বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধঃ দলিলপত্র – ৯ ম খণ্ড (অনুবাদসহ)

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধঃ দলিলপত্র – ৯ ম খণ্ড (অনুবাদসহ)

 

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধঃ দলিলপত্র

নবম খন্ড-সশস্ত্র সংগ্রাম (১)

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

অ্যাটেনশন!

পরবর্তী পেজগুলোতে যাওয়ার আগে কিছু কথা জেনে রাখুনঃ

  • ডকুমেন্টটি যতদূর সম্ভব ইন্টার‍্যাক্টিভ করা চেষ্টা করা হয়েছে। অর্থাৎ এই ডকুমেন্টের ভেতরেই অসংখ্য ইন্টারনাল লিংক দেয়া হয়েছে। আপনি সেখানে ক্লিক করে করে উইকিপিডিয়ার মতো এই ডকুমেন্টের বিভিন্ন স্থানে সহজেই পরিভ্রমণ করতে পারবেন। যেমন প্রতি পৃষ্ঠার নিচে নীল বর্ণে ‘সূচিপত্র লেখা শব্দটিতে কিবোর্ডের Ctrl চেপে ধরে ক্লিক করলে আপনি সরাসরি এই ডকুমেন্টের সূচিপত্রে চলে যেতে পারবেন।
  • তারপর ‘দলিল প্রসঙ্গ’ শিরোনামে কিছু লেখা আছে। এটি যুদ্ধদলিলের ১৫ তম খণ্ড থেকে সরাসরি লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। এখানে আপনারা জানতে পারবেন যে এই ডকুমেন্টে আসলে কী কী আছে।

তারপর সূচিপত্র এখান থেকেই মূল দলিল শুরু। সূচিপত্রটি সরাসরি দলিলপত্র থেকে নেয়া হয়েছে। সূচিপত্রে লেখা পেজ নাম্বারগুলো যুদ্ধদলিলের মূল সংকলনটির পেজ নাম্বারগুলোকে রিপ্রেজেন্ট করে।

 

যুদ্ধদলিলে মোট ১৫ টি খণ্ড আছেঃ

প্রথম খন্ড : পটভূমি (১৯০৫-১৯৫৮)
দ্বিতীয় খন্ড : পটভূমি (১৯৫৮-১৯৭১)
তৃতীয় খন্ড : মুজিবনগর : প্রশাসন
চতুর্থ খন্ড : মুজিবনগর : প্রবাসী বাঙালীদের তৎপরতা
পঞ্চম খন্ড : মুজিবনগর : বেতারমাধ্যম
ষষ্ঠ খন্ড : মুজিবনগর : গণমাধ্যম
সপ্তম খন্ড : পাকিস্তানী দলিলপত্র: সরকারী ও বেসরকারী
অষ্টম খন্ড : গণহত্যা, শরনার্থী শিবির ও প্রাসঙ্গিক ঘটনা
নবম খন্ড : সশস্ত্র সংগ্রাম (১)
দশম খন্ড : সশস্ত্র সংগ্রাম (২)
একাদশ খন্ড : সশস্ত্র সংগ্রাম (৩)
দ্বাদশ খন্ড : বিদেশী প্রতিক্রিয়া : ভারত
ত্রয়োদশ খন্ড : বিদেশী প্রতিক্রিয়া : জাতিসংঘ ও বিভিন্ন রাষ্ট্র
চতুর্দশ খন্ড : বিশ্বজনমত
পঞ্চদশ খন্ড : সাক্ষাৎকার

এই ডকুমেন্টে প্রতিটি দলিলের শুরুতে একটা কোড দেয়া আছে।

<খণ্ড নম্বর, দলিল নম্বর, পেজ নম্বর>

অর্থাৎ <৯,১২,২৮-৩১> এর অর্থ আলোচ্য দলিলটি মূল সংকলনের ৯ম খণ্ডের ১২ নং দলিল, যা ২৮ থেকে ৩১ নং পৃষ্ঠায় মুদ্রিত আছে। দলিল নম্বর বলতে সূচিপত্রে উল্লিখিত নম্বরকে বুঝানো হচ্ছে। উদ্ধৃত দলিলটি সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের একটি সাক্ষাৎকার। বুঝার সুবিধার্থে দলিলটির শুরুর অংশ দেখে নিনঃ

 

  • দলিলে বানান সহ বেশ কিছু ভুল আমরা খুঁজে পেয়েছি। সেগুলোকে হলুদ মার্ক করা হয়েছে।
  • মনে করুন, ২৬ শে মার্চ উপলক্ষে আপনি কোন ম্যাগাজিনে একটি লেখা দিবেন। এই ফাইলে তখন ২৬ শে মার্চ লিখে সার্চ দিলেই ৯ম খণ্ডের সেই সংক্রান্ত সকল দলিল পেয়ে যাবেন। ফলে রেফারেন্স নিয়ে লিখতে আপনার খুবই সুবিধা হবে। কারণ আমাদের মূল উদ্দেশ্য একটাই। আমরা যেন সঠিক ইতিহাস চর্চা করে বেড়ে ওঠা একটি প্রজন্ম হয়ে উঠি। এটা আমাদের নিজেদের জন্যেই অত্যন্ত প্রয়োজন। যে জাতি নিজের জন্মের ইতিহাস জানে না, সে জাতির চেয়ে দুর্বল সত্ত্বা পৃথিবীতে আর কিছু নেই।
  • মনে করুন, আপনি নিজের এলাকা নিয়ে জানতে চান। তবে নিজের এলাকার নাম লিখে এই ডকুমেন্টে সার্চ করুন। উদাহরণস্বরূপ, আপনি মিরপুর এলাকার হলে Ctrl+F চেপে “মিরপুর” লিখে সার্চ করুন। ৯ম খণ্ডে রক্ষিত মিরপুর নিয়ে সকল দলিল আপনার সামনে চলে আসবে। দেশকে জানার প্রথম শর্তই হলো নিজের এলাকাকে জানা।

অনুবাদ এবং অন্যান্য বিষয়কে সবুজ রং দিয়ে মার্ক করা হয়েছে।

 

 

মনোযোগ দিয়ে সারসংক্ষেপটি পড়ার জন্য ধন্যবাদ। এবার বিস্তারিত।

 

 

 

 

দলিল প্রসঙ্গঃ সশস্ত্র সংগ্রাম (১)

(পৃষ্ঠা নাম্বারগুলো মূল দলিলের পৃষ্ঠা নাম্বার অনুসারে সরাসরি লিখিত। এর সাথে এই ওয়ার্ড ফাইলের পৃষ্ঠা নাম্বার রিলেটেড নয়)

সশস্ত্র সংগ্রামের দলিলপত্র তিন খন্ডে বিভক্ত করা হয়েছে। দীর্ঘ নয় মাস স্থায়ী এই যুদ্ধের প্রকৃতি বিচার করে বিভাজনগুলি করা হয়েছে।

 

প্রথম ভাগে এসেছে প্রতিরোধ যুদ্ধের বিবরণ। যেহেতু মার্চ থেকে মে-জুন পর্যন্ত এর ধরণ ছিলো প্রতিরোধমূলক। দ্বিতীয় ভাগে অন্তর্ভূক্ত হয়েছে কেন্দ্রীয় কমান্ডের অধীনে সংঘটিত যুদ্ধের ঘটনাবলী (মধ্য ডিসেম্বরে হানাদার বাহিনীর চুড়ান্ত আত্মসমর্পণ পর্যন্ত। তৃতীয় ভাগে রয়েছে সরকারী দলিলপত্রের সংকলন)।

 

এই খন্ড সশস্ত্র সংগ্রাম-(১) প্রণীত হয়েছে প্রতিরোধযুদ্ধের ঘটনাবলী নিয়ে। প্রতিরোধ যুদ্ধ যেহেতু সারা দেশে বিস্তৃত ছিলো সেহেতু এ সংক্রান্ত যাবতীয় বিবরণ জেলাভিত্তিক ভাগে ভাগে বিন্যস্ত হয়ে।

 

মার্চ মাসের ব্যাপক গণ-অসহযোগের মূল কেন্দ্র ঢাকায় হানাদার বাহিনীর আকস্মিক আক্রমণ এবং সশস্ত্র বাঙ্গালী সেনা ইউনিটগুলোকে নিরস্ত্রকরণ ও বাঙ্গালী সেনা নিধন, ছাত্রাবাসে আক্রমণ, বুদ্ধিজীবি ও নিরস্ত্র জনগণকে অবাধে হত্যার (পৃঃ ৫-৬, ৬-৭, ১১-১৩, ১৪-১৯, ৩২-৪১) তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় দেশের সর্বত্র সশস্ত্র বাঙ্গালী ইউনিটসমূহ-(ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, ইপিআর-বর্তমানে বিডিআর, পুলিশ প্রভৃতি সংস্থা রুখে দাঁড়ায়। যেসব স্থানে এসব সশস্ত্র ইউনিট অবস্থান করছিলো সেসব স্থানে ব্যাপক গণ-অসহযোগের পটভূমিতে তাদের এই তৎপরতা জনগণের স্বতোৎসারিত দৃঢ় সক্রিয় সমর্থন প্রবল প্রতিরোধ যুদ্ধে পরিণত হয়। পরবর্তীকালে তা বিজয় অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ পূর্বশর্ত হিসেবে কাজ করে।

 

প্রাথমিকভাবে এ যুদ্ধ ছিলো অসংগঠিত, উপস্থিত স্থানীয় নেতৃত্বনির্ভর এবং অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র সজ্জিত একটি প্রবল শত্রুবাহিনীর বিরূদ্ধে প্রায় নিরস্ত্র জনতার আত্মরক্ষায় মরিয়া, প্রয়াস-সঞ্জাত এক অসম লড়াই। অনিবার্যরূপে এ ছিলো সশস্ত্র সংগ্রামের এক খণ্ডিত পর্যায়। এ যুদ্ধে প্রতিরোধী শক্তির প্রাথমিক পরাজয় ঘটা সত্ত্বেও তাদের ত্যাগ, বীরত্ব ও অসম সাহসিকতার অত্যুজ্জ্বল নির্দেশাবলী গভীর প্রেরণার উৎস ছিল। এ সমস্ত ঘটনাবলীর বিন্যাস দেশের তৎকালীন প্রশাসনিক-রাজনৈতিক ক্রিয়াকান্ডের মূল কেন্দ্র ঢাকা থেকে শুরু করা হয়েছে এবং পরে পৃথক পৃথক শিরোনামে প্রত্যেক জেলায় ঘটনা পরপর তুলে ধরা হয়েছে। এ বিন্যাসে দেশের তৎকালীন ক্যান্টমেন্টগুলোতে অবস্থিত ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টগুলির বিভিন্ন ব্যাটালিয়ন, যেমন- ১ম বেঙ্গল, ২য় বেঙ্গল, ৩য় বেঙ্গল, ৪র্থ বেঙ্গল ও ৮ম বেঙ্গলের ভুমিকা এবং তাদের অফিসারদের দৃঢ় সিদ্ধান্ত ও সমঝোতা প্রতিষ্ঠার কথা যেমন এসেছে, তেমনি আধাসামরিক বাহিনী ইপিআর উইংগুলির সময়োচিত উদ্যোগী তৎপরতাসহ জেলা ও মহকুমাগুলির পুলিস লাইন, প্রশাসনিক ইউনিট, আনসার, মুজাহিদ, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, ছাত্র-জনতার প্রতিরোধের লক্ষ্যে মুজিবনগরে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার এবং তদকালীন নেতৃবৃন্দ, ছাত্র জনতার প্রতিরোধের লক্ষ্যে দৃঢ়ভাবে একীভূত বীরত্বপূর্ণ কর্মকাণ্ডের বিবরণ। সর্বত্র ছড়িয়ে পড়া প্রতিরোধ যুদ্ধকে সুসংহত করার লক্ষ্যে মুজিবনগরে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার এবং তৎকালীন কর্নেল (অবঃ) এমএজি ওসমানীকে সর্বাধিনায়ক করে মুক্তিবাহিনী গঠনের বিষয়ও বিবরণে এসেছে (পৃঃ ১২৪, ২৪৫-২৪৭, ২৫৮-২৬১)।

 

প্রতিরোধ যুদ্ধের বিবরণ সংবলিত দলিলপত্র সংগ্রহ ও সন্নিবেশ করা মোটেও সহজসাধ্য ব্যাপার ছিল না। হানাদার বাহিনীর অতর্কিত আক্রমণের শিকার হয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনার বিবরণ রাখতে সমর্থ হন নি। এ বিষয়ে তাই স্বাধীনতা যুদ্ধের উত্তরকালে এ যুদ্ধের সাথে জড়িত বিভিন্ন সামরিক ও বেসামরিক নেতৃবৃন্দের সাক্ষাৎকার সমূহের উপরই নির্ভর করতে হয়েছে মূখ্যভাবে। এছাড়া সমসময়ে প্রণীত “প্রতিরোধ সংগ্রামে বাংলাদেশ” এ ব্যাপারে মূল্যবান আকর গ্রন্থরূপে কাজ করেছে। পরবর্তীতে রচিত আরও কিছু গ্রন্থ যেমন “লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে”, “মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস” প্রভৃতি তথ্যও প্রতিরোধ যুদ্ধের বিবরণকে উজ্জ্বলতর করে তুলেছে (পৃঃ ৪৬-৪৯, ৫৮-৮৯, ২৬১)। পত্রপত্রিকার বিবরণও সশস্ত্র প্রতিরোধের পরিস্থিতিকে তুলে ধরতে অনেকখানি সাহায্য করেছে (পৃঃ ৩৮৬-৪৪৮) সমগ্র দেশ দখলদার বাহিনী কবলিত থাকায় এ ব্যাপারে পার্শ্ববর্তী মিত্ররাষ্ট্র ভারতে প্রকাশিত পত্র-পত্রিকা থেকেই সাহায্য নেওয়া হয়েছে বেশী। মুক্তাঞ্চল থেকে প্রকাশিত দু’একটি পত্রিকার খবরও নেওয়া হয়েছে (৩৮৬, ৪৩১, ৪৩৪, ৪৪৬, ৪৪৮)। তবে বেঙ্গল রেজিমেন্ট, ই-পি-আর-এর অধিনায়ক পর্যায়ের মূল ব্যক্তিবর্গের প্রদত্ত সাক্ষাৎকারগুলোই এ খণ্ডেরর সারবস্তুরূপে কাজ করেছে।

 

সাক্ষাৎকারগুলির অধিকাংশ গৃহীত হয়েছিলো বাংলা একাডেমীর অঙ্গীভূত জাতীয় স্বাধীনতার ইতিহাস পরিষদের উদ্যোগে। ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ, মেজর জেনারেল (অবঃ) কে এম শফিউল্লাহর সাক্ষাৎকার দুটিসহ (পৃষ্ঠাঃ ৯৬-১২৮, ১৬০-১৮৪) বেশ কয়েকটি মূল্যবান সাক্ষাৎকার বাংলা একাডেমীর গবেষক সুকুমার বিশ্বাস ব্যক্তিগত গ্রহণ করেছিলেন।

 

সংগৃহীত সাক্ষাৎকারগুলোকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে এবং প্রতিরোধের বিবরণপূর্ণ প্রথমাংশ সশস্ত্র সংগ্রাম (১)-এ এবং প্রতিরোধের পর কেন্দ্রিয় কমান্ডের অধীনে বিভিন্ন সেক্টরে সংঘটিত যুদ্ধের বিবরণ সাধারণতঃ সাক্ষাৎকারের দ্বিতীয়াংশে এসেছে। যেখান থেকে প্রতিরোধ পরবর্তী সংঘটিত যুদ্ধের কথা শুরু হয়েছে, সেখানকার অংশগুলি সশস্ত্র সংগ্রাম (২)-এ সন্নিবেশিত হয়েছে। এভাবে বাংলাদেশের সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতিরোধ ও সংঘটিত প্রত্যাঘাত পর্বের যুদ্ধের একটি পূর্ণাঙ্গ রূপ তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।

 

গ্রন্থের সবশেষে স্বতন্ত্র অধ্যায়ে এসেছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী কতিপয় গেরিলা বা গণবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ অবদানের বিবরণ (পৃঃ ৪৫০-৪৯৫)। প্রাথমিক পর্বে প্রতিপক্ষের উন্নততর আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রের মুখে প্রথাগত পদ্ধতির সম্মুখযুদ্ধমূলক প্রতিরোধ ভেঙ্গে পড়লে যুদ্ধ ক্রমশ গেরিলা রণকৌশলের দিকে মোড় নেয়। এই অবস্থায় নিয়মিত বাহিনীর যুদ্ধের কৌশল হিসেবে অতি অল্প সময়ের মধ্যেই অনেক গেরিলা বাহিনী গড়ে উঠে। অনেক স্থানে স্বতঃস্ফূর্তভাবে স্থানীয় অবস্থার উপর ভিত্তি করেও অনেক গেরিলা দলের সৃষ্টি হয়। তাদের ক্ষীপ্র তৎপরতা, সাহস ও আত্মত্যাগ স্বাধীনতা যুদ্ধকে সাফল্যজনক যৌক্তিক পরিণতিতে পৌঁছতে বিপুলভাবে সহায়তা করেছিল। গেরিলা বাহিনীগুলোর কর্মকাণ্ড বাংলাদেশের গোটা রণাঙ্গনজুড়ে এতই ব্যাপক ও বিচিত্র ছিল যে, তা স্বতন্ত্র খন্ডে সন্নিবেশিত হওয়ার দাবী রাখে। কিন্তু এ ব্যাপারে তথ্যের নিদারুণ স্বল্পতার কারণে (যেহেতু গেরিলা মুক্তিযোদ্ধাদের দৈনন্দিন তৎপরতার লিখিত বিবরণ বেশি পাওয়া যায় নি) তাঁদের মাত্র কয়েকটি বাহিনীর তৎপরতাসমূহের প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র এখানে তুলে ধরা সম্ভবপর হয়েছে।

 

 

 

সূচিপত্র

(কিবোর্ডের Ctrl চেপে ধরে এখানকার যে কোন বিষয়ে ক্লিক করে আপনারা সরাসরি সেই দলিলে চলে যেতে পারবেন)

(পৃষ্ঠা নাম্বারগুলো মূল দলিলের পৃষ্ঠা নাম্বার অনুযায়ী লিখিত)

 

 

দলিল নং -১) সশস্ত্র প্রতিরোধঃ ঢাকা

 

সাব-দলিল নং দলিলের বিষয় পৃষ্ঠা নং কম্পাইলার
০১

(১) ঢাকা সেনানিবাস ও শহরের কথা

সাক্ষাৎকারঃ লেঃ কর্নেল আবু তাহের সালাউদ্দিন

০১ সজীব সাহা
০২

(১) ঢাকা সেনানিবাসের অভ্যন্তরের কথা

সাক্ষাৎকারঃ এয়ার কমোডোর এম, কে, বাশার

০৯ ওমর ফারুক শুভ
০৩

(১) ঢাকা সেনানিবাসের অভ্যন্তরের আরো কিছু কথা

সাক্ষাৎকারঃ আব্দুল করিম খন্দকার
ডেপুটি চীফ অফ ষ্টাফ বাংলাদেশ ফোর্সেস

১০ ওমর ফারুক শুভ
০৪ ঢাকার পিলখানার কথা
সাক্ষাৎকারঃ মেজর দেলোয়ার হোসেন
১২ আলামিন সরকার
০৫ পিলখানার আরও কথা
সাক্ষাৎকারঃ মোঃ আশরাফ আলী সরদার
১৩ সৈয়দা অনন্যা রহমান
০৬

(১) প্রতিরোধ যুদ্ধে রাজারবাগ পুলিশ বাহিনী

সাক্ষাৎকারঃ মোঃ আসমত আলী আকন্দ
এস, আই, পুলিস

১৪ আলামিন সরকার
০৭

(১) প্রতিরোধ যুদ্ধে রাজারবাগ পুলিশ বাহিনী

সাক্ষাৎকারঃ আঃ গনি তালুকদার(পুলিশ)

১৫ সৈয়দা অনন্যা রহমান
০৮

(১) রাজারবাগ পুলিশ লাইন

সাক্ষাৎকারঃ শরীফ খান মোহাম্মদ আলী

১৬ বিদ্যুৎ মনোরঞ্জন দে
০৯

(১) ঢাকার মিরপুরের প্রতিরোধ

সাক্ষাৎকার : মোহাম্মদ আ: সোবহান,

এস, আই, রিজার্ভ পুলিশ

১৯ নাজমুস সাকিব
১০

(১) ঢাকা শহরে সশস্ত্র প্রতিরোধ

ঢাকা শহরে সশস্ত্র প্রতিরোধ
সাক্ষাৎকারঃ লেঃ (অবঃ) আনোয়ার হোসেন

২১ জরীফ উদ্দিন
১১

(১) বংশাল ফাঁড়ির প্রতিরোধ

(২) নরসিংদীতে সশস্ত্র প্রতিরোধ

প্রতিবেদনঃ সত্যেন সেন

২২ সায়েম চৌধুরী

 

 

 

 

দলিল নং-২) সশস্ত্র প্রতিরোধ- চট্টগ্রাম

 

সাব-দলিল নং দলিলের বিষয় পৃষ্ঠা নং কম্পাইলার

(১) চট্টগ্রামের স্বাধীনতা লড়াইয়ের শুরুর কথা

(২) স্বাধীনতার ঘোষণা প্রসঙ্গ

সাক্ষাৎকারঃ লেঃ কর্নেল জিয়াউর রহমান

২৮ ডেমিয়েন থর্ন
(১) ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টারের ঘটনা ও প্রতিরোধ
সাক্ষাৎকার : মেজর এনামুল হক চৌধুরী
৩২

৩২-৩৭> সজীব সাহা

৩৮-৪০> আলামিন সরকার

(১) স্বাধীনতার ঘোষণা প্রসঙ্গে

(২) চট্টগ্রামের প্রতিরোধ

(৩) চট্টেশ্বরী রোডে অপারেশনঃ

(৪) ২৯শে মার্চ আসকের দীঘি অপারেশনঃ

(৫) ৩০শে মার্চ বাকুলিয়া গ্রাম অপারেশনঃ

(৬) চট্রগ্রাম কালুরঘাটের যুদ্ধঃ

সাক্ষাৎকারঃ ক্যাপ্টেন শমসের মুবিন চৌধুরী

৪১ আলামিন সরকার

(১) চট্টগ্রামের সশস্ত্র প্রতিরোধ

সাক্ষাৎকারঃ বিগ্রেডিয়ার হারুন আহমেদ চৌধুরী

৪৪ চন্দন ঘোষ শুভ

(১) স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র

(২) কুমিরার লড়াই

সাক্ষাতকারঃ মেজর এম এস এ ভূঁইয়া

৪৬

৪৬-৪৮> চন্দন ঘোষ শুভ

৪৮-৫১> আলামিন সরকার

(১) চট্টগ্রামের প্রতিরোধ যুদ্ধ

সাক্ষাৎকার: লেঃ কর্নেল মাহফুজুর রহমান

৫১ অনুবাদকঃ অভিজিত ঘোষ

(১) ঘেরাও

(২) চট্টগ্রামের সশস্ত্র প্রতিরোধ

(৩) সরবরাহের অভাব

(৪) চট্টগ্রাম শহরে চূড়ান্ত লড়াই

(৫) ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ

(৬) প্রথম বাংলাদেশ সরকার

(৭) রামগড় ভস্মীভূত

(৮) শুভপুর সেতুর যুদ্ধ

সাক্ষাতকারঃ মেজর (অবঃ) রফিক-উল-ইসলাম

৫৯

৫৯-৭০> তানিয়া ইমতিয়াজ লিপি

 

 

৭১-৭৯> অথৈ ইসলাম

 

 

৮০-৮৮> আলামিন সরকার

(১) চট্টগ্রামের প্রতিরোধ যুদ্ধ

(২) স্বাধীনতার ঘোষণা প্রসঙ্গ
সাক্ষাৎকারঃ লেঃ জেনারেল (অবঃ) মীর শওকত আলী বীর উত্তম

৮৮ জেসিকা গুলশান তোড়া

 

দলিল নং-) সশস্ত্র প্রতিরোধঃ কুমিল্লা-নোয়াখালী-ঢাকা (৪র্থ বেঙ্গল অন্যান্য বাহিনী)

 

সাব-দলিল নং দলিলের বিষয় পৃষ্ঠা নং কম্পাইলার

(১) ৪র্থ বেঙ্গল রেজিমেন্টের সশস্ত্র প্রতিরোধ

(২) কুমিল্লার সশস্ত্র প্রতিরোধ

সাক্ষাৎকারঃ ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ

৯৬ রুবেল শংকর

(১) ৪র্থ বেঙ্গল রেজিমেন্টের সশস্ত্র প্রতিরোধ

সাক্ষাৎকারঃ লেঃ কর্নেল শাফায়াত জামিল

১২৮ ফাহমিদা শিমু

(১) কুমিল্লা-নোয়াখালির সশস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধ

(২) ৪র্থ বেঙ্গল রেজিমেন্টের সশস্ত্র প্রতিরোধ

সাক্ষাৎকার- মেজর আবদুল গাফফার

১৩৪ আলামিন সরকার

(১) কুমিল্লার সশস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধ

(২) ৪র্থ বেঙ্গল রেজিমেন্টের সশস্ত্র প্রতিরোধ

সাক্ষাৎকার: মেজর আইনউদ্দিন

১৩৭ শ্রাবণ চৌধুরী

(১) কুমিল্লার সশস্ত্র প্রতিরোধ

সাক্ষাৎকারঃ মেজর ইমামুজ্জামান

১৪১ আলামিন সরকার

(১) কুমিল্লা নোয়াখালির সশস্ত্র প্রতিরোধ

সাক্ষাতকারঃ সুবেদার মেজর লুৎফর রহমান

১৪২ অথৈ ইসলাম

(১) সশস্ত্র প্রতিরোধে কুমিল্লা

সাক্ষাৎকারঃ সুবেদার সৈয়দ গোলাম আম্বিয়া

১৪৮ আলামিন সরকার

(১) বড় কামতার যুদ্ধ

(২) মুক্তিযুদ্ধে ফেনী

(৩) চন্দ্রগঞ্জের যুদ্ধ

(৪) সোনাইমুড়ি রেলস্টেশন

প্রতিবেদনঃ সত্যেন সেন

১৪৯ ফরহাদ

 

দলিল নং-) সশস্ত্র প্রতিরোধঃ ঢাকা- ময়মনসিংহ – টাঙ্গাইল (২য় বেঙ্গল অন্যান্য বাহিনী)

 

সাব-দলিল নং দলিলের বিষয় পৃষ্ঠা নং কম্পাইলার

(১) জয়দেবপুর-তেলিয়াপাড়াব্যাপী সশস্ত্র প্রতিরোধ

(২) ২য় বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও অন্যান্য বাহিনীর প্রতিরোধ

(৩) গেরিলা অপারেশন

(৪) লেঃ কর্নেল (অবঃ) কাজী আব্দুর রকীবের প্রতিবেদন

-‘বিচিত্রা’ ১৩ই মে, ১৯৮৩

(৫) মেজর জেনারেল অবঃ কে এম শফিউল্লাহর প্রতিবাদ

-‘বিচিত্রা’, ১৯৮৩

সাক্ষাতকারঃ মেজর জেনারেল কে, এম শফিউল্লাহ

১৬০

১৬০-১৬৮> বিদ্যুৎ মনোরঞ্জন দে

১৬৯-১৭৬> সজীব বর্মন

১৭৭-১৮১> অথৈ ইসলাম

১৮২-১৮৪> সমীরণ বর্মন

১৮৫-১৮৮> জেসিকা গুলশান তোড়া

১৮৯-১৯৬> আলামিন সরকার

(১) জয়দেবপুর-তেলিয়াপাড়া প্রতিরোধ যুদ্ধ

সাক্ষাতকারঃ ক্যাপ্টেন গোলাম হেলাল মোরশেদ খান

১৯৬ সায়েম চৌধুরী

(১) ময়মনসিংহ-ঢাকা-সিলেটের প্রতিরোধ যুদ্ধ

সাক্ষাৎকারঃ মেজর এম,এ, মতিন

১৯৯ বোরহান উদ্দিন খলিফা (শামীম)
১২

(১) ময়মনসিংহ ও অন্যান্য এলাকার সশস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধ

সাক্ষাৎকারঃ সিপাহী আফতাব হোসেন

২০১ দ্বীপংকর ঘোষ দ্বীপ

(১) মনতলার পতন

মেজর এম, এস, এ ভূঁইয়া

২০৪ বোরহান উদ্দিন খলিফা (শামীম)

(১) নরসিংদী-আশুগঞ্জের সশস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধ

ব্রিগেডিয়ার মোঃ মতিউর রহমান

২০৬ শ্রাবণ চৌধুরী

(১) সাটিয়াচড়ার (নাটিয়াপাড়া) যুদ্ধ

প্রতিবেদনঃ সত্যেন সেন

২০৯ সৈয়দা অনন্যা রহমান

 

দলিল নং-) সশস্ত্র প্রতিরোধঃ ময়মনসিংহ ও অন্যান্য এলাকা

 

সাব-দলিল নং দলিলের বিষয় পৃষ্ঠা নং কম্পাইলার

(১) ময়মনসিংহ শহর ও অন্যান্য স্থানের সশস্ত্র প্রতিরোধ

সাক্ষাৎকারঃ সুবেদার এ,কে এম ফরিদউদ্দিন

২১২ সৈয়দা অনন্যা রহমান

(১) সশস্ত্র প্রতিরোধে ময়মনসিংহ

সাক্ষাৎকারঃ সুবেদার মেজর জিয়াউল হক

২১৬ সৈয়দা অনন্যা রহমান

(১) মধুপুর গড়ের যুদ্ধ

প্রতিবেদনঃ সত্যেন সেন

২১৮ সৈয়দা অনন্যা রহমান

 

দলিল নং-) সশস্ত্র প্রতিরোধ- সিলেট

 

 

সাব-দলিল নং দলিলের বিষয় পৃষ্ঠা নং কম্পাইলার

(১) সিলেটের প্রতিরোধ যুদ্ধ

সাক্ষাৎকারঃ ব্রিগেডিয়ার চিত্তরঞ্জন দত্ত

২২১ জরীফ উদ্দিন

(১) সিলেটের সশস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধ

ডায়রীঃ লেঃ কর্নেল আবদুর রব

২২৮ (অনুবাদ) মোঃ রাশেদ হাসান (নোবেল)
(১) সিলেটের সশস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধ
সাক্ষাৎকার-ল্যান্স নায়েক সোনা মিয়া
২৩০ আলামিন সরকার

(১) সশস্ত্র প্রতিরোধে সিলেট

সাক্ষাৎকারঃ সিপাই শফিক আহমেদ

২৩১ সাইফুল ইসলাম

 

 

 

দলিল নং-) সশস্ত্র প্রতিরোধঃ কুষ্টিয়া-চুয়াডাঙ্গা

 

সাব-দলিল নং দলিলের বিষয় পৃষ্ঠা নং কম্পাইলার

(১) চুয়াডাঙ্গা-কুষ্টিয়ার প্রতিরোধ যুদ্ধের বিবরণ

(২) ফরাসী টিভি সাংবাদিকগণ কর্তৃক সরাসরি বোমা হামলা, রণাঙ্গনের চিত্রগ্রহণ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ ও বিশ্বব্যাপী প্রচারণা

(৩) ভারতের সাথে যোগাযোগ

(ঘ) গোয়ালন্দ প্রতিরোধ

সাক্ষাৎকারঃ লেঃ কর্নেল এম এ ওসমান চৌধুরী

২৩৪

২৩৪-২৪১> সায়েম চৌধুরী

 

 

২৪২-২৪৩> ইব্রাহীম রাজু

 

 

২৪৪-২৪৭> আলামিন সরকার

(১) চুয়াডাঙ্গা-কুষ্টিয়া প্রতিরোধ

সাক্ষাৎকার- মেজর এ আর আজম চৌধুরী

২৪৭ আলামিন সরকার

(১) কুষ্টিয়া-যশোরের সশস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধ

সাক্ষাৎকার : মোহাম্মদ তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরী

২৫০ রুবেল শংকর

(১) কুষ্টিয়ার যুদ্ধ

প্রতিবেদনঃ মেজর (অবঃ) রফিক-উল-ইসলাম

২৬০ দ্বীপংকর ঘোষ দ্বীপ

 

দলিল নং-) সশস্ত্র প্রতিরোধঃ যশোর (যশোর-নড়াইল-গোপালগঞ্জ)

 

সাব-দলিল নং দলিলের বিষয় পৃষ্ঠা নং কম্পাইলার

(১) যশোর-গোপালগঞ্জের প্রতিরোধ যুদ্ধ

সাক্ষাৎকারঃ মেজর আবদুল হালিম

২৬৩ ডেমিয়েন থর্ন

(১) যশোর সেনানিবাস ও অন্যান্য স্থানে ১ম বেঙ্গল রেজিমেন্টের তৎপরতা

(২) স্বাধীনতার ঘোষণা প্রসঙ্গে

সাক্ষাৎকারঃ ক্যাপ্টেন হাফিজউদ্দিন আহমেদ বীরবিক্রম

২৬৫ ডেমিয়েন থর্ন

(১) যশোর রণাঙ্গণে

(২) মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রউফ

প্রতিবেদনঃ সত্যেন সেন

২৬৮ ডেমিয়েন থর্ন

 

 

 

 

দলিল নং-) সশস্ত্র প্রতিরোধঃ রংপুর-দিনাজপুর

 

সাব-দলিল নং দলিলের বিষয় পৃষ্ঠা নং কম্পাইলার

(১) রংপুর-দিনাজপুরের প্রতিরোধ যুদ্ধ

(২) ৩য় বেঙ্গল রেজিমেন্টের প্রতিরোধ যুদ্ধ

সাক্ষাৎকারঃ সাক্ষাৎকার:মেজর মোঃ আনোয়ার হোসেন

২৭৯ ডেমিয়েন থর্ন

(১) সশস্ত্র প্রতিরোধের রংপুর

সাক্ষাৎকার-লেঃ মোঃ আবদুস সালাম

২৮২ আলামিন সরকার

(১) সৈয়দপুর-রংপুরের সশস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধ

(২) ৩য় বেঙ্গল রেজিমেন্টের প্রতিরোধ

সাক্ষাৎকার : সুবেদার মেজর মোহাম্মদ আবদুল খালেক

২৮৩ রুবেল শংকর

(১) সশস্ত্র প্রতিরোধে রংপুর

সাক্ষাৎকারঃ হাবিলদার জয়নাল আবেদীন

২৮৭ সমীরণ বর্মন
(১) সশস্ত্র প্রতিরোধে রংপুর
সাক্ষাৎকার- মোঃ নুরুজ্জামান
২৮৮ আলামিন সরকার

 

 

 

দলিল নং-১০) সাক্ষাৎকারঃ সুবেদার মেজর কাজিম উদ্দিন

 

সাব-দলিল নং দলিলের বিষয় পৃষ্ঠা নং কম্পাইলার

(১) ঠাকুরগাঁ-দিনাজপুরের সশস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধ

সাক্ষাৎকারঃ সুবেদার মেজর কাজিম উদ্দিন

২৯০ বোরহান উদ্দিন খলিফা (শামীম)

(১) দিনাজপুর ইপিআর সেক্টর হেডকোয়ার্টারের ঘটনাবলী

সাক্ষাৎকারঃ নায়েক সুবেদার মোহাম্মদ আনসার আলী

২৯৯ বোরহান উদ্দিন খলিফা (শামীম)

(১) দিনাজপুর জেলার সশস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধ

সাক্ষাৎকারঃ সুবেদার আরব আলী

৩০০ বোরহান উদ্দিন খলিফা (শামীম)

(১) দিনাজপুর জেলার সশস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধ

সাক্ষাৎকারঃ হাবিলদার বাসারত উল্লাহ

৩০২ নাহিদ সুলতানা নীলা

(১) দিনাজপুর জেলার সশস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধ

সাক্ষাতকারঃ সুবেদার আহম্মদ হোসেন

৩০৩ নাহিদ সুলতানা নীলা

(১) ঠাকুরগাঁ-দিনাজপুরের সশস্ত্র প্রতিরোধ

সাক্ষাৎকারঃ নায়েব সুবেদার আবু তালেব শিকদার

৩০৬ নাহিদ সুলতানা নীলা

(১) দিনাজপুরের সশস্ত্র প্রতিরোধ

সাক্ষাতকারঃ খন্দকার আবদুস সামাদ

৩০৭ নাহিদ সুলতানা নীলা

(১) মুক্তিযুদ্ধে দিনাজপুর

প্রতিবেদনঃ সত্যেন সেন

৩০৮ নাহিদ সুলতানা নীলা

(১) দিনাজপুরের সশস্ত্র প্রতিরোধের আরো বিবরণ (অনুবাদ)

সাক্ষাতকারঃ সুবেদার মেজর এ, রব (ডি-এ-ডি)

৩০৯ মুহসিন সরকার

 

 

 

 

 

 

 

দলিল নং-১১) সশস্ত্র প্রতিরোধঃ রাজশাহী

 

সাব-দলিল নং দলিলের বিষয় পৃষ্ঠা নং কম্পাইলার

(১) নওগাঁ-রাজশাহীর সশস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধ

সাক্ষাৎকার- ব্রিগেডিয়ার গিয়াসউদ্দিন চৌধুরী

৩২১

৩২১-৩২২> আলামিন সরকার

৩২৩-৩২৪> সায়েম চৌধুরী

৩২৫-৩২৭> অভিজিত ঘোষ

৩২৮> মোঃ রাশেদ হাসান (নোবেল)

(১) সারদা ও অন্যান্য স্থানের প্রতিরোধ যুদ্ধ

সাক্ষাৎকার- সুবেদার আলী মোহাম্মদ মকিবর রহমান সরকার

৩২৯ আলামিন সরকার

(১) রাজশাহী-বগুড়া-পাবনার প্রতিরোধ যুদ্ধ

সাক্ষাৎকারঃ সুবেদার খোন্দকার মতিউর রহমান

৩৩০ ফরহাদ

(১) চাপাইনবাবগঞ্জ-রাজশাহীর সশস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধ

সাক্ষাৎকার- হাবিলদার মোহাম্মদ ফসিউদ্দিন

৩৩২ সজীব বর্মন

(১) কানুপুরের যুদ্ধ

প্রতিবেদনঃ ‘দৈনিক বাংলা’

৩৩৪ তানিয়া ইমতিয়াজ লিপি

 

 

 

 

দলিল নং-১২) সশস্ত্র প্রতিরোধঃ বগুড়া

 

সাব-দলিল নং দলিলের বিষয় পৃষ্ঠা নং কম্পাইলার

(১) বগুড়ার ছাত্র জনতার প্রতিরোধ যুদ্ধ

প্রতিবেদনঃ সত্যেন সেন

৩৩৬ অথৈ ইসলাম

(১) বঙ্গবন্ধু ২৫শে মার্চে স্বাধীনতা ঘোষণার সাইকোস্টাইলের লিফলেট বিতরণ প্রসঙ্গ ও যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার নির্দেশ

(২) বগুড়ার সশস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধ
সাক্ষাৎকারঃ গাজীউল হক

৩৩৯ জেসিকা গুলশান তোড়া

 

দলিল নং-১৩) সশস্ত্র প্রতিরোধঃ পাবনা

 

সাব-দলিল নং দলিলের বিষয় পৃষ্ঠা নং কম্পাইলার

(১) পাবনা শহরে পুলিশ ও জনতার প্রতিরোধ যুদ্ধ

প্রতিবেদনঃ সত্যেন সেন

৩৪৮ রকিবুল হাসান জিহান

(১) সিরাজগঞ্জের সশস্ত্র প্রতিরোধ

সাক্ষাৎকার- মোজাফফর হোসেন

৩৫১ আলামিন সরকার

(১) শাহাজাদপুরসহ অন্যান্য স্থানের সশস্ত্র প্রতিরোধ

সাক্ষাৎকার-আব্দুর রহমান, প্রাক্তন গণপরিষদ সদস্য

৩৫৩ আলামিন সরকার

(১) মুক্তিপাগল এক সরকারী অফিসার

প্রতিবেদনঃ মনজুর আহমদ

৩৫৫ রকিবুল হাসান জিহান

 

 

 

দলিল নং-১৪) সশস্ত্র প্রতিরোধঃ বরিশাল-খুলনা-ফরিদপুর

 

সাব-দলিল নং দলিলের বিষয় পৃষ্ঠা নং কম্পাইলার

(১) বরিশালের সশস্ত্র প্রতিরোধ

সাক্ষাৎকার- মেজর মেহেদী আলী ইমাম

৩৫৭ আলামিন সরকার

(১) বরিশালের সশস্ত্র প্রতিরোধ

সাক্ষাৎকারঃ মহিউদ্দীন আহমদ, প্রাক্তন এম-টি

৩৬১ সমীরণ বর্মন

(১) বরিশাল প্রতিরোধ

সাক্ষাৎকার- আবদুল করিম সরদার, প্রাক্তন এমপি

৩৬৪ আলামিন সরকার

(১) বরিশালের সশস্ত্র প্রতিরোধ

সাক্ষাৎকারঃ ডাঃ মোহাম্মদ শাহজাহান

৩৬৪ আলামিন সরকার

(১) বরিশাল রণাঙ্গনে

প্রতিবেদনঃ সত্যেন সেন

৩৬৬ নিয়াজ মেহেদী

(১) গৌরনদীর প্রতিরোধ

প্রতিবেদনঃ শহীদ সেরনিয়াবাত

৩৭৪ সমীরণ বর্মন

(১) খুলনার মুক্তিযুদ্ধের প্রথম পর্ব

(২) খুলনার মুক্তিযুদ্ধের দ্বিতীয় পর্ব

(৩) মংলা পোর্টের বাহাদুর শ্রমিক ভাইয়েরা

প্রতিবেদনঃ সত্যেন সেন

৩৭৫ আলামিন সরকার

(১) খুলনা জেলার সশস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধ

সাক্ষাৎকারঃ মোমিন উদ্দিন আহম্মেদ, প্রাক্তন এমপি

৩৮১ আলামিন সরকার
(১) ফরিদপুরের প্রতিরোধ ৩৮১ সমীরণ বর্মন
১০ (১) ফরিদপুর শহরে প্রাথমিক প্রতিরোধ
প্রতিবেদনঃ সহকারি অধ্যাপক আহমেদ কামাল
৩৮৩ সৈয়দা অনন্যা রহমান

 

 

দলিল নং-১৫) পত্র-পত্রিকায় সশস্ত্র প্রতিরোধ

 

সাব-দলিল নং সংবাদের শিরোনাম ও পত্রিকার নাম পৃষ্ঠা নং কম্পাইলার

(১) পাক মিলিটারী তাণ্ডবে বাঙালির রক্ত ঝরছে

–যুগান্তর, ২৭ মার্চ, ১৯৭১

(২) কুমিল্লায় সংঘর্ষ

-যুগান্তর, ২৮ মার্চ, ১৯৭১

(৩) ওরা লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন-আরও গুলিগোলা চাই

-আনন্দবাজার পত্রিকা, ২৮ মার্চ, ১৯৭১

(৪) আওয়ামী লীগর নেতারা এপারে

তাঁদের আবেদনঃ অস্ত্র চাই

-আনন্দবাজার পত্রিকা, ৩০ মার্চ, ১৯৭১

(৫) সীমান্তের চারদিক থেকে

-আনন্দবাজার পত্রিকা, ৩০ মার্চ, ১৯৭১

(৬) বাংলাদেশ প্রায় পুরোই মুক্তিফৌজের কব্জায়

-যুগান্তর, ৩১ মার্চ, ১৯৭১

(৭) সকল রণাঙ্গনেই পাকফৌজ গা বাঁচিয়ে চলছে

-আনন্দবাজার পত্রিকা, ৩০ মার্চ, ১৯৭১

(৮) ইয়াহিয়া ফৌজের ‘বিদ্রোহী’ সেনাকে গুলি করে হত্যা

-আনন্দবাজার পত্রিকা, ১ এপ্রিল, ১৯৭১

(৯) যশোরের বোমাবর্ষণ

-যুগান্তর, ১ এপ্রিল, ১৯৭১

(১০) স্থলে, জলে, অন্তরীক্ষে পাক ফৌজের সর্বাত্মক অভিযান

-আনন্দবাজার পত্রিকা, ২ এপ্রিল, ১৯৭১

(১১) মুক্তিযোদ্ধারা যশোর দখল করেছে

-যুগান্তর, ২ এপ্রিল, ১৯৭১

(১২) বাংলাদেশের পশ্চিম ও উত্তর এলাকা মুক্তিফৌজের দখলে

-আনন্দবাজার পত্রিকা, ৪ এপ্রিল, ১৯৭১

(১৩) উত্তরাঞ্চলের চারটি জেলা মুক্তিফৌজের দখলে

-আনন্দবাজার পত্রিকা, ৫ এপ্রিল, ১৯৭১

(১৪) সমুদ্রবক্ষে পাক সাবমেরিনের বাঙালি নাবিকদের বিদ্রোহ

-আনন্দবাজার পত্রিকা, ৬ এপ্রিল, ১৯৭১

(১৫) গুরুত্বপূর্ণ রেলশহর পাবর্তীপুর মুক্ত

-আনন্দবাজার পত্রিকা, ৬ এপ্রিল, ১৯৭১

(১৬) পূর্ব রণাঙ্গনের খবর

-আনন্দবাজার পত্রিকা, ৭ এপ্রিল, ১৯৭১

(১৭) সোমবার জয়-বাংলার জয়ের পালা

-আনন্দবাজার পত্রিকা, ৮ এপ্রিল, ১৯৭১

(১৮) সংগ্রামের তৃতীয় সপ্তাহের সূচনায় পাকফৌজের পাল্টা অভিযান

(১৯) দূর্গ দখলের অভিযানে সেনাপতির সঙ্গী বেগম ওসমান

-আনন্দবাজার পত্রিকা, ৯ এপ্রিল, ১৯৭১

(২০) ঝিকরগাছায় পাকবাহিনীর সঙ্গে মুক্তিফৌজের প্রচণ্ড লড়াই

(২১) পদ্মার তীরে নতুন যুদ্ধ ফ্রন্ট

-যুগান্তর, ১০ এপ্রিল, ১৯৭১

(২২) হৃত সাম্রাজ্য পুনরুদ্ধারে মরিয়া পাক-বিমান

শহরে শহরে মুক্তিসেনার প্রতিরোধ

-আনন্দবাজার পত্রিকা, ১০ এপ্রিল, ১৯৭১

(২৩) কামানে বিমানে আগুয়ান হানাদার বাহিনী বনগাঁ সীমান্তের কাছাকাছি

(২৪) দিনাজপুর শহরের কাছে প্রচণ্ড লড়াই

-আনন্দবাজার পত্রিকা, ১১ এপ্রিল, ১৯৭১

(২৫) হারাগাছ ও তিস্তা সেতু এলাকা মুক্তিফৌজের হাতে এসেছে

-যুগান্তর, ১১ এপ্রিল, ১৯৭১

(২৬) HEAVY FIGHTING CONTINUES

Pak forces capture Pabna Town

(তীব্র সংঘর্ষ চলছে, পাবনা শহর পাকবাহিনীর হাতে)

– Hindustan Standard, 12 April, 1971

(২৭) রাজশাহী শহরের প্রশাসনভার মুক্তিফৌজের হাতে

-আনন্দবাজার পত্রিকা, ১৩ এপ্রিল, ১৯৭১

(২৮) ঢাকার উপকণ্ঠে লড়াই, দিনাজপুর আবার মুক্ত

হানাদারদের হাওয়াই হামলা

-আনন্দবাজার পত্রিকা, ১৫ এপ্রিল, ১৯৭১

(২৯) Army keeps up pressure on Sylhet, Comilla

Bid to capture Rajshahi foiled

(অনুবাদঃ সিলেট এবং কুমিল্লার উপর চাপ বজায় রাখছে পাকবাহিনী

রাজশাহী দখলের চেষ্টা ব্যর্থ)

-Hindustan Standard, 16 April, 1971

(৩০) রণাঙ্গণের খবর

-বাংলাদেশ, ১ম বর্ষ, ১ম সংখ্যা, ১৭ এপ্রিল, ১৯৭১

(৩১) আখাউড়া দখল নিয়ে জোর লড়াই

(৩২) পশ্চিম রণাঙ্গনে মুক্তিফৌজ গেরিলা কায়দায় লড়ছে

(৩৩) পাকফৌজের কুড়িগ্রামের দখলের চেষ্টা প্রতিহত

-আনন্দবাজার পত্রিকা, ১৮ এপ্রিল, ১৯৭১

(৩৪) মুক্তিফৌজের গেরিলা তৎপরতা বৃদ্ধি, আখাউড়ায় জোর লড়াই

-যুগান্তর, ১৯ এপ্রিল, ১৯৭১

(৩৫) মেহেরপুর আবার মুক্ত, শালুটিকরও বাংলাফৌজ নিয়ে নিলো-

সোমবার সাফল্যের পর সাফল্য

-আনন্দবাজার পত্রিকা, ২০ এপ্রিল, ১৯৭১

(৩৬) বাংলাদেশে লড়াইয়ের দ্বিতীয় পর্যায়

মুক্তিফৌজের সাঁড়াশী আক্রমণে পাকবাহিনী পর্যুদস্ত

-যুগান্তর, ২২ এপ্রিল, ১৯৭১

(৩৭) আরও কয়েকটি অঞ্চলে মুক্তিফৌজের সাফল্য

কসবা স্টেশন ও পাকশি সেতু পাক হানাদার মুক্ত

-আনন্দবাজার পত্রিকা, ২৩ এপ্রিল, ১৯৭১

(৩৮) ময়মনসিংহ ও ফরিদপুরে পাক আক্রমণ প্রতিহত

–যুগান্তর, ২৫ এপ্রিল, ১৯৭১

(৩৯) বেনাপোলে মুক্তিফৌজের হাতে পাকিস্তানী গোলন্দাজ বাহিনী ঘায়েল

-আনন্দবাজার পত্রিকা, ২৬ এপ্রিল, ১৯৭১

(৪০) In sylhet front, pak army falls to break resistance

(অনুবাদঃ পূর্ব ও পশ্চিম রণাঙ্গনে মুক্তিফৌজের ব্যাপক গেরিলা তৎপরতা)

-Hindustan Standard, 27 April, 1971

(৪১) পূর্ব ও পশ্চিম রণাঙ্গনে মুক্তিফৌজের ব্যাপক গেরিলা তৎপরতা

-যুগান্তর, ২৮ এপ্রিল, ১৯৭১

(৪২) গোয়ালন্দে অনূন্য একশ পাকসৈন্য নিহত

-যুগান্তর, ১ মে, ১৯৭১

(৪৩) মুক্তিফৌজের পাল্টা আক্রমণে ছদ্মবেশী পাক-হানাদাররা পর্যুদস্ত

-আনন্দবাজার পত্রিকা, ১ মে, ১৯৭১

(৪৪) নোয়াখালী ও কুমিল্লায় গুরুত্বপূর্ণ সড়ককেন্দ্র মুক্তিফৌজের দখলে

-যুগান্তর, ৫ মে, ১৯৭১

(৪৫) মুক্তিফৌজের গেরিলা তৎপরতা বৃদ্ধি, আখাউড়ায় জোর লড়াই

-আনন্দবাজার পত্রিকা, ৭ মে, ১৯৭১

(৪৬) বিভিন্ন রণাঙ্গনে মুক্তিফৌজের ব্যাপক গেরিলা আক্রমণ

(৪৭) প্রখ্যাত খেলোয়াড়ের মুক্তিফৌজে যোগদান

-যুগান্তর, ১ মে, ১৯৭১

(৪৮) আখাউড়ায় প্রচণ্ড লড়াইঃ ১৫০ পাক সেনা নিহত

-আনন্দবাজার পত্রিকা, ৯ মে, ১৯৭১

(৪৯) কুমিল্লা ও আখাউড়ায় তিনদিন তুমুল লড়াইঃ

তিনশ’ পাকসেনা খতম

-যুগান্তর, ১০ মে, ১৯৭১

(৫০) বিভিন্ন রণাঙ্গনে মুক্তিফৌজের ব্যাপক গেরিলা আক্রমণ

-আনন্দবাজার পত্রিকা, ২ মে, ১৯৭১

(৫১) মুক্তিফৌজ এখনো প্রচণ্ড লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন

-যুগান্তর, ১৪ মে, ১৯৭১

(৫২) গেরিলা আক্রমণে রেলপথ ও সেতু ধ্বংস, তামাবিল হাতছাড়া

-আনন্দবাজার পত্রিকা, ১৫ মে, ১৯৭১

(৫৩) শুভপুর সেতুর দখল নিয়ে প্রচণ্ড লড়াই, দুশো পাক সৈন্য নিহত

-যুগান্তর, ১৮ মে, ১৯৭১

(৫৪) কমান্ডোদের চোরাগোপ্তা আক্রমণ বহু পাকসৈন্য খতম

(৫৫) এক সপ্তাহের লড়াইয়ে আরও সহস্ত্রাধিক শত্রু সৈন্য নিহত

-জয়বাংলা, ১ম বর্ষ, ২য় সংখ্যা, ১৯ মে, ১৯৭১

(৫৬) মুক্তিফৌজের অতর্কিত আক্রমণে পাকসেনারা নাজেহাল

-যুগান্তর, ১৯ মে, ১৯৭১

(৫৭) গেরিলা বাহিনীর হাতে ৬১ জন পাকসেনা খতম

-যুগান্তর, ২১ মে, ১৯৭১

(৫৮) ঢাকায় গ্রেনেড আক্রমণের কথা পরোক্ষে স্বীকার

-আনন্দবাজার পত্রিকা, ১২ মে, ১৯৭১

(৫৯) স্টীমার আটক করে ১৭ জন পাকিস্তানীর প্রাণদণ্ডাদেশ

-আনন্দবাজার পত্রিকা, ২৪ মে, ১৯৭১

(৬০) নারায়ণগঞ্জ শহরে মুক্তিফৌজ গেরিলা ‘সক্রিয়’

-যুগান্তর, ২৪ মে, ১৯৭১

(৬১) জীবন দিয়ে প্রতিশোধ গ্রহণ

-যুগান্তর, ২৫ মে, ১৯৭১

(৬২) খোদ ঢাকায় মুক্তিবাহিনীর হামলাঃ এক সপ্তাহে

আরো ৬ শত শত্রুসৈন্য খতম

-জয়বাংলা, ১ম বর্ষ, ৩য় সংখ্যা, ২৬ মে, ১৯৭১

(৬৩) তামাবিল ঘাটি আবার মুক্তিফৌজের দখলে

-আনন্দবাজার পত্রিকা, ২৭ মে, ১৯৭১

(৬৪) বাংলাদেশের বিভিন্ন রনাঙ্গনে মুক্তিফৌজের সফল সংঘর্ষ

-যুগান্তর, ২৮ মে, ১৯৭১

(৬৫) Guerilla Actions Intensified in Dhaka

150 Pak Troops Killed

(অনুবাদঃ ঢাকায় আরো তীব্র হচ্ছে গেরিলা হামলা

-Hindustan Standard, 29 May, 1971

(৬৬) মুক্তিফৌজের অর্তকিত আক্রমনে শত্রুসৈন্য অতিষ্ঠ

-যুগান্তর, ৩০ মে, ১৯৭১

(৬৭) “আমরা ক্ষান্ত হবো নাঃ গৌরকিশোর ঘোষ

–আনন্দবাজার পত্রিকা, ৩১ মে, ১৯৭১

(৬৮) Mukti Fouj killed 100 Pakistani Soldiers

–Hindustan standard, 31 May, 1971

(অনুবাদঃ মুক্তিফৌজের আক্রমণে ১০০ পাকসেনা নিহত)

(৬৯) ভারতীয় এলাকায় পাকসেনাদের গোলাবর্ষণ অব্যাহত

–কালান্তর, ১ জুন, ১৯৭১

(৭০) চুকনগরে পাকসৈন্যের বেপরোয়া গুলি

(৭১) বাংলাদেশের বিভিন্ন রণাঙ্গনে গেরিলা বাহিনীর তৎপরতা

-কালান্তর, ২ জুন, ১৯৭১

(৭২) কমান্ডো আক্রমণে পাকসৈন্য মরছে

-আনন্দবাজার পত্রিকা, ৪ জুন, ১৯৭১

(৭৩) Guerrilla Tactics of Mukti Fouj

Paying Dividends

(অনুবাদঃ মুক্তিফৌজের গেরিলা কৌশল সফলতার মুখ দেখছে)

-Hindustan Standard, 5 June, 1971

(৭৪) পাকসৈন্যরা মুজিবনগর দখলে ব্যর্থ

-যুগান্তর, ৬ জুন, ১৯৭১

(৭৫) মুক্তিযুদ্ধ চলছে

-যুগান্তর, ৭ জুন, ১৯৭১

(৭৬) মুক্তিফৌজের ব্যাপক ও প্রচণ্ড আক্রমণে বহু পাকসৈন্য খতম

-যুগান্তর, ৯ জুন, ১৯৭১

(৭৭) Mukti Fouj Intensifies

(অনুবাদঃ মুক্তিফৌজ ঘনীভূত হচ্ছে)

-Hindustan Standard, 10 June, 1971

(৭৮) মুক্তিযোদ্ধারা দেশের মাটি থেকে পাক হানাদারদের

উৎখাত করতে বদ্ধপরিকর

-কালান্তর, ১১ জুন, ১৯৭১

(৭৯) পাক হানাদারদের উপর মুক্তিফৌজের পাল্টা আক্রমণ

-কালান্তর, ১২ জুন, ১৯৭১

(৮০) কুমিল্লা শহরে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা

-যুগান্তর, ১২ জুন, ১৯৭১

(৮১) গেরিলা আক্রমণে বাংলা বাহিনীর অপূর্ব সাফল্য

-বঙ্গবাণী, ১ম বর্ষ, ৪র্থ সংখ্যা, ১৩ জুন, ১৯৭১

(৮২) মেহেরপুরের পাকবাহিনীর এক প্ল্যাটুন সৈন্য খতম

-যুগান্তর, ১৪ জুন, ১৯৭১

(৮৩) Mukti Fouj Active on Wide Front in Bangladesh

(অনুবাদঃ যুদ্ধে ব্যাপক হারে তৎপরতা মুক্তিবাহিনীর)

-Hindustan Standard, 16 June, 1971

(৮৪) চট্টগ্রাম এলাকায় মুক্তি ফৌজের তৎপরতা

-আনন্দবাজার পত্রিকা, ২০ জুন, ১৯৭১

(৮৫) মুক্তিফৌজের ভয়ে পাকসৈন্য সদা-সন্ত্রস্ত

-যুগান্তর, ২৩ জুন, ১৯৭১

(৮৬) খান সেনাদের ওপর মুক্তিবাহিনীর আক্রমণ তীব্রতর হয়েছেঃ

আরো সাত শতাধিক সৈন্য খতম

-জয়বাংলা, ১ম বর্ষ, ৭ম সংখ্যা, ২৫ জুন, ১৯৭১

(৮৭) Mukti Fouj kills 600 Pak Soldiers in Two Days

(অনুবাদঃ মুক্তিফৌজ ২ দিনে ৬০ জন পাকসেনা খতম করেছে)

-Hindustan Standard, 28 June, 1971

৩৮৬

 

৩৮৬

 

৩৮৭

 

৩৮৭

 

 

৩৮৮৯০

৩৯০-৯

৩৯

 

৩৯৩

 

৩৯৩

 

৩৯৪

 

 

৯৫

 

৩৯৫

 

 

৩৯৬

 

৩৯৮

 

 

৩৯৯

 

৩৯৯

 

৪০০

 

৪০২

 

৪০৩

 

 

৪০৩

 

৪০৩

 

৪০৪

 

 

৪০৫

 

৪০৫

 

৪০৫

 

 

৪০৭

 

 

 

৪০৯

 

৪১০

 

 

৪১১

 

 

 

 

 

 

৪১২

 

৪১৩

৪১৩

৪১৩

 

৪১৪

 

 

৪১৫

 

 

 

৪১৬

 

 

৪১৭

 

 

৪১৭

 

৪১৮

 

 

৪১৮

 

 

 

 

৪২০

 

 

৪২১

 

৪২

 

 

৪২২

 

 

৪২৩

 

 

৪২৪

 

৪২৪

 

৪২৪

 

৪২৫

 

 

৪২৬

 

 

৪২৭

 

৪২৭

 

 

৪২৮

 

 

৪২৮

 

৪২৯

 

 

৪৩১

 

 

৪৩১

 

৪৩১

 

৪৩২

 

 

৪৩২

 

৪৩২

 

৪৩৩

 

 

৪৩৪

 

৪৩৪

 

 

৪৩৫

 

 

 

৪৩৬

 

৪৩৬

 

৪৩৭

 

৪৩৭

৪৩

 

 

৪৩৮

৪৩৮

 

 

৪৩৯

 

৪৪০

 

 

 

 

৪৪০

 

৪৪১

 

৪৪২

 

 

৪৪২

 

 

৪৪৩

 

 

৪৪৪

 

 

৪৪৫

 

৪৪৫

 

৪৪৬

 

৪৪৬

 

 

 

৪৪৬

 

৪৪৬

 

৪৪৭

 

 

 

৪৪৮

৩৮৬-৪১৫> সাইফুল ইসলাম

 

 

 

৪১৬> শ্রাবণ চৌধুরী

 

 

 

৪১৭-৪২১> সায়েম চৌধুরী

 

 

 

৪২২-৪২৬> সজীব বর্মন

 

 

 

৪২৭-৪৩০> তানিয়া ইমতিয়াজ লিপি

 

 

 

৪৩১-৪৩৩> সমীরণ বর্মন

 

 

 

৪৩৪-৪৩৭> সৈয়দা অনন্যা রহমান

 

 

 

৪৩৮-৪৪৮> বোরহান উদ্দিন খলিফা (শামীম)

 

 

 

 

 

 

দলিলের এই অংশে ইংরেজী পত্রিকার ৯টি রিপোর্ট আছে। এই রিপোর্টগুলো যারা ইংরেজী থেকে অনুবাদ করেছেনঃ

 

৪০৭> রাইসা সাবিলা

 

 

৪১১> রাইসা সাবিলা

 

 

৪১৮> রাইসা সাবিলা

 

 

৪৩৫> রাইসা সাবিলা

 

 

৪৩৭> আলামিন সরকার

 

 

৪৩৯> তাজকিয়া ইসাবা

 

 

৪৪২> আমিনুল হক পলাশ

 

 

৪৪৬> রাইসা সাবিলা

 

 

৪৪৮> আলামিন সরকার

 

 

 

 

দলিল নং-১৬) সশস্ত্র সংগ্রামে গেরিলা বাহিনী(কাদের বাহিনী, আফসার ব্যাটালিয়ান, হেমায়েত বাহিনী, ঢাকায় গেরিলা অপারেশন)

 

সাব-দলিল নং দলিলের বিষয় পৃষ্ঠা নং কম্পাইলার
(১) কাদের বাহিনীর গঠন ও যুদ্ধ তৎপরতা-১
সাক্ষাৎকারঃ কাদের সিদ্দিকী
১৯৭২
৪৫০ আলামিন সরকার

(১) কাদের বাহিনী সাড়ে তিনশো লড়াইয়ে অংশ নিয়েছে

(২) শত্রুর মোকাবিলা করেই কাদের বাহিনী যুদ্ধ শিখছে

(৩) যুদ্ধে কখনো হারি নি-কিন্তু নাগপুরের কোন যুদ্ধে আমি জিতি নিঃ কাদের সিদ্দিকী

(৪) আমার পরিচয় পেয়ে নিয়াজী তড়াক করে দাঁড়িয়ে আমাকে স্যালুট করলো

প্রতিবেদনঃ হেদায়েত হোসাইন মোরশেদ

৪৫১

 

৪৫৩

 

৪৫৫

 

৪৫৮

বোরহান উদ্দিন খলিফা (শামীম)

(১) কাদের বাহিনী সম্পর্কিত আরো বিবরণ-৩

প্রতিবেদনঃ মোহাম্মদ মোদাব্বের

৪৫৯ নাহিদ সুলতানা নীলা

(১) আফসার ব্যাটালিয়ন

প্রতিবেদনঃ মোহাম্মদ হাফিজুর রহমান

৪৬৪

৪৬৪-৪৬৮> সায়েম চৌধুরী

 

৪৬৯-৪৭৪> আলামিন সরকার

(১) হেমায়েত বাহিনী

প্রতিবেদনঃ এম, এম সামাদ

৪৭৪ আলামিন সরকার

(১) ঢাকায় গেরিলা অপারেশন-১

সাক্ষাৎকারঃ মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া

৪৭৮ এম হোসাইন সজীব

(১) ঢাকায় গেরিলা অপারেশন-২

সাক্ষাৎকার এ, মাসুদ (চুল্লু)

৪৮০ আলামিন সরকার

(১) ঢাকায় গেরিলা অপারেশন-৩

সাক্ষাৎকারঃ আবদুস সামাদ

৪৮০

সায়েম চৌধুরী

 

সজীব বর্মন

(১) ঢাকায় গেরিলা অপারেশন-৪

সাক্ষাৎকারঃ নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু

৪৮৬ ডেমিয়েন থর্ন
১০

(১) ঢাকায় গেরিলা অপারেশন-৫

প্রতিবেদন: শাহাদাত চৌধুরী

৪৯০ ডেমিয়েন থর্ন
১১

(১) ঢাকায় গেরিলা অপারেশন-৬

প্রতিবেদন- মোঃ জহিরুল হক

৪৯২ তাজকিয়া ইসাবা

 

সশস্ত্র প্রতিরোধঃ ঢাকা

 

শিরোনাম সূত্র তারিখ
১। ঢাকার সশস্ত্র প্রতিরোধের বিবরণ বাংলা একাডেমীর দলিলপত্র ১৯৭১

 

<৯, ১.১, ১-৯>

ঢাকা সেনানিবাস ও শহরে যা ঘটেছিল

সাক্ষাৎকারঃ লেঃ কর্নেল আবু তাহের সালাউদ্দিন

(১৯৭১ সালে পালিস্তান সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা বিভাগে ক্যাপ্টেন পদে ঢাকা সেনানিবাসে কর্মরত ছিলেন)
অহিংসা ও অসহযোগ আন্দোলনের সময় যেসকল ছোটখাটো গণ্ডগোল আরম্ভ হয় তাতে পাকিস্তান সরকার সম্পূর্ণরূপ আওয়ামী লীগের উপর দোষারোপ করে এবং এই দোষ দিয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনী সরকারের সহযোগিতায় ২৫ শে মার্চ বাংলাদেশে সীমাহীন গনহত্যা চালায়। কিন্তু এই হত্যার পরিকল্পনা অসহযোগ আন্দোলনের পূর্ব থেকে পাকিস্তান সরকার ও সেনাবাহিনী ছিল। তার কারণস্বরূপ-

 

যে কোন দেশে সেনাবাহিনীর সৈন্য এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় মোতায়েন করতে হলে তার মূল জায়গা অর্থাৎ যেখানে থেকে সৈন্য পাঠান হয় সেই জায়গায় প্রতিরিক্ষার উপর প্রথম গুরুত্ব দিতে হয় এবং সেটা করতে পারলেই সেই জায়গা থেকে সরানোর আদেশ হয়। (এখানে উল্লেখ করা যায় যে, পাকিস্তান সামরিক সরকার ফেব্রুয়ারি, ১৯৭১ থেকেই এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে থাকে। তাতেই প্রমান হয় যে পাকিস্তান সামরিক সরকারের সুপরিকল্পনা ছিল)।

 

যেহেতু সীমান্ত এলাকায় শত্রুদেশের সৈন্যের সঙ্গে কোন ছোটখাটো গোলাগুলি বিনিময় হয়নি বা দেশের জনসাধারণ ও খবরের কাগজে যুদ্ধের কোন হুমকির আভাসও পাওয়া যায়নি তথাপি পাকিস্তান সরকারের এরূপ সৈন্য মোতায়েন (বিভিন্ন থানা পর্যায়ে) প্রমান হয় যে পাকিস্তানী সামরিক সরকার বাংলাদেশের জনসাধারনের উপর গনহত্যার পরিকল্পনা পূর্ব থেকেই করেছিল।

 

১লা মার্চ, ৭১ থেকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ জেনারেলগন বিভিন্ন সময় ঢাকাসহ বিভিন্ন ক্যান্টনমেন্টে গিয়ে সম্মেলন করেন। তাদের মধ্যে কয়েকজন হলেনঃ

(১) লেঃ জেঃ টিক্কা খান, কমান্ডার ইস্টার্ণ কমাণ্ড।

(২) মোঃ জেঃ খাদেম হোসেন রাজা, জি-ও-সি, ১৪ ডিভিশন।

(৩) জেনারেল আব্দুল হামিদ খান, চীফ অব আর্মি স্টাফ।

(৪) লেঃ জেঃ এ,এ,কে নিয়াজী, কোর কমান্ডার।

(৫) মেঃ জেঃ আকবর হোসেন, ডাইরেক্ট জেনারেল, ইন্টার সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্স।

(৬) মোঃ জেঃ ওমর,চেয়ারম্যান, ন্যাশনাল সিকিউরিটি কমিশন।

(৭) মেঃ জেঃ কমর আলী মীর্জা,প্রাক্তন ডাইরেক্টর, মিলিটারী ইন্টেলিজেন্স (তখন-ডাইরেক্টর সাপ্লাই এণ্ড ট্রান্সপোর্ট।

(৮) মেঃ জেঃ মিঠঠা খান, স্পেশাল সার্ভিস গ্রুপ কমান্ডার এণ্ড কোয়ার্টার মাস্টার জেনারেল।

(৯) মেঃ জেঃ খোদা দাদ, এডজুট্যান্ট জেনারেল।

(১০) মেঃ জেঃ গুল হাসান, চীফ অব দি জেনারেল স্টাফ।

(১১) মেঃ জেঃ রাও ফরমান আলী খান, সিভিল এফেয়ার্স এডভাইজার, গভর্ণমেন্ট অব আনসারী পাকিস্তান।

(১২) ব্রিগেডিয়ার আনসারী (মেঃ জেঃ আনসারী) (স্টেশন ,ঢাকা), (পরে জি-ও-সি, ৯-ডিভিশন)।

(১৩) মেঃ জেঃ নজর হুসেন শাহ।

(১৪) মেঃ জেঃ কাজী আবদুল মজিদ।

(১৫) লেঃ জেঃ পীরজাদা, (পি-এস-ও-টু জেঃ ইয়াহিয়া খান)।

(১৬) মেজর জেনারেল জামশেদ।

(১৭)মেঃ জেঃ বাহাদুর শের।

 

সৈন্য বিভিন্ন এলাকায় মোতায়েন করার পূর্বে কতকগুলো দিক চিন্তা করতে হয়, যেমন সৈন্যদের থাকা, খাওয়া, বেতন, যানবাহন, যোগাযোগ ইত্যাদি। তাছাড়া ডাটা, ম্যাপ ইত্যাদি করতে হয়। পঁচিশে মার্চের গনহত্যা যদি হঠাৎই হতো তাহলে পাকিস্তানি সৈন্যগন ২৫ শে মার্চে বাংলাদেশের প্রত্যেক গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় একই সাথে একই সময়ে বাঙালি সৈন্য, ই-পি-আর, পুলিশ, আনসার, তথা জনসাধারনের উপর উপর আক্রমন ও গনহত্যা চালায় কিভাবে! এতেই প্রমান হয় যে পাকিস্তান সামরিক সরকারের পূর্ব পরিকল্পনা নিশ্চয়ই ছিল।

 

১৫ই মার্চ, ৭১ এ প্রেসিডেন্ট জেঃ ইয়াহিয়া খান ঢাকায় এসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান ও আওয়ামী লীগ নের্তৃবর্গের সঙ্গে রাজনৈতিক সমস্যা, ক্ষমতা হস্তান্তর, অসহযোগ আন্দোলন প্রভৃতি সম্পর্কে প্রেসিডেন্ট হাউসে (বর্তমান গনভবন) এবং বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সভায় আলোচনা করেন। অপরদিকে রাতের অন্ধকারে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে উপোরোল্লিখিত জেনারেলদের সঙ্গে গোপন বৈঠক চলত।

 

যেহেতু আর্মি ইন্টেলিজেন্স এ ছিলাম ও সাধারণ পোশাকে কর্তব্য পালন ও চলাফেরা করতাম, সেজন্যই আমি পাকিস্তান সামরিক সরকারের কার্যকলাপ অনুসরণ করতে পারি।

 

২৫শে মার্চের পূর্বেই তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান সেনাবাহিনী তে যে সমস্ত উচ্চপদস্থ বাঙালি অফিসার ছিলেন, তাঁদেরকে বিভিন্ন অজুহাতে তাঁদের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। কয়েকজন বাঙালি অফিসারসহ কিছু বাঙালি সৈন্য পশ্চিম পাকিস্তানে পাঠায়। পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থানরত পাঞ্জাবী সৈন্যদের সঙ্গে যে সমস্ত বাঙালি সৈন্য ছিলেন তাঁদেরকে নিরস্ত্র করা হয়। বেঙ্গল রেজিমেন্টের সকল সৈন্যকে সীমান্ত এলাকায় প্রেরণ করে ভারতের হুমকির অজুহাতে।

 

যেসকল বাঙালি অফিসারকে স্ব স্ব পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় ও কয়েকজনকে অন্য পদে দেওয়া হয়, তাদের পরিচয় যথাক্রমেঃ

 

(১) মেজর (বর্তমানে কর্নেল) খালেদ মোশাররফ, চীফ অব জেনারেল স্টাফ, বাংলাদেশ আর্মি। তিনি ছিলেন ৫৭-ব্রিগেড হেডকোয়ার্টারের (ঢাকা) ব্রিগেড মেজর (ব্রিগেড মেজরের কাজ হচ্ছে ব্রিগেডের অপারেশন প্লান করা এবং পরিচালনা করা)। মেজর খালেদ মোশাররফকে পাঠায় কুমিল্লা ৪র্থ বেঙ্গল রেজিমেন্টে এবং তদস্থলে একজন পাঞ্জাবী অফিসারকে নিয়োগ করে।

 

(২) ব্রিগেডিয়ার মজুমদার। তিনি চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টারের কমান্ডান্ট ছিলেন।তাঁকে ২২শে মার্চ ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে আসা হয় এবং গৃহবন্দী অবস্থায় রাখা হয়।তার সঙ্গে ছিলেন ক্যাপ্টেন আমিন আহমেদ চৌধুরী। ক্যাপ্টেন চৌধুরী (বর্তমানে মেজর) বর্তমানে বাংলাদেশ ১৬-বেঙ্গল রেজিমেন্টের কমাণ্ড’র।

 

(৩) লেঃ কঃ মাসুদুল হাসান খান। তিনি ২য় বেঙ্গল রেজিমেন্টে জয়দেবপুরে ছিলেন। তাঁকে ২২শে অথবা ২৩শে মার্চ ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে আসে এবং তাকেও গৃহবন্দী করে এবং তার স্থলে লেঃ কঃ রকিবকে জয়দেবপুর ২য় বেঙ্গল রেজিমেন্টে পাঠায়। কারণ লেঃ কঃ রকিব ৩২-পাঞ্জাব রেজিমেন্টেই ঢাকায় ২৫শে মার্চের রাতে গনহত্যা চালায়। এছাড়াও কয়েকজন বাঙালি অফিসারকে ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় রাখা হয়। তাদেরকে বাইরের যোগাযোগ থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত করা হয়।

 

বেঙ্গল রেজিমেন্টকে কয়েকটি ক্যান্টনমেন্ট থেকে সীমান্ত এলাকায় মোতায়েন করা হয়। যেমন, প্রথম বেঙ্গল রেজিমেন্টকে যশোর ক্যাণ্টনমেন্ট থেকে চৌগাছা (সীমান্ত এলাকা) পাঠায়। ২য় বেঙ্গল রেজিমেন্টকে জয়দেবপুর থেকে তাদেরকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য একব কোম্পানী পাঠায় টাঙ্গাইল। উক্ত কোম্পানীর কমান্ডার ছিলেন মেজর শফিউল্লাহ (বর্তমানে ব্রিগেডিয়ার-চীফ অব বাংলাদেশ আর্মি)। অন্য একটি পাঠায় ময়মনসিংহে। উক্ত কোম্পানীর কমান্ডার ছিলেন মেজর নূরুল ইসলাম (বর্তমান লেঃ কর্নেল)।

 

সৈয়দপুরে অবস্থিত ৩য় বেঙ্গল রেজিমেন্টকে কয়েক ভাগে বিভক্ত করে সীমান্ত এলাকায় পাঠায়। কুমিল্লায় অবস্থিত ৪র্থ বেঙ্গল রেজিমেন্ট কে পাঠায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। উক্ত রেজিমেন্টের কমান্ডার ছিলেন মেজর (বর্তমান কর্নেল) খালেদ মোশাররফ। ৮ম বেঙ্গল রেজিমেন্ট ছিল চট্টগ্রামে। তাদেরকে পশ্চিম পাকিস্তানে পাঠানোর আপ্রান চেষ্টা করে ব্যার্থ হয়ে চট্টগ্রাম শহর ও বন্দর এলাকায় মোতায়েন করে। ১০ম বেঙ্গল রেজিমেন্টকে (ন্যাশনাল সার্ভিস ব্যাটেলিয়ন, যার অধিকাংশই ছাত্রদের নিয়ে গঠিত হয়েছিল) ২৫শে মার্চের পূর্বেই ঢাকায় নিরস্ত্র করে। এছাড়াও ৬০৪ ফিল্ড ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের প্রায় ২৫ জন বাঙালিকে (যার সেকেণ্ড-ইন-কমাণ্ড ছিলাম আমি নিজেই) নিরস্ত্র করা হয়। শুধুমাত্র আমার অস্ত্রটা নিতে তারা সাহস করে নাই। তাছাড়া ঢাকায় অবস্থানরত নিম্নপদের সৈন্যগন যেমন সিগনাল রেজিমেন্ট, ইঞ্জিনিয়ার ব্যাটালিয়ন, ৬০৪ কম্বাইণ্ড ওয়ার্কশপ, ১৪৭ ইনফ্যানট্রি ওয়ার্কশপ, সাপ্লাই এণ্ড ট্রান্সপোর্ট ব্যাটালিয়ন, স্টেশন সাপ্লাই ডিপো, গাজীপুর অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরী, কম্বাইণ্ড অর্ডন্যান্স ডিপো, স্টেশন সাপ্লাই ডিপো, ট্রানজিট ক্যাম্প,ফিল্ড এম্বুলেন্স ও পাকিস্তান বিমান বাহিনীর সমস্ত সৈন্যদেরকে অতি কায়দায় ও চালাকি করে নিরস্ত্র করে। বাঙালিকে কেন নিরস্ত্র করা হচ্ছে পাঞ্জাবীরা তার কারণস্বরূপ দেখায় যে, যারা বাঙালি তারা বাঙালি আইন-শৃংখলা ভঙ্গকারী জনগনের উপর গুলি চালাতে সক্ষম হবে না। জনগনের উপর গুলি চালাতে আমাদের মায়া-মমতা লাগা স্বাভাবিক। কাজেই পাঞ্জাবীদের হাতে অস্ত্র কম থাকায় আমাদের অস্ত্র নিয়ে আইন শৃংখলা স্বাভাবিক ও আয়ত্তে আনার চেষ্টা করবে- এই কারনে আমাদের কাছ থেকে অস্ত্র নিচ্ছে।

 

অসহযোগ আন্দোলন চলাকালীন শাহেদ নসরুল্লাহ (ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র) আমার অফিসে প্রায়ই দেখা করত ও আমার নিকট থেকে খবরাখবর নিত। শাহেদ নসরুল্লাহ এভাবে আসা যাওয়া করাতে আমাকে আমার অফিসার কমান্ডিং মেজর মনোয়ার হোসেন জিজ্ঞাসা করেন যে ছেলেটি কে এবং কেন আসে। আমি আমার আত্মীয় বলে পরিচয় দেই এবং জানাই যে, যেহেতু আমাকে ক্যান্টনমেন্ট থেকে বের হতে দেয়া হয় না সেজন্য আমার সঙ্গে দেখা করতে আসে। পরে একদিন শাহেদ নসরুল্লাহ যখন আমার অফিস থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিল তখন রাস্তায় মেজর মনোয়ার হোসেনের হাওলাদার মোঃ আশরাফ তার ফটো তুলে নেয়।

 

পরদিন নসরুল্লাহ আমার নিকট এসে হাওলাদার কর্তৃক তার ফটো তোলার কথা জানায়। আমি নসরুল্লাহকে সাহস দিয়ে বলি ওতে কিছু হবে না। এরপর পাকিস্তান পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান জুলফিকার আলী ভূট্টো যখন ঢাকায় আসে তখন শাহেদ ছাত্রনেতাদের নের্তৃত্বে একটি ছাত্র ও গনবিক্ষোভ মিছিল হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে পৌঁছে এবং ভূট্টো কে নিন্দা করে বিভিন্ন শ্লোগান দেয়। ঐ মিছিলে শাহেদ নসরুল্লাহর শ্লোগান দেওয়া ফটোটি ‘দি পিপল’ পত্রিকায় দেখা যায়। পিপল পত্রিকায় নসরুল্লাহর ফটো দেখা মাত্র মেজর মনোয়ার হোসেন আমাকে ডেকে বলেন, যে ছেলেটি তোমার নিকট আসে ও তোমার আত্মীয়, সে তো একজন ছাত্রনেতা সে ছেলেটি মিছিলে নের্তৃত্ব দিয়েছিল। তিনি পিপল পত্রিকাটির কপি এনে আমাকে দেখান। তখন আমি মেজর মনোয়ার হোসেন কে জানাই যে আমি সঠিক কিছু বুঝতে পারছি না, সে তো কোনদিন ছাত্ররাজনীতি করতো না। এর থেকে মেজর মনোয়ার হোসেন আমাকে আরও বেশী সন্দেহের চোখে দেখেন।

 

এরপর ১৫ই মার্চ থেকে ২৩শে মার্চ পর্যন্ত ইয়াহিয়া খানের ঢাকা আগমন ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানসহ আওয়ামী লীগ ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার অগ্রগতির কথা শুনে আমরা কিছুটা আশাবাদী ছিলাম যে তারা সম্ভবত আওয়ামী লীগকে শান্তিপূর্ণ ভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে। আমরা বাঙালি অফিসাররাও পাঞ্জাবীদের মতিগতিকে তেমনভাবে লক্ষ্য করতাম না আওয়ামী লীগ ক্ষমতা পাবে মনে করে (আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক জনাব তাজউদ্দীনের প্রেসনোটের উপর ভিত্তি করে)।

 

২৩শে মার্চ প্রদেশব্যাপী ছাত্র ও গণহত্যার প্রতিবাদে ঢাকায় প্রত্যেক বাঙালির ঘরে ঘরে বাংলাদেশের পতাকা ও কালো পতাকা উত্তোলিত হয় এবং ২৪শে মার্চ সকালে পাকিস্তান ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির প্রেসিডেন্ট ওয়ালী খানসহ আরও কয়েকজন পশ্চিম পাকিস্তানী রাজনৈতিক নেতার ঢাকা ত্যাগ করে যাওয়ায় আমাদের মনে সন্দেহ হয় এজন্য যে, হয়তবা আলোচনা মোটেই ফলপ্রসূ হয় নাই।

 

২৫শে মার্চ আমি আকস্মিকভাবে বিকেল চারটায় ক্যান্টনমেন্ট থেকে বাইরে চলে যাই আত্মীয়স্বজনের সাথে দেখা করতে। দুর্ভাগ্যবশত শহর থেকে আমার মেসে ফিরতে রাত প্রায় ৯টা বেজে যায়। আমি ক্যান্টমেন্টে এসে সোজা আমার কক্ষে না গিয়ে ডাইনিং হলে যাই। খাওয়ার টেবিলে পাঞ্জাবী অফিসাররা উপস্থিত ছিল। খাবার পরে সাড়ে ন’টায় আমার কক্ষে যাই। সেখানে সিপাই মোশাররফ হোসেন (বাঙালি) আমার জন্য অপেক্ষা করছিল। আমাকে দেখেই সে আমার নিকট ছুটে আসে এবং জানায় যে, সে আমার জন্য বিকেল ৪টা থেকে অপেক্ষা করছে। একথা বলেই সে সঙ্গে সঙ্গে তার পকেট থেকে ছোট এক টুকরো কাগজ বের করে আমার হাতে দেয়।

 

উক্ত চিঠিখানা লিখেছিলেন ৩১-ফিল্ড রেজিমেন্ট আর্টিলারীর ক্যাপ্টেন (বর্তমান মেজর) খুরশীদ আলম চৌধুরী। তিনি লিখেছিলেন, ৩১-ফিল্ড রেজিমেন্ট আর্টিলারীর কমান্ডিং অফিসার কর্নেল জাহেদ হাসান ঐদিন (২৫ শে মার্চ) বেলা আড়াইটায় নির্দেশ দিয়েছেন অদ্য রাতে (২৫ শে মার্চ) তার রেজিমেন্ট কে শহরে যাবার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। শহরে আইন-শৃংখলা রক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে বলে জানান এবং আরও বলেন যে যদিও শান্তি-শৃংখলা রক্ষা করার শহরে যাওয়া হবে তবু একটা যুদ্ধের প্রয়োজনীয় অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ সঙ্গে নিতে হবে। আরও বলেছিলেন যে, তার নির্দেশের পর কোন বাঙালি অফিসার বা জোয়ানরা রেজিমেন্ট এলাকা থেকে কোনক্রমেই বাইরে যেতে পারবে না (তখন থেকে যতক্ষন পর্যন্ত রেজিমেন্ট শহরের উদ্দেশ্যে বের না হয়)। উক্ত ক্যাপ্টেন খুরশীদ আলম চৌধুরীর পক্ষে আমার নিকট চিঠিখানা এজন্যই পাঠানো সম্ভব হয়েছিল যে, তার রেজিমেন্ট এলাকা ও আমার মেস পাশাপাশি জায়গায় ছিল,মাঝখানে শুধু কাঁটাতারের বেড়া।

 

চিঠিখানা আমার হস্তগত হওয়ার পর আমি কিছুক্ষন অস্বস্তি বোধ করি। এমতবস্থায় কি করা কর্তব্য সে চিন্তায় অস্থির হয়ে পড়ি এবং আমার সমস্ত শরীর ঘামতে থাকে। গভীর চিন্তার পর আমার পাশের কক্ষের বন্ধু ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মুস্তাফিজুর রহমান (তিনি আর্মি ইঞ্জিনিয়ার্সের ক্যাপ্টেন এবং বিমান বাহিনীর সঙ্গে ডেপুটেশনে ছিলেন এবং সেখানে সহকারী গ্যারিসন ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করতেন) এর নিকট যাই। মুস্তাফিজুর রহমান আমার একান্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন এবং আমরা দু’জনে মাঝে মাঝে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির উপর আলোচনা করতাম। তাঁকে ক্যাপ্টেন খুরশীদ আলম চৌধুরীর চিঠিখানা সম্বন্ধে জানাই। দু’জনে কিছুক্ষণ চিন্তা করে শহরে গিয়ে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ নের্তৃবর্গকে এ খবর পৌঁছানোর সিদ্ধান্ত নেই। শেখ কামালের বিশিষ্ট বন্ধু শাহেদ নসরুল্লাহকে (ধানমন্ডীর বাসায়) প্রথমে খবর দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেই। কেননা শাহেদ নসরুল্লাহকে খবর দিলে সঙ্গে সঙ্গে শেখ কামালের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নিকট এ খবর অতিশীঘ্র পৌঁছাবে। মুস্তাফিজুর রহমান বললেন, তার কয়েকজন ভাই, যারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হল (বর্তমান সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) ও বিভিন্ন হলে রয়েছে, তাদেরকেও এ খবর জানালে ছাত্ররাও প্রস্তুতি নিতে পারবে। এই সিদ্ধান্ত নিয়েই আমরা দু’জন তার নিজস্ব টয়োটা গাড়িতে শহরে রওনা হই (রাত প্রায় দশটা)। যখন আমাদের টয়োটা গাড়ী ৩১-ফিল্ড রেজিমেন্টের গেটে পৌঁছে তখন আমরা দেখতে পাই যে, ৩১-ফিল্ড রেজিমেন্টের গেট দিয়ে চীফ অব আর্মি স্টাফের পতাকাসহ ৪ তারকাবিশিষ্ট একখানা স্টাফ কার বের হচ্ছে। উক্ত গাড়ীতে জেঃ আব্দুল হামিদ খান, চীফ অব আর্মি স্টাফ, পাকিস্তান আর্মি এবং জেনারেল টিক্কা খান, কমান্ডার ইস্টার্ণ কমাণ্ড ছিলেন। উক্ত গাড়ীর পিছনে প্রায় ৫০/৬০ খানা খোলাগাড়ী ছিল। কয়েকটি গাড়ীতে ভারী মেশীনগান লাগানো, কয়েকটি গাড়ীতে রিকয়েললেস রাইফেল লাগানো, কয়েকটি বড় বড় ট্রাকে পুরো যুদ্ধের পোষাক ও অস্ত্রসহ সৈন্য ছিল। আমরা রাস্তা নির্দেশের উলটোপথ দিয়ে তাদেরকে পিছনে ফেলে আগে চলে যাই। তখন শহরে লোকজন স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করছিল। প্রথমে আমরা ধানমন্ডি ২৬ নং সড়কে শাহেদ নসরুল্লাহর বাসভবনে গিয়ে বিস্তারিত জানাই এবং শেখ কামালের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর নিকট আমাদের খবর পৌঁছানোর কথা বলি। এছাড়া তাকে (নসরুল্লাহ) তার বাসা থেকে অন্যত্র চলে যাবার পরামর্শ দেই। কেননা মেজর মনোয়ার হোসেনের নিকট তার তুলে দেওয়া ফটো ও দি পিপল পত্রিকায় প্রকাশিত ফটো ছিল। আমাদের কথা শুনে শাহেদ নসরুল্লাহর পিতা খুবই চিন্তায় পড়েন। কিছুক্ষন পর আমরা মুস্তাফিজুর রহমানের ভাই ও আত্মীয়স্বজনকে খবর দেয়ার জন্য মোহাম্মদপুরে যাই। তাদেরকেও আমরা বিস্তারিত খবর জানাই এবং সতর্ক হওয়ার জন্য অন্যান্য বন্ধুবান্ধব এবং আত্মীয়স্বজনকে খবর পৌঁছাতে বলি। সেখান থেকে আমরা ক্যান্টনমেন্ট ফিরে আসার পথে ফার্মগেট ছাত্রদের একটা বিরাট মিছিলের মাঝে পড়ি। ছাত্ররা ফার্মগেটে প্রতিবন্ধকতা (ব্যারিকেড) সৃষ্টি করেছিল যেন শহরে সৈন্যবাহিনীর যে সমস্ত গাড়ী গিয়েছে তারা ক্যান্টনমেন্টে ফিরে আসতে না পারে। আমরা যখন মিছিলের মাঝে পড়ি তখন কয়েকজন ছাত্র আমাদের পরিচয় জানতে চায়। আমি সেনাবাহিনীর পরিচয় না দিয়ে বাঙালি ও সাধারণ মানুষ, গুলশানে বাসা আছে বলে জানাই। তখন তারা আমাদের গাড়ী চলার জন্য একটু জায়গা পরিস্কার করে দেয় (তখন রাত প্রায় এগারটা)। ব্যারিকেড অতিক্রম করার পরই আমরা দেখলাম সেনাবাহিনীর ৪ খানা মেশিনগান লাগানো গাড়ী (বাতি নিভানো) কয়েকজন সৈন্য ফার্মগেটের দিকে ঠেলে নিচ্ছে। আমাদের গাড়ী একটু থামালাম। গাড়ী কয়েকখানা ফার্মগেটের কাছাকাছি গিয়েই ছাত্রদের উপর গুলি চালাতে শুরু করে। ফলে সঙ্গে সঙ্গে বেশকিছু ছাত্র ও সাধারণ মানুষ সেখানেই মারা যায়। তারপর আমরা ক্যান্টনমেন্টে আমাদের মেসে ফিরে আসি। কিছুক্ষন পর আমি আমাদের চট্টগ্রামের বাসায় আমার পিতার সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলি এবং জানতে পারি যে চট্টগ্রামেও পশ্চিমা সৈন্যরা শহরে নিরীহ জনসাধারণের উপর নির্মমভাবে গুলি করছে এবং হত্যাকাণ্ড শুরু করেছে। আমার পিতার সঙ্গে কথা শেষ করেই আমি ঢাকায় ধানমন্ডিতে আমার মামা এডভোকেট জনাব আবু তাহের চৌধুরীকে টেলিফোন করি ও তাকে ঢাকা ও চট্টগ্রামে পাঞ্জাবী সেনাবাহিনী কর্তৃক গনহত্যার খবর জানাই। রাত বারটা পর্যন্ত টেলিফোন যোগাযোগ ছিল, তার পরই আমাদের কানে অসংখ্য গুলির আওয়াজ আসে। মীরপুর, গুলশান ও এয়ারপোর্ট এলাকাসহ বিভিন্ন জায়গায় গোলাগুলির আওয়াজ ও দাউ দাউ করে আগুন জ্বলতে দেখি। এসময় পুরোদমে পাঞ্জাবীরা নিরীহ ঘুমন্ত জনসাধারণের উপর আক্রমণ করে মেশিনগান দিয়ে নির্মমভাবে গনহত্যা শুরু করেছে। এভাবে সারারাত গনহত্যা চালায়। শেষরাতে সেনাবাহিনী ক্যান্টনমেন্ট থেকে ট্যাঙ্ক নিয়ে শহরে আক্রমন চালায় এবং অসংখ্য বোমা বিস্ফোরণের আওয়াজ পাই। এভাবে আমি, ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মুস্তাফিজ, ক্যাপ্টেন এনামসহ আরো কয়েকজন চিন্তায় থাকি ও অনিদ্রায় রাত কাটাই।

 

আমাদের বিল্ডিং-এ পাঞ্জাবী মেজর পীর কমরউদ্দিন (জি-এইচ-কিউ ফিল্ড ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের অফিসার কমান্ডিং ছিলেন) সকালে ঘুম থেকে উঠেই তার বিছানাপত্রসহ সমস্ত কিছু গুছিয়ে নিয়ে যখন চলে যাচ্ছিলেন তখন আমরা তাকে জিজ্ঞেস করি, কোথায় যাচ্ছেন? তিনি বলেন, তিনি অফিসে যাচ্ছেন এবং অফিসেই থাকবেন। মেজর কমর পাঞ্জাবী হলেও আমার একজন বিশিষ্ট বন্ধু এবং একই সাথে ইনটেলিজেন্স কোর্স করি। আমার আত্মীয়স্বজনের অনেকেই তাকে চিনতেন। তিনি চলে যাবার সময় অকথ্য ভাষায় আমাদেরকে কতগুলি কটুক্তি করেন ও আওয়ামী লীগকে গালিগালাজ করেন। আমাদেরকে সন্দেহ করে কিংবা ভয় করেই হয়তবা তিনি চলে যান। তার এরুপ কটুক্তি ও গালাগালিতে আমরা সবাই ধারনা করি যে অন্যান্য পাঞ্জাবী অফিসারও বোধ হয় বাঙালি অফিসার ও সৈন্যদের সঙ্গে অনুরূপ দুর্ব্যাবহার করেছে।

 

২৬শে মার্চ সকাল সাতটায় আমি আমার অফিসে যাই। মেজর মনোয়ার হোসেনসহ মেজর ফারুকী ও মেজর মীর্জা উপস্থিত ছিলেন। তারা খুব আনন্দ ও হাসাহাসি করছিলেন এবং অতি খুশীতে মিষ্টি খাচ্ছিলেন। মেজর মনোয়ার হোসেন আওয়ামী লীগের পতন ও বাঙালিদের দমন করার কথায় মেতে ছিলেন।তারা আমাকেও মিষ্টি খেতে বলেন। তখন আমি অত্যন্ত অস্বস্তি বোধ করছিলাম। আমার মিষ্টি খাওয়ার ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও একটা মিষ্টি খেলাম, তারপরই আমি শহরে আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করার জন্য মেজর মনোয়ার হোসেনের নিকট কয়েক ঘন্টার জন্য বাইরে যাবার অনুমতি চাই। কিন্তু তিনি আমাকে বাইরে যাওয়া থেকে বঞ্চিত করেন এবং বলেন, শহরে অনেক বাঙালি দুস্কৃতিকারী মারা গেছে। যেহেতু তুমি বাঙালি, কাজেই তাদের মৃতদেহ দেখে তুমি স্বাভাবিকভাবেই সহ্য করতে পারবে না, কাজেই তোমাকে এখন বাইরে বা শহরে যাবার অনুমতি দিতে পারি না। আমি অফিসে প্রায় দু’টা পর্যন্ত বসে রইলাম। এসময় ইউনিটের বেশ কয়েকজন বাঙালি সৈন্য আমার নিকট এসে শহরে ভয়াবহ পরিস্থিতির খবর জানায় এবং এমতাবস্থায় তাদের কি কর্তব্য তা আমার নিকট হতে জানার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে। আমি তাদেরকে কিছুটা সান্ত্বনা দেই ও আরও কিছু সময়ের জন্য ধৈর্য সহকারে অপেক্ষা করতে বলি। তারপর আড়াইটার সময় আমি আমার মেসে খেতে যাই এবং খাবার পরে কক্ষে প্রবেশ করলে আমার সিপাই মোশাররফ (যার নিকট একটা স্টেনগান থাকত) আমাকে জানায় যে তার নিকট থেকে পাঞ্জাবীরা স্টেনগানটি নিয়ে নিয়েছে। সিপাই মোশাররফের কাছ থেকে স্টেনগান কেড়ে নেয়ায় আমার একটু ভয় হয় এবং অত্যন্ত চিন্তায় অস্থির হয়ে পড়ি। তার পরই আমাদের পাশের বাড়িতে মেজর মওলার (বাংগালী-১৪৯ ইনফ্যানট্রি ওয়ার্কশপের কমান্ডিং অফিসার) নিকট গিয়ে স্টেনগান কেড়ে নেয়ার কথা জানাই এবং আমরা যারা বাঙালি ছিলাম সবাই নিরাপত্তার কথাও বলি। আমার কথা শুনে মেজর মওলা বলেন, বাঙালিদেরকে পাঞ্জাবীরা মারবে না – মারতে পারে না। কিন্তু তবু আমরা তিন – চারজন অফিসার রাতে তার বাসায় থাকা ও ঘুমানোর কথা বলি এবং আরও জানাই যে আমাদের ঘুমের সময় একজন অফিসার রাতে সবসময় পাহারা থাকবে। তিনি রাজি হলেন। আমি, ক্যাপ্টেন এনাম এবং মুস্তাফিজ ও মেজর ইকবাল তার বাসায়ই থাকি। কিন্তু সারারাত গুলির আওয়াজ এবং মীরপুর, গুলশান এলাকায় আগুন লাগানো দেখে আমাদের মোটেই ঘুম হয় নি।

 

২৭শে মার্চ, সকাল সাড়ে সাতটায় আমি অফিসে গেলে দেখতে পাই যে, তিনটা ই-পি-আর ট্রাক অসংখ্য রাইফেল ও অস্ত্রশস্ত্র (অস্ত্রগুলোতে অনেক লাল রক্ত লাগানো দেখতে পাই) নিয়ে ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় ঢুকছে। আমার অফিসের অফিসের অনেক বাঙালি সিপাই আমাকে জানায় যে, ই-পি-আর ক্যাম্প এবং রাজারবাগ পুলিশ ক্যাম্পে পাঞ্জাবীরা নিষ্ঠুরভাবে আক্রমন করে এবং বহু ই-পি-আর ও পুলিশকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। এসময় আমি আমার শহরের আত্মীয়স্বজনের কোন খবরাখবর না পেয়ে খুবই চিন্তায় পড়ি এবং আমি মেজর মনোয়ার হোসেনকে কঠোরভাবে জানাই যে, যে কোন প্রকারে হোক আমাকে অন্তত আধ ঘন্টার জন্য শহরে যেতে হবে। পরে মেজর মনোয়ার হোসেন আমাকে শহরে যাবার অনুমতি দেন। অনুমতি পাওয়ার পর আমি সকাল দশটার সময় এম, এম দৌল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারকে (জি-২ ইন্টেলিজেন্স হেড কোয়ার্টার, ইস্টার্ণ কমাণ্ড) সঙ্গে নিয়ে জীপে শহরে চলে যাই।

 

সেদিন সকাল দশটা বিকাল ৬ টা পর্যন্ত কোন কারফিউ ছিল না। আমরা যাবার পথেই দেখলাম অসংখ্য নরনারী শহর ছেড়ে বাইরে চলে যাচ্ছে। এয়ারপোর্ট এলাকা পার হবার পর আমরা স্বচক্ষে যা দেখলাম তা হলোঃ

 

ফার্মগেটের পরে আওলাদ হোসেন মার্কেটের সমস্ত কাঁচা ঘরবাড়ি এবং দোকানপাট (কমপক্ষে ৬০/৭০ টি) জ্বালিয়ে দিয়েছে।

 

ইস্কাটন রোডে আমার ভগ্নিপতি জনাব এস, আর, খান (সেকশন অফিসার, মিনিস্ট্রি অব ইনফরমেশন) এর বাসায় যাই। সেখানে তাদের মুখে শুনতে পাই যে ঐ এলাকায় পাঞ্জাবীরা ২৫শে ও ২৬শে মার্চ রাস্তায় বাঙালি যাদেরকেই পেয়েছে তাদের সবাইকে জঘন্যভাবে হত্যা করে রাস্তার আশেপাশে মাটিতে চাপা দিয়েছে। ইস্কাটন রোড থেকে বের হয়ে যখন আমরা হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের কাছে পৌঁছালাম তখন ডানদিকে দি পিপল পত্রিকার অফিস দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে এবং অসংখ্য মৃত লাশ পড়ে রয়েছে এবং অনেক লাশ আগুনে জ্বলছে। ঐ রাস্তা দিয়ে রাতে ট্যাংক চালানো হয়েছে। ট্যাংকের চেইন এর ছক তখনো রাস্তায় ছিল।

 

সেখান থেকে আমরা হাতিরপুলে মেজর দৌল্লাহ সাহেবের বাসায় যাই। সেখানে মেজর দৌল্লাহ সাহেবের ছোট ভাই জনাব জনাব আসফউদ্দৌল্লাহ (বর্তমান জয়েন্ট সেক্রেটারী, ওয়ার্কস) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইকবাল হল, জগন্নাথ হল ও স্টাফ কোয়ার্টারে ঢুকে পাঞ্জাবীরা কিভাবে জঘন্যভাবে ছাত্র ও শিক্ষকদের হত্যা করেছে তার বিবরণ দেন (২৫শে ও ২৬শে মার্চ জনাব আসফউদ্দৌলাহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্টাফ কোয়ার্টারে তার শ্বশুর ভূগোল বিভাগের অধ্যক্ষ ডঃ নফিজ আহমেদের বাসায় ছিলেন)। জনাব আসফউদ্দৌলাকেও পাঞ্জাবীরা হত্যা করার চেষ্টা করে কিন্তু ডঃ নফিস তাঁকে রক্ষা করেন। হাতিরপুল এলাকায়ও আমরা কিছুকিছু বাড়িঘর ভস্মীভূত দেখি এবং কয়েকটি লাশ রাস্তায় দেখতে পাই।

 

হাতিরপুল থেকে আমরা ধানমন্ডি ১৪ নং সড়কে আমার মামা এডভোকেট আবু তাহের চৌধুরীর বাসায় যাই। মামার মুখে শুনতে পাই যে সেখানেও পাকিস্তানী বর্বর সেনাবাহিনীর সৈন্যরা বহু লোককে গুলি করে হত্যা করেছে এবং নারী ধর্ষন করে, কতিপয় মেয়েকে গাড়ীতে তুলে ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে গেছে।

 

মামার কাছে থেকে বিদায় নিয়ে আমরা নিউ মার্কেট হয়ে ইকবাল হলে রওনা হই। নিউ মার্কেটে বাজার সম্পূর্ণ ভস্মীভূত অবস্থায় দেখি। আজিমপুর হয়ে যখন আমরা রেল ক্রসিং এ পৌঁছি তখন সেখানে বেশ কিছু সংখ্যক লাশ দেখতে পাই। ইকবাল হলের গেটে ঢোকার পর মাঠের মধ্যে আমরা ১১ জনের মৃতদেহ একই লাইনে পড়ে রয়েছে দেখতে পাই। প্রত্যেকের চেহারাই ছাত্র বলে ধারনা হলো। হলের সমস্ত দরজা জানালার কাঁচ ভাঙ্গা অবস্থায় দেখি এবং দেয়ালে ট্যাংকের গোলা দাগ ও গর্ত দেখা যাচ্ছিল। হলের মধ্যে ঢুকে কয়েকটি কক্ষে তাজা লাশ পড়ে থাকতে দেখি।

 

এ সময় বহু লোক হলের ভেতরে ঢুকে মৃত লাশগুলি দেখছিল। হল থেকে বের হবার সময় মাঠের মধ্যে কয়েকটি বিরাট গর্ত দেখতে পাই। জনসাধারণের মুখে শুনতে পাই যে, বহু ছাত্রকে হত্যা করে ঐ সমস্ত গর্তে কবর দেয়া হয়েছে। ইকবাল হল থেকে বের হয়ে রাস্তা দিয়ে যাবার সময় এস এম হলের দেয়ালেও ট্যাংকের অনেক গোলার দাগ দেখতে পাই। এরপর আমরা জগন্নাথ হলের ভিতরে প্রবেশ করি। সেখানেও ইকবাল হলের মত একইভাবে মৃত লাশ ও গর্ত করা কবর দেখতে পাই। সেখানে কয়েকজন ছাত্র ও লোকের মুখে ডাঃ জি সি দেবসহ শিক্ষক, ছাত্র ও রোকেয়া হলে নারী ধর্ষণের করুণ কাহিনী শুনতে পাই।

 

জগন্নাথ হল থেকে বের হয়ে রোকেয়া হলের পাশ দিয়ে রেসকোর্স অতিক্রম করার সময় রেসকোর্সের মাঝখানে অবস্থিত হিন্দু মন্দিরটি সম্পূর্ণ ধ্বংস অবস্থায় দেখি। হিন্দু মন্দিরে যে সমস্ত হিন্দু নরনারী ছিল তাদেরকে হত্যা করা হয় এবং তাদের কয়েকটি মৃতদেহ আমরা রাস্তা থেকেই দেখতে পাই।

 

রেসকোর্স থেকে হাইকোর্ট হয়ে গুলিস্তান এলাকায় যাই। গুলিস্তান থেকে নওয়াবপুর রোডে অনেক বাড়িঘরে আগুন জ্বলতে দেখি। আমরা গভর্ণর হাউস (বর্তমান বঙ্গভবন) দিয়ে দৌল্লাহ সাহেবের এক ভাইয়ের বাসায় (উয়ারী) যাই। সেখানেও তার নিকট পাক হানাদার বাহিনী কর্তৃক নিরীহ জনসাধারণের উপর অত্যাচার ও গনহত্যার কাহিনী শুনি। সেখান থেকে ইত্তেফাক অফিসে আগুন জ্বলতে দেখি। তারপর আমরা পুরানা পল্টনে আওয়ামী লীগ অফিসের সম্মুখে অফিসের সমস্ত কাগজপত্র রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখি এবং কিছু কিছু কাগজ বা অন্য কিছু পোড়া দেখতে পাই। আওয়ামী লীগ অফিস থেকে মতিঝিল হয়ে আমরা রাজারবাগ পুলিশ ক্যাম্পের সম্মুখে যাই। তখন প্রায় বিকেল তিনটা বাজে। সেখানে ইঞ্জিনিয়ার্স এর মেজর এনামের মুখে আমরা রাজারবাগ পুলিশ ক্যাম্পের যে বিস্তারিত ঘটনা জানতে পারি তা হলোঃ

 

২৫শে মার্চ রাত বারোটার সময় বর্বর পাক হানাদার বাহিনীর সৈন্যরা পুরা যুদ্ধের অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে রাজারবাগ পুলিশ ক্যাম্পের চতুর্দিক থেকে অতর্কিত হামলা করে গুলি চালায়। পুলিশরাও বীরত্বের সাথে নিজেদের আত্মরক্ষার্থে পাল্টা গুলি চালায়। এভাবে সারারাত উভয় পক্ষ যুদ্ধ চালায়। এবং যুদ্ধে যখন পাক বাহিনী কোনক্রমেই পুলিশ দলের সঙ্গে জয়লাভ করতে পারছিল না তখন ভোর চারটার সময় পাক হানাদার বাহিনী ট্যাংক নিয়ে আক্রমন চালায়। ট্যাংকের আক্রমনও বীর পুলিশ ভাইয়েরা প্রতিহত করে। ২৫শে মার্চ সারারাত ২৬শে মার্চ বিকাল ৪টা পর্যন্ত এক নাগাড়ে পাক হানাদার বাহিনীর সঙ্গে পুলিশ ভাইয়েরা প্রচণ্ড যুদ্ধ করে।

 

বিকাল চারটার পর পুলিশ বাহিনীর গোলাবারুদ প্রায় শেষ হয়ে যায় এবং প্রায় সাতশ পুলিশ ভাই শহীদ হন। প্রায় সাড়ে তিনশ আত্মসমর্পন করেন। বাকি সবাই পালিয়ে যেতে সক্ষম হন।যে সমস্ত পুলিশ ভাই শহীদ হন তাদের লাশ পাঞ্জাবীরা পুলিশ ক্যাম্পের মাঠে বিরাট গর্ত করে কবর দেয়। মেজর এনামের মুখে বিস্তারিত খবর নিয়ে আমরা পিলখানা ইপিআর ক্যাম্পে যাই। সেখানে পাক হানাদার বাহিনী পিলখানার চতুর্দিকে ব্যারিকেড সৃষ্টি করে রাখায় আমরা কিছুই দেখতে পারিনি। সেখান থেকে আমরা বিকাল চারটার সময় ক্যান্টনমেন্টে ফিরে আসি।

 

ক্যান্টনমেন্ট পৌঁছে আমি গোছল করি। বিকাল ৫ টার সময় আমার নায়েক সুবেদার ফজলুল করিম আমাকে জানায় যে, সেক্রেটারিয়েট অফিসের কয়েকজন পদস্থ কর্মচারী ৩ টা বাসে পরিবারসহ ময়মনসিংহ সড়ক দিয়ে ময়মনসিংহ যাবার সময় (তাদের অধিকাংশই ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইলের অধিবাসী) পাঞ্জাবী ১৩-এফ-এ রেজিমেন্টে সৈন্যরা কুর্মিটোলা রেল স্টেশনের সম্মুখে যেখানে আর্মি ব্যারিকেড সৃষ্টি করেছিল সেখানে উক্ত বাস ৩ টা বাস থামিয়ে বিবাহিত ও অবিবাহিত যুবতী মেয়েদেরকে এক জায়গায় দাঁড় করিয়ে রাখে এবং যুবক ও বয়স্ক স্ত্রী পুরুষদের মারধর করে তাদের বাস ছেড়ে দেয়। পরে মেয়েদেরকে ক্যান্টনমেন্টে ১৯-সিগনাল ব্যাটালিয়নে নিয়ে যায়। এবং পরস্পর শোনা যায় যে সেখানে মেয়েদেরকে ধর্ষন ও অত্যাচার করছিল। এ খবর পাবার পর আমি লেঃ কর্নেল তাজ মোহাম্মদকে জানাতে যাই। লেঃ কর্নেল তাজকে না পেয়ে লেঃ কর্নেল সিনওয়ারীর (জিএসও-১ ইনটেলিজেন্স, জেড কোয়ার্টার, ইস্টার্ণ কমাণ্ড) নিকট যাই। তাকে না পেয়ে ১৪ ডিভিশন হেড কোয়ার্টার অফিসার মেসে যাই। সেখান থেকে টেলিফোনে মেজর হাজী মোঃ কেয়ানীকে (জি-২ ইনটেলিজেন্স ১৪ ডিভিশন) নারী ধর্ষন ও অত্যাচারের কথা জানাই। আমার কথা শুনে মেজর হাজী কেয়ানী সাহেব অত্যন্ত দুঃখ প্রকাশ করে বলেন যে তার করার কিছু নেই। কেননা ইতিপূর্বেও তিনি অনুরূপ কয়েকটি ঘটনার কথা শুনেছেন। তিনি বলেন, এ সমস্ত জঘন্য কার্যকলাপের জন্য কয়েকজন অফিসারই দায়ী। এবং বর্তমানে পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে গিয়েছে যা তার পক্ষে বা অন্য কোন অফিসারের পক্ষেও আয়ত্ত্বে নেওয়া সম্ভব নয়। কেননা কতিপয় অফিসারের দোষেই সৈন্যরা বেশী প্রশ্রয় পেয়েছে। তিনি আমার কঠোর মনোভাব বুঝতে পেরে আমার নিকট তার অক্ষমতা প্রকাশ করে ক্ষমা চান এবং আরও বলেন যে, আমি যেন লজ্জাজনক কথা বলে তাঁকে গুনাহগার না করি। মেজর হাজী মোঃ কেয়ানী সাহেবের সঙ্গে টেলিফোনে কথা শেষ করে আমার মেসে ফেরার পথে শহীদ আনোয়ার বালিকা বিদ্যালয় প্রাঙ্গনের এক ব্যাটালিয়ন কমান্ডোর উপস্থিতিতে লেঃ জেঃ টিক্কা খানের ভাষন শুনতে পাই। তখন বিকাল সাড়ে ছটা। সন্ধ্যা সাতটার সময় আমার নায়েক সুবেদার ফজলুল করিম দুজন পাঞ্জাবীসহ জীপে আমার মেসে আসে। ফজলুল করিম আমাকে জানায় যে পরিস্থিতি খুবই ভয়াবহ।তাকে নির্দেশ দিয়েছে সার্ভে অব পাকিস্তান-এ (বর্তমান সার্ভে অব বাংলাদেশ) গিয়ে চট্টগ্রামের মানচিত্র আনতে। আমি তাকে চুপে চুপে বললাম আমার ইউনিটে যে সমস্ত বাঙালি রয়েছে তাদের সবাইকে পালিয়ে যেতে। এবং ফজলুল করিম আমাকে জানাল যে তার সাথে দুইজন পাঞ্জাবী রয়েছে কাজেই সে কি করে পালাবে। আমি তাকে মানচিত্র নিয়ে আসার পর সুযোগ মত দেখা করতে বললাম। ফজলুল করিম চলে যাবার পর আমি চিন্তা করতে লাগলাম যে হঠাৎ এক ব্যাটালিয়ন কমান্ডোর একত্রে উপস্থিত হওয়ার কারণ কি থাকতে পারে এবং শেষ পর্যন্ত এই ধারনা হলো যে, তাদেরকে হয়তো বা কোথাও পাঠানো হচ্ছে এবং সেভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছে। তারপর চট্টগ্রামের মানচিত্র সংগ্রহের কথা শুনে পুরোপুরি বিশ্বাস হলো যে, চট্টগ্রামের যুদ্ধে পাকিস্তানী সৈন্যরা বোধ হয় আমাদের বাঙালিদের নিকট পরাজিত হয়েছে এবং সে জন্যই মানচিত্রের সাহায্যে রাতে প্যারাসুটে তাদেরকে চট্টগ্রামে পৌঁছাবে। ইতিপূর্বে সন্ধ্যা সাতটার সময় ক্যাপ্টেন এনামের কক্ষে রেডিওতে আমরা চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্রে মেজর জিয়াউর রহমান (বর্তমান ব্রিগেডিয়ার) এর ভাষন শুনতে পাই। বেতারে মেজর জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর পক্ষ থেকে বাংলার স্বাধীনতা ঘোষনা করেন এবং সমস্ত বাঙালি সেনাবাহিনীর সদস্য, ইপিআর, বিমান বাহিনী, পুলিশ বাহিনী ও জনসাধারণকে পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে তাদেরকে চিরতরে এদেশ থেকে নির্মূল ও খতম করার আহবান জানান। এবং তিনি নিজেকে মুক্তিযুদ্ধের সিইনসি ঘোষনা করেন। এ খবর শোনার পর আমরা কয়েকজন অত্যন্ত আনন্দিত হই এবং অনেক মনোবল ফিরে পাই। আমরা বুঝতে পারলাম যে চট্টগ্রামে পাক বাহিনী পরাজিত হয়েছে এবং আমাদের পুরোপুরি দখল রয়েছে। এর পর থেকে আমি কিভাবে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করব এবং কিভাবে ক্যান্টনমেন্ট থেকে বের হয়ে গিয়ে যুদ্ধ করব সে চিন্তাই করতে লাগলাম। রাত ৯টার সময় ক্যাপ্টেন এনামের মারফত একটি ভীতিজনক খবর শুনতে পাই। সেটা হচ্ছে ৭ই ডিসেম্বর ’৭০ আমি এবং ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মুস্তাফিজ আমাদের মেসে পাঞ্জাবী অফিসারদের উপস্থিতিতে টেলিভিশনে দেশের সাধারণ নির্বাচনের ফলাফল দেখছিলাম। আওয়ামী লীগের পক্ষে সন্তোষজনক ফলাফলে পাঞ্জাবী অফিসাররা সকলেই কক্ষ থেকে কেটে পড়তে থাকে। ক্রমে ক্রমে সবাই কক্ষ ত্যাগ করলেও আমি এবং মুস্তাফিজ শুধু কক্ষে থাকি। রাত বারোটার সময় নায়েক পয়া খান (পাঠান) আমাদেরকে জানায় যে, মেস কমিটির সভাপতি মেজর রানার (পাঞ্জাবী) নির্দেশমত রাত বারোটার পর টেলিভিশন অনুষ্ঠান দেখা বন্ধ করতে হবে। আমরা তাকে বুঝিয়ে বললাম যে, সারা দেশের লোক টেলিভিশন দেখছে এমন কি প্রেসিডেন্ট স্বয়ং টেলিভিশনে নির্বাচনের খবরা খবর নিচ্ছেন সেখানে আমরা রাত বারোটার পর খবর শুনলে তেমন অসুবিধা হবে না। তাকে আরও বললাম যে, তার যদি কোন অসুবিধা হয় তবে আমরা অন্য বেয়ারা রেখে তাকে তার কর্তব্যের অতিরিক্ত পয়সা দিয়ে দেব। আমাদের কথায় কর্ণপাত না করে উক্ত নায়েক পয়া খান নিজেই টেলিভিশন বন্ধ করে দেয়। কিন্তু পরক্ষণই লেফটেন্যান্ট মুস্তাফিজ টেলিভিশন অন করে। নায়েক পয়া খান দ্বিতীয়বার টেলিভিশন বন্ধ করলে লেফটেন্যান্ট মুস্তাফিজ পুনরায় অন করে। কিন্তু পয়া খান আমাদের তোয়াক্কা না করে তৃতীয়বারও টেলিভিশন বন্ধ করে। এবারেও মুস্তাফিজ টেলিভিশন অন করতে উদ্যত হলে পয়া খান মুস্তাফিজের হাত ধরে ফেলে। তখন আমি রাগান্বিত হয়ে পয়া খানের জামার কলার চেপে ধরে উত্তম-মাধ্যম দিয়ে কক্ষ থেকে বের করে দিলে সে দৌড়ে গিয়ে একটা ছোড়া নিয়ে এসে আমাদের গালাগালি করতে থাকে যে, ‘শালা বাঙ্গাল লোককো খতম করেঙ্গে।’ এ সময় সেন্ট্রি দৌড়ে এসে তাকে ধরে সরিয়ে নিয়ে যায়। পরদিন আমি আমার অফিসার কমান্ডিং মেজর মনোয়ার হোসেনকে লিখিতভাবে এবং মেজর রানাকে মৌখিকভাবে জানাই।পরে ঘটনার তদন্ত চলে। লেঃ কঃ শরিফের সভাপতিত্বে তিন সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির বিস্তারিত বিবৃতিতে আমাকে এবং মুস্তাফিজকেই দোষী করা হয় এবং আমাদের বিরুদ্ধে কোর্ট মার্শাল হওয়ার কথা প্রকাশ করে।

 

দ্বিতীয়ত, দেশের পরিস্থিতির অবনতি ঘটলে আমাদেরকে হত্যা করার হুমকি দেখায়। মেজর রানা ক্যাপ্টেন এনামকে আরও বলেছিলেন যে, যেহেতু আমার আত্মীয়স্বজনের অনেকে এমএনএ ও এমপিএ এবং অনেকেই আওয়ামী লীগ সমর্থক সেহেতু আমি এবং মুস্তাফিজ দুজনই আওয়ামী লীগের সমর্থক সুতরাং আমাদের দুজনকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ভোগ করতে হবে। রাত ৯টার সময় (২৭ শে মার্চ ১৯৭১) ক্যাপ্টেন এনামের মুখে উপরোক্ত কথা শুনে আমি খুবই ঘাবড়ে যাই। কিছুক্ষন পর আমি ক্যান্টনমেন্ট থেকে পালানোর সিদ্ধান্ত নেই এবং ক্যাপ্টেন এনামকেও আমার সঙ্গে পালানোর ইঙ্গিত দেই। কিন্তু সে নেতিবাচক জবাব দেয় এবং আমার কক্ষ থেকে তার নিজ কক্ষে চলে যায়। আমি চুপ করে মুস্তাফিজের কক্ষে গিয়ে তাকে আমার সঙ্গে পালানোর কথা বলি। সে পালানোর কোনো সিদ্ধান্ত রাতে নিতে পারলো না।

 

———————————————-

<৯, ১.২, ৯-১০>

ঢাকা সেনানিবাসের অভ্যন্তরের কিছু কথা

সাক্ষাৎকারঃ এয়ার কমোডোর এম, কে, বাশার

২৫শে মার্চ বিকাল চারটার সময় বিশেষ বোয়িং তার নিরাপত্তা প্রহরী নিয়ে বিমান বন্দরে অবতরণ করে। বিমান বাহিনীর দুজন অফিসার (তন্মধ্যে একজন আমি ও ছিলাম) এবং একজন টেকনিশিয়ানকে বোয়েংটির কাছে যেতে দেওয়া হয়। সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় সেনানিবাস থেকে টেলিফোনে নির্দেশ দেওয়া হয় বোয়িং ষ্টার্ট করার জন্য। রাত আটটায় একটা প্রাইভেট গাড়ীতে করে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান(এর গাড়ীর ড্রাইভার ছিলো একজন কর্ণেল) ঢাকা সেনানিবাস থেকে সোজা একটা বোয়িং- এ উঠে যান এবং সঙ্গে সঙ্গে বিমান চলে যায়। ঐ বিমানে প্রেসিডেন্ট একা ছিলেন। প্রেসিডেন্টের এভাবে চলে যাওয়াতে আমার ধারণা হলো যে, হয়তো জেনারেল হামিদ খান ক্ষমতা দখল করেছেন এবং ইয়াহিয়া খানকে বোয়িং-এ করে পশ্চিম পাকিস্তানে পাঠিয়ে দিয়েছেন। এখানে উল্লেখ্য যে, জেনারেল হামিদ তখন ঢাকায় ছিলেন।

 

২৫ শে মার্চ রাতে আমি বনানীতে আমার বাসায় ছিলাম। রাত বারোটার পর ভীষণ গোলাগুলির আওয়াজ শুনতে পেলাম। ভোর রাত থেকে জনগণ বনানীর ওই পথ দিয়ে গ্রামের দিকে পালাচ্ছে।

 

২৭ শে মার্চ আমি অফিসে আসি। সেই সময়কার বেস কমান্ডার ছিলেন এয়ার কমোডোর জাফর মাসুদ, যিনি মিঠঠি মাসুদ হিসাবে বিমান বাহিনীতে পরিচিত ছিলেন। আমরা বাঙালি অফিসাররা তাঁর সাথে দেখা করলাম এবংদেশের এই পরিস্থিতিতে আমাদের নিরাপত্তার ব্যাপারে তার সাথে আলাপ করলাম। তিনি বললেন, নো ওয়ান উইল টাচ মাই মেন অর অফিসার বিফোর দে কিল মি’। আমরা তাকে অনুরোধ করলাম তিনি যেন সবাইকে ডেকে সান্তনা দেন। এর মধ্য ২৯ শে মার্চ সেনাবাহিনী বিমান বাহিনীর কাছে বিমান সাহায্য চেয়ে পাঠায়। তিনি সে সাহায্য দিতে অস্বীকার করেন।

 

৩০ শে মার্চ তিনি বেসের সবাইকে ডেকে ভাষণ দেন। তিনি বলেন, “তোমরা সবাই জান যে, সেনাবাহিনী তৎপরতা চালাচ্ছে। আমি বিমান সাহায্য দিতে অস্বীকার করেছি। কিন্তু আমি কতদিন এটা ঠেকিয়ে রাখতে পারব বলতে পারছি না। সমস্ত বাঙালি পাইলট দেরকে এই সব মিশনে যাওয়া থেকে অব্যাহতি দিচ্ছি এবং যে সমস্ত বাঙালি টেকনিশিয়ানরা এই সমস্ত বিমানে কাজ করতে চায়না তারা অনির্দিষ্ট কালের জন্য ছুটিতে যেতে পারে।”

 

এপ্রিল মাসের ৩/৪ তারিখে প্রথম বিমান হামলা চালানো হয় পাবনার আশেপাশে। এয়ার কমোডোরের নির্দেশ ছিলো যদি কোথাও লোক জমায়েত দেখা যায় প্রথমে যেন ওয়ার্নিং শর্ট করা হয় যাতে করে জনতা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। অপরদিকে সেনাবাহিনীর নির্দেশ ছিলো ম্যাসাকার করার জন্য। এই জন্য এয়ার কমোডোর জাফর মাসুদকে বদলি করে পশ্চিম পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেওয়া হয় এবং চাকরী থেকে বরখাস্ত করা হয়।

 

এর মধ্য সমস্ত বাঙালি অফিসারকে পশ্চিম পাকিস্তানে বদলি করা হয়। আমরা ছুটি নিলাম। আমরা কারো সাথে যোগাযোগ করতে পারছিলাম না। জিয়াউর রহমানের ভাষণ আমরা শুনেছিলাম। লোকমুখে শুনলাম যে, ময়মনসিংহ এলাকায় প্রতিরোধ চলছে। তখন ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মীর্জাকে খবর আনার জন্য পাঠানো হয়। সেও ঠিকমতো কারো সাথে যোগাযোগ করতে পারেনি-তবে একটা থমথমে পরিবেশ সে লক্ষ্য করেছিল। ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কাদেরকে আগরতলাতে পাঠানো হয়। সে ভারতে গিয়েছিলো এবং খালেদ মোশাররফের বাহিনীর সাথে যোগাযোগ করতে সক্ষম হযেছিল।যখন সে ফিরে কুমিল্লা আসে তখন পাক বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে। পরে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।

 

১২ ই মে আমরা ঢাকা ত্যাগ করলাম।নরসিংদী হয়ে লঞ্চে রওনা হলাম। লঞ্চ থেকে আমরা দেখলাম যে, পাক বাহিনী একটা গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়েছে। পথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রের সাথে আমাদের দেখা হয়। সে তার বাড়ীতে আমাদের আশ্রয় দিয়েছিল।

 

—————————————————-

 

<৯, ১.৩, ১০-১১>

 

ঢাকা সেনানিবাসের অভ্যন্তরের আরও কিছু কথা

সাক্ষাৎকারঃ আব্দুল করিম খন্দকার
ডেপুটি চীফ অফ ষ্টাফ বাংলাদেশ ফোর্সেস

(জুন ৭১- ডিসেম্বর ৭১)

 

২৩ মার্চ ১৯৭১- এ পাকিস্তান দিবস উপলক্ষে ঢাকাতে এক আন্তঃসার্ভিসেস কুচকাওয়াজের আয়োজন করার কথা হয়েছিল। আমাকে সেনাবাহিনী, বিমান বাহিনী ও নৌ বাহিনীর ঐ প্যারেডের প্যারেড কমান্ডার এর দায়ীত্ব দেওয়া হয়। জাকজমকের সাথে এই অনুষ্ঠান আয়োজনের কথা ছিল।ফেব্রুয়ারী মাসের ২৬ তারিখ হঠাৎ খবর পেলাম যে প্যারেড বাতিল করা হয়েছে। আমি একটু আশ্চর্য্য হলাম। আমি আর্মি ডিভ হেডকোয়াটারে এসে কর্ণেল গীলের সাথে দেখা করলাম। সেখানে আরও কয়েকজন উচ্চ পদস্থ অফিসার ছিলেন, সবাইকে কেমন যেন এক অস্বস্তিকর অবস্থায় দেখলাম।

 

২৮ ফেব্রুয়ারী পশ্চিম পাকিস্তান থেকে একটা বোয়িং ঢাকা বিমান বন্দরে অবতরণ করে। সেটাতে বেসামরিক পোষাকে সেনাবাহিনীর লোকজন ছিল।

 

১লা মার্চ জাতীয় পরিষদের বৈঠক স্থগিত ঘোষণা করা হয়। তখন থেকে প্রত্যেক দিন পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সেনাবাহিনীর লোকজন আসতে থাকে এবং প্রত্যহ এর সংখ্যা বাড়তে থাকে।

 

ঢাকা বিমান বন্দরে যেদিন থেকে বাঙালি কর্মচারীরা কাজে যোগ দিতে বিরত থাকে সেদিন থেকে পাক সেনাবাহিনী বিমান বন্দরের নিয়ন্ত্রন নিজেদের কাছে রাখে এবং বিমান বন্দরে পজিশন নিয়ে থাকে।

 

৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণ দেওয়ার কথা শুনে পাকিস্তানী সৈন্যরা এক উদ্বেগজনক অবস্থায় ছিল- তিনি কি বলবেন, কি করবেন। মিটিংয়ের পরে কোন গণ্ডগোল সৃষ্টি না হওয়ায় তারা সবাই একটু আশ্বস্ত হয়। সেদিন সমস্ত সেনাবাহিনীর লোকজনকে জরুরী অবস্থা মোকাবেলার জন্য সজাগ বা সতর্ক রাখা হয়েছিল। অসহযোগ আন্দোলন শুরু হওয়ার পর তাঁরা তাঁদের সৈন্য সংখ্যা বৃদ্ধি করতে লাগলো এবং বিমান বন্দর ও সেনানিবাসের চারদিকে এনট্রেন্সড পজিশন নিতে শুরু করে। এবং বাঙালি ও পশ্চিম পাকিস্তানী সৈন্যদের মধ্য সন্দেহ, অবিশ্বাস সৃষ্টি হতে শুরু হল।

 

বিমান বাহিনীতেও শেষের দিকে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে কমান্ডোদের আনা হচ্ছিলো। এয়ারফিল্ডের বিভিন্ন জায়গায় বাঙালিদের সরিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানীদের নিয়োগ করা হয়।

 

২৮ মার্চ আমি এমওডিসি কমান্ডারকে ডেকে যদি পারে ছুটি নিয়ে ও অস্ত্র নিয়ে পালিয়ে যেতে বললাম। বেশ কয়েকজন এমওডিসি কমান্ডার অস্ত্র নিয়ে পালিয়ে গিয়েছিল।

 

২৮/২৯ শে মার্চ বিমান বাহিনীর স্যাবর জেটগুলোতে রকেট লাগানো শুরু হয়- কুমিল্লা, চট্রগ্রাম ও যেই সমস্ত জায়গায় প্রতিরোধ চলছে ঐ সমস্ত এলাকায় বোমা বর্ষণের জন্য। রকেট গান ফিট করার কাজে সে সময় বাঙালিরা ছিল। কিন্তু ওইদিন ওই কাজে পশ্চিম পাকিস্তানীদের নিয়োগ করা হয়। ২৯/৩০ শে মার্চ বিমান বাহিনী চট্রগ্রাম বেতার কেন্দ্রে বোমা বর্ষণের জন্য যায়। সেখান থেকে মেজর জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষনা করেছিলেন।

 

২৫ শে মার্চের ক্রাক ডাউন – এরপর আমি নিজেকে পাকিস্তান বিমান বাহিনীর সদস্য বলে মেনে নিতে পারছিলাম না।

 

আমি ২৯ শে মার্চ ছুটির জন্য দরখাস্ত করেছিলাম। দুই সপ্তাহের ছুটি দেওয়া হয়েছিল। আমি ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মারগুবের সাথে যোগাযোগ করলাম এবং ৩ রা এপ্রিল স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য ভারত যাওয়ার চেষ্টা করলাম। কিন্তু যোগাযোগ ব্যবস্থার দরুণ যেতে পারিনি।

 

১২ ই মে তারিখে আমি, উইং কমান্ডার বাশার, ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট রেজা(অবসরপ্রাপ্ত ফ্লাইং অফিসার- বদরুল আলম আগরতলাতে পৌঁছি)

 

—————————————————-

 

<৯, ১.৪, ১২>

ঢাকার পিলখানার কথা
সাক্ষাৎকারঃ মেজর দেলোয়ার হোসেন
১৯ নভেম্বর ১৯৭৩

 

মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহের দিকে ২২ জন বেলুচকে পিলখানাতে আনা হয়েছিলো। তাদেরকে এখানে থাকার জায়গা দেয়া হয়েছিলো। এবং পিলখানার ইপিআর’এর সাথে ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় ইন্টারনাল সিকিউরিটি ডিউটি করার জন্য ভার দেয়া হয়েছিলো। ওরা এখানে আসাতে ইপিআরদের মাঝে সন্দেহ অবিশ্বাস আরো ঘনীভূত হয়। ওরা এখানে আসাতে আমরা বুঝতে পারলাম যে হয়তো কিছু একটা ঘটতে পারে। ক্যাপ্টেন গিয়াসের সাথেও আমার এ ব্যাপারে কথাবার্তা হয়েছিলো।

 

২৫ মার্চ বেলা একটার সময় মেজর জামিল (পশ্চিম পাকিস্তানী, জেনারেল স্টাফ অফিসার- ইপিআর হেড কোয়ার্টার) আমাকে তার অফিসে ডেকে পাঠান। তিন ঘন্টা পর্যন্ত আমি তার অফিসে বসে অফিশিয়াল কথাবার্তা বলেছি। তারপর তিনি আমাকে বলেন যে, তোমাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। প্রহরী এসে আমাকে নিয়ে যায়।

 

রাত আনুমানিক ১২টার দিকে চারিদিকে গোলাগুলি শুরু হয়ে যায়। আমি অনুমান করেছি যে, ২২ বেলুচ বাঙালি ইপিআরদের উপর আক্রমণ করেছে। আমাকে যে ঘরে বন্দী করে রাখা হয়েছিলো সেদিকেও গুলি এসে পড়ছিলো। রাত তিন চারটার দিকে গোলাগুলি একটু কমে যায়। আমাদের যে সমস্ত বাঙালি ইপিআর পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিলো তারা নিরাপদ জায়গায় গিয়ে গুলি ছুঁড়ছিলো। জানালা দিয়ে দেখতে পেলাম তারা অনেককে বন্দী করে নিয়ে যাচ্ছে। ২৬ মার্চেও ঠুসঠাস গুলির শব্দ শুনতে পেলাম।

 

২৭ মার্চ সকালে ক্যাপ্টেন আরেফ (পাঞ্জাবী) যে এই হেড কোয়ার্টারে কাজ করতো সে আমাকে এসে বললো, “ইউ আর এ গাদ্দার, ইউর আংকেল ক্যাপ্টেন রফিক ইজ অলসো এ গাদ্দার। উই আর গোইং শুট ইউ আউট বোথ।”

 

১৭ এপ্রিল পর্যন্ত আমাকে এখানে বন্দী অবস্থায় রাখা হয়। বন্দী অবস্থায় আমাকে অনেক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিলো। কিন্তু কোনো নির্যাতন চালানো হয় নি। পরে আমাকে পাকিস্তান পাঠিয়ে দেওয়া হয়। ঐ রাতে বহু বাঙালি ইপিআরকে হত্যা করা হয়। বন্দী অবস্থায়ও অনেককে হত্যা করা হয়।

 

মার্চ মাসের তৃতীয় সপ্তাহে পিলখানার বাঙালি ইপিআর’রা বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেছিলো প্যারেড গ্রাউন্ডের মাঝখানে দণ্ডায়মান বটবৃক্ষের শীর্ষে। বাংলাদেশ সেনানিবাস সমূহের মধ্যে প্রথম জাতীয় পতাকা পিলখানাতেই উত্তোলিত হয়েছিলো। ল্যান্স নায়েক বাশার এ পতাকা উত্তোলন করেছিলেন। পরে তাকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। পিলখানায় অবস্থিত প্রায় ২৫০০ বাঙালি সৈন্যের মধ্যে মাত্র ৬ শতাধিক সৈন্য রাতের অন্ধকারে পালাতে সক্ষম হয়েছিলো। বাকি সবাই বন্দী হয় আর তাদের পাঠানো হয় নৃশংস অত্যাচার ও হত্যার বধ্যভুমি মোহাম্মদপুর বন্দী শিবিরে। পরবর্তীকালে জিসিও/এসসিও এবং সুশিক্ষিত প্রায় ৭ শতাধিক বাঙালি সৈনিককে হত্যা করা হয়েছিলো বুলেট ও বেয়নটের নির্মম আঘাতে। ঐ রাতে যারা পালাতে পেরেছিলো তাদের অনেকে স্বাধীনতা সংগ্রামে যোগ দিয়েছিলো। তারা প্রতি এলাকায় অমিতবিক্রমে সম্মুখযুদ্ধে পর্যুদস্ত করেছিলো পাকিস্তানীদের।

 

বাংলাদেশের দীর্ঘ নয় মাসে এই বাহিনীর ১ হাজারের মতো সদস্য স্বাধীনতার জন্য নিজেদের মূল্যবান জীবন উৎসর্গ করেছিলো। অনেকে পঙ্গু অবস্থায় দিন যাপন করছে।

 

স্বাক্ষরঃ দেলোয়ার হোসেন
১৯-১১-৭৩

 

——————————————-

 

<৯, ১.৫, ১৩-১৪>

পিলখানার আরও কথা
সাক্ষাৎকারঃ মোঃ আশরাফ আলী সরদার
১২১৯৭৪

২৩ মার্চ পাকিস্তান দিবস ছিল। ঐ দিন আমরা প্রস্তুত ছিলাম কোন একটা নির্দেশ পাবার অপেক্ষায়। কিন্তু দুভার্গ্যবশত কোন নির্দেশ পাই নি। তারপর ২৪শে মার্চ আমাদের নিজস্ব সিদ্ধান্তে পিলখানার প্যারেড গ্রাউন্ডের বটবৃক্ষের শীর্ষে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়। এবং সে পতাকার উর্দুতে লেখা ছিল, “ পশ্চিমারা আবি বাংলা ছোড়কে ভাগ যাও, নেহি ত এধারই তোম লোগ ভাগ যাও, নেহি ত এ ধারই তোম লোগ কা কবর বানায়েগা।”

 

পশ্চিম পাকিস্তানীরা এ পতাকা দেখে উত্তেজিত হয়ে ওঠে এবং ঐ পতাকা নামিয়ে ঢাকা সেনানিবাসে পাঠিয়ে দেয়। এই পতাকা উত্তোলন সংবাদ সিগনালের বেতার মারফত সমস্ত সেক্টর, উইং এবং চৌকিতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এবং তারাও বিকেলে খবর দিল যে তারাও পতাকা উত্তোলন করেছে। যশোর থেকে বেতারে খবর আসলো যে, সেখানকার বাঙালি ইপিআররা যথাযোগ্য মর্যাদার সঙ্গে সাময়িক সালাম (গার্ড অব অনার) দিয়ে পতাকা উত্তোলন করেছে।

 

২৪শে মার্চ রাতে পিলখানায় অবস্থিত সমস্ত বাঙালি ইপিআরকে নিরস্ত্র করা হয়। পশ্চিম পাকিস্তানীরা আমাদের বলে যে, শেখ সাহেবের ৭ই মার্চের ঘোষিত চার দফা ইয়াহিয়া খান মেনেছে এবং শিগগিরিই ক্ষমতা হস্তান্তর করা হবে। দেশে এখন শান্তি বিরাজ করছে। সুতরাং সবাই অস্ত্র জমা দিয়ে বিশ্রাম করুন।

 

২৫শে মার্চ বৃহস্পতিবার বিকেল পর্যন্ত আমরা পশ্চিম পাকিস্তানীদের উপোরোক্ত ভূয়া আশ্বাসে বিশ্বাস করেছিলাম। কিন্তু যখন শুনতে পারলাম যে, নরখাদক ইয়াহিয়া তার দলবল নিয়ে কোন সিদ্ধান্ত ছাড়াই ঢাকা ত্যাগ করেছে তখন আমি নায়েক সুবেদার শহীদ শামসুল হক সাহেবের সঙ্গে যোগাযোগ করি। তিনি সেদিন কোয়াটার গার্ড ডিউটি অফিসার ছিলেন। তিনি আমাকে বাইরে গিয়ে সংবাদ নিতে নির্দেশ দিলেন। তখন রাত প্রায় আটটা। আমি সরাসরি ইকবাল হলে যাই। কিন্ত সেখানে কোন ছাত্রনেতাকে পেলাম না। আমি সেখান থেকে সুবেদার শহীদ জহীরউদ্দিন মুন্সির বাড়ীতে যাই। তাকে সমস্ত বিষয় অবগত করি। তিনি আমার কথা পুরোপুরি বিশ্বাস না করে নায়েক নূর হোসেনের সঙ্গে শেখ সাহেবের বাড়ির দিকে রওনা হন। তিনি আমাকে কি করতে হবে না হবে পরে জানাবেন বলে বললেন। আমি এবং হাবিলদার শহীদ বেলায়েত হোসেন রাত এগারোটা পর্যন্ত তাদের অপেক্ষায় সিগনাল ওয়ার্কশপে বসে থাকি। আমরা দুজন আমাদের সিগনালের লোকজনকে কিছু একটা খবর আসবে বলে সর্তক করে দিয়েছিলাম। এবং ১৫ শাখার জনৈক সিপাহীকে এ সংবাদ পৌছে দেই। এছাড়া আমরা উভয়ে আমাদের অস্ত্রাগারের ভারপ্রাপ্ত এনসিও শহীদ নায়েক হাসেমকে জিজ্ঞাসা করি যে, অস্ত্রাগারের কোন ডুপ্লিকেট চাবি তৈরী হয়েছে কি না যা আগে আপনাকে বলা হয়েছিল। তিনি বললেন যে, তার কাছে ডুপ্লিকেট চাবি আছে। এই সংবাদ আমরা শহীদ নায়েক সুবেদার শামসুল হক সাহেবকে কোয়াটার গার্ডে গিয়ে জানাই। তিনি আমাদেরকে নির্দেশ দিলেন যে, কোন রকম হামলা হলে প্রত্যোকে অনতিবিলম্বে অস্ত্রাগারে চলে আসবে। এখানে আমি উপস্থিত থাকবো তোমরা লাইনে গিয়ে বিশ্রাম নাও এবং দুজন প্রহরী নিয়োগ কর। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আমাদের সে সুযোগ আসে নি।

 

২৫শে মার্চ দিবাগত রাত ১টা পাঁচ মিনিটে প্রথম গুলির আওয়াজ হয়। আমরা প্রত্যেকেই সামরিক পোশাকে ব্যারাকে বিশ্রাম নিচ্ছিলাম। আমাদের প্রহরী আমাদেরকে সর্তক করে দিয়ে বলে যে, পশ্চিমারা আমাদেরকে আমক্রম করেছে। তখন আমরা সবাই পূর্ব নির্দেশ মতো অস্ত্রাগারে যাবার জন্য বের হয়ে পড়ি। কিন্ত দেখতে পেলাম গুলির আগেই তারা সমস্ত পিলখানাকে অস্ত্রাগারে যাবার জন্য বের হয়ে পড়ি। কিন্তু দেখতে পেলাম গুলির আগেই তারা সমস্ত পিলখানাকে অস্ত্রাগারসহ দখলে নিয়ে নিয়েছে। আমরা যখন বাইরে আসলাম তখন চারিদিক থেকে এলএমজি/এসএমজি ব্রাশ ফায়ার আমাদের উপর আসতে থাকে। তখন আমরা অনন্যপায় হয়ে এদিক-সেদিক দৌড়াদৌড়ি করতে থাকি। অল্প সংখ্যক পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। বাকি সবাই বন্দী হয়ে যায়। রাত ৪টার সময় আত্মসর্মপণ করায়।

 

৩নং গেটে কর্তব্যরত কয়েকজন বাঙালি ইপিআর পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। একজন লেফটেন্যান্টসহ ৬ জন পশ্চিম পাকিস্তানী বেলুচ রেজিমেন্টের লোক নিহত হয়। এই খণ্ড যুদ্ধে বাঙালিদের সঙ্গে কর্তব্যরত একজন পাঞ্জাবী ইপিআর মোহাম্মদ খানকেও হত্যা করা হয়। এই খণ্ড যুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছিল গার্ড কমান্ডার নায়েক জহিরুল হক। সে তার সহকর্মীদের নিয়ে বেড়িয়ে যেতে সক্ষম হয়। ঢাকায় অবস্থিত সিগনালের প্রধান বেতার কেন্দ্রে খবর পৌঁছে দেয়া হয় যে, উইং কমান্ডের লেফটেন্যান্ট কর্ণেল আব্দুর রহমান আওয়ান আমাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছে সমস্ত বেতার যোগাযোগ বন্ধ রাখার জন্য। আমাদের কর্তব্যরত অপারেটররা সংকেতের সাহায্যে এক ভয়াবহ পরিস্থিতির কথা বাইরে কর্তব্যরত সেক্টর/উইং/বিওপি পযর্ন্ত সমস্ত ইপিআরকে জানিয়ে দেন। ২৬ শে মার্চ সকাল দশটা পর্যন্ত আমাদের এইচ-এফ (হাই ফ্রিকোয়েন্সি সেট) চালু থাকে যার মাধ্যমে ২৬শে মার্চের ঘটনা নায়েক শহীদ বাশার বাইরের সবাইকে জানিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি তার শেষ সংবাদে চট্টগ্রামকে বলেছিলেন যে, আমাদের সবাই বন্দী হয়ে গেছে। হয়তো কিছুক্ষণ পর আমিও বন্দী হয়ে যাব আর নির্দেশ দেবার সময় পাবনা। তোমরা সমস্ত পশ্চিমাদের খতম কর। চট্টগ্রাম থেকে হাবিলদার বাহার উক্ত সংবাদ সীমান্তের চৌকি পযর্ন্ত পৌঁছে দেয় এবং আমাদের লোকজনকে অনুপ্রাণিত করার জন্য সে বলেছে যে, আমি ঢাকা থেকে বলছি। সম্পূর্ণ ঢাকা আমাদের নিয়ন্ত্রাণাধীন চলে এসেছে এবং ইপিআর- এর ডাইরেক্টর জেনারেল বিগ্রেডিয়ার নেসার আহমদ বন্দী হয়েছেন। তোমরা স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড় এবং সমস্ত পশ্চিম পাকিস্তানীদের বন্দী করে রির্পোট দাও।

 

———————————————

<৯, ১.৬, ১৪-১৫>

প্রতিরোধ যুদ্ধে রাজারবাগ পুলিশ বাহিনী

সাক্ষাৎকারঃ মোঃ আসমত আলী আকন্দ
(১৯৭১ সালের পূর্বে রাজারবাগ পুলিস রিজার্ভ অফিসের প্রোসিডিং সেকশনে এ-এস-আই হিসেবে কর্মরত ছিলেন)

এস, আই অব পুলিশ, রমনা থানা, ঢাকা
১০-১-৭৪

 

১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ সন্ধ্যায় আমি রাজারবাগ রিজার্ভ অফিসে কাজ করছিলাম। আমাদের রিজার্ভ অফিসের বাইরে সহস্র বিক্ষুদ্ধ জনতা বড় বড় গাছ ও ইট পাটকেল দিয়ে ব্যারিকেড তৈরী করেছিলো। সন্ধ্যার সময় এ সংবাদ চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছিলো যে, পাক হানাদার বাহিনী রাজারবাগ পুলিশের রিজার্ভ অফিস আক্রমণ করবে। এ সংবাদ শোনার পরে আমি রাত সাড়ে ন’টার সময় তেজগাঁও থানার কর্তব্যরত পুলিশ কর্মকর্তাকে ঢাকা সেনানিবাসে পাক হানাদারদের মনোভাব কি তা জানবার জন্য টেলিফোনে অনুরোধ করি। তিনিও পাক হানাদার কর্তৃক রাজারবাগ রিজার্ভ অফিস আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনার কথা শুনেছেন বলে জানান। এরপর আমি তেজগাঁও’এ আবার ফোন করে জানতে পারি যে, তখন পাক হানাদারদের প্রায় ৮০/৯০টি সশস্ত্র ট্রাক ও জীপ তাদের থানার রাস্তা ধরে রাজধানীতে প্রবেশ করতে তারা দেখেছেন। রাজারবাগ রিজার্ভ পুলিশের উপর পাক হানাদারদের এমন উলঙ্গ হামলার সংবাদ শুনে আমাদের আরআই একেবারে হতবাক হয়ে যান। এরপর আমরা পুলিশের রিজার্ভ অস্ত্রাগার থেকে প্রয়োজন মত অস্ত্র নিয়ে হানাদারদের শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত প্রতিরোধ এবং প্রতিহত করার জন্য রাজারবাগ পুলিশ রিজার্ভ অফিসের চারিদিকে পজিশন নিয়ে শত্রুর অপেক্ষা করতে থাকি। আমরা পুলিশ লাইনের সমস্ত বাতি নিভিয়ে চারিদিকের পরিবেশ একেবারে অন্ধকারাচ্ছন্ন করে ফেলি। আমরা বাইরে অনেক দূর থেকে পাক হানাদারদের বিক্ষিপ্ত গুলিবর্ষণের শব্দ শুনছিলাম। আমরা শুধু পজিশন নিয়ে শত্রুর অপেক্ষা করছিলাম। অয়ারলেস ও টেলিফোনের সমস্ত যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো।

 

সারা শহর অন্ধকার, নীরব, নিথর ও নিস্তব্ধ। আনুমানিক মধ্যরাতে পাক হানাদারেরা প্রথম রাজারবাগ পুলিশ লাইনের হাসপাতাল গেট (দক্ষিন দিক) থেকে গোলাবর্ষণ শুরু করে। আমরা তার পাল্টা জবাব দেই। এবং পাক পশুদের প্রাণপণ প্রতিহত করার চেষ্টা করি। ওরা আমাদের লৌহকঠিন মনোবল ভেঙ্গে দেওয়ার জন্য ভারী অস্ত্র, শেল, কামান ও ট্যাংক ব্যবহার করে। আমাদের উপর সাংঘাতিকভাবে বৃষ্টির মতো গোলাবর্ষণ করতে থাকে। আমরা প্রথমে আত্মসমর্পণ করিনি এবং আত্মসমর্পণের মতো কোনো দুর্বলতাও দেখাই নি। বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের উদাত্ত আহবান অনুযায়ী আমরা আমাদের যার হাতে যে অস্ত্র ছিলো তা দিয়ে সমস্ত পাক হানাদারদের প্রাণপণে প্রতিহত করার চেষ্টা করি। এবং এভাবে আমাদের সামান্য অস্ত্র নিয়ে পাক হানাদেরদের প্রাণপণ প্রতিরোধ ও প্রতিহত করে জীবনদান করার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা নিয়ে যুদ্ধ করছিলাম। আমাদের মনোবল ভেঙ্গে দেওয়ার জন্য ওরা গভীর রাতে রিজার্ভ অফিসের উত্তর দিকে টিনশেড ব্যারাকে লাইট বোম ও পেট্রোল দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। সেখানে পাক সেনাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সৃষ্টি করেছিলো আমাদের এমন কতিপয় বীর সিপাহী নিদারুন ভাবে দগ্ধীভূত হয়ে শহীদ হন। অনেকে সাংঘাতিকভাবে আহত হয়ে সেখানেই মৃতবৎ পড়ে থাকেন। আগুনের লেলিহান শিখা ক্রমেই প্রসারিত হতে থাকে এবং সমস্ত ব্যারাক পুড়ে ভস্ম হয়ে যায়। আমরা উপায়ন্তর না দেখে ছাদের উপর গিয়ে আত্মরক্ষা করতে থাকি। সেই সাথে পাক হানাদারদের প্রাণপণ প্রতিহত করা অব্যাহত রাখি। ব্যারাকের চারিদিকে আগুনের লেলিহান শিখায় আমরা বিন্দুমাত্র দমে যাইনি। আর আমাদের মনোবল কোনো সময়ই দুর্বল হয়ে পড়েনি। ওদিকে কামান, শেল আর ট্যাংকের গর্জন ও বৃষ্টির মতো গোলাবর্ষণ চলছিলো। কামান ও শেলের প্রচণ্ড আঘাতে আমাদের কয়েকটি পাকা ব্যারাকের প্রাচীরঘেরা মটর ওয়ার্কশপ মাটিতে ধসে পড়ে। ফলে আমাদের সিপাহীরা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে নিজ নিজ সুবিধামতো স্থান গ্রহণ করে। চারিদিকে জ্বলন্ত আগুন, অবিরাম শেলিং ও কামানের গর্জনের মধ্যেও প্রাণপণে প্রতিরোধ করছিলো পাক পশুদের। আমাদের অনেক বীর সিপাহীকে প্রতিরোধ করতে করতে শহীদ হতে দেখেছি আমি স্বচক্ষে। এমনিভাবে পাক হানাদারদের প্রতিহত করতে করতে রাতের অন্ধকার কেটে যায়। ভোর হয়ে যায় এবং বেলা উঠে যায়। আমাদের গুলি প্রায় নিঃশেষ হয়ে যায় দেখে আমরা আর কোনো উপায়ন্তর পাই না। ইতিমধ্যে পাক হানাদারদের হাজারো হুমকির মুখেও আমাদের মনোবল এতটুকু দুর্বল হয়ে পড়েনি। তারা ব্যারাকে ঢুকে আমাদের বন্দী করে এবং ছাদের উপর থেকে আমাদেরকে নিচে নামিয়ে এনে বুটের লাথি ও বন্দুকের বাট দিয়ে সজোরে এলোপাতারি আঘাত করতে শুরু করে। আকস্মাৎ এক হানাদার পাক পশু হাতের বন্দুক দ্বারা আমার মাথায় সজোরে আঘাত করলে আমার মাথা ফেটে ফিনকি দিয়ে রক্ত পড়তে থাকে। তৎক্ষণাৎ অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাই। তিন ঘন্টা পড়ে আমি জ্ঞান ফিরে পাই। উর্ধ্বতন কর্মকর্তা, এমআই, এএসআই, হাবিলদার, সুবেদার, নায়েক, সিপাহীসহ আমরা প্রায় দেড়শত বীর যোদ্ধাকে পাক হানাদারদের হাতে বন্দী অবস্থায় কাটাতে হয়। ১৯৭১ সালের ২৬ শে মার্চ থেকে ২৯ শে মার্চ পর্যন্ত সম্পূর্ণ বন্দী অবস্থায় কাটাতে হয়।

 

২৯শে মার্চ বিকাল সাড়ে চারটায় ঢাকার তৎকালীন পুলিশ সুপার জনাব ই.এ. চৌধুরী রাজারবাগে আমাদের পুলিশ লাইনে আসেন এবং পাক হানাদারদের মেজরের সাথে কথোপকথনের পর আমাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয় “আব তুমলোগ চালা যাও, আয়েন্দা কাল ভোর ছ বাজে মিল ব্যারাকমে তোমলোগ রিপোর্ট করেগা, আওর উহাই তোমলোগ রাহেগা- ইদার হামলোগকা জোয়ান রাহেগা।”

 

  • ৯ম খণ্ডের ১৫ নং পৃষ্ঠার শেষাংশে মুদ্রিত অর্থাৎ উপরের হলুদ চিহ্নিত অংশটুকু দলিলপত্রের ৮ম খণ্ডের ২২ নং পৃষ্ঠার সাথে কনফ্লিক্ট করে। আপনারা ক্রসচেক করে দেখতে পারেন।

————————————————————-

 

<৯, ১.৭, ১৫-১৬>

সাক্ষাৎকারঃ আঃ গনি তালুকদার

(১৯৭১ সালের ২৫ শে মার্চের স্বাধীনতা সময় রাজারবাগ (রিজার্ভ) পুলিস লাইনে ওয়ারলেস অপারেটর ছিলেন)
অফিস সহকারী (পুলিশ), রমনা থানা, ঢাকা (সদর)
৯-১-৭৪

সিপাহী আব্দুল খালেক খালেক, মোজাম্মেল হক, মুখলেসুর রহমান, মির্জা মহিউদ্দিন এবং আরো অন্যান্য বন্ধু ও সহকর্মীসহ আমরা ২৫ শে মার্চ রাত দশটার সময় খাওয়া-দাওয়া করে ১৪ নং ব্যারাকে বসে ছিলাম। রাত পৌনে এগারোটার সময় ঢাকা পিলখানা ইপিআর হেড কোয়াটার থেকে টেলিফোনে পাক হানাদার কর্তৃক রাজারবাগ পুলিশ রিজার্ভ ও ইপিআর হেডকোয়াটার আক্রমনের সংবাদ পাই। টেলিফোনে ইপিআর হেডকোয়াটার থেকে আমাদের সশস্ত্রভাবে পাক হানাদারদের মোকাবেলা করার জন্য থাকতে বলা হয়। আমরা আমাদের ১৪ ব্যারাকে মোট পঞ্চাশজন সিপাহী এএসআই, হাবিলদার ও সাধারণ সিপাহী উপস্থিত ছিলাম। এসংবাদ দ্রুত রাজারবাগ রিজার্ভ পুলিশের আরআই ও এসপি হেডকোয়াটারকে জানানো হয়। এ সংবাদ পেয়ে রিজার্ভ পুলিশের সকল অফিসার ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা সবাই ডিউটিতে এসে সকল সিপাহী, সুবেদার, এএসআই, এসআই, হাবিলদার সবাইকে অস্ত্রশস্ত্রে সুসজ্জিতকরে পাক হানাদারদের মোকাবেলা করার জন্য তৈরী করেন এবং প্রত্যেক ডিউটিতে মোতায়েন করেন। তৎকালীন রাজারবাগ পুলিশ লাইনের পুলিশ সুপার মিঃ শাহজাহান ও আরআই মিঃ মফিজউদ্দিন আমাদের এই সশস্ত্র প্রস্তুতিতে নেতৃত্ব দান করেন।

 

পুলিশ সুপার ও আরআই উভয়েই শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত পাক হানাদারদের বিরুদ্ধে লড়ে যাবার জন্য জ্বালাময়ী ভাষায় সংক্ষিপ্ত নির্দেশ দান করে নিজ নিজ দায়িত্বে চলে যান। এরপর রাজারবাগ পুলিশ লাইনের সমস্ত বাতি নিভিয়ে দেওয়া হয়। আমরা সবাই সিপাহী, হাবিলদার, সুবেদার, এএসআই, এসআই, সবাই সশস্ত্রভাবে পজিশন নিয়ে পাক হানাদার বাহিনীর অপেক্ষা করতে থাকি। এসময় অয়ারলেস এবং টেলিফোন সবকিছু অচল করে দেওয়া হয়েছিল। রাজারবাগ পুলিশ লাইনের বাইরে সহ ছাত্র-জনতা বড় বড় গাছ লাইটপোষ্ট, ইট-পাটকেল ফেলে ব্যারিকেট তৈরী করে। রাজারবাগে প্রবেশ করার পথে পথে বহু প্রশস্ত ড্রেন কাটা হয় হানাদার বাহিনীর অগ্রগতি প্রতিরোধ করার জন্য। এভাবে প্রস্তুতি ও প্রতিরোধ তৈরী করার মধ্য দিয়ে সাড়ে এগারোটা বেজে যায়। পাক হানাদাররা রাত সাড়ে এগারোটার সময় রাজারবাগ পুলিশ লাইনে চারিদিক থেকে লাইট বোম মারতে মারতে অগ্রসর হয়। এরমধ্যে চলছিল বৃষ্টির মতো গুলিবর্ষণ, কামান ও ট্যাংকের গর্জন। পাক হানাদার হামলার সাথে সাথে আমরা সবাই আমাদের সামান্য রাইফেল বন্দুক নিয়ে ওদের হামলার প্রাণপণ জবাব দিতে থাকি। ওরা আমাদের দৃঢ় মনোবল দেখে এরপর যুগপৎ কামান ও ট্যাংক ব্যবহার করে। আমরা টিকতে না পেরে ক্রমে পিছু হটতে থাকি। আমাদের অধিকাংশ বীর যোদ্ধা লড়তে লড়তে শহীদ হন। অনেকে দারুণভাবে আহত হয়ে মৃতবৎ সেখানেই পড়ে থাকেন। আর অনেকে আহত দেহ নিয়ে প্রাণ রক্ষা করতে সমর্থ হন। পাক হানাদার পশুরা আমাদের লৌহকঠিন মনোবল ভেঙ্গে দেয়ার জন্য এরপর রাজারবাগ পুলিশ লাইনের সকল ব্যারাকে লাইট বোমা ও প্রেট্রোল দ্বারা আগুন লাগিয়ে দেয়। আমাদের বহু আহত যোদ্ধা ঐ সকল ব্যারাকে আটকা পড়ে জলন্ত আগুনে দগ্ধীভূত হয়ে শাহাদাৎ বরণ করেন। আনুমানিক রাত তিনটার সময় অবিরাম গোলাবর্ষনের মধ্য দিয়ে আমি আমার অস্ত্র ফেলে দিয়ে আত্মরক্ষা করার জন্য ঢাকা শহরের বাইরে চলে যাই।

 

————————————————
<৯, ১.৮, ১৬-১৯>

সাক্ষাৎকারঃ শরীফ খান মোহাম্মদ আলী

(১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাজারবাগ পুলিশ লাইনে হাবিলদার মেজর হিসেবে কর্মরত ছিলেন)


আর্মড সাব-ইন্সপেক্টর অব পুলিশ
বিআরপি, রাজশাহী
৩-২
৭৪

১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ সকাল থেকে আমাদের পুলিশ লাইনে নীরব, নিস্তব্ধ ও থমথমে ভাব বিরাজ করছিলো। স্পেশাল আর্ম ফোর্স-এ আমার লাইনে রাত আটটায় বাইরের কর্তব্যরত সিপাহী বাদে আমি নাম ডাকার সময় মাত্র ত্রিশজন বাঙালি সিপাহীকে উপস্থিত পেয়েছি। আমি কোন অবাঙালি সিপাহীকেই লাইনে উপস্থিত পাইনি। ওরা সন্ধ্যার পরপরই আমার লাইন থেকে ডিউটি ত্যাগ করে কোথায় উধাও হয়ে গিয়েছিল তার কোনো হদিস পাইনি। নাম ডাকার সময় বিপুলসংখ্যক সিপাহীর এভাবে উধাও হয়ে যাওয়ার ঘটনা রাজারবাগ পুলিশ লাইনের ইতিহাসে আর ঘটে নি। ঢাকা জেলা রিজার্ভ লাইনের এ অবস্থা ছাড়া কেন্দ্রীয় লাইন থেকেও সেদিন সকল অবাঙালি সিপাহী তাদের পদস্থ অফিসারদের নির্দেশ ও মর্যাদা একেবারে উলঙ্গভাবে, পুলিশের ইতিহাসে এই প্রথম , অবজ্ঞা ও উপেক্ষা করে সম্মিলিতভাবে একযোগে উধাও হয়ে গিয়েছিলো। অবাঙালি সিপাহীদের রাজারবাগ পুলিশ লাইন থেকে এভাবে উধাও হয়ে যাওয়ার পর আমরা আসন্ন বিপদের কথা বুঝতে পারি এবং আমার অধীন বাঙালি সিপাহীদের হাতে অস্ত্র দিয়ে পুলিশ লাইনের সকল প্রবেশপথে তাদেরকে কড়া প্রহরায় নিযুক্ত করি। পুলিশ লাইনের চারটি প্রবেশপথে চারজন হাবিলদারের সাথে ছয়জন করে সশস্ত্র সিপাহী মোতায়েন রাখি। আমি খুব চিন্তাযুক্তভাবে পুলিশ লাইনে টহলরত ছিলাম। আমি এক সময় দোতলা থেকে অস্ত্রাগারের সিঁড়ি বেয়ে নীচে নামছিলাম। এমন সময় অস্ত্রাগারের ভিতরের টেলিফোনটি বেজে উঠলে আমার কর্তব্যরত নায়েক চিৎকার করে আমাকে টেলিফোন ধরতে বলে। আমি দৌড়ে গিয়ে টেলিফোন ধরলাম। অস্ত্রাগারের সেই টেলিফোনে এক ভীতসন্ত্রস্ত কাঁদো কাঁদো কম্পিত কণ্ঠ চাপাচাপা অস্ফুট কণ্ঠে বলছিল “মিলিটারী হেডকোয়ার্টারে বহু সশস্ত্র আর্মি ট্রাক লাইন হয়ে দাড়িয়ে আছে। ওরা এখুনি রাজধানী আক্রমণ করতে যাচ্ছে।” সেই ভীত কণ্ঠ আরো বলেছিলো- “ওদের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু রাজারবাগ পুলিশ লাইন, ই-পি-আর হেড কোয়ার্টার ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইকবাল হল।“ এ কথা বলেই সেই কণ্ঠ স্তব্ধ হয়ে গেলো। “কে বলছেন? কোথা থেকে বলছেন ?“ আমি চিৎকার করে এসব প্রশ্ন করার সাথে সাথে টেলিফোনের লাইন বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলো। সিপাহীরা টেলিফোনের এ মারাত্মক সংবাদ লাইনের সর্বত্র চীৎকার করে ছড়িয়ে দিচ্ছিলো। এ সংবাদে সকল সিপাহী অস্ত্রাগারের দিকে ছুটে এসে টেলিফোনের সংবাদ সম্পর্কে নানা প্রশ্ন করতে থাকে। এ সময় আমি লাইনে বসে রাজারবাগ পুলিশ লাইনের তৎকালীন আর-আই মিঃ মফিজউদ্দীনের সাথে তার বাসায় টেলিফোনে যোগাযোগ করে ঢাকা সেনানিবাস থেকে ভেসে আসা পাক সেনাদের রাজারবাগ পুলিশ লাইনের দিকে ধেয়ে আসার সংবাদ বিস্তারিত জানালে তিনি তৎকালীন পুলিশ সুপার ই,এ, চৌধুরী সাহেবকে সব কিছু জানাচ্ছেন বলে টেলিফোন ছেড়ে দেন। এদিকে আমার সিপাহীরা এবং রাজারবাগ পুলিশ লাইনের চারশত বাঙালি বলছিলো “অস্ত্র দাও, অস্ত্র দাও। আমাদের হাতে অস্ত্র তুলে দাও, আমরা ওদের প্রতিরোধ করব, প্রতিহত করবো।“ শেষ পর্যন্ত অস্ত্রাগারের সামনে দাঁড়িয়ে আমার হাবিলদার সহকর্মীরা বুকফাটা চীৎকারে রাজারবাগ কাঁপিয়ে তুলে বলছিলো “আমাদের হাতে অস্ত্র দাও, আমরা লড়বো, লড়তে লড়তে মরবো, শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত লড়াই করবো ঐ বেঈমানদের বিরুদ্ধে কিন্তু পিছু হটবো না, হটবো না।“ এরপর আমি রিজার্ভ ইন্সপেক্টর সাহেবের বাসায় গিয়ে তাকে না পেয়ে আমাদের ফোর্সের সুবেদার আবুল কাসেমকে এ সংবাদ জানালে তিনি লাইনে ছুটে আসেন। এর পরপরই আমাদের আরআই সাহেব পুলিশ সুপার ই,এ চৌধুরীর সাথে আলাপ –আলোচনা করে লাইনে এসে বলেন, “তোমরা ওদের রুখতে পারবে না কোনো প্রকারেই, দেখো আমাদের নীরব থাকাই ভালো।“

কিন্তু তখন নীরব থেকে প্রাণ বাঁচাবার কোনো উপায় ছিলো না। পুলিশ লাইনের সকল বাঙালি সিপাহীই তখন অস্ত্র নিয়ে ওদেরকে প্রাণপণ প্রতিরোধ করার জন্য ব্যাকুল ও ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলো। সিপাহীরা বলছিলো, “আর-আই সাহেব আপনি অস্ত্রাগার খুলে দিন, আমাদের হাতে অস্ত্র তুলে দিন, আমরা ওদের প্রতিরোধ করবো।“ এরপর আর-আই সাহেব অস্ত্রাগারের চাবি দিয়ে দিলে বাঙালি সিপাহীরা সবাই পাগলের মতো অস্ত্রাগারে প্রবেশ করে যার যার প্রয়োজন মতো রাইফেল ও গুলি হাতে তুলে নেয়। এ সময় চারিদিক থেকে হাজারো জনতা রাজারবাগ পুলিশ লাইনে প্রবেশ করে আমাদের অস্ত্রাগার থেকে বিনা বাধায় অস্ত্র নিয়ে যায়। এসময় আমাদের অফিসাররা বাইরে কর্তব্যরত ছিলেন। এ সময় সুবেদার ফোর্স আবুল কাসেম, আর-ও হাফিজুর রহমান, সার্জেন্ট মূর্তজা হোসেন, সুবেদার আবুল হাশেম, নায়েক মোহাম্মদ আলী (ফুটবল খেলোয়াড়) সবাই সশস্ত্রভাবে আমাদের সিপাহীদের সাথে মরণের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য তৈরী ছিলেন। রাজারবাগ পুলিশ লাইনের সমস্ত বাতি নিভিয়ে দিয়ে সমস্ত সিপাহী লাইনের চারিদিকে মাটিতে শুয়ে, ছাদের উপর বসে থেকে, দাঁড়িয়ে থেকে, গাছের আড়ালে থেকে পজিশন নিয়ে পাক পশুদের অপেক্ষায় ছিলো। সেদিন হাবিলদার তাজু আহমেদ, হাবিলদার আবুল হোসেন, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ফুটবল খেলোয়াড় নায়েক মোহাম্মদ আলী, হাবিলদার আতাউর রহমান, সিপাহী মোহাম্মদ আলী, আরও কতিপয় হাবিলদার, নায়েক ও সিপাহী এবং কেন্দ্রীয় পুলিশ ফোর্সের সুবেদার খলিলুর রহমান মৃত্যুকে তোয়াক্কা না করে সবার সামনে দাঁড়িয়ে পুলিশ লাইনের সবাইকে এ প্রতিরোধে বীরের মতো নেতৃত্ব দিয়েছেন। ওদের সকলকে সালাম।

 

আমরা চারিদিকে ছড়িয়ে পজিশন নিচ্ছিলাম ওদের প্রতিরোধ করার জন্য। হঠাৎ টেলিফোন বেজে উঠল। টেলিফোনে এক ভীতসন্ত্রস্ত কম্পিত বাঙালি সিপাহী কণ্ঠ বলছিলো, “ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট ফাঁড়ি থেকে বলছি। একশত সশস্ত্র আর্মি ট্রাক রাজধানীর দিকে এগোচ্ছে।“ এরপরই আরেক বাঙালি পুলিশের কণ্ঠ টেলিফোনে ভেসে আসলো, সেই মার্জিত কণ্ঠ বলছিলো, ”তেজগাঁ থানার সামনে দিয়ে সশস্ত্র আর্মি ট্রাক রাজধানীর দিকে এগোচ্ছে।“ এরপর আমাদের ওয়ারলেসে এক পুলিশ কণ্ঠ বলে উঠল, “ময়মসিংহ রোড থেকে টহলরত অফিসার বলছি, পাক আর্মির বহু ট্রাক রমনা রেসকোর্স মাঠে জড়ো হয়েছে।“ কিছুক্ষণ পরই দেখলাম পাক পশুর একটি দল হাতে স্বয়ংক্রিয় মেশিনগান নিয়ে সশস্ত্রভাবে চোরের মতো টিপে টিপে পা ফেলে আমাদের ব্যারাকের দিকে গুলি বর্ষণ করে। সাথে সাথে আমাদের রাইফেল গর্জে ওঠে। ওদের গুলিবর্ষণের জবাব দেই আমরা সম্মিলিতভাবে। পাক পশুদের প্রথম অগ্রগামী দলের কিছু সেনা মারা যায়। রাস্তায় ওদের লাশ পড়ে থাকে। অবশিষ্ট পাক পশু বিপদ বুঝতে পেরে সেই অন্ধকারে আবার চোরের মতো পিছু হটে যায়। এ ঘটনা ঘটে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরেই রাজারবাগ পুলিশ লাইনের দক্ষিণ- পূর্ব কোনে হাসপাতালের দিক থেকে অবিরাম শেলিং করতে থাকে পাক পশুরা। এরপর তারা উম্মত্তের মতো শেলিং করতে থাকে আমাদের পুলিশ লাইনের বিল্ডিং- এর উপর, উত্তর – পূর্ব কোণ থেকে। এভাবে তারা অবিরাম শেলিং করতে করতে পুলিশ লাইনের পূর্ব দিক থেকে ঢুকে পড়ে আমাদের এলাকার অভ্যন্তরে। আমাদের রাইফেলধারী বাঙালি পুলিশ প্রহরী তখন প্রাণপণ প্রতিরোধ করে যাচ্ছিল পাক পশুদের অবিরাম শেলিং- এর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। আমাদের বহু সিপাহী পুলিশ লাইনের পূর্ব দিকে ওদের প্রাণপণ প্রতিরোধ করতে করতে শহীদ হন। অবশিষ্ট সিপাহীরা রাইফেল নিয়ে পিছু হটে আমাদের ব্যারাকের বিভিন্ন নিরাপদ জায়গায় পজিশন নিয়ে ওদের প্রতিরোধ করতে থাকে। আমাদের সিপাহীদের প্রতিরোধ ও দৃঢ় মনোবলের সম্মুখে ওরা আরও ক্ষিপ্ত হয়ে আমাদের পুলিশ লাইনের পূর্ব দিকের ব্যারাকে লাইট-বোম বৃষ্টির মত বর্ষণ করতে করতে ভিতরে প্রবেশ করছিল। ওদের অবিরাম গোলাবর্ষণে আমাদের ব্যারাকের চারদিকে আগুন ধরে যায়, অস্ত্রাগারের দেয়াল ভেঙ্গে পড়ে যায়। দোতলার দেওয়ালগুলো ভেঙ্গে পড়তে থাকে আস্তে আস্তে। ওরা আমাদের আওতার বাইরে থেকে শেলিং করছিল, আর লাইট বোম মারছিল। আমাদের পুলিশ লাইনের একেবারে অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে তখনও সাহস পায়নি। রাত আনুমানিক আড়াইটার সময় ওরা মরিয়া হয়ে আমাদের ব্যারাকের অভ্যন্তরে প্রবেশ করার চেষ্টা করেছিল। অবিরাম শেলিং হচ্ছিল, আগুনের ভয়ংকর ফুলকি নিয়ে লাইট- বোমগুলি একের পর এক পড়ছিল আমাদের দিকে। চারিদিকে আমরা ট্যাংক ও কামানের কান ফাটা ভীষণ গর্জন শুনছিলাম। পাক পশুরা এভাবে অজস্র শেলিং ও কামানের গোলাবর্ষণ করতে করতে আমাদের আওতার ভিতরে এসে গেলে আমাদের সিপাহীদের রাইফেলগুলো আবার গর্জে ওঠে। পশুদের কতিপয় আমাদের বীর নায়েক বিখ্যাত ফুটবলার খেলোয়াড়ের নেতৃত্বে, আমাদের সিপাহী কায়েস, সাত্তার, হাফিজ, নায়েক আঃ সুবহানের রাইফেলের গুলিতে মাটিতে পড়ে যায়। আর অবশিষ্ট পশুর দল পিছু হটে যায়। আমাদের বীর সিপাহীরা অবিরাম প্রতিরোধ করে যচ্ছিল, প্রাণপণে ব্যারাকের সেই জ্বলন্ত আগুনের পাশে দাঁড়িয়ে আমাদের বীর সিপাহীরা বীরবিক্রমে প্রতিহত করছিল। উম্মত্ত সেনাদের অগ্রগতিকে রুখে দিচ্ছিল নির্ভিকভাবে। আগুন ক্রমে ক্রমে রাজারবাগ পুলিশ লাইনের উত্তর দিকের ব্যারাকে ছড়িয়ে পড়ছিল। আগুনের লেলিহান শিখায় সেই ধেয়ে আসা ভস্মের মধ্যে আমাদের কতিপয় বীর সিপাহী প্রতিরোধ সৃষ্টি করার সময় অকস্মাৎ আটকা পড়ে নিদারুন ভাবে শহীদ হন। আর অবশিষ্ট সিপাহী আগুন ও শেলিং –এর মুখে আস্তে আস্তে পিছু হটতে হটতে আমাদের প্রধান বিল্ডিং- এর দিকে আসতে থাকে- আমাদের বীর সিপাহীরা তখনও প্রতিরোধ করে যাচ্ছিল বীর বিক্রমে। মাইক্রোফোনে ওদের উম্মত্ত গর্জন শুনছিলাম, “তোমলোগ সারেন্ডার করো, হাতিয়ার দে দাও, নাই তো খাতাম কার দিওঙ্গা, তামা হও যায়েগা।“

 

আমাদের বীর সিপাহীরা ওদের মিথ্যা ভাঁওতায় কান না দিয়ে প্রাণপণ প্রতিরোধ করছিলো ওদের। কিন্তু আমাদের বীর সিপাহীরা ও আমাদের সকলের গুলি শেষ হয়ে গিয়েছিলো। আমাদের অস্ত্রাগারেও তখন প্রবেশ করার উপায় ছিলো না। সেখানে ওরা গোলাবর্ষণ করছিলো উম্মত্তভাবে। আমি উপায়ন্তর না দেখে পিছু হটতে হটতে পুলিশ লাইনের দক্ষিণ দিকে অবস্থিত ঘোড়ার আস্তাবলের পিছনের রাস্তা দিয়ে আমিনবাগের মধ্যে দিয়ে চলে এসে প্রাণ বাঁচাই। এরপর আমি গ্রামের দিকে গিয়ে বাংলার মুক্তি সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ি।

 

————————————————-

 

<৯, ১.৯, ১৯-২১>

ঢাকার মিরপুরে প্রতিরোধ

সাক্ষাৎকার : মোহাম্মদ আ: সোবহান

(মোহাম্মদ আব্দুস সোবহান ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাজারবাগ পুলিশ লাইনে আর্মড সাব ইন্সপেক্টর অব পুলিশ হিসেবে কর্মরত থাকাকালে মিরপুর দশ নম্বর সেকশনে জরুরী টহলে গিয়েছিলেন)

 

ইন্সপেক্টর অফ রিজার্ভ পুলিশ

বি-আর-পি, রাজশাহী

২৯-১-১৯৭৪

 

আমার ওয়ারলেস সেটটি কিছুক্ষন নীরব থাকার পর রাজারবাগ ওয়ারলেস কন্ট্রোল রুম থেকে আর এক বাঙালি পুলিশের কণ্ঠ ঘোষণা করলো, “অল অফিসার্স অফ এণ্ড অ্যাভব র‍্যাঙ্ক অফ ইন্সপেক্টরস উইল প্রোসিড টু দেয়ার কোয়ার্টার্স।” হোটেল ইন্টার কন্টিনেন্টালের পশ্চিমের গেটে প্রহরারত বাঙালি পুলিশের ভীতসন্ত্রস্ত কণ্ঠ আমার ওয়ারলেস সেটে বেজে ওঠার পর এবং রাজারবাগ পুলিশ লাইনের কন্ট্রোল রুমের ওয়ারলেস থেকে সতর্কবাণী পাওয়ার পর আমারা সন্ত্রস্ত হয়ে পরেছিলাম। এরপর বিএসপি, ইন্সপেক্টর সহ সকল পদস্থ বাঙালি পুলিশ অফিসার যারা মিরপুর ও অন্যান্য স্থানে বিভিন্ন সেকশন ও সেক্টরের দায়িত্বে ছিলেন, ওয়ারলেস মারফৎ রাজারবাগ কন্ট্রোল রুম থেকে উপরোক্ত নির্দেশ পাওয়ার পর সবাই হেড কোয়ার্টারে চলে গেলে আমি আমার এক প্লাটুন (৩৭ জন পুলিশ) নিয়ে মিরপুর থানায় উঠি। সেখানে আমি মিরপুরের বিভিন্ন সেকশনে কর্তব্যরত সকল ফোর্সকেই জমায়েত দেখতে পাই। সারা মিরপুরে এ সময় থমথমে ভাব বিরাজ করছিলো। হঠাৎ পুলিশ (কমিশনার বিল্ডিং) কন্ট্রোল রুম থেকে আবার ওয়্যারলেস সেটে বাঙালি পুলিশের কম্পিত কণ্ঠ বেজে উঠলো। সেই কণ্ঠ বলছিলো- “পাক আর্মি ভারী কামান, ট্যাংক ও মেশিনগান নিয়ে আমাদের কন্ট্রোনল রুম ঘেরাও করে ফেলেছে। ওরা গোলাবর্ষণ করতে করতে সিড়ি বেয়ে উপরে উঠে আসছে আমাদিগকে নিশ্চিহ্ণ করে দেবার জন্য- ওরা ভীষণভাবে ধেয়ে আসছে – তোমরা যে যেখানে থাকো এগিয়ে আসো, আমাদের রক্ষা করো, বাঁচাও, আমাদের বাঁচাও।” সেই কণ্ঠ বলে যাচ্ছিলো– “রাজারবাগ পুলিশ লাইনে পাকপশুদের হামলা হয়েছে, সেখানেই গোলাগুলি চলছে, আমাদের বীর পুলিশরা লড়ছে, সেখানকার ওয়্যারলেস বেইস থেকে আমরা কোন শব্দ পাচ্ছি না, সব নীরব নিস্তব্ধ হয়ে গেছে।” পরক্ষনেই আমারা ঢাকার আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখলাম আকাশে বৃষ্টির মতো লাইট বোম উড়ছে। কামান, ট্যাঙ্ক আর গোলাবর্ষণের ভীষণ গর্জন শুনছিলাম, অসংখ্য মানুষের বুকফাটা অসহায় কান্নার রোল ভেসে আসছিলো। অস্থির অধীর ছাত্র জনতা যেন ঝাপিয়ে পড়ছে সেই অসংখ্য কামান, ট্যাঙ্ক ও গোলাবর্ষণের আগুনের মধ্যে। চোখের সামনে দেখলাম আগুন আর আগুন, জ্বলন্ত আগুনের লেলিহান শিখা জ্বলছে, রাজধানী ঢাকা জ্বলছে। চোখ ফিরিয়ে মোহাম্মদপুরের আসাদ গেটের দিকে তাকিয়ে দেখলাম সেখানেও ভীষণ গুলি আরম্ভ হয়ে গেছে, বাড়ি ঘর জ্বলছে । সেই ভয়াল ও ভয়ংকর গোলাবর্ষন ও আগুনের লেলিহান শিখা আস্তে আস্তে আমাদের দিকে এগিয়ে আসছিলো, আমাদের ফোর্স সবই মিরপুর থানায় জামায়েত হয়েছিল। অর্ধেকের হাতে ছিলো লাঠি আর অর্ধেকের হাতে ছিলো সাধারণ রাইফেল আর বিশ রাউণ্ড গুলি। মিরপুর থানায় এভাবে বসে থাকলে সব এক সাথে ওদের ঘেরাও এর মধ্যে পড়ে কুকুর-বিড়ালের মতো মরতে হবে ভেবে আমরা আমাদের ফোর্সকে বিভিন্ন জায়াগায় ছড়িয়ে পজিশন নিতে বলি আর আমার সিপাহীদের যাদের হাতে শুধু লাঠি ছিল তাদের চলে যেতে বলি আত্মরক্ষার জন্য। আমি আমার ফোর্স নিয়ে মিরপুর ইটখোলার ভিতরে পজিশন নিয়ে পাক পশুদের অপেক্ষা করতে থাকি। আমারা পালাই নাই। কারণ পালাবার ইচ্ছা আমাদের ছিলো না। আমারা মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে দৃঢ় শপথ নিয়েছিলাম। সামান্য রাইফেল নিয়েই আমারা পশুদের প্রতিরোধ করবো। প্রতিহত করবো, লড়বো তবু পিছু হটবো না। সারারাত আমি আমার সশস্ত্র ফোর্স নিয়ে সেই ইটখোলার বিভিন্ন জায়াগায় ছড়িয়ে পড়ে পজিশন নিয়ে বসেছিলাম। আর ঢাকার আকাশে দেখেছিলাম আগুনের লেলিহান শিখা, সকল নিরীহ নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার সহিত পাক পশুদের কামান ও ট্যাঙ্ক যুদ্ধের তাণ্ডবলীলা। রাত তিনটার সময় আমরা দেখছিলাম আমাদের চোখের সম্মুখে চারটি সশস্ত্র পাকসেনাদের ট্রাক চলে গেলো। ট্রাকের পিছনে পিছনে যাচ্ছিলো কামান বসানো ‘ডজ’। মিরপুরের ইপিআর বাহিনীর সাথে আমারা পাক আর্মিদের এক ঘন্টা তুমুল সংঘর্ষ দেখলাম। কামান ও ট্যাঙ্কের কানফাটা গর্জনে আমারা সবাই বিমূঢ় হয়ে পড়ছিলাম। কিছুক্ষন পর দেখলাম পাক আর্মি সেই সশস্ত্র ট্রাকগুলো নিয়ে ফিরছে আর তার পিছনে আরও তিনটি ট্রাক আসছিল। ঐ অতিরিক্ত ট্রাকে ছিলো পর্যুদস্ত বাঙালি ইপিআর বন্দীরা। আমাদের সম্মুখ দিয়েই পাক পশুদের সশস্ত্র ট্রাকগুলো ইপিআর বন্দীদের নিয়ে সদর্পে এগোচ্ছিলো। আমি আমার সিপাহীদের ওদের উপর গুলিবর্ষণ করতে নিষেধ করছিলাম। ওদের গাড়িগুলো এগোচ্ছিলো– সবই চলে গেলো । পিছনে দুটি গাড়ি থাকতেই আমার এক সিপাহী হঠাৎ ওদের প্রতি গুলিবর্ষণ করতেই ওরা ট্রাক থামিয়ে নেমে পড়ে কুকুরের মতো। ভীষণ ব্রাশ ফায়ার শুরু হয় আমার সিপাহীদের উপর। আমাদের উপর পড়ছিলো অসংখ্য গ্রেনেড, আরোও পড়েছে স্বয়ংক্রিয় মেশিনগান থেকে বৃষ্টির মত অসংখ্য গুলি। আমরা আমাদের সামান্য রাইফেল নিয়েই পশুদের প্রাণপণ প্রতিরোধ করতে থাকি । কিছুক্ষণ পর আমাদের গুলি শেষ হয়ে গেলে আমরা গুলিবর্ষণ করতে করতে আস্তে আস্তে পিছু হটতে থাকি– আমাদের হাতে সামান্য রাইফেল থাকলেও ওরা রাতের কালো অন্ধকারে সেই ভারী কামান, ট্যাঙ্ক বহর ও অসংখ্য মেশিনগান, গ্রেনেড ও সশস্ত্র সৈন্য নিয়েও আমাদের সামনে সদম্ভে এগিয়ে আসতে সাহস পায় নাই। আমাদের দূর্জয় মানসিক শক্তির সামনে ওরা প্রথমত আসতে সাহস পায় নাই। সামান্য রাইফেল দিয়েই ওদেরকে প্রায় এক ঘন্টা প্রতিরোধের পর আমি আমার ফোর্স নিয়ে পিছু হটছিলাম। আমার ফোর্স সব পিছনে চলে গিয়েছিলো। আমি আমার দূর্জয় সিপাহী নিয়ে একাই ওদের বিরুদ্ধে ফাইট দিচ্ছিলাম। হঠাৎ দেখলাম ওরা নীরব- ওদের নীরবতা দেখে আমি ওদের ঘেরাওয়ের মাঝে পড়ে যাওয়ার ভয়ে পিছু হটে চলে আসি। পিছনে এসে দেখমাল এক প্রাসাদের ছাদের উপর এক বিদেশী দাঁড়িয়ে আছেন। আমি তার গেটের সামনে যাওয়ার সাথে সাথে সেই বিদেশী ভদ্রলোক এসে আমাকে ভিতরে নিয়ে গিয়ে বিল্ডিংয়ের পিছনে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় দিলেন। কিন্তু সে জায়গা নিরাপদ মনে না করায় আমরা সেই ভদ্রলোকের পরামর্শ অনুযায়ী তার বিল্ডিংয়ের পিছনের রাস্তা দিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। আমার এক সিপাহীর কথামত আমরা সবাই নিকটবর্তী অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ সুপার মান্নান সাহেবের বাসায় গিয়ে আশ্রয় নেই। তিনি আমাদিগকে যথেষ্ট যত্ন করেন। আমারা তার বাড়িতে চা নাস্তা খেয়ে ছাদের উপরে গিয়ে দেখলাম পাক আর্মিরা ইটখোলার ভিতরে ঢুকে আমাদিগকে সার্চ করছে, তখন ভোর হয়ে গিয়েছিলো। অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ সুপার তার বাসা থেকেই ধেয়ে আসতে থাকা পাক আর্মিদের বিরুদ্ধে ফাইট দিতে বললেন কিন্তু আমার সিপাহীদের গুলি শেষ হয়ে যাওয়ায় এবং রাতের ফাইটে আমরা সাঙ্ঘাতিক ভাবে ক্লান্ত হয়ে যাওয়ায় কল্যানপুরের বাঙালি এলাকায় চলে গিয়ে পুলিশের পোশাক ফেলে দিয়ে কলোনীর বাঙালি ভাইদের দেয়া ছেঁড়া লুঙ্গী গেঞ্জী পরে কল্যানপুর কলোনীর ছাত্র-জনতার সাথে মিশে গিয়ে সেখাঙ্কার বাঙালি জনতাকে সর্বতোভাবে সাহস দিতে থাকি। সকাল তখন দশটা বেজে গিয়েছিলো। আমি আমার হাতে রাখা অচল ওয়্যারলেস সেটটা মেরামত করে সচল করে দিয়ে ঢাকার সব পুলিশ সেক্টর ডেড দেখলাম। মিরপুর থানার সহিত লাইন দিলাম, সেখান থেকে এক বাঙালি কণ্ঠ ভেসে আসছিল– জোর করে স্বাভাবিক করা সেই কণ্ঠ বলছিলো, “মিরপুর থানা,” পরক্ষনেই এক অবাঙালি পাকসেনা ওয়্যারলেস সেটে বলে ওঠে– “কোন শালা কাহা তোম বোলতা হায়।” আমি বেশ বুঝতে পারি ওয়্যারলেসে বাঙালি কণ্ঠ সোনা গেলেও সেখানে পাকসেনাদের প্রভুত্ব বহাল রয়েছে। এরপর আমি আমার ওয়্যারলেস সেটটি অচল করে কল্যানপুর কলোনীর এক বাঙালির বাসায় রেখে পার্শ্ববর্তী মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে গিয়েছিলাম। মসজিদে জনতার ব্যাকুল চাহনী কিছুতেই এড়াতে পারলাম না। নামাজ শেষে বের হয়ে এসে পাশের এক ছোট ঘরে বসে আছি এমন সময় দেখলাম অসংখ্য দাঙ্গাবাজ বিহারী লাফিয়ে লাফিয়ে আসছে, পিছনে পাকসেনাদের গাড়ী। বিহারীরা সেখানে এসেই বাঙালি কনোনীতে আগুন লাগিয়ে দিয়ে লুটপাট শুরু করে দিলো। ইতিমধ্যে পাকসেনাদের গাড়ী দুটো বিহারীদের বাঙালি কলোনীতে লুণ্ঠনে লাগিয়ে দিতে চলে গেলো। আমরা বিহারীদের তাণ্ডবলীলা আর সইতে পারলাম না– আমি আমার সিপাহীদের পজিশন নিয়ে বিহারীদের উপর ফায়ার করার নির্দেশ দিলে দুজন বিহারী গুলি খেয়ে পড়ে যায়– আর বাকীসব বিহারী দৌড়ে পালিয়ে যায়। তখনকার মত কল্যানপুর বাঙালি কলোনী বেঁচে যায় বিহারী লুণ্ঠন থেকে। আমাদের গুলিবর্ষনে বাঙালি কলোনীতে আসন্ন পাক ও বিহারীদের হামলা ও লুণ্ঠনের আশংকায় সবাই ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পাগলের মতো পালাতে থেকে চারদিকে। এরপর আমি মিরপুরের রাস্তার সামনে নদী পার হয়ে গ্রামের দীর্ঘ রাস্তা ধরে আমাদের সিপাহীদের নিয়ে অজানার পথে অদৃশ্য হয়ে যাই।

——————————————————

 

<৯, ১.১০, ২১-২৭>

ঢাকা শহরে সশস্ত্র প্রতিরোধ
সাক্ষাৎকারঃ লেঃ (অবঃ) আনোয়ার হোসেন

অসহযোগ আন্দোলনের পূর্ণ সমর্থন ছিল। আমি ঢাকা সেনানিবাসে দ্বিতীয় বেঙ্গলে ছিলাম।

২৫ শে মার্চের ঘটনায় বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠি। আমার বাঙ্গালি অফিসারদের সাথে কথা বললে তারা আমাকে নিরুৎসাহিত করেন। তারপর আমরা ১৬জন যুবক আলাপ- আলোচনা করে ২৭শে মার্চ সেনানিবাস থেকে পালিয়ে যাই। তেজগাঁ ড্রাম ফ্যাক্টরীর কাছে এসে দেখি মুক্তিবাহিনী গঠন হয়েছে। সেখানে ইপিআর, আনসার, মুজাহিদ, ছাত্র, কৃষক, শ্রমিক সবাই ছিল। আমি দলের নেতৃত্ব হাতে নেই। আমরা ৩৫০ জনের উপরে ছিলাম। তেজগাঁ রেল লাইনের অপরদিকে ডিফেন্স নিয়ে ২ শে মার্চ পাকসেনাদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হই। ১২৬ জন পাক সেনা হতাহত, ৩টি গাড়ী ধ্বংস এবং অনেক আহত হয়। বহু অস্ত্রও আমরা উদ্ধার করি। অস্ত্র দ্বারা আমরা পুনর্গঠিত ও নববলে বলীয়ান হই। ৩০শে মার্চ ঢাকার মহাখালীতে আমরা ১০জন রেকি করতে বের হই। আগে থেকে আমরা বুঝতে পারিনি যে পাকসেনারা এ্যামবুশে পরে যাই। শামসুল আলম নামক একজন ইপিআর ওখানে শহীদ হন। বাকী নয়জন কোন রকমে বেঁচে আসি। সময় ছিল রাত সাড়ে দশটা। ৩১ শে মার্চ সেকেণ্ড ক্যাপিটালে আসাদ গেটের নিকটে হাসপাতালের কাছে পাক সেনাদের অবস্থান ছিল। আমরা রাত ৩টায় আক্রমন চালাই। এতে ৫ জন পাক সেনা খতম হয়। আমাদের কোন ক্ষতি হয় নি।

 

ভোর পাঁচটায় পাকসেনারা ব্যাপক সেনা ও অস্ত্র নিয়ে আমাদের উপর আক্রমন চালায়। ওদের সামনে টিকতে না পেরে পালাবার চেষ্টা করি। সবাই বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, বেশ কিছু শহীদ হন। আমিসহ সাতজন পাক সেনাদের হাতে ধরা পড়ি। তারিখ ১লা এপ্রিল।

 

বংশাল ফাঁড়ির প্রতিরোধ

(শারদীয় কালান্তর, সেপ্টেম্বর ১৯৭১ সংখ্যায় প্রকাশিত সত্যেন সেন রচিত “নাদির গুন্ডা” শীর্ষক প্রতিবেদন থেকে সংকলিত)

 

১৯৭১ সালের পঁচিশে মার্চের সেই ভয়ংকরী রাত্রি, যার কথা বাংলাদেশের মানুষেরা কোনো দিনই ভুলতে পারবে না। ওরা ঢাকা শহরকে রক্তবন্যায় ভাসিয়ে দেবার জন্য অতর্কিতে নেমে এলো। ওরা জানতো, এদেশে ওদের পক্ষে কেউ নেই। সরকারী কর্মচারী থেকে রাস্তার পুলিশ পর্যন্ত, শিক্ষিত বুদ্ধিজীবী থেকে শহরের মেহনতী মানুষ আর গ্রামের কৃষক পর্যন্ত জনসাধারণের সমস্ত স্তর থেকে ওরা সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন। তাই পশ্চিমী শাসক চক্রের জঙ্গী বাহিনী কোন রকম বাছ-বিচার না করে সর্বগ্রাসী আক্রমণ নিয়ে নেমে এসেছিল।

 

রাত বারোটার পর ঘড়ি দেখে কাঁটায় কাঁটায় একই সঙ্গে ওরা বিশ্ববিদ্যালয় অঞ্চল, লালবাগ, পিলখানায় ইপিআর ব্যারাকে, পুলিশ ব্যারাকে এমনকি থানায় থানায় ফাঁড়িতে ফাঁড়িতে আক্রমণ করে বসলো। সবাই জানে, একমাত্র রাজারবাগ পুলিশ লাইন ছাড়া আর কোন জায়গা থেকে তারা কোনো প্রতিরোধ পায়নি, যেখানে গেছে সেখানেই অবাধে ধ্বংসলীলা চালিয়ে গেছে। কিন্তু এর ছোট্ট একটা ব্যতিক্রমও আছে। এই খবরটা কিন্তু খুব কম লোকই জানে।

 

নবাবপুর থেকে বংশালের রাস্তায় ঢুকলে বাঁয়ে নিশাত সিনেমা হল, ডাইনে দৈনিক সংবাদ অফিস, সেখান থেকে একটুখানি এগিয়ে গেলে বংশাল ফাঁড়ি। কিছুসংখ্যক সৈন্য মেশিনগান-রাইফেল নিয়ে এই ফাঁড়ি আক্রমণ করতে গিয়েছিল। তারা নিশ্চিন্ত মনে রাত্রির নিঃশব্দতার বুকে আর্মি বুটের খট খট শব্দ হেনে ফাঁড়িটার দিকে এগিয়ে চলেছিল। এখানে কারো কাছ থেকে যে প্রতিরোধ আসতে পারে এমন কথা তারা কল্পনাও করতে পারেনি। ভেবেছিল, অবাধে ও স্বচ্ছন্দে তাদের হত্যালীলা চালিয়ে যাবে, একটা প্রাণীকেও রেহাই দেবে না। কিন্তু ফাঁড়িটার কাছে যেতেই এক পশলা বৃষ্টিধারার মতো মেশিনগানের গুলি তাদের অভ্যর্থনা জানাল। ওরা ভীষণ চমকে উঠে পিছিয়ে গেল। এটা কি বিশ্বাস করবার মতো কথা। এক সামান্য ফাঁড়ির জনকয়েক পুলিশ, তাদের এত বড় সাহস হবে! কিন্তু বিশ্বাস না করে উপায় ছিল না, ওদের মধ্যে কয়েকজন সেই গুলিতে আহত হয়েছে। এরপর ফাঁড়ির ভেতর থেকে পরপর কয়েকবার রাইফেলের শব্দ শোনা গেল।

 

এবার দু’পক্ষে যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। বংশালের পথে একটিও জনপ্রাণী নেই। ঘরে ঘরে দরজা-জানালা বন্ধ। কারো কোন সাড়া-শব্দ নেই, শুধু ঘন ঘন মেশিনগান আর রাইফেলের শব্দে বংশালের পথ আর দুই ধারের বাড়িগুলি থেকে থেকে কেঁপে উঠছিল। সৈন্যরা বেশ একটু বেকায়দায় পড়ে গিয়েছিলো।

 

ফাঁড়ির ভেতরে কে কোথায় আছে, কারা কি করছে- কিছুই তারা দেখতে পাচ্ছিল না। অপর পক্ষে অন্ধকার ফাঁড়িটার মধ্যে উপযুক্ত জায়গায় পজিশন নিয়ে প্রতিরোধকারীরা তাদের লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়ছিল। রাস্তার আলোয় সৈন্যদের তারা ভালো করেই দেখতে পাচ্ছিল। ফলে এইবার ওরা বেশিক্ষন লড়াই চালিয়ে যেতে পারলো না, তখনকার মতো সেখান থেকে পৃষ্ঠভঙ্গ দিল।

 

ফাঁড়ির মধ্যে প্রতিরোধকারীরা উল্লাসে ‘জয় বাংলা’ ধ্বনি তুলল। আক্রমণকারীদের মধ্যে জনকয়েক সম্ভবত হতাহত হয়েছিল। কিন্তু পশ্চাদপসরণকারী সৈন্যরা তাদের কোনো চিহ্ন রেখে যায় নি।

 

ফাঁড়ির পুলিশেরা এভাবে একদল সশস্ত্র সৈন্যকে হটিয়ে দেবে, এটা সত্য সত্যই অভাবনীয়। আরও আশ্চর্যের কথা, তারা ফাঁড়ির মধ্যে থেকে মেশিনগান চালিয়েছিল। থানা বা ফাঁড়ির পুলিশদের হাতে কখনো মেশিনগান দেওয়া হয় না। একমাত্র বন্দুক ও রাইফেল তাদের সম্বল। এই সংকট মুহূর্তে এই মেশিনগান কেমন করে তাদের হাতে এলো?

 

বংশাল মহল্লার লোকের মুখে এর উত্তরটা আমি পেয়েছি। এটা শুধু ফাঁড়ির পুলিশের কাজ নয়। তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিল এই মহল্লারই সুপরিচিত নাদির গুন্ডা ও তার কয়েকজন সাগরেদ। যোগ দিয়েছিল বললে কথাটা সঠিকভাবে বলা হবে না। কার্যত এই নাদিরের নেতৃত্বেই নাকি এই প্রতিরোধকে সংঘটিত করে সৈন্যদের হটিয়ে দেয়ার সম্ভব হয়েছিল।

 

নাদিরের সঙ্গে যোগাযোগ না থাকলে ফাঁড়ির পুলিশেরা এ কাজে হাত দিতে সাহস করত না। আর মেশিনগান? শুধু বংশাল মহল্লা নয়, পাশাপাশি মহল্লার অনেকেই এ কথা শুনেছিল যে সারা শহরের মধ্যে এক্তিমাত্র লোক আছে যার হাতে একটি মেশিনগান আছে। সেই লোকটি হচ্ছে নাদির গুন্ডা নামে পরিচিত নাদির মিয়া। কি করে সে এই মেশিনগান সংগ্রহ করেছিল, একমাত্র সে-ই জানে।

 

প্রাক-স্বাধীনতার যুগে বিখ্যাত উর্দু লেখক কিষণচন্দর ‘তিন গুন্ডা’ নামে এক অপূর্ব কাহিনী লিখেছিলেন। কাহিনীর সেই তথাকথিত গুন্ডারা স্বাধীনতা আন্দোলন উপলক্ষে গুলিতে প্রাণ দিয়েছিল। কিন্তু সত্য সত্যই এরা কেউ গুন্ডা ছিল না। সরকারী প্রচারণায় স্বাধীনতা আন্দোলনের এই শহীদদের গুন্ডা বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছিল।

 

নাদির গুন্ডার ব্যাপারটা কিন্তু সে রকম নয়। সত্য সত্যই সে গুন্ডামি করত। যেই পরিবেশে জন্মেছিল, বড় হয়েছিল, সেই পরিবেশই তাকে এই পথে টেনে আনে। বয়স আর কত? ত্রিশের কোঠার নিচেই ছিল। এই বয়সেই সে গুন্ডা নামে কুখ্যাত হয়ে উঠেছিল। তবু সাধারণ গুন্ডাদের চেয়ে সে স্বতন্ত্র ছিল। তার পরিচিত যারা, এর কথাটা তাদের জানা ছিল যে, অনেকে বিপদে-আপদে নাদির গুন্ডার কাছ থেকে নানাভাবে সাহায্য পেয়েছে, ভালোবাসাও পেয়েছে।

 

এই সংসারে এমন অনেক ঘটনা ঘটে যা বিশ্বাস করা কঠিন অথচ সত্য। নাদির গুন্ডার জীবনে এমনি এক ঘটনা ঘটল। স্বাধীন বাংলা আন্দোলনের সংস্পর্শে এসে লোকটা কেমন করে যেন সম্পূর্ণ বদলে গেল। আর সব কথা যেন ভুলে গেল সে। কেমন করে বাংলাদেশকে পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকচক্রের হাত থেকে মুক্ত করা যাবে- এটাই তার ধ্যান, জ্ঞান, জপমন্ত্র হয়ে দাঁড়াল। কোনো বিশেষ রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত না হলেও সে বিভিন্ন মহল্লায় রাজনৈতিক কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলত।

 

একটা বিষয়ে সে নিঃসন্দেহে ছিল যে, সত্য সত্যই ওদের হাত থেকে দেশকে মুক্ত করতে হলে সশস্ত্র সংগ্রামে নামতে হবে। সেই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে সে এই মেশিনগান আর অন্যান্য অস্ত্রশস্ত্র সংগ্রহ করে নিয়েছিল। আর এই নাদির গুন্ডার প্রভাবে একই পথের পথিক আরও কয়েকটি ছেলে তাকে ঘিরে দাঁড়িয়েছিল।

 

পঁচিশে মার্চের সেই বিভীষিকা নাদিরের মনকে বিন্দুমাত্র দমিয়ে দিতে পারেনি। ওদের সেই পৈশাচিক হত্যা আর ধ্বংসলীলা তাকে প্রতিহিংসায় উম্মত্ত করে তুলেছিল। সারা শহরে হতাশা আর আতঙ্কের আবহাওয়া। তার মধ্যে দুর্জয় সাহস বুকে নিয়ে মহল্লায় মহল্লায় ঘুরে সে প্রতিরোধের কৌশল ও সংগঠন গড়ে তুলেছিল। তার এই সাহস আর নিষ্ঠার পরিচয় পেয়ে মাত্র কয়েকদিনের মধ্যে মহল্লার লোকেরা তাকে আপন মানুষ বলে চিনে নিল।

 

তারা বলাবলি করত, এই শহরে নাদিরের মতো আরও গোটা কয়েক মানুষ যদি থাকত, তবে আমরা ওদের নাভিশ্বাস তুলে দিতে পারতাম। নাদিরের নামটা মিলিটারি গোয়েন্দাদের কাছে পৌঁছাতে দেরি হয়নি। তারা তন্নতন্ন করে তার সন্ধান করে ফিরেছিল।

 

পঁচিশে মার্চের পর থেকেই লুণ্ঠনরত সৈন্যের দল ঘরবাড়ি-দোকানপাট ভেঙ্গেচুরে ইচ্ছামতো লুঠপাট করে চলেছে। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে শহরের গোটা কয়েক রেশনের দোকান লুট হয়ে গেল। শহরের মানুষ ভয়ে আঁতকে উঠল। এভাবে রেশনের দোকান যদি লুট হয়ে যায়, তবে খাবে কি তারা? শেষকালে কি না খেয়েই মরতে হবে? ভয়ে দিশেহারা মানুষ কি করবে পথ খুঁজে পায় না।

 

রেশনের দোকানের মালিকেরা ভয়ে দোকান খুলতে চায় না। এই দুর্দিনে সর্বসাধারনের অবস্থা চিন্তা করে অস্থির হয়ে উঠল নাদির। কিছু একটা করতেই হয়। ঐ শয়তানেরা এসে রেশনের চাল লুট করে নিয়ে যাবে আর তারা অসহায়ের মতো হাত গুটিয়ে বসে বসে দেখবে, এ কিছুতেই চলবে না। কিন্তু কি করতে পারে সে?

 

একদিন মহল্লার লোকেরা অবাক হয়ে দেখল নাদির আর তার দলবল তাদের রেশনের দোকান ভেঙ্গে বস্তা বস্তা চাল বের করে নিয়ে যাচ্ছে। শেষকালে নাদিরের এই কাজ! তারা হতবুদ্ধি হয়ে গেল। কিন্তু একটু পরেই তাদের আসল ব্যাপারটা বুঝতে বাকি রইল না। নাদির তাদের মুখের দিকে চেয়েই এই দুঃসাহসের কাজে হাত দিয়েছে। নাদির আর তার সঙ্গীরা অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে সেই চাল মহল্লার ঘরে ঘরে ভাগ করে দিল। পাড়ার লোকে তখনকার মত কিছুটা চাল পেয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। হাতের কাজটা সেরে ফেলে অদৃশ্য হয়ে গেল নাদির। তার মাথার উপর মৃত্যুর পরোয়ানা ঝুলছে। খবরটা ইতিমধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। মিলিটারির জীপ তার সন্ধান নিয়ে ফিরছে।

 

এরপর দুঃসাহসী নাদির আর বেশীদিন কাজ করার সুযোগ পায়নি। এপ্রিলের মধ্যভাগে গ্যাদা নামে এক কুখ্যাত গুন্ডা তাকে মিলিটারির হাতে ধরিয়ে দিল। গ্যাদা ইতিমধ্যেই মিলিটারির দালালি করে আরো কয়েকজনকে ধরিয়ে দিয়েছে। তাছাড়া নাদিরের বিরুদ্ধে তার ব্যক্তিগত আক্রোশ ছিল। একবার নাদিরের গুলিতে জখম হয়ে তাকে বেশ কিছুদিন শয্যাশায়ী থাকতে হয়েছিল। তখন রাত অনেক হয়েছে। নাদির একটি জীপে করে আসছিল। আর্মানিটোলা ময়দানের কাছে এসে তার জীপটা একটা বাড়ির পাশে দাঁড়াল। ওরা আগে থেকেই তৈরি হয়ে ছিল। একটা সঙ্কেত পেয়ে মিলিটারির লোকেরা বিদ্যুৎগতিতে এসে তার জীপটাকে ঘিরে ফেলল। তারপর তারা তাকে ধরে নিয়ে তাদের আস্তানায় চলে গেল। নাদির সেই যে গেল, তারপর আর ফিরে আসেনি। ফিরে আসবে না কোনদিন।

 

 

নরসিংদীতে সশস্ত্র প্রতিরোধ

(সত্যেন সেন রচিত “প্রতিরোধ সংগ্রামে বাংলাদেশ” (আগষ্ট ১৯৭১) নামক গ্রন্থের “ওরা বারো জন” শীর্ষক প্রতিবেদন থেকে সংকলিত)

 

এপ্রিল মাসের তৃতীয় সপ্তাহ।

ভারতীয় বেতার মারফৎ একটি সংবাদ প্রচারিত হলো- ঢাকা শহর থেকে কুড়ি কিলোমিটার দূরে কোন এক জায়গায় পাকিস্তানী সৈন্যদের সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধ চলছে। খবরটা চাঞ্চল্যকর, বিশেষ করে ঢাকা জেলার লোকদের কাছে। দিনের পর দিন বাংলাদেশের নানা জায়গা থেকে মুক্তিবাহিনীর সক্রিয়তার সংবাদ পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু ঢাকা জেলায় তাদের প্রতিরোধের চিহ্নমাত্র নেই। অবশ্য ২৫শে মার্চ তারিখে সামরিক হামলার প্রথম রাত্রিতে রাজারবাগের পুলিশ ভাইয়েরা বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধ দিয়েছিল। বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসে এই কাহিনী অবিস্মরণীয়। তার দুই দিন বাদে নারায়ণগঞ্জ শহরের সংগ্রামী ভাইয়েরা শুধুমাত্র গোটা কয়েক রাইফেলের উপর নির্ভর করে আধুনিক যুদ্ধবিদ্যায় সুশিক্ষিত সৈন্যদলকে দুই দিন পর্যন্ত আটকে রেখেছিল শহরে ঢুকতে দেয়নি। তাদের মধ্যে যারা সবচেয়ে উদ্যোগী ভূমিকা গ্রহণ করেছিল তারা সবাই তরুণ ও কিশোর; অভিজ্ঞতার দিক দিয়ে একেবারেই কাঁচা। আমাদের এই সংগ্রামী ভাইদের জন্য ঢাকা জেলার মানুষ সঙ্গতভাবে গর্ববোধ করতে পারে। কিন্তু তারপর?

 

তারপর থেকে সারা ঢাকা জেলায় মুক্তিসংগ্রামীদের কোন সাড়া শব্দ নেই। ঢাকা জেলার মানুষ দুঃখ করে বলে, সবাই এগিয়ে যাচ্ছে, আমরাই শুধু পেছনে পড়ে আছি।

 

কুড়ি কিলোমিটার দূরের সেই জায়গাটা কোথায় তাই নিয়ে বিতর্ক ও বাদানুবাদ চলে। দূরত্ব সম্পর্কে অনেকের সঠিক ধারণা নেই। কেউ বলে সাভার, কেউ বলে নরসিংদী, আমার কেউ বলে জয়দেবপুর। এবার এমন লোকও আছে যারা এই ভারতীয় প্রচারণাকে একদম গাঁজাখোরি বলে উড়িয়ে দেয়, কিন্তু অধিকাংশ মানুষ একে সত্যি বলে বিশ্বাস করে। শুধু যে বিশ্বাস করে তাই নয়, নিজেদের কল্পনার সাহায্যে তাদের আরো দ্বিগুণ করে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে তোলে। ইতিপূর্বে নরসিংদীর উপর পাকিস্তানী বোমারু বিমান বোমা ফেলেছে। এটা ভারতীয় বেতারের প্রচার নয়, প্রত্যক্ষদর্শীরা বোমাবিধ্বস্ত নরসিংদীর সেই ভয়াবহ দৃশ্য দেখে এসেছে।

 

বাইরের লোকে এটুকুই শুধু জানল, কিন্তু ঠিক কোন জায়গায় যুদ্ধ বেধেছিল এবং যুদ্ধের ফলাফল কি সেই সম্পর্কে কারো মনে কোন স্পষ্ট ধারণা ছিল না। তাছাড়া নিত্যনতুন এমন সব চমকপ্রদ ঘটনা ঘটছে যে শহর থেকে কুড়ি কিলোমিটার দূরের সেই সংঘর্ষ সম্পর্কে কে আর মাথা ঘামায়।

 

যারা বাইরের লোক তাদের কাছে ঘটনাটা ছোট হতে পারে। কিন্তু স্থানীয়ভাবে ঘটনাটা দারুন উত্তেজনা ও উৎসাহের সৃষ্টি করেছে। আমার এক বন্ধু তার নিজস্ব কাজে ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন। ভাগ্যক্রমে তার সঙ্গে আমার দেখা হয়ে গিয়েছিল, সেইজন্যই এই উল্লেখযোগ্য ঘটনাটা সম্পর্কে কিছুটা আলোকপাত করতে পারছি। আজ সারা বাংলাদেশ জুড়ে এই ধরনের যে সমস্ত ঘটে চলেছে, তার কতটুকু খবরই বা আমরা রাখি।

 

পাকিস্তানের বোমারু বিমানে ৪ঠা এপ্রিল ও ৫ই এপ্রিল পরপর দুই দিন নরসিংদীর উপর বোমা ফেলেছিল। তারপর দিন সাতেক কেটে গেল, ইতিমধ্যে পাকিস্তানী সৈন্য বা মুক্তিবাহিনী কেউ নরসিংদীতে প্রবেশ করেনি। তারপর হঠাৎ একদিন শোনা গেল পাকিস্তানী সৈন্যরা নরসিংদী দখল করবার জন্য ছুটে আসছে। গুজব নয়, প্রত্যক্ষদর্শীরা তাদের দেখে এসেছে।

 

তাঁতের কাপড়ের হাট হিসেবে বিখ্যাত বাবুরহাট থেকে জিনারদী পর্যন্ত একটি রাস্তা চলে এসেছে। মাইল সাতেকের পথ, জিনারদী থেকে নরসিংদী তিন মাইল। সৈন্যরা এই পথ ধরে এগিয়ে আসছিল। তাদের দলে কয়েকশ’ সৈন্য। সৈন্যবাহিনীর ট্রাকগুলি একের পর এক মিছিল করে আসছিল। তাদের সঙ্গে মর্টার, রকেট, মেশিনগান- কোন কিছুরই অভাব নেই। মুক্তিবাহিনীর ‘দুষ্কৃতকারী’ লোকগুলিকে তারা নিঃশেষে খতম করবে, চূর্ণ করে ধুলোয় মিশিয়ে দেবে।

 

বাবুরহাট থেকে জিনারদী, মাঝখানে পাঁচদোনা গ্রাম। এই পাঁচদোনা গ্রামের কাছে সংঘর্ষটা ঘটেছিল, সেইদিন ১৩ই এপ্রিল। প্রথমে গোটা পাঁচেক সৈন্যবাহিনীর ট্রাক। এই ট্রাকের কনভয় থেকে সৈন্যরা কিছুটা সামনে এগিয়ে এসেছে। পথ জনশূন্য। তবে মাঝে মাঝে দুই-একটা অতি সাহসী কৌতূহলী লোক ঝোপ-ঝাড়ের আড়াল থেকে উঁকিঝুঁকি মারছে। সৈন্যরা নিশ্চিন্ত মনে এগিয়ে চলেছিল। হঠাৎ এক সময় শান্ত পল্লী-প্রকৃতিকে চমকে দিয়ে গুড়ুম গুড়ুম-পরপর তিনবার কামানের গর্জন শোনা গেল। অতি পরিচিত মর্টারের আওয়াজ। শুধু আওয়াজই নয়, একটা গোলার টুকরো ছিটকে এসে একটা ট্রাকের উপর পড়ল। ট্রাকের উপর সৈন্যদের মধ্যে হুড়োহুড়ি পড়ে গেল। এমন অপ্রত্যাশিতভাবে আক্রান্ত হতে হবে ওরা ভাবতে পারেনি। ওরা কি তবে শত্রুপক্ষের কব্জির মধ্যে এসে পড়েছে? এই অচেনা-অজানা নির্বান্ধব দেশে তারা কি করে আত্মরক্ষা করবে? প্রতিপক্ষ সহজ নয়, ওরা মর্টার নিয়ে আক্রমণ করতে এসেছে। ওদের সঙ্গে কত লোক আছে কে বলবে? এরা সংখ্যায় বড় কম হবে না। তা না হলে এরা এভাবে আক্রমণ করতে সাহস করত না। যারা আক্রমণ করছে, তারা ঝোপঝাড়ের আড়ালে এমন সুকৌশলে আত্মগোপন করে আছে যে, রাস্তা থেকে তাদের কোন মতেই দেখা যায় না। ট্রাক নিয়ে সেই দিকে এগোবার উপায় নেই, যেতে হলে পায়ে হেঁটে যেতে হয়। কিন্তু সেটা কোনমতেই নিরাপদ নয়। ওদের সঙ্গে শুধু মর্টার নয় মেশিনগানও আছে। একপশলা বৃষ্টির মত কয়েক ঝাঁক মেশিনগানের গুলি ট্রাকের উপর এসে পড়েছে। প্রথম পর্যায়েই সৈন্যদের কয়েকজন মারাত্মকভাবে জখম হয়ে পড়েছে। সৈন্যরা আর দেরী না করে অনুমানের উপর নির্ভর করে মর্টারের গোলাবর্ষণ করতে লাগল। তাদের মেশিনগানও অবিরাম কাজ করে চলেছে।

 

এইভাবে কয়েক ঘণ্টা ধরে দুই পক্ষের গোলাগুলির বর্ষণ চলল, একে রীতিমতো যুদ্ধ ছাড়া আর কি বলা যেতে পারে। এই কয়েক ঘণ্টার যুদ্ধে পাক সৈন্যদের নিদারুণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। মর্টার আর মেশিনগানের গোলাগুলিতে তাদের তিন ট্রাক সৈন্য হতাহত হয়েছে। এদের সংখ্যা প্রায় একশো, অপরপক্ষে অদৃশ্য গেরিলা বাহিনীর কি পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তা বুঝে উঠা সম্ভব ছিল না। তবে এই বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই যে, গেরিলা বাহিনীর লোকেরা বড় কম নয়। অস্ত্রসস্ত্রের দিক দিয়ে ওরা যথেষ্ট শক্তিশালী। এরপর আরও কিছুদূর এগোতে গেলে ওদের ফাঁদের মধ্যে সবশুদ্ধু আটকে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এই অবস্থায় বাবুরহাটের দিকে ফিরে যাওয়াটাই ওরা সঙ্গত বলে মনে করল।

 

অদৃশ্য মুক্তিবাহিনী গোলাগুলি বর্ষণ করে নিঃশব্দ হয়ে গেছে। খুব সম্ভবত এটা ওদের চাল। ওরা প্রলোভন দেখিয়ে আরও দূরে সম্পূর্ণ ওদের আয়ত্তের মধ্যে টেনে নিতে চাইছে। পাক-সৈন্যরা আপাদত বাবুরহাটে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল। প্রথম তিনটা ট্রাক একেবারে অচল হয়ে গেছে। নিহত ও জখমী সৈন্যদের দেহ অন্যান্য ট্রাকে বোঝাই করা হলো। এবার ওদের এই শোকের মিছিল ফিরে চলল বাবুরহাটের দিকে। অচল ট্রাক তিনটি এই যুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন হিসাবে রাস্তার উপর পড়ে রইল। বেশ কিছুদিন সেগুলি ঐভাবে পড়ে ছিল।

 

বেলা বেশী নেই, এই অবস্থায় আর বেশী দূর এগোনো বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। ওরা স্থির করল কাল বাবুরহাট থেকে এবার নতুন করে অভিযান শুরু করতে হবে। প্রতিপক্ষ যথেষ্ট শক্তিশালী সেই বিষয়ে সন্দেহ নেই। অবস্থা সুবিধাজনক বলে মনে হলে ঢাকা থেকে আরও বেশী সৈন্য আনাবার প্রয়োজন হতে পারে।

 

এবার মুক্তিবাহিনীর কথায় আসা যাক। যাদের তীব্র আক্রমনে আধুনিক যুদ্ধবিদ্যায় সুশিক্ষিত পাক-সৈন্যদল নিদারুণ ক্ষয়ক্ষতি বরণ করে পিছিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিল, বিশ্বাস করুন আর নাই করুন তারা সংখ্যায় ছিল মাত্র বারো জন। তাদের অস্ত্রের মধ্যে ছিল শুধুমাত্র একটি মর্টার আর একটি মেশিনগান। এদের মধ্যে কেউ মারা যায়নি, শুধু দু’জন জখম হয়েছিল।

 

ওদের ঘাঁটি থেকে কয়েক মাইল দূরে। কোথায় সেই ঘাঁটি এই কথাটা একমাত্র তারাই জানে। ওরা সেই ঘাঁটি থেকে জোয়ান ছেলেদের নিয়ে বসল। আর তাদের পরিকল্পনাটা ওদের কাছে খুলে বলল। ছেলেরা শুনে উল্লাসে আত্মহারা হয়ে বলল- আমরাও থাকব আপনাদের সঙ্গে। আমরাও এখানে মুক্তিবাহিনী গড়ে তোলার কথা ভাবছিলাম। আপনাদের কয়জন লোক চাই বলুন।

 

না, না আমাদের যা প্ল্যান তাতে এই বারোজনই যথেষ্ট। তার বেশী লোক নিতে গেলে সবকিছু ভন্ডুল হয়ে যাবে। আপনারা শুধু চারদিকে লক্ষ্য রাখবেন। দেখবেন ওরা যেন হঠাৎ আমাদের চমকে দিতে না পারে। এমন আরও অনেক কাজ আছে, যা আপনারা করতে পারেন। করতে পারেন নয়, করতেই হবে আপনাদের। আপনারা না করলে কে করবে!

 

ওরা বলল, আপনারা যা বলবেন আমরা তাই করতে রাজী আছি।

 

কিন্তু বুড়োদের মনে একটা খটকা লেগেছে। একজন প্রশ্ন তুলল, এরা যদি আপনাদের এখানে এসে এই সমস্ত গোলমাল বাধিয়ে বসে, তাহলে ওরা আমাদের উপর বদলা নেবে। আমাদের ঝাড়ে-গুষ্টিতে শেষ করবে।

 

“এই অবস্থায় কি করতে বলেন আপনি” একজন প্রশ্ন করল।

 

বুড়ো আসল শয়তান! প্রথমেই মুখ খুলতে চায় না, পরে সবার চাপাচাপিতে বলে ফেলল। কথাটা ভাল শোনায় না। তারপরও অনুপায় হয়ে বলতে হচ্ছে।

 

আমরা বাধা দিলে ওরা তা মানবে না, ওদের যা করবার তা করবেই। এই অবস্থায় এদের ধরিয়ে দেওয়া ছাড়া নিজেদের বাঁচাবার আর কোন পথ দেখছি না। শুধু আমার জন্য বলছি না। আমি এই অঞ্চলের সবার কথা ভেবেই বলছি। এমন একটা কথা কেউ মেনে নিতে পারে না। হাজার হোক, এরা তাদেরই দেশের ছেলে, তাদের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করে চলেছে। এদের কি ধরিয়ে দেওয়া যায়! এদের কি শত্রুর হাতে তুলে দেওয়া যায়!

 

ইতিমধ্যে খবরটা ছেলেদের কাছে পৌঁছে গেছে। ওরা দল বেঁধে বুড়োদের সামনে এসে চড়াও করল, কোনরকম ভূমিকা না করে উত্তেজিত কণ্ঠে বলে উঠল, যদি কোন বেইমান ধরিয়ে দিতে চেষ্টা করে, তাহলে আমরা তাকে কেটে কুচোকুচো করে ফেলব। বুড়োরা সবাই চুপ। এবার আর কারো মুখে কোন কথা শোনা গেল না। মুক্তিবাহিনীর লোকেরা ছেলেদের সাহায্য নিয়ে সমস্ত অঞ্চলটা ঘুরে ঘুরে পরীক্ষা করে দেখল। তার পরের দিন তাদের পরিকল্পনানুযায়ী তারা সেই দুঃসাহসিক কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ল।

 

এই বারোজন বীর দেশপ্রেমিকেরা নাম আমরা জানি না। কিন্তু এই বারোজনের বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামের কাহিনী মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানকার মানুষ এদের কথা ভুলতে পারবে না।

 

পরদিন পাক-সৈন্যদল তাদের পথের বাধা দূর করার জন্য বাবুরহাট থেকে দূরপাল্লার কামান দেগে গ্রামের পর গ্রাম অগ্নিবর্ষণ করে চলল, কয়েক ঘণ্টা ধরে এই গোলা বর্ষণ চলল। কিন্তু যাদের লক্ষ্য করে তারা গোলা ছুঁড়েছিল, তারা সেখান থেকে বহু দূরে, তাদের ধরাছোঁয়ার নাগালের বাইরে নতুন অঞ্চলে নতুন খেলায় মেতে উঠেছে।

 

——————————————-

 

২) সশস্ত্র প্রতিরোধ- চট্টগ্রাম

শিরোনাম সূত্র তারিখ
২। চট্টগ্রামের সশস্ত্র প্রতিরোধের বিবরণ ১৯৭১

 

<৯, ২.১, ২৮-৩২>

 

সেদিন চট্টগ্রামে যেমন করে
স্বাধীনতা লড়াই শুরু হয়েছিল

সাক্ষাৎকারঃ লেঃ কর্নেল জিয়াউর রহমান

(উনি ১৯৭১ সালের মার্চ মাসের ৮ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেকেণ্ড-ইন-কমাণ্ড হিসেবে মেজর পদে কর্মরত ছিলেন। পরবর্তীকালে তিনি লেঃ জেনারেল এবং রাষ্ট্রপতি পদে আসীন হন। লেখাটি ২৬ শে মার্চ, ১৯৭২ সংখ্যার ‘দৈনিক বাংলা’ থেকে সংকলিত)

 

 

৩রা মার্চ, ১৯৭১ সাল। সময় সকাল সাড়ে নয় টা। এই প্রথম পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার তথা বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে সশস্ত্রভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ার ব্যাপারে প্রথম প্রকাশ্য আলোচনা। এদিকে ঢাকা ও চট্টগ্রামের পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি ঘটছিল। সামরিক বাহিনীর অন্যান্য বাঙালি অফিসাররা অস্থির হয়ে উঠেছিলেন। তাঁদের সবার মনেই একটি চিন্তাই পাক খেয়ে ফিরছিল- কি করা যায়? কি করব?
বিভিন্ন খবরাখবর নিয়ে তাঁরা বার-বার ছুটে আসছিলেন মেজর জিয়ার কাছে। মেজর জিয়া তখন ছিলেন ৮ম ইস্ট বেঙ্গল ব্যাটালিয়নের বাঙালি অফিসারদের মধ্যে সর্বোচ্চ পদে অধিষ্ঠিত।
এর পর এলো ৭ই মার্চ। বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ডাক দিলেন। বললেন, যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত হও। ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল।

 

৮ম ইস্ট বেঙ্গল ব্যাটালিয়নের অফিসাররা একে অস্ত্র তুলে নেবার আহবান বলেই মনে করলেন।

 

পরদিন ৮ই মার্চ। আবার সেই সকাল। ওরা দু’জন সবার অলক্ষ্যে আবার উঠে এলেন ছাদে। মেজর জিয়াউর রহমান আর ক্যাপ্টেন অলি আহমদ। বিদ্রোহ ঘোষনা সম্পর্কে একটি সুস্পষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে দু”জনে আলোচনা করলেন। ঠিক হলো বিদ্রোহ ঘোষনার জন্য উপযুক্ত মুহূর্তটির জন্য অপেক্ষা করতে হবে।

 

কিন্তু কখন আসবে সেই উপযুক্ত মুহূর্ত? কখন? কবে?
ওঁরা জানতেন এই বিশেষ মুহুর্ত টি আসবে তখনই যখন তাদের বিদ্রোহের সমর্থনে পূর্ণ আন্তরিকতা নিয়ে এগিয়ে আসবে জনসাধারণ। এই মুহুর্ত টি আসনে তখনই যখন শত্রুর বর্বরতা সম্পর্কে সুস্পষ্ট প্রমাণ সবার সামনে তুলে ধরা যাবে। এদিকে ইয়াহিয়া বসলো মুজিবের সঙ্গে আলোচনায়। ৮ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙালি অফিসাররা রূদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করতে লাগলেন আলোচনার ফল কি হয়?…আলোচনার অন্তরালে পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষের এক জঘন্যতম চক্রান্ত। সে চক্রান্ত বাঙালিদের উপর হামলার। সে চক্রান্ত বাংলাদেশের উপর বর্বর অভিযানের।

 

আলোচনা চলছিল। আর এদিকে আসছিল জাহাজ বোঝাই সৈন্য। বিপুল পরিমান অস্ত্রশস্ত্র, গোলাবারুদ। জাহাজ বোঝাই করে যে সব সৈন্য আসছিলো, তাদেরকে দ্রুত বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হচ্ছিল।

 

এমন সময় ডাক এলো লেঃ কর্নেল এম, আর, চৌধুরীর কাছ থেকে। ১৭ইমার্চ রাত সাড়ে নয়টায় চট্টগ্রামে স্টেডিয়ামে সামরিক আইন সদর দপ্তরে তার ডাকে প্রথম গুপ্ত বৈঠক অনুষ্ঠিত হল- চারজন সামরিক বাহিনীর বাঙালি অফিসারের মধ্যে। এরা চারজন হচ্ছেন লেঃ কর্নেল এম, আর, চৌধুরী, মেজর জিয়াউর রহমান, নোয়াখালীর মেজর আমীন আহমদ চৌধুরী ও ক্যাপ্টেন অলি আহমদ।

 

-কি মনে করছ? বৈঠকের শুরুতেই কর্নেল চৌধুরী পরিস্থিত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন মেজর জিয়াকে।

 

-ওদের ভাবগতি দেখে পরিস্কার মনে হচ্ছে ওরা হামলা চালাবে।

 

কর্নেল বললেন তাঁরও তাই ধারনা। কিন্তু কি করা যায়? সবারই মনে এই প্রশ্ন। এক- বিদ্রোহ। কর্নেল চৌধুরী সুস্পষ্ট ভাবে বললেন, সশস্ত্র অভ্যুত্থানই একমাত্র পথ। তিনি প্রথম বাঙালি সামরিক অফিসার যিনি সশস্ত্র অভ্যূত্থানের আহবান জানালেন।

 

সশস্ত্র অভ্যুত্থান। পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ। ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম ‘সিপাহী বিদ্রোহের’ পর আর এক নতুনতর সিপাহী বিদ্রোহ। এ বিদ্রোহ অবিশ্যম্ভাবী। সশস্ত্র অভ্যুত্থান ছাড়া বিকল্প আর কিছু নেই।

 

ওরা চারজন বাঙালি অফিসার বসলেন বিদ্রোহের পরিকল্পনা প্রণয়নে। ঠিক হলো ক্যান্টনমেন্টের স্টেশন কমান্ডার একমাত্র বাঙালি ব্রিগেডিয়ার এম, আর মজুমদারকে এ পরিকল্পনা থেকে বাইরে রাখতে হবে। ঠিক হলো লেঃ কর্নেল এম, আর, চৌধুরীর নেতৃত্বেই তারা বিদ্রোহের প্রস্তুতি চালিয়ে যাবেন।

 

এদিকে পাকিস্তানী হামলার প্রস্তুতি চলছিল পুরোদমে। বাঙালি অফিসারদের উপরে তাদের সজাগ দৃষ্টি হয়ে উঠেছিল আরো প্রখর। আর এরাও পাল্টা গোয়েন্দা বৃত্তি চালিয়ে সংগ্রহ করছিলেন পাক সেনাদের তৎপরতা। এরই মধ্যে কুমিল্লা থেকে বিস্তারিত খবর আসতে থাকল।

 

কমাণ্ড ব্যাটেলিয়নকে আনা হল চট্টগ্রামে। তাদেরকে রাখা হতে লাগল শহরের অবাঙালিদের বাড়ি বাড়ি। চট্টগ্রামের ২০ তম বালুচ রেজিমেন্টের সৈন্যরাও প্রতি রাতে সাদা পোশাকে অসামরিক ট্রাকে করে বেরিয়ে যেত শহরে। তাদের কাজ ছিল অবাঙালিদের সাথে মিলে লুটপাট করা।

 

বাংলাদেশের উপর বর্বর হামলার প্রস্তুতি দেখতে এলেন পাক সেনাবাহিনীর জেনারেল হামিদ খান। ২১ শে মার্চ চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টে তাকে আপ্যায়িত করা হল মধ্যাহ্ন ভোজে। এই মধ্যাহ্ন ভোজেই পশ্চিমা সামরিক অফিসারদের কানাঘুষা আর জেনারেল হামিদের একটু ছোট্ট উক্তিতে বাঙালি অফিসাররা স্পষ্ট বুঝতে পারলেন দিন ঘনিয়ে এসেছে। হামলা অত্যাসন্ন।

 

মধ্যাহ্ন ভোজে জেনারেল হামিদ বীর বাঙালি অফিসারদের যেন চিনতেই পারেন নি। তার যত কানাঘুষা আর কথাবার্তা চলছিল পশ্চিমা অফিসারদের সাথে।

 

কি এত কানাঘুষা? কিসের এত ফিসফাস? সন্দিগ্ধ হয়ে উঠেছিল্ল মেজর জিয়ার মন। কৌশলে একজনের সাথে কথা বলতে বলতে গিয়ে দাঁড়ালেন জেনারেল হামিদের ঠিক পেছনে। দাঁড়ালেন পেছন ফিরে। কথা বলতে লাগলেন সঙ্গীটির সাথে আর দু’কান সজাগ রাখলেন জেনারেল হামিদের কথার দিকে।

 

জেনারেল হামিদ তখন বলছিলেন ২০ তম বালুচ রেজিমেন্টের কমান্ডিং অফিসার লেঃ কর্নেল ফাতমীর সাথে। অনেক কথার মধ্যে অনেকটা যেন সামরিক নির্দেশের মতই কর্নেল ফাতমীকে বলে উঠলেন জেনারেল হামিদ- “দেখ ফাতমী, অভিযান (একশন) খুব দ্রুত ও কম সময়ের মধ্যে হতে হবে। আমাদের পক্ষের কেউ যেন হতাহত না হয়।”

 

আঁতকে উঠলেন মেজর জিয়া। একি? কি হতে যাচ্ছে? ঐ দিনই বিকেলে তিনি সস্ত্রীক এক সৌজন্য সাক্ষাতে গেলেন ব্রিগেডিয়ার মজুমদারের বাসায়। কথায় কথায় তিনি জানতে চাইলেন জেনারেল হামিদের সফরের উদ্দেশ্য। কিন্তু ব্রিগেডিয়াম মজুমদারের সে তথ্য ছিল অজানা। তিনি শুধু বললেন, ওরা আমাকে বিশ্বাস করে না। তিনি জানালেন, জেনারেল হামিদ যখন অপারেশন রুমে ছিলেন তাঁকে সে ঘরে ঢুকতেই দেয়া হয় নি।

 

– কি বুঝলেন? জানতে চাইলেন মেজর জিয়া।

 

– মনে হচ্ছে সামথিং ফিশি।

 

জিয়া বললেন, ফিশি নয়- বিরাট কিছু। বিরাট এক চক্রান্তে মেতেছে ওরা। ব্রিগেডিয়ার মজুমদার মেনে নিলেন সে কথা। পরদিন ২২শে মার্চ। রাত ১১ টায় চট্টগ্রাম ই-পি-আর সেক্টর দফতরের এডজুট্যান্ট ক্যাপ্টেন রফিক এসে দেখা করলেন মেজর জিয়ার সাথে। তিনি সরাসরি বললেন, সময় খুব দ্রুত এগিয়ে আসছে। আমাদের বিদ্রোহ ঘোষনা করতেই হবে। আপনার প্রতি আমাদের আস্থা আছে। আপনি বিদ্রোহ ঘোষনা করুন। ই-পি-আর দের সাহায্য পাবেন। মেজর জিয়া তাঁকে তাঁদের পরিকল্পনার কথা জানান। ই-পি-আর এর সাহায্য সম্পর্কে আলোচনা করেন। ২৫শে মার্চে ব্যাপক রদবদল ঘটে গেল ক্যান্টনমেন্টের প্রশাসন ব্যবস্থায়।

 

ঢাকা থেকে হেলিকপ্টারে করে উড়ে এলেন জেনারেল খাদেম হোসেন রাজা, জেনারেল আনসারি, মেজর জেনারেল মিঠা খান, লেঃ জেনারেল খোদাদাদ খান প্রমুখ। ব্রিগেডিয়ার মজুমদারকে তারা জোর করে ধরে নিয়ে গেলেন ঢাকায়। সেই সাথে নিয়ে গেলেন মেজর আমিন আহমদ চৌধুরীকেও। ব্রিগেডিয়ার মজুমদারের স্থানে আনসারী নিযুক্ত হলেন স্টেশন কমান্ডার। কর্নেল শিগারী দায়িত্ব নেন ই-পি-আর এর সেক্টর কমান্ডার হিসাবে।

 

এই রদবদলে আশংকিত হয়ে উঠেন বাঙালি সৈনিক ও অফিসারেরা। এই দিনই গুরুতর অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন লেঃ কর্নেল চৌধুরী।

 

এদিকে চট্টগ্রাম শহরের উত্তেজনা ক্রমেই বেড়ে চলছিল। অস্ত্র বোঝাই জাহাজ সোয়াতের বিরুদ্ধে গড়ে তোলা হচ্ছিল প্রবল প্রতিরোধ। অস্ত্র খালাস করে যাতে পশ্চিমা সৈন্যদের হাতে পৌছাতে না পারে তার জন্য রাস্তায় রাস্তায় তৈরী করা হলো ব্যারিকেড। এই ব্যারিকেড সরিয়ে রাস্তা পরিস্কারের কাজে লাগানো হল বাঙালি সৈন্যদের। রাত ১০ টা পর্যন্ত চলল এই ব্যারিকেড সরানোর কাজ। রাত ১১ টার অফিসার কমান্ডিং জানজুয়া আকস্মিকভাবে মেজর জিয়ার কাছে নির্দেশ পাঠালেন এক কোম্পানী সৈন্য নিয়ে বন্দরে যাওয়ার জন্য। এই আকস্মিক ও রহস্যজনক নির্দেশের অর্থ তাঁর কাছে বোধগম্য হল না। রাত প্রায় সাড়ে এগারোটায় জানজুয়া নিজে এসে তাকে নৌবাহিনীর একটা ট্রাকে তুলে ষোল শহর ক্যান্টনমেন্ট থেকে বন্দরের দিকে রওনা করিয়ে দেন কিন্তু রাস্তায় ব্যারিকেড সরিয়ে সরিয়ে যেতে তার দেরী হচ্ছিল। আগ্রাবাদে যখন একটা বড় ব্যারিকেডের সামনে বাধা পেয়ে তার ট্রাক দাঁড়িয়ে পড়ে তখনই পিছন থেকে ছুটে আসে একটি ডজ গাড়ি। ক্যাপ্টেন খালেকুজ্জামান গাড়ী থেকে নেমেই আসেন মেজর জিয়ার কাছে। তাঁকে হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে যান রাস্তার ধারে।

 

-পশ্চিমারা গোলাগুলি শুরু করেছে। শহরের বহু লোক হতাহত হয়েছে। খালেকুজ্জামানের উত্তেজিত কণ্ঠস্বর থেকে কথা কয়টি ঝরে পরে। কি করবেন জিয়া ভাই এখন?

মাত্র আধ মিনিট। গভীর চিন্তায় তলিয়ে যান মেজর জিয়া। তারপর বজ্রনির্ঘোষে বলে উঠেন- উই রিভোল্ট!

 

সাথে সাথে তিনি খালেকুজ্জামান কে ফিরে যেতে বলেন। বললেন, ব্যাটালিয়নকে তৈরি করার জন্য অলি আহমেদকে নির্দেশ দিতে। আর সেই সাথে নির্দেশ পাঠান ব্যাটালিয়নের সমস্ত পশ্চিমা অফিসারকে গ্রেপ্তারের।

 

খালেকুজ্জামান দ্রুত ফিরে গেলেন ষোল শহরের দিকে। আর মেজর জিয়া ফিরে এলেন ট্রাকে। যে পশ্চিমা অফিসারকে তার সাথে দেয়া হয়েছিল, তাকে বললেন, হুকুম বদলে গেছে। বন্দরে যেতে হবে না। আমাদের এখন ফিরে যেতে হবে ক্যান্টনমেন্টে। বাঙালি সৈন্য যারা তার সাথে ছিলেন তাঁদেরকে ইশারায় বললেন রাইফেল লোড করে রাখতে, প্রয়োজন হতে পারে।

 

তাঁরা ফিরে আসেন ব্যাটালিয়নে। এসেই তিনি সাথের পশ্চিমা অফিসারকে অস্ত্র সমর্পণের নির্দেশ দিয়ে বলেন, তুমি এখন আমাদের হাতে বন্দী। অফিসারটি আত্মসমর্পন করলে তিনি ট্রাক থেকে নেমে ট্রাকের পশ্চিমা নৌ-সেনাদের দিকে রাইফেল তাক করে তাদেরকেও অস্ত্র ছেড়ে আত্মমসমর্পন করতে বলেন। হতচকিত পশ্চিমা সেনারা সবাই আত্মসমর্পণ করে।

 

এরপর তিনি একাই গাড়ি নিয়ে ছুটে যান অফিসার কমান্ডিং জানজুয়ার বাড়ি। কলিং বেল টিপতেই ঘুম থেকে উঠে আসেন জানজুযা। আর সামনেই মেজর জিয়াকে দেখে ভূত দেখার মত করে চমকে উঠেন। তার ধারনা ছিল পরিকল্পনা অনুযায়ী মেজর জিয়া বন্দরে বন্দী রয়েছে। জানজুয়া কে গ্রেফতার করে নিয়ে ষোলশহরে ফিরে আসেন মেজর জিয়া। পথে অফিসার্স মেসে মেজর শওকত কে তিনি সব কথা বলতেই মেজর শওকত উৎফুল্ল হয়ে উঠেন এবং বিদ্রোহে তাঁর সাথে যোগ দেয়ার কথা ঘোষনা করে দ্রুত ব্যাটালিয়নে চলে আসেন।

 

এরপরই মেজর জিয়া স্থানীয় জননেতা ও বেসামরিক অফিসারদের সাথে যোগাযোগ চেষ্টা করেন, কিন্তু কাউকেই পান না। তখন টেলিফোন এক্সচেঞ্জের অপারেটর কে জানালেন সবাইকে টেলিফোন করে ৮ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বিদ্রোহের ঘোষনার কথা জানাতে। অপারেটর সানন্দে তাঁর এই নির্দেশ জানাতে রাজি হন।

 

তিনি লেঃ কর্নেল এম, আর , চৌধুরীকেও টেলিফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। কিন্তু তাঁকেও পাননি। পরে শুনেছিলেন পকিস্তানী সৈন্যরা এই রাতেই গুরুতর অসুস্থ এম, আর , চৌধুরীকে হত্যা করেছিল।

 

শুরু হয়ে গেল বিদ্রোহ। রাত তখন দুটো। ব্যাটালিয়নের আড়াইশোর মত সৈনিককে একত্রিত করে তাঁদেরকে সব কথা বলেন মেজর জিয়া। সবাই একবাক্যে এই বিদ্রোহের প্রতি তাঁদের পূর্ণ সমর্থনের কথা ঘোষনা করেন। তাঁরা জানান, দেশের স্বাধীনতার জন্য তাঁরা জান দিতেও প্রস্তুত। কিছু সৈন্য ষোলশহরে রেখে বাকিদের নিয়ে মেজর জিয়া বেরিয়ে পরেন কালুরঘাটের পথে। এদিকে ই-পি-আর এর জোয়ানেরাও লড়াই শুরু করেছিল। কালুরঘাটে পরেরদিন তাঁদের সাথে বেশ কিছু পুলিশ ও যোগ দেন।

 

২৬শে মার্চ সকাল। আগের রাতে ঢাকা শহরে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে রাজধানীর উপরে পূর্ণ কর্তৃত্ব স্থাপন করেছিল পাকিস্তানী বাহিনী। আর আনন্দে সকাল হতেই পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের সদর দফতরে চলছিল মিষ্টি বিতরণ আর অভিনন্দন বিনিময়ের পালা। কিন্তু কয়েক মূহুর্ত পরেই তাদের হাসি ম্লান হয়ে যায়। মিষ্টি হয়ে যায় বিস্বাদ। চট্টগ্রামের যুদ্ধের খবর যখন তাদের কাছে পৌছাল, তখন এক নিদারুন সন্ত্রস্তে আঁতকে উঠলেন তারা।

 

চট্টগ্রাম। পাকিস্তানীদের লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ালো চট্টগ্রাম। ২৭শে মার্চ সকালেই বিমান বোঝাই হয়ে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে এসে গেল পুরো দ্বিতীয় কমাণ্ডো ব্যাটালিয়ন। চট্টগ্রাম যুদ্ধের পরিকল্পনা তৈরীর জন্য মিঠা খান কে হেলিকপ্টারে পাঠানো হয় চট্টগ্রামে। বাঙালি সৈন্যরা গুলি করে সে হেলিকপ্টারটি ফুটো করে দেয়। একই সাথে বিমানে করে নামানো হতে লাগল দ্বিতীয় কমান্ডো ব্যাটালিয়ন কে। নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ বাবর কে নিয়ে আসা হয় বন্দরে। এতে ছিল দুই ব্যাটালিয়ন সৈন্য। ডেস্ট্রয়ার, এক স্কোয়াড্রন ট্যাঙ্ক ও লাগানো হয় এই যুদ্ধে। জাহাজের গান থেকেও গোলা নিক্ষেপ হতে থাকে শহরের দিকে।

 

এই বিরাট শক্তির মোকাবিলায় বেশিক্ষন টিকে থাকা সম্ভব হবে না এ কথা বাঙালি সৈন্যরা বুঝেছিলেন। তাই শহর ছেড়ে যাবার আগেই বিশ্ববাসীকে কথা জানিয়ে যাবার জন্য মেজর জিয়া ২৭শে মার্চ সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্রে যান। বেতার কেন্দ্রের কর্মীরা মেজর জিয়া কে পেয়ে উৎফুল্ল হয়ে উঠেন। কিন্তু কি বলবেন তিনি? একটি করে বিবৃতি লিখেন আবার ছিড়ে ফেলেন। কি জানাবেন তিনি বিশ্ববাসী এবং দেশবাসী কে বেতার মারফৎ? এদিকে বেতার কর্মীরা বারবার ঘোষণা করছিলেন- আর পনের মিনিটের মধ্যে মেজর জিয়া ভাষণ দেবেন। কিন্তু পনের মিনিট পার হয়ে গেল। মেজর জিয়া মাত্র তিনলাইন লিখতে পেরেছেন। তখন তাঁর মানসিক অবস্থা বুঝাবার নয়। বিবৃতি লেখার ঝুঁকিও ছিল অনেক। ভাবতে হচ্ছিলো শব্দ চয়ন, বক্তব্য পেশ প্রভৃতি নিয়ে।

 

প্রায় দেড় ঘন্টা মোসাবিদার পরে তিনি তৈরী করেন তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণটি। নিজেই সেটা বাংলা ও ইংরেজীতে পাঠ করেন।

 

১১ই এপ্রিল পর্যন্ত কালুরঘাটে থেকে তাঁরা চট্টগ্রামের যুদ্ধ চালিয়ে যান। তাঁদের যুদ্ধের সাথে নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল ২০ তম বালুচ রেজিমেন্ট, কুমিল্লা থেকে নিয়ে যাওয়া ৫৩-ব্রিগেড। আর নিশ্চিহ্ন হয়েছিল কমান্ডো, যারা অবাঙালিদের ঘরে ঘরে ঘাঁটি গেড়েছিল।

 

এদেরকে ছাড়াও চট্টগ্রামের এই যুদ্ধে বাঙালিদের বিরুদ্ধে লাগানো হয়েছিল কোয়েটা থেকে নিয়ে আসা ১৬শ ডিভিশন ও প্রথম কমান্ডো ব্যাটালিয়নকে।

 

৩০শে মার্চ সকালে মেজর জিয়া স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র (চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র) থেকে আর এক ঐতিহাসিক ভাষণে শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও সেনাবাহিনীর সর্বোচ্চ কমান্ডার ঘোষণা করেন।

 

এই দিনই দুটি পাকিস্তানী বিমান থেকে গোলাবর্ষন করে বেতার কেন্দ্রটি ধ্বংস করে দেওয়া হয়।

 

১১ই এপ্রিল কালুরঘাট এলাকা থেকে অবস্থান সরিয়ে নেয়ার পর যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে আশেপাশের বিস্তীর্ণ এলাকায়। এ যুদ্ধ চলে রামগড়, রাঙ্গামাটি এলাকায়। যুদ্ধ চলে কক্সবাজারের পথে, শুভপুরে। যুদ্ধ শুরু হবার পর থেকেই দলে দলে জনসাধারণ বিশেষ করে ছাত্ররা এসে যোগ দিয়েছে বাহিনীতে। অস্ত্র ধরেছে, ট্রেনিং নিয়েছে, বীরত্বের সাথে লড়াই করেছে।

 

৩০শে মার্চ চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র ধ্বংস হয়ে যাবার পর ৩রা এপ্রিল রাত সাড়ে নয়টায় পার্বত্য চট্টগ্রামের কোন এক গোপন এলাকা থেকে চালু করা হয় আরেকটি বেতার কেন্দ্র। “আমার সোনার বাংলা” দিয়ে করা হয় এই কেন্দ্রের উদ্বোধন। এই গানটি গাইবার জন্য সেই রাতে সেখানে এসেছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রামের তদানীন্তন পুলিশ সুপার জনাব রহমানের তিন মেয়ে।
—————————————————————-
<৯, ২.২, ৩২-৪০>

ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টারের ঘটনা ও প্রতিরোধ
সাক্ষাৎকার : মেজর এনামুল হক চৌধুরী
(১৯৭১ সালের মার্চে ক্যাপ্টেন পদে কর্মরত ছিলেন। সাক্ষাৎকারটি বাংলা একাডেমীর দলিলপত্র থেকে সংকলিত)

৭ -১১ -১৯৭৩

 

২৪শে মার্চ ব্রিগেডিয়ার মজুমদার, কর্নেল হামিদ হোসেন শিগরী, ক্যাপ্টেন মোহসিন (এডজুট্যান্ট) চট্টগ্রাম বন্দরে ‘এম, ভি, সোয়াত’ জাহাজের অস্ত্রশস্ত্র গোলাবারুদ খালাসের ব্যাপারে আলোচনা করার জন্য এক উচ্চ পর্যায়ের সম্মেলনে যোগ দিতে চলে যান। আমাকে নির্দেশ দিয়ে যান ব্রিগেডিয়ার আনসারী, হেলিকপ্টার যোগে ঢাকা থেকে আসার পর তাকে জীপ যোগে চট্টগ্রাম বন্দরে পাঠিয়ে দিতে।

 

হেলিকপ্টার যখন চট্টগ্রাম সেনানিবাস অবতরণ করে তখন আশ্চর্যের সাথে দেখতে পাই লেফটেন্যান্ট জেনারেল আব্দুল হামিদ খান (সি-ও-এস, পাকিস্তান আর্মি), জেনারেল নওয়াজেশ, জেনারেল খাদিম হোসেন রাজা (জি-ও-সি, ১৪ ডিভিশন, ঢাকা) এবং ব্রিগেডিয়ার আনসারী এরা সবাই হেলিকপ্টারে ঢাকা থেকে এসেছেন। কিন্তু ব্রিগেডিয়ার আনসারী সেই হেলিকপ্টারে চট্টগ্রাম বন্দরে চলে যান। তাদেরকে দেখার সাথে সাথে আমরা সবাই আশ্চর্যান্বিত হয়ে গেলাম কারণ তাদের আগমন অপ্রত্যাশিত ছিল।

 

জেনারেল দের আগমনের সাথে ২০-বালুচের সি-ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফাতমী ই-বি-আর-সি তে আসেন। চা পানের পর জেনারেল খাদেম হোসেন রাজা ২০-বালুচের সি-ওর সাথে ২০-বালুচ অফিসে যান। কিন্তু আমরা আশ্চর্য হয়ে যাই যে, স্টার প্লেট ছাড়াই তিনি গাড়িতে করে ছদ্মবেশে ২০-বালুচের অফিসে চলে যান। ই-বি-আর-সি অফিসার মেস এ আমরা লাঞ্চ পার্টির ব্যাবস্থা করি। সেখানে প্রায় ৩০/৪০ জন অফিসার উপস্থিত ছিলেন। ব্রিগেডিয়ার মজুমদার ও ব্রিগেডিয়ার আনসারির জন্য আমরা প্রায় ১ ঘন্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করছিলাম। ব্রিগেডিয়ার মজুমদার তিনটার সময় পোর্ট থেকে আমাকে টেলিফোনে পার্টি শুরু করার নির্দেশ দিলেন।

 

পার্টি হৈ হুল্লোড় এবং আনন্দের সাথে শুরু হয়ে যায়। কথা প্রসংগে জেনারেল খাদেম হোসেন রাজা মেজর মং কেও (এস-এস-ও) কে জিজ্ঞেস করেন যে অবসর জীবনে তিনি কি করবেন। তিনি বললেন, দেশের এই অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে বাইরের কিছু চিন্তা করা সম্ভব নয়। খাদেম হোসেন রাজা বললেন, “থিংস আর গোয়িং টু বি নরমালাইজড ভেরী সুন। ডু নট ওরি। প্ল্যান ফর ইওর ফিউচার।“

 

খাদেম হোসেন রাজা আমাদেরকেও বললেন। “দিস আনসারটেইনিটি ইজ গোয়িং টু বি ওভার ভেরী সুন। ওয়ার্ক হার্ড। ডিভোট ইওর টাইম ফর ট্রেনিং।

 

ব্রিগেডিয়ার মজুমদারও বেলা পৌনে চারটার দিকে হেলিকপ্টার যোগে ব্রিগেডিয়ার আনসারী, ক্যাপ্টেন মোহসিনসহ ই-বি-আর-সি তে আসেন। খাওয়া শেষ করার পর ব্রিগেডিয়ার মজুমদার আমাকে বলেন যে বিশেষ কারনে তিনি ঢাকা চলে যাচ্ছেন। তিনি আরো বলেন, “লুক আফটার ইওরসেল্ফ।”

 

তার সাথে ক্যাপ্টেন আমিন আহমদ চৌধুরী (এ-আর-ও-পি) মেডিকেল চেক আপ এর জন্য ঢাকা আসেন। সব জেনারেল একই হেলিকপ্টারে ঢাকা রওনা হয়ে যান।

 

২৪শে মার্চ বিকালে ই-বি-আর-সিতে থমথমে ভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছিল। আমাদের পেরিমিটার গার্ড এর সংখ্যা বাড়িয়ে দেয়া হয়।

 

২৫শে মার্চ বিকেলে কর্নেল এম, আর, চৌধুরী (চীফ ইন্সট্রাক্টর, ই-বি-আর-সি) আমাকে সমস্ত অস্ত্রশস্ত্র জোয়ানদের দিয়ে দিতে বললেন। সমস্ত জোয়ানদের বিভিন্নভাবে অরগানাইজ করা হয়।

 

এখানে উল্লেখ করা দরকার যে, ষোলশহরে অবস্থিত অষ্টম বেঙ্গল রেজিমেন্টের বিশেষ কোন অস্ত্রশস্ত্র ছিল না। ই-বি-আর-সি থেকে দেড়শত রাইফেল তারা ধার চেয়েছিল। আমরা ঢাকা থেকে স্যাংশন পেয়ে তাদেরকে নিয়ে যেতে নির্দেশ দেই। অষ্টম বেঙ্গলের কোয়ার্টার মাষ্টার ক্যাপ্টেন অলি আহমদ আজ নেবেন কাল নেবেন বলে আর নেন নাই। অষ্টম বেঙ্গলের কিছু সৈন্য এডভান্স পার্টি হিসেবে পাকিস্তান চলে যায়। যাবার প্রস্তুতি হিসেবে সমস্ত অস্ত্রশস্ত্র, গাড়ী জমা দিতে হয়েছিল। খুব কম অস্ত্রশস্ত্র, গাড়ী বাকি সৈন্যদের কাছে ছিল।

 

২৫শে মার্চ সকাল থেকেই চট্টগ্রাম শহরের বিভিন্ন জায়গায় জনসাধারণ ব্যারিকেড সৃষ্টি করতে শুরু করে। বায়েজীদ বোস্তাম থেকে ব্যারিকেড পরিস্কার করার জন্য ই-বি-আর-সি কে নির্দেশ দেয়া হয়। সাথে বেলুচ রেজিমেন্টের একটি কোম্পানীও ছিল।

 

লেফটেন্যান্ট কর্নেল এম, আর চৌধুরীকে ব্যারিকেড পরিস্কার করার দায়িত্ব দেয়া হয়। তার সাথে ক্যাপ্টেন আজিজ ব্যারিকেড পরিস্কারের কাজ তদারকি করছিলো।

 

সকাল ১১টা থেকে চারটে পর্যন্ত সকল সৈন্যসামন্ত নিয়ে মাত্র ২০০ গজ রাস্তা পরিস্কার করা হয়। বহু কষ্টে বায়েজীদ বোস্তামীর রাস্তার মোড় পর্যন্ত যান। সৈন্যদেরকে সেখানেই দুপুরের খাবার দেয়া হয়।

 

বেলা সাড়ে তিনটার দিকে বেসামরিক ট্রাক যেগুলো আমাদের সৈন্য নিয়ে ব্যারিকেড পরিস্কারের কাজে যাচ্ছিল সমস্ত ড্রাইভার ট্রাক ফেলে পলায়ন করেন।

 

বায়েজীদ বোস্তামের মোড়ে বিপুল জনসমাবেশ হয়েছিলো। তারা ড্রাম দিয়ে ব্যারিকেড তৈরী করছিল। এবং যেখানে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা করছিল শ্লোগানে শ্লোগানে সে এলাকাকে তারা মুখরিত করে তুলেছিল।

 

জনতাকে ছত্রভঙ্গ করার জন্য বাধ্য হয়ে কর্নেল এম, আর চৌধুরী নির্দেশে এক রাউণ্ড গুলি ছোড়া হয়। এতে তিনজন লোক আহত হয়। একজনের অবস্থা খুব শোচনীয় ছিল। পরে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। আর সামনের দিকে অগ্রসর না হয়ে এম, আর চৌধুরী সৈন্য সামন্ত নিয়ে সেনানিবাসে ফিরে আসেন।

 

এরপর কর্নেল এম, আর চৌধুরীর সাথে আমার দেখা হয়। তিনি অত্যান্ত দুঃখের সাথে বলেন যে, এই গুলিটি শুধু পাকিস্তানীদের দেখাবার জন্য নির্দেশ দিয়েছিলাম।

 

সন্ধ্যা ৭টার দিকে আমাদের এক কোম্পানীকে জেটি এলাকায় যেতে নির্দেশ দেয়া হয়। মেজর কামাল মেহের (পাঞ্জাবী) ক্যাপ্টেন আজিজ কোম্পানীকে নিয়ে জেটিতে রওনা হয়ে যান।

 

২১শে মার্চ ব্রিগেডিয়ার মজুমদার ই-বি-আর-সি’র বাঙালি অফিসারদেরকে ডেকে চট্টগ্রাম শহরকে পুরো নিয়ন্ত্রনে আনা এবং বাঙালিদের যেন অযথা হয়রানি, দুঃখ দুর্দশার সম্মুখীন হতে না হয়। সেদিকে লক্ষ্য রাখার নির্দেশ দিলেন। তদানুসারে আমরা সমস্ত অফিসার সৈন্যদের নিয়ে শহরে যাই। আমি নিজে অয়ারলেস কলোনীতে যাই। সেখানে ক্যাপ্টেন রফিকের (এডজুট্যান্ট, ই-পি-আর) সাথে দেখা হয়। তার সাথে চট্টগ্রামের ডি-সি এবং এস-পিও ছিলেন। রাত আটটার দিকে অয়ারলেস কলোনীতে আগুন লাগিয়ে দেয়া হয়। বহু কষ্টে ই-পি-আর ও বেঙ্গল রেজিমেন্ট পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনে। তার জন্য ডি-সি, এস পি খুব আনন্দিত হন এবং বলেন যে পশ্চিম পাকিস্তানী সৈন্যরা থাকলে পরিস্থিতি আরো মারাত্মক আকার ধারণ করত।

 

পরে আমি নৌবাহিনীর পশ্চিম পাকিস্তানী জোয়ানদেরকে হাতে অস্ত্রশস্ত্র সহ দেখতে পাই। অয়ারলেস কলোনীতেও তাদেরকে দেখা গিয়েছিল। তা আমি ব্রিগেডিয়ার মজুমদারকে বলি। তিনি বললেন যে এরপর নৌবাহিনীর কোন লোককে শহরে দেখা যাবে না।

 

কর্নেল এম, আর, চৌধুরী সেদিন খুব অসুস্থ ছিলেন। তার দুদিন আগে হাতে ব্যাথা পেয়েছিলেন। তিনি বলেন, “পরিস্থিতি খুব খারাপ। আমাদেরকে সাবধানে থাকতে হবে।“ এই সময় ঢাকা থেকে ক্যাপ্টেন আমিন আহমদ চৌধুরী টেলিফোনে চারদিকে খেয়াল রাখতে বলেন। টেলিফোনটি এম, আর, চৌধুরী কে দিতে বলেন। এম, আর, চৌধুরী টেলিফোনে কথোপকথনের পর আমাকে বলেন, “পরিস্থিতি বড় খারাপ, আমাদেরকে অত্যন্ত সতর্কের সাথে থাকতে হবে।“

 

২৫ শে মার্চ রাতে মেসে যাবার পর কর্তব্যরত অবস্থায় ক্যাপ্টেন মোহসিন আমাকে বললেন, তার মেয়ে বড় অসুস্থ। আমি যদি তার জায়গায় ডিউটি করি তাহলে রাতে তিনি বাসায় থাকতে পারেন। আমি তাতে সম্মত হলাম।

 

অফিসে আসার পর ক্যাপ্টেন মোহসীন সব বুঝিয়ে দেন। এই সময় মেজর বেগ আসেন, তিনি কড়া নির্দেশ দিয়ে যান যে আজকের পরিস্থিতি খুব খারাপ। যদি প্রয়োজন হয় তাহলে সারারাত ডিউটি করতে হবে।

 

কর্নেল এম, আর চৌধুরীর সাথেও আমার দেখা হয়। তিনি বললেন আমি খাবার জন্য মেসে যাচ্ছি, এবং আমার কক্ষে থাকব। প্রয়োজন হলে আমার সাথে টেলিফোনে যোগাযোগ করবে। তবে পরিস্থিতি খারাপ।

 

রাতে শহর থেকে অনেক টেলিফোন পাই। বন্ধুবান্ধবরা পরিস্থিতি কেমন জিজ্ঞেস করছিলো। তাদেরকে বললাম যে, তারা যদি কিছু জানে তাহলে আমাকে যেন জানায়।

 

রাত সাড়ে এগারটার দিকে অষ্টম বেঙ্গল থেকে মেজর মীর শওকত আলী টেলিফোনে বললেন, ই-বি-আর-সি ও যত গাড়ী আছে সবগুলোই যেন তাদের জন্য সত্বর পাঠিয়ে দেয়া হয়। কারণ তাকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে এমভি-সোয়াত থেকে সত্বর অস্ত্রশস্ত্র আনলোড করতে। কিছুক্ষন পর তিনি টেলিফোনে বললেন। তার অধিনস্থ সকলে গাড়ির জন্য প্রস্তুত হয়ে আছে।

 

আমি বললাম, গাড়ির জন্য খবর দেয়া হয়েছে। দু’তিন মিনিট তিনি আবার টেলিফোনে বললেন, ব্রিগেডিয়ার আনসারী তার সৈন্যসামন্ত নিয়ে যেতে নির্দেশ দিয়েছেন। যদি পাঠাতে আমি দেরি করি তাহলে আমার অসুবিধা হবে।

 

আমি জবাব দিলাম, “গাড়ি যাচ্ছে।“ এই সময় চট্টগ্রাম শহর থেকে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক এর ভাইস চেয়ারম্যান এম, এ কাদের আমাকে টেলিফোনে বললেন, ঢাকার কোন খবর পেয়েছেন। আমি বললাম না। তিনি বললেন ঢাকায় পুলিশ, ই-পি-আর’ এর উপর পশ্চিম পাকিস্তানীরা হামলা চালিয়েছে। তারা বিদ্রোহ ঘোষনা করেছে। ঢাকার বাঙালি সামরিক বাহিনীর লোকেরাও বিদ্রোহ ঘোষনা করেছে।

 

টেলিফোন এক্সচেঞ্জ অপারেটর সে সময়ে বাঙালি ছিল, তাই কোন অসুবিধা হয়নি। আমি তাদের সবাইকে বললাম। আপনি কর্নেল এম, আর চৌধুরীর সাথে কথা বলুন। কাদের সাহেব ও এম, আর চৌধুরী যখন কথা বলছিলেন তখন অপারেটর কে বলি তাদের কথোপকথন আমাকে মনিটর করতে।

 

কথা শেষ করে আমি বললাম, স্যার আমি সব শুনছি। তিনি বললেন, বাকি যতসব অস্ত্রশস্ত্র আছে সমস্ত জোয়ানদেরকে দিয়ে দিতে। তিনি সত্বর অফিসে আসছেন বলে জানালেন। আমি সুবেদার মেজর, নায়েক সুবেদার, কোয়ার্টার মাস্টার ও অন্যদেরকেও ডেকে অস্ত্রশস্ত্র কোটে থেকে নিয়ে নিতে নির্দেশ দেই। তারা নির্দেশ নিয়ে বাইরে যাবার সাথে সাথে দেখতে পাই ২০-বালুচ থেকে অনেকগুলো গাড়ি আসছে। গাড়িগুলো আমাদের সামনের রাস্তা দিয়ে শহরের দিকে যেতে দেখতে পাই। কিন্তু কিছুক্ষনের মধ্যে সব গাড়ি থেমে যায়। আমি বাইরে এসে দেখতে পাই গাড়ি থেকে সেনাবাহিনীর লোকজন নিচে নামছে। কোয়ার্টার গার্ড থেকে গার্ড কমান্ডার দৌড়ে এসে আমাকে বলে যে, ২০ বেলুচের সমস্ত লোক অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে গাড়ি থেকে নামছে। আমি তাকে বললাম তুমি চলে যাও। সে যাওয়ার সাথে সাথে কোয়ার্টার গার্ডের লোকজনকে স্ট্যাণ্ড টু (সতর্ক) করা হয়।

 

অল্পক্ষনের মধ্যে ২০-বালুচের লোকেরা কোয়ার্টার গার্ডের রক্ষীদের উপর হামলা চালায়। মূহুর্তের মধ্যে চারদিক থেকে গোলাগুলি শুরু হয়ে যায়।

 

তখন হামিদ হোসেন শিগরী আমাকে টেলিফোন করে জানতে চান কোথা থেকে এ গোলাগুলি হচ্ছে বা কেন হচ্ছে। আমি বললাম, আমি কিছু জানি না। তবে বেলুচ রেজিমেন্টের লোকেরা আমাদের লোকদের উপর গোলাগুলি ছুড়ছে। তিনি বললেন, “ডু নট ওরি। আই উইল ট্রাই টু কন্ট্রোল দি সিচুয়েশন ইফ নিডেড। আই উইল শেড মাই ফর বেঙ্গল রেজিমেন্ট। দেয়ার ইজ নো ডিফারেন্স বিটুইন মাই সন এণ্ড ইউ ক্যাপ্টেন এনাম। আই উইল বি দি ফার্স্ট ম্যান টু টেক ইউ আউট ফ্রম দি ডিউটি রুম।“

 

চারদিক থেকে রাইফেল, এল-এম-জি, ২” মর্টারের আওয়াজ ছাড়া আর কিছুই শোনা যাচ্ছিল না। এ পরিস্থিতি চলতে থাকে দু’ঘন্টার মত। তারপর গর্জে ওঠে ৩” মর্টারের আওয়াজ।

 

কর্নেল শিগরীর আবার টেলিফোন পাই। তিনি বললেন, কে যে আমার বাসার চতুর্দিকে গুলি ছুঁড়ছে। কিছুক্ষণ পর দু-তিন মিনিটের বিরতি হয়।

 

তিনি পুনরায় টেলিফোনে বললেন, “ইজ ইট এডভাইজ্যাবল ফর মি টু কাম টু অফিস এণ্ড টেক ইউ আউট?” আমি জবাব দিলাম গোলাগুলি বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত আসা উচিৎ নয়। তার সাথে সাথে পুনরায় সবরকমের গোলাগুলির আওয়াজ শোনা গেল। সাথে সাথে ট্যাংকের গর্জনও শোনা গেল। আমি যে ডিউটি রুমে ছিলাম, পাশে ৩” মর্টারের গোলা পড়ে। দরজা জানালার চতুর্দিক দিয়ে অনবরত গোলাবর্ষণ হচ্ছিল। আমি বাধ্য হয়ে টেলিফোনটি নিয়ে জমিনের উপর অবস্থান নিয়ে শুয়ে থাকি। কর্নেল শিগরী আবার টেলিফোনে বললেন যদি কোন অফিসার আসে তাহলে তাকে কর্নেল শিগরীর সাথে কথা বলতে দেয়ার জন্য। আমাকে বললেন, তোমার কোন অসুবিধা হবে না। আমি সত্বর আসব। কিন্তু তারপর তার নিকট থেকে কোন সাড়া পাওয়া গেল না।

 

কিছুক্ষন পর গোলাগুলি কিছুটা কমে যায়। বাহির থেকে কে যেন বলছিল আমার রুমে বহু লোক আছে। সাথে সাথে আমি পাঞ্জাবী ক্যাপ্টেন আনোয়ারের কণ্ঠস্বর শুনতে পেয়ে উচ্চকন্ঠে বললাম আমার কাছে আসতে। আমাকে বলা হল বাইরে আসার সাথে সাথে হ্যাণ্ডস আপ করিয়ে তার বিকট স্বরে যেতে বলা হয়। দেখা হওয়ার সাথে সাথে ক্যাপ্টেন আনোয়ার বলে “ডু – নট ওরি। ইউ আর নট এ প্রিজনার অব ওয়ার। ফ্যাক্ট ইজ দ্যাট ইউ আনডার মাই কমাণ্ড।“

 

আমি তাকে কর্নেল শিগরীর সাথে কথা বলতে বলি। সে আমার কথামত কর্নেল শিগরীর সাথে আমার ডিউটি রুম থেকে কথা বলে। সে আমাকে সাথে করে ডিউটি রুম থেকে কোট এ নিয়ে যায় আর বলে, ভাগতে চেষ্টা করলে বিপদ হবে সাথে সাথে তিনজন প্রহরী আমার জন্য মোতায়েন করা হয়।

 

সেখানে দেখতে পাই বাঙালি সৈনিকদের মৃত্যুর আর্তনাদ। কেউ বাবারে মারে বলে চিৎকার করছে। কেউ পানির জন্য কাতরাচ্ছে। আর সাথে সাথে দেখতে পাই পশ্চিম পাকিস্তানী সৈন্যরা ঐ সমস্ত লোকদেরও বেয়নেটের গুতো দিচ্ছে আর বলছে। বাংগালীকা জান বহুত ছখত হায়। আর ইয়ে শালা মারতা ভি নেহি হায়। মূমুর্ষ বাঙালি সৈন্যদের উপর পশ্চিম পাকিস্তানী সৈন্যদের নির্যাতন যথেচ্ছ চলছিল। যারা মূমুর্ষু অবস্থায় ছটফট করছিল পশ্চিম পাকিস্তানী সৈন্যরা তাদের গলার উপর বুট দিয়ে চেপে ধরেছে, যাতে তাড়াতাড়ি তারা মারা যায়।

 

আমাকে প্রহরারত এক প্রহরী বলে, আপ আগার অর্ডার দেতে হাম ভি ইয়ে করনে ছাকতা। লেকিন ইয়ে আচ্ছা নেহী হায়। এক মুসলমান দুসরা মুসলমানকো খামাখা মার রাহা হায়। খোদা কি কসম হাম অভিতক এক গুলি ভী নেহী মারা। “সাথে সাথে আমাকে বলে “লেফটেন্যান্ট আবু তালেব (বাঙালি – আর্মি এডুকেশন কোর) সাব জিন্দা হায়। উসকো সব বেয়নেট কররা থা উস টাইম পর হাম উনকা বাচা দিয়া। উস দিন এমতেহানমে সাব নে হামে পাশ করায়া। ইস লিয়ে হামনে ইস ইয়ে কিয়া। “এই সৈন্যটি আমার সাথে খুব ভাল ব্যাবহার করেছিল। আমিও তাকে অনুরোধ করেছি আমার কাছে থাকতে। সে বলে ” ছোবাহ তাক হাম জিন্দা রাহেগা তো আপ ভী জিন্দা রাহেগা।”

 

ভোর হওয়ার সাথে সাথে ট্যাঙ্কের গর্জন বেশী বাড়তে থাকে। ব্যারাকের উপর ট্যাঙ্কের গোলাবর্ষন চলতে থাকে। চারদিকে পাহাড়ের উপর তিন ইঞ্চি মর্টারের গোলা পড়তে থাকে আর চতুর্দিকে বাঙালি আহত সৈন্যদের গোঙানী ও আর্তনাদ পুরো এলাকায় এক বিভীষিকা এবং বীভৎসতা সৃষ্টি করেছিল। তারপর দেখা গেল বহু বাঙালি সৈন্যকে চতুর্দিক থেকে বেয়নেটের মুখে ধরে আনা হচ্ছে আর তাদেরকে ই-বি-আর-সি স্কুল কক্ষে ঢুকানো হচ্ছে। একদল ভেতরে ঢোকার সাথে সাথে আর কয়েকজন পশ্চিম পাকিস্তানী সৈন্যকে বড় লাঠি নিয়ে ঢুকতে দেখি। আর সাথে সাথে তাদের বেদম মারপিট শুরু হয়ে যায়। তারা যখন ভীষন আর্তনাদ শুরু করে তখন পশ্চিম পাকিস্তানী সৈন্যরা বাইরে আসে। বাহির থেকে ভেতরে দু-তিন রাউণ্ড গুলি ছোড়ার সাথে সাথে আর্তনাদ বন্ধ হয়ে যায়।

 

আমার সামনে যে সব সিপাহীকে গ্রেফতার করে আনা হয়েছিল। তাদেরকে বাঁধা হয়। ভোর সাতটার দিকে একজন সুবেদার এসে আমাকে জিজ্ঞেস করে “খাজনা (ট্রেজারী) কিধার হায়। আমি আঙ্গুল দিয়ে দেখবার সাথে সাথে সুবেদার আমার উপর স্টেনগান উঠিয়ে বলে, ছহি ছহি বাতাও কিধার হায়। কারণ দুদিন আগে দেড় লাখ টাকা সিপাহীদের বেতন বাবদ ঢাকা থেকে ই-বি-আর-সি তে পাঠানো হয়েছিল।

 

কিছুক্ষনের মধ্যে সুবেদার একটি হাবিলদার কে নির্দেশ করে বলে, সাব কো ভী বাঁধো। হাবিলদার একটা রশি নিয়ে আসে। আমি দুই হাত পিছু করার সাথে সাথে সে আমাকে বেশ শক্তভাবে বেঁধে ফেলে। আমি বলি , ওস্তাদ বহুত জোয়াদা টাইট হায়, সে বলে সাব আপকা বাজু বহুত মোটা হায়। আমি হাসতে হাসতে বলি, হামতো গামা নেহী হায়। যাক সে আমার বাঁধন একটু শিথিল করে, কিছুক্ষন পর আমার কমান্ডো প্রহরীটি বাঁধন খুলে নামেমাত্র বেঁধে দেয়।

 

এই সময় আমাদের সুবেদার মেজর রুহুল আমিন, নায়েক সুবেদার কোয়ার্টার মাস্টার লুৎফুলকেও বেঁধে আনা হয়।

 

কিছুক্ষন পরে সুবেদার রহমান কে বেঁধে আনা হয়। তাকে আমি গুলিবিদ্ধ অবস্থায় দেখলাম। একটা গুলি তার পেটে ঢুকে অপর দিকে বের হয়ে যায়। রক্ত পড়ছিল। তাকেও বেঁধে রাখা হয়। পশ্চিম পাকিস্তানী সৈন্যরা আমাদেরকে দেখিয়ে দেখিয়ে চা, পরাটা, হালুয়া, খাচ্ছিল। কমান্ডো প্রহরীটি আমার জন্য চা আনতে যাওয়াতে তাকে অপমান করা হয়। সে এসে বলে, “সময় সবকিছু করে।“

 

আমার সামনের লোকদেরকে খালি চা দেওয়া হয়। তারা বিষ মনে করে খেতে ইতস্তত করে। আমি একটু মুখে নিয়ে বলি, খেয়ে ফেল, কোন অসুবিধা হবে না। কিন্তু সুবেদার মেজর ও নায়েক সুবেদার লুৎফর রহমান তাতেও চা স্পর্শ করলেন না।

 

পশ্চিম পাকিস্তানী সৈন্যরা ই-বি-আর-সি পাহাড়ের নিচে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয় আর পাহাড়ের উপর ৩” মর্টার আর ট্যাংক দিয়ে অনবরত গোলাবর্ষন করতে থাকে। উপর থেকে প্রত্যুত্তরে দু-চারটি গুলিও আসতে থাকে।

 

২৬শে মার্চ বেলা এগারটার দিকে আমাদের কোয়ার্টার গার্ড থেকে পলাতক একটি বাঙালি সৈন্য ই-বি-আর-সি ফুটবল মাঠের ড্রেন থেকে অকস্মাৎ তিনটি গুলি ছুড়লে প্রায় ৬ জন পাকিস্তানী সৈন্য মৃত্যুবরণ করে। প্রায় ১২/১৩ জন মারাত্মকভাবে আহত হয়। তারপর সে পালাতে শুরু করে। পশ্চিম পাকিস্তানী সৈন্যরা তাকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়তে থাকে। শেষ পর্যন্ত সৈন্যটি তাদের গুলিতে মৃত্যুবরণ করে।

 

২৬শে মার্চ ভোর ৭টার দিকে পাক সৈন্যরা যেসব লোকদেরকে রাত্রে নির্দয়ভাবে হত্যা করেছিলো তাদেরকে একটি ট্রাকে ভর্তি করতে দেখতে পাই। আমার সামনে দিয়েও শ’খানেকেরও উপর লাশ নিয়ে যেতে দেখতে পাই। প্রত্যেক লাশকে চারজন সৈন্য হাত পা ধরে মরা কুকুরের মতো নিয়ে যাচ্ছিলো। মাঝে মাঝে সৈন্যদেরকে কিছু লাশ মাটিতে ছেঁচড়িয়ে নিয়ে যেতে দেখতে পাই।

 

এই সময় কয়েকজন পশ্চিম পাকিস্তানী জুনিয়র অফিসারকে দেখতে পাই। তারা আমাকে বাঁধা অবস্থায় দেখে দুঃখ প্রকাশ করে। একজন ২০-বেলুচের লেফটেন্যান্ট কোয়ার্টার মাস্টার কেঁদে ফেলেছিলো।

 

বেলা তিনটার দিকে কর্নেল ফাতমী (২০ বেলুচের কমান্ডিং অফিসার) ইবিআরসি এলাকাতে আসেন এবং আমাকে বাঁধা অবস্থায় দেখে মনোক্ষুন্ন হন। তিনি এক হাবিলদারকে আমার বাঁধন খুলে দিতে নির্দেশ দেন। আমি লেফটেন্যান্ট আবু তালেবের কথা বলাতেও তার বাঁধন খুলে দেয়। অনুরোধ করাতে সুবেদার মেজর রুহুল আমীন ও নায়েক সুবেদার কোয়ার্টার মাস্টার লুৎফর রহমানের বাঁধনও খুলে দেওয়া হয়। আর লুৎফর রহমানকে বলেন, ‘তুমি একটা মেগাফোন নিয়ে যে সমস্ত লোক পাহাড়ের উপর বা অন্যান্য জায়গায় আছে তাদেরকে আত্মসমর্পণ করতে আহবান জানাও।’ তারা যদি খালি হাতে হাত উঁচু করে আসে তাহলে তাদেরকে কেউ মারবে না। পরক্ষণে তিনি সমস্ত বাঙালি সৈন্যর হাতের বাঁধন খুলে এক জায়গায় একত্রিত করতে নির্দেশ দেন। তাই করা হলো। আমাকে বলেন যে তুমি গিয়ে তাদের সাথে কথা বলতে পারো। তাদের উপর আর কোনো অত্যাচার করা হবে না।“

 

আমি গিয়ে সকলকে একত্র করে তাই বললাম। ৫০০/৬০০ জন বাঁধা অবস্থায় ছিলো। পুনরায় কর্নেল ফাতমীর সাথে দেখা করলে তিনি আমাকে বলেন, “এ্যানি হয়ার ইউ ওয়ান্ট টু গো ইউ ক্যান গো। ইফ ইউ ওয়ান্ট টু স্টে ইন অফিসার মেস, গো এহেড। বেটার গো হোম।”

 

আমি অন্যদের কথা জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ঢাকা থেকে নির্দেশ পেলে তাদেরকেও ছেড়ে দেওয়া হবে।

 

আমি দুজন সিপাহী নিয়ে মেসে টাকা আনতে যাই। ওখানে প্রহরারত হাবিলদার পাঞ্জাবী ভাষায় আমার প্রহরারত সিপাহীদের বলল, সাহেব যখন ভিতরে যাবে তখন তাকে হত্যা করো। আমি শুনতে পেয়ে একটু সামনে যেয়ে আবার ফিরে এসে বললাম, ওস্তাদ আব লোগ কোকাকোলা ফান্টা পিয়া, হামারা নাম পর পিলে। হামে এক বাদ ইয়াদ আয়া, কর্নেল সাব নে বাতায়া সিএমএইচ ছে ডাক্তার লে কর জখমী কো পহেলা দেখন কি লিয়ে। হাম ফের থোর বাদমে আয়েঙ্গা। এ যাত্রা মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে যাই।

 

তারপর আবার কর্নেল ফাতমীর সাথে দেখা হয়। আমি বলি, আমার লোকজনের খাবারের কোনো ব্যবস্থা আছে? তিনি বলেন, আমাদের লোক নিয়ে তাদের খাবারের ব্যবস্থা করুন। না হয় তারা কষ্ট পাবে।

 

তিনি আরো বলেন, ইবিআরসি’র সামনে কোনো পশ্চিম পাকিস্তানী থাকবে না। রাত্রে তাদের কোনো অসুবিধা হবে না। এখানে বলা যেতে পারে ইবিআরসি’র সামনের জায়গাটা হলো বায়েজিদ বোস্তাম ও বেসমরিক লোকদের বাড়িঘর। লোকজনকে একত্রিত করে পুনরায় আমি তাদের খাবারের ব্যবস্থা করার জন্য বলি। আর বলি আমাকে লেফটেন্যান্ট তালেব, সুবেদার মেজর রুহুল আমীন ও নায়েব সুবেদার কোয়ার্টার মাস্টার লুৎফর রহনানকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। আমরা বাইরে যাচ্ছি। বাকিদের ঢাকা থেকে ক্লিয়ারেন্স পেলে ছেড়ে দেওয়া হবে। তবে ইবিআরসি’র সামনে রাত্রে কোনো পশ্চিম পাকিস্তানী সৈন্য থাকবে না।

 

ই-বি-আর-সি থেকে বের হওয়া কষ্টকর ছিলো। চারিদিক থেকে এখনো এলোপাতাড়ি গোলাগুলি চলছিলো। মৃত্যুকে হাতে নিয়ে বহু কষ্টে ইবিআরসি এলাকা থেকে বের হতে সক্ষম হই।

 

ই-বি-আর-সি’র বাইরে একটি ফ্লাটে আমাদের চারজন অফিসার ছিলেন। আসার পথে তাদেরকে বাইরে নিয়ে আসতে যাই। আমাকে দেখে তারা যেনো আকাশ থেকে পড়ছেন বলে মনে হলো। আমাকে দেখার সাথে সাথে তারা ইবিআরসি’র ভিতরের অবস্থা জানতে চান। আমি উপরে বর্ণিত দু-একটি কথা বলার সাথে সাথে তাদেরকে আমার সাথে আসতে বলি। সেখানে ছিলেন মেজর রেজাউল রহমান (মেডিক্যাল স্পেশালিষ্ট), মেজর আশরাফ (রেডিওলজিষ্ট), ক্যাপ্টেন বাশার (আর্মি সাপ্লাই কোর) ও ক্যাপ্টেন মোহসীন (এডজুট্যান্ট, ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট)।

 

তাদের মধ্যে একজন বলেন, আমরা তো মনে করেছিলাম ইবিআরসি’তে পশ্চিম পাকিস্তানীরা ফাঁকা আওয়াজ করেছে। জবাবে আমি বলি, “এক হাজারেরও অধিক লোককে তারা বেয়নেট বুলেট ও অন্যান্য মরণাস্ত্র দিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করেছে।“

 

এ কথা শোনা মাত্রই মেজর রেজাউল রহমান সকলকে তৎক্ষণাৎ আমার সাথে শহরের দিকে চলে যেতে বলেন। পরিবারের সকলকে নিয়ে আমরা যাযাবরের মতো শহরের দিকে রওয়ানা হই।

 

চট্রগ্রাম শহরে আসার পর দেখি শহরবাসীরা ছোট ছোট অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে মারমুখী হয়ে এদিক ওদিক ছোটাছোটি করছে। আমি আমার এক আত্মীয়ের বাড়িতে রাত দশটায় যাই এবং সেখানে রাতযাপন করি।

 

সকালে আওয়ামী লীগ অফিসে জনাব এম আর সিদ্দিকীর সাথে কথা হয়। তিনি আমাকে চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত ইপিআরের কমাণ্ড নিতে বলেন।

 

আমি কয়েকজন ছাত্রের সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে রওয়ানা হই এবং স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে (চট্রগ্রাম বেতার কেন্দ্র) যাই। সেখানে ক্যাপ্টেন সুবেদ আলী ভূঁইয়া ও লেফটেন্যান্ট শমসের মুবিনকে দেখতে পাই। সুবিদ আলী ভুঁইয়াকে দেখামাত্র বলি, “কেন বিনা যুদ্ধে ই-বি-আর-সি ছেড়ে চলে আসলে?”

 

সে জবাবে বলে, কোনো উপায় না দেখে আত্মগোপন করছি। বেশী কিছু না বলে তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবার কথা বললাম। সে আমাকে যাওয়ার জন্য বললো। আমি বললাম, “আমি কোরবানীর বকরা, তাই যাচ্ছি।“ তারপর ছাত্রদের সাথে গাড়িতে করে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাই। সেখানে ইপিআর’দের সংগঠিত করি।

 

আমি ইপিআর’এর লোকদেরকে যুদ্ধ করার জন্য এক জ্বালাময়ী বক্তৃতায় ইবিআরসি’র ঘটনাবলীর কথা বলাতে তারা একযোগে পশ্চিম পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে তাদের দৃঢ় শপথ ঘোষণা করলো।

 

ই-পি-আর’দের নিয়ে কোথায় কি করতে হবে তার পরিকল্পনা করার পর আমি পুনরায় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে মেজর জিয়াউর রহমানের সাথে যোগাযোগ করতে চেষ্টা করি। দেখা না পেয়ে বেতার কেন্দ্রে একদিনের মতো কাজ করি। বাইরে যাবার পর দেখি চারিদিকে লুটপাট, মারামারি চলছে। একজন ছদ্মবেশী ক্যাপ্টেন, নাম নাসির। তার সাথে কতোয়ালী থানা থেকে অস্ত্রশস্ত্র বাহির করতে যাই। সেখানে প্রহরারত প্রহরীদের দেখি। নাসিরের হাবভাবে মনে হলো যে, সে সেনাবাহিনীর লোক নয়। তদুপরি থানা থেকে ১০/১৫ হাজার টাকা চাওয়াতে মনে আরো সন্দেহ হয়। চট্রগ্রামে আরো দুদিন ছোটখাটো অপারেশন করার পর আমি ফেনীর পথে রওয়ানা হই এবং ফেনী, নোয়াখালী, মাইজদী, লাকসাম, কুমিল্লার মিয়ার বাজার, চৌদ্দগ্রাম এলাকার সেক্টর কমান্ডারের দায়িত্ব নেই। ফেনীতে হেডকোয়ার্টার ছিলো। পুলিশ, ইপিআর, আর্মি, মুজাহিদ, ইউওটিসি ও ছাত্রদের নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী মুক্তিবাহিনী গঠন করতে সক্ষম হই। সেখানে জনাব খাজা আহমেদ, জনাব জহরুল কাইয়ূম- এম-সি-এ’কে ভারত থেকে আমাদের জন্য অস্ত্রশস্ত্র সংগ্রহ করতে অনুরোধ করি। তারা তাদের চেষ্টা চালান। দুদিন পর বেলুনিয়ার এসডিও ও বিএসএফ কমান্ডারের সাথে আমাদের এক উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক হয়। সেখানে জনাব খাজা আহমদ, জনাব জহুরুল কাইয়ূম, জনাব আবদুর রশিদ এমসিএ উপস্থিত ছিলেন। আমাদের অস্ত্রশস্ত্রের প্রয়োজন তাদেরকে জানাই। বিএসএফ কমান্ডার সবকিছু দিতে স্বীকার করেন।

 

আমরা বাংলাদেশ থেকে ভারত সীমান্তে রসদপত্র রাখার ব্যবস্থা করাই। সেদিনই সব ব্যবস্থা করা হয়। তার সাথে সাথে বার্টার সিস্টেম আমাদের প্রয়োজনীয় জিনিস তারা দিবেন বলেও স্বীকার করেন।

 

আমরা আমাদের এলাকাটাকে পশ্চিম পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী থেকে মুক্ত রাখার জন্য চতুর্দিকে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ঘাঁটি তৈরী করি। যে সব রাস্তা দিয়ে হানাদার বাহিনী চলাচল করার সম্ভবনা ছিলো সেসব রাস্তার গুরুত্বপূর্ণ সেতুগুলো ডিনামাইট দিয়ে উড়িয়ে দেওয়া হয়। যেমনঃ চৌদ্দগ্রাম-লাকসাম রাস্তার ডাকাতিয়া নদীর উপর বড় সেতু হরিকোট পুল, ফেনী-লাকসাম রেলওয়ে রাস্তার বড় সেতু পরিকোট ব্রীজ। এছাড়া নোয়াখালীর অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্রীজও উড়িয়ে দেওয়া হয়েছিলো। পরিকোট ব্রীজের সত্বর মেরামতের কাজ পরিদর্শনের জন্য কুখ্যাত টিক্কা খান এসেছিলো এখানে।

 

লাকসামে আমাদের অবরোধ প্রতিহত করতে পশ্চিম পাকিস্তানীরা মারমুখী হয়ে পড়ে। বিভিন্ন জায়গায় চারদিন অনবরত যুদ্ধের পর আমাদেরকে লাকসাম ছাড়তে হয়।

 

লাকসাম-নোয়াখালী প্রবেশপথে খণ্ড খণ্ড বহু যুদ্ধ হয়। যার নেতৃত্বের ভার সুবেদার লুৎফরকে দেয়া হয়েছিলো। বহুদিন খণ্ডযুদ্ধ চলার পর ভারী আধুনিক অস্ত্রের অভাবে পিছু হটতে বাধ্য হই।

 

সামান্য কিছু অস্ত্র নিয়ে ভারত থেকে মাঝে মাঝে এমসিএ নুরুল হক যুদ্ধক্ষেত্রে আসতেন। তাকে দেখে আমাদের লোকজন দ্বিগুন উৎসাহ উদ্দীপনা নিয়ে যুদ্ধ করার মনোবল পেত।

 

সমুদ্রপথে পশ্চিম পাকিস্তানীদের আক্রমণ প্রতিহত করতে চারদিক দিয়ে বহু বাঙ্কার তৈরী করা হয়। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানীরা আমাদের শক্তিশালী অবরোধ দেখে নোয়াখালী থেকে ফেনী না এসে লাকসাম থেকে ফেনীর দিয়ে রেলপথে ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে অগ্রসর হয়। পরিকোট পুলের নিকটে প্রায় একদিন যুদ্ধ চলে। তাদের ত্রিমুখী আক্রমণের মুখে টিকতে না পেরে আমাদের লোকজন পিছু হটে আসে। আমাদের অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিলো। ঐ দিনই পাকিস্তানী সেনাদেরকে তিনদিকে আটক করে রাখি। নোয়াখালীর পশ্চিম দিকে, ফেনীর উত্তর দিকে ও বুরবুরিয়া ঘাট এলাকায়।

 

পশ্চিম পাকিস্তানীরা একদিন গুণবতীতে অপেক্ষা করার পর অতর্কিতে ফেনীর তিন দিক ঘিরে ফেলে। আমাদের লোক মারমুখী হয়ে বারো ঘন্টার মতো তাদেরকে বহু কষ্টে ঠেকিয়ে রাখে। কিন্তু তাদের ভারী আধুনিক অস্ত্রের মুখে টিকতে না পেরে ফেনী ছাড়তে বাধ্য হয় এবং ভারতের সীমান্তে গিয়ে একত্রিত হয়। তখন ছিলো মে মাস।

 

একিনপুরে আমরা সবাই একত্রিত হই। একিনপুর থেকে চার কোম্পানী সৈন্য নিয়ে শুভপুর বুরবুরিয়া ঘাট, মুহুরী নদী ও ছাগলনাইয়া ফ্রন্টে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে যাই। ছাগলনাইয়ায় বাঙ্কার তৈরী করে অপেক্ষা করছিলাম। পাক সেনাবাহিনী একদিন অতর্কিতে হামলা করে। তাদের কিছু সংখ্যক মুহুরী নদী পাড় হতে দেই এবং এবং তাদের উপর অতর্কিতে হামলা চালানো হয়। অনেক পাক সৈন্য নিহত হয়। এমনকি তাদের লাশ নিতেও দেড় দিন পর্যন্ত কোনো আসে নাই। বাধ্য হয়ে সকল সৈন্য সামন্ত নিয়ে ভারতে আসতে হয়। আমরা ১নং সেক্টরে প্রথম পর্যায়ে মেজর জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে সংগঠিত হই। আমার কিছুসংখ্যক লোক খালেদ মোশারফের নেতৃত্বে ২নং সেক্টরে যুদ্ধ করে।

 

স্বাক্ষরঃ এনামুল হক চৌধুরী

০৭-১১-১৯৭৩
———————————————–

 

<৯, ২.৩, ৪১-৪৪>

ক্যাপ্টেন শমসের মুবিনের

দৃষ্টিতে চট্টগ্রামের প্রতিরোধ

সাক্ষাৎকারঃ ক্যাপ্টেন শমসের মুবিন চৌধুরী

২০-১০-১৯৭৩

(বাংলা একাডেমির দলিলপত্র থেকে সংকলিত)

মার্চের ২২ তারিখে ক্যাপ্টেন হারুন (এসিস্ট্যান্ট উইং কমান্ডার, ইপিআর) কাপ্তাই এসে আমাকে বললো যে আমাকে মেজর রফিকের (এডজুট্যান্ট, ইপিআর) বাসায় যেতে হবে। ২২শে মার্চ রাতে আমি, ক্যাপ্টেন হারুন, মেজর খালেকুজ্জামান, ক্যাপ্টেন অলি মিলে মেজর রফিকের বাসায় গেলাম।

জনাব কায়সার এমপিএ এবং ডাক্তার মান্নান, এই দুজন আওয়ামী লীগ কর্মীও সেখানে ছিলেন। আমরা স্থির করলাম যে, এখানে আলাপ-আলোচনা করা নিরাপদ নয়, তাই আমরা চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে গেলাম। যাবার সময় আমরা খুব সতর্ক ছিলাম যে, কেউ আমাদের অনুসরণ করছে কিনা।

আমরা আওয়ামী লীগ কর্মীদের তাদের পরিকল্পনা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তারা বললেন যে, শেখ সাহেব রাজনৈতিক সমাধানের আশা করছেন। আমরা বললাম যে, আমরা আপনাদের সাথে আছি। আপনাদের পক্ষ থেকে যদি ঠিক সময়ে কোনো সাড়া বা আভাস পাই তাহলে আমরা কিছু একটা করতে পারি।

আমরা বুঝতে পারলাম যে তাদের কোনো প্রস্তুতি নেই। আমরা বললাম যে আমরা মানসিক দিক থেকে প্রস্তুত আছি। আপনারা ঢাকা থেকে খবরাখবর নিয়ে অমাদের জানাবেন।

২৩শে মার্চ মেজর রফিক আমাদের প্রস্তুত থাকতে বললেন। কিন্তু কিছু একটা হবে কিনা তিনি তখনো জানেন না। আমাদের আলাপ-আলোচনার কথা মেজর জিয়াউর রহমানকে জানালাম। তাকে আমরা আবার আশ্বাস দিলাম যে আমরা সবসময় তার সাথে থাকবো। এর আগে লেঃ মাহফুজকে পরিস্থিতি অবগত করানোর জন্য মেজর জিয়াউর রহমান আমাকে বলেছিলেন। আমি তাকে পরিস্থিতি বুঝিয়ে বললাম যে আমাদেরকে পাকিস্তানীরা সন্দেহ ও অবিশ্বাসের চোখে দেখছে। আমরাও তাদেরকে বিশ্বাস করতে পারছি না। মেজর জিয়াউর রহমান বলেছেন যে ‘সিটিং ডাক’-এর মতো না থেকে নিরস্ত্র করতে আসলে তা প্রতিহত করবেন। মাহফুজ বললো যে পরিস্থিতি এতো মারাত্মক আকার ধারণ করেছে কিনা? তারপর সে বললো যে আচ্ছা ঠিক আছে।

২৪শে মার্চ মেজর রফিক আমাকে বললো যে আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ তাদের কোনো সিদ্ধান্ত এখনো আমাদেরকে জানান নি। ২৪শে রাতে খবর পেলাম যে জনগণ রাস্তায় রাস্তায় ব্যারিকেড তৈরী করছে। ‘এমভি সোয়াত’ থেকে অস্ত্রশস্ত্র খালাস করতে জনগণ বাধা দিচ্ছে। জেটি থেকে সেনানিবাস পর্যন্ত রাস্তায় ব্যারিকেড সৃষ্টি করা হয়েছ যাতে সেনাবাহিনীর লোকজন চলাফেরা করতে না পারে। এ খবরটা আমি জিয়াউর রহমান সাহেবকে পাঠালাম।

আমাদের সৈনিকদের মাঝে একটা আতংক দেখতে পেলাম। কি হবে? কি করতে হবে না হবে? বাইরের ঘটনাবলীতে সৈনিকরাও যথেষ্ট উদ্বগ্ন ছিলো। আমি সারারাত সজাগ ছিলাম। ২৪শে মার্চ পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর দুইজন মেজর জেনারেল চট্রগ্রামে ইবিআরসি-তে এসেছিলেন। ঐদিন জানতে পারলাম দু’জনের সাথে করে ব্রিগেডিয়ার মজুমদারকে (ইবিআরসি-কমান্ডার মার্শাল ল এডমিনিসট্রেটর) ঢাকা নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এ খবরটা জিয়াউর রহমানকে জানাই। আমাদের সি,ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল জানজুয়া বললেন যে ব্রিগেডিয়ার মজুমদারকে ঢাকা নিয়ে যাওয়া হয় নি। তিনি বার বার বলেছিলেন যে ব্রিগেডিয়ার মজুমদারকে ঢাকা নিয়ে যাওয়া হয় নি। ব্রিগেডিয়ার মজুমদারের জায়গায় ব্রিগেডিয়ার আনসারীকে সামরিক প্রশাসক নিযুক্ত করা হয়।

২৫শে মার্চ ব্রিগেডিয়ার আনসারী আমাদের সিও’কে নির্দেশ দিলেন যে আমরা যেনো ব্যারিকেড পরিস্কার করি। “অল ব্যারিকেড মাস্ট বি ক্লিয়ার এ্যাট এনি কস্ট”-এটা ব্রিগেডিয়ার আনসারীর মেসেজ ছিলো। ‘এ্যাট এনি কস্ট’ শব্দটার উপর আমাদের সিও খুব এ্যামফ্যাসিস করছিলেন। ষোলশহর রেলক্রসিং এর উপর ওয়াগন দিয়ে ব্যারিকেড সৃষ্টি করা হয়েছিলো। ঐ ব্যারিকেড সরাতে পুরো একটা কোম্পানী ডিটেইল করা হলো। সুবেদার খালেককে বললাম যে, এই ট্রেনের ওয়াগন যেনো বিকেল চারটার আগে সরানো না হয়। কমান্ডিং অফিসার আমাদের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারদেরকে ডেকে ঐ ওয়াগনগুলোর চাকা ব্রেক করতে শুরু করলেন। জনসাধারণ খুব হৈ হুল্লোড় করছিলো। বিকেল পর্যন্ত ঐ ব্যারিকেড সরানো হলো। বায়েজীদ বোস্তামি পর্যন্ত সমস্ত ব্যারিকেড পরিস্কার করতে নির্দেশ দেয়া হলো। আমরা আশা করেছিলাম যে আওয়ামী লীগ হাই কমাণ্ড থেকে কোনো নির্দেশ পাবো। আমি মেজর রফিকের সাথে টেলিফোনে যোগাযোগ করি। তিনিও বললেন যে কোনোনির্দেশ তিনিও পাননি। তিনিও প্রস্তুত আছেন।

আমরা ব্যারিকেড পরিস্কার করতে গেলাম। ২৫শে মার্চ রাত ৯টা নাগাদ সমস্ত ব্যারিকেড পরিস্কার করা হলো। জনসাধারণ আমাদেরকে খুব বাধা দিচ্ছিল। ” আপনারা এসব করবেন না। আপনাদেরই ক্ষতি হবে।” জনসাধারণ এসব বলছিলো। আমরা বললাম যে আমাদের নিজেদের ইচ্ছায় কিছু করছি না। আমরা শুধু নির্দেশ পালন করছি। তদুপরি আমরা অন্য কোনো নির্দেশও পাচ্ছি না। কমান্ডিং যে কোনো উপায়ে হোক ব্যারিকেড ক্লিয়ার করার নির্দেশ দিচ্ছিলেন।

ষোলশহর থেকে বায়েজীদ বোস্তামী পর্যন্ত ডিউটি দেবার জন্য আমাদের উপর নির্দেশ দেয়া হলো। আমরা যখন ডিউটি করছিলাম তখন বেলুচ রেজিমেন্টের ৫টা গাড়ি আমাদের সামনে দিয়ে ক্যান্টনমেন্টের দিকে চলে গেলো। ঐসব গাড়িতে গোলাবারুদ ও এমুনিশেনও ছিলো।

রাত সাড়ে এগারোটায় লেফটেন্যান্ট কর্নেল জানজুয়ার সাথে দেখা হয়। তিনি আমাকে মেজর জিয়াউর রহমানকে চট্টগ্রাম পোর্টে ডিউটি করার জন্য খবর দিতে বললেন। তিনি জিয়াউর রহমানের স্ত্রীকে বলতে বললেন যে ভয়ের কোনো কারণ নেই। জিয়াউর রহমান ২৬শে মার্চ সকালে চলে আসবে।

রাস্তায় ছেলেরা একটা গর্ত করেছিলো। আমাকে সেই গর্তটা ভরাট করতে বলা হলো। আমি জিয়াউর রহমানের স্ত্রীকে এ খবর দিলাম। জিয়াউর রহমানকেও এ খবর জানালাম।

রাত বারোটায় আমি ষোলশহর ক্যান্টনমেন্টের গেটে গেলাম। সেখানে গিয়ে গুলির আওয়াজ শুনতে পেলাম। বৃষ্টির মতো গুলি হচ্ছিলো। ক্যাপ্টেন অলিকে টেলিফোনে জানালাম যে ক্যান্টনমেন্টের ভিতরে ভীষণ গোলাগুলি হচ্ছে। আমি বুঝতে পারছি না সেখানে ঠিক কি হচ্ছে। ক্যাপ্টেন অলি আমাকে সঠিক খবর নেবার চেষ্টা করতে বললেন এবং তাকে জানাতে বললেন। এমন সময় কিছু বাঙালি সৈন্যকে গেটের দিকে আসতে দেখলাম। তারা আমাকে বললেন যে, স্যার বেলুচ রেজিমেন্ট আমাদের উপর হামলা চালিয়েছে এবং আমাদের অনেককে মেরে ফেলেছে। কর্নেল এমআর চৌধুরীকেও (ইবিআরসি চীফ ইন্সট্রাক্টর) মেরে ফেলেছে। আমি সঙ্গে সঙ্গে তাদেরকে গাড়িতে উঠালাম এবং আমার সাথে ষোলশহরে এইটথ বেঙ্গলে নিয়ে আসলাম।

এইটথ বেঙ্গলে এসে শুনলাম যে, সমস্ত পশ্চিম পাকিস্তানী অফিসারদেরকে গ্রেফতার করা হয়েছে। মেজর জিয়াউর রহমানের নির্দেশে এটা করা হয়েছে। মেজর জিয়াউর রহমানের সাথে আমার দেখা হয়। তিনি বললেন যে, এখন থেকে তিনিই হচ্ছেন ব্যাটালিয়নের কমান্ডিং অফিসার। তিনি আরো বললেন যে, গোলাগুলির খবর তিনি শুনেছেন। এখবর শোনার পর তিনি ব্যাটালিয়নের কমান্ডিং অফিসার লেঃ কর্নেল জানজুয়াসহ অন্যান্য পশ্চিম পাকিস্তানী অফিসারদের গ্রেফতার করেছেন। পরে ওদের সবাইকে মেরে ফেলা হয়েছিলো। তারপর মেজর জিয়াউর রহমান আমাকে ব্যাটালিয়নের সবাইকে এক জায়গায় একত্রিত করতে বললেন। সবাইকে এক জায়গায় একত্রিত করা হলো। তারপর মেজর জিয়াউর রহমান টেবিলের উপরে উঠে বক্তৃতা দিলেন। তিনি বললেন, “আজ থেকে আমি অষ্টম বেঙ্গল রেজিমেন্টের অফিসার হিসেবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার সংকল্প ঘোষণা করলাম। এবং আমার নির্দেশেই সবকিছু চলবে। আপনারা সবাই আমার সাথে থাকবেন। এখন এখানে থাকা আমাদের জন্য নিরাপদ নয়। আমরা সবাই কালুরঘাটের দিকে যাবো, সেখানে গিয়ে আমরা সবকিছু রিঅর্গানাইজ করবো এবং আমাদের পরবর্তী কর্মস্থল নির্ধারণ করবো।”

২৬শে মার্চ ভোরে আমরা কালুরঘাটের আরেকটু দুরে গিয়ে পৌঁছালাম। সেখানে আমরা বিশ্রাম নিলাম এবং রিঅর্গানাইজেশন করলাম। ২৬শে মার্চ এভাবে কেটে গেলো।

২৭শে মার্চ সন্ধ্যার সময় মেজর জিয়াউর রহমান চট্রগ্রাম বেতার কেন্দ্রে গেলেন এবং ভাষণ দিলেন। ভাষণে তিনি বললেন যে, আমরা স্বাধীনতা যুদ্ধে লিপ্ত আছি। আপনারা যে যেখানে আছেন, সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেন। তিনি বিশ্বের শান্তিকামী দেশগুলোর সাহায্য এবং সহযোগীতা কামনা করলেন। দেশবাসীকে যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে বললেন।

২৮শে মার্চ সারাদিন আমি ঐ ভাষণ বেতার কেন্দ্র থেকে পড়ি।

 

চট্টেশ্বরী রোডে অপারেশনঃ

পাকিস্তানী সেনাবাহিনী আমাদের এ্যামবুশ করেছিলো। আমরা দশ জন ছিলাম। আমরা ওদের কাউন্টার এ্যামবুশ করেছিলাম।

 

২৯শে মার্চ আসকের দীঘি অপারেশনঃ

 

প্রায় ১২ ঘন্টা এখানে পাকিস্তানী বাহিনীর সাথে আমাদের গোলাগুলি বিনিময় হয়।

৩০শে মার্চ বাকুলিয়া গ্রাম অপারেশনঃ

 

এখানে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর দুটো গেরিলা কমান্ডোকে হত্যা করা হয়।

এপ্রিল মাসের এগারো তারিখে কালুরঘাট ব্রীজে অপারেশন চালানো হয়। এখানে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী আমাদের আক্রমণ করে। এই যুদ্ধে আমি গুরতররুপে আহত হই। আমি পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর হাতে ধরা পড়ি। তারপর আমাকে ঢাকা নিয়ে আসা হয়। বন্দী শিবিরে রাখা হয়এবং অশেষ নির্যাতন করা হয়। প্রত্যহ আমাকে মারধোর করা হতো। ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে আমাকে রাখা হয়।আমার সাথে আরো অনেক বন্দী ছিলো। এদের বাসা থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। জুন মাস পর্যন্ত আমার উপর অত্যাচার চলে। নভেম্বর মাসে আমার বিরুদ্ধে চার্জশীট আনা হয়। বলা হয়েছিলো আমাকে কোর্ট মার্শাল করা হবে। কিন্তু ডিসেম্বরের ১৬ তারিখে পাক বাহিনী আত্মসমর্পন করে। আমি মুক্ত হয়ে যাই।

এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, কালুরঘাটে এসে গ্রামে আমরা শপথগ্রহণ করলাম। শপথবাক্য পাঠ করেছিলেন মেজর জিয়াউর রহমান- বাংলাদেশ স্বাধীন না হওয়া পর্যন্ত আমরা লড়াই চালিয়ে যাবো। এমনকি যদি প্রয়োজন হয় দেশের জন্য আমরা প্রাণ দেবো।

আমাদের ব্যাটালিয়নের হেডকোয়ার্টার ছিলো গ্রামে। ৩০শে মার্চ বাকুলিয়া গ্রামে অপারেশন চালিয়ে আমরা দুজন কমান্ডোকে হত্যা করি।

চকবাজারে আমরা প্রতিরক্ষা ব্যুহ তৈরী করি। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ট্যাংক আক্রমণের মুখে টিকতে না পেরে আমরা পিছু হটে যাই।

চট্রগ্রাম কালুরঘাটের যুদ্ধঃ

 

১১ই এপ্রিল সকাল আটটার সময় পাকিস্তান সেনাবাহিনী ভীষণ আর্টিলারি ফায়ার শুরু করে। আমি এবং মেজর হারুন আমাদের অবস্থান পর্যবেক্ষণ করছিলাম। আমাদের সৈন্য সংখ্যা ছিলো প্রায় ৩৫ জন। ওদের সংখ্যা ছিলো ১০০-এর উপরে। আমাদের একজন সিপাহী এই যুদ্ধে মারা যায়। মেজর হারুন ব্রীজের উপর আহত হন। আহত হবার পর অতিকষ্টে তাকে পুলের অপর দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। পাকিস্তান বাহিনীর তীব্র আক্রমণের মুখে টিকতে না পেরে পিছু হটতে নির্দেশ দিলাম। আমাকে একজন সৈন্য বললো চলে যেতে। আমি বললাম যে, আমি আসছি। আমি রয়ে গেলাম। হঠাৎ আমি নিজেকে পাকিস্তান বাহিনী কর্তৃক ঘেরাও অবস্থায় দেখলাম। অন্য সবাই পুলের অপর পারে চলে যেতে সক্ষম হয়। আমি ট্রেঞ্চ থেকে বের হয়ে চারিদিকে চাইনিজ স্টেনগান দিয়ে গুলি ছুড়তে থাকলাম। তারপর একটা গুলি এসে আমার কোমরে লাগে এবং আমি গুরুতর আহত হয়ে পুলের উপর পড়ে গেলাম। আমি ভাবতে লাগলাম যে, শত্রুরা আমাকে ধরে ফেলবে। আমি ওদের হাতে ধরা পড়ার চেয়ে আত্মহত্যা করে মৃত্যুবরণ করাকে শ্রেয় বলে স্থির করলাম। কিন্তু স্টেনগানটা দুরে ছিলো। তাই এটা সম্ভব হলো না। আমি ভাবছিলাম ওরা আমাকে ধরে মেরে ফেলবে কিন্তু শত্রুরা আমাকে ধরে নিয়ে যায় এবং বন্দী করে রাখে। তারপর আমাকে ঢাকা পাঠিয়ে দেয়।

স্বাক্ষরঃ

শমসের

বাংলাদেশ আর্মি

——————————————————–

 

<৯, ২.৪, ৪৪-৪৬>

চট্টগ্রামে সশস্ত্র প্রতিরোধ

সাক্ষাৎকারঃ বিগ্রেডিয়ার হারুন আহমেদ চৌধুরী

(১৯৭১ সালে ক্যাপ্টেন পদে কর্মরত ছিলেন)

১৭১৯৭৫

 

২২শে মার্চ আমি চট্টগ্রামে আসলে ক্যাপ্টেন রফিক আমাকে বললেন,৮ম ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট অনেক বাঙালী অফিসার আছেন,তাদের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে দেশের অবস্থা সম্পর্কে আলোচনা কর এবং বিদ্রোহ সম্পর্কে কথাবার্তা চালাও।আমি ক্যাপ্টেন রফিকের কথামত ২৩শে মার্চ ৮ম ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের মেসে যাই এবং আমার কোর্স মেট ক্যাপ্টেন খালেকুজ্জামান চৌধুরী(বর্তমানে লেঃকঃ) ক্যাপ্টেন অলি আহমেদ(বর্তমানে মেজর) লেঃমাহফুজুর রহমান(বর্তমানে মেজর),লেঃশমসের মুবিন চৌধুরী (বর্তমানে মেজর) এর সঙ্গে দেখা করে কথাবার্তা বলি।মেজর শওকত তখন মেসে ছিলেন।কিন্তু যেহেতু তিনি সিনিয়র,সেহেতু তার সঙ্গে কথা বলতে সাহস পাই নি।

 

উপরের বর্নিত অফিসার বৃন্দকে নিয়ে আমি ক্যাপ্টেন রফিকের বাসায় সন্ধ্যায় আসি,এবং সেখানে থেকে ক্যাপ্টেন রফিক সহ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এর অধ্যাপকের বাসায় পৌছাই-তখন রাত আনুমানিক সাড়ে ৯’টা।আমার নিজের একটি ভক্সওয়াগন গাড়ি ছিল।ঐ গাড়িতে করে আমরা গিয়েছিলাম।ঐ সভাতে এমপিএ আতাউর রহমান কায়সার ছিলেন,ডঃ মান্নান সহ আরও কয়েকজন উপস্থিত ছিলেন।সভায় দেশের সর্বশেষ অবস্থা,আমাদের ক্ষমতা,পাকিস্তান থেকে সৈন্য নিয়ে আসা ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা হয়।সামরিক বাহিনী গতিবিধি দেখে আমরা নিশ্চিত হলাম যে,পাকিস্তানি সেনারা সত্বর বাঙালীদের বিরুদ্ধে একটা কিছু করতে যাচ্ছে।সভায় ৮ম ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের তরুন অফিসার বৃন্দের(২ জন) মাঝে সমঝোতা হয় এবং সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে,যদি পাক বাহিনী আক্রমন করে আমরা বাঙালীরা একসঙ্গে প্রতিরোধ গড়বো এবং সমুচিত জবাব দেব।

 

২৪শে মার্চ সকালে আমি কাপ্তাই চলে যাই।কথা হয় যে,পাকিস্তানীরা যদি আক্রমন করে অথবা ইঙ্গিত দেয় তাহলে আমরা বিদ্রোহ করবো এবং ক্যাপ্টেন রফিক আগে বিদ্রোহ করলে সে আমাকে খবর দেবে।রফিক আরোও বললো যে,ইন্সপেকশনের নামে পান্জাবীদের অস্ত্রের ফায়ারিং পিন অকেজো করে দিয়েছে এবং তুমিও তোমার উইং-এ তাই করো।আমি রাজী হলাম।আমাকে কোর্ড ওয়ার্ড দিলেন,”ব্রিং সাম উড ফর মি”-অর্থ হলো চট্টগ্রামে যুদ্ধ শুরু হয়েছে।আমাকেও বিদ্রোহ শুরু করতে হবে।এবং সমস্ত অবাঙালীদের বন্দী করে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ক্যাপ্টেন রফিকের সঙ্গে মিলতে হবে।

২৪শে মার্চ খুব ভোরে আমি কাপ্তাই চলে গেলাম।আমার উইং-এ সুবেদার মেজর ছিল (বাঙালী) নাজমুল হক।সুবেদার মেজর আমাকে সব খবরাখবর এনে দিত।অসহযোগ আন্দোলন চলাকালে অবাঙালী এন-সিও এবং জে-সি ওরা রাতে গোপনে মেজর পীর মোহাম্মদের(উইং কমান্ডার) বাসাতে সলাপরামর্শ করতো।আমি সবসময় সতর্ক থাকতাম এবং বুঝতে পারতাম উইং কমান্ডার এবং অবাঙালীদের মনে আক্রমনাত্বক প্রস্তুতি চলছে।আমি ভিআইপি রেস্ট হাউসে থাকতাম।

 

২৪শে মার্চ সন্ধ্যায় ক্যাপ্টেন ফারুক বান্দরবন থেকে উইং হেড কোয়াটারে আসে।ক্যাপ্টেন জায়দী আমার অনুমতি নিয়ে ২৫শে মার্চ সন্ধ্যায় কাপ্তাইতে আসেন।ক্যাপ্টেন ফারুক এবং ক্যাপ্টেন জায়দী আমার রুমে জায়গা নিলেন।আমরা তিনজন কথাবর্তা বলে রাত ৯-৩০ থেকে ১০ টার দিকে ঘুমাতে যাই।এমন সময় আমার ওডার্রলি দরজা ধাক্কা দেয় এবং আমার টেলিফোনের কথা বলে।আমি টেলিফোন যেয়ে শুনলাম লাইন কেটে গেছে।তবে অপারেটর বলল,ক্যাপ্টেন রফিক কথা বলতে চেয়েছিলেন।আমি রুমে ফিরে যাই।এবং মিনিট দশেক পর আবার টেলিফোন আসে।টেলিফোন ধরে জানলাম এস,আর, সিদ্দিকী।জনাব সিদ্দিকী বলেন,২০-বালুচ বেঙ্গল রেজিমেন্ট আক্রমন করেছে।শহরে খুব গোলমাল,আপনি বিদ্রোহ করেন এবং চট্টগ্রাম শহরে চলে আসেন।আমি রফিকের সাথে কথা বলতে চাইছিলাম।তিনি বললেন,”রফিক যুদ্ধ করছে,সে এখানে নাই।এরপর আবার টেলিফোন পেলাম,করেছেন জনাব এম, আর, সিদ্দিকী।জনাব সিদ্দিকী বললেন বলেন,”রফিক যুদ্ধ ময়দানে তবে একটি কোর্ড ওয়ার্ড পাঠাতে বলেছেন,সেটি হলো, “ব্রিং সাম উড ফর মি।” তখন আমি অবস্থাটা বুঝলাম।তখনই আমার রুমে এসে পোশাক পরি এবং সিদ্ধান্ত নিই অবাঙালীদের নিরস্ত্র করবো এবং চট্টগ্রামে রওনা হব।পোষাক পড়ার সময় অবাঙালী অফিসার জেগে যায় এবং তিনি জিজ্ঞাসা করেন যে আমি পোশাক ক্যান পরছি।”লাইনে কিছু গোলমাল,এখনই ফিরে আসবো,তোমরা ঘুমাও”।এই কথা বলেই আমি চলে যাই।গাড়িতে উঠতে যাচ্ছি এমন সময় এক অবাঙালী এনসিও আমার দিকে আসে,এবং বলে স্যার,লাইনে গোলমাল।তখন এনসিওকে তুলে নিয়ে আমি লাইনে যাই।লাইনে পৌঁছে আমি সুবেদার মেজরকে ডাকি এবং সমস্ত কথা বলি।তাকে বলি,”কোতে চাবি নিয়ে প্রস্তুত থাকুন।বাঁশী বাজালে কোত খুলে দেবেন।”ঐ রাতে গার্ড কমান্ডার ছিল একজন পান্জাবী।তাকে ডেকে আমাদের দোতলায় সমস্ত এনসিওকে ডাকতে বললাম।আমার সাথের এনসিওকে তার আগেই উপরে পাঠিয়েছিলাম।গার্ড কমান্ডার উপর তলা থেকে নিচের তলায় নামার সঙ্গে সঙ্গে তাকে বন্দী করি।এবং অস্ত্র কেড়ে নেই।আমার কথামত কোয়ার্টার গার্ডের বাঙালী সৈনিকরা সঙ্গে সঙ্গে দোতলার সিঁড়ির মুখে পজিশন নিতে থাকে।হুইসেল দেই,সমস্ত বাঙালী সৈনিকদের উপর হতে নিচে নেমে আসতে বলি এবং অবাঙালীদের উপরে থাকতে বলি।কোন অবাঙালী নামার চেষ্টা করলে গুলি করার হুকুম দেই।বাঙালীরা প্রস্তুত ছিল,তাই হুইসেলের সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত বাঙালীরা নিচে নেমে আসে।কোত খুলে দেওয়া হয় এবং সকলের হাতে অস্ত্র-গোলাবারুদ তুলে দেওয়া হয়।আমি তখন উইং কমান্ডার মেজর পীর মহাম্মদকে নিরস্ত্র করতে গেলাম।কাপ্তাইতে তখন কতগুলো পয়েন্ট ছিল সে পয়েন্টে গার্ড ছিল অবাঙালী।আমি তখন পয়েন্টের গার্ডটিকে নিরস্ত্র করি এবং তারপর মেজর পীর মহাম্মদের বাসাই যাই।মেজর পীর মহাম্মদ তখন ঘুমাচ্ছিলেন।ডাকাডাকিতে উঠলেন এবং তিনি আমাকে পোষাক পড়া দেখে ঘাবড়ে গেলেন।তিনি আসলে বললাম,”আপনি বন্দী।বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে,আমি উইং এর দায়িত্ব নিয়েছি।”মেজর পীর মহাম্মদ অস্ত্র ধরার চেষ্টা করলেন।আমি হুশিয়ার করে দেই,”অগ্রসর হলে মৃত্যু।””ঘরে থাকেন,কোন অসুবিধা হবে না আপনার।”এই বলে বাইরে গার্ড রেখে আবার রুমের দিকে যাই।রুমে পৌঁছে দেখলাম ক্যাপ্টেনদ্বয় উঠে বসেছে। তাদেরকে বললাম, ‘”তোমরা বন্দী এদেশ স্বাধীন।”পান্জাবী ক্যাপ্টেন জায়দী উঠবার চেষ্টা করে,তার আগেই তাকে বন্দী করে ফেলি।ক্যাপ্টেন ফারুক পাঠান ছিল।সে খুশী হয়ে বললো।”আমি ভালোই হলো আমি তোমার অনুগত হয়ে বাংলাদেশের সেবা করবো।”রাত তখন সাড়ে এগারোটা হবে।হাজার হাজার জনতা পথে নেমেছে।আমি ই-পি আর কোম্পানীর ৪/৫ জনকে উইং হেডকোয়ার্টারে রেখে বাকী সবাইকে নিয়ে রাত সাড়ে তিনটার দিকে চট্টগ্রামের পথে রওনা হই।যাবার পূর্বে অয়ারলেস মারফত আমার অবশিষ্ট কোম্পানী গুলোতে মেসেজ পাঠাই যে,সমস্ত অবাঙালীদের বন্দী করে কাপ্তাইতে একত্রিত হয়ে চট্টগ্রামের দিকে রওনা হও।“

২৬শে মার্চ আমি যখন চট্টগ্রাম শহর থেকে ৭/৮ মাইল দূরে ছিলাম দেখলাম বেঙ্গল রেজিমেন্টের কয়েকজন সৈন্য পটিয়ার দিকে দৌড়াচ্ছে।তাদের জিজ্ঞাসা করে জানলাম পাক বাহিনী আক্রমন করেছে।আমি অগ্রসর হলে মেজর জিয়ার সাক্ষাৎ পাই।তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে বললেন”ক্যাপ্টেন রফিক শহরে যুদ্ধ করছে আমরা ৮ম ইষ্ট বেঙ্গল পটিয়াতে একত্রিত হবো তারপর আবার শহরে এসে পাল্টা আক্রমন চালাবো।”আমাকে তার সঙ্গে থাকতে বললেন।আমি মেজর জিয়ার সঙ্গে থেকে গেলাম।এরপর মেজর জিয়ার কমান্ডে কাজ করতে থাকি।পটিয়াতে আমরা সবাই মেজর জিয়ার নেতৃত্বে শপথ নেই।কালুরঘাটে পাক-বাহিনী ব্যাপকভাবে চাপ দিয়ে যাচ্ছিল। ১১ই এপ্রিল পাকসেনারা চারদিক থেকে বৃষ্টির মতো গোলা ফেলতে থাকে।

ঐ তারিখে আমি এবং শমসের মুবিন চৌধুরী গুরুতর রুপে আহত হই।আমাকে পটিয়ায় নিয়ে যাওয়া হয়।ডঃ নূর হোসেন(অস্ত্র বিশেষজ্ঞ) পটিয়াতে আমার অস্ত্রপাচার করেন।তারপর আওয়ামিলীগের লোকজন গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে নিয়ে ফিরতে থাকে।ইতিমধ্যে কালুরঘাটের পতন ঘটে।মালুরঘাট নামক স্থানে খৃষ্টান মিশনারী হাসপাতালে পুনরায় আমার অস্ত্রপাচার করে সেখান থেকে কক্সবাজারের উখিয়া নামক স্থানে সমসের আলম চৌধুরীর বাড়িতে রাখেন।সমসের আলম চৌধুরী আমাকে ঔষধ পত্র দিয়ে এবং সেবা-যত্ম করে সুস্থ করে তোলেন। ফকরুদ্দিন (আমার ব্যাটসম্যান) সব সময় সঙ্গে ছিল।খামারবাড়ি নামক স্থানে থাকা অবস্থায় পান্জাবীরা আমাদের খোঁজে আসে।তখন আমাকে স্ট্রেচারে করে সবাই বার্মা চলে যায়।বার্মা রিফুইজি ক্যাম্পে সবাই আশ্রয় নিই।সেখানে চিকিৎসার পর আমি সুস্থ হয়ে উঠি।বার্মা থেকে পালিয়ে ডিসেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে টেকনাফে আসি।টেকনাফে এসে বেশ কিছু ই.পি.আর ছেলে পেলাম এবং তাদের সঙ্গে অন্যান্যরাও ছিল।আমি ওখানে থেকে যাই এবং আবার যুদ্ধে নেমে পড়ি।

১১/১২ই ডিসেম্বরে কক্সবাজারে ভারতীয় সেনাবাহিনী নামলে আমি তাদের সঙ্গে যোগ দিই এবং দেশ মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যাই।

স্বাক্ষরঃ

হারুন আহমেদ

১৭-১-৭৫

——————————————–

<৯, ২.৫, ৪৬-৫১>

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে ক্যাপ্টেন ভূইয়া
মেজর এম,এস,এ,ভূঁইয়া

(১৯৭১ সালে ক্যাপ্টেন পদে কর্মরত ছিলেন। বিবরণটি তাঁর রচিত ‘মুক্তিযুদ্ধে নয়মাস’ গ্রন্থ, ঢাকা, ১৯৭৪ থেকে সংকলিত)

২৬শে মার্চ দুপুরে ক্যাপ্টেন রফিকের সাথে আলাপের সময় আমি জানতে পারি যে, একটি বেতার কেন্দ্র আমাদের দখলে রয়েছে। ২৮শে মার্চের সন্ধ্যা থেকে ২৯শে মার্চের রাত পর্যন্ত আমি এই বিপ্লবী বেতার কেন্দ্রে ছিলাম। আমার সে সময়কার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার রূপায়নই এই আলেখ্য।

 

বলা বাহুল্য বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র এবং পরে মুজিবনগর থেকে প্রচারিত স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র নামে পরিচিত এই ঐতিহাসিক বেতার কেন্দ্র গোড়াতে খোলা হয়েছিল চট্টগ্রামে।

 

বেতার কেন্দ্রটি খোলা হয়েছিল চট্টগ্রামের কালুরঘাটে। ২৮শে মার্চ সকালে কালুরঘাটে মেজর জিয়ার সাথে সাক্ষাৎ করে চট্টগ্রাম শহরে ফেরার পথে আমি প্রথমবারের মতো বেতার কেন্দ্রটিতে প্রবেশ করি। কিছুক্ষনের মধ্যেই ঐ বেতার কেন্দ্রে কর্মরত স্টাফের সাথে আমার পরিচয় হয়। সেখানে ৮ম বেঙ্গল রেজিমেন্টের লেফটেন্যান্ট শমশের-এর সাথেও আমার দেখা হলো লেফটেন্যান্ট শমশের সে সময়ে মেজর জিয়াউর রহমানের লিখিত ভাষন বারবার প্রচার করছিলেন।

 

সেদিন পশ্চিম কমোডোর মমতাজের বাসা আক্রমণের পর আমি বেতার কেন্দ্রে ফিরে আসি এবং লেফটেন্যান্ট শমসেরের স্থলাভিষিক্ত হই। মেজর জিয়ার নির্দেশ অনুযায়ী লেফটেন্যান্ট শমশের সে সময়ে কালুরঘাটে ফিরে যান।

 

বেতার কেন্দ্রে অবস্থানকালে সেখানে আমার কাজ ছিল ঐ ‘বিপ্লবী বেতার-কেন্দ্রের’ চারদিকে মোতায়েন প্রতিরক্ষা বাহিনীকে কমাণ্ড করা ঐ কেন্দ্রের গোপনীয়তা রক্ষা করা এবং বেতার কেন্দ্রে প্রচারিতব্য সংবাদ, বুলেটিন ও নানা কথিকা পড়ে সেসব এ্যাপ্রুভ করে দেওয়া। আমার স্পষ্ট মনে আছে,বেতার-কেন্দ্রে থাকাকালীন আমাদের সাথে যারা কাজ করতেন তাদের বেতার কেন্দ্রের অভ্যন্তরে আসা যাওয়ার অনুমতি দিয়ে আমি ৭টি ‘পাস’ ইস্যু করেছিলাম। প্রথমে ৬টি পরে ১টি পাস ইস্যু করা হয়েছিল। মেজর জিয়ার নির্দেশ ছিল কোন সংবাদ বা কথিকা বেতার কেন্দ্রে প্রচার করার আগে অবশ্যই তা কোন অফিসারকে পড়ে চেক করে দিতে হবে। লেফটেন্যান্ট শমশের বেতার কেন্দ্র থেকে কালুরঘাট চলে যাবার সময় মেজর জিয়ার এই নির্দেশের কথা আমাকে বলে গিয়েছিলেন। সে সময় বেতার-কেন্দ্র থেকে আমি সেসব সংবাদ এবং কথিকা পাঠ করেছি তার সবগুলোতেই আমি আমার ইনিশিয়াল দিয়েছি। বলা বাহুল্য এসব কাজ করার সময় আমার এক অসাধারণ বিপ্লবী চেতনার জন্ম হয়েছিল। বলতে দ্বিধা নেই, সে সময় আরব জাহানের প্রখ্যাত গেরিলা নেতা ইয়াসের আরাফাতের কর্মধারা ও জীবন-চেতনা আমাকে অনুপ্রাণিত করে তুলেছিল। তার কথা তখন আমার বারবারই মনে পড়তো, মনে পড়তো তার বিপ্লবী সংস্থা ‘প্যালেস্টাইন লিবারেল ফ্রন্ট’-এর কথাও। মনে আছে একটি কথিকায় লেখক প্রদত্ত নামটি কেটে দিয়ে তার ওপর আমি লাল কালিতে আমাদের সংগ্রামী-সংস্থার নাম দিয়েছিলাম ‘বেঙ্গল লিবারেশন ফ্রন্ট’। পরবর্তীকালে সাংবাদিকরা এর বাংলা অনুবাদ করেছিলেন ‘মুক্তিফৌজ।”

 

২৮শে মার্চ সন্ধ্যায় লেফটেন্যান্ট শমসের ও আমি অনেকক্ষন আলাপ আলোচনার পর ব্লাক আউট ঘোষনার সিদ্ধান্ত নিই। সে অনুসারে বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র থেকে ব্লাক আউট পালনের ঘোষণাও প্রচারিত হয়। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশে সবাইকে নিজ নিজ হাতিয়ার নিয়ে ক্যাপ্টেন মুহাসিন, ক্যাপ্টেন মুখলেস, ক্যাপ্টেন ইনাম, ক্যাপ্টেন ওয়ালী, ক্যাপ্টেন ভূঁইয়া ও অন্যান্যের কাছে রিপোর্ট করার আহবান জানানো হয়েছিল। অবশ্য এই ঘোষণায় কোন জায়গার নাম উল্লেখিত হয় নি।

 

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণায় বলা হয়েছিলোঃ ‘নিজ নিজ অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে লালদীঘির ময়দানে ক্যাপ্টেন ভূঁইয়ার কাছে রিপোর্ট করুন। এই ঘোষণা রিপোর্ট করার স্থান হিসেবে লালদীঘির ময়দানের উল্লেখ ছিল কারণ ২৯শে মার্চ সকালে দেখা গেল যে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম-কাপ্তাই রোড ধরে হাজার হাজার লোক নিজ নিজ বাড়ির দিকে ছুটে যাচ্ছে। উল্লেখ করা আবশ্যক যে, ২৮-২৯ শে মার্চ রাতে পি,এন,এস জাহাঙ্গীর যুদ্ধজাহাজ থেকে পাঞ্জাবীরা চট্টগ্রাম শহরে অত্যাধিক শোলিং করেছিল। শেলিং এর দরুন কয়েক জায়গায় আগুন ধরে যায়। আগুনের ফুলকিতে মনে হয়েছিল চট্টগ্রাম শহরে বুঝি পাইকারী ধ্বংসলীলা চলছে। এ অবস্থা দেখে বেসামরিক লোকেরা যার হাতে বন্দুক বা অন্য অস্ত্র ছিল তাই নিয়ে প্রাণভয়ে গ্রামের দিকে ছুটে যাচ্ছিল। তাদের মধ্যে তখন নেতৃত্ব দেওয়ার মতো কেউই ছিলনা, তাই তারা অসংঘবদ্ধভাবে গ্রামের দিকে চলে যাচ্ছিল। ঐসব লোকদের আবার একত্রিত করে পুনর্গঠিত করার উদ্দেশ্যই বিপ্লবী বেতার থেকে অস্ত্র নিয়ে লোকদের আবার একত্রিত করে। পূনর্গঠিত করার উদ্দেশ্যেই বিপ্লবী বেতার থেকে অস্ত্র নিয়ে লালদীঘির ময়দানে ক্যাপ্টেন ভূঁইয়ার কাছে রিপোর্ট করার নির্দেশ প্রচারিত হয়েছিল। সত্বর তাদের এক জায়গায় জমায়েত করতে হলে এ-ধরনের ঘোষনা প্রচার ছাড়া গত্যন্তর ছিলনা। বলা বাহুল্য, এই ঘোষনা এ-সময়ে বেতার-কেন্দ্রে উপস্থিত কয়েকজনের সাথে আলোচনা করেই প্রচারিত হয়েছিল।

 

ঘোষনাটি কয়েকবার প্রচারিত হবার পর চট্টগ্রাম বিশ্ব বিদ্যালয়ের তদানীন্তন উপাচার্য এ,আর,মল্লিক আমাকে টেলিফোন করেন। লালদীঘির ময়দানে একত্রিত হওয়ার এই ঘোষনা সম্পর্কে তার সাথে আমার অনেক আলাপ হয়। তিনি আমাকে অবিলম্বে এই ঘোষনা প্রচার বন্ধ করতে বলেন। তিনি যুক্তি দেন যে, এই ঘোষনামতে যদি সবাই গিয়ে লালদীঘির ময়দানে একত্রিত হয় তাহলে হানাদাররা নিশ্চয় এই জমায়েতের ওপর পি,এন,এস জাহাঙ্গীর জাহাজ থেকে শেলিং করবে, এমনকি হাওয়াই হামলা করতে পারে। ডক্টর মল্লিকের এই যুক্তিপূর্ণ উপদেশে আবার আমাকে বেতার মারফত ‘লালদীঘির ময়দানে’ একত্রিত হওয়ার ঘোষনাটি বাতিল করে দিতে হয়।

 

দুনিয়ার ইতিহাসে যেসব বিপ্লব হয়েছে তাতে লক্ষ্য করা গেছে যে, প্রথমে অর্গানাইজ করা হয়েছে এবং ঘোষিত হয়েছে বিদ্রোহ, হয়েছে বিপ্লব। কিন্তু আমাদের বাংলাদেশে ব্যাপারটি ঘটেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন রকম। এক্ষেত্রে প্রথমে ঘোষিত হয়েছে বিদ্রোহ, পরে হয়েছে সংগঠন-আমরা প্রথমে বিদ্রোহ করেছি, পরে শুরু করেছি বিদ্রোহীদের সংগঠন। ২৬শে মার্চ ভোরে যে আমাদের বিদ্রোহ করতে হবে তা আমরা অনেকেই ২৫শে মার্চের মধ্যরাতেও জানতাম না।

 

কুমিরার লড়াই

মেজর এম এস এ ভূঁইয়া

(‘মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস’ গ্রন্থ থেকে সংকলিত)

 

ইচ্ছা ছিলো সন্ধ্যার আগেই ক্যান্টমেন্ট দখল করবো। কিন্তু শত্রুর শক্তি বৃদ্ধর জন্য কুমিল্লা থেকে যে ২৪নং এফ এফ (ফ্রন্টিয়ার ফোর্স) এগিয়ে আসছে তাকে বাঁধা দেওয়াই সর্বপ্রথম কর্তব্য হয়ে দাঁড়ালো।

 

তখন বিকাল ৫টা। ২৪নং এফএফ’কে প্রতিহত করার জন্য কুমিল্লার দিকে অগ্রসর হলাম। বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও ইপিআর’এর মাত্র ১০২ যোদ্ধা সমবায়ে সংগঠিত দল নিয়ে এই অভিযানে আমরা বের হলাম। আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত পশ্চিমা হানাদার সৈন্যদলের মোকাবিলা করার আমাদের সম্বল মাত্র একটি এইচ এম জি, কয়েকটি এলএমজি আর বাকীসব রাইফেল। এতো অল্পসংখ্যক সৈন্য নিয়ে পুরো একটি সুসংগঠিত ব্যাটালিয়নের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে যাওয়ার ঝুঁকি যে কি বিরাট এবং তার পরিণাম যে কি মারাত্মক হতে পারে সেদিন তা আদৌ উপলব্ধি করতে পারি নি তা নয়। আসলে মনটা ছিলো তখন প্রতিশোধ স্পৃহায় উন্মত্ত, দেশের মুক্তি কামনায় উত্তপ্ত, ক্ষোভে ক্রোধে আবেগে উত্তেজিত। সুতরাং ঠাণ্ডা মাথায় অগ্র পশ্চাৎ বিবেচনা করে পরিকল্পনা করার আদৌ অবসর ছিলো না তখন। অন্য কিছু সম্বল না থাকলেও যুদ্ধে সবচেয়ে বড় যে জিনিস প্রয়োজন সেই সাহস, সেই উদ্দীপনা, সেই উদ্দীপ্ত প্রাণের আকাঙ্খা ছিলো আমাদের সম্বল। আমাদের এই অপরিমেয় মনোবল ও দুর্জয় আত্মবিশ্বাস সেদিন মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার শক্তি দিয়েছিলো। এছাড়া ছিলো পরম করুণাময়ের অপার করুনা যা বারবার নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে উদ্ধার করে আমাদেরকে সাফল্যের স্বর্ণদুয়ারে পৌঁছে দিয়েছে। আজ আমার এ প্রত্যয় দৃঢ়তা লাভ করেছে যে, সত্য ও ন্যায়ের সেই পবিত্রতা চিরদিনই অন্যায়কে প্রতিরোধ করতে এভাবেই সাহায্য করে থাকে।

 

আগেই খবর পেয়েছিলাম শত্রুবাহিনী ফেনীর কাছে শুভপুর ব্রিজ পেরিয়ে এগিয়ে আসছে। অতএব, যত দ্রুত তাদের অগ্রগতিকে প্রতিহত করা যায় ততই আমাদের জন্য মঙ্গল। আমার কথামত আওয়ামী লীগের কয়েকজন কর্মী পাঁচটি ট্রাক এনে হাজির করলেন। তখন আমাদের সৈন্যবাহিনী ও জনসাধারণের প্রত্যেকেরই যেনো একটা যুদ্ধাংদেহী ভাব। তাদের চেহারা দেখে মনে হচ্ছিলো যেনো অনেকদিনের পুঞ্জিভূত বেদনা বঞ্চনা ক্ষোভ, আক্রোশ বিদ্রোহের আগুনে ফুসে উঠেছে এবং তা দুর্জয় সংগ্রামের মাধ্যমেই যেনো স্ফুরিত হতে চায়। চব্বিশ বছরের পাকিস্তানী বুর্জোয়াদের শাসন শোষণ ও অত্যাচার উৎপীড়নের জগদ্দল পাথরকে টুকরো টুকর করে ভেঙ্গে ফেলতে আজ সবাই বদ্ধপরিকর।

 

আমি আমার ক্ষুদ্র দলের ১০২ জন যোদ্ধাকে ৪টি ট্রাকে উঠালাম এবং বাকি ট্রাকটিতে গুলির বাক্য উঠিয়ে দিলাম। আমি নিজে মোটর সাইকেলে চড়ে সবার আগে চললাম। উদ্দেশ্যঃ এগোনোর সাথে সাথে পথের দুপাশে এমন একটি উপযুক্ত স্থান খুজে নেওয়া যেখান থেকে শত্রুর উপর সাফল্যের সাথে প্রচণ্ড আঘাত হানা যায়। শুভপুরে সেদিন আমাদের যাত্রাপথের দৃশ্য অবিস্মরণীয়। রাস্তার দুপাশে হাজার হাজার মানুষ ভীড় জমিয়েছে। তাদের মধ্যে কল কারখানার শ্রমিকই বেশী। মুখে তাদের নানান শ্লোগান। হাজার কণ্ঠের সেই শ্লোগান আকাশ বাতাস মুখরিত করে তুলেছিল। গত রাতে শহরের বিভিন্ন স্থানে ইয়াহিয়ার লেলিয়ে দেওয়া বর্বর বাহিনী কর্তৃক অতর্কিত আক্রমণ, নির্মম হত্যা, পাশবিক অত্যাচার, বিশেষতঃ বেঙ্গল রেজিমেন্টের জওয়ানদেরকে পাশবিকভাবে হত্যা করার খবর এরই মধ্যে প্রতিটি মানুষের কানে পৌঁছে গেছে। যে কোন ভাবে এই বিশ্বাসঘাতকতার উপযুক্ত শাস্তি দেওয়ার জন্য তারা প্রস্তুত। সুতরাং যখনই তারা দেখতে পেল খাকি পোষাক পরা বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও ইপিআর এর জওয়ানরা অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে শত্রুর মোকাবিলা করার জন্য এগিয়ে যাচ্ছে তখন তারা আনন্দে আত্মহারা হয়ে উঠলো। মুহুর্মুহু শ্লোগান দিতে লাগলো। জয় বাংলা, বেঙ্গল রেজিমেন্ট জিন্দাবাদ, ইপিআর জিন্দাবাদ। এদিকে তাদের কেউ কেউ সৈনিকদের কি দিয়ে এবং কিভাবে সাহায্য করতে পারে তাই নিয়ে মহাব্যস্ত।

 

আমাদের সৈন্য বোঝাই ট্রাকগুলো তখন ধীরে ধীরে এগিয়ে চলছে। এমন সময় একজন বুড়ো লোক তার পথের পাশের দোকান থেকে সিগারেট নিয়ে এসে আমার হাতে তুলে দিলো। বললো, “স্যার আমি গরীব মানুষ, কিছু দেওয়ার মতো ক্ষমতা আমার নাই, এই নিন আমার দোকানের সিগারেট (সিগারেট ৩ কার্টুন ছিল); আপনার জওয়ানদের মধ্যে বিলিয়ে দিন।“ বৃদ্ধের এই সহানুভুতি ও আন্তরিকতায় তার প্রতি কৃতজ্ঞতায় আমার মন ভরে উঠলো। আরেকজন একটি ট্রাকে করে প্রায় এক ড্রাম কোকাকোলা নিয়ে এলো। কেউ কেউ খাদ্যসামগ্রীও নিয়ে এলো।

 

আন্তরিকতা আর ভালবাসার সেই উপহার আমাদের মনকে আনন্দে উদ্বেল করে তুলেছিলো। কেমন করে কিভাবে তারা সেসব জিনিস যে সেদিন সংগ্রহ করেছিলেন তা ভাবলে আজও বিস্মিত হই।

 

সন্ধ্যা তখন ৬টা। আমরা কুমিল্লায় পৌঁছে গেলাম। শত্রুকে বাঁধা দেওয়ার জন্য স্থানটি খুবই উপযুক্ত বিবেচিত হলো। পথের ডানে পাহাড় এবং বামে আধ মাইল দূরে সমুদ্র। শত্রুর ডানে এবং বামে প্রতিবন্ধকতা আছে এবং শত্রুকে এগোতে হলে পাকা রাস্তা দিয়েই আসতে হবে। তাই সেখানেই পজিশন নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। আমি যেখানে পজিশন নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেই তার পিছনে একটি খাল ছিল। ঐ খাল থেকে ৫০০/৬০০ গজ সামনে অর্থাৎ উত্তর দিকে আমি পজিশন নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেই। খালটি একটি পদাতিক বাহিনীর জন্য তেমন একটা বাঁধা নয়। তবুও এটা পিছনেই রাখলাম। উদ্দেশ্য ছিলো যদি বর্তমান পজিশন শত্রু আমাদের ছাড়তে বাধ্য করে তখন খালের পাড়ে পজিশন নিতে পারবো। এটা ছিলো আমার বিকল্প পরিকল্পনা। জমিনের সরূপ দেখে কয়েক মিনিটের মধ্যে পরিকল্পনা তৈরী করে নিলাম। আমার তিনজন প্লাটুন কমান্ডারকে ডেকে খুব সংক্ষেপে আমার পরিকল্পনার কথা জানালাম এবং নিজ নিজ স্থানে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পজিশন নেওয়ার নির্দেশ দিলাম। আমার নির্দেশ অনুযায়ী এইচএমজি’টা ডান পাশে পাহাড়ের ঢালুতে ফিট করা হলো। স্বয়ং ইপিআর সুবেদার সাহেব ভারী মেশিনগানটির সঙ্গে রইলেন। কারণ এই ভারী মেশিনগানটিই আমাদের প্রধান হাতিয়ার এবং সবচেয়ে বড় সম্বল। আমি বামদিকের কয়েকটি এলএমজি’র পজিশন ঠিক করে দিলাম। আমার নির্দেশমত সবাই মাটিতে পজিশন নিয়ে নিলো। পজিশনের অবস্থাটা হলো অনেকটা ইংরেজী U-এর মতো। অর্থাৎ ডানে বামে এবং পিছনে আমাদের সৈন্য। যেদিক থেকে শত্রু এগিয়ে আসছে কেবল সেই সামনের দিকটা সাঁড়াশির হারের মতো খোলা।

 

কুমিরা পৌঁছেই মোটর সাইকেলযোগে একটি লোককে আমরা পাঠিয়েছিলাম শত্রুর অগ্রগতি সম্পর্কে খবর নিতে। এরই মধ্যে সে খবর নিয়ে এসেছে যে, শত্রু আমাদের অবস্থান থেকে আর বেশী দূরে নেই। মাত্র চার পাঁচ মাইল দূরে। তবে তারা ধীরে ধীরে গাড়ী চালিয়ে আসছে। যে লোকটিকে পাঠিয়েছিলাম সে পাঞ্জাবীদের নিকটে গিয়ে রাস্তার পাশের একটি দোকান থেকে সিগারেট কিনে ফিরে এসেছে। সে আমাকে জানালো যে, পাঞ্জাবীদের পরনে কালো বেল্ট, কাঁধে কালো বেজ এবং কি যেনো একটা কাঁধের উপরে তাও কালো। তখন আমার সন্দেহ রইলো না যে ফ্রন্টিয়ার ফোর্সের সৈন্যরাই এগিয়ে আসছে।

 

আমাদের অবস্থানের ৭০/৮০ গজ দূরে বড় একটি গাছ ছিলো। জনসাধারণের সাহায্যে গাছের মোটা ডালটা কেটে রাস্তার ঠিক মাঝখানে ফেলা হলো। গাছের ডাল দিয়ে আমাদের সুন্দর একটা ব্যারিকেড সৃষ্টি হয়ে গেলো। জনসাধারণ আশপাশ থেকে কিছু ইট এনে ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত অবস্থায় রাখলো।

 

এত অল্প সময়ে জনসাধারণ কিভাবে ঐ মোটা গাছের ডালটা কেটে ফেললো এবং ইট সংগ্রহ করে ব্যারিকেড সৃষ্টি করলো তা আজ ভাবতে আশ্চর্য লাগে। সৈন্যদের জানিয়ে দেয়া হলো যে শত্রুসৈন্য যখন ব্যারিকেড সাফ করার জন্য গাড়ী থেকে নামবে এবং সাফ করার জন্য একত্রে জমা হবে তখন সকলে একযোগে শত্রুর উপর গুলি ছোড়া শুরু করবে। বিশেষ করে ভারী মেশিনগান দ্বারা অবিরাম গুলি ছুড়বে।

 

প্রায় এক ঘন্টা সময় আমাদের প্রতিক্ষার মধ্যে কেটে গেলো। সন্ধা তখন ৭টা। আমরা শত্রুবাহিনীর অপেক্ষায় ওৎ পেতে রইলাম। আমাদের সামনে শত্রুবাহিনীর উপস্থিতি প্রায় আসন্ন বলে মনে হলো। আরো কিছুক্ষণ প্রতিক্ষার পরই সম্মুখ সমরে ঝাঁপিয়ে পড়ার সুযোগ এলো। শত্রুবাহিনী ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে। ব্যারিকেড দেখে সামনের গাড়ীগুলো থেমে গেলো। কিছুসংখ্যক সিপাহী গাড়ী থেকে নেমে ব্যারিকেডের কাছে এলো। এবং কেউ কেউ ইটগুলো তুলে দূরে ফেলে দিতে লাগলো। পিছনের গাড়ীগুলোও তখন সেই দিকেই এগিয়ে আসছিলো।

 

সন্ধ্যা তখন সোয়া সাতটা। শত্রুরা যখন ব্যারিকেড সাফ করতে ব্যস্ত, ঠিক এমন সময় আমাদের ডান দিকের ভারী মেশিনগানটি গর্জে উঠলো। শুরু হলো শত্রু নিধন পালা। চারিদিক থেকে কেবল গুলির আওয়াজই শোনা যেতে লাগলো। ভারী মেশিনগানটি থেকে তখন মাঝে মাঝে ট্রেসার রাউণ্ড বের হচ্ছে। উহ! সে কী দৃশ্য! শত্রুকে এত কাছাকাছি অতর্কিত অবস্থায় পেয়ে আমার মন খুশিতে নেচে উঠলো। মনে মনে বললাম- তোমরা (পাঞ্জাবীরা) এতদিন মনে করতে বাঙালিরা যুদ্ধ করতে জানে না। এখন যুদ্ধ ক্ষেত্রেই বাঙালিরা তোমাদের জানিয়ে দিবে তারা যুদ্ধ করতে জানে কিনা। হানাদার বাহিনীর অগ্রগতি রোধ করাই ছিলো আমাদের লক্ষ্য। আমাদের আকস্মিক আক্রমণে তারা তখন হকচকিত। তাদের সামনের সৈন্যগুলির অনেকেই আমাদের গুলির আঘাতে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। তাদের মৃত্যুকাতর আর্তনাদ আমাদের কানে আসছিলো। যারা দিশেহারা হয়ে এদিক ওদিক ছোটাছুটি করছিলো তাদের অনেকেই মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই শত্রুদের পিছনের সৈন্যরা এ অবস্থা সামলে নিয়ে মেশিনগান, মর্টার এবং আর্টিলারী থেকে অবিশ্রাম গুলি শুরু করলো। এবার উভয় পক্ষে তুমুল লড়াই লেগে গেলো। কিন্তু বহু চেষ্টা করেও শত্রুরা আমাদের ব্যূহ ভেদ করতে পারলো না। তাদের সৈন্য বোঝাই তিনটি ট্রাকে আগুন ধরে গেলো। আমাদের মেশিনগান নিউট্রালাইজ করার জন্য প্রচুর পরিমানে আর্টিলারী গোলা নিক্ষেপ করলো। কিন্তু আল্লার মেহেরবাণীতে শত্রুর সকল প্রচেষ্টা মাঠে মারা গেলো। প্রায় দুই ঘন্টা প্রাণপণ লড়াই করে তারা শেষ পর্যন্ত দুই ট্রাক অস্ত্রশস্ত্র ফেলে রণে ভঙ্গ দিলো।

 

ঘন্টা দুয়েক এই লড়াই চলেছিলো। উভয় পক্ষের গোলাগুলির শব্দ স্তব্ধ হয়ে গেলো। তারপর তারা পিছু হটতে বাধ্য হলো। প্রথম দিনের লড়াইয়ে অর্থাৎ ২৬ তারিখের রাতেই শত্রুবাহিনীর ভীষণ ক্ষতি হয়েছিলো। শত্রুবাহিনীর কমান্ডিং অফিসার লেঃ কর্নেল ও একজন লেফটেন্যান্টসহ বিভিন্ন পক্ষের ১৫২ জন সাধারণ সৈনিক প্রাণ হারিয়েছিলো। আমরা শত্রদের দুই ট্রাক এম্যুনিশন কবজা করেছি। আমাদের পক্ষে চৌদ্দজন বীর সৈনিক শাহাদাৎ বরণ করেন।

 

কুমিল্লায় লড়াই চলেছিলো সর্বমোট তিনদিন। শত্রু এই সময়ের মধ্যে তাদের আর্টিলারী ও মর্টার দিয়ে বারবার আক্রমণ চালিয়েছিলো আমাদের বাহিনীর উপর। অবশেষে ২৮ তারিখে তারা ত্রিমুখি আক্রমণ চালায়। পিছন থেকে তারা নৌবাহিনীর মাধ্যমে আক্রমণ চালায়। সাগর থেকে গানবোট দিয়ে ফায়ার সাপোর্ট দেয়। রাতের আঁধারে শত্রুরা পহাড়ের উপর অবস্থিত টিবি হাসপাতালের নিকটে মেশিনগান বসায়। ত্রিমুখি আক্রমণের মুখে আমাদের সৈন্যরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যেতে বাধ্য হয়। ফলে ২৮ তারিখে কুমিরা পাকিস্তানী সৈন্যদের দখলে চলে যায়। কুমিরা পতনের পর হানাদার বাহিনী চট্রগ্রাম অভিমুখে রওয়ানা হয়। তারা অগ্রসর হওয়ার সময় রাস্তার দুপাশে অবস্থিত সমস্ত গ্রাম ও হাটবাজার জ্বালিয়ে দেয় এবং সামনে যাকে দেখে তাকেই গুলি করে হত্যা করে। লোকমুখে শুনেছি কুমিল্লা পতনের পর রাস্তার দুপাশে কয়েকদিন ধরে আগুন জ্বলেছিল।

 

আমার মনে হয় বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে কুমিরার যুদ্ধটাই একমাত্র প্রথম যুদ্ধ যেখানে বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও তৎকালীন ইপিআর বাহিনী সম্মিলিতভাবে হানাদার বাহিনীর উপর এক প্রচণ্ড আঘাত হানতে সক্ষম হয়েছিলো। এই যুদ্ধে ২৪ নং এফএফ-এর একটা পুরো কোম্পানী একেবারে নিশ্চিন্ন হয়ে গিয়েছিলো। একথা আমি জানতে পেরেছিলাম ক্যাপ্টেন জাফর ইমামের কাছে। তিনি কুমিরার যুদ্ধে ২৪ এফএফ-এ কর্মরত ছিলেন।

 

—————————————

 

<৯, ২.৬, ৫১-৫৮>

চট্টগ্রামের প্রতিরোধ যুদ্ধ

সাক্ষাৎকার: লেঃ কর্নেল মাহফুজুর রহমান

(১৯৭১ সালে লেফটেন্যান্ট পদে কর্মরত ছিলেন। সাক্ষাতকারটি বাংলা একাডেমীর দলিলপত্র থেকে সংকলিত)

(অনুবাদ)

২৫-৮-৭৩

 

বৃহস্পতিবার, ২৫ মার্চ ১৯৭১। লেফটেন্যান্ট কর্নেল আব্দুর রশিদ জাঞ্জুয়া অষ্টম ইস্ট বেঙ্গলের সকল অফিসারকে নির্দেশ দিয়েছিল চট্টগ্রাম শহরের বিভিন্ন স্থানে জনসাধারণের দেয়া ব্যারিকেড সরিয়ে দেয়ার। গতরাতের আঁধারে জনসাধারণ একটি আস্ত যাত্রীবাহী ট্রেনকে তুলে এনেছিল এবং ষোলশহরে আমাদের ব্যাটালিয়নের কাছে রেলওয়ে জংশনের প্রধান রাস্তায় ব্যারিকেড হিসেবে রাখা হয়েছিল। ক্যাপ্টেন (বর্তমানে মেজর) সাদেক হোসেইনের অধীনে থাকা সম্পূর্ণ কোম্পানী এবং লেফঃ কর্নেল জাঞ্জুয়াসহ ব্যাটালিয়নের প্রায় সকল অফিসার রেলওয়ে জংশনের রাস্তার ট্রেনটি সরাতে সেখানে ছিল।

 

চারপাশের সকল বেসামরিক লোকজন ও স্থানীয় শিল্পের শ্রমিকেরা সেখানে জড় হয়ে ব্যারিকেড সরানোর বিপক্ষে চিৎকার দেয়া শুরু করেছিল। ক্যাপ্টেন আহমেদ দ্বীন (অন্যতম পাকিস্তানী অফিসার) ক্ষুব্ধ হয়ে বলেছিলেন- “এই সকল জারজদের চুপ করানোর একমাত্র ওষুধ হচ্ছে গুলি করা।” ব্যারিকেড কতটুকু সরানো যাবে এটা নিয়ে লেফঃ কর্নেল এতোটাই চিন্তিত ছিলেন যে ক্যান্টনমেন্টের ২০ জন বেলুচ সেনাকে তৈরী রাখা হয়েছিল যাতে যে কোন বিপদে তারা সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসতে পারে। খুব সম্ভবত তিনি তার নিজের ব্যাটালিয়নের উপরও ভরসা করতে পারছিলেন না।

 

যাই হোক, অনেক চেষ্টার পরে ট্রেনটি সরানো হয়েছিল। ৫-৬ ঘন্টা লেগেছিল এই কাজটা করতে। এই ব্যারিকেডের জন্য রাস্তার উভয়পাশে একশ’র বেশি গাড়ী জ্যামে আটকা পড়েছিল। আমরা ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অন্তর্ভুক্তভেবে জনসাধারণ আমাদের উপর যতসম্ভব ক্ষোভ দেখায়নি। তারা আমাদের নিয়েও খুব বেশী খুশী ছিল না। মেজর (বর্তমানে কর্নেল) শওকতকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন তরুণ ছাত্র জিজ্ঞেস করেছিল- “আপনারা কি আমাদের দলে না?” তারা যত সম্ভব আশা করেছিল যে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট তাৎক্ষনিকভাবে জনসাধারণের সাথে যোগ দিবে। মুচকি হেসে মেজর (বর্তমানে কর্নেল) শওকত উত্তর দিয়েছিলেন- “সময় এলেই দেখতে পাবে।”

 

আমরা বুঝতে পারছিলাম যে চারপাশের সার্বিক পরিস্থিতি আরো খারাপ হচ্ছে। শহরের সকল স্থানে জনসাধারণ ক্রমেই উত্তেজিত হয়ে উঠছিলো। একটার পর একটা মিছিল বের হচ্ছিলো, যোগাযোগ বন্ধ করার শহরের রাস্তায় রাস্তায় জন্য ব্যারিকেড দেয়া হচ্ছিল। বেশিরভাগ দোকান-পাট বন্ধ ছিল। এদিকে-সেদিকে লোকজন দল বেধে বসে আলোচনা করছিল যে কি ঘটতে যাচ্ছে। ২০ জন বালুচ সেনার একটি কোম্পানির সাথে অষ্টম ইস্ট বেঙ্গলের অন্যতম একটি কোম্পানিকে সুবেদার আবদুল কাদেরের অধীনে চট্টগ্রামের জেটিতে পাঠানো হয়েছিল অস্ত্র নামানোর জন্য যেগুলো পাকিস্তান থেকে ‘শামস’ নামক একটি মালবাহী জাহাজে করে আনা হয়েছিল। সৈন্যরা জাহাজ থেকে অস্ত্র নামানোর চেষ্টা করছিল।কিন্তু জন সাধারণ তাদেরকে এটা করতে দিচ্ছিল না। আমরা বুঝেছিলাম যে মারাত্মক কিছু ঘটবে।

 

সন্ধ্যায় একটা কোম্পানিসহ লেফঃ (বর্তমানে ক্যাপ্টেন) শমসের মবিন চৌধুরীর সাথে আমাকে ষোলশহর ক্যান্টনমেন্টের রাস্তায় পাহারা দিতে বলা হয় যাতে রাতে আর কোন ব্যারিকেড সেখানে না দিতে পারে। আমার সাথে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট মোহাম্মদ হুমায়ূনও (পাকিস্তানী অফিসার) ছিল। রাত এগারটার দিকে, কে রহমানের কোকাকোলার ফ্যাক্টরীতে বিশ্রাম নেয়ার সময়, শহর থেকে আমি একটা টেলিফোন পেলাম। একজন অপরিচিত ব্যাক্তি আতঙ্কিত ও অস্থির হয়ে ফ্যাক্টরীতে তার কোন এক আত্মীয়ের কাছে গুরুত্বপূর্ণ একটি বার্তা পাঠাতে চাচ্ছিলেন এবং আমার পরিচয় জানতে চাইলেন। আমি উত্তরে বললাম যে আমি কোন দায়িত্বে নেই। সেই ব্যাক্তি আমাকে ফ্যাক্টরীর কোন এক পাহারাদার ভেবেছিল এবং বলেছিল- “ঢাকা থেকে এইমাত্র আমরা একটা টেলিফোন পেয়েছি যে সেখানে গুলিবর্ষণ শুরু হয়েছে, পাকিস্তানীরা গণহারে সাধারণ মানুষ মারা শুরু করেছে এবং সবাই তাদের মোকাবিলা করার চেষ্টা করছে।” টেলিফোনে এরকম একটা তথ্য দেয়ার জন্য আমি সেই অপরিচিত ব্যাক্তিকে ধন্যবাদ দিয়ে রিসিভার রেখে দিলাম।

 

ষোলশহরে আমাদের ইউনিটের দিকে কিছু আগানোর পরই দেখলাম সুবেদার সুবেদ আলি সরকার দৌড়ে আমার দিকে আসছে এবং ফিসফিস করে বাংলাতে বললো আমি যেন যথাশীঘ্র ইউনিটে পৌছেঁ যাই। আমি বাকিটুকু বুঝে গিয়েছিলাম। আমার সৈন্যদের নিয়ে তাড়াতাড়ি ষোলশহরে পৌছে দেখলাম মেজর (বর্তমানে ব্রিগেডিয়ার) জিয়াউর রহমান আমাদের সৈন্যদের একসাথে লাইনে দাঁড় করাচ্ছেন।

 

বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সৈন্যদের একসাথে করতে এক ঘণ্টার মত সময় লেগেছিল। মেজর (বর্তমানে ব্রিগেডিয়ার) জিয়াউর রহমান অষ্টম ইস্ট বেঙ্গলের নেতৃত্ব নিয়ে নিলেন এবং সৈন্যদের উদ্দেশ্যে কয়েক মিনিট ভাষণ দিলেন- “বাঘেরা আমার, পাকিস্তানীরা বাঙালিদের গণহারে হত্যা করা শুরু করেছে। তারা ইতিমধ্যেই ইস্ট বেঙ্গলের কয়েকটি ব্যাটালিয়নকে নিরস্ত্র করেছে। তারা আমাদের সবাইকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তারা ইতিমধ্যে আমাকে ফাঁদে ফেলেছিল কিন্তু সৌভাগ্যবশত আমি রক্ষা পেয়েছিলাম। আমাদের সবাইকে তাড়াতাড়ি সংগঠিত হতে হবে এবং যেকোন মূল্যে দেশকে রক্ষা করার জন্য তাদের মুখোমুখি হতে হবে। তোমরা সবাই কি আমার সাথে এই কাজটা করতে প্রস্তুত?” আমরা সকলে রাজী হয়েছিলাম এবং সেটা করার জন্য আল্লাহর নামে শপথ নিয়েছিলাম।

 

অষ্টম ইস্ট বেঙ্গলের একটি কোম্পানি কিছুদিন আগে অগ্রগামী দল হিসেবে খরিয়া ক্যান্টনমেন্টে পৌছেছিল। পাকিস্তানের ইস্ট বেঙ্গলের পঞ্চম, ষষ্ঠ ও সপ্তম ব্যাটালিয়নের একটি কোম্পানিকে আসতে হয়েছে। তাদের খরিয়া যাবার আগেই একটি কোম্পানির শক্তিমত্তার সৈন্যরা ছুটিতে গিয়েছিল এবং সেই মুহূর্তে অষ্টম ইস্ট বেঙ্গলের সর্বমোট ২৫০ জনের মত সৈন্য ছিল। কয়েকমাস আগে ১৯৭০ সালের ৩০ অক্টোবর ষোলশহরে এই ব্যাটালিয়নের জন্ম হয়। যেহেতু এই দলটি খরিয়া যাচ্ছিল তাই সেখানে সকল অস্ত্র, গোলাবারুদ, যন্ত্রপাতি, মজুদ, গাড়ি ইত্যাদি তৈরী রাখা হয়েছিল। এই ব্যাটালিয়নটি ইবিআরসি’র কাছ থেকে থ্রি নট থ্রি ধরনের ১৫০টি বন্দুক, একটি ১০৬ মিলিমিটার আর আর এবং বেলুচ ২০ থেকে কোন গোলাবারুদ ছাড়া দুইটি ৩ ইঞ্চি মর্টার প্রশিক্ষণের জন্য এনেছিল।যেগুলো সৌভাগ্যবশত ব্যাটালিয়নের সাথেই ছিল। ষোলশহরের বাজার যেখানে ব্যাটালিয়নটি বেড়ে উঠেছিল সেখানে থেকে এইসব লুকিয়ে রাখা মোটেই উপযুক্ত জায়গা ছিল না। উপরন্তু সেই মুহূর্তে কোনকিছু ছাড়া সুবিধাজনকভাবে অপারেশন চালানো ব্যাটালিয়নের পক্ষে সম্ভব ছিল না। সুতরাং, আপাততঃ শহরের বাইরে কোথাও সংগঠিত হয়ে অপ্রথাগতভাবে অপারেশন চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হল।

 

ভোররাত দুইটার দিকে আমাদের সাথে থাকা অস্ত্র-গোলাবারুদ নিয়ে ইউনিট ত্যাগ করি। আমরা কালুরঘাট রাস্তার রেলওয়ে সেতু পার হয়েছিলাম এবং গ্রামে লুকিয়ে থাকার একটি অস্থায়ী স্থান খুঁজে পেয়েছিলাম। পরবর্তীকালে আমাদের সাথে ক্যাপ্টেন (বর্তমানে মেজর) হারুন আহমেদ চৌধুরী যোগ দেন যিনি ১৭ উইং ক্যাপ্টেনের কাছ থেকে তাঁর সর্বোচ্চ সংখ্যক সৈন্য, অস্ত্র, গোলাবারুদ নিয়ে পালিয়ে এসেছিলেন। এটা ছিল সৃষ্টিকর্তার আশীর্বাদ যার জন্য আমরা বিপুল পরিমাণে এত অস্ত্র-গোলাবারুদ এবং প্রস্তুত সৈন্যদের পেয়েছিলাম। বিভিন্ন এমসিএ, নেতা এবং শুভাকাঙ্ক্ষীরা সেখানে আমাদের সাথে দেখা করেছিল। একটা খসড়া পরিকল্পনা তৈরী করা হয়েছিল এবং সন্ধ্যার অন্ধকারে আমরা আবার শহরের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম।

 

কালুরঘাট রেলওয়ে সেতুর বিপরীত পাশের একটি গ্রামে আমি আমার কোম্পানিকে নিয়ে অস্থায়ী আশ্রয় নিলাম। আমার একজন সিপাইকে সাথে নিয়ে সম্পূর্ণ ভিক্ষুকের ছদ্মবেশে শহরে ঢুকেছিলাম এবং শহরে শত্রুপক্ষের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান চিহ্নিত করেছিলাম। কিছু উঁচু পাহাড় ও দালান শত্রুপক্ষের অধীনে ছিল যেখান থেকে তারা অনবরত গুলিবর্ষণ করছিল। অনেক উঁচু পাহাড় ও দালান তখনও কারো অধীনে ছিল না। ছাত্ররা তাদের শটগান বাইরে বের করে সম্ভাব্য সর্বোচ্চ গতিতে ছাদখোলা গাড়ি চালাচ্ছিল। তারা খাবারসহ বিভিন্ন জিনিস আওয়ামী লীগ অফিস থেকে সংগ্রহ করে অনেক ছাত্র যোদ্ধা, আনসার পুলিশ, মুজাহিদ, অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা বিভিন্নদের মধ্যে বিতরণ করছিল।

 

২৯ মার্চ ১৯৭১, আমাকে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল কালুরঘাট সেতুর উভয় পাশে নিরাপত্তা দিতে এবং সেদিনের মধ্যেই এটা করা হয়েছিল। দুপুরবেলা পাকিস্তানের একটি সি-১৩০ বিমান সন্দেহের দৃষ্টিতে সেতুর উপর দিয়ে উড়ে গিয়েছিল। রাতে আমরা সবাই শুনেছিলাম যে কুমিল্লা থেকে কিছু কমান্ডো প্যারাট্রুপার আনা হয়েছিল এবং তারা চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে নেমেছিল। রাত আটটার দিকে খুবই শক্তিশালী সার্চলাইট জ্বালিয়ে একটি মোটরলঞ্চ আমাদের প্রতিরক্ষার দিকে এগিয়ে আসছিল। নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত আমাদের সৈন্যদের গুলি না করতে বললাম। দূরে নদীর তীরের একপাশে লঞ্চটি আধাঘন্টার মত দাড়িয়ে সার্বিক পরিস্থিতি দেখছিল এবং কিছুসময় পরে চলে গেল। আমরা জানতাম না কি ঘটেছিল। সৈন্যরা সারারাত উদ্বেগের সাথে সজাগ ছিল। ভোর সাড়ে চারটার দিকে আমাদের প্রতিরক্ষার খুবই কাছে কিছু গুলির শব্দ শুনেছিলাম।

 

একাত্তরের ৩০ মার্চ সকালের দিকে মোহাম্মদ আসাফ নামে একজন বেসামরিক ব্যাক্তি আমার সাথে দেখা করলো এবং ‘শত্রু’ ‘শত্রু’ বলে চিৎকার করা শুরু করলো। মেজর (বর্তমানে ব্রিগেডিয়ার) জিয়াউর রহমান আমার সাথে ছিল। তিনি আমার মুখের দিকে তাকালো এবং এক প্লাটুন সাথে নিয়ে তাদের মুখোমুখি হতে বললো। উচ্চ পদস্থ কমান্ডার সাথে থাকায় আমার প্রথম অপারেশনে যাবার জন্য অনেক সাহস পেয়েছিলাম। সেনাবাহিনীর একটি গাড়িতে ইস্ট বেঙল এবং ইপিআর মিলিয়ে এক প্লাটুন সৈন্য নিলাম এবং চলা শুরু করলাম। সেই বেসামরিক ব্যাক্তি মোহাম্মদ আসাফ আমাদের পথ দেখিয়ে এমন জায়গায় নিয়ে গিয়েছিল যেখানে আমার পুরো প্লাটুন সরাসরি গুলির নিচে পড়ে গেল। আমরা গাড়ি থেকে লাফ দিয়ে নেমে কিছু বাড়ি আর ঝোপেঁর পিছনে আশ্রয় নিলাম। কিছুদূর সামনে আগানোর পর আমরা শত্রুর অবস্থান নির্ণয় করতে পারলাম। এটা ছিল কৃষি বিভাগের তিনতলার বড় একটি বাড়ি যার পিছনের দিকে তারা আশ্রয় নিয়ে সেখান থেকে গুলি করছিল।

 

শত্রুরা আমার প্লাটুনের অবস্থান নির্ণয় করে এমজি ও এলএমজি (লাইট মেশিন গান) চালানো শুরু করেছিল। এখন আমার পুরো প্লাটুনটি শত্রুপক্ষের দালানটির ৪০০-৫০০ গজ দূরের ছোট একটি জায়গার সম্মুখভাগে চলে আসলো। আমি একবার আরেকটু কাছে যাবার চেষ্টা করলে শত্রুরা এমজি চালালো এবং আমি একটি ছোট গাছের নিচের সরে এলাম। গুলি আমাকে আঘাত করতে পারেনি। ইপিআর এর সেপাই নূর মোহাম্মদ তাঁর এলএমজি নাম্বার ২ নিয়ে আমাকে অনুসরণ করা শুরু করলো। শত্রুরা এখন তাদের সবগুলো অস্ত্র চালানো শুরু করলো। বেসামরিক ব্যাক্তি আসাফকে নিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে আমি একটি বালির স্তূপের পিছনে কিছুদূর আগালাম এবং এখন আমার এসএমজি’র নিশানার মধ্যে দালানটি চলে আসলো। দালানটা এখন ২০০-৩০০ গজদূর দিয়ে তিনদিক থেকে প্রায় বৃত্তাকারে ঘেরা ছিল। আমার প্লাটুন এবং শত্রুপক্ষের মধ্যে গুলি বিনিময় শুরু হলো। প্রথম তলা থেকে দ্বিতীয় তলার কাঁচের সারির মধ্য দিয়ে দালানের ভিতর শত্রুপক্ষের অবস্থান নির্ণয় করা আমাদের জন্য সহজ ছিল। হঠাৎ করে দালান থেকে একটি রকেট লঞ্চার ছোড়া হল এবং তাঁর নিচে একটি ছোট আমগাছের পিছনে আমার প্লাটুনের সিপাই নূর মোহাম্মদ তাঁর এলএমজি দিয়ে গুলি করছিল। দৈবক্রমে এক ও দুই নম্বর এলএমজি’তে আঘাত করেনি এটা। তারপর সাথে সাথে আমার অবস্থান লক্ষ্য করে আরেকটি রকেট লঞ্চার ছোড়া হল। সৃষ্টিকর্তা জানেন কিভাবে সেটা বালির বস্তার উপরে পড়ে গেল এবং আমার পিছনে বিস্ফোরিত হলো। আমি পড়ে গিয়ে এখন আমার রকেট লঞ্চার দালানের দিকে ছোড়া শুরু করলাম এবং সেটা খুব ভালো কাজে দিলো। সকাল সাড়ে দশটার দিকে শত্রুপক্ষের সেনাবাহিনীর দুটি বিমান আমাদের অবস্থানের উপর পৌছালো। বিমানটি আমার বর্তমান অবস্থানের প্রায় ১০০০ গজ সামনে চট্টগ্রাম বেতারে বোমাবর্ষণ করলো যেটা সুবেদার সাবেদ আলী সরকারের অধীনে আমাদের সৈন্যদের দখলে ছিল।

 

আমরা দিনের বেলা দালানটি দখলে নিতে পারিনি। রাত হবার সাথে সাথেই আমরা দালানটিকে চারদিক থেকে ঘিরে রাখলাম এবং পাহারা দিতে শুরু করলাম যাতে শত্রুরা পালাতে না পারে। রাতে কোন গুলি বিনিময় হয় নি। পরেরদিন সকালবেলা আমি আমার প্লাটুন নিয়ে দালানের ভিতরে চার্জ করলাম এবং ভিতরে নিন্মোক্ত জিনিস খুঁজে পেলামঃ-

 

পাঁচটি শত্রুপক্ষের মৃতদেহ, একজন আধমরা ল্যান্সনায়েক যে পরবর্তীতে মারা গিয়েছিল এবং একজন জীবিত কিন্তু গুরুতরভাবে আহত মোহাম্মদ আকবর নামে একজন সিপাই। যখন জিজ্ঞেস করা হল তখন সে বললো যে সে হামজা কোম্পানীর তৃ্তীয় এসএসজি (কমাণ্ড) ব্যাটালিয়নের অন্তর্ভুক্ত। ক্যাপ্টেন সাজ্জাদের নির্দেশে ৩০ জনের একটি প্লাটুন রাতে এসেছিল এবং কালুরঘাট রেলওয়ে সেতু উড়িয়ে দেবার জন্য দালানটি দখলে নিয়েছিল। শত্রুপক্ষের বাকি সৈন্যরা নিম্নোক্ত জিনিস রেখে রাতের আঁধারে পালিয়ে গিয়েছিলঃ-

 

মেশিন গান ওয়ান-এ-থ্রি- ১ টি

লাইট মেশিন গান-৭.৬২ চাইনিজ- ১ টি

জি-থ্রি রাইফেল- ২টি

স্মল মেশিন গান- ১ টি

স্মল মেশিন গান-৭.৬২ চাইনিজ- ২ টি

৪০ মিলিমিটার রকেট লাঞ্চার- ৩টি (রকেটসহ)

ওয়্যারলেস সেট-জিআরসি-নাইন (সকল যন্ত্রাংশ সহ)- ১টি

৯ মিলিমিটার ওয়াল্টার পিস্তল- ১ টি

অত্যন্ত হালকা পিস্তল- ২ টি

কমান্ডো নাইফ- ১ টি

কমান্ডো বেল্ট- ৭ জোড়া

কমান্ডো বুট- ৭ জোড়া

কমান্ডো বেরেট- ৮ টি

৭.৬২ এমুনিশনস- ২০০০ (বুলেট এবং ম্যাগাজিন)

এবং সেইসাথে বিপুল পরিমাণে বোমা।

 

হাজার হাজার জনতা দালানে জড়ো হয়ে আমাদের উৎসাহ দিতে শুরু করলো। দখলে নেয়া অস্ত্র ও গোলাবারুদ আমরা সংগ্রহ করলাম এবং আমার প্রতিরক্ষায় আনলাম। দুর্ভাগ্যবশত শত্রুপক্ষের সিপাই আকবরও ফেরার পথে প্রচণ্ড ব্যথায় মারা গেল। সেই কৃ্ষি দালানের চৌকিদার ও অন্যরা শত্রুপক্ষের মৃতদেহগুলো নিয়ে গিয়েছিল এবং দালানের উত্তর-পূর্ব কোনে কবর দিয়েছিল। মেজর (বর্তমানে ব্রিগেডিয়ার) জিয়াউর রহমান আমার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পরিদর্শন করলেন। আমার প্রথম অপারেশনের সফলতা শুনে এবং দখলে নেয়া বিপুল পরিমাণ অস্ত্র গোলাবারুদ দেখে তিনি খুবই খুশি হয়েছিলেন।

 

শহরেও একইসাথে যুদ্ধ চলছিল। ক্যাপ্টেন (বর্তমানে মেজর) হারুন আহমেদ চৌধুরী এবং লেঃ (বর্তমানে ক্যাপ্টেন) শমসের মবিন চৌধুরী শহরের প্রবেশমুখ চকবাজারে কঠিনতর যুদ্ধ করেছিল যেখানে বেলুচ ২০ ট্যাঙ্কও ব্যবহার করেছিল। এক এক করে অনেক গুরুত্বপূর্ণ জায়গা আমাদের দখলে আসছিল। আমি আমার প্রতিরক্ষা বুহ্য চট্টগ্রাম বেতারে সামনে থেকে ইস্পাহানি, লিভার ব্রাদার্স, এফআইডিসি ইত্যাদি থাকা কর্ণফুলী নদী পর্যন্ত বাড়িয়েছিলাম। একাত্তরে ২ এপ্রিল শত্রুপক্ষ আমাকে আঘাত করতে প্রথমবারের মত ৩ ইঞ্চি মর্টার ব্যবহার করেছিল। ফসফরাস ব্যবহার করে তারা শত শত বাড়ি, দোকান ইত্যাদি পুড়িয়ে দিয়েছিল।

 

আমাকে আমার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টের দিকে মুখ করে চট্টগ্রাম-কাপ্তাই রাস্তার জংশন দখলে নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। প্রায় এক মাইলব্যাপী একটি সম্পূর্ণ গ্রাম আমার একটি কোম্পানির দখলে ছিল। আমার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সামনে চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট এবং পিছনে চট্টগ্রাম বেতার ছিল। নিঃসন্দেহে আমার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী ছিল কিন্তু কালুরঘাটের প্রধান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থেকে আমার অবস্থান ছিল খুবই দূরে এবং আমার অবস্থানের পিছনে একটি বড় অংশ খালি ছিল। দুইদিন ধরে আমার সামনের শত্রুপক্ষকে ভালোভাবে আটকে রেখেছিলাম কিন্তু আমার মনে হচ্ছিল সেগুলো ছিল শত্রুপক্ষের গৌণ অথবা মিথ্যা আক্রমণ। ৭ এপ্রিল শত্রুরা একটি সম্পূর্ণ ব্যাটালিয়ন নিয়ে চট্টগ্রাম বেতারে সুবেদার সাবেদ আলী’র অবস্থানে আক্রমণ করে এবং দখলে নেয়।

 

মেজর (বর্তমানে কর্নেল) শওকত যিনি শত্রুপক্ষের জাহাজ না ভিড়তে দেয়ার জন্য এবং পেছন থেকে অগ্রসর হবার জন্য দীর্ঘতম উপকূলীয় এলাকা পাহারা দিচ্ছিলেন। তিনি আজকে পিছু হটেন এবং অর্ধেক হারানো কালুরঘাট প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার নেতৃ্ত্বভার নেন। আমি তার সাথে যোগাযোগ করি এবং সাহায্য চাই। তিনি চট্টগ্রাম-কাপ্তাই রাস্তার মদনঘাট সেতুতে প্রধান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে যাওয়ার এবং প্রধান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ২ মাইল সামনে থেকে শত্রুপক্ষের মুখোমুখি হবার নতুন পরিকল্পনা দিয়েছিল। সাবেক কর্পোরাল করিম, যিনি একজন সাহসী মানুষ, তিনি বিভিন্ন সৈন্যের প্রায় এক কোম্পানি শক্তি নিয়ে আমার সাথে যোগ দেয়। মদনঘাট সেতুর উভয়পাশে আমি আমার স্থায়ী ও শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলি এবং সামনে থেকে শত্রুদের পাশে ও পিছনের দিকে চাপ দিতে শুরু করি।

 

একাত্তরের ৯ এপ্রিলের প্রথম প্রহরে মেজর (বর্তমানে কর্নেল) শওকত আমার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ২ মাইল সামনে থাকা শত্রুপক্ষের অন্যতম শক্তিশালী পোস্ট মন্টি ট্যানারীতে হানা দেয়ার একটি কাজ দেয় যার মাধ্যমে তিনি আমাকে সাহায্যের জন্য মর্টার ছোড়া এবং কালুরঘাটে শত্রুপক্ষের অবস্থানের উপর তার অন্যতম অপারেশনের সমন্বয় করতে চেয়েছিলেন। শত্রুপক্ষের অবস্থানের কাছাকাছি বানিয়াপাড়া ও চৌধুরীপাড়া নামে একটি গ্রাম ছিল যেটা লুকানোর জন্য ব্যবহৃত হবার কথা ছিল। গ্রামটি দৈর্ঘ্যে ৫০০ গজ ও প্রস্থে ২০০ গজ ছিল এবং এর চারপাশে বড় উন্মুক্ত জায়গা ছিল যা মন্টি ট্যানারীর শত্রুপক্ষের বন্দুকের নিশানার মধ্যে ছিল। দিনেরবেলা সেই বড় উন্মুক্ত জায়গাটি পার হয়ে গ্রামটি দখলে নেয়া সম্ভব ছিল না। একটি শক্তিশালী প্লাটুন নিয়ে একাত্তরের ৮ এপ্রিল প্রথম প্রহরের আগে এটা দখলে আনি এবং সারাদিন বসে সন্ধ্যা হবার জন্য প্রার্থনা করছিলাম। সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ যে শত্রুপক্ষ আমাদের অবস্থান ধরে ফেলেনি। অন্যথায় তারা খুব সহজেই আমাদের ঘিরে ফেলে হত্যা করতে পারতো। সন্ধ্যায় আমরা আমাদের লক্ষ্যের চেয়ে ৫০-১০০ গজ দূরত্বের কাছাকাছি চলে আসলাম। ১০-১২ জন সৈন্যকে আমরা একটা সেনাবাহিনীর গাড়ি থেকে নামতে দেখলাম। যেহেতু দিনেরবেলা লক্ষ্যবস্তু থেকে সরে যাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না সেহেতু আমি শত্রুপক্ষের অবস্থা ও তাদের শক্তিমত্তা সঠিকভাবে নির্ণয় করতে পারলাম না।

 

শারীরিক আক্রমণের জন্য আমি দালানের মধ্যে প্রবেশ করি নি। কিন্তু আমরা একসাথে আমাদের সকল অস্ত্র চালানো শুরু করলাম। বিহারী ল্যান্সনায়েক সালেহউদ্দিন সাকে আমি সন্দেহ করতাম তিনি শত্রুপক্ষের পরিকল্পনা আর দালানের বিরুদ্ধে ৮৩ মিলিমিটার ব্লেন্ডিসাইড ব্যবহার করে এই অপারেশনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। ৪-৫ মিনিটের মধ্যে আমরা পিছিয়ে আসলাম। এর কিছুক্ষন পর মর্টার চালু হয় এবং কালুরঘাট থেকে গুলিবর্ষণ শুরু হয়। আমরা নিরাপদ দূরত্বে সরে এসে শত্রুপক্ষের অবস্থানের উপর শেল বিস্ফোরণ দেখলাম এবং এটা পুনঃদখলে নিলাম। চট্টগ্রামের সেই অপারেশনে প্রথম শহীদ হন অষ্টম ইস্ট বেঙলের ল্যান্সনায়েক নাইব।

 

একাত্তরের ৯ ও ১০ এপ্রিল শত্রুপক্ষ তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছিল কালুরঘাট ও মদনঘাট সেতু দখলে নেবার কিন্তু ব্যর্থ হয়েছিল। এগার তারিখে পিএনএস জাহাঙ্গীর এবং ফিল্ড আর্টিলারির একটি রেজিমেন্ট সকাল থেকে একইসাথে উভয় সাথে অস্বাভাবিক চাপ দিতে থাকে। চট্টগ্রাম-কাপ্তাই রাস্তার কোন থেকে ৩১ পাঞ্জাবের একটি অংশ সামনে থেকে চাপ দিতে থাকে। তাদেরকে আটকে রাখা আমার জন্য খুবই কষ্টসাধ্য হয়ে পড়লো। সেতুর অন্যপাশ থেকে এক প্লাটুন এনে সামনে বসানো লাগলো। শত্রুপক্ষের শেলের জন্য আমাদের কি পরিমাণ আতঙ্ক কাজ করছিল সেটা বলে বোঝানো যাবে না। কালুরঘাট সেতুতে শত্রুপক্ষ আরো চাপ দিয়ে এটা দখলে নিয়ে নিল। সাহসিকতার সাথে যুদ্ধ করা ক্যাপ্টেন (বর্তমানে ক্যাপ্টেন) শমসের মবিন চৌধুরী আঘাত পেল এবং পাকিস্তানীদের কাছে আটকা পড়লো।

 

আমাদের সৈন্যের বেশিরভাগ একটা নিরাপদ দূরত্বে সরে যাওয়া পর্যন্ত আমাকে আমার অবস্থান ধরে রাখতে বলা হয়েছিল। ২ কোম্পানি সৈন্য নিয়ে আমি এখন একা মদনঘাট সেতু ধরে রেখেছি। দুপুর দুইটার দিকে সেতুর চারপাশ থেকে এবং আমার প্রতিরক্ষার ব্যবস্থার উপর শত্রুপক্ষের জাহাঙ্গীর হতে আরো বেশি চাপ দেয়া শুরু করলো। সেতুর অপর পাশে এক কোম্পানি বেশি এবং চট্টগ্রাম শহরমুখী শত্রুপক্ষের সেতুর দিকে এক কোম্পানি এর কম সৈন্য ছিল। সেতুর অন্যপাশে আব্বাস নামে এক বেসামরিক ব্যক্তিকে পেয়েছিলাম এবং আমি ফিরে না আসা পর্যন্ত তাকে যেতে বারণ করেছিলাম। যখন আমি সেতু পার হয়ে আমার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সম্মুখভাবে চলে আসি তখনই শত্রুপক্ষ আমাদের অবস্থানকে আক্রমণ করে সেতুকে বন্দুকের নিশানার মধ্যে নিয়ে আসে।

 

যদি আমি শত্রুপক্ষকে কিছুদূর সামনে এগোতে দিতাম তাহলে তখন আমরা কখনোই নদী পার হতে পারতাম না। শত্রুপক্ষের আর্টিলারি থেকে শেল ছুড়ে আমাদের সরে যাওয়াকে বাঁধা দিতে চাচ্ছিল। সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ যে তখনই একটা ভয়ঙ্কর ঝড় শুরু হয় এবং আমি ভাবলাম আমার সামনের সৈন্যকে নৌকা দিয়ে বিকল্প পথে পিছনে নিয়ে আসার এটাই সুযোগ। দুই ঘণ্টা পর আমরা নদীর অপরপাশে আসতে পারলাম এবং কোন হতাহত ছাড়া প্রধান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সাথে যোগ দিলাম। যেহেতু সেতুটা অরক্ষিত ছিল এবং শত্রুপক্ষের শেল তখনও চলছিল তাই নদীর এই পাড়ে থাকাও সম্ভব ছিল না। তাই আমি সিদ্ধান্ত নিলাম এখান থেকে সরে গিয়ে কয়েক মাইল পিছনে উপযুক্ত জায়গায় একটি বিকল্প প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার। হঠাৎ করে আমার আব্বাসের কথা মনে পড়লো আর ভাবলাম শত্রুপক্ষের শেল দ্বারা সেই জায়গা হয়তো লণ্ডভণ্ড হয়ে গিয়েছে এবং তিনি নিশ্চয়ই সেই জায়গা অনেক আগেই ত্যাগ করেছেন। কিন্তু তারপরও সাবেক কর্পোরাল করিম ও ১৭ উইং ইপিআর এর সিপাই মানিক মিয়ার সাথে আমি সেই জায়গাটা দেখে আসার প্রয়োজন অনুভব করলাম। সেই সাহসী মানুষকে নিশ্চল পাথরের মত প্রধান রাস্তার পাশে তার গাড়ি নিয়ে দাড়িয়ে আমাদের জন্য অপেক্ষা করতে দেখাটা ছিল আমাদের কল্পনারও বাইরে। বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ জায়গায় পুরো মুক্তিযুদ্ধ জুড়েই তিনি আমার সাথে ছিলেন। তিনি এটাকেই পুরষ্কার হিসেবে গ্রহন করেছিলেন।

 

একই দিকে প্রথম প্রহরের মধ্যে মদনঘাটের কয়েকমাইল দূরে নোয়াপাড়া কলেজে আমি আরেকটি অস্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলি। রাতে শত্রুপক্ষ সেতু পার হয়নি। ১৪ এপ্রিল সকালবেলা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে আলাদা হয়ে যাওয়া আরো সৈন্যকে এদিক-সেদিক থেকে সংগ্রহ করি এবং তাদের আমার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সাথে যুক্ত করি। তাদের মধ্যে একজন ছিলেন ব্রিগেডিয়ার এম আর মজুমদারের গাড়িচালক হাবিলদার আরব আলী। চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টের পাকিস্তানি বন্দীশালা থেকে তিনি পালিয়ে এসেছিলেন। তিনি নির্দয়ভাবে প্রহৃত হয়ে অর্ধমৃত ছিলেন।

 

আমার সাঙ্ঘাতিক ভুল ছিল আমার সৈন্যদের ইপিআর এর এক সিনিয়র জেসিও এর অধীনে রেখে যাওয়া এবং সাবেক কর্পোরাল করিমকে সাথে নিয়ে কাপ্তাইয়ের পিছনের দিকে আমাদের প্রধান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অবস্থান জানতে চাওয়া যারা গতকাল চলে গিয়েছিল। কাপ্তাইয়ে পৌছার পর আমি জানতে পারলাম আমার সৈন্যরা খাগড়াছড়ি যাবার জন্য রাঙামাটির দিকে রওনা হয়েছে। আমি আমার সৈন্যদের দিগ্বিদিক ছোটাছুটি অবস্থায় খুঁজে পেলাম। শত্রুপক্ষ ইতিমধ্যে আমার অবস্থান আক্রমণ করে সবকিছু তছনছ করে দিয়েছিল। ২ কোম্পানি সৈন্যের মধ্যে আমি কষ্ট করে ২ প্লাটুন সৈন্য খুঁজে পেলাম যাদের নিয়ে আমাদের প্রধান বাহিনীর খোঁজে পিছনে সরে যেতে শুরু করলাম।

 

একাত্তরের ১৩ এপ্রিল খাগড়াছড়ি পৌছে আমি সকল অফিসার ও সৈন্যদের সাথে দেখা করলাম। মেজর (বর্তমানে ব্রিগেডিয়ার) জিয়াউর রহমান যিনি সোবহানপুর-ছাগলনাইয়া রাস্তা, কালুরঘাট-চট্টগ্রাম রাস্তা, নাজিরহাট-চট্টগ্রাম রাস্তার মত বিভিন্ন স্থানে শত্রুপক্ষকে ধরে রেখেছিলেন তিনি খাগড়াছড়ি আসেন এবং চেঙ্গী নদী দিয়ে রাঙামাটিকে সামনে থেকে ধরে রাখার একটি নতুন পরিকল্পনা আমাদের দেন। ১৪ এপ্রিল আমরা সকলে মহলছড়িতে ফিরে আসি এবং আমাদের কৌশলের প্রধান কার্যালয় তৈরী করি। সৈন্যদের পুনরায় সংগঠিত করে বিভিন্ন জায়গায় ভাগ করে দেয়া হচ্ছিল। ক্যাপ্টেন (বর্তমানে মেজর) খালেকুজ্জামান, ক্যাপ্টেন আফতাব কাদের এবং এক প্লাটুন সাথে নিয়ে মেজর (বর্তমানে ব্রিগেডিয়ার) জিয়াউর রহমান একাত্তরের ১৫ এপ্রিল ঘাগড়ার উদ্দেশ্যে রওনা হন। ইপিআর এর সুবেদার খাইরুজ্জামান, সাবেক কর্পোরাল করিম, দুইজন বেসামরিক ব্যাক্তি- একজন ছিল কেপিএম এর ক্যামিকেল ইঞ্জিনিয়ার জনার ইশাক এবং অন্যজন ছিল চন্দ্রঘোনার একজন আন্তর্জাতিক ফুটবল খেলোয়াড় জনাব মুরি, দুইজন সাহসী ছাত্র- একজন ছিল ফারুক আহমেদ এবং অন্যজন শওকত আলীর (উভয়েই বর্তমানে লেফটেন্যান্ট) সাথে এক প্লাটুন সৈন্য নেই এবং বুড়িঘাট বাজারের উদ্দেশ্যে রওনা দেই। কয়েকদিনের জন্য আমরা শত্রুপক্ষকে হানা, চোরাগোপ্তা হামলা ও হয়রানি করে তটস্থ করে রাখি। ১৭ এপিল শত্রুপক্ষের এক প্লাটুন আচমকা মোটরলঞ্চে করে ক্যাপ্টেন (বর্তমানে মেজর) খালেকুজ্জামান ও ক্যাপ্টেন আফতাব কাদেরের দ্বীপে ঢুকে পড়ে এবং হতাহতের ঘটনা ঘটায়। ১৮ তারিখ ২-৩ টি লঞ্চ নিয়ে শত্রুপক্ষের একটি কোম্পানি ক্যাপ্টেন (বর্তমানে মেজর) দ্বীপকে ঘিরে ফেলে আক্রমণ করে। অষ্টম ইস্ট বেঙ্গলের ল্যান্সনায়েক মুন্সী আবদুর রব সেই অপারেশনে সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে শহীদ হন। মিজোদের সাথে যোগাযোগ করে শত্রুপক্ষ গত কয়েকদিন ধরে তাদের উপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। তারা মহলছড়ির কাছে আমাদের টেকনিক্যাল হেড কোয়াটারে পৌছে গিয়ে অপারেশন শুরু করে। আমাদের সবাইকে ডেকে নিয়ে টেকনিক্যাল হেড কোয়াটারে পাহারা দিতে বলা হয়।

 

২৭ এপ্রিল শত্রুপক্ষ ২ সৈন্যের সাথে হাজারের বেশি মিজোদের নিয়ে আমাদের টেকনিক্যাল হেড কোয়াটারের কাছে জড়ো হয়। দুর্ভাগ্যবশত পাহারা দিতে থাকা আমাদের এক বাহিনী তাদের লুকিয়ে থাকা ধরে ফেলে। কোন বিকল্প না পেয়ে টেকনিক্যাল হেড কোয়াটারের সামনে ক্যাপ্টেন (বর্তমানে মেজর) খালেকুজ্জামানের উপর অপরিকল্পিত আক্রমণ করতে হয়। ক্যাপ্টেন খালেককে শক্তিশালী করে এক প্লাটুনসহ আমাকে মেজর শওকত পাঠায়। এইসময়ের মধ্যে আমি সেখানে গিয়ে ক্যাপ্টেন খালেককে কমবেশি চারপাশ থেকে ঘেরা অবস্থায় আবিস্কার করি। আমি আমার প্লাটুন নিয়ে ক্যাপ্টেন খালেকের পরিখাগুলো দখলে করে যুদ্ধ শুরু করি। আমার ডান সেক্টরের অধীন সুবেদার সাকবেদ আলী শত্রুপক্ষের সামনে পড়ে যায় কিন্তু ক্যাপ্টেন খালেকসহ তার কিছু সৈন্যকে মুক্ত করতে ভালো একটা চেষ্টা চালায়।দুইজন সেক্টরকে সাথে নিয়ে আমি শত্রুপক্ষের সম্মুখভাগের গুলির মধ্যে চলে আসি। জঙ্গলের মধ্য থেকে শত শত মিজোরা সবুজ পোশাকের ছদ্মবেশে আমাদের দিকে ছুটে আসছিল। বাম সেক্টরে এলএমজিধারী যোদ্ধা সিপাই (বর্তমানে নায়েক) সামনে থেকে অনেককে হত্যা করে কিন্তু তার সকল গোলাবারুদ শেষ করে চিৎকার দেয়া শুরু করে। ডান সেক্টরের একটি এলএমজি তখনো চলছিল।

 

অনেক হতাহতের পরও শত্রুপক্ষ সামনের দিকে আগানোর চেষ্টা করছিল। যখনই আমরা কিছুটা পিছিয়ে আসি তখন টেকনিক্যাল হেড কোয়াটার থেকে মেজর শওকত শত্রুপক্ষের উপর এমজি চালানো শুরু করে। আমি আমার প্লাটুনকে সৌভগ্যবশত অক্ষত অবস্থায় নিয়ে আসি এবং মেজর শওকতের সাথে যোগ দেই। আমার সেক্টর কমান্ডারের অন্যতম ইপিআর এর সুবেদার লোনি মিয়া এই অপারেশনে অভূতপূর্ব সাহসিকতার পরিচয় দেয়। শত্রুপক্ষ তাদের গতি ধরে রেখে আমাদের টেকনিক্যাল হেড কোয়াটারের উপর ৩ ইঞ্চি মর্টার ছোড়া শুরু করে। প্রতিশোধ নেয়ার জন্য আমাদের কাছে এমনকি একটা ২ ইঞ্চি মর্টারও ছিল না। আমরা দেখতে পাচ্ছিলাম পাকিস্তানি সৈন্যরা পিছন থেকে মিজোদের সামনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। শত্রুপক্ষের আগানো ঠেকানোর জন্য আমাদের সম্মুখভাগ বাম থেকে ডানে চওড়া করা এবং নিজেদের সৈন্যদের উৎসাহ দেয়া লেগেছিল। এটা ছিল আমাদের দুর্ভাগ্য যে ক্যাপ্টেন আফতাব কাদেরর ডান পাশ থেকে একটি গুলি এসে বুকের বাঁ পাশে বিদ্ধ হয় এবনহ কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তিনি শহীদ হন। আমরা আরেকজন সাহসী যোদ্ধাকে হারাই।

 

শত্রুপক্ষের ভীষণ গুলিবর্ষণের মধ্যে তার মৃতদেহ দুই ছাত্রের (বর্তমানে লেফটেন্যান্ট) সাথে রামগড়ে পাঠানো হয় এবং ডাকঘরের সামনে শ্রদ্ধার সাথে কবর দেয়া হয়। প্রথম রাতের পরই সাথে সাথে আমরা পিছিয়ে আসি। যেটেকনিক্যাল হেড কোয়াটারকে আমরা অর্ধেক মাস পর্যন্ত সুরক্ষা করে রেখেছিলাম গিয়ে দেখি সেটা আগুনে দাউ দাউ করে পুড়ছে।

 

২৮ এপ্রিল খাগড়াছড়ি হয়ে আমরা গুইমারা পৌছি এবং আরেকটা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলি। পরেরদিন আমরা রামগড়ে পিছিয়ে আসার সংকেত পাই কারণ শত্রুপক্ষ নিজেদের সৈন্যদেরকেই কারেরহাট-নাজিরহাট দিক দিয়ে একইসাথে রামগড়ের দিকে চাপ দিচ্ছিল। ৩০ তারিখ কর্নেল (বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল) আতাউল গনি ওসমানী সেখানে সম্মানজনক পরিদর্শন করে আমাদের সৈন্যদের সাথে দেখা করে এবং ২৪ ঘন্টার জন্য রামগড় ধরে রাখার নির্দেশ দেয়। রামগড়ের ৫ মাইল সামনে চিকনছড়ায় ক্যাপ্টেন (বর্তমানে মেজর) অলি তার সৈন্যসহ ছিলেন এবং আমি আমার সৈন্যদের নিয়ে ক্যাপ্টেন অলির অবস্থানের এক মাইল দূরে বাগানবাড়ির বিওপি তে অতিরিক্ত হিসেবে প্রতিরক্ষা গড়ে তুলি। শত্রুপক্ষ আর্টারীর সাহায্যে ক্যাপ্টেন অলির অবস্থান আক্রমণ করে। তিনি তার সর্বোচ্চ চেষ্টা করে শত্রুপক্ষকে আটকে রাখে এবং রামগড়ে পিছিয়ে আসে। শত্রুপক্ষ তখন আমার সামনে ছিল এবং নিয়মিত বিরতিতে চাপ দিয়ে তারা নিজেরাও বেশিসংখ্যক হতাহতের সম্মুখীন হয়।

 

একাত্তরের ২ মে সকাল দশটা থেকে বিকাল তিনটা পর্যন্ত আমরা শত্রুপক্ষকে খুব শক্তভাবেই ধরে রেখেছিলাম। তারপর তারা বড় আর্টারী ব্যবহার শুরু করে। অনেক শেল আমাদের কাছে পড়েছিল কিন্তু সৌভাগ্যবশত আমরা বেঁচে গিয়েছিলাম। পিছিয়ে আসার সময় রামগড়ের দুই মাইল সামনে মহামুনি বুদ্ধ মন্দিরে আমার এক প্লাটুন নিয়ে আমি আটকা পড়ি এবং মুক্ত হতে পারছিলাম না। অস্টম ইস্ট বেঙ্গলের সুবেদার আনোয়ার দুঃসাহসিকভাবে তার এলএমজি নিয়ে সরাসরি রাস্তায় চলে আসে এবং গুলির আড়াল করে দিয়ে প্লাটুনকে বের হয়ে আসতে সাহায্য করে। তখন আমরা রামগড়ে আমাদের নিজেদের এমজি’র তত্ত্বাবধানেই ছিলাম। একবার সুযোগ পেয়ে মেজর শওকত এমজি শেষবারের মত চালিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত আমরা বাংলাদেশের শেষ টুকরো ভূখণ্ড রামগড়কে ত্যাগ করি এবং সন্ধ্যায় সাব্রুমপাড়ি দেই।

স্বাক্ষরঃ

২৫-০৮-১৯৭৩

————————————————–

 

<৯, ২.৭, ৫৯-৮৮>

 

চট্টগ্রামের সশস্ত্র প্রতিরোধ ও প্রাসঙ্গিক কথা

সাক্ষাতকারঃ মেজর (অবঃ) রফিক-উল-ইসলাম

(মেজর (অবঃ) রফিক-উল-ইসলাম রচিত ‘লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে’ গ্রন্থ, ১৯৮১ থেকে সংকলিত। ১৯৭১ সালের মার্চে উনি ক্যাপ্টেন পদে সাবেক ইপিআর সেক্টর হেড কোয়ার্টার চট্টগ্রামে কর্মরত ছিলেন)

 

।।চরম আঘাতের সেই রাত।।

 

২৫শে মার্চ, ১৯৭১ সাল। বৃহস্পতিবার।

 

অন্যান্য দিনের মতো সকাল ৭টায় আমি অফিসে গেলাম। সেখানে পৌঁছে দেখি পশ্চিম পাকিস্তানী মেজর ইকবাল বসে আছেন। তিনি আমাকে দেখেই বললেন, “মিঃ রফিক আপনাকে দারুন ক্লান্ত দেখাচ্ছে। অনেক খাটুনি গেছে আপনার ওপর দিয়ে, কক্সবাজার গিয়ে কয়েকদিন বিশ্রাম নিন না কেন? ইচ্ছা হলে আজই যেতে পারেন। আমি কমান্ডিং অফিসারকে বলে দেব।”

 

এটা ঠিক, গত কয়েক বছরের মধ্যে আমি কোন ছুটি নেই নি। বিশ্রামের আমার খুবই প্রয়োজন ছিলো। তবু মেজর ইকবালের সেদিনের অস্বাভাবিক পীড়াপিড়ি আমার ভালো লাগলো না, বরং আমার সন্দেহকে আরও ঘনীভূত করলো। তাঁকে আমি শান্ত গলায় জবাব দিলাম, “ধন্যবাদ স্যার। কিন্তু স্যার, আপনি তো জানেন গত জানুয়ারি থেকে সব ছুটি বাতিল করা হয়েছে।”

 

“ওকথা বাদ দিন। আমি কমান্ডিং অফিসারকে বুঝিয়ে বলতে পারবো। আমার বিশ্বাস, তিনি ছুটি মঞ্জুর করবেন।” মেজর ইকবাল তবুও বলে চললেন।

 

মেজর ইকবাল যে কমান্ডিং অফিসারের একজন প্রিয়পাত্র তা আমরা সবাই জানতাম। আমাকে চট্টগ্রাম শহরের বাইরে এবং আমার সৈন্যদের সংস্পর্শ থেকে দূরে রাখার জন্যে মেজর ইকবালের এ প্রচেষ্টা আমাকে ভাবিয়ে তুললো। আমি তাঁর কথায় তাল না দিয়ে প্রসঙ্গ পরিবর্তনের জন্য বললাম, “আপনি বোধকরি জানেন, গতকাল পোর্ট এলাকায় জনতার ওপর সৈন্যরা গুলি চালিয়েছে অনেক লোক মারা গেছে।”

 

‘অনেক নয়’- যেন তেমন কিছুই ঘটেনি এমন ভাব দেখিয়ে তিনি বললেন, “মাত্র একজন কিংবা দু’জন আহত হয়েছে।”

 

এরপর তিনি মুখে কৌতুহলোদ্দিপক হাসি ফুটিয়ে বললেন, “শুনলাম শেখ মুজিবর রহমান সামরিক পদক্ষেপের প্রতিবাদে আগামী ২৭শে মার্চ হরতাল ডেকেছেন।”

 

 

“আমি এখনো শুনিনি তবে পোর্ট এলাকায় যে সৈন্যরা এলোপাতারি গুলি চালিয়েছে তার শব্দ আমাদের অফিসে বসেও শোনা গেছে।”

 

সেদিন বেলা ২টায় আমি ই-পি আর সদর দফতর ত্যাগ না করা পর্যন্ত মেজর ইকবাল সারাক্ষণ আমাকে ছায়ার মতো অনুসরণ করলেন।

 

ইয়াহিয়ার সাথে মীমাংসায় পৌঁছে গেছে বলে এ সময়ে একটা গুজব ছড়িয়ে পড়ে। তবে নির্ভরযোগ্য কোন মহল থেকে এর সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া গেলো না। সরকারী বেতার একটা রাজনৈতিক ফয়সালার আভাস দেয়া হয়। কিন্তু এ খবরের ওপরও নির্ভর করা গেলো না। বাসা থেকে সেই মুহূর্তে আমি আমার সদর দফতরে টেলিফোন করে সকল সৈন্যকে পুরোপুরি প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিলাম। তারপরে বাড়ির লনে অস্থিরভাবে পায়চারি করতে লাগলাম।

 

চট্টগ্রামের বেলা ৪টা ৩০ মিনিটের দিকে ডাঃ জাফর আমার বাসায় এলেন। লনে বসে আমরা সম্ভাব্য সবকিছু নিয়ে আলোচনা করলাম। কিন্তু তখনো ঢাকার কোন নির্ভরযোগ্য খবর আমরা পাইনি। রাত ৮টার দিকে ডাঃ জাফর ঢাকার কোন সংবাদ এসেছে কিনা জানার জন্য আওয়ামী লীগ অফিসের দিকে গেলেন। আমি আমার এক বন্ধু ক্যাপ্টেন মুসলিম উদ্দিনকে নিয়ে অন্যান্য দিনের চেয়ে একটু আগেই রাতের খাবার খেয়ে নেয়ার জন্য বাসার ভিতরে গেলাম। খাওয়া কেবল শুরু করেছি, এমন সময় একজন আওয়ামী লীগ কর্মীসহ ডাঃ জাফর আবার ফিরে এলেন। রাত তখন ৮টা ৩০ মিনিট।

 

“মনে হচ্ছে আলোচনা ব্যার্থ হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার গোপনে করাচী চলে গেলেন বলে শোনা যাচ্ছে ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট থেকে পাকিস্তানী সৈন্যরা ট্যাংক নিয়ে শহরের দিকে বেরিয়ে পড়েছে বলে খবর এসেছে।“ তারা দুজনই উদ্বেগ উৎকণ্ঠায় এতো উত্তেজিত ছিলো যে তাদের মুখ দিয়ে যেন কথা সরছিলো না।

 

“আপনি কি সত্যি সংবাদ বলছেন?” তবু আমি ডাঃ জাফরকে জিজ্ঞেস করলাম।

 

“হ্যাঁ। ঢাকা থেকেই আমরা এ খবর পেয়েছি। খবর পেয়েই আমাদের দল জনাব সিদ্দিকীর বাসায় রুদ্ধদ্বার বৈঠকে মিলিত হই। বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুসারে জনাব সিদ্দিকী আমাদেরকে অবিলম্বে আপনাকে ঢাকার সর্বশেষ পরিস্থিতি জানাতে বলেছেন এবং উপযুক্ত বেবস্থা গ্রহণ করার জন্য আপনাকে অনুরোধ জানিয়েছেন। এতগুলো কথা বলে উভয়ে একটু থামলেন এবং গভীর আশা নিয়ে আমার দিকে তাকালেন। তাদের দু’জনকেই বিষণ্ণ দেখাচ্ছিল। আমি শুনতে পেলাম, কে যেন খুব নিচু গলায় বলল, “এবার আপনার পালা।”

 

তখনও আমাদের হাত ভাতের থালায়। মুহূর্তের জন্য আমি গভীর চিন্তায় ডুবে গেলাম। ওদিকে আগ্রহী আগন্তকের স্থির দৃষ্টি আমার ওপর নিবদ্ধ।

 

সেনাবাহিনী ট্যাংক নিয়ে শহরের দিকে বেরিয়ে থাকলে নিশ্চয়ই তারা ভয়ানক কিছু ঘটাবে। সব চাইতে খারাপ কিছুর কথাই এখন আমাদের ভাবা উচিত। ৩রা মার্চ থেকেই ওরা নির্বিচারে বাঙালিদের হত্যা করেছে শুধু ২৪ শে মার্চ চট্টগ্রাম পোর্টে ২০ জনেরও বেশী লোক নিহত হয়েছে। আরো খবর পেয়েছিলাম বাংলাদেশের সর্বত্রই ওদের হত্যাকাণ্ড চলছে – ঢাকা, খুলনা, যশোর, রংপুর, সৈয়দপুর, রাজশাহীসহ আরো অনেক জায়গায় গুলি চলেছে। ২৫শে মার্চ সন্ধ্যায়ও এক বিস্ময়কর ঘটনা ঘটেছে। চট্টগ্রাম ই-পি-আর- এর দুটি ওয়্যারলেস সেটই ঢাকার পিলখানার সাথে যোগাযোগ করতে পারছিল না। এমন কোন দিন ঘটে নি। সন্দেহ আগে থেকেই গভীরতর হয়ে উঠেছিল।

 

এসব দ্রুত আমার মানসপটে ভেবে উঠলো। পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে থেকে জেনেছি, ওদেরকে কোন জায়গায় একবার লেলিয়ে দেয়া হলে হেন নৃশংসতা নেই যা ওরা করতে পারেনা। ইয়াহিয়ার আকস্মিক ঢাকা ত্যাগ, আলোচনা ব্যার্থ হওয়া এবং ক্যান্টনমেন্ট থেকে সেনাবাহিনীর বের হওয়া – সবকিছু মিলিয়ে একটা বেপরোয়া হত্যালীলার সুস্পষ্ট আভাস পাচ্ছিলাম। আরো আশংকা করছিলাম, সামরিক বাহিনীর বাঙালি সৈন্যরাও ওদের হাত থেকে নিস্তার পাবে না।

 

এ সময় নিজের ভেতর থেকেই আমি যেন এক অলৌকিক সাহস অনুভব করলাম। মনে হলো আমার ভেতর থেকে কে যেন আমাকে বলছে আমার নিজের জীবন এবং আমাদের অন্যান্যর জীবন রক্ষার জন্য এ পশুশক্তির বিরুদ্ধে অবশ্যই ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। এরপর আমি ‘হয় স্বাধীনতা অর্জন, না হয় ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যু’ এ ধরনের এক চরম সিদ্ধান্ত নিলাম। ডাঃ জাফরকে বললামঃ আমাদের ষোলশহর এবং ক্যান্টনমেন্টে গিয়ে বাঙালি সৈন্যদেরকে আমাদের সঙ্গে যোগ দিতে বলুন। তারপর রেলওয়ে হিলে আমার সদর দফতরে দেখা করবেন।

 

খাওয়া থেকে উঠেই আমি হালিশহর ই-পি-আর দফতরে ফোন করলাম। সেখানে বাঙালি জেসিও’রা আমার নির্দেশের অপেক্ষাতেই ছিলেন। তাঁদেরকে বললাম, এক্ষুনি সব ফাঁড়িতে দ্বিতীয় সাংকেতিক বার্তাটি পাঠিয়ে দিন। অস্ত্রাগার নিয়ন্ত্রণে রাখবেন। পাকিস্তানী সৈন্যদের রুম থেকে বের হতে দেবেন না। নৌ- বাহিনী সদর দফতরের দিকে থেকে হামলা হতে পারে। সেদিকে প্রতিরক্ষামুলক কিছু সৈন্য মোতায়েনের ব্যবস্থা করুন। আমি আসছি।

 

রাত তখন ৮টা ৪৫ মিনিট। আমি শেষবারের মত আমার সারসন রোডস্থ বাসভবন ত্যাগ করলাম। আমাদের প্রথম লক্ষস্থল ওয়ারলেস কলোনীর দিকে আমাদের গাড়ী ছুটে চললো। আমার পাশে ড্রাইভার কালাম এবং পেছনের সিটে দুজন রক্ষী। তীব্র উত্তেজনায় সবাই ঠোঁট কামড়াচ্ছিলো। রাস্তা জনমানবশূন্য। আমাদের গাড়ী যতই আয়ারলেস কলোনির এগচ্ছিলো, উত্তেজনা ততই বাড়ছিলো। একটা সরু রেল ক্রেসিংয়ের ওপর আসতেই জীপ একটু লাফিয়ে উঠলে আমার চিন্তায় ছেদ পড়লো। আমি সম্বিৎ ফিরে পেলাম। এখান থেকে আমি ওয়ারলেস স্টেশনের এনটিনা দেখতে পাচ্ছিলাম। নিরাপত্তামুলক ব্যবস্থা হিসাবে আয়ারলেস স্টেশনের চারদিকে ছিল কাটা তারে ঘেরা।যাতে কেউ সন্দেহ করতে না পারে সেজন্য আমি ড্রাইভারকে গাড়ী আস্তে চালাতে বললাম। আমাদের এখানকার সাফল্য ছিলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তামুলক ডিউটিতে নিযুক্ত ই-পি-আর-এর একটি প্লাটুনের মোকাবিলা করতে হবে আমাদের ৪ জনকে ওদেরকে নিরস্ত্র করতে হবে। আমার রেকর্ড অনুযায়ী পশ্চিম পাকিস্তানী ক্যাপ্টেন হায়াত এবং সুবেদার হাসমত এই প্লাটুনের কমান্ডে ছিলেন। বাকী সেনারা সবাই ছিলো বাঙালি। আমাদের জানামতে এখানে আরো তিনজন পশ্চিম পাকিস্তানী সৈন্য ছিলো। অনুরুপভাবে নগরীর অন্যান্য এলাকাতেই ই-পি-আর প্লাটুন অবস্থান করছিলো। তবে আয়ারলেস কলোনীর এই প্লাটুনটিই শুধু পশ্চিম পাকিস্তানী অফিসারের কমান্ডে ডিউটিরত ছিলো।

 

গেটে পৌঁছতেই প্রহরারত শান্ত্রি জীপ থামিয়ে দিলো। বাঙালি শান্ত্রি প্রহরারত ছিলো। সে আমার জীপটি ভেতরে যাবার অনুমতি দিলো। আমরা ক্যাপ্টেন হায়াতের রুমের সামনে গিয়ে জীপ থামালাম। সেখানেও একজন শাস্ত্রী পাহারা দিচ্ছিলো।

 

সাবধানে আমি হায়াতের কক্ষের দিকে এগিয়ে গেলাম। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে মারাত্মক কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে, হয় সফল হবো, না হয় আমার মাথা ভেদ করে একটা বুলেট বেরিয়ে যাবে। শেষেরটি সত্যি হলে চট্টগ্রামের ই-পি- আর সেনা পরিচালনা করতে আর কোন বাঙালি অফিসার থাকবে না। এই চিন্তা আমাকে কিছুটা বিহবল করে তুললো ক্ষণিকের জন্য।

 

আমি খুব আস্তে দরজায় নক করলাম এবং বন্ধুসুলভ গলায় বললাম। “হ্যালো হায়াত ঘুমিয়ে পড়েছো নাকি?”

 

“এই কেবল শুয়েছি স্যার।“ আমার গলায় স্বর চিনতে পেরে সে আলো জ্বালালো। জানালার পর্দার ফাক দিয়ে আমি দেখলাম বালিশের তলা থেকে কি যেন একটা নিয়ে সে তার শোবার পোশাকের নিচে রাখছে। দরজা খোলার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, “সব কিছু ঠিকঠাক আছে তো।”

 

“সব ঠিকঠাক হ্যাঁয়” জবাব দিয়েই সে দরজা খুললো।

 

“প্লিজ ভেতরে আসুন স্যার, এবং-”

 

তার কথা শেষ না হতেই আমি স্টেনগান তার বুকের দিকে ধরে বললাম, “আমি দুঃখিত হায়াত, তোমাকে গ্রেফতার করতে হচ্ছে।“ হঠাৎ সে তার পিস্তল বের করার উদ্যোগ নিতেই ড্রাইভার কালাম দ্রুত এগিয়ে আসে এবং দুজনেই হায়াতের মাথায় আঘাত করি। সাথে সাথে আমরা তার হাত ও মুখ বেধে ফেললাম এবং টেলিফোনের তার কেটে দিলাম। তারপর পাশের ব্যারাকে ঘুমন্ত সুবেদার হাসমতকে ডেকে আনার জন্য লোক পাঠালাম। সুবেদার হাসমত চোখ মুছতে মুছতে উঠে এসে স্যালুট দিয়ে দাড়াতেই কালাম এবং অন্য প্রহরিরা তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লো। হাসমতকে আটক করে তার হাত ও মুখ বেঁধে ফেলা হলো।

 

হায়াতের রুমের সামনে দাঁড়ানো শাস্ত্রীটি এতক্ষন হতভম্ব হয়ে এইসব অদ্ভুত ঘটনা দেখছিল। হঠাৎ কি মনে করে সে একটি টিলার দিকে দৌড় দিলো। কালাম ফিসফিস কণ্ঠে বললে, ও পশ্চিম পাকিস্তানী এবং পড় মুহূর্তেই একটি বুলেট সাঁ করে চলে গেলো। আমরা নিচু হয়ে বসে পড়লাম। ব্যারাকগুলো থেকে সৈন্যরা বেরিয়ে পড়তে লাগলো। যথাসম্ভব স্বাভাবিক গলায় আমি বললাম, শান্ত্রি ভুল করে গুলি ছুঁড়েছে। তারপর সবাইকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ানোর নির্দেশ দিলাম। অন্য তিনজন পশ্চিম পাকিস্তানী সৈন্য আত্মসমর্পণ করলো। যে শান্ত্রি গুলি ফেলে পালিয়ে গেলো। এই প্লাটুন থেকে আমি ১০ জন সেনাকে রেলওয়ে হিলে আমার সম্ভাব্য সমর- দফতর রক্ষা করার জন্য পাঠালাম। অন্যদেরকে হালিশহরে আমার সঙ্গে যোগ দেয়ার নির্দেশ দিলাম। বিচ্ছিন্ন প্লাটুনগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য বিভিন্ন দিকে কয়েকজন বার্তাবাহককে পাঠালাম এবং চূড়ান্ত নির্দেশের জন্য সবাইকে অবিলম্বে হালিশহরে আমার সঙ্গে দেখা করার নির্দেশ দিলাম।

 

অত্যন্ত সাফল্যের সঙ্গে একটি দুঃসাধ্য কাজ সমাধা হলো। ড্রাইভার কালাম এবং দুজন প্রহরীকে ধন্যবাদ, তারা জীবন বিপন্ন করে এ কাজে সহায়তা করেছে।

 

রাত সাড়ে নটায় আমরা হালিশহরে পৌঁছলাম। ড্রাইভার কালামকে সতর্ক করে আলো নিভিয়ে দিয়ে গাড়ী আস্তে চালাবার নির্দেশ দিলাম। হালিশহরে জেসিও এবং এনসিওরা আমরা জন্য অপেক্ষা করছিলো। তিনটি অস্ত্রাগাড়ের সবকটিই আমাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে ছিলো। বাঙালি এনারা যার যার অস্ত্রাগারের সামনে অস্ত্র ও গুলির জন্য সমবেত হয়েছে। মাত্র একমাস আগে আমরা থ্রি-নট- থ্রি রাইফেলের পরিবর্তে বিপুল পরিমান চীনা হাতিয়ার ও গোলাগুলি পেয়েছিলাম। এগুলো মিলিয়ে আমাদের মজুত ছিলো উদ্বৃত্ত, যুগ পরে খুবই কাজে লেগেছিলো।

 

হালিশহরের কাজটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এখানে ছিল ৩০০ পশ্চিম পাকিস্তানী-ই-পি-আর সৈন্য। এদের মধ্যে অধিকাংশই ছিলো সিনিয়র জেসিও এবং এনসিও। নিঃশব্দে এদের পরাভূত করতে হবে কেননা আমার সদর দফতরের চারপাশের এলাকায় ছিলো অবাঙালিদের ঘন বসতি। এছাড়া বেশ কিছুসংখ্যক কমান্ডে সেসব অবাঙালির সঙ্গে বসবাস করছে বলে আগেই খবর পেয়েছিলাম এবং কমান্ডে ও অবাঙালিরা সবাই ছিলো পুরোপুরি অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত। কাজেই এখানে কোন শব্দ হলে গোটা ব্যাপারটা পণ্ড হয়ে যাবে।

 

অস্ত্রাগার আমাদের কব্জায় থাকায় আমরা সুবিধাজনক অবস্থায় ছিলাম। শুধু একটি মাত্র বিপদ ছিলো, কেউ যদি গোপনিয়তা ফাঁস করে দেয় তাহলে চট্টগ্রাম সেনানিবাস থেকে নৌবাহিনী সদর দফতর থেকে পাকিস্তানী বাহিনী আমাদের প্রচেষ্টা বানচাল করতে ছুটে আসতে পারে।

 

আমরা প্রথমে সমগ্র এলাকা ঘেরাও করে ফেললাম যাতে কোন পশ্চিম পাকিস্তানী পালাতে না পারে। এরপর শুরু হলো শত্রু সৈন্যদের গ্রেফতারের পালা।

 

মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহে অনেক বাঙালি জেসিও এবং এনসিওকে সীমান্ত এলাকায় পাঠিয়ে চট্টগ্রামের ই-পি-আর সদর দফতরে পশ্চিম পাকিস্তানীদের মোতায়েন করা হয়েছিলো। চট্টগ্রামের ই-পি-আর কমান্ডার ছিলেন লেঃ কর্নেল আবদুল আজিজ শেখ। নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করার জন্য ঢাকার নির্দেশে তিনি এই ব্যবস্থা করছিলেন।

 

এই সব বদলী ইত্যাদির ব্যাপারে প্রথমে আমি খুবই চিন্তিত হয়েছিলাম। পরে দেখলাম যে, এটা আমার পরোক্ষ উপকারেই লেগেছে। কারণ, এক জায়গায় এতগুলো শত্রু সৈন্য পাওয়া কম সৌভাগ্যের কথা নয়।

 

আমি কৌশলে অস্ত্রাগারে বাঙালিদের মোতায়েন রাখার ব্যবস্থা করেছিলাম। দিনের বেলা আমি শুধু বাঙালি সেনাদের চুলকাটা, পোশাক ও আচরণ পরীক্ষা করে দেখতাম। এদেরকে সংশোধনের অছিলায় শাস্তি হিসাবে অস্ত্রাগার প্রহরার অতিরিক্ত ডিউটি দিতাম। অধিকাংশ ক্ষেত্রে রাতের এই ডিউটি পড়তো। ফলে অস্ত্রাগারের কাছে আর কোন পশ্চিম পাকিস্তানীর থাকার দরকার হতো না। আমার এই ব্যবস্থা খুবই কাজে লেগেছিলো।

 

তখন রাত ১০টা। আমি আমার অফিসের বারান্দায় অস্থিরভাবে পায়চারি করছি। ভীষণ ক্ষুধা বোধ করছিলাম। উত্তেজনায় গলা শুকিয়ে যাচ্ছিল। পানি চেয়ে পর পর দুগ্লাস খেয়ে দেখলাম। সৈন্যদের ইতিমধ্যে অস্ত্রশস্ত্র দেয়া হয়ে গেলো। নৌ-বাহিনীর সদর দফতর থেকে কোন হামলা হলে তা প্রতিরোধ করার জন্য দুটি প্লাটুন এর মধ্যেই সেদিকে পাঠানো হয়েছিলো। আমি পশ্চিম পাকিস্তানীর সবচাইতে সিনিয়র জেসিও সুবেদার মেজর ইতবার এর অপেক্ষা করছিলাম।

 

কোনরুপ সন্দেহ না করেই সুবেদার মেজর আমার অফিস রুমে প্রবেশ করলেন। আমি তাকে বসতে বললাম। তারপর বললাম, “সুবেদার- মেজর সাহেব, আপনি তো ঘুমাচ্ছিলেন। শহরে কি ঘটেছে জানেন কিছু ?”

 

“না স্যার”- সরলভাবেই তিনি জবাব দিলেন। আসলেও তিনি কিছু জানতেন না। তিনি শুধু দেখছেন যে, সৈন্যরা অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হচ্ছে এবং তিনি এটাকে আমার নেতৃত্বে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ডিউটির অঙ্গ বলে মনে করেছিলেন। পাকিস্তানী কর্তৃপক্ষ গণহত্যা পরিকল্পনার কঠোর গোপনীয়তা রক্ষা করায় ব্রিগেডিয়ারের নিচের পদের খুব কমই এ ব্যাপারে জানাতে পারে। মাত্র কয়েকজন লেফটেন্যান্ট কর্নেল এ ব্যাপারে জানতে পেরেছিলেন। এ কড়াকড়ি গোপনীয়তা প্রকারান্তরে আমাদেরি কাজে লেগেছিলো।

 

সুবেদার- মেজর হঠাৎ চোখ কচলে দেখলেন পাশের বিশ্রাম কক্ষ থেকে চারজন সৈন্য বেড়িয়ে এসে রাইফেলের বেয়োনেট তাঁর বুকের ওপর ধরেছে। আমি তখন দৃড়কণ্ঠে বললাম’ “সুবেদার- মেজর সাহেব, আপনাকে গ্রেফতার করা হলো। চিৎকার কিংবা পালাবার চেষ্টা করলেই প্রাণ হারাবেন।

 

তাঁর হাত বেঁধে বিশ্রাম কক্ষে নিয়ে যাওয়া হলো। এভাবেই অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে সকল পশ্চিম পাকিস্তানী জেসিওকে গ্রেফতারের পালা শেষ হলো। এ গোপনীয়তা রক্ষা না করলে আমাদের সমস্ত পরিকল্পনা ভেস্তে যেতো। এ ক্ষেত্রে আমাদের অবস্থান সুদৃঢ় হবার আগেই পাকিস্তান সেনাবাহিনী কিংবা নৌবাহিনীর লোকেরা আমাদের আক্রমন করে বসতো।

 

এর কিছু পরেই ই-পি-আর সিগন্যাল কোম্পানির দায়িত্বে নিয়োজিত আবাঙ্গালি জেসিও সুবেদার মোবিনকে আমার কক্ষে ডাকলাম। ইতিমধ্যে পশ্চিম পাকিস্তানী ই-পি-আর সেনারা কিছু একটা ঘটেছে বলে আঁচ করে ফেলে। কিন্তু নিরস্ত্র অবস্থায় তাদের আর কিছু করার ছিলো না। কেননা, গোটা এলাকা আমাদের সৈন্যরা আগেই ঘেরাও করে ফেলেছিলো।

 

সুবেদার অফিসে ঢুকতেই দেখি সে খুব আতঙ্কিত। ঠিক এ সময়ে মেজর ইকবালের টেলিফোন এলো। আমি রিসিভার তুলে ধরতেই ওপাশ থেকে তিনি বললেন, হ্যালো রফিক এতো রাতে ওখানে কি করছেন ?

 

“এখানকার গার্ডরা সতর্ক আছে কিনা, দেখতে এসেছি।“

 

“আচ্ছা। মুহূর্তের জন্য তিনি থামেন, তারপর হঠাৎ প্রশ্ন করেন, সুবেদার মোবিন কোথায় ?”

 

“তিনি হয়তো রুমে ঘুমাচ্ছেন। কথা বলবেন তাঁর সাথে?”

 

“হ্যাঁ, দয়া করে টেলিফোনটা তাকে দিন না।”

 

“আমি এক্ষুনি তার কাছে লোক পাঠাচ্ছি। তিনি এলেই আপনাকে ফোন করতে বলবো।“ সন্দেহ নিরসনের জন্য আমি আরো কিছুক্ষন তার সাথে আলাপ চালিয়ে যাই, “সৈন্যরা ডিউটি দিচ্ছে কিনা তা কয়েকটি জায়গায় দেখে এসেছি, সবকিছু ঠিক আছে।“

 

এরপর হঠাৎ তার প্রশ্ন শুনে ধাক্কা খেলাম। “কিন্তু ক্যাপ্টেন হায়াতের টেলিফোন কেউ ধরছে না কেন ?”

 

“ওহ! ওর টেলিফোনটা খারাপ। এইমাত্র ওর ওখান থেকে এলাম। সুন্দর এক কাপ চা খাওয়ালো।”

 

“ইয়ার! কভি হামকো ভি লে চলো চায়ে পিনে কে লিয়ে। মেজর ইকবাল বললেন।”

 

“কালকেই নিয়ে যাব।”

 

এরমধ্যে চারজন সিপাই সুবেদার মোবিনকে বেঁধে ফেললো। বাইরের কেউ জানতেও পারলো না আমার রুমে কি ঘটেছে। মেজর ইকবাল রেখে দিলেন। আমি বেয়োনেট চেয়ে নিয়ে সুবেদার মেজরের গলায় ধরে বললাম, “আমার অধীনে এতদিন কাজ করে নিশ্চয়ই বুঝেছেন আমি কেমন। এখনই মেজর ইকবালের সাথে আপনাকে কথা বলতে হবে- আমি যেভাবে বলবো ঠিক সেইভাবেই জবাব দিয়ে কথা না বললে মেরে ফেলবো। বুঝতে পারছেন ?”

 

ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে আমার কথায় তিনি সম্মতি জানালেন। আমি ইকবালের নম্বরে ডায়েল করে সুবেদার মোবিনের কানের কাছে রিসিভার ধরলাম।

 

“হ্যালো স্যার, আমি সুবেদার মোবিন বলছি।”

“মোবিন সাহেব, আপনার কাছে আর কেউ আছে কি?” মেজর ইকবাল প্রশ্ন করেন। আমি মাউথ পিসে হাত চারা দিয়ে মোবিনকে বলতে বললাম। বলুন এখানে কেউ নেই। সুবেদার আমার নির্দেশ মত তাই বললেন।

 

“কিন্তু ক্যাপ্টেন রফিক তো ওখানে ছিলেন, কোথায় গেলেন তিনি।“ এবারও আমি টেলিফোন চেপে ধরে তাকে যেভাবে বলতে বললাম তিনি সেভাবেই জবাব দিলেন, “ক্যাপ্টেন রফিক এই মাত্র সুবেদার মেজর ইতবারকে নিয়ে কোথায় যেন বেড়িয়ে গেলেন।“

 

“কোই গড়বড়?”

 

“না স্যার। সব কিছু ঠিকঠাক হ্যাঁয়।“ সুবেদার মোবিন অত্যন্ত অনুগত জবাব দিলেন।

 

“বহুত আচ্ছা। আজ রাতের জন্য আপনিই ডিউটি অফিসার। টেলিফোনের পাশেই অপেক্ষা করবেন। চারদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখবেন।“

 

“ঠিক হ্যাঁয় স্যার-“

 

বিরাট একটা দুশ্চিন্তা কেটে গেলো। বন্দী সুবেদার মোবিনের প্রহরায় একজন বাঙালি জেসিওকে রাখা হলো যাতে সে আর টেলিফোনে কিছু উল্টাপাল্টা বলতে না পারে।

 

রাত ১০টা ৪৫ মিনিটের দিকে সিনিয়র বাঙালি জেসিও সুবেদার জয়নাল খবর দিলেন যে, কাজ শেষ হয়েছে। এর মধ্যে আমরা চট্টগ্রাম শহরে ই-পি-আর এর সকল পশ্চিম পাকিস্তানী সৈন্য আটক করতে সক্ষম হলাম। সীমান্ত ফাঁড়িগুলোতেও আমার সাংকেতিক বার্তা দুটি পৌঁছে গেছে বলে খবর পেলাম। বার্তা দুটি পেয়েই রাত ৮টা ৪০মিনিট থেকে ৯টা ৩০মিনিটের মধ্যে তারা সব ফাঁড়ির পশ্চিম পাকিস্তানী সৈন্যদের পরাভুত করা হয়। ২৪শে মার্চের রাতে যখন আমি দ্বিতীয় বার্তাটি স্থগিত রাখতে বলি, সে নির্দেশ পাওয়ার আগেই প্রথম নির্দেশ অনুযায়ী কয়েকটি ফাঁড়িতে বাঙালি সেনারা কাজ সমাধা করে ফেলে। পরে অবশ্য দ্বিতীয় বার্তাটি স্থগিত হয়ে গেল তারা আর চট্টগ্রামের দিকে রওনা হয় নি।

 

২৫শে মার্চ রাতে দ্বিতীয় বার্তায় চূড়ান্ত নির্দেশ লাভের পর অনেক সেনাদলই চট্টগ্রামের দিকে রওনা হয়ে পড়ে।

এদিকে চট্টগ্রাম শহরের বিচ্ছিন্ন প্লাটুনগুলো খবর পেয়ে লড়াই কেন্দ্রগুলোর দিকে এগোচ্ছিলো। শুধু বিমানবন্দরের প্লাটুনটির সঙ্গে যোগাযোগ করা গেল না। এটা আমার জন্য খুবই বিপদের কারণ ছিলো। কেননা, পরিকল্পনা মোতাবেক শত্রুরা যাতে বিমান বন্দর ব্যাবহার না করতে পারে তার দায়িত্ব ছিলো এই প্লাটুনের ওপর। এখান দিয়ে সৈন্য আনা-নেয়া বন্ধ করতে পারলে বিমান বন্দর, পোর্ট এবং নৌ-বাহিনীর সদর দফতরসহ সমগ্র এলাকায় আমাদের নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠা সহজতর হতো। বিমানবন্দরের টেলিফোন এক্সচেঙ্গ অপারেটরকে গোপনে চব্বিশ ঘণ্টা লাইন চালু রাখার জন্য নির্দেশ দিয়েছিলাম। কিন্তু ২৫শে মার্চ সন্ধার পরই নৌ-বাহিনীর সদর দফতরের সৈন্যরা গোপনে বিমানবন্দরে গিয়ে পুরো প্লাটুনের লোকদের গ্রেফতার করে ফেলে। ফলে এখানে আমাদের বড় একটা ক্ষতি হয়ে যায়।

 

উপকূলীয় বাধ বারবার শত্রু সৈন্যর চলাচল প্রতিরোধ করার জন্য দুটি প্লাটুনকে পাঠানো হলো। একটি কোম্পানি রেলওয়ে হিল প্রতিরক্ষা দায়িত্বে রইলো। প্রায় ১০০ সৈন্যকে দুই অথবা তিনজনের ছোট ছোট দলে ভাগ করে আগ্রাবাদ রোড এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ এলাকার মোড়ে মোড়ে লড়াইয়ের জন্য মোতায়েন করা হলো। বাকী সৈন্যদের হালিশহরেই সংরক্ষিত রাখ হলো- যাতে কোথাও বিপদ দেখা দিলে তারা সেদিকে যেতে পারে। রামগড়ের সৈন্যদের কাছে পাঠানো বার্তায় তাদেরকে ফেনী নদীর ওপর শুভপুর সেতু ধ্বংস করে সেখানে একটি কোম্পানিকে প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থায় অবস্থান গ্রহণ করতে এবং অবশিষ্ট সৈন্যদেরকে প্রধান সড়ক দিয়ে চট্টগ্রাম চলে আসতে বলা হয়েছিল।

 

হালিশহর ত্যাগের আগে বন্দিদের একটি ভবন কঠোর প্রহরাধীনে রাখার এবং “শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ” করে যাওয়ার জন্য নির্দেশ দিয়ে রাত ১১ টা ৪৫ মিনিটের মধ্যে আমি রেলওয়ে হিলের সদর দফতরে পৌঁছলাম। এখানে পৌঁছে নৌ- বাহিনীর সদর দফতর, পোর্ট এলাকা এবং বিমানবন্দরের ওপর আক্রমন চালানোর উদ্দেশ্যে সীমান্ত এলাকার সৈন্যদের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। আমি ভেবেছিলাম ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টার এবং ষোলশহরে মোতায়েন ৮ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙালি সৈন্যরা ক্যান্টনমেন্ট দখল করতে সক্ষম হবে। রেজিমেন্টাল সেন্টারের কমান্ডে ছিলেন লেঃ কর্নেল চৌধুরী এবং ৮ইষ্ট বেঙ্গল ছিলেন মেজর জিয়াউর রহমান। এ দু’জায়গায় বাঙালি সৈন্যদের সংখ্যা ছিলো প্রায় ২০০০ এবং পশ্চিম পাকিস্তানী সৈন্য ছিলো আনুমানিক ৪০০।

 

রাত তখন ১১টা ৩০মিনিট। হঠাৎ ২০ বালুচ রেজিমেন্টের সৈন্যরা বারাক থেকে বেড়িয়ে ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টারের বাঙালি সৈন্যদের ওপর হামলা চালালো। অস্ত্রাগারের গার্ডদের হত্যা করে প্রথমে তারা সেগুলো দখল করে। অন্যান্য বাঙালি সৈন্য তখনও ঘুমিয়ে ছিলো। অস্ত্রাগার দখলের পরই পাকিস্তানী সৈন্যরা নির্বিচার হত্যালীলায় মেতে উঠে। সে রাতে তারা এক হাজারেরও বেশি বাঙালি সৈন্যকে হত্যা করে। এরপর তারা বাঙালি সৈন্যদের আবাসিক কোয়াটারগুলোতে ঢুকে পড়ে এবং অস্ত্রের মুখে যাকে পায় তাকেই হত্যা করতে থাকে। নারী ও শিশুদের বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে মারা হয়।

 

এই হত্যালীলা থেকে যেসব বাঙালি সৈন্য জীবন রক্ষা করতে পেরেছিলো তারা চারদিকে দৌড়াতে শুরু করে। কেউ কেউ আমার দফতরে এসে সেই লোমহর্ষক ঘটনার বিবরণ দেয়। অন্যরা ষোলশহরস্থ ৮ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের দিকে ছুটে যায়। এই রেজিমেন্টের অধিকাংশ অফিসার এবং সকল সৈন্য ছিল বাঙালি।

 

কিছুসংখ্যক সৈনিক ক্যান্টনমেন্ট থেকে পালিয়ে ষোলশহর ৮ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সঙ্গে রাত প্রায় একটার দিকে যোগাযোগ করে সেনানিবাসে আক্রান্ত বাঙালি সৈনিক এবং তাদের পরিবারবর্গ প্রাণ রক্ষায় এগিয়ে যাবার জন্য তাদেরকে অনুরোধ জানায়। সেই ভয়াবহ রাতে বাঙালি অফিসার ক্যাপ্টেন এনাম সেনানিবাস থেকে পালাতে সক্ষম হয়েছিলেন।

 

ইতিমধ্যে রেলওয়ে হিলে প্রতিরক্ষায় আমার ই-পি-আর প্লাটুনগুলোর সুসংগঠিত করে যুদ্ধ পরিচালনার জন্যে এই পাহাড়েরই একটিন আবাসিক ভবনের নিচতলায় আমার সদর দফতর স্থাপণ করলাম।

 

এই ভবনের রেলওয়ে অফিসারদের কয়েকটি পরিবার বাস করতেন। রেলওয়ে হিলে অবস্থান নিতেই সেখানকার অফিসার এবং তাদের পরিবারবর্গ অত্যন্ত উৎসাহের সঙ্গে আমাদের সাহায্য করতে এগিয়ে এলেন। তারা গাড়ি থেকে আমাদের জিনিসপত্র নামাতে পাহাড়ের উপর আত্মরক্ষামূলক ট্রেঞ্চ খুঁড়তে, নতুন টেলিফোন লাইন স্থাপণ করতে এবং আমাদের সৈনিকদের খাবার তৈরিতে প্রভূত সাহায্য করেন।

 

আগেই কোথায় কোথায় ট্রেঞ্চ খুঁড়তে হবে তা দেখে রেখেছিলাম এবং কয়েকজন জেসিওকে স্থানগুলো গোপনে দেখিয়েছিলাম। সৈনিকরা যথাস্থানে ট্রেঞ্চ খুঁড়ছে কিনা তা দেখার জন্য রেলওয়ে হিলের চারদিক ঘুরলাম। পূর্বনির্ধারিত পাহাড়ের ঢালে ৩ ইঞ্চি মর্টার স্থাপণ করা হলো। রেলওয়ে হিলে আরও কয়েকটি ভবনে বহুসংখ্যক অফিসার তাদের পরিবারবর্গকে অন্য কোন নিরাপদ স্থানে পাঠিয়ে দেয়ার জন্য অনুরোধ জানালাম। আমাদের কথামত অফিসারদের পরিবারবর্গকে অন্যত্র নিরাপদ স্থানে পাঠিয়ে দেয়া হলেও অধিকাংশ রেলওয়ে অফিসার এবং তাদের বয়স্ক পুত্রসন্তান ও পুরুষ আত্মীয়রা পাক সেনাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে আমাদের সাহায্য করার জন্য পাহাড়েই থেকে গেলেন। ইতিপূর্বে খবর পেয়েছিলাম চট্টগ্রামের সকল সীমান্তবর্তী ফাঁড়ির ই-পি-আর সৈনিকরা আবাঙ্গালি সৈন্যদের নিরস্ত্র করে আমার সঙ্গে পাক সেনাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যোগ দেয়ার জন্য শহরের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এদিকে কেবলমাত্র নৌ-সদর দফতর এবং সেনানিবাস ছাড়া সমগ্র চট্টগ্রাম শহর এলাকা, হালিশহরস্থ ই-পি-আর লাইন এবং ই-পি-আর সদর দফতর তখন আমাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রনে। আমি ভেবেছিলাম ৮ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট এবং ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টারের সৈনিকদের নিয়ে মেজর জিয়া এবং লেঃ কর্নেল চৌধুরী সেনানিবাস আক্রমন করবেন এবং আক্রমণে নিশ্চয়ই তারা সফলতা অর্জন করবেন। পাক সেনাদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র কার্যক্রম গ্রহণের উদ্দেশো রাত ৮টা ৩০ মিনিটে যখন আমি সারসন রোডের বাসভবন ত্যাগ করি তখনই ডাঃ জাফর এবং জনাব কায়সারকে বলেছিলাম ৮ ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টকে তারা যেন খবরটি জানিয়ে দেন। তারা আমার যুদ্ধ শুরু করার কথা এই রেজিমেন্টকে জানিয়েছিলেন। বলা প্রয়োজন যে, ঐ রাতে প্রায় ২ ঘণ্টা সময়ের মধ্যে হালিশহর এবং চট্টগ্রাম নগরীর অন্যান্য এলাকায় ৫০০ অবাঙ্গালি সৈনিক, জেসিও এবং কয়েকজন ই-পি-আর অফিসারকে আমরা নিরস্ত্র করতে পেরেছিলাম। আমার অধীনস্থ ই-পি-আর সৈনিক ও জেসিওদের সাহসিকাপূর্ণ কার্যক্রমের পূর্ণ গোপনীয়তা সুস্ঠ পরিকল্পনা জন্যই অবাঙ্গালি সৈনিক ও অফিসারদের নিরস্ত্র করা সম্ভব হয়েছিলো।

 

প্রাথমিক সাফল্যের পর রাত ১১টা ৪৫ মিনিটের দিকে আমি ৮ ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট এবং ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টারের সৈনিকদের সাফল্যের খবর শোনার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলাম আর ভাবছিলাম নিশ্চয়ই তারাও ২০ বালুচ রেজিমেন্টাক ইতিমধ্যে নিরস্ত্র করতে পেরেছেন। প্রাথমিক সাফল্যের পর পরই সদর দফতর এবং বিমানবন্দর দখলের জন্যে আমি আমার সীমান্ত ফাঁড়ির ই-পি-আর সৈনিকদের আগমন অপেক্ষায় উন্মুখ ছিলাম।

 

ইত্যবসরে আমি বেতার কেন্দ্র, টেলিফোন একচেঞ্জ আক্রমন ও দখল করার উদ্দেশ্যে আমার সৈন্যদের পাঠালাম। আমার এই রেলওয়ে হিল দফতরের ঠিক উল্টোদিকেই ছিলো নৌ-বাহিনীর যোগাযোগ কেন্দ্র। এখান থেকে পরিস্কার দেখা গেলো কয়েকজন পাকিস্তানী নৌ-সেনা ওখানে ঘোরাফেরা করছে। ঠিক এই সময়ে নৌ- বাহিনীর একটি গাড়ি আগ্রাবাদের দিকে এগিয়ে গেলো। আমার মর্টার জেসিও সুবেদার আইজুদ্দিন গাড়ি দেখেই তাঁর অবস্থান থেকে দৌড়ে এসে বললো- “স্যার, গাড়ীতে কয়েকজন নৌ-সেনা রয়েছে। দেবো নাকি শেষ করে ?”

 

আমি বললাম, “না এখন নয়। এটা বোধ হয় পর্যবেক্ষণ গাড়ী। রাস্তা পরিস্কার আছে কিনা দেখার জন্য এসেছে। মনে হয় সৈন্যদের আরো বড় দল এই রাস্তায় আসবে। সেই লক্ষ্য বস্তই হবে আমাদের জন্য উত্তম। একসঙ্গে অনেক লোককে পেয়ে যাবো।“ একটু পরেই আরেকটি গাড়ী একই পথে চলে গেলো। কিন্তু সৈন্যদের বড় দলটি আর এলো না। মিনিট দশেক পর দুটি গাড়ীই ফিরে এলো এবং ক্যান্টনমেন্টের দিকে চলে গেলো।

 

পরবর্তীকালে জানতে পেরেছিলাম, প্রথম গাড়ীতে করে মেজর জিয়া পোর্টের দিকে যাচ্ছিলেন। তার কমান্ডিং অফিসার লেঃ কর্নেল জানজুয়ার নির্দেশে এম, ভি, সোয়াত জাহাজ থেকে অস্ত্রশস্ত্র নামিয়ে ক্যান্টনমেন্টে আনার জন্য তিনি রওনা হয়েছিলেন। স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের চট্টগ্রামস্থ নিউ মার্কেট শাখার ম্যানেজার জনাব কাদের যখন আমার বার্তা নিয়ে ৮ ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের দফতরে যান তার আগেই মেজর জিয়া তার কমান্ডিং অফিসারের আদেশে ষোলশহর থেকে বেড়িয়ে পড়েন। রেজিমেন্টের ডিউটি অফিসার আমার বার্তাটি পান। খবর পেয়েই ক্যাপ্টেন খালেকুজ্জামান মেজর জিয়াকে থামানোর জন্য পোর্টের দিকে রওনা হয়ে যান। ২৫শে মার্চ রাত তখন প্রায় সাড়ে ১১টা। ২০ বালুচ রেজিমেন্টের সৈন্যরা এই মধ্যে ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টারের ওপর হামলা চালায়। ৮ ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈন্য ও অফিসারবৃন্দ তখনো এ খবর জানতে পারেন নি। পূর্বে উল্লেখিত দ্বিতীয় গাড়ীতে ছিলেন ক্যাপ্টেন খালেকুজ্জামান। আগ্রাবাদ পর্যন্ত গিয়ে মেজর জিয়াকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য ব্যারিকেড পরিস্কার করেছিলেন। খালেকুজ্জামান মেজর জিয়াকে সর্বশেষ পরিস্থিতির কথা জানালে মেজর জিয়া ৮ ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট লাইনে ফিরে আসার এবং তার অফিসারদের সঙ্গে পরবর্তী করনীয় সম্পর্কে আলোচনার সিদ্ধান্ত নেন। মেজর জিয়াকে বহনকারী প্রথম গাড়িটি দেখেই নায়েব সুবেদার আইজুদ্দিন উত্তেজিত হয়ে আক্রমন করতে চেয়েছিল। রেলওয়ে হিলের পাশের এই সড়কের অনেকখানি আমাদের এল-এম-জি এবং রকেট লাঞ্চারের সুনির্দিষ্ট আওতার মধ্যে ছিল। আমরা ধৈর্য্য না ধরলে মেজর জিয়া এবং ক্যাপ্টেন খালেকুজ্জামানকে বহনকারী গাড়ী দুটি রকেট লাঞ্চারের গোলায় উড়ে যেতো। আরো বড় শিকারের জন্য অপেক্ষা করেছিলাম বলেই অলৌকিকভাবে সেদিন তারা দুজন বেঁচে গিয়েছিলেন।

 

ইউনিট লাইনে ফিরে মেজর জিয়া এবং তার অফিসাররা কমান্ডিং অফিসার সহ অবাঙ্গালি অফিসারদের গ্রেফতার করার সিদ্ধান্ত নেন। অবাঙ্গালি অফিসারদের গ্রেফতার পর্ব শেষ হবার পরই তাদের কাছে ক্যান্টনমেন্টের হত্যাকাণ্ডের খবর পৌঁছে।

 

৮ ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের একজন অফিসার পরে স্বীকার করেছিলেন, ক্যান্টনমেন্টের ঘটনার ব্যাপারে মতদ্বৈততা দেখা দেয়। রেজিমেন্টের তরুন অফিসারদের কয়েকজন তখনই ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টারের সৈনিকদের জীবন রক্ষায় ছুটে যেতে চান। অন্যরা ২১০ বালুচ রেজিমেন্টকে আক্রমন করাকে আত্মঘাতি হবে বলে মত প্রকাশ করেন। এই মত পার্থক্যের ফলেই শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হয় যে, এই পর্যায়ে ক্যান্টনমেন্টের দিকে যাওয়া কিংবা ২০ বালুচ রেজিমেন্টের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরা বোকামি হবে। এরপর ঐ রাতেই আমরা ষোলশহর ত্যাগ করে পটিয়ার দিকে অগ্রসর হই।

 

এদের এই পদক্ষেপ সম্পকে আমি আগে কিছুই জানতাম না। ৮ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট এবং ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টারে যাকে দিয়ে খবর পাঠিয়েছিলাম সেই ডাঃ জাফর ফিরে এলে সব জানতে পারলাম। কিছুটা অধৈর্য্য হয়ে ডাঃ জাফরকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কি এদের সাথে যোগাযোগ করতে পারেন নি?

 

“আপনার খবর তো ৮ ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট পৌঁছে দিয়েছি। তবু তারা শহর ছেড়ে চলে যাচ্ছে। রেজিমেন্টাল সেন্টারের সাথে যোগাযোগ করতে পারি নি”- ডাঃ জাফর জবাব দিলেন।

 

“দয়া করে এক্ষুনি যান, গিয়ে ওদেরকে থামান। এখন সবকিছুই আমাদের নিয়ন্ত্রনে। ওদের সাথে সম্মিলিতভাবে বাকী জায়গাগুলোও আমরা মুক্ত করতে পারবো। আজকের রাতই সব চাইতে গুরুত্বপূর্ণ।“

 

।।সশস্ত্র প্রতিরোধ।।

 

চট্টগ্রাম, ২৬শে মার্চ। আমার দফতরে টেলিফোনে খবর এলো যে পাকিস্তানী সেনারা নৌ-ঘাঁটি থেকে অগ্রসর হয়ে হালিশহরে আমাদের প্রতিরক্ষা ব্যূহের ওপর আক্রমন চালিয়েছে। ই-পি-আর ট্রুপস এই আক্রমণ প্রতিহত করে। শুত্রুদের প্রচুর হতাহত হয়। পাকিস্তানীরা হালিশহরে কোন বাধা আশা করেনি। সংগঠিত প্রতিরোধ মোকাবেলার জন্য তারা প্রস্তুত ছিলো না। তাদের অগ্রবর্তী দলটি হালিশহরের প্রথম প্রতিরক্ষা ব্যূহের সম্মুখীন হতেই আমাদের সৈনিকরা পাকিস্তানীদের লক্ষ্য করে গুলি চালালো। পাকিস্তানীরা ঘটনার আকস্মিকতায় বিমুর হয়ে পড়ে। বহু সংখ্যক হতাহত হলো। অবশেষে তারা পিছু হটতে বাধ্য হলো। এ সময়ে অপর এক টেলিফোমে জানালাম, ৮০ থেকে ১০০টি যানের বিরাট একটি কনভয় কুমিল্লা থেকে চট্টগ্রামের পথে রওনা হয়েছে। কুমিল্লা থেকে মেজর বাহার চট্টগ্রাম টেলিফোন অপারেটকে একথা জানালে সে তাৎক্ষনিক আমাকে তা অবহিত করে। সংবাদ পাওয়ার পরপরই আমি পাকিস্তানী কলামটিকে এম্বুশ করার জন্য একজন জেসিওর নেতৃত্ব হালিশহর থেকে এক কোম্পানি সৈন্য পাঠালাম। হালকা মেশিনগান এবং ভারী মেশিনগান ছাড়াও কোম্পানিটির সাথে ছিল ৩ মর্টার ও রকেট লাঞ্চার। অপারেশনাল কমান্ডার সুবেদার মুসা যাত্রার প্রাক্কালে আমাকে টেলিফোন করে বললেন, “আমাদের সাফল্যের জন্য দোয়া করবেন স্যার।“

 

“সকল দেশবাসী আপনাদের জন্য দোয়া করছে। যুদ্ধ চালিয়ে যান, মাতৃভুমিকে মুক্ত করেন। আমার গলার স্বর ছিলো আবেগে উদ্বেল।“

 

কুমিল্লা থেকে চট্টগ্রামগামী শত্রুপক্ষে ছিলো ২৪ ফ্রন্টিয়ার ফোরস রেজিমেন্ট ও ফিল্ড ইঞ্জিনিয়ারদের একটি অংশ এবং তাদের সঙ্গে ১২০ মিলিমিটার মর্টারবাহী একটি দল। ২৬শে মার্চ রাত ১টার দিকে তারা চট্টগ্রামের পথে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট ত্যাগ করে। কুমিল্লা থেকে চট্টগ্রামের দূরত্ব একশ মাইলের কিছু বেশি। তাদের পথে বহুসংখ্যক কাল্ভারট এবং ছোট ছোট সেতু ছিল। সৈন্য চলাচল বাধাদানের জন্যে পূর্বেই জনসাধারণের এগুলোর অধিকাংশ ভেঙ্গে ফেলেছিলো। তাই পাকিস্তানী কলামটিকে অনেক ক্ষেত্রে মুল রাস্তা ছেড়ে ছেড়ে ধীরে ধীরে অগ্রসর হতে হচ্ছিল। একই সাথে ফিল্ড ইঞ্জিনিয়ারের সৈনিকরা সেতুগুলো মেরামতও করে চলছিলো। যা হোক, পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী শুভপুরে সেতুর ব্যাপক ক্ষতি সাধন করে রাখা হয়েছিল। কুমিল্লাস্থ ৫৩ ব্রিগেডিয়ার ইকবাল শফি নিজেই সমগ্র কলামের নেতৃত্বে ছিলেন। শুভপুর সেতু মেরামত করতে সময় লাগবে দেখে ব্রিগেড কমান্ডার পদাতিক সেনাদের নিয়ে নদী পার হয়ে চট্টগ্রামের পথে রওনা হলেন এবং পিছনে রেখে গেলেন মর্টার এবং ইঞ্জিনিয়ার ইউনিটকে। তাদের বলে গেলেন সেতু মেরামত করতে তারা যেন অগ্রবর্তী দলের সঙ্গে যোগ দেয়। সূর্য তখন অস্তপ্রায়। ব্রিগেডিয়ার ইকবাল শফি এবং তার বাহিনী চট্টগ্রাম থেকে ১৪ মাইল দূরে কুমিরায় পৌঁছে গেলেন।

 

এদিকে ইপিআর সেনারা স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র রাস্তার পূর্বে পাশের একটি উঁচু জায়গায় এম্বুশ করে বসেছিলো। রাস্তার পশ্চিমে কিছু দুরেই সাগর। উঁচু জায়গাটি থেকে রাস্তা এবং সাগর বেশ পরিস্কার দেখা যাচ্ছিল। বড় সেতুগুলোর কষ্টসাধ্য বাধা পেরিয়ে আসতে পেরে ব্রিগেডিয়ার ইকবাল শফি খুব খুশী ছিলেন কারণ সেতুগুলো পুরোপুরি ধ্বংস হলে তাদের পক্ষে সেতু পার হওয়া সম্ভব হতো না। সমস্যার মুহূর্তে কুমিরায় পৌঁছে তিনি ধরেই নিয়েছিলেন যে আর মাত্র মিনিট পঁয়তাল্লিশের মধ্যেই চট্টগ্রামের পশ্চিম পাকিস্তানী সেনাদের সঙ্গে মিলিত হতে পারবেন এবং তারপরই নামতে পারবেন বাঙালিদের শায়েস্তা করতে। কিন্তু হঠাৎ করেই তিনি জীবনের সর্ববৃহৎ চ্যালেঞ্জার মুখোমুখি হলেন। ইপিআর সেনাদের এমবুশে তিনি এবং তার প্রায় অর্ধেক সৈন্য দিশেহারা হয়ে পড়লো।

 

এই এমবুশে পাক সেনাদের হতাহতের খবর পরে পাওয়া গিয়েছিলো। লাইট মেশিনগানের ঝাঁক ঝাঁক গুলির শিকার হয়েছিলেন ২৪ ফ্রন্টিয়ার ফরস রেজিমেন্টের কমান্ডিং অফিসার কর্নেল শাহপুর খানসহ প্রায় ৭০ জন পাকসেনা। ধ্বংস প্রাপ্ত যানবাহনের সংখ্যাও ছিলো প্রচুর। ব্রিগেডিয়ার ইকবাল শফি জীবন বাঁচানোর জন্যে তখন প্রাণপণে ছুটেছিলেন পাহাড়ের দিকে। কয়েকজন সঙ্গীও তাকে অনুসরণ করলো। ভীতসস্ত্রস্ত সৈনিকরা হাতিয়ার, যানবাহন এবং অন্যান্য জিনিসপত্র ফেলেই প্রাণপণে ছুটেছিলো। শত্রুপক্ষের পিছনের অংশ যারা আমাদের অস্ত্রের আওতার বাইরে ছিল তারা সঙ্গে সঙ্গেই সুবিধাজনক স্থানে অবস্থান নিয়ে পাল্টা গুলিবর্ষণ শুর করলো। এক ঘণ্টারও বেশি সময় এই গুলি বিনিময় চললো। এই সময় আমাদের সেনারা প্রায় ৩মাইল সরে এসে পরবর্তী অবস্থানে প্রস্তুতি গ্রহণ করলো। এই ভয়াবহ সংঘর্ষে ইপিআর এর ৫জন গুরুত্বরভাবে আহত হয়।

 

কুমিল্লায় শত্রুর বিরুদ্ধে ইপিআর সেনাদের এই এমবুশ ছিলো আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাসে এই প্রথম সরাসরি আক্রমন। কুমিরার ঘটনার গুরুত্ব এতই সুদুরপ্রসারী ছিলো যে, এই ঘটনা পাকিস্তানী সৈন্যদের চট্টগ্রামে অবাধে কিছু করার মুল পরিকল্পনা ব্যাহত করে দেয়। চট্টগ্রামে শত্রুদের লোকবল পর্যাপ্ত ছিলো না বলে কুমিল্লা থেকে লোকবল বৃদ্ধি ছিল একমাত্র ভরসা। এই এম্বুশের পরে আমরা একটি আয়ারলেস বার্তা শুনে ফেলি। চট্টগ্রামের জৈনক কমান্ডার ঢাকায় ৯৪ ডিভিশনের কর্নেল স্টাফ হেডকোয়ার্টারের সঙ্গে কথা বলছিলেন। তিনি বলছিলেন, আমাদের অনেক লোক হতাহত হয়েছে। সীতাকুণ্ডের দক্ষিনে বাকী সৈন্যরা আটকা পড়ে আছে। বিমানে সৈন্য পাঠানোর অনুরোধ করছি। জরুরী ভিত্তিতে বিমানে করে হতাহতদের সরাবার বাবস্থা করা দরকার।

 

কুমিল্লায় আমারও কিছু লোক হতাহত হয়েছিল। আমারও প্রয়োজন ছিল নতুন সৈন্যের, অস্ত্র এবং গোলাবারুদের। সেই মুহূর্তে সীমান্ত এলাকা থেকে যে সব ইপি সৈন্য আসছিলো তারাই ছিলো আমার প্রধান ভরসা।

 

২৬শে মার্চ ভোর নাগাদ ক্যাপ্টেন হারুন শহরের পাঁচ মাইলের মধ্যে এসে পড়লেন। তাঁর সৈন্যরা উচ্চ কণ্ঠে “জয় বাংলা” শ্লোগান দিতে দিতে আসছিলো। কিন্তু শহরের উপকণ্ঠে এসেই থামতে হলো তাদেরকে। কয়েকজন সৈন্যকে শহর ছেড়ে কালুরঘাট সেতুর দিকে যেতে দেখা গেলো। কিছুক্ষনের জন্য ক্যাপ্টেন হারুন বিভ্রান্ত হয়ে পড়লেন। ভাবলেন “শত্রুরা কি তাহলে পুরোপুরি শহর দখল করে ফেলেছে?” এই ভাবনা তাঁকে কিছুটা হতবুদ্ধি করে দেয়। পরে দেখা গেলো যে, এরা বেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টার এবং ৮ ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের লোক। তারা সবাই পটিয়ার দিকে যাচ্ছিলো। শহরে ঢোকার আগে আরো নিশ্চিত হওয়ার জন্য তিনি কালুরঘাট ব্রিজ পেরিয়ে মেজর জিয়াউর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করলেন। তাঁকে কালুরঘাট এলাকাতেই থাকতে বলা হলো। ফলে পূর্বে পরিকল্পনা অনুযায়ী শহরের যুদ্ধে আমার সঙ্গে যোগ দেয়া তার পক্ষে আর সম্ভব হলো না।

 

কক্সবাজারে ইপিআর কোম্পানির কমান্ডার ছিলেন সুবেদার মফিজ। তিনি দুটি ইপিআর কোম্পানি নিয়ে আমার সঙ্গে যোগ দেওয়ার জন্য কক্সবাজার ত্যাগ করেছিলেন। তাঁকেও কালুরঘাট এলাকায় থামিয়ে সেখানেই আত্মরক্ষামূলক অবস্থান গ্রহণ করতে বলা হয়। তিনি পরে আমাকে বললেন। আপনার সাথে যোগ দিতে পারিনি এটা আমার ত্রুটি ছিলো না। মেজর জিয়া আমাকে কালুরঘাট থামিয়ে দিয়েছিলেন। আমি তাকে আপনার নির্দেশের কথা জানালে তিনি আমাকে জানান শহরে কেউ নেই। অবশ্য পরে দেখা গেলো আপনি তখনো শহরে যুদ্ধ করে চলেছেন।“

 

আমরা তখনো শহর ছাড়ি নি। বিভিন্ন জায়গায় প্রচণ্ড লড়াই হচ্ছিল। কিন্তু ঘটনাবলী শহরের পরিস্থিতিকে যেদিকে নিয়ে যাচ্ছিলো তা মোটেই আমার জন্য অনুকুল ছিলো না।

 

কক্সসবাজার এবং কাপ্তাই থেকে যে সৈন্যরা আসছিলো কালুরঘাট ব্রিজের কাছে তাদের থামিয়ে দেয়া হচ্ছিল। কুমিরায় প্রধান সড়ক বরাবর প্রচণ্ড সংঘষের দরুন রামগড়ের সৈন্যরা আসতে পারছিলো না। শহরে যে ক’জন সৈন্য ছিলো শুধু তাদের সম্বল করে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া ছাড়া আমার আর গত্যন্তর ছিলো না। নৌ- বাহিনীর সদর দফতর এবং পোর্ট মুক্ত করার পরিকল্পনা ভেস্তে গেলো।

 

বেলা ৯টা নাগাদ অনেক উঁচু দিয়ে শহরে হেলিকাপ্টার ঘোরাঘুরি শুরু করলো। কয়েক জায়গায় জনসাধারণ সেগুলোর দিকে বন্দুকের গুলি ছুঁড়লো। বিরাটকায় সি-১৩০ বিমানগুলো ঢাকা থেকে সৈন্য আনতে থাকলো। অসহায়ভাবে তবু আমরা সেই অবস্থান আঁকড়ে রইলাম। আমাদের প্রচেষ্টা ছিলো, ক্যান্টনমেন্ট এবং নৌ- বাহিনীর সদর দফতর থেকে শুত্রুদের বেরোতে না দেয়া। কিন্তু ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টারের অধিকাংশ সৈন্য নিহত হওয়ার এবং ৮ বেঙ্গল রেজিমেন্ট শহর ত্যাগ করায় ওদিকে দিয়ে পাকিস্তানী সৈন্যদের বেরোনো সহজতর হয়ে উঠেছিল। ঘটলোও তাই। ট্যাংকের ছত্রছায়ায় ২০ বালুচ রেজিমেন্টের সৈন্যরা ক্যান্টনমেন্ট থেকে বেড়িয়ে পড়লো।

 

নৌ-বাহিনী সদর দফতরের পাকিস্তানী সৈন্যরা অবশ্য তখনো আটক অবস্থায়। সমগ্র আগ্রাবাদ রোডের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলো ছিল ইপিআর সৈন্যদের দখলে। হালিশহরের কাছে সুদূঢ় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলাম বলে শত্রুপক্ষের একটি লোকের পক্ষেও চলাচল করা সম্ভব ছিলো না। এমনিভাবে ওদের নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপনের প্রচেষ্টা আমরা অনেকখানি ব্যাহত করতে পেরেছিলাম।

 

চট্টগ্রামের পাকিস্তানীদের সাহায্যার্থে বেশ কিছু সংখ্যক সৈন্য ২৬শে এবং ২৭শে মার্চ ঢাকা থেকে বিমানযোগে চট্টগ্রাম বিমান বন্দরে এসে পৌছায়। বিমানবন্দর থেকে পাকসেনারা আগ্রাবাদ এলাকার দিকে অগ্রসর হতে থাকে। পাক সেনাদের অপর একটি গ্রুপ হালিশহর ইপিআর সদর দফতরের দিকে অগ্রসর হয়। হালিশহরে আমরা ইপিআর বাহিনী আগে থেকেই শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যূহ গড়ে তুলেছিলো।

 

কুমিরার সংঘর্ষ মারাত্মক হয়ে পড়ে। ব্রিগেডিয়ার ইকবাল শফির সৈন্যদের মনোবল এতই ভেঙ্গে পড়েছিলো। যে, তাদের পক্ষে আর সামনে অগ্রসর হওয়া সম্ভব ছিলো না। এই সময় হেলিকপ্টার যোগে জেনারেল মিঠঠা খান কুমিল্লায় উপস্থিত হন এবং সৈন্যদের প্ররোচিত করার উদ্দেশ্যে এক জঘন্য মিথ্যা ভাষণে বলেনঃ “হিন্দুদের প্ররোচনায় বাঙ্গালিরা তোমাদের অফিসার, সৈন্য এবং তাদের পরিবার পরিজনকে হত্যা করে চলছে। তোমরা তাদের রক্ষা না করলে তারা সকলেই প্রাণ হারাবে। প্রতিশোধ গ্রহনের জন্য তোমরা সামনে এগিয়ে যাও। খুনের বদলে খুন। ইসলাম এবং পাকিস্তানকে তোমরা রক্ষা কর।“ প্রতিশোধ গ্রহনের এই তীব্র হলাহল পাকিস্তানী সৈনিকদের মনে ব্যাপক জিঘাংসা সৃষ্টি করে।

 

মূল সড়ক পথে অগ্রসর হওয়া সম্ভব না হওয়ার ব্রিগেডিয়ার শফি পাহাড়ের ভিতর দিয়ে একটি কলামকে সেনানিবাসে ২০বালুচ রেজিমেন্টের সঙ্গে মিলিত হওয়ার জন্য পাঠিয়ে দেন। অপর কলামকে উপকুল রেখা বরাবর অগ্রসর হয়ে বাধের উপর তরিত অবস্থান গ্রহণকারী আমাদের সৈন্যদের ঘিরে ফেলার নির্দেশ দেন।

 

সন্ধ্যা হয়ে আসে। মাঝে মাঝেই উভয় পক্ষে গুলি বিনিময় চলছিলো। সংঘর্ষ এলাকা থেকে জনসাধারণ ক্রমশঃ দূরে সরে যেতে থাকলেও এলাকার তরুনরা আমাদের সৈনিকদের সঙ্গে যোগ দিয়ে খাবার এবং অন্যান্য দ্রব্যাদি সরবারহ করতে থাকে। এমনকি তারা হতাহতদের নিরাপদ স্থানে সুচিকিৎসার ব্যবস্থাও করতে থাকে। সৌভাগ্যরে বিষয় ছিল তাদের অনেকেই শত্রু সৈন্যদের কাছাকাছি থেকে তাদের প্রতিটি অবস্থানের খবরাখবর আমাদের সরবরাহ করে চলছিল।

 

উপকূল বরাবর শত্রু সৈন্যদের অগ্রসর হওয়ার খবর পেয়েই আমরা আরেকটি এমবুশের আয়োজন করি। পাকিস্তানীরা আমাদের এম্বুশে পড়ে যায়। এই দ্বিতীয় এমবুশেও শত্রুসেনাদের অনেকে হতাহত হয়। ভীতু পাকিস্তানীরা তাদের মৃত সঙ্গীদের ফেলেই নানা দিকে দৌড়াতে থাকে। অনেকেই পথ ভুলে গ্রামগুলোতে ঢুকে পড়লে নিরস্ত্র বিক্ষুব্ধ জনতার হাতেই প্রাণ হারায়।

 

ইতিমধ্যে ইপিআর কোম্পানীর গোলাবারুদ প্রায় নিঃশেষ হয়ে আসে। অপরদিকে হালিশহর সদর দফতরেও বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করার মতো গোলাগুলি আর তেমন ছিল না। এই পরিস্থিতিতে আমি কুমিরার কোম্পানিকেও পেছনে সরে শহরের উপকন্ঠে নতুন প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান নিতে বললাম। স্থানটি হালিশহরে আমাদের অবস্থানের নিকটেই ছিল। আমরা তীব্রভাবে গোলাগুলি এবং নতুন সৈন্যের প্রয়োজনীয়তার অভাব অনুভব করি। অথচ সেই মুহূর্তে এগূলো সংগ্রহ করা দুঃসাধ্য ছিল। এদিকে রাঙামাটি থেকে আগত ইপিআর সেনারা ক্যান্টনমেন্টের অদুরে বাধাগ্রস্থ হয় এবং রামগড় এলাকার অপর দুটি ইপিআর কোম্পানিও মূল সড়ক পথ ধরে অগ্রসর হতে পারছিল না। এ সময় আমার হাতে দুটি বিকল্প পথই খোলা ছিল। হয়, ক্যান্টনমেন্টের অস্ত্রাগার দখল করা অথবা সরবরাহের জন্য ভারতের সাথে যোগাযোগ করা অন্যসব সম্ভাবনা ব্যর্থ হলে চূড়ান্ত পন্থা হিসেবে শেষেরটিই বিবেচনা করা যায় বলে মনে করলাম। আমি প্রথম পন্থা গ্রহনের সিদ্ধান্ত নেই এবং তখনই রামগড়ের একটি কোম্পানীকে মাঠের পথ ধরে অগ্রসর হয়ে ক্যান্টনমেন্টের পেছনে অবস্থানকারী আমাদের সেনাদের সঙ্গে যোগ দেয়ার নির্দেশ দিলাম। অপর কোম্পানীটিকে শুভপুর সেতু এলাকায় শক্তিশালী প্রতিরক্ষা বুহ্য গড়ে তুলতে বললাম যাতে সড়ক পথে কুমিল্লা থেকে নতুন কোন পাক সৈন্য চট্টগ্রাম আসতে না পারে।

২৬শে মার্চ সন্ধ্যা সাড়ে ৮টার দিকে নৌবাহিনীর যোগাযোগা ঘাঁটিতে পাক সৈন্যদের আনাগোনা লক্ষ করা গেল। রেলওয়ে পাহাড়ে আমার ট্যাকটিকাল হেড কোয়ার্টার থেকে পাশের একটি মসজিদে তাদের আনাগোনা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল। কয়েকজন বেসামরিক ব্যক্তিও তাদের সঙ্গে মসজিদে যোগ দেয়। এসময়ই হালকা মেশিনগান নিয়ে অবস্থানকারী আমার একজন সিপাই ট্রেঞ্চ থেকে যে মুহূর্তে মাথা তুললো অমনি একটি বুলেট তাকে আঘাত করলো। গুলিটি আসে মসজিদের দিক থেকে। সাথে সাথে শত্রুরা আমাদের অবস্থানের উপর স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের সাহায্যে বিপুলভাবে গুলি চালাতে শুরু করলো। কামানের গোলা আমাদের চতুর্দিকে পড়তে থাকে। বিস্ফোরিত গোলার মারাত্মক টুকরোগুলো ভয়াবহরূপে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই শত্রুদের একটি দল টাইগার পাস ঘাঁটি থেকে আক্রমণ চালায়। অবশ্য এই আক্রমণ সাথে সাথেই প্রতিহত করা হল। কিছুক্ষন পর অপরদিক থেকেও হামলা হতে থাকে। তবে দুটি হামলাই সামনের দিক থেকে আসছিল বলে তারা তেমন সুবিধা করতে পারেনি। বরং পাকিস্তানিরা প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি স্বীকার করে। সামনে অগ্রসর হতে ব্যর্থ হয়ে তারা পিছু হটে গিয়ে তাদের সুদৃঢ় ঘাঁটি থেকে আমাদের অবস্থানের উপর অবিরাম গুলি বর্ষণ করতে থাকল।

 

অনুরূপভাবে আমাদের হালিশহর অবস্থানের উপর কয়েক দফা হামলা হলো। কিন্তু প্রতিবারই শত্রু সেনারা পিছু হটতে বাধ্য হলো। ২৬শে এবং ২৭শে মার্চের মধ্যবর্তী রাতকে মনে হচ্ছিল এ রাত যেন আর পোহাবে না। গুলির শব্দে গোলার বিস্ফোরনে সমস্ত শহর কেপে কেপে উঠছিল বারংবার।

 

এ সময় আমাদের অবস্থানের পেছনেই গোলার আওয়াজ পেলাম। অন্য কোন ভাবে আমাদের অবস্থান দখল করতে না পেরে শত্রুরা ক্যান্টনমেন্ট থেকে ট্যাংক নিয়ে অগ্রসর হচ্ছিল। রেলওয়ে হিলে আমাদের অবস্থান শত্রুদ্বারা ঘেরাও আসন্ন হয়ে উঠলো। অথচ কোন ট্যাংক বিধ্বংসী অস্ত্র আমাদের ছিল না।

 

প্রায় দু’ঘন্টা পর কামানের গোলা বর্ষণ একটু কমে এলো। এ সময় আহত সৈনিককে আমার কমাণ্ড পোস্টে নিয়ে আসা হলো। সে ছিল বয়সে তরুন। কাদামাটি লাগা কাপড়চোপড় রক্তে ভেজা। বুলেট তার বুকে বিদ্ধ হয়েছিলো। দারুন কষ্টে নিঃশ্বাস টানতে গিয়ে আস্ফুট কন্ঠে সে জিজ্ঞাসা করলো, “কখন আমার মৃত্যু হবে?” তার দৃষ্টিতে ছিল সারা বিশ্বের আকুল জিজ্ঞাসা। এরপর সে আর কিছু বলতে পারেনি। আরও অনেকের মতোই নিভৃত যন্ত্রণায় সেও আমাদের মাঝ থেকে হারিয়ে গেল।

 

।। ঘেরাও ।।

 

ঢাকা এবং অন্যান্য স্থানে নৃশংস অভিযানের প্রাথমিক সাফল্যে উৎফুল্ল ইয়াহিয়া তার বাহিনীকে ব্যপক গণহত্যার ছাড়পত্র প্রদান করে। পাকসেনারা তাদের অভিযান এলাকাগুলোতে প্রানী বলতে যা পেয়েছে তাই নিধন করেছেএবং এসব স্থানে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে অবলীলাক্রমে। কিন্তু তবুও লোক এবং অস্ত্রবলে বলীয়ান পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে আমাদের অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধারা প্রাণপণ প্রতিরোধ চালিয়ে গড়ে তোলে। কিন্তু এই প্রতিরোধ অব্যাহত রাখা ছিল দুঃসাধ্য, কারণ অস্ত্র চালনায় জনসাধারনের একদিকে যেমন কোন ট্রেনিং ছিল না। তেমনি তাদের অস্ত্রগুলোও ছিল পুরনো আমলের। এদিকে ট্রেনিংপ্রাপ্ত আমাদের সৈনিকেরা যেখানেই সংগঠিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চেয়েছেন সেখানেই শুরু হয়েছে কামান,ট্যাঙ্ক আর স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র দ্বারা শত্রুপক্ষের সম্মিলিত আক্রমণ। এই ধরনের বারংবার হামলার মোকাবিলা করতে গিয়ে আমাদের গোলাবারুদের মজুতে টান পড়ে।

এই অবস্থায় রেলওয়ে হিলের অবস্থান ত্যাগ করার জরুরী প্রয়োজন দেখা দিল। তখন চারদিকেই শত্রুসেনা। ক্রমাগতএক ঘন্টার বেশি সময় ধরে পাকিস্তান নৌবাহিনীর কামানগুলো আমাদের উপর আক্রমণ চালিয়ে আমাদেরকে ব্যস্ত রাখে। এই সংকটময় অবস্থায় আমি আমার সৈন্যদের কোতোয়ালী থানা এলাকার দিকে স্বরে যেতে নির্দেশ দেই এবং সেখান থেকে ক্যান্টনমেন্টের পেছনে সকলকে একত্র হতে বলি। গুলি বর্ষণের ছত্রছায়ায় যখন সকলেই স্থান ত্যাগ করে চলে যায় তারপরই আমি ঘাঁটি ত্যাগ করার জন্য পা বাড়াই। একজন তরুন কলেজ ছাত্রও আমার সাথে ছিল। আমরা চলছিলাম কিন্তু মুখে কোন কথা ছল না। সমস্ত সকালটি ছিল কুয়াশাচ্ছন্ন। বিমুড় বিষণ্ণতায় সমস্ত শহর যেন আচ্ছন্ন। রাস্তাঘাট ছিল জনমানবশুন্য, মনে হচ্ছিল মৃতের নগরী। শত শত বছর পড়ে মাটির তলা থেকে খুঁড়ে যেন নগরটিকে আবিষ্কার করা হয়েছে। দূরে বন্দরে জাহাজের মাস্তুল,ক্রেন,ওধারে অন্ধকারাচ্ছন্ন গ্রাম সবকিছুই একটির পর একটি আমার চোখের সামনে ভেসে উঠতে থাকে। ভরাক্রান্ত হৃদয়ে পাহাড় থেকে নামতে গিয়ে পিছন ফিরে তাকাতেই সা করে একটি বুলেট আমাদের পাশ দিয়ে চলে গেল। সাথে সাথে আমরা নিচু হয়ে চলার গতি বাড়িয়ে দেই।

কদমতলী রেলক্রসিং এর কাছে নৌ-সেনাদের দুটি ট্রাক এ সময় অন্ধকারের মধ্যে অপেক্ষা করছিল। আমি নিঃশঙ্কচিত্তে সামনে এগোচ্ছিলাম। কোন দেশ কি আমাদের সাহায্যে এগিয়ে আসবে না ? বহির্জগতের কোন দেশ কি জানে না বাংলাদেশে এখন কী ঘটছে ? আমাদের বেতার ঘোষণা কী তারা শুনেছে ? এমনি নানা কথার ভীড় আমার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল। কদমতলীর কাছাকাছি এসে আমরা এসব কথা ভাবতে ভাবতে যখনই রাস্তা পেরুতে গেছি তখনই দুটি গাড়ির হেডলাইটের তীব্র আলোয় আমার চোখ ঝলসে যায়। দুটি গাড়ি থেকেই সৈন্যরা লাফিয়ে নামতে থাকে। আমি সামনে একটি প্রাচীর দেখে সেটি পার হওয়ার জন্য দৌড় দিই শত্রু সৈন্যরাও গুলি বর্ষণ শুরু করে। একটি গুলি এসে আমার ডান হাতে থাকা এস্টেনগানে এসে লাগলে প্রচণ্ড ধাক্কায় সেটি ছিটকে পড়ে। আমি মুহূর্তে দেয়ালের উপর লাফিয়ে উঠে প্রচণ্ড বেগে ওপাশে গিয়ে পড়ি। তারপর লাফিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে আবার কখনো দৌড়ে চলতে থাকি। পেছনে শুনতে থাকি নৌ-সেনাদের এলোপাথারি গুলি বর্ষণের শব্দ। তাদের দুঃখ, শিকার তাদের হাতছাড়া হয়ে গেলো।

 

আমার বাম উরুতে তখন ভয়ানক যন্ত্রনা হচ্ছিল, ভীষণ রক্ত ঝরছিল এবং ট্রাইজারের একটি অংশ হাটু পর্যন্ত ছিলে ঝুলে ছিল। দেয়াল থেকে লাফিয়ে পড়ার সময়ই বোধহয় কিছুতে লেগে এই জখম হয়েছে। কোতোয়ালী থানায় পৌছে দেখি আমার লোকেরা সবাই সেখানে জড়ো হয়েছে। ৩’’ মর্টারগুলো তখন আমাদের জন্য বোঝা হয়ে পড়েছিল। কারণ ওগুলোর কোন শেল অবশিষ্ট ছিল না। পেট্রোলের অভাবে কয়েকটি গাড়িও আমাদের ফেলে আসতে হলো। আমি টেলিফোনে জনাব সিদ্দিকীকে মর্টারগুলো নিয়ে যাওয়ার জন্য কাউকে গাড়িসহ পাঠাতে বললাম এবং সৈন্যদের পূর্বপরিকল্পিত যায়গায় গিয়ে প্রস্তুত হওয়ার জন্য নির্দেশ দিলাম। আমাদের আশা ছিল সেখান থেকে ক্যান্টনমেন্টের উপর আক্রমণ চালিয়ে ক্যান্টনমেন্ট থেকে প্রচুর গোলাগুলি উদ্ধার করতে পারবো।

আমাদের ভিন্ন রাস্তায় অগ্রসর হতে হলো। ক্যান্টনমেন্ট ও শহরের মধ্যবর্তী প্রধান শহরটি তখন শত্রুকবলিত। আমরা কিছু লোক গাড়িতে এবং কিছু লোক পায়ে হেটে গন্তব্যস্থলের দিকে রওনা হলাম। চকবাজারের কিছু সামনে শহরের উপকণ্ঠে পৌছতেই আমার একজন ইপিআর সিপাই পায়ে হেটে শহরের দিকে ফিরছে। “ওদিকে কোথায় যাচ্ছো ?” আমি চীৎকার করে জিজ্ঞাসা করলাম। বিষণ্ণ কণ্ঠে সে জবাব দিল, আপনার কাছেই স্যার। সে আরও বলল, “আপনি ক্যান্টনমেন্টের পেছনের এলাকায় গিয়ে আমাদের একত্র হতে বলেছিলেন। কিন্তু একজন অফিসার অন্যপথ দিয়ে সৈন্যদেরকে নিয়ে কালুরঘাট সেতুর দিকে চলে গেছে।“ আমি আবার চীৎকার করে জিজ্ঞাসা করলাম, “কোন অফিসার ?”

“আমি তার নাম জানি না, স্যার”

 

জনাব হান্নান এবং ডাঃ জাফরকে প্রশ্ন করে জানতে পারলাম মেজর জিয়াউর রাহমান আমাদের সেনাদের কালুরঘাট সেতুর দিকে নিয়ে গেছেন। আমি আওয়ামীলীগ নেতাদের অনুরোধ করলাম তারা যেন জিয়াকে বলেন আমার সৈন্যদের ছেড়ে দিতে যাতে তারা শহরে আমার সাথে যোগ দিতে পারে। তদনুসারে ডাঃ জাফর, জনাব হান্নান, নগর আওয়ামীলীগের সেক্রেটারি জনাব মান্নান,জনাব কায়সার, আরও কয়েকজন কালুরঘাটের দিকে রওনা হয়ে যান। গোমদন্ডী ষ্টেশনের কাছে তারা মেজর জিয়া, মেজর শওকত ও আরো কয়েকজন নেতার সাক্ষাত পান। আমার সাথে শহরের লড়াইয়ে অংশ নেয়ার জন্য তারা জিয়াকে আমার সৈন্যদের ছেড়ে দিতে বলেন। মেজর জিয়া জবাব দেন যে, তার বাহিনী পুনর্গঠনের পরই তিনি আমার সংগে যোগ দেবেন। আওয়ামীলীগ নেতারা ফিরে এসে আমাকে সব কথা জানালেন। অবশ্য মেজর জিয়া এবং তার অফিসাররা শহরের লড়াইয়ে আর আসতে পারেন নি।

ঢাকা থেকে তখনও বিমান বোঝাই করে সৈন্য আনা হচ্ছিল। প্রধানতঃ কুমিল্লার ৫৩ ব্রিগেড থেকে এবং অন্যান্য স্থান থেকেও পাক সৈন্যরা চট্টগ্রামের পথে এগিয়ে আসছিল। শহরের উপর দিয়ে হেলিকপ্টার চক্কর দিচ্ছিল। এদিকে বাংলাদেশের পতাকা বিক্রি বেড়ে গেলো বহুগুণ। সর্বত্র নীল আকাশের নিচে নতুন পতাকা উড়তে দেখা গেল। কিন্তু ক্যান্টনমেন্ট থেকে শত্রুসৈন্যরা বের হয়ে সবাইকে সেগুলো নামিয়ে ফেলতে বাধ্য করতে লাগলো। যদিও প্রকৃতপক্ষে প্রতিটি বাঙ্গালির হৃদয়ে গ্রথিত বাংলাদেশের পতাকার ছাপ তারা কোনদিনই মুছে ফেলতে পারে নি।

 

ক্যান্টনমেন্টের অদূরে ইপিআর সৈন্যরা আমার কথা অনুযায়ী নতুন সৈন্যদের অপেক্ষা করছিল। আমার সৈন্যদের কালুরঘাটে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। একথা তারা তখনও জানতে পারেনি। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের দিক থেকে ক্যান্টনমেন্টের উপর যে হামলা পরিচালনার পরিকল্পনা আমি ইতিপূর্বে করছিলাম তা ভেস্তে গেলো।

 

এমতাবস্থায় আমি অস্ত্র ও গোলাবারুদের জন্য ভারতে যাবার সিদ্ধান্ত নিলাম। ভাব্লাম, ৬০ মাইল পথ অতক্রম করে ভারতে একবার যেতে পারলে সেখান থেকে নিশ্চয়ই অস্ত্র, গোলাগুলি এবং জরুরী জিনিসপত্র সংগ্রহ করা যাবেএবং এরপর রামগড় থেকে কিছু সৈন্য নিয়ে এসে ক্যান্টনমেন্ট আক্রমণ করতে পারবো। অস্ত্রের জন্য ভারতে রওনা হওয়ার প্রাক্কালে আমি সীমান্ত রক্ষীদের সাথে প্রাথমিকভাবে আলোচনা করে রাখার জন্য অয়্যারলেসে রামগড়ে একটি বার্তা পাঠালাম। আমার ভারত পৌঁছানোর পর আলোচনা শুরু করতে যাতে দেরী না হয় সেজন্যই আগে থেকে এ ব্যবস্থা করলাম।

।। সরবরাহের অভাব ।।

 

২৮শে মার্চ ভোর নাগাদ শত্রুপক্ষ ক্যান্টনমেন্ট এবং নৌবাহিনীর ঘাটির মধ্যবর্তী প্রধান সড়কের টাইগার পাস এলাকা দখল করে নেয় এবং নগরীর কেন্দ্রস্থলে সার্কিট হাউসে তাদের সদর দফতর স্থাপন করে। কুমিরায় যে শত্রুদলটিকে আমরা প্রতিহত করেছিলাম তারাও এসে ক্যান্টনমেন্টের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করে। আমাদের সেখানকার সৈন্যরা সরে এসে হালিশহর প্রধান প্রতিরক্ষা ব্যূহ অবস্থান নেয়। হালিশহরে আমাদের প্রতিরক্ষা ব্যূহ দু’ভাবে কাজে লাগছিলো। প্রথমত, এ প্রতিরক্ষা ছিল বিমানবন্দর, নৌবাহিনীর সদর দফতর এবং পোর্ট এলাকায় শত্রুদের আসার পথে হুমকিস্বরূপ। দ্বিতীয়ত, শত্রুদের প্রধান অংশে আঘাত হানার জন্যও দৃঢ় ঘাঁটি হিসেবে এটা কাজে লাগছিলো। ইতিমধ্যে ইপিআর সৈন্যদের কালুরঘাটে আটকানো না হলে পোর্ট, বিমানবন্দর এবং নৌবাহিনীর সদর দফতর আক্রমণ এবং দখল করা আমাদের পক্ষে সম্ভব হতো এবং তাহলেই যুদ্ধের গতিধারা পাল্টে যেত। পোর্ট এলাকা থেকে শত্রুসৈন্যরা দিনের বেলা কয়েকবারই আগ্রাবাদ রোড পরিষ্কার করে টাইগার পাস দিয়ে নৌঘাঁটির সংগে যোগাযোগ স্থাপনের চেষ্টা করে। কিন্তু তীব্র প্রতিরোধের মুখে প্রত্যেকবারই তাদের পিছু হটতে হয়। শত্রুরা হয়তো মরিয়া হয়ে অগ্রসর হলে সরকটি দখল করতে পারতো। কিন্তু রাস্তায় রাস্তায় এ ধরনের সংঘর্ষে লোকক্ষয় ছিল অবশ্যম্ভাবী। লোকক্ষয় এড়ানোর জন্যই তারা সাময়িকভাবে এ প্রচেষ্টা স্থগিত রেখে কুমিল্লা থেকে অগ্রসরমান সৈন্যদের দেওয়ান হাট উপস্থিতির জন্য অপেক্ষা করতে থাকে।

দামপাড়া পুলিশ লাইনের বাঙালি পুলিশরাও অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে শত্রু সেনাদের প্রতিরোধ করছিল। কিন্তু যুদ্ধের পুরো ট্রেনিং এবং অভিজ্ঞতা না থাকায় তারা বেশিক্ষন টিকতে পারেনি। সংঘর্ষে বহু বাঙালি পুলিশ হতাহত হয়। শত্রুদের ক্রমাগত চাপের মুখে বাঙালি পুলিশদের স্থানটি পরিত্যাগ করতে হয়।

পরদিন ২৯শে মার্চ। সকালে শত্রুসেনারা আগ্রাবাদ রোড অতিক্রম করতে সক্ষম হয় এবং একটি দল্কে তারা মাদারবাড়ি ও আইস ফ্যাক্টরি সড়ক হয়ে নিউ মার্কেটের দিকে পাঠিয়ে দেয়। নিউমার্কেটে অবশ্য আমাদের লোক ছিল না তবে আমি এক প্লাটুন শক্তিসম্পন্ন একটি দল্কে (প্রায় ৩০ জন) ঐ এলাকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থান কোর্ট ভবন দখলে রাখার জন্য পাঠিয়েছিলাম।

 

শত্রুদের আরেকটি দল স্টেডিয়ামের বিপরীত দিকের নৌ-ভবন থেকে বেড়িয়ে পি-আই-এ অফিসের নিকটবর্তী একটি লেনের মধ্যে দিয়ে ডিসি হিলের দিকে এগুতে থাকে। কয়েকজন পথচারী তাদের পথের মধ্যে পড়লে পাকিস্তানীরা তাদেরকে নির্মমভাবে হত্যা করে। এরপর একস্থানে থেমে তারা যুদ্ধের প্রস্তুতি নেয় এবং দ্রুতগতিতে পাহাড়ের উপর উঠে সমস্ত এলাকাটি বিনা বাধায় দখল করে নেয়। কোর্ট বিল্ডিঙে তখন আমাদের সৈন্যরা পরবর্তী লড়াইয়ের জন্য অপেক্ষমান। তারা গভীরভাবে সাহায্যের প্রত্যাশা করছিল। এবং সাহায্য করলেই যে কোন মুল্যে তারা শত্রুদের প্রতিরোধ করতে পারতো।

 

ওইদিন বিকালে এক অজ্ঞাত ব্যক্তি জাকির হোসেন রোডে অ্যাম্বুলেন্স পাঠানর জন্য মেডিকেল কলেজে ফোন করে। এ পর্যন্ত মেডিকেল কলেজ আমাদের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে ছিল। কলেজের নিকটেই গুরুত্বপূর্ণ স্থান প্রবর্তক হিলে আমাদের কিছু সৈনিক মোতায়েন ছিল। আমাদের আহত সৈনিকদের নিয়ে মেডিকেল কলেজের ডাক্তার, নার্স, ছাত্রছাত্রীরা সকলেই দিনরাত ব্যস্ত ছিল।

 

পূর্ব কথিত এ্যাম্বুলেন্সটি ফিরে আসতেই ডাক্তার এবং নার্সরা দ্রুত বেড়িয়ে আসেন। কিন্তু এ্যাম্বুলেন্সের দরজা খুলতেই বেড়িয়ে আসে একদল শত্রু সৈন্য, হাতে তাদে উদ্যত হাতিয়ার। ক্ষিপ্ততার সাথে তারা হাসপাতাল ভবনের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান গ্রহন করে। সন্ধ্যা নাগাদ আরও একদল সৈন্য এসে অবস্থানরত সৈন্যদের সাথে যোগ দেয়। কর্মচঞ্চল হাসপাতাল ভবন এবং তার পার্শ্ববর্তী আবাসিক এলাকায় নেমে আসে এক বিষণ্ণ নীরবতা।

হালিশহর এবং কোর্ট ভবন এ দুটি স্থানে তখনও আমাদের সুদৃঢ় ঘাটি ছিল। তাছাড়া শহরের বিভিন্ন স্থানে আমাদের ছোট ছোট বিচ্ছিন্ন দলগুলো তখনও শত্রুসেনাদের মোকাবিলা করছিল। কিন্তু শেষে কুমিল্লা থেকে নতুন শত্রুদল দেওয়ানহাট ক্রসিঙের কাছে পৌছে গেলে আগ্রাবাদ এলাকা থীকে আমাদের সৈন্যদের হালিশহর ঘাঁটিতে সরে আসা ছাড়া গত্যন্তর থাকে না। শহরের অর্ধেক জনসংখ্যা ততক্ষনে গ্রামের দিকে চলে গেছে। অনেকে সরাসরি সীমান্তের দিকেও চলে যায়। সকলেই কেমন যেন হতাশ হয়ে পড়ে। জনসাধারণ ঠিকই ভেবেছিল যে, কোনরূপ সাহায্য ছাড়া যুদ্ধে জয়লাভ করা আমাদের পক্ষে দেরী হবে। কারণ ইতিমধ্যেই তারা দেখছে আমাদের সৈন্যরা ভীষণ অসহায় অবস্থার মধ্যে যুদ্ধ করছিল। আমাদের গোলাগুলির সরবরাহ ছিল খুবই কম। একজন সৈনিকের হাতের অস্ত্র অকেজো হয়ে গেলে তাকে নতুন অস্ত্র না দেয়া পর্যন্ত সেই সৈনিকটিই অকেজো হয়ে পড়ে। কেউ আহত হলেও তার প্রাথমিক চিকিৎসা কিংবা তাকে অন্যত্র স্থানান্তরের কোন ব্যবস্থা আমাদের ছিল না। এমনকি একপর্যায়ে প্রয়োজনীয় পানি ও খাদ্য সরবরাহেরও কেউ ছিল না। আমার ট্যাক্টিকাল হেডকোয়ার্টারে ওয়্যারলেস কিংবা আধুনিক কোন যোগাযোগ ব্যবস্থা পরযাপ্ত না থাকায় বিভিন্ন রণাঙ্গনে যুদ্ধরত সৈনিকদের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখতে পারিনি। ফলে সর্বশেষ পরিস্থিতি অবহিত হওয়া এবং সে অনুসারে নতুন নির্দেশ দেওয়াও সম্ভব হয়নি। এছাড়া যাতায়াতের জন্য যানবাহনের সমসসাও ছিল প্রকট। আমরা যোগাযোগ এবং পরিবহনের অভাবেই ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছি বেশি। কুমিরায় আমাদের অবস্থান বিপন্ন হওয়ার সংবাদ একজন সংবাদ বাহকের মারফত তিন ঘন্টা পর পাই। সংবাদ পাওয়ার আধ ঘন্টার মধ্যেই আমি নতুন কিছু সৈন্য কুমিরার উদ্দেশ্যে পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু তারা কুমিরার দুই মাইল দূরে পৌছানোর পূর্বেই কুমিরার পতন ঘটে। আমাদের সৈন্যরা ততক্ষনে হালিশহরের দিকে ফিরে আসতে থাকে। আরেকটি সংকট ছিল ট্রেনিংপ্রাপ্ত শত্রুসৈন্যদের সাথে যখন অব্যাহতভাবে নতুন নতুন সৈন্য এবং অত্যাবশ্যকীয় দ্রব্যাদির সরবরাহ যোগ হচ্ছিলো, আমি তখন অসহায়ভাবে তা দেখছিলাম। একইভাবে দল বেধে আমাদের সামরিক লোকজনও শহর ছেড়ে চলে যাচ্ছিলো।

আমি যে কয়জন সৈন্য নিয়ে যুদ্ধ করছিলাম তার সঙ্গে একজনও নতুন সৈনিক কিংবা একটিমাত্র বুলেটও যোগ করতে পারিনি। ক্রমাগত শত্রুসৈন্যরা মোকাবিলা করে আমাদের ক্লান্ত, অবসন্ন হয়ে পড়েছিল। অনেকেই ২৫ তারিখের রাত থেকে এখন পর্যন্ত এক মুহূর্তের জন্যও চোখ বন্ধ করতে পারেনি। আমার রেলওয়ে ঘাঁটি সার্কিট হাউস এলাকা, মেডিকেল কলেজ, ডিসি হিল এবং হালিশহর কোট বিল্ডিঙ্গের যুদ্ধে আমি নতুন সৈন্য ও অস্ত্র সরবারহ প্রাপ্তির প্রত্যাশায় হতাশ হয়েছি বারবার। আর এই প্রত্যাশা যুদ্ধের সেই পর্যায়ে আমার সৈন্যদের অবসাদগ্রস্ত করে তোলে সাময়িকভাবে।

 

।। চট্টগ্রাম শহরে চূড়ান্ত লড়াই ।।

 

৩০শে মার্চ। শহরে তখন কারফিউ চলছে। খুব ভোরে একজন ভদ্রলোক চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরী বিভাগে অস্থিরভাবে অনবরত টেলিফোন করছিলেন। একটু আগে জানালা দিয়ে তিনি নারকীয় দৃশ্য দেখেছেন। একটি গাক্সহের উপর বাংলাদেশের পতাকা উড়ছিল। কয়েকজন পাকসেনা কিশোর বয়সের একটি ছেলেকে সেই পতাকা নামিয়ে ফেলতে বলে। ছেলেটি অনিচ্ছাসত্ত্বেও গাছ বেয়ে উপরে উঠে এবং পতাকাটি আস্তে আস্তে ভাজ করতে থাকে। ঠিক এ সময়ে নিচ থেকে সৈন্যরা সুস্থ মস্তিষ্কে তার দিকে রাইফেল তাক করে গুলি ছোড়ে। গুলিবিদ্ধ ছেলেটি বৃন্তচ্যুত ফুলের মতো নিচে পড়ে যায়। সৈন্যরা হো হো করে হেসে ওঠে এবং সে স্থান ত্যাগ করে।

কোন এ্যাম্বুলেন্স কিংবা অন্য কেউ কিশোরটির সাহায্যে এগিয়ে আসেনি। হাসপাতালের সবকটি গাড়িই পাকিস্তানী সৈন্যদের বহন করছিল। বস্তুত পুরো হাসপাতালটিই মিলিটারি ক্যাম্পে পরিনত হয়েছে। বাঙালি ডাক্তার, নার্স এবং অধিকাংশ রোগীই ইতিমধ্যে হাপাতাল ত্যাগ করেছে। আর রক্তপিপাসু দানব্দের হাত থেকে বাচতে যারা একেবারেই অসমর্থ তারা অসহায়ভাবে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছিলেন।

প্রতিদিনের ব্যস্ত বিপণী কেন্দ্র নিউমার্কেট সেকিন একেবারে চুপচাপ। দুপুরের মধ্যে পাকসেনারা পোর্টের দিক থেকে বরফকল সড়ক হয়ে এখানে পৌছে যায় এবং সদরঘাট, রেলওয়ে ষ্টেশন এবং স্টেডিয়ামের দিকে তারা অগ্রসর হতে থাকে। ছোট একটি দল কোর্ট হিলের দিকেও পা বাড়ায়। কিন্তু হিলে অবস্থানরত আমাদের সৈনিকদের বুলেট বৃষ্টিতে পাকিস্তানীদের পিছু হটে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে হয়।

একই দিনে হালিশহরেও সকাল ৮টা থেকে সংঘর্ষ চলতে থাকে। পাকিস্তানীরা মরিয়া হয়ে কামান দেগে চলছিল। নৌবাহিনীর সবগুলি কামানই তখন সক্রিয় ছিল। ক্রমাগত ৬ ঘন্টা যাবত তারা হালিশহরের উপর গোলাবর্ষণ করে। কামানের ছত্রছায়ায় শত্রুরা হালিশহরের দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা চালায়। কিন্তু ইপিআর সেনাদের পাল্টা আক্রমণের মুখে অগ্রগতি লাভে ব্যর্থ হয়ে শত্রুরা বিমান বাহিনীর সাহায্য প্রার্থনা করে। আধ ঘন্টার মধ্যে দুটি বিমান চলে আসে। এবং বেলা সাড়ে বারোটা থেকে আমাদের অবস্থানের উপর ক্রমাগত বিমান হামলা চলতে থাকে। আমাদের কোন বিমান বিধ্বংসী হাতিয়ার ছিল না। সেই সময় নিজেদেররও কোন বিমান থাকার কথা নয়। তাই শত্রু বিমানগুলো আকাশে তাদের আধিপত্য বিস্তার করে নির্ভিগ্নে আমাদের উপর বোমাবর্ষণ করতে থাকে। তারা তাদের ইচ্ছা মতো রনাঙ্গনের উপর আঘাত হানতে থাকলো। পরিস্কার রৌদ্রকরোজ্জ্বল দিনে তারা একটার পর একটা ট্রেঞ্চ দেখে দেখে স্ট্যাম্পিং করে চলছিল। আমাদের বীর সেনানিরাও প্রাণপণে ঘাটি আঁকড়ে লড়াই করতে থাকল। লড়াই করতে করতে অনেকেই ট্রেঞ্চের মধ্যেই মৃত্যুবরণ করল। আহতও হল অনেক। কিন্তু অবিরাম বোমা বর্ষণের ফলে তাদের অপসারণ করা সম্ভব হয়ে উঠে নি। যুদ্ধরত বাকী সৈন্যরাও বুঝতে পারল তাদের আর বেশিক্ষন হালিশহর রক্ষা করা সম্ভব হবে না। গোলাগুলির মজুতও নিঃশেষ প্রায়। তারা রাইফেলের উপরে বেয়নেট লাগিয়ে নিচের শত্রুদের সাথে হাতাহাতি লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত হল।

বিকালের মধ্যে শত্রুরা হালিশহর দখল করে নিল। হাতাহাতি যুদ্ধ চলল আধঘন্টার মতো। শত্রুসৈন্য সংখ্যাধিক্যের ফলে চূড়ান্ত ফলাফল কি হয়েছিল তা বোঝা গিয়েছিল। আমাদের সৈন্যরা পেছনে এসে ঢাকা-চট্টগ্রাম সড়কের এক স্থানে অবস্থান গ্রহন করলো সহযোগীদের লাশও ফেলে আসতে হলো।

হালিশহর পতনের পর শত্রুদের পুরো দৃষ্টি পড়লো কোর্ট হিলের উপর। এটাই ছিল শহরে আমাদের সর্বশেষ ঘাটি, সর্বশেষ আশা। বিভিন্ন দিক থেকে অবস্থানটির উপর কয়েকবারই হামলা হল। কিন্তু প্রতিবারই আমাদের সৈন্যরা তা প্রতিহত করে! এরপর এল ট্যাংক বহর। অগ্রবর্তী ট্যাংকটি পাকা রাস্তা বেয়ে উপরের দিকে উঠতেই আমাদের সৈন্যদের ট্যাংক বিধ্বংসী শেলের আঘাতে তা অকেজো হয়ে পড়লো। ট্যাংকটি অকেজো হয়ে থেমে পড়লে পেছনে অন্যান্য ট্যাংক এবং পদাতিক সৈন্যরা কিছুটা থমকে দাঁড়ালো। এ সময় সম্ভবত আমাদের শক্তির পরিমাপ করছিল। ইতিমধ্যে অবশ্য শত্রুপক্ষ আমাদের দুর্বলতা বুঝতে পেরেছিল। আমাদের সৈনিকদের তখন গোলাবারুদ নিঃশেষ প্রায়। এবং বাইরের সাথে সকল সংযোগও প্রায় সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। অদূর ভবিষ্যতে নতুন করে কোন সাহায্য লাভের সম্ভাবনা ছিল না।

২রা এপ্রিল ভোরে শত্রুরা আবার হামলা শুরু করলো। হামলা ছিল সুপরিকল্পিত। মাত্র ৩০জন সৈনিকের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল পাকিস্তানিদের পুরো একটি ব্যাটেলিয়ন। দুটি কোম্পানি মিলে প্রথম আঘাত হানলে তা সাফল্যের সাথে প্রতিহত করা হয়। এরপর আরও জোরদার হামলা চলতে থাকে। দুটি সংরক্ষিত কোম্পানি এবার অন্য দিক থেকে আক্রমণ শুরু করে। মারাত্মক গুলিবর্ষণের ছত্রছায়ায় এরা একটু একটু করে পাহাড় বেয়ে উঠতে থাকে। এদিকে আমাদের প্রতিরোধকারী সৈন্যদের গোলাগুলি নিঃশেষ হয়ে যায়। একমাত্র ট্যাংক বিধ্বংসী অস্ত্রটিও অকেজো হয়ে পড়ে। পদাতিক বাহিনীর আগে আগে এ সময় দিটি ট্যাংক উপএ উঠে আসে। বলতে গেলে অলৌকিকভাবে সেদিন আমাদের সৈনিকদের প্রায় সবাই সে স্থান ত্যাগ করে আত্মরক্ষা করতে সক্ষম হয়েছিল। এভাবেই কোর্টহিলের পতন ঘটল এবং সাথে সাথে অনির্দিষ্ট কালের জন্য চট্টগ্রাম নগরীও আমাদের হাতছাড়া হয়ে গেল। তখন সময় ছিল বেলা সাড়ে ১২টা। মাত্র ৩০জন ইপিআর এর দুর্জয় সৈনিক শত্রুপক্ষের এক ব্যাটেলিয়ন সৈন্য শক্তির অব্যাহত শেলিং এবং উপর্যুপরি আক্রমণের মুখে ৩ দিনেরও বেশি তাদের অবস্থান আগলে রেখেছিল। কাজেই এই পরাজয় তাদের অদম্য সাহস ও বিক্রমের মহিমাকে ম্লান করে দিতে পারে না।

।। ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ ।।

 

এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহেই আমি অস্ত্রসস্ত্র ও গোলাবারুদ সংগ্রহের উদ্দেস্যে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য রামগড় যাই। সেখান থেকে সাবরুম গেলে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) অফিসাররা আমার সাথে কথা বলেন এবং অবিলম্বে আগরতলা নেতৃস্থানীয় কর্মকর্তাদের সাথে আমার সাক্ষাতের ব্যবস্থা করেন। প্রয়োজনবোধে ভারতীয় রাজধানীতে যাওয়ার ব্যবস্থাও তারা করে রাখেন।

২রা এপ্রিল আমি আগরতলা পৌছালে সরাসরি আমাকে সরাসরি বিএসএফ এর সিনিয়র অফিসার মিঃ কালিয়ার অফিসে নিয়ে যাওয়া হল। আমি তার কাছে আমাদের লড়াইয়ের অবস্থা বর্ণনা করে সামরিক সাহায্যের অনুরোধ জানালাম। মিঃ কালিয়া অস্ত্রশস্ত্র সংগ্রহে কেন্দ্রীও সরকারের অনুমোদন প্রয়োজন বিধায় আমাকে অপেক্ষা করতে বললেন। অপেক্ষা করা ছাড়া আমার কোন গত্যন্তর ছিল না। আমাকে আগরতলার এক অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়া হল এবং সেখানেই এক কক্ষে আমি সারাদিন রইলাম। সেখানে সাদা পোশাক পরিহিত কয়েকজন ভারতীয় অফিসার পর্যায়ক্রমে আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করলেন। তারা আমার কাছে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অবস্থান,তাদের শক্তি, কোন ধরনের অস্ত্র তারা ব্যবহার করছে ইত্যাদি বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করলেন। তারা আমার অতীত জীবন এবং কী কারনে আমি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করেছিলাম সে বিষয়েও প্রশ্ন করলেন, ঘটনাবলী সম্পর্কে আমার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি, পাকবাহিনীর সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং স্বাধীনতা অর্জনে আমরা কি কি উদ্যোগ নিয়েছি তাও জানতে চাইলেন।

এদের সঙ্গে আমার আলোচনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও আন্তরিকতার সাথে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তারা খুবই সহানুভূতিশীল ছিলেন। তবে এদের আলোচনার ধারা থেকে আমরা বুঝতে পারি, এরা সকলেই ভারতীয় সমরিক বাহিনী ও বিএসএফ-এর গোয়েন্দা বিভাগের লোক। পরেরদিন নেতৃস্থানীয় ভারতীয় অফিসারদের সঙ্গে আমার দীর্ঘ আলোচনা হল। বিকআলের দিকে ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী শ্রী শচিন সিং এর সাথে আমি বৈঠকে মিলিত হলাম। তার আচরণও ছিল বন্ধুসুলভ। তার কাছেও আমি অস্ত্রশস্ত্র এবং কিছু জরুরী জিনিসপত্রের জন্য অনুরোধ জানাই।

মুখ্যমন্ত্রী আমাকে আশ্বাস দিয়ে বললেন, দিল্লী থেকে জবাব এলেই তিনি আমার জন্য কিছু সাহায্যের ব্যবস্থা করতে পারবেন। এ সময় দরকার হলে আমাকে দিল্লী যাবার জন্যও প্রস্তুত থাকতে বলা হলো।

পরদিন চট্টগ্রাম জেলার কয়েকজন রাজনৈতিক নেতা আগরতলা পৌছলেন। তাদের নিয়ে পুনরায় আমি শ্রী শচিন সিং এর সাথে দেখা করলাম। তিনি আমাকে জানালেন যে, ৯২তম বিএসএফ ব্যাটেলিয়ন থেকে জরুরী ভিত্তিতে আমি কিছু অস্ত্রশস্ত্র পেতে পারি। আমার অন্যান্য জিনিসপত্রের চাহিদা সম্পর্কেও তাকে অবহিত করতে বললেন। আমি তার কামরার এক কোনায় বসে প্রায় ১০ মিনিটের মধ্যে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের একটি তালিকা প্রস্তুত করে ফেলি। আওয়ামী লীগ নেতাদের হাতে সেটি তুলে দিয়ে আমি তখনই চট্টোগ্রামের পথে আগরতলা ত্যাগ করলাম। পথে ৯২তম বিএসএফ এর কমান্ডীং অফিসার কর্নেল ঘোষের সাথে আলোচনা করলাম। তিনি ততক্ষনে আমাকে কয়েকটী লাইন মেশিনগান, রাইফেল, হ্যাণ্ডগ্রেনেড ও কিছু গোলাবারুদ সরবরাহ করার জন্য তার ব্যাটেলিয়ন কে নির্দেশ দিয়ে ফেলেছেন এবং সেগুলো ইতোমধ্যেই সাবরুম থানায় পৌঁছে গিয়েছিল। জিনিসগুলো আমাকে দেয়ার জন্য ব্যাটালিয়ন হেডকোয়ার্টার থেকে বিএসএফ এর ক্যাপ্টেন মেহেক সিং কে আমার সঙ্গেই পাঠানো হয়।

চট্টগ্রাম শহরের উপর নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠার পর পাকিস্তানীরা গ্রামাঞ্চলের দিকে ছড়িয়ে পড়ে। পাকিস্তানিদের একটি কলাম হাঠাজারি, ফটিকছড়ি, নারায়নহাট এবং হিয়াকু হয়ে রামগড়ের দিকে অগ্রসর হয়। অপরদিকে রাঙ্গামাটি,কাপ্তাই এবং কক্সবাজারের দিকেও একটি করে কলাম অগ্রসর হতে থাকে। এ সময় আমরা গ্রামাঞ্চলের উপর নিয়ন্ত্রন বলবত রাখার সিদ্ধান্ত নেই। এ উদ্দেশ্য সাধন কেবল শত্রুসৈন্যদের শহরাঞ্চলে কোণঠাসা করে রাখার মাধ্যমেই সম্ভব ছিল। এভাবে সুসংগঠিত গোরিলা যুদ্ধের মাধ্যমে ক্রমান্বয়ে শত্রুর শক্তিক্ষয় করে তাদের উপর চূড়ান্ত আঘাত হানাই হবে সঠিক পদক্ষেপ। এটা আমাদের কাছে পরিষ্কার ছিল যে, এই সুদীর্ঘ প্রক্রিয়ায় আমাদের হারাতে হবে অসংখ্য জীবন। আমাদের সামনে যুদ্ধের প্রস্তুতি ব্যতিত অন্য কোন বিকল্প ব্যবস্থাছিল না। এ জন্য অবশ্য জনসাধারণকেও সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে।

রামগড় থেকে দুটি ইপিআর প্লাটুনকে চট্টগ্রাম শহরের প্রায় ৬ মাইল দূরে ভাটিয়ারি এবং ফৌজদারহাটের মধ্যে প্রতিরক্ষা মুলক অবস্থান গ্রহনের জন্য পাঠানো হয়েছিল। অন্য দুটি ইপিআর প্লাটুনকে ফটিকছড়ি হাঠাজারি হয়ে ক্যান্টনমেন্টের দিকে সহযোদ্ধাদের সাহায্যে পাঠানো হয়। ক্যাপ্টেন হারুন এবং আরও কয়েকজন অফিসার ৬টি কোম্পানি নিয়ে কালুরঘাট সেতুর নিকটেই প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান নিয়েছিল। ঠিক এ পর্যায়ে চৌঠা এপ্রিল আমরা ভারত থেকে অস্ত্র ও গোলাবারুদের প্রথম সংগ্রহ পাই। যুদ্ধ পরিচালনা করার জন্ন এ সময় আমার পুরো বাহিনীকে পুনর্বিন্যস্ত করা হয়। সসস্ত্র বাহিনীর বাঙালি সদস্যদের গুরুত্তহিন স্থান থেকে সরিয়ে গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ ফ্রন্টগুলোতে পাঠানো হল। ক্যাপ্টেন মতিন এবং লেফটেন্যান্ট এজাজের নেতৃত্বে এরুপ দুটি কোম্পানি ভারতীয় এলাকা দিয়ে শতাধিক মাইল দূরে চট্টগ্রাম সেক্টরকে শক্তিশালী করার জন্য সেখানে পৌছে। আমার দলের শক্তি ববৃদ্ধির জন্য পর্যাপ্ত অস্ত্র ও গোলাবারুদ সহ এদের একটি কোম্পানি ভাটিয়ারি অভিমুখে রওনা হয়। এবং অন্য একটি কোম্পানিকে নিয়ে আমি হিয়াকু,ফটিকছড়ি হয়ে পুনরায় চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টের দিকে অগ্রসর হই। এটা ছিল এক কষ্টসাধ্য অভিযাত্রা। রাস্তা ছিল অত্যন্ত খারাপ। যান্ত্রিক কনভয় বলতে ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালের কয়েকখানি জিপ, আর এই জিপ গুলোকে প্রায় অর্ধেক পথই আমাদের ঠেলে নিয়ে যেতে হচ্ছিল। আমাদের এ চলাচলের গোপন খবর রাখার উপায় ছিল না। কারণ, যেমনি দিনের বেলায় আমাদের চলতে হচ্ছিলো। তেমনি আবার ভারতের পথে পলায়নপর ভিতসন্ত্রস্ত অসংখ্য জনসাধারণ একই পথ ধরে অগ্রসর হচ্ছিল। যদিও আমরা সবাই বেসামরিক পোশাকে ছিলাম। এবং অস্ত্রশস্ত্র লুকিয়ে রেখেছিলাম। তথাপি শত্রুকবলিত একটি শহরের দিকে কিছুসংখ্যক লোকের সুসংগঠিত হয়ে চলার ভাব দেখে আশংকা ও হতাশায় নিমজ্জিত লোকদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার হয়। আত্মতুষ্টি লাভের জন্য তারা মুক্তিযোদ্ধার সঠিক সংখ্যার চেয়ে কয়েকগুন বাড়িয়ে শহরের দিকে তাদের যাত্রার কথা যেভাবে বলাবলি করছিল সে খবর দ্রুত শত্রু ঘাঁটিতে পৌছে যায়।

নারায়ণহাটে পৌছে আমরা সন্ধ্যার পরবর্তী যাত্রার জন্য অপেক্ষা করতে থাকি। রাতের সামান্য আহার গ্রহন করি। নারায়নহাট থেকে আমাদের মুক্তিসেনাদের নাজিরহাট পর্যন্ত পৌঁছানোর জন্য কয়েকটি নৌকার বেবস্থা করা হয়। আকাশ মেঘাচ্ছন্ন ছিল অন্যদিকে নৌকাগুলোরও কোন ছৈ ছিল না। ক্লান্তিতে অবসাদে আমরা সবাই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। কিছুক্ষন পর মুষল ধারায় বৃষ্টি নেমে আসে। আমরা বৃষ্টিতে ভিজে উন্মুক্ত আকাশের নিচে শীতে কাপতে থাকি। নাজিরহাট পৌছাতে ভোর হয়ে গেল। এখানেই খবর পেলাম ক্যান্টনমেন্টের নিকট আমাদের যে সানাদল ছিল শত্রুর আক্রমনে তা পিছু হটে হাটহাজারীর দিকে চলে গেছে। নাজিরহাট পৌছেই আমাদের জন্য একটি সম্ভাব্য ঘাটি খুজে বের করার উদ্দেশ্যে দ্রুত পর্যবেক্ষণের কাজ শুরু করি। খোজাখুজির পর কয়েক মাইল দূরে উদালিয়া চা বাগানই উপযুক্ত স্থান হিসেবে নির্ধারণ করি। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই সে দিকে রওয়ানা দিলাম। বাগানের ম্যানেজার আন্তরিকতার সাথে আমাদের স্বাগত জানালেন। সকল প্রকার সাহায্যের তিনি ব্যবস্থা করেছিলেন।

সীতাকুণ্ড পাহাড় শ্রেণীর একটি বিচ্ছিন্ন ছোট পাহাড়ের উপর গড়ে উঠেছে উদালিয়া চা বাগান। সৈন্যদের এখানে ছোট ছোট দলে ভাগ করে। প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ, খাবারের ব্যবস্থা এবং অন্যান্য কাজের ভার দেয়া হল। একশন গ্রুপকেও সদা প্রস্তুত রাখা হলো, যাতে তারা স্বল্পকালীন সময়ে শত্রুর মোকাবিলায় দ্রুত রওয়ানা হতে পারে। প্রয়োজনবোধে বিকল্প ঘাঁটি স্থাপনের স্থানটিও দেখে রাখা হল। রক্ষাবুহ্য নির্মাণের কাজ পুরোপুরি সম্পন্ন হলে এ স্থানের দায়িত্ব লেফটেন্যান্ট এজাজের উপর ন্যাস্ত করে আমি কালুরঘাটের দিকে অগ্রসর হই।

কালুরঘাটের প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে অধিকাংশই ইপিআর সৈনিক। প্রাথমিক পর্যায়েই আমি যখন চট্টগ্রাম শহরে পাকসেনাদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত ছিলাম। তখনই আমার সঙ্গে যোগ দেয়ার জন্য চট্টগ্রামের সীমান্ত ফাঁড়িগুলো থেকে ইপিআর সৈনিকদের অগ্রযাত্রা মেজর জিয়া থামিয়ে দেন। ইপিআর সৈনিকদের তিনি কালুরঘাটে রেখে দিয়েছিলেন। ৮ বেঙ্গল রেজিমেন্ট এবং ইস্ত বেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টারের কিছু সৈন্যকেও এখানে রেখে দেয়া হয়। সব মিলিয়ে কালুরঘাটে তখন ৬টি কোম্পানি ছিল যার সৈন্য শক্তি ছিল প্রায় এক হাজার।

 

আমি যখন চট্টগ্রাম শহর নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য নতুন লোকবল ও অস্ত্রবলের প্রত্যাশায় অপেক্ষা করছিলাম তখন আমারই নির্দেশে আগত ইপিআর সেনাদের কালুরঘাটে আটকে রাখা হয়। আমাদের সৈন্যদের কালুরঘাটে না থামিয়ে আমার সঙ্গে শহরের যুদ্ধে যোগ দিতে দেয়া হলে আমরা সাফল্যের সাথে নৌবাহিনীর সদর দফতর, বিমান বন্দর এবং ক্যান্টনমেন্ট দখল করতে পারতাম। এর ফলে পাকিস্তানীরা আর নতুন সৈন্য আনতে পারতো না এবং আমরাও সেখানে তাদের সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দিতে পারতাম। সে ক্ষেত্রে আমাদের যুদ্ধের ইতিহাস সম্পূর্ণ ভিন্নতর।

কী কারনে জানি না, কালুরঘাট যুদ্ধ হয়েছিল দু সপ্তাহ পরে এবং এই দুই সপ্তাহ পর্যন্ত আমাদের এখানকার সৈন্যরা কোন কাজেই লাগে নি। আমাদের তরুণ অফিসাররা দুর্জয় মনোবল এবং অদম্য সাহসে সঙ্গে এখানে লড়াই করলেও সৈন্যরা কিন্তু যোগ্য সিনিয়র অফিসারের অভাব তীব্রভাবে অনুভব করছিল। অবশ্য আমাদের সিনিয়র অফিসারদের সংখ্যাও তখন খুব বেশি ছিল না। এদের মধ্যে আবার মেজর শওকত কক্সবাজার চলে গিয়েছিলেন। ভূল খবরের ভিত্তিতেই এটা হয়েছিল। তারপর তিনি নিজেই কক্সবাজার ত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়ে কালুরঘাটে আমাদের সৈন্যদের সাথে যোগ দেন।

এখানে আমাদের প্রয়োজনীয় অস্ত্রশস্ত্র তেমন ছিল না। ৩০৩ রাইফেল ছাড়া আর ছিল কয়েকটি হালকা মেশিনগান এবং দুটি ৩’’ মর্টার। ইপিআর মর্টার জেসিও ৩’’ মর্টার দিয়েই অবিশ্বাস্য কাজ করেছিলেন। মাত্র কয়েক রাউণ্ড মর্টার শেল দিয়েই তিনি শত্রুসৈন্যদের একাধিক যায়গায় ব্যস্ত রাখতে সমর্থ হয়েছিলেন। তিনি একাই দ্রুত স্থান পরিবর্তন করে বিভিন্ন জায়গা থেকে মর্টার দাগতে থাকলে আমাদের মর্টারের সংখ্যা ঠিক কতো পাকিস্তানীরা তা অনুমান করতে ব্যর্থ হয়। আমাদের প্রতিরোধের দুর্জয়তায় শত্রুরা বরাবরই পিছু হটতে বাধ্য হয় এবং পরিশেষে প্রায় দু সপ্তাহ পর ১১ই এপ্রিল কালুরঘাটের যুদ্ধ চূড়ান্ত রূপ নেয়। কালুরঘাট সংঘর্ষে আমরা কেবল সইনিকই হারাই নাই, দু জন অফিসারও সেই সংকটকালে আহত হয়েছিল। ক্যাপ্টেন হারুন গুরতর অবস্থায় বার্মায় আশ্রয় নিলেন, আর লেফটেন্যান্ট শমসের মবিন গুরতর আহত অবস্থায় পাকিস্তানিদের হাতে বন্দী হলেন।

কালুরঘাট অবস্থান পরিদর্শনের পর আমি আবার রামগড় হয়ে কুমিরার দিকে অগ্রসর হই। কুমিরার সৈন্যদের জন্য আরো কিছু অস্ত্রশস্ত্র লাভের উদ্দেশ্যে রামগড়ে আমাকে কিছু সময় অপেক্ষা করতে হয়। রামগড়ে মেজর জিয়ার সঙ্গে আবার দেখা হলে তাকে আমি কালুরঘাট অবস্থানের অসারতার কথা বলি। তারপর কিছু অস্ত্র ও গোলাবারুদ নিয়ে সোজা কুমিরার পথে রওনা হই। কুমিরায় তখনও আমাদের সৈন্যরা শত্রুর সাথে মরণপণ লড়ে যাচ্ছিলো।

 

।। প্রথম বাংলাদেশ সরকার ।।

 

৪ঠা এপ্রিল চট্রগ্রাম শহরের পতন ঘটলে পাকিস্তানীরা ক্রমান্বয়ে কালুরঘাট সেতুর দিকে অগ্রসর হতে থাকে। ১০ই এপ্রিলের মধ্যে সেতুর নিকট তারা তাদের অবস্থান সুদৃঢ় করে তোলে। এই সময় শত্রুরা ছিলো আক্রমণমুখী এবং আমাদের ভুমিকা ছিলো আত্মরক্ষামূলক। কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী আত্মরক্ষামূলক অবস্থানে থাকতে থাকতে আমাদের সৈন্যরা উদ্যম হারিয়ে ফেলেছিল।

 

১১ই এপ্রিল সকাল আটটায় শত্রুপক্ষের গোলন্দাজ বাহিনী কালুরঘাট অবস্থানের উপর আক্রমণ শুরু করে। নৌবাহিনীর কামানগুলো থেকেও গোলাবর্ষণ শুরু হয়। ক্যাপ্টেন হারুন ও লেফটেন্যান্ট শমসের সেতুর পশ্চিম পার্শ্বে (শহরের দিকে) অগ্রবর্তী দলের নেতৃত্বে ছিলেন। আমাদের প্রধান অবস্থান ছিলো সেতুর পূর্ব পার্শ্বে।

 

কিছুক্ষণের মধ্যে শত্রুদের গোলাবর্ষণ তীব্রতর হয়ে ওঠে। এই গোলাবর্ষণের ছত্রছায়ায় পাকিস্তানীরা সম্মূখযুদ্ধেও প্রস্তুতি নিয়ে সেতুর দিকে অগ্রসর হতে থাকে। ট্রেঞ্চ থেকে হারুন শত্রুপক্ষের অস্বাভাবিক তৎপরতা লক্ষ্য করে শমসেরকে বললো তোমার বাইনোকুলারটা দাও তো, ওদের অবস্থানটা দেখি। কথা শেষ না হতেই হারুন তলপেটে প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব করলো। তীব্র যন্ত্রণায় হারুন কুকড়ে যাচ্ছিলো। লাইট মেশিনগানের এক ঝাঁক গুলি তাকে বিদ্ধ করেছে। দুজন ছাত্র তাড়াতাড়ি হারুনকে ধরে সেতুর গোড়ায় নিয়ে এলে সে নিজেই প্রায় দৌড়ে সেতু পার হয়ে সংজ্ঞাহীন অবস্থায় পড়ে যায়। তাকে একটি মাইক্রোবাসে পটয়ায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এর অল্পক্ষণ পরেই শমসেরের হাটুতে গুলি লাগলে সেও অচল হয়ে পড়ে। তখন তার প্রায় চারপাশে লড়াই চলছিলো। শমসের শত্রুদের হাতে বন্দী হয়। দুজন অফিসারকে হারিয়ে আমাদের সৈন্যদের মনোবল সম্পূর্ণ ভেঙ্গে পড়ে। তারা ঘাঁটি ত্যাগ করে পিছনে হাটতে শুরু করে। সেদিন বিকাল নাগাদ কালুরঘাটে আমাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ে এবং আমাদের সৈন্যরা পার্বত্য চট্রগ্রামের পথ ধরে রামগড়ের দিকে অগ্রসর হতে থাকে।

 

পথে মহালছড়িতে হঠাৎ পাক বাহিনীর কমান্ডো কোম্পানীর সাথে তাদের সংঘর্ষ বেঁধে যায়। পাক বাহিনীর সাথে বিচ্ছিন্নতাবাদী মিজোরাও ছিলো। পাকিস্তান সরকার এইসব মিজোদের আশ্রয় এবং ট্রেনিং দিয়ে ভারতের বিরূদ্ধে বিদ্রোহাত্মক তৎপরতায় সহায়তা করতো।

 

উদালিয়া চা বাগানে আমাদের যে কোম্পানী ঘাঁটি স্থাপন করেছিলো পাকিস্তানীদের তীব্র আক্রমণে তাদের সে এলাকা পরিত্যাগ করতে হয়। ওদিকে চট্রগ্রাম ঢাকা মহাসড়কের কুমিরায় তখন প্রচণ্ড লড়াই চলছিলো। চট্টগ্রামের দিকে শত্রুদের অগ্রাভিযান প্রতিরোধ করার জন্য আমাদের যে সৈন্যরা সেখানে অবস্থান গ্রহণ করেছিলো, শত্রুবাহিনী পর্যবেক্ষণ বিমানের সহায়তায় তাদের উপর প্রচণ্ড গোলাবর্ষণ শুরু করে। গোলাবর্ষণে আমাদের পক্ষের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। আরো রক্তক্ষয় এড়ানোর জন্য আমাদের সৈন্যরা সীতাকুণ্ডতে সরে আসে। শত্র সৈন্যর আগমন বিলম্বিত করার উদ্দেশ্যেই সেখানে আমাদের অল্প কয়েকজন সৈন্য থেকে যায় এবং এই অবসরে বাঙালি সৈন্যরা তাদের সীতাকুণ্ড ঘাঁটি সুদৃঢ় করে গড়ে তোলে। কিন্তু ১৬ই এপ্রিলের মধ্যে শত্রুরা আমাদের সীতাকুণ্ড অবস্থানের উপর আঘাত হানে। তারা গোলন্দাজ বাহিনীর সহায়তায় কয়েক দফা হামলা চালায়। নৌবাহিনীর কামানগুলো তখন ব্যাপকভাবে গোলাবর্ষণ করছিলো। তবুও আমাদের সেনারা পাল্টা আঘাত হেনে শত্রুপক্ষের প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি করে।

 

বাংলাদেশের প্রতিটি প্রত্যন্ত অঞ্চলে তখন লড়াই ছড়িয়ে পড়েছে। এই সময়ে কুষ্টিয়ার মেহেরপুরের বৈদ্যনাথ তলায় আমবাগানে বাঙালির জীবনে এক অনন্য সাধারণ ঘটনা ঘটে যায়। দিনটি ছিলো এপ্রিলের ১৭ তারিখ। ঐদিন সকাল আনুমানিক ৮টায় জনাব তাজউদ্দিন আহমেদ, জনাব সৈয়দ নজরুল ইসলাম, কর্ণেল এমএজি ওসমানী এবং অন্যান্য রাজনৈতিক নেতারা বৈদ্যনাথ তলায় এসে পৌঁছান। নেতৃবর্গের বসার জন্য পাশের গ্রামগুলো থেকে কিছুসংখ্যক চেয়ার জোগাড় করা হলো। সেসব চেয়ারের অধিকাংশের হাতল ছিলো না। বেলা এগারোটার মধ্যে অন্যান্য নেতারা পৌঁছে গেলেন। পার্শ্ববর্তী এলাকার লোকজন এবং জনা পঞ্চাশেক বিদেশী সাংবাদিকও সবুজ শ্যামলিমায় ঘেরা আম্রকাননে উপস্থিত হলেন। এদের সামনেই সেদিন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। শেখ মুজিবের নামানুসারে এ জায়গার নামকরণ করা হয় মুজিবনগর। শেখ মুজিবুর রহমানের নাম ঘোষণা করা হয় রাষ্ট্রপতি হিসেবে। সৈয়দ নজরুল ইসলাম হন উপ-রাষ্ট্রপতি এবং ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি। কারণ শেখ মুজিবুর রহমান তখন পাক সামরিক জান্তার কারাগারে বন্দী। ইপিআরের একটি প্লাটুন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামকে গার্ড অব অনার প্রদান করে।

 

এদিকে ১৮ই শত্রু বাহিনী আমাদের সীতাকুণ্ড অবস্থান ছত্রভঙ্গ করে দিলে এখান থেকে আমাদের সৈন্যদের মীরেশ্বরাইতে পশ্চাদপসরণ করতে হলো। আমরা জানতাম মীরেশ্বরাইতেও আমরা অল্প কিছুদিনের জন্য থাকতে পারবো, তারপর আবার সরে যেতে হবে। এই দুঃখজনক অবস্থা কতদিন চলবে তা কারো জানা ছিলো না। সৈন্যরাও ক্রমে আস্থা হারিয়ে ফেলছিলো। কোনো রকম অবস্থান প্রতিরক্ষায় নিজেদের যোগ্যতা সম্পর্কে নিজেরাই সন্দিহান হয়ে উঠছিলো। লোকবল ও বিপুল অস্ত্রবলের সাহায্যে শত্রুপক্ষ প্রতিটি যুদ্ধেই ইচ্ছামতো ফলাফল নির্ধারণ করে চলছিলো। এই সংকটময় দিনগুলোতে আমাদের সবচাইতে বেশী দরকার ছিলো কিছু ভালো অস্ত্রের। চিরাচরিত পন্থায় যুদ্ধ হচ্ছিলো। অস্ত্রবল বৃদ্ধি করতে না পারলে আমাদের জয়ের কোনো আশাই ছিলো না। দুর্ভাগ্যক্রমে আমাদের বাংলাদেশ বাহিনীর কলকাতাস্থ সদর দফতরটি ছিলো রণাঙ্গণ থেকে বহুদূরে। সম্ভবতঃ এই দূরত্বের কারণেই যুদ্ধের পরিস্থিতি ও আমাদের চাহিদা সম্পর্কে সদর দফতর কিছুটা উদাসীন ছিলেন। একদিকে আমাদের সামরিক দফতর থেকে বলা হতো, “যেভাবেই হোক ঘাঁটি দখলে রাখার জন্য দৃঢ় প্রতিরক্ষাব্যুহ রচনা করো।” আবার উন্নত ধরণের অস্ত্রশস্ত্র চাইলে জবাব পেতাম, ‘এটা তো গেরিলা যুদ্ধ, ভারী অস্ত্রের তেমন প্রয়োজন নেই।’ ওই জবাব গেরিলা যুদ্ধ সম্পর্কিত বই পড়া জবাব না ভারতের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় অস্ত্র সংগ্রহে সরকারের অক্ষমতা তা আমরা জানতাম না। গেরিলা যুদ্ধে উন্নত অস্ত্রশস্ত্রের প্রয়োজন নেই, এই উক্তিটি যে কত অসার তা সে সময়ে পৃথিবীর অন্যান্য যেসব দেশে গেরিলা যুদ্ধ চলছিলো সেসব যুদ্ধ পর্যালোচনা করলেই বুঝা যায়। তাছাড়া আমরা শুধু গেরিলা যুদ্ধ করছিলাম না। সাথে সাথে প্রচলিত ধারার লড়াইও আমাদের করতে হচ্ছিলো। দেশের বেশ কয়েকটি স্থানে আমাদের সৈন্যরা প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে শত্রুপক্ষের অগ্রাভিযান প্রতিরোধেরও চেষ্টা করছিলো। প্রচলিত প্রথার এই যুদ্ধের পাশাপাশি ট্রেনিংপ্রাপ্ত ছোট ছোট গেরিলা দলকেও বাংলাদেশের ভিতরে পাঠানো হচ্ছিলো।

 

একাত্তরের যুদ্ধের এই বৈশিষ্ট অনেকেই পরিস্কারভাবে বুঝতে পারেনি। তাই আমাদের সরকার এবং সামরিক হেডকোয়ার্টারের কাছে আমাদের সুবিধা অসুবিধা বোধগম্য হয়নি। সবচাইতে নাজুক অবস্থা ছিলো আমাদের অর্থাৎ সমরক্ষেত্রের কমান্ডারদের যারা সৈন্য ও অফিসারদেরকেও যুদ্ধের ব্যাপারটা বুঝাতে হতো। সে সময়ের একটি ঘটনার কথা বলছি। তখন আমি সৈন্য নিয়ে মীরেশ্বরাই এলাকায় শত্রুর সাথে যুদ্ধ করছিলাম। ৩ইঞ্চি মর্টার গোলার ঘাটতি ছিলো আমাদের এবং শত্রুরা তখন আমাদের প্রতিরক্ষাব্যুহের উপর কামান দেগে চলছিলো। শত্রুদের গোলায় আহত একজন সৈনিক আমাকে জিজ্ঞেস করলো, “আপনি আমাদেরকে কামানের আশ্বাস দিয়েছিলেন, কিন্তু কাফেরদের বিরুদ্ধে আমাদের কামান ব্যবহার করছেন না কেনো?” এ প্রশ্নের কোন জবাব আমি দিতে পারি নি। তবুও আমার আশা ছিলো, শেষ পর্যন্ত প্রয়োজনীয় সাহায্য আমি পাবোই। এটা আমার দুরাশা ছিলো কিনা বলতে পারি না। পর্যাপ্ত অস্ত্র শস্ত্র পাবার ইঙ্গিতের উপর ভিত্তি করেই আমি যোদ্ধাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম।

 

শেষ পর্যন্ত যখন অস্ত্র পাওয়া যাচ্ছিলো না এবং যোদ্ধাদের পর্যাপ্ত অস্ত্রশস্ত্র দেয়া যাচ্ছিলো না সে অবস্থায় সৈন্যদের ঘাঁটি আগলে থাকার নির্দেশ দেয়া আমাদের জন্য খুবই অস্বস্তিকর হয়ে উঠে। এতদস্বত্বেও আমি আমার বাহিনীকে দৃঢ় মনোবল নিয়ে তাদের অবস্থান রক্ষা করতে বাধ্য করছিলাম। এছাড়া আর বিকল্প পথ ছিলো না। কোনো কোনো সময় মনে হয়েছে সৈন্যদের আমরা গিনিপিগের মতো ব্যবহার করছি। ট্রেঞ্চে বসে থেকে কেউই প্রাণ হারাতে চায় না। তারা যুদ্ধের ময়দানে যুদ্ধই করতে চেয়েছিলো, কিন্তু প্রচলিত যুদ্ধের সুযোগ ক্রমেই সীমিত হয়ে আসছিল।

 

২০শে এপ্রিল পাক সেনাদের দুটি ব্যাটালিয়ন সর্বশক্তি দিয়ে মীরেশ্বরাইয়ের উপর হামলা চালায়। চুড়ান্ত আঘাত হানার পূর্বে প্রায় ২৪ ঘন্টাই পাক কামানগুলো আমাদের উপর আঘাত হেনে চলছিলো। মাটি খোড়ার সরঞ্জামাদি এবং অন্যান্য প্রতিরক্ষামূলক জিনিসপত্র না থাকায় তেমন শক্তিশালী বাংকারও আমরা তৈরি করতে পারিনি। অনেক সময়েই সৈন্যদের বেয়নেট দিয়ে মাটি খুড়তে দেখেছি। উপরের আচ্ছাদন তৈরীর জিনিসপত্রও ছিলো না। তাই আমাদের বাংকার ও ট্রেঞ্চগুলো কামানের গোলায় ভেঙ্গে পরছিলো। খোলা জায়গায় আমাদের আমাদের সৈন্যরা শত্রুর সহজ শিকারে পরিণত হচ্ছিলো। যা আশংকা করেছিলাম, শত্রুরা এই সময়ে এয়ার বার্ষ্ট শেল নিক্ষেপ করতে শুরু করে। আমাদের সৈন্যরা এই ধরনের হামলার সাথে পরিচিত ছিলো না। হতাহতের সংখ্যা বাড়তে থাকায় অবস্থান থেকে তারা হটতে শুরু করে। শত্রু পক্ষেও হতাহত কম হচ্ছিলো না। পরপর তিনদফা আক্রমণে ওদের শতাধিক সৈন্য হারাতে হয়। আমাদের ট্যাংক বিধ্বংসী গোলায় পাকিস্তানী সৈন্যবাহী আটটি যান প্রায় তিন ঘন্টা যাবৎ জ্বলতে থাকে। মটরযানে অবস্থানরত বেশকিছুসংখ্যক সৈন্যও জ্বলন্ত দগ্ধ হয়। সন্ধ্যার অন্ধকারে আমাদের সৈন্যরা পরবর্তী অবস্থান মস্তাননগরে প্রতিটি রক্ষাব্যুহ গড়ে তোলে। এই সময় শত্রুপক্ষের সাথে কয়েকটি ট্যাংক এসে যোগ দিলে সংঘর্ষ তীব্রতর হয়।

 

আমাদের সৈন্যরা মস্তাননগরে তাদের অবস্থান সুদৃঢ় করার পূর্বেই সেখানে শত্রুর কামানের গোলা এসে পড়তে থাকে। বাঙালি সেনাদের তখন খাদ্য ও পানি সরবরাহ করা যাচ্ছিলো না। এমনকি গোলাগুলির যোগান দেওয়া কঠিন হয়ে উঠছিলো। তবু তারা শেষ গুলিটি নিঃশেষ না হওয়া পর্যন্ত ঘাঁটি আগলে রাখে। শত্রুরা তখন ট্যাংক সামনে নিয়ে আমাদের দিকে অগ্রসর হচ্ছিলো। মস্তাননগরে অবস্থান টিকিয়ে রাখা দুস্কর হয়ে উঠলে আমি করের হাটের কয়েক মাইল দক্ষিনে হিংগুলী এলাকায় সৈন্যদের নিয়ে যেতে মনস্থ করি। এখানে পূর্ব-পশ্চিম বরাবর একটি খাল থাকায় শত্রুদের দ্রুত অগ্রগমন সম্ভব ছিলো না। অগ্রসরমান শত্রুর ট্যাংকের অগ্রযাত্রা থামাতে হলে খালের উপর প্রধান সেতুটি ধ্বংস করা দরকার।

 

তখন প্রায় মধ্যরাত। আমাদের সৈন্যরা সবাই ক্লান্ত, অবসন্ন। তবুও তারা হিংগুলীতে প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান গড়ে তোলে এবং পরবর্তী লড়াইয়ের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। রাতে কারো চোখে ঘুম ছিলো না। পাকিস্তানীরা সতর্কতার সঙ্গে অগ্রসর হচ্ছিলো। হিংগুলীর অদুরেই আমরা তাদের যানবাহন এবং ট্যাংকের আওয়াজ পরিস্কার শুনতে পাচ্ছিলাম। সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে আমি সেতুটি ধ্বংসের কাজে হাত দিলাম। আমাকে সহায়তা করছিলো বিএসএফের মেজর প্রধান।

 

রাত ৭টা নাগাদ সেতুটি ধ্বংস করার সব ব্যবস্থা সম্পন্ন হলো এবং মেজর প্রধান সেই রাতেই সাব রুমের পথে রওয়ানা হয়ে গেলেন। আমি ত্রিশ সেকেন্ডের একটি ফিউজে আগুন ধরিয়ে দ্রুত নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেই। এক এক করে সেকেণ্ড অতিবাহিত হয়, তারপর মিনিট, কিন্তু বিস্ফোরণ আর ঘটলো না। আসোলে ফিউজটি খারাপ ছিলো। আমার সঙ্গে অতিরিক্ত যে ফিউজ ছিলো তাও দেখা দেখা যয় অকেজো। ভোর হতে মাত্র দুঘন্টা বাকী। এরই মধ্যে সেতু আমাদের ধ্বংস করতেই হবে। তখন আমার সামনে হিংগুলী থেকে পঁচিশ মাইল দুরের রামগড় থেকে ফিউজ নিয়ে আসা ছাড়া অন্য কোনো পথ খোলা ছিলো না। ট্যাংক এবং অন্যান্য গাড়ী ক্রমশ নিকট থেকে নিকটতর হচ্ছিলো। রাত তিনটা। আমি তখন মরিয়া হয়ে ফিউজের জন্য খবর পাঠালাম। আমাদের নিজস্ব কোনো বিস্ফোরণের মজুত ছিলো না। ফলে সম্পূর্ণভাবে বিএসএফের উপর নির্ভর করতে হতো।

 

রাতে আমরা দ্রুত হিংগুলী ঘাঁটিতে অবস্থান করছিলাম। ভোরে আবার তার পুনর্বিন্যাস করা দরকার হবে। ভয় ছিলো এই পুনর্বিন্যাসের আগেই না শত্রুরা এসে পড়ে। সেতু ধ্বংস করা যায়নি। ট্যাংক এসে পড়লে পরিস্থিতি মারাত্মক আকার ধারণ করে। ইতিমধ্যে রামগড় ফেরার পথে মেজর প্রধান খবর পান যে, সেতুটি ধ্বংস করা সম্ভব হয়নি। এই সংবাদ পেয়ে তিনি দ্রুত কয়েকটি ফিউজ নিয়ে পুনরায় হিংগুলী অবস্থানে আসেন। রাত তখন পৌনে চারটা। এসময় রামগড়ের দিক থেকে আমার দিকে অগ্রসরমান একটি জীপের আলো আমার নজরে পড়ে। মেজর প্রধান জীপ থেকে দৌড়ে এসে আমাকে একটি ফিউজ দিয়ে বলেন, এটা আশা করি কাজ করবে। না সেটাতেও কোনো কাজ হলো না। শেষ পর্যন্ত চতুর্থ ফিউজ কাজ হলো। কর্ণবিদারী বিস্ফোরণের আওয়াজ কয়েক মাইল দূর থেকেও শোনা গেলো। সেতুটি সম্পূর্ণ ধ্বংস হওয়াতে আমাদের দুশ্চিন্তার অবসান হলো। আমরা দুজনে আনন্দে বলে উঠলাম ‘চমৎকার।‘

 

শত্রুসৈন্যদের মূল দল তখন মাইল খানেক দূরে। এদের পিছনেই ছিলো আর্টিলারী। দিনের প্রথম আলোয় আমরা তাড়াতাড়ি ঘাঁটি পুনর্বিন্যাসের কাজে হাত দেই।

 

এই সংকটময় মুহুর্তে কুমিল্লা সেক্টর থেকে পাওয়া আমাদের নিয়মিত কোম্পানীকে অন্য এক যুদ্ধ ফ্রন্টে চলে যেতে হয়। আমার কাছে হিংগুলীতে তখন একশ’র বেশী লোক ছিলো না, যাদের অধিকাংশ ইপিআর পুলিশ ও মুজাহিদ। আমাদের সৈন্যদের বেশীরভাগই মহালছড়ি এবং নারায়ণহাট এলাকার সংঘর্ষে ব্যাপৃত ছিলো। আমাদের হিংগুলীর অগ্রবর্তী অঞ্চল ছিলো প্রায় তিন মাইল বিস্তৃত। এই বিস্তীর্ণ অঞ্চল রক্ষা করা অপরিহার্য। কুমিল্লা সেক্টর কোম্পানীর কাছে কিছু ভালো অস্ত্র ছিলো তা তারা নিয়ে গেছে। আমাদের ছিলো মাত্র দুটি লাইট মেশিনগান। বাকীগুলো সবই ছিলো সেকেলে ৩০৩ রাইফেল। একটি ৩” মর্টার পাওয়া গেলেও সেটি আপন খেয়ালে চলতো। আমি বুঝতে পারছিলাম, মাত্র একশ সৈন্য নিয়ে দুই ব্যাটালিয়ন শত্রুসৈন্যকে নিশ্চই বেশিক্ষণ ঠেকিয়ে রাখা যাবে না। নারায়ণহাটে সৈন্য চেয়ে আমি যে খবর পাঠিয়েছিলাম তাদের আসতে অন্তত দুদিন লাগবে। এখানে আমাকে এই দুইদিন শত্রুদের ঠেকাতে হবে। শত্রুরা আমার আসোল শক্তি সম্পর্কে বিন্দুমাত্র আভাস পেলেও তৎক্ষনাৎ আক্রমণ করে বসতো। সেতুর পূর্বদিকে পাহাড়ী এলাকা পর্যন্ত প্রায় সমতল। মাঝে মধ্যে ছোট ছোট ঢিবি, টিলা। সৈন্য চলাচলে এগুলো আড়াল হিসেবে কাজে লাগছিলো। এই সমতল এলাকাটির দৈর্ঘ্য ছিলো প্রায় দুই মাইল। সেতুর পশ্চিম দিকের এলাকা একেবারে সমুদ্র উপকুল পর্যন্ত আমাদের অরক্ষিত রাখতে হচ্ছিলো। সৈন্যসংখ্যা বেশী না থাকায় আমি জনা ত্রিশের মতো লোক নিয়ে তাদের দু’ভাগে ভাগ করি। এরপর দুদলকে পূর্ব ও পশ্চিম দিকে পাঠাই। উদ্দেশ্য ছিলো তারা এমনভাবে চলাচল করবে যাতে দুর থেকে শত্রুরা বুঝতে পারে যে, দুটি অঞ্চল জুড়েই আমরা প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান গ্রহণ করেছি। পরিকল্পনা অনুযায়ী সামনে এগিয়ে গিয়ে এক জায়গায় শুয়ে পড়ে এবং এমনভাবে হামাগুড়ি দিয়ে কোনো মাঠ বা ঝোপের পিছনে চলে আসতো যাতে শত্রুরা যাতে শত্রুরা তাদের পিছনে হটে যাওয়া দেখতে না পায়। এখান থেকে উঠে আবার একটু প্রকাশ্যভাবেই আরেক যায়গায় যেতে থাকে। গোপনে পিছন দিকে এবং প্রকাশ্যে সামনের দিকে যাওয়ার এই প্রক্রিয়া বিভিন্নস্থানে বেশ কয়েকবার করে চলে। এতে শত্রুদের ধারণা জন্মায় যে এক একটি স্থানেই পঞ্চাশ ষাটজন করে বাঙালি সেনা রয়েছে। অথচ আমাদের ছিলো মাত্র পনের জনের মতো সৈন্য। বিকাল পর্যন্ত আমরা কাজটি চালিয়ে যেতে থাকি। দূর থেকে কেউ এ দৃশ্য দেখলে নির্ঘাত মনে করবে সেতুর উভয় পার্শ্বে আমাদের পনের থেকে দুই হাজার সৈন্য প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান গ্রহণ করেছে।

 

এই অবস্থায় আমাদের বাদবাকী সৈন্যরা সেতুর নিকট রাস্তা কভার করে সুবিধাজনক স্থানগুলোতে প্রতিরক্ষাব্যুহ গড়ে তুলতে থাকে। সন্ধ্যা নাগাদ আমাদের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়। পদ্ধতিটি কিছু সময়ের জন্য অবশ্যই কাজে লেগেছিলো। রাতে আমাদের সাড়া সম্মুখভাগ জুড়ে শত্রুর কামানের গোলাবর্ষণ শুরু হয়। দুই দিন পর্যন্ত তা অব্যাহত থাকে, তবুও তারা এগিয়ে এসে আক্রমণ করলো না। এদিকে আমাদের দলেও নতুন সৈন্য এসে পৌঁছায়নি। এ সময় এক নতুন বিপদ দেখা দিলো। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে বিপুল সংখ্যক সৈন্য এসে পড়ায় শত্রুরা রণাঙ্গণে আরো বেশী করে সৈন্য পাঠাতে লাগলো। ১২০ এম এম মর্টারসহ আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত একটি পুরো ব্যাটালিয়ন ফটিকছড়ি, নারায়ণ হাট দিয়ে হিয়াকুর দিকে এগোয়। এদের অগ্রাভিযানের ফলে হিয়াকু এবং করেরহাট হিংগুলী এলাকার মধ্যবর্তী স্থানে আমাদের সকল সৈন্য আটকা পড়ার আশংকা দেখা দেয়। এই অবস্থায় আমি নারায়ণ হাট থেকে সৈন্য পাওয়ার আশা পরিত্যাগ করি।

 

।। রামগড় ভস্মীভূত ।।

 

২৫শে এপ্রিল পাকিস্তানীদের হাতে করের হাটের পতন ঘটে। তারপর তিনদিক থেকে রামগড় অভিমুখে অগ্রসর হয়। করেরহাট রামগড় সড়কে একদল, নারায়ণহাট হিয়াকু রামগড় পথে দ্বিতীয় দল এবং মহালছড়ি রামগড় সড়ক ধরে তৃতীয় দল অগ্রসর হতে থাকে। করেরহাট থেকে রামগড় যাওয়ার পথে পাহাড়গুলো দখল করার জন্য পাকিস্তানীরা পূর্বদিকে এগুচ্ছিলো। ফেনী নদীর শুভপুর সেতুর দিকেও কিছুসংখ্যক শত্রুসেনা অগ্রসর হচ্ছিলো। পক্ষকাল পরে এই সেতুর কাছেই এক রক্তক্ষয়ী লড়াই সংঘটিত হয়।

 

করেরহাট এবং রামগড়ের মাঝামাঝি স্থানে ছোট বাজার হিয়াকু। শত্রুরা কিভাবে যেনো জেনেছিলো আমরা রামগড়েই চট্টগ্রাম সেক্টরের সদর দফতর স্থাপন করেছি। কথাটি আংশিক সত্য, সম্পূর্ণ নয়। এখানে আমাদের কিছু জালানী এবং খাদ্য মজুত ছিলো। আরো ছিলো আমাদের আহতদের চিকিৎসার জন্য অস্থায়ী একটি হাসপাতাল। এছাড়া ছিলো ছোট্ট একটি ট্রেনিং ক্যাম্প। এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহের পর থেকেই মুক্তিযোদ্ধাদের এখানে আমরা অস্ত্র ও বিস্ফোরক ব্যবহারের ট্রেনিং দিচ্ছিলাম। তবে প্রয়োজনে এখান থেকেও সবকিছু সরানোর প্রস্তুতি আমাদের ছিলো। রামগড় অবশ্য আমাদের মান সম্মানেরও প্রতীক হয়ে উঠছিলো। কারণ এটাই ছিলো আমাদের নিয়ন্ত্রণাধীন সর্বশেষ মহকুমা সদর দফতর। তাই আমরা স্থানটি প্রতিরক্ষার জন্য সম্ভাব্য সবরকম প্রস্তুতি গ্রহণ করি। এজন্য আমরা কয়েকটি সেতু ধ্বংস করে ফেলি। সীমিত সম্পদ ও শক্তির দিকে লক্ষ্য রেখে যতদূর সম্ভব ব্যাপক এলাকা জুড়ে সম্ভাব্য শত্রু হামলার স্থানগুলোতে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা গড়ে তুলি।

 

রণকৌশলের দিক থেকে তখন হিয়াকু এবং করেরহাটের মধ্যে আমাদের কোনো সৈন্য রাখার উপযোগিতা ছিলো না। সৈন্যদের এখানে শত্রুবেষ্টনীর মধ্যে পড়ে যাওয়ার ভয় ছিলো। তাই সকল দিকের সব সৈন্য প্রত্যাহার করে হিয়াকু এলাকায় সমাবেশ করেছিলাম।

 

অন্য পথে আরো পূর্বে মহালছড়িতে আমাদের সৈন্যদের উপর ইতিমধ্যে শত্রুরা হামলা চালিয়েছিলো। আমাদের বাহিনী তখন আরো সৈন্য ও অস্ত্রশস্ত্র চেয়ে খবর পাঠাচ্ছিল। কিন্তু আমরা তাদের কিছুই দিতে পারি নি।

 

এপ্রিলের তৃতীয় সপ্তাহের দিকে অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকার সর্বোচ্চ সামরিক কমান্ডের মতো কিছু একটা গঠন করেন। রণাঙ্গণের কমান্ডাররা কিন্তু সর্বোচ্চ সামরিক কমাণ্ড থেকে কোনো আদেশ পান নি। বস্তুতঃ অভিযান সংক্রান্ত কোনো আদেশই তাদের ছিলো না। যে কোনো মূল্যে শত্রু আক্রমণ প্রতিহত করতে হবে। আমাদের প্রতি এটাই ছিলো সেই বিমূর্ত হাই কমান্ডের একমাত্র নির্দেশ। যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তব চিত্রের সাথে এই আদেশের কোনো সম্পর্ক ছিলো না। শত্রুর অগ্রাভিযান কিছু সময়ের জন্য হয়তো বিলম্বিত করা যায় কিন্তু প্রাণঘাতী লড়াইয়ের ময়দানে প্রয়োজনীয় অস্ত্রশস্ত্র ও রসদ ছাড়া শত্রুকে দমন করার চিন্তা আকাশ কুসুম স্বপ্নমাত্র। কেউ কেউ এই যুক্তি অনুধাবন না করেই খামখেয়ালী এবং অসঙ্গত আদেশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। অচিরেই আমাদের সৈন্যরা এই অদৃশ্য কমান্ডের উপর আস্থা হারিয়ে ফেলে এবং এর আসোল অস্তিত্ব সম্পর্কেই সকলের মধ্যে সন্দেহ সন্দেহ দেখা দেয়।

 

পাকিস্তানীরা মহালছড়ি আক্রমণ করেছিলো ২৭শে এপ্রিল। এখানে ছিলো প্রায় তিন হাজার সৈন্যের দুটি মিজো ব্রিগেড এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একটি নিয়মিত কমান্ডো কোম্পানী। আমাদের সৈন্যদের পাহাড়ী এলাকায় যুদ্ধের ট্রেনিং ছিল না। অস্ত্র ও রসদপত্রের অভাব ছিলো। তাই মহালছড়িতেও আমাদের বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হয়। পাকিস্তানীরা মিজোদের সামনের সারিতে পাঠিয়ে দিয়ে একটির পর একটি হামলা চালাতে থাকে। প্রতিবার প্রথমেই তাদের সে হামলা ব্যর্থ হয়ে যায়। হামলায় মিজোরা দারুনভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়। পিছনে থাকা কমাণ্ডদের চাপের ফলে মিজোরা পিছনেও সরতে সরতে পারছিল না। এমনকি কমান্ডোরা অস্ত্র দিয়ে এমন ভাব দেখাচ্ছিলো যে কোনো মিজো পালাতে চেষ্টা করলেই তাকে গুলি করা হবে। যুদ্ধ গড়িয়ে চলে।

 

মিজোদের কয়েকটি ছোট ছোট দল কোনোক্রমে কয়েকটি টিলা পেরিয়ে পাহাড়ের উপর সুবিধাজনক স্থান দখল করে নেয়। এদের এই জায়গা থেকে আমাদের অবস্থান এবং রামগড় অভিমুখী সড়ক পরিস্কার দেখা যাচ্ছিলো।

 

যুদ্ধ পরিস্থিতি ক্রমেই সঙ্গীন হয়ে ওঠে। আমাদের সৈন্য সংখ্যার চেয়ে কয়েকগুন বেশি শত্রুসৈন্য বাঙালি সৈন্যদের প্রায় ঘিরে ফেলে। তরুন অফিসার ক্যাপ্টেন কাদেরকে আমরা এখানেই হারাই। প্রচণ্ড ঝুঁকি নিয়ে একটা সুবিধাজনক স্থান দখল করার জন্য সে গিয়েছিলো যাতে বাঙালি সৈন্যদের নিরাপদ পশ্চাদপসরণে সে সাহায্য করতে পারে। কাদের সফল হয়েছিলো, কিন্তু তারপরই লাইট মেশিনগানের এক ঝাক গুলিতে তার দেহ ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। বীরের মতো মৃত্যুবরণ করেছিলো ক্যাপ্টেন কাদের। এই যুদ্ধে প্রথম একজন অফিসার হারিয়ে আমাদের সৈন্যদের মনোবল ভেঙ্গে পড়েছিলো। দু’জন মাত্র শওকত ও ফারুক (পরে দুজই সেনাবাহিনীতে কমিশনপ্রাপ্ত অফিসার হয়েছিলেন) এবং সিপাই ড্রাইভার আব্বাস শত্রুদের বৃষ্টির মতো গুলির মধ্য দিয়েই ক্যাপ্টেন কাদেরের দেহ উদ্ধার করে আনে। রামগড়ে আমরা যথাযোগ্য ধর্মীয় ও সামরিক মর্যাদায় কাদেরের মৃতদেহ দাফন করি।

 

এপ্রিলের ২৯ তারিখে হিয়াকুর কাছে যুদ্ধ শুরু হয়। আমাদের অবস্থান স্থলের সামনের জায়গাটি ছিলো খোলা কিন্তু দু’পাশে ছোট ছোট টিলার উপর ঘন জঙ্গল। এই জঙ্গলের আড়াল দিয়ে শত্রুরা আমাদের পিছনে চলে আসতে পারতো। সে পরিস্থিতিতে সরবরাহ ঘাঁটি রামগড় থেকে আমাদেরকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে হতো। আমাদের কাছে তখন রান্না করার মতো কিছু ছিলো না। অধিকাংশ খাবারই আসতো রামগড় থেকে। দিনটি ছিলো পরিস্কার। ভোর থেকেই আমাদের অবস্থানের উপর মর্টার শেলিংয়ের মাধ্যমে কয়েক দফা হামলা হয়। বোমাবর্ষণের ছত্রছায়ায় আমাদের দিকে অগ্রসরমান শত্রুর অগ্রভাগে ছিলো প্রায় দুইশত স্থানীয় দালাল। খোলা মাঠ দিয়ে দুই কোম্পানী পাকসেনা এগিয়ে আসছিলো। ওরা একশ গজের মধ্যে আসতেই আমাদের অস্ত্রগুলো গর্জে উঠলো। এই আকস্মিক হামলায় মুহুর্তের মধ্যে ওরা ভয় ও আতংকে ইতস্তত বিক্ষিপ্ত হয়ে ছড়িয়ে পড়লো। দীর্ঘ দুই ঘন্টা অবিরাম লড়াইয়ে আমাদের কয়েকজন হতাহত হবার পর অবশেষে আমাদের সৈন্যদেরকে চিকনছড়ার দিকে পশ্চাদপসরণ করার নির্দেশ দেয়া হলো।

 

হিয়াকুর পতনের পর রামগড়ের পতন অবসম্ভাবী হয়ে উঠলো। সবচাইতে বিপজ্জনক ব্যাপার ছিলো শত্রুরা আমাদের অসামরিক ব্যাক্তিদের বিশেষ করে বড় বড় শরণার্থী দলের ভারত গমনের পথ প্রায় বন্ধ করে দিয়েছিলো। সে সময়ে প্রতিদিন হাজার হাজার লোক ধূলিময় রাস্তা ধরে নারায়ণহাট থেকে হিয়াকুর এবং তারপর রামগড় হয়ে ফেনী নদী পেরিয়ে সাবরুমে আশ্রয় নিচ্ছিলো। কিন্তু হিয়াকুর পতনের পর সে পথ বন্ধ হয়ে গেলো।

 

করেরহাটের পতনের পর বুঝতে পারি বর্তমান ধারায় যুদ্ধ করে আমরা কিছুই করতে পারবো না। আমরা আমাদের বাহিনীকে সুসংগঠিত করে তুলতে পারছিলাম না। এই বাহিনীতে ছিলো বিভিন্ন ধরণের লোক। ইপিআর, পুলিশ, আনসার, মুজাহিদ, সামরিক বাহিনীর লোক এবং মাত্র সপ্তাহ খানেক ট্রেনিং দেওয়ার পর রণাঙ্গণে নামিয়ে দেয়া নতুন মুক্তিযোদ্ধা। এইসব দলের মধ্যে ঐক্যবদ্ধ ও শৃঙ্খলার অভাব ছিলো আমাদের বিপর্যয়ের একটি কারণ। আমাদের সকল সৈন্যদের একটা নিরাপদ শিবিরে নিয়ে তাদের জন্য বিশ্রাম ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন হয়ে পড়েছিলো। তাহলে তাদেরকে নিয়েই আবার একটা সংঘবদ্ধ ও সুসংগঠিত বাহিনী গড়ে তোলা যেতো। আমাদের অধিকাংশ সৈন্যকেই ইতিমধ্য অপুষ্টিরও শিকার হয়ে পড়তে হয়েছিলো।

 

সেই উদ্দেশ্যে ভারতীয় সীমানায় ছয় মাইল ভিতরে হরিনায় একটা গোপন শিবির স্থাপন করা হয়। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ থেকে কয়েকটি তাবু পেয়েছিলাম। রামগড় থেকে কিছু কিছু জিনিস এখানে নিয়ে আসা হলো। শিবিরের জন্য যে হাসপাতালের ব্যবস্থা করেছিলাম, যুদ্ধে আহতদের সেখানে আনা হয়। এরপর যুদ্ধ থেকে একটু অবকাশ পেয়েই নতুনভাবে আমাদের বাহিনী সংগঠনের কাজ পুরোদমে শুরু হয়।

 

মুজিবনগরে গঠিত অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকার তখন অন্যান্য দেশের স্বীকৃতি আদায়ের চেষ্টা করছিলেন। কাজটি ছিলো খুবই দুঃসাধ্য। বাংলাদেশ বাহিনী একটা উল্লেখযোগ্য পরিমান এলাকায় তাদের দখল প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে কেউ আমাদের সরকারকে স্বীকৃতি দিবে না। যুদ্ধের প্রাথমিক অবস্থায় বাংলাদেশের যে কোনো একটি অঞ্চলে যতদূর সম্ভব সৈন্যদের জড়ো করে সেই এলাকা প্রতিরক্ষার ব্যবস্থা করা যেতো। সময় নষ্ট না করে সেই সময়ই এই সিদ্ধান্ত নেয়া উচিৎ ছিলো। কিন্তু দেখা গেছে কর্তৃপক্ষ সকল ফ্রন্টেই যুদ্ধ করতে আগ্রহী এবং যুদ্ধ করে জয়ী হতেও চাইছিলেন। আমাদের সৈন্যসংখ্যা এবং তাদের পরিমানের প্রেক্ষিতে রণকৌশলগত দিক থেকে এ ব্যবস্থা ছিলো অবাস্তব। সব জায়গায় যুদ্ধ করার দরুন সৈন্যরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। সুষ্ঠু যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাবে আমাদের সেনাদের বিচ্ছিন্ন এবং স্থানীয়ভাবে লড়ে যেতে হয় এবং এই লড়ে যাওয়া অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ছিলো লক্ষ্যহীন। তাই একটির পর একটি এলাকা এলাকা আমাদের হাতছাড়া হয়ে যেতে থাকে।

 

৩০শে এপ্রিল মহালছড়ির সৈন্যরা রামগড় এসে পৌঁছে। এখান থেকে সকালে ছোট ছোট দলে হরিনা শিবিরের দিকে অগ্রসর হয়। ওদের আসার আগে কর্তৃপক্ষ আমাদেরকে রামগড় ছেড়ে যেতে প্রস্তুত থাকার আদেশ দিয়েছিলেন। এই আদেশে বোঝা গিয়েছিলো, হাই কমাণ্ড আমাদের প্রয়োজনীয় চাহিদা মিটাতে অসমর্থ। তখন সাহায্য ব্যতিরেকে মাত্র তিনদিনের বেশী যুদ্ধ করার সামর্থ্য আমাদের ছিল না। কিন্তু অবাক কাণ্ড, ৩০শে এপ্রিল রাতেই আরেকটি নতুন আদেশ পেলাম। বাংলাদেশ সরকারের জন্য রামগড় রক্ষা কর। ইতিমধ্যে চিকনছড়া থেকে আমরা সৈন্য সরিয়ে এনেছি। হরিণায় আমাদের নিরাপদ পশ্চাদপসরণের জন্য রামগড়ের বাইরে কিছু সৈন্য রেখেছি। যাতে শত্রুর অগ্রাভিযান কিছু সময়ের জন্য তারা বিলম্বিত করতে পারে। আমাদের সৈন্যদের অর্ধেক তখন হরিণার রাস্তায়।

 

অবশ্য সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে নির্দেশ পাওয়ার পর রামগড় প্রতিরক্ষার জন্য উপস্থিত যাদেরকে পেলাম সবাইকে জড়ো করা হলো। পাকিস্তানী সৈন্য যাতে ভারতীয় ভূখন্ডে ঢুকে না পড়ে তা প্রতিহত করার জন্য ভারতীয় সেনাবাহিনীর একটি দলও সাবরুমে চলে আসে। ভারতীয় সেনাবাহিনীর এই পদক্ষেপে কিছুটা ভুল বুঝাবুঝির সৃষ্টি হয়েছিলো। গুজব রটেছিলো যে, রামগড় প্রতিরক্ষায় ভারতীয় সৈন্যরাও অংশ নিতে পারে। কিন্তু সে রকম কিছুই ঘটে নি।

 

১লা মে থেকে শত্রুরা রামগড়ের আশেপাশের এলাকার উপর গোলাবর্ষণ শুরু করে। একটি দল মূল সড়ক ধরে অগ্রসর হচ্ছিলো। অন্য একটি দল রামগড়ের পূর্ব-দক্ষিণে পাহাড়ের দিকে এগোতে থাকে। এই পাহাড় এবং রামগড়ের মধ্যে কিছুটা জায়গা একেবারে খোলা এবং সমতল। পহেলা মে দিবাগত রাতে এই পাহাড়ে গোপনে শত্রু সমাবেশ ঘটেছিলো।

 

২রা মে সকালে পাকিস্তানীরা মরিয়া হয়ে রামগড়ের উপর আক্রমণ শুরু করে। কামানের প্রচণ্ড গোলার ছত্রছায়ায় তারা সড়কপথে আমাদের প্রথম প্রতিরক্ষাব্যূহ ভেঙ্গে দেয়। শেলের আঘাতে আমাদের বাংকারগুলো ভেঙ্গে পড়তে থাকে। এদিকে সেই পাহাড় এবং রামগড়ের মধ্যবর্তী স্থানটিতে ধোঁয়ার জাল সৃষ্টি করা হয়। এই ধোঁয়ার আড়ালে শত্রুদের দ্বিতীয় দলটি রামগড়ের মধ্যভাগের দিকে অগ্রসর হয়। সন্ধ্যার ঘন্টাখানেক আগে শত্রুরা শহরটির মধ্যাঞ্চলের উপর চুড়ান্ত আক্রমণ চালায়। এতে আমাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ে। এরপর এক ঘন্টারও বেশী সময় আমাদের সৈন্যরা শত্রুর উপর গুলিবর্ষণ অব্যাহত রাখে এবং পরিশেষে গুলি ফুরিয়ে গেলে তারা অন্ধকারের আড়ালে পশ্চাদপসরণ করে।

 

ওদিকে সাবরুমের সকল বেসামরিক বাসিন্দাকে ইতিপূর্বে আরো অভ্যন্তরে নিরাপদ স্থানে অপসারণ করা হয়েছিলো। সারা তল্লাট জুড়ে বুলেট ছুটছিলো। ভারতীয় এলাকার বাড়িঘর এবং গাছপালায় গিয়ে গুলি লাগছিলো। ভারতীয় সেনাবাহিনী এবং সীমান্ত রক্ষীবাহিনীও (বিএসএফ) ইতিমধ্যে যার যার ট্রেঞ্চের ভিতরে অবস্থান গ্রহণ করেছিলো। তবে তারা সবকিছু অবলোকন করছিলো মাত্র।

 

এ সময় শত্রুর একটি অয়্যারলেস বার্তা আমরা শুনতে পাই। ওতে বলছিলো, “রামগড়ের বিদ্রোহী হেডকোয়ার্টার দখল করেছি।”

 

২রা মে রাতে শত্রুরা রামগড়ের ঘরবাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। সমগ্র বাজার এলাকা জ্বলে উঠে। ঊর্ধ্বমূখী ধোঁয়ার কুণ্ডলী আর অগ্নিবলয়ের ভিতর দিয়ে দুরে তখন পাহাড় শ্রেণীর অস্পষ্ট রেখা চোখে পড়ছিলো সেখানেই আমাদের স্বপ্নের সেই দেশ যার জন্য আমরা যুদ্ধ করে চলেছি, অবিরাম যুদ্ধ চালিয়ে যাবো। কিন্তু কতদিন এ যুদ্ধ চলবে তা আমরা কেউ জানতাম না।

 

।। শুভপুর সেতুর যুদ্ধ ।।

 

রামগড় হারানোর বিপর্যয়ে আমাদের তখন মনমরা অবস্থা। হরিণায় বিকল্প সদর দফতর স্থাপন করতে পারলেও ভারতের আশ্রয়ে থেকে শত্রুর বিরূদ্ধে যুদ্ধ করতে হবে এটা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছিলাম না। রামগড়ে আমাদের একটা সান্তনা ছিলো যে, সেটা আমাদের নিজের দেশ। সেখানকার সব কিছুই আমাদের। কিন্তু হরিণা ভারতীয় এলাকা। দুইয়ের মধ্যে বিরাট পার্থক্য। আমাদের সব স্বপ্ন বুঝি ভেঙ্গে গেলো। আমাদের কেউ কেউ শিশুর মতো কেঁদেছিলো। মানসিক আঘাতে পাথর হয়ে যাওয়া অনেককে দেখছিলাম একটা ঘোরের মধ্যে পা দুটি যেনো টেনে নিয়ে হরিণার দিকে চলছে। কাঁধে ঝুলছে পুরোনো দিনের হাতিয়ার এবং গুলিশূণ্য থলে।

 

এরপর প্রধান সড়কে শুভপুর সেতুর কাছে মারাত্মক লড়াই আসন্ন হয়ে উঠে। ভারতীয় বিএসএফ বাহিনীর সহযোগীতায় সেতুর একটি অংশ আমরা এর আগে ধ্বংস করে দিয়েছিলাম। এখানে আমাদের দলে লোকসংখ্যা ছিলো মাত্র একশ’র মতো। এদের অধিকাংশই ছিলো আবার সাত দিনের ট্রেনিং প্রাপ্ত বেসামরিক মুক্তিযোদ্ধা। সেতু প্রতিরক্ষার দায়িত্ব পড়েছিলো ইপিআর সুবেদার ফখরুদ্দিনের উপর। আমাদের লক্ষ্য ছিলো শত্রুরা যাতে এই গুরুত্বপূর্ণ সেতু ব্যবহারের সুযোগ না পায় এবং ঢাকা ও কুমিল্লার সাথে সংযোগ স্থাপন করতে না পারে।

 

করেরহাটের পতনের পর সেতুর উত্তরদিক থেকে আমরা সৈন্য প্রত্যাহার করে সেতুর দক্ষিণ দিকে আমাদের সর্বশক্তি নিয়োগ করি। আমরা জানতাম সেতুটি দখল করার জন্য শত্রুরা মরিয়া হয়ে উঠবে। করেরহাটে তারা কামান মোতায়েন করেছিলো। কয়েকটি ট্যাংকও নদীর পার পর্যন্ত চলে এসেছিলো। দূর থেকে শত্রুপক্ষের কামানের গোলা এসে আমাদের উপর পড়ছিলো। ট্যাংকগুলো অগ্রসর হয়ে আমাদের একটির পর একটি বাংকার ধ্বংস করে চলছিলো। আমাদের ট্যাংক বিধ্বংসী কয়েকটি ছোট হাতিয়ার থাকলেও তখন কোনো শেল আমাদের কাছে ছিল না।

 

ট্যাংক ও কামানের প্রচণ্ড গোলাবর্ষণের ছত্রছায়ায় পাকিস্তানীরা কয়েকবারই নদী পার হওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করে। দুবার তাদের সৈন্যরা নদীপথে মাঝামাঝি পর্যন্ত এসে দু’দিকের গোলাগুলির মাঝখানে পড়ে যায়। পরিস্কার দিনের আলোয় তাদেরকে দেখে দেখে আমরা গুলিবিদ্ধ করতে থাকি। অনেকটা যেনো বেশ আরামের সাথে টার্গেট প্র্যাকটিস করার মতো। এভাবে দুই কোম্পানীরও বেশী সৈন্য আমরা নির্মূল করি। তাদের লাশগুলো নদী দিয়ে ভাসতে ভাসতে সাগরের দিকে চলে যায়। এভাবে সৈন্যক্ষয়ের পর শত্রুরা নদী পার হয়ে সেতু দখলের চেষ্টা ত্যাগ করে।

 

ওদিকে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট থেকে আগত পাকসেনাদের নিকট ফেনী শহরের পতন ঘটে। ১১ই মে’র মধ্যেই তারা শুভপুর সেতুর কাছে এসে পড়ে।

 

পাকিস্তানীদের এই কলামে শত্রুদের আনুমানিক দুটি ব্যাটালিয়ন ছিলো। পক্ষান্তরে সেতুর কাছে একশ’রও কমসংখ্যক মুক্তিযোদ্ধা তখন চুড়ান্ত লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত। পরের দিন শুরু হয় যুদ্ধ।

 

১২ই মে সকাল থেকে করেরহাটের কমাণ্ডগুলো আমাদের উপর গোলাবর্ষণ শুরু করে। অপরদিকে নদীর পাড়ে শত্রু ট্যাংকগুলোকেও দেখা যায়। পাকিস্তানীরা আমাদের অবস্থানের উত্তর ও পশ্চিম দিকে ধূম্রজালের সৃষ্টি করে। সকাল ১১ টায় পশ্চিম দিকের সেই ধোঁয়ার আড়াল থেকে বেরিয়ে দুটি কোম্পানী প্রথম হামলা শুরু করে। কিন্তু বেশ ক্ষতি স্বীকার করে তাদেরকে পিছু হটতে হয়। তারপর কিছু সময় সব চুপচাপ। বেলা তিনটার দিকে প্রচণ্ড গোলা বর্ষণের সঙ্গে সঙ্গে তারা আবার হামলা শুরু করে। দুটি শত্রু ব্যাটালিয়নকে হামলায় অংশ নিতে দেখা যায়। দিনের বাকী সময়টুকু আমাদের সেনাদেরকেও প্রচণ্ডতম গোলাবর্ষণের মোকাবিলা করতে হয়। প্রায় অর্ধেক মুক্তিযোদ্ধাই তখন শেলের আঘাতে আহত। সরাসরি আঘাতে বাংকারগুলো ধসে পড়লে অনেকেরই জীবন্ত সমাধি ঘটে। আমরা হতাহতদের সরাতে পর্যন্ত পারছিলাম না। নতুন সৈন্যও যোগ হচ্ছিলো না। দীর্ঘ সময় পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধারা খাদ্য কিংবা পানির মুখ দেখেনি। বেলা পাঁচটার দিকে কামানের গোলাবর্ষণ বন্ধ হয়। শত্রুরা তখন আমাদের অবস্থান থেকে আনুমানিক ৩০০ গজ দূরে। শুধু একটি মেশিনগান এবং দুটি লাইট মেশিনগান দিয়ে আমরা এদের মোকাবিলা করছিলাম। ট্যাংকের আঘাতে অস্ত্রগুলো ধ্বংস হওয়ার পূর্বক্ষণ পর্যন্ত সেগুলো সেগুলো সমানে শত্রু নিধন করে চলে। এরপর আমাদের সৈন্যরা শুধু ৩০৩ রাইফেল দিয়ে গুলি চালাতে থাকে। অচিরেই হাতাহাতি যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। পাকিস্তানীদের তুলনায় আমরা সংখ্যায় ছিলাম খুবই কম। আমাদের যেসব সেনা ভারতীয় সীমান্তের কাছাকাছি অবস্থানে ছিলো তারা শেষ পর্যন্ত পশ্চাদপসরণ করতে পেরেছিলো। এদের অধিকাংশই ছিলো গুরুতর আহত। তারপরেও মনোবল ভেঙ্গে পড়ে নি।

 

তখন সন্ধ্যা হয় হয়। শুভপুর সেতুর অদুরে ভারতের শ্রীনগর সীমান্ত ফাড়ি। এখান থেকে একটি কাঁচা রাস্তা পাহাড়ের ভিতর দিয়ে আগরতলা অভিমুখী প্রধান সড়কে গিয়ে মিশেছে। এই সন্ধ্যায় রাস্তাটিতে অন্য কোনো লোক ছিল না। শুধু রণাঙ্গণ ফেরত কিছু লোক নিঃশব্দে হেটে চলছিলো। এদের মধ্যে কেউ কেউ হাটছিলো লাঠিতে ভর দিয়ে। কয়েকজনকে আবার সহযোদ্ধারা ধরে নিয়ে যাচ্ছিলো। পথে আমাদের একজন অফিসারের সাথে তাদের দেখা হলে জনৈক মুক্তিযোদ্ধা তার বাম হাত তুলে সামরিক কায়দায় অভিবাদন জানায়। তার ঝুলন্ত ডান হাত থেকে রক্ত ঝরছিলো। শেলের বিচ্ছুরিত টুকরায় হাত প্রায় দুভাগ হয়ে গিয়েছিলো। শুধু কুঁকড়ে যাচ্ছিলো। তবু সে মুখে একটু হাসির ভাব ফুটিয়ে অফিসারকে “জয় বাংলা” বলে শুভেচ্ছা জানায়। তারপর সে অন্যদের সাথে সামনে অন্ধকারের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যায়।

 

————————————————

 

<৯, ২.৮, ৮৮-৯৫>

চট্টগ্রামের প্রতিরোধ যুদ্ধঃ
সাক্ষাৎকারঃ লেঃ জেনারেল (অবঃ) মীর শওকত আলী বীর উত্তম

(১৯৭১ সালের মার্চের মেজর পদে কর্মরত ছিলেন। সাক্ষাৎকারটি শামসুল হুদা চৌধুরী রচিত ‘একাত্তরের রণাঙ্গন’ গ্রন্থ থেকে সংকলিত)

 

প্রঃ কখন কিভাবে আপনি একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিলেন?

 

উঃ ১৯৭১ সালের জানুয়ারী মাসে কোয়েটা স্টাফ কলেজ থেকে আমাকে চট্টগ্রামের ষোলশহরে ৮ম বেঙ্গল রেজিমেন্টে পোস্টিং দিয়ে পাঠানো হয়। মার্চ ৭১ এর প্রথম ভাগে আমি ছুটিতে ছিলাম। ১৫ই মার্চ এর দিকে যখন অসহযোগ আন্দোলন খুব জোরদার হচ্ছিল এবং ইতিপূর্বে ৭ই মার্চ ৭১ এ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ভাষণ দিলেন, তখন থেকেই আমরা বাঙালি সৈন্যরা চিন্তা করছিলাম যে একটা গণ্ডগোল বাধাবে এবং দেশের স্বাধীনতার জন্য আমাদের সবাইকে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। চট্টগ্রামের ষোলশহরে ৮ম বেঙ্গল রেজিমেন্টের কমান্ডার ছিলেন তখন কর্ণেল জানজুয়া। মেজর জিয়াউর রহমান (পরবর্তীকালে লেঃ জেনারেল এবং মহামান্য রাষ্ট্রপতি ছিলেন এই ব্যাটালিয়ানের সেকেণ্ড ইন কমাণ্ড। জেনারেল জিয়া এবং আমি ছাড়াও ৮ম বেঙ্গল রেজিমেন্টে আরো কয়েকজন বাঙালি অফিসার ছিলেন। ১৫ই মার্চ’ ৭১ এর দিকে আমি এই ব্যাটালিয়ানে যোগদান করি। ২৫শে মার্চ’ ৭১ রাতে যখন হত্যাকাণ্ড শুরু হয়, তখন স্বভাবতই আমি বাঙালি হিসেবে আমার যা কর্তব্য সেটাই করেছি। এতে জড়িয়ে পড়ার মত কিছুই নেই। একটা কর্তব্য ছিল। সমস্ত বাঙালি সৈন্যরই কর্তব্য ছিল এটা। সবাই এতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। কিছু কিছু সৈন্য হয়তো সুযোগ পান নি কিংবা কিছু সংখ্যক সৈন্য আগেই ধরা পড়ে গিয়েছিলেন। আমাদের যেহেতু বাঙালি ব্যাটালিয়ান ছিল সেই জন্য আমরা ধরা পড়ি নি।আমরা আমাদের কর্তব্য করেছি মাত্র। ২৫শে মার্চ, ’৭১ রাতে যখন জেনারেল জিয়াকে চট্টগ্রাম বন্দরের দিকে পাঠানো হলো মূলত সেই সময় থেকেই স্বাধীনতা যুদ্ধ আমাদের পক্ষ থেকে শুরু হয়।

 

উক্ত দূর্যোগের রাত প্রায় ১১-৩০ মিনিট সময়ে আমরা টেলিফোনে জানতে পারলাম যে ঢাকায় হত্যাকাণ্ড শুরু হয়ে গিয়েছে। স্বভাবতঃই আমরা ধরে নিলাম ঢাকায় যখন হত্যাকাণ্ড শুরু হয়েছে, নিশ্চয় এটা সারা বাংলাদেশব্যাপী শুরু হয়ে গিয়েছে। কারণ সেনাবাহিনী তো মাত্র এক জায়গায় তাদের পরিকল্পনা কার্যকর করেনা; এ জাতীয় পরিকল্পনা সব জায়গাতেই একই সময়ে কার্যকর করাই স্বাভাবিক। আমাদের কর্তব্য আমরা আগেই ঠিক করে রেখেছিলাম। কারণ ২৫শে মার্চের আগে থেকেই আন্দোলন যে রুপ নিচ্ছিল, সে সবে যখনই আমাদের নিযুক্ত করা হতো ব্যারিকেড সরানোর জন্য কিংবা জনগণকে হটানোর জন্য, তখন আমরা তাদের বিরুদ্ধে কাজ কখনো ঠিকমতো করতাম না। কার্যত আমরা সেই চূড়ান্ত অসহযোগের সময় থেকেই আন্দোলনের প্রতি আমাদের সমর্থন জানাতে শুরু করি। কাজেই ২৫শে মার্চ ৭১ রাতে যখন হানাদার বাহিনী বাঙালি হত্যাকান্ডে ঝাঁপিয়ে পড়ল, তখন আমাদেরও তাৎক্ষণকভাবে স্বাধীনতা যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া বাদে অন্য কোনও বিকল্প ছিল না।

 

বাঙালি হত্যাকাণ্ড শুরু হওয়ার খবর দিয়ে সম্ভবত আমাদের কাছে প্রথম টেলিফোন করেছিলেন চট্টগ্রামের হান্নান ভাই (চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি)। সম্ভবত তিনিই চট্টগ্রামে সবাইকে জানিয়ে দিয়েছিলেন।

 

আগেই বলেছি, জেনারেল জিয়া এবং আমি একই ব্যাটালিয়নে ছিলাম। তিনি যেহেতু আমার চাইতে সিনিয়র ছিলেন, সেহেতু তিনিই আমাদের কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। আমি তার দুনম্বর হিসেবে কাজ করেছি। স্বাধীনতা যুদ্ধের সূচনা পর্যায়ে আমরা যে একই ব্যাটালিয়নে ছিলাম, এটা অনেকেই হয়তো জানেন না। বেশীরভাগ জনসাধারণের ধারণা আমরা আলাদা ছিলাম। আমরা একই সঙ্গে ছিলাম এবং একই সঙ্গেই বিদ্রোহ করেছিলাম। জেনারেল জিয়াউর রহমানও তার বিবৃতিতে উল্লেখ করেছেনঃ “আমি বিদ্রোহ করে পোর্ট থেকে ফিরে এসেই শওকতের কাছে এলাম, এবং শওকত আমার সাথে হাত মিলালো।”
প্রঃ এই যে দুঃসাহসিক কাজ আপনারা করলেন, এর পিছনে অন্যান্য ক্যান্টনমেন্টের বাঙালি সৈন্যদেরও পূর্ণ সমর্থন ছিল এবং তারাও আপনাদের মত এগিয়ে আসছিলেন, এটা আপনারা বুঝেছিলেন কি?
উঃ এটা আমি বলতে পারবো না। কারণ রাজনীতিতে আমি কখনো জড়াতাম না। কিন্তু এটা রাজনীতি ছিল না। এটা ছিল স্বাধীনতা যুদ্ধ। এতে জাতির জীবন-মরণের প্রশ্ন জড়িতে হয়ে পড়েছিলো। তাছাড়া অন্যান্য সেক্টর থেকে বাঙালি সৈন্যরা এগুচ্ছিলেন কি না সে তথ্য আমাদের জানার উপায় ছিল না। সে তথ্য জানা না জানার গুরুত্ব দেয়ার সময়ও তখন আমাদের ছিল না। এমনকি তখন আমার বাবা মা ছিলেন আমার স্ত্রী এবং ছেলেমেয়েকে নিয়ে কুমিল্লায়। তাদের নিরাপত্তা সম্পর্কে চিন্তা করার অবকাশও তখন আমাদের ছিল না। কাজেই তাৎক্ষনিকভাবে স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে আমরা আমাদের কর্তব্য করেছি মাত্র। অবশ্য আমরা ভেবেছি অন্য সবাইও হয়তো আমাদের মত এগিয়ে আসছিলেন। শুধু ক্যান্টনমেন্টেই নয়, আমরা মনে করেছি সমস্ত বাঙালিই এই যুদ্ধে ছিলেন। কারণ এটা ছিল বাঙালি জাতির প্রশ্ন, বাঙালি জাতির অস্তিত্বের প্রশ্ন।

 

প্রঃ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা বেতারে কখন প্রচারিত হয়েছে বলে আপনি বলতে চান?

 

উঃ এটা একটি বিতর্কিত প্রশ্ন। বেতারে স্বাধীনতা ঘোষণা যেটা নিয়ে সব সময় বিতর্ক চলতে থাকে যে জেনারেল জিয়া করেছেন, না আওয়ামী লীগ করেছেন। আমার জানামতে সবচাইতে প্রথম বোধ হয় চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র থেকে হান্নান ভাইয়ের কণ্ঠ থেকেই লোকে প্রথম শুনেছিলেন। এটা ২৬শে মার্চ’ ৭১ অপরাহ্ন দু’টার দিকে হতে পারে। কিন্তু যেহেতু চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্রের প্রেরক যন্ত্র খুব কম শক্তিসম্পন্ন ছিল, সেহেতু পুরা দেশবাসী সে কণ্ঠ শুনতে পান নি। কাজেই যদি বলা হয়, প্রথম বেতারে কার বিদ্রোহী কণ্ঠে স্বাধীনতার কথা উচ্চারিত হয়েছিল, তাহলে আমি বলব যে, চট্টগ্রামের হান্নান ভাই সেই বিদ্রোহী কণ্ঠ। তবে এটা সত্য যে পরদিন অর্থাৎ ২৭শে মার্চ ৭১ মেজর জিয়ার ঘোষণা প্রচারের পরই স্বাধীনতা যুদ্ধ গুরুত্বপূর্ণ মোড় নেয়।

 

প্রঃ ২৭শে মার্চ ৭১ মেজর জিয়াউর রহমান কি পরিস্থিতিতে কালুরঘাট ট্রানসমিটারে সংগঠিত বিপ্লবী স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে গেলেন এবং স্বাধীনতা ঘোষণা পাঠ করলেন?

 

উঃ ২৫শে মার্চ রাতে ঢাকায় হত্যাকান্ডের খবর পাওয়ার পরই আমরা চট্টগ্রামে আমাদের অধীনস্থ সমস্ত ব্যাটালিয়নকে হাতে নিয়েছিলাম। আমরা ভেবে দেখলাম যে, নতুন পাড়া ক্যান্টনমেন্টে পাকিস্তান বাহিনী নিয়ন্ত্রিত ট্যাংক ছিল। আমরা ছিলাম ষোলশহরে মাত্র দু’মাইল দূরত্বে। আমরা দেখলাম, আমাদের হাতে কোন ও ট্যাংক ছিল না। এবং কোন অস্ত্রশস্ত্র ও আমাদের অর্থাৎ ৮ম বেঙ্গল রেজিমেন্টের হাতে ছিল না। ইতি পূর্বেই ৮ম বেঙ্গল রেজিমেন্ট পাকিস্তান চলে যাবে বলে অধিকাংশ অস্ত্রই পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল। আমাদের হাতে শুধু ছিল কিছু রাইফেল এবং এল এম জি ধরনের স্বল্প সংখ্যক অস্ত্র। ভারী কোন ও অস্ত্র ছিল না। আমার সাথেই জেনারেল জিয়া আলাপ করলেন। আমরা আলাপ করে দেখলাম যে আমরা যদি ষোলশহর বিল্ডিং এর ভিতর অবস্থান করি এবং এই অবস্থায় যদি ট্যাংক আসে, তাহলে আমরা ট্যাংক ঠেকাতে পারব না। কারণ ট্যাংক ঠেকানোর মত কোন অস্ত্র ই আমাদের হাতে ছিল না। ট্যাংক থেকে দু তিনটা গোলা ছুড়লেই আমাদের অনেক সৈন্য মারা যাবে। তখন আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম যে, আমাদের ঐ এলাকা থেকে বাইরে চলে যাওয়া উচিত এবং নিরাপদ দূরত্বে থেকে হেডকোয়ার্টার বেস বানানো উচিত। এ ছাড়া আমাদের অধীনস্থ জোয়ানদের শপথ নেয়া উচিত। শপথ নিয়ে পুরো ব্যাপারটা বুঝিয়ে তারপর যুদ্ধে যাওয়া উচিত। আমরা সোজা প্রথমে গেলাম কালুরঘাট। সেখানে ভোররাতের দিকে আমরা মার্চ করে গেলাম। তখন খুব কুয়াশা ছিলো এবং আল্লাহর কি ইচ্ছা সেদিন অর্থাৎ ২৬শে মার্চ’ ৭১ এর সকাল ৮টা কি ৯টা পর্যন্ত কুয়াশা ছিল। কালুরঘাটে পৌঁছে আমরা সবাই কনফারেন্স করলাম। এতে কিছু বিডিআর অফিসার এবং জোয়ানও ছিলেন। এই কনফারেনসে সিদ্ধান্ত নেয়া হল যে, আমরা বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে চট্টগ্রাম রক্ষার জন্যে পাকিস্তান বাহিনীর বিরুদ্ধে আক্রমণ চালাব। আমাদের আক্রমণের মূল লক্ষবস্তু ছিল পোর্ট এবং ক্যান্টনমেন্ট। এই সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় আওয়ামী লীগের কিছু নেতৃবৃন্দ আমাদের সাথে এসে যোগ দিয়েছিলেন। এই তো গেল ২৬শে মার্চ ‘৭১ এর কথা। ঐদিন আমরা খোজখবর নিয়েছিলাম কোথায় কি ঘটেছিলো। আমি একখানা জীপ নিয়ে পুরা শহর ঘুরে দেখলাম। আমি টহল দেয়ার সময় আগ্রাবাদের মোড়ে আমার জীপের ওপর একটি এল.এম.জি বার্স্ট ফায়ার এলো। আমি কোনও প্রকারে জীপ ঘুরিয়ে ফেরত গেলাম এবং জেনারেল জিয়াকে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর অবস্থান সম্পর্কে অবহিত করলাম এবং সেভাবে আমাদের দলকে নিয়োজিত করলাম।

 

২৭শে মার্চ’ ৭১ মনে হয় জেনারেল জিয়া বুঝতে শুরু করলেন যে বেতারে একটা ঘোষণা প্রচার করা দরকার। ঐ তারিখেই সন্ধ্যায় কালুরঘাট ট্রানসমিটার থেকে এটা করলেন তিনি। বেশ কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতাও ঐ সময় খুব তৎপর হয়ে উঠেছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন প্রফেসর নুরুল ইসলাম, আতাউর রহমান খান কায়সার, হান্নান ভাই এবং এম আর সিদ্দিকী। তারাও সম্ভবতঃ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে রেডিওতে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে কিছু প্রচারিত হওয়া উচিত। অপরদিকে জেনারেল জিয়া কি বলবেন তার একটি খসড়াও প্রস্তুত করে নিলেন। ২৭শে মার্চ ৭১ সন্ধ্যার পর চট্টগ্রামের কালুরঘাট ট্রান্সমিটার থেকে প্রচারিত হল জেনারেল জিয়ার (তৎকালীন মেজর) ভাষণ।

 

প্রঃ আপনার কমান্ডে সবচাইতে ভয়াবহ যুদ্ধ কোথায় এবং কখন সংঘঠিত হয়েছিল?

 

উঃ প্রথম ভয়াবহ যুদ্ধ হয়েছিল কালুরঘাটে ১১ই এপ্রিল’ ৭১। ঐ সময় জেনারেল জিয়া আমার সাথে ছিলেন না। তিনি ৩০শে মার্চ’ ৭১ এর পর ই রামগড় চলে গিয়েছিলেন।

 

এই যুদ্ধ পরিচালনা আমার কমান্ডে হয়। সৈন্য ছিলেন অষ্টম বেঙ্গল রেজিমেন্ট বি ডি আর এবং স্থানীয় কিছু স্বেচ্ছাসেবী যেমন ছাত্র, শ্রমিক এবং অন্যান্য যারা অস্ত্র সংগ্রহ করতে পেরেছিলেন এমন কিছু লোকজন। আমার পক্ষে ছিল পাকিস্তান বাহিনীর দুটি ব্রিগেড।এ ছাড়া কর্ণফুলীতে তাদের যে নৌ জাহাজ ছিল সেটি তারা শংখ নদী হয়ে কালুরঘাটের কাছাকাছি নিয়ে এসে ওখান থেকে নেভাল গান দিয়ে আমাদের এলাকায় বম্বিং শুরু করে দিয়েছিল। তাদের ব্রিগেডের যে আর্টিলারী ছিল সেই আর্টিলারী দিয়েও তারা বম্বিং করতে থাকে ১০ই এপ্রিল ‘৭১ থেকে। ১১ই এপ্রিল তাদের কিছু সৈন্য মহিলার পোশাক এবং কিছু সৈন্য সিভিল এর পোশাক পরে জয়বাংলা বলতে বলতে আমাদের দিকে অর্থাৎ কালুরঘাটের পুলের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। চট্টগ্রামে আমাদের পক্ষে এবং তাদের বিপরীতে ছিলেন ক্যাপ্টেন হারুন, শমসের মবিন চৌধুরী, লেঃ মাহফুজ এবং অন্য কয়েকজন অফিসার। এই অবস্থায় আমাদের লোকজন প্রথমে বুঝতে পারেন নি তারা পাকিস্তানী। যখন শত্রু জয়বাংলা বলতে বলতে একেবারে কালুরঘাটের পুলের ওপর চলে এলো, তখনই মাত্র আমাদের লোকজন বুঝতে পারলেন যেতারা সিভিলিয়ান বা মহিলা কেউ নন। তখন আমাদের পক্ষ ফায়ার করতে শুরু করলেন। শত্রুপক্ষের গোলার আঘাতে ক্যাপ্টেন হারুন এবং শমসের মবিন আহত হলেন। মাহফুজ চলে আসতে পেরেছিলেন। কালুরঘাট ছেড়ে আমরা পটিয়ার দিকে চলে এলাম।

 

প্রঃ তখন আপনারা মোট কতজন ছিলেন?

 

উঃ আমরা প্রায় সাড়ে তিনশর মত ছিলাম। এই যুদ্ধে পাকিস্তান বাহিনী পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ পরিচালনা করেছিলেন। ব্রিগেডিয়ার মিঠঠা খান হেলিকপ্টার থেকে ওদের পক্ষে এই যুদ্ধ পরিচালনা করেছিল (পরে জেনেছি)
প্রঃ এই যুদ্ধে আপনাদের প্রধান অস্ত্র কি ছিল?

 

উঃ আমাদের কিছু রাইফেল ছিল, কিছু এল এম জি এবং দুটি তিন ইঞ্চি মর্টার ছিল। এই মর্টার দু’টির কোন অবলোকন ব্যবস্থা (Aiming Sight) ছিল না। আন্দাজে ছুঁড়তে হত।

 

প্রঃ আপনাদের পক্ষে হতাহত কেমন হয়েছে?

 

উঃ আমাদের পক্ষে তেমন হতাহত হয় নি, ওদের পক্ষে কতজন হতাহত হয়েছিল তাও বলা মুসকিল, তবে সংখ্যা অনেক বেশি ছিল। ইতিপূর্বে ৮ই এপ্রিল আর একটি যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। তখন পাকবাহিনীর একটি দল কালুরঘাটের প্রায় এক মাইল উত্তরে একটি কৃষি ভবন দখল করে নিয়েছিল। পাকবাহিনীর শক্তি ছিল একটি প্লাটুন। পাকসেনারা ওখানে এসে পড়ায় শহরের বিভিন্ন স্থানে অবস্থানরত আমাদের সৈন্যের সঙ্গে আমরা যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি। আমি কয়েকজন অফিসারকে পাকবাহিনীর প্রতিরক্ষাব্যুহের ওপর আক্রমণ চালাবার জন্য বললে কেউ তখন এগুতে উৎসাহিত হলেননা। তবে আমার কথা মোতাবেক লেঃ শমসের মবিন চৌধুরী কিছু সৈন্য নিয়ে আক্রমন পরিচালনা করেছিলেন, কিন্তু কৃতকার্য হতে পারেননি। উপরন্তু এই আক্রমণ পরিচালনাকালে নায়েক নায়েব আলী পাকবাহিনীর গুলিতে নিহত হয়েছিলেন। এমনি আমি নিজে মাত্র ১০ জন সৈন্য নিয়ে ৯ই এপ্রিল হাওলাদার হামদু মিঞা, নায়েক তাহের এবং ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের কয়েকজন বি ডি আর সহ সকাল ৮:৩০ মিঃ সময়ে কৃষি ভবনে অবস্থানরত পাক ঘাটি আক্রমণ করি। আমার আক্রমণে প্রায় ২০ জন পাকসেনা (১জন ক্যাপ্টেন ও ১জন সুবেদারসহ) নিহত হয় এবং তারা ঐ পোস্ট ছেড়ে পালিয়ে যায়।

 

প্রঃ তারপর?

 

উঃ তারপর আমি কালুরঘাট ব্রীজের চট্টগ্রামের দিক পুনর্দখল করেছিলাম। ১০ই এপ্রিল ৭১ খবর পেলাম পাক সেনাবাহিনী পটিয়ার কালাপুলের দিক থেকে আমাদের ওপর আক্রমণের চেষ্টা করছে। আমি তখনই ক্যাপ্টেন খালেকুজ্জামান চৌধুরীকে কিছু সৈন্য দিয়ে পটিয়ার কালাপুলে পাঠালাম। ১১ই এপ্রিল ভোরবেলা আমি নিজে পটিয়ায় কালাপুলের অবস্থা জানতে পেলাম। ঐ তারিখ সকাল ৮-৩০ মিঃ সময়ে ক্যাপ্টেন ওয়ালি আমাকে খবর পাঠালেন পাক সেনারা প্রায় সাত থেকে আটশত সৈন্য নিয়ে কালুরঘাট আক্রমন করেছে; ক্যাপ্টেন হারুন গুরুতররুপে আহত, লেঃ শমসের মবিন চৌধুরীর কোন খবর পাওয়া যাচ্ছে না। এ সংবাদ পেয়ে আমি ওয়ালিকে বললামঃ “আমাদের লোকদের একত্রিত করবার চেষ্টা কর, পরিস্থিতি ভালভাবে জেনে নাও, আমি আসছি”. সকাল ৯টার দিকে আমি কালুরঘাটে এসে পৌঁছাই। ওখানে গিয়ে আমি মেজর জিয়ার সাথে অয়ারলেসে যোগাযোগের চেষ্টা করলাম।

 

পরে আমি তাদের সবাইকে পিছনে সরে আসতে বললাম। লেঃ মাহফুজকে মদনঘাট ডিফেনসে অবস্থান করতে বললাম যতক্ষণ না আমার কালুরঘাটের ডিফেনসের সবাই পিছু হটতে পারে। আমরা সবাই কালুরঘাট থেকে পটিয়াতে একত্রিত হলাম। এবং সেখান থেকে সবাই বান্দরবন রওনা হই। আমার সাথে সৈন্য ছিল প্রায় ৪৫০ জন (তৎকালীন ইপিআর পুলিশ এবং বেঙ্গল রেজিমেন্ট সহ)।

 

আমরা ১২ই এপ্রিল বান্দরবান পৌঁছেছিলাম। ঐ তারিখেই কাপ্তাই হয়ে রাঙ্গামাটি পৌঁছি। রাঙ্গামাটিতে আমরা ডিফেনস নেবার পর মহালছড়িতে ব্যাটালিয়ন হেডকোয়ার্টার স্থাপন করলাম। লেঃ জেনারেল মাহফুজ শত্রুর ওপর আঘাত হেনে চলেছিল। কিন্তু পাকবাহিনীর ব্যাপক আক্রমনে টিকে থাকা দুরুহ বুঝে পার্শবর্তী নোয়াপাড়া নামক স্থানে ডিফেনস নেয়। সেখান থেকে তিনি ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাতে সার্থকভাবে ডিফেনস নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করলেন। শেষ পর্যন্ত আমার নির্দেশ ১৪ই এপ্রিল লেঃ মাহফুজ তার ২০০ এর বেশি কিছু সৈন্য নিয়ে মহালছড়িতে আমার সঙ্গে মিলিত হন। ছুটি ভোগরত ক্যাপ্টেন আফতাব কাদের (আর্টিলারী) আমার কাছে ঐ তারিখে আসেন। বঙ্গ সন্তান সাহসী বীর ক্যাপ্টেন কাদেরকে মেজর জিয়া আমার কাছে পাঠিয়েছিলেন। তাকে আমার সৈন্যদের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন অফিসারের নেতৃত্বে ডিফেন্স নিতে পাঠালাম।

 

আমার রক্ষাব্যুহকে যেসব স্থানে অবস্থান দিলাম সেগুলি ছিলঃ

 

১) ক্যাপ্টেন আফতাব কাদেরের নেতৃত্বে প্রায় ১০০ সৈনি রাঙ্গামাটির খাগড়াতে।

২) ক্যাপ্টেন খালেকুজ্জামানের নেতৃত্বে ১০০ সৈন্য রাঙ্গামাটির মধ্যস্থলে বুড়িঘাটে।

৩) লেঃ মাহফুজের নেতৃত্বে প্রায় ১০০ সৈন্য রাঙ্গামাটির বরকলের মধ্যস্থলে।

৪) সুবেদার মুত্তালিবের নেতৃত্বে প্রায় ১০০ সৈন্য রাঙ্গামাটির কুতুবছড়ি এলাকাতে।
অপরদিকে ১৫ই এপ্রিল পাকবাহিনী রাঙ্গামাটি শহরে পৌঁছে যায়। রাজা ত্রিদিব রায় পাকবাহিনীকে আহবান করে আনলেন।

 

১৬ই এপ্রিল এর মধ্যে আমাদের সবাই নির্দিষ্ট স্থানে অবস্থান নিলেন। ক্যাপ্টেন ওয়ালিকে মেজর জিয়ার নির্দেশানুযায়ী রামগড় পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। ঐদিন ক্যাপ্টেন কাদের তার বাহিনী নিয়ে খাগড়া রেস্ট হাউজে কজন অফিসারসহ এক প্লাটুন পাকবাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে ক্যাপ্টেন কাদের পাকবাহিনীর অফিসারসহ প্রায় ২০ জন সৈন্যকে নিহত করতে সমর্থ হন। বাকী সৈন্য পালিয়ে যায়। অপরদিকে আমাদের মুক্তিবাহিনীর পক্ষে কোন ও ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। ক্যাপ্টেন কাদের নিরাপদে তার ঘাটিতে ফিরে আসেন। ১৭ই এপ্রিল পাকবাহিনীর প্রায় ২০ জন সৈন্য একটি লঞ্চযোগে রেকি করতে বেরিয়েছিল। ক্যাপ্টেন খালেকুজ্জামান ওত পেতে ছিলেন। কিছুক্ষণ পরই পাকসেনারা বুঝতে পেরেছিল যে তারা মুক্তিবাহিনীর রক্ষাব্যুহের কাছাকাছি চলে এসেছে। পাকসেনারা গুলি ছোড়া শুরু করে। কিন্তু ক্যাপ্টেন খালেকুজ্জামান তবুও চুপ করেছিলেন। সম্পূর্ণ লঞ্চটি তার এলাকায় চলে আসা মাত্র তিনি গুলি চালানো শুরু করলেন। এতে লঞ্চসহ অধিকাংশ পাকবাহিনী ধ্বংস হয়ে যায়। কয়েকজন পালাতে সমর্থ হয়েছিল। এই যুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর ২জন মাত্র আহত হয়েছিলেন।

 

১৮ই এপ্রিল পাকসেনারা দুটি লঞ্চ ও একটি স্পিডবোটে সৈন্য নিয়ে চিঙ্গী নদী দিয়ে অগ্রসর হচ্ছিল। লেঃ মাহফুজের কিছু সৈন্য হঠাৎ গুলি ছুড়ে বসলেন।

 

পাকসেনারা কিছু ক্ষয়ক্ষতি স্বীকার করে পিছু হটে দূরে গিয়ে ডিফেন্স নিয়ে লেঃ মাহফুজের ওপর আর্টিলারী আঘাত হানতে থাকে। উভয় পক্ষের সংঘর্ষে লেঃ মাহফুজের কোন ক্ষতি হয়নি। তবে, পাক সেনাদের কিছু ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু তাদের চাপ আমাদের ওপর ক্রমে বাড়তে থাকে।

 

১৮ই এপ্রিল বিকেল ৩ টায় সুবেদার মুত্তালিব তাঁর দল নিয়ে কুতুবছড়িতে পাকবাহিনীর ৬টি চলমান সৈন্যভর্তি ট্রাকের উপর এমবুশ করে। এই এমবুশে ৩০ থেকে ৪০ জন পাকসেনা নিহত ও দুই-তিনটি গাড়ী ধ্বংস হয়।

 

১৯শে এপ্রিল ৩ টায় পাকসেনাদের একটি বড় রকমের দল ক্যাপ্টেন খালেকুজ্জামান চৌধুরীর ওপর বুড়িঘাটে ব্যাপকভাবে আক্রমন করে। পাকসেনারা ঐ সময় একটি জীপ থেকে তিনটি মর্টার ছুড়েছিল। তাদের বাহিনী ব্যাপকভাবে আক্রমন চালিয়ে অগ্রসর হচ্ছিল। এমনি পরিস্থিতিতে ক্যাপ্টেন খালেকুজ্জামান কিছুতেই থাকতে পারছিলেন না। তখন ল্যান্স নায়েক মুনসী আবদুর রব (৮ম বেঙ্গল রেজিমেন্ট) অটোমেটিক হাতিয়ার মেশিনগান হাতে তুলে নিয়ে বললেনঃ ‘আমি গুলি চালিয়ে যাচ্ছি আপনি বাকী সৈন্যদের নিয়ে পিছু হটে যান।’ ক্যাপ্টেন খালেকুজ্জামান প্রায় ১০০ মুক্তিবাহিনী নিয়ে নিরাপদে পিছু হটলেন। কিন্তু ল্যানস নায়েক মুনসী আবদুর রব পাকবাহিনীর শেলের আঘাতে প্রাণ হারালেন। সেদিন মুনসী আবদুর রব মুনসীকে সরকার বীর শ্রেষ্ঠ উপাধি দিয়েছিলেন। ২০শে এপ্রিল লেঃ জেনারেল মাহফুজ ঐ স্থানে যান এবংমুনসীর ছিন্ন দেহের অংশবিশেষ এবং কিছু গোলাবারুদ নিয়ে ঘাটিতে ফিরে আসেন।

 

ঐ দিনই আমি লেঃ মাহফুজকে বরকলে পাঠিয়েছিলাম মিজো উপজাতিকে আমাদের স্বার্থে কাজ করার পক্ষে মত বিনিময়ের জন্য। লেঃ মাহফুজ বহু কষ্টে সুবলম পর্যন্ত পৌঁছে খবর পেলেন যে, পাকিস্তানীরা মিজোদের ইতিমধ্যেই হাত করে নিয়েছে। আমি আরো খবর পেলাম পাকবাহিনী মিজোদের নিয়ে মহালছড়ির দিকে অগ্রসর হচ্ছে। ২১শে এপ্রিল পাকবাহিনীর একটি কোম্পানী বন্দুকভাঙ্গা নামক স্থানে লেঃ মাহফুজের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। সংঘর্ষে পাকসেনারা পিছু হটে চলে যায়। আমাদের কোন ক্ষতি হয় নি।

 

২৩শে এপ্রিল পাকবাহিনীর প্রায় ২০০ সৈন্য রাঙ্গামাটি থেকে মহালছড়ির দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। আমি ক্যাপ্টেন কাদের এবং লেঃ মাহফুজকে পাঠালাম প্রতিরোধ করার জন্য। ২৪শে এপ্রিল কুতুবছড়ি নামক স্থানে অফিসারদ্বয় পাকবাহিনীর মুখোমুখি হন। এই যুদ্ধে পাকবাহিনী বেশ কিছু ক্ষতি স্বীকার করে।

 

২৫শে এপ্রিল খবর পেলাম চিঙ্গী নদী এবং নার্নিয়ার চর বাজার হয়ে পাকবাহিনী মহালছড়ি অভিমুখে অগ্রসর হচ্ছে। মহালছড়ি আমাদের ব্যাটালিয়ন হেডকোয়ার্টার ছিল।

 

২৬শে এপ্রিল ক্যাপ্টেন কাদের, ক্যাপ্টেন খালেকুজ্জামান ও লেঃ মাহফুজকে কিছুটা পিছিয়ে যেতে বললাম। ঐ তারিখেই ক্যাপ্টেন খালেকুজ্জামানকে নানিয়াচর বাজারে বড় পাহাড়ের ওপর ডিফেনস নিতে বলেছিলাম। কারণ ঐ পথই পাক সেনাদের অগ্রসর হওয়ার সম্ভাব্য এলাকা ছিল। লেঃ মাহফুজকে ডিফেনসে রাখলাম রিজার্ভে পাল্টা আক্রমনের জন্য এবং প্রয়োজনে ক্যাপ্টেন জামানকে সাহায্যের জন্য। ক্যাপ্টেন কাদেরকে পাঠালাম সড়ক পথে পাকবাহিনীর গতিপথ রুদ্ধ করার জন্য।

 

২৫শে এপ্রিল ভোরবেলা হাবিলদার তাহের সিপাহী বারী এবং করপোরাল করিমের সঙ্গে ৮/১০ জনলোক দিয়ে রেকি পেট্রোলে পাঠালাম। এই দলটি ভুলবশতঃ মিজোদের আড্ডায় ঢুকে পড়েছিল। সৌভাগ্যবশত মিজোরা তখন একটি হাতি কেটে খাওয়াতে ব্যস্ত ছিল। রেকি পার্টি পালিয়ে আসতে সক্ষম হয়। আমাদের দলটি পরে হেডকোয়ার্টার মহালছড়িতে পৌঁছে। ঐ তারিখ বেলা ১২ঃ৩০ মিঃ সময়ে ক্যাপ্টেন খালেকুজ্জামান চৌধুরীর অবস্থানের ওপর মিজোরা আক্রমন চালিয়েছিল। ফলে উভয় পক্ষে সংঘর্ষ বেধে যায়। আক্রমনের চাপ বাড়তে থাকে মিজোদের পক্ষ থেকে। মিজোরা সংখ্যায় ছিল অনেক। এই অবস্থায় আমি লেঃ মাহফুজকে প্রায় ১০ জন সৈন্য নিয়ে ক্যাপ্টেন খালেকুজ্জামানের সাহায্যে পাঠিয়েছিলাম। লেঃ মাহিফুজ ওখানে পৌঁছেই ডিফেনস নিয়ে লক্ষস্থলে আক্রমন চালাতে থাকে। কিন্তু ক্যাপ্টেন খালেকুজ্জামান তার সাথীদের গুলি ফুরিয়ে যাওয়ায় ভিন্ন ভিন্ন পথে পিছু হটে আসেন। আধ ঘন্টা গুলি বিনিময়ে লেঃ মাহফুজ ১৫০ জন মিজোকে হত্যা করেছিল। কিন্তু অপর পক্ষে সব বাধাকে অগ্রাহ্য করে অসংখ্য মিজো সমুদ্রের ঢেউয়ের মত সামনের দিকে এগিয়ে আসতে থাকে। লেঃ মাহফুজকে মিজোরা চারদিক থেকে ঘিরে ফেলেছিল। খবর পেয়ে ক্যাপ্টেন কাদের এবং ক্যাপ্টেন খালেকুজ্জামান লেঃ মাহফুজকে উদ্ধার করে আনার জন্য অগ্রসর হলেন। আমরা তখন হেডকোয়ার্টারের চারপাশে ডিফেনস পাকা করছিলাম। এমনি পরিস্থিতিতে ২৭শে এপ্রিল অপরাহ্ণ ৩টায় পাকবাহিনীর ১১ এবং পাঞ্জাবের ২টি কোম্পানী সহযোগে প্রায় এগার শত মিজো ব্যাপকভাবে আমাদের ওপর আক্রমন চালায়। পাকবাহিনী ৬টি মর্টার দিয়ে আক্রমণ চালাতে থাকে। চারদিকে শুধু আগুন আর আগুন। আমি ক্যাপ্টেন খালেক, ক্যাপ্টেন কাদের, ফারুক প্রমুখকে এলাকা ভাগ করে দিয়ে মহালছড়ি হেডকোয়ার্টার রক্ষা করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করলাম। পাকসেনারা মিজোদের নিয়ে ক্রমাগত অগ্রসর হতে থাকে আধুনিক মারনাস্ত্র নিয়ে। অথচ আক্রমন প্রতিহত করার জন্য উপযোগী কোনই ভারী মর্টার আমার কাছে ছিলনা। মাত্র থ্রি নট থ্রি রাইফেল ও সামান্য হালকা মেশিনগান দিয়ে আক্রমন চালালাম। ক্যাপ্টেন কাদের তার এলাকাতে যুদ্ধ করতে করতে শত্রুর গুলিতে শহীদ হলেন। বৃষ্টির মতো গুলির মধ্যে শওকত, ফারুক ও সিপাহী ড্রাইভার আব্বাস গাড়িতে ক্যাপ্টেন কাদেরের মৃতদেহ নিয়ে রামগড় ফিরে এলেন। ক্যাপ্টেন কাদেরের মৃতদেহ রামগড় রেখে বাকী সৈন্যরা আমার কাছে চলে আসেন। আমরা তখন এমনি এক অবস্থায় ছিলাম যখন আমার সমস্ত বাহিনী নিয়ে ঐ পরিস্থিতিতে পিছু হটা সিম্ভব ছিল না। তাই সন্ধ্যা পর্যন্ত আক্রমন চালিয়ে যেতে হয়েছিল। ঐ তারিখে রাতের আধারে মহালছড়ি ছেড়ে সমস্ত সৈন্য নিয়ে আমরা খাগড়াছড়ি নামক স্থানে এসে পৌঁছলাম এবং ডিফেন্স নিলাম।

 

২৮শে এপ্রিল খাগড়াছড়ি থেকে আমি মেজর জিয়ার সাথে অয়ারলেসের মাধ্যমে যোগাযোগ করে আমাদের অবস্থার কথা বর্ণনা করলাম। ঐদিন পাকবাহিনীর একটি দল আমাদের অবস্থান দেখে গুইমারা হয়ে রামগড়ের দিকে অগ্রসর হিচ্ছিল। আমি আমার বাহিনী নিয়ে গুইমারাতে ডিফেন্স নিলাম। আমাদের তখন শক্তি ছিল প্রায় ৪৫০ জন। আমি মানিকছড়ির রাজার সঙ্গে দেখা করলাম। রাজা আমাদের সাথে যোগ দিলেন। তিনি আমার সাথে বিশদ আলোচনা করে মগদের সমস্ত শক্তি নিয়োগ করবেন বলে জানালেন। রাজা পাকিস্তানীদের খবরাখবর দিলেন। সমগ্র মগ উপজাতি আমাদের সাথে যোগ দিয়েছিলেন। চাকমা উপজাতিদেরও হয়তো আমাদের সাহায্যে পেতাম। কিন্তু রাজা ত্রিদিব রায়ের বিরোধিতার জন্য তারা আমাদের বিপক্ষে চলে যায়। মিজোরা বেশ কিছু আগেই আমাদের শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছিল। স্বাধীনতা যুদ্ধের ন’মাস মগ উপজাতি আমাদের সর্বতোভাবে সাহায্য করেছে।

 

২৯শে এপ্রিল রাতে মেজর জিয়া আমাদের রামগড়ে চলে আসতে বললেন। কারণ ইতিমধ্যে পাকবাহিনীর একটি দল করেরহাট-হিয়াকুল হয়ে রামগড়ের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। অপর দল শুভপুর ব্রীজে ক্রমাগত আঘাত হানছিলি। আর একটি দল আমাদের পিছু পিছু আসছিল গুইমারা রামগড়ের পথে। মেজর জিয়া করেরহাটে ক্যাপ্টেন ওয়ালীকে পাঠালেন এবং আমাদের চলে আসতে বললেন। আমরা ২৯শে এপ্রিল র ওয়ানা হয়ে রাত ২টায় সমস্ত সৈন্য নিয়ে রামগড়ে পৌঁছলাম। ৩০শে এপ্রিল মুক্তিবাহিবীর প্রধান সেনাপতি কর্নেল (পরবর্তীকালে জেনারেল) এম, এ, জি ওসমানী রামগড়ে আমাদের দেখে গেলেন এবং চট্টগ্রামের সমস্ত খবরাখবর নিলেন। কর্নেল ওসমানী খুবই খুশী হলেন। আমাকে নির্দেশ দিলেন যে কোন প্রকারেই অন্ততঃ আরো দু’দিন রামগড়কে মুক্ত রাখার জন্য, যাতে করে নিরীহ জনতাসহ সবাই নিরাপদে ভারতে আশ্রয় নিতে পারি।

 

আমি, ক্যাপ্টেন খালেকুজ্জামান, সুবেদার মুত্তালেব এবং লেঃ মাহফুজকে তাদের বাহিনী নিয়ে ক্যাপ্টেন ওয়ালীর সাহায্যার্থে হিয়াকুলে পাঠালাম পাকবাহিনীকে প্রতিরোধ করতে। উভয় পক্ষে তুমুল সংঘর্ষ হয়। পাকবাহিনীর একটি ব্রিগেড তিন দিক থেকে রামগড় আক্রমন করে। ২রা মে আমাদের রামগড় হারাতে হয়। ঐদিনই আমরা সবাই ভারতের সাবরুমে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিলাম। সময় তখন সন্ধ্যা ৬টা।

 

————————————————–

 

সশস্ত্র প্রতিরোধঃ কুমিল্লা-নোয়াখালী-ঢাকা

 

শিরোনাম উৎস তারিখ
৩। চতুর্থ বেঙ্গল ও অন্যান্য বাহিনীর কুমিল্লা, নোয়াখালী, ঢাকা জেলায় সশস্ত্র প্রতিরোধ সাক্ষাৎকারঃ ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ ১৯৭৪-১৯৭৫ ১৯৭১

 

<৯, ৩.১, ৯৬-১২৮>

সাক্ষাৎকারঃ ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ

(খালেদ মোশারফ একাত্তরের মার্চে ৪র্থ বেঙ্গল রেজিমেন্টে সেকেণ্ড ইন কমাণ্ড হিসেবে মেজর পদে ছিলেন)

১৯শে মার্চ ১৯৭১ আমাকে ঢাকা সেনানিবাস থেকে চতুর্থ বেঙ্গল রেজিমেন্টের হেড অফিস কুমিল্লাতে বদলী করা হয়। আমি ২২শে মার্চ আমার পরিবারকে ঢাকার ধানমন্ডিতে রেখে কুমিল্লা চলে যাই এবং সন্ধ্যা সাতটায় চতুর্থ বেঙ্গল রেজিমেন্টে গিয়ে যোগদান করি। ইউনিটে পৌছার সাথে সাথেই বুঝতে পারলাম আমার সৈনিকরা বেশ উদ্বিগ্ন। আরো জানতে পারলাম পাঞ্জাবীদের কমান্ডো এবং গোলন্দাজ আর্টিলারি বাহিনী বেঙ্গল রেজিমেন্টের চতুর্দিকে পরিখা খনন করে মেশিনগান লাগিয়ে অবস্থান নিয়েছে। নির্দেশ পেলেই সবাইকে হত্যা করবে। পাঞ্জাবীরা সেনানিবাস রক্ষার অজুহাতে এসব পরিকল্পনা নিয়েছে। পাঞ্জাবীদের কার্যাবলীতে চতুর্থ বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈনিকদের মনে তীব্র অসন্তোষ দানা বেঁধে উঠেছিল। আমি পৌঁছাবার সঙ্গে সঙ্গে তারা জানতে চায় এখন তাদের কি কর্তব্য? আমি সকলকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়ে এবং আত্মরক্ষার্থে প্রহরী দ্বিগুণ করার নির্দেশ দিয়ে তাদের শান্ত করি। পরের দিন ২৩শে মার্চ ছুটির দিন ছিল। ২৪শে মার্চ সকাল ৭টায় আমি প্রথম অফিসে রিপোর্ট করি লেফটেন্যান্ট কর্ণেল খিজির হায়াত খানের কাছে। তিনি চতুর্থ বেঙ্গল কমান্ডিং অফিসার ছিলেন এবং পাঞ্জাবী ছিলেন। লেফটেন্যান্ট কর্ণেল খিজির হায়াত খান আমাকে বুঝাতে চেষ্টা করলেন যে আমার পোষ্টিংয়ে তিনি খুব খুশি হয়েছেন এবং ইউনিট সম্বন্ধে নানা বিষয়ে আলাপ আলোচনা করলেন। ঐদিনই আমি যখন আমার অফিসে সেকেণ্ড ইন কমাণ্ড উপ-প্রধানের কাজ বুঝে নিচ্ছিলাম সকাল প্রায় সাড়ে দশটায় তখন খিজির হায়াত খান ডেকে পাঠালেন। আমি অফিসের ভিতর ঢুকে দেখি খিজির হায়াত খান উদ্বিগ্ন। তিনি আমাকে বসার জন্য বললেন এবং জানান যে আমাকে গুরুত্বপূর্ণ কাজের দায়িত্ব নিয়ে আজই কুমিল্লা থেকে রওনা হতে হাবে। আমি উত্তর দিলাম যে হুকুম যদি হয় আমি নিশ্চই যাব। তবে আমি একদিন হয় এসেছি এবং আমার দায়িত্ব কেবল বুঝে নিচ্ছি, এমতাবস্থায় ইউনিট থেকে অন্য জায়গায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়তো আপনার পক্ষে ভুল হবে। তাকে আরো বুঝাতে চেষ্টা করলাম ব্যাটালিয়ানে আরো অফিসার আছে, তাদেরকেও পাঠানো যেতে পারে। তাছাড়া ইউনিট প্রধানকে সাধারণত: এভাবে পাঠানো হয়না। আমার বক্তব্য শোনে তিনি বললেন ব্যাপারটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ সেজন্য তোমাকেই যেতে হবে। আমি জানতে চাইলাম আমাকে কি ধরণের দায়িত্ব দিয়ে পাঠানো হচ্ছে। খিজির হায়াত খান বললেন যে, খবর এসেছে সিলেটের শমসের নগর নামক একটা জায়গায় নকশালপন্থীরা বিশেষ তৎপর রয়েছে এবং পাশ্ববর্তী রাষ্ট্র ভারত তাদেরকে অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে ব্যাপকভাবে সাহায্য করছে। আরো খবর আছে ভারত থেকে বেশ অনুপ্রবেশও হচ্ছে। এইসব কারণে আমাকে চতুর্থ বেঙ্গল রেজিমেন্টের একটা কোম্পানী নিয়ে সেখানে যেতে হবে এবং তাদেরকে দমন করতে হবে। আমি জবাব দিলাম একটা কোম্পানী যখন যাবে তখন কোন জুনিয়র মেজরকে সেখানে পাঠানো যেতে পারে। সাধারণত উপ-প্রধান একটা কোম্পানী নিয়ে কখনও যায়না। আমার বক্তব্যে খিজির হায়াত খান কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে গেলেন এবং আমাকে বললেন ঠিক আছে আপনি যান এবং আমি আপনাকে একটু পরে ডেকে পাঠাব। কিছুক্ষণ পরে কর্ণেল আমার আমাকে ডেকে পাঠালেন এবং ব্রিগেড কমান্ডারের কাছে ইকবাল শফি এখনই আপনাকে ডেকেছেন। আমাকে নিয়ে কর্ণেল খিজির হায়াত খান ব্রিগেড কমান্ডারের কাছে গেলেন। ব্রিগেড কমান্ডার আমাকে দেখেই বললেন আমি তোমার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম। বিশেষ একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে যা একমাত্র তুমি ছাড়া কেউ সম্পন্ন করতে পারবেনা এবং সেই জন্য আমি তোমাকেই নির্বাচিত করেছি। আশা করি তুমি আমাকে নিরাশ করবে না। তিনি আরো বললেন, তোমার মত একজন সিনিয়র অফিসারকে এই জন্য মনোনীত করা হয়েছে। আমি ট্রুপস ছাড়া শমসের নগর ইপিআর-এর একটি কোম্পানী আছে। এই বড় ফোর্সের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য একজন সিনিয়র বাঙালি অফিসারের দরকার। তুমিই একমাত্র বাঙালি অফিসার কুমিল্লাতে যাকে আমি এ ব্যাপারে বিশ্বাস করতে পারি।

 

আমি বুঝতে পারলাম যেতে আমাকে হবেই। উপায় যখন আর নেই তখন যতটুকু তাদের কাছে আদায় করে নেয়া যায় সেইটুকুই আমার পক্ষে মঙ্গল। আমি ব্রিগেডিয়ার শফিকে বললাম, যে কাজের ভার আমাকে দিচ্ছেন শুধু একটা কোম্পানী দিয়ে তা হবেনা। কোম্পানীর চেয়ে বেশী সৈন্য আমাকে দেয়া হোক। আর হেড কোয়ার্টারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার জন্য একটা শক্তিশালী ওয়ারলেস দেওয়া হোক। এছাড়া যেহেতু আমি অনেক দুরে একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজে যাচ্ছি সেহেতু আমার ট্রুপস-এর জন্য স্বয়ংক্রিয় ভারী এবং হালকা অস্ত্রশস্ত্র এবং মর্টার ইত্যাদি এবং যথেষ্ট পরিমাণ গোলাবারুদ দেয়ার অনুমতি দেয়া হোক। ব্রিগেডিয়ার শফি প্রথমে বললেন, তোমাকে যে কাজের জন্য পাঠানো হচ্ছে, তাতে এসব ভারী অস্ত্রশস্ত্রের দরকার হবে না। আমি উত্তরে বললাম যে, আপনি যে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থার কথা চিত্রিত করেছেন তাতে আমার সামরিক জ্ঞান অনুসারে এই সমস্ত ভারী অস্ত্রশস্ত্রের দরকার হবে বিশেষ করে যেখানে হেড কোয়ার্টার থেকে তাড়াতাড়ি সাহায্য পাবার আশা কম। আমার বক্তব্যে ব্রিগেডিয়ার শফি কনভিন্সড হলেন এবং কর্ণেল খিজির হায়াতকে নির্দেশ দিলেন আমার যা প্রয়োজন তা যেন আমাকে দিয়ে দেয়া হয়। আমরা ব্রিগেডিয়ার শফির কাছ থেকে ইউনিটে ফিরে এলামা। এসই ব্যাটালিয়নের এডজুট্যান্ট ক্যাপ্টেন গফফারকে (এখন মেজর) ডেকে নির্দেশ দিয়ে দিলাম সমস্ত ব্যাটালিয়ান থেকে বেছে বেছে ২৫০ জনের মত সৈন্যকে আলফা কোম্পানীতে একত্র করার জন্য।

 

গাফফারকে বলে দিলাম যে, ব্যাটালিয়নের ভারী অস্ত্রশস্ত্র যতো আছে সব নিয়ে যাও। গোলাবাদরু এমনভাবে নেবে যাতে একমাস যুদ্ধ করা যায়। আমাদের ২৬টা গাড়ী ব্রিগেড থেকে দেওয়া হয়েছিল। সব বোঝাই করতে এবং অস্ত্রশস্ত্র ও সৈনিকদের তৈরী করতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। এই সময় আমি একটা অস্বাভাবিক ঘটনা দেখতে পাই। যতোক্ষণ পর্যন্ত আমি এবং আমাদের লোকজন প্রস্তুত হচ্ছিলাম ততক্ষণ পর্যন্ত খিজির হায়াত এবং অন্যান্য ব্রিগেড স্টাফের অফিসাররা বসে লক্ষ্য করতে থাকলেন।

 

আমি ২৪শে মার্চ সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় যাওয়ার জন্য তৈরী হই। ব্যাটালিয়নে যে সমস্ত বাঙালি অফিসার থেকে গেল তারা সবাই আমার যাবার পূর্বে মেসে এসে দেকা করে গেল। এদের মধ্যে সিনিয়র অফিসার ছিলেন ক্যাপ্টেন মতিন (বর্তমানে মেজর) তাকে আমি উপদেশ দিলাম যে আমি চলে যাচ্ছি, এতে ঘাবড়াবার কিছু নাই। এখন তুমিই সিনিয়র। যদি কোন অঘটন ঘটে তাহলে এই চতুর্থ বেঙ্গলের বাকী ট্রুপসের নিরাপত্তার পুরো বন্দোবস্ত করবে এবং যদি প্রয়োজন হয় যুদ্ধ করে ক্যান্টনমেন্ট থেকে বেরিয়ে আসবে এবং আমার সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করবে। সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় আমি কনভয় নিয়ে শমসের নগরের পথে রওনা হলাম। রাত প্রায় ২টা-আড়াইটার সময় ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের উপকন্ঠে পৌঁছলাম। সেখানে রাস্তায় অনেক ব্যারিকেড। এই প্রতিবন্ধকতার জন্য আমাদের এগোতে অসুবিধা হচ্ছিল। এই ব্যারিকেড ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে শহরের দিকে এগোচ্ছিলাম। শহরের কিনারে যে পুল আছে (নিয়াজ পার্কের কাছে) সেখানে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ছাত্র-জনতা আমাদের বাধা দেয়। হাজার হাজার লোক এবং ছাত্র রাস্তায় শোয়ে পড়ে এবং বলে যেতে দেওয়া হবেনা। আমি সেখানকার নেতৃস্থানীয় লোকদের সাথে কথা বলতে চাইলাম। ওখানেই আওয়ামী লীগের তদানিন্তন এমসিএ সাচ্চু মিয়া এবং অন্য কয়েকজন আওয়ামী লীগ এবং ছাত্রনেতারা আমাকে জানান যে, পূর্ব বাংলার অনেক জায়গায় পাকসেনারা আবার গুলি চালিয়েছে এবং মিলিটারী চলাচল কেন্দ্রীয় নির্দেশে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। তারা আরও বলেন আপনাদের বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈনিকদের ইচ্ছাকৃতভাবে কুমিল্লা থেকে দুরে পাঠিয়ে দিচ্ছে এবং আপনাদের যেতে দেবনা। এই ভাবে কয়েকঘন্টা কথাবার্তা হয়। ইতোমধ্যে মেজর শাফায়াত জামিল (বর্তমানে লে: কর্ণেল), যিনি চতুর্থ বেঙ্গল রেজিমেন্টের আর একটা কোম্পানীসহ ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে অবস্থান করছিলেন, তিনিও ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। তিনিও তাদের বুঝাতে চেষ্টা করলেন যাতে ব্যারিকেড এবং অন্যান্য প্রতিবন্ধকতা সরিয়ে ফেলা হয়। কিন্তু তাতেও তারা আমাদের অনুরোধ রাখতে রাজী হয়না। তারপর তাদের নিয়ে মেজর শাফায়াত জামিলের ক্যাম্পে যাই। সেখানে আবার কথাবার্তা চলে এবং তাদের আমি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিই যে, বেঙ্গল রেজিমেন্ট বাংলাদেশেরই রেজিমেন্ট, যখন দরকার পড়বে বাঙালি জাতির জন্য পিছিয়ে থাকবে না। এমতাবস্থায় আমাদের বাধা দেয়া ঠিক হবেনা। অবশেষে সকাল সাড়ে পাঁচটায় সব নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা আমাদেরকে আর বাধা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। আমরা শমসেরণগরের পথে আবার ২৫শে মার্চের সকালে রওনা দিলাম। যাওয়ার আগে মেজর শাফায়াত জামিলকে আলাদা ডেকে সতর্ক করে দিলাম এবং আমার সঙ্গে অয়ারলেস মারফত যোগাযোগ রাখার নির্দেশ দেয় গেলাম। আমি সকাল দশটা-এগারোটার সময় শ্রীমঙ্গলে পৌঁছি। সেখান থেকে শমসেরণগর যেতে হলে মৌলভীবাজার হয়ে যেতে হবে। শ্রীমঙ্গলে কনভয় দাড় করিয়ে স্থানীয় কিছু ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসা করি শমসেরণগরে যাওয়ার রাস্তা সম্বন্ধে এবং জানতে পারি মৌলভীবাজার হয়ে যাওয়া যায় অথবা আর একটা রাস্তা আছে সোজা শ্রীমঙ্গল হয়ে জঙ্গল এবং পাহাড়ের মধ্য দিয়ে। এই রাস্তা অপেক্ষাকৃত কম দুরত্বের আমি এই সোজা জঙ্গলের রাস্তা দিয়ে শমসের নগরের পথে রওনা হলাম। যে রাস্তা দিয়ে যাওয়ার কথা ছিল সে রাস্তা পরিত্যাগ করে পাহাড়ের পথ দিয়ে রওনা হলাম। এই রাস্তা খুব খারাপ ছিল তাই অতি কষ্টে দুপুর ২টায় শমসের নগর গিয়ে পৌঁছি। সেখানে যেয়ে ডাকবাংলোতে আমি আমার ছাউনি স্থাপন করি।

 

দুপুরে খেয়ে আমি এবং লে. মাহবুব শমসেরণগরের চারদিকে ঘুরে দেখে আসি পরিস্থিতি স্বাভাবিক। আর কিছু পেট্রোল পার্টি চতুর্দিকে পাঠিয়ে দিই। স্থানীয় ব্যক্তিদের সঙ্গে আলাপ আলোচনা করে জানতে পারি কোন অঘটন সেখানে ঘটেনি। ইপিআর-এর যে দুটো কোম্পানীর কথা আমাকে বলা হয়েছিল তাদের কোন পাত্তা নেই। ইপিআর-এর একজন সুবেদার এবং আরো কয়েকজন সিপাই শমসেরণগর এয়ারপোর্টে অবস্থান করছিল। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে সঠিক কোন উত্তর পাইনি। শমসেরণগরের টিগার্ডেনগুলো ঘুরে জানতে পারলাম। সমস্ত পশ্চিম পাকিস্থানী ম্যানেজার এবং অফিসাররা ঢাকায় চলে এসেছে। নকশালপন্থী বা অনুপ্রবেশকারীদের কোন চিহ্ন আমি খুজে পেলাম না। ২৫শে মার্চের রাতটা এভাবে খবরাখবর নিয়ে এবং পেট্রোলিং করে কেটে গেল। সমস্ত ব্যাপারটা আমার কাছে ঘোড়ালো মনে হলো। আমার মনে জাগল আমাকে এখানে কৌশল করে পাঠানো হয়েছে এবং যা কিছু তারা বলেছিল, তা সবই মিথ্যা। আমি সমস্ত সকাল অয়ারলেসের মাধ্যমে হেড কোয়ার্টারে যোগাযোগ করার চেষ্টা করি কিন্তু কোন যোগাযোগ হলনা। এইভাবে দুপুর পর্যন্ত চলে যায়। আমি এবং লে. মাহবুব ডাকবাংলোর বারান্দায় বসেছিলাম। হঠাৎ আমাদের এসে খবর দেয় এক পাঞ্জাবী অফিসার এবং বেশ কয়েকজন সৈন্য শমসেরণগর বাজারে এসেছে এবং ষোকনে কারফিউ জারি করে স্থানীয় জনসাধারণের উপর অত্যাচার করছে। সেই দলটি আমাদের ক্যাম্পের সম্মুখে দিয়ে মৌলভীবাজার যাচ্ছিল। আমাদের সেন্ট্রিকে সেই দলটির অফিসারকে ডাকার জন্য পাঠাই। এরা যখন সামনে দিয়ে যাচ্ছিল তখন সেন্ট্রি তাদের আমাদের ক্যাম্পে আসার জন্য অনুরোধ জানায়। অফিসারটি ক্যাম্পের ভিতর আসে এবং আমার সেখানে উপস্থিতি সম্বন্ধে আশ্চর্যবোধ করে। এমন ভাব দেখায় যে, আমার এখানে আছি এটা সে জানত না। কথাবার্তায় আমি জানতে পারি যে, ৩১ পাঞ্জাব রেজিমেন্টের বেশ কিছু সৈন্য সিলেট থেকে মৌলভীবাজার এসে দুই দিন আগে ক্যাম্প করেছে। অফিসারের হাবভাব এবং কথাবার্তা আমাকে সন্দিহান করে তোলে। যতক্ষণ সে ডাকবাংলোয় বসেছিল ততক্ষণ সে স্টেনগানটি কোথাও না রেখে নিজের হাতে রাখে। এতে সন্দেহ আরও ঘনীভুত হয়। এদের আগমন সম্বন্ধেও আমাকে অবহিত করা হয় নি। এটাও অত্যন্ত অস্বাভাবিক। কিছুক্ষণ পরে অফিসারটি তার দলবল নিয়ে চলে যায় এবং যাওয়ার আগে আমাদেরকে পাঞ্জাব রেজিমেন্ট ক্যাম্পে যাওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানায়। আমি যাওয়ার আশ্বাস দিয়ে অফিসারটিকে বিদায় করলাম।

 

সেই দিনই বিকেলে স্থানীয় জনসাধারণের মুখে আমি জানতে পাই ঢাকাতে কিছু একটা ভয়ংকর অঘটন ঘটেছে। কিন্তু কেউ সঠিক কিছু বলতে পারেনা। আস্তে আস্তে লোকমুখে শুনতে পাই যে, ঢাকায় পাক সেনাবাহিনী হাজার হাজার লোককে গুলি করে মেরে ফেলেছে এবং মারছে। বাংলাদেশের অন্যান্য জায়গাতেও পাক বাহিনী সেই রূপ নৃশংস অত্যাচার এবং হত্যাকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। হাজার হাজার লোক ঢাকা ছেড়ে জান বাঁচানোর জন্য বাইরে চলে যাচ্ছে। পাক সেনাবাহিনী ট্যাংক, কামান এবং অন্যান্য অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে নির্দোষ, নিরীহ, নিরস্ত্র জনসাধারণের উপর বর্বরোচিতভাবে অত্যাচার করেছে। ঢাকা শহর একটা ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছে। আমি অনেকক্ষণ বসে থেকে চিন্তা করতে থাকলাম আমার এখন কর্তব্য কী। অয়ারলেস সেট খোলার হুকুম দিয়ে হেড কোয়ার্টারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করতে লাগলাম। অনেক চেষ্টার পরও কোন যোগাযোগ হলনা্ তবুও আবার চেষ্টা চালিয়ে যেতে বললাম। অনেকক্ষণ পর আমাকে লেঃ মাহবুব এসে খবর দিল যে হেড কোয়ার্টারের সঙ্গে অতি কষ্টে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়েছে। আমি তাড়াতাড়ি দৌড়ে গেলাম অয়ারলেসে কথা বলার জন্য। যখন আমি কথা বলত