বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধঃ দলিলপত্র – ৫ম খণ্ড (অনুবাদসহ)

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধঃ দলিলপত্র – ৫ম খণ্ড (অনুবাদসহ)

 

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

মুজিবনগর : বেতার মাধ্যম

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

সম্পাদক : হাসান হাফিজুর রহমান

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

অ্যাটেনশন!

পরবর্তী পেজগুলোতে যাওয়ার আগে কিছু কথা জেনে রাখুনঃ

ডকুমেন্টটি যতদূর সম্ভব ইন্টার‌্যাক্টিভ করা চেষ্টা করা হয়েছে। অর্থাৎ এই ডকুমেন্টের ভেতরেই অসংখ্য ইন্টারনাল লিংক দেয়া হয়েছে। আপনি সেখানে ক্লিক করে করে উইকিপিডিয়ার মতো এই ডকুমেন্টের বিভিন্ন স্থানে সহজেই পরিভ্রমণ করতে পারবেন। যেমন প্রতি পৃষ্ঠার নিচে নীল বর্ণে সূচীপত্র লেখা শব্দটিতে কি-বোর্ডের Ctrl চেপে ধরে ক্লিক করলে আপনি সরাসরি এই ডকুমেন্টের সূচিপত্রে চলে যেতে পারবেন।

তারপর দলিল প্রসঙ্গঃ মুজিবনগর বেতার মাধ্যম শিরোনামে কিছু লেখা আছে। এটি যুদ্ধদলিলের ৫ম খণ্ড থেকে সরাসরি লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। এখানে আপনারা জানতে পারবেন যে এই ডকুমেন্টে আসলে কী কী আছে।

তারপর সূচীপত্র । এখান থেকেই মূল দলিল শুরু। সূচিপত্রটি সরাসরি দলিলপত্র থেকে নেয়া হয়েছে। সূচিপত্রে লেখা পেজ নাম্বারগুলো যুদ্ধদলিলের মূল সংকলনটির পেজ নাম্বারগুলোকে রিপ্রেজেন্ট করে।

যুদ্ধদলিলেমোট ১৫ টি খণ্ড আছেঃ

প্রথম খন্ড : পটভূমি (১৯০৫-১৯৫৮)
দ্বিতীয় খন্ড : পটভূমি (১৯৫৮-১৯৭১)
তৃতীয় খন্ড : মুজিবনগর : প্রশাসন
চতুর্থ খন্ড : মুজিবনগর : প্রবাসী বাঙালীদের তৎপরতা
পঞ্চম খন্ড : মুজিবনগর : বেতারমাধ্যম
ষষ্ঠ খন্ড : মুজিবনগর : গণমাধ্যম
সপ্তম খন্ড : পাকিস্তানী দলিলপত্র: সরকারী ও বেসরকারী
অষ্টম খন্ড : গণহত্যা, শরনার্থী শিবির ও প্রাসঙ্গিক ঘটনা
নবম খন্ড : সশস্ত্র সংগ্রাম (১)
দশম খন্ড : সশস্ত্র সংগ্রাম (২)
একাদশ খন্ড : সশস্ত্র সংগ্রাম (৩)
দ্বাদশ খন্ড : বিদেশী প্রতিক্রিয়া : ভারত
ত্রয়োদশ খন্ড : বিদেশী প্রতিক্রিয়া : জাতিসংঘ ও বিভিন্ন রাষ্ট্র
চতুর্দশ খন্ড : বিশ্বজনমত
পঞ্চদশ খন্ড : সাক্ষাৎকার

এটি ৫ম খণ্ডের অর্থাৎ মুজিবনগর : বেতারমাধ্যম সংক্রান্ত দলিলের ইউনিকোড ভার্শন। এই খণ্ডে প্রায় ৪৩০ পৃষ্ঠা বাংলা দলিলের পাশাপাশি ১০০ পৃষ্ঠা ইংরেজি দলিলও রয়েছে। আপনাদের জন্য আমরা সেগুলো অনুবাদ করে দিয়েছি।

এই ডকুমেন্টে প্রতিটি দলিলের শুরুতে একটা কোড দেয়া আছে।

<খণ্ড নম্বর, দলিল নম্বর, পেজ নম্বর>

অর্থাৎ<৫,১২,২৮৮> এর অর্থ আলোচ্য দলিলটি মূল সংকলনের ৫ম তম খণ্ডের ১২ নং দলিল, যা ২৮৮ নং পৃষ্ঠায় মুদ্রিত আছে। দলিল নম্বর বলতে সূচিপত্রে উল্লিখিত নম্বরকে বুঝানো হচ্ছে। আপনারা বুঝার সুবিধার্থে দলিলের হার্ড কপির একটি ছবি দেখে নিন। এটি ঈদুল ফিতর উপলক্ষে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের প্রচারিত অনুষ্ঠানঃ রমজানের ঐ রোজার শেষে সংক্রান্ত দলিলের পৃষ্ঠার ঊর্দ্ধাংশঃ

 

দলিলে বানান সহ বেশ কিছু ভুল আমরা খুঁজে পেয়েছি। সেগুলোকে হলুদ মার্ক করা হয়েছে।

এই ফাইলটি আপনার কম্পিউটার বা মোবাইলে সংরক্ষিত করা থাকলে ভবিষ্যতে আপনি মুক্তিযুদ্ধ সংক্রান্ত যে বিতর্কিত কোন ইস্যু সম্পর্কে অত্যন্ত সহজে দলিলপত্রের রেফারেন্স দেখাতে পারবেন। আপনার নিজের এলাকার ঘটনাবলি জানতে পারবেন। কোনদিন মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে স্ট্যাটাস বা অন্যকিছু লিখতে ইচ্ছা হলে এখান থেকে সরাসরি কপি করে সহজেই লিখতে পারবেন।

মনে করুন, ২৬ শে মার্চ উপলক্ষে আপনি কোন ম্যাগাজিনে একটি লেখা দিবেন। এই ফাইলে তখন ২৬ শে মার্চ লিখে সার্চ দিলেই ৭ম খণ্ডের সেই সংক্রান্ত সকল দলিল পেয়ে যাবেন। ফলে রেফারেন্স নিয়ে লিখতে আপনার খুবই সুবিধা হবে। কারণ আমাদের মূল উদ্দেশ্য একটাই। আমরা যেন সঠিক ইতিহাস চর্চা করে বেড়ে ওঠা একটি প্রজন্ম হয়ে উঠি। এটা আমাদের নিজেদের জন্যেই অত্যন্ত প্রয়োজন। যে জাতি নিজের জন্মের ইতিহাস জানে না, সে জাতির চেয়ে দুর্বল সত্ত্বা পৃথিবীতে আর কিছু নেই।

মনে করুন, আপনি নিজের এলাকা নিয়ে জানতে চান। তবে নিজের এলাকার নাম লিখে এই ডকুমেন্টে সার্চ করুন। উদাহরণস্বরূপ, আপনি মিরপুর এলাকার হলে Ctrl+F চেপে“মিরপুর”লিখেসার্চকরুন।৬ষ্ঠতমখণ্ডেরমিরপুরনিয়েসকলদলিলআপনারসামনেচলেআসবে।দেশকেজানারপ্রথমশর্তইহলোনিজেরএলাকাকেজানা।

আপনি চাইলে নিজের সুবিধামতো ডকুমেন্টটিকে সহজেই কয়েক ভাগে কপি করে ভাগ করে আলাদা আলাদা ডকুমেন্ট তৈরি করতে পারেন। মনে করুন, আপনি স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে জানতে আগ্রহী। তখন ‘স্বাধীনতারঘোষণা’লিখেসার্চকরেপ্রাপ্তসকলদলিলেস্বাধীনতারঘোষণাসংক্রান্তঅংশকপিকরেআলাদাফাইলতৈরিকরুন।পড়তে, বুঝতে এবং প্রয়োজনীয় তথ্য খুঁজে পেতে অনেক সুবিধা হবে।

 

মনোযোগ দিয়ে সারসংক্ষেপটি পড়ার জন্য ধন্যবাদ। এবার বিস্তারিত।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

দলিল প্রসঙ্গঃ মুজিবনগর – বেতার মাধ্যম

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস ৫ম খন্ডের দলিলপত্রের অধিকাংশই প্রাথমিক সূত্র থেকে আহৃত। প্রাথমিক সূত্র থেকে পাওয়া যায়নি এমন কিছু কিছু দলিল শহীদুল ইসলাম সম্পাদিত শব্দসৈনিক এবং রেডিও বাংলাদেশের পাক্ষিক মুখপত্র বেতার বাংলা’ থেকে গ্রহণ করা হয়েছে। এ ছাড়া সন্নিবেশিত গানসমূহের কয়েকটি উৎস শামসুল হুদা চৌধুরী সম্পাদিত অনেক রক্ত একটি জাতি নামক সাময়িকী এবং তার রচিত একাত্তরের রণাঙ্গন। সন্নিবেশিত দলিলসমূহের সূত্রোল্লেখ থেকেই এটা জানা যাবে।

 

স্বাধীন বাংলা বেতারের সূচনা চট্টগ্রামের কালুরঘাট ট্রান্সমিশন ভবনে ২৬-৩০ মার্চ ১৯৭১- সমাপ্তি মুজিব নগরে জানুয়ারী ২, ১৯৭২ তারিখে। ৩০ মার্চ ১৯৭১ তারিখে কালুরঘাট ট্রান্সমিশন ভবন হানাদার বাহিনীর বিমান হামলায় বিধ্বস্ত হওয়ার পর ৩ এপ্রিল থেকে ২৫ মে পর্যন্ত যেসব অনুষ্ঠান প্রচারিত হয়েছিল, সেগুলির কোন নিদর্শন সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। তবে এ পর্যায়ে প্রচারিত মাত্র একটি বিষয় (পৃঃ ১৩) সন্নিবেশ করা হয়েছে। সূচনা পর্বের ২৬ থেকে ৩০ মার্চ ১৯৭১ পর্যন্ত প্রচারিত বিষয় সমূহও বেশি পাওয়া যায়নি, শুধু একখানি বাণীবদ্ধ টেপ (পৃঃ ১-১০), ‘ শব্দসৈনিক – এ প্রকাশিত একটি কথিকা (পৃঃ ১২) ও বেতার বাংলায় প্রকাশিত এ সময়ের প্রচারিত অনুষ্ঠানের অংশবিশেষ (পৃঃ ১১) ছাড়া। এগুলি গ্রন্থের প্রারম্ভেই দেওয়া হয়েছে।

 

মুজিবনরে প্রতিষ্ঠিত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সরকার তত্ত্বাবধানে সংগঠিতভাবে ২৫ মে ১৯৭১- এ স্বাধীন বাংলা বেতার সম্প্রচার নিয়মিতভাবে শুরু হয়। সেই তারিখ থেকে প্রচারিত অনুষ্ঠানমালার দলিলপত্র যতোদূর সংগৃহীত হয়েছে তা আংশিকভাবে সন্নিবেশ কারা হয়েছে (পৃঃ ৪০-৫১১)।

 

তার আগে বেতারের অধিবেশন সমূহের পরিচয় দেবার প্রয়াস রয়েছে গ্রহন্থের ৩ নং শিরোনামভূক্ত অনুষ্ঠান পত্রগুচ্ছে (পৃঃ ১৫)। শেষে রয়েছে সংগীত সূচী (পৃঃ ৫১২-৫১৬)। স্বাধীন বাংলা বেতারের নিয়মিত কর্মী, সংগঠক ও পরিচালবৃন্দের নামের কোন তালিকা এ খন্ডে দেওয়া হয়নি, কারণ, অনুরুপ একটি তালিকা এই দলিলপত্রের ৩য় খন্ডে আগেই মুদ্রিত হয়েছে।

 

বিভিন্ন শিরোনামে প্রচারিত বাংলা ধারাবাহিক স্বাতন্ত্র কথিকামালাকে সূত্রানুযায়ী বিভাজন করা হয়েঠেছ (পৃঃ ৫৪-৫২৬) বাংলা অনুষ্ঠানের বিষয়াদি ছাড়াও উর্দু এবং ইংরেজী অনুষ্ঠানের প্রচারিত বিষয় সমূহের পরিচয় মিলবে যথাক্রমে ২৭৯-২৮০ ও ৪২২-৫০২ পৃষ্ঠাগুলিতে। বিষয় বস্তু অনুসারে আলাদা শিরোনামে চিহ্নিত করেও বাংলা অনুষ্ঠানের কিছু কথিকা সন্নিবেশিত হয়েছে-যেমন রণাঙ্গন সম্পর্কিত কয়েকটি কথিকা (পৃঃ ৫২৭-২৭৮), ধর্মীয় আলোচনা অনুষ্ঠানের ধারাবাহিক কথিকা (পৃঃ ২৮১-২৮৭) ঈদুল ফিতর উপলক্ষে অনুষ্ঠন (পৃঃ ২৮৮-২৯৫) ইত্যাদি। প্রচারিত বিভিন্ন নিয়মিত অনুষ্ঠান যেমন রক্ত স্বাক্ষর সাহিত্যানুষ্ঠান (পৃঃ ২৯৬-৩০৯), মুক্তিবাহিনীর জন্য প্রচারিত অগ্নিশিখা অনুষ্ঠান (পৃঃ ৩৪০) গ্রামীণ শ্রোতাদের জন্য অনুষ্ঠান (পৃঃ ২৯৬-৩০৯), প্রবৃতির অন্তর্গত কিছু কিছু বিষয় সংকলন করা হয়েছে। এ ছাড়া কবিতা(পৃঃ ৩১০-৩৩৯), রুপকানুষ্ঠান (পৃঃ ২৪৮-৩৭০),জীবন্তীকা (পৃঃ ৩৭১-৩৮২), গান(পৃঃ ৪০২-৪২১) ইত্যাদিও রয়েছে। সংযোজনীতে স্থান পেয়েছে মার্চ ও এপ্রিল ১৯৭২-এর বেতার বাংলা থেকে সংকলিত আরও কয়েকটি বাংলা কাথিকা (পৃঃ ৫০৩-৫১১)।

 

পরিশিষ্ঠে (পৃঃ ৫১৭-৫২৭) আছে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের গোড়াপত্তন সম্পর্কিত বিভিন্ন জনের লেখা কয়েকটি প্রতিবেদনের অংশবিশেষ। সবশেষে এসেছে বেতার অনুষ্ঠন প্রচার সম্পর্কিত একটি সভার সরকারী দলিল (পৃঃ ৫২৮)। এ দলিলপত্রের পঞ্চদশ খন্ডে সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলা বেতার নেন্দ্রের প্রতিষ্ঠা সংক্রান্ত তথ্যাদি সন্নিবেশিত হওয়ায় এখানে এ সম্পর্কিত তথ্য সংক্ষেপ করা হয়েছে।

এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, নিয়মিত অনুষ্ঠানমালার বাইরে বিভিন্ন সময়ে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্যবৃন্দ, সরকার প্রধান, সেনাবাহিনী প্রধান ও ছাত্র নেতৃবৃন্দের যেসব ভাষণ এবং সরকারের যেসব নির্দেশ, বিজ্ঞপ্তি স্বাধীন বাংলা বেতারে প্রচারিত হয়েছে সেগুলি বাংলাদেশের স্বধীনতা যুদ্ধঃ দলিলপত্র -এর অন্যান্য প্রাসঙ্গীক খণ্ড, যেমন- ৩য়, ৪র্থ ও ১১শ খন্ডসমুহে সংযোজিত হওয়ায় এখানে অন্তর্ভুক্ত হয়নি।

 

বিষয়সমূহের রচয়িতার নাম প্রায় ক্ষেত্রেই দেয়া হয়েছে কেবল দু’একটি ক্ষেত্রে যেমন-বিশ্বজনমত শীর্ষক ধারাবাহিক বাংলা কথিকাগুলির (পৃঃ ৫৪-৮৬) লেখকের নাম দলিল সন্নিবেশকালে জানা যায়নি বলে অনুল্লিখিত থেকে গেছে। এ পর্যায়ের ৩০ মে, ১০ জুন, ২৯ জুলাই, ১ আগষ্ট ১৯৭১- এর কথিকাগুলি বাদে বাকী সবগুলি সাদেকীন-এর রচনা বলে পরে চিহ্নিত করা গেছে। ১ আগষ্ট-এর কথিকাটি লিখেছেন আবুল কাশেম সন্দ্বীপ। কিন্তু প্রথমোক্ত তিনটির লেখকের নাম জানা যায়নি। অনুরূপভাবে, ইংরেজী অনুষ্ঠানের ‘ওয়ার্ল্ড প্রেস রিভিউ অন বাংলাদেশ শীর্ষক প্রতিবেদনগুলিরও লেখকের নাম জানা যায়নি। তবে এগুলি একাধিক জনের রচনা এবং আলমগীর কবীর, আলী জাকের ও মওদুদ আহমেদ সাধারণত এগুলি লিখতেন।

.

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

সূচীপত্র

 

ক্রমিক নং                                                            বিষয়                                                                                   পৃষ্ঠা

১|       স্বাধীন বাংলাবেতার কেন্দ্র প্রচারিত অনুষ্ঠান (অংশ)                                      ১

২।      স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র প্রচারিত আরও অনুষ্ঠান

-২৬ শে মার্চের অনুষ্ঠান থেকে                                                      ১১

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের প্রথম কথিকা                              ১২

সাম্প্রদায়িতকাঃ সামন্তবাদ প্রসঙ্গ                                          ১৩

৩।      স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র-এর অনুষ্ঠান গুচ্ছপত্র (অংশ)                                ১৫

৪।      স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত বাংলা ও ইংরেজী সংবাদঃ

-বাংলা সংবাদ                                                                         ৪০

ইংরেজী সংবাদ                                                              ৪২

৫ ।     স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র প্রচারিত নিয়মিত বাংলা কথিকামালাঃ

-বিশ্ব জনমত                                                                 ৫৪

দৃষ্টিপাত                                                                      ৮৬

সংবাদ পর্যালোচনা                                                         ১০৪

মানুষের মুখ                                                                 ১২৩

প্রতিনিধির কণ্ঠ                                                              ১৩০

অভিজ্ঞতার আলোকে                                                      ১৩৯

শেখ মুজিবের বিচার প্রহসন                                               ১৪৩

পর্যবেক্ষকের দৃষ্টিতে                                                        ১৪৬

দর্পণ                                                                          ১৫০

কাঠগড়ার আসামী                                                         ১৫৩

জনতার সংগ্রাম                                                             ১৫৪

পুতুল নাচের খেল                                                          ১৫৫

বিশ্ব বিবেক ও বাংলাদেশ                                                 ১৫৮

পিন্ডির প্রলাপ                                                               ১৬১

রক্তের অক্ষরে লিখি                                                        ১৬৬

দৃষ্টিকোণ                                                                     ১৭২

রাজনৈতিক মঞ্চ                                                             ১৭৫

৬ ।     স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র প্রচারিত আরও কয়েকটি নিয়মিত কথিকাঃ

-দর্পণ                                                                          ১৭৮

রাজনৈতিক মঞ্চ                                                             ১৮১

জনতার সংগ্রাম                                                             ১৮৩

 

 

 

 

 

 

 

 

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

 

 

সুচিপত্র

 

ক্রমিক নং                                                           বিষয়                                                                                          পৃষ্ঠা

অভিযোগ                                                                   ১৮৫

চরমপত্র                                                                     ১৮৭

৭ ।     স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র প্রচারিত বাংলা কথিকামালাঃ

– সাময়িকী                                                                    ১৯০

বিদেশী মুসলিম রাষ্ট্রের পত্র-পত্রিকার সম্পাদকীয় অভিমত         ১৯২

মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশের কবিতা                                         ১৯৩

রণ দামামা                                                                  ১৯৬

কথিকা                                                                      ১৯৭

বাংলাদেশ গেরিলা                                                         ১৯৮

আমাদের মুক্তি সংগ্রাম ও মহিলা                                        ১৯৯

দেশবাসী সমীপে নিবেদন                                                ২০০

যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি ও বাংলার নারী                                    ২০৩

সাংবাদিক স্বাধীনতা ও হানাদার অধিকৃত বাঙলাদেশ                 ২০৪

আমরা তাদের ভাতে মারাবো                                                     ২০৬

যুদ্ধই একমাত্র পথ                                                         ২০৮

কয়েকটি ছবি- একটি ইতিহাস                                                   ২১০

মুক্তি সংগ্রামে মায়ের প্রেরণা                                                      ২১২

মুক্তি সংগ্রামে বঙ্গ বীরাঙ্গণা                                               ২১৪

বাংলার মুখ                                                                 ২১৬

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পুনর্গঠন                                       ২১৯

বাংলাদেশে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির উপায়                                         ২২১

আগ্রগামী মুক্তিবাহিনী                                                               ২২৩

– এখন অনেক কাজ                                                        ২২৪

৮ ।     স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র প্রচারিত আরও বাংলা কথিকা

রাজনৈতিক বঞ্চনার নেপথ্যে                                                       ২২৭

প্রতিধ্বনি                                                                     ২২৯

আমর ১৭ই সেপ্টেম্বর                                                               ২৩০

ইয়াহিয়া জবাব দাও                                                        ২৩২

ঝিলামের চার ভাই                                                         ২৩৩

রক্ত দিয়ে রেখে গেলাম                                                              ২৩৫

রেনেসার সূচনাঃ বাংলাদেশ                                               ২৩৭

রণাঙ্গনে বাঙলার নারী                                                               ২৩৯

দেয়ালের লিখন                                                                      ২৪০

বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধু                                                        ২৪২

 

 

 

 

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

 

ক্রমিক নং                                                           বিষয়                                                                                          পৃষ্ঠা

দেশে গঠনে নারীর ভূমিকা                                                ২৪৪

স্বদেশ স্বকাল                                                                         ২৪৬

বাংলার সংগ্রামী জনাতা প্রস্তুত                                                     ২৪৮

বাংলাদেশের পুর্নগঠন-৩                                                           ২৪৯

পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ                                                ২৫১

৯ |     স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র প্রচারিত রণাঙ্গন সম্পর্কিত কংয়েকটি কথিকাঃ

দখলীকৃত এলাকা ঘুরে এলাম                                                      ২৫৭

মুক্তিযুদ্ধ কোন পথে                                                        ২৬৪

মুক্তিফৌজের ক্যাম্পে                                                               ২৬৬

দুর্জয় বাংলা                                                                  ২৬৮

মুক্তাঞ্চল ঘুরে এলাম                                                                ২৭০

ঘুরে এলাম মুক্তাঞ্চল                                                                ২৭২

রণাঙ্গণ ঘুরে এলাম                                                         ২৭৩

মুক্তাঞ্চলে                                                                    ২৭৬

১০ ।   স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র প্রচারিত উর্দু অনুষ্ঠান থেকেঃ

-একটি উর্দু কথিকা                                                          ২৭৯

১১।     স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র প্রচারিত ধর্মীয় আলোচনা অনুষ্ঠানের কয়েকটি কথিকাঃ

-ইসলামের দৃষ্টিতে                                                           ২৮১

ইসলামের দৃষ্টিতে জেহাদ                                                  ২৮২

বাইবেল পাঠ ও আলোচনা                                                ২৮৫

১২ । ঈদুল ফিতর উপলক্ষে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের প্রচারিত অনুষ্ঠানঃ

-রমজানের ওই রোজার শেষে                                                       ২৮৮

রকেথ রাঙ্গ ঈদ                                                             ২৯১

রক্তে রাঙা ঈদুল ফিতর                                                             ২৯৪

১৩ । স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র প্রচারিত সাহিত্যানুষ্ঠন থেকেঃ

-বিপন্ন যখন                                                                  ২৯৭

আজকের বাংলায়                                                           ৩০০

সূর্য ওঠার স্বপ্ন নিয়ে                                                        ৩০৩

রণ শিবিরের একটি প্রতক্ষ্য চিত্র                                                   ৩০৫

স্বীকারোক্তি                                                                   ৩০৭

১৪ । স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র প্রচারিত কয়েকটি কবিতাঃ                             ৩১০

১৫।     স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য প্রচারিত অনুষ্ঠান অগ্নিশিখা থেকেঃ

‘-এহিয়া বধ কাব্য’                                                           ৩৪০

১৬ | স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র প্রচারিত একটি রুপক অনুষ্ঠানঃ -জল্লাদের দরবার (অংশ) ৩৪৮

 

 

 

 

 

 

 

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

ক্রমিক নং                                                         বিষয়                                                                                   পৃষ্ঠা

১৭| স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র প্রচারিত জীবন্তিকা অনুষ্ঠানঃ

-মীর জাফরের রোজনামচা                                                  ৩৭১

এ সত্য রুধিবে কে?                                                        ৩৭৪

কে আমাদের রুখবে?                                                                ৩৭৯

১৮।    স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের গ্রামীণ শ্রোতাদের জন্য প্রচারিত অনুষ্ঠানঃ

-সোনার বাংলা                                                                         ৩৮৩

জনতার আদালত                                                           ৩৮৯

গ্রাম বাংলা                                                                   ৩৯২

১৯ | স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র প্রচারিত গান                                                      ৪০২

২০ | স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র প্রচারিত ইংরেজী অনুষ্ঠানঃ

-নিউজি কমেন্টারী                                                           ৪২২

২১।    স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র প্রচারিত ইংরেজী অনুষ্ঠানঃ

-ওয়ার্ল্ড প্রেস রিভিউ অন বাংলাদেশ                                      ৪৩৪

২২ | স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র প্রচারিত ইংরেজী প্রতিবেদনমালা:

-Shocking Western Apathy: Bangladesh No Biafra or                  ৪৫০ Indonesia                                                                      ৪৫১

UN Proved Impotent                                                            ৪৫২

British Parliament Debates Bangladesh

More US Arms for Killing Bengalees:                             ৪৫৪

AAPO Fails to Understand Bangladesh                                     ৪৫৫

Emergence of Secularism                                                     ৪৫৭

British Delegation States Yahya, Tikka

Awami League Opts for Military Solution                                 ৪৫৮

Not Separatism : A War of Liberation                                     ৪৬০

Causes of Arab Apathy Toward Bangladesh                              ৪৬২

Nixon Goes to Peking as Bangladesh Bleeds                            ৪৬৪

Yahya Prepares to Murder Sheikh                                          ৪৬৫

Indian Moslems Misled                                                ৪৬৭

A multi-pronged Attack on Bangladesh                                    ৪৬৯

UN to Pakistan’s Rescue                                               ৪৭১

Famine as a Weapon Relief Food for Soldiers!

Bangla is NO Biafra                                                                ৪৭২

World Press Worried about Sheikh: Honor for Tikka!                ৪৭৪

Yahya Finds His Quisling                                                       ৪৭৬

‘Amnesty’ Fail to deceive : BBC Thaws: Mercenary Malik

–An Historic Five-Party Agreement : Proof. Galbraith                 ৪৭৭

Mistakes Bengali Spirit                                                  ৪৭৯

US Senators Vote Stop|page of Aid: Paks on the Run                ৪৮১

 

 

 

 

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

ক্রমিক নং                                                    বিষয়                                                                                  পৃষ্ঠা

-Collusion with Iran                                                               ৪৮৩

India-USSR Treaty                                                                ৪৮৪

British Labor Party Wakes up: UN Intervention

Not Welcome Now                                                              ৪৮৬

Yahya and His Bay Elections                                                   ৪৮৯

Monem Eliminated: Other Collaborators Shaking in                  ৪৯০

Pants                                                                                 ৪৯১

Yahya’a Approaching Doom                                                    ৪৯৩

US People Force Nixon Stop Arms Flow                                  ৪৯৫

Pakistan in Tight Corner: D-Day Nearing Warning for                ৪৯৬

UN                                                                           ৪৯৮

Bangladesh Get Ready!                                                ৫০০

Final Battle Begins: Mukti Bahini Riding High                            ৫০১

-The Decisive Stage                                                                        –Niazi’a Pitiful Boasts

 

সংযোজন

২৩| স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র প্রচারিত বাংলা অনুষ্ঠানমালার আরও কয়েকটি কথিকাঃ

-তথাকথিত পাকিস্তান বেতার ঢাকা                                                 ৫০৩

মৃত্যুহীন প্রাণ                                                                         ৫০৬

ইবলিশের মুখোশ                                                           ৫০৭

রণাঙ্গনের চিঠি                                                                       ৫০৯

বিচার চাই                                                                    ৫১০

২৪|    স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সঙ্গীত সূচী (অংশ)                                        ৫১২

 

পরিশিষ্ট-১

২৫।    স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র সম্পর্কিত কয়েকটি প্রতিবেদন (অংশ)                    ৫১৭

 

পরিশিষ্ট-১

২৬ | স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অনুষ্ঠান প্রচার সম্পর্কিত একটি সভার           ৫২৮

কার্যবিবরণী

২৭|             নির্ঘণ্ট                                                                          ৫৩১

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<005.001.001>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

শিরোনাম সূত্র তারিখ

১। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র

প্রচারিত অনুষ্ঠান (অংশ)

টেপ থেকে উদ্ধৃত ২৬-৩০ মার্চ, ১৯৭১

 

“এবার তোমাদের বিদায় নিতে হবে, তবে অক্ষত অবস্থায় নয়। যে রক্ত এতদিন তোমরা নিয়েছো, সে রক্ত এবার আমরাও নেব।” বলেছেন বাংলার মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব।

“বাঙালী রেজিমেন্ট, ই-পি-আর, পুলিশ বাহিনী, মুক্তিসেনা- এগিয়ে যাও। তোমাদের সাথে রয়েছে বাংলার বিপ্লবী বীর জনতা। এরা সবাই রক্ত দিতে প্রস্তুত, আজ এরা রক্ত দেবেই এই প্রতিজ্ঞা নিয়ে পাকিস্তানী হানাদারদের ওপর এরা আক্রমণ চালাবে।” বলেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব।

“পাক সৈন্যদের খতম করুন, বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে অক্ষুণ্ণ রাখুন। যে পতাকা একবার বাংলার– মানুষ উড়িয়েছে,শেষ রক্তবিন্দু থাকতেও সেই পতাকা কোনোদিন তারা ভুলে যাবে না।” বলেছেন স্বাধীন বাংলার ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের চারজন নেতা।

মনে রাখবেন, শত্রুসৈন্য ধ্বংস হওয়া না পর্যন্ত এই যুদ্ধাবস্থা চলবেই। তাই আরাম-আয়েশ বিসর্জন দিয়ে, রাতের ঘুম হারাম করে আপনারা আপনাদের বিজয়ের পথে এগিয়ে যান।

পশ্চিমা হানাদারেরা এখনো চিনতে পারেনি বাঙালী রেজিমেন্ট, ই-পি-আর, পুলিশ বাহিনী আর মুক্তিসেনা কি জিনিস। তারা ভুলে গেছে, এই বাহিনী বিভিন্ন যুদ্ধে যে শৌর্য ও বীর্য দেখিয়েছে তা তারা এখনো আন্দাজ করতে পারেনি। আমরা দৃঢ় বিশ্বাস রাখি, যে সমস্ত হানাদার পাকিস্তানী সৈন্য এখনো রয়েছে তাদের বাঙালীরা নিশ্চিহ্ন করে দেবে। জয় বাংলা।

সংগীতঃ জয়, জয়, বাংলার জয়… …।

স্বাধীনতা অর্জনের জন্য মরণপণ সংগ্রাম চলেছে। বাংলার বীর সৈনিক, ইষ্ট বেঙ্গল রাইফেলস, ইষ্ট পাকিস্তান রাইফেলস, পুলিশ বাহিনী এবং এদেশের প্রতিটি ছাত্র, কৃষক, জনতা, হানাদার পশ্চিমা গুণ্ডা বাহিনীর আক্রমণ সাফল্যের সাথে প্রতিহত করে চলেছে। এবং বাংলার বীর সৈনিকদের আক্রমণে দিশেহারা পশ্চিমা বাহিনী পিছু হটে চলেছে এবং মর্টার, কামান এবং ট্যাঙ্কের সাহায্যে বিভিন্ন স্থানে নির্বিচারে গণহত্যা করে চলেছে। পশ্চিমা হানাদার বাহিনী যখন প্রতিটি আন্তর্জাতিক নিয়ম-কানুন উপেক্ষা করে গতকাল রাত্রে হাসপাতালে পর্যন্ত বোমাবর্ষণ করেছে- বাংলার সাত কোটি মুক্তিপাগল মানুষের উপর যেভাবে পশ্চিমা হানাদার বাহিনী আক্রমণ করে চলেছে, তার প্রতিরোধে বাংলার মানুষকে সর্বাত্মক সহায়তা করা প্রত্যেক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নৈতিক কর্তব্য বলে আমরা মনে করি। তাই বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষ আজ বিশ্বের কাছে আহবান জানাচ্ছে তারা যেন বাংলার মুক্তিপাগল জনগণের সাহায্যার্থে এগিয়ে আসেন। আপনাদের অবগতির জন্য আমরা আরও জানাচ্ছি যে, পশ্চিমা হানাদার বাহিনীর মেজর জেনারেল টিক্কা খান- যাকে বাংলার বীর জনতা গর্ভনর হিসাবে মেনে নিতে ………. (অস্পষ্ট) অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন, সেই কুখ্যাত টিক্কা খানকে বাংলার বীর

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

স্বাধীন বাংলা বেতারের প্রথম সম্প্রচার কেন্দ্র ছিল চট্টগ্রাম বেতারের কালুরঘাট ট্রান্সমিটার ভবন। ২৬ মার্চ থেকে ৩০ মার্চ পর্যন্ত অনুষ্ঠান প্রচারের পর হানাদার বাহিনীর বিমান আক্রমণে কেন্দ্রটি বন্ধ হয়ে যায় এবং চট্টগ্রাম সীমান্তবর্তী মুক্তাঞ্চল থেকে দ্বিতীয় পর্যায়ে অনুষ্ঠান পুনঃপ্রচার শুরু হয়। পরবর্তীতে ২৫ মে থেকে মুজিব নগরে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সরাসরি তত্ত্বাবধানে বেতার সম্প্রচার পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হয়।

 

* বন্ধনীযুক্ত অংশের টেপ অস্পষ্ট ও বাংলা ভাষণের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ।

 

<005.001.002>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

 

সৈনিকেরা হত্যা করেছে। বাংলার বীর জনতা প্রতিটি অলিতে-গলিতে অস্ত্র হাতে শত্রু দের মোকাবিলা করে চলেছে। বিশ্ববাসী, আপনারা আসুন, বাংলার মানুষকে সর্বাত্মক সহায়তা করুন। আমরা জানি, ইনশাল্লাহ জয় আমাদেরই হবেই। জয় বাংলা।

আপনারা বাংলার প্রতিটি জনসাধারণকে জানিয়ে দিন যেন শত্রুর মোকাবিলায় তারা সর্বাত্মক সাহায্য করেন। বাংলার বীর সৈনিকেরা যেভাবে শত্রুর মোকাবিলা করে চলেছে, তা সত্যই প্রশংসার যোগ্য। আপনারা এগিয়ে আসুন। আপনারা কেউ শহর থেকে যাবেন না। যে যেরূপ ভাবেই পারেন বাংলার মুক্তিপাগল মানুষকে সাহায্য করুন। …… আমাদের বিভিন্ন কেন্দ্রে খাদ্য ও যেসব সামগ্রী সংগ্রহ করা আছে, আপনারা যদি পারেন, সেখানে খাদ্য ও সামগ্রী জমা দিন।

সঙ্গীতঃ … … …

ঘুম পাড়ানো তোতা পাখী লও বিদায়, লও বিদায়।

 

…       …           …           …         …           …

. আমি বাংলাদেশ মুক্তিবাহিনীর মেজর জিয়া। বাংলাদেশ মুক্তিবাহিনীরদলনেতা মেজর জিয়া বংবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনুতার আন্দোলনের পক্ষে কথা বলছি।

 

মূলত পাঞ্জাবী অধ্যুষিত পাকিস্তানী সামরিক বাহিনী সর্বস্তরের বেসামরিক বাঙ্গালীদের নির্মমভাবে হত্যা করেছে। তারা মূলত সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী এবং বিমানবাহিনীর নিরস্ত্র কর্মকর্তা ও অন্যান্যদের যাদের পরিবারকে হত্যা করা হয়নি মূলত তাদের কাউকেই রেহাই দেওয়া হয়নি। গত বৃহস্পতিবার রাত হতেই এই হত্যাকান্ড শুরু করেছে এবং যখন তারা আক্রমণ করা শুরু করে পুরো স্বাধীন বাংলার নিরস্ত্র সৈন্য, নৌ সদস্য, বিমানবাহিনীর সদস্য ও সাধারণজনগণকে হত্যা করা শুরু করে দেয়। তারা আর্টিলারী কামান, আমেরিকান, রাশিয়ান ও চীনা অস্ত্রশস্ত্র ব্যবহার করে। এছাড়াও বর্তমানে তাদের কাছে রয়েছে রাশিয়ান ট্যাঙ্ক যা ১৯৬৫ সালের তথাকথিত যুদ্ধে ইন্দোনেশিয়া আমাদেরকে দিয়েছিলো। তাদের এ সমস্ত কাজ যেমন বর্বরোচিত তেমনই জঘন্য। বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, বেসামরিক কর্মচারী, সেনাবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদেরকে হত্যা করার ব্যাপারে তাদের পূর্ব পরিকল্পনা ছিল। এই চরম মুহূর্তে সবচাইতে প্রয়োজনীয় হচ্ছে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের অন্তরালে চলে যাওয়া বা গোপনে সেখান হতে কাজ চালানো। কিছুক্ষণ আগে ভয়েস অব আমেরিকা বেতারে বলা হয়েছে যে, স্বাধীন বাংলাদেশের ন্যায় আন্দোলনকে পূর্ণরূপে সমর্থন করে বেলুচিস্তান এবং সীমান্ত প্রদেশের পাখতুনিস্তান তথাকথিত পাকিস্তান হতে বিচ্ছিন্ন হয়েছে। এই সময়ে আমাদের একমাত্র লক্ষ্য হচ্ছে সংঘবদ্ধভাবে মহান সংগ্রাম গড়ে তোলা। সৃষ্টিকর্তার অনুগ্রহে আমরা এই সমস্ত দেশদ্রোহী পাঞ্জাবী সেনাদের দু’একদিনের ব্যবধানেই সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত করবো এবং শত্রুদের কবল থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত করবোই। জয় বাংলা।

 

আপনারা এতোক্ষন শুনছিলেন বাংলাদেশ মুক্তিবাহিনীর নেতা মেজর জিয়ার ধারণকৃত বক্তব্য। এই সম্প্রচার মুক্ত বাংলা বেতার হতে সম্প্রচারিত হচ্ছে।

 

 

 

আপনারা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অনুষ্ঠান শুনছেন। এবার আপনাদের মুক্তি-বাঙালী মুক্তিসেনা বাহিনীর নায়ক মেজর জিয়া আপনাদেরকে বাংলায় ভাষণ দিচ্ছেন।

 

আমি শেখ মুজিবুর রহমানের ঘোষিত স্বাধীন বাংলা প্রসংগে বলছি।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<005.001.003>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

 

পাকিস্তান সেনাবাহিনী প্রধানত ……….. * পাঞ্জাবী সৈন্যরা বাংলার বেসামরিক মানুষদের নির্মমভাবে হত্যা করেছে। তারা অফিসার এবং নিরস্ত্র সৈন্যদের হত্যা করেছে। এমন কি তাদের পরিবারদেরকেও রেহাই দেয়নি। তাদের এরকম হত্যাকাণ্ড শুরু হয়েছে গত বৃহস্পতিবার থেকে। সেদিন থেকে তারা বাঙালী সৈন্যদের নিরস্ত্র করে এবং সমস্ত স্বাধীন বাংলাদেশের জনগণের উপর জুলুম চালাতে থাকে। তারা আর্টিলারী কামান, আমেরিকান, রাশিয়ান ও চীনা অস্ত্রশস্ত্র ব্যবহার করে। এছাড়াও তাদের জুলুমের ভয়াবহ সামগ্রীগুলির মধ্যে ইন্দোনেশিয়া আমাদেরকে দিয়েছিলো। দুশমনদের এ সমস্ত কাজ যেমন বর্বরোচিত তেমনি জঘন্য। এই সমস্ত বর্বর হানাদারদের এখন সুপরিকল্পিত মতলব হচ্ছে স্বাধীন বাংলাদেশের মহান রাজনীতিক নেতাদের, বেসামরিক উচ্চপদস্থ কর্মচারীদের এবং বাংলাদেশের মুক্তিসেনাদের হত্যা করা। এই চরম মুহুর্তে সবচেয়ে প্রয়োজন হচ্ছে স্বাধীন বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদিগকে আণ্ডারগ্রাউন্ড বা গোপন কাজে চলে যেতে হবে এবং সেখান থেকে দুর্বার আক্রমণ গড়ে তুলতে হবে। কিছুক্ষণ আগে ভয়েস অব আমেরিকা বেতারে বলা হয়েছে যে, স্বাধীন বাংলাদেশের ন্যায় আন্দোলনকে পূর্ণরূপে সমর্থন করে বেলুচিস্তান এবং সীমান্ত প্রদেশের পাখতুনিস্তান তথাকথিত পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে। এই সময় আমাদের একমাত্র লক্ষ্য হচ্ছে সংঘবদ্ধভাবে মহান সংগ্রাম গড়ে তোলা। আল্লাহর অনুগ্রহে আমরা পাঞ্জাবী দেশদ্রোহীদের সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত করবো। এই পাঞ্জাবী দেশদ্রোহীদের বিধবস্ত করতে আমাদের সময় লাগবে মাত্র একদিন কিংবা দুইদিন। এবং এভাবে স্বাধীন বাংলাদেশকে আমরা শত্রুর কবল থেকে মুক্ত করবো। জয় বাংলা।

 

আমি বাঙালি মুক্তি বাহিনীর লেফটেন্যান্ট শমসের বলছি, এতদ্বারা বাঙালি মুক্তিবাহিনীর মেজর জিয়াউর রহমানের তরফ থেকে এই ঘোষণা পাঠ করছি। তিনি বলেন, এমন খবর পাওয়া গেছে যে জল ও আকাশ পথে চিটাগং এবং ঢাকায় আরো অধিক সংখ্যক পাঞ্জাবি সেনা এবং অস্ত্র আনয়ন করা হচ্ছে। অতএব বাঙালি জনগণের পক্ষ থেকে বিশ্বের সকল শান্তিকামী দেশের প্রতি আমার অনুরোধ, স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিন এবং গণতান্ত্রিক মানসিকতার বাংলাদেশকে স্বাধীন করতে সব ধরনের সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন। এই পরিস্থিতিতে আমি নিজেকে শেখ মুজিবের অধীনে পরিচালিত স্বাধীন বাংলা মুক্তি সরকারের প্রাদেশিক প্রধান হিসেবে ঘোষণা করছি। আমি বাংলাদেশের মানুষকে আরো তীব্রতা, তেজ এবং আত্মত্যাগের সাথে স্বাধীনতা সংগ্রাম চালিয়ে নেয়ার আহবান জানাচ্ছি। আল্লাহর রহমতে জয় আমাদেরই- জয় বাংলা। ঘোষণাটি এরকমঃ চট্টগ্রামের সকল বেসামরিক জনগণকে যার যা অস্ত্র আছে তাই নিয়ে লালদিঘী ময়দানে জমায়েত হওয়ার জন্য এবং বাঙালি মুক্তিবাহিনীর ক্যাপ্টেন ভূঁইয়া এবং ক্যাপ্টেন নাসেরের কাছে রিপোর্ট করার জন্য অনুরোধ করা গেল।

 

চট্টগ্রামে অবস্থানরত সমস্ত নাগরিকদেরকে আহবান করা হচ্ছে যে, তারা দুপুর বারোটার মধ্যে লালদিঘীর ময়দানে তাদের সমস্ত অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ক্যাপটেন ভূইয়া এবং ক্যাপটেন নাসের … (অস্পষ্ট) হাজির হন। তিনারা দুপুর বারোটা পর্যন্ত আপনাদের জন্য ওখানে অপেক্ষা করবেন। দুপুর বারোটার মধ্যে আপনারা সবাই নিজ নিজ অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে লালদিঘীর ময়দানে হাজির হয়ে যান। সেখানে ক্যাপটেন ভূইয়া ও ক্যাপটেন নাসের আপনাদেরকে আদেশ ও নির্দেশ দেবেন। অস্ত্রশস্ত্র পারতপক্ষে লুকিয়ে আনবেন-সাধারণ নাগরিক যাতে তা না দেখেন। আপনারা অস্ত্রশস্ত্র লুকিয়ে আনবেন। অস্ত্রশস্ত্র ছাড়া লালদিঘীর ময়দানে যাবেন না। যাদের হাতে অস্ত্রশস্ত্র আছে শুধু তারাই লালদিঘীর ময়দানে যেয়ে হাজির হবেন। অস্ত্রশস্ত্র ছাড়া কেউ ওখানে যাবেন না।

 

 

 

 

*এই অংশে টেপ অস্পষ্ট

 

 

 

 

 

 

 

<005.001.004>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

 

আর একটি বিশেষ ঘোষণাঃ কুমিরায় অবস্থানরত স্বাধীন বাংলা মুক্তিবাহিনীর সংগে ক্যাপটেন ভূইয়া- ক্যাপটেন ভূইয়া দ্বারা পরিচালিত স্বাধীন বাংলা মুক্তিবাহিনীর সংগে পাঞ্জাব রেজিমেন্টের যে সংঘর্ষ হয়েছিল, তাতে পাঞ্জাব রেজিমেন্টের তিনশত সিপাই নিহত হয়েছে। তারা এখন ছত্রভঙ্গ হয়ে এদিক-সেদিক ছড়িয়ে পড়েছে। কোন বেসামরিক নাগরিক তাদেরকে সাহায্য করবে না। পাঞ্জাবী কোন সৈনিককে বেসামরিক নাগরিক সাহায্য করবেন না। এখানেও স্বাধীন বাংলা মুক্তিবাহিনীর জয় হয়েছে। জয় বাংলা।

 

……স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে বলছি। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে বলছি। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে বলছি। স্বাধীন বাংলার বাসিন্দাদের উদ্দেশে আমাদের আবেদন, আপনারা কোন অবস্থাতেই বিভ্রান্ত হবেন না। আপনাদের উৎসাহ ও মনোবল অক্ষুণ্ণ রাখুন। শান্তি ও শৃংখলার সাথে প্রত্যেকটি স্বাধীন দেশের নাগরিক বাংলার মুক্তিবাহিনীর কাজে সহায়তা করুন। আমাদের মুক্তিবাহিনীর কর্মতৎপরতায় সমগ্র এলাকা মুখর। আমাদের ব্যবসায়ীরা তাদের দোকানপাট চালু করেছেন যাতে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সুলভে পাওয়া যায়। ঔষধপত্রের দোকানগুলো খোলা হচ্ছে। আপনারা যদি পরাজিত শক্রবাহিনীর তাদের সাথে কথা বলে তাদের ভাষা পরীক্ষা করবেন। তারা আমাদের বাঙালী সামরিক বিভাগের জোয়ানদের ওপর জুলুম করেছে। তাদের ক্ষমা নেই। ক্ষমা নেই। প্রতিশোধ! প্রতিশোধ নেবো! নেবো! আমাদের মুক্তিবাহিনী, কুমিরায় তিনশত বেঈমান পাঞ্জাবী জোয়ান যখন পালাচ্ছিল, ক্যাপটেন ভূইয়ার নেতৃত্বে সম্পূর্ণভাবে তাদের ধ্বংস করে দিয়েছে। জয় বাংলা। জয় বাংলা। জয় বাংলা।

দুশমনরা আমাদের মুক্তিবাহিনীর পোশাক পরে চোরের মত স্বাধীন বাংলাদেশ ছেড়ে বনে-জঙ্গলে পালিয়ে যাচ্ছে। সমস্ত বাংলাদেশের নাগরিকরা সজাগ দৃষ্টি রাখুন এই হানাদারদের ওপর। এদের যেখানেই পান, সাথে সাথে এদের ধরে উপযুক্ত শাস্তি দিন। এদের চেনার প্রথম উপায় হচ্ছে- যেখানে দেখেন বেশ দূরত্বে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে এদের সাথে কথা বলবেন, সামনে যাবেন না প্রথমে। সন্দেহজনক লোক দেখলে বেশ দূরত্ব থেকে কথা বলে এদের পরিচয় জেনে তারপরে যদি সন্তুষ্ট হন, ছেড়ে দেবেন। নয়তো হাতের আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করুন।

 

 

 

স্বাধীন বাংলা বেতার থেকে প্রচারিত খবর শুনুন

 

স্বাধীন বাংলার মুক্তিবাহিনী প্রধান ঘোষণা করেছেন, স্বাধীন বাংলার গ্রাম ও শহরের কোন ব্যক্তি যেন কোন প্রকার গুজবে কান না দেন বা কোন গুজবে বিভ্রান্ত না হন। কেননা, শত্রুসৈন্যরা ছদ্মবেশে শহরে ছড়িয়ে পড়ে এসব গুজব ছড়াতে পারে বলে তিনি জানিয়েছেন। আন্তর্জাতিক মানবতাবাদী সংস্থা স্বাধীন বাংলাদেশের নিরস্ত্র জনগণের ওপর হানাদার পাঞ্জাবীদের অমানুষিক অত্যাচারের তীব্র নিন্দা করেছেন। গত পাঁচদিন ধরে শত্রুসৈন্যরা পানি, খাদ্য, বিদ্যুৎবঞ্চিত হয়ে অবরুদ্ধ হয়ে আছে। তাদেরকে ভাতে পানিতে মারাই হচ্ছে উপযুক্ত প্রতিশোধ। এই উচিত সাজাই হবে তাদের প্রাপ্য। আসাম বেতার কেন্দ্রের খবরে প্রকাশ, কুখ্যাত এহিয়া সরকার বঙ্গবন্দু শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে খবর প্রচারের বহু পরে বেতারে শেখ মুজিবুর রহমানের কণ্ঠ শোনা গেছে। আমি আবার বলছি, আসাম বেতার কেন্দ্রের খবরে প্রকাশ, কুখ্যাত এহিয়া সরকার বঙ্গবন্দু শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে খবর প্রচারের বহু পরে বেতারে শেখ মুজিবুর রহমানের কণ্ঠ শোনা গেছে । শেখ মুজিবুর রহমান সম্পূর্ণ সুস্থ অবস্থায় বিপ্লবী পরিকল্পনা কেন্দ্রে অবস্থান করছেন। মুক্তিবাহিনী প্রধান

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<005.001.005>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

 

নির্দেশ দিয়েছেন- বেসামরিক লোক, যাঁরা অস্ত্রশস্ত্রের ব্যবহার জানেন না, তাঁদের হাতে যেসব অস্ত্রশস্ত্র আছে, তা প্রত্যেক জেলার ই-পি-আর বাহিনীর হাতে অবিলম্বে জমা দিতে হবে। পাঞ্জাব, সিন্ধু, বেলুচিস্তান, পাখতুনিস্তানে অবস্থানকারী সমস্ত সামরিক ও বেসামরিক বাঙালী লোকজন সম্প্রতি আশংকার কোন কারণ নেই বলে আসাম বেতার থেকে ঘোষণা করা হয়েছে।

মুক্তিবাহিনী প্রধানের খবরে প্রকাশ,নিহত টিক্কা খানের চারজন সহকারীও নিহত হয়েছে। এ খবর আপনারা শুনছেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে। প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের প্রধানমন্ত্রী মিসেস ইন্দিরা গান্ধী বলেছেন, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মিষ্টার শরন সিং পূর্ববাংলার উপর পশ্চিমাদের সামরিক হামলার পরিপ্রেক্ষিতে যে বিবৃতি দিয়েছেন তাতে কোন আবেগ প্রকাশ না করার অর্থ এই নয় যে, ভারতবাসীদের মনে বাঙালীদের প্রতি সহানুভূতি ও আবেগের অভাব রয়েছে এবং এ বিষয়কে গুরুত্ব দেয়ার অর্থই হচ্ছে তারা আমাদের প্রতি বিশেষ সহানুভূতিশীল। মিসেস গান্ধী স্বাধীন বাংলার মুক্তিকামী জনতার ওপর পাঞ্জাবী দস্যুদের ট্যাঙ্ক আক্রমণের তীব্র নিন্দা করেছেন।

ভয়েস অব আমেরিকার খবরে প্রকাশ, সীমান্ত প্রদেশ ও বেলুচিস্তান পাখতুনিস্তানের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে।

বাংলাদেশের সমস্ত সরকারী-বেসরকারী অফিস, আদালত সম্পূর্ণরূপে বন্ধ রয়েছে। এই সম্পর্কিত তথাকথিত পাকিস্তান রেডিওর খবর সর্বৈর মিথ্যা।

খবর শুনলেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে। আমাদের পরবর্তী ঘোষণার জন্য একটু অপেক্ষা করুন।

বাংলাদেশের সমস্ত পেট্রোল পাম্পের মালিকদের প্রতি এক নির্দেশে স্বাধীন বাংলার মুক্তিবাহিনী প্রধান ঘোষণা করেছেন, সামরিক বাহিনীর অনুমোদিত পরিচয়পত্র ছাড়া কেউ যেন কোন প্রাইভেট গাড়ীর জন্য পেট্রোল বিক্রি না করেন।

আমি আবার বলছি, বাংলাদেশের সমস্ত পেট্রোল পাম্পের মালিকদের প্রতি এক নির্দেশে স্বাধীন বাংলার মুক্তিবাহিনী প্রধান ঘোষণা করেছেন, সামরিক বাহিনীর অনুমোদিত পরিচয়পত্র ছাড়া কেউ যেন কোন প্রাইভেট গাড়ীর জন্য পেট্রোল বিক্রি না করেন। এই সংগে অন্যান্য নির্দেশ হচ্ছে, রাত্রে কেউ বাতি জ্বালাবেন না। কোন ঘরের আলো যেন আকাশ থেকে দেখা না যায়। সারা বাংলাদেশে সম্পূর্ণরূপে নিম্প্রদীপ থাকবে। স্বেচ্ছাসেবকরা প্রত্যেকটি গাড়ী চেক করবেন। বাংলাদেশের প্রত্যেকটি বিমানবন্দরের রানওয়ে যে-কোন ত্যাগের বিনিময়ে বিমান নামার পক্ষে অনুপযোগী করে তুলুন। রাত্রে কোন বেসামরিক স্বেচ্ছাসেবক কোন গোলাগুলির আওয়াজ করবেন না। কোন অবস্থাতেই কোন সক্ষম ব্যক্তি শহর ছেড়ে গ্রামে যাবেন না। ঘোষণাটি আবার পড়ছি … …

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অনুষ্ঠান সম্পর্কে বিশেষ ঘোষণা। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রর অনুষ্ঠান সম্পর্কে একটি বিশেষ ঘোষণাঃ

এখন থেকে আমরা প্রতিদিন নিয়মিত তিনটি অধিবেশন আমাদের সংগ্রামী জনতার উদ্দেশে প্রচারের ব্যবস্থা করেছি। প্রতিটি অধিবেশন আধঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টা পর্যন্ত স্থায়ী হবে। প্রতিদিন সকাল ন’টায় আমাদের প্রথম অধিবেশন শুরু করা হবে, বেলা একটায় দ্বিতীয় অধিবেশন ও সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় তৃতীয় অধিবেশন শুরু করা হবে। আবার বলছি … … … …

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<005.001.006>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

 

প্রত্যেক অধিবেশনে আপনারা খবর, দেশ-বিদেশের প্রতিক্রিয়া, সংগীত ইত্যাদি শুনতে পাবেন। মাঝে মাঝে বঙ্গবন্ধু ও স্বাধীন বাংলা মুক্তিবাহিনীর মেজর জিয়ার নির্দেশ শুনতে পাবেন। এছাড়া মুক্তিবাহিনীর বীর জোয়ান এবং বেসামরিক ব্যক্তিবিশেষের সংগে সাক্ষাৎকারও প্রচারিত হবে।

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে বিশেষ ঘোষণা ও খবর প্রচার শেষ হলো। জয় বাংলা।

 

 

বাংলাদেশের স্বাধীনতা বাহিনী- আমি এখন বাংলাদেশ স্বাধীনতা বাহিনীর মেজর জিয়ার পক্ষ থেকে একটি বাণী প্রচার করবো। এতে বলা- এ কথা প্রচারিত হচ্ছে যে আরও পাকিস্তানি পাঞ্জাবী সেনাবহর ও অস্ত্রশস্ত্র চট্টগ্রাম ও ঢাকায় নিয়ে আসা হচ্ছে সাগর ও আকাশপথে। তাই-আমি, বাংলাদেশের জনগণের পক্ষ থেকে বিশ্বের সকল শান্তিপ্রিয় দেশগুলোকে অনুরোধ জানাচ্ছি “স্বাধীন বাংলাদেশ” এর স্বীকৃতি প্রদানের জন্য এবং গণতান্ত্রিক মানসিকতালব্ধ বাংলাদেশের মানুষকে স্বাধীনতা প্রদানের জন্য সকল প্রকার বাস্তবিক সহায়তা বৃদ্ধি করতে। এমতাবস্থায় আমি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছত্রচ্ছায়ায় নিজেকে স্বাধীন বাংলা মুক্তি সরকারের ভারপ্রাপ্ত প্রধান বলে ঘোষণা করছি। আমি বাংলাদেশের জনগণকে এই স্বাধীনতা যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য অনুরোধ জানাচ্ছি। আমি আবারও বলছি…

সমস্ত পেট্রল পাম্পের মালিকদের প্রতি-যারা গাড়ী চালানো জানেন, তারা অবি লম্বে রেষ্ট হাউজে আওয়ামী লীগ অফিসে গিয়ে উপস্থিত হোন।

 

… … (নারীকণ্ঠ)- বাংলাদেশকে মুক্ত করার জন্য বাংলার সব পুরুষেরা ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। এদের সাহস ও উৎসাহ যোগাতে হবে আমাদের নিজ নিজ ঘরে শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখুন, এ সংগ্রাম চালিয়ে যেতে বাড়িতে পুরুষদের উজ্জীবিত করে প্রমাণ করুন- এ সংগ্রাম শুধু বাংলার পুরুষদের নয়, মা-বোনেরাও ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। আপনারা প্রমাণ করুন প্রতিটি বাঙালী ললনা বীর নওজোয়ানদের মা-বোন,বীরাঙ্গনা। আপনারা বগীর হাংগামার সময় যেভাবে হানাদার বর্গীদের বিরুদ্ধে তেজের সংগে রুখে দাঁড়িয়েছেন, রাস্তায় রাস্তায় বেরিয়ে পড়ে প্রতিবাদের ঝড় তুলেছেন, তা এখন বৃথা যেতে দেবেন না। আপনারা সবক্ষেত্রে প্রাণপণ সাহায্য করুন। প্রতিটি ঘরে দুর্গ তৈরী হরেছেন, আজ দেশদ্রোহী পাঞ্জাবীদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। আপনাদের সন্তানদের প্রেরণা দিন, সাহস দিন, তাদেরকে অস্ত্র হাতে বেরিয়ে পড়তে দিন। আপনাদের কোন ভয় নেই। আমাদের স্বাধীন বাংলা মুক্তিবাহিনীর তৎপরতায় সারা বাংলাদেশ এখন আমাদের হাতে আমাদেরই আছে, আমাদের কাছে। আপনারা এদেশ রক্ষা করুন, আপনারাও রক্ষার কাজে পার্টিসিপেট করুন, অংশগ্রহণ করুনঅংশ নিন। আপনারা মুক্তিবাহিনীর জোয়ানদের সব রকমের সহায়তা করুন। আল্লাহর অনুগ্রহে আমাদের জয় সুনিশ্চিত। জয় ন্যায়ের ও বিনাশ অন্যায়ের হবেই হবে, এ আমাদের মনে রাখতেই হবে। জয় বাংলা। … …

 

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে অনুষ্ঠান প্রচার এখনকার মত এখানেই শেষ হচ্ছে। আবার আমরা আপনাদের সম্মুখে উপস্থিত হবো সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায়।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<005.001.007>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

 

স্বাধীন বাংলা বেতার থেকে প্রচারিত অনুষ্ঠান শুনছেন।

স্বাধীন বাংলার ভাই-বোনেরা, আসসালামু আলায়কুম

 

মহান জননায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলার স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন । সারা বাংলাদেশে আজ যুদ্ধাবস্থা বিরাজমান। চিরাচরিত প্রথায় বাংলার জনসম্পদ লুণ্ঠন করার ঘৃণ্য মানসিকতা বর্জন করতে না পেরে এখনও শোষণ অব্যাহত রাখতে চায় ওরা। তাই তার সকল ন্যায়নীতি বিসর্জন দিয়ে পৈশাচিকভাবে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে সাড়ে সাত কোটি বাঙালীকে সর্বপ্রকার অধিকার থেকে বঞ্চিত রাখতে বদ্ধপরিকর এবং বাংলাদেশসহ সমগ্র পৃথিবী আজ স্তম্ভিত সামরিক শক্তির এহেন জঘন্যভাবে প্রয়োগ পৃথিবীর ইতিহাসের আর দ্বিতীয় নজীর নেই। আজ সারাদেশ সামরিক শক্তির দাপটে এবং নারকীয় হত্যাকাণ্ডে ক্ষতবিক্ষত। স্বাধীন বিপ্লবী জনসাধারণ*…….. হেনে তাদের জীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছে। ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় স্বাধীন বাংলার মুক্তিযোদ্ধাদের প্রচণ্ড আক্রমণে হানাদার তস্করের দল প্রায় দিশেহারা হয়ে পড়েছে। এই অবস্থায় এ শত্রুবাহিনী তাদের শক্তি বাড়াবার উদ্দেশ্যে অনবরত হেলিকপ্টার ব্যবহার করছে। কুমিল্লা থেকে সৈন্য এনে তারা তাদের শক্তিকে মজবুত করতে চাইছে। ই-পি-আর ও অন্যান্য শক্তি তাদের মোকাবিলায় প্রচণ্ডভাবে যুদ্ধ চালিয়ে তুমুল যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ুন। হানাদারদের যাতয়াতের পথ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দিন। শত্রুসেনা শহরে প্রবেশ করতে চাইলে সুবিধা মত স্থানে অবস্থান করে মরিচের গুড়া, সোডা ও অন্যান্য জিনিসপত্র ছড়িয়ে দিন, হাতবোমা নিক্ষেপ করুন। গ্রামের ভাইদের কাছে আমাদের আবেদন, দলে দলে শহর অভিমুখে অগ্রসর হোন এবং ক্যান্টনমেন্ট দখল করার কাজে লিপ্ত মুক্তিসেনাদের সর্বতোভাবে সাহায্য করুন। শহরের ভাইদের কাছে আবেদন, আপনারা দলে দলে আন্দোলনকে সফলকাম করে তুলুন। বন্ধুগণ!……….

 

আজকে আমরা দেখতে পাই, নিরপরাধ নিরীহ নিরস্ত্র জনগণের ওপর যেভাবে অত্যাচার চালিয়ে যাচ্ছে, দেখামাত্র গুলি করছে, হাজার হাজার মানুষ আজকে মৃত্যুবরণ করছে তার নজির এ বিশ্বের ইতিহাসে নেই। জানাবো, আপনারা এই নারকীয় হত্যাকাণ্ড দেখেও চুপ করে থাকবেন না। আসুন বিশ্ববাসী, সাড়ে সাত কোটি এই পূর্ব পাকিস্তানী ভাইদের বাঁচানোর জন্য আপনারা আমাদের সাহায্য করতে অগ্রসর হোন। বিশ্ববাসীর কাছে আবেদন জানাই- আপনারা মানবতার খাতিরে, মানুষকে বাঁচাবার তাগিদে, বাংলার জনগণের মুক্তির জন্য অগ্রসর হোন। হে বিশ্বের অধিবাসী তোমরা দেখ, কিভাবে পশ্চিমা এই গণবিরোধী শক্তি,এই শোষক শ্রেণীর প্রতিভূ পশ্চিম- এই সাম্রাজ্যবাদীদের দালালেরা পূর্ব পাকিস্তানকে শোষণ করবার উদ্দেশ্যে কিভাবে তাদের নারকীয় হত্যাকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। তাই প্রতিবেশী রাষ্ট্রসমূহের কাছে আহবান জানাই, আপনারা চুপ করে থাকবেন না, আসুন আমাদের সর্বপ্রকার সাহায্য করুন। বন্ধুগণ, আমি সারা বাংলার স্বাধীন বাংলার জনগণের কাছে আহবান জানাবো, বাঙালী ভাইয়েরা, আপনারা তুমুল সংগ্রামে নিজেদেরকে শরিক করুন এবং হানাদার দুশমনদের খতম করুন। যেখানে যে যে অবস্থায় আছেন, যার হাতে যে অস্ত্র আছে, সেই অস্ত্র তুলে নিন। মা-বোন বাপ-ভায়েরা বসে থাকবেন না। রাস্তায় বার হন এবং সুবিধামত স্থানে অবস্থান করে শত্রুসেনাদের ঘায়েল করুন। মারাত্মকভাবে আঘাত হানুন। আঘাতের পর আঘাত হেনে বাংলাকে মুক্ত করুন। স্বাধীন বাংলার পতাকা উড়বে- এদিন আর সুদূরপরাহত নয়। পরিশেষে আমি জনগণকে আহবান জানাবো, এই দেশ এই দেশের মহামান্য জননেতা, বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষের প্রাণের দেবতা, বাংলার নয়নের করবে না এবং কোন মার্শাল ল’ বাঙালীরা মানে না। আমি আহবান জানাবো- বাংলার প্রতিটি নরনারী সকলের কাছে-আপনারা মার্শাল ল’ মানবেন

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

টেপ অস্পষ্ট

 

<005.001.008>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

 

না, মার্শাল ল’র আইনই আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। আমরা স্বাধীন বাংলার নাগরিক। স্বাধীন বাংলার মহান জননায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নির্দেশ আমাদের শিরোধার্য। জয় বাংলা স্বাধীন বাংলা-জয়। …

 

 

 

……অনুষ্ঠান শুনছেন স্বাধীন বাংলা বেতার থেকে। আমাদের পরবর্তী অনুষ্ঠান বাংলা খবর।

 

স্বাধীন বাংলাদেশের বিপ্লবী বেতার থেকে খবর বলছি। আমাদের বিপ্লবী গণবাহিনী শত্রুর দুর্ধর্ষ আক্রমণকে প্রতিহত করে সম্মুখের দিকে এগিয়ে চলছে। বাংলাদেশের অধিকাংশ সামরিক ঘাঁটিতে এখন বাংলাদেশের পতাকা উড়ছে। সামরিক বিধি-বিধান, ভয়-ভীতি সবকিছুকে তুচ্ছ করে আমাদের বিপ্লবী বাঙালী সৈন্যবাহিনী শত্রুদের হটিয়ে চলছে। বাংলাদেশের মানুষের সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টার ফলে বাংলার মাটি আজ দুর্জয় ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছে। ঢাকা, কুমিল্লা, দিনাজপুর, রংপুর, পাবনা, চট্টগ্রাম এবং আরও কয়েকটি জেলায় সামরিক ঘাঁটি আমাদের বেঙ্গল রেজিমেন্টের হাতে এসে গেছে। দুনিয়ার সমস্ত মানবতার সহায়তা আমরা পাচ্ছি। খবর শুনছেন স্বাধীন বাংলাদেশের বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র থেকে। আমাদের বীর সেনানীরা বিপুল বিক্রমে দুশমন সৈন্যকে প্রতিহত করে চলছে। বাংলাদেশের ঘরে ঘরে মুক্তির আগুন জ্বলছে দাউ দাউ করে। বাংলাদেশের প্রত্যেকটি থানার পুলিশ বাহিনী আমাদের সাথে লড়ছেন। ই-পি-আর বাহিনী, বেঙ্গল রেজিমেন্ট, বাংলার বীর স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী, বাংলার মা-বোনেরা, বাংলার যুবক সম্প্রদায় প্রত্যেকে ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাও করে আছেন। স্বাধীন বাংলা বেতার থেকে আজকের মত খবর এখানে শেষ করছি। জয় বাংলা।

স্বাধীন বাংলা বেতার থেকে আমাদের বিশেষ অনুষ্ঠান আজকের মত এখানেই শেষ হলো। আল্লাহ আমাদের সহায় হউন। জয় বাংলা।

 

 

 

শত্রুবাহিনী উপায়ন্তর না দেখে ট্যাঙ্ক ও মারাত্মক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়েছে, আঘাত হানার চেষ্টা করছে। চট্টগ্রামের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বাঙালীদের আয়ত্তে (একজনের হাততালি ও বাহবা) কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট দখল করে ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট সৈন্যবাহিনী ইতিমধ্যেই চট্টগ্রামে পৌঁছে গেছে। এদেশের অন্যান্য সকল স্থান বাঙালীদের সম্পূর্ণ আয়ত্তাধীনে এসে গেছে। বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র থেকে বলছি। স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র। এখন খবর পড়ছি-

 

বাংলাদেশের পথে পথে মুক্তিবাহিনীর সাথে পাকিস্তানী হানাদার সৈন্যদের প্রচণ্ড লড়াই চলছে। স্বাধীন বাংলার বিপ্লবী সৈন্যবাহিনী ও পুলিশ জনতার সাহায্য নিয়ে আক্রমণের পর আক্রমণ করে চলেছে। ঢাকার সর্বশেষ প্রাপ্ত খবরে প্রকাশ, পাকিস্তান হানাদার সেনাবাহিনীর কর্মাধ্যক্ষ টিক্কা খান দলবলসহ নিহত হয়েছেন। কিছুক্ষণ পূর্বে হানাদার সৈন্যদের মুখপত্র পানিস্তান রেডিও থেকে যে খবর পৌঁছেছে যে শেখ মুজিব ধৃত হয়েছেন, সেটা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও উদ্দেশ্যমূলক। টিক্কা খান তার দলবলসহ নিহত হয়েছেন। কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট সম্পূর্ণভাবে বাঙালীদের আয়ত্তাধীন। কুমিল্লা থেকে একদল সৈন্য চট্টগ্রামের পথে পালাবার সময় বাংলার বিপ্লবী ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, ই-পি-আর ও পুলিশ বাহিনী তাদের সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিয়েছে ও তারা এখন তাদের আক্রমণের মুখে টিকে থাকতে না পেরে বিভিন্ন অবস্থায় পালিয়ে রয়েছে। তাই বঙ্গবন্ধু এক নির্দেশ জারি করেছেন যে পলায়িত সৈন্যরা যাতে কোনক্রমেই রেহাই না পেতে পারে। চট্টগ্রামের অবস্থা সম্পূর্ণভাবে বাঙালী সৈন্যদের আয়ত্তাধীন। চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টের হানাদার পাকিস্তানী সৈন্য বিভিন্ন অবস্থানে লুকিয়ে রয়েছে। চট্টগ্রামের বীর জনতা, বেঙ্গল রেজিমেন্ট, ই-পি-আর, পুলিশ তাদের ধ্বংস করে দেয়ার কাজে লিপ্ত রয়েছে। গতকাল চট্টগ্রামের বিভিন্ন অবস্থান থেকে হানাদার বাহিনীর উপর প্রচণ্ড আক্রমণ চালানো হয় এবং এতে করে

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<005.001.009>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

 

হানাদার বাহিনীর বেশ কয়েকটা ঘাঁটি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। যশোর, রংপুর সিলেট এসব শহরেও এখন পর্যন্ত প্রচণ্ড গোলাগুলি চলছে এবং হানাদার সৈন্যদের এখন মূল লক্ষ্যস্থল হলো বেতার কেন্দ্রগুলো। তারা বেতার কেন্দ্রগুলো দখল করে সেখান থেকে ভুয়া প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছে। কিন্তু বাংলার বীর জনতা তাতে মোটেই বিভ্রান্ত না হয়ে তাদের যুদ্ধ অব্যাহত রেখেছেন। ঢাকার পথে পথে এখন মুক্তিসেনা এবং বেংগল রেজিমেন্ট, ই-পি-আর ও পুলিশদের সাথে হানাদার সৈন্যদের প্রচণ্ড লড়াই চলছে এবং সর্বশেষ প্রাপ্ত খবরে প্রকাশ, টিক্কা খান তার দলবল সহ নিহত হয়েছেন। সারা বাংলাদেশে পাকিস্তানী হানাদার সৈন্যের নির্দেশ অমান্য করে জনসাধারণ স্বাধীন বাংলার পাহারাদার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নির্দেশক্রমে চলছেন এবং তারা বঙ্গবন্ধু প্রদত্ত প্রত্যেকটি নির্দেশকে হুবহু মেনে চলছেন। স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দ ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব জাতিসংঘের কাছে এক আহবানে বলেছেন, যেহেতু পাকিস্তানী হানাদার সৈন্যরা বাংলাদেশ আক্রমণ করেছে তাই জাতিসংঘের এখন উচিত বিদেশী সৈন্যদের বাংলাদেশ থেকে হটানোর ব্যাপারে বাংলার মুক্তিকামী মানুষকে সহযোগিতা করা। আপনারা এ খবর শুনছেন স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র থেকে।

টিক্কা খান সদলবলে নিহত হয়েছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে তার নির্দেশ জারি করে চলেছেন। তার সর্বশেষ নির্দেশ হলো যে, আপনারা জনসাধারণ যে যেখানে আছেন সেখান থেকেই পশ্চিমা সেনাবাহিনীর অবস্থান নির্দেশ করুন। এবং পশ্চিমা সেনাবাহিনী কোথায় আছে সেটা জেনে তাদের ধ্বংসকাজে লিপ্ত থাকুন। ই-পি-আর, বেংগল রেজিমেন্ট ও পুলিশ বাহিনীকে খাদ্য-পানীয় দিয়ে সর্বাত্মক সহযোগিতা করুন। যার ঘরে যা আছে, বন্দুক, পিস্তল, রিভলভার, প্রয়োজনবোধে সেটা ই-পি-আর অথবা বেংগল রেজিমেন্টের হাতে তুলে দিন আর আপনারা যারা চালানো জানেন তারাও তৈরী হয়ে থাকুন এবং যেখানে পশ্চিমা সেনাবাহিনী দেখবেন তাদের উপর আক্রমণ করুন। তবে একটি জিনিস মনে রাখবেন যে, কোথাও বাংগালী বা অন্য কেথাও কোন সৈন্য দেখা গেলে তার প্রতি গুলি করবেন না এবং এসব করার আগে ই-পি-আর, বেংগল রেজিমেন্ট অথবা পুলিশ বাহিনীর সাথে যোগাযোগ করুন। গত রাত্রেও সারা বাংলাদেশের উপর নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চলেছে কিন্তু বাংলার বিপ্লবী বীর জনতা পশ্চিমা হানাদার সৈন্যদের উপর আঘাতের পর আঘাত হেনে চলেছে। স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বিদেশের কাছে এক আবেদনে জানিয়েছেন যে, পাকিস্তানী হানাদার সৈন্যরা বাংলাদেশ আক্রমণ করে এটাকে দখল করে নিতে চাইছে। তাই প্রত্যেকটি দেশের উচিত এ অবস্থায় বাংলাদেশকে সহযোগিতা ও সাহায্য করা এবং পাকিস্তানের হানাদার বাহিনীর উপর চাপ সৃষ্টি করা যাতে করে তারা অবিলম্বে এখান থেকে চলে যেতে বাধ্য হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব আর এক নির্দেশে এ কথাও জানিয়েছেন যে … পাকিস্তানী সৈন্য যারা যেখানে আছেন তারা যদি আত্মসমর্পণ করেন তাহলে তাদেরকে ক্ষমা প্রদর্শন করা যেতে পারে। অন্যথায় বাংলার মাটি থেকে তাদের সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিহ্ন করে দেয়া হবে এবং যাতে করে তারা বাংলাদেশ থেকে পালাতে না পারে তারও সম্পূর্ণ নির্দেশ তিনি জারি করেছেন। জয় বাংলা। বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র থেকে খবর প্রচার আপাতত এখানে শেষ হলো।

 

স্বাধীন বাংলা বেতার থেকে প্রচারিত একটি ঘোষণা। আমাদের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন। এখন বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র। স্বাধীনতা ঘোষণার পরপরই পাকিস্তানী বিপক্ষ শক্তি পাগলা কুকুরের মতো আচরণ করছে এবং গণহত্যা চালিয়ে যাচ্ছে, এভাবে বাংলাদেশে ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের সাহসী মানুষেরা শেখ মুজিবের নেতৃত্বে পাকিস্তানিদের দেশছাড়া করার জন্য লড়ে যাচ্ছে। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, ইস্ট বেঙ্গল রাইফেলস ও পুলিশ বাহিনীর সাথে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ মিলে তাদের প্রতিহত ও প্রতিআঘাত করছে সারা বাংলাদেশজুড়ে। চট্টগ্রাম পুরোপুরি বাংলা রেজিমেন্টের দখলে চলে এসেছে পাশাপাশি কুমিল্লা, রাজশাহী, সিলেট, যশোর ও রংপুরও । ঢাকায় তীব্র যুদ্ধ হচ্ছে এবং আমাদের সাহসী যোদ্ধারা বিজয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

 

 

 

 

 

 

 

 

<005.001.010>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

আমরা শহরে ও সদরে অবস্থানরত সবাইকে অনুরোধ করবো শহর ছেড়ে না যেতে এবং তাদের যা কিছু আছে তা দিয়েই শত্রুপক্ষের আসার সম্ভাবনা আছে এমন রাস্তার প্রতিটি মোড়ে মোড়ে ব্যারিকেড দিয়ে রাখার প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে। তাদের এক ইঞ্চিও আগাতে দেয়া যাবে না বাঁধা ছাড়া। গ্রামের সকল মানুষ যাদের কাছে যেকোনোপ্রকার আগ্নেয়াস্ত্র আছে তাদের শহরের দিকে আসার জন্য অনুরোধ করা যাচ্ছে। সর্বসাধারণকেই অনুরোধ করা যাচ্ছে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়ার জন্য, বিশেষ করে খাবার দিয়ে আমাদের সাহসী যোদ্ধাদের সহায়তা করার জন্য।

এখন, স্বাধীন বাংলাদেশের তরফ থেকে বিশ্বের সকল শান্তিপ্রিয় দেশ, বিশেষ করে আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোর কাছে যতটুকু সম্ভব সাহায্য প্রার্থনা করছি যেন আমরা আমাদের দেশকে আমাদের করে নিতে পারি। আমরা বিশ্বের ক্ষমতাবান শক্তিদের হস্তক্ষেপ আশা করছি এবং সাড়ে সাত কোটি মানুষ যেন অবিচার, কষ্ট, আইনি অধিকার থেকে বঞ্চনা ও শোষণ এবং পাকিস্তানী শক্তির অত্যাচার থেকে মুক্ত হতে পারে সেটি দেখতে বলছি। আমরা আরও অনুরোধ জানাই জাতিসঙ্ঘকে তড়িৎ…

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<005.002.011>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

শিরোনাম সূত্র তারিখ

২। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র

প্রচারিত আরও অনুষ্ঠান

১। বেতার বাংলা’

১৬ ডিসেম্বর ১৯৭৯

২ ও ৩। শব্দসৈনিক’ ফেব্রুয়ারী, ১৯৭২

২৬ ও ২৮ মার্চ এবং

২১ এপ্রিল, ১৯৭১

 

১.

২৬ শে মার্চের অনুষ্ঠান থেকে

আবদুস সালাম

“নাহমাদুহু ওয়ানুসাল্লীয়ালা রাসুলিহীল কারিম”

 

 

আসসালামু আলায়কুম,

প্রিয় বাংলার বীর জননীর বিপ্লবী সন্তানেরা। স্বাধীনতাহীন জীবনকে ইসলাম ধিক্কার দিয়েছে। আমরা আজ শোষক প্রভুতুলোভীদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়েছি। এ গৌরবোজ্জ্বল স্বাধিকার আদায়ের যুদ্ধে, স্বাধীনতার যুদ্ধে, আমাদের ভবিষ্যৎ জাতির মুক্তিযুদ্ধে মরণকে বরণ করে যে জানমাল কোরবানী দিচ্ছি, কোরআনে করিমের ঘোষণা-তারা মৃত নহে, অমর।

 

দেশবাসী ভাইবোনেরা, আজ আমরা বাংলার স্বাধীনতার সংগ্রাম করছি।

 

আল্লার ফজল করমে বাংলার আপামর নরনারী আমাদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সংগ্রাম করে চলেছেন। আর সবখানে আমাদের কর্তৃত্ব চলছে। আমরা যারা সংগ্রামে লিপ্ত রয়েছি- তাঁদের আপনারা সকল প্রকার সহযোগিতা দিন। এমন কি খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারেও সহাযতা দিন। স্মরণ রাখবেন দুশমনরা মরণকামড় দিয়েছে। তাদের এ সোনার বাংলাকে সহজে তাদের শোষণ থেকে মুক্তি দিতে চাইছে না। কোন অবাঙালী সৈনিকের কাজেই সাহায্য করবেন না।

 

মরণ তো মানুষের একবার। বীর বাংলার বীর সন্তানেরা শৃগাল-কুকুরের মতো মরতে জানে না। মরলে শহীদ, বাঁচলে গাজী।

 

কোন গুজবে কান দেবেন না। খালি হাতে কয়েকজন মিলে কোন পশ্চিমা মিলিটারীর মোকাবেলা করবেন না। ওরা আমাদের দেশে এসে আমাদের খেয়েই শক্তি যুগিয়ে আমাদের নির্বিচারে হত্যা করবে- তা হতে পারে না। দশজনে হলেও একজনকে খতম করুন। সমস্ত প্রকার অস্ত্র নিয়ে প্রস্তুত থাকুন। যারা নিরস্ত্র তারা অন্তত সোডার বোতল, বাজি প্রস্তুতকারীরা মরিচের গুড়ার ঠোঙ্গা বানায়ে ওদের প্রতি নিক্ষেপ করলে টিয়ার গ্যাসের কাজ করবে। বিজলী বাতির বাল্বে এসিড ভরে তাও নিক্ষেপ করুন। একেবারে খালি হাতে থাকবেন না। মরবেন তো মেরেই ইতিহাস সৃষ্টি করুন।

 

“নাছরুম মিনাল্লাহে ওয়া ফাতহুন কারিব” । আল্লাহর সাহায্য ও জয় নিকটবর্তী।।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<005.002.012>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

২.

 

 

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের প্রথম কথিকা

বেলাল মোহাম্মদ

কবির ভাষায়ঃ

 

‘স্বাধীনতা হীনতায় কে বাঁচিতে চায় রে

কে বাঁচিতে চায়

দাসত্ব শৃংখল বলো কে পরিবে পায় রে

কে পরিবে পায়।’

দাসত্বের শৃংখল ভেঙ্গেছে সাড়ে সাত কোটি বাঙালী। স্বাধীনতাবঞ্চিত জীবন থেকে তারা স্বাধীন জীবনের জয়যাত্রার পথে এগিয়ে চলেছে। এই এগিয়ে চলার পথ দুর্গম, দুর্বার। এই যাত্রাপথে কোনো শাসক-শোষকের দমননীতি, কোনো অশুভ শক্তির বিধিনিষেধ সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত জীবনজয়ের অভিযাত্রীদের কে বাধা দেবে? কে এই অভিযাত্রীদের পথ রোধ করে দাঁড়াবে? সেই সাধ্য কারুর নেই, সেই দুঃসাহস দেখাবার সকল ‘পশ্চিম পাকিস্তানী দাপট আজ ছিন্ন-ভিন্ন, পর্যুদস্ত।

 

ভাবতে অবাক লাগে, তেইশ-তেইশটি বছর কিভাবে সেই তথাকথিত পাকিস্তান সরকার বাংলার মাবোন, বাংলার শিশুবৃদ্ধ, বাংলার কৃষক-শ্রমিক, জেলে-তাঁতী কামার-কুমার-মেহনতি মানুষের ওপর অত্যাচারের ষ্টীম রোলার চালিয়েছে। আমার সন্তানের দুধ ওরা কেড়ে খেয়েছে, আমাদের ক্ষেতের ফসল ওরা লুটে নিয়েছে, ওরা আমাদের মা-বোনের ইজ্জত নষ্ট করেছে, তথাকথিত সংহতির ধুয়া তুলে ওরা আমাদের নিরীহ জনপদের ওপর শাসনের নামে চালিয়ে গেছে শোষণ।

 

বাংলার মানুষকে ওরা লাঞ্ছনা-গঞ্জনা আর অবহেলা দিয়ে দিয়ে নিজেদের জাতিগত দুশ্চরিত্রেরই পরিচয় দিয়েছে।

 

আজকের স্বাধীন বাংলার পথে-ঘাটে দেখতে পাওয়া যায় বীর জনতার গড়া স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিরোধ ব্যবস্থা। পশ্চিম পাকিস্তানী গুপ্তচর, বর্বর সৈন্যদের প্রত্যেক প্রবেশপথ আজ রুদ্ধ। ওদেরকে যেখানেই দেখা যাচ্ছে, স্বাধীন বাংলা মুক্তিবাহিনীর রাইফেল গর্জে উঠছে, এফোঁড়-ওফোঁড় করে চলে যাচ্ছে বুলেট- আজ ধরাশায়ী হচ্ছে এক-একটি হানাদার দুশমন। ওদের ক্ষমা নেই- ক্ষমা নেই। স্বাধীন বাংলার প্রতিটি গৃহ এক-একটি দুর্ভেদ্য দুর্গ। আমাদের মা-বোনেরাও আর নিক্রিয় হয়ে নেই। প্রত্যেকেই সশস্ত্র। দুশমনকে উচিত সাজা দেবার জন্যে নারী-পুরুষ শিশু-বৃদ্ধ সবাই সদা প্রস্তুত।

 

বাঙালী আজ জেগেছে। দাসত্বের শৃংখল ভেঙ্গে বেরিয়ে এসেছে তারা –

‘এবার বন্দী বুঝেছে,

মধুর প্রাণের চাইতে ত্রাণ

মুক্তকণ্ঠে স্বাধীন বিশ্বে

উঠিতেছে এক তান;

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<005.002.013>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

 

জয় নিপীড়িত জনগণ জয়

জয় নব অভিযান

জয় নব উত্থান।’

জয় স্বাধীন বাংলা।

প্রচারঃ ২৮-৩-৭১

৩.

 

 

সাম্প্রদায়িকতাঃ সামন্তবাদ প্রসঙ্গ *

মোস্তফা আনোয়ার

সামন্তবাদ সভ্যতার ইতিহাসে একটি মৃত অধ্যায়। বাংলাদেশেও একদিন ছিলো সামন্ততন্ত্র ছিলো জমিদারের শাসন ও শোষণ। এই জমিদারদের ছিল দুর্দান্ত প্ৰতাপ। পরগাছার মত এই জমিদার-শ্রেণী বেঁচে ছিল লাঞ্ছিত-নিপীড়িত মানুষের রক্ত শোষণ করে। এই জমিদাররা নিজেরাই এক জাতি-নিজেরাই একটা শ্রেণী। এরা হিন্দুও নয়, মুসলমানও নয়। এরা রক্তপায়ী এক জীব। এরা দরিদ্র মুসলমান কৃষককে শোষণ করেছে-নিরন্ন হিন্দু কৃষককেও ক্ষমা করেনি। এদের রক্তলোলুপ থাবা থেকে কেউ-ই রেহাই পায়নি। সম্পর্কটি ছিলো জমিদার ও কৃষকের মধ্যে শোষক ও শোষিতের সম্পর্ক- হিন্দু-মুসলমানের সম্পর্ক নয়। হিন্দু জমিদারের মধ্যে যেটা কাজ করেছে সেটা শ্রেণীস্বর্থ-জমিদাররূপে অত্যাচারিত কৃষকের রক্ত-পানের উদগ্র নেশা।

 

হিন্দু বা মুসলমান জমিদারদের অত্যাচারের এটাই বাস্তব চিত্র। শুধু বাংলাদেশে কেন সমগ্র বিশ্বে সামন্ততন্ত্রের এটাই আসল চেহারা। রাশিয়ায় বা আমেরিকায় এই সামন্ত প্ৰভুদের অত্যাচারের কাহিনী রক্তলেখায় লেখা আছে ইতহাসে ও সাহিত্যে।

 

(বিশ্বের প্রতিটি দেশে সাধারণ মানুষ অত্যাচারিত, লাঞ্ছিত, নিপীড়িত হয়েছে এই জমিদার শোষকগোষ্ঠী দ্বারা। কিন্তু এই অমানিশারও শেষ আছে। মানুষের মুক্তির সূর্যোদয় অবশ্যম্ভাবী। অত্যাচারিত মানুষ জেগেছে। ঘুম ভেঙ্গেছে দৈত্যপুরীর রাজকন্যার। অবশেষে কবর রচিত হয়েছে সামন্ততন্ত্রের। অত্যাচার আর নিপীড়নের হয়েছে অবসান। শোষণহীণ গণতান্ত্রিক সমাজ গঠন করেছে সংগ্রামী মানুষ।)

 

আমরা আগেই বলেছি, সামন্তবাদ বা জমিদারতন্ত্র সভ্যতার ইতিহাসে একটি মৃত অধ্যায়-যাদুঘরের সামগ্ৰী। যে জমিদার অত্যাচার করেছিলো, সে জমিদার শেষ হয়েছে। নিশ্চিহ্ন হয়েছে এই রক্তাপায়ী জোঁক শ্রেণী। ব্যাপারটি হচ্ছে শ্রেণী-সংঘর্ষের- হিন্দ-মুসলমানের নয়। বরং সর্বহারা কৃষকের জয় ঘোষিত হয়েছে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র পত্তনের মধ্য দিয়ে। বাংলাদেশের দরিদ্র কৃষকের দুঃখের অবসান হয়েছিল। বাংলার কৃষকের চোখে নেমেছিলো নতুন ফসলের আশা। বাংলার কৃষক দুর্ভিক্ষ দেখেছে। দেখেছে জলোচ্ছাসের ভীষণ তাণ্ডবলীলা, দেখেছে প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণির বিধ্বংসকে। তবু সে বুক বেঁধে দাঁড়িয়েছে প্রতিবার। পদ্মাপারের মানুষ ধ্বংসকে ভয় করে না, তার হাতে আছে দুর্জয় সৃষ্টির মন্ত্র।

 

কিন্তু এতবড় দুর্যোগ কি কেউ কোনোদিনও দেখেছে? নিজের দেশে, নিজের ঘামঝরানো পয়সায় কেনা গুলি এসে বিধে নিজেরই বুকে। কারা চালালো গুলি? হিন্দু জমিদার-নাকি সেই দস্যু বর্বর পশ্চিম পাকিস্তানী হানাদার?

 

 

 

 

 

 

 

 

 

চট্টগ্রাম সীমান্তবর্তী মুক্তাঞ্চলে দ্বিতীয় পর্যায়ে স্থাপিত বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত

 

<005.002.014>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

 

কারা পুড়িয়ে দিলো কৃষকের সাজানো সবুজ ক্ষেতকে- কারা কামান ও গোলায় গুড়িয়ে দিলো কৃষকের কুটির- কারা কেড়ে নিলো নবান্নের উৎসব- কারা, কারা, তারা কারা?

ইতিহাসের কবর থেকে উঠিয়ে আনা হচ্ছে জমিদারকে । জমিদার তো অত্যাচার করাই ছিল আর তার শাস্তিও পেয়েছে গণ-মানুষের হাতে। কিন্তু তোমাদের শাস্তির দিনও যে দ্রুত ঘনিয়ে আসছে- তা কি জানো?

তোমরা কি ভেবেছ জমিদার ও কৃষকের শ্রেণী-সংঘাতের ইতিহাসটি মুছে দিয়ে আজকের জাগ্রত শ্রেণীসচেতন মানুষকে সাম্প্রদায়িতার ভাঁওতায় ভোলাতে পারবে? ইতিহাসের ভুল ব্যাখ্যা করে দাঙ্গাবাজ রাজনীতি এদেশের মাটিতে আজ অচল।

আজ প্রতিটি বাঙালী জানে, এ যুদ্ধ তার বাঁচার জন্য। এ যুদ্ধ তার চিরদাসত্বের নিগড় থেকে মুক্তির জন্য। বাঙালীর মুক্তিযুদ্ধকে তাই ইতিহাসের কবরে পচে যাওয়া সাম্প্রদায়িকতার বিষে ঘুলিয়ে দেওয়া যাবে না।

তথাকথিত পাকিস্তান আর নেই। পাকিস্তানের নিশান আমরা পুড়িয়ে ভস্মীভূত করেছি। আমরা উড়িয়েছি আমাদের বুকের রক্তে রাঙানো স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা। রক্তে আমাদের স্বাধীনতার আগুন গদগদ করছে। চোখে আমাদের প্রতিশোধের দাবাগ্নি দাউ দাউ করে জ্বলছে। মুখে আমাদের স্বাধীনতার বাণী চৌচির করে ফেটে পড়েছে শত-কোটি কণ্ঠে ।

এই মহান বিপ্লবকে বিভ্রান্ত করার জন্য ওরা তাই উঠে-পড়ে লেগেছে। কিন্তু ওদের রসদ কই? হ্যাঁ, আছে বস্তাপচা রাজনীতি- হিন্দু-মুসলমানের দাঙ্গা-বাধানোর অপচেষ্টা। বুকে বেপরোয়া গুলি চালিয়ে সমস্ত বাঙালী জাতিটাকে পৃথিবীর বুক থেকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার হীন-ষড়যন্ত্রে মেতে, অখণ্ডতার প্রলেপ মাখানো আর ভারতীয় অনুপ্রবেশকারী ভূত দেখানোতে ।

এক কথায়, দাঙ্গাবাজি, লুটতরাজ, নারী-হরণ প্রভৃতি অসামাজিক পৈশাচিক নারকীয় পশুত্বের রাজত্ব সৃষ্টি করতে চায় ওরা লক্ষ শহীদের রক্তভেজা বাংলার মাটিতে। যে জাতি সূৰ্যতেজে জেগে উঠেছে সে কি অন্য কোন রাষ্ট্রের কাছে দাসত্বের জন্য হার মানে? অদ্ভুত ওদের রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ। অদ্ভুত ওদের ইতিহাসের ব্যাখ্যা। অদ্ভুত ওদের বেপরোয়া গণ-হত্যার নজির।

দাঙ্গাবাজি কলা-কৌশল আর চলচে না। লাঞ্ছিত নিপীড়িত দরিদ্র বাঙালী গণ-মানুষ ওদের কলঙ্কিত রাজনীতির মুখোশ উন্মোচিত করেছে। ওদের নগ্ন আসল রূপটি অতি দুর্ভাগ্যের রাত্রে আমরা দেখে ফেলেছি। পশুও বুঝি এত নগ্ন নয়- এত বিশ্রী, এত কুৎসিৎ এত বীভৎস নয়।

ওরা মানুষ হত্যা করেছে- আসুন আমরা পশু হত্যা করি।

জয় বাংলা।

 

প্রচারঃ ২১-8-৭১

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<005.003.015>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

শিরোনাম সূত্র তারিখ

৩৷ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র

(মুজিব নগর) এর অনুষ্ঠানপত্র গুচ্ছ

(অংশ)

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র-এর

দলিলপত্র

 

২৫ মে-১৭ ডিসেম্বর, ১৯৭১

 

আজ মঙ্গলবার, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৩৭৮

২৫ মে ১৯৭১ সাল

 

 

(Signature Tune)

 

 

7-00Α.Μ      আসসালামো আলায়কুম। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র। বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি জনগণকে শুভেচ্ছা জানিয়ে আমাদের প্রথম অধিবেশন শুরু করছি। মিটারে… কিঃ সাঃ এ। অধিবেশনের প্রথমে

7-10 ”         শুনুন তেলাওয়াতে কালামে পাক ও তার বাংলা তরজমা। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র। আমাদের অনুষ্ঠান সম্পর্কে একটি ঘোষণা। আজ থেকে সকাল ৭টা ও সন্ধ্যে ৭টায় দুটি অধিবেশনেস্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অনুষ্ঠান প্রচারিত হবে। আজকের প্রথম অধিবেশনের অনুষ্ঠানঃ

* বাঙলা খবর প্রচারিত হবে সকাল সোয়া সাতটায়।

* ইংরেজী খবর শুনতে পাবেন মিনিটে।

* “চরমপত্র’ শুনতে পাবেন সকাল ৭টা বেজে …..মিনিটে।

* বঙ্গবন্ধুর বাণী থেকে পাঠ শুনতে পাবেন সকাল সাতটা বেজে চল্লিশ মিনিটে।

* জাগরণীঃ দেশাত্মবোধক গান শুনবেন সকাল পৌনে আটটায়।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

আজকের প্রথম অধীবেশনের অনুষ্ঠান সূচি শুনলেন। স্বাধীন বাঙলা বেতার কেন্দ্র থেকে…মিটারে। কিছুক্ষণের মধ্যেই খবর শুনতে পাবেন-প্রথমে বাংলা পরে ইংরেজীতে।

7–15A.M      (News in Bengali)

7-25 “                 (News in English)

7–30 “        সকাল সাড়ে সাতটা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র। আজ এগারই জ্যৈষ্ঠ। বিদ্রোহী কবি নিপীড়িত জনগণের কবি কাজী নজরুল

7–40   “       ইসলামের জন্মদিন। এ উপলক্ষে এখন কবি রচিত কবিতা থেকে আবৃতি ও গান শুনুন অগ্নিশিখা অনুষ্ঠানে।

Slogans & Sayings of SK. Mujib.

SWADHIN BANGLA BETAR KENDRA

(Cue Sheet)

Trans-I

Date: 26-5-71

6–57 P.M.

Signature Tune Opening of the station &

7–00   ”       Programme Summary.

AGNISHIKHA : A

Composite Programme for the freedom fighters. (a)Message from

 

 

 

 

 

 

 

<005.003.016>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

খ) “দুর্গম গিরি কান্তার মরু”- নজরুল সঙ্গীত     রাত ৭:৫০     চরমপত্রঃ শ্রব্য অনুষ্ঠান

গ) এগিয়ে চলো- অনুপ্রেরণার বাণী     রাত ৭ টা ৫৫- ৮ টা পর্যন্ত   বিশ্ব জনমত- বাঙালি কথন

ঘ) বিশেষ সংবাদ বুলেটিন                                 সমাপ্তি ঘোষণা

ঙ) দেশাত্মবোধক গান                 ৩০ মে, ১৯৭১

সন্ধ্যা ৭টা ২০ চরমপত্র-               সন্ধ্যা ৬টা ৫৮         সুরসংকেত

সন্ধ্যা ৭টা ৩০ বিরুদ্ধানুস্ঠান           সন্ধ্যা ৬টা ৫৯         স্টেশনের কার্যক্রম শুরু

সন্ধ্যা ৭টা ৪০ বাংলা সংবাদ         সন্ধ্যা ৭টা     অগ্নিশিখা- মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সংযুক্ত অনুষ্ঠান

সন্ধ্যা ৭টা ৪৫ ইংরেজি সংবাদ                       ক) দর্পণ- বাংলায় কথন

রাত ৮টা ১৫ অগ্নিবীণা- কবি নজরুল ইসলামের           খ) ঐকতান- দেশাত্মবোধক গান
জন্মদিবস উপলক্ষে                     গ) আবৃত্তি
বিশেষ অনুষ্ঠান।                   ঘ) রণভেরি- বিভিন্ন সেক্টর থেকে প্রতিবেদন
রাত ৮টা ২০ জাতীয় নেতাদের       সন্ধ্যা ৭টা ২০       ঙ) দেশাত্মবোধক গান
স্লোগান ও বক্তব্য
রাত ৮টা ৩০ আলোর দিগন্ত- বাংলা কথন

২৭ শে মে, ১৯৭১

সন্ধ্যা ৬টা ৫৯ সঙ্গিতাংশ, সমাপ্তি ঘোষণা     সন্ধ্যা ৭টা ৩০       ইংরেজি সংবাদ

সন্ধ্যা ৭টা                                             স্বায়ত্তশাসন থেকে স্বাধীনতা

সুরসংকেত স্টেশনের কার্যক্রম                                 বাংলা কথন
শুরু এবং অনুষ্ঠানসূচি                   সন্ধ্যা ৭টা ৪০       জনাব এ মন্নান, এমএনএ
রক্তস্বাক্ষর-
অগ্নিশিখা- মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সংযুক্ত অনুষ্ঠান   সন্ধ্যা ৭টা ৪৫         স্বরচিত কবিতা,

ক) বেলাল মোহাম্মদ
ক) দর্পণ- বাংলায় কথন                 সন্ধ্যা ৭টা ৫৫         খ) এস আই নূর

বাংলা সংবাদ, সাময়িকী- সংবাদ
খ) ঐকতান- দেশাত্মবোধক গান           রাত ৮টা         বাংলায় ভাষ্য
রাত ৮টা ৫       লোকসঙ্গীত- শাহ্‌ আলী সরকার

গ) কবিকন্ঠ-
স্বরচিত কবিতা                     রাত ৮টা ১৫     বাঙালি জবাব দাও- বাংলা কথন

ঘ) রণভেরি- বিভিন্ন সেক্টর থেকে প্রতিবেদন   রাত ৮টা ২৫     দেশাত্মবোধক গান

সন্ধ্যা ৭টা ২০ ঙ) দেশাত্মবোধক গান                      বিশ্ব জনমত
সন্ধ্যা ৭টা ৩০   বাংলা কথন             রাত ৮টা ৩৫       চরমপত্র-
সন্ধ্যা ৭টা ৪০   বাংলা সংবাদ           রাত ৮টা ৪০       বিরুদ্ধানুস্ঠান
সন্ধ্যা ৭টা ৪৫   ইংরেজি সংবাদ                         স্লোগান ও দেশাত্মবোধক গান
রক্তস্বাক্ষর                             সমাপ্তি ঘোষণা
.
.
স্বরচিত কবিতা ও
দেশাত্মবোধক গান

 

<005.003.017>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

 

৩১ মে, ১৯৭১                                                                         (চ) সঙ্গীত

দ্বিতীয় অধিবেশন :                                                 ৭-৩০ মিঃ               বাংলা সংবাদ

৬-৫৯ মিঃ               সূচকধ্বনি ও উদ্বোধনী ঘোষণা                  ৭-৪৫   ’’               সাময়িকী/কথিকা

৭-০০   ”               অগ্নিশিখাঃ মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য                 ৭-৫০   ’’               ইংরেজী খবর

বিশেষ অনুষ্ঠান                           ৭-৫৭   ’’               বজ্রকণ্ঠ

(ক) দৰ্পণঃ বাংলা কথিকা               ৮-০০ ’’                সঙ্গীত

(খ)জাগৃতিঃদেশাত্মবোধক গান                  ৮-১৫ ’’                … …

(গ)আবৃত্তি                       ৮-৩০ ’’               জাগ্রত বাংলা

(ঘ) রণভেরীঃ যুদ্ধের খবর              ৮-৪০   ’’               চরমপত্র

(ঙ)বজ্রকণ্ঠঃ শেখ মুজিবেরবাণী                 ৮-৪৭   ’’               বিশ্বজনমত

(চ) দেশাত্মাবোধক গান                 ৮-৫১   ”               রক্তস্বাক্ষরঃ ৭ই জুন (ক) কথিকা-

৭-২০   ’’               ইংরেজী সংবাদ                                             শহিদুল ইসলাম

৭-৩০   ’’               বিশ্বজনমত                                         (খ) কবিতা

৭-৩৫   ’’               পল্লীগীতিঃ শাহ আলী সরকার                   ৮-৫৫’’                  সমাপ্তি

৭-৪০   ’’               রক্তস্বাক্ষরঃস্বরচিত কবিতা পাঠ                    ১৯ জুন, ১৯৭১

(ক) বেলাল মুহম্মদ                      সন্ধ্যাঃ

(খ) শিকদার ইবনে নূর                 ৭-০০ মিঃ     উদ্বোধনী ঘোষণা ও অনুষ্ঠান

 

৭-৪৫   ’’               বাংলা সংবাদ                                       পরিচিতি।

৭-৫৫   ”               দেশাত্মবোধক গান ও বিশেষ           ৭-০৫   ’’               অগ্নিশিখাঃ

ঘোষণা                                                       (ক) দর্পণঃ ইসলাম ও

৮-০৫   ”               যন্ত্রসঙ্গীত                                                    পকিস্তানের রাজনীতিঃ কথিকা

৮-১৫   ”               বজ্রকণ্ঠ ও দেশাত্মবোধক গান                            -কামাল মাহবুব

৮-২০ ”               চরমপত্র                                                     (খ) সঙ্গীত

৮-৩০ ’’               সমাপ্তি।                                                      (গ) সংবাদ

৭ জুন, ১৯৭১                                                                         (ঘ) আবৃত্তি

দ্বিতীয় অধিবেশন                                                            (ঙ) বাংলাদেশ সরকারের নির্দেশ

৬-৫৯ মিঃ               পরিচিত সুর                    ৭-২৫   ’’               বিশ্বজনমত

৭-০০   ’’               উদ্বোধনী ঘোষণা                         ৭-৩১   ’’               সঙ্গীত

৭-০৫   ’’               অনুষ্ঠান পরিচিতি।                       ৭-৪০   ’’               দৃষ্টিপাতঃ কথিকা-ডঃ মজহারুল

৭-১০   ’’               অগ্নিশিখা।                                                   ইসলাম

(ক) দর্পণঃ বাদশা                        ৭-৪৫   ’’               বাংলা সংবাদঃ পড়বেন

(খ) সংগীত                                        কামাল লোহানী।

(গ) আবৃত্তিঃ নূরে আলম               ৭-৫৫   ’’               বজ্রকণ্ঠ

(ঘ) সংবাদ বুলেটিনঃ                    ৮-০০   ’’               ইংরেজী অনুষ্ঠান।

কামাল লোহানী                           ৮-২৫   ’’               স্লোগান ও সঙ্গীত

(ঙ) নির্দেশাবলী

 

 

 

 

<005.003.018>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

 

৮-৩০ মিঃ               চরমপত্র                                   ৭-৪০ মিঃ               ত্রিপিটক/কথিকা অথবা আবৃত্তি

৮-৪০ ’’                সঙ্গীত                             ৭-৪৫ ”                বিশ্বজন্মত

৮-৪৫ ’’                রক্তস্বাক্ষর                        ৭-৫০ ”               বজ্রকণ্ঠ ও স্লোগান

(ক) শহীদ মিনারঃ                       ৭-৫৩ ”                চরমপত্র

আলেখ্য-মোস্তফা আনোয়ার            ৮-০০ ”                জয় বাংলা।

৯-০০ ’’               জয় বাংলা ।

২৭ জুন, ১৯৭১

সন্ধ্যাঃ                                               সন্ধ্যাঃ

৭-০০ মিঃ               উদ্বোধনী ও অনুষ্ঠান পরিচিতি                   ৭-০০ মিঃ               উদ্বোধনী অনুষ্ঠান পরিচিতি।

৭-০৫ ”                অগ্নিশিখাঃ                                 ৭-০৫ ”                অগ্নিশিখাঃ

(ক) দর্পণ                                                   (ক) দর্পণ

(খ) সঙ্গীত                                         (খ) সঙ্গীত

(গ) আবৃত্তি                                        (গ) আবৃত্তি

(ঘ) রণভেরীঃ সংবাদ বুলেটিন                                    (ঘ) রণভেরীঃ সংবাদ বুলেটিন

(ঙ) বাংলাদেশ সরকারের                                (ঙ) বাংলাদেশ সরকারের

নির্দেশ                                                       নির্দেশাবলী

৭-২৫ ”                বিশ্বজনমতঃ পর্যালোচনা                ৭-২৫ ”                বিশ্ব জনমতঃ পর্যালোচনা

৭-৩০ ”                সঙ্গীত                                               আমিনুল হক বাদশা

৭-৩৫ ”                দৃষ্টিপাতঃ                                   ৭-৩০ ”                সঙ্গীত

অধ্যাপক আবদুল হাফিজ              ৭-৩৫ ”                দৃষ্টিপাতঃ কথিকা

৭-৪০ ”               সঙ্গীত                                               অধ্যাপক আবদুল হাফিজ

৭-৪৫ ”                বাংলা সংবাদ, সঙ্গীত ও                 ৭-৪০ ”                সঙ্গীত

স্লোগান                                     ৭-৪৫ ”                বাংলা সংবাদ

৮-০০ ”               ইংরেজী অনুষ্ঠান                         ৮-০০ ”                ইংরেজী অনুষ্ঠান

৮-২৫ ”                বজ্রকণ্ঠ ও স্লোগান                        ৮-২৫ ”                বজ্রকণ্ঠ ও স্লোগান

৮-৩০ ”                চরমপত্র                                   ৮-৩০ ”                চরমপত্র

৮-৪০ ”                ইসলামের দৃষ্টিতেঃ                       ৮-৩৫ ”                সঙ্গীত

সৈয়দ আলী আহসান।                  ৮-৪০ ’’                রক্তস্বাক্ষরঃ ষড়যন্ত্রের অন্তরালেঃ

৯-০০ ”               জয় বাংলা                                          পাকিস্তানের কবর রচনার জন্য

৩০ জুন, ১৯৭১                                                              দায়ী কে?- অধ্যাপক অসিত রায়

সকালঃ                                                                        চৌধুরী।

৭-০০ মিঃ     (ক) উদ্বোধনী                            ৮-৪০ ”                স্লোগান ও সঙ্গীত

(খ) কোরান তেলাওয়াত                ৯-০০ ”                জয় বাংলা।

৭-১০ ”                 (ক) অনুষ্ঠান সূচী

(খ) বাংলা সংবাদ                        ৫ জুলাই,১৯৭১

(গ) ইংরেজী সংবাদ                     সকালঃ

৭-৩০ ”                জাগরণীঃ সঙ্গীতানুষ্ঠান                  ৭-০০ মিঃ              (ক) উদ্বোধনী

”      (খ) কোরান তেলাওয়াত

 

 

<005.003.019>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

৭-১০ মিঃ               (ক) অনুষ্ঠান সূচী                        ৮-৩০ মিঃ      চরমপত্রঃ কথিকা-এম, আর,

(খ) বাংলা সংবাদ                                          আখতার।

(গ) ইংরেজী সংবাদ                     ৮-৩৫ ”                সঙ্গীত

৭-৩০”                  জাগরণীঃ সঙ্গীতানুষ্ঠান                   ৮-৪০ ”                রক্তস্বাক্ষর

৭-৪০”                  আবৃত্তি                                     ৮-৪৫ ”                সঙ্গীত

৭-৪৫”                  বিশ্বজনমত                       ৮-৫০ ”                ইসলামের দৃষ্টিতে

৭-৫০”                  বজ্ৰকণ্ঠ ও স্লোগান                                          সৈয়দ আলী আহসান

৭-৫৩”                  চরমপত্র                                   ৮-৫৫ ”                স্লোগান ও দেশাত্মবোধক গান

৮-০০”                 জয় বাংলা                        ৯-০০”                  জয় বাংলা।

১০জুলাই, ১৯৭১

সন্ধ্যাঃ                                               সকালঃ

৭-০০ মিঃ               উদ্বোধনী ও অনুষ্ঠান পরিচিতি

৭-০৫ ”                অগ্নিশিখাঃ                        ৭-০০ মিঃ               (ক) উদ্বোধনী

(ক) দৰ্পণঃ আজকের মুক্তিযুদ্ধঃ                          (খ) কোরান তেলাওয়াত

সূর্যসেনের স্মৃতি-কথিকাঃ               ৭-১০ ”                 (ক) অনুষ্ঠান

রণেশ দাশগুপ্ত পরিচিতি                                   (খ) বাংলা সংবাদঃ

(খ) সঙ্গীত                                         আলী রেজা চৌধুরী

(গ) আবৃত্তি                                        (গ) ইংরেজী সংবাদঃ

(ঘ) সংবাদ বুলেটিন                                       পারভীন হোসেন

(ঙ) বাংলাদেশ সরকারের              ৭-৩০ ”                 জাগরণীঃ সঙ্গীতানুষ্ঠান

নির্দেশাবলী                       ৭-৪৫ ”                বিশ্ব জনমতঃ আমিনুল হক

৭-২৫ ”                বিশ্ব জনমতঃ আমিনুল হক                               বাদশা

বাদশা                             ৭-৫০ ”                বজ্রকণ্ঠ

৭-৩০ ”                সঙ্গীত                             ৭-৫৩ ”                চরমপত্রঃ এম আর আখতার

৭-৩৫”                  দৃষ্টিপাতঃ কথিকা                                           (পুনঃপ্রচার)

অধ্যাপক আবদুল হাফিজ              ৮-০০ ”                জয় বাংলা।

৭-৪০ ”                সঙ্গীত

৭-৪৫”                  বাংলা সংবাদঃ সালেহ আহমদ

৮-০০”                  ইংরেজী অনুষ্ঠানঃ                        সন্ধ্যাঃ

পরিচালনা-আলমগীর কবীর            ৭-০০ মিঃ     উদ্বোধনী ও অনুষ্ঠান পরিচিতি

৭-০৫ ”                অগ্নিশিখা

(ক) ……                                          (ক) দর্পণ

(খ) বিভিন্ন বিদেশী সংবাদপত্রের                        (খ) সঙ্গীত

উদ্ধৃতিঃ আলী জাকের                                     (গ) আবৃত্তি

(গ) গান                                                     (ঘ) সংবাদ বুলেটিনঃ মনজুর

ইংরেজী সংবাদঃ পারভীন                                 কাদের

হোসেন                                    ৭-২৫ ”                বিশ্ব জনমতঃ আমিনুল হক

৮-২৫”                 বজ্ৰকণ্ঠ                                                      বাদশা

৭-৩০ ”                সঙ্গীত

 

 

 

<005.003.020>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

 

৭-৩৫ মিঃ               দৃষ্টিপাতঃ জামিল শরাফী                ৭-৪০           সঙ্গীত

৭-৪০”                  মিঃ সঙ্গীত                        ৭-৪৫”                  বাংলা সংবাদঃ সালেহ আহমদ

৭-৪৫”                  বাংলা সংবাদঃ সালেহ আহমদ                  ৮-০০ ”                 ইংরেজী অনুষ্ঠানঃ

৮-০০”                  ইংরেজী অনুষ্ঠানঃ পরিচালনা-                                    পরিচালনা- আলমগীর কবীর

আলমগীর কবীর                                          (ক) বিদেশী সংবাদপত্রের

(ক) বিদেশী সংবাদপত্রের                                মন্তব্য

উদ্ধৃতি                                                       (খ) পর্যালোচনা

(খ) পর্যালোচনা                                           (গ) সঙ্গীত

(গ) ইংরেজী সংবাদঃ                                     (ঘ) ইংরেজী সংবাদঃ পারভীন

পারভীন হোসেন                                           হোসেন

(ঘ) সঙ্গীত                       ৮-২৫ ”                 উর্দু সংবাদঃ শহীদুল হক

৮-২৫”                 সাম্প্রদায়িকতার উপর উর্দু              ৮-৩০ ”                 চরমপত্রঃ এম আর, আখতার

কথিকা-শহীদুর রহমান                  ৮-৩৫”                  সঙ্গীত

৮-৩০”                  দেশবাসীর উদ্দেশে অর্থমন্ত্রী            ৮-৪০ ”                 মানবতার নামেঃ কথিকাঃ

এম মনসুর আলীর ভাষণ                                আবু মাসুদ

৮-৪০”                  দেশাত্মবোধক গান                       ৮-৪৫”                  বজ্রকণ্ঠ, স্লোগান ও সঙ্গীত

৮-৪৫”                  চরমপত্রঃ এম আর আখতার           ৯-০০”                 জয় বাংলা

৮-৫০”                  বজ্রকণ্ঠ

৮-৫২”                  স্লোগান ও সঙ্গীত

৯-০০”                  জয় বাংলা।                       ২৭ জুলাই, ১৯১৭

সকালঃ

২৩ জুলাই, ১৯১৭

সন্ধ্যাঃ                                                                 উদ্বোধনী ও অনুষ্ঠান পরিচিতি

৭-০০ মিঃ               অগ্নিশিখাঃ

৭-০০ মিঃ               উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ও পরিচিতি          ৭-০৫ ”                 (ক) দর্পণ

৭-০৫”                  অগ্নিশিখাঃ                                          (খ) সঙ্গীত

(ক) দর্পণ                                                   (গ) আবৃত্তি

(খ) সঙ্গীত                                        (ঘ) সংবাদ বুলেটিনঃ

(গ) আবৃত্তি                                        শহীদুল ইসলাম

(ঘ) সংবাদ বুলেটিন                                       (ক) আমাদের সংগ্রামঃ

শহীদুল ইসলাম                          ৭-২০”                 আবু শহিদ

৭-২০ মিঃ               সংবাদ পর্যালোচনাঃ                                        (খ) স্লোগান ও সঙ্গীত

আমীর হোসেন                                             দৃষ্টিপাতঃ

৭-২৫”                  আলাপনঃ শ্রোতাদের চিঠির             ৭-৩৫”                  অধ্যাপক আবদুল হাফিজ

জবাব                                               সঙ্গীত

৭-৩০”                  সঙ্গীত                             ৭-৪০”                  বাংলা সংবাদঃ সালেহ আহমদ

৭-৩৫”                  দৃষ্টিপাতঃ                                   ৭-৪৫”                  ইংরেজী অনুষ্ঠানঃ

অধ্যাপক আবদুল হাফিজ              ৮-০০”                  (ক) বিদেশী সংবাদপত্রের

মন্তব্য

 

<005.003.021>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

(খ) পর্যালোচনা                                            লিখিত-সলিমুল্লা, পড়বেন-

(গ) সঙ্গীত                                         মোস্তফা আনোয়ার

(ঘ) ইংরেজী সংবাদঃ           ৮-৪৫”                  বজ্রকণ্ঠ ও স্লোগান

পারভীন হোসেন                         ৮-৪৭”                  জল্লাদের দরবার

৮-২৫”                  উর্দু সংবাদঃ শহীদুল হক                ৯-০০           জয় বাংলা।

৮-৩০”                  স্লোগান ও সঙ্গীত

৮-৩৫”                  শেখ মুজিবের বিচার প্রহসনঃ           ২৮আগষ্ট, ১৯৭১

আহমদ রফিক                            দ্বিতীয়

৮-৪৪”                  বজ্রকণ্ঠ, স্লোগান ও সঙ্গীত              অধিবেশনঃ     (ক) উদ্বোধনী ঘোষণা ও

৮-৫৩”                  চরমপত্র ; এম, আর, আখতার                 ১-০০”                   অনুষ্ঠানসূচী

৯-০০”                  জয় বাংলা ।                                        (খ) বাংলা খবর

(গ) ইংরেজী খবর

১৮ আগস্ট                                         ১-১৫”                   সঙ্গীতানুষ্ঠান/পল্লীঃ

১৯৭১                                                                 ১। শেখ মুজিব সত্যযুগের….

সন্ধ্যাঃ                                                                 ২। মুজিব বাইয়া …

৩। ওরা কোথায় ….

৭-০০ মিঃ               উদ্বোধনী ও অনুষ্ঠান পরিচিতি                   ১-৩০”                  বিশ্ব জনমত

অগ্নিশিখা                                  ১–৩৫ ”                 রবীন্দ্র সঙ্গীতঃ

৭-০৫”                 (ক) দর্পণঃ আশরাফুল আলম                  ১-৪৫ ”                  রক্তস্বাক্ষরঃ আশরাফুল আলম।

ও মোস্তফা আনোয়ার           ১-৫০”                   পুঁথিপাঠঃ মোহাম্মদ শাহ বাঙালী

(খ) সঙ্গীত                       ২-০০”                  জয় বাংলা।

(গ) আবৃত্তি

(ঘ) সংবাদ বুলেটিন

সংবাদ পর্যালোচনাঃ                      তৃতীয় অধিবেশনঃ

৭-২৫”                  আমির হোসেন                           সন্ধ্যা

৭-৩০”                  সঙ্গীত                             ৭-০০ মিঃ

৭-৩৫”                  পর্যবেক্ষকের দৃষ্টিতেঃ           ৭-০০ ”                 উদ্বোধনী ঘোষণা ও অনুষ্ঠানসূচী

কামাল লোহানী                                             অগ্নিশিখাঃ পরিচালকঃ

৭-৪৫”                  বাংলা সংবাদ                                       আশরাফুল আলম

৮-০০”                  ইংরেজি অনুষ্ঠান                                           (ক) সংবাদ বুলেটিনঃ

পরিচালনা আলমগীর কবির                              মঞ্জুর কাদের

(ক) বিদেশী সংবাদপত্রের                               (খ) সঙ্গীতঃ সঙ্গীতঃ বীর বাঙালী অস্ত্র

পর্যালোচনা                                        ধর

(খ) সঙ্গীতঃ                                        (গ) দর্পণঃ আশরাফুল

৮-২৫”                  (গ) ইংরেজি সংবাদ                                       (ঘ) আবৃত্তিঃ কামাল লোহানী

৮-৩০”                  উর্দু সংবাদ                                                  (ঙ) পুথিপাঠঃ

৮-৩৫”                  সঙ্গীতঃ                                                       মোহাম্মদ শাহ বাঙালী

(চ) মুক্তিযোদ্ধার ডায়েরী থেকেঃ

মোস্তফা আনোয়ার

(ছ) আমার সোনার বাংলা

 

 

<005.003.022>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

 

৭-৪৫ মিঃ               বাংলা খবরঃ আলী রেজা                         ৮-৩০”                  উর্দু কথিকা

চৌধুরী                                              ৮-৩৫”                  রবীন্দ্র সঙ্গীত

৭-৫৫”                  সংবাদবাদ পর্যালোচনাঃ শহীদুল                         ৮-৪০”                  সোনার বাংলা/পল্লীগীতি

ইসলাম                                             ৯-০০”                  আমাদের মুক্তি সংগ্রাম ও

৮-০০”                  ইংরেজী অনুষ্ঠান                                                   মহিলাঃ মেহের খোন্দকার

(ক) পর্যালোচনা                                  ৯-০৭”                  সঙ্গীত

(খ) উদ্ধৃতি                                ৯-১৭”                   বজ্ৰকণ্ঠ ও স্লোগান

(গ) সঙ্গীতঃ দুর্জয় বাংলা’                        ৯-২০”                  চরমপত্র

(ঘ) খবর                                           ৯-৩০”                 সমাপ্তি।

৮-২৫ ”                 উর্দু খবর                                           ২০সেপ্টেম্বর,১৯৭১

৮-৩০”                  ‘সোনার বাংলা: গ্রামীণ শ্রোতাদের জন্যে অনুষ্ঠান     প্রথম অধিবেশনঃ

৮-৪৫”                  পর্যবেক্ষকের দৃষ্টিতে                              ৭-০০ মিঃ               (ক) উদ্বোধনী ঘোষনা

৮-৫২”                  বজ্ৰকণ্ঠ ও স্লোগান                                                   (খ) তেলাওয়াত

৮-৫৫ ”                 চরম পত্র                                                             (গ) অনুষ্ঠান পরিচি

৯-০০ ”                 জয় বাংলা।                                                 (ক) খবরঃ বাংলা

(খ) খবরঃ ইংরেজী

১৬ সেপ্টেম্বর,                                                      ৭-৩০”                  জাগরনী সঙ্গীতানুষ্ঠান

১৯৭১                                                        ৭-৪৫”                  ‘রুস্তমের মা আমার মা”:

তৃতীয় অধিবেশনঃ                                                                    কথিকাঃ কামাল লোহানী

সন্ধ্যা                                                                           (পুনঃপ্রচার)

৭-০০ মিঃ               উদ্বোধনী ঘোষণা ও অনুষ্ঠান                    ৭-৫৫”                  বজ্রকণ্ঠ ও স্লোগান

পরিচিতি                                           ৮-০০”                 সমাপ্তি।

৭-০৫”                  অগ্নিশিখা

(ক) সংবাদ বুলেটিন

(খ) সঙ্গীত

(গ) দর্পণঃ রণজিৎ                                তৃতীয় অধিবেশনঃ

(ঘ) আবৃত্তি                               সন্ধ্যাঃ           উদ্বোধনী ঘোষণা ও অনুষ্ঠান

(ঙ) সঙ্গীত                                                  পরিচিতি

(চ)মুক্তিযোদ্ধার ডায়েরী                          ৭-০০”                  অগ্নিশিখা

থেকেঃ                                                                (ক) সংবাদ বুলেটিনঃ

মোস্তফা আনোয়ার                                ৭-০৫”                  (খ) সঙ্গীত

(ছ) আমার সোনার বাংলা                                         (গ) দর্পণঃ মোস্তফা আনোয়ার

৭-৪৫”                  খবরঃ বাংলা                                                 (ঘ) সঙ্গীত

৭-৫৫”                  সংবাদ পর্যালোচনা                                                  (ঙ) বাংলার মুখঃ জীবন্তিকা

৮-০০”                  ইংরেজী অনুষ্ঠান                                                    (চ) আমার সোনার বাংলা

সঙ্গীত… …                               ৭-৪৫”                  খবরঃ বাংলা

খবরঃ ইংরেজী

৮-২৫ ”                 খবরঃ উর্দু

 

 

 

<005.003.023>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

 

৭-৫৫ মিঃ               সংবাদ পর্যালোচনা                                ৮-২৫ মিঃ               খবরঃ উর্দু

৮-০০”                  ইংরেজী অনুষ্ঠান                                  ৮-৩০”                  (ক) আমাদের মুক্তি সংগ্রাম ও

(ক) পর্যালোচনা                                                    মহিলাঃ বেগম উম্মে কুলসুম

(খ) ডাইরি                                                 (খ) রবীন্দ্র সঙ্গীত

(গ) সঙ্গীত                                ৮-৫০”                 সোনার বাংলা

(ঘ) খবর                                                             (ক) কথোপকথন

৮-২৫ ”                খবরঃ উর্দু                                                            (খ) পল্লীগীতি

৮-৩০”                 রবীন্দ্র সঙ্গীত                              ৯-০০”                  পর্যবেক্ষকের দৃষ্টিতে

৮-৪০”                  সোনার বাংলা                             ৯-০৭ ”                 সঙ্গীত

৯-০০”                  কথিকা                                              ৯-১৭”                  বজ্রকণ্ঠ ও স্লোগান

৯-০৭”                 সঙ্গীত                                      ৯-২০”                 চরমপত্র

৯-১৭ ”                  বজ্রকণ্ঠ ও স্লোগান                                 ৯-৩০ ”                 সমাপ্তি।

৯-২০”                  চরম পত্র                                           ২৪সেপ্টেম্বর,১৯৭১

৯-৩০”                  সমাপ্তি।                                             তৃতীয় অধিবেশনঃ

সন্ধ্যা

২১ সেপ্টেম্বর,১৯১৭                                                ৭-০০ মিঃ               উদ্বোধনী ঘোষণা ও অনুষ্ঠান

তৃতীয় অধিবেশনঃ                                                                   পরিচিতি

সন্ধ্যা                                                         ৭-০৫”                  অগ্নিশিখা

(ক) সংবাদ বুলেটিন

৭-০০”                 উদ্বোধনী ঘোষণা ও অনুষ্ঠান                                      (খ) সঙ্গীত

পরিচিতি                                                              (গ) দর্পণ

৭-০৫”                  অগ্নিশিখা                                                             (ঘ) আবৃত্তি

(ক) সংবাদ বুলেটিন                                               (ঙ) সঙ্গীত (২টি)

(খ) সঙ্গীত                                                 (চ) আমরা গেরিলা (৩)

(গ) দর্পণ                                                            (ছ) আমার সোনার বাংলা

(ঘ) আবৃত্তি                               ৭-৪৫”                 খবরঃ বাংলা

(ঙ) সঙ্গীত (২টি)                                 ৭-৫৫”                 সংবাদ পর্যালোচনা

(চ) আমরা গেরিলা (২)                         ৮-০০”                 ইংরেজী অনুষ্ঠান

(ছ) আমার সোনার বাংলা                                         (ক) পর্যালোচনা

৭-৪৫”                  খবরঃ বাংলা                                                (খ) উদ্ধৃতি

৭-৫৫”                  সংবাদ পর্যালোচনা                                                  (গ) সঙ্গীত

৮-০০”                 ইংরেজী অনুষ্ঠান                                                    (ঘ) খবর

(ক) পর্যালোচনা                                  ৮-২৫ ”                 খবরঃ উর্দু

(খ) উদ্ধৃতি                                ৮-৩০”                  (ক) ইয়াহিয়া জবাব দাও

(গ) সঙ্গীত                                                  (১): শওকত ওসমান

(ঘ) খবর                                                            (খ) সঙ্গীত

 

 

 

 

<005.003.024>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

 

 

৮-৪০ মিঃ               সোনার বাংলা

(ক) কথোপকথন

(খ) পল্লীগীতি

৯-০০ ”                 পর্যবেক্ষকের দৃষ্টিতে

৯-০৭ ”                 সঙ্গীত

৯-১৫ ”                  বজ্রগকণ্ঠ ও স্লোগান

৯-২০ ”                 সমাপ্তি

 

আজ ২৫ শে সেপ্টেম্বর, ১৯৭১ সাল। বাংলাদেশের সাড়ে ৭ কোটি মানুষের মুক্তি, অধিকার ও স্বাধীনতা সংগ্রামের আজ ছ’মাস পূর্ণ হলো ।

 

ছ’মাস আগে ২৫ শে মার্চের কাল রাতে জঙ্গী বাংলার নিরীহ নিরস্ত্র জনসাধারণের উপর। লক্ষ লক্ষ নারী-পুরুষ আর শিশু হত্যার এক কলঙ্কিত ইতিহাস রচনা করে জঙ্গীশাহী সমগ্র বিশ্ববাসীকেও স্তম্ভিত করে দিয়েছে। কিন্তু বর্বর বাহিনীর নৃশংসতার জবাব দিতে বাংলার ছাত্র, যুবক, ই পি আর, আসনার আর এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী মুক্তিবাহিনী। প্রতি রণাঙ্গণে তারা প্রচণ্ড আঘাত হেনে চলেছেন শত্রুবাহিনীর উপর। চূড়ান্ত বিজয় এখন সন্নিকটে।

 

সোনার বাংলার সোনালী আকাশ, রূপালী নদী বীর মুক্তিযোদ্ধা শক্রহননের দৃঢ়প্রত্যয়ে আত্মোৎসর্গ জানিয়ে এবং চূড়ান্ত বিজয়ের দুর্বার শপথে যাঁরা অবিরাম যুদ্ধ করে চলেছেন তাদেরকে সংগ্রামী অধিবেশন শুরু করছি।

 

বাংলাদেশের মাটি থেকে হানাদারদের চিরতরে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার এ মরণজয়ী সংগ্রামে যারা শহীদ হয়েছেন এবং যারা অপ্রতিরোধ্য শক্তি নিয়ে অবিরাম যুদ্ধ করে চলেছেন তাদেরকে সংগ্রামী সালাম জানিয়ে আজকের অনুষ্ঠান অগ্নিশিখা অনুষ্ঠান শুরু করছি। ২৫ শে মার্চ ১৯৭১ সালে বাঙালী জাতির উপর সেদিন নেমে এসেছিল শতাব্দীর ভয়াবহতম বিভীষিকা। হানাদার পশ্চিম পাকিস্তানী পশুশক্তি বনমানুষের মতো ঝাপিয়ে

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

পড়েছিল বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষের উপর। কিন্তু সংগ্রামী বাঙালী জাতি সে আক্রমণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল দেশমাতৃকার মুক্তিমন্ত্রে। সংগ্রাম চলেছে অবিরাম-১ দিন- ২দিন- ১ মাস- ২ মাস। আজ ২৫ শে সেপ্টেম্বর। মুক্তিসংগ্রাম আজ সাফল্যজনকভাবে অতিক্রম করলো দীর্ঘ ৬টি মাস। সংগ্রাম চলছে, চলবে- যতদিন না দেশ থেকে শেষ শত্রুসৈন্যটি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।

 

এই গৌরবমণ্ডিত দিনে আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এখন পরিবেশিত হচ্ছে নাট্যানুষ্ঠান ‘রক্তশপথ’।

 

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র –

 

বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামে শহীদানের প্রতিটি রক্তবিন্দু আজ উদ্দীপ্ত করেছে স্বাধীনতার সূর্যকে। এই স্বাধীনতা সংগ্রামের লক্ষ লক্ষ মুক্তিসেনা আর কোটি কোটি বীর বাঙালীকে সংগ্রামী অভিনন্দন জানিয়ে আমাদের আজকের এ অধিবেশন এখানে শেষ করছি।

 

আবার আমরা আপনাদের সামনে উপস্থিত হবো আজ বেলা ১টায়। জয় বাংলা।

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র –

 

ঘূর্ণিঝড় সম্পর্কিত একটি বিশেষ ঘোষণাঃ

 

বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড়টি এখন হারিকেনের আকার ধারণ করেছে এবং তা আজ সন্ধ্যায় সুন্দরবনের উপর দিয়ে বয়ে যাবার সম্ভাবনা রয়েছে।

  • চালনার সমুদ্র-বন্দর থেকে ৮ নম্বর মহাবিপদ থেকে

দেখাতে হবে।

  • চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের সমুদ্রবন্দরগুলো থেকে ৩

নম্বর স্থানীয় সতর্ক সঙ্কেত দেখাতে হবে।

  • খুলনা, বরিশাল, পটুয়াখালী এবং উপকূলবর্তী

দ্বীপসমূহ থেকে ৪ নম্বর নৌ-মহাবিপদ সঙ্কেত

দেখাতে হবে।

  • চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, নোয়াখালী, ঢাকা,ফরিদপুর, পাবনা, যশোর, কুষ্ঠিয়া রাজশাহী জেলার নদী –

 

 

 

 

 

 

 

 

<005.003.025>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

 

 

বন্দরগুলো থেকে ২ নম্বর নেী সর্তক-সঙ্কেত দেখাতে হবে। খুলনা জেলার সমুদ্রবর্তী এলাকায় যারা অবস্থান করছেন তাদেরকে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে অনুরোধ করছি।

 

সমুদ্রে অবস্থানরত জেলে-নৌকা ও ট্রলারসমূহের আরোহীদের প্রতি অনুরোধ, তাঁরা যেন নৌযানগুলোকে বন্দরে নিরাপদ আশ্রয়ে ভিড়িয়ে রাখেন।

 

ঘোষণাটি শেষ হলো।

২৬ সেপ্টেম্বর, ১৯৭১

প্রথম অধিবেশনঃ

সকাল

৭-০০ মিঃ      (ক) উদ্বোধনী ঘোষণা

(খ) তেলওয়াত

(গ) অনুষ্ঠান পরিচিতি

৭-১০ ”         (ক) খবরঃ বাংলা

(খ) খবরঃ ইংরেজী

৭-৩০ ”        মুক্তিযুদ্ধের সফল অর্ধবর্ষ পূর্তি

উপলক্ষে গত রাতে গণপ্রজাতন্ত্রী

বাংলাদেশের অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট

জাতির উদ্দেশে যে বেতার ভাষণ

দেন, তার ইংরেজী অনুবাদ।

৮-১৫ ”        বজ্রকণ্ঠ ও স্লোগান

৮-২০ ”        সমাপ্তি।

 

দ্বিতীয় অধিবেশনঃ

বেলা

১-০০ মিঃ      (ক) উদ্বোধনী ঘোষণা ও অনুষ্ঠান

(খ) খবরঃ বাংলা

(গ) খবরঃ ইংরেজী

১-১৫ ”         (ক) ঐকতানঃ কোরাস

১-৩০ ”        (ক) এবার মায়ের পুজোয় আমরা:

বিশেষ কথিকা-

রণজিৎ পাল চৌধুরী।

(খ) রবীন্দ্র সঙ্গীত

 

 

 

১-৪৫” রক্তস্বাক্ষরঃ স্বরচিত কবিতা

আবৃত্তি-শামীম চৌধুরী

১-৫০ ”         পুঁথিপাঠ

২-০০ ”        সমাপ্তি

 

তৃতীয় অধিবেশনঃ

সন্ধ্যা

৭-০০মিঃ       উদ্বোধনী ঘোষণা ও অনুষ্ঠান

পরিচিতি

৭-০৫”         অগ্নিশিখা

(ক) সংবাদ বুলেটিন

(খ) সঙ্গীত

(গ) দর্পণঃ মাহমুদ ফারুক

(ঘ) আবৃত্তি

(ঙ) সঙ্গীত

(চ) স্বাধীন বাংলা বেতার পরিক্রমা

(ছ) আমার সোনার বাংলা

৭-৪৫”         খবরঃ বাংলা

৭-৫৫”         প্রতিধ্বনিঃ শহীদুল ইসলাম

৮-০০”         ইংরেজী অনুষ্ঠান

(ক) পর্যালোচনা

(খ) উদ্ধৃতি

(গ) সঙ্গীত

(ঘ) খবর

৮-২৫”         খবরঃ উর্দু

৮-৩০”         কথিকাঃ উর্দু

৮-৪০’’         সোনার বাংলা

৯-০০’’         পর্যবেক্ষকের দৃষ্টিতে

৯-০৭”         সঙ্গীত

৯-১৫”          জল্লাদের দরবার

৯-৩০”         সমাপ্তি

১ অক্টোবর, ১৯৭১

তৃতীয় অধিবেশনঃ

সন্ধ্যা

৭-০০ মিঃ      উদ্বোধনী ঘোষণা ও অনুষ্ঠানসূচী

৭-০৫ ”        অগ্নিশিখা

 

 

 

 

 

 

<005.003.026>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

 

 

(ক) বুলেটিন

(খ) সঙ্গীত

(গ) দর্পণ

(ঘ) সঙ্গীত

(ঙ) আবৃত্তি

৭-৩৫ ”        পর্যবেক্ষকের দৃষ্টিতে

৭-৪৫ ”        বাংলা খবর

৭-৫৫ ”        সংবাদ পর্যালোচনা

৮-০০”         ইংরেজী অনুষ্ঠান

৮-২৫ ”        উর্দু সংবাদ

৮-৩০ ”        কথিকাঃ এ,বি,এম, শাহাবুদ্দিন

৮–৪০ ”        সোনার বাংলা

৯-০০ ”        জয় বাংলা

৯-৩০ ”        সমাপ্তি।

 

২ অক্টোবর ১৯৭১

প্রথম অধিবেশনঃ

সকাল

৭-০০ মিঃ      উদ্বোধনী ঘোষণা

৭-০৩ ”        তেলাওয়াতে কালামে পাক ও তার বাংলা তরজমা

৭-০৮ ”        অনুষ্ঠান পরিচিতি

৭-১০ ’         বাংলা সংবাদ

৭-২০ ”        ইংরেজী সংবাদ

৭-৩০ ’’        জাগরণী

৭-৪৫ ”        কথিকা (পর্যবেক্ষকের দৃষ্টিতে)

৭-৫৫ ”        বজ্রকণ্ঠ, সঙ্গীত

৮-০০ ”        সমাপ্তি আজ শনিবার,

 

আজ ১৬ই আশ্বিন ১৩৭৮ সন, ২রা অক্টোবর, ১৯৭১ সাল। অধিবেশনের শুরুতে কালামে পাক থেকে তেলাওয়াত করে শোনাচ্ছেন মোঃ মুজিবুর রহমান জেহাদী ও তার বাংলা তরজমা পড়ছেন মোঃ খায়রুল ইসলাম যশোরী।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

তৃতীয় অধিবেশনঃ

৭-০০ মিঃ      উদ্বোধনী ও অনুষ্ঠান পরিচিতি

৭-০৫ ”        অগ্নিশিখা (মুক্তিবাহিনীর জন্য বিশেষ অনুষ্ঠান)

(ক) বুলেটিন

(খ) সঙ্গীত (দুর্জয় বাংলা)

(গ) দর্পণ

(ঘ) সঙ্গীত

(ঙ) সাক্ষাৎকার অনুষ্ঠানঃ মেজর মঈনের সাথে

(চ) সোনার বাংলা (গান)

৭-৪৫ ”        খবরঃ বাংলা

৭-৫৫ ”        সংবাদ পর্যালোচনা আমির হোসেন

৮-০০”         ইংরেজী অনুষ্ঠান

৮-২৫ ”        উর্দু সংবাদ

৮-৩০”         সঙ্গীত

৮-৪০”         সোনার বাংলা (পল্লীর শ্রোতাদের জন্য বিশেষ অনুষ্ঠান)

৯-০০”         সঙ্গীত

৯-০০”         কথিকাঃ আবদুর রাজ্জাক চৌধুরী

৯-১৩’’         বজ্রকণ্ঠ

৯-১৩”         চরমপত্র

৯-২৫ ”        জয় বাংলা

৯-৩০”         সমাপ্তি

 

৩ অক্টোবর, ১৯৭১

তৃতীয় অধিবেশনঃ

৭-০০ মিঃ      উদ্বোধনী ও অনুষ্ঠানসূচী

৭-০৫”         অগ্নিশিখা

(ক) বুলেটিন

(খ) দর্পণ

(গ) সঙ্গীত

(ঘ) সাক্ষাৎকার অনুষ্ঠান

(ঙ) সোনার বাংলা (গান)

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<005.003.027>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

 

৭-৪৫ মিঃ               খবরঃ বাংলা                               ১-১৫           মিঃ ঐকতান

৭-৫৫”                  প্রতিধ্বনি                                           ১-৩০”                  কথিকাঃ ইলিয়াস আহমেদ

৮-০০”                  ইংরেজী অনুষ্ঠান                                  ১-৩৮”                  রবীন্দ্র সঙ্গীত

৮-২৫”                  খবরঃ উর্দু                                ১-৪৫”                   সাহিত্যানুষ্ঠানঃ

৮-৩০”                 উর্দু কথিকা                                                 রক্তস্বাক্ষর-শামিম চৌধুরী

৮-৪০”                  সোনার বাংলা                             ১-৪৮”                  পুঁথিপাঠ/পল্লীগীতি

৯-০০”                  সঙ্গীত                                      ১-৫৫”                   জয় বাংলা

৯-০৫”                  পর্যবেক্ষকের দৃষ্টিতে                              ২-০০”                  সমাপ্তি।

৯-১৩”                  সঙ্গীত

৯-১৮”                  দখলকৃত এলাকা ঘুরে এলামঃ                            তৃতীয় অধিবেশনঃ

৯-৩০”                 কথিকা                                              সন্ধ্যা

৯-২৫ ”                 বজ্রকণ্ঠ ও সঙ্গীত                                  ৭-০০ মিঃ               উদ্বোধনী ঘোষণা ও অনুষ্ঠান

৯-৩০”                 জল্লাদের দরবার                                                     পরিচিতি

৯-৫০”                  জয় বাংলা                                 ৭-০৫”                  অগ্নিশিখা

৯-৫৫ ”                 সমাপ্তি।                                                               (ক) সংবাদ বুলেটিন

(খ) সঙ্গীত

৪ অক্টোবর, ১৯১৭                                                                   (গ) দর্পণ প্রথম অধিবেশনঃ

প্রথম অধিবেশন                                                                      (ঘ) আবৃত্তি

(ঙ) আমরা গেরিলা (৪)

৭-০০”                  উদ্বোধনী                                                              (চ) আমার সোনার বাং

৭-০৫ ”                 কোরান তেলাওয়াত ও                           ৭-৪৫”                 খবরঃ বাংলা তরজমা

তরজমা ৭-৫৫”                                                    সংবাদ পর্যালোচনা

৭-১০”                  অনুষ্ঠান পরিচিতি                                 ৮-০০”                  ইংরেজী অনুষ্ঠান

৭-১১”                  খবরঃ (ক) বাংলা                                                    (ক) পর্যালোচনা

(খ) ইংরেজী                                                (খ) উদ্ধৃতি

৭-৩০”                  জাগরণী                                                              (গ) সঙ্গীত

৭-৪০”                 নিমজ্জমান ব্যক্তিদের তৃণ                                          (ঘ) খবর

অকড়ে বাঁচার চেষ্টাঃ কথিকা                     ৮-২৫ ”                 খবরঃ উর্দু

(পুনঃপ্রচার)                               ৮-৩০”                  সঙ্গীত

৭-৪৯”                  বজ্রকণ্ঠ                                            ৮-৪০”                  সোনার বাংলা

৭-৫০”                 নজরুলগীতি                              ৯-০০”                  কথিকা

৭-৫৫”                 জয় বাংলা                                 ৯-০৭ ”                 সঙ্গীতঃ পল্লী

৮-০০”                  সমাপ্তি।                                             ৯-১৭”                   বজ্রকণ্ঠ

৯-২০”                  চরমপত্র

দ্বিতীয় অধিবেশনঃ     উদ্বোধনী ও অনুষ্ঠান পরিচিতি                            ৯-৩০ ”                 সমাপ্তি।

১-০০ মিঃ               খবরঃ

(ক) বাংলা

১-০৫”                   (খ) ইংরেজী

 

 

 

<005.003.028>

পৃষ্ঠা-২৮

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র থেকে বলছি

১৬ অক্টোবর,১৯৭১

তৃতীয় অধিবেশনঃ

৭-০০ পি,এম           উদ্ভোধনী ঘোষনা ও অনুষ্ঠান পরিচিত

৭-০৫ ‘’                 অগ্নিশিখাঃ মুক্তি বাহিনীর জন্য

১)সংবাদ বুলেটিন

২)সংগীত

৩)দর্পন

৪)কবিতা আবৃতি

৫) সংগীত

৬)কথিকা/ সাক্ষাৎকার

৭) আমার সোনার বাংলা

৭-৪৫ পি,এম       খবরঃবাংলা

৭-৫৫ ‘’             সংবাদ পর্যালোচনা/ প্রতিধ্বনি

৮-০০ ‘’             ইংরেজি অনুষ্ঠান

১)ধারাভাষ্য

২) বিশ্ব সংবাদ মাধ্যম পর্যালোচনা

৩) সংগীত

৪) খবর

৮-২৫ “               খবর ঃ উর্দু

৮৩০   “               ক) কথিকা

৮-৪০ “                 খ) সংগীত

সোনার বাংলা

ক) কথোপকথন

খ) পল্লীগীতি

৯-০০ “                     কথিকা/পিন্ডির প্রলাপ

৯-০৭ “                     পল্লীগীতি/পুথি/জারি

৯-১২ “                   বজ্রকন্ঠ ও স্লোগান

৯-১৫ “                     নাটক/জল্লাদের দরবার

৯-২০ “                     চরমপত্র

৯-৩০ “                   সমাপ্তি

 

১ নভেম্বর,১৯৭১

প্রথম অধিবেশনঃ

৭-০০ এ,এম               ১)উদ্ভোধনী

২) কোরআন তেলওয়াত ও অনুবাদ

৩) অনুষ্ঠান পরিচিত

৭-১০   “                     খবরঃ বাংলা

৭-২০ “                     খবরঃ ইংরেজি

৭-৩০ “                     সঙ্গীত

৭-৩৫ “                     কথিকাঃ রনাঙ্গনে বাংলার নারী বেগম উম্মে কুলসুম

৭-৪২ “                       রবীন্দ্র সংগীত

৭-৪৭ “                       কথিকাঃ মুস্তাফিজুর রহমান

পর্যবেক্ষকের দৃষ্টিতেঃ শত্রুর রক্তে

অবগাহন করতে দাও ( পুনঃপ্রচার)

৭-৫০ “                       বজ্রকন্ঠ ও স্লোগান

৮-০০ “                       সমাপ্তি

 

 

 

 

পৃষ্ঠা ২৯

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপরত্র থেকে বলছি পঞ্চম খন্ড

২য় অধিবেশন

১-০০ পি,এম     উদ্ভোধনী ও অনুষ্ঠান পরিচিতি                                                        আলমগীর কবির কতৃক পরিচালিত

১-০৫ “             ক)খবরঃ বাংলা                                                                         ক) আহমেদ চৌধুরীর ধারাভাষ্য

খ) খবরঃ ইংরেজি                                                                    খ) স্বদেশপ্রেমী গান

১-১৫ “               সঙ্গীত                                                                                     গ) বিশ্ব সংবাদমাধ্যমের সারমর্ম

১-২৩ “              বিশ্ব জনমতঃ সাদেকীন এর লেখনী                                                 ঘ) সংবাদ

১-৩০ “               পল্লীগীতি/পুথি/জারি                                         ৮-৫৫ “             খবরঃজাহেদ সিদ্দীকের উর্দু সংবাদ

১-৪০ “             কয়েকটা বিক্ষিপ্ত ঘটনাঃ এসপ্তাহের                       ৯-০০ “             কথিকাঃ উর্দু/ স্বদেশপ্রেম গান

জয় বাংলা পত্রিকা থেকে                                     ৯-১৫ “               স্লোগান এবং অর্কেস্ট্রা

১-৪৭ “               সংগীত                                                            ৯-২০ “             চরমপত্রঃ এম আর আক্তার

১-৫০ “               পুঃপ্রচারঃ জল্লাদের দরবার                                   ৯-৩০ “             সমাপ্তি

তৃতীয় অধিবেশন                                                                        ২ নভেম্বর,১৯৭১

৭-০০ পি,এম         উদ্ভোধনী ও অনুষ্ঠান পরিচিতি                             প্রথম অধিবেশন

৭-০৫ “                 অগ্নিশিখা                                                         ৭-০০ এ,এম          ক)উদ্ভোধনী

১)সংবাদ বুলেটিন                                                                         খ) কোরআন তেলওয়াত ও অনুবাদ,মাওলানা

২)সঙ্গীত                                                                                            এম আর জাহেদী

৩) দর্পনঃ আশরাফুল আলম                                                           গ) অনুষ্ঠান পরিচিত

৪) সঙ্গীত ও স্লোগান                                          ৭-১০ “               খবরঃ বাংলা

৫)আবৃতিঃ মোস্তফা আনোয়ার                               ৭-২০ “               খবরঃ ইংরেজি

৬) বাংলার মুখঃজীবনটিকা                                    ৭-৩০ “             সঙ্গীত

রচনায় কল্যান মিত্র                                               ৭-৩৫ “             কথিকা/বিশ্বাস বিবেক ও বাংলাদেশঃ মহাদেব

অংশগ্রহনে পুর্নেন্দু সাহা এবং বুলবুল                        ৭-৪২ “               সাহা

৭) আমার সোনার বাংলা                                         ৭-৪৭ “             নজরুল গীতি

৭-৪৫ “                                                                                          ৭-৫০ “             বজ্রকন্ঠ ও স্লোগান কথিকা

৭-৫৫ “                       খবরঃ বাংলা,সংবাদ পর্যালোচনা                           ৮-০০ “             সমাপ্তি

লেখাঃ আমীর হোসেইন                                   তৃতীয় অধিবেশনঃ

৮-০০ “                     পথঃ আশফাক রহমান                                       ৭-০০ পি,এম         উদ্ভোধনী ও অনুষ্ঠান পরিচিতি

৮-০৫ “                      সঙ্গীত,জীবনটিকাঃ মিরজাফরের রোজনামচা           ৭-০৫ “               অগ্নীশিখা

রচনায় কয়ান মিত্র

৮-১৫ “                       নজরুল সঙ্গীত                                                                              ১)সংবাদ বুলেটিনঃ কামাল লোহানী

৮-২০ “                       কথিকা বিশ্বাস বিবেক                                                                     ২) সঙ্গীত

ও বাংলাদেশঃ মহাদেব সাহা                                                          ৩) কথিকঃ মোস্তফা কামাল

৮-২৭ “                         বজ্রকন্ঠ ও স্লোগান                                                                         ৪) সঙ্গীত ও স্লোগান

৮-৩০ “                         ইংরেজি অনুষ্ঠান                                                                          ৫) আবৃতিঃ বি,হাসান

৬) আমার সোনার বাংলা

৭-৪৫ “                 খবর বাংলা-বাবুল আক্তার

৭-৫৫ “                সংবাদ পর্যালোচনা

 

 

 

<005.003.030>

 

লেখাঃ           আমির হোসেন

পাঠঃ           আশফাক রাহমান

দুপুর ১.০০   উদ্বোধনী অনুষ্ঠান

রাতঃ           ৮.০০ সঙ্গীত                                               দুপুর ২.০০   পরিচিত

রাতঃ            ৮.০৫ কথিকা/ সংগ্রাম ঘরে ঘরে                                দুপুর ১.০৫   ক) খবরঃ বাংলা

মোস্তাফিজুর রহমান দ্বারা রেকর্ড কৃত                                                           খ) খবরঃ বাংলা

 

দুপুর ১.১৫- সঙ্গীত                                                                                             দুপুর ১.২৩- বিশ্ব জনমত

লেখাঃ সাদেইন

পাঠঃ শাহজাহান ফারুক

রাত ৮.১৫     নজরুল সঙ্গীত                                                       দুপুর ১.৩০- পল্লীগীতি

রাত ৮.২০     কথিপকাঃ পর্যবেক্ষকের দৃষ্টিতে                                   দুপুর ১.৪০- সাহিত্য অনুষ্ঠান

লেখাঃ ফায়াজ আহমেদ                                            রক্ত স্বাক্ষর/ নির্মলেন্দু গুনের স্বরচিত দুপুর ১.৪০- সাহিত্য অনুষ্ঠান                                     কবিতা

পাঠঃ কালাম লোহানী

রাত ৮.২৭     বজ্র কন্ঠ ও স্লোগান                                                  দুপুর ১.৪৭- সঙ্গীত

রাত ৮.৩০     ইংরেজী অনুষ্ঠান                                                    দুপুর ১.৫০- কথিকা( পুনঃপ্রচার)

পরিচালনায় আলমগীর কবির                                     পর্যবেক্ষকের দৃষ্টিতে

ক) ধারা ভাষ্যেঃ আহমেদ চৌধুরী                                দুপুর ২.০০- সমাপ্তি

খ) দেশাত্ববোধক গান

গ) বহির্বিশ্বের খবর                      তৃতীয় অধিবেশন

কথায়ঃ আলী যাকের

ঘ) সংবাদঃ পারভীন হোসেন

 

রাত ৮.৫৫     খবরঃ উর্দু পরিবেশনায় জাহিদ সিদ্দিকি                 সকাল ৭.০০ টা উদবোধনী অনুষ্ঠান

সকাল ৭.০৫ পরিচিতি

অগ্নিশিক্ষাঃ পরিচালনায়- এ আলম

রাত ৯.০০     কথিকা, (উর্দু) জাহিদের পরিবেশনায়                                    ক) সংবাদ বুলেটিনঃ বুলবুল আখতার

রাৎ ৯.১৫      সিদ্দিকী; দেশাত্নবোধক গান                              খ) সঙ্গীতঃ ১) আমি অস্ত সাগর

রাত ৯.২০     শ্লোগান ও অর্কেস্ট্রা                                        গ) দর্পনঃ এ আলম

রাত ৯.৩০     চরম পত্র ও এম আর আখতার সম্পতি                         ঘ) সঙ্গীত ও শ্লোগান-

মোরা ঝংঝার মত উদ্দাম

৩রা নভেম্বর ১৯৭১                                                          ঙ) আবৃত্তিঃ এ রহমান

চ) কথিকাঃ মুস্তফা আনোয়ার

প্রথম অধিবেশন

সকাল ৭.৪৫ ছ) আমার সোনার বাংলা

সকাল ৭.০০                                                                 খবরঃ বাংলা

ক) উদ্বোধনী                                                                  সকাল ৭.৫৫ আবদুল্লাহ আল ইসলাম

খ) কোরআন তেলওয়াত                                                            সংবাদ পর্যালোচনা

মওলানা এম. আর জাহেদী                                                          লেখাঃ আমির হোসেন

অনুবাদঃ এ এ ফারুকী                                              সকাল ৮.০০ পাঠ আশফাকুর রহমান

সকাল ৭.১০                                                                  সঙ্গীত ১) আধারে বাধ ভেঙ্গে

সকাল ৭.২০ ক) খবরঃ বাংলা                                             সকাল ৮.০৫ ২) মরবো তাতে নেই ক্ষতি

খ) খবরঃ ইংরেজী                                                   কথিকা/জীবন্তিকাঃ জাফর সিদ্দিকের দৃষ্টিপাত

সকাল ৭.৩৫          সঙ্গীত                                               এগিয়ে চলোঃ দেশাতবোধক গান আর সাথে       কথিকা/ কাঠগড়ার আসামী                                       শ্লোগান নিয়ে অনুষ্ঠান

সকাল ৭.৪২ জনাব রহমান এর পরিবেশনায়                                   ১) আয়রে চাষী

সকাল ৭.৪৭ রবীন্দ্র সঙ্গীত                                                ২) এবার উঠেছে মহা আলোড়ন

সকাল ৭.৫০ বজ্র কন্ঠ ও শ্লোগান

কথিকাঃ                  পোন্দীর প্রলাপ অথবা

সকাল ৮.০০ চরম পত্র

সমাপ্তি

 

Page: 31

 

রাত ৮-২৭ বজ্রকন্ঠে-ও-স্লোগান।                                           বেলা ১-১৫ সংগীত

রাত ৮-৩০ ইংরেজি অনুষ্ঠান                                                  ক) রক্ত রঙ্গীন উজ্জল দিন

পরিচালনায় আলমগীর কবির                                    খ) দূর্গম দূর পথ বন্ধুর

ক)পরিবেশনায় আহমেদ চৌধুরী, এ কবির                 বেলা ১-২৩ বিশ্ব জনমত

খ)দেশাত্ববোধক গান ব্যারিকেড বেয়নেট          বেলা ১-৩০ পল্লী গীতি

গ)বিশ্ব পত্রিকার সারসংক্ষেপ                                    ইন্দ্রমোহন রাজ বংশী

ঘ)খবরঃ জারীদ আহমেদ                             বেলা ১-৪০ সাহিত্যঃ অনুষ্ঠান

রাত ৮-৫৫ খবরঃ উর্দু-জাহেদ সিদ্দিকি                                   বেলা ১-৪৭ রক্ত সাক্ষর, মহাম্মদ

রাত ৯-০০ কথিকাঃ উর্দু এবং সংগীত                                        রফিকের সরচিত কবিতা

রাত ৯-১৫ জল্লাদের দরবারঃ লিখেছেন                                               সংগীতঃ রবীন্দ্র গীতি

কল্যান মিত্র                                              বেলা ১-৫০ জীবনটিকাঃ পুনপ্রচার-

অংশগ্রহনেঃ রাজু আহমেদ,                                                 মীর জাফরের রোজনামচা

…বোস, বাবুল চৌধুরী, নারায়ন ঘোষ                 বেলা ২-০০ সমাপ্তি

রাত ৯-২০ চরম পত্র                                               ৩য় অধিবেশন

রাত ৯-৩০ সমাপ্তি                                                  সন্ধ্যা ৭-০০ উদ্বোধনি ও অনুষ্ঠান

নভেম্বর, ১৯৭১                                                              পরিচিতি

প্রথম অধিবেশন                                                             সন্ধ্যা ৭-০৫ অগ্নি শিখাঃ পরিচালনা

সকাল ৭-০০ ক)উদ্বোধনি                                                     আশরাফুল আলম

খ)কুরআন তিলাওয়াত ও অনুবাদ                                       ক)সংবাদ বুলেটিন

গ) অনুষ্ঠান পরিচিতি                                                    বাবুল আখতার

সকাল ৭-১০ খবরঃ বাংলাঃ আব্দুল্লাহ আল ইসলাম                                 খ)সংগীতঃ

সকাল ৭-২০ খবরঃ ইংরেজিঃ পারভীন হোসাইন                                    গ)কথিকাঃ

সকাল ৭-৩০ সংগীতঃ জন্ম আমার ধন্য হল…                                            আমরা গরিলাঃ বেলাল

সকাল ৭-৩৫ কথিকা                                                                মোহাম্মদ

সকাল ৭-৪২ নজরুল সংগীতঃ ও ভাই খাটি সোনার চেয়ে খাটি                  ঘ)সংগীত ও স্লোগান

সকাল ৭-৪৭ বজ্রকন্ঠ-ও-স্লোগান                                                      ঙ)আবৃতিঃ মোস্তফা

সকাল ৭-৫০ কথিকাঃ পিন্ডির প্রলাপ, রচনা আবু তোয়াব খান                                  আনোয়ার

সকাল ৮-০০ সমাপ্তি                                                           চ)দুর্জয় বাংলাঃ কথা

২য় অধিবেশন                                                                         বলবেন বদরুল হাসান

বেলা ১-০০ উদ্বোধনি ও অনুষ্ঠান পরিচিতি                      সন্ধ্যা ৭-৪৫ খবরঃ বাংলা-কামাল লহানি

বেলা ১-০৫ ক)খবরঃ বাংলাঃ আলী রেজা চৌধুরী               সন্ধ্যা ৭-৫৫ সংবাদ পর্যালোচনা

খ)খবরঃ ইংরেজিঃ পারভীন হোসাইন                                           লেখা-আমির হোসেন

পাঠ-এ রহমান

রাত ৮-০০ সংগীত

রাত ৮-০৫ কথিকাঃ বলবেন, নুরুল হক                                                                                                এম.এন.এ.

রাত ৮-১৫ নজরুল সংগীত

রাত ৮-২০ কথিকাঃ পুতুল নাচের খেল,

বলবেন আব্দুল গাফফার

চৌধুরী

রাত ৮-২৭ বজ্রকন্ঠ-ও-স্লোগান

Page: 32

 

রাত ৮.৩০   ইংরেজি অনুষ্ঠানঃ                                           রাত ৮.৫৫     খবরঃ উর্দু

(ক)ধারা বিবরণী                                           রাত ৯.০০     কথিকাঃ সৈয়দ আল আহসানের

পরিবেশনায় রমজানের আদর্শ

(খ) দেশাত্ববোধক গান                                    রাত ৯.১০ অর্ক্রেস্ট্রা ও শ্লোগান                          (গ) বহির্বিশ্বের খবর                              রাত ৯.২৫ জল্লাদের দরবার কল্যান মিত্রের            (ঘ) খবরঃ পারভিন হোসেইন                   লেখা

রাত ৮.৫৫     খবরঃ উর্দু                                                   রাত ৯.৩০ সমাপ্তি

রাত ৯.০০     আলোচনা

রাত ৯.১৫     উর্দু আলোচনা এবং গানঃ জাহিদ সিদ্দিকি                     ১৬ নভেম্বর ১৯৭১

রাত ৯.২০     পর্যবেক্ষকের দৃষ্টিতে লেখা – ফায়াজ আহমেদ                  প্রথম অধিবেশনঃ

পাঠ – কামাল লোহানি                                             সকাল ৭.০০

রাত ৯.৩০     সমাপ্তি ।                                                              ক) উদবোধনী                                                                                                    খ) কোরআন তেলওয়াত ও অনুবাদ

গ) অনুষ্ঠান পরিচিতি

১০ নভেম্বর, ১৯৭১                                                 সকাল ৭.১০ খবরঃ বাংলা

তৃতীয় অধিবেশন                                                            সকাল ৭.২০ খবরঃ ইংরেজি

সকাল৭.৩০ সঙ্গীত

সন্ধ্যা ৭.০০     উদ্বোধনী ও অনুষ্ঠান পরিচিতি                                 সকাল৭.৩৫ কথিকা / পুতুল নাচের খেলা                                                                                   পুনঃ প্রচার

সন্ধ্যা ৭.০৫     অগ্নিশিখাঃ                                                সকাল৭.৪২ রবীন্দ্র সঙ্গীত

ক) সংবাদ শিরোনাম                             সকাল ৭.৫০ কথিকা- অভিযোগ

খ) সঙ্গীত                                          সকাল৮.০০ গন সঙ্গীত ও শ্লোগান

গ) কথিকাঃ বদরুল হাসানের জনতার সংগ্রাম                  সকাল ৮.১৫ বজ্র কন্ঠ ও শ্লোগান

ঘ) সঙ্গীত ও শ্লোগান                             সকাল৮.২০ কথিকা-পিন্দির প্রলাপ, এ

ঙ) আবৃত্তিঃ মোস্তফা আনোয়ার                                   তোয়াব খান

চ) সাক্ষাতকারঃ রনাঙ্গনে ডকুমেন্টরী

ঙ) আমার সোনার বাংলা                                 সকাল ৮.৩০ সমাপ্তি

সন্ধ্যা ৭.৪৫    খবরঃ বাংলা                                        দ্বিতীয় অধিবেশন

সন্ধ্যা ৭.৫৫    সংবাদ পর্যালোচনা                                দুপুর ১.০০ উদ্বোধনী ও অনুষ্ঠান পরিচিতি

লেখাঃ আমির হোসেন                            দুপুর ১.০৫ ক) খবরঃ বাংলা

পাঠঃ এ। রহমান                                                     খ) খবরঃ ইংরেজি

রাত ৮.০০     সঙ্গীত                                               দুপুর ১.১৫ সঙ্গীত

রাত ৮.০৮     দৃষ্টিপাতঃ জাফর সাদেক                                   দুপুর ১.২৩ ধর্মীয় অনুষ্ঠান /ইসলামের দৃষ্টিতে-                                                                        পুনঃ প্রচার

রাত ৮.১২     সঙ্গীত ( লোক সঙ্গীত )                                   দুপুর ১,৩০ পুথি মোহাম্মদ শাহ বাঙালী

রাত ৮.১৭     বজ্রকন্ঠ ও শ্লোগান                                দুপুর ১.৪০ সাহিত্য অনুসন্ধ্যান

ছোট গল্প মুসা সাদেক

রাত ৮.৩০     ইংরেজি অনুষ্ঠান                                           দুপুর ১.৪৭ যন্ত্র সঙ্গীত

আই জাকের পরিচালিত                                  দুপুর ১.৫০ কথিকা পুনঃপ্রচার করবে

ক) ধারা ভাষ্যে আই জাকের                            দুপুর ২.০০ সমাপ্তি ।

খ) দেশাত্ববোধক সঙ্গীত

গ) বহির্বিশ্বের খবর

কথাঃ জামিল আখতার

ঞ) সংবাদঃ

 

.

.

 

<005.003.033>

তৃতীয় অধিবেশন ক) বজ্রকন্ঠ
সন্ধ্যা ৭ টা উদ্বোধনি ও অনুষ্ঠান পরিচিতি খ) সঙ্গীত
সন্ধ্যা ৭টা ৫ খবরঃ বাংলা গ) প্রতিনিধির কণ্ঠ- আবদুল মালেক উকিল এমএনএ
সন্ধ্যা ৭টা ১৫ গণসংগীত ও স্লোগান ঘ) …
সন্ধ্যা ৭টা ৩০ অগ্নিশিখা- পরিচালনাঃ আশফাকুর রহমান ঙ) কথিকা- কাঠগড়ার আসামী- মুস্তাফিজুর রহমান
ক) বজ্রকন্ঠ চ) স্লোগান ও সঙ্গীত
খ) বিশ্ববিবেক ও বাংলাদেশ- মহাদেব সাহা ছ) জনতার সংগ্রাম- বদরুল হাসান
গ) সঙ্গীত
ঘ) আবৃত্তি জ) যুদ্ধের খবর
ঙ) ইবলিশের মুখোশ- মেসবাহ আহমেদ রাত ৮টা ২৫ আমার সোনার বাংলা
রাত ৮টা ৩০ ইংরেজি অনুষ্ঠানঃ
চ) সঙ্গীত আলমগীর কবিরের সম্পাদনায়
ছ) পিণ্ডির প্রলাপঃ পুনঃপ্রচার রাত ৮টা ৫০ ইংরেজি খবর
জ) যুদ্ধের খবর রাত ৯টা পল্লিগীতি/পুঁথিপাঠ
রাত ৮টা ২৫ আমার সোনার বাংলা রাত ৯টা ১০ কথিকাঃ
রাত ৮টা ৩০ ইংরেজি অনুষ্ঠান আবদুর রাজ্জাক চৌধুরী
রাত ৮টা ৫০ ইংরেজি খবর রাত ৯টা ২০ উর্দু অনুষ্ঠানঃ
রাত ৯টা পুঁথিপাঠ ক) কথিকা
রাত ৯টা ১০ কথিকা- পর্যবেক্ষকের দৃষ্টিতে রাত ৯টা ৩৫ খ) খবর
সংঘর পর্যালোচনাঃ
রাত ৯টা ২০ উর্দু অনুষ্ঠান পান্ডুলিপি- আমির হুসেইন
ক) কথিকা পড়েছেন- আশফাকুর রহমান
খ) খবর রাত ৯টা ৪০ সঙ্গীত
রাত ৯টা ৩৫ সংঘর পর্যালোচনা রাত ৯টা ৪৫ কথিকা- ইসলামের দৃষ্টিতে
রাত ৯টা ৪০ সঙ্গীত শবে কদর- সৈয়দ আলী আহসান
রাত ৯টা ৪৫ কথিকা- ইসলামের দৃষ্টিতে রাত ৯টা ৫৫ সঙ্গীত
রচনায়- সৈয়দ আলী আহসান রাত ১০ টা কথিকা- দৃষ্টিপাত
রাত ৯টা ৫৫ সঙ্গীত ডঃ মাজহারুল ইসলাম
রাত ১০টা চরমপত্রঃএম আর আখতার রাত ১০টা ১০ জীবন্তিকা- যাইদের দরবার
রাত ১০টা ১০ গ্রাম বাংলা- জীবন্তিকা রাত ১০টা ১৫ কথিকা
রাত ১০টা ২৫ খবর শিরোনাম রাত ১০টা ২৫ খবর শিরোনাম
রাত ১০টা ৩০ সমাপ্তি রাত ১০টা ৩০ সমাপ্তি
১৭ নভেম্বর,১৯৭১ ২০ নভেম্বর, ১৯৭১ ঈদের দিন
তৃতীয় অধিবেশন প্রথম অধিবেশন
সন্ধ্যা ৭টা উদ্বোধনি সকাল ৭টা ক) উদ্বোধনি
অনুষ্ঠান পরিচিতি খ) কোরআন তেলাওয়াত ও অনুবাদ
সন্ধ্যা ৭টা ৫ খবর- বাংলা গ)অনুষ্ঠান পরিচিতি
সন্ধ্যা ৭টা ১৫ গণসংগীত ও স্লোগান সকাল ৭টা ১০ খবর- বাংলা
সন্ধ্যা ৭টা ৩০ অগ্নিশিখাঃ সকাল ৭টা ২০ খবর- ইংরেজি

 

 

<005.003.034>

সকাল ৭টা ৩০ সঙ্গীত আয়োজন গ) আবৃত্তি- কৃষকের ঈদ
ঈদের দিনের জন্য সুর করেছেন কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা
শহিদুল ইসলাম ও অজিত রায় আবৃত্তি করবেন- মুস্তাফা আনোয়ার
সকাল ৭টা ৪৫ রমজানের ওই রোজার শেষে ঘ) কথিকাঃ বিশ্ববিবেক
রচনা- আবদুল গাফফার চৌধুরী ও বাংলাদেশ
সকাল ৮টা ২০ সঙ্গীত বজ্রকন্ঠ ও স্লোগান ঙ) সঙ্গীত
সকাল ৮টা ২৫ সমাপ্তি চ) পিণ্ডির প্রলাপঃ আবু তোয়াব খান
দ্বিতীয় অধিবেশন ছ) যুদ্ধের খবর
দুপুর ১ টা উদ্বোধনি ও অনুষ্ঠান পরিচিতি রাত ৮টা ২৫ আমার সোনার বাংলা
দুপুর ১টা ৫ ক) খবর- বাংলা রাত ৮টা ৩০ ইংরেজি অনুষ্ঠান
খ) খবর- ইংরেজি আয়োজনে- আলমগির কবির
দুপুর ১টা ১৫ সঙ্গীত রাত ৮টা ৫০ খবর- ইংরেজি
দুপুর ১টা ২৩ রক্ত রাঙা ঈদ- জীবন্তিকা রাত ৯টা পল্লিগীতি
বাংলা-লিখেছেন- বদরুল হাসান রাত ৯টা ১০ সূর্যশপথ- কথন- আবদুর রাজ্জাক চৌধুরী
দুপুর ১টা ৩০ ঈদের পুঁথিঃ মোঃ শাহ্‌ রাত ৯টা ২০ উর্দু অনুষ্ঠান
বাংলা ক) কথিকা
দুপুর ১টা ৪০ সাহিত্য- অনুষ্ঠান- খ) খবর
ছোটোগল্প রাত ৯টা ৩৫ সঙ্ঘদ পর্যালোচনা
বুলবন ওসমান লেখক- আমির হোসেন
দুপুর ১টা ৪৭ গণসংগীত ও স্লোগান
দুপুর ১টা ৫০ কথিকা- ঈদুল ফিতর রাত ৯টা ৪০ সঙ্গীত
দুপুর ২টা আলী আহসান- কথন রাত ৯টা ৪৫ কথিকা- পত্রপত্রিকার
দুপুর ২টা ৫ সঙ্গীত মন্তব্য- রচনা-সাদেকিন
রমজানের ওই রোজার শেষে
(পুনঃপ্রচার) রচনা- আবদুল গাফফার চৌধুরী
রাত ৯টা ৫৫ চন্দর, রচনা- মামুনুর
রশিদ, প্রযোজনা- হাসান ইমাম
দুপুর ২টা ৩০ সমাপ্তি রাত ১০টা ২৫ খবর শিরোনাম
তৃতীয় অধিবেশন রাত ১০ টা ৩০ সমাপ্তি
সন্ধ্যা ৭টা উদ্বোধনি ও অনুষ্ঠান পরিচিতি ২৫ নভেম্বর,১৯৭১ ঈদের দিন
সন্ধ্যা ৭টা ৫ খবর- বাংলা প্রথম অধিবেশন
সন্ধ্যা ৭টা ১৫ সঙ্গিতায়োজন- ঈদের বিশেষ আয়োজন- মুস্তাফিজুর রহমান, প্রযোজনায়- আশরাফুল আলম সকাল ৭টা ক)উদ্বোধনি
খ) কোরআন তেলাওয়াত
গ) অনুষ্ঠান পরিচিতি
সকাল ৭টা ১০ খবর- বাংলা
সন্ধ্যা ৭টা ৩০ অগ্নিশিখা- আশফাকুর রহমান সকাল ৭টা ২০ খবর- ইংরেজি
ক) বজ্রকণ্ঠ সকাল ৭টা ৩০ সঙ্গীত
সকাল ৭টা ৩৫ কথিকা- মুক্তিসংগ্রামে মায়ের প্রেরণা
খ) সঙ্গীত- ঈদুল ফিতর এই দিনে
বাংলা কথন- হাফেজ আলী, পড়েছেন- মোঃ ফারুক সকাল ৭টা ৪২ রবীন্দ্র সঙ্গীত/ নজরুল গীতি

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<005.003.035>

পৃষ্ঠা ৩৫

সন্ধ্যা ৭.৫০ কথিকাঃ দৃষ্টিপাত রচনায় ডঃ এম ইসলাম                 সকাল ৮.০০ বর্ণনার সাথে গন সঙ্গীত

সন্ধ্যা ৮.১৫ বর্ণোনার সাথে গনসঙ্গীত                           সকাল ৮.১৫ বজ্রকন্ঠ শ্লোগান

সন্ধ্যা ৮.২০ বজ্রকন্ঠ ও শ্লোগান                                   সকাল ৮.২০ কথিকাঃ পিন্ডির প্রলাপ, রচনায় ও পাঠে

কথিকাঃ পিন্ডির প্রলাপ , রচনায় ও পাঠে               সকাল ৮.৩০ সমাপ্তি

আবু তোয়াব খান                                           দ্বিতীয় অধিবেশন

সন্ধ্যা ৮.৩০ সমাপ্তি                                       দুপুর ১.০০ উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ও পরিচিতি

দ্বিতীয় অধিবেশন                                                   দুপুর ১.০৫ (ক) বাংলা খবর পাঠে কামাল লোহানী

দুপুর ১.০০ উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ও পরিচিতি                                  (খ) ইংরেজী খবর পাঠে পারভীন হোসেন

দুপুর ১.০৫    ক) খবরঃ বাংলা                                   দুপুর ১.১৫ সঙ্গীত

খ) খবরঃ বাংলা                                   দুপুর ১.২৩ জীবন টিকাঃ জনতার আলাপ

দুপুর ১.১৫ সঙ্গীত                                                  দুপুর ১.৩০ পল্লীগীতি, পুথি , জারী

দুপুর ১.২৩ ধর্মীয় অনুষ্ঠান/ গীতা পাঠ                                   দুপুর ১.৪০ সাহিত্য অনুষ্ঠানঃ

দুপুর ১.৪০ সাহিত্য অনুষ্ঠানঃ                                     রক্ত স্বাক্ষরঃ ছোট গল্প

জাফর সাদেক রচিত রক্তের আখর লিখি               দুপুর ১.৪৭ যন্ত্রসংগীত

পাঠে আশরাফুল আলম                                  দুপুর ১.৫০ কথিকা অগ্নিশিক্ষা to be re-b cast

দুপুর ১.৪৭ যন্ত্রসংগীত

দুপুর ১.৫০ কথিকা অগ্নিশিক্ষা to be re-b cast              দুপুর ২.০০ সমাপ্তি

থেকে সময়োপযোগী আলোচনা

কাঠগড়ার আসামীঃ এম রহমান

দুপুর ২.০০ সমাপ্তি                                        ১০ই ডিসেম্বর ১৯৭১ ঈদের দিন

৪ই ডিসেম্বর ১৯৭১                                        প্রথম অধিবেশন

প্রথম অধিবেশন                                                    সকাল ৭.০০ (ক) উদ্বোধনী

সকাল ৭.০০ (ক) উদ্বোধনী                                                (খ) কোরআন তেলওয়াত ও তর্জমা

(খ) কোরআন তেলওয়াত ও তর্জমা                                      (গ) অনুষ্ঠান পরিচিতি

(গ) অনুষ্ঠান পরিচিতি

সকাল ৭.১০ বাংলা খবর পাঠে বাবুল আখতার                          সকাল ৭.১০ খবরঃ বাংলা

সকাল ৭.২০ ইংরেজী খবর পাঠে পারভীন হোসেন           সকাল ৭.২০ খবর ইংরেজী

সকাল ৭.৩০ সঙ্গীত                                       সকাল ৭.৩০ সংগীত শ্লোগান

কথিকাঃ পর্যবেক্ষকের দৃষ্টিতে রচনায় ফায়েজ                  সকাল ৭.৪৭ যন্ত্র সঙ্গীত ও শ্লোগান

আহমেদ                                                     সকাল ৭.৫০ কথিকা স্বীকৃতির খবর পেয়ে শওকত

সকাল ৭.৪২ রবীন্দ্র সংগীত /নজরুল গীতি                              ওসমান

সকাল ৭.৫০ কথিকা জনতার সংগ্রাম- গাজীউল হক                  সকাল ৭.৫৮ সংবাদ শিরোনাম

সকাল ৮.০০ কথিকা/পিন্দির প্রলাপঃ আবু তোয়াব খান

সকাল ৮.১০ সঙ্গীত

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

পৃষ্ঠা ৩৬

সকাল ৮.১৫ কথিকাঃ বাংলাদেশ ও বুদ্ধিজীবি সম্প্রদায়                সকাল ৭.২৫ সঙ্গীত

ডঃ অজয় রয়                            সকাল ৭.৩০ অগ্নিশিখা

সকাল ৮.২২ নজরুল গীতি                                                (ক) বজ্রকন্ঠ ও শ্লোগান

সকাল ৮.২৮ সংবাদ শিরোনাম                                            (খ) সঙ্গীত

সকাল ৮.৩০ পল্লীগীতি                                                     (গ) প্রতিনিধির কন্ঠঃ জীল্লুর রহমান এম এন এ

সকাল ৮.৪২ বজ্র কন্ঠ ও শ্লোগান                                         (ঘ) আবৃত্তিঃ অমিত্রাক্ষর ছন্দ, আশফাক রহমান

সকাল ৮.৪২ বজ্রকন্ঠ ও শ্লোগান                                                   উম্মে কুলসুম

সকাল ৮.৪৫ খবরঃ উর্দু                                                    (ঙ) যন্ত্রসংগীত ও শ্লোগান

সকাল ৮.৫০ খবরঃ বাংলা                                                  (চ) কথিকাঃ জনতার সংগ্রামঃ গাজীউল হক

সকাল ৯.০০ সমাপ্তি                                               (ছ) সঙ্গীত

দ্বিতীয় অধিবেশন                                                            (জ) কথিকা/ রনাঙ্গন ঘুরে

দুপুর ১.০০ উদ্বোধনী ও অনুষ্ঠান পরিচিত                                এলমঃ মুসা সাদেক

দুপুর ১.০৫ খবরঃ বাংলা                                                    (ঝ) যুদ্ধের খবর

দুপুর ১.১৫ খবরঃ ইংরেজী                                         সকাল ৮.১০ আমার সোনার বাংলা

দুপুর ১.২৫ সঙ্গীত                                         সকাল ৮.১৫ উর্দু অনুষ্ঠান

দুপুর ১.৩০ সংগ্রামী বাংলা                                                 (ক) কথিকা

দুপুর ১.৩৭ যন্ত্র সঙ্গীত ও শ্লোগান                                         (খ) খবর

দুপুর ১.৪০ সাহিত্য অনুষ্ঠানঃ রক্ত স্বাক্ষর/                      সকাল ৮.২৮ সংবাদ শিরোনাম

অসিত রয় চৌধুরী ও সবুজ চক্রবর্তী রচিত             সকাল ৮.৩০ ইংরেজী অনুষ্ঠান

কবিতা                                                       সকাল ৮.৫০ ফায়েজ আহমেদ এর রচনায় পর্যবেক্ষকের

দুপুর ১.৫০ সঙ্গীত                                                  দৃষ্টিতে, পাঠে কামাল লোহানী

দুপুর ১.৫৮ সংবাদ শিরোনাম                                     সকাল ৮.৫৮ সংবাদ শিরোনাম

দুপুর ২.০০ কথিকা                                        সকাল ৯.০০ কথিকাঃ জংগীশাহীর পদলেহীর উদ্দেশ্যে

দুপুর ২.০৭ যন্ত্রসংগীত ও শ্লোগান                               সকাল ৯.১০ জীবন টিকাঃ গ্রাম বাংলা

দুপুর ২.১০ কথিকা, ফায়েহ আলীর লেখায় একটি সমীক্ষা   সকাল ৯.২৮ সংবাদ শিরোনাম

দুপুর ২.২০ সঙ্গীত                                         সকাল ৯.৩০ সংঘাত পর্যালোচনা লেখায় আমির হোসেন

দুপুর ২.২৮ সংবাদ শিরোনাম

দুপুর ২.৩০ পুথিপাঠঃ মোহাম্মদ শাহ                             সকাল৯.৪০ সঙ্গীত ও শ্লোগান

দুপুর ২.৪০ কথিকাঃ দৃষ্টিপাত ডঃ মাজহারুল ইসলাম                  সকাল ৯.৫০ খবরঃ বাংলা

দুপুর ২.৫০ খবর বাংলা                                            সকাল ১০.০০ সমাপ্তি

দুপুর ৩.০০ সমাপ্তি                                        ১২ ডিসেম্বর ১৯৭১ ঈদের দিন

 

সকাল ৭.০০ (ক) উদ্বোধনী

সন্ধ্যা ৭.০০ (ক) উদ্বোধনী    ও অনুষ্ঠান পরিচিতি                              (খ) কোরআন তেলওয়াত ও তর্জমা

সন্ধ্যা ৭.০৫ বাংলা খবর                                                             (গ) অনুষ্ঠান পরিচিতি

সন্ধ্যা ৭.১০ ইংরেজী খবর                                         সকাল ৭.১০ খবর বাংলা

সকাল ৭.২০ খবর ইংরেজী

সকাল ৭.৩০ সংগীত শ্লোগান

 

 

 

 

 

পৃষ্ঠা ৩৭

সন্ধ্যা ৭.৪০ কথিকা; একটি আলেখ্য-জলি জাহানুর                   দুপুর ২.৪০ কথিকা; রনাঙ্গন ঘুরে

এলম; মুসা সাদেক

সন্ধ্যা ৭.৪৭ যন্ত্র সংগীত ও শ্লোগান                              দুপুর ২.৫০ খবর বাঙলা

সন্ধ্যা ৭.৫০ কথিকা এই যুদ্ধ শেষ যুদ্ধঃ সাধন কুমার ধর              দুপুর ৩.০০ সমাপ্তি

১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১

সন্ধ্যা ৭.৫৮ খবর শিরোনাম                             সকাল ৭.০০ (ক) উদ্বোধনী

সন্ধ্যা ৮.০০ কথিকা                                                         (খ) কোরআন তেলওয়াত ও তর্জমা

সন্ধ্যা ৮.১০ সঙ্গীত                                                          (গ) অনুষ্ঠান পরিচিতি

সন্ধ্যা ৮.১৫ কথিকাঃ বিশ্ব বিবেক ও বাংলাদেশ                সকাল ৭.১০ খবর বাঙলা

মহাদেব সাহা, পাঠকঃ শহীদুল ইসলাম                 সকাল ৭.২০ খবর ইংরেজী

সন্ধ্যা ৮.২২ নজরুল গীতি খবর                                  সকাল ৭.৩০ সংগীত শ্লোগান

সন্ধ্যা ৮.২৮ খবর শিরোনাম                             সকাল ৭.৪০ কথিকাঃ দেশ গঠনে নারীর

সন্ধ্যা ৮.৩০ দৃষ্টিপাত ডঃ মাজহারুল ইসলাম                                     ভুমিকাঃ পারভিন আখতার

সন্ধ্যা ৮.৪০ বজ্রকন্ঠ ও শ্লোগান                                   সকাল ৭.৪৭ যন্ত্র সঙ্গীত ও স্লোগান

সন্ধ্যা ৮.৪২ যন্ত্র সঙ্গীত ও শ্লোগান                               সকাল ৭.৫০ কথিকাঃ মদের গরব মোদের আশা; আসাদ

চৌধুরী

সন্ধ্যা৮.৪৫ খবরঃ উর্দু                                              সকাল ৭.৫৮ সংবাদ শিরোনাম

সন্ধ্যা ৮.৫০ খবরঃ বাঙলা                                        সকাল ৮.০০ কথিকাঃ দৃষ্টিকোনঃ আবু তোয়াব খান

১৩ই ডিসেম্বর ১৯৭১

দ্বিতীয় অধিবেশন

দুপুর ১.০০ উদ্বোধনী ও অনুষ্ঠান পরিচিতি                      সকাল ৮.১০ সঙ্গীত

দুপুর ১.০৫ বাংলা খবর                                            সকাল ৮.১৫ কথিকাঃ সত্যের ঝংকারঃ প্রনব চৌধুরী

দুপুর ১.০৫ ইংরেজী খবর                                         সকাল ৮.২২ নজরুল গীতি

দুপুর ১.২৫ সঙ্গীত                                         সকাল ৮.২৮ সংবাদ শিরোনাম

দুপুর ১.৩০ সাদেকীন এর সম্পাদনায় বিশ্ব জনমত           সকাল ৮.৩০ কথিকাঃ সুর্য শপথঃ রেজাউল হক চৌধুরী

দুপুর ১.৩৭ যন্ত্র সঙ্গীত ও শ্লোগান                                সকাল ৮.৩৫ যন্ত্র সঙ্গীতএবং শামসুর রহমান ও সুকান্তের

কবিতা মোস্তফা মনোয়ারের আবৃত্তি

দুপুর ১.৪০ সাহিত্য অনুষ্ঠানঃ রক্ত স্বাক্ষর/নির্মলেন্দু গুনের কবিতা

দুপুর ১.৫০ সঙ্গীত                                         সকাল ৮.৪০ বজ্রকন্ঠ ও শ্লোগান

দুপুর ১.৫৮ সংবাদ শিরোনাম                                     সকাল ৮.৪২ যন্ত্র সঙ্গীত ও শ্লোগান

দুপুর ২.০০ কথিকা                                        সকাল ৮.৪৫ খবর উর্দু

দুপুর ২.০৭ যন্ত্র সংগীত ও শ্লোগান                              সকাল ৮.৫০ খবর বাংলা

দুপুর ২,১০ কথিকাঃ পর্যবেক্ষকের দৃষ্টিতে( পুনঃপ্রচার)                সকাল ৯.০০ সমাপ্তি

তৃতীয় অধিবেশন

দুপুর ২.২০ সঙ্গীত                                         সন্ধ্যা ৭.০০ (ক) উদ্বোধনী    ও অনুষ্ঠান পরিচিতি

দুপুর ২.২৮ সংবাদ শিরোনাম                                     সন্ধ্যা ৭.০৫ বাংলা খবর

দুপুর ২.৩০ পল্লীগীতি পুথিপাঠঃ                                  সন্ধ্যা ৭.১৫ ইংরেজী খবর

মোহাম্মদ শাহ বাঙালী                                     সন্ধ্যা ৭.২৫ সঙ্গীত

(ক) ব্জ্রকন্ঠ ও শ্লোগান                                    সন্ধ্যা ৭.৩০ অগ্নিশিক্ষা

(খ) কথিকাঃ ঢাকায় স্বাধীনতার সূর্য দীপ্তি লোহানী    সন্ধ্যা ৭.৩০ তোরা সব জয়ধ্বনি করঃ বিশেষ

(গ) সঙ্গীত                                                           সঙ্গীতানুষ্ঠান

সন্ধ্যা ৭.৪২ এই ঢাকা এই রাজধানীঃ বিশেষ জীবন্তিকা

পৃষ্ঠা ৩৮                                                                       রচনাঃ টি, এইচ সিকদার।

ঘ)আবৃত্তিঃ শহিদুল ম্যাম                                           সকাল ৭.৫২ (ক) অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর

ঘ)আবৃত্তিঃ শহিদুল ম্যাম                                                    ভাষণ

ঙ)জারিত্র সঙ্গীত ও শ্লোগান                                       (খ) বিজয় নিশান উড়ছে ওইঃ বিশেষ সঙ্গীত

চ)কথিকাঃ বাংলাদেশ সরকারের সাফল্যঃ                       সকাল ৮.০০ শ্লোগান ও গান (স্বাধীন স্বাধীন)

শামীম চৌধুরী                                              সকাল ৮-০৫ প্রধানমন্ত্রীর সাথে ‘দি পিপল’ পত্রিকার

ছ)চোরা সব জয়ধ্বনি করঃ কোরাস গান                                 প্রতিনিধির সাক্ষাৎকার

জ)যুদ্ধের কাহাঁর                                           সকাল ৮.১০ বাংলার মাটি বাংলার জলঃ রবীন্দ্র সঙ্গীত

রাত ০৮-১০ অর্কেস্ট্রা                                              সকাল ৮.১৫ চরমপত্রঃ এম, আর আখতার

রাত ০৮-১৫উর্দু অনুষ্ঠানঃ জাহিদ সিদ্দিকি                      সকাল ৮.২৫ দেশাত্মবোধক গান

পরিচালিত                                          সকাল ৮.৩০ যন্ত্রসঙ্গীত ও শ্লোগান

ক)কথিকা, শহিদুর রাহমান                              সকাল ৮.৩৫ বাংলাদেশ সরকারের ডেপুটি কমিশনার

খ) খবর                                                              ও পুলিশ সুপারিটেন্ডেন্টের নিয়োগ সম্পর্কিত

রাত ০৮-২৮খবর শিরোনাম                                                         ঘোষণা

রাত ০৮-৩০ইংরেজি প্রোগ্রাম                            সকাল ৮.৪০ দেশাত্মবোধক গান

রাত ০৮-৫০পর্যবেক্ষকের দৃষ্টিতেঃ                                সকাল ৮-৪৫ খবরঃ উর্দু

ফাইজ আহরমেদ                                                   সকাল ৮-৫০ খবরঃ বাংলা

 

রাত ০৮-৫৮খবর শিরোনাম                              সকাল ৯-০০ সমাপ্তি

 

রাত ০৯-০০ কথিকাঃ চরমপত্রঃ                                   দ্বিতীয় অধিবেশনঃ

এম. আর. আখতার                              দুপুর ১-০০ উদ্বোধনী ও অনুষ্ঠান পরিচিতি

রাত ০৯-১০ জীবন্তিকাঃ কল্যাণ মিত্রের লেখা                   দুপুর ১-০৫ খবর বাংলা

রাত ০৯-২৮খবর শিরোনাম                              দুপুর ১-১৫ খবর ইংরেজী

রাত ০৯-৩০সংসদ পর্যালোচনাঃ                                  দুপুর ১-২৫ সঙ্গীত

আমির হোসেন                                    দুপুর ১-৩০ বাংলার মুখঃ কথিকা-সাদেকীন

রাত ০৯-৪০সঙ্গীত ও শ্লোগান                            দুপুর ১-৩৭ বাংলাদেশের বিভিন্নস্থানে প্রশাশনিক

রাত ০৯-৫০খবরঃ বাংলা                                                    পুলিশ অফিসার নিয়োগ সম্পর্কিত ঘোষণা।

রাত ১০-০০ সমাপ্তি                                       দুপুর ১-৪২ সাহিত্যনুষ্ঠানঃ স্বরচিত কবিতা আবৃত্তিঃ                                                                  দুপুর ১-৪২ সাহিত্যনুষ্ঠানঃ স্বরচিত কবিতা আবৃত্তিঃ

১৭ ডিসেম্বর, ১৯৭১                                                মোহাম্মদ রফিক ও আবুল কাশেম সন্দ্বীপ

প্রথম অধিবেশনঃ

৭-০০ মিঃ (ক) উদ্বোধনী

(খ) কোরান তেলাওয়াত ও অনুষ্ঠান

পরিচিতি

সকাল ৭-১০ খবরঃ বাংলা

সকাল ৭-২০ খবরঃ ইংরেজি

 

 

দুপুর ১-৫০ সঙ্গীত                                                  কথিকাঃ বদরুল হাসান

দুপুর খবর শিরোনাম                                                       গ)সঙ্গীতঃ ও আমার দেশের মাটি

দুপুর ২-০০ ………..                                              ঘ) আবৃত্তি

দুপুর ২-০৭ যন্ত্রসঙ্গীত ও স্লোগান                                          ঙ) যন্ত্রসঙ্গীত ও শ্লোগান

 

পৃষ্ঠা ৩৯

দুপুর ২-১০    বহু ইতিহাসের নগরী ঢাকাঃ কথিকা-                             কথিকাঃ মহাদেব সানা

জয় বাংলা পত্রিকার কাটিং……                                   ছ) কথিকা

দুপুর ২-২০    সঙ্গীত                                                        জ) সঙ্গীত

দুপুর ২-২৮    খবর শিরোনাম                                                      ঝ) যুদ্ধের খবর

দুপুর ২-৩০    পল্লিগীতি/পুঁথিপাঠ                                রাত ৮-১০ অর্কেস্ট্রা

দুপুর ২-৪৫    বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে প্রশাসনিক                   রাত ৮-১৫ উর্দু অনুষ্ঠানঃ

পুলিশ অফিসার নিয়োগ সম্পর্কিত ঘোষণা                     ক)কথিকা/জীবন্তিকা

দুপুর ২-৪৬    সঙ্গীত                                                        খ)খবর

দুপুর ২-৫৩    খবরঃ বাংলা                               রাত ৮-২৮ খবর শিরোনাম

রাত ৮-৩০ ইংলিশ প্রোগ্রাম

রাত ৮-৫০ পর্যবেক্ষকের দৃষ্টিতেঃ

চিত্রনাট্য ফাইয়াজ আহমেদ,

তৃতীয় অধিবেশনঃ                                                  পঠিত কামাল লোহানী

সন্ধ্যা ৭-০০   উদ্বোধনী ও অনুষ্ঠান পরিচিতি          পঠিত কামাল লোহানী

সন্ধ্যা ৭-০৫   খবরঃ বাংলা                               রাত ৯-০০ কথিকা/দৃষ্টিকথন আবু তোয়াব খান

সন্ধ্যা ৭-১৫    খবরঃ ইংরেজী                                     রাত ৯-১০ দেশাত্মবোধক গান

সন্ধ্যা ৭-২৫   সঙ্গীত                                      রাত ৯-২৮ খবর শিরোনাম

সন্ধ্যা ৭-৩০   অগ্নিশিখাঃ আশরাফুল আলম পরিচালিত      রাত ৯-৩০ সংসদ পর্যালোচনাঃ মুস্তাফিজুর রহমান

(ক)বজ্রকন্ঠ ও শ্লোগান                           রাত ৯-৪০ সঙ্গীত ও শ্লোগান

(খ) দর্পনঃ আশরাফুল আলম          রাত ৯-৪০ সঙ্গীত ও শ্লোগান

রাত ১০-০০ সমাপ্তি।

 

.

 

 

 

 

 

 

 

<005.004.040>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

শিরোনাম সুত্র তারিখ
৪। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত বাংলা ও ইংরেজী সংবাদ

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র-

এর দলিলপত্র

২৬ মে-৫ জুন, ১৯৭১

 

বাংলা সংবাদ

২৬-৫-৭১

(১) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপ্রধান সৈয়দ নজরুল ইসলাম বলেছেন,স্বাধীনতা ও

সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতির মধ্যেই রয়েছে বাংলাদেশে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনার চাবিকাঠি।

(২) ওয়ার অন ওয়ান্ট প্রতিষ্ঠান প্রধান ও বৃটিশ এম-পি আমাদের প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করেছেন।

(৩) বুদাপেষ্টের শান্তি সম্মেলন বাংলাদেশে পাকিস্তানী হামলার নিন্দা করেছে।

(৪) মুক্তিফৌজ গানবোট দখল করেছে, কালভার্ট উড়িয়ে দিয়েছে, পাক ফাঁড়ি উড়িয়ে দিয়েছে।

(৫) আজ বাংলাদেশের সর্বত্র বিদ্রোহী কবি নজরুলের জন্মজয়ন্তী পালিত হচ্ছে।

(৬) বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ প্রতিনিধি বিচারপতি জনাব আবু সাঈদ চৌধুরী নিউইয়র্ক পৌছেছেন।

(৭) পাকিস্তান বৌদ্ধ কৃষ্টি প্রচার সংঘের প্রধান উ থান্টের কাছে বাংলাদেশের বৌদ্ধহত্যার কাহিনী

জানিয়েছেন।

 

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপ্রধান সৈয়দ নজরুল ইসলাম বলেছেন যে, বাংলাদেশের স্বাধীন ও সার্বভৌম সত্তা স্বীকার করে নেওয়ায় মধ্যে নিহিত রয়েছে বাংলাদেশে স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরে আসার নিশ্চয়তা। তিনি আশা প্রকাশ করেছেন যে, জাতিসংঘ বাংলাদেশ থেকে পাক সৈন্য সরিয়ে নিতে পাকিস্তান সরকারের উপর প্রভাব বিস্তার করবে।

ইউনাইটেড প্রেস ইন্টারন্যাশনালের জনৈক বিশেষ প্রতিনিধির সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে আমাদের অস্থায়ী রাষ্ট্রপ্রধান বাংলাদেশ মনোভাব ব্যক্ত করেছেন।

ভারতে আশ্রয়প্রার্থী বাংলাদেশ শরণার্থীদের সাহায্য দানের জন্য বিশ্ব সরকারসমূহের প্রতি জাতিসংঘের সেক্রেটারী জেনারেল যে আবেদন জানিয়েছেন সে সম্পর্কে মন্তব্য প্রসঙ্গে সৈয়দ নজরুল ইসলাম বলেন,বিরাট সংখ্যক নির্যাতিত ও নিগৃহীত মানুষ যে পাক-দস্যুদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে বাংলাদেশ ছেড়ে ভারতে গিয়েছে উ থান্টের আবেদনে তার স্বীকৃতি রয়েছে। সেক্রেটারী জেনারেলের বিবৃতি থেকে এও প্রতীয়মান হয়, কি নিদারুন পরিস্থিতিতে মানুষ জন্ম-জন্মান্তরের বাড়িঘর ছেড়ে বিদেশে চলে যেতে বাধ্য হয়েছে।

সৈয়দ নজরুল ইসলাম আশা প্রকাশ করে বলেন যে উ থান্ট বাংলাদেশে এমন একটা পরিবেশ সৃষ্টি করার দায়িত্ব নেবেন যে পরিবেশে দেশত্যাগী শরণার্থীরা পূর্ণ মর্যাদায় ও নিরাপত্তায় আবার দেশে ফিরে আসতে পারবেন। উক্ত সাংবাদিকের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমার এ বক্তব্যের দ্বারা আমি এ কথাই বোঝাতে চাচ্ছি যে জাতিসংঘ পাকিস্তান সরকারের উপর এমন একটা চাপ সৃষ্টি করবে যে চাপের মুখে বাংলাদেশ থেকে

 

 

 

 

 

 

 

 

পাক হানাদার বাহিনী প্রত্যাহার করা হবে এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব স্বীকৃত হবে। তিনি বলেন যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব স্বীকৃত হওয়ার মধ্যেই বাংলাদেশে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা

 

 

 

 

 

 

 

<005.004.041>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

 

ফিরে আসার সম্ভাবনা নিহিত রয়েছে। তিনি বলেন, শুধু সে অবস্থাতেই দেশত্যাগী লক্ষ লক্ষ নারী-পুরুষ-শিশু স্বদেশে ফিরে আসতে পারবে।

বুদাপেষ্ট শান্তি সম্মেলনে যোগদানকারী ৫৫টি দেশের ১২৫ জন প্রতিনিধি একটি বিশেষ আবেদন প্রচার করেছেন। প্রতিনিধিদের মধ্যে মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, আইনজীবী, চিকিৎসক, সাংবাদিক, আফ্রো-এশীয় দেশসমূহের মুক্তি আন্দোলনের এবং গোষ্ঠী-নিরপেক্ষ দেশসমূহের নেতৃবৃন্দ রয়েছেন।

আবেদনে বাংলাদেশের শরণার্থীদের সাহায্যদানের জন্য এবং তারা যাতে মাতৃভূমিতে ফিরে যেতে পারেন সেই অবস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য বিশ্বের সরকারসমূহের ও জনগণের প্রতি অনুরোধ জানান হয়েছে। তারা বাংলাদেশে গণহত্যার জন্য পাকিস্তান সামরিক শাসক-চক্রের কার্যকলাপের তীব্র নিন্দা করেছেন। বাংলাদেশের জনগণের গণতান্ত্রিক আশা-আকাঙ্খার প্রতি মর্যাদা প্রদর্শনের জন্য তারা পাক সামরিক শাসকচক্রের প্রতি আহবান জানান। তারা সিয়াটো-সেন্টো জোটের মার্কিন এবং অন্যান্য সদস্যরা যাতে পাকিস্তানের সামরিক চক্রকে সাহায্য দেয়া বন্ধ করেন তার জন্যও দাবী জানিয়েছেন। বুদাপেস্ট শান্তি সম্মেলনে জাতীয় পরিষদ সদস্য জনাব এম. এ. সামাদ বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধিত্ব করেন। তিনি বর্তমানে লণ্ডনের পথে রয়েছেন বলে অনুমান করা হচ্ছে।

বিলেতের War on Want প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান মিঃ ডোনাল্ড চেসওয়ার্থ এবং শ্রমিক দলের পার্লামেন্ট সদস্য মিঃ মাইকেল বার্নস গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী জনাব তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে এক বৈঠকে মিলিত হন। এই বৈঠক প্রায় তিন ঘণ্টা কাল স্থায়ী হয়। এই বৈঠকে বাংলাদেশ সরকারের স্বীকৃতির প্রশ্নে বৃটিশ সরকারের মনোভাব সম্পর্কে আলাপ-আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সমাধান বলতে বৃটিশ পার্লামেন্ট কি বোঝাতে চাইছেন সে সম্পর্কে আমাদের প্রধানমন্ত্রী বৃটিশ এম, পি-র কাছ থেকে বিশদ ব্যাখ্য দাবী করে বলে জানা গেছে। বৃটিশ নেতা আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে জানিয়েছেন যে, বাংলাদেশের মানুষের আশা-আকাঙ্খার বাস্তবায়নকেই তাঁরা সমস্যার রাজনৈতিক সমাধান বলে মনে করেন। বাংলাদেশ থেকে বাঙালীদের তাড়িয়ে দিয়ে সেখানে একটা শাসন চাপিয়ে দেওয়ার নাম রাজনৈতিক সমাধান নয় বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

মুক্তিবাহিনীর দক্ষিণাঞ্চলীয় সদর দফতর থেকে পাওয়া এক খবরে জানা গেছে যে, মুক্তিফৌজ এক প্রচণ্ড সংঘর্ষের পর পাকিস্তানী সেনাদের একখানা গানবোট দখল করে নিয়েছে। গানবোটযোগে খানসেনারা টহল দিয়ে বেড়াচ্ছিল। গানবোটের আরোহী সব ক’জন খানসেনাই পানিতে ডুবে মারা গেছে।

মুক্তিবাহিনী জোয়ানেরা বরিশালে একটি থানা আক্রমণ করেন এবং বাঙ্গালীর দুশমন খানসেনাদের কয়েকজন স্থানীয় দোসরকেও হত্যা করেন।

রংপুর সেক্টরে পাকিস্তানী সৈন্যদের একটি দল ধরলা অতিক্রমের চেষ্টা করলে মুক্তিফৌজ তাদেরকে বাধা দেয়। সংঘর্ষকালে বেশ কয়েকজন খানসেনা নদীতে ডুবে মারা যায়।

রাজশাহীর কাছে একটি কালভার্টে মুচক্তিফৌজের স্থাপিত মাইন বিস্ফোরিত হয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একটি জীপ ধ্বংস হয়েছে। জীপের আরোহীরা গুরুতর আহত হয়েছে বলে জানা গেছে।

সিলেট সেক্টরে বাংলাদেশ মুক্তিবাহিনী পশ্চিম পাকিস্তানী সৈন্যদের একটি কনভয়ের উপর চোরা-গোপ্তা আক্রমণ চালায়। এতে শত্রুপক্ষের ৭ খানা যানবাহন ধ্বংস হয়। বিয়ানীবাজার এবং বরলেখায় মুক্তিফৌজ খানসেনাদের ১৭ জন স্থানীয় দালালকে হত্যা করেছে বলে সংবাদ পাওয়া গেছে।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<005.004.042>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

 

সম্প্রতি কুমিল্লার কসবা অঞ্চলে বাংলাদেশ মুক্তিফৌজ একটি পাক-হানাদার বাহিনীর উপর হামলা চালায় এবং তাদের হটিয়ে দেয়।

এই অঞ্চলে মোন্দেভাগ নামক এক জায়গায় পাক-হানাদারদের একটি ট্রলি বোঝাই অস্ত্র আর খাদ্যদ্রব্য যাচ্ছিল। মুক্তিফৌজ সেটি আক্রমণ করে পুড়িয়ে দিয়েছেন। বল্লবপুরে পাক-ঘাঁটির উপর হঠাৎ আক্রমণ করে মুক্তিফৌজ দু’জন প্রহরীকে হত্যা করেছেন। কাঁঠালবাড়িয়াতে মুক্তিফৌজের হামলায় পাক-বাহিনীর একজন ক্যাপ্টেন ও কয়েকজন পাক-হানাদার খতম হয়েছে। ময়মনসিংহ এলাকার শ্রীবর্দীতে মুক্তিফৌজ একটি পাকা সেতু উড়িয়ে দিয়েছেন।

সিলেট সেক্টরে দুটি পাক-ঘাঁটি মুক্তিফৌজ জ্বালিয়ে দিয়েছেন। এই ঘাঁটি দুটির নাম জামকান্দি ও লালাপুঞ্জি। কুমিল্লায় বিবিরবাজারে মুক্তিফৌজ মাইন ফেলে পাক-হানাদারদের একটি ট্রাক বিধ্বস্ত করেন। হতাহতের সংখ্যা জানা যায়নি। হিলি আর পাচবিবির মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থা আমাদের মুক্তিফৌজ বিপর্যস্ত করে দিয়েছেন।

চট্টগ্রাম শহর ও বন্দর এলাকায় যুক্তিসংগ্রামরত বাঙালী ছাত্ররা পাকিস্তানী বর্বর সৈন্যদের হুশিয়ার করে দেয়ালে দেয়ালে পোস্টার লাগিয়েছে। পোস্টারের ভাষা হচ্ছে, ইয়াহিয়ার সেনাদের খতম কর- ওদের খতম কর- খতম কর। অবিলম্বে বাংলাদেশ ছেড়ে না গেলে হানাদার সৈনিকদের সবাইকে খতম করা হবে বলে হুঁশিয়ারি করে দেওয়া হয়েছে ।

আজ বাংলাদেশের সর্বত্র বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ৭২তম জন্মজয়ন্তী পালিত হচ্ছে। এ উপলক্ষে বাংলাদেশের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান আয়োজন করেছে আলোচনা সভা আর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের। আজকের সান্ধ্য অধিবেশনে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকেও নজরুলের উপর একটি বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচার করা হবে।

পাকিস্তান বৌদ্ধ কৃষ্টি প্রচার সংঘ এবং বিশ্ব বৌদ্ধ ফেলোশিপের পাকিস্তান আঞ্চলিক শাখার সভাপতি মিঃ জ্যোতিপাল মহাথেরো জাতিসংঘের সেক্রেটারী জেনারেল উ থান্টের কাছে বাংলাদেশে পাক সৈন্য কর্তৃক বৌদ্ধ নিধনযজ্ঞের সংবাদ জানিয়ে একটা তারবার্তা পাঠিয়েছেন। তারবার্তায় তিনি জাতিসংঘের সেক্রেটারী জেনারেলকে জানিয়েছেন যে, বাংলাদেশে পাক সৈন্যরা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী জনগণকে নির্বিচারে হত্যা করছে। এই হত্যাকাণ্ড থেকে বৌদ্ধ ভিক্ষুরাও বাদ যাচ্ছে না। মহাথেরো জানিয়েছেন, বৌদ্ধদের গ্রামগুলো একের পর এক জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে, মন্দিরগুলো ধ্বংস করা হয়েছে। মহাথেরো বাংলাদেশের বৌদ্ধদের রক্ষা করার জন্য উ থান্টকে অনুরোধ জানিয়েছেন।

 

ইংরেজী সংবাদ

 

26-5-71

১। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বীকৃতি ও স্বার্বভৌমত্ত নির্ভর করছে বিশ্ব মানচিত্রে অত্র অঞ্চলের স্বাভাবিকতা পুনরুদ্ধারের উপর।

২। War on Want (লন্ডন ভিত্তিক একটি দারিদ্র বিমোচন সংক্রান্ত চ্যারিটি সংস্থা) এর চেয়ারম্যান ও লেবার পার্টির একজন এম পি প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ কে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<005.004.043>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

 

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিল পত্রঃ পঞ্চম খন্ড

 

৩. বুদাপেষ্ট পীস কনফারেন্স বাংলাদেশে পাকিস্তানী নৃশংসতার নিন্দা জানায়

৪. আজ বাংলাদেশ জুড়ে কবি নজরুলের ইসলামের ৭২তম জন্মদিন উদযাপন করা হয়।

৫. মুক্তিসেনারা একটা গানবোট দখল করে নেয়। একটা কালভার্ট ধ্বংস এবং একটি পাকিস্তানী চেকপোষ্ট পুড়িয়ে দেয়।

৬. “পাকিস্তান বৌদ্ধ কৃষ্টি সংঘের” প্রধান এক তার বার্তায় উ থান্টকে বাংলাদেশের বৌদ্ধদের দুর্দশাপূর্ণ অবস্থার কথা জানান।

৭. জাতিসংঘে বাংলাদেশের বিশেষ দূত বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী নিউইয়র্কের উদ্দেশ্যে রওনা দেন।

৮। “লন্ডন টাইমস” সংবাদ ছাপায়- পূর্ব বাংলায় সর্বত্র সন্ত্রাস ছড়িয়ে পড়েছে।

৯. সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট মিস্টার পোডগোর্নি গতকাল কায়রো পৌঁছান।

 

বাংলাদেশের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম বলেন যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্ব স্বীকার করার মাধ্যমেই কেবলমাত্র এখান স্বাভাবিকতা পুনঃস্থাপন সম্ভব। তিনি আশা প্রকাশ করেন বাংলাদেশে থেকে পাকিস্তানী শক্তি সরিয়ে নিতে পাকিস্তানকে চাপ দিতে সমর্থ হবে জাতিসংঘ।

ইউনাইডেট প্রেস ইন্টারন্যাশনাল এর এক বিশেষ প্রতিনিধিকে তিনি সব কথা বলেন।

ভারতে বাংলাদেশী শরনার্থীদের জন্য সেক্রেটারী জেনারেল উ থান্টের ত্রাণ সংগ্রহের আহ্বানের সময় তিনি বলেন উ থান্টের এই আহ্বান প্রমাণ করে, বিপুল সংখ্যক বাঙালী তাদের ঘর গৃহস্থালী ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। পাকিস্তান মিলিটারী জান্তার সংগঠিত ভয়াবহতায় তারা তাদের সর্বস্ব ছেড়ে যায়। সেক্রেটারী জেনারেলের আহ্বানে এটাও স্পষ্টত প্রমাণিত হয় কী অসহনীয় পরিস্থিতিতে লোকজন তাদের দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছে।

ইউ.পি.আই প্রতিনিধিকে নজরুল ইসলাম বলেন যে, তিনি আশা করেন জাতি সংঘের মহাসচিব বাংলাদেশের অভ্যন্তরে এমন পরিস্থিতি তৈরি করবেন যেন উদ্বাস্তুরা দেশে ফিরে আসতে পারে। এর মাধ্যমে তিনি বোঝান জাতিসংঘ পাকিস্তান সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করবে যেন তারা পাকিস্তানী দখলদার আর্মিকে বাংলাদেশ থেকে তুলে নিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং সার্বভৈৗমত্ব স্বীকার করে নেয়। তাহলেই কেবলমাত্র শান্তি পুনঃ স্থাপিত হতে পারে।

ইংল্যান্ডের সংগঠন “ওয়ার অন ওয়ান্ট” এর চেয়ারম্যান মিঃ ডোনাল্ড চেশওয়ার্থ এবং একজন লেবার পার্টির সংসদ সদস্য মিঃ মিশেল বার্নস গতকাল গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদকে ডেকে নেন। ব্রিটিশ নেতৃদ্বয় আমাদের প্রধানমন্ত্রীর সাথে অন্তত তিন ঘন্টা সময় কাটান এবং পারস্পরিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন। আলোচনায় বাংলাদেশের স্বীকৃতির প্রশ্ন বিশেষভাবে গুরুত্ব পায়।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<005.004.044>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

আমাদের প্রধানমন্ত্রী দুই ব্রিটিশ নেতার কাছে জানতে চান তারা বাংলাদেশে রাজনৈতিক সমাধান বলতে তারা কি বোঝাতে চান। জবাবে তারা বলেন এক্ষেত্রে বাংলাদেশের সংখ্যাগুরু জনসংখ্যার আশা আকাঙ্খার বাস্তবায়নের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হবে। যে বিপুল সংখ্যক বাঙালী দেশের বাইরে রয়েছেন তাদের উপর কোন রাজনৈতিক সমাধান চাপিয়ে দেওয়া হবে না কোন অবস্থাতেই।

বুদাপেষ্টে অনুষ্ঠিত “বিশ্ব শান্তি সম্মেলনে” ৫৫টি অংশগ্রহণকারী দেশের ১২৫ জন প্রতিনিধি বিশ্বের সকল সরকারকে ইন্ডিয়ায় বাংলাদেশী উদ্বাস্তুদের জন্য আরো বেশি ত্রাণ এবং সাহায্য পাঠানোর জন্য সম্মিলিতভাবে আহ্বান জানান। সম্মেলনে উদ্বাস্তুদের দেশে ফিরে যাওয়ার মত পরিস্থিতি সৃষ্টি করিতে বিশেষভাবে সাহায্যের কথা বলা হয়। এই আহ্বানে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে ছিলেন মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, আইনজীবী ডাক্তার এবং আফ্রো-এশিয়ান স্বাধীনতা কামী যোদ্ধা এবং নিরপেক্ষ শক্তি।

তারা পাকিস্তান সরকারকে বাংলাদেশে নজিরবিহীন খুন এবং গণহত্যার জন্য দায়ী করে এবং তাদের নির্দেশনায় সংগঠিত সকল কর্মকান্ডের নিন্দা জানানো হয়। তারা পাকিস্তানী মিলিটারী জান্তাকে বাংলাদেশের মানুষের গণতান্ত্রিক আশা আকাঙ্খার প্রতি সশ্রদ্ধ হবার আহ্বান জানায়। জাতিসংঘের অন্তর্ভূক্ত SEATO এবং CENTO এর মত সংগঠনগুলোকে শাসক পাকিস্তান সামরিক জান্তাকে সাহায্য বন্ধের আহ্বান জানায়। জনাব এম.এ সামাদ এম.এন.এ বুদাপেষ্টে এই শান্তি সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। তিনি এখন ইংল্যান্ডে যাবার পথে রয়েছেন।

একজন আওয়ামীলীগ কার্যনির্বাহী সদস্য জনাব মোল্লা জালাল উদ্দিন এম.এন.এ এখন পাটনা সফর রয়েছেন। তিনি প্রাদেশিক সরকারের নেতৃবৃন্দের সাথে আলোচনা করেছেন এবং সেখানে অবস্থান কালে এই আলোচনা অব্যাহত রাখবেন

আপনারা শুনছেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সংবাদঃ

দক্ষিণ অঞ্চলের মুক্তিসেনারা জানান, উত্তেজনা পূর্ণ এক সংঘর্ষের পর মুক্তিসেনারা বরিশালের উপকূলীয় এলাকায় টহলরত শত্রুদের একটি গানবোট দখল করেছে। গানবোটে অবস্থানরত পাকিস্তানী সেনারা পানিতে ডুবে ইহলীলা …… করে। বরিশালে স্বাধীনতা কামী জওয়ানরা এক পুলিশ ষ্টেশনে তীব্র আক্রমণ করে দখল করে নেয় এবং স্থানীয় পাকিস্তান সহযোগীদের পরাজিত করে।

রংপুরে পাকিস্তানী বাহিনী যখন ধরলা নদী অতিক্রম করে, রাজশাহী কাছে তখন মাইন বিস্ফোরণ করে একটি কালভার্ট উড়িয়ে দেওয়া হয় এবং শত্রুদের একটি জিপ ধ্বংস করা হয়েছে। সিলেটে শত্রুদের এক কনভয়ে গেরিলা আক্রমণ করে সাতটি ট্রাক ধ্বংস করা হয়।

মুক্তিফৌজ কসবায় যুদ্ধসরঞ্জাম এবং খাদ্যভর্তি এক লরিতে আগুন ধরিয়ে দেয়। বল্লবপুরের পাকিস্তান ফাঁড়িতে অতর্কিত আক্রমণ করে মুক্তিফৌজ দুই পাহারাদারকে হত্যা করে। কাঁঠালাবাড়িয়াতে এক পাস্তিান আর্মি ক্যাপ্টেন এবং তার কিছু সহযোগীকে খুন করা হয়। শ্রীবর্দিতে মুক্তিফৌজ সফলভাবে একটি কংক্রিটের ব্রিজ উড়িয়ে দিতে সমর্থ হয়। জামকান্দি এবং লালাপুঞ্জিতে দুইটি পাকিস্তান ফাঁড়ি পুড়িয়ে দেয় মুক্তিফৌজের সদস্যরা এবং কুমিল্লার বিবির বাজারে মাইন অপারেশনে শত্রুর লরি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়।

 

 

 

 

 

 

 

<005.004.045>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

পাকিস্তান বৌদ্ধ কৃষ্টি প্রচার সংঘ এবং পাকিস্তান সেন্টার ফর দ্য ওয়ার্ল্ড ফেলোশিপ অফ বুড্ডিষ্ট এর সভাপতি মিস্টার জ্যোতিপাল মহাথেরো জাতিসংঘ মহা সচিবের কাছে এক বার্তায় বাংলাদেশে বৌদ্ধদের দুরবস্থার কথা জানিয়ে বিশ্ব সংস্থার কাছে তিনি বৌদ্ধদের রক্ষায় জরুরী নিরাপত্তার ব্যবস্থা করার আহ্বান জানান। তার বার্তায় তিনি আরো বলেন, ভিক্ষুসহ অনেক বৌদ্ধকে নৃশংসভাবে পাকিস্তানী বাহিনী হত্যা করে, নন্দির ধ্বংস করে দিয়ে বৌদ্ধ গ্রাম পুড়িয়ে ছাই বানিয়ে দেওয়া হয়েছে। পাকিস্তানী সেনাদের সহযোগী দুর্বৃত্তরা সম্পত্তি লুট করে। দয়া করে তাদের নিরাপত্তা দিন।

জাতিসংঘে বাংলাদেশের বিশেষ দূত বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর লন্ডন থেকে নিউইয়র্ক যান তার দায়িত্ব গ্রহণ করতে। জাতিসংঘে তিনি বাংলাদেশের ঘটনাবলী উপস্থাপন করবেন। বিচারপতি চৌধুরী আমেরিকার জনগণ এবং সংবাদ মাধ্যমেও বাংলাদেশে দখলদার পাকিস্থানী বাহিনীর পূর্ব পরিকল্পিত গণহত্যা, তারুন এবং বুদ্ধিজীবীদের হত্যার কথা উপস্থাপন করবেন।

আজ বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ৭২তম জন্মদিন পালিত হয় সারা বাংলাদেশে। এই উপলক্ষে বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন সেমিনার এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মতো নানাবিধ কর্মসূচীর আয়োজন করে। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে সন্ধ্যাকালীন প্রচারের নজরুল জয়ন্তী উপলক্ষ্যে এক বিশেষ আয়োজন প্রচার করবে।

দি টাইমস অফ লন্ডন “বাংলাদেশ সার্বিক ভয়ানক সামাজিক অবস্থা তুলে ধরে। টাইমস প্রতিনিধি পিটার হ্যাজেল হার্স্ট বলেন, “পূর্ব বাংলার আনাচে-কানাচে সন্ত্রাস ছড়িয়ে পড়েছে। হাজার হাজার লোক বাস্তুচ্যুত, সর্বত্র দুর্ভিক্ষ ছড়িয়ে পড়েছে। মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়া রোগের সাথে লড়াই করার মতো পর্যাপ্ত ডাক্তারও নেই।”

সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট পোডগোর্নি দু’দিনের সফরে গতকাল কায়রো এসেছন সর্বশেষ মধ্যপ্রাচ্য সংকট নিয়ে রাষ্ট্রপতি আনোয়ার সাদাতের সাথে কথা বলতে।

বাংলাদেশে গত নভেম্বর ঘূর্ণিঝড় আক্রান্তদের জন্য ব্রিটিশ জনগণের দেওয়া এক মিলিয়নের বেশি ইউরো লন্ডন ব্যাংকে অলস পড়ে আছে বিপর্যয়ের ছয় মাস পরেও। বৃটেনের অন্যতম বৃহৎ ত্রাণ সংস্থা অক্সফামের মতে, টাকাটা অলস পড়ে আছে কারণ, পাকিস্তান সরকার ত্রাণকর্মীদের ঐ অঞ্চলে ঢোকার অনুমতি দেয়নি।

২৭-৫-৭১

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বলেন “আমরা পাকিস্তানের জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলাম এবং সেজন্য আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি।

 

.

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<005.004.046>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

 

যখন আমাদের সকল শান্তিপূর্ণ প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে এবং ২৫ মার্চের কালরাতে ইয়াহিয়ার আর্মি নিলর্জ্জভাবে অস্ত্রহীন বাঙালীর উপর আকস্মিকভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করা ছাড়া আমাদের কোন বিকল্প ছিল না। ১৫ মিলিয়ন বাঙালীর অস্তিত্ব রক্ষার জন্য এটি ছিল রক্ষাকবচ।

টাইমস অফ লন্ডনের এক প্রতিনিধির সাথে আমাদের প্রধানমন্ত্রী কথা বলেন। তিনি বলেন “আমি বুঝতে পারিনা বিশ্বের গণতান্ত্রিক সরকার সমূহ সামরিক জান্তা পরিচালিত একটি স্বৈরতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থাকে কি করে সমর্থন করে। যেখানে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার জন্য একটি জাতির আশা আকাঙ্খা ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে।

পাকিস্তানের প্রধান অর্থনীতিবিদের মতে, “পশ্চিম পাকিস্তান গ্রীষ্মের শেষে দেউলিয়া হয়ে যাবে এবং বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সংগ্রাম অব্যাহত রাখতে পুরোপুরি ব্যর্থ হবে।” হার্ভার্ডের অর্থনীতিবিদ বরার্ট ডফম্যান গতকাল বলেন “বাইরের সাহায্য ছাড়া পশ্চিম পাকিস্তান বাংলাদেশে পরিচালিত মিলিটারী কার্যক্রম চলমান রাখতে পারবেনা। তিনি আরো বলেন “মনে হচ্ছে পশ্চিম পাকিস্তান এ মাসে বাকি থাকা কিস্তি সমূহ স্থগিতের পথ খুঁজছে। তাছাড়া আমেরিকার চলমান অনুদান এবং ঋণ কোন সামরিক অভিযানের চেয়ে পশ্চিম পাকিস্তানী কৌশলের জরুরী পরবর্তী লক্ষ্য। তিনি বলেন আমেরিকার উচিত কোন সেনা অভিযানের জন্য টাকা না দেওয়া।

বাংলাদেশে ত্রাণ কার্যক্রম সমন্বয়ের জন্য সেক্রেটারি জেনারেল উ-থান্টের প্রতিনিধিকে এদেশে আসতে দিয়ে পাকিস্তানীরা নিজেদের ঔদ্ধত্য নিজেরাই গলধঃকরণ করতে বাধ্য হয়। জাতিসংঘে পাকিস্তানের প্রতিনিধি মি. আগা সাদীর চিঠিতেই বিষয়টি পরিস্কার হয়ে যায়। গতকাল জাতিসংঘের সদরদপ্তর থেকে চিঠিটি প্রকাশিত হয়। এর আগে জাতিসংঘ পাকিস্তানের প্রতিনিধি হিসেবে বিলুপ্ত পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ছাড়া কেউই তাকে স্বীকার করেননি।

সোভিয়েট কমুনিস্ট পার্টির পত্রিকা “প্রাভদা” সোমবারে আসামে পাকিস্তানী বাহিনীর অগ্নি সংযোগের খবর প্রকাশ করে। এতে এই অঞ্চলে বেড়ে যাওয়া উত্তেজনা সোভিয়েত রাশিয়ার চিন্তার কারণ বলে প্রতীয়মান হয়। এই রিপোর্টে পূর্ববাংলায় দখলদার পাকিস্তানী বাহিনীর কার্যক্রম পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বর্ণনা করে।

জাতিসংঘের মহাসচিব উ থান্ট জানিয়ে দেন পরবর্তী মেয়াদের জন্য তিনি আর প্রতিদ্বন্দ্বীতা করবেন না।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশে শান্তি এবং গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠায় মধ্যস্ততা করার জন্য বিশ্ব সম্প্রদায়কে সনির্বন্ধ অনুরোধ জানান। গতকাল তিনি ভারতীয় লোকসভায় আট ঘন্টা ব্যাপী এক বিতর্কে উত্তর দিচ্ছিলেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন বাংলাদেশে পাকিস্তানের পরিকল্পিত গণহত্যা এবং উদ্বাস্তু প্রবেশ ভারতের এমনকি দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার শান্তি এবং নিরাপত্তার জন্য হুমকি

সেনা, অর্থ এবং রাজনৈতিক উপদেষ্টাদের নিয়ে সোভিয়েত রাষ্ট্রপতি পোডগোর্নি তার মিশরীয় সহযোগী প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাতের সাথে আলোচনা শুরু করেন। পোডগোর্নি গত সোমবার কায়রো পৌঁছে রাতে মিশরের রাষ্ট্রপতির সাথে দেখা করেন। গতকাল পর্যন্ত আলাপ আলোচনা চলছিলো।

 

<005.004.047>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

ইয়াহিয়ার দখলদার সরকার সরকারী চাকুরীজীবীদের মে মাসের বেতন ভাতার বিষয়টি আজকে পর্যন্ত পরিস্কার করেনি। নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় সরকারী ভাতা থেকে বরাদ্দ হিসেবে থাকলেও তা এখনো পৌঁছায়নি।

আওয়ামী লীগ বাংলাদেশ নিয়ে যে কোন সমঝোতার সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়ে বলেছে যে, এই চেষ্টা যেই করুক, বাংলাদেশের জনগণ শেষ পর্যন্ত তা নাকচ করে দেবে। আমেরিকার স্টেট ডিপার্টমেন্টের এক মুখপাত্র দাবী করেন, ইয়াহিয়ার এক গুপ্তচর আপোষমূলক সমাধানের জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছে। আওয়ামী লীগ জোর দিয়ে বলেছে বাংলাদেশ একটি যুক্ত এবং সার্বভৌম দেশ এবং আলাপ আলোচনার জন্য নতুন কোন সুযোগ নেই।

কলকাতার বাংলাদেশ মিশনের প্রধান মিঃ হোসেন আলী কবি নজরুল ইসলামের ৭২ তম জন্মদিনে বাংলাদেশের ৭৫ মিলিয়ন লোকের পক্ষে সম্মান জানান। গতকাল সস্ত্রীক কবিকে দেখতে গিয়ে তিনি তাঁকে ফুলের মালা পড়িয়ে দেন।

কবির বাড়িতে এক বিশেষ আলোচনায় হোসেন আলী বলেন “নজরুল ইসলামের ভালোবাসার দেশ বাংলাদেশে এখন এক ভয়াবহ হত্যাকান্ড চলছে। বাংলাদেশের জনগন দখলদার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করছে। ইনশাআল্লাহ আমরা জয়ী হবো।”

 

২.৬.৭১

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে খবর পড়ছি পারভীন হোসেন।

১. পাকিস্তানে বিদেশী ব্যাংকগুলো পাকিস্তানের ব্যাংকগুলোর এল.সি. গ্রহন করছে না।

২. তিন সদস্য বিশিষ্ট বাংলাদেশের সংসদীয় প্রতিনিধি দল ভারতের রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রীর সাথে নতুন দিল্লীতে সাক্ষাৎ করেছেন।

৩. খান আব্দুল গাফফার খান বাংলাদেশের সংকটের জন্য ক্ষমতালোভী পশ্চিম পাকিস্তানী দের দায়ী করেন।

৪. গত সোমবার চার তরুণ মুক্তিযোদ্ধা শিকড়গাছায় তিন পাকিস্তানী এজেন্টকে হত্যা করে।

৫. মাওলানা ভাসানী বলেন “স্বাধীনতাই বাংলাদেশের মানুষের একমাত্র লক্ষ্য।“

 

বিশ্বের আর্থিক সংস্থাগুলো পাকিস্তানের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে সতর্কতা জারি করে এবং পাকিস্তানে কোন ঋণ দিতে অস্বীকৃতি জানায়।

 

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

<005.004.048>

ব্যাংক কর্মকর্তারা পাকিস্তানের ব্যবসায়ীদের জানান, পাকিস্তান অর্থনীতির ভয়াবহ সংকটের কারণেই তারা এই পদক্ষেপ নিয়েছেন।

 

একজন প্রধান এক্সপোর্ট ইম্পোর্ট ব্যবসায়ী পাকিস্তানী এক সংবাদকর্মীকে গতকাল বলেন আমদানির জন্য একটি আমেরিকান ব্যাংক ১০০% ডিপোজিটের শর্তারোপ করেছ।

 

সুইস এবং জাপানী ব্যাংগুলোও এল.সি. গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছে।

 

জনাব ফনী মজুমদারের নেতৃত্বে তিন সদস্য বিশিষ্ট বাংলাদেশের সংসদীয় প্রতিনিধি দল নতুন দিল্লীতে ভারতের রাষ্ট্রপতির সাথে সাক্ষাত করেছেন। বেগম নূর জাহান মোর্শেদ এবং শাহ্ মোয়াজ্জেম হোসেন সহ বাংলাদেশী আইন প্রণেতারা গতকাল পার্লামেন্ট ভারতীয় ভবনে সংসদ সদস্যদের সাথে দেখা করেন। বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্র দপ্তরের এক মুখপাত্র আমাদের জানান ৪৫ মিনিট ধরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মুখপাত্র আমাদের জানান ৪৫ মিনিট ধর ভারতের প্রধানমন্ত্রী মিসেস ইন্দিরা গান্ধীর সাথে আলোচনায় প্রধানত পশ্চিম পাকিস্তানী বর্বরতায় ভারতে যে সকল বাংলাদেশী উদ্বাস্তু অবস্থান করছে, এই সম্পর্কিত সমস্যা প্রাধান্য পায়।

 

তারা বাংলাদেশ সরকারকে স্বীকৃতির প্রশ্ন নিয়েও আলোচনা করেন।

ইন্ডিয়ার রাষ্ট্রপতি ভি.ভি গিরি প্রায় বিশ মিনিট ধরে তাদের কথা শোনেন এবং বাংলাদেশ সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন।

 

বাংলাদেশের তিন আইন প্রণেতা ভারতীয় সংসদে কথা বলার সময় ভারত সরকারের কাছে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়ে আবেকঘন আবেদন জানায় তারা বাংলাদেশের পটভূমি, পশ্চিম পাকিস্তানের দ্বারা প্রতারিত এবং শোষিত হবার কথা এবং সবশেষে পশ্চিম পাকিস্তানী আর্মিদের নিরীহ বাংলাদেশীদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার বর্ণনা দেন।

 

ইন্ডিয়ার সংসদ সদস্যদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে জনাব ফনী মজুমদার বলেন বাংলাদেশ গণতন্ত্র ধর্ম নিরপেক্ষতা এবং সমাজতন্ত্রের পক্ষে। তিনি ভার সরকারকে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারকে স্বীকৃতি দেবার আহ্বান জানান। জনাব ফনী মজুমদার প্রতিটি জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক ফোরামে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তির কথা বলতেও আহ্বান জানান।

 

<005.004.049>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

রাজনৈতিক স্থিরতা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে মিসেস নূর জাহান মোর্শেদ বলেন, রাজনৈতিক স্থিরতা হতে হবে আমাদের শর্ত মেনে। এবং তা হলো, পশ্চিম পাকিস্তানী সৈন্যদের পুরোপুরি প্রত্যাহার করা এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা।

এর আগে ভারতের সংসদ সদস্যদের বাংলাদেশের জনগণের বৈষম্যের কথা তুলে ধরেন। পাকিস্তান সৃষ্টির শুরু থেকেই যারা দুর্দশার স্বীকার হচ্ছে অথচ আমরাই পাকিস্তানের সংখ্যাগুরু অংশ। তিনি বলেন পাকিস্তানী শাসকরাই পাকিস্তানকে বিভক্ত করেছে। তারা পাকিস্তানকে হত্যা করেছে আমরা শুধু সমাহিত করছি। পাকিস্তান এর দুই অংশ নিয়ে বিভক্ত এবং দুই অংশের জনগনের মধ্যে একমাত্র ধর্ম ছাড়া অন্য কোন বিষয়ে কোন মিল নেই। জনগণের ইচ্ছে পাকিস্তান এক থাকতে পারেনা। এবং সে ইচ্ছে তৈরি হতে পারতো চাকরের মতো নয় বরং সবাইকে সমান দৃষ্টিতে দেখলে।

জনাব মোয়াজ্জেম হোসেন ইয়াহিয়ার সেনাবাহিনীল হত্যাযজ্ঞ বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, প্রায় পাঁচ লাখ লোক খুন হয়েছে বাংলাদেশে। তাঁর বক্তৃতায় মোয়াজ্জেম হোসেন বাংলাদেশ সরকারকে কুটনৈতিক স্বীকৃতি দিয়ে সনির্বদ্ধ আহ্বান জানান।

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে খবর প্রচারিত হচ্ছে:

পাখতুন নেতা খান আব্দুল গাফফার খান, বাংলাদেশের বর্তমান সঙ্কটের জন্য পশ্চিম পাকিস্তানী আগ্রাসী, ক্ষমতালোভী, ধনী বা শ্রেণীকে দায়ী করেন।

কাবুলের দৈনিক “কারাভান” রিপোর্ট করে “খান আব্দুল গাফফার খান আওয়ামী লীগ এবং পশ্চিম পাকিস্তানের নেতাদের সাথে মধ্যস্থতা বাংলাদেশে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত।

এই পাখতুন নেতা আরও বলেন, জালালাবাদের পাকিস্তান পরিষদ তাকে পাকিস্তান সফর করে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সাথে সাক্ষাত করার আমন্ত্রন জানায়। কিন্তু তিনি পাকিস্তানের এক মিলিটারী স্বৈরশাসকের সাথে দেখা করতে অস্বীকৃতি জানান।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী এম মনসুর আলী দেশের পূর্বাঞ্চলে যাত্রা করছেন। সেখানে অবস্থান কালে তিনি আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সাথে সাক্ষাৎ করবেন।

রংপুর, কুমিল্লা এবং ঢাকা সেক্টরে বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধারা তীব্র গেরিলা যুদ্ধ করছে। লালমনিরহাট এবং কেকনিয়া রেললাইনের মাঝে অনেক ব্রিজ উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। পাকিস্তানী সেনাদের জন্য রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। লালমনিরহাট ও কুঁড়িগ্রামে উপর্যুপরি কমান্ডো আক্রমণ করে পাকিস্তানি বাহিনীকে নাস্তানাবুদ করা চলছেই। রিপোর্টে বলা হয়, সম্প্রতি এক আক্রমণে মুক্তিযোদ্ধারা লালমনিরহাটে একটি শত্রু জীপ ধ্বংস করে এবং ৬ পাকিস্তানী সৈন্যকে হত্যা করা হয়।

ময়মনসিংহের উত্ত-পূর্বে, ঢাকা সেক্টরে মুক্তিযোদ্ধারা সম্প্রতি একটা পাকিস্তানী আর্মি টহলদারীতে আগুন ধরিয়ে দেয়। মুক্তিসেনারা সফলতার সাথে পাক বাহিনীর ধরলা নদী অতিক্রম ঠেকিয়ে দেয়। শত্রু সেনারা প্রতিশোধ স্বরূপ গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেয় এবং বেসামরিক লোকের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।

 

 

 

<005.004.050>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

কুমিল্লা সেক্টরে পাকিস্তানী আর্মির চলাচল বিঘ্নিত করতে মুক্তিবাহিনী আখাউড়ার কাছে দুইটা রেলওয়ে ব্রিজ ধ্বসিয়ে দেয়। কুমিল্লায় পাকিস্তানী সেনারা অসংখ্য লোকজন হত্যা করে মেয়েদের অপহরণ করে নিয়ে যায়। চাঁদপুরের দক্ষিণে পাকিস্তানী সেনারা ৩০০ লোককে গুলি করে হত্যা করে। সম্প্রতি যশোরে স্থানীয় লোকজন দুই পাকিস্তানী সৈন্যকে মেরে ফেলে।

ঢাকা এবং চট্টগ্রামের মধ্যে রাস্তা এবং রেল যোগাযোগ এখনো পুনরায় শুরু হয়নি। আমাদের ময়মনসিংহ প্রতিনিধি জানায়, মুক্তিযোদ্ধারা ময়মনসিংহের তাওয়াকুচা বর্ডারে ফাঁড়ি থেকে পাকিস্তানী সৈন্যদের বিতাড়িত করে।

গত সোমবার ঝিকরগাছা থানার গঙ্গারামপুরে চার তরুন মুক্তিযোদ্ধা তিনজন পাকিস্তানী এজেন্ট কে খুন করে। এর মধ্যে ছিলো স্থানীয় আঞ্জুমান-এ-মুহাজারিন সভাপতি এ সামাদ এবং ঝিকরগাছা থানার দুই সাব ইন্সপেক্টর।

এই পাকিস্তানী এজেন্টরা স্থানীয় দুর্বৃত্তদের সহায়তায় বেসামরিক লোকজনের লুট করা দ্রব্য সামগ্রী জীপে তুলছিলো, তখন চার তরুণ মুক্তিযোদ্ধা হঠাৎ আক্রমণ করে তাদের তিনজনকে হত্যা করে। মুক্তিযোদ্ধারা কিছু রাইফেল এবং একটি হালকা মেশিন গান কেড়ে নেয়। শত্রুদের জীপটা দখল করা হয় এবং মুক্তিযোদ্ধারা মৃত এজেন্টদের একজনের মৃতদেহ নিয়ে আসে।

আপনারা শুনছেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সংবাদঃ

ন্যাশনাল আওয়ামী পাটি নেতা মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী বাংলাদেশ বিষয়ে যেকোন রাজনৈতিক সমঝোতার সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন। মৌলানা পরিস্কার ভাবে ঘোষণা করেছেন: পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আপনাদের যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত চলবে। আমরা জিতবো অথবা মরবো।

তিনি বলেন, দেশ অথবা দেশের বাইরে যদি কোন রাজনৈতিক সমঝোতার চেষ্টা করা হয়, বাংলাদেশের ৭৫ মিলিয়ন লোক তা সাথে সাথে প্রত্যাখ্যান করবে। কারণ লোকজন পাকিস্তানী সরকারের উপর থেকে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছে। তাছাড়াও সম্প্রতি বাংলাদেশে তারা বর্বরতা চালায় তা মানব জাতির ইতিহাসে আগে কখনো শোনা যায়নি।

মৌলানা বলেন, জাতিসংঘের পৃষ্ঠপোষকতায় যদি কোন গণভোট অনুষ্ঠিত হয় তাহলে তিনি আপত্তি করবেন না। তিনি নিশ্চিত যে, এক ভাগ লোক ও স্বাধীনতার বিপক্ষে ভোট দিবেনা।

মৌলানা আমেরিকা, রাশিয়া, বৃটেন চীনের মতো দেশগুলোকে বাংলাদেশে পাকিস্তান আর্মির বর্বরতার চিত্র তুলে ধরতে এখানে তাদের সাংবাদিকদের পাঠানোর আহ্বান জানান আওয়ামীলীগ নেতৃত্বের প্রতি সমর্থন জানিয়ে তিনি বলেন বাংলাদেশের জনগনকে আলাদা করে শাসন করার কোন সুযোগ পাকিস্তান সরকারকে দেওয়া হবে না।

 

 

 

 

 

<005.004.051-052>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

 

আপনারা শুনছেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সংবাদঃ

বাংলাদেশের দূত জনাব আব্দুল সামাদ এখন মস্কো সফরের পথে। তিনি বলেন ইয়াহিয়ার বাংলাদেশ শরনার্থীদের ভারত থেকে দেশে ফিরে যাওয়ার আহ্বান শুধুমাত্র বিশ্ববাসীকে ধোঁকা দেবার জন্য। যখন পাকিস্তানী সেনারা বাংলাদেশে তাদের গণহত্যা এবং বর্বরোচিত নৃশংসতা করে চলেছে সেখানে ইয়াহিয়ার এই আহ্বান একটি নিষ্ঠুরতার ইংগিত মাত্র।

মিঃ সামাদ গত তিন সপ্তাহ ধরে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ঘুরে ইউরোপের নেতাদেরকে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থার একটি পরিস্কার ধারণা দিতে চেষ্টা করছেন।

খবর এখানে শেষ হলোঃ

৫-৬-৭১

আপনারা শুনছেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রঃ

খরব পড়ছি পারভীন হোসাইন।

১. বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বাংলাদেশের নিরীহ জনগনের উপর পাকিস্তানী বাহিনীর অমানবিক বর্বরতার ব্যাপক নিন্দা জানানো হচ্ছে।

২. পাকিস্তান সরকার অনেক দেরিতে হলেও অবশেষে বিভিন্ন দাতা দেশের কাছে স্বীকার করেছে বাংলাদেশীরা শোষন বঞ্চনার শিকার হয়েছে।

৩. ‘ডেইলী টেলিগ্রাফের’ প্রতিনিধি রিপোর্ট কার যে, পাকিস্তানী আর্মি বাংলাদেশে ভিয়েতনাম ধরনের গেরিলা যুদ্ধের আশংকা করছে

৪. সকল সেক্টরে পাকিস্তানী আগ্রাসনকারীদের উপর মুক্তিযোদ্ধারা ব্যাপক আক্রমণ শুরু করেছে।

৫. রেডিও অস্ট্রেলিয়ার রিপোর্টে বলা হয়, কলকাতার এক রোমান ক্যাথলিক আর্চবিশপ নিশ্চিত করেছেন বাংলাদেশে গত দুই মাসে অন্তত তিনজন যাজক খুন হয়েছে।

পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বাংলাদেশের নিরীহ জনগনের উপর পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর অমানবিক বর্বরতার খবর প্রকাশিত হয়। বাংলাদেশের জনগনের জন্য বিশ্বের আরও অনেক দেশের জনগন সহানুভুতি প্রকাশ করে এবং সমর্থন জানায়।

জাতি সংঘর বিভিন্ন সহায়ক সংস্থা পশ্চিম পাকিস্তানের সৈনিকদের নৃশংস গণহত্যায় গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে লুক্সেমবার্গে অনুষ্ঠিত ফেডারেশন অফ দ্য ইউনাইটেড নেশনস্ অ্যাসোসিয়েশনের ২৩ম সাধারণ সভায় বাংলাদেশ গণহত্যার জন্য পাকিস্তানকে দায়ী করে নিন্দা প্রস্তাব গৃহীত হয়। বেলজিয়ামের পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূতকে এই সভায় প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি।

এই সভায় আমেরিকা, রাশিয়া, ব্রিটেন, পোল্যান্ড, ইটালী অস্ট্রেলিয়াসহ ৫২টি দেশের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহন করে। ফেডারেশনের একজন মুখপাত্র বলেন, বাংলাদেশে দুর্ভাগ্য জনক হাজার হাজার হত্যাকান্ডে নিন্দা জানানোর সময় সকল প্রতিনিধিরা সরব ছিলেন।

ভেনেজুয়েলার আইন সভার সদস্যরা জাতিসংঘ সহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থাকে বাংলাদেশের জনগনের মানবাধিকারের দিকে দৃষ্টি দিতে পাকিস্তান সরকারের প্রতি আহ্বান জানাতে বলেন। পাকিস্তানী আর্মির যে ভয়াবহ দমনের কারণে বাংলাদেশের উদ্বাস্তুরা দেশ ছেড়েছে, পাকিস্তান যেন তাদের দেশে ফিরিয়ে নেবার যাবতীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে এই চাপ সৃষ্টির অনুরোধও তারা জানায়।

যে সীমাহীন অন্যায় অত্যাচার বাংলাদেশে সংগঠিত হয়েছ বিশেষ করে গণহত্যার মতো ঘৃণ্য কর্মকান্ডের জন্য ভেনেজুয়েলার আইন সভার ২১৪ জন সদস্যে একমত হয়ে দুঃখ প্রকাশ করেন।

পশ্চিম পাকিস্তানের সেনাবাহিনী বাংলাদেশে যে গণহত্যা চালায় তার প্রতিবাদ স্বরূপ থাইল্যান্ড পাকিস্তান বিমানের জ্বালানীর যোগান বন্ধ করে দেয়। থাইল্যান্ডের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঘোষণা করে ৭৫ মিলিয়ন নিরীহ লোকের উপর মিলিটারী অপারেশন চালানোর জন্য কোন বিমানের জ্বালানী তাঁদের কাছে নেই। তাই নেতৃবৃন্দ বাংলাদেশের সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে তাদের অবহিত করানোর কথা বলেন।

ভ্যাটিকানের দৈনিক “অবজারভেটরি রোমানো” প্রকাশ করে যে পাকিস্তানী সামরিক জান্তা বাংলাদেশকে যে যুদ্ধের ভিতর টেনে এনেছে তা একটি অসম যুদ্ধ। প্রথম পাতার মন্তব্যে পত্রিকাটি বলে, এই সংকট সমাধানের জন্য পাকিস্তানের উচিত এই মুহূর্তে যুদ্ধ বন্ধ করা। এবং বাংলাদেশের মানুষের স্বাধীনতাকে মেনে নেওয়া। অন্যথায় গেরিলা যুদ্ধের কারণে পূর্ব বাংলা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে যেটা পশ্চিম পাকিস্তানের অর্থনীতিতে আঘাত হানবে।

পাকিস্তান সরকার অনেক পরে অবশেষে দাতা দেশগুলোর কাছে স্বীকার করেছে বাংলাদেশের জনগন বঞ্চনার স্বীকার হয়েছে যার ফলেই এই যুদ্ধ। লজ্জাহীনভাবে পাকিস্তানী মিলিটারী শাসকরা এর প্রতিনিধিদের ঋণ এবং সহায়তা চাইবার কথা বলে দেয়।

বিশ্বস্ত সূত্র মতে পাকিস্তান বর্তমানে প্রতি মাসে ১২০ থেকে ১৫০ মিলিয়ন ক্ষতির মধ্যে রয়েছে। প্রত্যেকটা দেশে পাকিস্তানী মিশনে ঋণ এবং ত্রাণ সংগ্রহের নির্দেশনা দেওয়া

“ডেইলী টেলিগ্রাফের” প্রতিনিধি মে মাসের ২০ তারিখ রিপোর্ট করে, বাংলাদেশে পাকিস্তানী আর্মি দাবী করে সবকিছুই তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে কিন্তু তারা এখন আশংকা প্রকাশ করছে বাংলাদেশে ভিয়েতনামের মতো গেরিলা যুদ্ধ শুরু হতে যাচ্ছে। সাংবাদিক বলেন, প্রতি রাতেই মুক্তি যোদ্ধারা শত্রুদের চলাচলে বাধা সৃষ্টি করতে অন্তত ৩০ রকম ধ্বংসাত্মক কর্মকান্ড পরিচালনা করছে। পাকিস্তানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অনুমান করছে আরও নিবিড় রকম গেরিলা যুদ্ধ সামনের বর্ষাকালে উপস্থিত হবে।

 

 

 

 

 

 

<005.004.053>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

পৃষ্ঠা- ৫৩

মুক্তিযোদ্ধারা সকল সেক্টরে পশ্চিম পাকিস্তানী হানাদারদের বিরুদ্ধে ব্যাপক আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে। শত্রুদের ধ্বংস করার সংকল্প নিয়ে তারা অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম করছে, মুক্তিযোদ্ধারা রেললাইন উপড়ে ফেলে এবং পথঘাট বন্ধ করে দিয়ে পাকিস্তানীদের কৌশলগত ভাবে ভোগান্তি দিয়ে যাচ্ছে। সকল সেক্টরেই পাকিস্তানী বাহিনী চলাচলের ক্ষেত্রে বাঁধার সম্মুখীন হচ্ছে।

 

পাকিস্তানী বাহিনীর চলাচল বন্ধ করতে মুক্তিসেনারা বিরল এবং কাঞ্চনকে সংযোগকারী ব্রিজ উড়িয়ে দিয়েছে।

 

আমাদের রংপুর প্রতিনিধি জানায়, লালমনিরহাট এবং বড়বাড়ির মাঝামাঝিতে টহলরত অবস্থায় পাকিস্তানী বাহিনীর উপর মুক্তিযোদ্ধারা আকস্মিক আক্রমণ চালায় এই অপারেশনে ১৬ জন শত্রু নিহত হয়।

 

মুক্তিযোদ্ধারা স্বরমাটি রেলওয়ে ব্রিজ উড়িয়ে দিয়েছে। পাকিস্তানী সেনাদের বহনকারী একটা ট্রেন মুক্তিবাহিনী আক্রমণ করে এবং তাদের দশ জনকে হত্যা করে।

 

তিস্তার ভটমারি ঘাটে মুক্তিযোদ্ধারা দুইটা ফেরী বোট ডুবিয়ে দেয়। এই ফেরি দুইটা পাকিস্তানীরা তাদের সৈন্যদের চলাচলের কাজে ব্যবহার করতো। রেল এবং রাস্তার যোগাযোগ বাঁধাগ্রস্থ হওয়ায় পাকিস্তানীরা চলাচলের ক্ষেত্রে এক ভয়াবহ সমস্যার সম্মুখীন হয়।

 

উত্তরের সেক্টরে মুক্তিযোদ্ধা এবং পাকিস্তানী হানাদার সৈনিকদের সাথে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়।

 

গত শুক্রবার ভুরুঙ্গামারিতে পাকিস্তানী সেনাদের ভারী গোলাগুলি বিনিময় করে এবং শত্রুদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কারণ ঘটায়। এখানে অনেক পাকিস্তানী সৈন্য নিহত হয়। দিনাজপুরে বিভিন্ন জায়গায় মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানী সৈনিকদের উপর ব্যাপক আক্রমণ শুরু করে।

 

রেডিও অস্ট্রেলিয়া রিপোর্ট করে, কলকাতার এরা রোমান ক্যাথলিক আর্চবিশপ নিশ্চিত করেছে বাংলাদেশে গত দুই মাসে পাকিস্তানী বাহিনীর হাতে তিনজন যাজক নিহত হয়েছেন। আর্চবিশপ বলেছেন শেষ হত্যাকান্ডটি সংগঠিত হয় ৮ মে, চার্চ বন্ধ করে যাজক বের হলেই তার গায়ে পাকিস্তানীরা আগুন ধরি

 

 

 

 

 

<005.005.054>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

শিরোনাম সূত্র তারিখ

৫। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র-

এর নিয়মিত কথিকামালা (অংশ)

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র-এর

দালিলপত্র

৩০মে-২৬ নভেম্বর, ১৯৭১

 

বিশ্ব জনমত

৩০ মে, ১৯৭১

বিশ্বাসঘাতক ইয়াহিয়া সরকার ২৫শে মার্চ রাতের অন্ধকারে নিরস্ত্র জনতার উপর যে নৃশংস আক্রমণ চালিয়েছে- ইতিহাসে তার তুলনা নেই। আর সে রতের পর থেকেই শুরু হয়েছে বিশ শতকের ইয়াজিদ ইয়াহিয়ার ঘাতক বাহিনীর হত্যাযজ্ঞ। বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের উপর ঔপনিবেশিক শোষণ অব্যাহত রাখার যে চক্রান্ত সাবেক পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকে শুরু হয়েছিলো একাত্তরের মার্চ মাসে ঘটলো তারই নগ্ন প্রকাশ। পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকেরা তাই আর কোনকিছু রেখেঢেকে রাখতে চায় না। এজন্য তারা কামান-বন্দুক-মেশিনগান-বোমারু বিমান মায় যুদ্ধ জাহাজ নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় বাংগালীদের সামনে একটি মাত্র পথ-সে পথ স্বাধীনতা রক্ষার সশস্ত্র লড়াই। বাংলার বীর জনতা সে দায়িত্ব পালন করেছে। আজ তাই স্বাধীন সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ একটি বাস্তব সত্য। এ সত্য বাংলার সাড়ে সাত কোটি জনতার প্রাণের মন্ত্র- বাংলাদেশের বাঁচার শপথ।

বিগত ২৪ বছর বাংলাদেশ শোষিত হয়েছে ধর্ম আর সংহতির নামে। পশ্চিম পাকিস্তানী শোষক গোষ্ঠী লুণ্ঠন করেছে বাংলার সম্পদ-ধ্বংস করেছে বাংলাদেশের আর্থিক মেরুদণ্ড পাট প্রধান অর্থকরী ফসল। আর এ পাট রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় করেছে পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকেরা। কিন্তু পাটচাষীরা তাতে কোনো উপকৃত হয়নি। বাংলার গরীব চাষী-শ্রমিকেরা আরো গরীব হয়েছে- তাদের উপর নেমে এসেছে নির্যাতনের চরম দণ্ড।

বাংলাদেশ এবং বাংলার জনগণকে বাঁচাবার জন্যই আজ তাই শুরু হয়েছে মরণপথ স্বাধীনতা সংগ্রাম। এ সংগ্রামে শরীক বাংলার বুদ্ধিজীবি, বাংলার কৃষক-শ্রমিক-ছাত্র-জনতা সবাই।

বাঙালীরা এ সংগ্রামকে আজ নৈতিক সমর্থন জানাচ্ছে সারা দুনিয়ার মানুষের বিবেক। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটের অধিকাংশ সদস্য দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেছেন বাংলার জনগণের প্রতি তাঁদের সমর্থন। সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি, সিনেটর ফুলব্রাইট এবং আরো কয়েকজন প্রভাবশালী সিনেটর দৃঢ়কণ্ঠে জানিয়ে দিয়েছেন- পাকিস্তানের জংগী সরকার বাংলাদেশে যে গণহত্যা চালাচ্ছে তাকে সমর্থন করার কোন প্রশ্নই ওঠে না। সিনেটের বৈদেশিক সাহায্য সম্পর্কিত কমিটি পাকিস্তানকে আর্থিক সাহায্য দেবার প্রস্তাব সরাসরি নাকচ করে দিয়েছে। ইসলামাবাদের খুনী সরকারের বিশেষ দূত এম, এম, আহমদ হয়েছেন প্রত্যাখ্যাত। সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি তাঁর সাথে দেখা করার সকল আবেদন-নিবেদন নাকচ করে দিয়েছেন।

বাংলাদেশে যুদ্ধ চালাতে গিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানী ঘাতকেরা অধুনালুপ্ত পাকিস্তানের অর্থনৈতিক দেউলিয়াতৃ তুরান্বিত করেছে। যুদ্ধের খরচ দৈনিক দেড় কোটি টাকা। অতএব-চাই-চাই-সাহায্য চাই। সাহায্যের জন্য ভিক্ষাপাত্র নিয়ে দেশ পরিক্রমায় বেরিয়েছিলেন ইয়াহিয়ার দোসর এম,এম, আহমদ কিন্তু সবখানেই ব্যর্থ হয়েছেন- তিনি শূন্য হাতেই ফিরেছেন।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<005.005.055>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

 

অন্যদিকে যতই দিন যাচ্ছে বাংলা মুক্তিবাহিনীর আঘাত দুর্বার হয়ে উঠেছে। হানাদার শত্রুরা গেরিলা আক্রমণে হয়ে উঠেছে দিশাহারা। সারা বিশ্বের শান্তিকামী মানুষ এগিয়ে আসছে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের সাহায্যে কয়েকদিন আগে বুদাপেষ্টে অনুষ্ঠিত হয় বিশ্বশান্তি কংগ্রেসের অধিবেশন। পৃথিবীর বহু দেশের প্রতিনিধিরা সেখানে সর্বসম্মতভাবে প্রস্তাব নিয়েছেন- বিশ্বশান্তি কংগ্রেস সর্বাত্মক সাহায্য করবে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামে।

সুইডেনের সকল রাজনৈতিক দল যুক্তভাবে ঘোষণা করেছেন- বাংলাদেশে ইসলামাবাদের লেলিয়ে দেয়া জল্লাদদের নির্বিচার হত্যালীলা বন্ধ করতেই হবে বাংলার নির্যাতিত জনগণকে। তাদের সকল গণতান্ত্রিক অধিকার অর্জনে তাঁরা জানিয়েছেন অকুণ্ঠ সমর্থন। সুইডেনের ইতিহাসে এই প্রথমবার দল-মত নির্বিশেষে সবাই এমন একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বাংলাদেশের জনগণ বিশ্বের শুভ বিবেকের এই কণ্ঠস্বরকে জানাচ্ছে অকুণ্ঠ অভিনন্দন। লক্ষ লক্ষ স্বাধীনতাকামী জনতা উদ্দীপিত হয়ে উঠেছে- স্বাধীনতার চূড়ান্ত লক্ষ্যে আমাদের লড়াই আজ তাই সুনিশ্চিত বিজয়ের পথে।

ইন্দোনেশিয়ার প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ও ইন্দোনেশীয় পার্লামেন্টের স্পীকার মিঃ জাইচেক বিশ্ব মুসলিম সমাজের কাছে বাংলাদেশের সপক্ষে আবেদন জানিয়েছেন। বাংলাদেশে ইয়াহিয়ার হানাদার সেনারা বর্বরতা ও নৃশংসতার যে বীভৎস ইতিহাস রচনা করছে- তার তিনি তীব্র ভাষায় নিন্দা করেছেন। সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালীর উপর অকারণে ইয়াহিয়ার সেনারা যে নির্যাতন চালাচ্ছে তার প্রতিবাদে আওয়াজ তোলার জন্যে তিনি আহবান জানিয়েছেন বিশ্বের সকল মুসলিম রাষ্ট্রের প্রতি। তিনি বলেছেন, বিশ্বের অন্যতম প্রধান মুসলিম রাষ্ট্রের কর্ণধারগণ সে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ অধিবাসীদের বিরুদ্ধে অঘোষিত যুদ্ধ শুরু করেছে- শাসকগোষ্ঠীর এই অমানুষিক হত্যাকাণ্ডের সমর্থন কোন বিবেকসম্পন্ন মানুষই করতে পারে না।

দেশে দেশে পশ্চিম পাকিস্তানী সামরিক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে জনমত সংগঠিত হচ্ছে। বিবেকের কণ্ঠস্বর আজ বহু দেশে উচ্চকিত। বৃটেনের শ্রমিক দলীয় পার্লামেন্ট সদস্য মাইকেল বার্ণসও বিশ্ববিবেকের সাথে ঘোষণা করেছেন একাত্মতা। বিশ্বের সকল রাষ্ট্রের কাছে আবেদন জানিয়ে তিনি বলেছেন, ‘বাংলাদেশের নিরস্ত্র অসহায় জনগণের উপর পশ্চিম পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর বর্বরতা বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত পাকিস্তানকে যে কোন রকম সাহায্য দান বন্ধ রাখুন।”

বাংলাদেশের যে সমস্ত লোক পশ্চিম পাকিস্তানী দখলদার বাহিনীর অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন তিনি স্বচক্ষে তাদের অবস্থা প্রত্যক্ষ করেছেন। মিঃ মাইকেল বার্নস বলেছেন, বৃটেনের জনগণ বাংলাদেশের জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার সম্পূর্ণ সমর্থন করে।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

১০ জুন, ১৯৭১

হংকং-এর ফার ইস্টার্ন ইকনমিক রিভিউ পত্রিকার এক সম্পাদকীয় নিবন্ধে বলা হয়েছেঃ

দৈনিক ডন এবং দৈনিক পাকিস্তান টাইমসসহ পশ্চিম পাকিস্তানের পত্রপত্রিকা স্বীকার করেছিলেন যে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া, শেখ মুজিবুর রহমান ও মিঃ জুলফিকার আলী ভুট্টো ঢাকায় আলোচনা চলাকালে একটা সমঝোতায় এসেছিলেন। ইসলামাবাদ কর্তৃপক্ষ একথা প্রচারও করেছিলেন যে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান আওয়ামী

 

 

 

 

 

 

 

<005.005.056>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

 

লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমানের চারটি যুক্তিসঙ্গত দাবী মেনে নিয়েছেন। শেখ মুজিবুর রহমানের এই চারটি দাবী হলোঃ

 

এক – সামরিক শাসন তুলে নেয়া

দুই – সৈন্যদের ব্যারাকে ফিরিয়ে নেওয়া

তিন – নির্বাচিত জন-প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা দেয়া

চার – সশস্ত্র বাহিনী কর্তৃক নিরস্ত্র জনসাধারণ হত্যার তদন্ত করা।

 

এই দাবীগুলো মেনে নেয়ার কথা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করার আগেই প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া নিতান্ত গোপনে ২৫শে মার্চ মধ্যরাতে বিমানযোগে করাচী ফিরে গেলেন। এবং আওয়ামী লীগকে বে-আইনী ঘোষণা করে ও পূর্ব বাংলার নিরস্ত্র মানুষের ওপর সশস্ত্র সৈন্য লেলিয়ে দিয়ে ইয়াহিয়া খান বিশ্বাসঘাতকতা করলেন। এর কোনো যুক্তসঙ্গত ব্যাখ্যাও প্রেসিডেন্ট দিতে পারলেন না। এতে পরিষ্কারভাবে বোঝা গেলো যে, আলোচনার নামে সময় নিয়ে ইয়াহিয়া খান পূর্ববাংলায় সৈন্য আমদানী করলেন- যাতে বাংলাদেশের অধিকার-সচেতন মানুষ ইয়াহিয়া খানের সশস্ত্র বাহিনীর সামনে আর মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে। এ সকল কারণে ইয়াহিয়া ও ভুট্টোর প্রতি সকলে সন্দেহ পোষণ করলো।

কানাডার দৈনিক মন্ট্রিল স্ট্রিট পত্রিকায় বলা হয়েছেঃ

 

ঢাকার ব্যাপক গণহত্যা পরিকল্পনায় স্বয়ং ইয়াহিয়া খানসহ পাক-সেনাবাহিনীর সব জেনারেল জড়িত ছিলো। মূলত গৃহযুদ্ধ দমনের পরিকল্পনা, তত্ত্বাবধান ও পরিচালনায় এই জেনারেলরা পুরোপুরি সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে। এই হত্যাযজ্ঞ কেবলমাত্র টিক্কা খানের নিজস্ব ও একক উদ্যোগ নয়- এটা আসলে খুব সতর্কতা ও সাবধানতার সঙ্গে সংঘটিত একটি মিলিটারী অভিযান। বাঙালী হত্যার সামরিক আদেশ সেনাবাহিনীর সকল ইউনিট কমাণ্ডারের কাছে যাতে প্রত্যক্ষভাবে এবং লিখিতভাবে পৌছে সেজন্য প্রেসিডেন্ট ২৫শে মার্চ বিকেল দুটো পর্যন্ত নিজেই খোঁজখবর নিয়েছেন। সন্ধ্যে সাতটায় প্রেসিডেন্ট বিমানবন্দরের উদ্দেশ্যে বাসভবন ত্যাগ করেন। রাত ১১টায় ট্যাঙ্ক, কামান, মর্টার গানসহ ভারী ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে আক্রমণ শুরু হয়।

জাপানের ডেলী জাপান টাইমস এক সম্পাদকীয় নিবন্ধে লিখেছেনঃ পূর্ববাংলায় পাক-সেনাবাহিনীর সশস্ত্র আক্রমণেই এই রক্তক্ষয়ী অভিযান চলছে। জাপানের আসাহি শিমবুন পত্রিকা বলেছেন, বাংলাদেশে নিহতের সঠিক সংখ্যা জানা না গেলেও সেখানে যে নির্বিচারে গণহত্যা চলছে, তা নজীরবিহীন।

পূর্ববাংলায় যে নৃশংস হত্যাকাণ্ড চালাচ্ছে এবং গণজীবনকে দুৰ্বিসহ করে তুলেছে তাতে বাংলাদেশের নিরস্ত্র ও অসহায় মানুষের প্রতি বিশ্ববাসী সহানুভূতি দেখিয়েছেন। মুক্তিকামী জনতাকে এভাবে হত্যার ফলে পূর্ববাংলা ও পশ্চিম পাকিস্তানের সম্পর্ক চিরতরে তিক্ত হয়ে গেল। বাংলাদেশে ইয়াহিয়া খানের সেনাবাহিনীর কাণ্ডকারখানার দ্বারা এটাও প্রমাণিত হয়ে গেছে যে, পূর্ববাংলার মানুষ স্বাধীনতার জন্য অকাতরে প্রাণ দিতে পারে এবং তারা প্রাণ দিচ্ছেও।

তুরস্কের ডি ডেলী জুনাইদিন পত্রিকা মন্তব্য করেছেন যে, একদিকে প্রায় এক লক্ষ সুসংগঠিত, সর্বাধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত পশ্চিম পাকিস্তানী সৈন্য, অপরদিকে সাত কোটি নিরস্ত্র বাঙালী পাকিস্তানী সেনাবাহিনী সকল বাঙ্গালীকে কখনো কতল করতে পারবে না। বাঙালীর মুক্তি অবধারিত।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<005.005.057>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

 

১৭ জুন, ১৯৭১

বাংলাদেশে পশ্চিম পাকিস্তানী সৈন্যদের বর্বরতা ও ব্যাপক গণহত্যা অপরাধকে ধামাচাপা দেয়ার জন্য ইয়াহিয়ার সামরিক চক্র এক ঘৃণ্য কৌশল অবলম্বন করেছে। বাংলাদেশে পশ্চিম পাকিস্তানী হানাদারদের গণহত্যার ঘৃণ্য অপরাধ ঢাকা দিতে তারা “ইসলাম বিপন্ন, ইসলামী দেশ বিপন্ন” বলে ধুয়ো তুলেছে। এই ধুয়ো তুলে তারা মধ্যপ্রাচ্য ও আরব দেশসমূহের জনগণকে বিভ্রান্ত করতে চেষ্টা করছে। “ইসলাম বিপন্ন, ইসলামী দেশ বিপন্ন’ বলে তারা ওইসব দেশের সাহায্য নিয়ে পাকিস্তানের কবরে শোয়া অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে চাইছে। কিন্তু সবরকমের সাবধানতা সত্ত্বেও ইয়াহিয়ার সামরিক চক্রের এই হীন দুরভিসন্ধি ঢাকা পড়েনি। বাংলাদেশে গণহত্যার রক্তাক্ত হাত তারা লুকোতে পারেনি। গোপন করতে পারেনি তাদের জঘন্যতম অপরাধ।

বিভিন্ন আরব দেশের পাঁচটি প্রভাবশালী যুব সংস্থা এক যুক্ত বিবৃতিতে জানিয়েছে যে ইয়াহিয়ার সামরিক চক্র ধর্মের দোহাই দিয়ে আরব জনগণকে প্রতারিত করার যে চেষ্টা করেছিলো তা ব্যর্থ হয়েছে।

বাংলাদেশের জনগণের উপর পশ্চিম পাকিস্তানী বর্বর বাহিনীর আক্রমণ ও গণহত্যার প্রতিবাদে আরব দুনিয়া থেকে এটাই হলো সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য বিবৃতি ও প্রতিবাদ। ধর্মের দোহাই দিয়ে বিভ্রান্ত করার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলো আবার।

পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের তথা বাঙালীদের বিপুল বিজয়ের বর্ণনা করে বিবৃত্তিতে বলা হয়েছে যে, গণনির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে শাসন ক্ষমতা তুলে দেবার এবং জনগণের রায়ের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের পরিবর্তে পশ্চিম পাকিস্তানের একচেটিয়া পুঁজিপতিদের স্বার্থে ইয়াহিয়া বাংলাদেশে গণহত্যা শুরু করেছে। বাংলাদেশের জনগণের উপর গণহত্যা ও পাকবাহিনীর বর্বরতা ঐক্যের ওপর প্রচণ্ডতম আঘাত হেনেছে।

আরব দুনিয়ার এই পাঁচটি প্রভাবশালী যুব সংস্থা বাংলাদেশের সাত কোটি মানুষের মুক্তি সংগ্রামের প্রতি দৃঢ় সমর্থন ঘোষণা করেছে। বাঙালী মুক্তিসেনাদের বীরোচিত লড়াইয়ের প্রতি দৃঢ় সমর্থন ঘোষণা করেছে। বাঙালী মুক্তিসেনাদের বীরোচিত লড়াইয়ের প্রতি দৃঢ় সমর্থন ও সাহায্যদানের জন্যে সংহতিমূলক প্রচার সংগঠিত করার এবং ইয়াহিয়ার জঙ্গী বাহিনীর গণহত্যার মুখোশ খুলে ধরার জন্য আরব জনগণের প্রতি আহবান জানিয়েছে।

বিবৃতিতে আরব যুব সংস্থাগুলি দাবী করেছেন যে, বাংলাদেশে গণনির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরে ইয়াহিয়া ও তার জঙ্গীচক্রকে বাধ্য করে হবে। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে হবে।

বিবৃতিতে সিরিয়ার ডেমোক্রাটিক ইউনিয়ন অব ইউথ, ইরাকের ডেমোক্রাটিক ইউথ ইউনিয়ন, ইয়েমেন গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের আসসালাফি যুব আন্দোলন, সুদানের ইউথ ইউনিয়ন,ও লেবানন ডেমোক্রাটিক ইউথ ইউনিয়ন ও লেবানন ডেমোক্রেটিক ইউথ ইউনিয়নে নেতৃবৃন্দ স্বাক্ষর করেছেন। বৃটিশ পার্লামেন্টের শ্রমিক দলের ১২০ জনের বেশী সদস্য বাংলাদেশে গণহত্যার জন্যে ইয়াহিয়ার জঙ্গী সরকারকে এককভাবে দায়ী করে এক প্রস্তাবে স্বাক্ষর করেছেন।

বৃটেনের ক্যাবিনেট মন্ত্রী জন ষ্টোনহাউজ এই প্রস্তাব রচনা করেন। এই প্রস্তাবে পশ্চিম পাকিস্তানী বাহিনীর বাংলাদেশে আক্রমণের ফলে উদ্ভূত পরিস্তিতিকে আন্তর্জাতিক শান্তির পথে মারাত্মক হুমকি ও জেনেভা কনভেনশনের পরিপন্থি বলে বর্ণনা করা হয়েছে। প্রস্তাবে এ ব্যাপারে রাষ্ট্রসংঘকে হস্তক্ষেপ করার আহবান

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<005.005.058>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

 

জানানো হয়েছে। প্রস্তাবে দাবী করা হয় যে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারকেই প্রকৃত সরকার বলে মর্যাদা দিতে হবে।

মার্কিন প্রতিনিধি সভার এশিয়া বিষয়ক সাবকমিটির চেয়াম্যান মিঃ কর্নেলিয়াস গ্যালাঘার পাকিস্তানকে সবরকম সাহায্য বন্ধ করে দেয়ার জন্যে গতকাল একটি সংশোধনী প্রস্তাব এনেছেন। মার্কিন সিনেটের এ ধরনের একটি প্রস্তাব আনা হয়েছে।

এদিকে ইউরোপের বহু দেশ সুস্পষ্টভাবে একথা জানিয়ে দিয়েছে যে, পাকিস্তান বাংলাদেশে এক তরফা সামাধান চাপিয়ে দিতে পারে না।

সুইডেন, হল্যান্ড, ইতালি, অস্ট্রিয়া ও হাঙ্গেরী সমেত ইউরোপীয় দেশগুলি এ ব্যাপারে একমত হয়েছে যে, পাকিস্তান বাংলাদেশের ওপর একতরফাভাবে কোন সমাধান চাপিয়া দিতে পারে না। ইউরোপের এইসব দেশগুলি তাদের মিত্রদেশসমূহের সঙ্গে একত্রে মিলে ইয়াহিয়া সরকারকে তাদের এই মনোভাব জানিয়ে দেবে।

১৯ জুন, ১৯৭১

…. বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ দূত জনাব আবদুস সামাদ আজাদ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দীর্ঘ এক মাস ধরে সফরের পর মাত্র কয়েক দিন আগে বাংলাদেশের মুক্তাঞ্চলে ফিরে এসেছেন। জনাব আবদুস সামাদ আজাদ গিয়েছিলেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শান্তিকামী মানুষ ও সরকারের কাছে বাংলাদেশে পাকিস্তানী হানাদারদের ব্যাপক গণহত্যা, ধ্বংসযজ্ঞ ও বর্বরতার করুণ চিত্রটি তুলে ধরতে এবং দেশ থেকে পশ্চিম পাকিস্তানী হানাদারদের উৎখাতের জন্যে বাংলাদেশের মানুষ আজ যে মরণপণ যুদ্ধে নেমেছে তার প্রতি সক্রিয় সহানুভূতি ও সমর্থন আদায় করতে।

জনাব আবদুস সামাদ আজাদ বিশ্বশান্তি সম্মেলনের বুদাপেস্ট অধিবেশনে বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে যোগদান করেন। জনাব আবদুস সামাদ আজাদ বলেন, বাংলাদেশের ব্যাপারে এই সম্মেলন সার্থক হয়েছে। তিনি বলেন, জাতীয় স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য সংগ্রামরত বাংলাদেশের জনগণের ন্যায্য সমর্থনে এই সম্মেলনে একটি সর্বসম্মত প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে। পরিশেষে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের আইনসঙ্গত ও ন্যায্য সংগ্রাম ও তাঁদের বীরত্বের স্বীকৃতি হিসেবে এই সম্মেলনের পক্ষ থেকে ‘ল্যামব্রাকীস’ পদক উপহার দেয়া হয়েছে।

জনাব আবদুস সামাদ আজাদ বলেন, বিশ্ব এটাও বুঝতে পেরেছে যে বাংলাদেশে এই বিস্ফোরক পরিস্থিতির সমাধান না হলে সমগ্র বিশ্বে এর বিস্ফোরণ ছড়িয়ে যেতে পারে। তিনি বলেন, বাংলাদেশে ইয়াহিয়াশাহীর অবসান ঘটবে। বাংলাদেশ থেকে পশ্চিম পাকিস্তানীরা নির্মুল হবে এবং তাদের ধবংসস্তুপের ওপর একটি নতুন জাতির অভ্যুত্থান ঘটবে- এই মূল সত্যটি বিশ্ববাসী আজ উপলব্ধি করেছেন।

 

২০ জুন, ১৯১৭

…পাক সেনারা বাংলাদেশে যে অবর্ণনীয় ধ্বংসযজ্ঞ, লুঠতরাজ ও নারী নির্যাতন চালিয়েছে তাকে কতিপয় দুষ্কৃতকারীরা কার্যকলাপ বলে বিভ্রান্তকর খবর রটিয়েছিলো। কিন্তু বিশ্বের মানুষ তাদের এই অপপ্রচারে বিভ্রান্ত

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<005.005.059>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

 

হয়নি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে শত শত সাংবাদিক, কূটনীতিক, শান্তি ও সমাজসেবী সংস্থাসমূহ এবং পর্যটক প্রকৃত ঘটনাবলী স্বচক্ষে দেখেছেন। তারা দেখেছেন বাংলাদেশে ইয়াহিয়ার সেনাবাহিনীর লোমহর্ষক নৃশংসতার চিহ্ন। ভারতের সীমান্তে যে লক্ষ লক্ষ শরণার্থীকে ইয়াহিয়া সরকার ভারতীয় অনুপ্রবেশকারী বলে বর্ণনা করেছিলো তারা সকলেই যে প্রকৃতই বাংলাদেশ থেকে বিতাড়িত এবং ইয়াহিয়ার বর্বর বাহিনীর অত্যাচারেই যে তারা বাধ্য হয়ে দেশ ছেড়েছে এটা তারা প্রত্যক্ষ করেছে। পৃথিবীর সকল দেশের পত্র-পত্রিকা, বেতার ও টেলিভিশনে এর প্রামাণ্য তথ্যাদি প্রকাশিত হয়েছে। বিশ্বের কোন মানুষই ইয়াহিয়া সরকারের জঘন্য প্রচারে ভ্রান্ত হয়নি।

জাতিসংঘের সেক্রেটারী জেনারেল উথান্ট বললেন, বাংলাদেশে যা ঘটছে তা মানব ইতিহাসের এক মর্মান্তিক অধ্যায়- মানব ইতিহাসের এই কলঙ্ক মুছে দেয়া সম্ভব নয়।

বাংলাদেশের ঘটনাবলী সম্পর্কে সেক্রেটারী জেনারেল উথান্টের এই মন্তব্যের কয়েক দিন পরেই জাতিসংঘ ত্রাণ ও সাহায্য দফতরের হাইকমিশনার প্রিন্স সদরুদ্দীন আগা খাঁ ভারত সীমান্তে বাংলাদেশ থেকে বিতাড়িত লক্ষ লক্ষ শরণার্থীর শিবিরগুলি পরিদর্শন করতে গিয়েছিলেন।

ভারত সীমান্তে শরণার্থী শিবির সফর করার পর সদরুদ্দীন আগা খাঁ নিজেই বললেনঃ বাংলাদেশ থেকে আগত শরণার্থীরা নিজেদের জীবন সম্পর্ক কোনোরকম নিশ্চয়তা না পাওয়া পর্যন্ত স্বদেশে ফিরতে পারে না। বাংলাদেশের শরণার্থীরা তাঁর কাছে একটি স্মারকলিপি দিয়েছেন। এই স্মারকলিপিটিতে বাংলাদেশের শরণার্থীরা বলেছেন যে, যতদিন পাক হানাদার বাহিনী বাংলাদেশের মাটিতে থাকবে ততদিন স্বদেশে ফেরা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডী বলেন, পাকিস্তানী হানাদারদের আক্রমণে বাংলাদেশ থেকে লক্ষ লক্ষ মানুষ আজও সর্বস্ব হারিয়ে দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে। পশ্চিম পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী আজও সেখানে গণহত্যা চালাচ্ছে, আজও তারা সেখানকার সাধারণ মানুষের বাড়ি-ঘর সহায়-সম্পদ ধ্বংস করছে- নারীর ওপর পৈশাচিক নির্যাতন চালাচ্ছে। সারা বাংলাদেশে পাকিস্তানী হানাদারদের এই বর্বরতায় উদ্বেগ প্রকাশ করা ও এর অবসান ঘটানোর ব্যাপারে সচেষ্ট হবার জন্য সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডী মার্কিন প্রেসিডেন্ট মিঃ রিচার্ড নিক্সন ও মার্কিন পরারট্র সচিব মিঃ রজার্সের প্রতি আহবান জানিয়েছেন। সিনেটর কেনেডী বলেন, বাংলাদেশে পশ্চিম পাকিস্তানী হানাদারদের সৃষ্ট এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে মার্কিন সরকারের নীরবতা মানব ইতিহাসের এক করুন ট্রাজেডি ছাড়া আর কিছুই নয়। তিনি বলেন, আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানকে যেসব অস্ত্রশস্ত্র সরবরাহ করেছে ইয়াহিয়া সরকার তা সবই বাংলার নিরস্ত্র জনগণের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছে। সিনেটর কেনেডী বলেন, আর কালবিলম্ব না করে ইয়াহিয়ার জঙ্গী সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির ব্যাপারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরকারকে সক্রিয় হতে হবে। বর্তমান জরুরী অবস্থাই ইয়াহিয়া সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির প্রকৃত সময় বলে তিনি উল্লেখ করেন। ২১ জুন, ১৯৭১ … সম্প্রতি হেলসিঙ্কিতে বিশ্বশান্তি সংসদের সম্পাদকমণ্ডলীর এক বৈঠকে বাংলাদেশে পাক হানাদার বাহিনীর সভ্যতা ও মানবতাবিরোধী সামরিক তৎপরতার জন্যে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। বাংলাদেশে পাক

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<005.005.060>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

 

হানাদার বাহিনীর হত্যা, ধ্বংস ও লুণ্ঠন বন্ধ করার ব্যাপারে পাকিস্তান সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রতি বৈঠকে আহবান জানান হয়। বিশ্বশান্তি সংসদের সম্পাদকমণ্ডলী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, বৃটেন ও অন্যান্য রাষ্ট্রবর্গের প্রতি এই মর্মে দাবী জানান যে তারা যেন পাকিস্তানকে সর্বপ্রকার সাহায্য দান একেবারে বন্ধ করে দেন।

বাংলাদেশের শরণার্থী প্রসঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকারের কাছে এক আবেদনে বিশ্বশান্তি সংসদের সম্পাদকমণ্ডলী বলেন, যারা মানবিকতার নীতিকে অস্বীকার করে, যারা মানবতাকে হত্যা করে- বাংলাদেশে যারা গণতন্ত্র, সভ্যতা ও মানবতাকে একসঙ্গে খুন করেছে তাদের ক্ষমা নেই।

বিশ্বশান্তি সংসদের সম্পাদকমণ্ডলী বিশ্বের বিভিন্ন সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, “শান্তি ও মানবতার প্রতি আজও যারা শ্রদ্ধাশীল তাদের প্রক্যেকেরই উচিত পাকিস্তান কর্তৃপক্ষের কাছে এমন অনুকূল অবস্থা সৃষ্টির দাবী করা, যাতে বাংলাদেশের শরণার্থীরা তাদের স্বদেশে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও শান্তিপূর্ণ জীবন বিশ্বশান্তি সংসদের সম্পাদকমণ্ডলী পাকিস্তান সরকারকে বাংলাদেশ থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করে জনগণ কর্তৃক গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবী করেছেন। বিশ্বশান্তি সংসদের সম্পাদকমণ্ডলীর বৈঠকে বাংলাদেশের সংগ্রামকে সাহায্য করার ব্যাপারে সক্রিয় উদ্যোগ গ্রহণের জন্যে বিশ্বের সকল শান্তি সংস্থার প্রতি আহবান জানানো হয়।

বাংলাদেশে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর নির্বিচার গণহত্যা ও ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের ফলে উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার জন্যে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠক আহবানের উদ্দেশ্যে পৃথিবীর বহু দেশ থেকে বহু মানবদরদী ও শান্তি সংস্থা সেক্রেটারী জেনারেল উত্থান্টের কাছে তারবার্তা পাঠিয়েছেন। এইসব তারবার্তায় বলা হয়েছে যে, বাংলাদেশের বর্তমান ঘটনাবলী যেহেতু ‘মানব ইতিহাসের সবচেয়ে মর্মান্তিক অধ্যায় সেই কারণেই বাংলাদেশের ঘটনাবলী নিয়ে আলোচনার জন্যে নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়া উচিত। অথচ কয়েকদিন আগে পর্যন্ত ইয়াহিয়া সরকার তার বেতার, টেলিভিশন ও কূটনৈতিক মিশনসমূহের মাধ্যমে এই ঘটনাকে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার বলে প্রচার করছিলো। বাংলাদেশে তাদের সেনাবাহিনীর নির্বিচার গণহত্যাতে তারা বাঙ্গালী-অবাঙ্গালীর মধ্যে সংঘর্ষ ও কমিপয় দুস্তৃকারীর কার্যকলাপ বলে চালিয়ে দিতে চেয়েছিলো। কিন্তু তাদের সে অপকীর্তি বিশ্ববিবেকের চোখে এখন পরিষ্কারভাবে ধরা পড়েছে। জানি না ইয়াহিয়ার সামরিক সরকার এই কেলেঙ্কারির পর আবার কোন ছেদো কাহিনীর আশ্রয় নেবেন- তবে সত্য ঢাকতে গিয়ে, অপরাধ গোপণ করতে গিয়ে তারা যে কৌশলই অবলম্বন করুন না কেন পরিণতি তাদের একই হবে। কারণ, খোঁড়ার পা গর্তেই পড়ে।

২৭ জুন, ১৯৭১

সম্প্রতি বার্লিন থেকে প্রকাশিত জার্মান গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র সরকারের এক ইশতেহারে ঘোষণা করা হয়েছে যে, পশ্চিম পাকিস্তানী সৈন্যদের ব্যাপক গণহত্যা, লুঠতরাজ, অগ্নিসংযোগ ও নারী নির্যাতনের ফলে বাংলাদেশ থেকে লক্ষ লক্ষ নরনারী আর যাতে দেশ ছেড়ে যেতে বাধ্য না হয় এবং ইতিমধ্যেই যে ৬০ লক্ষ বাঙালী দেশ ছেড়ে ভারতে শরণার্থী হতে বাধ্য হয়েছে তারা যাতে অবিলম্বে স্বদেশে ফিরে যেতে পারে এবং বাংলাদেশে যাতে তাদের জানমালের পূর্ণ নিরাপত্তা বিধান করা হয় তার জন্য কালবিলম্ব না করে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষ যাতে ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারেন তার জন্যে কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এইসব কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণের মধ্যেই বাস্তবসম্মত, উপযুক্ত এবং স্বায়ী সমাধানের পথ নিহিত আছে।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<005.005.061>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

 

জার্মান গণতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্রের এই ইশতেহারে আরও বলা হয়েছে যে, বাংলাদেশের জনগণের ইচ্ছা এবং সেখানকার গণনির্বাচিত নেতৃবর্গের পরামর্শ ও পরিকল্পনার ভিত্তিতেই মৌলিক রাজনৈতিক সমস্যা সমাধানের এক সঠিক ও সহজ পথ খুঁজে পাওয়া যাবে।

জার্মান গণতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্রের এই ইশতেহারকে বিশ্বের সকল দেশের রাজনৈতিক মহল দারুণ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন। তাঁরা বলেন, এই ইশতেহারে বাংলাদেশ থেকে যেসব শরণার্থী ভারতে চলে গেছে তাদের সমস্যাকে শুধু যে কেবল আন্তর্জাতিক সমস্যা বলে বর্ণনা করা হয়েছে তা নয়। এই ইশতেহারে দাবী করা হয়েছে, বাংলাদেশ থেকে পশ্চিম পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর প্রত্যাহার, শেখ মুজিবুর রহমানসহ সব রাজনৈতিক নেতার মুক্তি, আওয়ামী লীগের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, গণনির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর প্রভৃতি।

ইউরোপ ও আমেরিকার পত্রপত্রিকা ও রেডিও-টেলিভিশনসমূহের প্রকাশিত ও প্রচারিত বিভিন্ন সংবাদ ও মন্তব্যে বলা হয়ঃ গত ২৫ শে মার্চ থেকে পশ্চিম পাকিস্তানী সৈন্যরা বাংলাদেশে যে বর্বরতা চালিয়েছে তাতে বাংলাদেশ থেকে আরও লক্ষ লক্ষ নরনারী দেশছাড়া হতে বাধ্য হবে।

গত ১৯৭০ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশে যে ঘূর্ণিঝড় হয়েছিলো তাতে অনুমানিক ১৮ থেকে ২০ লাখ লোক প্রাণ হারিয়েছে এবং এই ব্যাপক প্রাণহানির মূল্যেও পশ্চিম পাকিস্তানীদের প্রচ্ছন্ন কারসাজি ছিলো। যেসব ব্যবস্থা অবলম্বন করলে ঘূর্ণিঝড়ে ও জলোচ্ছাসে মৃত্যুর হাত থেকে শতকরা ৯৫ জন অব্যাহতি পেতে পারতো, পশ্চিম পাকিস্তানীরা তথা ইয়াহিয়া সরকার ইচ্ছা করেই সেসব ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। এমন কি ব্যাপক প্রাণহানির খবরটুকু পর্যন্ত চেপে গেছে। বাইরের জগত যেটুকু জেনেছে তা বাংলাদেশের বেসরকারী কতগুলো পত্র-পত্রিকার মাধ্যমে এবং বিদেশী সাংবাদিকদের খবর থেকে। গত ২৫শে মার্চ থেকে ইয়াহিয়া সরকার বাংলাদেশে যে গণহত্যা চাললো, এর খবরও তারা চেপে গেছে। ইয়াহিয়ার জঙ্গী বাহিনী ১০ লাখ নরনারীকে গুলি করে ও আগুনে পুড়িয়ে মেরেছে।

লণ্ডনে কমনওয়েলথ প্রেস সম্মেলনে বিভিন্ন দেশের পত্রপত্রিকা থেকে এই তথ্য উদ্ধৃত করা হয়। অনেকগুলো পত্র-পত্রিকায় একরম মন্তব্য করা হয়েছে যে, পবিত্র বাইবেল গ্রন্থে বর্ণিত মুসার (আঃ) যুগে মিশরের উপর পর পর যে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বিপর্যয় এসেছিলো তাতেও এত প্রাণহানি ঘটেনি। পশ্চিম পাকিস্তানীরা এ পর্যন্ত যত বাঙালী খুন করেছে তার দ্বিতীয় কোন দৃষ্টান্ত নেই। এত নরহত্যা প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে এ পর্যন্ত কখনও ঘটেনি।

 

২৮ জুন, ১৯৭১

 

বিশ্বব্যাঙ্ক পাকিস্তানকে আর কোন আর্থিক সাহায্য দেবে না বলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। মার্কিন প্রভাবশালী দৈনিক “ওয়াশিংটন পোষ্ট’-এ প্রকাশিত এক খবরে উল্লেখ করা হয় যে, সম্প্রতি প্যারিস পাকিস্তানকে সাহায্য দানকারী কনসর্টিয়ামভুক্ত ১১টি দেশের প্রতিনিধিদের এক বৈঠকে সর্বসম্মতিক্রমে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। কনসর্টিয়ামভুক্ত দেশসমূহের প্রতিনিধিগণ স্থির করেছেন যে, বাংলাদেশে সবদিক থেকে পূর্ণ স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে না আসা পর্যন্ত পাকিস্তানকে নতুন করে কোন রকম আর্থিক সাহায্যদানের প্রশ্নই উঠতে পারে না। বরং পাকিস্তান এ পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে যেসব ঋণ নিয়েছে সেগুলোই সুদে-আসলে আদায় করা হবে। বৈঠকে আরও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়ে যে, আর্থিক সাহায্য লাভের বিষয়টি পুনর্বিবেচনার জন্যে পাকিস্তান যত কান্নাকাটিই করুক না কেন, এ ব্যাপারে কনসর্টিয়ামের আর কোন বৈঠক বসবে না।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<005.005.062>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

 

‘ওয়াশিংটন পোষ্ট’-এর প্যারিসস্থ সংবাদদাতা জানিয়েছেন যে উক্ত বৈঠকে বেলজিয়াম, কানাডা ও বৃটেন একথা খোলাখুলিভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে, পাকিস্তানীরা বাংলাদেশে যে ব্যাপক গণহত্যা, লুটতরাজ ও ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে তার বিরুদ্ধে তাদের জনমত প্রবল আকার ধারণ করেছে এবং পাকিস্তানকে কোন রকম সাহায্য দানের তারা ঘোরবিরোধী। অতএব নিজেদের দেশের জনমতকে উপেক্ষা করে পাকিস্তানকে সাহায্য দিয়ে বাংলাদেশে সামরিক বর্বরতা চালানোর সহযোগিতা করা তাদের পক্ষে আদৌ সম্ভব নয়। -অর্থাৎ পাকিস্তানকে সাহায্যদানকারী কনসর্টিয়ামভুক্ত দেশসমূহের অভিমত হলোঃ ইয়াহিয়া ও তার জঙ্গী সরকার যতদিন পর্যন্ত বাংলাদেশে গণহত্যা, লুঠতরাজ, অগ্নিসংযোগ ও নারী নির্যাতন বন্ধ না করবে, বাংলাদেশ থেকে যতদিন পর্যন্ত তাদের রক্তভেজা লোমশ হাতগুলো গুটিয়ে না ফেলবে এবং যতদিন পর্যন্ত বাংলাদেশে পূর্ণ স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে না আসবে ততদিন আমরা কেউই পাকিস্তানকে একটি কানাকড়ি পর্যন্ত দিচ্ছি না।

হল্যাণ্ড সরকারও এই একই অভিমত প্রকাশ করেছেন। হল্যাণ্ডের উন্নয়ন সাহায্য সংক্রান্ত মন্ত্রী মিঃ জে, বি, উডনিক হেগস্থ পাকিস্তানী রাষ্ট্রদূতকে তাঁর সরকারের এই সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, যেহেতু পাকিস্তানের সরকার তার নিজের দেশের মানুষের বিরুদ্ধে বর্বর বাহিনীকে লেলিয়ে দিয়ে লক্ষ লক্ষ চালিয়ে ও শহর গ্রাম পুড়িয়ে দিয়ে লক্ষ লক্ষ মানুষকে দেশছাড়া করেছে এবং যেহেতু পাক সরকার নিজেই নিজের দেশের অর্থনীতির মূল বুনিয়াদটিকেই বুলেট-বেয়োনেটের আঘাতে শেষ করে দিয়েছে, সেই কারণেই পাকিস্তানকে নতুন কোন সাহায্য দানের কথা বিবেচনা করা যায় না।

মিঃ উডনিক বলেন, পাকিস্তানকে সাহায্যদানকারী কনসর্টিয়ামভুক্ত দেশসমূহের সিদ্ধান্তের সাথে অমত হয়েই তার সরকার এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি বলেন, যেসব সাহায্য দেওয়ার কথা ইতিপূর্বেই হয়েছিলো তা এখন পুনর্বিবেচনা করে দেখা হচ্ছে।…

 

৪ জুলাই, ১৯৭১ …

ভাটিকানের মহামান্য পোপ পল থেতে শুরু করে জাতিসংঘের সেক্রেটারী জেনারেলে উথান্ট এবং পৃথিবীর শান্তিকামী মানুষ বাংলাদেশে পশ্চিম পাকিস্তানী হানাদারদের বিরুদ্ধে বর্বরতার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ, ধিক্কার আর ঘৃণা প্রকাশ করেছেন। ইয়াহিয়ার সামরিক সরকার একদিকে যেমন বাংলাদেশে ব্যাপক গণহত্যা ও অবর্ণনীয় বর্বরতায় লিপ্ত হয়েছে অন্যদিকে তারা বাংলাদেশ থেকে বাইরে সংবাদ যাওয়ার সকল পথ রুদ্ধ করে চরম অপপ্রচার ও ভুয়ো কল্পকাহিনী ছড়িয়েছে। এইসব পরস্পরবিরোধী চিত্র ও প্রচারণার জন্যেই সম্প্রতি বৃটিশ পার্লামেন্টের একটি প্রতিনিধিদল পাক-অধিকৃত এলাকাসমূহ এবং বাংলাদেশের মুক্ত এলাকা সফরের এসেছিলেন। এই বৃটিশ পার্লামেন্টার প্রতিনিধিদলে ক্ষমতাসীন রক্ষণশীল ও শ্রমিক উভয় দলের সদস্যই ছিলেন। প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব করেছিলেন দলের প্রভাবশালী সদস্য মিঃ আর্থার বটমলি।

মিঃ আৰ্থার বটমলি ছিলেন বৃটিশ কমনওয়েলথ সচিব। এখন তিনি পার্লামেন্টে শ্রমিকদলের একজন প্রভাবশালী সদস্য।

বাংলাদেশ সফর করে গিয়ে মিঃ বটমলি সাংবাদিকদের বলেছেনঃ ইয়াহিয়া তার সাম্প্রতিক বেতার বক্তৃতায় যে রাজনৈতিক সমাধানের কথা বলেছেন তা স্রেফ ধাপ্পা মাত্ৰ। ইয়াহিয়ার ওই বেতার বক্তৃতায় রাজনৈতিক সমাধানের প্রস্তাব করা হয়েছে। বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষ তা ছুড়ে ফেলে দেবেন। ও ধরনের প্রস্তাব বাংলাদেশে মানুষ গ্রহণ করতে পারেন না।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<005.005.063>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

 

মিঃ বটমলি বলেনঃ আওয়ামী লীগ ও শেখ মুজিবুর রহমানকে বাদ দিয়ে সমাধানের দ্বিতীয় কোন পথ নেই। বৃটিশ পার্লামেন্টার দলের অন্যতম সদস্য মিঃ টোবি জেসেল ও বিশিষ্ট সদস্য মিঃ আর্নেষ্ট প্রিন্টিসও এ ব্যাপারে মিঃ বটমলির সঙ্গে একমত।

মিঃ টোবি জেসেল বলেনঃ রাজনৈতিক দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থা বিপজ্জনক। অবিলম্বে এ সমস্যার সমাধান যদি না করা হয়, তাহলে ভারত-পাকিস্তান সংঘর্ষ হতে বাধ্য। তিনি বলেন, পাকিস্তান এখন এ শতাব্দীর সবচে বড়ো দুর্যোগের মধ্যে রয়েছে।

বাংলাদেশে ব্যাপক ধ্বংসের পিছনে ভারতীয় দুষ্কৃতকারীরা রয়েছে বলে পাকিস্তান যে ডাহা মিথ্যা কাহিনী ফেঁদেছিল বৃটিশ পার্লামেন্ট সদস্যগণ সকলেই তার সত্যতা অস্বীকার করেছেন। তাঁরা বলেন, রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে সারা বাংলাদেশে ধ্বংসের যে বীভৎস চিত্র আমরা দেখে এসেছি তা কোনক্রমেই ভারতীয়দের দ্বারা সংঘটিত হয়নি। হওয়া সম্ভবও নয়।…

বৃটিশ পার্লামেন্টারী দলের অপর সদস্য প্রাক্তন বৃটিশ সমর সচিব মিঃ জেমস র‍্যামসডেন বলেনঃ বাংলাদেশে পাক সামরিক বাহিনী যা করছে তা বীভৎস। তিনি বলেন, বাংলাদেশে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠার কোন সম্ভবনা নেই। বাংলাদেশের পরিস্থিতি এতই বিপজ্জনক ও দুর্বিষহ যে সেখান থেকে আরও অধিক সংখ্যায় শরণার্থী ভারতে বা প্রতিবেশী দেশে চলে যেতে পারে। এর ফলে শরণার্থী সমস্যা আরও গুরুতর আকারে দেখা দিতে পারে। আর তা দেখা দিলে এক ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে। পাকিস্তানের পক্ষে আসবে এক দারুণ মরণ আঘাত। সে আঘাত সহ্য করার ক্ষমতা পাকিস্তানের নেই।

যে পাকিস্তান বর্তমানে এ শতাব্দীর সবচে বড়ো দুর্যোগের মাঝ দিয়ে চলেছে। তাঁরা বলেন, বাংলাদেশের ওপর জঙ্গী শাসন চাপিয়ে রেখে এর সুরাহা হবে না, হতে পারে না। মিঃ আর্থার বটমলি বলেনঃ পাক বাহিনী কেন, পৃথিবীর কোন শক্তির পক্ষেই সাড়ে সাত কোটি মুক্তি-সচেতন মানুষকে দাবিয়ে রাখা সম্ভব নয়। …

 

৯ জুলাই, ১৯৭১

গতকাল বিশ্বজনমত অনুষ্ঠানে মার্কিন সাময়িকী নিউজউইক’-এ প্রকাশিত বাংলাদেশের ঘটনাবলী সম্পর্কিত একটি মর্মস্পশী রিপোর্টের অংশবিশেষ আমরা উল্লেখ করেছিলাম। দ্য টেরিবল ব্লাড বাথ অব টিক্কা খান” বা “টিক্কা খানের বীভৎস রক্তস্নান’ শিরোনামের এই রিপোটে নিউজউইক’ সংবাদদাতা টনি ক্লিফটন বাংলাদেশে পাক বর্বরতার একটি আংশিক চিত্র তুলে ধরেছেন। রিপোর্টে তিনি বাংলাদেশে যে মর্মান্তিক ঘটনাবলীর কথা বলেছেন সে সম্পর্কে কোন রকম মন্তব্য না করে আমরা শুধু তার বাকী অংশটুকু তুলে ধরছি।

টনি ক্লিফটন তাঁর রিপোর্টে লিখেছেনঃ পাক বর্বরতার যেসব বীভৎস স্বাক্ষর আমি প্রত্যক্ষ করেছি ও পাক-হানাদারদের পৈশাচিকতার যেসব লোমহর্ষক কাহিনী আমি শুনেছি তাতে আমার শুধু একথাই মনে হয়েছে যে বাংলাদেশে কয়েক হাজার মাইলাই ও কয়েক হাজার লিডিসেস সংঘটিত হয়ে গেছে। আমার আজ আর কোন সন্দেহ নেই যে প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে এ পর্যন্ত এমন বর্বরতা কখনও সংঘটিত হয়নি। কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগে এবং এমন কি গত দুটো বিশ্বযুদ্ধেও একখানি বিপর্যয় কখনও ঘটেনি। আমার মনে হয়, পাক বর্বর বাহিনী বাংলাদেশে যে হাজার হাজার মাইলাই আর লিডিসেস করেছে তার শেষ এখানে নয়-বাংলাদেশে আরও অনেক মাইলাই, আরও অনেক লিডিসেস অচিরেই সংঘটিত হতে যাচ্ছে।

টনি ক্লিফটন বলেনঃ এইসব দেখে-শুনে আমার ব্যক্তিগত প্রতিক্রিয়া যা হয়েছে তা যদি বলতে হয় তাহলে আমি বলবো- আমি হতবাক, স্তব্ধ হয়ে গেছি। আমি যা দেখেছি যা শুনেছি তাতে ভয়ঙ্কর এক আতঙ্কে স্তব্ধ হয়ে

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<005.005.064>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

 

যাওয়া ছাড়া আর কোন উপায় নেই। আমি হতবাক হয়ে গেছি- বার বার বিস্ময়ে অবাক হয়ে যাচ্ছি- এই নারকীয় হত্যাকাণ্ড আর এই প্রাগৈতিহাসিক বর্বরতায় একজন মানুষের কোন চেতনা থাকা কি সম্ভব?

টনি ক্লিফটন তাঁর রিপোর্টে বাংলাদেশে পাক-হানাদারদের হত্যা, নির্যাতন ও ব্যাভিচারের বর্ণনা দিতে গিয়ে বাংলাদেশের একটি সর্বহারা বালিকার এক মর্মান্তিক কাহিনী তুলে ধরেছেন।

তিনি বলেনঃ লালফুল ও সবুজ লতাপাতা আকা গোলাপী রঙের একটা ছেড়া ফ্রকের আট-ন বছরের বালিকা ইসমত আরার মুখে আমি এক ভয়ঙ্কর আতঙ্কের প্রতিচ্ছবি লক্ষ্য করেছি। আমি তাকে দেখলাম শরণার্থী শিবিরের অনতিদূরে একটি হাসপাতালে। শত শত আহতদের ভিড়ের একপ্রান্তে সে দাঁড়িয়ে ছিলো। দিশেহারা দুটি ভিরু চোখ দিয়ে চারিদিকে সে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিলো। সে যে আহত আমি তা দূর থেকেই লক্ষ্য করলাম। মনে হলো শীর্ণ আলোর একটি রেখার মতো এই মেয়েটি তো কারও বিপদের কারণ হতে পারে না? এই ছোট্ট মেয়েটি ইয়াহিয়ার সেনাবাহিনীর কাছে কি এমন বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিলো যার জন্য তারা এভাবে আঘাত করেছে? একজন পাকিস্তানী সৈন্য বেয়োনেট দিয়ে তার ঘাড়ে আঘাত করেছে। তার শ্বাসনালি কেটে দিয়েছে। সে তার গলার ব্যাণ্ডেজের ওপর একটা হাত রেখে দাঁড়িয়ে ছিলো। আমি এগিয়ে গেলাম। মেয়েটি বললোঃ আমার নাম ইসমত আরা আমার বাবার নাম মরহুম ইশাক আলী। কুষ্টিয়ায় আমার বাবার দোকান ছিলো। দু’মাস আগে বাবা কুষ্টিয়ায় রওয়ানা হয়েছিলেন সেই রাতে আমি ঘুমোবার আগে বাইরে কোলাহল আর ভারী ভারী পায়ের শব্দ শুনতে পেলাম। কি হচ্ছে না হচ্ছে দেখতে যাওয়ার আগেই দেখতে পেলাম অনেকগুলো পাক সৈন্য আমাদের ঘরে ঢুকে পড়েছে। তারা আমাদের ঘরে ঢুকেই আমার দাদাকে গুলি করে। আমার দাদা বি-এসসি পাস করেছিলো। তারপর তারা আমার মা ও বোনদের ওপর অত্যাচার চালায় এবং তাদের শেষ পর্যন্ত বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে মেরে ফেলে। একজন সৈন্য লাফ দিয়ে এসে আমাকে আঘাত করে। তারা বেয়োনেট দিয়ে আমার গলায় আঘাত করার সঙ্গে সঙ্গে আমি পড়ে যাইে এবং মৃতের ভান করি। তারপর সৈন্যরা চলে গেলে পরের দিন একজন লোক দিয়ে আমাকে অচেতন অবস্থায় তুলে নিয়ে আসে। এই কথাগুলো বলার সঙ্গে সঙ্গে সে যেন কেমন হয়ে পড়েছিলো। সেই বীভৎস দৃশ্য যেন তার চোখের সামনে ভেসে উঠছিলো। সে তা সহ্য করতে না পেরে হঠাৎ সরে গেল আমার কাছ থেকে। আর তাকে দেখতে পেলাম না। আমি তার ওয়ার্ডের ডাক্তারের সংগে আলাপ করলাম। ডাক্তার আমায় জানালেন, একদিন এক ভদ্রলোক তাকে রক্তাক্ত অবস্থায় এখানে নিয়ে আসে। এরপর হাসপাতালে আহত শরণার্থীদের ভিড় ঠেলে আমি যখন বাইরে বের হচ্ছিলাম ঠিক সেই সময় ইসমত আরা দরজার কাছে এসে দাঁড়ায়। তার দুচোখের কোণায় জল টলমল করছিলো। কাঁপা কাঁপা ঠোঁট নিয়ে সে আমায় জিজ্ঞেস করলোঃ বলুন না এখন আমি কি করবো? জানেন আমরা পাঁচ বোন ছিলাম, আমার ভাই ছিলো, মা-বাবা ছিলো। কতো সুন্দর আমাদের ঘরবাড়ি ছিলো। আজ আমার কেউ নেই, কিছু নেই। আজ আমি এতিম। বলুন না, আমি কোথায় যাবো? আমার কি হবে? আমি তাকে বললাম, আর তো কোন ভয় নেই। তুমি এখানে চলে এসেছ, এখন তোমার ভয়ের কিছু নেই। কপট এক নির্বোধের মতো আমি তাকে সান্তনার কথাগুলো বললাম- কিন্তু ইসমত আরার কি হবে? কি হবে আরও হাজার হাজার ইসমত আরার?

টনি ক্লিফটন তাঁর রিপোর্টে উল্লেখ করেন যে, আমেরিকার নিউজার্সির কংগ্রেস সদস্য মিঃ কর্নেলিয়াস গ্যালাঘার আমায় বলেছেন যে, পাক বাহিনীর বর্বরতার খবর অতিরিক্ত বলে আমি প্রথমে মনে করেছিলাম এবং প্রকৃত সত্য যাচাইয়ের জন্যেই আমি শরণার্থী শিবিরগুলো পরিদর্শন করতে গিয়েছিলাম কিন্তু আমি যা দেখেছি তা অবর্ণনীয়। মিঃ গ্যালাঘার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মার্কিন বাহিনীর একজন বিখ্যাত সামরিক অফিসার ছিলেন। তিনি বলেছেনঃ দ্বিতীয় বিশ্ব মহাসমরের সময় ফ্রান্সের বিধ্বস্ত এলাকাগুলো আমি দেখিছি- মর্মান্তিক বধ্যভূমিগুলোও আমি দেখেছি, কিন্তু আমি এমনটি কখনও দেখিনি। এ বীভৎসতা, এ বর্বরতার কোন তুলনা হয় না।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<005.005.065>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

 

টনি ক্লিফটন বলেন, গত তিন মাসে পশ্চিম হানাদাররা বাংলাদেশে যে নারকীয় বর্বরতায় লিপ্ত হয়েছে তাতে এটা আজ অত্যন্ত সুস্পষ্ট হয়ে গেছে যে পাকিস্তান ভেঙ্গে দুটি স্বতন্ত্র দেশ হয়ে যাচ্ছে। সেটা ঠিক কবে হচ্ছে সেটাই শুধু প্রশ্ন, হচ্ছে কিনা সেটা আজ আর কোন প্রশ্ন নয়। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ আজ একটি বাস্তব ঘটনা।

১০ জুলাই, ১৯৭১

 

বেশী দিনের কথা নয়। মাত্র কয়েক দিন আগে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী জনাব তাজউদ্দীন আহমদ পশ্চিম পাকিস্তানের সংগে বাংলাদেশের সম্পর্কের প্রসঙ্গে দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন“বাংলাদেশের লাখো শহীদের লাশের তলায় পাকিস্তানের কবর হয়ে গেছে।” প্রধানমন্ত্রী জনাব তাজউদ্দীনের এই উক্তির কদিন পরেই লণ্ডনের প্রভাবশালী দৈনিক ডেলী মিরর-এ প্রকাশিত A DEATH OF A NATION শিরোনামের একটি মর্মস্পর্শী রিপোটে বাংলাদেশে পাক বর্বরতার লোমহর্ষক বিবরণ দিয়ে এই একই মন্তব্য করা হয়। এর আগে লেবানিজ দৈনিক “আল সাব’ পত্রিকায় প্রকাশিত ARTIFICIALLLY CREATED PAKISTAN IS UNFIT TO CONTINUE শিরোনামের রিপোর্টটিতেও এই একই মন্তব্য করা হয়। তারপর গত সপ্তায় প্রকাশিত প্রভাবশালী মার্কিন সাময়িকী NEWSWEEK- এ প্রকাশিত THE TERRIBLE BLOOD BATH OF TIKKA KHAN শিরোনামের রিপোর্টে পাকিস্তানীদের বীভৎস হত্যাযজ্ঞ, ব্যাভিচার, নির্যাতন ও ধ্বংসলীলার বিবরণ দিয়ে মন্তব্য করা হয় যে, বাংলাদেশে পাকিস্তানের কবর হয়ে গেছে। পাকিস্তান ভেঙে দু টুকরো হয়ে যাচ্ছে। এ ভাঙ্গন জোড়া দেয়ার নয়। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ আজ একটি বাস্তব ঘটনা। চলতি সপ্তাহে নিউজউইক লিখেছেন, পশ্চিম পাকিস্তান যেদিন বাংলাদেশে সৈন্য পাঠিয়েছে সেই দিনই পাকিস্তানের মৃত্যু হয়েছে।

সম্প্রতি কানাডীয় পার্লামেন্টের তিনজন প্রভাবশালী সদস্য বাংলাদেশ থেকে ভিটেমাটি ছেড়ে যাওয়া সর্বহারা শরণার্থীদের অবস্থা এবং বাংলাদেশে পাক বর্বরতার নমুনা দেখার জন্যে শরণার্থী শিবিরগুলি পরিদর্শনে গিয়েছিলেন।

শরণার্থী শিবিরগুলি পরিদর্শন করে গিয়ে এক সাংবাদিক সম্মেলনে তাঁরা বলেছেনঃ “পূর্ব পাকিস্তান’- এই নামে কোন রাষ্ট্র-রাষ্ট্রাংশের অস্তিত্ব আর নেই। বাংলাদেশ আজ একটি বাস্তব সত্য।

সাংবাদিক সম্মেলনে জাতীয় পরিষদ সদস্যগণ এ কথা জোর দিয়ে বলেন, আমরা একটি গণতান্তিক দেশের নির্বাচিত প্রতিনিধি। নির্বাচন ও গণতন্ত্রের উপর আমাদের পূর্ণ আস্থা আছে। আর এই আস্থা বলেই আমরা মনে করি বাংলাদেশের গণনির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করাই বাংলাদেশ সমস্যা সমাধানের একমাত্র পথ। কানাডীয় পার্লামেন্টারী প্রতিনিধিদলের নেতা, কানাডার ক্ষমতাসীন লিবারেল পার্টির মিঃ জর্জের লাচসি সাংবাদিকদের বলেনঃ শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার দাবী জানিয়ে অন্যায় কিছু করেননি। তিনি বলেন, কানাডার অনেক পরিষদ সদস্যই তো কুইবেক-এর বিছিন্ন হওয়ার দাবী তুলেছেন। এটা গণতান্ত্রিক অধিকার। অতএব এই গণতান্ত্রিক অধিকার তোলার জন্যে কাউকে অপরাধী বলে গণ্য করা উচিত নয়।

শরণার্থী শিবিরগুলি পরিদর্শনের পর কানাডীয় প্রতিনিধিগণ বলেনঃ এটা এখন পরিষ্কার যে পাকিস্তানের সামরিক কর্তৃপক্ষ পরিকল্পিতভাবে একটি জাতিকে ধ্বংস করতে চেয়েছিলেন। তাঁরা বলেন, এটা এই শতাব্দীর সবচে কলঙ্কজনক অধ্যায়। শুধু কানাডার জনসাধারণের নয়, বিশ্ববাসী বিশেষ করে কমনওয়েলথ দেশসমূহের মানুষের যা কিছু করণীয় আছে আমরা তা অবশ্যই তুলে ধরবো।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<005.005.066>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

 

তাঁরা বলেন, পাকিস্তান, ভারত ও কানাডা সকলেই কমনওয়েলথের সদস্য। কমনওয়েলথের একটি সদস্যরাষ্ট্রের সমরনায়করা বাংলাদেশকে ও বাঙালী জাতিকে নিশ্চিহ্ন করবে তা কোনমতেই সহ্য করা যায় না।

কানাডীয় পরিষদের এই তিনজন সদস্য হলেন ক্ষমতাসীন লিবারেল পার্টির মিঃ জর্জেস লাচসি, মিঃ এ বিউইন ও মিঃ হিথ নেলসন। সম্প্রতি ভেনেজুয়েলার কারাকাস থেকে প্রকাশিত খৃষ্টীয় বিশ্বের প্রভাবশালী দৈনিক ‘দ্য রিলিজিয়ন’ পত্রিকায় বলা হয়ঃ পাকিস্তানী হানাদাররা বাংলাদেশে যে নারকীয় বর্বরতায় লিপ্ত হয়েছে তা দেখলে যীশুখৃষ্ট নিজেও ভয়ে শিউরে উঠতেন।

পাক হানাদারদের এই পৈশাচিকতার কঠোর সমালোচনা করে ‘দ্য রিলিজিয়ন’ পত্রিকায় সম্পাদকীয় কলামে বলা হয়ঃ পাক সামরিক সরকার বাংলাদেশের ঘটনাবলীকে ঘরোয়া ব্যাপার বলে চালাতে চেষ্টা করে বিশ্বের বুদ্ধিজীবীদেরই চূড়ান্ত অপমান করেছে। বস্তুতঃ এই সমস্যা একটি আন্তর্জাতিক সমস্যা এবং মানববিবেকের প্রতি এটা একটি বিরাট চ্যালেঞ্জ।

১৪ জুলাই, ১৯৭১

… গত ১২ই জুলাইয়ে প্রকাশিত মার্কিন সাময়িকী নিউজইউক-এ বলা হয়ঃ পাকিস্তান যেদিন বাংলাদেশে সামরিক অভিযান চালানোর জন্যে সৈন্য পাঠায় সেই দিনই পাকিস্তানের মৃত্যু হয়েছে।

নিউজউইক’ পত্রিকায় বলা হয়ঃ ইয়াহিয়া খান সামরিক অভিযান চালানোর জন্যে বাংলাদেশে যখন সৈন্য ও সমরসম্ভার পাঠানোর কাজে ব্যস্ত ছিলো ঠিক সেই সময় পাকিস্তানের ঘরে-বাইরে সবদিক থেকেই রাজনৈতিক সমাধানের দাবী উঠছিলো। ইয়াহিয়ার সামরিক প্রস্তুতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ উঠছিলো। দাবী উঠছিলো- পাকিস্তানের যে সঙ্কট তার সমাধান সমরসজ্জা বা সামরিক অভিযানে সম্ভব নয়। সমস্যার রাজনৈতিক সমাধান করতে হবে। কোন রকম শর্ত আরোপ না করে গণনির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের মধ্যেই সমাধান নিহিত রয়েছে। বুলেট-বেয়োনেটে পাকিস্তানের রাজনৈতিক সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। কিন্তু ইয়াহিয়া ও তার সামরিক চক্র ঘরে-বাইরের এই দাবী উপেক্ষা করে পাকিস্তানের গণনির্বাচিত প্রতিনিধিদের প্রস্তাবিত বৈঠক বাতিল করে বাংলাদেশের ওপর সামরিক অভিযান চালালো৷….

নিউজউইক উল্লেখ করেঃ গত সপ্তাহে ঢাকায় কয়েকজন বিদেশী কূটনীতিক মন্তব্য করেছেন, আপোষ আলোচনার আর কোন পথই খোলা রইলো না। ইয়াহিয়ার গোঁয়াতুমির জন্যে আলোচনার সব পথ রুদ্ধ হয়ে গেল। আলোচনা এখন আর সম্ভব নয়। পাকিস্তান মরে গেছে এবং ইয়াহিয়া ও তার সামরিক চক্রই পাকিস্তানকে ধ্বংস করেছে।

 

১৫ জুলাই, ১৯৭১

… পাকিস্তানকে উন্নয়ন সাহায্য দেওয়ার মত আদৌ কোন অবস্থা রয়েছে কিনা তা সরেজমিনে তদন্ত করার জন্যে বিশ্ব ব্যাঙ্কের একটি বিশেষ প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন। বাংলাদেশ ও পশ্চিম পাকিস্তান সফলকরে ফিরে গিয়ে তাঁরা একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছেন।

এই রিপোর্টে বলা হয়েছেঃ বাংলাদেশ ও পশ্চিম পাকিস্তান সফর করে এসে বিশ্ব ব্যাঙ্ক প্রতিনিধিদল তাঁদের রিপোর্টে এই একমাত্র সিদ্ধান্ত করেছেন যে, পাকিস্তানকে সর্বপ্রকার আন্তর্জাতিক সাহায্য দেয়া বন্ধ করা

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<005.005.067>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

 

হোক। কারণ, এখন পাকিস্তানে যে কোন আন্তর্জাতিক সাহায্যই দেয়া হোক না কেন তা সম্পূর্ণ অর্থহীন হয়ে দাঁড়াবে।

রিপোর্টে তারা বলেছেনঃ বর্তমানে পাকিস্তানকে কোন রকম আন্তর্জাতিক সাহায্য দেয়া যাবে না। এমন কি পাকবাহিনী বিধ্বস্ত বাংলাদেশের জন্যে যদি কোন আন্তর্জাতিক সাহায্য পাঠানো হয় তাহলে ইয়াহিয়ার সামরিক সরকার সেই সাহায্যকে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাবে। বাংলাদেশের মানুষের কাছে কোন সাহায্যই গিয়ে পৌঁছুবে না। বাংলাদেশে যুদ্ধ চালাতে গিয়ে পাকিস্তানের অর্থাৎ পশ্চিম পাকিস্তানের অর্থনীতি দারুণভাবে বিপর্যস্ত হয়েছে। পাকিস্তানের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙ্গে যাচ্ছে। এ অবস্থায় পাকিস্তানকে কোন রকমের আন্তর্জাতিক সাহায্য দিলে ইয়াহিয়া সরকার তা পশ্চিম পাকিস্তানেই পাচার করবে। অতএব পাকিস্তানকে কোন রকম আন্তর্জাতিক সাহায্য দেয়া যেতে পারে না। বাংলাদেশ ও পাকিস্তান সফরকারী বিশ্ব ব্যাঙ্ক প্রতিনিধিদলের GREİ Mr. I. P. M. CARGILL এই রিপোর্ট প্রস্তুত করেছেন Mr. I. P. M. CARGILL বিশ্ব ব্যাঙ্কের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া বিভাগের ডিরেক্টর।

Mr. CARGILL তাঁর রিপোর্টে লিখেছেন, বাংলাদেশে পাকিস্তানী সামরিক অভিযানের ব্যাপকতা এত বেশি হয়েছে যে সেখানে ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক জীবনধারা একেবারে বন্ধ হয়ে গেছে। বাংলাদেশের মানুষের জীবনে এখন এক ভয়াবহ আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।

Mr. CARGILL তাঁর রিপোটে লিখেছেনঃ পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী বাংলাদেশের সহজ সরল মানুষের বিরুদ্ধে যে এখনও সামরিক অভিযান অব্যাহত রেখেছে, সেখানের সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে তাঁরা যে এখনও চরম শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিচ্ছে, হত্যা, লুণ্ঠন ও ব্যাভিচারে তারা যে এখনও সমান তৎপর রয়েছে সে বিষয়ে কোন সন্দেহ থাকতে পারে না। সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধেই হোক অথবা বিশেষ ব্যক্তিবর্গের বিরুদ্ধেই হোক, সামরিক গভীর আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা। বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ চলছে। মুক্তিসেনাদের হাতে প্রচণ্ড মার খাচ্ছে পাক সেনারা, আর তারই প্রতিশোধ তারা গ্রহণ করছে সাধারণ মানুষের ওপর।

সংক্ষেপে, বাংলাদেশের প্ররিস্থিতি এখন দারুণ উদ্বেগজনক। স্বাভাবিকতার নাম-গন্ধ নেই। বাংলাদেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক বলে পাকিস্তানী সামরিক সরকার যে দাবী করছে Mr. CARGILL তাঁর রিপোর্টে তার কঠোর সমালোচনা করে বলেনঃ সামরিক তৎপরতা বন্ধ করা, সৈন্য প্রত্যাহার করা ও বেসামরিক প্রশাসন প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসতে পারে না।

 

 

১৮ জুলাই, ১৯৭১

কিছুটা বিলম্বে হলেও বাংলাদেশ সম্পর্কে বিশ্বজনমত আজ এক নতুন ধারায় প্রবাহিত হতে শুরু করেছে। বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের বিরুদ্ধে বর্বর সেনাবাহিনীকে লেলিয়ে দিয়ে ব্যাপক হত্যা, লুণ্ঠন ও পৈশাচিক নির্যাতন চালিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানী পুঁজিপতি স্বার্থান্বেষী মহল ও ইয়াহিয়া চক্র সর্বাত্মক মিথ্যা ও অপপ্রচার ছড়িয়ে যে বিভ্রান্তির কালো ধোঁয়া ছড়িয়েছিলো বিশ্বমানবতা ও বিশ্ববিবেকের নবতর অভু্যদয়ের আলোকচ্ছটায় তা দ্রুত কেটে যাচ্ছে। বিশ্বের দেশে দেশে আজ ইয়াহিয়ার বর্বর বাহিনীর গণহত্যা, ধ্বংসযজ্ঞ ও অমানুষিক নির্যাতনের খবর পৌছে গেছে। বাংলাদেশে পাক বাহিনীর গণহত্যা ও বর্বরতার পেছনে কোন দুরভিসন্ধি ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কাজ করেছে বিশ্বের মানুষের কাছে তা আজ অনেকখানি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। পাশে এসে দাঁড়াচ্ছে। বিশ্বের বহু দেশ আজ আমাদের প্রকাশ্যভাবে সমর্থন জানাচ্ছে। কানাডা, পশ্চিম জার্মানী, সুইডেন, স্ক্যাণ্ডিনেভীয় দেশসমূহ এবং আরও কয়েকটি দেশ বাংলাদেশ সংক্রান্ত প্রশ্নটি জাতিসংঘে তোলার জন্যে

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<005.005.068>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

 

উদ্যোগী হয়েছে। বাংলাদেশে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর গণহত্যা ও নির্যাতনের প্রশ্নটি জাতিসংঘে উত্থাপনের প্রস্তুতি প্রায় সম্পূর্ণ হয়ে গেছে। বাংলাদেশে পাক হানাদার বাহিনীর বর্বরতা ও গণহত্যার অপরাধ সম্পর্কে পাকিস্তানের কোন বক্তব্য যে থাকতে পারে না তা ধরে নেয়া হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সাংবাদিক, সমাজসেবী, কূটনীতিক, পর্যটক ও বিশ্বসংস্থাসমূহের যেসব প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফর করে গেছেন তাদের রিপোর্ট ও প্রামাণ্য তথ্যাদি থেকে এটা আজ অত্যন্ত সুস্পষ্ট যে, পাক বাহিনী বাংলাদেশে গণহত্যা ও বর্বরতার অপরাধে অপরাধী। জাতিসংঘে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ উঠলে পাকিস্তান বাংলাদেশে গণহত্যার অপরাধে অপরাধী হানাদার বলে চিহ্নিত হবে এবং সেই সঙ্গে বাংলাদেশও বিশ্ব সংস্থার সমর্থন এবং স্বীকৃতি লাভ করবে।

সোভিয়েট ইউনিয়ন ও ফ্রান্স এ কথা দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করেছে যে, সামরিক ও অর্থনৈতিক সাহায্য দিয়ে কোন অবস্থাতেই তারা পাকিস্তানের সামরিক সরকারকে সহযোগিতা করবে না। অর্থাৎ, ফ্রান্স ও ব্যাঙ্কের যে প্রতিনিধিদলটি গত ৩রা জুন থেকে ২১ শে জুন পর্যন্ত উনিশ দিন ধরে বাংলাদেশ সফর করে গেছেন তারা বাংলাদেশের প্রকৃত ঘটনাবলী ফাঁস করে দিয়েছেন। তারা বলেছেন পরিস্থিতি আদৌ স্বাভাবিক নয়। সেখানে সর্বত্রই ধ্বংসের চিহ্ন ছড়িয়ে আছে, পাক হানাদার সৈন্যরা এখনও বাংলাদেশের ওপর হত্যা, ধ্বংস ও নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে। একমাত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরকার ছাড়া এইড কনসর্টিয়ামভুক্ত সব দেশই পাকিস্তানকে সাহায্য বন্ধের পক্ষে মত প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশ সফর করে গিয়ে বিশ্বব্যাঙ্ক প্রতনিধিদলের নেতা তাঁর দলের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে একমত হয়ে একথা তো স্পষ্টই ঘোষণা করেছেন যে, পাকিস্তানকে সাহায্য দেয়া অর্থহীন হবে এবং পাকিস্তানকে এখন যে কোন সাহায্যই দেয়া হোক, ইয়াহিয়ার জঙ্গী সরকার তা সামরিক প্রয়োজনে ব্যবহার করবে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরকার বিশ্বজনমত উপেক্ষা করে, ইয়াহিয়ার জল্লাদ বাহিনীকে সমর সম্ভার ও অর্থ সাহায্য দিয়ে বাংলাদেশে গণহত্যার প্রত্যক্ষভাবে সহযোগিতা করলেও আমেরিকান জনগণ, সংবাদপত্র, বেতার-টেলিভিশ ও বহু জননায়ক বাংলাদেশের প্রকৃত ঘটনাবলী প্রকাশ করে বাংলার জনগণের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেছে। মার্কিন সংবাদপত্রসমূহ খোলাখুলিভাবেই বাংলাদেশ প্রশ্নে মার্কিন সরকারী নীতির কঠোর সমালোচনা করেছে। নিউইয়র্ক টাইমস’, ‘ওয়াশিংটন পোষ্ট’, ‘ইভিনিং ষ্টার প্রভৃতি প্রভাবশালী দৈনিক পত্রিকাগুলিতে মার্কিন সরকারী নীতির কঠোর সমালোচনা করে বলা হয়েছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য ঋণদানকারী রাষ্ট্রগুলির উচিত পাকিস্তানকে সর্বপ্রকার সাহায্য বন্ধ করে দেয়া। ভারতে নিযুক্ত প্রাক্তন মার্কিন রাষ্ট্রদূত Mr. Chester Bowles পাকিস্তানে মার্কিন সাহায্য প্রেরণের কঠোর সমালোচনা করে বলেছেন, মার্কিন সরকারের এ ভুলের কোন তুলনা হয় না। মার্কিন সরকারের এটা শুধু ভুল নয়, এটা একটি ক্ষমাহীন অপরাধ- ইতিহাস এ অপরাধ কোন দিনই ক্ষমা করবে না।

 

 

২০ জুলাই, ১৯৭১

… ডাবলিন থেকে প্রকাশিত “আইরিশ টাইমস’ পত্রিকার এক সম্পাদকীয়তে বলা হয়ঃ ইয়াহিয়া তার বেতার ভাষণে যে রাজনৈতিক পরিবর্তনের বা যে রাজনৈতিক রদবদলের প্রস্তাব করেছে তা জঘন্য। ইয়াহিয়া তার বেয়োনেট-উদ্যত সেনাবাহিনী দিয়ে আটক দেশবাসীর উদ্দেশে যে বক্তৃতা করেছে তাতে তার দেশ গোল্লায় যাবে। বাংলাদেশ থেকে যে সকল নারী-পুরুষ-শিশু-বৃদ্ধ সেনাবাহিনীর অত্যাচারে দেশ ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছে তারা কেউই এ প্রস্তাবে দেশে ফিরে আসতে পারে না। ক্ষমতা হস্তান্তরের যে পদ্ধতির কথা ইয়াহিয়া ঘোষণা করেছে তা দুরভিসন্ধিমূলক। দশ লক্ষ বাঙালীকে নির্বিচারে হত্যা করে গোটা বাংলাদেশটাকে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ধ্বংস করে দিয়ে ইয়াহিয়া বাংলাদেশের কিছু অংশের ওপর তথাকথিত দখল রেখেছে সত্যি, কিন্তু এই দখল

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<005.005.069>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

 

রাখতে গিয়ে তাদের যে কী পরিমাণ দিতে হচ্ছে তা একমাত্র তারাই জানে। কারণ, বাংলাদেশের মানুষ ইতিমধ্যে স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে এবং বাংলাদেশে সরকারের অধীনে নিয়মিত সেনাবাহিনী গড়ে উঠছে। সৈন্যদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালাচ্ছেন। বাংলাদেশের সর্বত্রই এখন গেরিলা যুদ্ধ চলছে- শুধুমাত্র তাই নয়, ইয়াহিয়ার সেনাবাহিনীতেও গণ্ডগোল শুরু হয়েছে।

‘আইরিশ টাইমস’ পত্রিকায় আরও বলা হয় যে, বাংলাদেশ সরকার বর্তমানে সামরিক সমাধানের পথ বেছে নিয়ে যুদ্ধ চালাচ্ছে। বর্তমানের এই দারুণ সঙ্কটপূর্ণ পরিস্থিতিতে শরণার্থীরা দেশে ফিরে যেতে পারে না। ইয়াহিয়ার সেনাবাহিনী ও সরকার যেখানে আজও হত্যা, লুণ্ঠন ও নির্যাতন সমানে চালিয়ে যাচ্ছে সেখানে শরণার্থীদের ফিরে যাওয়ার প্রশ্নই উঠতে পারে না। এখনও প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ বাংলাদেশ ছেড়ে ভারতে চলে যাচ্ছে। ভারতে এভাবে লাখ লাখ শরণার্থ ঠেলে দিয়ে ইয়াহিয়া সরকার প্রকৃতপক্ষে ভারতের অর্থনীতিকে দুর্বল করতে চাইছে। পত্রিকায় বলা হয়ঃ বাংলাদেশ সমস্যার প্রকৃত সমাধান না হওয়া পর্যন্ত ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্পর্ক ক্রমশ অবনতির দিকেই যাবে এবং তার পরিণতি হবে ভয়াবহ।

স্টকহোম থেকে প্রকাশিত সুইডিশ দৈনিক, DOGENS NYHETER-এর এক সম্পাদকীয় নিবন্ধে পাকিস্তানকে বাংলাদেশে সামরিক তৎপরতা বন্ধ করে বাংলাদেশের জনগণের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দিতে বলা হয়।

‘ডগেনস নিহিতের পত্রিকার এই সম্পাদকীয় নিবন্ধটিতে ইয়াহিয়ার সামরিক অভিযানের কঠোর সমালোচনা করে বলা হয়ঃ বাংলাদেশে পাক হানাদার বাহিনীর বর্বরতা বর্তমানে চরমে পৌছেছে। এখনও বাংলাদেশ থেকে লাখ লাখ শরণার্থী সৈন্যদের তাড়া খেয়ে দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে।

পত্রিকায় বলা হয়ঃ বাংলাদেশে সামকি বর্বরতা সবকিছুর সীমা ছাড়িয়ে গেছে। বাংলাদেশ ও ভারত সীমান্তে গিয়ে কিছু সময় দাঁড়ালেই ইয়াহিয়ার স্বাভাবিক পরিস্থিতির দাবীর অসারতা সহজেই ধরা পড়েবোঝা যায় ইয়াহিয়া সরকারের মিথ্যা প্রচারণার বহর।

২৩ জুলাই, ১৯৭১

… সিয়েরা লিওনের ফ্রিটাউন থেকে প্রকাশিত ‘মেইল পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠা জুড়ে এক দীর্ঘ রিপোর্ট বেরিয়েছে। বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ শরণার্থী সম্পর্কে লিখতে গিয়ে ফ্রিটাউন দৈনিকের সংবদদাতা Mr. SOM SHORT প্রশ্ন করেছেনঃ বাংলাদেশে যা ঘটেছে তার চেয়ে বেশি কিছু কি ঘটতে পারতো?

তিনি লিখেছেনঃ বাংলাদেশে যে ভয়ঙ্কর একটা কিছু ঘটেছে এবং এখনও ঘটছে, তা বোঝার জন্যে বা তা বিশ্বাস করার জন্য এর চেয়ে বেশী প্রমাণের প্রয়োজন আছে বলে আমার মনে হয় না। বাংলাদেশের ঘটনাবলী স্বচক্ষে দেখে ফ্রিটাউন দৈনিক মেইল-এর সংবাদদাতা Mr. SOM SHORT বলেন, পাকিস্তান সরকারের নীতি ও কার্যকলাপের পশ্চাতে যে একটা ভীষণ ষড়যন্ত্র বা ভয়াবহ একটা কিছু আছে তা আমি বুঝতে পেরেছি। তিনি লিখেছেন, পশ্চিম পাকিস্তানীদের বর্বরতা ক্রমে বেড়েই চলেছে, যুদ্ধ যতো দীর্ঘস্থায়ী হবে বাংলাদেশে ধ্বংস ও মৃত্যু ততো বেড়ে যাবে। পৃথিবীর সকল দেশের মানুষই তো এখন এখানকার ঘটনাবলীর অল্পবিস্তর জানতে পেরেছে কিন্তু তবু আমরা আমাদের নিজ নিজ দেশের সরকারকে পাকিস্তানের ওপর চাপ সৃষ্টিতে বাধ্য করতে পারছি না কেন?- এই রক্তমানের কি কোন শেষ নেই?

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<005.005.070>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

 

২৯ জুলাই, ১৯৭১

বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অবস্থা সম্পর্কে বিশ্বের দৃষ্টিকে বিভ্রান্ত করার যতো অপচেষ্টাই পাকিস্তানী সামরিক চক্র করুক, কিন্তু যা সত্য তাকে ধামাচাপা দিয়ে রাখা সম্ভব নয়। বিশ্বের পত্র-পত্রিকায় নিয়মিতই বাংলাদেশের ঘটনাবলীর খবরাখবর প্রকাশিত হচ্ছে।

আমেরিকান বহুল প্রচারিত সাপ্তাহিক নিউজউইক’ ও লণ্ডনের প্রভাবশালী দৈনিক দি টাইমস’-এ বাংলাদেশে পাকিস্তানী বর্বর সৈন্যদের মোকাবিলায় মুক্তি বাহিনীর সাফল্যজনক অভিযান পরিচালনার খবর প্রকাশিত হয়েছে। পাকিস্তানের সামরিক প্রেসিডেন্ট সম্প্রতি বাংলাদেশের পরিস্থিতি সম্পূর্ণরূপে সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন এবং তথাকথিত দুষ্কৃতকারী ও অনুপ্রবেশকারীদের নির্মুল করা হয়েছে বলে যে দাবী করেছেন, সে প্রসঙ্গে ‘The Bengalis Strike Back’ শীর্ষক একটি নিবন্ধে নিউজউইক’ পত্রিকা বলেঃ ইয়াহিয়ার জন্যে দুঃখ হয়, কেননা তিনি যা দাবী করেছেন প্রকৃত ঘটনা তার সম্পূর্ণ বিপরীত। পত্রিকায় বলা হয় যে, সমগ্র বাংলাদেশে মুক্তি বাহিনীর প্রতিরোধ অভিযান ক্রমেই জোরদার হচ্ছে। এ অভিযান গোড়া থেকেই পরিচালিত হচ্ছে এবং উন্নত সমরসজ্জায় সজ্জিত পাকিস্তান সামরিক বাহিনী চরমভাবে ঘায়েল হচ্ছে।

‘নিউজউইক’ বলেঃ বাংলাদেশের বহু কলকারখানা ধ্বংস করা হয়েছে, ডিনামাইট দিয়ে প্রধান প্রধান ব্রীজসমুহ উড়িয়ে দেয়া হয়েছে, মাইন বসিয়ে বহু রেল সড়কের ক্ষতিসাধন করা হয়েছে

পত্রিকায় বলা হয়, সামরিক বাহিনী অধিকৃত ঢাকা শহরেও নিয়মিত গোলাগুলি চলছে। পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর বর্বরোচিত কার্যকলাপের বিরুদ্ধে জাগ্রত মুক্তি সংগ্রামীদের অভিযান বাংলাদেশের সর্বত্রই অব্যাহত রয়েছে।

সম্প্রতি বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চল সফরকারী নিউজউইকের সংবাদদাতা মিঃ লোরেন জেনকিনস এখানে মুক্তিবাহিনীর হাতে খুলনার দু’জন দালালের ‘লালরঙা চিঠি’ প্রাপ্তি এবং কড়া সামরিক পাহারাধীন থেকেও শোচনীয় মৃত্যুর খবর জানান।

লণ্ডন টাইমসের রিপোর্টার মাইকেল হর্নসবী জানান যে, বাংলাদেশে পাকিস্তান সামরিক বাহিনী অহরহ মুক্তি বাহিনীর গেরিলাদের দ্বারা আক্রান্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মুক্তি বাহিনীর গেরিলারা রাস্তা, রেলওয়ে ব্রীজ, রেললাইন এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার ক্ষতিসাধন করে পাকিস্তানী সামরিক প্রশাসনকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে।

লণ্ডন টাইমসের সংবাদদাতা জানান, বাংলাদেশের সকল শহর বিশেষ করে ঢাকা শহরে গেরিলাদের পাক বাহিনীর ওপর বোমা নিক্ষেপ করছে।

হর্নসবী জানান যে, গেরিলা বাহিনীর আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে প্রতিহিংসাপরায়ণ পাক বাহিনী আশপাশের এলাকার বেসামরিক বাসিন্দাদের ওপর উৎপীড়ন করে থাকে।

বস্তুতঃ বাংলাদেশের পাক বাহিনী অধিকৃত এলাকায় এমনি প্রশাসনিক অচলাবস্থাই বিরাজ করছে। মুক্তি বাহিনীর গেরিলাদের আক্রমণে পাক সেনারা এখানে-ওখানে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। দিন দিনই হানাদার বাহিনীর মনোবল ভেঙ্গে পড়ছে।

এই বাস্তব সত্যকে গোপন করার মতো অপচেষ্টাই পাকিস্তানী জঙ্গী সরকার করুক, বিশ্বের চোখে ধরা পড়বেই। আর এভাবে বাংলার সার্বিক মুক্তিকামী মানুষের সপক্ষে গড়ে উঠবে বিশ্বজনমত।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<005.005.071>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

 

১ আগষ্ট, ১৯৭১

… বর্তমানে ক্ষমতার লোভে উন্মত্ত ইয়াহিয়ার সৈন্যদের অমানুষিক পাশবিক অত্যাচার ও দাপট যতই বাড়ছে এবং আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের তৎপরতা যতই জোরদার হচ্ছে ততই বিশ্ববাসী আমাদের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে উঠছেন। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের নির্যাতিত জনগণের সপক্ষে ততই গড়ে উঠছে বিশ্বজনমত।

ইতিমধ্যে জঙ্গীশাহীর অনেক বাধাবিপত্তি সত্বেও বহু বিদেশী সাংবাদিক, সেবাপ্রতিষ্ঠান প্রতিনিধি ও রাজনীতিবিদ যুদ্ধক্ষত বাংলাদেশ সফর করেছেন।

আন্তর্জাতিক রেডক্রস সোসাইটির প্রতিনিধি কর্নেল আ্যালা সম্প্রতি বাংলাদেশ সফর করে তাঁর সফর অভিজ্ঞতা বর্ণনা প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের বলেছেন, বাংলাদেশে দখলদার পাকিস্তানী সৈন্যদের নির্যাতন বায়াফ্রার মর্মান্তিক ঘটনাকেও ছাড়িয়ে গেছে। দখলকৃত এলাকায় হানাদার সৈন্যরা যে বীভৎস হত্যাকাণ্ড ও পাশবিক অত্যাচার চালিয়ে যাচ্ছে তার কোন নজির নেই। নরওয়ে রেডক্রসের একজন প্রতিনিধি ভারতের শরণার্থী শিবিরগুলো পরিদর্শন করে বলেছেন, বর্তমান শরণার্থী সমস্যার সাথে বিশ্ব ইতিহাসের অন্য কোন ঘটনার তুলনা করা যায় না।

একটি স্বাধীন দেশে দখলদার সৈন্যরা কতো বেশি নির্যাতন চালিয়ে গেলে ৮০ লাখ মানুষকে ঘর-বাড়ি ও ধন-সম্পত্তি ফেলে দেশত্যাগ করতে হয় তা সকলেই বোধগম্য।

এহেন অবস্থায় বাংলাদেশে যখন মানুষের জীবনের কোনো নিরাপত্তা নেই- মানবতা, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সভ্যতা যখন বিপর্যস্ত, সে ক্ষেত্রে চীন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো দুটি বৃহৎ শক্তি একনাগাড়ে পাকিস্তানের সামরিকশাহীকে অস্ত্র ও আর্থিক সাহায্য করে গণহত্যার উস্কানি দিচ্ছে।

মার্কিন জনগণ ও সেখানকার পত্র-পত্রিকা বাংলাদেশের নিরস্ত্র মানুষের সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের প্রতি তাঁদের অকুণ্ঠ সমর্থন জানালেও প্রেসিডেন্ট নিক্সন জঙ্গীশাহীকে অস্ত্র সাহায্যের নীতিতে অবিচল রয়েছেন। তাঁরা সকলেই এ বিষয়ে একমত যে, বাংলাদেশ সমস্যার সমাধান না হওয়া পর্যন্ত জঙ্গী সরকারকে সাহায্য দেয়ার মানেই হচ্ছে গণহত্যায় অংশ গ্রহণ করা। তা ছাড়া যুদ্ধের ফলে যেক্ষেত্রে বাংলাদেশে তিন কোটিরও রীতিমত যুদ্ধাপরাধ।

এদিকে ওয়াশিংটনের ষ্টেট ডিপার্টমেন্টের আণ্ডার সেক্রেটারী জন আরউইন সিনেটের এক সাব-কমিটির বৈঠকে বলেছেন যে, বাংলাদেশে দারুণ দুর্ভিক্ষের খবর তাঁরা পেয়েছেন। অথচ পাকিস্তানের দখলদার সমরকর্তারা দুর্ভিক্ষ রোধের কোনো চেষ্টা চালাচ্ছে না। এতে এ কথা পরিষ্কার বোঝা যায় যে, দেশ থেকে ৮০ লাখ মানুষকে তাড়িয়ে এবং ১০-১২ লাখ মানুষকে হত্যা করেও এদের কসাই বনোবৃক্তির এখনো খায়েশ মেটেনি।

এমনি মর্মান্তিক অবস্থায় জাতিসংঘ আবার বাংলাদেশ ও ভারত সীমান্তে পর্যবেক্ষক নিয়োগের পাঁয়তারা করছে। অথচ গত চারমাস যাবৎ জাতিসংঘ বাংলাদেশে ইয়াহিয়ার গণহত্যার নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে। পাকিস্তানের জঙ্গী সরকারও বাংলাদেশ-সমস্যাটিকে ভারত-পাকিস্তান বিরোধ হিসাবে দেখাবার অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<005.005.072>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

 

মুজিবনগরে প্রদত্ত বিবৃতিতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খোন্দকার মোশতাক আহমদ জঙ্গশাহীর এ ধরনের নির্লজ্জ অপকৌশলকে পাকিস্তানের ভ্রান্ত পদক্ষেপ” বলে আখ্যায়িত করেছেন।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী খোন্দকার মোশতাক আহমদ বলে সহানুভূতিশীল বিশবাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন যে, মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে চরম মার খেয়ে পাকিস্তানের অপরিণামদশী জঙ্গী কর্মকর্তারা আজকাল জাতিসংঘের ভিতরে ও বাইরে ব্যাপক তৎপরতা চালিয়ে বাংলাদেশে তাদের কৃতকর্মের কালিমা মোচনের ব্যর্থ চেষ্টা করছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, বাংলাদেশ স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র। কাজেই বাংলাদেশ সমস্যাটি হচ্ছে পাকিস্তান ও বাংলাদেশ বিরোধ। এ বিরোধ যত শ্ৰীঘ্ৰ মিটমাট হবে ততই সাড়ে সাত কোটি মানুষের কল্যাণ তুরান্বিত হবেবাংলাদেশের নিপীড়িত মানুষের মনে ফিরে আসবে শান্তি ও আস্থার মনোভাব।

বিশ্বের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা, বেতার ও টেলিভিশন সংস্থাও সাড়ে সাত কোটি বাঙালীর জীবনের নিরাপত্তার জন্যে বাংলাদেশ সমস্যার আশু সমাধানের উপর জোর দিয়েছেন। এ ব্যাপারে সকলেই একমত যে, বাংলাদেশের প্রকৃত গণপ্রতিনিধিরাই দেশে শান্তি ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে পারবে এবং লাখ লাখ শরণার্থীকে

১৫ আগস্ট, ১৯৭১

… গত ২৫শে মার্চ থেকে ইয়াহিয়ার বর্বর সামরিক চক্র বাংলাদেশে যা করেছে সমস্ত বিশ্ব তাতেই হতবাক হয়েছে। জাতিসংঘের সেক্রেটারী জেনারেল উথান্ট বর্ণিত মানব ইতিহাসের সেই সর্বাধিক কলঙ্কজনক অধ্যায় রচনার পর এবং মার্কিন সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডী বর্ণিত মানব ইতিহাসের বৃহত্তম বিপর্যয় সৃষ্টির এনে সামরিক আদালতে বিচার প্রহসন শুরু করেছে। এই বিচার প্রহসনের পিছনে পশ্চিম পাকিস্তানী সামরিক চক্রের যে ঘৃণ্য উদ্দেশ্য ও দুরভিসন্ধি রয়েছে তাতে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই। বাংলাদেশে পাক সামরিক চক্রের বর্বরতা ও বীভৎসতার দৃষ্টান্তে এটাই মনে হয় যে, ইয়াহিয়া ও তার নয়া নাৎসী বাহিনী করতে পারে না এহেন কিছু নেই।

কানাডার প্রধানমন্ত্রী মিঃ ট্রুডো পাকিস্তানের জঙ্গী প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়ার কাছে এক তারবার্তায় শেখ মুজিবুর রহমানের বিচার প্রহসনে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, এর পরিণতি অত্যন্ত গুরুতর হবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, বৃটেন ও অন্যান্য দেশের পত্র-পত্রিকা, বেতার ও টেলিভিশনেও পশ্চিম পাকিস্তানী সামরিক আদালতে শেখ মুজিবুর রহমানের গোপন বিচারে দারুণ আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।

লণ্ডনের প্রভাবশালী সংবাদপত্রগুলিতে মন্তব্য করা হয়েছে যে, যেভাবে শেখ মুজিবুর রহমানের বিচার প্রহসন শুরু হয়েছে তাতে পাক সামরিক চক্রের ওপর আদৌ ভরসা করা যায় না। লণ্ডনের টাইমস’ ইয়র্কশায়ার পোষ্ট ও অন্যান্য সংবাদপত্রে এই তথাকথিত বিচারের কঠোর সমালোচনা করা হয়েছে। বৃটেনের আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আইনজীবীগণ এবং কয়েকটি আন্তর্জাতিক আইনজীবী সংস্থাও শেখ মুজিবুরের বিচার প্রহসনের জন্যে ইয়াহিয়ার বর্বর সামরিক চক্রের কঠোর সমালোচোনা করেছেন।

টাইমস’ পত্রিকায় প্রখ্যাত বৃটিশ আইনজীবী মিঃ ডব্ৰু টি, উইলিয়ামের একটি চিঠি প্রকাশিত হয়েছে। এই চিঠিতে মিঃ উইলিয়াম বলেছেনঃ যেভাবে সামরিক আদালতে শেখ মুজিবের গোপন বিচার প্রহসন শুরু হয়েছে তাতে তিনি ও বিশ্বের বিবেকসম্পন্ন সকল মানুষ গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। তিনি বলেন, যেভাবে এই তথাকথিত বিচার চলছে তাতে কোনক্রমেই শেখ মুজিবুর রহমানের ন্যায় বিচার আশা করা যেতে পারে না। তিনি বলেন, একমাত্র প্রাণের ঝুঁকি ও বহু ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি ছাড়া কোন বাঙালী কৌশুলিই শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষ সমর্থনে যাবেন না। মিঃ উইলিয়াম বলেন, আইয়ুবের আমলে সুপ্রিম কোর্টের রায় লঙ্ঘন করে সামরিক সরকার শেখ মুজিবুর

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<005.005.073>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

 

রহমানের বিচার শুরু করেছিলো। ভয়ঙ্কর ইয়াহিয়ার সামরিক চক্র সেই একই ধারাবাহিকতায় বর্তমান বিচারে প্রহসন শুরু করেছে। তিনি বলেন, পাক সামরিক চক্ৰ মূঢ়তার বশে মিথ্যা অভিযোগ শেখ মুজিবুর রহমানকে যদি কোনরকম দণ্ড দেয় তাহলে তার পরিণতি হবে অত্যন্ত ভয়াবহ।

গত শুক্রবারে ‘ওয়াশিংটন পোষ্ট’ পত্রিকার এক সম্পাদকীয়তে বলা হয়ঃ মিথ্যা অভিযোগ তুলে শেখ মুজিবুর রহমানের বিচার প্রহসন শুরু করে পাকিস্তানের ক্ষমতাসীন সামরিক জান্তা এক মারাত্মক ভুল করেছে। পাকিস্তানী সামরিক জান্তা যদি এই তথাকথিত বিচারে শেখ মুজিবুর রহমানের প্রাণদণ্ড দেয় তাহলে সেটাই হবে সবচে মারাত্মক ভুল আর সেই ভুলের কোন সংশোধনের পথ থাকবে না।

১৬ আগষ্ট, ১৯৭১

… পৃথিবীর দেশে দেশে শানিকামী মানুষ দেশবরেন্য জননেতা, বুদ্ধিজীবী সমাজ, বেতার টেলিভিশন ও সংবাদপত্র পাকিস্তানী নরঘাতী তস্করদের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে ফেটে পড়েছে।…

জাতিসংঘের জনৈক মুখপাত্র গত শুক্রবারে বলেছেন যে, পাকিস্তানী সামরিক আদালতে শেখ মুজিবুর রহমানের গোপন বিচার প্রহসনের ব্যাপারে সেক্রেটারী জেনারেল উথান্ট কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছেন এবং এ ব্যাপারে তিনি আলোচনা চালাচ্ছেন।

গত শুক্রবারে ‘ওয়াশিংটন ষ্টার’ পত্রিকার এক সম্পাদকীয়তে বলা হয়ঃ শেখ মুজিবুর রহমানের বিচার প্রহসন শুরু করে পাকিস্তানের মূঢ় সামরিক চক্র এক প্রচণ্ড ভুল করে বসেছে। ইয়াহিয়া আর তার সাঙ্গপাঙ্গদের একথা বোঝা উচিত যে নেতা হিসাবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মর্যাদা প্রশ্নাতীত।

ক্রীশ্চিয়ান সায়েন্স মনিটর’ পত্রিকার এক সম্পাদকীয় নিবন্ধে বলা হয়ঃ শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের প্রাণপ্রিয় নেতা। আজও তিনি বাংলার নয়নমণি। সাড়ে সাত কোটি বাঙালীর হৃদয়ে আজও তিনি সদ্য প্রস্ফুটিত রক্তপদ্ম। পাকিস্তানের জঙ্গী সামরিক চক্র বিচার প্রহসনের দ্বারা যদি তার কিছু করে, তাহলে পাকিস্তান বাংলাদেশ থেকে যে চিরতরে বিদায় হবে তা নয় বরং মূল পাকিস্তানটাই চূর্ণ হয়ে যাবে।

যুগোশ্লাভ বৈনিক “বলগ্রেড বোরবা” পত্রিকার সম্পাদকীয় নিবন্ধে বলা হয়, শেখ মুজিবুর রহমানের বিচার প্রহসন করতে গিয়ে ইয়াহিয়া তার নিজের সমস্যার সমাধানের সকল পথই রুদ্ধ করেছে। এখন অন্ধকারে মাথা কুটে মরা ছাড়া তার আর দ্বিতীয় কোন পথ নেই।

জেনেভার ওয়ার্ল্ড কাউন্সিল অব চার্চেস’-এর সদর দফতর থেকে ইসলামাবাদে একটি তারবার্তা পাঠানো হয়েছে। এই তারবার্তায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের গোপন বিচারের তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়েছে।

‘জাকার্তা টাইমস’-এ বলা হয়ঃ শেখ মুজিবুর রহমান হলেন বাংলাদেশের জনপ্রিয় নেতা। তার বিচার ভুল ঘোড়ায় বাজি ধরেছে।

১৮ আগষ্ট, ১৯৭১

বিশ্ব জোড়া প্রতিবাদ, ঘৃণা ও কোটি ধিক্কার উপেক্ষা করে পাক সামরিক চক্র বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিচার প্রহসন অব্যাহত রেখেছে …..

 

 

<005.005.074>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

 

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একজন ঝানু আণ্ডার সেক্রেটারী ও প্রাক্তন রাষ্টদূত মিঃ চেষ্টার বোলস শেখ মুজিবুর আদালতে শেখ মুজিবুর রহমানের যে গোপন বিচার চালাচ্ছে তা আগাগোড়া একটি প্রহসন মাত্র। পাকিস্তানী সামরিক জান্তার এটা একটা চরম ধৃষ্টতা। এ বিচার সকল রীতিনীতি ও আইন-কানুনের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।

মিঃ চেষ্টার বোলস পাকিস্তান ও বাংলাদেশ সম্পর্কিত যুক্তরাষ্ট্র সরকারের বর্তমান নীতির কঠোরতম সমালোচনা করেন। মার্কিন সরকার পাকিস্তান সরকারকে যে সামরিক সাহায্য অব্যাহতভাবে দিয়ে চলেছে, মিঃ চেষ্টার বোলস তাকে “চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতা ও নীতিবিগর্হিত” বলে বর্ণনা করেছেন।

সম্প্রতি ওয়াশিংটন পোষ্ট’-এ তাঁর একটি তথ্যপূর্ণ প্রবন্ধে মিঃ চেষ্টার বোলস বলেনঃ পাকিস্তানের ফ্যাসিবাদী সরকারকে সাহায্য করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এক চরম ভুল করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরকারকে অতীতের সব ভুলত্রটি সংশোধন করে পাকিস্তানের কাছে সামরিক অস্ত্র ও সমরসম্ভার বিক্রয় সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা এবং পাকিস্তানকে সর্বপ্রকার অর্থনৈতিক সাহায্য দান একেবারে বন্ধ করে দেবার আহবান জানান।

পরলোকগত মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডীর সহোদর সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডী বাংলাদেশে পাক হানাদার বাহিনী সৃষ্ট মানব ইতিহাসের চরম বিপর্যয় ও মানব ইতিহাসের সবচে কলঙ্কজনক অধ্যায় নিজের চোখে দেখে যাবার জন্যে বাংলাদেশের শরণার্থীদের শিবিরগুলো পরিদর্শন করে গেছেন। তিনি পাক অধিকৃত বাংলাদেশেও যেতে চেয়েছিলেন কিন্তু পাক বাহিনীর বর্বরতা পাছে পুরোপুরি ফাঁস হয়ে যায় সেজন্যে পাকিস্তানী সামরিক সরকার তাঁকে পাকিস্তানী বর্বর বাহিনী অধিকৃত বাংলাদেশে যাবার অনুমতি দেয়নি। শুধুমাত্র সীমান্তে দাঁড়িয়ে ও শরণার্থীদের শিবিরগুলো পরিদর্শন করে তিনি যা দেখেছেন এবং যে মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা হয়েছে তা থেকেই তিনি বলেছেনঃ পাকিস্তানী সৈন্যরা যে বাংলাদেশে গণহত্যা চালিয়েছে তাতে কোন সন্দেহ নেই।

মার্কিন সিনেটের উদ্বাস্তু বিষয়ক কমিটির সভাপতি সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডী বলেনঃ পাকিস্তানী সামরিক জান্তার কাছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একমাত্র অপরাধ হলো তিনি নির্বাচনে জয়লাভ করেছেন। তাঁর বিচার আন্তর্জাতিক আইনের দিক থেকে বিচারের ব্যাভিচার এবং ন্যায়বিচারের প্রহসন মাত্র।

আদ্দিস আবাবা বেতার থেকে প্রচারিত এক খবরে বলা হয়ঃ রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তির ব্যাপারে সাহায্য করার জন্যে গঠিত আন্তর্জাতিক সংস্থা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তির জন্যে সারাবিশ্বে এক প্রচার অভিযান শুরু করবে।

বিশ্ব জোড়া এই বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ সত্ত্বেও পাকিস্তানী সামরিক জান্তা শেখ মুজিবুর রহমানের গোপন বিচার প্রহসন অব্যাহত রেখেছে। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ এই প্রহসন মেনে নেয়নি। আজ বাংলাদেশের অধিকৃত এলাকার সর্বত্রই চলছে পাক হানাদার নিধনের দুর্বার অভিযান। মুক্তি বাহিনীর বীর যোদ্ধারা বাংলাদেশের পুণ্যভূমি থেকে হানাদারদের সমানে উৎখাত করে চলেছে। বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষ আজ হানাদার উৎখাতে বদ্ধপরিকর।

১৯ আগষ্ট, ১৯৭১

… পাকিস্তানের সাবেক এয়ার মার্শাল আসগর খান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিচার প্রহসনের তীব্র নিন্দে করেছেন। এই বিচার প্রহসনের কঠোর সমালোচনা করে তিনি পাকিস্তানী সামরিক চক্রকে এই বলে হুশিয়ার করেছেন যে, পাকিস্তানী সামরিক জান্তা বাংলাদেশে যা করছে এবং বঙ্গবন্ধুর বিচার প্রহসনে মেতে যা করতে যাচ্ছে তার পরিণতি হবে অত্যন্ত ভয়াবহ এবং এর ফলে পাকিস্তানটাই তাসের ঘরের মতো এক মুহুর্তে হুড়মুড় করে ভেঙে পড়বে।

 

 

<005.005.075>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

 

এয়ার মার্শাল আসগর খান এ নিয়ে পাকিস্তানী সামরিক জান্তাকে পরপর দুবার হুশিয়ার করে দিলেন। এয়ার মার্শাল আসগর খানের মতো পশ্চিম পাকিস্তানের আরও কয়েকজন নেতার চৈতন্যোদয় ঘটেছে। সিন্ধু, উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ ও বেলুচিস্তানের কয়েকটি পত্র-পত্রিকাতেও পাকিস্তানী সামরিক জান্তার সর্বনাশা তৎপরতার কঠোর সমালোচনা করা হয়েছে।

পাকিস্তানী জঙ্গীশাহীর খোদ মুখপত্র ‘পাকিস্তান টাইমস’-এও শেখ মুজিবুর রহমানের বিচার প্রহসনের সমালোচনা করা হয়েছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব জনমতকে উপেক্ষা করে, বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি শান্তিকামী মানুষের প্রতি চরম বিশ্বাসঘাতকতা করে পাকিস্তানী সামরিক চক্রকে সমরাস্ত্র, সমরসম্ভার ও আর্থিক সাহায্য দিয়ে এলেও মার্কিন বুদ্ধিজীবী মহল, রাজনীতিক ও শান্তিকামী মার্কিন জনগণ পাক জঙ্গীশাহীর বিরুদ্ধে বিরুদ্ধে আজ প্রতিবাদমুখর। গত সপ্তাহে পাকিস্তানী জাহাজ আল-আহমদী মার্কিন সমরাস্ত্র বহনের জন্যে ফিলাডেলফিয়া বন্দরে ভেড়ার চেষ্টা করছিলো কিন্তু সেখানে পাকিস্তানী জঙ্গীশাহীর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রদর্শিত হয় এবং বিক্ষোভকারীরা ছোট ছোট নৌযান দিয়ে পাকিস্তানী জাহাজের সম্মুখে অবরোধ সৃষ্টি করে। ফলে পাকিস্তানী জাহাজটিকে ফিলাডেলফিয়া বন্দরে ভেড়ার সংকল্প পরিত্যাগ করে বাল্টিমোরের দিকে এগুতে হয়।

শুধু ফিলাডেলফিয়া বন্দর নয়, পৃথিবীর সর্বত্রই পাকিস্তানী সামরিক চক্রের বিরুদ্ধে ঘৃণা ও ধিক্কার উঠেছে। পাকিস্তানী জঙ্গীশাহী সর্বত্র লাঞ্ছিত। যুদ্ধবাজ সাম্রাজ্যবাদী শক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরকারের মদদ পেয়ে পাকিস্তানের গোঁয়ার সামরিক চক্র এখনও আস্ফালন করছে সত্যি কিন্তু এর শোচনীয় পরিসমাপ্তি অত্যাসন্ন।

২০ আগষ্ট, ১৯৭১

… পশ্চিম পাকিস্তান ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি প্রধান খান আবদুল ওয়ালী খান পাকিস্তান থেকে আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলে এসে তাঁর বাবা খান আবদুল গফফার খানের সঙ্গে মিলিত হয়েছেন। কাবুলে পৌছে তিনি সেখানকার একটি ইংরেজী পত্রিকা ‘নিউ ওয়েভ’-এর সাংবাদিকের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেনঃ পাকিস্তানের রাজনীতি এখন এমন এক অবস্থায় পৌঁছেছে যেখান থেকে আর ফেরা সম্ভব নয়পাকিস্তান ছিন্নভিন্ন টুকরো টুকরো হয়ে যাবেই। পাকিস্তানের রাজনীতি এখন যেভাবে চলছে তাতে সমূলে ধ্বংস হয়ে যাওয়া থেকে পাকিস্তানকে রক্ষা করার আর কোন উপায় নেই।

তিনি বলেনঃ বাংলাদেশে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী যা করছে তা প্রাগৈতিহাসিক বর্বরতাকেও হার মানায়। তবে পাকিস্তানী সৈন্যদের পক্ষে বাংলাদেশকে দখলে রাখা আদৌ সম্ভব নয়। পাকিস্তানী সামরিক বাহিনী যদি মনে করে থাকে যে, চরম অত্যাচার চালিয়ে, গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ অব্যাহত রেখে বাংলাদেশের বীর জনগণকে দাবিয়ে রাখতে পারবে তাহলে তারা চরম ভুল করবে। খান আবদুল ওয়ালী খান বলেনঃ তুচ্ছাতিতুচ্ছ পুঁচকে পাকিস্তানের পক্ষে বিক্ষুব্ধ বাংলাদেশকে কব্জায় রাখা কি করে সম্ভব? পাকিস্তানের আর্থিক ও সামরিক বাজেট এখনও যেখানে বাংলাদেশের ওপর বিশেষভাবে নির্ভরশীল, সেখানে জয়লাভের কথা চিন্তাও করা যায় না।

পশ্চিম পাকিস্তানী ন্যাপ নেতা খান আবদুল ওয়ালী খান বলেনঃ ধৰ্ম যে ভিন্ন সংস্কৃতির দুটি জাতির রাষ্ট্ৰীয় বন্ধন হতে পারে না, তা চিরকালের মত প্রমাণিত হয়ে গেল। ধর্মকে রাষ্ট্রীয় বন্ধন বলে যারা ভাবতো এবার তাদের মোহমুক্তি চিরদিনের মতো ঘটে গেল। তিনি বলেনঃ আমার কাছে বাঙালীদের প্রতিরোধ আন্দোলনের গুরুত্ব এখানেই।

 

 

 

<005.005.076>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

 

বাংলাদেশে ইয়াহিয়া আর তার বর্বর সেনাবাহিনীর সামরিক অভিযান শুরু হবার দুদিন আগে পর্যন্ত খান আবদুল ওয়ালী খান ঢাকায় ছিলেন। তিনি বলেন, নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা এবং পাকিস্তানের নতুন সরকার গঠনের একমাত্র অধিকারী তিনিই ছিলেন। কিন্তু ইয়াহিয়া ও তার সামরিক চক্র তাঁর আইনসঙ্গত অধিকার থেকে তাঁকে বঞ্চিত করেছে। তিনি বলেন, পাকিস্তান নামক কৃত্রিম রাষ্ট্রটিকে টিকিয়ে রাখার যে ক্ষীণতম সম্ভবনা ছিলো, পাকিস্তানী সামরিক চক্র তাকেও বেয়োনেট বিদ্ধ করেছে। পাকিস্তান টুকরো টুকরো হবেই- তাকে কেউ রোধ করতে পারবে না। অথচ এমনটি হয়তো এতো তাড়াতাড়ি ঘটতো না। পাকিস্তানী সামরিক চক্রের মাথায় গোবর বোঝাই না হলে খুব সহজে এমনটি ঘটতো না। তারা যদি জনগণের রায়কে মনে নিত এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে যদি দেশের প্রধানমন্ত্রী বলে স্বীকার করে নেয়া হতো তাহলে পাকিস্তানকে আরও কয়েকটা দিন টিকিয়ে রাখা যেতো। কিন্তু তা এখন আর কিছুতেই সম্ভব নয়। গত ২৫শে মার্চের রাতেই ইয়াহিয়ার বর্বর সেনাবাহিনী সেই সম্ভাবনাকে খুন করেছে।

পিণ্ডির বর্তমান পরিস্থিতির উল্লেখ করতে গিয়ে খান আবদুল ওয়ালী খান একটি উপমা দিয়ে বলেনঃ ‘দুধের কলসী ভেঙ্গে গেছে। দুধ চারদিকে গড়িয়ে পড়ছে। আর তার চারপাশে বসে তারা কাঁদছে।”

পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তিনি বলেনঃ পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ যে কেবল অন্ধকারাচ্ছন্ন তা নয়, বিপজ্জনক।

২১ আগষ্ট, ১৯৭১

… বাংলাদেশের শহরে নগরে বাজারে বন্দরে প্রতিটি পল্লীতে আজ শত্রু হননের দুর্বার লড়াই চলছে। আর এই লড়াইয়ে কুলিয়ে উঠতে না পেরে আমাদের মৃত্যুঞ্জয়ী বীর মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে প্রচণ্ড মার খেয়ে পাকিস্তানী সামরিক চক্র নতুন এক ফন্দি আটলো। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে তারা ভারত-পাকিস্তান সমস্যা বলে চিহ্নিত করে কাজ হাসিল করতে চেয়েছিলো। তারা ভেবেছিলো আমাদের দেশের এই মুক্তিযুদ্ধকে তারা যদি ভারত-পাকিস্তান বিরোধ বলে চিহ্নিত করতে পারে তাহলে বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের মুক্তিসংগ্রামের প্রতি আজ যে বিশ্ব জনমত গঠিত হয়েছে তাকে বিভ্রান্ত এবং বাংলাদেশে আজ যে দুর্বার লড়াই চলছে, তাকে কিছুটা প্রশমিত করা যাবে। পাকিস্তানী সামরিক চক্র এই উদ্দেশ্যে বাংলাদেশের অধিকৃত এলাকার সীমান্তে এবং ভারত-পাকিস্তান সীমান্তে উস্কানিমূলক তৎপরতা শুরু করলো। কিন্তু বিশ্বের সচতেন মানুষ পাকিস্তানী সামরিক চক্রের এই দুরভিসন্ধিটা বুঝে নিয়েছে। ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধের হুমকি দিয়ে এমন কি প্রয়োজন হলে সংঘর্ষ একটা বাধিয়ে দিয়ে কাজ হাসিল করার যে দুরভিসন্ধি তারা করেছিলো তা ভন্ডুল হয়ে গেছে।

সোভিয়েত প্রধানমন্ত্ৰী মিঃ আলেক্সী কোসিগিন পাকিস্তানী ফ্যাসীবাদী সামরিক চক্রের এই ঘৃণ্য দুরভিসন্ধির কথা জানতে পেরে বাংলাদেশে গণহত্যা, ধ্বংসযজ্ঞ ও নারী নির্যাতনের নায়ক পাকিস্তানের স্বঘোষিত প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়াকে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় হুশিয়ার করে দিয়ে বলেছেনঃ সাবধান ভারতের সঙ্গে যুদ্ধ বাধানো পাকিস্তানের পক্ষে আত্মহত্যার সামিল হবে।

গত ১৭ই আগষ্ট ইসলামাবাদস্থ সোভিয়েট রাষ্ট্রদূত মিঃ এ, এ, রদিনভ জেনারেল ইয়াহিয়ার হাতে সোভিয়েট প্রধানমন্ত্রী মিঃ কোসিগিনের একটি চিঠি পৌঁছে দেন। ওই চিঠিতেই সোভিয়েত প্রধানমন্ত্রী পাকিস্তানী সামরিক চক্রের গোপন দুরভিসন্ধি ঔদ্ধত্যের বিষয়ে জেনারেল ইয়াহিয়াকে হুশিয়ারী প্রধান করেন। চিঠিতে তিনি ইয়াহিয়া ও তার বর্বর সামরিক চক্রকে অত্যন্ত সুস্পষ্ট ভাষায় এই বলে হুশিয়ার করেছেন যে, তারা যেন গোঁয়ারের মতো ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধের আস্ফালন বা দায়িত্বজ্ঞানহীন উক্তি না করে। চিঠিতে প্রধানমন্ত্রী আলেক্সী কোসিগিন ইয়াহিয়া আর তার জঙ্গী সামরিক চক্রকে বাংলাদেশে গণহত্যা ও উৎপীড়ন অবিলম্বে বন্ধ করতে এবং শেখ মুজিবুর রহমানের বিচার প্রহসনে আর একপা অগ্রসর না হওয়ার জন্যে উপদেশ দিয়েছেন।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<005.005.077>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

 

২৭ আগষ্ট, ১৯৭১

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রাণরক্ষার জন্য অবিলম্বে সক্রিয় ও কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বিশ্বের সকল সরকারের প্রতি আহবান জানিয়েছেন। বিশ্বের সকল সরকারের কাছে পাঠানো এক বার্তায় তাঁরা বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি ও সামরিক আদালতে বঙ্গবন্ধুর বিচার প্রহসনে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেনঃ বাংলাদেশে আজ যা ঘটেছে এবং যা ঘটতে যাচ্ছে, তাকে বিশ্বশান্তি আজ দারুণ এক হুমকির সম্মুখীন। পাকিস্তানের জঙ্গশাহীকে কোনরকম সামরিক অথবা অর্থনৈতিক সাহায্যদান সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করার জন্যেও তাঁরা বিশ্বের সরকারবর্গের প্রতি আহবান জানিয়েছেন। হংকং-এর একটি প্রভাবশালী দৈনিক হংকং স্ট্যাণ্ডার্ড-এ শেখ মুজিবুর রহমানের বিচার প্রহসনের জন্যে পাকিস্তানের জঙ্গী সরকারের কঠোর সমালোচনা করা হয়েছে। এই পত্রিকার এক সম্পাদকীয় নিবন্ধে বলা হয়ঃ সামরিক আদালতে শেখ মুজিবুর রহমানের বিচারের নামে পাকিস্তানী সামরিক জান্তা যা করতে যাচ্ছে তা একটা প্রহসন ছাড়া আর কিছুই নয়। এই বিচার প্রহসনের পেছনে পাকিস্তানী সামরিক জান্তার যে গোপন দুরভিসন্ধি রয়েছে তা বীভৎস। পত্রিকায় বলা হয়ঃ সম্প্রতি পাকিস্তানী জঙ্গীশাহী ঘোষণা করেছে যে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে একজন কৌঁসুলি নিযুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে কো কোঁসুলি থাক আর না-ই থাক এটা স্রেফ একটা ধাপ্পা ও প্রসহন ছাড়া আর কিছুই নয়। কারণ ইয়াহিয়া আর জঙ্গ সরকার ইতিপূর্বেই শেখ মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে বিশ্বাসঘাকতার অভিযোগ এনেছে। তারা যে ক্ষেত্রে শেখ মুজিবুর রহমানকে আগেভাবেই দোষী বলে ঘোষণা করছে সেখানে এই বিচার স্রেফ একটি প্রহসন ছাড়া আর কি হতে পারে? আইরিশ আইনজীবী সমিতির অত্যন্ত প্রভাবশালী সদস্য ও রাজনৈতিক বন্দী মার্জনা সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সংস্থার চেয়াম্যান মিঃ সিয়ান ম্যাকব্রাইড জেনারেল ইয়াহিয়ার কাছে লেখা এক চিঠিতে বঙ্গবন্ধু তিনি সেখানে গিয়ে তখন কিছুই করতে পারেননি। বঙ্গবন্ধু মুজিবের বিচার গোপনে সামরিক আদালতে না করে প্রকাশ্যে বেসামরিক আদালতে করার দাবী জানিয়ে মিঃ ম্যাকব্রাইড বলেনঃ কোন বিদেশী আইনজীবীকে পাকিস্তানের আদালতে শেখের পক্ষ সমর্থনের অনুমতি যদি না দেয়া হয় তাহলে শেখ মুজিবুর রহমান যাতে তাঁর ইচ্ছেমতো আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আইনজীবীদের সাথে পরামর্শ করতে পারেন তার ব্যবস্থা যেন করা হয়। মিঃ ম্যাকব্রাইড গত মাসে তাঁর পশ্চিম পাকিস্তান সফরের উল্লেখ করে বলেনঃ শেখ মুজিবুর রহমানের লণ্ডন সলিসিটরদের অনুরোধে তিনি বাংলাদেশের নেতার পক্ষ সমর্থনের উদ্দেশ্য নিয়েই পশ্চিম পাকিস্তানে দেখা করে শেখের বিচার যেভাবে চলছে সে সম্পর্কে দারুণ উদ্বেগ ও সংশয় প্রকাশ করেছিলেন। তিনি বলেনঃ রাজনৈতিক বন্দীদের মার্জনা সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রধান হিসাবে তিনি বিচারের কতগুলো উদ্বেগপূর্ণ দিক সম্পর্ক উল্লেখ করেছেন। তিনি অভিযোগ করেনঃ সামরিক আদালতে গোপনে শেখ মুজিবুর রহমানের যে বিচার চলছে তাতে শেখ মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ প্রকাশ করা হয়নি। এর মধ্যে শুধু একটাই বলা হয়েছে যে, অপরাধে মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে। তিনি বলেন, বিচারে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে যদি তার ইচ্ছামতো আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দেয়া হয় তাহলে সে বিচার বলে গণ্য হতে পারে না।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<005.005.078>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

 

২১ আগষ্ট, ১৯৭১

… আজ বাংলাদেশ সমস্যা একটি গুরুতর আন্তর্জাতিক সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে। পাকিস্তানী শাসক চক্র শত প্রচেষ্টাতেও বাংলাদেশের ঘটনাবলীকে মৃত পাকিস্তানের পচা গলিত লাশের তলায় ঢাকা দিয়ে রাখতে পারেনি। বিশ্বের সকল চিন্তাশীল, বুদ্ধিজীবী, কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক নেতৃবর্গের কাছেও এই তথ্যটি আজ অজানা নয়। আর ঠিক এই কারণেই মার্কিন সিনেটের আরও একজন প্রভাবশালী সদস্য রিপাবলিকান দলের মিঃ চার্লস পার্সি মন্তব্য করলেনঃ পাকিস্তানের মৃত্যু হয়েছে। আর কোন অবস্থাতেই দ্বিখণ্ডিত পাকিস্তানে জোড়া লাগানো সম্ভব নয়। রিপাবলিকান সিনেটর পার্সি সম্প্রতি ভারত ও পাকিস্তান সফরে এসেছিলেন। তিনি বাংলাদেশের প্রকৃত অবস্থা নিজের চোখে দেখে গেছেন। বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী পশ্চিম বঙ্গের উদ্বাস্তু শিবিরগুলোর তিনি বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ শরণার্থীর অবস্থা প্রত্যক্ষ করেছেন। তিনি ভারতীয় নেতৃবর্গের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। তিনি পাকিস্তানের জঙ্গী সরকারের হোমড়া-চোমড়াদের সঙ্গেও কথা বলে দেখেছেন এবং দেখেশুনেই তিনি বলেছেনঃ এখন আর যাই হোক, একথা কল্পনাও করা যায় না যে পাকিস্তান আবার বেঁচে উঠবে। আগের অবস্থা ফিরে আসবে এ কথা চিন্তা করাও অসম্ভব। পাকিস্তানী হানাদারদের বিরুদ্ধে প্রত্যেক বাঙালীর মনোভাব একই রকম। বাঙালীদের কাছে পাকিস্তানীরা বিদেশী হানাদার ছাড়া আর কিছুই নয়। সিনেটর চার্লস পার্সি বলেনঃ বাঙালী জাতি আজ যে ইস্পাতকঠিন সংকল্প নিয়ে লড়াই করবে তা একটি বিরাট ও মহৎ সংকল্প। আমি আশা করি পাকিস্তানী জঙ্গীশাহীর নায়করা এটা উপলব্ধি করবে এবং ই উপলব্ধির উপরেই তাদের বাঁচা-মরা নির্ভর করছে। সিনেটর চার্লস পার্সি বলেনঃ আমি পাকিস্তানী সামরিক সরকারের নেতাদের এ কথা সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছি যে, বঙ্গবন্ধুর বিচার প্রহসনে তারা যদি আর এক পা অগ্রসর হয় তাহলে তার পরিণতি হবে অত্যন্ত ভয়াবহ। তারা যদি তথাকথিত বিচারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রাণদণ্ড দেয় তাহলে পৃথিবীর কেউ-ই তাদের ক্ষমা করবে না।

২২ সেপ্টেম্বর, ১৯৭১

… বাংলাদেশ পরিস্থিতির এই ক্রমাবনতিতে পৃথিবীর শান্তিপ্রিয় মানুষ আজ দারুণ উদ্বিগ্ন। বিশ্বজনতার এই উদ্বেগ প্রকাশ পেয়েছে জাতিসংঘের সেক্রেটারী জেনারেল উথান্টের সাম্প্রতিক একটি বিবৃতিতে। গত ১৯শে সেপ্টেম্বরে এক বিবৃতিতে তিনি বিশ্বের রাষ্ট্রবর্গের প্রতি এক দারুণ হুশিয়ারী উচ্চারণ করে বলেছেনঃ বাংলাদেশের ঘটনাবলী বর্তমানে যেভাবে জটিল হয়ে পড়ছে সেখানকার পরিস্থিতি বর্তমানে যেভাবে দ্রুত অবনতির দিকে গড়িয়ে চলেছে এবং এর ফলে প্রতিনিয়ত যেভাবে জটিল থেকে জটিলতর সমস্যাদির উদ্ভব ঘটছে তাতে আন্তর্জাতিক গোষ্ঠীর পক্ষে দারুণ উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ আছে।… তিনি বলেনঃ বাংলাদেশ পরিস্থিতি এখন এত দ্রুত অবনতির দিকে এগিয়ে চলেছে যে, এ ব্যাপারে বিলম্ব হলে যে কোন রকমের মারাত্মক বিপর্যয় দেখা দেবে এবং তা বাংলাদেশ বা পাকিস্তানের সীমার মধ্যে সীমিত থাকবে না। তিনি বলেনঃ আন্তর্জাতিক গোষ্ঠীর পক্ষে এটা দারুণ এক উদ্বেগের ব্যাপার। বাংলাদেশের মূল সমস্যার সমাধান আন্তর্জাতিক গোষ্ঠীকে অবিলম্বে এগিয়ে আসবে হবে। সেক্রেটারী জেনারেল উথান্ট বলেনঃ গত ১৯৭০ সালের নভেম্বরের সর্বনাশা ঘূর্ণিঝড়ে বাংলাদেশে লক্ষ লক্ষ প্রাণহানি ঘটেছে। তারপর সেখানে শুরু হয়েছে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর সামরিক অভিযান এবং তাতেও লক্ষ

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<005.005.079>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

 

লক্ষ মানুষের জীবনহানি ও ব্যাপক ধ্বংসলীলা সংঘটিত হয়েছে। তিনি বলেন, আজও বাংলাদেশ থেকে প্রতিনিয়ত লক্ষ লক্ষ শরণার্থী সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে চলে যাচ্ছে। পাকিস্তানের সামরিক চক্র বাংলাদেশের তাঁবেদার সরকার খাড়া করেছে এবং জেনারেল ইয়াহিয়া শরণার্থীদের দেশে ফেরার আহবান জানিয়েছে- কিন্তু এসব সত্ত্বেও সেখানে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসছে না, বরং প্রতিদিনই জঙ্গী সরকার যতই গলাবাজী করুক না কেন তারা সেখানে তাদের গণবিরোধী নীতি এখনও সামনে চালিয়ে যাচ্ছে।

সেক্রেটারী জেনারেল উথান্ট বলেনঃ বাংলাদেশ বর্তমানে দুর্ভিক্ষের সম্মুখীন হয়েছে। বাংলাদেশে পাকিস্তানী সামরিক অভিযানের ফলেই এই দুর্ভিক্ষাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তিনি বলেন বাংলাদেশের অধিকৃত এলাকসমূহের মানুষ আজ দারুণ এক শোচনীয় অবস্থার মুখে পড়েছে। অবিলম্বে সেখানে বড় রকমের ত্রান ব্যাবস্থা চালু করা ছাড়া দ্বিতীয় কোন পথ নেই।

৩০ সেপ্টেম্বর, ১৯৭১

গত ২৮শে সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলাদেশ পরিস্থিতি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়। বাংলাদেশে পাকিস্তানী হানাদাররা যা করেছে যা করেছে এবং আজও যা করে চলেছে তার এক মর্মান্তিক বিবরণ দিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিগণ পাকিস্তানের জঙ্গশাহীর কঠোর সমালোচনা করেন।

অধিবেশনের শুরুতে সোভিয়েট উইনিয়ন, সুইডেন ও ফ্রান্সের প্রতিনিধিগণ কঠোরতম ভাষায় বাংলাদেশে পাকিস্তানী সামরিক অভিযানের সমালোচনা করে বলেনঃ পাকিস্তানী হানাদাররা বাংলাদেশে যা করছে এবং আজও যা করে চলেছে তা কল্পনাও করা যায় না। তাঁরা দাবী করেন, অবিলম্বে বাংলাদেশে পাকিস্তানী বর্বরতার অবসান ঘটাতে হবে। তাঁরা বলেছেনঃ বাংলাদেশের ঘটনাবলী সম্পর্কে পাকিস্তানী সরকারী প্রচারযন্ত্র যতই বিভ্রান্তির জাল বুনুক সেখানকার প্রকৃত ঘটনাবলী আজ আর কারও অজানা নয়। পাকিস্তানী সামরিক সরকার বা সেখানকার জান্তা যা-ই বলুক না কেন সেখানে যা ঘটেছিলো তা কোনো বিশেষ রাজনৈতিক মতাদর্শ বা বিশেষ কোনো দাবীভিত্তিক আন্দোলন নয়। তা ছিলো বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের জীবন-মরণের আন্দোলন। আর অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিতেই বাংলাদেশের মানুষ তাদের লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলো। তারা পশ্চিম পাকিস্তানের কায়েমী স্বার্থবাদী নিও-ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক আন্দোলনই শুরু করেছিলো। গত ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে বাংলাদেশের মানুষ যে অভূতপূর্ব বিজয় লাভ করেছিলো পাকিস্তানী হানাদাররা তা মেনে নিতে পারেনি। তাদের কাছে বাংলাদেশের মানুষের একমাত্র অপরাধ হলো নির্বাচনে তাদের বিরুদ্ধে পশ্চিম পাকিস্তানী কায়েমী স্বার্থবাদীদের ঔপনিবেশিক স্বার্থে আঘাত লাগার জন্যেই তারা বাংলাদেশে সামরিক অভিযান চালিয়েছে।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে সুইডেন, ফ্রান্স ও সোভিয়েট প্রতিনিধিগণ গভীর আশংকা প্রকাশ করে বলেন যে, অবিলম্বে বাংলাদেশ সংকটের সমাধান না করা হলে তা এক মহাপ্লাবী দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়বে এবং তার পরিণতি হবে অত্যন্ত ভয়াবহ।

সুইডেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মিঃ ক্রিসটার ভিকম্যান বলেন, বাংলাদেশে পাকিস্তানী দখলদার বাহিনী যা চালাচ্ছে তা কোনোমতেই সমর্থন করা যায় না। দেশমাতৃকার বুক থেকে পাকিস্তানী দখলদার বাহিনীকে হটিয়ে দেবার জন্যে বাংলাদেশের মানুষ আজ পাল্টা আঘাত হেনেছে। বাংলাদেশের পাক অধিকৃত এলাকার সর্বত্রই দুর্বার লড়াই চলছে এবং এ লড়াইয়ের পরিণতি বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তার পক্ষে দারুণ বিপজ্জনক। মিঃ ক্রিসটার ভিকম্যান এই আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, বাংলাদেশে মান্তি প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে এবং বাংলাদশের মানুষের পূর্ব নিরাপত্তার ব্যাপারে অবিলম্বে বিশ্ব নেতৃবৃন্দ সচেষ্ট না হলে এ সংকট বহু দূর গড়াবে।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<005.005.080>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

 

ফরাসী পররাষ্ট্রমন্ত্রী মরিস সু্যম্যান বলেন, বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের ইচ্ছানুযায়ী বাংলাদেশ সংকটের সমাধান করতে হবে, তা না হলে বাংলাদেশের সংকট আরও বিস্তার লাভ করবে।

২ অক্টোবর, ১৯৭১

বাংলাদেশে সাধারন মানুষের উপর পাকিস্তানী হানাদারদের অমানুষিক অত্যাচার ও বর্বরতার মর্মান্তিক দৃশ্য সহ্য করতে না পেরে ঢাকায় বিশ্বব্যাঙ্কের প্রতিনিধি মিঃ টাইগারম্যান পদত্যাগ করেছেন।

মিঃ টাইগারম্যান গত ছ’বছর ধরে বাংলাদেশে বিশ্বব্যাঙ্কের একজন বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেছেন। বাংলাদেশে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের পর তিনি গত ডিসেম্বর মাসে শিকাগো গিয়েছিলেন। মিঃ টাইগারম্যান একজন মার্কিন নাগরিক। তিনি শিকাগো থেকে গত ১৮ই সেপ্টেম্বর ঢাকায় ফিরে এসেছিলেন।

মিঃ টাইগারম্যান বলেনঃ বাংলাদেশ অত্যন্ত পরিচিত দেশ। এদেশে বিশ্বব্যাঙ্কের প্রতিনিধি হিসাবে যোগদানের পর এখানকার প্রতিটি জিলা প্রতিটি শহর-বন্দরে গ্রামে-গঞ্জে আমি ঘুরেছি। ঘুরেছি একবার নয়, বার বার। বাংলাদেশের জেলাগুলোয় তিনি এ পর্যন্ত ঘুরেছেন ১৮ বার।

গত ৮ই সেপ্টেম্বরে আবার তিনি ঢাকায় ফিরে এলেন তখন তিনি বিস্ময়ে অবাক হয়ে গেলেন। তিনি বলেনঃ বিমান থেকে নেমেই আমি অবাক হয়ে গেলাম। আমার সেই পরিচিত ঢাকা বিমানবন্দর এ যেন নয়। এ যেন বিশ্বযুদ্ধের সময়কার কোন বিমান ঘাঁটি। বিমান বন্দরে পাকিস্তান বিমান বাহিনীর জঙ্গী বিমানগুলোকে প্রস্তুত হয়ে থাকতে দেখলাম। দেখলাম বিমানবন্দরের চারিদিকে অসংখ্য বিমানবিধ্বংসী কামান। টার্মিনাল ভবনের ছাদে, জানালায় আর চিলতে ছাদ বা বারান্দাগুলোয় দেখলাম বালির বস্তা দিয়ে বাঙ্কার করা হয়েছে এবং সেখানে সশস্ত্র পাকিস্তানী সৈন্যরা বিমানবিধ্বংসী কামান, মেশিনগান ও স্বয়ংক্রিয় রাইফেল তাক করে আছে যেন এখুনি কিছু ঘটবে বা ঘটতে যাচ্ছে। আগে যেখানে বিমানবন্দরের পূর্বপাশে রাস্তায় প্রাচীরের ধারে এবং ডমেষ্টিক ও ইন্টারন্যাশনাল উইংসের টার্মিনাল ভবনে হাজার হাজার দর্শনার্থীকে দেখতাম লাইন ধরে দাঁড়িয়ে আছে এখন সেক্ষেত্রে একজন অসামরিক ব্যক্তিকেও দেখলাম না। আগে বিমানবন্দরে যেসব অসামরিক কাষ্টম ও ইমিগ্রেশন বিভাগের কর্মচারীদের দেখতাম, তাদের কাউকেই দেখলাম না। হয় তাদের সবাইকে গুলি করে মারা হয়েছে, অথবা তারা প্রাণভয়ে এ শহর ছেড়ে পালিয়েছে। বিমানবন্দরে পশ্চিম পাকিস্তানী সৈন্যরাই সবকিছু করছে। বিমানবন্দরে যেসব বিদেশী নাগরিক যাওয়া-আসা করছে পাকিস্তানী সৈন্যরা তাদের নানাভাবে নাজেহাল করছে। পিআইএ বা পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্সের যে সাজ-সরঞ্জাম, গোলাবারুদ ও সৈন্যদের পরিবহণের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। মিঃ টাইগারম্যান বলেন, ঢাকা বিমানবন্দরে নেমে একজন বাঙালীকেও আমি খুঁজে পেলাম না। অথচ দেশটা একান্তভাবে সাড়ে সাত কোটি বাঙালীর দেশ।

বিশ্বব্যাঙ্ক প্রতিনিধি মিঃ টাইগারম্যান বলেনঃ বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে আমি দেখলাম এয়ারপোর্ট রোডের দু’পাশে বহু ট্রেঞ্চ খোঁড়া হয়েছে এবং রাস্তার দুধারের বাড়িগুলি জনশূন্য। আর এইসব জনশূন্য বাড়িগুলির ছাদে, বারান্দায় ও জানালায় বালির বস্তা দিয়ে বাঙ্কার বানানো হয়েছে। রাস্তায় দু’হাত ছাড়া চেকপোষ্ট বসানো হয়েছে। এইসব চেকপোষ্টে পশ্চিম পাকিস্তানী সৈন্যরা পাহারা দিচ্ছে। এই রাস্তা দিয়ে কথিত যে দু-একটা অসামরিক গাড়ী চলাচল করছে সৈন্যরা সেগুলো তন্নতন্ন করে তল্লাশী করছে। পথচারীদেরও তল্লাশী করা হচ্ছে। পথচারীদের বেশভূষা ও চেহারায় বাঙালীত্বের স্পষ্ট ছাপ পাওয়া গেলে সৈন্যরা তাদের ধরে নিয়ে ক্যান্টনমেন্টর দিকে যাচ্ছে। বাঙালী বুদ্ধিজীবী তরুণ হলে তো আর কথাই নেই। গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোয় যুদ্ধক্ষেত্র সৃষ্টি করে রাখা হয়েছে। সারি সারি বাঙ্কার ও ট্রেঞ্চে সশস্ত্র পাকিস্তানী সৈন্য মোতায়েন রয়েছে। জায়গায় জায়গায় রাস্তার দুপাশে দেয়াল তুলে দিয়ে চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। শহরের প্রধান প্রধান সরকারী ভবনগুলোর চারপাশে ১৫

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<005.005.081>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

 

থেকে ২৫ ফুট উচু দেয়াল তোলা হয়েছে। ঢাকা রেডিওকে বর্তমানে একটি দুর্ভেদ্য দুর্গে পরিণত করা হয়েছে। সন্ধ্যার পর ঢাকার রাস্তায় কেউ হাঁটে না। সন্ধ্যা থেকে সকাল পর্যন্ত শহরের রাস্তায় কেবল পাকিস্তানী সৈন্য, পশ্চিম পাকিস্তানী পুলিশ ও কুকুর ছাড়া আর কেউ চলাচল করে না। মানুষ সেখানে পাকিস্তানী সৈন্যদের অত্যাচার এতই ভীবসন্ত্রস্ত যে কেউ কারও সঙ্গে কথা বলে না। বিদেশীদের সঙ্গে কথা বলতে তারা ভীষণ ভয় পায়। কারণ আজও প্রতিদিন শহরে ধরপাকড় চলছে। কখন কোন মুহুর্তে সেখানে কার জীবনে মৃত্যু নেমে আসবে না কেউ জানে না। প্রায় প্রতিরাতেই বোমা বিস্ফোরণ ও খণ্ড লড়াইয়ের শব্দ শোনা যায়। গোটা শহরটা এখন বদ্ধভূমিতে পরিণত।

বিশ্বব্যাঙ্ক প্রতিনিধি বলেনঃ এই ভয়ংকর পরিস্থিতিতে সেখানে থেকে কাজ করা আমার পক্ষে যুক্তিগতভাবে, নীতিগতভাবে কিংবা নৈতিকতার দিক থেকে কোনভাবেই সম্ভব নয়। তিনি বলেন , পাকিস্তানে আমি আর কোনদিন ফিরে যাবো না। বাংলাদেশ থেকে হানাদার পাকিস্তানীরা বিতাড়িত হলে আমি বাংলাদেশের পক্ষে কাজ করতে যাবো। আমি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশে কাজ করবো। দীর্ঘ ছ’বছর থাকার পর আমি বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের মানুষকে ভালোবেসেছি। তাদের সঙ্গে আমার হৃদয়ের বন্ধন অনেক গভীর।

৫ অক্টোবর, ১৯৭১

…বৃটিশ কমন্সসভার অত্যন্ত প্রভাবশালী সদস্য মিঃ ফ্রেভ ইভান্স বলেছেনঃ বাংলাদেশ আজ একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র। জাতিগতভাবে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং ভাষা ও সামাজিকতার দিক থেকে বাংলাদেশ সম্পূর্ণ স্বাধীন, সার্বভৌম একটি রাষ্ট্র- সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি জাতি। বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের এই স্বতন্ত্র অস্তিত্ব ও বাঁচার অধিকার সুপ্রতিষ্ঠিত করার জন্যেই বাঙালীরা আজ হানাদার পাকিস্তানী বাহিনীর বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নিয়েছে। তারা আজ যে লড়াই করছে তা হলো এ দেশকে মুক্ত করার লড়াই- শত্রু মুক্তির লড়াই। দেশকে শত্রুমুক্ত করার জন্য সাড়ে সাত কোটি বাঙালী যে যুদ্ধ করছে তা তাদের বাঁচার অধিকার প্রতিষ্ঠার যুদ্ধ। আর এই অধিকার প্রকৃতপক্ষে মানুষের জন্মগত অধিকার।

বাংলাদেশে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর নির্বিচার হত্যা, লুণ্ঠন ও নারী-নির্যাতনের ফলে যে দুই লক্ষাধিক শরণার্থী সীমান্তের ওপারে ভারতে আশ্রয় নিয়েছে তাদের অবস্থা নিজের চোখে দেখে যাবার জন্যে এবং কি নারকীয় নির্যাতনের ফলে তারা তাদের সাতপুরুষের ভিটেমাটি ফেলে উদ্বাস্তু শিবিরে দিন কাটাচ্ছে তা জানার জন্যে বৃটিশ কমন্সসভার বিশিষ্ট সদস্য মিঃ ফ্রেড ইভান্স লণ্ডন থেকে পশ্চিম বাংলায় গিয়েছিলেন। একাধিক শরণার্থী শিবির পরিদর্শন করে পশ্চিম বাংলার রাজধানী কলকাতায় ফিরে গিয়ে এক সাংবাদিক সম্মেলনে বাংলাদেশ সম্পর্কে তিনি এই মন্তব্য করেন। বাংলাদেশের ব্যাপারে বিশ্বের বৃহৎ শক্তিবর্গের অসহনীয় নিস্ক্রিয়তার সমালোচনা করে তিনি বলেনঃ বাংলাদেশ সমস্যার সমাধানে বিশ্বের প্রত্যেকটি দেশেরই এগিয়ে আসা উচিত।

মিঃ ফ্রেড ইভান্স বাংলাদেশ সম্পর্কে বক্তৃতায় বৃটিশ সরকারের সমালোচনা করেন। তিনি বলেনঃ অবিলম্বে বাংলাদেশ সমস্যার সমাধান না হলে এশিয়ার এই অঞ্চলের শান্তি বিঘ্নিত হবে। অবিলম্বে এর সমাধান করতেই হবে। মিঃ ফ্রেড ইভান্স বলেনঃ বাংলাদেশের মূল সমস্যা মানবিক চেতনা ও মানবাধিকারের সমস্যা। তিনি বলেনঃ একজন গণতন্ত্রী হিসাবে বুলেটের বদলে ব্যালটের মাধ্যমেই যে কোন সমস্যার সমাধানে আমি পক্ষপাতী। বাংলাদেশ সঙ্কটের শুরুতে বিশ্বের গণতন্ত্রকামী সকল মানুষের এবং সাড়ে সাত কোটি বাঙালীর মতো আমিও এটাই আশা করেছিলাম কিন্তু পাকিস্তানী সামরিক শক্তি সে সম্ভাবনাকে গোঁয়ারের মতো গুড়িয়ে দিয়েছে।

মিঃ ফ্রেড ইভান্স বলেনঃ আমরা বৃটেনবাসী ১৯৩৯ সালে ফ্যাসিষ্ট জার্মানীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধে নেমেচিলাম, প্রয়োজন নয়া ফ্যাসিস্টদের বিরুদ্ধেও যুদ্ধ করতে আমরা প্রস্তুত।…

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<005.005.082>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

 

২৯ অক্টোবর, ১৯৭১

…গত বাইশে অক্টোবর থেকে পচিশে অক্টোবরে মধ্যে নয়াদিল্লীতে ভারত ও সোভিয়েট ইউনিয়নের মধ্যে আলোচনা হয় তাতে এই উপমহাদেশের পরিস্থিতি এবং পাকিস্তান ভারতের সীমান্তে যে গুণ্ডামি ও তস্করবৃত্তির দেশের মধ্যে চারদিনব্যাপী আলোচনার পর প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলা হয়ঃ পাকিস্তান ভারত সীমান্তে ব্যাপক সৈন্য সমাবেশ করে এবং যুদ্ধপ্রস্তুতি ও সামরিক তৎপরতায় লিপ্ত হয়ে এই উপমহাদেশে যে উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে তাতে এ অঞ্চলের শান্তি বিঘ্নিত হবার দারুণ আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এ ব্যাপারে ভারত যে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে সোভিয়েট ইউনিয়নের তাতে পূর্ণ সমর্থন রয়েছে বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়। সুতরাং ভারত আক্রমণ করে বাংলাদেশ প্রশ্নকে ভারত-পাকিস্তান প্রশ্নে রূপান্তরিত করার সপক্ষে এবং পরে জাতিসংঘের সাহায্য নিয়ে ত্রাণ পাওয়ার যে স্বপ্ন দেখেছে তাও সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়ে গেছে। আজ ভারত আক্রমণের অর্থ হবে পাকিস্তানের আত্মহত্যা, ভারত আক্রমণ করতে গেলে গোটা পাকিস্তানটাই কবর হয়ে যাবে।

গত ছাব্বিশে অক্টোবর মস্কো ও অটোয়ায় যুগপৎভাবে প্রকাশিত সোভিয়েট-কানাডা যুক্ত ইশতাহারে বাংলাদেশ সমস্যার প্রকৃত রাজনৈতিক সমাধানের দাবী জানানো হয়।

সোভিয়েট ইউনিয়ন এবং কানাডার এই যুক্ত ইশতাহারে বলা হয়ঃ বাংলাদেশ পরিস্থিতির এমন একটি রাজনৈতিক সমাধান আনতে হবে যাতে বাংলাদেশের জনগণের আইনসম্মত অধিকার ও স্বার্থ সম্পূর্ণ রক্ষিত এবং ভারতে আশ্রয় গ্রহণকারী শরণার্থীরা পূর্ণ আস্থায় ও মর্যাদায় দেশে ফিরে আসতে পারবেন। কানাডায় সোভিয়েট প্রধানমন্ত্রী মিঃ আলেক্সী কোসিগিনের আটদিনব্যাপী সরকারী সফরশেষে এই ইশতাহার প্রচারিত হয়।

১ নভেম্বর ১৯৭১

…যুগোশ্লাভিয়া সর্বোতোভাবেই গোষ্ঠীনিরপেক্ষ একটি শান্তিকামী দেশ বলে বিশ্ববাসির কাছে পরিচিত। পুঁজিবাদী ও সমাজতন্ত্রীবাদী উভয় ব্লকেই এই সম্পর্কে কোনো দ্বিমত নেই। বিশ্বের সকল রাষ্ট্রের কাছেই জোটনিরপেক্ষ যুগোশ্লাভিয়া সমানভাবে সমাদৃত।

গোষ্ঠীনিরপেক্ষ যুগোশ্লাভিয়ার প্রেসিডেন্ট টিটোও আজ বাংলাদেশের পাকিস্তানী বর্বরতার বিরুদ্ধে মুখ খুলতে বাধ্য হয়েছেন।

প্রেসিডেন্ট টিটো বলেছেনঃ বাংলাদেশে পশ্চিম পাকিস্তানী সেনাবাহিনী যা করেছে এবং আজও তারা সেখানে যা করে চলেছে পৃথিবীর ইতিহাসে তার কোন দৃষ্টান্ত নেই। পাকিস্তানী সৈন্যরা বাংলাদেশে যে ব্যাপক গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে এবং নারী-শিশু-বৃদ্ধ নির্বিশেষে সেখানকার নিরপরাধ সাধারণ মানুষের ওপর যে অবর্ণনীয় অত্যাচার ও বর্বরতা চালিয়েছে তার ফলেই বাংলাদেশ থেকে নব্বই লক্ষাধিক শরণার্থী তাদের ঘরবাড়ি সহায়-সম্বল ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে।

অথচ পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়াসহ গোটা সরকারী প্রচারযন্ত্র এতদিন প্রচার করে এসেছিলেন যে বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি বাঙালী মুষ্টিমেয় অবাঙালীদের ওপর আক্রমণ চালিয়েছিলো, আর তাকেই থামাতে গিয়ে সেনাবাহিনীকে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয়েছে। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ ঘোষণা করে জনগণতান্ত্রিক স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার গঠন করে বাংলাদেশের মানুষ আজ দেশ থেকে হানাদার নিশ্চিহ্ন করার যে দুর্বার অভিযান চালিয়েছে তাকে দুষ্কৃতকারী ও ভারতীয় অনুচরদের কার্যকলাপ বলে ইয়াহিয়া সরকার কতদিন যাবৎ প্রচার করে এসেছে।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<005.005.083>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

 

পাকিস্তানের মাথামোটা গোঁয়ার প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া আর তার জঙ্গী সরকারের অপপ্রচামুখর মুখে বিরাট একটা চপেটাঘাত মারার মতো জওয়াব শোনা গেল গোষ্ঠীনিরপেক্ষ যুগোশ্লাভীয় প্রেসিডেন্টের দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে। তিনি বলেনঃ বাংলাদেশ প্রশ্নটি ভারত-পাকিস্তান প্রশ্ন নয়। এটি ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার কোন বিষয় নয়। তিনি বলেনঃ এটি পাকিস্তানের আভ্যন্তরীণ ব্যাপারও নয়।

সপ্তাহব্যাপী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফরের আগে গত সপ্তাহে মার্কিন টেলিভিশন সংস্থা সি, বি, এস-এর সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট টিটো অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বিশ্বাবাসীকে এই সত্যটি জানিয়ে দিয়েছেন।…

 

৬ নভেম্বর, ১৯৭১

সম্প্রতি নিউইয়র্ক টাইমস’ পত্রিকায় বাংলাদেশ পরিস্থিতি তথা বাংলাদেশের বর্তমান ঘটনাবলী ও প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে এক রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। এই রিপোর্টে পাক হানাদার বাহিনী অধিকৃত ঢাকা নগরীসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন অধিকৃত এলাকার একটি চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

নিউইয়র্ক টাইমস-এর রিপোর্টার ঢাকা থেকে পাঠানো এর রিপোটে বলেছেনঃ বাংলাদেশে পাকিস্তানী সামরিক অভিযান শুরুর পর সাত মাস কেটে গেছে কিন্তু এখনও কোথাও স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসেনি। বাংলাদেশের প্রত্যেক শহর-বন্দরের জনসংখ্যা বিগত ২৫ শে মার্চের আগে যা ছিলো এখন তার শতকরা ৩০ থেকে ৪০ ভাগ হাস পেয়েছে। এই ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ মানুষের কিছু অংশ সেনাবাহিনীর গুলিতে প্রাণ হারিয়েছে, কিছু লোক নিখোঁজ হয়েছে এবং বাকী সকলে মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিয়ে লড়াই করছে।

নিউইয়র্ক টাইমস-এর রিপোর্টে বলা হয়ঃ পাকিস্তানী সৈন্যরা মুক্তি বাহিনীকে খতম করবে বলে যে দুরাশা পোষণ করেছিলো তা চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ হয়েছে। বরং ফল উল্টো ফলতে শুরু করেছে- বাংলাদেশের বিভিন্ন রণাঙ্গনে পাকিস্তানী সৈন্যরা মুক্তিবাহিনীর হাতে দারুণ মার খাচ্ছে। মুক্তিবাহিনীর বিরুদ্ধে তাদের আক্রমণাত্মক পরিকল্পনাগুলো ব্যর্থ হচ্ছে। লড়াইয়ে তারা তারা কোনোক্রমেই সুবিধে করে উঠতে পারছে না। জলে-স্থলে সর্বত্রই তারা মুক্তিবাহিনীর হাতে মার খাচ্ছে। পাকিস্তানী সৈন্যদের এখন একমাত্র নিরাপদ আশ্রয়স্থল হলো কয়েকটি ক্যান্টমেন্ট।

নিউইয়র্ক টাইমস-এর রিপোর্টার লিখেছেনঃ বাংলাদশের বহু বিস্তীর্ণ অঞ্চলে মুক্তিবাহিনীর অধিকার ও প্রশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ফরিদপর, রংপুর, ময়মনসিংহ, সিলেট ও দিনাজপুরের বিস্তীর্ণ এলাকায় স্বাধীন সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

ওই রিপোর্টার লিখেছেনঃ বাংলাদেশের অধিকৃত এলাকাগুলোয় ব্যাপক হত্যা, লুটতরাজ, নারী নির্যাতন ও ধ্বংসের দ্বারা পাকিস্তানী সৈন্যরা যে বিভীষিকা ও ত্রাসের সঞ্চার করেছিলো তা এখন হ্রাস পেয়েছে। মুক্তিসেনারা এখন দেশের শহরে বন্দরে গ্রামে গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে স্থানীয় প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। বর্তমানে বাঙালীদের মনে পশ্চিম পাকিস্তানের ওপর ঘৃণা দারুণভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশে সামরিক অভিযানের পর প্রথমদিকেও এতখানি ঘৃণা ছিল না। পাকিস্তানী সামরিক বাহিনী অসামরিক প্রশাসনে নিযুক্ত বাঙালী এবং সাধারণ বাঙালীদের ওপর এখনও চরম নির্যাতন অব্যাহত রেখেছে। একজন বাঙালী একজন বিদেশী সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বলেছিলো-শুধু এই অপরাধেই পাকিস্তানী সৈন্যরা ওই বাঙালী ভদ্রলোকের পরিবারের সকলকে নির্মমভাবে প্রহার করেছে। কিন্তু এত করেও তারা মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে পেরে উঠছে না।

নিউইয়র্ক টাইমস-এর সংবাদদাতা লিখেছেনঃ মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে পেরে উঠতে না পেরে পাকিস্তান এখন বাংলাদেশ প্রশ্নটিকে অন্যদিকে ঘোরানোর উদ্দেশ্যে ভারত সীমান্তে ব্যাপক সৈন্য সমাবেশ করেছে। ভারতীয়

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<005.005.084>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

 

বাহিনীর সঙ্গে একটা সংঘর্ষের মাধ্যমে তারা বিষয়টিকে ভারত-পাকিস্তান বিরোধ বলে চালাবার চেষ্টায় আছে। এই উদ্দেশ্যে পাকিস্তান বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে ব্যাপক সৈন্য সমাবেশ করেছে। ফলে বাংলাদেশের শহরে-বন্দরে পাকিস্তানী সৈন্যদের বর্বরতা, সন্ত্রাস ও দৌরাত্ম্য কমে গেছে।…

 

১২ নভেম্বর, ১৯৭১

… সম্প্রতি সোভিয়েট ইউনিয়নের সুপ্রীম সোভিয়েটের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক সংসদীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক মিঃ ভি, কুদরিয়াভেৎসেভ বাংলাদেশের এই যুদ্ধকে জাতীয় মুক্তিযুদ্ধ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেছেন-বাংলাদেশে আজ যে লড়াই চলেছে তা খাঁটি জাতীয় মুক্তিযুদ্ধ। পাকিস্তানের জঙ্গী সরকার তথা বর্বর সমর নায়করা বাংলাদেশে গণহত্যা, ধ্বংস আর চরমসন্ত্রাসের নীতির দ্বারা বাঙালীদের জাতীয় মুক্তিযুদ্ধকে তুরান্বিত করেছে। তিনি বলেনঃ আমি আশা করি এই বাস্তব ঘটনা যত তিক্ত ও যতো কঠোরই হোক না কেন পাকিস্তান এটা উপলব্ধি করে সুবুদ্ধির পরিচয় দেবে। সম্প্রতি সোভিয়েট পার্লামেন্টারী প্রতিনিধিদলের নেতা হিসেবে ভারত সফরে গিয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে মিঃ কুদরিয়াভেৎসেভ বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম সম্পর্কে এই মন্তব্য করেন।

বিশিষ্ট সোভিয়েট নেতার এই উক্তিরই আরও স্পষ্ট প্রতিধ্বনি উঠেছে ফরাসী দেশে। ফ্রান্সের লোকবরেণ্য নেতৃবর্গ আজ মনে করেন স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ আজ এক অবশ্যম্ভাবী সত্য। এ সত্যকে অস্বীকার করা বা এড়িয়ে যাবার কোনো পথ নেই, পন্থাও নেই। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট জর্জেস পপিদু নিজেই বলেছেনঃ বাংলাদেশ সংকটের মূল হচ্ছে রাজনৈতিক, অতএব বাংলাদেশের জনগণের ইচ্ছানুযায়ী এ সঙ্কটের সমাধান করতে হবে। তা না হলে সমগ্র উপমহাদেশে বিপর্যয়ের ঝড় নেমে আসবে এবং যার পরিণতি ভাবা দারুণ কঠিন ব্যাপার। বর্বর পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর ব্যাপক গণহত্যা, লুটতরাজ ও পৈশাচিকতার ফলেই বাংলাদেশ থেকে ৯৬ লক্ষ অসহায় নরনারী-শিশু বৃদ্ধ তাদের বাড়িঘর-সহায় সম্পদ হারিয়ে ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী বাংলাদেশকে একটি বধ্যভূমিতে পরিণত করেছিলো। বাংলাদেশে এই ভয়াবহ অবস্থা সৃষ্টির জন্যে পাকিস্তানের জঙ্গীশাহী তথা জঙ্গী সমরনায়করাই দায়ী। আর ঠিক এই কারণেই সোভিয়েট কমিউনিষ্ট পার্টির মুখপত্র প্রাভদা’য় পাকিস্তানী জঙ্গী সরকার ও সামরিকজান্তাকে হুশিয়ার করে বলা হয়েছেঃ বাংলাদেশের যে নব্বই লক্ষাধিক শরণার্থী তাদের সহায়-সম্পদ ঘরবাড়ি এবং স্বদেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে, তারা যাতে পূর্ণ মর্যাদা ও নিরাপত্তার সঙ্গে স্বদেশে ফিরে আসতে পারে তার উপযুক্ত অবস্থার সৃষ্টি করতে হবে। পূর্ণ স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার সঙ্গে তারা যাতে স্বদেশে ফিরে আসতে পারে তেমন অবস্থার সৃষ্টি করতে হবে। প্রাভদায় বলা হয়, ইয়াহিয়ার জঙ্গীশাহীই শরণার্থী সমস্যার সৃষ্টি করেছে এবং এ সমস্যা আজ এক জটিল আন্তর্জাতিক সমস্যায় পরিনত হয়েছে। পাকিস্তানের মাথাগরম জঙ্গীচক্র যুক্তিতর্ক বিসর্জন দিয়ে তাদেরই সৃষ্ট সমস্যার জন্যে গোঁয়ারের মতো ভারতের ঘাড়ে দোষ চাপাবার চেষ্টা করছে।

 

২৪ নভেম্বর, ১৯৭১

… গত রাতে বিবিস’র এক বিশেষ সংবাদ বুলেটিনে বিভিন্ন সংবাদ সংস্থা ও সাংবাদিকদের পাঠানো রিপোর্টের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়ঃ মুক্তি বাহিনীর প্রচণ্ড আক্রমণে গত ৪৮ ঘন্টায় পাকিস্তান তার দশটি সামরিক ঘাঁটি হারিয়েছে। মুক্তিবাহিনীর বীর যোদ্ধারা পশ্চিম খণ্ডে মোট বাইশটি সীমান্ত চৌকির মধ্যে একুশটি দখল করেছে।

গত রাতে ঢাকা থেকে বিবিসি’র বিশেষ সংবাদদাতা মিঃ রোনাল্ড রোবসন জানাচ্ছেনঃ মুক্তিবাহিনীর বীর যোদ্ধারা এখন যশোরের চৌগাছা থেকে যশোর বিমান বন্দরের ওপর প্রচণ্ড আক্রমণ চালিয়েছে। মুক্তিবাহিনীর

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<005.005.085>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

 

আক্রমণে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী অধিকৃত যশোর বিমানবন্দরে রানওয়ে ও কন্ট্রোল টাওয়ারটি সম্পূর্ণরূপে নষ্ট হয়ে গেছে। মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে পাল্লা দিতে না পেরে প্রভূত ক্ষয়ক্ষতি স্বীকার করতে করতে পাকিস্তানী বাহিনী এখন দ্রুত পিছু হটে যেতে শুরু করেছে।

বিবিসি, ভয়েস অব আমেরিকা ও অস্ট্রেলীয় বেতার থেকে প্রচারিত সংবাদে উল্লেখ করা হয়ঃ বাংলাদেশের সর্বত্রই বীর মুক্তিসেনারা সর্বাত্মক অভিযান চালিয়ে শত্রু সেনাদের একের পর এক ঘাঁটি থেকে বিতাড়িত করে দুর্বার বেগে এগিয়ে চলেছে। পাকিস্তানী হানাদারদের শিবিরে শিবিরে এখন ত্ৰাহি ত্ৰাহি হাঁক উঠেছে।

ঢাকা থেকে AFP সংবাদদাতা এক তারবার্তায় জানাচ্ছেনঃ শত্রু বাহিনী অধিকৃত ঢাকার সঙ্গে গত সোমবার থেকে বাংলাদেশের অন্যান্য এলাকার যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। ঢাকা-যশোর, ঢাকাইশ্বরদী, ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-কুমিল্লা এক কথায় বাংলাদেশের সকল আভ্যন্তরীণ রুটে পি-আই এ’র সকল সার্ভিস বন্ধ হয়ে গেছে। গত মার্চের পর ঢাকার সঙ্গে বাংলাদেশের অন্যান্য এলাকার একমাত্র যোগাযোগ ছিলো পাকিস্তানী বাহিনী নিয়ন্ত্রিত পি-আই-এ সার্ভিস। কিন্তু মুক্তিবাহিনীর দুর্বার আক্রমণের মুখে তাও বিনষ্ট হয়ে গেল। প্রকৃতপক্ষে মুক্তিসেনারা বর্তমানে চারদিক থেকে শক্রবাহিনীকে ঘিরে ফেলেছে এবং প্রতিটি ক্ষেত্রে তার শত্রু বাহিনীকে সমূলে নিধন করে চলেছে। সর্বত্রই চলেছে মুক্তিবাহিনীর অপ্রতিরোধ্য জয়যাত্রা। ঢাকার মাত্র আঠারো মাইল দূরে মুক্তিবাহিনীর বীর যোদ্ধারা মুন্সীগঞ্জ শহর আক্রমণ করে। মুন্সীগঞ্জ থানার পুলিশের ওপর আক্রমণ করলে থানার একজন পুলিশ অফিসার ও বহু পুলিশ নিহত হয়। মুক্তিসেনারা বিজয় দৰ্পে সারা শহরে কুচকাওয়াজ করেন। মুক্তিসেনারা মুন্সিগঞ্জ মহকুমার লৌহজং ও টঙ্গীবাড়ী থানা দুটিও পুড়িয়ে দিয়ে ঢাকার এক বিশাল এলাকাকে শত্রুমুক্ত করে।

এদিকে মুক্তিসেনারা বর্তমানে উত্তরে সামরিক গুরুত্বপূর্ণ সিলেট শহরের ওপর প্রচণ্ড আক্রমণ করে বলে বিবিসির বিশেষ সংবাদদাতা মিঃ ডোনাল্ড রোবসন উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, সিলেটের বিভিন্ন ঘাঁটি থেকে পাকিস্তানী সৈন্যরা হটে যাচ্ছে। তিনি তার বার্তায় জানিয়েছেন মুক্তিসেনারা কুমিল্লার ওপরেও এক ব্যাপক অভিযান চালিয়েছে।

গত রাতে অষ্ট্রেলীয় বেতারের এক সংবাদদাতা বুলেটিনে বলা হয়ঃ বাংলাদেশে মুক্তিবাহিনী যে দুর্বার আক্রমণ চালিয়েছে তার সঙ্গে একমাত্র বাংলাদেশের গত ঘূর্ণিঝড়েরই তুলনা করা যেতে পারে।

এ প্রসঙ্গে আমরা উল্লেখ করবোঃ গত সপ্তাহে NEWSWEEK-এর সিনিয়র এডিটর মিঃ বোচগ্রেভ তাঁর An unwinnable Guerilla war শীর্ষক রিপোটে বাংলাদেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে বলতে গিয়ে মন্তব্য করেছিলেনঃ পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী এখন এমন এক দুর্জয় গেরিলা যুদ্ধের ফাঁদে পড়েছে যেখান থেকে তাদের মুক্তির কোন সম্ভাবনা নেই।

 

২৬ নভেম্বর, ১৯৭১

… গত ২২ শে নভেম্বর নিউইয়র্ক টাইমস’ পত্রিকায় প্রকাশিত এক দীর্ঘ রিপোর্টে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের এক রূপরেখা প্রকাশিত হয়েছে।

নিউইয়র্ক টাইমস-এর করাচীস্থ সংবাদদাতা গত সপ্তাহে বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ এলাকা সফর করে God is not with the big battalions শিরোনামের এক দীর্ঘ রিপোর্টে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছেনঃ গেরিলা যুদ্ধের কৌশল সম্পর্কিত মাও সেতুঙ এর একটি বিখ্যাত উক্তি ভিয়েৎনাম তথা সমগ্র ইন্দোচীন, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার মুক্তিসেনাদের দারুণ প্রেরণা দিয়ে চলেছে। উক্তিটি হলোঃ মাছ

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<005.005.086>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

 

যেমন করে সমুদ্রের অগাধ জলের মধ্যে অত্যন্ত স্বচ্ছন্দে বিচরণ করে, মুক্তিসেনাকেও সেভাবে জনসমুদ্রে স্বচ্ছন্দে বিচরণ করতে হবে।

Mr. Malcom Browne তাঁর এই রিপোটে বলেনঃ বাংলাদেশের বীর মুক্তিসেনারাও আজ বাংলাদেশের বিশাল জনসমুদ্রে মাছের মতোই সাঁতার দিয়ে বেড়াচ্ছে।

নিউইয়র্ক টাইমস সংবাদদাতা বলেনঃ গত সপ্তাহে বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ এলাকা সফর করে আমার এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা হয়েছে। পাকিস্তানী সেনাবাহিনী অধিকৃত বিভিন্ন এলাকা এবং মুক্তিবাহিনী নিয়ন্ত্রিত বিশাল এলাকা সফল করে আমার যে অভিজ্ঞতা হয়েছে আমি কোনদিন তা কল্পনাও করিনি। এত স্বল্প সময়ের মধ্যে একটা দেশের সমগ্র জনগণ মুক্তিসেনানী হয়ে উঠবে একথা ভাবাও যায় না। কিন্তু ভাবনা-চিন্তা নয় বাংলাদেশে গিয়ে আমাকে তো স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করতে হয়েছে। আজ বাংলাদেশের যে কোন পর্যটক যেকোন সাংবাদিক যান না কেন তিনিও আমার মতোই বিস্ময়ে মুগ্ধ হবেন।

পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীকে বাংলাদেশের সর্বত্র শোচনীয়ভাবে পর্যুদস্ত হতে দেখে আমার শুধু বার বার একটা কথাই মনে হয়েছে যে ভিয়েৎনাম যুদ্ধ থেকে এইসব হতভাগ্য পাকিস্তানী সৈন্য ও সমর নায়করা কিছুই শেখেনি। বাংলাদেশের বিভিন্ন অধিকৃত এলাকায় আমি যেসব পাকিস্তানী সামরিক অফিসারদের সঙ্গে কথা বলেছি, জিজ্ঞাসাবাদ করেছি তাদের সবাইকেও মনে হয়েছে এক একটি আস্তো উজবুক।

পাকিস্তানের মাথামোটা সমরনায়করা বাংলাদেশে বড়ো বড়ো রেজিমেন্ট ও ব্যাটেলিয়ন নিযুক্ত করেছে বাঙালীদের মুক্তি সংগ্রামকে ঠেকিয়ে রাখার জন্য কিন্তু God is not with the big battalions –অর্থাৎ আল্লাহ তাদের সহায় নন। বাংলাদেশের গণগেরিলাদের হাতে তারা চূড়ান্তভাবে মার খাচ্ছে। পাকিস্তানের ব্যাটেলিয়নগুলো এখন কেবল প্রাণরক্ষার জন্যেই লড়াই করছে। বাংলাদেশের নদী-মাঠ-প্রান্তরে আর জলাভূমিগুলোয় পাকিস্তানী যুদ্ধজয়ের স্বপ্নের কবর দিয়েছে বাঙালী গেরিলারা। যে কোন বিদেশীর পক্ষে বাংলাদেশের এই বাস্তব পরিস্থিতিটুকু উপলব্ধি করা আদৌ কঠিন ব্যাপার নয়। কারণ শুধু গ্রাম বা প্রত্যন্ত অঞ্চল বলে নয়- বাংলাদেশের অধিকৃত এলাকাসমূহের প্রতিটি শহর-বন্দরের সর্বত্রই মুক্তিবাহিনীর দেখা পাওয়া আদৌ কষ্টসাধ্য নয়। হোটেল, রেস্তোরাঁ, ব্যাংক, দোকান, বিদেশী ফার্ম, কনসুলেট অফিস থেকে শুরু করে সরকারী অফিস আদালতের প্রত্যেকটি দফতরে তারা সক্রিয়। বাংলাদেশের আমি যেখানে গেছি, যার সঙ্গে কথা বলেছি সবখানে সবার মুখে একই কথা শুনেছি পাকিস্তানী হানাদারগুলোকে আমরা নিশ্চিহ্ন করবোই। আমাদের স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশকে পাকিস্তানী হানাদারমুক্ত না করা পর্যন্ত লড়াই চলবেই।

পাকিস্তানী বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা এখন এমন অবিশ্বাস্যরূপে কমতে শুরু করেছে যা বিশ্বাস করাও কঠিন। কিন্তু বাংলাদেশের ঘটনাবলী সম্পর্কে আজ এটাই কঠোর বাস্তব।

 

 

 

দৃষ্টিপাত

 

১৪ জুন, ১৯৭১

আমাদের চোখের সামনেই যেন একটি মর্মান্তিক ইতিহাস তার পৃষ্ঠাগুলো দিনের পর দিন উন্মোচন করে দিল। আর আমরা সবাই হয়ে থাকলাম ইতিহাসের এক-একজন উজ্জ্বল সাক্ষী। সর্বযুগের, সর্বকালের এবং সর্বদেশের একটি নিষ্ঠুরতম ঘটনা, একটি অমানুষিক পৈশাচিকতা, একটি হৃদয়বিদারক, বিশ্বাসঘাতকতা

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<005.005.087>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

 

আমাদের চোখের সামনেই ঘটে গেল। আমরা চোখ দিয়ে দেখলাম, আমাদের সমগ্র অনুভূতি দিয়ে অনুভব করলাম এবং আমরা সবাই বহু ত্যাগের মধ্যে দিয়ে দিনযাপন করে আবার নতুন সূর্যের অভিমুখে যাত্রা শুরু করলাম। নতুন দিনের আশায় আমরা সাড়ে সাত কোটি বাঙালী আজ উজ্জীবিত নতুন সংগ্রামে আমরা সমগ্র বাঙালী আজ শপথ গ্রহণ করেছি। এ সংগ্রাম আমাদের সুনিশ্চিত মুক্তি নিয়ে আসবে, এ সংগ্রাম আমাদের বিজয়ের তোরণদ্বারে উপস্থাপন করবেই।…

বন্ধু, আমরা তো কোন অন্যায় করি নাই। বৃটিশ বেনিয়াদের উৎখাত করে এদেশে স্বাধীনতা গোখলে তাই একদিন বাঙালীকে লক্ষ্য করে এ যুগের একটি পরম সত্যবানী উচ্চারণ করেছিলেন What Bengal thinks today, Indian thinks tomorrow -অর্থাৎ বাঙালী আজ যা ভাবে, সারা ভারত তা চিন্তা করে আগামীকাল। রামমোহন, চিত্তরঞ্জন, রবীন্দ্রনাথ, ইসমাইল হোসেন সিরাজী, নেতাজী সুভাষ বসু, নজরুল ইসলাম এবং এই জাতীয় আরো বহু নাম উচ্চারণ করা যায় যাঁরা সারা ভারতীয় উপমহাদেশকে মানবতার শিক্ষায় শিক্ষিত করেছেন এবং স্বাধীনতার দীক্ষায় দীক্ষিত করেছেন। পাকিস্তান আন্দোলনের ভিত্তিও ছিল বাংলাদেশ। ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগের জন্ম হয়েছিল বাংলাদেশের ঢাকায়। ১৯৪০ সালে পাকিস্তান প্রস্তাব যিনি সারা বিশ্বের কাছে পেশ করেছিলেন তিনিও ছিলেন একজন বাঙালী-বাংলার নয়নমণি, বাংলার বাঘ ফজলুল হক। পাকিস্তান অর্জনের প্রাক্কালে পাঞ্জাবে এবং সিন্ধুতে মুসলিম লীগের বিরোধী মন্ত্রিসভা ছিলসীমান্ত প্রদেশ পাকিস্তান চায় কিনা তা নির্ধারণ করতে হয় গণভোট নিয়ে। সারা পাকিস্তানে একমাত্র বাংলাদেশেই মুসলিম লীগ সরকার কায়েম ছিল। সুতরাং পাঞ্জাব ও সিন্ধু এবং সীমান্ত প্রদেশ পাকিস্তান আন্দোলনের প্রতি বহুলাংশে নিস্পৃহ ছিল-এ আন্দোলনে বলিষ্ঠ এবং অগ্রণী নেতৃত্ব গ্রহণ করেছিল বাংলাদেশ। বাঙালীর আন্দোলনেই পাকিস্তান এসেছে পাঞ্জাবীম সিন্ধী, বেলুচি বা পাঠানদের আন্দোলনে নয়। কিন্তু দুর্ভাগ্য এই যে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হবার সাথে সাথেই মাতব্বর হয়ে এলো পাঞ্জাবী, কি চাই? না লুটের মাল চাইএলো সিন্ধী, এলো পাঠান। কোথায় লুট করা যায়। আর কোথায়! সোনার বাংলায় সোনা ফলে। সুতরাং সবাই মিলে লুটের জন্য হাত বাড়ালো। কিন্তু লুট করতে গিয়ে দেখা গেল বাঙালীর সাধনা, বাঙালীর ঐতিহ্য, বাঙালীর সংস্কৃতি সব কিছু অত্যন্ত প্রদীপ্ত। সুতরাং শুরু হলো ষড়যন্ত্র। ধ্বংস, করতে হবে বাঙালীর আসল চেহারাকে। ইসলামকে সামনে রেখে পাকিস্তানের অখণ্ডতাকে সামনে রেখে তাদের এই লুণ্ঠনের কাজ সম্পন্ন করতে হবে। এরপর দিনের পর দিন ষড়যন্ত্রেও জাল বিস্তারিত হতে থাকলো। প্রথম আঘাত এলো ভাষার ওপর তারপর অর্থনীতির ক্ষেত্রে, রাজনীতি ক্ষেত্রে, সংস্কৃতির ক্ষেত্রে। শুরু হলো শোষণের এক সুপরিকল্পিত আয়োজন, আরম্ভ হোল শাসনের এক নিদারুণ প্রয়াস। আমরা পাকিস্তান অর্জন করেছিলাম এবং প্রত্যেকটি বাঙালী পাকিস্তানের নিষ্ঠাবান নাগরিক হিসেবে পাকিস্তানের আদর্শকে বিশ্বস্তভাবে অনুসরণ করতে একান্ত নাগরিরে পরিণত করলো। কথায় কথায় আমরা যে পাকিস্তানের সত্যিকার নাগরিক সে ব্যাপারে তারা সন্দেহ পোষণ করতে শুরু করলো-আমাদের আন্তরিকতা, আমাদের বিশ্বস্ত চেতনা সবকিছু পদদলিত করে আমাদের সবাইকে পর্দার সামনে থেকে পর্দার অন্তরালে নিয়ে যাবার সুপরিকল্পিত কাজ শুরু হোল। আর এই হোল পাকিস্তানের বিগত তেইশ বছরের ইতিহাস। বর্তমান শতাব্দীর নিমর্ম একটি ইতিকথা।

 

(‘চেনাকণ্ঠ” ছদ্মনামে ডঃ মযহারুল ইসলাম রচিত)

 

১৬ জুন ১৯৭১

বাংলার প্রাণের নেতা শেরে বাংলা ফজলুল হককে পশ্চিম পাকিস্তানের স্বার্থবাদীচক্রের মুখপাত্ররা of an foot of ST-T fossil of Mr. Fazlul Hoq is self-confessed traitor ১৯৫৪ সালের

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<005.005.088>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

 

নির্বাচনে কুচক্রী মুসলিম সরকারের অনুসারীগণ বাংলার মাটিতে সাংঘাতিক পরাজয়বরণ করে আবার পর্দার অন্তরালে ষড়যন্ত্রের আশ্রয় গ্রহণ করে। এই নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের একুশ দফার সপক্ষে সমগ্র বাঙালী অকুণ্ঠ রায় দিয়েছিলেন। বাঙালীর এই একতা ও নবজাগ্রত চেতনা পশ্চিমাদের ভয়ের ও আশঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়ায় বাংলাকে যেমন নির্বিচারে শোষণ করা চলছিল এবার সে পথে এক বিরাট বিঘ্ন সৃষ্টি হয়ে পড়ে। এই জাগ্রত জনতার পুরোভাগে দাঁড়িয়ে যখন শেরে বাংলা ফজলুল হক ব্ৰজকণ্ঠে ঘোষণা করতে থাকেন যে বাংলাকে আর শোষণ করতে দেয়া হবে না তখন পশ্চিমা আমলাগণ এবং স্বার্থবাদী রাজনীতিবিদরা বিপদ গুনতে শুরু করে। তাই ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার হতে থাকে-আর বাংলার অবিসংবাদিত নেতা ফজলুল হককে বলা হয় বিশ্বাসঘাতক। এই ষড়যন্ত্রের নেতা সেদিন ছিল ইস্কান্দার মির্জা, গোলাম মোহাম্মদ প্রমুখ। এদের সাথে হাত মিলিয়েছিল চুয়ান্নোর নির্বাচনে পরাজিত মুসলিম লীগের কতিপয় বাঙালী মীরজাফর। ১৯৫৫ সালের ২৯ শে মে বাংলার দরদী নেতা শেরে বাংলা ফজলুল হক যখন করাচী থেকে ঢাকা বিমানবন্দরে ফিরে এলেন তখন বিপুল জনতা তাঁকে সংবর্ধনা জানাতে সেখানে সমবেত হয়েছিলেন। কিন্তু ভাগ্যের কি পরিহাসনিজের দেশে ফিরে এসে, যে বাংলার মাটিকে ফজলুল হক প্রাণের মত ভালবাসতেন সেই মাটিতে দাঁড়িয়ে একটি কথা পর্যন্ত বলবার অধিকার তাঁর রইল না। সামরিক বাহিনীর কড়া পাহারায় তাঁকে বিমানবন্দর থেকে গৃহে নিয়ে যাওয়া হোল এবং নিজের ঘরে তাঁকে অন্তরীণাবদ্ধ করে রাখা হোল ছয় মাস তাঁকে বাইরের কোন লোকের সাথে মিশতে দেয়া হোত না। এমনকি পবিত্র ঈদের দিনে মুসলিম জামাতের সাথে একত্রে বসে নামাজ পড়তে পর্যন্ত তাঁকে দেয়া হোত না। বাংলাকে ভালবাসার এই হোল শাস্তি-বাংলার দুঃস্থ, নিঃস্ব, নিপীড়িত এবং বঞ্চিত মানুষের জন্য কথা বলার এই হোল সত্যিকার পুরস্কার। ঋণ সালিসী বোর্ড স্থাপন করে একদিন যে ফজলুল হক বাঙালীর অস্তিত্ব রক্ষা করতেন, বাংলার গ্রামে, বন্দরে, শহরে অসংখ্য স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠা করে শিক্ষার পথ যিনি সুগম করেন এবং সর্বোপরি লাহোর বৈঠকে যিনি সারা বিশ্বের সামনে পাকিস্তান প্রস্তাব তুলে ধরেন সেই ফজলুল হক, সেই শেরে বাংলা ফজলুল হক সেদিন প্রবীণ ও বৃদ্ধ বয়সে নিজের ঘরে বন্দী হয়ে রইলেন। যেদিন জীবনের সমস্ত বিশ্বাস ও আরাম-আয়েশ পরিত্যাগ করে দেশের স্বাধীনতার জন্য ফজলুল হক ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন সেদিন কোথায় ছিল ইস্কান্দার মির্জা, গোলাম মোহাম্মদ? বৃটিশের তাঁবেদার ও গোলাম সেজে তারা তখন চাকরি করতো ও নিজেদের সমস্ত বিপদ থেকে নিরাপদ দূরত্বে বাঁচিয়ে রেখে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের ওপর রক্তচক্ষু নিক্ষেপ করতো এই দুই পরাশ্রিত বশংবদ জানোয়ার। আর পাকিস্তান বলতে এদের এতটুকু বাধলো না।…

 

উনিশ শ’ সত্তরের নির্বাচনের পর এসেছে অভিশপ্ত একাত্তর সাল। এবারেও সেই একই খেলার ভয়াবহ পরিণাম আমাদের চোখের সামনে প্রত্যক্ষ হয়ে উঠেছে। চুয়ান্নোর নির্বাচনের পর শিকার ছিলেন শেরেবাংলা ফজলুল হক, প্রবীণ গণনেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী ও অসংখ্য দেশপ্রেমিক। শিকার ছিলেন শহীদ সোহরাওয়াদী এবং সেদিনের তরুণ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান। আর আজকের নির্বাচনের পর শিকার হয়েছেন বাংলার অবিসংবাদিত প্রাণের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান, তাঁর অনুসারীবৃন্দ এবং বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষ আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা। যে ইয়াহিয়া, টিক্কা এবং এম, এম, আহমেদ একদিন ছিল বৃটিশের পদলেহী চাকর, যারা স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় ছিল এক-একটি অখ্যাত-কুখ্যাত সাধারণ গোলাম, আজ তারাই হয়েছে দেশের হর্তাকর্তা-বিধাতা। আর ফজুলল হকের ভাগ্যে যেমন জুটেছিল বিশ্বাসঘাতকতার গ্রানি, তেমনি বাংলার প্রাণের নেতার সমগ্র পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের একমাত্র গণনেতা আজ হলেন দেশদ্রোহী। ভাগ্যের এ এক নির্মম পরিহাস বটে-রবীন্দ্রনাথের উপেনের ভাষায় “তুমি মহারাজ সাধু হলে আজ আর আমি চোর বটে।”

 

কিন্তু দিন আর বেশী দূরে নয় যখন এই ষড়যন্ত্রের জাল আমরা ছিন্নবিচ্ছিন্ন করবোই এবং বাং এই দানবদের নির্যাতন থেকে উদ্ধার করবোই। আসুন আপনি কৃষক-মজুর, আসুন আপনি চাকরিজীবী-বুদ্ধিজীবী, সবার ওপর এসো তোমরা ছাত্র-ছাত্রী, যুবক-তরুণের দল এবার আমরা দানব হত্যায় ও দানব বিতাড়নের

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<005.005.089>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

 

কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ি। আল্লাহ আমাদের সহায় হবেন। জয় বাংলা। (চেনাকণ্ঠ” ছদ্মনামে ডঃ মযহারুল ইসলাম রচিত)

 

২৩ জুলাই, ১৯৭১

পাকিস্তানের জঙ্গী শাসকবর্গ তাদের বেতার ও অন্যান্য প্রচারকেন্দ্রের মাধ্যমে বিশ্বের নিকট দিন-রাত প্রচার করে চলেছে যে তাদের দখলীকৃত বাংলাদেশের অঞ্চলসমূহ স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এসেছে। বিগত তিন মাসে জঙ্গী শাসকদের অমানুষিক কার্যকলাপ এবং সমগ্র প্রচারণা যে কিভাবে বিশ্বাসঘাতকতা ও মিথ্যাকে অবলম্বন করে অগ্রসর হয়েছে আমরা তা জানি এবং বিশ্বের নিকটও তা বিশেষভাবে প্রমাণিত হয়েছে। স্বাভাবিক অবস্থা সম্পর্কে পাকিস্তান সরকারের চীৎকার এবং ক্ৰন্দন এই বিশ্বাসঘাতকতা এবং মিথ্যা প্রচারণাই জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত।

মাসক্যারেনহাস নামক সানডে টাইমস’-এর একজন বিখ্যাত সাংবাদিক এই মাসের ১৩ তারিখে করাচী থেকে সপরিবারে লণ্ডনে চলে যান এবং সেখানে গিয়ে বাঙালী জাতিকে সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন করবার সুপরিকল্পিত কার্যকলাপের একটি লোমহর্ষক এবং প্রামাণ্য বর্ণনা দিয়েছেন। সানডে টাইমস-এর জেনোসাইড বা একটি জাতিকে নির্মুল করা সম্পর্কে এই প্রামাণ্য তথ্য আজ ইউরোপ, আমেরিকা এবং প্রাচ্যজগতে একটি আলোড়নের সৃষ্টি করেছে। তিনি স্বচক্ষে দেখেছেন কিভাবে শক্তসমর্থ যুবকদের ধরে নিয়ে গিয়ে শরীর থেকে ধরছে এবং খেয়ালখুশিমত গুলি করে মারছে। তিনি দেখেছেন এই বর্বর পশুগুলো কিভাবে যুবতী মেয়েদের ধরে নিয়ে গিয়ে পাশবিক অত্যাচার করছে। এবং এই জাতীয় আরো বহু চোখে দেখা ঘটনার বর্ণনা তিনি দিয়েছেন। আর এই ঘটনাগুলো সবই বেশী দিন আগের নয়। মে মাসের দ্বিতীয় ও তৃতীয় সপ্তাহের দিকে ঘটেছে। সুতরাং একদিকে মৃত্যুর নিষ্ঠুর লীলা চালিয়ে যাচ্ছে পাকিস্তানের বর্বর হানাদার সেনাবাহিনী, অন্যদিকে জঙ্গী সরকার প্রচারণা অব্যাহত রেখেছে যে অবস্থা স্বাভাবিক হয়েছে।

এই প্রসঙ্গে পি-টি-আই পরিবেশিত আর একটি চাঞ্চল্যকর ঘটনার উল্লেখ করবো। কোন একটি শহরে শতাধিক নিরীহ লোককে বলা হয় যে, রেশনের দোকানে এলে তাদেরকে সাপ্তাহিক রেশন দেয়া হবে। লোকজন সরল বিশ্বাসে রেশনের দোকানে উপস্থিত হয়। তখন সেনাবাহিনী রেশনের দোকান খুলে দিয়ে সেই শতাধিক লোককে দ্রব্য নিয়ে দোকান থেকে ঘরে ফিরে যাচ্ছিল তখন সৈন্যরা পেছন থেকে গুলি করে এবং শতাধিক লোককে সেখানেই হত্যা করে।

এগুলো সবই বর্বরতা এবং বিশ্বাসঘাতকতার এক-একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। আর এই দৃষ্টান্তগুলো এখন সবই ইউরোপ, আমেরিকা ও অন্যান্য বিদেশী পত্রিকাগুলোতে ব্যাপকভাবে প্রকাশ পেয়েছে। অন্যদিকে মিথ্যা প্রচারণার তো অন্ত নেই। দেশবাসী সবাই জানেন যে এখনো ট্রেন পুরো চালু করা সম্ভব হয়নি- যে সব জায়গায় দিনে একটি কি দুটো মাত্র ট্রেন চালু হয়েছে সেখানেও বাঙালীদের উঠবার বিশেষ সুযোগ নেই। সড়কপথেও অনুরূপ অবস্থা। মফস্বল শহরগুলোতে লোকজন ফিরে আসতে ভরসা পাচ্ছে না, কেননা বহু ঘটনায় দেখা গেছে যে লোকজন ফিরে এলেই তাদের ব্যাপকভাবে হত্যা করা হয়েছে। সুতরাং সড়কপথে গাড়ি দু’এক স্থানে চালু হলেও লোকজন নেই। জলপথের অবস্থাও একই রকম। স্কুল, কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় খোলা হয়েছে কিন্তু দু’একজন শিক্ষক কাজে যোগ দিলেও ছাত্র নেই- এবং এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে হানাদার সৈন্যদের বিতাড়িত না করা পর্যন্ত কোন ছাত্র পড়াশুনা করতে যাবে না।

অফিস-আদালতের অবস্থাও অন্যরূপ নয়। ঢাকার বেশকিছু পরিমাণ অফিস খোলা হয়েছে। কিন্তু ঢাকার অফিসগুলো মফস্বল শহরগুলোর অফিসের ওপর নির্ভরশীল। যেহেতু মফস্বল শহরে শতকরা আট-দশটির বেশী

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<005.005.090>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

 

অফিস চালু হয়নি, সেহেতু ঢাকায় লোকজন অফিসে গিয়ে বসে বসে স্ময় কাটানো ছাড়া করবার কিছু পাচ্ছেন না।

 

সুতরাং পাকিস্তানের জঙ্গী শাসক চীৎকার করে যতই বলুক যে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে এসেছে কিন্তু আসলে যে তা সত্য নয় একথা আমরা সবাই জানি। আর আমরা বাঙালী একথা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে বাংলাদেশকে যতদিন পর্যন্ত না হানাদার পশ্চিম পাকবাহিনীর হাত থেকে মুক্ত করা যাচ্ছে, ততদিন দেশে স্বাভাবিক অভস্থা ফিরে আসতে পারে না। সত্যিকারভাবে বাংলায় বিগত তিনমাসে যা ঘটেছে তারপর আর কোন অবস্থায়ই এই হানাদার পশুশক্তির সাথে সহযোগিতা করতে একটি বাঙালীও অগ্রসর হতে পারেন না। জোর করে কিছুসংখ্যক লোককে অফিসে, আদালতে, ট্রেনে, বাসে বা শহরে-নগরে নিয়ে এলেও বাংলার মানুষের মন জয় করবার সাধ্য এই পশুশক্তি চিরদিনের জন্য হারিয়ে ফেলেছে। আর তাদের বর্বরতা, তাদের ইতিহাসে নজীরবিহীন হত্যালীলা, পাশবিকতা ইত্যাদি কার্যকলাপের মাধ্যমে পাকিস্তান নামক দেশটি মৃত্যুবরণ করেছে-আর সেখানে জন্ম নিয়েছে স্বাধীন সার্বভৌম জনগণতান্ত্রিক বাংলাদেশ। আমাদের প্রিয় জন্মভূতি বাংলাদেশ। জয় বাংলা।

 

(চেনাকণ্ঠ” ছদ্মনামে ডঃ মযহারুল ইসলাম রচিত)

 

 

২৬ জুন, ১৯৭১

বাংলাদেশ ও নাম কানের ভিতর দিয়া মরমে পশে এ নামের লাবণী অবনি বহিয়া যায়। আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি। শেখ মুজিবের বড় প্রিয় গান। সাড়ে সাত কোটি বাঙালীর প্রাণের গান। এ গানে বাংলাদেশের মর্মকথাটি আছে। আমার কাছে এ গানের কিন্তু একটা ভিন্ন অর্থ আছে। মনে পড়ছে গাঁ থেকে ফিরছি। অদূরে রাজশাহী শহর দেখতে পাচ্ছি। তেসরা এপ্রিল। সকাল দশটা। মাথার ওপরে উড়ে এলো ইয়াহিয়া খানের জল্লাদ বিমান স্যাবর জেট। তারপর শুরু হলো নির্মম বোমা বর্ষণ। আমি তাড়াতাড়ি একটা খালে শুয়ে পড়লাম। কিন্তু খালটার দশহাত দূরেই একটি ছেলে হাল চাষ করছে। তাকেও শুয়ে পড়তে দেখলাম। কিন্তু সে নির্বিকার হাল চাষ করতে লাগলো। কোন কিছুই হয়নি। বিমানগুলি চলে গেলে আমি উঠে দাঁড়িয়ে কাপড়-চোপড় ঝাড়তে লাগলাম। কিন্তু ছেলেটি তখন গাইছে, আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি। আমাকে দেখে ও বলদ দুটি থামালো-বললো, আপনি বুঝি খুব ভয় পেয়েছিলেন? তার কথায় একটু বিদ্রুপের সুরও ছিল। বললাম, হ্যাঁ ভয় একটু পেয়েছিলাম বৈকি। বললাম, তোমার বুঝি ভয় করেনি। বললো, না। বললো, মরতে তো হবেই স্যার। জিজ্ঞেস করেছিলাম, তোমার নামটি কি ভাই? উত্তর এলো, অমল। ঘটনাটা ছোট্ট কিন্তু অসামান্য। অমল, বিমল, রহিম, করিম হাল-চাষ করছে আর গান গাইছে, আমার সোনার বাঙলা আমি তোমায় ভালবাসি।

হাঁটতে হাঁটতে আবার গাঁয়ের দিকে যাচ্ছি। আম বাগানের নীচে ইষ্ট পাকিস্তান রাইফেলসের বীর সেনানী ভাইরা বন্দুক নিয়ে শত্রুর মোকাবেলার জন্য প্রস্তুত হয়ে বসে আছি। রাজশাহী শহরের চারিদিকে অতন্দ্র প্রহরী এই ই-পি-আর বাহিনীর জোয়ানেরা। ওদের কাছে বসলাম। পাশেই বাজছে রেডিও। আবার গানঃ আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি। ই-পি-আর এর কয়েকজন জোয়ান গানের সঙ্গে পায়ের তাল ঠুকছে। ওরই মধ্যে একজন, নাম রশিদ। ঢাকায় বাড়ি, বললো, কি জানেন সাহেব, এ গানটা শুনলেই পরানটা এক্কেবারে ফাইট্যা যাবার চায়। বললো ঐ যে ছেলেটাকে দেখছেন, ঐ যে হাল চাষ করছে। ওর নাম অমল। কাল সারা রাত ট্রেঞ্চ কেটেছে আমাদের জন্য। আর এই যে দেখছেন বুড়ো মিয়াকে, ইনি মসজিদের ইমাম। সারাদিন আমাদের জন্য খাবার দিয়ে যাচ্ছে। পানি আনছেন। বিড়ি-সিগারেট জোগাড় করছেন। বুকটা আমার গর্বে ফুলে উঠলো। বাংলাদেশের মানুষ জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে শেখ মুজিবের আহবানে সাড়া দিয়েছেন। হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের এমন প্রমাণ আর কখনও দেখিনি…

 

(অধ্যাপক আব্দুল হাফিজ রচিত)

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<005.005.091>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

 

২৭ জুন, ১৯৭১

২৭ জুন, ১৯৭১

একজন মায়ের কথা বলছি। হ্যাঁ, একজন বাঙালী মায়ের কথাই বলতে চাইছি। মার্চ মাসে ইয়াহিয়ার সরকার বন্দুক-রাইফেল জমা দেবার নির্দেশ দিয়েছেন। কেউ কেউ জমাও দিয়েছিল। কিন্তু যে মায়ের কথা হাতে বন্দুক দেয়ার অর্থ মৃত্যুকে ডেকে আনা। মা-বোনের ইজ্জত রক্ষা করবি না তোরা? বললেন তিনি। আমার মনে আছে, তিনি তাঁর তিন ছেলেকেই বললেন, মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করো। হয় ইয়াহিয়ার সেনাদেরকে খতম করবে আর না হয় মরবে। ছেলেরা কথা রেখেছে। তাঁর এক ছেলে শহীদ হয়েছে। আর বাকী দুজন এখনও লড়ছে। গেরিলা আক্রমণে তারা দুজনেই সকলের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা পেয়েছে। এই কিছুদিন আগে এদের দু’ভাইয়ের সঙ্গে আমার আলাপ হলো। বললাম- তোমার মায়ের কথা বলো। বললে মা আছেন গাঁয়ে। তিনি তাঁর কাজ করছেন। সবাইকে মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেবার জন্য উদ্বুদ্ধ করছেন, প্রেরণা যোগাচ্ছেন। বললে- মা কি বলেন জানেন আপনি? বলেন, মাকে আর দেশকে এক করে দেখবি। তোমরা আমার ছেলে নও, তোমরা বাংলাদেশের সন্তান- এই কথাটা মনে রেখো, ইয়াহিয়ার রক্তপিপাসু সেনারা আমার মতো বহু রত্নপ্ৰসবিনী মাতাকে হত্যা করেছে। আর এখন রতুগর্ভা বাংলাদেশকে হত্যা করছে। কিন্তু ওরা জানে না, একজন মাকে হত্যা করা যায় কিন্তু দেশকে হত্যা করা যায় না। বাংলাদেশকে হত্যা করা যায় না। যাবেও না। মাতা আর পুত্রের রক্ত থেকে জন্মনেবে রক্তবীজের ঝাড় ।

 

এমনি মা আমরা পেয়েছি লক্ষ লক্ষ, আর এমনি পুত্ৰও পেয়েছি লক্ষ লক্ষ। শেখ মুজিবের বাংলাদেশ আজ মরণ-পণ লড়াইয়ে ব্যস্ত। সমস্ত শোষিত নিপীড়িত জনগণ আজ জেগে উঠেছে, হাতে তুলে নিয়েছে তারা ওপর। আর ভয় নেই। মুক্তিফৌজের বীর ভাইয়েরা প্রতিনিয়ত কঠিন আঘাত হানছে ইয়াহিয়ার সেনাদলের ওপর। আর ভয় নেই। মুক্তিফৌজির সামনে তিনটি প্রধান কর্তব্যঃ

(এক) শত্রু কে চূড়ান্ত আক্রমণ করতে হবে

(দুই) শত্রুর দালালদের খতম করতে হবে

(তিন) কে শত্রু আর কে মিত্র তা চিনতে হবে।

…আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধে লড়াই করছি, আমরা জানি পৃথিবীর যে সমস্ত স্থানে মুক্তিযুদ্ধ চললছে, তার মধ্যে বাংলাদেশের জাতীয় মুক্তি আন্দোলন সর্বাপেক্ষা গৌরবময়। কারণগুলো কি? প্রথম কারণঃ পৃথিবীর কোনও মুক্তিযুদ্ধ এমন অভূতপূর্ব গণঐক্য দেখে নি। দ্বিতীয় কারণঃ পৃথিবীর কোনও মুক্তিযুদ্ধই যুদ্ধের শুরুতেই সশস্ত্র বাহিনীর এমন সমর্থন লাভ করেনি। স্মরণ করুন কিভাবে আমরা ই-পি-আর, ই-বি-আর পুলিশ, আনসার এবং মুজাহিদ ভাইদের সহযোগিতা পেয়েছি এবং এ মুহুর্তেও তারা কিভাবে জনগণের পাশে দাঁড়িয়ে লড়াই করে যাচ্ছেন। এমন কি ভিয়েতনামের যুদ্ধেও প্রথম দিকে এ ধরনের সশস্ত্র সমর্থন পাওয়া যায়নি, কাজেই সবদিক থেকে বিচার বিবেচনা করে বলা যায় আমরা সবাই একটি গৌরবময় মহান যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করছি। মনে রাখতে হবে, আমাদের মুক্তিযুদ্ধের কারণসমূহ যথার্থ। আমরা লড়াই করছি ন্যায়ের জন্য এবং আমাদের লড়াইও যথার্থ পথ ধরে অগ্রসর হচ্ছে। কাজেই বিশ্বের সকল দেশ থেকে আমরা সমর্থন, সাহায্য ও সহানুভূতি পাবোই এবং পাচ্ছিও….

 

(অধ্যাপক আবদুল হাফিজ রচিত)

 

৯ জুলাই, ১৯৭১

মাঠে মারা গিয়েছে ইয়াহিয়া খানের লম্বা-চওড়া রেডিও গলাবাজি। শাহী কায়দায় ফরমান জারির ভঙ্গিতে কাকাতুয়া ইংরেজীতে আওড়ানো প্রায় একঘন্টার নরম গরম চরম বিলাপ আর প্রলাপ কি করে দাগ রাখবে

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<005.005.092>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

 

দুনিয়ার মানুষের মনে? তবু, যাদের মাথায় দুবুদ্ধি ভর করেছে, যাদের মাধ্যমণি হিসেবে ইয়াহিয়া খান ধরাকে সরা জ্ঞান করেছে, তারা এই রেডিও গলাবাজির আগে একটা অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির জন্যে বাজনা তো কম দেশদেশান্তরে মিষ্টি কথা তো কম পরিবেশন করেনি। পাকিস্তানী শাসকচক্রের ঝানু ঝানু উপদেষ্টারা ইতিমধ্যে তদ্বির-তদারকের বাকি কিছু রাখেনি। কিন্তু কোন ফল হলো না। ইয়াহিয়া খানের ২৮ শে জুনের রেডিও ভাষণ একটা জঘন্য অপভাষণ হিসেবেই বরং চিহ্নিত হয়ে গেল। উলঙ্গ হয়ে ধরা পড়ে গেলে রাওয়ালপিণ্ডি সামরিকচক্রের সেই মুনাফালোভী দুবুদ্ধিতা, যা এই চক্রকে বাংলাদেশ দমনে প্রবৃত্ত করেছে। ইয়াহিয়া খান তার প্রলাপে বলেছে যে, রাওয়ালপিণ্ডির সামরিক চক্র নিজেরাই শাসনতন্ত্র রচনা করবে। তারা পশ্চিম পাকিস্তানের নির্বাচিত প্রতিনিধিদেরও শাসনতন্ত্র রচনার এখতিয়ার নাকচ করে দিয়েছে। বাংলাদেশকে তো তারা ধ্বংস করতেই চেয়েছে। এটা ইয়াহিয়ার কারণে দুনিয়ার কাছে জাহির হয়ে গিয়েছে।

২৮শে জুনের আগে দুনিয়ার যেসব রাষ্ট্রের কর্মকর্তারা চিন্তা করছিলেন যে, দাবনীয় অপকর্ম করে ফেলে হাতেনাতে ধরা পরে ইয়াহিয়া খানেরা হয়তো তওবা করে পশ্চিম পাকিস্তানে বহাল থাকার জন্যেও দুনিয়ার কাছে একটা সম্মানজনক মীমাংসাসূত্র রাখতে পারবে, তারাও খুঁজে পেতে কিছু পায়নি ইয়াহিয়া খানের বাচনে।

বস্তুতপক্ষে ২৮শে জুনের পরে বিভিন্ন রাষ্ট্রের মুখপাত্র এবং প্রতিনিধিবৃন্দ বাংলাদেশের ঘটনা সম্পর্কে যেসব বক্তব্য বলেছেন, তাদের প্রত্যেকটি থেকেই একথা বুঝতে পারা যায় যে, এইসব মুখপাত্র এবং প্রতিনিধি ইয়াহিয়া খানের বাচনকে আমলেই আনেননি। নিউজিল্যাণ্ডের প্রধানমন্ত্রী এবং পশ্চিম জার্মানীর পররাষ্ট্র বিষয়ক মন্ত্রী বাংলাদেশ সম্বন্ধে বলতে গিয়ে বাংলাদেশের পক্ষে গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক মীমাংসাসূত্রের জন্যেই তাগিদ দিয়েছেন। এটা ধরে নেওয়া যায়, তাঁরা কূটনৈতিক সূত্রে ইয়াহিয়া খানের রাজনৈতিক সমাধান সূত্রগুলিকে প্রত্যাখান করেছেন।

কানাডা আর আয়ারল্যান্ডের আইন পরিষদের যেসব সদস্য বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ সফরে এসেছেন, তাদেরও একই কথা। তাঁরা স্বচক্ষে দেখে যাচ্ছেন, বাংলাদেশে ইয়াহিয়া খানের রাওয়ালপিণ্ডি চক্রের জল্লাদেরা একটা গোটা জাতিকে সাড়ে সাত কোটি নরনারী শিশুকে ধ্বংস করে দেওয়ার উদ্দেশ্য কি ধরনের হত্যাকাণ্ড করেছে। বাংলাদেশের প্রশ্নে রাজনৈতিক সমাধানের যে তাগিদ তাঁরা দিয়েছেন তাতে বুঝতে পারা যায়, ইয়াহিয়ার বাচনকে তাঁরা ঝাড়া অগ্রাহ্য করেছে। গোটা বাঙালী জাতিকে নিধন করার জন্য পাকিস্তানী শাসকচক্র যে ষড়যন্ত্র চালিয়ে এসেছে এতদিন, ইয়াহিয়ার বক্তব্য তারই একটা বেতালা পদক্ষেপের মহড়া ছাড়া যে আর কিছু নয় সে কথা আজ বিশ্বের মানুষ বুঝে নিয়েছে। পূর্ব ইউরোপের বিভিন্ন সমাজতন্ত্রী দেশ বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের পক্ষে তাঁদের সমর্থন জানিয়ে আসছে। সর্বশেষ সংবাদে দেখা গেল, চেকোশ্লোভাকিয়ার কর্মকর্তারা সরকারীভাবে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের পক্ষে সমর্থন জানিয়েছেন। তাঁরা বাংলাদেশের ব্যাপারে রাজনৈতিক মীমাংসার জন্যে তাগিদ দিয়েছেন। এর সোজা অর্থ এই যে, ইয়াহিয়া খানের রেডিও বাচনকে তাঁরা ধর্তব্যের মধ্যেই আনেননি। বাংলাদেশ আজ স্বাধীন। এটাই সত্য, এটাই বাস্তব, এটাই বর্তমান, এটাই ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ নিজের শাসনতন্ত্র নিজেরাই তৈরী করবে। দুনিয়ার দেশ-দেশান্তরের কাছে এই ঘটনা অনিবার্য অপ্রতিরোধ্য ঘটনা হিসেবে উন্মোচিত হয়ে চলেছে। ইয়াহিয়া খানেরা মিথ্যা। স্বাধীন বাংলাদেশ সত্য। বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি নরনারী-শিশু বুকের রক্ত ঢেলে এই সত্যের ভিত্তিতেই বাংলাদেশের মুক্তির দিনকে এগিয়ে নিয়ে আসছেন।

 

(“জামিল শারাফি’ ছদ্মনামে রণেশ দাশগুপ্ত রচিত)

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<005.005.093>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

 

১০ জুলাই, ১৯৭১

রাওয়ালপিণ্ডি থেকে দুটো পত্র পৌঁছেছে লণ্ডনে। সরকারীভাবে সরকারী চিঠি। এগুলো নাকি প্রতিবাদলিপি। কিন্তু কিসের প্রতিবাদ? দুনিয়া তাজব হয়ে গিয়েছে খবরটা শুনে। পাকিস্তানী জল্লাদ সরকার বৃটিশ প্রধানমন্ত্রীর কাছে লিখে জানিয়েছে, বাংলাদেশের ঘটনা নিয়ে বৃটেনের সংবাদপত্রে পাকিস্তানবিরোধী প্রচার চলছে- এ প্রচার বন্ধ করার ব্যবস্থা হোক।

বিশ্ববাসীর মনে স্বভাবতই দুটো প্রশ্ন জেগেছে। বাংলাদেশ নিজেকে স্বাধীন বলে ঘোষণা করার পরেও যে পাকিস্তানী স্বৈরাচারী শাসকচক্র অতীতের রেশ ধরে বাংলাদেশের ঘটনাকে এখনও আভ্যন্তরীণ ব্যাপার বলে বোঝাতে চেষ্টা করছে। আর শুধুমাত্র অস্ত্রপাতির জোরে বলে বেড়াচ্ছে যে বাংলাদেশ তাদের দখলে রয়েছে- তারা বৃটেনের খবরের কাগজগুলি কি লিখছে না লিখছে তার ওপর খবরদারি করতে চাইছে কোন লজ্জায়? এটা হতে পারে প্রথম প্রশ্ন।

দ্বিতীয় প্রশ্নটা ভিন্ন ব্যাপার থেকে এসেছে। পাকিস্তানী জল্লাদেরা নিজেদের হাতে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ধ্বংস করা ঢাকা কিংবা চট্টগ্রাম নগরীতে রাজমিস্ত্রী দিয়ে দুটো-চারটে দালানকোঠা মেরামত করিয়ে আর রং ফিরিয়ে, নিজেদের হাতে খুন করা হাজার হাজার নরনারী-শিশুর গলিত লাশ গুম করে সাফাই-সাক্ষীর মারফত প্রমাণ করার চেষ্টায় ছিল যে, পাকিস্তানী ফৌজের লোকেরা বেকসুর, মাসুম; তারা দুষ্টের দমন আর ক্যান্টনমেন্টে বসে আছে জনসংযোগ দফতর হাট করে খুলে। ফল এতে উল্টোই হয়েছে। সাংবাদিকরা অবরুদ্ধ নগরীগুলিতে ঢুকবার সুযোগ কাজে লাগিয়েছেন এবং ফাঁস করে দিয়েছেন পাকিস্তানী জল্লাদদের সমস্ত গোমর। শেষ রক্ষা করার জন্যে, সত্যের বিশ্বপরিব্যাপ্ত অগ্নিশিখাগুলিকে ঢাকা দেবার জন্যে পাকিস্তানী জল্লাদেরা এখন চেষ্টা করছে বিভিন্ন দেশের সরকারকে দিয়ে কিছু একটা করাতে। কিন্তু এদের মাথায় কি এ কথাটা ঢুকছে না যে, যে হাত দিয়ে এরা সত্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদপত্র লিখছে, তা বাংলাদেশের নিরস্ত্র নিরীহ নরনারী-শিশুর রক্তে রঞ্জিত সে রক্তের দাগ লেগে যাচ্ছে এদের চিঠিপত্রেও? তবে দুনিয়ার সামনে উপরোক্ত দুটো প্রশ্নের একটাই জবাব রয়েছে। দু’কান কাটা রাস্তার মাঝ দিয়েই চলে। আসামীর কাঠগড়ায় উঠে আবোল-তাবোল বকে পাগলের ভান করে। সত্যকে চাপা দেবার জন্যে পাকিস্তানী জল্লাদেরা কম চেষ্টা করেনি এরা ২৫শে মার্চে নৈশ হামলা শুরু করার সঙ্গে সঙ্গে ঢাকা নগরীতে সমাগত সমস্ত বিদিশী সাংবাদিকদের হোটেলের কামরায় আটকে রেখেছিল। তা সত্ত্বেও সেই অবরোধ ভেদ করে সাংবাদিকরা পাকিস্তানী জল্লাদদের নারকীয় কাণ্ডের যে তথ্য আর ছবি নিয়েছিল, সেই সব তথ্য আর ছবি কেড়ে নেয়া হয়েছিল করাচী বিমানবন্দরে। আন্তর্জাতিক রেডক্রসের স্বেচ্ছাসেবী বাহিনীকে এরা ঢুকতে দেয়নি, পাছে পাপ প্রকাশ পেয়ে যায় এই চিন্তায়। এরা বাংলাদেশের যেসব খবরের কাগজের অফিসকে দালান সমেত পুড়িয়ে ছাই করেনি, তাদের ওপর জঙ্গী আইনের নিষেধাজ্ঞা জারি করে। কোন ফাঁকে যাতে বাংলাদেশ থেকে খবর বাইরে না যেতে পারে সে জন্যে এরা বিদেশীদের জন্যে নির্ধারিত কূটনৈতিক শিষ্টাচারকে বুটের তলায় মাড়াতেও দ্বিধা করেনি। কিন্তু সত্যকে চাপা দেওয়া যায়নি। পাকিস্তানী জল্লাদেরা ভেবেছিল, দিন চলে যাবে একরকম করে এবং দুনিয়ার মানুষ আস্তে আস্তে ভুলে যাবে।

 

(“জামিল শারাফী’ ছদ্মনামে রণেশ দাশগুপ্ত রচিত)

 

১৬ জুলাই, ১৯৭১

বাংলাদেশের মত এমন শান্তির দেশ, এমন সুখের দেশ আর কোথায় আছে। এমন জন্মভূমি ক’জনে ভাগ্যে পায়। সুজলা সুফলা শস্যশ্যামলা বঙ্গজননী। বাংলাদেশের ছেলে-মেয়েরা চিরকাল ঘরকুনো। বুঝিবা একটু আডডাবাজ। কিন্তু বাংলার ছেলেমেয়েরা কোনোদিন গোলমালে নিজেদেরকে জড়াতে চায়নি। মায়ের স্নেহ, দাদা-

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<005.005.094>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

 

দাদী আর নানা-নানীর আদর কেড়ে বাংলার ছেলেমেয়েরা মানুষ হয়। অথচ আজ! ভাবলে অবাক লাগে। এই তো সেদিন ঘুরছি আর ঘুরছি। হঠাৎ গিয়ে হাজির হলাম মুক্তিবাহিনীর শিবিরে। শান্ত নিরীহ বাঙালীর ছেলেরা দীপ্ত অগ্নিশিখার মত জ্বলছে। এক একটি ছেলে যেন জীবন-মৃত্যুকে পায়ের ভূত্য করে নিয়েছে। মায়ের আচল ছেড়ে, ঘরের নিশ্চিন্ত কোণ ছেড়ে, সামান্য সুখ আর আনন্দের পথ ত্যাগ করে বাংলাদেশের ছেলেরা এই প্রথম অস্ত্রের ভাষায় কথা বলছে। পার্থক্যটা অনুভব না করে উপায় নেই। আমিও না করে পারিনি। বাংলাদেশে স্কুল-কলেজ বন্ধ। কিন্তু বন্ধ নেই মুক্তিবাহিনীর স্কুল-কলেজ। তা সব সময়ই খোলা।

এমনি একটি মুক্তিবাহিনীর শিবিরে গেলাম সেদিন। সোনার টুকরো হীরের টুকরো সব ছেলেরা লড়াইয়ে যাবে তাই তৈরী হচ্ছে। বললাম, কেমন আছো ভাইরা আমার? কেমন আছো? সবাই বললে ভালো আছি। বললেঃ আমাদের বিপ্লবী সেলাম নিন। ওদের সঙ্গে কথা বললাম। পেয়ালা পেয়ালা চা খেলাম। একজন বললেঃ আমরা এখন লড়াই করতে যাচ্ছি। বললাম- সে কি? এক্ষুনি? হ্যাঁ এক্ষুনি। প্রথমে অবশ্য বুঝতে পারিনি। পরে বুঝেছিলাম। অস্ত্রে ওরা দীক্ষিত হচ্ছে- অস্ত্রে ওরা শাণ দিচ্ছে। ওদের সমস্ত মাংসপেশীগুলো ক্রমাগত শক্তিশালী হচ্ছে, ওরা পায়ের তালে তালে মার্চ করছে- ওরা তৈরি হচ্ছে, লড়াই করতে যাচ্ছে। বাংলার সন্তান মুক্তিযুদ্ধে লড়ছে, শক্র নিকেশ করছে। পার্থক্যটা সত্যিই ভুলবার মত নয়। মায়ের আদূরে বেগ। ওদের একজন বললে-দেখবেন লড়াইটা। বলার অপেক্ষা মাত্র। সঙ্গে সঙ্গে ওরা দু’ভাগে ভাগ হয়ে গেল। একদল মুক্তিবাহিনী আর একদল পাক-সেনা শুরু হল লড়াই। ইয়াহিয়ার সেনাবাহিনী হেরে গেল। আমি হাততালি দিয়ে ওদের অভ্যর্থনা জানালাম। এরপর ওরা গেরিলাযুদ্ধের কলাকৌশল দেখালো। আর একবার হাততালি দিয়ে ওদেরকে অভিনন্দন জানালাম। ওদের অবসর ওরা এমনি করে কাটায়। আনন্দের মধ্যে শিক্ষা আর শিক্ষার মধ্যে আনন্দ। মুক্তিবাহিনীর ছেলেরা এভাবে তৈরী হচ্ছে। ইয়াহিয়ার খুনী সেনাবাহিনীর কবর রচিত হবে অচিরে।

 

(অধ্যাপক আবদুল হাফিজ রচিত)

 

 

১৯ জুলাই, ১৯৭১

কবি শহীদ সাবের আজ আর নেই- কিন্তু তার কবিতা আছে। সেই কবিতাটিই পড়ছিলাম। গত মহাযুদ্ধের সময় ফ্যাসিস্ট জার্মান বাহিনী যেভাবে গেরিলাদের ওপর অত্যাচার চালিয়েছিল- সেসব কথা মনে পড়েছিলো শহীদ সাবেরের। সাবেরের মনে তৈরি হচ্ছিল বিদ্যুতের-জন্ম হচ্ছিল একটি কবিতার- আর সে কবিতা মুহুর্তে মনকে আক্রান্ত করে।

কবিতাটি পড়ছিলাম। শহীদ সাবের আজ আর নেই। বাংলাদেশে ইয়াহিয়ার বর্বর সেনাবাহিনী হত্যা করেছে শহীদ সাবেরকে হত্যা বলবো, না অন্য কিছু? শহীদ থাকতেন ঢাকার দৈনিক পত্রিকা ‘সংবাদ’-এর কার্যালয়ে আগুনে-বোমা ফেলে পুড়িয়ে দেওয়া হল সংবাদ কার্যালয়। তাঁরই সঙ্গে পুড়ে গেলেন শহীদ সাবেরযে শহীদ সাবের ছিলেন ফ্যাসি-বিরোধী, যে শহীদ ছিলেন মুক্ত মানবতার প্রতীক। ইয়াহিয়ার খুনী সেনাবাহিনী শুধু অধ্যাপক হত্যাই করেনি। কবি-সাহিত্যিক-শিল্পী কেউ বাদ যায়নি।

শহীদ সাবের নেই- কিন্তু আছে তাঁর কবিতা। কবিতাটির একটি ভূমিকা লিখেছিলেন সরদার ফজলুল করিম। লিখেছিলেনঃ

 

‘কিশোর শহীদ সাবের আমারই ন্যায় জেল থেকে জেলান্তরিত হতে হতে রাজশাহী সেন্ট্রাল জেলে এসে আমার সঙ্গে দৈবক্রমে মিলিত হয়েছিলেন। রাজশাহীর সাঁওতাল কৃষকদের আত্মপ্রতিষ্ঠার আন্দোলন পূর্ববাংলার

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<005.005.095>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

 

আন্দোলনের মধ্যমণি ছিল। আর সে আন্দোলনের সঙ্গে ইলা মিত্রের নামও ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল।”… সরদার ফজলুল করিম আরও লিখেছেনঃ “ইলা মিত্রের গ্রেফতার এবং তার উপর অনুষ্ঠিত নির্যাতন তখনকার সংগ্রামের উপকথায় পরিণত হয়েছিল। সে কাহিনীর ভিত্তিতে শহীদ সাবের তাঁর ‘শোকার্ত মায়ের প্রতি কবিতাটি রচনা করেন।” সংক্ষেপে এই হল শহীদ সাবেরের সেই বিখ্যাত কবিতার পটভূমি। তাঁর মনে পড়েছিল হিটলারের ফ্যাসিস্ট বাহিনীর অত্যাচারের কথা। কিন্তু যে কারণে আমি বিস্ময় বোধকরি, তা হল শহীদ সাবেরের সেই কবিতায় ইয়াহিয়ার খুনী জল্লাদ সেনাবাহিনীর অত্যাচার, নারী নির্যাতন ধর্ষণ, অপহরণ, খুন সবই প্রতিফলিত হয়েছে বিস্ময়কর ভাষায়। কবিরা নাকি ভবিষ্যৎ দেখতে পান। দেখতে পেয়েছিলেন শহীদ সাবেরও। সবচাইতে বড় কথা সেই ফ্যাসিস্ট নির্যাতনের শিকার হলেন কবি নিজেই। এমন করে নিজের ভবিষ্যৎ আর কোনও কবি দেখেছেন কি? আছে কি বিশ্বে কোনও উদাহরণ? না নেই- শুধু আছে এই বাংলাদেশে। শহীদের সেই কবিতার ভাষা তাই কান্নায় সিক্ত, ঘৃণায় ঘৃণায় উচ্চকিত, ছন্দে ছন্দে উচ্ছসিত, পাশব শক্তির ঘৃণ্যতম অত্যাচারের কথা এমন কোরে কেউ কখনও প্রকাশ করেনি।…

 

 

কবিতাটির প্রথম অংশে দেখা যাচ্ছে একজন জার্মান ফ্যাসিস্ট ক্যাপ্টেন ভের্নের গর্ভবতী একজন রুশ মহিলাকে উলঙ্গ করছে। কারণ, সেই রুশ মা ছিলেন গেরিলা দলের সদস্যা। তাই এই নির্মম অত্যাচার। শহীদ সাবের লিখেছেনঃ

 

মাগো, মা আমার কাঁদছো তুমি?

আমাকে একবার দেখো,

দেখো, আমি স্থির, আটল, চোখের পাতাটি নড়ছে না।

চেয়ে দেখো, আমার হাতে লাল মলাটের বই,

কারা-প্রাচীরের অন্তরালে, লুকিয়ে আনা বইটি।

এখন আমার চোখে ভেসে উঠেছে

সেতো তোমারি ছবি মাগো।

 

কি সেই ছবি? ছবিটা দেখুন।

 

চারদিকে রক্ত-জমানো হিমেল মৃত্যু

আর তুমি দাঁড়িয়ে আছ জার্মান কমান্ডারের সামনে

মাগো ক্যাপ্টেন ভের্নের কি বুঝবে বলো?

কেন তুমি যোগ দিয়েছ গেরিলা দলে?

স্বদেশ প্রেমের আগুন কত জ্বলে

পররাষ্ট্র লোভী নাৎসীরা কি বুঝবে তা।

 

 

না, শুধু হিটলারের ফ্যাসিষ্ট বাহিনী নয়। বোঝেনি ইয়াহিয়ার ফ্যাসিস্ট জল্লাদ সেনারাও। শহীদ সাবের তারপর লিখেছেন দ্বিতীয় দৃশ্য। ফ্যাসিস্টরা ধরে নিয়ে গেছে গর্ভবতী মাতাকে। পথেই তার সন্তান হল। মায়ের কোল থেকে দস্যরা কেড়ে নিলে নবজাতককে।

 

তারপর আমি দেখছি পরিষ্কার

সেই হাড় কাঁপানো শীতের রাতে, সেই দুঃসহ শীতে

তুমি উলঙ্গ, মাগো তুমি উলঙ্গ

 

 

 

 

 

 

 

<005.005.096>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

 

 

সেই বরফের আস্তরণের উপর দিয়ে ধীর পদক্ষেপে তুমি

হেঁটে চলেছ মাগো, পেছনে বেয়োনেটের ডগা

ছুঁয়ে আছে পিঠেতে তোমার,

দস্যুরা হাসছে মাগো, মাতৃমূর্তির নগ্নতায়,

তোমার সন্তান ভরা পেট ঝুলে পড়েছে মাগো

 

*       *       *       *       *

 

তুমি এখন জন্ম দিচ্ছ একটি সন্তানের

কি দারণ যন্ত্রণা বলোঃ

একটি ক্ষুদ্র লাল মাংসপিণ্ডঃ আগামী দিনের

এক সর্বহারা সেনা বেরিয়ে আসে ধীরে।

শিশুটি ছিনিয়ে নিলে তোমার কোল থেকে

 

*       *       *       *       *

 

শয়তান তোমার ছেলের জাম কবজের দিক হুমকি

মাগো, তুমি, মা- তোমার একটি কথার পরে

করছে নির্ভর অসংখ্য তরুণ গেরিলার প্রাণ

তুমি তো জননী, বলবে না একটি কথাও।

 

না জননী একটি কথাও বলেননি। তাঁর চোখের সামনে তার সাদ্যোজাত শিশুকে হত্যা করা হলো। পরে তিনি নিজেও প্রাণ দিলেন। বাংলাদেশের মা-বোনদের ওপরে এমনি নির্যাতন চালিয়েছে ইয়াহিয়ার বর্বর সেনারা।…

 

শহীদ সাবের লিখেছিলেনঃ

আর দেখ আমি কারাগারে

মাগো তুমি কেঁদো না, কেঁদো না

আমার জন্যে কেঁদো না, দেখ দেখ

আমি স্থির, আটল…

 

না, শহীদ সাবেরের জন্য আমরা কাঁদবো না। বাংলাদেশের তিনিই প্রথম কবি যিনি ইয়াহিয়ার বর্বর ফ্যাসিষ্ট সেনাদের হাতে প্রাণ দিলেন।…

 

 

(অধ্যাপক আবদুল হাফিজ রচিত)

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<005.005.097>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

 

২০ জুলাই, ১৯৭১

 

…পাকিস্তান সরকার শিক্ষিত সেনাবাহিনীর নিয়মিত মৃত্যু রোধ করতে আরও কিছু ব্যবস্থা নিয়েছে? যেমন- রাজাকার বাহিনী তৈরী করেছে বিভিন্ন অঞ্চলে। আকাশ থেকে নিক্ষেপ করেছে রাশি রাশি প্রচারপত্র। তাতে বলা হয়েছেঃ হে দেশপ্রেমিক জনগণ দুষ্কৃতকারী ও অনুপ্রবেশকারীরা বড্ড খারাপ কাজ করছে। আপনারা তাদেরকে ধরিয়ে দিয়ে দেশপ্রেমের পরাকাষ্ঠা দেখান। বাংলাদেশে ইয়াহিয়া খাঁ সাহেবদের জন্য এখনও দেশপ্রেমিক আছে, এ কথা ভাবলে হাসি পায়। তবে একটা কথা বলতেই হয়, বাংলাদেশের মানুষ দেশপ্রেমের বাস্তব পরাকাষ্ঠার প্রমাণ দিয়েছেন হাতে হাতে।

একজন কৃষক ভাইয়ের সাথে আলাপ করছি। তিনি জমিতে রোয়া লাগাচ্ছিলেন। বললাম- কেমন আছেন? বললে-ভাল আছি, খুব ভাল আছি। বলেই মাথার টোপরের ভেতর থেকে একখানা কাগজ বের করে দিলে। বললে, এই এক্ষুণি ফেলেছে বিমান থেকে। ওখানেই বসে বসে পড়লাম। সেই প্রচারপত্র যাতে দেশপ্রেমিক জনগণের প্রতি আবেদন জানানো হয়েছে। কৃষক ভাইটি জানালেন, মুক্তিবাহিনীকে বলবেনতাদের জন্য আমরা ধান-চাল আটা-গম সব মজুদ করে রেখেছি। এমন জায়গায় রেখেছি, খান সেনাদের চোঁদ্দপুরুষও খুঁজে পাবে না।

অবাক লাগলো। একজন সাধারণ চাষী মুক্তিবাহিনীর জন্য সর্বস্ব পণ করেছেন। অবশ্য এটাই স্বাভাবিক। বাংলাদেশে ইয়াহিয়ার দস্যু সেনাবাহিনী যা করছে, তা সমস্ত অত্যাচারের ইতিহাসকে স্নান করে দিয়েছে। প্রতিটি কৃষক, শ্রমিক, মধ্যবিত্ত, বুদ্ধিজীবী প্রতিদিন অনুভব করছেন, পশ্চিম পাকিস্তানের পুঁজিবাদী ধনিকদের দালাল পাকিস্তানী হানাদার সেনার হাত থেকে মুক্ত করতেই হবে স্বদেশকে তাই দেশের সমস্ত অঞ্চলে মুক্তিবাহিনীকে সাহায্য করছেন। দেশের সাধারণ মানুষ। মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে জনগণের আন্তরিক সহযোগিতাই মুক্তিবাহিনীর সাফল্যের কারণ। রাজাকার বাহিনী কিংবা শান্তি কমিটি করেও কূল পাওয়া যাচ্ছে না। জনগণের ব্যাপক অংশে বিরাজ করছে অসন্তোষের তীব্র দাবদাহ।…

আজ পাকিস্তান বলতে যা বোঝায়- তা হল পশ্চিম পাকিস্তান। পশ্চিম পাকিস্তানের সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কোনো অভিযোগ নেই। পশ্চিম পাকিস্তানের সাধারণ মানুষ আমাদের মতই শোষিত, বঞ্চিত, নির্যাতিত। কিন্তু পাকিস্তানী শাসকচক্র পশ্চিম পাকিস্তানের সাধারণ মানুষকে মিথ্যে ভাঁওতায় ভুলিয়ে, কাশ্মীরে নিয়ে যাওয়ার নাম করে বাঙালীকে হত্যা করবার কাজে লাগাতে চেয়েছে। সিন্ধু থেকে কৌশলে এভাবে স্বল্পমেয়াদী ট্রেনিংপ্রাপ্ত লোক আনা হয়েছে সীমান্ত অঞ্চল রক্ষার জন্যে মুক্তিবাহিনীর হাতে এরাও প্রচণ্ড মার খাচ্ছে।

গোড়াতে সেই যে চাষী ভাইয়ের কথা বলেছিলাম। তিনিই বলছিলেন- একটা মজার ব্যাপার দেখেছেন? মজার ব্যাপার? আমি অবাক হলাম- চারিদিকে হত্যাকাণ্ড, লুটতরাজ এবং অত্যাচারের মধ্যে মজার ব্যাপারটা কি? তিনি বলছিলেন, সিন্ধু থেকে আনা একদল সেনা রাস্তার ধারে বসে নিজেদের ভাগ্য নিয়ে আলোচনা করছে। তারা এ হত্যাকাণ্ডে নিজেদের হাত রক্তাক্ত করতে চায় না। তাদের মধ্যে কেউ কেউ দেশে ফিরে যেতে চায়। আর কেউ বা বসে বসে কাঁদে। এরা যুদ্ধ করতে চায় না, মরতে চায় না। পাকিস্তানী শাসকচক্র সিন্ধুর শোষিত জনগণকে লেলিয়ে দিয়েছে শোষিত বাঙালীদের বিরুদ্ধে। মানুষ যুদ্ধ নয়- মানুষ ভাবে, মানুষ চিন্তা করে, মানুষেরই শুধু বিবেক রয়েছে। তাই সিন্ধী, বেলুচী এবং সীমান্ত প্রদেশের লোকেরা লড়তে চায় না। একজন কম্যাণ্ডিং অফিসার তার অধীনস্থ সেনাদেরকে বাঙালীদের বাড়ি ঘর লুট করতে বললে তারা রাজী হয়নি। উল্টো তারা কম্যাণ্ডিং অফিসারকেই হত্যা করে।…

 

 

(অধ্যাপক আবদুল হফিজ রচিত)

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<005.005.098>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

 

২ নভেম্বর, ১৯৭১

 

বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ এলাকা আজ শত্রুমুক্ত। এইসব জায়গায় মুক্তিবাহিনীর সহায়তায় গ্রামবাসী প্রতিটি গ্রমকে দুর্ভেদ্য দুর্গের মতো করে গড়ে তুলেছে। যে হাত কেবল লাঙল ধরতো, কিংবা কলম ধরতো, কিংবা যে হাতে একতারা শোভা পেতো-সেই হাত, সেই একই হাত আজ তুলে নিয়েছে রাইফেল।

এই সব এলাকা কয়েকদিন আগে ঘোরার সময় খান সেনাদের অত্যাচারের চিহ্ন দেখেছি, শুনেছি তাদের বর্বরতার কথা, জেনেছি মুক্তিবাহিনী ও গ্রামবাসীর সম্মিলিত ক্রমাগত যুদ্ধের কথা, জয়ের কথা। তরুণ যোদ্ধাদের সঙ্গে ভাব-বিনিময় করেছি এবং বার বার অনুভব করেছি কি গভীর আমাদের দেশের মানুষের দেশপ্রেম; কি প্রচণ্ড সংগ্রামের, যুদ্ধের ইচ্ছা তাদের। এবং কি কঠিন পণ নিয়েছে তারা সবকিছু উৎসর্গ করে স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার।

এসব জায়গায় যে কদিন খান সেনারা ছিল, সে কদিন তারা গ্রামগুলোর ওপর দিয়ে অত্যাচারের ঝড় বইয়ে দিয়েছে। বহু মানুষের ঘর-বাড়ি জ্বালিয়েছে, ফসলের ক্ষতি করেছে, বাজার-দোকানপাট জ্বালিয়েছে, মানুষকে, অত্যাচার করেছে মেয়েদের উপর। এইসব অন্যায়-অত্যাচারের মধ্য দিয়ে মানুষ-পদদলিত, শোষিত মানুষ জেগে উঠেছে। তাদের চোখে এখন শত্রু হননের আকাঙ্খা। জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত প্রতিটি মানুষ এখন যুদ্ধ করে যেতে চায়। একজন গ্রামবাসী আমায় বললেনঃ যুদ্ধ তো সবে শুরু, এখনই কি জয়ের কথা বলেন। খান সেনাদের বিষদাঁত ভেঙে না দেয়া পর্যন্ত জয় কিসের। আমাদের হাতে অস্ত্র ছিলো না তাই খান সেনারা ফাঁকা মাঠে কারদানি দেখিয়েছে, এখন তো আমরা সবে অস্ত্র ধরেছি, তারা শোধ তুলবো না?

গ্রামের একজন যুবক বললেন, ‘অস্ত্র যখন ধরেছি তখন বেঁচে থাকতে খান সেনারা এই গ্রামে আর ঢুকতে পারবে না। চেষ্টাও তারা কম করেনি, ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়েও চেষ্টা করেছে, কিন্তু এখন মজাটা টের পেয়েছে তারা। এখন তারা মাইল সাতেক দূরে থানা গেড়েছে।’

সবখানেই এক মানসিকতা। খরচাপাতি কমিয়ে দিয়েছে সবাই। খাদ্যসামগ্রী জমিয়ে রাখছে ভবিষ্যতের জন্য। গ্রামের এখানে-ওখানে জঙ্গল হয়ে গেছে- আমাদের যোদ্ধাদের জন্য খুবই অনুকূল। গ্রামবাংলা যুদ্ধ ও জীবন সব এখন একাকার হয়ে গেছে।

 

মুক্তিযোদ্ধারা এমন চতুরতার সঙ্গে খানসেনাদের ঘায়েল করে চলেছে যে আমাদের কোন প্রাণহানি হয় না বল্লেই চলে। তার কারণ নিজেদের পরিচিত দেশে যুদ্ধ করে চলেছে মুক্তিসেনারা সহজে তারা দেশের মাটির সঙ্গে, মানুষের সঙ্গে মিশে যেতে পারে। মানুষের শত্রুখান সেনারা তা পারে না। কাউকেই তারা বিশ্বাস করতে পারে না, দেশের মাটি ও পরিবেশ তাদের অনুকূল নয়। কারণ এদেশ তাদের নয়, এদেশকে তারা জানে না, এ দেশের মানুষকে চেনে না, জানে না। তারা কেউ এদেশের নয়। তারা যে জোর করে এদেশে থাকতে চাইছে সেটি নিতান্তই অস্বাভাবিক ব্যাপার তাই তারা এদেশে থাকতে পারবে না, এদেশ থেকে তাদের চলে যেতে হবে, এদেশের মানুষই তাদের তাড়িয়ে দেবে। মাটির সঙ্গে ও মানুষের সঙ্গে যারা শত্রুতার করে তাদের এরকমই পরিণত হয়ে থাকে।

যুদ্ধ কিভাবে জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে তা দু-পাঁচজন মুক্তিসেনার সঙ্গে আলাপ করলেই জানা যায়। যারা আহত হয় তাদের কারুর হাতে বা পায়ে, কিংবা কাঁদে বা শরীরের অন্য কোথাও হয়তো গুলি লাগে। এগুলো যেন কাউকে বলার মতো কোন ব্যাপার নয়। নিতান্ত জিজ্ঞেস করলে উত্তর পাওয়া যায়ঃ গুলি তা লেগেছিল

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<005.005.099>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

গোটা দুই-হাত কিংবা পায়ে বা অন্য কোথাও বেশ কিছু ছেলে বিকলাঙ্গ হয়ে গেছে, কিন্তু তাদের কাছে তা বিশেষ কোন ব্যাপার নয়, জীবনে আর পাঁচটা ঘটনা প্রত্যেকদিন ঘটে, ঘটেছে; এও তেমনি। সে জন্যে এসব ব্যাপারে কোন মুক্তিসেনার ভ্রক্ষেপও নেই। তাদের সবার সামনে একটি মাত্র লক্ষ্য-শত্রু ধ্বংস করা।

দুটি তরুণের কথা শুনলাম। কয়েকবার যুদ্ধ করেছে এমন একটি ছেলের নাম খোকন। স্কুলের ছাত্র। হালকা গড়ন। লাজুক লাজুক ভাব। সবার সঙ্গে বিনয়ের সঙ্গে কথা বলতো। যুদ্ধ করতে করতে এমন অবস্থা হয়েছিল যে, কোন সুযোগ এলেই সে লাফিয়ে উঠতো। তার সঙ্গে শেষবারের মতো যখন আমার দেখা হয় তখন সে বারবার আমাকে বলেছিল, “আমাদের একমাত্র উদ্দেশ্য শুক্র খতম করে এদেশের শোষিত মানুষকে সত্যিকার স্বাধীনতা দেয়া। কেউ যেন আর কোন দিন আমাদের বঞ্চিত পদদলিত করতে না পারে সে জন্যই আমরা জীবন দিচ্ছি। পাক-সেনাদের দ্বিমুখী আক্রমণের সম্মুখীন হয়েছিল খোকন। একটি সজিনা গাছের আড়ালে লুকিয়ে গুলি চালাচ্ছিল সে। তার শেষ চেষ্টা ছিল সঙ্গীদের বাঁচানো। কয়েকজন খানসেনাকে খতম করার পর একটি গুলি সজিনা গাছ ভেদে করে তার শরীর বিদ্ধ করে। মৃত্যুর শেষ মুহুর্তে তার উত্তর ছিল একজন খান সেনার উদ্দেশে একটি হ্যান্ড গ্রেনেড ছুড়ে দেয়া। তাতেই খানরা তাদের বহু সঙ্গীকে হারিয়ে পালিয়ে যায়।

কাছাকাছি এক শিবিরে দেখা হয় হাবলুর সঙ্গে। তার বুকে পাশ থেকে এক ঝাঁক গুলি এসে লাগে। বাঁ হাতেও লাগে কয়েকটি গুলি, বা পা-ও রেহাই পায়নি। ডান হাত ছাড়া হাবলুর কোন অঙ্গই আর চালু ছিল না। বুক পেটের সামনের মাংস সমেত উড়ে চলে যায়, হাত-পা আচল তবু হাবলু যুদ্ধ চালিয়ে গেছে এক হাতে, ছুড়েছে গ্রেনেড। যে খানসেনাটি তাকে গুলি করেছিল তাকে হাবলু শেষ করেছে এক গ্রেনেডেই। সামনে যে কয়টি পড়েছিল তাদের কাউকেই ছাড়েনি সে। তারপর বুকে হেঁটে জীবন ও মৃত্যুর সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে সে নিরাপদ জায়গায় চলে। হাবলুর বাঁ হাতের আঙ্গুলগুলো অচল হয়ে গেছে।

হাবলু বললো, “আমরা এখন খানদের একেবারে কাছে না পেলে আর গুলি ছুড়ি না। ওরা এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়ে, আমরা হিসেব করে গুলি খরচ করি। ওরা বেহিসাবীর মতো মরে, মরে অন্যায়ের ধ্বজাধারী হয়ে। আমরা মরি স্বাধীনতা রক্ষার জন্য, প্রতিটি প্রাণ আমাদের অমূল্য, একটি একটি মৃত্যু একটি অবদান।”

এরকম বহু খোকন ও হাবলুর সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে। তারা সবাই প্রাণ দিচ্ছে, দেবে। তারা বারবার বলেছে, এই যুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমরা শোষণের শেষ ঘাঁটিটি পর্যন্ত ধ্বংস করতে চাই। কড়াই থেকে আগুনে পড়তে চাই না আমরা। দশ লক্ষ নিরীহ মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে। মরছে প্রতিদিন হাজার হাজার। রক্ত দিচ্ছে মুক্তিসেনারা, দেশ সম্পূর্ণ শত্রুমুক্ত না হওয়া পর্যন্ত এর বিরাম নেই। কিন্তু তার মাধ্যমে মানুষে মানুষে ভেদাভেদ যেন মুছে যায়, শোষক যেন ধ্বংস হয়। শোষক যেন না গজায়, গরম কড়াই থেকে আমরা যেন আগুনে না পড়ি। তাহলেই, কেবল তাহলেই আমাদের জীবন বিসর্জন, আমাদের সংগ্রাম, আমাদের যুদ্ধ, আমাদের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ সার্থক হবে।

 

(“জাফর সাদেক’ ছদ্মনামে মোহাম্মদ আবু জাফর রচিত)

 

৩ নভেম্বর, ১৯৭১

 

‘মাথার ঘায়ে কুকুর পাগল প্রবাদটি বিশেষভাবে প্রযোজ্য পিণ্ডি অধিকর্তাদের বেলায়। কয়েক লক্ষ মানুষকে হত্যা করে, ৯০ লক্ষ লোককে দেশত্যাগী, আরো অসংখ্য গৃহ ভস্মীভূত এবং লুণ্ঠন করে হঠাৎ টনক নড়েছে। আজ ইয়াহিয়ার বাদশাহী সিংহাসন টলোমলো, জল্লাদবাহিনীর আর্তনাদে মুখর সমস্ত পাকিস্তানের আকাশ বাতাস। যারা এসেছিল এদেশকে পদানত করতে, শৃংখল পরাতে, ধনসম্পদ লুট করতে আজ মুক্তি বাহিনীর প্রতিরোধের মুখে হত্যাকারী হয়ে উঠেছে হতোদম, গতপ্রাণ। জল্লাদ বাহিনীর মনেও আজ ভয়, সন্ত্রাস দানা বেদে উঠেছে। মুক্তিবাহিনীর নাম শুনলে তিনবার ইষ্টদেবতার নাম স্মরণ করে।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<005.005.100>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

 

এখন উপায়? উপায় খুঁজে বের করেছে বিশ্ব ইতিহাসের ঘৃণিত নায়ক, বুদ্ধিবিবেক বর্জিত সেনাপতি ইয়াহিয়া খান। খবরের কাগজে প্রকাশিত হলো বিবৃতি, সর্ব অসত্যের ভাণ্ডার রেডিও পাকিস্তান থেকে ক্ষণে গৃহহীন আশ্রয়হীন সংসারকে টিকিয়ে রাখার জন্য, একটু আশ্রয়, একটু নিরাপত্তার অভিপ্ৰায়ে। দরদবিগলিত কণ্ঠে পরম বন্ধুর মতো আহবান এলো- ‘আয়, ওরে আয় ঘর ছেড়ে যারা গেছিস তারা আয়। তোদের সব আছে, তোদের সব দেবো। কিন্তু বাংলার মানুষ দুর্জনের আশ্বাসে ভুলল না। কেননা তারা জানে, ‘খলের ছলের অভাব হয় না। একবার তারা আঘাত পেয়েছে, বহু কষ্টে বুকের পাথর চাপা দিয়ে ভুলে আছে মা বোন ভাই আত্মীয়স্বজনের হত্যার কাহিনী। তারা চায় নায় আবার সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হোক।

ইয়াহিয়ার তাঁবেদাররা বলল, ‘সংবর্ধনা শিবিরগুলি ফেরত-উদ্বাস্তুদের দ্বারা ভেঙ্গে গেছে।” সংগে সংগে ইংল্যাণ্ডের একটি পত্রিকায় প্রকাশিত হলো, ‘সংবর্ধনা সভায় একটি লোকও দেখলাম না। দুর্জনদের মিথ্যা উক্তির প্রমাণটি লক্ষ্য করুন।

যারা মানুষকে ঘরছাড়া করার জন্য সর্বশক্তি প্রয়োগ করেছে, বাঙালীকে হত্যা করে সংখ্যাসমতা আনতে চাইছে- তাদের কোন আশ্বাস কি সংগ্রামী মানুষ সুস্থ মানুষের উক্তি বলে গ্রহণ করতে পারে?…

শুধু এই নয়, আরো আছে। ইয়াহিয়া নির্বাচনের দিন ও তারিখ ঘোষণা করেছে। ভাবখানা এই, নিজের মুরগী যেদিকে ইচ্ছা সেদিকে কাটব’। কিন্তু সাড়ে সাত কোটি মানুষের অধিকার, ভাগ্য, ধ্যান-ধারণা তো সস্তা বা মূল্যহীন নয়। ইয়াহিয়া খান অনুভব করেছে এতদিনে।

আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হলো, জনপ্রিয় অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, নির্বাচিত সদস্যবৃন্দ, আওয়ামী লীগের সদস্যদের দেশদ্রোহী বলে ফরমান জারি করা হলো। আবার সেই ব্যক্তি যে দলটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করলো, সে দলেরই নির্বাচিত কতিপয় সদস্যদের আবার বৈধ বলে মেনে নিলো। প্রবঞ্চক প্রবঞ্চনার পথ বেছে নিলো। বাতিলকৃত সদস্যপদ আবার নির্বাচন হবে। এ যেন ছেলের হাতের মোয়া। সামরিক শক্তির বলে গণমানুষের মৌলিক অধিকার হরণ করা যেন ছেলেখেলা ব্যাপার।

শুধু তাই না, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রতিনিধি নির্বাচিতও হয়ে যাচ্ছে। আর আশ্চর্য, আওয়ামী লীগের সংগে প্রতিদ্বন্দ্বিতায়, খেলা আর বলে কাকে? মনগড়া হিসেবে বিশ্বকে ভাঁওতা দেয়ার যে পথ বেছে নিয়েছিল ইয়াহিয়া খান, আজ তা নিদারুণভাবে ব্যর্থতায় পর্যবসিত। বাংলার মানুষ আজ তার জবাব দিচ্ছে প্রতিটি ক্ষেত্রে এবং বারবার।…

 

(মুস্তাফিজুর রহমান রচিত)

 

৭ নভেম্বর, ১৯৭১

জল্লাদ বাহিনীর মৃত অফিসারদের জন্য কাটের বাক্স তৈরী করা হচ্ছে এবং সেটা হচ্ছে ব্যাপকহারে। বেচারা কাঠমিস্ত্রীর শান্তি বা স্বস্তি নেই। দিন-রাত তার কাজ-বাক্স বানাও। মরা লাশগুলোকে জলদি পাঠাও নিজের দেশের মাটিতে। কারণ? কারণ অনেকগুলো। প্রথমত, বাংলার মানুষ যেন বুঝতে না পারে যে বর্বরবাহিনীর অফিসাগুলোর একে একে লোপাট হয়ে যাচ্ছে। দ্বিতীয়, বাংলার মাটিতে ওদের ঠাঁই নাই। কেননা ওরা বাংলার নয়। বাংলার মাটির এতোটুকু দরদ নেই ওদের জন্য। বাংলা শুধু বাংলাদেশের জনগনের। এখানের সাহিত্য-সংস্কৃতি, ঐতিহ্য কৃষ্টি সব এদেশেরই। এসবই বেড়ে উঠেছে সবুজ কোমল লতার মতো বাংলার মাটি থেকে। তাই এ মাটিতে কি ঠাই পেতে পারে যারা বাঙালী বিদ্বেষী, যারা বাংলার পয়লা নম্বরের দুশমন? কখনোই না।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<005.005.101>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

 

হিংস্র পশুদের খাঁচা থেকে ছেড়ে দেয়া হয়েছিল বাংলার শ্যামল প্রান্তর আর জনপদে। লোভী, বিবেকহীন পশুর দল দিকদিশাহীনভাবে চালিয়েছে অত্যাচার, হনন আর সন্ত্রাসের রাজত্ব।

কিন্তু তারপর? কুল আর রক্ষা হয় না। চারিদিক থেকে আঘাত হানছে বাংলার মানুষ। পথে-ঘাটে, হাটে-বাজারে, শহরে-বন্দরে, জলে-স্থলে, যেখানেই সুযোগ পাচ্ছে, অতর্কিত আক্রমণ চালিয়ে তাদের খতম করছে। এখন শয়তানদের পথ চলতে ভয়, ঘরের মধ্যেও নেই স্বস্তির আশ্রয়।

এজন্যেই নিজের প্রাণ বাঁচানোর জন্যে এবং মুক্তিবাহিনীর আক্রমণ প্রতিরোধ করার জন্য রাইফেল দেখিয়ে টেনে নিয়ে আসছে খেটেখাওয়া সাধারণ মানুষকে। তাদের আড়ালে এগিয়ে আসছে মুক্তিবাহিনীর সম্মুখে। কিন্তু এতেও কুল রক্ষা হচ্ছে না। তীক্ষ্ণধী, সদজাগ্রত বাংলার প্রহরী মুক্তিবাহিনী তাদের কৌশল ধরে ফেলেছে। পাল্টা এমন আঘাত হানছে যে দস্যুর দল পরি কি মরি করে পালাতে দিশা পাচ্ছে না।

ভীত সন্ত্রস্ত জল্লাদবাহিনী শহরের চারপাশে নদীর ধারে গড়েছে বাঙ্কার, বসিয়েছে মেশিনগান। কিন্তু রাতের অন্ধকারে গা মিশিয়ে এসে মুক্তিবাহিনী আচমকা ঝাঁপিয়ে পড়ে ওদের উপর, তাই কোন কিছুতেই বিশ্বাস নেই। নদী দিয়ে পানা ভেসে যাবে ওদের সামনে দিয়ে? যাদি মুক্তিবাহিনী হয়? মেশিনগানের গুলি চলে পানার ওপর।

রাতের অন্ধকারে শিয়াল-কুকুরেরও ওদের সীমানা দিয়ে যাওয়ার উপায় নাই। হত্যাকারীদের ধারণা, মুক্তিবাহিনীর গেরিলারা যেকোন রূপ ধারণ করতে পারে-অতএব দৃশ্যগোচর কোন কিছুকেই ক্ষমা নেই।

রাতের বেলায় মুক্তিবাহিনীর গুলির শব্দ পেলে সে পথে তারা হাঁটে না। প্রথমে তাদের পরম ভৃত্য রাজাকারদের পাঠিয়ে খোজ খবর নেয়, পরে বিশ্বাসযোগ্য হলে সেখানে যায়।

একবার রাতের বেলায় গেরিলারা একজন পাক দালালের বাড়ি ঘেরাও করে তাকে হত্যা করে। দালালের এক শুভানুধ্যায়ী উর্ধ্বশ্বাসে ছুটে যায় পার্শ্ববর্তী জল্লাদবাহিনীর ক্যান্টনমেন্টে। খবর দেয়, ‘হুজুর, অমুককে মুক্তিবাহিনী এসে মেরে ফেলল। এখনো ওরা আছে, রাজাকারদের খুঁজে বেড়াচ্ছে। কাপুরুষ পশুপ্রবর, খেকিয়ে উঠে বলল, ‘হাম কিয়া করেগা। মুক্তিফৌজ আয়া হ্যায়, তুম লোগ যা কর হঠা দো। আভি হাম নেহি যায়েগা, সুবাহ মে যায়েগা। নিরাশ হয়ে ফিরে এলো দালালের সাগরেদ।

এখন ফল হয়েছে অন্যরকম। এখন বরং পশুগুলো এলে এইসব ঘা খাওয়া মানুষগুলোই এসে খবর দেয়, ‘ওরা এসেছে। তাদের সংখ্যা এবং শক্তি সমস্তই পুংখানুপুংখরূপে জানিয়ে দেয় মুক্তিবাহিনীকে।

যারা নেহাৎই প্রাণের দায়ে শান্তি কমিটির সদস্য হয়েছিল বা রাজাকারে নাম লিখিয়েছিল, আজ তারা সর্বতোভাবে সাহায্য করতে প্রস্তুত। শুধু তাই নয়, মুক্তিবাহিনীর প্রচণ্ড মারের সামনে টিকতে না পেরে দলে দলে রাজাকার আত্মসমর্পণ করছে। জংগীশাহীর জঘন্যতার রূপটাও ফাঁস করে দিচ্ছে।

আজ স্পষ্টভাবে প্রমাণ হয়ে গেছে ভাড়াটে সৈন্যের চেয়ে হাজার গুণ শক্তিশালী দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ সৈনিক। আমাদের গেরিলারা আজ তাই হয়ে উঠেছে অজেয়, দুর্বার।

আর পক্ষান্তরে এবং মুক্তিবাহিনীর সাম্রাজ্য বাসনা ঘরের মতো ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে।

দুঃসাহসী গেরিলাদের এবং মুক্তিবাহিনীর আক্রমণে খতমকৃত জালেম বাহিনীর অফিসারের জন্য আর কতো কতো কাটের বাক্স লাগবে, তার খতিয়ান কি করছে ইয়াহিয়া খান?

(মুস্তাফিজুর রহমান রচিত)

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<005.005.102>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

 

১ ডিসেম্বর, ১৯৭১

যাদের চক্ষু আছে এবং চক্ষু থেকেও যাঁরা অন্ধ নন, আজ তাঁদেরকে একবার বাংলাদেশের রণাঙ্গনে দিকে দৃষ্টিপাত করতে অনুরোধ করবো। একবার চোখ খুলে দেখুন আমাদের সংগ্রামী বীর যোদ্ধা বাঙালী যুবকগণ কিভাবে পশ্চিম পাকের হানাদার পশুদের খতম করে ক্রমাগত জয়যাত্রার পথে এগিয়ে চলেছেন। বাংলাদেশের চূড়ান্ত দুর্দিনে পশু পাকসেনাদের হাত থেকে দেশকে সম্পূর্ণ মুক্ত করবার জন্য মুক্তিবাহিনীর বীর সৈনিকগণ আত্মত্যাগ, সাহসিকতা, বিক্রম, ধৈর্য এবং দেশপ্রেমিকতার যে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, বিশ্বের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে তার নিদর্শন একান্ত বিরল। একবার চেয়ে দেখুন যশোর রণাঙ্গনের দিকে-আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের আঘাত সামালাতে অপারগ হয়ে কিভাবে খানসেনারা পশ্চাদপসারণ করছে। খুলনায় একটি জাহাজ ডুবিয়ে আমাদের সেনারা জাহাজ চলাচলের পথ রুদ্ধ করে দিয়েছেন। সিলেট, চাটগাঁ, কুমিল্লা, নোয়াখালী, ময়মনসিংহ, রংপুর, দিনাজপুর, রাজশাহী, বগুড়া, পাবনা, কুষ্টিয়া সর্বত্রই আমাদের বীর যোদ্ধাদের অগ্রগতি এবং পাকসেনাদের পরাজয় অব্যাহত রয়েছে। ঢাকায় বেসামাল হয়ে সামরিকচক্র বারবার সান্ধ্য আইন জারি করে নিরীহ নিরস্ত্র নাগরিকদের হত্যা ও নির্যাতন করছে। কিন্তু তাই বলে বাঙালীর মনোবল হ্রাস পায়নি। আমাদের বীর সেনাদের অগ্রগতি দেখুন এবং জেনে রাখুন, ইনশাল্লাহ সময় আর খুব দূরে নাই যখন ঢাকায় স্বাধীন বাংলার পতাকা গৌরবের সঙ্গেই উত্তোলিত হবে।

সে কারণেই বলছিলাম যাঁদের চক্ষু থেকেও যাঁরা অন্ধ নন আজ তাঁরা চোখ খুলে একবার দেখুনশ্রবণশক্তি যদি বধির না হয়ে থাকে তবে স্বাধীন বাংলার বেতার কেন্দ্রের এই বিজয় বার্তাগুলো শুনুন। কথাগুলো এইজন্য বলছি যে বাংলাদেশ এখনো কিছুসংখ্যক বাঙালী আছেন যারা চোখ থেকেও অন্ধ এবং শ্রবণশক্তি থেকেও বধির। ঢাকা, রাজশাহী প্রভৃতি বেতার কেন্দ্রে এই জাতীয় কিছু অন্ধও বধির বাঙালী এখনো পশ্চিম পাকিস্তানের প্রভুদের মনোরঞ্জনের জন্য দেদার চীৎকার করে যাচ্ছেন। এইসব বাতুলদের তখনই জ্ঞানোদয় হবে যখন মুক্তিবাহিনীর সঙ্গীন তাদের গর্দানকে স্পর্শ করবে। যে প্রভুদের মনোরঞ্জনের জন্য এখনো কিছুসংখ্যক জন্মদালাল বাঙালী গলদঘর্ম হচ্ছেন তাদের বোঝা উচিত যে আজ ঐসব প্রভুদের কি অবস্থা। পশ্চিম পাকিস্তানেও বিদ্রোহের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে উঠছে। বেলুচিস্তানে বেলুচরা এবং সীমান্ত প্রদেশে পাঠানরা এবার অস্ত্ৰধারণ করেছে। এমান কী রাজনীতির ক্ষেত্রে বালকোচিতে চাপল্যই যাঁর বৈশিষ্ট্য সেই জুলফিকার আলী ভূট্টোর খোদ জন্মভূমি সিন্ধু ও আজ বিক্ষুদ্ধ। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, ভূট্টো এবং ইয়াহিয়া চক্রের পালাবার স্থানটি পর্যন্ত থাকবে না। এই দুই জানোয়ারের শেষের সেই ভয়ঙ্কর দিনটির কথাই আমরা এখন ভাবছি।

জানি, বহু দুঃখ এবং বেদনা, এবং নিপীড়ন বহু রক্তক্ষয় এবং মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের মানুষের দিন কেটেছে এবং এখনো অনেক ক্ষেত্রে সেভাবেই তাঁদের দিন কাটাতে হচ্ছে। জানি, আমরা যারা স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশে দুদিন পর বিজয়ীর বেশে নতুন করে যাত্রা শুরু করবো, তাদের অনেকেই প্রিয়জন হারানোর গভীর বেদনাকে কোনদিন ভুলতে পারবো না। যে জীবন আমরা হারিয়েছি, যে সম্মান এবং ইজ্জত আমরা পশুদের হাতে বিসর্জন দিয়েছি, যে সম্পদ আমাদের লুষ্ঠিত হয়েছে, জানি, সেসব আর ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু এই অবক্ষয়, এই অপরিসীম ত্যাগের মধ্য দিয়ে আমরা একটি জাতিকে, একটি দেশকে বিশ্বের ইতিহাসে নবজন্ম দান করতে চলেছি- এই মহান গৌরব একান্তভাবেই আমাদের বাংলাদেশের বর্তমান বংশধরদের। আমাদের পূর্বপুরুষদের এই গৌরব অর্জনের সৌভাগ্য হয়নি। সেদিকে থেকে আমরা অনেক ভাগ্যবান। দুঃখ আমাদের অনেক হয়েছে, রক্ত এবং জীবন আমাদের প্রচুর দিতে হয়েছে সত্য কিন্তু স্বাধীনতার জন্য এই মৃত্যু এই রক্তদান, এই আত্মত্যাগ সবকিছুর মধ্যেই একটি বিরাট মাহাত্ম্য আছে। সেই মাহাত্ম্যই আমাদের মহীয়ান করে তুলেছে। তার জোরেই ভবিষ্যৎ বংশধরগণ আমাদের ললাটে গৌরবের টিকা দিয়ে বলতে পারবে যে আমরা আজ দেশের কারণে মরতে শিখেছিলাম বলেই তারা মানুষের মত বাঁচতে পারবে। আমাদের

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<005.005.103>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

 

আত্মত্যাগ ও মৃত্যুর মাধ্যমে ভবিষ্যত বংশধরদের সত্যিকার মানুষের মত বাঁচবার একটি স্থান, একটি পথ আমরা আজ তৈরি করে যাচ্ছি। যে মহৎ কারণের জন্য জীবনের মায়াকে তুচ্ছ করে, অনেক অভাব ও দীনতাকে হাসিমুখে বরণ করে এবং দুঃখ-কষ্ট ও দুর্ভোগের সকল ছোবলকে দু’পায়ে দলিতমথিত করে আজ বাংলাদেশের মানুষ সংগ্রামে লিপ্ত রয়েছেন, তার মূল্য মানুষের ভাষায় নির্ণয় করা দুঃসাধ্য। এই মহান কারণ ও সংগ্রামের উজ্জ্বলতম আদর্শ শুধু বাংলাদেশের নয়, ভবিষ্যতে সমস্ত বিশ্বের সমাজ গঠনে ব্যাপকভাবে সাহায্য করবে। বাঙালী জাতি হিসাবে আমরা যে সমগ্র বিশ্বের সম্মুখে এই একট অত্যুজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপনে সমর্থ হয়েছি, তা কম গৌরবের কথা নয়।…

এটা অত্যন্ত আশার কথা যে বিশ্ববিবেকের ক্ষেত্রে আজ আশানুরূপ পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। বিশ্বের বিবেকসম্পন্ন সকল মানুষ আজ উপলব্ধি করেছেন যে, আমাদের সংগ্রাম ন্যায়ের পথে, সত্যের পথে। অবশ্য বাংলাদেশের মানবতার যে অপমান সংঘটিত হয়েছে, মানবতার ইতিহাসে তুলনা হয় না। আর এই লাঞ্ছিত মানবতাকে রক্ষার জন্য সভ্যতাগর্বী উন্নত দেশগুলো সক্রিয়ভাবে এগিয়ে আসবেন, আমরা গোড়া থেকেই এমন আশা করেছিলাম। সে আশা আমাদের সম্পূর্ণভাবে সফল হয়েছে একথা আমরা বলতে পারবো না। গণতন্ত্রের আদর্শকে সমগ্র বিশ্বে যাঁরা সমুন্নত রেখেছেন বলে গর্ব করেন, সেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকারী ভূমিকা আমাদের সম্পূর্ণ নিরাশ করেছে।

বিশ্বের জনগণ আমদের সাথে আছেন। এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জনগণও আমদের সংগ্রামকে সমর্থন করেন। এ ছাড়া বিশ্বের সর্বত্রই বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম মোটামুটি একটি সহানুভূতি লাভে সমর্থ হয়েছে। আমরা আশা করব, আমাদের চুড়ান্ত বিজয়ের দিন ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে বিশ্ব বিবেক আমাদের সপক্ষে আরো জাগ্রত হবে। আমরা একথা জানি,স্বাধীনতা কোনদিন শুধুমাত্র অপরের সাহায্যে আসে না সংগ্রাম ও ত্যাগের মাধ্যমে সেই স্বাধীনতা অর্জন ও রক্ষা করতে হবে। আমরা তাই আজ দিকে দিকে সংগ্রামের এমন দুষ্কর যাত্রাপথকে বেছে নিয়েছি। আর এই সংগ্রামই আমাদেরকে বিজয়ের পথে দ্রুত এগিয়ে নিয়ে চলেছে। মুক্তিবাহিনীর জয়পতাকার ছায়া আজ বাংলা সমস্ত অঞ্চলে অঞ্চলে সবুজ ঘাসের ওপর বিপুল এক শুভাবহ মায়ার প্রলেপের মত বিস্তারিত হচ্ছে। সেদিন আর অধিক দূরে নয় যখন এই বিজয়-কেতনের ছায়ায় দাঁড়িয়ে আমরা জাগ্রত সাড়ে সাত কোটি বাঙালী কবি নজরুলের কণ্ঠে কণ্ঠে মিলিয়ে গভীর প্রত্যয় জননী জন্মভূমি বাংলাদেশকেও প্ৰণতি জানাবোঃ

নমঃ ননঃ বাংলাদেশ মম

চির মনোরম চির মধুর

বুকে নিরবধি বহে শত নদী

চরণে জলধির বাজে নূপুর।

(ডঃ মযহারুল ইসলাম রচিত)

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<005.005.104>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

 

 

সংবাদ পর্যালোচনা *

২১ জুলাই, ১৯৭১

একটি ছোট্ট খবর। পাকিস্তানী জঙ্গীশাহী শীগগীরই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের বিচার করবে। কখন, কোথায়, কিভাবে এ বিচার প্রহসন জমে উঠবে, খবরে তার বিস্তারিত বিবরণের উল্লেখ নেই। তবে প্রকাশিত খবরে এটুকু স্পষ্ট করেই বলা হয়েছে যে, ইয়াহিয়া খানের জঙ্গী সরকার স্বাধীন বাংলার জনক শেখ মুজিবের বিচারের আয়োজন করছে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ-রাষ্ট্রদ্রোহিতা।

ভ্রান্তি বিলাসের কি বিচিত্র পুনরাবৃত্তি! সত্যকে, ন্যায়কে, বিবেককে, টুটি টিপে হত্যা করে ক্ষমতার গদি আঁকড়ে থাকবার কি দুঃসাহসিক প্রয়াস! কি সীমাহীন স্পর্ধা! এ তো নতুন কিছু নয়। বিচার নামে প্রহসনের জালিয়াতি মঞ্চ সাজিয়ে শেখ মুজিবের কণ্ঠকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেবার এমনি এক স্পর্ধিত অপচেষ্টা ছিল আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা। উনিষ শ ছিষট্টি সালে বীরপ্রসবিনী বাংলার অগ্নিসন্তান শেখ মুজিব যেদিন ছয়দফা দাবী পেশ করেন, সেদিনই ত্রাসে আতঙ্কে থরথর করে কেপে উঠেছিলো পশ্চিমা শাসককুলের তখতে তাউস। আর তাই সেদিনের গণবিরোধী শাসক সামরিক জান্তার মুখপাত্র প্রেসিডেন্ট আইয়ুবের কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছিল গৃহযুদ্ধ ও অস্ত্রের ভাষা প্রয়োগের হুমকি। উদ্ধত রাজরোষ জেল-জুলুম আর বক্ষভেদী বুলেট হয়ে নেমে এসেছিল আওয়ামী লীগের নেতা ও কর্মীদের উপর-স্বাধীনচেতা বাঙালী জাতির উপর। কিন্তু তাতেও যখন ফল হয়নি, যখন বাংলার গণশক্তির ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের মুখে আয়ুবের রণহুঙ্কার বিধবার অসহায় আর্তনাদের মত বাতাসে মিলিয়ে গেছে, আইয়ুবশাহী শেষরক্ষার জন্য সাজিয়েছিল মিথ্যা আগরতলা ষড়যন্ত্রের মামলা। উদ্দেশ্য ছিল, ভাড়াটিয়া জজ, উকিল আর সাক্ষীসাবুদের সযত্নসৃষ্ট ষড়যন্ত্রের জালে বেঁধে শেখ মুজিবকে চিরতরে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেয়া। কুর্মিটোলা সেনানিবাসে দিনের পর দিন সেই সাজানো-গুছানো মামলার বিচার প্রহসন চলেছে। ভাড়াটিয়া সাক্ষীদের মিথ্যা জবানীর রেকর্ডপত্র স্তুপীকৃত হয়ে উঠেছে-গোটা সরকার তার সর্বশক্তি দিয়ে শেখ সাহেবকে আটকাবার চেষ্টা করেছে। কিন্তু সকলি ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। বাংলার মানুষ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলাকে মনে করেছে তাদের নিজেদেরেই বিরুদ্ধে, সমগ্র বাংলার বিরুদ্ধে এক সুগভীর ষড়যন্ত্র। আর তাই সর্বশক্তি নিয়ে তারা রুখে দাঁড়িয়েছে এই ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে, আইয়ুবশাহীর বিরুদ্ধে। শেখ মুজিবের পিছনে কাতারবন্দী বাংলার মানুষের সেই প্রতিরোধ আন্দোলনের স্রোতের মুখে খুলে গেছে জেলের তালা, খড়কুটোর মত ভেসে গেছে ক্ষমতাদর্পী শাসকের মসনদ আর আইয়ুব-মোনেম নিক্ষিপ্ত হয়েছে ইতিহাসের আস্তাকুড়ে।

তারপর বহুদিন গত হয়েছে। বাঙালীর আশা-আকাঙ্খার বিশ্বস্ততম প্রতিনিধি, বঞ্চিত বাংলার বিবেকের কণ্ঠস্বর শেখ মুজিবর রহমান জেল-জুলুম আর ত্যাগ-তিতিক্ষার দুঃসহ আগুনে পুড়ে হয়েছেন আরও খাঁটি সোনা। হয়েছেন বঙ্গবন্ধু-বাংলার মুকুটহীন সম্রাট। বিগত সাধারণ নির্বাচনে নিঃশব্দ ব্যালটের বিপ্লবে বাংলার মানুষ সমগ্র পৃথিবীকে দেখিয়ে দিয়েছে-শেখ মুজিব বাংলার, বাংলা শেখ মুজিবের। তারা আরও দেখিয়ে দিয়েছে-শেখ মুজিব শুধু বাংলার নন, সারা পাকিস্তানের সংখ্যাগুরু দলের নেতা। শুধু তাই নয়, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে সমগ্র বাংলাদেশের মানুষ বিশ্ববাসীকে বিস্মিত হতবাক করে দিয়ে অসহযোগ আন্দোলনের ইতিহাসে এক নয়া রের্কড সৃষ্টি করেছে। সবচাইতে বড় কথা, শেখ মুজিবেরই মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে বাঙালী জাতি প্রতিষ্ঠা করেছে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। তারই নির্দেশে বাংলার মানুষ হাতে অস্ত্র তুলে নিয়েছে। ইয়াহিয়ার জল্লাদ বাহিনী গ্রামের পর গ্রাম পুড়িয়ে দিয়েছে, লক্ষ লক্ষ মানুষকে নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করেছে। এই নরপশুর দল ছারখার করে দিয়েছে অগণিত সোনার সংসার-চিরতরে নিভিয়ে দিয়েছে লক্ষ লক্ষ ঘরের প্রদীপ। কিন্তু বুলেট শুধু রক্তই ঝরাতে পারে-মানুষের হৃদয়ের অমোঘ বাণীকে, তার আত্মার আন্তরিক আকাংক্ষাকে পিষে মারতে পারে না। ওরাও পারেনি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ গঠনে যে অনিবার্য প্রদীপশেখা শেখ মুজিব জেলেছেন সাড়ে সাত কোটি

 

‘সংবাদ পর্যালোচনা’ শীর্ষক ধারাবাহিক কথিকাগুলি আমির হোসেন রচিত।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<005.005.105>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

 

বাঙালীর অন্তরে, হানাদার সেনা-দস্যুদের হিংস্র থাবা তা নিবিয়ে দিতে পারেনি। আর পারেনি বলেই তা আজ বাংলার দশদিগন্তে চলেছে শত্রুহননের মহোৎসব। দিন যায়, রাত যায়, আর স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হয়ে ওঠে জল্লাদবাহিনীর মৃত্যুঘন্টার শব্দ। ওরা দেখতে পাচ্ছে ওদের পরাজয় আসন্ন। ওরা বুঝতে পারছে সোনার বাংলার বুকটিকে চিরে চিরে খাবার দিন শেষ-এবার বিদায়ের পালা। তাই মুমূর্ষু শয়তানের মরণার্তির মতই ইয়াহিয়ার মুখে অশ্রাব্য প্ৰলাপধ্বনি। তাই আইয়ুবের আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার শোচনীয় পরিণতির স্মৃতি মিলিয়ে যাবার আগেই তার জারজ সন্তান আজ ব্যতিব্যস্ত শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে নতুন মামলা সাজাবার আয়োজনে।

কিন্তু কিসের মামলা? কিসের বিচার? কে করবে কার বিচার? নরঘাতক ইয়াহিয়া শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ এনেছে। কিন্তু ক্ষমতাদর্পী সেই উন্মাদ জেনারেল রঙীন পানীয়ের নেশায় বুদ হয়ে আজ এই সত্যটুকু উপলব্ধি করবার মানসিকতা হারিয়ে ফেলেছে যে, ইয়াহিয়ার শক্তির উৎস বন্দুকের নল। আর সাড়ে সাত কোটি বাঙালীর স্বাধীন আবাসভূমি বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবের শক্তির উৎস তার দেশবাসীর শুভেচ্ছা, সমর্থন ও সংগ্রামী চেতনা। …

২৮ জুলাই, ১৯৭১

একটি বিদেশী বার্তা প্রতিষ্ঠানের খবরে বলা হয়েছে যে, বাংলাদেশের অধিকৃত এলাকায় অফিস আদালতে ও দোকান-পাটের নামফলক বাংলার পরিবর্তে ইংরেজী ও উর্দুতে লেখার নির্দেশ জারি করা হয়েছে। খবরে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, যেসব স্থান বা প্রতিষ্ঠানের নামের সংগে অমুসলিম গন্ধ রয়েছে সেগুলো পাল্টিয়ে নয়া নামকরণের অভিযান শুরু হয়েছে।

খবরটিতে নতুনত্ব না থাকলেও কৌতুকের খোরাক আছে। কারণ, ইতিহাসের চাকা আর ঘড়ির কাঁটা পেছনদিকে ঘোরে না জেনেও কসাই ইয়াহিয়া ইতিহাসের চাকা আর ঘড়ির কাটাকে পশ্চাদমুখী করার হাস্যকর প্রচেষ্টায় লিপ্ত হয়েছে। বাংলার পরিবর্তে উর্দু এবং ইংরেজীতে নামফলক লেখা আর বিশেষ বিশেষ স্থাপনা ও প্রতিষ্ঠানের নয়া মুসলমানী নামকরণের নির্দেশে ওদের দুরভিসন্ধিটাই নগ্নভাবে আত্মপ্রকাশ করেছে।      আমরা এতে বিস্মিত হইনি। বিক্ষুব্ধ হলেও আমরা এতে মোটেই বিচলিত হইনি। কারণ, ওদের এই অপচেষ্টা নতুন কিছু নয়। চব্বিশ বছর আগে যেদিন বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদীরা এদেশ ছেড়ে যায় সেদিনই পশ্চিম পাকিস্তানী উপনিবেশবাদীচক্র মেতে ওঠে বাংলার বিরুদ্ধে সুগভীর ষড়যন্ত্রে। এই ষড়যন্ত্রের লক্ষ্য ছিল বাঙালী জাতিকে চিরদিন পায়ের নীচে দাবিয়ে রাখা। আর এই ঔপনিবেশিক লক্ষ্য হাছিলের স্বার্থে পশ্চিমা শাসককুল বাঙালীর রাজনৈতিক অধিকার, অর্থনৈতিক হিস্যা, তাদের সাহিত্য, সংস্কৃতি আর স্বকীয় সত্তার ওপর হামলা করেছে বার বার। বাঙ্গালীদের নিজস্ব পরিচয়, তাদের স্বতন্ত্র সত্তাকে চিরতরে মুছে ফেলবার জন্য চক্রান্ত চলেছে সুপরিকল্পিতভাবে। চেষ্টা চলেছে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাহিত্য ও সংস্কৃতিক দিক দিয়ে তাদের পঙ্গু করে রাখবার। …

বাংলার মানুষের সাহিত্য সংস্কৃতিকে পঙ্গু করার যে নির্লজ্জ প্রচেষ্টা চলে এসেছে চব্বিশ বছর ধরে, পরাধীন বাংলার শেষ সুবেদার মোনেম খানের আমলের একটি ঘটনায় তার একটি সুন্দর চিত্র পাওয়া যাবে। দুরন্ত প্রতাপশালী গভর্নর মোনেম খান একদিন লাটভবনের দরবার কক্ষে ডেকে পাঠালেন ঢাকার কবি, সাহিত্যক, লেখক ও বুদ্ধিজীবীদের। এ এত্তেলা পেয়ে হাজির হলেন সকলে। তাদের মধ্যে ছিলেন ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লা, অধ্যক্ষ মুহম্মদ আবদুল হাই, আবুল হাশিম, কবি জসীমুদ্দীন এবং অন্যান্য। হুকুম করলেন গভর্নরঃ কি লেখাপড়া করেছেন আপনারা? রবীন্দ্রসঙ্গীত লিখতে পারেন না? জবাব দিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের তৎকালীন অধ্যক্ষ মুহম্মদ আবদুল হাই। বললেনঃ ‘না, পারি না। আমরা কি করে রবীন্দ্রসঙ্গীত

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<005.005.106>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

 

লিখবো? আমরা লিখলে তো তা হবে হাই সঙ্গীত, জসীম সঙ্গীত… লজ্জায় অপমানে অগ্নিশৰ্মা হয়ে উঠলেন গভর্নর। জারি করলেন দ্বিতীয় নির্দেশ- বাংলা ভাষাকে ইসলামী রূপ দিতে হবে। এবার জবাব দিলেন অবিভক্ত বাংলার খ্যাতনামা রাজনীতিক- মুখের উপর চীৎকার করে বলেছিলো বাংলার ছাত্র-তরুণের দল- ‘না। তোমার কথা মানি না। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করতে হবে। বিদ্রোহী বাঙালীর সেই কণ্ঠস্বর নূরুল আমিনের বুলেটও স্তব্দ করে দিতে পারেনি। বরকত, সালাম, রফিক, জাব্বারের দল বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে মাতৃভাষা বাংলার রাষ্ট্ৰীয় মর্যাদার স্বীকৃতি আদায় করে এনেছেন। রক্তের অক্ষরে লিখিত হয়েছে বাংলাভাষা আর বাঙালীর বিজয়গাথা।

কিন্তু পশ্চিমা শাসকের দল কোনদিন এই সত্যকে সহজভাবে স্বীকার করে নিতে পারেনি। বাংলা আর বাঙালী কথা দুটি ওদের অনুভূতিতে প্রতিনিয়ত ছড়িয়েছে বৃশ্চিক দংশনের জ্বালা। তাই অবিরাম হামলা চলেছে বাঙালী জাতির উপর-বাংলা ভাষা, বাংলা সাহিত্য, বাঙালী, সংস্কৃতির ওপর। ওরা আরবী হরফে বাংলা ভাষা লিখতে চেয়েছে, হাওয়াই হামলা করেছে, ভাষাটাকে মুসলমানী চেহারা দেবার জন্য তার মাথায় টুপি পরিয়ে দিয়েছে। ‘কৃষ্টি-সংস্কৃতিকে’ করা হয়েছে ‘তাহজিব-তমদ্দুন’। নজরুলের কবিতায় ‘শ্মশান’ কেটে করা হয়েছে ‘গোরস্থান’। কায়কোবাদের লেখা ‘মহাশ্মশান’ বইখানির নাম পাল্টিয়ে রাখা হয়েছে ‘মহা-গোরস্থান’।

কিন্তু কি লাভ? মিঃ জিন্নাহ থেকে মোনেম খাঁ যা পারেনি-ইয়াহিয়া-টিক্কাও তা পারবে না। ইতিহাসের গতি পশ্চাদমুখী নয়, ঘড়ির কাটা পেছনের দিকে ঘোরে না। সাড়ে সাত কোটি মানুষের মুখের ভাষা আর তাদের অসাম্প্রদায়িক জাতীয়বাদী চেতনাকেও কেউ জোর করে হত্যা করতে পারবে না।

৩০ জুলাই, ১৯৭১

একটি বিদেশী বার্তা প্রতিষ্ঠানের খবরে জানা যায় যে, এবারে পাকিস্তানী সামরিক কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশের অধিকৃত এলাকায় রেডিও বাজেয়াফত করতে শুরু করেছে। অপরাধ? সেখানকার মানুষ শত্রুকবলিত ঢাকা বেতারের কোন অনুষ্ঠান শোনে না-তারা শোনে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র, বিবিসি, আকাশবাণী ও ভয়েস অব আমেরিকার অনুষ্ঠান।

খবরটি ছোট্ট হলেও তাৎপর্যপূর্ণ। বুঝতে কষ্ট হবার কথা নয় যে, অধিকৃত এলাকার জনগণকে যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং বিশ্বজনমত সম্পর্কে অন্ধকারে রাখবার জন্যই জঙ্গীশাহী রেডিও বাজেয়াফত করতে শুরু করেছে। আর এই প্রচেষ্টা থেকে বাংলাদেশে হানাদারদের নাজেহাল অবস্থারই স্বীকৃতি পাওয়া যায়।

যুদ্ধের সবচাইতে বড় বলি হচ্ছে সত্য। মারণাস্ত্র মানুষের জানমালের মত সত্যকেও নির্দয়ভাবে হত্যা করে। বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর জঙ্গীশাহীও তাই করেছে। প্রকৃত ঘটনা যাতে কেউ জানতে না পারে সেজন্য সংবাদপত্রের উপর কড়া সেন্সরশীপ আরোপ করা হয়েছে। অধিকৃত এলাকায় বর্তমানে যেসব সংবাদপত্র প্রকাশিত হয় তাতে প্রকৃত ঘটনার কোন বিবরণ থাকে না, নিরপেক্ষ সত্যনিষ্ঠ মতামত প্রকাশের কোন সুযোগ সেখানে নেই। প্রতিটি শব্দ ছাপা হবার আগে সামরিক কর্তৃপক্ষের অনুমতি লাগে। সব কাগজে একই খবর ও মন্তব্যের কার্বন কপি ছাপা হয়। ফলে সংবাদপত্র নামে যে কাগজগুলি অধিকৃত এলাকায় প্রকাশিত হয়, তা বস্তুত সংবাদপত্র নয়- জঙ্গীশাহীর প্রচার বুলেটিন মাত্র। তাই সেগুলো কেউ কেনে না, পড়ে না। জালেমশাহীর প্রচার দফতর ওগুলো বিনামূল্যে বিলি করে।

এইতো গেল সংবাদপত্রের কথা। এরপর থাকে রেডিও। এবং সেটাই আজকের দিনের সবচাইতে শক্তিশালী প্রচার মাধ্যম। ঢাকা বেতারকেন্দ্র এখন শত্রুবাহিনীর দখলে। শত্রুকবলিত এই বেতারযন্ত্রটি থেকে যা প্রচারিত হয়, তা জঘন্য জালিয়াতি আর মিথ্যার বেসাতি ছাড়া কিছুই নয়। জল্লাদ বাহিনীর বর্বর অত্যাচারের রক্তের গঙ্গা

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<005.005.107>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

 

বয়ে চলেছে বাংলার দিকে দিকে। ভস্মীভূত ঘরবাড়ি, বিধ্বস্ত জনপদের ধ্বংসস্তুপ সাক্ষী হয়ে আছে ওদের পাশবিক নির্যাতনের। হানাদার দস্যুরা নারীর স্মভ্রম কেড়ে নিচ্ছে, দুধের শিশুকে খুন করেছে, দলে দলে মানুষকে করছে ঘরছাড়া, দেশছাড়া। অধিকৃত এলাকার মানুষ নিজের চোখে দেখেছে, দেখছে এ দৃশ্য। কিন্তু ঢাকা বেতারে শুনছে ঠিক এর উল্টো কথা। ঢাকা বেতার সুকৌশলে প্রচারণার মারপ্যাচে সত্যটাকে হত্যা করে মিথ্যার পুতুল সাজিয়ে খাড়া করছে মানুষের কাছে। তাই তারা আস্থা হারিয়েছে- বীতশ্রদ্ধ, অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে ঢাকা বেতারের উপর। আর সেই কারণেই কেউ আজ ঢাকা বেতারের অনুষ্ঠান শুনছে না। তারা সত্যি খবরের জন্য, নির্ভুল তথ্যের জন্য, বাংলাদেশ সম্পর্কে বিশ্বজনমতের ধারা সম্পর্কে অবহিত হওয়ার জন্য শুনছে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র, বিবিসি, আকাশবাণী, ভয়েস অব আমেরিকার অনুষ্ঠান। জঙ্গীশাহী এ খবর জানে। তারা জানে যে, এসব বেতার কেন্দ্রের মারফত জনগণ হানাদারদের নির্যাতন-নিপীড়ন-গণহত্যার লোমহর্ষক কাহিনী জেনে নিচ্ছে। জেনে নিচ্ছে বাংলাদেশের যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের গৌরবময় সাফল্য এবং হানাদারদের ক্রমাগত বিপর্যয়ের বৃত্তান্ত। ফলে ওদের জারিজুরি ফাঁস হয়ে যাচ্ছে। ধরা পড়ে যাচ্ছে ওদের মিথ্যাবাজি আর জালিয়াতির বেসাতি। তাই শংকিত, বিব্রত হয়ে উঠেছে জঙ্গীশাহী। ওরা জানে, লোকের হাতে যদি রেডিও থাকে, ঢাকা বেতারের জাল-জুয়াচুরি অনুষ্ঠান তারা শুনবে না- শুনবে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র ও বিদেশী বেতারের অনুষ্ঠান। তাই আক্রোশের ক্রোধে দিশেহারা হয়ে জল্লাদেরা এখন কেড়ে নিতে শুরু করেছে সকল রেডিও উদ্দেশ্য-মিথ্যে যদি না শুনতে চাও, সত্য কথাও শুনতে দেবো না…।

১আগষ্ট, ১৯৭১

পাকিস্তানের জঙ্গশাহী বাংলাদেশের অধিকৃত এলাকায় উৎপাদিত ফসলের তিন-চতুর্থাংশ সামরিক কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দোবর জন্য চাষীদের প্রতি নির্দেশ জারি করেছে। নির্দেশে বলা হয়েছে যে, ফসলের এক-চতুর্থাংশ নেওয়া হবে জরিমানা হিসাবে এবং বাকী দুই-চতুর্থাংশ নেওয়া হবে ট্যাক্স ও খাজনা বাবদ।

বুঝতে এতটুকু কষ্ট হবার কথা নয় যে, বাংলাদেশের অধিকৃত এলাকায় চাষীদের শায়েস্তা করা ছাড়াও আরেকটা উদ্দেশ্যে এই নির্দেশ জারি করেছে। বাংলাদেশের যুদ্ধ পশ্চিমা শাসকদের রাজকোষ শূন্য করে দিয়েছে। আর সেই শূন্য রাজভাণ্ডার পূর্ণ করে তোলার জন্যই জল্লাদ ইয়াহিয়া করেছে এই তোগলকি নির্দেশ।

একথা আজ সকলেরই জানা যে, বাংলাদেশে যুদ্ধের বিপুল ব্যয়ভারের চাপে পাকিস্তানী অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেছে। বাংলাদেশ থেকে পাট, চা, চামড়া সহ সমস্ত রকম রফতানী বাণিজ্য বন্ধ। কলকারখানায় উৎপাদন নেই। যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে থাকার দরুন ব্যবসা-বাণিজ্যে নেমে এসেছে চূড়ান্ত অচলাবস্থা। সাড়ে সাত কোটি মানুষের সংরক্ষিত বাজারে পশ্চিম পাকিস্তানী পণ্য বিক্রয়ের নামে হরিলুটের বাতাসের মত দুহাতে অর্থ লুটে নেবার দিন শেষ। রাজস্ব আদায় বন্ধ-বাংলার মানুষ খাজনা দিচ্ছে না, ট্যাক্স দিচ্ছে না। আয়ের কোটা শূন্য কিন্তু খরচ বেড়েছে বহুগুণ। প্রশাসনিক ব্যয় ছাড়াও জঙ্গশাহী বাংলাদেশে গণহত্যা খাতে প্রতিদিন খরচ করছে দেড় কোটি টাকা। এত টাকা আসবে কোথা থেকে? বৈদিশক সাহায্য বন্ধ। পৃথিবীর দেশে দেশে ভিক্ষার ঝুলি হাতে ঘুরেছে ইয়াহিয়ার অনুচরেরা, কিন্তু উদ্দেশ্য সিদ্ধি হয়নি। তাই রাজকোষ শূন্য-নিদারুণ অর্থসংকট, পরের ধনে পোদ্দারিতে ঘটেছে মারাত্মক বিঘ্ন। বেসামরিক কর্মচারীদের তো বেতন দেয়ার প্রশ্নই নেই, কসাই বাহিনীর জোয়ানদেরও বেতন বাকী পড়েছে দীর্ঘদিনের। ফলে দিকে দিকে উঠেছে অসন্তোষের ঝড়। বেগার খাটতে রাজী নয় তারা- কাজ করেছি পয়সা চাই। বেতন বাকী রেখে যুদ্ধ করা যায় না। আর এই পরিস্থিতির মোকাবেলা করার জন্যই টাকা চাই-প্রচুর টাকার দরকার ইয়াহিয়া খানের। টাকার দরকার বাঙালী হত্যার হাতিয়ার কিনতে, জল্লাদ ভাড়া করতে। আর সে টাকা ওরা আদায় করতে চায় বাংলাদেশেরই চাষীদের কাছ থেকে। এই লক্ষ্য হাসিলের জন্যই জারি হয়েছে নরঘাতক ইয়াহিয়ার নয়া নির্দেশ। …

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<005.005.108>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

 

১৭ আগষ্ট,১৯৭১

তিনটি খবর। তিনটি খবরের উৎসস্থল দূর-দূরান্তরে তিনটি জায়গা-করাচী, নয়াদিল্লী, ওয়াশিংটন। অথচ খবর তিনটি একই সূত্রে গাঁথা-একই লোককে কেন্দ্র করে। আর তিনি হচ্ছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

করাচী থেকে ফরাসী বার্তা প্রতিষ্ঠান এ-এফ-পি জানিয়েছে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান আত্মপক্ষ সমর্থনে অস্বীকৃত জ্ঞাপন করায় পশ্চিম পাকিস্তানী সামরিক আদালতে তার বিচার স্থগিত হয়ে গেছে। লায়ালপুরের কাছে শেখ সাহেবের বিচার প্রহসনের আয়োজন করা হয়েছিল। কিন্তু তিনি বলেছেন, আমি কোন অপরাধই করিনি। তাই বিচার বা আত্মপক্ষ সমর্থনের প্রশ্নই ওঠে না।

নয়াদিল্লীতে মার্কিন সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডী বলেছেন, তিনি সর্বপ্রথম শেখ মুজিবের মুক্তিদানের শর্তে বাংলাদেশের সমস্যার একটি রজনৈতিক সমাধানের পক্ষপাতী। বঙ্গবন্ধুর গোপন বিচারের তীব্র নিন্দা করে সিনেটর কেনেডী বলেন, শেখ মুজিব যদি কোন অপরাধ করে থাকেন তা হচ্ছে এই যে, তিনি একটি নির্বাচনে জয়লাভ করেছে। যেভাবে গোপনে তাঁর বিচার হচ্ছে তা আন্তর্জাতিক আইন ও রীতি-নীতির চূড়ান্ত বরখেলাপ ছাড়া আর কিছুই নয়।

অপরদিকে জাতিসংঘে জঙ্গশাহীর রাষ্ট্রদূত আগা হিলালী বলেছে যে, শেখ মুজিবের গোপন বিচার প্রত্যক্ষ করার জন্য আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের অনুমতি দেয়া হবে না।

আগা হিলালী আরও বলেছে যে, বঙ্গবন্ধুর বিচারকারী মিলিটারী কোর্টের রায় যাই হোক না কেন, তাকে সঙ্গে সঙ্গে হত্যা করা হবে না। রায়ের পর প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া বঙ্গবন্ধুর দণ্ডাদেশ বাতিল বা হ্রাস করতে পারবে।

খবরগুলো পাশাপাশি রেখে এগুলোর তাৎপর্য লক্ষ্য করলেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, শেখ মুজিবকে জল্লাদ বাহিনী এখনও হত্যা করেনি- করতে পারবেও না। কারণ সে শক্তি ওদের নেই। তাই বঙ্গবন্ধুর বিচারের প্রহসন মঞ্চ সাজিয়ে সমগ্র বিশ্বকে ভীতসন্ত্রস্ত করে নরঘাতক ইয়াহিয়া চেষ্টা করছে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করতে। বঙ্গবন্ধুর অমূল্য জীবনকে বাজি রেখে সে নেমেছে বাংলার স্বাধীনতার যুদ্ধ বানচালের জুয়াখেলায়। কিন্তু ইয়াহিয়া খান আবার ভুল করেছে- আবার ভ্রান্তির বালুচরে পা আটকে গেছে তার। ইয়াহিয়া স্বীকার না করলেও বিশ্ববাসী জানেন, প্রায় সাড়ে চারমাস ধরে ভয়ভীতি- প্রলোভন দেখিয়ে চেষ্টা চলছে শেখ মুজিবকে বশে আনার। কিন্তু কোন লাভ হয়নি। বঙ্গবন্ধুর মাথা সে কিনতে পারেনি। আর পারেনি বলেই শেষ অস্ত্র নিক্ষেপের মত হুঙ্কার ছেড়েছে-আমি শেখ মুজিবের বিচার করবো, তাকে ফাঁসিতে ঝুলাবো। এর পিছনে এক সুচতুর লক্ষ্য ছিল ইয়াহিয়া খাঁর। সে ভেবেছিল, শেখ মুজিবকে হত্যার হুমকি দিয়ে তাকে বশে আনা যাবে, মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল ভেঙ্গে দেয়া যাবে, আর যাবে বিশ্বজনমতকে বিভ্রান্ত করা। কিন্তু এবারও ব্যর্থ হয়েছে জল্লাদী প্রচেষ্টা। ভয় পাবার পরিবর্তে আরও বলিষ্ঠকণ্ঠে বঙ্গবন্ধু বলেছেন: আমি কোন অপরাধ করিনি। সুতরাং বিচার বা আত্মপক্ষ সমর্থনের কোন প্রশ্নই ওঠে না।

তাই বাধ্য হয়ে তাকে বঙ্গবন্ধুর বিচার প্রহসন মুলতবি রাখতে হয়েছে। এই বিচার আর হত্যার হুমকি মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল এতটুকু দমাতে পারেনি। বরং শেখ মুজিবের নির্দেশিত পথে দ্বিগুণতর শক্তি নিয়ে তারা ঝাঁপিয়ে পড়েছে দুশমনের ওপর-আরও ত্রিশঙ্কু অবস্থায় নিক্ষিপ্ত হয়েছে হানাদার বাহিনী। আর বিশ্বজনমত বিভ্রান্ত করার প্রচেষ্টাও ব্যর্থ হয়েছে ইয়াহিয়া খানের। এইতো গতকাল সিনেটর কেনেডী বলেছেন শেখ মুজিবের একটিমাত্র অপরাধ যে তিনি নির্বাচনে জয়লাভ করেছেন। তার গোপন বিচার আন্তর্জাতিক আইন ও রীতি-নীতির চূড়ান্ত বরখেলাপ মাত্র। বস্তুতঃ এ কথা কেনেডীর একার কথা নয়। কেনেডীর কণ্ঠে বিশ্ববিবেকের দ্ব্যর্থহীন রায়ই ধ্বনিত হয়েছে। আর সে ক্ষমাহীন নিয়তির মত জানিয়ে দিয়েছে যে, অপরাধী শেখ মুজিব নয়- ইয়াহিয়া

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<005.005.109>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

 

খান। যুদ্ধ শেখ মুজিব শুরু করেননি-ইয়াহিয়া খানের গণহত্যা অভিযানের জবাবেই সৃষ্টি হয়েছে রক্তাক্ত সংঘর্ষের। আর তাই সমস্যার সমাধানের শর্ত হচ্ছে শেখ মুজিবের মুক্তি। কেনেডীর এই বক্তব্যের আরেকটি তাৎপর্য আছে। কেনেডীদের বলা হয়ে থাকে মার্কিন বিবেকের কণ্ঠস্বর। আর সে কারণেই বলা যায়, কেনেডীর বক্তব্য পৃথিবীর আর দশটি দেশের মত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোটি কোটি শান্তি, স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রকামী মানুষেরই বক্তব্য। সুতরাং দেখা যায়, যে দেশের অস্ত্র দিয়ে ইয়াহিয়া বাঙালীদের হত্যা করেছে, শেখ মুজিবকে হত্যার হুমকি দিচ্ছে সেই আমেরিকার জনগণের দৃষ্টিতেও ইয়াহিয়া দোষী, শেখ মুজিব নির্দোষ। জল্লাদ ইয়াহিয়ার রাষ্ট্রদূত আগা হিলালী বলেছে, বিচারের রায় যাই হোক সঙ্গে সঙ্গে শেখ মুজিবকে হত্যা করা হবে না। তার দণ্ডাদেশ বাতিল বা হ্রাসের ক্ষমতা থাকবে ইয়াহিয়ার। চমৎকার ব্যবস্থা। কিন্তু এর গোপন তাৎপর্যটুকু বুঝতে কষ্ট হবার কথা নয়। ইয়াহিয়া চেয়েছিল ভারতের সঙ্গে যুদ্ধ বাধিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার যুদ্ধকে ধামাচাপা দিতে। কিন্তু ভারত-রাশিয়া শান্তি ও সহযোগিতার চুক্তি জল্লাদের সে খায়েশ চিরতরে গুড়িয়ে দিয়েছে। এখন একটিমাত্র তুরুপের তাস আছে ইয়াহিয়ার হাতে। আর সে হচ্ছে শেখ মুজিবের জীবন। তাই সে চাইছে বিচার প্রহসনে বঙ্গবন্ধুর চরম দণ্ডের ব্যবস্থা করে তার জীবনরক্ষার ক্ষমতাটুকু নিজের হাতে নিয়ে তাই দিয়ে রাজনীতি করতে। আর ইয়াহিয়ার এই গোপন উদ্দেশ্যটি সম্পর্কে টাইম ম্যাগাজিন লিখেছে : “এ ব্যাপারে সন্দেহের অবকাশ নেই যে শেখ মুজিবকে দণ্ড দেওয়া হবে। তবু মনে হয় ইয়াহিয়া খান বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করবে না। কারণ, সে জানে বাংলাদেশের যুদ্ধে এক পাকিস্তানের আসা চিরতরে সমাধিস্থ হয়েছে। শেখ মুজিবকে বাচিয়ে রাখলে অন্তত একটা শেষ সুযোগ পাওয়া যাবে। সে হচ্ছে দীর্ঘস্থায়ী রক্তাক্ত যুদ্ধের বদলে শান্তিপূর্ণভাবে বাংলাদেশ ও পশ্চিম পাকিস্তানের ভাগাভাগিটা সম্পন্ন করা।” অতঃপর মন্তব্য নিম্প্রয়োজন।

২২ শে আগষ্ট, ১৯৭১

লণ্ডনের ‘ডেলী টেলিগ্রাফ’ পত্রিকার এক খবরে বলা হয়েছে যে, পাকিস্তানী জঙ্গীশাহীর সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে আলোচনার পন্থা স্থির করার উদ্দেশ্যে ইসলামাবাদ ও তেহরানে গোপনে গোপনে জোর কূটনৈতিক তৎপরতা চলেছে। এই তৎপরতার নায়ক ইরান। আর এর পেছনে নাকি সমর্থন রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়ার। খবরটিতে আরও বলা হয়েছে যে, পশ্চিম পাকিস্তানের পররাষ্ট্র দফতরের সেক্রেটারী ইতিমধ্যেই তেহরান পৌছেছেন। সেখানে ইরানের উদ্যোগে তার সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদের গোপন সাক্ষাৎকারের আয়োজন হবে।

সুদূর ইরানে বাংলাদেশ প্রশ্ন নিয়ে পর্দার অন্তরালে কি ঘটেছে স্পষ্ট জানবার উপায় নেই। আর সে নেপথ্য নাটকে তেহরান-চীন-রাশিয়ার ভূমিকাটাও সহজবোধ্য নয়। ডেলী টেলিগ্রাফের এই খবরটি ছাড়া এ ব্যাপারে আর কোন সূত্র থেকে কোন তথ্যও আমাদের হাতে আসেনি। তাই এক কথায় খবরটি উড়েয়ে দেয়া বা একে সত্য বলে মেনে নেয়া কোনটাই সহজ নয়। তবু কথা আছে। বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের প্রচন্ড আক্রমণের মুখে জল্লাদ ইয়াহিয়ার ভাড়াটিয়া বাহিনী আজ দিশেহারা। প্রতিদিন ওরা মরছে মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে। আর সেই শূন্যস্থান পূর্ণ করতে মাত্র কদিন আগে নতুন করে এক ডিভিশন সৈন্য আমদানী করা হয়েছে বাংলাদেশে। আমেরিকা থেকে প্রচুর অস্ত্র আসছে, চীন থেকে সামরিক সরঞ্জাম আসছে, মার্কিন বিশেষজ্ঞ এসেছে। এমনকি জর্দান থেকে লোক ভাড়া করে আনা হয়েছে বাংলাদেশের বীর যোদ্ধাদের মোকাবিলা করার জন্য। কিন্তু তবু অবস্থার উন্নতি হয়নি-পায়ের তলা থেকে দ্রুত মাটি সরে যাচ্ছে ইয়াহিয়ার। প্রতিদিন নয়া নয়া এলাকা মুক্ত হচ্ছে। অবস্থা বেগতিক দেখে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামকে ধামাচাপা দেওয়ার জন্য ইয়াহিয়া খান প্রাণপণ চেষ্টা করেছে পাক-ভারত যুদ্ধ বাধাতে। ভারত-সোভিয়েত শান্তি, মৈত্রী ও সহযোগিতার চুক্তি তার সে দুরভিসন্ধি বানচাল করে দিয়েছে-ভারতের সঙ্গে যুদ্ধের খায়েস মিটে গেছে ইয়াহিয়ার। ক্ষমতার মদমত্ত সেই নরঘাতক চেষ্টা করেছে জাতিসংঘকে টেনে এনে নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠক ডেকে বাংলাদেশ প্রশ্নকে পাক-ভারত বিরোধ বলে চিহ্নিত করতে। কিন্তু সে চেষ্টাও তার নিদারুন ব্যর্থতা বরণ করেছে। আরেকটা চাল খেলেছে খুনী ইয়াহিয়া। সে

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<005.005.110>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

 

ভেবেছিল বিচারের নামে প্রহসনের মঞ্চ সাজিয়ে মিলিটারী জজ-ব্যারিস্টারের পুতুল নৃত্যের ব্যবসা করে শেখ মুজিবকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়া যাবে-আর তার ফলে মনোবল ভেঙ্গে যাবে বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের। তার ভাড়াটিয়া ডালকুত্তা বাহিনীর দুরু দুরু বক্ষে আসবে নতুন শক্তি-দাবিয়ে দেওয়া যাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার যুদ্ধ। কিন্তু এখানেও হতাশ হয়েছে জোনারেল ইয়াহিয়া। এ খবরে আরও ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছে মুক্তিবাহিনী-তীব্রতর হয়েছে তাদের আক্রমণধারা। তারই পাশাপাশি বিশ্বজনমতের প্রচণ্ড চাপে শাণিত ছুরিকা খসে পড়েছে জল্লাদের হাত থেকে। তার প্রমাণ- বিচারের সঙ্গে সঙ্গেই শেখ মুজিবকে গুলি করা হবে না বলে জাতিসংঘে পশ্চিম পাকিস্তানী রাষ্ট্রদূত আগা হিলালীর ঘোষণা। ইয়াহিয়ার সামনে এখন পাকিস্তান নামক মৃত ঘোড়াটিকে জীবিত করে তোলার আর কোন পথই খোলা নেই। তবু শেষ চেষ্টা করছে সে। শেখ মুজিবকে ফিরিয়ে দিয়ে হলেও যদি বাংলাদেশকে পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে রাখা যায়, সেটাই তার শেষ চেষ্টা। হতে পারে, এই উদ্দেশ্যেই চলেছে তেহরানের গোপন কূটনৈতিক তৎপরতা। আবার এমনও হতে পারে যে, এই তৎপরতা নতুন কোন জালিয়াতি, কোন দুরভিসন্ধি হাসিলের জঘন্য ষড়যন্ত্রেরই অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ।…

 

২৬ আগষ্ট, ১৯৭১

 

একটা খবরের মত খবর। করাচী থেকে এ-এফ-পি জানিয়েছে যে, পাকিস্তানী জঙ্গীশাহী বাংলাদেশের জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যদের প্রতি জনগণের প্রতিনিধি হিসাবে দায়িত্ব পালনে এগিয়ে আসার আবেদন জানিয়েছেন। যেসব সদস্য জল্লাদশাহীর দৃষ্টিতে নিরপরাধ সুবোধ বালক, তাদের প্রতিই এই আবেদন জানানো হয়েছে। রেডিও পাকিস্তানের মারফত সরকারী মহল গণপ্রতিনিধিদের সর্বপ্রকার নিরাপত্তার ব্যবস্থা করারও প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

খবর শুনে হাসবো না কাঁদবো ভেবে পাই না। মনে হয়, পৃথিবীর সবকিছুরই সীমা আছে- সীমা নাই শুধু বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে ওদের নির্মম পেশাদারী রসিকতার। সম্ভবতঃ সে কারণেই, এতদিন পরে জঙ্গীশাহী গণপ্রতিনিধিদের প্রতি স্বীয় দায়িত্ব পালনের আবেদন জানাতে এতটুকু লজ্জাবোধ করেনি। কে না জানে, নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে এই দেশবাসীর প্রতি দায়িত্ব পালনের জন্যই তারা বাংলাদেশের গণপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েছিলেন। আর এজন্যই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে বাংলার মানুষ নিঃশব্দ ব্যালটের বিপ্লবের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের শিরদেশে পরিয়ে দিয়েছিল ইতিহাসের নজিরবিহীন নির্বাচনী বিজয়ের গৌরবময় শিরোপা। বাংলার মানুষ বিগত নির্বাচনে শেখ মুজিব এবং তার অনুসারীদের শুধু ভোট দেয় নাই- দিয়েছিল হৃদয়ের অন্তহীন ঐশ্বর্যমণ্ডিত অবিচল বিশ্বাস, ভালোবাসা আর আস্থা। এ বিশ্বাস ও আস্থার যাতে এতটুকু অমর্যাদা না হয়, স্বীয় দায়িত্ব পালনে যাতে বিন্দুমাত্র অবহেলা না হয়, সেই সচেতন সতর্কতাই গণপ্রতিনিধিদের সমাবেশ ঘটিয়েছিল ঢাকার ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে। দিনটা ছিল ৩রা জানুয়ারী ১৯৭১ সাল। বাংলার উদার আকাশের নীচে শীতার্ত দিনের শেষ প্রহরে স্নিগ্ধ সূর্যালোক-স্নাত সুবিশাল রেসকোর্সের জনারণ্য আর উপরে জাগ্রত বিধতাকে সাক্ষী রেখে সেদিন বাংলাদেশের গণপ্রতিনিধিরা শপথ নিয়েছিলেন। এক হাত বুকের উপর রেখে আরেক হাত উর্ধ্বে তুলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে গণপ্রতিনিধিরা বিবেকের নামেই ওয়াদা করেছিলেন : ‘জীবনের বিনিময়ে হলেও আমরা আমাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করে যাব।’ এই শপথ যে ধোঁকাবাজির ভড়ং ছিল না, ছিল তাদের ঈমানেরই অঙ্গ-সেই সমাবেশে বঙ্গবন্ধুর ভাষণেও তার সুস্পষ্ট আভাস ছিল। শেখ মুজিব সেদিন বাংলার মানুষকে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় নির্দেষ দিয়েছিলেন ; যদি কেউ এই শপথ ভঙ্গ করে, যদি কোন গণপ্রতিনিধি তোমাদের বিশ্বাস ও আস্থার অমর্যাদা করে, দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়-তাকে জ্যান্ত কবর দিও। এমনকি এই যদি আমি করি-আমাকেও তোমরা রেহাই দিও না।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<005.005.111>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

 

গণপ্রতিনিধির দায়িত্ব পালনের এমন দুর্বার আগ্রহ ছিল বলেই নির্বাচনী-বিজয়ী সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হিসাবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বারবার জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহবানের জন্য ইয়াহিয়ার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। এজন্য তিনি ১৫ই ফেব্রুয়ারী তারিখটিও নির্দিষ্ট করে দিয়েছিলেন। কিন্তু ইয়াহিয়াই টালবাহানা করেছে। শেষ পর্যন্ত তারই খুশিমত ১লা মার্চ হয়েছিল জাতীয় পরিষদের উদ্ভোদনী অধিবেশনের তারিখ। কিন্তু সেদিনও পরিষদের অধিবেশন বসতে দেয়নি ইয়াহিয়া খানই-গণপ্রতিনিধিরা নয়। আর এভাবেই শাসনতন্ত্র রচনা ও রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালনের পথ গণপ্রতিনিধিদের সামনে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে অথচ আজ হঠাৎ করে সেই জঙ্গীশাহীর মুখেই শোনা যাচ্ছে গণপ্রতিনিধিদের প্রতি দায়িত্ব পালনের আবেদন। শুনে চমকে উঠতে হয় ভূতের মুখে রাম নাম শোনার মত।

কিন্তু আর যাই হোক হঠাৎ করে জঙ্গীশাহীর এই সুমতির পেছনে যে কোন সাধু উদ্দেশ্য নেই তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সেদিন ও আজকের অবস্থাটার দিকে তাকালেই জল্লাদী আবেদনের গোমরাটা ফাঁস হয়ে যাবে।

৩১০ সদস্যের জাতীয় পরিষদে আওয়ামী লীগের সদস্যসংখ্যা ১৬৭। ৩০০ সদস্যের বাংলাদেশ পরিষদেও আওয়ামী লীগারের সংখ্যা ২৮৮। যদি মার্চের এক তারিখে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বসতো, একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে আওয়ামী লীগ জনগণের আশা-আকাঙ্খা অনুযায়ী একটি শাসনতন্ত্র রচনা করতে পারতো, ক্ষমতাসীন হতে পারতো। ফলে সমাধি রচিত হতো জঙ্গীশাহীর। কিন্তু তা হতে দিতে চায়নি জল্লাদ ইয়াহিয়া। আর চায়নি বলেই ষড়যন্ত্র আর শঠতার আশ্রয় নিয়ে সে বাহিনীকে লেলিয়ে দিয়েছে বাংলার মানুষের ওপর। লক্ষ লক্ষ মানুষকে খুন করে, বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে, অসংখ্য ঘর-বড়ি জ্বালিয়ে দিয়ে, প্রায় এক কোটি মানুষকে দেশান্তরী করেও ইয়াহিয়া বাংলাদেশের গণপ্রতিনিধিদের বিবেককে কিনে নিতে পারেনি। তাই সেই বিবেকহীন জল্লাদ কলমের এক খোঁচায় জবাই করেছে আওয়ামী লীগের ৭৯ জন জাতীয় পরিষদ এবং ১৯০ জন প্রাদেশীক পরিষদ সদস্যকে। ইয়াহিয়ার দৃষ্টিতে তার পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ পরিষদে আওয়ামী লীগের টিকিটে নির্বাচিত গণপ্রতিনিধিরা এখন সংখ্যলঘু। শেখ মুজিব কারাগারে। পাকিস্তানের সাবেক জঙ্গীশাসক আইয়ুবের জারজ সন্তান এবং বর্তমান শাসক ইয়াহিয়ার লেজুড় ভূট্টোর দল জাতীয় পরিষদে সংখ্যাগুরু। সুতরাং আর ভয় নেই। তাইতো আজ জল্লাদ ইয়াহিয়া মেহেরবানি করে পরিষদ সদস্যদের প্রতি দায়িত্ব পালনের আবেদন জানিয়েছেন। কিন্তু বড় দেরী হয়ে গেছে। এ আবেদনে আজ শুধু মানুষের মনে বিদ্রুপ, ঘৃণা আর ধিক্কার সৃষ্টি করবে। …

 

২৭ শে আগষ্ট, ১৯৭১

বিদেশী পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে যে, পাকিস্তানী জঙ্গশাহী বাংলাদেশের দখলীকৃত এলাকার তথাকথিত দণ্ডাদেশপ্রাপ্ত গণপ্রতিনিধিদের শূন্য আসনগুলির উপনির্বাচন অনুষ্ঠান স্থগিত রাখতে চায়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের যে ৭৯ জন অনুসারীকে দেশদ্রোহী আখ্যা দিয়ে তাদের সদস্যপদ খারিজ করা হয়েছে, তাদের জায়গায় আগামী নভেম্বর মাসে উপনির্বাচন হবে বলে ইয়াহিয়া খানই ঘোষণা প্রচার করেছিল। লণ্ডনের ‘ডেলী টেলিগ্রাফ’ পত্রিকা জানিয়েছে যে, নির্বাচনে দাঁড়াবার মত দালাল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বলেই ইয়াহিয়া খান উপনির্বাচন স্থগিত রাখতে বাধ্য হচ্ছে। এর আরেকটা কারণ হচ্ছে গেরিলাদের অপ্রতিহত তৎপরতা। তারা যে কোনভাবে হোক উপনির্বাচনের প্রহসন ঠেকিয়ে রাখবে। ‘ডেলী টেলিগ্রাফ’ বলেছে, ইয়াহিয়া খান খুব শিগগিরই উপনির্বাচন স্থগিতের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করবে। বলা নিম্প্রয়োজন, যা ঘটতে যাচ্ছে তা অপ্রত্যাশিত বা আকস্মিক কিছু নয়।

গত ডিসেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত নির্বাচন ছিল পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরবর্তী তেইশ বছরের প্রথম নির্বাচন। এই নির্বাচনে বাংলাদেশের মানুষ ভোট দিয়েছে শোষক-ষড়যন্ত্রী শাসকের কব্জা থেকে নিজেদের ভাগ্য ছিনিয়ে আনার দূর্বার আকাঙ্ক্ষায়। বিজয়ী করেছে তাদের প্রিয় নেতা শেখ মুজিব এবং তার দল আওয়ামী লীগকে। দেশ ও

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<005.005.112>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

 

দেশবাসীর প্রতি বঙ্গবন্ধুর অপরিসীম ভালোবাসা এবং তার প্রতি জনগণের অকুণ্ঠ বিশ্বাস ও আস্থাই নেতা ও জনতাকে পরস্পরের কাছাকাছি টেনে এনেছে। এই নৈকট্যবোধ এবং ঘনিষ্ঠ সম্পর্কই প্রতিফলিত হয়েছে নির্বাচনী রায়ে। এই নির্বাচনের লক্ষ্য ছিল একটি গণতান্ত্রিক শাসনতন্ত্র প্রণয়ন ও গণপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর। কিন্তু এই নির্বাচনের রায় যখন শেখ মুজিবের পক্ষে গেল, যখন শোষক-ষড়যন্ত্রকারী গণদুশমন শাসকরা বুঝতে পারলো যে শেখ মুজিবের হাতে ক্ষমতা দেওয়ার মানে হলো নিজেদের কবরের উপর জনতার বিজয়-কেতন উড্ডীন করা, ওরা প্রমোদ গুনলো। লিপ্ত হলো নির্বাচনী রায় বানচালের ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রে। ন্যায়নীতি বিবেকের মাথা খেয়ে জঙ্গীশাহী জনতা, গণ-প্রতিনিধিবর্গ আর তাদের নেতা শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে শুরু করলো নতুন চক্রান্ত। উদ্দেশ্য-যে কোনভাবে হউক পরিষদের অধিবেশন বাতিল এবং শেখ মুজিবকে রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ লাভ থেকে বঞ্চিত রাখতেই হবে। আর এই দুরভিসন্ধি হাসিলের জন্য কি না করেছে জঙ্গীশাহী। রক্তগঙ্গা সৃষ্টি করেছে ওরা বাংলাদেশে-খুন, জখম, লুট, নারী ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ এমন কোনও খারাপ কাজ নেই যা ওরা করেনি। এমনকি শেখ মুজিবকে বন্দী করে, বিচারের প্রহসন মঞ্চ সাজিয়ে তাকে হত্যা করার চক্রান্ত করতেও ওরা পিছপা হয়নি। তাতেও যখন কাজ হয়নি-মাথা নত করেনি বাংলার নেতা ও জনতা-জল্লাদ ইয়াহিয়া কলমের এক খোঁচায় খারিজ করেছে পৌনে তিনশত গণপ্রতিনিধির সদস্যপদ। কারণ, ইয়াহিয়া ভেবেছিল আওয়ামী লীগ দলীয় সদস্যদের এসব শূন্যপদে উপনির্বাচন করে দালালদের পার করিয়ে নেওয়া যাবে, গঠন করা যাবে একটি পুতুল সরকার- যে সরকারের একমাত্র দায়িত্ব হবে জল্লাদের পা চাটা।

কিন্তু বিধি বাম, বাংলার মাইর দুনিয়ার বাইর। বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধা আর বীর জনতার মিলিত প্রতিরোধের সামনে ধূলিসাৎ হয়ে গেছে ইয়াহিয়ার তোগলকি খোয়াব। …

 

…সেপ্টেম্বর, ১৯৭১

 

রয়টার পরিবেশিত এক খবরে জানা যায়, পাকিস্তানী জঙ্গীশাহীর নায়ক ইয়াহিয়া খান গত মঙ্গলবার ইরানের রাজধানী তেহরান গিয়ে পৌঁছেছে। ওয়াকেবহাল মহল জানিয়েছেন, ইয়াহিয়া খান ইরানের শাহের সঙ্গে পাক-ভারত সম্পর্কে যে সংকট সৃষ্টি হয়েছে সে সম্পর্কে আলাপ-আলোচনা করবে।

তেহরানের ইংরেজী দৈনিক ‘তেহরান জার্নাল’ -এর উদ্ধৃতি দিয়ে রয়টার আরও জানিয়েছে, পাকিস্তান ও ভারতের বর্তমান সংঘাত ইরানের মধ্যস্থতা করার সম্ভাবনা রয়েছে। পত্রিকায় আরও বলা হয়েছে, পাকিস্তান ও ভারত উভয় দেশের সঙ্গে ইরানের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বিরাজমান থাকায় ইরান দুই দেশের সম্পর্কোন্নয়নের ব্যাপারে তৃতীয় যে কোন দেশের চাইতে অধিকতর ফলপ্রসূ ভূমিকা পালন করতে পারবে। পত্রিকাটিতে এমনও বলা হয়েছে , অক্টোবরে পারস্য সম্রাজ্যের আড়াই হাজারতম বার্ষিকী অনুষ্ঠান ইয়াহিয়া খান ও ভারতীয় নেতাদের বৈঠকের একটা চমৎকার সুযোগ করে দেয়।

ঠিক একই দিন ঢাকা থেকে এক বেতার ভাষণে বাংলদেশের অধিকৃত এলাকার লাটবাহাদুর গাদ্দার মালিক বলেছে যে, সে ভারতীয় মন্ত্রীদের সঙ্গে দেখা করে শরণার্থীদের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ও অন্যান্য প্রাসঙ্গিক বিষয়ে আলোচনা করতে প্রস্তুত রয়েছে।

দুটি খবরের উৎসস্থল তেহরান ও ঢাকার মধ্যে দূরত্ব অনেক-হাজার হাজার মাইল। কিন্তু আশ্চর্যজনক মিল রয়েছে খবর দুইটির সারসংক্ষেপে। ব্যাপারটা অদ্ভুত ঠেকছে অনেকের কাছেই। তবু একথা সত্য যে, সমস্যার কেন্দ্রভূমি বাংলাদেশ হওয়া সত্ত্বেও ইয়াহিয়া ধর্না দিয়েছে ইরানের দরবারে, উদ্যোগ-আয়োজন চলছে ইয়াহিয়ার সঙ্গে ভারতীয় নেতাদের বৈঠকের। আর এদিকে ইয়াহিয়ার ভাড়াটিয়া গভর্নর মালিক বাস্তচ্যুত বাঙ্গালী শরণার্থীদের স্বদেশে ফিরিয়ে আনবার জন্য আলোচনা করতে চাইছে ভারতীয় মন্ত্রীবর্গের সঙ্গে।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<005.005.113>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

 

কিন্তু কেন? পশ্চিম পাকিস্তানী জঙ্গীশাহীর এই আচরণের, ভারতের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার এত খায়েশ কেন?

বিশ্ববাসী জানেন ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের প্রত্যক্ষ কোন বিরোধ নেই। আসলে সংঘাত চলেছে, যুদ্ধ চলেছে শেখ মুজিবের স্বাধীন বাংলাদেশ এবং উপনিবেশবাদী পশ্চিম পাকিস্তানী জঙ্গীশাহীর মধ্যে। রক্তপাত, বর্বরতা, লুটতরাজ, নির্যাতন চলছে বাংলার মাটিতে-এসব করেছে ইয়াহিয়ার লেলিয়ে দেওয়া ডালকুত্তার দল। সাড়ে সাত কোটি বাঙালীর মাতৃভূমি বাংলাদেশ স্বাধীনতা ঘোষণা করে অমিতবিক্রমে লড়ে চলেছে হানাদার পশ্চিম পাকিস্তানী সেনাদস্যুদের বিরুদ্ধে। হানাদার বাহিনী নাপাম বোমা ফেলে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছাই করে দিচ্ছে বাংলাদেশের জনপদ। স্বাধীন বাংলার জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে কারারুদ্ধ করে রেখেছে জল্লাদ ইয়াহিয়া খান। লিপ্ত হয়েছে তার বিচার প্রহসনে। তাই সমগ্র বিরোধটা, মূল সংঘর্ষটা চলেছে বাংলাদেশের জনগণ আর পশ্চিম পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর সঙ্গে। এর মধ্যে ভারতের স্থান কোথায়? ভারতের কথা আসে কিসে?

কিন্তু তবু গোড়া থেকেই জঙ্গীশাহী চেষ্টা করে এসেছে বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রসঙ্গটি বেমালুম চাপা দিয়ে বিশ্ববাসীকে এই মর্মে বিভ্রান্ত করতে যে সংঘর্ষটা আসলে পাকিস্তন ও ভারতের মধ্যে। এর উদ্দেশ্যেও পরিষ্কার। জঙ্গীশাহী চাইছে পাক-ভারত সংঘর্ষের ডামাডোলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনকে স্তব্ধ করতে ইয়াহিয়া চাইছে বাংলাদেশ ইস্যু থেকে বিশ্ববাসীর দৃষ্টি কল্পিত পাক-ভারত বিরোধের দিকে সরিয়ে নিতে। আর সে কারণেই তেহরানের দুয়ারে ধর্না।

 

২২শে সেপ্টেম্বর, ১৯৭১

খবরের পর খবর। নয়াদিল্লীতে বাংলাদেশ সম্পর্কে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগদানকারী ২৫টি দেশ একবাক্যে বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি সংগ্রামী মানুষের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিনাশর্তে মুক্তি দাবী করেছে। গত সোমবার সম্মেলনের সমাপ্তি অধিবেশনে স্বাধীন বাংলাদেশেকে স্বীকৃতি দিয়ে সর্বপ্রকার রাজনৈতিক ও অর্থিক সাহায্য দানের জন্য বিশ্বের সকল রাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানানো হয়। ভারতের সর্বোদয় নেতা শ্রী জয়প্রকাশ নারায়ণের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে পাকিস্তানকে সর্বপ্রকার আর্থিক ও সামরিক সাহায্য দান বন্ধ করা এবং বাংলাদেশের জনগণের জন্য বরাদ্দকৃত সমুদয় সাহায্য সামগ্ৰী স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের মাধ্যমে বিলি-বন্টনের ব্যবস্থা করারও দাবী জানানো হয়।

এদিকে কুয়ালালামপুরে অনুষ্ঠিত কমনওয়েলথ সংসদীয় সম্মেলনে বাংলাদেশে হানাদার পশ্চিম পাকিস্তানী বাহিনীর বর্বর গণহত্যাযজ্ঞের তীব্র নিন্দা করে বাংলাদেশ সমস্যার রাজনৈতিক সমাধানের দাবী জানানো হয়েছে। সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের মুক্তি দাবী করে বলা হয়েছে, তাঁর মত কালজয়ী নেতাকে আটক রাখা গৰ্হিত অন্যায়। আফগানের বাদশাহ জহির শাহের মস্কো সফরশেষে প্রকাশিত সোভিয়েত – আফগান যুক্ত ইশতেহারেও বাংলাদেশ সমস্যার রাজনৈতিক সমাধানের সুপারিশ করা হয়েছে। এমনকি, বাংলাদেশে হানাদার পশ্চিম পাকিস্তানী সেনাদস্যুদের বর্বর গণহত্যাযজ্ঞের নীরব দর্শক জাতিসংঘের সেক্রেটারী জেনারেল উ থান্ট শেষ পর্যন্ত বিবেকের তাড়নায় বলতে বাধ্য হয়েছেন যে, মানবিক মূল্যবোধের মর্যাদাপূর্ন স্বীকৃতির ভিত্তিতে রাজনৈতিক সমাধানের মাধ্যমেই বাংলাদেশের মূল সমস্যার সমাধান সম্ভবপর। তিনি একথাও বলেছেন যে, বাঙালী জাতিকে সর্বপ্রকার সাহায্য করা বিশ্ববাসীর নৈতিক দায়িত্ব।

এদিকে, ফ্রান্সের বিশিষ্ট লেখক, রাজনীতিক ও প্রাক্তন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী মঁসিয়ে আঁদ্রে মালরো বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করবার সদিচ্ছা প্রকাশ করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, বাংলাদেশের পক্ষ হয়ে হানাদার দস্যুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবার ইচ্ছা প্রকাশ করে দেশ-

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

<005.005.114>

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড

 

বিদেশের বহু তরুণ তার কাছে চিঠি লিখেছে। এই খবর পরিবেশনাকারী একটি পত্রিকার ভাষায় “আজ বাংলার মুক্তিসংগ্রামে কার আগে প্রাণ, কে করিবে দান, তারি লাগি কাড়াকড়ি” পড়ে গেছে।

বলা বাহুল্য, উল্লেখিত সবকটি খবরই বাঙালী জাতির জন্য শুভ সংবাদ। কারণ, এতে একদিকে যেমন বাঙালী জাতির মুক্তিযুদ্ধের যৌক্তিকতা ব্যাপকভাবে স্বীকৃত হয়েছে, অন্যদিকে তেমনি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়ে গেছে যে দুনিয়ার মানুষ জল্লাদ ইয়াহিয়ার কথা বিশ্বাস করেনি। বরং পৃথিবীর বিবেকবান মানুষের কাছে অস্ত হীন ঘৃণা আর ধিক্কার ছাড়া তার আশা করবার আর কিছুই নেই।….

 

২৯ সেপ্টেম্বর, ১৯৭১

 

একটি বিদেশী পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে জানা যায়, লণ্ডনে এই মর্মে জোর জল্পনা-কল্পনা চলেছে যে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তি আসন্ন। কোন কোন পর্যবেক্ষকের মতে, বাংলাদেশ সম্পর্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে আলোচনার আগেই শেখ সাহেবকে মুক্তি দেওয়া হতে পারে। লণ্ডনে পাকিস্তানী অনুচররা এই মর্মে প্রচরণা চালিয়ে যাচ্ছে যে, শেখ মুজিবের কোন দোষ নেই। শুধুমাত্র চরমপন্থীরা দেশদ্রোহী কার্যকলাপের জন্য দায়ী। আর এরই দরুন ২৫শে মার্চ পাক ফৌজকে অস্ত্র হাতে রাস্তায় নামতে হয়েছিল।

এদিকে করাচী থেকে ফরাসী বার্তা সংস্থা এ-এফ-পি জানিয়েছে, জেনারেল ইয়াহিয়া খান বেগম মুজিবকে লয়ালপুরের কারাগারে আটক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের সঙ্গে দেখা করতে দিতে পারে। রাওয়ালপিণ্ডির বিভিন্ন পত্র-পত্রিকার খবর অনুযায়ী ইয়াহিয়া খান বঙ্গবন্ধুকে ঢাকায় চিকিৎসাধীন তার বৃদ্ধ পিতা এবং বৃদ্ধা মায়ের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ দিতে পারে। বলা হয়েছে যে, গত সপ্তাহে বাংলাদেশের অধিকৃত এলাকার গভর্নর ডাঃ মালিকের সঙ্গে দেখা করে বেগম মুজিব বঙ্গবন্ধু যাতে তার অসুস্থ পিতা-মাতাকে দেখতে পারেন সে ব্যবস্থা করার অনুরোধ জানান। পিণ্ডির পত্র-পত্রিকার খবরে আরও বলা হয়েছে যে, শেখ মুজিবের বিচারের রায় আগামী সপ্তাহেই দেওয়া হবে বলে মনে হয়।

জল্লাদ ইয়াহিয়া খেলাটা ভালো জমিয়ে তুলেছে। উপরের খবরগুলো একটু তলিয়ে দেখলেই পরিষ্কারভাগে বুঝতে পারা যায় যে এর পেছনে রয়েছে ইয়াহিয়ার এক সুচতুর চাল। এই ক’দিন আগেও জেনারেল ইয়াহিয়া খান “লা ফিগারো’ পত্রিকার প্রতিনিধির কাছে সদম্ভে বলেছে যে, শেখ মুজিব কোথায় আছে তা তার জানা নেই। কারণ, কারারুদ্ধ ক্রিমিনালদের কে কোথায় আছে তা-একটা দেশের প্রেসিডেন্টের জানা থাকবার কথা নয়। আজ সেই ইয়াহিয়া খানের সরকারই দয়ায় বিগলিত শেখ মুজিবের পত্নীকে তার সঙ্গে দেখা করার সুযোগ দেবে, বঙ্গবন্ধুকে তার রোগশয্যায়শায়ী পিতামাতাকে দেখতে ঢাকায় নিয়ে আসবে, এমন