বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধঃ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড (অনুবাদসহ)

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধঃ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড (অনুবাদসহ)

 

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র: প্রথম খণ্ড

                 পটভূমিঃ ১৯০৫-১৯৫৮

 

 

 

 

 

অ্যাটেনশন!

পরবর্তী পেজগুলোতে যাওয়ার আগে কিছু কথা জেনে রাখুনঃ

 

  • ডকুমেন্টটি যতদূর সম্ভব ইন্টার‍্যাক্টিভ করা চেষ্টা করা হয়েছে। অর্থাৎ এই ডকুমেন্টের ভেতরেই অসংখ্য ইন্টারনাল লিংক দেয়া হয়েছে। আপনি সেখানে ক্লিক করে করে উইকিপিডিয়ার মতো এই ডকুমেন্টের বিভিন্ন স্থানে সহজেই পরিভ্রমণ করতে পারবেন। যেমন প্রতি পৃষ্ঠার নিচে নীল বর্ণে ‘সূচিপত্র’ লেখা শব্দটিতে কিবোর্ডের Ctrl চেপে ধরে ক্লিক করলে আপনি সরাসরি এই ডকুমেন্টের সূচিপত্রতে চলে যেতে পারবেন।

 

 

  • তারপর ‘সূচিপত্র এখান থেকেই মূল দলিল শুরু। সূচিপত্রটি সরাসরি দলিলপত্র থেকে নেয়া হয়েছে। সূচিপত্রে লেখা পেজ নাম্বারগুলো যুদ্ধদলিলের মূল সংকলনটির পেজ নাম্বারগুলোকে রিপ্রেজেন্ট করে। আপনার মূল দলিলের পিডিএফ ডাউনলোড করে মিলিয়ে দেখতে পারেন।

 

 

 

  • বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধঃ দলিলপত্র মোট ১৫ টি খণ্ড আছেঃ

 

প্রথম খণ্ড : পটভূমি (১৯০৫-১৯৫৮)
দ্বিতীয় খণ্ড : পটভূমি (১৯৫৮-১৯৭১)
তৃতীয় খণ্ড : মুজিবনগরঃ প্রশাসন
চতুর্থ খণ্ড : মুজিবনগরঃ প্রবাসী বাঙালীদের তৎপরতা
পঞ্চম খণ্ড : মুজিবনগরঃ বেতারমাধ্যম
ষষ্ঠ খণ্ড : মুজিবনগরঃ গণমাধ্যম
সপ্তম খণ্ড : পাকিস্তানী দলিলপত্র: সরকারী ও বেসরকারী
অষ্টম খণ্ড : গণহত্যা, শরনার্থী শিবির ও প্রাসঙ্গিক ঘটনা
নবম খণ্ড : সশস্ত্র সংগ্রাম (১)
দশম খণ্ড : সশস্ত্র সংগ্রাম (২)
একাদশ খণ্ড : সশস্ত্র সংগ্রাম (৩)
দ্বাদশ খণ্ড : বিদেশী প্রতিক্রিয়াঃ ভারত
ত্রয়োদশ খণ্ড : বিদেশী প্রতিক্রিয়াঃ জাতিসংঘ ও বিভিন্ন রাষ্ট্র
চতুর্দশ খণ্ড : বিশ্বজনমত
পঞ্চদশ খণ্ড : সাক্ষাৎকার

 

 

  • এটি ১ম খণ্ডের অর্থাৎ পটভূমি: ১৯০৫-১৯৫৮- এর দলিলের ইউনিকোড ভার্শন। এই খণ্ডে ৭৮২ পাতার প্রায় ৯০ শতাংশ ইংরেজি দলিল রয়েছে। আপনাদের সুবিধার্থে আমরা সেগুলো অনুবাদ করে দিয়েছি।

 

  • এই ডকুমেন্টে প্রতিটি দলিলের শুরুতে একটা কোড দেয়া আছে।

<খণ্ড নম্বর, দলিল নম্বর, পেজ নম্বর>; অর্থাৎ <১, ৯১, ৪২৬> এর অর্থ আলোচ্য দলিলটি মূল সংকলনের ১ম খণ্ডের ৯১ নং দলিল (দলিল নাম্বার মূল দলিলপত্রের সূচিপত্র অনুযায়ী), যা ৪২৬ নম্বর পৃষ্ঠায় মুদ্রিত আছে। দলিল নম্বর বলতে সূচিপত্রে উল্লিখিত নম্বরকে বুঝানো হচ্ছে। উদ্ধৃত ‘৯১’ নাম্বার দলিলটিতে ‘মারী চুক্তি’ রয়েছে। বুঝার সুবিধার্থে দলিলটি দেখে নিনঃ

 

 

 

দলিলে যেসব বানান ভুল আমরা খুঁজে পেয়েছি, সেগুলোকে হলুদ মার্ক করা হয়েছে।

 

এই ফাইলটি আপনার কম্পিউটার বা মোবাইলে সংরক্ষিত করা থাকলে ভবিষ্যতে আপনি মুক্তিযুদ্ধ সংক্রান্ত যে বিতর্কিত কোন ইস্যু সম্পর্কে অত্যন্ত সহজে দলিলপত্রের রেফারেন্স দেখাতে পারবেন। আপনার নিজের এলাকার ঘটনাবলী জানতে পারবেন। কোনদিন মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে স্ট্যাটাস বা অন্যকিছু লিখতে ইচ্ছা হলে এখান থেকে সরাসরি কপি করে সহজেই লিখতে পারবেন।

 

মনে করুন, আপনি “ভাষা আন্দোলন” নিয়ে কিছু একটা লিখতে চাইছেন। এই ফাইলে “ভাষা আন্দোলন” লিখে সার্চ দিলেই ১ম খণ্ডের সেই সংক্রান্ত সকল দলিল পেয়ে যাবেন। ফলে রেফারেন্স নিয়ে লিখতে আপনার খুবই সুবিধা হবে। কারণ আমাদের মূল উদ্দেশ্য একটাই। আমরা যেন সঠিক ইতিহাস চর্চা করে বেড়ে ওঠা একটি প্রজন্ম হয়ে উঠি। এটা আমাদের নিজেদের জন্যেই অত্যন্ত প্রয়োজন। যে জাতি নিজের জন্মের ইতিহাস জানে না, সে জাতির চেয়ে দুর্বল সত্ত্বা পৃথিবীতে আর কিছু নেই।

 

মনে করুন, আপনি কোন এলাকা নিয়ে জানতে চান। তবে ঐ এলাকার নাম লিখে এই ডকুমেন্টে সার্চ করুন। উদাহরণস্বরূপ, আপনি ঢাকা শহরের সংঘটিত যুদ্ধ সম্পর্কে জানতে চাইলে Ctrl+F চেপে ‘ঢাকা’ লিখে সার্চ করুন। ১ম খণ্ডে রক্ষিত ‘ঢাকা’ নিয়ে সকল দলিল আপনার সামনে চলে আসবে। দেশকে জানার প্রথম শর্তই হলো নিজের এলাকাকে জানা।

 

আপনি চাইলে নিজের সুবিধামতো ডকুমেন্টটিকে সহজেই কয়েক ভাগে কপি করে ভাগ করে আলাদা আলাদা ডকুমেন্ট তৈরি করতে পারেন। মনে করুন, আপনি ‘শরণার্থী’ নিয়ে জানতে আগ্রহী। তখন ‘শরণার্থী’ লিখে সার্চ করে প্রাপ্ত সকল দলিল কপি করে আলাদা ফাইল তৈরি করুন। পড়তে, বুঝতে এবং প্রয়োজনীয় তথ্য খুঁজে পেতে অনেক সুবিধা হবে।

 

অনুবাদ করা অংশে আলাদা করে অনুবাদ লিখে দেয়া আছে।

 

১ম খণ্ডে যারা কাজ করেছেন তারা এক একজন এক এক ধরনের অপারেটিং সিস্টেম বা একই অপারেটিং সিস্টেম/সফটওয়ারের বিভিন্ন ভার্শনে কাজ করেছেন। যার কারণে ভিতরের টেক্সট মাঝে মাঝে এলোমেলো দেখা যেতে পারে। সেরকম কিছু হলে দয়া করে বিচলিত হবেন না। যে অংশটুকু এলোমেলো দেখাচ্ছে সে অংশটুকু কপি বা কাট করে নিয়ে “নোটপ্যাডে” পেস্ট করুন। দেখবেন ঠিক হয়ে গেছে। এরপর সেটাকে চাইলে কপি করে ওয়ার্ড ফাইলটিতে পেস্ট করে রাখতে পারেন।

 

 

মনোযোগ দিয়ে সারসংক্ষেপটি পড়ার জন্য ধন্যবাদ। এবার বিস্তারিত।

 

 

দলিল প্রসঙ্গঃ

পটভূমি

(পৃষ্ঠা নাম্বারগুলো মূল দলিলের পৃষ্ঠা নাম্বার অনুসারে সরাসরি লিখিত। এর সাথে এই ওয়ার্ড ফাইলের পৃষ্ঠা নাম্বার রিলেটেড নয়)

 

‘বাংলাদেশ স্বাধীনতা যুদ্ধ : দলিলপত্র’ গ্রন্থের প্রথম খণ্ডে ১৯০৫ থেকে ১৯৫৮ সালের সময়সীমার অন্তর্ভুক্ত বাংলাদেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিবর্তনের দলিলপত্র প্রকাশিত হয়েছে।

 

১৯০৫ সালে বঙ্গভংগ সংক্রান্ত সরকারী ঘোষণা এই খণ্ডে প্রথম দলিলরূপে স্থান পেয়েছে। এরপর সন্নিবেশিত হয়েছে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের পাকিস্থান প্রস্তাব সম্পর্কিত দলিল। তৃতীয় দলিলটি হলো শেরেবাংলা কর্তৃক লিয়াকত আলী খানকে লিখিত পত্র। এই পত্রে বংগীয় মুসলিম লীগ নেতৃত্বের সংগে কেন্দ্রীয় মুসলিম লীগ নেতৃত্বের দ্বন্দ্বের চিত্র ফুটে উঠে।

 

এর মধ্যে সন্নিবিষ্ট হয়েছে নিখিল ভারত মুসলিম লীগ কর্তৃক ১৯৪০ সালে গৃহীত পাকিস্তান প্রস্তাব থেকে শুরু করে ১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগ ও পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা সংক্রান্ত নির্বাচিত দলিলপত্র (পৃঃ ২ থেকে ৪৬ পর্যন্ত)। এতে একদিকে বংগীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগ নেতৃত্বের দ্বন্দ্বের চিত্র আছে, শেরেবাংলা কর্তৃক লিয়াকত আলী খানকে লিখিত পত্রে তা স্পষ্টরূপ লাভ করেছে; অন্যদিকে আছে বৃটিশ সরকার কর্তৃক উত্থাপিত কিছু প্রস্তাব এবং তাঁদের প্রদত্ত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আদেশের দলিল। স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্ঠা সংক্রান্ত দলিলপত্রও এই অংশে সন্নিবিষ্ট হয়েছে (পৃঃ ২২-৩৫) ।

 

১৯৪৭ থেকে ১৯৪৮ সালের যেসব দলিল এই সংগ্রহের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, তাতে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর পূর্ব বাংলার জনসাধারণের ক্রমবর্ধমান অসন্তোষের পরিচয় পাওয়া যায়। এর মধ্যে রয়েছে রাষ্ট্রভাষা বিতর্ক (পৃঃ ৪৯, ৫৪, ৬৬-৭৮), মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর বিভিন্ন ভাষণ (পৃঃ ৭৫-৯৩), পূর্ব বাংলার মানুষের অধিকারের পক্ষে মাওলানা ভাসানীর একমাত্র সংসদীয় বক্তৃতা (পৃঃ ৭৪) এবং গণতান্ত্রিক যুবলীগ (পৃঃ ৯৪) ও পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বিরোধী ভাবধারার রাজনৈতিক তৎপরতার দলিল (পৃঃ ১১৭-১৬৫)।

 

১৯৪৮ থেকে ১৯৫২ পর্যন্ত যেসব রাজনৈতিক ঘটনা বা ধারা-উপধারা পরিলক্ষিত হয় তার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে পৃষ্ঠা ১৩৪ থেকে ২২৭ পর্যন্ত । এই অংশে যেমন এসেছে পাকিস্তান গণপরিষদের অবজেকটিভ রেজুলিউশান (পৃঃ ১৩৭), মৌলিক অধিকার কমিটি রিপোর্ট (পৃঃ ১৫৬ থেকে ১৫৭), মূলনীতি সংক্রান্ত ঢাকায় অনুষ্ঠিত জাতীয় মহাসম্মেলন (পৃঃ ১৬০ থেকে ১৬৯)- তেমনি সংযোজিত হয়েছে হাজং বিদ্রোহ (পৃঃ ১৪৪ থেকে ১৪৫), নাচোল বিদ্রোহ (পৃঃ ১৫১), ১৯৬০ সালের দাঙ্গাবিরোধী বক্তব্য (পৃঃ ১৫৩) সংক্রান্ত দলিল।

 

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন সংক্রান্ত বিভিন্ন দলিলের মধ্যে রয়েছে নাজিমুদ্দিনের বক্তৃতা (পৃঃ ২২৮), তৎকালে প্রকাশিত ভাষা আন্দোলনের ঘটনাপঞ্জী (পৃঃ ২৩০ থেকে ২৩৬), বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া (পৃঃ ২৩৭ থেকে ২৩৯) এবং প্রধানমন্ত্রী নূরুল আমিনের বক্তব্য। গণপরিষদে বাংলা ভাষা সংক্রান্ত প্রস্তাব (পৃঃ ২৪৬ থেকে ২৫৯) এবং সর্বদলীয় কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদের দলিল দেওয়া হয়েছে ২৬০ থেকে ২৬৪ পৃষ্ঠায়।

 

২১শে ফেব্রুয়ারীতে ছাত্র-জনতার উপর গুলিবর্ষণ সম্পর্কে তদন্তের জন্য প্রতিষ্ঠিত এলিস কমিশন রিপোর্টটিও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে (পৃঃ ২৬৯ থেকে ৩০১)। সংযোজনী অংশে তৎকালীন পত্রিকায় প্রকাশিত ঘটনার আরও কিছু বিবরণ এবং রাজনৈতিক দলের প্রচারপত্র দেওয়া হয়েছে।

 

১৯৫৩ সালে যুক্তফ্রন্ট গঠন (পৃঃ ৩৭১), ২১ দফা কর্মসূচী (পৃঃ ৩৭২), ১৯৫৪ সালের নির্বাচন ও অন্যান্য বিষয়ের দলিল রয়েছে ৩৭১ থেকে ৩৮৮ পৃষ্ঠায়। ৯২-ক ধারার মাধ্যমে যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা বাতিলের দলিল রয়েছে পৃঃ ৪০৩ থেকে ৪০৬ পর্যন্ত। ১৯৫৪ সালে গণপরিষদ বাতিল হবার (পৃঃ ৪০৭) পর থেকে ১৯৫৮ সালে সামরিক আইন জারি হওয়া পর্যন্ত যেসব দলিল অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে তা যেমন বাংলাদেশের মানুষের ক্রমবর্ধমান অসন্তোষের পরিচয় বহন করে তেমনি পূর্ব পাকিস্তানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল কর্তৃক সরকার গঠনের প্রচেষ্টা (পৃঃ ৪২০, ৬৮১ ও অন্যান্য), পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের সংখ্যাসাম্যের ব্যাপারে মারী চুক্তি (পৃঃ ৪২৬), এক ইউনিট গঠন, খসড়া শাসনতন্ত্র ইত্যাদির বিবরণ দেয়।

 

আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অন্যান্য বিষয়ে পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে দ্বন্দ্ব, কাগমারী সম্মেলনে তার বিশিষ্ট প্রকাশ (পৃঃ ৫৯২-৬০২) এবং এই মূল ধরে ১৯৫৭ সালে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি নামে নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের (পৃঃ ৬১১) দলিলপত্র এবং পূর্ব বাংলার মানুষের ক্রমবর্ধমান অসন্তোষের বিবরণ পাওয়া যায় আওয়ামী লীগ মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান খানের বক্তব্যে (পৃঃ ৬১৫)। এই রাজনৈতিক আবহাওয়ার প্রেক্ষাপটে ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর প্রেসিডেন্ট ইসকান্দার মীর্জা কর্তৃক সামরিক আইন ঘোষণা এবং ২৭ অক্টোবর জেনারেল আইয়ুব খানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করার দলিল পাওয়া যাবে যথাক্রমে ৬২৩ ও ৬৩৩ পৃষ্ঠায়।

 

১৯৪৭ থেকে ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানে সংসদীয় ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল। রাষ্ট্ৰীয় কাঠামো, সংবিধান রচনা, স্বায়ত্তশাসন, নির্বাচন প্রণালী, রাষ্ট্রভাষার প্রশ্ন এবং পূর্ব বাংলার অর্থনৈতিক অবনতি সংক্রান্ত বিষয় সংসদীয় বিতর্কে গুরুত্বপূর্ণ স্থান পেয়েছিল। এই খণ্ডে সংসদীয় বিতর্ক থেকে গৃহীত দলিলের সংখ্যা তাই বেশী। বলাবাহুল্য, আমরা যেসব দলিল সংগ্রহ করতে পেরেছি, তার থেকে নির্বাচন করেই এই সংকলন তৈরী করা হয়েছে।

 

 

সূচিপত্র

ক্রমিক নং বিষয় পৃষ্ঠা

অনুবাদকের নাম ও

অনুবাদ করা পৃষ্ঠা নং

০১ বংগভংগ প্রস্তাব

লেনিন গাজী (১)

 

০২ লাহোর প্রস্তাব শামসুন নাহার চৌধুরী (২-৩)
০৩ মুসলিম লীগ নেতৃত্বের মনোভাব ও ভূমিকার প্রতিবাদে লিয়াকত আলী খানকে লিখিত জনাব এ, এক, ফজলুল হকের চিঠি আহসান উজ জামান (৪-৭)
০৪ হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতি রক্ষার্থে জনাব এ, কে, ফজলুল হকের ভূমিকা এ.এস.এম হাসান লতিফ (৮)
০৫ পূর্ব পাকিস্থান রেনেসাঁ সোসাইটি সুমিতা দাশ (৯-১৪)
০৬ মুসলিম লীগ ব্যবস্থাপক সভার সদস্যদের সম্মেলনে এক-পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব ১৫ মেহেদি হাসান (১৫-১৬)
০৭ ক্যাবিনেট মিশন প্রস্তাব ১৭ পার্থ সুমিত ভট্টাচার্য (১৭-২১)
০৮ স্বাধীন সার্বভৌম বাংলা প্রতিষ্ঠার পক্ষে জনাব হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর প্রেস বিজ্ঞপ্তি ২২ আবেদ হোসাইন (২২-২৪)
০৯ স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের পক্ষে বংগীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সম্পাদক জনাব আবুল হাশিমের প্রেস বিজ্ঞপ্তি ২৫ মাহমুদা জাহান সংস্কৃতি (২৫)
১০ হিন্দু মহাসভা কর্তৃক স্বাধীন সার্বভৌম বাংলার বিরুদ্ধাচরণের জবাবে জনাব হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর বক্তব্য ২৮ তনুজা বড়ুয়া (২৮-৩০)
১১ “স্বাধীন বাংলা” অবাঙালী ও বৃটিশ কর্তৃক বংগভংগের উদ্যোগের বিরুদ্ধে লেখা সম্পাদকীয় ৩১ তানজিম বিন ফারুক (৩১-৩২)
১২ স্বাধীন সার্বভৌম বাংলার প্রস্তাবিত কাঠামো ৩৩ শারমিন রেজওয়ানা (৩৩)
১৩ মিঃ গান্ধী কর্তৃক শরৎ বোসকে লিখিত চিঠি : স্বাধীন সার্বভৌম বাংলার প্রতি কংগ্রেস নেতৃত্বের মনোভাব ৩৪ নিশাত অনি (৩৪)
১৪ ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেন্ডন্স এ্যাক্ট ৩৫ শিফা সালেহীন শুভ (৩৫-৩৯)
১৫ রাষ্ট্রীয় নীতিমালা ব্যাখ্যা : গণপরিষদে জনাব মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর প্রথম বক্তৃতা ৪০ তাসমিয়া তাহসীন (৪০-৪২)
১৬ র‍্যাডক্লিফ রোয়েদাদ : পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে সীমান্ত চিহ্নিতকরণ ঘোষণা ৪৩ মোহাম্মদ আহসান উল্লাহ (৪৩-৪৬)
১৭ পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের কর্মসূচী ৪৭
১৮ বাংলা ভাষার পক্ষে প্রকাশিত পাকিস্তান তমদ্দুন মজলিশের পুস্তিকা (অংশ) ৪৯
১৯ পূব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের সাংগঠনিক প্রচারপত্র ৫০
২০ ঢাকায় গণপরিষদ অধিবেশন অনুষ্ঠানের প্রশ্নে বিতর্ক ৫২ রুবায়েদ মেহেদী অনিক, মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ, প্রনয় রায়
(৫২-৫৩)
২১ গণপরিষদ অধিবেশনে বাংলা ভাষাকে অন্তর্ভুক্তকরণের প্রশ্নে বিতর্ক ৫৪ রহমান মাসুদ (৫৩-৫৪)
শিফা সালেহীন শুভ (৫৩-৫৮)
২২ প্রথম জাতীয় বাজেট আলোচনাকালে পূর্ব বাংলার দাবীদাওয়ার প্রশ্নে বিতর্ক ৫৯

কামরুজ্জামান কাব্য (৬৩-৬৫)

শিফা সালেহীন শুভ (৫৯- ৬৫)

২৩ সাপ্তাহিক নও বেলালে প্রকাশিত সম্পাদকীয় “রাষ্ট্রভাষা” : পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা ও শিক্ষার মাধ্যমরূপে বাংলাকে গ্রহণ করার সুপারিশ ৬৬
২৪ এগারই মার্চ, ১৯৪৮ সালে অনুষ্ঠিত হরতাল সম্পর্কে সরকারী বক্তব্য ৬৮
২৫ পূর্ব বাংলা ব্যবস্থাপক সভার কার্যবিবরণীর অংশ ৬৯ আবেদ হোসাইন (৫৯-৭৩)
২৬ পূর্ব বাংলা ব্যবস্থাপক সভার বাজেট বিতর্কে মওলানা ভাসানীর বক্তব্য ৭৪ শিফা সালেহীন শুভ (৭৫-৭৬)
২৭ ১১ই মার্চের ধর্মঘট সম্পর্কে “নও বেলাল” প্রতিনিধির বক্তব্য ৭৭
২৮ রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ ও পূর্ব বাংলার প্রধানমন্ত্রী জনাব নাজিমুদিনের মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তি ৭৮
২৯ জাতীয় সংহতি সম্পর্কে পাকিস্তানের গর্ভনর জেনারেল কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ভাষণ ৭৯ নিশাত অনি   (৭৯-৮৫)
৩০ জাতি গঠনের ছাত্রদের ভূমিকা : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে গভর্নর জেনারেল জানাব মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ভাষণ ৮৬ রুবায়েদ মেহেদী অনিক, মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ, প্রনয় রায়
(৮৬-৮৯)
৩১ রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ কর্তৃক জেনারেল জনাব মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর কাছে প্রদত্ত স্মারকলিপি ৯০
৩২ জনাব মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর পূর্ব পাকিস্তান হতে বিদায়কালীন ভাষণ ৯১ শাহ জালাল (৯১-৯৩)
৩৩ গণতান্ত্রিক যুবলীগের প্রচার পুস্তিকা ৯৪
৩৪ ভাষার স্বাধীনতার পক্ষে পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সম্মেলনের সভাপতি ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহর ভাষণ ১০৯
৩৫ আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রথম প্রস্তাবিত ম্যানিফেষ্টো ১১৭
৩৬ পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রথম ঘোষণা ও গঠনতন্ত্র ১২০

তাসনিয়া লুবনা (১২০-১২২)

নুরুন নাহার জুঁই (১২৩-১২৫)

সুদীপ্ত কুমার ধর (১২৬-১২৭)

সাফানুর সিফাত (১২৮)
সালাউদ্দিন ফেরদৌস (১২৯-১৩১)

রিমি দাস (১৩২-১৩৪)

কাজী ইশরাত জাহান তন্বী (১৩৫-১৩৬)

৩৭ পাকিস্তান গণপরিষদে জনাব লিয়াকত আলী খান কর্তৃক উত্থাপিত অবজেকটিভস রিজোলিউশন ১৩৬

কাজী ইশরাত জাহান তন্বী (১৩৭)

সাদ্দাম হোসেন বকুল (১৩৮-১৪০)

অর্পণ ভট্টাচার্য (১৪১-১৪২)

৩৮ হাজং বিদ্রোহের উপর সংবাদপত্রের প্রতিবেদন ও সরকারী প্রেসনোট ১৪৩
৩৯ পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের রাজনৈতিক বক্তব্য ১৪৫
৪০ উর্দুর পক্ষে তাত্ত্বিক বক্তব্য ১৪৭
৪১ নাচোল অঞ্চলে কৃষক বিদ্রোহের নেত্রীর উপর পুলিশী নির্যাতনের অভিযোগ ১৫০ আবীর এম. আহমেদ (১৫০-১৫১)
৪২ সাম্প্রদায়িক দাংগার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের যৌথ বিবৃতি ১৫২
৪৩ পাকিস্তানের নাগরিক ও সংখ্যালঘু প্রশ্নে মৌলিখ অধিকার কমিটির রিপোর্ট ১৫৫

অতঃপর সাবেরি (১৫৫-১৫৬)

জুবায়ের আবদুল্লাহ (১৫৭)

 

৪৪ পূর্ব বাংলার গণতান্ত্রিক এবং সামগ্রিক পরিবেশ সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী জনাব লিয়াকত আলী খান-এর কাছে পেশকৃত প্রশ্নমালা ১৫৮ শাহাদাত জামান সৈকত (১৫৮-১৬০)
৪৫ ঢাকায় অনুষ্ঠিত জাতীয় মহা-সম্মেলনে গৃহীত মূলনীতি ও প্রস্তাবসমূহ ১৬০

রাইয়ান রন (১৬১-১৬৩)

মোহাম্মদ মহিদুর রহমান (১৬৪-১৬৬)

শওকত আরা (১৬৭-১৬৯)

৪৬ মূলনীতি কমিটির অন্তর্বর্তীকালীন রিপোর্ট ১৬৮

আবেদ হোসাইন (১৬৮-১৭৭)

মারসিয়া হিমি (১৭৫)

ফারহানা শারমিন (১৭৬-১৭৮)

ফরহাদ রকিব (১৭৯-১৮১)

লামিয়া মহসিন (১৮২-১৮৪)

সাফানুর সিফাত (১৮৫-১৯০)

সজিব সাখাওয়াত (১৯১-১৯৩)

ইকবাল মাহমুদ অনিক (১৯৪-১৯৬)

রহমান সোহাগ (১৯৭-১৯৯)

মোহাম্মদ মহিদুর রহমান (২০০)

ফারহানা শারমিন (২০১-২০২)

রুবাইয়াত সাইমুম (২০৩-২০৫)

৪৭ মূলনীতি কমিটির অন্তর্বর্তীকালীন রিপোর্ট বিবেচনা স্থগিত রাখার প্রস্তাব ২০৪ মোহাম্মদ তামিম (২০৬)
৪৮ পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগের ঘোষণাপত্র ২০৭
৪৯ বাংলা ভাষার সরলীকরণ প্রচেষ্টার একটি নমুনা ও তার প্রতিক্রিয়া ২১৪ মারসিয়া হিমি (২১৪-২১৫)
৫০ উর্দু ভাষাকে শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করার পক্ষে বক্তব্য ২১৭
৫১ পূর্ব বাংলার লবণ সংকট ২১৯

শাহা মোহন (২২০)

ফাহিম ফেরদৌস চয়ন (২২১)

শুভা সরকার (২২২-২২৫)

৫২ রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জনাব খাজা নাজিমুদিনের বক্তব্য ২২৮
৫৩ একুশে ফেব্রুয়ারী : আন্দোলনের ঘটনাবলী ২৩০
৫৪ আবুল কালাম শামসুদিন কর্তৃক লিখিত দৈনিক আজাদে প্রকাশিত সম্পাদকীয় ২৩৭
৫৫ ভাষা বিতর্কের উপর লিখিত প্রবন্ধ : সকল ভাষার সমান মর্যাদা ২৩৮
৫৬ ভাষা আন্দোলনের উদ্দেশ্য ও গতি প্রকৃতির সমালোচনায় পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী জনাব নূরুল আমীনের বক্তব্য ২৪০
৫৭ যুব দাবী দিবস উপলক্ষে পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগের রাজনৈতিক ঘোষণা ২৪৪
৫৮ পাকিস্তান গণপরিষদে বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব উত্থাপন ২৪৬

রামিসা ফারহানা (২৪৬-২৪৯)

রাইয়ান রন (২৫১)

আব্দুর রহমান সৌরভ (২৫২)

এ. এম. ফয়সাল (২৫০, ২৫৩-২৫৪)

আফরিন মোহনা (২৫৫)

সাফানুর সিফাত (২৫৬)

এ. এম. কাউসার (২৫৭)

জান্নাত আরা জ্যোতি (২৫৮-২৫৯)

 

৫৯ সর্বদলীয় কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদ সম্মেলনে জনাব আতাউর রহমান খানের ভাষণ ২৬০
৬০ বাংলা ভাষার পক্ষে ইসলামী ভ্রাতৃসংঘের ঘোষণা ২৬৫
৬১ রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনকালে মিছিলে গুলিবর্ষণের ঘটনার উপর জাষ্টিস এলিস-এর তদন্ত রিপোর্ট ২৬৯

এ. এম. কাউসার (২৬৯)

মারসিয়া হিমি (২৭০)

রিমি দাস (২৭১-২৭৩)

ইকবাল মাহমুদ অনিক (২৭৪, ২৮৫)

সাইমা এইচ পুতুল (২৭৫)

জুবাইর আবদুল্লাহ (২৭৬)

সাফানুর সিফাত (২৭৭-২৭৮)

রামিসা ফারহানা (২৭৯-২৮০)

রাকেশ বিশ্বাস (২৮১)

রুবায়েদ মেহেদী অনিক (২৮২)

আব্দুর রহমান সৌরভ (২৮৩-২৮৪)

ইয়াসির আরেফিন (২৮৬, ২৯৯-৩০০)

সাফানুর সিফাত (২৮৭-২৮৮)

রিমি দাস (২৮৯-২৯০)

ইকবাল মাহমুদ অনিক (২৯১-২৯২)

সাফানুর সিফাত (২৯৩-২৯৪)

তানজিম রহমান (২৯৫-২৯৭)

রুবায়েদ মেহেদী অনিক (২৯৮)

৬২ পাকিস্তান গণপরিষদে মূলনীতি কমিটির রিপোর্ট পেশকালে জনাব খাজা নাজিমুদ্দিন-এর বক্তব্য ৩০২

মুনসুর সজিব (৩০১-৩০৩)

সামিয়া সুলতানা (৩০৪-৩০৬)

সাদ্দাম সুলতান বকুল (৩০৭-৩০৮)

৬৩ পাকিস্তান গণপরিষদে পেশকৃত মৌলিক অধিকার কমিটির রিপোর্ট ৩০৮ আব্দুর রহমান সৌরভ (৩০৯-৩১৪)
৬৪ মূলনীতি কমিটির চূড়ান্ত রিপোর্ট ৩১৫

তামিম হোসেন (৩১৫)

সন্ধ্যা প্রদীপ (৩১৬)

আফরিন মোহনা (৩১৭-৩১৯)

আবু মোহাম্মদ ফয়সাল (৩২০-৩২১)

মামুর নূর আমিন চৌধুরী (৩২২-৩২৪)

শাহেদুল হক (৩২৫-৩২৬)

রামিসা ফারহানা (৩২৭-৩২৮)

সোহানুর রহমান সোহান (৩২৯)

তনু দীপ (৩৩০)

শুভা সরকার (৩৩১-৩৩৩)

জয়া করিম (৩৩৪-৩৪৪)

সাফানুর সিফাত (৩৪৫-৩৪৮)

আবীর এম. আহমেদ (৩৪৯-৩৫১)

শিফা সালেহীন শুভ (৩৫২-৩৫৭)

 

৬৫ মোহাম্মদ আলী ফর্মুলা ৩৫৬

বলরাম রয় (৩৫৮-৩৫৯)

অভিক হাসান (৩৬০)

৬৬ মূলনীতি কমিটির চূড়ান্ত রিপোর্টের উপর বিতর্ক ৩৬১

সালাউদ্দিন ফেরদৌস (৩৬১-৩৬৩)

নওশিন সখি (৩৬৪-৩৬৬)

সায়েম তামজিদ অপূর্ব (৩৬৭-৩৬৮)

সাইমা এইচ পুতুল (৩৬৯-৩৭০)

 

 

৬৭ যুক্তফ্রন্ট গঠন ৩৭১
৬৮ যুক্তফ্রন্টের ২১-দফা ৩৭২
৬৯ যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন সংক্রান্ত সার্কুলার ৩৭৪

রুবায়েদ মেহেদী অনিক (৩৭৪)

 

৭০ মুসলিম লীগ বিরোধী যুক্তফ্রন্টের প্রচার পুস্তিকা ৩৭৫ ফারহানা শারমিন (৩৭৫)
৭১ যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন-পরবর্তী সাংগঠনিক সার্কুলার ৩৮৫ ফারহানা শারমিন (৩৮৫-৮৬)
৭২ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের বিজয় ৩৮৭
৭৩ সাংগঠনিক বিষয় ও বিভিন্ন এলাকার সমস্য সম্পর্কে অবহিত করার জন্য প্রচার-পত্রের মাধ্যমে মওলানা ভাসানীর আহবান ৩৮৮
৭৪ পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সম্মেলনে ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহর উদ্বোধনী বক্তৃতা ৩৯০
৭৫ পাকিস্তান গণপরিষদে উর্দু ও বাংলাকে সরকারী ভাষা হিসাবে স্বীকৃতি দান ৩৯৫ ইকবাল মাহমুদ অনিক (৩৯৫-৩৯৬)
৭৬ ড. হক কর্তৃক কেবলমাত্র উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দানের আহবান ৩৯৬
৭৭ পাকিস্তান গণপরিষদের ভাষা সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে মওলানা ভাসানীর বিবৃতি ৩৯৮ মারসিয়া হিমি (৩৯৭-৩৯৮)
৭৮ নিউইয়র্ক টাইমস-এর প্রকাশিত পূর্ব বাংলার “স্বাধীনতার” পক্ষে জনাব এ, কে, ফজলুল হকের বিবৃতি ৩৯৯ সাফানূর সিফাত (৩৯৯-৪০০)
৭৯ জনাব এ, কে, ফজলুল হক কর্তৃক নিউ ইয়র্ক টাইমস-এ প্রকাশিত বিবৃতির প্রতিবাদ ৪০১ রাকেশ বিশ্বাস (৪০১-৪০৪)
৮০ পূর্ব পাকিস্তানে ৯২-ক ধারা প্রবর্তন ৪০৩
৮১ সরকার কর্তৃক ৯২-ক ধারা প্রবর্তনের যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা ৪০৪ সজীব সাখাওয়াত (৪০৫-৪০৬)
৮২ পাকিস্তান গণপরিষদ বাতিল ঘোষণা ৪০৭

মোক্তাদির রাকিব (৪০৭-৪০৮)

সাইমা এইচ পুতুল (৪০৯)

৮৩ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দাবী দিবসে জনাব এ, কে, ফজলুল হকের ভাষণ ৪১০ রাজিব কুণ্ডু (৪১৭-৪১৮)
৮৪ মওলানা ভাসানীকে দেশে ফিরে আসতে দেয়ার দাবী ৪১৩
৮৫ আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক প্রচারপত্র ৪১৪
৮৬ পাকিস্তান গণপরিষদের নির্বাচনের ফলাফল ৪১৭
৮৭ ৯২-ক ধারা প্রত্যাহার ও যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভার পুনর্বহাল ৪১৯ শুভা সরকার (৪১৯-৪২০)
৮৮ জনাব আবু হোসেন সরকারের নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠন ৪২০ মরহুম স্বপ্নিল (৪২১-৪২২)
৮৯ যুক্তফ্রন্ট সরকার কর্তৃক রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তিদান ৪২২
৯০ আওয়ামী লীগ প্রচারিত মুসলিম লীগ বিরোধী বক্তব্য ৪২৩
৯১ মারী মুক্তি ৪২৬ তনু দীপ (৪২৬-৪২৭)
৯২ পাকিস্তান গণপরিষদে এক ইউনিট প্রশ্নে বিতর্ক ৪২৭

শর্মিষ্টা দাশ(৪২৮)

সৈকত(৪২৯, ৪৩৪)

সাফানুর সিফাত (৪৩০-৪৩১, ৪৪১)

রামিসা ফারহানা (৪৩২-৪৩৩)

শুভ সরকার (৪৩৫)

মনসুর সজীব (৪৩৬-৪৩৭)

আব্দুর রহমান সৌরভ (৪৩৮-৪৩৯)

তানজিম রহমান (৪৪০) সাফানুর সিফাত (৪৪১)

নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ (৪৪২-৪৪৩)

 

৯৩ বাংলা একাডেমীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে পূর্ব বংগের প্রধানমন্ত্রী জনাব আবু হোসেন সরকারের ভাষণ ৪৪৪
৯৪ আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে আওয়ামী লীগ ৪৪৭ রুবায়েদ মেহেদী অনিক (৪৪৭-৪৪৮)
৯৫ পাকিস্তান গণপরিষদে ১৯৫৬ শাসনতন্ত্র বিল পেশ ও আইনমন্ত্রীর বক্তব্য ৪৪৯ সালাউদ্দিন ফেরদৌস (৪৪৯-৪৫০)
৯৬ ১৯৫৬ সালের প্রস্তাবিত শাসনতন্ত্রের উপর মওলানা ভাসানীর বক্তব্য ৪৫১
৯৭ পাকিস্তান গণপরিষদে ১৯৫৬ শাসনতন্ত্র বিল সংক্রান্ত বির্তক ৪৫৩

শুভা সরকার (৪৫৩-৪৫৪)

আবীর এম. আহমেদ (৪৫৫)

তনু দীপ (৪৫৬)

সামিয়া সুলতানা (৪৫৭-৪৫৮)

সাইমা এইচ পুতুল (৪৫৯-৪৬০)

শওকত আরা (৪৬১-৪৬২)

রাজন বিশ্বাস (৪৬৩-৪৬৪)

তামিম হোসেইন (৪৬৫-৪৬৬)

সালাউদ্দিন ফেরদৌস (৪৬৭-৪৬৮)

রিমি দাস (৪৬৯)

ইস্পিতা দাস (৪৭০, ৪৭৩-৪৭৪)

সজিব সাখাওয়াত (৪৭৫-৪৭৬)

মোক্তাদির রাকিব (৪৭১-৪৭২)

সন্ধ্যা প্রদীপ (৪৭৭-৪৭৮)

শাহেদুল হক (৪৭৯-৪৮২)

 

 

৯৮ ১৯৫৬ সালের শাসনতন্ত্র ৪৮২

শেখ সালাউদ্দিন (৪৮৩)

আশরাফুল মাহবুব (৪৮৪-৪৮৫)

ফাহিম ফেরদৌস চয়ন (৪৮৭-৪৮৮)

শিফা সালেহীন শুভ (৪৮৯-৪৯২)

ইকবাল মাহমুদ অনিক(৪৯২)

মহিয়ূল মুক্তি (৪৯৪-৪৯৫)

শিহাব শাহারিয়ার মুকিত (৪৯৬-৪৯৯)

ইফ্ফাত আরা মুনিয়া (৫০০-৫০১, ৫০৪, ৫০৮)

মাসআ নাতালসু থিযূঁ (৫০২)

তন্ময় (৫০৩)

অভিক হাসান (৫০৫, ৫০৭)

জান্নাত আরা জ্যোতি (৫০৬)

তনুজা বড়ুয়া (৫০৯-৫১০)

মেহরাজ উদ্দিন (৫১১-৫১৪)

ওমর ফারুক নাইম (৫১৬ )

শুভ সরকার (৫১৭)

শম্পা সরকার (৫১৫, ৫৬৭)

কাজী ইসরাত জাহান তন্বী (৫১৮-৫১৯, ৫৫৪-৫৫৫)

মাহমুদা জাহান সংস্কৃতি (৫২০, ৫৬৩, ৫৬৬)

রিফাত মাহমুদ (৫২১)

রিমি দাস (৫২২-৫২৩)

শিফা সালেহীন শুভ (৫২৪, ৫২৭-৫৩০, ৫৪৯-৫৫৩, ৫৬০-৫৬১, )

শাহেদুল হক (৫২৫-৫২৬, ৫৫৮-৫৫৯, ৫৭০-৫৭১)

ইন্দ্রাণী গোলদার (৫৩১-৫৩২, ৫৮৫-৫৮৬)

মোহাম্মদ ইমরান খান ইমন (৫৩৩-৫৩৪)

এম. গোলাম মাহবুব (৫৩৭-৫৩৮)

আশরাফুল মাহবুব (৫৩৯-৫৪০)

সোহানুর রহমান সোহান (৫৩৫-৫৩৬, ৫৪১-৫৪২, ৫৪৭-৫৪৮)

কৃষিবিদ বিধান চন্দ্র সাহা (৫৪৩-৫৪৪)

বদরুন নাহার লুনা (৫৫৬-৫৫৭ )

সায়েম তামজিদ অপূর্ব (৫৪৫-৫৪৬, ৫৭৯-৫৮০)

শর্মিষ্টা দাস (৫৬৮-৫৬৯ )

নাযিউর রহমান রাহাত (৫৭২-৫৭৩)

আস্রাফুল মাহবুব (৫৭৪)

আব্দুর রহিম (৫৭৫-৫৭৬)

 

৯৯ যুক্ত নির্বাচনের পক্ষে আওয়ামী লীগের প্রচার ৫৭৭
১০০ আওয়ামী লীগ সরকার গঠন ৫৭৯
১০১ আওয়ামী লীগ মুখ্যমন্ত্রীর নীতিনির্ধারণী বক্তব্য ৫৮১
১০২ যুক্ত নির্বাচন বিল ৫৮৫ মুহিয়ুল মুক্তি (৫৮৭-৫৯১)
১০৩ নির্বাচন প্রথা আইন পাস ৫৯০
১০৪ মওলানা ভাসানীর রাজনৈতিক বক্তব্য ৫৯২
১০৫ কাগমারী সম্মেলনের প্রচারপত্র ৫৯৩
১০৬ কাগমারী সম্মেলনে আন্তর্জাতিক রাজনীতির উপর মওলানা ভাসানীর বক্তব্য ৫৯৪
১০৭ কাগমারী সম্মেলনে আন্তর্জাতিক রাজনীতির উপর জনাব হোসেন শহীদ সোহরাওয়াদীর বক্তব্য ৫৯৮
১০৮ কাগমারী সম্মেলনে সম্পর্কে মুসলিম লীগ সমর্থক দৈনিক আজাদ’-এর সম্পাদকীয় বক্তব্য ৬০০
১০৯ মওলানা ভাসানীর রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক বক্তব্য ৬০২
১১০ পূর্ব পাকিস্তান ব্যবস্থাপক সভায় স্বায়ত্তশাসন প্রস্তাব গৃহীত ৬০৩

আদনান তাবাসসুম (৬০৩-৬০৫)

শামিম (৬০৭,৬০৯-৬১০)

১১১ পাকিস্তান ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি গঠিত ৬১১
১১২ সাধারণ নির্বাচন বানচালের বিরুদ্ধে হুশিয়ারী ৬১৩
১১৩ পূর্ব পাকিস্তানের আর্থিক অবস্থা সম্পর্কে মুখ্যমন্ত্রী জনাব আতাউর রহমান খানের ভাষণ ৬১৫
১১৪ সামরিক আইন জারি ও জেনারেল ইস্কান্দার মীর্জা কর্তৃক ক্ষমতা দখল ৬২৩
১১৫ প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মীর্জা কর্তৃক ঘোষিত নিউ লীগাল অর্ডার এবং এ প্রসঙ্গে প্রধান ৬২৭

লামিয়া মোহসিন (৬২৮-৬২৯, ৬৩২-৬৩৩)

এ. এম. ফয়সাল (৬৩৩)

মারসিয়া হিমি (৬৩০-৬৩১)

১১৬ জেনারেল আইয়ুব খানের ক্ষমতা দখল ৬৩৫
সংযোজন
১১৭ বংগভংগ সংক্রান্ত আরও সরকারী দলিল ৬৩৬
১১৮ বংগভংগ রদ সংক্রান্ত সরকারী দলিল ৬৩৮

আফরিন মোহনা (৬৩৮-৬৩৯)

লামিয়া মোহসিন (৬৪০)

রিমি দাস (৬৪১-৬৪২)

১১৯ রাষ্ট্রভাষা বাংলার সপক্ষে একটি নিবন্ধ ৬৪৫
১২০ অবজেকটিভ রেজুলিউশন সংক্রান্ত বিতর্ক ৬৪৮

শাহেদুল হক (৬৬৯, ৬৭২)

আবীর এম. আহমেদ (৬৫৩)

সোহানুর রহমান সোহান (৬৫৪)

 

১২১ রাষ্ট্রভাষা বাংলার সমর্থনে ও ২ শে ফেব্রুয়ারী হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে দুটি লিফলেট ৬৭৩ শিফা সালেহীন শুভ (৬৭০-৬৭১)
১২২ ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারী : ভাষা আন্দোলনে ঘটনাপঞ্জী ৬৭৫
১২৩ ভাষা আন্দোলনকালীন দৈনিক আজাদ-এর দুটি সম্পাদকীয় ৭০৫
১২৪ মোজাফফর আহমদ চৌধুরী ও মীর্জা গোলাম হাফিজের বিরুদ্ধে সরকারের আটকাদেশ সংক্রান্ত তথ্য ৭০৮
১২৫ পূর্ব পাকিস্তান গণতন্ত্রী দলের আত্মপ্রকাশ : পাকিস্তানে কনফেডারেশন প্রতিষ্ঠার দাবী ৭১১
১২৬ পূর্ব বাংলায় ৯২-ক ধারা জারির পরিপ্রেক্ষিতে কেন্দ্রীয় সরকারের দমননীতি : রাজনৈতিক নেতা ও কর্মীদের ব্যাপক গ্রেফতার ৭১৩
১২৭ পাকিস্তান গণপরিষদ বাতিলের বিরুদ্ধে তমিজুদ্দীন কানের রীট আবেদন ৭১৭ সাফানুর সিফাত (৭১৭)
১২৮ পূর্ব পাকিস্তান ব্যবস্থাপক সভার আতাউর রহমান খানের বাংলায় বাজেট বক্তৃতা ৭১৯
১২৯ পূর্ব পাকিস্তান ব্যবস্থাপক সভার নির্বাচন প্রথা সম্পর্কিত বিতর্ক ও যুক্ত নির্বাচনের সপক্ষে প্রস্তাব গ্রহণ ৭২৭

এ এম ফয়সাল (৭৩৭)

কপিল দেব (৭৩৮,৭৪০)

জিয়া আরেফিন আজাদ (৭৪৫)

১৩০ নিখিল পাকিস্তান গণতান্ত্রিক কর্মী সম্মেলনে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর বক্তৃতা ৭৫৪
১৩১ পাকিস্তান কেন্দ্রীয় মন্ত্রী পরিষদসমূহের তালিকা ৭৬৮
১৩২ নির্ঘন্ট ৭৮৩

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<001.001.001>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

 

 

শিরোনামঃ বঙ্গভঙ্গ প্রস্তাব সম্পর্কিত দলিল

সুত্রঃ স্ট্রাগল ফর ফ্রিডমঃ আর.সি.মজুমদার, পৃষ্ঠা-২০

তারিখঃ ১৯শে জুলাই,১৯০৫

 

বঙ্গভঙ্গ

বাংলার আসাম, ঢাকা, চট্টগ্রাম আর রাজশাহী বিভাগ নিয়ে আলাদা একটি অঙরাজ্য গঠিত হবে, এখবরটি প্রথম কোলকাতা প্রেস-এ প্রকাশ পাশ ১৯০৫ সালের ৬ই জুলাই। পরদিন এর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসে সিমলা থেকে।

এর ফলে বাস্তবিক কী কী পরিবর্তন আসবে তার বিবরণ ঘোষণাটির অনুচ্ছেদ ৭ তুলে ধরা হলো: “৭। সম্মতিক্রমে প্রস্তাবের ফলে যে সকল পরিবর্তন তার বিবরণ নিম্নরূপ:

আসামের বর্তমান প্রধান কমিশনারকে প্রতিনিধি গভর্নর করে বাংলার চট্টগ্রাম, ঢাকা এবং রাজশাহী বিভাগ, মালদহ জেলা এবং পার্বত্য ত্রিপুরা রাজ্য নিয়ে নতুন একটি রাজ্য গঠিত হবে। দার্জিলিং বাংলার সাথে থাকবে। উভয় অঞ্চলের গুরুত্ব বিবেচনা করে সমন্বয়ের জন্য রাজ্যের নাম হবে পূর্ববঙ্গ ও আসাম। এর রাজধানী হবে ঢাকা আর অধীনস্থ কিছু হেডকোয়ার্টার হবে চট্টগ্রামে।

১,০৬,৫৫০ বর্গমাইলের ও ৩ কোটি ১০ লাখ জনগোষ্ঠীর এই অঞ্চলে, ১ কোটি ৮০ লাখ মুসলিম এবং ১ কোটি ২০ লাখ হিন্দু বসবাস করে। এর অধীনে একটি আইন সভা থাকবে। রাজস্ব বোর্ডের দুই সদস্য এবং কোলকাতা হাইকোর্টের কর্তৃত্ব অবিঘ্নিত থাকবে।

বিদ্যমান বাংলা প্রদেশ পূর্ব দিকের এই বিশাল অঞ্চল এবং ছোট নাগপুরের পাঁচটি হিন্দু রাজ্য ছেড়ে দেয়ায় আয়তনে ছোট হলেও সম্বলপুর ও উরিষ্যার পাঁচটি পূর্ববর্ণিত রাজ্যের অধিগ্রহণ করবে। ৫ কোটি ৪০ লাখ জনগোষ্ঠীর মধ্যে ৪ কোটি ২০ লাখ হিন্দু এবং ৯০ লাখ মুসলিম অধ্যুষিত এর মোট আয়তন হবে ১,৪১,৫৮০ বর্গ মাইল।

সংক্ষেপে বাংলা ও আসামের বর্তমান অঞ্চলসমূহ দুটো অখণ্ড এবং সার্বভৌম প্রদেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাবে। প্রতিটির মধ্যেই ব্যাপক সমরূপী অঞ্চল রয়েছে, যারা সুনির্দিষ্ট সীমানা দ্বারা পৃথককৃত, সম্পদে স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং উন্নত প্রশাসনিক ব্যবস্থায় সজ্জিত।”

পাদটীকা: পুনর্বিবেচিত এই বিভাজনের পরিকল্পনা ১৯শে জুলাই সরকারী ঘোষণা হিসেবে জনসমক্ষে আসে, ২০শে জুলাই কোলকাতা প্রেস থেকে তা প্রকাশিত হয়।

(ঘোষণার পূর্ণ বিবরণ দিয়েছেন বাংলা, ওপি.সিআইটি অ্যাপ. জিপিএল)

 

——-

 

 

 

<001.002.002>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

 

শিরোনামঃ লাহোর প্রস্তাব

সুত্রঃ পাকিস্তান মুভমেন্ট- হিস্টরিক ডকুমেন্টস, পৃষ্ঠা – ১৭২

তারিখঃ ২৩শে মার্চ, ১৯৪০

 

সর্ব ভারতীয় মুসলিম লীগ তেইশতম বার্ষিক অধিবেশনে ২৭শে মার্চ, ১৯৪০ এ সমাধান গৃহীত হয় যা সাধারনত পাকিস্তানী প্রস্তাব নামে পরিচিত।

 

যখন সমগ্র ভারত মুসলিম লীগ কমিটির সংসদ ও কর্ম পরিষদ দ্বারা অনুমোদন গ্রহন করা হয়েছে; যা সমাধানকেই নির্দেশ করেছে। ২৭শে অগাস্ট, ১৭ই এবং ১৮ই সেপ্টেম্বর এবং ২২শে অক্টোবর ১৯৩৯ এবং ৩ই ফেব্রুয়ারী ; ১৯৪০ সংবাধানিক বিষয়ে সর্ব ভারতীয় মুসলিম লীগ এই অধিবেশনে সজোরে পুনরাবৃত্তি করে ফেডারেশনের পরিকল্পনা সরকারের দেহী ভারত শাসন আইন ১৯৩৫ যা সম্পূর্ণই দেশের এই অদ্ভুত অবস্থার জন্য অনুপযুক্ত এবং অকার্যকর এবং পুরো মুসলিম ভারতে তা অগ্রহণযোগ্য।

এটা আরও জোরালো দৃশ্য রেকর্ড করা হয় যখন মহামান্য সরকারের পক্ষ থেকে রাজপ্রতিনিধি ১৮ই অক্টোবর, ১৯৩৯ তারিখে ঘোষণা করে পুনরায় ভরসা প্রদান করা হয় যে যতদূর পর্যন্ত ১৯৩৯ এর ভারত শাসন আইন নীতি এবং পরিকল্পনা গ্রহন করা হয়েছে; তা যদি ভারতের সম্প্রদায় ও মুসলিম ভারত যদি সন্তুষ্ট না হয় তাহলে পুরো সাংবিধানিক পরিকল্পনা নতুন করে পুনর্বিবেচনা করা হবে এবং ততক্ষণ পর্যন্ত সংশোধিত পরিকল্পনা গ্রহণযোগ্য হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত তা মুসলিমদের অনুমোদন এবং সম্মতি নিয়ে প্রণীত হয়।

সর্ব ভারতীয় মুসলিম লীগের এই অধিবেশনে সংশোধিত দৃশ্য হল কোন সাংবিধানিক পরিকল্পনা এই দেশে অথবা মুসলিমদের কাছে কার্যকর হবে না যদি তা নিম্নলিখিত মৌলিক নীতির উপর নকশা না করা হয় ; যথা, যে ভূগোলিকভাবে সংলগ্নন একক অঞ্ছল যা অঞ্চলগুলোর সীমা নির্দেশ করে যেমন স্থানিক পুনরায় সমন্বয় প্রয়োজন হতে পারে, যে এলাকায় মুসলমান সংখাসুচকভাবে একটি সংখ্যা গরিষ্ঠ ভারতের উত্তর পশ্চিম এবং পূর্ব জোনের হিসাবে হওয়া উচিত যেখানে “স্বাধীন রাষ্ট্র ” হিসাবে স্বায়ত্তশাসিত ও সার্বভৈাম সংবিধানিক ইউনিট থাকবে।

এই পর্যাপ্ত, কার্যকরী এবং বাধ্যতামূলক রক্ষাকবচ যা বিশেষভাবে সংখ্যা লঘুদের জন্য জোগান দেওয়া উচিত এবং তাদের সঙ্গে আলোচনাতে তাদের ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, প্রশাসনিক এবং অন্যান্য অধিকার রক্ষায় তাদের সঙ্গে আলোচনা করে এবং ভারতের অন্যান্য অংশে যেখানে মুসলমানরা সংখালঘু তাদের এবং অন্যান্য সংখ্যালঘুদের ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও অন্যান্য অধিকার ও স্বার্থ রক্ষায় পরামর্শ করে পর্যাপ্ত কার্যকর এবং বাধ্যতামূলক সংবিধান রক্ষাকবচ বিশেষভাবে জোগান দেওয়া হবে।

এই অধিবেশনে আরও একটি প্রকল্প গঠন করা হবে কার্যকর কমিটির অনুমোদন এর সাথে মৌলিক নীতি অনুযায়ী সংবিধান ধারনাটি পরিশেষে প্রদান করা হবে। সমস্ত অধিকার যেমন প্রতিরোধ, বাহ্যিক ব্যপার, যোগাযোগ, রীতিনীতি এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় বিষয় নিজ নিজ অঞ্চল দ্বারা প্রদান করা হবে।

 

 

 

<001.002.003>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

 

প্রস্তাবিত – মাননীয় মৌলভি এ কে ফজলুল হক (বাংলার প্রধানমন্ত্রী )

সহকারিত্ত – চৌধুরী খালিকুজ্জামান সাহেব; এম এল এ ( ইউ পি )

সমর্থিত – মাওলানা জাফর আলী খান সাহেব; এম এল এ (কেন্দ্রীয় )

  • সরদার আড়ঙ্গ জেব খান সাহেব; এম এল এ ( এন ডব্লিউ এফ প্রদেশ )
  • হাজী স্যার আবদুল্লাহ হারুন; এম এল এ ( কেন্দ্রীয় )
  • কে বি নওয়াব ইসমাইল খান সাহেব, এম এল সি ( বিহার )
  • কাজী মোহাম্মদ ঈসা খান সাহেব, বেলুচিস্তানের রাষ্ট্রপতি, প্রাদেশিক মুসলিম লীগ।
  • আব্দুল হামিদ খান সাহেব ; এম এল এ ( মাদ্রাজ )
  • আই আই চুনদরিগার সাহেব ; এম এল এ ( বোম্বে )
  • সৈয়দ আব্দুল রউফ শাহ সাহেব; এম এল এ ( সি পি )
  • ডঃ মোহাম্মদ আলম; এম এল এ ( পাঞ্জাব)
  • সৈয়দ জাকির আলী সাহেব ( ইউ পি )
  • বেগম সাহিবা মাওলানা মোহাম্মদ আলী
  • মাওলানা আব্দুল হামিদ সাহেব কাদের ( ইউ পি )।

 

 

 

———-

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<001.003.004>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

 

শিরোনামঃ মুসলিম লীগ নেতৃত্বের মনোভাব ও ভূমিকার প্রতিবাদে দল থেকে পদত্যাগের প্রশ্নে লিয়াকত আলী খানকে লিখিত ফজলুল হকের চিঠি

সুত্রঃ দৈনিক স্টেটসম্যান সূত্রঃ অমলেন্দু দে পাকিস্তান প্রস্তাব ও ফজলুল হক। পৃঃ ১০৫ও শীলা সেন, “মুসলিম পলিটিক্স ইন বেঙ্গল”

তারিখঃ ৮ই সেপ্টেম্বর, ১৯৪১

 

ফজলুল হক লিয়াকত আলির নিকট লিখিত পত্রে যে দৃঢ় মনোভাব ব্যক্ত করেন তার কিছু অংশ এখানে উদ্ধৃত করা হলোঃ

“শেষ করার আগে আমি কিছু বিষয়ের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানাতে চাই। আমার এই প্রতিবাদ কিছু প্রদেশের সেই সমস্ত মুসলিম নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে যাদের কর্মকান্ডের জন্য বাঙলা এবং পাঞ্জাবের মুসলমানদের স্বার্থ হুমকির মুখে। এই সমস্ত নেতৃবৃন্দ যেসব অঞ্চলের প্রতিনিধিত্ব করছেন তাতে মুসলমানরা অত্যন্ত সংখ্যালঘু, এমনকি মুসলমানদের মাঝেও তা ভারতের সংখ্যালঘু প্রদেশ নামে পরিচিত। একমাত্র বাঙলা ও পাঞ্জাবেই রয়েছে প্রায় ৫ কোটি মুসলমান, যা ভারতের সর্বমোট মুসলিম জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক। বাকি ৫ কোটি মুসলমান সমগ্র উপমহাদেশে এমনভাবে ছড়িয়ে আছে যে বিভিন্ন প্রদেশে এর সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য। কিছু কিছু ক্ষেত্রে তা সেই প্রদেশের মোট জনসংখ্যার শতকরা ৪ থেকে ৫ ভাগ মাত্র। উনাদের ক্ষেত্রে একটা ব্যাপার স্পষ্ট যে-ক্ষমতায় আসা তো দূরের কথা, প্রশাসনে একজন প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার আশা করাও উনাদের পক্ষে সম্ভব নয়। সুতরাং এটা সহজেই অনুমেয় যে, বাঙলা এবং পাঞ্জাবের মুসলমানেরা প্রশাসনে কর্তৃত্বপূর্ণ পদসমূহে থাকার কারণে যেসব সুবিধাসমূহ ভোগ করছে তা এই ভাইয়েরা কখনো উপলব্ধি করতে পারবেন না। এ সমস্ত অঞ্চলে একজন মুসলিম প্রশাসকের কি পরিমাণ দায়িত্ব সেটাও বোঝা সম্ভব নয় তাদের পক্ষে। তারা মনে করেন, বাঙলা এবং পাঞ্জাবের মুসলমানদের ভবিষ্যতও তাদের ভবিষ্যতের মতই অন্ধকার। স্বভাবতই যখন সমগ্র ভারতের মুসলমানদের বিষয়ে কোন সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন হয় তখন সেই সিদ্ধান্তের প্রভাব বাঙলা ও পাঞ্জাবের মুসলমানদের রাজনীতির উপর কি হতে পারে সেই বিষয়ে তাদের কোন পরোয়া থাকে না। আমি এই সংখ্যালঘু প্রদেশের মুসলিম নেতৃবৃন্দের মনে করিয়ে দিতে চাই যে, তারা যদি মুসলমান সংখ্যাধিক্য অঞ্চলসমূহের রাজনীতি নিয়ে অযথা হস্তক্ষেপ করেন, তাতে কিন্তু সমগ্র ভারতের মুসলমান সম্প্রদায়ের স্বার্থই হুমকির মুখে পড়ে যাবে। অন্তত আমি কখনোই ৩ কোটি ত্রিশ লাখ মুসলমানের স্বার্থ রক্ষার দায়িত্ব বাইরের কোন শক্তির নিয়ন্ত্রণে ছেড়ে দেব না, তা সে যতই প্রভাবশালী হোক না কেন।

“আমার ধারণা, বর্তমানে আমাদের প্রদেশের বাইরের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের আলোচনায় বাঙলার তেমন কোন গুরুত্ব নেই, যদিও সমগ্র ভারতের সর্বমোট মুসলিম জনসংখ্যার এক তৃতীয়াংশই বাঙলায় বসবাস করে। তারপরও, সংখ্যালঘু প্রদেশগুলোর নেতৃবৃন্দ কখনোই আমার দায়িত্বকে এবং প্রতিনিয়ত যে বাধার সম্মুখীন হচ্ছি তাকে কোন গুরুত্ব দেননি। উপরন্তু, তারা তাদের স্বার্থ রক্ষা করে এমন সব বিষয় নিয়ে রাজনৈতিক হতাশা প্রকাশকারী অর্থহীন সব স্লোগান দিয়ে চলেছেন আমার বিরুদ্ধাচরণ করার জন্য, আমার কথা যাতে কারো কাছে না পৌঁছায় সে জন্য। অথচ তাদের এসব বিষয়সমূহের সাথে আমার প্রদেশের কোন অবস্থার কোন সম্পর্ক নেই। আমি আমার বক্তব্য রাষ্ট্রপতির কাছে তুলে ধরার পূর্বেই আমাকে থামিয়ে দেওয়া হয়।

 

 

 

 

 

 

<001.003.005>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

 

জুলাই এর প্রথমদিকে আমার গভর্ণরের মাধ্যমে ভাইসরয় আমাকে জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদে বাঙলার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে উক্ত প্রদেশের প্রতিনিধিত্ব করার আহ্বান জানান। আমি আমার কর্তব্যবোধ থেকে প্রস্তাবে সম্মতি জানাই। আমি জানতাম আমাকে নির্বাচন করা হয়েছে সরকারি আদেশে, কারন আমি ছিলাম প্রধানমন্ত্রী। তাই কারও কোন আপত্তি থাকার কথা নয়। কিন্তু নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যদের নাম ঘোষণার পর লীগ সভাপতির বক্তব্য শুনে আমি বিস্মিত হই। তিনি বলেছেন, তিনি আমার এবং লীগের অন্যান্য সদস্যদের কার্যক্রমে ক্ষুব্ধ এবং আমাদের কার্যক্রমে আপত্তি জানিয়ে পরবর্তী কি পদক্ষেপ নেয়া যায় সেই বিষয়ে চিন্তা করছেন। আমি আমার অবস্থান জানিয়ে একটি বক্তব্য পেশ করি। সেখানে স্পষ্টভাবে বলা আছে প্রধানমন্ত্রীদের সরকারি আদেশের মাধ্যমে নির্বাচিত করা হয়েছে, যা প্রত্যাখ্যান করা সম্ভব নয়। আমি ভেবেছিলাম আমার অবস্থান আমি পরিষ্কার করতে পেরেছি এবং সভাপতির বক্তব্যে যে পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছিল তা ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু ৩০ তারিখে সভাপতির বক্তব্যে পড়ে আমি আবারও বিস্মিত হই। সেখানে বলা ছিল, আমার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। বক্তব্যের ভাষার মাঝে কোন অস্পষ্টতা ছিল না এবং সেটা পড়ে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল যে এই ব্যাপারে ইতোমধ্যে সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয়া হয়েছে। আমার মতামত, সভাপতির এই আচরণ চরম অসাংবিধানিক। মাদ্রাজ প্রস্তাব থাকার পরও আমাদের বক্তব্য শোনার আগে কোন ধরণের সিদ্ধান্ত নেয়া তার উচিৎ হয় নি। আমি আরও বলতে চাই, উক্ত বিষয়টি নিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য কার্যকরী কমিটির কাছে বিষয়টি হস্তান্তর করাও সম্পূর্ণ অর্থহীন। কার্যকরী কমিটির সামনেও সভাপতির কার্যক্রমকে বৈধতা দেওয়া ছাড়া আর কোন উপায় ছিল না। কেননা সভাপতির কার্যক্রমে অসম্মতি জানানো মানে সভাপতির উপর অনাস্থা জ্ঞাপন করা, যার ফলে এমন একটি পরিস্থিতির উদ্ভব হবে যা মোকাবেলা করার মত ইচ্ছা কার্যকরী কমিটির নেই। যার ফলশ্রুতিতে কমিটি আমাকে জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ থেকে নিঃশর্তভাবে পদত্যাগের আহ্বান জানিয়ে একটি প্রস্তাব পাস করে।

২. পরবর্তিতে দেখা যায়, নিরাপত্তা পরিষদে থেকে প্রধানমন্ত্রীরা কিছু নির্দিষ্ট ক্ষমতাবলে কাজ করবেন- এ ব্যাপারে যে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল তা ২১ জুলাই ভাইসরয়ের নিকট হতে বোম্বের গভর্নরের মাধ্যমে সভাপতি মহোদয় আগেই জেনেছিলেন। আমরা প্রধানমন্ত্রী অথবা সাধারণ প্রতিনিধি যে হিসেবেই নির্বাচিত হয়ে থাকি না কেন, সভাপতি আমাদের নির্বাচনের খবর নাম প্রকাশের অন্তত এক দিন আগে থেকেই জানতেন। উনার অসম্মতি থাকলে আমাদের টেলিগ্রাম অথবা টেলিফোন করে তা আগে থেকেই জানানো স্পষ্টতই তাঁর দায়িত্বের মাঝে পড়ে। তিনি আমাদেরকে এ ও বলতে পারতেন যে তিনি চান আমরা যেন নিরাপত্তা পরিষদ থেকে পদত্যাগ করি। এমনকি তিনি আমাদের আকারে ইঙ্গিতেও বোঝাতে পারতেন যে আমরা যদি পদত্যাগ না করি তাহলে উনি আমাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হবেন। কিন্তু তিনি নাম প্রকাশ হওয়ার পর্যন্ত অপেক্ষা করলেন, এবং তার পর পরই আমাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার কথা জানিয়ে দিলেন। এরকম একটি ঘোষণা দেওয়ার আগে সতর্ক করে দেওয়ার মত যে সাধারণ সৌজন্যতাবোধ সেটাও তিনি দেখাননি। তাঁর কার্যক্রম আমাদেরকে অত্যন্ত বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে দিয়েছে। উনি আমাদের ব্যাখ্যা দেয়ার সুযোগ দিয়ে অসতর্ক অবস্থায় আমাদের এরকম পরিস্থিতিতে ফেলে দেন। তাঁর কার্যক্রমে মনে হচ্ছিল উনি জনসম্মুখে তাঁর ক্ষমতা দেখানোর জন্য উদগ্রীব হয়ে আছেন।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<001.003.006>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

 

৩. আমার সুদৃঢ় মতামত, নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য হওয়ার মাধ্যমে আমি লীগের কোন মূলনীতির বরখেলাপ করিনি। ভাইসরয় গত বছর একটি প্রস্তাব রাখেন, ভারতের বিভিন্ন রাজ্য ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দের সমন্বয়ে একটি বৃহদাকার যুদ্ধ বিষয়ক পরিষদ গঠন করার। লীগ তা প্রত্যাখ্যান করে, যদিও নিরাপত্তা পরিষদ বিভিন্ন রাজ্য ও বিভিন্ন প্রদেশের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সমন্বয়ে গঠিত। এই ব্যাপারটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং দেখা যায় যে নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য হওয়ার মাধ্যমে লীগের কোন সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করা হয় না। যদিও সভাপতি বারবার বলে যাচ্ছেন আমরা মুসলিম প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছি, আমি তারপরও দৃঢ়ভাবে বলতে চাই, আমরা নির্বাচিত হয়েছি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার কারণে। যদি এইভাবে বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করা যায় তাহলে বোঝা যায়, নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য হওয়ার মাধ্যমে লীগের কোন ধারা বা মূলনীতির বরখেলাপ করা হয় নাই। উপরন্তু, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই আমি যুদ্ধ বিষয়ক আমাদের কার্যক্রম তুলে ধরার জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছি এবং সরকারি ও ব্যক্তিগত উদ্যোগে যুদ্ধের পক্ষে বাঙলার মানুষের থেকে জনসমর্থন আদায়ের জন্য চেষ্টা করে চলেছি। তখন কিন্তু সভাপতি আমার কোন কার্যক্রমে অসন্তোষ প্রকাশ করেন নি। এমনকি, তিনি সারা ভারত জুড়ে বিশিষ্ট মুসলিম লীগ নেতৃবৃন্দকে এভাবে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যেতেও কোন বাধা দেননি।

৪. বিভিন্ন প্রদেশে যুদ্ধ বিষয়ক কার্যক্রমে আমার যে সংশ্লিষ্টতা ছিল তা যদি বিবেচনা করা হয় তাহলে নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যপদ প্রাপ্তির ঘটনাটা একদমই গুরুত্বহীন। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে অসহযোগিতা করার অনুরোধ করাটাও একদম অযৌক্তিক। আমি মনে করি, কার্যকরি কমিটিকে দিয়ে তাঁর যে কার্যক্রমগুলো অনুমোদন করিয়ে নিয়েছেন তা ভিত্তিহীন। আমি বিশ্বাস করি না আমার নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যপদ গ্রহণের ব্যাপারে বাঙলার বা সমগ্র ভারতের মুসলমানদের কোন আপত্তি আছে। এমনকি বাইরের প্রদেশেও অনেকের মতামতই আমার পক্ষে। সভাপতির আচরণ প্রথম থেকেই ছিল পক্ষপাতদুষ্ট ও অসাংবিধানিক, যদিও মুসলমানদের স্বার্থের বিপক্ষে যায় এমন কিছুই আমি করিনি। আমি নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যপদ গ্রহণ করার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছি তা মুসলিম সম্প্রদায়ের মাঝে বিভক্তির সৃষ্টি করবে- সভাপতির এই দাবি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। তাই, সভাপতি এবং কার্যকরি কমিটি যাই ভাবুক না কেন, নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যপদ গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার কোন কারণ দেখি না।

৫. কিন্তু এখানে অন্যান্য কিছু বিষয় বিবেচনা করা প্রয়োজন। সভাপতির অদূরদর্শীতা এবং তাড়াহুড়ো করে দেওয়া ঘোষণা মুসলমানদের মাঝে এক ধরণের দ্বিধার জন্ম দিয়েছে। তাঁরা ভাবছেন আমরা নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যপদ গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি ব্যক্তিগত স্বার্থ রক্ষার জন্য অথবা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মন রক্ষার স্বার্থে। এই ধরণের ধারণা পোষণ করা মারাত্মক ক্ষতিকর। বর্তমান প্রজন্মের খুব কম মুসলিম নেতাই জানেন লীগ অথবা মুসলমান সমাজের জন্য আমি কি করেছি। নিজের বড়াই না করেই বলতে চাই, ইসলাম এবং ভারতীয় মুসলমানদের জন্য আমি যা যা করেছি তা নিয়ে আমার লজ্জিত হওয়ার কোন কারণ নেই। আমি জোর গলায় জানাতে চাই, কোন উচ্চপদস্থ সরকারী কর্মকর্তা আমার নিজের ইচ্ছানুযায়ী সিদ্ধান্ত নেয়া থেকে কোনভাবেই আমাকে বিরত রাখছেন না। তা সত্ত্বেও বর্তমানে আমি এক অপ্রীতিকর সিদ্ধান্তহীনতার সম্মুখীন। আমি মনে করি আমার নিরাপত্তা পরিষদে যোগদান করা উচিৎ। কিন্তু আমি যদি তা করতে চাই তাহলে তা ভারতীয় মুসলমানদের মাঝে এক ধরণের দ্বিধার সৃষ্টি করবে, কেননা অন্যান্য প্রধানমন্ত্রীদের অনেকেই তাঁর পদ ছেড়ে দিয়েছেন। এমতাবস্থায় যে পরিস্থিতির উদ্ভব হবে তার জন্য আমাকেই দায়ী করা হবে। এমনকি এই অবস্থার জন্য অন্যদেরও দোষারোপ করা হতে পারে যাদের এ ব্যাপারে মাথা ঘামানোর বিন্দুমাত্র ইচ্ছা নেই কিন্তু তাদের এসব বিষয় থেকে নিজেদের দূরে থাকার খবর জনসাধারণের জানা নেই।

৬. উপরোক্ত পরিস্থিতি বিবেচনায় আমার মনে হয় না নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য হয়ে আমি কোন কাজে আসতে পারবো। তাই আমি আমার গভর্ণরের মাধ্যমে ভাইসরয় এর কাছে পদত্যাগের অনুমতি চাইতে যাচ্ছি। আমি এই পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছি শুধুমাত্র মুসলিম লীগ এবং ভারতীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের মাঝে বিভেদ এড়ানোর জন্য। আমার পদত্যাগের কারন স্যার সিকান্দারের পদত্যাগের কারণ হতে সম্পূর্ণ আলাদা। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী তিনি পদত্যাগ করেছেন কারণ তিনি মনে করেন সিদ্ধান্তগুলো নেয়ার সময় কিছু তথ্য নিয়ে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়েছিল। যদিও আমার সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল তারপরও আমি পদত্যাগ করছি কারণ আমি পদত্যাগ না করলে মুসলিম সম্প্রদায়ের স্বার্থের জন্য ভবিষ্যতে তা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। স্যার সিকান্দার মনে করেন তিনি ভুল ছিলেন এবং পদত্যাগের মাধ্যমে তিনি সেই ভুল সংশোধন করেছেন। আমি মনে করি আমি ঠিক ছিলাম কিন্তু তারপরও আমি পদত্যাগ করছি ভবিষ্যতে এর প্রভাব কি হতে পারে সেই কথা ভেবে। আমি পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছি সম্পূর্ণই আমার বিবেচনার বিপরীতে, শুধুমাত্র বৃহৎ স্বার্থের কথা চিন্তা করে। যা ভবিষ্যতে আমাদের মাঝে বড় কোন সংঘাত এড়াতে সাহায্য করবে এবং সবাইকে একত্র হয়ে মুসলিম সম্প্রদায় এবং দেশের স্বার্থে কাজ করার জন্য সুযোগ করে দেবে।

 

<001.003.007>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

 

৭. “সংখ্যালঘু অঞ্চল” এর মুসলিম নেতৃবৃন্দের দ্বারা যেভাবে প্রতিনিয়ত বাঙলা এবং পাঞ্জাবের মুসলিম সম্প্রদায়ের স্বার্থ বিপন্ন হয়ে চলেছে আমি তাঁর তীব্র প্রতিবাদ জানাই। সংখ্যালঘু অঞ্চলের মুসলিম ভাইদের একটা ব্যাপার বোঝা উচিৎ, তাদের পক্ষে ক্ষমতায় আসা তো দূরের কথা, প্রশাসনে প্রভাব বিস্তারও সম্ভব নয়। বাঙলা এবং পাঞ্জাবের মুসলমানেরা প্রশাসনে কর্তৃত্বপূর্ণ পদসমূহে থাকার কারণে যেসব সুবিধাসমূহ ভোগ করছে তা এই ভাইয়েরা কখনো উপলব্ধি করতে পারবেন না। এ সমস্ত অঞ্চলে একজন মুসলিম প্রশাসকের কি পরিমাণ দায়িত্ব সেটাও বোঝা সম্ভব নয় তাদের পক্ষে। স্বভাবতই যখন সমগ্র ভারতের মুসলমানদের বিষয়ে কোন সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন হয় তখন সেই সিদ্ধান্তের প্রভাব বাঙলা ও পাঞ্জাবের মুসলমানদের রাজনীতির উপর কি হতে পারে সেই বিষয়ে তাদের কোন পরোয়া থাকে না। যেসব অঞ্চলে মুসলিমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ সেসব অঞ্চলের রাজনীতিতে তাদের বেশি হস্তক্ষেপ করা উচিৎ নয়। আমার ধারণা, বর্তমানে আমাদের প্রদেশের বাইরের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের আলোচনায় বাঙলার তেমন কোন গুরুত্ব নেই, যদিও সমগ্র ভারতের সর্বমোট মুসলিম জনসংখ্যার এক তৃতীয়াংশই বাঙলায় বসবাস করে। আমার সমালোচকরা ঘটনার গভীরে না যেয়েই আমার নিন্দা করেন এবং আমাকে দোষী সাব্যস্ত করতে ব্যস্ত হয়ে ওঠেন। তারা কিন্তু ভুলে গেছেন মুসলিম সম্প্রদায়ের উন্নতিতে আমার সারা জীবনের অবদান। আমি দৃঢ়বিশ্বাসী, ভবিষ্যতে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ কোন সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় আরও দূরদর্শিতার পরিচয় দেবেন এবং এমন কোন পরিস্থিতি সৃষ্টি করবেন না যা থেকে উত্তরণের একমাত্র উপায় নিজের বিবেকের কাছে অপরাধী হয়ে থাকতে হয় এমন কোন সিদ্ধান্ত নেয়া।

৮. আমি আরও জানাতে চাই, আমার পক্ষে সর্বভারতীয় মুসলিম লীগের কার্যকরী কমিটির সদস্য হিসেবে আর থাকা সম্ভব নয়। সভাপতির আয়ত্বে থাকা অবাধ এবং বিধিবহির্ভূত ক্ষমতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ আমার এই পদত্যাগ। আমি এমন প্রতিষ্ঠানের সদস্য হয়ে থাকতে পারি না যারা প্রাদেশিক নেতৃবৃন্দের প্রতি ন্যূনতম শিষ্টাচার প্রদর্শনে অক্ষম এবং অন্যায়ভাবে এমন সব পদক্ষেপ নিয়ে থাকে যা একজন প্রাদেশিক কর্মকর্তার নেয়ার কথা। উপরোক্ত বিষয়টির ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য সভাপতির উচিৎ ছিল তা প্রাদেশিক মুসলিম লীগের হাতে ছেড়ে দেওয়া। তিনি দাপ্তরিক কার্যক্রম সাংবিধানিক এবং যৌক্তিক উপায়ে সম্পন্ন করতে দৃষ্টিকটু রকমভাবে ব্যর্থ হয়েছেন। এই পদত্যাগের মাধ্যমে আমি সাম্প্রতিক ঘটনাবলীর উপর দৃষ্টি আকর্ষণ করে সবাইকে সতর্ক করে দিয়ে বলতে চাই, সর্বভারতীয় মুসলিম লীগের গণতন্ত্র এবং স্বায়ত্বশাসনের মূলনীতি ধীরে ধীরে গুরুত্বহীন হয়ে যাচ্ছে শুধুমাত্র একজন ব্যক্তির স্বেচ্ছাচারিতার কারণে, যার লক্ষ্যই হচ্ছে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হয়ে শাসন করা, এমনকি বাঙলার ৩ কোটি ৩০ লক্ষ মানুষকেও, যারা ভারতীয় মুসলমানদের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে।

 

——-

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<001.004.008>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

 

শিরোনামঃ হিন্দু মুসলিম সম্প্রীতি রক্ষার্থে ফজলুল হকের ভূমিকা

সুত্রঃ পাকিস্তান প্রস্তাব ও ফজলুল হক – অমলেন্দু দে , পৃষ্ঠা – ২৪৯

তারিখঃ ২০শে জুন, ১৯৪২

২০শে জুন, ১৯৪২ তারিখে কোলকাতায় অনুষ্ঠিত হিন্দুমুসলিম ঐক্য সম্মেলণ এ গৃহীত সিদ্ধান্তাবলীঃ

১।        ভারত, আরও খোলাখুলি বলতে গেলে বাংলা ও আসাম আজ চরমতম বিপদের সম্মুখীণ। বিদেশী আগ্রাসণ কেবল আমাদের নিরাপত্তাকেই নয় বরং তা আমাদের বাড়ী-ঘর, উনুন, আমাদের আশা-আকাঙ্খা, আমাদের সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক স্থিতিশীলতা, এক কথায় আমাদের সবচেয়ে প্রিয় ও একান্তে ধারণের সব কিছুকেই হুমকি দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক অবস্থার প্রতিনিয়ত অবনতির দৃষ্টি কোণ থেকে হতাশা ও পরাজয়ের মনোভাবকে দুর করার জন্য এবং আমাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর ভাঙ্গণ প্রতিহত করতে সমস্ত লভ্য শক্তি আহরণ করা অপরিহার্য হয়ে পরেছে। আমাদের জনগণ ও অর্থের, প্রজ্ঞার, চরিত্রের ও শক্তির এই অবস্থায় এবং যে কোন আঘাত প্রতিহতের জন্য আমাদের প্রস্তুত করতে/ রাখতে সর্ব প্রথম শর্ত হচ্ছে পারষ্পরিক সহমর্মিতা ও সহযোগীতার আবহ সৃষ্টির মাধ্যমে উন্নত সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পরিবেশ সৃষ্টি করা। বাংলার মানুষ ঐক্যের ও সংহতির জন্য এমন তাড়ণা পূর্বে আর কখনই অনুভব করেনি কেননা কেবলমাত্র এই ঐক্যের উপর নির্ভর করে আমরা সর্বগ্রসী বিপদের এই হুমকির বিরুদ্ধে জয়ের আশা করতে পারি।

 

প্রদেশের জনগণের মধ্যে রাজনৈতিক কর্মসূচি এবং দৃষ্টিভঙ্গিতে পার্থক্য সত্বেও আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষা, খাদ্য ও প্রয়োজনীয় সামগ্রীর সংরক্ষণ ও বিতরণ, ধর্ম, বর্ণ, রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নির্বিশেষে সকল জনগণের চিকিৎসা ও ত্রাণের সুবিধা এবং আত্ম-পরিচয় প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনে নিবিড় প্রপাগান্ডা চালানোর জন্য এই সংকটকালে “শান্তির সৈণিক/ সেবকদল” গঠন যেসমস্ত এলাকায় জাতিগত বিশৃঙ্খলার সম্ভাবনা রয়েছে সেসমস্ত করে সংকটাপন্ন এলাকায় প্রেরণের মত বিষয়গুলিতে মুসলমান ও হিন্দুদের উভয় জাতিগোষ্ঠীর জনগণকে অবশ্যই একত্র হওয়ার মতামত উঠে আসে।

 

২. এই সম্মেলণে এই মতামত/ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে, জাতিগত ঐক্য ও সহযোগীতার পরিবেশ তৈরীর নিমিত্ত একটি দীর্ঘ্য-মেয়াদী ও একটি স্বল্প-মেয়াদী পরিকল্পণা গ্রহণের জন্য অবশ্যই কাজ করতে হবে এবং এর নিমিত্ত বক্তব্য ও প্রচারপত্র জনপ্রিয়করণের জন্য, সাম্প্রদায়িক/ জাতিগত ঐক্যের সাহিত্য সৃষ্টির লক্ষ্যে আবশ্যিকভাবে একটি স্থায়ী ট্রাস্ট তহবিল গঠনের মাধ্যমে সাম্প্রদায়িকভাবে/ জাতিগতভাবে আত্মিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে সাধারণ অর্জিত জ্ঞান জনগণের মধ্যে বিস্তারের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

 

৩.         সাম্প্রদায়িক ঐক্য ও সহযোগীতার পরিবেশ সৃষ্টির কার্যক্রম অবিরত রাখার নিমিত্ত এবং আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণে, খাদ্য ও অন্যান্য জরুরী দ্রব্যাদির মজুত ও বিতরণ রক্ষায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের একত্রিতকরণের জন্য এবং চিকিৎসা ও অন্যান্য ত্রাণ কার্যাদির ক্ষেত্রে একটি স্থায়ী নির্দলীয় ও অরাজনৈতিক সংগঠন প্রতিষ্ঠার সংকল্প করা হয় এবং সে উদ্দেশ্যে সংগঠনের গঠনতন্ত্রের কাঠামো প্রণয়ন এবং কার্যক্রম ও কর্ম পরিকল্পণা প্রণয়নের নির্দেশনা প্রদানের জন্য হিন্দু-মুসলমান ঐক্য সংঘ-এর কাউন্সিল/ পরিষদ গঠন করা হবে।

 

[দ্যা হিন্দুস্তান স্ট্যান্ডার্ড-এ ২১ জুন, ১৯৪২ তারিখে প্রকাশিত]

 

 

——-

 

 

<001.005.009>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

 

শিরোনামঃ পূর্ব পাকিস্তান রেনেসাঁ সোসাইটি সংক্রান্ত দলিল

সুত্রঃ বুদ্ধির মুক্তি ও রেনেসাঁ আন্দোলনঃ মোহাম্মদ মাহফুজুল্লাহ

তারিখঃ ১৯৪৩ সাল

 

বুদ্ধির মুক্তি ও রেনেসাঁ আন্দোলন

(সাবেক) পাকিস্তান- পূর্বকালের মুজীবর রহমান খাঁ তাঁর ‘পাকিস্তান’ শীর্ষক গ্রন্থে পাকিস্তানের (সাবেক) রাষ্ট্র ভাষা সম্পর্কে বিশদভাবে আলোচনা করেন। হাবিবুল্লাহ বাহার,তালেবুর রহমান প্রমুখের পাকিস্তান-সম্পর্কিত গ্রন্থে এবং আব্দুল হক, ফররুখ আহমদ প্রমুখ আরও অনেকের রচনায় বিভাগ-পূর্বকালেই (সাবেক) পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষার প্রসঙ্গ আলোচিত হয়েছিল। এ সম্পর্কে ১৩৫০ সালে (১৯৪৩) একটি অত্যন্ত মূল্যবান প্রবন্ধ আবুল মনসুর আহমদ। ১৩৫০ সালের কার্ত্তিক সংখ্যা “মাসিক মোহাম্মদী”তে প্রকাশিত “পূর্ব পাকিস্তানের জবান” নামক শীর্ষক এই গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধটিতে তিনি বিভাগ পূর্ব-কালেই বলেন

“মুসলিম লীগ রাজনীতিতে “জাতীয়তা” যে সংজ্ঞা নির্ধারিত হয়েছে, তাতে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের স্বাতন্ত্র্য ও স্বাধীনতা সুস্পষ্টভাবে স্বীকৃত ও সম্ভব হয়ে উঠেছে।”

এই প্রেক্ষিতে উর্দুকে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা ও জাতীয় ভাষারূপে চাপিয়ে দেওয়ার বিপদ ও ষড়যন্ত্র সম্পর্কে ঐতিহাসিক ,সামাজিক, সাংস্কৃতিক ,ভাষাতাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে আলোকপাত করে আবুল মনসুর আহমদ ১৯৪৩ সালেই বলেছিলেনঃ

“এত করেও বাংলার চার কোটি বাঙলাভাষী মুসলিম জনসাধারণ হাজার বছরেও উর্দুভাষী হবে না… লাভের মধ্যে হবে একশ্রেণীর অভিজাত সম্প্রদায়ের সৃষ্টি। এদের সাথে জনসাধারনের কোন যোগ থাকবে না, একথাও আগে বলেছি। কিন্তু এ’রা পশ্চিমাদের গলার সুর মিলিয়ে উর্দুর মাহাত্ম্য গেয়ে যাবেন।কারণ এরাই হবেন পশ্চিমাদের এদেশীয় আত্মীয় ও পূর্ব পাকিস্তানের এাংলো-ইন্ডিয়ান শাসক শ্রেণী।শাসক শ্রেণীর ভাষা থেকে জনসাধারণের ভাষা পৃথক থাকার মধ্যে মস্ত বড় একটি সুবিধে আছে। তাতে অলিগার্কী ভেঙ্গে প্রকৃত গণতন্ত্র কোনদিন আসতে পারেনা; সুতরাং পূর্ব পাকিস্তানের প্রকৃত গনতন্ত্র প্রতিষ্ঠার রোকাওট হিসাবে রাজনৈতিক মতলবে এই অভিজাত শ্রেণী উর্দুকে বাঙলার ঘাড়ে চাপিয়ে রাখবেন।শুধু চাকরীতেই নয়, আইনসভার মেম্বরগিরিতেও যোগ্যতার মাপকাঠি হবে উর্দু-বাগ্মিতা। সুতরাং সেদিক দিয়েও এই ভাষাগত আভিজাত্যের স্টীলফ্রেম ভেঙ্গে যাবার সম্ভাবনা থাকবে না। উর্দুকে পূর্ব-পাকিস্তানের জাতীয় ভাষা করবার চেষ্টার বিপদ এইখানেই।… অথচ উর্দুকে নিয়ে এই ধস্তাধস্তি না করে আমরা সোজাসুজি বাঙলাকেই যদি পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা ও জাতীয় ভাষারূপে গ্রহন করি তবে পাকিস্তান প্রবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আমরা মুসলিম বাঙলার শিক্ষিত সম্প্রদায় নিজেরাই পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, শিক্ষাগত, অর্থনৈতিক ও শিল্পগত রুপায়নে হাত দিতে পারবো। আমাদের নিজেদের বৃদ্ধি, প্রতিভা ও জীবনাদর্শ দিয়েই আমাদের জনসাধারণকে উন্নত ও আধুনিক জাতিতে পরিণত করবে। জাতির যে অর্থ শক্তি , সময় ও উদ্যম উর্দু প্রবর্তনে অপব্যয় হবে, তা যদি আমরা শিক্ষা-সাহিত্য, শিল্প-বানিজ্যে নিয়োজিত করি, তবে পূর্ব পাকিস্তানকে শুধু ভারতের নয়, সমগ্র মুসলিম জগতের এমনকি গোটা দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ দেশে পরিণত করতে পারবো”।

 

 

 

( পূর্ব-পাকিস্তানের জবান, মাসিক মোহাম্মদী, কার্ত্তিক,১৩৫০)

 

 

<001.005.010>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

 

‘পূর্ব পাকিস্তানের জবান’ শীর্ষক এই গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধটিতে তিনি বলেন, “জিন্না-নেতৃত্বের বাস্তববাদী দূরদর্শিতার গুণে মুসলিম লীগ রাজনীতিতে ‘জাতীয়তা’র যে সংজ্ঞা নির্ধারিত হয়েছে , তাতে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের স্বাতন্ত্র‍্য ও স্বাধীনতা সুস্পষ্টভাবে স্বীকৃত ও সম্ভব হয়ে উঠেছে। কাজেই পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও শিক্ষাগত রুপায়নের ভাবী রূপ নিয়ে মুসলিম বাঙলার চিন্তা নায়কদের মধ্যে এখন থেকেই আন্দোলন আলোচনা খুব স্বাভাবিকভাবেই শুরু হয়েছে।… পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় ও আর্থিক রুপায়ণ নিয়ে যথেষ্ট না হলেও অনেক আলোচনা এরা করেছেন, আমরাও সে আলোচনায় অংশগ্রহণ করেছি। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের ভাষা কি হবে , এ নিয়ে সোজাসুজি আলোচনা এঁরা আজো করেননি। করেননি বোধ হয় এই জন্য যে, পূর্ব পাকিস্তানের ‘জাতীয় দৈনিক আজাদ’ বাঙলা ভাষার কাগজ এবং এরাও তাই ধরে নিয়েছেন, পূর্ব পাকিস্তানের ভাষা যে বাঙলা হবে, এ সত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েই আছে। হয়েই ছিল সত্য, বাঙলার মুসলমানদের মাতৃভাষা বাঙলা হবে কি উর্দু হবে এ তর্ক খুব জোরেশোরেই একবার উঠেছিল। মুসলিম বাঙলার শক্তিশালী নেতাদের বেশীর ভাগ উর্দুর দিকে জোর দিয়েছিলেন , নবাব আবদুর রহমান মরহুম, স্যার আব্দুর রহিম, মৌঃ ফজলুল হক, ডাঃ আবদুল্লাহ , সোহরাওয়ার্দী, মৌলভী আবুল কাসেম মরহুম প্রমুখ প্রভাবশালী নেতা উর্দুকে বাঙ্গালী মুসলমানের মাতৃভাষা করবার প্রাণপণ চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু মুসলিম বাঙলার সৌভাগ্য এই যে, উর্দুর প্রতি যাদের বেশী সমর্থন থাকার কথা সেই আলেম সমাজই এই অপচেষ্টায় বাধা দিয়েছিলেন। বাঙলার আলেম সমাজের মাথার মণি মওলানা মোহাম্মদ আকরাম খাঁ, মওলানা আবদুল্লাহেল বাকী, মওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামবাদী উর্দু বিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্ব করেছিলেন। এঁদের প্রয়াসে শক্তি যুগিয়েছিলেন মরহুম নবাব আলী চৌধুরী সাহেব। সে লড়াইয়ে এঁরাই জয়লাভ করেছিলেন। বাঙলার উপর উর্দু চাপাবার সে চেষ্টা তখনকার মত ব্যর্থ হয়। কিন্তু নির্মূল হয়নি। বাঙলার বিভিন্ন শহরে বিশেষত কোলকাতায় মাঝে মাঝে উর্দুওয়ালারা নিজেদের আন্দোলনকে জিইয়ে রেখেছিলেন। সম্প্রতি পাকিস্তান আন্দোলনের ফলে মুসলমানদের স্বতন্ত্র জাতীয়তাবাদ তাদের রাজনৈতিক আদর্শের বুনিয়াদে পরিণত হওয়ায় উর্দুওয়ালারা আবার গা-ঝাড়া দিয়ে উঠেছেন। সম্প্রতি ‘মর্নিং নিউজ’ ও ‘স্টার অব ইন্ডিয়া’ এ ব্যাপারে কলম ধরেছেন। জনকতক প্রবন্ধ লেখকও তাতে জুটেছেন। এরা বলেছেন ‘পূর্ব পাকিস্তানের ভাষা স্বভাবতই উর্দু হবে’।

১৩৫২ সালে (১৯৪৪) রচিত ও ‘মাসিক মোহাম্মদী’তে প্রকাশিত একটি ব্যঙ্গ কবিতায় ফররুখ আহমদ উর্দুপ্রেমিকদের প্রতি তীব্র কটাক্ষ ও বিদ্রুপবান হেনে লিখেছিলেনঃ

দুই শো পশ্চিম মুদ্রা যে অবধি হয়েছে বেতন
বাংলাকে তালাক দিয়ে উর্দুকেই করিয়াছি নিকা,
(বাপান্ত শ্রমের ফলে উড়েছে আশার চামচিকা)
উর্দুনীল আভিজাত্যে (জানে তা নিকট বন্ধুগণ) ।
খাটি শরাফতি নিতে ধরিয়াছি যে অজানা বুলি
তার দাপটে চমকাবে একসাথে বেয়ারা ও কুলি
সঠিক পশ্চিমা ধাঁচে যে মুহূর্তে করিব তর্জন ।

পূর্ণ মোগলাই ভাব তোর সাথে দু’পুরুষ পরে
বাবরের বংশ দাবী-জানি তা অবশ্য সুকঠিন
কিন্তু কি লাভ বল হাল ছেড়ে দিলে এ প্রহরে
আমার আবাদী গন্ধ নাকে পায় আজো অর্বাচীন ।
পূর্বোক্ত তালাক সূত্রে শরাফতি করিব অর্জন;
নবাবী রক্তের ঝাঁজ আশা করি পাবে পুত্রগণ।

 

(উর্দু বনাম বাংলা)

 

 

 

<001.005.011>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

 

‘ভারতের রাষ্ট্রভাষা সম্বন্ধে বিদ্বজ্জনের আলোচনা’ সভায় বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করা যায় কিনা, এ নিয়ে ভাবনা চিন্তা করা হয়। উপরোক্ত বিদ্বজ্জনের আলোচনা সভার বিবরণ ১৩৪৫ সালের ফাল্গুন সংখ্যা ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। সম্ভবতঃ এটাই বাংলার রাষ্ট্রভাষা সম্পর্কে প্রথম দাবী। এখানে বিস্তারিত বিবরণ দেয়া হল।

“গত ১৯শে ভারতের রাষ্ট্রভাষা সম্বন্ধে আলোচনা করার নিমিত্ত বঙ্গীয় সাহিত্য-পরিষদ ভবনে একটি সভার অধিবেশন হয়। সুপণ্ডিত হিরেন্দ্রনাথ দত্ত মহাশয় সভাপতির আসন গ্রহণ করেন। তিনি এবং অতুলচন্দ্র গুপ্ত, অর্ধেন্দ্র কুমার গঙ্গোপাধ্যয় , উপেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, খগেন্দ্রনাথ মিত্র, প্রফুল্লকুমার সরকার, সুন্দরী মোহন দাস ও দ্বিজেন্দ্র নাথ মৈত্র আলোচনায় যোগদান করেন। আলোচনাটি কলিকাতার অন্ততঃ একখানি দৈনিক কাগজে বিস্তারিতভাবে বাহির হওয়া উচিত ছিল। তাহা না হওয়ায় বাঙ্গালী বিদ্বান ও সাহিত্যিকগণের এ-বিষয়ে মত ও যুক্ত সেদিন কি বিবৃত হইয়াছিল সে বিষয়ে অবাঙালীরা সাধারণতঃ অজ্ঞ থাকিবেন। ইহা বাঞ্ছনীয় নহে।

নিম্নলিখিত প্রস্তাবগুলি গৃহীত হইয়াছিলঃ

১। এই সভার মতে বাংলা ভাষার বহুলতর প্রচারের জন্য নিম্নলিখিত ও অন্যান্য উপায় অবলম্বন করা উচিতঃ

(ক) বিশেষ প্রয়োজন ভিন্ন বাঙ্গালী মাত্রই দৈনন্দিন কার্য ও ব্যবহারে বাংলা ভাষা ব্যবহার করা কর্তব্য।

(খ) বাংলাদেশে প্রবাসী অন্য ভাষাভাষী ব্যক্তিগণের সহিত যতদূর সম্ভব বাংলা ভাষায় কথোপকথন ও চিন্তার বিনিময় কর্তব্য।

(গ) অ-বাঙ্গালীদের মধ্যে ও বাংলার বাহিরে যাহাতে বঙ্গ-সাহিত্যের প্রচার ও প্রসার বৃদ্ধি হয় তজ্জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা করা কর্তব্য। যথা- পরীক্ষা গ্রহণ, পুরস্কার বিতরণ, বাংলা সাহিত্যের আলোচনা প্রতিষ্টান স্থাপন ও প্রতিযোগিতা নির্ধারণ প্রভৃতি।

২। এই সভার মতে ভারতীয় রাষ্ট্রের বর্তমান অবস্থায় রাষ্ট্রীয় ভাষা নির্ধারণের চেষ্টা কালোচিত নহে এবং অসমীচীন। ভারতবর্ষে পুরন-স্বরাজ প্রতিষ্ঠিত হইবার পর ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত সমগ্র প্রদেশের নির্বাচিত প্রতিনিধিবর্গ কর্তৃক রাষ্ট্রীয় ভাষা নির্ধারিত হওয়া উচিত।

৩। বর্তমানে যদি রাষ্ট্রভাষা নির্দিষ্ট করিতেই হয়, তবে বঙ্গ-সাহিত্যের সম্পদ ও সমৃদ্ধি এবং ঐ ভাষা বঙ্কিমচন্দ্র ও রবীন্দ্রনাথের প্রতিভা দ্বারা প্রভাবান্বিত মনে রাখিয়া বঙ্গভাষাকেই রাষ্ট্রীয় ভাষারূপে নির্ধারণ করা উচিত।

৪। এই সভা বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ, বঙ্গীয় সাহিত্য-সম্মেলন, মুসলিম সাহিত্য-সম্মেলন, প্রবাসী বঙ্গ সাহিত্য-সম্মেলন ও অন্যান্য বঙ্গ সাহিত্য-প্রতিষ্ঠানকে এ সম্বন্ধে একযোগে কার্য করিবার জন্য অনুরোধ ও আহবান করিতেছেন।

৫। উপরোক্ত প্রস্তাবগুলি কার্যে পরিণত করবার জন্য যথোচিত ব্যবস্থা করিবার ভার নিম্নলিখিত ভদ্রলোকদিগকে লইয়া গঠিত কমিটির উপর অর্পণ করা হইল। কমিটি প্রয়োজনমত সদস্যসংখ্যা বৃদ্ধি করিতে পারিবেনঃ

সভাপতি শ্রীযুক্ত হিরেন্দ্রনাথ দত্ত। আহ্বানকারী শ্রীযুক্ত জ্যোতিশচন্দ্র ঘোষ। সভ্যঃ শ্রীযুক্ত অতুলচন্দ্র   গুপ্ত, শ্রীযুক্ত রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়, অধ্যাপক সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, শ্রীযুক্ত খগেন্দ্রনাথ মিত্র, শ্রীযুক্তা অনুরূপা দেবী, শ্রীমতী কল্যাণী মল্লিক, শ্রীযুক্ত প্রফুল্লকুমার সরকার, পন্ডিত অমূল্যচরণ

 

 

 

 

 

 

<001.005.012>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

 

বিদ্যাভূষণ, শ্রীযুক্ত উপেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়, শ্রীযুক্ত অর্ধেন্দ্রকুমার গঙ্গোপাধ্যায়, শ্রীযুক্ত মন্মাথ নাথ বসু ও শ্রীযুক্ত শৈলেন্দ্র কৃষ্ণ লাহা প্রমুখ।

বাংলার রাষ্ট্রভাষা হইবার সম্ভাবনা সম্বন্ধে বক্তাদের মধ্যে একমাত্র অধ্যাপক সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় সন্দেহ প্রকাশ করেন। এইজন্য তাঁহার বক্তৃতার তাৎপর্য নীচে দেওয়া হইলঃ

“ডঃ সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করিবার সম্ভাবনা সম্বন্ধে সন্দেহ প্রকাশ করেন এবং বলেন যে, সাহিত্যের গৌরব থাকিলেই ভাষার প্রসার হয় না। ইংরেজ জাতির আত্মপ্রসারের শক্তির ফলে ইংরেজ ভাষা প্রসার হইয়াছে। কয়লাওয়ালা, চাউলওয়ালা, মুদী দারোয়ান প্রভৃতি নিম্নশ্রেণীর লোকের কথাবার্তার ভিতর দিয়া হিন্দী ভাষার প্রসার ঘটিয়াছে। কিন্তু কংগ্রেস উহাকে রাষ্ট্রভাষা করিতে সাহসী নহে। কারণ মুসলমানেরা কিছুতেই উর্দু ছাড়িবে না। সেই জন্য হিন্দুস্তানীর সৃষ্টি হইয়াছে। হিন্দুস্তানী একাডেমী ও পাটনা বিশ্ববিদ্যালয়ের চেষ্টায় অদ্ভুত হিন্দুস্তানী সৃষ্টি হইতেছে। তাহারা জোড়া জোড়া শব্দ ব্যবহার করিতেছে- একটি হিন্দী ও আর একটি উর্দু শব্দ। ‘আন্তর্জাতিক’ শব্দটির শেষে ‘নৈতিক’ শব্দের পরিবর্তে উর্দু ‘কৌম’ শব্দ দিয়া তাহারা হিন্দুস্তানী ‘অন্তরাকৌম’ শব্দের সৃষ্টি করিয়াছে। এই ভাষা রাষ্ট্রীয় ভাষা হওয়ার সম্পূর্ণ অযোগ্য। বক্তা মনে করেন যে, বাঙ্গালীদের এই সকল গোলমালে গিয়া কাজ নাই। কিন্তু যুক্ত প্রদেশ ও বিহারে বাংলা ভাষাকে দাবাইয়া রাখিবার যে চেষ্টা চলিয়াছে তাহার প্রতিবাদস্বরূপ বাংলাদেশেও হিন্দুস্তানী চালু করিবার চেষ্টায় আপত্তি হওয়া উচিত। ডঃ চট্টোপাধ্যায় আরও বলেন যে, গয়ার ভাষা ও মৈথিলীর ভাষার সঙ্গে বাংলা ভাষার অনেক মিল আছে। কিন্তু লিখিবার সময় সেখানকার হিন্দুরা হিন্দী ও মুসলমানেরা উর্দু ভাষা ব্যবহার করে। প্রকৃতপক্ষে উর্দু ও হিন্দী ভাষা ছাড়া ভারতের সব ভাষার গতি ও প্রকৃতি এক। কারণ গঙ্গা ও যমুনার মধ্যবর্তী প্রদেশ হইতে যে ভাষার সৃষ্টি হইয়াছে তাহাই ভারতের সর্বত্র ছড়াইয়া পড়িয়াছে।”

বাংলার স্বাতন্ত্র্যের এই ধ্যান-ধারনার ভিত্তিতে পূর্ব পাকিস্তান রেনেসাঁ সোসাইটি গঠিত হয়েছিল। রেনেসাঁ আন্দোলনের উদ্দেশ্য, লক্ষ্য ও চারিত্র্য সম্পর্কে ১৯৪২ সালে বলা হয়েছিলঃ

“পূর্ব পাকিস্তান রেনেসাঁ সোসাইটি চায় পূর্ব পাকিস্তানের অধিবাসীর বুদ্ধির মুক্তি তার চিন্তারাজ্যে অরাজকতার অবসান১ আপনারা নিশ্চয়ই অস্বীকার করবেন না যে, বুদ্ধির মুক্তি না ঘটলে ও চিন্তারাজ্যের অরাজকতার অবসান না হলে, মানে আভ্যন্তরীণ মুক্তি না ঘটলে কোন জাতির বহিরাঙ্গিক মুক্তিও সাধিত হয় না। তাই পূর্ব পাকিস্তানের বহিরাঙ্গিক মুক্তি, মানে রাজনৈতিক আজাদী সত্যিকারভাবে আসতে পারে না। ততক্ষণ, যতক্ষণ না তার অধিবাসীর মনের মুক্তি, মানে চিন্তারাজ্যের অরাজকতা দূর হচ্ছে।

আমাদের সোসাইটি জাতির এই মনের মুক্তি আনবারই সাধনা করছে। এই যে মনের মুক্তি, এ হচ্ছে রেনেসাঁর ব্যাপার। জাতির চিন্তারাজ্যে বিপ্লবাত্মক পরিবর্তন সংঘটনের নাম রেনেসাঁ। অতীতে প্রত্যাবর্তনের নাম রেনেসাঁ নয়, আবার অতীতকে সমূলে বর্জন করার কল্পনাও রেনেসাঁর নেই। অতীতের যা ভালো ও স্থায়ী তাই নিঃসন্দেহে রেনেসাঁর ভিত্তিভূমি। অতীতের এই ভিত্তিভূমির উপরে দাঁড়িয়ে বর্তমানের অভিজ্ঞতার আলোকে রেনেসাঁ ভবিষ্যতকে বরন করে। তাই রেনেসাঁ চিন্তারাজ্যের বিপ্লব। আমরা পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) অধিবাসীর চিন্তারাজ্যে এই বিপ্লবাত্মক পরিবর্তনই চাই। তাই আমাদের সঙ্ঘের নাম ‘পূর্ব পাকিস্তান রেনেসাঁ সোসাইটি’। জাতির রাজনৈতিক মুক্তির সর্বাঙ্গীণ জাতীয় আজাদী নয়। কাজেই জাতির রাজনৈতিক মনের মুক্তি বিজ্ঞানসম্মত পন্থা-নির্দেশই রেনেসাঁর একমাত্র কাজ নয়। তামদ্দুনিক, সাহিত্যিক, আর্থিক, শৈক্ষিক মুক্তি না ঘটলে শুধু রাজনৈতিক আজাদী লাভ করে কোনো জাতি সত্যিকার আজাদী লাভের অধিকারী হয় না। রেনেসাঁ

 

১ বিভাগ পূর্ব কালেই ধরে নেওয়া হয়েছিল যে ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে ‘পূর্ব পাকিস্তান হবে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। ১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের ভিতর দিয়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সত্তা ও স্বাধীন সার্বভৌম অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

 

 

<001.005.013>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

 

তাই সাহিত্য, তমদ্দুন, শিক্ষা, অর্থনীতি, শিল্প প্রভৃতি সম্পর্কেও জাতিকে বিপ্লবাত্মক পরিবর্তনে উদ্বুদ্ধ করে।… পলাশীর বিপর্যয়ের পরে ভারতের এই পূর্বাঞ্চলে অধিবাসীদের রাজনৈতিক চিন্তাধারা এ যাবত ভুল পথেই প্রবাহিত হয়ে এসেছে। প্রথমে আমরা অতীতে প্রত্যাবর্তনের উৎকট প্রয়াস করেছিলাম। আমাদের সে চেষ্টা স্বাভাবিকভাবেই ব্যর্থ হয়েছে। কারণ অতীতে প্রত্যাবর্তনের বাণী সত্যিকার আজাদীর কথা- রেনেসাঁর নয়। সে ব্যর্থতার পরে আমরা গ্রহণ করেছিলাম অনুকরণের পথ। পরের দেখানো পথে আজাদী মেলে না। আমরা ভুল পথে গিয়ে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে পড়েছিলাম। এই সব ব্যর্থতার অভিজ্ঞতা জাতিকে দিয়েছে সত্যিকার পথের সন্ধান। জাতির চিত্তলোক ফুঁড়ে উত্থিত হয়েছে পাকিস্তানের বাণী। একমুহুর্তে জাতি আপন স্বচ্ছতা ফিরে পেয়েছে- পুরানুকরনের আলেয়ার পশ্চাদ্ধাবন ত্যাগ করে সে স্বকীয়তাকে বরণ করেছে। সাহিত্যেও প্রায় একই ব্যাপার অনুষ্ঠিত হয়েছে। নিজস্ব পুঁথি সাহিত্য ও লোক-সাহিত্য থেকে বিচ্যুত হয়ে আমরা অতীতমুখী হয়ে কিছু দিন বিজাতীয় উর্দু ভাষার মোহে কাটিয়েছি। তারপর শুরু হ’ল অনুকরণের পালা। সে অদ্ভুত কসরৎ এখনো চলছে। তবে সে কসরতের হাস্যকরতার উপলব্ধি ধীরে ধীরে আমাদের মধ্যে হচ্ছে। পুরব-পাকিস্তান রেনেসাঁ-সোসাইটি আমাদের সাহিত্যে স্বচ্ছতা ও স্বকীয়তা আসবে না- কারণ ওটা অতীতে প্রত্যাবর্তনের কথা-রেনেসাঁর কথা নয়। তবে পুঁথি ও লোক-সাহিত্যের ভিত্তিতে আমাদের সাহিত্যকে দাঁড় করাতে হবে নিশ্চয়ই। সে ভিত্তির উপর বর্তমানের ব্যর্থ সাহিত্য কসরতের অভিজ্ঞতার আলোকে ভবিষ্যতের প্রয়োজনে আমাদের ভাবী সাহিত্যের সৌধ রচনা করতে হবে। তমদ্দুন, শিক্ষা, ইতিহাস, অর্থনীতি প্রভৃতি ক্ষেত্রেও (সাবেক) পূর্ব পাকিস্তানের অধিবাসীর স্বকীয় বিশিষ্টতাকে খুঁজে বার করতে হবে- তাকে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। পলাশীর বিপর্যয়ের জাতি হিসাবে জীবন্মৃত হয়ে পড়ার ফলে আমরা আত্মবিস্মৃত হয়েছিল। আমরা ভুলে গিয়েছিলাম আমাদের গৌরবময় অতীতের ইতিহাস, ভুলে গিয়েছিলাম আমাদের তমদ্দুনিক বৈশিষ্ট্যের কথা, ভুলেছিলাম আমাদের শিক্ষানীতির গণতান্ত্রিক এবং অর্থনীতি সমাজতান্ত্রিক ভিত্তির বিশিষ্টতার কথা। এসব ক্ষেত্রেও আমরা স্বকীয়তা হারিয়ে অনুকরণের বাঁদরে পরিণত হয়েছিলাম। কাজেই রেনেসাঁর সোনার কাটির স্পর্শে আমাদের এ বাঁদরত্ব ঘোচাতে হবে।”

[আবুল কালাম শামসুদ্দীন, রেনেসাঁ সম্মেলনে অভ্যর্থনা সমিতির সভাপতির ভাষণ,মাসিক মোহাম্মদী, শ্রাবণ ও ভাদ্র, ১৩৫১।]

দেশ বিভাগ ও সাবেক পাকিস্তান প্রতিষ্টার অনেক আগেই ‘পূর্ব পাকিস্তান রেনেসাঁ সোসাইটি’র উদ্যোগে আয়োজিত ১৩৫১ সালে কলিকাতায় অনুষ্ঠিত রেনেসাঁ-সম্মেলনে মূল সভাপতির অভিভাষণ দিতে গিয়ে প্রখ্যাত সাহিত্যিক আবুল মনসুর আহমদ স্পষ্টতই বলেছিলেনঃ

“রাজনীতিকের বিচার (সাবেক) ‘পাকিস্তানের’ অর্থ যাই হোক না কেন সাহিত্যের কাছে তার অর্থ তমদ্দুনী আজাদী, সাংস্কৃতিক স্বরাজ, কালচারে অটনমী। রাজনৈতিক আজাদী ছাড়া কোনো জাতি বাঁচতে পারে কিনা সে প্রশ্নের জবাব পাবেন আপনারা রাষ্ট্র নেতাদের কাছে। আমরা সাহিত্যিকরা শুধু এই কথাটাই বলতে পারি যে, তমদ্দুনী আজাদী ছাড়া কোনো সাহিত্য-বাঁচানো পরের কথা- জন্মাতেই পারে না। -পাকিস্তান (সাবেক) ও একটা বিপ্লব। এ বিপ্লব আনতে হলে সাহিত্যের ভিতর দিয়েই তা করতে হবে। কিন্তু কোথায় পাকিস্তানের সাহিত্য? (সাবেক) পূর্ব পাকিস্তান অর্থাৎ বাংলা ও আসামের সাহিত্য বলতে আমরা যা বুঝি, তা বিদ্যাসাগর- বঙ্কিমচন্দ্র থেকে রবীন্দ্র-শরৎচন্দ্র যুগের সাহিত্যিকদের সাহিত্য। এটা খুবই উন্নত সাহিত্য। বিশেষতঃ রবীন্দ্রনাথ এ সাহিত্যকে বিশ্ব-সাহিত্যের দরবারে স্থান দিয়ে গিয়েছিলেন। তবুও এ-সাহিত্য পূর্ব পাকিস্তানের সাহিত্য নয়। এ সাহিত্যে মুসলমানদের উল্লেখযোগ্য কোনো দান নেই। শুধু তা নয়, মুসলমানদের প্রতিও এ-সাহিত্যের কোনো দান নেই। অর্থাৎ এ সাহিত্য থেকে মুসলিম সমাজ-প্রাণ প্রেরণা পায়নি এবং পাচ্ছে না। এর কারণ

 

 

২ ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব ও তৎকালীন ‘পাকিস্তান পরিকল্পনা’ অনুযায়ী ‘পূর্ব পাকিস্তান’ স্বতন্ত্র, স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হবে, এটাই ছিল নিশ্চিত।

 

 

 

<001.005.013>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

 

আছে। সে কারণ এই যে, এ সাহিত্যের স্রষ্টাও মুসলমান নয়; এর স্পিরিটও মুসলমানী নয়; এর ভাষাও মুসলমানের নয়। প্রথমঃ এ-সাহিত্যের স্পিরিটের কথাই ধরা যাক। এ-সাহিত্য সৃষ্টি করেছেন। ঠিকই তাঁরা করেছেন। নইলে ওটা জীবন্ত সাহিত্য হতো না- কিন্তু সত্যি কথা এই যে, এই সাহিত্যকে মুসলমানেরা জাতীয় সাহিত্য মনে করে না। কারণ, ত্যাগ বৈরাগ্য ভক্তিপ্রেম যত উঁচুদরের আর্দশ হোক, মুসলমানদের জীবনার্দশ তা নয়। -সাহিত্যের স্পিরিটের সম্বন্ধে যা বলেছি, বিষয়বস্তু সম্বন্ধেও তাই বলতে হয়। সাহিত্যের নায়ক-নায়িকা যদি আমরা না হলাম, সাহিত্যের পটভূমি যদি আমার কর্মভূমি না হলো, সাহিত্যের বাণী যদি আমার মর্মবাণী না হলো তবে সে সাহিত্য আমার সাহিত্য হয় কিরুপে? আমার ঐতিহ্য আমার ইতিহাস আমার ইতিকথা এবং আমার উপকথা যে সাহিত্যের উৎস নয়, সে-সাহিত্য আমার জীবন-উৎস হবে কেমন করে?… সব জাতীয় চেতনাই তার ঐতিহ্যকে কেন্দ্র করে। যতদিন সে ঐতিহ্যকে বুনিয়াদ করে সাহিত্য রচিত না হবে, ততদিন সে-সাহিত্য থেকে কোনো জাতি প্রেরণা পাবে না। একটা অতি আধুনিক নজীর দিচ্ছি। ইংরেজ সাহিত্য খুবই উন্নত ও সম্পদশালী সাহিত্য। ওটা মিলটন, শেক্সপিয়র, স্কট, শেলীর সাহিত্য। কিন্তু অত বড় সাহিত্যও আইরিশ জাতির প্রেরণা জাগাতে পারেনি। সুইফট, বার্কলে, গোল্ড স্মিথ ও বার্নার্ডশ’র মত অনেক আইরিশ এই ইংরেজী সাহিত্যের সেবা করেছেন, বিশ্বজোড়া নামও করেছেন। কিন্তু তাদের সাহিত্যসেবা হয়েছে লন্ডনে বসে- আয়র্লন্ডের মাটিতে নয়। – আয়র্লন্ডবাসীর জাতীয় জীবনে সে সাহিত্য কোন স্পন্দন সৃষ্টিও করতে পারেনি । তাই পার্নলে, ড্যাভিট, রেড-মন্ড প্রভৃতি রাষ্ট্রনেতার বিপুল ত্যাগ, কঠোর সাধনা কিছুই আইরিশ জাতির মুক্তির আন্দোলন সফল করতে পারেনি। অথচ যেদিন – আয়র্লন্ডের জাতীয় কবি ডব্লিউ বি, ইয়েটস ইংরেজী প্রভাবমুক্ত স্বাধীন আইরিশ সাহিত্য সৃষ্টি করলেন, ইংরেজী কালচারের অনুকরণমুক্ত করে তিনি যেদিন আইরিশ সাহিত্যসাধনাকে কেলটিক সংস্কৃতির বুনিয়াদে নিজস্ব রুপদান করলেন, সেদিন আইরিশ গণ-মন নিজের হারানো ধন ফিরে পেল; নবজন্মের আনন্দে সে মেতে উঠলো; নিজের ভাগ্য-নির্মাণে সে কর্মোন্মত্ত হয়ে গেল, তার ফল এই হল যে, আইরিশ জাতির দু’শো বছরের ব্যর্থ স্বাধীনতা আন্দোলন ডিভেলেরার নেতৃত্বে কুড়ি বছরে জয়যুক্ত হলো।”

 

 

——–

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<001.006.015>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
মুসলিম লীগ ব্যবস্থাপক সভার সদস্যদের সভায় এক পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব।
প্রস্তাবকঃ শহীদ সোহরাওয়াদী

ইন রেট্রসপেকশান; আবুল হাসিম

পৃষ্ঠা ১৭৯

৯ই এপ্রিল, ১৯৪৬

 

দিল্লী প্রস্তাবনা ১৯৪৬*

 

(প্রস্তাবনার ভাষ্য এপ্রিল ৯, ১৯৪৬ সালে অ্যাংলো-এরাবিক কলেজ, দিল্লীতে অনুষ্ঠিত আইন প্রণেতাদের সভার হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দির ভাষণ থেকে সংগৃহীত।)

এই বিশাল ভারতীয় উপমহাদেশে যেখানে ১০ কোটি মুসলিম এমন একটি ধর্মের অনুসারী যা তাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্র, শিক্ষা, সমাজ, অর্থনীতি ও রাজনীতি; নিয়ন্ত্রন করে, যা শুধুমাত্র আধ্যাত্মিক মতবাদ, বিশ্বাস অথবা আচার-অনুষ্ঠানেই সীমাবদ্ধ নয় এবং যা হিন্দু ধর্ম ও দর্শনের বিরোধী যা কিনা হাজার বছর ধরে কঠোর বর্ণপ্রথা লালন করেছে যার ফলে ৬ কোটি লোক অস্পৃশ্য জীবে পরিণত হয়েছে। মানুষে মানুষে ভেদাভেদ আর দেশের কোটি কোটি লোকের ওপর সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য চাপিয়ে দেয়া হলে মুসলিম, খ্রীস্টান আর অন্যান্য সংখ্যালঘু ধর্মের অনুসারীরা সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে দলিত শ্রেণিতে পরিণত হবে।

জাতীয়তাবাদ, সাম্য, গণতন্ত্র এবং অন্যান্য যত মহান আদর্শকে ইসলাম সমর্থন করে, হিন্দু বর্ণপ্রথা তা অস্বীকার করে।

হিন্দু ও মুসলিমদের ঐতিহাসিক পটভূমি, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিয়মাবলী অভিন্ন আকাঙ্ক্ষা ও আদর্শে উদ্বুদ্ধ অবিভক্ত ভারতীয় জাতির আত্মপ্রকাশকে অসম্ভব করে তুলেছে এবং শতাব্দী পার হবার পরও তারা দুটি ভিন্ন পৃথক বৃহত্তর জাতি হয়েই থাকবে।

ব্রিটিশদের মাধ্যমে পশ্চিমা গণতন্ত্রের সংখ্যাগরিষ্ঠের মতের উপর ভিত্তি করে রাজনৈতিক সংস্থার প্রতিষ্ঠার নীতির প্রবর্তনের পরপরই, আমরা দেখেছি যে এই নীতির ফলে কোন জাতি বা সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ গোষ্ঠী অন্য জাতি বা সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ গোষ্ঠীর বিরোধীতা সত্ত্বেও তাদের ওপর সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে পারে, যার উদাহরণ আমরা দেখেছি কংগ্রেস সরকারের আড়াই বছরের শাসনামলে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশগুলোতে যখন ভারত শাসন আইন, ১৯৩৫ এর অধীনে মুসলিমরা অবর্ণনীয় শোষণ ও হয়রানির শিকার হয়েছিলো। যার ফলে তারা সংবিধানের দেয়া তথাকথিত নিরাপত্তার আশ্বাসের অসারতা ও অক্ষমতা ও গভর্নরদের বিধি-নিষেধের ব্যাপারে নিশ্চিত হয়। তারা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে, ইউনাইটেড ইন্ডিয়া ফেডারেশন যদি প্রতিষ্ঠা পায়, তবে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশগুলোতেও তাদের অবস্থার কোন উন্নতি হবে না এবং তাদের অধিকার ও স্বার্থ কেন্দ্রের চিরস্থায়ী সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের নিকট কখনোই গ্রাহ্য হবে না।

 

 

*লাহোর প্রস্তাব “States of Pakistan’ বা একাধিক পাকিস্তানের কথা বলা হয়েছে। এই প্রস্তাবের মাধ্যমে ‘States’ শব্দ পরিবর্তন করে “State’ বা একটি পাকিস্তান করা হয়।

 

 

 

 

<001.006.016>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

 

আর তাই মুসলিমরা এখন নিশ্চিত যে হিন্দুদের কর্তৃত্ব থেকে মুসলিম ভারতকে বাচাতে এবং তাদের নিজস্ব মেধায় নিজেদের উন্নতি ঘটাতে হলে উত্তর-পূর্বের বাংলা ও আসাম এবং উত্তর-পশ্চিমের পাঞ্জাব, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ, সিন্ধু ও বেলুচিস্তান নিয়ে একটি স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠন করা আবশ্যক।

মুসলিম লীগ কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক নীতি-নির্ধারকদের এই সভায়, চুলচেরা বিবেচনার পর ঘোষণা করে যে মুসলিম জাতি অবিভক্ত ভারতের শাসনতন্ত্রের কাছে মাথানত করবে না এবং একক সংবিধানের কোন আন্দোলনে অংশগ্রহণ করবে না। এতে করে ব্রিটিশ সরকারের ব্রিটিশদের থেকে ভারতের জনগণের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের উদ্দেশ্য ও প্রক্রিয়া, যা দেশের অভ্যন্তরীণ শান্তি বজায় রাখার জন্য নিম্নলিখিত যথাযত ও ন্যায়সঙ্গত নীতির সাথে একমত নয়, ভারতের সমস্যার সমাধানে কোন ভূমিকাই রাখবে না।

১. উত্তর-পূর্বের বাংলা ও আসাম এবং উত্তর-পশ্চিমের পাঞ্জাব, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ, সিন্ধু ও বেলুচিস্তান অর্থাৎ পাকিস্তান জোন, যেখানে মুসলিমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ, নিয়ে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠিত হবে এবং পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার বাস্তবায়নে দ্যর্থহীন উদ্যোগ নিতে হবে।

২. পাকিস্তান ও হিন্দুস্তানের পৃথক সংবিধান রচনার জন্য দুটি দেশের নাগরিকদের নিয়ে দুটি ভিন্ন সংবিধান রচনা কমিটি গঠন করতে হবে।

৩. ২৩ মার্চ, ১৯৪০ সালে লাহোরে ঘোষিত নিখিল ভারত মুসলিম লীগের প্রস্তাবনা অনুযায়ী পাকিস্তান ও হিন্দুস্তানের সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হবে।

৪. মুসলিম লীগের পাকিস্তান গঠনের দাবির অনুমোদন ও অনতিবিলম্বে এর বাস্তবায়ন কেন্দ্রীয় সরকার গঠনে মুসলিম লীগের সহযোগিতা ও অংশগ্রহণের জন্য অবশ্য করনীয়।

এই সভায় আরো জোরালোভাবে ঘোষিত হয় যে, মুসলিম লীগের দাবির বিপরীতে অবিভক্ত ভারত প্রতিষ্ঠার যে কোন উদ্যোগ নেয়া বা কেন্দ্রে কোন রকম অস্থায়ী বন্দোবস্ত করা হলে, মুসলিমদের যেকোনো উপায়ে টিকে থাকা ও জাতীয় অস্তিত্ব রক্ষার জন্য এর বিরুদ্ধে আন্দোলন করা ছাড়া আর কোন বিকল্প থাকবে না।

————-

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<001.007.017>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

 

শিরোনামঃ ক্যাবিনেট মিশন প্রস্তাব

সূত্রঃ দি ইভুল্যশান অব ইন্ডীয়া এন্ড পাকিস্তানঃ সি,এইচ, ফিলিপ্স, পৃষ্ঠা- ৩৭৮

তারিখঃ ১৬ই মে ১৯৪৬।

 

দ্য ক্যাবিনেট মিশন

১৬ মে ১৯৪৬

 

১। গত ১৬ই মার্চ, বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী ভারতে ক্যাবিনেট মিশন শেষ হবার একটু আগে এই কথাগুলো বলেছেন,

‘আমার সহকর্মীরা, যতটা সম্ভব দ্রুত এবং সম্পূর্ণভাবে মুক্তি অর্জনে ভারতকে সর্বোচ্চ সাহায্য করার উদ্দেশ্য নিয়ে, সেখানে যাচ্ছেন। কোনধরনের সরকার বর্তমান শাসনকে প্রতিস্থাপিত করবে তা ভারতকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে; কিন্তু আমাদের অভিপ্রায় এটাই যে, তাঁকে অবিলম্বে এ সিদ্ধান্ত নিতে সকলভাবে সাহায্য করা …… ?

আমি আশা করি ভারতীয় জনগণ বৃটিশ কমনওয়েলথের মাঝে অবস্থানকে বেছে নেবে। আমি নিশ্চিত ভারত এর মাধ্যমে বৃহৎ সুবিধাভোগী হবে ……

‘কিন্তু ভারত যদি তা বেছে নেয়, তবে সেটা অবশ্যই স্বেচ্ছায় হতে হবে। বৃটিশ কমনওয়েলথ এবং সাম্রাজ্য কোনো বাহ্যিক বাধ্যবাধকতায় একত্রে আবদ্ধ নয়। এটা সকল মুক্ত মানুষের একটা মুক্ত সমিতি। যদি অন্যথায় ভারত তার স্বাধীনতাকে বেছে নেয়, আমাদের দৃষ্টিতে ভারত তা করার পূর্ণ অধিকার রাখে। আমাদের করনীয় শুধু এই রূপান্তরকে যতটা সম্ভব মসৃণ ও সহজ করা।’

২। এই ঐতিহাসিক কথাগুলোয় উদ্দীপ্ত হয়ে, আমরা – মন্ত্রীসভার সদস্যরা এবং ভাইসরয়, দুই রাজনৈতিক দলকে ভারতের অখন্ডতা বা বিভক্তির মতো মৌলিক ইস্যুতে সহমতে পৌঁছানোর জন্য আমাদের সর্বোচ্চটুকু করেছি। দিল্লীতে দীর্ঘ আলোচনার পর, আমরা কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগকে সিমলায় সম্মেলনে একত্রে উপস্থিত রাখার ব্যাপারে সফল হয়েছি। সেখানে উভয়ের দৃষ্টিভঙ্গির পূর্ণ বিনিময় ছিল এবং উভয় দলই একটা মীমাংসায় পৌঁছাতে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোয় ছাড় দিতে প্রস্তুত ছিল, কিন্তু পরিশেষে দুই দলের মাঝে থাকা অবশিষ্ট ফাটলগুলো বন্ধ করা অসম্ভব বলেই প্রমাণিত হয়েছে ও ফলে উপসংহারে কোনো সহাবস্থান আসে নি। যেহেতু কোনও ঐক্যমতে পৌঁছানো যায় নি, সেহেতু দ্রুত একটা নতুন সংবিধান প্রণয়নের জন্য যেসব সম্ভাব্য কর্মপরিকল্পনা সর্বোত্তম বলে আমাদের বিবেচনাধীন তা দাখিল করা আমাদের দায়িত্ব বলে আমরা অনুভব করি। এই বিবৃতি যুক্তরাজ্যের সরকার কর্তৃক অনুমোদন সাপেক্ষে দেয়া হয়েছে।

৩। তদনুসারে আমরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি যে অবশ্যই কিছু আশু পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে যার মাধ্যমে ভারতীয় জনগণ ভারতের ভবিষ্যৎ সংবিধানের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে, এবং যতদিন না নতুন সংবিধান চলে আসছে ততদিন পর্যন্ত বৃটিশ-ভারতের প্রশাসন চালানোর জন্য একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করা যাবে।

আমরা জনগণের ক্ষুদ্রতর সাথেসাথে বৃহত্তর স্বার্থে পাশে থাকব বলে ও তাঁদের সমস্যাগুলোর সমাধান সুপারিশ করার প্রয়াস চালাবো বলে স্থির করেছি যা ভবিষ্যতের ভারতকে পরিচালনার ক্ষেত্রে বাস্তবধর্মী নেতৃত্বে সহযোগিতা যোগাবে এবং প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে একটা যুক্তিসঙ্গত ভিত্তি ও সামাজিক, রাজনৈতিক এবং আর্থনীতিক ক্ষেত্রে একটা ভাল সুযোগ করে দেবে।

 

 

 

<001.007.018>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

 

৪। এই বিবৃতিতে বিস্তারিত প্রমাণাদির, যা মিশনে দাখিল করা হয়েছে, পর্যালোচনা করার কোনো অভিপ্রায় ছিল না; কিন্তু এটা ঠিক যে আমরা অবশ্যই বলতে চাই এটা, মুসলিম লীগের সমর্থকদের বাইরে, ভারতের অখন্ডতার জন্য প্রায় সার্বজনীন আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন দেখিয়েছে।

৫। যদিও এই বিবেচনা আমাদেরকে, ভারতের বিভক্তির সম্ভাব্যতাকে, পুঙ্খানুপুঙ্খে ও নিরপেক্ষভাবে পরীক্ষা করা থেকে নিরস্ত করে নি; কেননা আমরা মুসলিমদের হিন্দু-সংখ্যাগরিষ্ঠ শাসনে স্থায়ীভাবে শাসিত হবার অকৃত্রিম এবং তীব্র উদ্বেগে প্রভাবিত হয়েছিলাম। এই অনুভূতি মুসলিমদের মাঝে এতটাই প্রবল এবং ব্যাপক আকার পেয়েছে যে কোনো নির্দিষ্ট কাগজের তৈরি রক্ষাকবচের মাধ্যমে এর প্রশমন সম্ভব নয়। যদি ভারতে অভ্যন্তরীণ শান্তি বজায় রাখতে হয় তবে মুসলিমদের সংস্কৃতি, ধর্ম ও অর্থনীতি অথবা অন্যান্য স্বার্থ সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর উপর তাঁদের নিয়ন্ত্রণ বিশেষ কিছু ব্যবস্থার মাধ্যমে সংরক্ষিত হতে হবে।

৬। তাই আমরা প্রথম উদাহরণসরূপ মুসলিম লীগ প্রদত্ত পাকিস্তান নামের একটা আলাদা ও সম্পুর্ণ সার্বভৌম রাষ্ট্রের প্রশ্নটা পরীক্ষা করে দেখি। এই পাকিস্তান রাষ্ট্রটিতে দু’টো অঞ্চল অন্তর্ভুক্ত থাকবেঃ একটা অঞ্চল উত্তর-পশ্চিমে যাতে থাকবে পাঞ্জাব, সিন্ধু, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত এবং বৃটিশ বেলুচিস্তান প্রদেশগুলো; অন্যদিকে আরেকটা অঞ্চল উত্তর-পূর্বে যাতে থাকবে বাংলা এবং আসাম প্রদেশ। মুসলিম লীগ সীমান্তের পুনর্গঠন নিয়ে পরবর্তী সময়ে বিবেচনা করতে সম্মত হলেও পাকিস্তান রাষ্ট্রের মূলনীতিগুলোর আবশ্যিক স্বীকৃতির জন্য দাবি জানিয়েছে। আলাদা পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিতর্কের ভিত্তি ছিল, প্রথমত, মুসলিম সংখ্যাগুরুদের তাঁদের পদ্ধতি বা তাঁদের আকাঙ্ক্ষিত সরকার ব্যবস্থার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবার অধিকারের ওপর, এবং, দ্বিতীয়ত, যেসব অঞ্চলে মুসলিমরা সংখ্যালঘু সেসব অঞ্চলগুলো অন্তর্ভুক্তির প্রয়োজনীয়তার ওপর, যাতে করে পাকিস্তান প্রশাসনিক ও আর্থনীতিকভাবে কার্যকর হয়ে ওঠে।

পাকিস্তানে অংশীভূত করে ছয়টি প্রদেশের সামগ্রিক অমুসলিম সংখ্যালঘুদের পরিমাণের সমগ্র গাণিতিক হিসাব এখানে খুবই বিবেচ্য হবে যা নিচে দেখানো হয়েছে।

উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলঃ মুসলিম অমুসলিম
পাঞ্জাব ১৬,২১৭,২৪২ ১২,২০১,৫৭৭
উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ ২,৭৮৮১৭৯৭ ২৪৯,২৭০
সিন্ধু ৩,২০৮,৩২৫ ১,৩২৬,৬৮৩
বৃটিশ বেলুচিস্তান ৪৩৮,৯৩০ ৬২,৭০১
২২,৬৫৩,২৯৪ ১৩,৮৪০,২৩১
                               শতকরা ৬২.০৭ ভাগ                                  শতকরা ৩৭.৯৩ ভাগ

 

উত্তর-পূর্বাঞ্চলঃ
বাংলা ৩৩,০০৫,৪৩৪ ২৭,৩০১,০৯১
আসাম ৩,৪৪২,৪৭৯ ৬,৭৬২,২৫৪
৩৬,৪৪৭,৯১৩ ৩৪,০৬৩,৩৪৫
শতকরা ৫১.৬৯ ভাগ শতকরা ৪৮.৩১ ভাগ

 

 

<001.007.019>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

 

 

দুই কোটি মুসলিম সংখ্যালঘু পুরো ১৮.৮ কোটি জনসংখ্যার বৃটিশ ভারতের মাঝে অদৃশ্য হয়ে যাবে।

এই সংখ্যাগুলো আমাদের দেখায় যে মুসিলম লীগের দাবি অনুসারে একটি আলাদা সার্বভৌম পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করলে সাম্প্রদায়িক সংখ্যালঘু সমস্যার কোনো সমাধান হবে না; আবার একটি সার্বভৌম পাকিস্তান রাষ্ট্রে পাঞ্জাব এবং বাংলা এবং আসামের অমুসলিম সংখ্যাগুরু এলাকাগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করার কোনো ন্যায্যতাও দেখি না। আমাদের দৃষ্টিতে পাকিস্তানের পক্ষে প্রতিটি বিতর্কই অমুসলিম এলাকাগুলোকে পাকিস্তান থেকে বাদ দেয়ার পক্ষে রায় দিয়েছে। এই বিষয়টা শিখদের অবস্থান বিশেষভাবে প্রভাবিত করবে।

৭। তাই আমরা বিবেচনা করেছি যদি শুধু মুসলিম সংখ্যাগুরু এলাকাগুলো নিয়ে একটি সার্বভৌম পাকিস্তান গঠন করা যায় তবে তা সমঝোতার একটা সম্ভাব্য ভিত্তি হতে পারে। এই ধরণের পাকিস্তান মুসলিম লীগ এর বিবেচনায় সম্পুর্ণ অবাস্তব কেননা এর ফলশ্রুতিতে পাকিস্তান থেকে (ক) পাঞ্জাবের আম্বালা ও জলন্ধর বিভাগ (খ) পুরো আসাম শুধুমাত্র সিলেট বাদে (গ) পশ্চিম বাংলার বিরাট অংশ, কোলকাতা সহ, যাতে পুরো জনসংখ্যার মুসলিমরা পুরো জনসংখ্যার শতকরা ২৩.৬ ভাগ। আমরা আরও উপলব্ধি করতে পেরেছি যে কোনো সমাধান যা পাঞ্জাব এবং বাংলাকে মৌলিকভাবে বিভক্ত করে ফেলে তা এই প্রদেশগুলোর মানুষের ইচ্ছার বিরুদ্ধে যাবে। বাংলা এবং পাঞ্জাব প্রত্যেকেরই নিজস্ব ভাষা আছে এবং একটা দীর্ঘ ইতিহাস ও ঐতিহ্য আছে। এছাড়াও, পাঞ্জাবের কোনোপ্রকার বিভাজন করতে গেলে সীমান্তের দু’পারেই প্রচুর পরিমাণ শিখদের রেখে বিভাজিত করতে হবে। অতএব এ থেকে আমরা বাধ্য হয়েই এই উপসংহারে উপনীত হয়েছি যে বড় বা ছোট কোনো আকারেরই একটি সার্বভৌম পাকিস্তান রাষ্ট্র সাম্প্রদায়িক সমস্যার একটি গ্রহনযোগ্য সমাধান দেবে না।

৮। পূর্বোল্লিখিত বিতর্ক ছাড়াও এখানে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক, আর্থনীতিক, এবং সামরিক বিষয়ও বিবেচনাধীন। ভারতবর্ষের সম্পূর্ণ যোগাযোগ এবং ডাক ও টেলিগ্রাফ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে একটি অবিভক্ত ভারতবর্ষের ওপর ভিত্তি করে। এই ব্যবস্থার ভাঙ্গন বিভক্ত ভারতের উভয় অংশকেই চরম ক্ষতির সম্মুখীন করবে। একটি অবিভক্ত প্রতিরক্ষা অনেক শক্তিশালী হবে। ভারতীয় প্রতিরক্ষা বাহিনী তৈরি করা হয়েছে পূর্ণাঙ্গ ভারতকে রক্ষার উদ্দেশ্যে, এবং তাদের বিযুক্তি ভারতীয় সেনাবাহিনীর সুদীর্ঘ ঐতিহ্যে এবং উচ্চমানের দক্ষতায় একটি মারাত্মক আঘাত দেবে, ফলে তাদের মধ্যে গুরুতর বিপর্যয় দেখা দেবে। ভারতীয় বিমান ও নৌবাহিনীও কম কার্যকর হয়ে পড়বে। প্রস্তাবিত পাকিস্তান রাষ্ট্রের দু’টো ভাগই ভারতের দু’টো খুবই অরক্ষিত সীমান্ত অন্তর্ভুক্ত করে এবং সমুদ্রে একটি সফল প্রতিরক্ষার জন্যও পাকিস্তানের আয়তন যথেষ্ট নয়।

৯। একটি তদতিরিক্ত গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় হল এই বিভক্ত বৃটিশ ভারতে ভারতীয় রাজ্যগুলো পারস্পরিক সাহচর্যে বৃহত্তর প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হবে।

১০। পরিশেষে, এখানে ভৌগলিক সত্যটা হল প্রস্তাবিত পাকিস্তানের দু’টো ভাগ পরস্পর থেকে সাত’শ মাইল দুরত্বে বিচ্ছিন্ন এবং যুদ্ধ বা শান্তিতে তাদের মধ্যে যোগাযোগ নির্ভর করবে হিন্দুস্তানের দয়ার ওপর।

১১। অতএব আমরা বৃটিশ সরকারকে, বৃটিশদের হাতে থাকা বর্তমান ক্ষমতাকে দু’টো সম্পুর্ণ আলাদা, সার্বভৌম রাষ্ট্রে হস্তান্তর করার পরামর্শ দিতে অপারগ।

 

 

 

 

 

 

<001.007.020>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

 

১২। যদিও এই সিদ্ধান্ত আমাদেরকে মুসলিমদের বাস্তবিক শঙ্কার ব্যাপারে অন্ধ করে দেয় না যে, তাঁদের সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবন বিশুদ্ধ একক ভারতে নিমজ্জিত হয়ে যেতে পারে, যেখানে হিন্দুরা তাঁদের বাস্তবিক সংখ্যাগুরুত্ব দিয়ে একটি প্রভাবশালী অংশ। এই সমস্যা মোকাবেলায় কংগ্রেস একটি পদ্ধতি পেশ করেছে যেখানে প্রদেশগুলো পূর্ণাঙ্গ সায়ত্বশাসন ভোগ করবে শুধুমাত্র পররাষ্ট্রীয়, প্রতিরক্ষা ও যোগাযোগের মতো কেন্দ্রীয় বিষয়গুলো ছাড়া।

এই পদ্ধতিতে প্রদেশগুলো, যদি আর্থনীতিক এবং প্রশাসনিক পরিকল্পনায় বড় পরিসরে অংশ নিতে চায়, কেন্দ্রের হাতে আবশ্যিক বিষয়গুলো ছাড়াও ঐচ্ছিক বিষয়গুলো ছেড়ে দিতে পারবে।

১৩। আমাদের দৃষ্টিতে এধরণের পদ্ধতি ভেবে দেখার মতো সাংবিধানিক ক্ষতি ও বিশৃংখলা বাড়িয়ে দেবে। এভাবে একটি কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী পরিষদ ও আইনসভার পক্ষে কাজ করতে কষ্টকর হবে যাতে কিছু মন্ত্রী, যারা আবশ্যিক বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করে, পুরো ভারতের ব্যাপারে দায়িত্বশীল থাকবে, যখন অন্য প্রাদেশিকভাবে নির্বাচিত মন্ত্রীরা, যারা ঐচ্ছিক বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করে, দায়িত্বশীল থাকবে শুধুমাত্র সেসব ঐচ্ছিক বিষয় নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার জন্য। এই অসুবিধা কেন্দ্রীয় আইনসভায় লক্ষনীয়ভাবে দৃষ্টিগোচরীভুত হবে, যেখানে কিছু নির্দিষ্ট প্রাদেশিক সদস্যকে আলোচনার মাঝে কথা বলা ও ভোট প্রদান থেকে বিরত রাখতে হবে যখন বিষয়গুলো তাঁর প্রদেশের সাথে সম্পর্কিত হবে না। এই পদ্ধতিতে কাজ করার অসুবিধাটি ছাড়াও, আমরা মনে করি না, যে অন্য প্রদেশগুলো, যাঁরা কেন্দ্রের ঐচ্ছিক বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করতে ইচ্ছাপোষণ করে নি, তাঁদের একই উদ্দেশ্য নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার অধিকার অগ্রাহ্য করা উচিৎ হবে। যদি এমনটা করা হয় তবে এটা আর তাঁদের স্বায়ত্বশাসনের পরিপন্থী হবে।

১৪। আমাদের সুপারিশগুলো পেশ করার আগে আমরা বৃটিশ ভারতের সাথে ভারতীয় রাজ্যগুলোর মধ্যেকার সম্পর্কে আলোকপাত করব। এটা পরিষ্কার যে বৃটিশ ভারতের স্বাধীনতা অর্জনের ফলে, বৃটিশ কমনওয়েলথের ভেতরে থাকুক না না থাকুক, যে সম্পর্ক এযাবৎ রাজ্যশাসক এবং বৃটিশরাজের মধ্যে চলে এসেছে তা আর অস্তিমান থাকা সম্ভব হবে না। বৃটিশরাজ সর্বপ্রধানত্ব না পুনঃ অর্জন করতে পারবে না নতুন সরকারের কাছে হস্তান্তর করতে পারবে। প্রদেশগুলোতে আমরা যাঁদের সাক্ষাৎকার নিয়েছি তাঁরা সবাই এই বিষয়টি উপলব্ধি করতে পেরে গেছে। তাঁরা আমাদের এটাও নিশ্চিত করেছে যে প্রদেশগুলো ভারতের নতুন উন্নয়নে পারস্পরিক সহযোগীতায় প্রস্তুত এবং ইচ্ছুক।

সাংবিধানিক গঠন তৈরির সময়কালে তাঁদের এই পারস্পরিক সহযোগীতা অবশ্যই যথাযথ আলোচনাসাপেক্ষ হতে হবে এবং অবশ্যই তা সকল প্রদেশের জন্য একই হতে হবে। তাই আমরা বৃটিশ ভারতের প্রদেশ হিসেবে একই প্রকারের রাষ্ট্রগুলো নিয়ে আর পরবর্তী অনুচ্ছেদে আলোচনা করি নি।

১৫। আমরা এখন একটি সমাধান প্রকৃতির দিকে ইঙ্গিত করব যা আমাদের দৃষ্টিতে সকল দলের অপরিহার্য দাবিগুলোর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ এবং একইসাথে সমগ্র ভারতে একটি বাস্তব ও স্থিতিশীল সাংবিধানিক গঠন আনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে আদর্শ হবে।

আমরা সুপারিশ করি যে সংবিধানের অবশ্যই নিচে দেয়া মৌলিক আকার থাকতে হবেঃ

(১)

এখানে বৃটিশ ভারত ও নব্য রাষ্ট্রদ্বয় উভয়ের সমন্বয়ে অবশ্যই একটা ভারতীয় ইউনিয়ন থাকতে হবে, যা কাজ করবেঃ পররাষ্ট্ বিষয়গুলো, প্রতিরক্ষা ও যোগাযোগ নিয়ে এবং অবশ্যই এই বিষয়গুলোর জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক সংস্থান করে দেবার মতো ক্ষমতা থাকতে হবে।

 

 

 

 

 

<001.007.021>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

 

(২) ইউনিয়নটির অবশ্যই একজন কার্যনির্বাহী এবং বৃটিশ ভারতীয় ও রাষ্ট্রগুলো থেকে নিয়ে গঠিত আইনসভা থাকতে হবে। আইনসভাতে উত্থাপিত যোকেনো সাম্প্রদায়িক বিষয়ের যেকোনো প্রশ্ন সম্পর্কিত সিদ্ধান্ত দুই প্রধান সম্প্রদায়ের সিংহভাগ প্রতিনিধির উপস্থিতি ও ভোট করার উপর নির্ভর করবে পাশাপাশি সকল সদস্যের সিংহভাগের উপস্থিতি ও ভোট করার উপর নির্ভর করবে।

(৩) ইউনিয়নের বিষয়গুলো ছাড়া অন্যসকল বিষয় এবং সকল লেনদেন সম্পর্কিত ক্ষমতা অবশ্যই প্রদেশের হাতে ন্যস্ত থাকতে হবে।

(৪) রাষ্ট্রগুলো কেন্দ্রে সমর্পিত বিষয়গুলো ছাড়া সকল প্রজাদের এবং ক্ষমতা নিজে ধারণ করবে।

(৫) প্রদেশগুলো নিজেদের মাঝে কার্যনির্বাহীদের ও আইনসভাগুলোকে নিয়ে দলবদ্ধ হবার স্বাধীনতা থাকতে হবে এবং প্রতিটি দল নিজেদের মধ্যে থাকা সার্বজনীন প্রাদেশিক বিষয়গুলো নির্ধারণ করতে পারবে।

(৬) ইউনিয়ন এবং দলের সংবিধানগুলোতে একটি বিধান থাকতে হবে যার সাহায্যে যেকোনো প্রদেশ তাঁর বিধানসভার অধিকাংশ ভোটের মাধ্যমে দশ বছরের প্রাথমিক পর্যায়ের পর এবং পরবর্তীতে দশ বছর অন্তর অন্তর সাংবিধানিক শর্তগুলোর পুনর্বিবেচনার জন্য আহ্বান জানাতে পারবে।

১৬। এটা আমাদের উদ্দেশ্য নয় যে ওপরে বর্ণিত কার্যক্রমের উপর নির্ভর করে একটি সংবিধানের বিস্তারিত বিন্যাস করা, বরং কিছু গতিশীলতা প্রদানকারী কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন যার সাহায্যে ভারতীয়দের দ্বারা ভারতীয়দের জন্য একটি সংবিধান স্থির করা যায়।

এটা আমাদের জন্য অত্যাবশ্যক এবং আলোচনার সময় থেকেই পরিষ্কার হয়ে গেছে যে ভবিষ্যৎ সংবিধানের জন্য যেকোনো সুপারিশ করা ততক্ষণ পর্যন্ত সম্ভব নয় যতক্ষন না বড় দুই সম্প্রদায়কে সংবিধান প্রণয়ণ কারী কর্মপরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা যায়।

আমরা আশা করব যে নতুন স্বাধীন ভারত বৃটিশ কমনওয়েলথের সদস্য হতে ইচ্ছাপোষণ করবে। আমরা আশা করি যে, যেকোনো কর্মসূচীতে, আপনারা আমাদের জনগণের সাথে ঘনিষ্ঠ ও বন্ধুত্বপূর্ণ সাহচর্যে থাকবেন। কিন্তু এই বিষয়গুলো আমাদের মুক্ত অভিমতের উপর নির্ভরশীল। তবে অভিমত যাই হোক না কেন, ভবিষ্যতে, যা অতীতের চেয়েও গৌরবময় হবে, আমরা সানন্দে আপনাদের সাথে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ জাতিগুলোর মাঝে আপনাদের নিত্য বর্ধনশীল সমৃদ্ধিতে থাকতে চাই।

 

 

——-

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<001.008.022>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

 

শিরোনামঃ স্বাধীন সার্বভৌম বাংলা প্রতিষ্ঠার পক্ষে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ারদীর প্রেস বিজ্ঞপ্তি

সুত্রঃ মর্নিং নিউজ, ২৮শে এপ্রিল ১৯৪৭। সূত্র- শীলা সেন, মুসলিম পলিটিক্স ইন বেঙ্গল। পৃষ্ঠা- ২৮১

তারিখঃ ২৭শে এপ্রিল, ১৯৪৭

 

. ২৭ এপ্রিল, ১৯৪৭এ নয়া দিল্লীতে মুখ্যমন্ত্রী এইচ. এস. সোহরাওয়ার্দীর কর্তৃক প্রদানকৃত সংবাদ বিবৃতির নির্যাস

 

যারা সাগ্রহে বাংলার কল্যাণ ও উন্নতির আশা করেছিলেন তাদের জন্য এটা পাওয়া খুবই পরিতাপের বিষয় যে বাংলা ভাগের জন্য কিছু আবাস স্থলে আশংকাজনক ভাবে প্রবল চেষ্টা করা হচ্ছে। এই ক্রন্দন কখনোই উঠত না যদি হিন্দুদের কিছু অংশে হতাশা ও অস্থিরতা না থাকত যেহেতু প্রদেশে তাদের সংখ্যা, সম্পদ, প্রভাব, শিক্ষা, প্রদেশের প্রশাসনে অংশগ্রহন, প্রচার এবং তাদের সহজাত বল থাকা সত্ত্বেও বাংলা মন্ত্রণালয়ে তাদের সম্প্রদায়ের সদস্যদের যথাযথ অংশিদারিত্ব নেই।

বাংলার বর্তমান অবস্থা স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্য প্রযোজ্য না যেমন বাংলা হবে আমি আশা করি, এটি অনুধাবন করার ব্যর্থতাই মূলত এই হতাশা সৃষ্টির জন্য অনেকাংশে দায়ী। আজ ভারতে আমরা সারা ভারতের প্রতিদ্বন্দ্বী দলসমূহের সংগ্রামের মাঝে আছি। প্রত্যেকে তার মতামত অন্যের উপর চাপিয়ে দেওয়ার অভিপ্রায়ে থাকে এবং কেউই ছাড় দিতে রাজি নয় যদি না অন্যদল এমন মূল্য দিতে পারে যা দেওয়ার জন্য তারা প্রস্তুত নয়।

তাদের সঙ্ঘাত গভীরভাবে সব প্রদেশের রাজনীতিতে প্রভাব ফেলে এবং এই সমস্যাগুলো সামগ্রীকভাবে মধ্যস্থতা করা হয়। যখন প্রতিটি প্রদেশের নিজে নিজেকে পরিচালনা করতে হবে এবং যখন প্রতিটি প্রদেশ নিশ্চিতভাবে প্রয়োগিক হয়, যদি পূর্ণ স্বাধীন না হয়, তখন সম্পূর্ণ ভিন্ন অবস্থার সৃষ্টি হবে এবং বাংলার জনগনকে একে অপরের উপর নির্ভর করতে হবে।

এটা অবিশ্বাস্য যে এমন অবস্থা চক্রের মাঝেও বাংলায় একটি মন্ত্রণালয়ের অস্তিত্ব থাকতে পারে যেটা সমাজের সব গুরুত্বপূর্ণ উপাদানের মিশ্রণ নয় অথবা যেটা সাম্প্রদায়িক দলের মন্ত্রণালয় হতে পারে অথবা যেখানে বিভিন্ন অংশের যে প্রতিনিধিত্ব বর্তমানে যেমন আছে তার চেয়ে ভাল হবে না। আমি মনে করি না যে, খুবই সামান্য ব্যবধানের সংখ্যা গরিষ্ঠতার ফলে মন্ত্রণালয়ে মুসলমানদের যে সামান্য আধিক্য রয়েছে এই তথ্যটি হিন্দুদের গাত্রদাহের কারণ হবে যেহেতু প্রকৃতপক্ষে এযাবতকাল পর্যন্ত বাংলার প্রকৃতিতে এটি সহজাতভাবে প্রচলিত।

হিন্দু জনগণের সাথে কথিত আচরণ নিয়ে বাংলা সরকারের বিরুদ্ধে সবেচেয়ে তপ্ত সমালোচনা আমি পড়েছি। সবচেয়ে ঠুনকো ও কল্পনার উপর ভিত্তি করে এই প্রকাশ্য সমালোচনা সমূহ গড়ে উঠেছে। বিভাজনের দাবি, বাংলার অধিকাংশ হিন্দুদের কথা বাদ দিলাম, এমনকি পশ্চিম বাংলার অধিকাংশ হিন্দুদেরও এই দাবি তা আমি কোনভাবে স্বীকার করব না।

বাংলার প্রতিটি অংশে হিন্দুদের বন্ধন ও সংস্কৃতি এত সদৃশ যে ক্ষমতা দখলের উদ্দেশ্যে এসব বন্ধন ভাঙ্গা বাংলার এক অংশের হিন্দুদের জন্য সুবিধাস্বরুপ হয় না। প্রকৃতপক্ষে এই সাদৃশ্য অনুসারে বিভাজনের প্রশ্ন বাংলার সব মানুষ তথা মুসলমান, হিন্দু, উপজাতি এবং অন্যান্যদের মতামত অনুসারেই নিরুপন করা উচিত যা শুধুমাত্র তখন চেষ্টা করা যায় যখন তার পক্ষে তাৎপর্যপূর্ণ সংখ্যাধিক্য থাকে।

 

 

 

 

 

<001.008.023>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

 

এই মুখ্য উপাদানগুলোই বাংলার জন্য বিশেষ যা বাংলা ভাগের প্রশ্ন মুসলিমদের ভারত ভাগের প্রশ্ন থেকে আলাদা করেছে, তবে অর্থনৈতিক ঐক্য, পারস্পরিক আস্থা এবং শক্তিশালী কার্যকর রাষ্ট্র তৈরীর প্রয়োজনীয়তার মত উপাদানগুলো ব্যতিরেকে। বিভাজনের নেতৃত্ব হিন্দু মহাসভা নিয়েছে যা আশা করে যে বাংলা ভাগের আশংকার চাবুক পরিচালনা করে, বাংলা মন্ত্রী পরিষদ ভাঙ্গার জন্য, ৯৩ এর ধারা আরোপ, আঞ্চলিক মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা, মুসলমানদের বিরুদ্ধে ধর্মান্ধতা সৃষ্টির দ্বারা, হরতাল ও সহিংসতার মাধ্যমে বিশৃংখলা সৃষ্টির দ্বারা তারা হিন্দুদের দৃষ্টি তাদের দিকে ফেরাতে পারবে এবং কংগ্রেসের প্রভাব ধ্বংস করতে পারবে। হিন্দু মহাসভা দৃশ্যপটে ফেরার কামনা করে এবং কতিপয় নেতাও এই কামনা করে যারা নিজেদের জন্য বিন্দুমাত্র জায়গা খুঁজে পাচ্ছে না।

*                                                                       *                                                           *

কিন্তু আমাদের আরো একবার দাবিটির নিজের বৈধতা বিবেচনা করতে দিন। কেন বাঙ্গালি হিন্দুদের উচিত আলাদা মাতৃভূমি দাবি করা?

বর্তমানে আমাকে একটা অনুমান করতে দিন যে এই দাবিটি শুধু গুটিকয়েকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় বরং হিন্দুদের সকল জাত, উপজাতি ও নিজেদের জাতে না ফেরা মানুষদের দ্বারা সামনে আনা হয়েছে। বর্তমান শাসন আমলে তাদের সংস্কৃতি, ধর্ম, ভাষা কোনটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি এবং তারা কিভাবে ভাবে যে ভবিষ্যত কাঠামোয় তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে তার ফলে তারা শুধু মাত্র তখনই তাদের সংস্কৃতি ও জীবনের উন্নতি করতে পারবে ও নিরাপদ থাকবে যদি তাদের পশ্চিম বঙ্গের ছোট একটা অংশ থাকে। আমার মতে, আমি মনে করি হিন্দুদের দৃষ্টিকোন থেকে এই দাবিটা আত্মঘাতি। এমনকি যদি তা ঘটে, একটি ঘটনাক্রম যা আমি কল্পনা করতে পারি না, যে এককভাবে মুসলমানদের দ্বারা পাসকৃত আইন, এবং মনোভাব যা সমগ্র হিন্দুদের মুসলমানদের বিরুদ্ধে দাড় করিয়েছে, এমন পন্থা সফল করা অথবা কার্যকর করা কি সম্ভব, যেখানে বাংলার যেকোন সরকারকে নিজেদের কর্মচারিদের তার সাথে বহন করতে হয় এবং তাদের অধিকাংশই হিন্দু সম্প্রদায়ের? তারপরও আবার, শিল্প, ব্যবসা, পেশাসমূহ তাদের হাতেই আছে। তাদের তরুনরা ভালভাবে অগ্রসর এবং তাদের অধিকার কী জানে এবং জানে কিভাবে তাদের দাবি করতে হয়। তাদের বর্তমান মনোভাব শুধুমাত্র অস্থিরতা ও হতাশার কারণে সৃষ্ট নয়, শুধুমাত্র অদূরদর্শিতা নয় বরং এটা হল পরাজিত মনোভাবের স্বীকারোক্তি যা বাংলার মহান হিন্দু সম্প্রদায় থেকে কদাচিত আশা করা যায়।

স্বাধীন রাষ্ট্রের কাঠামোতে কী ঘটতে পারে তার উদাহরণ হিসেবে সর্বদা নোয়াখালির কথা উল্লেখ করা হয়। আমি ইতোমধ্যেই বলেছি যে বর্তমান কাঠামো থেকে ভবিষ্যত নির্ণয় করা হাস্যকর কিন্তু আসুন এখানে কিছুক্ষনের বিরতি নেই। নোয়াখালি ও এই এলাকার ঘটনা কি আদর্শ স্বরুপ ও ভবিষ্যতের পূর্বাভাস রুপে ভাবা যেতে পারে, এবং এখানে কি আরও জেলা নেই যেখানে মুসলমানরা বিশ্বাসজনক ও অভাবনীয়ভাবে সংখ্যা গরিষ্ঠ কিন্তু তারপরও সে জেলাগুলোতে শান্তি বিরাজ করছে, পূর্বের মতই কি হিন্দুরা তাদের ক্ষমতা ও সুবিধা ভোগ করছে না?

এবং একটু ক্ষনের জন্য বিরতি নেই বাংলা কী হবে বিবেচনা করতে যদি তা সংযুক্ত থাকে। এটা বিখ্যাত দেশ হবে, প্রকৃতপক্ষে ভারতে সবচেয়ে ধনী ও উন্নয়নশীল যা তার জনগণকে উন্নত জীবন মান প্রদানে সক্ষম হবে, যেখানে অধিকাংশ লোক তাদের যোগ্যতার চুড়ান্ত সীমায় উঠতে পারবে, একটা ভুমি যা সত্যিই প্রাচুর্যে পূর্ণ হবে। এটি কৃষিতে উন্নত হবে, শিল্প ও বাণিজ্যে উন্নত হবে এবং সময়ের পরিক্রমায় বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী ও উন্নয়নশীল রাষ্ট্র হবে। যদি বাংলা একত্র থাকে তবে তা স্বপ্ন ও কল্পনা থাকবে না।

 

 

 

 

 

 

 

<001.008.024>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

 

যে কেউ যে তার পুঁজি ও বর্তমান উন্নয়ন অবস্থা দেখে অবশ্যই একমত হবে যে এটা অবশ্যই পাস হওয়ার অবস্থায় আসা উচিত যদি আমরা নিজেদের হত্যা না করি। অতএব, আমি পুরোটা ঠাহর করতে পারি যে বাংলা একটি স্বাধীন রাষ্ট্র এবং ভারতীয় কোন জোটের অংশ নয়। যদি এমন রাষ্ট্র গঠিত হয় তবে তাদের ভবিষ্যত তাদের উপরই নির্ভর করবে। আমি কখনোই ভুলতে পারব না ১৯৪৩ সালে বাংলার দুর্ভিক্ষ অনুধাবন করতে ভারত সরকার কত দীর্ঘ সময় নিয়েছে, বাংলায় প্রবল অভাব থাকতেও কিভাবে প্রতিবেশী প্রদেশ বিহার খাদ্য শস্য দিতে অস্বীকার করেছে, ভারতের তখনকার প্রতিটি প্রদেশ কিভাবে তাদের দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল, এবং বাংলাকে তার সাধারণ অপরিহার্য পাওনা থেকে বঞ্চিত করেছিল, ভারতীয় সম্মেলনে কিভাবে বাংলাকে অমর্যাদার কোনে নিক্ষেপ করেছিল যখন অন্যান্য প্রদেশ অযৌক্তিক কর্তৃত্ব ফলিয়েছিল।

না, যদি বাংলা গুরুত্বপূর্ণ হতে চায়, তবে এটা একমাত্র তখনই গুরুত্বপূর্ণ হতে পারবে যদি সে নিজের পায়ে দাঁড়ায় এবং একে মহাকরণে সবাই একত্রিত হয়। তাকে অবশ্যই তার সম্পদ, ধন এবং তার ভাগ্যের নিয়ন্ত্রক হতে হবে। তাকে অবশ্যই অন্যদের দ্বারা শুষিত হওয়া বন্ধ করতে হবে এবং ভারতের বাকি অংশের সুবিধার জন্য দুর্ভোগ পোহানো আর অবিরত রাখা যাবে না। অতএব হিন্দুদের মধ্যে যারা বাংলা ভাগ নিয়ে আস্তে কথা বলে তাদের প্রতি আমার অনুরোধ তারা যেন সীমাহীন ভণ্ডামিতে পূর্ণ এই আন্দোলন বাদ দেয়। নিশ্চিতভাবেই, সরকারে কিছু পদ্ধতি আমাদের সকলের একত্র আলোচনার দ্বারা তৈরি হতে পারে যা সব অংশের লোককে সন্তুষ্ট করবে এবং বাংলার যে দ্যুতি ও গৌরব ছিল তা পুনরুজ্জীবিত করবে।

  • (উৎসঃ মর্নিং নিউজ, ২৮ এপ্রিল, ১৯৪৭.)

 

 

——–

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<001.009.025>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

 

                 শিরোনাম                        সূত্র                  তারিখ
স্বাধীন সার্বভৌম বাংলদেশের পক্ষে বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সম্পাদক জনাব আবুল হাশিমের প্রেস বিজ্ঞপ্তি মর্নিং নিউজ, ২৯ শে এপ্রিল ১৯৪৭। সূত্রঃ শীলা সেন, মুসলিম পলিটিক্স ইন বেঙ্গল। পৃষ্ঠা – ২৮১ ২৯ শে এপ্রিল, ১৯৪৭

 

. আবুল হাশিম, সম্পাদক, বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগ, কলকাতা এর সংবাদ বিবৃতি, ২৯ এপ্রিল, ১৯৪৭

সময় হয়েছে সত্যি বলার। সস্তা জনপ্রিয়তা ও সুযোগসন্ধানী নেতৃত্বের মতন কুরুচিপূর্ণ চিন্তার কাছে আত্মসমর্পণ করা মেধাগত পতিতাবৃত্তির নামান্তর। ১৯০৫ সালের দিকে বাংলা ছিল ভারতবর্ষের মননশীল নেতা এবং সাফল্যের সহিত তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারের ক্ষমতাকে প্রতিহত করে। দুঃখের বিষয় আজকের বাংলা বুদ্ধিবৃত্তিতে দেউলিয়া হয়ে গেছে এবং বিদেশী নেতাদের কাছে চিন্তাভাবনা ও দিক-নির্দেশনা ভিক্ষা ও ধার করে বেড়াচ্ছে। আমি বিস্ময়বোধ করি, বাঙালি হিন্দুরা, যারা একসময় সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, অশুতোষ মুখার্জী, চিত্তারঞ্জন দাস এবং সুভাষ চন্দ্র বোসের মতন মানুষের জন্ম দিয়েছেন তাদের আজ কি হোল।

ভারতবর্ষের বর্তমান বৈপ্লবিক চেতনার জন্ম বাংলায়। সত্যিকার বিপ্লব ভয়ংকর খুনোখুনিতে নয়, বরং চিন্তা-চেতনার বিপ্লব তৈরিতে নিহত। বাংলাকে অবশ্যই তাঁর হীনমন্যতা ও পরাজিত মানসিকতা ঝেড়ে ফেলতে হবে, অতীতের ঐতিহ্য পুনোরুদ্ধার করতে হবে, নিজ শিখরে আবারো উঠে দাঁড়াতে হবে। নিজ লক্ষ্য গড়ে তুলতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ চিন্তায় আবেগ অনুভূতির কোন স্থান নেই। সাময়িক পাগলামীকে আমাদের ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব ফেলতে দেয়া যাবে না।

বাঙালি আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যার একটি চলে গেছে স্বাধীনতা ও গৌরবের পথে, আরেকটি চলেছে আজীবন দাসত্ব ও সমূহ গ্লানির দিকে। বাঙালিদের অবশ্যই এই মূহুর্তে একটি সিদ্ধান্তে উপনীত হতে হবে। প্লাবনে ভেসে যাওয়া মানুষের জন্যে কিছু ঢেউ সৌভাগ্য নিয়ে আসে। একবার হারানো সুযোগ জীবনে আর নাও আসতে পারে।

বাংলাকে শোষণ করে যে সমস্ত ভারতীয় ও অ্যাংলো-আমেরিকান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়েছে, তার প্রতিটি পাই খরচ করা হচ্ছে পশ্চিম বাংলায়। আমাদের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান সমাজতান্ত্রিক প্রবণতা আমাদের বিদেশী শোষকদের মনে বাজেয়াপ্ত হবার ভয় তৈরি করেছে। স্বাধীন একত্রিত বাংলার সমস্যার ব্যাপারে তারা সতর্ক। বৈদেশিক মুদ্রা লাভের উদ্দেশ্যে তারা বাংলাকে বিভক্ত করতে চায়, পঙ্গু ও অক্ষম করতে চায় যাতে এর কোন অংশই ভবিষ্যতে প্রতিবাদ করার মত যথেষ্ট শক্তিশালী হয়ে উঠতে না পারে।

বাংলার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ধরণ থেকে আমি এই মতামত দিতে পারি, এসমস্ত দাঙ্গার সূত্রপাত ও বিস্তার হয়েছে ইংরেজ ও তাদের ভারতীয় দোসরদের ইচ্ছায়। সম্মানিত ও নির্ভরযোগ্য দলগুলোর সাধারণ প্রয়োজনে আগ্নেয়াস্ত্রের জন্য নিরাপদ লাইসেন্স পেতে বেগ পেতে হয়। অথচ বিপুল পরিমাণে বিপজ্জনক ব্রিটিশ ও আমেরিকান আগ্নেয়াস্ত্র ভারতে পড়ে আছে যা হিন্দু-মুসলমান গুণ্ডাদের ও বাংলা বিভাজনের সচেতন অসচেতন প্রতিনিধিদের মাঝে বিপুল পরিমাণে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রিত্বের জন্যে আপত্তিকর নেশায় আসক্ত বাংলার এক বড় মাথা একবার আমাকে এ কথাগুলো বলেছিলেন, যেহেতু তার কোন ভবিষ্যৎ নেই এবং তাঁর সমস্ত কিছুই ছিল অতীত তাই সে তার সুবিধাবাদ মনোভাবকে সঠিক মূল্যায়ন করেছিল। বাংলার জীবাশ্ম এই বিভক্তিকরণ হতে তাৎক্ষণিক লাভ অর্জন করতে পারে, কিন্তু বাংলার তারুণ্যের কি হবে যার সম্পূর্ণ লক্ষ্য ভবিষ্যতের ওপর নির্ভরশীল? তারা কি পরিস্থিতির শিকারে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকা সুযোগসন্ধানী মুষ্ঠিমেয় কিছু মানুষের জন্য তাদের ভবিষ্যৎ বিলিয়ে দিবে?

 

 

 

 

 

<01.009.026>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

 

বাংলার বিভক্তিকরণের সাথে ভারতবর্ষের বিভক্তিকরণের কোন সাদৃশ্য নেই। চিন্তার অসন্তোষজনক বিকৃতি ধারণা দেয় যে, বঙ্গভঙ্গের জন্য যেই আন্দোলন তা প্রচন্ড অবহেলার বিরুদ্ধে পাকিস্তানের জেগে উঠার প্রতি উপযুক্ত জবাব। এটা লাহোর প্রস্তাবের প্রতিরূপও বটে। ভারতীয় মুসলমানেরা শুধুমাত্র এই বিশ্বাসের ওপরই আনুগত্য রাখে, অন্য কোন ব্যাখ্যাই তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। এই প্রস্তাব কখনই কোন অখন্ড মুসলিম রাষ্ট্র অথবা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায় বানানোর জন্য অনুশীলন করেনি। প্যালেস্টাইনের মত জোর করে বিদেশী সামগ্রী দেশে আনা হয়নি, আবার অসংখ্য জনসংখ্যার স্থানান্তরকরণও হয়নি যেমনটি হয়েছিল তুর্কী ও গ্রীসের মধ্যে।

এটা বিশ্বের বুকে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত দেশগুলোর জন্য পূর্ণ সার্বভৌমত্ব দাবি করেনি, বরং ভারতের সমগ্র জাতি ও প্রদেশের জন্য পূর্ণাঙ্গ সার্বভৌমত্ব ও আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবির প্রতিই ইঙ্গিত করে। এটা বাংলা ও ভারতের অন্যান্য সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ সার্বভৌমত্ব দেয় এবং একই সাথে সকলের সুবিধার জন্য আন্তর্জাতিক-করনের সম্ভাবনা জাগিয়ে রাখতে স্বেচ্ছাসেবকের কাজ করে।

পাকিস্তান কখনই দাবি করে না যে, বাঙালি বা পাঞ্জাব মুসলমানেরাই কেবল শাসকগোষ্ঠী হবে এবং অন্যদের পরাধীন করে রাখা হবে। মুম্বাইয়ে জিন্নাহ-গান্ধী বৈঠকের ব্যর্থতার পর, কায়েদ-এ-আযম স্পষ্ট ও দ্ব্যার্থহীন চিত্তে ঘোষণা দেন যে, সার্বজনীন প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকারের মাধ্যমে সমগ্র জনগোষ্ঠীর ইচ্ছা ও সম্মতি অনুযায়ী স্বাধীন পাকিস্তান রাষ্ট্র শাসিত ও পরিচালিত হবে। আমি যোগ করতে চাই যে, যৌথ নির্বাচকমন্ডলী ব্যবস্থার মাধ্যমে এটা করা হবে, যদি সংখ্যালঘুরা নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থে পৃথক নির্বাচকমন্ডলী দাবি না করে।

অসাধারণ নেতৃত্বের অভাবে, অমার্জিত সৌভাগ্য সন্ধানীরা দেশকে ভেঙে ছারখার করে ফেলছে। বাংলার হিন্দু-মুসলমান যুবকদের অবশ্যই একত্রিত হতে হবে, বহিরাগত নিয়ন্ত্রণের লাগাম হতে দেশকে মুক্ত করতে হবে, বাংলার হারানো গৌরব পুনরুদ্ধারের জন্য বাজি ধরতে হবে এবং ভারতবর্ষের ও একই সাথে বিশ্বের বুকে ভবিষ্যৎ জাতিগুলোর কমিটিতে সম্মানজনক পদে আসীন হতে হবে। বাংলার যুবকদের তাদের অতীত ঐতিহ্য হতে চরিত্র গঠন করতে হবে এবং ভবিষ্যতের গরিমার জন্য বর্তমান সমস্যা সমাধানে অনুপ্রেরণা যোগাতে হবে।

বাংলার হিন্দু-মুসলমানেরা, তাদের নিজ সত্ত্বা বজায় রেখে, সম্মিলিত প্রচেষ্টায় নিজ ভূমির প্রাকৃতিক ও জলবায়ুগত প্রভাবের সাথে পূর্ণাঙ্গ মিলবন্ধন রেখে একটি চমৎকার সার্বজনীন সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য গড়ে তুলেছে। মানুষের বিবর্তনে পৃথিবীর যেকোন জাতির অংশীদারিত্বের সাথে ইহা নিঃসন্দেহে তুলনাযোগ্য।

বাংলা নামক স্বাধীন দেশে হিন্দু-মুসলমানদের নিজেদের জন্য একচেটিয়াভাবে সংরক্ষিত কোন অধিকার থাকবে না। তবে মুসলিমদের তাদের নিজ শরীয়ত অনুযায়ী নিজ সমাজ পরিচালনার অধিকার থাকবে, তেমনি হিন্দুদের তাদের শাস্ত্রানুযায়ী তাদের নিজ সমাজ পরিচালনার অধিকার থাকবে। এই অধিকার পাকিস্তানের প্রতি মুসলিমদের আধ্যাত্মিক চাহিদা মেটায় এবং হিন্দুদের একটি সত্যিকার বাসভূমি দেয়, যেখানে তারা তাদের আদর্শের মুক্তচর্চা ও জীবন সম্বন্ধে তাদের সূক্ষ দৃষ্টিভঙ্গির বাস্তব অনুধাবন করতে পারবে। এটা অভাবনীয় যে, স্বাধীন বাংলায় প্রশাসনিক কাজে জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক বাঙালি হিন্দুদের ন্যায্য অংশীদার অস্বীকার করা হবে এবং দেশের বস্তুগত সম্পদ ভোগে বাঁধা দেয়া হবে। বাংলার হিন্দু-মুসলমান জনগণ প্রায় সমান। কোন গোষ্ঠীই অন্যটিকে শাসন করার মত অবস্থানে নেই। যদি বাংলাকে তার সমস্ত সম্পদ তার মাটিতে জন্মানো সন্তানদের স্বতন্ত্র কাজে ব্যবহারের জন্য অনুমতি দেয়া হয়, তবে হিন্দু-মুসলমান উভয়েই সামনের শতাব্দীগুলোতে সুখ-সমৃদ্ধিতে থাকবে।

 

 

 

 

 

 

 

<001.009.027>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

কিন্তু বিভক্ত বাংলায়, পশ্চিম বাংলা বিদেশী ভারত সাম্রাজ্যবাদের দূরে নিক্ষিপ্ত প্রদেশ, এমনকি উপনিবেশ হিসেবে ব্যবহৃত হতে বাধ্য। বিভক্তিকরণ নিয়ে তাদের যতই উচ্চাকাংখা থাকুক না কেন, এটা আমার কাছে কাঁচের মত স্বচ্ছ যে, বাংলার হিন্দুদের বৈদেশিক পুঁজিবাদের দৈনিক মজুর হিসেবে দমিয়ে রাখা হবে।

বিদ্বেষপূর্ণ বর্তমান দাসত্ব ও গোলামির ভিত্তিতে ভবিষ্যতকে কল্পনা করা একটি মর্মান্তিক ভুল। বাংলায় দশ বছর ধরে একপক্ষীয় মুসলিম মন্ত্রিত্ব হতে বাংলার হিন্দুদের মাঝে সন্দেহপূর্ণ জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু এটা সম্পূর্ন সততার সাথে বলা যায় যে, বাংলা কিংবা অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ কেউই বাংলার সত্যিকার হিন্দু প্রতিনিধিদের সাথে কখনো জোট তৈরি করেনি। আইনসভায় মুসলিম লীগ পার্টি এমন একটি জোট গঠনের জন্য অবিচল প্রচেষ্টা করেছে। কিন্তু কংগ্রেস উচ্চাপদের হস্তক্ষেপে তা সফল হয়নি। সোহরাওয়ার্দী সাহেব তাঁর মন্ত্রিসভা গঠনের পূর্বে সৎ প্রচেষ্টা করেছিলেন কংগ্রেসের সহযোগিতা নিশ্চিত করার জন্য।

আমার বিক্ষিপ্তভাবে মনে পড়ে, গান্ধীজী নোয়াখালীতে যাওয়ার পূর্বে ৪০ নম্বর, থিয়েটার রোডে আমাদের সাথে আলাপচারিতার সময় বলেছিলেন, “আমি জোটের পক্ষপাতী নই। আমি একদলীয় সরকারে বিশ্বাসী। এজন্যে আমি বাংলার জোট গঠনে জোর দেই না”। আমি এখানে উল্লেখ করতে চাই যে, তখন বাংলাই ছিল একমাত্র স্থান যার মুসলিম মন্ত্রিসভা ছিল। এখানে কোন প্রকার জোট হলে সমস্ত ভারত-ই জোট সরকার গঠনের সম্মুখীন হতো। এজন্যে বাঙালি হিন্দুদের পরিত্যাগ করা হয়েছিল, যেমনটি অন্যত্র করা হয়েছে মুসলিম লীগকে।

বাংলার হিন্দু-মুসলমানদের যদি নিজেদের মত থাকতে দেয়া হতো এবং ভারতকরনের ভীতি হতে মুক্ত রাখা হতো, তবে তারা শান্তিপূর্ণ ও আনন্দের সাথে তাদের মধ্যকার ব্যাপারগুলো মিটিয়ে নিতে পারতো। দূর্ভাগ্যবশতঃ, মুসলিম সাংসদেরা মন্ত্রিসভায় সর্বদাই তাসের প্যাকেটের মত অদলবদল হচ্ছে। তারা ভাল-মন্দ নিরপেক্ষ কোন নীতি ও কর্মপন্থায় সহজে মনোযোগ দিতে পারছে না।

আমার দুর্ভাগ্য যে আমি ১৯৩৫ সালের আইনের আওতাধীন হতভাগ্য সরকারকে সমর্থনে ব্যর্থ হচ্ছি। যেহেতু যুক্তিসংগত কারনে অথবা যে কারনেই হোক হিন্দুদের মনে মুসলমানদের নিয়ে সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে, তাই এখন মুসলিমদের দায়িত্ব হোল এই সন্দেহ দূর করা এবং হিন্দুদের মানানো। এটা কেবল বক্তৃতা কিংবা সংবাদ বিবৃতি দিয়ে নয়, বরং তারা হিন্দুদের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট নয় তা কাজে দেখাতে হবে। বর্তমান অস্থির বিকৃত চিন্তা-ভাবনা ও আত্মঘাতী পদক্ষেপ সামাজিক অবয়বে ব্যাধির সৃষ্টি করছে। একটি স্বাধীন দেশের সমস্ত গুণাবলী সহ একত্রিত ও সার্বভৌম বাংলা গঠনে তীব্র দেশপ্রেমই হোল সমাধান, দেশভাগ সমাধান নয়।

সি. আর. দাশ আজ মৃত। গৌরবজ্জল ভবিষ্যৎ গঠনে তাঁর আদর্শ আমাদের অনুপ্রেরণা যোগাক। বাংলার হিন্দু-মুসলমানেরা রাজনৈতিক ক্ষমতা ও অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা ভোগে তাঁর ৫০:৫০ নীতিতে সম্মত হোক। আমি আবারও বাংলার যুবসমাজকে তাদের অতীত ঐতিহ্য ও সোনালী ভবিষ্যতের নামে একত্রিত হওয়ার জন্য আহবান জানাবো। সকল প্রতিক্রিয়াশীল চিন্তা অপসারণে এবং আসন্ন গ্লানি হতে বাংলাকে রক্ষায় তারা একটি সম্মিলিত প্রচেষ্টা নিক।

 

———————–

 

 

 

 

 

 

 

 

<001.010.028>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

শিরোনামঃ হিন্দু মহাসভা কর্তৃক স্বাধীন সার্বভৌম বাংলার বিরুদ্ধাচারণের জবাবে হসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী

সুত্রঃ লুক ইন্টু দি মিররঃ সিরাজুল হোসেন , পৃষ্ঠা – ৯৫

তারিখঃ ৮ মে, ১৯৪৭

 

[অখণ্ড স্বাধীন বাংলা আন্দোলনের পক্ষে এইচ এস সোহরাওয়ারদির অবস্থানের প্রতি হিন্দু মহাসভার বিরুদ্ধাচারোনের প্রতিবাদে প্রেস ০১১ থেকে ৮ মে, ১৯৪৭ সালে প্রকাশিত হোসেন সোহরাওয়ার্দীর লিখিত বিবৃতি।]

জনাব শ্যামা প্রসাদ মুখার্জীসহ অন্যান্য নেতারা অখন্ড সার্বভৌম বাংলা প্রতিষ্ঠার জন্য আমার আহবানের বিরুদ্ধে বিবৃতি দিয়েছেন। এসব প্রতিবাদলিপিতে মুসলিম সমাজের প্রতি গভীর সন্দেহ এবং অবিশ্বাস লক্ষ্য করা যায়, এছাড়াও এই মর্মে গভীর আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে যাতে অন্তত বাংলার একাংশে মুসলমানদের তুলনায় সংখ্যায় হিন্দুরা এত বেশি সংখ্যক থাকে যাতে তারা সংখ্যালঘু মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর প্রাধান্য বিস্তার করতে পারে।

 

গৌণ উপস্থিতি

 

এই স্বপ্ন তাদেরকে সকল যৌক্তিক চিন্তা ত্যাগ করার জন্য প্রলুব্ধ করছে, এবং মুসলিমদের সাথে সকল প্রকার আপোষ এবং সহযোগিতার ইচ্ছাকেও দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। তারা এটা অনুধাবন করতে পারছেন না যে বিভক্ত ভারতের আইনসভায় তাদের এই বাংলাকে সবার পেছনে আসন দেওয়া হবে যা একটি গৌণ উপস্থিতি ছাড়া আর কিছুই না।

 

বিশেষত, জনাব শ্যামা প্রসাদ মুখার্জী আক্রমণাত্মক উক্তি এবং অতিরঞ্জিত কূটবাক্যে প্রয়োগে নিজেকে নিম্নস্তরে নামিয়ে এনেছেন। তাঁর বাংলায় হিন্দুদের অসহায় অবস্থার এই পুনঃপুনঃ দাবী থেকে এই প্রতীয়মান হয় যে , তিনি হয়তো এই প্রসঙ্গে সমগ্র বিশ্বকে বোঝাতে চাইছেন যে বাংলার হিন্দুদের জন্য এটি দুর্ভাগ্যজনক হবে যদি বাংলা অবিভক্ত থাকে।

 

এমনকি তিনি বাংলায় হিন্দুদের অবস্থানকে তুলনা করেছেন নরকের সাথে, যদিও এটি এমনই একটি নরক যা প্রভূত সম্মানিত, সম্পদ, ক্ষমতা এবং প্রতিপত্তিশালী, এবং যেখানে বসবাস করাকেই মুসলমানরা নিজেদের লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য হিসাবে গণ্য করবে, এবং এরকম স্থানে বাস না করতে পারলেই বরং মুসলিমরা নিজেদের দুর্ভাগা মনে করবে।

কঠিন সত্যসমূহ

কটু এবং নিষ্ঠুর বাক্যবাণ প্রয়োগ করে কি লাভ ? আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালিয়ে কি প্রাপ্তি হবে ? আমার সদিচ্ছাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, আমি যা করতে ব্যর্থ হয়েছি এবং যা করেছি তা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনায় গিয়ে এবং বাংলার সকল দুর্ভাগ্যের জন্য আমাকে দায়ী করে কি হবে ? এতে বাস্তব অবস্থার কোন পরিবর্তন হবে না, বরং তা সেসব মানুষের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি করবে যাদের মুসলমানদের কটুবাক্য এবং ঘৃণা হজম করতে এবং প্রত্যেক মুসলিমকে খারাপ ভাবতে শেখানো হয়েছে।

তিনি এবং তাঁর মতো করে যারা ভাবছেন, তারা এই সত্যটুকু সম্পূর্ণভাবে এড়িয়ে যাচ্ছেন যে, ভবিষ্যত স্বাধীন বাংলা ১৯৩৫ সালের আইন অথবা অন্য বহিঃশক্তির উপর নির্ভর করবে না। কিন্তু তাকে নির্ভর করতে হবে এর জনসাধারণের আন্তরিক সহযোগিতার উপর, যেখানে এই জনগণের মধ্যে হিন্দু জনগোষ্ঠী এতটাই প্রভাবশালী যে এই প্রদেশে রাজনৈতিক মতপার্থক্য না থাকার কোন কারণ নেই। বর্তমান সরকার বা মন্ত্রনালয়ের যেসব ত্রুটি-বিচ্যুতির অভিযোগ আনা হয়েছে তার সাথে, এবং আমার নিজের পদ এবং ব্যক্তিগত অবস্থানের সাথে বাংলার মানুষ ঐক্যবদ্ধভাবে মিলেমিশে থাকলে যা অর্জন করতে পারবে তার কী সম্পর্ক আছে?

 

 

<001.010.029>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

 

সাময়িক অভিমত

 

আমি তাদেরকে কোন কিছু দেবার কেউ না, বরং বাংলার জনগণকে ঐক্যবদ্ধ থাকার মাধ্যমে নিজেদের ভাগ্য নিজেদেরই গড়তে এবং পরিবর্তন করতে হবে। বর্তমান পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে নেওয়ার জন্য এটি একটি অস্থায়ী মতামত, অনেক সীমাবদ্ধতা নিয়েই এটি স্বাধীন বাংলার ভবিষ্যৎ রূপরেখার একটি নির্দেশনা।

 

উপরন্তু , জনাব মূখার্জীর কি এটি দৃষ্টিগোচর হচ্ছে না যে বাংলা এবং ভারতের সমস্যার মধ্যে বিস্তর ফারাক আছে; কারণ, বাঙ্গালিরা এক জাতি এবং তাদের ভাষা অভিন্ন, তাদের অনেক বিষয়ে অভিন্নতা আছে এবং তারা একে অপরকে বুঝতে সক্ষম, আর তারা কাজ করে অভিন্ন স্বার্থে। তার মানে এই না যে ভারতীয় উপমহাদেশে বসবাসকারী জনগণও একই জাতির অন্তর্ভুক্ত, একই ভাষায় কথা বলে, অভিন্ন স্বার্থ এমনকি অভিন্ন ইতিহাস বহন করে। ভারতে, এবং ভারতের বেশির ভাগ প্রদেশেই হিন্দুরা উল্লেখযোগ্যভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ, যেখানে বাংলার মুসলিমরা অল্প ব্যবধানে সংখ্যাগরিষ্ঠ, এবং যুক্ত বাংলায় এই ব্যবধান আরও কমে আসবে।

 

বাংলার হিন্দুদের তাদের অবস্থান, মর্যাদা এবং সংখ্যার কারণে কোন বাড়তি প্রতিরক্ষা বা নিরাপত্তার প্রয়োজন নেই, কিন্তু ভারতের মুসলিমরা সংখ্যা এবং সম্পদের দিক থেকে নিচু অবস্থানে থাকার কারণে তাদের এ ধরনের নিরাপত্তার প্রয়োজন রয়েছে যেটা দেশভাগের মধ্যে নিশ্চিত করা হয়েছে। বাংলার হিন্দুদের নিজস্ব ভাষা,সংস্কৃতি ,শিক্ষা ব্যবস্থা এবং স্বাধীনভাবে ধর্মচর্চার সুযোগ রয়েছে । কিন্তু ভারতে মুসলমানদের ভাষা এবং সাহিত্যরূপকে বিকৃত করা হচ্ছে, সেই সাথে তাদের শিক্ষাব্যবস্থাও ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে, এবং বিভিন্ন স্থানে তাদের পরিপূর্ণ এবং স্বাধীনভাবে ধর্মচর্চার অধিকারকে আইন করে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

 

হিন্দুদের জন্য সর্বোচ্চ বরাদ্দ

 

ভারতে এবং বেশিরভাগ প্রাদেশিক প্রশাসনে মুসলমানদের জন্য আদৌ যদি কোন বরাদ্দ থাকও তবে তার পরিমাণ অতীব নগণ্য, কিন্তু বাংলায় হিন্দুদের জন্য বরাদ্দ যথেষ্ট এবং মুসলমানদের প্রায় সমপরিমাণে। কাজেই যদি ভারতের বিভাগের লক্ষ্য হয় ভারতীয় মুসলমান জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা প্রদান, তার অর্থ এই নয় যে, বাংলার হিন্দুদের সুরক্ষা করার জন্য বাংলাও ভাগ হওয়া উচিত।

 

আমার এই সুস্পষ্ট বৈষম্যের ব্যাপারে নতুন করে আর কিছু বলার প্রয়োজন নেই। জনাব মুখার্জীর মতামত অনুযায়ী দুটো বিভক্ত এলাকাই সমাধান যার একদিকে হিন্দুদের প্রাধান্য থাকবে এবং অপরদিকে মুসলমানদের প্রাধান্য থাকবে। প্রকৃত সমাধান থেকে অনেক দূরে গিয়ে এই ব্যাপক সংখ্যাগত প্রাধান্য বরং সমাজে একটি অবদমিত অবস্থা সৃষ্টি করবে যা সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর নৈতিক মনোবলের অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করবে এবং তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি এবং জীবনপ্রণালীকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।

 

আমি যে বিকল্প প্রস্তাবটি পেশ করছি, অর্থাৎ পারস্পরিক পূর্ণ সহযোগিতা যা প্রায় সমান সংখ্যার সংখ্যাগুরু এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে বিরাজ করতে বাধ্য এবং যেখানে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর সংখ্যালঘু অবস্থান তার প্রভাব দ্বারা ভারসাম্য পায়, সেই প্রস্তাবটি কি উভয় অংশের সংখ্যালঘুর মধ্যে একটি দমনমূলক পরিস্থিতি সৃষ্টির চেয়ে বহুলাংশে শ্রেয়তর নয়? আমার প্রস্তাবনায় যেকোন একটি দলের আগ্রাসন/শাসনের কথা উল্লেখ নেই। বাংলা প্রদেশকে কেন্দ্রের সাথে যুক্ত রাখার ইচ্ছা মূলত এই বিশ্বাস থেকে আসে বলে প্রতীয়মান হয় যে হিন্দু প্রধান কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত থাকলে বাংলার হিন্দুদের জীবন এবং সংস্কৃতি রক্ষা পাবে যা যুক্ত বাংলায় অস্তিত্বহীন হয়ে যাবে।

 

 

 

 

 

 

 

 

<001.010.030>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

 

নীতিগত দুর্বলতা

 

এটা কি একটা পরাজয় এবং ভয়ঙ্কর দুর্বল নীতিগত দুরবলতার পরিচয় নয় যে বাংলার হিন্দুদের তাদের নিরাপত্তার জন্য একটি দুর্বল কেন্দ্রের কাছে আবেদন জানাতে হচ্ছে?

আমি তাদের কাছে জানতে চাই, অন্য কোন খানে এমন প্রভাব -প্রতিপত্তির বিস্তার লাভ কি আদৌ সম্ভব? পৃথিবীর এত জায়গার মধ্যে এই বাংলাতেই হিন্দুদের ভয় পাবার কারণ কি কিছু আছে ? প্রভাব বিস্তারের যে আশঙ্কা তা অচিরেই দূরীভূত হবে এবং ইতোমধ্যে তা হচ্ছেও। ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠি যারা দীর্ঘকাল ভারত শাসন করেছে তারাও এটি স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে যে এই ধরনের দমনের সম্ভাবনা অনেক আগেই অকার্যকর প্রমাণিত হয়ে গেছে। এবং কোন একটি জাতি বা কোন একটি দল দৃঢ়তা এবং ইচ্ছাশক্তির প্রতিরোধের মুখে কেবল একক ইচ্ছায় ক্ষমতার দাপট জাহির করতে পারেনা। যেখানে ব্রিটিশরা ব্যর্থ হয়েছে, সেখানে ভারতে কি অন্য কারো সফল হবার কোন সম্ভাবনা আছে?

আমি আরো যোগ করতে চাই যে, বাংলার বেশ কিছু হিন্দু নেতা ভারতীয় হিন্দুদের চাপের মুখে নতি স্বীকার করছে এবং, বাংলাভাগের অর্থ যে হিন্দু ও মুসলমানদের সমান সর্বনাশ সেটা পুরোপুরিভাবে উপলব্ধি করেও তাদের ফাঁদে পা দিচ্ছে, ফলত তারা ভারতের অন্যান্য অংশের সে সমস্ত হিন্দু নেতাদের ক্রীড়নকে পরিণত হয়ে বাংলা বিভাগ মেনে নিচ্ছে যাদের বাংলার মানুষের ভবিষ্যতের প্রতি যাদের কোন নজর নেই।

তারা নিশ্চিতভাবে জানেন যে , যদি বাংলা বিভক্ত হয়ে যায় , তবে বাঙ্গলা ভারতের অন্যান্য প্রদশের জনগোষ্ঠীর শিকারে পরিণত হবে এবং সেইসাথে বাংলা তাদের স্বার্থসিদ্ধিতে ব্যবহৃত হবে ।

এসকল কিছু বলা এবং করার পরও আমার বিবৃতির শেষ অনুচ্ছেদে আমি হুমকি দিয়েছি এই মর্মে আমাকে অভিযুক্ত করা হয়েছে, অথচ যেখানে আমি কলকাতার উল্লেখ করেছিলাম কারণ আমি কেবলই বিপদগুলো চিহ্নিত করতে চেয়েছিলাম। আমি কেবল এটিই বোঝাতে চেয়েছি যে বাংলার বিভক্তির পেছনে হই হট্টগোলের মূল উদ্দেশ্য আর কিছুই নয়, শুধু কলকাতার মত একটি মূল্যবান পুরষ্কার হস্তগত করা এবং মুসলমানদের ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা।

তবে আমিও এ বিষয়েও সমানভাবে আলোকপাত করার চেষ্টা করেছি যে, এই মূল্যবান পুরস্কার এসব দম্ভোক্তির মাধ্যমে সহজে অর্জিত হবে না এবং যদি কলকাতাই বিতর্কের উৎস হয়ে যায় তাহলে আর কি বা অবশিষ্ট থাকে? বাংলার সকল অর্থনৈতিক কার্যক্রমের উৎস হিসাবে বজায় থাকতে হলে, কলকাতার শান্তি এবং নিরাপত্তা বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ন।

কোথাও আমি পড়েছি যে, যৌথ ভোটাধিকার এবং তরুণ নেতৃত্ব নিয়ে আমি প্রশ্ন তুলেছি বলে কথা উঠেছে। বাংলায় জনসাধারণকে বেঁধে ফেলার মত ক্ষমতাশালী একনায়ক হয়ে আমি দায়িত্ব নেইনি। আমি এতো টুকুই পরামর্শ দিতে পারি যে, অদূর ভবিষ্যতে বাংলার রূপরেখা নির্ধারনের জন্য হিন্দু এবং মুসলমান নেতাদের সরাসরি আলোচনায় বসতে হবে যদি তারা তাদের আশা-আকাংখাকে বাস্তবা রূপ দিতে চায়।

আমি এখনো সবাইকে আন্তরিক আহ্বান জানাই। আমি তাদেরকে অনুরোধ করছি, ক্রোধ ও দম্ভে অন্ধ না হয়ে বা নিজের বাঙ্গালী বন্ধুদের প্রতি ঘৃণায় নিমজ্জিত হয়ে বাংলাকে ধ্বংস করবেন না, বরং সাম্নের দিকে তাকান এবং বাংলাকে মুক্ত ও স্বাধীন করার স্বর্ণালী সুযোগটি গ্রহণ করুন, একে নিজের ভাগ্য এবং সম্পদের মালিক হতে দিন, একে স্বাধীন ইচ্ছায় যার সাথে খুশি ইউনিয়ন এবং চুক্তি করার মত সমর্থ হতে দিন, পৃথিবীর জাতিসমূহের মধ্যে সম্মানিত, ধনী, শক্তিশালী এবং সাধারণ মানুষের জন্য স্বর্গ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হতে দিন।

 

 

———

 

 

 

 

 

<001.011.031>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

 

শিরোনামঃ “স্বাধীন বাংলা ” অবাঙ্গালী ও ব্রিটিশ কর্তৃক বংগভংগের উদ্যোগের বিরুদ্ধে লেখা সম্পাদকীয়

সুত্রঃ সাপ্তাহিক মিল্লাত

তারিখঃ ৯ মে ১৯৪৭

সম্পাদকীয়

স্বাধীন বাংলা

 

দুইশত বৎসর পরাধীনতার পর বাঙালী জাতি আজ স্বাধীন হইতে চলিয়াছে। আর তের মাসের মধ্যেই বাংলাদেশ স্বাধীন হইবে। বহু ত্যাগ ও সাধনার পর বাঙালীর জীবনে আসিয়াছে এই পরম বাঞ্চিত শুভক্ষণ।

কিন্তু কি হতভাগ্য এই বাংলাদেশ – বহু প্রতীক্ষিত এবং দীর্ঘদিনের সাধনালব্ধ এমন একটি শুভক্ষণকে ব্যর্থ করিতে অবাঙালী কায়েমী স্বার্থবাদীদের প্ররোচনায় এই বাংলাদেশেরই একদল স্বার্থান্ধ লোক অতি জঘন্য ষড়যন্ত্রে মাতিয়াছে। বাংলাকে দ্বিখণ্ডিত করিয়া ইহার একটি খণ্ডিত অংশকে কেন্দ্রীয় গভর্ণমেন্টের তাঁবেদাররূপে বাঁধিয়া রাখিতে এই ষড়যন্ত্রকারীর দল তাহাদের সকল শক্তি ও সামর্থ্য নিয়োজিত করিয়াছে।

সমগ্র ভারতবর্ষকে পরাধীনতার শৃঙ্খলে মজবুত করিয়া বাঁধিতে বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদী কেন্দ্রীয় গভর্ণমেন্ট সৃষ্টি করিয়াছিল। আর, শুধু বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদীই বা বলি কেন? বৃটিশের এদেশে আগমনের পূর্ব ভারতবর্ষ যখনই কোন সাম্রাজ্যবাদীর শাসনাধীনে আসিয়াছে তখনই কেন্দ্রীয় গভর্ণমেন্টের লৌহ নিগড় ভারতের সকল দেশকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করিয়াছে। কিন্তু ভারতের অন্যান্য সকল দেশকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করিলেও অতীতে একাধিক সাম্রাজ্যবাদী শত চেষ্টা সত্ত্বেও বাংলাদেশের স্বাধীনতা হরণ করিতে পারে নাই। আর্য্যদের সাম্রাজ্য মিথিলা পর্যন্ত বিস্তার লাভ করিয়াছিল বটে, কিন্তু বাংলাদেশ কখনও আর্য্যদের পদানত হয় নাই। এমন কি অত বড় বড় সব নামকরা সম্রাট মহারাজা অশোক, কনিষ্ক, সমুদ্রগুপ্ত, চন্দ্রগুপ্ত, বিক্রমাদিত্য তাহারাও কেহ বাংলাদেশকে তাহাদের সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করিতে পারেন নাই। গুপ্ত আমল পর্যন্ত বাংলাদেশের স্বাধীনতার পতাকা কোন বিদেশীর স্পর্শে কলুষিত হয় নাই।

পাল বংশ ও সেনবংশের স্বাধীন রাজাদের শাসনাধীন স্বাধীন বাংলা সমগ্র ভারত হইতে বিচ্ছিন্ন থাকিয়া তাহার স্বীয় বৈশিষ্ট্যে রূপায়িত হইয়াছিল। মোহাম্মদ বখতিয়ারের বংগ বিজয়ের পূর্ব পর্যন্ত বাঙলার ইতিহাস বলিতে স্বাধীন বাঙলার ইতিহাসই বুঝায়।

তারপর বিদেশী মুসলমান বাংলাদেশ দখল করিয়া কালক্রমে ইহাকে যখন নিজের দেশ বলিয়া মানিয়া লইল তখন আবার শুরু হইল দিল্লীর কেন্দ্রীয় গভর্ণমেন্টের বন্ধন হইতে মুক্তির সংগ্রাম। দিল্লীর সুলতান কুতুবুদ্দিনের মৃত্যুর পরই গোড়েশ্বররা দিল্লীর সহিত সকল সম্পর্ক ছিন্ন করিয়া স্বাধীনভাবে বাংলাদেশ শাসন করিতে শুরু করেন। সুলতান আলতামস দিল্লীর সিংহাসনে আরোহণ করার পর ‘বিদ্রোহী’ বাংলাকে পুনরায় শৃঙ্খলিত করিলেন বটে কিন্তু গিয়াসউদ্দীন বলবনের আমলে কেন্দ্রীয় গভর্ণমেন্টের নিগড় ভাংগিয়া তুগরল খাঁ আবার বাংলার স্বাধীনতার পতাকা উড়াইয়া দিলেন। এই যে শুরু হইল দিল্লীর কেন্দ্রীয় সরকারের সহিত বাংলাদেশের সংগ্রাম, গোটা পাঠান আমল ও মোগল আমলের শেষ পর্যন্ত এই সংগ্রাম নিরবিচ্ছিন্নভাবে চলিল। ঐতিহাসিক জিয়াউদ্দীন বারানী বলিয়াছেন , “ বাঙলার অধিবাসীদের বিদ্রোহী হওয়ার একটা মজ্জাগত স্পৃহা আছে। ” কেন্দ্রীয় গভর্ণমেন্টের শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হওয়ার এই স্পৃহা বাস্তবিকই বাঙালী চরিত্রের সবচাইতে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য। বাংলার স্বাতন্ত্র্য স্বাধীনতা অব্যাহত রাখিতে বাংলাদেশ বরাবর যে লড়াই করিয়াছে সেই লড়াইয়ের ইতিহাসই বাংলার ইতিহাস। দিল্লীর সাম্রাজ্যকে বাংলাদেশ কোনদিনই বরদাস্ত করিতে পারে নাই, আর দিল্লীর

 

 

 

 

<001.011.032>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

 

সম্রাটরাও বাঙলার স্বাধীনতাকে কোনদিনই সহজ চিত্তে মানিয়া লইতে পারে নাই। তাই কেন্দ্রীয় গভর্ণমেন্ট ও বাংলার মধ্যে চিরদিন বিরামহীন ও আপোষহীন লড়াই চলিয়াছে। এই লড়াইয়ে কখনও বা পরাজিত হইয়া কেন্দ্রের রাষ্ট্রীয় বন্ধনে বাংলাদেশ বাঁধা পড়িয়াছে আর কখনও বা কেন্দ্রীয় গভর্ণমেন্টকে পরাজিত করিয়া বাঙলাদেশের স্বাধীন সত্তাকে সমগ্র দুনিয়ার সম্মুখে সে উঁচু করিয়া ধরিয়াছে। দিল্লীশ্বর বারবার পাশবিক শক্তিবলে বাংলার স্বাধীনতা হরণ করিয়াছে বটে, কিন্তু বাংলাদেশ যখনই সময় ও সুযোগ পাইয়াছে তখনই মুহূর্তমাত্র বিলম্ব না করিয়া দিল্লীর রাষ্ট্রীয় বন্ধন ছিঁড়িয়া বাঙলার আজাদীর পতাকা উড়াইয়াছে।

সমগ্র ভারত হইতে বিচ্ছিন্ন তাহার একক স্বতন্ত্র একটি সত্তা আছে এই অনুভূতি বাঙলার সহজাত অনুভূতি। এই অনুভূতির প্রেরণাতেই বাংলাদেশ দুনিয়ার ইতিহাসে এক গৌরবময় ট্র্যাডিশন সৃষ্টি করিয়াছে। ভারতে সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার লোভ তাহার মনে কখনও স্থান পায় নাই। অপরপক্ষে, লড়াইয়ে পরাজিত না করা পর্যন্ত ভারত সাম্রাজ্য পরাধীনতার শৃঙ্খলে তাহাকে কখনও বাঁধিতেও পারে নাই।

বাঙালী যে সুমহান ট্র্যাডিশনের ধারক ও বাহক সেই ট্র্যাডিশনের প্রেরণাতেই বাংলার স্বতন্ত্র স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠনের বাসনা আজ তাহার মনে জাগিয়াছে। অতীতে পরাধীন বাংলা যখনই লক্ষ্য করিয়াছে, ভারত সরকারের কেন্দ্রীয় গভর্ণমেন্ট দুর্বল হইয়া পড়িতেছে তখনই সে কেন্দ্রের তাঁবেদারী অস্বীকার করিয়া বাংলার সার্বভৌম স্বাধীনতা ঘোষণা করিয়াছে। আজ ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হইতে চলিয়াছে। তাই ভারত হইতে বৃটিশ সাম্রাজ্যের বিলুপ্তির সংগে সংগে কেন্দ্রীয় গভর্ণমেন্টের সকল বন্ধন ছিন্ন করিয়া বাংলাদেশ তাহার ট্র্যাডিশনকে সমগ্র জগতের সম্মুখে উঁচু করিয়া তুলিয়া ধরিতে উন্মুখ হইয়া উঠিয়াছে।

কিন্তু অত্যন্ত লজ্জার কথা , এক শ্রেণীর কায়েমী স্বার্থবাদী দেশদ্রোহীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হইয়া বাংলাকে দ্বিখণ্ডিত করিয়া ইহার একটি অংশকে বিদেশীর হাতে তুলিয়া দিতে গভীর ষড়যন্ত্র করিতেছে। অবাঙালীদের প্রতি বিদ্বেষের কথা বাড়ীর পাশে বিহার ও আসামে কংগ্রেস ও ভারতীয় আমলে প্রবাসী বাঙালীর উপর অত্যাচার ও অবিচারের কথা , অবাঙালী কর্তৃক নিষ্ঠুরভাবে বাংলার ধন-দৌলত শোষণের কথা, নিখিল ভারতীয় কংগ্রেস রাজনীতিতে উপেক্ষিত ও অবহেলিত বাঙালী হিন্দু নেতাদের অপমানের কথা – সব কথাই ষড়যন্ত্রকারীদের জানা আছে; তবু তাহারা বিদেশী ধনিক – বণিকদের প্রেরণায় বাংলাদেশের একটি অংশকে বিদেশীর উপনিবেশে রূপান্তরিত করিত উন্মত্ত হইয়া উঠিয়াছে।

বাঙালী হইয়াও যাহারা বাংলা দ্বিখণ্ডিত করার পক্ষে ও বাংলার স্বাধীনতার বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলিয়াছে তাহাদিগকে একটি প্রশ্ন করিতে চাই। বাঙালীর রক্ত শোষণ করিয়া যাহারা বিত্ত সঞ্চয় করিয়াছে তাহারা আজ অকস্মাৎ এমন পরোপকারী হইয়া উঠিল কেন ? বংগভংগ আন্দোলনকে সাফল্যমণ্ডিত করিতে তাহারা দুই হাতে পানির মত অর্থ ব্যয় করিতেছে কেন? এই কেন’র কি কোন জওয়াব নাই? জওয়াব আছে। আর সেই জওয়াবের ভিতরেই বংগভং আন্দোলনের সকল গূঢ় রহস্য নিহিত।

ভারতের অন্যান্য প্রদেশের প্রবাসী বাঙালীদের উপর যে নির্যাতন চলিতেছে সেই নির্যাতনের বিরুদ্ধে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত প্রবাসী বংগীয় সাহিত্য সম্মেলনে যে সব তীব্র মন্তব্য ও প্রস্তাবাদি পাশ করা হইয়াছে তাহা সবারই জানা আছে। কিন্তু সবকিছু জানিয়া-শুনিয়াও বাংলার ট্র্যাডিশনকে পদদলিত করিয়া অখণ্ড ভারতের তাঁবেদাররূপে বাংলার একটি অংশকে বাঁধিয়া রাখার জন্য গুটিকয়েক কায়েমী স্বার্থবাদী বাঙালী আজ ক্ষেপিয়া উঠিয়াছে। ইহাদের এই ক্ষেপামীর ফলে বাঙালীর জীবনে যে কি ভয়াবহ পরিমাণ অভিশাপ দেখা দিতে পারে, সে সম্পর্কে আমরা বারান্তরে আলোচনা করিব।

 

———-

 

 

 

 

<001.012.033>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

 

শিরোনামঃ স্বাধীন সার্বভৌম বাংলার প্রস্তাবিত কাঠামো

সুত্রঃ ইন রেট্রস্পেকশনঃ আবুল হাশিম। পৃষ্ঠা – ১৫৮

তারিখঃ ২৩শে মে, ১৯৪৭
নীচে শরৎ চন্দ্র বোস এবং আমার সাক্ষরকৃ্ত সম্ভাব্য চুক্তির খসড়া বিধৃত হলো-

১। বাংলা একটি স্বাধীন রাস্ট্র হবে। স্বাধীন বাংলা রাস্ট্র ভারতের অন্যান্য অংশের সাথে সম্পর্ক কেমন হবে তা নিজে সিদ্ধান্ত নেবে।

২। স্বাধীন বাংলার সংবিধানে যৌথ নির্বাচকমণ্ডলী ও প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটাধিকারের ভিত্তিতে এবং হিন্দু, মুসলিম জনসংখ্যার অনুপাতে আইনসভার আসন সংরক্ষণ সাপেক্ষে আইসভা নির্বাচনের সু্যোগ থাকবে। হিন্দু এবং নিম্নবর্ণের হিন্দুদের মধ্যে আসন সংখ্যার ভাগ হবে তাদের নিজ নিজ গোত্রের জনসংখ্যার অনুপাতের ভিত্তিতে অথবা দুই পক্ষের সম্মতিক্রমে অন্য কোন পদ্ধতিও অবলম্বন করা যেতে পারে। নির্বাচকমন্ডলী হবে একাধিক এবং ভোট হবে সুষম ভাবে বন্টিত। যে প্রার্থী নির্বাচনে তার নিজের জনগোষ্ঠীর সংখ্যা গরিষ্ঠ ভোট পাবে এবং অন্যান্য জনগোষ্ঠী শতকরা ২৫ ভাগ ভোট পাবে, তিনিই নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে ঘোষিত হবেন। যদি কোন প্রার্থীই এই দুই শর্ত পুরণ করতে না পারেন সেক্ষেত্রে যে প্রার্থী তার জনগোষ্ঠীর সর্বাধিক ভোট পাবে সেই নির্বাচিত হিসেবে বিবেচিত হবেন।

৩। মহামান্য সরকার এতদ্বারা ঘোষনা করছে যে, স্বাধীন বাংলা রাজ্যের প্রস্তাবিত পরিকল্পনা অনুমোদিত হলো এবং বাংলা বিভাজিত হবে না, বর্তমান বাংলার মন্ত্রীসভা বিলুপ্ত ঘোষিত হলো এবং সমান সংখ্যকমুসলমান ও হিন্দু সদস্যদের সমন্বয়ে (নিম্ন বর্ণের হিন্দু সম্প্রদায় সহ) একটি নতুন অন্তর্বর্তী মন্ত্রণালয় গঠিত হবে তবে প্রধানমন্ত্রীর পদ এর মধ্যে বিবেচিত হবে না। নব গঠিত মন্ত্রণালয়ের প্রধানমন্ত্রী হবেন একজন মুসলিম ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিন্দু।

৪।নতুন সংবিধানের অধিনে পূর্ণাঙ্গ আইনসভা এবং মন্ত্রণালয়ের চুড়ান্ত বাস্তবায়ন পর্যন্ত দেশের সেনাবাহিনী এবং পুলিশ সহ অন্যান্য পরিষেবায় হিন্দু (নিম্ন বর্ণের হিন্দু সহ) এবং মুসলমানদের সমান ভাগ থাকবে। সকল পরিষেবায় লোক নিয়োগ করবে বাংগালীরা।

৫। আইনসভার মুসলিম এবং অমুসলিম সদস্যদের দ্বারা নির্বাচিত ৩০ সদস্যের একটি গণপরিষদ গঠিত হবে যাতে মুসলিম থাকবেন ১৬ জন, হিন্দু ১৪ জন এবং এতে কোন ইউরোপীয় থাকবেন না।

আই, উডবার্ন পার্ক                                                                   (স্বাক্ষরিত)

কলকাতা                                                                                        শরৎ চন্দ্র বোস

২০শে মে,১৯৪৭                                                                                  আবুল হাশিম

 

 

———-

 

 

 

 

 

<001.013.034>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

 

শিরোনামঃ মিঃ গান্ধী কর্তৃক শরৎ বোসকে লিখিত চিঠিতে প্রকাশিত স্বাধীন সার্বভৌম বাংলার প্রতি কংগ্রেস নেতৃত্বের মনোভাব

সুত্রঃ ইন রেট্রসপেকশনঃ আবুল হাশিম পৃষ্ঠা-১৫৮

তারিখঃ ৮ই জুন,১৯৪৭
মিঃ গান্ধী মিঃ শরৎ চন্দ্র বোসকে লেখেন ৮ই জুন, ১৯৪৭:

প্রিয় শরৎ,

আমি আপনার খসড়া পেয়েছি। আমি পরিকল্পনার ব্যপারে পণ্ডিত নেহরু এবং সরদারের সাথে আলোচনা করেছি। তার দুজনেই এই দলিলের বিরুদ্ধে এবং তাদের অভিমত- এটা তফসিলি নেতা এবং হিন্দুদের বিভক্ত করার একটা চাল। তাদের সাথে এটা শুধু সন্দেহ আরোপই নয়, প্রায় দোষী সাব্যস্তকরন, এবং মনে হয় অর্থ দৌলত তফসিলি ভোট সংরক্ষনের জন্য ব্যয় করা হচ্ছে। যদি তাই ই হয় তাহলে আপনার সংগ্রাম আপাতত বন্ধ করা উচিত। দুর্নীতির মধ্য দিয়ে যে একতা অর্জিত হয় তা, একটি অকপট বিভাজনের চেয়েও খারাপ হবে, যা হিন্দুদের ভগ্নহৃদয় ও দুর্ভাগ্যজনক অভিজ্ঞতা প্রতিষ্ঠার স্বীকৃতি দেবে। আমি আরো দেখতে পাচ্ছি ভারতের দুই অংশে ক্ষমতা বদলের কোন আশা নেই। তবে যে চুক্তিই হোক, তা কংগ্রেস ও লীগের পূর্ববর্তী চুক্তি অনুযায়ীই হবে। যা যতদূর মনে হয় আপনি অর্জন করতে পারবেন না। তথাপি আপনার বিশ্বাস নাড়ানো আমার উচিত না, যতক্ষণ না পর্যন্ত উল্লিখিত চাল ও দুর্নীতি চর্চা দূর না হয়। যদি আপনি পুরোপুরি নিশ্চিত থাকেন যে, সন্দেহের কোন কারন নেই এবং কেন্দ্র সমর্থিত মুসলিম লীগের লিখিত না পাওয়া পর্যন্ত বাংলার একতার স্বার্থে আপনার সংগ্রাম ছেড়ে দেয়া উচিত এবং বাংলার বিভক্তিকরনে তৈরি হওয়া পরিবেশে ক্ষান্তি দেয়া উচিত।

 

ভালবাসার সহিত
বাপু

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<001.014.035>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেন্ডেন্স এ্যাক্ট

‘ দি ইভালুয়েশ অফ ইন্ডিয়া এ্যাক্ট ’

পাকিস্থানঃ সি এইচ ফিলিপ্স, পৃষ্ঠা ৪০৭

১৮ই জুলাই, ১৯৪৭

ভারতীয় স্বাধীনতা অধিনিয়ম ১৯৪৭
১৮ মে, ১৯৪৭

যা নিম্নরূপে প্রণীত হবেঃ

I )        ১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসের ১৫ তম দিনে ভারতে দুটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবে যা যথাক্রমে ভারত ও পাকিস্তান নামে পরিচিত হবে।

উল্লেখিত স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রদ্বয় কে এরপর থেকে এই অধিনিয়মে “ নতুন রাষ্ট্রদ্বয় ” এবং উল্লেখিত আগস্টের ১৫ তম দিন কে “ নির্ধারিত দিন ” হিসেবে আখ্যায়িত করা হবে।

II )        এই বিধানের উপধারা ৩ এবং ৪ এর বিধান মোতাবেক মহামান্য ভারত সার্বভৌমত্বের ভূখণ্ডের মধ্যে থাকবে, এই বিধানের উপধারা ২ এর অধীনে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত ভূখণ্ড ব্যাতীত সেইসব ভূখণ্ড যা নির্ধারিত দিনের অবব্যাহিত পূর্বে ব্রিটিশ ভারতের অন্তর্ভুক্ত ছিল।

এই বিধানের উপধারা ৩ এবং ৪ এর বিধান সাপেক্ষে পাকিস্তানের ভূখন্ড হবেঃ

ক। সেইসব অঞ্চল যা নির্ধারিত দিনে নিম্নলিখিত ধারাদ্বয়ের অধীনে গঠিত পূর্ব বাংলা এবং পশ্চিম পাঞ্জাব প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত ছিল;

খ। সেইসব অঞ্চল যা এই অধিবিধান গৃহীত হবার দিনে সিন্দ এবং ব্রিটিশ বালুচস্থানের মুখ্য মহাধ্যক্ষের প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত ছিল; এবং

গ। এই অধিবিধান গৃহীত হবার আগে অথবা পরে তবে নির্ধারিত দিনের পূর্বে, যদি রাজ্যপাল তার অধীনে উত্তরপশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে সংগঠিত সাম্প্রতিক বৈধ গণভোটে অংশগ্রহণকারী সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতের ভিত্তিতে, এই অধিবিধান গৃহীত হবার দিনে, ঐ প্রদেশের প্রতিনিধিদের পাকিস্তানের গণপরিষদে অংশগ্রহনের পক্ষে রায় দেন, তবে এই আইন গৃহীত হবার দিনে, উত্তরপশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত অঞ্চলসমূহ ঐ প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত হবে।

এই ধারার কোন বিধানই কোনসময়েই কোন অঞ্চলকে নতুন রাষ্ট্রসমূহের অন্তর্ভুক্ত বা বহির্ভূত করা থেকে বিরত করবে না তবে যাইহোকঃ

ক। কোন অঞ্চল যা এই ধারার যথাযথ উপধারা ১ বা ২ এর অধীনে গঠিত ভূখণ্ডের অন্তর্ভুক্ত নয় তা কোন রাষ্ট্রের সম্মতি ছাড়া ঐ রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত হবে না; এবং

খ। কোন অঞ্চল যা এই ধারার যথাযথ উপধারা ১ বা ২ এর অধীনে গঠিত ভূখণ্ডের অন্তর্ভুক্ত বা নির্ধারিত দিনের পরে কোন একটি রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে তা ঐ রাষ্ট্রের সম্মতি ব্যাতীত ঐ রাষ্ট্রের বহির্ভূত হবে না।

 

110 & 11 Geo. VI, ch. 30

 

 

<001.014.036>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

 

এই ধারার উপধারা ৩ এর বদান্যতার হানী না করলে এই ধারার কোন বিধান ই ভারতীয় রাষ্ট্রসমূহকে নতুন রাষ্ট্রদ্বয়ের কোনটির মধ্যে প্রবেশে বাঁধাদান করে বলে নির্ণীত হবে না।

III.        নির্ধারিত দিন থেকেঃ

ক। ভারত শাসন আইন, ১৯৩৫ এর অধীনে গঠিত বাংলা প্রদেশ বিলুপ্ত হবে; এবং

খ। এর পরিবর্তে নতুন দুটি প্রদেশ গঠিত হবে যা যথাক্রমে পূর্ব বাংলা এবং পশ্চিম বাংলা নামে পরিচিত হবে।

এই অধিবিধান গৃহীত হবার আগে অথবা পরে, তবে নির্ধারিত দিনের পূর্বে, যদি রাজ্যপাল তার অধীনে সিলেট জেলায় সংগঠিত সাম্প্রতিক বৈধ গণভোটে অংশগ্রহণকারী সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতের ভিত্তিতে, এই অধিবিধান গৃহীত হবার দিনে, নতুন পূর্ব বাংলা প্রদেশ গঠনে সিলেট জেলার অন্তর্ভুক্তির পক্ষে রায় দেন, তবে সেইদিন থেকে এই ধারার উপধারা ৩ এর বিধি মোতাবেক আসাম প্রদেশের একটি অংশ, এই আইন গৃহীত হবার দিন থেকে, নতুন পূর্ব বাংলা প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত হবে।

পূর্ব উল্লেখিত নতুন প্রদেশসমূহের সীমানা এবং এই ধারার উপধারা ২ এ উল্লেখিত ঘটনা সংঘটনের পরিপ্রেক্ষিতে আসাম প্রদেশের সীমানা, নির্ধারিত দিনের আগে অথবা পরে, রাজ্যপালের নিযুক্ত সীমানা নির্ধারক দলের রায় অনুসারে নির্ধারিত হবে কিন্তু সীমানা নির্ধারণ না হওয়া পর্যন্তঃ

ক। এই ধারার উপধারা ২ এ উল্লেখিত ঘটনা সংঘটনের পরিপ্রেক্ষিত সহকারে, এই অধিবিধানের তফসিল ১ এ নির্দেশিত বাংলা জেলা এবং সিলেটের আসাম জেলা এমন ভূখণ্ড হিসেবে গণ্য হবে যা পূর্ব বাংলা প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত হবে বলে বিবেচিত হবে।

খ। এই অধিবিধান গৃহীত হবার দিনে বাংলা প্রদেশের অবশিষ্ট ভূখণ্ড নব্যগঠিতব্য পশ্চিম বাংলা প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য হবে; এবং

গ। এই ধারার উপধারা ২ এ উল্লেখিত ঘটনা সংঘটিত হলে আসাম প্রদেশ থেকে সিলেট জেলা বাদ পরবে।

এই ধারায় সীমানা নির্ধারক দলের “রায়” অভিব্যাক্তির অর্থ হল সীমানা নির্ধারক দলের নিরূপণ শেষে রাজ্যপালের কাছে সেই দলের সভাপতি কর্তৃক প্রদত্ত চূড়ান্ত প্রতিবেদনে উল্লেখিত তার সিদ্ধান্ত।

  1. নির্ধারিত দিন থেকে-

ক। ভারত শাসন আইন, ১৯৩৫ এর অধীনে গঠিত পাঞ্জাব প্রদেশ বিলুপ্ত হবে; এবং

খ। দুটি নতুন প্রদেশ গঠিত হবে যারা পরিচিত হবে পশ্চিম পাঞ্জাব এবং পূর্ব পাঞ্জাব হিসেবে।

উল্লেখিত নতুন প্রদেশসমূহের সীমানা নির্ধারিত দিনের আগে অথবা পরে রাজ্যপালের নিযুক্ত সীমানা নির্ধারক দলের রায় অনুসারে নির্ধারিত হবে কিন্তু সীমানা নির্ধারণ না হওয়া পর্যন্তঃ

 

 

 

 

 

<001.014.037>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

 

ক। এই অধিবিধানের তফসিল ২ এ নির্দেশিত জেলাসমূহ নব্যগঠিতব্য পশ্চিম পাঞ্জাব প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত হবে বলে বিবেচিত হবে; এবং

খ। এই অধিবিধান গৃহীত হবার দিনে পাঞ্জাব প্রদেশের অবশিষ্ট ভূখণ্ড নব্যগঠিতব্য পূর্ব পাঞ্জাব প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য হবে; এবং

এই ধারায় সীমানা নির্ধারক দলের “রায়” অভিব্যাক্তির অর্থ হল সীমানা নির্ধারক দলের নিরূপণ শেষে রাজ্যপালের কাছে সেই দলের সভাপতি কর্তৃক প্রদত্ত চূড়ান্ত প্রতিবেদনে উল্লেখিত তার সিদ্ধান্ত।

প্রতিটি নতুন সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্য একজন করে রাষ্ট্রপাল থাকবেন যিনি রাজা কর্তৃক নিযুক্ত হবেন এবং শাসক হিসেবে তার রাজার প্রতিনিধিত্ব করবেনঃ

এই শর্তে যে, যদি না এবং যতক্ষণ পর্যন্ত না যেকোন একটি নতুন রাষ্ট্র কর্তৃক আইনসভার মাধ্যমে উক্ত দেশের জন্য সংবিধান প্রণীত হয় ততক্ষন পর্যন্ত একই ব্যক্তি উভয় নতুন রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপাল হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন।

  1. নতুন রাষ্ট্রদ্বয়ের গণপরিষদের কাছে নিজ রাষ্ট্রের এবং অতিরাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডের জন্য আইন প্রণয়নের পূর্ণ ক্ষমতা থাকবে।

নতুন রাষ্ট্রদ্বয়ের আইনসভা কর্তৃক প্রণীত কোন আইন বা আইনের কোন বিধান এই মর্মে অকার্যকর হবে না যে, তা ইংল্যান্ডের আইন বা আইনের কোন বিধানের অথবা যুক্তরাজ্যের সংসদের কোন বিদ্যমান/প্রচলিত বা ভবিষ্যত কোন অধিনিয়ম বা এর অধীনে গৃহীত কোন আদেশ বা বিধি বা প্রবিধান এর পরিপন্থী, এবং নতুন রাষ্ট্রদ্বয়ের আইনসভার ক্ষমতার মধ্যে এজাতীয় যেকোন অধিনিয়ম, আদেশ, বিধি অথবা প্রবিধান কে নতুন রাষ্ট্রের আইনের অংশ হিসেবে বিলোপ অথবা সংশোধনের ক্ষমতা অন্তর্ভুক্ত থকবে।

নতুন রাষ্ট্রদ্বয়ের প্রত্যেকের রাষ্ট্রপালের কাছে তাদের রাজার নামে রাষ্ট্রের আইনসভার যেকোন আইনের প্রতি সম্মতি দেয়ার পূর্ণ ক্ষমতা থাকবে এবং এতদ্বারা যেকোন অধিনিয়ম রাজার পক্ষে নামঞ্জুর করা যাবে অথবা রাজার সন্তুষ্টি অনুযায়ী যে কোন আইন সংরক্ষণ করা যাবে অথবা রাজার সন্তুষ্টি অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত যে কোন রাষ্ট্রের আইনসভায় সেই আইনের প্রয়োগ স্থগিত রাখা যাবে।

নির্ধারিত দিনের পরে যুক্তরাজ্যের সংসদে গৃহীত কোন অধিনিয়ম কোন নতুন রাষ্ট্রের আইনসভা আইনের অংশ হিসেবে কার্যকর হবে না বা কার্যকর হয়েছে বলে গণ্য হবে না।

নির্ধারিত দিনের পরে পরিষদে গঠিত কোন আদেশ, নির্ধারিত দিনের আগে যুক্তরাজ্যের কোন মন্ত্রী অথবা অন্য কোন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক গৃহীত কোন অধিনিয়ম এবং এর অধীনে গৃহীত কোন আদেশ অথবা নির্ধারিত দিনের পরে এর অধীনে গৃহীত কোন আদেশ, বিধি বা অন্যধরনের কোন দলিল, নির্ধারিত দিনে বা এর পরে কোন নবগঠিত রাষ্ট্রের আইনসভা আইনের অংশ হিসেবে বর্ধিত হবে না বা বর্ধিত হয়েছে বলে গণ্য হবে না।

……………….                                            ……………..                                        ………………

 

 

 

 

 

 

<001.014.038>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

 

VIII.      প্রতিটি নতুন রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের আইনসভা ঐ রাষ্ট্রের প্রথম গণপরিষদে রাষ্ট্রের সংবিধান প্রণয়নের জন্য বিধান প্রণয়নের ক্ষমতা পাবে এবং রাষ্ট্রের আইনসভার প্রতি এই অধিনিয়মে নির্দেশিত উদ্ধৃতিসমূহের যথাযথভাবে উল্লেখ করা হবে।

এই ধারার উপধারা ১ এর অধীনে, রাষ্ট্রের গণপরিষদ কর্তৃক গঠিত কোন আইন বা আইন অনুসারে স্পষ্টভাবে অন্যকোন বিধান দেয়া না হলে, প্রতিটি নতুন রাষ্ট্র এবং এর সকল প্রদেশ ও অন্যন্য অঞ্চল সমূহ ভারত শাসন আইন, ১৯৩৫ এর যতটা সম্ভব অনুরূপ ভাবে শাসিত হবে, এবং সেই আইনের বিধান সমূহ এবং পরিষদের আদেশ, বিধি, এবং অন্যান্য দলিল, এই ধারার কোন স্পষ্ট বিধি মোতাবেক রাজ্যপালের আদেশে সুনির্দিষ্ট বিলোপন, সংযোজন, অভিযোজন এবং পরিবর্ধন যতখানি পর্যন্ত প্রযোজ্য হয় ততখানি সহকারে প্রযুক্ত হবে।

……………………                   …………………….                 ……………………….

  1. রাষ্ট্রপাল কর্তৃক, এই ধারার পূর্ববর্ণিত বিধানসমূহের অধীনে গঠিতব্য আদেশসমূহ দ্বারা, মহামান্য ভারতরাজের সশস্ত্রবাহিনীকে নতুন রাষ্ট্রদ্বয়ের মধ্যে বণ্টন এবং বণ্টিত হবার পরে সেসব বাহিনীর সুশাসন এবং পদাধিকারের ক্রম নির্ধারণের বিধান তৈরি হবে।

নির্ধারিত দিন থেকে মহামান্য ভারতরাজের ভারতীয় বাহিনীর কোন সদস্য ভিন্ন মহামান্য ভারতরাজের অন্য কোন বাহিনীর যেকোন সদস্য যখন ভারতীয় যেকোন বাহিনীর সাথে সংযুক্ত বা সেবাদানের জন্য নিযুক্ত হবেন তখনঃ

ক। তিনি আলোচ্য রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রসমূহের আইনসভা কর্তৃক প্রণীত কোন আইন অথবা এই ধারার পূর্ববর্তী কোন বিধানের অধীনে রাজ্যপাল কর্তৃক প্রদত্ত কোন আদেশের বিপরীতে আলোচ্য ভারতীয় বাহিনীতে তার পদমর্যাদা এবং কার্যকলাপ অনুযায়ী যথাযথ পদাধিকার এবং শাস্তি প্রদানের ক্ষমতার অধিকারী হবেন; কিন্তু

এই অধিনিয়ম গৃহীত হবার দিন বলবত যেকোন আইনের কোন বিধানই তাকে কোনভাবেই আলোচ্য ভারতীয় বাহিনীর কোন আইনের আওতাধীন করবে না।

XVIII. এই অধিবিধানে অন্যকোথাও স্পস্টভাবে উল্লেখিত না হলে, ব্রিটিশ ভারত ও ত্বদীয় বিভিন্ন অংশের আইন যা নির্ধারিত দিনের অবব্যহিত পূর্বে কার্যকর ছিল তা যথারীতি প্রযোজ্য হবে হবে এবং প্রয়োজনীয় অভিযোজন সাপেক্ষে প্রতিটি নতুন রাষ্ট্রে এবং ত্বদীয় বিভিন্ন অংশের আইন হিসেবে বলবত থাকবে যতদিন পর্যন্ত নতুন রাষ্ট্রের আইনসভা অথবা যথাযথ ক্ষমতা সম্পন্ন অন্য কোন কর্তৃপক্ষ নতুন আইন প্রণয়ন না করে।

…………                                                ……………                                             ……………

  1. এই অধিবিধান কে ভারতীয় স্বাধীনতা অধিবিধান-১৯৪৭ হিসেবে উদ্ধৃত হতে পারে।

 

 

 

 

 

 

 

 

<001.014.039>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

 

তফসিল সমূহ

প্রথম তফসিল

নতুন পূর্ব বাংলা প্রদেশে বিধিবদ্ধ ভাবে সংযুক্ত বাংলার জেলাসমূহ

চট্টগ্রাম বিভাগে চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, এবং ত্রিপুরা জেলাসমূহ।

ঢাকা বিভাগে বাকেরগঞ্জ, ঢাকা, ফরিদপুর এবং ময়মনসিংহ জেলাসমূহ।

প্রেসিডেন্সী বিভাগে যশোর, মুর্শিদাবাদ এবং নদীয়া জেলাসমূহ।

রাজশাহী বিভাগে বগুড়া, দিনাজপুর, মালদা, পাবনা, রাজশাহী এবং রংপুর জেলাসমূহ।

দ্বিতীয় তফসিল

নতুন পশ্চিম পাঞ্জাব প্রদেশে বিধিবদ্ধ ভাবে সংযুক্ত জেলাসমূহ

লাহোর বিভাগে গুজরানওয়ালা, গুরুদাসপুর, লাহোর, শেখুপারা এবং শিয়ালকোট জেলাসমূহ।

রাওয়ালপিন্ডি বিভাগে আচক, গুজরাট, ঝিলাম, মিয়ানওয়ালি, রাওয়ালপিন্ডি ও শাহপুর জেলাসমূহ।

মুলতান বিভাগে দেরা গাজি খান, ঝাং, ল্যালপুর, মন্টোগোমারি, মুলতান ও মুজাফ্ফারগর জেলাসমূহ।

 

————-

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<001.015.040>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

 

শিরোনামঃ মূল রাষ্ট্রীয় নীতিমালা ব্যাখ্যা করে মোঃ আলী জিন্নাহ’র গণপরিষদে প্রথম বক্তৃতা

সুত্রঃ কায়েদে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহঃ স্পিচেজ এজ গভর্নর জেনারেল অব পাকিস্তান, ১৯৪৭-৪৮ পৃষ্ঠা-৬

তারিখঃ ১১ই আগস্ট, ১৯৪৭

 

১৯৪৭

প্রথম রাষ্ট্রপতি হিসেবে ১১ ই আগস্ট ১৯৪৭ এ পাকিস্তানের গণপরিষদে কায়েদআজম এর উদ্বোধনী ভাষণঃ

 

মিঃ প্রেসিডেন্ট, সুধীবৃন্দ,

আমি বিনীতভাবে পরম আন্তরিকতার সাথে ধন্যবাদ জানাচ্ছি, আপনাদের প্রথম রাষ্ট্রপতি হিসেবে আমাকে নির্বাচিত করে যে সম্মানে আমাকে ভূষিত করা হয়েছে, সে সম্মান এই সার্বভৌম পরিষদের সবচেয়ে বড় সম্মান। আমি সেইসব নেতাদেরও ধন্যবাদ জানাই যারা আমার সেবার কদর করেছেন এবং ব্যাক্তিগত মতামত জানিয়েছেন। আমি আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করি যে, আপনাদের সমর্থন ও সহযোগিতায় এই গণপরষদকে আমরা বিশ্বে দৃষ্টান্তরূপে উপস্থাপন করতে পারবো। এই গণপরিষদ দুইটি প্রধান কাজ করবে। প্রথম কষ্টদায়ক ও দয়িত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে আমাদের ভবিষ্যত সংবিধান প্রণয়নএবং দ্বিতীয় পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় আইনসভা হিসেবে সম্পূর্ণরূপে সার্বভৌম অঙ্গ হিসেবে কাজ করা। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় আইনসভার জন্য প্রাথমিক সংবিধান প্রণয়নে আমাদের সর্বাত্মক চেষ্টা করতে হবে। আপনারা জানেন যে শুধু আমরাই না, আমি মনে করি, এই উপমহাদেশে দুইটি স্বাধীন সার্বভৌম রাজত্ব সৃষ্টি ও প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা যে অভূতপূর্ব বিপ্লব এনেছে তাতে পুরো বিশ্বই আশ্চর্যান্বিত হচ্ছে। এটি এমন যে, বিশ্বের ইতিহাসে এমন কোন নজির নেই। এই মহৎ উপমহাদেশ তার সকল প্রকার অধিবাসীদের নিয়ে এক বিরাট, অজ্ঞাত, অনুপম পরিকল্পনার মধ্যে চলে এসেছে । আর এই সম্বন্ধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল যে আমরা এটি শান্তিপূর্নভাবে এবং সর্বাধিক সম্ভাব্য উপায়ের বিবির্তনের দ্বারা অর্জন করেছি।

 

এই পরিষদে প্রথম কার্যক্রম নিয়ে এই মূহুর্তে আমি কোন সুবিবেচিত ঘোষনা করতে পারবো না, তাও আমি কিছু বলবো যেহেতু আমার সাথে এগুলো সম্পর্কিত। প্রথম এবং সর্বাগ্রে যে জিনিষের উপর আমি গুরুত্ব আরোপ করবো, সেটি হলো আপনারা এখন যে একটি সার্বভৌম সংস্থা এবং সকল ক্ষমতার অধিকারী সেটি মনে রাখা। সুতরাং, আপনারা কিভাবে সিদ্বান্ত নিবেন তা নিয়ে আপনাদের উপর গুরু দায়িত্ব এসে পড়ে। আমার প্রথম পর্যবেক্ষনঃ আপনারা আমার সাথে একমত হবেন যে , সরকারের সর্বপ্রথম কাজই হচ্ছে আইনের প্রতিষ্ঠা যাতে করে নাগরিকদের জান-মাল ও ধর্মীয় বিশ্বাস রাষ্ট্র দ্বারা সংরক্ষিত থাকবে।

দ্বিতীয়ত, সবচেয়ে বড় অভিশাপ যা ভারত ভোগ করছে তা হল ঘুষ ও দুর্নীতি, যদিও আমি বলছিনা যে অন্য দেশগুলো এর থেকে মুক্ত, কিন্তু আমাদের অবস্থা খুবই সঙ্গিন। এটি আসলেই বিষের মত। আমাদের শক্ত হাতে এগুলোর দমন করতে হবে এবং আমি আশা করছি যে এরকমটি করতে এই গণপরিষদের জন্য আপনারা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।

 

কালোবাজারি হলো আরেকটি শাপ। আমি জানি কালোবাজারিরা প্রতিনিয়তই ধরা পরছে ও শাস্তি পাচ্ছে। বিচার করে কারাদন্দ হচ্ছে অথবা অনেক সময় শুধু মাত্র জরিমানা হচ্ছে। আমাদের এই বৈরীতাকে সামলাতে হবে যেটি আমাদের এই পীড়িত অবস্থায় যখন প্রতিনিয়ত অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থানের মত মৌলিক চাহিদাগুলোর ঘাটতিতে ভুগছি, আমাদের সমাজের বিরুদ্ধে প্রকান্ড অপরাধস্বরূপ। একজন নাগরিক যে চোরাকারবারি করেন, তিনি যেই অপরাধ করেছেন তা জঘন্যতম অপরাধের চেয়েও নিকৃষ্টতম। যারা কালোবাজারির সাথে জড়িত তারা বেশিরভাগই পরিচিত, বুদ্ধিমান ও সাধারণভাবে দায়িত্ববান হিসেবে পরিচিত, তারা যখন এই অপরাধে জড়িয়ে পড়ে, আমি মনে করি তাদের অবশ্যই কঠোরভাবে শাস্তি দেওয়া দরকার। কারণ তারা নিত্যপণ্য ও খাদ্য সামগ্রীর নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনার পুরো সিস্টেমেরই পতন সাধন করেন এবং অনাহার, চাহিদা এমনকি মৃত্যুরও কারন হয়ে দাঁড়ায়।

 

 

 

 

 

<001.015.041>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

 

 

আরেকটি বিষয়ঃ এটি আমাদের উত্তরাধিকার সূত্রেই পাওয়া। আরো অনেক কিছুর সাথে, ভালো কি মন্দের সাথে, স্বজনপ্রীতি ও দালালির মতো অশুভ জিনিষগুলো আমাদের মধ্যে চলে এসেছে। এই অশুভ শক্তির সাথে নিরলসভাবে লড়াই করতে হবে । আমি বলে দিচ্ছি, আমি কোন দালালি, স্বজনপ্রীতি কিংবা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কোন প্রভাবই বরদাস্ত করবো না। কোথাও যদি দেখি প্রথায় পরিণত হচ্ছে বা এই রেওয়াজ চালু হচ্ছে, কম কি বেশি, আমি কখনোই সমর্থন করবোনা।

 

আমি জানি অনেকেই আছে যারা ভারতের ভাঙ্গন বা বাংলা ও পাঞ্জাবের বিভাজন কে সমর্থন করেন না। অনেকেই এর বিরুদ্ধে বলেছেন, কিন্তু এখন যখন সবাই মেনে নিয়েছে, আমাদের সবার দায়িত্ব এর প্রতি অনুগত থাকা এবং যেই চুক্তি এখন চূড়ান্ত ও বাধ্যতামূলক সেই চুক্তি মোতাবেক আচরণ করা। আপনারা অবশ্যই মনে রাখবেন যেমনটি আমি আগেই বলেছি যে এই বিপ্লব সত্যিই অভুতপূর্ব। যে কেউ এই দুইটি সম্প্রদায়ের মধ্যে বিদ্যমান অনুভূতি বেশ বুঝতে পারবে হোক সে সংখ্যা গরিষ্ঠ কিংবা সংখ্যা লঘু। কিন্তু প্রশ্ন হলো যা হয়েছে তার অন্যথা কি সম্ভব ছিল। বিভাজন তো হতেই হত। হিন্দুস্তান ও পাকিস্তান , উভয়পাশেই, কিছু অংশ মানুষ হয়তো একে সমর্থন করছে না, একে পছন্দ করছেনা, কিন্তু আমার মতে আর কোন সমাধান নেই এবং আমি নিশ্চিত ভবিষ্যত ইতিহাস এর পক্ষেই রায় দিবে। এবং সামনে বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমেই প্রমাণিত হবে যে এটিই ভারতের সাংবিধানিক সমস্যার একমাত্র সমাধান। সংযুক্ত ভারতের ধারণা কখনোই ফল্প্রসু হত না, আর আমার মতে তাতে এক ভয়ঙ্কর দুর্যোগ সৃষ্টি হত। হয়ত সেই ধারনা সঠিক ছিল অথবা ছিল না , তা এখনও দেখার আছে। তদসত্বেও, এই বিভাজনের ফলে সংখ্যালঘুরা কোন রাজ্যে যাবে সেই প্রশ্ন এড়ানো অসম্ভব ছিল। এখন এটি অনিবার্য ছিল। আর কোন উপায় ছিল না। তো এখন আমরা কি করব? এখন আমরা যদি এই পাকিস্তানের মহান রাজ্যকে খুশি ও সমৃদ্ধ করতে চাই, আমাদের সম্পূর্ণভাবে মানুষের বিশেষত জনসাধারণ ও দরিদ্রদের মঙ্গলের উপর মনযোগ দিতে হবে। আপনারা যদি অতীত ভুলে, মনোমালিন্য দূর করে একত্রে কাজ করতে পারেন তাহলে অবশ্যই সফল হতে পারবেন। আপনাদের সাফল্য অটুত থাকবে যদি আপনারা অতীত পরিবর্তন করে একসাথে কাজ করেন, এই উদ্দীপনায় যে আপনাদের মধ্যে সকলে, সে যেই সম্প্রদায়েরই হোক না কেন, অতীতে যে সম্পর্কই তাদের মধ্যে থাকুক না কেন, যে বর্ণ-গোত্র-ধর্মেরই হোক না কেন, সবাই এই রাষ্ট্রের নাগরিক যাদের সকলের সমান অধিকার ও বাধ্যবাধকতা আছে।

 

আমি এতে আর জোর দিতে পারছিনা। আমাদের এই উদ্দীপনা নিয়ে কাজ শুরু করে দিতে হবে এবং সময়ের সাথে সাথে সংখ্যাগরিষ্ঠ ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের – হিন্দু সম্প্রদায় ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে সকল জটিলতা দূর হবে কারন মুসলমান্দের মধ্যেও পাঠান, পাঞ্জাবি, শিয়া, সুন্নী ইত্যাদি গোষ্ঠী আছে আবার হিন্দুদের মধ্যেও বাহ্মণ, বৈষ্ণব, ক্ষত্রিয়, আবার বাঙ্গালী , মাদ্রাজী প্রভৃতি রয়েছে। এমনকি, ভারতের স্বাধীনতা অর্জনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা এটিই ছিল। নাহলে আরো অনেক আগেই আমরা মুক্ত হতে পারতাম। কোন শক্তিই একটি জাতিকে ধরে রাখতে পারে না, বিশেষত ৪০০ মিলিয়ন মানুষের একটি জাতিকে বশীভূত করতে পারে না, কেউ আপনাদের জয় করতে পারত না, যদি করত ও , এতদিন পর্যন্ত কেউ কর্তৃত্ব বজায় রাখতে পারত না।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<001.015.042>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

 

এর থেকে আমরা একটি শিক্ষা পেয়েছি। আপনারা মুক্ত, আপনারা কোন মন্দিরেও যেতে পারবেন, কোন মসজিদেও যেতে পারবেন অথবা এই পাকিস্তানে যে কোন আরাধনার জায়গায়ই যেতে পারবেন। আপনি যে কোন ধর্ম বা গোত্রেরই হন না কেন তার রাষ্ট্রের সাথে কোন সম্পর্ক নেই। আপনারা যেমনটি জানেন, ইতিহাস সাক্ষী , কিছুদিন আগেও ব্রিটিশদের, ভারতে এখন যে অবস্থা এর থেকে অনেক খারাপ অবস্থা ছিল। রোমান ক্যাথলিক ও প্রোটেস্ট্যান্টরা একে অপরকে তাড়া করে বেড়াত। এখনো কিছু রাজ্য আছেযেখানে শ্রেনী বৈষম্য বিদ্যমান এমনকি কিছু বিশেষ শ্রেনীর উপর নিষেধাজ্ঞাও রয়েছে। উপরওয়ালাকে শুকরিয়া যে আমাদের সেই অবস্থায় শুরু করতে হচ্ছে না। আমরা এমন দিনে শুরু করছি যখন এক সম্প্রদায়ের সাথে অন্য সম্প্রদায়ের , কিংবা এক গোত্রের সাথে অন্য গোত্রের বিভেদ- বৈষম্য নেই। আমরা সকলেই রাষ্ট্রের সমান নাগরিক এই মূলনীতিতেই আমরা শুরু করেছি। কালক্রমে ইংল্যান্ডের মানুষদের বাস্তবিকতার সম্মুখীন হতে হয়েছে, এবং তাদের সরকার দ্বারা তাদের উপর দায়িত্বের যে বোঝা অর্পিত হয়েছে তা থেকে ভারমুক্ত হতে হয়েছে। তাদের ধাপে ধাপে এই অগ্নিপরিক্ষা পেরোতে হয়েছে। আজ আপনারা ন্যায়ের সাথে বলতে পারবেন যে কোন রোমান ক্যাথলিক বা কোন প্রোটেস্ট্যান্ট নেই, যারা আছে সবাই যুক্ত্রাজ্যের নাগরিক যাদের সকল ক্ষেত্রে সমান অধিকার আছে।

 

আমরা এখন এটিকে আমাদের সামনে আদর্শ হিসেবে রাখবো, এবং দেখবেন সময়ের সাথে, ধর্মীয় অর্থে না কারন এটি যার যার নিজস্ব ব্যাপার, রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে রাজনৈতিক অর্থে হিন্দুরা হিন্দু হওয়া থেকে, মুসলমানেরা মুসলমান হওয়া থেকে ক্ষান্তি দিবে ।

তো ঠিক আছে সুধীবৃন্দ, আমি আর আপনাদের সময় নিবোনা। আবারো আপনাদের ধন্যবাদ জানাচ্ছি এই সম্মানের জন্য যা আমাকে আপনারা দিয়েছেন। আমি সর্বদাই ন্যায়ের আদর্শে পরিচালিত হব, এবং রাজনৈতিক ভাষায় যেমন বলে, কোন কুসংস্কার বা বৈরিতা ছাড়া, অন্য কথায় কোন পক্ষপাতিত্ব ছাড়াই ন্যায়বিচার করবো। আমার পথপদর্শক নীতি হবে, ন্যায় ও সম্পূর্ণ নিরপেক্ষতা, এবং আমি নিশ্চিত আপনাদের সহযোগিতায় ও সমর্থনে পাকিস্তান কে এক মহৎ জাতিতে পরিণত করতে পারবো।

 

আমি যুক্তরাষ্ট্র হতে একটি বার্তা পেয়েছি যা হচ্ছেঃ

“আমি পাকিস্তানের গণপরিষদের সভাপতি হিসেবে আপনাকে যোগাযোগ করার সম্মান লাভ করেছি। নিম্নলিখিত বার্তাটি আমি এই মাত্র যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হতে পেয়েছিঃ

“পাকিস্তান গণপরিষদের প্রথম বৈঠক উপলক্ষে, আমি আপনাকে এবং পরিষদের সদস্যদের যুক্তরাষ্ট্রের সরকার ও জনগণের পক্ষ থেকে আন্তরিক শুভেচ্ছা জানাচ্ছি যেন আপনি যেই মহান দায়িত্ব হাতে নিয়েছেন তাতে সফল হন। ”

 

 

 

——-

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<001.016.043>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

 

শিরোনামঃ পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে সীমান্ত চিহ্নিতকরণ ঘোষণাঃ র‍্যাডক্লীফ রোয়েদাদ

সুত্রঃ পাকিস্তান রেজোলিউশান টু। পাকিস্তান পৃষ্ঠা – ২৬১

তারিখঃ ১২ ই আগস্ত,১৯৪৭

 

বেঙ্গল সীমান্ত পরিষদের চেয়ারম্যান কতৃক প্রদত্ত প্রতিবেদন

 

বরাবর,

মাননীয় গভর্নর জেনারেল,

১।আমি সত্যি গর্বিত যে আজ আমি বাংলার সীমান্ত চুক্তির সনদের বিশেষ সিদ্ধান্ত নিতে পারছি যেটা ধারা সেকশন তিন অনুযায়ী ১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় উত্থাপিত হয়েছিল যা বর্তমানে আমার সিদ্ধান্তের মাধ্যমে এই কমিশনের চেয়ারম্যান বরাবর পুনরায় পরিবেশিত হচ্ছে। এই চুক্তিতে সিলেট ও অন্যান্য অঞ্চলের সাথে পুরো বাংলা অঞ্চলের সংঘবদ্ধতার দলিল অন্য একটি প্রতিবেদনে প্রদর্শিত হবে।

২।নমুনাপত্র নামা ৫০/৭/৪৭ অনুযায়ী ১৯৪৭ সালের ৩০ শে জুন গভর্নর জেনারেলের আদেশ বলে এই সীমান্ত চুক্তি ঘোষিত হয়। এই কমিশনের সদস্য ছিলেন- জনাব বিচারপতি বিজন কুমার মূখারজি জনাব বিচারতি সি সি বিশ্বাস জনাব বিচারপতি আবু সালেহ মোহাম্মদ আকরাম এবং জনাব বিচারপতি এস এ রহমান পরবর্তীকালে আমি সেই কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে নিযুক্ত হই।             ৩।সেই ঘোষিত কমিশনের নীতিমালা অনেকটা এমন ছিল যেঃ সেই সীমান্ত কমিশনকে এই নির্দেশনা দেওয়া হয় যে তারা যেন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে পাকিস্তানের মুসলিম এবং অমুসলিম দুই জাতির ভেতর সীমানা নির্দেশ করে দেয়। যার প্রভাব পারিপার্শ্বিক আরো বিভিন্ন পরিস্থিতির উপর পরবে। আমরা ১৫ ই আগস্টের পূর্বেই কোনো একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে চেয়েছিলাম।

৪। পার্লামেন্টারি মিটিং এর পর এই কমিশন আগ্রহী দলসমূহকে তাদের নিজেদের স্মারকলিপি এবং প্রতিনিধিদের বিবরণী জমা দেওয়ার আমন্ত্রণ করল। বিপুল সংখ্যক প্রার্থীর আবেদন পাওয়া গিয়েছিল।

৫। কমিশন ভারতের কলকাতায় একটি লোকসভার আয়োজন করে এবং সেটা ১৯৪৭ সালের ২০ শে জুলাই, রবিবার ব্যতীত ১৬ জুলাই, বুধবার থেকে ২৪ জুলাই বৃহস্পতিবার পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছিল। সেখানে কমিশনের নিকট বিভিন্ন প্রার্থী এবং দল পারস্পরিক আলোচনায় অংশ নেয় । যেখানে একদিকে বেশিরভাগ দাবি-দাওয়া পেশ করে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস , বাংলা আঞ্চলিক হিন্দু মহাসভা এবং বাংলা সংগঠন। অন্যদিকে মুসলিম লীগের সদস্যবৃন্দ । সেই অবস্থায় আমি তখন পাঞ্জাব সীমান্ত চুক্তি কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে নিযুক্ত রয়েছি। এককালে এই পাঞ্জাব চুক্তি ধীরে ধীরে বঙ্গচুক্তির জায়গায় স্থান করে নিতে লাগল আমার ভেতর। আমি বঙ্গচুক্তির সেই অধিবেশনে ব্যক্তিগতভাবে ছিলাম নাহ । কিন্তু সেই চুক্তির সকল তথ্যই বিবেচনার স্বার্থে আমাদের কাছে আসত।

 

 

 

 

<001.016.044>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

৬। লোকসভার পর ধীরে উত্থাপিত সকল দাবি দাওয়া এবং সমস্যাদির কৈফিয়ত এবং সমাধান দেওয়ার সময় এসে গেল। । কলকতায় আমাদের আলোচনা শুরু হল।

৭। যখন পশ্চিম বাংলা এবং পূর্ববাংলায় একটি নির্দিষ্ট সীমান্ত অংকনের প্রশ্ন আসল তখন দলগুলো হতে বিচিত্র সব সমাধান প্রস্তাবিত হল। বেশীরভাগই মুসলিম বা অমুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতার উপর ভিত্তি করে এর সংলগ্ন এলাকার সমন্বয়ে সীমান্ত অংকনের প্রতি সন্তুষ্টি প্রকাশ করলেন।

৮। আমার মতে নিম্নে উল্লেখিত কিছু প্রশ্নের উত্তরের উপর ভিত্তি করে পূর্ব এবং পশ্চিম বাংলার বিভাজন করা হয়েছিলঃ

ক।দুটো অঞ্চল বিভাজনের পর ঠিক কোন অঞ্চলটাকে কলকাতা হিসেবে অভিহিত করা হবে?

খ। যদি কোনো অংশকে কলকাতা হিসেবে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে চিহ্নিত করা হয় , তবে কলকাতার কোন অংশে কাদের আধিপত্য বেশি থাকবে। কলকাতার সকল জলবন্দর যা নদীয়া এবং কুলতি নদীকে ঘিরে রয়েছে সেগুলোর কোন অংশ কাদের অধীনে থাকবে?

গ। গঙ্গা-পদ্মা-মধুমতি প্রভৃতি নদীর প্রতি আকর্ষণ কি আর থাকবে যশোর এবং নদীয়াবাসীদের কাছে? সেসব নদীর ভাগাভাগী নিয়ে তাদের মধ্যে কি দাঙ্গা বাজতে পারে না?

ঘ। এটা কি সম্ভব যে খুলনা এখনো সেই অঞ্চল দ্বারাই চলবে যা যশোর থেকে ভিন্ন হয়ে গিয়েছে?

ঙ। মালদা এবং দিনাজপুর এর মত এলাকা যেখানে অমুসলিমদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা বেশী সেসব অঞ্চল পূর্ববাংলার অধীনে মনোনয়ন দেওয়াটা কি সঠিক হচ্ছে?

চ। আবার পশ্চিম বাংলার অধীনস্থ দার্জিলিং অঞ্চল এবং জলপাইগুড়ি অঞ্চল যেখানে মুসলিমদের সংখ্যা যথাক্রমে ২.৪% এবং ২৩.০৮% সেই সংখ্যালঘু মুসলিমদের বোঝানো কি সম্ভব হবে? অমুসলিম অঞ্চল সংলগ্ন এসব মুসলিম এলাকার বাসিন্দারা স্বভাবতই মুসলিম অধ্যুষিত বাংলায় যাওয়ার ক্ষেত্রে তৎপর থাকবেন নাহ?

ছ। পার্বত্য চট্টগ্রামকে কোন অঞ্চলের অধীনস্থ করা হবে যেখানে মুসলিমদের সংখ্যা মাত্র তিন শতাংশ । চট্টগ্রাম অঞ্চল নিজেদেরকে স্বাধীন অঞ্চল হিসেবে স্বায়ত্বশাসিত থাকা কি তাদের পক্ষে খুব কঠিন হবে?

 

 

 

 

 

 

 

 

<001.016.045>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

জ। বহুল আলোচনার পরও আমার সহকর্মীরা বুঝতে পারলেন যে এসব সমস্যা উত্তরণ এবং এই প্রশ্নগুলোর সপক্ষে এবং বিপক্ষে যুক্তি তর্কের মাধ্যমে কেও কোনো সিদ্ধান্ত পৌঁছাতে পারছিলেন নাহ । তারা দক্ষিণ পশ্চিম , উত্তর-পূর্ব এবং পূর্ব সহ সকল এলাকার সঠিক সীমারেখা বন্টনের ক্ষেত্রে অপারগ ছিলেন। তখন এক প্রকার বাধ্য হয়েই আমাকে আমার নিজেস্ব সিদ্ধান্ত নিতে হয়।

ঝ। এখন আমি সেই পথেই এগুতে চাচ্ছি এবং আমি আমার মত আমার সহকর্মীদের নিকট প্রকাশ করেছি এবং একই সময় এসব কঠিন সিদ্ধান্ত এবং সমালোচনার একটি সুষ্ঠু সমাধান বের করার চেষ্টা করছি। তাই এসব অঞ্চলের সীমান্ত নির্ধারণের একটি কার্যতালিকা নির্ণয় করতে হবে এবং এরপর দুটো অঞ্চলের বিভিন্ন দিকনির্দেশনা সম্বলিত সকলের বোধগম্য একটি মানচিত্র নির্ণয় করতে হবে।

ঞ। আমি যথাসম্ভব চেষ্টা করেছি দুটি প্রদেশের সকল রেলওয়ে যোগাযোগ পদ্ধতি এবং নদীপথে যাতায়াত পদ্ধতি যেগুলো দুটি প্রদেশের মানুষের জীবনের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ সেগুলোকে বাদ না দিয়ে দুই বঙ্গের সীমান্ত অংকনের এবং এটা এখন তাদের

উপর নির্ভর করছে তারা পরস্পরের সাথে কতটুকু সমঝোতা বজায় রেখে একে অপরের সীমান্ত এবং ক্ষেত্রে দখলদারি করবে নাহ।

নয়াদিল্লি, স্বাক্ষর, সাইরাল রেডক্লিফ ১২ই আগস্ট, ১৯৪৭

 

কার্য নীতিমালা অধ্যায় ১

১। দার্জিলিং জেলার ফন্সিদেওয়া এবং জলপাইগুড়ি জেলার তেতুলিয়া থানার ভেতর একটি সীমারেখা অংকিত হবে যেখানে সেটি বিহার অঞ্চল পর্যন্ত থাকবে এবং এর ভেতর তেতুলিয়া এবং রাজগঞ্জ থানার মধ্যে সীমারেখা অংকিত থাকবে। আবার একই সাথে অন্য অংশে পঞ্চগড় থানা এবং রাজগঞ্জ থানার মধ্যে এবং পঞ্চগড় ও জলপাইগুড়ি জেলার অংকিত সীমারেখা উত্তর দিক বরাবর দেবিগঞ্জ এবং কোচবিহার থানার মধ্যবর্তী সীমান্ত পর্যন্ত যাবে। আর এভাবে দারজলিং এবং জলপাইগুড়ি জেলার যেসকল এলাকা সীমান্তের পশ্চিম দিকে অবস্থান করছে তারা যাবে পশ্চিম বাংলার অধীনে এবং পাটগ্রাম সহ অন্য যেসব অঞ্চল যেগুলো পূর্ব দিকে রয়েছে তারা যাবে পূর্ব বাংলার অধীনে।

২। হরিপুর এবং রায়গঞ্জ অঞ্চলের মাঝে একটি সীমারেখা অংকিত হবে যা দিনাজপুর থানা থেকে অংকিত সীমারেখা থেকে শুরু করে বিহার অঞ্চল পর্যন্ত অংকিত সীমারেখার সাথে মিলিত হবে যেখানে বঙ্গোপসাগরের এক অংশে রয়েছে ২৪ পরগণা এবং অপর অংশে রয়েছে খুলনা। আগের নিয়মানুসারে দার্জিলিং এবং জলপাইগুড়ির অধীনস্থ এসব অঞ্চলের যেগুলো সীমারেখার পশ্চিমে পরবে তা পশ্চিম বাংলার এবং যেগুলো পূর্বে পরবে তা পূর্ব বাংলার।

 

 

 

 

 

 

 

<001.016.046>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

৩। এবার হরিপুর এবং রাজগঞ্জ ,রামশংকইল এবং হেমতাবাদ, পীরগঞ্জ এবং হেমতাবাদ,পীরগঞ্জ এবং কালিগঞ্জ, বোচাগঞ্জ এবং কালিগঞ্জ, বিরাল এবং কালিগঞ্জ, বিরাল এবং কুশুমেন্দি,বিরাল এবং গঙ্গারামপুর, দিনাজপুর এবং গঙ্গারামপুর, দিনাজপুর এবং কুমারগঞ্জ, ফুলবাড়ি এবং বালুরঘাট, চন্দ্রবাড়ী-কুমারগঞ্জ-ফুলবাড়ি সীমা রেখা অংকিত হবে। বালুরঘাট এবং ফুলবাড়ীর উত্তর দক্ষিণ দিকে বাংলা-আসাম রেলওয়ে পথ পরে। এই রেলওয়ে বালুরঘাট এবং পঞ্চবিবি থানার যেখানে মিলিত হবে সীমারেখা সেখানে শেষ হবে ।

৪। এভাবে একেক থানার উপর দিয়ে সীমারেখা একেকভাবে যাবে। যেমনকিঃ

৫। এরপর সেই সীমারেখা গঙ্গা নদীর দিকে মালদা এবং মুরশিদাবাদের ভেতর দিয়ে যাবে। মালদা-মুরশিদাবাদ,রাজশাহি-মুরশিদাবাদ,রাজশাহী-নদিয়া বরাবর সীমারেখা চলবে। নদিয়া জেলার উত্তর-পশ্চিম কোণে যেখানে মাথাভাঙ্গা নদী ও গঙ্গার মোহনা রয়েছে সেদিক দিয়ে যাবে। আর এভাবে সীমান্ত নিয়মের পূর্ব উপখ্যানের পুনরাবৃত্তি ঘটবে।

৬। মাথা ভাঙ্গা এবং গঙ্গা অধ্যুষিত সেই সীমারেখা মাথাভাঙ্গা নদী যেখানে শেষ হয়েছে সেখান থেকে দৌলতপুর এবং খইরপুর বরাবর যাবে যা মূল সীমারেখার মধ্যবর্তী সীমারেখার অংশ হিসেবে অবস্থান করবে ।

৭। এরপর এখান থেকে পশ্চিম বাংলা এবং পূর্ব বাংলার এই সীমারেখা দৌলতপুর-খইরপুর, গানগানি-করিমপুর,মেহেরপুর-তেহিট্ট,মেহেরপুর-চাপরা,দামারহুদা-চাপরা,দামারহুদা-কিশোরগঞ্জ, চন্দরগঞ্জ-কিশোরগঞ্জ সহ এভাবে সমস্ত জোড়া এলাকাগুলোর মধ্যবর্তী অংশ দিয়ে সীমারেখা অংকিত হবে যা ২৪ পরগণা এবং খুলনা অধ্যুষিত অঞ্চলের মাঝ দিয়ে যাবে এবং পূর্বের নিয়ম বহাল থাকবে।

৮। এরপর খুলনা এবং ২৪ পরগনার মধ্য দিয়ে সীমান্ত রেখা দক্ষিণ বরাবর যেতে থাকবে যেখানে উভয় সীমান্ত বঙ্গোপসাগরে মিলিত হয়েছে।

 

———

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<001.017.047>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের কর্মসূচি পুর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ ১৯৪৭

 

পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ

পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সংগঠনী কমিটি পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্র সমাজের খেদমতে নিম্নোক্ত কর্মসূচী পেশ করিয়াছেনঃ

ছাত্র লীগের আর্দশ উদ্দেশ্য

১।        (ক) পূর্ব পাকিস্তানে বিভিন্নমুখী প্রতিভা সৃষ্টির উপযোগী পরিবেশ তৈয়ার করা

(খ) বিভিন্ন রকমের কারিগরি, ইঞ্জিনিয়ারিং, ডাক্তারী ও ধাত্রীবিদ্যা শিক্ষার জন্য ছাত্র-ছাত্রীদের উৎসাহিত করা।

২। পাকিস্তানকে আভ্যন্তরীণ ও বহিঃশক্রদের কবলমুক্ত করা এবং সর্বশক্তি দিয়ে পাকিস্তানের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা।

৩।        (ক) স্বার্থন্বেষী নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে তীব্র সংগ্রাম এবং ছাত্রসমাজকে তাহদের স্বার্থসিদ্ধির যন্ত্ররূপে চালিত হইতে না দেওয়া

(খ) ছাত্রসমাজকে দলীয় রাজনীতি হইতে মুক্ত রাখা

৪।        (ক) নিরক্ষরতার বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা

(খ) ছাত্রসমাজকে পরস্পর সহযোগিতার ভিত্তিতে অবিচ্ছেদ্যভাবে একত্রীভূত করা

(গ) ছাত্রসমাজের ন্যায্য দাবীদাওয়াগুলিকে সুপ্রতিষ্ঠিত করা

(ঘ) ছাত্রসমাজকে কৃষ্টি ও আধুনিক রাজনৈতিক আন্দোলনের সংস্পর্শে আনিয়া নৈতিক ও চারিত্রিক বিপ্লবের সৃষ্টি করা

(ঙ) জাতি ও দেশের কল্যাণের জন্য ছাত্রসমাজের বিক্ষিপ্ত কর্মশক্তিকে সুসংবদ্ধ ও কেন্দ্রীভূত করা

৫। ইসলামিক নীতির উপর ভিত্তি করতঃ জাতীয় দারিদ্রের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করিয়া অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও সমতা আনয়ন করা

৬। পাকিস্তানের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে সমানাধিকারে ভিত্তিতে সৌহাৰ্দ্দ্য ও মিলনের পথ সুপ্রশস্ত করা

৭। জনসংখ্যার অনুপাতে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানীদের ন্যায্য দাবীদাওয়াগুলির সুনিশ্চিত ব্যবস্থা করিয়া দিয়া পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মিলনকে সুদৃঢ় করা

৮। সরকারের জনকল্যাণকর কৰ্ম্মপদ্ধতিকে সমর্থন করা এবং গণস্বার্থবিরোধী কৰ্ম্মপন্থার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা

৯। প্রাপ্তবয়স্কদের সার্ববজনীন ভোটাধিকারের দাবী

১০। দুনীতি, স্বজনপ্রীতি, মুনাফাকারী ও চোরাকারবারীদের উচ্ছেদ সাধন এবং ব্যক্তিকে কেন্দ্র করিয়া ছাত্র আন্দোলন পরিচালনার যে রেওয়াজ প্রচলিত আছে, তার ধ্বংস সাধন।

 

 

 

ছাত্রলীগের দাবী

১। আজাদী লাভের পরিপ্রেক্ষিতে সমগ্র শিক্ষা ব্যবস্থা এবং পাঠ্য পুস্তকের আমূল পরিবর্তন

২। অবৈতনিক বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষার প্রচলন ও বর্তমান শিক্ষাসঙ্কোচ নীতির প্রতিরোধ

৩।        (ক) বিনা ব্যয়ে বাধ্যতামূলক সামরিক শিক্ষার প্রবর্তন

(খ) পূৰ্ব্ব পাকিস্তানের যুবকদের বিমান, নৌ, স্থল প্রভূতি সামরিক শিক্ষা প্রদানের জন্য অনতিবিলম্বে পূৰ্ব্ব পাকিস্তানে সামরিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন (গ) পাকিস্তান নৌ বিভাগের সদর দফতর চট্টগ্রামে স্থানান্তরিতকরণ

৪। কারিগরি, ইঞ্জিনিয়ারিং, ডাক্তারী, ধাত্রীবিদ্যা প্রভৃতি প্রসারের অধিকতর সুবন্দোবস্তকরণ

৫।        (ক) স্বল্পব্যয়ে উচ্চ শিক্ষার ব্যবস্থা

(খ) শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে অধিকতর সরকারী সাহায্য

(গ) শিক্ষায়তনগুলিতে উপযুক্ত বেতন দিয়া উপযুক্ত শিক্ষক নিয়োগ

(ঘ) পল্লী অঞ্চলকে শিক্ষাকেন্দ্ররূপে গড়িয়া তুলিবার উদ্দেশ্যে মফস্বল শিক্ষায়তনগুলির জন্য অধিকতর ছাত্রাবাসের প্রতিষ্ঠা

(ঙ) গরীব ও মেধাবী ছাত্রদের জন্য শিক্ষায়তন ও ছাত্রাবাসগুলিতে অধিকতর ফ্রি ষ্টুডেণ্ডশিপ এবং বৃত্তির সংখ্যা বাড়াইয়া দেওয়ার ব্যবস্থা

(চ) শিক্ষায়তনসমূহের পাঠাগারগুলিতে ইসলামিক কৃষ্টি ও ঐতিহ্যমুলক গ্রন্থের সমাবেশ

(ছ) বিনাব্যয়ে ছাত্রদের চিকিৎসার উপযুক্ত ব্যবস্থা

 

 

<001.017.048>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

 

৬। নারীশিক্ষা প্রসারের উপযুক্ত ব্যবস্থা

৭। পূর্ব পাকিস্তানের বিশ্ববিদ্যালয় ও স্কুল কলেজসমূহে বাংলা ভাষার মাধ্যমে শিক্ষা প্রদান ও পরীক্ষা গ্রহণের আশু ব্যবস্থা

৮। শিক্ষায়তনগুলিকে স্বায়ত্তশাসনমূলক ক্ষমতা প্রদান

৯। শিক্ষায়তন ও ছাত্রাবাসগুলিতে স্বায়ত্তশাসনমূলক ছাত্র ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠা এবং স্বাধীন মতামত প্রকাশের অধিকার

১০। শিক্ষায়তনসমূহে পুলিশের অন্যায় ও অযথা হস্তক্ষেপ বন্ধ করিয়া দিয়া শিক্ষায়তনগুলির পবিত্রতা রক্ষা করা। নাইমউদ্দীন আহমদ আহবায়ক পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ*

 

ছাত্রাবাস ও একোমোডেশন সমস্যাযুক্ত স্কুল কলেজের ছাত্রবন্ধুদের “কেন্দ্রীয় একমোডেশন ও কমিটি অব একশনের” সহিত যোগাযোগ স্থাপন করিবার জন্য অনুরোধ জানান হইতেছে।

  • পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পূর্ব থেকেই বাংলাদেশ মুসলিম লীগের দুটি অংশ কাজ করতে থাকে। একটি অংশের নেতৃত্বে ছিলেন খাজা শাহাবদীন ও খাজা নাজিমুদ্দীন এবং অন্যটির নেতৃত্ব ছিলেন আবুল হাশিম ও সোহরাওয়াদী পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ ছিল হাশিম-সোহরাওয়াদী সমর্থক। পরবর্তীকালে এই সংগঠন থেকেই আওয়ামী লীগের বহু কমী সৃষ্টি হয়।

 

 

<001.018.049>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
বাংলা ভাষার পক্ষে প্রকাশিত তমদ্দুন মজলিশের পুস্তিকা (অংশ) পাকিস্তান তমদ্দুন মজলিশ ১৬ ই সেপ্টেম্বর, ১৯৪৭

পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু?- তমদ্দুন মজলিশ*

১। বাংলা ভাষাই হবেঃ

(ক) পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষার বাহন।

(খ) পূর্ব পাকিস্তানের আদালতের ভাষা।

(গ) পূর্ব পাকিস্তানের অফিসাদির ভাষা। ২। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের ভাষা হবে দুটি- উর্দু ও বাংলা।

৩। বাংলাই হবে পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষা বিভাগের প্রথম ভাষা। ইহা পূর্ব পাকিস্তানের শতকরা একশতজনই শিক্ষা করবেন।

(খ) উর্দু হবে দ্বিতীয় ভাষা। যারা পাকিস্তানের অন্যান্য অংশে চাকরী ইত্যাদি কাজে লিপ্ত হবেন তারাই শুধু ও-ভাষা শিক্ষা করবেন। ইহা পূর্ব পাকিস্তানের শতকরা ৫ হইতে ১০ জন শিক্ষা করলেও চলবে। মাধ্যমিক স্কুলের উচ্চতর শ্রেণীতে এই ভাষা দ্বিতীয় ভাষা হিসাবে শিক্ষা দেওয়া যাবে।

(গ) ইংরেজী হবে পূর্ব পাকিস্তানের তৃতীয় ভাষা বা আন্তর্জাতিক ভাষা। পাকিস্তানের কর্মচারী হিসাবে যাঁরা পৃথিবীর অন্যান্য দেশে চাকরী করবেন বা যাঁরা উচ্চতর বিজ্ঞান শিক্ষায় নিয়োজিত হবেন তাঁরাই শুধু ইংরেজী শিক্ষা করবেন। তাদের সংখ্যা পূর্ব পাকিস্তানের হাজারকরা ১ জনের চেয়ে কখনো বেশী হবে না। ঠিক একই নীতি হিসাবে পশ্চিম পাকিস্তানের প্ৰদশেগুলিতে ওখানের স্থানীয় ভাষা বা উর্দু ১ম ভাষা, বাংলা ২য় ভাষা, আর ইংরেজী ৩য় ভাষার স্থান অধিকার করবে।

৪। শাসনকার্য ও বিজ্ঞান-শিক্ষার সুবিধার জন্য আপাততঃ কয়েক বৎসরের জন্য ইংরেজী ও বাংলার উভয় ভাষাতেই পূর্ব পাকিস্তানের শাসনকার্য চলবে। ইতিমধ্যে প্রয়োজন অনুযায়ী বাংলা ভাষার সংস্কার সাধন করতে হবে।

 

 

 

  • ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু ছাত্র ও অধ্যাপকের উদ্যোগে ১৯৪৭ সনের ২রা সেপ্টেম্বর তমদ্দুন মজলিশ প্রতিষ্ঠিত হয়। এই প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য ছিল বাংলা ভাষার মাধ্যমে সংস্কৃতি সেবা। বাংলা ভাষার পক্ষে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর এদের ভূমিকা ছিল প্রাথমিক ও গুরুত্বপূর্ণ।

 

 

 

 

 

 

 

<001.019.050>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের সাংগঠনিক প্রচারপত্র পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ ১৯৪৭

 

পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ
আপনি সদস্যভূক্ত হইয়াছেন কি?

প্রত্যেক পরাধীন জাতির মুক্তি সংগ্রামে ছাত্রসমাজ এক অপরিহার্য্য অংশ গ্রহণ করিয়া থাকেন। পাকিস্তান হাসেলের পথে ছাত্রদের বলিষ্ঠ তৎপরতা, একনিষ্ঠ সাধনা, ত্যাগ ও প্রেরণা আজ ইতিহাসের বস্তু। জাতির ইতিহাস কিন্তু জাতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের মধ্যেই থাকিয়া যায় না। বস্তুতঃ “দেওয়ানী আজাদী” লাভের ভিতর দিয়াই নূতন ইতিহাস গড়িয়া উঠে। আর প্রত্যেক নাগরিককেই এই ঐতিহাসিক দায়িত্বভার বহন করিতে হয়। আমাদের অগ্রগামীদের মধ্যে স্বার্থের সংঘাত ও ইনটেলিজেনশিয়ার অভাববশতঃ ছাত্রসমাজের উপরেই আজ এই দায়িত্ব বৰ্ত্তাইয়াছে। একটা শিক্ষা-স্বাস্থ্যসম্পন্ন বলিষ্ঠ জাতি গঠন আমাদেরই দায়িত্ব।

একটা রাষ্ট্রের পত্তন যত না কঠিন, তাহার চেয়েও কঠিন সেই রাষ্ট্রকে গড়িয়া তোলা। তাহার জন্য চাই সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও দৃঢ় সংগঠন। সুষ্ঠ পরিকল্পনা এবং দৃঢ় সংগঠনও সামর্থ্যের অভাবে ব্যর্থ হইয়া যায়। তাই সকল সমস্যার গোড়ার কথা হইতেছে সংগঠন। এক কথায় সংগঠনই শক্তি।

পূর্ব পাকিস্তানের গোটা শিক্ষাব্যবস্থা আজ ভাঙ্গনের মুখে। ছাত্র আছে ছাত্রাবাস নাই, স্কুল-কলেজ আছে শিক্ষক নাই, শিক্ষা দপ্তর আছে শিক্ষা প্রসারের চেষ্টা নাই। বরং শিক্ষা সঙ্কোচের উৎসাহে সরকারী মহলে সাজ সাজ রব পড়িয়াছে। আজাদীর পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষাপদ্ধতির আমূল পরিবর্তন দূরের কথা, শিক্ষাব্যবস্থায় গতানুগতিকতার প্রসার যেন বাড়িয়াই চলিয়াছে। যে অল্পসংখ্যক শিক্ষক আছেন, তাঁহাদেরও আবার জীবন ধারণের মত বেতন নাই। যে কয়েকটি স্কুল-কলেজ তাহারও আবার কিছু অংশ সরকারী কাজে ব্যবহৃত হইতেছে। তাহার উপর দেশের অন্নবস্ত্র স্বাস্থ্য সংকট আজ গোটা সমাজকে বিশেষ করিয়া ছাত্রসমাজকে প্রচণ্ড আঘাত হানিতেছে।

এই সংকটে পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্র-ছাত্রীদের সাড়া দিতেই হইবে। সংহতির আহবান জানাইয়া পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রাবাসের ব্যবস্থা ও প্রদেশের বিভিন্ন ছাত্র সমস্যার সমাধানে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের সুসংহত বলিষ্ঠ নেতৃত্ব আজ ছাত্র সমাজের আস্থা অর্জন করিয়াছে। কিন্তু সমস্যা সকলের, কাজেই সহযোগিতাও সকলেরই চাই। আসুন আমরা সকলে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের পতাকাতলে জমায়েত হইয়া ছাত্রসমাজের দাবী-দাওয়া আদায়ের জন্য সক্রিয়া হইয়া উঠি।

আগামী ১০ই ডিসেম্বর বেলা ২ ঘটিকায় ছাত্রলীগের নিজস্ব অফিস ১৫০ নং মোগলটুলীতে ঢাকা সিটি কমিটির নির্বাচন হইবে। আপনারা ৫ই ডিসেম্বরের মধ্যে আপনাদের নিজ নিজ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রাইমারী ইউনিট গঠন করিয়া ছাত্রলীগকে সুদৃঢ় করুন। আমাদের স্মরণ রাখিতেই হইবে যে, ঢাকা পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী বিধায় প্রদেশের অধিকাংশ ছাত্রছাত্রী আজ রাজধানীতে শিক্ষালাভের জন্য জমায়েত হইয়াছেন। গোটা পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্র সমস্যা আজ রাজধানীতে পুঞ্জীভূত হইয়া দেখা দিয়াছে। আসুন আমরা আজ সকলে এই নির্বাচনী অভিযানকে সফল করিয়া ছাত্রলীগের পতাকাতলে জড় হই এবং ক্ষতদুষ্ট দলীয় রাজনীতির উর্ধ্বে

 

 

 

 

 

 

 

<001.019.051>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

 

থাকিয়া ছাত্রসমাজের তথা গোটা সমাজের বৃহত্তর মঙ্গল সাধনে ঐক্যবদ্ধবাবে অগ্রসর হই। আবার বলি, চলার পথে সংগঠনের প্রয়োজন, সংগঠনই শক্তি।

আজীজ আহমদ
চেয়ারম্যান, ঢাকা সিটি সংগঠনী কমিটি

আবদুল ওয়াদুদ
ভাইস চেয়ারম্যান, ঢাকা সিটি সংগঠনী কমিটি

নুরুল কবীর

কাজী গোলাম মাহবুব
যুগা আহবায়ক, সংগঠনী কমিটি

 

 

বিঃ দ্রঃ- প্রত্যহ বৈকাল ৪টা হইতে ৭টা পর্যন্ত ছাত্রলীগ অফিসে নির্বাচন সংক্রান্ত ব্যাপারে আলোচনা করিবার জন্য ছাত্রবন্ধুদের অনুরোধ জানান হইতেছে।

 

 

———-

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<001.020.052>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

 

শিরোনামঃ ঢাকায় গণপরিষদ অধিবেশন অনুষ্ঠানের প্রশ্নে বিতর্ক

সুত্রঃ পাকিস্তান গণপরিষদ

তারিখঃ ২৪শে ফেব্রুয়ারী ১৯৪৮

 

প্রফেসর রাজ কুমার চক্রবর্তী (পূর্ব বাংলা: সাধারন)

 

স্যার, আমাদের এটি একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, তাই, দেশের অধিকাংশ কিংবা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক জনমানুষের অনুভূতি এবং ইচ্ছেকে সম্মান করা আমাদের কর্তব্য। আপনি জানেন, পুরো পাকিস্তানের দুই-তৃতীয়াংশ জনগণ পূর্ব পাকিস্তানের। নিজেদের রাজধানীতে সংসদীয় কমিটিতে কিংবা সংসদ অধিবেশনে পূর্ব পাকিস্তানের কিছু আসন থাকাটা তাই খুবই স্বাভাবিক। এই সংশোধনীতে অন্যান্য দফার সাথে এই বিষয়ের পক্ষে দুইটি দফা আছে। এর মানসিক প্রতিক্রিয়াও আছে। এমন একটা ধারণা জন্মেছে যে এই নতুন পাকিস্তানি ব্যবস্থায় পূর্ব পাকিস্তান নিগৃহীত হচ্ছে। যদি রাজধানীতে সংসদের অধিবেশন ও কমিটির কিছু মিটিং এ আমরা বসতে পারি, তবে এই ধারণা দূর হয়ে যাবে এবং ভুল বুঝাবুঝিরও কোন অবকাশ থাকবে না। দ্বিতীয়ত স্যার, আমার সংশোধনী যদি মানা হয় তবে এর কিছু ফলও থাকবে। সংসদ অধিবেশনের এই সেশন যদি পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানীতে অনুষ্ঠিত হয়, তবে এটি জনগণের স্বার্থের পক্ষে সর্বোত্তম হবে। সংসদীয় ব্যব্স্থা সম্পর্কে এবং একটা দেশের সরকার কিভাবে পরিচালিত হয়, সে বিষয়গুলো সম্পর্কে তারা অবহিত হতে পারবে।

পাকিস্তান রাষ্ট্রের নেতারা এই সকল উপলক্ষে যদি পূর্ব পাকিস্তান ভ্রমণ করে, তবে এখানকার জনগণের সুযোগ মিলবে তাদের সংস্পর্শে আসার এবং নেতাদের উপস্থিতি তাদেরকে উৎসাহিত করবে। সুতরাং, তাই আমি বলব আমার সংশোধনীর শিক্ষামূল্যটা যেন অগ্রাহ্য করা না হয়। আমার অনুমান বাস্তব প্রয়োগের অজুহাত দেখিয়ে আমার সংশোধনীর বিরূদ্ধে অভিযোগ উঠতে পারে; তবে কী, ইচ্ছা থাকলে উপায় হয়। ভারত ভাগের আগে কেন্দ্রীয় অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়েছিল দিল্লি এবং সিমলাতে; এবং কিছু প্রাদেশিক অধিবেশন ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় অনুষ্ঠিত হয়েছিল। নিঃসন্দেহে সেখানে কিছু সমস্যা ছিল, তা আমি স্বীকার করে নিচ্ছি, কিন্তু, আমি যে প্রস্তাবনা গুলো রাখছি সেগুলোর বাস্তবায়ণের পথে এগুলো বাধা হয়ে না দাঁড়ানোই উচিৎ। স্যার আমার সংশোধনীটা বড় নিরীহ ধরণের। ‘অধিবেশনের সকল কার্যাবলী রাষ্ট্রপতি ভিন্নমত না দিলে করাচিতেই অনুষ্ঠিত হবে’- এমন একটা আইন গৃহীত হয়েছে। সুতরাং, রাষ্ট্রপতির ভিন্নমত পোষণ করার জায়গা রয়েছে। আমার এই সংশোধনী যদি গৃহীত হয় তবে রাষ্ট্রপতি নিয়মের কোন লঙ্ঘণ করছেন না, বরঞ্চ, তা হলে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের মানসিকতায় তা বড় ধরণের প্রভাব ফেলবে। এটি খুবই বিনীত একটা সংশোধনী এবং আমি আশা রাখি পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের ইচ্ছে এবং অনুভূতিকে স্বীকার করে আমার সংশোধনীটা গৃহীত হবে…..।

জনাব তমিজউদ্দিন খানঃ

এই সংশোধনী উত্থাপনকারী মাননীয় সদস্যের বিভিন্ন পর্যবেক্ষণের প্রতি আমার পূর্ণ সমর্থন আছে, তবুও আমি মনে করি এক্ষেত্রে আমরা আবশ্যিকভাবে কিছু বাস্তব সমস্যার সম্মুখীন হব। অর্থের ব্যাপারটা এখানে একটা বড় প্রশ্ন। আমি জানি না ওখানে সংসদের একটি অধিবেশন বসানোর জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র পরিবহণ করতে সরকারের কী ধরণের সমস্যার সম্মুখীন হতে হবে।

 

 

 

 

 

 

<001.020.053>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

 

এক্ষেত্রে সেখানে একটা ভালো রকম অসুবিধার সৃষ্টি হতে পারে। অপরপক্ষে, অধিবেশনটি যদি ঢাকায় অনুষ্ঠিত করতে হয়ই, সেটা বাস্তবায়ন করার জন্য মহামান্য রাষ্ট্রপতির হাতেই প্রয়োজনীয় কর্তৃত্ব আছে বলে আমি বিশ্বাস করি। একারণেই, আমি মনে করি, ঢাকায় একটি অধিবেশন বসানোর গ্রহণযোগ্যতা এবং ফলপ্রসূতা যদি মহামান্য রাষ্ট্রপতির নিকট সত্য বলেই মনে হয় তবে এই সংশোধনী ছাড়াই মাননীয় উত্থাপনকারীর মনের আশা পূরণ হতে পারে। ফলে, এ সংশোধনীর খুব একটা প্রয়োজন আছে বলে আমি বোধ করি না।

 

বেগম শায়েস্তা সোহরাওয়ার্দী ইকরামুল্লাহ(পূর্ব বাংলাঃমুসলিম)

স্যার, সদস্যদের পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তানে যাওয়ার থেকে পূর্ব পাকিস্তান থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে আসতে আরও বেশি সমস্যার সৃষ্টি হবে বলে আমি মনে করি, যেহেতু তারা সংখ্যায় বেশি। আবাসন এবং প্রশাসনিক কাজের জন্য আমি পূর্ব পাকিস্তানের কোন অজগ্রামের কথা বলছি না বরং বলছি ঢাকার কথা, যেখানে, আমি মনে করি সংসদের স্থান সংকুলানের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা আছে। যা হোক, আমার মনে হয় মনস্তাত্ত্বিক সুবিধা বাস্তব সমস্যাগুলোকে দূর করে দিবে। পূর্ব পাকিস্তানীদের মধ্যে এমন একটা মনোভাব সৃষ্টি হচ্ছে যে, পূর্ব পাকিস্তান অবহেলিত হচ্ছে এবং কেবলই পশ্চিম পাকিস্তানের একটি উপনবেশ হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। এই মনোভাব দূর করার জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছুই আমাদের করা দরকার। এই সংকীর্ণ প্রাদেশিকতার ব্যাপারটি অবশ্যই রাষ্ট্রের বিবেচনায় আনা দরকার। সত্য হোক আর অসত্য, কোন অঙ্গরাজ্যকে আমাদের এমন সুযোগ দেওয়া উচিত নয় যাতে তারা নিজেদের অবহেলিত বলে ভাবতে পারে। পশ্চিম পাকিস্তানী জনগনের সাথে আমি বহুদিন ধরে থেকেছি এবং আমি জানি, পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ সম্পর্কে পশ্চিম পাকিস্তানীরা জানে না বললেই চলে। সেজন্যই আমি বিশ্বাস করি যে বছরে অন্তত একটি মিটিং পূর্ব পাকিস্তানে হওয়া উচিৎ। বর্তমানে আমরা আরও বহুমূখী সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছি। সুতরাং, বর্তমানের জন্য এই সংসদের অধিবেশন কেবল পশ্চিম পাকিস্তানেই বসুক এবং পরবর্তীতে যখন এটি আইন পরিষদে পরিণত হবে তখন বছরে অন্তত একটি অধিবেশন পূর্ব পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত করা হোক।

 

 

——-

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<001.021.054>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

 

তারিখ সূত্র শিরোনাম
২৫শে ফেব্রুয়ারী ১৯৪৮ পাকিস্তান গণপরিষদ গণপরিষদের অধিবেশনে বাংলা ভাষাকে অন্তর্ভুক্তকরণের প্রশ্নে বির্তক

 

জনাব দ্বিরেন্দ্রনাথ দত্ত (পূর্ব পাকিস্তানঃ জেনারেল)ঃ

মহামান্য রাষ্ট্রপতি, জনাব, আমি প্রস্তাব করছিঃ

 

“বিধি ২৯ এর উপ-বিধি ১ এর ২য় লাইনে “ইংরেজি” শব্দটির পরে “ অথবা বাংলা” শব্দ সমূহ সংযুক্ত করা হোক”।

 

জনাব, আমি নিজের নামে এই প্রস্তাব করার ক্ষেত্রে এই কক্ষকে এটা নিশ্চিত করে বলতে পারি যে, আমি হীন প্রাদেশিকতায় একেবারেই আগ্রহ প্রকাশ করি না বরং এই মনোভাব পোষণ করি যেন এই কক্ষের সকল সদস্যসের কাছে এই প্রস্তাব পূর্ণ গ্রহণযোগ্যতা পায়। আমি জানি, বাংলা একটি প্রাদেশিক ভাষা, কিন্তু আমাদের রাষ্ট্রের পরিপ্রেক্ষিতে এটা রাষ্ট্রের অধিকাংশ মানুষের ভাষা। সুতরাং, যদিও এটা একটি প্রাদেশিক ভাষা তারপরেও এটা রাষ্ট্রের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষা হওয়ায় এর একটি আলাদা অবস্হান রইয়াছে। এই রাষ্ট্রে ছয় কোটি নব্বই লক্ষ লোকের বসবাস, যার মধ্যে চার কোটি চল্লিশ লক্ষ মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলেন। তাই জনাব, এই রাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় ভাষা কী হওয়া উচিত? এই রাষ্ট্রের রাষ্ট্রভাষা তাই হওয়া উচিত যা দেশের অধিকাংশ মানুষ ব্যবহার করে। সুতরাং, জনাব, এ কারণে আমি মনে করি বাংলা ভাষা হচ্ছে এই রাষ্ট্রের সর্বসাধারণের ভাষা।

 

আমি জানি জনাব, আমি আমার রাষ্ট্রের লক্ষ মানুষের ভাবানুভূতি তুলিয়া ধরছি। এরই সাথে আমি এই কক্ষকে জানাতে চাই, আমাদের দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ লক্ষ লক্ষ মানুষের অনুভূতি। এমনকি জনাব, পূর্ব পাকিস্তানে; যেখানে চার কোটি চল্লিশ লক্ষ মানুষের বসবাস; যারা কিনা বাংলায় কথা বলে তারা যদি ডাকঘরে যেয়ে মানি অর্ডার ফরম চায়, তখন সেখানে তারা দেখে যে ঐ মানি অর্ডারখানা উর্দুতে কিংবা ইংরেজিতে মুদ্রণ করা, বাংলায় না! জনাব, একজন গরীব চাষী; যার সন্তান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করছেন এবং তাকে যখন তিনি টাকা পাঠানোর জন্য ডাকঘরে যান তখন তিনি দেখেন যে মানি অর্ডার ফরমটি উর্দুতে মুদ্রিত। এমতাবস্হায়, টাকা না পাঠাতে পেরে তিনি দূরবর্তী শহরে ছুঁটে যান এবং ঐ উর্দু মানি অর্ডারখানা অনুবাদ করে তারপর তার সন্তানকে প্রয়োজনীয় টাকা পাঠান। একজন গরীব চাষী যখন কোন জমি বিক্রয় বা ক্রয় করেন; তখন তিনি স্ট্যাম্প বিক্রেতার নিকট যান এবং এর জন্য টাকা পরিশোধ করেন, তিনি বলিতে পারেন না স্ট্যাম্পে কী পরিমান মূল্য নির্ধারিত আছে কারণ এটাও ইংরেজি এবং উর্দুতে লেখা, বাংলায় না। আমাদের রাষ্ট্রের সাধারণ মানুষ এইসব সমস্যা ভোগ করছেন। একটি দেশে রাষ্ট্রীয় ভাষা এমন হওয়া উচিত যাহা কিনা দেশের সাধারণ মানুষের বোধগম্য হবে। এই দেশের সাধারণ জনসাধারণের (চার কোটি চল্লিশ লক্ষ) জন্য সংসদে এমন এক ভাষা নির্বাচিত করা হয়েছে যা তাদের অজানা। আম জানি ধারা ২৯ এ ইংরেজি ভাষা একটি সম্মানসূচক স্হান লাভ করেছে, কারণ এটি একটি আন্তর্জাতিক ভাষা।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<001.021.055>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

কিন্তু, জনাব, ইংরেজি যদি বিধি ২৯ এ এমন সম্মানসূচক অবস্হান পেতে পারে যে গণপরিষদের কার্যক্রম উর্দু কিংবা ইংরেজিতে পরিচালিত হতে হবে তাহলে চার কোটি চল্লিশ লক্ষ মানুষের ভাষা বাংলা কেন কার্যবিধি বিধিমালায় বিধি ২৯ এ সম্মানসূচক অবস্হান পাবে না, জনাব। জনাব, আমি জানি, আমি আমাদের রাষ্ট্রের বিপুল সংখ্যক মানুষের ভাবানুভূতি নিয়া কথা বলছি, সুতরাং বাংলাকে কেবল একটি প্রাদেশিক ভাষা হিসেবে বিবেচনা করা উচিত হবে না। এটাকে রাষ্ট্রীয় একটি ভাষা হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। এবং এই কারণে, জনাব, আমি অভিমত জানাচ্ছি যে, “ইংরেজি” শদটির পর “বাংলা” শব্দটি বিধি ২৯ এ সন্নিবিষ্ট করা হোক।

জনাব প্রেম হরি বর্ম (পূর্ব বাংলাঃ জেনারেল) জনাব, আমি অন্তরের অন্তঃস্হল হতে এই পরিবর্তনের পক্ষে আমার সম্মানিত এবং শ্রদ্ধাভাজন বন্ধু জনাব ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের বক্তব্যের সাথে একমত পোষণ করিতেছি। জনাব, এই পরিবর্তনের উদ্দেশ্য কোনভাবেই ইংরেজি এবং উর্দুকে পুরোপুরি বিতাড়িত করা নয়, বরং এর উদ্দেশ্য হচ্ছে গণপরিষদের পরিষদ সদস্যদের বক্ত্যব্যের একটি মাধ্যম হিসেবে বাংলা কে অন্তর্ভুক্ত করা।

সুতরাং, ইংরেজি অথবা উর্দুকে বিতাড়িত করা মোটেই এই সংশোধনীর উদ্দেশ্য নয় বরং বাংলাকেও এই রাষ্ট্রের একটি রাষ্ট্র ভাষা হিসেবে পাওয়াই এর উদ্দেশ্য। জনাব, আমার সম্মানিত বন্ধু ইতোমধ্যেই এই কক্ষে বলেছেন, পাকিস্তানের বেশিরভাগ মানুষ বাংলায় কথা বলে। এই কারণে, বাংলা কে অবশ্যই এমন একটি স্থান দিতে হবে যেন পরিষদের সদস্যরা গণপরিষদে বক্ত্যব্যের মাধ্যম হিসেবে বাংলা ব্যবহার করতে পারে। আরেকটি সমস্যা এই হবে যে, যদি কোন সদস্য পরিষদে তার মাতৃভাষায় ভাষণ দেন কিন্তু তা যদি পরিষদে ভাষণদানের গ্রহণযোগ্য মাধ্যম না হয় তাহলে প্রকৃত বক্ত্যব্য টি নথিভুক্ত হবে না বরং কেবলমাত্র এর একটি অনুবাদ নথিভুক্ত হবে। এই কারণে, এটা রাষ্ট্রের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জন্য জরুরী যে, যে বক্ত্যব গুলো বাংলায় প্রদত্ত হবে তা যেন বাংলাতেই নথিভুক্ত হয়। এই বক্ত্যব্যের মাধ্যমে আমি এই সংশোধনীতে মি. ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের সাথে সহমত পোষণ করছি।

জনাব লিয়াকত আলী খান (প্রধাণমন্ত্রী এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রী) মহামান্য রাষ্ট্রপতি, জনাব, আমি অত্যন্ত যত্ন এবং মনোযোগের সাথে সংশোধনী প্রস্তাব এর সম্মানিত উত্থাপনকারীর বক্ত্যব্য শুনেছি। আমি আশা করি, সম্মানিত সদস্য পাকিস্তানের ভিন্ন ভিন্ন অংশে ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টির জন্য এমন একটি প্রস্তাব উত্থাপন করেননি। আমার সম্মানিত বন্ধু বাকপটুতার মাধ্যমে বোঝাতে চেয়েছেন যে, বাংলা সত্যিকার অর্থেই পাকিস্থানের একটি রাষ্ট্রভাষা হওয়া উচিত। অন্যভাবে বলা যায়, তিনি বাংলাকে এই কক্ষে ব্যক্ত্যব্যের একটি মাধ্যম হিসেবেই শুধু চান না বরং তিনি এরচেয়েও বড় একটি প্রস্তাব তুলেছেন। তাহার উপলব্ধি করা উচিত, পাকিস্তান রাষ্ট্রের সৃস্টি হয়েছে এই উপমহাদেশের দশ কোটি মুসলমানের চাহিদার ভিত্তিতে, এবং এই দশ কোটি মুসলমানের ভাষা হচ্ছে উর্দু এবং এই কারণে, তার জন্য এমন একটা আবহ সৃষ্টি করা অন্যায় হবে যে, পাকিস্থানের অধিকাংশ মানুষ একটি বিশেষ অঞ্চলে বসবাস করে সুতরাং তাদের ভাষাই হবে পাকিস্থানের রাষ্ট্রভাষা। পাকিস্তান একটি মুসলিম রাষ্ট্র এবং এর রাষ্ট্রভাষা অবশ্যই হতে হবে একটি মুসলিম রাষ্ট্রের ভাষা। আমার সম্মানিত বন্ধু অসন্তুষ্ট যে উর্দু ইংরেজীকে প্রতিস্থাপিত করবে। বহু বছর ধরে চলে আসা পাকিস্থানের রাষ্ট্রভাষা ইংরেজী কে প্রতিস্থাপন করে উর্দু চালু করার উদ্যোগ এর বিরুদ্ধাচারণ করাই উনার অভিপ্রায়; যতদিন ইংরেজী ছিল রাষ্ট্রভাষা ততদিন আমার সম্মানিত বন্ধুর কোন অভিযোগ ছিল না, তখন তিনি বাংলা ভাষা কে প্রস্তাব করেননি। আমি গণপরিষদে বছরের পর বছর কখনো বাংলার মানুষের পক্ষ থেকে শুনি নাই যে, বাংলা পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা হওয়া উচিত। আমি জানতে চাই, কেন এই কথা আজ উত্তোলন করা হল এবং আমি দুঃখিত যে । আমরা বাংলার প্রয়োজনীয়তা সম্বন্ধে অবহিত। বাংলা থেকে বাংলা ভাষাকে বিতাড়িত করার মোটেও কোন অভিপ্রায় আমাদের নাই। প্রকৃতপক্ষে, এটা যেকারো পক্ষেই একটা অন্যায় হবে যদি কোন প্রদেশের জনগনের উপর অন্য এমন একটি ভাষা চাপিয়ে দেয়া হয় যা তাদের মাতৃভাষা নয় কিন্তু একই সাথে আমাদের একটি রাষ্ট্রভাষা থাকতে হবে যে ভাষা রাষ্ট্রের বিভিন্ন অংশের মধ্যে আন্তপ্রাদেশিক যোগাযোগের জন্য ব্যবহৃত হবে।

 

 

 

 

 

<001.021.056>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

 

আবার জনাব, আপনি শুধু জনসংখ্যা কে আমলে নিলেই হবে না। আরও অন্যান্য অনেক বিষয় আছে। উর্দু হচ্ছে একমাত্র ভাষা যা পূর্ব বাংলা বা পূর্বাঞ্চল এবং পশ্চিমাঞ্চলের জনগণকে কে একসুত্রে বেঁধে রাখতে পারে। এটা একটা জাতীর জন্য জরুরী যে তাদের একটি মাত্র ভাষা থাকবে এবং সেটা কেবল উর্দুই হতে পারে এবং উর্দু ছাড়া অন্য কোন ভাষাই নয়। অতএব জনাব, আমি দুঃখিত যে আমি আমি প্রস্তাবিত সংশোধনীটি সমর্থন করতে পারছি না। বস্তুত, যখন সংশোধনী বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়েছিল, আমি ভেবেছিলাম এর উদ্দেশ্য নিরীহ। বাংলা ভাষাকে সংযুক্ত করার উদ্দেশ্য ছিল, যারা ইংরেজী বা উর্দুতে দক্ষ নয় তারা যেন বাংলাতে তাদের মতামত প্রকাশ করতে পারে, কিন্তু এখন দেখছি উদ্দেশ্য টি এত নিরীহ কিছু না, যেমনটা আমি ভেবেছিলাম। এই সংশোধনীর উদ্দেশ্য পাকিস্থানের জনগণের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি। এই সংশোধনীর উদ্দেশ্য হচ্ছে মুসলমানদের কাছ থেকে তাদের ঐক্যবদ্ধ হবার সেই শক্তি টা কেড়ে নেয়া যা তাদের একত্রিত রাখে।

 

জনাব ভূপেন্দ্র কুমার দত্ত (পূর্ব বাংলাঃ সাধারণ): জনাব, আমারা বিরোধীতার কোন বাজে উদ্দেশ্য নিয়ে এই সংশোধনীর উপর জোর দেয় নি। আমি এই কক্ষের সম্মানিত সদস্যের সদ্য প্রদত্ত বক্তব্যে বিস্মিত। উনি এমন কিছু মন্তব্য করেছেন যা আমি আশাই কর নি যে উনি করবেন। এটা অন্যত্র এমনকি পাকিস্থানের অভ্যন্তরে কিছু নির্দিষ্ট অংশে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে। অতএব, একারনেই এই সংশোধনী টি হওয়া আরও বেশী জরুরী। আমি প্রায়শই দেশের যে অংশে আমার নিবাস সেখানে যাতায়াত করি এবং আমি জানি এই বিষয়ে অনুভূতির তীব্রতা আমি জানি। বাংলা সেখনে অধিকাংশ মানুষের ভাষা, এটা সেখানকার একমাত্র ভাষা যা সেখানে কথিত এবং বোধগম্য। এটা সমগ্র পাকিস্তানেরও ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষা। আমি এই কক্ষে প্রায়শই লক্ষ্য করি যে, এখানে অন্য ইউনিয়নটির (ভারতের) কোন কাজের সাথে তুলনা বা তাদের অনুকরণের একটা প্রবণতা রয়েছে। এমনকি গতকালই যখন আসন পুনঃবন্টনের কথা হচ্ছিল, তখন আমার বন্ধু জনাব দত্ত কে বাঁধা দিয়ে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, “ভারতে কি হচ্ছে”। কিন্তু এই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারটিতে এর ব্যত্যয় ঘটেছে। ভারতে সমগ্র জনসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের ভাষাকে গ্রহণ করা হয়েছে।

 

সমাবেত কন্ঠেঃ প্রশ্ন, প্রশ্ন।

জনাব ভূপেন্দ্র কুমার দত্ত: কিন্তু এখানে আমাকে উর্দু কে গ্রহণ করছি। উর্দু পাকিস্থানের কোন প্রদেশের ই ভাষা না। এটা পশ্চিম পাকিস্থানের কিছু উচ্চবর্গীয় মানুষের ভাষা। এই সংশোধনীর বিরোধিতা পশ্চিম পাকিস্থানের উচ্চবর্গীয় মানুষদের পাকিস্থান কে নিয়ন্ত্রন করার দৃঢ় অভিপ্রায়ই প্রমাণ করে…

এটা নিশ্চিতভাবেই কোন গণতান্ত্রিক মনোভাব না; এটা রাষ্ট্রটির একটি নির্দিষ্ট অংশের উচ্চবর্গীয় কিছু মানুষের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার মনোভাব। আমরা এখন পর্যন্ত এটাকে পাকিস্থানের মিশ্র ভাষা করার দাবী করি নি। আমরা কেবল এটাকে এখানে গ্রহণযোগ্য তিনটি ভাষার একটি হিসেবে অনুমোদনের দাবী করছি। এমনকি আমি এখন যে ভাষায় কথা বলছি, যা আমাদের সাথে দাসত্বের স্মারক হিসেবে রয়ে গেছে, সেই ইংরেজী ভাষা একটা মর্যাদাপূর্ণ স্থান পেলেও এটা সাধারণ মানুষের তথা সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ মানুষের ভাষা না। আফসোস…

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<001.021.057>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

 

মাননীয় খাজা নাজিমুদ্দিন (পূর্ব বাংলা: মুসলিম): জনাব, আমি মনে করি বাংলা ভাষা প্রশ্নে পূর্ব পাকিস্থানের ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মনোভাব এই কক্ষে উপস্থাপন করা আমার দায়িত্ব। আমি মনে করি, এবিষয়ে কোন দ্বিমত হবে না যদি আমি বলি যে, প্রদেশগুলোর মধ্যে আভ্যন্তরীণ যোগাযোগ এবং কেন্দ্রের সাথে যোগাযোগের ক্ষেত্রে তারা মনে করে যে উর্দুই একমাত্র ভাষা যা গ্রহণ করা সম্ভব। কিন্তু এব্যাপারে খুব শক্তিশালী একটা মনোভাব আছে যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এবং প্রাদেশিক প্রশাসনের ক্ষেত্রে ভাষা হতে হবে বাংলা। এটা জেনে আনন্দিত যে, এই কক্ষের সম্মানিত নেতা এটা স্পষ্ট করেছেন যে, প্রদেশটি থেকে বাংলা উৎখাতের কোন প্রশ্নই উঠে না এবং আমি নিশ্চিত ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ উর্দু কে সামগ্রিক ভাবে পাকিস্থানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে মেনে নেবার পক্ষে। আরেকটি বিষয় আমি ঠিক করে দিতে চাই। পূর্ববর্তী বক্ত্যারা যারা এই সংশোধনীর পক্ষ নিয়েছেন, তারা দৃষ্টান্ত দিয়েছেন যে অপর রাষ্ট্রটিতে অধিকাংশ মানুষের ভাষা হচ্ছে হিন্দি। যেটা আমি মনে করি, সঠিক নয়। মাদ্রাস, বোম্বে, সিপির বহির্ভাগ, উড়িষ্যা এসব প্রদেশের মাতৃভাষা হিন্দি না। আমি মনে করি, আমি এটাও বলতে পারি যে উত্তরপ্রদেশের (ইউপি) অধিকাংশ মানুষ উর্দু তে কথা বলে এবং যারা হিন্দি সমর্থন করেছিল তারা সমাবেশে অথবা জনসভায় হিন্দিতে অনর্গল বক্তৃতা দিতে যথেষ্ট সম্যস্যার সম্মুক্ষীন হন। সুতরাং, হিন্দি ভারতের সকল প্রদেশের মাতৃভাষা না, তারপরেও হিন্দি ভারতের রাষ্ট্র ভাষা হিসেবে গৃহীত হয়েছে। সুতরাং জনাব, সেই তুলনা থেকে থেকে এই তত্ত্ব সমর্থনের কোন ভিত্তি ই নাই যে বাংলা হবে পাকিস্থানের রাষ্ট্রভাষা, তবে বাংলা প্রদেশের ভাষা প্রসঙ্গটি আমি গভীর ভাবে উপলব্ধি করতে পারি। আমি যথাসময়ে প্রস্তাব টি উত্থাপন করব যে, সাধারণ প্রশাসন এবং সরকারী কার্যক্রমের ক্ষেত্রে বাংলার অভ্যন্তরে যেন বাংলা ভাষা ব্যাবহৃত হয়।

 

জনাব শ্রীস চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের (পূর্ব বাংলাঃ সাধারণ): মহামান্য রাস্ত্রপতি, জনাব, এটা আমাকে ব্যাথীত করে যখন এই কক্ষের মাননীয় নেতা বলেন যে পাকিস্থান একটি মুসলিম রাষ্ট্র। এতদিন আমি ভাবতাম, পাকিস্থান এর জনগণের রাষ্ট্র এবং এটা যতটা মুসলিমদের ততটাই অমুসলিমদেরও। আজকে যদি মাননীয় সংসদ নেতার এই বক্ত্যব্য গৃহীত হয় তবে এই রাষ্ট্রের অমুসলিমদের জন্য এটা যথেষ্ট উদ্বেগের বিষয় হবে যে তাদের আদৌ রাষ্ট্রের সংবিধান গঠনের কোন অধিকার আছে কি না। এই প্রশ্নটি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ কারন সেক্ষেত্রে প্রত্যাশিত ভাবেই কেবল মাত্র মুসলিমরা তাদের নিজস্ব সংবিধান গঠন করবে। আমি ইতিমধ্যেই আমার বক্ত্যব্যে এবং এই কক্ষে আপনাদের বলেছি যে, আমি এদেশের আমার অংশের মানুষদের বলেছি; পাকিস্থান কেবলমাত্র একটি মুসলিম রাষ্ট্র নয় বরং এটা মুসলিম এবং অমুসলিম নির্বিশেষে সকলের রাষ্ট্র, এটা জনগণের রাষ্ট্র। এই ব্যাপারটি আমি আশা করি মাননীয় সংসদ নেতা স্পষ্ট করবেন যেন ভবিষ্যতে আমরা আমাদের কার্যপ্রণালী স্থির করতে পারি এবং এই রাষ্ট্রে আমাদের অবস্থান নিশ্চিত হতে পারি।

এই সংশোধনীতে যা আছে তা কখনই রাষ্ট্র ভাষা সম্পর্কে বলেনি, কিভাবে এই কক্ষের কার্যক্রম পরিচালিত হবে উল্লেখ করেনি। এখানে উর্দুর এবং ইংরেজীর কথা বলা আছে। আমরা কেবল বাংলা সংযুক্ত করতে চাই।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<001.021.058>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

 

যদি সংসদীয় কক্ষ এটা সমর্থন করে তাহলে বেশ ভাল কিন্তু রাষ্ট্র ভাষা আজকের প্রস্তাবনার বিষয় নয়, উর্দুকেও যদি রাষ্ট্র ভাষা হিসেবে নির্ধারণ করা হয় তা মেনে নিতে আমার কোন আপত্তি নাই কিন্তু কেউ উর্দু জানে না। আমরা ইংরেজী শিখেছিলাম এবং প্রয়োজন হলে আমরা এখন উর্দু শিখব।

 

আমি নিজে আমার সম্মানিত বন্ধু জনাব তমিজুদ্দিন আহমেদ সাহেবের সাথে জেলে থাকার সময় উর্দু শেখার চেষ্টা করেছি, কিন্তু জেল থেকে বেরিয়ে আমি ভুলে গেছি। (হাসি) সুতরাং সংসদীয় কক্ষের কার্যকলাপ পরিচালনার ভাষা নির্ধারণ করা, রাষ্ট্রভাষা নির্ধারণের চেয়ে বেশ একটা ভিন্ন ব্যাপার। তার সংশোধনীর বিষয় হচ্ছে কিভাবে এই সংসদের কার্যকলাপ পরিচালিত হবে। উর্দু, ইংরেজী অথবা বাংলায়? এটাই একমাত্র বিষয় যা এই সংশোধনীতে উত্থাপন করা হয়েছে এবং আমি নিশ্চিত যে এই সংশোধনী প্রস্তাব উত্থাপন করে তিনি সম্মানিত সংসদ নেতার বিরাগভাজন হবার মত কিছু করেননি। এই বক্ত্যব্যের সাথে আমি সংশোধনীটি সমর্থন করেছি……………

 

জনাব তমিজুদ্দিন খানঃ জনাব, আমার সম্মানিত বন্ধু জনাব দত্ত সাহেবের উত্থাপিত সংশোধনীর বিরুদ্ধে যা কিছু বলা হয়েছে তার সাথে আমার খুব সামান্যই যোগ করার আছে। একটা কথা যা কংগ্রেস পার্টির সম্মানিত ভারপ্রাপ্ত নেতা বলেছেন তা আমার কাছে কিছুটা তাৎপর্যপূর্ণ মনে হয়েছে। তিনি বলেছেন যে, সংসদের সম্মানিত নেতা তার ভাষণে উল্লেখ করেছেন যে, এটি একটি মুসলিম রাষ্ট্র এবং তার দুশ্চিন্তা এই যে যদি তাই হয় তাহলে সংখ্যালঘুদের অবস্থান কোথায়। এই প্রসঙ্গে আপনি জনাব একদম প্রথম দিনেই এটা স্পষ্ট করেছেন এবং এযাবত, আরো হাজারো অবস্থান থেকে এটা পরিষ্কার করা হয়েছে যে পাকিস্থানের সকল সংখ্যালঘু সম্প্রদায় সংখ্যাগরিষ্ঠদের সাথে সমঅধিকার ভোগ করবে। সংখ্যাগরিষ্ঠদের যে অধিকার আছে তাদেরও ঠিক সেই অধিকারই থাকবে। আমার বিশ্বাস সেই অবস্থান এখনও অটুট আছে। মাননীয় সংসদ নেতা পাকিস্থানকে একটি মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে অভিহিত করেছেন। ভারতে এমন মানুষ আছে যারা ভারতকে হিন্দুরাষ্ট্র বলে। আমরা তুরস্ক আর মিশরকেও মুসলিম রাষ্ট্র বলি। কিন্তু এর মানে কি এই যে সেইসব দেশে কোন অমুসলিম নেই? এখন পর্যন্ত আমেরিকায় সকল ভারতীয়কে হিন্দু, মুসলিম, পার্সি অথবা খ্রীষ্টান নির্বিশেষে হিন্দু বলা হয়। কোন কিছুর বৈশিষ্ট এর নামের উপর নির্ভর করে না। এটা একদমই পরিষ্কার যে পাকিস্থানের প্রতি অনুগত পাকিস্থানের যেকোন নাগরিকের অনুরূপ অধিকার এবং সুযোগ আছে। আর অন্য প্রসঙ্গে এযাবত যা বলা হয়েছে তার বাইরে আমার আর কিছু বলার নাই। জনাব, আমি সংশোধনী টি গ্রহণ করতে পারছি না।

 

রাস্ত্রপতি মহোদয়ঃ আলোচ্য প্রস্তাবনাটি হচ্ছেঃ “বিধি ২৯ এর উপবিধি ১ এ “ইংরেজী” শব্দটির পর দ্বিতীয় পঙ্কতিতে “বংলা” শব্দটি সংযুক্ত হোক”।

 

“না” জয়যুক্ত হয়েছে।

 

 

* বক্তব্য মাননীয় সদস্য কর্তৃক সংশোধিত হয়নি।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<001.022.059>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
প্রথম জাতীয় বাজেট আলোচনাকালে পূর্ব বাংলার দাবিদাওয়ার প্রশ্নে বিতর্ক।

পাকিস্থান গণপরিষদ

(আইনসভা)

১লা মার্চ, ১৯৪৮

 

জাতীয় বাজেট আলোচনা

পাকিস্থান গণপরিষদ(আইনসভা)

১লা মার্চ, ১৯৪৮

পাকিস্থান গণপরিষদ(আইনসভা)বিতর্ক

১৯৪৮ এর খন্ড ১

 

অধ্যাপক রাজকুমার চক্রবর্তী (পূর্ব বাংলা: সাধারণ): জনাব, আমি জনাব অর্থ সদস্যকে অভিবাদন জানাই তার প্রশংসনীয় বক্ত্যব্যের সাথে জাতীয় সংসদে বাজেট পেশ করার জন্য। এটা ছিল পাকিস্থানের প্রতি আবেগ ও অনুভূতিতে পরিপূর্ণ যা আমরা সকলেই ধারন করি। আমরা সম্মানিত অর্থমন্ত্রীর কাছ থেকে নিশ্চয়তা পেয়েছি যে, পরিহার্য কোন খাতে একটি পয়সাও খরচ করা হবে না। আমরা আরও জানতে পেরেছি যে, ভবিষ্যতের সকল ব্যায়ের জন্য তার অর্থ বিভাগের একান্ত মূলনীতি হবে অপরিহার্যতা।

 

জনাব, পাকিস্তান সরকারের প্রথম বাজেট উপস্থাপনে তার সমস্যার ব্যাপারটি আমরাও অনুধাবন করি যেমনটা তিনি বলেছেন যে আমরা প্রায় গোড়া থেকে শুরু করছি এবং আমাদের পাকিস্থানের যথাযোগ্য ভবিষ্যৎ বিনির্মাণ করতে হবে। কিন্তু জনাব, আমি তাকে তার বাজেটের বিষয়বস্তু এবং তিনি যেভাবে এই সংসদে বাজেট উপস্থাপন করেছেন তার জন্য অভিবাদন জানতে পারছি না। বাজেটে বাস্তবতাবোধের ঘাটতি রয়েছে। আমি আরও বলতে চাই যে চূড়ান্ত স্বদিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও তিনি সম্পূর্ণভাবে বাজেট উপস্থাপনের পুরানো, সেকেলে পন্থা পরিহার করতে পারেননি। বাজেটটি হওয়া উচিত ছিল একটি ঘাটতি বাজেট কিন্তু তিনি এটিকে একটি উদ্বৃত্ত বাজেট হিসেবে দেখিয়েছেন এবং তাও আবার দরিদ্র, সাধারণ মানুষের স্বার্থের বিনিময়ে। জনাব, একটা বাজেটের সার্থকতা এতে নয় যে, এটি ঘাটতি কিংবা উদ্বৃত্ত বাজেট কি না। বাজেটের সার্থকতা এতে যে, এটা বৃহত্তর জনগণের জন্য বৃহত্তম কল্যাণের পথ সূচিত করে কি না, এর মধ্যে সাধারণ মানুষের জন্য কিছু আছে কিনা এবং সেই আলোকে এই বাজেটটি কোন সফল বাজেট নয়। জনাব, সম্মানিত অর্থ সদস্য দরিদ্র মানুষের লবণের উপর কর বজায় রেখেছেন, যা তাদের অতি প্রয়োজনীয় নিত্য ব্যবহার্য পণ্য। তিনি হুক্কার তামাক, যেটা দরিদ্র মানুষের জীবনের একমাত্র সান্ত্বনা, এর উপর আবগারি শুল্ক বৃদ্ধি করেছেন, তিনি সুপরীর উপর আরগারি শুল্ক বৃদ্ধি করেছেন যেটা সাধারণ মানুষের আরেকটি আনন্দের উপষঙ্গ। তিনি আভ্যন্তরীণ পোষ্টকার্ডের উপর মুল্যহার বৃদ্ধি করেছেন যা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। এদেশের ৯৯ শতাংশ মানুষ কেরোসিন ছাড়া চলতে পারে না এবং তাদের ঘরে বিদ্যুত নেই এটা জেনেও তিনি কেরোসিন এর উপর মাশুল বৃদ্ধি করেছেন। তিনি তৃতীয় শ্রেণীর রেলভাড়া বৃদ্ধি করেছেন এটা জানা সত্ত্বেও যে, তৃতীয় শ্রেনীর রেলযাত্রা আর যাই হোক আরামদায়ক না। তিনি দরিদ্র সাধারণ মানুষকে যে কোন স্বস্তি দেননি শুধু তাই না, তিনি তাদের রীতিমত আহত করেছেন, এমনকি ছুড়ে ফেলেছেন। তিনি যে বাজেট প্রস্তাব করেছেন তাতে দরিদ্র মানুষ করের বোঝায় বছরজুড়ে ওষ্ঠাগত হবে। জনাব, তিনি একটি পুরানো প্রথাগত আমলাতান্ত্রিক বাজেট পেশ করেছেন।

 

 

 

 

 

 

 

<001.022.060>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

 

তিনি সার্বিক পরিস্থিতির উপর সূক্ষ নজর দেননি বললেই চলে। তিনি জীবনের কোন ক্ষেত্রেই কার্যকরী নতুন কিছু উপস্থাপন করেননি, তা শিক্ষা, চিকিৎসা বা শিল্প কারখানা যাই হোক হোক না কেন, অথচ আমাদের প্রতিশ্রুতির পর প্রতিশ্রুতি দেয়ে গেছেন কিন্তু তা পূরণ করেননি। তিনি বলেছেন যে, তিনি একটি উন্নয়ন পর্ষদ গঠন করেছেন অথচ এই পর্ষদ এখন পর্যন্ত কোন উন্নয়ন সাধন করেনি। তিনি বলেছেন যে, তিনি একটি পরিকল্পনা উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করেছেন অথচ এই পরিষদ এখন পর্যন্ত কোন পরিকল্পনা গঠন করে নি, তিনি প্রস্তাব করেছেন যে, তিনি একটি শিল্প বিনিয়োগ কর্পোরেশন গড়ে তুলবেন অথচ এখনও এর বাস্তবায়ন হয় নি। তিনি বলেছেন যে, তিনি একটি শিল্প গবেষণা সংস্থা গড়ে তুলবেন অথচ তা এখনও বিবেচনাধীন, সুতরাং জনাব, এই বাজেট হচ্ছে একটি জল্পনা-কল্পনার বাজেট যার প্রকৃত কার্যক্ষমতা যৎসামান্যই। স্বাধীন পাকিস্থান প্রতিষ্ঠিত হবার পর তিনি ৬ মাস পার করেছেন অথচ আমাকে আফসোসের সাথে বলতে হচ্ছে, এর মধ্যে তিনি দৃশ্যমান পরিকল্পনা মাফিক কোন কিছুই করেননি যেখানে, পরিকল্পনার মূলমন্ত্রই হছে সময়। তিনি উল্লেখ করেছেন এবং আমরা সকলেও জানি যে, এই উপমহাদেশের ৭০ শতাংশেরও বেশী পাটজাত পণ্য পাকিস্থানে উৎপন্ন হয় অথচ পাকিস্থানে সেই মানের কোন পাটকল নাই। এ ব্যাপারে তিনি যে কিছু করেননি শুধু তাই না, তিনি পূর্ব পাকিস্তানের পাট উৎপাদন মোকাবিলা করার মত গঠনমূলক কোন পদক্ষেপও নেননি। তিনি বলেছেন এবং আপনারা সবাই জানেন পাকিস্তানে কিছু তুলা কারখানা আছে এবং পাকিস্থানে ব্যপক পরিমানে উন্নতমানের তুলা উদপাদিত হয়। আমি আশা করেছিলাম তিনি তুলা কারখানা প্রতিষ্ঠা বা তুলা কারখানার সংখ্যা বাড়ানোর জন্য কিছু করবেন যাতে আমদের সম্পদের অধিকতর সদব্যাবহার নিশ্চিত হয়। জনাব, বাজেটের উপর এই হল আমার প্রাথমিক অভিমত। বাজেটের পরবর্তী যে ব্যাপারে আমার আপত্তি আছে তা হল প্রাদেশিক সরকারের অধিকারের উপর অন্যায্য হস্তক্ষেপ। তিনি পরবর্তীতে প্রদেশসমূহ থেকে ভূসম্পদ শুল্ক আদায়ের প্রস্তাব করেছেন। জনাব, এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু সমস্যার জন্ম দেবে, এবং আমি মনে করি এই সংসদে প্রাদেশিক সরকারের পক্ষ থেকে, প্রাদেশিক ব্যাবস্থার কেন্দ্রের এই অনধিকার হস্তক্ষেপের প্রতিবাদ করা আমার দায়িত্ব। জনাব, আমরা পাকিস্থানের স্বায়ত্তশাসিত রাষ্ট্রসমূহের একটি রাষ্ট্রসংঘ পেতে চলেছি এবং মাননীয় অর্থমন্ত্রীর এই করারোপ প্রস্তাব সেই রাষ্ট্রীয় স্বায়ত্তশাসনের নাভিমূলে আঘাত করেছে যা আমরা কোনভাবেই সন্তোষজনক ভাবে এবং স্বস্তির সাথে দেখতে পারি না। এই মর্মে আমি কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করতে চাই যে, তারা যদি এভাবে অযাচিত হস্তক্ষেপ করতে থাকে তাহলে প্রাদেশিক সরকার এইসব উদ্যোগকে মাননীয় অর্থমন্ত্রীয় পদযাত্রার প্রথম পদক্ষেই হিসেবে দেখবে এবং আমি আশা করি তিনি তা বিবেচনা করবেন……

 

জনাব আবুল মাতিন চৌধুরী (পূর্ব বাংলাঃ মুসলিম): জনাব, আমি মাননীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রী কে পাকিস্থান সেনাবাহিনীর জাতীয়করণে তিনি ইতিমধ্যে যেসব পদক্ষেপ নিয়েছেন সেসবের জন্যে অভিনন্দন জানাই কিন্তু তার প্রতি আমার কিছু পরামর্শ আছে। জনাব, পাকিস্থানের সেনা, নৌ এবং বিমান বাহিনীর কর্মকর্তা পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে জনাবের উচিত যথাযথ নজর দেয়া যেন পূর্ব পাকিস্থানের প্রয়োজনীয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়। প্রতিরক্ষা, জনাব, দেশের রাষ্ট্রের সকল নাগরিকের সমান কর্তব্য এবং পূর্ব পাকিস্থানের লক্ষ লক্ষ মানুষের মধ্যে থেকে কর্মকর্তা পদে নিয়োগের জন্য যোগ্য প্রার্থীর কোন অভাব নাই। আমি যখন পূর্ব পাকিস্থানের কথা বলি তখন প্রদেশপ্রিতী থেকে বলি না। জনাব, আমি এই দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করি যে, পাকিস্থান রাষ্ট্রের স্বার্থ কোন খণ্ডিত, গন্ডিবদ্ধ অথবা প্রাদেশিক অন্যান্য সকল স্বার্থের ঊর্ধ্বে এবং আমাদের সকলের উচিত জীবনের সকল ক্ষেত্রে সংহতি বিনাশী মনোভাব অবদমিত রাখা যদি আমরা একটি সুসঙ্ঘত এবং সমজাতিক রাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকতে চাই কিন্তু জনাব, এর জন্য দেশের অন্য অংশটির ক্ষোভ থেকে উদ্ভূত উন্নাসিকতাকে এক্ষেত্রে নিবারণ করতে হবে এবং এই অংশের অবস্থা সম্পর্কে আমদের সকলেরই বিশেষ জ্ঞান আছে।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<001.022.061>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

 

জনাব, পূর্ব পাকিস্থান সৌভাগ্যবান যে এর বিশাল একটি জনগোষ্ঠী সমুদ্রে চলাচলকারী যারা সিলেট, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, কুমিল্লা, ঢাকা, ময়মনসিংহ এবং ফরিদপুর জেলা সমূহে বসবাস করে। বহুবছর ধরে এইসব জেলা কোলকাতা, বোম্বে এমনকি মোম্বাসা বন্দরের সমুদ্রগামী যানের জন্য নাবিক সরবরাহ করে আসছে। আমি আশা করি জনাব, নৌবাহিনীর প্রশিক্ষণে এইসব মানুষের দক্ষতার সর্বোচ্চ সদব্যাবহার করা হবে। জনাব, আমি মনে করি করাচিতে প্রশিক্ষণালয় স্থাপন নৌবাহিনীর প্রশিক্ষণে আমাদের সর্বোচ্চ সামর্থ্য ব্যাবহারের ক্ষেত্রে একটি অন্তরায়। আমি আশা করি জনাব, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এই ব্যাপারগুলো বিবেচনায় রাখবে।

 

জনাব আজিজুদ্দিন আহমেদ (পূর্ব বাংলাঃ মুসলিম): জনাব, এটা খুবই সত্য যে পাকিস্থানের বর্তমান অবস্থানে এর একটি বিশাল প্রতিরক্ষা বাহিনী এবং একটি শক্তিশালী সেনাবাহিনী প্রয়োজন কিন্তু জনাব, আমি যখন বাজেটের দিকে তাকাই তখন দেখি যে পাকিস্তানের বিচ্ছিন্ন অংশ পূর্ব বাংলার সুরক্ষার জন্য কোন উদ্যোগই নেয়া হয়নি যেখানে পূর্ব বাংলা তিন দিক থেকে ভিন্নরাষ্ট্র এবং একদিক থেকে সমুদ্র প্রতিবেষ্টিত। আমি খুবই আশাহত হয়েছি।

জনাব, এটা আগেই বলা হয়েছে যে একসময় বাংলা ছিল অবহেলিত, ইতিপূর্বে একদিন আমার সম্মানিত সহকর্মী বেগম শায়েস্তা ইকারামুল্লাহ বলেছেন, ইদানীং বাংলাকে নিয়ে যদি কিছু বলাও হয় তা যেন দাক্ষিণ্য করে বলা হচ্ছে। জনাব, এখনকার পরিকল্পনা দেখে তাই মনে হচ্ছে। পূর্ব বাংলা অতিশয় অবহেলিত। আমাদের বন্ধুরা যারা এখনে সিন্দ, উত্তরপশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ, বালুচস্থান এবং পাঞ্জাবের নিশ্ছিদ্র অঞ্চলে আছেন, তারা পাকিস্তানের এই অংশ থেকে ১,৫০০ মেইল দূরে অবস্থিত তিনদিক থেকে বিদেশী রাষ্ট্র, যাদের মধ্যে কখনো কখনো শত্রুভাবাপন্ন রাষ্ট্রও রয়েছে, এবং এক দিক থেকে সমুদ্র বেষ্টিত পূর্ব বাংলা সম্পর্কে যথেষ্ট সময় দেন না বা ভাবেন না বলেই মনে হয়। জনাব, আমি জানি না আমার সম্মানিত বন্ধু মাননীয় অর্থমন্ত্রীর এ বিষয়ে কি বক্তব্য-এটা হয়ত পূর্ব বাংলাকে সুরক্ষার জন্য রাষ্ট্রীয় কোন গোপন সূত্র! কিন্তু জনাব, জনগণকে আশ্বস্ত করা দরকার যে, অন্য কারও পক্ষে পূর্ব পাকিস্থানে সহিংসতা ঘটানো অথবা আঘাত হানার কোন অবকাশ নাই। সুতরাং জনাব, বাজেটের এই অংশ আমাদের পূর্ব বাংলার জনগণের জন্য অত্যন্ত হতাশাব্যাঞ্জক। উপরন্তু জনাব, পাকিস্তানে প্রচুর পরিমানে রাজস্ব আসে পাটের উপর শুল্ক থেকে কিন্তু জনাব, বর্তমান বাজেটে আমরা চট্টগ্রাম বন্দরের উন্নয়নের কোনধরনের কোন বিধানই খুজে পাই নি যাতে করে এই পণ্যের উপর আমাদের শুল্ক আরও বাড়ানো যায়। সেখানে জাহাজঘাট গুলোর ব্যাপক উন্নয়ন দরকার কিন্তু আমি মনে করি জনাব, আমাদের অর্থ ভান্ডারে আরও রাজস্ব যোগ করার জন্য চট্টগ্রাম এবং পাট রপ্তানীতে এর উন্নয়নের গুরুত্ব মাননীয় অর্থমন্ত্রী বেমালুম ভুলে গেছেন। তার উপর জনাব, যারা পাট উৎপাদন করেন সেই সব মানুষের ভাগ্যের উন্নয়নেরই বা কি অবকাশ রাখা হয়েছে? তাদের জীবনের একমাত্র আয়েশ হল হুক্কা। তাদের কোন প্রেক্ষাগৃহ নাই, নাট্যমঞ্চ নাই, অবকাশ কেন্দ্র নাই; তাদের জীবনের একমাত্র বিনোদন যে হুক্কা তার উপরেও করারোপ করা হয়েছে…এছাড়াও আরেকটি জিনিস যা দরিদ্র চাষিরা উপভোগ করে তা হল পান। যার উপরেও জনাব ব্যাপক শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছে যাতে দরিদ্র মানুষের জীবন নিতান্তই অসহনীয় হয়ে উঠেছে। দরিদ্র মানুষেরা ইতিমধ্যেই কেরোসিনের প্রাপ্তি নিয়ে ঝামেলায় আছেন, এরমধ্যে কেরোসিনের উপর ভারী করারোপ তাদের সঙ্কট আরও বাডিয়ে দিয়েছে……

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<001.022.062>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

 

 

তারপর আবার জনাব, পূর্ব পাকিস্থানে কোন বস্ত্র কারখানার জন্য কোন ধরনের বরাদ্দ নেই। সম্ভবত ১,৫০০ মাইল দূরে এখানে বসে মাননীয় অর্থমন্ত্রী এই তথ্য সংগ্রহ করেননি যে, পূর্ব পাকিস্থানের দরিদ্র মানুষ বস্ত্রের অভাবে ভুগছে। যাইহোক, আমার বন্ধু খাজা নাজিমুদ্দিন দরিদ্র মানুষদের জন্য দোয়া প্রার্থনা করতে পারেন এবং শুভকামনা করতে পারেন এবং পূর্ব বাংলার অর্থমন্ত্রী জনাব হামিদুল হক চৌধুরী নিজের ব্যর্থতার ব্যাপারে বলতে পারেন অথবা অন্যের উপর দোষ চাপাতে পারেন যে, গ্রামের মানুষের জন্য বস্ত্র সরবরাহ অন্য কারও দায়িত্ব কিন্তু এর মধ্যে বাস্তবতা হল সাধারণ মানুষের কাপড়ের অভাবে বিবস্ত্র হবার দশা। জনাব, পাকিস্থান সৃষ্টির আগে সাধারণ মানুষের সমস্যা যদি থেকে থাকে তবে তা এখন আরও প্রকট হয়েছে, এইসব মানুষের কোন শিক্ষা নাই, বাজেটে তাদের শিক্ষার ব্যাবস্থা করার জন্য কোন বরাদ্দও নেই, এই অবস্থায় তারা পাকিস্থানকেই দোষারোপ করবে যদি তাদের এখন বিবস্ত্রও হতে হয়, যদি তাদের লজ্জা নিবারণের জন্য পোশাক না থাকে, যদি তাদের মরদেহ দাফনের জন্য কাপড় না থাকে। পূর্ব পাকিস্থানে এমন ঘটনাও ঘটেছে যে কাপড়ের অভাবে মৃতদেহ কে বিবস্ত্র অবস্থায় দাফন করা হয়েছে। সুতরাং আমি মনে করি, মাননীয় অর্থমন্ত্রীর বাজেটের এই অংশটিও হতাশাজনক কারণ বাজেটে পূর্ব পাকিস্থানে কিছু বস্ত্রকল চালু করে আমাদের অতিরিক্ত কিছু কাপড়ের যোগান দেবার জন্য কোন বরাদ্দ রাখা নেই। জনাব, আমি আনন্দিত যে, আপনি চুরুট এবং সিগারেট ও মোটরযান এবং বেতারযন্ত্রের উপর করারোপ করেছেন, কিন্তু আমি মনে করি আপনি দরিদ্র সাধারণ মানুষের দুর্দশা আরও লাঘব করতে পারতেন যদি চক্রযান এবং দ্বিচক্রযানের উপরেও করারোপ করতেন। জনাব, বাংলায় আমাদের চক্রযান এবং রিক্সা আছে, জনাব, আমি মাননীয় অর্থমন্ত্রী কে অনুরোধ করব যেন তিনি এই করকে কেন্দ্রীয় সম্পদে পরিণত না করে চক্রযানের উপর করারোপ করেন। নিদেনপক্ষে, আমার পূর্ব বাংলা বন্ধুরা তাদের বিক্রয় করের অংশ হারিয়েছেন………।

 

মাননীয় জনাব লিয়াকত আলী খানঃ না জনাব, আপনারা তা হারাননি। আপনারা সবকিছুই ফিরে পাবেন।

 

জনাব আজিজুদ্দিন আহমেদঃ কিন্তু জনাব, ক্ষতিপূরণ এতই সামান্য যে তা গুরু মেরে জুতাদানের সামিল। সুতরাং জনাব, যদি বিক্রয় কর কেন্দ্রের হাতে চলে যায়, আয়করও চলে যায় যা ইতিমধ্যেই প্রদেশের মধ্যে থাকত না, এবং যদি কৃষিজ আয় করও কেন্দ্রের কাছে চলে যায় তাহলে দরিদ্র মানুষের ভ্যাগের উন্নয়নের জন্য কি ই বা আর করার থাকবে, সম্ভবত প্রাদেশিক সরকারের কাছে করারোপের জন্য আর কোন উপাদান ই বাকী থাকবে না।

 

জনাব গিয়াসউদ্দিন পাঠান (পূর্ব বাংলাঃ মুসলিম): জনাব, মাননীয় প্রতিরক্ষা কে প্রতিরক্ষা ব্যাবস্থাকে শক্তিশালী এবং পুনর্গঠিত করায় তার সৎ প্রচেষ্টার জন্য আমার আন্তরিক সাধুবাদ জানানোর পাশাপাশি আমি কিছু বিষয়ে তার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। এতে কোন সন্দেহ নাই নতুন অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে পাকিস্থানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে পুনর্গঠন এবং শক্তিশালী করা অত্যন্ত প্রয়োজন। বলাবাহুল্য, পাকিস্থানের দুটি অংশের মধ্যে পূর্ব অংশটি সব দিক থেকে বিদেশী রাষ্ট্রপ্রতিবেষ্টিত। এটা একটি সমতল ভূমি যেখানে বর্ষাকালে পানির বাঁধা ছাড়া বহিঃআক্রমণের বিরুদ্ধে কোন প্রাকৃতিক বাঁধা নেই। সংখ্যা এবং ঘনত্বের দিক থেকে আমাদের জনসংখ্যা সর্বাধিক।   প্রাক-ব্রিটিশ শাসনামলের ভারতের ইতিহাস টেনে আমি বলব যে, বাঙ্গালীরা ছিল যোদ্ধার জাতি যারা যুদ্ধক্ষেত্রে বহুবার বিজয়মাল্য ছিনিয়ে এনেছে। ব্রিটিশদের দমননীতির ফলে বাঙ্গালীদের মধ্যে থেকে সেনাবাহিনী গঠন বন্ধ হয়ে যায়।

 

         

 

<001.022.063>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

এটা অবশ্যই স্বীকার করতে হবে যে স্বাধীনতা আন্দোলনে ইন্ডিয়ার রাজ্যগুলোর মধ্যে বাংলা থেকে সবথেকে বেশি মানুষ অংশগ্রহন করার কারনে তাদের সেনাবাহিনীতে প্রবেশের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছিল।স্বাধীনতা অর্জনের সাথে সাথে আমাদের পুরাতন প্রভুদের পুরাতন দৃষ্টিভংগি পরির্বতন করা উচিত ছিল। পাশাপাশি সর্বশেষ যুদ্ধে সামরিক এবং অসামরিকদের মধ্যে কোন পার্থক্য করা হয়নি এবং বাংলাসহ ইন্ডিয়ার সকল রাজ্য থেকে নিয়োগ করা হয়েছিল যা স্থল ও বিমান বাহিনীতে ভূমিকা রেখেছিল। আর নৌ বাহিনীর কথা বলতে গেলে, পূর্ব বাংলা সমুদ্রগামী একটি জাতি হিসেবে গর্বিত, যা বহু শতাব্দী আগে থেকেই স্বনামধন্য। ইন্ডিয়ান নাবিকরা যারা মুলত পূর্ব বাংলার নাবিক, তারা পৃথিবীর সবধরনের রুক্ষ এবং মসৃন জলপথে প্রবেশ করে বিদেশী নৌসেনাপতীদের প্রশংশা পেয়েছে। সেইজন্য সরকারের উপর অবশ্যদায়িত্ত পূর্ব বাংলার মানুষদের নৌ প্রশিক্ষন সুবিধা দেওয়া এবং চ্রট্রগ্রামকে নৌ প্রশিক্ষন কেন্দ্র হিসাবে উন্নত করা। বিমান বাহিনীতে লোকবল সংগ্রহের সময় পূর্ব বাংলার সাথে সৎ মায়ের মত আচারন করা হয়েছে। পশ্চিম পাকিস্থানে যখন ছয় অথবা সাত টা নিয়োগ কেন্দ্র সেখানে পূর্ব বাংলায় মাত্র একটা। এটা সকল পাকিস্থানি নাগরিকদের সমান সুবিধা দিচ্ছে না, আবার পূর্ব বাংলায় কোন প্রশিক্ষন কেন্দ্র খোলা হয়নি এবং যেসব ছেলেরা নিয়োগ পেয়েছে তাদের প্রাথমিক প্রশিক্ষনের জন্য কমপক্ষে দুই হাজার মাইল যেতে হয়। এটা অনুপ্রেরনাদায়ী নয়। সেই জন্য অনতিবলম্বে পূর্ব বাংলায় বিমান প্রশেক্ষন কেন্দ্র খোলা অত্যাবশ্যক এবং পূর্ব বাংলা যেহেতু পাকিস্থানের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ তাই এটিকে অবশই একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ অংশ করা উচিত কারন পূর্ব বাংলা এবং পশ্চিম পাকিস্থানের মধ্যে বিশাল দূরত্ব। পতিরক্ষা ও যে কোন উন্নয়নের জন্য পূর্ব বাংলাকে কখনো সাধারনভাবে দেখা উচিত হবে না, যা পশ্চিম পাঞ্জাব, সিন্দু, সীমান্ত প্রদেশ ও বেলুচিস্তানের জন্য প্রযোজ্য কারন এগুলো একটি নিশ্ছিদ্র ভৌগোলিক অঞ্চল। পূর্ব বাংলা যেহুতু আলাদা অংশে অবস্থিত তাই এটিকে একটি পৃথক অংশ হিসেবেই দেখতে হবে এবং প্রতিরক্ষা এবং যে কোন উন্নতি পাকিস্থান রাষ্ট্রের পূর্ব এবং পশ্চিম উভয় অঞ্চলেই সমান ভাবে করা উচিত। আপনাদের অবশই সব দিক থেকেই পূর্ব বাংলাকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে হবে। স্যার, প্রতিরক্ষা প্রসঙ্গে আলোচনা শেষ করার পুর্বে আমি বলব, আমি অবশই জোর দিতে চাই পূর্বাঞ্চলে অতিদ্রুত একটি কামান কারখানা প্রতিষ্ঠার জন্য। এটা চিন্তা করা বোকামি হবে যে যুদ্ধের সময় পশ্চিম অঞ্চল পূর্ব অঞ্চলকে পর্যাপ্ত অস্ত্র ও গোলাবারুদ দিয়ে সাহায্য করতে পারবে। সম্পূর্ণ বাজেট বক্তৃতা জুড়ে স্বিকার করা হয়েছে যে, পূর্ব বাংলার জরুরি প্রয়োজনীয় প্রতিরক্ষা বাবস্থার অভাব রয়েছে। তারপরেও আমি খুশি যে পাকিস্থান সরকার অনেকগুলো নতুন প্রশিক্ষন প্রতিষ্ঠান যেমন মিলিটারি একাডেমি, কারিগরী ও প্রশাসনিক স্কুল, বৈদ্যুতিক ও যান্ত্রিক প্রকৌশল সেন্টার খোলার কথা ভাবছে এবং যথেষ্ট বরাদ্দ দিয়েছে নির্দিষ্ট কিছু কারখানায় পরবর্তী বছরে অপরিহার্য যন্ত্রপাতি স্থাপনের জন্য। এতে অবশ্যই কামান ও গোলাবারুদ বিভাগ অন্তর্ভুক্ত হবে। আমি পরিষদের গোচরে আনতে চাই যে, এইসব প্রতিষ্ঠানের কিছু পূর্ব বাংলায় স্থাপন করা উচিত উপরে বর্ণিত কারনগুলোর জন্য। আমার মতে এ ধরনের একটি পদক্ষেপ দূরদর্শিতা ও রাজনৈতিক বিচক্ষণতার অংশ। সমস্যা, অজুহাত বা মামুলী যুক্তি ব্যাবহার করে পূর্ব বাংলাকে ইতিমধ্যে উল্লেখিত সুবিধাদি থেকে বঞ্চিত করা যেতে পারে। কিন্তু এই ধরনের পদক্ষেপ হবে অপরিণামদর্শী এবং এটা পাকিস্থানের অর্ধেক জনগোষ্ঠীর মধ্যে হতাশার সৃষ্টি করবে। এই মনোভাব এরই মধ্যে বিরাজমান এবং যত দ্রুত নেতারা এটা বুঝবেন এবং এই অবস্থার সমাধান করবে, সবার জন্য তা তত মঙ্গলজনক হবে।                

 

<001.022.064>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

 জনাব মাহনুইদ হুসাইন (পূর্ব বাংলা: মুসলিম): জনাব, আমার মতে, বাজেটের ভারসাম্য রক্ষা পদ্ধতিতে এমন দুটি বিষয় আছে যা আপত্তিকর। একটি খুবই মৌলিক। এবং এর মধ্যে আমি প্রাদেশিক অর্থনৈতিক স্বায়ত্তশাসনের উপর অবৈধ হস্তক্ষেপ দেখতে পাচ্ছি। এটা খুবই মৌলিক এবং বড় একটি প্রশ্ন যা গভিরভাবে চিন্তার বিষয়। আমি আমার এই অল্প সময়ের মধ্যে এই বিষয়ে বিস্তারিত বলতে পারব না। কিন্তু আমার বিবেচনা মতে পাকিস্তান বিভিন্ন স্বশাসিত ইউনিট নিয়ে গঠিত। ভৌগলিক কারন, ভাষাগত পার্থক্য, জাতিগত পার্থক্য, আমাদের থেকে প্রায় ১৫০০ মাইল দূরে অবস্থান এসব কারন পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্থান কে পৃথক করেছে, এমনকি পশ্চিম পাকিস্থানের অভ্যন্তরেও কিছু বিভেদ আছে যা এড়িয়ে যাওয়া যায় না এবং তা এড়িয়ে যাওয়া উচিতও না, তাই আমি মনে করি আমাদের ভবিষ্যৎ উন্নতি প্রদেশগুলোর সম্পূর্ণ স্বায়ত্বশাসনের ভিত্তিতে করা উচিত। এটাই একমাত্র পদ্ধতি যা দিয়ে আমরা পাকিস্তানকে চালাতে পারি। এটাই মূলতত্ত্ব। আমার মতে, এই বাজেটে এর দেখা মোটেই মেলেনি বরং প্রাদেশিক সম্পদের উপর অন্যায় হস্তক্ষেপের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। এটা আসলে আমাদের সাহায্য করে না, কারন আপনারা সবাই প্রদেশগুলো থেকে কিছু টাকা নিয়ে কেন্দ্রে খরচ করেন। এটা আমাদের অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধান করতে পারবে না। আমাদের অর্থনৈতিক সমস্যা তখনই সমাধান হবে যখন আমরা আমাদের জাতীয় সম্পদ বৃদ্ধি করতে পারব। আমরা আমাদের আয়ের উৎস পুনর্বিন্যাস এবং এখানকার টাকা ওখানে দিয়ে আমাদের জীবনযাপন মানসম্মত করতে পারব না। এটা আমাদের অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধান করতে পারবে না। আমার অভিযোগ এই যে আমাদের অর্থমন্ত্রী আমাদের অর্থনৈতিক সমস্যা সঠিকভাবে মোকাবিলা করতে পারেননি।এই সমস্যার মুখোমুখি হওয়া তার কর্তব্য এবং এটার সমাধান বের করাও তার কর্তব্য। তার কর্তব্য কমপক্ষে কিছু শুরু করা, তিনি আমাদের কমপক্ষে তার ভবিষ্যৎ কর্ম পরিকল্পনা সম্পর্কে কিছু ধারনা দিতে পারতেন যে, এটা হল তার পরিকল্পনা যা দিয়ে তিনি আমাদের সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছেন……………     মাননীয় খাজা নাজিমুদ্দিন (পূর্ব বাংলা, মুসলিম) [২ মার্চ, ১৯৪৮]স্যার, আমি বলতে চাই, যে সকল রাষ্ট্রে প্রদেশ আছে সেইসকল প্রদেশের মানুষের উন্নতি সমান ভাবে করা খুব প্রয়োজন কারন একটা ঘোড়ার গাড়ি এক জোড়া ঘোড়া টেনে নিয়ে যায় কিন্তু সেখানে যদি একটা শক্তিশালী আর একটা যদি ক্ষীন ও দুর্বল হয় তাহলে এটার কোন কার্যকারিতা থাকে না, সেই দলও কাজ করবে না। সেইভাবে প্রদেশগুলো একই সাথে সমান ভাবে উন্নতি করা দরকার এবং যদি আমাদের একটা প্রদেশ অর্থনৈতিক ভাবে দুর্বল হয়, সেই প্রদেশের মানুষও সম্পদশালী হবে না, এটা গোঁটা রাষ্ট্রের উপর প্রভাব ফেলবে এবং দৃষ্টিকোণ থেকে আমি কিছু দাবি জানাতে চাই কেদ্রিয় সরকারের সামনে। তাদের মধ্যে প্রথম এবং গুরুত্তপুর্ন হল, পুর্ব পাকিস্তানের পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের অবশ্যই পাকিস্থানের অস্ত্রধারী বাহিনীতে নিরপেক্ষ ও সমান অংশিদারিত্ব তৈরি করতে হবে। এটা আমি অপরিহার্য বলে মনে করি এবং এটা আমাদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে অনেক কারনেই পুর্ব পাকিস্তানের মানুষদের অস্ত্রধারী বাহিনীর বাইরে রাখা হয়েছে এবং আপনি যদি এখন অস্ত্রধারী বাহিনীর নতুন নিয়োগের একটি অংশ হিসেবেও পূর্ব পাকিস্তানের মানুষদের নিয়োগ দেন তাহলেও আপনি বুঝতে পারছেন যে, পর্যাপ্ত প্রতিনিধিত্ব পেতে কত সময় লাগবে।                

 

<001.022.065>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

আমাদের সামরিক বাহিনীর প্রধান পুর্ব পাকিস্তান প্রদর্শন কালে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের একটি বা দুটি ব্যাটালিয়নের নিয়োগপ্রাপ্তদের দেখে অভিভূত হয়েছেন। তারা বুঝতে পেরেছেন যে পুর্ব বাংলা থেকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষকে পাকিস্তান সামরিক বাহিনীতে সরবরাহের ব্যপক সম্বাভনা রয়েছে। কিন্তু যদি ন্যায় সঙ্গত ও যথাযথ অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করার জন্য বিশেষ পদক্ষেপ না নেয়া হয় তাহলে, পূর্ব পাকিস্থানের পর্যাপ্ত প্রতিনিধিত্ব নিচ্চিত করা কঠিন হয়ে পরবে। পরিশেষে, আমি আবারো অর্থমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানাতে চাই এবং তাকে মনে করিয়ে দেতে চাই যে আমরা পুর্ব পাকিস্তানে অপূর্ণতায় ভুগছি। আমরা কেদ্রিয় সরকারের থেকে অনেক দূরে এবং আমরা তাদের স্মৃতিভ্রষ্ট হয়ে যাচ্ছি। আমরা পাকিস্তান রাষ্ট্রের সংহতি রক্ষা করার জন্য সম্ভ্যাব্য সকল সাহায্য করার জন্য মুখিয়ে আছি। আমরা বেশিরভাগই দরিদ্র মানুষ এবং এটাই পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিশেষত্ব। পাকিস্তান রাষ্ট্র দরিদ্র মানুষের পক্ষে। এটা এখন জনগনের সরকার এবং এটা অন্য কোন ধরনের সরকার না, তাই কেন্দ্রীয় সরকারের উচিত তাদের দাবির প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া।————–                               

 

<001.023.066>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
সাপ্তাহিক “নও বেলালে’ প্রকাশিত রাষ্ট্রভাষা সংক্রান্ত সম্পাদকীয় সাপ্তাহিক ‘নও বেলাল। সূত্র: ভাষাআন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতিঃ বদরুদ্দীন উমর। পৃষ্ঠা-৬২ ৪ঠা মার্চ ১৯৪৮

এই পত্রিকাটিতে ৪ঠা মার্চ তারিখে পাকিস্তান গণপরিষদের ভাষা বিষয়ক প্রস্তাব এবং তার সম্পর্কে আলোচনা ও সিদ্ধান্তের উপর রাষ্ট্রভাষা’ শীর্ষক একটি দীর্ঘ সম্পাদকীয় প্রকাশ করা হয়। রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নের সাথে পূর্ব বাংলার সাংস্কৃতিক জীবনের ও সাংস্কৃতিক আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের যোগসূত্রের কথা উল্লেখ করে তাতে বলা হয় :  পাকিস্তান লাভ করিবার পূর্বে পূর্ব-পাকিস্তানবাসীদের ধারণা ছিল যে তাহদের সংস্কৃতি, তহজিব, তমদ্দুন সকল অবস্থায়ই অক্ষুণ্ণ থাকিবে। পাকিস্তান রাষ্ট্রের এলাকাধীন বিভিন্ন প্রদেশের অধিকাংশ বাসিন্দা মুসলমান গতিকে, তাহদের মধ্যে মজহাবী একতা ছাড়া ভাষাগত বিষয়ে বিভিন্ন প্রদেশের নানাবিধ পার্থক্য রহিয়াছে তাহা অস্বীকার করিবার উপায় নাই। যদি এক ভাষার আধিপত্যে অন্য ভাষার প্রসার সংকুচিত হয় অথবা অন্য প্রদেশের সংস্কৃতি নষ্ট হইবার সূচনা দেখা যায় তাহা হইলে যে প্রদেশের ভাষার মর্যাদার হানি হইয়াছে তাহার প্রতি অবিচার করা হইবে।  বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের সাথে কেন্দ্রীয় পাকিস্তান সরকারের তুলনা করে পত্রিকাটি বলেন :  সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজদের আমলেও গভর্ণমেন্টের কারেন্সী নোটেও বাংলা ভাষার স্থান ছিল। পাকিস্তান সরকার বাংলাকে তুলিয়া ফেলিয়াছেন। পাকিস্তান সরকারের মনি অর্ডারের ফরম, ডাক টিকিট, পোষ্ট কার্ড ইত্যাদিতে বাংলার স্থান নাই।  প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলীর উক্তি সম্পর্কে নওবেলাল বলেন :  এই প্রস্তাবের প্রসঙ্গে পাকিস্তানের উজিরে আজম জনাব লিয়াকত আলী যে অসংলগ্ন কথার অবতারণা করিয়াছেন তাহাতে বাস্তবিকই মর্মাহত হইতে হয়। তিনি বলিয়াছেন পাকিস্তান একটি মুসলিম রাষ্ট্র, তাই পাকিস্তানের ভাষা হইবে মুসলিমদের ভাষা উর্দু। এই সব অপরিণামদশী ভাষণের আলোচনাও এক দুঃখজনক ব্যাপার। তবে এই সব ঘোষণার প্রতিক্রিয়া যে মারাত্মক হইতে পারে সে সম্বন্ধে আমরা জনাব লিয়াকত আলী খানকে ভাবিয়া দেখিতে অনুরোধ করি।  খাজা নাজিমুদিনের উক্তির সমালোচনা প্রসঙ্গে এতে বলা হয়:  এই প্রসঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানের জনমতের উল্লেখ করিতে যাইয়া জনাব নাজিমুদ্দিন ও তমিজুদ্দিন খান যেসব অপ্রত্যাশিত মন্তব্য করিয়াছেন তার জন্য নিশ্চয়ই তাহাদিগকে একদিন পূর্ব পাকিস্তানবাসীর নিকট সাধারণ ভাষারূপে গ্রহণ করিতে চায় এই তথ্য কোথায় আবিষ্কার করিলেন?  গণপরিষদের মুসলিম লীগ দলীয় বাঙালী সদস্যদের উদ্দেশে পত্রিকাটি বলেন:  এইভাবে আপনার মাতৃভাষার মূলে যাহারা কুঠারঘাত করিতেছেন, তাহারা কি একবার ভাবিয়াও দেখেন নাই যে ভাষার ভিতর দিয়াই জাতির আশা-আকাংখা, সুখ-দুঃখ, আর্দশ প্রভৃতি রূপ পাইয়া     

 

<001.023.067>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

 

থাকে। ভাষা সম্পূর্ণ বিকাশ লাভ না করিলে জাতির মেরুদণ্ড গঠিত হইয়া উঠিতে পারে না। কোন এক বিশেষ প্রভাবে পড়িয়া তাঁহারা হয়ত আপনাদের অস্তিত্বের বিলোপ করিতে পারেন, তবে পূর্ব পাকিস্তানের চারি কোটি চল্লিশ লক্ষ লোক কিছুতেই তাহাদিগকে ক্ষমা করিবে না। কিছুতেই তাহারা তাহাদের মাতৃভাষা বাংলার অবমাননা সহ্য করিবে না। তাই ইতিমধ্যেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ধর্মঘট করিয়াছে এবং মিছিল সহকারে সর্বত্র বিক্ষোভ প্রদর্শন করিয়াছে। কেবল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রগণই নহে পূর্ব পাকিস্তানের সর্বত্র এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে তুমুল আন্দোলন গড়িয়া উঠিতেছে। এই গনবিক্ষোভ যখন পূর্ণ আত্মপ্রকাশ করিবে তখন এইসব নেতাদের আসনও টলটলায়মান হইয়া পড়িবে।

 

সর্বশেষে পাকিস্তানের শান্তি এবং ঐক্য বজায় রাখার আবেদন জানিয়ে সম্পাদকীয়টিতে বলা হয় :

তাই পূর্বাহ্নেই আমরা কর্তৃপক্ষ মহলকে অনুরোধ করিতেছি যদি পাকিস্তানের সংহতি, ঐক্য ও সর্বোপরি শান্তি বজায় রাখিবার জন্য তাহদের মনে এতটুকু আগ্রহ থাকে তাহা হইলে অনতিবিলম্বে তাহদের কর্মের সংশোধন করুন। পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা ও শিক্ষার মাধ্যমরূপে বাংলাকে গ্রহণ করুন। তাহা না হইলে স্বভাবতঃই পূর্ব পাকিস্তানবাসীর মধ্যে এই ধারণা বদ্ধমূল হইতে থাকিবে যে পূর্ব পাকিস্তানের উপর যুক্ত প্রদেশ ও পশ্চিম পাঞ্জাবের লোকের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করিবার জন্য বাংলাকে আস্তে আস্তে

 

 

 

  • এই সময় ঢাকা থেকে কোন দৈনিক পত্রিক প্রকাশিত হোত না। সিলেট থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক ‘নও বেলাল’-এর ভূমিকা ছিল প্রগতিশীল ও বাংলা ভাষার পক্ষে।

———-              

 

<001.024.068>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
১১ই মার্চ ১৯৪৮ সালে অনুষ্ঠিত হরতাল সম্পর্কে সরকারী বক্তব্য পূর্ব বাংলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতিঃ বদরুদ্দীন উমর। পৃষ্ঠা-৮২ ১২ই মার্চ, ১৯৪৮

১১ই মার্চের এই ঘটনাবলী সম্পর্কে পূর্ববঙ্গ সরকারের একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয় :  বাংলাকে কেন্দ্রের সরকারী ভাষা না করার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জ্ঞাপনের উদ্দেশ্যে ১১ই মার্চ আহুত সাধারণ ধর্মঘটকে কার্যকর করবার জন্যে আজ ঢাকাতে কিছুসংখ্যক অন্তর্ঘাতক এবং একদল ছাত্র ধর্মঘট করার চেষ্টা করে। শহরের সমস্ত মুসলিম এলাকা এবং অধিকাংশ অমুসলিম এলাকাগুলি ধর্মঘট পালন করতে অসম্মত হয়। শুধুমাত্র কিছু কিছু হিন্দু দোকানপাট বন্ধ থাকে। শহরের এবং আদালতের কাজকর্ম সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ছিলো। রমনা এলাকায় অবশ্য ধর্মঘটকারীরা কিছু কিছু অফিসের লোকদেরকে কাজে যোগদানে বাধা দেয়। পিকেটিং করার উদ্দেশ্যে ছাত্রদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র এক একটি দল সেক্রেটারিয়েট, হাইকোর্ট এবং অন্য কতকগুলি অফিসে সম্মুখে সমবেত হয়। এদের মধ্যে অনেককে শান্তভাবে স্থান ত্যাগ করতে সম্মত করা গেলেও অন্যান্যেরা আক্রমণোদ্যত হয়ে সেখানে অবস্থিত পুলিশ ও অফিস যোগদানে ইচ্ছুক কিছুসংখ্যক লোকজনের উপর ইটপাকেল ছোড়ে এবং অন্যান্য হিংসাত্মক কাৰ্যকলাপ শুরু করে। এর ফলে পুলিশ লাঠিচার্জ করতে বাধ্য হয় এবং ৬৫ জনকে গ্রেফতার করে। এক সময় দুবার বন্দুকের ফাঁকা আওয়াজ পর্যন্ত করতে হয়। বিক্ষোভ প্রদর্শন ও পুলিশ তৎপরতার ফলে মোট চৌদ্দ ব্যক্তি আহত হন এবং তাঁদেরকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এদের মধ্যে কেউই গুরুতরভাবে অথবা গুলির আঘাতে আহত হননি। খানাতল্লাসীর ফলে যে সমস্ত প্রমাণাদি এখন সরকারের হস্তগত হয়েছে তার থেকে স্পষ্টই বোঝা যায় যে মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ এবং প্রশাসনিক হতবুদ্ধিতা সৃষ্টি করে পাকিস্তানকে খর্ব করার উদ্দেশ্যে একটা গভীর ষড়যন্ত্র চলছে।

———–

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<001.025.069>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

 

শিরোনামঃ পূর্ববাংলা ব্যবস্থাপক সভার কার্য বিবরণীর একটা অংশ

সুত্রঃ প্রাদেশিক ব্যবস্থাপক সভা

তারিখঃ ১৫ই মার্চ ১৯৪৮

 

            জনাব ধীরেন্দ্র নাথ দত্তঃ স্যার, সংসদ-র বাইরে খুব গোলমাল চলছে, ছেলেদের উপর কোন অত্যাচার হচ্ছে কিনা আমরা তা জানতে চাই।

. প্রতাপ গুহ রয়ঃ সভাপতি সাহেব, যদিও আমাদের মুলতবির প্রস্তাব উত্থাপন করতে পারি নাই তাহলেও ঐ মুলতবি সম্বন্ধে আমাদের আইনসভা-এর নেতা কোন বিবৃতি দেবেন কি?

          মাননীয় জনাব খাজা নাজিমুদ্দিনঃ স্যার, আমি যে কারণে বিলম্ব করেছি তা হল আমি সংগ্রাম পরিষদের সাথে সাক্ষাৎ করছিলাম। আমাদের মধ্যে একটি চুক্তি সাক্ষরিত হয়েছে এবং আমি এই লোকগুলোকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য নির্দেশনা দিয়েছি। আমাদের মধ্যে একটি বোঝাপড়া ছিল যে তারা সংসদ ও সচিবালয়ের নিকট আসবে না; কিন্তু আমি প্রমাণসহ পেলাম যে তার সংসদ কক্ষের খুব কাছে এসেছে এবং আন্দোলন করছে। চুক্তি অনুসারে আমি সকল পুলিশ তুলে নিয়েছি এবং তারা তাদেরকে সংসদ ও সচিবালয় ভবনের সামনে ছেড়ে দিয়েছে। আমি জানিনা কী ঘটছে এবং আমি মনে করি কোন অবাঞ্ছিত ঘটনা ঘটবে না। আমাদের অবস্থান হল এই, জনাব, যদি তারা সংসদ সংলগ্ন রাস্তায় না আসে তাহলে তাদেরকে উৎপীড়ন করা হবে বলে আমি মনে করি না।

          . প্রতাপ চন্দ্র গুহ রয়ঃ স্যার, ১১ তারিখের ঘটনা সম্বন্ধে কোন বিবৃতি দিবেন কিনা?

মাননীয় জনাব খাজা নাজিমুদ্দিনঃ এ সম্বন্ধে আলোচনা সংসদীয় দলের সভায় হয়ে গিয়েছে এবং তার বিবৃতি করা হয়েছে, সে সম্বন্ধে তার অধিক আলোচনা ভাল মনে করি না।

জনাব প্রভাস চন্দ্র লাহিড়ীঃ মাননীয় সভাপতি সাহেব, আইনসভার বাইরে যে কি হচ্ছে এবং ছাত্র ডেমোন্সট্রেটর-দের উপর কোন অত্যচার হচ্ছে কিনা সেটা একবার দেখে এলে ভাল হোত।

মাননীয় জনাব খাজা নাজিমুদ্দিনঃ আপনার অনুমতি অনুসারে, স্যার, কি ঘটেছে সে সম্পর্কে একটি বিবৃতি প্রদান করতে চাই (প্রতিবন্ধকতা) । দয়া করে আমার কথা শুনুন। দয়া করে আমার যা বলার আছে তা শুনুন (প্রতিবন্ধকতা)।

          জনাব স্পিকারঃ আমি সদস্যদের অনুরোধ করছি হাউজের কার্যপ্রণালী অনুসরণ করার জন্য। মাননীয় সংসদ নেতা এই বিষয়ে একটি বিবৃতি দিবেন এবং আপনাদের নিকট আমার অনুরোধ তার কথা শুনুন।

          জনাব মনোরঞ্জন ধরঃ স্যার, আমি নিজে দেখে এলাম এবং প্রধান মন্ত্রীর নিজে গিয়ে দেখা উচিত যে বাইরে কি হচ্ছে। সত্যই যদি এখানে ছাত্রদের উপর পুলিশের কোন অত্যাচার হয় তাহলে সেটা বড় দুঃখের বিষয় হবে।

 

 

 

 

 

 

<001.025.070>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

 

মাননীয় জনাব খাজা নাজিমুদ্দিনঃ স্যার, সকাল হতে আমি সংগ্রাম পরিষদের সাথে আলোচনা সভায় ছিলাম যেটাতে বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিত্ব আছে যারা এই আন্দোলন শুরু করেছে। আমাদের আলোচনার ফল স্বরুপ আমরা কিছু নির্দিষ্ট চুক্তিতে পৌঁছেছি এবং তাদেরকে জেলে যাওয়ার ও সেখানে কারা আছে তা দেখার অনুমতি প্রদান করা হয়েছে। তারা ফিরে এসেছে এবং চুক্তিতে সই করেছে। যারা জেলে আছে তাদের সকলকে মুক্ত করে দেওয়ার আদেশ আমি দিয়েছি। তারা চেয়েছিল আমি যেন সকল পুলিশ তুলে নেই। বিধানসভা ও সচিবালয় বাদে অন্য জায়গার পুলিশ তুলে নেওয়ার আদেশ আমি দিয়েছি। আমি তাদের নিশ্চয়তা দিয়েছি এবং আদেশও করেছি যেন সকল পুলিশ তুলে নেওয়া হয়। তাদের উচিত নয় সংসদের সামনে আসা। তারা যেখানে খুশি সেখানে যেতে পারে কিন্তু সংসদের সামনে যেন না আসে। তারা রমনা অথবা অন্য কোন জায়গায় যেতে পারে। আমি জানি না কি ঘটেছে, তারা কেন এখানে বিক্ষোভ প্রদর্শন করছে? এই হল চুক্তির একটি কপি। সচিবালয় ও বিধানসভা বাদে অন্য জায়গা থেকে পুলিশ সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। আমি মনে করি সংগ্রাম পরিষদ বর্জিত হয়েছে, অথবা কি হয়েছে আমি তা জানি না। (হইচই)

আপনি যদি চান তবে চুক্তির কপিটি পড়তে পারি।

“সংযুক্ত রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সাথে আলোচনার পর নিম্নোক্ত বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছেঃ

১. ২৯শে ফেব্রুয়ারি ১৯৪৮ থেকে বাংলা ভাষা ইস্যুতে যাদেরকে গ্রেফতার করা হয়েছে, তাদেরকে অবিলম্বে ছেড়ে দেওয়া হবে।

২. মাননীয় প্রধান মন্ত্রী পুলিশ কর্তৃক আনা বাড়াবাড়ির অভিযোগ সম্পর্কে তদন্ত করবেন, এবং এক মাসের মধ্যে বিবৃতি প্রদান করবেন।

৩. এপ্রিল, ১৯৪৮ এর প্রথম সপ্তাহে পূর্ব বাংলার বিধানসভার অদাপ্তরিক বিষয়ের জন্য একদিন বরাদ্দ থাকবে, বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা এবং পাক সংসদ ও কেন্দ্রীয় সরকারী পরীক্ষায় উর্দুর সমমর্যাদা প্রদান করার জন্য বিশেষ প্রস্তাব আনা হবে।

আজকের দলীয় সম্মেলনে এই বিষয়গুলো আলোচনা করা হবে।

৪. ইংরেজি ভাষা পরিবর্তন করার সাথে সাথেই বাংলাকে এই প্রদেশের দাপ্তরিক ভাষা বানানোর প্রস্তাব করে এপ্রিলে বিধানসভায় দাপ্তরিক ঘোষণা উত্থাপিত হবে, এবং নির্দেশনা প্রদানের মাধ্যম হবে বাংলা কিন্তু স্কুল ও কলেজে সংখ্যা গরিষ্ঠ ছাত্রদের ভাষা প্রাধান্য পাবে।

৫. এই আন্দোলনে যারা অংশগ্রহন করেছে তাদের কাউকে ক্ষতিগ্রস্ত করা হবে না।

৬. পত্রিকা সমূহের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হবে।

৭. ভাষা সংক্রান্ত কারণে পূর্ব বাংলার যেসব স্থানে ২৯শে ফেব্রুয়ারি থেকে ১৪৪ ধারা জারি হয়েছে সেসব স্থান থেকে তা তুলে নেওয়া হবে।

৮. সংগ্রাম পরিষদের সাথে আলোচনার পর। আমি তৃপ্ত যে এই আন্দোলন রাষ্ট্রের শত্রুদের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়নি।

           . . এম. মল্লিকঃ মাননীয় সভাপতি সাহেব, আমাদের বিধানসভা নেতা যে বললেন সব জায়গা হতে পুলিশ তুলে নেওয়া হয়েছে কিন্তু আমি দেখে এলাম পুলিশ তুলে নিয়ে মিলিটারি বসান হয়েছে।

 

 

 

 

<001.025.071>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

 

          জনাব আবু তাইয়্যাব মাজহারুল হকঃ স্যার, আপনি নিজে গিয়ে দেখুন।

          মাননীয় জনাব খাজা নাজিমুদ্দিনঃ এখানে মিলিটারি প্রথম থেকে বসান ছিল, এখানে মিলিটারি শুরু থেকেই বসান ছিল এবং অন্যান্য জায়গা থেকে পুলিশ তুলে নেওয়া হয়েছে। তারা পুরো রমনা জুড়ে, কিন্তু ঐসব জায়গা থেকে পুলিশ তুলে নেওয়া হয়েছে এবং কোন গ্রেফতার করা হয়নি, কাউকে বাধা গ্রস্ত করা হয়নি। চুক্তি ছিল এই যে তারা বিধানসভার সামনে আসবে না ও সচিবালয়ে যাবে না, কিন্তু তারা যেখানে খুশি সেখানে যেতে পারে। (কক্ষে বড় ধরণের হইচই)

            জনাব মফিজুদ্দীন আহমেদঃ স্যার, ১১ তারিখে যে সমস্ত ছাত্রদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছি কি?

           জনাব আব্দুল মমিনঃ একজনে বললে ভাল হয়।

          জনাব সামসুদ্দীন আহমেদঃ স্যার, আমি যখন আসি তখন বহু জায়গায় পুলিশ দেখেছি। কি চুক্তি হয়েছে তা আমি জানি না। যাই হউক তিনি যে চুক্তিটি পড়লেন ওটা বহু গণ্ডগোলের ব্যাপার, তিনি যদি ব্যাপারটা নিজে গ্যে একবার দেখে আসেন তা হলে ভাল হয়।

            জনাব মুহাম্মদ আলিঃ স্যার, এ সময়ের মধ্যে অবশ্যই নতুন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। মনে হচ্ছে যে প্রদর্শনকারীরা এখানে আসতে চায় কারণ এটাই একমাত্র ফোরাম যেখানে জন প্রতিনিধিরা তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করে থাকে। অতএব ব্যাপারটি আইনসভার একটি বৈঠকে নেয়া উচিত। আমি সুপারিশ করি না যে প্রধান মন্ত্রীকে ব্যক্তিগত ভাবে উপস্থিত থাকা উচিত এবং তাদের ক্ষোভ সমূহ কি তা দেখা উচিত। এটা অপেক্ষাকৃত ভাল হয় যে আপনি, স্যার, আপনার প্রতিনিধিদের উচিত যে প্রদর্শনকারীরা কি চায় এবং তাদের ক্ষোভগুলো কি কি তা খুজে বের করা, যাতে করে তারা বুঝতে পারে যে অবস্থাটা কি, এবং তাদের অভিযোগের কতটা প্রতিকার করা সম্ভব।

            জনাব মসিহুদ্দীন আহমেদঃ সভাপতি সাহেব, আমি এই আইনসভাকে একটা সংবাদ দিচ্ছি, আপনারা জানেন যে একটা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল কিন্তু এখনই শুনতে পেলাম যে জনাব গফুর ইউনিভার্সিটি প্রাঙ্গণে ঢুকে সেখানে মহিলা ছাত্রীদের উপর টিয়ার গ্যাস ছেড়েছে, তারফলে যে চুক্তি করা হয়েছিল তা নষ্ট হয়ে গিয়েছে এবং তার জন্যে বাহিরে বিক্ষোভ হচ্ছে, আমি আশা করি আইনসভার নেতা বাহিরে গেলে সব বুঝতে পারবেন। মি. গফুর এই অবস্থা তৈরি করেছে।

*                       *                       *                       *                       *                       *

           বেগম আনোয়ারা খাতুনঃ স্যার, আমার একটা বক্তব্য আছে।

           জনাব এ. কে. ফজলুল হকঃ পয়েন্ট অফ অর্ডার হিসেবে, স্যার, আমি সুপারিশ করছি যে আইনসভার নেতার উচিত বাহিরে যাওয়া এবং বাইরে কি হচ্ছে তা দেখা। এটা যতক্ষণ পর্যন্ত করা না হয় ততক্ষণ পর্যন্ত আইনসভার কার্যক্রম চলমান থাকতে দেব না আমরা। আমাদের অনুভূতি এভাবে নিষ্পিষ্ট হতে পারে না। এইটা ছেলেখেলা নয়। আইনসভার নেতার উচিত এখনই বাইরে যাওয়া। তার অবশ্যই যাওয়া উচিত, অবশ্যই যাওয়া উচিত, অবশ্যই যাওয়া উচিত।

           

 

 

 

 

 

<001.025.072>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

 

আনোয়ারা খাতুনঃ স্যার, আমার একটা বক্তব্য আছে।

            মি. স্পিকারঃ জনাব ফজলুল হক, আম খুব দুঃখের সাথে বলছি যে আপনি যা বলেছেন তা কোন পয়েন্ট অফ অর্ডার নয়। পুরনো সাংসদ হিসেবে আপনার জানা উচিত কোনটা পয়েন্ট অফ অর্ডার আর কোনটা পয়েন্ট অফ অর্ডার নয়। ভাষা সংক্রান্ত বিষয়ের উপর নেতা বিবৃতি দিয়েছেন। এরপর এই বিষয়ে কোন পদক্ষেপ নেওয়ার কথা আমি তাকে বলতে পারি না। সে তার দায়িত্ব সম্পর্কে পূর্ণ সচেতন। যদি আপনি তা মনে করেন তবে আইনসভার বাইরে তাকে এই বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলতে পারেন।

            জনাব ধীরেন্দ্র নাথ দত্তঃ মি. স্পিকার, স্যার, বেগম আনোয়ারা খাতুন কিছু বলতে চাচ্ছেন।

মিসেস আনোয়ারা খাতুনঃ স্যার, গত ১১ই মার্চ তারিখে যা হয়েছে , তা হয়েছে। আজ পুলিশ মেয়েদের গায়ে হাত দিয়েছে, গলা টিপে মেরেছে, তার প্রতিকার চাই। ঐ সমস্ত চোরামি এখানে চলবে না। আমরা চাই প্রধান মন্ত্রী সেখানে গিয়ে আসুন।

*                       *                       *                       *                       *

            জনাব সামসুদ্দীন আহমেদঃ স্যার, মেয়েদের গায়ে পুলিশ হাত তুলেছে। আমরা এর প্রতিকার চাই। এই মুহূর্তে সকলের পদত্যাগ করা উচিত।

            মি. স্পিকারঃ আইনসভা বিকাল ৪.৫৫ পর্যন্ত মুলতবি থাকবে।

*                       *                       *                       *                       *

বিরতির পর

          জনাব মুহাম্মদ আলীঃ স্যার, আমি একটা সুপারিশ করেছিলাম যে আপনার উচিত ব্যাপারটি আপনার নিজের হাতে নেওয়া যেহেতু বিধানসভার সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শন চলছে। স্যার, এটা সাধারণ মানুষের প্রতিনিধিদের আইনসভা এবং যখন কিছু মানুষ আমাদের সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শন করছে, আমরা জানতে চাই তাদের অভিযোগ গুলো কি কি এবং কিভাবে তার প্রতিকার করা যায়। আপনার দপ্তরে আইনসভার কিছু সদস্য ও বিক্ষোভকারীদের কিছু প্রতিনিধি নিয়ে একটি পরামর্শ সভার আয়োজন করে ব্যাপারটি নিজের হাতে নেওয়ার জন্য আপনিই সর্বোত্তম লোক। এবং তখন আমরা তাদের অভিযোগ কি কি এবং সেগুলোর প্রতিকার আইনসভার এখতিয়ারে পড়ে কিনা তা জানতে চাওয়ার অবস্থানে যেতে পারব। আমি, স্যার, জানতে চাই আমার সুপারিশ অনুযায়ী কী প্রস্তাব করেন।

জনাব মুহাম্মদ রুকুনুদ্দীনঃ জনাব স্পিকার, স্যার, ছেলেরা আমাদের প্রাণ; ছেলেদের শান্তি আমাদের শান্তি; তাদের অশান্তি আমাদের অশান্তি; গত ২/৩ দিন যাবৎ যা চলছে তা নিতান্তই অপ্রীতিকর। একটা সমঝোতা হওয়ায় আমরা আনন্দিত ও নিশ্চিন্ত হয়েছিলাম। কিন্তু সে সমঝোতা ভঙ্গ হয়েছে। আমাদের দেখা দরকার কি জন্য কাদের উস্কানিতে এমন একটা সুন্দর সমঝোতা ভঙ্গ হল, একটা তদন্ত হওয়া উচিত এবং যারা এর জন্য দায়ী তাহাদের উপযুক্ত বিচার হওয়া উচিত।

*                       *                       *                       *                       *

 

 

 

 

 

 

 

001.025.073>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

 

            ভাষা সংক্রান্ত প্রশ্নের তথ্যের নির্দিষ্ট বিষয়বস্তু (১৭ই মার্চ, ১৯৪৮)

মাওলানা আব্দুল হামিদ খানঃ জনাব সদর সাহেব, এখানে যারা সদস্য আছেন তারা সকলেই স্বীকার করবেন যে এটা বাংলা ভাষাভাষীদের দেশ, এই আইনসভার যিনি সদর তিনিও নিশ্চয়ই বাংলাতেই বলবেন। আপনি কি বলেন আমরা তা কিছুই বুঝতে পারি না, আপনি যা বলেন তার সহিত সদস্যদের আলোচনার কোন সংস্রব থাকতে পারে না। আপনি যদি বাংলায় বিনির্দেশ না দেন তা হলে আমরা আপনার আলোচনার শরীক হ’ব কি করে, আমি আশা করি আপনি নির্দেশনা দিবেন যেন সবাই বাংলাতে বলেন এবং আপনিও বাংলাতে নির্দেশনা দিবেন।

জনাব স্পিকারঃ মাননীয় মেম্বর যা বলছেন সে সম্বন্ধে আমার বক্তব্য হচ্ছে এই যে এখন পর্যন্ত এই আইনসভাতে ঠিক হয় নাই যে কোন ভাষায় এ আইনসভার কাজ হবে, তা নির্ভর করে এই আইনসভার সিদ্ধান্তের উপর। এখনও এই রূপ কোন সিদ্ধান্ত এই আইনসভাতে হয় নাই, যে পর্যন্ত এইরূপ কোন সিদ্ধান্ত না হয় সে পর্যন্ত যিনি যে ভাষা জানেন তিনি সেই ভাষায় বলবেন, এটা নির্দেশনার বিষয় নয়।

মাওলানা আব্দুল হামিদ খানঃ আপনি কোন ভাষায় বলবেন? সদর সাহেব, আমি আশা করি ইংরেজি বর্জ্জন করে বাংলা ভাষাতেই যাতে সকলে বলেন তার ব্যবস্থা করবেন।

 

 

———-

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<001.026.074>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ

পূর্ববাংলা ব্যবস্থাপক সভায় বাজেটের ওপর বিতর্কে মওলানা ভাসানীর বক্তব্য

 

প্রাদেশিক ব্যবস্থাপক সভা ১৯ই মার্চ ১৯৪৮

 

মওলানা আবদুল হামীদ খানঃ জনাব সদর সাহেব, দীর্ঘদিন যাবৎ সাম্রাজ্যবাদী বৃটিশ গভর্ণমেন্টের শাসন ও শোষণ হতে মুক্তি লাভ করে পূৰ্ব্ববঙ্গের জনসাধারণ আশা করেছিল যে স্বাধীন পাকিস্তান রাষ্ট্রে স্বাধীনভাবে জীবিকা নিৰ্ব্বাহ করবে, স্বাধীন মতামত ব্যক্ত করবে, তাদের হারান গৌরব ফিরে পাবে, তারা অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং রাজনৈতিক উন্নতি লাভে সক্ষম হবে কিন্তু বড়ই পরিতাপের বিষয়, বড় আফসোসের বিষয় যে এই হাউসে জনাব অর্থসচিব যে বাজেট পেশ করেছেন তা তিনি জনসাধারণের প্রতিনিধি হিসাবে করেননি। গভর্ণর জেনারেলের মনোনীত মেম্বর হিসাবে করেছেন। স্বাধীন দেশে, স্বাধীন পাকিস্তানে স্পেশাল পাওয়ারের মন্ত্রী দ্বারা বাজেট পেশ হবে তা আমরা কখনও আশা করিনি। জনসাধারণের মনের কথা, মনের দুঃখ ও বেদনা বুঝবার তাঁর শাক্তি নাই কারণ জনসাধারণের সঙ্গে তাঁর আদৌ কোন সংশ্রব নাই। তিনি গভর্ণর জেনারেলের প্রেরিত প্রতিনিধি। জনসাধারণের সঙ্গে তাঁর মনের কোন মিল নাই। বিংশ শতাব্দীর এই গণতান্ত্রিক যুগে এই স্বাধীন দেশে গভর্ণর জেনারেল স্পেশাল পাওয়ার ব্যবহার করবেন এটা আমাদের ধারণার অতীত।

তারপর তিনি যে বাজেট পেশ করেছেন তাতে আমলাতান্ত্রিক ভোগবিলাসের জন্য সব কিছুই করেছেন। কিন্তু দেশের মেরুদণ্ড কৃষক মজুর যারা দিবারাত্র হাড়ভাঙ্গা খাটুনি খেটে রাজস্ব যোগায়, তাদের জন্য কিছুই করেন নাই। শতকরা ৪ জন লোক শহরে বাস করে তাদের পানীয় জলের জন্য ১০ লক্ষ টাকা বরাদ্দ করেছেন কিন্তু ৪ কোটি ৬০ লক্ষ গ্রামবাসীদের পানীয় জলের জন্য কোন ব্যবস্থা করেন নাই। যুক্তবঙ্গে ১৯৪৩-৪৪ সালে পুলিশ খাতে ব্যয় বরাদ্দ করা হয়েছিল ৩ কোটি ২ লক্ষ ১৪ হাজার টাকা আর আমাদের মাননীয় অর্থ সচিব যে বাজেট উপস্থিত করেছেন তাতে কেবল পূৰ্ব্ব পাকিস্তানের জন্য পুলিশের খাতে ব্যয় বরাদ্দ করেছেন ৩,০৩,৭৭,০০০ টাকা।

পূৰ্ব পাকিস্তান যারা হাসিল করেছে তাদের উপরই ইহা রক্ষা করার দায়িত্ব। পূৰ্ব্ব পাকিস্তানের জনসাধারণ তা করতে বদ্ধপরিকর। পূৰ্ব্ব পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যারা শক্রতা করে ইহাকে ধ্বংস করবার চেষ্টা করবে, পূৰ্ব্ব পাকিস্তানের আবালবৃদ্ধবণিতা কৃষক, মজুর, সকলে সংগবদ্ধ হয়ে তাদের বিরুদ্ধে লড়বে এবং পাকিস্তানকে রক্ষা করবে। পুলিশের ব্যয় বৃদ্ধি করে স্বাধীন পাকিস্তানকে রক্ষা করার চেষ্টা অত্যন্ত লজ্জাকর বিষয়।

দেশের শিল্প, কৃষি, নৈতিক চরিত্র ও সৰ্ব্বপ্রকার উন্নতি নির্ভর করে শিক্ষার উপর। কিন্তু সেই শিক্ষার উপর ব্যয় বরাদ্দ করা হয়েছে মাত্র ২ কোটি কয়েক লক্ষ টাকা। আমি আশা করি মাননীয় অর্থ সচিব সাহেব পুইশের ব্যয় সঙ্কোচ করে শিক্ষার খাতে যথেষ্ট টাকা বরাদ্দ করবেন এবং এই বাজেট রহিত করে নূতন আকারে আনয়ন করবেন।

মাননীয় অর্থ সচিব সাহেব সেদিন বলেছেন যে জমিদারী প্রথা তাড়াতাড়ি উচ্ছেদ করলে এক কোটি লোক মারা যাবে বা তাদের জীবন বিপন্ন হবে। তাঁর ফিগার বুঝতে পারলাম না। পূবর্ব বাংলার মোট ৪ কোটি ৬০ লক্ষ লোকের মধ্যে শতকরা ৯৫ ভাগ কৃষিজীবী। জমিদার প্রথা উচ্ছেদ করলে ১ কোটি লোক কি করে মারা যায়? এটা তিনি কি করে আবিষ্কার করলেন? গরীব কৃষকদের উপর জুট লাইসেন্স কী বাবদ ২০ লক্ষ টাকা ধাৰ্য্য করা হয়েছে। কিন্তু আপনারা জেনে অবাক হবে যে এই প্রদেশে জমিদারদের কাছে ২ কোটি টাকা সেস বাকি আছে। এক ময়মনসিংহ জেলায় ২৬ লক্ষ টাকা সেস বাকি। ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিষ্ট্রেট সমস্ত দিন ঘুমান আর সন্ধার সময় গিয়ে দস্তখত করেন। এই বাকি সেস আদায়ের কোন ব্যবস্থা করছেন না। যে সমস্ত গরীব কৃষক কৃষিঋণ

 

 

 

 

<001.026.075>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

 

নিয়েছে এবং শোধ করতে পারছে না, মাননীয় অর্থ সচিব সার্টিফিকেট দ্বারা তাদের বাড়ীঘর নীলাম এবং জোতজমি ক্রোক করে উক্ত ঋণ আদায়ের ব্যবস্থা করেছেন। কিন্তু প্রবল প্রতাবশালী জমিদারদের হাতে কড়া লাগিয়ে ২ কোটি টাকা বাকি সেস আদায়ের ব্যবস্থা করতে পারেননি। এই হাউসে অনেক মিনিষ্টারের কাছেও লক্ষ লক্ষ টাকা সেস বাকি পড়ে আছে। স্বয়ং অর্থ সচিব মাননীয় হামিদুল হক সাহেবেরও হয়ত সেস বাকী আছে। (হাস্য…)। যদি মন্ত্রীরা গরীব কৃষকদের মেরে মন্ত্রীত্ব করতে চান তাহলে তাহারা আর বেশী দিন মন্ত্রীত্ব করতে পারবেন না।

মাননীয় জনাব হামিদুল হক চৌধুরীঃ মহামান্য স্পীকার, আপনি কি অনুগ্রহ করে সম্মানিত সদস্যকে উনার এই মন্ত্যব্যের জন্য ব্যক্তিগত ভাবে দায়ভার গ্রহণ করতে বলবেন যে উনি জানেন একটি বিশাল পরিমাণ উপকর বকেয়া আছে?

(এই পর্যায়ে কক্ষে চিল্লাচিল্লি শুরু হয়)

মওলানা আবদুল হামিদ খান: যদি মরণাপন্ন কৃষকদের এই অবস্থা করা হয় তাহলে মন্ত্রমণ্ডলীর সোনার চেয়ার ধ্বংস হবে। কৃষকদের উপর অত্যাচার করে মন্ত্রিত্ব করার অধিকার কারো নাই। আজ আর বৃটিশ শাসন নাই। আজাদ পাকিস্তানে প্রত্যেক নাগরিকের সমান অধিকার। প্রত্যেক মানুষ চায় খাওয়া-পরা, রোগ ঔষধ, থাকার ঘর, চলাচলের রাস্তা, ও লেখাপড়ার সুব্যবস্থা এবং এগুলি তাদের সঙ্গত দাবী। আমি আশা করি মন্ত্রীমন্ডলী জমিদারী প্রথা উচ্ছেদ করে জনপ্রিয়তা লাভ করবেন।

সমবায় বিভাগ-এর ঋণদান সমিতি সুদের টাকা আদায় করতে কি অত্যাচার না করে? এই বিভাগ একটি ফালতু বিভাগ। গভর্ণমেন্টের কত টাকা খরচ হচ্ছে কিন্তু বাস্তবিক কোন কাজ হচ্ছে না। এর চেয়ে ট্রেড সোসাইটি করে শেয়ার বিক্রি করে গ্রামে গ্রামে শিল্পকারখানা গড়ে তুলবার ব্যবস্থা করলে অনেক ভাল হত।

বিনা বেতনে বেসামরিক সরবরাহ বিভাগে পরিদর্শকের পদ পেলেও অনেকে আবেদন করবে। আমি দেখেছি বেসামরিক সরবরাহ বিভাগের ২০০ কর্মচারীর ঘরে সিল্ক এর মশারী এবং দরজা জানালায় সিল্কের-এর পর্দা। এরাই এই পাক পাকিস্তানকে নাপাকের আস্তানায়-তে পরিণত করেছে। এটা বড়ই আফসোসের কথা। এই নাপাকের আস্তানা উচ্ছেদ করতে হবে। বেসামরিক সরবরাহ বিভাগ দুনীতিপূর্ণ বিভাগ। এই বিভাগকে উচ্ছেদ করবার প্রতিশ্রুতি দিয়ে এই কক্ষের সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। মুসলীম লীগের নির্দেশ অনুযায়ী দেশের জনসাধারণ লীগ মনোনীত কলা গাছকেও ভোট দিয়েছে। মুসলিম লীগ প্রার্থী ১ নয় ২ নয় শতকরা ৯৮টি আসন দখল করেছে। জনসাধারণ আপনাদের মুখপানে চেয়ে আছে-জমিদারী প্রথা উচ্ছেদ হবে, বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা প্রবর্তিত হবে, দুনীতিপূর্ণ কষ্ট্রোল প্রথা উঠে যাবে।

এই পাকিস্তানে লক্ষ লক্ষ টাকার মদ বিক্রি হচ্ছে। মদ বিক্রি করে, হারাম বিক্রির রাজস্ব দিয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্র পরিচালনা হতে পারে না। মানুষের নৈতিক চরিত্রের উন্নতি ছাড়া পাকিস্তানের উন্নতি হতে পারে না। আপনারা জানেন বহু টাকা ক্ষতি হওয়া সত্ত্বেও আসাম গভর্ণমেন্ট মদ বিক্রি তুলে দিয়েছেন। আমাদের প্রধানমন্ত্রী আলহাজ, আশা করি পাকিস্তানে নাপাক ডিপো, মদ-গাজার দোকান, বেশ্যাবৃত্তি এবং দুনীর্তিপূর্ণ নিয়ন্ত্রন ব্যবস্থা রাখবেন না। পাকিস্তানে পাক মানুষ বাস করবে। পাক বিভাগ থাকবে। মেম্বরদের জন্য ১০ লক্ষ কয়েক হাজার টাকা বরাদ্দ হয়েছে কিন্তু প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষকগণ আজ ৮ মাস যাবৎ সামান্য ১৫ টাকা বেতনও পাচ্ছেন না। অথচ মন্ত্রীদের বেতন ঠিক মাস মাস আদায় হচ্ছে।

 

 

 

 

 

 

<001.026.076>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

 

মাননীয় স্পীকার: আপনার সময় হয়েছে, আপনি বসুন।

মওলানা আবদুল হামিদ খান: দুটি কথা। প্রাদেশিক গভর্নমেন্ট এই যে বিক্রিয় কর কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে চুক্তি করে কেন্দ্রীয় সরকারের সম্পত্তি করে দিয়ে আসলেন এবং তাদের কাছ হতে মাত্র ১ কোটী টাকা নিবেন বলে স্বীকৃত হলেন, এটা মন্ত্রীমণ্ডলী কোন স্বাধীনতার বলে করলেন? পরিষদের সদস্যদের সঙ্গে পরামর্শ না করে তাঁরা নিজেরা মোড়লী করলেন কোন অধিকারে? আমরা কি কেন্দ্রীয় সরকারের গোলাম? বৃটিশ গভর্ণমেন্টের গোলামী করি নাই। ন্যায়সঙ্গত অধিকারের জন্য চিরকাল লড়াই করেছি, আজও করব। আমরা হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে পাট উৎপাদন করব অথচ পাট কর, এমনকি রেলওয়ে কর, আয়কর, বিক্রয় কর নিয়ে যাবে কেন্দ্রীয় সরকার। এইসব করের শতকরা ৭৫ ভাগ প্রদেশের জন্য রেখে বাকি অংশ কেন্দ্রীয় সরকারকে কে দেওয়া হোক। এই বাজেটে মোহাম্মদ আলী ও মওলানা শওকত আলী যাঁরা আজাদীর জন্য প্রাণ দিয়েছেন এবং কায়েদে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ যিনি পাকিস্তানের জন্য সমস্ত জীবন উৎসর্গ করেছেন তাদের স্মৃতিসৌধের জন্য কোন ব্যবস্থা করা হয় নাই। এই দিকে আমি গভর্ণমেন্টের দৃষ্টি আকর্ষণ করি।

———-

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<001.027.077>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
১১ই মার্চের ধর্মঘট সম্পর্কে “নও বেলেলের” প্রতিনিধির বক্ত্যব্য পূর্ববাংলার ভাষা আন্দোলন ও ততকালীন রাজনিতীঃ বদরুদ্দিন উমর, পৃষ্ঠা-৮৩ ২৫শে মার্চ, ১৯৪৮

 

১১ই মার্চ কেবলমাত্র কিছু সংখ্যক অমুসলমানদের দোকান বন্ধ ছিলো এবং ভাষা আন্দোলনের উদ্দেশ্য মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি ও পাকিস্তানকে খর্ব করা, এই বক্তব্যের মাধ্যমে প্রেস বিজ্ঞপ্তিটিতে সমগ্র আন্দোলনের একটা সাম্প্রদায়িক ব্যাখ্যা দেওয়ার প্রচেষ্টা সহজেই লক্ষণীয়। এই প্রসঙ্গে সাপ্তাহিক “নও বেলালের ঢাকাস্থ প্রতিনিধি প্রেরিত একটি চিঠিতে বলা হয়ঃ

১১ই মার্চের এত বড় ঘটনার পর পূর্ববঙ্গ সরকার যে প্রেসনোট বাহির করেন তাহা পড়িলেই বুঝা যায় প্রকৃত সংবাদকে ব্ল্যাক আউট করার জন্য সরকার চেষ্টা করিয়াছেন। প্রেসনোটে বলা হয় মাত্র কতিপয় বিভেদ সৃষ্টিকারী রাষ্ট্রের দুশমন এই ধর্মঘটে যোগ দিয়াছিল। শহরের সমগ্র মুসলিম এলাকা ধর্মঘটে অংশগ্রহণ করিতে অস্বীকার করে অর্থাৎ সরকারের মতে মুষ্টিমেয় কমু্যনিষ্ট এবং কতিপয় হিন্দু ধর্মঘটে অংশ নিয়াছিল। অথচ কে না জানে ধর্মঘটকে সফল করিয়া তুলিবার জন্য ঢাকার প্রত্যেকটি মুসলমান ছাত্র পুলিশের গুলি ব্যায়নেট ও লাঠির সম্মুখে বুক পাতিয়া দিয়াছিল। অথচ সরকারের মতে মুসলমানরা এই আন্দোলনে যোগ দেয় নাই। প্রচারণার কি অপূৰ্ব্ব নমুনা!

——–

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<001.028.078>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ ও নাজিম উদ্দীনের মধ্যে স্বাক্ষরিত রাজনৈতিক সুযোগ প্রদান সংক্রান্ত চুক্তি। পূর্ববাংলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনিতীঃ বদরুদ্দিন উমর, পৃষ্ঠা-৯০ ১৫শে মার্চ, ১৯৪৮

 

সর্বসম্মত চুক্তিটির বিবরণ নিমণরূপঃ

১। ২৯শে ফেব্রুয়ারী, ১৯৪৮, হইতে বাংলা ভাষার প্রশ্নে যাঁহাদিগকে গ্রেপ্তার করা হইয়াছে তাঁহাদিগকে অবিলম্বে মুক্তি দান করা হইবে।

২। পুলিশ কর্তৃক অত্যাচারের অভিযোগ সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং তদন্ত করিয়া এক মাসের মধ্যে এ বিষয়ে একটি বিবৃতি প্রদান করিবেন।

৩। ১৯৪৮-এর এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে পূর্ব বাংলা সরকারের ব্যবস্থাপক সভায় বেসরকারী আলোচনার জন্য যেদিন নির্ধারিত হইয়াছে সেইদিন বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করিবার এবং তাহাকে পাকিস্তান গণপরিষদে এবং কেন্দ্রীয় সরকারের পরীক্ষা দিতে উর্দুর সমমর্যাদা দানের জন্যে একটি বিশেষ প্রস্তাব উত্থাপন করা হইবে।

৪। এপ্রিল মাসে ব্যবস্থাপক সভায় এই মর্মে একটি প্রস্তাব উত্থাপন করা হইবে যে প্রদেশের সরকারী ভাষা হিসাবে ইংরেজী উঠিয়া যাওয়ার পরই বাংলা তাহার স্থলে সরকারী ভাষা রূপে স্বীকৃত হইবে। ইহা ছাড়া শিক্ষার মাধ্যমও হইবে বাংলা। তবে সাধারণভাবে স্কুল-কলেজগুলিতে অধিকাংশ ছাত্রের মাতৃভাষার মাধ্যমেই শিক্ষা দান করা হইবে।

৫। আন্দোলনে যাঁহারা অংশগ্রহণ করিয়াছেন তাঁহাদের কাহারো বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হইবে না।

৬। সংবাদপত্রের উপর হইতে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হইবে।

৭। ২৯ শে ফেব্রুন্নয়ারী হইতে পূর্ব বাংলার যে সকল স্থানে ভাষা আন্দোলনের জন্য ১৪৪ ধারা জারি করা হইয়াছে সেখান হইতে তাহা প্রত্যাহার করা হইবে।

৮। সংগ্রাম পরিষদের সাথে আলোচনার পর আমি এ ব্যাপারে নিঃসন্দেহ হইয়াছি যে এই আন্দোলন রাষ্ট্রের দুশমনদের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয় নাই।

 

 

——–

 

 

 

 

 

 

 

 

<001.029.079>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

 

শিরোনামঃ জাতীয় সংহতি সম্পর্কে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর বক্তব্য

সুত্রঃ কায়েদে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহঃ স্পিচেস এ্যাজ গভর্নর জেনারেল অব পাকিস্তান- ১৯৪৭-১৯৪৮ পৃষ্ঠা-৮২

তারিখঃ ২১শে মার্চ, ১৯৪৮

 

জাতীয় সংহতি

ঢাকায় তিন লাখের অধিক জনতার সম্মেলনে ভাষণ

২১ মার্চ, ১৯৪৮

 

আসসালাম-উ-আলাইকুম! আসসালাম-উ-আলাইকুম!! আসসালাম-উ-আলাইকুম!!!

প্রদেশের সব জনতা, অভ্যর্থনা কমিটির চেয়ারম্যান, ঢাকার বাসিন্দা সবার কাছে আমি কৃতজ্ঞ এই উষ্ণ অভ্যর্থনার জন্য। পূর্ব পাকিস্তানে আসাটা আমার জন্য কতটা আনন্দের তা আর বলার প্রয়োজন রাখেনা। পূর্ব বাংলা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় একক মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকা যা পাকিস্তানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আমি এখানে আসার জন্য উদগ্রীব ছিলাম, কিন্তু দুঃখজনক হল অন্যান্য ব্যস্ততার কারনে এই গুরুত্বপূর্ণ কাজটি করা হয়ে ওঠেনি।

এই গুরুত্বপূর্ণ ব্যপারের কিছু কিছু আপনারা অবশ্যই জানেন। আপনারা জানেন, ভাগের পর পরই পাঞ্জাবে প্লাবন হানে যার ফলে যে মুসলিমরা তাদের ঘরবাড়ি পূর্ব পাঞ্জাব, দিল্লী এবং প্রতিবেশী যে জেলা সমূহে সরিয়ে নেয় পশ্চিম পাকিস্তানে তাদের নিরাপত্তা, আশ্রয়, খাদ্য এবং পুনর্বাসনের প্রয়োজন হয়ে পড়ে। নতুন গড়ে ওঠা কোন প্রদেশে এমন মারাত্মক সমস্যার মুখোমুখি হবার ঘটনা ইতিহাসে নেই। এমনকি ইতিহাসে কোন নতুন প্রদেশের এমন ধৈর্য ও সাহসের সাথে তা মোকাবেলার ঘটনাও নেই। আমাদের শত্রুরা পাকিস্তানকে এর উত্থানের সাথেই খতম করতে চেয়েছিল। কিন্তু পাকিস্তান আগের থেকেও শক্তিধর হয়ে তা জয়যুক্ত করে। পাকিস্তান যার জন্য সৃষ্টি হয়েছে তা ই করে দেখিয়েছে এবং গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করেছে।

আপনাদের স্বাগত বক্তব্যে আপনারা এই প্রদেশের কৃষি এবং শিল্পখাতের উন্নয়ন, প্রদেশের তরুন-তরুণীদের পাকিস্তানি আর্মিতে প্রশিক্ষণের সুবিধা প্রদান, চিটাগাং বন্দরের উন্নয়ন এবং পাকিস্তানের অন্যান্য অংশের সাথে প্রদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি, শিক্ষাগত সুবিধা এবং ফাইনালি সরকারের সব ধরনের কাজে পূর্ব পাকিস্তানের নাগরিকদের বকেয়া এবং বৈধ ভাগ নিশ্চিত করার ব্যপারে জোর দিয়েছেন। আপনাদের আশ্বস্ত করছি, আমার সরকার আপনাদের সব দাবিকে গুরুত্ত্বের সাথে নিয়েছে এবং সর্বোচ্চ গতিতে পূর্ব পাকিস্তানকে এর উচ্চতায় নেয়ার ব্যপারে উৎকণ্ঠিত। এই প্রদেশের সামরিক উন্নয়নের ক্ষেত্রেও ইতিহাস সাক্ষী হবে। ইতিমধ্যেই সরকার তরুন-তরুণীদের পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী এবং জাতীয় প্রতিরক্ষা বাহিনীতে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে প্রশিক্ষণের জন্যে জোরালো পদক্ষেপ নিয়েছে। আপনারা নিশ্চিত থাকতে পারেন, প্রদেশের সব তরুণদের প্রতিরক্ষক হিসেবে গড়ে তোলা হবে।

 

 

 

 

 

<001.029.080>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

 

এবার প্রাদেশিক অন্যান্য সাধারণ ব্যপারে আসা যাক। সেক্ষেত্রে প্রথমেই আপনাদের জনগন এবং সরকারকে অভ্যর্থনা জানাই এই কষ্টকর সাত মাস যেভাবে মোকাবেলা করেছেন। বিভাগের পর আপনাদের সরকার যে নিষ্ঠা ও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে সকল সমস্যা ও দ্বন্দের মোকাবেলা করে প্রশাসনকে সমৃদ্ধ করেছে তা সত্যিই প্রশংসার যোগ্য। ১৫ই আগস্টের পর প্রাদেশিক সরকার ঢাকায় এর নিজের ঘরেই পালাতক ছিল বলা যায়। বিভাগের আগে যা ছিল ছোট একটা মফস্বল শহর তার পক্ষে হাজারো সরকারী কর্মীদের তাৎক্ষনিক বাসস্থানের ব্যবস্থা করা কষ্টকর ছিল। বিভাগের পর ভারত থেকে বিতাড়িত সত্তর হাজার রেলওয়ে ও অন্যান্য কর্মীদের পরিবার সহ এখানে যোগ হওয়ায় সরকার কঠিন প্রশাসনিক সমস্যায় পড়ে। তাছাড়া হিন্দুদের প্রস্থানের সাথে সাথে তাদের মালিকাধিন প্রশাসনিক ব্যবস্থা ও পুরো যোগাযোগ ব্যবস্থা অসংগঠিত হয়ে পড়ে। এইসব সমস্যার সমাধানের জন্য এবং আসন্ন প্রশাসনিক ভাঙ্গন রোধে সরকার তাৎক্ষনিক ভাবে প্রশাসন পুনর্গঠন এবং এর বাহিনীকে নতুন করে গঠন করে।

সরকার অত্যন্ত দ্রুত ও দক্ষতার সাথে এসব করেছে। প্রশাসন ও সাম্প্রদায়িক জীবন শান্তিপূর্ণ ভাবে চলতে শুরু করে। দ্রুত প্রশাসনিক পুনর্গঠনই শুধু নয় অন্যান্য অভাবও কাঁটিয়ে ওঠে যা প্রদেশের শান্তির সাথে আসন্ন দুর্ভিক্ষ কাঁটিয়ে ওঠার জন্য প্রয়োজন ছিল। পরের কৃতজ্ঞতা এখানের জনগনের প্রতি বিশেষ করে সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়কে যারা বিভাগের পরবর্তী মাস জুড়ে মুসলিমদের উপর ভারতীয় রাজত্ব, গনহত্যা ও নিপীড়নের পরেও দৃষ্টান্তমূলক শান্ত থেকেছে ও শান্তি বজায় রাখাতে একাগ্র থেকেছে। এইসব ভয়ংকর ঘটনার পরেও গত পূজায় প্রায় চল্লিশ হাজারের মত হিন্দুরা এই প্রদেশে মিছিল করে, যেখানে এখানকার মুসলিমরা শান্তি ভঙ্গ করেনি এবং বিরক্তিও প্রকাশ করেনি।

যে কোন নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষক আমার সাথে একমত হবেন, পাকিস্তান যেভাবে সংখ্যালঘুদের দেখাশোনা ও আশ্রয় দিয়েছে তা ভারতের কোথাও দেয়া হয়নি। আপনারা একমত হবেন যে পাকিস্তান আইন শৃঙ্খলার মাধ্যমে শান্তি বজায় রাখতে সক্ষম; এবং বলে রাখি শুধু ঢাকাতেই নয়, পাকিস্তানের সবখানেই সংখ্যালঘুরা অন্য সব জায়গা থেকে নিরাপদ। আমরা এটা স্পষ্ট করেছি যে পাকিস্তানী সরকার শান্তি বিঘ্নিত হতে দেবেনা; পাকিস্তান যে কোন মুল্যেই আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা করবে; কোন প্রকার হাঙ্গামা প্রশ্রয় দেবেনা। কিছু বিষয়ে গুরুত্ব দেয়া জরুরি যথা, একটি সুশৃঙ্খল প্রশাসন গড়ে তুলতে হবে, যাতে আসন্ন দুর্ভিক্ষ এড়িয়ে প্রদেশের চার কোটি মানুষের খাদ্য সরবরাহ ঠিক রাখা যায়, যে কোন খাদ্য ঘাটতি ও প্রশাসনিক অসুবিধা দূর করা যায়, এবং শান্তি বজায়ে রাখা যায় কারন সরকারের এই সব অর্জনকে অগ্রাহ্য করার করার এবং এসবের অনুমোদন দেয়ার প্রবণতা রয়েছে।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<001.029.081>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

 

সমালোচনা করা সবসময় সহজ; ভুল ধরাও সহজ, কিন্তু মানুষ ভুলে যায় তাদের জন্য কি করা হয়েছে এবং কি করা হবে, এবং স্বভাবতই পাকিস্তান জন্মের সময় আমাদের যে দুখ, ক্লেশ, সমস্যা ও বিপদের মোকাবেলা করতে হয়েছে তারা তা অনুধাবনই করবে না। আপনাদের প্রশাসন নির্ভুল তা আমি মনে করিনা; এর সাথে আমি এও বলি নাই যে উন্নতির কোন সুযোগ নেই; আমি বলি নাই যে সত্যিকারের পাস্তানিদের সৎ সমালোচনা গ্রহন করা হবেনা। সবসময়ই স্বাগতম। কিন্তু কাওকে যখন সরকার ও বিশ্বস্ত কর্মকর্তা ও কর্মীদের দিনরাত ধরে আপনাদের জন্য করে যাওয়া কাজ অস্বীকার করে শুধু অভিযোগ ও ভুল ধরতে দেখি, তা স্বাভাবিকই আমাকে কষ্ট দেয়। কমপক্ষে ভাল কাজের জন্য কিছু ভাল কথা বলে পড়ে অভিযোগ এবং সমালোচনা করুন। বড় প্রশাসনে ভুল হবেই, নির্ভুল আশা করা যায়না; পৃথিবীর কোন দেশেই তা সম্ভব না। আমাদের আশা আকাঙ্ক্ষা হল এটাকে যতটা সম্ভব কম করা যায়। আমাদের ইচ্ছা এটাকে কতটা পর্যাপ্ত, উপকারী ও কর্মোপযোগী করে তোলা যায়। কিসের জন্য? সরকার এর থেকে কি পাবে? সরকারের একটাই উদ্দেশ্য- কিভাবে জনগনের সেবা করা যায়, কিসে তাদের কল্যান হয়, কিসে তাদের আরো ভাল হয়। সরকারের আর কি উদ্দেশ্য থাকতে পারে, এখন এটা আপনাদের হাতে সরকারের হাতে ক্ষমতা দেবেন নাকি সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরাবেন কিন্তু অবশ্যই কোন হাঙ্গামা করবেন না। আপনাদের ক্ষমতা আছে, এর ব্যবহার জানতে হবে; আপনাদের এর কলকব্জা বুঝতে হবে। সাংবিধানিকভাবে, আপনারা অসন্তুষ্ট হলে এক সরকারের বদলে অন্য সরকারকে ক্ষমতায় আনতে পারেন।

অতএব, পুরোটাই আপনাদের হাতে, কিন্তু আপনাদের প্রতি আমার উপদেশ হচ্ছে ধৈর্য ধরুন এবং তাদের সমর্থন দিন যারা সরকারের হাল ধরে আছে, তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল হোন, তাদের অসুবিধা ও সমস্যা বোঝার চেষ্টা করুন যেমনটা তাদেরও উচিত আপনাদের ক্ষোভ, অভিযোগ এবং ভোগান্তি বোঝার চেষ্টা করা। এই পারস্পরিক সহযোগিতা, উদ্যম এবং সুনাম পাকিস্তানকে শুধু রক্ষাই করবেনা, পৃথিবীর মধ্যে একটি একটি মহান রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলবে। আপনারা কি এখন এই অর্জিত পাকিস্তানকে আপনাদের মূর্খতার জন্য ধ্বংস করবেন? আপনারা কি এর ভাল চান না? সেইক্ষেত্রে একটি অপরিহার্য শর্ত হচ্ছে- নিজেদের মধ্যে একতা ও সংহতি গড়ে তুলুন।

কিন্তু আমি আপনাদের বলতে চাই, আমাদের মধ্যে কিছু লোক বিদেশী সংস্থার অর্থায়নে ভাঙ্গন সৃষ্টির চেষ্টা করছে। তাদের উদ্দেশ্য পাকিস্তানের ভাঙ্গন এবং অনিষ্টসাধন। আমি চাই আপনারা সুরক্ষিত থাকুন, সজাগ থাকুন এবং কোন শ্লোগান ও বাঁধা বুলিতে আকৃষ্ট হবেন না। তারা বলছে পাকিস্তানী সরকার এবং পূর্ব বাংলা সরকার আপনাদের ভাষা নষ্ট করবে। এর থেকে বড় মিথ্যাচার কোন মানুষের থেকে এখন পর্যন্ত উচ্চারিত হয়নি। অনেকটা সরাসরি ও খোলামেলা ভাবে আপনাদের বলছি, আপনাদের মধ্যে কিছু কম্যুনিস্ট ও বিদেশী সাহায্যের প্রতিনিধির ব্যপারে যদি সাবধান না থাকেন তাহলে আপনারা চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে যাবেন। পূর্ব বাংলাকে ভারতীয় ইউনিয়নে ফিরিয়ে নেয়ার ধারনা এখনো তাদের ছাড়েনি, এবং এটাই তাদের উদ্দেশ্য। আমি নিশ্চিত- আমি ভীত নই কিন্তু সতর্ক থাকা জরুরী- যারা ভারতীয় ইউনিয়নে পূর্ব বাংলাকে ফিরিয়ে নেবার চিন্তা করছে তারা স্বপ্নরাজ্যের বাসিন্দা।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<001.029.082>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

 

আমাকে বলা হয়েছে কিছু হিন্দু সম্প্রদায় দলবদ্ধ হয়ে এই প্রদেশ ছেড়েছে। এই প্রস্থানে ভারতীয় পত্রিকায় দারুন প্রভাব পড়েছে এবং সংখ্যা প্রায় লাখের কাছাকাছি। সরকারি হিসেবে এই সংখ্যা দুই লাখের উপর ছাড়িয়েছে। সেক্ষেত্রে সংখ্যালঘুদের সাথে কোন দুর্ব্যবহার না করে এদের প্রস্থানে আমি খুশি হয়েছি। অন্যদিকে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বৃহত্তর স্বাধীনতা উপভোগ করছে এবং ভারতীয় অন্যান্য সংখ্যালঘুদের প্রভুত্ব থেকে নিজেদের কল্যাণের ব্যাপারে তারা উৎকণ্ঠিত।

এই দেশান্তরের কারন হিসেবে ভারতীয় রাজ্যে যুদ্ধনেতাদের পাকিস্তান এবং ভারতের মধ্যে অবশ্যসম্ভাবি যুদ্ধের আভাষ পাওয়া যাচ্ছে; ভারতের কিছু প্রদেশে সংখ্যালঘুদের সাথে দুর্ব্যবহার ও ভয় সৃষ্টির প্রতিক্রিয়া হিসেবে এখানেও তাই করা হচ্ছে, এবং ভারতীয় পত্রিকার একটা অংশে হিন্দুদের এই প্রদেশ ছাড়ার জন্য খোলাখুলি ভাবে উৎসাহিত করা হচ্ছে, যা পাকিস্তানী সংখ্যালঘুদের মধ্যে হিন্দু মহাসভা দ্বারা কাল্পনিক এক দুর্দশার আহ্বান করছে। সংখ্যালঘুদের সাথে দুর্ব্যবহারের এই অভিযোগ এবং প্রচারণা মানে, বার মিলিয়নেরও বেশি অমুসলিম যারা এই প্রদেশে শান্তির সাথে বাস করছে এবং এখান থেকে চলে যাওয়াকে অস্বীকার করেছে তাদের সাথে মিথ্যাচার করা।

যা বলেছি তা আমাকে পুনরায় বলার সুযোগ দিনঃ আমরা পাকিস্তানে সংখ্যালঘুদের সাথে নিরপেক্ষ ও যথাযথ আচরন করবো। পাকিস্তানে তাদের জীবন ও সম্পত্তি ভারত থেকে সুরক্ষিত এবং আমরা জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে আইন শৃঙ্খলা ও শান্তি বজায়ে রেখে সকলকে রক্ষা ও হেফাজত করবো।

এই পর্যন্ত ঠিক আছে। এবার প্রদেশের কিছু অসন্তোষজনক ব্যাপারে আসা যাক। এখানকার অমুসলিমদের বিপক্ষে আমি যা বলেছি তা কিছু নির্দিষ্ট ভাবনা মাত্র। ইদানিং এক ধরনের উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে পাকিস্তান ও এই প্রদেশের ভাষা বাংলা হবে নাকি উর্দু হবে এই নিয়ে। আমি শুনেছি কিছু রাজনৈতিক সুযোগ সন্ধানীরা ঢাকায় ছাত্র সম্প্রদায়কে রাজনৈতিক হাতিয়ার বানানোর চেষ্টা চালিয়ে প্রশাসনকে অস্বস্তিতে ফেলছে।

আমার তরুন বন্ধুরা যারা এখানে উপস্থিত আছেন তাদের বলছি, আপনাদের প্রতি যার সবসময়য়ই মায়া ভালবাসা রয়েছে, যে আপনাকে দশ বছর ধরে বিশ্বাস ও ভরসার সাথে দেখে আসছে, আমি সতর্ক করছি- যদি কোন রাজনৈতিক দলের স্বীকার হন তবে সেটা হবে সবচেয়ে বড় ভুল। মনে রাখবেন একটা বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটবে। এটা আমাদের নিজস্ব সরকার। আমরা মুক্ত, স্বাধীন ও সার্বভৌম জাতি। আমাদের আচরন ও সম্পর্ক হবে মুক্তঃ বিদেশী শাসন আমাদের আর দমন ও নিপীড়ন করতে পারবেনা; আমরা সেই শৃঙ্খল ও হাতকড়া ভেঙ্গেছি। আমার তরুন বন্ধুরা, আপনারাই পাকিস্তানকে প্রস্তুত করবেন, ধ্বংস ও বিপথে যেতে দেবেন না। আপনাদের মধ্যে পরিপূর্ণ একতা ও সংহতি গড়ে তুলুন। দেখিয়ে দিন আপনারা কি করতে পারেন। আপনাদের বড় কাজ হচ্ছে নিজের কাছে সৎ থাকা, মা-বাবার কাছে সৎ থাকা, দেশের কাছে সৎ থাকা- পড়ালেখায় মনযোগী হওয়া। আপনারা যদি এখনি শক্তি অপচয় করেন, পরে পস্তাবেন। আপনাদের কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্ট শেষ করে আপনারা স্বাধীন ভাবে নিজের ও দেশের কাজে লাগতে পারেন। পাকিস্তান এবং আপনার প্রদেশ এখনো বিপদে আছে সে ব্যপারে আপনাদের সতর্ক করছি। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা ঠেকাতে ব্যর্থ হয়ে, হতাশা ও ব্যর্থতার দায় নিয়ে পাকিস্তানের শত্রুদের এখন প্রধান মনোযোগ হচ্ছে পাকিস্তানের মুসলিমদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করা। এই প্রচেষ্টা প্রধানত প্রাদেশিকতাকে উৎসাহিত করছে।

 

 

 

 

 

 

 

 

<001.029.083>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

 

যতদিন না পর্যন্ত রাজনীতি থেকে এই বিষ ঝেড়ে ফেলা হবে, আপনারা নিজেদের সংযুক্ত করতে পারবেন না, নিজেদের তৈরি করতে পারবেন না এবং নিজেদেরকে সত্যিকারের জাতি হিসেবে গঠন করতে পারবেন না। বাঙ্গালী, পাঞ্জাবী, সিন্ধী, বালুচি, পাঠান ও অন্যান্য যে ভাষা আছে আমরা তাতে কথা বলতে চাইনা। এগুলো একেকটা কোর্স ইউনিট। কিন্তু আপনাদের কাছে জানতে চাই, ত্রিশ বছর আগে শেখানো বিদ্যা কি আপনারা ভুলে গিয়েছেন? যদি আমি বলি, এখানে সবাই বহিরাগত। বাংলার আসল বাসিন্দা কারা- যারা এখন বাস করছে তারা কি? তাহলে আমরা বাঙ্গালী, সিন্ধী, পাঠান বা পাঞ্জাবী এগুলো বলার অর্থ কি। এখন আমরা সবাই মুসলিম।

ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে, এবং আপনারা সবাই একমত হবেন যে আপনি যে ই হোন, আপনি একজন মুসলিম। আপনারা এখন একটি জাতির অন্তর্ভুক্ত, একটি এলাকা দ্বারা বেষ্টিত, একটি বিস্তীর্ণ এলাকা যা এখন আপনাদের; যা কোন পাঞ্জাবী, সিন্ধী, পাঠান বা বাঙ্গালীর নয়; এটা আপনাদের। যদি নিজেদের একটি জাতি হিসেবে গড়তে চান তাহলে ঈশ্বরের দোহাই, এই প্রাদেশিকতা ছাড়ুন। শিয়া, সুন্নি ইত্যাদি বিভক্তির মতোই প্রাদেশিকতা একটি অভিশাপ।

এতে আমাদের পূর্বসূরি সরকারের কোন উদ্বেগ ছিলোনা, এটা নিয়ে দুশ্চিন্তার কোন কারন ছিলোনা; তারা শুধু এখানে প্রশাসন চালাত, আইন শৃঙ্খলা মেনে চলে তাদের ব্যবসা পরিচালনা করতো এবং যতটা সম্ভব ভারতে কাজে লাগাত। কিন্তু এখন আমরা সবাই আলাদা অবস্থায় আছি। আপনাদের একটা উদাহরণ দেই। ধরুন আমেরিকা। যখন তারা ব্রিটিশ শাসন ত্যাগ করে নিজেদের স্বাধীন বলে ঘোষণা দিল, তখন সেখানে কয়টি জাতি ছিল? অনেকেই ছিল- স্প্যানিশ, ফ্রেঞ্চ, জার্মান, ইটালিয়ান, ইংরেজ, ডাচ আরো অনেকে। যাই হোক, তারা ছিল। তাদের অনেক সমস্যাও ছিল। কিন্তু মনে করিয়ে দেই, তাদের অস্তিত্ব টিকে ছিল এবং তারা আসলেই মহান জাতি। যেখানে আপনাদের কিছুই নেই। আপনাদের এখন শুধু পাকিস্তান আছে। সেখানে যদি কোন ফ্রেঞ্চ বলতো, ‘আমি একজন ফ্রেঞ্চ এবং আমি একটি মহান জাতির অন্তর্ভুক্ত’ এবং আরো অনেক কিছু। কিন্তু হয়েছিল কি? তারা তাদের সমস্যা অনুধাবন করেছিল এবং বুঝেছিল কারন তাদের জ্ঞান ছিল, খুব অল্প সময়ে তারা তাদের সমস্যার সমাধান করে এবং এই গোষ্ঠীতন্ত্রকে বিনষ্ট করে যেখানে নিজেদের জার্মান, ফ্রেঞ্চ, ইংরেজ বা স্প্যানিশ না বলে একজন আমেরিকান বলে। তারা শৌর্যের সাথে বলতঃ ‘আমি একজন আমেরিকান’ এবং ‘আমরা আমেরিকান’। সুতরাং আপনাদেরও এভাবে ভাবতে হবে যে আপনাদের দেশ পাকিস্তান এবং আপনারা পাকিস্তানি।

আপনাদেরকে এই প্রাদেশিকতা থেকে বের হতে হবে, কারন যতক্ষণ পর্যন্ত পাকিস্তানের রাজনীতিতে এই বিষ থাকবে, বিশ্বাস করুন, আপনারা শক্তিশালী জাতি হতে পারবেন না, যা চান তা অর্জন করতে পারবেন না। এটা ভাববেন না যে আমি এই অবস্থান মেনে নেইনি। খুব জলদি এটা একটা দুষ্টচক্র হবে। যখন আপনারা বাংলায় কথা বলবেন, তারা বলবে, ‘হ্যাঁ আপনিই ঠিক কিন্তু পাঞ্জাবীরা খুব অহংকারী’। যখন আপনি পাঞ্জাবী বা অন্য কোন ভাষায় কথা বলবেন, তারা বলবে, ‘হ্যাঁ, কিন্তু এরা আমাদের এখানে চায়না, বের করে দিতে চায়’। এখন এটা একটা দুষ্টচক্র হয়ে গেছে এবং আমার মনে হয়না কেউ এই চাইনিজ ধাঁধার সমাধান করতে পারবে। প্রশ্ন হচ্ছে কে বেশি সদয়, বেশি কাজের এবং অন্যান্য রাজ্যের মতো কে পাকিস্তানের সবচেয়ে বেশি সেবা করবে? সুতরাং মন ঠিক করেন এবং এই গোষ্ঠীতন্ত্রকে আজই খতম করেন।

ভাষার ব্যাপারে আমি ইতোমধ্যেই বলেছি, মুসলমানদের মধ্যে সংহতি নাশের চেষ্টা চলছে। আপনাদের প্রধানমন্ত্রী সঠিকভাবেই সম্প্রতি বিবৃতি দিয়েছেন এবং আমি খুশি এই সরকার তাদের কোন প্রতিনিধির মাধ্যমে প্রদেশের শান্তি বিনষ্ট না হওয়ার ব্যাপারে অনড়। প্রদেশের জনগণের দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধিই ঠিক করবে এখানের সরকারি ভাষা বাংলা হবে কিনা। এই ব্যাপারে আমার কোন সন্দেহ নেই যে এই প্রশ্নের জবাব সঠিক সময়ে এখানকার বাসিন্দাদের আশানুরূপ ভাবেই ঠিক করা হবে।

 

 

 

 

 

 

<001.029.084>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

 

আমি পরিষ্কারভাবে বলতে চাই, বাংলা ভাষার বিষয় নিয়ে আপনাদের সাধারণ জীবনযাত্রা অনুভূত বা বিঘ্নিত হচ্ছে এটা সত্য নয়। কিন্তু এটাই চূড়ান্ত, আপনাদের প্রদেশের ভাষা আপনাদের জনগন দ্বারাই স্থির করা হবে। কিন্তু এটা পুরোপুরি নিশ্চিত যে, পাকিস্তানের জাতীয় ভাষা হবে উর্দু, অন্য কিছু নয়। পাকিস্তানের শত্রু হবার জন্য যারা আপনাদের বিপথে চালিত করছে। একটি জাতীয় ভাষা ছাড়া কোন জাতিই নিজেদের একতা ও ক্রিয়াকলাপ ধরে রাখতে পারেনা। অন্যান্য দেশের ইতিহাস দেখুন। অতএব, জাতীয় ভাষার প্রসঙ্গ আসলে, পাকিস্তানের ভাষা হবে উর্দু। কিন্তু এটা সময় মতো হবে।

আপনাদের আবারো বলছি, পাকিস্তানের শত্রুদের ফাঁদে পা দেবেন না। দুঃখজনকভাবে, আপনারা পঞ্চ-শ্রেণীভুক্ত- এবং আমি দুঃখের সাথে বলছি যারা বাইরে থেকে অর্থায়ন পাচ্ছে, তারা মুসলিম। কিন্তু তারা অনেক বড় ভুল করছে। আমরা আর কোন অন্তর্ঘাত সহ্য করবোনা; পাকিস্তানের শত্রুদের আর সহ্য করবোনা; আমাদের দেশে কোন দেশদ্রোহিতা ও পাঁচ-কলামিস্ট সহ্য করবোনা, এবং এসব যদি বন্ধ না হয়, তাহলে আমি নিশ্চিত আপনাদের ও পাকিস্তান সরকার খুব নিষ্ঠুর ভাবে এর মোকাবেলা করবে, কারন এরা একধরনের বিষ। আমি এই উদ্দেশ্য ঠিকই বুঝতে পারছি। প্রায় বলা হয়, ‘ কেন আমরা এই দলে বা ওই দলে’? এখন আপনাদের বলি, আশা করি আপনারা আমার সাথে একমত হবেন; আমাদের এই ক্রমাগত প্রচেষ্টা ও সংগ্রামের ফল হিসেবে দশ বছর পরে পাকিস্তান অর্জন করেছি। মুসলিম লীগের দ্বারা এটা হয়েছে। সেখানে অবশ্যই কিছু মুসলমান নিরপেক্ষ ছিল; কিছু ভীত ছিল, কারন তারা ভিতরে ভয় পাচ্ছিলো তারা হয়তো হেরে যাবে; কিছু শত্রুদের কাছে বিক্রি হয়ে আমাদের বিপক্ষে কাজ করছিল, কিন্তু সংগ্রাম ও যুদ্ধ করে সৃষ্টিকর্তার দোয়া ও সাহায্যে আমরা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা করেছি যা বিশ্বকে স্তব্ধ করেছে।

এই পবিত্র বিশ্বাস এখন আপনাদের হাতে; মুসলিম লিগ। আমাদের দেশ ও দেশের জনগণের মঙ্গলে আমাদেরই অবিভাবক হয়ে এই পবিত্র বিশ্বাস রক্ষা করতে হবে, নয়তো? আমরা যা অর্জন করেছি তা কি এইসব অতিতের সন্দিহান মানুষদের নিয়ে গঠিত ছত্রাক দল গুলো ধ্বংস করবে বা আমাদের নিরাপত্তাকে রোধ করবে? আপনাদের কাছে জানতে চাই, আপনারা কি পাকিস্তান বিশ্বাস করেন? ( হ্যাঁ, হ্যাঁ আওয়াজ)। পাকিস্তান অর্জন করে আপনারা খুশি? (হ্যাঁ, হ্যাঁ আওয়াজ)। পূর্ব বাংলা বা পাকিস্তানের কোন অংশ ভারত ইউনিয়নে যাক, সেটা কি আপনারা চান? (না, না)। তাহলে যদি পাকিস্তানের ভালো চান, গড়ে তুলতে চান, পুনর্গঠন করতে চান, তাহলে আমি বলবো প্রতিটি মুসলমানের সৎ দায়িত্ব হবে মুসলিম লীগে যোগ দেয়া এবং সর্বত ভাবে পাকিস্তানের সেবা করা। অন্য যেসব ছত্রাক দল আজকাল দেখা যাচ্ছে তাদের অতীতের কারনে তারা অবিশ্বাস্য; ঈর্ষা, বৈরিতা বা বদলার জন্য নয়। সৎ পরিবর্তনকে স্বাগতম কিন্তু বর্তমান জরুরী অবস্থায় সব মুসলমানদের মুসলিম লীগের ব্যানারে আসা উচিত, যা পাকিস্তানের সত্যিকারের অবিভাবক, এবং একটি মহান জাতি হিসেবে গড়ে তুলতে হবে নিজেদের দল গুলোকে পরে সুন্দর ও সুস্থ ভাবে গড়ে তোলার আগেই।

আরেকটি ব্যাপার। বিচ্ছিন্নতা বোধ করবেন না। অনেকেই আমাকে বলেছে পূর্ব বাংলা পাকিস্তান থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন মনে করে। কোন সন্দেহ নাই পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যকার দুরত্ত্ব অনেক; সন্দেহ নেই যে অনেক সমস্যা রয়েছে, কিন্তু আপনারা জেনে রাখুন আমরা পূর্ব বাংলা ও ঢাকার গুরুত্ব জানি ও অনুধাবন করেছি।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<001.029.085>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

 

এবার আমি শুধু এক সপ্তাহ বা দশ দিনের জন্য আসছি, দেশের প্রধানের দায়িত্ব থেকে মুক্ত হতে অনেক দিনের জন্য আসতে হতে পারে এবং থাকতে হতে পারে, বা সপ্তাহের জন্য, একই ভাবে পাকিস্তানের মন্ত্রীদেরও কাছের যোগাযোগ তৈরি করতে হবে। তাদের এখানে আসা উচিত এবং আপনাদের নেতা ও সরকারের সদস্যদেরও পাকিস্তানের রাজধানী করাচী যাওয়া উচিত। আপনাদের ধৈর্য ধরতে হবে। আপনাদের সাহায্য সহযোগিতায় আমরা পাকিস্তানকে শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে পারবো।

অবশেষে, আমি আপনাদের একসাথে থাকার অনুরোধ করছি, আমাদের জনগনের ভালোর জন্য সকল অসুবিধা, দুর্ভোগ উৎসর্গ করুন। যে কোন মাপের যন্ত্রণা, কঠোর পরিশ্রম, স্বার্থ ত্যাগ কম হবে যদি আপনি আপনার নিজের, জাতির ও দেশের ভালোর জন্য অবদান রাখতে চান। এভাবেই আপনারা পাকিস্তানকে বিশ্বের পঞ্চম বৃহৎ রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে পারবেন শুধুমাত্র জনসংখ্যার দিক দিয়েই নয়, শক্তির দিক দিয়েও, এবং বিশ্বের অন্যসব জাতির নেতৃত্ব হিসেবে। এরই সাথে উপরওয়ালা আপনাদের মঙ্গল করুন। *

 

পাকিস্তান জিন্দাবাদ। পাকিস্তান জিন্দাবাদ। পাকিস্তান জিন্দাবাদ।

 

 

———-

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<001.030.086>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

 

শিরোনামঃ জাতি গঠনে ছাত্রদের ভূমিকা সম্পর্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ

সুত্রঃ কায়েদে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহঃ স্পিচেস এ্যাজ গভর্নর জেনারেল অব পাকিস্তান ১৯৪৪-১৯৪৮। পৃষ্ঠা- ৮২

তারিখঃ ২৪শে মার্চ ১৯৪৮

 

জাতি গঠনে ছাত্র সমাজের ভূমিকা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন বক্তৃতা, ২৪ মার্চ, ১৯৪৮

(ঢাকার রেডিও পাকিস্তান কর্তৃক রেকর্ডকৃত)

 

 

ভদ্র মহোদয় ও মহোদয়াগণ,

 

আপনাদের উপাচার্য মহাশয় যখন আমাকে এসে অনুরোধ করলেন সমাবর্তনে একটা বক্তৃতা দেয়ার জন্য, আমি তাকে স্পষ্ট বলে দিলাম, আমার নানামুখী এত ব্যস্ততা যে সমাবর্তনের জন্য একটা আনুষ্ঠানিক বক্তৃতা প্রস্তুত করা হয়তো সম্ভব হবে না, যা এই বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন মহান বিষয়াদি যেমন শিল্প, ইতিহাস, দর্শন, বিজ্ঞান, আইন প্রভৃতির সাথে মান সম্মত হয়। যাহোক, আমি অবশ্য প্রতিজ্ঞা করেছিলাম যে সমাবর্তন উপলক্ষ্যে ছাত্রদের সামনে দুটো কথা বলব এবং এখন যে কথাগুলো বলব তা এই প্রতিজ্ঞা পূরণই বলা যায়।

 

প্রথমেই উপাচার্য মহাশয়কে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করব, বিভিন্ন গালভরা বিশেষণে আমাকে বিশেষায়িত করার জন্য। জনাব উপাচার্য, আমি এখন যা করছি কিংবা যতটা করতে সক্ষম হয়েছি, মোটামুটি সবই ছিল আমার দায়িত্ব পালন। একজন মুসলমান হিসেবে সততা এবং নিঃস্বার্থতার সাথে দেশের মানুষের সেবা করাটা দায়িত্ব হিসেবেই বর্তায়।

 

আপনাদেরকে যখন আমি কথাগুলো বলছি, তা রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে নয়, বরঞ্চ এমন একজন বন্ধু হিসেবে বলছি যে সার্বক্ষণিক আপনাদের মমতায় বেধে রাখে। অনেকেই আজকে তাদের ডিপ্লোমা এবং ডিগ্রি অর্জন করবেন, আমি তাদের সাধুবাদ জানাই। আপনারা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নিজেদের যোগ্য প্রমাণ করে জয়মাল্য ছিনিয়ে নিয়েছেন। বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত পরিসরে যেখানে আপনার প্রবেশ করতে যাচ্ছেন সেখানেও আপনাদের সফলতা কামনা করি। অনেকেই আপনাদের শিক্ষাজীবনের শেষপ্রান্তে এবং জীবনের চরম চূড়ায় দাঁড়িয়ে আছেন। আপনারা ভাগ্যবান যে একান্ত নিজেদের একটা স্বাধীন সার্বভৌম দেশের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে যেতে পারছেন, যা আপনাদের পূর্বপুরুষরা পারে নি। পাকিস্তান রাষ্ট্র জন্মের কারণে যে যুগান্তকারী পরিবর্তনসমূহ সূচিত হয়েছে তা আপনাদের এবং পরবর্তী ছাত্রদের বুঝতে পারাটা জরুরী। পরাধীনতার শিকল আমরা ভেঙেছি, এখন আমরা মুক্ত মানুষ। আমাদের দেশ আমাদের একান্ত নিজেদের। আমাদের সরকার আমাদের একান্ত নিজেদের, জনগণের জন্য, জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ এবং রাষ্ট্রের উন্নতির জন্য কাজ করে যাচ্ছে।

যাহোক, স্বাধীনতা মানে কিন্তু লাইসেন্স পাওয়া নয়। এর মানে এই নয় যে তোমার যা ইচ্ছা তুমি করবে, রাষ্ট্রের কে কী মনে করল সেসব না ভেবে যেমন ভাল লাগে তেমন আচরণ করবে। আপনাদের উপর অনেক দায়িত্ব, বলতে গেলে অন্যান্য সময়ের চেয়েও বেশী। আমাদেরকে একতাবদ্ধ ও শৃঙ্খলাবদ্ধ জাতি হিসেবে কাজ করে যেতে হবে। স্বাধীনতা অর্জনের সময় যে সামরিক শক্তির দরকার ছিল, তারচেয়ে এখন বেশী দরকার উন্নয়নমূলক শক্তির। স্বাধীনতা অর্জনের জন্য সামরিক শক্তির প্রয়োগের চেয়ে কঠিন হচ্ছে তাকে গড়া তোলাটা। জেলে যাওয়া কিংবা স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করা সরকার পরিচালনার চেয়ে সহজতর।

 

 

 

 

 

 

<001.030.087>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

 

বরঞ্চ যেসব বিপদ আমরা কাটিয়ে উঠেছি এবং যেসব কতিপয় ঝামেলা সামনে আসছে সেসব সম্পর্কে আপনাদের দু’কথা বলি। পাকিস্তান জন্ম ঠেকাতে না পারার অতৃপ্ত বাসনা মেটানোর জন্য শত্রুরা এখন নজর দিয়েছে আমাদেরকে দূর্বল এবং ধ্বংস করার পথ খুঁজতে। একারণেই সরকার ক্ষমতায় আসতে না আসতেই পাঞ্জাব এবং দিল্লির ব্যাপক হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হল। হাজার হাজার পুরুষ, নারী এবং শিশুকে জবাই করা হয়েছে এবং লাখ লাখ মানুষ ঘর ছাড়া হয়েছে। মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যেই এমন পঞ্চাশ লাখ মানুষ পাঞ্জাবে এসে হাজির হয়েছে। দেহ এবং মন উভয় ক্ষেত্রেই বিপর্যস্ত এই দূর্ভাগা অভিবাসীদের পরিচর্যা এবং পুনর্বাসন করতে যেসব সমস্যার উদ্ভব হচ্ছে, তা যে কোন বৃহৎ রাষ্ট্রকেও পথে নামাতে পারে। কিন্তু, পাকিস্তানের জন্মকে আঁতুড় ঘরেই যারা মেরে দিতে চেয়েছিল তারা এতে হতাশ হয়েছে। পাকিস্তান সেই বিপর্যয় কেবল কাটিয়েই উঠে নি বরঞ্চ আরো শক্তিশালী, মার্জিত এবং পূর্বের যেকোন সময়ের চেয়ে বেশী ভাবে সজ্জিত।

এর সাথে সারি বেধে আরো কিছু সমস্যা উদ্ভুত হয়েছে, যেমন, ভারত কর্তৃক আমাদের উদ্বৃত্ত এবং সামরিক যন্ত্রপাতির প্রতি প্রতিসংহারমূলক আচরণ এবং অতি সম্প্রতি আপনাদের এই প্রদেশের সাথে পুরোপুরি অর্থনৈতিক অবরোধ স্থাপন। আমার কোন সন্দেহ নেই যে, ভারতীয় প্রদেশের সুচিন্তার মানুষগুলো এইসব ঘটনাকে সমর্থন করেন না এবং যারা এসব ঘটাচ্ছেন তাদেরও মন মানসিকতার পরিবর্তন হবে, তারপরও, এসব বিষয়ে আপনাদের ধারণা থাকাটা জরুরী। আমাদের অংশের উপর কড়া নজর রাখার উপর তারা জোর দিচ্ছে। বিশেষ করে সম্প্রতি আপনাদের প্রদেশের উপর আক্রমনের ঘটনা রহস্যময় রূপ নিয়েছে। অতি দুঃখের সাথে বলতে হচ্ছে, আমাদের শত্রুদের মধ্যে কিছু মুসলমানও আছে, যারা প্রাদেশিকতাবাদের জোর প্রচারণা চালাচ্ছে যাতে পাকিস্তান দূর্বল হয়ে পড়ে এবং আগের মত ভারতীয় আধিপত্যের সাথে একাত্ম হয়। যারা এই সব ভাবছে তারা বোকার স্বর্গেই বসবাস করছে, যদি তা তাদের চেষ্টা থেকে নিরস্ত রাখছে না। প্রতিটা দিন এক গাদা মিথ্যে বানোয়াট ইস্যু তৈরি করা হচ্ছে যাতে দেখানো যায় যে মুসলমানদের মধ্যে সৌহার্দ্য নেই এবং তাদেরকে আইনবিরোধী কাজ কামে উদ্বুদ্ধ করা যায়। সাম্প্রতিক কালের ভাষা বিষয়ক বিতর্কের কথাই ধরুন, আমি অতীব দুঃখের সাথে বলতে বাধ্য হচ্ছি আপনাদের অনেকেই প্রাদেশিকতাবাদের পাতা ফাঁদে পা দিয়ে ফেলেছেন, যা অতি সুহ্মভাবে এই প্রদেশে বুনে দেয়া হয়েছে, যদিও আপনাদের প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে সুস্পষ্ট মত দিয়েছেন। আপনাদের মনে কি এটা কখনও জাগে না যে, যে দেশের পত্রিকাসমূহের কাছে পাকিস্তান কেবল একটি অভিশাপের নাম, তারাই ভাষার ব্যাপারে আপনাদেরকে অধিকার শেখাতে আসছে? এটা কি মনে হয় না যে, অতীতে যে লোকটা মুসলমানদের সাথে প্রতারণা করেছে কিংবা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে, হুট করে ভাষার ব্যাপারে সে এখন আপনাদের ত্রাতা হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে, আপনাদেরকে অধিকার সচেতন হয়ে সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে শেখাচ্ছে? এই ফিফথ কলামনিস্টদের থেকে সাবধান হোন। পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষার ব্যাপারে আমার দৃষ্টিভঙ্গি আরেকটিবার ব্যাখা করি। এই প্রদেশের অফিশিয়াল ব্যবহারের জন্য এই প্রদেশের লোকজন যেমনটা চায় তেমন এক ভাষা তারা পছন্দ করতে পারে। এই ব্যাপারে কোন দ্বিমত নেই, দেশের লোকজন নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময়ে নিজেদের পছন্দমত ভাষা পছন্দ করে নিবে। যাহোক, লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা- অর্থাৎ বিভিন্ন প্রদেশের মধ্যে আন্তযোগাযোগের জন্য ব্যবহৃত ভাষা অবশ্যই উর্দু হবে, অন্য কিছু নয়। সুতরাং, রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু এবং অবশ্যই উর্দু, যা এমন একটি ভাষা যা উপমহাদেশের লক্ষ লক্ষ মুসলমানদের নিবিড় পরিচর্যায় বেড়ে উঠেছে, পাকিস্তানের প্রতিটি কোণায় কোণায় যে ভাষা অন্য যে কোন প্রাদেশিক ভাষার চেয়ে লোক ভাল বুঝতে পারে, মুসলমানদের কৃষ্টি এবং সংস্কৃতির সাথে সংগতিপূর্ণ এবং অন্যান্য ইসলামি রাষ্ট্রের ভাষাগুলোর মোটামুটি কাছাকাছি।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<001.030.088>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

 

ভারতীয় ইউনিয়ন থেকে উর্দুর বিতাড়ন এমনকি অফিশিয়াল ব্যবহার থেকে উর্দুকে বাদ রাখা বিনা কারণে ঘটে নি। ভাষা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করে যারা জল ঘোলা করতে চাইছে ব্যাপারটা তাদের অজানা নয়। এই ঝামেলা সৃষ্টি স্বীকার না করে উপায় নেই, যদিও তারা স্বীকার করবে না কেননা তা তাদের মনোবাসনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাদের ভাষা বিতর্ক সৃষ্টির একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে মুসলমানদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি এবং অ-বাঙালি মুসলমানদের প্রতি ঘৃণার প্ররোচনা প্রদান। অবশ্য ভাষা বিতর্কে আপনাদের প্রধানমন্ত্রী করাচি থেকে ফিরে যে স্পষ্ট বয়ান দিয়েছেন যে বাঙালিরা ইচ্ছে করলে বাংলাকে অফিসিয়াল ল্যাঙ্গুয়েজ বানাতে পারে, শুনে তারা তাদের কর্মপরিকল্পনা পরিবর্তন করেছে। এখন তারা চাচ্ছে বাংলাকে পুরো পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বানাতে, এবং একটি মুসলিম রাষ্ট্রের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুর দাবিকে তারা অগ্রাহ্য করছে। তারা বলছে, বাংলা এবং উর্দু দুটিকেই রাষ্ট্র ভাষা করতে। এই বিষয়ে ভুল করবেন না আপনারা। রাষ্ট্রের একাত্মতার স্বার্থে কেবল একটাই রাষ্ট্রভাষা থাকতে পারে, এবং আমার মতে তা উর্দু; এই বিষয়ে অনেক আলোচনা করেছি, আমাদের শত্রুদের এবং কিছু সুবিধাবাদি রাজনীতিবিদদের ব্যাপারে তাই আপনাদের সতর্ক করছি। আপনারা যারা জীবনের বিস্তীর্ন পথে হাঁটতে যাচ্ছেন তারা নিজেদেরকে এই সব মানুষ থেকে দূরে রাখবেন। যারা আরো কিছুদিন পড়াশুনা চালিয়ে যাবেন তারা নিজেদেরকে স্বার্থান্বেষী রাজনীতিবিদদের বলির পাঠা হতে দিয়েন না। আগের দিন যেমনটা বলেছিলাম, আমাদের নিজেদের জন্য, পিতামাতার জন্য, রাষ্ট্রের জন্য আপনারা পুরোদস্তুর পড়াশুনায় মনোনিবেশ করুন। একমাত্র এই পথেই ভবিষ্যতের জীবন যুদ্ধের জন্য আপনারা নিজেদেরকে সজ্জিত করতে পারবেন। একমাত্র এভাবেই আপনি নিজেকে দেশের সম্পদ, শক্তি এবং অহংকার রূপে গড়ে তুলতে পারেন। একমাত্র এভাবেই সামনের নানাবিধ সমস্যা সমাধানের মাধ্যমে দেশকে বিশ্বের মধ্যে উন্নত ও শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে পারেন।

 

নবীন বন্ধুরা, একারণেই আমি কিছু ব্যপারের প্রতি আলোকপাত করব যা সম্পর্কে আপনাদের সদা সতর্ক থাকতে হবে। প্রথমত, আমাদের অন্তর্বর্তী ফিফথ কলামিস্টদের ব্যপারে সাবধান থাকতে হবে। দ্বিতীয়ত, সকল স্বার্থপর ব্যক্তিদের ব্যপারে সর্বোচ্চ সতর্কতা ধারণ করতে করতে হবে এবং তাদের মূলোৎপাটন করতে হবে কেননা তারা তাদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য আপনাকে কাজে লাগাবে।তৃতীয়ত, প্রকৃত সৎ এবং পরপোকারী সরকারী কর্মচারী, যারা তাদের সবটুকু দিয়ে জনগণের জন্য কাজ করতে চায়, তাদেরকে চিনতে হবে এবং সমর্থন করতে হবে।চতুর্থত, মুসলীম লীগকে আরও দৃঢ়ভাবে গড়ে তুলতে হবে কারণ তারা প্রকৃত অর্থেই এক মহান পাকিস্তান গড়ে তুলবে। পঞ্চমত, এই মুসলীম লীগই পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা করেছে এবং এখন পাকিস্তানকে গড়ে তোলার সে পবিত্র দায়িত্বের রক্ষক হিসেবে এটা মুসলীম লীগেরই দায়িত্ব।ষষ্ঠত, এমন অনেকেই আছেন যারা আমাদের সংগ্রামের সময় আমাদের বিন্দুমাত্র সহযোগিতা করেনি, এমনকি আমাদের বিরুদ্ধে কাজ করেছেন এবং খোলামেলা ভাবেই আমাদের মহান সংগ্রামের পথে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছেন এবং এই শত্রুপক্ষের সহযোগিতাকারীদের সংখ্যা মোটেই অপ্রতুল নয় তারা হয়ত এখন তাদের চটকদার স্লোগান, বাধা-বুলি, আদর্শ আর কর্মসূচি নিয়ে আমাদের সামনে এগিয়ে আসতে পারে। কিন্তু, তাদেরকে অবশ্যই বিশ্বস্ততা কিংবা তাদের অন্তর্ণিহিত চিন্তাধারার যে প্রকৃত পরিবর্তন ঘটেছে তার প্রমাণ দিতে হবে। আর এর সত্যতা পাওয়া যাবে এই ভয়ংকর সন্ধিক্ষণে যদি তারা ব্যাঙের ছাতার মত দল গঠন না করে তাদের মত ও বিশ্বাস নিয়ে মুসলীম লীগে যোগদান করে এবং এই দলকে সমর্থন করে, এমন একটা সময় যখন আমরা নানবিধ বহির্মুখী এবং অন্তর্মুখী বিপদের সম্মুখীন হচ্ছি যার সাথে সাত কোটি মানুষের ভাগ্য জড়িত। এ জন্য প্রয়োজন সম্পূর্ণ সংহতি, ঐক্য আর শৃঙ্খলা। একটা ব্যপারে আমি আপনাদের আশ্বস্ত করছি যে “একতায় উত্থান, বিভেদে পতন”

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<001.030.089>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

 

এরকম আরও একটা ব্যাপার আছে যার প্রতি আমি আলোকপাত করতে চাই। নবীন বন্ধুরা, এখন পর্যন্ত আপনারা প্রচলিত গৎবাধা রীতিই অনুসরণ করে আসছেন। যখন আপনারা আপনাদের ডিগ্রী নিয়ে হাজারে হাজারে ইউনিভার্সিটি থেকে বের হন, তখন আপনাদের একটাই চিন্তা আর আকাঙ্ক্ষা থাকে আর তা হল সরকারি চাকরি। আপনাদের উপাচার্য যথার্থই বলেছেন যে অদ্যাবধি শিক্ষা-দীক্ষার পুরণো আর প্রচলিত রীতি হল সু-প্রশিক্ষিত, সুসজ্জিত কেরাণী তৈরি করা। অবশ্যই তাদের মধ্যে কেউ কেউ উচ্চ পর্যায়ে অধিষ্ঠিত হয়েছিল কিন্তু পুরো সিস্টেমটাই ছিল সুদক্ষ কেরানী তৈরি করার জন্য। সিভিল সার্ভিসে মূলত বৃটিশ কর্মীরাই নিযুক্ত হতেন, পরে ভারতীয়রা এতে যোগদান করতে শুরু করেন এবং এই ধারা বাড়তেই থাকে। এর সামগ্রিক উদ্দেশ্য ছিল এমন একটা মানসিকতা তৈরি করা যে একজন সাধারণ মানুষ বি.এ. অথবা এম.এ. পাশ করেই একটি সরকারি চাকরি খুঁজতে থাকবে। যদি সে এটা পেয়ে যেত তবে ভাবত সে তার সর্বোচ্চ উচ্চতায় পৌঁছে গেছে। আমরা সবাই জানি যে এর প্রকৃত ফলাফল কি ছিল। আমরা অভিজ্ঞতায় দেখেছি একজন এম.এ. পাশ ব্যক্তি একজন ট্যাক্সি ড্রাইভারের থেকেও কম আয় করেন এবং তথাকথিত অধিকাংশ সরকারি চাকুরীজীবীই স্বচ্ছল পরিবারে নিযুক্ত ভৃত্যের থেকেও দুর্দশায় জীবন অতিবাহিত করেন। এখন, আমি চাই আপনারা সেই প্রচলিত রীতি আর মানসিকতা থেকে বের হয়ে আসুন কারণ আমরা এখন মুক্ত পাকিস্তানের বাসিন্দা। সরকার হাজারে হাজারে চাকরি দিতে পারবেনা। এটা অসম্ভব। কিন্তু সরকারি চাকুরির এই প্রতিযোগিতায় আপনাদের মধ্যে অধিকাংশই মনোবলহীন হয়ে পড়েন। সরকার কেবল সীমিত জনকেই চাকরি দিতে পারে এবং যারা বাকি থাকে তারা কোনকিছুতেই স্থির হতে পারে না আর এই হতাশ মানুষগুলো সহজেই স্বার্থান্বেষীদের শিকারে পরিণত হয়। আমি চাই আপনারা আপনাদের মন, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য এমন পথে পরিচালিত করুন সেসব ক্ষেত্রে যেসব ক্ষেত্র আপনার জন্য উন্মুক্ত এবং ভবিষ্যতে আরও উন্মুক্ত হবে। কায়িক পরিশ্রম করার মধ্যে কোন লজ্জা নেই। কারিগরী শিক্ষায়ও প্রচুর সুযোগ আছে কারণ কারিগরী জ্ঞানে দক্ষ লোকজনের ভীষণ প্রয়োজন আমাদের। আপনারা অর্থ ও ব্যাংকিং, বানিজ্য, আইন প্রভৃতি সম্পর্কে জানতে পারেন যা বর্তমানে অপরিসীম সুযোগের সৃষ্টি করেছে। ইতোমধ্যেই আপনারা জানেন যে নতুন নতুন কারখানা, ব্যাংক, ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি, বানিজ্যিক ফার্ম প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে এবং সেগুলো সময়ের সাথে সাথে বাড়তেই থাকবে। এই পথগুলোই আপনাদের জন্য অবারিত। এগুলো সম্পর্কে ভাবুন এবং আপনার মনোযোগকে এদিকে পরিচালিত করুন। বিশ্বাস করুন, এভাবে আপনি সরকারি চাকরির তুলনায় অনেক বেশি লাভবান হবেন। অনেক বাশি খুশি থাকবেন আপনি কারন অনেক বেশি সুযোগের মাধ্যমে আপনি অনেক বেশি উন্নতি করতে পারবেন যদি আপনি বানিজ্যিক প্রতিষ্ঠান আর কারখানাগুলোতে যোগদান করেন।আর এভাবে আপনি আপনার নিজের পাশাপাশি রাষ্ট্রকেও সহযোগিতা করবেন। আমি আপনাদের একটি উদাহরণ দিতে পারি। আমি একজন তরুণকে চিনি যিনি সরকারি চাকরিতে ছিলেন। চারবছর আগে দুইশত রুপিতে তিনি একটি ব্যাংকিং কর্পোরশনে যোগদান করেন কারণ তিনি ব্যাংকিং বিষয়ে পড়েছিলেন। আজ তিনি ওই কর্পোরেশনের একটি ফার্মের ব্যবস্থাপক এবং মাত্র চার বছরের মাথায় তিনি এখন মাসিক ১৫০০ রুপি আয় করেন। এই সুযোগগুলোর সদব্যবহার করতে হবে এবং আমি সত্যি আপনাদের উপর খুশি হব যদি আপনারা বিষয়গুলো নিয়ে ভাবেন।

পরিশেষে, আমি আচার্যকে ধন্যবাদ জানাই আর বিশেষত ধন্যবাদ জানাই উপাচার্যকে, আমাইয় উষ্ণ অভ্যর্থনা জ্ঞাপন আর ওইসব প্রশংসাসূচক বাক্যবর্ষনের জন্য। আমার আশা নয় বরং আমার দৃঢ় প্রত্যয়, পূর্ব বাংলার তরুণেরা আমাকে আশাহত করবে না।

 

 

 

——-

 

 

 

 

 

<001.031.090>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ কর্তৃক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর কাছে প্রদত্ত ভাষার দাবী বিষয়ক স্মারকলিপি পূর্ববাংলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনিতীঃ বদরুদ্দিন উমর, পৃষ্ঠা-১২১ ২৪শে মার্চ, ১৯৪৮

 

এই সাক্ষাৎকারের সময় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে জিন্নাহর কাছে নিম্নলিখিত স্মারকলিপিটি* পেশ করা হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের একমাত্র মুসলমান যুবকদের লইয়া গঠিত এই কর্মপরিষদ মনে করেন যে, বাংলা পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হওয়া উচিত। কারণ প্রথমতঃ তাঁহারা মনে করেন যে, উহা পাকিস্তানের সমগ্র জনসংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশের ভাষা এবং পাকিস্তান জনগণের রাষ্ট্র হওয়ার অধিকাংশ লোকের দাবী মানিয়া লওয়া উচিত।

দ্বিতীয়তঃ আধুনিক যুগে কোন কোন রাষ্ট্রে একাধিক ভাষা রাষ্ট্রভাষা হিসাবে গৃহীত হইয়াছে। দৃষ্টান্তস্বরূপ নিম্নোক্ত কয়েকটি দেশের নাম করা যায়ঃ বেলজিয়াম (ফ্লেমিং ও ফরাসী ভাষা), কানাডা (ইংরেজী ও ফরাসী ভাষা), সুইজারল্যাণ্ড (ফরাসী, জার্মান ও ইতালীয় ভাষা), দক্ষিণ আফ্রিকা (ইংরেজী ও আফ্রিকানারা ভাষা), মিসর (ফরাসী ও আরবী ভাষা), শ্যাম (থাই ও ইংরেজী ভাষা), এতদ্ব্যতীত সোভিয়েট রাশিয়া ১৭টি ভাষা রাষ্ট্রভাষা হিসাবে গ্রহণ করিয়াছে।

তৃতীয়তঃ এই ডোমিনিয়নের সমস্ত প্রাদেশিক ভাষার মধ্যে একমাত্র বাংলা ভাষাই রাষ্ট্রভাষার স্থান অধিকার করার পক্ষে উপযুক্ত। কারণ, সম্পদের দিক বিবেচনায় এই ভাষাকে পৃথিবীর মধ্যে সপ্তম স্থান দেওয়া হইয়াছে।

চতুর্থতঃ আলাওয়াল, নজরুল ইসলাম, কায়কোবাদ, সৈয়দ এমদাদ আলী, ওয়াজেদ আলী, জসিমউদ্দীন ও আরো অনেক মুসলমান কবি ও সাহিত্যিক তাঁহাদের রচনাসম্ভার দ্বারা এ ভাষাকে সমৃদ্ধিশালী করিয়াছে।

পঞ্চমঃ বাংলার সুলতান হুসেন শাহ সংস্কৃত ভাষার প্রতিদ্বন্দ্বিতা সত্ত্বেও এই ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার পর্যায়ে উন্নীত করিয়াছিলেন, এবং এই ভাষার শব্দ সম্পদের মধ্যে শতকরা ৫০ ভাগ পারসিক ও আরবী ভাষা হইতে গৃহীত।

উপসংহারে আমরা বলিতে চাই যে, যে কোন পূর্ণ গণতান্ত্রিক দেশে প্রত্যেক নাগরিকের কয়েকটি মৌলিক অধিকার আছে। কাজেই যে পর্যন্ত না আমাদের অধিকার সুপ্রতিষ্ঠিত হয় সে পর্যন্ত বাংলা ভাষার জন্যে এই আন্দোলন চালাইয়া যাওয়া হইবে।

 

  • এই স্মারকলিপিটির খসড়া তৈরী করেন কমরুদ্দীন আহমদ

 

 

———

 

 

 

 

 

<001.032.091>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

 

শিরোনামঃ মোহাম্মদ আলি জিন্নাহর পূর্ব পাকিস্তান থেকে বিদায়-পূর্ব ভাষণ

সুত্রঃ কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ; স্পিচেজ   এ্যাজ গভর্নর জেনারেল অব পাকিস্তান, ১৯৪৭-৪৮। পৃষ্ঠা – ১০৭

তারিখঃ ২৮শে মার্চ ১৯৪৮

 

পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি বিদায়ী ভাষণ

রেডিও পাকিস্তান থেকে সম্প্রচারিত,

২৮ শে মার্চ, ১৯৪৮, ঢাকা

 

বিগত নয় দিন আপনাদের প্রদেশে অবস্থানের প্রাক্কালে আমি আপনাদের স্থানীয় অবস্থা এবং কিছু সমস্যা পর্যেবেক্ষ্ণ করছিলাম, যা পূর্ব বাংলা সম্মুখিন হয়েছে। আজরাতে, আমার বিদায়ের প্রাক্কালে, আমি আমার কিছু অনুভূতির কথা আপনাদের বলতে চাই। এটা করার আগে, যাইহোক, আমি আপনাদের আন্তরিক ধন্যবাদ দিতে চাই আপনাদের মাঝে আমাকে উষ্ণ এবং সাদর ভাবে গ্রহণ করার জন্য, আমার পুরো অবস্থানকালে।

প্রশাসনিক দৃষ্টিকোণ থেকে, পূর্ব বাংলা পাকিস্তানের অন্য যে কোন প্রদেশ থেকে সম্ভবত বেশি সমস্যার মুখোমুখি দেশ ভাগের কারণে। ১৫ আগস্টের পূর্বে, এই প্রদেশ ছিল কলকাতার পশ্চাৎ প্রদেশরূপে। যার (কলকাতার) উন্নয়নে এর (ঢাকা) অবদান থাকলেও সেটা ভাগাভাগির ছিল না। ১৫ আগস্টে, ঢাকা ছিল নিছক একটি মফস্বল শহর, যার মাঝে আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা/ সরকারের আবশ্যকীয় সুবিধা- বন্দোবস্তের কিছুই ছিল না। আরো বলা যায়, দেশ বিভাগের পরে, এই প্রদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙ্গে পরে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং প্রশাসনিক কাঠামো সাংঘাতিকভাবে বিশৃঙ্খল ছিল যখন দেশে খাদ্যের সংকট চলছিল। এভাবে নব্য প্রদেশ পূর্ব বাংলা চরমতম প্রতিকূল অবস্থার মাঝে পরে, যা দুর্বল সংকল্পের এবং স্বল্প দৃঢ়তার মানুষদের জন্য মারাত্মক হয়ে দাঁড়ায়। এই প্রতিকূল অবস্থায় প্রশাসন শুধু বেঁচেই থাকেনি বরং চট্টগ্রামের সাইক্লোনের মত দূর্যোগের মাঝেও আরো উজ্জ্বল ভাবে জ্বলে উঠেছে, যা জনসাধারণের অসাধারণ চরিত্র এবং প্রদেশ সরকারের দূর্দমনীয় তেজ- উভয়ের জ্বলন্ত সম্মাননার চিহ্ন। এখন অবস্থা এমন যে, প্রারম্ভিক সমস্যাগুলির বড় দিক অতিক্রম করতে হবে এবং এখানে আরামের কোন সুযোগ নেই, এরপরেও অন্তত ভবিষ্যতের জন্য পুরোপুরি আত্মবিশ্বাসী হবার কারণ রয়েছে। যদিও এখনো অনুন্নত, পূর্ব বাংলার রয়েছে কাঁচামাল এবং পানিবিদ্যুতের অফুরান সম্ভাবনা। চট্টগ্রামে আপনাদের রয়েছে প্রথম শ্রেণীর বন্দরের উপাদান, যা পৃথিবীর সব থেকে সেরা বন্দরগুলির একটি হওয়া উচিৎ সময়ের সাথে সাথে। শান্তিপূর্ণ পরিস্থিতি এবং সব শ্রেণির জনসাধারণের সর্বোচ্চ সহযোগিতা নিয়ে, আমরা এই প্রদেশকে পাকিস্তানের সব থেকে সমৃদ্ধ প্রদেশে পরিণত করব।

এটা অভিনন্দনের যোগ্য যে, দেশ ভাগের পরবর্তী মাসগুলিতে ভারত রাজত্বে মুসলিম গণহত্যা এবং নিপীড়নের পরেও এই প্রদেশে শান্তিপূর্ণ অবস্থান বিরাজ করছে এবং আমি দেখেছি যে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় পরিপূর্ণ নিরাপত্তা নিয়ে তাঁদের দৈনন্দিন কাজ করছেন। ভারত অঞ্চলের দিকে কিছু দূর্ভাগ্যজনক হিন্দু-দেশান্তরের ঘটনা ঘটেছে যদিও, তবে ভারতীয় সংবাদ মাধ্যমের দেয়া হিসাব হাস্যকর। যে কোন হিসাবে আমি সন্তুষ্ট যে, যা-ই দেশান্তরের ঘটনা ঘটুক না কেন, তা এখানে তাঁদের প্রতি ব্যবহারের কারণে ঘটেনি, এই অবস্থায় যা আদর্শনীয়, তবে তা মানসিক এবং বহিরাগত চাপে নয়।

 

 

 

 

 

<001.032.092>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

 

ভারতের নেতারা এবং সংবাদমাধ্যমের একটি অংশ মুক্তভাবে যুদ্ধাংদেহী প্রচারকে প্রশ্রয় দিচ্ছেন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে। ভারতে জনগনসাধারণের বিনিময়/প্রতিস্থাপন এবং বিশৃঙ্খলার জন্য হিন্দু মহাসভার মত দলের অবিরাম হীন প্রপাগাণ্ডা, যাতে মুসলিমরা নিধন হচ্ছেন, যাতে পূর্ব বাংলার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মত ভয়ের উদ্রেক ঘটেছে

এরকিছুর পরে, সাম্প্রতিক ভারত সরকার দ্বারা শুল্ক বিভাগে পাকিস্তানকে বিদেশী রাষ্ট্র ঘোষণা এবং অন্য পদক্ষেপগুলি হিন্দু ব্যবসায়ী সম্প্রদায়কে চরম আর্থিক সমস্যায় ফেলেছে এবং তাদের ব্যবসা ভারতে সরিয়ে নিতে চাপ তৈরি করেছে। আমি দেখেছি প্রাদেশিক সরকার বারবার আশ্বস্ত করেছেন এবং সবসময় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা এবং কল্যাণের জন্য দরকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করছেন যতদূর সম্ভব এবং তাঁদের সর্বোচ্চ নিরস্ত করার চেষ্টা করছেন যাতে তাঁরা তাঁদের পৈত্রিক আবাস ছেড়ে ভারতে অনিশ্চিত যাত্রা না করেন।

আমি এখন আপনাদের কিছু উপদেশ/পরামর্শ দিতে চাই সবিনয়ে। আমি দেখেছি যে একশ্রেণীর মানুষের মাঝে কিছু অপ্রত্যাশিত দৃষ্টিকোণের প্রবণতা রয়েছে তাদের সদ্য উপার্জিত স্বাধীনতা নিয়ে, এটা স্বাধীনতায় উন্মুক্ত বিশাল সুযোগ এবং তাদের উপরে আরোপিত দায়িত্ব হিসাবে নয়, বরং তাঁরা একে অনুমতিপত্র হিসাবে দেখছেন। এটা সত্য যে, বৈদেশিক কর্তৃত্ব দূর হওয়ার সাথে সাথে জনসাধারণ এখন তাদের নিয়তির চূড়ান্ত বিচারক। তাদের যথাযোগ্য স্বাধীনতা রয়েছে আইনগতভাবে যে কোন সরকার বেছে নেওয়ার। এর মানে যাই হোক এটা নয় যে, কোন সম্প্রদায় বেআইনীভাবে কোন পদক্ষেপ আরোপিত করবে জনপ্রিয়ভাবে নির্বাচিত কোন সরকাররের উপরে। সরকার এবং এর নিয়মনীতি ভোট নিয়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দিয়ে পরিবর্তিত হতে পারে প্রাদেশিক আইনগত সভায়। শুধু তাই নয়, কোন সরকারই কোন অপরিণামদর্শী এবং দায়িত্বহীন মানুষের কোন গুণ্ডামি- ডাকাতি আইন এক মুহূর্তের জন্য সহ্য করবে না এবং তা ধূলিসাৎ করতে কঠোর ব্যবস্থা অবশ্যই নিবে। আমি বিশেষ করে চিন্তা করছি ভাষা- বিতর্ক নিয়ে যা সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় উত্তেজনা এবং সমস্যা তৈরি করছে প্রদেশের একটি অংশে এবং যদি এটা বন্ধ করা না যায় তবে তা চরম পরিণতির দিকে যাবে। এই প্রদেশের সরকারী ভাষা/ রাষ্ট্রীয় ভাষা কী হবে তা আপনাদের প্রতিনিধিরাই নির্ধারণ করবেন।

তবে এই ভাষা-সমস্যা প্রাদেশিকতার বড় সমস্যার একটি দিক। আমি নিশ্চিত যে আপনারা অবশ্যই বুঝতে পারছেন, পাকিস্তানের মত নব্য প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রের, যা আবার দুইটি বিশালভাবে বিভক্ত অংশ, উন্নতি এবং সেই সাথে এর টিকে থাকার জন্য সর্ব সাধারণ জনগণের, তাঁরা যে অঞ্চলেরই হোন না কেন, একাত্মতা এবং ঐক্যের একান্ত দরকার। পাকিস্তান মুসলিম ভ্রাতিত্ব এর একটি নিদর্শন এবং অবশ্যই একে বেঁচে থাকতে হবে। এই ঐক্য আমরা, সত্যিকারের মুসলিম হিসাবে সর্বোচ্চভাবে প্রহরায় রাখব এবং রক্ষা করব। যদি আমরা আমাদের বাঙ্গালী,পাঞ্জাবী, সিন্ধী ইত্যাদি পরিচয়কে মূখ্য হিসাবে ভাবতে শুরু করি এবং এর মুসলিম ও পাকিস্তানী পরিচয়কে ঘটনাক্রমে পাওয়া বলে ধরে নেই, তাহলে পাকিস্তান খণ্ড-বিখণ্ড হতে বাধ্য। ভাববেন না যে এটি কিছু অস্বচ্ছ সিদ্ধান্তের ফসল। আমাদের শত্রু পরিপূর্ণভাবে সক্রিয় আছে যে কোন সুযোগের অপেক্ষায় , যেটা আমি আপনাদের সতর্ক করে দিতে চাই যে তারা এর মাঝেই চক্রান্তে মেতে আছে। আমি আপনাদের পরিষ্কারভাবে অনুরোধ করছি, ভারত সংবাদমাধ্যমের রাজনৈতিক প্রতিনিধি এবং অঙ্গগুলি, যারা সর্বোতভাবে চেষ্টা করেছিল পাকিস্তান সৃষ্টির বিরুদ্ধে, হঠাৎ করে সংবেদনশীল সুযোগ পেয়ে গিয়েছে,যাতে তারা দাবী করছে পূর্ব বাংলার মুসলিদের, আপনারা কি একে চরম অশুভ সংকেত হিসেবে দেখছেন না ? এটা কি পূর্ণভাবে পরিষ্কার নয় যে, মুসলিমদের পাকিস্তান গঠনে বাঁধাদানে ব্যর্থ হয়ে এই চক্রগুলি এখন চেষ্টা করছে হীন প্রপাগাণ্ডা চালিয়ে মুসলিম ভাইয়ের বিরুদ্ধে মুসলিম ভাইকে দাড়া করিয়ে পাকিস্তানকে ভেঙ্গে দিতে ? এই কারণে আমি প্রাদেশিকতা নামের বিষের বিরুদ্ধে আপনাদের রক্ষক হতে চাই, যা আমাদের শত্রুরা প্রোথিত করতে /অনুপ্রবেশ করতে ইচ্ছুক আমাদের রাষ্ট্রে । অনেক মহান কাজ করতে বাকী এবং অনেক বিপদ অতিক্রম করতে হবে, আমরা তা করবোই নিশ্চিতভাবে। কিন্তু আমরা দ্রুততরভাবে এটা করতে পারবো যদি আমাদের ঐক্য অক্ষত থাকে এবং একক জাতি হিসাবে সামনে এগিয়ে যাবার প্রত্যয় অকম্পিত থাকে। এটাই পাকিস্তানকে জাগিয়ে তোলার একমাত্র উপায় এবং নিশ্চিতভাবে উন্নতি করার, সভ্য জগতে সম্মান জনক স্থান পাওয়ার।

 

 

 

 

 

 

<001.032.093>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

 

এখানে আমি পূর্ব পাকিস্তানের মহিলাদের উদ্দেশ্যে কিছু বলতে চাই। জাতি গঠনের বিশাল কার্যে এবং এর ঐক্য বজায় রাখতে, মহিলাদের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি করার আছে। জাতির মেরুদণ্ড গঠনকারী যুব সম্প্রদায়ের চরিত্রের মূল স্থপতি হিসাবে শুধু মাত্র নিজ গৃহে নয়, তারা যেন তাদের দূর্ভাগা/ কম ভাগ্যবান বোনদেরও এই মহান কাজের সাথে সাহায্য করেন। আমি জানি পাকিস্তান অর্জনের সুদীর্ঘ সংগ্রামে, মুসলিম মহিলাগণ তাদের পুরুষদের পিছনে দৃঢ়ভাবে দাড়িয়েছেন। এরথেকেও বড় সংগ্রাম পাকিস্তান বিনির্মাণে, যা সামনে পরে আছে, এটা যেন না বলা হয় পাকিস্তানের মহিলারা পিছনে পরে আছেন কিংবা তাঁদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছেন।

পরিশেষে, আমি সরকারী কর্মচারীদের, কেন্দ্রীয় এবং প্রাদেশিক- যা অগ্রগতির মহান অংশ, উদ্দেশ্য করে কিছু বিশেষ কথা বলতে চাই, যাদের অনেকেই এই প্রদেশে কঠিন অবস্থায় কাজ করে যাচ্ছেন। আপনাদেরই রয়েছে মহান দায়িত্ব। আপনাদের নিশ্চিত করতে হবে যে, এই প্রদত্ত প্রদেশে, শুধু মাত্র করতে বাধ্য দৈনন্দিন কার্যাবলীয় নয়, আপনাদের সক্ষমতার নিঃস্বার্থতার চূড়ান্ত শ্রম দিতে হবে এই রাজ্যের জন্য। এই জাতি নির্মাণের মহান যজ্ঞে, আপনাদের সামনে রয়েছে অপূর্ব সুযোগ। আপনারা এর মাঝে যে সাহস, বিশ্বাস এবং সংকল্প দেখিয়েছেন তা বজায় রাখতে হবে ভবিষ্যত মোকাবেলায় এবং আপনাদের কাজ সম্পাদনে।

এই সব কিছুর উপরে, আপনারা নিজেদের, হীন প্রচারণাকারী এবং স্বার্থবাজ আন্দোলনকারীদের হাতের পুতুল বানাবেন না যারা বাইরে আছে আপনাকে কলুষিত করতে এবং সেই সাথে একটি নতুন রাষ্ট্রের অবশ্যম্ভাবী সমস্যাগুলিকে কলুষিত করতে। পাকিস্তান সরকার এবং প্রাদেশিক সরকার গুরুত্বের সাথে পরিকল্পনা করে যাচ্ছেন উপায় এবং পথ খুঁজতে যাতে আপনারা আবাস এবং অন্য সমস্যাবলী, যা এই সন্ধিক্ষণে অবশ্যম্ভাবী, থেকে উত্তরণ পেতে পারেন এবং আমি বিশ্বাস করি এইসব সমস্যা অতি দ্রুতই কেটে যাবে। এই মহান রাষ্ট্র আপনারা যার অন্তর্ভুক্ত, আপনাদের থেকে দাবি করে, সেই জনসাধারণ তাঁদের আপনারা সেবা দেন এবং অবশ্যই আপনাদের নিজেদের, যাতে কোন সমস্যা আপনাদের থমকে না দেয় বরং সজাগ রাখে এবং সামনে এগিয়ে যায় এবং একাগ্রচিত্তে একান্ত প্রচেষ্টা বজায় রাখে। পাকিস্তানের সামনে অসাধারাণ ভবিষ্যত অপেক্ষা করছে। এখন আমাদের কাজ প্রকৃতি আমাদের অফুরন্তভাবে যেইসব সুবিধা দিয়েছে তার সর্বোচ্চ সুবিধা নেয়া এবং একটি গর্বিত ও শক্তিমান জাতি তৈরি করা। পাকিস্তান জিন্দাবাদ !

 

 

 

 

 

——–

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<001.033.094>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল দাবী সম্বলিত সেপ্টেম্বর, ১৯৪৮ গণতান্ত্রিক যুবলীগের পুস্তিকা পূর্ব পাকিস্থান গণতান্ত্রিক যুবলীগ সেপ্টেম্বর, ১৯৪৮

 

গোড়ার কথা

গত ১৯৪৭ সালে ১৪ই আগষ্ট পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয়। ইহার এক মাস পরে সেপ্টেম্বর মাসে ঢাকায় অনুষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তান কর্মী সম্মেলনে মিলিত হইয়া পাকিস্তান সংগ্রামে যাহারা পুরোভাগে ছিল সেই যুব সমাজ গণতান্ত্রিক যুবলীগ গঠন করিয়া পাকিস্তানকে স্বাধীন, সুখী এবং সমৃদ্ধিশালী করিয়া গড়িয়া তুলিবার প্রতিজ্ঞা গ্রহণ করে। যুবসমাজ দাবী করে সুখী ও স্বাধীন পাকিস্তান গঠনের জন্য বৃটিশ কমনওয়েলথের বাহিরে আসিয়া পূর্ণ আজাদী ঘোষণা করিতে হইবে, পূর্ণ ব্যক্তিস্বাধীনতা, রাজনৈতিক এবং আর্থিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত করিতে হইবে এবং জনগণের সহযোগিতাতেই পাকিস্তান গড়িয়া তুলিতে হইবে। যুবলীগ সরকারের সহযোগিতায় কাজে ঝাঁপাইয়া পড়ে। বিগত সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও খাদ্যসংকট সমাধান আন্দোলনে যুবলীগের নেতৃত্বে যুবসমাজ বিপুলভাবে সাড়া দিয়াছে। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে যুবসমাজ পুরোভাগে আগাইয়া আসিয়াছে।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হইবার পর এক বছর পার হইয়া গিয়াছে। পাকিস্তান রাষ্ট্র এবং পাকিস্তান রাষ্ট্রের ৭ কোটি জনসাধারণের উন্নতির জন্য যুবসমাজ কতটুকু করিতে পারিয়াছে এবং স্বাধীন সুখী পাকিস্তান গঠনের প্রতিজ্ঞা কতখানি সফল হইয়াছে যুবসমাজ তাহা আজ খতাইয়া দেখিবে।

পাকিস্তান আজও বৃটিশ কমনওয়েলথের বাহিরে আসিয়া পূর্ণ আজাদী ঘোষনা করে নাই। পাকিস্তানে ব্যক্তিস্বাধীনতার কবর দেওয়া হইয়াছে। সভা সমিতির অধিকার হরণ, বিনা বিচারে আটক, সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধ এবং অর্ডিন্যান্স রাজের ষ্টীমরোলার আজ পাকিস্তানে বিভীষিকার সৃষ্টি করিয়াছে। রাজনৈতিক এবং আর্থিক গণতন্ত্র অর্থহীন হইয়া দাঁড়াইয়াছে। কৃষকের ভাগ্যে জমি মিলে নাই। মজুরের মজুরী বাড়ে নাই। ছাঁটাইয়ের কবলে পড়িয়া লক্ষ লক্ষ লোক জীবিকাহীন হইয়া পড়িয়াছে। খাদ্য সংকট গভীর হইয়া দেখা দিয়াছে। কৃষক, মজুর, মধ্যবিত্ত সকলের জীবনেই সংকট গভীর হইয়া দেখা দিয়াছে। স্বাধীন পাকিস্তানে খাইয়া পরিয়া বাঁচিবার আকাঙ্খা ধূলিসাৎ হইয়া গিয়াছে, পূর্ণ আজাদী, গণতন্ত্র এবং সুখী জীবনের পরিবৰ্ত্তে নূতন দাসত্ব এবং অনাহারের শৃংখলে জনগণ শৃংখলিত হইতেছে।

মুষ্টিমেয় লোক অগণিত জনসাধারণকে অস্বীকার করিয়া নিজেদের ভোগ বিলাসের জন্য পাকিস্তানকে ব্যবহার করিতেছে। মুষ্টিমেয় কায়েমী স্বার্থবাদীর স্বার্থকে পাকিস্তান এবং ইসলামের স্বাৰ্থ বলিয়া সরকারী নীতি নির্ধারণ করা হইতেছে। পাকিস্তানের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নীতি আজ মেহনতকারী মানুষের বিরুদ্ধে নির্ধারিত হইতেছে। স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের পরিবৰ্ত্তে ধনিক দাসত্বই জনগণের জীবনে চরম সত্য হইয়া দাঁড়াইয়াছে। সুখী পাকিস্তান গঠনের জন্য জনগণের সহযোগিতার আকাঙ্খা এবং যুবসমাজের পবিত্র প্রতিক্ষা আজ আখ্যা দেওয়া হইতেছে। কিন্তু যুবসমাজ তাহদের পবিত্র প্রতিজ্ঞা কার্যকরী করিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। যুবসমাজ জানে কোন একজন ব্যক্তির কৃতিত্বে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয় নাই। লক্ষ লক্ষ জনসাধারণের সংগ্রামেই এই পাকিস্তান আসিয়াছে এবং সুখী পাকিস্তান গঠনের অধিকার তাহাদেরই, কোন শক্তিই জনসাধারণের পথ রোধ করিতে পরিবে না। জনসাধারণের শক্তিতে অটল বিশ্বাস লইয়াই যুবসমাজ অগ্রসর হইবে।

 

 

 

 

 

 

 

<001.033.095>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

 

ঢাকায় প্রতিজ্ঞা লইবার এক বছর পরে রাজশাহী বিভাগের যুবকেরা ঈশ্বরদীতে বিভাগীয় সম্মেলনে মিলিত হইয়া সমস্ত অবস্থার পর্য্যালোচনা করিয়াছে। ধনিক শ্রেণীর ষড়যন্ত্রকে বানচাল করিয়া সুখী পাকিস্তান গঠনের জন্য নুতনভাবে প্রতিজ্ঞা লইয়াছে। সম্মেলনে আন্দোলনের জন্য একটা ইস্তাহার এবং কয়েকটি প্রস্তাব গৃহীত হইয়াছে। কৃষক-মজুরকে তাহদের শ্রেণী সংগঠন সংঘবদ্ধ করিয়া জনগণের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করিবার জন্য যুবসমাজ প্রতিজ্ঞা লইয়াছে। খাদ্য সংকট প্রতিরোধ, ব্যক্তিস্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা, ছাঁটাই বন্ধ, জমিদার উচ্ছেদ, চিকিৎসার পূর্ণ ব্যবস্থা এবং সংকটের হাত হইতে শিক্ষাব্যবস্থা রক্ষা করিবার জন্য প্রস্তাব লওয়া হইয়াছে। সম্মেলনে গৃহীত ইস্তাহার এবং প্রস্তাবাদী কাৰ্য্যে পরিণত করিতে যুবসমাজ আপোষহীন সংগ্রাম করিবে। পূর্ণ আজাদী এবং গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করিতে যুবলীগ যুবসমাজকে আহবান জানাইতেছে। দিকে দিকে যুব সংগঠন করিয়া গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে যুবসমাজকে সংঘবদ্ধ হইবার জন্য যুবলীগ আবেদন জানাইতেছে।

আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম শেষ হয় নাই। জনগণের মুক্তি জন্য আমরা বৃটিশের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করিয়াছি। বৃটিশের শোষণের বিরুদ্ধেই ছিল আমাদের সংগ্রাম। আজও শোষণ বন্ধ হয় নাই। নূতনভাবে শোষণ আরম্ভ হইয়াছে। দেশী বিদেশী কোন শোসককেই আমরা বরদাস্ত করিব না। সমস্ত রকমের শোষণ ধ্বংস করিয়া গণআজাদী প্রতিষ্ঠার জন্যই যুবসমাজ সংগ্রাম করিয়াছে। গণআজাদী প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত যুবসমাজ থামিবে না। পূর্ণ আজাদী এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য যুবসমাজ যে প্রতিজ্ঞা নিয়াছিল সে প্রতিজ্ঞা পূর্ণভাবে পালনে করিবেই। কোটি কোটি মজলুম মানুষের জন্য পূর্ণ আজাদী হাসিল করিবেই। গণতান্ত্রিক যুবলীগ তাই এই পবিত্র প্রতিজ্ঞা পালনের জন্য যুবসমাজকে উদাত্ত আহবান জানাইতেছে।

মোঃ একরামুল হক
প্রকাশক

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<001.033.096>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

 

 

ইস্তাহার

গত বৎসর পূর্ব পাকিস্তানের সাতশত যুবক কর্মীর সহযোগিতা ও চেষ্টার মধ্য দিয়া গণতান্ত্রিক “যুবলীগ’ জন্মলাভ করে। যুবলীগের গঠনের পিছনে মূল প্রেরণা ছিল পাকিস্তানকে একটি স্বাধীন, সুখী ও গণতান্ত্রিক দেশ হিসাবে গড়িয়া তোলা। সেই জন্য গত যুব সম্মেলনে প্রগতিশীল আদর্শের উপর ভিত্তি করিয়া একটি “গণদাবীর সনদ’ রচিত ও গৃহীত হয়, সেই আদর্শের উপর ভিত্তি করিয়া পাকিস্তান রাষ্ট্রকে গড়িয়া তুলিবার জন্য যুবশক্তির নিকট আহবান জানান হয় এবং এই পথে রাষ্ট্রকে গড়িয়া তুলিবার কাজে সরকারকে সকল রকম সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।

যুবলীগ প্রতিষ্ঠার পরে পুরা এক বছর চলিয়া গিয়াছে। পূর্ব পাকিস্তানের মজুর কৃষক, মধ্যবিত্ত প্রভৃতি সকল শ্রেণীর যুবকদের মধ্যে আজ প্রশ্ন জাগিয়াছে গত যুব সম্মেলনে যে গণদাবীর সনদ রচিত হইয়াছিল, যে প্রেরণা ও চেতনা লইয়া যুবকগণ পাকিস্তান রাষ্ট্রকে গড়িয়া তুলিবার স্বপ্ন দেখিয়াছিল গত এক বছরে তাহার কতটুকু সফলতা লাভ করিয়াছে? আমরা কি পূর্ণ স্বাধীনতা, সুখ ও গণতন্ত্রের পথে অগ্রসর হইতেছি, না ক্রমেই সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্তের পাকে জড়াইয়া পড়িতেছি, দেশবাসীর জীবনে দুঃখ-দুর্দশা কমিতেছে না আরও বাড়িয়া চলিয়াছে।

আমাদের বর্তমান দুঃখ-দুর্দশা, গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ ও বৃটিশ আধিপত্যের জন্য দায়ী কে এবং কোন পথেই বা ইহার আবসান হইতে পারে, ইহাই আজ প্রত্যেক গণতান্ত্রিক চেতনাসম্পন্ন যুবকের মনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। যে “গণদাবীর সনদ’ আমরা গত ঢাকা সম্মেলনে গ্রহণ কায়িছিলাম তাহা কোন অবস্থার মধ্যে কার্যকরী হওয়া সম্ভব, বৰ্ত্তমান সরকার দ্বারা ঐ সনদকে কার্য্যে পরিণত করা সম্ভব কিনা এবং তাহা সম্ভব না হইলে কোন কৰ্ম্মপন্থার ভিত্তিতে আমরা অগ্রসর হইব এই সকল মূল প্রশ্ন এড়াইয়া যাওয়ার ফলেই আমাদের “গণদাবীর সনদ’ একটি আদর্শ পরিকল্পনাই মাত্র রহিয়া গিয়াছে, ইহাকে কার্য্যে পরিণত করিবার সংগ্রাম আজও গড়িয়া উঠে নাই। ইহার ফলে প্রথম কিছুটা কৰ্ম্মচাঞ্চল্যের পরেই যুবলীগ ঝিমাইয়া পড়িয়াছে। আমাদের এই ঝিমাইয়া পড়া অবস্থার কারণ ইহাই নয় যে পাকিস্তানের যুবলীগ আজ নিজীব ও অকৰ্ম্মণ্য বরং একথা খুব জোরের সাথেই বলা চলে যে বৰ্ত্তমান দুঃখ-দুর্দশা আজ কৃষক, মজুর ও মধ্যবিত্ত যুবককে যত বেশী চঞ্চল করিয়া তুলিয়াছে, যত বেশী কৰ্ম্মপ্রেরনা সৃষ্টি করিয়াছে অতীতে কোনদিনই এরূপ হয় নাই। যুবকগণ আজ একথা বুঝিয়াছে যে শুধুমাত্র একটা আদর্শ প্রোগ্রাম হাজির করিলে বা তাহাকে প্রচার করিলেই চলিবে না। তাহাকে কার্যকরী করিবার জন্য সক্রিয় কৰ্ম্মপস্থাও গ্রহণ করিতে হইবে। আমাদের গত সম্মেলন সে সম্বন্ধে কোনও নির্দেশ দিতে পারে নাই সে জন্যই আজ পাকিস্তানের যুবশক্তি বিপুল কৰ্ম্মক্ষমতা লইয়াও বৰ্ত্তমান অবস্থার নিরপেক্ষ দর্শকমাত্র হইয়া রহিয়াছে। অতীতে দেখা গিয়াছে যখনই তাহদের কাছে সংগ্রামের আহবান আসিয়াছে তখন তাহাতে সাড়া দিতে একটুকুও দ্বিধাবোধ করে নাই।

গত বাংলা ভাষা আন্দোলন দুটি সত্য আমাদের সম্মুখে খুলিয়া ধরে। প্রথমতঃ একথা পরিষ্কার ধরা পড়ে যে আমাদের গণদাবীর সনদের সব্বনিম্ন দাবী বাংলা ভাষার অধিকার অর্জন করিতেও যুবশক্তি বৰ্ত্তমান শাসক শ্রেণীর কাছ হইতে লাঠি, গুলি, কাঁদুনে গ্যাস ও জেল পাইয়াছে। ইহাতেই দেখা যায় আমাদের সনদের অন্যান্য মূলদাবী আদায় করিতে হইলে আমাদিগকে কি বিরাট বাধার সম্মুখীন হইতে হইবে। দ্বিতীয়তঃ ইহাও দেখা যায় যে, পাকিস্তানের যুবশক্তি বৰ্ত্তমান শাসক শ্রেণীর সকল আঘাত উপেক্ষা করিয়াও আন্দোলনের আহবানে কিভাবে সাড়া দিয়াছে।

“বাংলা ভাষা আন্দোলনের” শিক্ষা আমরা ঠিকমত বুঝিয়া সময়মত নেতৃত্ব না দিবার ফলেই বিপুল সম্ভাবনা সত্ত্বেও পূর্ব পাকিস্তানের যুব আন্দোলনে ভাটা পড়িয়াছে। আমাদের গণদাবীর সনদ শুধুমাত্র কাগজপত্রের থাকিয়া গিয়াছে।

 

 

<001.033.097>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

 

যুব আন্দোলনকে নূতন ও উচ্চস্তরে আগাইয়া লইয়া যাইতে হইলে অবিলম্বে প্রয়োজন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর গত এক বছরের রাজনৈতকি ও অর্থনৈতিক অবস্থা ভালভাবে পর্যালোচনা করিয়া নূতন কৰ্ম্মপদ্ধতি গ্রহণ করা। সামান্য প্রয়োজনীয় পরিবর্তন করিলেই “গণদাবীর সনদই’ যুব আন্দোলনের মূল প্রোগ্রাম হিসাবে এখনও গ্রহণ করা যাইতে পারে বটে কিন্তু মুহুৰ্ত্তের প্রয়োজন হইল উক্ত প্রোগ্রামকে কার্যকরী করিবার আন্দোলন গড়িয়া তোলার সম্বন্ধে কৰ্ম্মপন্থা নির্ধারণ করা।

১৫ই আগষ্ট ১৯৪৭ হইতে ১৫ই আগষ্ট ১৯৪৮আমরা কি চাহিয়াছিলাম এবং কি পাইয়াছি

গত ঢাকা সম্মেলনে যে “গণদাবীর সনদ’ গৃহীত হয় তাহাতে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, মৌলিক গণতান্ত্রিক অধিকার, গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা, আর্থিক গণতন্ত্র, কৃষি পুনর্গঠন, শিল্প বিপ্লব প্রভৃতি মূলদাবীর কথা বলা হইয়াছে। এই সনদের অর্থই হইল পরাধীন দেশের রাজনৈতিক সম্পর্ক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ভাঙ্গিয়া ফেলিয়া নূতন বুনিয়াদের উপর দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ভিত্তি স্থাপন করা। কিন্তু বৰ্ত্তমান সরকার পুরাতন সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থাকেই কায়েম রাখিতে যে বদ্ধপরিকর গত এক বছরের কার্য্যাবলী লক্ষ্য করিলেই তাহা ধরা পড়ে।

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র?

আমাদের দাবী ছিল পাকিস্তান বৃটিশ সাম্রাজের বাহিরে একটি স্বাধীন ও সাৰ্ব্বভৌম গণরাষ্ট্র হোক অথচ ১৯৪৮ সালের জুন মাসে বৰ্ত্তমান শাসকমণ্ডলী সার্বভৌম ঘোষণা না করিয়া ইংরাজ রাজার জন্ম দিবস পালন করিল। কায়েদ-এ-আজম পূৰ্ব্বেই ঘোষণা করিয়াছেন যে বৃটিশ কমনওয়েলথের ভিতরে থাকাই তাঁহার ব্যক্তিগত মত। এখনও রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক কার্য্যে ইংরাজ গভর্ণর, উপদেষ্টা ও বড় বড় অফিসার নিযুক্ত থাকিয়া গরীব দেশের কোটি কোটি টাকা লুটিতেছে, আমাদের রাষ্ট্রের উপর তাহদের প্রভাব বজায় রাখিতেছে। ইহাই কি স্বাধীনতা? এই সকল ঘটনা হইতেই পরিস্কার বোঝা যায় বৰ্ত্তমান প্রকৃত স্বাধীনতা নয়, মেকি স্বাধীনতা মাত্র।

আমরা দাবী করিয়াছিলাম পাকিস্তানের বিভিন্ন ভাষাভাষী প্রদেশকে আত্মনিয়ন্ত্রণের পূর্ণ অধিকার দেওয়া হউক। রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব জনগণের উপর ন্যস্ত থাকিবে। অথচ বৰ্ত্তমান শাসক শ্রেণী আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের বদলে সমগ্র ক্ষমতা কেন্দ্রীয়করণের উপর জোর দিতেছে। খুশীমত যে কোন প্রদেশের অধিকার হরণ করিতেছে (সিন্ধু হইতে করাচীকে বিচ্ছিন্ন করা) সমস্ত রাজনৈতিক ক্ষমতা হরণ করিবার এমন কি প্রাদেশিক ও কেন্দ্রীয় আইন সভার হাত হইতেও ক্ষমতা কাড়িয়া সমস্ত ক্ষমতা বড় লাটের হাতে কেন্দ্রীভূত করিতেছ। ইহাই কি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নমুনা?

মৌলিক গণতান্ত্রিক অধিকার?

আমাদের সনদে দাবী করা হইয়াছিল প্রত্যেক বয়স্ক লোকের ভোটাধিকার চাই কিন্তু এখন পর্যন্ত সকল নিৰ্ব্বাচনই ইংরাজ মার্কা পদ্ধতিতেই চলিয়াছে। অর্ডিন্যান্স করিয়া জনগণের অধিকার হরণ করা চলে কিন্তু অধিকার দান করা চলে না।

আমরা দাবী করিয়াছিলাম ব্যক্তিস্বাধীনতা চাই অর্থাৎ মতামত প্রকাশের, সভা ও সমিতি, শোভাযাত্রা, সংগঠন গঠনের, পত্রিকা ও প্রকাশের, বিক্ষোভ ও প্রদর্শন ও ধৰ্ম্মঘটের, বিনা বিচারে আটক না রাখার স্বাধীনতা চাই। কিন্তু গত এক বছরের অভিজ্ঞতার ফলে একথা জোরের সাথেই বলা যায় যে, আজ যেভাবে ব্যক্তিস্বাধীনতা হরণ করা হইতেছে এবং সকল রকমের বিরোধিতা ও সমালোচনার টুটি টিপিয়া বন্ধ করা হইতেছে, ইংরাজ আমলেও ইহার চাইতে বেশী কিছু করা সম্ভব হয় নাই। পুলিশ, গোয়েন্দা ও কায়েমী স্বার্থের দল হাত ধরাধরি

 

 

 

<001.033.098>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

 

করিয়া আজ সকল রকম প্রগতিশীল আন্দোলন ধ্বংস করিতেছে এবং তাহারাই পাইতেছে শাসকমণ্ডলীর পূর্ণ সমর্থন। খুশীমত ১৪৪ ধারা জারী করিয়া সভা সমিতি বন্ধ করা, যে কোন রকম মজুর কৃষক আন্দোলনকেই বে-আইনী কাজ হিসাবে দমন করা, যথেচ্ছাভাবে খানাতল্লাশী চালানো, গোয়োন্দা বিভাগের অঙ্গুলী হেলনে যে কোন ব্যক্তিকে যত দিন খুশী বিনা বিচারে আটক রাখা বা প্রদেশ হইতে বহিস্কৃত করা আজ প্রতিদিনের ঘটনা হইয়া দাঁড়াইয়াছে। শত শত বৎসরের লড়াই ও ত্যাগের মধ্য দিয়া যতটুকু ব্যক্তিস্বাধীনতা আমরা অর্জন করিয়াছি বৰ্ত্তমান শাসকমণ্ডলীর হাতে তাহাও বিপন্ন হইয়া পড়িয়াছে। “পঞ্চম বাহিনী”, “রাষ্ট্রের শক্র”, “কমিউনিষ্ট” প্রভৃতি মামুলী আখ্যা দিয়া চরম দমননীতি প্রয়োগ করিয়া বৰ্ত্তমানে মন্ত্রীসভা সমস্ত ক্ষমতা নিজের মুষ্ঠির মধ্যে আনিয়া পুলিশ, গোয়েন্দা ও ধনিক শ্রেণীর খেয়ালের উপর পূৰ্ব্ব পাকিস্তানের পৌনে পাঁচ কোটি লোকের ভাগ্য ছাড়িয়া দিয়াছে। জমিদার, জোতদার, মিল মালিক প্রভৃতি ধনিক গোষ্ঠীর স্বার্থে আঘাত লাগে এরূপ যে কোন আন্দোলনকেই দমন করা ও রাষ্ট্রের শক্র আখ্যা দেওয়ার মধ্য দিয়াই রাষ্ট্রের বর্তমান কর্ণধারগণের স্বরূপ ধরা পড়ে। বাংলা ভাষা আন্দোলনের উপর নিৰ্ম্মম আঘাত হানার মধ্যে দিয়া ইহাদের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারবিরোধী মনোভাবও প্রকাশ পাইয়াছে।

এক কথায় বলিতে গেলে যে মৌলিক গণতান্ত্রিক অধিকার আমরা দাবী করিয়াছিলাম বৰ্ত্তমান শাসকমণ্ডলী তাহার কোন মর্য্যাদাই দেয়া নাই।

আর্থিক গণতন্ত্র?

কোন দেশের রাজনৈতিক কাঠামো কিরূপ তাহা ভালবাবে বুঝিতে হইলে সেই দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে প্রথমে লক্ষ্য করিতে হয়। যে দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা শোষণ ও জুলুমের ভিত্তিতে গঠিত অর্থাৎ দেশের শতকরা ৯৫ জন লোককে শতকরা মাত্র ৫ জন লোকের স্বার্থেই খাটিয়া মরিতে হয়, যে দেশে বড় বড় মোটা বেতনের আমলা পুষিয়া গরীব কেরানী ও মজুরকে ছাঁটাই করা হয়- এ কথায় বলিতে গেলে যে দেশে অর্থনৈতিক সাম্য বলিয়া কোন জিনিষ নাই সে দেশে রাজনৈতিক গণতন্ত্র বলিয়াও কিছু থাকিতে পারে না। ইংরাজ সরকার তাহার শোষণ ও শাসন বজায় রাখিবার জন্য আমাদের দেশে একদিকে জমির উপর একদল পরগাছা সৃষ্টি করিয়াছে অপর দিকে শিল্পের দিক দিয়া আমাদের দেশকে অনগ্রসর করিয়া রাখিয়াছে। মুষ্টিমেয় জমিদারের স্বার্থে কোটি কোটি কৃষককে শোষণ করা হইতেছে এবং অপর দিকে বেকারের দল সৃষ্টি হইয়াছে। করিয়া সেই স্থলে নূতন গণতান্ত্রিক অর্থনৈতিক কাঠামো তৈরী করা। আমাদের নূতন অর্থনৈতিক কাঠামোর মূল ভিত্তিই হইবে বিনা খেশারতে জমিদার প্রথা ধ্বংস করিয়া কৃষককে জমির মালিক বলিয়া ঘোষণা করা এবং যে সকল ক্ষেত্রে একজন লোকের হাতে অধিক পরিমাণে আবাদী জমি একীভূত হইয়াছে সে সকল ক্ষেত্রে সমস্ত প্রয়োজনাতিরিক্ত জমি বাজেয়াপ্ত করিয়া তাহা গরীব কৃষক ও দিনমজুরদের মধ্যে বিতরণ করা। যাহারা চাষের হাল-বলদ কিনিতে পারিতেছে না, জমিতে সার দিতে পারিতেছে না তাহাদিগকে সরকার হইতে সাহায্য করা। অথচ বর্তমান সরকার জমিদারী উচ্ছেদের যে বিল আনিয়াছে তাহাতে “শিশু রাষ্ট্রের” পকেট হইতে ৪০ কোটি টাকা খেসারত ব্যবস্থা হইয়াছে, জোতদারকে ২০০ শত বিঘা জমি রাখিতে দেওয়া হইয়াছে, জমিদারের ঋণ লাঘবের ব্যবস্থা হইয়াছে, জমিদার জোতদারের জন্য সকল রকমেরই রক্ষাকবচের ব্যবস্থা হইয়াছে কিন্তু এই বিলের ফলে কৃষক কি পাইবে, আধিয়ার ও দিনমজুরের ভাগ্যের কি পরিবর্তন হইবে শুধু সেইটাই খুঁজিয়া পাওয়া যায় না। এক কথায় বলিতে গেলে এই বিল কৃষকের স্বার্থে রচিত হয় নই-জমিদারের স্বার্থেই রচিত।

কৰ্মচারী, কেরানী, শিক্ষক প্রভৃতি সম্বন্ধে সত্যিকারের গণতান্ত্রিক নীতির অর্থ এই যে, যে দেশের কোটি কোটি লোকের পেটে ভাত নাই, পরনে কাপড় নাই, ঘরে বাতি নাই সে দেশের মন্ত্রী বা উচ্চ অফিসারদের কখনও মাহিনা, ভাতা প্রভৃতি দিয়া চার-পাঁচ হাজার টাকা মাসিক আয় বরদাশত করা চলে না। যাহারা একজন রেলমজুরকে ও একজন প্রাইমারী শিক্ষককে ১৫/২০ টাকা মাহিনা দিতে লজ্জা বোধ করে না তাহারা নিজেরাই বা

 

 

<001.033.099>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

 

পাঁচ হাজার টাকা লয় কিভাবে ও ইংরাজ আমলের অত্যাচারী ও দুনীতিপরায়ণ আমলাদের হাজার হাজার টাকা বেতন দিয়া পুষিতেছে কিভাবে? বৰ্ত্তমান অবস্থায় কোন মজুর ও কৰ্ম্মচারীর বেতন ও ভাতা ১০০ টাকার কম হইতে পারে না এবং কোন উচ্চপদস্থ কর্মচারীই বেতন ৫০০ টাকার বেশী হওয়া উচিত নয়। অথচ আমাদের সরকার মুখে ইসলামী সমাজতন্ত্রের কথা বলিয়া কাৰ্য্যক্ষেত্রে ইংরাজ আমলের শোষণ ও অসাম্যের উপর প্রতিষ্ঠিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকেই কায়েম রাখিতেছে। ঘুষ, দুনীতি, স্বজনপ্রীতি ও স্বেচ্ছাচারিতা বৃটিশ আমলকেও লজ্জা দেয়।

শিল্প বিস্তারের ব্যাপারে সরকার মজুর ও জনসাধারণের সক্রিয় সহযোগিতা লাভ করিয়াছে, অপরদিকে তেমনি মুষ্টিমেয় ধনিকের হাতে না জমিয়া কোটি কোটি টাকা সরকারের হস্তগত হইয়াছে, যাহা দিয়া নূতন শিল্প গড়িয়া তোলা, পুরাতন শিল্পকে প্রসার করার সুযোগ পাওয়া গিয়াছে। এই পথেই তাহারা জনসাধারণের আয় বাড়াইয়াছে, জিনিষের দর কমাইয়াছে এবং বেকার সমস্যার সমাধান করিয়াছে। এই ব্যবস্থা গ্রহণ করার ফলে মুষ্টিমেয় ধনিক, রাজা, জমিদার ও বিদেশী সাম্রাজ্যবাদী তাহদের শক্র হইয়াছে বটে কিন্তু দেশের কোটি কোটি মজুর, কৃষক ও মধ্যবিত্ত রাশিয়া রাষ্ট্রের নিরাপত্তার ভার গ্রহণ করিয়াছে, রাষ্ট্র পরিচালনায় সক্রিয় অংশগ্রহণ করিয়াছে। সেই জন্যই দেখা যায় যুদ্ধের নিদারুন ক্ষয়ক্ষতি সহ্য করা সত্ত্বেও সোভিয়েট রাশিয়া ও নয়া গণতান্ত্রিক দেশসমূহ কেবলমাত্র নিজ শক্তির উপর ভরসা করিয়াও পরস্পরের সাথে সহযোগিতা করিয়া অতি দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নতির পথে অগ্রসর হইতেছে। আর মার্কিন ধনকুবেরগণের সাহায্য লাভ করিয়া পশ্চিম ইউরোপের দেশসমূহ, চিয়াংকাইশেকের চীন প্রভৃতি কেবল সম্মেলন করিয়া বেড়াইতেছে ও অর্থনৈতিক সংকটে হাবুডুবু খাইতেছে।

যাহারা নিজের দেশের ধনিকদের তোষণ ও লালপালন করে অর্থের জন্য তাদেরই বিদেশী সাম্রাজ্যবাদীদের কাছে হাত পাতিতে হয় এবং তদ্বারা অভ্যন্তরীণ ব্যাপারেও বিদেশী প্ৰভুদের হস্তক্ষেপ ডাকিয়া আনিতে হয়। এইভাবেই অর্থনৈতিক গোলামী হইতে রাজনৈতিক গোলামীর সৃষ্টি হয়।

সেইজন্য পাকিস্তান সরকার অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে ধনিক তোষণ ও কৃষক মজুর আন্দোলনে ধ্বংসের পথ গ্রহণ করিয়াও আন্তর্জাতিক ব্যাপারে বৃটিশ ও আমেরিকার লেজুড়ে পরিণত হইয়াছে। ইহার ফলেই নেতারা বৃটিশ সম্পর্কোচ্ছেদের বদলে বৃটিশ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত থাকিবার কথা বলিতেছেন, রাজার জন্মদিবস পালন করিতেছেন। ইহা আজাদীর পথ নয়, গোলামীর পথ, শিল্প বিস্তারের পথ নয়, বিদেশী পুঁজিপতিদের স্বার্থে দেশের শিল্পবিস্তার বন্ধ রাখার পথ ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতার বদলে অর্থনৈতিক দাসত্বের পথ।

সত্যিকারে, আজাদীর শিল্প বিস্তার ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতার পথে বর্তমানে শাসকমণ্ডলী অগ্রসর হইতে পারেন না, কারণ তাহা হইলে কৃষক, মজুর ও গরীব মধ্যবিত্তের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা না করিয়া মিল মালিক, জমিদার, জোতদার, বিদেশী পুঁজিপতি, মুনাফাখোর, বড় ব্যবসায়ী ও মোটা বেতনের দেশী-বিদেশী অফিসারদের বিরুদ্ধেই জেহাদ ঘোষণা করিতে হইবে। দুই নৌকায় পা দিয়া চলা আজ অসম্ভব। হয় ধনিকের শাসন ধ্বংস করিয়া মেহনতকারী জনসাধারণকে বাঁচাইতে হইবে আর না হয় মেহনতকারী জনসাধারণকে বুভূক্ষু রাখিয়া ধনিকের ধন-দৌলত বাড়াইতে হইবে। কোন দেশ কোন পথে যাইবে তাহা নির্ভর করে সেই দেশের শাসক শ্রেণী কোন দলের প্রতিনিধি তাহার উপর। সোভিয়েট রাশিয়া ও নয়া গণতান্ত্রিক দেশসমূহে কৃষক, মজুর ও গরীব মধ্যবিত্ত রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করিয়াছে সেই জন্যই সেখানকার জনগণ আজ খাঁটি আজাদী গণতন্ত্র ও সুখ ভোগ করিয়াছে, আর উন্নতির পথে আগাইয়া চলিয়াছে। গত এক বৎসরের কার্যকলাপের ফলে একথা ক্রমেই স্পষ্ট হইয়া উঠিতেছে যে পাকিস্তানের শাসক শ্রেণী ধনিক শ্রেণীর প্রতিনিধি হিসাবেই কাজ করিতেছে এবং সেই জন্যই দেশবাসীর জীবনে দুঃখ-দুর্দশা নামিয়া আসিয়াছে। সরকার বলে “সময় দাও” কিন্তু আমাদের প্রশ্ন যে এক বৎসর সময় আমরা দিলাম তাহা কাহার স্বার্থে কিভাবে ব্যবহার করা হইল? এই এক বৎসরে কি তাহারা বৃটিশ সম্পর্কোচ্ছেদ, ধনিক শ্রেণীর উচ্ছেদ, চোরাকারবারী ও মুনাফাখোর ধ্বংস ও কৃষক মজুর মধ্যবিত্তের উন্নতির

 

 

<001.033.100>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র – প্রথম খণ্ড

 

কাজে ব্যয় করিয়াছে, না দেশী বিদেশী ধনিক তোষণ ও গরীব হত্যার কাজে ব্যয় করিয়াছে? সময় পাইলেই যদি ধনিক শ্রেণীর উচ্ছেদ হইত, জনসাধারণ পেটে ভাত, পরনে কাপড় পাইত তাহা হইলে আমেরিকা ও ইংলেণ্ডে আজ কোটিপতিরা দেশের মালিক কেন? সেখানকার মজুরদেরও মজুরী বৃদ্ধির জন্য ধর্মঘট করিতে হয় কেন? আর মাত্র ২/৩ বৎসর সময়ের মধ্যে আলবেনিয়া, হাঙ্গেরী, পোলাও প্রভৃতি দেশ তাহাদের ভাগ্য পরিবর্তন করিতে পারিল কেন?

সময় পাইলেই সব ঠিক হইবে একথা সম্পূর্ণ মিথ্যা, সরকারী কর্তৃপক্ষ কাহার স্বার্থে রাষ্ট্র পরিচালনা করিতেছে-ধনিকের না গরীবের? এটাই হইল আসল প্রশ্ন। যে সরকার ধনিকের স্বার্থে রাষ্ট্র পরিচালনা করে তাহাকে সময় দেওয়ার অর্থ ধনিকের শক্তিবৃদ্ধি করিতে সুযোগ দেওয়া মাত্র।

গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা

যে রাষ্ট্রে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক গণতন্ত্রের স্থান নাই; সেই রাষ্ট্রে গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা আশা করা বৃথা। আমরা দাবী করিয়াচিলাম সকলের কাজ করিবার অধিকার চাই, গ্রামে গারমে বিনা বেতনে শিক্ষা দেবার স্কুল চাই, প্রতি ইউনিয়নে সরকারী ডাক্তার চাই। বলা বাহুল্য যে, ইহার কোনটাই আমরা পাইতেছি না এবং পাইবার কোন সম্ভাবনাও দেখিতেছি না। প্রত্যেকের কাজের অধিকারের বদলে পাইতেছি বেকার সমস্যা; গ্রামে গ্রামে স্কুলের পরিবৰ্ত্তে বৰ্ত্তমানে সামান্য কয়টি স্কুল ও সরকারী শিক্ষা বিভাগের খেয়ালমত ভাঙ্গা গড়া ইত্যাদি। স্বাস্থ্যের উন্নতি দূরের কথা সরকারী খরচে মাত্র যে কয়জন Health Assistant টিকা, ইনজেকশন দিবার জন্য রাখা হইয়াছে তাহদেরও বরখাস্তের বন্দোবস্ত হইতেছে। শ্রমিক, কৃষক, নারী জাতি প্রভৃতির জন্য আমরা যে সকল অধিকার দাবী করিয়াছিলাম, একটি সুখী সমাজ ব্যবস্থা গড়িবার যে আর্দশ, যে কর্মপন্থা আমরা গ্রহণ করিয়াছিলাম বর্তমান শাসকমণ্ডলীর দ্বারা তাহা সম্পূর্ণ উপেক্ষিত হইয়াছে। গত এক বছরে নূতন সমাজ ব্যবস্থা গড়িয়া তোলা দূরে থাকুক পুরাতন জরাজীর্ণ ব্যবস্থাও ভাঙ্গিয়া পড়িয়াছে। সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীকে নূতন অধিকার দানের বদলে পুরাতন অধিকার কাড়িয়া লওয়া হইয়াছে।

বৰ্ত্তমান শাসক শ্রেণী খাদ্য সমস্যার সমাধান করিতে পারিতেছে না অথচ খবরের কাগজে বিবৃতি দিতেছে যে দেশে খাদ্য সমস্যা নাই। কোন জিনিষেরই দর কমাইতে পারিতেছে না। সকল রকমের কুটির শিল্প ধ্বংস হইয়া যাইতেছে। ছাঁটাই প্রভৃতির ফলে বিরাট আকারে বেকার সমস্যা দেখা দিয়াছে। এক কথায় বলিতে গেলে লোকের আয় ক্রমেই কমিতেছে আর ব্যয় বহুলাংশে বাড়িয়া চলিয়াছে, অথচ সরকারী কর্তৃপক্ষ ইহার বিরুদ্ধে নেতাদের গ্রেপ্তার, বরখাস্ত, বদলী, ১৪৪ ধারা জারী প্রভৃতি দ্বারা ইহার জবাব দেয়। কাপড় ও চিনির কলের মালিকরা যখন উৎপাদক মজুর শ্রেণী, ক্রেতা ও মধ্যবিত্ত ও কৃষক শ্রেণীকে শোষণ করিয়া কোটি কোটি টাকা মুনাফা লুট করে তখন সরকার নিরপেক্ষ দর্শকের ন্যায় সবই মুখ বুজিয়া সহ্য করে। অথচ মজদুর শ্রেণী যখন বাধ্য হইয়া জীবন ধারণের উপযোগী মজুরী, ছুটি প্রভৃতির দাবী লইয়া আন্দোলন ও ধর্মঘটের পথে অগ্রসর হয় তখন সরকার মিল মালিকের পক্ষেই হস্তক্ষেপ করাকে পবিত্র কৰ্ত্তব্য বলিয়া মনে করে। আমরা আজাদী পাইয়াছি, কিন্তু এখনও রেল শ্রমিক ও যাত্রীদের শোষণ করিয়া কোটি কোটি টাকা ইংরাজ পুঁজিপতিদের জন্য বিলাতে পাঠাইতে হয়। যে সকল ইংরাজ অফিসার আমাদের দেশে চাকুরী করার নামে শোষণ ও শাসনের যন্ত্র হিসাবে কাজ করিয়াছে, আমাদের দেশের স্বাধীনতাকামী জনসাধারণের বুকের রক্ত দিয়া হাত রাঙ্গাইয়াছে, সেলামীস্বরূপ তাহাদের পেনসনের টাকা বিলাতে পাঠাইতে হয়। অথচ আমাদের দেশেরই গরীব মজুর ও শিক্ষকের দল না খাইয়া থাকে।

 

 

 

 

 

 

 

<001.033.101>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ প্রথম খন্ড

আমরা দাবী করিয়াছিলাম অর্থনৈতিক গণতন্ত্র, শোষণমূলক ব্যবস্থার অবসান। অথচ আমরা পাইতেছি একদিকে মুষ্টিমেয় কায়েমী স্বার্থের অর্থনৈতিক একাধিপত্য, মোটা বেতনভোগী, ভোগ-বিলাস ও অপরদিকে অন্নহীন, বস্ত্রহীন কঙ্কালসার দরিদ্র জনসাধারণ- ইহাই কি ইসলামী সমাজতন্ত্র? না সমাজতন্ত্রের নামে প্রবঞ্চনা?

শিল্প বিপ্লব

গত এক বছর হইল সরকারীমহল হইতে আশার বাণী শুনান হইতেছে যে পাকিস্তানে শিল্প বিস্তারের সম্ভাবনা প্রচুর। এক বিশেষ কমিটি গঠিত হইতেছে, ইংরাজ বিশেষজ্ঞদিগকেও মোটা টাকা দিয়া পরামর্শ দিবার জন্য আনা হইতেছে, কিন্তু অবস্থার একচুলও পরিবর্তন হয়নি। বাস্তব কর্মপন্থা ভিত্তিতে একটি কাজও শুরু হয়নি। আমাদের সরকার যতদিন বৃটিশ ও আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদীদের তোষণ করিয়া পাকিস্তানের শিল্প বিস্তারের চেষ্টা করিবে ততদিন পর্যন্ত বৰ্ত্তমান অবস্থাই চলিতে থাকিবে। কারণ সাম্রাজ্যবাদীরা নিজ স্বার্থে যতটুকু প্রয়োজন তার চাইতে একধাপও অগ্রসর হইবে না। পাকিস্তানের জনসাধারণের প্রয়োজনের চেয়ে নিজেদের সাম্রাজ্য বিস্তারের প্রয়োজনই তাহাদের কাছে ঢের বড় কথা এবং এইদিকে নজর রাখিয়াই তাহারা সব কিছু করিবে। মার্শাল পরিকল্পনা মারফৎ পশ্চিম ইউরোপের শিল্পপ্রধান দেশগুলিকে যেভাবে পদানত করিবার চেষ্টা করিতেছে, তাহাতে বেশ বুঝা যায় যে এই সাম্রাজ্যবাদী ধুরন্ধরেরা পাকিস্তানের দুর্বলতার সুযোগ গ্রহণ করিতে মোটেই ছাড়িবে না। অথচ আমাদের কর্তৃপক্ষ তাহদেরই দুয়ারে ধর্ণা দিতেছে। আমেরিকার কাছ হইতে তাহদের শৰ্ত্তে টাকা ধার করা বা আমেরিকার পুঁজিপতিগণকে দেশে শিল্প বিস্তারের জন্য আমন্ত্রণ জানানো যে খাল কাটিয়া কুমীর আনিবারই শামিল হইবে একথা যে কোন সাধারণ লোকেই বুঝিতে পারে। অথচ চোখের উপরই দেখিতেছি পূৰ্ব্ব ইউরোপের নয়া গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রসমূহ সাম্রাজ্যবাদীদের দাসত্বসুলভ শর্তে দেওয়া ঋণ ঘৃণায় প্রত্যাখান করিয়া নিজ শক্তির উপর নির্ভর করিয়াই অনেক দ্রুতগতিতে শিল্প বিস্তার করিতেছে। ১৯৭১ সালে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পরে সোভিয়েট রাশিয়া আমাদের দেশের মত প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে পড়িয়াও সাম্রাজ্যবাদীদের কাছে মাথা বিকাইয়া না দিয়া নিজ শক্তির উপর ভরসা করিয়া দাঁড়াইয়াছিল। তাহারা যদি সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরোধিতা সত্ত্বেও অতি দ্রুত শিল্প বিস্তার করিতে পারে তাহা হইলে আমাদের সরকার সাম্রাজ্যবাদীদের তোষণ করিয়াও গত এক বছরে এক ধাপও অগ্রসর হইতে পারেন নাই কেন? সোভিয়েট রাশিয়া পরাধীন দেশ শোষণ করিয়া বা সাম্রাজ্যবাদীদের কাছ হইতে ঋণ করিয়া শিল্প ও আভ্যন্তরীণ ও বহির্বাণিজ্য ধনিক শ্রেণীর হাত হইতে দখল করিয়া রাষ্ট্রের হাতে আনিয়া জারের আমলের সকল ধার-দেনা অস্বীকার করিয়া। দেশী ও বিদেশী ধনিকদের হাতে মুঠা হইতে অর্থনৈতিক আধিপত্র কাড়িয়া লওয়ার ফলে একদিকে যেমন শ্রমিক শ্রেণীর মজুরী বাড়িয়াছে ও জিনিষের দর কমিয়াছে- এককথায় বলিতে গেলে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সকল দিক দিয়াই আমরা যেন আরও পরাধীনতার নাগপাশে আবদ্ধ হইতেছি। অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থাসমূহ জোর করিয়া আমাদের উপর চাপাইয়া দেওয়া হইতেছে- ইহাই হইল আমাদের গত এক বছরের অভিজ্ঞতা।

গণপরিষদ

স্বাধীন দেশের গঠনতন্ত্র রচনার ফলে যে মুষ্টিমেয় লোকের ভোটে এবং পরোক্ত নির্বাচন দ্বারা গণপরিষদ গঠিত হইয়াছিল এক বছরে একমাত্র পতাকা নির্ধারণ ছাড়া তাহা কোন কাজই করে নাই। জনসাধারণকে ভুলাইবার জন্য নামেমাত্র একটি গণপরিষদ খাড়া করিয়া রাখা হইয়াছে। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাস আলোচনা করিলে আমাদের গণপরিষদের অগণতান্ত্রিক ভিত্তি ও স্থবিরতা একটি লজ্জার বিষয় হইয়াছে। এইরূপ একটি গণপরিষদের কাছ হইতে আমরা বিপ্লবী পরিবর্তন আশা করিতে পারি কিভাবে? সকলের মনেই আজ এ প্রশ্ন জাগিতেছে বৰ্ত্তমান পরিষদ কি কালের দাবীর সহিত তাল মিলাইয়া পুরাতন বৃটিশ

 

<001.033.102>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ প্রথম খন্ড

 

রচিত সমাজব্যবস্থা ধ্বংস করিয়া আমাদের রাজনৈতিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবনে বিপ্লবী পরিবর্তন আনিতে পারিবে? একথা আজ লজ্জার সাথে স্বীকার করিতেই হইবে যে বৰ্ত্তমান গণপরিষদ পাকিস্তানবাসীকে সকল দিক হইতেই নিরাশ করিয়াছে।

আমাদের ভবিষ্যৎ

গত এক বছরের অভিজ্ঞতা আগামীকালের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে মোটেই আশাম্বিত করিয়া তুলিতেছে না। বরং এই আশংকাই আমাদের মধ্যে প্রবল যে, বর্তমান অবস্থার গতিরোধ করিতে না পারিলে আমাদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবনে এক ঘোরতর বিপর্যয় দেখা দিবে। মাত্র কয়েকজন লোকের স্বার্থে পাকিস্তানের কোটি কোটি জনসাধারণের সকল অধিকার হরণ করিয়া একটিমাত্র গোষ্ঠীর একনায়কত্ব জাকিয়া বসিবে। ইহাদেরই স্বার্থে এবং খেয়াল চরিতার্থ করিবার জন্য আমাদের সকলের স্বার্থ ত্যাগ করিতে হইবে। ইহাদেরই সুখ বৃদ্ধির জন্য আমাদের সকলের সুখ বিসর্জন দিতে হইবে। ইহাদের অধিকার কায়েম রাখিতে আমাদের সকলের অধিকার হরণ করা হইবে। পাকিস্তানের যুবসমাজ শাসকমন্ডলীর এই গণবিরোধী নীতি, গণতন্ত্রের প্রতি উপেক্ষা ও শোষকমুলক ব্যবস্থা কখনো মুখ বুজিয়া মানিয়া লইতে পারে না। সরকার যদি মনে করিয়া থাকে একমাত্র দমন নীতির সাহায্যে ত্রাসের সঞ্চার করিয়া সমস্ত গণতান্ত্রিক আন্দোলন স্তব্ধ করিয়া দিব, কৃষক, মজুর, ছাত্র ও যুব সংগঠন ধ্বংস করিয়া দিব, তাহা হইলে তাহারা চরম ভুল করিয়াছে; ইতিহাস হইতে কোন শিক্ষাই গ্রহণ করে নাই। লাঠি ও জেলখানার সাহায্যে কখনও গণআন্দোলন ধ্বংস করা যায় নাই। হিটলার-মুসোলিনী হইতে শুরু করিয়া পৃথিবীর কোন দেশের শাসক শ্রেণীই যে কাজে কৃতকাৰ্য হইতে পারে নাই পাকিস্তান সরকারের সেই চেষ্টা করা বৃথা। পাকিস্তান সরকার যেন এ কথা না ভুলে যে, আজ যাহারা গণআন্দোলন গড়িয়া তুলিতেছে তাহাদেরই এক বিরাট অংশ বৰ্ত্তমান পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার জন্য দায়ী। শুধুমাত্র পঞ্চম বাহিনী’, ‘রাষ্ট্রের শক্র প্রভৃতি আখ্যা দিয়া লোক চক্ষে তাহদের হেয় করিবার চেষ্টা বৃথা। যে প্রেরণা জন্য দ্বিগুণ উৎসাহ লইয়াই বৰ্ত্তমান শাসকশ্রেণীর বিরুদ্ধে আন্দোলনে পাকিস্তানের যুবশক্তি ঝাঁপাইয়া পড়িবে। সরকারের কোন হুমকি তাহাকে সফলচু্যত করিতে পারিবে না।

যুবসমাজের প্রতি

বৰ্ত্তমান সরকারের সাম্রাজ্যবাদ ঘেঁষা নীতি, ব্যক্তি-স্বাধীনতা হরণ, কৃষক-মজুর আন্দোলন ও তাহদের সংগঠন ধ্বংস করা ও জমিদার, মিল মালিক তোষণ, ছাঁটাই ও বেতন বৃদ্ধি না করা প্রভৃতি কার্যের বিরুদ্ধে তুমুল আন্দোলন করিবার জন্য আমরা পাকিস্তানের যুব সমাজের কাছে উদাত্ত আহবান জানাইতেছি, এমন আন্দোলন সৃষ্টি করিতে হইবে যাহার ফলে সরকার তাহার গণবিরোধী নীতি পরিবর্তন করিতে বাধ্য হইবে। না হয় মজুর, কৃষক, গরীব, মধ্যবিত্তের প্রতিনিধিত্বমূলক নুতন সরকার বর্তমান সরকারের স্থান গ্রহণ করিবে। যে সরকার গণবিরোধী কার্য্যের দ্বারা আস্থা হারাইয়া ফেলে যে সরকার দেশের লোকের ভাত-কাপড়ের ব্যবস্থা না করিয়া শুধু লাঠি ও জেলখানার সাহায্যে দেশ শাসন করে গণতান্ত্রিক নীতি অনুযায়ী তাহার একদিনও টিকিয়া থাকিবার অধিকার নাই। যুবসমাজই জাতির মেরুদন্ড। সেইজন্য তাহাদের কাছে আমাদের আহবান আপনারাই আগাইয়া আসিয়া আন্দোলনে নেতৃত্ব দিন। কৃষক, মজুর, ছাত্র, কৰ্ম্মচারী প্রভৃতির যে সকল নিজস্ব শ্রেণী, প্রতিষ্ঠান তাহার সাথে যুবলীগের কোন বিরোধিতা নাই বরং তাহদের সহযোগিতাতেই একমাত্র প্রকৃত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়িয়া উঠিতে পারে। যুবলীগের মধ্যে থাকিয়াও যেন কৃষক সমিতি ও মজুর ইউনিয়নের সভ্যভূক্ত হন এবং কৃষক সমিতি ও মজুর ইউনিয়নের সংগে সহযোগিতা করেন। তাহদের দাবী-দাওয়া লড়াই করতে আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। কৃষকমজুরের আন্দোলনকে বাদ দিয়া কোন সত্যিকারের গণতান্ত্রিক আন্দোলনই গড়িয়া উঠিতে পারে না। কোন

<001.033.103>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ প্রথম খন্ড

 

দেশ কতটা গণতান্ত্রিক তাহার প্রকৃত প্রমাণ মিলে সেই দেশের শাসক শ্রেণীর কৃষক-মজুরের দাবী-দাওয়া ও তাহাদের আন্দোলনের প্রতি মনোভাবের মধ্য দিয়া। আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদীদের ন্যায় মুখে গণতন্ত্রের বুলি ও কার্যে নিগ্রো নির্যাতন ও কৃষক-মজুর শোষণ কখনো গণতন্ত্রের নীতি হইতে পারে না। পাকিস্তানে এমন শক্তিশালী গণতান্ত্রিক যুব আন্দোলন গড়িয়া উঠুক যাহা দুনিয়ার প্রগতিশীল যুব আন্দোলনের পাশে সমমর্যাদা লইয়া দাঁড়াইতে পারে। সেই উদ্দেশ্যে প্রতি গ্রাম, বন্দর ও কলকারখানায় যুবলীগের শাখা গঠন করিতে হইবে। তাহদের দাবী-দাওয়া লইয়া আন্দোলন করিতে হইবে। নিম্নলিখিত কার্যসূচীর ভিত্তিতে আন্দোলন গড়িয়া তুলিবার জন্য যুব সমাজের প্রতি আহবান জানানো যাইতেছেঃ ১। অবলিম্বে বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করিয়া পূর্ণ আজাদী ঘোষণা করিতে হইবে। আগামী অক্টোবরের বৃটিশ উপনিবেশ সম্মেলনে যোগদান করা চলিবে না। বৃটিশ আমলের কোন ইংরাজ অফিসারের পেনসনের খরচ পাকিস্তান সরকার বহন করিতে পারিবে না। ১৯৪৮ সালের মধ্যেই পাকিস্তানের ষ্ট্রালিং পাওনা কড়ায় গন্ডায় বুঝিয়া লইতে হইবে- কোন রকম দীর্ঘ-মেয়াদী চুক্তি করা চলিবে না। ২। প্রাপ্ত বয়স্কদের সাৰ্ব্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে অবিলম্বে নুতন গণপরিষদ মারফৎ গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা প্রণয়ন করিতে হইবে। ৩। ভাষার ভিত্তিতে স্বয়ং শাসন অধিকার সম্পন্ন প্রদেশ গড়িবার এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার মানিয়া লইতে হইবে। ৪। সংখ্যালঘুদের ন্যায্য অধিকারর স্বীকার করিতে হইবে। ৫। জনগণের স্বার্থে পারস্পরিক অর্থনৈতিক সাহায্যের জন্য এবং সাম্রাজ্যবাদী হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক দেশগুলির সহিত বন্ধুত্ব স্থাপন করিতে হইবে। ৬। বিনা ক্ষতিপূরণে জমিদার প্রথার উচ্ছেদ করিয়া কৃষককে জমির মালিক করিতে হইবে। কৃষকের ঋণ মকুব করিতে হইবে। ক্ষেত-মজুরদের ন্যায্য মজুরী দিতে হইবে। ৭। বড় বড় শিল্প, বড় ব্যাঙ্ক, ইনসিওরেন্স কোম্পানীগুলি জাতীয়করণ করিতে হইবে। শ্রমিকদের খাটুনির সময় আট ঘন্টা বধিয়া দিতে হইবে এবং বাঁচার মত মজুরীর ব্যবস্থা করিতে হইবে। ৮। ব্যাঙ্ক, চা বাগান, খনি ইত্যাদি বড় বড় ব্যবসায় নিয়োজিত বিদেশী মূলধন বাজেয়াপ্ত করিতে হইবে। মার্শাল প্লান অথবা অন্য কোন বিদেশী মূলধন জাতীয় স্বার্থবিরোধী শর্তে গ্রহণ করা চলিবে না। ৯। বিনা ব্যয়ে শিক্ষা বাধ্যতামূলক ও সাৰ্ব্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা চালু করিতে হইবে। ১০। রাষ্ট্রের খরচে স্বাস্থ্য এবং চিকিৎসার ব্যবস্থা করিতে হইবে। ১১। জনগণকে সামরিক শিক্ষা দিতে হইবে এবং জনগণের সামরিক বাহিনী গড়িয়া তুলিতে হইবে। ১২। নারীদের সমান গণতান্ত্রিক অধিকার স্বীকার করিতে হইবে। পাকিস্তান গণতান্ত্রিক যুবলীগের রাজশাহী বিভাগীয় আঞ্চলিক কমিটির সেক্রেটারী মোহাম্মদ একরামূল হক কর্তৃক এই ইস্তাহার উত্থাপিত হয় এবং উপস্থিত প্রতিনিধিগণ কর্তৃক সৰ্ব্বসম্মতি ক্রমে গৃহীত হয়।

<001.033.104>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ প্রথম খন্ড

 

খাদ্য সংকটের বিরুদ্ধে রুখিয়া দাঁড়াও
আমলাতান্ত্রিক গাফিলতির মুখোশ খুলিয়া দাও
জনগণের প্রতিরোধ গড়িয়া তোল

পূর্বপাকিস্তানে খাদ্যসমস্যা প্রকট হইয়া উঠিয়া যশোহর জেলায় ৪০ টাকা, খুলনায় ৩৮ টাকা, পাবনা নদীয়ায় ৩৫ টাকার উপরে চাউলের দর চলিতেছে। ২২/২৪ টাকার নীচে কোন জেলাতেই চাউল পাওয়া সম্ভব নয়। এক কথায় বলিতে গেলে পূৰ্ব্ব পাকিস্তানে খাদ্যের মূল্য জনসাধারণের নাগালে বাহিরে চলিয়া গিয়াছে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ইহা দ্বিতীয় খাদ্য সংকট। এই সংকট সমাধানে সরকারের তরফ হইতে এক বিবৃতি দেওয়া ছাড়া অন্য কোনই চেষ্টা হইতেছে না। খাদ্য সংগ্রহ ও সরবরাহ সম্পর্কে সরকারী নীতি খাদ্য সংকটকে আরও প্রকট করিয়া তুলিতেছে। এখন পর্যন্ত খাদ্য সংগ্রহের যথোপযুক্ত ব্যবস্থা হয় নাই। বড় জোতদার ও মজুতদারদের স্পর্শ না করিয়া সাধারণ কৃষকের নিকট হইতে ধান চাউল সংগ্রহ করাই সরকারের নীতি হইয়া দাঁড়াইয়াছে। মজুতদার ও জোতদারকে তোষণ করিয়া কৃষকের ধান সীজ করিবার নীতিতে খাদ্য সংগ্ৰহ হইতে পারে না। দ্বিতীয়তঃ বিদেশ হইতে খাদ্য আমদানীরও কোন ব্যবস্থা হইতেছে না। যে খাদ্য বৰ্ত্তমানে সরকার সংগ্ৰহ করিয়াছেন তাহাও সঠিকভাবে সরবরাহ হইতেছে না। খাদ্য সংগ্রহ ও সরবরাহ এইরূপ চলিতে থাকায় ৪ কোটি ৪০ লক্ষ লোকের পূর্ব পাকিস্তান আজ এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের সামনে উপস্থিত হইয়াছে। রাজশাহী বিভাগীয় যুব সম্মেলন ভয়াবহ উদ্বেগের সঙ্গে এই পরিস্থিতি লক্ষ করিতেছে। খাদ্য সমস্যার আশু সমাধানের জন্য অবিলম্বে নিলিখিত কৰ্ম্মপদ্ধতি গ্রহণ করিবার জন্য এই সম্মেলন সরকারের নিকট দাবী করিতেছেঃ ১। কৃষকদের নিকট হইতে জবরদস্তিমূলকভাবে ধান কাড়িয়া লওয়া চলিবে না। অবিলম্বে সমস্ত জোতদার ও মজুতদারদের বাড়তি খাদ্য বাজেয়াপ্ত করিয়া লইতে হইবে। ২। ভারত ও পাকিস্তানের বাহিরে অন্যান্য দেশের সঙ্গে সমঝোতা করিয়া খাদ্য আমদানীর ব্যবস্থা করিতে হইবে। ৩। সরকার কর্তৃক সংগৃহীত খাদ্য কালবিলম্ব না করিয়া ঘাটতি এলাকায় সস্তা দরে সরবরাহ করিতে হইবে। ৪। প্রত্যেক শহরে রেশনিং ব্যবস্থা চালু করিতে হইবে এবং রেশনিং এলাকায় নিয়মিতভাবে সস্তা দরে খাদ্য সরবরাহের ব্যবস্থা করিতে হইবে। ৫। যে সমস্ত লোক দুস্থ হইয়া পড়িয়াছে এবং খাদ্যক্রয়ে অক্ষম তাহদের জন্য বিনামূল্যে খাদ্য বিলির ব্যবস্থা করিতে হইবে। বন্যাপীড়িত অঞ্চলে দ্রুত সরবরাহ পাঠাইতে হইবে। ৬। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিষের মূল্য কমাইইতে হইবে।

 

<001.033.105>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ প্রথম খন্ড

 

৭। কৃষকের ক্রয় শক্তি বৃদ্ধির জন্য অর্থকারী ফসল যেমন পাট ইত্যাদির মূল্য বৃদ্ধি করিয়া সর্বনিম্ন দর বাঁধিয়া দিতে হইবে। পাটের সর্বনিম্ন দর মণ প্রতি ৪০ টাকা বধিয়া দিতে হইবে। ৮। মজুর ও মধ্যবিত্ত কর্মচারীদের মাহিনা বৃদ্ধি করিতে হইবে। ৯। জিন্নাহ তহবিল হইতে দুই-তৃতীয়াংশ অর্থ পূৰ্ব্ব পাকিস্তানের দুর্ভিক্ষ ও বন্যাপীড়িতদের সাহায্যের জন্য বরাদ্দ করিতে হইবে। উপরোক্ত পদ্ধতি যাহাতে অবিলম্বে কার্যকরী করা হয় তজ্জন্য আন্দোলন গড়িয়া তুলিবার জন্য পূৰ্ব্ব পাকিস্তানের যুব সমাজ ও জনসাধারণের নিকট এই সম্মেলন আহবান জানাইতেছে। ২। জমিদারী উচ্ছেদের ভাঁওতা দিয়া কৃষক উচ্ছেদ চলিবে না। বিনা খেসাতে জমিদারী উচ্ছেদ ও কৃষককে জমির মালিক করিতে হইবে। বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদী নিজের শাসন ও শোষণ কায়েম করিবার জন্য জমিদারী প্রথার সৃষ্টি করিয়া আমাদের দেশের জনসাধারণের অর্থননিতক জীবন পঙ্গু করিয়া দিয়াছে। দেশে চিরস্থায়ী খাদ্যসমস্যার সৃষ্টি করিয়াছে। সাম্রাজ্যবাদ সৃষ্ট এই ঘৃণ্য প্রথার বিরুদ্ধে কৃষকের আন্দোলন বহুদিনের আন্দোলন। আজাদী পাইলে জমিদারী প্রথা উচ্ছেদ করিয়া কৃষককে জমির মালিক করা হইবে-ইহাই ছিল নেতাদের ওয়াদা। আজাদ পূৰ্ব্ব পাকিস্তান সরকার জমিদারী উচ্ছেদের এক বিলও উত্থাপন করিয়াছে। কিন্তু এই বিলে যে সমস্ত ধারা রহিয়াছে তাহা সমস্তই কৃষক স্বার্থের বিরোধী। এই বিলের মূলধারাগুলি হইতেছেঃ (১) জমিদারদের জন্য ৪০ কোটি টাকারও অধিক ক্ষতিপূরণ। (২) জোতদারদের জন্য জমি। (৩) জমিদারদের ঋণ মকুব। (৪) ওয়াকফ ও দেবোত্তর সম্পত্তির সুবিধা ইত্যাদি। এই সম্মেলনের মতে উপরোক্ত সমস্ত ধারাগুলি কৃষক স্বার্থবিরোধী এবং বিনা খেসারতে জমিদারী প্রথা উচ্ছেদ করিয়া কৃষককে জমির মালিক করিবার মূল দাবী গৃহীত হয় নাই। এই বিল পাশ হইলে জমিদারী উচ্ছেদের পরিবৰ্ত্তে কৃষক উচ্ছেদেরই ব্যবস্থা হইবে। জমিদারী উচ্ছেদের নামে এইরূপ কৃষক বিরোধী বিল উত্থাপন করিয়া সরকার পূৰ্ব্ব পাকিস্তানের জনমতের সঙ্গে চরম বিশ্বাসঘাতকতা করিয়াছে। এই সম্মেলনে প্রস্তাবিত বিলের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ করিতেছে এবং অবিলম্বে এই বিল প্রত্যাহার করিয়া বিনা ক্ষতিপূরণে ও “কৃষকই জমির মালিক” এই নীতির ভিত্তিতে জমিদারী উচ্ছেদের দাবী জানাইতেছে। এই সম্মেলন মনে করে যে তুমুল আন্দোল ব্যতীত সরকার কৃষকের দাবী অনুযায়ী জমিদারী প্রথা উচ্ছেদ করিবে না। কৃষকের শ্রেণী সংগঠনকে জোরদার করিয়াই এই অন্দোলন সফল হইতে পারে। এই সম্মেলন পূৰ্ব্ব পাকিস্তানের যুব সমাজকে কৃষকের শ্রেণী সংগঠনকে সৰ্ব্বতোভাবে সাহায্য করিয়া জমিদারী উচ্ছেদকে সফল করিবার জন্য আহবান জানাইতেছে। ৩। রেল শ্রমিকের বাঁচিবার লড়াইয়ে সাহায্য করিব। আসন্ন রেল ধর্মঘটকে কামিয়াব করেত সর্বপ্রকার সহযোগিতা দিব। পাকিস্তান সরকারের শ্রমনীতি পাকিস্তানের রেল মজুরদের ধ্বংসের মুখে ঠেলিয়া দিতেছে। পাকিস্তান রেলওয়েতে প্রায় ১৬,০০০ হাজার শ্রমিক ছাঁটাইয়ের মুখে। পে কমিশনের রায় চালু, গ্রেনশপের পাকা ব্যবস্থা,

<001.033.106>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ প্রথম খন্ড

 

বাসস্থান ইত্যাদি শ্রমিকদের কোন দাবীই সরকার পূরণ করে নাই উপরন্তু রেল শ্রমিক আন্দোলনের উপর ব্যাপক দমননীতি প্রয়োগ করা হইতেছে। তাই রেলশ্রমিকরা বাধ্য হইয়া নিৰ্ম্মলিখিত পাঁচটি মূল দাবীর ভিত্তিতে সাধারণ ধৰ্ম্মঘটের প্রস্তুতির জন্য ষ্ট্ৰাইক ব্যালট গ্রহণ করিতেছেঃ (১) পুরাতন পে কশিশনের রায় চালু করিতে হইবে। (২) ছাঁটাই বন্ধ করিতে হইবে। (৩) গ্রেনশপের তালিকাভূক্ত দ্রব্য পূর্ণ সরবরাহের ব্যবস্থা করিতে হইবে। (৪) বাসস্থানের ব্যবস্থা করিতে হইবে। (৫) দমননীতি বন্ধ করিতে হইবে এবং ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের পূর্ণ স্বাধীনতা দিতে হইবে। এই সম্মেলন রেল শ্রমিকদের দাবী-দাওয়া ন্যায্য বলিয়া মনে করে এবং দাবী আদায়ের জন্য শ্রমিকদের ধৰ্ম্মঘটের সিদ্ধান্তকে পূর্ণভাবে সমর্থন করিতেছে এবং তাহাদের সংগ্রাম সৰ্ব্বপ্রকার সাহায্য ও সহানুভূতির প্রতিশ্রুতি দিতেছে। রেল ধৰ্ম্মঘটকে সাফল্যমন্ডিত করিবার জন্য এই সম্মেলন বিভিন্ন রেলশ্রমিক প্রতিষ্ঠানকে ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন করিবার আহবান জানাইতেছে। ৪। ব্যক্তিস্বাধীনতার জন্য লড়ো আজাদ পাকিস্তানে ব্যক্তি স্বাধীনতা হরণ চরম পর্যায়ে উঠিয়াছে। ব্যক্তি স্বাধীনতা হরণে পাকিস্তান সরকার সাম্রাজ্যবাদীদেরও ছাপাইয়া উঠিয়াছে। সভা, শোভাযাত্রা করিবার অধিকার ব্যাপকভাবে খৰ্ব্ব করা হইতেছে। ১৪৪ ধারার যথেচ্ছ প্রয়োগ, বিনা বিচারে আটক, অন্তরীণ ও বহিস্কার আদেশ, গ্রেপ্তারী পরওয়ানা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণ ইত্যাদি নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হইয়া দাঁড়াইয়াছে। দমননীতি, পুলিশ জুলুম ও অর্ডিন্যান্স-রাজ পাকিস্তানবাসী জনসাধারণের জীবনে বিভীষিকা সৃষ্টি করিয়াছে। এই সম্মেলন ব্যক্তি স্বাধীনতার উপর সরকারী আক্রমণ এবং দমননীতির বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ করিতেছে এবং অবিলম্বে সমস্ত বিনা বিচারে আটক বন্দীদের মুক্তি, ১৪৪ ধারা, গ্রেপ্তারী পরোয়ানা, অন্তরীণ ও বহিস্কার আদেশের আশু প্রত্যাহার দাবী করিতেছে। দমননীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়িয়া তুলিয়া ব্যক্তি স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা করিবার জন্য এই সম্মেলন দলমত নিৰ্ব্বিশেষে সমস্ত যুবক ও জনসাধারণকে আহবান জানাইতেছে। ৫। যুব আন্দোলনের উপর হামলা বরদাস্ত করা হইবে না। এই সম্মেলন গভীর উৎকণ্ঠার সহিত লক্ষ্য করিতেছে যে, পাকিস্তান সরকার গণতান্ত্রিক যুবলীগ’ প্রতিষ্ঠিত হইবার পর হইতে ইহার উপর হামলা শুরু করিয়াছে। সম্প্রতি ঢাকায় যুবলীগের কেন্দ্রীয় অফিস খানাতল্লাশী করা হইয়াছে। যুবলীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠিত মিঃ আতাউর রহমানের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারী পরোয়ানা জারী করা হইয়াছে এবং প্রাদেশিক কমিটির সদস্য মিঃ আবদুল আওয়ালের উপর ময়মনসিংহ জিলা হইতে বহিস্কার আদেশ জারী করা হইয়াছে। এই সম্মেলন, যুবলীগের প্রতি সরকারী দমননীতির তীব্র প্রতিবাদ করিতেছে এবং অবিলম্বে মিঃ আতাউর রহমানের উপর হইতে গ্রেপ্তারী পরোয়ানা প্রত্যাহার এবং মিঃ আব্দুল আউয়ালের উপর হইতে বহিস্কার আদেশ উঠাইয়া লইবার দাবী জানাইতেছে।

<001.033.107>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ প্রথম খন্ড

 

৬। ব্যাপক ছাঁটাইয়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াও এই সম্মেলন বিশেষ উৎকণ্ঠার সহিত লক্ষ্য করিতেছে যে, পাকিস্তান সরকারের ছাঁটাই-নীতি দেশের মধ্যে এক ভয়ানক বিভীষিকার সৃষ্টি করিয়াছে। ছাঁটাই নীতির কবলে পড়িয়া হাজার হাজার দরিদ্র কৰ্ম্মচারী ও মজুরের সংসার ছারখার হইয়া যাইতেছে। এই সম্মেলন সরকারের এই ছাঁটাই নীতির তীব্র প্রতিবাদ জানাইতেছে এবং সম্মেলন মনে করে যে, এইরূপে সমস্যা বাড়িবে কিন্তু কমিবে না। সুতরাং সম্মেলনের দাবী যে, ছাঁটাই নীতি অবিলম্বে বন্ধ করিতে হইবে এবং যাহাদিগকে ছাঁটাই করা হইয়াছে তাহাদিগকে পুনর্নিয়োগ করিতে হইবে। ৭। ধ্বংসমুখী শিক্ষা ব্যবস্থাকে বাঁচাও পূর্বপাকিস্তানে শিক্ষা ব্যবস্থায় ভীষণ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হইয়াছে। চট্টগ্রাম, ঢাকা, রংপুর প্রভৃতি জেলায় বিদ্যালয়ে সরকারী দপ্তর স্থাপন করিবার চেষ্টা করিয়াছিল কিন্তু সংঘবদ্ধ ছাত্র আন্দোলন দ্বারাই সরকারী প্রচেষ্টা ব্যর্থ হইয়াছে। পাকিস্তান লাভের আগে রাজশাহী জেলায় প্রাইমারী স্কুল ছিল ১২০০ শত, বৰ্ত্তমান সরকার তাহাকে ৮০০ শতে নামাইবার ব্যবস্থা করিয়াছেন। প্রাইমারী শিক্ষকগণের মাহিনা প্রয়োজনের তুলনায় অকিঞ্চিঃৎকর কিন্তু তাহাও নিয়মিত পাইতেছে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নূতন সিলেবাস অনুযায়ী নূতন পুস্তক এখনও পর্যন্ত যথেষ্ট পরিমাণে বাজারে বাহির না হওয়ার জন্য ছাত্রদের পড়াশুনা ভয়ানক ক্ষতি হইতেছে এবং বিভিন্ন সাময়িক পরীক্ষাগুলি বন্ধ রহিয়াছে। ছাত্রদের নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য খাতা, পেন্সিল, কাপড়, কেরোসিন প্রভৃতির অভাবে ছাত্র জীবন বিপন্ন কিন্তু সরকারের তরফ হইতে কোন প্রকার সাহায্য তো করা হয় নাই বরং যাহারা নিত্য প্রয়োজনীয় দাবী লইয়া আন্দোলন করিতেছে তাহাদের উপর সরকারী দমননীতি নগ্নরূপে প্রকাশ পাইতেছে। আজ শিক্ষা জীবনে যে সংকট দেখা দিয়াছে তাহা রোধ করিবার জন্য অবিলম্বে নিম্নলিখিত ব্যবস্থাগুলি কার্যকরী করিবার জন্য এই সম্মেলন সরকারের নিকট দাবী জানাইতেছে; এবং এই সমস্ত দাবী সরকার যাহাতে কার্যকরী করেন তাহার জন্য ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়িয়া তুলিবার জন্য ছাত্রসমাজকে আহবান জানান যাইতেছেঃ (১) কোন প্রাথমিক, মাধ্যমিক বা হাই স্কুল তুলিয়া দেওয়া চলিবে না। (২) শিক্ষকগণকে মানুষের মত বাঁচিবার উপযোগী বেতন দিতে হইবে। (৩) বাংলা ভাষাকে শিক্ষার মাধ্যমরূপে চালু করিতে হইবে। (৪) বাধ্যতামূলক অবৈতনিক শিক্ষা ব্যবস্থার প্রবৰ্ত্তন করিতে হইবে। (৫) ছাত্রদের নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস খাতা, পেন্সিল, বই, কেরোসিন ইত্যাদি নিয়মিত সরবরাহের ব্যবস্থা করিতে হইবে। (৬) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং অন্যান্য কলেজে বিভিন্ন বিভাগে শিক্ষকের যে সমস্ত পদ খালি রহিয়াছে তাহার পূরণ করিতে হইবে। (৭) শিক্ষালয়ে পূর্ণ গণতান্ত্রিক উপায়ে ইউনিয়ন চালু করিতে হইবে। ৮। জনস্বাস্থ্যের প্রতি সরকারী উদাসীনতার প্রতিকার চাই পূর্বপাকিস্তানে জনস্বাস্থ্য বিপন্ন হইয়াছে। জনসংখ্যার তুলনায় ডাক্তারের সংখ্যা নগণ্য। ঔষধপত্র বাজারে দুষ্প্রাপ্য হইয়া দাঁড়াইয়াছে। যাহাও আসিতেছে অগ্নিমূল্যের জন্য জনসাধারণের আয়ত্তের বাহিরে। ঔষধপত্র

<001.033.108>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ প্রথম খন্ড

 

আমদানীর কোন ব্যবস্থা হইতেছে না। ডাক্তারী শিক্ষার জন্য মেডিক্যাল স্কুল-কলেজ শিক্ষার্থীদের তুলনায় একেবারেই নগণ্য। স্বাধীন পাকিস্তানে জনস্বাস্থ্যের উন্নতির জন্য নূতন ব্যবস্থা হওয়া দূরের কথা যেটুকু ব্যবস্থা আছে সরকারের অবহেলায় তাহাও বিপন্ন হইয়া পড়িয়াছে। সরকারী হাসপাতালগুলিতে ঔষধ নাই, দুনীতিতে পূর্ণ। পল্লীর জনস্বাস্থ্য রক্ষার যেটুকু ব্যবস্থা ছিল তাহাও জনস্বাস্থ্য কৰ্ম্মচারীদের ছাঁটাই করিয়া ধ্বংস করিবার পরিকল্পনা চলিতেছে। এই সম্মেলন সরকারের জনস্বাস্থ্যবিরোধী মনোভাবের তীব্র নিন্দা করিতেছে এবং অবিলম্বে জনস্বাস্থ্যের উন্নতির জন্য নিম্নলিখিত ব্যবস্থাগুলি কার্যকরী করিবার দাবী জানাইতেছে এবং এই ব্যবস্থাগুলি যাহাতে সরকার কার্যকরী করেন তার জন্য আন্দোলন গড়িয়া তুলিতে এই সম্মেলন জনসাধারণ এবং যুবসমাজকে আহবান জানাইতেছেঃ (১) হাসপাতালগুলিতে ঔষধ সরবরাহ করিয়া সক্রিয় ও দুনীতিমুক্ত করিতে হইবে। (২) প্রতি ইউনিয়নে হাসপাতাল খুলিয়া বিনামূল্যে চিকিৎসার ব্যবস্থা করিতে হইবে। এ, জি, হাসপাতালগুলিকে পুনজীবিত করিতে হইবে। (৩) মেডিক্যাল স্কুল-কলেজের সংখ্যা বৃদ্ধি করিতে হইবে। (৪) জনস্বাস্থ্য বিভাগকে রাষ্ট্ৰীয়করণ করিতে হইবে এবং ডিষ্ট্রিক্ট বোর্ড হেলথ এ্যাসিসটেন্টদের চাকুরী স্থায়ী করিতে হইবে। সাংগঠনিক প্রস্তাবাবলী উপরোক্ত প্রস্তাবগুলি ছাড়া সম্মেলনে নিম্নলিখিত বিষয়ে চারিটি সাংগঠনিক প্রস্তাব গৃহীত হইয়াছেঃ • রাজশাহী বিভাগীয় আঞ্চলিক কমিটি গঠন। রাজশাহী শহরে আঞ্চলিক অফিস স্থাপন। আঞ্চলিক কমিটির পক্ষ হইতে যুব অভিযান’ নামে পাক্ষিক প্রচারপত্র প্রকাশ। প্রাদেশিক যুবলীগ সম্মেলন আহবানের জন্য প্রাদেশিক কমিটিকে অনুরোধ। যুব অভিযান গণতান্ত্রিক যুবলীগের রাজশাহী বিভাগীয় আঞ্চলিক কমিটির তরফ হইতে যুব অভিযান’ নামে একখানা পাক্ষিক প্রচারপত্র বাহির করিবার সিদ্ধান্ত লওয়া হইয়াছে। এই প্রচার পত্রিকার জন্য প্রচুর অর্থের প্রয়োজন। রাজশাহী বিভাগের প্রত্যেক জেলা, মহকুমা এবং প্রাথমিক যুবলীগ কমিটিগুলিকে অর্থ সংগ্ৰহ করিয়া পাঠাইবার জন্য আবেদন করা যাইতেছে। কেহ সরাসরি সাহায্য পাঠাইলেও সাদরে গৃহীত হইবে। যুব আন্দোলনকে বেগবান করিতে হইলে প্রচারপত্রের প্রয়োজনীয়তা কতখানি তাহা বলা বাহুল্য। বিভিন্ন যুবলীগ কমিটি কতখানি “যুব অভিযান লইতে চান তাহা অবিলম্বে জানাইবেন। যেখানে যুবলীগ গঠিত হয় নাই সেখানকার কোন যুবকর্মী ব্যক্তিগতভাবে “যুব অভিযান লইতে ইচ্ছুক থাকিলে বিভাগীয় অর্থ পাঠাইবার ঠিকানাঃ মাহবুব আহম্মদ খান (কোষাধ্যক্ষ), পোঃ ঈশ্বরদী, পাবনা।

 

১৯৪৭ সনে পূর্ব পাকিস্তান গণতান্ত্রিক যুবলীগ প্রতিষ্ঠিত হয়। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর পরই ঢাকা রাজশাহী ও ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন জেলায় এর শাখা খোলা হয়, কিন্তু তীব্র পুলিশী নির্যাতন ও ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের গুন্ডাদের অত্যাচারের ফলে ১৯৪৮ সালের শেষ দিকে এই সংগঠনের বিলুপ্তি ঘটে।

<001.034.109>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ প্রথম খন্ড

 

শিরনামঃ পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সম্মেলনে ভাষার স্বাধীনতার পক্ষে ডঃ শহীদুল্লাহ

সুত্রঃ “শহীদুল্লাহ সম্বর্ধনা গ্রন্থ এবং বদরুদ্দীন উমরের পূর্ব বাংলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি’

তারিখঃ ডিসেম্বর, ১৯৪৮

পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সম্মেলন ঢাকা অধিবেশনে মূল সভাপতির অভিভাষণ ৩১-১২-১৯৪৮ইং সমবেত সাহিত্যিক ও সাহিত্যরসিক বন্ধুগণ, দয়াময় খোদাতায়ালার অসংখ্য ধন্যবাদ, আমরা আজ এক স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রাদেশিক রাজধানীর বুকে মুক্ত আকাশের নীচে মুক্ত-মানুষরূপে সমবেত হতে সক্ষম হয়েছি। জাহাঙ্গীর, শায়েস্তা খান ও ইসলাম খান পূর্ববঙ্গের এলাকাধীন রাজধানী সোনারগাঁও ন্যায়বান বাদশাহ গিয়াসুদ্দীন আযম শাহের পুণ্য স্মৃতি আজও বুকে ধরে আছে। স্মৃতি আমাদের নিয়ে যায় ঢাকার অদূরবর্তী বিক্রমপুরে সেন রাজাদের শেষ রাজধানীতে, যেখানে একদিন লক্ষণ সেন, কেশব সেন ও মধু সেন রাজত্ব করেছিলেন। দূর স্মৃতি আমাদের টেনে নিয়ে চলে বিক্রমপুরের সন্নিকট রাজা রামপালের স্মৃতিচিহ্ন রামপালে এবং বৌদ্ধ মহাপন্ডিত শীলভদ্র, কমলশীল ও দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান অতীশের স্মরণপূত অধুনা-বিস্মৃত জন্মভূমিতে। এই অঞ্চল যেমন বৌদ্ধ, হিন্দু ও মুসলমানের স্মারকলিপি হয়ে আছে, প্রার্থনা করি তেমনই এ যেন নূতন রাষ্ট্রের জাতি বর্ণ ধৰ্ম্ম নিবির্বশেষে সকল নাগরিকের মিলনভূমি হয়। আমীন। পূর্ব বাংলার বিশেষ গৌরব এই যে, এই প্রদেশের প্রাচীন নাম বাঙ্গাল থেকে সমস্ত দেশের নাম হয়েছে বাঙ্গালা বা বাংলা। এই বঙ্গাল নাম পাই আমরা রাজেন্দ্র চোড়ের তিমরুলৈ লিপিতে (১০২৩ খ্রীঃ অব্দে)। বৌদ্ধযুগের কবি ভুসুকু একটি চর্য্যাগীতিতে বলেছেন “বাজ-শাব পাড়ী পউঅী খালে বাহিউ। অদ্বয় বঙ্গাল দেশ লুড়িউ”। -বজ্রযানরূপ নৌকায় পাড়ি দিয়ে পদার খালে বাইলাম। অদ্বয়-রূপ বঙ্গাল দেশ লুট করলাম। -এতে বুঝতে পারি যে পদ্মা নদীর পারেই হ’ল বঙ্গাল দেশ। “বাঙাল” আমাদের নিন্দার কথা নয়, এই দেশবাসীর প্রাচীন নাম। শীরাযের অমর কবি হাফিয সোনারগাঁওয়ের সুলতান গিয়াসউদ্দিন আযম শাহকে যে গযল কবিতা উপহার পাঠিয়েছিলেন, তাতে বলেছেন “শক্কর-শিকন শওন্দ হমা তৃতীয়ানে হিন্দ। যে কন্দে পারসী কে ব-বঙ্গালা মী রওদ।” -ভারতের তোতা হবে চিনি খেকো সকলি। পারসীর মিছর এই যে বাঙ্গালায় চলিছে। কেবল হাফিয নন, মিথিলার বিদ্যাপতিও বাংলার এই সুলতানকে প্রশংসা করেছেন- “মহলম যুগপতি চিরজীব জীবথু গ্যাসদীন সুরতান’।

<001.034.110>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ প্রথম খন্ড

 

মালব, কর্ণাট প্রভৃতি দেশের নামের ন্যায় এই বঙ্গাল দেশও সঙ্গীত শাস্ত্রের এক বিশেষ রাগের নামকরণ করেছে। ভুসুক একটি চর্য্যাগীতি এই বঙ্গাল রাগে রচনা করেছেন। পূর্ববঙ্গের শ্রেষ্ঠ গৌরব এই যে, এই দেশ থেকেই বাংলা সাহিত্য এবং নাথপন্থের উৎপত্তি হয়েছে। মৎস্যেন্দ্রনাথ যেমন বাংলার আদিম লেখক, তেমনি তিনি নাথপন্থের প্রবর্তক। তাঁর নিবাস ছিল ক্ষীরোদ সাগরের তীরে চন্দ্রদ্বীপে, বৰ্ত্তমানে সম্ভবতঃ যাকে সনদ্বীপ বলে। ৬৫৭ খ্ৰীঃ অব্দে তিনি রাজা নরেন্দ্র দেবের রাজত্বকালে নেপালে উপস্থিত হন। তাঁর একটি কবিতা তাঁর পরদর্শন থেকে আশ্চর্যচর্য্যাচয়ের টীকায় উদ্ধৃত হয়েছে “কহস্তি গুরু, পরমার্থের বাট কৰ্ম্মক রঙ্গ সমাধিক পাট। কমল বিকসিল কহিহ ণ জমরা কমল মধু পিবিবি ধোকই ন ভমরা।” অর্থ-কহনে গুরু পরমার্থের বাট। কৰ্ম্মের রঙ্গ সমাধির পাট।। কমল বিকসিল কহিওনা জোংড়াকে (শাযুককে)। কমল মধু পান করিতে ভুল করে না ভোমরা। এর শেষ দুই পদের সঙ্গে তুলনা করুন “গুণিনি গুণজ্ঞো রমতে নাগুণশীলস্য গুণিনি পরিতোষঃ। অলিরেতি বনাৎ কমলং নহি ভেকেতৃেকবাসোহপি।” (হিতোপদেশ) মৎস্যেন্দ্রনাথের পদাঙ্ক অনুসরণ করে কানু পা, কুকুরীপা, ডোম্বী, সরহ, শবরী প্রভৃতি বহু সিদ্ধাচাৰ্য্য চর্য্যাগীতি বা পারমার্থিক গান রচনা করেন। তার কতকগুলি আমরা পেয়েছি। এই গানগুলির একটি বিশেষত্বপদের শেষে ভণিতা। যেমন ধরুন “সরহ গুণন্তি বর সূন গোহালী কি মো দুঠ বলদে একেলে জগা নাসিআ রে বিহরহু সুচ্ছন্দে।।” -সরহ ভণেণ বরং শূন্য গোয়াল, কি মোর দুষ্ট বলদে। একেলা জগৎ নাশিয়া রে আমি বিহার করি স্বচ্ছন্দে।। এই ভণিতার রীতি প্রাচীন বাংলা থেকে সংস্কৃতে যায়। যেমন জয়দেবের গীতগোবিন্দে। সমস্ত মহাজন পদাবলী চর্য্যাগীতির বৈঞ্চব সংস্করণ। নাথপন্থের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে চৰ্য্যাগীতির রীতি পঞ্জাব পৰ্য্যন্ত উত্তর ভারতের পারমার্থিক গানে চলতে তাকে। পঞ্জাব থেকে এই রীতি পারস্যে যায়। পারসী গজল আরবীর অনুকরণে নয়। তা চৰ্য্যাগীতিরই অনুকরণে। আরবীতে রুসাদী আছে গযল নেই। ত্রিপুরার মেহেরকুলের রাজা গোপীচন্দ্র গুরু জালন্ধরী পার নিকট নাথপন্থে দীক্ষিত হয়ে বৈরাগী হয়ে যান। নাথপন্থের সঙ্গে সঙ্গে এই আখ্যান ভারতময় বিভিন্ন ভাষার কবিতার উপজীব্য হয়ে ওঠে। সুদূর হিমালয়ের কাংড়া উপত্যকায় যে গোপীচাঁদের গান প্রচলিত আছে, আমি তার প্রথম চার চরণ উদ্ধৃতি করছি

 

<001.034.111>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ প্রথম খন্ড

 

“চনন চৌকী বো রূপী ঝাড়িয়াঙ রাজা গোপীচন্দ নহাএ। তা অম্বর ভোলা বো অঘণা চান্দী বর্ণা ঠভী বুন্দ কতেীও আএ। তা সজে বো বৈঠী মাতা নৈনবন্তী নৈন-ভর ভরী টোএ। তা ফির উপড়হুঙ হেরে রাজা গোপীচন্দ তা মাতা নৈনবন্তী রোএ।” -চন্দনের চৌকিতে রূপার ঘড়ায় রাজা গোপীচাঁদ করে। আকাশ পরিস্কার চাঁদীবর্ণ, ঠান্ডা বৃষ্টিবিন্দু কোথা থেকে আসে? বারান্দায় বসে মা ময়নামতী চোখ ভরে ভরে কাদে। তখন ফের উপর দিকে চেয়ে দেখে রাজা গোপীচাঁদ, মা ময়নামতী কাঁদে। এই পূর্বাঞ্চলের ভীম, দিব্বোক, ঈসা খান, চাঁদ রায়, কেদার রায় প্রভৃতি বীরেরা সাম্রাজ্যবাদী অত্যাচারী রাজশক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল। পূর্ববঙ্গের সাহসী সন্তানেরা শুধু আজ নয়, প্রাচীন কাল থেকে সমুদ্রযাত্রায় নির্ভীক। এরাই একদিন সুমাত্রা, জাভা, বালিদ্বীপ, কম্বোডিয়া এবং বর্ণিও পৰ্য্যন্ত সাগরে পাড়ি দিত। মহাকবি কালিদাস নৌ বিদ্যায় দক্ষ বঙ্গবাসীর উল্লেখ করেছেন। কবিকঙ্কণ প্রচীন ঐতিহ্য অনুসরণ করেই ধনপতি সদাগরের জাহাজের মাঝি-মাল্লাদিগকে পূৰ্ব্ববঙ্গবাসী বলে বর্ণনা করেছেন। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এবং পূৰ্ব্ব ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জের ধর্ম, সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে বাংলার ছাপ রয়েছে। বাংলার উপকথা এখনও সেখানে প্রচলিত আছে। বাংলার রক্ত যে তাদের রক্তের সঙ্গে মেশেনি, তা কে বলতে পারে? জাভার বরবুদুরের স্থাপত্য উত্তর বঙ্গের পাহাড়পুরের মঠের স্থাপত্যের অনুকরণে। প্রাচীন রাঢ়, বরেন্দ্র এবং বঙ্গ নিয়েই আমাদের বাঙ্গালা দেশ। রাঢ় ব্রাহ্মণ্য ধৰ্ম্মকে আঁকড়ে ছিল। সেখানে শূর বংশীয় রাজারা রাজত্ব করতেন। এই বংশের আদিশূর বাইরে থেকে ব্রাহ্মণ আমদানী করে হিন্দুত্বকে বাঁচিয়ে রাখেন। শুর বংশের পর সেন বংশ এই রাঢ় থেকেই রাজত্ব বিস্তার করেন। তাঁরাও গোঁড়া হিন্দু ছিলেন। বল্লাল সেন কৌলীণ্য প্রথা চালিয়ে আদিশূরের ধারাকেই স্থায়ী করেন। তুর্কিদের বাংলা বিজয়ের সূত্রপাত রাঢ় থেকে হলেও এখানে ইসলাম তেমন বিজয়ী হতে পারিনি। বরেন্দ্র ও বঙ্গ মুসলিম আক্রমণের প্রাক্কালে বৌদ্ধ বা নাথপন্থী ছিল। তারা সনাতন পন্থীদের দ্বারা নিৰ্য্যাতিত হচ্ছিল। এমন সময়ে আসে তুর্কিদের হামলা। তারা এই বিদেশীদের রক্ষাকর্তা মনে ক’রে বোধ হয় সাহায্য করেছিল এবং পরে সাম্যবাদী ইসলাম ধর্মের শীতল ছায়ার আশ্রয় নিয়েছিল। তাই আজ পূর্ব পাকিস্তান হওয়া সম্ভবপর হয়েছে। নাথপন্থীদের একটি ছড়ায় এই যুগের অহিন্দু জনসাধারনের মনের ছাপ রয়েছে “জাজপুর পুরবাদি সোল সআ ঘর বেদি বেদি লয় কেবোল দুর্জন দখিন্যা মাগিতে জাঅ জার ঘরে নাহি পাঅ সাঁপ দিয়া পুড়ান ভুবন।। 米 翠 球 বেদ করে উচ্চারণ বের্যাঅ অগ্নি ঘনে ঘন দেখিয়া সভাই কম্পমান মনেত পাইআ মন্ম সভে বোলে রাখ ধৰ্ম্ম তোমা বিনে কে করে পরিত্তান

<001.034.112>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ প্রথম খন্ড

 

ধৰ্ম্ম হৈল্য জবনরুপি মাথাএত কাল টুপি হাথে সোভে ত্রিকচ কামান। চাপিআ উত্তম হয় ত্রিভূবনে লাগে ভয় খোদায় বলিয়া এক নাম।। নিরঞ্জন নিরাকার হৈলা ভেন্ত অবতার মুখেত বলে তদম্বদার। যতেক দেবতাগণ সভে হয়্যা একমন আনন্দেত পরিল ইজার। 来源 来源 来源 জতেক দেবতাগণ হয়্যা সবে একমন প্রবেশ করিল জাজপুর। পাখড়া পাখড় বোলে বোল। ই বড় বিষম গন্ডগোল।।” (শূন্য পুরাণ) পরবর্তীকালে কিছু কিছু হিন্দু ইসলাম গ্রহণ করলেও পূর্ব পাকিস্তানের অধিকাংশ মুসলমান যে বৌদ্ধ বংশজাত তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই। বাংলার বৌদ্ধ ও নাথ পন্থীদের প্রধান উপাস্য ছিল শূন্যমূৰ্ত্তি নিরঞ্জন। কানুপা তাঁর দোহায় বলেছেন “লোআহ গবব সমুঝবহই হউ পরমথে পবীন। কোড়িহ মঙেঝ এক্কজই হোই নিরংজন লীন।” অর্থাৎ- লোকগর্ব বয়ে বেড়ায় যে আমি পরমার্থে প্রবীণ। কোটির মধ্যে একজন যদি নিরঞ্জনে লীন হয়। প্রাচীন মুসলমান লেখকেরা কেহই ঈশ্বর বা ভগবান আল্লাহের প্রতিশব্দ রূপে ব্যবহার করেননি। কিন্তু তাঁরা নিরঞ্জন শব্দটি ব্যবহার করেছেন। এটি বৌদ্ধ উৎপত্তির একটি বলবৎ প্রমাণ। ইসলাম জাত পাত মানে না। মানুষ মাত্রেই আদমের সন্তান এবং সমান। কুরআনের বাণী “ইন্না আকরামাকুম ইন্দাল্লাহি আতকৃাকুম’নিশ্চয় তোমাদের মধ্যে যে সকলের চেয়ে বেশি ধাৰ্ম্মিক, সেই আল্লাহের নিকট সকলের চেয়ে বেশি সম্মানিত। কাজেই আমরা বংশ দেখি না, আমরা দেখি গুণ। বাংলার মুসলমান যদি গুণে শ্রেষ্ঠ হতে পারে, তবে আরব, পারস্য, তুকী, হিন্দুস্থান প্রভৃতি পৃথিবীর যে কোন মুসলমানের চেয়ে সে কেন নিকৃষ্ট হবে? কবি হাফিজ কেমন সুন্দর বলেছেন “তাজে শাহী তলবী গওহরে যাতী বু-নামা। ওয়ার খোদ আয় তুখমাএ চমশীদ ও ফরীর্দু বাশী।” অর্থাৎ- রাজার মুকুট চাও যদি নিজ গুণের প্রকাশ কর। হও ফরীদুন জমশীদের বা যদি বংশধরও।

<001.034.113>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ প্রথম খন্ড

 

স্বাধীন পূর্ব বাংলার স্বাধীন নাগরিকরূপে আজ আমাদের প্রয়োজন হয়েছে সর্বশাখায় সুসমৃদ্ধ এক সাহিত্য। এই সাহিত্যে আমরা আজাদ পাক-নাগরিক গঠনের উপযুক্ত প্রয়োজনীয় বিষয়ের অনুশীলন চাই। এই সাহিত্য হবে আমাদের মাতৃভাষা বাংলায়। পৃথিবীর কোন জাতি জাতীয় সাহিত্য ছেড়ে বিদেশী ভাষায় সাহিত্য রচনা করে যশস্বী হতে পারেনি। ইসলামের ইতিহাসের একেবারে গোড়ার দিকেই পারস্য আরব কর্তৃক বিজিত হয়েছিল, পারস্য আরবের ধৰ্ম্ম নিয়েছিল, আরবী সাহিত্যের চর্চা করেছিল। কিন্তু তাঁর নিজের সাহিত্য ছাড়েনি। তাই রুদাগী ফিরদৌসী, নিযামী, সাদী, হাফিয, উফি, খাকানী, বুআলী সীনা, গাযালী, খায়্যাম প্রমুখ কবি, ভাবুক সুফী ও দার্শনিক লেখকগণের রচনায় পারস্য সাহিত্য গৌরব-সমুজ্জ্বল। বাংলা সাহিত্যের চর্চা আমাদের মধ্যে আজ নূতন নয়। বাংলাদেশ যখন দিল্লীর অধীনতা-নিগড় থেকে মুক্ত হয়ে গৌড়ে এক স্বাধীন সুলতানত প্রতিষ্ঠা করে, তখন থেকেই বাংলা সাহিত্য সৃষ্টির দিকে রাজার মনোযোগ পড়ে। ইউসুফ শাহ হোসেন শাহ, নসরত শাহ, ফিরোয শাহ, নিযাম শাহশূর, ছুটী খাঁ, পরাগল খাঁ প্রভৃতি রাজা ও রাজপুরুষগণ বাংলা সাহিত্যের উৎসাহদাতা ছিলেন। হিন্দু কবিরা মুক্তকষ্ঠে তাদের যশ কীর্তন করে গেছেন। কৃত্তিবাসের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন এক গৌড়েশ্বর। তাঁর প্রশংসায় কবি বলেছেন “পঞ্চ গৌড় চাপিয়া গৌড়েশ্বর রাজা। গৌড়েশ্বর পূজা কৈলে গুণের হয় পূজা।” এই গৌড়েশ্বর খুব সম্ভবতঃ রাজা গণেশ নন; কিন্তু তাঁর পুত্র উত্তরাধিকারী জালালুদ্দীন মুহম্মদ শাহ। রাজা গণেশের রাজত্বকাল অল্প এবং অশান্তিপূর্ণ ছিল। আমরা তাঁকে সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকরূপে কোথাও দেখি না। অন্যপক্ষ জালালুদ্দীন মুহম্মদ শাহ দীর্ঘকাল শান্তিতে রাজত্ব করেন (১৪১৯-১৪৩১ খ্ৰীঃ)। তিনি ভরত মল্লিককে নানা উপহাসহ বৃহস্পতি ও রায়মুকুট এই দুই উপাধি দিয়েছিলন। কৃত্তিবাস স্বধৰ্ম্মত্যাগী বলে বোধ হয় এই গৌড়েশ্বরের নাম উল্লেখ করেননি। কবীন্দ্র পরমেশ্বর সুলতান আলীউদ্দীন হোসেন শাহের প্রশংসায় বলেছেন “কলিযুগ অবতার গুণের আধার পৃথিবী ভরিয়া যাঁর যশের বিস্তার। সুলতান আলাউদ্দিন প্ৰভু গৌড়েশ্বর এ তিন ভুবনে যাঁর যশের প্রসার।” শ্রীকর নন্দী নসরত শাহের প্রশংসায় বলেছেন “নসরত শাহ নামে তথি অধিরাজ রাম সম প্রজা পালে করে রাজ-কাজ।” কবি শেখর এই নসরত শাহের প্রশংসায় বলেছেন “কবি শেখর ভণ অপরূপ রূপ দেখি রায় নসরত শাহ ভজলি কমলমুখী”। (মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে মুসলমানের অবদান হিন্দু অপেক্ষা কম নয়।) পল্লীগীতিকায় মুসলমানের দান অতি মহৎ কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থসাহায্যে জ্যেষ্ঠ সহোদরকল্প। পরলোকগত দীনেশচন্দ্র সেনের আগ্রহে ও উৎসাহে যে গাথাগুলি সংগৃহীত হয়েছে, তা ছাড়া আরও বহু পল্লীকবিতা পূৰ্ব্ববঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে আছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং পূৰ্ব্ববঙ্গের সরকার কি এদিকে মনোযোগ দিবেন? এইে পল্লীকাব্য সম্বন্ধে দীনেশবাবু বলেছেন, “এই বিরাট সাহিত্যের সূচনা আমি যেদিন পাইয়াছিলাম, সেদিন আমার জীবনের এক স্মরণীয় দিন। আমি সেদিন দেশ-মাতৃকার মোহিনীমূৰ্ত্তি দেখিয়া মুগ্ধ হইয়াছিলাম, আমাদের বাংলা ভাষার শক্তি ও প্রসার দেখিয়া বিস্মিত হইয়াছিলাম এবং হিন্দু ও মুসলমানের যে যুগলরূপ দেখিয়াছিলাম

<001.034.114>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ প্রথম খন্ড

 

তাহাতে চক্ষু জুড়াইয়া গিয়াছিল।” এ পর্যন্ত কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ৪৫টি পল্লীগাথা প্রকাশ করেছেন। এর মধ্যে ২৩টি মুসলমান কবির রচিত। গত ব্রিটিশ যুগের ও বৰ্ত্তমানের সাহিত্য সাধনার কথা সকলের সুবিদিত। সুতরাং এখানে বলা নিম্প্রয়োজন। আমাদের প্রয়োজন আছে আদিকাল থেকে আধুনিককাল পর্যন্ত বাংলার মুসলমানের সাহিত্য সাধনার বিস্তৃত ইতিহাস লেখা এবং প্রাচীন মুসলিম লেখকদের গ্রন্থ প্রকাশ করা। আমাদের সাহিত্যিক বন্ধুরা কি এ দিকে অবহিত এবং অগ্রসর হবেন? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এবং সরকারের অবশ্য কৰ্ত্তব্য পূর্ববাংলার সকল স্থান থেকে পুঁথি, পল্লীগীতি, পল্লীকাব্য ও উপকথা সংগ্রহ করে রক্ষা করা। বিশ্ববিদ্যালয়ের পুথিবিভাগকে আর সমৃদ্ধ করতে হবে। মোটকথা আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে পূৰ্ব্ববঙ্গের জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়রূপে দেখতে চাই, সরকারী নওকরখানারূপে নয়। এখানে আমি অষ্টাদশ শতাব্দীর কবি “নুরনামার” লেখক নোয়াখালির সন্দ্বীপ নিবাসী আবদুল হাকিমের একটি কথা আমাদের দেশের একশ্রেণীর লোককে শুনিয়ে রাখছি “যে সবে বঙ্গেতে জনি হিংসে বঙ্গবাণী। সে সবার কিবা রীতি নির্ণয় না জানি।। মাতা পিতামহ ক্রমে বঙ্গেতে বসতি। দেশীভাষা উপদেশ মনে হিত অতি।। দেশীভাষা বিদ্যা যার মনে না জুরায়। নিজ দেশ তেয়াগি কেন বিদেশে না যায়। যেমন আমরা বাংলার হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খৃষ্টান এক মিশ্রিত জাতি, আমাদের ভাষা বাংলাও তেমনি এক মিশ্রিত ভাষা। বাংলার উৎপত্তি গৌড় অপভ্রংশ থেকে। সংস্কৃতের সঙ্গে তার সম্পর্কটা অতিদূরের। তবুও যেমন কেউ বড় মানুষের সঙ্গে একটা সম্পর্ক আবিস্কার বা উদ্ভাবন করেন আত্মগৌরবের জন্য, তা তিনি মেসো মশায়ের খুড়তুত বোনের মামাশ্বশুরের পিসতুত ভাই হোন না কেন, সেই রকমই আমরা বাংলার সঙ্গে সংস্কৃতের কুটুম্বিতা পাতাই। কথাটা কিছু অতিরঞ্জিত হ’ল বটে। বিশেষ করে সংস্কৃতের ঋণ বাংলা ভাষার আপাদমস্তক এমন ভারাক্রান্ত করেছে যে, সম্পর্কটা স্বীকার না করেই অনেকে পারেন না। ভাষাতত্ত্বামোদীদের জন্য একটা উদাহরণ দেই- “তোমরা ঐ গাছটা দেখ”। এর গৌড় অপভ্রংশ হবে “তুমহেলোআ ওহি গচ্ছং দেকখহ”; এর সংস্কৃত হচ্ছে “যুয়ং অমুং বৃক্ষং পশ্যত।” যুয়ং- তোমার, অমুং- ঐ, বৃক্ষং- গাছ, পশ্যত- দেখ, -বাংলার কোন শব্দই সংস্কৃত থেকে আসেনি। তবে বাংলার গোড়ায় যে আর্যভাষা, তা কেউ অস্বীকার করতে পারেন না। সেই আৰ্য্যভাষার সঙ্গে মিশেছে আদি যুগে কোল, মধ্যযুগে পারসী ও পারসীর ভিতর দিয়ে কিছু আরবী ও যৎসামান্য তুর্কি এবং পরবর্তী যুগে পর্তুগীজ আর ইংরেজি। দু’চারটা দ্রাবিড়, মোঙ্গলীয়, ফরাসী, ওলন্দাজ প্রভৃতি ভাষার শব্দও বাংলায় আছে। মিশ্রভাষা বলে আমাদের কিছু লজ্জা নেই। পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা চলতি ভাষা ইংরেজির প্রায় দশ আনা শব্দসমষ্টি বিদেশী। পশ্চিমবঙ্গের পরিভাষা-নিৰ্ম্মাণ-সমিতি খাঁটি সংস্কৃতভাষার পরিভাষা রচনা করেছেন। পাঠ্যপুস্তকে এরূপ খাঁটি আর্যভাষা চলতে পারে; কিন্তু ভাষায় চলে না। বহুদিন পূৰ্ব্বে রেলওয়ের স্থানে লৌহবর্ত, টেলিগ্রাফের স্থানে তাড়িতবাৰ্ত্তাবহ প্রভৃতি সংস্কৃত প্রতিশব্দ সৃষ্টি করা হয়েছিল; কিন্তু সেগুলি পোরাণিক বিশ্বামিত্রের সৃষ্টির মতই অচল হয়ে গেছে। আমাদের মনে রাখতে হবে ভাষার ক্ষেত্রে গোঁড়ামি বা ছুমার্গের কোনও স্থান নেই। ঘৃণা ঘৃণাকে জন্ম দেয়। গোড়ামি গোড়ামিকে জন্ম দেয়। এক দল যেমন বাংলাকে সংস্কৃত-ঘেষা করতে চেয়েছে, তেমনি আর একদল বাংলাকে আরবী-পারসী ঘেষা করতে উদ্যত হয়েছে। এক দল চাচ্ছে খাঁটি বাংলাকে ‘বলি দিতে, আর এক দল চাচ্ছে ‘জবে করতে। একদিকে কামারের খাঁড়া, আর একদিকে কসাইয়ের ছুরি।

<001.034.115>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ প্রথম খন্ড

 

নদীর গতিপথ যেমন নির্দেশ করে দেওয়া যায় না, ভাষারও তেমনি। একমাত্র কালই ভাষার গতি নির্দিষ্ট করে। ভাষার রীতি (Style) ও গতি কোন নির্দিষ্ট ধরাবাঁধা নিয়মের অধীন হতে পারে না। ফরাসী ভাষার বলে Le style c’est I homme- ETTā ĪfĒ GŪT IERI- অর্থাৎ মানুষে মানুষে যেমন তফাৎ, প্রত্যেক লোকের রচনাতেও তেমনি তফাৎ থাকা স্বাভাবিক। এই পার্থক্য নির্ভর করে লেখকের শিক্ষাদীক্ষা, বংশ এবং পরিবেষ্টনীর উপর। মোট কথা, ভাষা হওয়া চাই সহজ, সরল এবং ভাষার রীতি (Style) হওয়া চাই স্বতঃস্ফূৰ্ত্ত, সুন্দর ও মধুর। এ সাধনার ধন ঘসে-মেজে রূপ আর ধরে-বেঁধে পীরিত যেমন, নিয়ম বেঁধে ভাষার রীতি শেখানও তেমন। অবশ্য প্রয়োজনবোধে (খামখেয়ালিতে নয়) সংস্কৃত, আরবী, পারসী, ইংরেজি, জাৰ্ম্মান, রুশ যে কোন ভাষা থেকে আমাদের শব্দ ধার করতে হবে। কিন্তু আমাদের দুটি কথা স্মরণ রাখা উচিত- ভাষা ভাব প্রকাশের জন্য ভাব গোপনের জন্য নয়; আর সাহিত্যের প্রাণ সৌন্দর্য্য, গোঁড়ামি নয়। কিছু দিন থেকে বানান ও অক্ষর সমস্যা দেশে দেখা দিয়েছে। সংস্কারমুক্তভাবে এগুলির আলোচনা করা উচিত এবং তার জন্য বিশেষজ্ঞদের নিয়ে পরামর্শ সমিতি গঠন করা আবশ্যক। যাঁরা পালী, প্রকৃত ও ধ্বনিত্ত্বর সংবাদ রাখেন, তাঁরা স্বীকার করতে বাধ্য যে, বাংলা বানান অনেকটা অবৈজ্ঞানিক, সুতরাং তার সংস্কার দরকার। স্বাধীন পূর্ববাংলায় কেউ আরবী হরফে, কেউ বা রোমান অক্ষরে বাংলা লিখতে উপদেশ দিচ্ছেন। কিন্তু বাংলার শতকরা ৮৫ জন যে নিরক্ষর, তাদের মধ্যে অক্ষরজ্ঞান বিস্তারের জন্য কি চেষ্টা হচ্ছে? যদি পূর্ববাংলার বাইরে বাংলা দেশ না থাকত আর যদি গোটা বাংলা দেশে মুসলমান ভিন্ন অন্য সম্প্রদায় না থাকত, তবে এই অক্ষরের প্রশ্নটা এত সঙ্গীন হত না। আমাদের বাংলাভাষী প্রতিবেশী রাষ্ট্র ও সম্প্রদায়ের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে হবে। কাজেই বাংলা অক্ষর ছাড়তে পারা যায় না। পাকিস্তান রাষ্ট্র ও মুসলিম জগতের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার প্রয়োজনীয়তা আমরা স্বীকার করি। তার উপায় আরবী হরফ নয়; তার উপায় আরবী ভাষা। আরবী হরফে বাংলা লিখলে বাংলার বিরাট সাহিত্য ভান্ডার থেকে আমাদিগকে বঞ্চিত হতে হবে। অধিকন্ত আরবীতে এতগুলি নূতন অক্ষর ও স্বরচিহ্ন যোগ করতে হবে যে বাংলার বাইরে তা যে কেউ অনায়াসে পড়তে পারবে, তা বোধ হয় না। ফলে যেমন উর্দু ভাষা না জানলে কেউ উর্দু পড়তে পারে না, তেমনই হবে বাংলা। বিদেশীর জন্য অক্ষর জ্ঞানের পূর্বে ভাষাজ্ঞান- এমন অদ্ভুত কল্পনা এ বৈজ্ঞানিক যুগে খাটে না। মীম-য়ানুন এই বানান মে, মায়, মিয়ন, মুয়িন, মুয়ন, মীন, মেন, মুয়ন এই রকম বহুরূপেই পড়া যেতে পারে। যদি কোন বৈজ্ঞানিক অক্ষর নিতে হয়, তবে International Phonetic Script ব্যবহার করতে হয়। অক্ষর সম্বন্ধে বিবেচনা করতে হলে ছাপাখানা, টাইপ-রাইটার, শর্টহ্যান্ড এবং টেলিগ্রাফের সুবিধা ও অসুবিধার কথা মনে করতে হবে। বিশেষ করে আজ যখন বাংলাকে প্রাদেশিক রাষ্ট্র ভাষারূপে গ্রহণ করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতে পাকিস্তান ও ভারত রাষ্ট্রের অন্যতম রাষ্ট্রভাষারূপে গ্রহণেরও সম্ভাবনা রয়েছে, তখন বাংলা ভাষায় রাজনৈতিক সম্ভাবনা ও উপযোগিতার কথা চিন্তা করারও প্রয়োজন রয়েছে। জনগণের মধ্যে শিক্ষা ও জ্ঞান বিস্তারের জন্য Basic English-এর মত এক সোজা বাংলার বিষয় আমাদের বিবেচনা করা কৰ্ত্তব্য। যদি ৮৫০টি ইংরেজী কথায় সমস্ত প্রয়োজনীয় ভাব প্রকাশ করতে পারা যায়, তবে বাংলায় তা কেন সম্ভব নয়? আমরা পূর্ববাংলার সরকারকে ধন্যবাদ দেই যে তাঁরা বাংলাকে পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক রাষ্ট্রভাষারূপে গ্রহণ করে বাংলা ভাষার দাবীকে আংশিকরুপে স্বীকার করেছেন। কিন্তু সরকারের ও জনসাধারণের এক বিপুল কৰ্ত্তব্য সম্মুখে রয়েছে। পূর্ববাংলা জনসংখ্যায় গ্রেটব্রিটেন, ফ্রান্স, ইটালি, স্পেন, পর্তুগাল, আরব, পারস্য, তুর্কি, প্রভৃতি দেশের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। এই সোনার বাংলাকে কেবল জানে নয়, ধনে-ধান্যে, জ্ঞানে-গুণে, শিল্প-বিজ্ঞানে পৃথিবীর যে কোন সভ্য দেশের সমকক্ষ করতে হবে। তাই কেবল কাব্য ও উপন্যাসের ক্ষেত্রে বাংলাকে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। দর্শন, ইতিহাস, ভূগোল, গণিত, রসায়ন, পদার্থবিদ্যা, ভূতত্ত্ব, জীবতত্ত্ব, ভাষাতত্ত্ব, অর্থনীতি, মনোবিজ্ঞান, প্রত্নতত্ত্ব, প্রভৃতি জ্ঞান-বিজ্ঞানের সকল বিভাগে বাংলাকে উচ্চ আসন নিতে ও দিতে হবে। তার জন্য শিক্ষার মাধ্যমে স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়ে আগাগোড়া বাংলা করতে হবে।

<001.034.116>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ প্রথম খন্ড

বিট্রিশ আমলে অনুমোদিত ওল্ড স্কীম, নিউ স্কীম ও সাধারণ- এই তিন বিভিন্ন ধারার শিক্ষা-পদ্ধতিকে একই সাধারণ ভিত্তির উপর দাঁড় করাতে হবে। ধৰ্ম্মে যেমন আমরা একত্ববাদী, শিক্ষায়ও আমাদিগে একত্ববাদী হতে হবে। এজন্য নানা বিষয়ে অভিজ্ঞ শিক্ষাবিদদের নিয়ে একটি পরামর্শ সভার আশু প্রয়োজন হয়েছে। আযাদ পাকিস্তানে আমাদের অবিলম্বে শিক্ষা-তালিকার সংস্কার করতে হবে। এই নূতন তালিকায় রাষ্ট্র-ভাষা উর্দুকে স্থান দিতে হবে। যারা এতদিন রাজ-ভাষারূপে ইংরেজির চর্চা করেছে, তাদের উর্দু শিখতে কি আপত্তি থাকতে পারে? দেশে গণশিক্ষা, স্ত্রীশিক্ষা ও বয়স্কদের শিক্ষার বিস্তার করতে হবে। প্রাথমিক শিক্ষা, ধৰ্ম্ম ও নীতি শিক্ষা এবং সামরিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করতে হবে। আমাদিগে একটি একাডেমী (পরিষদ) গড়তে হবে, যার কর্তব্য হবে পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষা থেকে জ্ঞানবিজ্ঞান ও সাহিত্য বিষয়ে শ্রেষ্ঠ গ্রন্থাবলীর অনুবাদ বাংলায় প্রকাশ। এজন্য একটি পরিভাষা-সমিতির প্রয়োজন আছে। বিশেষ করে আরবী, পারসী এবং উর্দু ভাষা থেকে ইসলাম, ধৰ্ম্ম ও সংস্কৃতি সম্বন্ধে বইগুলির অনুবাদ একান্ত প্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছে। মুখে পাকিস্তান জিন্দাবাজ’ বলেই পাকিস্তান জীবিত থাকবে না; তাকে ধৰ্ম্মে ও জ্ঞানে, চরিত্রে ও দৈহিক শক্তিতে উন্নত করে কৃষি ও শিল্পে, বাণিজ্যে ও রণকৌশলে, সাহিত্যে ও কলায় মহিমাম্বিত ও গৌরবাম্বিত করতে হবে। যে দিন সে দিন হবে, সে দিন আমরা দ্বিধামুক্ত অযুত কষ্ঠে বলতে পারব পাকিস্তান জিন্দাবাদ

  • আমরা হিন্দু বা মুসলমান সত্য, তার চেয়ে বেশী সত্য আমরা বাঙ্গালী। এটি কোন আদর্শের কথা নয়, এটি একটি বাস্তব কথা। মা প্রকৃতি নিজের হাতে আমাদের চেহারায় ও ভাষায় বাঙ্গালীত্বের এমন ছাপ মেরে দিয়েছেন যে, মালা-তিলক-টিকিতে কিংবা টুপি-লুঙ্গী-দাড়িতে ঢাকবার জো-টি নেই।
    • ভাষনের শেষ যে অংশটি (তারকা চিহ্নিত) গ্রন্থে প্রকাশিত হয়নি তা এখানে বদরুদিন উমরের গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃত হলো।

—————-

 

 

<001.035.117>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ প্রথম খন্ড

শিরোনামঃ শামসুল হক কর্তৃক আত্তয়ামী মুসলিম লীগের প্রথম প্রস্তাবিত ম্যানিফেষ্টো

সুত্রঃ পূর্ব বাংলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি : বদরুদ্দীন উমর, পৃষ্ঠা-২৪১

তারিখঃ ২৪শে জুন, ১৯৪৯

শামসুল হকের প্রস্তাব ও আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রথম ম্যানিফেষ্টোঙ্ক পুর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগ কর্মী সম্মেলনে বিবেচনার জন্যে শামসুল হক ‘মূলদাবী নামে একটি ছাপা পুস্তিকাতে লিপিবদ্ধ তাঁর বক্তব্য পাঠ করেন। পুস্তিকাটির মুখবন্ধের প্রারম্ভে তিনি বলেনঃ ইং ১৯৮৯ সনের ২৩শে ও ২৪শে জুন তারিখে ঢাকায় অনুষ্ঠিত “পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগ কর্মী সম্মেলন” মনে করে যে, সর্বকালের, সর্বযুগের সর্বদেশের যুগ প্রবর্তক ঘটনাবলীর ন্যায় লাহোর প্রস্তাবও একটি নূতন ইতিহাসের সৃষ্টি করিয়াছে। বিরুদ্ধ পরিবেশে মানবের দেহ, মন ও মস্তিস্কের উন্নতি ও পূর্ণ বিকাশ সম্ভব নয়। মানুষ পরিবেশের দাস এ কথা আধুনিক বৈজ্ঞানিকগণও স্বীকার করেন। বিরুদ্ধ পরিবেশে পূর্ণ ইসলামিক মনোভাব এবং সমাজ বিধান গড়িয়া তোলা সম্ভব নয়। ভারতের মুসলমানগণ বহু শতাব্দীর সঞ্চিত অভিজ্ঞতা হইতে এই মহা সত্য উপলব্ধি করিয়াই বিরুদ্ধ পরিবেশে বা দারুল হরবের পরিবর্তে ইসলামিক পরিবেশ বা দারুল ইসলাম কায়েম করার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হইয়াছিল। কিন্তু পাকিস্তান ইসলামিক রাষ্ট্র হইলেও শুধু মুসলমানের রাষ্ট্র বা শুধু মুসলমানের জন্য প্রতিষ্ঠিত করিবার এবং পাশ্চাত্য সভ্যতা ও শিক্ষা প্রভাবাম্বিত ইসলামবিরোধী সাম্রাজ্যবাদী, ধনতান্ত্রিক ও আত্মকেন্দ্রিক পরিবেশ গড়িয়া তুলিবার ইচ্ছা তাহদের ছিল না। রব বা স্রষ্টা হিসেবেই সৃষ্টির বিশেষ করিয়া সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব মানুষের সাথে আল্লাহ সবচাইতে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বস্তুতঃ রব বা স্রষ্টা, পালন বা পোষণকর্তা হিসাবে, বিশ্ব ও সৃষ্টিকে ধাপের পর ধাপ, স্তরের পর স্তর, পরিবর্তনের পর পরিবর্তনের ভিতর দিয়া কতকগুলি স্থায়ী ও সাধারণ ক্রমবিকাশ ক্রমোন্নতির নিয়মানুসারে এক অবস্থা হইতে অপর অবস্থার ভিতর দিয়া ধীরে ধীরে কিন্তু সুনিশ্চিতরূপে চরম সুখ, শান্তি ও পূর্ণতা প্রাপ্তির দিকে আগাইয়া নিবেন। ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গিতে আল্লাহ শুধু মুসলমানের নয়- জাতি, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে সমগ্র মানবের। রবই আল্লাহ সত্যিকার পরিচয়। রব হিসাবে রবুবিয়াৎ বা বিশ্ব-পালনই তাঁর প্রথম ও প্রধান কাজ। সুতরাং দুনিয়ার উপর আল্লাহর খলিফা বা প্রতিভূ হিসাবে মানব এবং খেলাফৎ হিসাবে রাষ্ট্রের প্রথম এবং প্রধান কাজ ও কর্তব্য হইল আল্লাহর উপায় ও পদ্ধতি অনুসারে বিশ্বের পালন করা এবং জাতি, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের সামগ্রিক সুখ, শান্তি, উন্নতি, কল্যাণ ও পূর্ণ বিকাশের জন্য চেষ্টা, সাধনা ও সংগ্রাম করা। মুসলিম লীগ সম্পর্কে শামসুল হক পুস্তিকাটিতে বলেনঃ নিখিল ভারত মুসলিম লীগ কখনও দল বিশেষের প্রতিষ্ঠান ছিল না; ইহা ছিল ভারত উপমহাদেশের মুসলিম জনগণের জাতীয় প্ল্যাটফর্ম বা মঞ্চ। ইহার উদ্দেশ্য পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর, পাকিস্তানের মূল নীতিগুলিকে কার্যকরী করিয়া তুলিতে হইলে প্রয়োজন নতুন চিন্তাধারা, নতুন নেতৃত্ব এবং নতুন সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নীতি ও কর্মসূচী এবং মুসলিম লীগকে মুসলিম জনগণের সত্যিকার জাতীয় প্ল্যাটফর্ম বা মঞ্চ হিসাবে গড়িয়া তোলার।…

  • ১৯৪৮ সালের ২৩শে জুন আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়। এই সংগঠনের প্রথম সভাপতি মওলানা ভাসানী, সম্পাদক শামসুল হক এবং যুগ্ম সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান ও খোন্দকার মোশতাক আহমেদ।

 

<001.035.118>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ প্রথম খন্ড

 

কিন্তু দুঃখের বিষয় বর্তমান পকেট লীগ নেতৃবৃন্দ উপরোক্ত কর্মপন্থা অনুসরণ না করিয়া তাঁদের নিজেদের কায়েমী স্বার্থ এবং প্রতিক্রিয়াশীল নেতৃত্ব বজায় রাখার জন্য লীগের মর্যাদা ও জনপ্রিয়তা ভাঙ্গাইয়া চলিয়াছেন। এই উদ্দেশ্যেই তাহারা মুসলিম লীগকে দলবিশেষের প্রতিষ্ঠান করিয়া ফেলিয়াছেন। শুধু তাহাই নয়, মানবের প্রতি আশীর্বাদস্বরূপ ইসলামকেও ব্যক্তি, দল ও শ্রেণীবিশেষের স্বার্থসিদ্ধির জন্য অন্যায় এবং অসাধুভাবে কাজে লাগান হইতেছে। কোনও পাকিস্তান প্রেমিক এমন কি মুসলিম লীগের ঝানু কমিগণ পর্যন্ত নীতি ও কর্মসূচী সম্পর্কে কোনরূপ প্রশ্ন উত্থাপন করিতে অথবা প্রস্তাব করিতে পারে না। কেহ যদি এইরূপ করিবার চেষ্টা করে তাহা হইলে তাহাদিগকে পাকিস্তানের শক্র বলিয়া আখ্যায়িত করা হয়। পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগ কর্মী সম্মেলন মনে করে যে, মুসলিম লীগকে এইসব স্বার্থান্বেষী মুষ্টিমেয় লোকদের পকেট হইতে বাহির করিয়া সত্যিকার জনগণের মুসলিম লীগ হিসাবে গড়িয়া তুলিতে হইলে, মুসলিম লীগকে সত্যিকার শক্তিশালী মুসলিম লীগ বা মুসলিম জামাত বা মুসলিম জাতীয় প্ল্যাটফর্ম বা মঞ্চে পরিণত করিতে হইলে প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিমকে ইহার সদস্য শ্রেণীভুক্ত করিতে হইবে, অন্যথায় মুসলিম লীগকে পাশ্চাত্য সভ্যতা, গণতন্ত্র ও সাংগঠনিক নীতি প্রভাবান্বিত দলবিশেষের পার্টি বলিয়া ঘোষণা করিয়া অপরাপর সবাইকে সাধ্যমত দল গঠন করিবার সুযোগ-সুবিধা ও অধিকার দিতে হইবে। মুসলিম লীগের ভিতর প্রত্যেক ব্যক্তি, দল ও উপদলের স্বাধীন মতামত, আদেশ, নীতি ও কর্মসূচী ব্যক্ত এবং তার পিছনে সংঘবদ্ধ হইবার অধিকার দিতে হইবে। তদুপরি ছাত্র, যুবক, মহিলা, চাষী, ক্ষেতমজুর, মজদুর প্রভৃতি শ্রেণীসংঘ গড়িয়া তুলিবার স্বাধীনতা থাকিবে। ইসলামী রাষ্ট্রের রূপ সম্পর্কে তাতে বলা হয়ঃ ১। পাকিস্তান খেলাফৎ অথবা ইউনিয়ন অব পাকিস্তান রিপাবলিকস বৃটিশ কমনওয়েলথের বাহিরে একটি স্বাধীন সার্বভৌম ইসলামী রাষ্ট্র হইবে। ২। পাকিস্তানের ইউনিটগুলিকে আত্মনিয়ন্ত্রণের পূর্ণ অধিকার দিতে হইবে। ৩। রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব আল্লাহর প্রতিভূ হিসাবে জনগণের উপর ন্যস্ত থাকিবে। ৪। গঠনতন্ত্র হইবে নীতিতে ইসলামী, গণতান্ত্রিক ও আকারে রিপাবলিকান। কৃষি পুনর্গঠন প্রস্তাবে বলা হয়ঃ ১। জমিদারী প্রথা ও জমির উপর অন্যান্য কায়েমী স্বার্থ বিনা খেসারতে উচ্ছেদ করিতে হইবে। ২। সমস্ত কৰ্ষিত ও কৃষি উপযোগী আকৰ্ষিত জমি কৃষকদের মধ্যে বন্টন করিয়া দিতে হইবে। ৩। তাড়াতাড়ি অর্ডিন্যান্স জারী করিয়া তেভাগা দাবী মানিয়া লইতে হইবে। ৪। রাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে অবিলম্বে সমবায় ও যৌথ কৃষি প্রথা প্রতিষ্ঠা করিতে হইবে।… ৫। নিম্নলিখিত বিষয়ে কৃষকদের অবিলম্বে সাহায্য করিতে হইবেঃ (ক) সেচ ব্যবস্থা সুবিধা ও সার প্রস্তুতের পরিকল্পনা। (খ) উন্নত ধরনের বীজ ও বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি। (গ) সহজ ঋণদান ও কৃষিঋণ হইতে মুক্তি। (ঘ) ভূমি-করের উচ্ছেদ না হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত ভূমিকর শতকরা পঞ্চাশ ভাগ কমানো। (ঙ) ভূমি-করের পরিবর্তে কৃষি আয়কর বসানো। (চ) খাদ্যশস্য প্রভৃতি জাতীয় ফসলের সর্বনিম্ন ও সর্ব-উর্ধ্ব দর নির্ধারণ করিয়া দিতে হইবে এবং পাটের সর্বনিম্ন দর বাঁধিয়া দিতে হইবে।

<001.035.119>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ প্রথম খন্ড

 

(ছ) খাদ্যশস্যের ব্যবসা সরকারের হাতে একচেটিয়া থাকা উচিত। পাট ব্যবসা ও বুনানীর লাইসেন্স রহিত করিতে হইবে। (জ) সকল রকমের সমবায় সমিতিগুলিকে সাহায্য ও উৎসাহ দিতে হইবে। ৬। কালে সমস্ত ভূমিকে রাষ্ট্রের জাতীয় সম্পত্তিতে পরিণত করিতে হইবে এবং সরকারের অধিনায়কত্ব ও তত্ত্বাবধানে যৌথ ও সমবায় কৃষিপ্রথা খুলিতে হইবে। দেশীয় শিল্পকে নানা বিপদের হাত থেকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যে মূল দাবীতে নিম্নলিখিত কর্মসূচীর উল্লেখ করা হয়ঃ ১। প্রাথমিক শিল্পগুলিকে জাতীয় সম্পত্তিতে পরিণত করিতে হইবে যেমনঃ যুদ্ধ শিল্প, ব্যাঙ্ক, বীমা, যানবাহন, বিদ্যুৎ সরবরাহ, খনি, বন-জঙ্গল ইত্যাদি; এবং অন্যান্য ছোটখাটো শিল্পগুলিকে পরিকল্পনার ভিতর দিয়া সরাসরি রাষ্ট্রের তত্ত্ববধানে আনিতে হইবে। ২। পাট ও চা শিল্পকে জাতীয় সম্পত্তিতে পরিণত হইবে এবং পাট ও চা ব্যবসা সরকারের হাতে একচেটিয়া থাকিবে। ৩। কুটির শিল্পগুলিকে সুচিন্তিত পরিকল্পনার ভিতর দিয়া বিশেষভাবে সাহায্য ও উৎসাহ দান করিতে হইবে। ৪। বিল, হাওর ও নদীর উপর হইতে কায়েমী স্বার্থ তুলিয়া দিয়া সরকারের কর্তৃত্বাধীনে মৎস্যজীবীদের মাঝে যৌথ উপায়ে বন্টন করিয়া দিতে হবে এবং সুপরিকল্পিত পদ্ধতিতে বৈজ্ঞানিক উপায়ে মৎস্যের চাষ ও মৎস্য ব্যবসার পত্তন করিতে হইবে। ফিশারী বিভাগের দ্রুত উন্নয়ন করিয়া এই সমস্ত বিষয়ে শিক্ষা প্রসার করিতে হইবে ও উন্নত ধরনের গবেষণাগার খুলিতে হইবে। ৫। শিল্প ও ব্যবসায়ে ব্যক্তিগত একচেটিয়া অধিকার থাকিবে না। ৬। বৃটিশের নিকট হইতে স্টার্লিং পাওনা অবিলম্বে আদায় করিতে হইবে এবং তাহা দ্বারা যন্ত্রপাতি ক্রয় করিতে হইবে ও শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়িয়া তুলিতে হইবে। ৭। দেশের আভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ব্যবসাকে নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত করিবার ভার রাষ্ট্রকে গ্রহণ করিতে হইবে। ৮। সমস্ত বৃটিশ ও বৈদেশিক ব্যবসাকে জাতীয় সম্পত্তিতে পরিণত করিতে হইবে। ৯। শিল্পে বৈদেশিক মূলধন খাটানো বন্ধ করিতে হইবে। ১০। শিল্পে মুনাফা হার আইন করিয়া বাধিয়া দিতে হইবে। মানবতার চূড়ান্ত মুক্তি সংগ্রাম যাতে বিলম্বিত না হয়, সেজন্য জনতাকে তাহদের সমস্ত ব্যক্তিগত এবং দলগত বিভেদ বিসর্জন দিয়া এক কাতারে সমবেত হইতে মুসলিম লীগ কর্মী সম্মেলন আবেদন জানাইতেছে। সাম্রাজ্যবাদী সরীসৃপের ফোঁস-ফোঁস শব্দ আজ সমাজের আনাচে-কানাচে সর্বত্র শোনা যাইতেছে- সেই ফোঁসফোঁস শব্দই যেন এই যুগের সঙ্গীত। আমাদের কওমী প্রতিষ্ঠান এই সরীসৃপদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালাইয়া তাহাদের বিষদাঁত উৎপাটন করিতে বদ্ধপরিকর। হজরত আবু বকর সিদ্দিকী (রাঃ) বলিয়াছিলেন : “যদি আমি ঠিক থাকি, তবে আমাকে অনুসরণ কর, আর যদি আমি ভ্রান্ত হই, আমাকে সংশোধন কর।” সেই অমর আদর্শকেই সামনে ধরিয়াই কওমী প্রতিষ্ঠান সমস্ত দেশবাসীকে সমতালে আগাইয়া আসিতে আহবান জানাইতেছে আসুন আমরা কোটি কোটি নর-নারীর সমবেত চেষ্টায় গণ-আজাদ হাসিল করিয়া সোনার পূর্ব পাকিস্তানকে সুখী, সমৃদ্ধ ও গণতান্ত্রিক ভিত্তিতে গড়িয়া তুলি।

<001.036.120>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ প্রথম খন্ড

 

খসড়া
পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের গঠনতন্ত্র ও নিয়মনীতি

নাম

এই সংগঠন “পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ” নামে অভিহিত হইবে এবং যথা সময়ে নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের সহিত সম্বন্ধযুক্ত করা হইবে।

আওয়ামী মুসলিম লীগ কেন গঠিত হয়েছিলো?
এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য

সর্বভারতীয় মুসলিম লীগ স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করে এবং এর প্রধান লক্ষ্যই ছিলো পাকিস্তানের স্বাধীনতা অর্জন। পাকিস্তান অর্জিত হওয়ার পর নেতাগণ এই সংগঠনটি বিলীন করে তার অস্তিত্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগের মধ্যে আনার সিদ্ধান্ত নেয়। শুরুর দিকে, পাকিস্তানের মুসলমানগণ এই সংগঠনকে সর্বভারতীয় মুসলিম লীগের উত্তরাধিকারী হিসেবে গ্রহণ করে যা পাকিস্তানের পক্ষে সংগ্রাম করেছিলো; কিন্তু কালক্রমে তাদের মোহ কাটতে লাগলো। এটা তাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে অঠে যে, পাকিস্তান মুসলিম লীগ পূর্বসূরিদের সব গোরবের উত্তরাধিকারী হওয়া সত্ত্বেও ততটা জনপ্রিয় হতে পারেনি। বরং একটি দলের প্রধান লক্ষ্যই ছিলো মন্ত্রণালয়ে ক্ষমতা বজায় রাখা। স্বাধীনতা সংগ্রামে যারা প্রকৃতপক্ষে সবকিছু হারিয়েছেন, তারাই সংগঠনে প্রবেশ করতে পারলোনা। সংগঠকদের এই চক্রান্তকে ধন্যবাদ দিতেই হয়, যখন বহুসংখ্যক পূর্বেকার ‘জাতীয়তাবাদী ‘, পাকিস্তানবিরোধী এবং সুযোগসন্ধানী, ক্ষমতালোভী মানুষজন রাতারাতি মুসলিম লীগের সদস্য হয়ে গেলো এবং একটিমাত্র গোষ্ঠী দ্বারা গঠিত হলো তথাকথিত ” মুসলিম লীগ”।

দেশের বহুল আলোচিত সমস্যা অসমাপ্তই থেকে গেলো এবং এই দীর্ঘ বছর মুসলিম লীগ জনগণের দুর্দশা লাঘবের জন্য কিছুই করেনি। পার্টি সম্পূর্ণভাবে সরকারের যন্ত্র হিসেবে প্রমাণিত হলো এবং কালক্রমে মুসলিম লীগ একটি সরকারি লীগে পরিণত হলো। বিরোধীদলের কণ্ঠ রোধ করা হয়েছিলো এবং যারা ন্যায়বিচার এবং বৈধ অধিকারের দাবি জানিয়েছিলো, সেসব সত্যিকার ও প্রকৃত নেতাদেরকে কারারুদ্ধ করার জন্য বিভিন্ন নিরাপত্তা আইন ও অধ্যাদেশ প্রণীত হয়েছিলো। প্রধানত মুসলিম লীগের মনোভাবের কারণেই দেশের অগ্রগতি সাধিত হয়নি, জনগণের শিক্ষাব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়েছে, উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসিত করা হয়নি, শিল্পখাত বিকশিত হয়নি, দুইবছরেরও বেশি সময় ধরে নির্বাচন আটকে থাকায় আসন শূন্যই থেকে গেছে; প্রশাসনিক মান প্রায় প্রতিটি শাখায় অবনতি হয়েছে এবং দিনদিন নিরাপত্তা আইনের তালিকা বৃহৎ হয়ে উঠছে।

এই প্রসঙ্গে, জনমত গঠন এবং দারিদ্র্যপীড়িত জনগণের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এবং সাম্যবাদী ইচ্ছাশক্তি দ্বারা সব দুর্দশা থেকে পরিত্রাণের জন্য সাধারণ মানুষ একটি সংগঠন গঠনের প্রস্তাব করেন। বর্তমান শাসকদের পকেটস্থ এবং আজ্ঞাবহ সরকারি লীগের বিপরীত এই সংগঠনটি হবে সকল মানুষের। আওয়ামী মুসলিম লীগ স্বতন্ত্র একটি পৃথক সংগঠন।

 

 

<001.036.121>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ প্রথম খন্ড

 

লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য

পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য প্রসঙ্গত নিম্নরূপ হতে হবে:-

(১) পাকিস্তানের সার্বভৌমত্ব, অখণ্ডতা, মর্যাদা ও স্থিতিশীলতা রক্ষা করা।

(২) পাকিস্তানের সংবিধান ও আইন সত্যিকারের গণতান্ত্রিক মূলনীতিরর উপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কিনা তা নিশ্চিত করা।

(৩) পাকিস্তানের মুসলমানদের ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক, সামাজিক, শিক্ষাগত এবং অর্থনৈতিক স্বার্থ বজায় রাখা ও উন্নত করা এবং পাকিস্তানের অন্যান্য অমুসলিমদের জন্যও অনুরূপ অধিকার নিশ্চিত করা।

(৪) পাকিস্তানের প্রত্যেক নাগরিকের জীবনধারণের মৌলিক উপকরণ যেমন :- খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা সেবা এবং সৎ উপায়ে সম্মানীয় পারিশ্রমিক আয় করার সুযোগ নিশ্চিত করে দেয়া।

(৫) সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করা এবং শ্রমের বিনিময়ে তাদের পূর্ণ পারিশ্রমিক পেতে সাহায্য করা।

(৬) দুঃখ-দুর্দশা উপশম, জ্ঞান সঞ্চারণ, সমতা ও ন্যায়বিচার প্রসারণ, নিপীড়ন দূরীকরণ, দুর্নীতি দমন এবং আত্মনির্ভরতা ও সহযোগিতার ভিত্তিতে সামাজিক সেবা সংগঠিত করে মানুষের নৈতিক ও বৈষয়িক মানোন্নয়ন করা।

(৭) নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ এবং বিচার বিভাগ ও পাবলিক সার্ভিস কমিশনের স্বাধীনতা বজায় রাখা; যুদ্ধবিগ্রহ কিংবা এধরনের জরুরি অবস্থা না হলে যেকোনো শাস্তিমূলক আটকাবস্থার পূর্বে জুডিশিয়াল ট্রায়াল প্রদান করা।

(৮) নাগরিক স্বাধীনতা রক্ষা করা যেমন : ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত বিশ্বাস, অভিব্যক্তি, সংঘ-সমিতি ইত্যাদির স্বাধীনতা।

(৯) বিশ্বজুড়ে মুসলমানদের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনকে শক্তিশালী করা এবং প্রতিবেশী দেশ তথা বিশ্বজুড়ে মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ অর্থনৈতি