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর আগরতলা এসে আমাদের সঙ্গে দেখা করেন। তিনি ছিলেন অনেক বয়োজ্যেষ্ঠ। আমাকে বললেন, “তুমি তো বোঝই আমাদের এখানে চাকরির অনেক অসুবিধা। তবে তোমার জন্য বোধ হয় একটা ব্যবস্থা করা যাবে।“ আমি কোলকাতা প্রেসিডেন্সী কলেজের প্রাক্তন ছাত্র ছিলাম এবং সে সময় চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রফেসর পদে উন্নীত হয়েছিলাম। তাই তিনি বোধ হয় আমাকে এই আশ্বাস দিয়েছিলেন। তিনি আমাকে কোলকাতা যেতে আহবান জানান এবং বিমানের টিকিট পাঠিয়ে দেন।
কোলকাতা গিয়ে আমি মুজিবনগর সরকারের অফিসে দেখা করি। অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির সঙ্গে আমার পূর্ব পরিচয় ছিলো। তিনিও আমাকে আশ্বাস দিলেন। ইতিমধ্যে সৈয়দ আলী আহসান সাহেবও শরণার্থী শিক্ষক বুদ্ধিজীবিগণের জন্য বিদেশের একটি সাহায্য সংস্থা হতে কিছু অর্থ সাহায্যের ব্যবস্থা করেছিলেন।
‘বাংলাদেশ সহায়ক সমিতি’ আমার বায়োডাটা পাঠিয়েছিলো পাতিয়ালা বিশ্ববিদ্যালয়ে। তাতে আমার ঠিকানা ছিলো আগরতলার। জুনের শেষের দিকে আমি কোলকাতায় আগরতলা থেকে পুনঃপ্রেরিত পাতিয়ালা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি চিঠি পাই। বিভাগীয় প্রধান ঐ চিঠিতে আমাকে এই বিশ্ববিদ্যালয় ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে যোগ দেবার আহবান জানান। তিনি আরো জানান যে, এজন্য তারা আমাকে এক হাজার রুপী মাসিক বেতন দিতে পারবেন। এই প্রস্তাব আমি সানন্দে গ্রহণ করি এবং জুলাই মাসের ১ তারিখে পাতিয়ালা রওয়ানা। এরপর থেকে আমি বাংলাদেশ শত্রুমুক্ত হওয়ার দিন পর্যন্ত সেখানেই ছিলাম।
পাতিয়ালায় অবস্থানকালে আমি রেডিও মারফত মুক্তিযুদ্ধের খবর ও পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত থেকেছি। সেখানে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে বিভিন্ন জায়গায় বক্তৃতা দিয়ে জনমত সৃষ্টির চেষ্টা করেছি। দেশ স্বাধীন হলে বর্তমান নেতৃত্ব সরকার পরিচালনায় সমর্থ হবেন কিনা, আমাদের মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক এরূপ নানা সংশয় বিদ্যমান ছিলো স্থানীয় লোকদের মধ্যে। পাক হানাদার বাহিনীর গণহত্যা একটা ব্যাপক প্রোপাগান্ডা হিসেবে অনেকে মনে করতো। শরণার্থীদের ক্ষেত্রেও অনুরূপ ধারণা ছিলো। আমি তাদের যথাসাধ্য বোঝাতে চেষ্টা করেছি। আমি এই ভেবে তাদের ধারণা পরিবর্তনের প্রয়াস পেয়েছি যে, আমরা শিক্ষকরা রাজনীতির সঙ্গে কখনো সরাসরি জড়িত ছিলাম না। তবে কেন আমাদেরকে এভাবে খালি হাতে দেশত্যাগ করতে হলো?
পাতিয়ালায় থাকাকালে ভারতের দূরবর্তী এলাকাসমূহে মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে জনমত গঠনের আরো কয়েকটি প্রক্রিয়া আমি প্রত্যক্ষ করি। যেমন, সিনেমা হলগুলোতে বাংলাদেশে পাক হানাদার বাহিনীর গণহত্যা, শরণার্থীদের অন্তহীন দুর্ভোগ ও দুর্দশা সম্বলিত সংবাদচিত্র প্রদর্শণী, বাংলাদেশ সম্পর্কে নেয়া বিভিন্নজনের সাক্ষাৎকারের ছবি ও কযাপশন প্রদর্শণী ইত্যাদি। এমনকি ইতিপূর্বে আগরতলা প্রবাসকালে ভারতীয় সংবাদপত্র আমার যেসব বিবৃতি ও সাক্ষাৎকার নিয়েছিলো তার কিছু কিছু পাতিয়ালাতেও প্রদর্শিত হয় বলে আমি জানতে পারি।
&nbsp;
১৬ ই ডিসেম্বর বাংলাদেশ শত্রুমুক্ত হবার পর আমি স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করি এবং ২৫ ডিসেম্বর তারিখে চট্টগ্রাম এসে পৌছি।–
&nbsp;
-মোহাম্মদ শামসুল হক
(উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়)
জুন, ১৯৮৪
&nbsp;
&nbsp;
&nbsp;
<a href=”https://www.facebook.com/razu.romeo?fref=ts”>রাজু আহসান হাবীব</a>
&lt;১৫,৩৪,২৫১-৫২&gt;<h1>[মোহাম্মদ হুমায়ূন খালিদ]</h1>মেঘালয়ের তুরাতে এফ জে সেক্টরে মুক্তিবাহিনীর ট্রেনিং সেন্টারে দীর্ঘ আট মাস মোটিভেশনের দায়িত্বে ছিলাম । এই কয় মাসে প্রায় ১৬ হাজার মুক্তিবাহিনীর সদস্য আমার হাত দিয়ে শপথ নিয়ে দেশের অভ্যন্তরে ঢোকে । আমি নিজেও দীর্ঘ ৪ মাস গেরিলা ট্রেনিং গ্রহণ করি।
টাঙাইলের গেরিলা নেতা কাদের সিদ্দিকির সঙ্গে সর্বপ্রথম আমার প্রত্যক্ষ যোগাযোগ হয় । মুক্তি বাহিনীর ছেলেদের ট্রেনিং গ্রহণ করার পর টাঙ্গাইল ময়মনসিংহের ভাল ভাল ছেলেদের সরাসরি কাদের সিদ্দিকির নিকট পাঠিয়ে দিই ।
&nbsp;
কাদের সিদ্দিকির জন্য কিছু ( উচ্চ মানের ) অস্ত্রশস্ত্র পাঠানোর ব্যাপারে আমি ভারতীয় উক্ত সেক্টরের বিগ্রেডিয়ার সাচ্ছু সিংহের সঙ্গে দেনদরবার করি । এই খবর পাক বাহিনী পায় । ফোলে আমার স্ত্রী পুত্র – পরিবারকে বন্দি করে তাদেরকে কঠোর ইন্টারগেশন করে । অবশ্য অন্য কোন অত্যাচার না করে তাদের ছেড়ে দেয়া হয় । আমি এই খবর ভারতে থেকে পাই । আরও জানতে পারি যে পাক সেনারা আমার পালক পুত্র (কলেজের ছাত্র ) সোহরাব হোসেনকে বন্দি করে টাঙ্গাইল জেলে রেখেছে ।
মুক্তিযুদ্ধের দীর্ঘ ৮ মাসে মাইঙ্কার চর , মহেন্দ্র-গঞ্জ ও ডালুতে ঘুরে ঘুরে বেঙ্গল রেজিমেন্ট , ইপি আর ও মুক্তিবাহিনীর ছেলেদের সামনে বক্তৃতা করে উদ্বুদ্ধ করতাম । তারা বজ্রশপথে মাতৃভূমি উদ্ধার কল্পে বাংলাদেশে ঢুকতো । নটিয়াপাড়া , বাঐখোলা, পাটখাগুড়ি , বাসাইল হাতিবান্দা ও মিরিকপুরে ১২ জন নিহত হয় । এদের সবাইকে গুলি করে হত্যা করা হয় । গণহত্যার স্থান ছিল মিরিকপুর বাসাইল। আমার পালিত পুত্রের বাবা খন্দকার শামসুর রহমানকে শুধু আমারই পালক পুত্রের বাবা হওয়ার অপরাধে ধরে এনে টাঙ্গাইল সার্কিট হাউসের সামনে নৃশংসভাবে জবাই করে হত্যা করা হয় ।
৩রা এপ্রিল ( যেদিন পাকবাহিনী টাঙাইলে প্রথম ঢুকে ) নাটিয়াপাড়াতে পাকবাহিনীর সঙ্গে মুক্তিবাহিনীর কাদের সিদ্দিকির নেতৃত্বে তুমুল যুদ্ধ হয় । নটিয়া পাড়া বাজার ও আশেপাশের বাড়িঘর পাক বাহিনী পুড়িয়ে দেয়।
আমার স্ত্রী রিজিয়া খালিদ পাক বাহিনীর হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার পর লজ্জায় অপমানে অসুস্থ হয়ে পড়েন । পরে চিকিৎসার জন্য ছদ্মনামে তিনি ঢাকা হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে ভর্তি হন । আমার প্রাক্তন ছাত্র ( ডাঃ আব্দুর রহমান ) উক্ত হাসপাতালের ডাক্তার আমার স্ত্রীকে বাঁচানোর জন্য অনেক চেষ্টা করেও রক্ষা করতে পারেন নি । ৩রা ডিসেম্বর ১৯৭১ সাল শুক্রবার সকাল ৯টায় তিনি প্রাণত্যাগ করেন । মারা যাওয়ার প্রাক্কালে প্রকাশ পেয়ে যায় যে তিনি আমারই স্ত্রী এবং যখন তার লাশ টাঙাইলে নেয়ার জন্য অনুমতি চাওয়া হয় , পাক বাহিনীর কাছে তা অগ্রাহ্য হয় । ফলে একদিন পর ৪ঠা ডিসেম্বর আজিমপুর গোরস্থানে তাকে দাফন করা হয় । সে সময় ঢাকায় ভীষণভাবে বোমাবর্ষিত হচ্ছিল । আমার স্ত্রীর এই অকাল মৃত্যুর খবর আমি ঘাঁটাইলে পাই ১৩ ডিসেম্বর , সর্বপ্রথম আমি যখন ভারত থেকে টাঙাইলের দিকে আসছিলাম।
কাদের সিদ্দিকির উপস্থিতিতে ১৮ই ডিসেম্বর ঢাকার পল্টন ময়দানে যে জনসভা হয়, সেই সভায় আমি কোরআন তেলাওয়াত করি এবং মর্মস্পর্শী বক্তৃতা দিই । এটি ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে প্রথম জনসভা । এই সভায় বঙ্গবন্ধুর মুক্তির জন্য আমি মোনাজাত পরিচালনা করি তাতে সমস্ত জনসভা যেন কান্নার রোলে ফেটে পরে।
&nbsp;
-অধ্যক্ষ হূমায়ুন খালিদ
এমসিএ (সাবেক এম এন এ)
টাঙ্গাইল
&nbsp;
<a href=”https://www.facebook.com/alamin.sorkar.7161″><strong>আলামিন সরকার</strong></a>
<strong>&lt;১৫,৩৫,২৫২-৬৩&gt;</strong><h1>[মোহাম্মদ রহমতউল্লাহ]</h1>বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো নওগাঁতেও স্বাধীনতা আন্দোলনের জোয়ার পুরোমাত্রায় এসেছিলো। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের স্থানীয় শাখাসমূহ তাদের নিজ নিজ কেন্দ্রীয় সংগঠনের নির্দেশ অনুযায়ী কর্মকান্ড চালিয়ে যাচ্ছিলেন। এ সংগ্রাম ছিলো সত্যিকার অর্থেই জনতার সংগ্রাম। অন্যান্য এলাকার মতো নওগাঁবাসীদের অবদানও এতে কোনো অংশে কম ছিলো না। ২৬শে মার্চের আগেই নওগাঁর বুকেও স্বাধীনতার প্রতীক বাংলাদেশের পতাকা নওগাঁবাসীরা উড়িয়েছিলো।
একাত্তরের ২৫শে মার্চের নিষ্ঠুর ও ভয়াবহ ঘটনাবলীর খবর টুকরো টুকরো খবর দু’একদিনের ভিতর বিভিন্ন সূত্রে নওগাঁতে এসে পৌছেছিল। অনেকের মত আমারও কোনো সন্দেহ ছিলো না যে ঐ ঘটনা আমাদেরকে এক রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতা সংগ্রামের পথে ঠেলে দিয়েছে।
ঢাকা শত্রু কবলিত হওয়ায় ঢাকার সংবাদপত্রগুলো আর আমাদের ছিলো না। ওগুলো দখলদার পাকিস্তানী বাহিনীর প্রচারপত্রে পরিণত হয়েছিলো। স্বাধীনতা সংগ্রামের স্বপক্ষে প্রচারণা চালাবার জন্য আমাদেরও পত্রপত্রিকার প্রয়োজন রয়েছে মনে করেই বিভিন্ন প্রতিকুল পরিবেশেও রাজশাহী জেলার নওগাঁ মহকুমা শহরের হোটেল পট্টির পাশে কাজীপাড়ার ছোট একটি হস্তচালিত প্রেস থেকে ১৯৭১ সালের ৩০শে মার্চ ক্ষুদ্রাকৃতি এক পাতার দৈনিক “জয় বাংলা” বের করি। বাংলার আবালবৃদ্ধবনিতার কণ্ঠে ধ্বনিত “জয় বাংলা” কথাটি আমাদের জাতীয় শ্লোগানে পরিণত হয়েছিলো বলে পত্রিকার নামটিও জয় বাংলা রাখি। মুক্তিযুদ্ধের একটি মুখপত্রের জন্য এর চেয়ে যোগ্য নাম আমার আসেনি।
মুক্তি সংগ্রামের স্বপক্ষে এবং সুনিয়ন্ত্রিত করার জন্য বিভিন্ন বিষয়ে “জয় বাংলা” লিখা হত। নানা রকম পরিস্থিতিতে জনগণেরকি করণীয় সে সম্পর্কেও মতামত ব্যক্ত করা হত। নিজেদের দোষ ত্রুটি এবং সকল প্রকার অনাচারের প্রতিও জোরালোভাবে পাঠক পাঠিকাদের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে। এছাড়া মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বপূর্ণ কার্যবলীর রিপোর্ট সংগ্রহ ও প্রকাশের মাধ্যমে তাদের উৎসাহিত করা হয়েছে। এটা আমার একক প্রচেষ্টা ছিলো। লেখা, রিপোর্ট সংগ্রহ, প্রুফ দেখা থেকে শুরু করে বিভিন্ন জায়গায় বিতরণের ব্যবস্থাও আমিই করতাম। সম্পাদকীয় মন্তব্য ও বিভিন্ন রিপোর্ট আমি সাধারণতঃ রাতে এবং খুব ভোরে লিখতাম। তারপর প্রায় সারাদিন ধরে প্রেসে হাত কম্পোজ শেষে প্রুফ দেখে ছাপা হবার পর বিকেলে পত্রিকার বান্ডিল নিয়ে প্রেস থেকে বের হতাম। মুসলিম লীগের সাবেক এমপিএ জনাব কাজী শহ মাহমুদের মালিকানাধীন প্রেসের জন্য যাতে কোন বিপদ না আসে সে কারনে কাজী সাহেবের অনুরোধে পত্রিকায় প্রেসের নাম ছাপা হত না। প্রেসের ম্যানেজার ও কম্পোজিটর যথেষ্ট উৎসাহ নিয়ে কাজ করতো।
২৬শে মার্চ থেকেই আমরা নিজেদেরকে স্বাধীন হিসেবে গণ্য করেছিলাম। তখনো আনুষ্ঠানিকভাবে আমাদের কোনো সরকার গঠিত না হলেও এক গোপন সরকারের অস্তিত্ব স্বীকার করে সংগ্রাম পরিষদগুলোকে স্বাধীন বাংলা সরকারের প্রতিনিধি গণ্য করার জন্য “জয় বাংলা” র প্রথম সংখ্যাতেই মত প্রকাশ করা হয়।
যেহেতু মুক্তিযুদ্ধের প্রথম পর্যায়ে বাংলাদেশের মুক্তাঞ্চল থেকে মুদ্রিত ও প্রকাশিত অপর কোনো দৈনিক পত্রিকার অস্তিত্বের কথা আমাদের জানা ছিলো না(পরে প্রমাণিত হয়েছে ঐ সময়ে সত্যি সত্যি আর কোনো দৈনিক পত্রিকা ছিলো না। তাই “জয় বাংলা” পত্রিকাতেই স্বাধীন বাংলাদেশের মুখপত্র হিসেবে হিসেবে কয়টি কথা ছাপা হতো।
“জয় বাংলা” প্রথম থেকেই কিছু নীতিমালা অনুসরণ করে চলেছে। কোনো প্রকার স্বার্থান্বেষী মহলের হুমকি এমনকি ব্যক্তিগত নিরাপত্তার প্রতি হুমকিও তোয়াক্কা না করে স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে নানা প্রকার গুরত্বপূর্ণ বিষয়ে মতামত ব্যক্ত করা এবং সকল প্রকার অনাচারের বিরুদ্ধে কঠোরভাবে প্রতিবাদ জানানো হয়েছে।
৫ই এপ্রিল রাতে আমি রাইফেল বাহিনীর গোলা বারুদের জীপে চড়ে বগুড়া যাই। বগুড়া এলাকার মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে যোগাযোগ ও মুক্তাঞ্চল সফর শেষে ৭ই এপ্রিল সন্ধ্যায় নওগাঁ ফিরে আসি। এ কারণে ৬ ও ৭ই এপ্রিল দুদিন “জয় বাংলা” প্রকাশিত হয়নি। ৮ই এপ্রিল বগুড়ার মুক্তিযোদ্ধাদের তৎপরতার এবং বীরত্বপূর্ণ কার্যকলাপের উপর ভিত্তি করে ৮ম সংখ্যাটি প্রকাশিত হয়। এ সফরকালে আমি বগুড়ার তৎকালীন ডিসি এবং এসডিও সাহেবের সঙ্গে সাক্ষাৎ তাদেরকে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে বগুড়ায় আইন শৃংখলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব গ্রহণের অনুরোধ জানাই।
এ বিশেষ সংখ্যায় হানাদার বাহিনীর হাত থেকে বগুড়া শহর রক্ষা এবং মুক্তিবাহিনী কতৃক আড়িয়ার বাজারে অবস্থিত পাক সেনাবাহিনীর গোলা বারুদের ডিপো দখলের বিস্তারিত বিবরণ ছাপা হয়। এছাড়া মুক্তাঞ্চলের টেলিফোন এক্সচেঞ্জগলোর কর্মীদের সহায়তায় যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করি এবং বেসামরিক কতৃপক্ষকে শান্তি শৃংখলা রক্ষার দায়িত্ব প্রদানের কথাও লেখা হয়।
“জয় বাংলা” র ১১তম এবং শেষ সংখ্যাটি প্রকাশিত হয় ১১ এপ্রিল ১৯৭১। এ সংখ্যায় যুদ্ধের খবরাখবর সংগ্রহের জন্য ‘জবাসস(জয় বাংলা সংবাদ সংস্থা) গঠনের কথা ঘোষণা করা হয়। বিভিন্ন সূত্রে যেসব খবর পাচ্ছিলাম সেগুলো সেগুলো একটি সংগঠনের মাধ্যমে প্রচার করার উদ্দেশ্যেই এটি আমি গ্রহণ করি। আমাদের নিজস্ব কোনো সংবাদ সংস্থা ছিলো না এবং কেউ সে রকম কোনো উদ্যোগ না নেয়ায় সীমিত সামর্থ নিয়েই ‘জবাসস’ গঠন করি। মুক্তাঞ্চলের কিছু টেলিফোন এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে খবরাখবর সংগ্রহের চেষ্টা করা হয়। এ কাজে জনাব সেলিম মন্ডল, পাঁচবিবি এক্সচেঞ্জের শ্রী উপেন্দ্রনাথ ঘোষ ও আরও অনেকে বগুড়া সার্কিট হাউজিস্থ মুক্তিযোদ্ধা কন্ট্রো রুমের রিটায়ার্ড সুবেদার দবিরউদ্দিন(ওস্তাদজী) ও হাবিলদার এমদাদুল হক ওরফে তোতাও এ ব্যপারে সহায়তা করেন। এছাড়া রাইফেলস বাহিনীর স্থানীয় কমান্ডার মেজর নাজমুল হকও এ বিষয়ে সহযোগিতা করেন।
দেশের অন্যান্য সীমান্তের মত নওগাঁ সীমান্তও তখন উন্মুক্ত ছিলো। কলকাতার বিভিন্ন পত্রপত্রিকারও দু’এক কপি সীমান্ত পথে আমাদের হাতে আসতে শুরু করেছিলো। “জয় বাংলা” র ১১তম সংখ্যায় ‘জবাসস’ সংগৃহিত এবং এসব পত্র পত্রিকা থেকে উদ্বৃত হয়ে কিছু সংবাদ ছাপানো হয়। অমৃতবাজার পত্রিকার ৯ই এপ্রিল তারিখের সংবাদে জানতে পারি যে, ২৫শে মার্চের রাতে ঢাকার ‘দৈনিক ইত্তেফাক’, ‘সংবাদ’, ও ‘দ্য পিপল’ এর কার্যালয়গুলো ধ্বংস করা হয়েছে এবং বেশ কিছু সাংবাদিক ও কর্মচারীদের হত্যা করা হয়েছে। আরও জানি ‘দি পাকিস্তান অবজারভার’, ‘দি মর্নিং নিউজ’, ‘দৈনিক পাকিস্তান’, আজাদ’ ও ‘পূর্বদেশ’ পাকিস্তানী সামরিক বাহিনীর তত্ত্বাবধানে ছাপা হচ্ছে। “জয় বাংলা”য় এ খবর উদ্বৃত করে মন্তব্য করা হয়- “পশ্চিমা বর্বরেরা বিশ্বকে ধোঁকা দিবার জন্য উক্ত বিখ্যাত পত্রিকাগুলোর নাম বা Goodwill ব্যবহার করিতেছে।” এই সংখ্যায় জনপ্রিয় সংবাদপত্রগুলোর অফিস ধ্বংস ও সাংবাদিক হত্যার নিন্দা করা হয়।
হানাদারদের আক্রমণের ভয়ে নওগাঁ শহর তখন প্রায় ফাঁকা। কাজীপাড়ায় যে প্রেস থেকে ‘জয় বাংলা’ ছাপা হচ্ছিল তার কর্মচারীদের অনেক বলে-কয়েও নওগাঁ থাকতে রাজী করানো যাচ্ছিলো না। সকলের মনেই ভীতি ছিলো, -এই বুঝি হানাদার এসে পড়লো। অন্যান্য প্রেসও বন্ধ। এ পরিস্থিতিতে ‘জয় বাংলা’ আর ছাপানো সম্ভব হয় নি।
১৬ই ডিসেম্বর বিজয় দিবসের পূর্ব পর্যন্ত বাংলাদেশের ভিতরে কিংবা বাইরে থেকে ‘স্বাধীন বাংলা’র আর কোনো দৈনিক পত্রিকা ছাপা হয়নি। দেশের বাইরে থেকে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানের নাম দিয়ে বাংলা ও ইংরেজী ভাষায় একাধিক সাপ্তাহিক/পাক্ষিক ইত্যাদি পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছিলো। কিন্তু একটি দৈনিকও বের হয়নি।
নিজস্ব সীমিত পুঁজির উপর নির্ভর ‘জয় বাংলা’ প্রকাশের কাজে হাত দিয়েছিলাম। কারো কাছ থেকে কোনো আর্থিক সাহায্য নেবার প্রয়োজন হয়নি। প্রেস কতৃপক্ষও কোন লাভ নিতেন না। শুধু কাগজ ও মুদ্রণের খরচ নিতেন। ‘জয় বাংলা’র প্রথম সংখ্যার মূল্য ১০ পয়সা ধার্য হয়েছিলো। এক ঘন্টায় ২০০ কপি বিক্রিও হয়েছিলো। কিন্তু এ সামান্য দাম আদায়ে ঝামেলার কারণে প্রথম সংখ্যার অবশিষ্ট কপি ও দ্বিতীয় সংখ্যা থেকে শেষ সংখ্যার সকল কপিই বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়েছিলো।
&nbsp;
‘জয় বাংলা’র প্রথম সংখ্যাটি ছাপা হয়েছিলো ১০০০ কপি। পরবর্তী সংখ্যাগুলোর কোনোটা ১৫০০ কোনটা ৩০০০ কপিও ছাপা হয়েছিলো। সর্বমোট কপি সংখ্যা ছিলো প্রায় ৩০,০০০। খুলনা নিউজপ্রিন্টের হাফ ডিমাই সাইজের কাগজে জয় বাংলা ছাপানো হত। প্রথম কয়েক সংখ্য এক পাতার একপাশে এবং অবশিষ্টগুলো পাতার উভয় পাশে ছাপা হতো। ঐ পরিস্থিতিতে ছোট হাতে চালানো প্রেস থেকে এর চেয়ে বড় আকারে পত্রিকা বের করা কোনভাবেই সম্ভব ছিলো না।
&nbsp;
‘জয় বাংলা’র প্রথম সংখ্যাটি আমি নিজে আমার স্কুল জীবনের সহপাঠী জাহিদ হোসেনকে সাথে নিয়ে নওগাঁ শহরে বিলি করেছিলাম ৩০শে মার্চ ১৯৭১ তারিখে। এ পত্রিকা প্রকাশকালে নওগাঁর তৎকালীন এমএনএ জনাব বায়তুল্লাহ(পরবর্তীকালে জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার), নওগাঁ, রাজশাহী, ও বগুড়া মুক্তাঞ্চলের তৎকালীন কমান্ডার রাইফেল(ইপিআর) বাহিনীর মেজর নাজমুল হক, বিভিন্ন এলাকার মুক্তিযোদ্ধাসহ সমাজের বিভিন্ন স্তরের আরও অনেকেই উৎসাহ দিয়েছেন এবং সহযোগীতা করেছেন। মেজর হকের অনুমতিক্রমে তার বাহিনীর যানবাহনে নওগাঁর বাইরে ‘জয় বাংলা’র বান্ডিল পাঠানো সম্ভব হয়েছে।
&nbsp;
এপ্রিলের মাঝামাঝি বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের মুক্তাঞ্চল একে একে আমাদের হাতছাড়া হতে থাকে। পাবনা, রাজশাহী, বগুড়া ও অন্যান্য শহরগুলোতে হানাদার বাহিনী ধীরে ধীরে তাদের কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। আমাদের অসংগঠিত, বিশৃংখল, কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণবিহীন এবং উপযুক্ত অস্ত্রবিহীন বাহিনী প্রথম পাল্টা আক্রমণেই পশ্চাদপসরণ করতে এবং নিরুপায় হয়ে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। ব্যাপক জনসমর্থন থাকা সত্ত্বেও আপৎকালীন জরুরী ব্যবস্থার কোনো পরিকল্পনা না থাকায় কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বও সম্পূর্ণ ভেঙ্গে পড়ে। বলা চলে সাময়িকভাবে বিলুপ্ত হয়ে যায় এবং এর ফলে হানাদারদের হামলার মুখে সারাদেশ জুড়ে শুরু হয় মাঠ-ঘাট, বন-বাদার, নদী-নালা, টিলা-পাহাড় পেরিয়ে পরিকল্পনাহীনভাবে সকলের নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য ছোটাছুটি। সীমান্ত নিকটবর্তী শহর নওগাঁতেও এর কোনো ব্যতিক্রম হয় নি।
&nbsp;
১৪ এপ্রিল সকালে রাইফেল বাহিনীর গোলাবারুদসহ রাজশাহীগামী দুটি জীপের কনভয়ে রাজশাহী যাত্রা করি। অধিকাংশ রাস্তাই কাঁচা। দুপুরের আগেই নদীর তীরে কালিকাপুরে পৌঁছি। নদীর ওপারে মান্দা। নৌকায় জীপ পারাপারের ব্যবস্থা ছিলো। সেখানেই রাজশাহী এলাকা থেকে জীপযোগে ফিরে আসা নওগাঁর সেক্টর কমান্ডার মেজর নাজমুল হকের সঙ্গে দেখা হয়। তিনি রাজশাহী শহর হাতছাড়া হবার খবর দেন এবং কনভয়ে কয়েকজন সৈন্যকে একটি জীপ নিয়ে ঐ এলাকায় অবস্থানরত ক্যাপ্টেন গিয়াসের সঙ্গে যোগ দেবার নির্দেশ দিয়ে অপরটিকে তার সঙ্গে নওগাঁ ফিরতে বলেন। রাজশাহী যাওয়া সম্ভব না বলে আমাকেও তার জীপে তুলে নেন। দুপুর ২টার দিকে আমরা নওগাঁর বলিহার হাউজে ইপিআর সেক্টর হেডকোয়ার্টারে ফিরে আসি। জীপে বসে মেজর হককে আমি নওগাঁ ঘাঁটি রক্ষার্থে সম্ভাব্য হামলার রাস্তাসমূহে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে তার অধীনস্থ সৈন্য এবং স্বেচ্ছাসেবকদের সহায়তায় প্রতিরক্ষা ব্যূহের ব্যবস্থা করার অনুরোধ করি। তিনি নিরাসক্তভাবে আমার বক্তব্য শোনেন। রাজশাহী হাতছাড়া হয়ে যাওয়ায় তিনি অনেকটা হতাশ হয়ে পড়েছিলেন এবং শিগগিরই নওগাঁ আক্রমণের আশংকা করেছিলেন। হাতিয়ারের জন্যও তিনি চিন্তিত ছিলেন। যে কয়েকটা মেশিনগান তার বাহিনীর হাতে ছিলো সেগুলোর ফায়ারিং পিনের অভাব দেখা দিয়েছিলো। হানাদারদের ধারণা তার ছিলো কেননা তিনি মূলতঃ আর্টিলারী কোরের সদস্য ছিলেন কিন্তু রাইফেল বাহিনীর সঙ্গে ডেপুটেশনে যুক্ত ছিলেন। সম্ভবত এসব কারণে আমার মতো যুদ্ধে অনভিজ্ঞ ব্যক্তির প্রস্তাবে তার কোনো ভাবান্তর হয়নি। এরপরে সংগ্রাম পরিষদের কয়েকজনের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। সকলের মনেই নানারকম আশংকা। প্রায় ফাঁকা নওগাঁ শহরে বিকেলের মধ্যেই আরো ফাঁকা হয়ে যায়।
&nbsp;
বিকেলে মেজর হকের সঙ্গে আবার দেখা করি। তাকে জিজ্ঞাসা করি আমাদের প্রতিবেশী দেশ থেকে কোনো অস্ত্র সাহায্য পাচ্ছেন কিনা। এখনো তো তেমন কিছু পাচ্ছি না। আমি তখন তাকে সীমান্তের ওপারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে যোগাযোগ করব কিনা জিজ্ঞাসা করি। তিনি চেষ্টা করে দেখতে বলেন। তার সাথে আলোচনায় এবং হেডকোয়ার্টারের তোড়জোড় দেখে বুঝতে বাকী রইলো না যে কোনো মুহুর্তে তিনি ঘাঁটি ত্যাগ করবেন। সন্ধ্যার পর সংগ্রাম পরিষদের অফিসেও আর কাউকে পাওয়া গেলো না। সব যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে। ‘মুক্তি’ সিনেমার রাস্তার মাথায় টেলিফোন এক্সচেঞ্জটিতে তখনো একজন অপারেটর ছিলেন। সেখান থেকে রাতে বলিহার হাউজের রাইফেল বাহিনীর হেডকোয়ার্টারে ফোন করে কোনো সাড়া পাওয়া গেলো না। এ পরিস্থিতিতে আমি অপারেটরের সহায়তায় পাঁচবিবি, আত্রাই, জয়পুরহাট ও পত্নীতলা পিসিও বগুড়া সার্কিট হাউজে অবস্থিত বগুড়া কন্ট্রোল রুমের সঙ্গে যোগাযোগ করি এবং রাজশাহীর সর্বশেষ পরিস্থিতির খবর দিয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেই। নওগাঁর পরিস্থিতির ইঙ্গিত দেই। পরদিন ১৫ এপ্রিল সকালে হেডকোয়ার্টার শূণ্য থাকার খবর পাওয়া গেলো। আগের রাতেই রাইফেল বাহিনীর হেডকোয়ার্টার অন্যত্র সরিয়ে নেয়া হয়েছে। শহরও প্রায় শূন্য। প্রেসও বন্ধ। এ পরিস্থিতিতে আমার শহরে থাকা মানে হানাদারদের হাতে পড়ে খামাখা জান দেয়া বিধায় একটি ব্যাগে কাগজপত্র ও একসেট বাড়তি কাপড় নিয়ে আমার বাসা-কাম-‘জয় বাংলা’র দফতরে তালা ঝুলিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়ি। সীমান্ত এলাকায় তখন সুযোগমত লুটপাটের প্রবণতা দেখা দিয়েছিলো। দু এক জায়গায় সন্দেহজনক লোকদের তথাকথিত ‘চেকপোষ্টে আমার পরিচয় দিয়ে দলসহ ১৫ এপ্রিল রাত প্রায় ১১টার দিকে প্রহরাবিহীন নওগাঁ-পশ্চিম দিনাজপুর সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে প্রবেশ করি। ভারতে এটাই ছিলো আমার প্রথম প্রবেশ।
&nbsp;
ভারতে প্রবেশের কিছুদিন পর কোলকাতা প্রেসক্লাবের সেক্রেটারীসহ কয়েকজন সদস্য আমাকে কোলকাতা থেকে ‘জয় বাংলা’ পুনঃপ্রকাশের পরামর্শ দেন। মুক্ত বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত ‘জয় বাংলা’ সম্ভব হলে পুনরায় মুক্ত বাংলাদেশ থেকেই প্রকাশিত হবে তাদেরকে আমার এ সিদ্ধান্তের কথা জানাই।
&nbsp;
ভারত থেকে পরবর্তীকালে অন্যান্য বাংলাদেশী সাংবাদিকেরা বেশ কয়েকটি সাপ্তাহিক/পাক্ষিক পত্রিকা বের করেছিলেন। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ১১ই মে ১৯৭১ তারিখে দলীয় মুখপত্র ‘সাপ্তাহিক জয় বাংলা’ প্রকাশ করেছিলেন। প্রকাশস্থলের নাম দেয়া হয় ‘মুজিবনগর’। কোলকাতার পার্ক সার্কাস এলাকার ২১/এ বালুহাক্কাক লেনে এ পত্রিকার দফতর ছিলো। কোলকাতাসহ ভারতের পত্রপত্রিকায় ‘দৈনিক জয় বাংলা’র ব্যপক প্রচার হওয়া সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ কর্তৃপক্ষ তাদের পত্রিকার নাম ‘জয় বাংলা’ রাখেন। এই দলীয় মুখপত্রটির সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক ছিলো না। ‘জয় বাংলা সংবাদ সংস্থা'(জবাসস) নামটি অবশ্য আর কেউ ব্যবহার করে নি।
&nbsp;
একাত্তরের ১৫ এপ্রিল মধ্যরাতে আমি ভারতের বালুরঘাট শহরে পৌঁছি। এটা পশ্চিম বাংলা রাজ্যের পশ্চিম দিনাজপুর জেলা সদর। পরদিন ১৬ এপ্রিল নওগাঁয় মেজর হকের সঙ্গে ১৪ এপ্রিলের আলোচনা মোতাবেক স্থানীয় এমএলএ শ্রী বীরেশ্বর রায় এবং পশ্চিম দিনাজপুরের জেলা ম্যাজিষ্ট্রেটের সঙ্গে সাক্ষাৎ করি এবং সাহায্যের প্রয়োজনীয়তার কথা জানাই। উভয়েই জানালেন বিষয়টি উচ্চতর কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের উপর নির্ভরশীল। আমাদেরকে সক্রিয়ভাবে কোনো সাহায্য দানের ব্যাপারে তারা কিছুই অবগত নন। এরপর ঐ দিনই খবরের কাগজ কিনে বাংলা দৈনিক ‘আনন্দবাজার’ ও ইংরেজী দৈনিক ‘অমৃত বাজার’ পত্রিকার টেলিগ্রাফ ঠিকানা সংগ্রহ করে বালুরঘাট থেকে ‘জবাসস’ নাম দিয়ে একটি রিপোর্ট পাঠাই। আমাদের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের অধিকাংশই কোলকাতা পৌঁছে গেছেন এবং পরদিন ভোরে এক্সপ্রেস বাসে বালুরঘাট থেকে কোলকাতা রওয়ানা হই। কোলকাতায় পৌঁছে পত্রপত্রিকায় মুজিবনগর সরকার গঠনের খবর দেখলাম।
&nbsp;
কোলকাতা আগে কখনো যাইনি। কাউকে চিনিও না। স্টেশন থেকে ট্যাক্সি নিয়ে সোজা ‘যুগান্তর’ পত্রিকার অফিসে গেলাম। সম্পাদক শহরে ছিলেন না। বার্তা সম্পাদক কবি শ্রী দক্ষিণারঞ্জন বসুর ঠিকানা নিয়ে তার বাসায় গিয়ে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করি এবং তাকে ‘জয় বাংলা’র কপিগুলো দেই। প্রবীণ সাংবাদিক শ্রী বসু সস্নেহে আমাকে গ্রহণ করে সব খবরাখবর নিলেন। তার বাাসায় কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে ঠিকানা সংগ্রহ কোলকাতা বাংলাদেশ সহায়ক সমিতির সঙ্গে যুক্ত প্রখ্যাত সাহিত্যিক শ্রী তারাশংকরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করি এবং ‘জয় বাংলা’র কপি উপহার দেই। তিনি সমিতির সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে বলেন। এরপর চৌরঙ্গীর কিড স্ট্রীটের স্টেট গেস্ট হাউজে যাই এবং ইনচার্জকে অনুরোধ করে রাতের জন্য একটি রুম পাই।
&nbsp;
পরদিন ১৯ এপ্রিল সকালেই বাংলাদেশ মিশনে গিয়ে জনাব হোসেন আলীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করি এবং নওগাঁ এলাকার বিস্তারিত খবর জানাই। তাকে বলি এখনো চেষ্টা করলে নওগাঁ এলাকাটি আমাদের দখলে রাখা সম্ভব। তাকে আরো জানাই সক্রিয় সাহায্য পেলে আমাদের বাহিনী বাংলাদেশের সমগ্র উত্তরাঞ্চল দখলে রাখতে পারে এবং আমাদের সরকারও দেশের অভ্যন্তরে থেকেই কাজ চালাতে পারে। তিনি আমাকে সরকারী কর্তৃপক্ষের কাছে পেশ করার জন্য একটি লিখিত রিপোর্ট দিতে বলেন। আমি তখন মিশনের টাইপিষ্ট দিয়ে দেশে থাকাকালীন মুদ্রিত ‘জবাসস’-এর প্যাডে একটি রিপোর্ট টাইপ করিয়ে দুই কপি জনাব হোসেন আলীকে দেই। জনাব হোসেন আলী এই রিপোর্টটি আমাদের কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছে দিবেন বলে জানান। আমার কাছে কোনো বৈধ ট্রাভেল ডকুমেন্ট নেই বিধায় আমাকে মিশন থেকে আমাকে একটি পরিচয়পত্র দেয়া হয়। একই দিনে মিশনের ফার্স্ট সেক্রেটারী জনাব আরআই চৌধুরী,প্রেস এ্যাটাসে জনাব মকসুদ আলীর সঙ্গেও পরিচয় হয়। এর ৩/৪ দিন পরে পুনরায় জনাব হোসেন আলীর সঙ্গে মিশনে সাক্ষাৎ হলে তিনি আমাকে জানান ১৯ তারিখের ‘জবাসস’র রিপোর্টটি তিনি আমাদের প্রধান সেনাপতি কর্নেল ওসমানীকে পৌঁছে দিয়েছেন।১৮ ও ১৯ তারিখ দুদিন ষ্টেট গেষ্ট হাউজে থাকার পর সেখানে অবস্থানরত গণপরিষদ সদস্য ও আওয়ামী লীগ নেতা জনাব অধ্যাপক ইউসুফ আলীর সুপারিশে আমাকে আরো ৭ দিনের জন্য গেষ্ট হাউজে থাকতে দেয়া হয়।
&nbsp;
১৯ এপ্রিল কোলকাতার দৈনিক ‘যুগান্তর’ ‘জবাসস’ সম্পর্কিত এবং মুক্তিযুদ্ধ সংক্রান্ত দেশের বাইরে ‘জবাসস’ প্রচারিত প্রথম সংবাদটি ছাপা হয়। এতে উত্তরাঞ্চলের সর্বশেষ পরিস্থিতি এবং অবিলম্বে সাহায্যের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়। ঐ দিনই ভারতের সর্ববৃহৎ সংবাদ সংস্থা পিটিআই-এর কোলকাতা ব্যুরোর ম্যানেজার শ্রী সুধীর চক্রবর্তীর সঙ্গে দেখা করি এবং বাংলাদেশের একজন সাংবাদিক হিসেবে বিশ্বের লেখক এবং সাংবাদিকদের উদ্দেশ্য করে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে এবং গণহত্যার বিরুদ্ধে বিশ্ব জনমত জোরদার করার আহবান জানিয়ে বিবৃতি দেই। পিটিআই তাদের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সারা বিশ্বে এটি প্রচার করে।২০ এপ্রিল প্রায় সবগুলো দৈনিকের প্রথম পাতায় এ বিবৃতিটি ছাপা হয়েছে দেখতে পাই। ২১ এপ্রিল পিটিআই-র মাধ্যমে প্রচারিত আরেকটি বিবৃতিতে বাংলাদেশের গণহত্যা বন্ধের জন্য জাতিসংঘসহ বিশ্ব বিবেকের প্রতি আহবান জানাই। এতে বাঙালি মুসলমান নিধনযজ্ঞে পাকিস্তানী বর্বরদের সাহায্য না করার জন্য আরসিডি জোটভুক্ত ইরান ও তুরস্কের মুসলমান ভাইদের প্রতিও আহবান জানাই। এতে বাংলাদেশ সরকারকে স্বীকৃতি দানের জন্যও আবেদন জানানো হয়। এটিও ২২ এপ্রিল দৈনিক পত্রিকাগুলোতে গুরুত্বের সঙ্গে ছাপা হয়। এরপর ভারতের অপর সংবাদ সংস্থা উইএনআই’র কোলকাতা ব্যুরোর ম্যানেজার শ্রী ইউআর কালকুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করি। বগুড়ার মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্ব সম্পর্কিত আমরা ‘জয় বাংলা’র বিষেশ সংখ্যার রিপোর্টির উদ্ধৃতি দিয়ে ২৫ এপ্রিল উইএনআই দুটি রিপোর্ট প্রচার করে। ২৬ এপ্রিল এ রিপোর্ট বিভিন্ন দৈনিকের প্রথম পাতায় ছাপা হয়।
&nbsp;
যুগান্তরের হেডিং ছিলো- ”বীরের এ রক্তস্রোত’।
&nbsp;
Statesman-এর “Student Forced Pak Army Column Retreat”।
<em> </em>
<em>-( অনুবাদঃ স্টেটসম্যানের শিরোনামঃ ‘ছাত্ররা পাক আর্মি বাহিনীকে পশ্চাদপসরণ করতে বাধ্য করেছে)</em>
দিল্লীর Times of India-“Many a Heroic saga from Bangladesh” ইত্যাদি।
&nbsp;
<em>-( অনুবাদঃ দিল্লীর টাইমস অব ইন্ডিয়ার শিরোনামঃ ‘বাংলাদেশের অসংখ্য ঐতিহাসিক বীরত্বগাথা‘)</em>
&nbsp;
এর আগে ১৯ শে এপ্রিল আকাশবাণী, কোলকাতায় যোগাযোগ করি। ২১ এপ্রিলের সংবাদ পরিক্রমায় ‘জয় বাংলা’ সম্পর্কে এবং আমার প্রদত্ত বিবৃতিগুলো উল্লেখ করা হয়।
&nbsp;
এ সময়ের মধ্যেই কোলকাতার সব প্রথম শ্রেণীর পত্রিকা যথা- আনন্দবাজার, <em>হিন্দুস্তান স্ট্যান্ডার্ড</em>, যুগান্তর, <em>অমৃত বাজার পত্রিকা, স্টেটসম্যান</em>, সাপ্তাহিক দেশ, অমৃত ইত্যাদির সাংবাদিকসহ কোলকাতা প্রেসক্লাবের সেক্রেটারী ও সদস্যদের সঙ্গে আলাপ পরিচয় হয়। এভাবেই ভারতীয় তথা বিশ্ব প্রচারমাধ্যমের সঙ্গে কোনো প্রকার সরকারী সাহায্য বা আনুকুল্য ছাড়াই সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত ও অরাজনৈতিক প্রচেষ্টায় ভারতে প্রবেশের এক সপ্তাহের মধ্যেই একটা কার্যকর যোগসূত্র প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হই।
&nbsp;
কোলকাতায় অবস্থানকালে সাংবাদিক ছাড়াও অন্যান্য বিভিন্ন স্তরের লোকজনের সঙ্গে যোগাযোগ হয়। কোলকাতা সফররত সর্বোদয় নেতা শ্রী জয় প্রকাশ নারায়ণের সঙ্গেও ২৮ এপ্রিল সাক্ষাৎ করি এবং আমাদের মুক্তিসংগ্রামের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে তাকে অবহিত করি। শ্রী নারায়ণ তার এই সফরকালে বাংলাদেশী নেতৃবৃন্দের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেছিলেন। এখানে উল্লেখ করা অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে, শ্রী নারায়ণ এবং তার নেতৃত্বাধীন সর্বোদয় ও গান্ধী আদর্শবাদী আন্দোলনের ভারতব্যাপী শত শত প্রতিষ্ঠানের শাখা উপশাখাগুলো বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামীদের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন জানিয়েছে এবং শরণার্থী শিবিরগুলোতে বেসরকারী পর্যায়ে ব্যাপক ত্রাণ তৎপরতা চালিয়েছে। শ্রী নারায়ণ ভারতে এবং ভারতের বাইরে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে জোরালো বক্তব্য রেখেছেন এবং ব্যাপক সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করেছিলেন। এ সময় প্রায় প্রতিদিন প্রবীণ সাংবাদিক শ্রী দক্ষিণারঞ্জন বসুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতাম। তিনি আমাকে বাংলাদেশের একজন তরুণ সাংবাদিক হিসেবে যথেষ্ট স্নেহ করতেন। একদিন সে তার অফিসের টেবিলের উপর রক্ষিত রাশি রাশি কাগজপত্র দেখিয়ে আমাকে বলল, ” দেখো রহমত, এগুলো যুগান্তর এবং অমৃতের পাঠকদের কাছ থেকে পাওয়া তোমাদের বাংলাদেশের এবং বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা কবিতা, গান ইত্যাদি। এবং প্রতিদিনই আসছে। দুচারটি পড়ে দেখলাম। সবই আবেগপূর্ণ ভাষায় লেখা। এ কথা সত্য যে, স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম সকল বাংলা ভাষাভাষি বাঙালির মনকেই আবেগ আপ্লুত করেছিলো।
&nbsp;
এপ্রিলের শেষে এক সন্ধ্যায় আবার আমাদের মিশন প্রধান জনাব হোসেন আলীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করলাম। অনেক বিষয়ে আলাপ হলো। তাকে বললাম ভারতের অন্যান্য অঞ্চল বিশেষ করে রাজধানী দিল্লীতে এবং ভারতের অন্যান্য অবাঙালি অধ্যূষিত এলাকায় আমাদের নিজস্ব লোকজন নেই বললেই চলে। আর এসব এলাকাতে আমাদের বিপক্ষে পাকিস্তানীদের অপপ্রচার চলছে। আমি দিল্লী থেকে এসব প্রচারণার পাল্টা জবাব এবং সর্বভারত এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বেসরকারীভাবে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে প্রচার চালাতে চাই। তিনি আমার সঙ্গে একমত হন এবং আমাকে কোলকাতা ও দিল্লী মিশনের সঙ্গে সংযোগ রাখতে বলেন।
&nbsp;
দেশ ছাড়ার সময় আমার সঙ্গে যে স্বল্প টাকা ছিলো তা বদলিয়ে ভারতীয় ২৫০ টাকার মতো পেয়েছিলাম। কোলকাতায় ১৯ থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত ষ্টেট গেষ্ট হাউজে থাকার সুযোগ হয়েছিলো বলে থাকা বাবদ কোনো ব্যয় হয়নি। তবে খাওয়া ও যাতায়াত ব্যয়ে পুঁজি প্রায় শেষ হয়ে এসেছিলো। পশ্চিম বাংলার বিধানসভার অধিবেশনের সময় এগিয়ে আসছিলো বলে ষ্টেট গেষ্ট হাউজ খালি করার সরকারী নির্দেশ দেয়া হয়েছিলো। এ ভবনটি এমএলএ হোষ্টেল হিসেবেও ব্যবহৃত হতো। এ পরিস্থিতিতে যুগান্তরের সাংবাদিক শ্রী পরেশ সাহা প্রাক্তন ঢাকা জেলাবাসী পূর্ব রেলওয়েতে কর্মরত শ্রী তরুণ গুহের গোবরা অঞ্চলের বাসায় আমার থাকা-খাওয়ার বন্দোবস্ত করে দিলেন। শ্রী গুহ আমার দিল্লী যাবার টিকিটের বন্দোবস্ত করে দিলেন এবং তার মহল্লার তরুণদের সমিতি ‘আদর্শসংঘ’র সদস্যরা চাঁদা তুলে আমাকে ১০০ টাকা দেন। সাহিত্যিক শ্রী শংকরের সুপারিশে উল্টোরথে মুক্তিযুদ্ধ সংক্রান্ত একটি লেখা দিয়ে আরো ৫০ টাকা পাই। এভাবেই ৪ঠা মে ট্রেনযোগে দিল্লী রওয়ানা হয়ে পরদিন ৫ মে দুপুরে দিল্লী ষ্টেশন থেকে শ্রী গুহের দেয়া ঠিকানায় তার ভাগ্নের বাসায় যাই। সেখান থেকে যুগান্তরের দিল্লী অফিসে এবং তাদের পরামর্শমত পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন রাজ্যপাল শ্রীমতী পদ্মজা নাইডুর নেতৃত্বাধীন দিল্লীর মহিলাদের ‘বাংলাদেশ এ্যাসিসট্যান্স কমিটি’র অফিসে যাই। কমিটির সহায়তায় দিল্লীর জয়সিংহ রোডের ওয়াইএমসিএ ট্যুরিষ্ট হোষ্টেলে এক সপ্তাহের জন্য আমার থাকা খাওয়ার বন্দোবস্ত হয়।এখানে প্রথমেই দিল্লী, বোম্বাই ও মাদ্রাজ থেকে প্রকাশিত ইংরেজী দৈনিক ও শন্যান্য সাময়িকী কিনে প্রচারণার গতি প্রকৃতি আঁচ করে নেই। আইইএনএস (ইন্ডিয়ান এন্ড ইস্টার্ন নিউজপেপার সোসাইটি) ভবনে অবস্থিত কোলকাতার যুগান্তর ও হিন্দুস্তান স্ট্যান্ডার্ড ব্যুরোর কয়েকজনের সঙ্গে আলাপ করে বুঝতে পারি রাজধানীর পত্র পত্রিকাগুলো আমাদের প্রতি যথেষ্ট সহানুভুতিশীল তবে প্রভাবশালী হিন্দুস্তান টাইমসের বিশেষ করে চিঠিপত্র কলামে বাংলাদেশ ও শেখ মুজিব বিরোধী বিতর্ক চলছে। কয়েকদিনের পত্রিকা পড়ে আমার সে ধারণাই হয়েছে।
&nbsp;
যেমন ৭ তারিখের পত্রিকায় লক্ষ্ণৌ থেকে তিন মুসলমান ভদ্রলোক লিখেনঃ-
&nbsp;
“………… the majority of Indian Muslims must not be expected to encourage those who are torch bearers of disruptive tendencies in Pakistan ……..”
&nbsp;
-(অনুবাদঃ “…পাকিস্তানে যারা বিধ্বংসী কাজ-কারবার করছে, তাঁদের উৎসাহ দেয়া ভারতীয় মুসলিমদের উচিৎ হবে না…”)
&nbsp;
শেখ মুজিবের কার্যকলাপের নিন্দা করে লেখা হয়- “……..the responsibility of the carnage and bloodshed in East Bengal lies entirely on him”
&nbsp;
-(অনুবাদঃ “…পূর্ব বাংলায় রক্তপাত এবং গণহত্যার দায়ভার সম্পূর্ন শেখ মুজিবের উপর বর্তায়…”)
&nbsp;
এছাড়া আরো অনেক যুক্তি তর্কের অবতারণা করা হয়।
&nbsp;
৯ মে’র সংখ্যায় ‘Bangladesh and the Indian press’ (বাংলাদেশ এবং ভারতীয় প্রেস) শিরোনামে প্রকাশিত ৩টি চিঠিতে লেখকেরা ভারতীয় প্রচার মাধ্যমে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ গণহত্যার খবর ফলাও করে প্রচারের জন্য ভারতীয় পত্রপত্রিকার নিন্দা করেন। তারা এ প্রচারকে অতিরঞ্জিত, নীতি বহির্ভূত বাড়াবাড়ি, পরোক্ষভাবে খোদ ভারতীয় অখন্ডতারও প্রতিকুল বিধায় ভারতের বৃহত্তর স্বার্থের পরিপন্থী বলে আখ্যয়িত করেন। এসব চিঠিপত্র এ পত্রিকায় পূর্বে প্রকাশিত একটি সম্পাদকীয় মন্তব্যের সমর্থনে লিখা হয়।
&nbsp;
এসব বক্তব্যের বিপক্ষে এবং আমাদের স্বপক্ষে কোনো লেখা ছাপা হচ্ছে না দেখে এ প্রচারণার একটি যথাযথ প্রত্যুত্তর দেবার সিদ্ধান্ত নেই এবং ‘In defense of Mujib’ (শেখ মুজিবের প্রতিরক্ষায়) শীর্ষক একটি দীর্ঘ পত্র লিখে এ পত্রিকার জাদরেল সম্পাদক মিঃ বি জি ভার্গিজের সঙ্গে সাক্ষাৎ করি। স্বাধীনচেতা এ সাংবাদিক সরকারী মতামতেরও খুব একটা তোয়াক্কা করতেন না। আমি তাকে বলি, ‘আপনাদের পত্রিকায় আমাদের বেশ সমালোচনা করা হচ্ছে কিন্তু আমাদের স্বপক্ষে কিছুই দেখছি না’। এই বলে ব্রীফকেস খুলে আমার টাইপ করা চিঠিটা তার হাতে দেই। তিনি মনোযোগ দিয়ে চিঠিটা পড়েন। আমি চিঠিটা শেষ করেছিলাম ‘জয় বঙ্গবন্ধু, জয় বাংলা’ দিয়ে। তিনি বলেন, ‘এ দুটি বাক্য বাদ দিতে হবে, এগুলো শ্লোগান’। আমি বলি প্রথমটি বাদ দিতে পারেন তবে দ্বিতীয়টি রাখতে হবে কারন ‘জয় বাংলা’ আমাদের জাতীয় শ্লোগান। তিনি আমাকে প্রথম শ্লোগানটা বাদে বাকী চিঠিটা হুবহু ছেপে দিবেন বলে জানান।
&nbsp;
মিঃ ভার্গিজের কাছে যুক্তি সহকারে আমাদের সংগ্রামের কারণগুলোও ব্যাখ্যা করি। এরপরে তার পত্রিকার কলামে বাংলাদেশবিরোধী বিতর্ক বন্ধ হয়ে যায়। ১০ মে আমার চিঠিটা ছাপা হয়। ১৩ মে আমাদের সমর্থন এবং পাকিস্থানপন্থীদের নিন্দা করে একসাথে ৫ টি চিঠি ছাপা হয় এবং ১৫ মে লক্ষ্ণৌর অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল হাবিবুল্লাহ এবং দিল্লী বিশ্ববিদ্যালয়ের উর্দু বিভাগের প্রফেসর কে এ ফারুকীর পাকিস্তানীদের নিন্দা এবং আমাদের আন্দোলন ও নেতাকে সমর্থন করে লিখিত ২টি চিঠি প্রকাশের মধ্য দিয়ে প্রভাবশালী হিন্দুস্তান টাইমসের পাতায় পাকিস্থানপন্থীদের বাংলাদেশবিরোধী প্রচারণার প্রচেষ্টার শোচনীয় পরিসমাপ্তি ঘটে। প্রফেসর ফারুকী পাকিস্তানী বাহিনীকে তৈমুর, চেংগীস ও হালাকু খানের মতো বর্বর বলে আখ্যায়িত করেন।
&nbsp;
একই সময়ে দিল্লীর প্রধান সংবাদপত্রের সম্পাদক ও অন্যান্য সাংবাদিক এবং সংবাদ সংস্থার কর্মকর্তাদের সঙ্গেও যোগাযোগ করি। ১০ মে ইউএনআই দিল্লী থেকে আমার রাজধানীতে অবস্থান এবং কাজকর্মের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিয়ে তিন প্যারার একটি সংবাদ প্রচার করে। এছাড়া আকাশবাণীর(অল ইন্ডিয়া রেডিও) কেন্দ্রীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করি। আকাশবাণীর মহাপরিচালক শ্রী এ কে সেনের পরামর্শ অনুযায়ী আকাশবাণীর বহির্বিশ্ব কার্যক্রমের, বিশেষ করে উর্দু সার্ভিসের জন্য আমাদের মুক্তি সংগ্রাম সম্পর্কে কতগুলো কথিকা রচনা করি। একটি সিরিজ হিসেবে প্রচারের জন্য তিনভাগে এগুলো লিখি। মূল শিরোনাম ছিলো ‘Recent event in Bangladesh’ (পাকিস্তানে সাম্প্রতিক ঘটবাবলী)। উপ-শিরোনাম ছিলো ‘Historical Background (ঐতিহাসিক পটভূমি)। ১৯৪৭ সালের আযাদী থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত ঘটনার ভাবাবেগবর্জিত সংক্ষিপ্ত তথ্যমূলক বিশ্লেষণ; Election in Pakistan and Aftermath (নির্বাচনের ফলাফল, অসহযোগ আন্দোলন ও স্বাধীনতার ঘোষণার প্রেক্ষাপট) এবং শেষেরটি Genocide in Bangladesh (২৫ মার্চের পরের গণহত্যার বিবরণ এবং পাকিস্তানের মিথ্যা প্রচারণার জবাব)। ইংরেজীতে লেখা এ কথিকাগুলো উর্দুতে অনুবাদ করে আকাশবাণী দিল্লী কেন্দ্রের বহিবিশ্ব উর্দু সার্ভিসের বিশেষ অনুষ্ঠানে ১৯৭১ সালের ২, ৪ ও ৮ জুন প্রথম প্রচারিত হয় এবং পরে পুনঃপ্রচারিত হয়। প্রতিটি কথিকার জন্য ১০ মিনিটের বেতার সময় বরাদ্দ ছিলো। এছাড়া আকাশবাণী দিল্লীর ‘হামারে মেহমান’ অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধের উপর আমার একটি ১০ মিনিটের টিভি সাক্ষাৎকার প্রচারিত হয় ১৪ মে। এটি উর্দুতে গৃহীত হয় এবং ভাঙ্গা ভাঙ্গা উর্দুতে আমার বক্তব্য পেশ করি। একই দিন দিল্লী টেলিভিষন তাদের ‘আজকাল’ অনুষ্ঠানে আমার একটি ১০ মিনিটের টিভি সাক্ষাৎকার প্রচার করে। মুক্তিযুদ্ধের উপর এ সাক্ষাৎকারে একই সাথে দিল্লী সফররত আওয়ামী লীগের ধর্মীয় ফ্রন্ট আওয়ামী ওলামা লীগের সভাপতি জনাব খায়রুল ইসলাম যশোরীর সাক্ষাৎকারও প্রচারিত হয়। শ্রোতাদের সুবিধার্থে এটি হিন্দিতে গৃহীত হয় এবং আমরা ভাঙ্গা ভাঙ্গা হিন্দিতে শ্রোতাদের বোধগম্যভাবে আমাদের বক্তব্য পেশ করি। মাওলানা যশোরী তখন মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে ভারতীয় ওলামাদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের চেষ্টা চালাচ্ছিলেন। এছাড়া তরুনদের জন্য সর্বভারতীয় অনুষ্ঠান যুব বাণীতেও আমার আরেকটি সাক্ষাৎকার প্রচারিত হয়। আকাশবাণীতে প্রচারিত কথিকাগুলো উর্দু অনুবাদ সাংবাদিক জনাব নজমুল হাসান কয়েকটি উর্দু পত্রিকায় প্রকাশের ব্যবস্থা করেছিলেন।
&nbsp;
মে এবং জুন এই দুই মাসে দিল্লীস্থ প্রচারমাধ্যমগুলোর সহায়তায় ব্যাপক প্রচার চালাই। আকাশবাণীতে প্রচারিত কথিকাগুলোর মূল ইংরেজীতে স্ক্রীপ্ট সাইক্লোস্টাইল করে ‘জবাসস’ এর External Bureau (বহিঃদপ্তর) নাম দিয়ে দিল্লী, বোম্বাই, মাদ্রাজ ও অন্যান্য এলাকা থেকে প্রকাশিত বিভিন্ন ধরনের পত্র পত্রিকার ঠিকানায় ডাকযোগে পাঠাই। দিল্লীর অনেক প্রবীণ সাংবাদিক বন্ধু আমাকে হেসে জিজ্ঞেস করতেন, “রহমত, আপনার ‘জবাসস’র External Bureau (বহিঃদপ্তর)-টা কোথায়?” আমিও হেসে জবাব দিতাম, “আমাদের সব কিছুই এখন চলমান, আজ এখানে কাল ওখানে। আমার হাতের ব্রীফকেসটাই আপাততঃ ‘জবাসস’ এর চলমান ব্যুরো”।দিল্লী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের সঙ্গে আমার যোগাযোগ হয়। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুনদের একটি মুখপত্র AEON (কাল) এর সম্পাদক তাদের বাংলাদেশ সংখ্যার জন্য আমার একটি লেখা নেন। এ সময়েই দিল্লীতে যাত্রাবিরতীকালে দিল্লী বিশ্ববিদ্যালয়ের গেষ্ট হাউজে অবস্থানরত ডঃ এ আর মল্লিকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করি।
&nbsp;
দিল্লী যাবার পূর্বে কোলকাতা থেকে একজন উত্তর কোরীয় সাংবাদিককে সাথে নিয়ে বনগাঁও এলাকার শরণার্থী শিবিরগুলো পরিদর্শন করে ক্যাম্প কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ আলোচনা করেছিলাম। কয়েকটি ছবিও নিয়েছিলাম। এর উপরে ভিত্তি করে “UN must rush to the rescue of victims” (জাতিসংঘের অতিসত্বর আক্রান্তদের উদ্ধারে এগিয়ে আসা উচিৎ) নামে একটি সচিত্র রিপোর্ট তৈরী করি। বোম্বাই থেকে প্রকাশিত ইংরেজী, উর্দু, হিন্দি, মলয়ালম ইত্যাদি ভাষায় মুদ্রিত BLITZ (ব্লিটজ)-এর ১৫ মে এটি প্রকাশিত হয়।
&nbsp;
“জবাসস এর External bureau’ (বহিঃদপ্তর)-এর নামে কিছু বাংলা দেশাত্মবোধক কবিতার ইংরেজী অনুবাদ সাইক্লোস্টাইল করেও প্রচার করা হয়েছিলো। এ সম্পর্কিত কিছু রিপোর্ট কোলকাতার অমৃত ও দেশ পত্রিকায়ও ছাপা হয়েছিলো। দেশ পত্রিকার নিয়মিত ফিচার ‘ঘরোয়া’র লেখক ‘শ্রীমতি'(শ্রীমতি সুজয়া সেন)-এর সঙ্গেও দিল্লীতে আমার পরিচয় হয়েছিলো। মাতৃসমা এ মহিলার স্নেহ আমার অনেকদিন মনে থাকবে। বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের প্রতি তার অকৃত্রিম দরদ ছিলো। জওয়াহরলাল নেহেরু প্রতিষ্ঠিত দৈনিক ন্যাশনাল হেরাল্ডের সম্পাদকীয় পাতায় ‘জবাসস’ প্রচারিত “Bengaless are not cowards” (বাঙালিরা কাপুরুষ নয়) নামক একটি কবিতাও ছাপা হয় ১৩ মে।
&nbsp;
এছাড়া ব্যাঙ্গালোর ও হুবলী থেকে একযোগে প্রকাশিত ঐ এলাকার কানাডা ভাষার Samyukta karnataka group of papers (সমুক্ত কর্ণাটক গ্রুপ অব পেপারস) মে’র শেষে আমর সাক্ষাৎকার গ্রহণ করে। দিল্লীর কয়েকজন মুসলমান সাংবাদিক বন্ধু কিছু উর্দু পত্র-পত্রিকাতেও আমার লেখার অনুবাদ পড়েছেন বলে আমাকে জানান। মোট কথা আমার সীমিত প্রচেষ্টায় এই অল্প সময়ের মধ্যেই যতটা সম্ভব প্রচারকার্য চালিয়েছিলাম এবং দিল্লীর সাংবাদিক মহলে সুপরিচিত হয়ে উঠেছিলাম। এ সময়ে শ্রী ফণী মজুমদারের নেতৃত্বে বাংলাদেশের একটি সংসদীয় দল দিল্লী সফরে আসেন। বেগম নুরজাহান মুর্শেদও এ দলে ছিলেন। দিল্লী প্রেসক্লাব তাদের একটি সম্বর্ধনার আয়োজন করে। শ্রী মজুমদার ও বেগম মজুমদার এ সভায় বক্তৃতা দেন। আমিও সেখানে উপস্থিত ছিলাম।
&nbsp;
জয়সিংহ রোডের ট্যুরিষ্ট হোষ্টেল থেকে সাংবাদিক বন্ধু শ্রী যতীন্দ্র ভাটনগরের বাসায় কিছুদিন থাকি। এরপরে বাকী সময় দিল্লীস্থ শান্তি পরিষদের আন্তর্জাতিক হোষ্টেলে তাদের মেহমান হিসেবে থাকি। কথিকা ও সাক্ষাৎকারের জন্য আকাশবাণী ও টেলিভিশন এবং অন্যান্য পত্রিকা থেকে দু একটি লেখার জন্য প্রাপ্ত সম্মানীর টাকায় আমার খরচ চলে যায়। থাকার জন্য কোনো খরচ হয়নি। খাওয়ার জন্য মাঝে মাঝে কিছু খরচ হয়েছে। যাতায়াত, পত্র পত্রিকা কেনা এবং ডাক খরচ সম্মানীর টাকা থেকে চালানো সম্ভব হয়েছিলো।
&nbsp;
গান্ধী শান্তি পরিষদের হোষ্টেলে অবস্থানকালে বেনারসের গান্ধীয়ান ইনস্টিটিউট অব ষ্টাডিজ-এর যুগ্ম পরিচালক অধ্যাপক শ্রী সুগত দাশ গুপ্তের সঙ্গে পরিচয় হয়। সর্বোদয় নেতা শ্রী জয় প্রকাশ নারায়ণ এ প্রতিষ্ঠানের অবৈতনিক পরিচালক ছিলেন। অধ্যাপক দাশগুপ্ত আমাকে তাদের ইনস্টিটিউটের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সংক্রান্ত কার্যক্রমে অংশ নেবার জন্য আমন্ত্রণ জানান। আমি সময়মত যোগাযোগ করার প্রতিশ্রুতি দেই। এ হোষ্টেলে অবস্থানকালে ভারতের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন অধ্যাপকের সঙ্গেও আমার পরিচয় হয়। তাদেরকেও মুক্তিযুদ্ধ সংক্রান্ত কাগজপত্র দেই। এছাড়া অল ইন্ডিয়া পঞ্চায়েত পরিষদের সেক্রেটারী শ্রী জি এল পুরীর সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। তার পরিষদও আমাদের সংগ্রাম সমর্থন করেছিল।
&nbsp;
দিল্লীতে অবস্থানকালে আমাদের কুটনৈতিক প্রতিনিধি পাকিস্তান হাই কমিশনের দলত্যাগী সাবেক দ্বিতীয় সচিব জনাব কে এম শাহাবুদ্দিনের সঙ্গেও আমি যোগাযোগ রক্ষা করেছি। জুন মাসের মাঝামাঝি সময়ে খবর প্রচারিত হয়, যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানকে নতুন সমরাস্রের চালান পাঠাচ্ছে। বাংাদেশের পক্ষ থেকে মুক্তিযুদ্ধের স্বার্থবিরোধী এ আক্রমণের প্রতিবাদ করা হয়। দিল্লীতে ঐ সময়ে মাত্র কয়েকজন খাস বাঙালি ছিলাম। সে কারণে অন্যান্য বাঙালি ও অবাঙালি সমর্থকদের সহায়তায় ২৫ জুন ১৯৭১ সালে মার্কিন দূতাবাসের সামনে এক বিক্ষোভ মিছিলের আয়োজন করা হয়। দিল্লীর সাংবাদিক বন্ধুদের সহায়তায় দেশী বিদেশী সংবাদ সংস্থা এবং টেলিভিশন প্রতিনিধিদের দ্বারা এ মিছিলের খবর বিশ্বব্যাপী প্রচারের ব্যবস্থা হয়। দূতাবাসের গেটে রাষ্ট্রদূতের প্রতিনিধির কাছে জনাব শাহাবুদ্দিন প্রতিবাদলিপি অর্পণ করেন। ভারতের সকল প্রধান প্রধান দৈনিকে এ বিক্ষোভের সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিলো।
&nbsp;
দিল্লীতে আমার কাজ কর্মের বিস্তারিত রিপোর্ট কোলকাতা মিশনে জনাব হোসেন আলীর কাছে পাঠাতাম। জুনের শেষে দিল্লী থেকে কোলকাতা ফিরে এসে জনাব হোসেন আলী, প্রেস এ্যাটাশে জনাব মকসুদ আলী ও অন্যান্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করি। কোলকাতা ফেরার পর আকাশবাণীর কোলকাতা কেন্দ্র থেকে ৩রা জুলাই “জানেন ওদের মতলবটা কি” শীর্ষক আমার একটি ১০ মিনিটের কথিকা পূর্বাঞ্চলীয় শ্রোতাদের অনুষ্ঠানে প্রচারিত হয় এবং পরে পুনঃপ্রচারিত হয়। এতে আমি বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত বাঙালিদেরকে জাতিগতভাবে পঙ্গু করার পাকিস্তানী চক্রান্ত সম্পর্কে শ্রোতাদের অবহিত করে হুশিয়ার থাকবার অনুরোধ জানাই। এর পরে আমি যশোর সীমান্ত এলাকায় যাই এবং নানা প্রকার খবরাখবর সংগ্রহ করি। এছাড়া নওগাঁ এলাকার লোকজনের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য বালুরঘাটে যাই। সেখানে নওগাঁর এমএসএ জনাব বায়তুল্লাহ ও অন্যান্যরা ছিলেন। ঐ এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পের অন্যতম সংগঠক নওগাঁর এমএ জলিলের সঙ্গে সীমান্ত এলাকায় স্থাপিত কয়েকটি ক্যাম্প ঘুরে দেখি এবং খবরাখবর সংগ্রহ করি।
&nbsp;
কোলকাতায় অবস্থানকালে আমি গান্ধী শান্তি পরিষদের কোলকাতা কেন্দ্রের আতিথ্য লাভ করি। এ প্রতিষ্ঠানও সীমান্ত এলাকার শরণার্থী শিবিরগুলোতে ‘অক্সফাম’-এর সহযোগীতায় নানা রকম ত্রাণ তৎপরতার ব্যাপকতা সম্পর্কে তার কাছেই একটি ভাল ধারণা পাই।
&nbsp;
জুলাইয়ের শেষে উত্তর ভারতের বেনারস শহরে শ্রী জয়প্রকাশ নারায়ণের নেতৃত্বাধীন গান্ধীবাদী শিক্ষা ইন্সটিটিউট-এর বাংলাদেশ বিষয়ক কাজকর্মে যোগ দেবার জন্য দিল্লীতে থাকাকালীন যুগ্ম পরিচালক অধ্যাপক দাশগুপ্তের আমন্ত্রণ অনুযায়ী বেনারস যাই। কনসালট্যান্ট অন বাংলাদেশ এ্যাফেয়ার্স হিসেবে প্রাথমিকভাবে তিন মাসের জন্য ইনস্টিটিউটের সঙ্গে যুগক্ত থাকি। আমাকে ৫০০ টাকা সম্মানী দেয়া হয়। এ ফেলোশীপটি তিন মাস পর আবার এক বৎসরের জন্য বাড়ানো হয়েছিলো তবে এর দুমাস পর দেশে ফিরে আসি। ইনস্টিটিউটের অবৈতনিক পরিচালক ও সর্বোদয় নেতা শ্রী জয়প্রকাশ নারায়ণের উদ্যোগে ১৮ থেকে ২০ সেপ্টেম্বর তিন দিনব্যাপী দিল্লীতে ‘বাংলাদেশ নিয়ে বৈশ্বিক সম্মেলন’ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বাংলাদেশ সমর্থক প্রতিষ্ঠানসমূহের পক্ষ থেকে প্রতিনিধিরা যোগ দেন। এ কনফারেন্স ব্যবহারের জন্য নানা রকম ওয়ার্কিং পেপার ইনস্টিটিউট থেকে তৈরী করা হয়। আমি বাংলাদেশ সম্পর্কে বিশ্ব পত্র পত্রিকার রিপোর্টের উপর ভিত্তি করে ‘Genocide in Bangladesh’, ‘Bangladesh in world press’ (বাংলাদেশে গণহত্যা এবং বিশ্ব পত্রিকায় বাংলাদেশ) শিরোনামে দু’টি পুস্তিকা প্রস্তুত করি এবং অন্যান্য ওয়ার্কিং পেপার তৈরীতেও অন্যদের সাহায্য করি। এ পুস্তিকা দুটি এবং ওয়ার্কিং পেপারগুলো ঐ কনফারেন্সে বিতরণ করা হয়।আগষ্ট মাসে খবর বের হয় যে পাকিস্তান সরকার শেখ মুজিবের বিচার করবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিবেকবান ব্যক্তিরা এর প্রতিবাদ করেন। ভারতের বিভিন্ন জায়গাতেও প্রতিবাদ মিছিল বের হয়। উত্তর ভারতের বেনারসেওইনস্টিটিউটের যুগ্ম পরিচালক শ্রী সুগত দাশ গুপ্তের নেতৃত্তে বুদ্ধিজীবী ও অন্যান্যদের প্রায় এক মাইল দীর্ঘ এক প্রতিবাদ মিছিল বের হয়। আমিও এতে যোগ দেই। বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটির অনেক ছাত্রও এতে অংশ নেন।
&nbsp;
সেপ্টেম্বরের ২২ তারিখে বেনারসে শ্রী জয়প্রকাশ নারায়ণের সঙ্গে আমার দ্বিতীয়বার সাক্ষাৎ হয়। এই সাক্ষাৎকালে শ্রী নারায়ণ আমাকে বলেল, ভারতের অবাঙালি অধ্যুষিত অনেক এলাকাতেই পাকিস্তানপন্থীরা আপনাদের বিরুদ্ধে ২৫ মার্চের আগেই বাংলাদেশে ব্যাপক হারে বিহারী নিধনের অভিযোগ করে প্রচার চালাচ্ছে। বিভিন্ন সভা সমিতিতে আপনাদের পক্ষে বক্তব্য রাখার সময় আমাকেও মাঝে মাঝে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়, এ অভিযোগ কতটা সত্যি? আমি তাকে জানাই ২৫ মার্চের আগে বাঙালিরা এ ধরনের কাজ ব্যাপক হারে করেছে এ অভিযোগ সত্যি নয়। দু এক জায়গায় এ ধরনের ছোটখাটো ঘটনা অবশ্য ঘটেছে তাতে উভয় পক্ষেরই ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তবে এটাকে ব্যাপক বিহারী হত্যা কোনো মতেই বলা চলে না। কোনো কোনো এলাকায় বাঙালিরাই বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে ২৫ মার্চে পাকিস্তানী গণহত্যা শুরুর পরে আমাদের দখলাধীন কিছু কিছু জায়গায় কিছু বাড়াবাড়ি হয়েছে সেটা সত্য। আর তার জন্য দায়ী হানাদারেরা এবং তাদের সহযোগী বিহারীরা। এর উত্তরে তিনি বলেন ২৫ মার্চ পর্যন্ত ঘটনা সম্পর্কে আমি আমি আপনার কাছ থেকে নিশ্চিত হলাম। ২৫ মার্চের ঘটনার পরের দায়-দায়িত্ব তো পাকিস্তানীদের। যদিও পাকিস্তান সরকার তাদের শ্বেতপত্রে আমাদের ঘাড়েই দোষ চাপিয়েছে। এরপরে তিনি আমাদের ১ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত ঢকা, পশ্চিম পাকিস্তান এবং কিছু নামকরা বিদেশী পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্টের ভিত্তিতে এ অভিযোগ খন্ডন করে ব্যাপক প্রচারের জন্য একটি রিপোর্ট তৈরী করার চেষ্টা করতে বললেন। তিনি বলেন, এ রিপোর্ট ভাবাবেগবর্জিত এবং নিরপেক্ষ হতে হবে। এ আলোচনার পরদিন ২৪ সেপ্টেম্বর বিদেশী পত্রিকার ঐ সময়ের কপি খোজার জন্য দ্বিতীয়বার দিল্লী যাই। আমার রিপোর্ট প্রণয়নের জন্য আমি দিল্লীর ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ লাইব্রেরী, বৃটিশ হাই কমিশন লাইব্রেরী এবং ইউএস আইএস লাইব্রেরীতে ঢাকা, পিন্ডি, প্যারিস, লন্ডন ও নিউ ইয়র্কের প্রধান প্রধান পত্রিকাসমূহ অনুসন্ধান করি।
&nbsp;
এসব পত্রিকার রিপোর্টের উপর ভিত্তি করে ‘Pakistan propaganda-is based on facts?’ (পাকিস্তানি প্রচার-আসলেই কি সত্যের উপর ভিত্তি করে প্রচারিত?) নামে একটি তথ্যমূলক পুস্তিকা রচনা করি। এতে পাকিস্তান সরকারের ‘শ্বেতপত্রে’ বিহারী নিধনেত অভিযোগও খন্ডন করা হয়। আমাদের কোলকাতা মিশনও আমার এ কাজে আগ্রহ দেখান এবং এ রিপোর্টের কপি পাঠানোর অনুরোধ করেন। আমি যথাসময়ে তা পাঠাই। ইনস্টিটিউট থেকে মুদ্রন করে এ রিপোর্টি ব্যাপকভাবে প্রচার করা হয়। আমিও ডাকযোগে বিভিন্ন সাংবাদিক বন্ধুদের কাছে এটি পাঠাই।
&nbsp;
নভেম্বর মাসে পুনরায় কোলকাতা আসি। এ সময়ে জানতে পারি আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ডঃ মোজাফফর আহমেদ চৌধুরী কোলকাতায় অবস্থান করছেন। আমি মিশন থেকে ঠিকানা নিয়ে আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র স্ট্রীটের হোটেল পূর্বরাগে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করি। অনেক আলোচনা হয়। তিনি তখন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ শাসনতন্ত্রের রূপরেখা প্রণয়নে ব্যস্ত ছিলেন।
&nbsp;
ইতিমধ্যেই ভারত সরকারের সক্রিয় সহযোগীতায় মুক্তিযুদ্ধের তৎপরতা অনেক বৃদ্ধি পায়। এবারে কোলকাতা থেকে শিলিগুড়ি হয়ে মেঘালয় সীমান্ত পথে দেশেত অভ্যন্তরে ঢোকার প্রস্তুতি নিয়ে শিলিগুড়ি পর্যন্ত যাই। ততদিনে সীমান্ত এলাকায় প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ফলে শিলিগুড়ি থেকে ফের কোলকাতা ফিরে আসি। সীমান্তে জোরেশোরে লড়াই চলছে শুনে নভেম্বরের শেষে কোলকাতা ছেড়ে নওগাঁ সীমান্ত নিকটবর্তী ভারতীয় শহর বালুরঘাট রওয়ানা হই। কিন্তু বালুরঘাটে তখন পাকিস্তানী শেলিং-এর কারনে শহর প্রায় ফাকা হয়ে গিয়েছিলো বলে মালদা থেকে পুনরায় কোলকাতা ফিরে আসি। খবর পাই ভারতীয় নিয়মিত বাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে একযোগে লড়াই চালাচ্ছে এবং বাংলাদেশ সীমান্তে ভারতীয় সামরিক বাহিনীর শক্তি বৃদ্ধি করা হয়েছে। এর পরে ঘটনার দ্রুত পট পরিবর্তন হতে থাকে। ৪ঠা ডিসেম্বর ভারত পাকিস্তান প্রকাশ্য যুদ্ধ শুরু হয়। এ পরিস্থিতিতে গান্ধীয়ান ইনস্টিটিউট অব স্টাডিজের সবার কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার জন্য ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে বেনারসে যাই। সেখান থেকে শ্রী জয় প্রকাশ নারায়ণের কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার জন্য পাটনা যাই ১১ ডিসেম্বর। শ্রী নারায়ণের সঙ্গে সাক্ষাতের পর ১৩ ডিসেম্বর কোলকাতা পৌঁছি। শত্রুমুক্ত হওয়ার আশা করা হচ্ছিলো। কোলকাতায় সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ১৬ ডিসেম্বর ভোর পাঁচটায় এক্সপ্রেস বাসযোগে নওগাঁ সীমান্তের নিকটবর্তী বালুরঘাট রওয়ানা হই। বিকেলে বাসে বসেই রেডিওতে ঢাকায় পাক বাহিনীর আত্মসমর্পণের খবর শুনি। ১৬ থেকে ২২ ডিসেম্বর পর্যন্ত বালুরঘাট শহরে থাকি। বাংলাদেশ সীমান্ত এলাকার রাস্তাঘাটে পাকিস্তানী মাইন পোঁতা ছিলো এবং ভারতীয় বাহিনী মাইন অপসারনের কাজ চালাচ্ছিলো। ২২ ডিসেম্বর মুক্তিবাহিনীর জীপে বালুরঘাট ছেড়ে নওগাঁ ফিরে আসি।
&nbsp;
-মোহাম্মদ রহমতউল্লাহ
সম্পাদক, দৈনিক জয়বাংলা, নওগাঁ
জুন, ১৯৮৪
&nbsp;
<a href=”https://www.facebook.com/amitav.barua.12?fref=ts”>অমিতাভ বড়ুয়া</a>
&lt;১৫,৩৬,২৬৩-৯৩&gt;<h1>[অধ্যাপক রেহমান সোবহান]</h1>সত্তরের ডিসেম্বরে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের নির্বাচনের পর থেকেই মুক্তিযুদ্ধে আমার সংশ্লিষ্টতা শুরু হয়। যদিও দেশের অন্যান্য অর্থনীতিবিদদের মতো আমিও এক দশক পূর্বে বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে জড়িয়ে গিয়েছিলাম। দুই পাকিস্তানের অর্থনৈতিক বৈষম্য নিয়ে বাঙালি অর্থনীতিবিদেরা বরাবরই উচ্চকণ্ঠ ছিলেন। সত্তরের দশকে বিভিন্ন উন্মুক্ত ফোরাম এবং প্রফেশনাল ও জনপ্রিয় প্রকাশনায় আমি আমার দৃষ্টিতে আঞ্চলিক বৈষম্য এবং পাকিস্তানকে দু’টি ভিন্ন অর্থনীতির আলোকে দেখার কথা লিখতে থাকি। এই দর্শনগুলো জনগণের মাঝে প্রবলভাবে আলোচিত হয় এবং এভাবেই আমরা পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর চোখে শত্রুভাবাপন্ন হয়ে উঠি।
&nbsp;
বাঙালি অর্থনীতিবিদদের এইসব আলোচনা পাকিস্তানের নীতি নির্ধারকদের কাছে বিভিন্ন সভা ও সেমিনারের মাধ্যমে খুব দ্রুত পৌঁছে যায়। উদাহরণস্বরূপ, ১৯৬০ সালে রাওয়ালপিণ্ডিতে অনুষ্ঠিত প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা নিয়ে আয়োজিত সেমিনারে প্রফেসর নুরুল ইসলামের সাথে আমি পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনীতিবিদদের প্যানেলে উপস্থিত ছিলাম। সে বছরেই দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা নিয়ে সভায় অধ্যাপক আখলাকুর রহমান, মোশারফ হোসেন এবং আমি সংযুক্ত ছিলাম।
&nbsp;
১৯৬১ সালের প্রথম অর্থ সম্মেলন (যেখানে অধ্যাপক নুরুল ইসলাম একজন সদস্য ছিলেন এবং আমি পূর্ব পাকিস্তানের সদস্যদের উপদেষ্টা ছিলাম), ১৯৬৫ সালের তৃতীয় পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা (যেখানে মোশারফ হোসেন এবং আমি উভয়েই সদস্য ছিলাম), ১৯৭০ সালের চতুর্থ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা (যেখানে অধ্যাপক মাজহারুল হক, নুরুল ইসলাম, আখলাকুর রহমান, আনিসুর রহমান এবং আমি সহ সকলেই সদস্য ছিলাম) প্রভৃতি সম্মেলনে পূর্ব-পাকিস্তানের অর্থনীতিবিদদের সাথে পাকিস্তানের পরিকল্পনাবিদ ও নীতি নির্ধারকদের দর্শনে প্রবল পার্থক্য ও মতবিরোধ দেখা যায়।
&nbsp;
১৯৬৯-৭০ সাল পর্যন্ত আমি সাপ্তাহিক ফোরামের নির্বাহী সম্পাদক ছিলাম। সেখানে আমি জনতার দরবারে বাংলাদেশের প্রতি বৈষম্য নিয়ে বিভিন্ন লেখার মাধ্যমে প্রধান সামরিক আইন উপদেষ্টা জেনারেল ইয়াহিয়া খান এবং তাঁর মুখ্য অর্থনৈতিক উপদেষ্টা জনাব এম, এম আহমেদের সাথে বিতর্কে জড়িয়ে পড়ি।
&nbsp;
সেই সব গবেষণা এবং বাংলাদেশের অধিকার নিয়ে জনতার কাতারে বাঙালি অর্থনিতিবিদদের প্রত্যক্ষ অবস্থান বাঙালি জাতীয়তাবাদের পক্ষে রাজনৈতিক সংগ্রামের পালে প্রবল হাওয়া লাগায়। আমাদের অনেকে তখন প্রায়শঃই রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সঙ্গে অর্থনৈতিক বিষয়াদি নিয়ে আলোচনায় বসতেন।
&nbsp;
আওয়ামি লীগের ৬ দফা আন্দোলন আমাদের লেখালেখি দ্বারা অনুপ্রাণিত ছিল। যদিও আমার জানা মতে কোন অর্থনীতিবিদ সেই দফাগুলো লেখালেখির সাথে জড়িত ছিলেন না।
&nbsp;
১৯৬৯ সালে রাওয়ালপিণ্ডির গোলটেবিল বৈঠকের পূর্বে শেখ মুজিবুর রহমান স্মারকলিপি প্রস্তুতে পরামর্শ দেবার জন্য অধ্যাপক নুরুল ইসলাম, অধ্যাপক আনিসুর রহমান এবং অধ্যাপক ওয়াহিদুল হককে ডেকেছিলেন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার তৈরিতেও সেই বছরের গ্রীষ্মে অধ্যাপক নুরুল ইসলাম, অধ্যাপক আনিসুর রহমান, ডঃ এ, আর খান, ডঃ স্বদেশ বোস, ডঃ হাসান ইমাম এবং আমি ডঃ কামাল হোসেনের সাথে করাচিতে দেখা করেছিলাম।
&nbsp;
অবশ্য ১৯৭০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত আমাদের আমাদের অবদান অনিয়মিত ছিল। যাই হোক, সত্তরের ডিসেম্বরে আওয়ামী লীগের সেই ব্যাপক নির্বাচনী বিজয়ের পর নির্বাচনের পর বঙ্গবন্ধু ৬ দফার ভিত্তিতে পাকিস্তানের একটি গ্রহণযোগ্য সংবিধান তৈরি করার উদ্যোগ নিলেন। উল্লেখ্য, এই ৬ দফার ভিত্তিতেই আওয়ামী লীগ তার নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়েছিল। উনি এরকম একটি সংবিধানকে বাস্তবে রূপ দেয়ার জন্য আলোচনায় বসতে চাইলেন যেন ৬ দফা কেবল নির্বাচনী ওয়াদার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। বরং এটি যেন জাতীয় পরিষদের সমঝোতার টেবিলে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উঠে আসে এবং দেশের জন্য একটি কর্মময় সংবিধান সৃষ্টির পথে অবদান রাখে।
&nbsp;
নির্বাচনের পরের মাস থেকে সংবিধান নিয়ে আলোচনার জন্য বঙ্গবন্ধুর উদ্যোগে একের পর এক মিটিং বসতে লাগলো। সেখানে আওয়ামী লীগের হাই কম্যান্ড তাজউদ্দিন আহমেদ, নজরুল ইসলাম, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, কামরুজ্জামান এবং খোন্দকার মোশতাকসহ ডঃ কামাল হোসেন, অধ্যাপক নুরুল ইসলাম, অধ্যাপক মুজাফফর আহমেদ চৌধুরী, অধ্যাপক সারওয়ার মুর্শেদ, অধ্যাপক আনিসুর রহমান এবং আমি উপস্থিত থাকতাম। বুড়িগঙ্গার পাড়ে একটি বাড়িতে সারা দিনব্যাপী আলোচনা চলতো। একাডেমিশিয়ানদের পাশাপাশি ডঃ কামাল হোসেন সবচেয়ে কার্যকরি ভূমিকা পালন করতেন। তাজউদ্দিন আহমেদের গভীর রাজনৈতিক অন্তর্দৃষ্টি ছিল। তিনি খুব সহজেই কঠিন কঠিন টেকনিকাল ইস্যুগুলোকে মৌলিক বিষয়াদিতে ভেঙে ফেলতে পারতেন। বঙ্গবন্ধু তাঁর রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং সহজাত ধারালো চিন্তাধারার মাধ্যমে সেখানে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতেন। সেই গ্রুপের কাজ শেষ হবার পর আওয়ামীর হাতে একখানা নতুন সংবিধানের খসড়া প্রস্তুত ছিল এবং সমঝোতার টেবিলে যে কোন ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সংলাপের জন্য তখন আওয়ামী লীগ পুরোপুরিভাবে প্রস্তুত ছিল।
&nbsp;
কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানের নেতৃস্থানীয় রাজনৈতিক দলগুলো কি সংবিধান সংশোধন বা ৬ দফা নিয়ে কিছু ভাবছিলেন? তা জানার জন্য বঙ্গবন্ধু এবং তাজউদ্দিন আহমেদের অনুরোধে আমি একাত্তরের জানুয়ারিতে ইনফর্মালভাবে পশ্চিম পাকিস্তানে গেলাম।
&nbsp;
লাহোরে আমি পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেতৃস্থানীয় চিন্তাবিদ হিসেবে পরিচিত মুবাশ্বের হাসান ও মিয়া মাহমুদ আলি কাসুরি সাথে দেখা করলাম। শুনলাম, উনারা কেউই সংবিধান সংশোধন নিয়ে তেমন কিছু ভাবেন নাই! তাঁরা ৬ দফাকে শুধু নির্বাচনে জয়লাভের ফাঁকা বুলি ভাবছিলেন! স্বাধীনতার পর জেনেছিলাম যে আমাদের সেই আলোচনার মাঝের কিছু তথ্য কাসুরি সাহেব পাকিস্তানের মিলিটারি গোয়েন্দাদের জানিয়েছিলেন এবং সেই মোতাবেক যুদ্ধকালীন গ্রেপ্তারকৃত ডঃ কামাল হোসেনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল।
&nbsp;
তারপর আমি লাহোর থেকে করাচি গেলাম। দেখা করলাম ব্যারিস্টার রাফি রেজার সাথে। উনি ভুট্টোর সংবিধান সংক্রান্ত উপদেষ্টা ছিলেন। জানতে পারলাম যে সামনের জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে সংবিধান সংক্রান্ত পাকিস্তান পিপলস পার্টির অবস্থান নিয়ে কর্মপরিকল্পনা করতে তিনি ভুট্টো কর্তৃক নিয়োজিত হয়েছেন। বাস্তবে উনি খুব কম কাজই করেছিলেন কারণ ভুট্টো নিজেই সংবিধান সংশোধন নিয়ে আগ্রহী ছিলেন না। ভুট্টর আরেকজন মুখ্য লেফটেন্যান্ট আবদুল হাফিজ পীরজাদা এই বিষয়টি নিশ্চিত করেন। ঢাকায় ফিরে আমি বঙ্গবন্ধুকে রিপোর্ট করলাম যে পিপিপি সংবিধান সংশোধন নিয়ে তেমন সিরিয়াস নয়।
&nbsp;
এই বিষয়টা পুরোপুরিভাবে নিশ্চিত হওয়া গেল একাত্তরের জানুয়ারির শেষে, যখন পিপিপি-র লোকজনসহ ভুট্টো ঢাকায় আসলেন। তাজউদ্দিন আহমেদের কাছ থেকে জানতে পেরেছিলাম যে উনারা ৬ দফার ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধনের চেয়ে ক্ষমতা ভাগাভাগির বিষয়ে আলোচনা করতে অধিকতর আগ্রহী ছিলেন। সেই সফর চলাকালীন আমি রাফি রাজা, মুবাশ্বের হাসান এবং পিপিপি-র শক্তিশালী নেতা মেহরাজ মোহাম্মদ খানের সাথে কিছু আলোচনা করেছিলাম। কিন্তু সেই আলোচনাগুলো সুনির্দিষ্ট ছিল না, বরং ছিল আধা-দার্শনিক গোছের। অন্যরা পিপিপি-আওয়ামীর এই সংলাপ সম্পর্কে আমার চেয়ে আরো ভালো বর্ণনা দিতে পারবেন। যদিও উনাদের অনেকেই আজ সম্পূর্ণ নিশ্চুপ। যতদূর বুঝলাম, ১ লা মার্চের আগ পর্যন্ত ইয়াহিয়া কিংবা পিপিপি ৬ দফা নিয়ে সিরিয়াস আলোচনার কথা ভাবেন নাই। যতদূর জানি, আওয়ামী লীগ এবং পশ্চিম পাকিস্তানের নেতৃবৃন্দের মাঝে কখনোই ৬ দফা বাস্তবায়নের আসল সমস্যাগুলো নিয়ে আলোচনা হয় নাই। যখন বিস্তারিত আলোচনা শুরু হয়েছিল, তখন একাত্তরের ২৫ মার্চ মধ্যরাতের ৫ মিনিট আগে সাংবিধানিক ইস্যুগুলো ৬ দফা থেকে বহু দূরে সরে গিয়েছিল এবং জেনারেলরা আগেই রক্তপাত ও অগ্নিকাণ্ডের মাধ্যমে সকল সমস্যা সমাধানের সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছিলেন।
&nbsp;
মার্চের ১ তারিখের আগ পর্যন্ত শ্বাসরূদ্ধকর পরিস্থিতিতে আমার লেখালেখির মাধ্যমে আমি উপরের বিষয়গুলো সম্পর্কে ফোরামে ইঙ্গিত দিয়েছিলাম। পাকিস্তান সমস্যার সর্বশেষ সমাধান যে ৬ দফাকে রাজনৈতিকভাবে অনুধাবন করা, সেটাই আমার লেখার মূল বক্তব্য ছিল। এটা ছাড়া একটা পথ অবশিষ্ট আছে। তা হলো গণসংগ্রাম এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা। অল্প কিছু বাঙালি শুধু সে সময় পাকিস্তান সৃষ্টির দর্শনের সাথে মনস্তাত্ত্বিকভাবে সংযুক্ত ছিলেন। তবে প্রশ্ন ছিল একটাঃ আলাদা হয়ে যাওয়া কি সাংবিধানিকভাবে হবে? নাকি যুদ্ধের মাধ্যমে?
&nbsp;
১ লা মার্চে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সাংবিধানিক সভা স্থগিত করার ঘোষণা আমার মাথায় রাজনৈতিক স্বাধীনতা নিয়ে চিন্তার জন্ম দেয়। ঐ দিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানে ডাকা অসহযোগ আন্দোলন বাংলাদেশের সীমানায় পাকিস্তান সরকারের রাজনৈতিক কর্তৃত্বকে প্রত্যাখ্যান করে। সেই রাজনৈতিক কর্তৃক আর কোন দিন ফিরে আসে নি। ২৬ শে মার্চ, ১৯৭১-এর পর পাকিস্তান সরকারের কর্তৃত্ব ফিরিয়ে আনার সকল চেষ্টাকে বাংলাদেশের লোকজন বিদেশী সশস্ত্র বাহিনীর দখলদারিত্ব হিসেবে দেখেছে।
&nbsp;
অসহযোগ আন্দোলনের ডাক অভূতপূর্ব সফলতার পাশাপাশি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীন প্রয়োজনীয় নাগরিক এবং অর্থনৈতিক সেবা প্রদানে সংকট সৃষ্টি করেছিল। যখন প্রশাসনিক, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা সহ সকল শ্রেণী পেশার মানুষ বঙ্গবন্ধুর অসহযোগ আন্দোলনের আহবানে সাড়া দিয়েছিল, তখন আক্ষরিক অর্থেই বাংলাদেশে মিলিটারী ক্যান্টনমেন্ট ব্যতিত পাকিস্তান সরকারের সকল নিয়ন্ত্রণ অকার্যকর হয়ে পড়েছিল। দেশের সমাজ ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙ্গে পড়া রোধে এই শূন্যতা কাটিয়ে ওঠা অপরিহার্য ছিল। ফলে ইয়াহিয়া খান ৬ই মার্চ ১৯৭১ তারিখে সেনাবাহিনীকে ক্যান্টনমেন্টে ফেরত যাবার আদেশ দিলে বঙ্গবন্ধু দেশের সমগ্র রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কর্তৃত্ব গ্রহণ করেন। ১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধের পর এই দিন থেকে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো স্বায়ত্ত্বশাসন অর্জন করে।
&nbsp;
অদ্ভুতভাবে লক্ষণীয় যে, এই সময়ে বাংলাদেশের কিছু কিছু অর্থনীতিবিদ অবিভক্ত পাকিস্তানের অর্থনীতি সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখার লক্ষ্যে সমস্যাসমুহের দিকে মনোনিবেশ করছিলেন। যেমন পশ্চিম পাকিস্তানে অর্থপ্রেরণে নিয়ন্ত্রণ আরোপ, পাকিস্তানের টাকশাল হতে ছাপানো মুদ্রার সরবরাহের সীমা নির্ধারণ, রপ্তানী নীতিমালা এবং রপ্তানীমূল্য পরিশোধের উপায়, নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য এবং কাঁচামাল আমদানী ইত্যাকার সমস্যাগুলোই তাদের কাছে প্রধান হয়ে উঠেছিল।
&nbsp;
৩২ নম্বর ধানমন্ডিস্থ প্রফেসর নুরুল ইসলামের বাসাটি শেখ মুজিবুর রহমান সরকারের একরকম অর্থনীতি বিষয়ক সচিবালয় হয়ে উঠেছিল। সার্কিট হাউস সারিতে ডাঃ কামাল হোসেনের বাসভবন ছিল তৃতীয় প্রশাসনিক কেন্দ্র। আমাদের কেউ কেউ প্রতিদিন সুনির্দিষ্ট সমস্যা সম্পর্কে আলোচনা করার জন্য প্রফেসর ইসলামের বাসায় মিলিত হতাম। সেখানে বাঙালি বেসামরিক এবং ব্যাংক কর্মকর্তারাও অংশ নিতেন। আমাদের সিদ্ধান্তগুলো সন্ধ্যায় তাজউদ্দীন আহমেদ কিংবা কামাল হোসেন কর্তৃক ৩২ নম্বর হতে বা কামাল হোসেনের বাসা হতেই আদেশ বা নির্দেশনা আকারে ব্যাংক, সরকারি কর্মকর্তা এবং পত্রিকায় প্রচারনার জন্য পাঠানো হতো।
স্থানীয় অর্থনীতি পর্যালোচনা ছাড়াও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর প্রতিনিধিদের নিকট সারসংক্ষেপ তুলে ধরা ছিল আমাদের অন্যতম কাজ। প্রতিদিনই বড় বড় আন্তর্জাতিক পত্রিকার প্রতিনিধি আমাদের আলোচনার সময়ে আসতেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন নিউ ইয়র্ক টাইমস এর টিলম্যান এবং পেগি ডারবিন, সিডনি শনবার্গ -যিনি স্বাধীনতা যুদ্ধ সম্প্রচার করতে গিয়ে পাকিস্তানী আর্মি কতৃক ঢাকা হতে বহিষ্কৃত হন, যা তাঁকে পুলিৎজার পুরষ্কার প্রাপ্তির দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গিয়েছিল, দ্য গারডিয়ান এর পিটার প্রেস্টন (বর্তমান সম্পাদক) এবং গার্ডিয়ান পত্রিকার মারটিন এডেনি, টাইমস এর পিটার হাজেলহার্স্ট, ওয়াশিংটন পোস্ট এর স্যালিং হারিসন, ওয়াশিংটন স্টার-এর হেনরি ব্র্যাডশার প্রমুখ। অভিজ্ঞ এসব সাংবাদিকদের সকলেই তাদের পত্রিকার পাঠকদের ঢাকার নাটকীয়তার আদ্যোপান্ত জানানোর জন্য নিয়মিত রিপোর্ট করছিলেন।
&nbsp;
পিটার হাজেলহার্স্টই আমাকে জানান যে, তিনি সম্প্রতি লারকানায় ভুট্টোর একটি সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। সেখানে তিনি বলেছেন যে বাংলাদেশে চলমান উত্তেজনা কিছু শহুরে রাজনীতিবিদদের চায়ের আসরে ঝড় ব্যতিত আর কিছু নয়। বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালালে এই উত্তেজনা কিছুটা প্রশমিত হবে এবং আলোচনার পরিবেশ সৃষ্টিতে সহায়ক হবে। এই সামরিক অভিযান আন্দোলনকারীদের ওপর হত্যা-সন্ত্রাস চালিয়েছিল এবং বহু নেতাদের জেলে পুড়েছিল। এই গোপনীয় তথ্যটি আমাদের কাছে ভবিষ্যদ্বাণীর মতো ছিল যা আমরা পরবর্তীতে ১৯৭১ এর ২৫ শে মার্চ সামরিক অপারেশন দেখতে পাই। ভুট্টো নিশ্চয়ই তার ভ্রান্ত ধারণা ইয়াহিয়া খান কে-ও জানিয়েছিলেন।
&nbsp;
এ সময় প্রফেসর নুরুল ইসলামের দুজন ভগ্নিপতি, পাকিস্তান আর্মির কর্নেল ইয়াসিন এবং টি এন্ড টি তে কর্মরত জনাব এস হুদা নিয়মিত তার বাড়িতে আসা যাওয়া করতেন। কর্নেল ইয়াসিন ঢাকায় পাকিস্তান বাহিনীর সরবরাহের দায়িত্বে ছিলেন। ফলে তার কাছে ঢাকায় পাকিস্তান আর্মিকে খাদ্য সরবরাহকারীদের তালিকা ছিল। পার্টির স্বেচ্ছাসেবকেরা এই তালিকা মোতাবেক সকল সরবরাহকারীদের সাথে দেখা করেন এবং বেশ কয়েকজনকে ক্যান্টনমেন্টে সরবরাহ বন্ধ করাতে সক্ষম হন। এ কাজের ফলাফলও ভয়াবহ হয়েছিল। ২৫ শে মার্চের ঘটনার পর, কর্নেল ইয়াসিন এবং জনাব হুদা দু’জনকেই আর্মিরা তুলে নিয়ে গিয়েছিল। হুদাকে তাঁরা ঢাকা হাজতে অত্যাচার চালিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করার পাশাপাশি স্বীকারোক্তি আদায় করতে চেয়েছিল যে, তিনি আমার এবং প্রফেসর ইসলামের সাথে মিলিত হয়ে আওয়ামীলীগ এর পক্ষ থেকে ভারতের সাথে টেলিযোগাযোগ স্থাপনের ষড়যন্ত্র করছিলেন। এই বানোয়াট অভিযোগ পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে আনীত রাষ্ট্রদ্রোহিতার চার্জশিটে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে বঙ্গবন্ধুকে ‘৭১ এর সময়টাতে কারারুদ্ধ করে রাখা হয়েছিল।
&nbsp;
কর্নেল ইয়াসিনকে আরও করুণ পরিনতি ভোগ করতে হয়েছিল। তাকেও হাজতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। কিন্তু তাকে লাহোরে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে তাকে অত্যাচার করে বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে মিথ্যা সাক্ষ্য প্রদানে বাধ্য করার চেষ্টা চালানো হয়। এঁদের দু’জনেরই এই পরিণতি ভোগের মূল কারণ ছিল মার্চের সেই দিনগুলোতে অধ্যাপক ইসলাম এবং আমার সাথে মাত্র কয়েকবার দেখা হওয়া।
&nbsp;
ইয়াহিয়া এবং মুজিবের মধ্যে যখন আলোচনা শুরু হয়েছিল, আওয়ামীলীগ টিমের ব্যাক-আপ দেয়ার জন্য নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমেদ এবং কামাল হোসেনের পাশাপাশি আমাদের কয়েকজনকেও থাকতে হয়েছিল। ইয়াহিয়া খানের টিমে ছিলেন মেজর জেনারেল পীরজাদা, বিচারপতি কর্নেলিয়াস এবং এম এম আহমেদ। আলোচনার লক্ষ্য ছিল অন্তর্বর্তীকালীন সংবিধানের রূপরেখা নির্ধারণ করা। আমরা প্রতি সেশন শেষে ইয়াহিয়া খানের টিম প্রদত্ত প্রস্তাবনা গুলো নিয়ে বসতাম এবং আমাদের প্রত্যুত্তর বা বিকল্প প্রস্তাব ঠিক করতাম। সেশনগুলো অনেক দীর্ঘ হতো। কিছু সেশনে বঙ্গবন্ধু নিজেই থাকতেন। ডঃ কামাল হোসেনের মতিঝিল চেম্বারে অনুষ্ঠিত সেশনটি ছিল চরম পরিণতিমূলক, যেটাতে সারারাত ধরে আওয়ামীলীগের হাই কমান্ড এবং উপদেষ্টামন্ডলী পরের দিন আলোচনায় চূড়ান্ত অবস্থান ঠিক করতে কাজ করেছিলেন। আমাদের প্রস্তাবনার ওপর এম এম আহমেদের হাতে লিখিত সংশোধনী নিয়ে আমরা বসেছিলাম, সেটাই ছিল শেষ। ইয়াহিয়া খানের টিম সর্বশেষ যে অবস্থান নিয়েছিলেন তাতে মনে হয়েছে অন্তত অর্থনৈতিক বিষয়াদিসমূহে একরকম ঐক্যমত্যে পৌঁছানো সম্ভব। আমাদের প্রত্যাশা ছিল জেনারেল পীরজাদা ২৪ শে মার্চ আলোচনার সর্বশেষ সেশন আহ্বান করবেন এবং সেখান থেকে একটি আনুষ্ঠানিক ঘোষণা প্রেসে আসবে। এই আহবানটির জন্য আমরা ২ দিন ধরে অপেক্ষা করছিলাম। ২৫ তারিখে আমরা জানতে পারলাম যে এম এম আহমেদ গতরাতে পশ্চিম পাকিস্তানের উদ্দেশ্যে ঢাকা ছেড়েছেন। মনে হচ্ছিলো যে তিনিও মিটিঙের জন্য অপেক্ষা করছিলেন কিন্তু পীরজাদা অকস্মাৎ তাঁকে এবং বিচারপতি কর্নেলিয়াসকে এই বলে ঢাকা ছাড়তে বলেন যে তাদের কাজ শেষ। সমঝোতার বিস্তারিত আলোচনা এখানে করছি না। আগ্রহী পাঠকেরা ‘বাংলাদেশের জন্য সমঝোতা’ শীর্ষক আমার আর্টিকেলে আমার দৃষ্টিতে আলোচনার বিস্তারিত বিবরণ পাবেন। এটা আমি স্মৃতি সজীব থাকতেই বছরের শেষের দিকে রেকর্ডস্বরূপ সাউথ এশিয়ান রিভিউতে লিখেছিলাম। ডঃ কামাল হোসেনও পৃথকভাবে এই বাদানুবাদ নিয়ে অধিকতর গ্রহণযোগ্য বর্ণনা দিয়েছেন।
বাদানুবাদের সময়টাতে ক্রমাগত উত্তেজনা তুঙ্গে উঠছিলো। কারণ প্রতিদিন বাংলাদেশে পাকিস্তানি সেনাদের দখলদারিত্ব বাড়ছিলো। বাংলার আমজনতা রাজনীতি সচেতন ও বিদ্রোহী হয়ে উঠছিল। মার্চের তৃতীয় সপ্তাহের দিকে আমাদের এক বন্ধু মঈদুল হাসান আমাকে জানান যে ক্যান্টনমেন্টের ভেতর থেকে পাওয়া একটি জরুরী খবর তিনি বঙ্গবন্ধুর নিকট পৌঁছে দিতে চান। খবরটি কে পাঠিয়েছে, সে তা সেই সময়ে না বললেও পরে আমাকে জানায় যে যে, খবরটির সোর্স ছিলেন এয়ার ভাইস মার্শাল খন্দকার, যিনি তখন পাকিস্তান এয়ার ফোর্সের গ্রুপ ক্যাপ্টেন ছিলেন। আমি মঈদকে এক রাতে ১০ টার দিকে বঙ্গবন্ধুর বাড়ীতে নিয়ে গেলাম। তিনি বঙ্গবন্ধুকে জানালেন যে পাকিস্তানী সেনারা সমর প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং আক্রমণ করার জন্য তৈরি হচ্ছে। বঙ্গবন্ধু খবরটি টুকে নিলেন যদিও তিনি এই প্রস্তুতি সম্পর্কে আগেই অবগত আছেন বলে জানালেন।
বাদানুবাদ চলাকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের কয়েকজন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) নেতার সাক্ষাৎ লাভ করার সুযোগ হয়েছিল। যতদূর মনে পড়ে, দৈনিক সংবাদ এর প্রোপ্রাইটর আহমেদুল কবির এর সাথে এনডব্লিউএফপি-এর আব্দুল ওয়ালী খান এবং বেলুচিস্তানের ঘাউস বাক্স বাইজেনজো অবস্থান করছিলেন। ওয়ালী খান এবং বাইজেনজো দুজনেই তাদের উপলব্ধির কথা আমাকে জানিয়েছিলেন। বলেছিলেন যে ইয়াহিয়া, মুজিব এবং ভুট্টোর মধ্যে আলোচনা পশ্চিম পাকিস্তানের ক্ষুদ্র প্রদেশগুলোর স্বার্থ ক্ষুণ্ণ করবে। এই পাঠান এবং বেলুচদের উপলব্ধির কারন এই যে, ভুট্টো আলোচনায় তার নিজের নির্বাচনী এলাকা পাঞ্জাব এবং সিন্ধুর এর সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে অধিকতর ক্ষমতায়ন দাবী করছিলেন। মুজিবের পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্ত্বশাসনের দাবীর বিপরীতে ভুট্টো শুধু পাঞ্জাব আর সিন্ধু নয় বরং পশ্চিম পাকিস্তানের পুরোটা নিজের করায়ত্ত্ব করতে চেয়েছিলেন। যেহেতু পিপলস পার্টি এনডব্লিউএফপি এবং বেলুচিস্তানের দু’টো নির্বাচনেই হেরেছিল, সেহেতু ভুট্টো আশংকা করেছিলেন সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ আওয়ামীলীগ পাঠান আর বেলুচদের সাথে নিয়ে পিপলস পার্টিকে কেন্দ্রের ক্ষমতা থেকে একেবারেই ছুঁড়ে ফেলে দিবে এবং পশ্চিম পাকিস্তানের প্রদেশগুলোর স্বায়ত্ত্বশাসন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে পাঞ্জাবের একক ক্ষমতা খর্ব করবে। ন্যাপ নেতারা এই ভেবে ভয় পেয়েছিলেন যে পূর্বের স্বায়ত্ত্বশাসনের বিনিময়ে হয়তো মুজিব পশ্চিমের ক্ষুদ্র প্রদেশগুলো ভুট্টোর হাতে ছেড়ে দিয়ে তাদের চলমান স্বায়ত্ত্বশাসনের আন্দোলন চাপা দিবেন। পরবর্তীতে দেখা গেল যে মুজিবের ভূমিকা সম্পর্কে তাদের ধারনা ছিল একেবারেই পুঁথিগত। যদিও ঘটনাক্রমে দেখা যাচ্ছে যে তাদের স্বায়ত্ত্বশাসনের অধিকার ঠিকই পাঞ্জাব আধিপত্যে হারিয়ে গেল, প্রথমে ভূট্টো এবং বর্তমানে সামরিক জান্তার হাতে।
&nbsp;
পাকিস্তানী জেনারেলদের আলোচনায় গড়িমসি দেখে আমার ধারনা হচ্ছিলো যে ওরা বাংলাদেশে সামরিক শক্তি বৃদ্ধির জন্য সময়ক্ষেপণ করছিল। ২৪শে মার্চ ন্যাপ এবং পশ্চিম পাকিস্তানের অন্যান্য ক্ষুদ্র অঞ্চলভিত্তিক দলের নেতারা ঢাকা ছাড়েন। এ থেকে বুঝা গিয়েছিল যে তাদেরকে ইয়াহিয়া খানই এ নির্দেশ দিয়েছিলেন আর সেনারা শীঘ্রই মাঠে নামছে।
&nbsp;
২৫শে মার্চ সন্ধ্যায়, আনুমানিক ৫/৬টার দিকে তারিক আলীর পিতা স্বনামধন্য সাংবাদিক মাজহার আলী খানকে নিয়ে আমি বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা করতে ধানমন্ডি ৩২ এর বাসায় যাই। মাজহার সাহেব ফোরামে একটি কলাম লিখতেন। ঐ সময় বাড়িটি সাংবাদিকে জনাকীর্ণ ছিল। উনারা উপলব্ধি করেছিলেন যে হয়তো পাক সেনাদের সাথে ঘটনাবলী পরিশিষ্ট হয়ে গেছে।
&nbsp;
মাজহার আলী খান বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা করতে চেয়েছিলেন। সেখানে সর্বদাই ভিড় থাকতো বলে এ ব্যাপারে তাকে প্রস্তুত করে রেখেছিলাম। বঙ্গবন্ধু মাজহারকে আগে থেকেই চিনতেন যখন তিনি মিয়া ইফতিখার উদ্দিনের মালিকানাধীন পাকিস্তান টাইমস এর সম্পাদনা করতেন। তিনি তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানালেন এবং রুমে শুধু আমাদের দুজনকে রেখে বাকিদের যেতে বললেন।
বঙ্গবন্ধু আমাদের বললেন যে আর্মি সেনা অভিযানে যাবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমার মনে আছে তিনি বলেছিলেন, “ ইয়াহিয়া মনে করে যে আমাকে মেরে সে আন্দোলনকে স্তব্ধ করতে পারবে। কিন্তু তার ধারনা ভুল। আমার কবরের ওপরেই স্বাধীন বাংলাদেশ নির্মিত হবে।” তার মৃত্যু অবধারিত এবং সেটি তিনি মেনে নিয়ে বাকিটা ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দিয়েছিলেন বলে মনে হয়েছিল। তিনি চেয়েছিলেন নতুন প্রজন্ম স্বাধীনতা সংগ্রাম চালিয়ে যাবে। এই মিটিং এর পর মাজহার আলী আসন্ন রক্তবন্যা সম্পর্কে কয়েকজন পিপিপি নেতার মনোভাব জানতে চেয়েছিলেন। ৩২ নম্বর থেকে আমরা হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল এ যাই। সেখানে মাহমুদ আলী কাসুরীর সাথে দেখা হয়। তার স্বভাবজাত দাম্ভিক স্বরে কাসুরী আমাকে এই বলে অভিবাদন জানালেন যে, “ মনে হচ্ছে আওয়ামীলীগ নিষ্পত্তি চাইছে না”। যেহেতু আমার জানামতে প্রেসে পাঠানোর জন্য একটি চুক্তির খসড়া ইতোমধ্যেই তৈরি ছিল, আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম যে এই খবর তিনি কোথায় পেলেন। উত্তরে তিনি জানালেন যে জেনারেল পীরজাদা তাকে এমনটিই বলেছেন। যেহেতু পীরজাদা আলোচনার টেবিলে একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন, সেহেতু তারা নিশ্চয়ই পশ্চিম পাকিস্তানী রাজনীতিবিদদের একটি ভিন্ন গল্প শোনাচ্ছিলেন আর সেনা অভিযানের ভিত্তি তৈরি করছিলেন। কাসুরী বলে চললেন, লিংকন যেভাবে আমেরিকার অখণ্ডতা রক্ষার জন্য রক্তপাতের মাধ্যমে সিভিল ওয়ার লড়েছিলেন এখানেও দরকার হলে তা করা হবে। ভিয়েতনামে আমেরিকার চালানো গণহত্যা বিষয়ক বারট্রান্ড রাসেল ওয়ার ক্রাইমস ট্রাইবুনালের একজন সুপরিচিত জুরিস্ট ছিলেন কাসুরি। আশা ছিল বাঙালিদের ওপর পাকিস্তানী আর্মিদের আসন্ন গণহত্যার বিষয়েও তিনি সোচ্চার থাকবেন যেমনটি তিনি ভিয়েতনামিদের প্রতি দেখিয়েছেন।
&nbsp;
পাকিস্তানী জেনারেলদের এই শঠতা সম্পর্কে নিশ্চিত জেনে আমি সার্কিট হাউস সারিতে কামাল হোসেনের বাসায় গেলাম এবং জানালাম যে পীরজাদা পিপিপির সঙ্গে আলোচনার বিষয়ে বানোয়াট গল্প প্রচার করছেন এবং হামলা চালানোর প্রেক্ষাপট মোটামুটি তৈরি। সেখান থেকে আমি গুলশানের বাড়িতে ফিরে এলাম। খবর আসছিল যে আর্মিরা আওয়ামীলীগ কর্মীদের রাস্তার ব্যারিকেড সরাতে বাধ্য করছিল। আনুমানিক রাত ৯/১০টার দিকে আমরা প্রথম গোলাবারুদের শব্দ শুনতে পাই যাতে বুঝতে পারছিলাম যে ইপিআর এবং পুলিশ ব্যারাকে পাকিস্তানী আর্মিদের আক্রমণ শুরু হয়ে গেছে। আমি বঙ্গবন্ধুর অবস্থা জানার জন্য ৩২ নম্বরের সরাসরি ফোন নাম্বারে ফোন করলাম। জানি না কে ধরেছিল তবে ফোনের সেই স্বরটি নির্দেশ করেছিল যে বঙ্গবন্ধু সেখানেই আছেন। পরের কলগুলোর জবাব কেউ দিলোনা। কিছুক্ষণ পরে সকল টেলিফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল।
&nbsp;
পরের ৩৬ ঘন্টা আমরা ভারী আর স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রশস্ত্রের ঝনঝনানি শুনলাম, দেখতে পাচ্ছিলাম দূরের আকাশে আর্মিদের গোলাগুলির আলোকচ্ছটা। ২৬ তারিখে ইয়াহিয়ার ঘোষণা কানে এল। আমাদের সবার কাছেই পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল যে স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। তবে কখন শেষ হবে সেটা বুঝতে পারছিলাম না।
&nbsp;
পরবর্তী ৩৬ ঘণ্টায়, টেলিফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় আর গুলশানের বাড়িটিতে অবরুদ্ধ থেকে আমরা শুধু গণহত্যার আর্তনাদই শুনেছি। ২৭ শে মার্চের সকালে কারফিউ তুলে দেওয়া হল। আমি প্রথমেই কিছু কারণবশতঃ হেঁটে গুলশানের ফোর্ড ফাউন্ডেশন গেস্ট হাউসে গেলাম যেখানে সরবন হতে আগত পাকিস্তান ইন্সটিটিউট অফ ডেভেলপমেন্ট ইকোনমিক্সের ভিজিটিং স্কলার ড্যানিয়েল থরনার অবস্থান করছিলেন। ধানমন্ডিতে প্রফেসর নুরুল ইসলাম ঠিক আছেন কিনা, তা অনতিবলম্বে গাড়ি চালিয়ে দেখে আসার জন্য আমি তাঁকে অনুরোধ করলাম। বাড়ী ফিরে এসে দেখলাম আমার বন্ধু মঈদুল হাসান এবং পাকিস্তান টোব্যাকোর জনাব এ আলম আমার জন্য অপেক্ষা করছেন। মঈদ আমাকে তৎক্ষণাৎ বাড়ী ছেড়ে যেতে বললেন। তার কাছ থেকে জানতে পারলাম যে, সশস্ত্র বাহিনী পাইকারি মাত্রায় গণহত্যা শুরু করে দিয়েছে। কামাল হোসেন এর বাসায় তিনি খবর নিয়ে জানতে পেরেছেন যে আর্মি তাকে তুলে নেবার জন্য সেখানে গিয়েছিল। তবে সেখানে তাকে পাওয়া যায় নি।
&nbsp;
আমার ধারনা ছিল না যে আমিও আর্মির টার্গেট হতে পারি, কারন কেউ একজন বলেছিল যে আর্মি শুধু রাজনৈতিক কর্মীদেরকেই ধরবে। তারপরও মঈদ আমাকে বিপদের সম্ভাবনা এড়াতে বাসা থেকে চলে যেতে বললো।
&nbsp;
আমার পরিবারের নিরাপত্তার কথা ভেবে আমি যেতে চাছিলাম না। কিন্তু আমার স্ত্রী বললেন যে আমার উপস্থিতি তাদেরকেও বিপদে ফেলতে পারে। এছাড়া আমি বাড়িতে না থাকলেই সে নির্ভয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে ঢাকার বাইরে চলে যেতে পারবে এবং আমিও নির্বিঘ্নে স্বাধীনতা সংগ্রামে কাজ করতে পারবো।
&nbsp;
প্রচণ্ড অনিচ্ছা সত্ত্বেও আমি আমার পরিবারকে ছেড়ে ঐদিন সকালে গুলশানের আরেকটি বাড়ীতে উঠলাম। মঈদ বিকেলে আমাকে জানালো যে, সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোয়ার্টারে গণহত্যার চিহ্ন দেখেছেন। জগন্নাথ হলের বিপরীতে প্রফেসর আব্দুর রাজ্জাক, প্রফেসর আনিসুর রহমানেরা যে ব্লকে থাকতেন, সেই ব্লকের মেঝে এবং সিঁড়িতে প্রচুর রক্ত দেখেছেন। সব কিছু তছনছ করা হয়েছে। প্রফেসর রাজ্জাককে আর্মিরা হত্যা করেছে বলে শুনলাম। তিনি আমাদের বন্ধু ছিলেন বলে শুধু নয়, পাকিস্তানী আর্মিরা যে সাম্প্রতিক ঘটনাবলীতে জড়িত ছিলেন না এমন ব্যক্তিদেরকেও হত্যা করছে, সেটা জেনে আরও বেশী মর্মাহত হলাম।
&nbsp;
২৭ তারিখের রাতটা আমি আমার নতুন আশ্রয়ে কাটালাম। পরদিন সকালে মঈদ এসে জানালেন যে গত সন্ধ্যায় কারফিউর পরপরই, আর্মি আমাকে তুলে নেবার জন্য আমার বাড়ীতে গিয়েছিল। পরে আমার স্ত্রীর কাছে শুনেছিলাম যে কর্নেল সাঈয়েদউদ্দীন এর নেতৃত্বে দুই ট্রাকভর্তি পাক আর্মি আমাদের বাড়িতে এসেছিল। এই কর্নেলই ২৫শে মার্চের রাতে বঙ্গবন্ধুকে তার বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করেছিল বলে জানা যায়।
&nbsp;
পাকিস্তানী আর্মিরা যখন আমাদের বাড়িতে এসেছিল, তখন ৮ বছর বয়সী আমার বড় ছেলে তৈমুর বাড়িতেই ছিল। তাকে কর্নেল সাঈয়েদউদ্দীন আমার ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল। সে অস্ত্রধারী এত এত সেনার মাঝেও যথেষ্ট ঠাণ্ডা মাথায় সব প্রশ্নের জবাব দিয়েছিল। আমার স্ত্রী সালমা সৈন্যদের আসতে দেখে এবং তৈমুরের জন্য ভয় পেয়ে বাড়ীতে লুকোতে চেয়েছিলেন কিন্তু অস্ত্রের মুখে সৈন্যরা তাকে আটকে ফেলে। কর্নেল সাঈয়েদউদ্দীন আমার প্রতিবেশীদেরকেও আমার অবস্থান সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করে। যখন জানতে পারল যে আমি ঐদিন সকালেই বাড়ী ছেড়েছি, তখন সে আমার স্ত্রী-সন্তানদের বন্দী করে নিয়ে যেতে চেয়েছিল যাতে “আমি বের হয়ে আসি”। যাই হোক, আমার প্রতিবেশীরা তাদেরকে ছেড়ে দেবার জন্য তাকে আশ্বস্ত করেছিলেন।
&nbsp;
পাকিস্তানী আর্মিরা যেহেতু তাদের অপারেশনের প্রথম ৪৮ ঘন্টাতেই আমার খোঁজে গিয়েছিল, সেহেতু আমি বুঝতে পারলাম যে আমি তখন তাদের একজন তালিকাভুক্ত লক্ষ্যতে পরিণত হয়েছিলাম। মঈদ আমাকে উপদেশ দিল যে আমার ঢাকার বাইরে যাওয়া উচিত। কারন এখানে বাড়ি বাড়ি তল্লাশী শুরু হতে পারে এবং আমাকে পাওয়া গেলে আশ্রয়দাতার কপালেও দুর্ভোগ নেমে আসবে। সময়টা এমন ছিল যে আমরা জানতাম না যুদ্ধটা কোনদিকে গড়াবে আর তাতে আমাদেরই বা কি করার থাকবে। আমি আমার স্ত্রী কে একটি চিরকুট পাঠালাম যেন সে ঢাকা ছেড়ে যায় আর যদি সম্ভব হয় তাহলে দেশের বাইরে চলে যেতে যাতে আমি স্বচ্ছন্দে স্বাধীনতা সংগ্রামে সক্রিয় থাকতে পারি।
&nbsp;
ঢাকা ছাড়ার প্রস্তুতির জন্য প্রথমে মঈদ আমাকে গুলশানে মোকলেসুর রহমান (সিদু মিয়াঁ)-র বাড়ীতে নিয়ে গেলেন। সেখান থেকে নদী পাড় হয়ে বারাইদ নামক একটি গ্রামে সিদু মিয়াঁর শ্বশুর জনাব মতিন এর বাড়িতে উঠলাম। গুলশান থেকে বারাইদ আসার পথে দীর্ঘ প্রান্তরে আমি পলায়নরত গণমিছিলে মিশে গিয়েছিলাম। এরা সকলেই ঢাকা থেকে গ্রামের দিকে পালিয়ে যাচ্ছিল। এই গণমিছিলে আমি আনিসুর রহমানের দেখা পেলাম যিনি আমাকে জানালেন গত ২৫-২৬ তারিখ তারা কী বিভীষিকাময় সময় পার করেছেন। তিনি জানালেন যে কিভাবে আর্মিরা তাদের ব্লকের নিচতলার বাসিন্দা অধ্যাপক জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা গুলি করে মেরেছে। মেরেছে উপর তলায় বসবাসরত পরিসংখ্যান বিভাগের অধ্যাপক মনিরুজ্জামানকে। শুধু ভাগ্যের জোরে প্রফেসর রাজ্জাক বেঁচে গিয়েছিলেন। কয়েকজন পাকিস্তানী সৈন্য তার দ্বিতীয় তলার বাসার দরজায় ধাক্কাধাক্কি করেছিল। তিনি দরজা খুলতে কিছু সময় নিয়েছিলেন আর তাতে পাকিস্তানীরা ভেবেছিলো যে বাসা খালি। ফলে দরজা খোলার আগেই পাকিস্তানীরা চলে গেল। প্রফেসর রাজ্জাকের সামনের বাসাতে থাকা আনিস বেঁচে গিয়েছিলেন এই কারনে যে তার বাসার দরজাগুলোর একটি বাইরে থেকে তালাবদ্ধ ছিল। ফলে এক্ষেত্রেও বাইরে থেকে মনে হয়েছিল যে বাসায় কেউ নেই। দু’ রাত এক দিন যাবত সেনারা যখন সিঁড়ি থেকে লাশগুলো সরাচ্ছিলো, তখন আনিস স্ত্রী এবং দুই কন্যা কে নিয়ে পুরোটা সময় তার বাসার মেঝেতে কাটিয়েছেন।
জনাব মতিন এর বারাইদ গ্রামে আমাদের অনেক বন্ধুর সাথে দেখা হল। সেখানে পেলাম জামিল চৌধুরী ও তার পরিবারকে, মোকাম্মেল হক ও তার পরিবার (যিনি জনাব মতিন এর জামাতা), ঢাকা টেলিভিশনের মোস্তফা মনোয়ার। সিদ্ধান্ত নেওয়া হল যে যেহেতু আমি আর্মিদের সরাসরি টার্গেট এবং হয়তো আনিসও, সেহেতু আমরা বর্ডার পেরিয়ে ভারতে যাব এবং বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তার জন্য প্রচারণা শুরু করব।
&nbsp;
২৯শে মার্চ এর ভোরে গাইড হিসেবে মতিন সাহেবের একজন আত্মীয় জনাব রহমতউল্লাহর সাথে আনিসুর রহমান, মোস্তফা মনোয়ার, একজন স্থানীয় স্কুলশিক্ষক জনাব রশীদ এবং আমি আগরতলার উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। সিদু মিয়া আর মঈদ আমাদের নদীর পাড় পর্যন্ত এগিয়ে দিয়েছিল।
&nbsp;
এখান থেকে আমরা নৌকায় শীতলক্ষ্যা ধরে নরসিংদীর দিকে আসছিলাম। সারাটা পথ জুড়ে দেখেছি মানুষ ঢাকা ছেড়ে পালাচ্ছিল। নরসিংদীতে এসে ব্রাহ্মণবাড়িয়া যাবার জন্য আমরা লঞ্চ খুঁজছিলাম। এতক্ষণ পর্যন্ত দেখেছি শুধু উদ্ভ্রান্ত জনতা আর্মির ভয়ে ঢাকা ছেড়ে পালাচ্ছিল। গুঞ্জন শুনছিলাম যে চট্টগ্রামে কিছু প্রতিরোধ হয়েছে তবে সেটা কোনমতেই পুরোদমে প্রতিরোধ যুদ্ধ বলা যায় না। প্রথম আমরা যুদ্ধের চিহ্ন দেখলাম একটা লঞ্চে। সেটা মেঘনা পাড়ি দিয়ে যাত্রী নিতে নরসিংদী আসছিলো। সেখানে বাংলাদেশের একটা পতাকা করে উড়ছিল।
&nbsp;
কিছুটা চলার পর লঞ্চটি তীরে ভীড়ানো হচ্ছিলো, যদিও ব্রাহ্মণবাড়িয়া তখনো অনেক দূর। সেখানে কিছু ছাত্র আমাদেরকে লঞ্চ থেকে নেমে তাদের সাথে যেতে বলল। এতদূর এসে আনিস এবং আমার কারোই পরিচয় প্রকাশে ভয় ছিল না, যদিও ভিড়ের মাঝে পাকিস্তানী গোয়েন্দা চর থাকতে পারতো। তবুও আমরা ইতস্তত করতে করতে তীরে নেমে পড়লাম। এখানকার যে পরিস্থিতি তৈরি হলো, তার জন্য আমরা একেবারেই প্রস্তুত ছিলাম না। কারণ কয়েকজন আমাদের পরিচয় নিয়ে সন্দিহান ছিল। পরিস্থিতি নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে বুঝতে পেরে মোস্তফা মনোয়ার উপস্থিত বুদ্ধিতে বললেন যে আশপাশের এলাকার মধ্যে কেউ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আছে কিনা এবং যদি থাকে তাকে ডেকে পাঠানো হোক, তাহলে সে তার শিক্ষকদের পরিচয় নিশ্চিত করতে পারবে।
&nbsp;
আনিস এবং আমি বললাম যে আমাদের সংগ্রাম পরিষদের নেতার কাছে নিয়ে যাওয়া হোক যাতে আমরা নির্ভয়ে আমাদের বিস্তারিত পরিচয় দিতে পারি, এই উত্তেজিত জনতার ভিড়ে আমরা পরিচয় দিতে চাই না। এমন সময় ঢাকার অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস (যেখানে আমি কয়েকবার গিয়েছিলাম) সেখানকার একজন পিয়ন আমাকে চিনতে পারলেন এবং সবাইকে আমাদের কথা শোনার জন্য আশ্বস্ত করলেন। এরপর সংগ্রাম পরিষদের প্রধান যিনি আওয়ামীলীগেরও একজন নেতা ছিলেন, তিনি এবং অন্যান্য আরও কয়েকজন মিলে আমাদেরকে স্থানীয় একটি স্কুলে নিয়ে গেলেন। সেখানে আমরা আমাদের পরিচয় বললাম কিন্তু আমাদের পরিচয় নিশ্চিত করানোর কোন উপায় খুঁজে পাচ্ছিলাম না। কেউ কেউ আমার নাম শুনেছে কিন্তু আমরাই যে তারা সেটা বিশ্বাস করাতে কষ্ট হচ্ছিল। তারপরও সিদ্ধান্ত নেওয়া হল যে আপাতত আমরা বাইরে অপেক্ষমান জনতাকে বলব যে আমাদের পরিচয় সম্পর্কে দেওয়া তথ্য গ্রহনযোগ্য হয়েছে। আমরা বাইরে আসামাত্র মুকতাদা নামের একজনকে দেখা গেল। সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে আমার এবং আনিসের সরাসরি ছাত্র ছিল। সাথে ছিল তার চাচাত ভাই মোফাকখের, ইতিহাস বিভাগের ছাত্র। তারা পাশের গ্রামে থাকতো। মোস্তফা মনোয়ারের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র খুঁজে আনার আবেদন পেয়ে আমাদেরকে চিনিয়ে দেবার জন্য তারা কয়েক মাইল দূর থেকে ছুটে এসেছে।
&nbsp;
আমাদের পেশা, পরিচয় ইত্যাদি নিশ্চিত হওয়া মাত্র আমরা এলাকাটিতে আমরা তারকাখ্যাতি পেয়ে গেলাম। আমাদেরকে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতার বাড়ীতে নিয়ে যাওয়া হল। এক পর্যায়ে গ্রামে গুজব ছড়িয়ে পড়ল যে ঝাঁকে ঝাঁকে মানুষ আমাদের দেখতে আসছে। যা হোক, গুজব আস্তে আস্তে কেটে গেল কিন্তু আমাদের পরিচয় গোপন রাখা গেল না এবং আমরা বুঝলাম যে আমাদের যাওয়া উচিত।
&nbsp;
আমাদেরকে স্থানীয় নেতারা জানালেন যে গ্রামের সাধারন মানুষ পাকিস্তানী চর আর ছত্রীসেনা সম্পর্কে সজাগ আছে। স্থানীয় জনগন হাতের কাছে যেই অস্ত্রশস্ত্র পেয়েছে, তা যোগাড় করে রেখেছে এবং তীক্ষ্ণভাবে সতর্ক আছে। এতে আবারো নিজের চোখে দেখে আশ্বস্ত হলাম যে, বিগত চার সপ্তাহে গ্রামের সাধারন মানুষ নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী পাকিস্তানী আর্মিদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের প্রস্তুতি নিয়েছে। স্থানীয় নেতাদের নেতৃত্বে তাঁরা সারা দেশেই নিজেদের সংগঠিত করেছে।
&nbsp;
এই এলাকা থেকে মুকতাদা আর মোফাকখের আমাদেরকে তাদের গ্রামে নিয়ে গেল। বর্তমান ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ, মোফাকখের এর ভাই প্রফেসর নোমান এর বাসায় গেলাম। সেখানে ঠিক হলো যে, আমরা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা করব তবে রাতেই ভ্রমন করবো। কারন আঁচ করা যাচ্ছিলো যে হয়তো পাকিস্তানী আর্মিরা নদীতে টহল দিচ্ছিলো। ৩০শে মার্চের প্রথম প্রহরে আমরা নৌকায় চড়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। সাথে ছিল মুকতাদা, মোফাকখের এবং তার তার বড় ভাই মোহাদ্দেস। সে রেডিও পাকিস্তানে কাজ করত। আমরা সেখানে রশিদ আর রহমত উল্লাহকে বিদায় জানালাম। বললাম যে, যদি সম্ভব হয় তবে আমাদের পরিবারের কাছে আমাদের খবর পৌঁছে দিতে।
&nbsp;
৩০শে মার্চের ভোরে আমরা ব্রাহ্মণবাড়িয়া নামলাম। শহরের রাস্তা ঘুরে প্রথমেই লক্ষ্য করলাম যে বাংলাদেশের পতাকাওয়ালা একটি আর্মি জীপ টহল দিচ্ছে। ঐ সময়েই ব্রাহ্মণবাড়িয়া ছিল এক টুকরো স্বাধীন বাংলাদেশ। বুঝাই যাচ্ছিল শহর মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ন্ত্রনে। কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধার সাথে দেখা করার সুযোগও হয়েছিল। সেই বিকেলে আমাদের ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস গ্যাস কোম্পানির রেস্ট হাউসে নিয়ে যাওয়া হল। সেখানে বেঙ্গল রেজিমেন্টের মেজর খালেদ মোশারফের সাথে আমার প্রথম সাক্ষাৎ হয়। তিনি আমাদের জানালেন যে কিভাবে তিনি তার ইউনিট নিয়ে পাকিস্তানী কমান্ডিং অফিসারকে গ্রেপ্তার করেছেন এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে মুক্ত করেছেন। এখন তারা পাকিস্তানী আর্মির আক্রমন প্রতিহত করার পরিকল্পনা করছেন।
&nbsp;
মেজর মোশাররফ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার প্রতিরক্ষা তদারকি করার সময় আমাদেরকে সাথে নিয়ে গেলেন। যখন রাত নামল, তখন তিনি আমাদের তিনজনকে নিয়ে তিনি তেলিপাড়া চা বাগানের কাছের কমান্ড পোস্টটিতে নিয়ে গেলেন। এটিও পাকিস্তানীদের নিয়ন্ত্রণমুক্ত করা হয়েছে। পাকিস্তানী বিমান হামলার ভয়ে সাবধানতাস্বরূপ পুরো এলাকা অন্ধকার করে রাখা হয়েছিল। বাগানের ম্যানেজারদের বাংলোর সব আলো নিভিয়ে রাখা হয়েছিল। সেখানে মেজর মোশাররফ আমাদেরকে তার ব্যাটেলিয়নের এতদূর আসাবার গল্প শোনালেন আর কুমিল্লায় তার বেস ক্যাম্পে বাঙালি সহকর্মীদের ওপর কিভাবে গনহত্যা চালানো হয়েছে, তার বর্ণনা দিলেন। সমস্যা হল, অন্যান্য প্রতিরোধ গড়ে ওঠা এলাকার সাথে তার তেমন যোগাযোগ ছিল না এবং চট্টগ্রামের যুদ্ধের খবর তিনি রেডিওতেই পাচ্ছিলেন।
&nbsp;
ঐ রাতে আমরা রেডিওতে শুনলাম যে প্রবাসী বাঙালি স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য অস্ত্র কিনতে অর্থ সংগ্রহের চেষ্টা করছেন। মোশাররফ আমাদের অনুরোধ করলেন যেন আমরা সীমানা পাড়ি দিয়ে ভারতীয় কতৃপক্ষের কাছে আরও গোলাবারুদ সরবরাহের অনুরোধ জানাই এবং প্রবাসী বাঙালিদের সংগৃহীত অর্থ দিয়ে বিদেশ হতে অস্ত্র কিনতে সাহায্য করি। মোশাররফ আশংকা করছিলেন যে তাদের প্রতিরক্ষা শক্ত হলেও শীঘ্রই যদি তারা যদি আরো অস্ত্র নতুন সরবরাহ না পায় তাহলে পাকবাহিনীর সামনে তাঁরা টিকতে পারবে না। তিনি আমাদেরকে আরও জানালেন যে তিনি এবং তার অন্যান্য অফিসাররা বিদ্রোহীদের অবস্থানে আছেন। তারা বেসামরিক কর্তৃপক্ষের দিক নির্দেশনা চান। তিনি আমাকে পরামর্শ দিলেন যে সার্বভৌম বাংলাদেশ সরকারের অধীনে বেঙ্গল রেজিমেন্টের সকল অফিসার এবং অন্যান্যদের নিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের সেনাবাহিনী গঠন করা যেতে পারে। এমন একটি কতৃপক্ষ গঠন করার মত ক্ষমতা যে আমার ছিল না, খালেদ সেটা জানতো না। তবে আমাকে জোর করল যেন নির্বাচিত কোন রাজনৈতিক নেতার দেখা পেলে অন্তত তাকে যেন আমি এই সংবাদটি পৌঁছে দিই। ঐ সময়েই, স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য নিজের জীবন বিপন্ন করে, ক্যান্টনমেন্ট এ ফেলে আসা পরিবারের নিরাপত্তা ভুলে এগিয়ে আসা এই নিষ্ঠাবান সৈনিকদের দেখে আমরা অভিভূত হয়েছিলাম।
&nbsp;
পরের দিন অর্থাৎ ৩১ শে মার্চ ভোরবেলা, মেজর মোশাররফ একটি জিপে করে আমাদের ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলায় পাঠিয়ে দিলেন। মনে হলো, ততদিনে সীমান্ত খুলে দেওয়া হয়েছে এবং মানুষ নির্বিঘ্নে পারাপার করছিল।
&nbsp;
আগরতলায় আমরা জানতে পারলাম যে, বাংলাদেশীদের এক বিরাট বহর স্পোর্টস স্টেডিয়ামে অবস্থান করছেন। সেখানে আমরা এম আর সিদ্দিকি, তাহের উদ্দিন ঠাকুরসহ অনেক আওয়ামীলীগ সংসদ সদস্য এবং চট্টগ্রাম, নোয়াখালী ও কুমিল্লা থেকে আসা অনেক ছাত্র-শ্রমিকের দেখা পেলাম।
জানতে পারলাম যে এম আর সিদ্দিকী এবং ঠাকুর ঐদিন সন্ধ্যায় ভারত সরকারের কাছে গণহত্যার বিষয়াদি তুলে ধরার জন্য ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রীকে সাথে নিয়ে প্লেনে চেপে দিল্লী যাচ্ছেন। তারা ভারত সরকারের কাছে বাঙালিদের প্রতিরোধ ধরে রাখার জন্য সহায়তা চাইবেন। সিদ্দিকীর কাছে শুনলাম অন্যান্য আওয়ামীলীগ নেতারা বেঁচে আছেন কিংবা থাকলে কে কোথায় আছেন, সে সম্পর্কে তিনি কিছুই জানেন না। তিনি নিজে চট্টগ্রামে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সংগঠকের দায়িত্ব পালন করেছেন এবং শুধু সেই প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করার জন্যে সামরিক সহায়তা চাইতে ত্রিপুরায় এসেছেন ।
&nbsp;
সিদ্দিকী এবং ঠাকুরের সঙ্গে আলাপ করে জানলাম, তাদের নিজেদের তেমন দিল্লীতে উচ্চ পর্যায়ে জানাশোনা নাই। তারা অনুধাবন করল আনিস এবং আমার ভারতীয় কয়েকজন বড় বড় অর্থনীতিবিদদের সাথে পরিচয় নিশ্চয়ই বাংলাদেশের সমস্যা গুরুত্বের সাথে তুলে ধরতে সহায়তা করবে। সুতরাং সন্ধ্যায় এম আর সিদ্দিকীদের সাথে আমাদেরও যেতে রাজী করানো হলো। সেখানে যেতে আগরতলা থেকে দিল্লী পর্যন্ত বিমান ভ্রমনে আমাদের একমাত্র সম্বল ছিল ধার করা পাজামা পাঞ্জাবি।
&nbsp;
৩১শে মার্চ, ১৯৭১-এ দিল্লীতে নেমে আনিস এবং আমি অমর্ত্য সেনকে ফোন করলাম। তিনি তখন দিল্লীর অর্থনীতি বিষয়ক অধ্যাপক ছিলেন। তিনি এবং তার স্ত্রী সঙ্গে সঙ্গে ছুটে এসে আমাদেরকে তাদের দিল্লী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসায় নিয়ে গেলেন। পরদিন সকালে প্রফেসর সেন আমাদেরকে তৎকালীন ভারত সরকারের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা, পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান সিপিএম সরকারের অর্থমন্ত্রী ডঃ অশোক মিত্রের বাড়ীতে নিয়ে গেলেন। ডঃ মিত্র তৎক্ষণাৎ আরেকজন সুপরিচিত অর্থনীতিবিদ প্রফেসর পি এন ধর কে ডেকে পাঠালেন। প্রফেসর ধর তখনকার ভারতের প্রধানমন্ত্রীর একজন সচিব ছিলেন। প্রফেসর ধরকে আমি এবং আনিস যতটুকু জানতাম গণহত্যার পটভূমি, ঢাকায় গণহত্যার ব্যাপকতা এবং বাংলাদেশীদের প্রতিরোধের অবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত বললাম। প্রফেসর ধর আমাদেরকে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিব পি এন হাকসারের নিকট নিয়ে গেলেন, যার কাছে আমরা আমাদের কথাগুলো পুনরায় বললাম।
&nbsp;
আমরা জানি না যযে এটাই স্বাধীনতা সম্পর্কে ভারত সরকারের উচ্চপর্যায়ে প্রথম যোগাযোগ কিনা। তবে যে সময়ে আমরা দিল্লী গিয়েছিলাম, সে সময়ে তাজউদ্দীন আহমেদ এবং ব্যারিস্টার আমিরুল হকও দিল্লীতে গিয়ে আরও নানান দিক তুলে ধরে ভারত সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ মজবুত করেছিলেন। পৌঁছানোর পরপরই আমাকে তাজউদ্দীন সাহেবের সাথে যোগাযোগ করিয়ে দেয়া হয়। তিনি আমাকে বললেন যে তিনি নিজেই জানেন না যে তার কোন কোন সহকর্মী বেঁচে আছেন। তিনি বললেন যে আর্মি অভিযানের আগাম খবর পেয়ে কিভাবে আমিরুল ইসলাম, ডঃ কামাল হোসেন আর তিনি ২৫শে মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধুর বাড়ীতে গিয়েছিলেন। তারা চেষ্টা করেছিলেন বঙ্গবন্ধুকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু তাদের সাথে যেতে অস্বীকার করেছিলেন এবং তাদেরকে আত্মগোপন করতে বলেছিলেন। তাজউদ্দীন এবং ইসলাম তখন কামাল হোসেনের কাছ থেকে আলাদা হয়ে ধানমন্ডিতে লুকিয়ে ছিলেন। এরপর তাদের সকল যোগাযোগ ছিন্ন হয়ে যায়। পরবর্তীতে তাজউদ্দীন এবং ইসলাম কুষ্টিয়া হয়ে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে প্রবেশ করেন।
&nbsp;
দিল্লীতে থাকাকালীন রেডিওতে ডঃ কামাল হোসেনকে পাকিস্তানী আর্মিদের বন্দী করার খবর শুনে আমরা বিচলিত হয়ে পড়ি। যাহোক, ততদিনে আমরা জানতে পারলাম যে একের পর এক আওয়ামীলীগ এর একজন বড় নেতারা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে এসে পড়ছেন। তাজউদ্দীন আহমেদ স্বাধীন বাংলাদেশের সরকার গঠন করে স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্ব দেবার জন্য দ্রুত তাদের সাথে দেখা করতে বিমানে চড়ে সীমান্তে চলে আসার জন্য উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লেন।
&nbsp;
এমন একটি সরকারকে কার্যকরী ভাবে প্রতিষ্ঠা করতে হলে একটি আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র লিখিত হওয়া প্রয়োজন। বঙ্গবন্ধুর প্রেরিত স্বাধীনতার ঘোষণা যা প্রথমে আওয়ামীলীগের আব্দুল হান্নান এবং পরে মেজর জিয়াউর রহমান রেডিওতে সম্প্রচার করেছিলেন, সেটা এখন আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে অন্তর্ভুক্ত করে দিতে হবে।
&nbsp;
তাজউদ্দীন আহমেদ আমাকে নির্ভরতার সাথে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র এবং এর প্রেক্ষাপট ও বাংলাদেশীদের ওপর পাকিস্তানী আর্মির গণহত্যা সংক্রান্ত আরেকটি বিবৃতি রচনার দায়িত্ব দিলেন। এগুলো ঐতিহাসিক দলিল হতে যাচ্ছে ভেবে আমি বেশ উত্তেজনার সাথে দায়িত্বটি নিলাম। মূল স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের বিষয়বস্তু এবং খালেদ মোশাররফ এর সেই অনুরোধ এর ওপর ভিত্তি করে আমার স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র রচিত হল। (খালেদ মোশাররফের অনুরোধটি ছিল, যেসব বাঙালিরা এতদিন পাকিস্তানী আর্মিতে কর্মরত থাকার পরে ২৫শে মার্চ, ১৯৭১ এর পর বর্তমানে বাংলাদেশের জন্য যুদ্ধ করছে তাদেরকে গনপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের আর্মিতে অন্তর্ভুক্ত করা সংক্রান্ত)।
&nbsp;
পরবর্তীতে জানলাম যে আমার রচিত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রটি এ ধরনের দলিলের আইনগত ঘাটতি পূরণের জন্য সংশোধন করা হয়েছে। কিন্তু আমার দেয়া কয়েকটা উপাদান দিয়েই ঘোষণাপত্রের মূল অংশটি রচিত হয়েছে। যাই হোক, পটভুমির সম্পর্কিত আমার রচিত বিবৃতিটি অবিকৃত রইল এবং কুষ্টিয়ার সেই বাগান, যা আজ মুজিবনগর বলে পরিচিত, সেখানে ১৪ই এপ্রিল বাংলাদেশ সরকারের শপথ গ্রহন অনুষ্ঠানে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাজউদ্দীন আহমেদ বিশ্ববাসীর কাছে এটিই তুলে ধরেছিল। সেখান থেকে যে বাক্যটি বারবার উচ্চারিত হয়েছে তা হল, “পাকিস্তান মরে গেছে আর পর্বতসমান লাশের নিচে চাপা পড়েছে” যেটি ছিল সে সময়ে আমার সত্যিকারের অনুভূতি। এটি ছিল আমার পরবর্তী সকল কাজের ভিত্তিস্বরূপ।
&nbsp;
তাজউদ্দীন এবং ইসলাম এর সাথে অবস্থানকালে বিবিসিতে শুনলাম যে পাকিস্তানে দাতাগোষ্ঠীর কাছে নবায়নকৃত সহায়তা প্রার্থনার জন্য এক জরুরী মিশনে এম এম আহমেদ ওয়াশিংটন যাচ্ছেন। তাজউদ্দীন আহমেদ বুঝলেন যে আমাদের রাজনৈতিক সামর্থ্যের সবটুকু দিয়ে বৈদেশিক সহায়তার নামে এই যুদ্ধে অর্থায়ন প্রতিহত করতে হবে। তাজউদ্দীন আমাকে দায়িত্ব দিলেন যত শীঘ্র সম্ভব লন্ডন এবং ওয়াশিংটন গিয়ে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে পাকিস্তানের প্রধান প্রধান দাতাদেরকে পাকিস্তানকে সহায়তা প্রদান বন্ধের আহবান জানাতে। আমার দ্বিতীয় দায়িত্ব ছিল পাকিস্তান দূতাবাসে কর্মরত সকল বাঙালি কর্মকর্তাদের ইস্তফা দিয়ে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করাতে। আমেরিকার মিশন আমার বিশেষ লক্ষ্য ছিল। কারন দক্ষ বাঙালি অফিসারদের অনেকেই সেখানে অবস্থান করছিলেন। তাদের নিজেদের প্রত্যাহার করে নেওয়া বিরাট গুরুত্ববহ একটি প্রচারণা হবে এবং বাংলাদেশের জন্যেও সহায়ক হবে।
&nbsp;
এপ্রিলের মাঝামাঝি আমি লন্ডন পৌছাতে পারলাম। সেখানে গিয়ে আমি জানতে পারলাম যে আমার স্ত্রী তিন সন্তানকে নিয়ে পাকিস্তান থেকে বের হতে পেরেছে এবং তারা এখন জর্ডানে তার বোনের কাছে আছে। খবরটা শুনে আমি পুরোপুরি নির্ভার বোধ করলাম। এখন আমি প্রকাশ্যে স্বাধীনতা সংগ্রামের কথা বলতে পারব। লন্ডনে আমি তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর সাথে যোগাযোগ করলাম। লন্ডনে যারা প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছিলেন এবং গনহত্যার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলেন, তিনি তাঁদের মাঝে অন্যতম ছিলেন।
&nbsp;
লন্ডনের এক সাংবাদিক ব্রায়ান লেপিং এর সাহায্যে আমি ব্রিটিশ লেবার পার্টির সাথে যোগাযোগ করে হাউস অফ কমন্সে একদল লেবার পার্টির এমপির সামনে বক্তৃতা দিয়েছিলাম। সেখানে পাকিস্তান সরকারকে সহায়তা বন্ধের জন্য ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ পার্টিকে চাপ দেবার ওপর আমি জোর দিয়েছিলাম। তারা খুবই সৌহার্দ্যপূর্ণ মনোভাব দেখালো। পরে আমি হাউস অফ কমন্সে লেবার পার্টির তৎকালীন ছায়া মুখপাত্র ডেনিস হিলে-র সাথে সাক্ষাৎ করেছিলাম।
&nbsp;
আমার স্ত্রীর পরিবারের সাথে পরিচিত স্যার ডগলাস ডডস পার্কারের মাধ্যমে আমি টরি সরকারের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা চালিয়েছিলাম। তিনি আমাকে তৎকালীন টরি সরকারের পররাষ্ট্র সচিব স্যার আলেক ডগলাস হোম এর সাথে যোগাযোগ স্থাপন করিয়ে দিতে পারতেন। উনিও আমার স্ত্রীর পরিবারের পরিচিত ছিলেন। ডড্‌স পার্কার বললেন যে বাংলাদেশের ঘটনাবলীর খবর তিনি পররাষ্ট্র সচিবকে পৌঁছে দিবেন এবং তিনি তা করেছিলেন। কিন্তু পররাষ্ট্র সচিবের কাছ থেকে আমি কখনোই সরাসরি সাড়া পাইনি। তিনি বাংলাদেশের “বিদ্রোহী” সরকারের একজন মুখপাত্রের সাথে আলোচনার রাজনৈতিক ঝুকি নিতে ইচ্ছুক ছিলেন না। পরবর্তীতে আমি তার ব্যক্তিগত সচিব নিকোলাস বেরিংটনের মাধ্যমে আবার চেষ্টা চালিয়েছিলাম। উনি আমার পূর্বপরিচিত ছিলেন। কিন্তু কিছুতেই কিছু হল না। তবে বাংলাদেশের ব্যাপারে সব তথ্য পররাষ্ট্র সচিবের কাছে পৌঁছানোর ব্যাপারে বেরিংটন আমাকে বেশ সাহায্য করেছিলেন।
&nbsp;
ওদিকে, এম এম আহমেদ আসার পরে ওয়াশিংটনেই ঘটছিল আসল ঘটনা। আমরা জানতে পারলাম যে পাকিস্তানের বৈদেশিক সাহায্য শোচনীয় হয়ে পড়েছিল এবং জরুরী ভিত্তিতে বিদেশী সাহায্যের দরকার ছিল। বাংলাদেশের পাট রপ্তানী আর রাজস্ব বাধাগ্রস্থ হওয়াতে যুদ্ধ চালিয়ে যাবার জন্য নতুন সাহায্য অপরিহার্য হয়ে উঠেছিল।
&nbsp;
এপ্রিলের শেষে আমি আমেরিকায় পৌঁছালাম। সেখানে দৈবক্রমে আমার সাথে প্রফেসর নুরুল ইসলাম এবং প্রফেসর আনিসুর রহমানের সাথে দেখা হয়ে গেল। তারা নিজেদের মত করেই সেখানে গিয়েছিলেন। প্রফেসর ইসলামের ঢাকা ছেড়ে আসাটা রীতিমত নাটকীয় ছিল। তিনি অবশ্য রওয়ানা হবার আগে দিল্লীতে আমার সাথে একবার দেখা করেছিলেন।
&nbsp;
আমি বিশ্ব ব্যাংকে কর্মরত একজন সিএসপি অফিসার হারুন উর রশীদকে নিয়ে নিউইয়র্ক থেকে ওয়াশিংটন গেলাম। বিমানবন্দরে পাকিস্তানের ওয়াশিংটন দূতাবাসের অর্থনীতি বিষয়ক মিনিস্টার এ এম এ মুহিত আমাকে অভ্যর্থনা জানালেন। সেদিন সন্ধ্যায় ওয়াশিংটন দূতাবাসের সমস্ত বাঙালির সাথে সাক্ষাৎ করলাম। সেই সম্মানিত গ্রুপের প্রধানদের মধ্যে ছিলেন মরহুম এনায়েত করিম, শামসুল কিবরিয়া যিনি পরে পররাষ্ট্র সচিব হিসেবে নিযুক্ত হন, প্রফেসর আবু রুশ্‌দ মতিনুদ্দিন যিনি সেখানকার শিক্ষা বিষয়ক কর্মকর্তা ছিলেন, মোয়াজ্জেম আলী যিনি সম্ভবত তৃতীয় সচিব ছিলেন, বেশ কয়েকজন নন-পিএফএস অফিসার যেমন রুস্তম আলী, রাজ্জাক খান এবং শরিফুল আলম। ঐ সময় এদের কেউই ইস্তফা দেননি। তারা সকলেই স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছিলেন এবং বাংলাদেশের পক্ষে গোপনে ইউএস কংগ্রেস সদস্য, এমনকি স্টেট ডিপার্টমেন্ট এর লোকজনের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখছিলেন। আমি তাদের কাছে তাজউদ্দীন আহমেদের ইস্তফা দেবার আহবান পৌঁছে দিলাম। তারা সকলেই এতে রাজী ছিলেন। কিন্তু পূর্ণ স্বাধীনতা অর্জনের জন্য বাংলাদেশী জনতার নিষ্ঠার ব্যাপারে তাঁরা আশ্বস্ত হবার পাশাপাশি তাদের ইস্তফার ফলে যে বাস্তবধর্মী সমস্যার সৃষ্টি হবে, সে সংক্রান্ত ব্যাপারেও আশ্বস্ত হবার নিশ্চয়তা চাইছিলেন। এর আগ পর্যন্ত তাঁরা বাংলাদেশের পক্ষে কথা বলতে রাজি হলেন, তবে তা জনসম্মুখে নয়।
&nbsp;
এ সময় রাজ্জাক খান, শরিফুল আলম এবং একজন বাংলাদেশী ছাত্র মহসিন সিদ্দিকী পাকিস্তানে সাহায্য বন্ধ করে দেবার জন্য আমার আহবান প্রচারে প্রেস, টিভি এবং কংগ্রেস এর সাথে যোগাযোগের কাজে প্রকাশ্যে নেমে পড়লেন। আমাকে মোক্ষম সময়ে বেশ কয়েকবার টিভি তে উপস্থিতির সুযোগ দেওয়া হল যা বাংলাদেশের জন্য প্রচারণায় বেশ মুল্যবান ছিল। বিশেষ করে ওয়ারেন উনা নামের একজন জনপ্রিয় সাংবাদিক এবং টিভি ভাষ্যকার এ কাজে অনেক সাহায্য করেছেন। পাকিস্তান দূতাবাসে কর্মরত থাকা সত্ত্বেও রাজ্জাক এবং আলম আমার জন্য এক ধরণের সচিবালয়ের মতোই কাজ করেছিলেন।
&nbsp;
প্রেসে আমি কথা বলেছিলাম ওয়াশিংটন স্টারের হেনরি ব্রেডশার, ওয়াশিংটন পোস্ট এর লুইস সিমন, বাল্টিমোর পোস্ট এর এডাম ক্লাইমার, নিউ ইয়র্ক টাইমসের বেন ওয়েলস এবং একটি বড় সাপ্তাহিক, নিউ রিপাবলিকের গিলবার্ট হ্যারিসনের সাথে। এগুলো ওয়াশিংটনের প্রধান প্রধান পত্রিকা ছিল এবং এ পত্রিকাগুলোর কলাম লেখকেরা কংগ্রেস এর মতামতে অনেক প্রভাব রাখতেন। এম এম আহমেদের ওয়াশিংটনে অবস্থানকালীন সময়ে পাকিস্তানে গণহত্যা বন্ধ না করা পর্যন্ত সাহায্যের প্রতিশ্রুতি বাতিল করার জন্য অনুরোধ করে প্রায় একই সময়ে চারটি প্রধান পত্রিকায় সম্পাদকীয় ছাপানোর ঘটনা ছিল বাংলাদেশের জন্য এক বড় ধরনের অভ্যুত্থান।
&nbsp;
আমি কংগ্রেসেও সক্রিয় ছিলাম। এখানে আমি ঐ সময়ে বাংলাদেশের জন্য দুজন সক্রিয় সমর্থক সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি এবং সিনেটর ফ্রাংক চার্চ এর সংস্পর্শে ছিলাম। উনারা সিনেট বৈদেশিক সম্পর্কে কমিটির পদধারী সদস্য ছিলেন। সিনেটর চার্চ এর সহকারী টম ডেইন, সাথে সিনেটর কেনেডির সহকারী গেরি টিঙ্কার এবং ডেইল ডেইহেন বাংলাদেশের জন্য সক্রিয় মুখপাত্রের ভুমিকা পালন করার ফলে এদেশের ঘনিষ্ঠ বন্ধুতে পরিণত হন। তাদের মাধ্যমে আমি বেশ কয়েকজন সিনেটরের সাথে সাক্ষাৎ করি। সে সময় কেনেডি, চার্চ এবং গেলাঘেরের নেতৃত্বে প্রতিনিধি পরিষদে কংগ্রেসম্যান এবং সিনেটররা পাকিস্তানে গণহত্যার নিন্দা জানানো এবং পাকিস্তানে সাহায্য স্থগিতের জন্য জোর দাবী জানান। তথ্য ও উপাত্তসহ এইসব বিবৃতির অনেকগুলো এবং ২৬ শে মার্চ এর পর বাংলাদেশ হতে প্রেরিত চিঠিগুলো কংগ্রেশনাল রেকর্ডে স্থান পায়।
&nbsp;
এ পর্যায়ে আমি জানতে পারলাম যে সিনেটর সিমিংটনের নেতৃত্বে আমার পুরনো পাকিস্তানী বন্ধুরা একটি চা চক্রের আয়োজন করছেন যেখানে এম এম আহমেদ সিনেটরদের নিকট পাকিস্তানের ঘটনাবলী ব্যাখ্যা করতে পারবেন। সেখানে গুটিকয়েক লোকজন এসেছিলেনও বটে কিন্তু হিলে আমার বন্ধুরা বললো যে আমাদেরও এরকম কিছু একটা করা উচিত। চার্চ এবং কেনেডি যেহেতু ডেমোক্রেটিক পার্টির গুরুত্বপূর্ণ নেতৃস্থানীয় তাই সিনেটের প্রায় মধ্যপন্থী একজনকে দিয়ে আমার সম্মানে মধ্যাহ্নভোজের আয়োজনের চিন্তা করা হল, যাতে রিপাবলিকান এবং ডেমোক্রেটিক দু’দলের লোকদেরই টানা যায়। ওহাইয়োর সিনেটর স্যাক্সবি এটি আয়োজনে রাজী হলেন। এতে এম এম আহমদের পার্টির চাইতে সংখ্যায় বেশী এবং অনেক গুরুত্বপূর্ন সিনেটরদের সমাগম শুরু হলো। এর ফলে অন্যান্য অনেকের মাঝে সিনেটর চার্চ, ফুলব্রাইট, সিনেট বৈদেশিক সম্পর্ক কমিটির সভাপতি, সিনেটের সংখ্যালঘিষ্ঠ দল রিপাবলিকান পার্টির নেতা সিনেটর স্কটের সামনে আমার কথা বলতে পেরেছিলাম। পাকিস্তানী গণহত্যার বাস্তব প্রেক্ষাপট এবং পাকিস্তানের প্রধান দাতা হিসেবে এতে আমেরিকার দায় সংক্রান্ত আমার বক্তব্য আমেরিকান রাজনীতির এইসব গুরুত্বপূর্ন ব্যক্তিরা ধৈর্য সহকারে শুনেছিলেন। সিনেটে আমাদের এইসব প্রাথমিক পদক্ষেপের ফলাফল হিসেবে মার্কিন বৈদেশিক সহায়তা বিলে স্যাক্সবি-চার্চ সংশোধনী আনা হয়। বাংলাদেশে গণহত্যা চলাকালীন পাকিস্তানে মার্কিন সাহায্য বন্ধ রাখাই এর উদ্দেশ্য ছিল। তবে এটাও অনেক পরের ঘটনা, আমাদেরকে এর জন্য আরও যুদ্ধ করতে হয়েছিল।
&nbsp;
সিনেটে আমাদের সাফল্য দেখে এম এম আহমেদ ন্যাশনাল প্রেস ক্লাবে একটি সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করতে যাচ্ছেন বলে শুনলাম। এতেও তাকে হারাবো বলে আমরা ঠিক করলাম। রাজ্জাক খান এবং তার সহযোগীদের সহায়তায় আমাদের নিজস্ব সম্মেলন আয়োজন করে তা পেরেওছিলাম। এতে প্রেস, রেডিও এবং টিভি প্রতিনিধির ভালোই উপস্থিতি ছিল। ভয়েস অফ আমেরিকা আমার উদ্ধৃতি নিয়ে সারা বিশ্বজুড়ে প্রচার করেছিল। ডন পত্রিকার প্রতিনিধি নাসিম আহমেদ (যিনি পরে ভুট্টোর অধীনে তথ্য সচিব হয়েছিলেন) এবং সাথে আরেকজন সাংবাদিক কুতুবউদ্দিন আজিজ আমার প্রচারণা ভণ্ডুল করার জন্য গিয়েছিলেন। নাসিম আহমেদ আমার প্রেস কনফারেন্সে ছিলেন। কিন্তু আমাকে কোন সিরিয়াস প্রশ্ন করার চেয়ে উনি বরং কে কে সেখানে উপস্থিত আছেন, তা দেখতেই বেশী মনযোগী ছিলেন। আমাদের প্রেস কনফারেন্সের সার্থকতা এবং বাংলাদেশকে যেভাবে তুলে ধরা হচ্ছিল তা দেখে এম এম আহমেদ আশাহত হয়ে গেলেন আর পরবর্তীতে নিজের কনফারেন্স বাতিল করলেন।
&nbsp;
মার্কিন কংগ্রেস এবং মিডিয়া আমাদের কথা যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে শুনলেও নিক্সন প্রশাসনের উপরের স্তরে যাওয়াটা অনেক বেশী কঠিন ছিল। আমরা হেনরি কিসিঞ্জারের সাথে যোগাযোগ স্থাপনের দিকে নজর দিলাম। তিনি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সেমিনারগুলোতে অনেক বাঙালিদের পড়িয়েছেন। তাই ভাবলাম স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রেক্ষাপট সম্পর্কে তার ভাল ধারণা থাকবে। শীঘ্রই আমরা বুঝতে পারলাম যে বাংলাদেশের জন্য আমেরিকার প্রশাসনের দরজা বন্ধ। পরামর্শ পেলাম যে ক্যামব্রিজে গিয়ে কিসিঞ্জারের সাবেক সহকর্মীদের সাথে যোগাযোগ করার জন্য, যদি তাঁদের সহায়তায় কিসিঞ্জারের সাথে কথা বলার সুযোগ হয়। তারা স্বনামধন্য কয়েকজন অর্থনীতিবিদ ছাড়াও কিসিঞ্জারের অন্যতম ঘনিষ্ঠ বন্ধু বলে বিবেচিত, যেমন অধ্যাপক ডর্ফম্যান। সরকারি অধিদপ্তরের অধ্যাপক স্যামুয়েল হান্টিংটনের সাথেও আমি দেখা করেছিলাম। তিনি কিসিঞ্জারের সহকর্মী ছিলেন। এছাড়া হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলের প্রফেসর লজ এর সাথেও আমি দেখা করেছিলাম। উনি কিসিঞ্জারের আরেকজন নিকট বন্ধু ছিলেন। এসব যোগাযোগের কোনটিই তেমন কাজে লাগেনি।
&nbsp;
ওয়াশিংটনে কর্মকর্তা পর্যায়ে আমি এনায়েত করিমের বাসায় সর্বোচ্চ দেখা করতে পেরেছিলাম ক্রেইগ বেক্সটারের সাথে। উনি ছিলেন স্টেট ডিপার্টমেন্টে বাংলাদেশ ডেস্কের কর্মকর্তা ছিলেন। আমি তৎকালীন বিশ্বব্যাংকের পরামর্শক টম হেক্সনারের সহায়তায় ইউএস এইড এর ডেপুটি ডিরেক্টর মরিস উইলিয়ামসের সাথেও দেখা করেছিলাম। উইলিয়ামসের মাধ্যমে পাওয়া মেসেজটির জন্য এই সাক্ষাৎকারটি আমার বিশেষভাবে স্মরণে আছে। সেটি ছিল এই যে, বাংলাদেশ যদি চায় যে তার ব্যাপার ওয়াশিংটন আরও গুরুত্ব দিবে। তবে তাকে সামরিক সক্ষমতা প্রমান করতে হবে।
&nbsp;
ওয়াশিংটনে আমার অন্যতম লক্ষ্য ছিল বিশ্বব্যাংক। এটি ছিল পাকিস্তানে দাতাগোষ্ঠীসমূহের প্রধান এবং প্রকৃতপক্ষে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে প্রধান মুখপাত্র।
বিশ্বব্যাংকে আমার প্রথম যোগাযোগ মাধ্যম ছিল তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট ইংরেজ আই পি কারগিল যিনি পাকিস্তান কনসোর্টিয়ামের সভাপতি এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন। তিনি আই সি এস এর সময় থেকে এম এম আহমেদ এর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন এবং পাকিস্তানের ঘটনাবলী সম্পর্কে সবচেয়ে বেশী অবগত ছিলেন। প্যারিসে অনুষ্ঠিত কনসোর্টিয়ামের সাম্প্রতিক সম্মেলনে কারগিল এর উপদেশে সদস্যরা একমত হন যে পূর্ব পাকিস্তান পরিস্থিতি সম্পর্কে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত মিশনের রিপোর্ট না দেওয়া পর্যন্ত পাকিস্তানে সহায়তা বন্ধ রাখা হবে। কারগিল আমার কথা দীর্ঘ সময় ধরে শুনেছিলেন এবং তার প্রত্যুত্তর দেখে আমি বুঝেছিলাম যে, বাংলাদেশে মিলিটারি কার্যক্রম বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত নতুন কোন সাহায্যের প্রতিশ্রুতির দেয়ার সম্ভাবনা নেই।
&nbsp;
কারগিল এর পরে আর থাকে শুধু বিশ্ব ব্যাংকের স্বর্গীয় প্রেসিডেন্ট রবার্ট ম্যাকনামারা। বিশ্বব্যাংকের বন্ধুদের অনেক প্রচেষ্টার পর ম্যাকনামারা আমার সাথে সাক্ষাতে রাজী হয়েছেন বলে আমাকে জানানো হল। আমাকে বলা হল যে তার কম্পিউটারের মতো প্রখর মস্তিষ্ক শুধু প্রামাণ্য তথ্যগুলোই গ্রহণ করে এবং সেগুলো আমাকে যতদূর সম্ভব সংক্ষিপ্ত আকারে উপস্থাপন করতে হবে। এর প্রস্তুতি হিসেবে ওয়াশিংটনে অন্যান্য বাংলাদেশীদের সহায়তায় আমি পাকিস্তানে সহায়তা বন্ধের জন্য একটি নিবন্ধ প্রস্তুত করলাম। পেপারটি পরে মুদ্রন করে ব্যাপকভাবে প্রচার করা হয়। আমার যতদূর মনে আছে পেপারটির শিরোনাম ছিল “ পাকিস্তানে সহায়তাঃ পেছনের কথা এবং ভবিষ্যতের বিকল্প”। আমাদের সংক্ষিপ্ত আলোচনায় যখন এটি তুলে ধরা হলো, তখন মনে হলো ম্যাকনামারার মানবিক দিকটি হয়তো নাড়া দিয়েছিল। অন্তত উনি আমাকে সংকটের তীব্রতায় সত্যিকার উদ্বেগ দেখিয়েছিলেন। পরবর্তীতে ম্যাকনামারার ভূমিকা আলাদা করে দেখার অবকাশ ছিল না। যা দেখা গিয়েছিল তা হলো, বিশ্বব্যাংক পাকিস্তানে একটি মিশন পাঠিয়েছিল এবং মিশনটি তাদের প্রতিবেদনে বাংলাদেশে পাকিস্তান আর্মির ভয়াবহ নৃশংসতার বিবরণ ছিল। সাথে ছিল সেখানে উন্নয়ন প্রক্রিয়া ভেঙ্গে পড়ার চিত্র। হারুন উর রশীদ এর ফাঁসকৃত সেই রিপোর্টটি নিউইয়র্ক টাইমস এ প্রকাশিত হয়েছিল। এটি আমেরিকার অভ্যন্তরে স্যাক্সবি-চার্চ সংশোধনীর পক্ষে লবিস্টদের অনেক সাহায্য করেছিল এবং ১৯৭১-এর জুনে পাকিস্তান এইড কনসোর্টিয়ামের সদস্যদের নতুন সাহায্য প্রদান থেকে বিরত থাকতে প্রভাবিত করেছিল।
&nbsp;
কংগ্রেস, বিশ্বব্যাংক এবং মিডিয়ার বাইরে আমি আমেরিকায় বসবাসরত বাংলাদেশী কমিউনিটির গড়ে ওঠা কিছু দলের সাথে যোগাযোগ করেছিলাম। তাদের মধ্যে প্রধান একটি গ্রুপ, যার সভাপতি ছিলেন প্রয়াত এফ আর খান, বাংলাদেশের পক্ষে আমেরিকায় জনমত গঠন আর স্বাধীনতা যুদ্ধের জন্য তহবিল সংগ্রহে কাজ করছিলেন।
&nbsp;
আমার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল এসব গ্রুপের সংগৃহীত তহবিল হতে ওয়াশিংটনে পাকিস্তান মিশনে এবং নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ মিশনে কর্মরত বাঙালিদের ইস্তফা দানের পর সহায়তা প্রদানের জন্য তাদের আশ্বস্ত করা। বাঙালি কমিউনিটি এবং মিশনে কর্মরত বাঙালিদের মধ্যে কিছু ভুল বুঝাবোঝি ছিল যা আমি দূর করার চেষ্টা করেছিলাম। ওয়াশিংটনে আমার সবচেয়ে বড় দায়িত্ব ছিল মিশনের সকল সদস্যকে একত্র করা, তাদের চলার জন্য আর্থিক প্রয়োজনের প্রাক্কলন করা এবং বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে যাতে তারা কাজ পারে, সেরকম একটি প্রতিষ্ঠান দাঁড় করানো। একটা তারিখও ঠিক হয়েছিলো, সম্ভবত ১লা জুলাই, যেদিন তারা একত্রে পাকিস্তানের প্রতি আনুগত্য প্রত্যাহার করবেন এবং বাংলাদেশের জন্য দায়বদ্ধতা প্রকাশ্যে ঘোষনা করবেন। ওয়াশিংটন থেকে আমি নিউইয়র্কে গেলাম। সেখানে বাঙালি কমিউনিটির প্রতিনিধিদের সাথে কথা বললাম। এছাড়া শিকাগোতে এফ আর খানের সাথে কথা বলে আমেরিকায় বাংলাদেশ মিশনের জন্য তাদের সংগৃহীত তহবিলের একটা অংশ বরাদ্দ দিতে অনুরোধ করলাম।
এসব বড় বড় কাজের পাশাপাশি যেটুকু সময় আমার অবশিষ্ট থাকতো, তাতে আমি বিভিন্ন ব্যক্তি কিংবা গ্রুপের সাথে মিটিং করতাম যাদেরকে কোন না কোনভাবে বাংলাদেশের জন্য কাজে লাগানো যেত। নিউইয়র্কে আমি সাক্ষাৎ করেছিলাম নিউইয়র্ক টাইমসের জিম ব্রাউনের সাথে যিনি বাংলাদেশে পাকিস্তানের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সমালোচনামুলক নিবন্ধ লিখেছিলেন।
&nbsp;
আমি পরে আরও কয়েকবার টিভিতে গিয়েছিলাম। সুলতানা আলমের আমন্ত্রনে আমি ফিলাডেলফিয়ায় একটি অত্যন্ত মূল্যবান সফরে গিয়েছিলাম। ক্রিপেনডর্ফে তার তৈরি করা বাংলাদেশের সমর্থনে গঠিত একটি গ্রুপের সামনে ভাষণ দিয়েছিলাম। অন্যান্য বাঙালিদের দ্বারা আয়োয়িত বাঙালিদের কিংবা আমেরিকানদের অনেক গোষ্ঠীও শ্রোতা হিসেবে প্রস্তত থাকতো।
&nbsp;
আমেরিকায় আমার অবস্থানের শেষের দিকে একটি বাঙালি কর্মী গোষ্ঠীর আমন্ত্রণে একদিনের জন্য অটোয়াতেও গিয়েছিলাম। তারা মনে করেছিল যে বাংলাদেশ সরকারের মুখপাত্র হিসেবে সেখানে আমার উপস্থিতি তাদের কাজে লাগবে। অটোয়াতে পৌঁছেই আমি একটি জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলন করলাম। এরপর অটোয়ার কয়েকজন সংসদ সদস্যর সাথে দুপুরের খাবারে অংশগ্রহণ করলাম যেখানে সংসদের বিরোধী দলীয় ছায়া পররাষ্ট্রমন্ত্রী সভাপতিত্ব করেছিলেন। বিকেলে একটি ব্যক্তিগত ক্লাবে মন্ত্রীসভার একজন সদস্যের সাথে গোপন বৈঠকে আমাকে নিয়ে যাওয়া হলো। মন্ত্রী হিসেবে তিনি আমার সাথে প্রকাশ্যে আলোচনা করতে অনিচ্ছুক ছিলেন। কিন্তু তিনি আমার কথা সহমর্মিতার সাথে শুনেছিলেন। সন্ধ্যায় আমি অটোয়াতে একটা বাঙালি গোষ্ঠীর সাথে আলোচনা করলাম। আমার একদিনের অটোয়া সফর পুরো ক্যাম্পেইনে অন্যতম ফলপ্রসূ দিন ছিল।
মে মাসের শেষের দিকে আমি লন্ডন ফিরে এলাম। লন্ডনে আমার স্বল্প সময় অবস্থানকালে দেখলাম যে বাংলাদেশের পক্ষে জনমত প্রবলতর হচ্ছে। কিউ গার্ডেনসে আমি জুডিথ হার্টের নিজের বাড়িতে দেখা করলাম। তিনি বৈদেশিক সাহায্য বিষয়ক লেবার পার্টির সামনের সারির মুখপাত্র ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি লেবার পার্টির সরকারের সময়ে বৈদেশিক উন্নয়ন বিষয়ক মন্ত্রী হন। আমার সাথে আলোচনার পর লেবার পার্টির বিরোধীদলের পক্ষ থেকে তিনি হাউস অফ কমন্সে একটি শক্তিশালী বক্তৃতা দেন। সেখানে তিনি দাবী করেন যে বাংলাদেশে গণহত্যা বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত এবং বাংলাদেশের নির্বাচিত নেতাদের সাথে একটি আলোচনা অনুষ্ঠিত হবার আগ পর্যন্ত যুক্তরাজ্য হতে পাকিস্তানে যেন আর কোন সাহায্য পাঠানো না হয়।
&nbsp;
টরি এবং লেবার উভয় দলেরই বেশ কয়েকজন এমপির সাথে আমার ভাব বিনিময় করার সুযোগ হয়েছিল। এছাড়া আবারো স্বল্প পরিচিত নিকোলাস বেরিংটনকে ব্যবহার করে স্যার এলেক ডগলাস হোমের কাছে আমাদের চিন্তাভাবনা পৌঁছে দেয়ার সুযোগ হয়েছিল। এছাড়া প্যারিসে অনুষ্ঠিত কনসোর্টিয়ামে যুক্তরাজ্যের বৈদেশিক উন্নয়ন বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে নিয়োজিত কয়েকজন কর্মকর্তার সাথে আমি কথা বলি এবং তাদের স্মারকলিপি পৌঁছে দিই।
&nbsp;
ওয়াশিংটনে ম্যাকনামারা এবং মার্কিন কংগ্রেস এর কাছে পাকিস্তানে সহায়তা বন্ধ করার জন্য যেসব যুক্তি তুলে ধরা হয়েছিল, সেগুলোই যুক্তরাজ্যে বাঙালি কমিউনিটির প্রচারনায় মূল প্রচারণা প্রেক্ষাপট হয়ে দাঁড়ালো। যুক্তরাজ্যে প্রচুর প্রবাসী বাঙালি অবস্থান করছিলেন। তারা তহবিল সংগ্রহে আর পাকিস্তানে সহায়তা বন্ধের জন্য জনমত গঠনে বেশ সক্রিয় ছিলেন। এজন্য বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীকে প্রধান মুখপাত্রের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল এবং পূর্ব লন্ডনের লিভারপুল স্ট্রিট ষ্টেশনের কাছে তিনি আন্দোলন চালিয়ে যাবার জন্য একটি অফিস খুলেছিলেন।
&nbsp;
সেবার এবং পরবর্তীতে লন্ডন সফরগুলোতে গঙ্গা রেস্টুরেন্ট-এর মালিক তাসাদ্দুক আহমেদ এবং তার স্ত্রী রোজমেরি আমার জন্য মিটিঙের আয়োজনে অনেক সাহায্য করেছেন এবং গেরাদ স্ট্রিটে রেস্টুরেন্ট এর উপরে তাদের গুদামঘরটি একরকম আমাদের লন্ডন অফিসের মতোই ব্যবহার করতে দিয়েছিলেন। সেখানে কয়েকটি মজার ঘটনা ঘটেছিল। নাগা বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের নির্বাসিত নেতা ফিযো এর সাথে একটি আলোচনার আয়োজন করা হল এই ভেবে যে, তার সাথে বেইজিংয়ে চীন প্রশাসনের একটি সংযোগসূত্র ছিল। তাই বাংলাদেশের আন্দোলন সম্পর্কে তার মাধ্যমে চিনকে অন্যান্যবারের চেয়ে আরো পরিষ্কারভাবে জানানো যাবে। ফিযো আলোচনার সময় গঙ্গা রেস্টুরেন্টে তার মেয়েকে নিয়ে এলেন। আলোচনায় মনে হচ্ছিলো যে তিনি চাইনিজদের সাথে আমাদের ব্যাপারে কথা বলার ক্ষেত্রে সহযোগিতা করার চাইতে নাগাদের পক্ষে আমাকে টানতেই বেশী উদ্বিগ্ন ছিলেন। আলোচনাটি তাই মজার কিন্তু নিষ্ফল ছিল।
&nbsp;
যুক্তরাজ্যে অবস্থানকালে আমি বাংলাদেশ বিষয়ে কিছু লেখালেখির সুযোগ পেয়েছিলাম। দ্য নিউ স্টেটসম্যান নামের বামঘেঁষা সাপ্তাহিকীটির সাথে আমি আমার পুরণো যোগাযোগ নবায়ন করলাম আর সেখানে বাংলাদেশে গণহত্যা এবং বৈদেশিক সাহায্যের উপর ইয়াহিয়া সরকারের টিকে থাকার বিষয়ক একটা লেখা পাঠালাম। নিউ স্টেটসম্যানের সম্পাদক পরবর্তীতে আমার লেখার ওপর ভিত্তি করে প্রথম পেজে একটি সম্পাদকীয় লিখেছিলেন। সেখানে তিনি পাকিস্তানে যুক্তরাজ্যের সব ধরনের সাহায্য বাতিলের আহ্বান জানিয়েছিলেন। সাউথ এশিয়ান রিভিউয়ের সম্পাদক জন হোয়াইট এর অনুরোধে সেখানে একটি লেখা দিয়েছিলাম যাতে প্রথমবারের মতো পাকিস্তানী আর্মি ঝাঁপিয়ে পড়া পর্যন্ত আলাপ আলোচনার বিস্তারিত লিপিবদ্ধ করেছিলাম। আমি গার্ডিয়ানেও একটি লেখা পাঠিয়েছিলাম।
&nbsp;
আমি অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি ইউনিয়নে আকবর নরমান এবং তারিক আব্দুল্লাহ নামক দু’জন সহানুভূতিশীল পাকিস্তানীর আয়োজিত একটি বড় বাস্তবধর্মী রাজনৈতিক আলোচনা সভায় অংশ নিয়েছিলাম। সেখানে বহু লোক সমাগম ছিল এবং সেখানে প্রফেসর ড্যানিয়েল থরনিয়ার বক্তৃতা দিয়েছিলেন, যিনি পিআইডিই (পাকিস্তান ইন্সটিটিউট অব ডিবেলাপমেন্ট ইকনমিক্স)-এর সাথে কাজ করাকালীন ঢাকা অবস্থানসূত্রে পাক আর্মির গণহত্যার একজন সাক্ষী ছিলেন। তিনি পারিসের সরবনে ফিরে এসে বাংলাদেশের জন্য নেতৃস্থানীয় সোচ্চারকন্ঠ হয়ে উঠেছিলেন। ড্যানিয়েল ছাড়াও অন্য এক পাকিস্তানী তারিক আলী পাকিস্তানী আর্মি কর্মকাণ্ডের জন্য কড়া সমালোচনা করেছিলেন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলেছিলেন। তিনি অবশ্য এই বিপ্লবী উত্থানের মধ্য দিয়ে দুই বাংলা এক হওয়ার সম্ভবনা দেখেছিলেন। পাকিস্তানী আর্মির কড়া সমালোচনা দেখে তাকে গ্যালারীর পেছনদিকের একজন পাকিস্তানী ইন্টেলিজেন্স অফিসার প্রশ্নবানে জর্জরিত করেছিলেন। এই আলোচনায় ভুট্টোর পিপলস পার্টির একজন প্রতিনিধিও বক্তৃতা রেখেছিলেন। স্বাভাবিকভাবেই পাকিস্তানী যুক্তি তেমন একটা ধোপে টিকে নি। আমি ছিলাম সর্বশেষ বক্তা। শ্রোতাদের কাছ থেকে বেশ স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়া পেয়েছিলাম। সবখানেই এ ধরণের জনসভায় এরকম প্রতিক্রিয়া পাওয়ার অভিজ্ঞতা আমাদের ছিল।
&nbsp;
লন্ডন থেকে আমি প্যারিসে পাকিস্তান এইড কনসোর্টিয়ামের সেই চরম গুরুত্বপূর্ণ মিটিংয়ের উদ্দেশ্যে গেলাম। সেটি ছিল খুব সম্ভবত জুনের ৭ তারিখে। বড় চালানের নতুন পণ্য সহায়তা পাবার আশায় পাকিস্তানীরা এই মিটিংটির ওপর নির্ভর করেছিল। যুদ্ধের কারণে তাদের আমদানী সক্ষমতা কমে গিয়েছিল।
&nbsp;
প্যারিসে আমি ড্যানিয়েল এবং এলিস থরনারের বাসায় ছিলাম। এই থরনার দম্পতির আশ্রয়ে আরও ছিলেন ডঃ হাসান ইমাম, যিনি পাকিস্তান ইন্সটিটিউট অব ডিবেলাপমেন্ট ইকনমিক্স-এ ছিলেন এবং সম্প্রতি ভারত হয়ে প্যারিসে এসেছেন। ম্যাকনামারার নিকট উপস্থাপিত স্মারকলিপির ওপর ভিত্তি করে ড্যানিয়েল, হাসান ইমাম এবং আমি মিলে কনসোর্টিয়ামের জন্য একটি স্মারকলিপি প্রস্তুত করলাম। তারপরে এটি মিটিংয়ের আগের রাতে প্রত্যেক প্রতিনিধি নেতাদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। তাদের মধ্যে আমরা কয়েকজন প্রতিনিধির সাথে দেখা করার চেষ্টা করেছিলাম। কেউ কেউ আমাদের কথা শুনেছিল। বাকিদের কাছে যাওয়া যায় নি। মিটিংয়ের আগের রাতে আমি ভোটাও নামের আমেরিকান বংশোদ্ভূত বিশ্বব্যাংকের সহকারী প্রধানের সাথে দেখা করেছিলাম। তিনি আমাকে জানিয়েছিলেন যে কনসোর্টিয়াম নতুন সহায়তা দেবে এমন সম্ভাবনা কম। বিশ্বব্যাংকের সহ-সভাপতি পিটার কারগিলের সাথে আমার ফোনে কথা হয়েছিল। তিনি সদ্য পাকিস্তান থেকে ফিরেছিলেন। তিনি তার সহকারীর দেয়া মতামতের নিশ্চয়তা প্রদান করলেন কিন্তু আমাকে বললেন মিটিং শেষে দেখা করতে।
&nbsp;
কনসোর্টিয়ামে আমাদের তিনজনের তদবিরকারী দল ছাড়াও একদল বাঙালি প্যারিসে মিটিং অনুষ্ঠিত হবার সময় ভবনের সামনে প্রতিবাদ করতে এসেছিলেন। পাকিস্তানে সহায়তা বন্ধের দাবিতে তাদের হাতে বিভিন্ন প্ল্যাকার্ডও উপস্থিত ছিল।
&nbsp;
কনসোর্টিয়াম শেষ হবার পরদিন সকালে প্রাতঃরাশের সময় আমি পিটার কারগিলের সাথে পাঁচ তারকা হোটেল রয়েল মন্স্যুতে দেখা করলাম। তিনি সেখানে অবস্থান করছিলেন। তিনি আমাকে সুসংবাদ দিলেন যে বাংলাদেশে পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত পাকিস্তানে কোনো নতুন সহায়তা না দেওয়ার ব্যাপারে কনসোর্টিয়ামে সিদ্ধান্ত হয়েছে। এতে ঢাকা এবং ইসলামাবাদ ঘুরে কারগিলের দেওয়া রিপোর্টের প্রভাব ছিল। মিটিংয়ে তিনি পাকিস্তানের অত্যন্ত অস্থিতিশীল অবস্থার কথা নিশ্চিত করেছেন। কোনো কোনো সদস্য আরও কড়া কড়া কথা বলেছেন। তবে বেশিরভাগই পাকিস্তানী বর্বরতার বিরুদ্ধে নিজ দেশে জনগনের চাপের মুখে খুশি মনে নতুন সহায়তা প্রদানের জন্য পাকিস্তনের উন্নয়ন পরিস্থিতি নেই মর্মে অজুহাত দেখিয়েছিলেন। মার্কিন প্রতিনিধিদল পাকিস্তানে সাহায্যের দোহাই দেবার চেষ্টা করলেও শক্ত ভাবে বিতর্কে না জড়িয়ে শেষ পর্যন্ত কনসোর্টিয়ামের সিদ্ধান্তের সাথে সহমত পোষণ করেছিল।
পাকিস্তানের জন্য কনসোর্টিয়ামের মিটিংটি ছিল একটি বড় ধরনের ধাক্কা আর বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে বিশ্বজুড়ে চলা সংগ্রামের জন্য ছিল একটি বিরাট জয়।
&nbsp;
কনসোর্টিয়ামে কাজ করা ছাড়াও আমার উপস্থিতিকে ড্যানিয়েল প্রভাবশালী ফরাসী বুদ্ধিজীবীদের নিকট বাংলাদেশকে উপস্থাপন করতে কাজে লাগিয়েছিলেন। ফরাসী সাংবাদিকসহ আরও কয়েকজন নেতৃস্থানীয় বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আমার জরুরী কয়েকটি মিটিং ছিল। যেমন রেয়মন্ড এরম, লুইস ডুমন্ট দ্য সোশাল এন্থ্রোপোলজিস্ট এন্ড দ্য এরাবিস্ট, ম্যাক্সিম রবিনসন। আমি সরবনেও কয়েকটি সেমিনার করেছিলাম। আমরা জানতে পারলাম যে ফ্রান্স পাকিস্তানে অস্ত্রের অন্যতম বড় যোগানদাতা। আমাদের লক্ষ্য ছিল প্রভাবশালীদের মতামত জোগাড় করে এসব বিক্রয় বাতিল করা। পরে দেখা গেল পাকিস্তান অস্ত্র সংক্রান্ত তাদের পুরণো দেনা পরিশোধের জন্য যে সময় কাঠামোর পুনর্বিন্যাস চাইছিল, ফরাসী সরকার তাতেই বেশী মনযোগী ছিল। আর্থিক কারনে ক্রমান্বয়ে ফরাসী অস্ত্রের চালান বন্ধ হয়ে গেল।
প্যারিস থেকে আমি রোমে গেলাম। সেখানে স্বল্প সময়ের অবস্থানে আমি বিশ্ব খাদ্য সংস্থা-কে এই বলে স্মারকলিপি দিলাম যে, পাকিস্তানে খাদ্য সাহায্যের যে অংশ বাংলাদেশ অংশের জন্য দেখানো হয়, তা বাংলাদেশ সরকারের নিকট পাঠানো হোক। এরা সীমান্ত পাড়ি দেয়া মানুষগুলোর মাঝে তা বিতরণ করবে। এই উদ্দেশ্যের বাইরে পাকিস্তানে ইতালি সহায়তা বন্ধের জন্য আমি ইতালির তিনটি প্রধান রাজনৈতিক দল ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটস, কম্যুনিস্ট আর সোশালিস্ট কর্তাব্যক্তিদের সাথে কথা বলেছিলাম। ইটালি কিন্তু পাকিস্তান কিংবা অন্য কোনো উন্নয়নশীল দেশের জন্য তেমন বড় দাতা কখনোই ছিল না। এটা শুধু তাদের প্রতি একটি ইশারা ছিল মাত্র।
&nbsp;
রোম থেকে আমি কেন্দ্র অর্থাৎ মুজিবনগর সরকারের কাছে আমার প্রচারণার প্রতিবেদন জমা দিতে গেলাম। ১৯৭১ এর জুলাই মাসে সেখানে থাকাকালীন আমি আমার অনেক বন্ধু এবং একাডেমিক সহকর্মীকে দেখতে পেলাম। আমরা ভাবলাম যে, স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের ভবিষ্যৎ দিক নির্দেশনা দেবার জন্য কিছু করা উচিৎ। এই চিন্তা হতে আমি বাংলাদেশের মন্ত্রীপরিষদের কাছে প্রস্তাব করলাম যে, বাংলাদেশ পরিকল্পনা বোর্ড গঠন করা হোক। সদস্য হিসেবে প্রফেসর মোশাররফ হোসেন, প্রফেসর সারওয়ার মুর্শেদ, ডঃ আনিসুজ্জামান, ডঃ স্বদেশ বসু এবং আমি থাকব বলে মনে মনে ঠিক করে নিয়েছিলাম। ধারণাটা একসময় গৃহীত হয়েছিল কিন্তু বাস্তবায়িত হতে কিছু সময় নিয়েছিল। একমাস কেন্দ্রে থাকার পর আমি যখন ইউরোপ হতে ফিরে আসি, তখন সমস্ত ধকল গেল প্রফেসর হোসেনের ওপরে। প্রফেসর মোজাফফর আহমদ চৌধুরী শেষ পর্যন্ত এলেন। তাকে বোর্ড এর সভাপতি করা হল। বোর্ডটি একটি অফিসের জন্য জায়গা আর গবেষণার জন্য অল্প বরাদ্দ খুঁজে পেল এবং যুদ্ধ শেষ হবার কাছাকাছি সময়ে মন্ত্রীপরিষদের জন্য কয়েকটি পলিসি পেপার তৈরির কাজ শুরু করে দিল।
&nbsp;
কেন্দ্রে থাকাকালীন আমার সাথে মেজর খালেদ মোশাররফের আবার দেখা হয়েছিল। তিনি ততদিনে বাংলাদেশ আর্মির সদস্য হয়ে গেছেন এবং একজন সেক্টর কমান্ডার ছিলেন। তিনি আমাকে বেলোনিয়ার যুদ্ধের বর্ণনা দিলেন। বললেন যে ব্রিটিশ টিভি সাংবাদিক ভানিয়া কিউলি তাদের সাথেই ছিলেন। এই সাংবাদিককে আমি আগেই লন্ডনে বলেছিলাম যুদ্ধ দেখতে চাইলে খালেদের সাথে দেখা করার জন্য। এরপর আমি মেজর জিয়াউর রহমানকে প্রথম বারের দেখলাম যিনি ছিলেন আরেকজন সেক্টর কমান্ডার। জিয়া তখন ব্যক্তিত্বের দিক থেকে খালেদের চেয়ে পিছিয়ে ছিলেন। জিয়ার কাছ থেকে আমি তার চট্টগ্রামে যুদ্ধের বর্ণনা এবং বর্তমানে যুদ্ধের বিশ্লেষণ শুনলাম। মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়ক জেনারেল ওসমানীর এবং ডেপুটি চীফ অফ স্টাফ গ্রুপ ক্যাপ্টেন খন্দকারের সাথেও আমার দেখা হল।
&nbsp;
মুক্তিবাহিনীর যার সাথেই আমার কথা হচ্ছিলো, সবাই তরুণদের মুগ্ধকর গল্প শোনাছিলেন যারা জোয়ারের মতো প্রতিরোধ গড়তে ছুটে এসেছিল। গেরিলা যুদ্ধ কিভাবে সংগঠিত হচ্ছে, তা আমি মেজরদের কাছ থেকে জেনেছিলাম। তাদের সকলেরই একই অভিযোগ ছিল যে, অপ্রতুল আর সেকেলে অস্ত্রগুলোই প্রতিরোধ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তাদের প্রধান বাঁধা। পরে আমি জানতে পারলাম, সবে আগস্ট মাস থেকে মুক্তি বাহিনীকে অস্ত্র সরবারহের ব্যাপারে ভারত সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
&nbsp;
বাংলাদেশের মন্ত্রীপরিষদের কাছে আমার প্রতিবেদন জমা দেওয়া আর পরিকল্পনা বোর্ড গঠনের প্রস্তাব দেবার পর আমি পাকিস্তানে সহায়তা বন্ধের জন্য ইউরোপ আমেরিকায় জনমত গঠনের কাজে ফিরে গেলাম। এবার আমার কাছে মন্ত্রীপরিষদের দেয়া অফিসিয়াল কাগজ ছিল যাতে আমাকে ‘অর্থনৈতিক বিষয়াদি সংক্রান্ত বিশেষ দূত’ হিসেবে পদায়ন করা হয়েছিল।
&nbsp;
আগস্ট মাসে আমি লন্ডনে ফিরে এসে দেখলাম যে, স্থানীয় বাঙালিদের প্রচারনা তুঙ্গে উঠেছে। ট্রাফলগার স্কয়ারে একটি বিশাল র‍্যালীর আয়োজন করা হয়েছিল। প্রেসের সমর্থন শক্ত ছিল, সংসদে সকল দলের মুখপাত্রগন পাকিস্তানে সহায়তা বন্ধের ব্যাপারে সোচ্চার ছিলেন এবং টরি সরকার পাকিস্তানে নতুন সহায়তা প্রত্যাখ্যানে বাধ্য হল।
&nbsp;
লন্ডনে চাথম হাউসে রয়েল ইন্সটিটিউট অফ ইন্টারন্যাশনাল এফেয়ার্সের আহবানে আয়োজিত একটি সভায় আমাকে বক্তৃতা দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। এখানে আমন্ত্রিত সকলেই গণ্যমান্য ব্যক্তিত্ব ছিলেন। আমার স্ত্রী পুত্র ইতোমধ্যে যুক্তরাজ্যে চলে এসেছিলেন। আমি সময়মতো লন্ডন ফিরতে না পারায় আমার পরিবর্তে আমার স্ত্রী সালমা বক্তৃতা করেন। আরও বক্তব্য দেন পাকিস্তান হতে সদ্য ফেরত লেবার পার্টির এমপি আর্থার বটমলি। উনি ছিলেন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে যাওয়া ব্রিটিশ পার্লামেন্টারি ডেলিগেশনের প্রধান। বটমলেয়ের চাক্ষুষ রিপোর্টের পাশাপাশি পরিস্থিতি সম্পর্কে সালমার হৃদয় নাড়া দেয়া বর্ণনার মাধ্যমে এটি বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে কার্যকর ফোরামে পরিণত হয়েছিল। পরবর্তীতে অক্টোবর মাসে চাথম হাউসে আমাকে আবার বক্তৃতা দেয়ার জন্য আমন্ত্রন জানানো হয়েছিল।
&nbsp;
যুক্তরাজ্য থেকে আমি ওয়াশিংটনে ফিরে গেলাম। সেপ্টেম্বর মাসের দিকে ওয়াশিন্টন দূতাবাস এবং জাতিসংঘের সমস্ত বাঙালি কর্মকর্তা কর্মচারী বাংলাদেশ সরকারের প্রতি তাদের সমর্থন জ্ঞাপন করলেন। এটি ছিল এক বিরাট কূটনৈতিক অভ্যুত্থান। তারা ছিল সংখ্যায় অনেক ভারী এবং পাকিস্তানের পররাষ্ট্র বিষয়ক এবং বেসামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে অনেক দক্ষ কর্মকর্তারা সেখানে ছিলেন। এস এ করিম ছিলেন জাতিসংঘের পাকিস্তান মিশনে স্থায়ী সহকারী প্রতিনিধি এবং সকলের বয়োজ্যেষ্ঠ। তিনি নিউইয়র্ক থেকে চলে এলেন এবং একটি জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে তাদের সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করা হল। এনায়েত করিমের অনুপস্থিতি সন্দেহের উদ্রেক করেছিল। কিন্তু জানা গেল তিনি কয়েকদিন আগে মারাত্মকভাবে হৃদক্রিয়া আটকে হাসপাতালে ভর্তি আছেন এবং সেখান থেকেই তিনি বাঙালিদের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করলেন।
&nbsp;
জুনের শুরুর দিকে আমরা পর্যবেক্ষণ করলাম যে, পাকিস্তানে পাঠানো ওয়ার্ল্ড ব্যাংক-আইএমএফ এর ফ্যাক্ট মিশনের রিপোর্টটি ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের কেউ একজন নিউ ইয়র্ক টাইমস এর কাছে ফাঁস করে দিয়েছেন। শুধু কনসোর্টিয়ামের ওপর নয় বরং আমেরিকার সাধারন জনগন, কংগ্রেস এমনকি আমেরিকা বাদে অন্য দাতাদের ওপরও এই রিপোর্টটির তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব ছিল।
এতদিনে আমেরিকাতে বাংলাদেশ আন্দোলন তদবিরের দিক থেকে সুসংগঠিত হয়ে উঠেছে। প্রতিশ্রুতিশীল এবং আদর্শবান আমেরিকানদের নিয়ে গঠিত বিভিন্ন সেচ্ছাসেবী সংগঠন বাংলাদেশের জন্য তাদের সময় এবং শ্রম দিচ্ছিল, যা দেখে আমেরিকান নাগরিকদের মধ্যে বাংলাদেশের জন্য সমর্থন স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কার্যকর গ্রুপটি ছিল ওয়াশিংটন ভিত্তিক ‘বাংলাদেশ তথ্য কেন্দ্র’। এরা স্যাক্সবি-চার্চ সংশোধনীর জন্য তদবিরের সমন্বয় করছিল।
&nbsp;
বাঙালি কূটনৈতিকদের সংখ্যা আর জনগণের মধ্যে আমেরিকান কংগ্রেসে বাংলাদেশে বিপুল জনসমর্থন দেখে ওয়াশিংটনে বাংলাদেশে স্থায়ী মিশন স্থাপনের জন্য মনস্থির করা হল। এটি ওয়াশিংটনের কানেক্টিকাট এভিনিউতে উপশহরে অবস্থিত ছিল। এম আর সিদ্দিকীকে মিশনের প্রধান করা হল এবং ইস্তফা দানকারী বিশিষ্ট ব্যক্তিদের এতে নিয়োগ করা হল। এস এ করিমকে জাতিসংঘ এবং নিউইয়র্ক অঞ্চলের দায়িত্ব দেওয়া হলো।
&nbsp;
ওয়াশিংটনে নবগঠিত মিশন এবং বাংলাদেশ তথ্য কেন্দ্র সেখানে স্যাক্সবি-চার্চ সংশোধনী প্রণয়নে লবিঙের প্রচেষ্টার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠল। এই সংশোধনীতে দাবী করা হয়েছিল যে, মার্কিন বৈদেশিক সাহায্য আইনে একটি অংশ যোগ করা হোক। তা অনুযায়ী গণহত্যা বন্ধ না করা এবং বাংলাদেশের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সাথে সংলাপ শুরু করার আগ পর্যন্ত পাকিস্তানে মার্কিন সহায়তা বন্ধ থাকবে। একজন পদধারী রিপাবলিকান আর একজন ডেমোক্রেটের নেতৃত্বাধীন মার্কিন সিনেটের এই দ্বি-দলীয় গ্রুপ ইতোমধ্যে সিনেটে প্রচুর সমর্থক যোগাড় করে ফেলেছিল।
&nbsp;
ঐ মুহূর্তের রাজনৈতিক লক্ষ্য ছিল সিনেটে সংশোধনীটির জন্য সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট লাভ করা। এই সংশোধনীটির প্রতি জোরালো সমর্থন থাকলেও এর সমর্থকদের আমেরিকা প্রশাসন থেকে আসা বিপরীত জোরালো চাপও সহ্য করতে হয়েছিল। প্রশাসন এই অজুহাতে ইয়াহিয়া প্রশাসনকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছিলো যে ইয়াহিয়া প্রশাসন তাদের অনুগত এবং সহায়তা কমিয়ে দেয়া হলে পাকিস্তানীদের ওপর তাদের প্রভাব খর্ব হবে। এই অজুহাতে পাকিস্তানে তাদের অস্ত্র এবং অন্যান্য যন্ত্রাংশের চালান অব্যাহত ছিল যা সিনেটে বক্তৃতাকালে সিনেটর কেনেডির প্রকাশ করে দেন। ইস্ট কোস্টে বন্দরে একটি নোঙ্গর করা জাহাজে করে পাকিস্তানে অস্ত্র যাচ্ছে ভেবে একদল আমেরিকান সমর্থক তা নৌকায় করে ঘেরাও করেছিল, যা সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
ওয়াশিংটনে ফিরে আমার কাজ তাই হয়ে পড়ে হিলে স্যাক্সবি-চার্চ সংশোধনী বিলের পক্ষে সমর্থন জোরালো করা। এ কাজে আমি বাংলাদেশ মিশন এবং বাংলাদেশ তথ্য কেন্দ্রের সাথে নিবিড়ভাবে কাজ করেছিলাম। তথ্য কেন্দ্র লবিং করার জন্য স্টাফ বিষয়ক কাজটা নিয়েছিল। এতে তারা পর্যাপ্ত গবেষণার মাধ্যমে প্রত্যেক কংগ্রেসম্যানের নথি তৈরি করেছিল, যাতে সকলের রাজনৈতিক অবস্থান এবং ভীতি বর্ণিত ছিল। তদবিরের জন্য সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা তৈরি করা হয়েছিল। বাঙালি এবং ওয়াশিংটন ও সারা দেশের অন্যান্য সহানুভূতিশীল আমেরিকানদের লবিং কার্যক্রম চালানোর জন্য ওয়াশিংটনে এসে কিছু সময় দেবার জন্য রাজী করানো গিয়েছিল। এই একত্রিত হওয়াতে আরও বেশী সমর্থন পাওয়া গিয়েছিল। মানুষ কাজ থেকে ছুটি নিয়েও কিছু সময় ওয়াশিংটনে এসে লবিঙে সমর্থন জানাতো। আমেরিকানদের পাঠানো হত তাদের নিজ নিজ স্টেটের সিনেটরদের কাছে। আর বাঙালিদের লক্ষ্যকৃত সিনেটর নির্দিষ্ট করে দেওয়া হত।
&nbsp;
এই লবিং কাজে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত থেকে আমেরিকার রাজনীতির জটিলতা এবং রাজনৈতিক মতামত গঠন প্রক্রিয়া সম্পর্কে আমার কিছু ধারণা হয়েছিল। কিছু আমেরিকান গ্রুপের সদস্য এবং হিল এ কর্মরত ব্যক্তিরা বাংলাদেশের জন্য যেরকম নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন তা ভোলার নয়। আমার বিশেষ করে মনে পড়ে বাংলাদেশ গ্রুপের টম ডাইনের স্ত্রী জোয়ান ডাইনের কথা। তিনি হিলে আমাদের সমর্থকদের মধ্যে সবচেয়ে নিষ্ঠাবান ছিলেন। মনে পরে ডেইভ ওয়েইসবার্গ নামক একজন তরুণ স্নাতকের কথা, যিনি বিআইসি’র পূর্ণকালীন সচিব হয়েছিলেন। তাদের সহায়তা করেছিলেন কায়সার হক নামের একজন তরুণ বাঙালি, যিনি নিজেও যথেষ্ট কাজ করেছিলেন। হিলে কর্মরত টম ডাইন, গেরি টিংকর এবং ডেইল ডাইহান প্রথম থেকেই বন্ধু ছিলেন। পরে সেখানে সিনেটর স্যাক্সবির সহকারী মাইক গার্টনার এলেন। সিনেটর স্যাক্সবি তো মে মাসের শুরু থেকেই বাংলাদেশের জন্য একনিষ্ঠ সমর্থক হয়ে গিয়েছিলেন। তিনি নিজ প্রশাসনের বিল সংশোধনের সহ-পৃষ্ঠপোষকই হয়ে গেলেন। এজন্য তাকে হোয়াইট হাউসের অনেক চাপ সহ্য করতে হয়েছিল। এ সময়ে মাইক গেস্টনার ছিলেন তার অক্লান্ত পরামর্শ আর সমর্থনদাতা।
&nbsp;
স্যাক্সবি-চার্চ সংশোধনী সিনেটে বাতিল হবার উপক্রম হয়েছিল। এখানে একটা অদ্ভুত জোট গড়ে ওঠে। ফ্রাংক চার্চ এর মত উদারপন্থি সিনেটরের সাথে দক্ষিণাঞ্চলীয় রক্ষণশীলরা এক হয়ে উঠল। উদারপন্থিগণ বলছিলেন যে পাকিস্তানে মার্কিন সাহায্য ইয়াহিয়ার বর্বরোচিত গণহত্যায় অপব্যবহৃত হচ্ছে। সকল উদারপন্থি সমর্থকগণ একই সুরে বলছিলেন। এবারে তাদের সাথে যুক্ত হল রক্ষণশীলের দল। এরা জাতিসংঘে চীনের অন্তর্ভূক্তিতে সাধারন পরিষদে তৃতীয় বিশ্বের কিছু দেশের উল্লাস দেখে এমনিতেই রাগে ফুঁসছিলেন। ১৯৭১ সালে আসলেই কমিউনিস্ট চীন বিপ্লবের সফলতার পর দীর্ঘ ২২ বছর পরে জাতিসংঘ থেকে তাইওয়ানকে সরিয়ে দেয়। জাতিসংঘের এ সমস্ত ঘটনা রক্ষণশীল কংগ্রেসম্যানদের মাথা খারাপ করে দিয়েছিল। এরা একে মার্কিন সহায়তার উপর নির্ভরশীল তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর অকৃতজ্ঞতা হিসেবে দেখেছিল। সাহায্য বন্ধ করে তারা এদেরকে একটা শাস্তি দিতে চেয়েছিল।
&nbsp;
এসব জানাজানি হয়ে গেলে, সিনেটে পুরো সহায়তা বিলটাই হেরে গেল। স্যাক্সবি-চার্চ সংশোধনীর প্রয়োজন হলো না। পুরো জিনিসটাই বাকি বিশ্বের জন্য অবশ্যই অনেক বড় ঘটনা ছিল। কিন্তু বাংলাদেশের লবিং প্রচেষ্টার জন্য এটা একটা বিজয় বলেই গণ্য হলো। কারণ এটি সকল সাহায্য গ্রহীতাদের মধ্যে পাকিস্তানে নতুন সাহায্যের চালান বন্ধ করে দিলো।
যাই হোক, এই বিজয় কিন্তু আমেরিকা প্রশাসনকে অন্যান্য ছিদ্রপথে পাকিস্তানকে সহায়তা প্রদান থেকে বাঁধা দিতে যথেষ্ট ছিল না। ততদিনে ন্যাটো জোটের মধ্যে আমেরিকা একাই ইয়াহিয়া প্রশাসনের সমর্থনে রক্ষাকবচ হয়ে গিয়েছিল। তাই অন্তত পাক জান্তার সাথে চুক্তি বহির্ভূত সহায়তা বন্ধে কংগ্রেস এবং আমেরিকান জনগনের মধ্যে লবিং চালিয়ে যাওয়াটা আবশ্যক ছিল।
&nbsp;
ওয়াশিংটনে যখন লবিং চলছিল, পাকিস্তানের দাতা কনসোর্টিয়াম তখনো একটি প্রভাব বিস্তারের গুরুত্বপূর্ণ জায়গা ছিল। অক্টোবর, ১৯৭১-এ ওয়াশিংটনের শেরাটন হোটেলে ওয়ার্ল্ড ব্যাংক আইএমএফ এর বার্ষিক সভা ছিল আমাদের পরবর্তী লক্ষ্য। যদিও মিটিংটির আলোচ্যসূচিতে পাকিস্তানের প্রতি সহায়তার বিষয়টি ছিল না, তথাপি আমাদের বন্ধুরা বললো যে পাকিস্তানীরা তাদের দায় পরিশোধের জন্য কনসোর্টিয়ামের কাছে সময় পুনর্বিন্যাসের আবেদন করার পাশাপাশি আবার নতুন সহায়তা প্রার্থনার জন্য এই মিটিংটিকে কাজে লাগাতে পারে। এ এম এ মুহিত এবং আমি মিলে পাকিস্তানের অবস্থা পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা করে স্বাধীনতা যুদ্ধের এই চরম মুহূর্তে পাকিস্তানে আর সাহায্য প্রদানে বিরত থাকার অনুরোধ জানিয়ে একটি নতুন একটি ডকুমেন্ট প্রস্তুত করলাম।
&nbsp;
সভায় অংশগ্রহনের জন্য বিভিন্ন দেশ থেকে কনসোর্টিয়ামে আসা প্রতিনিধিদের কাছে আমাদের কাগজপত্র পৌঁছে দেয়া, তাদের সাথে কথা বলা সহ যাবতীয় দায়িত্ব মুহিত এবং আমি নিজেই নিলাম। একদিনের জন্য প্রফেসর নুরুল ইসলাম তার কাজের মূল জায়গা ইয়েল থেকে বিমানে করে এসে আমাদেরকে সাহায্য করেছিলেন। হোটেল এর বাইরে বিআইসি গ্রুপ ছোট করে প্রতিবাদ সভার আয়োজন করেছিল। অন্যদের মাঝে জোয়ান ডাইন তার শিশুসন্তান এমিকে হাতগাড়িতে চড়িয়েই নিয়ে এসেছিল। একসময় মুহিত বাইরে প্রতিবাদকারীদের সাথে ছিলেন আর নিরাপত্তা রক্ষীরা তখন শেরাটন চত্বর থেকে সবাইকে সরিয়ে দিয়েছিলেন। সৌভাগ্যক্রমে আমি প্রতিবাদকারীদের কাছ থেকে দূরে ছিলাম এবং মুহিতের কাছ থেকে আমাদের কাগজপত্র নিয়ে হোটেলের অভ্যন্তরে কাজ চালাতে পেরেছিলাম।
&nbsp;
এটা ছিল আমাদের জন্য আরেক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা। কক্ষে, বারান্দায় যেখানে যাকে পাই ধরে ধরে আমাদের কথাগুলো বোঝানো। কেউ কেউ শুনেছিল, কেউ কেউ এড়িয়ে গেল। কয়েজনের সাথে দেখা হয়ে আশ্চর্য হয়ে গেলাম। এরকম একজন ছিল আমার ১৮ বছরের পুরনো ক্যামব্রিজের সহপাঠী শাহ পুর সিরাজী। তিনি তখন ইরানের ব্যাংক মারকাযির গভর্নর ছিলেন। সুযোগ পেয়ে পাকিস্তান মিলিটারীকে ইরানের শাহ-এর সাহায্য সহযোগিতার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলাম। শাহপুর দাবী করলেন যে ইরানের শাহ বঙ্গবন্ধুকে হত্যা না করার জন্য ইয়াহিয়াকে অনুরোধ করেছিলেন। কথাটা যাচাই করা আমার পক্ষে আর সম্ভব হয় নি।
&nbsp;
আরেক পর্যায়ে ক্যামব্রিজের আরেক বন্ধু তৎকালীন শ্রীলংকা সরকারের অর্থনীতি বিষয়ক সচিব লাল জয়াবর্ধনের সাথে দেখা হল। লাল তারপর প্রফেসর ইসলাম এবং আমার সাথে শ্রীলংকার অর্থমন্ত্রী ট্রটস্কাইতি এন, এম পিরার সাথে একটি আলোচনার ব্যবস্থা করে দেন। আমরা তাকে অস্ত্র এবং সৈন্য পরিবহনে সুবিধার্থে শ্রীলংকায় পিআইএ এবং পাকিস্তান এয়ার ফোর্স এর অবতরণের জন্য অনুমতি প্রদান বিষয়ে ধরেছিলাম। তিনি তখন তা প্রত্যাখ্যান করলেন এবং বললেন যে প্রদত্ত অবতরণ সুবিধার এমন অপব্যবহার যাতে না হয়, তিনি তা খেয়াল রাখবেন। এক্ষেত্রেও তিনি তার কথা রাখতে পেরেছিলেন কিনা, তা আমার জানা সম্ভব হয় নি।
&nbsp;
ঐ সময় আমি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজে জড়িত ছিলাম। তা হলো জাতিসংঘে প্রচারণা। ১৯৭১-এর অক্টোবরে অনুষ্ঠিতব্য জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে অধিবেশনে প্রতিনিধিত্ব করার জন্য বাংলাদেশ একটি দলকে মনোনিত করেছিল। সেই দলটির প্রধান ছিল বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী। সদস্যদের মধ্যে আমি ছাড়াও ম্যানিলা থেকে ইস্তফা দানকারী রাষ্ট্রদূত কে কে পন্নী, ইরাক থেকে ইস্তফা দানকারী রাষ্ট্রদূত এ ফতেহসহ ডঃ এ আর মল্লিকের মতো আরো অনেকেই ছুটে এসেছিলেন সেই প্রতিনিধি দলে যোগদান করার জন্য। জাতিসংঘে আমাদের প্রচারণার উদ্দেশ্য ছিল সাধারন পরিষদে গৃহীত সিদ্ধান্ত সমূহের মধ্যে বাংলাদেশে গণহত্যা বন্ধে যেন একটি সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। তবে এখানে আমাদের কার্যক্রম ছিল আরও হতাশাজনক। অধিবেশনে কয়েকজনের এবং কয়েকটি কমিটির বক্তব্যে আমাদের পক্ষে কিছু কথা উঠে আসলেও, তা থেকে কিছুই হলো না। কারণ জাতিসঙ্ঘের কোন সদস্য রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বে হস্তক্ষেপ হবে বলে বেশীরভাগ দেশই এ ব্যাপারে আওয়াজ তুলতে অনিচ্ছুক ছিল। যেহেতু ভেটো ক্ষমতাপ্রাপ্ত কোনো দেশই ঐ পর্যায়ে জনসমর্থন নিয়ে এগিয়ে আসে নি, তাই প্রাথমিক পর্যায়ে আমাদের প্রচেষ্টার কোন উল্লেখযোগ্য ফলাফলও ছিল না।
&nbsp;
এই সময় আমি বাংলাদেশের পক্ষে বেশ কয়েকটি বক্তব্য দিয়েছিলাম। এগুলোর মধ্যে ছিল ফিলাডেলফিয়া ও সাইরাকুস বিশ্ববিদ্যালয় দু’টিতে জনবহুল সভা। এছাড়া এমআইটিতে-ও একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেখানে আমার সাথে ছিলেন বিচারপতি আবু সায়ীদ চৌধুরী এবং ডঃ মহিউদ্দীন আলমগীর। প্রফেসর আনিসুর রহমান আমার জন্য সেখানকার উইলিয়ামস কলেজে একটি সভার আয়োজন করেছিলেন। এছাড়া প্রফেসর নুরুল ইসলামের ইয়েল কলেজেও একটি সভার আয়োজন করেছিলেন। বেশীরভাগ অনুষ্ঠান ভণ্ডুল করার জন্য পাকিস্তানীরা দলে দলে যেত। কিন্তু শেষ পর্যন্ত রাগের চাইতে দুঃখই পেত বেশী আর সাধারণ কয়েকটি প্রশ্নই শুধু করত।
&nbsp;
আমি মাঝে মাঝে টিভিতে যাওয়া এবং সাময়িকীর জন্য লেখা চালিয়ে যাচ্ছিলাম। সেখানে থাকাকালে একেবারে শেষের দিকে টিভিতে গিয়ে দু’বার খুব মজার ঘটনা ঘটল। প্রথমটি বোস্টনের সরকারী টেলিভিশনে। অনুষ্ঠানটি খুব জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে হতো। সেটি একটি আদালতে মামলা ভিত্তিক আয়োজিত হতো যেখানে দু’জন আইনজীবী পক্ষে এবং বিপক্ষে কথা বলতেন। প্রত্যেকে তিনজন করে সাক্ষী উপস্থিত করতে পারতেন। যতদূর মনে পরে, সেদিনের বিষয় ছিল বাংলাদেশের জন্য আমেরিকা সরকারের সমর্থন প্রদানের ওপর আলোচনা। আমাদের পক্ষের উকিল কে ছিলেন, তা আমি মনে করতে পারছি না। কিন্তু প্রতিপক্ষের প্রধান ছিলেন আমেরিকার অন্যতম প্রধান রক্ষণশীল সাপ্তাহিকী ন্যাশনাল রিভিউ-এর স্বত্ত্বাধিকারী উইলিয়াম রাশার। পত্রিকাটি সম্পাদনা করতেন সুপরিচিত ডানপন্থী ব্যক্তিত্ব উইলিয়াম এফ বাকলে জুনিয়ার। রুশার ছিলেন বাকলের চাইতে, এমনকি গেঙ্গিস খানের চাইতেও রক্ষণশীল। উপমহাদেশ সম্পর্কে তার ধারণা ছিল জন ফস্টার ডালেসের সময়কাল পর্যন্ত সীমাবদ্ধ। তিনি ইন্ধিরা গান্ধির ভারত এবং ১৯৫০ সাল সময়কার ইন্দিরার পিতার ভারত সম্পর্কে পার্থক্য করতে পারছিলেন না আর কৃষ্ণ মেননকেই তখনো ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলে ধরে নিয়েছিলেন।
অনুষ্ঠানটির দর্শক খুব বেশী ছিল না। কিন্তু এটি মজার ছিল কারণ তা বাংলাদেশের পক্ষে-বিপক্ষে অনেক যুক্তি বের করে এনেছিল। রাশার অনুষ্ঠানটির জন্য টিভির একজন কর্মীকে পাকিস্তানে পাঠালেন ভুট্টোর সাক্ষাতকার নেবার জন্য। এরকম একটি পক্ষপাতমূলক ভিডিও প্রযোজনা করে আমাদেরকে স্টুডিওতে দেখানো হয়েছিল। রাশার নিউ জার্সির কংগ্রেসম্যান ফ্রেলিংঘুসেন এবং পাকিস্তানে আমেরিকার একজন সাবেক রাষ্ট্রদূত, পেপসি কোলার ধনকুবের ব্যবসায়ীকেও জড়ো করেছিলেন। যাকে নিক্সনের নির্বাচনী প্রচারণার খরচ যুগিয়েছিল বলে পুরষ্কার স্বরূপ সেখানে পাঠানো হয়েছিল। বাংলাদেশের পক্ষে আমাদের উকিল নিয়ে এসেছিলেন লেবার পার্টির এমপি জন স্টোনহাউসকে, যিনি ইংল্যান্ডে বাংলাদেশের পক্ষে অন্যতম বাকপটু প্রচারক ছিলেন। উনি বিশেষ করে সেই অনুষ্ঠানটিতে অংশ নেবার জন্য লন্ডন থেকে উড়ে এসেছিলেন। আর ছিলেন সাবেক রাষ্ট্রদূত এম কে রাগোস্ত্রা। তিনি ওয়াশিংটনে ভারতীয় দূতাবাসে এল কে ঝা এর ডানহাত ছিলেন এবং বর্তমানে ভারত সরকারের পররাষ্ট্র সচিব। সবশেষে অনুষ্ঠানে একমাত্র বাংলাদেশী হিসেবে ছিলাম আমি। স্টুডিও দর্শকে পরিপূর্ণ ছিল এবং আমাকে বলা হয়েছিল যে আমি নাকি টিভি দর্শকদের জন্য একটি প্রাণবন্ত উপস্থাপনা করেছিলাম।
&nbsp;
টিভিতে আমার দ্বিতীয় উপস্থিতি ছিল আরও ঐতিহাসিক। এর আগে জাতিসঙ্ঘে প্রতিনিধিত্বকালে আমরা অনেক বেশী সক্রিয় হলাম যখন ভারত-পাকিস্তানের শত্রুভাবাপন্ন মনোভাব প্রকাশ্যে আসার পরে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ এবং সাধারন পরিষদে বাংলাদেশ ইস্যু শেষ পর্যন্ত উঠে এলো। উত্তর ভারতের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে পাকিস্তান বিমানবাহিনীর হামলার ফলে স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং সীমান্তে উত্তেজনা চরম পর্যায়ে পৌছালো। যে পাকিস্তান এতদিন পর্যন্ত বাংলাদেশ ইস্যু জাতিসংঘের আলোচ্যসূচিতে আনতে চায় নি, তারাই এখন এটাকে ইন্দো-পাকিস্তান শান্তির হুমকি হিসেবে আন্তর্জাতিকীকরণ করতে তৎপর হয়ে উঠল। বাংলাদেশে ভারত সেনাবাহিনীর সফল অগ্রগামিতা পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে ছিন্ন-ভিন্ন করে দিলো। ফলে পাকিস্তান যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে ভারত সেনাবাহিনীকে ফেরত পাঠাতে আন্তর্জাতিক সহায়তা চাইতে বাধ্য হলো। এ ব্যাপারে তারা আমেরিকা এবং চীনের শক্ত সমর্থন পেয়েছিল। পাকিস্তানের জন্য এই তদবির ছিল জাতিসংঘে চিনের প্রথম প্রকাশ্য কর্মকাণ্ড। যুদ্ধবিরতি এবং সেনাবাহিনী প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া নিরাপত্তা পরিষদ এবং সাধারন পরিষদে অপ্রতিরোধ্য সমর্থন পাচ্ছিলো। স্পষ্টতই বেশীরভাগ সদস্য এই ইস্যুতে একমত হয়েছিল কারণ তারা ভাবছিল যে এতে একটি যুদ্ধের অবসায়ন হতে যাচ্ছে। ফলে আমেরিকা এবং চীনের যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব নিরাপত্তা পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছিলো। শুধু ভেটো দিয়ে বাঁধ সাধলো সোভিয়েত ইউনিয়ন।
&nbsp;
এই ভেটোকে পাশ কাটানোর জন্য সাধারণ পরিষদে একই ধরনের একটি সিদ্ধান্তপত্র আনা হল যেখানে একটি যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবে সদস্যদের সমর্থন ছিল আরো বেশী। ফলে জানা ছিল যে এখানে এই রেজ্যুলেশন সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে। আমি পরবর্তীতে এই বিতর্কে সকলের বক্তৃতা পর্যালোচনা করে দেখলাম, খুব অল্প দেশই পাকিস্তানের প্রতি সমর্থন থেকে এটি করেছিল। বেশীরভাগ দেশ যুদ্ধবিরতি সায় দিয়েছিল কারণ এটাকে আন্তর্জাতিক রীতিতে ‘শান্তিনীতি’ বলেই ধরে নেয়া হয়।
&nbsp;
আমরা বাংলাদেশীরা ছিলাম জাতিসংঘে এই নাটক দেখা গ্যালারীর দর্শক। আমাদের প্রচেষ্টা অনেকের ব্যক্তিগত সহানুভূতি আদায় করতে পেরেছিল। কিন্তু সাধারণ পরিষদে আমাদের পক্ষে বলার মত তেমন কাউকে পাচ্ছিলাম না। বক্তারা সকলেই ৯ মাসের আগ্রাসন আর পাকিস্তানী আর্মির গণহত্যা বেমালুম ভুলে সদ্য উদ্ভুত ভারত পাকিস্তানের যুদ্ধের দিকে মনোযোগ দিয়েছিল।
&nbsp;
নিরাপত্তা পরিষদে প্রতিধিদের কাছে লবিঙে অংশ নেয়ার ছাড়াও আমি নিউ ইয়র্কের একটি পাব্লিক টেলিভিশনে আমন্ত্রণ পেয়ে উপস্থিত হয়েছিলাম। এই চ্যানেলটি অন্যদের তুলনায় আলাদা ছিল এই কারনে যে, জাতিসংঘের সাধারন ও নিরাপত্তা পরিষদের কার্যক্রম শুধু এই চ্যানেলটিতেই দেখানো হত। আমাদের অনুষ্ঠানটি জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনের আদলেই সাজানো হয়েছিল। দুটি প্যানেলের একটি সেট সাজানো হয়েছিল। একটি আমেরিকানদের নিয়ে। যতটুকু মনে পরে, এখানে ছিলেন টম ডাইন, নিউজউইক ম্যাগাজিন-এর আর্নল্ড ডি বর্সগ্রেইভ এবং অন্য আরেকজন সুপরিচিত ব্যক্তি। তাদের তিনটি পক্ষের সাথে আলোচনা করতে হয়েছিল। পাকিস্তানের পক্ষে ছিলেন নিউইয়র্কে পাকিস্তানের কনসাল-জেনারেল নাজমুস সাকিব খান, ভারতের পক্ষে ভারতীয় কনসাল-জেনারেল এবং বাংলাদেশের পক্ষে আমি। পাকিস্তানের কনসাল-জেনারেলকে আমার সাথে একই প্লাটফরমে বসতে নিষেধ করা হয়েছিল। তাই ভারতীয় কনসাল-জেনারেল এবং তিনি পর্দায় এক সাথে এলেন আর আমি এলাম পরে। তাই আমার বেলায় মনে হচ্ছিলো যেন আমি একক ভাবে ছিলাম। কাকতালীয়ভাবে আমি যখন এলাম, তখন সাধারন পরিষদে ভোট গণনার ফল প্রকাশ হচ্ছিলো। আমার বিবৃতি শুরু হওয়া মাত্র ক্যামেরা জাতিসংঘের অধিবেশনের দিকে ফিরে গেল। রিপোর্টে দেখা গেল তাৎক্ষনিক যুদ্ধবিরতি এবং সীমানা অতিক্রমকারী সৈন্যদের ফেরত পাঠানোর প্রস্তাবে বিপুল ভোট পড়েছে। ক্যামেরা আবার আমার কাছে ফেরত এল এবং সাক্ষাতকার গ্রহণকারী স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য প্রতিকূল এই ঘটনা সম্পর্কে আমার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানতে চাইল। যতটুকু মনে পড়ে, নিজেকে দ্রুত গুছিয়ে নিয়ে আমি বলেছিলাম, “পাকিস্তানের হত্যাযজ্ঞ হতে উদ্ভুত এই যুদ্ধের কেন্দ্রবিন্দু বাংলাদেশকে এই সাধারন অধিবেশনের আলোচনায় ডাকা হয় নি। বাংলাদেশ সরকার এবং জনগণ তাই জাতিসংঘের এই গৃহীত সিদ্ধান্তের কোন অংশ নয় এবং বাংলাদেশের জনগণের ওপর পাকিস্তানের আগ্রাসন বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধ চলবে।” বাংলাদেশে অবস্থা নিয়ে আমার বিবৃতি এবং জাতিসংঘে বিতর্কের পরে উদ্ভূত পরিস্থিতি সাদরে গৃহীত হয়েছিল। কিছু দিন পর নিউ ইয়র্কের রাস্তায় আমার কথাগুলো শুনে থাকা এক আগন্তুক আমাকে থামিয়ে আমার বিবৃতির জন্য বাহবা জানিয়েছিলেন।
&nbsp;
যা হোক, টিভি তারকার ভূমিকা ছিল ক্ষণস্থায়ী। আসল নাটক চলছিল বাংলাদেশে এবং জাতিসংঘের আনাচে কানাচে। আমরা জানতে পারলাম যে, শেষ মুহুর্তে সরকারে অন্তর্ভুক্ত হওয়া জুলফিকার আলী ভুট্টো নিরাপত্তা পরিষদে পাকিস্তানের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করার জন্য নিউইয়র্ক আসছেন। যদিও ভূট্টোর আসার চাইতেও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা বাংলাদেশের মাটিতে ঘটছিল। ভারতীয় এবং বাংলাদেশী বাহিনীর দর্শনীয় অগ্রগামিতা আর পাকিস্তানী ব্যুহের একেবারেই ভেঙ্গে পড়া জাতিসংঘের বিতর্কে তাদের অবস্থান খারাপ করে দিয়েছিল। একজন সাংকেতিক বার্তা নিয়ে কর্মরত কেরানীকে বলা হয়েছিল জাতিসংঘের পাকিস্তানী দূতাবাসে থেকে যেতে। তিনি জানালেন যে হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের অনুমতি চেয়ে জেনারেল নিয়াজির পাঠানো সাংকেতিক বার্তা এসে পৌঁছেছে। আমরা আরও জানতে পারলাম যে, পাকিস্তানী সৈন্যদের নিরাপদে আত্মসমর্পণের নিশ্চয়তা চেয়ে পাঠানো রাও ফরমান আলীর একটি বার্তা ঢাকায় জাতিসংঘের প্রতিনিধি পল মারে হেনরি জাতিসংঘের মহাসচিবের কার্যালয়ে পাঠিয়েছেন।
&nbsp;
ভুট্টো বিমানবন্দরে নেমেই তার জন্য ভয়াবহ এই সংবাদগুলো পেলেন। নিরাপত্তা পরিষদে তার চক্রান্তের পরিকল্পনা মাঠে মারা গেল। এত কিছুর জন্য একেবারেই অপ্রস্তুত ভুট্টো নিভৃতে চলে গেলেন এবং পরের কয়েকদিন জাতিসংঘে আমেরিকা এবং চীনের সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত প্রতিনিধি যথাক্রমে জর্জ বুশ এবং হুয়ান হুয়াং এর সাথে একান্তে আলাপচারিতায় কাটালেন। তারা গোপনে কি আলাপ করেছিলেন জানিনা তবে কয়েকদিন আত্মসমর্পণের ব্যাপারে কিছু শোনা গেল না। বুশ বর্তমানে রিগ্যান প্রশাসনের ভাইস-প্রেসিডেন্ট হিসেবে কর্মরত আছেন। মনে হলো, ইসলামাবাদ থেকে নিয়াজি এবং ফরমান আলীর আর্জি এই বলে খারিজ করা হল যে নতুন সাহায্য পাঠানো হচ্ছে। তার মানে ইয়াহিয়া এবং ভুট্টোকে উত্তর থেকে চীন এবং সমুদ্র থেকে আমেরিকা হস্তক্ষেপ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। হঠাৎ আমরা দেখলাম যে নিরাপত্তা পরিষদে আরেকটি অধিবেশন ডাকা হলো যেখানে ভুট্টো ভাষণ দিবেন।
আবারো জাতিসংঘে বাংলাদেশী প্রতিনিধি দলকে নিরাপত্তা পরিষদের গ্যালারিতেই বসে ভুট্টোর ভাঁড়ামি দেখতে হলো। আমরা নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য দেশগুলোর প্রতিনিধিদের সাথে যোগাযোগ করে যুদ্ধবিরতি চেয়ে তাদের অবস্থান পরিবর্তন করাতে চেষ্টা করছিলাম। এর পিছে আমরা সময় দিচ্ছিলাম আর এটা বুঝাতে চাচ্ছিলাম যে বাংলাদেশের জন্ম অনিবার্য। বেশীরভাগ মুখপাত্র একমত ছিলেন যে, ‘বাংলাদেশ’ একটি বাস্তব সত্ত্বা এবং সর্বোত্তম সমাধান হলো পাকিস্তান আর্মিকে দ্রুত আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করার মাধ্যমে যৌথ বাহিনীর অনতিবিলম্বে জয় লাভ করা। তারা বললেন, নিরাপত্তা পরিষদে আমেরিকান আর চিনারা যারা দেখাতে চাইছে যে ইয়াহিয়া খানের জন্য তারা তাদের সামর্থ্যের সবই করেছেন। এটা একটা নাটক ছাড়া আর কিছুই নয়। এই মিটিংগুলোতে জাপানের প্রতিনিধিদের মাঝে আমার আরেকজন অক্সফোর্ড সহপাঠি আমার সাথে নিয়মিত দেখা করতো এবং নিরাপত্তা পরিষদের মনোভাব আর অগ্রগতি সম্পর্কে খবরাখবর দিত।
&nbsp;
পাক আর্মির আত্মসমর্পণ আগমুহূর্তে আমি নিরাপত্তা পরিষদের বিতর্ক দেখেছিলাম। ভুট্টো যখন নিরাপত্তা পরিষদে তার কাজ করছিলেন, তখন খবর এলো যে নিক্সন আমেরিকার সপ্তম নৌবহরকে বঙ্গোপসাগরে যেতে বলেছেন। এর কোনো উদ্দেশ্য এখন পর্যন্ত বলা হয় নি। আমেরিকা প্রশাসন একগুয়েভাবে ভারতকে শাসিয়ে যাচ্ছিল এবং বাংলাদেশে ক্রমেই কোণঠাসা হয়ে পড়া পাকিস্তানকে সাহায্য করার জন্য কিছু একটা বুদ্ধি যে বের করবে তা অনুমান করা কঠিন ছিল না। ধারনা ছিল যে, এমন একটি হস্তক্ষেপ যা নিয়াজি সুদীর্ঘকাল ধরে চাইছিলেন, সেটার হয়তো ছক আঁকা হয়ে গেছে। এ হতে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করার ভিত্তি মজবুত করা যাবে এবং এমন একটি মীমাংসা হবে যা থেকে পাকিস্তানের অখণ্ডতা অটুট থাকবে। তাই বাংলাদেশকে ঘিরে যে বড় নাটক চলছিল, সেটি ঢেকে রাখার জন্য নিরাপত্তা পরিষদের নাটকটা ছিল একটি উছিলা মাত্র।
&nbsp;
উত্তর পূর্ব থেকে ভারতে চীনের সম্ভাব্য আক্রমন কিংবা মনোযোগ সরানোর চেষ্টা পাকিস্তানের জন্য ছিল অন্যতম আশা। আমাদের কানে এসেছিল যে কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় আর্মি জেনারেলকে ভুট্টো পিকিং পাঠিয়েছেন। আমি নিজেও আগে এমন একটি সম্ভাবনার বিষয়ে ভেবেছিলাম। অক্টোবরের শেষ দিকে আমি প্যারিসে বেইজিংয়ে পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত কে এম কাইসার এর সঙ্গে গোপনে বৈঠক করেছিলাম। পাকিস্তানী পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আহূত পাকিস্তানী রাষ্ট্রদূতদের সম্মেলনে যোগ দিতে কে এম কাইসার জেনেভায় এসেছিলেন। সেখান থেকে আমার সাথে দেখা করার জন্য তিনি গোপনে প্যারিস আসেন এবং আমাকে এই গুপ্ত তথ্যটি দেন যে চিন পাকিস্তানকে বাঁচানোর জন্য সামরিক হস্তক্ষেপ করবে না। তারা পাকিস্তানকে অস্ত্র এবং কূটনৈতিক সহায়তা দেবে কিন্তু পাকিস্তানের পক্ষে যতই প্রকাশ্যে তর্জন-গর্জন করুক না কেন, চিনের সাথে আওয়ামীলীগের গোপনে রাজনৈতিক সমঝোতা হয়েছে। তিনি আমাকে বলেছিলেন যে আমি যেন এসব তথ্য বাংলাদেশ সরকারের কাছে পাঠাই। আমি সে দায়িত্ব পালন করেছিলাম। পরে জানলাম যে আমি ছাড়াও বেইজিংয়ে পাকিস্তান অ্যাম্বাসীতে কর্মরত বাঙালিদেরকেও ভারতীয় দূতাবাসের মাধ্যমে এ ধরনের তথ্য পাঠাতে অনুরোধ করা হয়েছিল। এই তথ্যের পিছে এই অঞ্চলে মিলিটারি কৌশলে আর কী পরিকল্পনা নেয়া হয়েছিল, তা আমি বলতে পারি না।
&nbsp;
নিরাপত্তা পরিষদের ভেতরে এবং বাইরে আমেরিকা, চিন আর পাকিস্তানের সমন্বিত প্রচেষ্টা ছাড়া যৌথ বাহিনী কত দ্রুত পাক বাহিনীকে আত্মসমর্পণ করাতে পারে, তার সামর্থ্যের ওপর উত্তেজনা নির্ভর করছিল। ডিসেম্বরের ১০ তারিখের দিকে আত্মসমর্পণ নিশ্চিত মনে হচ্ছিলো। কিন্তু শেষ মুহূর্তে মোড় ঘুরে গেল ইসলামাবাদের নির্দেশে। ইসলামাবাদ চেয়েছিল বাইরের খেলোয়াড়দের খেলার জন্য কিছুটা সময় দিতে। আমি যখন নিউ ইয়র্ক থেকে লন্ডনের বাসায় ফিরে যাচ্ছিলাম, বাতাসে তখন তীব্র উত্তেজনা। সপ্তম নৌবহরের মাধ্যমে আমেরিকা এই যুদ্ধকে নতুন মাত্রায় নিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা উন্মোচিত করেছে। এটি এখন আর কেবল কল্পনার মাঝে সীমাবদ্ধ নেই।
&nbsp;
অক্সফোর্ডে থাকাকালীন আমি পাকিস্তান আর্মির আত্মসমর্পণের উল্লাসজনক সংবাদটি শুনলাম। আমি ঢাকার রেসকোর্সে লেফটেন্যান্ট জেনারেল অরোরা সিং এর কাছে জেনারেল নিয়াজির হাত নিচু করার দর্শনীয় ঘটনাটি টিভিতে দেখলাম। আজ পর্যন্ত এটি উদঘাতিত করা যায় নি যে, জেনারেল নিয়াজির বাহিনী আর একটু সময়ক্ষেপণ করতে পারলে কি আসলেই আমেরিকার সপ্তম নৌবহর হস্তক্ষেপ করতো? নাকি পাকিস্তানের সত্যিকারের মিত্র হিসেবে নিজেকে দেখানোর জন্য নিক্সনের এটা একটি গণসংযোগ প্রচেষ্টা ছিল মাত্র। এ ধরনের হস্তক্ষেপে আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতির যে সমর্থন ছিল না, তা নিশ্চিত। এই ইস্যুতে মিডিয়া অত্যন্ত সোচ্চার ছিল। ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলে কিসিঞ্জারের রিপোর্ট থেকে জানা গিয়েছিল যে নিক্সন মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টকে ভারতের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। এটি আগেই জ্যাক এন্ডারসন ফাঁস করে দিয়েছিলেন, যা বহু জায়গায় উদ্ধৃত করা হয়েছে। চার্চ, কেনেডি এবং বাংলাদেশের অন্যান্য বন্ধুর নেতৃত্বে কংগ্রেসের সদস্যরা আমেরিকার এ ধরণের নগ্ন হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করছিলেন। তাই ধারনা করা যায় যে, আমেরিকার জনগন, মিডিয়া এবং কংগ্রেস যদি বাংলাদেশের প্রতি এরকম সহানুভূতিশীল না হতো কিংবা উদাসীন হতো, তবে নিক্সন প্রশাসন পাকিস্তানের প্রতি সমর্থন আরও অনেক দূর নিয়ে যেতেন। এ থেকে বলা যায় যে, নিষ্ঠুর নিক্সন প্রশাসনের মাথার ওপর এমন তীব্র প্রচারণা বাংলাদেশের জন্য তাৎপর্যহীন ছিল না।
পাকিস্তানে নতুন সহায়তা প্রদানের প্রশ্ন যেন পুনরায় ফিরে না আসে, সেজন্য দাতাদের সাথে আমাদের যোগাযোগ শেষ পর্যন্ত চলমান ছিল। অর্থাৎ নভেম্বর এর শুরুর দিকে পাকিস্তান কনসোর্টিয়ামের জন্য আরেকটা মিটিঙে শেষ বারের মতো আমাকে আরেকবার প্যারিস যেতে হয়েছিল। কারগিল এর সাথে এই আরেকটা প্রাতরাশের মিটিংয়ে আমাকে নিশ্চিত করা হল যে, আমেরিকার যথেষ্ট চাপ সত্ত্বেও কনসোর্টিয়ামের সদস্য দেশগুলো পাকিস্তানে নতুন সাহায্য কিংবা পুরনো দায় পরিশোধের বিষয়ে সময় পুনর্বিন্যাসের সহায়তা করার কোনোটাতেই রাজী ছিল না। তাদের এই অবস্থানের কারণে পাকিস্তান হুমকি দিয়েছিল তারা তাদের দায় পরিশোধ নিয়ে একমুখী খেলাপিকরণের ঘোষণা দিবে। তবে তারা এমন একটি নীতিগত পরিবর্তনের ফলে সহায়তার সারিতে থাকা জাপানের মতো দেশগুলোর কাছ থেকে সাথে সাথে সাহায্য হারাবে। কারণ জাপানের মতো দেশগুলো এ ধরণের খেলাপিকরণের হুমকির ব্যাপারে আইনগতভাবে শক্ত। এমন পরিস্থিতিতে বিশ্বব্যাংক ভাবলো সকলেই বাড়াবাড়ি করছে। তাই এটি পাকিস্তান এবং কনসোর্টিয়ামের মধ্যে সমঝোতা করানোর জন্য উঠে পড়ে লাগলো। যার ফলে পাকিস্তান হয়তো খেলাপি অবস্থানে যায় নি।
&nbsp;
এখানে আবারো পাকিস্তানে নতুন সাহায্য না দেওয়ার জন্য দাতাদের আশ্বস্ত করতে পারাটা আমাদের প্রচারণার মাঝারি ধরণের সফলতা হিসেবেই ধর্তব্য। সেই মে মাসে আমার প্রচারণার শুরু থেকে ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভ হওয়া পর্যন্ত কনসোর্টিয়ামের একটা দেশও আসলে পাকিস্তানকে নতুন কোন সহায়তা দেয় নি। তবে দাতা দেশগুলো থেকে বাংলাদেশে দুর্ভিক্ষ মোকাবেলায় সাহায্য হিসেবে খাদ্য এবং যাতায়াতের জন্য যন্ত্রপাতি আকারে ত্রাণ এসেছে। এটি তাদের মানবিক আচরনের বহিঃপ্রকাশ ছিল। বাস্তবে পাকিস্তানের জন্য প্রচুর সহায়তা সারিবদ্ধভাবে ছিল। কারণ বাংলাদেশ অঞ্চলে তার চলমান আমদানী মারাত্মকভাবে কমে গিয়েছিল। তাই এটি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দিয়ে চলছিল এবং দুর্বল হয়ে পড়েছিল। দায় পরিশোধের চাপে পাকিস্তান আগেও একবার খেলাপিকরণের হুমকি দিয়েছিল। এই অনৈতিক পথের মাধ্যমে সুবিধা নেবার জন্য পরিষ্কারভাবেই পাকিস্তানের আরও কিছুদূর আসার দরকার ছিল। যেন ন্যূনতম পশ্চিম পাকিস্তানে বর্তমান আমদানী এবং ভোগ তাদের সামর্থ্যের মধ্যে গ্রহণযোগ্য স্তরে টেকসই অবস্থানে থাকে। পশ্চিম পাকিস্তান নিজেও চেয়েছিল সারিবদ্ধভাবে অপেক্ষমাণ এবং নতুন সাহায্য যেন বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু আমাদের প্রচেষ্টা ছিল ইতোমধ্যে প্রতিশ্রুত সহায়তা বাতিল করার জন্য দাতাদের বুঝানো, যা কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে আইনি জটিলতার কারণে তেমন সফল হয় নি।
&nbsp;
এভাবে আমাদের প্রচারণা যতটা না তাদের দৃশ্যমান কাজকর্ম কমিয়ে আনার ব্যাপারে প্রভাব ফেলেছিল, তার চাইতে বেশী প্রভাব ফেলেছিল ছিল রাজনৈতিক এবং মনস্তাত্ত্বিকভাবে। কিন্তু তারা পুরো সময় জুড়েই অর্থনৈতিক দিক দিয়ে টানাপোড়েনের মধ্যে ছিল এবং নতুন সহায়তা ছাড়া তাদের নাভিশ্বাস উঠছিল। সন্দেহের অবকাশ থেকে যায় যে, স্বাধীনতা যুদ্ধ যদি আর কিছু দিন প্রলম্বিত হতো, তাহলে পশ্চিম পাকিস্তানের অর্থনীতি এবং জনগণ তীব্র সংকটে পড়তো কিনা।
&nbsp;
প্যারিসে ‘পুরাতন’ পাকিস্তানের জন্য কনসোর্টিয়ামের সর্বশেষ মিটিংয়ে নভেম্বরে আন্দ্রে মার্লো নামক বিদগ্ধ ফরাসী নোবেলজয়ীর সাথে দেখা করার বিশেষ সুযোগ হয়েছিল। আমরা আগেই পত্রিকা মারফত জেনেছিলাম যে, মার্লো প্রকাশ্যে বাংলাদেশের জন্য তার সমর্থন জ্ঞাপন করেছেন এবং ঘোষণা করেছেন যে তিনি মুক্তিবাহিনীর সাহায্যার্থে ফরাসী যুদ্ধের সময়কার জার্মান বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সৃষ্টিকারী সহযোদ্ধাদের নিয়ে কাজ করবেন। মার্লো নিজে ছিলেন সত্তরোর্ধ্ব এবং অসুস্থ। তাই তার প্রস্তাব কতটা বাস্তবসম্মত ছিল, তা পরিষ্কার ছিল না। কিন্তু ড্যানিয়েল থর্নার চেয়েছিলেন, বাংলাদেশে সরকারের একজন দাপ্তরিক প্রতিনিধি যেন তার সাথে অন্তত দেখা করে এই পদক্ষেপের জন্য অভিবাদন জানাক।
&nbsp;
ড্যানিয়েল আমাকে প্যারিসের শহরতলীতে মার্লোর বাড়ীতে নিয়ে গেলেন। সেখানে আমি প্রথমবারের মতো এই মানুষটির দেখা পেলাম। ম্যালরক্স প্রবল উৎসাহের সাথে কথা বলছিলেন। তিনি বললেন যে, স্প্যানিশ গৃহযুদ্ধে তিনি প্রজাতন্ত্রের হয়ে পাইলটের কাজ করেছিলেন। তারপর থেকে নিজের দেশ ছাড়া আর কোনো দেশের কোন ঘটনায় তিনি এভাবে আন্দোলিত হন নি। বাংলাদেশের জন্য ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার্থে তিনি এতই দায়বদ্ধতা বোধ করছিলেন যে, তার বৃদ্ধ বয়স এবং অসুস্থ শরীর সত্ত্বেও তিনি তার পুরনো সহযোদ্ধাদেরকে বাংলাদেশের যুদ্ধে অংশগ্রহন করার জন্য ডাক দিয়েছিলেন। তারা তার ডাকে সাড়াও দিয়েছিল। তিনি বুঝাতে চেয়েছিলেন যে তারা বিস্ফোরক এবং যোগাযোগের জন্য মূল্যবান দক্ষ বিষয়াদি শিখিয়ে দিতে পারবেন, যা গেরিলা যুদ্ধের জন্য অত্যাবশ্যক। তিনি মুক্তিবাহিনীকে সহায়তা করার জন্য বিস্ফোরক এবং যোগাযোগের নানান যন্ত্রে সজ্জিত হয়ে পুরো একটি দল নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। এরপর তিনি এই অঞ্চলে মুক্তিবাহিনীর প্রয়োজনীয়তা এবং যুদ্ধে জড়ানোর বাস্তব সমস্যা বিষয়ক বিশদ এক কারিগরী আলোচনায় আমাকে নিয়ে গেলেন। দুঃখজনকভাবে এখানে আমি তাকে পরামর্শ দেওয়ার মত যথেষ্ট যোগ্য ছিলাম না। কিন্তু আমি তাকে তার উদ্যোগের জন্য বাংলাদেশের জনগণ এবং বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানালাম এবং তার প্রতিশ্রুতি বাংলাদেশ সরকারের কাছে পৌঁছে দেব বলে কথা দিলাম। সরাসরি অংশগ্রহণ ছাড়াও তিনি আমাকে কথা দিলেন যে তিনি গ্যালিস্ট মন্ত্রীদের সঙ্গে কথা বলবেন এবং ফ্রান্স সরকার যাতে পাকিস্তানে কোন অস্ত্র না পাঠায়, সেজন্য তার প্রভাব ব্যবহার করবেন। অবশ্য পাকিস্তানের দায় পরিশোধের ব্যর্থতার কারনে এটি এমনিতেই বাতিল হয়েছিল। মনে হয়েছিল, অস্ত্র বিক্রয়ের ক্ষেত্রে ফরাসীরা রাজনৈতিক চাপের চেয়ে হিসাব বইয়ের দ্বারাই বেশী তাড়িত হয়েছিল।
&nbsp;
আগেই বলেছিলাম, ১৬ই ডিসেম্বর যখন পাকিস্তানিদের আত্মসমর্পণের খবর এলো, আমি তখন অক্সফোর্ডে ছিলাম। বছরের শুরুর দিকে আমি অক্সফোর্ডের ‘রানী এলিজাবেথ হাউজ’-এর পক্ষ থেকে একটা ফেলোশিপ পেয়েছিলাম। যা থেকে অক্সফোর্ডে আমার পরিবারকে মোটামুটি চালানো যেত। সেই ফেলোশিপের একাডেমিক কাজে আমি খুব কম সময়ই দিতে পেরেছিলাম। কারণ আমার পুরোটা সময় আমি বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ব্যাপারে ব্যস্ত ছিলাম। তাই আমি পরিবারের সাথে থেকে অক্সফোর্ডের ফেলোশিপ ব্যবহার করে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পটভূমি এবং উত্তোরণের উপর একটা বই লিখব বলে ঠিক করলাম। কিন্তু আনন্দের আতিশয্যে আর বাংলাদেশের স্বাধীনতার নতুন প্রভাতের অনুভূতি থেকে আর ওখানে রয়ে যেতে পারলাম না। অতএব কলকাতা হয়ে বাংলাদেশে ফেরার জন্য রওনা দিলাম। কারণ ঢাকায় সরাসরি কোন বিমান যাচ্ছিলো না।
&nbsp;
কলকাতায় আমার সাথে অধ্যাপক মোশাররফ হোসেন, ডঃ স্বদেশ বসু আর ডঃ আনিসুজ্জামানের দেখা হল। তারা শেষের মাসগুলোতে শরণার্থী পুনর্বাসন এবং যুদ্ধ বিধ্বস্ত বাংলাদেশের অর্থনীতি পুনর্গঠনের নীতিমালা তৈরিতে অনেক পরিশ্রম করেছেন।
&nbsp;
মোশাররফ ইতোমধ্যে বাংলাদেশের মন্ত্রীসভার সাথে ঢাকায় ফিরে গিয়েছিলেন। পরে আবার এসেছেন তার পরিবারকে ফিরিয়ে নেবার ব্যবস্থা করতে। ৩১শে ডিসেম্বর আমি আর মোশাররফ, সাথে কামরুজ্জামান ও তাঁর পরিবার এবং জোহরা তাজউদ্দীন আর উনার পরিবার ভারতীয় এয়ারফোর্সের পুরাতন ডিসি-৩ বিমানে করে ঢাকায় এলাম। বিমানবন্দরে বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের সাথে দেখা হলো। তাকে আমি এর আগে এপ্রিলের সেই সংকটময় দিনে সর্বশেষ দেখেছিলাম, যখন বিশ্ববাসীর উদ্দেশ্যে তার সেই ঐতিহাসিক বিবৃতিটির খসড়া তৈরি করেছিলাম। শীতের একটি সকাল ছিল সেদিন, কিন্তু সূর্য কিরণ দিচ্ছিলো। আমাদের মনে হচ্ছিলো যেন নতুন বছরটি বাংলাদেশের সুদীর্ঘ বঞ্চনা আর যুদ্ধবিধ্বস্ত জনগণের জন্য বয়ে আনবে আশা আর সম্ভাবনার এক নতুন পৃথিবী।
&nbsp;
-রেহমান সোবহান
ডিসেম্বর, ৮৩
&nbsp;
&nbsp;
&nbsp;
&nbsp;
&nbsp;
&nbsp;
<a href=”https://www.facebook.com/alamin.sorkar.7161″><strong>আলামিন সরকার</strong></a>
&lt;১৫,৩৭,২৯৩-৯৪&gt;<h1>[শাহ জাহাঙ্গীর কবীর]</h1>আমার নির্বাচনী এলাকা ছিলো রংপুর জেলার গাইবান্ধা মহকুমার গোবিন্দগঞ্জ থানা। আমি ৪ঠা এপ্রিল ১৯৭১ সাল পর্যন্ত কারমাইকেল কলেজ ক্যাম্পাসে অবস্থান করেছি। এরপর পলাতক রংপুর ও বিভিন্ন গ্রামে ঘুরে বেড়িয়েছি। আমি ভারতে যাইনি।
আমার এলাকার ক্ষতিগ্রস্থ অঞ্চলগুলোর মাঝে সাইপাল, সাঁতারপাড়া, কাঁটাখালী প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। মহিমাগঞ্জ নামক বিখ্যাত বন্দর এলাকাটি ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলো। এখানকার বিভিন্ন পাটের গুদাম পুড়িয়ে দেয়া হয়েছিলো।
কাঁটাখালী ব্রীজের কাছে ছিলো পাক বাহিনীর ক্যাম্প। সেখান থেকে তারা বিভিন্ন গ্রামে গিয়ে লোকজন ধরে এনে হত্যা করতো। আমার এলাকায় প্রায় এক থেকে দেড় হাজার লোককে হত্যা করা হয়েছিলো। ছাত্রনেতা লতিফ, আমজাদ নামক জনৈক ব্যক্তি, মাসুম চৌধুরী, প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা, বাতাসু, এমাদাদুদ্দিন, কাদের সরকার প্রমুখ অনেক লোকই পাক বাহিনীর দ্বারা নিহত হয়েছেন।
২৮ শে মার্চ পাক বাহিনী প্রথম আক্রমণ করে কাঁটাখালী ব্রীজের আশেপাশের এলাকা। গ্রামের প্রায় কয়েক হাজার লোক ব্রীজটিকে অকেজো করে দেবার জন্য আসলে বগুড়া ক্যান্টনমেন্ট থেকে পাক বাহিনী খবর পেয়ে এগিয়ে আসে। স্বয়ংক্রিয় অস্র দিয়ে তারা ব্যাপক গুলি চালায়। এতে অকুলস্থলেই প্রায় ৬ জন শহীদ হয়। এই শহীদদের মাঝে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতা মান্নানের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। পাক বাহিনী চলে গেলে এ এলাকা আবার মুক্ত এলাকায় পরিণত হয়। এরপর ১৭ই এপ্রিল রংপুর ক্যান্টনমেন্ট থেকে একদল পাক সৈন্য ট্যাংক ও মর্টার নিয়ে এই এলাকা দখল করার জন্য এগিয়ে আসে। মুক্তিবাহিনী ও ইপিআর বাহিনীর প্রবল মর্টার আক্রমণের মুখে পশ্চাদপসরণ করে।
এরপর থেকেই মুক্তিবাহিনী বিচ্ছিন্ন অথচ সুপরিকল্পিতভাবে পাক বাহিনীকে আক্রমণ করেছে। মুক্তিবাহিনীর লক্ষ্য ছিলো রেলপথ, সড়ক সেতু অকেজো করে দেওয়া। এই তৎপরতায় মুক্তিবাহিনী ব্যাপক সফলতা অর্জন করে। ডিসেম্বরের প্রথমেই আমার এলাকা মুক্ত হয়। হিলি পুনর্দখল করে মুক্তি ও মিত্রবাহিনী এগোতে থাকলে পাক বাহিনী ফাঁসিতোলা নামক স্থানে তাদের গতিরোধ করে। সেখানে তুমুল ট্যাংক যুদ্ধ হয়। পাকবাহিনী বগুড়ার দিকে পশ্চাদপসরণ করার ফলে সম্পূর্ণ এলাকাটি মুক্ত হয়।
উল্লেখিত কাঁটাখালী ব্রীজের কাছে পাকবাহিনীর যে ঘাটি ছিলো সেখানে তারা বিভিন্ন এলাকা থেকে ধরে এনে মেয়েদের উপরে পাশবিক অত্যাচার করতো। এই এলাকায় প্রায় শ’খানেক মেয়ে নির্যাতিত হয়েছে বলে জানা গেছে।
মাসুম চৌধুরীকে হত্যার ঘটনাটিই আমার কাছে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য মনে হয়। এই প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা আমাদের এলাকায় সবচেয়ে সজ্জন ব্যাক্তি ছিলেন। কামাদিয়া হাট থেকে পাক বাহিনী তাকে ধরে। হাটের লোকদের জড়ো করে পাক বাহিনী মাসুম চৌধুরীকে নির্দেশ দেয় এদের মাঝ থেকে আওয়ামী লীগ কর্মীদের খুজে বের করে দিতে। বহু লোককে চেনা স্বত্বেও এই জনদরদি ব্যাক্তি কাউকেই আওয়ামী লীগ কর্মী হিসেবে চিহ্নিত করেন নি। এরপর পাকবাহিনী তাকে নিয়ে ক্যান্টনমেন্টে চলে যায়। স্বাধীনতার পর ক্যান্টনমেন্টের মাটি খুঁড়ে তার লাশ আবিস্কার করা হয়। এবং আশ্চর্য হয়ে আমরা প্রত্যক্ষ করি যে, দীর্ঘ সময়েও তার লাশে কোনো রূপ পচন ধরেনি। সম্পূর্ণ অবিকৃত লাশটিকে তুলে এনে আমরা তার পারিবারিক গোরস্তানে দাফন করি।
-শাহ জাহাঙ্গীর কবির
(সাবেক গণপরিষদ সদস্য, রংপুর)৭ জুন, ১৯৭৩
&nbsp;
<strong> </strong>
<a href=”https://www.facebook.com/zohir.rayhan.12″>জহির রায়হান</a>
&lt;১৫,৩৮,২৯৪-৯৮&gt;<h1>[সাঈদ-উর-রহমান]</h1>&nbsp;

১৯৭১ সালের ১লা মার্চ; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হিসেবে আমার শেষ দিন। ঐ দিন এম, এ শেষ পরীক্ষার মৌখিক পরীক্ষা। পরীক্ষার উত্তর দিতে দিতে বার বার শুনছিলাম করিডোর ও রাস্তায় ছাত্রদের মিছিলের শ্লোগান। পরীক্ষা শেষে হল ছেড়ে দেয়ার কথা ছিল। ভাবলাম আরো সপ্তাহখানেক থেকে পরিস্থিতির প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা নিয়ে বাড়ি ফিরব। সাত তারিখে শেখ মুজিবের ইতিহাস সৃষ্টিকারী বক্তৃতা ও নয় তারিখে মওলানা ভাসানীর পল্টন ময়দানের সভায় অংশ নিয়ে দশ তারিখে বাড়ি প্রত্যাবর্তন করলাম। পুনরায় পঁচিশ তারিখে ঢাকায় আসবো ও একেবারে হল ছেড়ে দেব; সে ধরনের চিন্তা মাথায় ছিল।
ছাব্বিশ তারিখের সকালে ইয়াহিয়ার বক্তৃতা বিমূঢ় করে দিল; সাহস ফিরে পেলাম পরদিন মেজর জিয়ার ঘোষণা শুনে। পরবর্তী এক মাস বাড়িতে কাটালাম। আমার বাড়ি কুমিল্লা শহর থেকে দুই মাইল উত্তরে; ভারত-সীমান্ত থেকে পাঁচ মাইল পশ্চিমে এবং রেল লাইনের একেবারে লাগোয়া। সুতরাং পাকিস্তানী সেনাদের অত্যাচারের প্রতিক্রিয়া প্রতিদিন দেখলাম।
মে মাসের প্রথম দিকে বুঝলাম; আমাদেরও বাড়ি ছাড়তে হবে। আমাদের বাড়ির মাইলখানেক উত্তরে ফকিরহাট রেল স্টেশন। ওখানে ঘাঁটি পেতেছে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী। তারা কুমিল্লা শহরে আসা-যাওয়া করে বাড়ির সামনের রাস্তা দিয়ে। দেশে থাকা আর নিরাপদ মনে হল না। মে মাসের শেষ দিকে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতেই চলে যাই।
দেশত্যাগ করে প্রথমে উঠলাম আত্মীয়ের বাড়িতে। ওখানে ছিলাম সপ্তাহখানেক। নিকটস্থ বক্সনগর যুবশিবির প্রতিদিন যেতাম ও দেখতাম মুক্তিযোদ্ধাদের শারীরিক কসরৎ। ক্যাম্পের পরিচালকমণ্ডলীর সঙ্গে পরিচয় হল। শিবির প্রধান অধ্যাপক আবুর রউফ আমার পুরনো পরিচিত। আমি চিন্তা করলাম আগরতলা যাবার। একদিন যুবশিবির থেকে পরিচয়পত্র সংগ্রহ করে ভোরবেলা রওয়ানা হলাম আগরতলার উদ্দেশ্যে। পার্বত্য ঘন জঙ্গলের মধ্যে আদিবাসীদের অধ্যুষিত এলাকার ভেতর দিয়ে প্রায় পনের মাইল হেঁটে দুপুরের দিকে শহরে উপনীত হলাম। আগেই জেনেছিলাম যে কলেজের মধ্যে পূর্বাঞ্চলীয় যুদ্ধক্ষেত্রের সমন্বয়কারীদের কয়েকজনের অফিস আছে- তাদের একজন ছিলেন আবদুল মান্নান চৌধুরী; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও আমার পুরনো বন্ধু। বিকালের দিকে মান্নান ভাইয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ হল এবং তিনি আমাকে পাঠালেন সোনামুড়ায়; রাজনৈতিক যুবকর্মীদের কেন্দ্রস্থল। সেখানকার প্রধান ছিলেন সৈয়দ রেজাউর রহমান- তিনিও ছিলেন আমার পূর্বপরিচিত। তিনি এবারে আমাকে পাঠালেন হাতিমারা যুবশিবির; শিবির প্রধানের কাছে চিঠি দিয়ে। সোনামুড়ায় একরাত কাটিয়ে পরদিন দুপুরবেলা আমি হাজির হলাম শিবিরে। যথারীতি অন্তর্ভুক্ত হলাম শিবির সদস্যরুপে। শুরু হল নতুন জীবন।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় রাজনীতির প্রত্যক্ষ কার্যকলাপে আমার কোন যোগ ছিল না; তবে বিশেষভাবে উৎসাহী ছিলাম মিছিলে; মিটিংয়ে। বিভিন্ন সংগঠনের মতপার্থক্য সম্বন্ধে জানলেও টার তীব্রতা আগে বুঝি নি।
হাতিমারা পার্বত্য ত্রিপুরার একটি পরিচিত অঞ্চল। জঙ্গল বেশ ঘন গভীর। উঁচু নিচু টিলা মধ্যে প্রবাহিত ছোট নালা; মাঝে মাঝে টিলায় পার্বত্য উপজাতি টিপরাদের বসতি। নিকটেই একটি বাজার ও প্রাইমারী বিদ্যালয়।
রাস্তার সামান্য দূরে শিবির। প্রথম শিবিরের প্রধান ফটক। ভেতরে সারি সারি ব্যারাকসমূহ। শাল গাছের খুঁটি, বাঁশের বেড়া ও শনের ছাউনি দিয়ে দীর্ঘ ব্যারাকসমূহ তৈরি। চারপাশে ছোট ছোট ঘর। কোনটি শিবির প্রধানের; কোনটি গুদাম। এসবে থাকেন বিভিন্ন দায়িত্বে নিয়োজিত পরিচালকবৃন্দ।
সুপারভাইজার এম, এ হান্নান সাহেব গোড়া থেকে সংশ্লিষ্ট। তিনি প্রথম শিবিরটি চালু করেন। শিবির প্রধান আফজাল খান আসেন আগস্টের মাঝামাঝি। তিনি কুমিল্লার সুপরিচিত ছাত্রনেতা। ছাত্র প্রতিনিধি হিসেবে ছিলেন ইমাম আবু জাহিদ সেলিম। আমি এসে পেলাম আমার এক পুরনো সহপাঠীকে- খায়রুল আলম বাদল। সামরিক প্রশিক্ষক হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন হাবিলদার মেজর আইউব।
শিবিরের প্রধান আকর্ষণ তরুন মুক্তিফৌজেরা। প্রতিদিন এরা আসছে। আর নাম লিখাচ্ছে মুক্তিবাহিনীতে। কেউ আসে সীমান্ত সংলগ্ন এলাকা থেকে কেউ আসে ঢাকা-ফরিদপুরের মতো দূরের এলাকা থেকে। এদের মধ্যে পনের বছরের কিশোর আছে। আবার পঁয়ত্রিশের যুবকও নজরে পড়ে।
হাতিমারা একটি যুবশিবির। দেশত্যাগী তরুণরা প্রথমত এসবে আশ্রয় নেয় ও প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহন করে। রাইফেল, স্টেনগান ও গ্রেনেড ছোড়া সম্পর্কে জ্ঞান দেয়া শরীরকে কষ্টসহিষ্ণু করে সামরিক শিক্ষার জন্য উপযোগী করে তোলাই এসবের লক্ষ্য। ছেলেরা সর্ববিধ কাজ নিজেরা করে। পানি আনা, রান্না করা, জ্বালানী সংগ্রহ, শিবির প্রহরা সবই নিজেদের করতে হয়।
কঠোর পরিশ্রমের সাথে সাথে খাওয়া-দাওয়া ও বিশ্রামের ব্যাপারে যথেষ্ট কঠোরতা পালন করা হয়। সকাল বেলায় নাশতা একটা আটার রুটি; সাথে কোনদিন সবুজ চা, বা অল্প ভাজি। দুপুরে বা সন্ধ্যায় এক বাসন ভাত, সাথে সামান্য ডাল বা তরকারি। ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলে মাসান্তে অর্ধেক ডিম বা দু’এক টুকরা মাংস বা মাছ পাওয়া যায়।
ছেলেরা থাকে বাঁশের মাচায়। কেউ এর উপর সতরঞ্চি বা চাদর বিছায়। বালিশ অনেকের নেই। বালিশের অভাবে কেউ কেউ মাথার নীচে কাপড়ের পুটুলি রাখে বা খাওয়ার প্লেটটি উপুড় করে দেয়। মশারি অধিকাংশের নেই। পানি খাওয়ার জন্য তারা ব্যাবহার করে মগ, কেটলি বাঁশের চোঙ্গা বা মর্টারের খোল। টিলার নিচে একটি টিউবওয়েল আছে। স্নান করে নালাতে। এতে পানি থাকে কখনো এক বিঘত, কখনো এক হাঁটু। বৃষ্টির দিনে নালার জল কর্দমাক্ত, অন্য সময় নির্মল।
সকাল সাতটায় শিবিরের কাজ শুরু। পতাকা উত্তোলন ও জাতীয় সঙ্গীতের পর ব্যায়াম শিক্ষক ক্লাশ নেন। পুরো এক ঘণ্টা চলে প্যারেড ও দৈহিক অনুশীলন। তারপর সামান্য বিরতি ও নাশতা। নাশতার পর আগ্নেয়াস্ত্র চালানোর শিক্ষাদানের ক্লাশ। বেলা দশটায় রাজনীতির ক্লাশ, এগারোটার দিকে পূর্ণ বিরতি।
বিকালের দিকে শিবির পুনরায় জেগে ওঠে। বেলা চারটে হতে প্যারেড ও দৈহিক ব্যায়াম করে খেলাধুলা শুরু হয়। শিবিরে আছে দুটো ভলিবল। সন্ধ্যার দিকে ছেলেরা আসর জমায় অফিসের সামনে খোলা যায়গায়। দুটো জারুল গাছকে ঘিরে বাঁশের মাচা তৈরি হয়েছে। তার ওপরে তারা বসে। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অনুষ্ঠান শুরু হয় সন্ধ্যা সাতটা থেকে। অনেকেই অপেক্ষা করে চরমপত্রের জন্য। এরপর ক্যাম্প নির্জন ও নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে।
শিবিরের কাজকর্মে চাঞ্চল্য আসে যেদিন কোন বিখ্যাত অতিথি আসেন বা রিক্রুটের জন্যে সামরিক কর্তার আগমন ঘটে। এমপি বা এমএনএ-রা আসেন, ছেলেদের সঙ্গে কথা বলেন, আশ্বাসের কথা শোনান। রিক্রুটিং অফিসার আসেন, ট্রেনিং-এর জন্য ছেলে নির্বাচন করেন। দল বেঁধে ওরা চলে যায় আসামে বা দিল্লিতে। বাকি ছেলেরা অশ্রুসজল চোখে তাদের বিদায় জানায় আর ভাবে কবে নিজেদের সুযোগ আসবে।
ক’দিন পরে আমি সেলিম ভাইয়ের কাছে বললাম আমার প্রশিক্ষনের কথা। এমনিতেই কর্মহীন জীবনে বিরক্ত হয়ে উঠেছিলাম। তিনি আমাকে একটি বড় আশা দিলেন। সাধারণ মুক্তিযোদ্ধাদের চেয়ে আরো বড় একটি প্রশিক্ষণের ব্যাবস্থা আছে বিশেষ কারো ক্ষেত্রে। দেরাদুনে জেনারেল ওভানের নেতৃত্বে তাদের ট্রেনিং দেয়া হয়। এদের নাম বেঙ্গল লিবারেশন আর্মি। যুদ্ধান্তে এদের মধ্য থেকে নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজে নিয়োগ করা হবে। তিনি ভরসা দিলেন যে আমাকে ঐ দলে অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ তিনি এনে দিবেন। আমি আশায় আশায় থাকি।
হাতিমারা এলাকায় যুদ্ধের দায়িত্বে ছিলেন ক্যাপ্টেন দিদারুল আলম। তাঁর সঙ্গে পরিচয় হল। প্রায়ই তিনি বাদল ও আমাকে ডেকে পাঠাতেন তাঁর তাবুতে। তিনি ছিলেন বাংলা সাহিত্যের ভক্ত ও মাওলানা ভাসানীর অনুসারী। তাঁর সঙ্গে আলোচনা করতাম বাংলা সাহিত্যের সাম্প্রতিক অবস্থা সম্পর্কে। রাতটা ওখানে কাটিয়ে ফিরতাম পরদিন।
কিছুদিন পরে ফজলুর রহমান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও আমার জ্ঞাতি ভাই ফিরে এল দেরাদুন ট্রেনিং নিয়ে। আমাদের ক্যাম্পেই উঠল। সে জানতে চাইল বাড়ির খবরাখবর; আমি জানতে চাইলাম ট্রেনিং এর খবর। আমি ঐ ট্রেনিং-এ যেতে চাই শুনে সে আতংকিত হল। বলল এই ট্রেনিং শুধুমাত্র বিশ্বস্ত বাছাই করা মুজিবভক্তদের জন্য। স্বাধীনতার পর মুজিব-রাজত্ব নিরঙ্কুশ করার কাজে এদের ব্যবহার করা হবে। আপনি যেহেতু ভিন্ন আদর্শে বিশ্বাসী সেজন্য আপনার যাওয়ার প্রশ্নই উঠে না। দেরাদুন যেতে পারলেও; কোনভাবে আপনার মতিগতি জানতে পারলে পরিণতি বিপদজনক হবে। সুতরাং এখানে আছেন ভাল। চুপচাপ থাকেন ও সময় কাটান।
কিন্তু সময় আর কাটেনা। ঠিক করলাম একবার বাড়িতে যাব। ক’দিন ধরে শুনছিলাম; এই শিবির পার্বত্য ত্রিপুরার আরো ভেতরে সরিয়ে নেয়া হবে। তাহলে বাড়ির সঙ্গে যোগাযোগ একেবারে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। সেজন্য একদিন সকালবেলা রওয়ানা হলাম দেশের দিকে।
বারটার দিকে বাংলাদেশের ভেতর ঢুকলাম। গ্রামের পর গ্রাম নির্জন; পরিত্যাক্ত। উঠোনে ঘাস গজিয়েছে। বাইরের উনুনগুলো ভেঙে পড়েছে। কলাগাছে পাকা কলা, খাবার লোক নেই। একটি বাড়িতে ডাব গাছ দেখে প্রবল তৃষ্ণা পেল। আমার সঙ্গী ছিল আমাদের পাশের বাড়ির রহিম। সে গাছে উঠার উপক্রম করতে বাড়ির ভেতর থেকে বেরিয়ে এলেন শীর্ণকায় বৃদ্ধ। তিনি ঘর থেকে ডাব ও বঁটি এনে দিলেন। পরিতৃপ্তি সহকারে তৃষ্ণা নিবারণ করে আমরা যাত্রা করলাম। আছরের নামাজের সময় বাড়িতে পৌঁছলাম। মা তাড়াতাড়ি ভাত বেড়ে দিলেন, আমি গেলাম পুকুরঘাটে গোসল করতে।
হঠাৎ চিৎকার উঠল মিলিটারী আসছে। ফকিরহাট ঘাঁটি থেকে রওনা দিয়ে তারা আমাদের গ্রামে এসে গেছে। দিলাম দৌড় পশ্চিম দিকে-মাঠ পেরিয়ে রেল লাইন অতিক্রম করে যেতে পারলে জানে বাঁচা যাবে। মাঠে পৌঁছে দেখলাম মাঠ ভর্তি লোক। সবাই দিগ্বিদিক ছুটছে। বালক-বালিকা, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, নারী পুরুষ সবাই ছুটছে। আমার সাত বছরের ছোট বোন নুরুন্নাহারও কাপড়ের একটি পুটুলি নিয়ে মা ও চাচীদের পেছনে দৌড়ুচ্ছে।
মাইল দুয়েক দৌড়ুনোর পর আপাতত নিরাপদ স্থানে পৌছা গেল। তখন সন্ধ্যা হয় হয়। ক্ষুধায় ও পরিশ্রমে এত অবসন্ন ছিলাম যে ধান ক্ষেতের আলের উপর শুয়ে পড়লাম। অনেক পরে, রাতের অন্ধকারে সন্তর্পণে ফিরলাম বাড়িতে। তার দুদিন পর আবার হাতিমারা।
সম্ভবত আগস্ট মাসের শেষাশেষি শিবির সরিয়ে নেয়া হয় পদ্মানগরে- আরো পনের বিশ মাইল অভ্যন্তরে। পূর্বোল্লিখিত বক্রনগর ক্যাম্পও একই জায়গায় নিয়ে আসা হয়। ইতিমধ্যে আমি ট্রেনিং এর আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম; সুতরাং কর্তৃপক্ষ আমাকে Political Motivator হিসেবে কাজ করার সুযোগ দেন। প্রতি সপ্তাহে আমাকে একটি করে বক্তৃতা দেয়ার কথা বলা হল- উদ্দেশ্য ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের রাজনৈতিকভাবে দীক্ষিত করা। এ কাজ করার জন্য আমি ছোট একটি গ্রন্থাগার তৈরি করলাম এবং নিজেও পড়াশোনায় মন দিলাম। শিবিরের বাইরে একটি স্থান নির্বাচন করে নিলাম- প্রায় দুপুর কাটতো সেখানে। বক্তৃতায় আমি বললাম মুক্তির কথা – ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম’- ঐ কথার উল্লেখ করে। ছেলেরা বেশ আগ্রহের সঙ্গে শুনত। কোনদিন হয়তো বলতাম সন্ত্রাসবাদী বিপ্লবের কথা- চারু মজুমদার ও চে গুয়েভারার রণকৌশলও আলোচনায় আসত। সমাজতন্ত্র মানে, ইতিহাসের বিকাশ, শোষণ-মুক্ত প্রভৃতি সরল ভাষায় বলার চেষ্টা করতাম।
সেপ্টেম্বর মাসে বাড়ির দুটো দুঃসংবাদ পাই। আমাদের গ্রামের বাড়িটি পুড়িয়ে দিয়েছে মিলিটারিরা, বিশেষ করে পুড়িয়েছে চাচার বছরখানেক আগে নির্মিত সুদৃশ্য বাড়িটি। আমাদের ঘরগুলো অধিকাংশ পুড়ে গেছে- একটি ঘর শুধু রক্ষা পেয়েছে। জ্ঞাতি ভাই ফজলু ও নুরুদের সব ভস্মীভূত হয়ে গেছে (এরা মুক্তিযোদ্ধা ছিল)। দ্বিতীয়টি হল যে আব্বাকে, চাচাকে ও চাচাতো ভাইদের ধরে নিয়ে গিয়েছিল। প্রচুর নির্যাতন করেছে; তবে কেন জানি প্রাণে মারেনি। আমাদের বাড়ির লোকেরা অন্যত্র কোথাও আশ্রয় নিয়েছে।
&nbsp;
অক্টোবর মাস থেকে ভাল খবর পেতে লাগলাম। বাড়ি থেকেও সুসংবাদ পেলাম। ফকিরহাটের ঘাঁটি ছেড়ে পাকিস্তানী বাহিনী চলে গেছে। গাঁয়ের সবাই বাড়িতে ফিরেছে। যুদ্ধেরও নাটকীয় মোড় ফেরা লক্ষণীয় হয়ে উঠল। রাজনৈতিক নেতাদের আলাপে সালাপে মনে হল শুভ দিন সন্নিকটে। চট করে মনে পড়ল ক্যাপ্টেন দিদারুল আলমের তাঁবুতে এক ভারতীয় মেজরের কথা। তিনি বলেছিলেন যে আমরা ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফিরতে পারবো বলে তিনি আশা করেন।
তারপরে শুরু হল চূড়ান্ত যুদ্ধ। ডিসেম্বরের সাত তারিখে আমাদের শিবির বন্ধ বলে ঘোষিত হল। ছেলেরা রওয়ানা হল যার যার দেশে। আমি যাত্রা করলাম নয় তারিখে। সোনামুড়ার চৌকি দিয়ে কুমিল্লা প্রবেশ করলাম। সন্ধ্যায় হাজির হলাম নিজ বাড়িতে। পৌষের প্রসন্ন ভোরবেলায় আবার জমজমাট হয়ে উঠল অগ্নিদগ্ধ বাড়ির ভিটে।
-সাঈদ-উর রহমান(সহকারী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়)জানুয়ারি; ১৯৮৪
&nbsp;
&nbsp;
<a href=”https://www.facebook.com/hemlok1?fref=ts”>গুরু গোলাপ</a>
&lt;১৫,৩৯,২৯৮-৩০২&gt;<h1>[অধ্যাপক সারওয়ার মুর্শেদ]</h1>&nbsp;
প্রথমে স্বায়ত্তশাসন আন্দোলনের পর্যবেক্ষক এবং পরে এই আন্দোলনের একজন সক্রিয় অংশগ্রহণকারী হিসেবে, সেই সংগে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছয়দফা ভিত্তিক খসড়া গঠনতন্ত্র প্রণয়ণকারি গ্রুপের সদস্য হিসেবে ২৫শে মার্চের বেশ আগেই উপলব্ধি করেছিলাম রক্তপাত হবেই, পাকিস্তানের কাঠামোতে স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করার গঠনতন্ত্র প্রণয়ন সম্ভব হলেও তা কাগজে নক্সা হয়েই থাকবে।এবং স্বাধীনতা যুদ্ধ অনিবার্য। বঙ্গবন্ধুর “এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম” ঘোষিত হল,তখন পাকিস্তানিদের বাংলাদেশে গণহত্যার পরিকল্পনা সমাপ্ত হয়েছিল। জাহাজ বোঝাই সমরসম্ভার এবং সাদা পোষাকে বিমানযোগে পাকিস্তান থেকে অতিরিক্ত সৈন্য আমদানি,ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ স্থান সমুহে মেশিনগান এবং কামানের নগ্ন উপস্থিতি। মুজিব-ইয়াহিয়ার আলোচনা সম্পর্কে সন্দেহ বাঙালিদের বিরুদ্ধে একটি সর্বাত্মক অভিযান আসন্ন;এ ধারণাকে আমার মনে দৃঢ়মূল করেছিল।
এসময়ে আমার মনকে একটি প্রশ্ন জিজ্ঞাসাসস্কুল করেছিল:বাঙালি জাতি উদ্বেলিত প্রত্যয় এবং প্রচন্ড আবেগে ঐক্যবদ্ধ এবং অগ্নিগর্ভ, একটি সশস্ত্র সংগ্রাম এবং প্রতিরোধের জন্য,সংগঠন এবং আয়োজনের দিক থেকে তৈরি কি? মার্চের মাঝামাঝি সময়ে এই প্রশ্নের ইতিবাচক জবাব দেয়া সহজ ছিল না। চূড়ান্ত সংগ্রামের প্রস্তুতির জন্য তথা কৌশলগত কারণে সাময়িকভাবে ছ’দফার দাবীকে কিছু নমনীয় করা যুক্তিযুক্ত নয়? কিন্তু একই সংগে এও বুঝেছিলাম যে আন্দোলনের রাশ টেনে ধরার কঠিন ঝুঁকি নেয়া হলেও সেই মুহূর্তে ইতিহাস তার গতি মন্থর করবে। স্বাধীন বাঙালি সত্তার শত্রুরা বাঙালিদের সময় দেবে, এমন চিন্তার কোন নিশ্চিত ভিত্তিও নেই।
সুতরাং গঠনতান্ত্রিক আলাপ আলোচনার আড়ালে পাকিস্তান সামরিক বাহিনী বাংলাদেশে যে একটি মৃত্যুযজ্ঞের আয়োজন করেছিলো,এ বিষয়ে বিশ্বজনমতকে অবহিত করার প্রচেষ্টা আমার কাছে প্রাধান্য পেল। ফরাসী দার্শনিক জ্যাঁ পল সার্ত্রে, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও বিশ্রুত অর্থনীতিবিদ জন কেথে গলব্রেথ,সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি এবং টাইমস ও নিউইয়র্ক টাইমসের সম্পাদকসহ আরো অনেকের কাছে এ বিষয়ে আমি তারবার্তা পাঠাই। এবিষয়ে আরো উল্লেখ্য যে কিসিঞ্জার-নিক্সনের পাকিস্তান সমর্থনের নীতি এবং বাংলার মাটিতে পরাশক্তি সমূহের অস্ত্রের উপস্থিতি এবং পাকিস্তানি শাসকদের বাংলার নিরস্ত্র জনগণের বিরুদ্ধে তা’ ব্যবহারের ক্রুর সম্ভাবনা কিভাবে বাংলার মানুষকে বিপন্ন জনগণের বিরুদ্ধে তা’ জানাবার জন্য পূর্বপরিচয়ের সুত্র ধরে প্রফেসর হেনরী কিসিঞ্জারকে আমি ১৬ মার্চ একখানা চিঠি লিখি। চিঠির অনুলিপি নিচে সন্নিবেশিত হলোঃ
“I am writing to you at a moment of grave peril to my people. Yahya has moved in guns and tanks apparently to reinforce his and mr. Bhutto’s constitutional arguments. There has already been a good deal of wanton killing and move is promised by the situation.The holocaust that seems all but inevitable will destroy many bengali lives and much else. it is clear to us that this country can not survive the application of force and that the resulting chaos and instability in wide area was in the subcontinent will benefit neither our friends nor our enemies.
We want the world to know that a military solution to our constitutional problem is not only liable to be barren and disastrous; but it is unnecessary. A political settlement is possible; provided the bengali demand for changing the colonial pattern of the relationship between the two wing was accepted by writing a constitution for the country, which would give them complete control over their economic resources. But of course; Mr. Bhutto; backed by army and the economic interests responsible for the deprivation of the bengalis for the post twenty three years; continued to oppose this.
The situation therefore has the element of a sophoclean tragedy; with this difference that its denouement would affect the fate of real human beings who number seventy five millions. What looms large in one’s mind at the moment of the bristling array of weapons to be seen in Bangladesh today and what they augur. These weapon ; American; Russian and Chinese in origin are to be used against an unarmed people. Bengalis are united as never before their history in their resolve to replace the old system of relationship in the country. Paradoxically, this make the threat of massive use of force by Islamabad more real; for it has no other way to imposing its will on the Bengalis ; although every dictate of sanity is against it.
I should like to appeal all men of goodwill; and you are a man of goodwill in high office in America; to do all they can to help avert this cruel possibility involving fellow human beings.
I am writing this letter to you as a teacher and as one who had the great good fortune and honour of knowing you and feel sure that you could sympathies human aspect of our crisis. You would earn our eternal gratitude if you would exert your influence and help prevent the threatened mass slaughter of men, women and children in East Pakistan. “
-(The weekly Web; 25 March 1973)
(অনুবাদ)
&nbsp;
আমার আমার লোকেদের ভীষণ বিপদের সময় তোমাকে লিখতে বসেছি। ইয়াহিয়া স্পষ্টতই তার এবং ভুট্টোর সাংবিধানিক মতাদর্শ টিকিয়ে রাখার জন্য অস্ত্র এবং ট্যাংকের আশ্রয় নিতে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে যথেষ্ট পরিমাণে নির্বিচার হত্যা শুরু হয়ে গেছে এবং অবস্থাদৃশ্যে তা চলমান থাকবে। ভয়াবহ গণহত্যা দেখে মনে হচ্ছে এতে অনিবার্যভাবে আরো অনেক কিছুর ধ্বংসের সাথে প্রচুর বাঙালি মারা পড়বে। এটা আমাদের কাছে স্পষ্ট যে এই দেশ জবরদস্তী সহ্য করতে পারবে না এবং এই জবরদস্তীর পার্শপ্রতিক্রিয়া হিসেবে এই উপমহাদেশ যে বিশৃঙ্খলা এবং ভারসাম্যহীনতা তৈরি হবে তা আমাদের বন্ধু বা শত্রু কারো জন্য লাভজনক হবে না।
&nbsp;
আমরা বিশ্ববাসীকে জানাতে চাই যে আমাদের সাংবিধানিক সমস্যার মিলিটারি সমাধান শুধু নিষ্ফল এবং সর্বনাশা নয় বরং এটা একেবারেই অপ্রয়োজনীয়। একটা রাজনৈতিক সমাধান সম্ভব হতো, যদি বাঙালিদের দাবী মেনে নিয়ে বর্তমানে চলমান ঔপেনিবেশিক কাঠামো পরিবর্তন করে দেশের দুই পক্ষের মধ্যে সম্পর্কের রীতি সাংবিধানিকভাবে বদলে অর্থনৈতিক বিষয়সমূহে উভয়পক্ষকে নিজ নিজ প্রদেশে পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হতো। কিন্তু বিগত ২৩ বছর যাবৎ বাঙালিদের বঞ্চনার জন্য দায়ী অর্থনৈতিক বিষয়াদি। আর্মি সমর্থনপুষ্ট জনাব ভুট্টো তাই ক্রমাগত এর বিরোধিতা করে যাচ্ছিলেন।
&nbsp;
এই পরিস্থিতিতে যে কোন দুঃখজনক ঘটনা ঘটার সমূহ উপাদান রয়েছে। এরকম চলতে থাকলে শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের ভাগ্য এতে আক্রান্ত হবে যাদের সংখ্যা সাড়ে সাত লক্ষ। এমন যুদ্ধ সরঞ্জাম দেখে মাথায় একটা ব্যাপারই গুটি পাকাতে থাকে যে এগুলো কিসের ভবিষ্যৎ বাণী করছে? অ্যামেরিকা, রাশিয়া এবং চায়নাতে তৈরি এই সব অস্ত্রসমুহ নিরস্ত্র মানুষের উপর ব্যবহার হবে। ইতিহাসের আগের যে কোন সময়ের থেকে বাঙালি ঐক্যবদ্ধ এবং দুই দেশের মধ্যকার সনাতন কাঠামো পরিবর্তনে বদ্ধপরিকর। অপরপক্ষে এটা ইসলামাবাদ কর্তৃক ব্যাপক বল প্রয়োগের সম্ভাবনাকে আরো বাস্তবসম্মত করে তুলছে, বাঙালীদের উপর তাদের নেতৃত্ব খাটানোর এছাড়া আর কোনই পথ নেই; যদিও সকল সদবিবেচনা এর বিপক্ষে যাবে।
&nbsp;
আমি সকল সহৃদয় মানুষের কাছে আপিল করব এবং আপনি আমেরিকার উচ্চ পদস্থ একজন সহৃদয় মানুষ; মানুষের উপর এই নিষ্ঠুর সম্ভাবনা প্রতিহতে সম্ভব সকল ব্যবস্থা করবেন।
&nbsp;
আমি এই চিঠিটা আপনাকে একজন শিক্ষক হিসেবে লিখছি যে কিনা আপনার সাথে পরিচিত হয়ে সৌভাগ্য এবং সম্মানের অধিকারী হয়েছে এবং আমি নিশ্চিত যে আমাদের বিপদের মানবিক দিকটি আপনি সহানুভূতির সাথে দেখবেন। যদি আপনি আপনার প্রভাব বিস্তার করে পূর্ব পাকিস্তানের নারী পুরুষ এবং শিশুদের নির্বিচার গণহত্যা প্রতিহত করতে পারেন, তবে এর মধ্যদিয়ে আপনি অর্জন করবেন আমাদের শ্বাশত কৃতজ্ঞতা।
&nbsp;
দা উইকলি ওয়েভ
২৫ মার্চ, ১৯৭৩
চীন-আমেরিকা সম্পর্ক পুনঃনির্মাণের সেতু হিসেবে পাকিস্তানকে ব্যবহারের নীতির অন্যতম স্থপতি হেনরী কিসিঞ্জার যে বাংলাদেশের ঘটনাক্রমের উপর কোন শুভ প্রভাব বিস্তার করেননি তা’ আজ বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে আমার এই চিঠির একটি sequel (অনুবাদঃ পরবর্তী পর্ব) আছে যার উল্লেখ প্রাসঙ্গিক। এ চিঠির কয়েক মাস পর কিসিঞ্জার নয়া দিল্লিতে এলে আমি তাকে পশ্চিম বাংলায় আমাদের শরণার্থী শিবির গুলোতে এসে আমারিকার পাকিস্তান নীতির ফলাফলের একটি দিক স্বচক্ষে দেখে যেতে আমন্ত্রণ জানাই। মানবিক বা নৈতিক প্রশ্নে সম্পূর্ণ উদাসীন এই ধুরন্ধর কূটনৈতিক এবার আমার চিঠির জবাব দিলেন এবং সবিনয়ে সময়াভাবহেতু আমার আমন্ত্রণ রক্ষা করতে পারলেন না বলে দুঃখ প্রকাশ করলেন।
২৫শে মার্চের কালো রাত্রের পর যখন ভাগ্যক্রমে বেঁচে গেলাম তখন সিদ্ধান্ত নিলাম সম্মানের সাথে বেঁচে থাকার জন্য নিজের শক্তি অনুযায়ী স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ নিবো।
বিশ্ববিদ্যালয় আবাসিক এলাকা ছেড়ে কিছুদিন আত্নগোপন করে থাকার পর যখন দেখলাম আশ্রয়দানকারীর সংখ্যা দ্রুত কমে আসছে তখন একদিন নরসিংদীর পথে ভারত সীমান্তের দিকে রওয়ানা হই। ৪ঠা এপ্রিল কি ছিল সেই দিনটি? তিতাসের ওপারে এক মেঘাচ্ছন্ন সকালে যখন আমি পরিবারসহ সিংগারবিল যাওয়ার পথ খুঁজছি দ্বৈবক্রমে আমার এক প্রাক্তন ছাত্র আমাকে দুর থেকে দেখতে পেয়ে কবি সানাউল হকের বাংলোয় নিয়ে আশ্রয় দেয়।এবং নদীর ওপারে ব্রাক্ষণবাড়িয়ার উপর পাকিস্তানি প্লেন থেকে কয়েক দফা গুলি বর্ষিত হয় সেদিন সন্ধ্যায় স্ত্রী এবং চার পুত্র কন্যা সীমান্ত অতিক্রম করে আগরতলার দিকে রওনা হই। সম্ভবতঃ সেই দিনটি ছিল ১৪ এপ্রিল।
ভারতে অবস্থানকালে আমার তৎপরতাকে তিন ভাগে ভাগ করা যেতে পারেঃ(১) পরিকল্পনা কমিশনের সদস্যের দায়িত্ব পালন।(২) অস্থায়ী সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে ভারতের অভ্যন্তরে নানা সমাবেশ এবং সেমিনারে বাংলাদেশ আন্দোলনের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করা;(৩) বাংলাদেশ শিক্ষা সমিতির প্রথমে আহবায়ক; পরে কোষাধ্যক্ষ হিসেবে প্রয়োজনমত মুক্তি সংগ্রামের লক্ষ্যে সমিতির স্বতন্ত্র কার্যক্রমে অংশগ্রহণ।এছাড়াও ঐ সময়ে অস্থায়ী সরকারের প্রধানমন্ত্রী জনাব তাজউদ্দীন আহমেদের কোন কোন বক্তৃতা ও নীতিবিষয়ক প্রতিবেদনের খসড়া ইংরেজিতে তৈরি করে দিয়েছি বা প্রয়োজনমত বাংলায় করতেন ডক্টর আনিসুজ্জামান।
বাংলাদেশ আন্দোলনের পটভূমি এবং তাৎপর্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আমার কয়েকটি জায়গায় স্মরণীয় অভিজ্ঞতা হয়েছিল। এখানে তা উল্লেখ করবো। আসামের বুদ্ধিজীবীরা “স্বাধীন বাংলাদেশের তাৎপর্য” বিষয়ে শিলং সরকারি কলেজের মিলনায়তনে একটি সেমিনারের আয়োজন করেছিলেন। এতে সভাপতিত্ব করেছিলেন আসাম সরকারের তৎকালীন অর্থমন্ত্রী শ্রী ত্রিপাঠী।
আমি সে উপলক্ষে যা বলেছিলাম তা’ সংক্ষেপে এইঃউপমহাদেশে দুটি দেশ; ভারত এবং বাংলাদেশ; খুব স্বাভাবিক কারনে পরস্পরের বন্ধু হবে। ভারত বিভক্ত হওয়ার পর ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ভূগোলের দিক দিয়ে যথেষ্ট নৈকট্য থাকা সত্বেও ভারত এবং পাকিস্তান স্বাভাবিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে নি।পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ও সমরবাদীর ভারত বিদ্ধেষকে তাদের স্বৈরশাসন এবং অর্থনৈতিক শোষনের স্বার্থে জিইয়ে রেখেছে। স্বাধীনতার পর নতুন বাংলাদেশ রাষ্ট্র এবং ভারতের মধ্যেকার সম্পর্কের ভিত্তি হবে পরিণত কান্ডজ্ঞান প্রবুদ্ধ স্বার্থচেতনা এবং পারস্পারিক সম্ভ্রন্ত এবং এই প্রক্রিয়ায় ইতিহাসের একটি বড় রকমের বিকৃতি দুর হবে। দু দেশের যৌথ নদনদী। সহজ যাতায়াতের প্রয়োজন অর্থনৈতিক আদানপ্রদান ও সহযোগীতার প্রশ্নাতীত যৌক্তিকতারও তা’ই দাবী করে। বাংলার স্বশস্ত্র সংগ্রামে ভারতের সহায়তা আমাদের বিপুলসংখ্যক শরণার্থীদের ভারতে আশ্রয় দান; একটি বড় গণতান্ত্রিক দেশের অন্য একটি গণতন্ত্রকামী মানবগোষ্ঠীর প্রতি এ মহানুভব সমর্থন। এই নতুন সম্পর্কের শুভসূচনা। শুধু একটি কথা; ভারত আয়তনে,সম্পদে,শক্তিতে একটি বড় দেশ আর বাংলাদেশ সেসব দিক থেকে ক্ষুদ্র। এ অসমতা যেন দু’দেশের স্বাভাবিক বন্ধুতার পথে কোনদিনও অন্তরায় সৃষ্টি করতে না পারে সে বিষয়ে দু’দেশকে সজাগ থাকতে হবে।“
বক্তৃতা শেষ হলে মন্ত্রী মহোদয় আসন ছেড়ে এসে আমায় অভিনন্দন জানিয়ে করমর্দন করেন এবং শ্রোতা বৃন্দও আমার বক্তব্য ও তার আন্তরিকতা সম্পূর্ণ হৃদয়ঙ্গম করেছিলেন বলে আমার বিশ্বাস।
কিন্তু ভারতীয় গোয়েন্দা বিভাগের লোকজন এক আজব কান্ড করে বসে। তারা তাদের কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো রিপোর্টে দাবী করে যে বাংলাদেশ থেকে আগত এক নরাধম অধ্যাপক ভারতকে সোভিয়েট ইউনিয়ন এবং ভবিষ্যতের বাংলাদেশকে হাঙ্গেরী রুপে কল্পনা করে ভারতকে প্রতিবেশী দমনেচ্ছু আগ্রহী শক্তিরুপে চিত্রিত করেছে। পশ্চিমবঙ্গের কয়েকজন প্রভাবশালী যারা আমাকে জানতেন; আশ্রয়দানকারী সরকারের বিরাগ থেকে সে যাত্রা আমায় রক্ষা করেন।
আরেকটি অন্য ধরনের স্মরণীয় অভিজ্ঞতা আমার হয়েছিল অন্ধ্রপ্রদেশের এক দরিদ্র মুসলিম পল্লীতে বাংলাদেশের মানুষের সংগ্রামের কথা বলতে গিয়ে। এই স্বল্পশিক্ষিত গরীব মুসলমানদের কাছে পাকিস্তান ছিল একটা বিশ্বাস এবং কল্পনার স্বর্গ; তারা সেখানে কোনদিন যেতে পারবেনা; তবুও যে স্থানটি তাদের মনের মধ্যে লুকোনো আশ্বাস এবং নিরাপত্তা। অনেক্ষন বক্তৃতার পরও দেখলকম মানুষ গুলো পাহাড়ের মত নিরব নিরুত্তাপ, তাদের চোখে শীতল ক্রোধের কাঠিন্য। কিন্তু এক আশ্চর্য ব্যাপার ঘটে গেল যখন আমি তাদের দিকে সঙ্গীনের মত কয়েকটি প্রশ্ন উদ্যত করলাম এবং জানতে চাইলাম ইসলামে কোন নির্দেশ আছে ধর্মের নামে কোন মুসলমান সৈনিক পিতার সামনে কন্যাকে ধর্ষণ করতে পারে, লুন্ঠন, অগ্নীসংযোগ, নারী এবং শিশু হত্যা করতে পারে? প্রশ্নের পর পাকিস্তানি বর্বরতার কিছু বর্ণনা, তারপর আবার প্রশ্ন করলাম, এরই নাম কি ইসলাম?এই পাকিস্তানই কি আপনার প্রিয় পাকিস্তান? ‘না’ ভঙ্গীতে অনেকগুলা হাত একসঙ্গে উঠে গেল। আমার সে সন্ধ্যার বক্তৃতা শেষ হওয়ার আগেই পাথর গলেছিল; সেই সরল বিশ্বাসী মুসলমানরা বুঝেছিল; কেন বাঙালিরা পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছিল।
স্বাধীনতাযুদ্ধের স্বপক্ষে কার্যক্ষেত্রে মুজিবনগর সরকারের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল এবং সরকার সংশ্লিষ্ট তৎপরতার বাইরেও বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির কাজের সংগে যুক্ত ছিলাম, এই কথা আগেই উল্লেখ করেছি। শুধু একটি ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত উদ্যোগে কাজ করেছি – সেটা হল সংবাদ মাধ্যমে আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিদের সংগে সহযোগিতা।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রফেসর শিক্ষাবিদ ও বিশিষ্ট ব্যক্তি যাদেরকে বুদ্ধিজীবি বলেও আখ্যায়িত করা হয়, ভারতে অবস্থানকালে বাংলাদেশ আন্দোলন ভিত্তিক তাদের একটা আলাদা অস্তিত্ব বা তাদের মধ্যে স্বতন্ত্র রকম সংহতি ছিল বৈকি বাংলাদেশ শিক্ষক সমতি স্বতন্ত্র সংহতির একটা দৃষ্টান্ত।
দিল্লি আন্তর্জাতিক সেমিনারে পাঠ করার জন্য “The nature of Bengali Nationalism” (অনুবাদঃ বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রকৃতি) শিরোনামে আমাকে একটি Paper (অনুবাদঃ প্রবন্ধ) তৈরি করার অনুরোধ জানানো হয়েছিলো, তবে সেই সেমিনারে যোগ দিতে আমি অসমর্থ হই। কিন্তু প্রবন্ধটির জন্য যে কাজ শুরু করেছিলাম তা’ বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি অনুমোদিত গবেষণা প্রকল্পের রুপ নেয়। perspectives of Bengal (অনুবাদঃ বাংলার প্রেক্ষাপট) শিরোনামে রচিত এই গবেষণা প্রকল্পের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল বাঙালি জাতিয়তাবাদের প্রকৃতি ও উৎস নিরূপণ করা।
মুজিব নগর সরকার একটি পরিকল্পনা কমিশন গঠন করেছিলেন। একটি Long term (দীর্ঘ মেয়াদী) একটি Mid term (মধ্য মেয়াদী) এবং একটি Short term (স্বল্প মেয়াদী) প্ল্যান তৈরি করার দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল এই কমিশনকে। আমি এই কমিশনের একজন সদস্য ছিলাম। কোন দীর্ঘ মেয়াদী বা মধ্য মেয়াদী প্ল্যান নিয়ে কমিশন সদস্যদের মধ্যে কোনও গভীর বা ধারাবাহিক আলোচনা বা বিতর্ক হয় নি। তবে কিছু স্বল্প মেয়াদী প্ল্যান নিয়ে মতবিনিময় হয়েছে- যেমন যুদ্ধ শেষে বিধ্বস্ত শিক্ষা ব্যাবস্থা এবং মুক্তিযোদ্ধাদের পুনর্বাসন বিষয়টি বং এর কোন কোনটি নীতিগতভাবে গৃহীত হয়েছিল। (মনে পড়ে তরুন মুক্তিযোদ্ধাদের পুনর্বাসন সমস্যা বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের জন্য একটি সমীক্ষা আমার তত্ত্বাবধানে শুরু হয়েছিল)। অস্থায়ী সরকার আওয়ামীলিগের পুরো আদর্শগত বর্ণালী ধারক হিসেবে স্বাভাবিকভাবেঈ যুদ্ধ জয়ের শেষে এক কোটি শরণার্থীসহ গৃহে প্রত্যাবর্তনের লক্ষ্যকেই প্রাধন্য দিয়েছিল। তার কাছ থেকে কোন দীর্ঘমেয়াদী এমনকি মধ্যমেয়াদী পরিকল্পনা তৈরির ভিত্তিগত দিকনির্দেশ পাওয়া সম্ভব ছিল না। কার্যতঃ তা পাওয়াও যায় নি। মৌলিক বিষয়ে, আমার বিশ্বাস কমিশনের সদস্যরাও একমত পোষণ করতেন না। স্বাধীন বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক হবে এমন একটি সাধারণ ধারণা প্রচলিত ছিল কিন্তু সংসদীয় গণতন্ত্র ও মিশ্র অর্থনীতির কাঠামোর মধ্যে সে সমাজতন্ত্র আবদ্ধ থাকবে, না ভূমির ব্যাক্তি মালিকানা বাতিল বা পুনর্বন্টনের পথে আরো সুদূরগামী হবে, এ জাতীয় প্রশ্নের মীমাংসা যুদ্ধরত অস্থায়ী সরকার দেন নি। সুতরাং কতগুলো অবিতর্কমূলক স্বল্পমেয়াদী পরিকল্পনাতে কমিশন নিজের কাজকে সীমাবদ্ধ রেখেছে। তার অর্থ এই নয় যে আলাদাভাবে কমিশনের সদস্যরা কোন দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার রুপরেখা বিবেচনা করেন নি-কিন্তু তা সহজবোধ্য কারনেই সরকারের দরবার পর্যন্ত পৌঁছে নি।
বিজয়ের পর কবে কিভাবে দেশে ফিরে আসি আমি তার সঠিক তারিখ কিছুতেই মনে করতে পারছিনা – একাত্তরের ডিসেম্বর মাসের শেষ দিকে জেনারেল অরোরার সৌজন্যে তাঁর বিমানে করে দেশে ফিরি। প্রায় দু’দিন বিমানবন্দরে অপেক্ষা করেও ঢাকাগামী কোনোও বিমানে জায়গা পেলাম না জানতে পারলাম জেনারেল অরোরা ঢাকায় যাচ্ছেন, তাঁকে অনুরোধ জানান মাত্র তিনি আমাকে তাঁর সঙ্গে নিতে রাজি হন। ভারত-বাংলাদেশ মিত্র বাহিনীর অধিনায়কদের সংগে কয়েক ঘন্টা কাটাবার এবং কথা বলার একটি অমূল্য সুযোগ আমার এভাবে দৈবাৎ মিলে গিয়েছিল। মনে পড়ে সিলেটের ভারতীয় ছাউনীতে অফিসারদের সঙ্গে জেনারেল অরোরা তাদের মেসে এক মধ্যাহ্ন ভোজে যোগ দেন। তাঁর মেহমান হিসেবে আমিও এই ভোজে শরিক হই। এই উপলক্ষে আমার কয়েকজন জেনারেল এবং অন্ততঃ এবং একজন এডমিরালের সঙ্গে আলাপ হয়। তাঁদের কিছু কথা এবং ইঙ্গিত আমাকে বিস্মৃত করেছিল। স্মরণযোগ্য যে স্বাধীনতা লাভের আগের মুহূর্তে ‘আল বদর’ পৈশাচিক নিপুনতা ও নিষ্ঠুরতার সঙ্গে বাংলাদেশের অনেক ক’জন বুদ্ধিজীবিকে হত্যা করেছিল। জাতির হৃদয়ে অনেক শোকের মধ্যে এই শোকটি বড় বেশি রকম আঘাত হেনেছিল।
ভারতীয় অফিসারদের কথাবার্তা আমার মনে হয়েছিল – তাদের ধারণা আগেই এই ব্যাপারটি ঘটেনি এবং এ বাঙালিদের গুজব সৃজন কুশলতার আরেকটি প্রমাণ। আমি মরিয়া হয়ে অফিসারবৃন্দকে বলেছিলাম যে দীর্ঘ নিহতের তালিকায় আমার অত্যান্ত ঘনিষ্ঠ এবং প্রিয় অন্ততঃ চার জন অধ্যাপক ছিলেন এবং আমি নিশ্চিত করে জানি তারা পাকিস্তান পরিচালিত আল বদরের হাতে নৃশংসভাবে প্রাণ হারিয়েছিল।
বিমান ভ্রমণের সময় জেনারেল অরোরার সাথে আমার নানা বিষয়ে আলাপ হয়। তাঁকে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম; মিত্র বাহিনীর সাথে পাকিস্তানের এত দ্রুত পরাজয়ের কারণ কি? জবাবে তিনি তিনটি প্রধান কারনের উল্লেখ করেছিলেনঃ<ul>  <li>The command structure of the Pakistanis had collapsed.</li>  <li>The Mukti Bahini had worked havoc on their communication lines and sapped their morale in a war of attrtition.</li>  <li>The Pakistanis were surrounded by a sea of hostility while the allied forces had the spontaneous support of the people of Bangladesh.</li></ul>(অনুবাদ)১। পাকিস্তানের কম্যান্ড কাঠামো ভেঙে পড়েছিল।২। মুক্তিবাহিনী তাঁদের যোগাযোগ ব্যবস্থা এলোমেলো করে দিয়েছিল এবং এভাবেই ধীরে ধীরে তাঁদের মানসিক অবস্থা দুর্বল করে দিয়েছিল।৩। পাকিস্তানিরা বাংলাদেশের জনগণের নিকট হতে ক্রমাগত অসহযোগিতা পেয়ে আসলেও মিত্রবাহিনী জনতার কাছ থেকে ক্রমাগত সহায়তা পেয়ে আসছিল।
-খান সারওয়ার মুর্শেদ
৯ নভেম্বর, ১৯৮৪
&nbsp;
<a href=”https://www.facebook.com/mehjabeen.mostafa?fref=ts”>মেহজাবীন মোস্তফা</a>
&lt;<strong>১৫</strong><strong>,৪০,৩০২-০৫</strong>&gt;<h1>[সিরাজুর রহমান]</h1>১৯৭১ সালে বিবিসিতে কতকগুলি সমস্যা ছিল। আমাদের শ্রোতাদের সঠিক তথ্য পরিবেশন করতে হবে, সর্বশেষ এবং সঠিক খবর তাদের জানাতে হবে কিন্তু সেই খবরগুলো আমরা পাই কোথায়। বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। সংবাদপত্রের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ থাকার ফলে সংবাদ সংগ্রহ করা আমাদের পক্ষে অত্যন্ত কষ্টকর ছিল। এই অসুবিধার ভেতর দিয়ে যথাসাধ্য আমাদের সংবাদ সংগ্রহ করার চেষ্টা করতে হয়েছে। দ্বিতীয়ত, এরূপক্ষেত্রে যা হয়, যেখানে সত্যিকারের সংবাদ পাওয়া কঠিন হয়ে যায় সেখানে মিথ্যা সংবাদ অজস্র আসতে থাকে, গুজবগুলো সংবাদের আকার নেয়। আমাদের পক্ষে আরো বড় সমস্যা ছিল যে, বাংলাদেশ-ভারতের বাংলাভাষী শ্রোতারা, যাদের নিয়ে আমাদের কাজ কারবার, বরাবরই তাদের জন্য আমাদের সংবাদ পরিবেশন করতে হবে। কিন্তু যদি কখনো অজান্তে গুজবের বেসাতি করে আমরা এমন একটি ধারণা সৃষ্টি করে ফেলি যে আমরা দুনিয়ার অন্যান্য অঞ্চল সম্বন্ধে মিথ্যা সংবাদ দিয়ে থাকি তাহলে ভবিষ্যতে কখনো শ্রোতারা আমাদের বিশ্বাস করবেন না। এক দিকে যাতে কেউ বলতে না পারে যে আমরা খবর অন্যান্যদের পরে দিচ্ছি, দ্বিতীয়ত আবার কেউ যাতে অভিযোগ করতে না পারে আমরা মিথ্যা খবর দিচ্ছি। আমাদের যথাসাধ্য চেষ্টা করতে হয়েছে দু’কূল বজায় রেখেই সর্বশেষ ও সঠিক সংবাদ পরিবেশন করতে। এই ছিল আমাদের মূল সমস্যা। এছাড়া আমাদের অনুষ্ঠানের সময় ছিল খুব কম, বেশি খবর দেয়ার খুব একটা সুযোগ ছিল না। অবশ্য পরবর্তীকালে আমাদের অনুষ্ঠানের সময় বাড়ানো হয়েছিলো।
&nbsp;
আমরা বাংলা বিভাগে যারা ছিলাম সংখ্যায় অত্যন্ত কম ছিলাম। আমাদের পক্ষে সবকিছু সামলানো মুশকিল হয়ে যাচ্ছিলো। সৌভাগ্যবশত তখন আশেপাশে কিছু ছাত্র ছিলেন তাঁরা এদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য এসেছিলেন। তাঁরা আমাদের যথাসাধ্য সাহায্য করেছেন। আমার মনে আছে আমার সহকর্মী শ্যামল লোধ, কমল বোসসহ কোনো কোনো সময়ে দিনের পর দিন আমরা সকাল ৯টার সময় এসেছি আবার রাত ২/৩টার সময় ট্রান্সমিশানগুলোর কাজ শেষ করে বাড়ি ফিরেছি।
&nbsp;
এর মধ্যে আবেগেরও বহু ব্যাপার ছিল। দেশ থেকে অবিরাম খবর আসছে। দেশের জনসাধারণের দুঃখ দুর্দশা বৃহত্তর ভোগান্তি ইত্যাদি নানা কাহিনী শুনে আমাদের মন আবেগে আপ্লুত হয়ে যেত। সে দিকটি তো ছিলই। তার ওপর আর একটা বড় সমস্যা ছিল – আমাদের হাজার হাজার বাঙালি যারা পাকিস্তানে আটকা পড়েছিলো। দেশের সাথে সরাসরি যোগাযোগ করার কোনো উপায় ছিল না তাদের। দুই তরফ থেকে তারা আমাদের শরণাপন্ন হয়েছিলেন। তখনই আমরা বুঝতে পারলাম বিবিসি বাংলা বিভাগের প্রতি তাদের ভালোবাসা কতোটুকু। কারণ বেপরোয়া হয়ে তারা আমাদের সাহায্য কামনা করেছিলেন। প্রথমত আমরা বাংলাদেশ থেকে পাওয়া কিছু চিঠি পাকিস্তানের আত্মীয়স্বজনের অথবা পাকিস্তানে আটকে পড়াদের চিঠি বাংলাদেশে তাদের আত্মীয়স্বজনদের পাঠানোর চেষ্টা করেছি। বেশ কয়েক হাজার চিঠিপত্র এভাবে এদিক-ওদিক গিয়েছিলো। আমাদের পর্যাপ্ত জনবল ছিল না এগুলো দেখাশোনা করার জন্য। শেষ পর্যন্ত আমরা ‘সেতুবন্ধন, সাগর পাড়ের বাণী’ অনুষ্ঠানে তাদের খবরাখবর বিনিময় শুরু করলাম। অজস্র চিঠি আমরা সে সময় পেয়েছি। এর ভেতর দিয়ে আমাদের শ্রোতারা কতো একাত্মবোধ করেছেন সেই প্রমাণ আমরা সেই সময়ে পেয়েছি।
&nbsp;
আরো মনে পড়ে, যখন ১৬ই ডিসেম্বর তারিখে আমরা টের পেয়ে গেলাম যে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পাকিস্তান বাহিনী ঢাকায় আত্মসমর্পণ করবে তখন আমরা নতুন একটা বিশেষ অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করেছিলাম। আমার মনে আছে যখন আমরা সেই অনুষ্ঠানটি প্রচার করি ঠিক সেই সময়ে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান বেতার ভাষণ দিচ্ছিলেন। আমি কানে ইয়াহিয়া খানের বেতার ভাষণ শুনছিলাম এবং মুখে আমাদের শ্রোতাদের খবর দিয়ে যাচ্ছিলাম যে ইয়াহিয়া খান তখন কি করছেন – একই টেইপে। অর্থাৎ ইয়াহিয়া খান যে মুহূর্তে বেতার ভাষণ দিয়ে যাচ্ছিলেন ইংরেজিতে সেই মুহূর্তে ভারত-বাংলাদেশে আমাদের বাংলা অনুষ্ঠানের শ্রোতারা এই বিষয়ে অনুষ্ঠানটি মারফতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণের খবরটা শুনতে পেরেছিলেন। আবেগে মনটা এ রকম হয়ে পড়েছিলো যে কান্না চাপাটাই খুব অসুবিধাজনক হয়ে গিয়েছিলো। অথচ আমি জানি বেতার সাংবাদিকদের পক্ষে আবেগ-অভিজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ ঘটতে দেওয়া অত্যন্ত অযোগ্যতার পরিচয়। কিন্তু তবুও সেদিন কান্না চেপে রাখা কষ্টকর ছিল।
&nbsp;
বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে এ দেশের প্রবাসী বাঙালিরা বিশেষ ভূমিকা নিয়েছিলেন এটা বলতে হবে। এখানে আমার কিছু বাঙালি বন্ধু ছিলেন, তারা একটা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তুললেন এবং আমার সাহায্য চাইলেন। সাব্যস্ত হলো আমি তাদের সাহায্য করবো জনসংযোগ ও তথ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে। তাদের মধ্যে ছিলেন ওয়ালী আশরাফ, মাহমুদ হোসেন মঞ্জুর, মোশারফ হোসেন, বুলবুল মাহমুদ, মানিক চৌধুরী, শামসুদ্দীন প্রমুখ। সুরাইয়া খানমও ছিলেন তাঁদের সঙ্গে। তাঁরা সিদ্ধান্ত নিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের তাৎপর্য ও যৌক্তিকতা সম্বন্ধে বিশ্বের জনসাধারণকে তাঁরা অবহিত করবেন। আরো সিদ্ধান্ত নেয়া হলো সাংবাদিক, বেতার-সাংবাদিক, শিক্ষাব্রতী এবং বিশেষ করে দেশের বাইরে যারা আছেন তাঁরা বিভিন্ন দেশের পার্লামেন্ট সদস্য ও অন্যান্যদের বুঝাবেন। একটা উপায় স্থির করা হলো যে, তথ্য বুলেটিন বের করা হবে। আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি তাদের সে ব্যাপারে সাহায্য করতে। আমরা নিজেরা প্রচুর তথ্য বুলেটিন লিখেছি। আমার পুরো মনে নেই মনে হয় হাজার পাঁচেক প্রতিনিধির বাড়িতে, বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, অধ্যাপক, সংবাদপত্র সম্পাদক, বেতার-টেলিভিশন, বিভিন্ন দেশের সংসদ সদস্য, রাষ্ট্রপ্রধান – এঁদের কাছে এবং লন্ডনে বিভিন্ন দেশের দূতাবাসের প্রত্যেকের কাছে পাঠানো হতো। আমরা নিজেরা যা লিখতাম তা তো বটেই অন্যান্যরা বাংলাদেশের সপক্ষে লিখতেন সেগুলোও আমরা তাঁদের কাছে তুলে ধরতাম। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলতে পারি, একদিন এক বন্ধু আমাকে আমেরিকা থেকে টেলিফোন করে জানালেন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনজন অধ্যাপক বাংলাদেশের দাবীকে সমর্থন করে ৩২ পৃষ্ঠাব্যাপী একটি তথ্য দলিল বের করেছেন। আমি বললাম সেটিই চাই। ডাঃ শামসুল হক স্বয়ং নিয়ে এসেছিলেন সেই দলিলটি। আমার মনে আছে সে দিনের মধ্যেই ৩২ পৃষ্ঠার দলিল আমরা ৫ হাজার কপি বিতরণ করেছি। পরবর্তীকালে কলকাতা থেকে অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকার যে তথ্য পুস্তকটি বের করেছিলেন তাতে এটি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিলো। এভাবে এই অবস্থা হয়েছিলো যে, পত্রপত্রিকাগুলো প্রায়ই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সম্বন্ধে কোনো খবর পেলে তার বিশ্লেষণের জন্য আমাদের কাছে ফোন করতেন রাতে-বিরাতে। বহুবার তাঁরা ফোন করেছেন। এ ব্যাপারে অনেক কিছু করা হয়েছিলো।
&nbsp;
আমার ব্যক্তিগত দিক থেকে একটা বিশেষ সন্তুষ্টি ব্যাপার ছিল। বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী তখন বাংলাদেশ আন্দোলন পক্ষে এখানে কাজ করছিলেন। তবে তাঁর কাজের ধারা ছিল স্বতন্ত্র। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলরদের সঙ্গে এবং আন্তর্জাতিক আইনজীবী সংস্থাগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছিলেন। কারণ, তিনি বিচারপতি ছিলেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলরও ছিলেন। টেলিফোনে কয়েকদিন ধরে কথাবার্তা হলো। আমি তাঁকে বুঝাতে চেষ্টা করছিলাম যে তাঁর প্রকাশ্যে কাজ করা উচিত। তিনি তখন ভাবছিলেন, তাঁর আত্মপরিচয় না দিয়ে যদি তিনি শিক্ষাব্রতী এবং বিচারকমণ্ডলীদের মধ্যে কাজ করেন ভালো কাজ হবে। এ সময়ে তিনি ব্রিটিশ পার্লামেন্ট-এর সদস্যদের রুদ্ধদ্বার বৈঠকে বাংলাদেশ প্রশ্ন তুলে ধরেন।
&nbsp;
ইতিমধ্যে দেখা গেল যে, ব্রিটেনে বাংলাদেশ আন্দোলনের সপক্ষে কাজ করার জন্য, বিশেষ করে ২৫শে মার্চ তারিখের পর থেকে আমাদের কর্মীর অভাব নেই, কিন্তু তাদের নেতৃত্ব দেয়ার লোকের অভাব আছে। যা হোক বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর সাথে আমি এ বিষয়ে অনেক কথাবার্তা বলেছি। শেষ পর্যন্ত তিনি স্থির করলেন যে, তাঁর আত্মপ্রকাশ করার প্রয়োজন আছে। বোধ হয় এই স্বাধীনতা আন্দোলনের সপক্ষে আমার সবচাইতে আত্মতুষ্টির কারণ, বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী আমার যুক্তির সাথে একমত হয়েছিলেন। আমার মনে আছে, তারপরে তিনি আত্মপ্রকাশ করে যে বিবৃতি দিয়েছিলেন, আমার সাংবাদিক বন্ধু পিটার গিল (পরবর্তীকালে যিনি উপমহাদেশের ‘ডেলি টেলিগ্রাফ’ পত্রিকার সংবাদদাতা হয়েছিলেন), আমার এখানে বসে বিচারপতি চৌধুরীর সাথে কথাবার্তা বলেছিলেন এবং তাঁর একটি আধ ঘণ্টাব্যাপী সাক্ষাৎকারের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলাম আমি।
&nbsp;
আমার ব্যক্তিগত দিক থেকে আর একটা সন্তুষ্টির কারণ এই যে; টেলিফোনে তৎকালীন পাকিস্তানের বাংলাদেশী কূটনীতিকরা, যাঁরা বিভিন্ন দূতাবাসে ছিলেন, আমি তাঁদের নাম বলতে চাই না। তাঁদের অনেকের সাথে আমার যোগাযোগ হয়েছিলো। আমার মনে হয় তাঁরা সেই সময় বাংলাদেশের পক্ষে চাকরি ছাড়তে রাজি ছিলেন এবং পরে ছেড়েছিলেন।
&nbsp;
আমার মনে আছে, বিভিন্ন সময়ে লন্ডনে যখন র‍্যালি করা হতো, পার্লামেন্ট লবী করা হতো, টেলিফোন করলে আমাদের বাংলাদেশীরা জিজ্ঞেস করতেন কতো লোক দরকার। কখনো কোথাও পাঁচ হাজার, কোথাও তিন হাজার – আগে থেকেই আমরা ঠিক করে নিতাম কোথায় কতো লোক পাঠানো হবে এবং সেই পরিমাণ লোক তাঁরা সংগ্রহ করে পাঠাতেন দু’একদিনের নোটিশে। সেই সময় বাংলাদেশের মহিলা সমিতি এখানে খুব কাজ করছিলো। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ এবং মহিলা সমিতির সদস্যরা পার্লামেন্টের অধিবেশনের সময় নিয়মিত গিয়ে পার্লামেন্ট ভবনে বসে থাকতেন। সদস্যদের কাছ থেকে অবশেষে তারা শতাধিক পার্লামেন্ট সদস্যদের স্বাক্ষর সংগ্রহ করেছিলেন বাংলাদেশের দাবি সমর্থন করে পার্লামেন্টে একটা প্রস্তাব আনার ব্যাপারে। সেখানে আবার আর একটা সংশ্লেষ আছে, তখন মহিলা সমিতির সাধারণ ছিলেন আমার স্ত্রী সুফিয়া রহমান।
&nbsp;
-সিরাজুর রহমান
বিবিসি, বাংলা বিভাগ
১৯৮০
&nbsp;
&nbsp;
<a href=”https://www.facebook.com/idi0tic?fref=ts”>দীপায়ন অর্নব</a>
&lt;১৫,৪১,৩০৫-১৩&gt;<h1>[সৈয়দ আলী আহসান]</h1>একাত্তরের মার্চ মাসে যখন অসহযোগ আন্দোলন তুমুলভাবে চলেছে এবং ইয়াহিয়া মুজিব আলোচনার প্রহসনলীলা তুংগে উঠছে সে সময় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা নিস্ক্রীয় ছিলাম না। আমি অনুভব করেছিলাম যে একটি দুর্যোগ আসছে। সুতরাং আমরা ছেলেমেয়েদের সকলকে আমি সন্নিকটে আনতে চেয়েছিলাম। ঢাকায় আমার বড় মেয়ে মোহাম্মদপুরে তার নিজের বাড়িতে থাকত। এলাকাটি অবাঙালিদের। তাদের বাড়িতে ঢিল পড়ত রাত্রে। কখনো কখনো সরাসরি হুমকীও তাদের দেয়া হয়েছে। এ খবর পেয়ে আমি ১৯৭১ সালের ২২শে মার্চ আমার গাড়ী নিয়ে ঢাকায় চলে আসি। পথে কোন দুর্ঘটনা ঘটেনি তবে বিকেলের দিকে মোহাম্মদপুর এলাকায় আমার মেয়ের বাড়ির কাছে মোড় ঘুরতে গিয়ে একটি অদ্ভুদ দৃশ্য চোখে পড়ল। একটি কাক তড়িতাহত হয়ে মাটিতে মরে পড়ে আছে। আর এক তলা বাড়ির কার্নিশে এক সারি কাক বসে আছে। একটি কাক কা কা করে মৃত কাকটির শরীর প্রায় ছুঁয়ে উড়ে চলে যাচ্ছে। এভাবে সব কটি কাক একটি অর্ধবৃত্তের মতো আবর্ত রচনা করে একে একে উড়ে চলে গেল। কাকগুলো তাদের মৃতের প্রতি শেষ বেদনা নিবেদন করলো। দৃশ্যটি দেখেই আমার ছেলেকে গাড়ি থামাতে বলেছিলাম। আমি গাড়িতে সম্পূর্ণ দৃশ্যটি দেখলাম। সে দৃশ্যের কুশীলবরা হচ্ছে কাক এবং রংগমঞ্চ হচ্ছে বাড়ির কার্নিশ এবং গাড়ি চলাচলের রাস্তা। আমি হঠাৎ কেন যেন শংকিত হলাম। শুনেছি ইতর প্রাণীরা পূর্বাহ্নেই অনুভব করে যে সংকট আসছে। আমার তখন মনে হল যে হয়তবা বিপদ শিগগিরই আসবে। সেদিন ছিল ২২শে মার্চ। আমি চট্টগ্রাম থেকে গাড়ি করে ঢাকায় এসেছিলাম। আমার বড় মেয়ে, জামাই এবং তাদের দু’টি সন্তানকে নিয়ে যেতে।
&nbsp;
মোহাম্মদপুরে মেয়ের বাসায় পৌঁছে মুনীর চৌধুরী এবং মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলাম মনে আছে। মুনীর চৌধুরী রাত্রে দেখা করতে এসেছিলেন। পরদিন সকালে সবাইকে নিয়ে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের পথে যাত্রা করলাম। এবারেও কোন বিঘ্ন ঘটেনি। শুধুমাত্র ব্রীজে ডাইভারশনের কাছে এসে কিছুটা অসুবিধার সম্মুখীন হয়েছিলাম। আমাদের গাড়ি ডাইভারশনের পথে নেমে ঠিক মাঝামাঝি জায়গায় এসেছে তখন উল্টোদিকে থেকে আমাদের মুখোমুখি হর্ন বাজিয়ে একটি আর্মি জীপ উপস্থিত হল। আমরা সঙ্গেই সঙ্গেই পিছিয়ে যেতে লাগলাম। কিন্তু জীপটি না এগিয়ে সেও পিছিয়ে গেল এবং আমাদের এগুতে বলল। আমরা যেই একটু এগিয়েছি তখন আবার নেমে এসে আমাদের মুখোমুখি দাঁড়ালো। আমরা তখন পেছনে চালিয়ে একেবারে বড় রাস্তায় উঠে অপেক্ষা করতে লাগলাম। জীপটিও পেছনে গিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো আমাদের এগিয়ে আসতে বললো কিন্তু আমরা ভয়ে এগুলাম না। তখন জীপটি এল, বড় রাস্তায় পড়ল এবং আমাদের গাড়ীর পাশ দিয়ে চললো। আমাদের গাড়ী পেরুবার সময় জীপের মধ্যে কয়েকজনের অট্টহাসি শুনলাম এবং একটি শুন্য মদের বোতল রাস্তায় এসে ভেঙ্গে খানখান হয়ে গেল। সৌভাগ্যক্রমে আমাদের গাড়ীতে কোন আঘাত লাগেনি। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় পৌঁছে দেখলাম, সারাদেশে একটা কিছু যেন ঘটবে সকলেই তার জন্য উন্মুখ হয়ে আছে। বিভিন্ন লোক, শিক্ষক এবং ছাত্র যূথবদ্ধ হয়ে নানা জায়গায় ছড়িয়ে আছে। কথাবার্তা চলছে। আশা এবং আশঙ্কা এ দুইয়ের মিলন ঘটলে যে এক রহস্যময়তার সৃষ্টি হয় তখনকার সময়ে সেই রহস্যময়তা ছড়িয়ে ছিল। শুনলাম পরের দিন ২৪ তারিখ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র এবং শিক্ষক সম্মিলিতভাবে একটি সভা আহবান করেছে যে সভায় ছাত্ররা স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করবে।
&nbsp;
পরের দিন বিকেলে শহরে মিটিং ছিল আমরা সবাই সেখানে গেলাম। বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলিত হল। বক্তৃতা করলেন অনেকে। সভা চলাকালে হঠাৎ খবর এলো সমুদ্র বন্দরে পাকিস্তান থেকে আগত জাহাজ থেকে অস্ত্রশস্ত্র নামানো হচ্ছে এবং বাঙালি শ্রমিকদের সঙ্গে পাকিস্তানী সেনাদের সংঘর্ষ বেধেছে। আমরা খবর পেলাম যে জাহাজ থেকে অস্ত্রশস্ত্র নামাতে আপত্তি করায় বাঙালি শ্রমিকদের উপর গুলি চালানো হয়েছে এবং অনেক নিরীহ লোক নিহত হয়েছে। মাঝপথে আমাদের সভা ভেঙ্গে গেল। আমার ছোট মেয়ে এবং জামাতা দেব পাহাড়ে থাকত। আমি গাড়ী নিয়ে সেখানে গেলাম এবং তাদেরকে আমার সঙ্গে ক্যাম্পাসে নিয়ে এলাম। দুর্ঘটনা একটা ঘটবে সেটা আমরা সকলে অনুমান করেছিলাম। এই দুর্ঘটনার মুহূর্তে আমি আমার ছেলে মেয়েদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে চাইনি। সবাইকে তাই একত্রিত করেছিলাম। বড় মেয়েকে তো আগের দিনই ঢাকা থেকে নিয়ে এসেছিলাম। পরের দিন ছোট মেয়েকে। যাহোক সেদিন শহর থেকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ফেরা খুব সহজ হয়নি। আমাদের যাবার পথে ক্যান্টনমেন্ট পড়ে। সেসব রাস্তায় চলাচল বন্ধ ছিল। বড় বড় গাছ কেটে এবং আড়াআড়িভাবে কিছু ট্রাক সাজিয়ে রাস্তার চলাচলকে বিঘ্নিত করা হয়েছে। আমরা বাধ্য হয়ে গ্রামের কাঁচা মাটি এবং খোয়া ফেলানো পথ দিয়ে অনেক সময় নিয়ে রাত প্রায় ১২টার দিকে ক্যাম্পাসে ফিরলাম। রাত্রিবেলা গ্রামের পথ দিয়েই গিয়েছিলাম। সুতরাং আশেপাশের জঙ্গল এবং বন্যফুলের সমারোহ চোখে পড়েনি কিন্তু তাদের গন্ধ পেয়েছিলাম। একজন ইংরেজ কবি এরকম বর্ণনা করেছেন এভাবে, শংকিত পথে অন্ধকারে ফুলগুলো কোন আশ্বাস আনে না। তাদের সুগন্ধ ক্রমশঃ হারিয়ে যায় পৃথিবীর পূর্ব থেকে পশ্চিমে।
&nbsp;
পঁচিশ তারিখ সারাদিন মানুষের আনাগোনা চলছিল বিভিন্ন এলাকায়। শহর থেকে রাজনৈতিক নেতাদের কেউ কেউ এসেছিলেন, সন্ধ্যার দিকে ইস্ট বেঙ্গল রাইফেলস-এর একটি প্লাটুন বর্ডারের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থান নিল। গ্রামের লোকেরা এদের জন্য প্রচুর খাবারের ব্যবস্থা করল। তখন আমাদের সকলের মধ্যে একটি মাত্র বিশ্বাস সমুচ্চারিত যে আমরা বাংলা ভাষাভাষি এক ও অভিন্ন। যারা বাংলায় কথা বলে তাদের সকলকেই এখন একত্রিত হতে হবে একটি বিশ্বাসের সচলতায় যে এদেশ আমার। আমার মনে হয় তখন এই বিশ্বাসটি নির্মাণ করতে হয় নি, স্বতঃস্ফূর্তভাবে আবেগের অন্তঃসার হিসেবে উৎসারিত হয়েছে। আমরা তখন চিন্তা করছিলাম না ভবিষ্যৎ আমাদের কি হবে। আমরা একটি প্রবল আন্তরিক ভাবাবেগের প্রবাহকে আশ্রয় করেছিলাম। সারাদিন বিভিন্ন সময় আমরা ঢাকার সঙ্গে করছি। যোগাযোগের স্থান ছিল দুটো- ইত্তেফাক অফিস ও বঙ্গবন্ধুর বাড়ি। কিন্তু সন্ধ্যার একটু পরে ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগ একদম বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তখনই ভয় হয়। কিছু একটা ভয়ানক ঘটতে যাচ্ছে এটা অনুভব করছিলাম কিন্তু তা যে কত ভয়াবহ এবং প্রচণ্ড হতে পারে তা আমাদের অনুমান করার সাধ্য ছিল না। বিপদের সম্ভাবনা আমরা ব্যাখ্যা করি ঝড় আসবে বলে। এদেশে আমরা প্রকৃতির তাণ্ডবকে তাই প্রকৃতির উপমা আনি। আমরা বলি ঝড় আসবে, প্রচন্ড ঝড়, প্রকান্ড সব বৃক্ষ উৎপাটিত হবে, লোকেরা ধুলায় আচ্ছাদিত হবে, বন্যায় গৃহাঞ্চল প্লাবিত হবে। আমরা প্রকৃতির উপমা একারণেই দেই যে প্রকৃতির তাণ্ডবের মুখে মানুষ সম্পূর্ণ অসহায়। সে বিপদ কেউ রোধ করতে পারে না। সে ভেসে যায় এবং ধ্বংসের লীলা নৈপুণ্যে সে নিশ্চিহ্ন হয়। আমার এক বিদেশী বন্ধু সবসময় বিপর্যয়ের সঙ্গে পাহাড় ভেঙ্গে পড়ার উপমা দিতেন। তিনি ছিলেন জার্মান, হাইডেলবার্গের লোক, চতুর্দিকে সবসময় পাহাড় দেখতেন তাই পাহাড়ের কথাটি তার অনিবার্যভাবে মনে পড়ত। তিনি বলতেন, পাহাড় যখন ভেঙ্গে পড়ে তখন প্রস্তর খণ্ডগুলো প্রচন্ড বেগে নিম্নাভিমুখে ছুটতে থাকে। তার গতিরোধ করার সাধ্য কারো থাকে না। পাথরগুলো প্রচণ্ড গতিতে সম্মুখের সমস্ত কিছুকে নিশ্চিহ্ন করে ছুটে চলে, ধ্বংসের অনিবার্যতা তো একেই বলে।
&nbsp;
২৫শে মার্চ দিবাগত রাত্রে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আমরা প্রায় সারারাত জেগেই কাটিয়েছিলাম। রাত ১টা পর্যন্ত আমরা বিভিন্নজনের বাড়ীতে বসে আলাপ-আলোচনা করেছি কর্তব্য নির্ধারণের জন্য। কিন্তু সুস্পষ্টভাবে কিছুই নির্ধারণ করতে পারি নি। একটি প্রধান চিন্তা ছিল ক্যাম্পাসে অবস্থানরত বিভিন্ন পরিবারকে কিভাবে রক্ষা করা যায়। এখানে তো সম্ভাব্য ভয়াবহতার চিত্র উদঘাটিত হয়নি। তাই আমরা দ্রুত রাত্রির অবসান চাচ্ছিলাম এবং দিনের আলোয় কর্তব্যের কথা চিন্তা করব ভেবেছিলাম। সেসময়, রূপক করে বলা যায়, আমাদের দক্ষিণ দিকে নিস্তব্ধতা, বাম দিকে নিস্তব্ধতা, আমাদের সম্মুখে ও পশ্চাতে নিস্তব্ধতা। শুধু আমাদের মাথার উপরে আকাশে বাংলা বর্ণমালারা সবকটি অক্ষর ছড়িয়ে আছে। সেখান থেকেই বেদনা এবং প্রতিবাদের শব্দগুলো সংগ্রহ করতে হবে।
&nbsp;
রাত্রি কাটলো সুগভীর নিদ্রায় নয়, তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায়। প্রায়ই জেগে উঠেছি আশংকায় এবং বিমূঢ়তায়। সকালে শয্যা ছেড়ে মাঠে কবুতরের খাঁচার দিকে এগিয়ে গেলাম। এটা আমার রোজকার অভ্যাস। খাঁচার দরজা খুলে গম অথবা ধান মাঠে ছিটিয়ে দেই। কবুতর গুলো প্রচুর পবিত্র শুভ্রতায় শেফালী ফুলের মতো খাদ্যকণার উপর ছড়িয়ে পড়ে। সেদিন কিন্তু আশ্চর্য ঘটনা ঘটলো। কবুতরের ঘরের দরোজা খুলে দিয়ে মাঠের মধ্যে ধান ছড়িয়ে আমি একটু দূরে দাঁড়িয়ে রইলাম কিন্তু কবুতরগুলো খাবারের দিকে এগিয়ে এল না। ওরা খাঁচার সামনে একটু ঘুরে ওদের ঘরের ছাদের ওপর বসলো। ১২ টির মত কবুতর ছিল, সবকটি প্রায় সাদা, একটি দুটি খয়েরি রঙের। হঠাৎ কবুতর কটি একসঙ্গে উড়তে লাগলো। পাখা ঝাপটিয়ে প্রথমে একটি উড়লো, পরে দোতলা বাড়ির ছাদ পর্যন্ত উড়লো। পরে সব কটি পাহাড়ের মধ্যে ক্রমশঃ সম্পূর্ণ হারিয়ে গেল। আমি আমার জীবনে এ রকম দৃশ্য কখনো দেখিনি। সে মুহুর্তে আমি জানলাম যে, ঢাকায় ভয়ানক কিছু ঘটেছে এবং আমাদের জীবনেও আমরা একটি সংকটের সম্মুখীন হচ্ছি।
&nbsp;
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ দিকে প্রায় লাগোয়া ছিল ক্যান্টনমেন্ট। আমরা রোজই দেখতাম যে হেলিকপ্টার উড়ে ক্যান্টনমেন্টে যাচ্ছে। এবং যাবার সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর বার কয়েক ঘুরে যাচ্ছে। তাছাড়া কুমিরার দিক থেকে পাকিস্তানী সৈন্য চলাচলের সংবাদও পাওয়া যাচ্ছিল। যদিও প্রথমে কয়েকদিন চট্টগ্রাম শহর পাকিস্তান সেনাবাহিনী কবলিত হয়নি এবং মেজর জিয়া নামক একজন সৈনিকের নাম তখন আমরা শুনেছিলাম যিনি কালুরঘাটে ঘাঁটি স্থাপন করে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মোকাবিলা করছিলেন। কালুরঘাট ট্রান্সমিশন স্টেশন থেকে জিয়ার কণ্ঠে আমরা স্বাধীনতা ঘোষণাবাণী শুনতে পেয়েছিলাম। সেই মুহুর্তটি আমাদের জীবনের আশা এবং উদ্দীপনার একটি তীব্রতম মুহুর্ত ছিল। যখন চতুর্দিকে বিশৃঙ্খলা এবং সংঘবদ্ধ প্রতিরোধের অভাব ঠিক সেই মুহুর্তে জিয়ার কণ্ঠস্বরে স্বাধীন বাংলাদেশ ঘোষণার দাবি একটি বিষ্ময়কর মানসিকতার সৃষ্টি করেছিল। আমরা তখনই ভাবতে পেরেছিলাম যে, কোন কিছুই হারিয়ে যায় নি, আবার সবকিছু ফিরে পাবার সম্ভাবনা আছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে অনবরত মানুষের আনাগোনা হচ্ছিল। উপাচার্য ডঃ মল্লিককে কেন্দ্র করে একটি প্রতিরোধের ব্যবস্থা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় গড়ে তোলা হয়েছিল কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমরা আমাদের বাসগৃহগুলোকে অরক্ষিত রেখেই ৩০শে মার্চ সরে যেতে বাধ্য হয়েছিলাম। আমরা আশ্রয় নিয়েছিলাম কুন্ডেশ্বরী বালিকা বিদ্যালয়ে। কুন্ডেশ্বরী রাউজান থানার অন্তর্গত। কুন্ডেশ্বরীর মালিক বাবু নতুন চন্দ্র সিংহ আমাদের সবার জন্য আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে আনন্দিত হয়েছিলেন। কুন্ডেশ্বরী বিদ্যালয়টি একেবারেই বড় সড়কের পাশে সম্পূর্ণ অরক্ষিত। রাত্রি বেলা প্রায়ই নানাবিধ শঙ্কায় আমাদের জেগে উঠতে হতো। এদিকে ওদিকে সৈন্য চলাচলের সংবাদ শুনতাম। কখনো বিদ্যালয় গৃহটি আক্রান্ত হবে এমন খবরও আসতো। শেষ পর্যন্ত সকলের পরামর্শে আমরা কুণ্ডেশ্বরী পরিত্যাগ করে প্রথমে নাজিরহাট এবং পরে কাটাখালি হয়ে রামগড়ে উপস্থিত হলাম। আমরা কুণ্ডেশ্বরী ছাড়লাম ৭ই এপ্রিল তারিখে। সে সময় একটি সিদ্ধান্তে আমাদের আসতে হয়েছিল। প্রথমে আমরা ভেবেছিলাম কোন গ্রামে আত্মগোপন করে থাকব কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিবেচনা করা হয় যে সীমান্ত এলাকায় যাওয়াই ভাল। কেননা সেনাবাহিনী আমাদের পশ্চাদ্ধাবন করছে এবং গ্রামাঞ্চলে গিয়েও আমরা রক্ষা পাব না। কিন্তু সীমান্তে যদি যাই তবে প্রয়োজনবোধে সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে পৌঁছে যাওয়া সম্ভবপর। রামগড় তখন মেজর জিয়ার প্রতিরোধ কেন্দ্র ছিল। তিনি কালুরঘাট থেকে সরে এসে রামগড়ে অবস্থান নিয়েছিলেন। রামগড়ে পৌঁছে জিয়াকে প্রথম চাক্ষুষ দেখলাম। তার চোখে কালো চশমা ছিল এবং মুখ ছিল শ্মশ্রূমন্ডিত। তিনি এক জায়গায় দাঁড়িয়েছিলেন এবং কখনো কখনো কাউকে কিছু নির্দেশ দিচ্ছিলেন। আমাদের কারো সঙ্গেই তিনি বিশেষ কোন কথা বলেন নি।
&nbsp;
পহেলা বৈশাখ তারিখে আমরা সীমান্ত অতিক্রম করার নির্দেশ পেলাম। জিয়াউর রহমান আমাদের জানালেন যে, কোন সিভিলিয়ানের তখন আর রামগড় থাকা নিরাপদ নয়। কেননা অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই পাকিস্তান বাহিনী সেখানে এসে পড়বে। আমাদের পরিবার পরিজনদের বাসের ব্যবস্থা করে আমি, ডঃ মল্লিক, তৌফিক ইমাম এবং আরো কয়েকজন রামগড়ের সীমানা পেরিয়ে আমরা আগরতলার দিকে রওনা হলাম। এ সময়কার একটি উল্লেখযোগ্য অভিজ্ঞতা হচ্ছে এই যে, সাবরুমের রাস্তায় একদল ভারতীয় স্কুলের ছাত্রের সঙ্গে সাক্ষাৎ। ছাত্ররা আমাদের জীপ থামিয়ে জীপের চারদিকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে গান করতে লাগল “আমাদের সংগ্রাম চলবেই চলবে”। সিকান্দার আবু জাফর এই গানটি লিখেছিলেন কিছুদিন আগে, তখন এই গানটির তাৎপর্য বুঝতে পারিনি। কিন্তু অপরিচিত পরিমন্ডলে শঙ্কিত সময়ের পদক্ষেপে গানটির বাণী আমার কাছে অসাধারণ তাৎপর্যবহ মনে হলো। আমার মনে হলো ঠিক এমন করে হৃদয়ের সর্বস্ব দিয়ে কেউ হয়তো তার জাতির বেদনাকে রুপ দিতে পারেননি। সে মুহুর্তে ইমোশন প্রবল ছিল। তাই হয়তো গানটিকে অসাধারণ মনে হয়েছিল। তবে অসাধারণ তো বটেই তার কারণ, আমাদের সংকটের মুহুর্তে এ গানটি আমাদের জন্য সমর্থন ও সহায়তা এনেছিল। আগরতলায় আমাদের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎ হয় এম আর সিদ্দিকীর সঙ্গে। তিনি এবং মাহবুব আলম চাষী আগরতলায় একটি বাংলাদেশ মিশন খুলেছিলেন। আমাদের পরিজনবর্গ আগরতলায় এসে পৌঁছোয় বিকেলবেলা। প্রথম রাতের জন্য আমরা আশ্রয় নিয়েছিলাম গ্রান্ড হোটেলে। নামটি গ্রান্ড কিন্তু কর্মব্যবস্থা অত্যন্ত সাধারণ এবং মলিন। হোটেলটি ছিল আগরতলায় রাজপরিবারের। সে রাতেই আমাদের সংগে দেখা মওদুদ আহমদ এবং সাদেক খান। একটু বেশি রাতে এম আর সিদ্দিকী সাহেবও হোটেলে এলেন এবং পরের দিন তিনি কলকাতায় যাবেন বললেন। আমাদের প্রস্তুত থাকতে বললেন। আমরা এক রাতই গ্রান্ড হোটেলে ছিলাম। পরের দিন আগরতলায় সরকার নরসিংগড়ে একটি পলিটেকনিক স্কুলে আমাদের থাকার ব্যবস্থা করে দিলেন।
&nbsp;
আগরতলায় আমরা অবর্ণনীয় অসুবিধার সম্মুখীন হয়েছিলাম। ব্যক্তিগতভাবে আমাদের অধিকাংশের কাছে বিশেষ টাকা পয়সা ছিল না। পাকিস্তানী মুদ্রার বিনিময় হার দিয়েছিল ১০০ টাকার স্থলে ভারতীয় ৪০ টাকা। অন্ততপক্ষে পোদ্দারদের কাছ থেকে আমরা এ হারই পাচ্ছিলাম। সে সময় আমার চিন্তা হল কি করে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকবৃন্দ, যারা দেশত্যাগ করে আসতে বাধ্য হয়েছেন, এবং অন্যান্য বুদ্ধিজীবী, তাঁদের জন্য অর্থনৈতিক সঙ্গতির কোন ব্যবস্থা করা যায় কিনা। প্যারিসে আমার কিছু পরিচয়ের সূত্র ছিল। একাডেমী ফ্রান্স-এর সদস্য এবং বিখ্যাত ফরাসী বুদ্ধিজীবী এবং কবি পীয়ের ইমানুয়েলকে আমি চিনতাম। তাঁর কাছে আমি একটি দীর্ঘ পত্র লিখি। আমার চিঠি পীয়ের ইমানুয়েল পান ১৭ই মে তারিখ। ১৯শে মে ইমানুয়েলের পক্ষ থেকে একখানা টেলিগ্রাম পাই। টেলিগ্রামের ভাষা ছিল নিম্নরুপঃ
&nbsp;
“পীয়ের ইমানুয়েল
আপনার চিঠি পেয়েছে। চিঠির অংশবিশেষ প্যারিসের সংবাদপত্রগুলোতে প্রকাশের অনুমতি চাচ্ছি। আশা করি ভবিষ্যতে অবস্থার উন্নতি ঘটবে।”
&nbsp;
পরবর্তী চিঠিতে প্যারিস থেকে স্টিফেন স্পেনডারের ঠিকানা আমার কাছে পাঠানো হয়। তখন তিনি কানেকটিকাটে ইংরেজী বিভাগে অধ্যাপনা করছিলেন। বিখ্যাত স্পেনীয় দার্শনিক সালভাদর মাদারিয়গার ঠিকানাও আমি এভাবে পাই। এদের দুজনের কাছেও বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে আমি চিঠি লিখি এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন সম্পর্কে তাদের সহানুভূতি কামনা করি। পীয়ের ইমানুয়েল বিভিন্ন সাহায্যকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের জন্য আবেদন জানান। অবশেষে ইন্টারন্যাশনাল এসোসিয়েশন ফর কালচারাল ফ্রিডমের সভাপতি মিং শেফার্ড স্টোন আমাকে জানান যে ফোর্ড ফাউন্ডেশন আমাদের সাহায্যের জন্য পঁচিশ হাজার ডলার অনুমোদন করেছে। এ টাকা (অনুবাদ) “সে সকল লেখক, স্কলার এবং বুদ্ধিজীবীদের জন্য ব্যয় করতে হবে, যারা জবরদস্তমূলক আচরণের কারণে নিজ দেশ ছেড়ে ভারতে চলে আসতে বাধ্য হয়েছেন” তাঁদের জন্য ব্যয় করতে হবে।
&nbsp;
মে মাসের শেষে আমি কোলকাতায় যাই এবং পাম এভিনিউতে ব্যারিস্টার এ সালামের বাড়িতে অবস্থান করতে থাকি। সালাম সাহেবের ওখানে বাংলাদেশের তিনজন ছিলাম- আমি, মওদুদ আহমদ এবং সাদেক খান। কোলকাতায় আমার সংগে যোগাযোগ করেন আমার পুরনো বন্ধু বোম্বের এ বি শাহ। এ বি শাহ সেকুলারিস্ট পত্রিকার সম্পাদক এবং কোয়েস্ট পত্রিকার প্রকাশক ছিলেন। এ বি শাহ কলকাতায় আসেন ৮ই জুন। সে তারিখে রাত্রে গ্রান্ড হোটেলে তাঁর সংগে আমার যোগাযোগ হয়। ফোর্ড ফাউন্ডেশনের প্রদত্ত টাকা যথাযথভাবে বণ্টনের ব্যবস্থা করার জন্য আমরা একটি কমিটি গঠন করি। কমিটির সভাপতি হন জাস্টিস এস এম মাসুদ এবং সদস্য থাকেন অন্নদাশঙ্কর রায়, আমি, ডাঃ মল্লিক, সুশীল ভদ্র এবং সুশীল মুখার্জী। জাস্টিস মাসুদ কর্তৃক অনুমোদিত ২১শে জুন তারিখের বুদ্ধিজীবীদের যে তালিকা আমার কাছে আছে তার মধ্যে জুন মাস থেকে দেশ স্বাধীন হবার সময় পর্যন্ত প্রতিমাসে যারা নিয়মিতভাবে সাহায্য পেয়েছেন তাঁদের নাম আছে। এ নামগুলো হচ্ছে- ডঃ এ আর মল্লিক, প্রফের সৈয়দ আলী আহসান, ডঃ সরওয়ার মুর্শেদ, ডঃ মোহাম্মদ শামসুল হক, ডঃ আনিসুজ্জামান, ডঃ মাহমুদ শাহ কোরায়শী, ডঃ মোশাররফ হোসেন, ডঃ কাজী আব্দুল মান্নান, মিঃ ওসমান জামাল, মিঃ আলী আশরাফ মাসুদ, মিঃ আবু জাফর, অনুপম সেন, ডঃ মোতিলাল রায়, ডঃ বেলায়েত হোসেন, শওকত ওসমান, বুলবুল ওসমান, গোলাম মোর্শেদ, আবদুল হাফিজ, ডঃ ফারুক আজিজ খান, ডঃ জিয়াউদ্দিন আহমেদ, কামরুল হাসান, বদরুল হাসান, দেবদাস চক্রবর্তী, মাহবুব তালুকদার, সাদেক খান, ডঃ স্বদেশ বোস, ডঃ মযহারুল ইসলাম, মোস্তফা মনোয়ার। এই তালিকায় পরে আরো অনেক নাম যুক্ত হয়েছিল যারা জুন মাসের পর কোলকাতায় এসেছিলেন। সে নামগুলো আমার কাছে নেই। এদের মধ্যে ডঃ মুসলিম হুদার নাম মনে পড়ছে। আরো ক’জনের নাম মনে পড়ছে তাঁদের মধ্যে একজন ডঃ মফিজউদ্দিন আহমদ, আরেকজন ডঃ সফর আলী আকন্দ এবং ডঃ সালেহ আহমদ।
&nbsp;
২৫শে জুন এ সাহায্য সম্পর্কে যে বিজ্ঞপ্তি ইন্টারন্যাশনাল এসোসিয়েশন ফর কালচারাল ফ্রিডমের ভারতীয় শাখার প্রোগ্রাম পরিচালক এ, বি শাহ কর্তৃক পত্রিকায় প্রেরিত হয়েছিল তার হুবহু প্রতিলিপি নিম্নে প্রদত্ত হলো।
&nbsp;
&nbsp;
INTERNATIONAL ASSOCIATION CULTRAL FREEDOM
June 25, 1971
&nbsp;
For the favor of publication
&nbsp;
The International Association for Cultural Freedom has made a special grant of $25,000 to provide assistance to emigrant schools, intellectuals and writers from Bangladesh. The grant has been made from the fund for Intellectuals that the Association created in 1968 in the wake of soviet occupation of Czechoslovakia.
&nbsp;
The grant will be operated by a Committee for Assistance to Bangladesh Intellectuals formed for the purpose by the IACF office in India. The Committee consists of Mr. Justice S.A. Masud of Calcutta High Court, Mr. Annada Sanker Ray, the eminent writer, Dr. A, R Mullick, Vice Chancellor of Chittagong University, Professor Syed Ali Ahsan, Head of the Department of Bengali in Chittagong University and former Director of the Bengali Academy in Dacca, professor A.B. Shah, Director of Programmes of the IACF in India, Mr. Sushil Bhadra, Mr Sushil Mukherjea, social workers from Calcutta.
&nbsp;
The Committee has already provided adhoc financial assistance to 25 scholars from Bangladesh and is preparing a comprehensive list of others who have emigrated to India. The Committee is also trying to persuade some of the Indian Universities to offer temporary assignments to Bangladesh scholars and secure the cooperation of Indina publishers to facilitate the publication of their manuscripts.
&nbsp;
The Committee is also sponsoring a special issue of Quest, the well know intellectual and cultural journal, to be edited by Dr. A R Mullick and Professor Syed Ali Ahsan.
&nbsp;
Scholars, Writers and intellectuals from Bangladesh are requested to contact Mr. Sushil Mukherjea at the Committee’s office at P 542 Raja Basanta Roy Road, Calcutta 29.
&nbsp;
sd / – A. B. Shah
Director of Progammes, India.
&nbsp;
&nbsp;
(অনুবাদ)
&nbsp;
ইন্টারন্যাশনাল এসোসিয়েশন ফর কালচারাল ফ্রিডম
জুন ২৫, ১৯৭১
&nbsp;
প্রকাশনার জন্য
&nbsp;
ইন্টারন্যাশনাল এসোসিয়েশন ফর কালচারাল ফ্রিডম বাংলাদেশ থেকে আগত স্কলার, বুদ্ধিজীবী এবং লেখকদের সহায়তার জন্য ২৫,০০০ ডলারের একটি বিশেষ অনুদান অনুমোদন করেছে। অনুদানটি প্রদান করা হয়েছে বুদ্ধিজীবীদের জন্য তৈরি করা তহবিল থেকে। এটি ১৯৬৮ সালে চেকোস্লোভাকিয়ায় সোভিয়েত দখলদারিত্বের প্রাক্কালে সৃষ্টি করা হয়েছিল।
&nbsp;
অনুদানটি একটি কমিটি দ্বারা পরিচালিত হবে যেটি আইএসিএফ ইন্ডিয়া শাখার প্রস্তাবনায় বাংলাদেশী বুদ্ধিজীবীদের সহায়তার জন্য গঠন করা হয়েছে। কমিটিতে রয়েছেন-
জনাব জাস্টিস এস এ মাসুদ (কোলকাতা হাইকোর্ট)
জনাব অন্নদাশংকর রায় (প্রখ্যাত লেখক)
ডঃ এ আর মল্লিক (ভিসি, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়)
প্রফেসর সৈয়দ আলী আহসান (বাংলা বিভাগের হেড, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং ঢাকাস্থ বাংলা একাডেমির প্রাক্তন পরিচালক)
প্রফেসর এ, বি শাহ (পরিচালক, প্রোগ্রামস, আইএসিএফ, ইন্ডিয়া) এবং
জনাব সুশীল ভদ্র
জনাব সুশীল মুখারজি (সমাজকর্মী, কোলকাতা)
&nbsp;
এই কমিটি ইতিমধ্যে বাংলাদেশের ২৫ জন স্কলারকে বিশেষ আর্থিক সহায়তা দিয়েছেন এবং অন্য যারা ইন্ডিয়াতে ইমিগ্রেন্ট হয়েছেন, তাঁদের একটি লিস্ট তৈরি করেছে। এই কমিটি ইন্ডিয়ার কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে যোগাযোগ করে বাংলাদেশী স্কলারদের সাময়িক কাজের ব্যবস্থা করছে এবং ইন্ডিয়ান প্রকাশকদের সহযোগিতায় তাদের পাণ্ডুলিপি প্রকাশের ব্যবস্থা করছে।
&nbsp;
এই কমিটি আরেকটি বিশেষ বিষয়ে প্রণোদনা দিচ্ছে। একটি স্বনামধন্য বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক জার্নাল তৈরির কাজে, যেটি ডঃ এ, আর মল্লিক এবং প্রফেসর সৈয়দ আলী আহসানের সম্পাদনায় প্রকাশিত হবে।
&nbsp;
বাংলাদেশ থেকে আগত স্কলার, লেখক এবং বুদ্ধিজীবীদের অনুরোধ করা হচ্ছে জনাব সুশীল মুখার্জির সাথে কমিটি অফিসে যোগাযোগ করার জন্য। যোগাযোগের ঠিকানাঃ পি-৫৪২ , রাজা বসন্ত রায় রোড, কোলকাতা-২৯।
স্বাক্ষর/-
এ. বি. শাহ্‌
ডিরেক্টর অফ প্রোগ্রামস, ইন্ডিয়া
&nbsp;
এ সময় মিসেস লী থ (Lee Thaw) নামক এক ভদ্রমহিলা কোলকাতায় আসেন এবং ওবেরয় গ্রান্ড হোটেল অবস্থান করেন। তিনি ছিলেন আন্তর্জাতিক উদ্বাস্তু সমিতির (International Refugee Organization) প্রতিনিধি। তিনি লোকদের জন্য কিছু সাহায্য এনেছিলেন। তার অর্থদানের পাত্র ছিল সৃষ্টিধর্মী লেখক, শিল্পী এবং সাংবাদিক। ৫-৭-৭১ তারিখে আমি মিসেস থ কর্তৃক অনুরুদ্ধ হয়ে লেখক এবং সাংবাদিকদের একটি তালিকা তাকে প্রদান করি। সে তালিকা অনুসারে যারা পূর্বের সাহায্য সংস্থা থেকে কিছু পান নি এবং সৃষ্টিশীল লেখক, শিল্পী এবং সাংবাদিক, তাদের মধ্যে এ অর্থ বিতরণ করা হয়েছিল। প্রথম পর্যায়ে ১১জন লেখক, শিল্পী এবং সাংবাদিককে ৫ হাজার ৮ শত টাকা দেয়া হয়েছিল এবং পরবর্তী পর্যায়ে ২২ হাজার ৫ শত টাকার জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছিল। যারা সাহায্য পেয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে শিল্পী কামরুল হাসান, জহির রায়হান, অভিনেত্রী সুমিতা এবং আরো অনেকে ছিলেন। তবে একটি কথা এখানে না বললে অন্যায় হবে, তা হচ্ছে লেখক ও সাংবাদিক ফয়েজ আহমদ প্রথমে সাহায্য নিয়েছিলেন কিন্তু পরে তার চেয়েও দুঃস্থ কোন লেখক এবং সাংবাদিকের আনুকূল্যে অর্থ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।
&nbsp;
এ সময় আরেকটি আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থা কোলকাতায় উপস্থিত হয়। উক্ত সংস্থা বাংলাদেশ মিশনের প্রধান হোসেন আলীর সংগে যোগাযোগ করেন। এই সংস্থার নাম International Rescue Committee, সংক্ষেপে I.R.C। উক্ত প্রতিষ্ঠান মূলত ইহুদীদের প্রতিষ্ঠান ছিল। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় ইউরোপ থেকে যে সমস্ত ইহুদী পালিয়ে আমেরিকায় আশ্রয়ের জন্য উপস্থিত হয়েছিলেন, মূলত তাঁদের সাহায্যের জন্য এ সংস্থাটি গড়ে ওঠে। আমাদের দুর্দশার সময় সংস্থাটি যখন কোলকাতায় আসে তখন এদের পশ্চাদভূমি সম্পর্কে আমাদের কোন ধারণা ছিল না। যাই হোক, জনাব হোসেন আলী এ সংস্থার সংগে ডঃ মল্লিকের যোগসূত্র ঘটিয়ে দেন এবং তিনি বাংলাদেশ বুদ্ধিজীবী সকলের সংগে পরামর্শ করে এই অর্থ বরাদ্দ করবার ব্যবস্থা করেন। এই অর্থ সাহায্য পাবার ফলে আমরা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সকল প্রকার সংবাদ সংগ্রহ এবং সংরক্ষণের জন্য বাংলাদেশ আর্কাইভস নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে সক্ষম হই। আর্কাইভস-এর পৃষ্ঠপোষক হয়েছিলেন ডঃ মল্লিক এবং আমি সভাপতি হয়েছিলাম। মোট ১৬ জন ব্যক্তি আর্কাইভস-এর কর্মপরিচালনায় নিযুক্ত হয়েছিলেন। এদের মধ্যে অধিকাংশই ছিল বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলেজের ছাত্র এবং আমার সহকারী হিসাবে আর্কাইভস-এর প্রধান দায়িত্বে ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলার অধ্যাপক আবু জাফর (বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক)। আর্কাইভস ভারতীয় এবং বিদেশী সংবাদপত্রে বাংলাদেশ সংক্রান্ত যে সমস্থ খবর প্রকাশিত হতো তা সংগ্রহ করতো। এই সংগৃহীত তথ্যাদি নথিবদ্ধ করে একটি হওয়ার পর আমি বাংলাদেশ আর্কাইভস-এ দিয়ে দিয়েছি। আর্কাইভস এর পক্ষ থেকে একটি রেফারেন্স লাইব্রেরী সার্ভিস প্রতিষ্ঠার চেষ্টা নেয়া হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত অর্থের অভাবে পরিকল্পনাটি কার্যকর হয়নি। ডঃ মযহারুল ইসলাম আই আর সি-র কাছ থেকে একটি অনুদান নিয়েছিলেন বাংলাদেশ থেকে আগত এবং বিভিন্ন ক্যাম্পে অবস্থানরত বিবিধ আঞ্চলিক জনগোষ্ঠীর কাছ থেকে “লোকলোর” সংগ্রহের জন্য। এই লোকলোর সংগ্রহের কাজে মযহারুল ইসলামকে সাহায্য করেছিলেন অধ্যাপক সুনীল কুমার মুখোপাধ্যায়।
&nbsp;
এ সময় কোলকাতায় বিখ্যাত ভারতীয় ঐতিহাসিক ডঃ রমেশ চন্দ্র মজুমদার ‘বাংলাদেশ তথ্যানুসন্ধান কমিটি’ নামে একটি কমিটি গঠন করেন। উক্ত কমিটির সম্পাদক ছিলেন শ্রী শৈবালকুমার গুপ্ত। মূলত এই কমিটির উদ্দেশ্য ছিল এটা প্রমাণ করা যে, বাংলাদেশে পাকিস্তান যে নির্যাতন করছে, তা ছিল সাম্প্রদায়িক। অর্থাৎ মূল উদ্দেশ্য ছিল পূর্ব পাকিস্তান থেকে হিন্দুকে সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন করে উক্ত দেশকে পুরোপুরি ইসলামী দেশ বানানো। তাঁর মুদ্রিত প্রশ্নাবলীর একটি প্রশ্ন ছিল, “বাছিয়া হিন্দুদের নির্বিচারে হত্যা, গৃহদাহ ও লুন্ঠনের পরিকল্পনা ছিল এমন অনুমান করিবার সংগত কারণ আছে কি?” হিন্দু সম্পত্তি লুঠ হইয়া থাকিলে কাহারা করিয়াছে”? আমার সংগে সে সময় ডঃ রমেশ মজুমদারের যোগাযোগ হয় এবং আমি তাঁর এই তথ্যানুসন্ধান ব্যাপারে দুঃখপ্রকাশ করি। সৌভাগ্যের বিষয় বাংলাদেশ থেকে যারা উদ্বাস্তু হয়ে চলে এসেছিলেন এমন সব হিন্দুরা ডঃ মজুমদারের সাম্প্রদায়িক অনুসন্ধানের প্রতিবাদ করেছিলেন। তারা পরিস্কার জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান থেকে যারা অত্যাচারিত হয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছে তারা হিন্দুও নয়, মুসলমানও নয়, তারা বাংলাদেশী এবং সকল বাংলাদেশী সম্মিলিতভাবে স্বাধীনতা আন্দোলনে জড়িত। শেষ পর্যন্ত ডঃ রমেশ মজুমদার তাঁর সাম্প্রদায়িক অনুসন্ধান তৎপরতা বন্ধ করতে বাধ্য হন। এখানে একটি কথা বলে রাখা ভাল যে, ডঃ মজুমদারের লোকেরা ক্যাম্পে অবস্থানরত সাধারণ হিন্দুদের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন, তারা বুদ্ধিজীবীদের কাছে আসেন নি এবং সাধারণ হিন্দুরাই সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে তাদের বক্তব্য রেখেছিলেন।
&nbsp;
২৩শে জুলাই আমি বাঙালোর শহরের গান্ধী স্মারক নিধির আমন্ত্রণক্রমে বাঙালোর যাই এবং সেখানে চার দিন অবস্থান করি। বাঙালোর এবং মহীশুরে আমি বাংলাদেশের সংকৃতি এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের উপর মোট দশটি বক্তৃতা করি। বাঙালোরে গান্ধী স্মারক নিধির প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ রিলিফ কমিটি গঠিত হয়েছিল এবং তারা বাংলাদেশের জন্য কিছু অর্থ সাহায্য করেছিলেন।
&nbsp;
১ লা আগস্ট তারিখে ইন্দো-সোভিয়েত কালচারাল সোসাইটি বাংলাদেশের ওপর একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। উক্ত অনুষ্ঠ