বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধঃ দলিলপত্র – ৮ ম খণ্ড (অনুবাদসহ)

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধঃ দলিলপত্র – ৮ ম খণ্ড (অনুবাদসহ)

 

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধঃ দলিলপত্র থেকে বলছি

(৮ম খণ্ড)

গণহত্যা, শরণার্থী শিবির ও প্রাসঙ্গিক ঘটনা

 

 

 

 

 

 

অ্যাটেনশন!

পরবর্তী পেজগুলোতে যাওয়ার আগে কিছু কথা জেনে রাখুনঃ

 

  • ডকুমেন্টটি যতদূর সম্ভব ইন্টার‌্যাক্টিভ করা চেষ্টা করা হয়েছে। অর্থাৎ এই ডকুমেন্টের ভেতরেই অসংখ্য ইন্টারনাল লিংক দেয়া হয়েছে। আপনি সেখানে ক্লিক করে করে উইকিপিডিয়ার মতো এই ডকুমেন্টের বিভিন্ন স্থানে সহজেই পরিভ্রমণ করতে পারবেন। যেমন প্রতি পৃষ্ঠার নিচে নীল বর্ণে ‘সূচিপত্র’ লেখা শব্দটিতে কি-বোর্ডের Ctrl চেপে ধরে ক্লিক করলে আপনি সরাসরি এই ডকুমেন্টের সূচিপত্রে চলে যেতে পারবেন।
  • শুরুতেই ‘পূর্বকথা’ শিরোনামে আমাদের এই উদ্যোগ নেয়ার পিছনের কারণ সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে।
  • তারপর ‘দলিল প্রসঙ্গ’ শিরোনামে কিছু লেখা আছে। এটি যুদ্ধদলিলের ৮ম খণ্ড থেকে সরাসরি লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। এখানে আপনারা জানতে পারবেন যে এই ডকুমেন্টে গণহত্যা ও শরণার্থী শিবির নিয়ে আসলে কী কী আছে।

তারপর ‘সূচিপত্র’। এখান থেকেই মূল দলিল শুরু। সূচিপত্রটি সরাসরি দলিলপত্র থেকে নেয়া হয়েছে। সূচিপত্রে লেখা পেজ নাম্বারগুলো যুদ্ধদলিলের মূল সংকলনটির পেজ নাম্বারগুলোকে রিপ্রেজেন্ট করে। আপনার মূল দলিলের পিডিএফ ডাউনলোড করে মিলিয়ে দেখতে পারেন।

  • যুদ্ধদলিলে মোট ১৫ টি খণ্ড আছেঃ

প্রথম খন্ড : পটভূমি (১৯০৫-১৯৫৮)
দ্বিতীয় খন্ড : পটভূমি (১৯৫৮-১৯৭১)
তৃতীয় খন্ড : মুজিবনগর : প্রশাসন
চতুর্থ খন্ড : মুজিবনগর : প্রবাসী বাঙালীদের তৎপরতা
পঞ্চম খন্ড : মুজিবনগর : বেতারমাধ্যম
ষষ্ঠ খন্ড : মুজিবনগর : গণমাধ্যম
সপ্তম খন্ড : পাকিস্তানী দলিলপত্র: সরকারী ও বেসরকারী
অষ্টম খন্ড : গণহত্যা, শরনার্থী শিবির ও প্রাসঙ্গিক ঘটনা
নবম খন্ড : সশস্ত্র সংগ্রাম (১)
দশম খন্ড : সশস্ত্র সংগ্রাম (২)
একাদশ খন্ড : সশস্ত্র সংগ্রাম (৩)
দ্বাদশ খন্ড : বিদেশী প্রতিক্রিয়া : ভারত
ত্রয়োদশ খন্ড : বিদেশী প্রতিক্রিয়া : জাতিসংঘ ও বিভিন্ন রাষ্ট্র
চতুর্দশ খন্ড : বিশ্বজনমত
পঞ্চদশ খন্ড : সাক্ষাৎকার

  • এটি ৮ম খণ্ডের অর্থাৎ গণহত্যা, শরণার্থী শিবির ও প্রাসঙ্গিক ঘটনার দলিলের ইউনিকোড ভার্শন। এই খণ্ডে প্রায় ৫০০ পৃষ্ঠা বাংলা দলিলের পাশাপাশি ৫০ পৃষ্ঠা ইংরেজি দলিলও আছে। আপনাদের জন্য আমরা সেগুলো অনুবাদ করে দিয়েছি।
  • এই ডকুমেন্টে প্রতিটি দলিলের শুরুতে একটা কোড দেয়া আছে।

<খণ্ড নম্বর, দলিল নম্বর, পেজ নম্বর>

অর্থাৎ <৮,৬২,৪৬১> এর অর্থ আলোচ্য দলিলটি মূল সংকলনের ৮ম খণ্ডের ৬২ নং দলিল যা ৪৬১ নং পৃষ্ঠায় মুদ্রিত আছে। দলিল নম্বর বলতে সূচিপত্রে উল্লিখিত নম্বরকে বুঝানো হচ্ছে। উদ্ধৃত দলিলটি পীর-দরবেশদের উপরে পাকবাহিনীর অত্যাচার নিয়ে। বুঝার সুবিধার্থে দলিলটির শুরুর অংশ দেখে নিনঃ

  • আর <৮,২.১.৫.২০-২১> এর অর্থ দলিলটি ৮ম খণ্ডের ২ নং দলিলের ১ নং উপ-দলিলের ৫ নং অংশ। যা ২০ থেকে ২১ নং পৃষ্ঠায় মুদ্রিত আছে। কমা এবং ফুলস্টপ দ্বারা বিষয়াদি পৃথক করা হয়েছে। উদ্ধৃত দলিলটি একবার দেখে নিন। জুম করলে ভালোভাবে দেখতে পারবেন। এটি আবদুল কুদ্দুস মিয়া নামক রাজারবাগের একজন পুলিসের সাক্ষাৎকার। বুঝার সুবিধার্থে দলিলটির ২০ তম পৃষ্ঠাটির উপরিভাগ দেখে নিনঃ

 

 

 

এবং সেই দলিলের ২১ তম পৃষ্ঠার উপরিভাগঃ

দলিলে বানান সহ বেশ কিছু ভুল আমরা খুঁজে পেয়েছি। সেগুলোকে হলুদ মার্ক করা হয়েছে।

  • এই ফাইলটি আপনার কম্পিউটার বা মোবাইলে সংরক্ষিত করা থাকলে ভবিষ্যতে আপনি মুক্তিযুদ্ধ সংক্রান্ত যে বিতর্কিত কোন ইস্যু সম্পর্কে অত্যন্ত সহজে দলিলপত্রের রেফারেন্স দেখাতে পারবেন। আপনার নিজের এলাকার ঘটনাবলী জানতে পারবেন। কোনদিন মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে স্ট্যাটাস বা অন্যকিছু লিখতে ইচ্ছা হলে এখান থেকে সরাসরি কপি করে সহজেই লিখতে পারবেন।
  • মনে করুন, ২৬ শে মার্চ উপলক্ষে আপনি কোন ম্যাগাজিনে একটি লেখা দিবেন। এই ফাইলে তখন ২৬ শে মার্চ লিখে সার্চ দিলেই ৮ম খণ্ডের সেই সংক্রান্ত সকল দলিল পেয়ে যাবেন। ফলে রেফারেন্স নিয়ে লিখতে আপনার খুবই সুবিধা হবে। কারণ আমাদের মূল উদ্দেশ্য একটাই। আমরা যেন সঠিক ইতিহাস চর্চা করে বেড়ে ওঠা একটি প্রজন্ম হয়ে উঠি। এটা আমাদের নিজেদের জন্যেই অত্যন্ত প্রয়োজন। যে জাতি নিজের জন্মের ইতিহাস জানে না, সে জাতির চেয়ে দুর্বল সত্ত্বা পৃথিবীতে আর কিছু নেই।
  • মনে করুন, আপনি নিজের এলাকা নিয়ে জানতে চান। তবে নিজের এলাকার নাম লিখে এই ডকুমেন্টে সার্চ করুন। উদাহরণস্বরূপ, আপনি মিরপুর এলাকার হলে “মিরপুর” লিখে সার্চ করুন। ৮ম খণ্ডের মিরপুর নিয়ে সকল দলিল আপনার সামনে চলে আসবে। দেশকে জানার প্রথম শর্তই হলো নিজের এলাকাকে জানা।
  • আপনি চাইলে নিজের সুবিধামতো ডকুমেন্টটিকে সহজেই কয়েক ভাগে কপি করে ভাগ করে আলাদা আলাদা ডকুমেন্ট তৈরি করতে পারেন। মনে করুন, আপনি ঢাকা বিভাগে গণহত্যা নিয়ে আগ্রহী। তখন ঢাকা বিভাগটাকে সিলেক্ট করে কপি করে আলাদা ফাইল তৈরি করুন। পড়তে এবং প্রয়োজনীয় তথ্য খুঁজে পেতে করতে সুবিধা হবে।

মনোযোগ দিয়ে সারসংক্ষেপটি পড়ার জন্য ধন্যবাদ। এবার বিস্তারিত।

 

 

 

 

দলিল প্রসঙ্গঃ গণহত্যা, শরণার্থী শিবির ও প্রাসঙ্গিক ঘটনা

(পৃষ্ঠা নাম্বারগুলো মূল দলিলের পৃষ্ঠা নাম্বার অনুযায়ী লিখিত। এর সাথে এই ওয়ার্ড ফাইলের পৃষ্ঠা নাম্বার রিলেটেড নয়)

২৫ শে মার্চের রাতে আকস্মিকভাবে ঢাকার বেসামরিক জনসাধারণের উপর পাক হানাদার বাহিনীর সামরিক হামলার পর থেকে ডিসেম্বরের মাঝামাঝি তাঁদের আত্মসমর্পণের পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত তারা সারা বাংলাদেশে নির্বিচারে হত্যা, নির্যাতন, ধর্ষণ, লুণ্ঠন ও অগ্নিসংযোগের যে ব্যাপক ক্রিয়াকলাপ চালায় সে সম্পর্কিত দলিলপত্র এই খন্ডে গ্রন্থিত হয়েছে। দলিলাদির প্রকৃতি অনুযায়ী এগুলো কয়েকটি ভাগে বিন্যস্ত করা হয়েছে।

 

প্রথমে রয়েছে হত্যার প্রত্যক্ষদর্শী এবং নির্যাতন ও অগ্নিসংযোগের শিকার ব্যাক্তিগণের পাকিস্তান সেনাবাহিনীর এসব তৎপরতার বিরুদ্ধে জেনেভাস্থ মানবাধিকার কমিশনে প্রেরিত কয়েকটি আবেদনের অনুলিপি (পৃষ্ঠা ১-১১)।

 

এরপরে রয়েছে বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকার গৃহীত সাক্ষাৎকার (পৃষ্ঠা ১২-৩২৪)। বাংলাদেশের ৪ টি আঞ্চলিক বিভাগের প্রতিটি জেলার সর্বশ্রেনীর জনসাধারণের কাছ থেকে নেয়া সাক্ষাৎকার হতে প্রতিনিধিত্বমূলক ২৬২ টি এখানে সন্নিবেশিত করা হয়েছে। মোটামুটিভাবে হানাদার বাহিনীর হাত থেকে আকস্মিকভাবে বেঁচে যাওয়া, তাঁদের বর্বর নির্যাতনের সাক্ষী ও ধর্ষিত নারীসহ বিভিন্ন ব্যাক্তিবর্গের এসব বিবৃতির মাধ্যমে বাংলাদেশের পল্লীগ্রাম তথা প্রত্যন্ত অঞ্চলে হানাদার বাহিনীর হত্যাকাণ্ড ও ধ্বংসযজ্ঞের ধরণ ও পদ্ধতির একটি সামগ্রিক চিত্র এই অধ্যায়ে পাওয়া যাবে।

 

এই একই চিত্র আমরা তুলে ধরার প্রয়াস করেছি আরেকটি মাধ্যম থেকে। সেটি হলো বাংলাদেশের পত্রপত্রিকা ও সাময়িকী (পৃষ্ঠা ৩২৫-৫২০)। এখানে উল্লেখ্য যে, ২৫শে মার্চের পর ঢাকা এবং দখলদার বাহিনী কবলিত বাংলাদেশের অন্যান্য এলাকার পত্রপত্রিকা সমূহ গণহত্যা ও নির্যাতনের কোনো খবর প্রকাশ করতে পারে নি। দখলদার কবলিত বাংলাদেশের গণহত্যার ৯ মাসের ঘটনাবলী পত্রপত্রিকায় উন্মোচিত হতে শুরু করে কেবলমাত্র বিজয়ের পর। সেকারণেই তৎপরবর্তীকালের বিভিন্ন পত্রপত্রিকা ও সাময়িকীতে প্রকাশিত গণহত্যার তথ্য ও সংবাদ নিবন্ধ নিয়েই নির্মিত হয়েছে এই অধ্যায়। ‘বাংলার বাণী’ ওই সময় গণহত্যার উপর বের করে বিশেষ সংখ্যা। সেখান থেকে বেশ কয়েকটি নিবন্ধ এখানে সংকলিত হয়েছে। পত্রপত্রিকা থেকে নেয়ার সময় বিষয়বস্তুর দিকেই মূলত লক্ষ্য রাখা হয়েছে- পত্রিকাবিশেষ নয়। কোনও কোনও বিষয় একাধিক পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ার ক্ষেত্রে ঘটনার বিবরণকে প্রাধান্য দিয়ে তার যেকোনো একটি হতে নেয়া হয়েছে।

২৫ শে মার্চের রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-ছাত্র-কর্মচারী এবং সারাদেশের শিক্ষক, সাংবাদিক, ডাক্তার, বুদ্ধিজীবী, প্রকৌশলী, সরকারী, পুলিশ ও সশস্ত্রবাহিনীর বাঙালি সদস্য এবং অন্যান্য সকল লোকদের উপর পাকবাহিনী ও তাদের দোসরদের দ্বারা পরিচালিত হত্যা ও নির্যাতনের বিচিত্র বিবরণ এই অধ্যায়ে বিধৃত হয়েছে। ১৪ ডিসেম্বর আল-বদরদের দ্বারা নিহত বুদ্ধিজীবীদের শেষ দিন ও শেষ কথা শীর্ষক প্রতিবেদনটি নেয়া হয়েছে সাপ্তাহিক ‘বিচিত্রা’ (১৭ ডিসেম্বর, ১৯৭৩) থেকে।

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকাশনা বিভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ শিক্ষক-ছাত্র-কর্মচারীদের যে তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে সেটি পরিশিষ্টে সংযোজন করা হয়েছে (পৃষ্ঠা ৫৭৪)।

 

আরেকটি পরিশিষ্টে সংযোজিত হয়েছে ’৭২ সালের তথ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ’ গ্রন্থে মুদ্রিত সারাদেশের শহীদ শিক্ষক, সাংবাদিক, রাজনৈতিক নেতা ও কর্মী তথা বুদ্ধিজীবী ও বিভিন্ন পেশাজীবীদের নামের তালিকা (পৃষ্ঠা ৫৭৬)।

 

একাত্তরে বাংলাদেশে পাকবাহিনীর গণহত্যা বিশ্বের পত্রপত্রিকা ও বেতার মাধ্যমগুলোতেও ব্যাপকভাবে এসেছে। এই গণহত্যার ঘটনাবলী তাঁরা কিভাবে প্রত্যক্ষ করেছে, নমুনাস্বরুপ তার একটি সংক্ষিপ্ত চিত্রও এখানে উপস্থাপন করা হয়েছে “বিদেশী পত্রপত্রিকা” অংশে (পৃষ্ঠা ৫২১-৫৩৯)। উল্লেখ্য যে, ‘বিশ্ব জনমত’ (চতুর্দশ) খন্ডেও গণহত্যা ও বাংলাদেশের প্রসঙ্গে প্রচুর দলিল সন্নিবেশিত হয়েছে।

 

হানাদারবাহিনীর হত্যা ও নির্যাতনে ভীত হয়ে লক্ষ লক্ষ বাঙালি ভারতে শরণার্থী হয়েছিল। তাদের দেশ ত্যাগ, নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধান, খাদ্য-চিকিৎসা ও ত্রাণের জন্য শিবিরে দিনযাপন ইত্যাদি বিষয় নিয়ে রচিত হয়েছে আরেকটি অধ্যায় ‘বাংলাদেশের শরণার্থী’। এই প্রসঙ্গে ‘ভারতীয় পত্রপত্রিকায় প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ’ শিরোনামে কিছু সংবাদ নিবন্ধ সংযোজিত হয়েছে এই খন্ডের শেষাংশে (পৃষ্ঠা ৫৪১)।

 

এছাড়া ভারতে বাঙালি শরণার্থী শিবিরসমূহের একটি তালিকা এবং সংখ্যার একটি হিসাবও মুদ্রিত হয়েছে (পৃষ্ঠা ৫৫৯)।

 

বাংলাদেশের গণহত্যার পূর্ণচিত্র একটি দলিলখন্ডে সন্নিবেশিত করা সম্ভব নয়। এখানে সারাদেশের আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা সর্বশ্রেনীর মানুষের উপর পাকবাহিনীর হত্যা ও নির্যাতনের প্রতিনিধিত্বমূলক বিবরণ উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছে। উল্লেখ্য যে এসব বিবরণের মধ্যে সংখ্যার হিসাবগুলো সর্বক্ষেত্রে সম্পূর্ণ সঠিক নাও হতে পারে। তবে এগুলোর দ্বারা এই গণহত্যার প্রকৃতি এবং ব্যাপকতা ও এর গভীরতা সম্যকভাবে ধরা পড়ে।

 

 

 

সূচিপত্র

(কি-বোর্ডের Ctrl চেপে ধরে এখানকার যে কোন বিষয়ে ক্লিক করে আপনারা সরাসরি সেই দলিলে চলে যেতে পারবেন)

(পৃষ্ঠা নাম্বারগুলো মূল দলিলের পৃষ্ঠা নাম্বার অনুযায়ী লিখিত)

ক্রমিক বিষয় পৃষ্ঠা
জেনেভাস্থ মানবাধিকার কমিশনের কাছে প্রেরিত বাংলাদেশে পাকবাহিনী কর্তৃক নির্যাতিত কতিপয় ব্যক্তির চিঠি (অনুবাদ)
গণহত্যা ও নির্যাতনের বিবরণঃ বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় গৃহীত সাক্ষাৎকার ১২-৩২৪
ঢাকা বিভাগ ১২
রাজশাহী বিভাগ ৬৭
খুলনা বিভাগ ১৮৩
চট্টগ্রাম বিভাগ ২৭০
ঢাকায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গণহত্যার অভিযানের ওপর একটি প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ ৩২৫
পাকবাহিনীর ইকবাল হল আক্রমণের উপর দু’টি প্রতিবেদন ৩৩১
জগন্নাথ হলে পাকবাহিনীর গণহত্যার উপর কয়েকটি প্রতিবেদন ৩৩৫
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আবাসিক এলাকায় পাক বাহিনীর হত্যাভিযান ৩৪৯
গণহত্যার কিছু দলিল ৩৫৩
পাকসেনাদের হাতে লেঃ কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেনের বিয়োগান্ত পরিনতির বিবরণ ৩৫৬
ঢাকা প্রেসক্লাবের উপর ট্যাংকের বোমাবর্ষণঃ একটি প্রতিবেদন ৩৫৯
১০ ময়নামতি ক্যান্টমেন্ট পাকবাহিনী হত্যাযজ্ঞের উপর দুটি প্রতিবেদন ৩৬৬
১১ নারায়নগঞ্জে ২ টি ছাত্রের হত্যাকাহিনী ৩৭৩
১২ অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো নরপশুরা ৩৭৪
১৩ পাকবাহিনীর জিঞ্জিরা আক্রমণ ৩৭৬
১৪ “জল্লাদেরা স্বামীর লাশটাও একবার আমাকে দেখতে দিলো না” ৩৭৯
১৫ মেজর জিয়ার পরিবারের উপর পাকবাহিনীর নির্যাতনের বিবরণ ৩৮১
ক্রমিক বিষয় পৃষ্ঠা
১৬ বর্বরতার রেকর্ড ৩৮৫
১৭ রমনা পার্কের বধ্যভূমি ৩৮৭
১৮ সাভারের কয়েকটি হত্যাকাহিনী ৩৮৮
১৯ রংপুর জেলাটাই যেন বধ্যভূমিঃ ৩৯০
২০ আমার ভাইকে তোমরা হত্যা করো না ৩৯২
২১ কঙ্কালের মিছিল এখানে ৩৯৩
২২ সিরাজগঞ্জ যমুনা পাড়ের কিছু হত্যা-কাহিনী ৩৯৫
২৩          আর এক বদ্ধভূমি চট্টগ্রামের দামপাড়া ৩৯৬
২৪ গ্রামে গ্রামে পথে পথে বধ্যভূমি ৩৯৭
২৫ রাজশাহীর গর্তে আরো নরকংকাল ৩৯৯
২৬ ধামরাই আজ শ্মশান ৪০০
২৭ হাজীগঞ্জে খানসেনাদের হত্যাযজ্ঞের স্বাক্ষর ৪০২
২৮ কিশোরগঞ্জের হত্যাকাণ্ড ৪০৩
২৯ স্বাধীনতা এলো, দানবীর আর পি সাহা আজও এলেন না ৪০৫
৩০ কুমিল্লা ও রাজশাহীতে (বিশ্ববিদ্যালয়) গণহত্যার স্বরূপ ৪০৭
৩১ নাটোরের ছাতনীতে পাক বাহিনীর বর্বরতা ৪০৯
৩২ খান সেনারা ওকে বাঘের খাঁচায় ঢুকিয়েছিল ৪১১
৩৩ হাজার প্রাণের হত্যাপুরী লাকসাম সিগারেট ফ্যাক্টরি ৪১৩
৩৪ চাঁদপুরে ৮ মাসের বিভীষিকা ৪১৫
৩৫ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পাক বাহিনীর হত্যা, লুট ও নির্যাতন ৪১৭
৩৬ নৃশংসতার আরেক স্বাক্ষর ভারতেশ্বরী হোমস ৪১৯
৩৭ দিনাজপুরে হত্যা ও লুণ্ঠন ৪২০
৩৮ “ওরা ছবাইকে গুলি করে মেরেছে ৪২২
৩৯ কে কটা হত্যা করলো তার ওপর নির্ভর করতো খান সেনাদের পদোন্নতি ৪২৪
৪০ বগুড়ায় পাক বাহিনীর হত্যাকাণ্ডের উপর ২টি প্রতিবেদন ৪২৬
৪১ খুলনায় নরমেধযজ্ঞ ৪৩০
৪২ চট্টগ্রামে বদ্ধভূমির সন্ধান ৪৩২
ক্রমিক বিষয় পৃষ্ঠা
৪৩ চাঁদপুরে পাকবাহিনীর হত্যালীলার আরো কাহিনী ৪৩৩
৪৪ সৈয়দপুরে বাঙ্গালী নিধন অভিযানের একটি প্রত্যক্ষ বিবরণ ৪৩৫
৪৫ জল্লাদেরা আছড়েও মানুষ মেরেছে ৪৩৭
৪৬ খুলনায় পাক বাহিনীর নরমেধযজ্ঞ ৪৩৯
৪৭ নওগাঁয় পাকিস্তানিদের হত্যাযজ্ঞের আরেকটি অধ্যায় ৪৪১
৪৮ অমানুষিক নির্যাতনেও তাঁর মনের বলিষ্ঠতা কমে নি ৪৪৩
৪৯ মানিকগঞ্জের একটি বধ্যভূমি সাটুরিয়া হাট ৪৪৪
৫০ মরণপুরী ভোলা ওয়াপদা কলোনি ৪৪৫
৫১ পটুয়াখালীর জেলখানায় বধ্যভূমি ৪৪৭
৫২ ময়মনসিংহে খান সেনাদের বর্বরতা ৪৪৮
৫৩ অগ্নিদগ্ধ, লুণ্ঠিত, ধর্ষিত কাশিয়াবাড়ী ৪৪৯
৫৪ ভৈরবে হত্যাকাণ্ড ৪৫১
৫৫ ফেনীতে পাকবাহিনীর নৃশংসতার কাহিনী ৪৫২
৫৬ বগুড়ার মান্নান ভাই এবং আরও কয়েকজন তরুণ হত্যার বিবরণ ৪৫৩
৫৭ মনুব্রিজে প্রকাশ্য গণহত্যা ৪৫৪
৫৮ মৌলভিবাজারে আরও বধ্যভূমির সন্ধান ৪৫৫
৫৯ গোপালপুর সুগারমিলে গণহত্যা ৪৫৬
৬০ স্বাধীনতার বেদীমূলে পিতা- পুত্র ৪৫৮
৬১ কেউ পাশবিকতা থেকে অব্যাহতি পায় নি ৪৫৯
৬২ পীর দরবেশরাও রেহাই পায়নি ৪৬১
৬৩ নারকীয় তাণ্ডবের আর এক লীলাভূমি ৪৬২
৬৪ একটি হালকা মেশিনগানের জন্য বত্রিশটি জীবনের পরিসমাপ্তি ৪৬৩
৬৫ আর এক শহীদ গণপরিষদ সদস্য নজমুল হক সরকার ৪৬৪
৬৬ দানবীর নূতনচন্দ্র সিংহ বাঁচতে পারেন নি ৪৬৫
৬৭ রংপুরের দুটি গণসমাধি ৪৬৬
৬৮ অধ্যাপক মুজিবুর রহমান দেবদাস হয়ে বেঁচে আছেন ৪৬৭
৬৯ গাজীপুর অস্ত্র কারখানায় কয়েকজন কর্মচারীর হত্যাকাণ্ড ৪৭০
ক্রমিক বিষয় পৃষ্ঠা
৭০ নির্মম অত্যাচারে নিহত ওসি ৪৭২
৭১ রাজশাহীতে দস্যুবাহিনীর বর্বরতার প্রাথমিক জরীপ ৪৭৪
৭২ রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজের ক’জন শহীদ ৪৭৫
৭৩ পাক হানাদারদের ধবংসযজ্ঞের কবলে কয়েকটি ঐতিহাসিক স্মৃতিচিহ্ন ৪৭৭
৭৪ ওরা ডাক্তার মেরেছে ৪৭৯
৭৫ ওরা সাংবাদিক মেরেছে ৪৮২
৭৬ যোগেশ বাবুর হত্যা কাহিনী ৪৮৩
৭৭ ‘ইত্তেফাক’-এর সাংবাদিকের লেখায় ২৫ শে মার্চের রাতের সামরিক হামলার প্রত্যক্ষ বিবরণ ৪৮৫
৭৮ ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজে পাকবাহিনীর হামলার বিবরণ ৪৮৯
৭৯ একাত্তরে রংপুরের আলমনগর ৪৯২
৮০ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনের মধুদা ৪৯৫
৮১ লে. কর্নেল ডা. নুরুল আবসার মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর ৪৯৭
৮২ ডঃ আয়েশার হত্যাকাণ্ড ৪৯৯
৮৩ হানাদার বাহিনীর সহযোগী আল-বদরদের হত্যার শিকার কয়েকজন ৫০০
৮৪ বেগম মুজিব কিভাবে কাটিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলো ৫১৩
৮৫ শহীদ শামসুল হক ও নুরুল হক ৫১৭
৮৬ শহীদ চার ভাই ৫১৯
৮৭ গণহত্যা ও নির্যাতনের বিবরণঃ বিদেশী পত্র-পত্রিকা ৫২১
৮৮ বাংলাদেশে শরণার্থী, গণহত্যা ও নির্যাতন প্রসঙ্গে ভারতীয় পত্র-পত্রিকায় প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ ৫৪১
৮৯ শরণার্থীদের উপর আই,আর,সি-র একটি রিপোর্ট ৫৫৩
৯০ শরণার্থী ও শরণার্থী শিবির সম্পর্কিত কিছু তথ্য ৫৫৯
৯১ পরিশিষ্ট-১ পাকবাহিনী ও তাদের দোসরদের দ্বারা নিহত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ছাত্র ও কর্মচারীদের নামের একটি তালিকা ৫৭৩
৯২ পরিশিষ্ট-২ শহীদ বুদ্ধিজীবী ও বিভিন্ন পেশাজীবীদের নামের আরেকটি তালিকা ৫৭৫
৯৩ নির্ঘণ্ট ৫৭৯

জেনেভাস্থ মানবাধিকার কমিশনের কাছে প্রেরিত বাংলাদেশে পাকবাহিনী কর্তৃক নির্যাতিত কতিপয় ব্যক্তির চিঠি (অনুবাদ)

 

 

নিটোল চন্দ্র দাশ

<৮,১,১> (চিঠিঃ ১)

একাত্তরের ২৬ মার্চ রাতের হত্যাযজ্ঞের কথা উল্লেখ করে জনৈক আবদুল করিম একাত্তরের ৮ই জুন হিউম্যান রাইটস কমিশন, সুইজারল্যান্ডে একটা চিঠি পাঠান। এখানে তিনি উল্লেখ করেন যে,

পাকিস্তানি সেনারা ঐদিন রাত আনুমানিক ১০ টার দিকে ঢাকার মালিবাগে তার বাসায় হামলা করে।

বাসায় ঢুকেই তাঁর বাবাকে জিজ্ঞাসা করে, তুমি কি বাঙালি? তার বৃদ্ধ বাবা উত্তর দেয়, হ্যাঁ। তখন সেনারা সরাসরি তাঁর উপরে গুলি চালায়।

পরে তার ভাইকেও একই প্রশ্ন করা হয়, উত্তর একই হওয়ায় তাকেও গুলি করা হয়।

যখন আবদুল করিমকেও এই প্রশ্ন করা হলো, তখন আবদুল করিম চালাকির সাথে উত্তর দেন যে, সে কেবল একজন অতিথি। তারপর পাক সেনারা তাকে জিজ্ঞাসা করে, সে কি হিন্দু? জবাবে করিম বলেন যে, সে একজন মুসলিম এবং পশ্চিম পাকিস্তানে থাকেন।

পরে পাকিস্তানি সেনারা তাকে ছেড়ে দিয়ে ঘর ছেড়ে চলে যায়।

 

নিটোল চন্দ্র দাশ

<৮,১.২,২-৩> (চিঠিঃ২)

জনৈক এ, বি এম কায়সার আহমেদ একাত্তরের ১০ ই জুন হিউম্যান রাইটস কমিশন, সুইজারল্যান্ডে একটা চিঠি পাঠান। এখানে তিনি উল্লেখ করেন যে, তাঁর বাড়ি ছিল কুমিল্লা জেলার দাউদকান্দিতে। মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রাণ বাঁচাতে তিনি ভারতের আগরতলায় পালিয়ে যান। তাঁর ভাষ্যেঃ

“পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বর্বরতা ও নৃশংসতা ছিল তুলনাহীন। ঢাকা থেকে শুরু করে নারায়ণগঞ্জ, তালতলা, মুন্সিগঞ্জ, সিরাজদিঘা ও গজারিয়া পুলিশ স্টেশনে তারা অত্যাচারের অসংখ্য চিহ্ন রেখে যায়। রাতের অন্ধকারে তারা অগুনতি নিরীহ মানুষ হত্যা করে। কেবলমাত্র গজারিয়াতেই তারা ৮ শতাধিক নারী,পুরুষ ও শিশু হত্যা করে।সেই সাথে টাকা,গয়না ও মূল্যবান সবকিছু লুট করে নেয়।

প্রকাশ্য দিবালোকে তারা ১২ থেকে ৩০ বছর বয়সী মহিলা ও মেয়েদের বন্দি করে, কালো কাপড় দিয়ে চোখ বেধে মিলিটারি ক্যাম্পে নিয়ে যেত। সেখান থেকে তাদের পশ্চিম পাকিস্তানে চালান করে দেয়া হত।

কায়সার আহমেদ নিজে হাত বাঁধা অবস্থনায় শতাধিক যুবকের লাশ নারায়নগঞ্জের গোদাইলে অবস্থিত বার্মা ইস্টার্ন কোম্পানি ও ইএসএসও কোম্পানির বারান্দায় পড়ে থাকতে দেখেন। পরে এই লাশগুলো নদীতে ফেলে দেয়া হতো।

এলাকার কিশোরী থেকে ষাট বছর বয়সী কোন মহিলাকেই ছাড় দেয়া হত না। তাদের ধর্ষন ও হত্যার পর ফেলে দেয়া হত। একই ধরনের বর্বরতা তারা নারায়ণগঞ্জ টার্মিনাল জেটি ও ফতুল্লাতেও চালায়।

ইয়াহিয়া সরকার ১২ থেকে ৩০ বছরের সবাইকে সেনা ক্যাম্প থেকে আইডেন্টিটি কার্ড নেয়ার জন্য আদেশ জারি করে। কিন্ত দুর্ভাগ্যবশত তাদের কেউই আর কখনো ফিরে আসে নি। তাঁদের ভাগ্যে কি ঘটেছিল তা সহজেই অনুমেয়।

যখন মুক্তিকামী যোদ্ধারা উল্টা আক্রমন শুরু করল,পাক সেনারা তখন কেবল নিরীহ গ্রামবাসীদের মেরেই ক্ষান্ত হল না। তাদের কবল থেকে দুধের শিশু থেকে শুরু করে বয়োবৃদ্ধ, কেউই ছাড় পেল না। গ্রামের পর গ্রাম তারা জ্বালিয়ে দিতে লাগল।

৭ই মার্চে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নির্দেশে সব ধরনের কর প্রদান বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। ফলে পাকিস্তান সরকার অত্যাচারের মাত্রা বাড়িয়ে দিল। শুধু তাই নয়, ঘোষনা প্রদান করল যে, ১৫ই মে ১৯৭১ এর মাঝে যারা সমস্ত কর পরিশোধ করবে না, তাঁদের স্থাবর অস্থাবর সব ধরণের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হবে।

এদিকে টিক্কা খানের মদদে বিশ্বাসঘাতক বিহারীরা নিরীহ বাঙ্গালিদের উপর ঝাপিয়ে পড়ল। তাদের ঘরবাড়ি লুট ও অগ্নিসংযোগ করা হল। মেয়েদের জোরপূর্বক অপহরণ ও ধর্ষন করা হল। তাদের অপরাধ সকল মাত্রা ছাড়িয়ে গেল।

তারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে যুবক ছেলেদের ধরে আনতো। তাঁদের হাত পা বেঁধে, শরীরে জখম করে দেহের সমস্ত রক্ত বের করে ফেলতো এবং লাশগুলোকে জলে ভাসিয়ে দিতো।

 

নিটোল চন্দ্র দাশ

<৮,১.৩,৩-৪> (চিঠিঃ৩)

মুক্তিযুদ্ধের সময় কুমিল্লা জেলার কোতোয়ালি থানার অন্তর্গত বিজয়পুর হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন ফজলুল হক। বাসা বাঞ্ছারামপুর। তিনি একাত্তরের ১১ই জুন হিউম্যান রাইটস কমিশন, সুইজারল্যান্ডে একটা চিঠি পাঠান। এখানে তিনি উল্লেখ করেন যে,

১৯৭১ সালের এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে পাক সেনারা বিজয়পুরে অবস্থিত বাগমারা হাই স্কুল ও কায়েদে আজম হাই স্কুলে আক্রমণ করে।

তারা স্কুলের সব দরজা- জানালা, ল্যাবের সব যন্ত্রপাতি, আসবাব পত্র, অফিস সংক্রান্ত কাগজপত্র সবকিছু ধ্বংস করে। পরবর্তীতে তারা মীরাবাজার উচ্চ বিদ্যালয়েও একই ভাবে হামলা করে এবং পুরো স্কুলঘর জ্বালিয়ে দেয়। পাক সেনারা আলেকদিয়া গ্রাম থেকে দুইজন ছাত্রকে ধরে নিয়ে যায়। যারা আর কখনো ফিরে আসে নি।

মে মাসের শেষ সপ্তাহে পাকিস্তানি সৈন্যরা বরুরা নামক গ্রাম থেকে দুইজন কমবয়সী মেয়েকে জিপে তুলে নিয়ে লালমাই হয়ে কুমিল্লার পথে যাত্রা করে এবং ধর্মপুর নামক গ্রামের পাশে তাদের একজনকে তারা খোলা রাস্তায় ধর্ষন করে।

লালমাইয়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর একটি ঘাটি ছিল। সেখানে তারা ইচ্ছামত লোক ধরে আনত এবং খেয়ালখুশিমত তাদের হত্যা করত। সেখান থেকে ভাগ্যগুনে বেচে ফিরে আসা কয়েকজন তাকে এই তথ্যগুলো জানায়।

যাদেরকে হত্যা করা হত,তাদের লাশ লালমাই পাহাড়ের ভিতর অবস্থিত সি এন্ড বি ডাকবাংলোর পাশের একটি গর্তে ফেলা হত। অপহরণকৃত মহিলা ও মেয়েদের জন্য তাদের আলাদা আলাদা তাবু ছিল, যেখানে পাকিস্তানিরা তাদের যৌনলালসার নিবৃত্তি করত। সেখান থেকে একজন লোক পালিয়ে আসতে সক্ষম হয়। যাকে বলা হয়েছিল একটি মেয়ের লাশ ফেলে দিয়ে আসার জন্য। মেয়েটিকে পর্যায়ক্রমে অসংখ্যবার ধর্ষন ও অত্যাচার করে হত্যা করা হয়েছিল।

চিঠি লেখাকালে লেখক পালিয়ে আগরতলা গিয়ে তদকালীন এম্পি প্রফেসর খুরশিদ আলমের সাথে আগরতলায় অবস্থান করছিলেন।

 

নিটোল চন্দ্র দাশ

<৮,১.৪,৪-৫> (চিঠিঃ ৪)

তাজুল ইসলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩য় বর্ষে পড়তেন। থাকতেন সলিমুল্লাহ হলে। তিনি একাত্তরের ১৭ই জুন হিউম্যান রাইটস কমিশন, সুইজারল্যান্ডে একটা চিঠি পাঠান। এখানে তিনি উল্লেখ করেন যে,

 

পাকসেনারা যখন আধুনিক সব অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোতে আক্রমণ শুরু করে, তখন সলিমুল্লাহ হলের ছাত্রদেরকেই সবচেয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। এর এক সপ্তাহ আগেই পাক সেনারা ডাকসুর সাংস্কৃতিক পরিষদের সেক্রেটারি ইকবাল আহমেদ ও তার ছোট ভাইকে গ্রেফতার করে। যাদের খোঁজ আর কখনোই পাওয়া যায় নি। গজারিয়ায় পাকিস্তানি সেনারা অসংখ্য নিরপরাধ ও নিরস্ত্র মানুষকে হত্যা করে। উনি ভয়ে ইন্ডিয়া পালানোর কথা ভাবছিলেন এবং এই চিঠিটি ওখান থেকে পোস্ট করার চিন্তা করছিলেন।

ছাত্র কমিউনিটির একজন হিসাবে তিনি এ সময় এই ঘটনার বিরুদ্ধে দ্রুত কার্যকরী প্রতিরোধের দাবি জানান।

 

নিটোল চন্দ্র দাশ

<৮,১.৫,৫> (চিঠিঃ ৫)

জনাব নুরুল আমিন থাকতেন টি এন্ড টি কলোনিতে (মগবাজার, ওয়ার্লেস)। তিনি একাত্তরের ২২ শে জুন হিউম্যান রাইটস কমিশন, সুইজারল্যান্ডে একটা চিঠি পাঠান। এখানে তিনি উল্লেখ করেন যে,

যখন ঢাকা শহরজুড়ে পূর্নমাত্রায় মিলিটারি অপারেশন শুরু হয়, তখন বাইরের জেলা থেকে অবাঙালি পশ্চিম পাকিস্তানি বিহারিরা দলে দলে ঢাকায় এসে লুটতরাজ শুরু করে।

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রাও ফরমান এর নির্দেশে তারা একের পর এক হিন্দু বাড়ি দখল ও লুট করতে লাগল। অবাঙ্গালি পুলিশ সদস্যরা প্রতিনিয়ত বাঙ্গালিদের উপর অত্যাচার করতে লাগল। রাতের বেলা পাক সেনারা যাত্রাবাড়ি ও গোপীবাগ এলাকা ঘিরে ফেলে, ঘর থেকে যুবক ছেলেদের ধরে নিয়ে যায়। যাদের আর কখনোই দেখা যায় নি। রাজারবাগে পাক সেনারা সিভিল ড্রেসে টহল দিত, যদিও তাদের সাথে অস্ত্র থাকত। তারা বাড়িতে ঢুকে ঢুকে ধর্ষন করত। একই সপ্তাহে তারা নরসিংদীতেও এভাবে আক্রমন চালায়।

অবাঙ্গালি পুলিশ সদস্যরা নিউ মার্কেট সংলগ্ন এলাকায় মেয়েদের উত্ত্যাক্ত করত এবং জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যেত।

 

নিটোল চন্দ্র দাশ

<৮,১.৬,৬-৭> (চিঠিঃ ৬)

একুশ বছর বয়েসি আবদুল কাদের ঢাকা বিষ্ববিদ্যালয়ে পড়তেন। তার পিতার নাম ছিল মৌলভি আলী। পৈতৃক নিবাস কালিগঞ্জ থানার চরসিন্দুর উপজেলার চালনা গ্রামে। তিনি একাত্তরের ২৩ শে জুন হিউম্যান রাইটস কমিশন, সুইজারল্যান্ডে একটা চিঠি পাঠান। এখানে তিনি উল্লেখ করেন যে,

একাত্তরের মার্চের ২৫ তারিখ তিনি মালিবাগে অবস্থান করছিলেন। আনুমানিক রাত ১২ টার দিকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী অত্যাধুনিক সব অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে রাজারবাগ পুলিস লাইন আক্রমণ করে।

পরদিন রাজারবাগ দিয়ে যাওয়ার সময় তিনি অসংখ্য মৃতদেহ এখানে সেখানে বিচ্ছিন্নভাবে পড়ে থাকতে দেখেন। কিছু পাকা দালান ও পুলিস সদস্যদের থাকার জন্য টিনশেড ঘরগুলো আগুনে পুড়িয়ে ফেলা হয়। ২৬ তারিখে উনি ইকবার হল, এস এম হল, জগন্নাথ হল ও রোকেয়া হল পরিদর্শনে যান। দেখেন যে, ছাত্রদেরকে মেরে রাস্তায় ফেলে রাখা হয়েছে এবং তাদের বইপত্র মাঠে ছুঁড়ে ফেলা হয়েছে।

জগন্নাথ হলকে প্রায় পুরোপুরি ধ্বংস করা হয় এবং অসংখ্য ছাত্রকে হত্যা করা হয়। রোকেয়া হলের নিচ তালায় তারা অগ্নিসংযোগ করে। সবগুলো শহীদ মিনার ও কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পাশে একটি নির্মাণাধীন জামে মসজিদ তারা ধ্বংস করে।

পাক সেনারা নরসিংদী বাজার শেল, মর্টার ও অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে প্রায় সম্পূর্ন ধ্বংস করে ফেলে। স্থানীয় রাজাকারদের সহায়তায় এলাকার প্রতিটি হিন্দু বাড়িতে হত্যা,ধর্ষন ও লুটতরাজ চালায়। এলাকার সব স্কুল, কলেজ ও শহীদ মিনারের ক্ষতি করে।

পাশ্ববর্তী গ্রামগুলোতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছাত্রদের খোজ করতে থাকে এবং পাওয়া মাত্রই হত্যা করে। যুবতী মেয়েদের ধরে নিয়ে ধর্ষন করা হত। তারা নরসিংদী, ঘোড়াশাল, ও পলাশে সেনা ক্যাম্প স্থাপন করে। যুবকদের ধরে এনে তাদের শরীর কেটে দিত এবং মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত রক্ত ঝরাতো। পুরুলিয়া, জিনারদি ও কৌশল্যা গ্রামের সকল বাড়ি ঘর জ্বালিয়ে দেয়া হয় এবং হিন্দু মুসলমান মিলিয়ে প্রায় ৪০০/৫০০ মানুষ হত্যা করা হয়। রায়পুরা হাইস্কুল সম্পূর্ণ জ্বালিয়ে দেয়া হয় এবং শহীদ মিনার ভেঙে হত্যা করা হয়।

ছাত্র, হিন্দু, আওয়ামীলীগ এর সদস্য ও মহিলারা ছিল তাদের প্রথম টার্গেট।

বিহারীরা মুসলিম লীগের অনুসারীদের চূড়ান্তভাবে পরাজিত করে। জামায়াতে ইসলামের প্রফেসর ইউসুফ আলী এবং মাহতাব উদ্দিন সংঘটনের সদস্যদের অস্ত্র শিক্ষা দিতেন এবং তাদের দিয়ে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড পরিচালনা করেন।

এই লোকেরা গত নির্বাচনে তাদের শোচনীয় পরাজয়ের বদলা নিতে থাকে এবং পাক সেনারা তাদের নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারে তাদের ব্যবহার করতে থাকে। পাকিস্তানি বাহিনী অত্যন্ত সুকৌশলে এদেশের বুদ্ধিজীবী গোষ্ঠী নির্মূল করতে থাকে।

 

নিটোল চন্দ্র দাশ

<৮,১.৭,৭> (চিঠিঃ ৭)

রনেন্দ্র দাস ছিলেন নোয়াখালী সদর পুলিসের সাব-ইনস্পেক্টর। থাকতেন মাইজদির সরকারি বাস ভবনে। পাকিস্তানিরা আক্রমণ শুরু করলে তিনি লক্ষ্মীপুরের বড়তলীতে আশ্রয় নেন। তিনি একাত্তরের ৩ রা জুন হিউম্যান রাইটস কমিশন, সুইজারল্যান্ডে একটা চিঠি পাঠান। এখানে তিনি উল্লেখ করেন যে,

মে মাসের ৭ তারিখে পাকি সেনারা তার মেয়ের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে। ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত সহ আরো অনেক হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়া হয়। তারা ধান ক্ষেতে নির্বিচারে গুলি করে কৃষকদের হত্যা করে। একই দিনে তারা ২১ টি হিন্দু-মুসলিম বাড়ি পুড়িয়ে দেয় এবং ৩২ জন মানুষ হত্যা করে।

৯ তারিখে পাক সেনারা এক ধোপার বাড়িতে আক্রমণ করে এবং তিনজনকে গুলি করে হত্যা করে।একই দিনে তারা মান্দারি বাজারের নিরঞ্জন ব্যানার্জি ও এডভোকেট মোহাম্মদ উল্লাহর বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে এবং বারেক মাঝি নামের একজনকে হত্যা করে। একই দিনে তারা একজন ঝাড়ুদারকে হত্যা করে যখন তারা শারীরিক পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমান পায় যে সেই ঝাড়ুদার হিন্দু।
৭ তারিখে পাক সেনারা বড়তলী গ্রামে প্রবেশ করে এবং চারজন মুসলিম মহিলাকে ধর্ষণ করে।

করে।

 

নিটোল চন্দ্র দাশ

<৮,১.৮,৮> (চিঠিঃ ৮)

সুপল চন্দ্র দাস থাকতেন ঢাকার তেজগাঁওয়ে। তিনি একাত্তরের ১০ই জুন হিউম্যান রাইটস কমিশন, সুইজারল্যান্ডে একটা চিঠি পাঠান। এখানে তিনি উল্লেখ করেন যে,

 

১৯৭১ এর মে মাসের ১১ তারিখ তিনজন সশস্ত্র পাকিস্তানি সেনা তার প্রতিবেশি জনাব কাদেরর বাড়িতে প্রবেশ করে এবং তার মেয়েকে টেনে হিচড়ে নিয়ে আসে। মেয়ের চিৎকার শুনে তিনি মেয়েকে বাঁচাতে চেষ্টা করেন এবং একজন আর্মির হাত জাপটে ধরেন। পাক সেনারা তাকেও টেনে হিচড়ে বাইরে নিয়ে আসে এবং বেয়নেট দিয়ে খুচিয়ে আহত করে। পরে তার মেয়ের সম্ভ্রমহানি করে ফেলে দিয়ে চলে আসে তারা।

গোলাম আজম নামক শান্তি কমিটির এক সদস্য আর্মি অথরিটির কাছে এই বিষয়ে নালিশ করে। তবে তাতে কোন লাভ হয় নাই।
এছাড়া সেনারা দোকান থেকে কোন মূল্য পরিশোধ ব্যতিরেকেই পণ্য নিয়ে যেত।

লুলা আউয়াল এবং শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান মুক্তিযোদ্ধা আছে এই মর্মে পাকিস্তানি সেনাদের নিয়ে তেজগা থানার বইরা গ্রামে আমন্ত্রন করে। পাক সেনারা গ্রামের নমশুদ্র পাড়ায় আক্রমণ চালায় এবং ৫০০-৬০০ মানুষ হত্যা করে। তারা তখন পথচারীদের কাছ থেকেও বিভিন্ন মূল্যবান জিনিস লুট করে।

 

নিটোল চন্দ্র দাশ

<৮,১.৯,৯> (চিঠিঃ ৯)

শ্রী গোপাল কৃষ্ণ গুহের লেখা চিঠি। যুদ্ধকালীন ২২ জুনে লেখা। পিতাঃ মনোরঞ্জন গুহ, নয়ামাটি, নারায়নগঞ্জ। তিনি হিউম্যান রাইটস কমিশন, সুইজারল্যান্ডে এই চিঠিটি পাঠিয়েছলেন।

 

এখানে তিনি উল্লেখ করেন যে, ১৯ বছর বয়সী শ্রী গোপাল কৃষ্ণ গুহ ছিলেন নারায়ণগঞ্জ সরকারি তোলারাম কলেজের বিএসসি পরীক্ষার্থী। ১৯৭১ এর ২৭ শে মার্চ পাকিস্তানি সেনারা ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে নারায়ণগঞ্জ শহরে আক্রমন করে। সামনে যা পায় তাঁরা তাই ধ্বংস করে দিতে থাকে। অন্যান্য অনেকের মত নারায়নগঞ্জের নিজ বাড়ি ছেড়ে গোপচরে চলে আসেন গোপাল। পাকিদের এলোপাথারি গোলাবর্ষণে দু’জন মেয়ে গোপচর মাঠে মরে পরে ছিল। তিনি ধলেশ্বরী নদী পার হবার সময় দেখতে পান, আহত সহ অনেক মানুষ নারায়ণগঞ্জ থেকে পালিয়ে যাচ্ছেন। অবশেষে তিনি নিজ পরিবারের সদস্যদের খুঁজে পান। এর তিনদিন পর প্রচন্ড ঝুঁকির মাঝেও তিনি নারায়নগঞ্জ শহরে আসেন। তাঁদের বাড়িটি বইসহ লুট করা হয়েছিল। পাশের অনেক বাড়িঘর পুড়িয়ে ছাই করে দেয়া হয়। নারায়নগঞ্জের আওয়ামীলীগ এর কেন্দ্রীয় অফিসটিকেও সম্পূর্নরূপে ধ্বংস করে ফেলা হয়। অসংখ্য মৃতদেহ রেললাইন এর উপর পরে থাকতে দেখা যায়। পালপারা ও দেবগ্রামের বেশিরভাগ বাড়িঘর এর ক্ষতিসাধন করা হয়। বাবুরাইলে সেনাদের বিক্ষিপ্ত গোলাগুলিতে বেশ কজন নিহত হয়। শ্রীনগর পুলিশ স্টেশনের প্রতিটি হিন্দু বাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হয় এবং ওইসময় উপস্থিত সকল হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকদের হত্যা করা হয়।

 

পাক সেনারা আওয়ামীলীগ এর কর্মী সন্দেহ হলেই প্রতিটি ব্যক্তিকে গ্রেফতার ও হত্যা করতো।

 

পাকসেনারা সিংপাড়ার ডাক্তার যোগেশ ও তার আশেপাশের কয়েকটি বাড়িতে লুটপাট চালায়। তারা তার ডিসপেনসারিও লুট করে নেয়।

 

এইরকম অনাকাঙ্ক্ষিত হত্যাজজ্ঞের বিরুদ্ধে অতিসত্ত্বর গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা নেয়ার জন্য জেনেভাস্থ হিউম্যান রাইটস কমিশনের নিকট তিনি দাবি জানান।

 

নিটোল চন্দ্র দাশ

<৮,১.১০,১০> ১০ নং চিঠিটা দীপালি রাণি সরকারের। তিনি একাত্তরের ২৪ শে জুলাই হিউম্যান রাইটস কমিশন, সুইজারল্যান্ডে একটা চিঠি পাঠান। এখানে তিনি উল্লেখ করেন যে,

 

“আমি ঢাকার শাহজাহানপুর এর রেলওয়ে কলোনিতে ( 4/B-L) নং বাসায় স্বামী অমল কান্তি সরকারের সাথে থাকতাম। এপ্রিলের একেবারে শুরুর দিকে, কোন এক সকালে আনুমানিক সকাল ৮ টা থেকে ৯ টার মধ্যে আমার স্বামী বাসা থেকে বেরিয়ে যায়। আমি আমার প্রতিবেশী জনাব ইদ্রিস সাহেবের বাসায় গিয়েছিলাম। তখন পাক সেনারা আমাদের বাসা লুট করে। সকাল ১০ টা বেজে গেলেও আমার স্বামী ফিরে আসেন নাই। ইদ্রিস সাহেব পরে আমাকে ইন্ডিয়ার বর্ডারে যাবার ব্যবস্থা করে দেন।

জুনের শেষের দিকে পাক সেনারা জিপে করে ডেমরা থানা ঘেরাও করে। সেখানে বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ করা হয়,গুলি করে মানুষ হত্যা করা হয় এবং হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের যুবতী মেয়ে এবং মহিলাদের তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। তাঁদের আর কখনোই দেখা যায় নি। পাক সেনারা মেয়েদের ধরে নিয়ে ডেমরার একটি বিল্ডিং এ বন্দি করে রাখতো। সদরঘাট এলাকায় পাক সেনারা ৭ জনকে হত্যা করে ও অনেক বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ করে।“

 

 

নিটোল চন্দ্র দাশ

<৮,১.১১,১০> ১১ নং চিঠিটি স্বপন কুমার সাহার। যুদ্ধকালীন ১৮ ই জুনে লেখা। চিঠিটি হিউম্যান রাইটস কমিশন, সুইজারল্যান্ডের উদ্দেশ্যে লেখা। এখানে তিনি উল্লেখ করেন যে,

“আমি ঢাকার নরসিংদীর একজন স্থায়ী বাসিন্দা ছিলাম। ১৯৭১ সালের ২৮ মার্চ নরসিংদীতে বিমান থেকে বোমা হামলা করা হলে আমি ইন্ডিয়ার আগতলায় চলে আসি এবং আগরতলার নাজিপুকুরপার এলাকার গৌরাঙ্গ চন্দ্র সাহার বাড়িতে আশ্রয় গ্রহন করি।

 

মার্চের ২৮ ও ২৯ তারিখে বোমা হামলার ফলে পুরো নরসিংদী বাজার পুরে ছাই হয়ে যায়। নিহত হয় প্রায় ১০০ মানুষ। পাকবাহিনীর এমন আক্রমনে আমরা পাচ মাইল দূরে একটি জায়গায় আশ্রয় নেই। কিন্ত সেখান থেকেও চলে যেতে হয়, কারন সবখানে পাক সেনাবাহিনীর মদদপুষ্ট কিছু বাহিনী( রাজাকার) ছিল, যারা সব ধরনের অপরাধ করতো। কিছুদিন পর আমরা বাজিদপুর আসি এবং একই কারনে সেখান থেকেও চলে আসতে হয়। হালাজিলা আসার পর পাকবাহিনীর আক্রমনে ৫ জন নিহত হয়। আমরা একটি পাট ক্ষেতে লুকিয়ে জীবন রক্ষা করি। বাজিদপুর থেকে প্রায় ৩৫ জন মেয়েকে পাক সেনাবাহিনী তুলে নিয়ে যায়। এই অভাগীদের কাউকেই আর কখনো দেখা যায় নি।

 

এখানে বলে রাখা ভালো, ঘটনার সময় আমি নরসিংদী কলেজের ছাত্র ছিলাম। আমার বয়স ছিল ২২ বছর এবং প্রায় সকল স্থানেই ঘটনাপ্রবাহ ছিল প্রায় একই রকমের।“

 

নিটোল চন্দ্র দাশ

<৮,১.১২,১১> ১২ নং চিঠিটি কলিমউদ্দিন মিয়ার। যুদ্ধকালীন ৪ঠা আগস্টে হিউম্যান রাইটস কমিশন, সুইজারল্যান্ডের উদ্দেশ্যে লেখা। বয়স ৩৫ বছর। থাকতেন ঢাকার জিনজিরায়। পিতাঃ সলিম আলী। উনার ভাষ্যেঃ

 

“বুড়িগঙ্গা নদীর অপর পাড়ে ছিল আমাদের বাড়ি। এপ্রিলের দুই তারিখে গভীর রাতে পাকিস্তানি সেনার ভারী শেল নিক্ষেপ করতে লাগলো। প্রান বাঁচাতে অনেকেই নদী পার হয়ে পালিয়ে যেতে লাগল। বৃদ্ধ মা, স্ত্রী ও সন্তান থাকায় আমি যেতে পারলাম না। আর্মি আসার আগেই সবাইকে পালিয়ে যাবার ব্যবস্থা করে দেয়া গেল না। ছয়জন আর্মি বাসায় ঢুকল,বিনা বাক্যব্যায়ে মা ও বাচ্চাদের হত্যা করল এবং আমার স্ত্রী আমিনা বিবিকে তুলে নিয়ে গেল আমি বাইরে জিনিসপত্র গোছগাছে ব্যস্ত ছিলাম। তাই পাক সেনারা আমায় দেখতে পায় নি। পুরো ঘটনাটি ঘটতে সময় নিল মাত্র ২/৩ মিনিট। আমি জানালা দিয়ে দেখতে পেলাম,তারা আমার স্ত্রী কে উঠিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

গণহত্যা ও নির্যাতনের বিবরণঃ বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় গৃহীত সাক্ষাৎকার

|| ঢাকা বিভাগ ||

 

 

মাঈমুনা তাসনিম

<৮,২.১.১,১২-১৪> বাংলা একাডেমী দলিলপত্র, ১৯৭২-৭৪

।১।

শ্রীমতী বাসন্তী রাণী গুহঠাকুরতা,

স্বামী ড. জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা

প্রধান শিক্ষয়িত্রী, মনিজা রহমান গার্লস হাইস্কুল,

গেণ্ডারিয়া, ঢাকা-৪

 

“১৯৭১ সনের ২৫ শে মার্চ সেই কালরাতে আমরা স্বাভাবিকভাবে প্রতিদিনের মত খাওয়া-দাওয়া শেষ করে সবাই রাত নয়টার সময় রেডিও খুলে বসে ছিলাম। ঢাকা রেডিও থেকে আমরা সে রাতে দূর্যোগের কোন পূর্বাভাস পাই নাই। ভয়েস অব আমেরিকা-এর সংবাদ শুনে আমার স্বামী ড. জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা মেয়ে ‘মেঘনার’ ঘরে গিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এম.এ. প্রিলিমিনারী এবং অনার্স পরীক্ষার্থীদের খাতা দেখতে বসলেন। অকস্মাৎ জনতার দুপদাপ শব্দ শুনে আমার স্বামী এবং আমি দেওয়ালের বাইরে গিয়ে দেখলাম, জনতা রাস্তায় রাস্তায় বড় বড় গাছ, পানির ট্যাঙ্ক ও ইট-পাটকেল দিয়ে প্রতিরোধ তৈরি করছে। আমার স্বামী বিপদ বুঝতে পেরে আমাদের ফ্ল্যাটের প্রবেশপথ তালাবদ্ধ করেন। আমার স্বামী রাস্তার দিকে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করে ভারাক্রান্ত মনে “বিপদ আরম্ভ হয়ে গেল” বলে আবার মেয়ের কক্ষে গিয়ে খাতা দেখতে বসে গেলেন। আমি আজেবাজে চিন্তা করতে করতে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। রাত বারটার দিকে অদূরে বোমার আওয়াজ শুনে জেগে উঠে দেখলাম, ইকবাল হল এবং রোকেয়া হলের দিক থেকে বোমার আওয়াজ ভেসে আসছে। আস্তে আস্তে অসংখ্য লাইট বোমা আকাশকে আলোকিত করে দিচ্ছে, আলোর ফুলকিতে দেখলাম বোমা ও গুলি বর্ষিত হচ্ছে। আমরা দু’জন গুলি ও বোমার কানফাটা আওয়াজ সহ্য করতে না পেরে খাটের তলায় বেড কভার বিছিয়ে নিরাপদে শুয়ে বর্বর পাক সেনাদের বীভৎসতার তাণ্ডব শুনছিলাম। পাশের কামরা থেকে আমাদের ঝিকে ডাকতে গেলে সে আসে না-আমরা সবাই গুলির অবিরাম গর্জনে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছিলাম। আমাদের ফ্ল্যাটটি কাঁপছিল-চারিদিকে দেখলাম লাইট বোমের আলোর ঝলকানি। হিস হিস শব্দ শুনে আমার গায়ের লোম শিউরে উঠলো-আমি উঠে গিয়ে জানালা দিয়ে উঁকি মেরে দেখলাম-আমার ফ্ল্যাটের প্রবেশপথের সামনে পাক সেনা-ভারী অস্ত্রবাহী সশস্ত্র আর্মী ট্রাক নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে-অল্পক্ষণ পরেই এক পাঞ্জাবী মেজর আমার গেটের লোহার জিঞ্জির হাত দিয়ে সজোরে ছিঁড়ে ফেলে দিয়ে ফ্ল্যাটে প্রবেশ করে আমার মেয়ে মেঘনার কক্ষের জানালার মসকুইটো নেট বেয়নেট দিয়ে ছিঁড়ে ফেলে মাথা ঢুকিয়ে আমাকে দেখে এক দৌড় দিয়ে ঘুরে রান্নাঘরের দরজা ভেঙ্গে আমাদের ফ্ল্যাটে প্রবেশ করে। আমি আমার স্বামীকে বললাম পাক সেনারা আমাদের ফ্ল্যাট ঘেরাও করেছে- আমরা বিপদগ্রস্ত, বিপন্ন। আমার স্বামী আমার মেয়েকে অন্য কামরায় গিয়ে শুয়ে থাকতে বললেন, পাঞ্জাবী সৈন্যরা আমাদের কামরার দরজায় বুটের লাথি মারছিল। আমি দৌড়ে গিয়ে আমার স্বামীকে বললাম, পাক সেনারা এসে গেছে, হয়তো তোমাকে গ্রেফতার করবে, তুমি তৈরি হয়ে নাও, বলে একটি পাঞ্জাবী তার হাতে দিয়ে মেয়েকে নিয়ে ঘরে এসে দেখলাম- রান্নাঘরের পাশে বারান্দার দরজা দিয়ে প্রবেশ করে আমার ‘আয়াকে’ কনুইয়ের আঘাতে সজোরে ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়ে আমার সামনে এসে জিজ্ঞাসা করলো “প্রফেসর সাহাব হায়?” আমি নিরুপায় হয়ে সত্য কথা বললাম, “হায়”। পাঞ্জাবী মেজর আবার বললো, উনকো লে যায়েগা। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, “কাহা লে যায়েগা?” আমার কথার সন্তোষজনক উত্তর না দিয়ে অত্যন্ত অবজ্ঞার সুরে বললো, “লে যায়েগা।” আমার সাথে সাথে মেজর চলতে চলতে বলতে লাগলো, “ফ্লাটমে আওর কই জোয়ান আদমী হায়?” আমি বললাম-“নাহি, ত হামারা একহী লাড়কি হায়।” একথা শুনে মেজর বললো, “ঠিক হায়, লাড়কি কা ডার নাহি হায়”-আমার সাথে যে কামরায় ছিলেন সেই কামরায় প্রবেশ করে আমার স্বামী ড. জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতাকে বাম হাত চেপে ধরে জিজ্ঞাসা করলো, “আপ প্রফেসর সাহাব হায়?” আমার স্বামী ইংরেজীতে বললেন, “ইয়েস”। পাঞ্জাবী মেজর বললো, “আপকো লে যায়েগা”। আমার স্বামী মোটা গলায় অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে বললেন, “হোয়াই?” মেজর তার প্রশ্নের কোন জওয়াব না দিয়ে টেনে বাইরে নিয়ে গেল- তাদের আমি পিছনে পিছনে কিছুদূর গিয়ে তাদেরকে আর দেখতে না পেয়ে কামরায় ফিরে এসে টেলিফোনের রিসিভার উঠিয়ে দেখলাম সবকিছু বিকল অচল হয়ে আছে। আমি এ সময় সবই বুঝতে পারলাম-আমরা বিপদগ্রস্ত, বিপন্ন। ফিরে দেখলাম-উপর তলার সিঁড়ির শেষ মাথায় মিসেস মনিরুজ্জামানকে পাঞ্জাবী জোয়ানরা “যাও, যাও, হাঁটো” বলে তাড়া দিচ্ছে। ইতিপূর্বেই পাকসেনারা ড. মনিরুজ্জামান, তার ছেলে, তার ভাগনে এবং প্রতিবেশী যুবককে টানাটানি করে ঠেলে ধাক্কিয়ে ধাক্কিয়ে নিচে নামিয়ে নিয়ে আসার জন্য জোরাজুরি করছিল। মিসেস জামান সিঁড়ির শেষ মাথায় এসে আমাকে বললেন, পাকসেনারা ওদের সবাইকে নিয়ে যাচ্ছে। আমি তাকে বললাম-নিয়ে যেতে দিন, ওদেরকে বাধা দিয়ে লাভ নাই- ওরা আমাদের ভাষা বুঝে না-জোরাজুরি করলে মেরে ফেলতে পারে। এ কথা বলতে বলতে বাইরে আমি দুটি গুলির আওয়াজ শুনে দৌড়ে বালিশ হাতে অদূরে দাঁড়ানো মেয়েকে ধরতে গিয়ে পরপর আটটি গুলির শব্দ শুনে অগ্রসর হয়ে দেখলাম-সিঁড়ির নিচে চারজনের দেহ গড়াগড়ি যাচ্ছে। গুলিবর্ষণ করার পরক্ষণেই পাকসেনারা সবাইকে কার্ফু জারীর কথা ঘোষণা করে, দ্রুত ট্রাকগুলি নিয়ে চলে গেল। মিসেস মনিরুজ্জামান তেতলা থেকে পানি নিয়ে এসে গুলিবিদ্ধ সবাইকে খাওয়ালেন-তিনি দৌড়ে এসে বললেন “দিদি আপনার সাহেব গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে আছেন, আমার সাথে কথা বলছেন, তিনি বাঁচবেন।“ একথা শুনে আমি এবং আমার মেয়ে “মেঘনা” দৌড়ে আমার স্বামীর গুলিবিদ্ধ দেহের সামনে উপস্থিত হয়ে দেখলাম- আমার স্বামীর দেহ গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে আছে। তিনি বলছিলেন, “ওরা আমাকে গুলি করেছে, আমার শরীর প্যারালাইসিস হয়ে গেছে। আমাকে তুলে ঘরে নিয়ে যাও।” আমি কান্নার শক্তি হারিয়ে ফেলেছিলাম শুধু হায় হায় শব্দ করছিলাম। দোতলার যে ফ্ল্যাটে অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক সাহেব এবং অধ্যাপক আনিস সাহেব থাকতেন তাদের ব্লকের প্রবেশপথে অটোমেটিক তালা ঝুলতে থাকায় পাকসেনারা সেখানে প্রবেশ করে নাই। পাকসেনারা চলে যাওয়ার পরও ওরা কেউ আমাদের অসহায় চিৎকার শুনেও আমাদের সাহায্যে এগিয়ে আসে নাই। আমরা কোন রকমে আমার স্বামীর রক্তাক্ত ক্ষতবিক্ষত দেহ ধরাধরি করে আমাদের ফ্ল্যাটে নিয়ে এসে বারান্দার খাটে এলিয়ে দিলাম-আমার স্বামী জ্ঞান হারান নাই তখনও। আমার মেয়ে “মেঘনা” মনিরুজ্জামান সাহেবের ভাগনের পানি পানি বলে অসহায় আর্তনাদ শুনে আমাকে নিয়ে তার মুখে শেষ পানি দিয়ে আসলো। পরক্ষণেই ছেলেটি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।

 

দূরে-অদূরে বৃষ্টির মত অবিরাম গুলি বর্ষণ করছিল পাকসেনারা। কিছুক্ষণ পরে দেখলাম পাকসেনারা জগন্নাথ হলের পূর্বদিকে ছাত্রদের কেন্টিনে আগুন লাগিয়ে দেয়- মাঝে মাঝে পাকসেনাদের সামরিক ট্রাকগুলি টহল দিচ্ছিল, চারিদিকে শ্মশানের হাহাকার।

 

পরের দিন ১৯৭১ সনের ২৬শে মার্চ এবং ২৭শে মার্চ সকাল পর্যন্ত আমার স্বামীর ক্ষত বেয়ে রক্ত ঝরছিল-বাইরে সান্ধ্য আইন বলবৎ থাকায় তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে তার চিকিৎসার কোন ব্যবস্থা করতে পারি নাই।

 

১৯৭১ সনের ২৭শে মার্চ সকালে কতিপয় লোকের সাহায্যে আমার স্বামীকে চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তরিত করি। হাসপাতালে কোন লোকজন ও ডাক্তার ছিল না। দায়িত্বরত নার্সরা সাধ্যমত আমার স্বামীর সেবাযত্ন করেছে।

 

১৯৭১ সনের ৩০শে মার্চ বিনা চিকিৎসায় আমার স্বামী মৃত্যুবরণ করেন। স্বামীর মৃত্যুর পর আমি তার মৃতদেহ হাসপাতাল থেকে সরিয়ে আনার অনুমতি পাই নাই- তার পবিত্র মৃতদেহের সৎকার করতে পারি নাই। আমার স্বামীর মৃত্যুর পরক্ষণেই পাকসেনারা ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ঘেরাও করে- আমি স্বামীর মৃতদেহ নিয়ে আসার কোন উপায় না দেখে ডাক্তারদের উপদেশে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্ণর ড. মালেকের বড় ভাই আব্দুল বারি সাহেবের স্ত্রীর সাথে তাদের গাড়ীতে আমাদের স্কুলের সেক্রেটারী ড. এম.এ. ওয়াহিদ সাহেবের ২০ নং ধানমণ্ডিস্থ বাসায় আশ্রয় লাভ করি। আমার স্বামীর লাশ চারদিন হাসপাতালে পড়েছিল-আমার ড্রাইভার ৩রা এপ্রিল পর্যন্ত হাসপাতালের ওয়ার্ডের বারান্দায় আমার স্বামী ড. জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতার মৃতদেহ দেখে এসেছে।

 

স্বাক্ষর

বাসন্তী গুহঠাকুরতা

২০-৫-১৯৭৪

 

 

নিয়াজ মেহেদী

<৮,২.১.২,১৫>

\২\

ডঃ মোহাম্মদ আজহার আলী
সহকারী অধ্যাপক
প্রাইমারী শিক্ষা বিভাগ
শিক্ষা ও গবেষণা ইন্সিটিউট
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।

১৯৭১ সনের ২৫ শে মার্চ আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টাফ কোয়ার্টারের ১৪/এইচ ফ্লাটে সপরিবারে অবস্থান করছিলাম। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের টিচার্স ক্লাবে অন্যান্য বিভাগের অধ্যাপকদের সাথে বসেছিলাম। রাত নয়টার সময় প্রতিদিনের মত স্বাভাবিকভাবে আমরা ক্লাব ছেড়ে যার যার ফ্লাটে চলে গিয়েছিলাম। খাওয়া দাওয়া করে আমরা সবাই শুয়ে পড়েছিলাম। রাত আনুমানিক বারটার সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাস ও স্টাফ কোয়ার্টারের চারদিক থেকে অকস্মাৎ বৃষ্টির মত অবিরাম গুলিবর্ষণের শব্দ শুনে জেগে উঠি। চার তলার অপর পাশে ব্যবসা প্রশাসন বিভাগের অফিস সেক্রেটারি মিঃ মনসুর আহমেদ সাহেব সপরিবারে অবস্থান করছিলেন। আমি, আমার স্ত্রী, আমার আড়াই বছরের ছেলেটি এবং আমার ভাতিজা, কাজের ছেলে সবাই আমরা অবিরাম গুলিবর্ষণের বিভীষিকাময় শব্দে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে বসেছিলাম। সারারাত আমরা গুলিবর্ষণের আওয়াজ শুনেছি। সারারাত আমরা দরজা-জানালা বন্ধ করে বসেছিলাম-

 

১৯৭১ সনের ২৬ শে মার্চ সকাল ছয়টায় গুলিবর্ষণের গতি কমে গিয়েছিল। কাঁচের ফাঁক দিয়ে দেখলাম-সশস্ত্র পাঞ্জাবী সেনারা আমাদের এলাকার প্রবেশ পথ দিয়ে অভ্যন্তরে প্রবেশ করছে। পাঞ্জাবী সেনারা ১১ এবং ১২ নম্বর ফ্লাটে প্রবেশ করে এলাপাতাড়ি গুলিবর্ষণ করতে থাকে। এসময়য় আমরা ফ্লাটের নীচে অবস্থানকারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী মেডিকেল অফিসার ডাঃ মুর্তজা স্টেথোস্কোপ গোলায় রেখে বাইরে পায়চারী করছিলেন। পাঞ্জাবী সেনারা ডাঃ মুর্তজাকে ও অন্যান্য আরও তিনজনকে ১২ নং ফ্লাট থেকে লাশ তুলে বাহিরে নিয়ে রাখার নির্দেশ দান করে। ডাঃ মুর্তজাকে অন্যান্য লোকজনকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডঃ মোকতাদির সাহেবের লাশ বের করতে দেখলাম। ইহার পর পাক সেনারা ১১ নং ফ্লাটে প্রবেশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লেবরেটরী স্কুলের শিক্ষক মোহাম্মদ সাদেককে হত্যা করে। সাদেক সাহেবের লাশ পাক সেনারা ফেলে রেখে যায়। বিকাল চারটার সময় সাদেক সাহেবের পরিবার আমাদের ফ্লাটে চলে আসে।

 

২৬ শে মার্চ সারাদিন সারারাত আমরা যার যার ফ্লাটে আটকা পড়েছিলাম। ২৭ শে মার্চ সকালে কার্ফূ উঠিয়ে নিলে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা থেকে সবাই নিরাপদ স্থানে যেতে থাকে। ১১ নং ফ্লাটের নীচতলায় সাদেক সাহেবের লাশ পড়েছিল। বিভিন্ন ফ্লাট থেকে ফ্রীজের পানি এনে লাশের উপর দেওয়া হয়। সাদেক সাহেবের স্ত্রী, শ্যালক, ভাই, চার ছেলেমেয়ে লাশের চারদিকে দাঁড়িয়ে আর্তনাদ করছিল। আমি আমার এবং সাদেক সাহেবের পরিবার অন্যত্র সরিয়ে রেখে ১১ নং ফ্লাটের দক্ষিণ পার্শ্বে সাদেক সাহেবের লাশ সমাহিত করি।

স্বাক্ষর/-                                                                                       মোঃ আজহার আলী                                                                                               ৮-৬-৭৪
 

 

নিয়াজ মেহেদী

<৮,২.১.৩,১৬>

ইব্রাহিম ভুইয়া

লাইব্রেরীয়ান, শিক্ষা ও গবেষণা ইনষ্টিটিউট

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।

 

১৯৭১ সনের সেপ্টেম্বর মাসে আমি গ্রামের বাড়ী যাওয়ার জন্য ঢাকা সদরঘাটের দিকে রওয়ানা হয়েছিলাম। সদর ঘাট টার্মিনালের প্রবেশ পথে পাঞ্জাবী সেনাদের প্রহরায় মোতায়েন দেখলাম। কিছুক্ষন পরে এক অতি বৃদ্ধ ভদ্রলোক মুন্সিগঞ্জ যাওয়ার জন্য টার্মিনালে আসলেন। সঙ্গে তার নবপরিণীতা পুত্রবধূ এবং যুবতী মেয়ে ছিল। পাঞ্জাবী সেনারা আমাদের সবাইকে তল্লাশি করতে বললো “ইয়ে দো আওরাত নাহি যায়েগী”। বৃদ্ধ নিরুপায় হয়ে কান্নাকাটি করে সামনে যাকে পায় তাকেই জড়িয়ে ধরে বলতে থাকেন, “আপনারা আমার মেয়ে ও পুত্রবধূকে বাঁচান।” কিন্তু আমাদের কিছুই করার ছিল না। ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও আমরা সেই অসহায় যুবতী মেয়ে দু’জনকে রক্ষা করার জন্য কোন কথা বলতে পারি নাই, কিছুই করতে পারি নাই। আমাদের সকলের চোখের সামনে পাঞ্জাবী সেনারা অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে যুবতী মেয়ে দু’টিকে টেনে হিঁচড়িয়ে ওদের আর্মি ট্রাকে উঠিয়ে নিয়ে গেল। মেয়ে দু’টি এসময় করুন আর্তনাদে ভেঙ্গে পড়েছিল। দু’ঘন্টা পড় আবার যুবতী মেয়ে দু’টিকে ফিরিয়ে নিয়ে এল। দেখলাম, মেয়ে দুটির চলার কোন শক্তি নাই, এলোমেলো চুল, অশ্রুভরা মুখমণ্ডল। আমরা লঞ্চে রওয়ানা হয়ে গেলাম।

 

‘পাগলার’ এম, এম ওয়েল পার্ক আর্মি ঘাটিতে আমাদের লঞ্চ আটকিয়ে তল্লাশী চালানো হয়-পাক সেনারা যাত্রীদের মুল্যবান মামালাম লুট করে নিয়ে যায়। লঞ্চে দাঁড়িয়ে আমরা দেখলাম-ওদের কামরার জানালার সম্মুখে চারটি বাঙ্গালী যুবতী মেয়ে এলোমেলো চুলে করুণ ও অসহায় দৃষ্টিতে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। জানালা দিয়ে তাদের দেহের যতটুকু দেখা গেল তাতে মনে হও তাদেরকে বিবস্ত্র করে রাখা হয়েছে। বুড়ীগঙ্গা নদীতে ১৫-২০ জন করে এক সাথে দড়ি দিয়ে বাঁধা বাঙ্গালী যুবকদের বহু লাশ ভাসতে দেখলাম।

 

১৯৭১ সনের অক্টোবর মাসের এক দিন আমি বাড়িতে ছিলাম। সকাল নয়টার সময় আমি বাগড়া বাজারে গিয়েছিলাম বাজার করতে। বহু লোকের সমাগম ছিল। বাজারের দক্ষিণ দিকে পদ্মা নদী। পুর্বের দিন সন্ধ্যায় পাক সেনাদের নোঙ্গর করা ষ্টিমারটি পদ্মার ঘাট ছেড়ে যাচ্ছিল-ষ্টিমারের চারিদিকে সশস্ত্র পাক সেনারা প্রহরায় মোতায়েন ছিল। অকস্মাৎ দেখলাম পাক সেনারা ষ্টিমার থেকে সজোরে টেনে একটি লাশ ফেলে দিচ্ছে-ষ্টিমার দৃষ্টির বাইরে চলে যাওয়ার পর আমরা নৌকা নিয়ে গিয়ে দেখলাম এক ক্ষত বিক্ষত যুবতীর বীভৎস উলঙ্গ লাশ। এছাড়া কাশবনের পাড়ে পড়ে আছে ফোলা বীভৎস লালের গালে ও দেহের অন্যান্য স্থানে ক্ষত চিহ্ন দেখলাম। তাঁর ডান দিকের স্তনের বোটা তুলে নেওয়া হয়েছে।                                                      স্বাক্ষর /-                                                                 ইব্রাহিম ভূইয়া                                                                   ৮/৬/৭৪

 

আলিমুল ফয়সাল

<৮,২.১.৪,১৭-১৯>

।। ৪ ।।

শ্রী পূর্ণ চন্দ্র বসাক, বি,এ
পিতা মৃত শ্রী বীর চন্দ্র বসাক
১৮, তাতীবাজার লেন, ঢাকা-১

 

আমি ১৯৭১ সনের ২৫শে মার্চ রাতে আমার ১৮, তাতীবাজারস্থিত বাসায় ছিলাম। রাত বারোটায় উত্তর দিক থেকে অকস্মাত কামানের আকাশ ফাটা গর্জন শুনে আমি তেতলার ছাদের উপর দেখলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাস সমূহে আগুনের ফুলকি ও লক্ষ লক্ষ আগুনের ফুলকিতে আকাশ ভরে আছে। অনবরত কামানের ভয়াল ও ভয়ংকর শব্দ আসছে। উত্তর দিকে আকাশে দেখলাম, একটা ঘোলাটে বেলুনের মত আগুনের পিন্ড পশ্চিম দিক থেকে আস্তে আস্তে উঠে পুর্ব দিকে গভর্নর হাউজের কাছে এসে নেমে পড়ল। এই সময় দেখলাম- চারিদিকে জনপদ, বস্তি এলাকায় আগুন আর আগুন জ্বলছে, বৃষ্টির মত গুলিবর্ষন হচ্ছে, কামানের কানফাটা গর্জন ভেসে আসছে। আমি ছাদে দাঁড়িয়ে দেখলাম গুলির আওয়াজ ক্রমে ক্রমে গুলিস্তান থেকে নওয়াবপুরের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। কিছুক্ষন পরই সদরঘাট খৃষ্টানদের গীর্জার সামনে সামরিক গাড়ী ও ট্যাংকের ঘর্ঘর আওয়াজ শুনলাম। এসময় শতকন্ঠের ‘মাগো বাবাগো বাঁচাও বাঁচাও’ আর্তনাদ শুনলাম। কিছুক্ষন পর সদরঘাট টার্মিনালে ভীষণ গুলিবর্ষনের আওয়াজ শুনলাম। শাখারীবাজার এর সকল হিন্দু জনতা যার যার ছাদে দাঁড়িয়ে এ বীভৎস কান্ড দেখছিল। রাত দুইটার সময় মাইকে ঘোষনা করা হল- রাজধানী ঢাকায় ২৬শে মার্চ ভোর পর্যন্ত কার্ফিউ জারি করা হয়েছে, যার যার বাড়িতে আওয়ামীলীগ ও স্বাধীন বাংলার পতাকা আছে তা নামিয়ে ফেলে পাকিস্তানের পতাকা তুলে দেয়ার নির্দেশ দেয়া যাচ্ছে। রাত দুইটার পর রাজধানীর পূর্বদিক থেকে আরেকটি জ্বলন্ত বেলুনের মত ঝলমলে গ্লোব পূব আকাশ থেকে উঠে আস্তে আস্তে সোজা পশ্চিমে ভেসে গিয়ে মিশে যেতে দেখলাম। ইহার পর আর একটি গুলির আওয়াজও কানে আসে নাই। চারিদিকে নীরব, নিস্তব্ধ, শ্মশ্মানের হাহাকার, আগুন আর আগুন জ্বলছে, রাজধানী ঢাকার চারিদিকে জনপদ ও বস্তি এলাকা জ্বলছে।

 

২৭শে মার্চ সান্ধ্য আইন তুলে নেয়ার পর শুনলাম, শাখারীবাজারে কোর্টে প্রবেশের পথে একটি বাড়ীতে দশজন হিন্দুকে একই ঘরে গুলিবিদ্ধ করে হত্যা করা হয়েছে এবং ডঃ শৈলেন সেনকে গ্রেফতার করে জগন্নাথ কলেজের পাক সেনাদের ছাউনিতে আটক করা হয়েছে। ইংলিশ রোড দিয়ে অগ্রসর হয়ে দেখলাম ইংলিশ রোড, ফ্রেঞ্চ রোডের দুই পাশের কোটি কোটি টাকার কাঠের কারখানা ও মেশিনপত্র ভস্ম হয়ে পাক সেনাদের বীভৎসতার স্বাক্ষর হয়ে পড়ে আছে- দুই পাশের বাণিজ্য এলাকার সকল দোকান ও বাণিজ্য কেন্দ্র নিশ্চিহ্ন হয়ে আছে। রাস্তাঘাট শূণ্য, কোথাও কোন মানুষ নাই। আমি কাজী আলাউদ্দিন রোড হয়ে বাবুপুড়া ফাড়িতে দেখলাম আটজন পুলিশী পোষাক পড়ে লাশ গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে ফাড়ির বারান্দায় ও রাস্তায় বিকৃতভাবে পড়ে আছে। রেললাইনের দুইপাশের বস্তি এলাকা ভস্ম ছাই হয়ে পড়ে আছে, দেখলাম চারিদিক জনমানবশূণ্য। আমি দ্রুত আমার বন্ধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক জি কে নাথ, সংস্কৃতের অধ্যাপক রবীন্দ্রনাথ ঘোষ ঠাকুর, অধ্যাপক শ্রী পরেশ চন্দ্র মন্ডলের খোঁজে জগন্নাথ হলে ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়ের দিক থেকে প্রবেশ করে দেখলাম জগন্নাথ হলের চারিদিকের দেয়াল গুলির আঘাতে ঝাঁঝরা হয়ে আছে। হলে জানালাসমূহের কাচ ভেঙ্গে খানখান হয়ে পড়ে আছে। হলের পুকুরের পাড় দিয়ে অগ্রসর হওয়ার সময় দেখলাম হঠাৎ একজন মানুষের মাথা উপরের দিকে উঠে আসার চেষ্টা করছে, ভীতসন্ত্রস্ত, দিশেহারা, উন্মাদের মত হয়ে পানি থেকে মাথা তুলে ক্রন্দন ও বুকে চপেটাঘাত করতে করতে বলতে লাগলেন ‘দাদা ওদিকে যাবেন না, ওরা আমাদের সব মেরে ফেলছে।‘ আমি লোকটিকে উন্মাদ মনে করে তার কথায় কান দেই নাই। আমি আরও অগ্রসর হয়ে কেন্টিনের দিকে এগিয়ে গিয়ে দেখলাম একটা প্রাণীও নাই, নীরব, জনমানবশূণ্য। কেন্টিনের ভেতর দিয়ে হলের নর্থ হাইজে প্রবেশ করে দেখলাম- একজন হিন্দু যুবকের লাশ পড়ে আছে- মাথার চুল আগুনে পোড়া, সারা দেহ গুলিতে ঝাঁঝরা, আমি দোতলায় না উঠে সোজা রাস্তায় নেমে শহীদ মিনারের সামনে এসে দেখলাম- শহীদ মিনারটি ভেঙ্গে খানখান হয়ে পড়ে আছে। শহীদ মিনারের পেছনে সদ্য মাটি তোলা ১০০ ফুট এক বিরাট গর্ত দেখলাম- গর্তটি কিছুক্ষন পূর্বেই মাটি দিয়ে ভরাট করে রাখা হয়েছে। গর্তের উপরে মাটি ভেদ করে কারো হাত, পায়ের পাতা দেখা যাচ্ছে। আমি আরো উত্তর দিকে অগ্রসর হয়ে হলের শেষ মাথায় লোহার গেইটে পৌছলে পেছন থেকে এক দিশেহারা কর্কশ নারীকণ্ঠ চিৎকার করে বললেন- ‘আপ কাহা যাতে?’ আমি সেই কন্ঠের দিকে নজর না দিয়ে শামসুন্নাহার হলের দিকে অগ্রসর হয়ে জগন্নাথ হলের হাউস টিউটর মিঃ জি কে নাথ, রবীন্দ্রনাথ ঘোষ ঠাকুর, পরেশ মন্ডলের কোয়ার্টারের প্রবেশপথে গিয়ে দেখলাম- কোয়ার্টারের দরজা জানালা সব খোলা, জনমানবশূণ্য, সিড়ি বেয়ে উপড়ে উঠতে গিয়ে দেখলাম- দোতলা থেকে পচা দুর্গন্ধ ভেসে আসছে, সিড়ির উপর থেকে নিচ পর্যন্ত রক্তের দাগ জমাট বেধে আছে। আমি এ পচা, দূর্গন্ধ ও জমাট রক্ত দেখে আর উপরে উঠরে পারি নাই। বন্ধুদের খোঁজ করতে গিয়ে আমি এখানেই প্রথম ভয় পেলাম এবং ভড়কে গেলাম। আমার মাথা ঘুরতে লাগল সেই বীভৎস দৃশ্য দেখে। আমি নিচে নেমে আসলাম এবং ভীত সন্ত্রস্তভাবে যেই পথ দিয়ে এসেছিলাম, সেই পথে দ্রুত ফিরে গেলাম। ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়ের রাস্তা ধরে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজের ভেতর প্রবেশ করলাম। প্রবেশ পথে জগন্নাথ হলের একজন চাপরাশীর সাক্ষাৎ পেলাম। সে বললো, আমাদের হলের প্রভোস্ট ডঃ জোতির্ময় গুহ গুলিবিদ্ধ অবস্থায় হাসপাতালের দোতলায় ৯ নম্বর কক্ষে আছেন, তিনি জীবিত আছেন। আপনি তার সাথে সাক্ষাৎ করুন। আমি হাসপাতালের ৯ নং কামরায় প্রবেশ করতেই হাতে ব্যান্ডেজ বাধা আহত হলের একজন যুবক এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে ক্রন্দন করতে করতে বলতে থাকলেন ‘দাদা আমি কি বেঁচে আছি? দেখেন আমাকে ওরা গুলি করেছে। ঐ যে দেখুন জোতির্ময় বাবু- তাঁকেও পশুরা গুলি করেছে।‘ আমি তাকে উন্মাদের মত মনে করলাম, তার অসংলগ্ন কথায় বুঝতে পারলাম সে প্রকৃতস্থ নয়। আমি আরো অগ্রসর হয়ে দেখতে পেলাম জোতির্ময় বাবু শুয়ে আছেন জ্ঞানহারা, মাঝে মাঝে দীর্ঘ চাপা নিঃশ্বাস ফেলছেন, মাঝে মাঝে চোখ খুলে আবার বন্ধ করে ফেলছেন। আমি অনেক্ষণ তার পাশে দাঁড়িয়ে তাঁর করুণ অবস্থা দেখলাম। তিনি একবার আমার দিকে চেয়ে বললেন ‘কে?’ আমি বললাম ‘আমি বসাক, আমি পূর্ণ বাবু।‘ তিনি উত্তরে বললেন ‘ও‘। একটু পরেই বিড়বিড় করে বললেন, ‘ডাঃ গোবিন্দবাবু, ডাঃ গোবিন্দবাবু ইজ প্রসিডিং ওয়েল।‘ একথা বলেই তিনি জ্ঞানহারা হয়ে গেলেন, সঙ্গা হারিয়ে ফেললেন। আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তার এই অন্তিম দৃশ্য দেখছিলাম। একটু পরেই বারান্দা থেকে তার স্ত্রী বাসন্তী দেবী ক্রন্দনরতা অবস্থায় কাতরকন্ঠে বললেন, ‘দাদা আপনি এসেছেন? আমাকে একটু সাহায্য করুন। কাল থেকে এই হাসপাতালে কিছুই নাই। আমাকে একটি এক্সরে প্লেট যোগাড় করে দিন?’ আমি উত্তরে বললাম ‘দাস কোম্পানীর দোকান খোলা পেলে এখনি এনে দিচ্ছি’- বলে তাকে প্রবোধ দিলাম। আমি তাকে ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি সমস্ত ঘটনা বললেন। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম গুলি কোথায় লেগেছে? উত্তরে বললেন, ঘাড়ে একটি গুলি বিদ্ধ হয়ে ঘাড় ভেদ হয়ে বেড়িয়ে গেছে। পেটে নাভির কাছে ব্যথার যন্ত্রনার কথা বলছেন। বোধহয় পেটের ভেতরেও গুলি লেগেছে। আমি তাকে স্বান্তনা দিয়ে চলে আসলাম। প্রবেশ পথে আসলে হলের সেই আহত গুলিবিদ্ধ ছাত্রটিকে জিজ্ঞাসা করলাম, তুমি কিভাবে বাঁচলে? সে বলতে লাগল, খান সেনারা ভারী অস্ত্র নিয়ে রাত বারোটার দিকে আমাদের হলের গেট ভেঙ্গে ভেতরে প্রবেশ করে প্রত্যেক কামরায় ব্যাপক তল্লাশী চালায়- হল বন্ধ থাকলেও কতিপত অনার্স পরীক্ষার্থী ও এম, এ পরীক্ষার্থী ২০-২৫ জন হলে অবস্থান করছিল। প্রত্যেক কক্ষে প্রবেশ করে যাকে যেখানে পেয়েছে সেখানেই গুলিবিদ্ধ করে হত্যা করেছে, আমি সে সময় হলের বাথরুমে পালিয়েছিলাম। তারা আমাকে বাথরুমেই ধরে ফেলে। আমাকে ধরে ওরা বলল, ‘তোমকো কুচ নেহি বলেগা’ এবং দোতলা থেকে আরো তিনজন ছাত্রওকে নামিয়ে এনে বলল, ‘ইয়ে দেখ তোমলোগ কো কুচ নাহি করেগা। উপর যতনা লাশ হ্যায়, সব নিচে লে আও।‘ আমরা চারজন তাদের নির্দেশমত উপর থেকে সদ্য গুলিবিদ্ধ শহীদদের লাশ নিচে নিয়ে আসলাম। বীর শহীদদের সব লাশ আমরা শহীদ মিনারের গর্তের সামনে নিয়ে এসে দেখলাম- পাক সেনারা সশস্ত্র ভাবে সেখানে দাঁড়িয়ে আছে। লাশগুলো ওরা গর্তের ভেতর ফেলে মাটিচাপা দিল। হত্যাযজ্ঞ শেষে আরেকদল সৈন্য আবার উপরে গিয়ে তল্লাশি চালিয়ে ফিরে আসল- আমাদের ৪ জনকে লাইন ধরে দাড়াবার নির্দেশ দিল- আমরা দাঁড়িয়ে গেলাম লাইন ধরে, এরপর আমাদের উপর গুলিবর্ষন করতে থাকল। আমাদের উপর গুলিবর্ষণ হওয়া মাত্র আমি মৃতের ভান করে পড়ে গেলাম। বীর শহীদদের সেই লাশের মাঝেই পড়ে থেকে দেখলাম- পাক সৈন্যরা আর্মি ট্রাক নিয়ে সদলবলে চলে গেল। চারদিক চেয়ে যখন নিশ্চিত হলাম তারা আর নেই- তখন সেই লাশের মধ্যে থেকে উঠে এক দৌড়ে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চলে এসেছি।

 

আমি বাড়িতে এসে দেখলাম শাখারীবাজারে থমথমে ভাব- শাখারীবাজারের হিন্দু অধিবাসীগন মনে করেছিল আর কোন হত্যাকান্ড হবে না। পাকপশুরা সাধারন নাগরিকদের উপর আর পাইকারী ভাবে হত্যাকান্ড ঘটাবে না। আমরা আমাদের এলাকায় ২৭ ও ২৮ শে মার্চ দিনের বেলায় কোন পাকসেনা দেখি নাই। কিন্তু কার্ফু আরম্ভ হওয়ার সাথে সাথে পাকসেনারা ঘরেঘরে প্রবেশ করে হত্যাকান্ড চালায় এবং বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ করে। আমরা কয়েকদিন ছাদের উপর বসে থেকে ঢাকার চারিদিকে শুধু গুলিবর্ষনের শব্দ শুনেছি। ১৯৭১ সনের ২৮শে মার্চ গুজব ছড়িয়ে পড়ে ঢাকার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বিহারী জনতা হিন্দু মহল্লা হামলা করার জন্যে এগিয়ে আসছে। এ খবর পাওয়া মাত্রই আমরা তাতীবাজার থেকে সকল হিন্দু পরিবার দলে দলে একযোগে বুড়িগংগা নদী পার হয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের উদ্দেশ্যে পল্লী এলাকায় চলে যাই। আমরা কেই কারো সাথে কোন জিনিসপত্র নিয়ে যেতে পারি নাই- সবাই শূণ্যহাতে রুদ্ধশ্বাসে পালিয়েছি। কিশোর, শিশু, যুবক-যুবতী, নারী-পুরুষ, বৃদ্ধ-যুবা সবাই শূণ্য হাতে পালিয়েছি। নদীর ওপার থেকে আমরা সংবাদ পেয়েছি যে ঢাকার জিন্দাবাজার মালিটোলা, বাবুবাজার এলাকায় ব্যাপক লুটতরাজ আরম্ভ হয়েছে। মুল্যবান জিনিসপত্র, সোনাদানা, তামা-কাসা, পিতল, কাপড়-চোপড়, খাট, চকি, দরজা-জানালা সব কিছু তারা লুট করে নিয়ে গেছে। লুট হওয়ার পরক্ষনেই সশস্ত্র বিহারীরা একযোগে এসে শাখারীবাজার, তাতীবাজার, সুতারনগর, গোপালনগরে সকল হিন্দুবাড়ি দখল করে বসেছে। আমরা নয় মাস নদীর অপর পাড়ে বাধৈর গ্রামে নিদারুন দুরবস্থায় অর্ধাহারে-অনাহারে কাটিয়েছি।

 

 

 

স্বাক্ষর
শ্রী পূর্ণচন্দ্র বসাক
২৯শে বৈশাখ, ১৩৭৮

 

 

রুশদী সাকিব হাসান

<৮,২.১.৫,২০-২১>

আবদুল কুদ্দুস মিয়া

রিজার্ভ ইন্সপেক্টর অব পুলিশ

বি,আর পি, হেড কোয়ার্টার, রাজারবাগ, ঢাকা

১৯৭১ সনের ১৫ই মে থেকে রাজারবাগ পুলিশ লাইনে পশ্চিম পাকিস্তানী পুলিশের জমায়েত করা হয়। পাঞ্জাবী পুলিশ লাইনে এসেই যথেচ্ছা ব্যবহার আরম্ভ করে দেয়; কথায় কথায় পশ্চিম পাকিস্তানী পুলিশরা আমাদের বুটের লাথি ও বন্দুকের বাট দিয়ে পিটাতে থাকে, চোখ রাঙ্গিয়ে বলতে থাকে ‘শুয়ারকা বাচ্চা, হিন্দুকা লাড়কা, বেইমান শালা লোগ, হামলোগ আদমী নাহি মাংতা, জামিন মাংতা’’।

 

আমাদেরকে হেডকোয়ার্টারের সকল কক্ষ থেকে কুকুর বিড়ালের মতো তাড়িয়ে দিয়ে সেখানে পশ্চিম পাকিস্তানী পুলিশদের জায়গা দেয়া হয়, আমাদের পোষাক পরিচ্ছদ, কাপড় আসবাবপত্র সব বাইরে ফেলে দেয়া হয়, আমারা অসহায়ের মত আমাদের আসবাব পত্র তুলে নিয়ে আসতাবলের সামনে, ব্যারাকের বারান্দায় আশ্রয় গ্রহন করি। পশ্চিম পাকিস্তানী পুলিশ রাজারবাগ আসার পরেই বাঙ্গালীদের উপর নির্মম অত্যাচার নেমে আসে। প্রতিদিন, “ইয়ে শালা লোগ মুক্তি হায়” বলে বহু নিরীহ বাঙ্গালী যুবককে চোখ বেঁধে মিলিটারী ট্রাক ও জীপ থেকে আমাদের চোখের সামনে নামিয়ে হেডকোয়ার্টার বিল্ডিংয়ের উপর তলায় নিয়ে রাখা হয়। সারাদিন এভাবে চোখ বেঁধে বাঙ্গালী যুবকদের রাজারবাগ এনে জমায়েত করা হয় এবং সন্ধ্যার পর এ সব অসংখ্য বাঙ্গালী যুবককে মিলিটারী ট্রাকে করে ঢাকা সেনা নিবাসে নিয়ে হত্যা করা হয়। হেডকোয়ার্টারের তেতলা ও চারতলায় বহু যুবতী উলঙ্গ করে রাখা হয়-পাঞ্জাবী সেনা ও পশ্চিম পাকিস্তানী পুলিশ এসব ধরে আনা বালিকা ও মহিলাদের উপর অবিরাম ধর্ষণ চালায়। লাইনে পুলিশের কলরবের জন্য আমারা অত্যাচারিত মেয়েদের ক্রন্দন রোল শুনতে পেতাম না- লাইনে দূরে গিয়ে দাঁড়ালেই ধর্ষিতা মেয়েদের আর্তনাদ ও আহজারি শুনতে পেতাম-রাতে ধর্ষিতা মেয়েদের বুকফাটা চিৎকারে আমরা কোয়ার্টারে ঘুমাতে পারতামনা- সারারাত পরিবার পরিজন নিয়ে জেগে থাকতাম। হেড কোয়ার্টার বিল্ডিং থেকে ভেসে আসা ধর্ষিতা মেয়েদের আর্তনাদে আমরা বাঙ্গালী মেয়েদের দুর্দশা দেখে দুঃখে, ক্ষোভে, বেদনায় দিশাহারা হয়ে পড়েছিলাম। আমরা ঐ সকল অসহায় মেয়েদের উদ্ধার করার জন্য কিছুই করি নাই, করতে পারি নাই, কারণ ওদেরকে উদ্ধার করার জন্য, ওদের অত্যাচারের সহানুভুতি ও দরদ দেখানোর কোন সুযোগ আমাদের ছিল না।

 

হেডকোয়ার্টারের তেতলা ও চারতলায় যেখানে বাঙ্গালী মেয়েদের উলঙ্গ অবস্থায় ঝুলিয়ে রেখে ধর্ষণ করা হতো সেখানে সব সময় পাঞ্জাবী সৈন্যরা প্রহরায় মোতায়েন থাকতো। সেখানে আমাদের প্রবেশ করার অনুমতি ছিল না। মিঃ বোস্তান খাঁ নামে এক পাঞ্জাবী ভদ্রলোক এ সময় রাজারবাগ পুলিশ লাইনের রিজার্ভ ইন্সপেক্টর ছিলেন। এই ভদ্রলোক আমাদের লাইনের দায়িত্বভার গ্রহন করার পর আমাদের উপর সবদিক থেকে অত্যাচার ও দমন নীতি আরম্ভ হয়ে যায়। পুলিশ লাইনে কখন আমাদের উপর মৃত্যুর করাল গ্রাস নেমে আসে, আমরা এই ভয়ে সব সময় সন্ত্রস্ত থাকতাম।

 

১৯৭১ সনের ৪ঠা এপ্রিল রাজারবাগ পুলিশ লাইন থেকে তৎকালীন ষ্টোর-ইন-চার্জ পুলিশ সার্জেন্ট মিঃ মুর্তজা হোসেন এবং সুবেদার আবুল হোসেন খান এবং সুবেদার মোস্তফাকে ঢাকা সেনানিবাসে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে পাঞ্জাবী সেনারা এই তিনজন বাঙ্গালী পুলিশকে ওদের ক্যাম্পে নিয়ে নির্মম অত্যাচার চালায়-পঞ্জাবী সেনারা এই তিনজন বাঙ্গালী পুলিশকে ওদের ক্যাম্পে নিয়ে নির্মম অত্যাচার চালায়-পাঞ্জাবী সেনারা লাইন হয়ে ওদেরকে ঘেরাও করে দাড়িয়ে ফুটবলের মত বুট দিয়ে লাথি মেরে খেলতে থাকে। ওদের তিন জনের দেহ লাঠি, বেত, বুট ও বেয়নেট দিয়ে গরুর মত পিটিয়ে চুরমার করে দেওয়া হয়, সারা দেহ চাক চাক করে কেটে দেওয়া হয়। ওদের দেহ রক্তাক্ত হয়ে একেবারে অবশ ও অচল হয়ে গেলে তাদের তিনজনকে গুলি করে হত্যা করার নির্দেশ দেওয়া হয়। ওদের ক্ষতবিক্ষত দেহ দেখে যাকে তাদের হত্যা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, সেই পাঠান তাদেরকে ছেড়ে দেন। পদস্থ পাঞ্জাবী মিলিটারী অফিসারদের তাদের হত্যা করার জন্য তিনটি ফাকা গুলির শব্দ শুনিয়ে দেয় এবং দেশ স্বাধীন না হওয়া পর্যন্ত আত্মগোপন করে থাকার জন্য বলা হয়। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর আমি উপরোক্ত তিন সহকর্মীর নিকট উক্ত ঘটনা বিস্তারিত জানতে পেরেছি।

 

১৯৭১ সনের ডিসেম্বরে ঢাকা রাজধানীতে মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর সম্মিলিত অবিজানের মুখে আমরা রাজারবাগ পুলিশ লাইনের পশ্চিম পাকিস্তানী পুলিশ ও পাঞ্জাবী সেনাদের বেসামাল অবস্থায় দেখতে পাই। বাংলাদেশ মুক্ত হলে মিত্রবাহিনী ও মুক্তি বাহিনী রাজারবাগ পুলিশ লাইনের সকল পশ্চিম পাকিস্তানী পুলিশ ও পাঞ্জাবী সেনাদের বন্দী করে নিয়ে যায়।

স্বাক্ষর/-

আবদুল কুদ্দুস

২৬-৩-৭৪

রিজার্ভ ইন্সপেক্টর অফ পুলিশ,
বি,আর,পি,

রাজারবাগ, ঢাকা।

 

 

 

 

নিয়াজ মেহেদী

<৮,২.১.৬,২২-২৫>

সুবেদার খলিলুর রহমান

আর্মস এস আই, বি, আর পি,

রাজারবাগ পুলিশ লাইন, ঢাকা।

 

১৯৭১ সনের ২৯শে মার্চ সকাল দশটায় আমরা মিল ব্যারাক পুলিশ লাইনে উপস্থিত হয়ে আমাদের প্রিয় পুলিশ সুপার মিঃ ই, এ, চৌধুরী, পুলিশ কমান্ডেন্ট মিঃ হাবিবুর রহমান, ডি, এস, পি লোদী সাহেব, রেঞ্জ রিজার্ভ ইন্সপেক্টর মিঃ মতিউর রহমান সবাইকে উপস্থিত দেখলাম। মিঃ ই, এ, চৌধুরী সাহেব ক্ষুধার্ত, আহত, ক্ষতবিক্ষত সিপাহীদের দেখে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন। লাইনে মুহূর্তে কান্নার রোল পড়ে গেল। তিনি লাইনের মধ্যে প্রবেশ করে প্রতিটি সিপাহীর আহত, ক্ষতবিক্ষত দেহ দেখলেন, তার দু’চোখ বেয়ে অঝোরে অশ্রু পড়ছিল। তিনি অবিলম্বে আমাদের খাওয়ার ব্যবস্থা করলেন। তিনি বললেন, তোমাদের কোন অসুবিধা নাই, তোমরা নীরবে তোমাদের কাজ করে যাও।” আমি তোমাদের নিরাপত্তার ব্যাপারে সতর্ক দৃষ্টি রাখবো।

 

আমার সাথে আরও তিনজন সুবেদার, সুবেদার সফিকুর রহমানের সহকর্মীর সাথে আটজন হাবিলদার- মোঃ ফজলুল হক, আঃ ওয়াদুদ, আবদুল কুদ্দুস ও অন্যান্য বিশজন পুলিশ কনস্টেবল দিয়ে ঢাকা কোতোয়ালী থানার দায়িত্ব দেয়া হয়। আমরা থানায় প্রবেশ করে দেওয়ালে, মেঝেতে চাপ চাপ রক্ত দেখতে পেলাম, দেখলাম থানার দেওয়াল গুলির আঘাতে ঝাঁজরা হয় আছে, বুড়ীঙ্গার পাড়ে অসংখ্য মানুষের মৃতদেহ পেলাম, আমাদের পি, এর, এফ, এর কনস্টেবল আবু তাহেরের ( নং ৭৯৮) পোশাকপরা লাশ ভাসছে, আরও বহু সিপাহীর ক্ষত বিক্ষত লাশ দেখতে পেলাম। আমার চোখ বেয়ে অশ্রু পড়ছিল, আমি দিশাহারা হয়ে কাঁদতে কাঁদতে আমার প্রিয় সিপাহী তাহেরের লাশ ধরতে গেলে পিছন থেকে এক পাঞ্জাবী সেনা গর্জ্জন করে কর্কশ ভাবে বলতে থাকে “শূওর কা বাচ্চা, তোমকো ভি পাকড়াতা হায়, কুত্তাকা বাচ্চা, তোম কো ভি সাত মে ‘গুলি করেগা” আমি আর্ম সাব ইন্সপেক্টর হওয়া সত্ত্বেও একজন সাধারণ পাক সেনা আমার সাথে কুকুরের মত ব্যবহার করলো। দুঃখে, অপমানে, লজ্জায়, আমি যেন অবশ হয়ে পড়লাম। প্রতিবাদ করতে চাইলাম সর্বশক্তি দিয়ে কিন্তু পারলাম না। প্রতিবাদ করার কোন উপায় ছিল না। তাই ওদের অসহ্য আপত্তিকর কার্যকলাপের প্রতিবাদ করি নাই, সবকিছু নীরবের সহ্য করেছি ওদের যথেচ্ছ কার্যকলাপের নীরব সাক্ষী হয়ে রয়েছি।

 

কোতোয়ালী থানার বরাবর সোজাসুজি গিয়ে বুড়ীগঙ্গার লঞ্চঘাটের পাড়ে দাঁড়িয়ে দেখলাম বুড়ীগঙ্গার পাড়ে লাশ, বিকৃত, ক্ষত-বিক্ষত, অসংখ্য মানুষের লাশ ভাসছে পুলিসের পোশাক পড়া বীভৎস লাশ। দেখলাম বিভিন্ন বয়সের নারী পুরুষ, বৃদ্ধা-যুবা, যুবক-যুবতী, বালক-বালিকা, কিশোর-শিশুর অসংখ্য লাশ। যতদূর আমার দৃষ্টি যায় দেখলাম বাদামতলী ঘাট থেকে শ্যামবাজার ঘাট পর্যন্ত নদীর পাড়ে অসংখ্য মানুষের বীভৎস পচা ও বিকৃত লাশ, অনেক যুবতীর লাশ দেখলাম, এই পূত-পবিত্র বীরাঙ্গনাদের ক্ষত-বিক্ষত যোনিপথ দেখে মনে হলো, পাঞ্জাবী সেনারা কুকুরের মত ওদের পবিত্র দেহের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে ওদেরকে যথেচ্ছভাবে ধর্ষণ করে গুলিতে ঝাঁজরা করে নদীতে ফেলে দিয়েছে। অনেক শিশুর ও বালক-বালিকাদের থেতলে যাওয়া লাশ দেখলাম। ওদেরকে পা ধরে মাটিতে আছড়িয়ে মারা হয়েছে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অশ্রুভরা চোখে আমি লাশ দেখলাম- লাশ আর লাশ-অসংখ্য নিরীহ বাঙ্গালীর লাশ- প্রতিটি লাশে বেয়নেট ও বেটনের আঘাত দেখলাম, দেখলাম কারও কারও মাথা চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে আছে, পাকস্থলি সমেত হৃৎপিণ্ড বের করা হয়েছে, পায়ের গিট হাতের কব্জা ভাঙ্গা, ঝুলছে পানিতে। সদরঘাট টার্মিনালের শেডের মধ্যে প্রবেশ করে শুধু রক্ত আর রক্ত দেখলাম- দেখলাম মানুষের তাজা রক্ত এই বুড়িগঙ্গা নদীর পাড়ে। এই টার্মিনাল শেড ছিল ২৫শে মার্চের কালো রাত্রিতে ওদের জল্লাদখানা। ওরা বহু মানুষকে ধরে এনে ঐ টার্মিনালে জবাই করে বেটন ও বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে টেনে হিঁচড়ে পানিতে ফেলে দিয়েছে। অসংখ্য মানুষকে এভাবে নদীতে ফেলে দেওয়ার পরিষ্কার ছাপ দেখতে পেলাম সেই রক্তের স্রোতের মধ্যে। শেডের বাইরের প্রাঙ্গণে দেখলাম অসংখ্য কাক ও শকুন মানুষের সেই রক্তের লোভে ভীর করেছে। সদরঘাট টার্মিনাল থেকে ভারাক্রান্ত হৃদয়ে বের হয়ে পূর্বদিকে পাক সেনাদের সদর আউট পোস্টের দিকে দেখলাম নদীর পাড়ের সমস্ত বাড়িঘর ভস্ম হয়ে ওদের নৃশংসতা ও বীভৎসতার সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দেখালাম রাস্তার পার্শ্বে মিউনিসিপালিটির কয়েকটি ময়লা পরিষ্কার করার ট্রাক দাঁড়িয়ে আছে, সুইপাররা হাত পা টেনে হেঁচড়ে ট্রাকে লাশ উঠাচ্ছে, প্রতিটি ঘর থেকে আমাদের চোখের সামনে বহু নারী-পুরুষ, বালক-বালিকা, কিশোর-শিশু ও বৃদ্ধ-বৃদ্ধার লাশ সুইপাররা টেনে ট্রাকে উঠাচ্ছিল। পাঞ্জাবী সেনারা নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে কুকুরের মত নির্মমভাবে প্রহরা দিচ্ছিল। ভয়ে সন্ত্রাসে আমি আর এগুতে পারলাম না। পুর্বদিকে রাস্তা দিয়ে আমি সদরঘাটের কাপড়ের বাজারের নীরব নিথর রাস্তা ধরে সদরঘাট বেপটিস্ট মিশনের চৌরাস্তার সম্মুখে দিয়ে নওয়াবপুরের দিকে অগ্রসর হচ্ছিলাম। আমাদের কারো শরীরে পুলিশের পোশাক ছিল না- আমি এবং আমার সাথে আরও দু’জন সিপাহী সাধারণ পোশাক পড়ে দায়িত্ব পালন করছিলাম।

 

কাপড়ের বাজারের চারদিকে রূপমহল সিনেমা হলের সম্মুখে সর্বত্র বিভিন্ন বয়সের অসংখ্য মানুষের ইতস্ততঃ ছড়ানো বীভৎস লাশ দেখলাম, বহু যুবতী মেয়ের ক্ষত-বিক্ষত লাশ দেখলাম।

 

খৃষ্টান মিশনারী অফিসের সম্মুখে, সদরঘাট বাস স্টপেজের চারদিকে, কলেজিয়েট হাইস্কুল জগন্নাথ কলেজ, পগোজ হাইস্কুল, ঢাকা জজকোর্ট, পুরাতন স্টেট ব্যাংক বিল্ডিং, সদরঘাট গির্জা, নওয়াবপুর রোডের সর্বত্র, ক্যাথলিক মিশনের বাইরে এবং ভিতরে আদালত প্রাঙ্গণে বহু মানুষের মৃতদেহ দেখলাম। রাস্তায় রাস্তায় দেখলাম পুলিশের পোশাক পড়া বহু মৃতদেহ, রায় সাহেব বাজার ব্রিজ পার হয়ে নওয়াবপুর রোডে পা দিয়েই দেখলাম বিহারীদের উল্লাস ও উন্মত্ত লাফালাফি, ওরা পশুর মত অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে অসংখ্য বাঙ্গালীর লাশ পাড়িয়ে জয়ধ্বনি করে মিছিল করে নওয়াবপুরের রাস্তায় বের হয়ে পড়ছিল। পাঞ্জাবী সেনা কর্তৃক নির্বিচারে বাঙ্গালী হত্যার খুশীতে দেখলাম বিহারীরা রাস্তায় রাস্তায় পড়ে থাকা নিরীহ বাঙ্গালীদের লাশের উপর লাথি মারছে, কেউ প্রস্রাব করে দিচ্ছে, হাসতে হাসতে, রাস্তায় রাস্তায় বিহারী এলাকায় দেখলাম সরু বাঁশের মাথায় বাঙ্গালী বালক ও শিশুর লাশ বিদ্ধ করে খাড়া করে রাখা হয়েছে। দেখলাম উন্মত্ত বিহারী জনতা রাস্তায় পড়ে থাকা লাশ গুলিকে দা দিয়ে কুপিয়ে কুচি কুচি করে কেটে আনন্দ করছে, উশৃঙ্খল বিহারী ছেলেরা রাস্তায় বেড়িয়ে পড়ে উল্লাস করছে, রাস্তার দুই পার্শ্বে সর্বত্র আগুন আর আগুন দেখলাম। বিহারী জনতা রাস্তার পার্শ্বের প্রতিটি বাড়িতে প্রবেশ করে আগুন লাগিয়ে দিয়েছিল, জ্বলছিল বাঙ্গালীদের ঘর-বাড়ী ,আসবাবপত্র পণ্যদ্রব্য, পোশাক পরিচ্ছদ মুল্যবান জিনিসপত্র। ঠাটারী বাজারের ট্রাফিক ক্রসিংয়ে এসে দেখলাম একটি যুবক ছেলের বীভৎস লাশের উপর পেট চিড়ে বাঁশের লাঠি খাড়া করে লাঠির মাথায় স্বাধীন বাংলার একটি মলিন পতাকা ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। লাশের উপর জয় বাংলার পতাকা ঝুলিয়ে রেখে বিহারী জনতা চারদিকে দাঁড়িয়ে থেকে হাসছে, উল্লাস করছে। দেখলাম লাশের গুহ্যদ্বার দিয়ে লাঠি ঢুকিয়ে আনন্দ প্রকাশ করছে। বিজয় নগরের রাস্তা ধরে আমি শান্তিবাগে আমার কোয়ার্টারের আসছিলাম- দেখলাম তখনও রাস্তার চারিপার্শ্বের ঘরবাড়ি জ্বলছে।

 

আমি কোতোয়ালী থানার দায়িত্ব পালন করতাম, ৩০ শে মার্চ কোতোয়ালী থানার মধ্যে আমরা কামরায় কামরায় প্রবেশ করে দেওয়ালের সর্বত্র চাপ চাপ রক্ত দেখলাম, দেখলাম থানার পায়খানা, প্রশ্রাবখানা ও অন্যান্য দেওয়াল গুলির আঘাতে ঝাঁজরা হয়ে গেছে।

 

১৯৭১ সনের মার্চ মাসের পর কোতোয়ালী থানার কোন বাঙ্গালী পুলিশকে বাহিরে টহলে পাঠানো হতো না, থানায় বসিয়ে রাখা হত। এক পাঞ্জাবী মেজর আমাদেরকে তদারক করে যেতেন মাঝে মাঝে এসে।

 

৫ই এপ্রিল আমাদের সবাইকে কোতোয়ালী থানা থেকে রাজারবাগ পুলিশ লাইনে আনা হয়। পুলিশ লাইনে এসে আমাদের ব্যারাক কেন্টিন, আসবাবপত্র, পোশাক পরিচ্ছদ সবকিছুর ভস্ম ছাই দেখলাম। তিন নম্বর ব্যারাকে প্রবেশ করে আমার দু’জন প্রিয় সিপাহীর অগ্নিদগ্ধ লাশ দেখলাম-লাশের পায়ে শুধুমাত্র বুট ছিল, তাদের পোশাক পরিচ্ছদ সারা দেহ জ্বলে শেষ হয়ে গিয়েছিল। আমার প্রিয় সিপাহী জাহাঙ্গীর ও আবদুস সালামের বীভৎস লাশ দেখে আমি কান্নায় ভেঙ্গে পড়লাম। লাশের দিকে মাথা নত করে আমার দু’জন বীর সিপাহীকে সালাম জানালাম, অশ্রুসিক্ত নয়নে। পুলিশ লাইনের উত্তর পূর্বদিকের পুকুরের উত্তর পাড়ে শহীদ সিপাহীদের যথার্থ মর্যাদার সাথে সমাহিত করলাম।

 

পুলিশ লাইন থেকে পাঞ্জাবীরা চলে গেলেও রাজারবাগ পুলিশ লাইনে চরম ভয় ভীতি, সন্ত্রাস ও হতাশা বিরাজ করছিল। আমরা সব সময় মৃত্যু ভয়ে ভীত ও আতঙ্কগ্রস্ত থাকতাম। ঢাকা ডিস্ট্রিক্ট বিশেষ পুলিশ ফোর্সের রিজার্ভ ইন্সপেক্টর ছিলেন এ সময় বোস্তান খাঁ নামে এক চরম বাঙ্গালী বিদ্বেষী পাঠান ভদ্রলোক। এ ভদ্রলোক পুলিশ লাইনের দায়িত্বভার গ্রহন করেই চরম সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেন। তিনি ৬ই এপ্রিল লাইনে বসেই বাঙ্গালী পুলিশের সাথে কুকুরের মত যথেচ্ছ ব্যবহার আরম্ভ করে দেন। লাইনে প্রবেশ করে স্বাস্থ্যবান, শক্তি সমর্থ কনস্টেবলদের ধরে, হাড়ের গিরায় গিরায় বেদম ভাবে পিটুনি দেন। খুঁজে খুঁজে তার পছন্দ ও ইচ্ছামত যাকে ইচ্ছা তাকেই ধরে মুক্তিবাহিনী বলে ঢাকা সেনানিবাসে ধরে নিয়ে গিয়েছিলেন তারা আর কোনদিন ফিরে আসেনাই। সাথে সাথে ঢাকা সেনানিবাস থেকে মিলিটারী ট্রাকে করে পাঞ্জাবী সেনারা হঠাৎ পুলিশ লাইনে উপস্থিত হয়ে বাঙ্গালী পুলিশদের তদারক আরম্ভ করে দিত। পাইকারীভাবে নাম ও নাম্বার জিজ্ঞাসা করতে করতে অকস্মাৎ অনেককে “তোম শালা মুক্তি বাহিনী হায়, চলো” বলে গরুর মত বুটের লাথি মারতে মারতে ট্রাকে উঠিয়ে নিয়ে যেত। আমি তখন পি, আর, এফ-এর ফোর্স সুবেদার ছিলাম। মিলিটারী ট্রাক লাইনে প্রবেশ করার সাথে সাথে আমি যে কোন অজুহাতে লাইনের বাইরে চলে যেতাম। পাঞ্জাবী সেনারা লাইনে প্রবেশ করলে লাইনের সর্বত্র যেন সবার মুখে মৃত্যুর কালো ছায়া নেমে আসতো। বাঙ্গালী পুলিশ যার যার মত ব্যারাকে প্রবেশ করে ওদের দৃষ্টির আড়ালে থাকার চেষ্টা করত। কারণ ওদের দৃষ্টিতে পড়ে গেলেই ওরা যে কোন অজুহাতে বাঙ্গালী পুলিশদের বিপন্ন করতো, বিপদগ্রস্ত করে তুলতো।

 

১৯৭১ সনের মে মাসে রাজারবাগ পুলিশ লাইনে পশ্চিম পাকিস্তানী পাঞ্জাবী পুলিশ এসে গেলে রিজ্জার্ভ ইন্সপেক্টর কুকুরের মত অট্টহাসীতে ফেটে পড়ে বলতে থাকে “যাও শালা লোক শোয়ার কা বাচ্চা হামারা ব্যারাক ছোড়ো, হামারা আদমী আগিয়া, শালা লোগ, ভাগো”। একথা বলার সাথে সাথে বিহারী, পাঞ্জাবী, পাঠান পুলিশ ও পশ্চিম পাকিস্তানী পোশাক পরিচ্ছদ, আসবাবপত্র সবকিছু ব্যারাকের বাইরে ফেলে দিয়ে আমাদের ঘাড়ে ধরে বের করে দেয়। আমরা বাঙ্গালী পুলিশরা অসহায় এতিমের মত আমাদের পোশাক পরিচ্ছদ কুড়িয়ে নিয়ে লাইনের আস্তাবলে বারান্দায় গাছের নিচে উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে আশ্রয় গ্রহণ করি। রাজারবাগ পুলিশ লাইনে যোগদান করার পর আমরা দেখেছি পাঞ্জাবী সেনারা মিলিটারী ট্রাকে ও জীপে করে প্রতিদিন স্কুলে, কলেজে, ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের, ঢাকার বিভিন্ন এলাকার বালিকা, যুবতী মেয়ে ও সুন্দরী রমণীদের ধরে আনতে থাকে। অধিকাংশ বালিকা, যুবতী মেয়ের হাতে বই ও খাতা দেখেছি। প্রতিটি মেয়ের মুখমণ্ডল বিষণ্ণ, বিমর্ষ ও বিষময় দেখেছি। মিলিটারী জীপে ও ট্রাকে যখন এভাবে যুবতী মেয়েদের রাজারবাগ পুলিশ লাইনে আনা হতো তখন পুলিশ লাইনে হৈচৈ পড়ে যেত, পাঞ্জাবী বিহারী ও পশ্চিম পাকিস্তানী পুলিশ জিভ চাটতে চাটতে ট্রাকের সম্মুখে এসে মেয়েদের টেনে হেচড়িয়ে নামিয়ে দিয়ে তৎক্ষণাৎ দেহের পোশাক পরিচ্ছদ কাপড় চোপড় খুলে তাদেরকে সম্পূর্ণ ভাবে উলঙ্গ করে আমাদের চোখের সামনেই মাটিতে ফেলে কুকুরের মত ধর্ষণ করত। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ও অঞ্চল থেকে ধরে এ সকল যুবতী মেয়েদের সারাদিন নির্বিচারে ধর্ষণ করার পর বৈকালে আমাদের পুলিশ হেডকোয়ার্টার বিল্ডিং এর উপর তাদেরকে উলঙ্গ করে চুলের সাথে লম্বা রডের সাথে বেঁধে রাখা হতো। রাতের বেলায় এসব নিরীহ বাঙ্গালী নারীদের উপর অবিরাম ধর্ষণ চালানো হতো। আমরা গভীর রাতে আমাদের কোয়ার্টারে বসে মেয়েদের আর্ত চিৎকার শুনে অকস্মাৎ সবাই ঘুম থেকে ছেলে মেয়ে সহ জেগে উঠতাম। সেই ভয়াল ও ভয়ঙ্কর চিৎকারে কান্নার রোল ভেসে আসত। “বাঁচাও, আমাদের বাঁচাও, তোমাদের পায়ে পড়ি, আমাদের বাঁচাও, পানি দাও, এক ফোটা পানি দাও, পানি পানি।”

 

মিলিটারী ট্রাক ও ভ্যানে প্রতিদিন পাঞ্জাবী সেনারা রাজধানীর বিভিন্ন জনপদ, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা থেকে নিরীহ বাঙ্গালী যুবক ছেলেদের চোখ বেঁধে ধরে নিয়ে হেডকোয়ার্টারে অফিসের কক্ষে কক্ষে জমায়েত করে অকথ্য অত্যাচার চালাতো। হেড কোয়ার্টারে অফিসের উপর তালায় আমাদের প্রবেশ করা একেবারে নিষিদ্ধ ছিল। দিনের বেলায় পুলিশ লাইনে প্যারেডের আওয়াজের জন্য উপরতলা থেকে নির্যাতিত বন্দীদের কোন আর্তনাদ আমরা শুনতে পেতাম না। সন্ধ্যার পর আমরা আমাদের নির্দিষ্ট কোয়ার্টার থেকে তাদের আর্তনাদ শুনতে পেতাম। সন্ধ্যার পর পাক সেনারা বিভিন্ন প্রকারের বন্দীদের উপর অত্যাচার চালিয়ে যেত। আর লোহার রডের উপর ঝুলন্ত বালিকা, যুবতী নারী ও রূপসী রমণীদের উপর চলতো অবিরাম ধর্ষণ, নির্মম অত্যাচার। বন্দীদের হাহাকারে আমরা অনেক সময় একবারে দিশাহারা হয়ে পড়তাম, অনেক সময় প্রতিবাদ করতে চাইতাম। কিন্তু ওদের শক্তির মোকাবেলায় আমাদের কিছুই করার ছিল না, আমরা কিছুই করি নাই, করতে পারি নাই। এভাবে প্রতিদিন ‘মুক্তি হায়’ বলে যে সব নিরীহ বাঙ্গালী ছেলেদের চোখ বেঁধে পুলিশ লাইনে এনে হেড কোয়ার্টার অফিসে জমায়েত করা হত রাতের শেষে পরের দিন সকালে আর এ সকল বন্দীদের দেখা যেত না এবং সে স্থানে নতুন বন্দীদের এনে রাখা হত।

স্বাক্ষর/-

খলিলুর রহমান

২-৬-১৯৭৪

 

 

 

নিয়াজ মেহেদী

<৮,২.১.৭,২৬-২৭>

মতিউর রহমান

সাব-ইন্সপেক্টর অব পুলিশ

রমনা থানা, ঢাকা

 

১৯৭১ সনের ২৫শে মার্চ আমি সারাদিন থানা সংলগ্ন পুলিশের সি, আই, অফিসের জন্য কাজ করছিলাম। রাত দশটা পনের মিনিট। আমার টেবিলের উপর রাখা টেলিফোনটি বেজে উঠল। কমলাপুর পুলিশের জি, আর, পি থেকে আমার এক বিশিষ্ট বন্ধু টেলিফোনে আমাকে জানালো যে, ঢাকা সেনানিবাস থেকে ভারী অস্ত্র ও কামান সেট করা সত্তরটি আর্মি ট্রাক ভর্তি সশস্ত্র পাক হানাদার এয়ারপোর্ট রোড ধরে ঢাকা শহরে প্রবেশ করছে। রাত প্রায় এগারোটার সময় পাক হানাদাররা আমাদের থানার উপর আক্রমন করে। ওরা এসেই ভারী মেশিনগানের সাহায্যে বৃষ্টির মত আমাদের থানায় গুলি বর্ষণ করতে থাকে। থানার সামনে নিয়োজিত আমাদের সশস্ত্র প্রহরী ও কতিপয় পুলিশ অফিসার পশুদের অবিরাম গুলিবর্ষণে বেশীক্ষণ টিকে থাকতে পারে নাই। পাক সেনারা থানায় ঢুকেই তাদের সবাইকে বন্দী করে। এরপর বহু পাক সেনা আমাদের দিকে গুলি বর্ষন করতে করতে অগ্রসর হতে থাকলে আমরা গুলিবর্ষন শুরু করি এবং প্রাণপণে পশুদের প্রতিরোধ করতে থাকি। এভাবে আমরা সারারাত শত্রুসেনাদের প্রতিরোধ করতে থাকি। সকালে সাড়ে পাঁচটায় ওরা থানার কলোনী সশস্ত্র ভাবে ঘেরাও করে ব্যাপক তল্লাশী আরম্ভ করে এবং আমাদের সবাইকে বন্দী করে। আমরা থানায় পুলিশের সাধারণ সিপাহী, উচ্চপদস্থ পুলিশ অফিসারসহ মোট ৪৫ জন ওদের হাতে বন্দী হয়েছিলাম। আমাদের সাথে বাইরের আরও ৫০ জন পুলিশ বন্দীকে রাখা হয়েছিল। আমাদের সবাইকে থানার সম্মুখে পশ্চিম দিকে মাঠে বেদম প্রহার করতে করতে, বুটদ্বারা লাথি মারতে মারতে নিয়ে গিয়ে “নজর নিচে দেকার মিটেট মে শো যাও” বলে আমাদেরকে উপড় করে লাথি মেরে শুইয়ে দেয়া হয়। সকাল ছয়টা থেকে নয়টা পর্যন্ত তিন ঘন্টা আমাদেরকে বেদম পিটানো হয়। হাতের বেত, বন্ধুকের নল এবং যার হাতে যা ছিল তাই দিয়ে আমাদের উপর এলোপাতাড়ি পিটুনি চলতে থাকে। “শালা মালাউন, শোয়ার কা বাচ্চা আভী জয় বাংলা বলতা নাই, শালা কাফের, হিন্দুকা লাড়কা, তোমহারা মুজিবর বাবা আভি কাহা হায়?” বলে অকথ্য গালাগালি করতে থাকে আর অবিরামভাবে প্রহার করতে থাকে। আমার ঘরে নৌকার সুন্দর আর্ট করা গ্রাম বাংলার একটি দেয়াল চিত্র দেখে আমাকে আরও বেশি প্রহার করতে থাকে। আমাদের সি, আই, মিঃ মোয়াজ্জেম হোসেন, লজ্জায় এবং অপমানে বিমুঢ় হয়ে সারাদিন হাউমাউ করে পাগলের মত কাঁদতে থাকেন। তার দু’ছেলেও তার সাথে বন্দী হয়ে চরম অত্যাচারের শিকার হয়েছিল। তিন ঘন্টা থানার সামনের মাঠে বেদম পিটুনি দেওয়ার ফলে আমাদের বহু সহকর্মী জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলেন। কারো মুখ দিয়ে রক্ত পড়ছিল, কারো কারো হাত পা ভেঙ্গে গিয়েছিল। এরপর আমাদের প্রায় ৪০ জনকে এলোপাতাড়ি পিটাতে পিটাতে থানার একটি আট ফুট প্রশস্ত ও দশ ফুট চওড়া ছোট কামরায় ঠাসাঠাসি করে চাউলের বস্তার মত গুদামজাত করে রাখা হয়। আমরা বেদমভাবে প্রহৃত হওয়ার পর থানার সম্মুখে প্রাঙ্গনে মানুষের তাজা রক্তে ভরপুর দেখেছি। আমাদের থানা হাজতে একজন আসামী ছিল তাকেও গুলি করা হয়। কিন্তু সে মরে নাই, আধমরা ভাবে ভীষণ যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিল। আমরা ছোট কামরায় প্রবেশ করার সময় দেখলাম আমাদের দু’জন শহীদ সিপাহীর লাশ থানার পিছনের মাটিতে পোতা হচ্ছে। সারারাত আমরা সকল সিপাহী বন্দী দাঁড়িয়ে থেকে যন্ত্রণায় কেঁদেছি, সাংঘাতিক যন্ত্রণা ভোগ করেছি। ওরা মেশিনগান নিয়ে সর্বক্ষন প্রহরায় ছিল।

 

পরের দিন ২৭শে মার্চ সকাল দশটার সময় সকল বন্দীকে বের করে গরুর মত পিটাতে পিটাতে থানার পূর্বদিকে নিয়ে গিয়ে ছোট হাউজের দাঁড় করিয়ে রেখে বলে, “যাও শালা লোগ পিয়ো”। ঐ পানিতে পশুরা নেমে সকালে থেকে গোসল করায় পানি দূষিত ও বিষাক্ত হয়ে গিয়েছিল। আমাদের বন্দীদের মধ্যে কতক সেই পচা পানি দিয়েই হাত মুখ ধুয়ে নিল, তৃষ্ণায় একেবারে দিশাহারা হয়ে অনেকে পানি খেয়ে নিল, অনেকেই সে পানি স্পর্শ করতে পারলো না। আমরা পানির হাউজের সামনে যাওয়ার সময় লক্ষ্য করলাম পূর্বের দিন যেখানে আমাদের দু’জন শহীদ সিপাহীদের লাশ পোতা হয়েছিল সেখানে তাদের লাশ নেই, সামনেই দেখলাম সে দু’জন শহীদ সিপাহীর রক্ত মাখা পোশাক এক জায়গায় গুটিয়ে রাখা হয়েছে। পানি খাওয়ার পর আমাদেরকে পুনরায় সেই ছোট কামরায় গাদাগাদি করে রাখা হয়। কিছুই খেতে দেয়া হয় নাই দু’দিন। আমাদের কেউ কেউ ক্ষুধায় একেবারে কাতর হয়ে খেতে দেওয়ার জন্য প্রার্থনা জানালে ওরা অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে বলতো, “তোমহারা মুজিবর বাবা খানা ডেজেগো”

 

১৯৭১ সনের ২৬শে মার্চ সকাল থেকেই ওরা তিন চার জন করে কামরা থেকে নিয়ে পাশের কামরায় বেদম পিটুনি আরম্ভ করলো। এভাবে আমাদের সকল বন্দীদের উপর অসহ্য মার পিট চললো। আমি সেই কামরায় প্রবেশ করার পর পরই দেখলাম দশ বার জন জল্লাদ পশু। ওদের হাতের ছোট ছোট লাঠি। বন্দুকের বাট, বুট, যার হাতে যা ছিল তাই দিয়ে নির্মম ভাবে পিটাতে থাকে। আমি ওদের মারে জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। এরপর আমাকে পাশের কামরায় নিয়ে পুলিশের কোথায় কি আছে, কত পুলিশ অফিসার থানায় আছে, পুলিশ কি মিটিং করেছিল ইত্যাদি সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করে। কিন্তু অসহ্য পিটুনি সহ্য করার পরও আমি কোন ব্যাপারেই সঠিক তথ্য ওদেরকে সরবরাহ করি নাই।

 

১৯৭১ সনের ২৭শে মার্চ আমরা সকল বন্দীরা যন্ত্রণায় ছটফট করছিলাম। বিকাল তিনটার সময় টুকরীতে করে সামান্য ভাত এনে আমাদের জানালার সামনে ধরে রেখে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে বলতে থাকে, “শালা লোগ চাউল খায়েগা, চাউল।” সে ভাত আমাদেরকে খাওয়াবার জন্য আনা হতো না, বরং আমাদেরকে নিয়ে বিদ্রুপ করার জন্যই আমাদের জানালার সামনে ধরে রাখা হতো। ওরা জানালার সামনে সামান্য কিছু ভাত ধরে ঠাট্টা তামাশা করতে থাকলেও আমাদের কোন ক্ষুধার্ত বন্দীই ওদের বিদ্রুপের সামনে কোন কথাই বলে নাই। ওরা ভাত নিয়ে এমন উলঙ্গভাবে আমাদেরকে নিয়ে বিদ্রুপ করে চলে যাওয়ার পর বন্দীখানায় কান্নার রোল পড়ে যায়। আমরা সবাই কাঁদতে থাকি হাউমাউ করে। ওরা সেই ভাতগুলি আমাদেরকে দেখিয়ে বন্দীখানার সামনের গাছের নিচে ফেলে দেয়। সারারাত আমরা সকল বন্দী কাঁদতে কাঁদতে পার করে। পশুরা মেশিনগান নিয়ে সব সময় আমাদের পাহারা দিচ্ছিল।

 

পরের দিন ২৮ শে মার্চ আমরা জানালা দিয়ে দেখতে পাই পশুরা থানার অস্ত্রাগার ও মালখানার সকল অস্ত্র ও মালামাল সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল ওদের মটর ট্রাকে করে। হাজতে রাখা আমাদের পুর্ববর্তী আহত বন্দীকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হয় আমরা জানতে পারি নাই।

 

২৯ শে মার্চ পর্যন্ত আমাদেরকে সারাদিন বন্দিখানায় এভাবেই দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। একফোটা পানিও দেওয়া হয় নাই কোন বন্দীকে, কোন খাদ্যও দেয়া হয় নাই।

২৯শে মার্চ বিকাল ৪ টায় তৎকালীন ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার ইমাদ আহমেদ চৌধুরী রমনা থানায় আসেন এবং আমাদেরকে তার সম্মুখে হাজির করা হয়। এমন সময় আমাদের এক বৃদ্ধ সিপাহী ক্ষুধায় এবং তৃষ্ণায় জ্ঞানহারা হয়ে মাটিতে পড়ে যান। ইমাদ আহমেদ চৌধুরী অশ্রুভরা চোখে বন্দীদের দেখছিলেন। আমার সামনে এসে আমার ক্ষতবিক্ষত দেহ দেখে তিনি আমাকে ধরে হাউ মাউ করে কেঁদে ফেললেন। পশুদের বুটের লাথি, বেয়নেটের আঘাত ও লাঠি এবং বেতের এলোপাতাড়ি আঘাতে আমার সমস্ত শরীর ক্ষতবিক্ষত হয়ে রক্ত ঝরছিল। আমাদের পুলিশ সুপার কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে আমাদেরকে বললেন যাদের নিকটবর্তী বাসা আছে তারা বাসায় চলে যান, আর যাদের কোন বাসা নাই তারা থানার সামনে দারানো ট্রাকে চড়ে মিল ব্যারাকে চলে যান।” আমি থানার বাসায় গিয়ে দেখলাম, সব লুট হয়ে গেছে, পাক পশুরা সব নিয়ে গেছে। খাওয়ার কিছুই ছিল না, না খেয়ে আহত ক্ষতবিক্ষত রক্তাক্ত দেহ নিয়ে খোদাকে আমার অত্যাচারের সাক্ষী রেখে শুন্য খাটে এলিয়ে পড়লাম। পরদিন সকালে আমি রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালের দিকে রওয়ানা হই অনেক কষ্টে। পথে দেখলাম তখনও রাজারবাগ পুলিশ লাইনে পুলিশের ব্যারাক দাউ দাউ করে জ্বলছে, জ্বলছে পুলিশের পোশাক-পরিচ্ছদ আসবাবপত্র। ব্যারাকের পিছনেই পাকা যায়গায় দেখলাম চাপ চাপ রক্ত শুকিয়ে আছে। ব্যারাকের মাঝখানে দেখতে পেলাম পায়ে বুট দেওয়া দু’টি পুলিশের লাশ তখনও জ্বলছে। পশুদের ভয়ে আর সামনে এগোতে সাহস পেলাম না। অন্য রাস্তা ধরে তাড়াতাড়ি হাসপাতালের দিকে পা’ বাড়ালাম।

স্বাক্ষর/-

মতিউর রহমান

২২-৩-১৯৭৪

 

নিয়াজ মেহেদী

<৮,২.১.৮,২৮-২৯>

\৮\

মোহাম্মদ হোসেন

পুলিশের সিপাহী

রমনা   থানা, ঢাকা

 

১৯৭১ সনের ২৫ শে মার্চ রমনা থানার একজন সাধারণ সিপাহী হিসেবে থানার সম্মুখের প্রাঙ্গণে প্রহরারত ছিলাম। রাত দশটায় আমার কর্তব্য শেষ করে আমি ব্যারাকে চলে যাই। কিছুক্ষন পরই আমি থানার চারদিকে ভীষণ হৈচৈ, দৌড়াদৌড়ি ও গোলমালের আওয়াজ শুনে থানার সামনে দাঁড়িয়ে দেখি ইট, পাথর ও গাছ দিয়ে জনতা রাস্তার উপর বেরিকেড তৈরী করছে। এ সময় আমাদের থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত পুলিশ অফিসার কাজী মহিউদ্দিন সাহেব থানার অস্ত্রাগার থেকে প্রত্যেকের প্রয়োজনমত অস্ত্র দিয়ে দেন। আমরা যার যা প্রয়োজন সে মত অস্ত্র নিয়ে পাক হানাদারদের হামলা প্রতিরোধ ও প্রতিহত করার জন্য থানার চারদিকে পজিশন নেই। আমরা সবাই সেদিন এই শপথ গ্রহন করেছিলাম যার হাতে যা আছে তা-ই দিয়ে পাক-পশুদের মোকাবিলা করব, প্রান দিব কিন্তু পিছু হটবো না। থানার চার দিকে আমরা সকল পুলিশ সিপাহী ও পুলিশের সকল অফিসার সশস্ত্রভাবে পাক-পশুদের জন্য অপেক্ষা করতে থাকি। অল্পক্ষন পরে পাক পশুরা চারদিক থেকে বৃষ্টির মত গুলি বর্ষণ করতে করতে থানায় প্রবেশ করার চেষ্টা করে। আমাদের হাতে সামান্য রাইফেল দিয়ে ওদের প্রানপন প্রতিরোধ করতে থাকি। এভাবে পাক-পশুদের অজস্র গুলিবর্ষণের মুখে আমরা সারারাত ওদের প্রতিরোধ করেছি কিন্তু আত্ম-সমর্পণ করি নাই। আর প্রতিরোধ করার সময় সহস্র গুলিবর্ষণের মুখেও আমাদের কোন সিপাহী বা অফিসার আত্মসমর্পণ করার জন্য কোন দুর্বলতা প্রকাশ করেন নাই। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আমরা এই দৃঢ়তা দেখিয়েছি, “প্রানপন পশুদের প্রতিহত করবো, কিন্তু পিছু হটব না।”

 

অতি প্রত্যুষে পশুরা থানার পিছনে যেখানে দাঁড়িয়ে আমরা ওদের প্রতিহত করছিলাম সেখানে প্রতিটি ঘরে ঘরে ব্যাপক তল্লাশী আরম্ভ করে দেয় এবং প্রত্যেক ঘর থেকে আমাদের থানার সশস্ত্র সিপাহীদের বন্দী করে গরুর মত এলোপাতাড়ি পিটাতে পিটাতে থানার পিছনের পুলিশ ব্যারাকে সামনে এনে জড়ো করে বন্দীদের অবিরামভাবে পিটাতে থাকে। ওরা আমাদেরকে উন্মত্তভাবে পিটাচ্ছিল আর বলছিল, “শালা মালাউনকা বাচ্চা, হিন্দুকা লাড়কা, শোয়ারকা বাচ্চা শালা তোমহারা মুজিব বাবা আভি কাহা হায়, শালা হারামী, আভি শালা জয় বাংলা বোলতা না-ই।” ওদের এলোপাতাড়ি পিটুনিতে আমাদের সিপাহীরা অনেকে জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে পড়ে যান, অনেকের মুখমন্ডল রক্তাক্ত ছিল, কারো হাত-পা একেবারে ভেঙ্গে গিয়েছিল, আমাদের অধিকাংশ বন্দীর শরীরে কোন কাপড় ছিল না। ওদের নির্মম মারের চোটে কখন যে পরণের বস্ত্র কোথায় পড়ে গিয়েছিল বলতে পারবো না কেউ। আমাদের সকলকে আবার পিটাতে পিটাতে বুটের লাথি মারতে মারতে আমাদের থানার সি, আই, সাহেবের কামরায় জুড়ে বসা পাঞ্জাবী ক্যাপ্টেনের সামনে আমাদের প্রায় উলঙ্গ দাঁড় করানো হয়। ক্যাপ্টেন তখন কর্কশ কন্ঠে চিৎকার করে বলছিল, “সব শালাকো এক গুলিতে খতম কার দেও”।

 

এমন সময় জনৈক পাঞ্জাবী মেজর সেখানে উপস্থিত হতে জানান যে, “জি. ও. সি সাহেব বোলা হায় ইন লোগকে রাখ দাও, গোলি মাত করো, বাদমে দেখা যায়েগা।” আমাদেরকে তখন গুলি করা হয় না, বুটের লাথি মারতে মারতে আমাদেরকে থানার সামনে দশ ফুট চওড়া ও আট ফুট লম্বা একটি ছোট কামরায় গরু ছাগলের মত গাদাগাদি করে এনে রাখা হয়। এ ছোট কামরায় আমরা পুলিশ ও পুলিশের উচ্চ পদস্থ অফিসার সহ মোট ৪৭ জন ছিলাম। আমাদের কামরার চারদিকে পশুরা মেশিনগান নিয়ে প্রহরায় মোতায়েন ছিল সবসময়। বেদম পিটুনি খাওয়ার পর বন্দীরা সবাই কান্নাকাটি করছিল, আমাদের সি, আই মোয়াজ্জেম হোসেন খান, অপমানে এবং বেদমভাবে নির্যাতিত হওয়ায় হাউমাউ করে কাঁদছিলেন। তার দুই ছেলেও নির্মমভাবে অত্যাচারিত হয়ে রক্তাক্ত আহত শরীর নিয়ে উলঙ্গভাবে দাঁড়িয়েছিল। আমরা থানার সেই ছোট কামরায় গাদাগাদি করে দাঁড়িয়ে থেকে সব সময় ভীতসন্ত্রস্তভাবে মৃত্যুর প্রহর গুনেছি।

 

এভাবে ২৭শে, ২৮শে ও ২৯শে মার্চ চলে যায়। আমাদেরকে তৃষ্ণা মিটানোর জন্য এক ফোটা পানি দেওয়া হয় নাই, আর কোন খাদ্যও দেয়া হয় নাই।

 

আর ২৯শে মার্চ বিকালে তৎকালীন জেলা পুলিশ সুপার ই, এ চৌধুরী সাহেব রমনা থানায় এসে আমাদের নাম তালিকাভুক্ত করলেন এবং আমাদের জন্য কিছু টাকা দিলেন নিজ পকেট থেকে। কিন্তু তখন বাহিরে কার্ফু থাকায় আমরা বেরুতে পারি নাই।

 

পরের দিন ৩০শে মার্চ আমি আমার তেজগাঁওস্থিত বাড়িতে চলে যাই। এরপর আমি বাংলার মুক্তি সংগ্রামকে সাহায্য করার একমাত্র আকাঙ্খায় এবং আমার পরিবারের নিরাপত্তা ও অস্তিত্ত্ব রক্ষার উদ্দেশ্যে আমি পুনরায় থানায় যোগদান করি। আমাদের থানা তখন বিহারী রাজাকার ও পাকসেনাদের দখলে ছিল। ওরাই থানার সর্বময় প্রভু ছিল। আমাদের হাতে কোন রাইফেল দেয়াও হতো না, শুধু লাঠি দেয়া হতো মাত্র। আমরা দেখেছি, প্রতিদিন অসংখ্য বাঙ্গালী যুবক, বৃদ্ধকে, অসহায় মানুষকে মুক্তিবাহিনীর মিথ্যা অজুহাতে ধরে থানায় আনা হতো, প্রতিদিন বিহারীরা এই নিরীহ বন্দীদের উপর অত্যাচার চালাতো। অনেক বন্দীকে সেনানিবাসে নিয়ে যাওয়া হতো। যে সকল বন্দীকে থানা থেকে নিয়ে যাওয়া হতো তাদের অধিকাংশই ফিরে আসতো না। ওদেরকে মেয়ে ফেলা হতো। পাক সেনা বিহারি ও বেইমান বাঙ্গালী রাজাকাররা এভাবে ১৯৭১ সনের নভেম্বর মাস পর্যন্ত অত্যাচার চালাতে থাকে। ডিসেম্বরে মুক্তি বাহিনী ও মিত্র শক্তির সম্মিলিত আগমনের মুখে পাক পশুরা রাজারবাগের দিকে পালিয়ে যায়।

 

আমরা এ থানায় কর্তব্যরত থাকাকালে মুক্তি বাহিনীকে নিয়মিত সংবাদ দিয়েছি, বন্দীদের সাহায্য করেছি- এ ভাবে আমরা বাংলার মুক্তি সংগ্রামকে মনে-প্রানে কার্যকলাপে সবদিক দিয়ে সর্বতোভাবে যথাসাধ্য সাহায্য করেছি।

স্বাক্ষর/-

মোহাম্মদ হোসেন

২১-১-৭৪

 

গুরু গোলাপ

<৮,২.১.৯,৩০-৩২> “কোন হিন্দুর লাশ আমি রাস্তায় পাই নাই। সবকটি লাশ মুসলমানের ছিল।“

মোঃ সাহেব আলী
সুইপার ইন্সপেক্টর
ঢাকা পৌরসভা,ঢাকা।

আমি ১৯৭১ সন থেকে ঢাকা পৌরসভার অধীনে সুইপার ইন্সপেক্টার হিসেবে দায়িত্ব পালন করি। ১৯৭১ সনের ২৫শে মার্চ আমি আমার সুইপারের দল নিয়ে দায়িত্ব পালন করে সন্ধ্যায় ৪৫/১, প্রসন্ন পোদ্দার লেনস্থিত আমার দ্বিতীয় স্ত্রীর বাড়িতে অবস্থান করছিলাম। রাত নয়টার দিকে আমি ঢাকা ইংলিশ রোডের দিকে বের হয়ে দেখলাম রাস্তাঘাট চারিদিকে থমথমে, সকল প্রকার যানবাহন দ্রুত গন্তবস্থলের দিকে যেতে দেখলাম। ছাত্র জনতাকে রাস্তায় বেরিকেড তৈরী করতে দেখলাম। প্রতিরোধ তৈরীতে ব্যস্ত ছাত্র জনতার নিকট জানতে পারলাম ঢাকা সেনানিবাস থেকে পাক সেনারা রাজধানী ঢাকার দিকে সামরিক ট্রাক নিয়ে এগিয়ে আসছে। পাক পশুদের প্রতিরোধ করার জন্য ছাত্র জনতার এই প্রচেষ্টা ও প্রয়াস। আমি সবকিছু দেখে অত্যন্ত ভারাক্রান্ত মনে বাসায় চলে গেলাম। রাত সাড়ে

এগারটার দিকে রাজারবাগ পুলিশ লাইন, পুলিশ হেডকোয়ার্টার, পুলিশ অফিস ও মালিবাগ, গোয়েন্দা অফিসের দিকে আকাশ ফাটা গোলাগুলির শব্দ শোনার সময় ঢাকা শাঁখারী বাজার প্রবেশ পথে বাবু বাজার ফাঁড়িতে ভীষণ শেলিংয়ের গর্জ্জন শুনলাম। আমি নিকটবর্তী নয়াবাজার সুইপার কলোনীর দোতলায় দাঁড়িয়ে চতুর্দিকে গোলাগুলির ভীষণ গর্জ্জন শুনলাম।

২৬শে মার্চ অতি প্রত্যুষে আমি সুইপার কলোনীর দোতলা থেকে দৌঁড়ে নেমে বাবুবাজার ফাঁড়িতে গিয়ে দেখলাম ফাঁড়ির প্রবেশ পথ, ভেতরে, চেয়ারে বসে, উপুড় হয়ে পড়ে থাকা দশ জন পুলিশের ইউনিফরম পরা গুলির আঘাতে ঝাঁজরা ক্ষতবিক্ষত রক্তাক্ত লাশ পড়ে আছে। আমি ফাঁড়ির ভেতরে প্রবেশ করে দেখলাম ফাঁড়ির চারিদিকের দেয়াল হাজারো গুলির আঘাতে ঝাঁজড়া হয়ে আছে। দেয়ালের চারিদিকে মেঝেতে চাপ চাপ রক্ত, তাজা রক্ত জমাট হয়ে আছে, দেখলাম কেউ জীভ বের করে পড়ে আছে, কেউ হাত পা টানা দিয়ে আছে, প্রতিটি লাশের পবিত্র দেহে অসংখ্য গুলির আঘাত। মানবতার অবমাননা ও লাঞ্চনার বীভৎস দৃশ্য দেখে আমি একটি ঠেলগাড়ীতে করে সকল লাশ ঢাকা মিটফোর্ড হাসপাতালে লাশ ঘরে রেখে আবার ঠেলাগাড়ী নিয়ে শাঁখারীবাজারে প্রবেশ করে একবারে পূর্বদিকে ঢাকা জজকোর্টের কোণে হোটেলের সংলগ্ন রাস্তায় দশটি ফকির মিসকিন ও রিকশা মেরামতকারী মিস্ত্রীর উলঙ্গ ও অর্ধ উলঙ্গ লাশ উঠালাম। কোন হিন্দুর লাশ আমি রাস্তায় পাই নাই। সবকটি লাশ মুসলমানের ছিল। রাস্তায় পড়ে থাকা গুলিতে ঝাঁঝরা দশটি লাশ ঠেলাগাড়ীতে তুলে আমি মিটফোর্ড নিয়ে গিয়েছি। মুসলমানের লাশ এভাবে রাস্তায় পড়ে থাকতে দেওয়া যায় না। তাই আমরা স্থানীয় জনতা সবাই মিলে লাশ গুলি তুলে মিটফোর্ডে জমা করেছি। রাজধানী ঢাকার সর্বত্র কার্ফূ থাকা সত্ত্বেও গণহত্যার সেই বীভৎস দৃশ্য দেখার জন্য ছাত্র জনতা রাস্তায় রাস্তায় বের হয়ে পড়লে পাক সেনারা ঘোষনা করে কার্ফূ বলবৎ রয়েছে, কেউ রাস্তায় বের হলে গুলি করা হবে। পাক সেনাদের এই ঘোষনার পর আমরা সরে পড়লাম। দিনের শেষে বেলা পাঁচটার সময় তাঁতিবাজার, শাঁখারীবাজার, এবং কোর্ট হাউজ স্ট্রীট এলাকায় পাক সেনারা আগুন ধরিয়ে দেয়। সাথে সাথে চলতে থাকে অবিরাম গুলি বর্ষণ। সারারাত পাক সেনারা তাঁতিবাজার, শাঁখারীবাজার ও গোয়াল নগর এলাকায় অবিরাম গুলি বর্ষণ করতে থাকে।

 

১৯৭১ সনের ২৭শে মার্চ বেলা একটার সময় পাক সেনারা নওয়াবপুর থেকে ইংলিশ রোডের বাণিজ্য এলাকার রাস্তায় দুদিকের সকল দোকানপাটে আগুন ধরিয়ে দেয়। বেলা তিনটা পর্যন্ত ইংলিশ রোডের রাস্তায় দুদিকে আগুন জ্বলতে থাকে। আগুনের সেই লেলিহান শিখায় পার্শ্ববর্তী এলাকার জনতা আশ্রয়ের জন্য পালাতে থাকে। পালাতে গিয়ে পাক সেনাদের গুলিতে অনেকে প্রাণ হারায় । বেলা তিনটায় পাক সেনারা তাঁতিবাজারের বাহির পথ ও মালিবাগের পুলের পশ্চিম পার্শ্বে হিন্দু মন্দিরের উপর শেলিং করে মন্দিরটি ধ্বংস করে দেয়। ইংলিশ রোদের আগুন বাসাবো এলাকাকে অতিক্রম করে সুইপার কলোনীর দিকে ধেয়ে আসতে থাকলে আমি সুইপারদের কলোনীর পানি রিজার্ব করে রাখার নির্দেশ দেই। পাক সেনাদের ডিঙ্গিয়ে সকল সুইপার মিলে সুইপার কলোনীটি রক্ষা করার জন্য অগ্রসর হলে আমরা পাক সেনাদের গুলির মুখে চলে আসি।

 

১৯৭১ সনের ২৮শে মার্চ সকালে রেডিও মারফত সকল সরকারী ও বেসরকারী কর্মচারীকে অবিলম্বে কাজে যোগদান করতে হবে এ নির্দেশ পেয়ে পরদিন আমি সকাল ১০টার সময় ঢাকা পৌরসভায় ডিউটি রিপোর্ট করলে ঢাকা পৌরসভার তৎকালীন কন্সারভেন্সী অফিসার মিঃ ইদ্রিস আমাকে ডোম নিয়ে অবিলম্বে ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় পড়ে থাকা লাশ তুলে ফেলতে বলেন। ইদ্রিস সাহেব অত্যন্ত ক্রুদ্ধভাবে বলতে থাকেন সাহেব আলী বের হয়ে পড়, যদি বাঁচতে চাও তবে ঢাকার রাজপথ ও বিভিন্ন এলাকা থেকে লাশ তোলার জন্য বের হয়ে পড়। কী বাঁচবেনা, কাউকে রাখা হবে না, সবাইকে পাক সেনাদের গুলি বর্ষণে মরতে হবে, সবাইকে কুকুরের মত হত্যা করা হবে। পৌরসভার তৎকালীন চেয়ারম্যান মেজর সালামত আলী খান শুর আমাদের সাথে কুকুরের মত উত্তেজিত হয়ে, অত্যন্ত কর্কশ স্বরে ক্রুদ্ধভাবে বকাবকি করতে থাকেন। সেখানে আমি, সুইপার ইন্সপেক্টর আলাউদ্দিন, সুইপার ইন্সপেক্টর কালীচরণ, সুইপার সুপারভাইজার পাঞ্চাম, সুইপার ইন্সপেক্টর আওলাদ হোসেন আমরা পাঁচজন উপস্থিত ছিলাম। আমাকে পরদেশী ডোম, লেমু ডোম, ডোম গোলাপ চান, দুঘিলা ও মধু ডোমকে নিয়ে মিটফোর্ড হাসপাতাল থেকে লাশ তুলে স্বামীবাগ আউটকলে ফেলতে বলা হয়।

 

১৯৭১ সনের ২৯শে মার্চ আমার দল ঢাকা মিটফোর্ড হাসপাতালের লাশ ঘর থেকে দুই ট্রাক লাশ তুলেছে। আমার দল যে সকল লাশ তুলেছে আমি স্বচক্ষে তা দেখেছি। অধিকাংশই ছিল সরকারী কর্মচারী, পুলিশ, আনসার ও পাওয়ারম্যানদের খাকী পোষাক পরা বিকৃত লাশ। লাশ তুলতে তুলতে পরদেশী নামক জনৈক ডোমের হাতে এক ষোড়শী রুপসীর উলঙ্গ ক্ষতবিক্ষত লাশ দেখলাম, দেখলাম সেই যুবতীর পবিত্র দেহে অসংখ্য ক্ষত চিহ্ন, তার বুক থেকে স্তন সজোরে তুলে নেওয়া হয়েছে, লজ্জাস্থান ক্ষতবিক্ষত হয়ে আছে, পিছনের মাংস তুলে নেয়া হয়েছে। হরিণের মত মায়াভরা মধুময় বড় বড় চোখ ঘুমিয়ে আছে, সারা দেহে সৃষ্টিকর্তা যেন দুধের সর দিয়ে আবৃত করে দিয়েছে, মাথায় কালো কালো চুল তার কোমর পর্যন্ত লম্বা হয়ে পড়ে ছিল, তার দুই গালে আঘাতের চিহ্ন দেখলাম। পরক্ষণেই দেখলাম দশ বছরের এক কিশোরীর উলঙ্গ ক্ষতবিক্ষত লাশ। অপরুপা রুপসী ফলের মত টক টকে চেহারা, সারা দেহে বুলেটের আঘাত।

 

১৯৭১ সনের ৩০শে মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হল থেকে ভারপ্রাপ্ত পাক সেনাদের মেজর পৌরসভায় টেলিফোনে সংবাদ দেন রোকেয়া হলের চারিদিকে মানুষের লাশের পচা গন্ধে বসা যাচ্ছে না, অবিলম্বে ডোম পাঠিয়ে লাশ তুলে ফেলা হোক। আমি ছয়জন ডোম নিয়ে রোকেয়া হলে প্রবেশ করে রোকেয়া হলের সমস্ত কক্ষে তন্ন তন্ন করে খুঁজে কোন লাশ না পেয়ে চারতলা চাদের উপর গিয়ে আঠার বছরের জনৈক রুপসী ছাত্রীর উলঙ্গ লাশ দেখতে পেলাম। আমার সাথে দায়িত্বরত জনৈক পাক সেনাকে জিজ্ঞাসা করলাম এ ছাত্রীর দেহে গুলির কোন আঘাত নাই, দেহের কোন স্থানে কোন ক্ষত চিহ্ন নাই অথচ মরে চিৎ হয়ে পড়ে আছে কেন? সে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে বলল আমরা সকল পাক সেনা মিলে ওকে ধর্ষণ করতে করতে মেরেছি। পচা-ফুলা সেই রুপসীর উলঙ্গ দেহ পড়ে আছে দেখলাম। ডাগর ডাগর চোখ ফুলে বের হয়ে আছে, মাথার চুল নিকটেই ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে, লজ্জাস্থান তার পেট থেকে ফুলে অনেক উপরে উঠে আছে, যোনিপথ রক্তাক্ত। তার দুইদিকে গালে পশুদের কামড়ের চিহ্ন দেখলাম, বক্ষের স্তনে মানুষের দাঁতের দংশনের চিহ্ন দেখলাম। আমি একটি চাদর দিয়ে লাশটি ঢেকে দিয়ে নামিয়ে নিয়ে আসি, রোকেয়া হলের সার্ভেন্ট কোয়ার্টারের ভেতরে প্রবেশ করে পাঁচ জন মালিদের স্ত্রী পরিজনদের পাঁচটি লাশ এবং আটটা পুরুষের লাশ (মালি) পেয়েছি। লাশ দেখে মনে হল মৃত্যুর পূর্বক্ষণে সবাই শুয়ে ছিল। আমি ট্রাক নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিববাড়ীর তেতলা থেকে জনৈক হিন্দু অধ্যাপক, তার স্ত্রী ও দুই ছেলের লাশ তুলেছি। স্থানীয় জনতার মুখে জানতে পারলাম তাঁর দুই মেয়ে বুলেটবিদ্ধ হয়ে হাসপাতালে আছেন। সংগৃহীত লাশ স্বামীবাগ আউটকলে ফেলে দিয়ে আমরা ট্রাক নিয়ে ঢাকা বুড়ীগঙ্গা নদীতে ভাসমান হাত-পা, চোখ বাঁধা অসংখ্য যুবকের লাশ তুলেছি। আমরা ৩০শে মার্চ ঢাকা বুড়ীগঙ্গা নদী থেকে তিন ট্রাক লাশ তুলে স্বামীবাগে ফেলেছি। পাক সেনারা কুলি দিয়ে পূর্বেই সেখানে বিরাট বিরাট গর্ত করে রেখেছিল।

 

পরের দিন মোহাম্মদপুর এলাকার জয়েন্ট কলোণির নিকট থেকে সাতটি পচা-ফুলা লাশ তুলেছি। ইকবাল হলে আমরা কোন লাশ পাই নাই। পাক সেনারা পূর্বেই ইকবাল হলের লাশ পেট্রোল দিয়ে জ্বালিয়ে ভস্ম করে দেয়। বস্তি এলাকা থেকে জগন্নাথ হলে আশ্রয়ের জন্য ছুটে আসা দশ জন নর-নারীর ক্ষতবিক্ষত লাশ তুলেছি। ফেরার পথে আমরা ঢাকা হলের ভেতর থেকে চার জন ছাত্রের উলঙ্গ লাশ তুলেছি।

 

১৯৭১ সনের ১লা এপ্রিল আমরা কচুক্ষেত, ড্রাম ফ্যাক্টরী, তেজগাঁও, ইন্দিরা রোড, দ্বিতীয় রাজধানী এলাকাস্থ ঢাকা বিমান বন্দরের অভ্যন্তরে, ঢাকা স্টেডিয়ামের পূর্ব দক্ষিণ দিক থেকে কয়েকজন ছাত্রের পচা লাশ তুলেছি। এরপর থেকে প্রতিদিন আমরা বুড়ীগঙ্গা নদীর পাড় থেকে হাত-পা, চোখ বাঁধা অসংখ্য যুবকের লাশ তুলেছি। রায়ের বাজার ইটখোলায় আমরা কয়েক হাজার বাঙ্গালী যুবকের লাশ তুলেছি। মিরপুর এক নম্বর সেকশনের রাস্তার পার্শ্বে ছড়ানো, ছিটানো বাঙ্গালী যুবকের লাশ তুলেছি। মোহাম্মদপুর ফিজিক্যাল কলেজের হল থেকে দশ জন ছাত্রের ক্ষতবিক্ষত লাশ তুলেছি। রায়ের বাজার রাস্তা, পিলখানা, গণকটুলি, ধানমণ্ডি, কলাবাগান, কাঁঠাল বাগান, এয়ারপোর্ট রোডের পার্শ্ববর্তী এলাকা, তেজগাঁও মাদ্রাসা থেকে অসংখ্য মানুষের পচা-ফুলা লাশ তুলেছি। অনেক লাশের হাত-পা পেয়েছি মাথা পাই নাই। মেয়েদের লাশ সবই উলঙ্গ ও ক্ষতবিক্ষত পেয়েছি।

 

কিছুদিন পর আমি কর্তৃপক্ষের নির্দেশ মত কারখানায় গিয়ে সাধনা ঔষধালয়ের মালিক প্রফেসর যোগেশচন্দ্র বাবুর বেয়নেটের আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত রক্তাক্ত তাজা লাশ তুলে স্বামীবাগ ফেলেছি। পাক পশুরা যোগেশ বাবুর সর্বস্ব লুণ্ঠন করে তাকে তার নিজস্ব কামরায় বক্ষে বেয়নেট ঢুকিয়ে দিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে রেখে যায়। পরে তার পবিত্র ক্ষত-বিক্ষত লাশ নিচে নামিয়ে এনে খাটের উপর রেখে দিয়েছিল। আমরা গিয়ে দেখলাম প্রফেসর যোগেশ বাবুর লাশ জীভ বের করে হা করে আছে। গায়ে ছিল ধুতি আর গেঞ্জি।
স্বাক্ষর- মোঃ সাহেব আলী।
১৯-০৫ ৭৪

গুরু গোলাপ

<৮,২.১.১০,৩৩>

মোঃ সাহেহুজ্জামান
সাব ইন্সপেক্টর অব পুলিশ
রমনা থানা, ঢাকা।
১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ সন্ধ্যায় আমি এক প্লাটুন ফোর্সসহ মিরপুর এক নম্বর সেকশনে টহলে ছিলাম। সন্ধ্যার পর পরই আমি মিরপুরের সর্বত্র থমথমে ভাব লক্ষ করেছি। রাত আনুমানিক সাড়ে দশটার সময় আমার ওয়্যারলেস সেটটি অকস্মাৎ সক্রিয় হয়ে উঠে। ওয়্যারলেস সেটে এক বাঙ্গালী পুলিশ কণ্ঠ অজানা ষ্টেশন থেকে বলছিল, “ঢাকা সেনানিবাস থেকে ট্যাঙ্ক ও কামানবাহী সশস্ত্র পাক সেনাদের ট্রাক সারিবদ্ধভাবে রাজধানীতে সদর্পে প্রবেশ করছে, বাঙ্গালী পুলিশ তোমরা সাবধান হও।” ইহার পর আমার ওয়্যারলেস সেটের মারফত ঢাকা পুলিশ কন্ট্রোল রুম থেকে মেসেজ দেয়া হয়, “পুলিশ ডিউটি উইথড্রন।” ওয়্যারলেস মারফত এসব মেসেজ আসার পরপরই আমি ঢাকা রাজধানীর আকাশে সর্বত্র আগুনের ফুলকি উঠতে দেখলাম। অকস্মাৎ রাজারবাগ পুলিশ লাইন, ইকবাল হল, ই,পি,আর হেডকোয়ার্টারে ভীষণ কামান ও ট্যাঙ্ক হামলার আকাশফাটা শব্দ শুনতে পাই। এ পরিস্থিতিতে আমি আমার টহলরত পুলিশ ফোর্সকে মিরপুরের পশ্চিম দিকে গ্রামের দিকে চলে গিয়ে প্রাণপণ প্রতিরোধ করার নির্দেশ দিয়ে আমি আমার রাইফেল ও গুলি নিয়ে থানার বাসায় চলে যাই। থানায় ফিরে আমি তৎকালীন মিরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত অফিসার মিঃ আবুল হাসেম ও অন্যান্য সাব ইন্সপেক্টর, এ,এস,আই ও বাঙ্গালী পুলিশদের আমিন অত্যান্ত বিমর্ষ অবস্থায় দেখতে পাই। থানায় বসে আমরা ওয়্যারলেসে বাঙ্গালী কন্ঠের বহু বীভৎস আর্তনাদ শুনতে পাই।

 

রাত সাড়ে চারটার দিকে পাক পশুরা পুলিশ কন্ট্রোল রুম দখল করে সেখানকার ওয়্যারলেসে বাইরে টহলে নিযুক্ত বাঙ্গালী পুলিশদের কর্কশ কণ্ঠে বলছিল “ বাঙ্গালী শালালোগ আভী আ-কার দেখো, তোমারা কেতনা মা বাহেন হামারা পাস হ্যায়…”। এ কথা শুনে বাঙ্গালী পুলিশদের গা শিউরে উঠে। আমি তৎক্ষণাৎ ওয়্যারলেস সেট বন্ধ করে দেই। সকাল হওয়ার পূর্বেই আমি থানা ও থানার বাসা ছেড়ে দিয়ে মিরপুরে অন্য এক বাসায় আত্মগোপন করে থাকি।

 

সকালে আমি দেখলাম বাঙালি ই,পি, আরদের মিরপুর ই,পি,আর ক্যাম্প থেকে বন্দী করে আমাদের থানার সম্মুখে এনে পাক-পশুরা নিরস্ত্র করে থানা বন্দী করছে। আমি আরো দেখলাম মিরপুরের সকল বাঙ্গালী বাড়ীতে বিহারীরা কপালে সাদা কাপড় বেঁধে দানবের মত উল্লাসে ফেটেপড়ে আগুন লাগাচ্ছে, লুটপাট করছে। বাড়ী বাড়ী থেকে বাঙ্গালী শিশু, যুবতী, বৃদ্ধাদের টেনে এনে রাস্তায় ফেলে ছোরা দিয়ে জবাই করছে, বাঙালী রমণীদের ধরে এনে রাস্তায় উলঙ্গ করে ফেলে উপর্যুপরি ধর্ষণ করে তৎক্ষণাৎ ধারালো ছুরি দিয়ে স্তন ও পাছার মাংস ছলাৎ করে কেটে ফেলে নৃশংসভাবে হত্যা করছে। কাউকে কুচি কুচি করে কেটে ফেলছে, কারো যোনীতে লোহার রড ঢুকিয়ে দিচ্ছে, কারো গায়ে আগুন লাগিয়ে দিয়ে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ছে। ভীত সন্ত্রস্থ হাজারো মানুষ তখন প্রাণভয়ে গ্রামের দিকে পালিয়ে যাচ্ছিল। যে সকল নিরীহ মানুষ পালাতে পারছিলো না, তাদেরকে বিহারীরা নির্মমভাবে জবাই করেছিল। পাক সেনারা এ ব্যাপক বাঙ্গালী হত্যায় বিহারীদের পিছনে থেকে সাহায্য করছিল।

 

২৭শে মার্চ কিছুক্ষণের জন্য কার্ফূ তুলে নিলে আমি আমার পরিবার পরিজন নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে মিরপুরের বাইরে যাত্রা করি। মিরপুর গরুর হাট অতিক্রম করার সময় আমি দেখলাম পাক সেনাদের টহল ভেদ করে একটি ট্রাকে মহিলা ও শিশু মিরপুর ব্রীজের দিকে যাচ্ছিল- পাক সেনারা ঐ ট্রাকে আগুন ধরিয়ে দেয়। আর দুটি যুবতী মেয়েকে তাদের জীপে উঠিয়ে নিয়ে যায়। মেয়ে দুটি পাক পশুদের হাতে পড়ে প্রাণফাটা আর্তনাদ করছিল। আমরা দূর থেকে গরুর হাট বরাবর বোরো ধানের ক্ষেতে আশ্রয় নিয়েছিলাম। বহু দুর্দশা ও লাঞ্চনা ভোগ করে আমি আট দিন পায়ে হেঁটে ও নৌকা যোগে দেশের বাড়ীতে পৌছি।
স্বাক্ষর/-
মোঃ সালেহুজ্জামান
৭/২/৭৪

গুরু গোলাপ

<৮,২.১.১১,৩৪>

রঞ্জিত (লাল বাহাদুর) ডোম
সুইপার কলোনী,

নারিন্দা শাহ সাহেব লেন,
থানা- সুত্রাপুর, ঢাকা।
১৯৭১ সনের ২৬ শে মার্চ সকাল ১০ টার সময় ঢাকা পৌরসভার হেল্‌থ অফিসার আনোয়ার সাহেব ঢাকা পিলখানার চোদ্দটুলী সুইপার কলোনী থেকে আমাদের সুইপার ইন্সপেক্টর পাঞ্জা ডোম সবুজজী, দরবারী, মহাবীর ও মুসু ডোমকে নিয়ে আমাদের এই সুইপার কলোনীর দক্ষিণ দিকের প্রবেশপথের সম্মুখে দাঁড়িয়ে “গণেশ, লাল, বদনেস, রণজিৎ, কানাই” বলে চিৎকার করে ডাকতে থাকলে আমরা সবাই যার যার ঘর থেকে বের হয়ে দেখতে পেলাম ঢাকা পৌরসভার একটি জীপে ঢাকা মিউনিসিপ্যালিটির তৎকালীন চেয়ারম্যান মিঃ সালামত আলী খান শুর, প্রশাসনিক অধিকর্তা মিঃ ইদ্রিস চিৎকার বলছেন, ঢাকার রাজপথে, বিভিন্ন জায়গায় বহু লাশ পড়ে আছে, তোমরা বের হয়ে আস, সে সব লাশ অবিলম্বে তুলে ধলপুর ময়লার ডিপোতে ফেলে দাও।

 

আমি, পরদেশি, গণেশ, চুন্নু আমরা সবাই মিটফোর্ড লাশ ঘর থেকে ২৮শে মার্চ সকালে দু’ট্রাক লাশ তুলে ধলপুর ময়লার ডিপোতে ফেলেছি। অধিকাংশ লাশ পচে, ফুলে বিকৃত ও বীভৎস হয়ে গিয়েছিল।

 

২৯শে মার্চ আমরা প্রথম মিটফোর্ড হাসপাতাল থেকে দু’ট্রাক লাশ তুলেছি। এরপর আমাদের দুই দিনের ছুটি দেয়া হয়।

 

তিনদিন পর আমরা রমনা কালীবাড়ী থেকে পাঁচটি পচা লাশ তুলে ট্রাকে কার্জন হলের দিকে অগ্রসর হতে থাকলে পাক সেনারা আমাদের ট্রাক আটক করে আমাদের ট্রাক ড্রাইভার চান মিয়া ও সুইপার ইন্সপেক্টর পঞ্চমকে ধরে মারধোর করে। সুপারভাইজারকে চপেটাঘাত করে রাস্তায় ফেলে দিয়ে কুকুরের মত চিৎকার করে বলতে থাকে “লাশ খোলা কিউ লে যাতা হ্যায়, শুয়োর কা বাচ্ছা, বাহেনচোত, শালা হারামী, শালা তেরপল লাগা লো”। পরের দিন আমি, ছাখিল, পরদেশি, চুন্নু সবাই মিলে শাঁখারী বাজারে কোর্টের প্রবেশ পথে অগ্রসর হতে চাইলে আমাদের সেখানে জ্বলন্ত আগুনের অদুরে প্রহরারত পাক সেনারা বাবুবাজার ফাঁড়ি দিয়ে শাঁখারী বাজার প্রবেশ করতে বলে কর্কশভাবে। এ সময়ে আমরা দেখলাম সারা শাঁখারীবাজারে লেলিহান আগুনের শিখা জ্বলছে, সারা শাঁখারীবাজার জ্বলছে, জ্বলছে দালানকোঠা, ঘরবাড়ী, মুল্যবান আসবাবপত্র জ্বলছে। আমরা ট্রাক নিয়ে মন্দিরের ভেতর দুজন যুবকের পচাগলা লাশ তুলেছি। লাশ পচে পোক হয়ে গিয়েছিল। গলিত লাশ দেখে আমরা ভীত হয়ে পড়েছিলাম। কোন লোকজন ছিলনা, চারিদিক নিরব নিস্তব্ধ, শ্মশানের হাহাকার দেখলাম। প্রতিটি ঘর থেকে আমরা শিশু-কিশোর, বৃদ্ধা-যুবা, যুবক-যুবতীর পচা ও গলিত লাশ তুলেছি। আমাদের সাথে আরো দুই দল ডোম ঢাকা পৌরসভার দু’টি ট্রাকে লাশ তুলে ধলপুর ময়লার ডিপোতে ফেলেছে। এরপর আমরা সদরঘাট বুড়ীগঙ্গা পাড়, শ্যামবাজার ঘাট, বাদামতলী ঘাট থেকে লাশ তুলেছি। আমরা নদীর ঘাট থেকে যে সকল পচা, ফুলা, গলিত লাশ তুলেছি তার অধিকাংশ ছিল চোখ ও হাত-পা বাঁধা যুবকের লাশ। এরপর লাল কুঠীর ভেতর থেকে লুঙ্গী পরা দু’জন যুবকের পচা ও গলিত লাশ পেয়েছি, বাংলাবাজার, প্যারীদাস রোডের কয়েকটি বাড়ী থেকে আমরা লাশ তুলেছি। এরপর আমরা বনগ্রাম এলাকার রাস্তা থেকে কয়েকটি পচা লাশ তুলেছি। কমলাপুর থেকে আমরা ট্রেন যাত্রীদের লাশ তুলেছি, আমরা মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা থেকে শ্রমিকদের বহু লাশ তুলেছি।

টিপসহি/-
রঞ্জিত
৮-৫-৭৪

গুরু গোলাপ

<৮,২.১.১২,৩৫>
বদলু ডোম
ওয়ারী সুইপার কলোনী,
ঢাকা।
আমি ১৯৭১ সনের ২৮শে মার্চ আমাদের সুইপার সুপারভাইজার পঞ্চমের দলে মিটফোর্ড হাসপাতালের লাশ ঘর থেকে লাশ তুলেছি। কয়েকদিন পরে আমি সুপারভাইজার সাহেব আলীর দলে মিলব্যারাক পুলিশ লাইনের নদীর পাড় থেকে পনের জন যুবক, একজন সাধু ও বৃদ্ধার ক্ষতবিক্ষত, ফুলা, পচা লাশ তুলেছি। প্রতিটি লাশ চোখ ও হাত-পা বাঁধা ছিল। এরপর আমরা বাবুবাজার পুলের উপর থেকে এক অন্ধ ফকিরের লাশ তুলেছি। সদরঘাট, শ্যামবাজার, ওয়াজঘাট, বাদামতলী এলাকায় আমরা নদীর পাড় ও পানি থেকে বৃদ্ধা, যুবা ও শিশুর লাশ তুলেছি। কয়েকদিন পর আমরা মন্দিরের সামনে থেকে দুধওয়ালা সাধুর লাশ তুলেছি, শাঁখারীবাজার প্রবেশ করে মন্দিরের সামনের বাড়ীর ভেতর থেকে শিশু-কিশোর, বৃদ্ধা-যুবা, যুবক-যুবতীর দশটি পোকায় খাওয়া গলিত লাশ নিয়ে এসেছি।

কয়েকদিন পর রমনা কালিবাড়ী থেকে, মন্দিরের ভেতর থেকে পাঁচটি এবং কালিবাড়ীর প্রবেশ পথে দুটি চোখ ও হাত বাঁধা পচা লাশ তুলেছি। গোয়ালঘরে তিনটি গরু গুলিতে ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখলাম। এরপর পাক সেনারা আমাদের নির্মমভাবে মারপিট করায় আমরা আর লাশ তুলতে যাই নাই।
স্বাক্ষর/-
বদলু ডোম
১১-৫-৭৪

গুরু গোলাপ
<৮,২.১.১৩,৩৬-৩৭> “লাশ গলে যাওয়ায় লোহার কাঁটার সাথে গেঁথে লাশ ট্রাকে তুলেছি।“

চুন্নু ডোম,
ঢাকা পৌরসভা,
রেলওয়ে সুইপার কলোনী,
২২৩ নং ব্লক, ৩নং রেল গেট
ফুলবাড়িয়া, ঢাকা।
১৯৭১ সনের ২৮শে মার্চ আমাদের সুইপার ইন্সপেক্টর ইদ্রিস সাহেব আমাকে লাশ উঠাবার জন্য ডেকে ঢাকা মিউনিসিপ্যালিটিতে নিয়ে যান। সেখান থেকে আমাকে বদলু ডোম, রঞ্জিত লাল বাহাদুর, গণেশ ডোম ও কানাইকে একটি ট্রাকে করে প্রথমে শাঁখারীবাজারে কোর্টের প্রবেশ পথের সম্মুখে নামিয়ে দেয়। আমরা উক্ত পাঁচ জন দেখলাম ঢাকা জজ কোর্টের দক্ষিণ দিকের প্রবেশপথের যে রাজপথ শাঁখারীবাজারের দিকে চলে গেছে, সে রাস্তার দু’ধারে ড্রেনের পাশে যুবক-যুবতীর, নারী-পুরুষের, শিশু-কিশোরের বহু পচা লাশ। দেখতে পেলাম বহু লাশ পচে ফুলে বীভৎস হয়ে আছে, দেখলাম শাখারীবাজারের দুদিকের ঘরবাড়ীতে আগুন জ্বলছে, অনেক লোকের অর্ধপোড়া লাশ পড়ে থাকতে দেখলাম, দুই পার্শ্বে অদূরে সশস্ত্র পাঞ্জাবী সেন্যদের প্রহরায় মোতায়েন দেখলাম। প্রতিটি ঘরে দেখালাম মানুষ ও আসবাবপত্র জ্বলছে। একটি ঘরে প্রবেশ করে এক জন মেয়ে, এক জন শিশু সহ ১২ জন যুবকের দগ্ধ লাশ উঠিয়েছি। শাঁখারীবাজারের প্রতিটি ঘর থেকে যুবক-যুবতী, বালক-বালিকা, কিশোর-শিশু ও বৃদ্ধের লাশ তুলেছি। পাঞ্জাবীরা প্রহরায় থাকাকালে সেই সব মানুষের অসংখ্য লাশের উপর বিহারীদের উচ্ছৃঙ্খল উল্লাসে ফেটে পড়ে লুট করতে দেখলাম। প্রতিটি ঘর থেকে বিহারী জনতাকে মূল্যবান সামগ্রী, দরজা, জানালা, সোনাদান সবকিছু লুটে নিয়ে যেতে দেখলাম। লাশ উঠাতে উঠাতে এক ঘরে প্রবেশ করে এক অসহায় বৃদ্ধাকে দেখলাম- বৃদ্ধা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে “পানি পানি” বলে চিৎকার করছিল, তাকে আমি পানি দিতে পারি নাই ভয়ে, বৃদ্ধাকে দেখে আমি আরো ভীত হয়ে পালিয়ে এসেছি। আমি পানি দিতে চেয়েছিলাম, কিন্তু আমাদের পিছনে সশস্ত্র পাঞ্জাবী সেনা প্রহরায় থাকায় আমি সেই বৃদ্ধাকে পানি দিয়ে সাহায্য করতে পারি নাই।

 

আমরা ১৯৭১ সনের ২৮শে মার্চ শাঁখারিবাজার থেকে প্রতিবারে একশত লাশ উঠিয়ে তৃতীয়বার ট্রাকে বোঝাই করে তিনশত লাশ ধলপুর ময়লার ডিপোতে ফেলেছি।

 

১৯৭১ সনের ২৯শে মার্চ সকাল থেকে আমরা মিটফোর্ড হাসপাতালের লাশঘর ও প্রবেশপথের দুপার্শ্ব থেকে বিশ্ববিদ্যালয় শিববাড়ী, রমনা কালিবাড়ী, রোকেয়া হল, মুসলিম হল, ঢাকা হল থেকে লাশ উঠিয়েছি। ২৯শে মার্চ আমাদের ট্রাক প্রথম ঢাকা মিটফোর্ড হাসপাতালের প্রবেশ পথে যায়। আমরা উক্ত পাঁচজন ডোম হাসপাতালের প্রবেশপথে নেমে একটি বাঙ্গালী যুবকের পচা, ফুলা, বিকৃত লাশ দেখতে পেলাম। লাশ গলে যাওয়ায় লোহার কাঁটার সাথে গেঁথে লাশ ট্রাকে তুলেছি। আমাদের ইন্সপেক্টর আমাদের সাথে ছিলেন। এরপর আমরা লাশ ঘরে প্রবেশ করে বহু যুবক-যুবতী, বৃদ্ধ-কিশোর ও শিশুর স্তুপীকৃত লাশ দেখলাম। আমি এবং বদলু ডোম লাশ ঘর থেকে লাশের পা ধরে টেনে ট্রাকের সামনে জমা করেছি, আর গণেশ, রঞ্জিত(লাল বাহাদুর) এবং কানাই লোহার কাঁটা দিয়ে বিঁধিয়ে বিঁধিয়ে পচা, গলিত লাশ ট্রাকে তুলেছে। প্রতিটি লাশ গুলিতে ঝাঁঝরা দেখিছি, মেয়েদের লাশের কারো স্তন পাই নাই, যোনীপথ ক্ষতবিক্ষত এবং পিছনের মাংস কাটা দেখিছি। মেয়েদের লাশ দেখে মনে হয়েছে, তাদের হত্যা করার পূর্বে তাদের স্তন জোর করে ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে, যোনিপথে লোহার রড কিংবা বন্দুকের নল ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। যুবতী মেয়েদের যোনিপথের এবং পিছনের মাংস যেন ধারালো চাকু দিয়ে কেটে এসিড দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে। প্রতিটি যুবতী মেয়ের মাথায় খোঁপা খোঁপা চুল দেখলাম। মিটফোর্ড থেকে আমরা প্রতিবারে একশত লাশ নিয়ে ধলপুর ময়লার ডিপোতে ফেলেছি।

১৯৭১ সনের ৩০শে মার্চ আমাদের উক্ত পাঁচ জনের সাথে দক্ষিণা ডোমকে সাহায্য করতে দেয়া হয়। আমাদের ট্রাক সেদিন সাত মসজিদের সম্মুখ থেকে যখন বাঙ্গালী লাশ উঠাচ্ছিলাম, তখন অসংখ্য বিহারী জনতা আমাদের চারিদিকে দাঁড়িয়ে হাসছিল, বাঙ্গালীদের পরিণতি দেখে উপহাস করছিল। আমরা সাত মসজিদের সম্মুখ থেকে আটটি বাঙ্গালী যুবকের লাশ তুলেছি, কতিপয় লাশ দেখলাম উপুড় হয়ে পড়ে আছে। সবার পিঠ গুলির অসংখ্য আঘাতে ঝাঁঝরা হয়ে আছে। পচা, ফুলা লাশ তুলতে যেয়ে দেখলাম কারো লুঙ্গী পরা, কারো পায়জামা পরা। আবার কারো দেহে হাওয়াই শার্ট এবং টেট্রনের দামী শার্ট। পানি থেকে বারটি লাশ তুলেছি; প্রতিটি লাশের চোখ এবং হাত পেছনের দিকে বাঁধা ছিল। নদীর পাড় থেকে বারটি লাশ গুলির আঘাতে ঝাঁঝরা দেখেছি। লাশ দেখে মনে হল, ভদ্র ঘরের অভিজাত বাঙ্গালী যুবকের লাশ। সাত মসজিদের সকল লাশ তুলে আমরা ধলপুর ময়লা ডিপোতে ফেলেছি। ফিরে এসে ট্রাক নিয়ে আমরা মিন্টু রোডের লাশ তুলতে গিয়েছি। মিন্টু রোডের রাস্তার পাশ থেকে প্যান্ট পরা দুটি পচা, ফুলা লাশ তুলেছি, দেখলাম লাশের পাশেই ভিক্ষার ঝুলি, টিনের ডিব্বা ও লাঠি পড়ে আছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিববাড়ীর সম্মুখ থেকে দুজন রুপসী যুবতী মেয়ে এবং তিন জন যুবকের ক্ষতবিক্ষত লাশ তুলেছি। রোকেয়া হলে একটি অর্ধদগ্ধ যুবতীর লাশ তুলেছি, মুসলিম হলে প্রবেশ করে একটি পচা লাশ পেয়েছি, ঢাকা হলের ভেতর থেকে চারজন ছাত্রের লাশ তুলেছি।

 

পরের দিন ৩১ মার্চ বাসাবো খাল থেকে তিনটি পচা লাশ তুলেছি। সেদিন অসুস্থ্ থাকায় আমি আর লাশ তুলতে যেতে পারি নাই।

টিপসহি/-
চুন্নু ডোম
৭-৪-৭৪

গুরু গোলাপ

<৮,২.১.১৪,৩৮> “কচি ছেলের তুলতুলে লাশ তুলতে গিয়ে আমার হৃদয় যেন কেঁপে উঠলো, হাহাকার করে উঠলো।“
ছোটন ডোম
রেলওয়ে সুইপার কলোনী
২২৩নং ব্লক, ৩নং রেল গেট
ফুলবাড়িয়া, ঢাকা।

১৯৭১ সনের ২৮শে মার্চ সকাল ৮টায় ঢাকা পৌরসভার সুইপার সুপারভাইজার পঞ্চম আমাদের নিতে আসেন। পাক সেনারা রাজধানী ঢাকার বহু লোককে নির্বিচারে হত্যা করার ফলে বিভিন্ন এলাকায় যে সকল লাশ পচে ফুলে রাস্তায় পড়ে আছে তা তুলে ধলপুর ময়লার ডিপোতে ফেলার জন্য রেলওয়ে কলোনী থেকে আমাকে ও দুখী লালকে ডেকে নিয়ে যায়। আমরা ঢাকা পৌরসভায় গিয়ে সেখানে আমার ভাতিজা ডোম গাংওয়া, আমার মেয়ে জামাই হরি ডোম, সন্টু, ফেকু ডোম, দরবারী, গণেশ, লেমু, লাল বাহাদুর, খুবী, পরদেশী, অর্জুন সবাইকে হাজির দেখেছি। আমার দলে আমরা-আমি, দরবারী, মহেশ, কানহাই, হরি, ফেকওয়া এই ছয়জন ছিলাম। সুইপার সুপারভাইজার পঞ্চম আমাদের সাথে ছিলেন। আমাদের ট্রাক ইংলিশ রোডের মুখে রায়সাহেব বাজারের প্রবেশপথ দিয়ে গোয়ালনগরের স্কুল ও মন্দিরের সুম্মখে যেয়ে থামানো হয়। মন্দিরের ভেতর প্রবেশ করে হাফ শার্ট ও হাফ প্যান্ট পরা এক চৌদ্দ বছরের সুন্দর ফুটফুটে ছেলের সদ্য মৃত লাশ দেওয়ালে ঠেশ দিয়ে পড়ে থাকতে দেখলাম- ছেলেটিকে তাড়িয়ে দিয়ে পিছন দিক থেকে হাত বেঁধে মাথার পিছন দিক থেকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। মাথার পিছন দিক দিয়ে অঝোরে তাজা রক্ত ঝরতে দেখলাম- সদ্য মৃত তাজা লাশ, হাত দিয়ে বড় আদরের সাথে ট্রাকে তুলে দিলাম। কচি ছেলের তুলতুলে লাশ তুলতে গিয়ে আমার হৃদয় যেন কেঁপে উঠলো, হাহাকার করে উঠলো। হায়, না জানি কোন মায়ের আদরের দুলাল, চোখের মনিকে পশুরা তাড়িয়ে এনে এভাবে হত্যা করে গেছে। লাশের ডাগর ডাগর চোখের দিকে তাকাতেই আমার চোখ বেয়ে পানি ঝরতে লাগলো অঝোরে, আমি কিছুতেই আমার চোখের পানি আটকে রাখতে পারলাম না। পশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে রাস্তার উপর আরো একটি যুবকের তাজা লাশ দেখলাম- উভয়ই মুসলমান যুবকের লাশ। গোয়ালনগরের দক্ষিণ দিকের রাস্তা দিয়ে আমরা অগ্রসর হয়ে দূর্গা মায়ের মন্দিরের নিকটবর্তী বাড়ীর অভ্যন্তরে রান্না ঘরে প্রবেশ করে সেখানে এক ঘরেই এগারটি পচা, ফুলা লাশ দেখলাম- তিনজন বাইরে- অবশিষ্টগুলি পালং- এর নিচে। একজন অর্ধ বয়সের রুপসী মহিলা মাথায় কোমর পর্যন্ত লম্বা চুল, হরিণের মত মায়াময় মুখ, লাবণ্যময় দেহ, সারা দেহের উপর যেন ভগবান দুধের সর বিছিয়ে দিয়েছিলেন। প্রবেশপথে দুটি যুবক ও একজন কিশোরের লাশ দেখলাম- ঘরের ভেতরে পালং এর নিচে থেকে আরো ছয়জন যুবক ছেলের লাশ তুলে আনলাম। পাশের ঘরে প্রবেশ করে দু’জন যুবক ছেলে ও একজন মধ্যবয়সী লোকের পচা লাশ তুলেছি। উপরোক্ত সমস্ত লাশ নিয়ে আমি ধলপুর ময়লার ডিপোতে গিয়ে দেখলাম- বড় বড় গর্ত করে কুলিরা বসে আছে- ট্রাক থামিয়ে আমরা সব লাশ গর্তে ঢেলে দিলে কুলিরা মাটি ফেলে গর্ত বন্ধ করে দিল। লাশ উঠাবার জন্য আমাদের প্রত্যেককে তিন টাকা করে দিলে আমি সারাদিন না খেয়ে লাশ তুলতে অস্বীকার করে চলে আসি। সারাদিন লাশ তুলে আমি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম। পরের দিন থেকে আমি আর লাশ তুলতে যাই নাই।

 

টিপসহি
ছোটন ডোম
৭-৪-৭৪

গুরু গোলাপ
<৮,২.১.১৫,৩৯>
পঞ্চম
সুইপার সুপারভাইজার
সুইপার কলোনী, গণকটুলী
নওয়াবগঞ্জ, ঢাকা।

আমি ১৯৭১ সনের ২৫শে মার্চ কালরাতে গণকটুলী পৌরসভার সুইপার কলোনীতে ছিলাম। এখানে আমাদের পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা আমার সাথে অবস্থান করছিল। সেই দিন রাত থেকে আমাদের কলোনীর চারিদিকে সান্ধ্য আইন জারি করে বর্বর পাক সেনারা ই,পি,আর হেডকোয়ার্টারে বাঙ্গালী জোয়ানদের নির্বিচারে হত্যা করতে থাকে। আমরা কলোনীতে সকল সুইপার দরজা-জানালা বন্ধ করে মৃত্যুর প্রহর গুনছিলাম। বাইরে চলছিল চারিদিকে বৃষ্টির মত গোলাবর্ষণ।

 

২৭শে মার্চ সকাল নয়টায় সান্ধ্য আইন কিছুক্ষণের জন্য উঠিয়ে নিলে সবাই স্বপরিবারে ঢাকার বাংলাদেশ মাঠ (পাকিস্তান মাঠ-আগা সাদেক রোড) সংলগ্ন সুইপার বস্তিতে আশ্রয় গ্রহন করি। গণকটুলির আমাদের সুইপার কলোনীর একজন পুরুষ সুইপার মুখ ধোয়ার সময় এবং কাউসিলা দেবী নামে একজন হিন্দু সুইপারকে পাক সেনারা গুলি করে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করে। “পৌরসভার সকল কর্মচারী অবিলম্বে কাজে যোগদান করতে হবে” – রেডিও মারফত আমি এই ঘোষনা শুনে চাকুরীর স্বার্থে পৌরসভায় এসে রিপোর্ট করি। অফিসে এসে দেখলাম, পৌরসভার তৎকালীন কনসারভেন্সি অফিসার ইদ্রিস সাহেব ক্রোধান্ধ হয়ে ডোমদের ডাকছেন। তার নির্দেশে আমি, সুইপার ইন্সপেক্টর রামদীন, ডোম পরদেশী, গণেশ, লেমু এবং লাল বাহাদুর- আমরা সবাই প্রথমে ঢাকা মিটফোর্ড হাসপাতালে লাশ তুলতে যাই। আমরা সেদিন মিটফোর্ড থেকে দু’ট্রাক লাশ তুলেছি- সকল লাশ আমরা ওয়ারী আউটকলে ফেলেছি। সেখানেই পূর্বেই শ্রমিকদের দ্বারা বিরাট বিরাট লম্বা লম্বা গর্ত করে রাখা হয়েছিল। আমরা লাশ নিয়ে সেই সব গর্তে ফেলেছি।

 

পরের দিন আমার দল আবার মিটফোর্ডে লাশ তুলতে যাই।

 

আমরা ২৯ শে মার্চ মিটফোর্ড লাশ ঘর থেকে দু’ট্রাক লাশ তুলেছি। পরদেশী এবং তার ভাই চুন্নু নীচে দাঁড়িয়ে পচা, ফুলা গুলিতে ক্ষতবিক্ষত লাশ তুলে ট্রাকের সম্মুখে এনেছে- রঞ্জিত(লাল বাহাদুর) ও গণেশ দু’জন ট্রাকের উপরেই ছিল। অধিকাংশ লাশ খাকী শার্ট পরা- পুলিশের ছিল। আমরা সকল লাশ ওয়ারী আউটকলে ফেলেছি।

 

পরের দিন আমার দল বুড়িগঙ্গা নদীর পাড় ও শ্যামবাজার থেকে লাশ তুলেছে।

 

তিন দিন পর আমার দল রমনা কালিবাড়ী থেকে লাশ তুলেছে। ডোম রঞ্জিত, গণেশ ও বদলু ছয়টি গন্ধ পোড়া লাশ তুলেছে। বুড়ীগঙ্গা নদী থেকে আমার দল আমার উপস্থিতিতে যে সব বাঙ্গালী যুবকের লাশ তুলেছে তার প্রায় সবই চোখ, হাত-পা বাঁধা ছিল। আমার দল বেশ কয়েকদিন পরে ঢাকা হলের ভেতর থেকে তিন জন যুবকের পচা লাশ তুলেছে।
স্বাক্ষর/-

পঞ্চম

১১-৫-৪৪
গুরু গোলাপ

<৮,২.১.১৬,৪০-৪১> “লাশ তুলে তুলে মানুষের পচা চর্বির গন্ধে আমার পাজস্থলি বের হতে চাচ্ছিলো।“
পরদেশি

পিতা-ছোটন ডোম
সুইপার, সরকারী পশু হাসপাতাল
ঢাকা।
১৯৭১ সনের ২৭শে মার্চ সকালে রাজধানী ঢাকায় পাক সেনাদের বীভৎস হত্যাকাণ্ডের পর ঢাকা পৌরসভার তৎকালীন চেয়ারম্যান মেজর সালামত আলী খান শুরের প্রশাসনিক অফিসার মিঃ ইদ্রিস পৌরসভার আরো কয়েকজন অফিসার সঙ্গে নিয়ে একটি মিউনিসিপ্যাল ট্রাকে পশু হাসপাতালের গেটে এসে বাঘের মত “পরদেশী পরদেশী” বলে গর্জন করতে থাকলে আমি ভীত- সন্ত্রস্তভাবে আমার কোয়ার্টার থেকে বের হয়ে আসি। ইদ্রিস সাহেব অত্যান্ত ক্রুদ্ধভাবে কর্কশ স্বরে বলতে থাকেন “তোমরা সব সুইপার ডোম বের হও, যদি বাঁচতে চাও অবিলম্বে সবাই মিলে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় স্তুপীকৃত লাশ উঠিয়ে ধলপুর ডিপোতে ফেলে দাও। নইলে কাউকে বাঁচানো হবেনা, কেউ বাঁচতে পারবেনা”। পৌরসভার সেই ট্রাকে নিন্মবর্ণিত সুইপাররা বসা ছিলঃ

১। ভারত

২। লাডু

৩। কিষণ।

আমি তার নির্দেশ অমান্য করার কোন উপায় না দেখে ট্রাকে উঠে বসলাম। সেই ট্রাকে করে পৌরসভা অফিসে আমাদের প্রায় আঠারজন সুইপার ও ডোমকে একত্রিত করে প্রতি ছয়জনের সাথে দুইজন করে সুইপার ইন্সপেক্টর আমাদের সুপারভাইজার নিয়োজিত করে তিন ট্রাকে তিনদলকে বাংলাবাজার, মিটফোর্ড ও বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় প্রেরণ করা হয়। আমি মিটফোর্ডের ট্রাকে ছিলাম। সকাল নয়টার সময় আমাদের ট্রাক মিটফোর্ড হাসপাতালের সম্মুখে উপস্থিত হলে আমরা ট্রাক থেকে নেমে লাশ ঘরের ভেতরে প্রবেশ করে বুকে ও পিঠে মেশিনগানের গুলিতে ঝাঁঝরা করা প্রায় একশত যুবক বাঙ্গালীর বীভৎস লাশ দেখালাম। আমি আমার সুপারভাইজারের নির্দেশে লাশ ঘরের ভিতরে প্রবেশ করে প্রতিটি লাশের পায়ে ধরে টেনে বের করে বাইরে দাঁড়ানো অন্যান্য সুইপারের হাতে তুলে দিয়েছি ট্রাকে উঠাবার জন্য। আমি দেখেছি প্রতিটি লাশের বুক ও পিঠ মেশিনগানের গুলিতে ঝাঁঝরা। সব লাশ তুলে দিয়ে একপাশে একটা লম্বা টেবিলের উপর চাদর দিয়ে ঢেকে দেওয়া একটি লাশের উপর থেকে চাদর টেনে উঠিয়ে দেখলাম, একটি ষোড়শী যুবতীর উলঙ্গ লাশ- লাশের বক্ষ, যোনিপথ ক্ষতবিক্ষত, কোমরের পেছনের মাংশ কেটে তুলে নেয়া হয়েছে, বুকের স্তন থেতলে গেছে, কোমর পর্যন্ত লম্বা কালো চুল, হরিণের মত মায়াময় চোখ দেখে আমার চোখ বেয়ে পানি পড়তে থাকলো, আমি কিছুতেই চোখের পানি ধরে রাখতে পারলাম না। আমি আমার সুপারভাইজারের ভয়াল এবং ভয়ঙ্কর কর্কশ গর্জনের মুখে সেই সুন্দরীর পবিত্র দেহ অত্যান্ত যত্ন সম্ভ্রমের সাথে ট্রাকে উঠিয়ে দিলাম। মিটফোর্ড লাশ ঘরের সকল লাশ ট্রাকে উঠিয়ে আমরা ধলপুরের ময়লার ডিপোতে নিয়ে গিয়ে বিরাট গর্তের মধ্যে ঢেলে দিলাম। দেখলাম বিরাট গর্তের মধ্যে সুইপার ও ডোমরা রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন স্থান থেকে নিয়ে আসা লাশ ট্রাক থেকে গর্তের মধ্যে ফেলে দিচ্ছে। আমি অধিকাংশ লাশের দেহে কোন কাপড় দেখি নাই, যে সমস্ত যুবতী মেয়ে ও রমণীদের লাশ গর্তের মধ্যে ফেলে দেওয়া হল তার কোন লাশের দেহেই আমি কোন আবরণ দেখি নাই। তাদের পবিত্র দেহ দেখেছি ক্ষতবিক্ষত, তাদের যোনিপথ পিছন দিক সহ আঘাতে বীভৎস হয়ে আছে। দুপুর প্রায় দুইটার সময় আমরা রমনা কালিবাড়ীতে চলে আসি পৌরসভার ট্রাক নিয়ে। লাশ উঠাবার জন্য ট্রাক রমনা কালীবাড়ীর দরজায় দাঁড় করিয়ে রেখে, দু’জনকে ট্রাকে দাঁড় করিয়ে রেখে আমরা চারজন কালিবাড়ীর ভেতরে গিয়ে দেখি সবকিছু পুড়ে ভস্ম হয়ে আছে। কালিবাড়ীর ভেতরে বিভিন্ন জায়গায় ছড়ানো ছিটানো ৪১টি পোড়া লাশ আমি ট্রাকে তুলেছি। কালিবাড়ীর এসকল লাশ আমরা ধলপুরের ময়লার ডিপোতে গর্তের মধ্যে ফেলেছি। লাশ তুলে তুলে মানুষের পচা চর্বির গন্ধে আমার পাজস্থলি বের হতে চাচ্ছিল।

 

পরের দিন আমি আর লাশ তুলতে যাই নাই, যেতে পারি নাই, সারাদিন ভাত খেতে পারি নাই, ঘৃণায় কোনকিছু স্পর্শ করতে পারি নাই।

 

পরের দিন ২৯শে মার্চ সকালে আমি আবার ঢাকা পৌরসভা অফিসে হাজির হলে আমাকে ট্রাক নিয়ে লাশ তোলার জন্য আরো কয়েকজন সুইপারের সাথে ঢাকা শাঁখারী বাজার যেতে বলা হয়। জজ কোর্টের সম্মুখে আগুনের লেলিহান শিখা তখনো জ্বলছিল, আর পাক সেনারা টহলে মোতায়েন ছিল বলে আমরা ট্রাক নিয়ে সে পথ দিয়ে শাঁখারীবাজার প্রবেশ করতে পারি নাই। পাটুয়াটুলী ঘুরে আমরা শাঁখারীবাজারের পশ্চিম দিকে প্রবেশ করে পাটুয়াটুলী ফাঁড়ি পার হয়ে আমাদের ট্রাক শাঁখারীবাজার প্রবেশ করল। ট্রাক থেকে নেমে আমরা শাঁখারীবাজারের প্রতিটি ঘরে প্রবেশ করলাম- দেখলাম মানুষের লাশ নারী-পুরুষ, যুবক-যুবতী, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, বালক-বালিকা, কিশোর-শিশুর বীভৎস পচা লাশ, চারিদিকে ইমারত সমূহ ভেঙ্গে পড়ে আছে, মেয়েদের অধিকাংশ লাশ আমি সম্পূর্ণ উলঙ্গ দেখলাম, দেখলাম তাদের বুক থেকে স্তন তুলে নেওয়া হয়েছে। কারো কারো যোনিপথে লাঠি ঢুকান হয়েছে। বহু পোড়া, ভস্ম লাশ দেখেছি। পাঞ্জাবী সেনারা পাষণ্ডের মত লাফাতে লাফাতে গুলিবর্ষণ করছিল, বিহারী জনতা শাঁখারীবাজারের প্রতিটি ঘরে প্রবেশ করে মুল্যবান আসবাবপত্র, সোনাদান লুণ্ঠন করে নিয়ে যাচ্ছিল, আমরা অবিরাম গুলিবর্ষণের মুখে প্রাণের ভয়ে দুই ট্রাক লাশ তুলে লাশ তোলার জন্য সেদিন আর শাঁখারীবাজারে প্রবেশ করার সাহস পাই নাই।

 

৩০শে মার্চ সকালে আমার দলকে মিলব্যারাক থেকে লাশ তুলতে বলা হয়। আমি মিলব্যারাক ঘাটে পৌরসভার ট্রাক নিয়ে গিয়ে দেখলাম নদীর ঘাটে অসংখ্য মানুষের লাশ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, বহু লাশ রশি দিয়ে বাঁধা দেখলাম, প্রতিটি রশির বন্ধন খুলে প্রতি দলে দশ জন পনের জনের লাশ বের করলাম, সব যুবক ছেলে ও স্বাস্থ্যবান বালকদের লাশ দেখলাম। প্রতিটি লাশের চোখ বাঁধা, হাত বাঁধা, শক্ত করে পিছন দিক থেকে। প্রতিটি লাশের মুখমণ্ডল কালো দেখলাম, এসিডে জ্বলে বিকৃত ও বিকট হয়ে আছে। লাশের সামনে গিয়ে ঔষধের অসহ্য গন্ধ পেলাম। লাশের কোন দলকে দেখালাম মেশিনগানের গুলিতে বুক ও পিঠ ঝাঁঝরা হয়ে আছে, অনেক লাশ দেখলাম বেয়নেটের আঘাতে বীভৎস হয়ে আছে, কারো মাথা চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে মগজ বের হয়ে আছে, কারো কাটা হৃদপিন্ড বের হয়ে আছে। নদীর পাড়ে ছয়জন রুপসী যুবতীর বীভৎস ক্ষতবিক্ষত, উলঙ্গ লাশ দেখলাম। চোখ বাঁধা, হাত-পা শক্ত করে বাঁধা প্রতিটি লাশ গুলির আঘাতে ঝাঁঝরা, মুখমন্ডল, বক্ষ ও যোনিপথ রক্তাক্ত, ক্ষতবিক্ষত ও বীভৎস দেখলাম। দুইবারে দুই ট্রাকে আমি সত্তরটি লাশ উঠিয়ে আমি ধলপুর ময়লার ডিপোতে ফেলেছি। এরপর আমাকে সদরঘাট, শ্যামবাজার, বাদামতলী ঘাট থেকে লাশ তুলতে বলা হয়। আমি উপরোক্ত এলাকার ঘাট থেকে পচা লাশ তুলে ধলপুর ময়লা ডিপোতে ফেলেছি। আমি যেদিন কালিবাড়ীতে লাশ তুলেছি, সেদিন সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলের পিছনে ষ্টাফ কোয়ার্টার, রোকেয়া হলের পশ্চিম দিকে জনৈক অধ্যাপকের বাসা থেকে লাশ তুলেছি। রোকেয়া হলের পিছনের ষ্টাফ কোয়ার্টারের ভেতর থেকে আমি মেয়ে, পুরুষ ও শিশু সমেত নয়টি লাশ তুলেছি। আর অধ্যাপকের বাসা থেকে সিঁড়ির সামনে লেপের ভেতর পেঁচানো জনৈক অধ্যাপকের লাশ আমি তুলে নিয়ে গেছি।

 

স্বাক্ষর/-
পরদেশী
২১-৩-৭৪

গুরু গোলাপ

<৮,২.১.১৭,৪২-৪৪>
মিসেস রাবেয়া খাতুন,
সুইপার, রাজারবাগ পুলিশ লাইন, ঢাকা।

১৯৭১ সনের ২৫শে মার্চ রাতে হানাদার পাঞ্জাবী সেনারা যখন রাজারবাগ পুলিশ লাইনের উপর অতর্কিতে হামলা চালায় তখন আমি রাজারবাগ পুলিশ লাইনের এস, এফ ক্যান্টিনে ছিলাম। আসন্ন হামলার ভয়ে আমি সারাদিন পুলিশ লাইনের ব্যারাক ঝাড়ু দিয়ে রাতে ব্যারাকেই ছিলাম। কামান, গোলা, লাইটবোম আর ট্যাঙ্কের অবিরাম কানফাটা গর্জনে আমি ভয়ে ব্যারাকের মধ্যে কাত হয়ে পড়ে থেকে থরথরিয়ে কাঁপছিলাম।

 

২৬ শে মার্চ সকালে ওদের কামানের সম্মুখে আমাদের বীর বাঙ্গালী পুলিশ বাহিনী বীরের মত প্রতিরোধ করতে করতে আর টিকে থাকতে পারে নাই। সকালে ওরা পুলিশ লাইনের এস, এফ ব্যারাকের চারিদিকে আগুন লাগিয়ে দেয় এবং ব্যারাকের মধ্যে প্রবেশ করে বাঙ্গালী পুলিশদের নাকে, মুখে, সারা দেহে বেয়নেট ও বেটন চার্জ করতে ও বুটের লাথি মারতে মারতে বের করে নিয়ে আসছিল। ক্যান্টিনের কামরা থেকে বন্দুকের নলের মুখে আমাকেও বের করে আনা হয়, আমাকে লাথি মেরে মাটিতে ফেলে দেওয়া হয় এবং আমার উপর প্রকাশ্যে পাশবিক অত্যাচার করছিল আর কুকুরের মত অট্টহাসিতে ফেটে পড়ছিল। আমার উপর পাশবিক অত্যাচার করতে করতে যখন আমাকে একেবারে মেরে ফেলে দেওয়ার উপক্রম হয়, তখন আমার বাঁচবার আর কোন উপায় না দেখে আমি আমার প্রাণ বাঁচাবার জন্য ওদের নিকট কাতর মিনতি জানাচ্ছিলাম। আমি হাউমাউ করে কাঁদছিলাম, আর বলছিলাম আমাকে মেরোনা, আমি সুইপার, আমাকে মেরে ফেললে তোমাদের পায়খানা ও নর্দমা পরিস্কার করার আর কেউ থাকবেনা, তোমাদের পায়ে পড়ি তোমরা আমাকে মেরোনা, মেরো না, মেরো না, আমাকে মেরে ফেললে তোমাদের পুলিশ লাইন রক্ত ও লাশের পচা গন্ধে মানুষের বাস করার অযোগ্য হয়ে পড়বে। তখনো আমার উপর এক পাঞ্জাবী কুকুর, কুকুরের মতই আমার কোমরের উপর চড়াও হয়ে আমাকে উপর্যুপরি ধর্ষণ করছিল। আমাকে এভাবে ধর্ষণ করতে করতে মেরে ফেলে দিলে রাজারবাগ পুলিশ লাইন পরিস্কার জন্য আর কেউ থাকবে না একথা ভেবে ওরা আমাকে ছেড়ে দিয়ে আমাকে এক পাঞ্জাবী ধমক দিয়ে বলতে থাকে, “ঠিক হায়, তুমকো ছোড দিয়া যায়েগা জারা বাদ, তোম বাহার নাহি নেকলে গা, হারওয়াক্ত লাই পার হাজির রাহেগা।“ একথা বলে আমাকে ছেড়ে দেয়।

পাঞ্জাবী সেনারা রাজাকার ও দালালদের সাহায্যে রাজধানীর স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা এবং অভিজাত জনপদ থেকে বহু বাঙ্গালী যুবতী মেয়ে, রুপসী মহিলা এবং সুন্দরী বালিকাদের জীপে, মিলিটারী ট্রাকে করে পুলিশ লাইনের বিভিন্ন ব্যারাকে জমায়েত করতে থাকে। আমি ক্যান্টিনের ড্রেন পরিস্কার করছিলাম, দেখলাম আমার সম্মুখ দিয়ে জীপ থেকে আর্মী ট্রাক থেকে লাইন ধরে বহু বালিকা যুবতী ও মহিলাকে এস, এফ ক্যান্টিনের মধ্য দিয়ে ব্যারাকে রাখা হল। বহু মেয়েকে হেডকোয়ার্টার বিল্ডিনহ- এ উপর তালায় রুমে নিয়ে যাওয়া হল, আর অবশিষ্ট মেয়ে যাদেরকে ব্যারাকের ভেতর জায়গা দেয়া গেল না তাদের বারান্দায় দাঁড় করিয়ে রাখা হল। অধিকাংশ মেয়ের হাতে বই আর খাতা দেখলাম, অনেক রুপসী মেয়ের দেহে অলঙ্কার দেখলাম, তাদের মধ্যে অধিকাংশ মেয়ের চোখ বেয়ে অঝোরে অশ্রু পড়ছিল। এরপরই আরম্ভ হয়ে গেল বাঙ্গালী নারীদের উপর বীভৎস ধর্ষণ। লাইন থেকে পাঞ্জাবী সেনারা কুকুরের মত জীভ চাটতে চাটতে ব্যারাকের মধ্যে উন্মত্ত অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে প্রবেশ করতে লাগলো। ওরা ব্যারাকে ব্যারাকে প্রবেশ করে প্রতিটি যুবতী, মহিলা, ও বালিকার পরনের কাপড় খুলে একেবারে উলঙ্গ করে মাটিতে লাথি মেরে ফেলে দিয়ে বীভৎস ধর্ষণে লাগে গেল। কেউ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সেই নিরীহ বালিকাদের উপর ধর্ষণে লেগে গেল, আমি ব্যারাকে ড্রেন পরিস্কার করার অভিনয় করছিলাম আর ওদের বীভৎস পৈশাচিকতা দেখছিলাম। ওদের উন্মত্ত উল্লাসের সামনে কোন মেয়ে কোন শব্দ পর্যন্ত করে নাই, করতে পারে নাই। উন্মত্ত পাঞ্জাবী সেনারা এই নিরীহ বাঙ্গালী মেয়ে শুধুমাত্র ধর্ষণ করেই ছেড়ে দেয় নাই- আমি দেখলাম পাক সেনারা সেই মেয়েদের উপর পাগলের মতো উঠে ধর্ষণ করছে আর ধারালো দাঁত বের করে বক্ষের স্তন ও গালের মাংস কামড়াতে কামড়াতে রক্তাক্ত করে দিচ্ছে, ওদের উদ্ধত ও উন্মত্ত কামড়ে অনেক মেয়ের স্তনসহ বক্ষের মাংস উঠে আসছিল, মেয়েদের গাল, পেট, ঘাড়, বক্ষ, পিঠের ও কোমরের অংশ ওদের অবিরাম দংশনে রক্তাক্ত হয়ে গেল। যে সকল বাঙ্গালী যুবতী ওদের প্রমত্ত পাশবিকতার শিকার হতে অস্বীকার করলো দেখলাম তৎক্ষণাৎ পাঞ্জাবী সেনারা ওদেরকে চুল ধরে টেনে এনে স্তন ছোঁ মেরে টেনে ছিঁড়ে ফেলে দিয়ে যোনি ও গুহ্যদ্বারের মধ্যে বন্দুকের নল, বেয়নেট ও ধারালো ছুরি ঢুকিয়ে দিয়ে সেই বীরাঙ্গনাদের পবিত্র দেহ ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছিল। অনেক পশু ছোট ছোট বালিকাদের উপর পাশবিক অত্যাচার করে ওদের অসার রক্তাক্ত দেহ বাইরে এনে দুজন দু পা দু দিকে টেনে ধরে চড়চড়িয়ে ছিঁড়ে ফেলে দিল, আমি দেখলাম সেখানে বসে বসে, আর ড্রেন পরিস্কার করছিলাম, পাঞ্জাবীরা শ্মশানের লাশ যে কোন কুকুরের মত মদ খেয়ে সবসময় সেখানকার যার যে মেয়ে ইচ্ছে তাকেই ধরে ধর্ষণ করছিল। শুধু সাধারণ পাঞ্জাবী সেনারাই এই বীভৎস পাশবিক অত্যাচারে যোগ দেয় নাই, সকল উচ্চ পদস্থ পাঞ্জাবী সামরিক অফিসাররাই মদ খেয়ে হিংস্র বাঘের মত হয়ে দুই হাত নাচাতে নাচাতে সেই উলঙ্গ বালিকা, যুবতী ও বাঙ্গালী মহিলাদের উপর সারাক্ষণ পর্যায়ক্রমে ধর্ষণ কাজে লিপ্ত থাকতো। কোন মেয়ে, মহিলা, যুবতীকে এক মুহুর্তের জন্য অবসর দেওয়া হয় নাই, ওদের উপর্যুপরি ধর্ষণ ও অবিরাম অত্যাচারে বহু কচি বালিকা সেখানেই রক্তাক্ত দেহে কাতরাতে কাতরাতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছে।

 

পরের দিন এ সকল মেয়ের লাশ অন্যান্য মেয়েদের সম্মুখে ছুরি দিয়ে কেটে কুচি কুচি করে বস্তার মধ্যে ভরে বাইরে ফেলে দিত। এ সকল মহিলা, যুবতী ও বালিকাদের মির্মম পরিণতি দেখে অন্যান্য মেয়েরা আরো ভীত ও সন্ত্রস্ত হয়ে পড়তো এবং স্বেচ্ছায় পশুদের ইচ্ছার সম্মুখে আত্মসমর্পণ করতো। যে সকল মেয়ে প্রাণে বাঁচার জন্য ওদের সাথে মিল দিয়ে ওদের অতৃপ্ত যৌন ক্ষুধা চরিতার্থ করার জন্য সর্বতোভাবে সহযোগীতা করে তাদের পিছনে ঘুরে বেড়িয়েছে, তাদের হাসি তামাসায় দেহ দান করেছে, তাদেরকেও ছাড়া হয় নাই। পদস্থ সামরিক অফিসাররা সেই সকল মেয়েদের উপর সম্মিলিতভাবে ধর্ষণ করতে করতে হঠাৎ একদিন তাকে ধরে ছুরি দিয়ে তার স্তন কেটে, পাছার মাংস কেটে, যোনি ও গুহ্যদ্বারের মধ্যে সম্পূর্ণ ছুরি চালিয়ে দিয়ে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে ওরা আনন্দ উপভোগ করতো।

এরপর উলঙ্গ মেয়েদেরকে গরুর মত লাথি মারতে মারতে, পশুর মত পিটাতে পিটাতে উপরে হেডকোয়ার্টারে দোতলা, তেতলা ও চার তলায় উলঙ্গ অবস্থায় দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। পাঞ্জাবী সেনারা চলে যাওয়ার সময় মেয়েদেরকে লাথি মেরে আবার কামরার ভেতর ঢুকিয়ে তালাবদ্ধ করে চলে যেত। ইহার পর বহু যুবতী মেয়েকে হেডকোয়ার্টারের উপর তলায় বারান্দার মোটা লোহার তারের উপর চুলের সাথে বেঁধে ঝুলিয়ে রাখা হয়। প্রতিদিন পাঞ্জাবীরা সেখানে যাতায়াত করতো সেই ঝুলন্ত উলঙ্গ যুবতীদের কেউ কেউ এসে তাদের উলঙ্গ দেহের কোমরের মাংস বেটন দিয়ে উন্মত্তভাবে আঘাত করতে থাকতো, কেউ তাদের বক্ষের স্তন কেটে নিয়ে যেত, কেউ হাসতে হাসতে তাদের যোনিপথে লাঠি ঢুকিয়ে আনন্দ করতো, কেউ উঁচু চেয়ারে দাঁড়িয়ে উন্মক্ত বক্ষ মেয়েদের স্তনে মুখ লাগিয়ে ধারালো দাঁত দিয়ে স্তনের মাংস তুলে নিয়ে আনন্দে অট্টহাসি করতো। কোন মেয়ে এসব অত্যাচারে কোন প্রকার চিৎকার চেষ্টা করলে তার যোনি পথ দিয়ে লোহার রড ঢুকিয়ে দিয়ে তাকে তৎক্ষণাৎ হত্যা করা হত। প্রতিটি মেয়ের হাত বাঁধা ছিল, পেছনের দিকে শুন্যে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল। অনেক সময় পাঞ্জাবী সেনারা সেখানে এসে সেই ঝুলন্ত উলঙ্গ মেয়েদের এলোপাতাড়ি বেদম প্রহার করে যেত। প্রতিদিন এভাবে বিরামহীন প্রহারে মেয়েদের দেহের মাংস ফেটে রক্ত ঝরছিল, মেয়েদের কারো মুখের সম্মুখের দাঁত ছিলনা, ঠোঁটের দু দিকের মাংস কামড়ে, টেনে ছিঁড়ে ফেলা হয়েছিল, লাঠি ও লোহার রডের অবিরাম পিটুনিতে প্রতিটি মেয়ের আঙ্গুল, হাতের তালু ভেঙ্গে, থেঁতলে ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল। এসব অত্যাচারিত ও লাঞ্চিত মহিলা ও মেয়েদের প্রস্রাব ও পায়খানা করার জন্য হাতের ও চুলের বাঁধন খুলে দেয়া হত না এক মুহুর্তের জন্য। হেডকোয়ার্টারের উপর তলার বারান্দায় এই ঝুলন্ত উলঙ্গ মেয়েরা হাত বাঁধা অবস্থায় লোহার তারে ঝুলে থেকে সেখানে প্রস্রাব-পায়খানা করত- আমি প্রতিদিন সেখানে গিয়ে এসব প্রস্রাব-পায়খানা পরিস্কার করতাম। আমি স্বচক্ষে দেখেছি, অনেক মেয়ে অবিরাম ধর্ষণেরফলে নির্মমভাবে ঝুলন্ত অবস্থায়ই মৃত্যুবরণ করেছে। প্রতিদিন সকালে গিয়ে সেই বাঁধন থেকে অনেক বাঙ্গালি যুবতীর বীভৎস মৃতদেহ পাঞ্জাবী সেনাদেরকে নামাতে দেখেছি। আমি দিনের বেলায়ও সেখানে সে সকল বন্দী মহিলাদের পূতগন্ধ, প্রস্রাব- পায়খানা পরিস্কার করার জন্য সারাদিন উপস্থিত থাকতাম।

 

প্রতিদিন রাজারবাগ পুলিশ লাইন ব্যারাক থেকে এবং হেডকোয়ার্টার অফিসের উপর তলা হতে বহু ধর্ষিতা মেয়ের ক্ষতবিক্ষত বিকৃত লাশ ওরা পায়ে রশি বেঁধে নিয়ে যায় এবং সেই জায়গায় রাজধানী থেকে ধরে আনা নতুন নতুন মেয়েদের চুলের সাথে ঝুলিয়ে বেঁধে নির্মমভাবে ধর্ষণ আরম্ভ করে দেয়। এসব উলঙ্গ নিরীহ বাঙ্গালী যুবতীদের সারাক্ষণ সশস্ত্র পাঞ্জাবী সেনারা প্রহরা দিত। কোন বাঙ্গালীকে সেখানে প্রবেশ করতে দেয়া হত না। আর আমি ছাড়া কোন সুইপারকেও সেখানে প্রবেশ করতে দেয়া হতো না।

মেয়েদের হাজারো কাতর আহাজারিতেও আমি ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও বাঙ্গালী মেয়েদের বাঁচাবার জন্য কোন ভুমিকা পালন করতে পারি নাই।

 

এপ্রিল মাসের দিকে আমি অন্ধকার অন্ধকার পরিস্কার হওয়ার সাথে সাথে খুব ভোরে হেডকোয়ার্টারের উপর তলায় সারারাত ঝুলন্ত মেয়েদের মলমুত্র পরিস্কার করছিলাম। এমন সময় সিদ্ধেশ্বরীর ১৩৯ নং বাসার রানু নামের এক কলেজ ছাত্রীর কাতর প্রার্থনায় আমি অত্যন্ত ব্যথিত হয়ে পড়ি এবং মেথরের কাপড় পরিয়ে কলেজ ছাত্রী রানুকে মুক্ত করে পুলিশ লাইনের বাইরে নিরাপদে দিয়ে আসি। স্বাধীন হওয়ার পর সেই মেয়েকে আর দেখি নাই।

 

১৯৭১ সনের ডিসেম্বরে মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় মিত্রবাহিনী বাংলাদেশ মুক্ত করার পূর্ব পর্যন্ত পাঞ্জাবী সেনারা এসকল নিরীহ বাঙ্গালী মহিলা, যুবতী ও বালিকাদের উপর এভাবে নির্মম-পাশবিক অত্যাচার ও বীভৎসভাবে ধর্ষণ করে যাচ্ছিল। ডিসেম্বরের প্রথম দিকে মিত্রবাহিনী ঢাকায় বোমাবর্ষণের সাথে সাথে পাঞ্জাবী সেনারা আমাদের চোখের সামনে মেয়েদের নির্মমভাবে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে। রাজারবাগ হেডকোয়ার্টার অফিসের উপর তলায়, সমস্ত কক্ষে, বারান্দায় এই নিরীহ মহিলা ও বালিকাদের তাজা রক্ত জমাট হয়েছিল। ডিসেম্বরে মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনী রাজধানীতে বীরবিক্রমে প্রবেশ করলে রাজারবাগ পুলিশ লাইনের সকল পাঞ্জাবী সেনা আত্মসমর্পণ করে।

টিপসহি/-
রাবেয়া খাতুন
১৮-২-৭৪

গুরু গোলাপ

<৮,২.১.১৮,৪৫-৪৬>

(প্রিন্টিং মিসটেকঃ ১৮কে সংকলনটিতে ৪৮ লেখা হয়েছে) পেজ- ৪৫
মোহাম্মদ আবু নূর,
শিক্ষক, সিদ্ধেশ্বরী হাই স্কুল,
ঢাকা।
আমি সিদ্ধেশ্বরী হাই স্কুলের সহকারী শিক্ষক। একদিন ভারতে যাওয়ার ব্যাপারে স্কুল থেকে কিছু পাওনা টাকা তুলতে গেছি। এমন সময় পাঞ্জাবী পুলিশের একটি দল আমাকে ও আমার বন্ধু সহকর্মী নজমুল হোসেনকে ধরে নিয়ে রাজারবাগ চলে যায়। সেখানে আমাদের অনেকক্ষন দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। তারপর তারা আমাদের টাকা-পয়সা, ঘড়ি ইত্যাদি ছিনিয়ে নিয়ে নেয়। হ্যান্ডকাফ পরিয়ে ওপরে নিয়ে গিয়ে মাটিতে বসিয়ে রাখে এবং মাঝে মাঝে চড় থাপ্পড় দিতে থাকে। সেখান থেকে আমাদেরকে রমনা থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। রমনা থানায় লকআপে থাকার সময় সেখানে আর অনেক ছেলেকে অত্যাচারে জর্জরিত অবস্থায় দেখতে পাই।

 

ঘন্টাখানেক পর আমাদেরকে লকআপ থেকে বারান্দায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানে প্রথমে আমার সহকর্মীর উপর দৈহিক পীড়ন করা শুরু হয়। তাঁকে বেতের মোটা লাঠি দিয়ে অমানুষিকভাবে প্রহার করা হয়। তার পা মুষড়ে ফেলা হয়। কিন্তু তিনি এরপরও কোন গুপ্ত খবর দিতে অস্বীকার করেন। তারপর শুরু হয় আমার পালা। আমাকে তারা নিদারুন লাঠিপেটা করে এবং আমার পা-ও তারা মুষড়ে ফেলে। কিন্তু আমিও কোন গোপন কথা বলতে সম্মত হইনি।

ঘণ্টা খানেক পর একজন ডি,এস,পি এসে আমাদেরকে আবার রাজারবাগ পুলিশ লাইনে নিয়ে যায়। সেখানে অন্যান্য আরো অনেকের সঙ্গে আমাদেরকে ২৪ দিনের জন্য বন্দী করে রাখা হয়। প্রথম দিন রাতে তারা কোন এক পিতা ও তার পুত্রকে একই সঙ্গে উলঙ্গ করে ঐ অবস্থায় সবার সামনে সারারাত দাঁড় করিয়ে রাখে এবং মারধোর করে। আমাকে ও অন্যান্য সবাইকে তারা সকালে, দুপুরে ও সন্ধ্যায় নিয়মমাফিক মারধোর করতো ও জোর করে জবানবন্দী আদায় করে নিত। তবে বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে আমরা সবাই সত্যকে গোপন করে যেতাম। পাঞ্জাবী পুলিশেরা ছাড়াও পাক সেনা বা ই,পি,সি,এ,এফ যারাই আসত তারাই একবার করে এসে আমাদের ধোলাই করে যেত। অনেকেই প্রহারের ফলে সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলত। মাঝে মাঝে মধ্যরাতে এসে ঘুম থেকে উঠিয়ে তারা নির্যাতন চালাত। ওরা নিয়মিত আমাদেরকে কিছু খেতে দিত না। তবে মাঝে মাঝে তাদের উচ্ছিষ্ট তারা আমাদের খেতে দিত। বিশেষ করে মারধোর করার সময় পানি চাইলে তারা পানি খেতে দিত না। উল্লেখ করা যেতে পারে মাঝে মাঝে ভিখিরি ছেলেরা বিভিন্ন জায়গা থেকে খাবার ভিক্ষে করে আমাদের দিয়ে যেত।

একদিন ওরা আমার দুই হাত বেঁধে ওপরের দিকে ঐ অবস্থায় একনাগাড়ে ৪৮ ঘণ্টা দাঁড় করিয়ে রাখে। বাঁধন খুলে দেয়ার পরপরই আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। আমার পা ভীষন রকম ফুলে যায় এবং সাধারণভাবে চলাফেরা করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলি।

একদিন কোন এক বন্দীকে তারা পিটিয়ে মেরে ফেলে। তারপর মৃতদেহ বস্তায় পুরে তারা নিয়ে যায়। ওখানে একটা ছেলেকে পিঠমোড়া করে সারাদিন বেঁধে রাখে ফলে তার পচনক্রিয়া আরম্ভ হয়। ঐ অবস্থায় পরে তাকে ছেড়ে দেয়া হয়।

 

একদিন সকালে পাঞ্জাবী পুলিশ এসে আমাকে বন্দুকের বাঁট দিয়ে পিটাতে শুরু করে, তখন আমার পরনে শুধু একটা জাঙ্গিয়া ছিল এবং হাত উপরের দিকে বাঁধা অবস্থায় ছিল। সে অবস্থায় একজন মিলিটারী অফিসার, ডি,এস,পি,আর,আই এবং কয়েকজন পুলিশ এসে আমাকে ঘিরে ফেলে, তারা প্রত্যেকেই আমার উপর কিল, ঘুষি, চপেটাঘাত, লাথি এবং থাপ্পড় চালাতে থাকে। আমার বুকের উপর একজন একটা রিভলবার ধরে তাদের ইচ্ছেমত স্বীকারোক্তি আদায়ের চেষ্টা করে। কিন্তু আমি কোন গোপন তথ্য প্রকাশ না করলে তারা আরো কিছুক্ষণ মারধোর করে চলে যায়।

একদিন সকালে পাঞ্জাব পুলিশের একজন ডি,এস,পি (অল্প বয়স্ক) দেখতে আসে। তার সাথে কথা বলার জন্য দু-এক মিনিট কথা বলার জন্য অনুমতি চাই এবং সে এতে রাজী হয়। তাকে আমি প্রথমে বলি “শিক্ষার দিক থেকে তুমি আমার চাইতে বেশী নও, কিন্তু কি অবস্থায় আমাদেরকে রেখেছ, তোমরা মানুষ না অন্য কিছু, আমাদের বিরুদ্ধে যদি কোন অভিযোগ থাকে তা তুমি তদন্ত কর এবং আদালতে বিচার দাও। তা না হলে এভাবে আমাদেরকে রাখার কোন অধিকার তোমাদের নেই”। আমার এ কথা শুনে ভীষণ রেগে যায় এবং চিৎকার করতে থাকে। আমাকে সে একটা ছেলের পরিচয় জিজ্ঞাসা করে। আমি বললাম যে ছেলেটির নাম আমি শুনেছি তবে চিনি না। এরপ সে চলে যায়, ঐ দিনই সন্ধ্যার সময় আমাকে বেদমভাবে প্রহার করা হয়। যে ঘরে আমাদের উপর অত্যাচার চালানো হত সেখান থেকে পরে আমাদেরকে অন্যত্র সরিয়ে নেয়া হয়। এখানে দুইজন পাঞ্জাবী পুলিশ মাঝে মাঝে আমাদেরকে খাবার দিয়ে যেত। সিগারেট কিনে এনে দিত, তারা আমাদের মারধোর করতো না। এদের সাহায্যে আমি হাবিব ব্যাংকে (শান্তি নগর শাখা) এক বন্ধুর কাছে ঝাড়ুদারের মারফত একটা চিঠি পাঠাতে সক্ষম হই। আমার বন্ধু ঐ ঝাড়ুদারের কাছে আমার জন্য দশটি টাকা পাঠিয়ে দেয় এবং বন্ধু বান্ধবদেরকে আমার খবর পৌছে দেয়। ছাড়া পাবার ৭/৮ দিন আগে থেকে আমাকে বলা হয় যে টাকা দিলে আমাকে ছেড়ে দেয়া হবে। আমার চেক বইটি (তল্লাশী করে তারা নিয়েছিল) আমার কাছে নিয়ে আসে এবং দু’হাজার টাকা চেক সই করে দিতে বলে। আমি তাদের শ পাঁচেক টাকা দিয়ে রাজি হই। শেষ পর্যন্ত তারা ৬০০ টাকার একখানা চেক সই করিয়ে নেয়, আমাদেরই একজন বন্দীকে নিয়ে টাকা উঠিয়ে নিয়ে আসে। সে দিনই বিকালে আমাকে ছেড়ে দেয়া হয় এবং আরো আটশ টাকা দিতে বলে। আমি পালিয়ে যাব এই ভয়ে একজন পুলিশ আমার পিছনে লাগিয়ে দেয়। পরেরদিন আমি আমার বন্ধুদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে তাদেরকে দিয়ে আসি।
দীর্ঘদিনে বন্দীশিবিরে অত্যাচার ও নির্যাতনের চিহ্ন বহন করে অবশেষে বাড়ী ফিরে যাই। এখনো আমি পুরোপুরি সুস্থ্য হয়ে উঠি নি এবং অস্বাভাবিক জীবনযাপন করছি।
স্বাক্ষর/-
মোঃ আবু নুর
৪-৪-৭৩

গুরু গোলাপ
<৮,২.১.১৮,৪৭>
মোহাম্মদ আলী নুর চোধুরী,
প্রধান শিক্ষক, ঘোড়াশাল হাই স্কুল।
১লা ডিসেম্বর ১৯৭১। সকাল ৫টায় রেলগাড়ী করে প্রায় ৫০/৬০ জন সৈনিক সাথে একজন মেজরসহ ন্যাশনাল জুট মিল (ইজব নগর, ঘোড়াশাল, ঢাকা) ঘিরে ফেলে। তখন অনেকেই নিদ্রায় মগ্ন। মিল ছিল রমজান উপলক্ষে ছুটি। বিশেষ করে মিলের স্টাফের লোকজনই সেখানে তখন ছিলেন। ঘোড়াশাল সেতুর পশ্চিম পাশে গাড়ী থামিয়ে মিছিল সহকারে প্রথমত গুলি করতে করতে পাক বাহিনী মিলে প্রবেশ করে। গুলির শব্দ শুনে মিলের আশেপাশের লোকজন দৌড়াদৌড়ি করতে থাকে। কিন্তু পাক বাহিনী ওদিকে কোন দৃষ্টিপাত করে নি। রাস্তার পাশে যে সব ঘরবাড়ী ছিল সেগুলিতে অগ্নিসংযোগ করে মাত্র। গোলাগুলির শব্দ শুনে মিলের প্রত্যেকে ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে যায়। মিলের সহকারী ম্যানেজার শহীদ আবু তালেব পাক বাহিনীর সাথে একত্র হয়ে মিলের সবাইকে সান্ত্বনা সহকারে ডেকে আনেন। অনুমান স্টাফ দেড়শত লোক ছিল এবং তাদের পরিবার পরিজনসহ ৫০০ লোক। মেজর সবাইকে ডেকে শীতলক্ষ্যা নদীর পশ্চিম পাড়ে নিয়ে যায়। চক্ষু লাল করে ম্যানেজার সাহেবকে জিজ্ঞাসাবাদ করে এখানে মুক্তিবাহিনী আছে কিনা? এবং স্টাফের সবাইকে মুক্তিবাহিনী বলে মেজর আখ্যায়িত করে। সহকারী ম্যানেজার সাহেব মেজরকে নানাভাবে তাঁর স্টাফ যে মুক্তিবাহিনী নয়, তা বোঝাতে চেষ্টা করেন এবং তার প্রমাণ দেন। ভোর ছয়টা থেকে বেলা দুইটা পর্যন্ত উভয়ের মধ্যে এসব কথা কাটাকাটি হয়। শেষ পর্যন্ত মেজর ব্যাপারটা বুঝতে সক্ষম হন। সহকারি ম্যানেজার সাহেবকে স্ব-স্ব কাজে লিপ্ত হতে আদেশ দেন। স্টাফের সবাই নিজ নিজ কাজে চলে যায়। মেজর ও তার অন্যান্য সৈন্যরা মিল প্রদক্ষিন করতে থাকে। তাদের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল মুক্তিবাহিনী অনুসন্ধান্ন করা। অবশেষে তারা আবার গাড়ির দিকে রওয়ানা হয়। যখন তারা গাড়ীর দিকে ধাবমান ঠিক সেই মুহুর্তে কোথা হতে কে যেন একে একে দুটি গুলি করে। গুলির শব্দ শুনে মেজর ও অন্যান্য সৈনিকরা তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠে এবং পুনরায় মিলের দিকে রওয়ানা হয়। আর কালবিলম্ব না করে অফিসার স্টাফের প্রত্যেকের বাসায় উঠে যাকে যেভাবে দেখেছে সেভাবেই নৃশংসভাবে হত্যা করে। উল্লেখ্য যে, মিলের গেটকিপারসহ অফিসার ও স্টাফের দু’একজন ছাড়া সবাইকে পাক বাহিনী নৃশংসভাবে হত্যা করে। ঠিক সন্ধ্যা ৬টায় তারা ট্রেনে উঠে ঢাকা অভিমুখে চলে যায়।
স্বাক্ষর/-
আলী নুর চোধুরী
৪-১২-৭৩
 

গুরু গোলাপ

<৮,২.১.১৯,৪৮>
মিসেস আবু তালেব

স্বামীঃ শহীদ আবু তালেব, এম,এ,

সহকারী ম্যানেজার, ন্যাশনাল জুট মিলস,

ঘোড়াশাল, ঢাকা।

 

১৯৭১ সালের ১লা ডিসেম্বর একদল খানসেনা অতর্কিতভাবে ঘোড়াশাল ন্যাশনাল জুট মিলস ঘিরে ফেলে এবং মিলের ১০৪ জন বিভিন্ন পদের নিরীহ নিরস্ত্র কর্মচারীকে নির্মমভাবে এক লাইনে দাঁড় করিয়ে এল,এম,জির ব্রাশ ফায়ারে হত্যা করে। শহীদ আবু তালেব তাদের মধ্যে সবচেয়ে উচ্চপদস্থ কর্মচারী ছিলেন। তিনি দিনাজপুরে ঠাকুরগাঁ মহকুমার ধাকদনপুর গ্রামের অধিবাসী ছিলেন এবং জনাব আহমদ উদ্দিন আহমেদের সর্বকনিষ্ঠ পুত্র ছিলেন এবং ন্যাশনাল জুট মিলের সহকারী ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি পরোক্ষভাবে স্বাধীনতা যুদ্ধে সহায়তা দান করেন এবং বহু জনহিতকর কাজ সম্পাদন করেন। তিনি দিনাজপুর জেলায় চিরিরবন্দর থানার নওখৈর গ্রামে “নবোদয়” নামে একটি পাঠাগারও স্থাপন করেন। তাছাড়া তার বড় পরিচয় তিনি ন্যাশনাল জুট মিল প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন এবং একজন দক্ষ ও জনপ্রিয় পরিচালক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। মাত্র ৩২ বছর বয়সে বর্বর পাক সেনাদের হাতে তাঁর প্রাণ হারাতে হয়। মৃত্যুকালে স্ত্রী ও দুই কন্যা রেখে যান। মৃত্যুর পূর্বমুহুর্তে তিনি বারবার পাক সেনাদের কাছে আবেদন জানান- “মারতে যদি হয় আমাকে মার, আমার কর্মচারীদেরকে মের না”। যেহেতু তিনি মিলটিকে গড়ে তোলেন, সেহেতু তাঁর শেষ ইচ্ছা ছিল মৃত্যুর পর যেন তাঁকে সেখানেই কবরস্থ করা হয়। কিন্তু তার শেষ ইচ্ছা পূর্ণ হয়নি।
স্বাক্ষর/-

মিসেস আবু তালেব

২০-১১-৭৩

 

গুরু গোলাপ

<৮,২.১.২০,৪৯>

মোহাম্মদ মাহমুদুল আশরাফ

গ্রাম ও পোঃ ঘোড়াশাল

কালীগঞ্জ, ঢাকা।

 

নভেম্বর মাসের ১৭ তারিখ ঘোড়াশাল স্টেশনে মিলিটারী ক্যাম্প থেকে ৫০/৫৫ জনের একটি দল ভোর ৬ টায় ষ্টেশনের দক্ষিণ দিকের দু’তিনটা পথ দিয়ে খিলপাড়া ও আটিয়া গ্রামের দিকে অগ্রসর হয়। আমি ঘোড়াশাল থেকে তার একদিন পুর্বে বৈয়ম গ্রামে চলে যাই। পাক বাহিনী প্রথমে খিলপাড়া গ্রামে প্রবেশ করে। খিলপাড়া গ্রামের জনৈক দোকানদার ইসলামের সাথে পাক বাহিনী সাক্ষাত কর। বিশেষ করে উল্লেখ্য যে, পাক বাহিনী পূর্বেই ইসলামকে দোকানদার হিসেবে চিনত। পাক বাহিনী ইসলামকে সাহায্য করতে বলে। উপায়ন্তর না দেখে ইসলাম বাধ্য হল পাক বাহিনীর সাহায্য করতে। এরপর শুরু হয় পাক বাহিনীর ধ্বংসলীলা। একের পর এক বাড়ী ধ্বংস করতে থাকে এবং লোকজনদেরকে এক এক করে গুলি করে হত্যা করে। প্রকাশ, ইসলাম একজন ধর্মভীরু লোক। তিনি কোরআন শরীফ পাঠ করছিলেন। হয়তবা অনেক লোক পাক বাহিনীর ভয়ে পালাচ্ছে। সেই মুহূর্তে পাক বাহিনী গুলি করে ওখানেই শেষ করেছে। এমনকি শিশু, নারী-পুরুষ কেউই তাদের নৃশংস হত্যা হতে নিস্তার পায় নি। হত্যার সাথে সাথে অগ্নিসংযোগ চালিয়ে যায়। এত মর্মান্তিক ধ্বংসলীলাকে তৈমুরের ধ্বংসলীলার সাথে তুলনা করা যায়।

 

এমনিভাবে দু’গ্রামের প্রায় ২০০ নারী, পুরুষ ও শিশুকে হত্যা করে। অনেক লোক রাস্তায়, কেউ ঘরে আবার কেউ সেতুর নীচে মৃত অবস্থায় পড়ে থাকে। পাক বাহিনীর এই অভিযান প্রায় ৮ঘন্টা ধরে চলে। পাক বাহিনীর সাহায্যকারী ইসলাম তাদের এ অপকার্যে সাহায্য করেছিল। যখন পাক বাহিনী দেখলো তাদের সাহায্যের আর প্রয়োজন নেই তখন পাক দস্যুরা ইসলামকেও হত্যা করে। প্রায় ২০০ মৃতদেহের মধ্যে জনগণ ২ জনের মৃতদেহকে সমাহিত করেছিল।

 

ঘোড়াশাল রেলষ্টেশনে পাক বাহিনীর একটা ক্যাম্প ছিল। দৈনন্দিন খাওয়ার যাবতীয় জিনিসপত্র গ্রামের নিরীহ লোকদের নিকট হতে জোর করে নিয়ে যেত। পাক পশুরা তাদের পশুত্ব চরিতার্থ গ্রামের যুবতী মেয়েদের উপর মাঝে মাঝে পাশবিক অত্যাচার চালাত। সত্যি কথা বলতে কি পাক বাহিনী সমগ্র ঘোড়াশাল গ্রামে একটা সন্ত্রাসের রাজত্ব সৃষ্টি করে। ঘোড়াশাল বাজার বন্ধ হয়ে যায়, স্কুলে কোন ছাত্র আসত না। গ্রাম প্রায় জনশুণ্য ছিল। যদিও দু’একজন বাঙ্গালী দেখত, তাদের ধরে নিয়ে যেত কাজ করার জন্য। তখন মনে হতো আমার জীবনের মুল্য এক পয়সাও নয়। হঠাৎ একদিন পাক বাহিনী আমাকে এবং আর অনেক লোককে ধরে ফেলে। মুসলমান ছিলাম বলে বেঁচে যাই।

 

স্বাক্ষর/-

মোঃ মাহমুদুল আশরাফ

 

গুরু গোলাপ

<৮, ২.১.২১,৫০>

 

শাহ মোহাম্মদ ফরিদ

ডি,সি, টাঙ্গাইল।

 

গোয়ালন্দের এস,ডি,ও থাকাকালে পাক বাহিনী আমাকে গ্রেফতার করে ঢাকা সেনা নিবাসে আটক রাখে। তারপর আমাকে ৩রা জুন ১৯৭১ সাল পর্যন্ত জয়দেবপুরে ভাওয়াল রাজার বাড়ীতে বন্দী রাখে। এই সময় নানা প্রকার শারীরিক অত্যাচারও করা হয়।

 

জুনের ৪ তারিখে আবার ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে একদিনের জন্য রাখে। সেই রাতে আমার উপর অনেক অত্যাচার করা হয়। পরেরদিন আমাকে সেকেন্ড ক্যাপিটালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ২১ শে সেপ্টেম্বর অবধি বন্দী রাখা হয়। এ সময় আমাকে নানা প্রকার শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার এবং প্রশ্নোত্তর করা হয়।

 

৩রা সেপ্টেম্বর তারিখে বিভিন্ন অভিযোগে সম্বলিত চার্জশীট দেওয়া হয়।

 

২১শে সেপ্টেম্বর তারিখে আমাকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়। কারাগারে বাঙ্গালী কর্মচারীরা আমাকে সকল প্রকার সাহায্য করে এবং যথাসাধ্য আরাম আয়েশে রাখার চেষ্টা করে। আমার সাথে অনেক সরকারী কর্মচারীদের মধ্যে ফরিদপুরের তদানীন্তন জেলা প্রশাসক (বর্তমানে রেজিস্ট্রার, কো-অপারেটিভ সোসাইটি) জনাব আ,ন,ম ইউসুফ, মাদারীপুরের মহকুমা প্রশাসক সৈয়দ রেজাউল হায়াত (বর্তমানে ঢাকার ডি,সি) বন্দী ছিলেন। আমরা সবাই বিচারাধীন আসামী ছিলাম।

 

১৭ই ডিসেম্বর শুক্রবার সকালে আমরা ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে বেরিয়ে আসি। গোয়ালন্দে আমার হুকুমে পাক বাহিনীর সাথে যুদ্ধে কুষ্টিয়া ৩০-৩১শে মার্চ ১৯৭১ আছমত ও কুদ্দুস নামে গোয়ালন্দ মহকুমার দু’জন আনসার শহীদ হয়। গোয়ালন্দে ঘাটে ২১শে এপ্রিল পাক বাহিনীর সাথে যুদ্ধে ফকির মহিউদ্দিন নামে আর একজন আনসার শহীদ হয়। এছাড়াও তিনজন আনসার কুষ্টিয়া যুদ্ধে আহত হয়। তাদের নাম আয়িউর, রব ও জিয়াউদ্দিন। গোয়ালন্দ মহকুমার আর একজন আনসার নুরুই ইসলাম আমার সাথে বন্দী ও দীর্ঘ যন্ত্রণাভোগের পর ১৭ই ডিসেম্বর মুক্তি পায়। আমি গ্রেফতার হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত গোয়ালন্দ মহকুমার দলমত নির্বিশেষে সকল জনসাধারণের এবং সর্বস্তরের সরকারী কর্মচারীদের পূর্ণ সহযোগীতা লাভ করেছিলাম।

 

স্বাক্ষর/-

শাহ মোহাম্মদ ফরিদ

২৫-৭-৭৩

 

 

জেসিকা গুলশান তোড়া

<৮,২.১.২২,৫১>

 

শরীফ উদ্দিন আহমদ

গ্রামঃ তারটিয়া

ডাকঘরঃ তারটিয়া ভাতকুড়া

টাঙ্গাইল

 

“১৯৭১ সনের ১০ই জুন তারিখ বিকাল ৪ টায় টাঙ্গাইল শহরের জেলা সদর রাস্তা হতে ১০ জন রাজাকার ও ৫ জন কুখ্যাত পাক বাহিনীর লোকেরা আমাকে ধরে টাঙ্গাইল জেলা সদরে তাদের আড্ডায় নিয়ে যায়। আমাকে রাস্তায় কোন দিকে তাকাতে দেয়না। আমাকে প্রথমে প্রশ্ন করে ভোট কোথায় দিয়েছ। আমি বলি নৌকায়। এই কথা বলার পর দুজন রাজাকার ও দুইজন পাক সৈনিক আমার উপর হান্টার ও চাবুক দ্বারা প্রহার আরম্ভ করে। তিনটা হান্টার ভাঙ্গার পর অজ্ঞান অবস্থায় আমাকে একটা পচা গন্ধ ভরা কামরায় রেখে চলে যায়। তিনদিন আমাকে কিছু খেতে দেয় নাই। দৈনিক তিনবার করে আমাকে প্রহার করতো। এইভাবে ৫ দিন প্রহার করার পর আমার শরীর ফুলে পচে যায়। এরপর ৬ষ্ঠ দিনে তারা আমাকে কারেন্ট মারে। কারেন্টের ধাক্কা লেগে দুইবার আমি ছিটকে পড়ে যাই। তারপর কি হয়েছে আমি জানিনা। সারাদিন পর অজ্ঞান অবস্থা থেকে জেগে উঠে দেখি আমার সর্বাঙ্গ রক্তাক্ত মেঝে রক্তে ভেসে গেছে। এরপর অত্যাচারের মাত্রা কমে যায়-দৈনিক একবার করে ১৯ তারিখ পর্যন্ত অত্যাচার চলে। ১৯ তারিখের পর আমি প্রায়ই অজ্ঞান অবস্থায় থেকেছি। এর মধ্যে আমি নিজ চক্ষে প্রতিদিন একদল করে লোক রাত্রি বারটার পর আড্ডার উত্তর দিকে নিয়ে যেতে দেখেছি। তাদের আর ফিরতে দেখি নাই। নিয়ে যাওয়ার পর দূর থেকে শুধু প্রতি মুহূর্তে বিকট একটি করে আওয়াজ শুনেছি। এই অবস্থায় ১৭ দিন আমাকে রাখার পর ২৭ তারিখে মৃত মনে করে ফেলে দেয়। আমার একজন পরিচিত লোক মৃতদেহের ভান করে আমাকে রিকশা করে বাড়ীতে পাঠিয়ে দেয়।“

 

স্বাক্ষর/-

শরীফ উদ্দীন আহমদ

 

 

জেসিকা গুলশান তোড়া

<৮,২.১.২৩,৫২>

 

কামিনী কুমার দাস

সার্কেল অফিসার (ডেভেলপমেন্ট)

রায়পুরা, ঢাকা

 

“আমার রায়পুরা থানায় তখন ২২ টি ইউনিয়ন ছিল। বর্তমানে এখানে ২৮ টি ইউনিয়ন। এখানে ৪ লাখ লোকের বাস। রায়পুরা থানায় ২২ টি ইউনিয়নের মধ্যে মেঘনা নদীর দ্বীপ চরে ৫ টি ইউনিয়ন (বর্তমানে অবস্থিত). এলাকা ১৫৪ বর্গ মাইল। অত্র থানার পরিধির মধ্যে ৫টি রেলওয়ে ষ্টেশন আছে। আমার প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে পাক বাহিনীর হেডকোয়ার্টার ছিল। তখন হেডকোয়ার্টার হতে হানাদারদের পৈশাচিক কার্যকলাপ পরিচালনা করত। চর এলাকার দু’টি ইউনিয়ন ও বাকি ইউনিয়নের মধ্যে ১৫টি ইউনিয়নে প্রজ্বলন কার্য চালায় হানাদাররা। যেহেতু রায়পুরা থানার মধ্য ভাগ দিয়ে রেল রাস্তা অবস্থিত। ফলে রেল রাস্তার উভয় দিকের গ্রাম ও অভ্যন্তরেও পাক হানাদাররা বাড়ীঘর জ্বালিয়ে দেয় ও নৃশংসভাবে জনসাধারণকে হত্যা করে। অত্র থানার বেগম ইউনিয়নে মুক্তিযোদ্ধাদের সহিত পাক বাহিনীর প্রচন্ড সংগ্রাম চলে। ইহা ব্যতীত মীর্জানগর ইউনিয়নের হাঁটুভাঙ্গা ও মোছাপুর ইউনিয়নের রামনগর গ্রামে কয়েকবার পাক বাহিনীর সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের খন্ড যুদ্ধ হয়। পাক বাহিনীকে ঘায়েল করা হয় এবং কয়েকজন পাক বাহিনী নিরস্ত্র জনতার হাতে মোছাপুর ইউনিয়নে ও মীর্জানগর ইউনিয়নে ধরা পড়ে। তাদের পরে হত্যা করা হয়। থানা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে পাক বাহিনীরা ছাউনী খুলে থানা ব্যাপী জনসাধারণের মাঝে সন্ত্রাসের সৃষ্টি করে এবং নিরীহ জনসাধারণকে হত্যা করে প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে কবরস্থ করে। গণকবর এখনও বিদ্যমান রয়েছে। কয়েকজনকে জোরপূর্বক ধর্মান্তর করে। ধর্মান্তরিত লোককেও বেদম প্রহার করে অত্যাচার করে এবং একজনকে হত্যা করে। থানার প্রত্যেকটি বাজার ওরা লুট করে। এছাড়াও গ্রামে গ্রামে ঢুকে হানাদাররা রাজাকারদের সহায়তায় লুটতরাজ করেছে। থানা পুলিশ ষ্টেশনও হানাদারদের প্রজ্বলন থেকে বাদ পড়েনি।“

 

স্বাক্ষর/-

কামিনী কুমার দাস

৬/১১/৭৩

 

 

জেসিকা গুলশান তোড়া

<৮,২.১.২৪,৫৩>

 

মোঃ আবদুল হাই

সাংঃ শাটিয়াচড়া

ডাকঘর-জামুকী

থানা-মির্জাপুর

জেলা-টাঙ্গাইল

 

আমাদের গ্রামের নিম্নলিখিত ব্যক্তিগণ শহীদ হয়েছেনঃ-

 

১| মোঃ জোমারত আলী দেওয়ান।

২| মোঃ নুর বকস

৩| মোঃ শাহ আলম

৪| মোঃ জাহাঙ্গীর আলম

৫| মোঃ হাবিবুর রহমান

৬| মোঃ দুলাল মিয়া

৭| মোঃ আব্দুল হাকিম

৮| বেগম আকতারুজ্জামান

৯| মোঃ লেবু মিয়া

১০| বেগম এখলাস উদ্দিন

১১| মোঃ ইব্রাহিম

১২| আব্দুল হক

১৩| বেগম মাজেম আলী

১৪| মোঃ মোতালেব হোসেন

১৫| মোঃ দুদু মিয়া

 

গুড়ান গ্রামের শহীদদের নামঃ-

১| মোঃ তোফাজ্জল হোসেন

২| মোঃ চেনু মিয়া

৩| মোঃ আবুল কাশেম

৪| মোঃ নূর উদ্দিন

৫| মোঃ জাহাঙ্গীর মিয়া

৬| মোঃ আবুল মাষ্টার

৭| মোঃ মজিবর রহমান

৮| মোঃ সামছুল হক

৯| বেগম নূরু ইসলাম

১০| আজমত আলী

১১| পান্না মিয়া

১২| বেগম আব্দুল বাকী মিয়া

 

৩রা এপ্রিল পাক বাহিনী ১৫০ খানা বাড়ীঘর সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়। পাক বাহিনীর দালাল আমাদের গ্রামের দুইজন মহিলাকে ধরে পাক শিবিরে নিয়ে তাদের উপর পাশবিক অত্যাচার করে।

 

 

 

ইশতিয়াক মাহমুদ টিপু

 

<৮,২.১.২৫,৫৪-৫৫> “পাকিস্তানি ক্যাপ্টেন সব শুনে আমার সাথে হ্যান্ডশেক করে বলে তোমার বাঙ্গালীরাই তোমার শত্রু, আমরা কি করবো?”

-আবুল কালাম আজাদ, নাগপুর, টাঙ্গাইল।

“১৬ই এপ্রিল টাঙ্গাইলে ডি, সি, জালাল আহমেদ সাহেব এবং এস, পি, নুরুজ্জামান সাহেব আসেন লুঙ্গী পরা অবস্থায়। সব ঘটনা বলেন এবং ২/৩ দিন থাকেন আমার ওখানে গোপনে। ওদের বন্ধু ছিলেন টাঙ্গাইলের জনাব আযম খান। ওর সাথে আলাপ করে ঠিক করা হয় কাজে যোগ দেয়ার।

আযম খান গাড়ী নিয়ে এসে নিয়ে গেলেন। এই খবর পাক গোয়েন্দা বিভাগ জেনে ফেলে আযম খানের বাড়ী ঘিরে ফেলে। ওদের তিনজনকে ব্যাপক মারধোর করে ঢাকায় পাঠিয়ে দেয়। ঢাকাতে কয়েকদিন অত্যাচার করে জবানবন্দী নিয়ে তিন জনের জবানবন্দী এক হওয়ায় তাঁরা ছাড়া পান। প্রতিটি স্টেটমেন্টে আমার কথা ছিল। এমনকি আযম খানকে যে চিঠি পাঠিয়েছিলাম সেটিও পাক কর্তৃপক্ষের হাতে গিয়েছিল। আমি সবসময় মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত ছিলাম। শেষ পর্যন্ত ওরা মুক্তি পেয়েছেন শুনে শান্তি পেলাম। ডি, সি, ও এস, পি ৩০শে এপ্রিলের দিকে কাজে যোগ দেন।

১০ই মে ডি, সি’র ওখানে সভাতে পাক ক্যাপ্টেনের কথা গুলি বলেন। সভা শেষে ডি, সি সাহেব গোপনে আমাকে ডেকে বললেন সাবধানে থেকো আর হিন্দুদেরকে বলো সাবধানে থাকতে, পূজাগুলো এখন বন্ধ রাখতে বলো- বাঁচলে অনেক কিছু করতে পারবে। আমি সে মোতাবেক রাত ১০টায় পৌছে সবাইকে ডেকে এ খবর দেই; তারা সেই মত সাবধানতা অবলম্বন করে।

ভোর রাতে প্রচুর শব্দে ঘুম ভেঙ্গে যায়। বাড়ীতে সবাই কান্নাকাটি শুরু করে দেয়। দেখলাম পাক সেনারা তিনদিক থেকে নাগপুর আক্রমন করেছে- অত্যাচার চালাচ্ছে। আমরা গেলাম ক্যাপ্টেনের কাছে, ক্যাপ্টেন বলল তুমিই সেই ম্যাজিস্ট্রেট যে জামুর্কীতে আমার বিরুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধা পাঠিয়েছিলে। তুমিতো গতকাল হিন্দুদেরকে পালিয়ে যেতে বলেছ। আমি চুপ থাকলাম। ক্যাপ্টেন আমাকে খুব গালাগালি করলো, সে কিছু হিন্দু ধরে এনে বেয়নেট চার্জ করতে লাগলো। আমার খবর শুনে রাতেই অধিকাংশ হিন্দু পালিয়ে গিয়েছিল। ফলে বহু লোক সেদিন বেঁচে যায়।

ক্যাপ্টেন আমাকে এক ঘণ্টা সময় দেয় যে এর মধ্যে ১০০ হিন্দু এনে দিতে হবে। নইলে একটি বুলেট তোমার জন্য বলেই এক চড় মারে। আমি এডামেন্ট হয়ে বেশ কথা কাটাকাটি করলে ক্যাপ্টেন নরম হয়ে আমাকে গাড়ী করে নিয়ে যায়। থানায় গিয়ে দেখলাম ৮/১০ জন নিরীহ লোককে হত্যা করার জন্য রেখেছে। আমি ওরা ঝাড়ুদার বলে ওদেরকে বাঁচাই। ডাঃ কাশেম (ডেন্টিস্ট) এবং ম্যারেজ রেজিষ্টার আমার বিরুদ্ধে টিক্কা খাঁর নিকট দরখাস্ত করেছিল মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে কাজ করায়।

ঐ দিন পাক সেনারা সামনে যাদেরকে পেয়েছে তাকেই গুলি করে হত্যা করেছে। থানায় যেতে গিয়ে রাস্তায় বিভিন্ন স্থানে মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখলাম। বার ঘাট, বাড়ী-ঘর সব ওরা লুট করে নেয়।

আমাকে এক জায়গায় বসিয়ে রেখে ক্যাপ্টেন চলে যায়। আধ ঘন্টা পরে ডেকে পাঠায়। যাওয়ার সাথে সাথে ক্যাপ্টেন আমার বুকে রিভিলবার ধরে অকথ্য ভাষায় গালাগালি করে মারধোর শুরু করে। সেখানে ২০/২৫ জন হিন্দু লোককে শুইয়ে রেখেছে দেখলাম। চারদিকে সিপাইরা বেয়নেট উঁচিয়ে ঘিরে ধরলো। আমার বিরুদ্ধে চার্জ দিল আমার বাড়ী থেকে নাকি ৬ রাউন্ড গুলি ছুড়েছে পাক সেনাদের উপর। অনেক কাকুতি করে ১ মিনিট বলবার সুযোগ পাই। বেশ কিছুক্ষণ পাকিস্তানের পক্ষে মিথ্যা-সত্য বলে ক্যাপ্টেনকে কনভিন্স করি। ক্যাপ্টেন সব শুনে আমার সাথে হ্যান্ডশেক করে বলে তোমার বাঙ্গালীরাই তোমার শত্রু, আমরা কি করবো? তারাই তোমার বিরুদ্ধে বলেছে। থানাতে গেলে ২৫/৩০ জনকে গুলি করার আদেশ দেয়। আমি বললাম এরা সবাই কৃষক, এদের মেরে কি করবে? ক্যাপ্টেন জিজ্ঞাসাবাদ করে কিছু মার দিয়ে দুই জন বাদে সবাইকে ছেড়ে দেয়। আমার বাড়ীর সবাই বেঁচে যায়। নির্ঘাত মৃত্যুর হাত থেকে সেদিন বেঁচে গেলাম।

২৮ মে মুক্তিবাহিনী নাগপুর আক্রমন করে। আমার ওখানে ওয়ারলেস সেট ছিল সেটি নিয়ে যায়। কাশেম ডাক্তারকে ধরে হত্যা করে। ম্যারেজ রেজিষ্টার পালিয়ে যায়। আমি পালিয়ে টাঙ্গাইল চলে যাই পাক সেনাদের ভয়ে।

নারী ধর্ষণ, প্রজ্জলন ধ্বংস পাক সেনারা করেছে।

স্বাক্ষর/-
আবুল কালাম আজাদ
১৬/৮/৭৩

 

ইশতিয়াক মাহমুদ টিপু

<৮,২.১.২৭,৫৬>
মোঃ কাজেম আলী
গ্রাম- ফুলদেহের পাড়া
ডাক- পিংনা
থানা- সরিষাবাড়ী
জেলা-ময়মনসিংহ।

হানাদার বাহিনী আমাদের গ্রামের ১৪ জন যুবককে নৃশংসভাবে হত্যা করে এবং ৯জন মুক্তিফৌজকে হত্যা করে। গ্রামবাসী অনেকেই পার্শ্ববর্তী গ্রামে আশ্রয় নেয়। যুদ্ধের শেষে গ্রামে এসে দেখি রোজ কেয়ামত আর কি? দাফন কাফন করার মানুষ পাওয়া যায় না।
আমাদের গ্রামে যে কয়েকজন শহীদ হয়েছেন তাদের নাম লিপিবদ্ধ করলামঃ-
মোঃ নুরুল ইসলাম, বি,এ; মোঃ আমিনুল ইসলাম; মোঃ মতিয়ার রহমান; মোঃ কাঙালীয়া; মোঃ আবদুল হালিম; মোঃ জামাত আলী; মোঃ আনোয়ার হোসেন; মোঃ ছেকান্দর আলী; মোঃ আছমত আলী; মোঃ মোনছের আলী; মোঃ মুসলিম উদ্দিন; মোঃ বাবুল হোসেন; মোঃ আবদুস সামাদ; দুদু মিয়া।

স্বাক্ষর/-
মোঃ কাজেম আলী

 

ইশতিয়াক মাহমুদ টিপু

<৮,২.১.২৮,৫৭> “ভূপতি বাবুর অন্তিম ইচ্ছা কি জানতে চাইলে তিনি প্রথমে প্রাণের বিমিময়ে ইসলাম ধর্মে দিক্ষা নেবার কথা জানান; কিন্তু পাক ক্যাপ্টেন তা সঙ্গে সঙ্গে নাকচ করে দেয়। তখন ভূপতি বাবু জীবনের শেষ বারের মত একটা গান গাইতে চান। উল্লেখ্য যে তিনি একজন গুণী শিল্পীও ছিলেন। তার আরজি মঞ্জুর হলে তিনি যে গানটি গান তাতে উপস্থিত জনগণ কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। পাক হানাদাররাও সঙ্গীতের মূর্ছনায় বিগলিত হয়ে পড়ে, কিন্তু এতদসত্ত্বেও ভূপতি বাবু রক্ষা পান নাই।“

 

-খাজা কামরুল হক
গ্রাম- নওয়া
পোষ্ট- কিশোরগঞ্জ
ময়মনসিংহ।

“সর্বপ্রথম ১৯৭১ সালের ১৮ এপ্রিল পাক হানাদার বাহিনী কিশোরগঞ্জ মহকুমার সদর এলাকায় প্রবেশ করে। ভৈরব হতে ট্রেন যোগে প্রায় দুই শতাধিক হানাদার সৈন্য ভারী অস্ত্র-শস্ত্রে সজ্জিত হয়ে ঐদিন বিকাল ৪ ঘটিকায় কিশোরগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশনে উপস্থিত হয়। এই খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শহরের সমস্ত লোক তাদের বাড়িঘর ত্যাগ করে দিকবিদিক জ্ঞানশুন্য হয়ে গ্রামের দিকে পালিয়ে যায়। মুক্তি সংগ্রামীরাও তাদের হালকা অস্ত্র-শস্ত্র ফেলে দিয়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। পাক সৈন্যরা শহরের মধ্যে প্রবেশ করে পলায়নপর লোকদের উপর নির্বিচারে গুলি চালায়। তাদের প্রথম বলি হয় জনৈক রিক্সাওয়ালা এবং একজন হিন্দু সন্যাসী। সন্ধ্যার সময় তারা মাইকযোগে স্থানীয় সকল লোককে নিজ নিজ বাসভবনে ফিরে আসার জন্য আসার জন্য আহবান জানায়; কিন্তু কেউ কর্ণপাত করে না। এ সময় জনৈক ধর্মান্ধ দালালের ইশারায় তারা এখানকার পতিতালয়টি সম্পূর্ণ ভস্মীভূত করে দেয়। পরদিন পাক সৈন্যরা মাইকযোগে পুনরায় লোকজনকে ফিরে আসার আহবান জানায়। যে সমস্ত দোকানপাট হিন্দুদের ছিল সেগুলি তালা ভেঙ্গে লুট করার জন্য জনসাধারণকে বাধ্য করতে থাকে। ভীতসন্ত্রস্ত জনগণ লুটের মাল মাথায় নিয়ে বেরিয়ে আসার সময় পাক সেনারা সে অবস্থায় তাদের কিছু সংখ্যকের ফটো তুলে নেয় এবং তারপর সঙ্গে সঙ্গে গুলি করে হত্যা করে।
মে মাসের প্রথম দিকে ভৈরব থেকে আরো কিছু সংখ্যক সৈন্য আসার পর তারা স্থানীয় ডাক-বাংলোয় ঘাঁটি স্থাপন করে এবং পি,ডি,পি জামাতে ইসলামী, মুসলিম লীগ, নেজামে ইসলামের লোকজনকে নিয়ে এক শান্তি কমিটি গঠন করে।

এরপর হানাদার সৈন্যরা স্থানীয় দালালদের সহায়তায় রাজাকার ও আল-বদর বাহিনী গঠন করে। এদের সহযোগে তারা বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে এবং কোন কোন ক্ষেত্রে নির্বিচারে ও কোথাও কোথাও বেছে বেছে লোককে হত্যা করতে থাকে।

১৮ই এপ্রিল থেকে ১৬ই ডিসেম্বর পর্যন্ত এই আট মাসে পাক হানাদাররা কিশোরগঞ্জ সদর এলাকায় ৩০০ থেকে ৪০০ লোককে হত্যা করেছে এবং এক কোটি টাকার মত সম্পত্তির ক্ষতি সাধন করেছে। গাঙ্গাকিয়া গ্রামের বিশিষ্ট পরোপকারী জমিদার ভূপতি বাবুকে নির্মমভাবে হত্যা করে। জুন-জুলাই মাসের দিকে একদিন পাক সেনারা ভূপতি বাবুর বাড়ী ঘেরাও তাঁকে ধরে ফেলে। স্থানীয় জনগণকে তার বাড়ী লুট করাতে বাধ্য করে। ভূপতি বাবুর অন্তিম ইচ্ছা কি জানতে চাইলে তিনি প্রথমে প্রাণের বিমিময়ে ইসলাম ধর্মে দিক্ষা নেবার কথা জানান; কিন্তু পাক ক্যাপ্টেন তা সঙ্গে সঙ্গে নাকচ করে দেয়। তখন ভূপতি বাবু জীবনের শেষ বারের মত একটা গান গাইতে চান। উল্লেখ্য যে তিনি একজন গুণী শিল্পীও ছিলেন। তার আরজি মঞ্জুর হলে তিনি যে গানটি গান তাতে উপস্থিত জনগণ কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। পাক হানাদাররাও সঙ্গীতের মূর্ছনায় বিগলিত হয়ে পড়ে, কিন্তু এতদসত্ত্বেও ভূপতি বাবু রক্ষা পান নাই। পরে তাঁকে অমানুষিক নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে। এছাড়াও কিশোরগঞ্জের গুরু দয়াল কলেজের ছাত্র চিস্তিসহ কয়েকজন ছাত্রকে পাক ফৌজরা হত্যা করেছে।

কিশোরগঞ্জ থানার বিভিন্ন এলাকা থেকে যুবতী মেয়েদেরকে তারা ধরে এনে ধর্ষণ করতো। প্রায় শতাধিক জনের উপর তারা নির্যাতন চালিয়েছে।

স্বাক্ষর/-
খাজা কামরুল হক
৫/৪/৭৩

 

ইশতিয়াক মাহমুদ টিপু

<৮,২.১.২৯,৫৮> শ্রী জ্ঞানেন্দ্রনাথ পোদ্দার
গ্রাম- জামুর্কী
থানা- মির্জাপুর
জেলা- টাংগাইল।

“১৯৭১ সালের ১০ই নভেম্বর পাক বাহিনী আমাদের গ্রামে আসে। আমি পালাতে চেষ্ট করছি। এমন সময় একজন পাক দস্যু আমাকে ডাকিয়ে তার সামনে হাজির করলো। আমাকে বলল, “চল বেটা আমাদের শিবিরে”। পাক শিবিরে নিয়ে পাক বাহিনী গাড়ীতে করে আমাকে অন্য এক শিবিরে পাঠিয়ে দিল। শিবিরে নিয়ে আমাকে নানা রকম প্রশ্ন করতে লাগলো। আমাকে বলে, “তোদের গ্রামে কোন মুক্তিবাহিনী হ্যায়?” তখন উত্তর দেই, আমাদের গ্রামে কোন মুক্তিবাহিনী নেই। এই কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে আমাকে লাঠি দিয়ে বেদমভাবে প্রহার করলো। তারপর অন্য একজন রাজাকার এসে আমাকে বলে বেটা মালাউন হ্যায়। বেটাকে নৌকা মার্কায় ভোট দেয়া দেখাচ্ছি। এই বলার সঙ্গে সঙ্গে আমাকে বেতের লাঠি দিয়ে ভীষণভাবে প্রহার করলো। আমি তখন অজ্ঞান হয়ে মাটিতে পড়ে রইলাম। তারপর আমার যখন যখন জ্ঞান ফিরে এলো তখন আমাকে একটি নদীর ধারে নিয়ে গেল, আমি মনে করলাম আমার জীবনের শেষ লীলা এখানে বুঝি শেষ হবে। আমাকে প্রথমে মাটির উপর চিৎ করে শুইয়ে রাখলো। কিছুক্ষন পর এক জন পাক দস্যু এসে আমাকে ভীষণভাবে লাথি মারলো এবং বেয়নেট দিয়ে আমাকে পেটের উপর আঘাত করলো। এই আঘাতে আমার জীবন শেষ হয়ে যায়। তখন আমি কোন রকমে জল টেনে মাটির উপর ভর করে থাকি। কোন রকমে সাঁতার কেটে নদীর ওপারে যেয়ে আঘাত স্থানে গেঞ্জি দিয়ে বেঁধে বহু কষ্ট করে নদীর জল হতে উঠে কোন রকমে আমার বাড়িতে চলে আসি।

বাড়িতে ডাক্তার এসে ভালো করে ব্যাণ্ডেজ করে দিল।

 

আজ পর্যন্ত আমার ক্ষতস্থানে তার চিহ্ন রয়েছে।

 

স্বাক্ষর/-
শ্রী জ্ঞানেন্দ্রনাথ পোদ্দার।

 

ইশতিয়াক মাহমুদ টিপু

<৮,২.১.৩০,৫৯>

মজিবর রহমান
গ্রাম- জামুর্কী
থানা- মির্জাপুর
জেলা- টাংগাইল।
১৯৭১ সালের ৭ই অগাস্ট পাক বাহিনী আমাদের গ্রামে আসে। আমি ঐ সময় আমাদের গ্রামে দক্ষিন পার্শ্বে বসে ধান কাটছিলাম। এমন সময় দুই জন পাক বাহিনী এসে আমাকে ধরে নিয়ে, “তোদের গ্রাম থেকে আমাদের হাঁস-মুরগী ধরে দিতে হবে”। আমি তখন বাধ্য হয়ে হাঁস-মুরগী ধরে পাক বাহিনীর হাতে দিলাম। তারপর আমাকে বলল তোদের গ্রাম থেকে ছাগলও দিতে হবে। ছাগল এনে হাতে দিলাম। তখন আমাকে বলল, “ছাগল নিয়ে তোকে আমাদের ক্যাম্পে যেতে হবে”। তখন আমি নিরুপায় হয়ে পাক শিবিরে চললাম।

পাক শিবিরে নিয়ে আমাকে রান্না করতে বলল। তখন আমি বললাম, “হুজুর আমি পাক করতে জানিনা”। তখন আমাকে ঘাড় ধরে পানিতে ফেলে দিল। আমাকে আর পানি হতে উঠতে দেয় না। আমি জোর করে পানি হতে উঠলে আমাকে পাদুকা দিয়ে লাথি মারলো এবং বেতের লাঠি দিয়া প্রহার করতে থাকে। বেতের লাঠি দিয়ে প্রহার করলে আমি অজ্ঞান হয়ে পড়ি। তখন আমাকে রেখে পাক দস্যুর দল চলে যায়। তখন আমি কোন মতে বাড়ীর পথে রওয়ানা হই। আমি বাড়ীতে এলে আমার ছেলে রেজাউল ইসলাম ডাক্তার ডেকে এনে আমার চিকিৎসার ব্যবস্থা করে।

 

এই চিকিৎসা বাবদ মোট ৩০০ টাকা খরচ হয়।

 

টিপসহি
মজিবর রহমান।

 

ইশতিয়াক মাহমুদ টিপু


<৮,২.১.৩১,৬০-৬৩>

মোঃ ওয়াছিম উদ্দিন

গ্রাম- সরিষাবাড়ী
ডাকঘর- সরিষাবাড়ী
ময়মনসিংহ।

“আমার বাস হতে সরিষাবাড়ী থানার পাক বাহিনীর শ্রেষ্ঠ কসাইখান আরামনগর মাদ্রাসা মাত্র কয়েকশ গজ দূরে অবস্থিত। আমি ছোট বেলা থেকেই অর্থাৎ আওয়ামীলীগের সৃষ্টি হতেই তার সমর্থক।

 

২৫শে মার্চের কালো রাতের বিভীষিকার পর থেকেই আমি সংগ্রামে ওতপ্রোতভাবে জড়িত হই। আমার ধানটা মহল্লায় গোবিন্দনগর নিবাসী অফিল উদ্দিন খান নামক একজন বাঙালী প্রাক্তন সৈনিক দ্বারা ২৫ জন যুবককে রাইফেল-ট্রেনিং এর ব্যবস্থা করি। কিন্তু হঠাৎ টাঙ্গাইল, মধুপুর ও জামালপুর পাক বাহিনীর দখলে যাওয়ায় আমরা প্রকাশ্যে ট্রেনিং এর ব্যবস্থা করি। সরিষাবাড়ীতে রাজাকার আল-বদরদের প্রাধান্য বাড়ে। পাক বাহিনীও যাতায়াত করতে থাকে।

 

২রা জুলাই ১৯৭১ইং রোজ শুক্রবার জুম্মার নামাজের পর থেকে বাসায় বসে আছি। বসেছিলাম একদম নিরিবিলি। বেতারের খবর শুনতেও মন বসছিলনা। ক্রমে সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত হল। চোখে ঘুম নেমে এল। রাত ১০-১১টার পূর্বে কোনদিনই নিদ্রামগ্ন হইনি। কিন্তু সে দিন রাত আটটা বাজার আগেই ঘুমিয়েছিলাম।

রাত গোটা নয়েকের সময় বেশ কয়েকজনের পদচারনায় এবং আনাগোনায় আমার নিদ্রা ভঙ্গ হলো। আগুন্তকেরা পাক বাহিনীর লোক কিন্তু তারা এসেছিল মুক্তিফৌজের বেশ ধরে। তারা আমাকে চাপা গলায় ডাকতে শুরু করল। আমি তাদের অবিশ্বাস করতে পারি নি। তাই দরজা খুলে ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। তারা আমার সাথে চুপিসারে কথা বলতে থাকলো। আমার নিকট মুক্তিফৌজের জন্য কিছু চাঁদার আবদার জানালো। আমার নিকট তখন মাত্র ১৫ টাকা ছিল তাই তাদের হাতে দিলাম। এরপর তারা আমাকে বাউসার রেল সেতুটা কোন পথে গিয়ে চুরমার করা যাবে তাই দেখিয়ে দিতে বলল এবং এক প্রকার জোর করেই আমাকে এগিয়ে নিয়ে চলল রেল লাইনের দিকে। আমি কোন কিছু ভাববার ফুরসত পেলাম না। আমার পরণে ছিল তখন একখানা লুঙ্গী, গায়ে ছিল গেঞ্জি, পায়ে ছিল জুতা। গায়ে জামা দিবার অবকাশ ওয়া আমাকে দেয় নি। রেল লাইনে গিয়েই আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। ওরা মুক্তিফৌজ নয়! ক্যাপ্টেন শামশাদের বাহিনী। স্থানীয় আলবদর বাহিনীর ক্যাপ্টেন মাওলানা আনছার আলী, আবু, মুসলিম লীগ দালাল আঃ হক ফেরদৌসী ও নুরুল ইসলাম খান ও আরো অনেকে। সবাই মারাত্মক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত, হঠাৎ আমার পার্শ্বেই একটা ফাঁকা গুলি হল। আমি রীতিমত হকচকিয়ে গেলাম। সাথে সাথে আমার হাত পিঠমোড়া দিয়ে শক্ত করে বেঁধে ফেলল ওরা। আর বার বার আমার কানের কাছে জয় বাংলা বলে উপহাস করতে লাগল। জীবনের আশা নেই নিশ্চিত হয়ে পড়লাম। অদূরে আমার বাসা হতে পরিবার পরিজনের করুন কান্না ভেসে আসছিল। ক্যাপ্টেন শামশাদের হুকুমে ওরা আমাকে নিয়ে আরামনগর মাদ্রাসায় আলবদর ক্যাম্পে রওনা দিল। আমার পায়ের তলা হতে যেন প্রতি পলে পলে মাটি সরে যেতে লাগলো। কিভাবে মাদ্রাসা ক্যাম্পে পৌছে ছিলাম তা মনে নেই। ওরা আমাকে মাদ্রাসা ক্যাম্পে পাহারায় রেখে চলে গেল সাতপোয়া গ্রামের আঃ মজিদ চেয়ারম্যান সাহেবের বাড়ীতে। অল্পক্ষণের মধ্যে তাকে না পেয়ে ফিরে এলো ক্যাম্পে। এরপর আমার হাতের বাঁধন ঠিক আছে কিনা পরীক্ষা করে দেখলো। আবার যাত্রা শুরু হল রেল লাইন ধরে সোজা দক্ষিণের দিকে। এই পথে চলার সময় ওরা আমার সাথে যে ব্যবহার করেছিল, তা মনে করলে আজও আমার চোখ ফেটে কান্না আসে, আমি যেন একটা বদ্ধ পাগল। কেউ পেছন থেকে দেয় ধাক্কা কেউ দেয় রাইফেলের বাঁট দিয়ে পায়ে গুঁতা। কেউ পা দিয়ে পায়ে আঘাত করে ফেলে দিতে চায়। তাছাড়া উপহাস যা করছিল তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। আমাকে শ্বশুরবাড়ী পাঠাচ্ছে ওরা। সেখানে নাকি জয় বাংলা জয়গান শুনা যাবে ইত্যাদি। মনটা তিতিয়ে উঠলো ওদের ব্যবহারে কিতু করবার আমার কি আছে? ক্যাপ্টেন শামশাদের ৭৫ জন পাক বাহিনীর একটা দল, সাথে স্থানীয় আলবদর বাহিনী ও তাদের তাবেদার দালালবৃন্দ। এই নরপিশাচদের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া একটা বন্দী মানব সন্তানের পক্ষে সম্ভব কিনা তা আপনারাই বিবেচনা করুন। কোন মুহূর্তে অবস্থার কি পতিবর্তন আসবে আমি তা ঠাওর করতে পারলাম না। ক্রমে ওরা আমাকে নিয়ে চলে চান্দ দিঘীর রেল সেতুর উপর এসে পৌছল। ওরা আবার একদফা আমার হস্তের বন্ধন পরীক্ষা করে নিল। মানুষ সাগরে ডুবতে গিয়েও তৃণখন্ডকে আশ্রয় করে বাঁচতে চেষ্টা করে এ কথা পুঁথি পুস্তকে পড়েছিলাম। ষোল আনা বিশ্বাস করতে পারি নি। পুলের উপর এসেই আমার কেন জানি মনে হল পুলের নিচে ঐ অতল জলে ঝাঁপিয়ে পড়ে বাঁচবার চেষ্টা করা যায় নাকি। কি করবো মনস্থির করতে পারলাম না। ক্যাপ্টেন শামশাদ আমার পার্শ্বে চলছে, পুল পার হয়ে গেলাম, পশ্চিম পার্শ্বেই মোজাম্মেল হোসেন তালুকদার সাহেবের বাড়ী। ওরা দুই ভাগে ভাগ হল, হঠাৎ পণ্ডিত বাড়ীতে একটা ফাঁকা গুলি হল। তাদের অগ্রগামী দলটি ঐ বাড়ীতে ঢুকে পড়ল। পিছনের দলটি মাটিতে শুয়ে পড়লো রেল লাইনে। আমাকেও শুইয়ে দিল মাটিতে। কিছুক্ষণ পর ওরা ফিরে এল তালুকদার বাড়ী হতে। মোজাম্মেল হোসেন তালুকদারকে ওরা ধরতে পারে নি। আমি নিজের অসহায় অবস্থার মধ্যেও কিছুটা তৃপ্তি পেলাম, যেহেতু তালুকদার সাহেব আমার অবস্থায় নিপতিত হননি।

আবার যাত্রা শুরু হল দক্ষিণের দিকে। বেশি দূরে নয়; পুটিয়ার পাড় গ্রামে এসে ওরা থেমে পড়ল। আবার শুয়ে পড়লো মাটিতে। কয়েকজন গেল মতিলাল রায়ের বাড়ীতে। ওদের লোক মতিলাল বাবুর বাড়ী থেকে ফিরে এসে কি যেন জানাল। রেল লাইনে কয়েকজন মেশিনগান ফিট করে পাহারায় রইলো। বাদবাকি সবাই চলল মতি বাবুর বাড়ী। ক্যাপ্টেন শামশাদ আমাকে নিয়ে গেল তার সাথে, মতি বাবুর বাড়ীর সামনে এসে সবাই আবার শুয়ে পড়লো মাটিতে, আমাকে শুইয়ে দিল। কয়েকজন চলে এল এদিকে এবং মতিবাবুর বাড়ীর মধ্যে। মতিবাবুর বাড়ীতে কাউকে ওরা পেলনা। পাশের বাড়ী হতে ধরে নিয়ে এল একজন যুবককে।ওকে আমি চিনতাম, ওর নাম রাধা। রাধাকে যখন নিয়ে এল তখন ওর গলা লেপটে ধরে ছিল ওর একমাত্র মাতৃহারা শিশু কন্যাটি। স্ত্রীর মৃত্যুর পর থেকেই ও মেয়েটিকে মাতৃস্নেহে পালন করছিল। রাধার ঠাকুর মা বুড়ি এই মর্মান্তিক ঘটনা অবলোকন করার জন্য বেঁচেছিল, বুড়ি রাধার সাথে মতিবাবুর বাহির আঙ্গিনায় এসে হাজির হল। ক্যাপ্টেন শামশাদ তখন রাধার নিকট গিয়ে বুকে জড়ানো শিশুটিকে রাধার ঠাকুর মাকে দিতে বলল।

রাধা প্রাণপণ চেষ্টা করেও শিশুটিকে তার ঠাকুর মার কোলে দিতে পারলো না। মাতৃস্নেহ থেকে বঞ্চিত শিশুটি কিছুতেই পিতৃস্নেহ হতে যেন বঞ্চিত হতে চায় না। তাই সে কোমর বেস্ট করে পিতার বুকে মিশিয়ে পিতৃস্নেহের অসীম ধারা যেন উজাড় করে নিচ্ছিল। কিন্তু সে মাত্র ক্ষণিকের জন্য মাত্র। তারপর যে চিত্রের অবতারণা হল তা মনে করলে আজও আমার সংজ্ঞা লোপ পেতে চায়। তখন আমি পাথরে পরিণত হয়ে যাই। আমার মুখের ভাষা বন্ধ হয়ে যায়। তবু আমাকে বলতেই হচ্ছে। দুরাচার ক্যাপ্টেনের ইঙ্গিতে একজন হানাদার সৈনিক রাধার শিশুটির বুকের ফাঁক দিয়ে একটা রাইফেল ঢুকিয়ে এমনভাবে ঝটকা দিল যে শিশু ৭/৮ হাত দূরে ছিটকে পড়ে পা আছড়িয়ে ডুকরে কেঁদে উঠলো। আমার মনে হল আদিমাতা বিবি হাওয়া যেমনে ছিটকে পড়েছিলেন, বুড়িটাও হাউমাউ করে কেঁদে উঠে রাধার শরীর পিছন থেকে জড়িয়ে ধরলেন, ক্যাপ্টেন শামশাদ পিছন ফিরে তার বুকের উপর সজোরে লাথি মেরে চিৎপটাং করে ফেলে দিল। তারপর ওখানে কোন পরিবেশের সৃষ্টি হল তা অবলোকন করার ভাগ্য আমার হয়নি। ওরা রাধা সহ আরো কয়েকজনকে পিঠমোড়া দিয়ে বেঁধে রেল লাইনে এল, আমাকেও নিয়ে এল। লাইনে এসে পুনরায় আমার হাতের বাঁধন পরীক্ষা করে দেখলো। আমি এরপর হাত দুটি একটূ জোরে অথচ ওরা যেন দেখতে না পায় এমনভাবে ঘষা দিলাম, তাতেই মনে হল হস্তের বন্ধন শিথিল হয়ে গেছে। আমি বুঝতে পারলাম হাত খসে গেছে; তবু তা বাঁধা আছে এমনভাবেই রেখে দিলাম। ইতিমধ্যেই ওরা ধরে আনা লোকদের মধ্যে হতে ৪ জনকে লাইন করে বসিয়ে মেশিনগান দিয়ে দু-তিনটি গুলি করলো। নিরাপরাধ ৪টি মানুষ হুমড়ী খেয়ে পড়ে গেল মাটির বুকে।

আমি মাত্র ৭/৮ হাত দূরে থেকে এ দৃশ্য পর্যবেক্ষণ করলাম। তখন আমি প্রকৃতস্থ ছিলাম কিনা মনে নেই। শুধু এই মনে আছে আমার মাতাপিতা, স্ত্রী-পুত্র, কন্যা, আত্মীয়-স্বজন সবাই যেন আমাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে। সবাই যেন আমাকে বিদায় দিতে এসেছে আমি যেন মহাশুন্যের অভিযাত্রী। ওরা গুলি খেয়ে ঢলে পড়লো মাটিতে আর আমি তার আওয়াজ শুনে উঠতে থাকলাম শুন্যে। এমনিভাবে কতক্ষন গিয়েছিলাম মনে নেই পা তুলতে থাকলাম ক্রমাগত কিন্তু পায়ের নীচে মাটি আছে কিনা অনুভব করতে পারলাম না। অরা আমাকে নিয়ে ফিরে চলল উত্তরের দিকে। আমার সাথে আর একজন বাঁধা অবস্থায় এল। ওকেও আমি চিনতাম। তার নাম কালু। আমরা উভয়ে বন্দী অবস্থায় এগুতে লাগলাম পুনরায় চান্দ দিঘীর পুলের দিকে যেহেতু আমরা পূর্বপরিচিত তাই আমাদের মধ্যে পথের মাঝে কোন কথাবার্তা প্রকাশ্যে হয় নি। মনে মনে ভাবলাম মরতে তো হবেই তবু বাঁচার একটু চেষ্টা করি না কেন? তাতে ধরা পড়ি যদি তাতেই বা ক্ষতি কি? এদের হাতে গেলে জীবন যে ফিরে পাওয়া যায় না তাতো নিশ্চিত ছিলাম, তাই ভেতরে ভেতরে বাঁচবার জন্য তৈরী হয়ে নিলাম। সামনেই চান্দ দিঘীর পুল। আমার রক্ষার সোপান।

পুলের উপর পা বাড়ালাম। হানাদারেরা আমাকে মধ্যে রেখে দু’পাশ দিয়ে লাইন ধরে অগ্রসর হতে লাগল। আমি মিছিমিছিই টলতে লাগলাম। একবার এদিকে একবার ওদিকে পড়ে যাই যেন এমনিভাবে দেখাতে লাগলাম। পুলের দুই-তৃতীয়াংশ শেষে হয়ে গেল। আমার ইচ্ছের প্রতিফলন করতে পারলাম কই? ঘেমে উঠলো সারা গা নিরাশার অমানিশায়। এমন সময় হঠাৎ পুলের পূর্ব পাশ দিয়ে চলার ফুরসত পেলাম। এক পা, দু পা, তিন পা,আর নয়, সিঁড়িতে পা না দিয়ে শুণ্যস্থানে পা দিয়ে শরীর ছেড়ে দিলাম। পড়ে গেলাম পুলের নিচে। যার হাতে আমার হাত বাঁধা রশি ছিল সে আমাকে ধরে রাখতে পারল না। ওরা উপরে কি করছিল তা আমার খেয়াল নেই। আমি ততক্ষনে পুলের নিচে পাকা খাম্বার সাথে দেহটাকে মিলিয়ে আছি। সে মাত্র ক্ষণিকের জন্য পরেই ডুব। এক ডুব, দুই ডুব, তিন ডুব দিয়ে বেশ কিছুক্ষণ গিয়ে মাথা ভাসিয়ে দেখি ওরা টর্চলাইট দিয়ে আমাকে খুঁজছে। টর্চের আলোটা তীক্ষ্ণ ছিলনা তাই রক্ষা। ওরা পুল পার হয়ে গেল। আমি প্রাণপণে সাঁতরাতে শুরু করলাম। কিন্তু বিপদ যখন আসে একা আসেনা। আমার হাত বাঁধা রশিটা এক হাতে বাঁধাই ছিল। সাঁতরাবার সময় সেটা যে বিপর্যয় আনতে পারে তা আদৌ মনে হয় নি। এতক্ষণে তা ক্রমাগত তা আমার উরু বেষ্টন করে সন্তরন বন্ধ করে দিতে লাগল, এক পা এবং এক পা বন্ধ হয়ে গেল। ওটা ছাড়াবার জন্য চেষ্টা করে আরো পেরেশান হয়ে পড়লাম। তখন আমি চান্দ দিঘীর মাঝখানে অতল জলে। স্রোত নেই; বাঁধা পানি গা এলিয়ে দিলে শরীর ডুবে যায়। এক হাতে আর এক পায়ে সাঁতরে চলেছি। ওরা দেখতে পেলে যেকোন মুহূর্তে গুলি করবে, এই চিন্তায় আরো অস্থির হয়ে পড়লাম। পাক বাহিনীর হাত হতে নিষ্কৃতি পেয়ে এখন বুঝি সলিল সমাধী রচিত হবে। মনে হতে লাগলো মৃত্যু অবধারিত। পাক বাহিনীর গুলি হতে নিষ্কৃতি পেয়েছিলাম, সত্য কিন্তু ওদের রশি থেকে বুঝি মুক্তি নেই। খোলা হাত দুটি আস্তে আস্তে নাড়াতে লাগলাম। খোদার নাম জপতে থাকলাম, নিরুপায় সেই অন্তিম মুহূর্তে। এখনি হয়ত ডুবে যাব চান্দ দিঘীর কাজল জলে।

 

হঠাৎ একটা কচুরীপানার চাকা হাতে লাগলো। ওরই উপর একটু ভর দিলাম। আমাকে আশ্রয় দিল না, ডুবে গেল। আবার পেলাম আরেকটা চাকা সেখানে ঐ অবস্থা ঘটল। তবও নিঃশ্বাস কাটার অবকাশ পেলাম। এমনিভাবে ক্রমাগত কচুরীপানার উপর ভর রেখে চান্দ দিঘীর পশ্চিমে গিয়ে অবশের মত পড়ে রইলাম। কিন্তু আমাকে পড়ে থাকলে পড়বে কেন? আমি বাঁচতে চাই। ওরা যদি আমাকে খালের ধার দিয়ে খুঁজতে আসে। আমি পাশের পাত ক্ষেতের মধ্যে গড়িয়ে পড়লাম। আমার দাঁড়াবার ক্ষমতা নেই। দু তিন বার চেষ্টা করে দেখলাম দাঁড়াতে পারিনে। শরীর অবশ হয়ে গেছে। দাঁড়াতে গেলে পড়ে যাই। ওরা যেকোন মুহূর্তে আমাকে ধরতে পারে এই ভয়ে আমি আরো অস্থির হয়ে পড়লাম। শেষে হামাগুড়ি দিয়ে অগ্রসর হতে থাকলাম ক্রমাগত দক্ষিণ দিকে। রাস্তা বা ক্ষেতের আইল বাদ দিয়ে শুধু পাট ক্ষেত গুলির মধ্য দিয়ে এগুতে লাগলাম। দু-চার গজ করে যাই আর থেমে শুনি কোথাও কেউ আসছে নাকি। ভেকের ডাকে চমকে উঠি। জীবনের মায়া আর মৃত্যু ভাওয় কতখানি সেদিন হাড়ে হাড়ে উপলব্দি করেছিলাম। হামাগুড়ি দিয়ে পাটক্ষেত গুলির মধ্য দিয়ে এঁকেবেঁকে পৌছালাম গিয়ে মূল্বাড়ী গ্রামে আলহ্বাজ মৌলভী শাহেদ আলী সাহেবের বাড়ীতে। মৌলভী সাহেব আমার ছেলেমেয়েদেরকে ডেকে এনে আমার প্রাণ রক্ষা করলেন। তারপর মৌল্ভী সাহেব আমাকে মুক্ত এলাকায় পাঠিয়ে দেন। এইভাবে আমি পাক সেনাদের হাত থেকে আমি রক্ষা পেলাম।“
স্বাক্ষর/-
ওয়াছিম উদ্দিন।

 

 

ইশতিয়াক মাহমুদ টিপু

 

<৮,২.১.৬৪-৬৫> “পাক সেনারা আমাকে দোস্ত বলতো”

-শ্রী মনোরঞ্জন দত্ত
গ্রাম- সরিষাবাড়ী
ডাকঘর- সরিষাবাড়ী
থানা- সরিষাবাড়ী
জেলা- ময়মনসিংহ।

“বর্বর পাক ফৌজের অত্যাচারের কাহিনী বাংলার জনসাধারণ চিরদিন ঘৃণার সঙ্গে স্মরণ করবে। মানুষ ক্ষমতা এবং স্বার্থের মোহে কেমন ব্যবহার করতে পারে সেই দৃষ্টান্ত সামনে রেখে- শোষিত, অত্যাচারিত, ভদ্র বাঙ্গালী উদার নৈতিক মনুষ্যত্বের পথকে খুঁজে নেবার সুযোগ পাবে এবং তারা স্বাধীনতার সুবর্ণ স্বাদকে সুমধুর করে উপভোগ করার যোগ্যতা অর্জন করবে।

 

আমার মনে পড়ে শহীদ আবদুল হামিদ মোক্তার, শহীদ হাসান খান, শহীদ সুরেন দত্ত, শহীদ ধীরেন বাবু এবং সমাজসেবক ওয়াছিম উদ্দিন সাহেব এবং সাব-রেজিষ্টার আবদুল হাই সাহেব ও আমার নিজের অমানুষিক নিপীড়নের ইতিহাস। তখনও থানা পর্যায়ে পশ্চিমা অত্যাচারের কসাইখানা খোলেনি। একদিন আমাদের থানার দারোগা আমাকে এরেস্ট করে জামালপুর হাজতে চালান দিল। অপরাধ আমরা হিন্দু তার উপর ভারত বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামীদের সহায়তা করছে- গুরতর অপরাধ সুতরাং শাস্তি মৃত্যুদন্ড। হাজত থেকে আমাকে মিলিটারী ক্যাম্পে চালান দেয়। আমি ভাঙ্গা উর্দু বলতে পারি। পশ্চিমা জল্লাদরা তাই আমাকে মেরে ফেলার আগে আমাকে দিয়ে কিছু কাজ করিয়ে নেবার ফন্দি আঁটলো। আমার আয়ু বাড়িয়ে দিল কয়েকদিন। ওরা আমাকে দোস্ত বলে। আমি কোন ভরসা পাই না- আমার আত্মারাম খাঁচা ছাড়া। আমাকে বলে শুধু আল্লাহকে ডাক, ইত্যাদি আশ্বাস দিয়ে আশ্বস্ত করে এবং দোভাষীর কাজ আদায় করে। যে সমস্ত স্বাধীনতাকামী বাঙ্গালীদের তারা একদিক থেকে হত্যা করার জন্য ফন্দি করেছিল, তাদের জবানবন্দীকে কোন রকমে উর্দু করে বুঝিয়ে দিতে হত আমাকে। দাসত্বের এতটুক স্বাধীনতার কিছু কিছু ভালো আচার ব্যবহার আমি পেতাম আমি। এই করে আমি সুষ্ঠভাবে ভাবনা চিন্তায় সহজ মানসিকতা খুঁজে পাই। কিভাবে মুক্তি পাওয়া যাবে এবং এই মৃত্যু থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে সে কথা মনে মনে সারাক্ষণ ভাবি।

দিন যেতে থাকে। আমি দিনের পর দিন অত্যাচার ও অবিচারের অমানুসিকতা প্রত্যক্ষ করতে থাকি। শিক্ষিত, অশিক্ষিত, আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা নির্বিশেষে সে কি মার, সে কি অত্যাচার- ভাষা দিয়ে সে বর্বরতা প্রকাশ সম্ভব নয়। চড়, ঘুষি, বুটের লাথি, গায়ে জলন্ত সিগারেট গুঁজে দেয়া, উপরে পা বেঁধে মাথা ণীচের দিকে ঝুলিয়ে রাইফেলের বাঁট দিয়ে বেদম প্রহার… সে ইতিহাস নাকে, মুখে রক্ত ঝরার ইতিহাস, বর্বরতার ইতিহাস তার বর্ণনা হয় না।এই অবস্থা দেখে আমার কাণ্ডজ্ঞান লোপ পায়।

অবশেষে একদিন আমাকে ও আরো একজনকে বলল যে, তোমাদের ময়মনসিংহ পাঠানো হবে। আমাদেরকে ট্রাকে উঠতে বলল। ট্রাক চলতে থাকে কিন্তু আমি তখন দেখলাম ট্রাক ময়মনসিংহের পথে না যেয়ে উপস্থিত হল শ্মশানঘাটে। তখন আমার আত্মা উড়ে গেল। স্মৃতির পটে পৃথিবীর আলো, মা, বাবা, জন্মভূমি ভিটে, স্ত্রী, সন্তানের মুখ ছায়ার মত কাঁপতে কাঁপতে ভেসে উঠলো, তারপর দুঃখের যবনিকায় হাবুডুবু খেল সব। সবাইকে লাইনবন্দী করে দাঁড় করানো হল- সামনে ধীরেন বাবু, তার পিছনে আমি নিজে, আমার পিছনে আরো বেশ কয়েকজন। ঠিক ভরা ব্রক্ষ্মপুত্রের তীর বেয়ে লাইনটি। ধীরেন বাবুর বুকের সাথে সংলগ্ন মেশিনগানের নাল। মেশিনগানধারী একজন পাক সৈনিক। প্রভুভক্ত নামধারী হিংস্র জানোয়ার। অর্ধমৃত মানুষগুলো কিছুতেই লাইন সোজা করছে না। বারবার লাইনটি শেষ নিঃশ্বাসের মত এঁকেবেঁকে যাচ্ছে। তখন আমি হঠাৎ করে দুঃসাহসিক চিন্তা করলাম। একটা মতলব করলাম ঝাঁপ দিয়ে কি করে নদীতে পরা যায়। সঙ্গে সঙ্গে বাঁচি কি মরি মেশিনগানের নাল ধরে ধাক্কা দিয়ে বন্দুকধারীকে উল্টিয়ে ফেলে আমি নদীতে ঝাঁপ দিলাম- বেশ কিছুক্ষণ গোলাগুলির শব্দের পর আমি তখন স্রোতের টানে অনেক দূরে চলে গেলাম- আর শব্দ শুনতে পেলাম না। নান্দিনার কাছে এক গ্রামে যেয়ে উঠলাম আমি। দিনে বাড়ীওয়ালার সহায়তায় রাখালের বেশ ধরে জামালপুর-টাঙ্গাইল রোড পার হয়ে সরিষাবাড়ীর দিকে পাড়ি জমালাম আমি। তারপর সরিষাবাড়ী থেকে মেয়ের বেশ ধরেকালীবাড়ী এবং তারপর ভারত সীমান্ত পাড়ি দিয়ে আমি মুক্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। এই ছিল আমার জীবনের মর্মান্তিক কাহিনী।

স্বাক্ষর/-
শ্রী মনোরঞ্জন দত্ত।

 

ইশতিয়াক মাহমুদ টিপু

<৮,২.১.৩৩,৬৬>

এম, এ, রশিদ
সার্কেল অফিসার, ভৈরব থানা
ভৈরব, ময়মনসিংহ।

পাক বাহিনী ভৈরবে যে নৃশংস ধ্বংসযজ্ঞচালায় তা এক কথায় অবর্ণনীয়। তারা প্রায় দু’হাজার বাড়ী ও দোকানপাট সম্পূর্ণ ভস্মীভূত করে। ভৈরব বাজারের লক্ষ লক্ষ টাকার মালামাল লুট করে বহু ব্যবসায়ীকে সর্বস্বান্ত করে। তারা ভৈরব থানার নিরীহ সর্বমোট ২৩৭ ব্যক্তিকে হত্যা করে ও ১০৭ ব্যক্তিকে মারাত্মকভাবে আহত করে। তন্মধ্যে স্থানীয় পরিকল্পনা অফিসার জনাব কাজী আব্দুস সামাদকেও অত্যান্ত নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে। উক্ত অফিসার যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে তাঁর পরিবারের খোঁজে অফিস থেকে বের হয়ে যাবার পথে পাক বাহিনীর সামনে পড়ে। সে সময় তাঁর কাছে একটা ব্যক্তিগত টেপ রেকর্ডার ছিল। দস্যু সেনারা ওটাকে একটা ওয়ারলেস সেট মনে করে অফিস সংলগ্ন বিলের পাড়ে একটা খোলা মাঠে কোন কথা জিজ্ঞেস না করে গুলি করে হত্যা করে। এমনি ধরনের আরো অজস্র বিবরণ নিরীহ গ্রামবাসীদের হত্যায়ও পাওয়া যায়। স্থানীয় পৌরসভার প্রাক্তন সহ-সভাপতি জনাব মসলন্দ আলীকে তৎকালীন সার্কেল অফিসার (ডেভ) জনাব আমিনুল হক সাহেবের মাধ্যমে লিখিত নির্ভয়ের আশ্বাস প্রেরণ করে পাক বাহিনী সম্ভবতঃ হত্যা করে। আজ পর্যন্ত তার কোন খোঁজ নাই।

একই সঙ্গে আরো কয়েকজন বিশিষ্ট আওয়ামীলীগ নেতা ও কর্মী যথা- জনাব হাফিজ উদ্দিন মিয়া, জনাব মতিউর রহমান, জনাব রইস মিয়া ও আরো অনেককে হত্যা করে। এই ধরনের পৈশাচিক হত্যায় ভৈরবে নেতৃত্বের ক্ষেত্রে সৃষ্টি করেছে।

স্থানীয় নেতৃস্থানীয় লোকদের কেউ কেউ রাজনৈতিক ভিন্ন মত পোষণ করতঃ পাক অফিসারদের নির্দেশে বা নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্যে পাক বাহিনীর ধ্বংসমুখী ক্রিয়াকলাপে সহযোগীতা করেছে। রাজাকার নিয়োগ করার ব্যাপারেও তাদের ভূমিকা ছিল অগ্রণী। তবে এসব লোকদের সংখ্যা ছিল অতি নগন্য। বর্তমানে তাদের অনেকেই বেঁচে নেই। মুক্তিবাহিনীর হাতে তাদের অনেককেই প্রাণ হারাতে হয়েছে। বাকীরা কেউ কেউ হারাতে আছে ও কেউ সম্পূর্ণ মনোভাব পাল্টিয়ে স্থানীয় নেতৃবৃন্দের করুণায় টিকে আছে।

এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য যে, পাক বাহিনীর ভৈরবে স্থিতিকালে স্থানীয় থানা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রস্থিত সরকারী অফিস সমূহের বহু রেকর্ড ও আসবাবপত্র নষ্ট করে এবং পৌরসভার ক্যাশ রুমের লোহার সিন্দুকটি ভেঙ্গে ১১,০০০ টাকার উপরে লুট করে। ঐ সঙ্গে পৌরসভার বহু আসবাবপত্রও নষ্ট করে। ভৈরব থানার কালিকাপ্রসাদ ও শিমুলকান্দি ইউনিয়নের ইউনিয়ন পরিষদ অফিস, বীজাগার ও সংলগ্ন দাতব্য চিকিৎসালয় সম্পূর্ণরুপে ধ্বংস করে।
স্বাক্ষর/-
এম
, এ, রশিদ
৬/১১/৭৩

 

*এই খণ্ডে ২ নং দলিলের ১ নং অংশের ২৬ নং সাক্ষাৎকারটি নেই।

।। রাজশাহী বিভাগ ।।

 

 

রকিবুল হাসান জিহান

<৮,২.২.৩৪,৬৭-৬৮> “বাঙালিরা নারীদের ইজ্জত নষ্ট করেছিলো বলে নাকি সেই মেয়েদের বাঁচাতে হাজার মাইল দূর থেকে পাকিস্তানিরা এসেছিলেন!!”

 

হত্যা, ধ্বংস ও নির্যাতনের বিবরণ

রাজশাহী বিভাগ

৩৪

মোঃ আরশাদুজ্জামান (আশু)

দি ইউনিভারসাল রেডিও হাউস

ঘোড়ামারা, রাজশাহী

 

২৫শে মার্চ শহরে যখন মিলিটারীদের তৎপরতা বেড়ে যায় তখন আমি ভাঙপাড়া গ্রামে কোন এক বন্ধুর বাড়িতে আশ্রয় নেই। পাকিস্তানী বেতার থেকে ঘোষণা করা হলো যে, মালিকবিহীন দোকান পেলে তারা অন্য জনকে দিয়ে দিবে।

 

তার পরিপ্রেক্ষিতে ২১শে মে আমি রাজশাহীতে চলে আসি এবং ঘোড়ামারায় চাচাতো ভাইয়ের বাসায় উঠি। জুমআর নামাজ পড়ে আসার সময় একজন বাঙ্গালী পশ্চিমাদের দালাল আমাকে দেখে। দেখার পর জিজ্ঞাসাবাদে জানতে পারে যে, আমি বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেছিলাম। এরপর অকস্মাৎ দুজন বর্বর সৈন্য গাড়ীসহ দালালের বাড়ীতে যায়। ইতিপূর্বে সে ফোনে মিলিটারীদের সাথে আলাপ করেছিল। তারপরে আমার ভাইয়ের বাসায় মিলিটারীরা ঢোকে। ঢোকার পরে আমাকে নিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন একজন অধ্যাপক সাহেবের রান্নাঘরে নিয়ে যায়। সেখানে অন্য একজন কাস্টম অফিসের আবদুল ওয়াহেদ নামের একজন লোককে দেখতে পাই নামাজ পড়া অবস্থায়। তাকে (ওয়াহেদ সাহেবকে) নানা জিজ্ঞাসাবাদ করায় বাইরে পাহারারত একজন মিলিটারী এসে আমাকে নির্মম্ভাবে বুটের লাথি মারে এবং জৈনক সৈন্য বলে, “আপছমে কৈ বাত কারনে নেহী হোগা”।

 

তারপরে বেলা তিনটের সময় নওয়াবগঞ্জ কলেজের সহ-অধ্যক্ষ মোনামুল হক সাহেবকে মোটা শিকল দ্বারা দু’হাত বেঁধে নিয়ে আসে। তার কিছুক্ষণ পর কানে বালিওয়ালা লম্বা পাতলা মত একজন মিলিটারী আসে। হাতে কাঠের রোলার দরজা বন্ধ করে উর্দুতে বলে যে, “ত্তুম নবাবগঞ্জ কলেজ কা ভাইস প্রিন্সিপাল হ্যায়?” বলে প্রহার আরম্ভ করে। তারপর আমাকে জিজ্ঞাসা করে যে, আমি নাকি বিহারীগণকে হত্যা করেছি, নারীর ইজ্জত নষ্ট করেছি, সেই জন্য তারা দুই হাজার মাইল দূর থেকে এসেছে। তারপর কাথের রোলার দিয়ে প্রহার করে, লাথি মারে।

 

রাত আটটার পরে কাষ্টম অফিসের জনার ওয়াহেদ সাহেবকে বের করে অন্য ঘরে নিয়ে যাওয়া হয়। তার পরে আমাকে ঐ একই ঘরে রাখে এবং জিজ্ঞাসা করে জানতে চায় কাকে ভোট দিয়েছিলাম। উত্তরে আমি বলেছিলাম যে, আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়েছিলাম। প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করে ক্যাপ্টেন জাফর। তারপরে হিংস্র পশুর মত আমাকে প্রহার করে। প্রহারের দরুন মাটিতে পড়ে যাই। তারপরে জিজ্ঞাসা করে যে, আমি বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়েছিলাম কিনা। আমি সম্মতি জানাই। তারপরে উক্ত ঘরে নিয়ে রাখা হয়।

 

পরের দিন সকালে মাটিতে একটি রুটি ও এক কাপ চা তিনজনকে খেতে দেয়া হয়। শরীরে অসুস্থতার জন্য দু’জন চা পান করছিল না বলে বর্বর সৈন্যরা লাথি মারে বেপরোয়াভাবে।

 

৯ টার দিকে আমাকে দিয়ে সৈন্যদের ব্যবহৃত ড্রেন, থালা বাসন, উঠান পরিষ্কার করে নেয়। বেলা তিনটার দিকে আমাকে ও ওয়াহেদ সাহেবের পিছনে হাত বেঁধে খাড়া অবস্থায় প্রায় এক ঘন্টা সময় রাখা হয়। তার পরে ক্যাপ্টেন জাফর উপর থেকে নিচে নেমে আসে। মান ধরে বলে, “তুমহারা নাম আশু হ্যায়, তুম রেডিও কা কাম জানতা হ্যায়?” উত্তরে আমি সম্মতি প্রকাশ করি। জাফর হাত খুলে দেয় এবং পরে নিয়ে যায় তার একটি রেডিওগ্রাম দেখতে বলে। দেখার পর আমি বলি উক্ত রেডিওর কোন যন্ত্রপাতি না হলে দেখা সম্ভব নয়। পরে আমাকে নিচে নামিয়ে হাত বাঁধা অবস্থায় রাখা হয়। কিছুক্ষন পরে আমাকে জিপে উঠান হয়। পরে জোহা হলের দিকে নিয়ে যায়। গাড়ি থেকে নামিয়ে হলের গেটেই সোজা করে দাঁড় করানো হয়। দাঁড় করানোর পর অনিবার্য মৃত্যু জেনে আমি ওয়াহেদ সাহেবের সাথে শেষ আলাপ করতে প্রয়াসী হই এবং প্রাণভরে বাংলাদেশকে দেখে নেই। ক্যাপ্টেন ইলিয়াসকে জাফর পরিচয় করিয়ে দেয় যে ওয়াহেদ সাহেবের মেয়ে জয় বাংলার গান গেয়েছে এবং আমি বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়েছি। তখন ইলিয়াস ক্যাপ্টেন জাফরের সাথে দূরে আলাপে বলে যে, বাংলাদেশের পতাকা, বাংলাদেশের সর্বত্রই উড়ানো হয়েছিল। তারপর ক্যাপ্টেন ইলিয়াস আমাকে ছেড়ে দেয় এবং ওয়াহেদ সাহেবকে উপরের তলায় নিয়ে যায়।

 

১৫ই আগস্ট (১৯৭১) পর্যন্ত আমি স্বগৃহে অবস্থান করি। রাত দু’টায় একটি পুলিশ জীপ এবং সঙ্গে ডি,এস,পি নাছিম সাহেব দরজায় ধাক্কা মারে। পুলিশদের নির্দেশ দেয় বাড়িটিকে ঘেরাও করার জন্য। তারপরে দরজার কাছে আমি আসি। আমার নাম জিজ্ঞেস করে। নাম জিজ্ঞেস করায় কিছুক্ষণ মুখ চাওয়াচাওয়ি করে। তারপর ডাক নাম জিজ্ঞেস করে। উত্তরে জানাই যে, ডাক নাম “আশু”। অতঃপর আমাকে গাড়িতে কিছুক্ষণ রাখার পর আরও দু’জন, যথাক্রমে আব্দুর রশিদ ও আব্দুর রাজ্জাক সাহেবকে গ্রেপ্তার করে জীপে তুলে দেয়।

 

থানায় কিছুক্ষণ গাড়িতেই রাখার পর গাড়ি জোহা হলে নিয়ে যাওয়া হয়। এবং তিন তলায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে প্রায় অপরাপর ত্রিশজন বন্দীকে দেখতে পাই।

ভোরবেলা তিনজনকে ৩৪০ নং কোঠায় নিয়ে রাখা হয়। সেখানে ইউনুছ মিয়াকে দেখতে পাই। তিনি সেখানে প্রায় অর্ধপাগল অবস্থায় ছিলেন। আমাকে চেনার পর ইউনুছ সাহেব আমাকে পাঁচটি টাকা দিয়ে বলেছিলেন যে, সৈন্যরাতো জীবন শেষই করবে, আপনি যদি ছাড়া পান তবে টাকাগুলি গরীবদের দিয়ে দিবেন।

 

পরে বেলা ৯ টার দিকে মেজর সাহেবের কাছে নিয়ে যাওয়া হয় এবং জিজ্ঞাসা করে যে, আমাদের পেশা ও নাম কি? পরে ৩৪০ নং কোঠায় নিয়ে যায়। নিয়ে যাবার সময় ঘর খুলে দেখানো হয়। ঐ ঘরগুলির মধ্যে ছাত্র গোছের কতকগুলি যুবককে ঝুলন্ত অবস্থায় উলঙ্গ করে রাখা হয়েছিল। আশেপাশে ভাঙা হকিস্টিক, বাঁশের লাঠি ইত্যাদি ভাঙা অবস্থায় পড়েছিল। আমাদেরকে বলা হয়েছিল সত্য কথা না বললে আমাদের পরিণতিও ঐ একইরূপ হবে।

 

এক থালাতে চারজনকে এমনকি সময় সময় মেঝেতে পচা, দুর্গন্ধময়, ভাত খেতে দিত। তাও প্রায় ২৪ ঘণ্টা পরে।

 

৩৪০ নং কোঠার পাশ্বে একটি সেন্ট্রী রুম ছিল। সেখানে তারা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করত যার কিছু কিছু মাঝে মাঝে শোনা যেত।

 

একদিন আমাকে জোর করে বিভিন্ন রুমের বন্দীদের নাম ইংরেজীতে লেখার জন্য নিয়ে যায়। ৩৪০ এর কয়েকটি রুম পরে একটি রুমের মাঝে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধাকে বিকৃত অবস্থায় দেখতে পাই। তাদের গায়ের চামড়া ছিল না, মাঝে মাঝে কাটা দাগ ছিল।

 

২৭শে আগস্ট হল থেকে আমাদের থানায় পাঠানো হয়। থানায় পাঁচদিন থাকার পর ইনকোয়ারী হয়। পরে আমাকে মুক্তি দেয়।

স্বাক্ষর/-

মোঃ আরশাদুজ্জামান (আশু)

১৯/০৮/১৯৭২

 

রকিবুল হাসান জিহান

<,২.২.৩৫,৬৯>যে সমস্ত নারী তাদের বেশী ভাল লাগতো তাদেরকে ক্যাম্প পর্যন্ত নিয়ে যেত।“

৩৫

মোঃ আব্দুস সামাদ

গ্রাম- নওহাটা

থানা- পবা

জেলা- রাজশাহী

 

১৯৭১ সালের ২৬শে মে তারিখ পাকবাহিনী নওহাটা হয়ে নওগাঁ যাওয়ার পথে অপারেশন করে যায়। নওহাটায় তারা তিনজন লোককে হত্যা করে অগ্নিসংযোগ করে দেয়। এই খান সেনারা নওহাটা বাজারের সমস্ত দোকান লুটপাট করে অগ্নিসংযোগ করে দেয়। তারপর যে সমস্ত স্থানীয় লোককে ধরে ছিল তাদের কে দিয়ে নদী পার হয়ে যাবার জন্য নৌকা গোছিয়ে নেয় এবং যাতে গাড়ি পার করে নিয়ে যেতে পারে তার সমস্ত ব্যবস্থা করে নেয়।

 

এরপর প্রায় দিনই তারা রাজশাহী টাউন থেকে হঠাৎ হঠাৎ এসে বাজারে যে সমস্ত লোক পেত, তাদেরকে মারপিট করে টাকা-পয়সা কেড়ে নিত এবং তা দিতে অস্বীকার করলে হত্যা করত এবং সেই সঙ্গে নারীদেরও গ্রাম থেকে ধরে নিয়ে এসে তাদের প্রতি পাশবিক অত্যাচার করে কাউকে ছেড়ে যেত এবং যে সমস্ত নারী তাদের বেশী ভাল লাগতো তাদেরকে ক্যাম্প পর্যন্ত নিয়ে যেত।

 

বিভিন্ন পথযাত্রীদের কাছ থেকে তাদের নগদ টাকা-পয়সা কেড়ে নিয়ে তারপর মারপিট করে ছেড়ে দিত। স্থানীয় লোকেরা তাদের অত্যাচারে অতিষ্ট হলে সকলে যুক্তি করে খান সেনাদের অল্পসংখ্যক আসলে তাদের একজনকে ধরে মাথা ফাটিয়ে দেয়। ইহার পর কিছুদিন নওহাটা বাজারের লুটপাট বন্ধ থাকে। কিন্তু ইহার অল্পদিন পরে আবার এক খান সেনার দল এসে উক্ত ব্যক্তিকে এবং তার সঙ্গে আরো কয়েকজনকে ধরে একত্র করে বেঁধে বেদম প্রহার করার পর গুলি করে হত্যা করে।

 

উক্ত ঘটনার পর তাদের লুটপাট বন্ধ থাকে কিন্তু তাদের অন্যান্য অত্যাচার বেড়ে যায়। তারা প্রায়ই মাঝে মাঝে রাতে আসতো এবং স্থানীয় লোক ধরে নিয়ে তাদের মাথায় গুলির বাক্স ও বিভিন্ন মালামাল বহন করে নিয়ে যাওয়ার জন্য ব্যবহার করত। রাতের অন্ধকারে বিভিন্ন গ্রাম ঘেরাও করে নিরীহ জনগণকে হত্যা করত, তাদেরকে মারপিট করত এবং তাদের মালামাল লুটপাট করত।

 

এইভাবে তারা বিভিন্ন জায়গায় প্রায় ২০০ লোককে হত্যা করে তাদের রাজত্বকে কায়েম রেখেছিল।

স্বাক্ষর/-

মোঃ আব্দুস সামাদ

 

 

রকিবুল হাসান জিহান

<,২.২.৩৬,৭০-৭১>লোকজনের উপর অত্যাচারের জন্য একটি স্কোয়াড থাকতো যাদের কালো ব্যাজ থাকতো।“

“নদীর অপর পাড়ে সকল গ্রামে তখন এমন কোন বাড়ি ছিলনা যে বাড়ির মেয়ে ধর্ষিত হয়নি। পাক সেনাদের চাইতে রাজাকার, আল বদর এরাই বেশি অত্যাচার চালিয়েছে। দালালরা এবং তাদের সহযোগীরা গ্রামকে লুট করেছে, ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে।“

৩৬

বীরেন্দ্র কৃষ্ণ রায়

রাণীবাজার, ঘোড়ামারা

জেলা- রাজশাহী

 

“জুন মাসের ১৩ তারিখে পাক দালালরা ষড়যন্ত্রমূলক আমার শ্বশুরবাড়ির একস্থানে গুলিসহ চাইনিজ রাইফেল রেখে ঐ রাতে তারা আমাদের সাথে নিয়ে নির্দিষ্ট স্থানে গিয়ে রাইফেল তোলে। তখন আমাকে আমার দুই ছেলে, আমার সম্বন্ধী ক্ষীতিশচন্দ্র রায় ও নিরোদ কুমারকে থানাতে নিয়ে যায়। ওদের ধারণা ছিল আমাদের কাছে প্রচুর টাকা-পয়সা, সোনা আছে। বন্দী করে সেগুলো আদায় করার পরে হত্যা করবে।

রাত ১-১.৩০ দিকে আমাদের থানাতে নিয়ে যায় স্টেটমেন্ট নিবে বলে। আমাদের পাঁচজনকে চালাকি করে হাজতখানায় বন্দী করে। সারারাত কিছু খেতে দেয়নি। তার পরদিনও না। বিকালে আমার বাড়ি থেকে কিছু খাবার নিয়ে আসে। ঐদিন শেষ রাতের দিকে আমার স্ত্রী দারোগাকে বহু অনুরোধ উপরোধ করে গায়ের সমস্ত গয়না খুলে দিয়ে নগদ কয়েকশত টাকা দিয়ে বলল যেন সামরিক আইনে তার ভাই, স্বামী, ছেলেকে না দেয়। দারোগাকে টাকা ঘুষ দিলে আমাদের সবাইকে হাজত থেকে বাইরে এনে রাখার ব্যবস্থা করেছিল। হঠাৎ করে একদিন আবার হাজতে পুরতে বলে। আমার দুই ছেলে আমার সাথে কান কথা না বলে পাশের নদীতে ঝাপ দেয় বাঁচবার জন্য। পিছু পিছু পুলিশ ছুটে। ওদের চিৎকারে গ্রামের লোকজন ধরে ফেলে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। থানায় নিয়ে এসে অকথ্য অত্যাচার চালায় আমার দুই ছেলের উপর। একজন কৃষক সে আমার ছেলেদের ধরেনি বলে পুলিশ তাকে থানায় ধরে এনে ভীষণভাবে মারধর করে। এখনই ছেলেদেরকে হত্যা করবে কিন্তু টাকার বিনিময়ে নিরস্ত হয়। চার্জশীটের মধ্যেও পালানোর কথা উল্লেখ করেনি।

 

১৫ই জুন আমাদের সবাইকে নাটোর চালান দেয়। হাশেম দারোগা চাইনিজ রাইফেল সহ চললো। টাকা পয়সা নেয়া সত্ত্বেও আমাদের হাঁটিয়ে নিয়ে যায়। পথে পাক বাহিনীর সাথে দেখা হলেই সালাম আলায়কুম জানিয়ে বলে, “দেখিয়ে কেয়া চীজ লেআয়া হ্যায়”। দারোগা বারবার আমাদের দেখিয়ে দেয় মুক্তিফৌজ হিসেবে। থানার ওসি হাশেমকে নিষেধ করেছিল অস্ত্র ঐভাবে খোলা নিয়ে যেতে কিন্তু হাশেম দারোগা তা শোনেনি।

 

নাটোর কোর্টে নিয়ে যাচ্ছে এমন সময় ইন্সপেক্টর (পুলিশ) জাফর সাহেবের সাথে আমাদের দেখা। জাফর সাহেব আমার ছেলের এবং ছেলের শালার বিশেষ বন্ধু ছিল। সে দেখে অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করে হাশেমকে। সামরিক কোর্টে নিয়ে যেতে বলে উনি জামাকাপড় পরে তাড়াতাড়ি কোর্টে আসেন। সামরিক কোর্টের সামনের মাঠে আমাদের বসিয়ে রাখে। পাকসেনারা আসে, নাম শোনে আর সবাইকে লাথি চড় মেরে চলে যায়। সামরিক কোর্টে ক্যাপ্টেন ও মেজর আসেন। আমরা ২৫ গজ মত দূরে বসে। চাইনিজ রাইফেলের কথা শোনার সাথে সাথে ক্যাপ্টেন খতম করার নির্দেশ দিলেন। কিন্তু পুলিশ ইন্সপেক্টর অনুরোধ করে একটি ইনকোয়ারী করার জন্য কারণ ওরা ভালোমানুষ। মেজর বলেন, কেমন করে চিনলে ওদের? ঐ থানাতে আমি থানা ইনচার্জ ছিলাম বহুদিন, ইন্সপেক্টর বলেন। মেজর আমাদের ডাকেন। আমাদের বক্তব্য আমরা বলি। মেজর সব শুনে কোর্টে পাঠাতে বলে ইনকোয়ারীর ভার দিলেন।

 

এসডিও জেলহাজতে পাঠিয়ে দিলেন। সামান্য একটু ঘরে আমাদের রাখলো। আমরা ৩০/৩৫ জন ছিলাম, শোয়াতো চিন্তা করা যায় না, ভালো করে বসারও উপায় ছিল না। জেল ওয়ার্ডার মোজাফফর খাঁ (বিহারী) বাঁশের লাঠি দিয়ে বেদম প্রহার করে। বাইরে এম,পি (মিলিটারি পুলিশ) ছিল সেও রাইফেলের বাঁট দিয়ে মারতে লাগলো। আমাদের মধ্যে কয়েকজন কয়েদি ছিল যারা স্বাধীনতার প্রথম ক্ষণে জেল ভেঙে পালিয়েছিল। তাদের উপর অমানুষিক অত্যাচার চালায়। চিৎ করে শুইয়ে দুই হাতে লাঠি তুলে শরীরে যত শক্তি আছে তা দিয়ে ঘন ঘন আঘাত করতে থাকে।

 

সারারাত শুনলাম মানুষের অসহ্য যন্ত্রণার চিৎকার। আমার মত এমনি বহু অধ্যাপক, ছাত্র, অ্যাডভোকেট ইত্যাদিকে সারারাত ধরে নির্যাতন চালায়। কান্না, চিৎকারে জেল প্রকম্পিত হচ্ছিলো। পাক সেনারা মারতো আর হাসতো। লোকজনের উপর অত্যাচারের জন্য একটি স্কোয়াড থাকতো যাদের কালো ব্যাজ থাকতো। জেল ওয়ার্ডার হরমুজ আমাদের উপর অত্যাচার চালাতে থাকে। ১৬/১৭ই জুন আমাদের ১৬ জনকে একসাথে রাজশাহী সেন্ট্রাল জেলে পাঠিয়ে দেয়।

 

রাজশাহী জেলে বহু রকমের লোকদের দেখলাম। যাদের আনতো তাদের অধিকাংশ কারো চোখ নাই, কারো হাত পা ভাঙা। বিশেষ করে পাক সেনারা যাদের পাঠাতো তারা প্রায় মৃত বা অর্ধমৃত হয়ে আসতো। জেলে যাদেরকে দেখেছি বেশীর ভাগ শান্তি কমিটির লোকেরাই ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিলো। একজন কৃষক কয়েদীর সাথে আলাপ করলাম। সে এসেছিল শহরে জমি বিক্রি করতে। মহুরির সাথে বাজারে বেড়িয়েছে এমন সময় কিছু লোক কৃষকটিকে জোর করে এক বাড়িতে নিয়ে গিয়ে বলে, “তোর ছেলে মুক্তিফৌজ”। সে বলে, “আমার বড় ছেলেই নেই”। তারপর মারধর করে জেলে পাঠিয়ে দেয়।

 

আমাদের কেস ইনকোয়ারীর জন্য ইন্সপেক্টর গ্রামে যান এবং আমাদের পক্ষে রিপোর্ট দেন। বর্তমান বরিশাল এসপি গোলাম মোর্শেদ তখন রাজশাহী এসপি ছিলেন। তিনি আমাদের ধরিয়ে দেবার জন্য এএসআই হাশেমকে প্রমোশন দিয়ে থানার ওসি করে দেন। নাটোর শান্তি কমিটি জাফর ইন্সপেক্টরের বিরুদ্ধে পাকসেনাদের কাছে অভিযোগ করে। জাফর সাহেবের চাকরি যাবার মত। বহু টাকার বিনিময়ে আইনুদ্দিনের (এম,এন,এ মুসলিম লীগ) তদবিরে আমাদের জামিন হয় ২৮শে সেপ্টেম্বর। পরে ইন্সপেক্টর আবার ইনকোয়ারী করে নভেম্বর মাসে আমাদের বিরুদ্ধে কিছু না পেয়ে মুক্তি দেয়। আমরা আবার গ্রামে চলে যায় (গালিমপুর)। আমাদের বাড়ি জামাতে ইসলামীর সভাপতি দখল করে নেয়, সমস্ত কিছু লুট করে রাজাকারের ক্যাম্প করে। আর একটি কক্ষে জামাতে ইসলামীর সভাপতি থাকতো। আমরা আবার গ্রাম থেকে গ্রামে পালিয়ে বেড়াতে লাগলাম।

 

ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে পাকসেনারা আবার আমাদের গ্রামে হামলা চালায়। সমস্ত গ্রাম লুট করে বহু জনকে ভীষণভাবে মারধর করে, কিছু লোকজনকে হত্যা করে। আমাদের সব লুটে নেয়।

 

তারপর দেশ মুক্ত হয়। মালঞ্চ এবং নদীর অপর পাড়ে সকল গ্রামে তখন এমন কোন বাড়ি ছিলনা যে বাড়ির মেয়ে ধর্ষিত হয়নি। পাক সেনাদের চাইতে রাজাকার, আল বদর এরাই বেশি অত্যাচার চালিয়েছে। দালালরা এবং তাদের সহযোগীরা গ্রামকে লুট করেছে, ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে।

 

ডিসেম্বরে যুদ্ধ বাঁধলে আমরা সবাই উল্লসিত হয়ে উঠি। একদিন গোলাগুলির শব্দ না পেলে আমাদের মন খারাপ হয়ে যেত।

 

১৬ই ডিসেম্বর যখন শুনলাম পাক বর্বর বাহিনী আত্মসমর্পণ করেছে তখন সেই রাতে আমার এই বৃদ্ধ বয়সে সারা গ্রাম হেঁকে বেড়াই পাক সেনারা আত্মসমর্পণ করেছে। মানুষজন গ্রামকে মাতিয়ে তোলে। স্বাধীনতার আনন্দে সবাই “জয় বাংলা” ধ্বনিতে গ্রামকে মুখরিত করে তোলে।

স্বাক্ষর/-

বীরেন্দ্র কৃষ্ণ রায়

৩০/০৮/১৯৭৩

 

 

রকিবুল হাসান জিহান

<,২.২.৩৭,৭২>পা কেটে কষ্ট দিয়ে না মেরে গুলি করে কেন মার না। উত্তরে জানায়, গুলি করে মারা হয়না, রাম দা দিয়ে জবাই করে মারা হয়।“

৩৭

সালু মিয়া

থানা- সদর

জেলা- রাজশাহী

 

জুলাই মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহের দিকে সাহেব বাজারের নিজস্ব দোকান থেকে জনৈক বিহারীর ইঙ্গিতে আমাকে গ্রেফতার করে বোয়ালিয়া থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। পরের দিন বিকাল পর্যন্ত থানাতেই বন্দী ছিলাম। তারপর ডিএসপি নাছিম সাহেব জিজ্ঞাসাবাদ করেন যে আপনি কয়টা বিহারী মেরেছেন; ভোট কাকে দিয়েছেন। তারপর মিলিটারী গাড়ি করে জোহা হলে নিয়ে যায়। ৭ দিন সেখানে বন্দী থাকাকালে আমাকে দিয়ে মাটি কাটিয়ে নিয়েছে এবং ত্রিপলাদি শুকিয়ে নিয়েছে। সেখানে ৭-৮ জনকে একই থালায় বসিয়ে দুর্গন্ধযুক্ত অপর্যাপ্ত ভাত দেওয়া হতো। ডাল হিসাবে শুধু পানি, লবণ, হলুদ দিয়ে সিদ্ধ করে দেওয়া হতো। আর কোন তরকারি থাকতো না।

 

৭-৮ দিন পরে আবার আমাকে থানায় নিয়ে আসে। সেখানে আমাকে ১৯ দিন রাখা হয়। প্রথমে ক্ষমা ঘোষণার পর বন্দী সকলেই ছাড়া পেলেও আমি এবং আর একজন অধ্যাপক ছাড়া পাননি। একদিন সিকিউরিটি অফিসার আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন এবং বলেন তোমাকে ইন্ডিয়ায় দেখেছি। না উত্তর দেওয়ায় প্রহার শুরু করে। অতঃপর ডিএসপি নাছিম সাহেব এসে সিকিউরিটি অফিসারকে জানান যে আমাকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে। অতঃপর আমাকে ছেড়ে দেয়।

 

এর ১৬-১৭ দিন পর এক রবিবার রাত দুইটার সময় আমাকে বাড়ি থেকে ধরে জোহা হলে বন্দী করে রাখে। সকালের মধ্যেই রাজশাহী ন্যাপ প্রধান আতাউর রহমানসহ বহুজনকে বন্দী করে নিয়ে যায়। সেখানে তাদের সবাইকে দিয়ে ঘাস কাটিয়ে নিয়েছে। এর মধ্যে রোজা এসে যায়। সময় মতো তাদের কোন খাবার দেওয়া হতো না। কোন কোন দিন সেহেরীও দেওয়া হতো না।

 

পহেলা রমজান রাত ১১টায় আমার রুম থেকে দুইজন, ন্যাপ প্রধানের রুম থেকে একজন, পাশের রুম থেকে তিনজনকে, আর এক রুম থেকে সাহেব বাজারের কেতু মিয়াকে হাত ও কালো কাপড় দিয়ে চোখ বাঁধা অবস্থায় নিয়ে যায়। পরদিন সকালে ঔৎসুক্যের বশবর্তী হয়ে জনৈক সেন্ট্রিকে জিজ্ঞাসা করি যে রাতে ছেড়ে দিলে তারা কোথায় গেছে। তখন উত্তর দেয় যে তাদেরকে বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে। আমি আবার জিজ্ঞাসা করি হাত, পা কেটে কষ্ট দিয়ে না মেরে গুলি করে কেন মার না। উত্তরে জানায়, গুলি করে মারা হয়না, রাম দা দিয়ে জবাই করে মারা হয়। আমি আবার জিজ্ঞাসা করি রাতে যারাই বেরুবেন তাদেরই কি মারা হবে? উত্তর পাই রাত ১১টার পর যারা বেরুবে তাদের সবাইকেই বাংলাদেশে পাঠানো হয়। এর ৪-৫ দিন পর থেকে প্রায় প্রত্যহ রাতে ৭-৮ জন করে লোক উধাও হয়ে যেতো।

 

২৬-২৭ দিন পর একদিন বেলা দেড়টার সময় আমাকে ছেড়ে দেয়। আসার আগে আমি আমার কাছের দশটি টাকা অন্যান্য বন্দিদের ইফতারি কেনার জন্য দিয়ে আসি। কারণ সেখানে কোন ইফতারি দেওয়া হতো না।

 

ছেড়ে দেয়ার দুইদিন পর পুলিশ আবার আমাকে খোঁজাখুঁজি করে এবং গ্রেফতার করে জোহা হলে মেজরের নিকট নিয়ে যায়। জিজ্ঞাসাবাদে মেজর আমাকে বলেন, “উপার যায়েগা না ঘার যায়েগা”? শেষ অবধি আমাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।

 

জোহা হলে বন্দী থাকা অবস্থায় সারাদিন প্রশ্রাব করতে দেওয়া হতো না। তাই বাধ্য হয়ে আমি নিজের জুতার মধ্যে প্রশ্রাব করে তিন তালা থেকে ফেলতাম। পৌর এলাকার ১ নং ওয়ার্ডের ৯৮ জন ধৃত ব্যক্তির মধ্যে আমিই শুধু বেঁচে আছি।

 

স্বাক্ষর/-

সালু মিয়া

 

রকিবুল হাসান জিহান

<,২.২.৩৮,৭৩-৭৪>দুপুরে কোন রকম তারকারি ও প্লেট ছাড়াই মাটিতে লবন দিয়ে কিছু ভাত দেওয়া হয় এবং বলা হয় “তুমলোক বাঙ্গালী হ্যায়, চাউল খাও”।“

৩৮

মোঃ আবুল ওয়াহেদ

গ্রাম- সুলতানাবাদ (বেলদার পাড়া)

ঘোড়ামাড়া, রাজশাহী

 

২৫শে মার্চের পরে রাজশাহী শহরকে পাক বাহিনী তাদের আয়ত্তে আনে। বাংলাদেশের স্বপক্ষের বিশেষ করে আওয়ামী লীগের কর্মীবৃন্দকে খুজতে থাকে এবং ধরে নির্দয়ভাবে হত্যা করে। এপ্রিলের প্রথম দিকে বেলদার পাড়ার দুজন যুবক যথাক্রমে বাদল ও অন্যজনকে প্রকাশ্য দিবালোকে রাস্তার উপরে গুলি করে হত্যা করে।

 

বর্বর সৈন্যদের এলোপাতাড়ি গোলাগোলির আওয়াজে গ্রামবাসী প্রাণের ভয়ে বাড়ি-ঘর ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। আমি এপ্রিল মাসের ১২ তারিখে মা সহ ভারতে আশ্রয় নেই এবং জুন মাসের ১ তারিখে স্ত্রী ও ছেলেমেয়েদেরকে নেবার জন্য বেলদার পাড়ায় আসি।

 

৩ দিন পর পাক বাহিনী রাত ৯টার সময় বাড়ি ঘেরাও করে আমাকে গ্রেফতার করে। অবশ্য শান্তি কমিটির দালালদের কুপ্ররোচনায়। গ্রেফতার করার সময় বাড়ির চারিদিকে এবং ছাদের উপর থেকে গোলাগোলি করে এক বিভীষিকাময় পরিবেশের সৃষ্টি করে। গ্রেফতার করার পর অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে। পরে গুলি করার জন্য আমাকে লাইনে দাঁড় করায়। কয়েকজন সৈন্যের উদারতার জন্য গুলি করতে বিরত হয় কিন্তু শারীরিক নির্যাতন চালায়। অতঃপর আমাকে জিপে করে হাত বাঁধা অবস্থায় স্থানীয় সার্কিট হাউজে নিয়ে যায়। সেখানে অন্ধকারময় বন্ধ ঘরে পিছনে হাত বাঁধা অবস্থায় দেয়ালের দিকে মুখ করিয়ে সারারাত দাঁড় করিয়ে রাখে। এবং যাতে বসতে না পারি তার জন্য সামরিক বাহিনীর লোকেরা কড়া পাহারা দিতে থাকে। সকালের দিকে এক কাপ চা ও একখানা রুটি খেতে দেয়। ঐ সার্কিট হাউজেই বিশ্ববিদ্যালয়ের দুজন ছাত্রকে বন্দী অবস্থায় দেখতে পাই। তাদের উপরে বর্ণনাতীত শারীরিক নির্যাতন চালায়।

 

নির্যাতনের এক পর্যায়ে জনৈক পদস্থ কর্মচারী ছাত্রদ্বয়কে চাকু লাগাতে নির্দেশ দেয়। কিম্ভূতকিমাকার বিশাল বপু বিশিষ্ট একজন সৈন্য অফিসারের নির্দেশের মর্মানুযায়ী তাদের পেটে কুকুরের মতো কামড়িয়ে মাংস ধরে টানাটানি করতে থাকে। ছত্রদ্বয় আর্তচিৎকার করতে থাকে। তিনজনই পূর্বপরিচিত হলেও কেউ কাউকে পরিচয় দেবো না বলে একমত হই।

 

পরের দিন আমিসহ দু’জন ছাত্রকে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টাফ কোয়ার্টার ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। নিয়ে যাবার পর ক্যাম্পের খোলা আঙ্গিনায় আমাদের গায়ের জামা খোলার নির্দেশ দেওয়া হয়। জামা খোলা হলে ১০/১২ জন বর্বর সৈন্য বেত, চাবুক দ্বারা এলোপাতাড়িভাবে প্রহার শুরু করে। রক্তাক্ত অবস্থায় যতক্ষণ না তারা অজ্ঞান হয় ততক্ষণ ঐ অবস্থা চালাতে থাকে। অতঃপর পা ধরে টেনে পাশের একটি ছোট কোঠায় পাশাপাশি রেখে দেয়। কিছুক্ষণ পর ছাত্রদের মধ্যের একজনকে যিনি বেশ স্বাস্থ্যবান ছিলেন তাকে পুনরায় টেনে আঙ্গিনায় নিয়ে যায় এবং পায়ে দড়ি বেঁধে উল্টোভাবে রডের সাথে টাঙ্গিয়ে দেয়। “তুমলোক লিডায় হ্যায়” বলে চাবুক দিয়ে মারতে শুরু করে। তার শরীর দিয়ে দর দর করে বিগলিত ধারায় রক্ত গড়াতে থাকে। অত্যাচারের এক পর্যায়ে হঠাৎ ছেলেটির পায়ের দড়ি ছিঁড়ে পড়ে যায়। তখন তারা সাময়িকভাবে অত্যাচার বন্ধ করে দেয়। অজ্ঞান অবস্থাতেই পুর্বোক্ত ঘরে পুর্বোক্ত পদ্ধতিতে রেখে দেয়া হয়।

 

সারা দিন ও রাত অভুক্ত অবস্থায় রেখে দেয়া হয়। পরদিন সকালে শুধু এক কাপ চা পান করতে দেয়। তারপর এক এক করে পাশের ঘরে সিকিউরিটি অফিসার সেলিমের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। তিনি প্রথমবারের মত বিবৃতি নিলেন। বিবৃতি নেয়ার মাঝে মাঝে অফিসারটি নিজের হাতে গ্লাভস পরে এলোপাতাড়ি ঘুষি মারতে থাকে। এর ফলে মাটিতে পড়ে গেলে বুট দিয়ে শরীরে চড়ে নির্যাতন করতে থাকে। এবং জ্বলন্ত সিগারেট শরীরের বিভিন্ন স্থানে ঠেসে ধরে। বলাবাহুল্য, অত্যাচার করে তারা পাশবিক আনন্দ উপভোগ করে। এবং নিজেদের খুশিমতো বিবৃতি তৈরী করে। বিবৃতি নেবার পর পুর্বোক্ত ঘরে আবার বন্দী করে রাখে এবং দুপুরে কোন রকম তারকারি ও প্লেট ছাড়াই মাটিতে লবন দিয়ে কিছু ভাত দেওয়া হয় এবং বলা হয় “তুমলোক বাঙ্গালী হ্যায়, চাউল খাও”।

 

পরের দিন সকাল আটটায় জিপে করে উক্ত সিকিউরিটি অফিসারের তত্ত্বাবধানে তিনজনকেই জুবেরী হাউসের দোতলার একটি কক্ষে রাখা হয়। এবং সেখানে কড়া সামরিক পাহারা ছিল। সেখানে পাশের কক্ষে একজন পুলিশ ইন্সপেক্টর একজন দারোগাসহ ১০/১২ জন পুলিশের লোক ইউনিফর্মসহ বন্দী ছিলেন। এদের অনেকেই আমার পরিচিত ছিলেন। আমাদের কক্ষে একজন ইউসি চেয়ারম্যানসহ আরো ৬/৭ জন সাধারণ মানুষ ছিলেন। সেখানে তিনদিন থাকাকালে কোন শারীরিক নির্যাতন করা না হলেও অপমানজনক অশ্লীল ভাষায় গালাগালি করে। যেমনঃ- “তুমলোক গাদ্দার হ্যায়, তুমলোক বেইমান হ্যায়, তুমলোক হিন্দু হ্যায়।”

 

ঐ তিনদিনের এক রাতে আমাকেসহ আরো দুজনের (উপরোক্ত ছাত্রদ্বয় নন) নাম ডেকে দোতলা থেকে নামিয়ে আনে এবং সাহসে ভর করে আমি তাদের জিজ্ঞাসা করেছিলাম, “হাম লোগকো কাঁহা লেয়ে যায়েংগে?” তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, “তুমলোক কালমা পড়নে পড়নে চলো, তুমলোগকো খতম করেগা।”

 

নীচে আসার পর সাথী দুজনের নাম ধাম জিজ্ঞাসাবাদের পর দু’জনকে নিরুদ্দেশের পথে নিয়ে যাওয়া হয়। এবং সম্ভবত তাদেরকে হত্যা করা হয়। পুনরায় বিবৃতি নেওয়া হবে এই উক্তির প্রেক্ষিতে আমাকে ফিরিয়ে আনা হয়। পরের দিন বেলা তিনটায় দুজন ছাত্রসহ আমাকে এক সঙ্গে হাত ও চোখ বাঁধা অবস্থায় মিলিটারি ট্রাকে নাটোরের পথে নিয়ে যাওয়া হয়। পথে বুট দিয়ে আমাদের উপর সীমাহীন অত্যাচার করে। জেল গেটের খাতায় “ফাইট এগেইনেস্ট গভর্নমেন্ট” লিখে নেয়। জেল গেটের আঙ্গিনায় তখন তিনজনের উপরে বেয়নেট, লাঠি, বেত, বুট ইত্যাদি দ্বারা নির্যাতন করতে থাকে।

 

নির্যাতনের পর বিকাল পাঁচটায় আমাদেরকে গলা ধাক্কা দিয়ে একটি কুঠুরীতে বন্দী করে। সেখানে আরো দুজনকে বন্দী অবস্থায় দেখা যায়। অবশ্য জেল গেটেই তাদের হাতের বাঁধন ও চোখের পট্টি খুলে দেয়।

 

নাটোর জেলখানায় তিনটি কোঠায় তিনশ জনের মত কয়েদী ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডঃ সালেহ আহমদ, অধ্যাপক মুজিবর রহমানসহ অনেক বুদ্ধিজীবীও ছিলেন। বলা প্রয়োজন যে ইপিআরদের জন্য তিনটি কোঠার একটি রিজার্ভ ছিল। প্রত্যহ পানি আনা, রাস্তা মেরামত, পুকুর পরিষ্কার, মিলিটারিদের খেলার মাঠ তৈরীসহ বিভিন্ন ধরণের কাজ তাদের দিয়ে করিয়ে নেওয়া হতো। এবং সে সময়ে তাদের উপর অত্যাচার করা হতো।

 

জেলখনায় মাস দুয়েক কাটানোর পর আমাকে জনৈক এফআইটি অফিসারের নিকট বিবৃতি দেওয়ার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। এবং সেখানে বিবৃতি আদায়ের ফাঁকে ফাঁকে বৈদ্যুতিক চাবুক দ্বারা প্রহার করে। শেষ পর্যন্ত যে বিবৃতিতে তারা সই করিয়ে নেয় তাতে সত্য অপেক্ষা মিথ্যাই ছিল বেশী।

 

নাটোর জেলখনায় মিলিটারীদের অত্যাচারের সময় জেলখানাতেই জনৈক কয়েদী মারা যান।

 

স্বাক্ষর/-

মোঃ আবুল ওয়াহেদ

১৬/০৮/১৯৭২

 

রকিবুল হাসান জিহান

<,২.২.৩৯,৭৫>এরপর সকলকে নদীর ধারে নিয়ে যায় গুলি করার জন্য। সে জায়গা খর স্রোতা নয়, লাশ জলে আটকে থাকবে এজন্য স্থান পরিবর্তন করে আর এক জায়গায় নেওয়া হয়।“

৩৯

মোঃ আফজাল আলী মন্ডল

গ্রাম- পারনাথপুর

পোঃ- রাণীনগর

রাজশাহী

 

“ভাদ্র মাসের শেষ সপ্তাহ মঙ্গলবার ভোর বেলায় গাড়ি থামিয়ে পাক সৈন্যরা চকউজির, বাহাদুরপুর, চক বিলাকী গ্রাম ঘেরাও করে। আমি সেদিন চক বিলাকী গ্রামে আত্মগোপন করেছিলাম। আমাকে এবং আরো দুজনকে ধরে বেঁধে রাখে। উল্লিখিত দুজনের একজনের চাচাকে বাড়িতে গুলি করে হত্যা করে রেখে তাকে বেঁধে নেয়। নদীর ধারে ঢাকা থেকে আগত কামলা ৯ জন ছিল। এরা তাদেরকেও ধরে ফেলে। আমার স্বাস্থ্য ভাল বিধায় আমাকে মুক্তিবাহিনীর নেতা বলে অকথ্য শারীরিক নির্যাতন চালায় এবং জানতে চায় মুক্তিফৌজ কোথায় এবং রাইফেলাদি কোথায়?

 

ইতিমধ্যে আরও তিনজনকে ধরে আনে। তাদের প্রহার করে ও আমি মুক্তিবাহিনীর নেতা কিনা তা জানতে চায়। এরপর সকলকে নদীর ধারে নিয়ে যায় গুলি করার জন্য। সে জায়গা খর স্রোতা নয়, লাশ জলে আটকে থাকবে এজন্য স্থান পরিবর্তন করে আর এক জায়গায় নেওয়া হয়। সেখানে ‘ওয়্যারলেস’ এর মাধ্যমে কথাবার্তা হতো। তারপর আমাদের একটি আম বাগানে নেওয়া হয়। সেখানে আরও তিনজনকে গ্রেফতার করে, যারা মিলিটারীকে দেখতে এসেছিল। এদের একজন অত্যাচারের অসহ্যতার জন্য বলে যে আমি আওয়ামী লীগের নেতা। যাহোক জনৈক রাজাকারের সামান্য সুপারিশে আমাকে ও উল্লিখিত দুজনকে ছেড়ে দেয়। কিছু দূর যাবার পরে আমার মনে হলো যে এ ছেড়ে দেওয়া মানে কিছু দূর যাবার পর গুলি করে হত্যা করবে। এসব ভাবতে ভাবতে আমি জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যাই। পরবর্তিকালে জ্ঞান ফিরলে দেখতে পাই যে আমি বাড়িতে আছি।

 

পাক বাহিনী ঐদিন গ্রামগুলি ঘেরাও করে অন্যূন ২৫০/৩০০ জন লোক ধরে এবং তাদের মধ্যে সাতজনকে গুলি করার জন্য আত্রাই নিয়ে যায়। তাদের সবাই মারা গেলেও ভাগ্যক্রমে আক্কেল আলী নামে জৈনক ছেলে গুরুতর আহত অবস্থায় বেঁচে যায়।

 

স্বাক্ষর/-

মোঃ আফজাল আলী মন্ডল

 

রকিবুল হাসান জিহান

<,২.২.৪০,৭৬>

৪০

মোঃ হামিদুর রহমান

গ্রাম- কুমাইল, পোঃ- কাশিমপুর

থানা- রাণীনগর, রাজশাহী

 

রাণীনগর থানার আতাইকুলা গ্রামে অপ্রত্যাশিতভাবে জুন মাসে ২৯ তারিখে প্রায় ৮০ জন পাক সৈন্য প্রবেশ করে। পাক বর্বরদের সাথে বিহারীরাও ছিল। সেদিন বেলা দশটার সময় উল্লেখিত পাক বর্বররা ধ্বংস, বীভৎসতা চালানোর জন্য গিয়েছিল। গ্রামে প্রবেশ করার আগে গ্রামের সংলগ্ন যমুনা নদী পার হয়ে সশস্ত্রভাবে দৌড়ে গিয়ে গ্রামটিকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে। অবশ্য গ্রামের পাল পাড়া ধ্বংস করাই উদ্দেশ্য ছিল বলে আমার মনে হয়। গ্রামের অন্যান্য পাড়ায় গুরুত্ব না দিয়ে উক্ত গ্রামের পাল পাড়াতেই বেশি তৎপরতা চালায়। পাল পাড়ায় সমস্ত জনগণকে একত্রিত হতে পাক হানাদাররা আদেশ করে। আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে উক্ত পাড়ার হিন্দু জনগণ এক জায়গাতে একত্রিত হয়। পরে পাক হানাদাররা তল্লাশি করে ও জোরপূর্বক টাকা-পয়সা, সোনার গহনা, ব্যবহারিক সৌখিন জিনিস লুট করতে থাকে। অন্যূন ৬০ হাজার টাকা উক্ত গ্রাম থেকে লুট করে নিয়েছে। বেলা ১০টা থেকে ২টা পর্যন্ত লুট পর্ব চলে। পড়ে উল্লিখিত ধৃত ব্যক্তিগণকে এক লাইনে দাঁড় করায়। লাইনে দাঁড় করানোর পরে মেশিন গানের গুলিতে ৪০ জন লোক নিহত হন।

 

উক্ত হত্যাকাণ্ডের আগে পাক বর্বররা গ্রামের প্রায় ৫০ জন কুলবধূকে অন্য এক জায়গায় বন্দী করে রাখে। কুলবধূগণকে গুলি করে না মারলেও তাদের অধিকাংশের শ্লীলতাহানি করে। বলা প্রয়োজন উক্ত হত্যালীলা ও ধর্ষণ চালানোর পরে উক্ত পাড়াতে ব্যাপকভাবে অগ্নিসংযোগ করে। ফলে উক্ত পাড়ায় শতকরা ৩০ ভাগ বাড়িঘর সম্পুর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে যায়। অবশ্য গ্রামে প্রবেশ করার পূর্বে ও পরে মাঠের দিকে বিক্ষিপ্তভাবে গুলি চালালে ইরি ক্ষেতের মাঝে লুকায়িত ৬/৭ জন নিরীহ মানুষ নিহত হয়েছিলেন।

 

কিছুদিন পরে পশ্চিমা বর্বর বাহিনী পুনরায় উক্ত আতাইকুলা গ্রামে পাল পাড়ায় প্রবেশ করে। প্রবেশ করার আগে গ্রামের জনগণ নারী, পুরুষ নির্বিশেষে প্রাণের ভয়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। পরে কোন মানুষকে না পেয়ে কয়েকটি বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে পাক পশুরা তাদের নির্দিষ্ট স্থানে চলে যায়।

 

আত্রাই থানায় তখন বর্বরদের ধ্বংস ও বীভৎসতা চরম ভাবে চলেছিল। বলা প্রয়োজন আতাইকুলাতে দুইবার অভিযান চলার পর পার্শ্ববর্তী গ্রামের কিছুসংখ্যক যুবক ঐ গ্রামে অভিযান হবেনা ভেবে রাত্রিতে অবস্থান করতেন। কিন্তু গ্রামে স্বার্থান্বেষী পাকিস্তানী দালালদের প্ররোচনায় তাদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছিল। পরে দালালদের আমন্ত্রণে পাক বর্বররা তৃতীয়বার উক্ত আতাইকুলা গ্রামে প্রবেশ করে পাল পাড়াতেই। বলা প্রয়োজন উক্ত পাল পাড়ায় প্রাণের ভয়ে কয়েকজন যুবক আশ্রয় নিয়েছিল। তখন কয়েকজন যুবক পাক দস্যুদের তৎপরতায় ধরা পড়ে। পাক বর্বররা উক্ত ধৃত যুবকদেরকে নৃশংসভাবে হত্যা করে।

 

স্বাক্ষর/-

মোঃ হামিদুর রহমান

 

 

রকিবুল হাসান জিহান

<,২.২.৪১,৭৭>

৪১

মোঃ ছালামত আলী

গ্রাম- সফিকপুর

ডাকঘর- পালসা

রাণীনগর, রাজশাহী

 

নভেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহের দিকে বর্বর নরপশুরা রাজাকারসহ সশস্ত্র অবস্থায় আকস্মাত গ্রামে প্রবেশ করার পূর্বেই গ্রামের জনসাধারণ স্ত্রী-পুত্র, কন্যাসহ বিক্ষিপ্তভাবে প্রাণের ভয়ে পলায়ন করতে থাকে। পড়ে সৈন্যরা এবং রাজাকাররা নৌকা থেকে নেমেই গ্রামের প্রত্যেকটি বাড়ি তন্ন তন্ন করে তল্লাশী চালাতে লাগলো, তাদের ধারণা ছিল হয়তো কোন আওয়ামী লীগার, মুক্তিযোদ্ধা কিংবা কোন স্বেচ্ছাসেবক গ্রামের মাঝে আত্মগোপন করে আছেন। কিন্তু তাদের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল লুট করা। ঘরের মাঝে যে সমস্ত মূল্যবান আসবাবপত্র ছিল তা নষ্ট করে দেয়, কতকগুলি শৌখিন জিনিস নিয়েও যায়। ট্রাংক, সুটকেস খুলে খুলে কিংবা উপর থেকে আছাড় মেরে তার ভেতরে যা পায় যেমন দামি কাপড় চোপড়, গহনা পত্র, রেডিও, ঘড়ি সমস্ত লুট করে নিয়ে যায়। পঞ্চান্ন বছর বয়স্ক মজিবর রহমান নামক এক বৃদ্ধকে বেদম প্রহার করে। সেই প্রহারের ক্ষণকাল পর আমাকে ধরে চোখ বাঁধে। চোখ বাঁধা অবস্থায়ই আমাকে নৌকায় তোলে। অনেক অবাঞ্চিত কথা বলার পর পাক বাহিনীর লোকেরা আমাকে আত্রাই স্টেশনে নিয়ে যায়। আত্রাই স্টেশনে নামিয়ে চোখের বাঁধন খুলে দেয়। স্টেশন সংলগ্ন একটি কোঠায় আমাকে বন্দী করে রাখে। সেখানে আমি নাম না জানা অপরিচিত বারজন লোককে দেখতে পাই। দুদিনে দুইখানা রুটি খেতে দিয়েছে নরপশুরা। অবশ্য কোন থালা বা প্লেটে দেয়নি। হাতে হাতে দিয়েছে।

 

যে বার জন লোক উল্লিখিত কুঠুরিতে ছিলেন তাদেরকে নিয়ে কয়েকজন মিলিটারী প্রায় দুইশ গজ দূরে নিয়ে যায়। তখন অন্ধকার রাত ছিল। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছিল। সেই অন্ধকারের মাঝে ব্রিজের উপরে বার জন লোককে তুলে নেয়। অবশ্য ব্রিজের নিচে অথৈ পানি ছিল। একসময় গুলি করে বার জন লোককে হত্যা করে। আমি স্পষ্ট গুলির শব্দ শুনতে পাই। পরে বর্বর সৈন্যরা নির্দিষ্ট জায়গাই চলে আসে।

 

উল্লিখিত ঘটনার পড়ে পালা এলো আমাকে হত্যা করার। আমি চাকুরিজীবী বলে পশুরা আমাকে হত্যা করে না। আর পকেটে ছিল পরিচয়পত্র। সেই পরিচয়পত্রের পরিপ্রেক্ষিতে আমাকে রাত ৯টার সময় আত্রাই স্টেশন ক্যাম্প থেকে হানাদাররা মুক্তি দেয়।

 

স্বাক্ষর/-

মোঃ ছালামত আলী

 

রকিবুল হাসান জিহান

<,২.২.৪২,৭৮>

 

৪২

মোঃ আবুল হোসেন

থানা- সদর, জেলা- রাজশাহী

 

পাকবাহিনী রাজশাহী প্রবেশের পূর্বে বিমান মহড়া শুরু করে জনমনে ত্রাসের সঞ্চার করে। বিমান থেকে যে দিন ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে বোমাবর্ষণ করা হয় সেদিন আমি প্রাণের ভয়ে সপরিবারে দুর্গাপুর থানার পাচুবাড়িয়া স্কুলগৃহে আশ্রয় নেই। সেখানে প্রায় মাসাধিককাল ছিলাম। ইতিমধ্যে গোটা শহর সামরিক বাহিনীর লোকেরা নিজেদের দখলে নেয়। বাজারের দোকান লুটপাট ও অগ্নিসংযোগে পুড়িয়ে দেয়। জনবসতি এলাকায় বাসাবাড়ি ও লুটপাট করে। এতে আমাদের বাড়ি ও দোকান লুট হয়।

 

সামরিক বাহিনীর লোকেরা শহর ছেড়ে গ্রামের দিকে যখন তৎপরতা শুরু করে তখন আমরা শহরে ফিরে আসি। নিজের বাড়ি বাসোপযোগী না থাকায় এক আত্মীয়ের বাসায় উঠি (বেলদার পাড়া)। এর দশ বারদিন পর হঠাৎ একদিন রাতে কারফিউ এর মধ্যে রাত দশটার সময় বাসা ঘেরাও করে আমাকে গ্রেফতার করে। পালাবার চেষ্টা করলে গুলি করে। গুলি পেটে লেগে পিছলে বেরিয়ে যায়।

 

গ্রেফতারের পর প্রথমে এক বাসায় নিয়ে যায়। সেখানে আকারে ইঙ্গিতে শলাপরামর্শের পর আমাকে স্থানীয় সার্কিট হাউসে নিয়ে যায়। সেখানে পিছনে হাত বাঁধা অবস্থায় সারারাত অত্যাচার করে। কেউ ঘুষি মারে, কেউ চড় মারে, কেউ বা লাথি মারে।

 

পর দিন সকাল ৯টার সময় জোহা হলে হাত ও চোখ বাঁধা অবস্থায় নিয়ে যায়। একটি অন্ধকার কক্ষে উলঙ্গ করে হাত বাঁধা অবস্থায় রাখে। সেখানে জিজ্ঞাসাবাদের পর হলের আঙ্গিনায় ইলেকট্রিক তার, হান্টার ও লোহার রড় দ্বারা বিরামহীনভাবে ৮ ঘন্টা ধরে অত্যাচার করা হয়। এর মধ্যে আমি ৯ বার জ্ঞান হারিয়েছিলাম। পিপাশায় পানি ও দেওয়া হয়নি। বিকাল বেলা আমাকে আবার ঘরে নিয়ে আসে। রাতে খিচুড়ি জাতীয় সামান্য কিছু খাবার দেওয়া হয়।

 

পরের দিনও আমাকে ঐ একইভাবে অত্যাচার করে ও নানা প্রশ্ন জিজ্ঞাসাবাদ করে। বিকালের দিকে এক বাঙালি দালাল বাসা থেকে এক হাজার টাকা মুক্তিপণ হিসেবে নেয়। এবং পরের দিন সকালে সৈন্যরা আমাকে পূর্বোক্ত বাসায় রেখে যায়। ছেড়ে দেওয়ার সময় বলা হয় তোমার উপর যা ঘটলো তা যদি কাউকে বলো তাহলে তোমার গোটা পরিবারকে শেষ করে দেওয়া হবে।

 

জোহা হলে বন্দী অবস্থায় আমি বহু সংখ্যক নারী কন্ঠের চিৎকার, কাকুতি মিনতি ও করুণ কান্নার শব্দ শুনেছি। যদিও কিছুই দেখতে পাইনি তবে এটা বুঝেছি যে নরপশুদের অমানুষিক অত্যাচার চলছে।

 

স্বাক্ষর/-

মোঃ আবুল হোসেন

 

 

 

রকিবুল হাসান জিহান

<,২.২.৪৩,৭৯>

 

৪৩

হরিদাসী

গ্রাম- রামজীবনপুর

থানা- পুটিয়া

জেলা- রাজশাহী

 

৮ই বৈশাখ বৃহস্পতিবার ৮০/৯০ জন পাক সৈন্য সমস্ত রামজীবনপুর ঘিরে ফেলে। এ সময় আমার সেজ ছেলে কানাইলাল হেমন্ত ঘুমিয়ে ছিল। ওদের সাড়া পেয়েই ও চেতন পায়। ইতিমধ্যে পাক সৈন্যরা দরজায় রাইফেলের গুঁতা এবং পায়ের লাথি মারে এবং ঘর থেকে বেরোবার নির্দেশ দেয়। আমার ছেলে যখন দরজা খুলে বেরোয় তখন তাকে এবং তার ছেলে-মেয়েকেও ঘরের বারান্দায় বসায়। আমি এবং আমার স্বামী তখন পাশের ঘর থেকে বেরিয়ে কান্নাকাটি ও তাদের অনুরোধ করতে থাকি। তারা আমাকে “আন্দর যাও” বলে শাসাতে থাকে।

 

অতঃপর আমার ছেলের কাছে রাইফেল, বন্দুক, সোনা, সাইকেল, ঘড়ি, টাকা-পয়সা চাইতে থাকে।

 

তারপর আমার উক্ত ছেলেকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে রশি দুই দূরে জমির মধ্যে নিয়ে যায়। তারা পাশের বাড়ি থেকে আরও দুজনকেও (পিতা-পুত্র) ধরে নিয়ে যায়। এবং সেখানে তাদের গুলি করে হত্যা করে।

 

গুলি করে হত্যা করার পর তারা আবার আমার বাড়ি আসে এবং আমার বেটার বৌ এর কাছে বলে যে তোমার স্বামীকে শেষ করে দিয়েছি। এখন তোমরা বাড়ি থেকে বেরোও। বাধ্য হয়ে আমরা বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলে তারা বাড়িতে আগুল লাগিয়ে দেয়। তারা আগুন লাগানোর আগে আমার গরুগুলি ছেড়ে দেয়। অতঃপর তারা চলে যায়। এদিন সমস্ত পাড়ায় তারা আগুন এবং অন্যূন ৮ জন লোককে হত্যা করে। এর দুই দিন পর আমি ভারতে চলে যায়। আমার চলে যাবার পর আমার বাড়ির অবশিষ্ট সম্পদ লুন্ঠিত হয়।

 

স্বাক্ষর/-

হরিদাসী

 

 

রকিবুল হাসান জিহান

<,২.২.৪৪,৮০-৮২>নামাজ পড়তে চাইলে তারা বলত “তোম লোগ কাফের হ্যায়, নামাজ কিউ পড়তা হ্যায়?” তাছাড়া নামাজ পড়তে দেখলে তারা দাত বের করে হাসতো।“

 

৪৪

মোঃ আব্দুর রাজ্জাক

আনছার কমান্ডার

গ্রাম- গৌরশহরপুর

থানা- চরঘাট, রাজশাহী

 

১৯৭১ সালের ১৩ই এপ্রিল পাক সৈন্যরা ৬০/৭০ খানা গাড়িযোগে সারদা আসে। এবং অবশেষে সারদার পতন ঘটে। তারা এসেছে এ খবরে এবং তাদের দেখে সারদা এলাকার লোকজন আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা প্রাণের ভয়ে আত্মরক্ষার্থে চরে আশ্রয় নেয়। পাক সৈন্যরা পিটিসিতে ঢুকে আগ্নেয়াস্ত্র দখল করে এবং বেপরোয়াভাবে গুলিবর্ষণ করতে থাকে। তারা চরে আশ্রয় নেয়া লোকদের ধরে একত্রিত করে। তাদের সংখ্যা ছিল অন্যূন ১০০০/১৫০০। এদের মধ্যে আনসার, পুলিস, সাধারণ মানুষ ছিল। একত্রিত লোকগুলিকে জমা করা হলে তারা সারি করে সকলকে গুলি করে হত্যা করে।

 

এক একটা দলকে ধরে এনে তারা গুলি করে হত্যা করে। ইতিমধ্যে আর একটি দল জমা হয়। তাদেরকে দিয়ে মৃত লাশগুলি জমা করে। অতঃপর তাদেরকে গুলি করে হত্যা করে। অপর ধৃত লোকগুলি দিয়ে তাদের লাশ জমা করে। শেষাবধি মৃত দেহগুলিকে পেট্রোল দিয়ে পুড়িয়ে দেয়।

 

আড়াইটা থেকে পাঁচটা পর্যন্ত তারা এই কাজ করে। অতঃপর তারা সন্ধ্যার মধ্যেই এলাকা ত্যাগ করে চলে যায়। এসময় তারা বিরামহীনভাবে বৃষ্টির মতো গোলাবর্ষণ করতে থাকে।

 

এ সময় আমি আর সকলের সাথে চরে আশ্রয় নিয়েছিলাম। কিন্তু ব্যাপার বেগতিক দেখে চর থেকে পালিয়ে গ্রামের মধ্যে ঢুকি এবং নিজেকে মুক্ত রেখে পাক সৈন্যদের কার্যকলাপ দেখছিলাম।

 

সন্ধ্যার মধ্যেই এখানে থাকা নিরাপদ নয় ভেবে ছেলে-মেয়েসহ অন্য গ্রামে পালিয়ে গিয়ে আশ্রয় নেই। পরদিন অত্র থানার নন্দনগাছি নিমপাড়া ইউনিয়নে আশ্রয় নেয়। কয়েকদিন সেখানে থাকার পর বুঝতে পারলাম যে সেখানে থাকা নিরাপদ নয়। পাক মেজর এবং শান্তি কমিটির লোকেরা আমাকে খুঁজছে। তাই সেখান থেকে জামনগর গ্রামে যাই। সেখানে থাকা অবস্থায় নন্দনগাছির কতিপয় লোক খবর দেয় যে চেয়ারম্যান আমাকে ডেকেছে, আমার কোন ভয় নেই। তাদের কথামতো নন্দনগাছি পৌছালে তারা আমাকে বন্দী করে এবং পরদিন সকালে জয়েন সরকারের বাড়িতে বন্দী অবস্থায় হাজির করে। সেদিন ছিল ২৯শে মে। সেখানে পৌছার কয়েক মিনিটের মধ্যে ক্যান্টনমেন্ট থেকে হাবিলদার মেজরসহ কতিপয় সামরিক লোক গিয়ে আমাকে বন্দী অবস্থায় ক্যান্টনমেন্ট নিয়ে আসে। নিয়ে যাবার সময় পিছনে হাত এবং ন্যাকড়া দিয়ে চোখ বেঁধে নিয়ে যায়। সেখানে মেজর শফি আহমেদের কুঠিতে বন্দী করে রেখে দেয়।

 

বিকেলে মেজর আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা শুরু করে। সে জিজ্ঞেস করেছিল যে তুমি গোপালপুরে কতোজন মিলিটারী মেরেছো এবং কতো রাইফেল নিয়ে গিয়েছিলে? উত্তরে তারা সন্তুষ্ট হতে না পেরে আমার উপর শারীরিক অত্যাচার শুরু করে। বুটের লাথি, চড়, কিল, ঘুষি মারছিল। এ অবস্থায় অত্যাচার করার পর চোখ আবার বাঁধা হয়। হাত তো আগে থেকেই বাঁধা ছিল। এ অবস্থায় গেস্ট হাউসের উপর তলায় রাখে।

 

রাত আটটার দিকে আবার নতুন করে হাত কষে বাঁধে। পায়ের গিটে বেঁধে হাঁটুর মধ্যে মাথা ঢুকিয়ে ঘাড় এবং হাঁটু পেঁচিয়ে শক্ত করে বাঁধে। অতঃপর ঐ অবস্থায় আমাকে হৃদয়হীনভাবে প্রহার শুরু করে। হাত, লাঠি, রুলার দ্বারা প্রহার করতে থাকে। রাইফেলের বাঁট দিয়ে গর্দানে এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে প্রহার করে। এই প্রক্রিয়ায় পালাক্রমে সারারাত ধরে অত্যাচার করে। শেষ রাতের দিকে সেই পশুরা যখন অণ্ডকোষ ও মলদ্বারে লাঠি মারে সে সময় আমি চিৎকার করে জ্ঞান হারিয়ে ফেলি।

 

সকাল ৭/৮ টার দিকে যখন আমার জ্ঞান ফিরে তখন আমি ঐ বসা অবস্থায় কুণ্ডলী পাকিয়ে নিজেকে পড়ে থাকতে দেখতে পাই। এবং ঐ অবস্থায় অভুক্তভাবে সারাদিন ঐখানেই পড়ে থাকি।

 

বিকেল বেলা আমার হাত এবং পায়ের বাঁধন খুলে দেয়। চোখ বাঁধা অবস্থাতেই গাড়িতে তুলে নিয়ে মেজর আমাকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গেস্ট হাউসে নিয়ে যায়।

 

সন্ধ্যার পর চোখ ও হাত পা খোলা অবস্থায় কর্নেল রেজভীর সামনে আবার পূর্বোক্ত প্রশ্নগুলি জিজ্ঞাসা করতে থাকে। আমি সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করি।

 

রাত ১১ টার দিকে আমাকে একটি ঘরে বন্দী করে। সেখানে আমি ১০/১২ জন লোককে বন্দী অবস্থায় দেখতে পাই।

 

পরদিন সকালে কয়েকজন সেপাই আমাকে দেখে প্রহার শুরু করে। পালাক্রমে তারা এই কাজ করে। তাদের রীতি ছিল যে ঐ ঘরে কোনো লোক গেলে তারা বলতো “তোম কাহাসে আয়া, কব আয়া?” আর তার সাথে প্রহার করতো। দুপুরের দিকে ২টা রুটি এবং কিছু তরকারি দেয়। পায়খানা প্রসাব অথবা গোসলাদির কোন ব্যবস্থা ছিল না।

 

সেখানে তের দিন বন্দী অবস্থায় ছিলাম। এবং সে সময় আমি লক্ষ্য করেছি যে সারাদিন ধরে লোক জমা হতো এবং রাতে অস্ত্রশস্ত্র সহকারে একজন হাবিলদার এবং তিনজন সেপাই আসতো। তাদের সাথে মোটা দড়ি থাকতো। কাগজে নাম লিখা থাকতো। নাম ধরে ডাকতো এবং বলতো “তোম খাড়া হো যাও।” খাড়া হয়ে গেলে পিছনে ঐ দড়ি দিয়ে কষে হাত বাধতো এবং টেনে মাঠের মধ্যে ১০০/১৫০ গজ দূরে নিয়ে যেত। তারপর শোনা যেত গুলির আওয়াজ। যতগুলি লোক ধরে নিয়ে যেত ঠিক ততটি গুলি করতো। প্রত্যেক রাতে ৭/৮/৯/১০টা করে লোক এমনি করে হত্যা করেছে। এ সময় প্রত্যেক দিন আমার উপর অমানুষিক অত্যাচার করেছে।

 

১৩ দিন পর বিকেলে নাকে লোহার পাত দিয়ে পিছনে হাত বেঁধে (ডাবল হ্যান্ডকাফ দিয়ে) জাহাঙ্গীর পরিবহনে (রাজশাহীর একটি বাসের নাম যা এখনো আছে) করে নাটোর এম, পি, এইচ, কিউ ফুল বাগানে পাঠায়। বাসের দরজা জানালা বন্ধ অবস্থায় ছয়জনের গার্ডে নাটোর পৌঁছায়। সেখানে প্রায় আধ ঘন্টা ছিলাম। সে সময়ই এমপিরা (MP = Military Police) পালাক্রমে প্রহার করে এবং অকথ্য ও অশ্লীল ভাষায় গালি গালাজ করে। তারপর নাটোর জেলখানায় পাঠিয়ে দেয়।

 

জেলখানায় হাত খোলা অবস্থায় হাজত ঘরে বন্দী করে রাখে। সেখানে আরও ৫০/৬০ জন লোক ছিল। ৫/৭ দিন আমি সেখানে ছিলাম। সেখানে একজন এফআইটি প্রত্যহ আসত এবং পালাক্রমে সকলের জবানবন্দী নিত। জবানবন্দী নেবার আগে এক পশলা প্রহার করে নিতো। সকাল, বিকাল ও দুপুরে এই কাজ করতো। জবানবন্দী হয়ে গেলে ঐ সময় আমাকে জেল ঘরে পাঠায়। সেখানে আমরা ৬২ জনের মত লোক ছিলাম।

 

জেলখানায় থাকার সময় আমাকে একদিন বের করে মেঝের উপর হাঁটুর মধ্যে দিয়ে মাথা ঢুকিয়ে কান ধরে রাখতে বলে এবং ঐ অবস্থায় ৫০/৬০টি বেত মারে। আমি পড়ে গেলে আমাকে আবার তুলে উপুড় করে শুইয়ে দেয়। এছাড়া কখনো হাত-পা ফাঁক করে দাঁড় করিয়ে রাখতো। কখনো বা টান উপর করে বুকডন দেওয়ার প্রক্রিয়ায় ঘন্টা খানেক করে রাখতো। তাছাড়াও উপুড় করে শুইয়ে রেখে দুজন সিপাই একই সঙ্গে পিঠের উপর খুচত। বেত পিটানো তো নিয়মিতই হচ্ছিল। প্রত্যেক দিন বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় ১৬২ জন ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার, মাস্টারসহ বিভিন্ন ধরণের লোককে অত্যাচার করতো। মাঝে মধ্যে ২০/২৫ জন লোককে ধরে ফুল বাগানে নিয়ে গিয়ে পাথর বালি বইয়ে নিত।

 

এ সময় নামাজ পড়তে চাইলে তারা বলত “তোম লোগ কাফের হ্যায়, নামাজ কিউ পড়তা হ্যায়?” তাছাড়া নামাজ পড়তে দেখলে তারা দাঁত বের করে হাসতো।

 

পরবর্তীকালে এফ,আই,ও রা আবার নাটোর রিক্রিয়েশন ক্লাবে নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করতো। সে সময় এক ধরনের কালো রাবারের পাইপ দিয়ে প্রহার করতো। ৫ই সেপ্টেম্বরের সপ্তাহখানেক আগে সামরিক আইনের ১৮ ধারা মতে (সামরিক বাহিনীর সাথে যুদ্ধ করা) চার্জশীট দাখিল করে। বিচার শুরু হবার আগেই ইয়াহিয়ার সাধারণ ক্ষমায় আমি ছাড়া পাই।

 

স্বাক্ষর/-

মোঃ আব্দুর রাজ্জাক

 

 

রকিবুল হাসান জিহান

<,২.২.৪৫,৮৩>তাদেরকে বিভিন্ন দোষে দোষারোপ করে জরিমানা করা হতো, যদি জরিমানা দিতে অক্ষম হতো তাহলে তাকে জবাই করে হত্যা করা হতো। আর যারা জরিমানা দিতে পারতো তাদেরকে তখনকার মতো ছেড়ে দেওয়া হতো।“

 

৪৫

মোঃ ওমর আলী শেখ

গ্রাম- গৌরসহর পুর

থানা- চারঘাট

জেলা- রাজশাহী

 

১৯৭১ সালের জ্যৈষ্ঠ মাসে খান সেনারা গোলাগোলি করতে করতে বাড়ি ঘর জ্বালাতে জ্বালাতে আসতে লাগলো। পাক সেনাদের ভয়ে আমরা নিরাপদ জায়গায় আত্মগোপন করে তাদের গতি লক্ষ করতে থাকলাম। তারা সারদা পুলিশ ট্রেনিং একাডেমীতে যায়। প্রাণভয়ে যে সমস্ত লোক পদ্মানদীর ধারে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল তাদেরকে ঘেরাও করে ধরে প্রায় আনুমানিক ১২০০/১৩০০ লোককে গুলি করে হত্যা করে এবং পড়ে সকলকে একত্রিত করে পেট্রোল দিয়ে আগুন ধরিয়ে জ্বালিয়ে দেয়। ইহার দুই ঘন্টার মধ্যেই তারা রাজশাহীতে চলে যায়।

 

পরের দিন সিএফ পুলিশ নিয়ে এসে এখানে রাখে এই অঞ্চলকে তাদের আয়ত্তে রাখার জন্য। শুধু তাই নয় তাদের সাথে আরো কিছু মিলিশিয়া জমায়েত করে রাখলো।

 

ইহার ২/৩ দিন পড়ে ভারী ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে এসে পুরা ক্যান্টনমেন্ট স্থায়ী করে। তারা বাজার লুট করতে লাগলো, গ্রামে গ্রামে গিয়ে যারা পালিয়ে গিয়েছে তাদের বাড়িঘর ভাঙ্গতে লাগলো এবং মালামাল লুট করতে থাকে।

 

খান সেনারা পূর্ণ ক্যান্টনমেন্টে স্থায়ী করার পর শান্তি কমিটির সদস্যরা তাদের স্বার্থসিদ্ধিতে অক্ষম হলে ঐ সমস্ত ব্যক্তিদেরকে ধরে মিলিটারীর হাতে দিতো। তাছাড়া পাশবর্তী গ্রাম থেকে সন্দেহজনক লোককে ধরে এনে খান সেনাদের হাতে দিত। তাদেরকে বিভিন্ন দোষে দোষারোপ করে জরিমানা করা হতো, যদি জরিমানা দিতে অক্ষম হতো তাহলে তাকে জবাই করে হত্যা করা হতো। আর যারা জরিমানা দিতে পারতো তাদেরকে তখনকার মতো ছেড়ে দেওয়া হতো।

 

খান সৈন্যরা বিভিন্ন গ্রামে গিয়ে নারীদের উপর পাশবিক অত্যাচার করতো। এবং বিভিন্ন জায়গা থেকে বেশ কিছু নারী নিয়ে এসে তাদের যৌনক্ষুধা নিবারণ করতো। এইভাবে তারা ৮ মাসে প্রায় ২৬০০/২৭০০ লোককে হত্যা করে।

 

স্বাক্ষর/-

মোঃ ওমর আলী

 

 

 

রকিবুল হাসান জিহান

<,২.২.৪৬,৮৪-৮৫>অনেকে যখন ভাত থালে বেড়ে নিয়ে খেতে বসেছিল ঠিক সে সময় তাদের থালাতে লাথি মেরে থালা ফেলে দিয়েছে, খেতে দেয়নি। বলেছে, “পাকিস্তানের ভাত তোদের জন্য হারাম, শীঘ্র পালা, প্রাণে মারলাম না, সেটা শুধু আমাদের দয়া।”

 

৪৬

মোঃ আনিসুর রহমান

গ্রাম- বাজে গোয়ালকান্দি

ডাকঘর- গোয়ালকান্দি

থানা- বাগমারা

জেলা- রাজশাহী

 

১৯৭১ সালের এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে শান্তি কমিটির সদস্যরা গাঙ্গোপাড়া হিন্দু বর্ধিষ্ণু গ্রামে হানা দেয়। সেখানে গ্রামে মুসলিম লীগ ও জামাতে ইসলামী পন্থীদের সহায়তায় তারা হিন্দুদের বাড়িঘর লুটপাট করে। সমস্ত কাপড়-চোপড়, সোনাদানা, থালাবাসন লুটপাট করে। এমন কি ঘরে মেঝে, পুকুর ঘাটের সিঁড়ি কোদালী, পাশ দিয়ে ভেঙ্গে ফেলে। তাদের ধারণা সেখানে লুকানো সম্পদ আছে। ঘরের জানালা কপাট খুলে নিয়ে যায়। ধানচাল, গরুবাছুর ইচ্ছামত নিয়ে নেয়। তাদের অনেকে বাস্তুভিটা ত্যাগ করার আগে পাকশাক করে শেষবারের মতো সকলে মিলে চারটি খেতে চেয়েছিল। কিন্তু শান্তি কমিটির লোকেরা তাদের সে সুযোগটুকুও দেয়নি। এমনকি অনেকে যখন ভাত থালে বেড়ে নিয়ে খেতে বসেছিল ঠিক সে সময় তাদের থালাতে লাথি মেরে থালা ফেলে দিয়েছে, খেতে দেয়নি। বলেছে, “পাকিস্তানের ভাত তোদের জন্য হারাম, শীঘ্র পালা, প্রাণে মারলাম না, সেটা শুধু আমাদের দয়া।”

 

অনুরূপভাবে জিনিসপত্র গরুবাছুরের তালিকা করে হিন্দুদের উচ্ছেদ করা হয় সেন পাড়া, ভবানীগঞ্জ, খাজাপাড়াসহ থানার সমস্ত হিন্দু এলাকা থেকে।

 

২৩শে এপ্রিল, ৯ই বৈশাখ বিকাল চারটার দিকে শান্তি কমিটির আমন্ত্রণে পাক সৈন্যরা তাহিরপুরে আসে। ঐ দিন ছিল তাহিরপুরের হাটবার। সৈন্যরা হাটে এসে সমগ্র হাটে বিক্ষিপ্তভাবে পজিশন নেয় এবং ১৩ জন লোককে ধরে গুলি করে হত্যা করে। এদের অধিকাংশই হিন্দু ছিল। মিলিটারীরা দাড়িয়ে থেকে হাট লুট করার নির্দেশ দেয়। কেউ অস্বীকার করলে বেদম প্রহার করে। ফলে হাট যথেচ্ছভাবে লুট হয়।

 

যে সকল হিন্দু দেশের মায়া ত্যাগ করতে না পেরে তখনো ছিল তাদের জোরপূর্বক মুসলমান করা হয়।

 

মুসলমান হবার সময় দেওয়া হয় মাত্র ৪৮ ঘন্টা। এতে নিরুপায় হিন্দুরা গত্যন্তর না দেখে মুসলমান হয়। একদিনেই ৩০০/৩৫০ জন হিন্দু সপরিবারে মুসলমান হয়। একমাত্র গোয়ালকান্দি ও উর্দুপাড়া গ্রামেই ১৩০ জন হিন্দু মুসলমান হয়। ধর্মান্তরিত করার পরেও তাদের মনের ঝাল মিটেনি। হিন্দুদেরই চালডাল, গরু ছাগল জবাই করে গোয়ালকান্দির মাদ্রাসা মাঠে ঘটা করে মজলিশ করে। উদ্দেশ্য ছিল, হিন্দুদের গোমাংশ ভক্ষন করিয়ে চিরতরে ধর্মচ্যুত করা।

 

মে মাসে সেন পাড়া গ্রাম থেকে বাঙ্গাল পাড়ার ইয়াছিন আলীকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। ইয়াছিন আলী সেন পাড়ায় তার শ্বশুরবাড়িতে আত্মগোপন করেছিলেন। তারপর তার আর কোন খবর পাওয়া যায়নি। সেই এই থানার প্রথম শহীদ ব্যক্তি। বাংলা আষাঢ় মাস ছিল তখন।

 

শান্তিকমিটি গঠিত হবার পর পরই শান্তিকমিটির লোকেরা দুষ্কৃতিকারীর তালিকা তৈরি করে। আওয়ামী লীগের নেতা ও প্রথম শ্রেণির একনিষ্ঠ কর্মীদের নামের তালিকা তৈরি করে। তাতে জনাব সরদার আমজাদ হোসেন এমপি, বাজে গোয়ালকান্দি গ্রামের আনিসুর রহমান, খামার গ্রামের কাজী সাজেদুর রহমান, থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি নুরুল ইসলামসহ প্রায় ২২/২৩ জনের তালিকা তৈরি করে। সরদার আমজাদ হোসেন সাহেবকে জীবিত অথবা মৃত ধরিয়ে দিতে পারলে ১৫ হাজার টাকা পুরষ্কার ঘোষণা করা হয়। এছাড়া আনিসুর রহমানসহ আরও কতিপয়কে ধরিয়ে দিতে পারলে ৫ হাজার টাকা পুরষ্কার ঘোষণা করা হয়।

 

মে মাসের মধ্যেই রাজাকার তৈরি করা হয়। এতে বহু ক্ষেত্রে জোরজবরদস্তি ও ভীতি প্রদর্শন করা হয়। প্রতিটি ইউনিয়নে রাজাকার মোতায়েন করার কথা থাকলেও তাহিরপুর এবং থানা ছাড়া কোথাও মোতায়েন করা সম্ভব হয়নি। কারণ মুক্তিযোদ্ধাদের তৎপরতায় তারা সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে।

 

৩রা আশ্বিন রাতে রায়পুরা গ্রামে হানা দিয়ে সরদার ওসমান আলী সাহেবের বাড়িঘরের সমস্ত জিনিসপত্র লুটপাট করে এবং তাঁর গায়ে কেরোসিন ঢেলে দেয়। আগুন লাগিয়ে দিতে থাকাকালে অন্য আর এক রাজাকারের কৃপায় বেঁচে যান। তাঁর পাটের গুদামে আগুন লাগিয়ে দেয়। এমনিভাবে থানার বিভিন্ন স্থানে লুটপাট করে। বেউকালীতেও অপারেশন করে লুটপাট করে, বেলসিংহেও লুটপাট চালায়।

 

পাক মিলিটারীরা থানার বিভিন্ন স্থানে অপারেশন করে লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, নরহত্যা ও নারী নির্যাতন করে। মুক্তিবাহিনীর অবস্থানের খবর পেয়ে মিলিটারীরা ভবানীগঞ্জ অভিমুখে যাত্রা করে। আগস্ট মাসের পর কোন এক সময়ের ঘটনা। সমস্ত ভবানীগঞ্জ বাজার লুটপাট করে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়। ভবানীগঞ্জ গ্রামের বেশ কিছুসংখ্যক মহিলার উপর নির্যাতন চালায়। বলা প্রয়োজন উক্ত গ্রাম ধর্মভীরু গোঁড়া মুসলমান বসতিপূর্ণ। পক্ষান্তরে তারা প্রায় সকলেই পাকিস্তানী সমর্থক ছিল। তবুও খান সেনারা তাদের পাশবিক অত্যাচার করে। তারা উত্তর একডালা গ্রামের শাহ মুহম্মদ জাফর উল্লাহ এম, এন, এ-র বাড়ি সম্পূর্ণ ভস্মীভুত করে দেয়।

 

খান সেনা ও রাজাকার দল হাজিরকুশলা গ্রামে সরদার আমজাদ হোসেনের বাড়ি অপারেশন করতে যাওয়ার পথে গোয়ালকান্দির নওমুসলিম পাড়া অগ্নিসংযোগ করে পুড়িয়ে দেয়।

 

বাগমারা থানায় রাজাকার ও আধা মিলিটারীদের ক্যাম্প ছিল তাহিরপুর, বাগমারা থানা এবং বালানগর মাদ্রাসা। উল্লিখিত স্থানে সমানে লোক হত্যা করা হতো। জবাই করে, গুলি করে এবং বস্তায় পুরে পানিতে ফেলে দিয়ে লোক হত্যা করতো। বহুসংখ্যক লোক উক্ত তিন স্থানে তাদের হাতে পাশবিকভাবে মারা যায়।

 

স্বাক্ষর/-

মোহাম্মদ আনিসুর রহমান

১৭/০৯/১৯৭২

 

 

 

রকিবুল হাসান জিহান

<,২.২.৪৭,৮৬>

৪৭

দেলজান বিবি

সাং- বাগমারা

জেলা- রাজশাহী

 

রমজান মাসের রোজা ছিলাম। বহুসংখ্যক পাকিস্তানী বর্বর সৈন্য আসে এবং কোন রকম পালানোর সুযোগ না দিয়েই তারা আমার ঘরে ঢোকে এবং ধরে পাশবিক অত্যাচার শুরু করে। চিৎকার করবার অথবা সাহায্যের জন্য ডাকাডাকি শুরু করলে তারা আমাকে হস্তদ্বারা প্রহার করে এবং গুলি করে হত্যা করবে বলে ভয় দেখায়।

 

টিপসহি/-

দেলজান বিবি

সেপ্টেম্বর, ১৯৭২

 

 

রকিবুল হাসান জিহান

<,২.২.৪৮,৮৬>

৪৮

সোনাভান খাতুন

সাং- বাগমারা

জেলা- রাজশাহী

 

রমজানের ১২/১৪ দিনের দিনে একদিন দুপুরে দুজন মিলিটারী যখন গ্রামের মধ্যে আসে তখন গ্রামের আর সকলের সাথে আমিও পালাতে চেষ্টা করি। কিন্তু বর্বর পশুরা আমাকে পথের মাঝখান থেকে তাড়িয়ে বাড়ি নিয়ে আসে এবং আমাকে ধরে। কাঁদলে অথবা চিৎকার করার চেষ্টা করলে তারা রাইফেল উচিয়ে বলে চেঁচালে গুলি করে হত্যা করবো।

 

আমার উপর দুজন নরপশু অমানুষিক হৃদয়হীনভাবে পাশবিক নির্যাতন করে। আমি মাটির তলে লুকালে তারা সেখান থেকে আমাকে টেনে বের করে।

 

টিপসহি/-

সোনাভান খাতুন

সেপ্টেম্বর, ১৯৭২

 

 

 

রকিবুল হাসান জিহান

<,২.২.৪৯,৮৭-৮৮>

 

৪৯

এল, পাইনস

বনপাড়া মিশন

থানা- বড়ইগ্রাম

জেলা- রাজশাহী

 

২০শে এপ্রিল ১৯৭১ সাল। মিলিটারীরা বনপাড়ার আশেপাশে আসে এবং বিক্ষিপ্তভাবে গোলাগুলি চালালে হারোয়াতে চারজন লোক মারা যায়। তারপর থেকে মাঝে মাঝে পাক নরপশুরা অপারেশন চালাতে থাকে। তার প্রতিক্রিয়ায় বনপাড়া এলাকার বিভিন্ন গ্রাম থেকে অমুসলমানরা পালিয়ে আসে মিশন হাসপাতালে। মিশন হাসপাতাল কতৃপক্ষ তাদের খাওয়া ও থাকার ব্যবস্থা যত্নসহকারে করতে থাকেন। তখন অবশ্য পাক সৈন্যরা নাটোর ও রাজশাহীতে চলে গিয়েছিল। তখন স্থানীয় দুষ্কৃতিকারীরা হিন্দুদের ক্ষতিসাধন করে। তাদের পরিত্যাক্ত বাড়ি-ঘর লুট করে। তখন থেকেই ২/১ জন অমুসলমান ওপার বাংলায় পালিয়ে যেতে থাকে।

 

২রা মে রাতে অমুসলমানরা ওপার বাংলায় চলে যাবে বলে স্থির করেছিল। কিন্তু অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের দরুণ সেদিন যেতে পারেনি।

 

৩রা মে। বিকাল সাড়ে তিনটার সময় মিশনের ফাদার লক্ষ্য করলেন যে, মিশন হাসপাতালের চারিদিক মিলিটারীরা ঘিরে নিয়েছে। তার কিছুক্ষণ আগে বনপাড়া সংলগ্ন অন্যান্য গ্রাম থেকে খৃস্টান পুরুষদের ধরে নিয়ে এসেছে। ধরার অভিযান পরিচালনা করেছিল মেজর শেরওয়ানী। পড়ে ফাদারের সুপারিশে সমস্ত খৃস্টানদেরকে নরপশুরা ছেড়ে দেয়।

 

তারপর নরপশুরা মিশনের অফিস, স্কুলঘর, মহিলা হোস্টেল তল্লাশি করে আওয়ামী লীগ সমর্থক ও হিন্দুদেরকে খুঁজতে থাকে। খোঁজাখুঁজির পর সর্বমোট ৮৬ জন মানুষকে বের করে ও বন্দী করে। অবশ্য অল্প বয়সের ছেলেরা ও বৃদ্ধেরা রেহাই পেয়েছিল তাদের মনোভাবের উপর নির্ভর করে। তারপর বন্দী লোকদেরকে ধরে নিয়ে মোড়ে ট্রাকের অপেক্ষায় পথপানে চেয়ে থাকে। সত্যি সত্যিই যখন সামরিক ট্রাক এসে হাজির হলো তখন ট্রাকে তুলে ৮৬ জন মানুষকে নিয়ে যায় হত্যা করার জন্য। পথিমধ্যে এক বৃদ্ধকে রেহাই দিয়ে অন্যান্য বন্দীদেরকে নির্মমভাবে প্রহার করতে করতে নিয়ে যায় তাদের নির্দিষ্ট স্থানে। ৮৫ জন লোককে নিয়ে হত্যা করা হয়। তাদের মধ্যে অনিল নামক একজন ভাগ্যক্রমে বেঁচে যায়। এ ঘটনা অবশ্য ফাদারের শোনা। দোয়াদপাড়া ব্রিজে নিয়ে হত্যা করা হয়। অনিল ফাদারকে বলে যে, এখান থেকে মাইল দুই নিয়ে যেয়ে রাইফেলের গাদা দিয়ে অমানুষিকভাবে ট্রাকের উপরেই প্রহার করা শুরু করে। দেয়াদপাড়া ব্রিজের কাছে একটি জলাশয়ে নিয়ে যেয়ে উপরে উল্লিখিত মানুষগুলোকে ২/৩ জন করে ধরে নিয়ে গুলি করতে থাকে। আনিলকে গুলি করে কিন্তু সে আঘাতে মরেনি। নাটোরের হাফিজ আবদুর রহমান অন্যান্য অপারশনের মত এখানেও উপস্থিত ছিল। সবশেষে আহত লোকদের উপর মেশিনগানের স্প্রে শুরু করে। অনিলের উরুতে মেশিনগানের একটি গুলি লাগে। এতেও সে খুব বেশী আহত হয় না। ফলে রাতে বর্বররা সরে গেলে সে আস্তে আস্তে স্বগ্রামে ফিরে আসে।

 

পাক বাহিনী যাবার আগে গ্রামবাসী মুসলমানদের ডেকে এনে এই স্তূপীকৃত মানুষগুলির উপর মাটিচাপা দিতে নির্দেশ দেয়। পরবর্তীকালে রাজাকার ও আলবদর বাহিনী অত্যাচার করতে সুযোগ পায়নি এই কারণে যে পাক সৈন্যদের সাথে একজন খৃস্টান মেজর ছিলেন যিনি প্রায়ই আসতেন। গীর্জার ফাদারের অনুরোধে, মেজরের সক্রিয় হস্তক্ষেপে অত্র এলাকার মানুষ যথেষ্ট রক্ষা পেয়েছে। একবার ৬ জনকে এ এলাকা থেকে নাটোরে ধরে নিয়ে গিয়েছিল তারা আর ফিরে আসেনি। পরবর্তীকালে তিনজনকে ধরে নিয়ে যাবার পর ফাদারের সুপারিশে তারা রেহাই পান। পরবর্তীকালে আবার পাঁচজনের উপরে গ্রেফতারি পরওয়ানা জারি হলে ফাদারের সুপারিশে তারাও মুক্তি পান।

 

স্বাক্ষর/-

এল, পাইনস

২৭/০৯/১৯৭২

 

 

রকিবুল হাসান জিহান

<,২.২.৫০,৮৯>আমি পায়খনায় যেতে চাই কিন্তু সে পায়খানায় যেতে হবেনা বলে জানায়। কিন্তু সকাল বেলা পায়খানা প্রশ্রাব করতে দেবে না এ কেমনতর কথা বলে রেগে উঠি এবং একটি পানির বদনা নিয়ে মেয়েকে নিয়ে বাড়ির বাইরে যাই”

 

 

৫০

কদভানু বেওয়া

গ্রাম- দুর্গাপুর

থানা- দুর্গাপুর

জেলা- রাজশাহী

 

২৪শে আষাঢ় মঙ্গলবার খুব ভোরে পাক সৈন্যরা গ্রাম ঘিরে ফেলে এবং সাথে সাথে ফাঁকা গুলি করে এবং লোক দেখেও গুলি করে।

 

আমার বাড়ির সামনে সামরিক গাড়ি দাঁড় করায় এবং আমার বাড়ি ঢোকে। এবং বন্ধু বন্ধু বলে ডাকে। আমাদের চেতন পাবার আগেই ঘরের দরজা ভেঙ্গে ফেলে। ইতিমধ্যে আমরা চেতন পেয়ে যাই। আমি সাড়া দিলাম এবং তারা কে জানতে চাইলাম। তারা বলে যে তারা থানার লোক। অতঃপর তারা আমার স্বামীকে ঘরের ভিতর থেকে টেনে বের করে দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখে। দুজন আমার স্বামীকে ধরে রাখে এবং একজন আমার পিছু নেয় এবং সে বার বার আমাকে ঘরের মধ্যে যেতে বলে। আমি পায়খনায় যেতে চাই কিন্তু সে পায়খানায় যেতে হবেনা বলে জানায়। কিন্তু সকাল বেলা পায়খানা প্রশ্রাব করতে দেবে না এ কেমনতর কথা বলে রেগে উঠি এবং একটি পানির বদনা নিয়ে মেয়েকে নিয়ে বাড়ির বাইরে যাই এবং অন্য এক বাড়ির গোয়াল ঘরে আশ্রয় নেই। আমি যখন যাচ্ছিলাম তখন ঐ লোকটি “কাঁহা যাতা হ্যায়” বলে পিছে পিছে যেতে থাকে।

 

বহুক্ষণ এখানে লুকিয়ে থাকার পর যখন বেরিয়ে আসি তখন আমার স্বামীকে চোখ খোলা অবস্থায় পশ্চিম দিকে মাথা পড়ে থাকতে দেখি এবং তখনই আমি অজ্ঞান হয়ে যাই। বলা বাহুল্য আমার স্বামীকে তারা গুলি করে হত্যা করে যায়।

 

 

টিপসই/-

কদভানু বেওয়া

 

 

রকিবুল হাসান জিহান

<,২.২.৫১,৯০> পাকিস্তানিরা কচি শিশুদের বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করেছে। তাদের অপরাধ তাদের মায়ের উপর যখন পশুরা অত্যাচার করছিল তখন তারা কাঁদছিল।

৫১

আবদুল মালেক

দুর্গাপুর

রাজশাহী

 

“শান্তিকমিটি ও রাজাকারদের সবরাহকৃত তথ্যের উপর ভিত্তি করে মিলিটারীরা বিভিন্ন এলাকায় এসে অপারেশন করেছে। তারা লুটপাট করেছে, অগ্নিসংযোগ করেছে, নারী ধর্ষণ করেছে এবং মানুষ হত্যা করেছে। তাদের অপারেশনগুলির মধ্যে নিম্মোক্তগুলি প্রধানঃ

 

তারা মে মাসের মাঝামাঝি যোগীদের পালশায় অপারেশন করে ৪২ জন হিন্দুকে হত্যা করে। সেখানে মেয়েদের উপর অত্যাচার করেছে।

 

জুন মাসে তারা দুর্গাপুরে অপারেশন করে ৮/৯ জনকে হত্যা করে। এখানেও তারা হৃদয়হীনভাবে নারী নির্যাতন করে। তাদের নির্যাতনের ফলে জনৈক অফিসারের একটি মেয়ে মারা যায় এবং অপর একজন পঙ্গু হয়ে যায়। এখানে তারা লুটপাট করে।

 

১লা রমজান শুক্রবার পাক সেনারা গগণবাড়িয়ায় অপারেশন করে। এখানে ত্রিমুখী অভিযান চালিয়ে ১০/১১ শত জন লোককে ধরে এনে তাদের দিয়ে গর্ত করিয়ে নিয়ে হত্যা করে মাটিচাপা দিয়ে রাখে। এখানে কচি শিশুদের বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করেছে। তাদের অপরাধ তাদের মায়ের উপর যখন পশুরা অত্যাচার করছিল তখন তারা কাঁদছিল। এখানে ১০০ বছরের উপর বয়স্ক অন্ধ একটি বৃদ্ধকে বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করেছে। গ্রামে আগুন দিলে মেয়েরা যখন প্রাণভয়ে মাঠে পালায় তখন সেখানেও তাদের ধরে শ্লীলতাহানি করে। বাপের সামনে মেয়েকে, স্বামীর সামনে স্ত্রীকে নির্যাতন করেছে।

 

স্বাক্ষর

সরদার আবদুল মালেক

 

 

 

রকিবুল হাসান জিহান

<,২.২.৫২,৯১>

৫২

মোঃ সাজ্জাদ হোসেন

নওগাঁ

রাজশাহী

 

“একদিন বিকেল বেলা আমি দৈনন্দিন কাজ সেরে বাসায় ফিরছিলাম। বাসায় ফিরে বিপুলসংখ্যক পাক সৈন্য ও বিহারীদেরকে দেখতে পাই। কয়েকজন বিহারী আমার বাসার গুরুত্তপূর্ণ মূল্যবান উপকরণগুলো খুলে নিচ্ছিল। আমি সরলভাবে প্রতিবাদ জানাই জনৈক পরিচিত বিহারীকে। উক্ত কুখ্যাত বিহারী আমার জীবনের ক্ষতির হুমকি প্রদান করে এবং ঘরের ভিতরে অবস্থানরত কুখ্যাত মেজর বাংলাদেশের পতাকা হাতে রাখে ও আমাকে অভিযুক্ত করে কারণ আমি আওয়ামী লীগের নেতা ছিলাম বলে উক্ত মেজরের ধারণা ছিল। পরে বিহারী ও পাক সৈন্যরা আমার বাসা লুট করে অনেক মালামাল নিয়ে যায়। বলা প্রয়োজন ঐ দিনই আমাকে ধরে ইপিআর ক্যাম্পে নিয়ে যায়। সেখানে আমার অফিসের একজন কর্মচারীর সুপারিশে সেবারের মত মুক্তি পাই। কিন্তু আমাকে কাজে যোগদান করতে বাধ্য করা হয়।

 

ঘটনা প্রবাহের অবনতির সাথে সাথে আমি জনগণের ভাগ্যের সাথে ভাগ্য মিলিয়ে আমার অফিসের কাজ করতে থাকি। কিছুদিন পর অত্র শহরের পাঞ্জাবী এসডিও দুষ্কৃতকারীদের হাতে নিহত হন। উক্ত এসডিওর হত্যার পরে বিহারী ও পাক সৈন্যদের মাঝে বিরূপ প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যায়। পাক দস্যুরা বিহারীদের যোগসাজশে হত্যা, নারী ধর্ষণ, অগ্নি সংযোগের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। হঠাৎ জুলাই মাসের ১৫ তারিখে আমার বাড়ি ঘেরাও করে। ঘেরাও করার পরে কুখ্যাত মিলিটারী ও বিহারীরা তথাকথিত এসডিওর হত্যাকারী বলে বিবেচনা করে। এখানে প্রকাশ করা প্রয়োজন যে জনৈক বিহারী দৃঢতার সাথে বলে যে, উক্ত এসডিওকে দুটি ছোরা দিয়ে আমি নিহত করেছি এবং ছোরার সাথে তাজা রক্তের ছাপ ছিল। তার সাক্ষ্যে পরে আমার দুই হাত বেঁধে নিহত এসডিওর বাসায় নিয়ে যায়। সেখানে একজন কর্ণেল, একজন মেজর ও কিছুসংখ্যক সামরিক উচ্চপদস্থ কর্মচারী ছিল। তারা আমাকে বেদম প্রহার করে। রাইফেলের বাঁট, কিল, ঘুষি, লাথি মারতে থাকে। বেশ কিছুক্ষণ প্রহার করার পর আমি অজ্ঞান হয়ে মাটিতে পড়ে যাই। পরে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় আমাকে নওগাঁর ইপিআর ক্যাম্পে নিয়ে যায়। ক্যাম্পে যাবার পরে আমি অনেক বিহারী ও মিলিটারীদের দেখতে পাই। পুনরায় পাক কুকুরেরা আমাকে প্রহার করতে থাকে। প্রহার করার পরে আমাকে ক্যাম্পের সংলগ্ন একটি ছোট প্রকোষ্ঠে রেখে দেয়। সেখানে ৪/৫ জন লোক থাকার মত জায়গা ছিল অথচ উক্ত প্রকোষ্ঠে প্রায় ২৪/২৫ জন বাঙ্গালী নিরীহ মানুষকে আটকিয়ে রেখেছিল। সেখানে আমি আটদিন অবস্থান করেছিলাম। আটদিনের প্রায় প্রতিদিনই বেদমভাবে প্রহার করতো। পাক বর্বররা পরিমিত খাদ্যদ্রব্য ও পানীয় সরবরাহ করতো না। ২/৩ দিন পরে পরে কিছু কিছু করে খাবার দিতো কিন্তু তা খাবার অযোগ্য আহার্য ছিল।

 

বন্দীখানায় অবস্থান করার পর আমি প্রত্যেক দিনই ফুটো দিয়ে দেখতাম যে ২০/২৫ জন করে নিরীহ লোকজনকে মারধর করার পর হাত উল্টো করে বেঁধে ও চোখ বেঁধে বেয়োনেট দিয়ে বুক চিরে রাস্তায় ফেলে রাখত। পরে মৃতদেহগুলিকে নিকটস্থ নদীতে নিক্ষেপ করত। উপরে উল্লিখিত প্রক্রিয়ায় আটদিনে তারা ২৫০ জন নিরীহ বাঙ্গালিকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে বলে আমি অনুমান করি। একমাত্র আমিই অফিসের কতৃপক্ষের সুপারিশে মুক্তি পাই।“

 

স্বাক্ষর

মোঃ সাজ্জাদ হোসেন

এস, ডি, ও অফিস, নওগাঁ

 

 

রকিবুল হাসান জিহান

<,২.২.৫৩,৯২>অত্র গ্রামের সংলগ্ন খৃস্টান মিশনের সাহেবের বাড়িতে সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করে। উক্ত ঘাঁটিতে পাক বর্বররা অন্য জায়গা হতে সুন্দরী মেয়েদেরকে ধরে এনে মিশনে সাহেবের বাসার উপর তলাতে আটকে রাখত। পাশবিক অত্যাচার ও ধর্ষণ করার পরে গলা কেটে হত্যা করেছে। হত্যার পরে তাঁদের রক্ত চৌবাচ্চার নল দিয়ে স্থানীয় তুলসী গঙ্গা নদীতে পড়তো।“

 

৫৩

জয় মণ্ডল

গ্রাম- চকরামপুর

নওগাঁ

রাজশাহী

 

“২৫শে মার্চের ঘটনাপ্রবাহ অত্র গ্রামের জনগণের জীবনে হতাশা নিয়ে এসেছিল। শান্তাহারে সাম্প্রদায়িক ঘটনার ফলে অত্র গ্রামটিকে পাক বর্বররা ক্ষতি করতে দ্বিধা করেনি।

 

৯ই বৈশাখ রোজ শুক্রবার শান্তাহার রোড হয়ে চকরামপুর গ্রামে পাক বর্বররা প্রবেশ করে। প্রবেশ করার আগে বিক্ষিপ্তভাবে চারিদিকে গোলাগুলি চালাতে থাকে। এতে জনগণের জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়। ফলে ধন, মাল রেখে পাইকারী হারে অত্র গ্রামের জনসাধারণ অন্যত্র পালাতে থাকে। অতঃপর পাক বর্বররা চকরামপুরের অধিকাংশ বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে ও লুটতরাজ চালায়। বলা প্রয়োজন, অত্র গ্রামের সংলগ্ন খৃস্টান মিশনের সাহেবের বাড়িতে সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করে। উক্ত ঘাঁটিতে পাক বর্বররা অন্য জায়গা হতে সুন্দরী মেয়েদেরকে ধরে এনে মিশনে সাহেবের বাসার উপর তলাতে আটকে রাখত। পাশবিক অত্যাচার ও ধর্ষণ করার পরে গলা কেটে হত্যা করেছে। হত্যার পরে তাঁদের রক্ত চৌবাচ্চার নল দিয়ে স্থানীয় তুলসী গঙ্গা নদীতে পড়তো। তা ছাড়া অত্র চকরামপুর গ্রামের প্রায় ৪০ জন লোককে গুলি করে হত্যা করেছে। তাঁদের মধ্যে কয়েকজনকে গলা কেটে হত্যা করেছে এবং বহুসংখ্যক আহত অবস্থায় এখনো বেঁচে আছে। এক মাস অবস্থানকালে অত্র গ্রাম হতে পাক বর্বররা গরু, খাসি, হাঁস, মুরগী, যাবতীয় তরিতরকারী লুট করে খেয়েছে।

 

স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে অত্র গ্রামের জনসাধারণ মুক্তিবাহিনীকে খাদ্যদ্রব্য ও সর্বতোভাবে সাহায্য করেছে।“

 

স্বাক্ষর/-

জয় মণ্ডল

গ্রাম- চকরামপুর

নওগাঁ, রাজশাহী

 

 

রকিবুল হাসান জিহান

<,২.২.৫৪,৯৩-৯৪>

 

 

৫৪

মোঃ মোসলেম উদ্দিন

গ্রাম- দিঘাপতিয়া, নতুনপাড়া

পোঃ দিঘাপতিয়া, নাটোর

জেলা- রাজশাহী

 

“আমি ছিলাম বেঙ্গল রেজিমেন্টের একজন সিপাহী। চার বৎসর আমি পশ্চিম পাকিস্তানে চাকুরী করেছি। পঁচিশে মার্চের কিছুদিন আগে আমি ভলান্টারী সার্ভিসে আমি চিটাগাংয়ে আসি। সেখান থেকে আমি ছুটিতে বাড়িতে আসি। তারপর বঙ্গবন্ধুর আহবানে চাকুরীতে চট্টগ্রামে যোগ দেই। ওখান থেকে ষোলশহর, কালিঘাট, ৭ নং জেটীতে পশ্চিম পাকিস্তানী বর্বরদের সাথে সাহসিকতার সঙ্গে মোকাবিলা করি এবং তাদেরকে পর্যুদস্ত করি। পরবর্তীকালে সেখানের পতন ঘটলে এপ্রিল মাসের (৭১) ৫ তারিখে অনেক সঙ্গীসহ ওপার বাংলার আগরতলায় পৌছি। সেখান থেকে কিছু অস্ত্রশস্ত্র সংগ্রহ করে কুমিল্লার ব্রাক্ষণবাড়িয়ায় ডিফেন্স দেই। তারপর পাক সৈন্যরা বিমান আক্রমণ চালালে সকলে ছত্রভঙ্গ হয়ে যাই। এপ্রিল মাসে ২২ তারিখে স্বগ্রাম দিঘাপাতিয়ায় পৌছি।

 

২৪শে এপ্রিল আমার বাড়িতে একদল পাক সৈন্য এসে ঘরের দরজা ভেঙ্গে আমাকে ধরে লাথি মারতে মারতে স্থানীয় কালীবাড়িতে নিয়ে যায়। বলা প্রয়োজন, এখানে অত্যাচারের কেন্দ্রভূমি ছিল। তারা সেখানে আমার হাত পা বেঁধে পা উপরের দিকে তুলে লটকিয়ে অত্যাচার করে। সে অত্যাচারের ভিতর ছিল বেত দিয়ে প্রহার, চাকু দিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থান কাটা। শরীর কেটে তারা আনন্দ পেত। তারা জানতে চাচ্ছিল যে চট্টগ্রামে আমি কতজন পাঞ্জাবিকে হত্যা করেছি, কতটি রাইফেল কোথায়, কিভাবে লুকিয়ে রেখেছি, বাংলাদেশ সম্পর্কীয় কি কি তথ্য আমি জানি।

 

আমার কাছ থেকে কোন তথ্য উদঘাটন করতে ব্যর্থ হলে তারা আমাকে কালীবাড়ি থেকে নাটোরের ফুলবাগানে অপারেশন ক্যাম্পে নিয়ে যায়। সেখানে বৈদ্যুতিক শক আমার গলায় দেওয়া হয়। হাত-পা বেঁধে ডেকচির মধ্যে করে পানির হাউজে নিক্ষেপ করে। ১০-১২ মিনিট সেখানে রাখার পর অর্ধমৃত অবস্থায় সেখান থেকে তুলে আবার জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে। সেখানেও তারা ব্যর্থ হবার পর আমাকে বেয়োনেট চার্জ করতে নিয়ে যায়। এ সময় ছিল সন্ধ্যার কিছু আগে। তখন আমার হাত পিছনে বাঁধা ছিল। বলা প্রয়োজন, এর কিছু আগে আমার সাক্ষাতেই চারজন লোককে গুলি করে হত্যা করে। পরে আমাকে নিয়ে যায়। বেয়োনেটের সামনে ধীরে ধীরে অগ্রসর হচ্ছিলাম কৌশলে হাতের বাঁধন খুলবার চেষ্টা করছিলাম। এক সময় আমি আমার হাতের বাঁধন তাদের অগোচরেই খুলতে সমর্থ হই। ফুলবাগানের মধ্যস্থ পুকুরের চারিদিকে মিলিটারীরা তখন সশস্ত্র পাহারায় ছিল। হাতের বাঁধন খুলেই ঘুরে সঙ্গীন উচানো সিপাইয়ের হাতের রাইফেল কেড়ে পুকুড়ে ফেলে দেই এবং বক্সিং মেরে তাকে ধরাশায়ী করি। তারপর পুকুরে ঝাপ দেই। ইতিমধ্যে অবশিষ্ট সৈন্যরা পুকুরের চারিদিকে সচেষ্ট হয়ে উঠে এবং আমাকে লক্ষ্য করে বেপরোয়া গুলি চালানো শুরু করে। যখন পুকুরের পাড়ে উঠছিলাম ঠিক সে সময় একটি গুলি এসে আমার ডান কানে লাগে। সাথে সাথে আর একটি গুলিও আমার বাম বাহুর নিচে লাগে। এতে আমি অবশ্য খুব বেশি আহত হই না। তাদের সকলের সব রকমের অপচেষ্টাকে ব্যর্থ করে দিয়ে বর্বরদের ব্যূহ ভেদ করে পালিয়ে আখের জমির ভিতর দিয়ে ক্রলিং করে নাটোরে পৌঁছাই। শরীর থেকে তখন দরবিগলিত ধারায় রক্তপাত হচ্ছিল। উলঙ্গ অবস্থায় যখন নাটোরের সিনেমা হলের মোড়ে পৌঁছাই তখন একদল বিহারী আবার আমাকে ধরে ফেলে। সেখানেও তারা বেদম প্রহার করতে শুরু করে। পূর্বোক্ত বক্সিং প্রক্রিয়ার বদৌলতে তাদের হাত থেকেও রেহাই পাই। এবং শহরের মাঝখানে মামারবাড়িতে প্রথমে আশ্রয় নেই। কিছুক্ষণ পর আমার শ্বশুর ডাক্তার আঃ লতিফের কাছে গিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা নেই। সেখান থেকে ঐ রাতেই মেয়ের পোষাকে এক গ্রামে আশ্রয় নেই। তার ১০ দিন পর ভারতে আশ্রয় নেই। এবং সেখানে সক্রিয়ভাবে স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ নেই।

 

ফুলবাগান থেকে উধাও হবার পর পাক পশুরা আমার বাড়ি ঘেরাও করে এবং আমার বৃদ্ধ বাবা এবং মাকে মারধর করে এবং বলে যে তোমার ছেলেকে বের করে দাও, তাকে চাকুরী দেব এবং তোমার মেয়েকে আমার সাথে (জনৈক সুবেদার) বিয়ে দাও। পরবর্তী সময়ে তারা আমার বাড়ি লুটপাট করে।

 

আমার মতে, ফুলবাগানে ন’মাসে অন্ততঃ ১৫-১৬ হাজার লোককে পাক পশুরা নির্মমভাবে হত্যা করেছে।

 

স্বাক্ষর/-

মোঃ মোসলেম উদ্দিন

গ্রাম- দিঘাপতিয়া, নতুনপাড়া

পোঃ দিঘাপতিয়া, নাটোর

জেলা- রাজশাহী

 

 

 

 

রকিবুল হাসান জিহান

<,২.২.৫৫,৯৫-৯৬>মোহসীন মুন্সী আজান দেয়ার জন্য মিনারে উঠেছেন এবং আল্লাহু আকবর উচ্চারণ করেছেন ঠিক তখনই তাকে লক্ষ্য করে প্রথম গুলি চালায়!!“

৫৫

ডি, এম, তালেবান নবী

প্রতিনিধি, ‘দৈনিক বাংলা’

চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী

 

“৩রা আগস্ট রাত্রি প্রায় ১১ টায় পাঞ্জাবী পুলিশ, স্থানীয় রাজাকার বাহিনীর প্রধান, শান্তি কমটির সদস্য ও ভি ডি পার্টির সভাপতিসহ আমার বাড়ি ঘেরাও করে এবং প্রবেশ করে আমাকে গ্রেফতার করে। অবশ্য গ্রেফতারের পূর্বে সমস্ত বাড়ি তছনছ করে। গ্রেফতার করে সামরিক ক্যাম্পে নিয়ে যায়। নিয়ে যাবার পর মুক্তিবাহিনীর সাথে যোগাযোগকারী ওয়্যারলেস ও রিভলবার কোথায় রয়েছে তা জানাতে বলে। সদুত্তর না পেলে আমাকে পা ফাঁক করে বাঁশ দেয়। অতঃপর চাবুক দ্বারা বেদম প্রহার শুরু করে। প্রায় ঘন্টা তিনেক একের পর এক হাত বদল করে এমনি অত্যাচার চালায়। এর মধ্যে বেশ কয়েকবার আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছি। এরপর গভীর রাতে ঐ অবস্থাতেই উঠাবসা করতে নির্দেশ দেয়। হয়তো একশ বার ঐ প্রক্রিয়া চালাতে বললে ৪০ বার করার পর বলে যে পাঁচবার হয়েছে। কিছু সময় এ অবস্থা চালিয়ে অসমর্থ হয়ে মাটিতে পড়ে গেলে আমাকে লাথি মেরে উঁচু বারান্দা থেকে নিচে ফেলে দেয়। সেখান থেকে আবার তুলে নিয়ে আসে এবং আবার উঠাবসা করায়। আবার পড়ে গেলে আবার লাথি মেরে ফেলে দেয় ও তুলে আনে। এমনি করে সকাল হয়ে গেলে ক্যাম্পের ভিতরে প্রধান রাস্তায় হাত-পা বেঁধে ফেলে রাখে। সেখান দিয়ে যে সমস্ত সামরিক লোক চলাচল করেছে তারা সকলে আমাকে যথেচ্ছভাবে লাথি মেরে পায়ের ঝাল মিটিয়ে নেয়। সারাদিন আমি ঐ অবস্থায় ছিলাম এবং খোলা জায়গায় রোদে সমানভাবে অত্যাচারিত হয়েছি। সন্ধ্যার দিকে ঐখানেই জিজ্ঞাসা করে যে তুমি মুসলমান না হিন্দু। মুসলমান বললে আমাকে কালেমা বলতে বলে। আমি ইচ্ছাকৃতভাবে কালেমা বলা থেকে বিরত থাকি। তখন আমাকে জিজ্ঞাসা করা হয় যে, এখানের কলেজে কালেমা পড়া হয় কি না। উত্তরে না বললে আমাকে কাপড় খুলতে নির্দেশ দেয় এবং উলঙ্গ করে। উলঙ্গ অবস্থাতেই আমাকে ঘন্টা দুই রাখা হয়। অতঃপর পূর্ব পদ্ধতিতে আবার উঠাবসা করতে বলে। কিন্তু বসতে পারলেও কিছুতেই উঠতে পারছিলাম না। কারণ খুব নিস্তেজ হয়ে গেছি। সে অবস্থাতেও আমাকে মারধর করা হয়। তারপর আমাকে টাঙ্গানোর নির্দেশ দেয়। তখন দু’পা উপরের দিকে বেঁধে টাঙ্গিয়ে দেয়। হাত যেন কোন বাঁধার সৃষ্টি না করে সে জন্য হাত দুটিও বেঁধে দেওয়া হয়। এরপর একজন সিপাইকে ডেকে চাবুক মারতে নির্দেশ দেয় এবং সেরূপ চলতে থাকে। একজন ক্লান্ত হলে আর একজন চাবুক মারত। এমনি করে তিনজন চাবুক মারার পর আমি অজ্ঞান হয়ে যাই। অত্যাচারের এক পর্যায়ে পানি পান করতে করতে চাইলে মুখে সজোরে লাথি মারে। আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। রাতের কোন এক সময় জ্ঞান ফিরে পাই। পুনরায় পানি পান করতে চাইলে পাহারারত দুইজন সিপাহীর একজন প্যান্টের বোতাম খুলে এবং মুখে প্রস্রাব করে দেয়। প্রস্রাব করে দিয়ে সিপাইটি তার নিজের আসনে ফিরে যায়। পরের দিন সকাল পর্যন্ত ঐ টাঙ্গানো অবস্থাতেই থাকি। এর মধ্যে মাঝে মাঝে সামান্য জ্ঞান ফিরে আসে এবং পর মুহূর্তেই আবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। সকালের দিকে আমাকে নামানো হলে বলে যে তুমি লিখে দাও, রিভলবার ও ওয়্যারলেস কোথায় আছে, তাহলে তোমাকে ছেড়ে দেওয়া হবে। নেতিবাচক উত্তর দিলে তারা আমাকে চড়-থাপ্পড় দেয়। তারপর আমাকে এক ঘরে বন্দী করে রাখা হয়। সেদিন দিবাগত রাতে একজন মাস্টারসহ তিনজন মুক্তিফৌজকে ধরে নিয়ে আসে। রাতে তাদেরকে পিটানোর পরে তাদের কাছে স্বীকৃতি আদায় করার জন্য আমার ঘরে দেয়। রাত দুইটার দিকে জিজ্ঞাসা করলে তারা (মুক্তিযোদ্ধারা) স্বীকার করেনি বলে আমি জানাই। সারা রাত তারা আমার কাছেই থাকেন। পরের দিন রাত ১২টার দিকে সেলে ঢুকে মুক্তিযোদ্ধাদের কাপড় ও পায়ের জুতা খুলতে বলে এবং খুলে লুঙ্গি পড়া অবস্থায় বাইরে ক্যাম্পের পিছনে নিয়ে যায়। এর কিছুক্ষণ পরে বিকট আ…… চিৎকার ভেসে আসলো। এতে অনুমান করা গেল যে, বেয়োনেট অথবা ছোরা দিয়ে গুঁতিয়ে তাদের হত্যা করা হয়েছে।

 

এভাবে পাঁচদিন প্রায় অভুক্ত অবস্থায় থাকার পর ৭ই আগস্ট দিবাগত রাত ৯টার সময় আমাকে শর্তসাপেক্ষে ছেড়ে দেয়। শহরের বাইরে কোথাও যেতে পারব না এটাই ছিল তাদের প্রধান নির্দেশ।

 

২৩শে এপ্রিল {আগস্ট বা সেপ্টেম্বর হবে}শুক্রবার দুপুর ১২টার দিকে গোমস্তাপুরে পাক মিলিটারীরা অপারেশন করে। থানার পাশের বাজারপাড়া হিন্দু বস্তিতে গিয়ে ৩১ জন পুরুষকে ধরে নিয়ে আসে। অতঃপর সমস্ত গ্রাম পেট্রোল দিয়ে পুড়িয়ে দেয়। ধরে আনা লোকদের থানার পিছন দিকে মহানন্দা নদীর তীরে ১৫ জনের প্রথম দলকে দাঁড় করায় এবং গুলি করে হত্যা করে। অপর দলের ১৬ জনকেও ঐ একইভাবে হত্যা করে। হত্যা করার পর লাশগুলিকে পেট্রোল দিয়ে জ্বালাবার নির্দেশ দিলে মৃত ৩১ জনের মধ্য থেকে অমিল কর্মকার নামে এক ব্যক্তি পুড়িয়ে দেয়ার ভয়ে লাফিয়ে ওঠে। তৎক্ষণাৎ তাকে গুলি করে হত্যা করে।

 

১৯শে অক্টোবর, রবিবার দিবাগত রাত্র প্রায় তিনটার দিকে পাঞ্জাব বাহিনীর দুটি ব্যাটেলিয়ান সীমান্তবর্তী গ্রাম বোয়ালিয়া ঘেরাও করে। মেজর ইউনুসের নেতৃত্বে ব্যাটেলিয়ান দুটি সকাল হওয়ার অল্প কিছু আগে মোহসীন মুন্সী আজান দেয়ার জন্য মিনারে উঠেছেন এবং আল্লাহু আকবর উচ্চারণ করেছেন ঠিক তখনই তাকে লক্ষ্য করে প্রথম গুলি চালায়। সাথে সাথে গ্রামের উপর বৃষ্টির মত গুলিবর্ষিত হতে থাকে। এ গ্রামে তিন ঘন্টায় প্রায় ৬৫০ জনকে হত্যা করে। এদের মধ্যে শিশু, বৃদ্ধ, যুবক ও নারীও ছিল। ১৬৮০টি বাড়ি সম্পূর্ণ ধূলিসাৎ করে। এরপর বোয়ালিয়া গ্রামসংলগ্ন নরশিরা, শাহপুরা, পলাশবোনা, দরবারপুর, কালোপুর ও ঘাটনগর বঙ্গেশ্বর গ্রামেও হামলা চালায়। এখানেও ১২০০ লোককে হত্যা করে। এ সমস্ত গ্রামও পুড়িয়ে দেয়। পাক বাহিনী হামলার সময় অসংখ্য মহিলার উপর বলাৎকার ও লুটপাট করে।

 

পরবর্তীকালে নরপশুরা উপরোক্ত হত্যা চালায়। এরপরে বিধ্বস্ত এ গ্রামগুলি পাঞ্জাব বাহিনী ও তার তাবেদাররা সংলগ্ন থানার নিরীহ জনসাধারণকে ধরে নিয়ে এসে হত্যামঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করে। দেশ স্বাধীন হবার পর দেখা যায় যে, সমস্ত গ্রামগুলিই বধ্যভূমিতে পরিণত হয়েছে। প্রতিটি কুয়া নরকঙ্কালে ভর্তি। অপর দিকে গ্রামগুলিতে যে সমস্ত দেওয়াল ঘর ছিল, সেসব ঘরে জনসাধারণকে হত্যা করে দেওয়াল ভেঙ্গে ঢেকে দেওয়া হয়েছিল। এসব গ্রামগুলির এমন বাড়ি খুজে পাওয়া যাবে না কাউকে না কাউকে সে বাড়ি থেকে হত্যা করা হয়নি। এমনও অনেক বাড়ি রয়েছে, যে বাড়ির সকলকেই পাক জল্লাদরা হত্যা করে। এমনি একটি পরিবার সেকান্দার আলী। অপর একটি পরিবার সোলেমান মিয়ার যেখানে শুধুমাত্র ছোট ছেলে বেঁচে রয়েছে। মা-বাবা, ভাইবোন সকলকে হত্যা করা হয়েছে।

 

স্বাক্ষর/-

ডি, এম, তালেবান নবী

প্রতিনিধি, ‘দৈনিক বাংলা’

চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী

 

 

 

রকিবুল হাসান জিহান

<,২.২.৫৬,৯৭>

 

৫৬

মোহাম্মদ মোছাওয়ার হোসেন

গ্রাম- মাইজপাড়া, ডাকঘর- রাজারামপুর

চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী

 

“৭১ এর ৪ঠা আগস্টের রাত সাড়ে তিনটার সময় আকস্মাৎ শান্তি কমিটির চেয়ারম্যানের নির্দেশে প্রায় ৫০ জন শান্তি কমিটির সদস্যসহ পুলিশ আমার বাড়ি ঘেরাও করে। আমি প্রাণপণ চেষ্টা করেও তাদের হাত থেকে রেহাই পেলাম না। ধৃত হওয়ার পরে আমাকে কঠোর পাহারার মাধ্যমে পথে নিয়ে এসেছে এবং থানাতে সোপর্দ করে। সেখানে আমি প্রায় ১৫ জন বন্দীকে দেখতে পাই। অবশ্য তারা অনেক আগেই ধৃত হয়েছিলেন।

 

পরের দিন দিবাগত রাত ৭টায় উপরোক্ত ১৫ জনকে থানায় হাজির করে এবং পাঁচজন করে করে এক একটি ব্যাচ তৈরি করে। পাঁচজনকে একটি ম্যাপ তৈরির ব্যাপারে অভিযুক্ত করে আলাদা করে রাখে এবং একমাত্র আমাকে অবাঙ্গালী হত্যার দায়ে অভিযুক্ত করে এবং যাদের কে হত্যা করা হয়েছে তাদের নামের তালিকা চায়। পাঁচজনের ভিতর যে দুজন বেশি দোষী বলে বিবেচনা করেন তাদেরকে থানার মধ্যেই মেজর শেরওয়ানীর নির্দেশে নির্মমভবে রোলার দ্বারা, বুকে লাথি মেরে প্রহার শুরু করে। ঐ সময় শেরওয়ানীর নির্দেশে অপর একজন সিপাহী আমাকে প্রহার করে। যতক্ষণ পর্যন্ত আমি অজ্ঞান হয়ে না যাই ততক্ষণ পর্যন্ত উপরোক্ত প্রক্রিয়ায় অত্যাচার চালাতে থাকে। জ্ঞান হবার পর পুনরায় হাজতে নিয়ে যায়। তার পরের দিন ম্যাপ তৈরির অভিযোগে গালাগাল করে। পরের দিন সন্ধ্যায় মেজর শেরওয়ানী ১৫ জনকে জেলখানা থেকে বের করে আনার হুকুম করে। আমার তন্দ্রার ভাব হওয়াতে আমি বের হতে পারলাম না। আমি উদ্বেগের ভিতর সময় কাটাতে থাকি। প্রকাশ থাকে যে, উল্লেখিত ১৪ জনকে গুলি করে হত্যা করে মহানন্দার নদীতে ফেলে দেয়। তারা জলে ভাসতে থাকে।

 

পরের দিন আমি যেখানে ছিলাম সেখানে প্রায় ১০-১২ জন আসামী এলো। তাদের কাছ থেকে বিবৃতি ও জিজ্ঞাসাবাদের পর কয়েক দিনের ভিতরেই অন্যান্য সবাইকে গুলি করে হত্যা করে। এর পরবর্তী ব্যাচে জেলখানাতে উকিল, মোক্তার ও শিক্ষিত ছাত্রসহ প্রায় ৭ জন এলো, তারপর উক্ত ৭ জনসহ আমাকে আঘাত হানতে থাকে। কিছুক্ষণ পরে বিবৃতি নিয়ে তাদের সবাইকে তাদের সবাইকে রাজশাহী জেলে চালান করা হচ্ছে বলা হয়। অবশ্য এটা ছিল নিছক ভাঁওতা। নবাবগঞ্জ নিউমার্কেটের একটি আলো-বাতাসহীন প্রকোষ্ঠে আবদ্ধ করে রাখল। সেখানে আবদ্ধ করার পর রাত ৯টার সময় সবাইকে বাইরে নিয়ে এসে জিপে তুলে অন্যত্র নিয়ে যেতে চায় এবং কঠিনভাবে হাত বন্ধন করে। জিপে তুলে রাস্তায় নিয়ে যাবার পথে জিপ থেকে ১২ জনকে নামিয়ে রাখে এবং বেদম প্রহার করতে থাকে। পরে সারারাত ধরে নিউমার্কেটের উল্লিখিত প্রকোষ্ঠে বন্দী করে রাখে। তার আগে জিপের অন্যদেরকে মেজর শেরওয়ানী গুলি করতে নির্দেশ দেয়। তাদেরকে রেহাই ঘরের শ্মশান ঘাটে মেরে ফেলে। পরের দিন সকালে উক্ত নিউমার্কেটের আসামীগুলিকে জেলখানায় নিয়ে আসে। দুইদিন পরে মেজর শেরওয়ানী নিজেই জেলখানায় গিয়ে আমার কাছে অঙ্গীকারপত্র লিখে নিয়ে মুক্তি দেয়। ইতিপূর্বে আমার পিতার নিকট থেকেও অনুরূপ অঙ্গীকারপত্র লিখে নেয়া হয়েছিল।

 

স্বাক্ষর/-

মোহাম্মদ মোছাওয়ার হোসেন

 

 

 

 

রকিবুল হাসান জিহান

<,২.২.৫৭,৯৮>

।। ৫৭।।

মোঃ আল এমরান

গ্রাম- আজাইরপুর, পোঃ- রাজারামপুর

নবাবগঞ্জ, রাজশাহী

 

“১৯৭১ এর জুন মাসের ১৬ তারিখে রাত দুটোর সময় আমার বাড়ি ৫০-৬০ জন পাক দস্যু ঘেরাও করে। ঘেরাও করার পর বাড়ির অভ্যন্তরে প্রায় ৪০ জন পাক দস্যু ঢুকে পড়েছিল। বাড়ির সমস্ত ঘর তল্লাশী চালিয়ে আমাকে ধরে ফেলে। ধরে দু’হাত পিছনে বেঁধে নিয়ে যায়। জেলখানায় আমি ধৃত ৩০ জনকে দেখতে পাই। সেখানে দিনভর রাখার পর থানাতে নিয়ে যায়। সেখানে কুখ্যাত মেজর শেরওয়ানী আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। বলা প্রয়োজন, সেখানে আরও অনেক মিলিটারী উপস্থিত ছিল। জিজ্ঞাসাবাদ করার পর মোটা বেতের লাঠি দিয়ে বেদম প্রহার করে। অনেকের হাত-পা ভেঙ্গে চুরমার হয়েছিল।

 

আমার পা হতে রক্ত ঝরছিল। পুনরায় সবাইকে জেলখানায় নিয়ে এলো। নিয়ে আসার পর রাত ১২টার পরে গুজর ঘাটের শ্মশানপুরীতে নিয়ে যায়। নিয়ে সবাইকে লাইন ধরার নির্দেশ দিল। লাইনের ভিতর থেকে ১২ জনকে বেছে নিয়ে গুলি করে হত্যা করে। বাকি লোকগুলিকে পুনরায় জেলখানায় নিয়ে সকালের দিকে মেজর শেরওয়ানী জেলখানায় আসে। অনেক জিজ্ঞাসাবাদ করার পরে বেদম মারধর আরম্ভ করে জেলে যত লোক ধৃত হয়েছিল সবাইকে। শ্মশানঘাটে সন্ধ্যার সময় গুলি করার জন্য ৭ জনকে নিয়ে যায়। বধ্যভুমিতে ৭ জনকেই গুলি করে হত্যা করে। রাত ১১টার সময় উক্ত জেলখানায় দু’জন যুবতীকে ধরে নিয়ে আনে। রাত অনুমান ৪টার সময় সে কক্ষের যুবতীদের করুণ কান্নার সুর শোনা যায়; অনুমিত হয় যে তাদের উপর পাশবিক অত্যাচার করা হয়েছিল।

 

সকাল ৮টার সময় জেলখানা থেকে কয়েকজন বর্বর সৈন্য বেরিয়ে যাবার ঘন্টাখানেক পরে মেজরসহ কয়েকজন মিলিটারী যুবতীদ্ধয়কে নিয়ে বাইরে চলে যায়। শেষ পরিণতি জানা যায়নি। সন্ধ্যা ৭টার সময় বাকি সমস্ত বন্দী লোকজনকে শ্মশানঘাটে গুলি করার জন্য নিয়ে যায়। নিয়ে যাবার পর দু’জন করে লাইন করিয়ে গুলি করতে থাকে। আমাকেসহ অন্য তিনজনকে গুলি করার পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো। তখন চারজনকে এক সাথে গুলি করার জন্য দাঁড় করালো। সেই মুহুর্তে একখানা সামরিক গাড়ি এসে শ্মশানঘাটে উপস্থিত হলো। গাড়ির কাছে অন্যান্য মিলিটারী যারা গুলি করছিল, তাদের হাজির হওয়ার নির্দেশ দিল। সেখানে কানা-ঘুষা হল। গুলি করা থেকে সাময়িক বিরতি নিল। পরের দিন আনুমানিক ১০টার সময় তিনজনকে ছেড়ে দেয়। আমি তাদের একজন। তিন দিনে প্রায় ৪০-৫০ জনকে গুলি করে পাক বর্বর বাহিনী হত্যা করেছিল।

 

স্বাক্ষর/-

মোঃ আল এমরান

 

 

ইব্রাহিম রাজু

<,.,৫৮,৯৯১০০>

।। ৫৮।।
এলাহী বক্স
ফিরোজা হাউস
শিব্বাটা, বগুড়া
এপ্রিলে পাক বাহিনী রংপুর, শান্তাহার, শেরপুর – এই তিন দিন থেকে বগুড়া শহর আক্রমণ করে। তা ছাড়া বিমান থেকেও পাক বাহিনী বগুড়া শহরের উপর আক্রমণ করে। ঐ সময় শহরের লোকজন জীবনের ভয়ে কোন দিকে দৌড়াতে না পেরে পুর্বদিকে মুক্ত দেখে নদী সাঁতরিয়ে চেলোপাড়ার দিক রওয়ানা হয়। পাক বাহিনী আক্রমণ করার সাথে সাথে সমস্ত শহর ঘেরাও করে ফেলে। কাজেই জনসাধারণ পালানোর সুযোগ পায় না। পাক বাহিনীর গুলির মুখে অসংখ্য লোকজন প্রাণ হারায়। আমি নিজের বাড়ী ছেড়ে চেলোপাড়ার দিকে রওয়ানা হই। চেলোপাড়ায় যাবার সময় আমি যে দৃশ্য দেখেছি ইতিহাসে তার নজির বিরল। চার থেকে পাঁচ শতের মত লোক মৃত অবস্থায় রক্তের মধ্যে ডুবে আছে। শহরের বিভিন্ন রাস্তায় তাদের মৃতদেহ পড়ে আছে। আর কুকুরেরা তাদের রক্ত পান করছে। পালিয়ে যাবার কোন উপায় ছিল না আমার। আমার মাথায় একটি টুপি ও হাতে একটি পাকিস্তানী পতাকা ছিল। আরও একজন মৌলভী এবং দুইজন লোক আমার সঙ্গে ছিল। তাদেরও মাথায় টুপি এবং হাতে পাকিস্তানী পতাকা ছিল। হঠাৎ করে একদল পাকসেনা আমাদের দেখে ঘিরে ফেলে। পাক বর্বর বাহিনী জিজ্ঞাসা করে তোমার কে? অবশ্য উর্দূতে।

জবাবে আমি বলি যে আমরা পাকিস্তানী বাঙ্গালী মুসলমান। তখন পাকসেনা কিছু সময় পর আমাদেরকে ছেড়ে দেয় এবং বলে যে তোমরা আগামিকাল সকাল ৮ টার পর আমাদের সঙ্গে দেখা করবে। কারন সন্ধ্যা ৬ টা থেকে ভোর আটটা পর্যন্ত কার্ফিউ থাকবে। পাকবাহিনীর কার্ফিউ দেওয়ার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল, সকাল ৮ টার পর জনসাধারণকে একত্রে একযোগে হত্যা করে। আমি সেটা বুঝতে না পেরে পরের দিন আবার বাসাবাড়ী দেখার জন্য শহরের দিকে রওয়ানা হই। আসার সময় অন্য তিনজন লোক আমার সাথে ছিল। ঐ সময় কয়েকজন পাঞ্জাবী আমাদের ধরে ফেলে। ধরার পরপরই একত্রে লাইন করে রাইফেল দিয়ে গুলি করে। গুলি করার সাথে সাথে দুজন ঘটনাস্থলেই মারা যায়। অপর একজন বাম হাতে গুলিবিদ্ধ হওয়ায় গর্তের ভিতরে পড়ে যায়। একজন পাঞ্জাবী এসে বেয়োনেট দিয়ে তার বুকটা চিরে দেয়। আমি সৌভাগ্যবশত গুলি না খেয়ে রক্তের মধ্যে হাবুডুবু খাচ্ছিলাম। একজন পাঞ্জাবী আমাকে পুনরায় দাঁড় করে পরপর দুই বার গুলি করে। প্রথম গুলিটি ফায়ার না হওয়ার জন্য দ্বিতীয়বার গুলি করে। ভাগ্যবশত গুলিটি আমার বাম পার্শ্বে দিয়ে চলে যায়। পাকসেনা কি যেন মনে করে আমাকে ছেড়ে দিয়ে বলে যে তোর হেঁয়াছে ভাগ যাও বাঙ্গালী। তখন আমি নিজের বাসার দিকে রওয়ানা হই। বাসায় আসার সময় আমি দেখতে পাই শুধু মানুষের মৃতদেহ। শহরের সমস্ত রাস্তা যেন রক্তে লাল হয়ে আছে। কুকুর তাদের মৃতদেহ নিয়ে টানাটানি করছে। আমি দেখতে পেলাম যে প্রথম দিনে খান দস্যুরা যে সমস্ত লোকজন হত্যা করেছিল সেগুলোকে শহরের রাস্তার পার্শ্বে গর্ত করে ৭-৮ জন করে পুঁতে রেখেছে। তাঁদের কারো হাত বা মাথা দেখা যাচ্ছে। কুকুরেরা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়ে যাচ্ছে এই বীভৎস ও করুণ দৃশ্য দেখে চোখের পানি মুছতে আমার শিব্বাটী বাসভবনে উপস্থিত হই। বাসায় গিয়ে দেখতে পেলাম যে, একজন মেয়র ও তিনজন বেলুচী সৈন্য আমার নিজস্ব ক্যাম্প খাটটি পেতে শুয়ে আছে। আমাকে দেখে তারা রাইফেল নিয়ে দাঁড়ায়। আমি বকি যে, আমি পাকিস্তানী বাঙ্গালী মুসলমান। এটা আমার বাসা এবং বাসাবাড়ী দেখতেই আমি এসেছি। তখন তারা আমাকে বলে যে এটা তোমার বাসা? তোমার খুব সাহস? এই বলে আমাকে বসতে বলে এবং মাংস ও রুটি খেতে দেয়। তা ছাড়া আমাকে বলে যে তোমার কোন ভয় নাই। রাত্রিতে তুমি তোমার ঘরে শুয়ে থাকবে। আমি কোন রকমে প্রথম রাত্রি অতিবাহিত করি। এখানে উল্লেখ করা হয় যে, পাক সেনা শহরে ঢুকেই অবাঙ্গালীদেরকে ৭২ ঘন্টা সময় দিয়েছিল; বাঙ্গালীদের ধন- দৌলত লুট করার জন্য। পরের দিন সকালে খান সেনারা আমাকে সংগে করে শহরে চলে আসে। খানসেনারা আমাকে লুট করার কথা বলে। তখন আমি বলি যে, আমি লুট করব না বা আমার কোন প্রয়োজন নাই। এইভাবে তিনদিন কেটে গেল। খান সেনার চার জনের মধ্যে একজন ছিল মেজর জাকি। ৪র্থ দিনে তারা আমার বাসা ছেড়ে দিয়ে রংপুর চলে যায়। পুনরায় মেজর শাকিরিয়া আমার বাসায় চলে আসে। এসে আমাকে বকে যে, তুমি এখান থেকে চলে যাও। এই বলে আমাকে সাথে করে সার্কিট হাউসে নিয়ে আসে। সেখানে গিয়ে আমি দেখতে পেলাম, রাজশাহী ভার্সিটি থেকে ধরে আনা কয়েকজন ছাত্রী। তারা বসে বসে কাঁদছে। পাক হায়েনারা তাদের উপর অমানুষিক পাশবিক অত্যাচার করে । তাদের সারা দেহে ধর্ষনের চিহ্ন বিদ্যমান। ঐ দৃশ্য দেখে আমি মর্মাহত ও অতিভূত হয়ে পড়ি। দুই ঘন্টা পর মেজর শাকিরি আমার নিজের বাসায় ফিরে যাবার অনুমতি দেয়। কোন রকমে আমি নিজের বাসায় ফিরে আসি। এরপরেও মাঝে মাঝে খান সেনারা আমার বাসায় এসে তদন্ত চালায় এবং বলে যে তুমি মুক্তিফৌজকা লিডার বা মুক্তিদের সর্বরকমের সাহায্য কর। আমি সম্পূর্ন অস্বীকার করলে আমাকে দারুণ নির্যাতন ও প্রহার করে । দিনে-রাতে সব সময় আমার বাসায় এসে খান দস্যুরা অমানুষিক অত্যাচার করত। আমার দুই ছেলে মুক্তিযোদ্ধা ছিল বলে খান সেনারা সব সময় দুই ছেলেকে খুঁজে বেড়াত । এরপর আমার বাসায় একটানা এপ্রিলের ২০ তারিখ থেকে সেপ্টেম্বরের ১৩ তারিখ পর্যন্ত অতিবাহিত করি। ১৪ ই সেপ্টেম্বর তারিখে নিজ ছেলে-মেয়ে এবং পরিবার বাসায় ফিরিয়ে নিয়ে আসি। এরপর মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় মিত্র বাহিনীর সহায়তায় বগুড়া শহর মুক্ত হয়ে যায়। বগুড়া শহর ও বাংলাদেশের জয়ের পতাকা উত্তোলিত হয়।

স্বাক্ষর/-
মোঃ এলাহী বক্স

 

 

 

ইব্রাহিম রাজু

 

<,.,৫৯,১০১১০৩>

 

।। ৫৯।।
শ্যামল রায়
মালতী নগর, থানা- সদর
জেলা-বগুড়া

 

প্রবল গুলি ও গোলাবর্ষনের ভেতর দিয়ে বর্বর পাক বাহিনী ট্যাঙ্ক সহকারে বগুড়ায় প্রবেশ করে। শুরু হলো নরপিশাচদের ‘বাঙালী চোষা’ বিহারী বেঈমান সহযোগে শহরের বুকে তান্ডব নৃত্য। লুটতরাজ, অগ্নিসংযোগ, খুন, তৎসহ ধর্মীয় স্থান কলুষিত ও বিধ্বস্ত করায় মত্ত হয় তারা।

২৫ শে এপ্রিল রবিবার হঠাৎ করেই গ্রামের বাসা হতে গুলি ও ব্রাশফায়ারের শব্দ শুনে বুঝতে দেরী হয়েছিলো না যে, পাকবাহিনী বগুড়া হতে বড় রাস্তা ধরে এদিকে এগিয়ে আসছে (সিরাজগঞ্জ ও উল্লাপাড়ার দিকে)। কিছুক্ষন পর দক্ষিন-পূর্ব কোণ হতে কালো ধোয়ার কুন্ডলী আকাশে উথিত হতে দেখা গেল। অনেকে বললেন কুমারেরা হাঁড়ি পোড়াচ্ছে। কিন্তু সব ধারনার অবসান হল তখনই, যখন শুধু এক জায়গাতে নয়, সমস্ত পশ্চিম দিক হতে ধোঁয়া আর আগুনের লাল আভা দেখা যেতে লাগল। যতই আধাঁর নামছিল আগুনের লেলিহান শিখা ততই প্রকট হয়ে ফুটে উঠছিল চোখের সামনে। আগুনের সঙ্গে সঙ্গে গুলির আওয়াজ ভেসে আসছিল উল্লাপাড়ার দিক হতে।

পরের দিন শুনলাম চাঁদাইকোনার প্রত্যক্ষদর্শীর এক বিবরণ। তারা লোকজন ডেকে এনে লুট করিয়েছে বাজার এলাকা। অনেক স্বেচ্ছায় এসেছে লুট করার লোভে। লুট করার সময় তারা ছবি তুলেছে। লুটপাট হয়ে গেলে আগুন ধরানোর পালা। আগুনও দিয়েছে লোকজনের সহায়তায়। আগুন ধরানোর সময় তারা ছবি তুলেছে। আর সব কাজ হাসিল করার পর বিক্ষিপ্তভাবে গুলিবর্ষণ করে জনসাধারণকে করা হয়েছে হত্যা। এরকম আরও ঘটনা। খাওয়ানোর নাম করে ডেকে এনে লাইন করে গরীব গ্রামবাসী নিরীহ মানুষকে হত্যা করা হয়েছে।

পরের দিন শুরু হলো সিরাজগঞ্জে ঐ একই দৃশ্যের অবতারণা। ৩-৪ দিন ধরে চলে অগ্নিসংযোগ, লুটতরাজ, খুন ইত্যাদি। বাসার এত কাছে ঐ সব হচ্ছিল যে, ছাই এসে পড়ছিল বাসার মধ্যে। গ্রামের ও আশেপাশের অনেক লোক শহরে গিয়ে আর ফিরে আসতে পারেনি। এর সংগে সংগে গ্রামে গ্রামে ডাকাতি, লুটতরাজ, রাহাজানি প্রকটভাবে দেখা দেয়। দিনে মিলিটারীর ভয়, রাত্রে ডাকাতের ভয় সবসময় তটস্থ থাকতে হয়েছে। দিনে গ্রামছাড়া আর রাত্রে পাটের ক্ষেত – এভাবে প্রতিটি ক্ষণ কেটেছে। দৌড়ানোর জন্য সবসময় প্রস্তুত থাকতে হয়েছে।

একদিন শুনলাম মিলিটারী আসছে। তবুও থাকলাম বাসায়। কিছুক্ষণ পর দেখলাম, কাছের এক হাট হতে আগুন আর ধোয়া। অনেকে পালিয়ে যেতে লাগল।গ্রামের কিছু দূর দিয়ে উঁচু মাটির রাস্তা। দাঁড়িয়ে ছিলাম মিলিটারীদেরকে দেখবার জন্য। দেখলামও, আমার কাছে ছোট একটা দূরবীন ছিল। তাই স্পষ্ট দেখলাম, একে একে ৭৯ জন সৈন্য পার হয়ে গেল। আমের সময় গাছে কাঁচা আম ছিল। তাই তারা খেতে খেতে চলছে। কি তাদের উল্লাস, এতটুকু অনুশোচনা নেই মনে তাদের এই ধ্বংসলীলার জন্য।

অবশেষে নানান কারনে সে গ্রাম আমাদের ছাড়তে হলো ২৬ শে মে বুধবার। নৌকায় চললাম উল্লাপাড়ার অভিমুখে। দুপুর ২ টার দিকে বুধগাছা নামক গ্রামে আশ্রয় নিলাম। যে বাড়ীতে ছিলাম সে বাড়ীর এক ছেলে সৈন্য বিভাগে কাজ করত। শুনলাম সে ছুটি নিয়ে এসেছিল। মার্চের পর পাক বাহিনীর পক্ষ হতে কাজে যোগ দেবার জন্য আবেদন আসে। কিন্তু বর্বর বাহিনীর সঙ্গে সে যোগ দেয়নি। কিন্তু স্বাধীনতা সংগ্রামের ডাকে বাংলা মাকে উদ্ধার করার জন্য সে এতটুকু দ্বিধাবোধ করে নি। মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে সে যোগ দিয়েছিল।

 

ঐ বাড়ির ধারেই রাস্তা (বগুড়া- উল্লাপাড়া) । সাহস করে বসলাম এক গাছের ধারে। কিছুক্ষনের মধ্যে মোটরের শব্দ পেলাম। বুঝতে দেরী হলো না মিলিটারীদের গাড়ী আসছে। দেখলাম এক এক করে নয়খানা গাড়ী পার হয়ে গেল। কোন গাড়ীতে শুধু দু-একটা পেট্রোলের ড্রাম। আবার কোন গাড়ীতে মিলিটারী ও গোলাগুলির বাক্স। হাটের দিন দু’একজন করে পাকা আম,কলা এসব নিয়ে যেত হাটে। ওরা জোর করে কেড়ে নিত, আম কলা ইত্যাদি, পয়সা চাইলে মারার ভয় দেখাত।

পরের দিন ২৭ শে মে দুপুরের পর আর এক গ্রামে পৌঁছালাম। সেখানে গিয়ে শুনলাম, যুবক ছেলেদের জোর করে ধরে নিয়ে মেরে ফেলেছে। ভয় পেলাম শুনে। এ গ্রামে আসার পথে কিছুক্ষণ বড় রাস্তার উপর দিয়ে হাঁটলাম খুব ভোরের দিকে। দেখলাম জ্বালিয়ে দেওয়া বহু বাড়ি। রাস্তা থেকে নেমে আধ মাইলের মত হেঁটে এসে বর্বরেরা পুড়িয়ে দিয়েছে বহু গ্রাম। রাস্তায় শুনলাম বাড়ী জ্বালিয়ে দেওয়ার কাহিনী। প্রথমে তারা নাকি কি একটা তরল পদার্থ ‘স্প্রে’ করত। তারপর একটা সাদা কাঠির মত জিনিসে আগুন ধরিয়ে ফিকে মারত ঘরের মধ্যে। আগুন ধরে যেত সমস্ত ঘরে। খেয়াল-খুশী মত দু-একটা বাড়ীও তারা বাদ দিয়েছে। মনে হয় খেলেছে তারা, আগুন আগুন খেলা।

যে গ্রামে আমরা থাকতাম, তার আশপাশের গ্রাম হতে ছেলেদেরকে ধরে নিয়ে গেছে। ধরে নিয়ে গিয়ে উল্লাপাড়া বাজারে খালের মধ্যে বুকজলে দাঁড় করিয়ে হত্যা করা হয়েছে তাদেরকে। ট্রেনে করে যাতে মিলিটারীরা না আসতে পারে সে জন্য গ্রামের লোকজন লাইন তুলে ফেলেছে। ফলে তাদেরকে হারাতে হয়েছে ঘরবাড়ী।

মুক্তিবাহিনীর লোকেরা মাঝে মধ্যেই রেল লাইন, ব্রীজ উড়িয়ে দিত। একদিন মোহনপুরের কাছে এক গ্রামে, রাত্রিবেলা দু’জন দালালকে মুক্তিবাহিনীর লোকেরা মেরে ফেলে। পরের দিন পাক সৈন্যরা সে গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়।

২৬ শে জুন শনিবার আমি ও একজন লোক বগুড়া বাড়ী দেখবার জন্য রওনা হই। একটা বাস রাজশাহীর ও একটা বাস বগুড়ার ছিল। বাসে একটা পাঠান ব্যক্তি বাসের সমস্ত পয়সা নিত। কণ্ডাক্টরের হাতে লাগান ছিল শান্তি কমিটির লাল ব্যাজ। পথে মিলিটারীর যাতায়াত চোখে পড়ল।

১-৪৫ মিঃ বগুড়ার পুলিশ লাইনে গাড়ী সার্চ করবার জন্য থামান হয়। অনেকের সঙ্গে আমাকেও জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল কি করি, কোথায় থাকি ইত্যাদি। দেখলাম, পুলিশেরা রাইফেলের বাঁট (দুইজন) উপর দিকে ও নল নিচের দিকে দিয়ে পাহারা দিচ্ছে। ‘বগুড়া কারিগরি মহাবিদ্যালয়কে তারা ঘাঁটি বানিয়েছিল। শহরে ১৮% জন জনসাধারণ তখন এসেছে। দোকানপাট বন্ধ। রাস্তার দু পাশের দোকান, বাড়ীঘর পোড়ানো। যারা বাইরে থেকে শহরে আসে, তখনই কিছু জিনিসপত্র কিনে নিয়ে তারা চলে যায়। বগুড়া জেলা স্কুল ও হয়েছিল তাদের ঘাঁটি। ঐ স্কুলের হোষ্টেলে বারান্দায় ব্যাটারী চার্জ দেওয়া হতো। ষ্টেশনে কোন বাঙ্গালীকে যেতে দেওয়া হতো না।

 

বগুড়া পিটি স্কুলের কাছে নামলাম ২-১০ মিঃ। নেমে হেঁটে বাড়ীর দিকে আসছি। বাড়ীঘড় পোড়া। রাস্তা জনমানবশূন্য। প্রায় ১ মাইল রাস্তার মধ্যে মাত্র ৪ জন লোকের সঙ্গে দেখা হয়। রাস্তা চলতে ভয় ভয় হচ্ছিল। যেখানে একদিন ছিল উৎফুল্ল প্রানের স্পন্দন, আজ সেখানে শুধু পোড়া মাটির স্তূপ। দেখে কান্না এসে যাচ্ছিল। বাড়ীর কাছে আসলাম, একই অবস্থা আমাদের বাড়ীর ও তবে সম্পূর্ণ নয়। কেননা জামায়াতে ইসলামীর এক লোক বেদখল করার জন্য বর্বরদের কাছে অনুরোধ জানালে তারা সম্পূর্ন বাড়ী ধ্বংস করেনি। প্রতিটি মন্দির ধর্মীয় স্থান তারা হয় ধ্বংস, না হয় ক্ষতিগ্রস্ত করে। আমি একটুর জন্য প্রাণে রক্ষা পাই বিহারীদের হাত হতে, এক মুসলমান ভাইয়ের সহায়তায়। প্রাণ নিয়ে ফিরি ঐ গ্রামে।

কিছুদিন পর দালালদের ভয়ে ও নানান কারনে কোন গ্রামেই থাকা সম্ভপর না হওয়ার জন্য ২রা সেপ্টেম্বর ১৯৭১ ভারত অভিমুখে নৌকায় রওয়ানা হই। মাঝে মধ্যেই সিরাজগঞ্জ, পাবনার দিক হতে গোলাগুলির আওয়াজ ভেসে আসত।

৩রা সেপ্টেম্বর নৌকা থেকে দেখলাম কাজীপুর এলাকার অগ্নিসংযোগের দৃশ্য। ৪ দিন পর মানকর চরে (আসাম) পৌঁছাই যমুনা পথে।

স্বাক্ষর/-
শ্যামল রায়
১৬.৯.৭৩

 

 

ইব্রাহিম রাজু

 

<,.,৬০,১০৪>
।। ৬০।।
বাদশা মিয়া
মালতী নগর
সদর থানা, বগুড়া
পাক বাহিনী চারদিক থেকে অসংখ্য গোলাগুলি বর্ষণ করতে শহরের মধ্যে প্রবেশ করে। শহরের মধ্যে প্রবেশ করেই অগণিত লোকজন হত্যা করে। অসংখ্য দোকান পাট লুট করে। বগুড়া শহরের মালতীনগর ও চক লোকমান গ্রামে অসংখ্য বাড়ীঘরে অগ্নি সংযোগ করে ভস্মীভূত করে দেয়। আমি আড়াল থেকে সবকিছু স্বচক্ষে দেখেছি। কার্ফিউ উঠিয়ে দেবার পর জনসাধারণ যখন শহরের মধ্যে এসেছিল পাক সেনারা সেই সময় মেশিনগানের গুলিতে ৩/৪ শত লোক হত্যা করে। আমিও শহরে এসেছিলাম ঐ দৃশ্য দেখে অতিভূত হয়ে পড়ি। কোন রকমে জীবন নিয়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হই।

 

১৯৭১ সালের ৩১ শে অক্টোবর রোজ রবিবার বেলা ১১ টার সময় ১৩ জন খান সেনা ও ৫ জন রাজাকার এসে আমাদের বাড়ি ঘেরাও করে আমাকে ধরে নিয়ে যায়। ধরার সময় আমার বাড়ী থেকে হাতঘড়ি ও আমার স্ত্রীর ঝুমকা ও গলার মালা রাজাকারেরা লুট করে নিয়ে যায়। ইহাতে অনুমান করি যে, খান সেনারা আমার তিন হাজার টাকার মত সোনার গহনা ও কাঁসার থালাবাটি লুট করে নিয়ে যায়। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে পাক সেনা শহরে প্রবেশ করেই অবাঙ্গালীদের ৭২ ঘন্টা সময় দিয়েছিল। বাঙ্গালীদের ধন সম্পদ লুটতরাজ করার জন্য। প্রথমে আমাকে স্থানীয় সার্কিট হাউজে নিয়ে আসে। খান সেনার বিগ্রেডিয়ার আমাকে উর্দুতে জিজ্ঞাসা করে যে, ব্যাঙ্ক লুট করেছে কারা, মুক্তি ফৌজ কোথায়, আওয়ামী লীগের লিডার কে কে ইত্যাদি বিষয়। আমি খুব ভালো উর্দু জানতাম। তাছাড়া আমাকে দেখতে অবাঙালীর মত দেখায়। তাই উর্দুতে সম্পূর্ণ অস্বীকার করি। তখন বিগ্রেডিয়ার সার্কিট হাউজ থেকে আমাকে জেল খানায় পাঠায়। জেল খানায় আমি অমানুষিক অত্যাচার সহ্য করি। সিগারেটের আগুন, লোহার রড, রাইফেলের বাঁট, বুট জুতার লাত্থি ইত্যাদির সাহায্যে খান পিচাশেরা নির্মম নির্যাতন চালায় আমার দেহের উপর। জ্বলন্ত সিগারেটের আগুনের চিহ্ন এখনও শরীরে বিদ্যমান। এইভাবে আমি ১৩ দিন জেল খানায় বন্দী ছিলাম। অনুমিত হয় যে, এক মাত্র ভাল উর্দু জানায় এবং দৃঢ় মনোবলের জন্য খান সেনারা আমাকে হত্যা করেনি।

স্বাক্ষর/-
মোঃ বাদশা মিয়া

 

 

ইব্রাহিম রাজু

 

<,.,৬১,১০৫>

।। ৬১।।
আব্দুস সামাদ
চক সুত্রাপুর, বগুড়া

১৯৭১- এর আগষ্ট মাসের ২২ তারিখ। আমার জীবনে এক অবিস্মরণীয় ঘটনা। এই দিন আমি যখন শহরে আমার নিজের কাপড়ের দোকান থেকে ফিরছিলাম তখন ষ্টেশনের সন্নিকটে তিন চারজন খান সেনা ঘিরে ফেলে। এসময় আমাকে হিন্দু না মুসলমান জানতে চায়। আমি মুসলমান বললে আমাকে বলে যে তুমি মুক্তিফৌজ। আমি তা অস্বীকার করলে আমার গালে প্রথমবারের মত থাপ্পড় মারে। অতঃপর আমাকে গ্রেফতার করে জন্য জনৈক সৈন্য নির্দেশ দেয়। তার পর আমাকে ডানা ধরে নিয়ে যেতে থাকে। কিছুদুর নেবার পর আমাকে সোজা হয়ে দাঁড়াতে বলে। আমি তাদের নির্দেশ পালন করার পর জিজ্ঞাসা শুরু করে তুমি তো মুক্তিফৌজ এবং ধরা যখন পড়েছ তখন স্বীকার কর তোমার আর দলবল কোথায় আছে। তোমার অস্ত্রশস্ত্রই বা কোথায় আছে।

স্বাভাবিকভাবে আমি অস্বীকার করি। তখন আমাকে চড় থাপ্পড় লাথি মারতে থাকে। এর সাথে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করতে থাকে। কিছুক্ষন এমনিভাবে মারার পর কয়েক মুহূর্ত মারের বিরতি ঘটায়। এ সময় আবার জিজ্ঞাসাবাদ করতে থাকে এবং স্বীকার না করলে আমাকে হত্যা করে ফেলা হবে বলে হুমকি দেখায়। যেহেতু আমি কিছুই জানি না, সমস্তই অস্বীকার করি।

অতঃপর আমাকে অনুরুপভাবে আবার মারধোর শুরু করে। এবার রাইফেলের গাদ দিয়েও মারতে থাকে। মারের চোটে অস্থির হয়ে পড়ছিলাম। নাকমুখ দিয়ে রক্ত পড়তে থাকে। এক পর্যায়ে মাটিতেও পড়ে যাই। এ সময় আমার পকেট থেকে টাকা মাটিতে পড়ে যায়। তখন আমার কাছে ৫৬৫ টাকা ছিল। উক্ত টাকা গুলো তারা তুলে নেয় এবং আমার পকেট হাতিয়ে যে টাকা পয়সা ছিল তা নিয়ে নেয়। টাকা তাদের হস্তগত হবার পর তারা নিজেদের মধ্যে কি সব আলোচনা করলো। শেষে আমাকে যেতে বলে মিলিটারীরা হাসিমুখে অন্য দিকে চলে যায়।

স্বাক্ষর/-
আব্দুস সামাদ

 

ইব্রাহিম রাজু

<,.,৬২,১০৬>

 

।। ৬২।।
আমির আলী খান
গ্রাম- তেঘর, থানা- জয়পুরহাট
জেলা- বগুড়া

তখন ৫ই এপ্রিল কিংবা ১০ ই এপ্রিল হবে। চারিদিকে খান সেনারা টহল দিয়ে ঘুরে ফিরছিল আওয়ামী লীগের লোকজনকে ধরার জন্য। আমার বড় ভাই ছিল আওয়ামী লীগের ৩৬ কমিটির একজন সদস্য। আমি কৃষিকাজ করে খাই। আমার ভাই আমার থেকে পৃথক। খান সেনাদের ধরার ভয়ে বাড়ী থাকে না। কোথায় কোথায় থেকে শুধু সংগ্রাম আর সংগ্রাম নিয়ে ব্যস্ত থাকে। একদিন হঠাৎ ২৫/২৬ জন খান সেনা রাত্রিতে এসে আমার বাড়ী ও ভাইয়ের বাড়ী ঘেরাও করে। ভাইকে না পেয়ে তারা আমাকে ধরে এবং বেদম প্রহার করতে শুরু করে আর বলে তোর ভাই কাঁহা উছকো বোলাও। আরো কি কি বলে আমি বুঝতে পারি না। আমি তাদেরকে বললাম ভাইয়ের সাথে কথা বলতে পারবো না সে আমার থেকে আলাদা। আমি কৃষক মানুষ সারাদিন মাঠে পরে থাকি কিন্তু তারা আমাকে কিছুতে ছেড়ে দিল না। কিছু দূরে তাদের গাড়ি ছিল। ধরে নিয়ে তাদের গাড়িতে উঠিয়ে তাদের ক্যাম্পে নিয়ে গেল। আমাকে যে ঘরে রাখল তার পার্শ্বে আরো কয়েকটি ঘর ছিল। সেখানেও আমার সমান বয়সী এবং কম বয়সী লোক বিভিন্ন ধরনের লোক সেখানে ছিল। সেখানে তাদের বড় ক্যাপ্টেন আসলো, আমাকে জিজ্ঞাসা করলো আমার ভাইয়ের কথা কিন্তু তার খুশি মত জবাব না পাওয়ায় সে নিজে খুব মারলো এবং শেষ পর্যন্ত কখন তারা মার বন্ধ করেছে তা আমি বলতে পারবো না জ্ঞান হলে দেখি আমার শরীর থেকে রক্ত বের হচ্ছে সমস্ত শরীর কেটে ফেটে গেছে। এইভাবে দু দিন ধরে পর পর আমাকে মারতো আর ভাইয়ের কথা জিজ্ঞাসা করতো। শেষ পর্যন্ত যখন তারা আর কিছুই আমার কাছ থেকে জানতে পারলো না তখন একদিন রাতে আমাকে ঘর থেকে ডেকে নিয়ে আমাকে এক রাস্তায় নিয়ে যায়। সেখানে তারা আবার মারতে শুরু করে। তাদের মারের চোটে অজ্ঞান হয়ে যাই। জ্ঞান হলে দেখি তাদের ক্যাম্প থেকে অনেক দূরে এক গর্তের মধ্যে পড়ে আছি। অনেক কষ্টে সেখান থেকে উঠে করিম নামে এক লোকের সাহায্যে বাড়ী পৌঁছি।

স্বাক্ষর /-
আমির আলী খান

 

ইব্রাহিম রাজু

 

<,.,৬৩,১০৭>

 

।। ৬৩।।
মোঃ আব্দুল মালেক মণ্ডল
গ্রাম ও থানা- সারিয়া কান্দি
জেলা- বগুড়া

১৪ ই আগষ্টে পাক বাহিনী সারিয়া কান্দিতে চলে আসে। সারিয়া কান্দিতে কালো পতাকা ও বাংলাদেশের পতাকা দেখে অসংখ্য বাড়ীঘর ও দোকানপাটে অগ্নিসংযোগ ও লুটতরাজ আরম্ভ করে। অতঃপর আমার দোকানে চলে আসে। দোকানে আসার পর আমার ছেলের কথা জিজ্ঞাসা করে। তা ছাড়া মুক্তিবাহিনী কোথায় আছে এবং আওয়ামী লীগ নেতাদের কথা জিজ্ঞাসা করে। উত্তরে আমি অস্বীকার করি অতঃপর সেখান থেকে চলে গিয়ে থানায় ঘাঁটি করে। ঐ দিন বিকেলের দিক কতিপয় খান সেনা ও রাজাকারেরা পুনরায় আমার দোকানে চলে আসে। তারা সরাসরি আমার দোকানের ভিতর ঢুকে পড়ে। খান সেনারা দোকানের বাক্সের ভিতর একটি বাংলাদেশের পতাকা পায়। পতাকা দেখে তৎক্ষণাৎ তারা দোকানের সমস্ত মালাপত্র লুটপাট করে নিয়ে যায়। আমি ঐ সময়ে দোকানে উপস্থিত ছিলাম না। তবে অনুমান করি যে, একমাত্র দোকান থেকে ৭০/৭৫ হাজার টাকার মাল পত্র খান দস্যু ও রাজাকারেরা নিয়ে যায়। অতঃপর দুষ্কৃতকারীদের চক্রান্তে খান পশু ও রাজাকারেরা আমার বাড়ির দিকে রওয়ানা হয়। সেখানে গিয়ে তারা আমার বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে ভস্মীভূত করে দেয়।

 

১৫ ই আগস্ট বিকাল বেলায় আমার ছেলে বিশিষ্ট আওয়ামী লীগ কর্মী আবজল হোসেনকে ধরে নেয়। তাদের ক্যাম্পে নেওয়ার পর বুট, লাথি, লোহার রড ও রাইফেলের বাঁটের সাহায্যে তার দেহে ভীষন আঘাত করে। তাছাড়া সিগারেটের জ্বলন্ত আগুন দিয়ে তার শরীর পুড়িয়ে দেয়। শুধু তাই নয়, পায়খানার ভিতর অনাহারে তিন দিন যাবৎ তালাবদ্ধ অবস্থায় রেখে দেয়। তিন দিন পর খান সেনারা তাকে ছেড়ে দেয়। খান পশুরা যেভাবে অত্যাচার ও নির্যাতন চালিয়েছিল, ইতিহাসে তার নজির নেই।

স্বাক্ষর/-
মোঃ আব্দুল মালেক মন্ডল
১৯/৯/৭৩

 

ইব্রাহিম রাজু

 

<,.,৬৪,১০৮>

 

।। ৬৪।।
খোন্দকার ইউনুস আলী
থানা- সারিয়া কান্দি
জেলা- বগুড়া

আগষ্টের ১৯ তারিখে সারিয়াকান্দি থেকে খান সেনারা দ্বিতীয় বার চন্দনবাইশা চলে আসে। গ্রামের জনসাধারণ একত্রে ডেকে হিন্দুর জমির লোভ দেখিয়ে এবং টাকা পয়সার লোভ দেখিয়ে রাজাকারে আসার নির্দেশ দেয়। তাছাড়া মুক্তিযোদ্ধারা কোথায় আছে এবং কে কে ইত্যাদি খোঁজখবর জানতে চায়। এরপর খান সেনারা রাজাকারে জোর করে লোক নেবার জন্য ২১ তারিখ মঙ্গলবার দিন ধার্য্য করে আসে। অতঃপর সারিয়াকান্দিতে চলে আসে। আসার পর খান সেনারা বগুড়া থেকে বহুসংখ্যক রাজাকার ও খান সেনা সারিয়া কান্দিতে সংবাদ নিয়ে আসে।

 

২১ তারিখ মঙ্গলবার ১১ টার সময় প্রায় ২ শত জন খান সেনা ও ৭৫ জন রাজাকার চন্দনবাইশায় চলে আসে। স্থানীয় প্রাইমারী স্কুলে ঘাঁটি করে এবং প্রয়োজনীয় বাঙ্কার তৈরী করে উক্ত স্থানে ঘাঁটি করে। খান সেনারা রাত্রি যোগে জনগণের বাড়ী থেকে হাঁস, মুরগী, গরু, খাসী ইত্যাদি নিয়ে যায়। অযথা যে কোন লোক জনকে ধরে ভীষণ নির্যাতন করত। গ্রামে ঢুকে মেয়েদের উপর পাশবিক অত্যাচার চালায়। একদিন উক্ত গ্রামে জনৈক ব্যাক্তির স্ত্রীকে খান সেনারা জোর করে ধরতে যায়। ঐ সময় স্বামী তার স্ত্রীর উপর অত্যাচারের ভাব দেখে সহ্য করতে না পেরে তাকে আঘাত করে। খানসেনা তৎক্ষণাৎ তাকে গুলি করে হত্যা করে এবং মাটি চাপা দেয়। অতঃপর কয়েক রাউন্ড গুলি এদিক ওদিক ফায়ার করে। খান সেনারা চর চন্দনবাইশার আইনুল হককে নির্মমভাবে হত্যা করে। ঐ সময় কয়েকজন গ্রাম্য লোক আহত হন। এরপর খান সেনারা প্রকাশ্যে নারী নির্যাতন করতে আরম্ভ করে। অকারনে যে কোন লোক জনকে ধরে নিয়ে খান সেনারা খেত। সেই কথা বলতে গিয়ে উক্ত গ্রামের লোক শাহ মনসুর আলী খান সেনাদের হাতে ভীষন নির্যাতন ভোগ করেন। ঐ সংগে তার ছেলেকে খান সেনারা ভীষণভাবে মারপিট করে। খান সেনারা তাদের দুইজনকে লাঠি, রাইফেলের বাঁট, বুট জুতার লাত্থি ও লোহার রড দিয়ে ভীষণভাবে নির্যাতন করে ছেড়ে দেয়। সংগে সংগে তার বাড়ীতে অগ্নিসংযোগ করে বহু টাকার ধন-সম্পদ ভস্মীভূত করে দেয়। রাজাকারেরা বহু টাকার ধন-সম্পদ লুট করে নিয়ে যায়। সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে আমার পার্শ্ববর্তী বাড়ীর বাসিন্দা শওকৎ হোসেন মুনসীর মিথ্যা চক্রান্তে আমাকে খান সেনারা ধরে নেয়। ধরার সময় চড় ও রাইফেল দিয়ে ভীষণ আঘাত করে এবং খান সেনারা আমাকে ছেড়ে দেয়। পরের দিন আমার নিজ বাড়ী ও বড় ভাইয়ের বাড়ী খান পশুরা লুট করে যথা সর্বস্ব নিয়ে যায়। খান সেনারা আমাদের দুই ভায়ের ৪,০০০ (চার হাজার) টাকার ধনসম্পদ অপহরণ করে নিয়ে যায়। প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ করা যেতে পারে যে, উক্ত এলাকার চতুর্দিকে খান সেনাদের ঘাঁটি থাকায় অসংখ্য বাড়ীঘর লুটতরাজ ও নারী নির্যাতন চালায়। আরও উল্লেখ করা যেতে পারে যে, সারিয়া কান্দি থানার মুক্তিযোদ্ধাদের একমাত্র ট্রেনিং সেন্টার এবং কেন্দ্রস্থল ছিল চন্দনবাইশা গ্রাম।

স্বাক্ষর/-
খন্দকার ইউনুছ আলী
২০/৯/৭৩

 

ইব্রাহিম রাজু

 

<,..৬৫,১০৯১১০> “অতঃপর আমি লোকজন ডাকলাম খান সেনাকে চাকু মারতে। কিন্তু কেউই আমাকে সাহায্য করতে আসল না।“

 

।। ৬৫।।
মোঃ আজাদুর রহমান মণ্ডল
গ্রাম- হামিদপুর
থানা- গাবতলী
জেলা- বগুড়া

খান সেনারা হঠাৎ একদিন হামিদপুর গ্রামে ঢুকে পড়ে। আমি কোন উপায় না দেখে অতি চতুরতার সাথে শরীরে কাদামাটি মেখে নিজের জমিতে চাষ করতে যাই। সেখান থেকে একজন খান সেনা আমাকে আক্রমণ করে। তখন আমি হাত থেকে গরু তাড়ানোর লাঠি মাটিতে ফেলে দু হাত তুলে খান সেনার কাছে আত্নসমর্পণ করি। অতঃপর খান সেনা আমার গ্রামের নাম, মুক্তিবাহিনী এবং নিজে মুক্তি কিনা ইত্যাদি প্রশ্ন উর্দুতে জিজ্ঞাসা করে। জিজ্ঞাসা করার পর আমি উর্দুতে সমস্ত কথা তাকে বুঝিয়ে দেই। কিন্তু খান সেনা অবিশ্বাস করে এবং আমাকে মুক্তি ধারনা করে গুলি করার প্রস্তুতি নেয়। এরপর আমি মৃত্যু নিশ্চিত ভেবে ভাল করে পাকিস্তানী জাতীয় সঙ্গীত উর্দুতে ও বাংলাতে বলি। তারপর আমি আল্লাহর নিকট পাকিস্তানের জন্য এবং পাকিস্তানের সৈন্যদের দীর্ঘায়ু কামনা করি। তখন খান সেনারা গুলি না করে আমার বাড়ীর ভিতর নিয়ে আসে। অতঃপর স্ত্রী পুত্র আছে কিনা ইত্যাদি প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করে। স্ত্রীকে ডেকে আনে। ঐ সময় আমার ঘরের ভিতর একজন পাঞ্জাবী সৈন্য ডেকে নেয়। ঠিক ঐ সুযোগে ঐ খানটি আমার স্ত্রীর ৫ ভরী সোনার দুইটি বালা বাক্স খুলে নেয়। এরপর তারা ছেলের নাম জিজ্ঞাসা করে। তখন আমি পিস্তল ও জান্টার পর পর দুই ছেলের নাম বলি। তখন পিস্তলের কথা শুনে তারা পজিশন নেয় । আমি তাহা উর্দুতে বুঝিয়ে দেই। কারণ পিস্তল ও জান্টার আমার ছেলেদ্বয়ের ডাকনাম ছিল। এত বলা সত্ত্বেও খান সেনারা আমাকে ভারতের দালাল বলে বিবেচনা করে। আমি মুসলমান কিনা তা দেখার জন্য আমার লুঙ্গী খুলতে বলে। একজন বেলুচী সৈন্য তা নিষেধ করে। ঐ বেলুচী সৈন্যটি আমাকে বারবার সাহায্য করে আসছে। আমি তখন বলি যে, আপনি আমাকে গুলি করে মেরে ফেলেন। তবুও আমি নিজের ইজ্জত দেখাব না। আরও বলি যে, আমি যদি প্রকৃত মুক্তি হয়ে থাকি, তাহলে আপনাদের ক্যাপ্টেনের কাছে নিয়ে চলুন। তিনিই বিচার করবেন। অতঃপর আমাকে ক্যাম্পে নিয়ে আসে। ক্যাম্পে এসে কিছু সময় পর দেখতে পাই যে হাত বেঁধে একটি ছেলেকে রাস্তার উপর নিয়ে আসছে। বিগ্রেডিয়ারের নির্দেশ মোতাবেক তাকে লাথি মেরে ক্যাম্পে নিয়ে আসে। পরপর কয়েকবার বুট জুতার লাথি মেরে তাকে নিষ্ঠুরভাবে মেরে ফেলে। এরপর আমাকে গুলি করার নির্দেশ দেয়। তখন আমি বলি খান সাহেব মৃত্যুর আগে আমি কয়েকটি কথা বলব, তখন আমাকে বলার জন্য সময় দেয়। অতঃপর আমি চতুরতার সাথে পাকিস্তানী জাতিয় সঙ্গীত গাই এবং পাকিস্তানী ফৌজ ও পাকিস্তানের দীর্ঘায়ু কামনা করি। এরপর বিগ্রেডিয়ার আমার লেখাপড়া কতটুকু জানতে চায়   আমি আরও চতুরতার সহিত বলি যে দ্বিতীয় শ্রেণীতে। ব্রিগেডিয়ার বলে যে, তা হলে তুমি এত ভালো উর্দু কেমন করে শিখলে? জবাবে আমি বলি যে, ভাষা আন্দোলনের সময় উর্দু ভাষার উপর যখন জোর দেওয়া হয়েছিল, সেই সময় আমি উর্দু ভাষা শিক্ষা করেছি। বার বার একই প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করার পর ব্রিগেডিয়ার পুণরায় গুলির হুকুম দেয়। তখন আমি কোন উপায় না দেখে বলি যে, খান সেনা আপনার মত আমারও একজন পাক ফৌজের ক্যাপ্টেন আছে। যার নাম কুদরতে খোদা (বাবলু)। ১৯৬৫ সনের যুদ্ধে তিনি কুদরতে খোদা খেতাব পেয়েছেন। এই কথা শুনে তিনি ওয়্যারলেসে যোগাযোগ করেন। এরপর সেখান থেকে সঠিক খবর নিয়ে আমাকে ছেড়ে দেয়। ছেড়ে দেওয়ার পর খান সেনাদের সাহায্য করার কথা, পাকিস্তানের হেফাজতের কথা এবং মুক্তিদের খোঁজ খবর দেওয়ার কথা বলে। এরপর আমি বাড়ী চলে যাই।

 

এর কিছু দিন পর খান সেনারা নাড়ুয়া মালা হাটে জনসাধারণ নিয়ে মিটিং এর জন্য নাড়ুয়া মালা হাটে চলে যায়। মিলিটারির কথা শুনে হাটের লোকজন দৌড়ে চলে যায়। আমি একটি গ্রেনেড নিয়ে জঙ্গলের ভিতর শুয়ে পড়ি খানসেনারা সেখান থেকে আমাকে দ্বিতীয়বার ধরে। আমাকে জিজ্ঞাসা করে যে, তুমি কেন জঙ্গলের ভিতর। নিশ্চয়ই তুমি মুক্তিফৌজ এই বলে আমাকে গাড়ীতে তুলে পুনরায় হাটে নিয়ে আসে। হাটের ভিতর ব্রিগেডিয়ার জনসাধারণের মধ্যে ভাষণ দিলেন এই বলে যে, তোমাদের কোন ভয় নেই, তোমারা আমাদের সাহায্য কর, মুক্তিফৌজের খোঁজ খবর দাও এবং ভারতের দালাল ধরে দাও ইত্যাদি বিষয়। এরপর আমি ব্রিগেডিয়ারের অনুমতি নিয়ে ঐ সমস্ত কথাগুলি পুনরায় বলি। আমি আরও বলি যে পাক ফৌজ কেন আমাদের মা বোনের ইজ্জত ধ্বংস করছে? তারা আমাদের হেফাজতের জন্য এসেছে। আমাদের অন্নে প্রতিপালিত হয়ে আমাদের উপর গুলি করা আল্লাহপাক বরদাস্ত করবে না। মুসলমানদের ধর্ম কি তাই? একজন নিরীহ লোককে হত্যা করা এটা বিধর্মীয় কাজ ইত্যাদি ভাষণ দেই। এই ভাষণ শুনে ব্রিগেডিয়ার আমাকে ডেকে ঘরের ভিতর নিয়ে যায়। ঘরের ভিতর নিয়ে জোর করে ৫০ টি টাকা বকশিস দিয়ে কোরআন ছুঁয়ে শপথ করায় যে, আগামী কাল আমি যেন তাদের ক্যাম্পে দেখা করি। পরের দিন সেই মোতাবেক তার কথা ও ধর্ম রক্ষার্থে ক্যাম্পে গিয়ে দেখা করি। তখন ব্রিগেডিয়ার বলে যে, তোমাকে ১০০০ (এক হাজার) করে টাকা দিতে ইচ্ছুক এবং সমস্ত বগুড়া জেলার রাজাকারের কমান্ডার বানিয়ে দিতে চাই, তুমি কি ইচ্ছুক? তখন আমি বলি যে, স্যার আমি রাজাকার হতে চাই না। এরপর আমাকে অনেকগুলি ৫০০ (পাঁচশত) টাকার নোট দেখায় এবং বলে যে, তুমি যদি রাজাকার কমান্ডার হও তাহলে তোমাকে বহু টাকা দেওয়া হবে। আমি সমস্ত কিছু অস্বীকার করে কোন রকমে বাড়ী চলে আসি। রমজান মাসে আমি নাড়ুয়া মালা হাট থেকে আসছিলাম। তখন দেখতে পেলাম একজন খানসেনা একটি লোকের নিকট থেকে জোর করে টাকা পয়সা কেড়ে নিয়ে চলে যাচ্ছে। লোকটি তখন আমার কাছে ঐ কথা বলে দেয়। তখন আমি প্রতিবাদ করলে আমার পকেটে যত টাকা ছিল খানসেনা তা কেড়ে নেয়। গাবতলী বাজারের ভিতর এসে একখানা চাকু সংগ্রহ করি। অতঃপর বাজারের ভিতর খান সেনাকে রাইফেলসহ জড়িয়ে ধরি। অতঃপর আমি লোকজন ডাকলাম খান সেনাকে চাকু মারতে। কিন্তু কেউই আমাকে সাহায্য করতে আসল না। ১০ মিঃ আমাদের এ লড়াই চলে আমিও সুযোগ পাইনা চাকু মারতে। অতঃপর খান সেনাটি তার টাকা এবং তার সাথে আরও বিশটি (২০) টাকা দেয়। আমি খান সেনাকে ছেড়ে দিয়ে দৌড় দিয়ে প্রাণ বাঁচাই। এই রকম ভাবে আমি তিনবার খান সেনাদের হাতে নির্যাতিত হই। প্রত্যেক বারই আমি সাহস ও তীক্ষ্ণ বুদ্ধির পরিচয় দিয়ে রেহাই পাই।
স্বাক্ষর/-
মোঃ আজাদুর রহমান মণ্ডল
ইং ২৪/৯/৭৩

 

ইব্রাহিম রাজু

 

<,..৬৬,১১১>

 

।।৬৬ ।।
মোঃ জজবর রহমান
ষ্টেশন মাষ্টার
জয়পুরহাট রেলষ্টেশন, জেলা-বগুড়া

হানাদার বাহিনী ২৪ শে এপ্রিল শনিবার রাত্রিতে জয়পুরহাট চলে আসে। আসার সময় রেলষ্টেশনের অনতিদূরে একটি রেল সেতুর কাছে গুলি করে ৩ জন নিরীহ জনসাধারণকে হত্যা করে। ইতিপূর্বে আমার স্ত্রী ও ছেলেমেয়েকে জয়পুরহাট থেকে তিন মাইল দূরে এক গ্রামে রেখে আসি। প্রত্যেক দিন ঐ গ্রাম থেকে সকালে ষ্টেশনে আসতাম এবং সন্ধ্যায় ফিরে যেতাম।

খান সেনাদের আগমনের সাথে সাথে আমি জীবনের ভয়ে কাজ ফেলে দূরে গিয়ে পালাতে বাধ্য হই। আর অফিসে আসি নি। খান সেনারা এখানে এসে স্কুল কলেজ এবং সরকারী বেসরকারী অফিস আদালত খোলার ব্যবস্থা করে। ষ্টেশন মাষ্টার সাহেবের খোঁজ করতে থাকে। বহু গুপ্তচরকে আমার পিছুনে লাগিয়ে দেয়। স্থানীয় এক বুকিং ক্লার্ক (অবাঙ্গালী) আমার তল্লাশী চালায়। শেষ পর্যন্ত তারা আমাকে ধরতে না পেরে এই মর্মে চিঠি লিখে পাঠায় যে, যদি আমি নিজ কার্যে যোগদান না করি , তবে ছেলেমেয়ে ও স্ত্রীকে ধরে এনে হত্যা করা হবে। সত্য সত্যই কয়েকদিন পর সেই অবাঙ্গালী বুকিং ক্লার্ক এবং আরও কয়েকজন অবাঙ্গালী খোলা তলোয়ার হাতে আমার বাড়িতে গিয়ে উপস্থিত হয়। উপায় না দেখে আমি ধরা দিতে বাধ্য হই। অতঃপর মহকুমা প্রশাসক কার্যে যোগদান করেছেন কিনা তা জানার উদ্দেশে তাদের সাথে তার কাছে যাই। মহকুমা প্রশাসন আমাকে কাজে যোগদান করতে আদেশ দেন। আমি মেজরের সাথে দেখা করি। দেখা করার সময় একজন পাঞ্জাবী আমাকে অকথ্য ভাষায় গালি দেয়। মেজর কার্যে যোগদানের জন্য আদেশ দেন। অতঃপর অফিসে চলে আসি। অফিসে আসার পথে প্লাটফরমে একজন পাক সেনা আমাকে ধরে পকেট থেকে টাকা-পয়সা নিতে চেষ্টা করে। উল্লেখ করা যেতে পারে যে, অফিসের বেশ কিছু টাকা খান সেনাদের ভয়ে সরিয়ে ফেলেছিলাম। খান সেনাটি আর কিছু না বলে ছেড়ে দেয়। দিনের পর দিন খান সেনারা অত্যাচার আর গনহত্যা চালাতে থাকে। পূর্ব উল্লেখিত খান সেনার সাথে আমার বেশ বন্ধুত্ব জমে উঠে। ঐ খান সেনার সহযোগীতায় আমি বহু নিরীহ লোকজনকে শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করি। অত্র এলাকার ঘাঁটি করে থাকাকালীন খান পশুরা অসংখ্য লোক জনকে হত্যা করে। খান সেনারা অবাঙ্গালীও ধরে আনে রেল মিস্ত্রীর সাহায্যে। রেললাইন মেরামত করে স্বাধীনতা পূর্ব পর্যন্ত শান্তাহার থেকে পার্বতীপুর পর্যন্ত রেল যোগাযোগ করে। এরপর ভারতীয় মিত্র বাহিনীর প্রবল আক্রমণে বাংলাদেশ মুক্ত হয়ে যায়। সঙ্গে সঙ্গে জয়পুরহাটও মুক্ত হয়ে যায়।

স্বাক্ষর/-
মোঃ জজবর রহমান
১১/১০/৭৩

 

 

 

ইব্রাহিম রাজু

<,..৬৭,১১২>

 

।।৬৭।।
মোঃ আবুল কাসেম
থানা-গাবতলী
জেলা- বগুড়া

২৫ শে মার্চ পাক হানাদার বাহিনী বগুড়া শহরে আক্রমন করে ব্যর্থ হলে অতঃপর ১৩ ই এপ্রিল তারিখে ত্রিমুখী আক্রমন ও বিমান আক্রমন করে বগুড়া শহর তাদের আয়ত্ত্বে নিয়ে আসে। অতঃপর কয়েক দিন পর এক দল খান সৈন্য গাবতলী থানায় চলে আসে। গাবতলীর সি, ও, অফিসে তারা ঘাঁটি স্থাপন করে। এরপর খান সেনারা চারিদিকে টহল দিতে থাকে। হঠাৎ করে একদল খান বর্বর বাহিনী সুখান পুকুর রেলষ্টেশনে এসে উপস্থিত হয়। পর পর বহু দোকান পাট ও বাসাবাড়ীতে অগ্নিসংযোগ করে। বাজারের অসংখ্য দোকানপাট ও বাসাবাড়ীতে লুটপাট আরম্ভ করে দেয়। যাকে যে অবস্থায় যেখানে পায় খান হায়েনারা তাকে সেখানেই বেয়োনেট চার্জ করে অথবা রাইফেলের গুলি দিয়ে হত্যা করে। এক সংগে ৭২ জন নিরীহ জনগণকে একত্রে দাঁড়া করে মেশিনগানের ব্রাশ ফায়ার মেরে হত্যা করে। গাবতলী থানার ভিতর সুখান পুকুরে এত গণহত্যার নজির আর কোথাও পাওয়া যায়নি। বাজারে ঢুকে সর্বপ্রথম কয়েকটি মালজাত গুদাম ঘরে তারা অগ্নিসংযোগ করে বহু টাকার ধান চাল ভস্মীভূত করে দেয়। তাছাড়া বাজারের বহু দোকানদারকে ধরে ভীষণ নির্যাতন করার পর গুলি করে হত্যা করে। এদিনই পাক সেনারা আমার বাড়ীতে বহু টাকার ধনসম্পদ লুট করে নিয়ে যায়। খান বর্বর বাহিনী আমার বাড়ি থেকে ৭/৮ হাজার টাকার জিনিসপত্র লুট করে নিয়ে যায়। বহু সংখ্যক হিন্দুর বাড়ী অগ্নিসংযোগ করে ভস্মীভূত করে দেয়। গ্রামে ঢুকে মেয়েদের উপর পাশবিক অত্যাচার করে। বাজারের সমস্ত দোকানপাট ও ঘরবাড়ী অগ্নিসংযোগ করে পাক হায়েনারা আবার গাবতলী সি, ও, অফিসে যায়। গাবতলি থেকে খান পশুরা প্রত্যহ সুখান পুকুরে যাওয়া আসা করতে থাকে। প্রত্যেক বারই তারা দু’চারজনকে হত্যা করতে সক্ষম হয়। স্বাধীনতার ১২/১৩ দিন পূর্বে মুক্তিবাহিনীর প্রবল আক্রমণে গাবতলী থানা তথা সুখান পুকুর শেষ বারের মত শত্রুমুক্ত হয়। স্বাধীনতার পতাকা সর্বত্র ঊড়াতে থাকে।

স্বাক্ষর/-
মোঃ আবুল কাসেম
২৫/৯/৭৩

 

 

ইব্রাহিম রাজু

<,..৬৮,১১৩>

 

।।৬৮।।
আরিফুর রহমান (বাদশা)
সন্ধ্যাবাড়ী, থানা- গাবতলী
জেলা-বগুড়া

জৈষ্ঠ মাসের একদিন রাতে আমাদের বাড়ি ঘেরাও করে পাক সৈন্যরা আমাকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারের আগে অবশ্য আমার বাড়ীর দামী জিনিসপত্র ও সোনাদানা লুটপাট করে। মিলিটারীদের সাথে কতিপয় অবাঙ্গালীও ছিল। তাদের মধ্যে বাঙ্গালীও থাকা সম্ভব।

গ্রেফতার করার পর আমাকে সার্কিট হাউসে নিয়ে যাওয়া হয়। বলা প্রয়োজন, আমার হাত বাঁধা অবস্থাতেই নেয়া হয়। পথের মধ্যেই কয়েক দফা চড় থাপ্পড় মারা হয়।

সার্কিট হাউসে নেয়ার পর আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ যে, আমি মুক্তিবাহিনীকে খবর সরবরাহ করি। তারা আমার কাছ থেকে জানতে চায় যে, মুক্তিবাহিনী কোথায় আছে, তাদের সংখ্যা কত এবং তাদেরকে কিভাবে খবর সরবরাহ করি? আমি মুক্তিবাহিনীর লিডার না অন্য কেউ লিডার আছে? তার নাম কি? মুক্তি বাহিনীর অস্ত্রশস্ত্র কোথায় আছে?

আমি সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করলে আমার উপর দৈহিক নির্যাতন শুরু করে। কয়েকজন মিলে পর্যায়ক্রমে আমাকে নানানভাবে অত্যাচার করতে থাকে। রুলার দিয়ে শরীরের বিভিন্ন জোড়ায় বেদম প্রহার করে। শরীরের গিট ছাড়াও বিভিন্ন অংশে হৃদয়হীন ভাবে অত্যাচার করে।

এ ছাড়া খাড়া করে পা টান করে রেখে পিঠ কুঁজো অবস্থায় ঘাড় টান করে হাতের কব্জি দিয়ে ঘাঁড়ে মারত। শরীর একটু এদিক ওদিক করলে অথবা যন্ত্রণায় কাতরালে আরো বেশী করে অত্যাচার করতে থাকে। মারের সাথে সাথে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে। এই অবস্থায় এত বেশী করে আমার উপর অত্যাচার করা হয়েছিল যে, আমি প্রায় অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলাম। এ ছাড়া রাইফেলের বাঁট, গাদা, গুতা আর পিটান দিতে থাকে। এ ছাড়া লাত্থি তো আছেই।
অত্যাচারের সময় তারা কয়েক পদে অত্যাচার করে। এরা উনিশ পদে অত্যাচার করত। তাদের সুবিধা মত কখনও তারা আমার হাত বেঁধে রাখত আবার কখনও পা খোলা রাখত।

দু দিন বন্দী থাকার পর শান্তি কমিটির সুপারিশে ছাড়া পাই। অবশ্য এ জন্য আমার আত্নীয়স্বজনকে আড়াই হাজার টাকা খরচ করতে হয়েছে।

স্বাক্ষর/-
আরিফুর রহমান।

 

 

ইব্রাহিম রাজু

<,..৬৯,১১৪>

 

।।৬৯।।

ডাক্তার মোঃ হাবিবুর রহমান
সুখানপুকুর ষ্টেশন বাজার
থানা-গাবতলী, জেলা-বগুড়া

প্রথমবারে (২৬শে মার্চ) পাক হানাদার বাহিনী ব্যর্থ হওয়ার পর ১৩ ই এপ্রিল ত্রিমুখী আক্রমণ চালিয়ে বগুড়া শহর পূর্ণ দখলে আনে। কয়েকদিন পর একদল হানাদার বাহিনী গাবতলী সি, ও, অফিসে ক্যাম্প স্থাপন করে। গাবতলী থাকাকালীন হঠাৎ একদিন খান পশুর অত্র সুখানপুকুরে হানা দেয়। হানা দিয়ে অসংখ্য দোকানপাট ও ঘড়বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে। ৭২ জন নিরীহ জনগণকে একত্রে লাইন করে মেশিনগান দিয়ে গুলি করে হত্যা করে। প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ করা যায় যে, খান সেনারা বাজারে ঢুকেই সর্বপ্রথম আমার বাসায় অগ্নিসংযোগ করে ভস্মীভূত করে দেয়। আমি অনুমান করি যে, খান সেনারা প্রায় এক লক্ষ টাকার ধন-সম্পদ ভস্মীভূত করে দেয়। রাজাকার ও বিহারীরা বাজারের বিভিন্ন দোকানপাট লুট করে নিঃশেষ করে দেয়। জনসাধারণকে ডেকে খান সেনারা মুক্তিবাহিনী ও আওয়ামী লীগের কর্মীদের খোঁজ জানতে চায়। জনগণ অস্বীকার করলে তাদেরকে ধরে ভীষন নির্যাতন করার পর বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে তাদেরকে হত্যা করে। গ্রামে গ্রামে ঢুকে খান কুকুরেরা নিরীহ অবলা বালার প্রতি পাশবিক অত্যাচার শুরু করে। প্রথম দিনের মত খান সেনারা গাবতলীতে পুনরায় ফিরে যায়। এরপর প্রত্যেক দিন গাবতলী থেকে বর্বররা গাড়ীযোগে সুখানপুকুরে টহল দিতে থাকে। প্রত্যহ আসার পথে অথবা যাওয়ার পথে বর্বর দস্যু বাহিনী ২/৪ জনকে হত্যা না করে ফিরে যেত না। খান সেনারা গাবতলী তথা সুখানপুকুরের আশেপাশের সমস্ত জনগণের মনে ত্রাশের সৃষ্টি করেছিল। প্রত্যেকদিন গ্রামের অভ্যন্তরে ঢুকে মেয়েদেরকে জোর করে বা তাড়িয়ে ধরে পাশবিক অত্যাচার চালায়। কাউকে ধরে ক্যাম্পে নিয়ে যেত। এদের প্রায়ই মরে যেত।

আবার কেউ কেউ পশুদের হাত থেকে বেঁচে কোন রকমে বাড়ী চলে আসত। দীর্ঘদিন নির্যাতন চলার পর মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর আক্রমণে শত্রুর হাত থেকে নিস্তার পাই।

স্বাক্ষর/-
ডাক্তার মোঃ হাবিবুর রহমান।

 

 

ইব্রাহিম রাজু

<,..৭০,১১৫>

 

।।৭০।।
সুকচান
গ্রাম – সাইন্দ্রা
পোঃ- শান্তাহার
জেলা- বগুড়া

বগুড়া জেলার অর্ন্তগত আদমদিঘী থানার শান্তাহার ইউনিয়নের অধীন সাইন্দ্রা গ্রামটি পশ্চিম পাকিস্তানী সৈন্য ও বিহারদের দ্বারা অত্যাচারিত। মার্চ মাসের শেষ সপ্তাহের দিকে প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্য সাইন্দ্রা গ্রামে পাক বর্বররা প্রবেশ করে। উক্ত গ্রামে প্রথমে লুটতরাজ এবং পরে অগ্নিসংযোগ করে। অগ্নিসংযোগের ফলে প্রায় ৩শ বাড়ি পুড়ে যায়। উক্ত ৩শ বাড়ির যাবতীয় মালামাল ভস্মীভূত হয়। এখন ও ধ্বংসের সাক্ষ্য বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে রয়েছে। উল্লিখিত গ্রামে প্রায় ৩০ লক্ষ টাকার সম্পদ নষ্ট হয়েছে।

এই গ্রামে ঢুকে পাক বর্বররা ছাগল, গরু, হাঁস, মুরগী ও তরকারী ইত্যাদি লুট করেছে। কয়েকজন নারী যারা পালাতে সক্ষম হয়নি তাদেরকে ধর্ষন করে ও ধরে ক্যাম্পে নিয়ে আসে। ক্যাম্পে আসার পর থেকে আজ পর্যন্ত তাদের আর কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি। এই গ্রামের প্রায় ১৫০ জন লোক পাক বর্বরদের হাতে প্রাণ দিয়েছেন।

স্বাক্ষর/-
সুকচান।

 

 

ইব্রাহিম রাজু

<,..৭১,১১৬> “ক্যাপ্টেন আমাকে গর্ত হতে তুলে জিজ্ঞাসাবাদ করে তোমার বাড়ী কোথায়, কোথায় যাবে তুমি? আমি ভয়ে ভয়ে তার প্রশ্নের জবাব দিই। তারপর ক্যাপ্টেন তার সিপাইদেরকে ও বিহারীদেরকে বেশ শাসন করে। এবং আরও বলে এ লোক একজন বুড্ডা আদমী, একে তোমরা কেন জ্যান্ত কবর দিচ্ছিলে। এ তো কোন অপরাধ করে নাই।“

 

।।৭১।।
ওমর আলী প্রামাণিক
গ্রাম-নাপুরগাছি,

থানা-পাঁচবিবি
জেলা-বগুড়া

এপ্রিল মাসের শেষের দিকে আমি আমার বাড়ী দেখার জন্য নাপুরগাছি চলে আসি। এবং নিজ বাড়িতে গিয়ে দেখি পাক হানাদার বাহিনী বাড়ীর আশেপাশে বাঙ্কার করে বাঙ্কারের মধ্যে মেশিনগান বসিয়ে পজিশনে আছে। আমি বাড়ীতে ঢুকে দেখতে পাই আমার বাড়ীতে খাট চৌকি ইত্যাদি সবকিছু পাক হানাদার বাহিনী নিয়ে তাদের কাজে ব্যবহার করেছে। তারপর আমি বাড়ী হতে খিড়া পাথার রওনা হয়ে যাবার সময় পথে এক জঙ্গলের মধ্যে পাক হানাদার বাহিনী ও বিহারীরা আমাকে দেখে ফেলে। এবং আমাকে পাঞ্জাবী একজন সৈন্য ডাকে। আমি তার নিকট গিয়ে দেখতে পাই জঙ্গলের মধ্যে হানাদার বাহিনী দুটি গর্ত করে রেখেছে, তার গভীরতা প্রায় ২০/৩০ হাত এবং দৈর্ঘ প্রায় ৩০/৪০ হাত। আমি সেখানে পৌছালে একজন পাক সেনা বিহারীদেরকে নির্দেশ দেয় আমাকে উক্ত একটা গর্তের মধ্যে ফেলে দিয়ে জ্যান্ত কবর দিতে। তারপর বিহারীরা ও একজন পাক সেনা আমাকে উক্ত গর্তের মধ্যে নামতে বলে। আমি গর্তের মধ্যে নামার সাথে সাথে আমাকে চিত হয়ে টান হয়ে শুইতে বলে। আমি ভয়ে চিত হয়ে শুয়ে পড়ে আল্লাহর নাম স্মরণ করতে থাকি। তারপর পাক হানাদারদের মধ্যে একজন বিহারীদেরকে নির্দেশ দেয় জ্যান্ত অবস্থায় আমাকে মাটিচাপা দিয়ে রাখতে। দুইজন বিহারী কোদাল হাতে করে একজন মাথার দিকে গিয়ে দাঁড়ায় আর একজন পায়ের দিকে গিয়ে দাঁড়ায়। তারপর তারা কোদালে মাটি তুলে আমার শরীরের উপর মাটিচাপা দিবে। এমন সময় একজন পাক সেনাদের ক্যাপ্টেন ঘটনাস্থলে এসে উপস্থিত হয় এবং তাদেরকে জিজ্ঞেস দেয় যে, এই লোকটাকে কেন তোমারা জ্যান্ত কবর দিচ্ছ। তারপর ক্যাপ্টেন আমাকে গর্ত হতে তুলে জিজ্ঞাসাবাদ করে তোমার বাড়ী কোথায়, কোথায় যাবে তুমি? আমি ভয়ে ভয়ে তার প্রশ্নের জবাব দিই। তারপর ক্যাপ্টেন তার সিপাইদেরকে ও বিহারীদেরকে বেশ শাসন করে। এবং আরও বলে এ লোক একজন বুড্ডা আদমী, একে তোমরা কেন জ্যান্ত কবর দিচ্ছিলে। এ তো কোন অপরাধ করে নাই। তারপর ক্যাপ্টেন আমাকে জিজ্ঞাসা করে তুমি কোথায় যাবে। আমি জবাব দেই আমি পূর্বদিকে যাবো। তারপর ক্যাপ্টেন আমাকে পূর্বদিকে যেতে নির্দেশ দিলে আমি রওনা হয়ে চলে আসি। এবং খিড়া পাথার গিয়ে আমার পরিবার পরিজনের সাথে সাক্ষাত করি এবং ঘটনাদি খুলে বলি। তারপর বাংলাদেশ স্বাধীন হলে আমি নিজ বাড়ী চলে আসি।

স্বাক্ষর/-
ওমর আলী প্রামাণিক
৬/১১/৭৩

 

 

ইব্রাহিম রাজু

<,..৭২,১১৭১১৮>

 

।।৭২।।
ফকির মামুদ মন্ডল
গ্রাম-দানেজপুর
ডাকঘর- পাঁচবিবি
থানা- পাঁচবিবি
জেলা- বগুড়া

১৯৭১ সালের বাংলা আষাঢ় মাসের ২০/২৫ তারিখে ৫০/৬০ জন রাজাকার পুলিশ বিহারী ও পাক মিলিটারী মিলে আমার বাসায় যায় এবং বাসা ঘেরাও করে এবং আমাকে বাসা হতে ধরে ফেলে। বাসার বাইরে নিয়ে এসে আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে থাকে। তোমার চার নাতী মুক্তিযোদ্ধা তাদেরকে যদি তুমি এনে না দাও তাহলে আমরা তোমাকে গুলি করে হত্যা করব। তার প্রতি উত্তরে আমি জবাব দেই তারা কোথায় গিয়েছে তা আমি বলতে পারবো না, আর আপনারা যদি তাদেরকে কোথাও খুঁজে পান তা হলে তাদেরকে আপনারা গুলি করে মেরে ফেলবেন আমার কোন আপত্তি থাকবে না। কিন্তু আমার নাতিরা কোথায় গিয়েছে তার জন্য তো আমি দায়ী হতে পারি না। কারন তারা এখন বড় হয়েছে নিজ নিজ স্বাধীনতা নিয়ে তারা যেখানে সেখানে ঘুরে বেড়াতে পারে। আমি এখন বৃদ্ধ হয়েছি আর কি তাদের খোঁজখবর আমার পক্ষে রাখা সম্ভব। তারপর পাক হানাদার বাহিনীরা আমাকে চোখ বেঁধে পাঁচবিবি রেল লাইনের উপর নিয়ে আসে। এনেই স্থানীয় বিহারীদের নেতারা আলাপ-আলোচনা করার পর চোখ বাঁধা অবস্থায় আমাকে রেল লাইনের উপর ছেড়ে দিয়ে চলে যায়। আমি বাড়ী চলে যাই।

 

ঐ ঘটনা ঘটার ৭/৮ দিন পর আয়ুবের নির্দেশে ২০/২৫ জন রাজাকার বিহারী ও পাক সেনা মিলে আবার আমার গ্রামের বাসায় গিয়ে ঘেরাও করে আমাকে ধরে পাঁচবিবি নিয়ে আসে। এসেই সেই একই প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করে, আমি আমার জবাবে একই কথা বলি। তারপর সেদিনও পাক হানাদার বাহিনী কুখ্যাত বিহারী নেতার সাথে আলাপ আলোচনা করে আমার চোখ বেঁধে সি,ও, অফিসের নিকট নিয়ে ছেড়ে দেয়। আমি বাড়ী চলে যাই। তারপর আমি আমার পরিবার পরিজনের সবাইকে নিয়ে ভারতে চলে যাই। সেখানে আমার পরিবারের সকলকে রেখে ৮/১০ দিন পর আমি বাংলাদেশে চলে আসি। এর মধ্যে দালাল বিহারী নেতা আমার গদিঘর দখল করে নিয়ে পরিবার পরিজন নিয়ে সেখানে বসবাস করছিল।

আষাঢ় মাসের শেষের দিকে পাক হানাদার বাহিনী পাঁচবিবি হতে কান্দি যাবার পথে কান্দিয়া ব্রীজে ৪/৫ টা চীনা মাইন ব্রীজ হতে উদ্ধার করে। এবং মাইন কারা পুঁতে রাখে তাদের খোঁজ করতে থাকে। কুখ্যাত আয়ুব পাক হানাদার বাহিনীকে জানিয়ে দেয় যে, উক্ত মাইন পাতার মূলে রয়েছে ছমির উদ্দিন মণ্ডল ও মামুদ মন্ডল।

 

শ্রাবন মাসের তিন তারিখে ৪০/৫০ জন পাক সেনা রাজাকার ও বিহারী মিলে আমাদের বাসায় যায় এবং বাসা ঘেরাও করে আমাকে এবং আমার ছোট ভাই ছমির উদ্দিন মণ্ডলকে ধরে দুই ভাই- এর হাত একত্র করে বেধেঁ কোমরে দড়ি দিয়ে বেধেঁ পাঁচবিবি থানায় নিয়ে যায় এবং বলে ব্রীজে তোমরা মাইন পুঁতেছিলে, তোমরা আমাদেরকে মেরে ফেলবে। তোমার চার নাতি মুক্তিযোদ্ধা তাদেরকে এনে দাও। নতুবা তোমাদের দুই ভাই কে গুলি করে হত্যা করবো। তারপর আমরা দুই ভাই মেজরকে বলি আমরা মাইন কেমন দেখা যায় চিনি না এবং মাইন পাতা সম্বন্ধে কিছুই বলতে পারবো না। আর আমার নাতীদের খোঁজখবর আমরা কিছুই বলতে পারবো না। তারপর আমাদের দুই ভাইকে মেজর পাঁচবিবি থানায় চালান দিয়ে যায়। পাঁচবিবি থানায় সেই সময় পাঞ্জাবী পুলিশেরা থাকতো এবং বিহারীরা থাকতো। আমাদের দুই ভাইকে থানার হাজতে রাখে। আমরা হাজতের মধ্যে ঢুকে দেখতে পাই মুজাফফর ন্যাপের একজন কর্মী নাম বছির মিয়া (বাড়ী আটুয়া পাঁচবিবি থানা) আধা মৃত অবস্থায় মেঝেতে পড়ে আছে। তাকে একজন পাঞ্জাবী পুলিশ এমন প্রহার করেছে যে, প্রহারের দরুণ তার সমস্ত শরীর হতে রক্তপাত হচ্ছে। আমি জেলে ঢুকেই তাকে দেখে বললাম বছির মিয়া তুমি এখানে। বছির আমাকে দেখে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলে। আমি তাকে সান্ত্বনা বাণী শুনিয়ে বলি আল্লাহ আল্লাহ করো।
আল্লাহ ছাড়া আর কোন গতি নাই। তারপর আমরা দুই ভাই জেলের মধ্যে থেকে যাই। সেই দিন রাত ৮ টার পর একটা পাক হানাদার বাহিনীর গাড়ি গিয়ে থানায় উপস্থিত হয় এবং একজন পাঞ্জাবী জেলের দরজায় গিয়ে বছিরকে ডাক দেয়। বছির নড়তে-চড়তে পারে না, দুই তিনজন বিহারী ও একজন পুলিশ বছিরকে হাজত হতে বের করে গাড়ীতে তুলে দেয়, গাড়ী চলে যায়। তার আধ ঘন্টা পরেই আমরা সি, ও, অফিসের সম্মুখে একটা ফায়ারের শব্দ শুনতে পাই। আমরা মনে করলাম বছির হয়তো বাংলাদেশের মাটিতে হানাদার বাহিনীর গুলিতে মিশে গেল। আমরা দুই ভাই আল্লাহর নাম স্মরণ করতে থাকি। এবং মনে মনে বলতে থাকি এরপর মনে হয় আমাদের পালা। কোন মতে রাত্রি কেটে যায়।

 

তার ৫/৭ দিন পর মেজর আবার আমদের সাথে জেলে দেখা করে এবং বলে শালা বাঙ্গালীকা জাত, বড় হারামীহায়। শালা মাইন পোঁতে হাম লোককে মারতে চায়। এবং আমাকে আরও বলে তোম লোককা দুনিয়াছে নেকাল করদেগা, আজ রাতমে তোম বিদায় নিয়ে গা। তারপর জয়পুরহাট চলে যায়।

 

এর মধ্যে আমি জেলের একজন বাঙ্গালী পুলিশের মারফত শুনতে পাই যে, আমাদের দুই ভাই- এর জন্য কবর খোঁড়া হয়েছে সি, ও, অফিসের পার্শ্বে। এটা শোনার সাথে সাথে আল্লাহর নাম স্মরণ করতে থাকি। কিন্তু আয়ুব বিহারীর নির্দেশে জেলের মধ্যে আমার উপর কোন শারিরীক ও মানসিক অত্যাচার করা হয় না।

 

মেজর চলে যাওয়ার ৮/১০ দিন পর একজন বেলুচ মেজর পাঁচবিবি আসে। এসেই জেলে গিয়ে আমাদেরকে দেখতে পায়। তারপর কাগজপত্র দেখে ও,সি, কে নির্দেশ দেয় যে, এখনই আমাদেরকে বগুড়া সেন্ট্রাল জেলে পাঠিয়ে দেওয়া হোক। সঙ্গে সঙ্গে আমাদের দুই ভাইকে গাড়ীতে করে বগুড়া সেন্ট্রাল জেলে পাঠিয়ে দেয়। আমরা জেলে ঢুকে দেখতে পাই জেলের মধ্যে ৮০/৯০ জন বাঙ্গালী পড়ে আছে। তাদের কারোর শরীরের শত শত লাঠির আঘাতের চিহ্ন। আবার কারুর শরীরে শত শত বেয়োনেটের খোঁচার চিহ্ন। কারোর শরীর হতে অঝোরে রক্ত ঝরছে। দ্রুত সব দৃশ্যাবলী দেখে জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। জেলের দারোয়ান আমাকে বলতে থাকে বুড্ডা তুম আর নেহি বাচেগা। তারপর আমরা জেলে ঢুকার মধ্যে ঢোকার আধ ঘন্টা পর একজন পাঞ্জাবী লাঠি হাতে করে জেলের মধ্যে ঢোকে। সকলেই তাকে দেখে ভয়ে সন্ত্রস্ত হয়ে সড়ো চুপচাপ হয়ে বসে। তারপর পাঞ্জাবীটা ঘরের মধ্যে ঢুকেই কোন কথা না বলে এক এক করে সবার পিঠে একটা করে লাঠির আঘাত করে। তারপর আমার নিকট গিয়ে থমকে দাঁড়ায় এবং আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে বুড্ডু তুম কাহাছে আয়া। আমি জবাব দিই আমি পাঁচবিবি হতে এসেছি। আমার কোন দোষ নেই আমাকে বিহারীরা ধরিয়ে দিয়েছে। তারপর মিনিট পাঁচেক চুপ করে থাকে এবং আমাকে বলে বুড্ডা তোমার কোন ভয় নেহি। তারপর আমার ভাই এর নিকট গেলে আমি বলি আমার ছোট ভাই। তারপর তাকে কিছু জিজ্ঞাসা না করে জেল হতে বেরিয়ে চলে যায়। তারপর সন্ধ্যা নেমে এলে ৪/৫ জন লোককে জেল হতে বের করে কোথায় যেন নিয়ে যায়। তাদেরকে আর জেলে ফিরে নিয়ে আসে না। এইভাবে প্রতি দিন ৪/৫ জন করে জেল হতে বের করে নিয়ে হত্যা করতো। কয়েকদিন পর বগুড়া শহরে আমার আত্নীয়ের তদ্বীরের দরুন মুক্তি পাই।

স্বাক্ষর/-
ফকির মামুদ মণ্ডল
৭/১১/৭৩

 

 

ইব্রাহিম রাজু

<,..৭৩,১১৯১২০> “এলো পশ্চিমা পুলিশ। এদের বাবা-মা মানুষ কিনা আমার জানা নেই। তবে এরা আকৃতিতে মানুষ হলেও আসলে ছিল কুকুর।“

 

।।৭৩।।
মোঃ জালাল উদ্দিন
সারিয়াকান্দি
জেলা- বগুড়া
১৯৭১ এর জুলাই আগষ্ট মাসের দিকে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী অধিক সামরিক শক্তি সরঞ্জাম নিয়ে সারিয়াকান্দিতে তাদের ঘাঁটি ফেলে। হানাদার বাহিনী বাঁধে যাওয়ার পথে বেণীপুর চরের তমিজউদ্দিন প্রামাণিকের ভগ্নিপতিকে সাপাড়ার রাস্তায় ধরে এবং রাইফেল দ্বারা আঘাত করে হত্যা করে। তারা প্রত্যেক দিন সকালে দল বেঁধে বিভিন্ন গ্রামে রুটিন মোতাবেক হামলা করত। নারী নির্যাতন, হত্যা, মারধোর ও লুন্ঠন করে মূল্যবান জিনিসপত্রাদি নিয়ে বিকালে তাদের ঘাঁটিতে ফিরত। এমনি একদিন গণকপাড়ায় যেয়ে তারা মুক্তি বাহিনীর হাতে আটকা পড়ে। সারাদিন সারারাত দু’দলের মধ্যে যুদ্ধ হয় কিন্তু মুক্তি বাহিনীর গুলি ফুরিয়ে যাওয়ায় পাকিস্তানী বাহিনী রক্ষা পায়।

অতর্কিতে হানা দিয়া পাক বাহিনী দেলুয়াবাড়ী গ্রাম হতে মুক্তিযোদ্ধা নজির হোসেন, সাহায্যকারী কোরবান আলী, মন্তেজার রহমান ও বাবু খাঁকে আটক করে। বাঁধের নিকট নিয়ে হাত পাঁ বেঁধে নজির হোসেনকে গুলি করে হত্যা করে এবং অপর তিনজনকে নিয়ে ঘাঁটিতে আসে। অতি কষ্টে পরে তারা মুক্তি পায়। কিন্তু মুক্তি পাওয়ার পর প্রায় সপ্তাহখানেক তাদের দু’জনকেই অজ্ঞান অবস্থায় দেখা গেছে। বাঙ্গালীর পশ্চিম পাড়, রামচন্দ্রপুর গ্রামে অপারেশন চালাতে গিয়ে মুক্তি বাহিনীর গুলিতে ছোট দারোগা নিহত হয় এবং সামরিক বাহিনীর একজন গুরুতররূপে আহত হয়।

মুক্তিবাহিনীর তৎপরতা রীতিমতো বেড়ে যায়। হানাদার বাহিনী বাইরে যাওয়া কম করে ফেলে। তাদের অত্যাচারে পলাতক বাড়িওয়ালাদের খাসী, মোরগ কুড়াতে থাকে। একদল হানাদার বাহিনী বগুড়া থেকে আসার পথে ফুলবাড়ী খেয়াঘাটে মুক্তিবাহিনী কর্তৃক আক্রান্ত হয়। খেউনিরুপী মুক্তিযোদ্ধা খেয়ার নৌকা নদীর মধ্যে আসলে গুলি ছুড়তে থাকে। ঘটনাস্থলেই তিনজন কনষ্টেবল প্রাণ হারায়। তারপর শুরু হয় স্থানীয় দোকানপাঠ লুন্ঠন। তবিবর মণ্ডলের দোকানের সম্মুখে ট্রাক রেখে মালপত্র বোঝাই করে সেগুলো রংপুরের গাইবান্ধায় পাচার করে। হাবিবুর প্রামাণিকের দোকান লুট করে এবং তাকে পর পর দুই দিন দোকানের মধ্যেই বেদম প্রহার করে। নৌকাতে পাঠ উঠানোর অভিযোগে দৌলতুজ্জামান তরফদার সাহেবকে ভীষণ মারধোর করে। তখন মুক্তি বাহিনীর আর সহ্য হয় না। এদিকে সোজাসুজিও তারা মিলিটারীদের ঘাঁটিতে হানা দিতে পারে না। কারন পাকিস্তানী বাহিনীর ক্যাম্পে হানা দিলে আশেপাশের গ্রাম পুড়িয়ে ছারখার করে দেয় এবং লোকজন মেরে সাফ করে ফেলে। তবুও সময় ঠিক করে একদিন মুক্তি বাহিনীর তৎপরতা আরো বৃদ্ধি পায়। পাকিস্তানী বাহিনীর এই খবর বগুড়ায় তাদের ঘাঁটিতে পৌঁছিয়ে দেয়ার পর সামরিক বাহিনীর লোককে সারিয়াকান্দি পাঠিয়ে তাদের শক্তি বৃদ্ধি করে। সারিয়াকান্দি বাজারের সমস্ত বাড়ী ও দোকানপাট তল্লাশী চালিয়ে মালেক মণ্ডলের দোকান হতে বাংলাদেশের পতাকা উদ্ধার করে। ফলে তার দোকানের সমস্ত মালপত্র থানাতে উঠাবার আদেশ দেয়। তারপর মন্তেজা রহমান মণ্ডলকে পাকিস্তানী পতাকা না উঠাবার অভিযোগে আটক করে তাদের সামরিক গাড়িতে উঠায়ে নেয়। মফিজ মাষ্টার সাহেবের বাড়ীতে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং তার বাড়ীতে পাহারারত কামলা খটটুর বাবাকে আটক করে এবং গাড়ীতে তুলে নেয়। জামাল ডাক্তারের শ্বশুর ময়েজ ডাক্তার, জামাল ডাক্তার, মালেক মণ্ডলের ছেলে এবং অন্যান্য বেশ কিছু লোককে হানাদার বাহিনীর জোয়ানরা আটক করে। সামরিক বাহিনীর উক্ত দলের নেতৃত্ব দিচ্ছিল লেফটেন্যান্ট আতিক। মালেক মণ্ডলের ছেলেকে থানায় তার বুকে পায়ের শক্ত জুতার দ্বারা বার কয়েক আঘাত করে। ফলে সে অজ্ঞান হয়ে মাটিতে পড়ে যায় এবং তার মুখ হতে রক্ত বের হতে থাকে। সকলকে নিয়ে বাউলে আটা ঘাঁটিতে চলে যায় এবং রাতে তাদের প্রতি অবর্ণনীয় নির্যাতন চালায়। তাদের ঘাঁটিতে রেখে জামাল ডাক্তারের বাসায় পুনরায় আসে এবং তার স্ত্রীকে খোঁজাখুঁজি করতে থাকে। তার স্ত্রীকে না পেয়ে তার শ্বাশুড়ীকে ধরে মোটরে উঠায় ও তার মেয়েকে বের করে দেয়ার জন্য ভয়-ভীতি প্রদর্শন করে। রাত্রিতে মুক্তিবাহিনী অতর্কিতে থানা আক্রমণ করে। তখন সারিয়াকান্দি থানায় মিলিটারী ছিল। থানা আক্রমনের পরপরই ভীষণ বৃষ্টি আরম্ভ হয়। দুই পক্ষের ভীষণ গোলাগুলি হয় কিন্তু বৃষ্টির বেগ আরো প্রবল হওয়ায় মুক্তিযোদ্ধারা ফিরে যেতে বাধ্য হয়। তারপর প্রায়ই খবর পাওয়া যেতে লাগল আজ এ দালাল খতম, কাল ও দালাল খতম। পাকিস্তানী বাহিনী তাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার দেখতে লাগল। ইতিমধ্যে থানায় পশ্চিম ও,সি কে পাঠানো হয়েছে। তার চেষ্টায় প্রায় ৭০/৮০ জন রাজাকার সংগ্রহ করা হয়েছে। এলো পশ্চিমা পুলিশ। এদের বাবা-মা মানুষ কিনা আমার জানা নেই। তবে এরা আকৃতিতে মানুষ হলেও আসলে ছিল কুকুর। মুক্তিবাহিনীর তৎপরতায় তাদের যাতায়াত বন্ধ করে দেয়া হল। রাজাকাররূপী একজন মুক্তিবাহিনীর ছেলেকে তারা টের পেয়ে লাঠি দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করে এবং হাত-পা কেটে নদীতে ফেলে দেয়। সারিয়াকান্দি এক্সচেঞ্জ হতে পাকবাহিনীর সংখ্যা এবং তাদের গোলা বারুদের খবর জেনে ভোর পাঁচটায় সারিয়াকান্দি আক্রমণ করা হয়। দুর্ভাগ্যবশতঃ উক্ত যুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর দুইজন যুবক প্রথমেই নিহত হওয়ায় তারা ফিরে যেতে বাধ্য হন। বগুড়া ও গাবতলী থেকে হানাদার বাহিনীদের ডাক আসে এবং তাদেরকে থানা ছেড়ে অতিসত্বর বগুড়া চলে যাবার নির্দেশ দেয়া হয়। কিন্তু ইতিমধ্যেই মুক্তিবাহিনী কতৃক রাস্তা বন্ধ হওয়ায় তারা চলে যাবার কোন পথ পেল না।

 

১৯৭১ সালের ২৬ শে নভেম্বর সকাল ঠিক এগারটায় মুক্তিযোদ্ধারা সম্মিলিতভাবে সারিয়াকান্দি থানাতে অবস্থানরত হানাদার বাহিনীদেরকে আক্রমণ করে। বিকাল তিনটার সময় এক্সচেঞ্জে অবস্থানরত বাহিনীদের পতন ঘটে। সারাদিন এবং সারারাত যুদ্ধের পর ২৭ শে নভেম্বর সকালে হানাদার বাহিনীসহ থানার পতন ঘটে। শতাধিক রাজাকার ও পুলিশ মুক্তিবাহিনীর দ্বারা আটক হয়। আটককৃত পুলিশদেরকে ভারতে বিচারের জন্য পাঠিয়ে দেয়া হয়। রাজাকারদের বিচার করা হয় যমুনা নদীর পাড়ে। বিচারে কিছু রাজাকার রক্ষা পায় এবং অবশিষ্ট গুলো যমুনা নদীতে তাদের সলিল সমাধি লাভ করে। থানার পতনের পর শুরু হয় উড়োজাহাজ থেকে বোমা বিস্ফোরণ ও মেশিনগানের গুলিবর্ষণ । উক্ত এমনি গুলিতে নিহত হয় পাকুড়িয়া গ্রামের পুকরা মণ্ডলের ছেলে দুদু মণ্ডল। সে মুক্তিবাহিনীদেরকে নিয়ে ভারতে যাচ্ছিল এবং মেশিনগানের গুলিতে নৌকা থেকে নদীতে পড়ে যায়। বর্বর পাক বাহিনীর রাইফেলের গুলিতে নিহত হয় উক্ত গ্রামের জাফর সরদারের ছেলে জহির উদ্দিন। মেশিনগানের আর একটি গুলিতে সারিয়াকান্দির আছমতের মা নিহত হয়।

দুঃখ ও পরিতাপের বিষয় সারিয়াকান্দি থানা পতনের পূর্ব রাত্রিতে পাকিস্তানী বাহিনীর অধিকাংশ পালিয়ে যেতে সক্ষম হয় এবং তার কিছু অংশ রাস্তায় মারা পড়ে। বাকীগুলো সমন্ধে কোন খোঁজ পাওয়া যায় নি। ফলে অত্র থানার অনেক অস্ত্রশস্ত্র মুক্তিবাহিনীর হাতে আসে।

স্বাক্ষর/-
মোঃ জালালউদ্দিন
২২/০৯/৭৩

 

 

ইব্রাহিম রাজু

<,..৭৪,১২১১২৪> “এক মনে ক্বাজা নামাজসহ এশার নামাজ আদায় করতে প্রায় ২০ মিনিট সময় লেগে যায়। নামাজের মাঝখানে আমি একবার টেলিফোন বেজে ওঠার শব্দ শুনতে পাই। নামাজ শেষে মোনাজাত করে আমি বর্বর বাহিনীকে বলি যে এই বার আমি প্রস্তুত এখন আমাকে নিশ্চিতভাবে হত্যা করতে পারো। এই সময় একজন সিপাই আমার কাছে এসে বলল যে খোদা আপনার দোয়া কবুল করেছেন। আপনাকে আর মারা হবে না কেননা এইমাত্র হেড অফিস থেকে ফোন এসেছে, আপনাকে সেখানে এখনই নিয়ে যাবার জন্য হুকুম দিয়েছে। “

 

।।৭৪।।
মোঃ ছানোয়ার হোসেন
গ্রাম- বালীস্বর্বা
ডাকঘর- পাঁচবিবি
জেলা- বগুড়া

১৯৭১ সনের ২২ শে জুলাই রাজাকারদের হাতে গ্রেফতার হলে পাক বাহিনীর ক্যাম্পে নিয়ে যাবার পর আমাকে গামছা দিয়ে চোখ বেঁধে দেয়। তারপর আরম্ভ হয় দৈহিক নির্যাতন। প্রায় ১৫/২০ জন পাঞ্জাবী ফুটবল খেলার মত লাথি মারতে থাকে। একজন লাথি মেরে আরেকজন এর কাছে দেয়, সে আবার আর একজনের কাছে। সঙ্গে সঙ্গে কিল ঘুষি, রাইফেলের বাঁটের বাড়ি চলতে থাকে। প্রায় ৪০ মিনিট তারা আমার উপর নির্যাতন চালায়। শেষের দিকে আমি জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়ি। সারা শরীর ফেটে রক্ত ঝরতে থাকে। আমার উপর দৈহিক নির্যাতন চালাবার পর প্রায় জ্ঞানশূন্য অবস্থায় থানাতে পৌছে দেয় এবং হাজতে চোখ, হাত বাঁধা অবস্থায় বন্দী করে রাখে। রাত্রি ৮ টার দিকে একজন বাঙ্গালী পুলিশ আমার চোখ ও হাতের বাধন খুলে দেয় এবং কিছু ভাত খেতে দেয়। এই সময় আমি দেখতে পাই হাজতের ভিতর আরও ৮ জন বন্দী আছে।

অতঃপর আমাকে ১০ দিন থানা হাজতে বন্দী করে রাখে। প্রত্যেকদিন বহু পাঞ্জাবী সৈন্য ও বিহারীরা আমাকে দেখার জন্য থানা হাজতে আসতো কেননা তারা নাকি মুক্তিফৌজ কেমন দেখা যায় তা জানে না। তারা এসে নানাভাবে আমাকে গালিগালাজ দিত এবং লাঠি দিয়ে হাজতের ভিতরেই আমাকে খোঁচাতো। অনেকে আবার উপহাস করে আমাকে বন্ধু বলে ডাকতো।

আগস্ট মাসের ১ তারিখে আমাদেরকে থানা হাজত থেকে বের করে এবং আমার দুই পার্শ্বে দুইজনকে দাঁড় করে আমার দুই হাত দুই জনের হাতের সঙ্গে বেঁধে মাজায় দড়ি বেঁধে টেনে রেল স্টেশনে আনা হয়। তারপর গাড়ীতে করে বগুড়া নিয়ে জেলে ঢুকিয়ে দেয়। বগুড়া জেলে দুইটা পাঞ্জাবী কে “জেল” দেয়া হয়েছিল। এই পাঞ্জাবী দুটি জেলের ভিতর যখন তখন আমাদেরকে মারধোর করতো।

৩ রা আগস্ট আমাকে জেল থেকে বের করে বগুড়া কটন মিলের নিকট একটা ছোট ঘরের ভিতর নিয়ে যায়। এখানে নিয়ে প্রথমে আমাকে জিজ্ঞাসা করা হয়। এই সময় তারা আমাকে জিজ্ঞাসা করে-
‘তুমি কত বিহারী ও পাঞ্জাবী মেরেছো? কোথায় মুক্তিবাহিনীর ট্রেনিং দিয়েছো, তোমাদের লিডার কে, কোথায় কোথায় যুদ্ধ করেছো, ভারতীয় সৈন্য বর্ডারে যুদ্ধ করছে, কিনা, মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যা কত? পাক বাহিনীর প্রশ্নের জবাবে আমি শুধু এ কথা বলি যে, আমি এ সব কিছু জানি না। আমি ভারত থেকে পালিয়ে আসছিলাম, আমি ট্রেনিং নেই নি।

আমার কাছ থেকে কোন কথা বের করতে না পেরে ৩ জন মিলে এক সঙ্গে আমাকে মারতে আরম্ভ করে। কিল, ঘুষি, লাথি, রাইফেলের বাটের বাড়ি এবং লাঠি দিয়ে ভীষণভাবে পিটানো আরম্ভ করে। প্রায় দেড় ঘন্টা যাবত এইভাবে মারধোর করার পর আমাকে পায়ের ভিতর হাত দিয়ে কান ধরে রাখতে নির্দেশ দেয়। আমি যখন তাদের কথা মত নিচু হয়ে পায়ের ভিতর হাত দিয়ে কান ধরে থাকি তখন পিছন থেকে চাবুক দিয়ে পিটান হয় এবং সঙ্গে সঙ্গে একই প্রশ্ন বারবার করতে থাকে। সময় সময় বাইরে থেকে যারা দেখতে আসে তারাও হাতের কাছে যা পায় তাই দিয়ে পিটায়।

 

প্রায় ৩ ঘন্টা যাবত এইভাবে নির্যাতন চালানোর পর সন্ধ্যা ৭ টার দিকে আমার পায়ে চিকন রশি শূন্যে ঝুলিয়ে দেয়। এই সময় এমন লাগতে থাকে যে জীবন বোধ হয় পা দিয়ে বের হয়ে যাবে। ঝুলে থাকা অবস্থায় মোটা রোলার দিয়ে প্রত্যেক গিরায় গিরায় মারতো এবং মাথার পিছনের দিকে আঘাত করতো। প্রায় ২০ মিনিট রাখার পর আমি বলি যে, আমাকে মাটিতে নামানো হলে আমি সব কথা বলবো। তখন তারা আমাকে নিচে নামায় এবং তখনই বলার হুকুম দেয়। কিন্তু আমি জিরিয়ে নেবার উদ্দেশ্যে আবোল তাবোল বলতে থাকি। আমার চালাকি বুঝতে পেরে বর্বর সৈন্যরা আমাকে লাথির পর লাথি মারতে থাকে। কিছুক্ষন পিটানোর পর পুনরায় আমাকে ঝুলিয়ে দেওয়া হয় এবং পূর্বের চেয়ে আরও বেশী প্রহার করতে থাকে এবং প্রশ্ন করতে থাকে। আমার ঐ একই উত্তর যে আমি জানি না।

২য় বার আমাকে ঝুলানোর প্রায় ১৫/২০ মিনিট পর পাশের রুম থেকে পাক বাহিনীর ক্যাপ্টেন বের হয়ে আসে এবং আমাকে বলে “ছানোয়ার, আমি একজন মুসলমান তুমি বিশ্বাস কর?” আমি তার জবাবে বলি যে। “হাঁ আপনি মুসলমান।“তখন ক্যাপ্টেন সাহেব আমাকে পুণরায় বলে যে “আমি মুসলমান হয়ে আর এক মুসলমান এর কাছে প্রতিজ্ঞা করছি যে যদি তুমি আমার কাছে সত্য কথা বলো তবে তুমাকে আর মারা হবে না, এবং আমি চেষ্টা করবো তোমাকে ছেড়ে দিতে।“তখন আমার তার কথা বিশ্বাস হলো এবং আমি প্রতিশ্রুতি দিলাম যে “আমি সত্য কথা বলবো?” এই সময় আমাকে মাটিতে নামান হয় এবং বলে যে তুমি “খাওয়া দাওয়ার পর বলবে না এখনই বলবে?” আমি বলি যে আপনি যা বলেন সেই হিসাবেই আমি কাজ করবো। তখন আমাকে রুটি ও তরকারি এনে খেতে দেওয়া হয়।

খাওয়ার পর ক্যাপ্টেন সাহেব আমাকে জানায় যে তুমি আজ বিশ্রাম কর কাল তোমার কাছ থেকে সব কিছু শোনা হবে। এই বলে আমাকে পুনরায় জেলে নিয়ে একটা সেলের ভিতর বন্দী করে রাখে। এই সময় আমি এত কাহিল হয়ে পড়েছিলাম যে আমি মোটেই নড়াচড়া করতে করতে পারতাম না।

৪ ঠা আগষ্ট সকাল ৯টার দিকে আমাকে জেল থেকে বের করে পূর্বের সেই ঘরে ক্যাপ্টেন সাহেবের কাছে নিয়ে যায়। ক্যাপ্টেন সাহেব আমাকে প্রশ্ন করে যে, বল তুমি কি করেছো? তার উত্তরে আমি জানাই যে আমি ৭দিন ট্রেনিং নিয়েছি। তারপর অপারেশনের জন্য আমরা বগুড়া যাবার পথে “গয়েশপুর” এসে আমি অসুস্থ হয়ে পড়ি এবং আমার দলের লোক আমাকে রেখে বগুড়া চলে যায়। তখন আমি পুনরায় ভারত চলে যাই এবং কিছু দিন পর যখন ইয়াহিয়া খান সাধারন ক্ষমা ঘোষনা করেছেন তখন আমি দেশে ফিরে আসার সময় রাজাকারদের কাছে ধরা পড়ি। ক্যাপ্টেন আমার কথা লিখে নেয় এবং আরও বহু প্রশ্ন করে, ভয় দেখায়, লোভ দেখায় উত্তর দেবার জন্য। আমি বলি যে যদি আমাকে মারতে মারতে মেরেও ফেলা হয় তবুও আমি এর বেশি আর কিছু বলতে পারবো না।

৭ ই আগস্ট আমাকে বগুড়া জেল থেকে বের করে ” মিলিটারী পুলিশ “হাত বেঁধে গাড়ীতে করে রেল স্টেশনে নিয়ে যায়। সেখানে তাদের কথা থেকে আমি বুঝতে পারি আমাকে নাটোর সামরিক জেলে পাঠান হচ্ছে। গাড়ী আসার পর মিলিটারী পুলিশ আমাকে অন্য মিলিটারীর হাতে তুলে দেয়।

গাড়ীর ভিতর তুলে আমাকে ও অন্য আরও একটি ছেলেকে ছিটের নিচে বসিয়ে আমাদের ঘাড়ের উপর পা তুলে বর্বর সৈন্যরা বসে থাকতো এবং প্রত্যেক স্টেশনে গাড়ী থামলে বিহারী ও অন্যান্য সৈন্য রা এসে আমাদের দুই জনকে ভীষণভাবে মারধোর করতো। প্রত্যেক ষ্টেশনে আমাদের এই ভাবে নির্যাতন চলতে থাকে।

নাটোর রেল স্টেশন থেকে আমাদের নাটোর সামরিক জেলের কাছে নিয়ে যায় এবং বলে যে এদেরকে নতুন “মেহমান” হিসাবে প্রাথমিকভাবে কিছু “খেদমত” করে দেওয়া হোক। এই বলে ভীষণ মারধোর আরম্ভ করে। মারতে মারতে প্রায় জ্ঞানশূন্য অবস্থায় আমাকে জেলের ভিতর ঢুকিয়ে দেয়।

 

প্রত্যেক দিন জেল থেকে বের করে কাজ করানোর জন্য নাটোর ফুল বাগানে নিয়ে যেত। প্রত্যেক দিন ৬ ঘন্টা কাজ করতে হতো। সকাল ৮টা থেকে রাত ১২ টা এবং ৩টা থেকে ৫ টা একটানা কাজ করতে হতো এর ভিতর কোন বিশ্রাম নিতে দিতো না। সব সময় “ডবল” হিসাবে কাজ করাতো। এরপরও বর্বর সৈন্যরা চাবুক দিয়ে আমাদের প্রহার করতো।

জেলখানার ভিতর যে ঘরে আমাদের রাখা হতো সে ঘরে খুব বেশি হলে ১০/১২ জন থাকতে পারে। সেখানে আমাদের ৬০ জনকে রাখতো। রাত্রিতে শোবার কোন ব্যবস্থা ছিল না। আমি যে ঘরে ছিলাম সে ঘরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচারার ডঃ কাজী সালেহ আহম্মেদ, লেকচারার মজিবর রহমান, ওয়াপদার ডিভিশনাল ইঞ্জিনিয়ার এম, ডি, ছারোয়ার হোসেন (রাজশাহী) ছিলেন। আমাদের মত এদের উপরও চলতো সমানভাবে নির্যাতন এবং আমাদের মতো এদেরও কাজ করতে হতো। জেলের ভিতর সর্বমোট ১৫০ জন কয়েদী বন্দী ছিল।

মোট ২৮/২৯ দিন আমি নাটোর জেলে ছিলাম। আমাদের খাবার দেবার জন্য জেল থেকে বের করে লাইন ধরাতো। আমরা যখন নিচু হয়ে খাবার নিতাম তখন বর্বর সৈন্যরা চাবুক দিয়ে আমাদের প্রহার করতো। মার ছিল আমাদের একমাত্র সঙ্গী। প্রত্যেক দিন সকালে ছোট একটা পুরি ও একটু চা। দুপুরে দেয় ছটাক চাউলের ভাত ও পানির মত একটু ডাউল অথবা একটু নিরামিশ তরকারী। বিকালে ২ টা ছোট রুটি ও একটু আলুর ঝোল। কোন সময়ই আমাদের খাবার খেয়ে পেট ভরতো না। আমরা সবাই সব সময় ক্ষুধার জ্বালায় ভুগতাম।

প্রত্যেকদিনই দেখতাম জেল থেকে ২/৩ জিন লোককে নিয়ে যেত জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য। বিকালে তাদের যখন জেলে ফিরিয়ে আনতো তখন তাদের দেহ ক্ষত বিক্ষত অবস্থায় দেখা যেত- সারা শরীর দিয়ে রক্ত ঝরতো।

এত বিপদের মধ্যেও রাত্রির বেলা জেলখানার ভিতর গান বাজনা করতাম। কেউ গান গাইত কেউবা তালি বাজাত। এইভাবে আমরা আমাদের দুঃখ ভুলে থাকার চেষ্টা করতাম।

আমাদের কাছ থেকে ‘চুক্তি পত্র’ লিখে নেওয়া হয় যে যদি পুনরায় ভারত চলে যাই তবে আমার অবর্তমানে আমার পরিবারের উপর নির্যাতন চালানো হবে। জেল থেকে আমাদের বের করে প্রত্যেককে ৫ টা করে টাকা ও একটা করে সার্টিফিকেট দিয়ে দেয়। মুক্তি পাবার পর আমি ৭ই সেপ্টেম্বর পাঁচবিবি হয়ে আমার বাড়ীতে পৌঁছি।

মুক্তি পেয়ে আমি বাড়ী আসার পর প্রায়ই পাক বাহিনী আমাকে চাপ দিত রাজাকারে ভর্তি হবার জন্য কিংবা বর্ডার স্পাইং করার জন্য। কিন্তু আমি অসুস্থ বলে বাড়ীতে থাকতাম এবং বলতাম যে আগে ভালো হয়ে নেই।

২৮ শে নভেম্বর বিকাল ৪ টার দিকে একজন রাজাকার আমার বাড়ীতে গিয়ে বলে যে, এখনই থানায় যেতে হবে। আমি যদিও বুঝতে পারি যে আমাকে বন্দী করার জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তবুও আমি তার সঙ্গে থানায় রওনা হই কিন্তু রাস্তায় নেমে দেখতে পাই যে পাক বাহিনী গাড়ি নিয়ে আমার বাড়ির দিকে যাচ্ছে। রাস্তার ভিতর থেকেই আমাকে তুলে নেয় এবং জয়পুরহাটে নিয়ে যায়।

আমাকে যখন বন্দী করে গাড়ীতে তোলা হয় তখন গাড়ীর ভিতর লেঃ আলতাফ (বিহারী) বসে ছিল। আমাকে জয়পুরহাট বি, আই, ডি, সির শিক্ষানবীশ আবাসিক এলাকায় ২ নং ব্যারাকে পাক বাহিনীর প্রধান কার্যালয়ে নিয়ে যায়। এখানে আমাকে “মেজর আফজালের” কাছে নিয়ে যায় এবং লেঃ আলতাফ আমার নামে বহু মিথ্যা অভিযোগ মেজর সাহেবের কাছে বলে এবং বলে যে আমি নাকি ২ জন বিহারীকে হত্যা করেছি তা লেঃ আলতাফ দেখেছে। মেজর আমাকে এই সব কথার সত্যতা জিজ্ঞাসা করে। এক কথায় আমি সব অস্বীকার করি। তখন মেজর সাহেবের সঙ্গে আমার কিছুটা কথার কাটাকাটি হয়। এই সময় মেজর সাহেব একজন সৈন্যকে ডাকে এবং আমাকে ধোলাই দেবার জন্য বলে। এই সময় আমাকে এমনভাবে প্রহার করা হয় যে আমি প্রায় জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়ি।

 

আমাকে বহু সময় মারধোর করার পর লেঃ আলতাফ আমাকে মেরে ফেলার জন্য মেজর সাহেবের কাছে এজাজত চায়। মেজর সাহেব লেঃ আলতাফ কে এজাজত দেয় আমাকে মেরে ফেলার জন্য।

এই সময় আমাকে হত্যা করার জন্য লেঃ আলতাফ হোসেন আমাকে করে খোঞ্জনপুর রাস্তার উত্তর পারে মাঠের ভিতর পাক বাহিনীর ডিফেন্স- এর কাছে নিয়ে যায়, ৩/৪ জন মিলিটারীর হাতে তুলে দেয় এবং বলে দেয় যে একে চাকু দিয়ে জবাই করে কিংবা বেয়োনেট দিয়ে হত্যা কর। বর্বর সৈন্যরা আমাকে হত্যা করার জন্য প্রায় ১০০ গজ দূরে নিয়ে যায়। রাস্তাটা ছিল উঁচু, আমাকে যখন নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল তখন তারা আমার চোয়ালে ঘুষি মারতে থাকে। আমি পড়ে যাই, তারা আবার টেনে তোলে।

আমাকে হত্যা করার জন্য যখন সুবেদার সাহেব একটা চাকু বের করে এবং টেনে জঙ্গলের দিকে নিয়ে যায় আমি তখন সুবেদার সাহেবের কাছে একটু নামাজ পড়ার জন্য সময় ভিক্ষা চাই। কিন্তু সুবেদার সাহেব আমাকে সময় দিতে অস্বীকৃতি জানায়। আমি তখন জোরে চিৎকার করে সুবেদারকে উদ্দেশ্য করে বলতে থাকি যে, “যদি আমাকে আল্লাহর এবাদত থেকে বঞ্চিত করে হত্যা করা হয় তা হলে রোজ হাসরের ময়দানে আল্লাহর সামনে আপনাদের বিচারের জন্য ফরিয়াদ করবো এবং বলবো এরা আমাকে তোমার (আল্লাহ) এবাদত থেকে বঞ্চিত করে হত্যা করেছে আমি এর বিচার চাই।”

আমার এই কথা শোনার পর সুবেদার সাহেব কিছুক্ষন নীরব থাকে এবং পরে নামাজ পরার জন্য এজাজত দেয়।

নামাজ পড়ার জন্য আমার এক হাত খুলে দেয় এবং এক জগ পানি এনে দেয়। আমি যখন নামাজ পড়ার জন্য দাঁড়িয়ে যাই তখন পাক সেনারা তিন দিকে এল, এম, জি নিয়ে পজিশন নিয়ে থাকে। তারা আমাকে বার বার স্মরণ করিয়ে দেয় যে পালানোর চেষ্টা করলে গুলি করে হত্যা করবে।

অতঃপর এক মনে ক্বাজা নামাজসহ এশার নামাজ আদায় করতে প্রায় ২০ মিনিট সময় লেগে যায়। নামাজের মাঝখানে আমি একবার টেলিফোন বেজে ওঠার শব্দ শুনতে পাই। নামাজ শেষে মোনাজাত করে আমি বর্বর বাহিনীকে বলি যে এই বার আমি প্রস্তুত এখন আমাকে নিশ্চিতভাবে হত্যা করতে পারো। এই সময় একজন সিপাই আমার কাছে এসে বলল যে খোদা আপনার দোয়া কবুল করেছেন। আপনাকে আর মারা হবে না কেননা এইমাত্র হেড অফিস থেকে ফোন এসেছে, আপনাকে সেখানে এখনই নিয়ে যাবার জন্য হুকুম দিয়েছে।

অতঃপর আমাকে হাত বাঁধা অবস্থায়ই একটা গাড়ীতে করে বি, আই, ডি, সি, অফিসের পাক বাহিনীর হেড অফিসে নিয়ে যায় এবং এক ক্যাপ্টেন সাহেবের কাছে হাজির করে।

শান্তি কমিটির চেয়ারম্যানের তদবীরের ফলে ২৮ শে নভেম্বর আমি রাত্রিতেই আমি মুক্তি লাভ করি।

স্বাক্ষর /-
মোঃ ছানোয়ার হোসেন
১০/১১/৭৩

 

 

ইব্রাহিম রাজু

<,..৭৫,১২৫> “তিনি দর্পভরে বলেন যে, ” আমি জীবিত থাকাকালে আমার কোন জিনিস খানরা তোমরা পাবে না। ”

 

।।৭৫।।
দারাজ উদ্দিন আহমেদ
থানা- জয়পুরহাট, জেলা- বগুড়া

২৬ শে এপ্রিল পাক সৈন্য জয়পুরহাট পৌঁছে এবং ২৭ শে এপ্রিল তারা ট্রেনযোগে পাঁচবিবি যাবার পথে পুরানোপৈল রেল ষ্টেশনের উত্তরে রেল গুদামটির কাছে ট্রেন দাঁড় করিয়ে রেখে তারা নির্দেশ দেয় গ্রামের লোকদের “মালাউনকা ঘর জ্বালাদো” বলে। তারা নিজেরাও একটি ঘরে আগুন লাগিয়ে দেয়। গ্রামের লোকেরা ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে গ্রামের সমস্ত হিন্দু বাড়ীতে আগুন লাগিয়ে দেয়। অবশ্য হিন্দুরা ইতিপুর্বেই দেশত্যাগ করে ভারত চলে যায়।

২৮ শে এপ্রিল তারিখে পাকসৈন্য মুসলিম লীগারদের খবরে জয়পুরহাট থেকে তিন মাইল পুর্ব উত্তর কোণের হিন্দু প্রধান গ্রাম করোই কাদিপুর ঘেরাও করে অপারেশন করে। এখানকার সমস্ত অধিবাসী হিন্দু এবং তারা কুমার ছিল।

গ্রাম ঘেরাও করে তারা উক্ত গ্রামের ১৮৫ জন পুরুষ-মহিলা এবং বাচ্চাকে হত্যা করে। গ্রাম ঘেরাও করার পর গ্রামের লোকজন প্রাণভয়ে পালাতে থাকে তখন তাদের উপর বেপরোয়া গোলাগুলি নিক্ষেপ করে উক্ত সংখ্যক লোকজনকে হত্যা করে। এ ছাড়া কিছুসংখ্যক লোককে তারা ধরে আনে এবং তাদের মধ্যে ৩/৪ জনকে জনৈক মুন্সি জবাই করে হত্যা করে। উক্ত মুন্সিকে পাক সৈন্যরা জবাই করতে বাধ্য করে। পাক সৈন্যরা উক্ত গ্রামের ৬/৭ জন লোক যারা প্রাণভয়ে কচুরীপানার মধ্যে ডুবিয়েছিল তাদেরকে দেখতে পায় এবং সেখানেই গুলি করে তাদের হত্যা করে। হত্যাযজ্ঞ শেষ হবার পর তারা সমস্ত গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়।

উল্লিখিত তারিখেই বিকাল ৪ টায় পুরানোপোল হাটে জনৈক হিন্দু মুচিকে গুলি করে হত্যা করে।

ডিসেম্বরের যুদ্ধকে মানুষ স্বাগতম জানিয়েছে। তারা এই যুদ্ধকে মুক্তির পথ বলে মনে করে।

স্মরণীয় ঘটনাঃ
২৭ শে এপ্রিল আমি বাজার করার জন্য জয়পুরহাট পৌঁছি। রাতে যে মিলিটারী এসেছে তা জানতাম না। বাজারে পৌঁছার পর তিনজন মিলিটারী আমাকে ধরে নিয়ে বাজারে যায় এবং একটি কাপড়ের দোকানের তালা ভেঙ্গে আমাকে লুট করতে বলে। আমি তাতে অস্বীকৃতি জানালে আমাকে তারা চড় মারে। তখন বাধ্য হয়ে একথান কাপড় নেই। অতঃপর আমাকে নিয়ে রেল ক্রসিং -এর পাশ দিয়ে যেতে থাকে। সে সময় জনৈক ভদ্রলোক সাইকেল চড়ে যাচ্ছিলেন। তাকে তারা থামিয়ে দেয় এবং তার হাতের ঘড়িটি চায়। তিনি দর্পভরে বলেন যে, ” আমি জীবিত থাকাকালে আমার কোন জিনিস খানরা তোমরা পাবে না। ”

অতঃপর তাকে লাথি দিয়ে ফেলে দেয়। তিনি উঠবার চেষ্টা করলে রাইফেল দিয়ে বাড়ি দিতে থাকে শেষ পর্যন্ত তারা তাকে গুলি করে হত্যা করে ঘড়ি ছিনিয়ে নেয়। জনৈক বিহারী ছেলেকে বলে তার সুপারিশে আমি মুক্তি পাই।

স্বাক্ষর/-
দারাজ উদ্দিন আহমেদ।

 

 

ইব্রাহিম রাজু

<,..৭৬,১২৬> “তখন তার দুই পায়ের পিছনে গোড়ালীর রগে ফুটো করে রশি লাগিয়ে খাশি বকরীর খাল খোলার মত উল্টো করে টাঙ্গিয়ে গায়ের চামড়া খুলে হত্যা করে।“

 

।।৭৬।।
মোঃ গোলাম মোস্তফা মণ্ডল
গ্রাম- জয়পুরহাট
জেলা-বগুড়া

পাক সেনা জয়পুরে পৌঁছার পর তাদের অত্যাচারে জনগণ ভীষণভাবে অতিষ্ট হয়ে পড়ে। জানমালের নিরাপত্তা তথা ইজ্জতের ভয়ে জনগণ ভারতে চলে যেতে থাকে।

মে মাসের মাঝামাঝি এমনিভাবে কতিপয় লোককে গাড়োয়ানরা বাংলাদেশের সীমানায় রেখে আসার পথে রাজাকাররা ঐ সমস্ত ১৬/১৭ জন গাড়োয়ানকে গ্রেফতার করে জয়পুরহাট শান্তি কমিটির অফিসে নিয়ে আসে। রাতে সেখানে বন্দী করে রেখে পরদিন ট্রাকে করে শামীম বিহারীর নেতৃত্বে তাদের আক্কেলপুর মিলিটারী ক্যাম্পে নিয়ে যায়। সেখানে তাদের ভালক্যা বাঁশের মোটা গোড়া দিয়ে কুপিয়ে কুপিয়ে ঐ সমস্ত গাড়োয়ানকে হত্যা করে।

যুগীপাড়ার মিঃ আলেক উদ্দিনকে একদিন ধরে জয়পুরহাট কলেজ ক্যাম্পে নিয়ে যায়। তিনি একজন গোঁড়া আওয়ামী লীগার ছিলেন। তাকে শারীরিকভাবে অমানুষিক অত্যাচার করেছে কিন্তু তিনি কিছুতেই “পাকিস্তানী” একথা স্বীকার করেননি। তিনি সর্বদাই বলেছেন যে আমি আওয়ামী লীগার। তাকে বেদম প্রহার করে। কিছুতেই পাকিস্তানের কথা স্বীকার করাতে পারেনি। তখন তার দুই পায়ের পিছনে গোড়ালীর রগে ফুটো করে রশি লাগিয়ে খাশি বকরীর খাল খোলার মত উল্টো করে টাঙ্গিয়ে গায়ের চামড়া খুলে হত্যা করে।

অত্র এলাকার প্রখ্যাত হোমিও ডাক্তার আবুল কাশেম যুদ্ধকালে ৭ মাস পালিয়ে ছিলেন। তিনি একজন প্রথম শ্রেনীর আওয়ামী লীগার ছিলেন। তিনি একদিন রাতে গরুর গাড়িতে করে বাড়ী পৌঁছেন। সে রাতেই মিলিটারীরা বাড়ী ঘেরাও করে তাকে গ্রেফতার করে। তাকে জয়পুরহাট ক্যাম্পে নিয়ে যায়। সেখানে তার নিম্নাংশ মাটির নিচে পুঁতে তাকে অমানুষিকভাবে নির্যাতন করে। এ ছাড়া তাকে পায়ের গোড়ালীর রগে ছিদ্র করে উল্টো করে রশি বেঁধে টাঙ্গিয়ে রেখে গায়ের চামড়া কেটে লবণ লাগিয়ে দেয়। অতঃপর তাকে হাত পা পুটলি করে বেঁধে ট্রাকে ধপাস করে ফেলে সেখান থেকে আবার নীচে ফেলে দেয়। তারপর তার দুই চোখ উপড়ে ফেলে দেয় এবং সেখানে পেট্রোল মাখানো তুলো দিয়ে আগুন লাগিয়ে দিয়ে হত্যা করে। এক কথায় যত প্রকার অত্যাচার করার সবই তার উপর প্রয়োগ করা হয়।

লতিফ টি ষ্টলের মালিক ছিলেন লুৎফর। ২৫ শে মার্চের পর এখানে যে সামরিক প্রশিক্ষন শুরু হয় সেখানে তিনি প্রশিক্ষন নেন। বলা প্রয়োজন তার ডান হাত সম্পূর্ণ অকেজো ছিল। তবুও তিনি দেশের ডাকে বাম হাতেই রাইফেল চালনা করতেন।

পাক সেনারা এখানে আসলে তিনি দেশের অভ্যন্তরে পালিয়ে যান। কিন্তু পালানোর অবস্থাতেই মুসলীম লীগের পাণ্ডাদের চক্রান্তে ও সক্রিয় সহায়তায় তিনি ধরা পড়েন। সে সময় মিলিটারীদের ক্যাম্প ছিল ষ্টেশনে। সেখানে তাকে নিয়ে এসে টাঙ্গিয়ে হৃদয়হীনভাবে নির্যাতন করে। তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে জ্বলন্ত সিগারেট ঠেসে ধরে। তাছাড়া লোহার রড আগুন দিয়ে পুড়িয়ে লাল শিক চোখের মধ্যে ঠেসে দিয়ে চোখ গালিয়ে ফেলে। সমস্ত প্রকার নির্যাতন চালানোর পর তার পা বেঁধে কুণ্ডলী পাকিয়ে রেল গাড়ীর ইঞ্জিনের জ্বলন্ত বয়লারে ফেলে দিয়ে জীবন্ত হত্যা করে। তার কোন অস্তিত্ব আর খুঁজে পাওয়া যায় নি।

স্বাক্ষর/-
মোঃ গোলাম মোস্তফা মণ্ডল ।

 

 

ইব্রাহিম রাজু

<,..৭৭,১২৭>

 

।।৭৭ ।।
আবু বকর আকন্দ
গ্রাম- কাটাবাড়ী
জেলা- বগুড়া

বৈশাখ মাসের দিকে একদিন ২৫/৩০ জন পাক সৈন্য কাটাবাড়ী এলাকায় আসে এবং আড়িয়া পালপাড়া ঘেরাও করে ৬ জন লোককে হত্যা করে।

আমি এসময় অন্যত্র পালিয়ে অন্যত্র ছিলাম। কিছুক্ষণ থেকে ছেলেমেয়ে বাড়ীতে কেমন আছে দেখার জন্য গোপনে বাড়ী আসি। বাড়ী আসার পর একজন পাক সৈন্য বাড়ীর মধ্যে প্রবেশ করে এবং আমি হিন্দু না মুসলমান তা জানতে চায়। আমি মুসলমান বললে উক্ত সৈন্য তৎক্ষণাৎ পালিয়ে যেতে বলে। তাই করছিলাম। কিন্তু আবার একজন বাঁধ সাধে। আমাকে ধরে নিয়ে একটি ঘরে বন্ধ করে এবং টাকা দাবী করে। টাকা দেবার অস্বীকৃতি জানিয়ে বলি যে, “স্যার আমার টাকা পয়সা নেই। “জোড় হাত করে উক্ত কথাগুলো বলি। একথা শোনার সাথে সাথে উক্ত সৈন্য ঠাস করে এক চড় কষে দেয়। ৪/৫ টি ঘুষি মেরে আমাকে কাহিল করে ফেলে।

নিরুপায় হলে বলি যে আমার টাকা পয়সা বৌ ছেলেমেয়ের কাছে এবং তারা কোথায় পালিয়ে আছে। তখন সৈন্যটি বলে যে চল তোমার বৌয়ের খোঁজে। টাকা দাও।

তারপর আমাকে নিয়ে যেতে থাকে। আবার অন্য দিক থেকে আরও দু’জন সৈন্য আসছিল। রাস্তার উপর এক বুড়ো জোব্বাজুব্বি গায়ে দিয়ে বসেছিল। তারা তাকে কয়েকটি ঘুষি হৃদয়হীনভাবে মারে এবং টাকা দাবী করে। লোকটি বলে যে বাড়ীতে আছে। তখন তাকে নিয়ে তার বাড়ী যায়। তার কাছে মসজিদ নির্মানের টাকা গচ্ছিত ছিল, তা এবং গয়নাপাতি নিয়ে নেয়।

অপর দিকে আমার কোন টাকা পাবার সম্ভাবনা না দেখে ছেড়ে দেয়। কিন্তু যেই যাবার জন্য পা বাড়িয়েছি অমনি রাইফেলের গাদা দিয়ে সজোরে ২/৩ বাড়ি দেয় এবং এতে অজ্ঞান হয়ে যাই। জনৈক মহিলার সেবায় আমি জ্ঞান ফিরে পাই।

এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, প্রথমে মিলিটারী আমার বাড়িতে ঢুকেছিল, তার পূর্বমুহূর্তে দুজন মুসলমান মেয়ে বাড়ীতে ঢুকে। আশ্রয় প্রার্থনা করে। আমি তাদের কচুর আদারের মধ্যে লুকিয়ে রাখি এবং সেখানে নিঃশ্চুপ হয়ে থাকতে বলি।

মিলিটারীটি যখন আমাকে হিন্দু না মুসলমান জিজ্ঞাসা করছিল এবং ধমকাচ্ছিল তখন মেয়ে দুটি ভীত হয়ে জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আসে। তখন মিলিটারীটি আমাকে ছেড়ে উক্ত মহিলার একজনের হাত ধরে ঘরের মধ্যে নিয়ে যায় এবং তার উপর পাশবিক অত্যাচার করে। অত্যাচার করে সৈন্যটি চলে যায়। সৈন্যটি মেয়েটিকে ঘরে নিয়ে যাবার পূর্বে আমাকে তাড়িয়ে দিয়েছিল।
স্বাক্ষর/-
আবু বকর আকন্দ।

 

 

ইব্রাহিম রাজু

<,..৭৮,১২৮>

 

।। ৭৮।।
মোঃ ওয়াহিদুজ্জামান চৌধুরী
একাউন্ট ইনচার্জ, তিস্তা বীমা কর্পোরেশন
সেন্ট্রাল রোড, রংপুর

আমি ১৯৭১-এর ২৫ শে মার্চের পরপরই রংপুর শহর সেনাবাহিনীর কবলিত হবার সঙ্গে সঙ্গে শহর ত্যাগ করে নিকটবর্তী গ্রামে আশ্রয় গ্রহণ করি। যুদ্ধকালীন সময়ের প্রথম কয়েক মাসে সেনাবাহিনীর রংপুর শহর ও শহরের আশে পাশে বিভিন্ন স্থানে নির্বিচারে বাঙ্গালী নিধন যজ্ঞের আমি একজন উৎসাহী পর্যবেক্ষক ছিলাম। বিভিন্ন স্থানে সেনাবাহিনী কর্তৃক মৃত ব্যাক্তিদের সংখ্যা এবং সঠিক তারিখ আমি সযত্নে আমার ডায়েরীতে লিপিবিদ্ধ করেছি। তথ্যগুলোর সত্যতা সম্পর্কে আমি নিশ্চিত।

৮ এপ্রিলঃ রংপুর শহর থেকে আড়াই মাইল পশ্চিমে নাড়িরহাট গ্রামের ৪৭ জন গ্রামবাসীকে বর্বর বাহিনী ধরে এবং উক্ত স্থানে খোলাহাটে তাদের নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করে আমার পরিচিত জনৈক ব্যক্তি দূর থেকে এ করুণ দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেন।

১৫ ই এপ্রিলঃ রংপুর ক্যান্টনমেন্ট থেকে দক্ষিন পূর্ব দিকে দেওভোগ গ্রাম থেকে ২২ জন ক্ষেতে কর্মরত কৃষক এবং উক্ত এলাকার মসজিদ থেকে ১৫ জন নামাজরত ব্যাক্তিকে খান সেনারা ধরে এবং গুলি করে হত্যা করে। মসজিদ থেকে লোক ধরে নির্মমভাবে হত্যা এলাকার গণমনে গভীর হতাশা এবং ক্রোধের সঞ্চার করে। এই হিংস্র কার্যকলাপের দরুন বহু গ্রামবাসী বাড়ী ঘর ত্যাগ করে ভারতে কিংবা দূর- দূরান্তের আশ্রয় গ্রহণ করে।

১৭ ই এপ্রিলঃ এই সময়ে মাহীগঞ্জের (রংপুর শহর) ২ মাইল উত্তরে সাহেবগঞ্জের নিকট একটি ক্যানেলের উপর বর্বর সেনা বাহিনী ১৭ ব্যাক্তিকে হত্যা করে। এদের মধ্যে বেশ সংখ্যক ছিলেন বেঙ্গল রেজিমেন্টের বীর জোয়ান পোশাক পড়া অবস্থায় তাদেরকে গুলি করে হত্যা করা হয়। গ্রামবাসীরা লুকিয়ে এ ঘটনা প্রত্যক্ষ করে এবং পাকিস্তানী দস্যু সৈন্যরা চলে গেলে তারা (গ্রামবাসী) বেঙ্গল রেজিমেন্টের লাশগুলো নিয়ে আসে এবং দাফন করে। মৃত জওয়ানদের প্রতি গ্রামবাসীদের ছিল অপূর্ব মমত্ববোধ। সবাই তাদের রুহের মাগফেরাতের জন্য দোয়া করেন।

১৯ শে এপ্রিলঃ রংপুর ক্যান্টনমেন্টের নিকট ঘাঘট নদীর তীরে ১৫২ জন সাবেক বাঙ্গালী ই,পি,আর,কে খান সেনারা হত্যা করে। পিছনে হাত বেঁধে দাঁড় করিয়ে মেশিনগানের ব্রাশফায়ারে তাদেরকে হত্যা করা হয়। পরে (মৃত) লাশগুলোর অধিকাংশ বাঁশ দিয়ে গেঁথে ঘাঘট নদীতে ফেলে দেয়া হয়। এদের মধ্যে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের বিশিষ্ট শিল্পী জনাব শাহ আলী সাহেবের বড় ভাই-র ছেলে (ঈ,পি, আর) কেবলমাত্র সৌভাগ্যক্রমে রক্ষা পান।

২৮ শে এপ্রিলঃ দমদমা ব্রীজের নীচে সরকারী কারমাইকেল মহাবিদ্যালয়ের ৪ জন অধ্যাপককে গুলি করে হত্যা করা হয়। জনৈক অধ্যাপকের স্ত্রীকেও এখানে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। রংপুর শহরে সাবেক জনতা ইন্সুরেন্স কোম্পানীর অফিস ১১-৩০ মিনিটের সময় খান সেনারা তছনছ করে দেয়। আওয়ামী লীগের গোপন কাগজপত্র এ অফিসে রাখা হয়েছে সন্দেহে সৈন্যরা হানা দেয়।

২৯ শে এপ্রিলঃ সামরিক কর্তৃপক্ষের নির্দেশে সমস্ত অফিস আদালতের হিসাব নিকাশ বন্ধ করে দেয়া হয়। রংপুর শহর ক্যান্টনমেন্টের কাছে সৈয়দপুরগামী পাকা রাস্তার পাশে ২১ জন নিরপরাধ বাঙ্গালীকে সেনাবাহিনী ধরে এবং গুলি করে হত্যা করে। তন্মধ্যে একটি অত্যন্ত কম বয়সী ছেলেকে বর্বর সৈন্যরা হত্যা করে। ছেলেটি হানাদার বাহিনীর সর্বপ্রকার যাতায়াত সংবাদ গোপনে গেরিলা ঘাঁটিতে সরবরাহ করতো। পাকিস্তানপন্থী কুচক্রীরা এই ছেলেটিকে সেনাবাহিনীর নিকট ধরিয়ে দিয়েছিল।

 

৬ই মেঃ সামরিক কর্তৃপক্ষ শহরের অভিজাত দোকানপাট গুলো চালু না রাখার অভিযোগে সিল করে দেয়। সেনাবাহিনীর লোকেরা এই সিব দোকানপাটের বহু মূল্যবান সামগ্রী লুট করে নিয়ে যায়। একই তারিখে সৈন্যরা ক্যান্টনমেন্টের নিকটবর্তী দেওভোগ গ্রাম লুট করে।

১১ই মেঃ পাক সৈন্যরা শহরের অদূরে নাড়ীরহাট গ্রামে অতর্কিত হানা দিয়ে ৪৮ জন ব্যক্তিকে হত্যা করে।

১৬ ই মেঃ স্থানীয় কুখ্যাত দালালদের সহযোগীতায় বর্বর সৈন্যরা শহরের রাধাবল্লভ ইউনিয়নে রাত্রি ৯ টা থেকে ১ ঘন্টা পর্যন্ত তল্লাশী চালায় তারা নারীদের উপর অত্যাচার করে। জনগনকে অসহায় অবস্থায় ধরে হত্যা করে এবং গৃহস্ত বাড়ী থেকে মূল্যবান আসবাবপত্র লুট করে নিয়ে যায়।

এই সময় রংপুর শহরের বিশিষ্ট মারোয়াড়ী ধনী পাট ব্যবসায়ী রামরিক আগরওয়ালার কাছ থেকে নগদ টাকা পয়সা, মিলের মেশিনারী দ্রব্যাদি এবং দালালদের দ্বারা জমাকৃত পাট নিয়ে যায়। হানাদাররা উক্ত মারোয়াড়ী ব্যবসায়ীর উপর দৈহিক নির্যাতন করে।

৩১ শে মেঃ জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে ১২৪ জন বেঙ্গল রেজিমেন্ট এবং সাবেক ই, পি, আর, কে সামরিক কর্তৃপক্ষ বেতন দানের প্রলোভন এবং কাজে যোগদানের নির্দেশ দিয়ে ডেকে নিয়ে আসে। তাদের সবাইকে ঘাঘট নদীর তীরে নিয়ে গিয়ে মেশিনগানের গুলিতে নির্মমভাবে হত্যা করে। সামরিক পোশাক পরিহিত অবস্থায়ই এদেরকে হত্যা করা হয়। সৌভাগ্যক্রমে এদের মধ্যে কয়েকজন কোনক্রমে ছুটে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।

২ রা জুনঃ রংপুর সদর থানার বুড়িরহাট নিবাসী জনৈক ব্রাক্ষ্মণ পরিবারসহ হানাদার সেনাবাহিনীর ভয়ে গরুর গাড়ী করে নিরাপদ স্থানে পালিয়ে যাবার সময় ঘাঘট নদীর তীরে সৈন্যদের নিকট ধরা পড়ে। হানাদাররা উক্ত ব্রাক্ষ্মণের স্ত্রীকে ধর্ষণ করে। ব্রাক্ষ্মণ সহ তার স্ত্রী এবং শিশু কন্যাকে হত্যা করে এবং ঘাঘট নদীর উপর জাফরগঞ্জ ব্রীজের নিচে তাদেরকে ফেলে দিয়ে চলে যায়।

রংপুর শহর সাবেক ইসপিক এর পাশে আর্মি হেডকোয়ার্টার সংলগ্ন জনৈক মেজরের বাস ভবনে রাত্রি ১১ টার দিকে জলসা বসতো। বিভিন্ন স্থান থেকে ধৃত তরুণীদের দিয়ে জোরপূর্বক নাচ এবং গানের আসর করানো হত। তখন তরুনীদের যথেচ্ছ ধর্ষণ করা হত। ধর্ষিতা মেয়েদেরকে শুকনো রুটি এবং রাত্রে সামান্য ভাত দেয়া হত।

রংপুর ক্যান্টনমেন্টের সেনাবাহিনীর মেজর বশীর ছিল নারী ধর্ষনের হোতা। প্রতি রাত্রে তার চিত্ত বিনোদনের জন্য ৩ থেকে ৪ জন বাঙ্গালী তরুণী সরবরাহ করা হতো।

সেনাবাহিনীর অফিসাররা বিভিন্ন স্থান থেকে ধৃত শিক্ষিতা তরুণীদের সাথে নিয়ে ফিরতো। রাজশাহী এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২ জন শিক্ষিতা তরুণীকে একদিন কালো বোরখা পরিয়ে জনৈক অফিসার ওরিয়েন্টাল সিনেমায় নিয়ে আসে। অফিসারটি কিছুক্ষণের জন্য বাইরে বাইরে যায়। পাশের ছিটে আমি বসা ছিলাম। একজন তরুণী সরাসরি আমার সাহায্য চায়। তিনি নিজেকে বাংলা বিভাগের ছাত্রী বলে জানান। ইত্যবসরে অফিসারটি এসে পড়ে। উক্ত হতভাগিনী তরুণীদ্বয়ের জন্য আমি কিছুই করতে পারি নি।

স্বাক্ষর/-
মোঃ ওয়াহিদুজ্জামান চৌধুরী ।

 

 

ইব্রাহিম রাজু

<,..৭৯,১৩০>

 

।। ৭৯।।
মোঃ আরব আলী মিয়া
চার্চলেন, জুম্মাপাড়া, রংপুর

৩ রা জুন (১৯৭১) বৃহস্পতিবার বিকেলে পৌনে পাঁচটায় বাসা থেকে আমাকে সিকিউরিটি ব্রাঞ্চের লোকেরা স্থানীয় লোকের সহায়তায় ধরে রংপুর ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যায়।

সন্ধ্যার পর সেখানে আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে। মুক্তিবাহিনীর লোকদের আড্ডা কোথায় এবং তাদের গোলাবারুদ কোথায় রক্ষিত আছে। আমার সাথে তাদের নিবিড় সম্পর্ক আছে ও তারা প্রায়ই আমার কাছে আসা-যাওয়া করে।

দ্বিতীয়তঃ আমার বাসা জেলা আওয়ামী লীগের অফিস ছিল। সেখানে তাদের গোপন মিটিং হতো। তাদের সাথে আমার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল, কাজেই তাদের গোপন দলিলপত্র কোথায় রক্ষিত আছে তা আমি জানি। আমি সমস্ত অভিযোগ করলে ভীষণভাবে ধমকি দেয় এবং সেখানে আমাকে রাত ৯ টা পর্যন্ত বসিয়ে রাখে। অতঃপর আমার উপর দৈহিক নির্যাতন শুরু হয়।

একটি নির্জন ঘরে দরজা-জানালা বন্ধ করে আমার দুজন সিকিউরিটি ব্রাঞ্চের লোক ইউসুফ খান ও হাবিলদার গোলাম রসুল দাঁড়ায়। একজনের হাতে লোহার রড এবং অপর জনের হাতে শাল কাঠের দরজার খিল (যা দিয়ে দরজা বন্ধ করা হয়) দিয়ে আমার শরীরের বিভিন্ন স্থানে হৃদয়হীনভাবে প্রহার শুরু করে। ঘন্টা দেড়েক আমার উপর সমানে দুজনে উল্লিখিত প্রক্রিয়ায় অত্যাচার চালায়। অত্যাচারের সময় ও আমাকে উল্লিখিত বিষয়গুলি সমন্ধে জিজ্ঞাসাবাদ করে। অত্যাচারের ফলে শরীরের বিভিন্ন স্থান থেকে বিশেষ করে থুতনি দিয়ে দরবিগলিত ধারায় রক্তপাত হচ্ছিল।

রাত এগারটা সাড়ে এগারটা দিকে এবং তা ছাড়া আরও দুবার দু’লোক এসে একই প্রক্রিয়ায় অত্যাচার করে। এ সময় আমাকে “বাইনচোদ, তোমলোগ জয় বাংলা নারায়ে লাগাতা হ্যায়। তুমলোগ লাখো লাখো মুসলমানকো খতম কর লেগা, সময় নেহি আতা হ্যায়। আবি কাঁহা গিয়া তোম লোগ কো জয় বাংলা। তোম লোগ আওয়ামী লীগকো বহুত মদদ দিয়া।” এছাড়া শ্লীলতাবর্জিত গালিগালাজ করতে থাকে।

রাত দেড়টার দিকে আমার হাত-পা রশি দিয়ে বেঁধে ফেলে এবং বলে যে ” গুলি কি নিশানা বানগিয়ে। কুচ বাতানে হ্যায় তো বাতাও।” আধ ঘন্টা খানেকে পর তারা আমার বাঁধন খুলে দেয়। এবং উক্ত ঘরেই দুদিন বন্ধ করে রাখে এবং তৃতীয় দিন থানায় পাঠায়।

 

থানা থেকে দুদিন ক্যান্টনমেন্টে মেজরের কাছে জিজ্ঞাসাবাদ করে। এ সময় আমাকে অকথ্য, অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করা হয়। ৫ দিন বন্ধ করে রাখার পর মঙ্গলবার আমাকে মুক্তি দেওয়া হয়। মুক্তির বিনিময়ে তারা ১৫ হাজার টাকা নেয়।

স্বাক্ষর/-
মোঃ আরব আলী মিয়া

 

 

ইব্রাহিম রাজু

<,..৮০,১৩১১৩২>

 

।। ৮০।।
আলতাফ হোসেন
নাগেশ্বরী, রংপুর

হানাদার বাহিনী নাগেশ্বরী এসেই প্রথমে ধ্বংসযজ্ঞে মেতে উঠে। কিছুদিন পর তারা জনগণকে হত্যা ও নির্যাতন শুরু করে।

পাক বর্বর বাহিনী একদিন নাগেশ্বরী থানার বাইরে থেকে একজন লোক ঘরে নিয়ে আসে। প্রথমে মারপিট করে, পরে হানাদাররা উক্ত লোকটিকে নির্মমভাবে ভলিবল এবং ফুটবলের ন্যায় কিল-ঘুষি এবং বুট জুতোর লাথি মেরে হত্যা করে।
সাধারণতঃ কিল,ঘুষি, লাথি, রাইফেলের বাঁট প্রভৃতির দ্বারা নির্মমভাবে বর্বর সৈন্যরা নির্দোষ জনগণের উপর নির্যাতন চালিয়েছে।

হানাদার দস্যু বাহিনী নাগেশ্বরী দখলের তিন দিন পর একদিন সকাল ১০ টায় নাগেশ্বরী বাজারের উত্তর-পূর্ব দিকের গ্রামে প্রবেশ করে। জনৈক আছমত মিয়ার গৃহে পাক সৈন্যরা ঢুকে আছমত মিয়া ও অন্য পুরুষদের বের করে দিয়ে তার পুত্রবধূর (২০) উপর পাশবিক অত্যাচার করে।

 

নাগেশ্বরী থানার বামনডাঙ্গা ইউনিয়নের আনছার হাটে একদিন মুক্তিযোদ্ধারা পাক সৈন্যদের মারার জন্য মাইন পুঁতে রাখে। দুর্ভাগ্যবশতঃ জনৈক রাখাল ও তার গরু উক্ত মাইনের শিকার হলে খবর পেয়ে নাগেশ্বরী থেকে কিছু সংখ্যক পাক সৈন্য আনছার হায়ে গিয়ে পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকে অনেক লোক ধরে। বর্বর সৈন্যরা আনছার হাটের নিকটস্থ বাড়ি থেকে কিছুসংখ্যক মেয়েছেলে ধরে এবং বাছাই করে অপেক্ষাকৃত কম বয়স্কা মেয়েছেলেদের উক্ত হাটের নিকটবর্তী হাবিবর রহমানের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে তাদের উপর পাশবিক অত্যাচার করে ছেড়ে দেয়। ঐ দিন ঐ এলাকা থেকে মোট ১০ জন পুরুষকে হানাদাররা ধরে নিয়ে এসে নাগেশ্বরী ঈদগাহ মাঠে বিভিন্ন স্থান থেকে ধৃত আরো কতিপয় লোকসহ মোট ৩৬ ব্যাক্তিকে মেশিনগানের গুলিতে হত্যা করেছে।

হানাদার সৈন্যরা বিভিন্ন গ্রামে ঢুকে মেয়েদের ধর্ষণ ছাড়াও তাদের শরীর থেকে নানা প্রকার স্বর্ণের অলঙ্কার নিয়ে আসত।

২৭ শে মে হানাদার বাহিনী নাগেশ্বরী থানায় প্রবেশের পরপরই ধ্বংসযজ্ঞে মেতে উঠে। হানাদাররা নাগেশ্বরী বাজারে প্রবেশ করে প্রথমেই হিন্দু পট্টিতে দোকান ও বাড়ীঘর অগ্নিসংযোগে ভস্মীভূত করে। অতঃপর হানাদাররা ঢাকাইয়া পট্টি অগ্নিসংযোগে নিশ্চিহ্ন করে দেয়।

ঐ দিনই বাজারসংলগ্ন সাঞ্জুয়ার ভিটার মুক্তিযোদ্ধা মোসলেমের বাড়ী এবং প্রতিবেশী রমজানের বাড়ী তারা পুড়িয়ে দেয়। উক্ত দিন হানাদার সৈন্যরা নাগেশ্বরী বাজার জামে মসজিদের নিকট পপাটুয়া (টমেটু) নামে একটি পাগলকে গুলি করে হত্যা করে। অপর একটি পাগলিনীকে ঐ দিন দস্যু সেনারা হিন্দু পট্রি সংলগ্ন আজিজার মিয়ার গৃহে জ্বলন্ত আগুনে নিক্ষেপ করে। নাগেশ্বরী বাজারে হিন্দুপট্টি এবং ঢাকাইয়া পট্টিতে অগ্নিসংযোগের ফলে পার্শ্ববর্তী বহু ব্যবসায়ী ও গৃহস্থের বাড়ীঘর ভস্মীভূত হয়েছে।

পাক হানাদার বাহিনী নাগেশ্বরী থানায় পৌঁছেই ডাকবাংলা এবং হাইস্কুলে ঘাঁটি করে। কিছুদিন পরেই এখান থেকে তারা জনগণকে নির্যাতন শুরু করে। পাক সৈন্যরা বিভিন্ন গ্রামে ঢুকে পড়তো এবং লোক ধরে এনে দৈহিক নির্যাতন চালাতো। সাধারণত দৈহিক নির্যাতনের প্রক্রিয়া ছিল কিল, ঘুষি, বুট জুতার লাথি, রাইফেলের বাঁট এবং বেয়নেট দিয়ে আঘাত হেনে তীব্রভাবে অত্যাচার করে।

মুক্তি ও মিত্রবাহিনী নাগেশ্বরী মুক্ত করার জন্য এগুতে থাকলে নাগেশ্বরী বাজার ও পার্শ্ববর্তী এলাকার জনতা ও তাদের পরিবারবর্গ নিরাপদ স্থানে আশ্রয়ের জন্য চলে যেতে থাকে। পাক বর্বর সৈন্যরা নাগেশ্বরী বাজারের চটাৎ ও জম মাঝিকে একদিন ধরে নিয়ে গিয়ে জবাই করে মেরে ফেলেছে।

স্বাক্ষর/-
মোঃ আলতাফ হোসেন (দুলু)

 

 

ইব্রাহিম রাজু

<,..৮১,১৩৩>

 

।। ৮১।।
মোঃ আজিজুর রহমান
গ্রাম- বেরুবাড়ী
থানা- নাগেশ্বরী
জেলা- রংপুর

হানাদার বর্বর বাহিনী চর বেরুবাড়ীর দুধকুমোর নদীর পশ্চিম তীরের গ্রামে অগ্নিসংযোগে লিপ্ত হয়। নিরীহ জনসাধারণের প্রায় একশত একুশটি বাড়ী দস্যু বাহিনী জ্বালিয়ে দেয়। এরপর গ্রাম থেকে লোক ধরে হানাদাররা উক্ত বেরুবাড়ী ফ্রি প্রাইমারী স্কুলের পিছনে নিয়ে আসে এবং লাইন করে দাঁড় করিয়ে মেশিনগানের গুলি দ্বারা ১৮ ব্যক্তিকে হত্যা করে। তিনজনকে গুরুতর আহত অবস্থায় রেখে যায়। তন্মধ্যে একজন এক সপ্তাহ পর মারা যায়। অতঃপর বর্বর বাহিনী গ্রাম থেকে প্রায় আড়াই শত যুবক ও বৃদ্ধকে ধরে এনে বেরুবাড়ী বাজারের পূর্বে এক জায়গায় সমবেত করে এবং তাদেরকে নির্মমভাবে ডবল (শাস্তিমূলক দৌড়) করাতে থাকে। পরে তাদেরকে ছেড়ে দেয়া হয়। সংঘর্ষের পর হানাদার বাহিনীর এরূপ অমানবিক কর্মকাণ্ডে জনসাধারণ যখন ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে বাড়ীঘর ছেড়ে পালাচ্ছিল, তখন এদিকে রাজাকাররা এ সুযোগের ব্যবহার করে। বিভিন্ন পরিত্যক্ত বাড়ীতে ঢুকে তারা লুট করে বিভিন্ন মূল্যবান সামগ্রী এবং গবাদিপশু নিয়ে যায়।

স্বাক্ষর/-
মোঃ আজিজুর রহমান
৩/৬/৭৩

 

 

ইব্রাহিম রাজু

<,..৮২, ১৩৪>

 

।। ৮২।।

মোঃ আজিম উদ্দিন
গ্রাম-গাছিডাঙ্গা
থানা- ভূরুঙ্গামারী,রংপুর

পাক বর্বর বাহিনী ভূরুঙ্গামারী থানা পূর্ণ দখলে নেবার দুই মাস পর গাছিডাঙ্গা গ্রামের দিকে ধাওয়া করে। পাক দস্যুদের সংখ্যা ছিল ৭ জন। তারা উক্ত গ্রাম গাছিডাঙ্গায় ঢুকে স্থানীয় (মৃত) হাজী আবদুস ছাত্তার সাহেবকে ধরে আনে। ধরে এনে তাকে গ্রামের আরও অন্যান্য লোকজনকে তাদের কাছে নিয়ে আসার জন্য হুকুম করে। তখন হাজী সাহেব জীবনের ভয়ে গাছিডাঙ্গার নিম্নলিখিত জনসাধারণকে খান দস্যুদের সামনে হাজির করতে বাধ্য হন। নিম্নে তাদের নাম দেওয়া হলঃ

(১) মোঃ ফরিদ

(২) পনির উদ্দিন

(৩) মঈন উদ্দিন

(৪) আবুল কাশেম

(৫) ফটিক

(৬) আইন উদ্দিন

(৭) আজিম উদ্দিন

(৮) নাছের উদ্দিন

(৯) নুরুল ইসলাম

(১০) নাছু শেখ

(১১) ময়েত উল্লাহ প্রমুখ।

অতঃপর আমাকে জিজ্ঞাসা করে যে, তুমি মুক্তিফৌজ এবং মুক্তিদের সহায়তা কর। অবশ্য এসব কথাগুলি উর্দুতে জিজ্ঞাসা করে। পরপর সবাইকে এইসব কথা জিজ্ঞাসা করে। তখন আমি ও সঙ্গীরা অস্বীকার করি। তখন খান দস্যুরা রাইফেলের বাঁটের সাহায্যে আমাদের ভীষণভাবে আঘাত করতে থাকে। তাছাড়া কিল, ঘুষি ও বুটের লাথিতে সবাইকে ভীষণভাবে আঘাত করে। পর মুহূর্তে আমাদের সবাইকে লাইনে দাঁড় করে কলেমা পড়তে বলে। তখন আমরা সবাই জীবনের ভয়ে ভুল করে কলেমা পড়তে আরম্ভ করি। তখন খান সেনারা বলে যে, তোমরা মালাউন এবং তোমরা নিজেরা মুক্তিদের লীডার এবং মুক্তিদের সাহায্য কর। এই মনে করে খান দস্যুরা পুনরায় কিল, ঘুষি ও রাইফেলের সাহায্যে আঘাত করে। আমি আমার সঙ্গীরা অচেতন হয়ে পড়ি। পাশে অবস্থানরত মুক্তিরা জানতে পেরে তাদেরকে উদ্দেশ্য করে ফাঁকা গুলি করতে থাকে। খান দস্যুরা সব বুঝতে পেরে পুনরায় ভূরুঙ্গামারীর দিকে পিছু হটতে বাধ্য হয়। কিছু সময় পর আমাদের জ্ঞান ফিরে। খান দস্যুদের আর আমাদের পাশে দেখতে পাই না। তখন আমরা কোন রকমে আধা মরা অবস্থায় দূর দূরান্তে আত্নগোপন করতে বাধ্য হই। খান দস্যুদের হাতে বেদম মারপিট খেয়েও আমি কোন রকমে বেঁচে আছি।

টিপসহি/-
মোঃ আজিম উদ্দিন

 

 

ইব্রাহিম রাজু

<,..৮৩, ১৩৫>

 

।। ৮৩।।
মোঃ তালেব মুন্সী
গ্রাম- গাছিডাঙ্গা
থানা- ভূরুঙ্গামারী
রংপুর

২৬ শে মার্চের পূর্বে আমি আওয়ামী লীগের কর্মী ছিলাম। ২৬ শে মার্চের পর অত্র গাছিডাঙ্গা মৌজার সংগ্রাম পরিষদের আমি সদস্য ছিলাম। পাক হানাদার বাহিনী ভূরুঙ্গামারী থানা দখলের প্রায় ২ মাস পর একদিন আমাদের গ্রামে আসে। তারা সংখ্যায় ৫০ জন ছিল। হানাদার সৈন্যরা গ্রামে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে আমি গ্রামের মেয়েছেলেদের আমার বাড়ীর পিছেনের একটি বড় বাঁশঝাড়ের জঙ্গলে আশ্রয়ের ব্যবস্থা করি। প্রাণভয়ে আমার ভ্রাতুষ্পুত্র মোঃ আব্দুর রহমান নিকটে একটি বাঁশের ঝোপে বাঁশের আগায় উঠে আত্নগোপন করে। হানাদাররা আব্দুর রহমানকে দেখে ফেলে এবং তাকে বাঁশ গাছ থেকে নামিয়ে এনে মারপিট শুরু করে তাকে রাইফেলের বাঁট, কিল, ঘুষি এবং জুতা দ্বারা আঘাত ও নির্যাতন করে। অতঃপর আব্দুর রহমানকে সঙ্গে নিয়ে তাঁরা আমার বাড়িতে আসে এবং আমাকে ধরে ফেলে। তাঁরা আমার উপর আব্দুর রহমানের ন্যায় উপরোক্ত অবর্ণনীয় অত্যাচার শুরু করে। অতঃপর আমার বাড়ীতে বিভিন্ন ঘর অনুসন্ধান করে মেয়েছেলেদেরকে দেখতে না পেয়ে তাঁরা বাড়ির পিছনে বাঁশঝাড়ে আত্মগোপনকারী মেয়েছেলেদের খোঁজ করতে থাকে। তাঁদের খোঁজ করে না পেয়ে হানাদাররা রাইফেলের ফাঁকা আওয়াজ করলে মেয়েছেলেরা চিৎকার করতে থাকে এবং বাঁশঝাড় থেকে বেরিয়ে পালাতে থাকলে পাক সৈন্যরা তাদের পিছনে ধাওয়া করে। আমি এ অবস্থায় থাকতে না পেরে পাক সৈন্যদের কাছে ছুটে যাই এবং মেয়েছেলেদের উপর নির্যাতন না করার জন্য কঠোর প্রতিবাদ করি।এ সময় হানাদারদের কয়েকজন মেয়েছেলেদের পিছনে ধাওয়া করতে থাকে এবং অপর কয়েকজন আমার উপর মারপিট শুরু করে। পাক ফৌজ কতৃর্ক প্রহৃত হওয়াকালীন আমার দুইজন আত্নীয়া মোছাম্মৎ আছিয়া খাতুন (চাচাতো বোন, বয়স ২৫ বছর) এবং মোছাম্মৎ মজিরন নেছা (ভাগনে বউ, বয়স ২৭ বৎসর) আমার দিকে ছুটে আসলে পাক হানাদাররা তাদেরকে ধাওয়া করে আমার বাড়ীতে ঢুকে পড়ে। আমিও তাদের পিছনে পিছনে বাড়ীতে ঢুকে পড়লে তারা পুনরায় আমার উপর কিল, ঘুষি, রাইফেলের বাঁট এবং জুতার আঘাত প্রভৃতি নির্যাতন করতে থাকে। আমি তখন সরাসরি তাদের সঙ্গে হাতাহাতি সংঘর্ষে অবর্তীণ হই। এই সময় আমার চাচাতো বোন এবং ভাগনে বউ পালাতে সক্ষম হয়ে ঘরে আশ্রয় নেয়। কিছুক্ষণ ধস্তাধস্তি করার পর আমাকে মুমূর্ষ অবস্থায় রেখে হানাদার দস্যুরা ঘরে ঢুকে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও অনেক চিকিৎসা করা সত্ত্বেও বর্তমানে অত্যন্ত দুর্বল অবস্থায় দিন যাপন করছি ।

স্বাক্ষর/-
মোঃ তালেব আলী মুন্সী
১৯/৪/৭৩

 

 

ইব্রাহিম রাজু

<,..৮৪,১৩৬১৩৮> “এদের সামনে তোমাকে তোমার মেয়ের সাথে ‘সহবাস’ করতে হবে।“

।। ৮৪।।
নারায়ন প্রসাদ
সৈয়দপুর বাজার
জেলা-রংপুর

২৭ শে মার্চ আমার বাবাকে বাড়ী থেকে ধরে কারফিউ চলাকালে সকালবেলা একটি সামরিক জীপে করে ৪ জন সামরিক লোক এবং ২ জন স্থানীয় অবাঙ্গালী অস্ত্রসহ এসে নক করে। দরজা খুললে তারা বাড়ীতে ঢুকে সিন্দুক খুলে সমস্ত সোনাদানা, টাকা-পয়সা নেয় এবং বাড়ীতে অথবা দোকানে ওয়্যারলেস আছে বলে বলে অভিযোগ করে। তাঁদের অভিযোগের সত্যতা প্রমাণের জন্য দোকান খুলেও দেখান হয়। পরিশেষে আমাকে একটি লাথি মেরে ফেলে দিয়ে আমার বাবাকে জীপে করে ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যায়।

৯ই এপ্রিল বেলা সাড়ে এগারটার দিকে জনৈক অবাঙ্গালী এসে আমাকে টেলিগ্রাফ অফিসে সামরিক কর্তৃপক্ষ ডাকছে বলে জানায়। সাথে আমার ছোট ভাইকেও নেবার নির্দেশ দেয়। ধৃত অবস্থায় আমার ছোট ভাই এবং আমাদেরই ভাড়াটে একজন স্বর্ণকারকে উল্লিখিত স্থানে জনৈক মেজরের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। নাম ধাম জিজ্ঞাসা করার পর মেজর আমাদেরকে বন্দি করার নির্দেশ দেয়। তারপর থানায় নেয়া হয়। সেখানে কিছুক্ষণ পর ঐ টেলিগ্রাফ অফিসের সুপারিনটেনডেন্ট (টি এণ্ড টি) হাতিম আলী খালিফাকে ধরে আনে। রেলওয়ে ওয়ার্কশপ থেকে শ্রমিক ও চার্জম্যানসহ কিছু লোককে ধরে আনে। সর্বমোট ২৪-২৫ জনকে একত্রে বন্ধ ওয়াগনে করে কড়া সামরিক পাহারায় ক্যান্টনমেন্টে নেয়া হয়। ক্যান্টনমেন্টে নামানোর সাথে সাথে সকলের এক হাত করে বেঁধে দাউন গেঁথে স্থানীয় অবাঙ্গালী ও পাক সৈন্যরা বেদম প্রহার করা শুরু করে। বেল্ট, বেত, লাথি, চড়, কিল, ঘুষি এবং রাইফেলের বাঁট, বৈদ্যুতিক তার দিয়ে প্রহার করতে থাকে এবং বলতে থাকে “আচ্ছা চিজ মিলা “। মারের পর্ব শেষ হলে ক্যান্টনমেন্টের ভিতরে ছোট ছোট ঘরে ১০-১২ জনকে একই ঘরে ঢুকায়।

তারপর সকলকে আবার বারান্দায় বের করে দেয়ালের দিকে মুখ করে হাত দেয়ালের সাথে ফাঁক করে রেখে দাঁড় করায় এবং ঐ অবস্থায় ওয়াপদার মোটা বৈদ্যুতিক তার দিয়ে প্রহার করতে থাকে। এ অবস্থায় অত্যাচার চলার পর প্রাচীরের সাথে যে বাঁশ টাঙ্গানো ছিল সে বাঁশের সাথে কোমরে দড়ি বেঁধে উল্টো অবস্থায় টাঙ্গিয়ে দেয় এবং পিঠে প্রহার করতে থাকে। প্রহারের ফলে অজ্ঞান হলে অথবা অজ্ঞান হবার উপক্রম হলে ছেড়ে দেয়।

এ সময় টিএণ্ডটি ডিপার্টমেন্টের ঐ ভদ্রলোকে জিজ্ঞাসাবাদ করে যে, এখানে আমার কে কে আছে। আমি আত্নীয়দের সাথে আমার যুবতী মেয়ের কথাও বলি। তখন ঐ পশুরা বলে যে তোমার সেই ১৫-১৬ বছরের মেয়েকে এখনই এখানে নিয়ে আসা হচ্ছে এবং এদের সামনে তোমাকে তোমার মেয়ের সাথে ‘সহবাস’ করতে হবে। অস্বীকৃতি জানালে আমার উপর এ ব্যাপারে সবচেয়ে বেশী অত্যাচার করে। শরীরের বিভিন্ন অংশ থেকে দরবিগলিত ধারায় রক্ত ঝরতে থাকে। সন্ধ্যা পর্যন্ত ঐ খানেই সকলে ছিলাম। যে আসত সে-ই মারত এবং কাফের লোক কো খতম করো বলে গাল দিত। এ সময় কয়েকজন দাড়িওয়ালাকে জিজ্ঞাসা করে যে, তোমরা মুলমান কি না এবং নামাজ পড় কিনা? হ্যাঁ-বাচক উত্তর দিলে তাদেরকে কলেমা পড়তে বলে। কলেমা পড়তে থাকলে তাদেরকে ধমক দিয়ে থামিয়ে দেয় এবং বলে যে, ‘তোম লোগ কাফের হ্যায়, তুম ঝুটা বলতা হ্যায়। ‘

সন্ধ্যার পর একটি ঘরে সকলকে বসায় এবং শুকনো রুটি ও ডাল এনে দেয়। খাওয়ার পর মুসলমানেরা নামাজ পড়তে চাইলে তাদেরকে মসজিদে না যেতে দিয়ে সেখানেই নামাজ পড়তে নির্দেশ দেয়। নামাজ পড়া যেই শেষ হয়েছে, অমনি জনৈক কোয়ার্টার মাষ্টার বেত হাতে এসে প্রহার শুরু করে। তোম লোগ নামাজ পড়তা হ্যায়। তোম লোগ বাঙ্গালী মুসলমান, তোম লোগ কাফের হ্যায়।

 

সেখান থেকে অতঃপর আর এক জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে অনেকগুলো বেঙ্গল রেজিমেন্টের লোক বন্দি অবস্থায় ছিল। সেখানে দরজা খুলে সকলকে ঢুকিয়ে দেয়। সেখানে বেঙ্গল রেজিমেন্টের লোকদের মুখে জানতে পারি যে, তারা সীমান্তবর্তী এলাকায় ছিলেন। ডিউটি অন্যত্র দেয়া হবে নিয়ে এসে বন্দি করে। তারা সংখ্যায় প্রায় ৫০-৬০ জন ছিলেন। ঘন্টাখানেক পর উল্লিখিত কোয়ার্টার মাষ্টার দরজা খুলে সিভিলিয়ানদের বেরিয়ে আসতে নির্দেশ দেয় এবং বেরিয়ে আসলে অন্য আর একটি ছোট ঘরে নিয়ে যায়। ঘরের সমস্ত দরজা জানালা বন্ধ ছিল এবং ঘরের ভিতর কোন আলো ছিল না। কেউ যেন না বসে এমন নির্দেশ দিয়ে সে চলে যায়। তার কিছুক্ষণ পর ঐ একই ব্যক্তি এক এক করে ঘরের বাইরে ডেকে নেয় এবং আমার প্রতি অকথ্য অত্যাচার করতে থাকে। যখন আমার পালা আসে তখন আমাকে জিজ্ঞাসা করা হয় যে, শহরের কে কে বাংলাদেশের পতাকা তুলেছিল, কে কে মুজিব ত্রাণ ফান্ডে চাঁদা দিয়েছে এবং কে কে নেতা?

পরদিন সকালে আমাদের দিয়ে একটি পুকুরের বাঁশ উঠিয়ে নেয়া হয় এবং মাঠের ঘাস পরিষ্কার করে নেয়া হয়। তারপর অপর একজন এসে আমাদেরকে বন্দি করতে নির্দেশ দেয়। তখন আমার পূর্বে ধৃত আমার বাবার খবর জানতে চাইলে তাদের সকলকে যে ঘরে আমার বাবা এবং স্থানীয় এমসিএ জিকরুল হকসহ ১৫-১৬ জন বন্দি ছিলেন সেখানে বন্দি করে রাখে।

কিছুক্ষণ পরে মেজর জাভেদ এসে সকলকে একদিক থেকে ঐ ঘরেই প্রহার করে। ডাঃ জিকরুল হককে প্রহার করার সময় সে বলে ‘ডঃ জিকরুল তোম বলতা হ্যায় মিলিটারী ফাঁকা ফায়ার করতা হ্যায়। তোম হিয়াসে মব লাগাতা হ্যায় ? বানচোত, তোম সবকো গুলি কর দিয়ে গা।’ তারপর ক্যাপ্টেন বখতিয়ার লাল আসে এবং একই প্রক্রিয়ায় অত্যাচার করে।

পরদিন সন্ধ্যায় ক্যাপ্টেন গুল এসে তার মাথায় শিরোস্ত্রাণ খুলে তা দিয়ে সকলকে প্রহার করে। মারের চোটে কেউ চিৎকার করতে চাইলে সে বলতে চীৎকার মাৎ কারো। এদিন ডাক্তার সাহেবকে বেশী অত্যাচার করে ও অকথ্য এবং অশ্রাব্য ভাষায় গালাগালি করে। তাঁকে লাথি দিয়ে বাইরে ফেলে দেয় এবং সেখানে তার প্রতি গুল ও অন্যান্য মিলিটারীর হৃদয়হীনভাবে অত্যাচার করে। এতে তার চশমা ভেঙ্গে যায়; মাথা ফেটে যায় এবং শরীরের বিভিন্ন স্থান থেকে রক্ত ঝরতে থাকে। অতঃপর তার মাথা ব্যান্ডেজ করে লাথি মেরে ঘরে ঢুকিয়ে দেয়।

ডাক্তার সাহেব ঘরে ঢুকলে সকলে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। ডাক্তার সাহেব সকলকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, ওরা অত্যাচার করুক না। আর না হয় কাল দিন আসবে, বাংলাদেশ স্বাধীন হবে।

তারিখ সেণ্ট্রি এসে জানায় যে, আপনাদের যা খাবার খেয়ে নেবেন, আপনাদের আজ কোথাও যেতে হবে। ১২ টার দিকে দরজা খুলে বাইরে বেরোলেই উল্লিখিত কোয়ার্টার মাষ্টার সকলকে একটি দুটি করে লাথি মেরে ট্রাকে ঊঠতে নির্দেশ দেয়। ট্রাকে উঠলে তিনজন করে একত্রে পেছনে শক্ত করে হাত বেঁধে দেয়। তিনটি ট্রাকে বেঙ্গল রেজিমেন্টের লোকসহ প্রায় ১৫০ জনকে ঊঠায়। ট্রাক রংপুরের রাস্তা ধরে আস্তে আস্তে যাচ্ছিল। যাবার পথে পাহাড়ারত সামরিক লোকেরা বেল্ট দিয়ে, রাইফেলের বাঁট দিয়ে অথবা বুট দিয়ে খুঁচিয়ে অত্যাচার চালাতে থাকে। শেষাবধি রংপুর ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যায়। সেখানে পৌঁছার পরই সকলের উপর অকথ্য অত্যাচার করে। তারপর অফিসার এসে সকলের নামের তালিকা বের করে সকলের নাম মিলিয়ে নেয়। তারপর রংপুর উপশহরের দিকে অফিসাররা জীপে যাত্রা করে এবং পিছনে পিছনে ট্রাকগুলোও যেতে থাকে। উপশহরের পাশে বালি তোলা খাদের কাছে নিয়ে গাড়ি দাঁড় করায় এবং সেখানে বেঙ্গল রেজিমেন্টের ৬ জন ৬ জন করে নিয়ে গুলি করে হত্যা করে। তারপর সিভিলিয়ানদের এক একজন করে পাশাপাশি একবারে ছয়জন করে দাঁড় করায়। তাদের সামনে খুব নিকটে ছয়জন বন্দুকধারী সিপাই থাকে এবং পাশে জোড়া লাগানো কালো প্যান্ট-শার্ট পরিহিত একজন সিপাই। দাঁড় করিয়ে দেয়া হলে ঐ কালো কাপড় পরিহিত লোক বলল ‘সিঙ্গল ফায়ার’ বলে রাইফেল উপরে তুলে গুলি করত আর গুলি করার সাথে বলত ‘স্টার্ট ফায়ার’। সাথে সাথে উল্লিখিত ছ’জনকে দাঁড় করানো হতো।

 

আমি ও আমার ছোট ভাই কমলাপ্রসাদ ঐরুপ তৃতীয় গ্রুপে ছিলাম। আমরা নিজেদের মধ্যে কিছু সলাপরামর্শ করে গুলি করার পূর্বমুহূর্তেই ইচ্ছাকৃতভাবে পড়ে যাই। ফলে গুলি লক্ষ্যভেদ হয়ে আমার হিপে (উরুর উপরে) এবং আমার ছোট ভাইয়ের হাঁটুর উপরে উরুতে লাগে। আমরা মরার ভান করে পড়ে থাকি এবং সমস্ত লক্ষ্য করতে থাকি।

এ হত্যাযজ্ঞের মাঝামাঝি সময়ে ডাঃ জিকরুল হককে একাই দাঁড় করায় এবং জিজ্ঞাসা করে যে, ‘এই তোমহারা জিন্দেগী আওর মউত কো স্যোয়াল হ্যায়। হাম জনতা হ্যায় তোমস্যে মুজিবরস্য ফোন মে বাত হোয়া।’ তিনি উত্তর দিলেন আমি মরার সময় মিথ্যা কথা বলে গুনাহগার হব না। আর এ কথা বলার সাথে সাথে তাকে গুলি করে। সঙ্গে সঙ্গে তিনি পড়ে যান এবং বলেন ‘আল্লাহ তোমার এখানে বিচার নেই, বিচার কর।’ এটাই তার শেষ কথা। শেষের দিকে স্থানীয় প্রভাবশালী ডাঃ শামশুল হককেও ঐ একা দাঁড় করিয়ে হত্যা করে।

এ অবস্থায় সকলকে হত্যা করতে প্রায় সন্ধ্যা ঘনিয়ে অন্ধকার হয়ে যায়। এবং আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে ও মেঘ ডাকতে থাকে।
হত্যাপর্ব শেষ হলে সকল মৃত ব্যক্তিকে ৫-৭ জনে পা ধরে টেনে উল্লিখিত খাদে ফেলে দেয় এবং আর ১০-১২ জনে মাটির উপর থেকে মাটিচাপা দিচ্ছিল। সে সময় অনেকে জীবিত ছিল। তারা গগনবিদারী করুণ চিৎকার করে আর্তনাদ করছিল। কেউ বা শেষবারের মত এক গ্লাস পানি পান করতে চাইছিল। আবার কেউ বা এ যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাবার জন্য আর একটা গুলি ভিক্ষা করছিল।

মাটি চাপা দিতে দিতে ভীষণ বৃষ্টি শুরু হয়। ফলে তারা আমার শরীরের অর্ধাংশ মাটি চাপা দিয়েই পরবর্তী সময়ে মাটি চাপা দেয়া হবে বলে চলে যায়।

ওরা চলে যাবার পর আমি ঐ গর্ত থেকে একজনকে উঠে দৌড়ে পালাতে দেখি। সে সময় আমার ভাই উক্ত পলায়নরত ব্যাক্তিকে লক্ষ্য করে বলে যে মিঠু আমাকে বাঁচা। আমার কেউ নেই এখানে। কিন্তু ঐ ব্যক্তি শুনতে না পেয়ে চলে যায়।

এদিকে আমি যেখানে ছিলাম সেখান থেকে উঠবার চেষ্টা করছিলাম। আমার নড়াচড়াতে আমার দেহের উপর থেকে বেশ ক’টি লাশ গড়িয়ে পড়ে যায়। সে সময় আমার পাশেই এক বেঙ্গল রেজিমেন্টের লোক জীবিত ছিলেন। তার একটি হাত ছিল না। তিনি আমাকে পালিয়ে যেতে বলেন এবং অপর হাত দিয়ে আমার হাতের বাঁধন খুলে দেয়ার শেষ চেষ্টা করেন; কিন্তু তিনি তা পারেন নি। কারন তার হাত অবশ হয়ে যাওয়ায় তা সামনে আসেনি।
আমি নিজে নিজে বহু চেষ্টা করে হাতের বাঁধন খুলে ফেলি এবং আমার ভাইকে সাথে করে নিয়ে গর্তের উপর উঠতে চেষ্টা করি। উপরে ওঠার পর হঠাৎ পা পিছলে নিচে পড়ে যাই। গর্ত থেকে আমি ভাইকে গ্রামে আশ্রয় নেবার নির্দেশ দেই।

গর্ত থেকে উঠে আমার ভাইকে আর পাই না। অতি কষ্টে কিছু দূরের গ্রামে একটি বাড়ীতে আশ্রয় নেই। সেখানে থাকা নিরাপদ নয় ভেবে আরও দূরে এক গ্রামে গিয়ে আশ্রয় নেই। উক্ত গ্রামের জনৈক মহিউদ্দিনের আন্তরিক সেবা-যত্নে কিছুটা সুস্থ হই। তারপর সেখান থেকে উক্ত ব্যাক্তির সাহায্যে প্রথমে তার এক আত্নীয়ের বাড়ী এবং পরবর্তীকালে জলঢাকা (নীলফামারী) যাই এবং সেখান থেকে মুক্তিবাহিনীর গাড়িতে করে ভারতের জলপাইগুড়ি পৌঁছি।

অপর পক্ষে আমার ভাই উক্ত ব্যাক্তির অক্লান্ত সেবা-যত্নের ফলে সুস্থ হয়ে ওঠে। রংপুর হাসপাতালে চিকিৎসার পর তাকেও ভারতে পাঠানো হয়।

এখানে উল্লেখ্যোগ্য যে, উক্ত গর্ত থেকে সেদিন মাত্র চার ব্যাক্তি প্রাণে বেঁচে গিয়েছিল।

স্বাক্ষর/-
নারায়ণ প্রসাদ

 

 

ইব্রাহিম রাজু

<,..৮৫,১৩৯১৪০> “নেয়ামত কসাই এক একটি জবাইয়ের বিনিময়ে ৬০(ষাট) টাকা পায় বলে জানায়। “

 

।। ৮৫।।
মোঃ মনোয়ার হোসেন
গ্রাম- মোল্লাপাড়া
পোঃ কুড়িগ্রাম
জেলাঃ রংপুর

পাক হানাদার সৈন্যরা ১৯৭১ সনের এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহে ট্রেনযোগে কুড়িগ্রাম নতুন শহরের (খলিলগঞ্জ) ষ্টেশনে পৌঁছে। ষ্টেশনে পৌছেই প্রথমে তারা ষ্টেশনের পশ্চিম দিকের জনসাধারণের পরিত্যাক্ত বাড়ীগুলোতে আগুন লাগিয়ে ভস্মীভূত করে। এরপর হানাদার সৈন্যরা খলিলগঞ্জ বন্দরে ঢুকে পড়ে। ঐ সময় খলিলগঞ্জের ছফর উদ্দিন (এলোপ্যাথি) ডাক্তার বাসাই ছিলেন।   বন্দরসংলগ্ন তার বাসগৃহ ছিল। পাক সৈন্যরা বন্দরে ঢুকে পড়ায় তিনি নিরাপত্তার জন্য বাসার পেছনে একটি খালে আত্নগোপন করেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে পাক সৈন্যরা তাকে দেখে ফেলে এবং গুলি করে হত্যা করে। এ ঘটনার পূর্বদিন আমি ঘোষপাড়ার চায়ের দোকানে ছিলাম। পাক সৈন্যরা খলিলগঞ্জ উক্ত চারজন লোককে হত্যা করে সেদিনই ট্রেনযোগে তিস্তা চলে যায়।

হতভাগ্য চারজনকে খান সেনারা বন্দরসংলগ্ন দিঘীর পাড়ে একত্র করে মেশিনগানের গুলিতে হত্যা। কয়েকদিন পর হানাদার সৈন্যরা ট্রেনযোগে কুড়িগ্রাম নতুন শহরে প্রবেশ করে এবং জেলখানায় প্রহরারত ৫ জন পুলিশরে হত্যা করে দ্রুত চলে যায়।

 

বুড়ির মেলা বাজারের কাছে একটি উঁচু স্থানে খান সেনারা নিরপরাধ বাঙালিদের গুলি করে হত্যা করে এবং তাঁদেরকে শূন্যে নিক্ষেপ করে বেয়োনেট দিয়ে গাঁথে।

কুড়িগ্রাম পুরাতন শহরের রিভারভিউ স্কুলের কাছ দিয়ে সন্তর্পণে হেঁটে ধরলা নদী অতিক্রমের সময় হঠাৎ হানাদার বাহিনীর মর্টারের গুলি পায়ে, হাঁটুতে এবং পিছন দিকে কোমরে লেগে আমি আহত হই। সঙ্গী সশস্ত্র তিনজন বাঙ্গালী ইপিআর আমাকে নদীর তীরে চানমারীতে অপেক্ষা করতে বলে দ্রুত শহরের ভেতরে ঢুকে পড়ে। ধরলা নদীর খেয়া তখন বন্ধ ছিল। চানমারীর কাছে একটি বাঙ্কারে আমি ঢুকে পড়ি এবং ক্রমেই আমার অবস্থার গুরুতর অবনতি ঘটে। বাঙ্গালী ইপিআর তিনটি আর পুনঃ আমাকে খোঁজ করতে আসে নি।

গুরুতর আহত অবস্থায় আমি উক্ত বাঙ্কারে ১১ দিন অনাহারে ছিলাম। হানাদার বাহিনী সমগ্র কুড়িগ্রাম দখল করে। এই এগার দিন আমি দৃঢ়তার সঙ্গে অতিবাহিত করি। কখনো জ্ঞান হারাই নি। ১২ দিন পর ৩ জন খান সেনা ৩ জন দালালসহ উক্ত স্থান অতিক্রমের সময় আমাকে দেখে ফেলে। খান সেনারা আমাকে কুড়িগ্রাম ডাক বাংলোয় নিয়ে যায়। ডাক বাংলোর দিকে যাবার পথে বর্তমান ইউনিয়ন কাউন্সিলের কাছে কুড়িগ্রাম রেলওয়ে অফিসের এক বৃদ্ধ দারোয়ানকে বিহারী নেয়ামত কসাই জবাই করছে দেখতে পাই। এ দৃশ্য আমার নিকট ছিল পৈশাচিক।

ডাক বাংলোয় পৌঁছে আমি ডাক বাংলোর কাছে স্যানিটারী অফিসের বারান্দায় ৮ জন লোককে চোখ ও পেছনে হাত বেঁধে কোমরে দড়ি লাগিয়ে বারান্দার খামে দাঁড়ানো অবস্থায় বেঁধে রাখতে দেখি। ডাক বাংলোয় খান সেনারা অবস্থান করত। আমি পৌঁছামাত্র আমার চোখ, পেছন দিকে হাত বেঁধে দড়ি লাগিয়ে অপর একটি খামে বাঁধা হয়। বারান্দায় বেঁধে রাখা সবাইকে মেজর গুলি করে হত্যার নির্দেশ দিয়েছিল। পরদিন ভোরে আনুমানিক সকাল আটটার দিকে নেয়ামত কসাই আসে এবং সবাইকে জবাই করবে বলে জানায়। নেয়ামত কসাই এক একটি জবাইয়ের বিনিময়ে ৬০(ষাট) টাকা পায় বলে জানায়। বেঁধে রাখা ব্যক্তিদেরকে মেজরের নির্দেশে বিকাল পাঁচটার সময় গুলি করে হত্যা করা হবে জানালে নেয়ামত কসাই চলে যায়।

 

বিকাল ৫ টায় ২ জন খান সেনা সবাইকে চোখ ও হাত বাঁধা অবস্থায় ধরলা নদীর তীরে চানমারীর পেছনে আমাকেসহ হতভাগ্য ১১ জনকে নিয়ে আসে। বাঁশঝাড়ের ভিতর দিয়ে চানমারীর পেছনে যাবার সময় অসংখ্য মৃত লাশ আমার গায়ে লাগছিল। চানমারীর পেছনে সবাইকে লাইন করানো হয় এবং সবাইকে বুকটান দিয়ে দাঁড়াতে বলা হয়। এক এবং দুই গোনার সঙ্গে সঙ্গে আমি পেছন দিকে হেলে পড়ি। সঙ্গে সঙ্গে মেশিনগানের গুলি বর্ষিত হয় আমি তৎক্ষণাৎ মাটিতে শুয়ে পড়ে নিঃশ্বাস রুদ্ধ করে মৃতবৎ পড়ে থাকি পাঞ্জাবীরা সবাইকে মৃত ভেবে চলে যায়। আমার তন্দ্রা কেটে গেলে বুঝতে পারি সৌভাগ্যক্রমে গুলিতে আহত হই নি। তবু আমি ভয়ে ৪-৫ ঘন্টা মৃতবৎ পড়ে থাকি। চারিদিকে একই সঙ্গে কুকুর এবং শৃগালের তুমুল কোলাহল চলছিল। রাত ১২ টার দিকে হঠাৎ দড়িতে টান পড়লে আমি জ্ঞান ফিরে পেয়ে উঠে বসি, কে দড়ি টানছে। জিজ্ঞাসা করলে অপর প্রান্ত থেকে একজন জীবিত ব্যক্তির কণ্ঠস্বর ভেসে আসে।তার বাড়ী রংপুর জেলার গাইবান্ধা বলে জানায়। তাঁর গায়ে গুলি লাগেনি বলে সে জানায়। অতঃপর উভয়ে হামাগুড়ি দিয়ে পরস্পরের সম্মুখীন হই এবং পরস্পরের হাতে বাঁধন খুলে দিতে সাহায্য করি। উভয়ে মুক্ত হবার পর চোখের বাঁধন খুলি এবং চারিদিকে তাকিয়ে কমপক্ষে ৪ শত লাশ দেখতে পাই শৃগালগুলো চারপাশে ছোটাছুটি করছিল। উভয়ে নদীর তীরে উপস্থিত হই। গাইবান্ধার লোকটি সাঁতার দিতে অক্ষমতা প্রকাশ করেন। অতঃপর আমি তার হাত ধরে গা ভাসিয়ে দেই। নদীতে কয়েকবার লোকটি আমার হাত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছিল কিন্তু অতি কষ্টে পরস্পর পরস্পরকে ধরে রেখে নদী পার হতে সক্ষম হই। তীরে পৌঁছতেই ভোর হয়ে আসে। উভয়েই ভারতে আশ্রয় গ্রহণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি এবং ভারতের পশ্চিম বাংলার চৌধুরী হাটে প্রবেশ করি।

স্বাক্ষর/-
মোঃ মনোয়ার হোসেন
৩০/০৭/৭৩

 

ইব্রাহিম রাজু

<,..৮৬,১৪১>

 

।। ৮৬।।
ডাঃ আব্দুল করিম আহমদ
গ্রাম- সাপটানা
লালমনিরহাট, রংপুর

৪ ঠা এপ্রিল ১৯৭১, হানাদার বাহিনীর লালমনিরহাট প্রবেশের পূর্ব পর্যন্ত লালমনিরহাট বাসভবনে ছিলাম। হানাদার বাহিনী প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে আমি পূর্বদরজা গ্রামের বাড়ীতে আশ্রয় গ্রহণ করি। কয়েক দিন পর গোপনে আমি আমার পরিত্যক্ত বাসভবন এবং ডিসপেনসারি দেখতে আসি। লালমনিরহাট শহরের পথিমধ্যে আমি অবাঙালিদের বিভিন্ন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দল দেখতে পাই। আমার বাসবভনে ঢোকার কিছুক্ষণ পর জনৈক ব্যক্তি আমাকে জানায় যে অবাঙ্গালীদের বিভিন্ন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দল দেখতে পাই। আমার বাসবভনে ঢোকার কিছুক্ষণ পর জনৈক ব্যক্তি আমাকে জানায় যে অবাঙ্গালীরা আমাকে মেরে ফেলার ষড়যন্ত্র করেছে। এ খবর পেয়ে আমি পূর্বদিক দিয়ে দ্রুত
বের হই। অবাঙ্গালীরা আমার খোঁজ নিয়ে আমার পিছু নিয়েছিল।

 

৭ ই জুলাই আমি যখন আমার পূর্বদরজা গ্রাম বাসভবনে কার্যরত ছিলাম, তখন বহু হানাদার সৈন্য বিভিন্ন দলবদ্ধভাবে তিন দিক থেকে আমার বাসভবন ঘিরে আসছে দেখতে পাই। হানাদার বাহিনীর সাথে স্থানীয় কুখ্যাত অবাঙালিরা ছিল। পূর্বেই নিরাপত্তার জন্য পরিবারবর্গকে দূরে নিরাপদ স্থানে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। হানাদার বাহিনী স্থানীয় অবাঙ্গালীদের নিয়ে আমার বাড়ী ঘিরে ফেলে এবং লুটতরাজ শুরু করে। যাবতীয় মূল্যবান সামগ্রী তারা নিয়ে নেয়। ইত্যবসরে অপর একটি দল এসে পড়ে। উক্ত দলে লালমনিরহাট থানার জনৈক অবাঙালি জমিদার ছিল। এ জমিদারটি জানায় যে, আমি কেন এখনও গ্রেফতার হইনি এবং আমাকে পাকিস্তানী পতাকা প্রজ্বলন এবং আওয়ামী লীগের একজন লীডার বলে অভিযুক্ত করে। হানাদার সৈন্যরা সঙ্গে সঙ্গে আমাকে ধরে ফেলে এবং কিল, থাপ্পড়, ঘুষি, লাথি প্রভৃতি দ্বারা অবর্ণনীয় দৈহিক পীড়ন শুরু করে। অবাঙ্গালী চরেরা আমার গৃহ থেকে দুটি ভারতীয় ঔষুধ বের করে আনে। হানাদার বাহিনী আমার গ্রেফতার এবং লুটের সামগ্রীসহ মোঘলহাট রেলওয়ে স্টেশনের নিকটবর্তী রেলওয়ে সেতুর কাছে অপর একদল সৈন্যের নিকট নিয়ে আসে। এখান থেকে লালমনিরহাটে ফোন করা হয়। কিছুক্ষণ পর দুটি কামরাসহ একটি রেল ইঞ্জিন সেখানে এলে হানাদার বাহিনীর কতিপয় লোক আমাকে লালমনিরহাটে নিয়ে আসে। এখান থেকে আমার চোখ বেঁধে এরোড্রাম ঘাঁটির নিকট হানাদার বাহিনীর ঘাঁটিতে আমাকে নিয়ে যাওয়া হয়। এখান থেকে শুরু হয় আমার উপর দৈহিক নির্যাতন। এখানে আরো বহু লোককে নিয়ে আসা হয়েছিল।

 

এই ঘাঁটিতে ১৪ দিন বন্দি জীবনযাপন করি। এই সময় আমাকে দিয়ে আবর্জনা পরিষ্কার, মাঠের কাজ, কঠোর পরিশ্রমমূলক কাজ ইত্যাদি করিয়ে নেয়া হতো। তা ছাড়া চড়, কিল,ঘুষি, লাথি প্রভৃতি অতি সাধারণ ব্যাপার ছিল।

এরপর আমাকে স্থানীয় রেলওয়ে ট্রেনিং স্কুলে আনা হয়। সেখানে কয়েকটি হাজত কামরায় আরো ধৃত বাঙ্গালীদের দেখতে পাই। এখানেও আমাকে দৈহিক পীড়ন এবং কায়িক পরিশ্রমশীল কার্যে নিয়োগ করা হয়। এখানে অবস্থানকালে আমি দেখতে পাই বিভিন্ন স্থান থেকে নিরপরাধ বাঙ্গালীদের ধরে আনা হতো। বিহারীরা এদের উপর নানা প্রকার অশ্লীল মন্তব্য করতো। কখনো কখনো বিহারীরা ধৃত বাঙ্গালীদের উপর মিথ্যা অভিযোগ আনতো। সঙ্গে সঙ্গে বাঙ্গালীদের ধরে নিয়ে গিয়ে সেনাবাহিনী হত্যা করতো। এভাবে গণহত্যা ছিল নিত্যদিনের অতি সাধারণ ঘটনা।

স্বাক্ষর/-
ডাঃ আব্দুল করিম আহমদ

 

রকিবুল হাসান জিহান

<,২.২.৮৭,১৪২>

।। ৮৭।।

মোঃ লুৎফর রহমান

গ্রাম- মুন্সিপাড়া

থানা ও জেলা – দিনাজপুর

 

জুলাই মাসের প্রথম দিকে ভারত হতে ফিরে আসার পরে লিলি সিনেমা হলের সামনে রাত্র ৮ টার সময় ২ জন অবাঙ্গালী আবার আমাকে আটক করে। তারা বলে যে, তুমি মুক্তিযোদ্ধা, তোমার কাছে বোমা আছে, তুমি কতজন অবাঙ্গালীকে মেরেছ ইত্যাদি। তারা আমাকে মারতে মারতে তদানীন্তন সার্কিট হাউসে নিয়ে যায় এবং খান সেনাদের হাতে তুলে দেয়। খান সেনারা প্রথমে আমাকে জিজ্ঞাসা করে যে তুমি কি কাজ কর? তার উত্তরে আমি বলি যে আমি ‘পটকা, আতশবাজী’ তৈরি করি। আমার উত্তরে খান সেনারা পুনরায় জিজ্ঞাসা করে যে, পটকা কেয়া চিজ হ্যায়? উত্তরে আমি বলি যে, পটকা বিয়ের অনুষ্ঠানে ফুটানো হয় আমোদ-প্রমোদ করবার জন্য। কিন্তু খান সেনারা বলে যে, “তোম জুট বলতা হ্যায়, তোম বোম বানাতা হ্যায়।” এই বলে তারা ভীষণ মারধর আরম্ভ করে এবং সিগারেট খেয়ে জ্বলন্ত সিগারেট আমার শরীরে চেপে ধরে। ঐ সময় ছোট চাকু আমার হাতের তালুর ঢুকিয়ে দেয়। হাত পিছনে বাঁধা অবস্থায় একটা অন্ধকার কক্ষে বন্দী করে রাখে। এ অবস্থায় দুই দিন আটকে রাখে। দ্বিতীয় দিনে আমাকে কিছু রুটি খেতে দেয়।

 

তৃতীয় দিনে আমাকে কোমরে রশি বেঁধে জেলখানায় নিয়ে আসে। আসার সময় তারা কিল, ঘুষি, লাথি যে যা পারে মারতে থাকে। জেলখানায় আসার পর আমার দুই হাতে রশি বেঁধে একটা বীমের সাথে ঝুলিয়ে দেয়। এক সময় আমাকে উলঙ্গ অবস্থায় রাখা হয়। ঝুলানো অবস্থায় হান্টার ও রাইফেলের বাঁট দিয়ে প্রহার করতে থাকে। প্রহার করার সময় আমাকে জিজ্ঞাসা করা হয় যে, “মুক্তিযোদ্ধা কাঁহা হ্যা? হাম লোক তোমাকে বোম দেগা, তোম যাকে উলোকো মার ছাকেগা।” উত্তরে বলি যে আমি যেতে পারব না। এতে আমার শাস্তি আরো দ্বিগুণ বাড়িয়ে দেয়। মারধর করার পরে আমাকে জেলখানাতেই বন্দি করে রাখে।

 

বলা প্রয়োজন যে, এই সময় একজন খান সেনা রাইফেলের বাঁট দিয়ে আমার মুখে আঘাত করে। ফলে আমার সামনের চারটা দাঁত ভেঙ্গে যায়। এই অবস্থায় আমার শারীরিক অবস্থা আশঙ্কাজনক মনে করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করে। এই অবস্থায় আমাকে চার মাস জেলে আটকে রাখে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আমি জেল হতে বের হয়ে আসি।

 

স্বাক্ষর/-

লুৎফর রহমান`

 

রকিবুল হাসান জিহান

<,২.২.৮৮,১৪৩>

।। ৮৮।।

নূর মোহাম্মদ

দিনাজপুর কারাগারের সিপাই

 

সরকারী ও বেসরকারী কর্মচারীদের কাজে যোগদানের জন্য পাক সরকার যখন নির্দেশ দেয়, তখন আমি দারুণ আর্থিক কষ্টের মধ্যে অজো পাড়াগাঁয়ে অবস্থান করছিলাম। পেটের দায় বড় দায়। কাজেই উপায়ন্তর না দেখে আমি কাজে যোগদানের জন্য শহরে আসি এবং অন্যান্য সহকারীরা যোগদান করেছে কিনা দেখার জন্য জেলখানার সামনের গেট দিয়ে আসবার চেষ্টা করি। কিন্তু সেখানে কালো পোষাক পরিহিত পাঞ্জাবী পশু ও তাদের অনুগ্রহপুষ্ট পদলেহী অবাঙ্গালীরা পাহারা দিচ্ছিল। সাহসে না কুলানোর জন্য আমি পিছনের অপ্রশস্ত রাস্তা দিয়ে ঢুকবার চেষ্টা করি। আর সে সময়ই জনৈক অবাঙ্গালী জেল হেড ওয়ার্ডার হানিফ খান আমাকে ধরে ফেলে জেল গেটে নিয়ে এসে হাত বেঁধে অমানুষিকভাবে হৃদয়হীন পদ্ধতিতে প্রহার শুরু করে। কিল, ঘুষি ও বুট দিয়ে লাথি মারে। প্রহারের চোটে আমি যখন অত্যন্ত কাতর হই, তখন আমাকে কোতোয়ালি থানায় নিয়ে যায়। যাবার পথে আমাকে সমানে প্রহার করা হয়। রাস্তার মাঝে আমার নাক ও মুখ জুড়ে এমন এক ঘুষি মারে যাতে আমার নাক ফেটে দরবিগলিত ধারায় রক্তপাত শুরু হয়। সে অবস্থায় আমাকে যখন থানায় নেয়া হয় তখন ঐ পশুরা আমি তখনও পান চিবোচ্ছি বলে রহস্য করে এবং প্রহার করতে থাকে। সেখানে ঘন্টাখানেক ঐরূপে বিরতিহীনভাবে মারধর করার পর আমাকে ক্যান্টনমেন্টে খান সেনাদের হাতে সোপর্দ করে।

 

ক্যান্টনমেন্টে নেবার পর জেলখানার অবাঙ্গালী সিপাই যারা মুক্তিফৌজের হাতে নিহত হয়েছে, তাদের পরিবারের মহিলারা জবানবন্দি দেয় যে, “ইয়ে শালা সতরা-আঠারো আওরতকো বেওয়া কিয়া। ইয়ে হামারা শওহরকো মারা, হামারা ভাইকো মারা।”

 

এ বক্তব্য শোনার পর পাক সৈন্যরা আমার উপর অমানুষিকভাবে প্রহার শুরু করে। আমাকে কেটে লবণ লাগিয়ে আস্তে আস্তে হত্যা করা হবে বলে হুমকি দেয়। তারা আমাকে নিয়ে ফুটবল খেলার মত বেশ কিছুক্ষণ খেলাও করে। এ সময় আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। অত্যাচারের এ পদ্ধতিতে তারা যখন তুষ্ট হয়ে যায়, তারপর আমাকে মেজর কামরুজ্জামানের নিকট নিয়ে যায়। সে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে এবং বলে যে তুমি কতজন বিহারী মেরেছ? নেতিবাচক উত্তর দিলে আমার বাঁধন খুলে দিতে বলে এবং আমাকে, একজন ডাক্তার ও আর এক ব্যক্তিকে জীপে তুলে নিয়ে মেজর নিজে গাড়ি চালিয়ে জেলখানায় আসে। আমাকে আলাদা রুমে বন্ধ করে রাখার নির্দেশ দেয়। সেখানে দুমাস বন্দি থাকার পর একদিন চা খাবার নাম করে বাইরে এসে পালিয়ে যাই।

 

স্বাক্ষর/-

নূর মোহাম্মদ

 

 

 

রকিবুল হাসান জিহান

<,২.২.৮৯,১৪৪> “তারা মেয়েদের উপর প্রথমে অত্যাচার করত, তারপর তারা গুপ্তাঙ্গের ভিতর রাইফেল-বন্দুকের নল ঢুকিয়ে দিত।“

।। ৮৯।।

মঈনুদ্দিন আহমদ

গ্রাম- আবদুলপুর

থানা- চিরিরবন্দর

জেলা- দিনাজপুর

 

১৪ ই আগস্ট তারিখে আমি যখন দিনাজপুরে গিয়েছিলাম তখন মহারাজা স্কুলের সামনে খান সেনাদের ক্যাম্পের কাছে রাস্তায় আমাকে গ্রেফতার করে। প্রথমে ক্যাম্পে নিয়ে গিয়ে পাশবিক অত্যাচার করে। সেখানে বেদম প্রহার করে। রাইফেলের নল ও গাদা দিয়ে, বেত দিয়ে অমানুষিকভাবে অত্যাচার করে। অত্যাচারের নির্মমতায় আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। উল্লিখিত পদ্ধতিতে আমাকে বহুক্ষণ ধরে অত্যাচার করে। এ সময় শরীরের বিভিন্ন স্থানে রাইফেলের বাঁট দিয়ে গুঁতাতে থাকে। রাইফেলের বাঁটের আঘাত আমার মুখের ডান দিকের দুটি দাঁত ভেঙ্গে দেয়। অত্যাচারের পর আমাকে ক্যাম্পের অদূরে জঙ্গলে গুলি করে হত্যা করবার জন্য নিয়ে যায়। জনৈক বাঙ্গালী ইপিআর সে সময় সক্রিয় সহযোগিতা করে গুলির হাত থেকে আমাকে রক্ষা করে। ক্যাম্পে সারা দিন সারা রাত অনাহারে রাখার পর আমার সাথের সমস্ত টাকা-পয়সা ও পায়ের জুতা কেড়ে নিয়ে পরদিন কোতোয়ালিতে স্থানন্তরিত করে। পরে সেখান থেকে ছেড়ে দেয়।

 

মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাসে অবাঙ্গালীরা মাঝে মাঝে গাড়ি করে বিভিন্ন এলাকায় যেত এবং গাড়ি থামিয়ে লুটপাট করত, মানুষ হত্যা করত, মেয়েদের উপর পাশবিকভাবে নির্যাতন করত এবং তাদের প্রভু খান সেনাদের জন্য উপঢৌকন হিসেবে ধরে নিয়ে যেত। তারা মেয়েদের উপর প্রথমে অত্যাচার করত, তারপর তারা গুপ্তাঙ্গের ভিতর রাইফেল-বন্দুকের নল ঢুকিয়ে দিত। এক একটি মেয়ের উপর ৭-৮ জন অত্যাচার করত। অত্যাচারের পর নির্যাতিত মহিলাদের বহুজন এমনি মারা যেত। তারা প্রকাশ্যেই এ অত্যাচার করত।

 

রাস্তার পথিকদের ধরে ক্যাম্পে নিয়ে যেত এবং সেখানে নির্দয় অত্যাচার করত এবং গুলি করে হত্যা করত। ঝোপ-ঝাড়ে কাউকে দেখলে সেখানেই গুলি করে হত্যা করত। তার খাসী-মুরগী-হাঁস-গরু ধরে নিয়ে যেত, ভাল ভাল কাপড়-গয়নাগাটি নিয়ে যেত।

 

স্বাক্ষর/-

মঈনুদ্দিন আহমদ

 

রকিবুল হাসান জিহান

<,২.২.৯০,১৪৫-১৪৭> “এরপর ঐ দুজনকে গুলি করে। একজন একটু মাথা আছড়াতে থাকলে তার মাথা লক্ষ্য করে আবার গুলি করে। ফলে তার মাথার মগজ ছিটকে চলে যায়।“

।। ৯০।।

মোঃ আছির উদ্দিন মুন্সী

গ্রাম- চিরিরবন্দর মাজাপাড়া

থানা- চিরিরবন্দর,

জেলা- দিনাজপুর

 

বৈশাখ মাসের প্রথম দিকে খান সেনারা চিরিরবন্দরে ক্যাম্প করে। সেখানে ক্যাম্প করার পর স্থানীয় গ্রামবাসীরা প্রাণের ভয়ে কতক ভারতে ও কতক গ্রাম থেকে গ্রামাঞ্চলে চলে যায়। এই সময়ে আমি স্ত্রী-পুত্রদের সঙ্গে নিয়ে দুই মাইল দূরে আমার শ্বশুরবাড়ি বালুপাড়ায় চলে যাই। আমি একদিন বালুপাড়া সন্নিকটে মরা নদীর ব্রিজের কাছে একদিকে চিরিরবন্দর হতে অপরদিকে পার্বতীপুর হতে এই দুই দিক হতে দুটি পাক সৈন্য বোঝাই গাড়ি এসে থামে। এখানে বলা প্রয়োজন যে, উক্ত ব্রীজটি এর পূর্বেই ইপিআর বাহিনী ভেঙ্গে দেয়। উক্ত বালুপাড়া গ্রামের ২০-২১ জন লোক ঐ গাড়ি দুটিতে বেঙ্গল রেজিমেন্ট আছে ভেবে তাদের অভিনন্দন জানানোর জন্য এগিয়ে যায়। কিন্তু নিকটে যাবার সঙ্গে সঙ্গে চারদিক হতে খান সেনারা তাদেরকে ঘিরে ফেলে। উক্ত ২০-২১ জনকে পরে ক্যাম্পে নিয়ে গিয়ে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় হত্যা করে এবং লাশগুলি কাঁকড়া নদীতে ভাসিয়ে দেয়। এই ঘটনার ৩-৪ দিন পরে বালুপাড়া গ্রামটি খান সেনারা তিন দিক হতে ঘিরে ফেলে। খান সেনাদের উপস্থিতি সম্পর্কে গ্রামবাসীরা পূর্বেই টের পেয়েছিল এবং তারা আগেই নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যায়। ফলে খান সেনারা সেদিন গ্রাম থেকে কাউকে ধরতে পারে না। এদিকে গ্রামবাসীরা তাদের আর উক্ত গ্রামে থাকা উচিৎ নয় ভেবে অন্যত্র যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং খান সেনারা গ্রাম হতে চলে যাওয়ার পর গ্রামবাসীরা তাদের পোটলা-পুটলি আনার জন্য রাতের অন্ধকারে প্রবেশ করে। আমি উক্ত বালুপাড়া গ্রাম হতে আমার নানাশ্বশুরের বাড়ি দুর্গাপুর (২ মাইল) যাওয়ার জন্য তৈরি হয়। এবং শেষ রাতের দিকে রওয়ানা দেই। এদিকে খান সেনারা বালুপাড়া গ্রাম ও দুর্গাপুর গ্রামের মাঝখানে ঐ রাত্রের অন্ধকারে মিশন স্কুলে পজিশন নেয়। আমি ও আমার ভাই গরু বাছুর নিয়ে যখন মিশন স্কুলের নিকটে পৌঁছাই তখন হঠাৎ করে ১৮ জন খান সেনা ও ৪ জন অবাঙ্গালী রাজাকার আমাদের দুজনকে ঘিরে ফেলে এবং একজন আমাকে লক্ষ্য করে এক রাউণ্ড গুলি ছোড়ে। কিন্তু খোদা মেহেরবান, গুলি আমাদের দুজনের একজনকে ও না লেগে আমাদের সঙ্গে আনা একটি গরুর পায়ে বিদ্ধ হয়।

 

পূর্ব হতেই আর ও দুজন দাড়িওয়ালা মুরব্বী গোছের লোককে উক্ত স্কুলের সামনে বেঁধে রেখেছে। খান একজন আমাকে বলে যে, “ইয়ে মৌলভী সাব, আপ কাঁহা যাতে হে?” জবাবে আমি বলি যে আমি গরু বাছুর নিয়ে জমিনে কাজ করতে যাচ্ছি। খান সেনারা পুনরায় বলে যে, “তোম ইন্ডিয়ামে বাগ যাতে হে?” জবাবে বলি যে, না ভাই আমি ইন্ডিয়া যাচ্ছি না। আমি জমিনে কাজ করতে যাচ্ছি। খান সেনারা পুনরায় আমাকে প্রশ্ন করে যে, “ইয়ে মৌলভী সাব আপ সাচ্ছা বাত বলেগা তো আপকো হাম ছোড় দেগা, আপ বলিয়ে আওয়ামী লীগকা পার্টি কাঁহা, স্কুল কলেজ কাঁহা, ছাত্র কাঁহা, মালাউন কাঁহা।” উত্তরে আমি বলি যে, যারা আওয়ামী লীগ, ছাত্র এবং মালাউন সবাই ভারতে পালিয়ে গেছে। যারা এখানে আছে তারা সকলেই খাঁটি পাকিস্তানী। এই সময় খান সেনাদের সাথী অবাঙ্গালী রাজাকাররা আমাকে বাংলায় বলে যে, “আপনি ভয় পাবেন না। আমরা ভারতীয় সৈন্য। এখানে বিহারীরা আসবার চেষ্টা করছে। তাদের বাঁধা দেওয়ার জন্য আমরা এখানে পজিশন নিয়েছি।”

 

আমি সরলমনে এটা বিশ্বাস করি এবং বলি যে, “ভাই আমি থাকব না। আমাকে ভারত পাঠাবার ব্যবস্থা করেন।” উত্তরে রাজাকাররা আমাকে আশ্বাস দেয় এবং বলে যে আপনি কোন চিন্তা করবেন না, সে ব্যবস্থা আমরা করছি। ঠিক সেই মুহুর্তে আমি লক্ষ্য করি যে, পূর্বেই আনা সেই দুজন মুরব্বী লোককে খান সেনারা চতুর্দিক হতে ফুটবলের মত লাথি মারছে। এভাবে মারার পর লোক দুটিকে আমার কাছে নিয়ে আসে। এবং আমার কাছ থেকে গরু বাঁধার রশি নিয়ে উক্ত মুরব্বী দুজনকে মজবুত করে বাঁধে। অতঃপর আমাকেসহ ৪ জনকে কিছু দূরে ক্যাপ্টেনের কাছে নিয়ে যায়। ক্যাপ্টেন আর্মি লোকদের কাছে জানতে চান যে, ধৃত ব্যক্তিরা কারা। জবাবে তারা বাঙ্গালী জানতে পারলে উল্লিখিত দুই বৃদ্ধকে প্রহারের নির্দেশ দেয় এবং তাদের উপর হৃদয়হীন নির্যাতন চলতে থাকে। নির্যাতন চলা অবস্থায় উক্ত ক্যাপ্টেন তাদের জয় বাংলা বলার নির্দেশ দেয়। তারা তা না বলে পাকিস্তান জিন্দাবাদ বললে তাদের উপর আরও প্রবলভাবে অত্যাচার করে। এই সময় আমাকে জয় বাংলা বলতে বলা হয়। আমি তা বলি, ক্যাপ্টেন আমাকে বলে, “ঠিক হায় মৌলভী সাব আপকো হাম ইন্ডিয়া ভি লিয়ে যায়গো।”

 

অতঃপর ৪ জনকেই পূর্ব দিকে নিয়ে যেতে শুরু করে। এবং একটি খালের কাছে গিয়ে থেমে যাওয়ার নির্দেশ দেয়। এ সময় একটি বেয়নেট দিয়ে উক্ত বৃদ্ধদুটির শরীরের সমস্ত কাপড় কেটে উলঙ্গ করে। এবং তাদের তলপেটে থাপড়িয়ে বলে, “বাঙ্গালী আদমী খাড়া হায়, আওর ভুঢ়িনে তেল লাগাতা হায়।”

 

এরপর ঐ দুজনকে গুলি করে। একজন একটু মাথা আছড়াতে থাকলে তার মাথা লক্ষ্য করে আবার গুলি করে। ফলে তার মাথার মগজ ছিটকে চলে যায়। এ সময় দক্ষিণ দিক থেকে দুজন গাড়োয়ানকে গাড়িসহ ধরে আনে এবং আমার কাছ থেকে “মৌলভী সাব হামকো একটা রশি দিজিয়ে আপ” বলে রশি চেয়ে নেয় এবং তাদের হাত বাঁধে। অতঃপর তাদের একজনকে যে ৩০-৩৫ বছরের যুবক ছিলেন তাকে মারতে থাকে। মারের চোটে সে জ্ঞান হারাবার উপক্রম হলে তাকে জোর করে তুলে ধরে উলঙ্গ করে এবং তার গুহ্যদ্বারে নড়ি ঢুকিয়ে দেয়। এ পদ্ধতিতে কিছুক্ষণ অত্যাচার চালাবার পর তার হাত বেঁধে গাড়ির পিছনে বেঁধে দেয় এবং অপর ব্যক্তিকে জোরে গাড়ি হাঁকাবার নির্দেশ দেয়। এ সময় তারা আমাকে বলে, “ মৌলভী সাব আপ চালিয়ে ইন্ডিয়া।” রেল লাইনে সকলে আশা শুরু করে। রাস্তার মাঝ থেকে বেশ কয়েকটি খাসি ধরে গাড়িতে তুলে নেয়। মরা নদীর ভাঙ্গা ব্রীজের কাছে এসে জনৈক খান আমাকে তার কাছে ডেকে বসায় এবং জিজ্ঞাসা করে, “মৌলভী সাব, আপ সাচ সাচ বাতলাইয়ে আওয়ামী পার্টিকো লোক কাঁহা, স্কুল কো ছাত্র কাঁহা, মালাউন কাঁহা।” উত্তরে আমি জানাই যে “সব ইন্ডিয়ামে চল গিয়ে, কোই আদমী নেহি হ্যায়। জোভি হ্যায় ওভি পাকিস্তান কো নাগরিক হ্যায়।” এতে আমাকে মিথ্যাবাদী বলে আখ্যায়িত করে। এ সময় আমাকে একটি সিগারেট খেতে দেয় এবং উক্ত প্রশ্ন গুলি আবার জিজ্ঞাসা করে।

 

অতঃপর ইন্ডিয়ায় পৌছে দেবার নাম করে আমাকে, সঙ্গীত ও গাড়ির দুজনকে এবং গাড়ির গরু দুটিসহ ক্যাম্পের দিকে আসতে থাকে। ক্যাম্পের নিকট ব্রীজের কাছে এসে হুইসেল দিলে ৫০-৬০ জন খান সেনা সেখানে যায়। তারপর সকলে স্টেশনে আসে। স্টেশনে পরিচিত জনৈক অবাঙ্গালীকে দেখে আমি খানদের কাছে সুপারিশের জন্য অনুরোধ করলে সে আমাকে আওয়ামী লীগের কর্মী বলে পরিচয় করিয়ে দেয় এবং গুলি করে হত্যা করার জন্য খানদের অনুরোধ জানায়।

 

সেখান থেকে ধৃত সকলকে ক্যাম্পে নিয়ে যায়। গাড়োয়ান দুজনকে একটি আলাদা কুঠুরিতে বন্দী করে রাখে। এবং আমাদের ব্রীজে যে সিপাই জিজ্ঞাসা করেছিল তার ঘরে বসতে দেয়। এবং চা খেতে দেয়, সিগারেট খেতে দেয়।

 

কুঠুরিতে বন্দী দুজনকে পাশবিকভাবে মারা শুরু করে। উলঙ্গ অবস্থায় লাঠি, রড, রাইফেলের গাদা দিয়ে পর্যায়ক্রমে হাত বদল করে পিটাতে থাকে এবং পরিশেষে তাদেরকে ফুটবলের মত লাথি মারতে থাকে। বেলা ৪ টার দিকে লোক দুটিকে ছেড়ে দেয়।

 

অতঃপর আমাদের দুজনকে ওই ঘরে ঢুকায়। সেখানে একজন গুলিবিদ্ধ ভীষণভাবে আহত লোক হাত বাঁধা অবস্থায় ছিলেন। সন্ধ্যার সময় ঐ আহত লোককে ঘর থেকে বের করে পশ্চিম দিকে পুকুরের ধারে নিয়ে যায়। যাবার পথে তাঁকে বেয়নেট দিয়ে খোঁচাতে খোঁচাতে সারা পথ নিয়ে যায় এবং পুকুরের ধারে নিয়ে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে। আমি এ দৃশ্য উক্ত ঘরের জানালা খুলে দেখেছি।

 

এশার নামাজের জন্য অজু করে আসছিলাম, তখন ক্যাম্প ইনচার্জ আমার পড়ার খবর শুনে কেরআত পাঠ শুনতে চায়। আমি তিন ঘন্টা ধরে মুখস্ত কোরআন পাঠ করে শুনিয়ে সন্তুষ্ট করি এবং পরদিন বিকাল চারটায় আমাকে মুক্তি দেয়।

 

স্বাক্ষর/-

মোঃ আছির উদ্দিন মুন্সী

 

 

 

রকিবুল হাসান জিহান

<,২.২.৯১,১৪৮> “রোজার দিন হওয়া সত্ত্বেও তারা সেহেরী ইফতারের জন্য কোন খাবার দেয়নি। ঐ কদিন না খেয়েই রোজা থাকতে হয়েছে। বহুবার তাদের কাছে পানি চাওয়া হয়েছিল, তবুও তারা দেয় নি।“

 

।। ৯১।।

মোঃ সোলায়মান গণি

গ্রাম- নান্দারাই

থানা- চিরিরবন্দর

জেলা- দিনাজপুর

 

১৯৭১ সনের ১১ ই রমজান রোজ রবিবার বেলা ১১-৩০ মিনিট খান সেনারা ও রাজাকাররা আমাকে গৃহ থেকে গ্রেফতার করে। শান্তি কমিটির সদস্যদের ইচ্ছার আমার হাতের পিছনে দড়ি বেঁধে রাজাকার, খান সেনা ও শান্তি কমিটির সদস্যরা মিছিল সহযোগে থানায় নিয়ে যায়। রাস্তার মধ্যে রাইফেলের গাদা ও হাত দিয়ে বেদম প্রহার করে। প্রহারের সময় তারা বেয়নেট দেখাচ্ছিল এবং উল্লাস করছিল। ৪ মাইল রাস্তা তারা বিরামহীনভাবে উল্লিখিত পদ্ধতিতে প্রহার করছিল। আনার সময় আমার চোখ-মুখে চুল কালি মেখে কিম্ভুতকিমাকার চেহারায় রুপান্তরিত করে এবং শরীরের সমস্ত জায়গায় ছাপ দিতে থাকে।

 

এখানে বলা প্রয়োজন, ওরা আমাকে গ্রেফতার করা ছাড়া ও আমার বাড়িঘর সমস্ত লুটপাট করে এবং সবশেষে আগুন লাগিয়ে দিয়ে সমস্ত বাড়ি ভস্মীভূত করে দেয়। আমার অপরাধ, আমি আওয়ামী লীগের একজন একনিষ্ট কর্মী ছিলাম এবং অসহযোগ আন্দোলনের সময় বিশেষ কর্মতৎপরতা প্রদর্শন করেছিলাম।

 

থানায় নেবার পর পা উপরের দিকে তুলে লটকিয়ে লোহার রড দিয়ে মারতে থাকে। এর সাথে কিল, ঘুষি ও লাথি সমানে চলতে থাকে। এ অবস্থায় ৪-৫ ঘন্টা টাঙ্গিয়ে রাখে ও উল্লিখিত পদ্ধতিতে অত্যাচার করতে থাকে। চার দিন, চার রাত্রি থানায় ছিলাম এবং উল্লিখিত পদ্ধতিতে অত্যাচার করে। রোজার দিন হওয়া সত্ত্বেও তারা সেহেরী ইফতারের জন্য কোন খাবার দেয়নি। ঐ কদিন না খেয়েই রোজা থাকতে হয়েছে। বহুবার তাদের কাছে পানি চাওয়া হয়েছিল, তবুও তারা দেয়নি।

 

চতুর্থ দিনের দিনে ৫ হাজার টাকার বিনিময়ে আমাকে ছেড়ে দেয়।

 

স্বাক্ষর/-

মোঃ সোলায়মান

 

রকিবুল হাসান জিহান

<,২.২.৯২,১৪৯>

।। ৯২।।

মোঃ হাবিল উদ্দিন আনছারী

গ্রাম- পালপাড়া

ডাকঘর- বাংলাহিলি

থানা- হাকিমপুর

জেলা- দিনাজপুর

 

২২ শে এপ্রিল পাক বাহিনী হিলি বাজার দখল করে নেয়। হিলি দখল করার পর চারদিকে অগ্নিসংযোগ এবং ব্যাপক হারে গণহত্যা চালিয়ে যায়।

 

২৩ শে এপ্রিল পাক বাহিনী ও বিহারীরা আমাদের পালপাড়া আক্রমণ করে। তারা বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ করে। নিরীহ জনসাধারণকে ধরে নির্বিচারে মারধর করতে থাকে। এই সময় তারা ৭ জন লোককে হত্যা করে। এইসব লোককে প্রথমে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে, পরে গুলি করে হত্যা করে। আমি এবং আরও একজন গুরুতররূপে আহত হই। আমার সারা শরীর দিয়ে রক্ত ঝরতে থাকে। বহু লোককে এই সময় দেখতে পাই পাঞ্জাবীরা কিল, ঘুষি এবং ফুটবলের মত “কিক” করছে এবং নানারুপ অকথ্য ভাষায় গালাগাল দিচ্ছে। এই সময় ৩ জন ছেলে ঘরের ছাদের উপর উঠে আশ্রয় নিয়েছিল। তারা ৪ দিন পর্যন্ত ঐ ছাদের উপর বসে থাকে। কোনরূপ নড়াচড়া বা খাবার-দাবার নাই। ৫ দিন পর আমাদের এখানে থেকে তাদের ক্যাম্প তুলে নিলে তারা মাটিতে নেমে আসে।

 

অক্টোবর মাসের প্রথম সপ্তাহে প্রাণকৃষ্ণপুর (চার) গ্রাম পাক বাহিনী চারিদিকে থেকে ঘিরে ফেলে। সমস্ত পুরুষ লোকদেরকে বেছে এক লাইন করে এবং অকথ্য নির্যাতনের পর ১৪৯ জনকে লাইন করে মেশিনগানের গুলিতে হত্যা করে। তাদের বাড়িঘর লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়। গ্রাম থেকে সুন্দরী মেয়েদের ধরে নিয়ে যায় এবং অনেককে সবার সামনেই ধর্ষণ করে।

 

স্বাক্ষর/-

মোঃ হাবিল উদ্দিন আনছারী

০৮/১১/১৯৭৩

 

 

রকিবুল হাসান জিহান

<,২.২.৯৩,১৫০-১৫১> “জ্ঞান হারিয়ে ফেলার আগে আমি পানি পান করতে চাই। তখন আমাকে প্রস্রাব খেতে দেওয়া হয়।“

।। ৯৩।।

রফিকুল ইসলাম

গ্রাম- সোনাপুকুর

থানা- পার্বতীপুর

জেলা- দিনাজপুর

 

২৫ শে মার্চের পর দিনাজপুর যখন ইপিআর কর্তৃত্বে ছিল সে সময় আমি ইপিআর বাহিনীদের গাড়ি করে স্থান থেকে স্থানান্তরে নিয়ে যেতাম। আর এ অপরাধের জন্য আমাকে এপ্রিলের ৬ তারিখে পাক হানাদাররা দিনাজপুর শহর থেকে গ্রেফতার করে কোতোয়ালি থানার পাশের জঙ্গলে নিয়ে যায়। উদ্দেশ্য, আমাকে সেখানে হত্যা করা হবে। আমাকে ঐ খানে নিয়ে গিয়েছিল কয়েকজন সামরিক লোকজন ও কতিপয় অবাঙ্গালী দালাল। সেখানে আমাকে জবাই করার জন্য ছোরা বের করে। ঠিক সে সময় শেষবারের মত পানি পান করার সুযোগ দেয়ার জন্য তাদের প্রতি অনুরোধ জানাই। অনুরোধে তাদের মধ্যের একজন দয়াপরবশ হয়ে আমাকে পানি পান করে আসার অনুমতি দেয়। থানার প্রাচীরের পাশের টিউবওয়েলে পানি পান করি এবং বাঁচার শেষ অবলম্বন হিসাবে তাদের বোঝার আগেই প্রাচীর টপকে অপর দিকে চলে যাই। সেখানেও খান সেনারা ছিল। তারা আমাকে পুনরায় গ্রেফতার করে থানায় নিয়ে যায়। সেখানে আমাকে বেদমভাবে হুইপিং করা হয় এবং মুক্তিফৌজ কোথায়, ‘সুন্দরবন’ গাড়িটি কোথায়, কতজন বিহারীকে হত্যা করেছ ইত্যাদি প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করে। কিছুক্ষণ হুইপিং সহ্য করার পর আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। জ্ঞান ফেরার পর ঐ দিন বিকালে আমাকে আবার জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে। সে সময় কিছুসংখ্যক অবাঙ্গালী মেয়ে থানায় এসে জবানবন্দী দেয় যে আমি তার স্বামী, ভাই অথবা বাবাকে হত্যা করেছি। ফলে পুনরায় আমার উপর প্রহার শুরু হয়। কিছুক্ষণ পর আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। জ্ঞান হারিয়ে ফেলার আগে আমি পানি পান করতে চাই। তখন আমাকে প্রস্রাব খেতে দেওয়া হয়।

 

রাত বারটায় আমি জ্ঞান ফিরে পেলাম। অতঃপর আমাকে আবার জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ওসির কক্ষে নিয়ে যায়। সেখানে জনৈক মেজরসহ, একজন ক্যাপ্টেন ও ডিএসপি ছিল। সেখানে আমার নামধাম ও আত্মীয়স্বজনের খবরাখবর আদায় করে নেওয়া হয়। সেখানে অবশ্য আরও ছয়জন আসামী ছিলেন। এরপর অফিসাররা নিজেদের মধ্যে ইংরেজিতে কিছু বলবার পর উল্লিখিত ছ’জনকে পেছনে হাত ও চোখ বেঁধে জীপে উঠিয়ে নিরুদ্দেশের পথে নিয়ে যায়। এরপর আমাকে আবার বন্দীশালায় বন্দী করে রাখে। এ অবস্থায় আমাকে থানায় রেখে দুবেলা জিজ্ঞাসাবাদ ও প্রহার করত। প্রথম সাত দিন আমাকে কিছুই খেতে দেয়নি। পানি চাইলে প্রস্রাব দ